Friday, July 31, 2020

পূরবী~ ২২ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী- ২২
অভিজিৎ চৌধুরী


পাতিরামে দুটো চটি কবিতার বই চোখ টানতো,শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা।ভাস্কর চক্রবর্তীর লেখা।আরেকটি অতো যে গভীরতা নেই বোঝা যেত,হস্টেল থেকে লেখা কবিতা।

সব হারাদের মাঝে।তীর্থ ভাবছিল,এই উক্তির মধ্যে কতোখানি সত্যকথন রয়েছে।রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন কিন্তু জাঁক দেরিদার বিনির্মাণ হয়তো অসাড়তা বের করে বলবে,পাঠকের অবিশ্বাস রইল।ধরুন,রবীন্দ্রনাথ কখনও কি বলেছেন, ভারতবর্ষকে জানতে গেলে বিবেকানন্দকে জানতে হবে।এটাও দূর কল্পনা।আমদের মন এরকম বিনির্মাণের জন্ম দেয় পজিটিভ হতে চায় বলে।

 বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের কথা বলতে গেছিলেন।বলতে গেছিলেন বেদান্তের কথা।সেদিনের নব জাগ্রত আমেরিকা তাঁকে গ্রহণ করে।কোন স্ববিরোধ ছিল না।তা ভুল ঠিক যাই হোক।

বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে তিনি মারা যাবেন।তাঁর সাফল্যের স্মারক সেই মহাদেশ।

তীর্থের মনে হয় ইউরোপে প্রিচ করতে তাঁর একটুও ভাল লাগত না।গান নেই এ থেকে বিষণ্ণতা আসত।ফলে Songs Offerings এর কবির সঙ্গে প্রচুর অমিল।

এই দ্বন্দ্ব তো তীর্থের চেনা।এই টানাপোড়েন স্বাভাবিক।রাশিয়ার জাগরণ দেখে উদ্বেলিত রবীন্দ্রনাথ আর আমেরিকার জাগরণ দেখে উদ্বেলিত বিবেকানন্দ - কোন বিরোধ নেই।আসলে ধনতন্ত্র নয়,সমাজতন্ত্র নয়,সেদিন আমরা ছিলাম পরাধীন।

সময় বদলেছে।স্বাধীনতা এসেছে।এসেছে কালো বাজারি কালো সাহেব।এতো কালো কেন এলো!

জাঁক দেরিদা বলবেন,কালো প্রতীয়মান করে সাদাকে।মুক্তচিন্তা বিনাশ ঘটায় ধনতান্ত্রিক আগ্রাসনের।

এখানেও তীর্থের মনে দ্বন্দ্ব রইল।

অতিমারি বিশ্বজুড়ে।কাতারে কাতারে মরছে মানুষ।আবার জন্মাবেও।কবি আত্মহত্যা করে বলে যাবেন হয়তোবা - শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা!বিষণ্ণতার দাঁড়কাক কলকাতাকে গ্রাস করলে আমরা ভাববো- ওগো পূরবী, ওগো অস্তরাগ এই মিথ্যের বাসরঘরে আর একটু জাগি।

পূরবীর রাগে তো সমর্পণ। এবার তো চলে যাওয়া অচিন দেশে।

মানুষের শরীরে যদি ব্যাঙের রক্ত ঢুকে যায়- এরকমটা রবীন্দ্রনাথ ভাবলে কি কোন আত্মার মৃত্যু হতো! নাকি এরকম স্ববিরোধ কবি অন্তর্লীন রেখেছিলেন ভাবীকালের জন্য।তীর্থের মনে পড়ে সে কোন কিশোরবেলায় পাতিরামে আবার দাঁড়িয়ে রয়েছে।

হঠাৎ কুয়াশার ফাইবারে || শুভ্রনীল চক্রবর্তী || কবিতা

হঠাৎ কুয়াশার ফাইবারে 
শুভ্রনীল চক্রবর্তী


কাল রাতে প্রকৃতি এসছিলো
দিশাহারা হয়ে কিছু গাছের পাতা
ছুটে বেড়াচ্ছিল
       রাস্তায় পড়ে থাকা মুঠোফোন সরিয়ে দিতে
ছুটে বেড়াছিল
     আকাশ থেকে নেমে আসা ঢেউ
        তার জন্য পথ বানাতে

ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছিল বহুদিনের মিশে থাকা এক কোষী ডিজিটাল ভাইরাস

আমি অবাক হয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে দেখছিলাম
জানলার ওপারে সম্পূর্ণ এক অন্য পৃথিবী
শুধু  মাঝবরাবর সময়ের স্নায়ুরেখা
ধীরে ধীরে প্রকৃতি আমার দিকে এগিয়ে আসছে
ধারণ করছে এক নতুন সৃষ্টিকল্প
একে একে শোধন করছে
    প্রতিবেশীদের কার্নিশে জমে থাকা দুহাজার   
                      বছরের জড়াজীর্ণতা

স্থাপন করে যাচ্ছে তার যুগতত্ত্ব বাদ
হঠাৎ এক মর্শুমী স্পর্শে মুছে গেল সভ্যতার এত বছরের অহংকার
প্রযুক্তির গরিমা
দমকা হওয়ার দাপটে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল
সভ্যতার ধ্বজাধারী যন্ত্র সৈন্য
ছিড়ে যেতে লাগলো একের পর এক স্তরে বিন্যস্ত
তথ্যতন্তু

প্রকৃতি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকলো
আমার দরজার দিকে
পেছনে বিধ্যস্থ হয়ে দাড়িয়ে থাকা
কিছু পারমাণবিক চুল্লী ,
তছনছ হয়ে যাওয়া সখের অপটিক্যাল ফাইবার
সবাই ইশারা করলো আমায়
প্রাণভিক্ষা করতে বললো রুদ্রার রুদেল তটে

আমি অবাক হয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে দেখছিলাম
আমার দরজার বাইরে
প্রকৃতির ভীষণ সুন্দর রূপ
প্রসবকালীন মাতৃত্বে ভরা এক অগোছালো সৌন্দর্য তার
আমাকে তার জঠর ভরা ইতিহাস দেখাতে দেখাতে বলে গেলো -
      আজ কাল পরশু বলে কিছু নেই
      পুরোটাই চক্রাকারে আবর্তিত এক পর্যায় মাত্র ।।

মুক্তি || ইয়াসিন খান || কবিতা

মুক্তি
ইয়াসিন খান


সামনে মানুষ পেছনে মানুষ
ছায়ারা সব মানুষ
মানুষের মত মানুষ
তথ্য প্রযুক্তির জালে মানুষ

স্বপ্নের স্রোত দিগন্তে জলের নূপুর
আলপনা আঁকে এক আকাশ
সৃষ্টি সবুজের মেলা
ভেসে চলে মেঘ ভেলা

রিয়াল টাইম মনিটরিং
মানুষ ও জীবন 
আবার ঝড়ের কবলে
স্বপ্নের রং বদল নাকি জীবনের?

বিপ্লব সঠিক সময়ের
সমাজ ও সংস্কৃতি বদলের
নতুন মানুষের ক্লাউড  সৃষ্টি
মুগ্ধ বিকেলে পথ বৃষ্টি

আই যুগ ও প্রহর
নতুন চেতনায়  শহর
সনাতনী ঐক্য ছুঁয়ে  আধুনিক অনুভব
ডিলিট হোক্  ছায়া মানুষ সব

মাউস ক্লিক আর মুঠো ফোনে
মুক্তি বাতাস নামে
পাহাড়ের উপর একলা বরফ ঢেউ 
আপন খেয়ালে বেঁচে কেউ

গলে যাওয়া স্রোতে  রবি
 কবিতা ধ্যানে বসে কবি
বরফ আগুনে  জীবন রেশ
 আগত এক নতুন দেশ

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ৮৮ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৮৮.
 দুর্গাপুর , এই ইস্পাত নগরীর সঙ্গে  রথীন বন্দ্যোপাধ্যায় -এর নামটিকে যুক্ত করার কোনো যুক্তি তৈরি করতে পারলাম না। বরং যুক্ত করতে হবে একটি দৃষ্টিভঙ্গীকে। আধুনিক-পরবর্তী যে চিন্তা এবং চেতনায় আমরা অনেকেই আপ্লুত ছিলাম , আমি মনে করি সেই অনেকের মধ্যে রথীনও একজন।সে সময় দুর্গাপুর বলতে আমরা বুঝতাম রজতশুভ্র গুপ্ত নিমাই বন্দ্যোপাধ্যায় প্রদীপ চক্রবর্তী পিনাকীরঞ্জন সামন্ত ব্রজকুমার সরকার অনিকেত পাত্র এবং অবশ্যই রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়।
এবার রথীন-এর কবিতায় প্রবেশ করছি। দেখুন আপনার অভিজ্ঞতার কোনো স্থানিক পরিবর্তন হয় কিনা। পড়ুন এবং পড়তে থাকুন :
১॥ সেফটিপিন বিষয়ে কিছু লিখতে গেলে প্রথমেই জেনে নিতে হবে ঘরের হিউমিডিটি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য।
২॥ প্রসঙ্গ : সান্ধ্যভ্রমণে যারা সাদা পাঞ্জাবি পরেন
তাদের আচরণবিধি রথীন যেভাবে চিহ্নিত করেছে তা বাংলাকবিতার সম্পদ :
তাদের পকেটে খুচরো পয়সা থাকে এবং ভ্রমণকালে তারা তাদের বাঁহাত কব্জি পর্যন্ত পকেটে গোপন রাখেন।
দাঁতের যথার্থ ব্যবহার জেনে গেছে বলে তারা স্বভাবতই লাজুক ( এবং কামুক ) হয়।
ফায়ারব্রিগেডের লালঘন্টির শব্দে তাদের যৌনতাবোধ তীব্র হয়।
 এইসব সংক্রামক কথাবার্তা লিখেছিল রথীন। আমরা সেই রথীনকেই মনে রাখি। মনে রাখতে বাধ্য হই।
রথীন-এর একটি অনবদ্য কবিতা :
 Push ও Pull.
সেই কবিতাটি থেকে কিছু অংশ :
এক। 'Push ' শব্দটির পিছনে একটি অন্দরমহল থাকে
দুই।  'Push ' - এর পৃথিবীতে পরিপূরক কোণগুলি শুধুমাত্র সমকোণ নয়।
তিন।  ' Push ' -এর  'S ' এবং  ' H ' এর জায়গায় দুখানি ' L ' বসে তৈরি হয়েছে  'Pull 'এবং 'L' দুটি এসেছে যথাক্রমে 'LANDSCAPE ' ও 'LIBERTY' এই দুটি শব্দ থেকে।
চার। 'PUSH ' ও 'PULL' এর মাঝখানে একটি কপাট থাকে বলেই শব্দদুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব অসীমও হতে পারে।
এইসব Message বাংলাকবিতায় আগে ছিল না।আমরা এই পোস্টমডার্ন কালখণ্ডের কবিদের সমবেত প্রচেষ্টায় এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। এখন এদিক-ওদিক থেকে কেউ কেউ বাংলাকবিতাকে পাল্টেছেন বলে দাবি করছেন দেখছি।তাঁরা কেউ ক্যালেন্ডার-নির্মাতা নন, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই।
 আমি তখন বাঁকুড়ার দেশের বাড়ি যাওয়া পথে ট্রেন থেকে নামতাম দুর্গাপুর। দুর্গাপুরে একটা আড্ডা হত।সেই আড্ডায় উপস্থিত থাকত রথীন। আমরা তখন কবিতার সীমাবদ্ধ পরিসরকে বড়ো করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। আমি লিখছিলাম আমার নোটবই - এর কবিতাগুলি।অর্থাৎ Notes on Physiology , Notes on Mathematics , Notes on Geography , Notes on Animals , Notes on Birds , Notes on Insectsগুলি লিখে ফেলেছি , সেসময় রথীন-কে বলেছিলাম : তুমি তো হাসপাতালে চাকরি কর। হাসপাতালকে কবিতায় ব্যবহার কর। রথীন কথা রেখেছিল। আমাকে পূর্ণ করে দিয়েছিল। বাংলাকবিতা সমৃদ্ধ হয়েছিল রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর  ' চার পরিচ্ছদ হাসপাতাল ' কবিতাগুচ্ছতে। এক পরিচ্ছদগুলির সাব-হেডিংগুলি দেখে নেওয়া যাক :
প্রথম পরিচ্ছদ : হাসপাতালের যে কোনো কোণ থেকেই শুরু হতে পারে নিখুঁত কবিতা
দ্বিতীয় পরিচ্ছদ :হাসপাতালমুখী সব রাস্তাই মিতভাষী হয়
তৃতীয় পরিচ্ছদ:অফসেটে যতবারই হাসপাতালকে লাইন টু লাইন কম্পোজ করতে যাই ততবারই রান-অন হয়ে যায়
চতুর্থ পরিচ্ছদ : ব্যবহৃত ডিসপোজেবল সিরিঞ্জে ভরে উঠছে হাসপাতালের মর্গ
আমি পূর্ণ হয়েছিলাম। বাংলাকবিতা সমৃদ্ধ হয়েছিল। নতুন নতুন কবিরা যুক্ত করেছে নতুন নতুন পরিসর।একে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না।এমনকি যিনি ইতিহাস নির্মাণ করেছেন তিনিও পারবেন না।
এখন কেউ কেউ দাবি করছে তারাও নাকি বাঁকবদলের দাবিদার।খোঁজ নিলে জানতে পারবেন ১৯৯৫-৯৬ সালে তারা বাঁকে করে জল নিয়ে তারকেশ্বরে যেতেন। প্রাক আধুনিকরাও উত্তর আধুনিক হতে চাইছে। তাদের কোথায় রাখবেন তা স্থির করবেন পাঠকসাধারণ।

আটপৌরে কবিতা || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫৪৬

আঘাত/ অত্যাচার/ অস্থিরতা
     ) আর্তনাদ  (
হেরে যাওয়া মানুষের জন্য ।

৫৪৭

হুল্লোড়/ আনন্দ/ দাবি
        )কোলাহল (
আমাদের জানান দিয়ে যায় ।

৫৪৮

দৃশ্য/  সুখ/ মুক্তি
    ) নিসর্গ  (
প্রকৃতির কোলে মিশে যায় ।

৫৪৯

সম্পৃক্ত/  পূর্ণতা/  স্বচ্ছল
    ) ভরপুর  (
এমনি ভাবে যাক দিন !

৫৫০

ট্রলিব্যাগ/  টিকিট/ হোটেল
        )ভ্রমণ  (
বর্হিদৃশ্য অন্যস্বাদ বিস্ময় প্রমোদ ।

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || জললেখা

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

জললেখা । অশোক চক্রবর্তী । দিবারাত্রির কাব্য । একশো পঁচিশ টাকা ।

পূর্বের দুটি অসংলগ্ন ও অকিন্ঞ্চিৎকর কাব্যগ্রন্থের পর কবি অশোক চক্রবর্তীর  ২০১৯সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'জললেখা ' য় সামান্য হলেও উন্নতি চোখে পড়লো । আসলে তিনি লিখতে লিখতে কবি হবার চেষ্টা করছেন । তাঁর মধ্যে পড়াশোনা ,কাব্যিকতার চরিত্র না থাকলেও  তিনি কবিতার নকল গড় সামলানোর মধ্যে দিয়ে আসল গড় সামলানোর তৃপ্তি পাচ্ছেন । সে কারণে সামান্য হলেও তাৎক্ষনিক মনোযোগ আকর্ষণ করে এই সব পংক্তি : ' তুমি এলে খাতাটি খুলে দেখি কিছুটি নেই! / আসলে জলেই লিখেছি এতকাল!  ' , ' হাজারো ধোয়ামোছার পরও / টিপের  আঠা ও মশারির/  সম্পর্ক  অবিচ্ছেদ্য ' ।
           বইটির ব্লার্বে  লেখা আছে,  ' মানুষটির কবিতার জগতে প্রকরণের বৈচিত্র্য চর্চা হয়তো তেমন নেই ' , এখানে ' হয়তো ' শব্দের মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটি হালকা করা হলেও তা কিন্তু প্রকটভাবেই নেই । গ্রন্থের ছোটখাটো শিরোনামহীন  বাহাত্তরটি কবিতা পড়ে এই ধারণা স্পষ্ট যে কবিতাগুলো কাব্যগ্রন্থ হিসেবে গ্রন্থিত হওয়ার অনুপযুক্ত।
           কবিতার এই এক দোষ যে যাদের কবিতা লেখার কথাই নয় , তারাও কবিতার সঙ্গে খ্যাতি ট্যাতির কিন্ঞ্চিত যোগ থাকায়,  তার আকর্ষণে আকর্ষিত হয়ে কবিতা লিখতে শুরু করে দেন । তারফলে সারা বিশ্বে আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে হাজারে হাজারে । অশোক চক্রবর্তী র কবিতায় ' সামান্য উন্নতি' নিয়ে  কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলে হাস্যকর হতে হবে । ফয়সল অরফিয়াসের প্রচ্ছদ বইটির মেজাজ তুলে ধরে না।

নস্টালজিয়া ৯ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৯
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


আমার ছোটবেলার দিনগুলো নিত্য নতুন আনন্দের আয়োজনে আপনা থেকেই সাজতো। প্রায় প্রতিটি দিনেই কী ভাবে যে আনন্দের উৎস মুখ খুলে যেত আজও তার হদিস মেলেনি।  রাত্রে শুতে যাওয়ার সময় ভাবতাম কাল তো  নতুন কিছুই নেই,  শুধু পড়াশোনা,  স্কুল আর বাড়ি। কিন্তু,  পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই মা  যখন  বলতো , আজ থেকে ঝুলনযাত্রা শুরু হচ্ছে। ব্যস ! মনের আগল যেত ভেঙে , তোলপাড়  শুরু হতো আনন্দে। ঝুলন সাজাতে হবে, চার-পাঁচ দিন ধরে ঝুলন থাকবে! আমাদের দেওয়াল আলমারিতে যত খেলনা পুতুল সেই সকালেই সব নামাতাম। বিভিন্ন মেলা থেকে কেনা অনেক ধরনের মাটির পুতুল ছিল আমাদের। লালবাগকে মেলার শহর বললে কিছু ভুল বলা হতো না। তখন সারা বছর জুড়ে কত রকমের মেলাই না হত আমাদের ওখানে।  রথের মেলা, মহরমের মেলা, বেড়ার মেলা, ঈদের মেলা,স্নানযাত্রার মেলা, শ্মশান কালীর মেলা ইত্যাদি। জানলার কাছে একটা চৌকিতে ঝুলন সাজাতাম।সেখানে মাটি মাখানো কাপড় দিয়ে পাহাড় তৈরি করে নিচে গাছের ডালপালা পুঁতে বনভূমি করতাম। ঘাসসুদ্ধ মাটির চাপ তুলে এনে বসাতাম খেলার মাঠ,  জমি করতে।  বাটিতে জল দিয়ে পুকুর করতাম।  তাতে কিছু জলজ পাতা রাখতাম।  প্লাস্টিকের হাঁস সেই জলে ভাসাতাম, কলসি কাঁখে মেয়ে বসাতাম সেখানে জল আনতে। এই ঝুলনে অনেক দৃশ্য সাজাতাম আমরা, যার যেমন খেলনা পুতুল থাকত সেইমত। বাজারে ফলমূল,  শাকসবজি বিক্রেতা, বিয়ে বাড়ি, ফুটবল খেলা, গ্রামের দৃশ্য , জুতোর দোকান ইত্যাদি। এখানে প্রতিটি দৃশ্যই আমাদের চেনা জীবন থেকে নেওয়া হতো। একটা সুন্দর দোলনায় ঝোলানো হত রাধাকৃষ্ণকে।দোলনাটি আমরা ফুল দিয়ে সাজাতাম আর একটা দড়ি বেঁধে মাঝে মধ্যে আড়াল থেকে সুতো দিয়ে টানতাম সেই দোলনাটি।বন্ধুরা পাড়ায় একে অন্যের ঝুলন সাজান  দেখতে যেতাম। কার ঝুলন বেশি সুন্দর সাজানো হয়েছে দেখতাম।আমার মামার বাড়ি গোকর্ণে মানুষ ঝুলন হতো, তাও দেখেছি। নশিপুরের রাজবাড়িতে সুন্দর ঝুলন সাজান হত এবং সেই সময় ভিতরটা দর্শকের জন্য খুলে রাখা হতো।নশিপুরে খুব বড় ঝুলনের মেলা হত। এই রাজবাড়ির ভিতরে দশদিকে ছিল দশাবতারের মূর্তি আরও অনেক দেবতার মূর্তি। এইদিন আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখতাম। রাজবাড়ির নির্দিষ্ট পুরোহিত থাকতেন এবং তখন নিয়মিত পূজার্চনা হত দেখে বোঝা যেত। এরপর আমরা মেলায় পাঁপড়,  জিলিপি, বাদামভাজা আরও টুকটাক কত কি খেতাম। কোনো কিছু কেনাকাটার বায়না ছিল না আমাদের। দু একটা  মাটির পুতুল ছাড়া কিছু কিনতামও না। মেলায় বেড়ানোর নির্মল আনন্দে মন প্রাণ ভরিয়ে আমরা যখন  ঘরে ফিরতাম তখন ঝুলন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চরাচর ভেসে যেত।

আমরা আধুনিক || জয়দেব বর্মন || আত্মপ্রকাশের কবিতা

আমরা আধুনিক
জয়দেব বর্মন


না, না "সাম্যের"কথা মুখে আনো না- শব্দটা বড়ই বাজে।
মৈত্রী সে তো আরো খারাপ, আসেনা কোনো কাজে।
গনতন্ত্রের লড়াই লড়তে, ওসব কী আর লাগে।
হিন্দু নাকি মুসলিম সেটাই বুঝতে হবে আগে।
কৃষক করবে আত্মহত্যা- ভাববার কিছুই নাই।
তবে আত্ম নির্ভর দেশ আমাদের এইটা বলা চাই।
যায় যদি ভেসে কাল স্রোতে, যাহা কিছু নৈতিক।
বুক ফুলিয়ে বললেই হয় আমরা আধুনিক।
পশ্চিমী দ্বার কবেই খুলেছে, অর্থ করতে চাঙ্গা।
সহিষ্ণুতা মাটিতে মিশেছে রাম-রহিমের দাঙ্গা ৷

Thursday, July 30, 2020

পূরবী~ ২১ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

পূরবী~ ২১
অভিজিৎ চৌধুরী

সত্যের লও সহজে।এর চেয়ে অসহজ জীবনে কিছু হয় না।তীর্থ তো তাই দেখল জীবনভর।স্তাবকেরা স্বার্থ নিয়ে ঘোরাফেরা করেন।চোখের পলকে সুখের পায়রার দল উড়ে যায় বহু দূরে।কিন্তু তাও কি শিখল কিছু তীর্থ জীবনের কাছে! একই ভুল৷ বয়ে নিয়ে যাওয়া।
বাবামশাই,আপনি কিন্তুএকেবারেই মানুষ চেনেন না।রথী প্রায় বলেন।বড় বউও তাই বলত।ছুটির কাছে এই নিয়ে বহু বকা খেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
একা লাগে না আপনার! হ্যা।খুব একা মনে হয়।সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন মৃণাল সেনকে।
মহর্ষি প্রতিটি চিঠিতেই লিখতেন,প্রাণাধিক রবি।কি আত্মখণ্ডন।থাকা আর না থাকা পলকের হেরফের।এই তো ছেলেবেলার সকাল।কখনও বৃষ্টি কখনও রোদ।আবার শীতের সন্ধে যেন আড়াল থেকে দেখছে এক বালককে।
দেবলীনা,শীর্ষ দুজনেই বলে,মানুষ না চেনা স্তাবকতায় অন্ধ। ভয় হয় তীর্থের বারবার এমন হয় কেন! এটাই কি পূরবীর অস্তরাগ!
মা বলত,মনু আমরা চলে গেলে তুই তো খুব একা হয়ে যাবি, তাই না! তীর্থ তখন ভাবতেই পারত না,বাবা মা থাকবে না একদিন।
হারলে চলবে না।আছেন তো অনেকেই।যাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হবে না কোনদিন।মুসাফির তার সেই অদেখা বন্ধুর টানেই চলেছে ঘাট থেকে ঘাটে।একদিন আসবে চরম সত্য।আলো আলো আলো।তিনি ডাকবেন কাছে।।বলবেন,তুমি তো পাপী নও।শুধু ভুলেছিল আমায়।
ভুলেছিলে।
বিবেকানন্দ বলতেন,বক্তা নয় সন্ন্যাসী নয় এক সেই অবোধ বালক গুরুর পাদপদ্মে গিয়ে বসবে।তিনি বলবেন,তুই কোথায় ছিলি নরেন!
তাঁর কাছে আছে অপার ক্ষমা।পাপ নেই,পুণ্য নেই।আছে শুধু ভালোবাসা।

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || সোনালী স্বপ্নের ভেলা

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার 

সোনালী স্বপ্নের ভেলা ।অনিল দাঁ । সোনালী রোদ পত্রিকা । ষাট টাকা ।

দেবাশীষ নাগের করা নিকৃষ্টতম প্রাচীনকালের বটতলার বইয়ের মতো প্রচ্ছদ উল্টে অনিল দাঁ-র
' সোনালী স্বপ্নের ভেলা ' কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে বিস্ময় আসে, আজকের যুগেও এরকম কবিতা একশ্রেণীর  মানুষ কি করে লিখে যাচ্ছে!  যেখানে অনেকেই কবিতার  পরবর্তী যুগ নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত, সেখানে এই গ্রন্থকার  ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থে  আমাদের নিয়ে যান প্রায় নব্বই বছর আগে ।  বইটির প্রথমে কিছু ছোট কবিতায়  তা স্পষ্ট  : ' স্বাগত  দু হাজার উনিশ/  শুষে নাও সমাজের যত আছে বিষ ।'
( 'বিষ') , ' জনতার সামনে যে নেতা/  মাইক ফাটায়/  পকেট শূন্য থাকলে/  মেজাজ পথ হারায় । ' ( নেতা ')ইত্যাদি ইত্যাদি
           বইটির ভেতরে যত এগোই তত শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে যায় বইটির ও কবির কাব্যবোধের । যদিও তাঁর লেখা 'আমার কথা ' নামে ভূমিকায়  দেখতে পাই,  তিনি বেশ কয়েকটি পত্রিকা থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন ও চারশো  পত্রিকায় ( দেশে ও বিদেশে)  তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ।
        এ সময়ে  ( এই গ্রন্থের রচনাকাল ১৪১৯ থেকে ১৪২৬ ) দাঁড়িয়ে তাঁর কবিতা নিয়ে  বলার তেমন কিছু থাকে না, শুধু দুঃখ থাকে । এদের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না । এরা কবিতার  বই বের করে  আনন্দ পায় অবর্ণনীয় । পরোয়া করে না সেটির ভবিষ্যত নিয়ে । তাতে এদের সুখ, ' কবি ' হওয়ার আনন্দ ।

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ৮৭ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৮৭.
প্রত্যেক লেখারই একটা ছক থাকে। লেখক যথাসাধ্য চেষ্টা করেন সেই ছক-টিকে বজায় রাখতে। ধারাবাহিক -এ এই বিষয়টি বেশি করে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু আমি তো ছক-এর বাইরের লেখক। ছক ভাঙা-টাই আমার প্রধান কাজ।  আমি চিরদিন লেখার নিজস্ব গতিময়তাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। নিজেকে নয়। নিজের লেখাকে। আমার এই কথা আপনার বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক। নিজেকে এবং নিজের লেখাকে প্রাধান্য দেবার মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায় ! তাহলে কি আমি যা লিখি সবটাই আমার নিজের কথা নয় ! এই উৎকণ্ঠাটিকে সামনে রেখে কিছু চিন্তা করা যাক।
সেই চিন্তা থেকে সামনে চলে এল ১৯৯৮ -এর শারদীয় সংখ্যার প্রচ্ছদটি। যেখানে বড়ো বড়ো টাইপে মুদ্রিত হয়েছিল :
আমাদের ছাতার নীচে , না ৫০ জন নয় , কমপক্ষে ৫০০ জন কবি নির্ভাবনায় আশ্রয় নিতে পারেন, আমরা সকলকেই ঝড়বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারব ,আর একটা কথা , আমাদের ছাতাটি বেশ অনেকগুলি রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি। কাজেই রং সম্পর্কে খুঁতখুতানিরও কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। যদিও আমাদের নিজস্ব একটি রং
এখানেই শেষ হয়েছিল। লেখা হোক বা হোক আমাদের যে নিজস্ব একটা রং ছিল এটা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এবং সেই রঙের তীব্রতা মনে রাখার মতো।  আরো মনে রাখার কথা কবিতাপাক্ষিক প্রকাশনার গ্রন্থতালিকার কথা। একবার দেখে নেওয়া যাক , কাদের বই আমাদের ছাতার নীচে প্রকাশিত হয়েছিল :
অরুণ মিত্র অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আলোক সরকার
ভূমেন্দ্র গুহ কবিরুল ইসলাম কালীকৃষ্ণ গুহ মঞ্জুষ দাশগুপ্ত প্রভাত চৌধুরী রবীন্দু বিশ্বাস সুজিত সরকার দীপ সাউ গোপাল দাশ অমিতাভ মৈত্র প্রশান্ত গুহমজুমদার সুধীর দত্ত নাসের হোসেন সুব্রত চেল কৌশিক চট্টোপাধ্যায় যশোধরা রায়চৌধুরী সুমিতেশ সরকার সুবীর সরকার।
এই লিস্টিটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে আমাদের ছাতার আয়তন তথা ছাতায় ব্যবহৃত কাপড়ের রং-তামাশা।
' রং তামাশা ' শব্দটি অপমান সূচক মনে হলে রং মশাল পড়বেন। তাতে লেখার মেজাজের রকমফের হবে না। আমার কাছে ' তামাশা' একটি পবিত্র শব্দ।
এবং এই কথাটাও গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করতে চাই : যাঁরা সেই সময়ে আমাদের ছাতা রং জেনেবুঝে আমাদের ছাতার নীচে আশ্রয় নিয়েছিলেন , তাঁদের সকলের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
১৯৯৯ -এর এপ্রিলে  প্রকাশনার লিস্টে যুক্ত হয়েছিল কয়েকটি নাম। সেগুলি যুক্ত করে নিচ্ছি :
প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত রাজলক্ষ্মী দেবী জহর সেন মজুমদার তীর্থঙ্কর মৈত্র মুরারি সিংহ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় অংশুমান কর অর্ণব সাহা রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আগের লিস্ট থেকে দু-একটি নাম বাদ পড়েছিল। তার উল্লেখ করলাম না।গুরুত্বহীন মনে হওয়ায়।
জুন ১৯৯৯ - এ গ্রন্থতালিকায় যুক্ত হয়েছিল :
সৈয়দ কওসর জামাল রজতশুভ্র গুপ্ত ধীমান চক্রবর্তী রামকিশোর ভট্টাচার্য প্রদীপ হালদার এবং শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম।
পত্রিকার পাশাপাশি প্রকাশনাও একটা নির্দিষ্ট জায়গা করে নিয়েছিল এটা এই লেখাটির পাঠক অনুমান করতে পারছেন আশা করি।
আবার পত্রিকায় ফিরে যাচ্ছি। তুলে আনছি এমন এক জনের কবিতা , যিনি এখন নিজে অনুপস্থিত কিন্তু তাঁর কবিতা মারাত্মকভাবে উপস্থিত আমার কাছে।
রামকিশোর ভট্টাচার্য-র কাছে যেতে হল কানাই ঘোষ -এর খোঁজে। বাঁশবেড়িয়ায় থাকতেন।সাহিত্যসেতু পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ঘটকবাগানে বাড়ি করেছিলেন। আমি গিয়েছিলাম সে-বাড়িতে।
এখন কানাই ঘোষ  যা লিখেছিলেন , তার কিছু অংশ :
১॥ খাদ্য ও পানীয় বিষয়ে আপনি যা বললেন সেখানে  মৌমাছিদের কোনো কথা নেই
২ ॥ সম্পাদকমশাই যাই বলুন আপনি হ্রদের কথা একবারও ভাববেন না
৩॥ প্রবেশপথে নৈঃশব্দ ধাক্কা খেতে থাকে আর শীতঋতুর চিহ্ন/ কাকে যে অনুসরণ করে !
৪॥ আমি তোমাকে যে কবিতার টুকরো পাঠিয়েছি সেখানে পুনশ্চ শব্দটি ছিল না  রন্ধনশালার উপর আমার গবেষণাপত্রটি পাঠাবার সময় এবার পুনশ্চ শব্দটিকে ব্যবহার করলুম।
৫॥ তুলসীপাতার সঙ্গে লাউপাতা কিংবা/ পলতাপাতার সঙ্গে কুলেখাঁড়াপাতার সম্পর্ক নিয়ে অবশ্যই ---/ অবশ্যই গবেষণা হওয়া দরকার।
আরো বেশি দরকার কবি কানাই ঘোষের কবিতা নিয়ে গবেষণা হবার। মনে রাখবেন এই মাপের কবি একটা ভাষাতে খুব বেশিজন থাকে না।
আমরা গর্বিত , কবি কানাই ঘোষের কবিতার বই 'বৃষ্টিদের কথোপকথন ' কবিতাপাক্ষিক থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল।

আটপৌরে কবিতা ৫৪১- ৫৪৬ || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ |||

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫৪১

বোকা/  অবিবেচক/  করিৎকর্মাহীন
           ) গাড়ল  (
সমাজের কাছে হাসির পাত্র ।

৫৪২

ধৃতরাষ্ট্র/ লেখক/ দম্পতি
       ) অন্ধত্ব  (
যাদের নিজস্ব সৃষ্টির জন্য ।

৫৪৩

তোলাবাজি/ সিন্ডিকেট/  দাদাগিরি
       ) দুর্বিসহ  (
জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা ।

৫৪৪

দুশ্চিন্তা/  অস্বস্তি/  হতাশা
      ) হালচাল  (
এমনি করে যায় দিন!

৫৪৫

ধ্বনি/ শব্দ/  আলো
   ) আকর্ষণ  (
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপন ।

কুমোর পোকা || প্রশান্ত দে || অণুগল্প

কুমোর পোকা
প্রশান্ত দে 


না।চাবিকাঠি রাখার ইনফরমেশনটা মেলাতে পারে নি।শেষমেষ তালাটাও ভাঙতে না পেরে ছিচকে চোর চলে গেছে। অফিস থেকে ফিরে বাঁকাটেরা তালাটাকে দেখে ভাবতে লাগলেন মাধবী।মাধবী মানে স্বামী পরিত্যক্তা
মাধবী স্যান্যাল।এক মাত্র ছেলেকে নিয়ে স্বর্গলোক প্রাপ্ত বাবা মায়ের ভিটেতেই থাকেন।ছেলেকে ইংরাজী মাধ্যম স্কুলে পাঠিয়ে নিজের অফিসে গিয়েছিলেন ।নিত্যদিনের অভ্যাস মতো ঘরে প্রবেশের দরজায় তালা দিয়ে,চাবিকাঠিটা চৌকাঠের বাজুর উপরের ফাঁকে রেখে গিয়েছিলেন ।আগে পরে আসার কথা চিন্তা করে ।
কিন্তু আজ শারীরিক অসুস্থতার কারনে ছেলের স্কুল থেকে ফিরে আসার আগেই ক্লান্ত শরীরে ফিরেছিলেন।
"আজ আরেকটা আঘাতের থেকে বেঁচে গেলম ,এই দামি কোম্পানীর তালাটার জন্য" এই কথাটা ভাবতে ভাবতে চাবিকাঠি  রাখার স্থানটিতে নজর পড়ল।দেখতে পেলেন চাবিটাকে ঢেকে একটা কুমোরপোকা মাটি বয়ে নিয়ে এসে নিজের লার্ভার পিউপা দশার  জন্য কলসাকৃতি ঘর তৈরী করছে।
অথচ আগে এক দিন চাবিকাঠিটা খুঁজে পেতে কতো কষ্ঠই না করতে হয়েছিল।সন্ধ্যায় অবসন্ন শরীরে অফিস থেকে ফিরে দেখে--ছেলেটা চাবিকাঠি খুঁজে না পেয়ে দরজার বাইরে বসে আছে।অন্ধকারে প্রথমে হাতড়ে চাবিটা না পেয়ে ,নিজের  ব্যাগটা তন্নতন্ন করে খুঁজে ছিলেন।অবশেষে নিজের ভাগ্যকে দোষারুপ করতে করতে মোবাইলের আলোটা জ্বেলে চাবি রাখার স্থানটা ভালো করে দেখতেই দেখতে পেয়েছিলেন-চাবি রাখার স্থানে ছোট্টো মাটির কলসের মতো কি যেন একটা।সেটা হাত দিয়ে ভাঙতেই চাবিটা খুঁজে পেয়েছিলেন।এবং খেদোক্তির সুরে বলেছিলেন ,'কেমন দুষ্টুমি দেখ্! কে যেন মাটি দিয়ে চাবিটা ঢেকে দিয়েছে।'
পরের দিন সকালে ঝাড়ু দিতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন  -মাটির টুকরোর সঙ্গে মরা একটা পতঙ্গের লার্ভা।
আজ ব্যাপারটা দেখে সব বুঝতে পারলেন এবং ভাবলেন ,"ভাগ্যিস আজও কুমোর পোকাটা চাবি রাখার স্থানে কলসাকৃতি ঘর তৈরী করছিল,তাই চাবিকাঠি রাখার ইনফরমেশন মেলেনি"।
এই জন্য কুমোরপোকাটাকে বাহবা দিলেন এবং আগের দিনের অপরাধের জন্য নিজেকেই অপরাধী করলেন।লার্ভার মৃত্যুতে দুঃখ পেলেন এবং আফশোষ করতে লাগলেন।

পালনের নেই দায় || রমেন্দ্র রায়চৌধুরী || আত্মপ্রকাশের কবিতা


পালনের নেই দায়
রমেন্দ্র রায়চৌধুরী



অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে হয়েছি সমৃদ্ধ।
দেখেছি প্রকৃতির সুনামি,
আবার ভয়াবহ অতিমারি।
মানুষের লোভের
নগ্ন প্রকাশ দেখি,
আত্মজার লাশে করে
আপন উন্নতির সোপান।
ক্ষুধাকে দেখেছি অন্যরূপে,
যেখানে সন্তানে বেচে
অভাবী জননী বাঁচার রসদ খোঁজে।
পাশবিকতার রূপ দেখি,
আপন সন্তানসম কন্যারে ধর্ষিতে।
জিঘাংসার প্রতিরূপ সৃষ্ট দাঙ্গায়।
মিথ্যার বেসাতি দেখি নেতার ভাষায়।
প্রতিশ্রুতির বন্যা দেখি
যারে পালনের নেই দায়।
পণ্যের বিজ্ঞাপনে সংজ্ঞায়িত
বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন।
তবু সে বন্ধুত্বের পরশ লাগে
একান্ত আলাপচারিতায়।
অথবা রোগশয্যায় বন্ধুর মরমি ছোঁয়া।

এত সবের মাঝেও
জীবনের নানারূপ হয়নি দেখা।
যে মজুর দিনরাত
কাজ করে ঘরে ফেরে,
তোলে এক অজানা সুর।
কি তার প্রেরণা,
কোথা হতে আসে এই জীবনের রূপ?
অথবা,চরম দারিদ্রের মাঝে,
পাশে আসে পড়শির হাত।
নিজেকে বাঁচাতে একা
এরা শেখেনি এখনও।
যখনি প্রকৃতির মারে
হঠাৎ স্তব্ধ হয় সমস্ত জীবন
তখনই কি প্রেরণা বলে!
যৌবন ঝাঁপিয়ে মরে
বাঁচাতে সেই স্তব্ধ জীবন।
এদের অঙ্গীকারে
আমারও প্রত্যয় জাগে,
ভাবি, আরও কেন পাইনা জীবন।

হারানো দিনের গল্প || দীপক মজুমদার || কবিতা

হারানো দিনের গল্প
দীপক মজুমদার



মুখোমুখি বসে কিছু কথা হয়েছিল ,
 কিছু কথা __
চোখে চোখে ভাবে ইশারায় ,
খুব সামান্য কিছু কথা__ কাজের ,

কিছু রহস্যে মোড়া ,কিছু আধপোড়া __
বেহিসাবী চাওয়া-পাওয়া
 গানিতিক যোগ-বিয়োগ কাটা-ছ্যাঁড়া
                                     শুকনো নিরস ...

ভাবি __
আজও খুব ভাবি ,
এলোমেলো সেসব কথার
                                কথা ,
কোথায় বা হারিয়ে গেল  __

 এজীবন কেন আজ প্রেমহীন ফাঁকা ?

                     *****

Wednesday, July 29, 2020

উনত্রিশ পয়েন্ট ফাইভ - ৩৬ || সোমনাথ বেনিয়া || কবিতা

কবিতা

উনত্রিশ পয়েন্ট ফাইভ - ৩৬ 
সোমনাথ বেনিয়া


কপালে ফুটেছে চন্দনের বিন্দু, সফেদ সুগন্ধ, মুক্তির চুম্বন
দুলছে নরম মৃণাল, দু-পাশে, বায়ুর শান্ত পরিশ্রমে
এরপর কোনো এক নক্ষত্র ভীষণ উজ্জ্বল দিক-বিশেষে
হাঁ করে অপর্যাপ্ত ঢোকে আপন করে রাখা পাঁজরের প্রচ্ছদে
পাতার ভাঁজে চ‍্যাপ্টা অন্ধকার আঙুলের থুতুতে জড়ায়
তার‌ই কিছু অলক্ষ‍্যে কখন চোখের প্রবেশদ্বারে কাজল
মুগ্ধ হয়েছি, আহা, যেন অঙ্কুরিত ছোলার ভোর, একরোখা
শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে ভাবনার বিবর্তন, স্বপ্নের শ্লেষ
দমকা কাশিতে কার যৌবনে পড়েছিল মেদুর রোদের ছটা
সেও কি তখন লালপেড়ে, গ্রাম থেকে শহর ছাড়িয়ে
এসব হয়ত সিরিয়ালের নষ্ট অধ‍্যায়, গৃহিণীর খারাপ মন
খোলা পিঠে পড়ে থাকে আঙুলের অচেনা স্পর্শ সংবিধান
কোনো এক অক্টোবরে দেখি কুর্চিফুলের ব‍্যাকুল ঝাঁপান

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ৮৬ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৮৬.
আজ রুদ্র কিংশুক-এর কথা।  রুদ্র-সম্পর্কিত যে কোনো কথা শুরু করতে গেলেই এসে যাবে সমুদ্রগড়ের কথা। কাটোয়া-লাইনের স্টেশনগুলির নাম দেখলেই বোঝা যাবে অঞ্চলগুলির সাংস্কৃতিক অবস্থান। আজ সেসব কথা থাক। আজ অন্যকথা।
১৯৯৯-এর  নভেম্বর -ডিসেম্বর নাগাদ একটা খাম এসেছিল কপা দপ্তরে। খামটা খুলেছিল রজত বা রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।খামে আসা কবিতাগুলো রজতের ভালো লেগেছিল। ফোন নম্বর দেওয়া ছিল।রজতই ফোন করেছিল। উত্তর দিচ্ছিল রজত। আমি পাশে আছি অপর-প্রান্ত সেটা বুঝতে পেরেছিল। পরে আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল রুদ্র কিংশুক।
আমি যথারীতি জানতে চেয়েছিলাম :
কী কর ।বাড়ি কোথায় । কোথায় পড়াশুনো। বাড়িতে কে কে আছে ।ইত্যাদি ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক খোঁজখবর। আমি অন্যজনের কাছে যেমন , রুদ্র-র কাছেও ঠিক তেমনই।
ওই খামটিতে মোট ৮ টি কবিতা ছিল। সিরিজকবিতা।
সিরিজটির নাম : সন্তরণশিল্পের পাঠ।
এই পাঠ্যসূচি থেকে কবিতাপাক্ষিক-এর পাঠকরা ঠিক কী পাঠ গ্রহণ করেছিলেন তা জানার জন্য কবিতাগুলির কাছে পৌঁছতে হবে :
 ১ ॥ সেই থেকে আমি কুয়োর মধ্যে পা ডুবিয়ে বসে আছি / লবণজলে পা গলে যদি পাখনা হয়
২ ॥ একটি গাছকে নিয়ে বহুকাল খেলা হল / গাছের স্পর্শে মানুষ পাখি হয়
৩ ॥  লকাই বাউল বলেছিল সন্তরণকালে / মাছেরা সব বিহঙ্গ হয়ে যায়।
৪ ॥  নৌশিল্প শেখাবে এমন বই পৃথিবীতে নেই
৫ ॥ প্রতিটি সাঁতার শেষ হলে/ অজ্ঞতা তীব্রতর হয়,
৬ ॥ ফুলেদের কাছে এলে কুণ্ডলিত সাপেরাও/ দীপ্যমান শিখা হয়
রুদ্র কিংশুক-এর শুরুটা দেখে আমি একবিন্দু অবাক হইনি। কারণ ওটাই ছিল চরম বাস্তব। আমি তখন প্রকাশ্যেই বলতাম : সাক্ষাৎকার থেকে নতুন বাংলাকবিতা লেখা শুরু হবে। ঠিক এই সূত্র ধরেই শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় আফজল আলি বা রুদ্র কিংশুক-এর মতো কবিরা শুরু করেছিল তাদের কবিতাযাত্রা। এরা কোনো অর্থেই আধুনিক-প্রভাবিত নয়। এরা এবং আরো কয়েকজন শুরু করার আগেই জেনে গিয়েছিল যুক্তিফাটলের কথা।
রুদ্র কিংশুকের পরবর্তী কবিতাগুচ্ছটির নাম ' শব্দজব্দ অথবা সন্তরণশিল্প। প্রথমটির নাম ছিল সন্তরণশিল্পের পাঠ। দুটির মধ্যে কমন হল সন্তরণ। এখন একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে তা হল হোয়াই সন্তরণ। চারদিকের ব্যবহৃত শব্দমালা থেকে উঠে এল সন্তরণ ! কেন ? এর জন্য আমাকে কি জবাবদিহি করতেই হবে ? আমি যদি বলি , রুদ্র জানে সেকথা। তাহলেই মিটে যায়। তাহলে কি সম্পাদক হিসেবে আমার কোনো দায় বা দায়িত্ব নেই।সে দায়িত্ব আমি অস্বীকার করতে পারি না।
আমি আমার মতো একটা উত্তর দিচ্ছি , এটা যে রুদ্র-র উত্তরের সঙ্গে মিলে যাবে , তেমনটা নাও হতে পারে।
সন্তরণ = সাঁতার , জলে শরীর ভাসিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
আমরা স্থলচর। কিন্তু আমরা প্রয়োজনে সাঁতার শিখি। সেটা যে জলের ওপর শরীরটা ভাসিয়ে রেখে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটা জেনে গেলে কাজটার বাঁদিকে '
' শুভ '  এই মঙ্গলকর বিশেষ্যটি যুক্ত করা যায়।আমি
' এগিয়ে যাওয়া ' এই শব্দটিকে মাথায় তুলে রাখলাম।এই এগিয়ে যাওয়ার সংকল্পই বাংলাকবিতাকে আধুনিকতা থেকে মুক্ত করেছিল। রুদ্র কিংশুক ছিল সেই কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।
আমি খুব বেশি উদ্ধৃতি দিচ্ছি না। দু-একটা :
১ ॥ রবিশংকরের সেতার শেষ হতেই দেখি , চিনেমাটির ফুলদানিটির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে কমলারঙের পাত্রের মাথায়।
২ ॥ বর্গীয় ' জ ' উচ্চারণ করলেই একটা পাখি তার গোলাপি ডানাদুটো ছাড়িয়ে দিয়ে ঝর্না ঝর্না নাচতে নাচতে ছাতাদিঘির দিকে উড়ে যায়।
মাননীয় পাঠক অবশ্যই বুঝতে পারছেন আধুনিকতা থেকে কবিতা তার নতুন যাত্রাপথে এগিয়ে যাওয়া শুরু করেছে।
এখন অন্য কিছু জরুরি কথা বলে রাখতে চাইছি। যেমন :
আমার একটা শান্তিনিকেতনযাপন আছে। এই যাপনে শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় দেবাশিস ভট্টাচার্য প্রবীর দাস প্রমুখ আত্মজনেরা। এদের মধ্যে সবথেকে বেশি সান্নিধ্য পেয়েছি রুদ্র কিংশুক-এর ।
সকলেই জানেন আমি পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনার প্রায় কিছুই জানতাম না। এখনো জানি না।  তবে সমীর রায়চৌধুরীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং রুদ্র কিংশুক-এর প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে লোকজন আমাকে  পোস্টমডার্ন চেতনার মানুষ বলে মেনে নিয়েছেন।
আমার একটা দৈবশক্তি আছে। আমি  টের পেয়ে যাই , পৃথিবীর কোন ভাষায় ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে। খবর পেলে গণদেবতা। রুদ্র-র বাড়ি। যতটুকু জানার তার থেকে কিছুটা বেশি জেনে নিয়ে পরদিন ব্যাক টু কলকাতা।
আরো একটা কথা রুদ্র কেবলমাত্র আমাকে শিক্ষিত করার জন্য ' পোস্টমডার্ন শব্দাভিধান " একটি পুরো অভিধানগ্রন্থ রচনা করেছিল। যার পাঁচটা সংস্করণও মূলত আমাকে শিক্ষিত করার জন্য।
আমি যে ইংরেজি একদম জানি না , আমার এই অভাববোধ থেকে আমাকে মুক্ত করার রুদ্র বিদেশি কবিতার অনুবাদ শুরু করে। আমি ভালোভাবে পরিচিত হই গ্রিক কবিতার সঙ্গে।অন্যান্য ভাষার কবিতার সঙ্গে।
শেষের দিকে শান্তিনিকেতনে গেলে একঘণ্টা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর  গান শুনতে যেতাম। মোহরদি ভেতর থেকে গাইতেন , রুদ্র আর আমি শুনতাম।এবং কথা দিলাম আবার শুনবো

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || আমার বৃৃৃষ্টির ভাষা

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার 

আমার বৃষ্টির ভাষা । কুমারেশ চক্রবর্তী । একুশ শতক। একশো টাকা ।

প্রতিবাদ যখন শিল্প হয়ে ওঠে তখন লক্ষ্য বুঝতে পারা যায় । পোষ মেনে চলা যেহেতু মানুষের পোষায় না তাই একদিন না একদিন তা মাথাচাড়া দেবেই ।  তখন এরকমই প্রশ্ন আসবে যা কবি কুমারেশ চক্রবর্তী  তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ' আমার বৃষ্টির ভাষা ' তে সাজিয়েছেন:  ' তাহলে নকশালবাড়িতে নিহত প্রথম শহীদের/  কবরে ঝুঁকেই যে কিশোর বুঝে, বা না বুঝে- / বলেছিল- আমি- ই লেনিন/  সে কেন এখন চোরাচালানের এক দুর্দান্ত মাফিয়া । ' ( কাঁটা), ' তখন পালাবি কোথাও কি তুই/  এ বাংলার মাটি- জল-ঘাস-লতা-পাতা  আর/  মায়ের আঁচল ছেড়ে? ' ( ফাটকা ')।
         কুমারেশের কবিতার সম্পদ হল তাঁর প্রশ্নবোধক ভাবনাগুলি । যা হয়ত প্রথমের দিকে সেরকম পরিপক্ব ভাবে আসেনি কিন্তু এখন পরিণত । তাঁর কবিতায় গভীরতা ধরা পড়েছে যা সংহত ও সঠিক মাত্রায় অবস্থান করার দিকে ধাবিত । কুমারেশের প্রতিবাদে আগে যেমন উচ্চগ্রামের কথাবার্তা থাকতো, এ গ্রন্থে তা অন্তর্হিত । কবির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাধারণ  মানুষের ক্ষোভ দুঃখ ও জীবনের দিক মেলে বলে তাঁর কবিতা মানুষের সামনে দাঁড়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়া যায় না ।
         কুমারেশের শেষ দুই বইয়ের নাম বৃষ্টি দিয়ে ।কুমারেশ বৃষ্টির ভাষা পড়তে পারেন বলে তিনি লেখেন : ' আমার বৃষ্টির ভাষা- / মেঘের সন্ত্রাসে ঘর ছাড়া এক না লেখা কবিতা ।' ( 'আমার বৃষ্টির ভাষা ')। শ্যামল জানার প্রচ্ছদ ভাবনার দিক থেকে নান্দনিক ।

আটপৌরে কবিতা || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫৩৬

চা/  কথাবার্তা/ অক্সিজেন
       ) আড্ডা  (
বাঙালির পরম প্রিয় বিনোদন ।

৫৩৭

যোগাযোগ/  খবর/ সান্নিধ্য
        ) দুরত্ব  (
কখন কার সঙ্গে হয় !

৫৩৮

বৈষ্ণব/ বিদ্যাপতি/ চন্ডীদাস
       ) পদাবলী  (
সাহিত্যের এক অনন্য স্তম্ভ ।

৫৩৯

রাধাষ্টমী/ কৃষ্ণজন্মাষ্টমী/ রামনবমী
               ) ব্রত (
ধার্মিক গৃহিনীর পবিত্র অনুভূতি ।

৫৪০

শিব/ বিষ্ণু/ দুর্গা
    ) স্তোত্রপাঠ  (
নির্ভুল উচ্চারণে অনন্য স্বাদ ।

তাড়া নেই || অমিত কাশ‍্যপ || কবিতা

তাড়া নেই
অমিত কাশ‍্যপ

এখন আর তাড়া নেই, নিশ্চিত জীবন ভাবতে
গলার কাছে কি যেন জমা হয়
প্রতিবেশী, পরিজন, সব
ভালো আছে তো

প্রভাতবাবু সকালে ভ্রমণে বেরন, অনিমেষবাবুও
এখন আর যান না, বাজারে দেখা হত কমলবাবু সঙ্গে
হয় না, সব কেমন আছেন, জানা নেই
আমি কি ভালো আছি

প্রশ্ন জাগে, এক মহাপরিবর্তনের সূত্রপাত
নাকি, মহাপ্রলয় আসন্ন

Tuesday, July 28, 2020

সন্ধ্যের ইতিহাস || হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় || কবিতা

সন্ধ্যের ইতিহাস
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে
যদি আমি সন্ধ্যের ইতিহাস লিখি
তাহলে তা হবে একতরফা
রাশি রাশি কালি উঠে আসবে মুখে
আমি একবারও জানার চেষ্টা পর্যন্ত করবো না
আমার কলম কী লিখতে চাইছে
সেও কি আমার পথে হেঁটে যেতে চায়?
তাছাড়া যে সন্ধ্যেকে আমি ভাবছি
অন্ধকারের বুক থেকে উঠে আসা
আদ্যন্ত কালো হয়ে থাকা একটা অস্তিত্ব
বিপরীতটাও হতে পারে
এবং সেটার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি -------
অন্ধকারের পাশে থেকে থেকে
আলোর কথায় কান পেতে থাকে সে সারাদিন



সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ৮৫ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৮৫.
কৌশিক চক্রবর্তী-কে চিনি 1998 থেকে। কথাটা লেখার পর থামতে হল। চিনতাম , তবে সবটা নয়।সেসময় আমাদের দৈনন্দিন আড্ডায় কবিদের মধ্যে গানের সুযোগ পেত রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় , যশোধরা রায়চৌধুরী এবং শান্তিময় মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কৌশিক গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছে , এমনটা মনে পড়ছে না। কিন্তু এই যোগাযোগহীনতায় জানা গেল কৌশিক চক্রবর্তী বাকিদের সমকক্ষ। বিশেষ করে পুরোনো দিনের গান। কৌশিকের সৌজন্যে ওই গানগুলি আবার শোনার সুযোগ পেলাম। এগুলিই কবিতাকথার মুখবন্ধ। এই মুখবন্ধ থেকে হাঁটা শুরু করা হোক ভবানন্দ রোডের দিকে। 
প্রথমেই কৌশিক-কে সাধুবাদ জানাতে চাই , ভবানন্দ রোডে আধুনিকদের একটা সাহিত্যের আড্ডা ছিল । সেই আড্ডাকে ডিঙিয়ে নবীন কিশোর পৌঁছে গিয়েছিল হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের কপা দপ্তরে। বা পৌঁছে যেতে বদ্ধপরিকর ছিল তার লেখার গুণে। ওইসব লেখা ভবানন্দ রোডের আধুনিকরা পড়লে ভিরমি খেতেন কেউ কেউ। কেমন ছিল সে-লেখা :
' আলনার পাশে রেডিওর গায়ে এখন রাত্তিরের মনখারাপের গন্ধ লেগে আছে '
অথবা
' নিষিদ্ধ আপেলে কামড় বসিয়ে ঝুলনের রাতে আমি সশব্দে পেচ্ছাপ করেছিলাম টাটকা কেতকীফুলে '
কৌশিকের কোনো উপায় ছিল না অন্যত্র ঘুরে বেড়ানোর।
এর কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম কিছু লাইন :
' তিন মিনিট আগে কিছু ছিল না , তিন মিনিট পরেঔ কিছু নেই বাকি সময়টায় চোখের সামনে একটু পর্দা আর মাথার মধ্যে সাদা ধোঁয়া বাকি সময়টা জলের শব্দ বুকের মধ্যে আর শুকনো ঘাসের গন্ধ ' 
কবিতাপাক্ষিক ১৫৪ সংখ্যার সূচিটা দেখে নিন :
প্রভাত চৌধুরী-র Notes on Birds : ঘুঘু থেকে শকুন, মোট ২০ টি পক্ষীকথা।
মুরারি সিংহ-র গন্ধসাবানের ৮ ছেলেবেলা
জয়দীপ চক্রবর্তী-র রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত পুষ্পার্ঘ্য
কৌশিক চক্রবর্তী-র জীবন সম্পর্কিত অনুভূতিমালা
মোহম্মদ শাহবুদ্দিন ফিরোজ-এর স্মৃতিদর্পণে বন্ধুজন।
ঠিক এরকম একটি সংখ্যায় কৌশিকের প্রমাণ করার দায়িত্ব ছিল ও নিজেও কবিতাপাক্ষিকের একটি স্তম্ভ।
এখন দ্যাখা যাক কৌশিকের জীবন সম্পর্কিত অনুভূতিমালাকে। আমি দেখছি। আপনিও দেখুন :
১ ॥ এটা একটা মারকাটারি জীবন ,
২ ॥  টি -ব্রেকের পরে ঠিক কত ওভার ব্যাট করবে বয়ঃসন্ধিক্ষণের টিশার্ট আর দর্শক গ্যালারিতে বসে চিটি লিখবে কোন গোলাপি নোটখাতা, তা হয়ত জলশালুকের সিলেবাসভুক্ত নয়।
৩ ॥ আমরাও কোনো ভুলে যাওয়া প্রেমের হলুদ শাড়ি খুলে নিতে নিতে লিখে রাখবো এক বিস্মৃত সুগন্ধী হাতরুমালের কথা।
৪ ॥ বাথরুমে মেঝেতে জমা ভোঁতা সেফটিপিন দেখে আমার সারাটা শরীর উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে।
৫ ॥  কোনো খাঁচার গরাদ দেখলে যেমন ভেতরে লুকিয়ে থাকা সিংহের অন্তরীণ রাত্রির কথা জানা যায় না , তেমনিই মোমবাতির সলতেয় কখনই প্রেমিকপ্রেমিকার শোষকচোখ আঁকা থাকবে না যা থেকে নিকষ অন্ধকারে জোনাকিপোকারা জন্ম নেয়।
৬ ॥ কলমের শীর্ষভাগে জমে থাকা  আমাদের সবুজ ইচ্ছেগুলো ক্রমশ ক্লোরোফিলযুক্ত গাছেদের মতো হয়ে যায়।
কৌশিক চক্রবর্তী-র অনুভূতিমালা যে অগ্রাণের অনুভূতিমালা নয় , এটা বলে না রাখলে আমার পাপ হবে। কৌশিকের অনুভূতি কৌশিকের একক।
কপা ১৫৭ -তে আবার কৌশিক ।ওই সংখ্যায় কৌশিক-এর কবিতার শিরোনামগুলি :
১ ॥ একটি নিরুদ্দেশ কবিতা
২ ॥ একটি আপাতভদ্র কবিতা
৩॥ ইলেকশনে দাঁড়াইবার সহজ উপায়
সম্মাননীয় আধুনিক কবিজনেরা আপনাদের কবিতার শিরোনামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন তো কিছু মিল চোখে পড়ছে কিনা !
' এই লিখলাম " পথ '। আচ্ছা ? পথ কেমন দেখতে হয়?বেশ ধরা যাক দুপাশে কিছু ঝুপড়ি থাকে, '
কিংবা পরের কবিতায় :
' টেবিলপ্রান্তে যে আপাতভদ্র কবিতাটি বসে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে এদিকে ,'
আবার ইলেকশনে দাঁড়াইবার  অনেকগুলি সহজ উপায় বলেছে কৌশিক। তার মধ্যে একটি উপায় :
' প্রত্যেক রোববার গড়ের মাঠে পাঁচ মিনিট হেঁটে পায়রাদের বাদামভাজা খাওয়াতে পারেন।খবরদার ভিকিরিদের খেতে দেবেন না , বড়োজোর উপদেশ দিতে পারেন। '
কৌশিক-এর একটি কবিতা ' ভবানন্দরোড কথা ',আমার খুব পছন্দের কবিতা। ওই দীর্ঘকবিতাটি থেকে জাস্ট কয়েকটি  অনুধ্যান তুলে দিচ্ছি :
  ব্যর্থ ঝুমঝুমির আওয়াজ ॥ বাদামি রঙের জিজ্ঞাসাচিহ্ন ॥ হলুদ পাঞ্জাবিগুলো অনেকটা মন্টেসরির মোমবাতি বা সার্কাসপালানো সিংহের মতো দেখতে বলেই ... ...  ....
কৌশিক চক্রবর্তী-র চাকরিজীবনের কোনো কথাই বলা হল না। সেসবও বেশ বর্ণময়।

ঈর্ষা || জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

ঈর্ষা
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়



এক
তোমার মুখে সাফল্যের হাসি উপচে পড়লে কাঁটাগুলো নড়ে ওঠে
আমার অতিচেনা ব্যর্থতারা অপ্রিয় শব্দের মতো নখদাঁত নিয়ে ঝাঁপায়
তুলে আনে কোশ কলা রস ঢিমেতালে অ্যাসিড ছেটায় দহন জ্বালায় জ্বলি.....

দুই

তোমার উজ্জ্বল হাসিমুখ স্টিয়ারিং ফেল গাড়ির মতো ফুটপাথের ঘর ভাঙে
প্রশ্ন ওঠে তোমার কী কোনও দুঃখ নেই?  সবকিছু হাতের নাগালে!
তাহলে আমি কেন তুমি হয়ে উঠিনা?

তিন

মাঝে মাঝে এক লাজুক কিশোর আসে দ্বিধাময় দূরে ভাসে অকপট হাসি
অঢেল  আলোমাখা মুখের পিছনে সে বড়ো বেমানান.....
তবু সেও হাঁটে হয়তো খরগোশ নয় ধীরগতি কচ্ছপের মতো
সে তার অযোগ্যতা জানে সেগুলি ইঁদুর বানিয়ে খেলে
পিছনের  মুখ কখন আলো ছেনে রং হয়ে যায় অহংকার পায় না নাগাল
কোনপথে ছায়ামুখ  সর্বজয়ী ফুল হয়ে ওঠে দেখে না ফোকাস

সাফল্যের নকল মুখ কোথায় হারায় ........।

গোপেশ্বরপল্লি,বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া-৭২২১২২
কথা-৭০০১৪৫৬৭২১/৯৭৩২২৩৭৬০৮
ই মেইল: chattopadhyayjayanta59@gmail.com

আটপৌরে কবিতা ৫৩১- ৫৩৫ || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫৩১

উড়ুউড়ু/ অন্যমনস্ক/  বেখেয়াল
      ) খামখেয়ালি  (
সমাজের কাছে তারা হাস্যকর ।

৫৩২

লাভ/  লোকসান/  অংক
     ) হিসাব  (
করতে করতেই জীবন গেল ।

৫৩৩

উচ্ছিষ্ট/  দোষনীয়/ ব্রাত্য
       ) জারজ  (
দোষ কার কে জানে!

৫৩৪

হাঁচি/ কালোবেড়াল/ পিছুডাক
      ) কুসংস্কার  (
জেনে বুঝেও মেনে যাই ।

৫৩৫

গঠনগত/  ধ্বংসগত/ স্বপ্নজাত
         )  জেদ  (
কোনোটা হাসির কোনোটা  কান্নার ।

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || পাখিদেরও পেটেন্ট চাই

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

পাখিদেরও পেটেন্ট চাই । অমর চক্রবর্তী ।  চিত্রকল্প । কুড়ি টাকা ।

আজ থেকে কুড়ি বছর আগে সাড়ে চার ফর্মার  বোর্ড বাইন্ডিং কাব্যগ্রন্থ  ( যা মাত্র কুড়ি টাকায়  পাওয়া যেত!) কবি অমর চক্রবর্তীর  ' পাখিদেরও পেটেন্ট চাই ' কাব্যগ্রন্থটি আবার পড়ে বুঝতে পারি তিনি আরো আরো আরো বেশী সমৃদ্ধ করেছেন আজকে । সে সময়ও তিনি ঈর্ষণীয় কবিতা লিখে ফেলেছিলেন সেই  কারণে  তাঁর কবিতাবোধ কতখানি তা উপলব্ধি করতে পারি : ' তবু দেখ, ঘুরেফিরে  / মেঘ সাইকেল পড়ে রইলো আকাশেই কাত হয়ে ' ( ' খরা ') , 'অতএব আসুন,  হারানোর আগে/  মুগ্ধতার শতবর্ষ পালন করি ' ( প্রবহমান ') - এর মতো পংক্তিগুলোতে ।
                কবি অমর চক্রবর্তীর কবিতায় আছে সেই তীব্রতা ও তীক্ষ্মতা যা অজান্তে মানুষকে ভাবিয়ে তুলতে পারে এই সময়ের খুঁটিনাটি বিষয় । তিনি তাঁর ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে ছুঁতে চেয়েছেন সেই মানুষকে, যারা আগুনটাকে জিইয়ে রাখতে পারবেন । তবে বইটিতে টিউনিং-এর অভাব দোষনীয় । এক তারে বাজে না বলে  কোলাহল লাগে কেমন ।
        কবির কবিতার বড় সম্পদ ব্যঙ্গাত্মক দিকটি । ' যার গোটা জীবনটাই ভুল/  তার জন্য কেন নেব ফুল? /  বরং আমি দেখতে চাই তার হাতে ড্রিপ নাকে নল/  একটু একটু করে প্যারালিসিস । '  -এর মতো কবিতার লাইন তাই পাই । করি দীর্ঘ কুড়ি বছরে লিখে গেছেন, ভালো লিখেছেন, আরো ভালো লিখবেন । কমলাকর পাটিলের প্রচ্ছদ অঙ্কণ দেখার মতো । তবে বইটির মেজাজের সঙ্গে মানানসই নয় ।

Monday, July 27, 2020

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক


শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
 পর্ব~ ৮



মালবন্দি গ্রাম থেকে সোজা দক্ষিণে যে রাস্তাটি চলে গেছে আনন্দনগর ও ঘোড়ামারা গ্রামের দিকে তারই মাঝখানে পড়ে বিশাল এক পাথর চাটান। এই পাথর চাটানের দিকে একটুখানি চোখ রাখলেই দেখা যাবে কত সুন্দর করে নির্দিষ্ট মাপে মাপে সাইজ করে পাথর কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে। কী করে যে সেই পাথর তোলা হয়েছে মনে প্রশ্ন জাগবেই।
এবড়ো-খেবড়ো ভাব নেই কোথাও, সব সরল আকারে আয়তকার মাপে কাটা। পাথর কাটার এমন অদ্ভুত যন্ত্রপাতি কোথায় যে পেয়েছিল তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।
 
   ঠিক এরকমই দৃশ্য চোখে পড়ে এই পাথর চাটান থেকে আধ কিলোমিটার পশ্চিমে আরও এক পাথর চাটানে। এত পাথর কেটে কী কাজে লাগিয়েছিল তাতেও প্রশ্ন জাগে। মনে করা হচ্ছে সেই সময় যে সময় লায়কালি গড় নির্মিত হয়েছিল সেখানে এইসব পাথর যেত। কিংবা এমনও হতে পারে সেইসময় নানাস্থানে যে মন্দির নির্মিত হয়েছিল সেখানেও এই পাথরগুলি যেত।
 
   আবার মালবান্দির পাথর চাটান থেকে আরও খানিকটা দূরে বড়ডাঙা বরাশোল নামক স্থানে অন্য একটি নিদর্শন চোখে পড়ে। এখানে একটি জায়গায় প্রায় তিন হাত ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট একটি গোলাকার মতো জায়গা। যেমন মসৃণ- তেমনই সুন্দর করে কাটা। ঠিক চার-পাঁচ জন ঘুমোতে পারে সেরকম মাপে। একটি নয়। এরকম দু’তিনটি। পাশাপাশি। অনুমান করা হচ্ছে এখানেই রাত্রে ঘুমাতেন নায়েক বিদ্রোহীরা। বিছানার সংখ্যা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাদি দেখে মনে করা হচ্ছে – ছোটো ছোটো চার পাঁচজনের দলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করতেন তারা এবং এইভাবে সারা অঞ্চলটি করায়ত্ত করেছিলেন।
   কিন্তু দু:খের বিষয় উপযুক্ত সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে তথ্যসমৃদ্ধ এইসব অপূর্ব নিদর্শন ও চিহ্নগুলি ধীরে ধীরে লোপ লোপ পেতে চলেছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে মানব ইতিহাসের অন্তরালে। নির্বিচারে চলছে পাথর ভাঙার কাজ। সেই পাথর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে লায়কালি আমলের নিদর্শনগুলিও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরনো দিনের সে সব অমূল্য সম্পদ ও ঐতিহ্যের অনেকটাই ধ্বংস পেয়েছে ইতিমধ্যে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারের এখনই উচিত এর উপযুক্ত একটা সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেওয়া। অযথা দেরি করলে আর কিছুদিনের মধ্যেই মালবান্দির জঙ্গল থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে লায়কালি আমলের বহুমূল্য অপূর্ব-সুন্দর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি।


   মালবান্দি গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত বলদঘাটা গ্রাম। এই গ্রামের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহ্য হোল এখানকার দ্বাদশ শিবালয়। মালবান্দি হয়ে এই গ্রামে ঢোকার ঠিক আগেটায় বামদিকে শীলাবতী নদীর একেবারে পাড় ঘেঁষে এই দ্বাদশ শিবালয়ের অবস্থান। ১২ টি মন্দির নিয়ে এককালে গড়ে উঠেছিল এই দ্বাদশ শিবালয়। ছ’টি মন্দির ইতিমধ্যে শীলাবতী নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে। যে ছ’টি মন্দির অবশিষ্ট আছে তাও ভাঙাচোরা। বর্তমানে মানুষ এখানে ঢোকে না। যত সাপ, শিয়াল, বেজি আর চামচিকের বাস। কথিত এখানকার কালাচাঁদ সামন্ত নামে এক সামন্তরাজ এই দ্বাদশ শিবালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দ্বাদশ শিবালয়ে এককালে বারোমাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকতো। রাসমেলা, বারুণীমেলা, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো সব জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠিত হোত। কিন্তু আজ তা কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে। এখন এখানে পুজো হয় না, সন্ধ্যায় বাতি জ্বলে না। নি:সীম – নি:সাড়ে পড়ে থাকে এই ভগ্ন দেউল। এখন এটি বলদঘাটা গ্রামের সংরক্ষণহীন পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ।

 
   এবারে আসছি ‘নাককটি মেলা’র কথায়। বলদঘাটা গ্রামের ওপাশে শীলাবতী নদী পেরোলেই পড়ে গড়বেড়িয়া গ্রাম। এই গ্রামেই বসে নাককটি মেলা। আজ থেকে প্রায় ৭০/৭২ বছর আগে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা-১ ব্লকের গড়বেড়িয়া নিবাসী স্বর্গীয় যতীন্দ্রনাথ পাল তাঁর পুকুর খনন কালে একটি পাথরের মূর্তি পান। বর্তমানে মূর্তিটি যতীন্দ্রনাথ পাল মহাশয়ের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে।
   মূর্তিটি আসলে কিসের মূর্তি তা প্রত্নতাত্ত্বিকরা হয়তো বলতে পারবেন, কিন্তু এলাকাবাসী জানেন না কিসের মূর্তি। মূর্তিটির শরীরিক গঠন এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথেষ্ট অভিনবত্ব আছে। মূর্তিটি এখানে কিভাবে এল তা ইতিহাস বলবে কিন্তু পর্যবেক্ষন করে যা দেখা যাচ্ছে তাতে করে মূর্তিটি কোনো দেবী নয়, দেবমূর্তি। অন্তত তার চেহারা, সাজগোজ এবং পরণের পোশাক বলছে।

   কালো শিলাপাথর দিয়ে মূর্তিটি তৈরি। একটি কাঠামোর মধ্যে মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে। মনে করা হচ্ছে রথের উপরে চড়ে তিনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন। রাজকীয় একটা ভাবমূর্তি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে এই দেবমূর্তিটির মধ্যে। কাঠামোর দৈর্ঘ্য
৩ ফুট ২ ইঞ্চি, চওড়া ১ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং পুরু দেড় ইঞ্চি। মূল মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ২ ফুট ৮ ইঞ্চি, অবশ্যই মাথার মুকুটসহ।
   মূল মূর্তির গলায় হার আছে। দু’হাতে বাহুমূলে বাজুবন্ধ আছে। কোমরে আছে কোমরবন্ধ। কর্ণমূলেও আছে দুল। বক্ষপ্রদেশ এবং উদর খোলা। রাজপুত্ররা যেভাবে পোশাক পরিধান করে থাকে তিনি সজ্জিত। মাথায় রাজমুকুট। দু’পাশে কাঁধ পর্যন্ত চুল। হাতে কী ধরা ছিল বোঝার উপায় নেই কর হাতের তালু দু’টোই ভাঙা। মূর্তিটির হাত যেমন নেই তেমনি নাকটাও নেই। আদিবাসীরা যারা কোদাল দিয়ে পুকুর কাটছিল তাদের কোদালের আঘাতে নাকটা কত গিয়েছিল তাই তখন থেকেই জনশ্রুতি ‘নাককাটি’। এই মূর্তিকে সামনে রেখে যে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয় তার নাম নাককাটি মেলা।
   যাই হোক মূর্তিটির মধ্যে আরও যে বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল – মূর্তিটির পায়ে নাগরা জুতো আছে। মজা পরে আছেন। সবই কিন্তু পাথরের তৈরি। মূর্তিটির একেবারে পায়ের তলায় আর একটি মূর্তি। মনে করা হচ্ছে তিনি রথের সারথি। তার নিচে সাতটি ছুটন্ত ঘোড়া। লাগাম দিয়ে বাঁধা। মূর্তিটির ডানদিকে একটি মূর্তি ঠিক গণেশের মতো, বামদিকে একই মাপের আর একটি মূর্তি, গণেশ নয় তবে কার্তিক হতে পারে। ধনুর্বাণ নয়, গদা ধরে আছেন তিনি, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। এই কার্তিক এবং গণেশের নিচে দু’পাশে একটি করে নারী মূর্তি। হাতে করে ফুল না শঙ্খ ধরে আছেন পরিষ্কার নয়।
   আসল মূর্তির পিছনে একটি চক্র আছে। যার উপরে ‘৺’ চিহ্নটি আঁকা। তার দু’পাশে দু’টি মূর্তি ভাসমান অবস্থায়। যেন তারা পদ্মফুলের উপরে ভেসে আছেন, দেবমূর্তিকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এই মূল মূর্তির দু’দিকে যে মূর্তিগুলি আছে তাদের দৈর্ঘ্য ১ ফুট আড়াই ইঞ্চি করে। মূর্তিটির বামদিকের গলা থেক একটি মালার মতো অলঙ্কার জঙ্ঘা ছুঁয়ে ডানদিকের কোমরে শেষ হয়েছে। মালাও হতে পারে, নয়তো পৈতে।
   এই মূর্তিখানি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি অনুরূপ কাঠামোর মতো আর একটি মূর্তি বসানো। এটিও পাওয়া যায় গড়বেড়িয়া মৌজাতেই। তবে এটি গড়বেড়িয়ার পশ্চিম দিকের মৌজাতে পাওয়া যায়। ক্ষেত থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নাম ক্ষেত্রপাল। এটিও শিলাপাথরের তৈরি। মূর্তিটির বৈচিত্র্য কিছুটা আলাদা। মাথা, মাথার মুকুট থেকে বক্ষপ্রদেশের শেষ প্রান্ত পাওয়া গেছে। এটিও পুরুষ মূর্তি। যেটুকু পাওয়া গেছে তার দৈর্ঘ্য ১ ফুট ৮ ইঞ্চি। শুধুমাত্র মুকুটেরই দৈর্ঘ্য ১৫ ইঞ্চি। এই মূর্তির দু’পাশে দু’টো মূর্তি আছে। বাজুবন্ধ আছে। অনুমান করা হচ্ছে একই সময়কালে তৈরি।
   এই দেবমূর্তিটি পাওয়ার ইতিহাস জানতে গিয়ে গুরুদাস পাল মহাশয়ের মুখ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও বেশ চমকপ্রদ এবং বিস্ময়ের। শ্রীপাল কথপ্রসঙ্গে বলেন – তাঁদের বাড়ির মূর্তি পাওয়ার খবর শুনে তাঁর মাস্টারমশাই – নাম প্রফুল্লবাবু (পদবী বলতে পারেননি) কামারপুকুর থেকে এসেছিলেন। তিনি এখানে এসে পুকুরপাড়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি মূর্তি কুড়িয়ে পান। যার উচ্চতা এক ফুটের মতো। তিনি সেই মূর্তিটি নিয়ে চলে যান। কীসের মূর্তি তা গুরুদাসবাবু বলতে পারেননি।
   শ্রীপাল আরও যে কথা জানান – তাঁর স্বর্গত পিতা যতীন্দ্রনাথ পাল বলেছিলেন যে তাদের বাড়ির অনতিদূরে পূর্বদিকের পুকুরের পাড়ে মাটির নিচে একটি ৪ ফুট চওড়া দেওয়াল পাওয়া গিয়েছিল। সেটি এখনো আছে তবে মাটির নিচে কোথায় চাপা পড়ে আছে জানেন না। যতীন্দ্রনাথ পাল বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন।
   তবে এখানে যে একটি গড় ছিল তা সর্বব সত্য। এখানে গড়ের পুকুর বলে একটি পুকুর আছে। সম্প্রতি এটিকে স্থানীয় পঞ্চায়েত সংস্কার করেছে। এখানের গড়ে পাথরগুলি সুন্দর সাইজ করে কাটা। তার কিছু পাথর গুরুদাস পাল তাঁর বাড়ির কাজে লাগিয়েছেন এবং কিছু পাথর পার্শ্ববর্তী রাজবল্লভপুরবাসীরা নিয়ে যান। পাশাপাশি গ্রামের লোকেরা আটচালা বানানোর কাজে লাগিয়েছেন।
   যতীন্দ্রনাথ পাল দেবমূর্তিটি পাওয়ার পর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দক্ষিণ দিকে শীলাবতী নদীর ধারে গঙ্গারাম পালের বাড়ির কাছে একটি বেলগাছের তলায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে একটি মেলা বসান যার নাম ‘নাককাটির মেলা’। শীলাবতী নদী গর্ভে সে স্থান কবেই তলিয়ে গেছে। মূর্তিটি যাতে সংরক্ষিত থাকে তাই যতীন্দ্রনাথ পাল পরবর্তীকালে নিজের বাড়িতে
নিয়ে চলে আসেন। সেখানেই আছে মূর্তিটি। কিন্তু মেলাটি আজও চলে প্রতিবছর মাঘ মাসের ৩ এবং ৪ তারিখে সেই শীলাবতী নদীর ধারেই। পুরাতত্ত্ববিদরা এখানে এলে অনেক কিছুই পেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

নীল অভিমান || ফটিক চৌধুরী || কবিতা

নীল অভিমান
ফটিক চৌধুরী


আমার নীল অভিমান জমিয়ে রাখি
ছোট্ট নীলখামে
যখন সেটা খুলব ডেকে উঠবে পাখি
ঠিক মধ্যযামে।
অবিশ্বাসের কাঁটার মধ্যেও ফোটে ফুল
নীল অভিমানে ভালবাসা থাকে নির্ভুল।

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ৮৪ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৮৪.
শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা দুর্গাপুরের শৈশব আছে। এই ইনফরমেশন দিয়ে একটি গদ্য লেখা শুরু হলে একে একে উপস্থিত হবে ডিএসপি এএসপি কোকোভান ফিলিপসকার্বন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিন্তু শুভাশিসের প্রসঙ্গে দুর্গাপুরের সাতকাহন শোনাবো না। আমি সরাসরি পৌঁছে যাব শুভাশিসের কবিতায়।
কিছুটা ঢেকে রেখে বাকিটা বলব , সে প্রকল্পনাও সমাপ্ত। এখন থেকে সোজা কথা সোজাই বলব। যেকজন কবি অন্তঃকরণ থেকে  আধুনিক কবিতাকে বিদায় জানিয়েছিলেন , শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় তাদের মধ্যে একজন প্রধান কবি।
আমি আজকের এই লেখাটিতে কেবলমাত্র মিথ হয়ে শুভাশিস-কবিতা তুলে ধরছি।
মিথ -১
আমি সুন্দরের থেকে সবুজ একটি পাতা ধার করলাম। আমি অসুন্দরের থেকেও সবুজ একটি পাতা ধার করলাম।
মিথ- ২
কতখানি রাস্তা পার হলে এক একটি জলপ্রপাতের
ভিত গড়ে উঠতে দেখা যায় সে বিষয়ে অধুনাবিলুপ্ত
মায়াসভ্যতার একটি মিথের সন্ধান পাওয়া যায়।
মিথ - ৩
একটা কাচবিহীন লণ্ঠন আর একটা কাচবিহীন আয়নার মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠলে
মিথ - ৪
দোলপূর্ণিমার কাছাকাছি চাঁদে যে জড়ুলচিহ্ন ফুটে ওঠে তা থেকে রক্তক্ষরণ হলে সমস্ত বাতাবিলেবুর বন এক হলুদ গন্ধে ভরে যায়।
মিথ - ৫
একটা অরণ্যপ্রিয় উটপাখিকে প্রায়শই আজকাল দেখতে পাচ্ছি আমার লেখার টেবিলে জলের গেলাসে বা শার্টের হাতায় যে উটপাখিটির মাথায় একটি স্বয়ংক্রিয় বোতাম ও আলো সবসময়ই ঝুঁটির মতো শোভা পায়
মিথ -৬
দুটি স্থবির প্রান্তের মধ্যে যদি একটি অস্থির সেতু গর্জে ওঠে তবে তাকে শ্রাবণের জলে ধুয়ে দেওয়াই ভালো।
মিথ - ৭
গতরাতে যে ঘুমটি  নিজের খেয়ালেই জানলার পাশে এসে বসেছিল  তার হাতে ছিল একটি সূক্ষ্ম তারযন্ত্র , আঙুলে  মেরজাপ।
মিথ - ৮
যে স্থিরমতি করুণ বালিকাটির নাম হতে পারে কনকাঞ্জলি / তার সোনালি এবং বাদামিতে খোদাই করা পোশাকটার সাথে একটা/  লালটুপি মানাইসই।
মিথ - ৯
পাথরের জন্মটা ভুলে ছিলাম বলে আত্মমগ্নই রয়ে গেলাম।
মিথ - ১০
 দরজার ওপাশে যে বসন্ত আসে তার কিংখাবে অপেক্ষা আর / উষ্ণীষে আগমনচিহ্ন।
আমি এই দশটি কবিতার অংশকে আগেই ঘোষণা করে দিয়েছি , এগুলিও বাংলাকবিতার মিথ।
আজকাল খুব তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে গেছে। এক একজন দিক্ গজ এক একটা ঘোষণা করে দিচ্ছে এক একটি রচনা যুগান্তকারী। কিন্তু হিসেব নিলে দেখা যাবে সে যেটিকে উপস্থিত করল সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের চল্লিশ বছরের পরিশ্রম যুক্ত আছে। গত দশ বা কুড়ি বছরে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মূল্যায়ন করবে পরবর্তী প্রজন্ম। তখন এইসব ভবিষ্যৎদ্রষ্টাদরের কোনো চিহ্নই থাকবে না।
আমি কবি শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার পোস্ট দেওয়া শুরু করলাম আজ থেকে। দেখুন কী হয়।

আটপৌরে কবিতা ৫২৬- ৫৩০ || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫২৬

আতঙ্কবাদী/  ধ্বংসকারী/  জঙ্গি
       ) দেশদ্রোহী  (
তকমা তাদের দেয় দেশ ।

৫২৭

পারদর্শী/  জ্ঞানী/  বিজ্ঞ
     )  ওস্তাদ  (
চিনতে হয় তার দক্ষতায়।

৫২৮

বেপরোয়া/  বেআক্কেলে  / বেখাপ্পা
      ) পাগল  (
এক কথায় বলে ওঠে সকলে ।

৫২৯

নিম্ন/  উচ্চ/ শীর্ষ
   ) আদালত  (
গুরুত্ব বিশেষে এগোতে হয় ।

৫৩০

সুখী/  অসুখী/  অপূর্ণ
    ) জীবন  (
এক জনমেই দেখা হয় ।

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || নিজস্ব পালক

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

নিজস্ব পালক । খগেশ্বর দাস । বাকপ্রতিমা । পঁচিশ টাকা ।

প্রতিদিনকার বাঁচবার জন্য স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ে যারা বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন,  তাদের মধ্যে কবিতা ভাবনা সন্ঞ্চারিত হওয়া ব্যতিক্রমী ব্যাপার । কবি  খগেশ্বর দাস সেরকম মানুষ নন তাই তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে প্রতিদিনকার চিন্তার বাইরে এক বিশেষ চিন্তা । যা কবিতাপ্রেমী সিরিয়াস পাঠক পেতে চায় প্রতিনিয়ত, কিন্তু তা পেতে তাদের অনেক সাধ্যসাধনা করতে হয় ।খগেশ্বর দাসের কবিতা ভাবনার সাক্ষী থেকেছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ' নিজস্ব পালক ' । সেখানে তিনি লেখেন:  ' এভাবেই একদিন কাচের স্বচ্ছতা পেয়ে গেলে/  লেখা হয়ে যায় একটি রৌদ্রদিনের কবিতা ' ( ' রৌদ্রদিনের কবিতা ') , 'পূর্ব আকাশে সূর্যের ছবি আঁকতে/ আমিও উঠোনে লাগিয়েছি/  কৃষ্ণচূড়ার গাছ ।' ( ' সূর্যের ছবি আঁকতে ' )।
         কবি খগেশ্বর প্রকৃতই স্বপ্ন দেখেন এক স্বচ্ছ পৃথিবীর , প্রকৃত কবির মতো । কিন্তু যখন বোঝেন এই পঙ্কিল পৃথিবীর মধ্যে পাওয়া দুরূহ তখন তাঁর দুঃখ বাড়ে । ' তবু কেন পুড়ে যাচ্ছে হাড়মাস/ তবু কেন টের পাচ্ছি আগুনের শিখা ' ( 'তবু কেন ') , ' পা আঁকতে যতবার দাগ টানি/  হয়ে যায় পিস্তল । '( 'মানুষ আঁকতে গিয়ে ') পংক্তি সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ।
          কবির এই কাব্যগ্রন্থের বয়স ২৩ বৎসর । প্রথম কাব্যগ্রন্থ । সেজন্য বয়সগত কারণে তার ভেতরে কিছু চন্ঞ্চলতা ও ব্যগ্রতা পাওয়া যায় এখানে । যার ভেতর তেমন কাব্যিক কৌশল না পেলেও তাঁর সৎ উচ্চারণের জন্য কাব্যগ্রন্থ আকর্ষণ করে । যা এখনো বজায় রেখে চলেছেন । প্রণবেশ মাইতির প্রচ্ছদ অত্যন্ত সাদামাটা হলেও ইঙ্গিতবাহী। ওই সময় ওই ধরনের  প্রচ্ছদের দিকে শিল্পীদের ঝোঁক দেখা গিয়েছিল।

Sunday, July 26, 2020

ইসোল্ট গন-কে নিবেদিত কবিতা || রুদ্র কিংশুক || কবিতা

ইসোল্ট গন-কে নিবেদিত কবিতা
রুদ্র কিংশুক



১.

আগস্ট, তোমার জন্মদিন এসে গেল
আমার ব্যক্তিগত ইস্টার
আপেলগাছের মাথায় অন্ধকার
রেজারেকশন, অ্যানেকডোটাল চাঁদ উঠছে

গ‍্যালওয়ের নতুন দ্বীপে আমাদের তরুণ অভিযান
টেগরের কবিতা আমাদের বাতিঘর
হ্যাজেলউডের ভেতর মৌচাক
অবিশ্রান্ত শিশির
এই সেই ইনিসফ্রি
কবিতা আমাদের টেনে এনেছে এতদূর

নির্জনতার ভেতর ঘুমানো
তোমার কচি বাতাবি দুটি
তুমিই আমার আরাধ্য মিউজ
তোমাকে অনুবাদ করি
দূর্জ্ঞেয়  গেইলিক থেকে প্রাঞ্জল আলোয়
তবু    স্পষ্ট হয়না সবটুকু অন্ধকার
কবিতা শরীরে

তুমি জানো কেবল টেগর কবি
তোমার আগুন পেলে আমিও কি
ফোটাতে পারি না ফুল, মিউজ?

২.
মাদাম ব্লাভাটস্কিকে তুমি জানো
দূর্জ্ঞেয় অন্ধকার তাকে ঘিরে রাখে
তুমি অন্ধকারে পা রাখলে জ্বলে ওঠে আলোদ্বীপ
যা কিছুই স্পর্শ্ব  কর
হয়ে ওঠে লাল ও লালাবির উর্মিমালা

ফরাসিরা যাকে বলে আমুর, তুমি বল গ্রা
একই অর্থ, তবু দুটি দ্বীপের মধ্যবর্তী ঊর্মিত সমুদ্র
অনুবাদ এমনই জটিলতাপ্রসবী খেলা
চোখে যেভাবে দেখো,হাতের তালুর ভেতর তার রূপান্তর

অবিরল অন্ধকার , ওলি-বুল আকাঙ্ক্ষা
বেজে চলে চিরকাল তবু
শূন্যতার ভেতরে এইভাবে অনুবাদ
তোমাকে নির্মাণ করি
তোমাকে টেনে আনি
জন্মান্তরের বর্ষাকালে
তোমার জন্মদিনে এই ছিহ্ন পদাবলী
লামুর পুর ভ‍্যু । 

যেমন দেখেছি || কাশীনাথ সাহা || রম্যরচনা

রম্যরচনা
যেমন দেখেছি 
কাশীনাথ সাহা 


যা দেখছি তা সবটা বলা যাবে না। বলতেও নেই। কি দরকার দাদা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার! ঘাড়ে তো একটাই মাথা। বেশ পুরাতন। পুরাতন জিনিসে একটু জং ধরে। ধরাটাই স্বাভাবিক। আমার মাথাতেও ধরেছে। তবু্ও নিজের মাথা তো তাই সামান্য একটু মায়াদয়া আছে। এই বয়সে ধড় থেকে মাথাটা আলাদা করবার কোন সদিচ্ছা আমার নেই । অসময়ে শহীদ হতেও চাইছি না।  তাই যা দেখছি তার সবকিছু বলতে পারলাম না বলে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিলাম।  যেদিক গুলি নিরাপদ ভাবে বলা যায় সেই দিকগুলিতেই মেরুদণ্ড সোজা রেখে দু'চারটি কথা বলি।
প্রথমেই সাহিত্যের কথা বলি। গ্রামে গঞ্জে এখন কবিদের ছড়াছড়ি। লকডাউনে কবি আর কবিতার সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেছে। সরকার কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কোন নিষেধাজ্ঞা এখনো অব্দি জারি করেনি। ফলে গাছে গাছে এখন কবিতা প্রচুর ফলছে। তিন ফসলি দো ফসলি জমির কথাই এতোকাল শুনে এসেছি। এখন দশ ফসলি কবিও দেখছি। প্রতিদিন দশ বারোটা কবিতা কোন কোন কবি নামিয়ে দিচ্ছে। কলমের মুখ দিয়ে গলগল করে কবিতা বের হচ্ছে। কবিতা কেমন হচ্ছে সেটা বিবেচ্য নয়। কবিতা যে অনর্গল বের হচ্ছে সেটাই বিবেচ্য। ওই কবিতা পরিবেশনের জন্য ভাল ক্যাটারার আছে। আর কিছুই না বুঝতে পেরে অসাধারণ, অসামান্য বলবার কিছু উর্বর বোদ্ধা তো আছেই। কবি লিখলেন প্রেমের কবিতা, বোদ্ধা মন্তব্য করলেন, আপনার এই পোতিবাদি কোবিতা পড়ে আমি ভাসা হারিয়ে ফেলেছি। আমি মনতোমুগধো। আগে কোনদিন আমি এমন পোতিবাদী ভকতি মূলক কোবিতা খাওয়া দূরস্থ চেখে দেখবারও সামাননো সুযোগ পাইনি। মম্তব্যের ভাষা আর বানান দেখে কবির আক্কেল গুড়ুম!
কবি যদি মহিলা হয় তো পোয়া বারো। তখন প্রশংসা আর থামতেই চায় না। ওই স্তাবকদের নৈবেদ্যে মহিলা তুষ্ট হয় কিনা জানি না। নিশ্চয়ই কোন কোন কবি হয় নইলে এমন বোদ্ধার দল তো কবেই অবলুপ্ত হয়ে যেত। এরপর আছে চুলকানির পালা। পালা নয়, মহোৎসব!  তুমি আমার কবিতার প্রশংসা করো আমিও তোমাকে দেখবো। আমার কবিতা যেমনই হোক তোমাকে প্রশংসায় প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হবে। নই-লে আড়ি। দাদা দিদিকে দেখেন দিদি দাদাকে। সবার হাতে শিশি ভর্তি তেল। মালিশ, তেল মালিশ। এ খেলা চলছে নিরন্তর। আর এই করতে গিয়ে কবি, কবিতা দুজনেই ডুবে মরছে।প্রায় প্রতি কবির একটা চেনা গন্ডী আছে। সেই গন্ডীতে আছে পোষা বোদ্ধা। তাদের গন্ডীর কবিতা যতো নিকৃষ্ট মানের হোক না কেন। নৈবদ্যের ডালি নিয়ে ফুল বেলপাতা নিয়ে ভক্তকূল প্রতিক্ষায় থাকে।  চরণামৃত না খেয়ে সেই ভক্তকূল উঠবেই না। এখানেও দর্শন আছে। সে দর্শন সকলের বোধগম্য নয়। এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আনজনে..  সজনি আমি বুঝি মরেছি মনে মনে।
অবশ্য স্তাবক পরিবৃত না হয়েও ভাল কবিতা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই কবিতায় হৃদয় আছে, আলো আছে, প্রাণ আছে, উত্তাপ আছে, লাবণ্য আছে, গভীরতা আছে।  সেই কবিতার নাম শম্ভুনাথ রক্ষিত। বিনয় মজুমদার। যাঁদের মাথায় রাজনৈতিক ছত্রছায়া নেই। যাঁদের জন্য সুদৃশ্য মঞ্চ নেই। যাঁদের পেটে খিদে বাসি আমানির মতো শুয়ে থাকে। হৃদয়ে অক্ষরের মন্ত্রধ্বণি। চেতনায় আলোর ছটা।
এদের স্তাবককূল নেই। তবুও একদিন  এই কবিতাই আমাদের আলোকিত করবে। আমাদের পথ দেখাবে। আমাদের শুদ্ধ করবে।
হারিয়ে যাবে এই স্তাবক পরিবৃত অক্ষম কবিতার অহংকারী মুখ গুলি।

আটপৌরে সিরিজ : ৬ || অলোক বিশ্বাস

আটপৌরে সিরিজ : ৬ 
অলোক বিশ্বাস

যাখুশিতাই
---------------
বর্জ্য ফেলার জায়গাটিকে
অপরাধপ্রবণ
এলাকা বলছো কেন বলতো

সরকারি বুদ্ধিজীবী
--------------------------
বাবুমহাশয় বুদ্ধিজীবী সত্তা।
অশ্বডিম্ব
পাড়লেও তিনি সরকারি সারবত্তা

কৃত্রিমতা
------------
ঝমঝম বিরাদরী আসিয়া
দুমদাম
চলে যায় অনুক্ত ঠিকানায়

অন্ধামি
----------
প্রতিক্রিয়া জানাতে বলেছো।
জানাতেই
সাম্প্রদায়িক মূর্তি ধারণ করেছ

বিকৃতি
----------
পরিবর্তন শব্দটিকে সহজে
ধর্ষণ
করা দেখি চিৎকৃত মগজে

সুপ্রভা আলোয় || পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

সুপ্রভা আলোয় 
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


মন কেমন করা রোদ্দুরের জন্য অপেক্ষা করি
         পুবদিকের জানলা দিয়ে বাতাস আসে
                    নিঝুম চারিধার
ভোরের সুপ্রভা আলোয়
 কতদিন দেখি  নি তোমার মুখ
                                   মনে করতেই
   একটা বসন্তবৌরি শিস্ দিয়ে উড়ে চলে গেল
ভেসে যাওয়া এক টুকরো মেঘে
                ক্রমশ ফুটে ওঠো তুমি
                       বড়ো বিষণ্ণতা ঘেরা 
হিমশীতল নির্জন হাত ছুঁয়ে যায় শূন্য দেওয়াল
      ভেসে যেতে দেখি
                                 আমার  ইহকাল পরকাল

আটপৌরে কবিতা ৫২১- ৫২৫ || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫২১

হৈচৈ/  ব্যস্ততা/  বাহার
     ) বিয়েবাড়ি  (
আবাহন নিমন্ত্রিত  উপহার আহারাদি ।

৫২২

অনূঢা / বিবাহযোগ্যা / দুশ্চিন্তা
        ) অরক্ষনীয়া (
ব্যাপারটা কোথায়  মিলিয়ে গেছে !

৫২৩

অনাথ/  স্নেহহীন/  স্বাবলম্বী
     ) হতভাগ্য  (
সুখ খুঁজে নিতে হয় ।

৫২৪

শোক/  অশোক/  বীতশোক
        ) চরিত্র  (
চিনিয়ে দেয় নিজস্ব আচরণে।

৫২৫

ফর্সা/  শ্যামা/  কালো
     ) রূপ  (
নির্ণয় হয় নারীর  যোগ্যতা ।

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || প্রাত্যহিক বিভাগ

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

মানুষ । শান্তি সিংহ । নয়া উদ্যোগ । বাইশ টাকা ।

রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ ছবি যা প্রচ্ছদে ও বইয়ের ভেতরে এক অনবদ্য শিল্প নিয়ে এসেছে  , তার মধ্যে মানুষকেন্দ্রিক কবিতার  সামনে দাঁড়িয়ে কবি শান্তি সিংহের  ' মানুষ ' কাব্যগ্রন্থের জন্য তারিফ করতে হয় । ' খোড়ো চাল আর মোটা ভাত কাপড়ে কি তার দিবাস্বপ্ন?/ মানুষ কি শুধুমাত্র  শিল্পীদের বাহারি প্রদর্শনীতেই ঠাঁই পাবে? ' -র মতো  শিরোনামহীন কুড়িটি কবিতা আমাদের এক অন্য স্তরে পৌঁছে দিতে পারে । অবশ্য তার জন্য পাঠককে কিছু সময় ও মগ্নতা দিতে হবে।
        ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ আমাদের কাছে নিয়ে আসে মানুষের গতিধারা,  জীবনচর্যা তার সঙ্গে কাব্যিক উপলব্ধি । যেখানে নাগরিক দিক তেমনভাবে উঠে আসে না । আসলে প্রকৃতার্থে জীবনের কথা বলার মধ্যে যে আনন্দ আছে তেমন বাহাদুরি আছে । কবির মানবিক দিকগুলো  যদি জোরালোভাবে  এই বিষয়ে তন্নিষ্ঠ না থাকে, তবে তা পাঠকের কাছে তুলে ধরা কতখানি সম্ভব জানি না । সে কারণে : ' জন্ম থেকে তোমাদের কপালে কেবলই নেই নেই শূন্যতা/  সাগর তো তোমাদের চোখের লোনাজলে ভর্তি । '  -র মতো  কবিতার লাইন পেয়ে যাই । যার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই হয় ।
       বলা যায় কবি গ্রামীণ দিকগুলোতে মনোনিবেশ করছেন । প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন,  ভালোবেসেছেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া মানুষ । তবে তাতে আবেগীয় দিক কিছুটা বেশি হওয়ায় পাঠকের মগ্ন হতে  অসুবিধা হয় ।
       বর্ষিয়াণ এ কবি  সত্যি সত্যি সঁপে দিয়েছেন সারস্বত জগতে । তার প্রমাণ এই কাব্যগ্রন্থ সহ অন্যান্য গ্রন্থে পাই ।

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ৮৩ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৮৩.
বাপন চক্রবর্তী-র আসল নাম সুব্রত চক্রবর্তী।  সুব্রত চক্রবর্তী  ছয়ের দশকের একজন বিশিষ্ট কবি। বাপন সুব্রত-র প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য নিজের সার্টিফিকেটের নামটিকে নির্বাসিত করে ডাকনামটিকে বসিয়ে দিল লেখার নামের শীর্ষে। এ ঘটনার কথা  খুব বেশি লোকজানাজানি হয়নি। এই লেখার সঙ্গে সুব্রত নামটির কোনো সম্পর্ক নেই। এখন কেবল বাপনের কথা। বাপন চক্রবর্তী-র কথা। যার নিবাস বারাসত।
বাপনের প্রথম কপা -তে প্রকাশিত কবিতা ' আকাশের দিকে ।১২১ সংখ্যায়।
' আকাশের দিকে উড়িয়ে দাও ছড়িয়ে দাও দরজা জানলা আর /তোমার সবগুলো হৃৎপিণ্ড '
এই বাক্যটির সঙ্গে যুক্ত আছে বাপনের কণ্ঠস্বর। এটুকুই সংযোজন করছি।  লেখার সঙ্গে গলা।
এরপর কপা ১২৩ -এ ।এই পক্ষের কবি  : মুরারি সিংহ চিরঞ্জীব বসু অংশুমান কর বাপন চক্রবর্তী এবং বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ওই সংখ্যায় মুরারি সিংহ -র  ' লৌকিক বাসভূমি ' - র  দশ নম্বর কবিতাটির শুরুটা কেমন ছিল একবার দেখে নিতে চাইছি।
' অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে দিয়েছি , তুমুল বৃষ্টিপাতের দিকে ,রাতভর জলসার দিকে , টিয়ার গ্যাসের না ফাটা সেলের দিকে। '
বাপনের কবিতার সঙ্গে মুরারির কবিতার দু-লাইন পড়িয়ে নিলাম , কারণ ষষ্ঠ বছরের শুরুতেই আমরা আমাদের মূল লক্ষ্যকে স্থির করে নিয়েছিলাম। আধুনিকতাকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর আধুনিকতা যে একটা ক্লোজড চ্যাপ্টার এটাও হ্যামার করে যেতে হবে ক্রমাগত।
এই সংখ্যায় বাপনের রূপকথা কবিতাটিও ছিল। কেমন ছিল কবিতাটি। পড়া যাক :
একদিন আমরা সবাই কোনো রূপকথার কাছে হেরে যাবো /একদিন মাছ শিকারের জাল সমুদ্রের কাছে হেরে যাবে
....   ...  ...  ...
একদিন চায়ের কাপের কাছে চায়ের কাপেরা হেরে যায় / একদিন সবচেয়ে উঁচু গাছ রোদ্দুরের কাছে হেরে যায় ...
আবার পড়ুন। পড়তে পড়তে জেনে নিন :
আমরা হেরে যাবো রূপকথার কাছে।
মাছশিকারের জাল হেরে যাবে সমুদ্রের কাছে।
চায়ের কাপের কাছে।
উঁচু একটা গাছ হেরে যাবে রোদ্দুরের কাছে।
সবগুলিই তো রূপকথা। অরূপকথাও।
 ওই ১২৩ সংখ্যাতেই বাপনের আরো দুটি কবিতা ছিল।  ওই দুটি কবিতার অংশ :
সাবানের শরীরে কোনো আকাশ ছিল না।
তবু , সাবান জলের চেয়ে অনেক সবুজ ...
সন্ধের একটু পরে পাঠ্যবই দ্রুত উল্টে যায় উত্তরমালার দিকে ...
মাননীয় পাঠক আপনি বিচার করে দেখুন
সাবান জলের থেকে অনেক সবুজ --- এই ইনফরমেশন আপনি আগে আগে জানতেন না।
আবার সন্ধের পর পাঠ্যবই বা প্রশ্নপত্র চলে যায় উত্তরমালার দিকে। এটাও নতুন সিলেবাস। আমরা যে কবিতার নতুন পাঠ্যসূচি তৈরি করতে চাইছিলাম , এসবই তার চিহ্ন।
এই ফাঁকে আমরা কিন্তু আরো একটা মাইলফলকের কাছে পৌঁছে গেছি।
                      কবিতাপাক্ষিক ১৫০
১৯ জুন ,১৯৯৯।তারিখটাও মনে রাখুন। ওই সংখ্যার প্রচ্ছদটা একবার পড়ে নিতে চাইছি।
প্রিয় কবিতাপাঠক
আপনি আপনার টুপিটি খুলে রাখুন
প্রিয় কবিতাপাঠক
আপনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান
কবিতাপাক্ষিক-কে আপনি
আপনার অভিনন্দন জ্ঞাপন করুন
কবিতাপাক্ষিক
এই প্রত্যাশা করতেই পারে
অন্তত আপনার কাছে
এটা ছিল বহিরঙ্গ। আর ভেতরে লিখেছিলাম :
আমরা জেনে গেছি আধুনিক লেখালেখির দিন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আধুনিকদের করণীয় কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। ...   ...   ...
ঠিক তেমনি মডার্নিস্টদের অসমাপ্ত কাজগুলিকে শেষ করার দায়িত্বও পোস্টমডার্নিস্টদেরই গ্রহণ করতে হবে।

Saturday, July 25, 2020

স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে || সৌমিত্র রায়

স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে
সৌমিত্র রায়


২৫-০৭-২০২০ | সন্ধ্যা | মেদিনীপুর
অনেক ভেবে দেখলাম, খারাপ থেকে লাভ নেই ! পরিস্থিতি পরিস্থিতির মতো থাক,আমি আমার মতো মনকে ভালো রাখি ! মন যেমন থাকে, আমি তেমন থাকি !
 || আনন্দ ||


নারী যেমন পুরুষ || বিশ্বজিৎ দাস || কবিতা

নারী যেমন পুরুষ
বিশ্বজিৎ দাস

তোমাকে গ্রহণ করি বিষাদের গায়
অর্জিত লাবণ্য যেন হঠকারী পায়

কি হবে এমন
আলো
বাতাসের বুকে
কি দুঃখ নেভানো ছক, কি আনন্দ সুখে?

একদিন রক্তের কাছে সব চলে যায়
চেহারা রঙিন হলে
পাপড়ি ঝরে; হায়!

পুরুষের...

রূপ নেই, কে বলেছে; সেও 
তো
যৌনশিকারী, মুখে বলছে হাত ধরো!

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ৬ || কান্তিরঞ্জন দে || প্রতি শনিবার

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ৬
কান্তিরঞ্জন দে


 হলগুলো সব গেল কোথায় ?

        কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ সিনেমাহল বন্ধ হয়ে গেছে । কেন ?
       ১৯৭৫ সালে ভারতে পাকাপাকি ভাবে টিভি এল ।দূরদর্শনে সম্প্রচার ব্যবস্থা চালু হল । সাতবছর একটি  সরকারি চ্যানেল রমরম করে চলতে লাগল । পরে বাংলায় আরও একটি চ্যানেল যোগ হল । ১৯৮২-তে এশিয়াডের পরে ভারতের ঘরে ঘরে টিভি ঢুকতে লাগল । ব্যক্তিগত প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে সিরিয়াল অথবা টেলিফিল্ম তৈরি করে সরকারি দূরদর্শনে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হল ।
      তখনও রাতের দিকে সরকারি চ্যানেলে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল।

      এরপর এল মেগা সিরিয়াল বা ডেইলি সোপ অপেরার যুগ । ততদিনে ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ( ভি সি পি ) প্রযুক্তি এসে গেছে । শুরু হল ঘরে ঘরে  সপরিবারে জনবিচ্ছিন্ন ভাবে সিনেমা উপভোগের যুগ ।
     গ্রামে গ্রামে  পর্দা টাঙিয়ে ভিডিওতে  সিনেমা দেখানো জনপ্রিয় হয়ে উঠল । ভিডিও- র   হাত ধরে এসে পড়ল  সি ডি ( কমপ্যাক্ট ডিস্ক )-র  জমানা ।

       পুরো সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থাটাই একবারে বিকেন্দ্রিত হয়ে গেল । সিনেমা দেখার জন্য  সিনেমাহলেই যাবার  আর তত  প্রয়োজন রইল না ।

     যা ছিল  বিরাট বড় অন্ধকার ঘরে অনেকে সম্মিলিত আনন্দ উপভোগের  উপায় , সেই স্থবির ব্যবস্থা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেল দিগ্ বিদিকে ।

     দিল্লি দূরদর্শনে রামায়ণ এবং মহাভারত সিরিয়াল দুটির জনপ্রিয়তা আর বাংলায় প্রতিদিন ঘরে বসে মেগা সিরিয়াল দেখতে পাবার মজা সিনেমা হলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিল ।

     এর পরে ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে লোকের হাতে হাতে এসে গেল 
অ্যাণ্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ফোন ।  ইউটিউব , নেটফ্লিক্স , অ্যামাজন , হটস্টার ইত্যাদির কল্যাণে লোকের পকেটে পকেটে এখন সিনেমা । সঙ্গে টেবিলে কম্পিউটার আর কোলের ওপর ল্যাপটপ তো আছেই ।

       সিনেমা হলের ব্যবসা এর মধ্যে বাঁচে কি করে ? অপরিস্কার অডিটোরিয়াম , নোংরা বাথরুম , ছেঁড়াখোঁড়া গদি আঁটা চেয়ার আর মাথার ওপর ঘটাং ঘটাং করে ঘুরতে থাকা ফ্যানের গরম হাওয়া সহ্য করে কে আর  হলে সিনেমা দেখতে যাবার কষ্ট সহ্য করে ? কেনই বা করবে ?

     ফলে , যা হবার তাই হল । কলকাতা এবং পশ্চিমবাংলায় গত ৩০-৩৫ বছরে একের পর এক সিনেমাহল বন্ধ হয়েই চলেছে । ঢাকা  এবং  সারা     বাংলাদেশেও  একই অবস্থা । বন্ধ সিনেমাহলের জমিতে কোথাও তৈরি হল শপিং মল । কোথাও উঠল মাল্টিস্টোরিড 
হাউসিং  ফ্ল্যাটবাড়ি । অনেকগুলোই এখনও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মাথায় নিয়ে ভুতের বাড়ির মতো বন্ধ হয়ে অন্ধকারে পড়ে রয়েছে ।

      আশি-র দশকের গোড়াতেও পশ্চিমবঙ্গে চালু সিনেমাহলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০০-র  কাছাকাছি । আজ সে সংখ্যাটা কমতে কমতে সারা রাজ্যে মেরে কেটে ২৫০-ও হবে কি না সন্দেহ ।

      সিনেমা দেখা সারা পৃথিবী জুড়েই ছিল একটা সমবেত উদযাপন । একটা দলবদ্ধ বিনোদন বা উৎসব । আজ তা নির্জন এককের নিঃসঙ্গ দিনলিপি ।
     সিনেমা দেখতে গেলে লোকে শো-এর আগে পরে চা , চানাচুর , ঝালমুড়ি , আলুর চপ খাবেই । সিনেমা দেখার শেষে রেস্টুরেন্টে চপ, কাটলেট, মোগলাই পরোটাসহ   ভালোমন্দ খেয়ে অথবা  সপরিবারে কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফেরাই ছিল দস্তুর । আমরাই তো কলেজ জীবনে  এসপ্ল্যানেডের হলগুলোয় সিনেমা দেখতে গেলে লুকিয়ে চুরিয়ে একটু আধটু  ড্রিংক করতে শিখেছিলুম ।

      হাল আমলের বিনোদন ব্যবসায়ীরা সিনেমা দেখার এই কার্নিভাল মেজাজটারই  সুযোগ নিলেন । এলাকায় এলাকায় গড়ে উঠল মাল্টিপ্লেক্স । একই ছাদের তলায়  তিন চারটে সিনেমার মধ্যে  পছন্দসই যে কোনও একটা দেখবার সুযোগ  হল । সঙ্গে রইল খানা-পিনা , কেনাকাটা , আড্ডা দেবার ব্যবস্থা । বউ বাচ্চা , বন্ধুবান্ধব নিয়ে সমবেতভাবে আনন্দ পাবার পশরা । এখন অব্দি সিনেমা দেখা এইখানে এসে ঠেকেছে ।

     সিনেমা- র সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সিনেমার সরবরাহ ( ডিস্ট্রিবিউশন ) এবং প্রদর্শন ( এক্সিবিশন ) ব্যবস্থা । তারও আমূল ভোল বদল হয়ে গেছে ।
      তাতে অবশ্য , সবাইম মিলে সিনেমাহলে যাবার মজাটা একটুও কমে নি । কমেছে কি ?
        শুধু , আমাদের শৈশবের , কৈশোরের , যৌবনের আনন্দের উপবনগুলো সময়ের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে ।

আপনারা যা বলছেন || "আটপৌরে কবিতা" প্রসঙ্গে || বন্দিশ ঘোষ

আপনারা যা বলছেন

"আটপৌরে কবিতা" প্রসঙ্গে
বন্দিশ ঘোষ

"বেদ/উপনিষদ/পুরাণ
      )জ্ঞান(
যাকে ছাড়া জয় নেই।"

বিশিষ্ট কবি নীলাঞ্জন কুমার এমনই এক পংক্তি দিয়ে শুরু করেন তাঁর আটপৌরে কবিতার পথচলা যার সৃষ্টিকর্তা কবি সৌমিত্র রায়।
তিন লাইনে মোট শব্দসংখ্যা ৮। প্রথম লাইনে ৩ টি। দ্বিতীয় লাইনে ১ টি। আর তৃতীয় লাইনে ৪ টি। ' আটপৌরে কবিতা ' র এই গঠন নিয়ে নানাভাবে নানান দর্শন পাঠকদের মনে সঞ্চারিত করার নেশায় মেতে উঠেছেন কবি নীলাঞ্জন কুমার। কবির নিজস্ব একমুখী কোনো ভাবনা আমার চোখে পড়েনি। ওনার লেখায় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিকগুলোও যেমন বর্তমান ঠিক তেমনই প্রেম, ব্যাঙ্গ, রসিকতা, শহর, প্রতিবাদ এসব নিয়েও কাটাছেঁড়া করেছেন অত্যন্ত সংযতভাবে।
অহেতুক পান্ডিত্য দেখাবার সুযোগ পেলেও তা কবি দেখাননি। বরং ইতিহাস থেকে শুরু করে এখনও অবধি আমাদের সংসারের খুঁটিনাটি সমস্তকিছুকে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে নেমেছেন ময়দানে অথবা বলতে পারি এই সমস্তকিছুকে সঙ্গী করে পথ চলছেন কবিতার পথে, শিল্পের পথে, সাহিত্যের পথে যার ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে পরিমিতিবোধ যা পাঠকদের স্পর্শ করতে বাধ্য করবে।

"বর্গক্ষেত্র/আয়তক্ষেত্র/কৌণিক
      )গণিত(
সারাঘর জুড়ে প্রতিদিন।"

              অথবা

পিশাচ/ডাইন/প্রেম
      )অপদেবতা(
সব আমাদের ভেতরে আছে

এমন সব লেখা পড়তে হয়ত খুব সহজ সরল বলে মনে হয় কিন্তু ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে যখন মনে হয় আরেকটু ভাবি, যখন কবিতার দর্শনটা পাঠকদের মনে হাজারটা চেতনার পথ বের করে দেয় তখন মনে হয় লেখনীটা সহজ হলেও লিখতে পারাটা ততটাই কঠিন। আর তখনই কবি জিতে যায় আর পাঠকেরা নিজেদেরই মননে উজ্জাপন করে কবির সেই জয়।
কবির লেখা ৮০% পংক্তি পড়ে বোঝা যায় উনি ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন, উনি নতুন যুগের কথা ভাবছেন, পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কথা ভাবছেন। আর সেই জন্যেই হয়ত তিনি তাঁর দর্শনকে গভীর থেকে গভীরে নিয়ে গিয়ে বিশাল এক অনন্ত খোলা আকাশ তুলে ধরতে চাইছেন এবং সেখানে বিচরণ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন সবাইকে। তাঁর আটপৌরে কবিতার প্রকৃত মূল্যায়ণ করতে হোঁচট খেতে হয়েছে বারবার।
শেষে এটুকুই বলবো কবি এভাবেই লিখতে থাকুন। 'সনেট' বললে যেমন প্রথমে আমাদের মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা মনে পড়ে যায় ঠিক তেমনই আটপৌরে কবিতা বললে কবি নীলাঞ্জন কুমারের নামটা প্রথমে মাথায় আসতে হয়তো আর বেশিদিন বাকি নেই। তবে ভালোরও তো ভালো হয়, তাই সেই ভালোরও ভালো, আরো ভালো, তার থেকেও ভালো লেখার পড়ার খিদে থেকে যাবে সারাজীবন।

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার


জলছবি নাভিপদ্মে । প্রাণজি বসাক । কবিতিকা । একশো পঁচিশ টাকা ।

উনিশটি কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টা প্রবাসী কবি প্রাণজি বসাকের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ' জলছবি নাভিপদ্মে ' - তে  অন্যান্য  কাব্যগ্রন্থ থেকে একচুলও এগিয়ে যাবার প্রয়াস দেখা গেল না । কবির বোঝা উচিত লেখা শুধুমাত্র সংখ্যা বাড়ানোর খেলা নয়, তাকে উত্তরণ করার দিকে মনোনিবেশ করতে হয় । বইটির ভেতরের বেশ কিছু কবিতা ভালো হলেও,  বেশিরভাগ  কাব্যগ্রন্থ পড়ে থাকার কারণে একটি পুরো কাব্যগ্রন্থ হিসেবে তারিফ করা যাচ্ছে না ।  কারণ:  ' অসংখ্য চৌকাঠ পেরিয়ে অতঃপর ঝরে পড়ে যাবতীয় পালক ' কিংবা ' একটা অন্ধকার ক্যানভাস ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ' র মতো লাইন তাৎক্ষনিক বাহবা পেতে পারে কিন্তু প্রকৃতার্থে  সে কতখানি যোগ্য হয়ে পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ আছে ।
             দেহসৌষ্ঠবের দিক থেকে সুন্দর কাব্যগ্রন্থটিতে টিউনিং এর অভাব স্পষ্ট । গোটা কাব্যগ্রন্থ এক তারে বেজে ওঠে না । যার জন্যে মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো না ' আঃ'।
       তবে দেখতে পাচ্ছি কবির ধৈর্য চেষ্টা অধ্যাবসায় অসম্ভব রকমের জোরালো । শুধু দরকার নিরবচ্ছিন্ন সাধনা । যা তাঁর কবিতার  দোষগুলোকে শুধরে দিতে পারবে । আসলে পত্রিকায় দু একটা লেখা প্রকাশ আর একটি পুরো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সম্পর্ক আকাশ পাতাল । সেখানে প্রকৃত যোগ্যতা খুঁজে পাওয়া যায় । কমলেশ নন্দের প্রচ্ছদ , প্রচ্ছদ হিসেবে মানিয়ে যায় ।

আজকের সূচি~

আজকের সূচি~