একলা পথে
অভিজিৎ চৌধুরী
একলা পথে
তোমার কাছে অনেক ভীড়
প্রচুর কোলাহল
আমি কথা বলি
সেগুলি কথার কথা হয়ে যায়।নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করে
শ্মশানবন্ধু আকাশে তাক করে
নীল চাঁদকে দেখায়
মনে পড়ে অবিরাম শ্লোগানে মিটিং এ আমি তো একাই ছিলাম।
একলা পথে
অভিজিৎ চৌধুরী
একলা পথে
তোমার কাছে অনেক ভীড়
প্রচুর কোলাহল
আমি কথা বলি
সেগুলি কথার কথা হয়ে যায়।নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করে
শ্মশানবন্ধু আকাশে তাক করে
নীল চাঁদকে দেখায়
মনে পড়ে অবিরাম শ্লোগানে মিটিং এ আমি তো একাই ছিলাম।
পূরবী- ৮৬
অভিজিৎ চৌধুরী
রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পর ঠাকুর বাড়িতে পড়ে রইলেন মহর্ষির দুই বিকৃতমস্তিষ্ক পুত্রের পরিবার।জমিদারির আয় অনেক আগেই চলে গেছিল।শুধুমাত্র লেখা দিয়ে ও অক্লান্ত পরিশ্রম করে রবীন্দ্রনাথ ৬ নম্বর জোড়াসাঁকোর বাড়িটিকে রক্ষা করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর সবই মুহূর্তের কালের অক্ষরে ইতিহাস হয়ে গেল।সেই নাটমঞ্চ সেই খাজাঞ্চিখানা বুড়ো বটগাছ কেয়ারি করা বাগানের বদলে পড়ে রইল একরাশ হতাশা।হয়তো চিলেকোঠার ঘরে নতুন বউঠান অপেক্ষা করতেন রবির জন্য।রবি যে নোবেল পেয়েছেন সেই লোকে গিয়েও তিনি হয়তো হেসেছেনও।বলেছেন,তুমি বড্ডো খ্যাতির কাঙাল।
আজকের ভাষায় তীর্থ বলল,অ্যাওয়ার্ড।
রথী অনেক আগেই চলে গেছিলেন সব কিছু ছেড়ে।
৫ নম্বর জোড়াসাঁকোর বাড়িটিকে রক্ষা করতে পারেননি অবন ঠাকুর।তাঁর কোন রকম বৈষয়িক বুদ্ধি ছিল না।অনেক আগেই ৫ জোড়াসাঁকোর বাড়ি বিক্রি করে তিনি উাঠেছিলেন ভাড়াবাড়িতে।
জোড়াসাঁকোর বাড়িগুলির দিকে তাকিয়ে খুব কান্না পাচ্ছিল তীর্থের।মনে হচ্ছিল,হে ছলনাময়ী, তোমার সৃষ্টির পথে শুধুই কি বাসন্তীর দীর্ঘশ্বাস!
একবার সে সকলের সঙ্গে বউঠানের কাছে এলো।
তিনি যেন বললেন,তুমি কে!
তীর্থ বলল কোমল স্বরে, আমি তীর্থ।
তিনি ফিসফিস করে বলে উঠলেন,তুমি রবি।ছদ্মবেশে আমায় ঠকাতে এসেছ!
আকাশে তখন এক ঝলক রামধনু দেখা দিয়েছে।
দিনের আলো গভীরে গেলে রাত হয়,আবার বসে সাহিত্য বাসর।
পূরবী- ৮৫
অভিজিৎ চৌধুরী
এই নে আমার বীণা দিনু তোরে উপহার,/ যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।
বারবার বলতেন আমার গান থাকবে।
কতো রাত তীর্থের কেটেছে গহন অন্ধকারে রবিবাবুর গানু শুনে।
ঘুম না হলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে না।আইনস্টাইন দশ ঘন্টা ঘুমের কথা বলতেন।নেপোলিিয়ন নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমিয়ে নিতেন।কখনও কখনও তিনি নাকি ঘোড়ার ওপর শুইয়ে পড়তেন।
সেন্ট হেলেনা বা এলবা দ্বীপে তাঁর কি ঘুম আসতো! প্রতিদিন তাঁর শরীরে চলছে বিষক্রিয়া। অবশ্য তিল তিল মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও পড়াশুনাটা ছাড়েননি।বলেন নি আমার সময় নেই বা মন খারাপ।
কাল সারা রাত আপনি
তো ঘুমোন নি!
হাসলেন রবীন্দ্রনাথ। বললেন, হ্যা।পারিবারিক একটা বিবাদে মন ভারাক্রান্ত ছিল।
ভোরে দেখলাম গান গাইছেন।
গানের সুর, ভোরের আলো মনটাকে পরিশ্রুত করল।তাই তো এসেছি উপাসনা গৃহে।
তোর গানে গলে যাবে সহস্র পাষাণ- প্রাণ।
বেথুন সোসাইটির ডাকে মেডিকেল কলেজ হলে প্রবন পাঠের কথা ছিল।বিষয় ছিল সংগীত।রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন এসেছিলেন।
মেডিকেল কলেজ হলে তারা বাংলার লেখক সন্মাননা পেয়েছিল তীর্থ আর অনেকের সঙ্গে।
তখন বারবার মনে হয়েছিল,রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন।বিষয় ছিল সংগীত।
পূরবী - ৮৪
অভিজিৎ চৌধুরী
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা মাঘ ১৩০১ ও ১৮১৬ শকাব্দ লেখা হল - সর্বপ্রথমে ঘন্টারব হইল।তখন সকলে ব্রহ্মোপসনার জন্য প্রস্তুত হইলেন এবং শ্রদ্ধাস্পদ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অগ্রবর্তী করিয়া মঙ্গল গীত গাহিতে গাহিতে মন্দির প্রদক্ষিণ করিলেন।পরে আচার্যেরা বেদী গ্রহণ করিলে শ্রদ্ধাস্পদ বাবু ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অগ্রবর্তী করিয়া মঙ্গলগীত গাহিতে গাহিতে মন্দির প্রদক্ষিণ করিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্রহ্ম উপাসনা যে শুরু হল তার একদম উল্টোদিকে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম আই সি এস হলেন ১৮৬৪ সালে।ইংল্যান্ড গিয়ে তখন পরীক্ষা দিতে হতো।কংগ্রেস তখনও গঠিত হয়নি স্বাধীনতার ভাবনা দূর অস্ত।সিভিল সার্ভেন্ট হতে পারাকে একটা মাইলস্টোন হিসেবে ধরা হল প্রতীচ্য সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার।
রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেছেন ১৮৬১।
একদিকে উপাসনা অন্যদিকে ইউরোপীয় সংস্কৃতির চর্চা এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তিনি বেড়ে উঠছেন।
ইউরোপ যাত্রার ডাইরিতে তিনি লিখেছিলেন,সেই সভ্যতার মাঝখানে ঝাঁপ দিয়ে তিনি আঘাত আবর্ত সবকিছু অনুভব করতে চেয়ে ছিলেন।
তারপর শিলাইদহে গিয়ে এক অন্য রবীন্দ্রনাথের যাত্রা।
জীবন যদি বহুমাত্রিক না হয় তবে তা আন্তর্জাতিক তো দূরের কথা এই দেশেরও হতে পারে না।
তীর্থ অপেক্ষা করছে এক অনাবিল মুক্তির যেখানে সে অনুভব করতে পারব সামগ্রিক মানব সত্তার।
ব্রাহ্ম সংস্কৃতি বা ধর্ম তাও কি ধরে রাখতে পেরেছে রবিবাবুকে।সরস্বতী বন্দনাও রয়েছে তাঁর গানে।পৌত্তিলকতাও সৃষ্টির কারণে গ্রহণীয়। শেষ অবধি পূরবীর বেলা অবসানেও তাইই ছিলেন।
পূরবী -৮৩
অভিজিৎ চৌধুরী
ফুটবলে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহের ফসল মোহনবাগানে খেলতে পাঠানো এক যুবককে।বোধহয় সূর্য নাম।তথ্য ঘাঁটতে ইচ্ছে করছে না।সেই ছেলেটি শেষমেশ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলে।
তীর্থের কিশোরবেলা জুড়ে ছিল ফুটবল।কোনদিনই ফুটবলার হওয়ার জন্য খেলেনি সে।খেলত নিছক আনন্দে। সেই আনন্দে সবুজ মাঠ,সেমিফাইনালে ওঠা,ফাইনালে হারা এসব থাকত।
তবে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে মেয়েদের আত্মরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে জাপানি কুস্তিগীর এনেছিলেন।মেয়েরা কেউ এগিয়ে না এলে লিখলেন,সংকোচেরই বিহ্বলতা নিজেরই অপমান।
রথী লিখেছিলেন,বাবা অনায়াসে পদ্মা পার করতেন তখন।
তবুও নির্জনতা,প্রকৃতির কাছে যাওয়া ছিল খেলায় খেলায় কাটানো সারাবেলা।
প্রকৃতির কোলে মানুষ কি স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়তে পারে!
না,রবীন্দ্রনাথও পারেননি।
শল্য চিকিৎসায় সংজ্ঞা হারিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আমি চিত্রাঙ্গদা, রাজেন্দ্রনন্দিনী।
সেই রাজেন্দ্রাণীকে ফেলে তিনি চলে গেলেন কি কিন্নরের দেশে!
পূরবী- ৮২
অভিজিৎ চৌধুরী
আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাধন কি তোদের আছে।
স্বদেশ ছাড়ার পর দুজনকে চিঠি দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।একজন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আরেকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
গান্ধীজী উত্তর দেননি।তবে ব্রিটিশ সরকারকে সুভাষ বোসের গতিবিধি জানিয়ে সাহায্যও করেননি।বরং খণ্ডিত স্বাধীনতার সময় বলেছিলেন নেহেরুকে, সুভাষ থাকলে এই স্বাধীনতা গ্রহণ করত না।
বোঝা যায় ভারতীয় রাজনীতিতে তিনিও তখন বেশ একলা।
তীর্থের কোন্নগর নবগ্রামের বাড়িতে তিনটে ছবি ছিল - সুভাষচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ।
কিন্তু অপেক্ষা ছিল একজনের জন্য। তিনি সুভাষচন্দ্র।তিমির উদার অভ্যুদয়।
সুভাসচন্দ্র কিশোর তীর্থকে কথা দিয়েও আসেন নি।রবীন্দ্রনাথ তাসের দেশ উৎসর্গ করলেন সুভাষচন্দ্র।কেন!
এই চিন্তা- নায়ক সমস্ত বিরুদ্ধতাকে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন বলেই কি!
ভিন্ন প্রসঙ্গে, সমকালে আসি।প্রভাত চৌধুরী মারা গেলেন।তিনি বলতেন,কবিরাই রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করেন।জীবনানন্দকে বড় কবি বলতেন না।জীবনানন্দকে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বলেছিলেন এরকমটাই তোমার কবিতার কেন্দ্রে যে বিষণ্ণতা রয়েছে তাকে আমি ভালোবাসি না।
তাই বিষণ্ণতা অতিক্রম করেই এগোতে হবে।
কুয়াশার বিষণ্ণতায় বিবস্বান জাগুন,,প্রার্থনা করল তীর্থ।
পূরবী -৮১
অভিজিৎ চৌধুরী, Purabi-81
পূরবী -৮০
অভিজিৎ চৌধুরী
মেজ বউঠান ঠিক করিলেন বালক বাহির কটিবেন।
উদ্দেশ্য ছিল ঠাকুর বাড়ির বালকেরা নিজেদের রচনা এখানে প্রকাশ করবে।অচিরেই লেখার অভাব পড়ল, ডাক পড়ল রবীন্দ্রনাথের।
এই সময় রবীন্দ্রনাথ কিছুদিনের জন্য দেওঘরে রাজনারায়ণবাবুর কাছে গেছিলেন।
ফেরার সময় ট্রেনে ঘুম আসছিল না বলে ভাবলেন বালক পত্রিকার জন্য গল্প লিখবেন।গল্প লেখা হল না।শেষমেশ ঘুমিয়ে গেলেন আর দেখলেন স্বপ্ন।
লেখা হল রাজর্ষি।বালকে ধারাবাহিক ভাবে বের হতে লাগল।
তীর্থকেও এরকম পাতা ভরানোর লেখা লিখতে হয়।যা কিছু একটা হবে লিখতে গিয়ে অনেক সময় খানিকটা পুরোনো লেখারও মার্জনা হয়েছে।
পূরবী- ৭৯
অভিজিৎ চৌধুরী
বর্ষশেষের পূরবীর রাগে কেমন বেসুরে বীণা বাজে।কোথায় সেই রোদনভরা বসন্ত।সখীর কুসুম কোমল হৃদয় আছে কি! ই ইংরেজি পয়লা তো নিজের নয়।
চার্চে নতুন বছরের ঘন্টা।ইংল্যান্ড। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,পুরোনো সেই দিনের কথা।
জোড়াসাঁকো। অধ্যাপিকা নিয়ে গেলেন সেই ছাদে।উড়ে এলো কি সেই সুবাস!
নতুন বউঠানের মৃতদেহ,ঝুলে পড়া চুল ওপারে ৫ জোড়াসাঁকোর বাসিন্দারা দেখতে পান।সেই খোলা ছাূে আর একটি ঘর যক্ষা হওয়ার পর রেণুকা থাকতেন।
পেরুর একটি প্রতারিত আমন্ত্রণপত্রে পথভুলে বুয়েনাস আয়ার্স।প্লাতা নদী ও কবির বিজয়া।বয়স তখন ৬৩।চিত্রকরের ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কবির জীবদ্দশায় আর এলেন না।
পূরবী- ৭৮
অভিজিৎ চৌধুরী
আমার পিতা সেই শিখ উপাসকদের মাঝখানে বসিয়া সহসা এক সময় সুর করিয়া তাহাদের ভজনায় যোগ দিতেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,ফিরিবার সময় মিছরির খণ্ড ও হালুয়া লইয়া আসিতেন।
জালিয়ানা হত্যাকাণ্ডের পর যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বুদ্ধিজীবীরা যখন নীরব ছিলেন,তখন রবীন্দ্রনাথ একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন।সেই প্রতিবাদের সাহসী চিঠি, নাইটহুডকে প্রত্যাখান আজকের সময়ের নিরিখেও অনন্য। আজও শুনেছি অমৃতসরে শোকজ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিও উঠে আসে বিনম্রতায়।
এক নিতান্ত বালকের সেই স্মৃতি, যেন এক উজ্বল পরম্পরা হয়তো সহিষ্ণুতার স্মারক। শুধু ইউরোপ নয় ভারতীয় রাগ সংগীতও রবীন্দ্রনাথ নিজের মতন করে আত্মস্থ করেছিলেন।
এই যে ছড়িয়ে যাওয়া নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আটকে না থাকা তা হয়তো ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলও সহায়ক হয়েছিল।
তবুও তীর্থ মনে করে ব্যক্তি যখন বিবস্বানের দীপ্তিতে প্রতিভাত হন তখন তিনি আবহমসনকালের মন্ত্রে নিজেকে দীক্ষিত করেন।তাঁর পরিবার,আত্মজনদের পক্ষেও বিপুলা ধরিত্রীর মানসপুত্রকে ক্রমশ অচেনা লাগে।
পূরবী- ৭৭
অভিজিৎ চৌধুরী,Purabi- 77
যে সংসারে প্রথম চোখ মেলেছিলুম সে ছিল অতি নিভৃত।শহরের বাইরে শহরতলীর মতো, চারিদিকের কলরবে আকাশটাকে আঁট করে বাঁধে নি।আর বললেন,আমাদের পরিবার আমার জন্মের পূর্বেই সমাজের নোঙর তুলে ধরে বাঁধাঘাটের বাইরে এসে ভিড়েছিল।
তীর্থ জন্ম সূর্য সেন স্ট্রিট।এক অখ্যাত নাম না জানা পরিবারে।সেখানে কোন স্বাতন্ত্র্য নেই,তার অভিমানও নেই।রোদ্দুর নেই,আলো বাতাস নেই।আছে শুধু বারুদগন্ধ।তবুও সেখানে বাপ্পাদের বাগানবাড়িতে কাঠগোলাপ ফোঁটে,যদিও সবুজ ঘাস নেই।কোন শ্রীও নেই যেমন উত্তর মধ্য কলকাতায় হয়ে থাকে।আছে শুধু সামান্য কারণে মানুষে মানুষে হানাহানি।
সেই জগতে কৃতজ্ঞতা শব্দটা বড্ডো বেমানান।
কালো বেড়াল বারবার ভয় দেখায় নতুন কোন দুঃস্বপ্নের।
পূরবী- ৭৬
অভিজিৎ চৌধুরী,Purabi- 76
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,চতুর্দশীর চাঁদ উঠেছে- চমৎকার হাওয়া দিচ্ছিল,ছাতে আর কেউ ছিল না।আমি একলা পড়ে আমার সমস্ত জীবনের কথা ভাবছিলুম।
পুরোনো স্মৃতিগুলি যেন মদের মতোন।যতো বেশীদিন সঞ্চিত হয়ে থাকে, ততোই তার বর্ণএবং স্বাদ,এবং নেশাও মধুর হশে আসে।
তীর্থও ভেবে দেখেছে জীবনে যদি বিয়োগ না থাকত, জীবন কি এতোটা সুন্দর হতো।সময় যদি থমকে থাকত, আলুনি লাগত নাকি বেঁচে থাকা।
সে কি কখনও ভেবেছিল মধ্য বয়স অতিক্রান্ত হলেও সুধার শেষ হয় না।
তাই তো মধুর তোমার শেষ যে নাহি পায় প্রহর হল শেষ।
বারাকপুর আসার পর থেকে প্রকৃতি আর নিকটবর্তিনী নেই।শিলাবতী নেই,নেই সে ভোরবেলার বকুল গাছ।এমন কি হুগলির হরি মাঝিও নেই,যার মাছধরার নৌকোয় শরতের কাশ স্পর্শ করেছিল তীর্থ।
পূরবী- ৭৫
অভিজিৎ চৌধুরী
আই ডাই অ্যান্ড ইয়েট নট ডাইস অন মি।
আমায় নইলে তোমার প্রেম হতো যে মিছে।
কখনও কখনও প্রেম ও পুজো মিশে যাচ্ছে।আমি চলে যাব কিন্তু আমার যাবতীয় কিছু যদি তোমার ইচ্ছের সঙ্গে মিশে যায়, তবে ঈশ্বরের আরাধনায় সত্যি হবে কিন্ত ভালোবাসায় কি একই রকমের সত্যি হবে!
বউঠান বলতেন,তুমি বড় খ্যাতির কাঙাল।তুমি ভালোবাসার কাঙাল হতে পার না! মুক্ত কণ্ঠে বলতে পার না আমি ভালোবাসি।
বহু বছর পরে যখন লিখলেন ভালোবেসেছিনু এই ধরণীরে,ভালোবেসেছিনু।
সেকি শুধু কল্পমায়া!
আর আসেননি ওকাম্পোর।আড়ালে থেকে প্যারিসে প্রবীণ রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন।
যখন বিজয়া নাম দিলেন তখন আর দেখা নেই।
চির বিচ্ছেদ থেকে মুক্তির সন্ধান।
কোন সমুদ্রে আপনি অবগাহন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ! ভালোবাসা না ঈশ্বরীয় প্রেমের!
উত্তর হবে মানব মানবীর প্রেমের।
কিন্তু ভয় পেয়েছেন কবি।নিজের রক্ষণশীলতার কাছে বারবার হার হয়েছে!
নাকি কোন দ্বিধা!
পূরবী- ৭৪
অভিজিৎ চৌধুরী
রবীন্দ্রনাথ তখন লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন।ইংরেজি পড়াতেন হেনরি মরলি।রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,তিনি কোন শব্দের অর্থ বলতেন না কিন্তু এমন ভাবে আবৃত্তি করতেন সবটা কল্পনায় স্পষ্ট হয়ে যেত।
সপ্তাহান্তের ছুটির আগের দিন ছাত্ররা তাঁর ডেস্কে নিজেদের নাম না লিখে প্রবন্ধ গুঁজে দিয়ে আসত। আর পরের সপ্তাহে স্যর হেনরি মরলি সমালোচনা করতেন।
রবীন্দ্রনাথ একবার করলেন কি ইংরেজদের নিন্দে করে একটা প্রবন্ধ হেনরি মরলির ডেস্কে রেখে এলেন।যদিন সমালোচনা হওয়ার কথা পালিয়ে এসে নির্জনে বসে রইলেন।হয়তো কপালে অশেষ দুঃখ আছে।
এই সময় সহপাঠী লোকেন পালিত এসে পীঠ চাপড়ে দিলেন।
কি লিখেছ রবি,আজ তো তোমার জয় জয়কার।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,প্রশংসা বরাবরই আমার ভাগ্যে জোটেনি।সেদিনযেন নতুন সূর্যোদয় হল।
তীর্থ ভাবছিল,সেদিনের যুবকের জীবনে সূর্যোদয় বড্ডো বিলম্বিত ছিল।
কিন্তু যেদিন তা এলো নোবেল প্রাইজের বাহক হয়ে, তিনি ছিলেন অন্যমনে।চাঁদের আলোয় যাচ্ছিলেন বনভোজনে।তা কিন্তু বাাতিল হল না।
শান্তিনিকেতন থেকে ১৯১২ তে ইংল্যান্ড যাওয়ার প্রাক্কালে যখন Songs Offerings শুরু করেছিলেন,মনে হয়েছিল এ যেন অন্য কোন আহ্বান।অশ্রুত।
শেষ জন্মদিনের আগে লিখেছিলেন,হে নূতন দেখা দিক আরবার....
সেই নব উন্মেষ চিরকাল প্রবহমান রইল।
জীবন তো তাই।প্রতিটি ক্ষণ নতুন করে দেখা।
পূরবী-৭৩
অভিজিৎ চৌধুরী
শান্তিনিকেতনে নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির সম্বর্ধনা সভায় কবি বলেন,দেশবাসী এতোদিন ধরে যে অপমান ও অপযশ দিয়ে এসেছেন,তার পরিমাণ কম নয়।আর আমার কবিতায় কখনও রৌদ্র,কখনও বা মেঘের ছায়া।ফলে এই ভালবাসাও সাময়িক।আর নোবেল প্রাইজ সাহিত্যর মাপক হতে পারে না।আমি পূর্বের উপাসক, কেন পশ্চিম আমায় গ্রহণ করল জানি না।তবুও আমার কৃতজ্ঞতা রইল।
আর আমি কোন জননেতস নই, কোন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অধিকারীও নই,ফলে আমি সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বও করি না।
ফলে আপনাদের মদিরা ওষ্ঠ স্পর্শ করল কিন্তু গলাধঃকরণ করতে পারল না।
তীর্থ আরেকবার তাকাল কবির প্রতিকৃতির দিকে।নভেম্বর মাসে তিনি নোবেল প্রাপ্তির সংবাদ পান।সেদিন হয়তো আনন্দের সঙ্গে সংমিশ্রিত ছিল দীর্ঘ দিনের অপমান।আজও রবীন্দ্রনাথ কারণে অকারণে লাঞ্ছিত হন।
ওপরের তাঁর প্রতিক্রিয়া তীর্থ নিজের মতোন করে লিখেছে।রবীন্দ্রনাথ অনুমতি দিয়েছেন,সে টের পেলো ছাতিম ফুলের গন্ধে।
পূরবী- ৭২
অভিজিৎ চৌধুরী
আমি প্রকৃতির সন্তান,আমাকে প্রকৃতির বুকে ঝরে পড়তে দাও।পুত্র রথীন্দ্রনাথকে তিনি এরকমটাই বলেছিলেন।
চিরকাল বাবার ভাস্বরে রথীকে খুব ছোট মনে হয়েছে।নিজের সত্তার অনেকটাই বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি।আক্ষেপ দেখাননি কখনও।পিতৃস্মৃতিতেও কি অনন্য অনুভব তাঁর এমন এক মহাজীবনকে কাছ থেকে দেখায়।
তীর্থ ভাবছিল অতিরিক্ত স্তাবকতা কবিকে শেষ জীবনে কিং লিয়রের মতোন করে তুলেছিল।মানুষ চিনতে ভুল করতেন।কিছুটা ব্যতিক্রম রথী।আর বারবার ফিরে যাচ্ছেন নতুন বউঠানের কাছে।সেই প্রথম দিকের সাহিত্য সঙ্গী।এক অসমাপ্ত জীবনে কিছু রেখাপাত রেখে মানুষের চলে যাওয়া।বউঠান বলতেন,রবি, তুমি বড় খ্যাতির কাঙাল।
তবুও তিনি যে সংমিশ্রন পৃথিবীর যাবতীয় সংস্কৃতির, ধর্মের হয়তো ভূগোলেরও।
আর গোপনে নতুন বউঠানকে ডেকে বলা,তুমি কি চাও না আমার লেখা সকলে পড়বে!
না,চাই না।এই লেখাগুলি শুধু তোমার আর আমার।
পূরবী- ৭১
অভিজিৎ চৌধুরী
অনেক বছর আগে একটু অপরিচিত এক কাকুর বিয়ে হচ্ছে।যিনি বর তিনিই দেখিয়ে দিচ্ছেন কলাপাতা কেমন করে টেবিলে সাজাতে হবে।তীর্থ একটু অবাক হয়েছিল,বউকে ফেলে বিশেষ করে যখন নতুন এরকম কেউ খাওয়ার টেবিলের তদারকি করতে পারেন! পরে জেনেছে একে বলে কাল রাত্রি।
বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস চলে যাচ্ছে।কেউ কেউ ভাবছে, উটকো ঝামেলা।দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটিং যেমন অচল,সম্পর্কও তাই।অস্থায়ী।
রবীন্দ্রনাথের জন্য পাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না।শেষমেশ হল।তিনি নিজেই বিয়ের চিঠি লিখলেন।একজন চলে গেলেন পরে পরেই।নতুন বৌঠান।কেন গেলেন চিরঘুমের দেশে।হয়তো ভোলেননি কখনও তাঁর সেই সাহিত্য সঙ্গীর কথা,যাঁকে কিছুতেই লিখে চমকে দেওয়া যেত না।
পূরবী- ৭১
অভিজিৎ চৌধুরী
পূরবী- ৭০
অভিজিৎ চৌধুরী
কোজাগরী পূর্ণিমা খুব কাছেই।তারও আগে তুমুল নির্বাচন পর্ব।জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যাওয়ার কথা হল।অধ্যাপিকা দেখাবেন।বাইশে শ্রাবণের ঘরে আজও জমাট বেদনা রয়েই গেছে।বুড়ো বটগাছ আর নেই।পুকুরটা রবীন্দ্রনাথের সময়েই উধাও হয়ে গেছিল।আছে দক্ষিণের বারান্দা। অবন ঠাকুরের বাড়ি।যাব,যাব সেই কবে থেকে বাজছে বীণা।শুধু সুরের বৈঠক আর হচ্ছে না।হৃদয়ের রাজা গেছে হারিয়ে।শিলাবতীর তীরে প্রলম্বিত ছায়ায় নতুন মানুষের কলরব নিশ্চয়ই।
শিলাদিত্য ছিল একলা পথের চিরসঙ্গী।এখন সে আছে জঙ্গলমহলে কিন্তু তীর্থ বহুদূরে নগরায়ণের ঘেরাটোপে।
একদিন সে লিখল,হৃদয়ের রাজা আর কবে দেখা হবে!
তীর্থ বলল,তিনি আসবেন।কথা যখন দিয়েছেন,তিনি আসবেনই।শুধু মনের হাট খোলা রাখতে হবে।
রুণুর দুঃখ / অণু গল্প
অভিজিৎ চৌধুরী
এক রাগী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মানে এখনও আছেন।যে রুমটায় বসেন তার নাম মুশকিল আসান।ঘরে এলে,দেখা করলে মুশকিল আসান হয় বটে তবে বকাও খেতে হয় ব্যাপক।
বকা দিয়ে তিনি অবশ্য জামা দেন,লজেন্স দেন আবার কলমও দেন।
প্রায় ভাবেন রাগ করবেন না বরং একটা দ্বীপ কিনবেন।রাগ মানে তো লস বা লোকসান।
দ্বীপ কিনবেন হাভানা বা কেপ অফ গুড হোপ।কেউ উনাকে এমনটা বলেছে।কিন্তু রাগনতো কমে না,যতোই রাগ নিরোধক ক্যালপল খান না!ফলে দ্বীপ কেনা হয়ন আর।
একদিন হল কি- কলকাতায় খুব বৃষ্টি হল।জলে জলাকার চারিদিক।রুণু ম্যাডাম আবার অফিস কামাই করতেন না।কিন্তু সেদিন উপায় নেই,গাড়িবডুবে যাচ্ছে জলে।অগত্যা যাওয়া হল না।ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখলেন বাড়িটা যেন দ্বীপের মধ্যে এক জেগে রয়েছে।স্বপ্নও দেখলেন বিস্তর।একদিনের ছুটিতে দ্বীপের স্বপ্ন সার্থক হতে দেখে আনন্দ হল বেশ।সন্ধেয় অনেক দিন পর বাগমারিতে ব্যাঙসহ প্রচুর শেয়ালও হুক্কা হুয়া জুড়ে দিল কারণ তাদের গর্তে জল ঢুকে গেছিল।
রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরদিন সকালে রোদ দেখে আনন্দ হল খুব।রাগও দেখলেন নেই।থার্মোমিটারে রাগের তাপমাত্রা ৯৮।
সেই থেকে রুণুর দুঃখের অবসান হল।