অনুবাদ উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৫১ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

 হে আমার স্বদেশ- ৫১

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৫১)

মত্যু অপ্রতিরোধ্য।মৃত্যু অমরত্ব দানের প্রতিবন্ধক।কিন্তু মানবীয় কর্ম এবং মানবতা উন্মেষকারী সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তাকে অমরত্ব প্রদান করে।লক্ষ্মীনাথের একটি মানবীয় সৃষ্টির অন্য একটি স্বীকৃ্তি দিল তেজপুরের তরুণ কিন্তু প্রতিশ্রুতিবান কবি-লেখক জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা।জ্যোতিপ্রসাদ শুধুমাত্র নতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কবি-লেখক নয়।তিনি অসমের কেউ না করা একটা কাজের পরিকল্পনা নিয়েছেন।লক্ষ্মীনাথ রচনা করা নাটক ‘জয়মতী’র আধারে তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন।চলচ্চিত্রটি ১৯৩৫ সনের ১০ মার্চ কলকাতার রাওনাক হলে প্রথমবারের জন্য প্রদর্শন করার আয়োজন করা হল।উন্মোচনী সভায় উপস্থিত থাকবেন প্রযোজক প্রমথেশ চন্দ্র বরুয়া,সুগায়ক সাইগল,মিঃহাঞ্চ,হেমন্ত কুমার চৌধুরী আদি বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি।সভা উদ্বোধন করার জন্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া আমন্ত্রিত হলেন।

নিজের সৃষ্ট একটি নাটক ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে,সেটি আবার অসমের প্রথম চলচ্চিত্র,উন্মোচিত হবে ভারতের সাংস্কৃতিক মহানগর কলকাতায়—উদ্বোধন করার আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ খুবই আনন্দিত হলেন।  

উৎসাহের সঙ্গে সভায় এসে উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বললেন , ‘আজ আমাদের অসময়ের জন্য এটি একটি গৌরবের দিন। এই ‘জয়মতী’নামে ছবিটি শ্রীমান জ্যোতিপ্রসাদের অশেষ চেষ্টা ,অপরিসীম ধৈর্য ,সূক্ষ্ম শিল্প চেতনা ,অভিনয় দক্ষতা এবং উদার ভাবে ধন ব্যয় করার ফসল। তিনি প্রকৃত অর্থে একজন শিল্পী।তার মধ্যে  শিল্পীর সমস্ত গুণ বর্তমান। আমি আশা করছি এভাবে তিনি আরও অধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সমগ্র ভারতে  অসমের গৌরব বৃদ্ধির সঙ্গে অসমীয়ার মনে জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলবেন’।

  লক্ষ্মীনাথের পার্থিব  জীবনের সূর্য অস্তায়মান।সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতির সঙ্গে মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা সম্বর্ধনা পেলেও জাগতিক ঘটনাক্রমে তাকে মাঝেমধ্যে বিমর্ষ করে ফেলে ।শিবসাগর থেকে খবর এল রায় সাহেব এবং অনোরারি  ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া লক্ষ্মীনাথের প্রিয় এবং ছোটো দাদা জগন্নাথ বেজবরুয়ার ৪ জুলাই (১৯৩৫) মৃত্যু হয়েছে। এদিকে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়, সুখ দুঃখের পরামর্শদাতা ,বন্ধু ছোটো দাদা ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোকগমন করেছেন। এই দুজন আত্মীয়ের মৃত্যু বার্ধক্যজনিত কারণে।মানুষের জীবনে এভাবেই মৃত্যু আসে। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া লক্ষ্মীনাথ সেটা জানেন। তথাপি আপনজনের বিয়োগের শোকটা অসহনীয়। শোকে-দুঃখে কষ্ট পেয়ে থাকার সময় তার এরকম মনে হয় যেন মৃত্যু দেবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

  জীবনের শেষ বেলার উদাসী চেতনা ভারাক্রান্ত করলেও তার মধ্যেও সম্বলপুরে তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা বাড়ল। এখানে আসার কিছুদিন পর থেকেই এখনকার ইউরোপিয়ান ক্লাব ,বেঙ্গলি ক্লাব আদির সদস্য হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যসূচির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। এখনকার ভিক্টোরিয়া হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ বা নিজে লেখা নাটক  মঞ্চস্থ করার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ শৈশবে নাটকে অভিনয় করেছেন। তার জন্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে তিনি একজন সাংস্কৃতিক পুরুষ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে পড়েছেন। এদিকে তিনি ক্রফর্ট হাইস্কুলের পরিচালনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া কয়েক বছর আগে থেকে তিনি সম্বলপুর মিউনিসিপালিটি বোর্ডের সরকারের মনোনীত সদস্য।। মিউনিসিপালিটি বোর্ডের তিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার পরিকল্পনা এবং তত্ত্বাবধানে মিউনিসিপালিটির বর্তমান অফিস ঘরটা নির্মাণ করা হয়েছিল।।

এত  প্রভাব প্রতিষ্ঠা যদিও তার কাঠের ব্যাবসায়ে উন্নতি হল না।।সত্যিই সম্বলপুরে ব্যাবসাটা জমাতে পারলেন না। তার মধ্যে টুকটাক করে কোনোমতে সাংসারিক খরচটা বের হয়ে আসে।। এভাবে কষ্ট হচ্ছে। লক্ষ্মীনাথ পুনরায় আর্থিক সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এসব দেখে অরুণা সত্যব্রত অস্থির হয়ে পড়ল।সত্যব্রতের  উপর্যুপরি  অনুরোধ এবং অরুণা কান্নাকাটি করার জন্য প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় বরোদা রওনা হলেন ।

বরোদায় এসে এবার প্রায় ৪০ দিন থাকলেন।বরোদার আর্য কন্যা মহাবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া সভায় মহারাজা গায়কোয়ারের সঙ্গে বসে জামাই সত্যব্রত মুখার্জির জ্ঞান উন্মেষকারী বক্তৃতা শুনলেন। লক্ষ্মীনাথ খুশি হলেন ।জামাই বক্তৃতা দিতে থাকা দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে তার বুক ভরে উঠল। তাছাড়া এবার বিশেষ কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়া হল না। স্বাস্থ্য জনিত কারণে বাংলোয় থেকে দুই নাতি-নাতনীর সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন।বিদায় নেওয়ার দিন সকাল বেলা থেকে লক্ষ্মীনাথ গম্ভীর হয়ে পড়লেন। প্রকাশ না করলেও তার মনে এরকম একটা ভাব হল যেন এটাই তার শেষ বরোদা ভ্রমণ।

বরোদায় থাকার সময়ই দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। দুই বছর আগে থেকেই তাকে দাঁতও অসুবিধা দিয়ে আসছে। কলকাতায় গিয়ে কয়েকটি গোড়ার দাঁত ফেলতে হবে। সম্বলপুরে আসার পরে তার ডাক্তার দাঁত না ফেলে নতুন একটা দাঁত লাগিয়ে দিলেন তবে সেটাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা হল। এমনিতেই একদিন বাথরুমে  পড়ে গিয়ে প্রজ্ঞা ব্যথা পেল।সার্জন এসে ব্যান্ডেজ বেঁধে ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরও অস্থির যন্ত্রণায় প্রজ্ঞা সারা রাত জেগে কাটাল। পরের দিন থেকে লক্ষ্মীনাথ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। জ্বর এতটাই বেশি যে বিছানা নিতে হল। খবর পেয়ে সিভিল সার্জন বাড়িতে এসে পরীক্ষা করে লক্ষ্মীনাথকে ঔষধ খেতে দিলেন ।

মোট কথা কমজোরী হয়ে পড়া লক্ষ্মীনাথের শরীরটাতে দ্রুত নানা রকম রোগ  বাসা বানিয়ে নিল ।অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন খুব বেশিদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন না ।অবশ্য তার জন্য হা–হুতাশ  নেই।তাকেও জীবনের মহামুহূর্তগুলিকে স্বীকার করে নিতে হবে। তার জন্য এখনই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। তারই একটা প্রস্তুতি হিসেবে লক্ষ্মীনাথ ১৯৩৬ সনের ২৫ নভেম্বর সম্বলপুরের বাড়িটা দান রূপে মেয়ে অরুণা মুখার্জির নামে রেজিস্ট্রি করে দিলেন।

তারপরে কিছুদিন ভালোই চলল। পরের বছর মে মাস থেকে লক্ষ্মীনাথের পুরোনো বদহজম এবং অম্ল শূলের অসুখটা বৃদ্ধি পেল। পেটের ব্যথা শুরু হল, কিছু খেলেই ঢেকুড় উঠে, বমি হয়। আহারে লক্ষীনাথের এত রুচি, খেতে এত ভালোবাসেন, অথচ খেতে পারেন না। স্বামীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে দেখে প্রজ্ঞা সম্বলপুরের সিভিল সার্জনকে ডেকে আনালেন। লক্ষ্মীনাথকে  পরীক্ষা করে সার্জন ঘোষণা করলেন, ‘ডিউডেনাল আলসার।’ লক্ষ্মীনাথের অন্ত্রে ঘা হয়েছে।

বাবার অসুখের কথা শোনার পরেই ডিব্রুগড় থেকে রত্না এল। সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত সব সময় কর্মব্যস্ত থাকা বাবাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে রত্নার চোখ ছল ছল হয়ে উঠল। বাবার উন্নত চিকিৎসা এবং সেবা– শুশ্রুষার প্রতি রত্ন গুরুত্ব দিল। তাতেই লক্ষ্মীনাথ কিছুটা সুস্থ হলেন বলে মনে হল। বরোদা থেকে অরুণা– সত্যব্রত এল। একটু সুস্থ হয়ে ওঠার পরে কিছুদিনের জন্য বাবাকে রত্না নিজের সঙ্গে রাখবে বলল। তার জন্য সে বাবাকে ডিব্রুগড়ে  নিয়ে যাবে। অন্যদিকে অরুণাও বাবাকে বরোদায় নিয়ে যেতে চাইছে। এটা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে তর্ক হল। কিন্তু রত্নার জিদের কাছে অরুণাকে হার মানতে হল। মা-বাবাকে নিয়ে রত্না কলকাতায় এল। সত্যিই বাবার অন্ত্রে ঘা হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কলকাতার একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাল। কলকাতার ডাক্তার একই কথা বললেন এবং লক্ষ্মীনাথকে বিশ্রাম নেবার পরামর্শ দিলেন।

অবশেষে ১৯৩৭ সনের আগস্ট মাসের ২১ তারিখ ডাঃ ভুবনেশ্বর দাস, রত্না এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ ডিব্রুগড়ির রওনা হলেন।

রওয়ানা হওয়ার দ্বিতীয় দিন তারা পান্ডু এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আসবেন বলে খবর পেয়ে চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, জ্ঞানদাভিরাম আদি পান্ডু স্টেশনে এসে দেখা করলেন। অসুস্থ যদিও আরাম কেদারায় বসে লক্ষ্মীনাথ প্রফুল্লিত । যেন তাঁর কোনো অসুখ নেই। আগের মতোই সবার সঙ্গে আনন্দ স্ফুর্তি করে কথাবার্তা বললেন ।ডঃ দাসকে আলাদাভাবে ডেকে এনে জ্ঞানদাভিরাম লক্ষ্মীনাথের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। কিছুটা সন্দেহের ভাব নিয়ে ডঃ দাস বললেন ’ অবস্থা খারাপ নয়। ভালো হয়ে যাবেন, যদি মাঝখানে অভাবনীয় কোনো সমস্যা উপস্থিত না হয়।’

বন্ধুবর চন্দ্রকুমার, আত্মীয় জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বিনন্দ বেজবরুয়ার( লক্ষ্মীনাথের দাদা) ছেলে আনন্দ বেজবরুয়াও এসে উপস্থিত হলেন। লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞা, রত্না এবং রত্নার মেয়েদের রেলে উঠিয়ে দিয়ে তারা সঙ্গে আনা গাড়িতে গুয়াহাটিতে এসে উপস্থিত হলেন। গুয়াহাটি স্টেশনে আর্ল ল কলেজের অনেক ছাত্র এবং অনেক ভদ্রলোক লক্ষ্মীনাথকে সম্বর্ধনা জানাল। চন্দ্রকুমার লক্ষ্মীনাথকে দুদিন  গুয়াহাটিতে থেকে বিশ্রাম নিয়ে যেতে বলল। রত্না রাজি হল না। সেদিনই গুয়াহাটি থেকে রেলে যাত্রা করল। পরের দিন তারা তিনসুকিয়া গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং সেখান থেকে মোটরে ডিব্রুগড় উপস্থিত হলেন।

মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া নতুন করে একটা বাড়ি তৈরি করেছেন। এই বাড়িটা ব্রহ্মপুত্রের তীরে। সুন্দর করে তৈরি করা বিশাল বাড়িটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো বাতাস। লক্ষ্মীনাথের মতো রোগির পক্ষে স্বাস্থ্যকর জায়গা। বাড়িটাতে ঢুকেই মহাবাহ ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আসা নির্মল বায়ু সেবন করে লক্ষ্মীনাথের ভালো লাগল। মাতৃভূমি অসমের প্রাণধারা ব্রহ্মপুত্রের পারে থাকার জন্য তিনি যেন নতুন শক্তি লাভ করলেন।

খবরের কাগজের মাধ্যমে অসমের জনগণ লক্ষ্মীনাথের অসুস্থতার কথা জানতে পারল। ডিব্রুগড়ে থাকার দুদিন পর থেকেই জনগণের চিঠিপত্র আসতে লাগল। সেইসব করে উত্তর লেখার জন্য সাহিত্য পুথীর সমালোচনা করার জন্য অসুস্থ শ্বশুরের মনের ওপরে চাপ পড়বে। তার স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়ে পড়বে। তাই দায়িত্বশীল জামাই রোহিণী খবরের কাগজে বিবৃতি দিলেন,’ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া সম্প্রতি কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্যের পথে। তিনি বর্তমানে মোটামুটি সুস্থ থাকলেও আরও কিছুদিনের জন্য তার বিশ্রাম নেওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই আশা করি, দেশবাসী যেন তার কাছ থেকে চিঠির উত্তর, পুথি সমালোচনা, সাহিত্যের ইতিহাস ইত্যাদির মতামত না চায় এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের জন্য তাকে কিছুদিনের জন্য রেহাই দেয় ।’

ঠিক তখনই ইতিহাসবিদ বেনুধর শর্মা শিবসাগর থেকে ডিব্রুগড়ে গিয়ে রোগ শয্যায় পড়ে থাকা লক্ষ্মীনাথকে দেখতে চাইলেন। রোহিণী প্রথমে তাকে অনুমতি দিলেন না। তারপরে বেনুধরের  নাম বলায় লক্ষ্মীনাথ আকুল অগ্রহে বেনুধরকে শয্যার পাশে ডাকলেন। বেনুধরকে দেখে আনন্দিত হলেন যদিও লক্ষ্মীনাথ বিছানা থেকে উঠতে পারলেন না। নিস্তেজ ভাবে বিছানায় পড়ে রইলেন। তার পা দুটির শোচনীয় অবস্থা দেখে বেনুধরের মন খারাপ হয়ে গেল।

তারপরেই ‘দৈনিক বাতরির’ ২৪ আগস্ট( ১৯৩৭) সংখ্যায় প্রকাশ পেল,’ অসমীয়া জনগণ এই পুণ্য ভাদ্র মাসের ৩ তারিখ সরকারিভাবে ঘরে ঘরে পালন করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক জীবনী এবং মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শংকরদেবের নির্মল চরিত্র যে বেজবরুয়া মহাশয়ের অমর লেখনীতে অমিয়া ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, এই তিন তারিখ অসমিয়া জনগণ যেন সেই বেজবরুয়া মহাশয়ের সম্পূর্ণ আরোগ্য কামনা করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায়।’

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অসমিয়া জাতির প্রাণপুরুষ।’ দৈনিক বাতরি’র এই আবেদনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অসমিয়া জনগণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীনাথের আরোগ্য কামনা করে সভা সমিতি এবং নাম কীর্তন অনুষ্ঠান করলেন।

‘ দৈনিক বাতরি’র সহকারী সম্পাদক করুণাকান্ত গগৈ বেজবরুয়ার জামাই রোহিণী বরুয়াকে অনুরোধ করলেন,’ অসমের সমস্ত মানুষই শ্রীযুক্ত বেজবরুয়া মহাশয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এই সন্দর্ভে জনগণ একটি করে বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তাই আপনার কাছ থেকে বেজবরুয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ পাব বলে আশা করছি।’

সঙ্গে সঙ্গে রোহিণী জানাল,’ এখন পূজনীয় বেজবরুয়া মহাশয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো হওয়ার পথে। কোনোরকম শারীরিক বিকার নাই বললেই হয়। রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে এবং রুচিসহকারে খেতেও পারছেন। কারও সাহায্য ছাড়াই উঠাবসা করতে পারছেন। এমনকি আমাদের অতিথি নিবাস থেকে আমরা থাকা ঘরটিতে বিনা সাহায্যে নিজে নিজে হেঁটে যেতে পারছেন। সম্প্রতি তিনি ডাঃ প্রভাত চন্দ্র দাস, এমবিডিটি মহাশয়ের চিকিৎসাধীনে রয়েছেন।ডঃ দাসের বক্তব্য অনুসারে, বেজবরুয়া মহাশয়কে দু-এক দিনের মধ্যে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া যাবে।’

সত্যিই স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হল। চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন। লক্ষ্মীনাথ নিজেই ‘ দৈনিক বাতরি’ খবরের কাগজের মাধ্যমে নিবেদন জানালেন,’ অসমের জনগণের আশীর্বাদ এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছি। তাই এই খবরের কাগজের মাধ্যমে খবরটা সবাইকে জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।’ আমার এই অসুস্থতা আমাকে একটা গৌরব এবং আনন্দের খবর দিয়ে গেল। আমি আগে জানতাম না যে আমি আমার মাতৃভূমি অসম দেশের কাছে এত ভালোবাসার পাত্র।’

শরীরে শক্তি লাভ করে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি থেকে বের হলেন। চলাফেরা করতে লাগলেন। দুই এক জায়গায় যেতে লাগলেন। কিন্তু তাকে একা বের হতে দেওয়া হয় না। সঙ্গে প্রজ্ঞা, রোহিণী,রত্না… কোনো একজন থাকেই।

নভেম্বরের দুই তারিখ ডিব্রুগড় ‘আলোচনী ক্লাব’এর উদ্বোধনী উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু বক্তৃতা দিতে উঠে দেখেন উদাত্ত ভাবে বক্তৃতা দেওয়ার আগের সেই শক্তি নেই ।তথাপি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লক্ষীনাথ বললেন এখন আমার দিক থেকে আপনাদের আশীর্বাদ ছাড়া দেওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ বামুনের এটাই পেশা। তারপরে কলকাতায় উ-ভা-ই-সা  সভার বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে তিনি বললেন এত বছর আগের আলোচনা ক্লাব মরে ছিল বলে বলেছে সে আসলে মরেনি এটা কেবল ‘সাসপেন্ডেন্ট অ্যানিমেশন।’

 এভাবে বাইরে বেরিয়ে, গুনমুগ্ধদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়ায় লক্ষ্মীনাথের দেহে বাসা বাঁধা জড়তাটা কিছু কমে এল। ভাঙ্গা মনে আশাও কিছুটা জাগল।এই সংসারে তার দিন ঘনিয়ে এসেছে বলে বুঝতে পেরেও নিজের ওপরে একটা ভরসার সৃষ্টি হল।আশা নেই যদিও বেঁচে থাকার মোহটা মরে যায়নি।। মৃত্যু শাশ্বত, নিষ্কাম মনোভাবে মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত জেনেও লক্ষ্মীনাথ সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারলেন না। তার মানে তার মনটি আরও কিছুদিন পর্যন্ত বিশ্বসংসারের আলো বাতাস উপভোগ করতে চায়।

 ডিব্রুগড় সাহিত্য সভা সাহিত্যরথী সংবর্ধনা জানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর রবিবার বিকেল তিনটের সময় অসমিয়া নাট্য মন্দিরে একটি জনসভার আয়োজন করল। সভার উদ্দেশ্য হল (ক)বর্তমান অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য আনন্দ প্রকাশ করে তাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন এবং (খ)অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেজবরুয়া মহাশয়ের বাণী শ্রবণ।

 সভার কাজ আরম্ভ হল।শ্রীমিঠারাম বরা সভাপতির আসন গ্রহণ করলেন।সভাপতির নির্দেশ অনুসারে সম্পাদক আনন্দরাম হাজরিকা  অভিনন্দন পত্র পাঠ করে সেটা লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার হাতে অর্পণ করলেন। সভায় উপস্থিত থাকা জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজুদ্দিন আহমদ হাজারিকা, তুলসীপ্রসাদ দত্ত, গনেশরাম ফুকন আদি বেজবরুয়াকে  সম্বর্ধনা জানিয়ে  কিছু কথা বললেন।অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য সদিচ্ছা সূচক প্রস্তাব গ্রহণ করার পরে হাতে তালি দিয়ে লক্ষীনাথ  বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন।

  ‘মাননীয় সভাপতি মহোদয় এবং সভায় উপস্থিত অসম প্রেমী সুধী সমাজ,

  আমি আমার  অসুস্থ অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে উঠার মূলে প্রথমে জনগণের আশীর্বাদ দ্বিতীয়ত ডাক্তার, তৃতীয়ত আমার পরিবার এবং আমার মেয়েদের যত্ন। যমরাজা আমাকে ভালো করে দৌড় করিয়েছেন। তবে বামুনের ছেলে যদিও টিকি না থাকায় আমাকে ধরতে পারলেন না। দেশ দস্তুর মতে আমার মাথার সামনের দিকে চুলের গোছাটা ,সেই গোছায় যম ধরতে গিয়েছিল।কিন্তু আমি এক দৌড়ে পগার পার।সেইজন্যই আমি আজ সশরীরে এই সভায় বিদ্যমান।’

 শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।

 ভূমিকা শেষ করে লক্ষ্মীনাথ তারপরে বললেন,‘আজকাল যেখানে সেখানে শোনা যায়, ‘আমাদের দেশটা গেল,বিজাতীয় হয়ে গেল।আমি বলি—‘ভয় কর না,চিন্তা কর না।বিদেশির স্রোত দেখে চমকে যেও না।পরিবর্তন সৃষ্টির নিয়ম।ভাস্কর বর্মার দিনের অসম এবং আজকের অসম দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক।

 এখানে একটা গল্প বলি।সত্য যুগে বটগাছের গুটিগুলি ছিল একটি লাউয়ের সমান।বটগাছের নিচে বিশ্রাম নেবার সময় গুটি পড়ে অনেক পথিকের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল।তথাপি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার হুঁশ নেই।এভাবে কিছুদিন যাবার পরে একদিন গুটি খসে পড়ে একজন বামুনের মৃত্যু হল।এবার কিন্তু ব্রহ্মার আসন টলল।তিনি স্বয়ং এসে বটগাছকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন বামুন মারলি?’

বটগাছ উত্তর দিল, ‘তাকে মরতে হবে বলে মারলাম।তাতে আবার কি অসুবিধা হল?বামুনের প্রতি তোমার এত পক্ষপাতিত্ব কেন?

বটগাছের অভদ্র উত্তর শুনে ব্রহ্মা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অভিশাপ দিলেন।‘বটগাছ,আজ থেকে তোর গুটিগুলি এই এতটুকু হয়ে যাবে।সেদিন থেকে বটগাছের গুটিগুলি ছোটো হয়ে গেল।কিন্তু গুটির ভেতরে সার বা ভাইটালিটির জন্যই ছোট্ট একটি গুটি থেকে আজও যেখানে সেখানে এক একটি প্রকাণ্ড বটগাছ জন্মায়।

তাই বিদেশি চারপাশ থেকে চেপে ধরে অসমিয়া জাতিকে আকারে ছোটো করে ফেলা সত্ত্বেও ভাইটালিটি থাকলে অসমিয়া কখনও মরতে পারে না।    

গীতার কথামতো বলি, কাজ করে যাও— ফলের অপেক্ষা কর না। অন্যেরা কী বলে সেদিকে তাকিও না। মাত্র ঈশ্বরে মতি রেখে সমস্ত কাজের ফলাফল তার হাতে সঁপে দিয়ে কাজ করে যাও।নিখুঁত অসমিয়া ভাষা বলবে, লিখবে। অসমিয়া সাজ পোশাক পরবে। শুধু শুধু বিদেশির অনুকরণ করবে না ।

নহি কল্যাণ কৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গছতি। ‘

লক্ষ্মীনাথের কন্ঠে আগের মতো ভাবের উচ্ছ্বাস নেই। কঠিন শব্দের প্রয়োগ নেই। বক্তৃতা ও সংক্ষিপ্ত।খুবই কম সময়ে তিনি সমাপ্তি টানলেন। সঙ্গে সঙ্গে  এক ধরনের সংযোগহীনতার যন্ত্রণায় তাঁর অন্তরটা কেঁপে উঠল। বড়ো দুর্বল অনুভব করলেন । ধীরে ধীরে নিস্তেজ  পদক্ষেপে নিজের আসনে এসে বসলেন। 

এটাই লক্ষ্মীনাথের শেষ জনসভা এবং শেষ বক্তৃতা। এমনিতে সুস্থ বলে মনে হলে ও ভেতরে ভেতরে লক্ষ্মীনাথ দুর্বল হয়ে পড়লেন। ইচ্ছা থাকলেও বেশি দিন যে বেঁচে থাকতে পারবেন না এই বিষয়ে তিনি নিজেও নিশ্চিত হলেন। কাউকে বললেন না। উল্টে সম্বলপুর ফিরে যাওয়ার কথাই বলতে থাকেন। কিন্তু দুই কুড়ি বছর ধরে সুখ-দুঃখের সঙ্গী, ঘর সংসার সমস্ত ক্ষেত্রে সুযোগ্যা , পরম বান্ধবী প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। এই বিষয়ে তিনি কন্যা রত্নার সঙ্গে কথা বললেন। মমতাময়ী রত্না বাবাকে সম্বলপুরে  নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করল। মেজ জামাই রোহিণী কুমার ও দায়িত্বশীল। সম্বলপুরে যাবার জন্য টিকিট কাটার কথা বলতেই তিনি বলেন,’ বাবা নতুন একটা বাড়ি করছি। বাড়িটা তৈরি না হওয়ার আগে আপনি সম্বলপুর যেতে পারবেন না।’

বাবার শারীরিক অবস্থাটা ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়ছে শুনে বরোদায় থাকা অরুণা অস্থির হয়ে পড়ল। দীপিকাকে নিয়ে বাবার মনে যে একটা অশান্তি আছে অরুণা জানে। অরুণা চিঠি লিখে দীপিকাকে দেশে ফিরে আসতে লিখল । অন্য একটি চিঠিতে লন্ডন স্থিত ব্যাপ্টিস্ট মিশনারির কর্মকর্তাদেরও অনুরোধ জানাল যাতে অন্তত কিছুদিনের জন্য দেশে এসে দীপিকা অসুস্থ পিতাকে দেখে যাবার সুযোগ পায়। অরুণার সকাতর আবেদন অস্বীকার করতে না পেরে প্রধান নান দীপিকার ছুটি মঞ্জন করলেন। অবশেষে ইংল্যান্ড থেকে স্ট্রথেডেন নামক জাহাজে বোম্বাই, সেই রাতেই রেলে বোম্বাই থেকে কলকাতায় এবং কলকাতা থেকে ১৯৩৮ সনের এক ফেব্রুয়ারি দীপিকা ডিব্রুগড় পৌঁছাল।

দীপিকা এখন দীপিকা বেজবরুয়া  নয়। দীপিকা এখন সিস্টার দীপিকা। আগের চেয়ে তার স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। আড়াই বছর শীত প্রধান ইংল্যান্ডে থাকার ফলে গায়ের রং উজ্জ্বল হয়েছে। তাছাড়া তার পরনে নানের পোশাক, গলায় সাদা সুতোয় ঝুলানো যিশুখ্রিস্টের মূর্তি। দীপিকা খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী।

সে এসে সামনে দাঁড়াতেই লক্ষ্মীনাথের মনে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হল। এটা রাগ নয়, ক্ষোভ নয়, খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছে বলে তার প্রতি ঘৃণা নয়। এটা ভালোবাসা। সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা। দীপিকার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের অন্তর এক অদ্ভুত শান্তি লাভ করল। এই শান্তির সঙ্গে কীসের এক আনন্দ। ব্যাখ্যাতীত এক আনন্দে লক্ষ্মীনাথের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

এদিকে খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী হওয়ার জন্য আত্মসমাহিত যদিও বাবার আদর  ভালোবাসা অনুভব করে দীপিকার দুই চোখ ও জলে ভরে  উঠল।

খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া নিয়ে এক সময় দীপিকার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের তীব্র বিরোধ হয়েছিল। এখন দুজনের মধ্যে মিলন হতে দেখে বাড়ির সবাই আনন্দিত হল।

তারপরে দীপিকা সহজ হয়ে পড়ল। আগের মতোই কথা বলতে লাগল। বোম্বাই থেকে জাহাজে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ যাত্রা, ঐতিহ্যপূর্ণ ইংল্যান্ডের  কোথায় কীভাবে থাকে, সেখানকার নানদের সঙ্গে তার দৈনন্দিন জীবন, তাদের সেবামূলক কর্ম, তাদের উপাসনা… লক্ষ্মীনাথ আগ্রহ নিয়ে দীপিকার কথা শুনল। বিদেশিনী নানদের সঙ্গে দীপিকা ভালই আছে, নিজেকে সেবামূলক কাজে উৎসর্গ করেছে বলে জানতে পেরে লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেলেন। তারপরে দীপিকার সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর আলোচনা হল। শারীরিক অসুস্থতার জন্য বাবার যে কষ্ট হচ্ছে, এই বিষয়ে দীপিকা সচেতন। বাবার মানসিক শান্তির জন্য সে বাইবেলের স্তোত্র এবং কিছু গান গেয়ে শোনাল। অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে মেয়ে এভাবে গান গেয়ে স্তোত্র শুনিয়ে শান্তি পাচ্ছে দেখে লক্ষ্মীনাথ সুখী হলেন।

অবশেষে অন্তঃসলিলা ভালোবাসা এবং আত্মিক এক অনুভূতিতে উদার লক্ষ্মীনাথ দীপিকার কাঁধে ডান হাতটা রেখে বললেন,’ মা দীপি, ঈশ্বরের ওপর নির্ভরতা এবং ভালোবাসায় যদি আন্তরিকতা থাকে— তোর মঙ্গল হবেই। রাম ,রহিম, যিশু যার মাধ্যমেই চলার পথ বেছে নিস না কেন, আন্তরিক সমর্পণ তোকে তোর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবেই দেবে। ‘

‘পাপা—।’দীপিকার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,’আজ তুমি একথা বলছ !’

‘আমি বলছি নারে,আমাদের ভাগবতে এসব কথা আছে।শ্বাশত বাণীতে সমৃদ্ধ আমাদের ভাগবতের কথাই আমি বলছি।যাই হোক,তুই সুখী হ,মা।তোর আত্মা শান্তিতে থাকুক।’

তারপরে পিতার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে দীপিকা কলকাতা যাত্রা করার দিন ঠিক করল।ছোটো মেয়ের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের এই বিদায় বড়ো করুণ।ডিব্রুগড় স্টেশন থেকে দীপিকা ট্রেইনে কলকাতা যাত্রা করবে।তার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।একটা মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্মীনাথ তাকে চোখের আরাল করতে পারে নি।তার জন্যি তিনি স্টেশনে  গিয়ে দীপিকাকে বিদায় জানাতে চাইলেন।রত্না,রোহিণী এমনকি প্রজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়া দেহটা নিয়ে  স্টেশনে যেতে লক্ষ্মীনাথকে বাধা দিল।কিন্তু তিনি মানলেন না।দেহ সাথ না দিলেও কন্যার প্রতি ভালোবাসা এবং শুধুমাত্র মনের জোরে লক্ষ্মীনাথ অবশেষে স্টেশনে এসে দীপিকাকে সাশ্রু নয়নে বিদায় জানালেন।

দীপিকা আসার পরে উদার চেতনায় লক্ষ্মীনাথের মনের পরিবর্তন ঘটল।  পুনরায় কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেলেন।তার জন্যই রত্না রোহিণী বিরোধিতা করা সত্ত্বেও লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুরে ফিরে যাবার জন্য লক্ষ্মীনাথ ট্রেনের টিকেট কাটলেন।যাত্রার তারিখ ১৮ মার্চ বলে ধার্য করা হল।সঙ্গে তিনি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারাকে জানিয়ে দিলেন,’২০ মার্চ সকালবেলা দার্জিলিং মেলে বোধ করি সাতটার সময় শিয়ালদহ গিয়ে পৌছাব।শিয়ালহ  থেকে হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।  হাওড়াতে সারাদিন থেকে সেদিনই বোম্বে মেইল ধরে সেদিনই সম্বলপুর চলে যাব। হাওড়াতে তোমাকে পেলে বেশ মজা হবে।’ কিন্তু এবারও রত্না প্রচন্ড বিরোধিতা করল,’বাবা এই শরীর নিয়ে তুমি এতদূর জার্নি করতে পারবে না।এই অবস্থায় আমি তোমাকে যেতে দিতে পারব না।’ অবশেষে জেদি কন্যা রত্নার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথকে আপোষ করতে হল।

এমন সময় গুয়াহাটি থেকে চন্দ্র কুমার আগরওয়ালার মৃত্যু সংবাদ এল ( ২ মার্চ ১৯৩৮ সাল)। অভিন্ন হৃদয় চন্দ্রকুমারের মৃত্যু সংবাদ শুনে লক্ষ্মীনাথ মর্মাহত হলেন। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বহু সমস্যার সমাধান করা বন্ধু। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বেঁচে থাকার এক অন্যতম শক্তি। চন্দ্র কুমার ছিল তার জন্য জীবনটা উপভোগ করার, জীবনটাকে বিস্তার করার প্রাণময় এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। চন্দ্রকুমার ছিল তার বহু সৃষ্টির প্রেরণা দাতা। চন্দ্রকুমার ইহসংসার ত্যাগ করার খবর শুনে লক্ষ্মীনাথের অন্তরটা কেঁপে উঠল। এবার তার এরকম মনে হল  যেন মৃত্যুদূত তার দরজার  সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুখে দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন,’ বন্ধু ,সখা ,সুহৃদ— কাজটা উল্টো হয়ে গেল । আমারই যাবার কথা ছিল । আমাকে ছেড়ে তুমি এগিয়ে গেলে । এটা ঈশ্বরের কী ধরনের ইচ্ছা ? তুমি চলে যাবার খবর শুনে আমার আঙ্গুল অবশ হয়ে পড়েছে ,গলা শুকিয়ে আসছে, জিভ কড়কড়ে হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রভু আমাকে গায়ে জোর দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে কি?’

মাজিউকে হারিয়ে মানসিকভাবে লক্ষ্মীনাথ বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিছুই ভালো লাগছে না। লেখা মেলা করার শক্তি তো আগেই নাই হয়ে গিয়েছিল। একটু আধটু বই পত্র পড়তেন। এখন পড়ার জন্য কিছু একটা মেলে ধরলেই অবশ আচ্ছন্নতার সঙ্গে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে আসে। রত্নার মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটছিল। ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন তার মনটা আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ে। তাঁর মনটা শান্ত করার জন্য কাছে বসে প্রজ্ঞা ব্রাহ্ম  গীত গায়। না এভাবে শান্তি পাচ্ছেন না। তারপরে মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের রবিবার তাকে আনন্দ দেবার জন্য রোহিণী এবং রত্না ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজের আয়োজন করল। একটা মোটর বোটের ব্যবস্থা করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বের হলেন।

ভটভট শব্দে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে মটর বোট এগিয়ে চলেছে। এখন ব্রহ্মপুত্রের দুই পার উত্তাল জলরাশিতে প্লাবিত নয়। তীর থেকে জল নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই তীরের  গাছপালায় চৈত্র মাসের ধূসরতা। তীর থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত বালুময় চর পার হয়ে মূল জলধারা। ধীরগতিতে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রকে এখন বিবাগী বলে মনে হচ্ছে। তথাপি নদীবক্ষের মুক্ত পরিবেশে এসে লক্ষ্মীনাথ আনন্দিত হলেন।

ব্রহ্মপুত্রের বালুচরের কাছে নৌকায় তার জন্ম। শৈশবে বাবার সঙ্গে এই নদী দিয়ে নৌকায় অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া, উচ্চ শিক্ষার্থী গোবিন্দ দাদার সঙ্গে দিশাং মুখ থেকে এই নদী দিয়ে কলকাতায় যাত্রা… এই নদী দিয়ে যাত্রা করার সময় দুই পারের বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজ গাছপালা চিত্রময় গ্রাম ওপরের বিশাল নীলাকাশ, জ্যোৎস্না রাতের রুপালি আলো ঝকঝকে তীরের বনভূমি… সবকিছু মনে পড়ছে।

পরিবারের সবার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজন খেলেন। মোটর লঞ্চ দাঁড়িয়ে থাকা জায়গায় একটা চালতে গাছের নিচ থেকে চালতে কুড়িয়ে প্রফুল্ল মনে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি ফিরলেন। তাকে প্রফুল্ল চিত্ত দেখে প্রজ্ঞা, রত্না এবং রোহিণীও খুশি হলেন। কিন্তু সেদিন বিকেল থেকেই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। সঙ্গে তার পুরোনো অন্ত্রের ঘা টা চাগাড় দিয়ে উঠল। রোগটা এত খারাপ ভাবে বেড়ে গেল যে আগে থেকে তাকে চিকিৎসা করতে থাকা ডঃ দাস দেওয়া কোনো ঔষধেই কাজ দিল না। ২৫ মার্চের রাত থেকে লক্ষ্মীনাথ ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়লেন। তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। শেষ রাতের দিকে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন ।

১৯৩৮ সালের ২৬ মার্চ । শনিবার । সকালে ব্রহ্মপুত্রের পারে বিদায়ের করুণ সুর বেজে উঠল। বাতাস নিস্তব্ধ হল। সকালের সজীবতা নাই হয়ে গেল। শয্যাগত লক্ষ্মীনাথ কাতর ভাবে বুকের পাশটাতে বসে থাকা পত্নীর দিকে তাকালেন । ইতিমধ্যে অন্তিম মুহূর্তের আশঙ্কায় প্রজ্ঞার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। তার দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে। তথাপি নিজেকে সামলে স্বামীর শিথিল শক্তিহীন ডান হাতটা চেপে ধরল। পায়ের কাছে বসে থাকা রত্না এবং মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিণী পরমেশ্বরের কাছে লক্ষ্মীনাথের জীবনের জন্য মিনতি করছে । কিন্তু না সবকিছুই অসার হয়ে গেল । জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল । লক্ষ্মীনাথ চিরকালের জন্য চোখ বুজলেন। 

যিনি ব্রহ্মপুত্রের জলে ভাসমান নৌকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি প্রাণের সম্পত্তি স্বরূপ ব্রহ্মপুত্র নদীটিকে কৃপা বরুয়ার শেষ উইলে অসমিয়া জাতিকে দান করে গেছেন, সেই তিনি আজ লুইতের তীরে দেহত্যাগ করলেন।দেশকে ভালোবাসা যেখানে সেখানে দেশের গুণ গাওয়া মাতৃভাষার সামান্য অপমান অবহেলা হলেও বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে মেতে উঠা এবং যার জীবনের মূল মন্ত্র দেশ, দেশের জাতি এবং মাতৃভাষা সেই লক্ষ্মীনাথ অসম মায়ের কোলে চির বিশ্রাম নিলেন ।

মুহূর্তের মধ্যে  দুঃসংবাদটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।চা ব্যাবসায়ী রোহিণী কুমার বরুয়ার বাসভবনে সাহিত্যরথীকে অন্তিম দর্শন করার জন্য জনতার স্রোত বইতে লাগল। ডিব্রুগড়ের সমস্ত শিক্ষানুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। কিছু সরকারি অফিস খোলা থাকলেও জেলা উপায়ুক্ত এই উপলক্ষে সোমবার দিনের দুটো থেকে সরকারি  কার্যালয়ের ছুটির আদেশ দিলেন।

 শনিবার দিন নগরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন শিক্ষা অনুষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী,ছাত্র-ছাত্রী রোহিণীকুমার বরুয়ার বাসভবনের প্রাঙ্গণে সমবেত হলেন।ন্তিম শয়নে শায়িত্ত বেজবরুয়ার দেহটা ফুল দিয়ে সাজিয়ে নাম কীর্তন করে নগর পরিভ্রমণ করে নদীর ঘাটে নিয়ে আসা হল।

লুইতের তীরে চিতা সাজানো হল।

 ইতিমধ্যে শিবসাগর থেকে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন এসে উপস্থিত হয়েছে।

 হিন্দু সংস্কার মতে অপুত্রক বা পুত্রের অপারগতার ক্ষেত্রে অন্তেষ্টিক্রিয়ার অধিকারী হয় বিবাহিত স্ত্রী কন্যা এবং জামাতা। দৌহিত্র হিসেবে অরুনার পুত্র স্বরূপ কুমার মুখার্জি লক্ষ্মীনাথের মুখাগ্নি করার অগ্রাধিকার পায়। কিন্তু এখন বরোদা থেকে এনে মুখাগ্নি করানোটা অসম্ভব কথা। তাছাড়া জীবিত থাকতেই এই বিষয়ে লক্ষ্মীনাথ সজ্ঞানে বিধান দিয়ে গেছেন। তার ইচ্ছা অনুসারে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন তার মুখাগ্নি করল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চিতাগ্নি জ্বলে উঠল।লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার দেহটা পঞ্চভূতে বিলীন হল। 

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার প্রয়াণের কথা শুনে প্রবীণ সাহিত্যিক পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ বেজবরুয়া জন্মভূমি থেকে দূরে দূরে অন্য প্রাদেশিক ভূমিতে কাটিয়েছেন। তথাপি ‘চরণে জানে মরণের ঠাঁই’ এই নীতি অনুসারে তার  লুইতিয়া নশ্বর দেহটি লুইতের বালুতে এসে বিলীন হয়ে গেল।

 কবি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা তার শোকগাথায় ব্যক্ত করলেন,

 লুইতের বুকে জন্ম লভিলে

 লুইতের বুকে মহাপ্রয়াণ

 লুইতের সুরে সুর বেঁধে নিয়ে

 দিলে অসমকে হারানো প্রাণ।

বঙ্গের অভিজাত দেশ পত্রিকা লিখল অসমিয়া সাহিত্যের ভান্ডারে  বেজবরুয়া মহাশয়ের দান অতুলনীয়।বাংলার সহিত তাহার অন্তরের যোগ ছিল। ব্যাবসা সূত্রে তিনি সম্বলপুরে বাস করিতেন। উড়িষ্যার সঙ্গেও তাহার যোগাযোগ ছিল। তাহার সাহিত্য সৃষ্টিতে বাংলা উড়িষ্যা এবং অসমের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।

বেজবরুয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানতে পেরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ভারতবর্ষের প্রত্যেক প্রদেশে তাহার আপন আপন ভাষার পূর্ণ ঐশ্বর্য উদ্ভাবিত হলে তবেই পরস্পরের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠ অর্ঘের দান--প্রতিদান সার্থক হইতে পারিবে এবং সেই উপলক্ষেই শ্রদ্ধা সমন্বিত ঐক্যের সেতু প্রতিষ্ঠিত হইবে। জীবনে লক্ষ্মীনাথ  বেজবরুয়ার এই সাধনা অতন্দ্রিত ছিল। মৃত্যুর মধ্য দিয়া তাহার এই প্রভাব বল লাভ করুক এই কামনা করি।’ 


  


    


রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৭ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৭

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৭)

বার্ড কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্বলপুরের জঙ্গল নিয়েছিল। তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। কাঠের ব্যবসা চালানোর জন্য কোম্পানি ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও জঙ্গলের সন্ধান করে থাকে এবং লাভজনক জঙ্গলের সন্ধান পেলেই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সেই জঙ্গলের কাঠ থেকে শ্লিপার তৈরি করে বিক্রি করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। এইবার বার্ড কোম্পানি অসমের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় এবং অসম নেপালের সীমাবৰ্তী এলাকায় কয়েকটি জঙ্গল পেয়ে রেলওয়ে কোম্পানিতে শ্লিপার জোগানের কাজ অব্যাহত রাখবে বলে পরিকল্পনা করল।নিজেকে একজন দায়িত্বশীল জঙ্গল পরিদর্শক এবং জঙ্গলে চলা কাজের পরিচালক রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সক্ষম হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ কোম্পানির সাহেবদের বিশ্বাস‐ ভরসার পাত্র হয়ে পড়েছেন।তাই নতুন করে নেওয়া জঙ্গল গুলির কাজের দায়িত্ব দেবার জন্য ১৯২৭ সালের ৩০ জুলাই তারিখে কোম্পানির বড়ো সাহেব তারযোগে লক্ষ্মীনাথকে কলকাতার অফিসে ডেকে পাঠালেন। 

লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে কলকাতার অফিসে এলেন। সাহেব তাকে শিলঙের কাছাকাছি নতুন জঙ্গল নেবার কথা বললেন। জঙ্গলগুলির কাঠের কাজ পরিচালনা করার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। অসমের শিলঙের কাছাকাছি জঙ্গলে কাজ—এদিকে পরিবার থাকবে সম্বলপুরে, লক্ষ্মীনাথ এই দায়িত্বটা গ্রহণ করতে অসুবিধা অনুভব করলেন। মানে আগের মতো মনে সাহস পেলেন না। তবে চূড়ান্ত আর্থিক সংকটে তার অনুরোধ রক্ষা করে বার্ড কোম্পানি চাকরি দিয়েছিল। কোম্পানি থেকে বেতন, বোনাস পায় বলেই তিনি এখন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তার চেয়েও বড়ো কথা হল এই চাকরিটা ছেড়ে দিলে এত টাকা বেতনের অন্য একটি চাকরি কোথায় পাবেন?এ সমস্ত ভেবে লক্ষ্মীনাথ বার্ড কোম্পানির হয়ে অসমের জঙ্গলে কাঠের ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। কোম্পানির বড়ো সাহেব তখন শিলঙের জঙ্গল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীনাথকে একটা প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন।

লক্ষ্মীনাথ যে  অসমের শিলঙের জঙ্গলের কাজের দায়িত্ব নিল, কথাটা প্রথমে প্রজ্ঞাকে জানাল না। অক্টোবরের ১৯ তারিখ কলকাতা থেকে শিলং অভিমুখে যাত্রা করলেন । পরের দিন শিলং পৌঁছে কয়েক দিন ধরে অমলিং,ননগ্ৰাম ইত্যাদি জায়গার জঙ্গল ঘুরে ঘুরে ৯ নভেম্বর কলকাতায় এসে কোম্পানিকে জঙ্গল পরিদর্শনের প্রতিবেদন দাখিল করলেন । প্রতিবেদন পাঠ করে কোম্পানি লক্ষ্মীনাথকে অসমের যোগবানীতে যাবার নির্দেশ দিলেন।এবার অসমের জঙ্গলে যাওয়ার কথাটা প্রজ্ঞাকে না বলে কীভাবে থাকেন? অসমের জঙ্গলে গিয়ে এক সপ্তাহ দশ দিন থাকা নয়, দীর্ঘ আড়াই মাস থাকতে হবে। না জানিয়ে আড়াই মাস অসমের জঙ্গলে থাকাটা উচিত হবে না। অবশেষে প্রজ্ঞাকে বললেন। প্ৰজ্ঞা চিন্তিত হয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল অসমের জঙ্গলে আড়াই মাস থেকে কাঠের ব্যবসা দেখাশোনা করবে বলে সাহেবদের কথা দিয়ে এলে, সত্যিই তুমি পারবে?'

' কেন পারব না? এই কাজই তো করছি—।'

'ওগো, এখন তোমার বয়স হয়েছে। তুমি এখন তেষট্টি বছরের বুড়ো । তাছাড়া ,যখন তখন তোমার নাক দিয়ে রক্তপাত হতে থাকে, তখন তুমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড় যে তিন চার দিন বিছানা থেকে উঠতে পার না। তেমন কিছু হলে আসামের ওই গভীর জঙ্গলে কে তোমাকে দেখবে, শুনি? তাছাড়া তোমার হজম শক্তি কমে এসেছে। তোমার এখন প্রায়ই অম্বল হয়। বনে জঙ্গলে থাকলে দিনের পর দিন বাইরের খাবার খেতে হবে। ওভাবে তোমার পেটের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। কোম্পানির সাহেবরা তোমার এসব কথা বিবেচনা করল না ?'

প্রজ্ঞা অভিজ্ঞ, বিচার জ্ঞান সম্পন্ন। জঙ্গলে থাকা অবস্থায় স্বামীর কী কী অসুবিধা হতে পারে তার জন্য তিনি সচেতন বলেই এভাবে বললেন।আর তিনি সঠিক কথাই বললেন।

লক্ষ্মীনাথ কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অসহায় ভাবে প্রজ্ঞার দিকে তাকিয়ে বললেন ,'চাকরি বাঁচাতে হলে আমাকে আসামে যেতে হবে।'

' বয়সের কথাটা বিবেচনা করে কোম্পানির সাহেবরা জঙ্গলে না পাঠিয়ে তোমাকে অফিসের কাজ দিতে পারত।'

'ওহো, বার্ড কোম্পানির কাঠের ব্যাবসাটা জঙ্গল নিয়েই। এত বছর ধরে জঙ্গলের কাজ করছি—অভিজ্ঞতার জন্যই কোম্পানি আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। আর আমি কি শখ করে জঙ্গলে যাচ্ছি? আড়াই মাস তোমাকে ছেড়ে, মেয়েদের ছেড়ে জঙ্গলে থাকতে আমারে কি ভালো লাগবে? দেখ পরি, সবই তো বোঝ —সাংসারিক খরচ তো আছেই। কলকাতায় হোস্টেলে রেখে রত্না- দীপিকার ইংলিশ স্কুলে পড়ানোর খরচ, তারপর ওদেরকে বিয়ে দিতে হবে। বিয়ে দেওয়ার জন্য এখন থেকেই তো টাকা-পয়সা জমাতে হবে।'

কথাটা সত্য।সব কথাই বাস্তব। কঠোর এই বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া লক্ষ্মীনাথের উপায় নেই।

' সবই মানছি।' গম্ভীর কন্ঠে প্রজ্ঞা বলল, আমি কখনও তোমার কোনো কাজে বাধা দিই না। আমাদের বাড়িতে রেখে তুমি কত জায়গায় ঘুরে বেড়াও, কখন ও না করি না। এবারও তোমাকে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু তোমার এই বয়স আর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কেন যেন মনে হচ্ছে এখন তুমি এত দিনের জন্য আসামের জঙ্গলে থেকে কাজ করাটা তোমার পক্ষে ঠিক হবে না।'

তথাপি লক্ষ্মীনাথ যোগবানীতে এলেন। যোগবানী অসমের সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতিহীন নির্জন স্থান। জঙ্গল। ওখান থেকে এক ফারলঙের  মতো দূরত্বে নেপালের সীমা। এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একটা মারোয়াড়ি দোকান দেখতে পেলেন। দোকানের মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তিনি গোলার ছোটো একটি ঘর নিয়ে বাস করতে লাগলেন। লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে উড়িয়া কাজের লোক ভালুককে ( আসল নাম মুকুন্দ) নিয়ে এসেছেন। এই বনবাসে একান্ত অনুগত ভালুক হল তার সঙ্গী, তার রাঁধুনি এবং তার বিপদের বন্ধু। ভালুর সঙ্গে ছোটো গোলাটাতে থেকে লক্ষ্মীনাথ জঙ্গলের কাজকর্ম চালাতে লাগলেন।

কিন্তু থাকা খাওয়ায় কষ্ট হল। লক্ষ্মীনাথ মানুষের সঙ্গে কথা বলে হাসি ঠাট্টা করে থাকায় অভ্যস্ত। তার কাছে পান্ডব বর্জিত এই জায়গায় থাকাটা এক ধরনের বন্দিত্ব। অপূর্ব শ্যামলীমা নিয়ে এর প্রকৃতি উদার যদিও ৩-৪ দিন থেকেই লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়েন। বেশি অস্থির হয়ে পড়লে এটা ওটা কাজ দেখিয়ে তিনি কোম্পানির গুয়াহাটির অফিসে চলে আসেন এবং কোম্পানির বাগান রোডের বাসভবনে দুই এক দিন থেকে জীবনের শক্তি নিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যান। এভাবে তার দেহের অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে পড়ল। তিনি নিজেই অনুভব করলেন শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। ভগবানের কাছে ভরসা করার সঙ্গে কাজের ভালুকে সারথি করে জঙ্গলে থেকে তিনি কাজকর্মের দেখাশোনা করতে লাগলেন।

গহন অরণ্যে থেকে কাঠের কাজ।জন্তু-জানোয়ার ছাড়া ম্যালেরিয়ার বীজানু নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মশা, বিষাক্ত সাপ ,রাতে বিদ্যুতের আলো নেই, খাবার জলের অসুবিধা। অসমিয়া জাতীয় অনুষ্ঠান অসম সাহিত্য সভার সর্বজনপূজ্য প্রাক্তন সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এখন জীবিকার জন্য অনিশ্চিত এবং বিপদ সংকুল জীবন বেছে নিয়েছেন। তবে এটাই সত্য তিন কুড়ি বছর পার করা লক্ষ্মীনাথ এই সত্যটিকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন ।আগের বাসস্থান ছেড়ে তিনি নতুন করে কাজ আরম্ভ হওয়া গুয়াহাটির কাছে জঙ্গল লাইলাকে ঘর নিলেন।

লাইলাকের জঙ্গলে গাছ কাটা হয়,করাতিরা গাছ কেটে শ্লিপার তৈ্রি করে,সেখান থেকে গাড়োয়ানের মাধ্যমে গরুর গাড়িতে ননগ্রাম জঙ্গলের কাছে থাকা গোলায় এনে রেলের ইঞ্জিনিয়ারকে খাতির করে শ্লিপার ‘পাস’করাতে হয়।প্রতিটি খেপে লক্ষ্মীনাথ লাইলাক থেকে ননগ্রামে হেঁটে আসেন।এভাবে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে আসা যাওয়া করাটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

সম্বলপুর থেকে প্রজ্ঞার উদ্বেগভরা চিঠি আসতে লাগল।জঙ্গলে স্বামীর থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে,সেবা-যত্নের অভাবে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়ছে। প্রজ্ঞা তাকে দ্রুত সম্বলপুরে ফিরে যেতে অনুরোধ করল।পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন—‘পরি,আমি নিজেও এখানে থাকতে চাই না।কিন্তু কোনোমতে আর কটা দিন কাটিয়ে একেবারে কাজ ছেড়ে চলে আসব।কাল যতীশ দাস ডাক্তার দুঃখ করল যে আমাকে অন্যায়ভাবে এরকম ভয়ানক জঙ্গলে পাঠানো হয়েছে।এই জঙ্গলের জল-হাওয়া খুবই খারাপ।এখানে রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।ভীষণ ডেম্প।বার্ড কোম্পানির সাহেব বেটারা ভীষণ সেলফিস।নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে দিয়ে এভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছে।যাই হোক,সাবধানে আছি।জল ফুটিয়ে খাচ্ছি।ভালু আমাকে দেখাশোনা করছে।তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না।ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করবেন।’

কিন্তু ঈশ্বর লক্ষ্মীনাথের প্রতি সদয় হলেন না।জঙ্গলে তার কষ্ট বৃ্দ্ধি পেল।

এমনিতে মানুষের জীবনে অরণ্য একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।গাছপালায় সবুজ অরণ্যানী হল পাখ-পাখালি,জন্তু-জানোয়ারের বাসস্থান।জঙ্গলের নিজস্ব একটা রূপ আছে।এই রূপটি লক্ষ্মীনাথকে আকৃ্ষ্ট করে।এক সময়ে তিনি মৃগয়ায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন।বন্দুক হাতে নিয়ে বনে-জঙ্গলে ঢুকে মৃগয়ার উন্মাদনায় এক আনন্দ উপভোগ করতেন।মৃগয়া ছেড়ে দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথ বনে জঙ্গলের নৈ্সর্গিক রূপটা দেখতে পেলেন। বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাত– কী অপূর্ব রূপ, যেন রূপ সৌন্দর্যে অপরূপা হয়ে স্বপ্নপুরীর পরীরা মর্ত্য লোকে নেমে আসে। লক্ষ্মীনাথ চায়। এত কষ্ট, থাকা খাওয়ার এত অসুবিধাতেও প্রকৃতির এই রূপটি তাকে এক বিমল আনন্দ দান করে।

নির্জন অরণ্যের এই অপরূপ দৃশ্যগুলি লক্ষ্মীনাথের অন্তরের রোমান্টিক ভাব সত্তাটিকে  সজীব করে তোলে। লক্ষ্মীনাথের তখন প্রিয়তমা পত্নীর কথা মনে পড়ে। তার জন্যই অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনের শেষে অস্থায়ীভাবে থাকা বাড়িতে এসে কেরোসিনের ক্ষীণ আলোতে পত্নীকে চিঠি লিখতে বসেন। এভাবে একদিন দুদিন পরে পরে এই চিঠি লেখাটা হল প্রজ্ঞার সঙ্গে হৃদয়ের দরজা খুলে আলাপচারিতা। এভাবে বনবাসে থাকার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা কিছুটা প্রশমিত হয়, সামান্য হলেও দিনের ক্লান্তি নিরসন হয়।

লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে লেখেন,' তোমার পাঠানো মিষ্টি পেলুম। তুমি যে নাড়ু দিয়েছিলে, সেগুলো প্রায় একমাস ধরে খেলুম।' অন্য একটি চিঠিতে,' আমি জঙ্গলের ভেতরে তাঁবুতে আছি। ভালো আছি। একরকম চলে যাচ্ছে। আমার জন্য তুমি অস্থির হবে না। ঈশ্বরের ওপরে ভরসা রাখ, ঈশ্বর আমাকে একরকম করে চালিয়ে নেবেন।' পরবর্তী একটি চিঠিতে,' তোমার মুক্তার মতো হস্তলিপি এইমাত্র পেলুম। মনটা হু হু করছিল। তোমার অমন সুন্দর চিঠিখানা পড়তেই আগুনে জল পড়লে যেমন ঠান্ডা হয়, সেইরকম মনটা আমার তৎক্ষণাৎ  ঠান্ডা হয়ে গেল। তুমি যে কী ঔষধ জান, তুমি সত্যিই দেবী প্রজ্ঞা সুন্দরী।'

কিন্তু অসমের গহন অরণ্যে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা বা প্রেম অনুরাগে পত্নীকে চিঠি লেখাটা তার কাজ নয়। তিনি বার্ড কোম্পানির নির্দেশে এখানে এসেছেন। কোম্পানির সাহেবরা ধুরন্ধর ব্যাবসায়ী। বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে তাকে কোম্পানির ব্যাবসায়িক স্বার্থ দেখতেই হবে।

জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় কাজ হয় না। শ্লিপার তৈরির উপযোগী গাছের অবস্থান অনুসারে করাতিদের কোথায় কোথায় গাছ কাটতে হবে সেটা মহরি এবং করাতিয়ারা স্থির করে। এদিকে জঙ্গলের মধ্যে পথঘাট নেই। করাতিয়ারা কাজ করার জায়গায় পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কাজ দেখার জন্য কোনো কোনো দিন কুড়ি মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়।

একদিন এভাবে ঘুরে ঘুরে জঙ্গলের কাজ দেখতে দেখতে কখন যে সূর্য ডুবে গেল বুঝতেই  পারলেন না। এত গভীর জঙ্গল যে সূর্যের আলো দেখা যায় না।

রাতের অন্ধকার নেমে এল। সঙ্গী ভালুর সঙ্গে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ পথ হারিয়ে ফেললেন। তথাপি সাহস করে এগিয়ে যেতে গিয়ে জঙ্গলের লতা পাতা তাদের পা ঘিরে ধরল। জায়গাটা এত খারাপ যে তারা আর এগোতে পারলেন না।

এদিকে অনতিদূরে  বন্য জন্তু-জানোয়ারের চিৎকার শুনে লক্ষ্মীনাথ প্রমাদ গুণলেন। এরকম মনে হল যে তারা যেন আর রক্ষা পাবেন না। রাতের মধ্যে তারা জন্তু-জানোয়ারের শিকার হয়ে যাবেন। ভয়ে লক্ষ্মীনাথের গলা শুকিয়ে গেল।শেষে আর পারলেন না। ভয়ে ক্লান্তিতে পরিশ্রান্ত হয়ে একটা পাথরের ওপরে বসে পড়লেন।

মনিবের এই অবস্থা দেখে ত্রিশ বত্রিশ বছরের ভালু এখন কী করবে? কীভাবে এখান থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে? নিরুপায় হয়ে ভালু কাতর কণ্ঠে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাতে লাগল।

 ভগবান যেন ভালুর প্রার্থনা শুনলেন। কিছুক্ষণ পরে পাশ দিয়ে দুজন গারো করাতিকে যেতে দেখে ভালু ওদের ডাকল। কাকুতি মিনতি করে ওদেরকে ডেকে এনে পাথরে  শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকা মনিব লক্ষ্মীনাথকে দেখিয়ে ভালু সাহায্য চাইল।‌‌

লক্ষ্মীনাথকে পড়ে থাকতে দেখে গারো করাতি  দুজনের খারাপ লাগল। ওদের সঙ্গে বাঁশের চুঙ্গায় চা থাকে। ওরা লক্ষীনাথকে সেই চা খাওয়াল। ধীরে ধীরে লক্ষ্মীনাথ ও জ্ঞান ফিরে পেলেন। তারপরে গারো করাতি দুজন লক্ষ্মীনাথ এবং ভালুকে ওদের সঙ্গে হাঁটতে বললেন। কিন্তু লক্ষীনাথের অবস্থা এতই শোচনীয় এবং এতটাই দুর্বল যে হাঁটার শক্তি নেই। তিনি অসহায় ভাবে বললেন,' আমি হাঁটতে পারছি না।'

অবশেষে গারো মানুষ দুজনের একজন লক্ষ্মীনাথকে পিঠে তুলে নিয়ে তারা  থাকা জায়গাটায় নিয়ে এল।

মনিবের দুর্দশার দিকে তাকিয়ে বেচারা ভালু বলল,' 'সাহেব আমি কোনোদিন, আপনাকে এত কষ্ট করতে দেখিনি।'

নির্বিকার কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' কী আর করবি? বিধির বিধান কে খন্ডন করবে?'

' আপনাকে এভাবে কষ্ট করতে দেখলে মেম সাহেব কেঁদে ফেলতেন।'

জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এত অসুবিধা এত কষ্ট… সত্যি  লক্ষ্মীনাথ আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন, এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। এত অত্যাচার তার দেহ সহ্য করতে পারবে না। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে বার্ড কোম্পানির চাকরি ছাড়তে হবে। কিন্তু  কার্যক্ষেত্রে সেটা নয়। নয় মানে আর্থিক দিকটা চিন্তা করেই লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়তে পারেন না।

প্রজ্ঞা ছাড়া রত্না এবং দীপিকা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। অরুণা-সত্যব্রত উদ্বেগ প্রকাশ করে তাকে কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দেবার জন্য চিঠি লিখল। তারপরও লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়ল না। প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনুসারে তিনি আড়াই মাস পূর্ণ করেই চাকরি ছাড়বেন। কথাটা জানতে পেরে বরোদা থেকে অরুণা‐- সত্যব্রত টেলিগ্রাম করল,' রিজাইন ইমিডিয়েটলি এন্ড কাম ব্যাক টু হোম।'

তারপরেও লক্ষ্মীনাথ লিখলেন, এই জঙ্গল সত্যিই ভীষণ, ভয়ঙ্কর। এখানে এলে কান্না পায়। তবু বলছি, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে তোমরা ভেব না। কোনো মতে আর কটা দিন কাটিয়ে দেব।'

এভাবে চিঠি লিখল যদিও শেষে লক্ষ্মীনাথ আর পারলেন না। পরিশ্রমের পরে বিশ্রাম হয় না।জঙ্গলের প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিশোধিত পানীয় জল খাওয়া-দাওয়া চূড়ান্ত অনিয়ম। নাক দিয়ে রক্তপাত না হলেও লক্ষ্মীনাথের  বদহজম হতে লাগল ।সঙ্গে পিত্ত শূল বেড়ে চলল। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ল। অবশেষে লক্ষ্মীনাথ নিয়তির  সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য হলেন।

কার্কপেট্রিকের পরে দায়িত্ব নিলেন মিঃ জেনার। কিছুদিন পরে মিঃ জেনার কলকাতার মূল অফিসে বিভাগীয় দায়িত্বে বাহাল হলেন। ইতিপূর্বে তিনি কাজ করা পদে এলেন মিস্টার উইথঅল।পালমার নামে এক  কম বয়সী সাহেবের সঙ্গে মিঃ উইথঅল লক্ষ্মীনাথ কাজ চালিয়ে থাকা জঙ্গল দেখতে গেলেন। কাজকর্ম দেখে তারা লক্ষ্মীনাথের প্রশংসা করলেন।

 তার জন্য লক্ষ্মীনাথের মনটা পুনরায় পরিবর্তিত হল। পদত্যাগের কথা না লিখে লক্ষ্মীনাথ মিঃ জেনারকে জানালেন তিনি সুদীর্ঘ বারো বছর ধরে বার্ড কোম্পানিকে সেবা করে আসছেন।নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও ছুটি নেননি। কিন্তু গত দুমাস অসমের অস্বাস্থ্যকর জঙ্গলে থেকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। কলিক পেইন, ইনডাইজেশন এন্ড উইকনেসে আক্রান্ত হয়েছেন।তাই তাকে স্বাস্থ্যকর কোনো জায়গায় বদলি করা হোক অথবা তাকে তিন মাসের ছুটি মঞ্জুর করা হোক।

অবশ্য বার্ড কোম্পানির কর্তারা এত অকৃতজ্ঞ নয় তারা ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে লক্ষ্মীনাথের ছুটি মঞ্জুর করলেন কিন্তু লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেল না নিজের ইচ্ছামতো ছুটি পেয়েও মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া অশান্তিটা কমল না। আসলে গত দুই মাস জঙ্গলে থাকার কষ্ট এবং তিক্ততা তাকে এমন করে তুলেছে। তার জন্যই চাকরি থেকে তার মন উঠে গেছে। এটাই লক্ষ্মীনাথের চরিত্রের এক বৈশিষ্ট্য। কোনো কারণে একবার যদি কোথাও থেকে মনটা উঠে যায় তারপরে তিনি আর মনটাকে ঘুরিয়ে আনতে পারেন না। তখন তিনি বৈষয়িক লাভ লোকসানের কথা ভাবতে পারেন না ।ভোলানাথের সঙ্গে সংঘাত লাগার পরে বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও লক্ষ্মীনাথ এটাই করেছিলেন।

মোটের ওপর এখন তিনি বার্ড কোম্পানি ছাড়ার জন্য ভেতরে ভেতরে সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়লেন। কোম্পানি থেকে দ্রুত অব্যাহতি লাভ করার জন্যই তাড়াতাড়ি শিলং গেলেন্। অফিসে কোম্পানির হয়ে করতে লাগা কাজটুকু করলেন। চারদিন পরে গুয়াহাটিতে এসে স্লিপার পাঠানোর জন্য রেলের কামরার বন্দোবস্ত করলেন।পরের দিনই ডাকযোগে বার্ড কোম্পানিতে পদত্যাগপত্র প্রেরণ করলেন। ১৯২৮  সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।তার ১৪ দিন পরে গুয়াহাটি অফিসে এসে মিঃস্মার্ট সাহেবকে নিজের দায়িত্বে থাকা সমস্ত কিছু  বুঝিয়ে দিলেন।

দুই মাসেরও বেশি দিন জঙ্গলে থাকা হল। সাধারণ জনজীবনের চেয়ে অরণ্যের জীবনটা আলাদা। সম্বলপুরে ঝাড়চোগোড়া চামুন্ডা লুড-লোরি বরছাই ইত্যাদি জঙ্গলে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আসামের জঙ্গলে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা আলাদা। এখানকার জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশটা লক্ষ্মীনাথকে অন্যরকম করে তুলেছিল। প্রতিদিন দাড়ি কামানোতে অভ্যস্ত লক্ষ্মীনাথ গত দুই মাস একবারও দাড়ি কামান নি। চুল কাটেন নি। প্রিয়তমা পত্নী এবং প্রাণাধিক মেয়েদের থেকে দূরে থাকার জন্য তিনি চুল দাড়ি কাটার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন।সাজ পোশাকেও যত্ন নেননি। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে 

গুয়াহাটিতে এসে নাপিত ডেকে এনে চুল কেটে, দাড়ি কামিয়ে পরিষ্কার শার্ট প্যান্ট পরে পুনরায় তিনি ভব্য  সাহেব হয়ে পড়লেন।

বার্ড কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার পরে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো লাগলেও মার্চের এক তারিখ রেলে কলকাতায় যাবার সময় বিগত ১২ বছরের অনেক স্মৃতি তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। সেই সব তাকে বিরক্ত করল, ব্যথিত করল। তারপরে মনটা অনিশ্চয়তায় ভরে উঠল। 

অনিশ্চয়তাটা হল এর পরে কী করবেন? জমা টাকায় কিছুদিন ঘর-সংসার মেয়ে দুটির পড়ার খরচ চালাতে পারলেও তারপরে কীভাবে চলবে? রত্না দীপিকাকে বিয়ে দেবার টাকা সংগ্রহ করবেন কীভাবে? জীবনের বাকি থাকা দিনগুলি কীভাবে চালাবেন? প্রশ্নগুলি তাকে অস্থির করে তুলল। এরকম মনে হল যেন আগন্তুক দিনগুলি ভয়াবহ এক রূপ নিয়ে এগিয়ে আসছে।

 তথাপি লক্ষ্মীনাথ মনোবল হারালেন না। শেষে ভাবলেন বর্তমানেই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায়ই খোলা আছে। সেটা হল পুনরায় কাঠের ব্যাবসা করা। কিন্তু বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ব্যাবসা করতে  গিয়ে সফল হতে পারেননি। এখন তিনি তিন কুড়ি চার বছর বয়সে পড়া এই শরীর নিয়ে কাঠের ব্যবসা নেমে সফল হতে পারবেন কি?

 অসমিয়া জাতি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের উন্নতির জন্য সেবা দান করে অসমিয়া জাতীয় জীবনে একজন বরেণ্য পুরুষ বলে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তার জন্য অসমিয়া মানুষ তাকে ভালোবাসে, সভা সমিতিতে আমন্ত্রণ করে সহস্র জনের মধ্যে ফুলে শোভিত গামছা পরিয়ে হাতে শরাই তুলে দিয়ে তাকে সম্বর্ধনা জানায়। সহস্রজনের উচ্ছ্বাস ভরা হাততালি শুনে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন বলেই মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা এটাই যে বেঁচে থাকার জন্য বা নিজের পরিবারকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য উপাদানটুকু কীভাবে যোগাড় করবেন সেটা অসমিয়া জাতির কেউ চিন্তা করেন না।…এসব ভাবলে লক্ষ্মীনাথের মনের ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।তা বলে জাতীয় দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন না।

গুয়াহাটি থেকে কলকাতায় এসে জোড়াসাঁকোতে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একদিন থাকলেন। হোস্টেলে থাকা রত্না এবং দীপিকার সঙ্গে দেখা করে তাদের কলেজের ফি দিয়ে পরের দিন সম্বলপুরে এলেন।

 লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে প্রজ্ঞার অন্তরটা ব্যথিত হয়ে পড়ল। স্বামীর স্বাস্থ্য এত খারাপ হয়ে পড়েছে। প্রজ্ঞার এরকম মনে হল যেন সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু তার আবেগ উচ্ছ্বাস কম। তিনি সেদিনই ডাক্তার ডেকে এনে লক্ষীনাথের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেন। হজম ভালো হয় না, অম্লশূলে কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তার ঔষধ লিখে দিলেন। সেইসব খাইয়ে প্রজ্ঞা স্বামীর সেবা যত্ন করতে লাগলেন। 

পত্নীর সেবা যত্ন আদর পেয়ে লক্ষ্মীনাথও মনে মনে শপথ নিলে্‌ন, না ভবিষ্যতে আর কখনও প্রজ্ঞাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আর্থিক দিকে কষ্ট হলেও প্রজ্ঞা থেকে আলাদা হয়ে থাকবেন না।

 দুদিন বিশ্রাম নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় কাজে লাগবে বলে ভাবলেন। এমন সময় দুঃসংবাদ এল। ১৯২৮ সনের দুই  মে প্রাগজ্যোতিষপুরের  লৌহিত্যতট পঞ্চতীর্থে পন্ডিত হেমচন্দ্র গোস্বামী দেহত্যাগ করেছেন। তিনি দেহত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরম্পরার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অন্ত পড়ল।কলকাতায় থেকে জোনাকি প্রকাশের সময়ে অন্যতম প্রধান সহযোগী প্রিয় বন্ধু হেম গোঁসাইয়ের বিয়োগে লক্ষীনাথের অন্তরটা শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। লক্ষ্মীনাথ লিখলেন  সেদিন কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের ২৯ তারিখ আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিতে  গেলাম। কে জানত যে সেই বিদায়ই আমার কাছে শেষ বিদায় হবে। আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাতে আমি তার কাছে থাকতে পারি সেজন্য মাটি এক টুকরো নিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করতে বলেছিলেন, ‘আপনি আসুন দুজনে কাছাকাছি একসঙ্গে বসবাস করি।’

  আজ কার কাছে কে বাড়ি তৈরি করে থাকবে, নিয়তি কে জিজ্ঞেস করছি। আজ অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামীকে হারিয়ে যে ক্ষতি হল সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। অসমিয়া ভাষার সাহিত্য একজন একনিষ্ঠ সেবক হারাল।

  হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল ।এদিকে ব্যবহারিক বাস্তব বড়ো নিষ্ঠুর। লক্ষ্মীনাথ জীবিকার উপায় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক মনে নিয়েও কয়েকবার ঝাড়চোগোড়ায় গিয়ে উড়িষ্যার কোথাও জঙ্গল নেবার জন্য চেষ্টা করলেন। অবশেষে ১৯২৮ সনের ৭ মে লক্ষ্মীনাথ ৫৫৮৩ টাকার বিনিময়ে সম্বলপুর জেলার জমিদারের লাইরা জঙ্গল লিজে নিতে সক্ষম হলেন ।

প্রজ্ঞার সান্নিধ্য এবং সেবা যত্ন পেয়ে ভালো হলেও লক্ষ্মীনাথ সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন না। এদিকে নতুন করে নেওয়া জঙ্গলের কাজ পরিদর্শন করতে হবে। শ্লিপার পাস করাতে হবে। ‘বাঁহী’তে প্রবন্ধ লিখতে হবে এবং অসমের সমস্যার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জঙ্গল নিয়ে কাঠের ব্যবসা চালানো এবং সাহিত্যচর্চা করা দুটি একেবারে বিপরীত ধর্মী কাজ। তথাপি সম্বলপুরে নিজের বাড়িতে থেকে ধীরে সুস্থে ব্যাবসা চালানো ছাড়াও তিনি অসমিয়া সাহিত্য রচনায় মগ্ন হলেন।



  


মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৩১ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Santosh Kumar Karmakar

হে আমার স্বদেশ- ৩১

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(৩১)

প্রতি বছরের মতো এবারও লক্ষ্মীনাথ নিজের বাড়িতে কলকাতায় থাকা সমস্ত অসমিয়া আত্মীয়-স্বজন,বন্ধুবান্ধব এবং কলেজ স্ট্রিট, প্রতাপ চ্যাটার্জী স্ট্রিটের অসমিয়া ছাত্রদের ডেকে শঙ্করদেবের জন্মতিথি পালন করল। যতই জরুরি থাকুক না কেন, বিশেষ এই দিনটিতে লক্ষ্মীনাথ নিজের ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজ করে না। দুদিন আগে থেকে নিমন্ত্রণ এবং প্রসাদের জন্য বুট-মুগ, ফল-মূল কিনে আনে। গুরুজনার তিথির দিন ঘরের পরিবেশটা শিবসাগরের পৈতৃক বাড়িটার মতো হয়ে পড়ে। শুধু সাদা পাজামা এবং আসাম সিল্কের পাঞ্জাবি পরে গলায় ফুলাম গামছা পরে সাত্ত্বিক আচার-আচরণের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ সত্রের গোঁসাইর রূপ ধারণ করে।

রত্নেশ্বর মহন্ত ছাত্রদের দিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজটুকু করিয়ে নেয়। আয়োজন সমাপ্ত হলে সবাই নাম প্রসঙ্গে বসে। নাম চলে। নামের শেষের দিকে লক্ষ্মীনাথ নিজে ভোরতাল নিয়ে উচ্চকণ্ঠে নাম গান গাইতে শুরু করে। এবারও সবকিছু সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হল। ভাব গম্ভীর কন্ঠে রত্নেশ্বর মহন্ত ভাগবতের একটি অধ্যায় পাঠ করলেন। তারপর উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে প্রসাদ বিতরণের পর্ব চলল। এই সময় লক্ষ্মীনাথের মাথা ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে মাথা ঘোরানিটা বেড়ে গেল। কিন্তু নিজের শারীরিক অসুবিধার কথা কাউকে বলল না। সবাই বিদায় নেওয়ার পরে ভেতর মহলে আসার পরে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তারপরেই তার নাক দিয়ে কাঁচা রক্ত পড়তে লাগল।

পিতার নাক দিয়ে রক্তের ধারা বইতে দেখে অরুণা চিৎকার করতে লাগল। প্রজ্ঞা সহজে বিচলিত হয় না। সে ধৈর্য হারায় না।প্রতিকূল কিছু ঘটলে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে।অরুণাকে চিৎকার করতে নিষেধ করে সে স্বামীর কাছে এগিয়ে এল। লক্ষ্মীনাথের কাঁধে থাকা উত্তরীয় দিয়ে নাক মুখ মুছে দিয়ে ঠান্ডা জলে কপাল-মাথা ধুয়ে দিল। পুনরায় ধীরে ধীরে কপাল মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে শোবার কোঠায় এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপরে একগ্লাস জল খাইয়ে তার কাছে বসল।

পত্নীর সেবা শুশ্রূষা পেয়ে লক্ষ্মীনাথ আশ্বস্ত হল। তবে তার শরীরে সীমাহীন ক্লান্তি। সঙ্গে কী রকম একটা আমেজ, কীরকম এক প্রশান্তি। লক্ষ্মীনাথের চোখ জোড়া আপনা থেকেই বুজে এল।

সব সময়েই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত, কাজের মধ্যে ও কথায় নানা অঙ্গভঙ্গি করে সবাইকে হাসাতে থাকা বাবাকে এভাবে চোখ বুজে নির্জীব হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে কিশোরী অরুণা অস্থির হয়ে' পাপা' বলে ডাকতে শুরু করল। কিন্তু প্রজ্ঞা মুখে আঙ্গুল রেখে তাকে চুপ থাকতে বলল। পরমেশ্বর ব্রহ্ম বলে জ্ঞান করা মহাপুরুষ শংকরদেবের জন্মতিথিতে এভাবে নাম প্রসঙ্গ করে ভক্তদের আপ্যায়ন করার পরে লক্ষ্মীনাথ আধ্যাত্বিক আত্মপ্রসাদ লাভ করে। তারপরেও তার অন্তরে যেন আরও কীসের একটা যন্ত্রনা থেকে যায়। এভাবে নাক দিয়ে রক্তক্ষরণটা তারই কোনো বহিঃপ্রকাশ নাকি?

প্রজ্ঞা প্রশ্নটার উত্তর পেল না। কিন্তু তিনি ভালোভাবে বুঝতে পারলেন যে এখন দীর্ঘ সময়ের জন্য লক্ষ্মীনাথের বিশ্রামের প্রয়োজন। ঘুমে ঢলে পড়ার পরেও কিছুক্ষণ মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে আদর করে বিছানার ওপরে মশারি টাঙিয়ে দিল। তারপর আলো কমিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞা অরুণাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

একনাগারে কয়েক ঘণ্টা গভীর নিদ্রায় অতিবাহিত করার পরে শরীরের ক্লান্তি‐ অবসাদ নাই হয়ে গেল। রাত পার হয়ে ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ভোরের কোমল আলো ভেসে এল। ঘুম আসার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে পুনরায় সেই শৈশবে ফিরে গেল।

শৈশবকালে লক্ষ্মীনাথ এবং তার দাদা ভাইদের দেখাশোনা করা রবিনাথ দাদু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে পারত না।এদিকে লক্ষ্মীনাথের পিতৃদেব ছিলেন ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করা পুরুষ। দেরি করে ঘুমোতে দেখলেই পিতৃদের বকাবকি করে রবিনাথকে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিত। এখন লক্ষ্মীনাথ সেই দৃশ্যটিকে স্বপ্নে দেখতে লাগল। লক্ষ্মীনাথ দেখল-বাবা বকাবকি করছে,'অলস অকর্মণ্যের মতো তুমি এখনও বিছানায় পড়ে আছ। এতই ঘুম। শক্ত সমর্থ শরীরটাতে এত আলস্য।'

তখনই লক্ষ্মীনাথের ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করল মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখ মেলে তাকিয়েই দেখল, পাশে বসে প্রজ্ঞা তারদিকে মমতা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।

' ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসছিলে।' প্রজ্ঞা বলল,' স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?'

ঘুমিয়ে পড়ার পরে লক্ষ্মীনাথ সারারাতে একবারও জেগে উঠে নি যদিও প্রজ্ঞা ঘুমোতে পারেনি। পাশের বিছানায় মেয়ে দুটিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে স্বামীর কাছে বসে পুনরায় তার নাক থেকে রক্ত বেরিয়েছে কিনা, কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা লক্ষ্য করেছে এবং কিছুক্ষণ পরে পরে আদর করে তার মাথা পিঠ মালিশ করে দিয়েছে। এটা লক্ষীনাথ ও জানে। অসুস্থ অবস্থায় সে পত্নীর ভালোবাসা আর ও নিবিড়ভাবে অনুভব করে। শুধুমাত্র রন্ধন বিদ্যায় নিপুণা নয়, গৃহসজ্জা, তৈলচিত্র অঙ্কনে পারদর্শিনী নয়,অপরূপ রূপ যৌবনে ভালোবাসায় অনুরঞ্জিতা নয়, সেবা-যত্ন করার ক্ষেত্রেও সে একজন আদর্শ নারী। প্রজ্ঞাসুন্দরী বাঙালি, প্রায় ষোলো বছর দাম্পত্য জীবন অতিক্রম করার পরেও তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে। তবু লক্ষ্মীনাথ সুখী।অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য গতকাল রাতে ভালোবাসার আদান প্রদান হয়নি। প্রজ্ঞার ডান হাতটা নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' হ্যাঁ বাড়ির স্বপ্ন দেখছিলাম।'

'কাল নাম প্রসঙ্গ করার সময় তোমার বুঝি মায়ের কথা মনে পড়ছিল?'

' মায়ের কথা!'

' হ্যাঁ মায়ের কথা আর দেশের কথা মনে পড়লেই তো তুমি এমন হয়ে যাও। বিজনেসের যদি কোনো অসুবিধা না হয়, তাহলে চল না সবাই মিলে একবার আসাম ঘুরে আসি।'

' তুমি আসাম যাবে?'

' হ্যাঁ যাব।'

' সত্যি বলছ?'

' বলছি তো যাব।'

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মাথাব্যথা নাই হয়ে গেল। উৎফুল্লিত হয়ে বলল,' ঠিক আছে, চল, এবার পুজোয় অসমেই যাই।

সত্যিই পরিবারের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ অসমে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। তার আগে প্রজ্ঞা ঘরোয়া ডাক্তার সত্যব্রত মিত্রকে ডাকিয়ে এনে লক্ষ্মীনাথের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাল। নাম কীর্তন শেষ হওয়ার পরেই কেন লক্ষ্মীনাথের নাক দিয়ে এভাবে রক্ত বের হল, সেই বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। ডক্টর মিত্র বললেন, কীর্তন করার সময় অতি মানসিক এক আবেগে তার রক্তচাপ বেড়ে যায়। রক্তক্ষরণের জন্য সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ও এটা নিয়ে চিন্তা করার মতো কোনো অসুখ নয়।

রেল কোম্পানি দুর্গা পূজার মাসে রেহাই মূল্যে ভ্রমণের সুযোগ দেয়। লক্ষ্মীনাথ এই সুযোগটা গ্রহণ করল। প্রজ্ঞা, অরুণা-রত্না, চাকর ভাগীরথী- কাশীনাথ এবং আয়াকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ শিয়ালদহ থেকে ১৯০৫ সনের অক্টোবরের ৮ তারিখ রাতে গোয়ালন্দ মেইলে অসমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। বি ব্রাদার্স কোম্পানি থেকে আলাদা হয়ে আসাম- বেঙ্গল খোলার পরে লক্ষ্মীনাথ শিবসাগর থেকে ভাই হরিনাথকে ডেকে এনে ম্যানেজার রাখল। লক্ষ্মীনাথের অনুপস্থিতে হরিনাথ ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে।

ইতিমধ্যে ১৯০৫ সনের সাত জুলাই ভারত সরকারের তরফ থেকে বঙ্গ বিভাজনের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠল। দুই-একজন স্বার্থান্বেষী জমিদার, ব্যবসায়ী এবং মুসলমান বুদ্ধিজীবী ছাড়া প্রত্যেকেই এই বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য এগিয়ে এল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণকুমার মিত্র, মতিলাল ঘোষ ইত্যাদি নেতার উপস্থিতিতে ১৭ই জুলাই খুলনার বাগেরহাটে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় ইংরেজের বিরুদ্ধে বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হল। এই প্রস্তাব অনুসারে যতদিন পর্যন্ত বঙ্গ-ভঙ্গ আইন রদ হবে না, ততদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ পণ্য সামগ্রী বর্জন করা হবে। ১৭ এবং ১৮ তারিখ রিপন কলেজে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশে 'বয়কট' আন্দোলনকে এক পবিত্র শপথ হিসেবে গ্রহণ করা হল। সাত আগস্ট কলকাতার টাউন হলে পাঁচহাজার জন ছাত্র এবং অগণন লোকের সমাবেশে অনুষ্ঠিত সভায় পৌরোহিত্য করলেন কাশিমবাজারের মহারাজা মুনিন্দ্রচন্দ্র নন্দী। এই সভায় ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গ বিভাজন আইনকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করা হল এবং ইতিপূর্বে রিপন কলেজে অনুষ্ঠিত সভায় ছাত্রসমাজ গ্রহণ করার বিদেশি সমগ্র বর্জন করার সিদ্ধান্তটাকে অনুমোদন জানানো হল। এই ধরনের এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে জন্মভূমি অসম যাত্রা করল।

যাত্রার পরের দিন ভোর বেলা গোয়ালন্দে পৌঁছল। গোয়ালন্দ থেকে দুপুর বেলা দুটোর সময় ডিব্রুগড় গামী জাহাজ ছাড়বে। এদিকে বড়ো হওয়ার জন্য জাহাজটা নদীর তীরে লাগাতে পারল না। মাঝ-নদীর মূল স্রোতে নোঙ্গর করল। তবে পাশের একটি অপেক্ষাকৃত ছোটো জাহাজে উঠে প্রাতঃকালীন কাজটুকু করে সকালের চা জল খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিল। তারপরে সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা থেকে রিজার্ভ করা আর এস এন কোম্পানির'ঘাজি' জাহাজের একটি কেবিনে উঠল। দুপুর আড়াইটা থেকে উজানের দিকে জলযাত্রা আরম্ভ হল। জাহাজটা রাত সাড়ে নয়টার সময় ধুবরিতে এসে নোঙ্গর করল। পরের দিন সকাল দশটার সময় জাহাজ ধুবরি ছেড়ে গেল।

অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ।শারদীয়া পরিবেশ।এখন ব্রহ্মপুত্রের দুকুল প্লাবিত নয়।স্রোতের বেগ ও কম। তার জন্য মেইল জাহাজ 'ঘাজি' অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে উজানের দিকে যেতে পারছে। নদীর দুইপাশের সবুজ মাঠ, মাঠে চড়তে থাকা গরু- ছাগল, গাছ-পালায় শ্যামল দূর দূরান্তের গ্রাম… চিত্রময় দৃশ্য। কেবিনের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অরুণা এই গতিশীল দৃশ্য গুলি দেখছে। আয়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রত্না ও অপরিসীম কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে তাদের পূর্বপুরুষের দেশটা দেখছে। আগে না দেখা কিছু দেখলেই আয়াকে জিজ্ঞেস করছে, এদিকে প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ কেবিন থেকে বেরিয়ে ডকে উঠল। এখন ডকে অন্য কেউ নেই ।লক্ষ্মীনাথ- প্রজ্ঞা দক্ষিণ দিকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

জাহাজের গতিবেগ বৃদ্ধি পেল। দুইপারের সবাই পার হয়ে গেছে। কয়েকটি গ্রাম এবং দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত পার হওয়ার পরে নদীর তীর থেকে কিছু দূরে পাহাড় দেখতে পেল। পাহাড়গুলি এত উঁচু নয়। গাছ পালায় সবুজ পাহাড়ের গায়ে সূর্যের কিরণ পড়ে মনোরম এক দৃশ্য সৃষ্টি করেছে ।পাহাড়গুলির পরে নীল আকাশ, নীল আকাশের কোলে অলস ভাবে ভেসে বেড়ানো সাদা সাদা মেঘ… রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রজ্ঞা নয়ন ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করল। সুখ এবং তৃপ্তির হাসিতে তার মুখটা অনুপম হয়ে উঠল।

শৈশব থেকে জন্মভূমির এই সুন্দর দৃশ্য দেখলেও আজ এভাবে প্রিয়তমা পত্নী ,স্নেহের দুই মেয়ে এবং চাকর আয়াদের নিয়ে মাতৃভূমির মুখ দিয়ে বয়ে যাওয়া মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র দিয়ে জলযাত্রার সময় দেখা মাতৃভূমির রূপ‐ লক্ষ্মীনাথের মনে অনুভূত হওয়া পূর্বের সেই সুখ আনন্দের সঙ্গে আলাদা একটি মাত্রা সংযোজিত হল। প্রকৃতির প্রাণময় মুখগুলির দিকে তাকিয়ে সে ভাবুক হয়ে পড়ল।

সুদূর অতীতের কথা স্মরণ করে লক্ষ্মীনাথ বলল যে আজ যে জলপথে যন্ত্রচালিত বিশাল জাহাজে তারা উজান অসমের দিকে যাচ্ছে এই একই পথে একদিন তাদের পূর্বজ কলিবর বরুয়া কান্যকুজ্ব থেকে সেই সময়ের বৈঠা দিয়ে চালিত ছোটো নৌকায় তীর্থ ভ্রমণ করতে এই অসমে এসেছিল।

মনোযোগের সঙ্গে শুনে প্রজ্ঞা তখন আশ্চর্য প্রকাশ করে বলল যে কান্যকুজ্ব থেকে লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষেরা যেহেতু অসমে এসেছিলেন তাই তারা অসমিয়া ছিলেন না। প্রজ্ঞার কথাটা স্বীকার করে মুচকি হেসে লক্ষ্মীনাথ বলল যে উজান অসমের উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা অধিকাংশই মূলত অসমিয়া ছিল না। বর্তমান কামরূপ এবং প্রাগজ্যোতিষপুর ছাড়া অসম ছিল বনে জঙ্গলে এবং পাহাড়ে পরিপূর্ণ পাহাড়ি এবং জনজাতি লোকের বাসভূমি। কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মার রাজত্বকালে সভ্যতা- সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছিল। তাঁর রাজত্বকালে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাঙ অসমে এসেছিলেন। তারপরে দ্বাদশ শতিকায় পূর্বের পাটকাই পর্বত পার হয়ে আহোমরা এসে জনজাতি গোষ্ঠীর রাজাদের পরাজিত করে আজকের অসমের ভিত গড়েছে। তখন থেকে অসমিয়া ভাষার বিকাশ আরম্ভ হয় এবং আশ্চর্যের কথা এটাই যে অসমে রাজ্য স্থাপন করে আহোম রাজ পুরুষরা মাতৃভাষা তাই ভাষাকে দেশের ভাষা না করে স্থানীয় অসমিয়া ভাষাকে স্বীকৃতি দিল এবং হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করল । তারপরের সেই কনৌজ থেকে অসমে এসে বসবাস করতে থাকা বারভূঞার শিরোমনি শঙ্করদের বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করার জন্য অসমের সমস্ত জায়গায় সত্র- নামঘর প্রতিষ্ঠা করে অসম বাসীদের একতার বন্ধনে বাঁধল এবং অসমিয়া সাহিত্য- সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করল।

প্রজ্ঞা তখন সরল ভাবে জিজ্ঞেস করল যে লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষরা যখন অসমিয়া ছিলেন না, তখন সে অসমিয়া ভাষা- সাহিত্যের জন্য এভাবে লড়াই করছে কেন? প্রজ্ঞার এই প্রশ্নটি লক্ষ্মীনাথকে অস্বস্তিতে ফেলল।তাঁর কিছুটা রাগও হল। পরের মুহূর্তে বুঝতে পারল প্রজ্ঞা তাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার মধ্যে অস্বাভাবিকতা নেই। অনেকক্ষণ দক্ষিণের উদার আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, সেটাই হল আজকের অসমিয়া জাতির ইতিহাস। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অসমিয়া না হলেও তাদের অসমে জন্ম হয়েছে। অসমে জন্মগ্রহণ করে মায়ের মুখে অসমিয়া কথা শুনেছে। তাই মায়ের ভাষাই তাঁর ভাষা। মায়ের পরিচয়ই তাঁর পরিচয়। তাই মাতৃভাষার অস্তিত্ব এবং স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য তাকে লড়াই করতেই হবে। সন্তানের জন্য সেটাই প্রধানতম দায়িত্ব এবং কর্তব্য।

শিয়ালদা থেকে যাত্রা আরম্ভ করে সপ্তম দিন সকালে কোকিলামুখ পৌঁছাল। কোকিলামুখের ভাসমান ডাকবাংলোয় বসে চা খেল। এগারোটার সময় জোরহাটে থাকা দাদা গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে ডাকবাংলোয় এল। এতদিনে সাহিত্যিক রূপে কলকাতা তথা সমগ্র অসমে বিখ্যাত হয়ে পড়া লক্ষ্মীনাথ গোবিন্দচন্দ্রের ভাই। ডাকবাংলোয় উঠার জন্য কড়া মেজাজের অভিভাবক গোবিন্দচন্দ্র লক্ষ্মীনাথকে গালিগালাজ করতে লাগল। তারপরে তিনি লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।

দাদা গোবিন্দচন্দ্রের বাড়িতে স্নান করে ,খাওয়া দাওয়া করে লক্ষ্মীনাথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশ্রাম নিয়ে সাত দিনের যাত্রার ক্লান্তি দূর করল। বিকেলবেলা রায় বাহাদুর জগন্নাথ বরুয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য লক্ষ্মীনাথ বের হল।

বিএ জগন্নাথ বরুয়া কয়েকটি চা বাগানের মালিক। নামে ধামে ধনসম্পত্তিতে তিনি কেবল জোরহাটে নয়, সমগ্র অসমে একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি।তাঁর বাসস্থানটিও বিশাল। বিশাল গেট পার হয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে লক্ষ্মীনাথ ভেতরে ঢুকে নিজের উপস্থিতির কথা বলে একজন কর্মচারীকে ভেতরে পাঠাল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিএ জগন্নাথ বরুয়া বেরিয়ে এলেন। পরনে সাহেবদের পরা ঘরোয়া পোশাক। মাস খানেক আগে কলকাতায় তাঁকে সুস্থ দেখেছিলেন। বয়সের সঙ্গে অসুখ তাকে কাহিল করে ফেলেছে। ওষুধপত্র খেয়েও শরীরটাকে সুস্থ রাখতে পারেননি।

কুশল সংবাদ আদান প্রদান করে থাকার সময় সাদা পোশাক পরা আধবয়সী একজন খানসামা একটা সুন্দর পটে উচ্চমানের চা নিয়ে এল। লক্ষ্মীনাথের কাছ থেকে চায়ে চিনি দুধের অনুপাত জিজ্ঞেস করে খানসামা এক কাপ চা লক্ষ্মীনাথের দিকে এগিয়ে দিল। চিনি দুধ না দিয়ে পাতলা লিকারের চা ঢেলে খানসামা জগন্নাথ বরুয়ার হাতে তুলে দিল।

চায়ের কাপটা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে জগন্নাথ বরুয়া বললেন, কলকাতা থেকে এলে, পার্টিশন কার্যকরী হওয়ার পরে কলকাতা আন্দোলনমুখী হয়ে পড়েছে। খবরের কাগজে দেখলাম বন্দেমাতরম স্লোগান দিয়ে হাজার হাজার জনতা কলকাতার রাজপথে নেমে এসেছে। রবিবাবু ' বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পুণ্য হোক পূণ্য হোক হে ভগবান' বলে গেয়ে পার্টিশনের বিরোধিতা করছেন।'

' হ্যাঁ কাকাবাবু, আন্দোলনটা দিন দিন বেড়েই চলেছে।'

' আর ও বাড়বে।'

' কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বাঙালির প্রতিবাদের কাছে নতিস্বীকার না করে পার্টিশন রদ করবে না। ১৮৫৭ সনের সিপাহী বিদ্রোহের চেয়ে ভয়াবহ আন্দোলন ছিল। সেটাকে আন্দোলন না বলে বিদ্রোহ বলাই সঙ্গত। সেই বিদ্রোহকে দমন করেছে যখন, এখন এত বছরে ভারতবর্ষে আরও স্থায়ীভাবে রাজত্ব করা ব্রিটিশ এই আন্দোলনকে সহজেই দমন করতে পারবে।'

' দমন করলে জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি আরও বেশি করে সংঘবদ্ধ হয়ে উঠবে।

' কিন্তু দাদা ব্রিটিশ আমাদের দেশের উন্নতির জন্য কাজ করেছে। আমাদের অসমের কথাই ধরুন, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার উন্নতি করেছে। আসামে যে এত লাভজনক চায়ের চাষ হতে পারে, এটা ব্রিটিশেরই আবিষ্কার। তাছাড়া রেললাইন পেতেছে ভালো ভালো জাহাজ কোম্পানি আসার জন্য অসমের জলপথের ও উন্নতি হয়েছে। জেলায় জেলায় প্রশাসনীয় অফিস স্থাপন করে আইনশৃঙ্খলা ধরে রেখেছে।'

' তুমি তাহলে ব্রিটিশ শাসনের পোষকতা কর। তবে লক্ষ্মীনাথ যতই যা বলনা কেন, আমাদের জন্য ব্রিটিশরা বিদেশি। তুমি সাহিত্যের সাধনা করছ। তোমার জ্ঞান- বুদ্ধি আমার চেয়ে বেশি। তুমি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবে যে দেশের মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না।'

ইংরেজিতে শুদ্ধ বক্তৃতার দ্বারা তৎক্ষণাৎ শ্রোতামন্ডলীকে আকর্ষণ করতে পারার ক্ষমতা থাকা জগন্নাথ বরুয়াও ব্রিটিশ ভক্ত। ১৯০২ সালে সপ্তম এডওয়ার্ডের অভিষেক উপলক্ষে ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা নিমন্ত্রিত হয়ে তিনি বিলাতে গিয়েছিলেন। অভিষেক উৎসব হয়ে যাওয়ার পরে লন্ডনের মেয়র প্রতিনিধিদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য টাউন হলে ভোট সভার আয়োজন করেছিল। সেই ভোজসভায় জগন্নাথ বরুয়া ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে অভ্যাগতদের সম্ভাষণ জানিয়েছিল। বক্তৃতাটি এতই মনোগ্রাহী হয়েছিল যে ম্যানচেস্টার গার্ডেন ইত্যাদি বিলাতের কাগজে বরুয়া মহাশয়কে প্রশংসা করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা রায়বাহাদুর উপাধিতে সম্মানিত জগন্নাথ বরুয়ার কন্ঠে এখন ইংরেজ শাসনের বিরোধিতার সুর শুনে লক্ষ্মীনাথ অবাক হল। কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তাহলে আপনি বলতে চাইছেন নাকি যে এখন আমাদেরও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে।'

'কবে আন্দোলন করতে হবে, সঠিকভাবে বলতে পারছিনা। কিন্তু বেশিদিন যে অপেক্ষা করতে হবে না সেটা অনুমান করতে পারছি।’ জগন্নাথ বরুয়া বললেন ' তারপরে ‘বন্তি’পত্রিকাটা রিভাইভ করার জন্য পদ্মনাথ যে অশেষ চেষ্টা,খবরটা পেয়েছ বোধহয়।’

‘হ্যাঁ, দুই মাস আগে পদ্ম বরুয়া কলকাতায় আমার এবং ভোলা দাদার সঙ্গে দেখা করেছিল। আমরা আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করেছি। ইতিমধ্যে 'বন্তি' পুনরায় ছাপা হয়েছে।

' পারবে। পদ্মনাথ ধরেছে যখন 'বন্তি' বের হবেই। পদ্মনাথ খুবই সিনসিয়ার। যে কাজ শুরু করে, একেবারে একনিষ্ঠ হয়ে লেগে থাকে। আচ্ছা তুমি তো এবার কলকাতা থেকে পরিবার এবং মেয়েদের নিয়ে এসেছ। তোমার দাদা তো জি বেজ বরুয়ার বাড়িতে আছে, নয় কি।

'হ্যাঁ কাকাবাবু।'

' জোরহাটে কয়েকদিন থাকবে কি?'

' হ্যাঁ থাকব। তারপরে গোলাঘাটে যাব। আজকাল আমাদের মা শ্রীনাথ দাদার সঙ্গে গোলাঘাটে থাকে।'

' মিসেস কে নিয়ে একদিন আমাদের বাড়িতে ভাত খেতে এসো। গাড়ি পাঠিয়ে দেব। গাড়িতে তাদের নিয়ে এসো।'

লক্ষ্মীনাথের দাদা ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে গতিশীল চরিত্রের মানুষ হল গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া। স্বভাবটা কিছুটা উগ্র হলেও তিনি খুব কর্মী মানুষ। গোবিন্দচন্দ্রের জন্যই গোলাপ বেজবরুয়া কলকাতায় পড়াশোনা করতে সক্ষম হয়েছিল। এবং টাকা-পয়সা সংগ্রহ করে তিনিই গোলাপ বেজবরুয়াকে বিলাত পাঠিয়েছিলেন।তাঁর জন্যই এন্ট্রান্স পাশ করার পরে পিতা দীননাথের ইচ্ছার বিরুদ্ধে লক্ষ্মীনাথ কলকাতায় যেতে পেরেছিল । তিনি লক্ষীনাথ কে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে কালীঘাটের বেনীমাধব হালদারের ঘরে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন এবং মির্জাপুরের রিপন কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথের নাম ভর্তি করেছিলেন।

গোবিন্দচন্দ্র সাজ-পোশাক , চাল-চলনে একেবারে সাহেব। ভাব-ভঙ্গিতেও ইংরেজ। মুখে ইংরেজি কথা-বার্তা। পারিবারিক পরম্পরা অনুসরণ করে তিনি ইংরেজ ভক্ত অসমিয়া। সভা-সমিতিতে তিনি মুক্ত কণ্ঠে বলেন‐ ইংরেজের পান্চুয়ালিটি, ইংরেজের ডিসিপ্লিন, ইংরেজের সাহস, ইংরেজের একতা, ইংরেজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, ইংরেজদের দেশ ভক্তি আমাদের চাই। গোবিন্দচন্দ্র খাওয়া দাওয়ায় নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণের নিয়ম-নীতি মানে না। তিনি মুসলমান স্পর্শ করা পাউরুটি খান, মুরগির ডিম খান, হুইস্কি ব্রান্ডি ও অনায়াসে পান করেন। তবে এইসব নিয়ে কোন লুকোচুরি নেই। তিনি একজন মুক্ত মনের মানুষ। অবশ্য বাড়ির বৈষ্ণব আচার- অনুষ্ঠান মানেন। তিনি বলেন,' সাহেব হলেও আমি অহিন্দু নই।' কিন্তু তাঁর দোষটা হল, তিনি কার ও মন রক্ষা করে অথবা স্থান- কাল- পাত্র বিচার করে কথা বলতে পারেন না। তাই অধিকাংশ মানুষ তাকে পছন্দ করে না। মাত্রাধিক সাহেবিবায়ুগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে বিশিষ্টতা দেখাতে যত্নশীল। তার জন্যই নিজের গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া নামটা সংক্ষেপে জি বেজবরুয়া করে নিয়েছেন এবং মানুষ তাঁকে সেভাবে ডাকলেই খুশি হন।

এইসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও এই গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া সমসাময়িক অসমের একজন অন্যতম শিক্ষাবিদ। এতদিনে তিনি একরকম একক প্রচেষ্টায় উজান অসমে ছয়টি ইংরেজি স্কুল স্থাপন করেছেন। সেগুলি হল দেরগাও এবং চারিগাওয়ে একটি করে মাইনর স্কুল, গোলাঘাট, যোরহাট, জাঁজি এবং শিব সাগরে একটি করে হাই স্কুল। স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেকটিতে একজন করে হেডমাস্টার এবং মাস্টারের নিযুক্তি দিয়ে নিজে ঘুরে ঘুরে স্কুল পরিদর্শন করেন, পরিচালনা করেন। এখন তিনি নিজে যোরহাট হাই স্কুলের হেডমাস্টার।

বিএ পাশ করার পরে সরকারি চাকরি পেয়েও চাকরিতে যোগদান না করার জন্য গোবিন্দচন্দ্র লক্ষ্মীনাথকে খুব গালিগালাজ করেছিলেন। এখন ও তাঁর কথায় সেরকম ভাবই প্রকাশ পেল। রায়বাহাদুর জগন্নাথ বরুয়ার বাড়ি থেকে এসে লক্ষ্মীনাথ দাদার সঙ্গে বসে ভোলানাথ বরুয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক সংঘাতের কথা বলতেই গোবিন্দচন্দ্র তাঁর স্বভাবসুলভ কর্কশ কণ্ঠে বলল‐' তুই যখন সেই অর্ধশিক্ষিত ধুরন্ধর ব্যবসায়ীটার সঙ্গে ব্যবসা করতে শুরু করলি তখনই ভেবেছিলাম তোকে সর্বনাশে পেয়েছে। তবে তুই হলি একটা 'গোঁয়ার গোবিন্দ' প্রাণী। একবার নিজে যেটা ভাববি, সর্বনাশ জেনে ও সেটাই কামড়ে পড়ে থাকবি। ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে নিজের মতো ব্যবসা শুরু করেছিস, ব্যবসায় তুই এগোতে পারবি না। শোন, আমরা ব্যবসায়ী নই। আমরা বেজবরুয়া বংশের ছেলে। বাবা ঠিকই বলেছিলেন, আমাদের রক্তে ব্যবসায়ীর গুণাবলী নেই।'

কথাগুলির বিরোধিতা করতে গেলেই গোবিন্দচন্দ্র তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। লক্ষ্মীনাথ চুপ করে দাদার কথা শুনতে লাগল।

' আর গোলাপ, তাকে কিসে পেয়েছে যে চৌদ্দ পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হল ?'চরম বিরক্তি এবং ক্রোধে গোবিন্দ চন্দ্র বললেন,' বিজাতি ব্রাহ্ম বিয়ে করে তুই তবুও দুই এক বছর পরে পরে বাড়িতে আসিস। বাবা খারাপ পাবে বলে কথাটা গোপন রেখে কত কষ্টে টাকা জোগাড় করে, আমি গোলাপকে বিলাতে পাঠালাম। বিলেতে গিয়ে ডাক্তার হয়ে আসা সেই মহা মূর্খটা এখন অসমে আসেই না। তারপরে সে পুনরায় কয়েকটি সন্তান থাকা একটি বিধবাকে বিয়ে করেছে! আর সেই বিয়েতে তুই কিনা তাকে সাহায্য করলি! হায় হায়, এসব কি হল! বাবা বেঁচে থাকলে এইসব দেখে শুনে নিশ্চয় আত্মহত্যা করতেন।'

লক্ষ্মীনাথ এই দাদার ক্রোধ প্রশমিত করার উপায় জানেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসতে হাসতে বলল,' মেজ দাদা, তুমি মিছামিছি রাগ করছ। গোলাপদাদা বিদেশে গিয়ে অভাবে পড়ে কোনো উপায় না পেয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। তারপরে তিনি যে এরকম একজন বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেছেন, তাকে ভালো লেগেছে বলেই। ভালোবাসলে কী করবে? ভালোবাসা তো কোনো বিচার মানে না। এমনিতেও কোন রূপসী যুবতি পঞ্চাশ বছরের বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বিয়ে বসতে চাইবে? তবে যতই গালিগালাজ কর না কেন, বিয়ের পরে গোলাপ দাদার ভালোই চলছে। শেষ বয়সে বিয়ে করে ঘর-সংসার পেতে একটু যদি সুখ পায় পেতে দাও।'

' আর ওটা শিবসাগর থেকে হরিকে নিয়ে গিয়ে বিজনেসে লাগালি,‐- সে তো একটা অপদার্থ, অলস। তোর সঙ্গে থেকেও ওর কি কোনো গতি হবে? সে নিজে কিছু করে খেতে পারবে কি?'

' ও শৈশব থেকে শিবসাগরে থাকা। ওর শরীর থেকে এখন ও দিখৌপরিয়ার গন্ধ যায়নি। কলকাতার হাবভাব বুঝতে সময় লাগবে।'

' তুই তাকে সহজ-সরল ভাবলে ভুল হবে। ও একটা নির্বোধ। কড়া শাসনে না রাখলে ও পথে আসবে না।'

' হবে হবে। সে নিশ্চয় নিজে থেকে কিছু একটা করে খেতে পারবে।'

' তারমানে তুই ওর কথাটা সিরিয়াসলি নিস নি। লখী তোকে আর শুধরানো গেল না। কোনো কথাকেই তুই গুরুত্ব দিস না।'


বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ২৭ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, He Amar Swadesh

হে আমার স্বদেশ- ২৭

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(২৭)

বি ব্রাদার্স কোম্পানির বিএন আর লাইনে শাল কাঠের ব্যবসায়িক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেল। কম দিনের মধ্যে এতই বৃদ্ধি পেল যে তার সাত দিনের খরচ যোগানোর জন্য লক্ষ্মীনাথ দশ পনেরো হাজার থেকে পঁচিশ ত্রিশ হাজার করে টাকা কলকাতা থেকে ঝাড়চোগড়াতে পাঠাতে লাগল। সাধারণত সেই টাকা অফিসের বিশ্বাসী কেরানি অথবা চাপরাশির মাধ্যমে পাঠানো হয়। পরিমান বেশি হলে লক্ষ্মীনাথ নিজেই সেই টাকা নিয়ে যায় এদিকে জঙ্গলের কাজ সরকারি কারেন্সি নোটে চলে না। নোট ভাঙ্গিয়ে টাকা,আধলি,সিকি এবং পয়সা করে না পাঠালে হয় না। কারণ অশিক্ষিত করতীয়া ,গাড়োয়ান, এবং কুলিরা নোটের মূল্য বুঝে না।

তাই প্রত্যেক সপ্তাহে হাজার হাজার টাকা ভাঙ্গিয়ে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের অস্থায়ী অফিসে বসে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়াটা একটি কষ্টদায়ক কাজ। তাছাড়া কলকাতা থেকে যেতে হয় রেলে। রেলে চোর ডাকাতের উপদ্রব থাকেই। তবে উপায় নেই। সময় মতো মজুরি না দিলে শ্রমিকরা কাজ করবে না। তারমধ‍্যে আবার এইসব কাজ বেশি হয়েছে। বেশি করে টাকা নিয়ে যেতে হবে। একটা লোহার বাক্সে কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ একা বেরোলো। এত টাকা পয়সা নিয়ে রাতের রেলে যেতে চলেছে ।প্রজ্ঞা একজন সঙ্গী নিয়ে যেতে বলল। কিন্তু ব্যয় সংকোচ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ সাহায্যকারী হিসেবে কাউকে নিল না। কেবল সেটাই নয় রেল কোম্পানিকে ফাঁকি দেবার জন্য লক্ষ্মীনাথ টাকা, আধুলি, সিকি ইত্যাদি মুদ্রার লোহার ভারী বাক্সটা বুক পর্যন্ত করল না। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ (১৯০২ সন) গত সপ্তাহ থেকে কাজের ভীষণ চাপ।অ'. এন্ড আরের কিটিং সাহেবের সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথ তাকে সেগুন কাঠের নমুনা দেখানোর জন্য শিবপুর টিম্বার ওয়ার্ডে গেল। জার্ডিন কোম্পানি এবং কালীকৃষ্ণ প্রামাণিকের কাছ থেকে পাওয়া চেকগুলি বেঙ্গল ব্যাংকে জমা দিল। শিবপুর লাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত কাঠ গুলি নীলামে বিক্রি করল। তাছাড়া চৌহদের ভেতরে নতুন ঘর একটা তৈরি করার জন্য দুজন পাকা মিস্ত্ৰি লাগাল। তাই সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত ব্যস্ত, যথেষ্ট পরিশ্রম হল। এদিকে গরমও পড়েছে । তারপরে ঝাড়-চোগড়াতে যাবার জন্য রেল ভ্রমণ। বসে বসে লক্ষ্মীনাথ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে গভীর ঘুমে নিদ্রামগ্ন। রাত একটার সময় রেলগাড়ি ঝাড়চোগড়া এসে পৌঁছাল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ জেগে উঠল না। স্টেশন ছেড়ে গাড়ির ইঞ্জিন হুইসেল দেওয়ার পরেই তার ঘুম ভাঙল, ধড়মড় করে উঠে বুঝতে পারল সর্বনাশ হয়ে গেছে। টাকার বাক্সটা যথাস্থানে আছে যদিও সেটাই যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলছে– 'বন্ধু আজ ফাঁদে পড়লে । বেঞ্চের উপরে চিত হয়ে পড়ে নাক ডাকতে থাক।গাড়ি ঝাড় চোগড়া পার হয়ে গেছে। লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়ল । অনিশ্চয়তা আর ভয়ে অন্তরটা শুকিয়ে গেল। এদিকে রেলগাড়ি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে। কী করবে। দু'ঘণ্টা পরে রেলগাড়ি রায়গড় পৌঁছালো ,একটা স্টেশনে ট্রেন বেশিক্ষণ থামেনা। এদিকে রাত তিনটা বেজেছে। নির্জন নিস্তব্ধ স্টেশন ।একটাও কুলি নেই। তবু মরণবাচন পণ করে প্রাণপণে টাকার ভারী বাক্সটা নিজেই টেনে হেঁচড়ে নিয়ে কোনোমতে প্লেটফর্মে ফেলে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল ।ইতিমধ্যে দুই মিনিট পার হয়ে গেছে। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে রেলগাড়ি স্টেশন পার হয়ে রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হারিয়ে গেল । জন প্রাণীহীন রায়গড় স্টেশনে ধনের বাক্সটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই আলো হাতে নিয়ে দেবদূতের মতো এগিয়ে এল স্টেশন মাস্টার। কণ্ঠস্বর শুনে তিনি বাঙালি বলে বুঝতে পেরে লক্ষ্মীনাথ ও অকূলে কুল পেল । নিজের অঘটনটার কথা দুঃখের সঙ্গে ব্যক্ত করে লক্ষ্মীনাথ স্টেশন মাস্টারের শরণাপন্ন হল । কথাবার্তা শুনে স্টেশন মাস্টার লক্ষ্মীনাথকে বাঙালি বলে ভাবলেন আর বিদেশে বাঙালি বাঙালির জন্য সবসময়ই সজ্জন। লক্ষ্মীনাথের প্রতি ও তার দয়া জন্মাল। সেটা লক্ষ্য করে লক্ষ্মীনাথ যেন তেন প্রকারেন ঝাড়চোগড়াতে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য স্টেশন মাস্টারকে অনুরোধ করল। এক ঘন্টা পরে একটা মাল গাড়ি এল। স্টেশন মাস্টার মালগাড়ির ফিরিঙ্গি গার্ডকে বলে স্টেশনে শুয়ে থাকা একজন কুলিকে ডাকল। তারপর কুলিটা ভারী বাক্সটা মালগাড়ির গার্ডের ডাবায় তুলে দিল।

অনিশ্চয়তার সঙ্গে পরিশ্রম, সময়ে খাওয়া-দাওয়া না হওয়া, বিশ্রাম নেই, ঘুম নেই ,বিগ ব্রাদার্স কোম্পানির উন্নতির জন্য লক্ষ্মীনাথ সমস্ত কিছু সহ্য করেছে। সেদিন চন্দ্রকুমার সতর্ক করে দেওয়ার জন্য মনে সংশয় সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল যদিও লক্ষ্মীনাথ এখন ও নিজেকে ভোলানাথের চেয়ে আলাদা মনে করে না। তার মনোভাবটা এরকম যে এত কষ্ট পরিশ্রম করা মানেই ভোলানাথের উন্নতি এবং ভোলানাথের উন্নতি মানে তার উন্নতি। কিন্তু আত্মভোলা লক্ষ্মীনাথ যেভাবে ভাবে সংসারের সবাই সেভাবে ভাবেনা।

অসম থেকে আগত ভোলানাথের আত্মীয়-স্বজনদের ভেতরে ভবানীচন্দ্র বরদলৈ, ভোলানাথের ভাগ্নে ভুবনচন্দ্র এবং মহীনারায়ণকে কোম্পানির বিভিন্ন কাজে লাগানো হল। কাঠের ব্যবসায়ের কাজে এরা অভিজ্ঞ নয়। দায়িত্ব পালনে এতটা আন্তরিক নয়। শৈশব থেকে অসমে থাকা, লেখাপড়ায় এত অগ্রণী নয় বলে লক্ষ্মীনাথের মতো তাদের কেউ গতিশীল মনের নয়। তার জন্যই ব্যবসায়ের দায়িত্বপূর্ণ বিশেষ করে টাকা-পয়সার লেনদেন এবং হিসাবপত্র রাখার কাজগুলি তাদের দেওয়া হল না। আগের মতো সেই সমস্ত কিছুর দায়িত্ব লক্ষ্মীনাথের কাছে রইল এটা ভোলানাথের আত্মীয় স্বজনদের পছন্দ হল না।। ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথকে বেশি গুরুত্ব দেয় সেটাও আত্মীয়দের কাছে লক্ষ্মীনাথ ঈর্ষার কারণ হয়ে পড়ল। অপদার্থরা নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারেনা যদিও অন্যে উপার্জন করা অর্থের প্রতি লোভ করে। তাদের আত্মীয় অকৃতদার ভোলানাথ বরুয়ায় নিজের ঘর সংসার নেই। কলকাতায় কাঠের ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী। ভোলানাথ বি ব্রাদারস কোম্পানির মালিক। স্বাভাবিক ভাবেই আত্মীয়রা উত্তরাধিকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগল। তাদের এই অভিলাস আকাঙ্ক্ষার কথা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রকাশ পেল এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যে জোর জল্পনা চলছে এই বিষয়ে প্রজ্ঞাও জানতে পারল। এই বিষয়ে লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে কথা বলল। লক্ষীনাথ প্রজ্ঞাকে এই বলে আশ্বস্ত করল যে দাদা হয়ে ভোলানাথ কখনও প্রাপ্য অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করবেনা। কিন্তু প্রজ্ঞার মনের আশঙ্কা দূর হল না। সে জোড়াসাঁকো গিয়ে এই বিষয়ে মা নিপময়ী দেবীর সঙ্গে কথা বলল। মেয়ে জামাইয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিপাময়ী দেবী অস্থির হয়ে পড়লেন। নিপময়ী দেবীও ভাবেন ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের দাদার মতো। তার জন্যই প্রতিবছর তিনি ভোলানাথকে জোড়াসাঁকোতে আমন্ত্রণ জানান এবং আদর অভ্যর্থনা করে খাইয়ে কিছু না কিছু একটা উপহার দেন। এবারও দুপুরবেলা খাবার জন্য ভোলানাথকে নিমন্ত্রণ করলেন। ভোজনের পরে ভোলানাথকে একটা মূল্যবান অভারকোট উপহার দিয়ে নিপময়ী দেবী বি বরুয়া কোম্পানির সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টা উত্থাপন করলেন। বি বরুয়া কোম্পানির উত্থানের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি অনুরোধ করলেন যে বিষয় সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ার ক্ষেত্রে ভোলানাথ যেন লক্ষ্মীনাথের প্রতি সুবিচার করেন। উপহার হাতে নিয়ে ভোলানাথ শান্ত হয়ে বসে রইল। নিপাময়ী দেবী পুনরায় অনুরোধ করার পরে ভোলানাথ গম্ভীর সুরে বললেন-‘ আচ্ছা দেখি এ ব্যাপারে আমি কী করতে পারি’ বলে বিদায় নিয়ে চলে এল। লক্ষ্মীনাথের শাশুড়ি মা সক্রিয় হয়ে উঠায় ভোলানাথের ভাগ্নে ভবানী আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সেদিনই আসাম থেকে তাদের আর ও একজন আত্মীয় এল। তার নাম গোলক। এইসব শুনে তিনি বাকিদের সঙ্গে সকাল থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত আলোচনা করলেন। তারা এটাও ভাবলেন যে প্রতিপত্তিশালী ঠাকুরবাড়ির মানুষ যখন উঠে পড়ে লেগেছে ভোলানাথের সম্পত্তির সিংহভাগ লক্ষ্মীনাথই পাবে, রক্তের সম্পর্ক থাকা আত্মীয়দের পাওয়ার আশা ক্ষীণ আর পেলেও কণা মাত্র পাবে।

এইসব নিয়ে আরও কথা বাড়ল। কথাগুলি জানতে পেরে একদিন ডবসন রোডের বাড়িতে বসে ভবানীকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে ভোলানাথ বলল,' দেখ ভবানী কেনার দিন থেকে পরিবারদের সঙ্গে বসবাস করছে যখন ডবসন রোডের এই বাড়িটা লক্ষ্মীনাথই পাবে, বিলাসপুরের বাড়িটা মহীকে দেওয়া হবে আর আসানসোলের বাড়িটা তোমাকে দেব।'

তখনই একদিন চন্দ্রের কাছ থেকে ভবানী শুনল যে ভোলানাথ আসানসোলের বাড়িটা চন্দ্রকে দেবে। হতাশ ভবানী অন্ধকার দেখল । এদিকে ভবানী বুঝতে পারল যে ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথকে ভালোবাসে এবং তার প্রতি ভোলানাথ খুবই সদয়। ভবানী লক্ষ্মীনাথের শরণাপন্ন হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ ভুবনের জন্য ভোলানাথের সম্পত্তির ভাগ দেবার কথা বলতে পারবে না বলে জানাল। তারপরেও অনুরোধ করায় লক্ষ্মীনাথ ভবানীকে নিজে বলার জন্য পরামর্শ দিল।

এতদিন পর্যন্ত ভোলানাথের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অনভিপ্রেত ঝগড়াটা মান সম্মান রক্ষা করে চলে আসছিল। তারপরের ঘটনাগুলি অত্যন্ত নিম্ন রুচির, অতিশয় গ্লানিদায়ক। চাহিদা মতো সাহায্য না পেয়ে ভবানী লক্ষ্মীনাথের বিরোধী হয়ে পড়ল। সে ভোলানাথের কাছে লক্ষ্মীনাথের বদনাম, গোলোককে ভোলানাথের একমাত্র উত্তরাধিকারী বলে প্রচার, বারবার অনুরোধ করার পরও লক্ষ্মীনাথ মহীর মেয়েটিকে ডবসন রোডের বাড়িতে থাকতে না দেওয়ার জন্য মহী 'আমি লক্ষ্মীনাথকে শিক্ষা দেব' বলে ধমক দেওয়া, ভুবন এবং ভুবনের ভাইকে ডবসন রোডের বাড়ির উপরের তলায় থাকতে দিতে হবে বলে কথাটায় লক্ষ্মীনাথ তীব্রভাবে বিরোধিতা করা ইত্যাদি ঘটনাক্রমের পরে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের সম্পর্কটা তিক্ত হয়ে পড়ল।

তারপরে ১৯০৪ সনের ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখ ক্লাইভ রোডের অফিসে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের একটা চিঠি পেল। চিঠিটা পড়ে তার মাথার উপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের সততার উপরে প্রশ্ন তুলেছে। তাছাড়া ব্যবসা পরিচালনায় তার দক্ষতার অভাব বলে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। তাই লক্ষ্মীনাথ ভবিষ্যতে বেঙ্গল ব্যাংক এবং হংকং ব্যাংকে লেনদেন করতে পারবে না বলে ভোলানাথ নির্দেশ দিয়েছে। তার মানে সে আর ভোলানাথের বিশ্বাসের পাত্র নয়। এটা অপমান ।সাংঘাতিক অপমান। লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হল যেন ভোলানাথ অন্যায় ভাবে প্রচন্ড শক্তিতে তার মাথায় আঘাত করেছে । তার মাথা ঘুরতে লাগল। মুহূর্তের জন্য ও থাকতে না পেরে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।

লক্ষ্মীনাথকে চিঠি দিয়ে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে উক্ত ব্যাংক দুটিকেও লক্ষ্মীনাথ সই করা চেকে টাকা দিতে নিষেধ করলেন। তার জন্যই পরদিন লক্ষ্মীনাথ সই করা চেকগুলি বেঙ্গল এবং হংকং ব্যাংক ফেরত পাঠাল। এটাও অপমান। এই অপমান সহ্য করতে না করতেই লক্ষ্মীনাথ আরও একটি চিঠি পেল। এই চিঠির ভাষা ও মারাত্মক। চিঠির মাধ্যমে ভোলানাথ নির্মমভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে তার ভাগ্নে এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রান্নাঘর, ডবসন রোডের নিচের মহলটা তখনই খালি করে দিয়ে পরিবার নিয়ে লক্ষ্মীনাথকে উপরতলায় উঠে যেতে হবে।

লক্ষ্মীনাথ দিশাহারা হয়ে পড়ল। কী করবে কী না করবে ভাবতে ভাবতেই পরের দিন অফিসের কর্মচারী গোপী আরও একটি চিঠি নিয়ে এল। এটিও ভোলানাথের চিঠি। পুনরায় সেই একই নির্দেশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রান্না ঘরসহ নিচের মহল খালি করে দিতে হবে। এইবার লক্ষ্মীনাথ অনুভব করল সত্যিই তার সর্বনাশ হল। তার চিৎকার করে করে বলতে ইচ্ছা হল অবশেষে রক্ষকই ভক্ষক হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ নিজেকে সামলে নিল। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল তার পক্ষে ডবসন রোডের নিচের মহল খালি করে দেওয়াটা সম্ভব নয়।

পরেরদিন ভাই ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে ভুবন ডবসন রোডের নিচের মহল দখল করতে এল। খালি করে দেব না বলে লক্ষ্মীনাথ নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল। কথাটা জানতে পেরে ভোলানাথ সম্বলপুর থেকে টেলিগ্রাম পাঠাল, বেজ. যত দ্রুত সম্ভব আমার নির্দেশ পালন কর। ভোলানাথ এতটাই উত্তেজিত, এতই ক্ৰোধিত হল যে পৃথক একটি টেলিগ্রাম করে অতুলকৃষ্ণ ঘোষকে নির্দেশ দিল লক্ষ্মীনাথ যাতে এখনই নিচের মহল ছেড়ে দেয় তার জন্য আপনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। অতুল কৃষ্ণ ঘোষ আত্মসম্মান থাকা ব্যক্তি।বি বরুয়া কোম্পানির কর্মচারী হয়ে তিনি কেন এই পারিবারিক মামলায় নিজেকে জড়িত করবেন? তিনি সঙ্গে সঙ্গে টেলিগ্রাম করে ভোলানাথকে জানিয়ে দিলেন আপনি নিজে এসে লক্ষ্মীনাথের ঘর ছেড়ে দেওয়ার কথাটা নিষ্পত্তি করুন। ভোলানাথ নিজে না এসে পরের দিন পুনরায় টেলিগ্রাম করে লক্ষ্মীনাথকে ধমক দিলেন এক্ষুনি নিচের মহল খালি করে না দিলে কথা খারাপ হবে।'

কিন্তু ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের মুখোমুখি হল না। কলকাতার বাইরে অথবা কলকাতার অজানা কোনো জায়গায় অবস্থান করে চিঠি লিখে অথবা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে এবং নিজের ভাগ্নেদের দ্বারা লক্ষ্মীনাথের উপরে চাপ প্রয়োগ করতে লাগল। লক্ষ্মীনাথ অফিসে যায় তবে ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজকর্ম করে না। অতুল কৃষ্ণ বাবু লক্ষ্মীনাথের আপনজন। তিনি সমস্ত কিছু জানেন। তিনি প্রকৃতই লক্ষ্মীনাথের শুভাৰ্থী। তার সঙ্গে কথাবার্তা হলে দুঃখ যন্ত্রণা কমবে কিন্তু তার সঙ্গে এইসব নিয়ে কথা বলতে খারাপ লাগে। কথা বলার কথা ভাবলেই মনে কী রকম একটা গ্লানির সৃষ্টি হয়। ঠেলা ধাক্কা দিয়ে দিনটা কোনোভাবে অতিক্রম করে ইন্ডিয়া ক্লাবে যায়। বিলিয়ার্ডস খেলা শুরু করে। আগের মতো খেলায় মনোসংযোগ করতে পারেনা। প্রতিটি গেমে হেরে ম্লান মুখে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়িতে প্রজ্ঞা এবং সাড়ে তিন বছরের শিশু কন্যা অরুণা। সংবেদনশীল প্রজ্ঞাৰ ভালোবাসা, প্রতিমুহূর্তের সেবা যত্ন তার কাছে বেঁচে থাকার শক্তি। প্রজ্ঞা ঘটে থাকা ঘটনাগুলি দেখছে ।লক্ষ্মীনাথের মনে ঘটনাগুলির প্রতিক্রিয়া জেনে সে বুঝতে পারে। নিজে কিছু বলে না। সেইসব নিয়ে কথা বললে লক্ষ্মীনাথের অন্তরে জ্বলতে থাকা ক্ষোভ- যন্ত্রণার আগুন আরও বাড়বে বলেই সে কিছু বলে না। সকাতরে ভালোবাসার দৃষ্টিতে লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সুদর্শন লক্ষ্মীনাথ সব সময় প্রফুল্ল থাকে, তাঁর কথায় কথায় কত রস, এখনও সতেরো আঠারো বছরের তরুণের মতো এটা ওটা কথা বলে তাকে হাসিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণবন্ত করে তোলে। সেই মানুষটা একেবারে নীরব- নিথর হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রজ্ঞার চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে।

এগারো দিনের মাথায় ভুবনকে সঙ্গে নিয়ে ঝাড়চোগড়া থেকে ভোলানাথ ডবসন রোডের বাড়িতে এল। কিন্তু এক কাপ চা ছাড়া সকালের জলখাবারের কিছুই খেল না ।লক্ষ্মীনাথকে দেখল যদিও কথা বলল না। প্রজ্ঞা মানসিকভাবে সাহসী মহিলা। সে ভোলানাথের মুখোমুখি হল। শান্ত কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে প্রজ্ঞা বলল,' বাইরে থেকে চিঠি আর টেলিগ্রামের মাধ্যমে আপনাদের যোগাযোগ হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে এটা কি চলছে বলুনতো ?দুই ভাই এক সঙ্গে বসে সমস্যা গুলি আলোচনা করে মিটিয়ে নিলে ভালো হত না কি? প্রজ্ঞা এভাবে বলার পরেও ভোলানাথের রাগ কমল না। বরং প্রজ্ঞার সঙ্গে তিনি কটু ব্যবহার করলেন। পরের দিন লক্ষ্মীনাথ অফিসে গেল না । মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। ইন্ডিয়া ক্লাবে গেল যদিও বিলিয়ার্ড না খেলে নিজের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবল। এবার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারল ,না, এভাবে চলতে পারে না। পুনরায় একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেবার সময় উপস্থিত হয়েছে। সেদিনই রাতে ভোলানাথ বাড়িতে এল। রাতের আহার খাবার সময় হল। টেবিলে সমস্ত কিছু তৈরি করে প্রজ্ঞা নিজেই ভোলানাথকে খাবার জন্য ডাকল। কিন্তু ভোলানাথ খাবার টেবিলে এল না। দেখে লক্ষ্মীনাথের আর সহ্য হল না। দীর্ঘ পদক্ষেপে ভোলানাথের রুমে প্রবেশ করে রোষতপ্ত কন্ঠে বলল –'দাদা এখন ডিনারের সময়। সবকিছু রেডি করে পরি আপনাকে ডেকেছে । আপনি ডিনারে আসেননি কেন?

ভোলানাথ বিছানায় আধা শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উঠল। স্থির দৃষ্টিতে লক্ষীনাথের দিকে তাকাল। তারপরে অবদমিত ক্রোধের সঙ্গে বলল যাকে আমি নিজের ভাই বলে ভেবেছিলাম সে যদি আমার আদেশ নির্দেশ না মানে তাহলে তার ওয়াইফ রান্না করে দেওয়া খাবার কীভাবে খাই ?

ভাই ,আপনি আমাকে আপনার ভাই বলে ভাবেন? ভাই বলে ভাবলে আপনি আমাকে চিঠির পরে চিঠি লিখে পাঠিয়ে বাড়ি ছাড়ার জন্য আদেশ দিতে পারতেন? টেলিগ্রাম করে এভাবে আমাকে ধমক দিতে পারতেন?

‘বেজ, তুমি উত্তেজিত হয়েছ? তোমার কণ্ঠস্বর তীব্র হয়ে উঠছে ।তুমি কি বলতে চাইছ?’

 ‘আমি বলতে চাইছি যে আসলে আপনি আমাকে নিজের ভাই বলে ভাবেন না। আমি আপনার ভাই বলে অন্যের সামনে পরিচয় দিয়ে আপনি আমাকে ইউটিলাইজ করেন। এত বছর আমাকে ইউটিলাইজ করে বি ব্রাদার্স কোম্পানি যখন কলকাতা তথা সমগ্র ইস্টার্ন ইন্ডিয়ায় এক নম্বর উড মার্চেন্টের ফার্ম রূপে প্রতিষ্ঠিত হল তখন আপনি আপনার ভাগ্নেদের উস্কানিতে আমাকে অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিতে চলেছেন । আপনি আমাকে শেষ করে দিয়েছেন ,আই হ্যাভ বিন রুইনড বাই ইউ।’

লক্ষ্মীনাথের উত্তেজনা বাড়ছে দেখে ভোলানাথ নিজের ক্রোধ উত্তেজনা সংযত করল। এমনিতেও সে বুদ্ধিমান। অনেক ধরনের বিপরীত পরিস্থিতি বেশ কৌশলের সঙ্গে নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে পারে । তার জন্যই সে কিছু সময় নিল। বিছানা থেকে নেমে বেশ বড়ো ঘরের মেঝেতে গম্ভীর ভাবে পায়চারি করে আগের চেয়ে কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলল,' ইউ হ্যাভ বিন রুইনড বাই মি'। আমার চরম শত্রু ও তোমার এই কথা বিশ্বাস করে না । তবে আমি তোমাকে রুইন করতে পারি। কিন্তু করব না। তোমাকে খারাপ পেয়েছি যদিও আমি তোমার সর্বনাশ চাই না ।’

‘আপনি আমাকে খারাপ পেয়েছেন? কেন?আমি কী অন্যায় করেছি?’

‘ সেই সব অনেক কথা।‌‌‌ সেই সব বলে তোমার সঙ্গে ঝগড়া বাড়াতে আমি চাইনা।’ ‘কিন্তু আপনাকে সেসব বলতেই হবে। কেন আপনি আমার বেঙ্গল এবং হংকঙ ব্যাংক থেকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি উঠিয়ে নিলেন? আমি কোথায় কী অবিশ্বাসের কাজ করেছি? আমাকে সমস্ত কিছু জানাতে হবে।’

‘ সেইসব বলার আগে তুমি আমাকে বলতো আমার এই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হওয়ার কথা নিয়ে আমাদের মধ্যে যখন কথাবার্তা চলছে তখন তোমার হয়ে তোমার শাশুড়ি মা আমাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ডেকে নিয়ে তোমার হয়ে কেন তিনি ওকালতি করতে গেলেন?'

‘তিনি আমার অভিভাবক । তাছাড়া আপনি আমাকে সহোদর ভাই বলে ভাবেন যখন তিনি আপনার আত্মীয় হিসেবে আপনাকে এই কথাটা বলতেই পারেন।’

‘ তথাপি বিজনেসের কথায় শ্বশুরবাড়ির মানুষকে জড়িত করাটা…’

‘ অথচ বিজনেসের শুরুতে আপনি ঠাকুরবাড়ির জামাই লক্ষ্মীনাথ আমার আদরের ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে কলকাতার অভিজাত মহলে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য যত্নশীল ছিলেন এবং সেটাকে বিজনেসের একটা ক্যাপিটাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ভোলানাথ দেখল লক্ষ্মীনাথ আগের মতো তাকে ভয় করছে না, সমীহ করছে না। তার জন্য কী বলবে ভেবে পেল না।

‘ দাদা? আমি যখন কলেজ স্ট্রিটের মেসে থাকতাম তখন থেকে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়। পরিচয় মানে ,আপনি নিজেই আমার মেসে এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। খোশ গল্প ,রঙ্গিন কথাবার্তা এভাবে বলতেন যে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। দিনের পর দিন আপনি আমার মন জয় করে নিয়েছিলেন। আমার হয়ে যাওয়া বিয়ের বিষয়ে উদার মন্তব্য দিয়ে আপনি আমার মন জয় করেছিলেন। কণ্ঠস্বরটা নামিয়ে লক্ষ্মীনাথ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল তারপর থেকে আপনার সঙ্গে আমার রিলেশন। আপনি যখন অসুস্থ হয়ে শয্যাগত হলেন তখন আমি এম এ এবং তার একমাস পরে বিএল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। পরীক্ষার পড়াশোনা একপাশে সরিয়ে রেখে এবং প্রজ্ঞাকে জোড়াসাঁকোতে রেখে দিনের পর দিন আপনার সঙ্গে থেকে আপনার অসুস্থ অবস্থায় আপনাকে সেবা শুশ্রূষা করেছিলাম। আর আপনার সেরকম অবস্থায় সেটাই কর্তব্য বলে আমার বিশ্বাস হয়েছিল। তার জন্য আমি পড়াশোনা করতে পারলাম না। আমার পরীক্ষা ভালো হল না। দুটো পরীক্ষাতেই ফেল করলাম।’

ভোলানাথ চুপ করে কথাগুলি শুনছে যদিও লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকাচ্ছে না।

‘একটা নিঃশ্বাস ফেলে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তারপরেও আমি আপনার সঙ্গ ছাড়িনি। আর সঙ্গ ছাড়িনি বলেই স্বাধীনভাবে কিছু একটা করার মানসে আপনার সঙ্গে ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলাম। আমি স্বীকার করছি, বেজবরুয়া বংশের সন্তান হওয়ার জন্য আমি ব্যবসার কিছুই জানতাম না। আজ ব্যবসার যা শিখেছি সেটা আপনার কাছ থেকেই শিখেছি। কিন্তু তার জন্য আপনি আমাকে যেভাবে যা করতে বলেছেন সেইসব করতে দ্বিধা করিনি ।কম বেশি হলেও আমার তরফ থেকে নিশ্চয় আন্তরিকতা নিষ্ঠার অভাব ছিল না। আপনি শুনেছেন গত বছর যে লোহার বড়ো বাক্সে টাকা-পয়সা নিয়ে একা রাতে ঝাড়চোগড়ায় যাবার সময় কী রকম বিপদে পড়েছিলাম– লাইফ রিক্স নিয়ে সেই বিপদ থেকে কোনো মতে রক্ষা পেয়েছিলাম। আপনার নির্দেশ অনুসারেই আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কালী কৃষ্ণ প্রামানিকের ফার্ম থেকে অতুল বাবুকে আনিয়েছি আর আপনি এটাও জানেন যে অতুলবাবু কেবল আমার জন্যই বি বরুয়া কোম্পানিতে যোগদান করেছেন। তারপরে –।'

পুনরায় লক্ষ্মীনাথ থামল। সহজাত রুচিবোধ তাকে এসব বলতে বাধা দিচ্ছিল। কিন্তু তার অন্তরে অপরিসীম যন্ত্রণা ।না বললে শান্তি পাবে না ।

'আপনাকে দাদার মতো সম্মান করি বলেই ডবসন রোডের এই বাড়ি কেনার সময় উকিলকে বলে আপনার নামে রেজিস্ট্রি করিয়েছিলাম। আপনি আমাকে আপন বলে ভাবতেন বলেই এই বাড়িটা মেরামতি করে নতুন করে কয়েকটি প্রয়োজনীয় রুম তৈরি করে লন টেনিসের গ্রাউন্ড নির্মাণ করেছি। সেসব করতে গিয়ে দিনে রাতে মিস্ত্রি এবং লেবারদের সঙ্গে লেগে দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনে আনার সময় আমার কতটা পরিশ্রম হয়েছে সেসব আপনি দেখেছেন ।এটা আমাদের দুজনের বাড়ি বলেই আমি এভাবে পরিশ্রম করেছিলাম। আর আমরা দুজনে সুখে আনন্দে থাকব বলেই করেছিলাম। অথচ বি ব্রাদার্স কোম্পানির উন্নতি, লক্ষ লক্ষ টাকার কারবার এবং কয়েক জায়গায় সম্পত্তি দেখে এই সেদিন অসাম থেকে আপনার আত্মীয়রা এসে প্রত্যেকেই সম্পত্তির ন্যায্য উত্তরাধিকারী বলে প্রতিপন্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এত অভিজ্ঞ এত বুদ্ধিমান হয়েও আপনি তাদের কথায় আমার পছন্দের নিচের মহলটা ছেড়ে দিতে বললেন। দাদা, এই বাড়ির প্রতিটি ঘরের প্রতিটি ইটে আমার হাতের স্পর্শ রয়েছে। এই বাড়ির এত সুন্দর কালারিং, পেছনে চাকরদের ঘর, ঘোড়ার আস্তাবল, সামনের বাগান, লন টেনিসের কোর্ট, সুরভির জন্য নির্মাণ করা স্মৃতি ঘর, এই সবকিছুই আমার প্লেনিং। আমি আপনাকে আর প্রজ্ঞাকে নিয়ে এই বাড়িতে থাকব বলেই এত যত্নের সঙ্গে এসব করেছি। অথচ এখন এই বাড়িতে আমি আমার পছন্দ অনুসারে থাকতে পারব না । শেষের দিকে লক্ষ্মীনাথের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল। অপরিসীম হতাশা এবং চূড়ান্ত বিরক্তিতে সে ভোলানাথের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল ।

লক্ষ্মীনাথের আবেগিক অবস্থাটার দিকে তাকিয়ে ভোলানাথের রাগ কমে এল। চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কোমল কন্ঠে বলল' ভাত বেড়ে বৌমা অপেক্ষা করে রয়েছে। চল, খেতে চল।’

সতেরো দিন পরে ভোলানাথ এবং লক্ষ্মীনাথ পুনরায় এক সঙ্গে রাতের আহার খেতে শুরু করল। প্রজ্ঞা পরিবেশন করল। প্রজ্ঞার রান্না করা তরকারি দিয়ে ভোলানাথ বেশ তৃপ্তি সহকারে খেল।

কিন্তু লক্ষ্মীনাথ খেতে পারল না। এখনও তার ক্রোধ কমেনি । তার আরও কিছু কথা বলার আছে ।বিশেষ করে নিজে না এসে ভোলানাথ বাইরে থেকে যে চিঠি এবং টেলিগ্রামে একটার পর একটা নির্দেশ পাঠিয়েছিল এবং তার এই ঝগড়াই যে অতুল কৃষ্ণ বাবুর মতো একজন ভদ্রলোককে জড়িত করে কাপুরুষের কাজ করেছিল এইসব লক্ষ্মীনাথের বলতে ইচ্ছা করল। কিন্তু কিছু ভোলানাথকে অনুতপ্ত দেখে লক্ষ্মীনাথের এসব কথা বলতে খারাপ লাগল।

খেয়ে উঠে ভোলানাথ আশ্বাস দেবার সুরে বলল,' বেজ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি ,কিছুদিনের মধ্যে সমস্ত নিষ্পত্তি করব। তোমার প্রতি যাতে কোনো অবিচার না হয় সেটাও দেখব ।’

লক্ষ্মীনাথ আশ্বস্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু এভাবে বলে ভোলানাথ তাকে অনুগ্রহ করতে দেখে তার মাথায় আগুন জলে উঠল।

' শুনুন দাদা, এই কয়েকদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।' লক্ষ্মীনাথের মুখ কঠিন। চোখ দুটি জ্বলছে,' আপনি বি ব্রাদার্স কোম্পানিতে আমার কী অবদান সেই বিষয়ে যা বিচার করার করবেন । কিন্তু আমার প্রতি আপনার মনে অবিশ্বাস জন্মেছে যখন আমি আর বি ব্রাদার্স কোম্পানিতে আপনার পার্টনার হয়ে থাকব না। দ্বিতীয়ত, ৩৮ নম্বর ডবসন রোডের এই বাড়িটা যেহেতু আপনার নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে, নীতিগতভাবে আমার আর এই বাড়িতে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমরা এই বাড়িটা ছেড়ে দেব। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেব। কিন্তু আলাদা একটি বাড়ি খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের এই নিচের মহলে থাকতে দিন।'



Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...