অসমিয়া সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অসমিয়া সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি । । মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, তৃতীয় অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

......

তৃতীয় অধ্যায়

তিন 

ফ্লাইট ফাইভ জিরো এইট সি।

কলকাতার সময় রাত বারোটা ত্রিশে প্লেইনটা 

কুনমিঙ অভিমুখে উড়ে যাবে। এখন সময় রাত এগারোটা বেজেছে।

আধ ঘন্টার মধ্যে হাতে থাকা টাকার কিছুটা য়ুবানে আর হিসাবের কিছু টাকা লাউ কিপে বদলে নিলাম।

আমার হাতে থাকা সাধারণ কাপড়-চোপড় ভরা ব্যাগটা নিয়ে আমি এগোচ্ছি চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের লাগেজ চেকআপ করার বিশেষ জায়গাটায়। ব্যাগটা এক্স রে মেশিনে পরীক্ষা করে সিকিউরিটি ট্যাগ ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়ায় এবার বোডিং পাশের দিকে এগিয়ে গেলাম। ব্যাগটা কাউন্টারের যথাস্থানে দিয়ে বোর্ডিং পাশটা নিয়ে অন্যান্য নিরাপত্তা জনিত কাজকর্ম গুলি সম্পূর্ণ করে লাউঞ্জে  এসে বসেছি। আমার হাতে একটা ক্যানন  ক্যামেরা। সিকিউরিটি চেক আপের সময় ক্যামেরার ব্যাগটিতে জলের বোতল ও ভরে রেখেছিলাম। লঙ্গে বসে দুটি ইংরেজি কাগজ এবং ম্যাগাজিনের পাতা এক দিক থেকে উল্টে যাচ্ছি। পেট ভর্তি, মোটেই ক্ষুধা লাগে নি, এমনকি যাত্রার উৎসাহের জন্য ঘুমও আসছে না। ফ্লাইটের সময় হয়েছে বলে ঘোষণা করায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে পাঁচ নম্বর গেটে এসে উপস্থিত হলাম।

এগারো  নাম্বার সারির এফ আসনটা আমার । জানালার পাশে। জানালার বাইরে কলকাতা বিমানবন্দরের উজ্জ্বল অনুজ্জ্বল আলোর রাশির বিচিত্র সমাহার। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যয় বিধর্ম বিমানটি আমার আসনের সামনের মনিটরে সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে গান শোনা পর্যন্ত সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। আমি সেসবে ভ্রুক্ষেপ করছি না। আসনটাকে হেলান দিয়ে আমি শরীরটাকে আসনে ছেড়ে দিলাম। আরামদায়ক আসনটিতে  শরীরটা শোবার ভঙ্গিমা গ্রহণ করেছে। চাইনিজ এয়ার হোস্টেজ একজন কাছে এসে আমাকে বিমানটা টেক অন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানাল। আমি আসনটা পুনরায় চেয়ারের মতো করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

নির্দিষ্ট সময় বারোটা ত্রিশ  মিনিটের পাঁচ মিনিট আগে বিমানটা উড়ার প্রস্তুতি নিল। কয়েকজন এয়ার হোস্টেজ নিয়মমাফিক বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ক কলা কৌশল দেখাল। কৌশল গুলি দেখানো হয়ে গেলে ক্যাপ্টেন এয়ার হোস্টেস কয়জনকে নির্দিষ্ট আসনে বসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিমানটা ধীরে ধীরে চালাতে শুরু করলেন। বিমানটা পার্কিং প্লেস থেকে এসে রান ওয়ে পৌঁছাল। রানওয়েতে ধীরে ধীরে দৌড়াতে আরম্ভ করা বিমানটির গতিবেগ ক্রমশ বাড়তে লাগল এবং বিমানটি ভূভাগ ছেড়ে আকাশ মার্গে উড়তে লাগল। ঊর্ধ্বগামী হেলানো বিমানটি একটা সময়ে মাঝ আকাশে সুস্থির অবস্থা পেল। বিভিন্ন যাত্রী শোবার জন্য নিজের নিজের আসনটাকে হেলিয়ে নেওয়ায় আমিও তাই করলাম। বিমান পরিচারিকারা কে কী খাবে তার ফরমায়েস নিচ্ছে। ভূরি-ভোজন করে আমার উদর পরিপূর্ণ। আমি কিছুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচারিকা জিজ্ঞেস করায় আমি ভদ্রতার সঙ্গে কিছুই লাগবে না জানালাম।

কুনমিঙ পৌঁছাতে পৌঁছাতে চিনের আকাশ রৌদ্র স্নাতা হয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ আট ঘন্টা আমাকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে কাগজপত্র আর বই পড়ে আর মানুষ দেখে কাটাতে হবে। বিমান থেকে নেমে এসে আমি লাউঞ্জে বসেছি। বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মানে পুনরায় সিকিউরিটি চেকআপ, কাস্টমসের চেকআপ, নানান ঝামেলা। অন্যদিকে আমার চাইনিজ ভিশা নেই। ঝামেলা কমানোর জন্য আমি লাউঞ্জে বসে থাকতে  বাধ্য হয়েছি। কুনমিঙ ব্যস্ত বিমানবন্দর। লোকজন আসছে যাচ্ছে। আমি খবরের কাগজের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি। কফি কিনে খাচ্ছি। মাঝখানে গিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করে এসেছি।

ব্যাগটা, ব্যাগটার কথা মনে পড়ায় আমি দ্রুত চারপাশে ব্যাগটা খুঁজতে লাগলাম। ধ্যাত, ব্যাগটা তো আমি ভিয়েতনামে পাব। আমি পুনরায় কাগজের পাতায় মনোনিবেশ করলাম। মাঝখানে একটু ঝিমুনির মতো এল।ঘুমের মধ্যে আবছাভাবে মাকে দেখতে পেলাম। চিতার আগুন দেখে এবং গুলি ফাটানোর শব্দ শুনে উড়ে যাওয়া বকের কয়েকটি ঝাঁক মানসপটে ভেসে উঠল। পাখিদের পাড়া-পড়োশির দু-একটি দৃশ্য আমার ঘুমের আমেজকে বিরক্ত করে দূরে চলে গেল। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার আমি এক কাপ কফির জন্য এগিয়ে গেলাম। পয়সাগুলি যুবানে না ভাঙ্গালেও চলে যেত। বিপনীটা  ডলারও গ্রহণ করে। আমার হাতে তো ডলারও ছিল না, তাই ডলার নেবার চেয়ে য়ুয়ান নিয়েছি, ঠিকই আছে।

বারোটার সময় কিছুটা ক্ষুধা পেল। চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার ইচ্ছা হল। চিনে চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার মজাই হয়তো আলাদা হবে। একটা বিপনিতে  আমি নুডুলস এবং কফির কথা বললাম। ছোটো ছোটো চোখ  এবং কোমর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া চুলের পরিচারিকা  জিজ্ঞেস করল— ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলস? এখনকার নুডুলস বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। সেই জন্য আমি সম্মতি সূচক  ভাবে মাথা নাড়লাম। পরিচারিকাটিকে যথেষ্ট অতিথি পরায়ণ বলে মনে হল এবং সেই সাহসে ভর করে পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম— চাইনিজ ভাষায় কি বলে?

—-গুও য়িয়া ও মিয়ান।

পরিচারিকাটি  আমি অর্ডার দেওয়া ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলসের চাইনিজ তরজমা করে নিল। জানিনা আমি কতটা শুদ্ধভাবে শুনতে পেয়েছি। তবে দাম শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। নুডুলস এর দাম ৭৬ য়ুয়ান এবং এক কাপ কফির দাম পঁচিশ ওয়ান। মোট একশত য়ুয়ান। ভারতীয় হিসেবে এক হাজার দশ টাকা । অর্থাৎ আমার দুপুরের খাবার খরচ আমার দশ দিনের খরচের সমান।

আমার কাছে বসা একজন সাদা চামড়ার বিদেশি লোক এক কাপ কফি হাতে নিয়ে কীসব বিড়বিড় করছিল। নুডুলসটা খেয়ে  কফির কাপটা হাতে নিয়ে আমি মানুষটার কাছে বসায় তিনি আমার কাছে তার আপত্তির কথা বলতে লাগলেন।

—একই কফি, আমি কুনমিঙের  রেস্তোরায় সকালবেলা খেয়ে এসেছি, ত্রিশ য়ুয়ান  নিয়েছে, এখানে নিচ্ছে ছিয়াত্তর য়ুয়ান। দ্বিগুণেরও বেশি।

— নেবেই। সমস্ত এয়ারপোর্টে একই ব্যাবসা। দিল্লির কফি হাউসে যে কাপ কফির দাম ষাট  টাকা, সেই কাপ কফির দাম এয়ারপোর্টে  ২৬০ টাকা। আমি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যাইনি, হয়তো সেখানেও একই ব্যাপার হবে।

বিদেশি ভদ্রলোক কফির কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে কফি কাপের সম্পূর্ণ পয়সা উশল করার তৃপ্তি লাভ করার চেষ্টা করলেন।

দেড়টার সময় তিন নম্বর গেটের সামনে ভিয়েনটিয়েন  অভিমুখী বিমানের জন্য যাত্রীরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াতে লাগলেন । আমিও এসে দাঁড়ালাম । একই ফ্লাইটের আসন সংখ্যা । সঠিক সময় দুটোতে বিমানটা যাত্রা আরম্ভ করেই মাত্র আধা ঘন্টার ভেতরে ওয়েট্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হল । বিমানবন্দরে পুনরায় কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য প্রসাধন কক্ষে প্রবেশ করলাম ।আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে প্রসাধন কক্ষ সমূহ আন্তর্জাতিক মানদন্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ইমিগ্রেশন কাস্টমস চেক ইত্যাদি সম্পন্ন করে এবং কিছু পয়সা ভাঙ্গানোর জন্য বিদেশি মুদ্রা পরিবর্তন করা একটা কাউন্টারে গেলাম। লাওয়ের মুদ্রাকে কিপ বলা হয় । আমাদের এক টাকা একশত কুড়ি  দশমিক আটান্ন লাওয়ের সমান। এসব করে বিমানবন্দরের বাইরে যেতে চারটা বেজে গেল। 

আমি এখন বিদেশের মাটিতে। জীবনে প্রথমবারের জন্য বিদেশের মাটিতে পদার্পণ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমি দীর্ঘশ্বাস নেবার চেষ্টা করছি এবং চারপাশটা পলকে দেখে নিচ্ছি।

আমার এখন গন্তব্যস্থান ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস স্টেশন। বিমানবন্দর থেকে সেন্ট্রাল বাস স্টেশন প্রিপেইড ট্যাক্সিতে গেলে সাত ডলার নেয়।সাতান্ন  হাজার কিপ। নেটে বিভিন্ন পর্যটকের মতামত থেকে জানতে পেরেছি ভিয়েনটিয়েন সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাবার ভিন্ন সবচেয়ে সস্তা হল বাস পরিবহন ব্যবস্থা। তার জন্য আমি বিমানবন্দর থেকে মূল পথে মাত্র পঁচিশ  মিটার পায়ে হেঁটে গেলেই হল। পায়ে হাঁটা মানুষের পেছন পেছন এসে আমি মূল পথটা পেয়ে গেলাম। এখান থেকে ত্রিশ  নম্বর বাসে উঠলে সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাওয়া যায়। দূরত্ব মাত্র তিন  কিলোমিটার।ভাড়া চার হাজার কিপ। আমাদের ওখানকার টেম্পোর মতো এখানে টুকটুক চলে । এখান থেকে টুকটুকে সেন্ট্রাল বাস আড্ডার ভাড়া পঞ্চান্ন  হাজার কিপ। কিন্তু দরদাম করলে ভাড়ার পরিমাণ হয় ত্রিশ হাজার কিপ। আমি ত্রিশ নম্বর বাস ধরে ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস আড্ডায় পৌঁছে গেলাম । এখন এখান থেকে যেতে হবে ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ  বাস স্টেশনে । দূরত্ব কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিট । ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ বাস স্টেশনে যাওয়া পথটার নাম থার্টিন সাদার্ণ  রোড।


 এই বাস আড্ডা থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়, বাসের চলাচল ছাড়াও আমি যেতে চাওয়া লাওয়ের ছাভানক্ষেত প্রদেশে যাবার জন্যও বাস পাওয়া যায়।সেন্ট্রাল বাস আড্ডা থেকে সাদার্ণ  বাস আড্ডায় উনত্রিশ  নম্বর বাসে যাবার সুবিধা আছে। ভাড়া নেয় দুই হাজার কিপ। টুকটুকে ভাড়া ষাট  হাজার এবং ট্যাক্সিতে নব্বই  হাজার কিপ। আমি অল্প নয় বেশ কিছু পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। আমি আসা ত্রিশ নম্বর বাসটা সাদার্ণ বাস আড্ডায় ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে গেল। বাসটার বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক বলে মনে হল।স্থানীয় সময় অনুসারে এখন সন্ধ্যে  ছয়টা বাজে ।ছাভানক্ষেটে আমাদের গন্তব্য বাসটার সময় আটটায়। এই বাসটাকে তারা ভিআইপি বাস বলে।বাসটা বাতানুকূল। বসে এবং শুয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।বাসটাতে  শৌচাদি ক্রিয়ার ব্যবস্থা আছে। বসে গেলে ভাড়া এক লাখ দশ হাজার কিপ এবং শুয়ে গেলে এক লাখ কুড়ি হাজার কিপ। আমি অনলাইনে শুয়ে যাবার জন্য একটা টিকেট আগেই সংগ্রহ করে রেখেছি। লাওয়ের সমস্ত সুবিধা অনলাইনযোগে গ্রহণ করা যায়। নির্ধারিত দূরত্বে বাসটা আট থেকে নয় ঘন্টার ভেতরে পৌঁছে যায়।আমি  হাতে কিছু সময় থাকায় বাস আড্ডাটা ঘুরে দেখলাম। সহজ সরল ভাবে সুন্দর করে সাজানো । প্রাচুর্যের  চিহ্ন নেই । 

আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বাসটা যাত্রা  আরম্ভ করল। বাসের বাইরে ঘোরতর অন্ধকার ।কিছুই দেখা যায় না। হাতের ব্যাগটাকে বালিশ করে নিয়ে ক্যামেরাটা সাবধানে উপরে রেখেছি। পরিষ্কার এবং বাতানুকূল  বলে বাসটা ভালো লাগছে। ক্লান্তির জন্য ঘুম ভালো হওয়ায় রাতটা  কীভাবে পার হল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না । সকালবেলা সাড়ে চারটার সময় আমার গন্তব্যস্থল ছাভানক্ষেট পৌছে গেলাম। ছাভানক্ষেট   বাস আড্ডায়  সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।লোকগুলিকে দেখে আমার ইম্ফলের বাসআড্ডার কথা মনে পড়ে গেল।গাড়ির ডিজাইনের বাইরে এটা যেন জাতীয় চেহারা এবং পরম্পরায় আবৃত ইম্ফল বাস আড্ডা।

এটা লাওসের  ছাভানক্ষেট প্রদেশ।আকার আয়তনের দিক থেকে লাওসের  সর্ববৃহৎ প্রদেশ। জেলার সংখ্যা পনেরোটি। মাটির ক্ষেত্রফলের প্রায় ষাট  শতাংশ অংশ অরণ্যে পরিপূর্ণ।

আমাকে এখন এখান থেকে অনলাইনে নির্ধারিত করে রাখা, ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যেতে হবে।হোটেলটা এই বাস আড্ডা  থেকে দুই কিলোমিটার এবং মেকং নদী থেকে নাকি দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ মেকং নদী থেকে কত দূরে অবস্থিত তার দ্বারাই যেন দূরত্ব মাপে ।টুকটুকের চালকের কথা থেকে আমি তাদের এরকম মনোভাব জানতে পারলাম।

 টুকটুকের চালকটিকে  বললাম আমি ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যাব।

ভাড়ার কথা বলায় আমি বললাম ভাড়া হোটেল দেবে। আমি এখানে কোনো দাম দর করব না।টুকটুকের চালক আমাকে ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটার সামনে নিয়ে  গিয়ে গাড়িটা রাখল।

-- তুমি ভাড়াটা হোটেল থেকে নিয়ে নাও।

চালক কাউন্টারে গিয়ে বলায় হোটেলের পরিচারিকা তাকে ভাড়াটা দিয়ে দিল ।

  অযথা তর্ক বিতর্ক  দরদাম থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি এই ব্যবস্থাটিকে গ্রহণ করলাম জানিনা সময়ে হিতে বিপরীতহয় কিনা।

দুই লাও ভগ্নি  পরিচালনা করা ছালা থংগোয়ন  হোটেলটিতে মাত্র দশটি ঘর। তুলনামূলকভাবে হোটেলটিতে থাকার খরচ যথেষ্ট কম প্রতিদিনের জন্য আটশো ছয় টাকা।হোটেলের সামনে একটি কাঠের নাম ফলকে লেখা আছে-- ‘ওয়েলকাম টু ছালা থংগোয়ন বাংলো।’

  আমি হোটেলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। ছোটো সাধারন অথচ স্থানীয় রূপে সাজানো অভ্যর্থনা কক্ষে একজন লাও নারী। হয়তো দুই বোনের একজন।

হোটেলে ইংরেজি থাই এবং লাও ভাষা চলে। নেটে হোটেলটিতে থাকা বিভিন্ন সুবিধার বর্ণনা দেওয়ার সময় এই তিনটি ভাষা জানা মানুষের সুবিধা থাকার কথা জানিয়ে রাখা হয়েছে ।সেই জন্য আমি বিনা দ্বিধায় ইংরেজিতে সামনের পরিচারিকাটির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।

-- ওয়েলকাম।

 পরিচারিকাটি  আমাকে স্বাগত জানাল।

  --থ্যাঙ্ক ইউ। আজকে থেকে  থাকার জন্য আমি হোটেলে অনলাইনে একটি ঘর বুক করেছিলাম।

  --আপনার নাম, আপনি কোন দেশ থেকে এসেছেন?

  জনজাতীয় মুখাবয়বের পরিচারিকাটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

 আমার নাম এবং আমি ভারতীয় বলে বলায় তিনি আমাকে সাত  নম্বর ঘরটা আমার জন্য সংরক্ষিত করে রাখা আছে বলে জানালেন। তারপরে তিনি হোটেলের পঞ্জীয়ন খাতাটা বের করে আমাকে আমার নাম ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। পাসপোর্টের কথা জিজ্ঞেস করায়  আমি পাসপোর্টটা বের করে দেওয়ায় তিনি সেটার একটি ফটোকপি করে নিয়ে  আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। গতানুগতিক এবং রুটিন মাফিক কাজগুলি হওয়ার পরে তিনি আমাকে তার পেছন পেছন যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।

--আসুন আপনাকে আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিই।

  আমি পরিচারিকা অথবা হোটেলের দুই বোনের কোনো একজনের পেছন পেছন যেতে লাগলাম।

 গাছ বনে সাজিয়ে তোলা চৌহদে দেখতে পাওয়া প্রায় ভাগ তরুগুল্ম  আমার পরিচিত। অসমিয়া লোক নিজের চৌহদ  সাজানোর জন্য এই ধরনের গাছপালা যেভাবে ব্যবহার করে এখানেও সেরকম ব্যবহার করে দেখতে পাচ্ছি। জীর্ণশীর্ণ একটি পেঁপে গাছের ডালে কয়েকটি পেঁপে ধরে আছে । টকো এবং নারকেলের গাছ দেখে নিজের জায়গায় আসার মতো মনে হচ্ছে। নিজের জায়গায় রয়েছি বলে মনে হচ্ছে। নৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করার জন্য আমি দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম ।বাতানুকুল পরিবেশ থেকে বাইরে থাকার ফলে গায়ে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিল। শরীরে মাথায় জল  ঢালার পরে সেই অস্বস্তির অবসান  হল। বাইরে তাপমাত্রা ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক নয়। ফ্যানের বাতাসের নিচে  আমার ঘুমের ভাব হল। তখনই একজন পরিচারিকা আমার জন্য এক কাপ লাল চা নিয়ে এল। আমি এই চায়ের কাপের অপেক্ষায় ছিলাম । চায়ের কাপ টেবিলে রেখে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল সকালের  আহার আমি এখানেই খাব কিনা?

আমি বললাম—হ্যাঁ।

--কী খাবেন?

  সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ।

যেহেতু এখানে কী পাওয়া যায় আমি জানিনা এবং এই মুহূর্তে এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ইচ্ছা আমার ছিল না। কেবল ঘুমোতে ইচ্ছা করছিল। তাই বললাম নুডুলস

  --ননভেজ

  --হ্যাঁ ননভেজ। এক ঘন্টা পরে দিলেই হবে বলে বলায় সে মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।

  ঠিক এক ঘন্টা পরে একটা ট্রেতে একটা নুডুলসের বাটি এবং সঙ্গে আমার জন্য অপরিচিত কয়েকটি পদ খাবার জিনিস নিয়ে পরিচারিকা আমার ঘরে এল। পরিচারিকাটির বয়স পঞ্চাশের উর্ধ্বে ।দেখলে মনে হয় আমি নাম পঞ্জীয়ন করার সময় সাক্ষাৎ করা পরিচারিকাটির মতো একই বলে মনে হয়। আমি তাকে সাধারণভাবে  স্বাগতম জানালাম। সে টেবিলের উপর খাদ্য সামগ্রীর ট্রেটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।

সে  চলে যাবার পরে আমি নুডুলসের বাটিটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। খাবার জিনিসের প্রতি আমার কোন বৈষম্য নেই সেতে পারা ধরনের হলে আমি সমস্ত খাদ্য সামগ্রীকে গ্রহণ করি নুডুলস এর বাটিটা হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম পালংশাক,ভাজা রসুন ও মুরগির মাংসের রান্না করা নুডুলসটা খেতে বেশ স্বাদযুক্ত।বিশেষ কোনো মশলা ব্যাবহার না করে সিদ্ধ করে রান্না করা হয়েছে। ক্ষুধার তাড়নায় আমি পুরোটা দিয়ে পেট ভরিয়ে নিলাম। 

খাওয়া-দাওয়া শেষে আরও দশ মিনিটের মতো বিশ্রাম নিয়ে আমি  পরিচারিকাটির কাছে এলাম।

আমাকে আপ্যায়ণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা বলে মনে কর পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম ডং সিথুয়ান গ্রামটা কত দূরে কোন জেলায়?

  --অ’ভিলেজ ফরেষ্ট্রি!দুর আছে। আমি যাইনি বলে ভালো করে জানি না। আপনি যেতে চান নাকি?

-- হ্যাঁ যেতে চাই

  আমার উত্তর শুনে সে কারও সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করল। তারা লাও ভাষায় কথা বলছে। কথা বলার সময় মানুষটা ফোনটা খামচে ধরে আমাকে জিজ্ঞেস করল ট্যাক্সি লাগবে।চাই কি?

আমি মাথা নড়লাম। তিনি পুনরায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কিছুক্ষণ মানুষটার সঙ্গে কথা বলে তিনি আমাকে বললেন আধঘন্টা পরে ট্যাক্সি এসে যাবে। গাড়ি ভাড়া আমি বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। আপনি রাস্তায় চাইলেও একটিও কিপো দেবেন না।

  --কেন?

  আমরা বন্দোবস্ত করে দিলে তাদের ভাড়া কম হয় বলে ভাবে। বেশি টাকা নিতে পারে না যে!

  আমি পরিচালিকাটিকে বিশ্বাস করলাম।

নির্দিষ্ট সময় আধঘন্টা পরেই ট্যাক্সি চালক এল। সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেশভূষায় একজন বয়স্ক চালক। হাসিমুখ। তাকে দেখে আমার এরকম মনে হল আমি যদি লাও ভাষা বুঝতে পারতাম এই ব্যক্তি আমাকে সারাটা যাত্রা পথে হাসির খোরাক জোগাতে পারত।

  আমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডং সিথুয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জেলাটির নাম দুবার দুজনের মুখে শুনেও মনে রাখতে পারলাম না। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। চালক আমার সঙ্গে কথা বলছে। ভারতের কথা, অসমের কথা ভারতে থাকা বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থস্থান গুলির কথা। সে আমাকে আমি বৌদ্ধ না মুসলমান জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম-- আমি হিন্দু। হিন্দু ধর্ম কেমন জিজ্ঞেস করায় আমি খুব সংক্ষেপে হিন্দু ধর্মের বিষয়ে ব্যাখ্যা করলাম। অসমের এক শৃঙ্গের গন্ডারের কথা বললাম। চালক আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। প্রায় তিন ঘন্টা পরে আমরা এসে জেলার সদর পেলাম। আমি ট্যাক্সি চালককে বললাম আমার গন্তব্যস্থান জেলা কৃষি এবং বন  বিষয়ার কার্যালয়। আমি চালক থেকে এ কথাও জানালাম যে কার্যালয়টিকে তারা ডাফো বলে।

আরক্ষীকে জিজ্ঞেস করে চালকটি আমাকে নির্দিষ্ট কার্যলের সামনে নিয়ে গেল।

 জেলা কৃষি এবং বন অফিসার নির্দিষ্ট সময়ে এসে কার্যালয়ে বসেছেন। মানুষটা প্রায় আমার বয়সী। আমাদের রাজ্যের যেকোনো জনজাতীয় অবয়বের পঞ্চাশ অনূর্ধ্ব ব্যক্তি। একজনের সঙ্গে আমি তার সাদৃশ্য দেখতে পেলাম। মানুষটা চশমা পরেছেন। অতি সাধারণ বেশভূষা ।আমি তাকে ভারতীয় ধরনে নমস্কার জানালাম। তিনিও প্রতি নমস্কার জানালেন। সম্ভবত ভারতীয় আদব কায়দা এবং রীতি-নীতির দ্বারা মানুষটা পরিচালিত। অথবা তাদের দেশেও আমাদের মতো নমস্কার দেবার নিয়ম আছে। আমি কথাটা জানতে পারলাম না। তিনি তাঁর নামটা বললেন কিন্তু আমি মনে রাখতে অপারগ হলাম ।নামটা জিজ্ঞেস করে লিখে রাখার জন্য আমার মোটেও ইচ্ছা হল না ।বিশেষ করে মানুষটির আন্তরিক ব্যবহারে ।আমি তাকে আমার উদ্দেশ্যের বিষয়ে জানালাম। তিনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করলেন। তারপরে তাদের উদ্দেশ্য এবং কাজ করার ধরনের উপরে এক বিস্তৃত ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বলা কথাগুলি সম্পূর্ণ বিদ্যাতনিক ধরনের এবং যান্ত্রিক ছিল বলে আমার মনে হল। তার বলা কথাগুলি আমার কাছে ইন্টারনেটে উপলব্ধ হওয়া বিভিন্ন প্রবন্ধ আদির মৌখিক রূপ বলে মনে হয়েছিল।

  আমি তার সামনে ডং সিথুয়ানে যাবার প্রস্তাব রাখলাম।

তিনি বললেন যেতে পারেন আমরা কীীভাবে কাজ করছি এবং সুফল লাভ করেছি দেখে আসতে পারেন। 

সম্পূর্ণ বাধ্যবাধকতা থাকা একটি কমিউনিস্ট দেশের বিষয়ে একজন কোনো আপত্তি ছাড়াই এভাবে বলায় আমি আশ্চর্যানিত হয়ে পড়লাম। তিনি নাকি ব্যস্ততার জন্য দু'একদিন যেতে পারবেন না। আমি গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তিনি করবেন। আমি কোনো অনুমতি পত্রের প্রয়োজন হবে নাকি জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন আপনি দেখতে যাবেন, আপনাকে আমাদের দেশ ভিসা দিয়েছে। আপনি একজন পর্যটক আপনি নিশ্চয়ই যেতে পারেন।

ডং সিথুয়ান  একটি গ্রামের নাম। সেই গ্রামটিকে অরণ্য গ্রাম হিসেবে প্রতিস্থাপিত করে নাম রাখা হয়েছে ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট।নামটি দেখছি  বেশি ব্যাবসায়িক বলে মনে হচ্ছে। ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট দশটি গ্রাম নিয়ে হয়েছে এবং এখানে ছয়টি দল কর্মরত রয়েছে। তারা ব্যবহার করা মোট ক্ষেত্রফলের পরিমাণ ২১২ হাজার হেক্টর ।অফিসারটির কথা থেকে জানতে পারা গেল যে তারা সামূহিকভাবে অরণ্য সুরক্ষার চেয়ে অরণ্য উৎপাদনে বেশি মনোনিবেশ করেছে। সেই উৎপাদন একমুখী। একমাত্র কাঠ কেন্দ্রিক।

  অফিসারটি আমাকে য়ায়ৈ ফুজিটা, থমথন ভংভিছোক, হংফেট চানটাভোং এবং চোমভিলাই চান্থালেউনাভোঙের দ্বারা  ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘ডং ফুজয় এন্ড ডং সিথুয়ানে প্রোডাকশন ফরেস্টঃপেভিং দী ওয়ে ফর ভীলেজ ফরেষ্ট্রি’  নামে একটি গবেষণা পত্র তার ল্যাপটপ থেকে প্রিন্ট আউট করে নিয়ে বের করে দিলেন। সেটির উপরে আমি একবার চোখ বুলিয়ে দেখে বললাম-- ধন্যবাদ। 

আমার ধন্যবাদ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার ভাব দেখিয়ে তিনি বললেন—এটাতে আপনি আমাদের সমস্ত ধরনের কাজ কর্মের বিষয়ে আদ্যোপান্ত পড়তে পারবেন।এটা পড়লে আপনি ডং সিথুয়ানে না গেলেও হবে।পাকে-প্রকারে মানুষটা আমাকে ডং সিথুয়ানে না যাবার জন্য বলছেন বলে মনে হল।

  তারপরে তিনি দেখালেন ‘ভিলেজ ফরেষ্ট্রি হেন্ডবুক’আমি বললাম—এটা আমি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিয়েছি।

 অফিসারটি মুচকি হাসলেন।

 কথার মাঝখানে মানুষটা আমাকে এক কাপ লাল চা দিয়ে অভ্যর্থনা করতে ভুললেন না।

 অফিসারটি আমার সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন যদিও তার কথা আমার কাছে অনেকটাই যান্ত্রিক বলে মনে হল।আমাদের দেশেও যদি গণ্ডারের হত্যার কথা কোনো বিদেশি নাগরিক জিজ্ঞেস করে সংশ্লিষ্ট বন অফিসার এভাবেই হয়তো নিয়মমাফিক উত্তর দেবে।

 অফিসারকে ধন্যবাদসূচক নমস্কার জানিয়ে আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

 এখন আমরা যাব ডং সিথুয়ান গ্রামে।

 পাহাড়ি পথে আমাদের ট্যাক্সিটা এগিয়ে চলল।রাস্তার দুপাশে হালকা জনবস্তি।চাং ঘর,মুরগি এবং শুয়োর পালন,শুকনো আবহাওয়া—পরিবেশটা আসমের কোনো একটি পাহাড়ি জেলার লাও সংস্করণের মতোই মনে হল।প্রায় দেড় ঘন্টার মতো সময় পরে আমরা ডং সিথুয়ান গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম।যে গ্রামে আসার উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমি কয়েকটি নদী এবং কয়েকটি পাহাড় অতিক্রম করে এসেছি।

ডং সিথুয়ানে গ্রামে উপস্থিত হয়ে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে শুরু করেছি।সঙ্গে চালক এবং ক্যামেরাটা।গ্রামের মানুষ আমার কোনো কথাই বুঝতে পারছে না।  

চালকটি  দোভাষীর কাজ করছে যদিও সে অরণ্য গ্রাম সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলি গ্রামের মানুষকে বুঝিয়ে বলতে পারে নি।আমি ‘ডিছ-ট্রিক লেভেল ফরেষ্ট কাম ইটি’এবং ফরেষ্ট ম্যানেজমেন্টের কথা জিজ্ঞেস করেছি এবং চালকটি  হয়তো গ্রামবাসীদের অন্য কিছু বলছে।ফলে আমি যা চাইছি সেই ধরনের উত্তরগুলি পাচ্ছি না। তাই আমি যতটা সম্ভব ক্যামেরার ব্যবহার করছি।তাঁরা প্রতিটি গাছকে চিহ্নিত করার জন্য ক্রমিক সংখ্যা ব্যবহার করছে।অসমের চা বাগিচায় সেভাবে গাছকে চিহ্নিত করার পদ্ধতি আমি আগেই দেখতে পেয়েছি। আমাদের এখানে সাদা কালোতে লেখা হয় এবং এখানে দেখছি লাল কালিতে লেখা।গ্রামের মধ্যের এক জায়গায় গাছের চারা উৎপাদন কেন্দ্র একটাও দেখতে পেলাম।আমাদের এখানকার সামাজিক বনানীকরণের চারা উৎপাদন কেন্দ্রের মতো।পাহাড়ি গ্রামটির পথ ঘাটের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমি প্রতিটি পরিবারে বিভিন্ন ধরনের ছোটো বড়ো গাছ দেখতে পেয়েছি। কিছু পরিবারে দেখতে পেয়েছি  গাছগুলির নিচটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,তাতে অরণ্যের পরিবেশ নেই। 

সামগ্রিকভাবে পরিবেশ অধ্যয়ন করায় এই গ্রাম যাত্রা আমার জন্য লাভ দায়ক হল।বিশেষ করে থমথন সানটাভোঙ নামের কৃ্ষকটির থেকে যে কথাটা জানতে পারলাম সেটা আমার অনেক উপকার করল।তাঁদের এখানে আমাদের এখানকার মতো জুম খেত করা হয়।ফলে অরণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে পরিবেশের গাঁথনির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।অরণ্য ধ্বংস প্রতিরোধ করার জন্য অরণ্য গ্রামের ধারণা তাদের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে।কৃ্ষিজীবী গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের আর্থিক দিকটা অতিশয় দুঃখের।অরণ্য গ্রাম আরম্ভ হওয়ার পরে গ্রামবাসী লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে।লাওচে প্রতিবেশী দেশ সমূহকে কাঠ যোগান ধরে।তাঁদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য কাঠের ব্যাবসা অন্যতম।সানটাভোঙ আমাকে আন্তরিকতার সঙ্গে বলা কথাগুলি চালকটি দোভাষী হয়ে তর্জমা করে গেছেন।আমি এবার সানটাভোঙের দিকে আর একবার চালকের মুখের দিকে আমার মুখ ফিরিয়ে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

পর্যাপ্ত সময় গ্রামের চারদিকে ঘুরে-ফিরে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।আমার কথায় চালকটি অসম্মত হওয়ার  কোনো প্রশ্নই উঠে না।

—বড়ো ক্ষুধা পেয়েছে।

আমি চালকটিকে বললাম।

--'খাও নিউ’তে খাব।হবে কি?

আমি বুঝতে না পেরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম—কোথায়?

--খাও নিউ মানে হল ‘লাও ষ্ট্রীট ফুড’।

আমি চালকের কথায় সম্মতি জানালাম।পর্যটকদের জন্য এখানে কী ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার জানার প্রয়োজন ছিল।

--সেখানে পাওয়া সমস্ত খাদ্য পরম্পরাগত ভাবে প্রস্তুত করা হয়।

 চালক এভাবে বলায় আমার মন আনন্দে ভরে উঠল।শুনতে পেলাম লাওচে পশ্চিমী খাদ্যের প্রচলন নেই।সেই জন্য হয়তো ছালা থঙ্গোয়নের মেনুতে আমি সাধারণত দেখতে পাওয়া স্যাণ্ডউইচ,বার্গার,টোস্ট ইত্যাদি পশ্চিমী খাদ্যের নাম দেখতে পাইনি।নিজেকে চিনতে পারা এবং নিজের পরিচিতি বহন করে চলার জন্য খাদ্য সম্ভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।দেশটি নিজের খাদ্য সম্ভারকে সুরক্ষা দিতে জানে বলেই লাওচে বিদেশি পর্যটকের সমাহার অন্য এক কারক বলে ভাবার কারণ আছে।ভবিষ্যতের কার্যপন্থার হেতু কথাটা আমার জন্য মনে রাখার দরকার আছে।

চালকটি একটি ‘খাও নিউর’সামনে গাড়ি এনে রাখল।দোকানটা দেখতে আমাদের এখানে এক সময় চলা পিসিও বুথের মতো,সবুজ রঙে আবৃত।দোকানের নিচের ভাগে বিভিন্ন খাদ্য সম্ভারের আলোক ছবি সজ্জিত করে রাখা হয়েছে।

--এখানে সর্বাধিক জনপ্রিয় খাদ্য দ্রব্য কি?

আমি চালককে জিজ্ঞাসা করলাম।

--জ’,চিয়েন চাভান এবং থুম মুক হ্ং। 

চালক কী বলল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকায় এবার সে ইংরেজিতে বলল।

--ষ্টিকি রাইস,লাও বীফ জার্কি এবং পাপায়া সালাড।

কথাটা বলার সময় চালকের মুখটা লালায় ভরে উঠেছিল বলে মনে হল।

--বীফ?

বড়ো স্বাদের।খাবার পরে বলবে।

--আমি বীফ খাই না।ভারতবর্ষে দুই একটি গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে হিন্দুরা বীফ খায় না।

 চালক এরকম ভাব করল যেন কোথাও সে মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে।সে আমার সামনে দুঃখ প্রকাশ করে আমি নিরামিষ খাই নাকি জিজ্ঞেস করল।

 --বীফ ছাড়া সমস্ত মাংস খাই।

 --তাহলে আপনি ‘খাও পিক চেন’খান।হোম মেড চিকেন নুডলস স্যুপ।

 আমি তার কথায় সম্মতি জানিয়ে আঠালো ভাত,পেঁপের সালাড এবং বাড়িতে প্রস্তুত করা মুরগির নুডলস স্যুপ আনতে বললাম।আর চালককে বললাম আপনি বীফ খেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।আমি এই ধরনের শুচিবাইগ্রস্ত মানুষ নই।চালক আমার জন্য খাবার জোগাড় করে নিজে কিছুটা দূরে খেতে গেল।আঠালো ভাতটা আমাদের বরো চালের ভাতের মতো,কিন্তু ধবধবে সাদা।পেঁপের সালাডটা খেতে খুব সুস্বাদু।ছোটো ফুটো থাকা চালনি দিয়ে নুডলসের মতো লম্বা লম্বা করে কাটা।সঙ্গে ঝাল,নুন ইত্যাদি মিশ্রিত করেছে।চিকেন নুডলস খেতে আমাদের এখানকার স্যুপের মতোই,কেবল সসের ব্যবহার নেই বলে মনে হল।আমরা দুজনের দুপুরের আহারে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হল।বিভিন্ন বিদেশি লোক ‘খাও নিউ’তে ভিড় করেছে।তাদের দেখে আমার এরকম মনে হল যেন প্রত্যেকেই ‘লাও বীফ জার্কি’র প্রতি আগ্রহান্বিত।এটা লাওচের স্থানীয় খাদ্য।

 আমার ভবিষ্যত কর্মপন্থায় স্থানীয় খাদ্যের গুরুত্ব এক মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।‘খাও নিউ’ থেকে আমরা সেই অনুপ্রেরণা লাভ করলাম।     


  

 

মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৫১ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

 হে আমার স্বদেশ- ৫১

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৫১)

মত্যু অপ্রতিরোধ্য।মৃত্যু অমরত্ব দানের প্রতিবন্ধক।কিন্তু মানবীয় কর্ম এবং মানবতা উন্মেষকারী সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তাকে অমরত্ব প্রদান করে।লক্ষ্মীনাথের একটি মানবীয় সৃষ্টির অন্য একটি স্বীকৃ্তি দিল তেজপুরের তরুণ কিন্তু প্রতিশ্রুতিবান কবি-লেখক জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা।জ্যোতিপ্রসাদ শুধুমাত্র নতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কবি-লেখক নয়।তিনি অসমের কেউ না করা একটা কাজের পরিকল্পনা নিয়েছেন।লক্ষ্মীনাথ রচনা করা নাটক ‘জয়মতী’র আধারে তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন।চলচ্চিত্রটি ১৯৩৫ সনের ১০ মার্চ কলকাতার রাওনাক হলে প্রথমবারের জন্য প্রদর্শন করার আয়োজন করা হল।উন্মোচনী সভায় উপস্থিত থাকবেন প্রযোজক প্রমথেশ চন্দ্র বরুয়া,সুগায়ক সাইগল,মিঃহাঞ্চ,হেমন্ত কুমার চৌধুরী আদি বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি।সভা উদ্বোধন করার জন্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া আমন্ত্রিত হলেন।

নিজের সৃষ্ট একটি নাটক ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে,সেটি আবার অসমের প্রথম চলচ্চিত্র,উন্মোচিত হবে ভারতের সাংস্কৃতিক মহানগর কলকাতায়—উদ্বোধন করার আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ খুবই আনন্দিত হলেন।  

উৎসাহের সঙ্গে সভায় এসে উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বললেন , ‘আজ আমাদের অসময়ের জন্য এটি একটি গৌরবের দিন। এই ‘জয়মতী’নামে ছবিটি শ্রীমান জ্যোতিপ্রসাদের অশেষ চেষ্টা ,অপরিসীম ধৈর্য ,সূক্ষ্ম শিল্প চেতনা ,অভিনয় দক্ষতা এবং উদার ভাবে ধন ব্যয় করার ফসল। তিনি প্রকৃত অর্থে একজন শিল্পী।তার মধ্যে  শিল্পীর সমস্ত গুণ বর্তমান। আমি আশা করছি এভাবে তিনি আরও অধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সমগ্র ভারতে  অসমের গৌরব বৃদ্ধির সঙ্গে অসমীয়ার মনে জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলবেন’।

  লক্ষ্মীনাথের পার্থিব  জীবনের সূর্য অস্তায়মান।সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতির সঙ্গে মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা সম্বর্ধনা পেলেও জাগতিক ঘটনাক্রমে তাকে মাঝেমধ্যে বিমর্ষ করে ফেলে ।শিবসাগর থেকে খবর এল রায় সাহেব এবং অনোরারি  ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া লক্ষ্মীনাথের প্রিয় এবং ছোটো দাদা জগন্নাথ বেজবরুয়ার ৪ জুলাই (১৯৩৫) মৃত্যু হয়েছে। এদিকে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়, সুখ দুঃখের পরামর্শদাতা ,বন্ধু ছোটো দাদা ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোকগমন করেছেন। এই দুজন আত্মীয়ের মৃত্যু বার্ধক্যজনিত কারণে।মানুষের জীবনে এভাবেই মৃত্যু আসে। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া লক্ষ্মীনাথ সেটা জানেন। তথাপি আপনজনের বিয়োগের শোকটা অসহনীয়। শোকে-দুঃখে কষ্ট পেয়ে থাকার সময় তার এরকম মনে হয় যেন মৃত্যু দেবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

  জীবনের শেষ বেলার উদাসী চেতনা ভারাক্রান্ত করলেও তার মধ্যেও সম্বলপুরে তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা বাড়ল। এখানে আসার কিছুদিন পর থেকেই এখনকার ইউরোপিয়ান ক্লাব ,বেঙ্গলি ক্লাব আদির সদস্য হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যসূচির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। এখনকার ভিক্টোরিয়া হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ বা নিজে লেখা নাটক  মঞ্চস্থ করার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ শৈশবে নাটকে অভিনয় করেছেন। তার জন্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে তিনি একজন সাংস্কৃতিক পুরুষ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে পড়েছেন। এদিকে তিনি ক্রফর্ট হাইস্কুলের পরিচালনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া কয়েক বছর আগে থেকে তিনি সম্বলপুর মিউনিসিপালিটি বোর্ডের সরকারের মনোনীত সদস্য।। মিউনিসিপালিটি বোর্ডের তিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার পরিকল্পনা এবং তত্ত্বাবধানে মিউনিসিপালিটির বর্তমান অফিস ঘরটা নির্মাণ করা হয়েছিল।।

এত  প্রভাব প্রতিষ্ঠা যদিও তার কাঠের ব্যাবসায়ে উন্নতি হল না।।সত্যিই সম্বলপুরে ব্যাবসাটা জমাতে পারলেন না। তার মধ্যে টুকটাক করে কোনোমতে সাংসারিক খরচটা বের হয়ে আসে।। এভাবে কষ্ট হচ্ছে। লক্ষ্মীনাথ পুনরায় আর্থিক সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এসব দেখে অরুণা সত্যব্রত অস্থির হয়ে পড়ল।সত্যব্রতের  উপর্যুপরি  অনুরোধ এবং অরুণা কান্নাকাটি করার জন্য প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় বরোদা রওনা হলেন ।

বরোদায় এসে এবার প্রায় ৪০ দিন থাকলেন।বরোদার আর্য কন্যা মহাবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া সভায় মহারাজা গায়কোয়ারের সঙ্গে বসে জামাই সত্যব্রত মুখার্জির জ্ঞান উন্মেষকারী বক্তৃতা শুনলেন। লক্ষ্মীনাথ খুশি হলেন ।জামাই বক্তৃতা দিতে থাকা দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে তার বুক ভরে উঠল। তাছাড়া এবার বিশেষ কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়া হল না। স্বাস্থ্য জনিত কারণে বাংলোয় থেকে দুই নাতি-নাতনীর সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন।বিদায় নেওয়ার দিন সকাল বেলা থেকে লক্ষ্মীনাথ গম্ভীর হয়ে পড়লেন। প্রকাশ না করলেও তার মনে এরকম একটা ভাব হল যেন এটাই তার শেষ বরোদা ভ্রমণ।

বরোদায় থাকার সময়ই দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। দুই বছর আগে থেকেই তাকে দাঁতও অসুবিধা দিয়ে আসছে। কলকাতায় গিয়ে কয়েকটি গোড়ার দাঁত ফেলতে হবে। সম্বলপুরে আসার পরে তার ডাক্তার দাঁত না ফেলে নতুন একটা দাঁত লাগিয়ে দিলেন তবে সেটাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা হল। এমনিতেই একদিন বাথরুমে  পড়ে গিয়ে প্রজ্ঞা ব্যথা পেল।সার্জন এসে ব্যান্ডেজ বেঁধে ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরও অস্থির যন্ত্রণায় প্রজ্ঞা সারা রাত জেগে কাটাল। পরের দিন থেকে লক্ষ্মীনাথ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। জ্বর এতটাই বেশি যে বিছানা নিতে হল। খবর পেয়ে সিভিল সার্জন বাড়িতে এসে পরীক্ষা করে লক্ষ্মীনাথকে ঔষধ খেতে দিলেন ।

মোট কথা কমজোরী হয়ে পড়া লক্ষ্মীনাথের শরীরটাতে দ্রুত নানা রকম রোগ  বাসা বানিয়ে নিল ।অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন খুব বেশিদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন না ।অবশ্য তার জন্য হা–হুতাশ  নেই।তাকেও জীবনের মহামুহূর্তগুলিকে স্বীকার করে নিতে হবে। তার জন্য এখনই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। তারই একটা প্রস্তুতি হিসেবে লক্ষ্মীনাথ ১৯৩৬ সনের ২৫ নভেম্বর সম্বলপুরের বাড়িটা দান রূপে মেয়ে অরুণা মুখার্জির নামে রেজিস্ট্রি করে দিলেন।

তারপরে কিছুদিন ভালোই চলল। পরের বছর মে মাস থেকে লক্ষ্মীনাথের পুরোনো বদহজম এবং অম্ল শূলের অসুখটা বৃদ্ধি পেল। পেটের ব্যথা শুরু হল, কিছু খেলেই ঢেকুড় উঠে, বমি হয়। আহারে লক্ষীনাথের এত রুচি, খেতে এত ভালোবাসেন, অথচ খেতে পারেন না। স্বামীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে দেখে প্রজ্ঞা সম্বলপুরের সিভিল সার্জনকে ডেকে আনালেন। লক্ষ্মীনাথকে  পরীক্ষা করে সার্জন ঘোষণা করলেন, ‘ডিউডেনাল আলসার।’ লক্ষ্মীনাথের অন্ত্রে ঘা হয়েছে।

বাবার অসুখের কথা শোনার পরেই ডিব্রুগড় থেকে রত্না এল। সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত সব সময় কর্মব্যস্ত থাকা বাবাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে রত্নার চোখ ছল ছল হয়ে উঠল। বাবার উন্নত চিকিৎসা এবং সেবা– শুশ্রুষার প্রতি রত্ন গুরুত্ব দিল। তাতেই লক্ষ্মীনাথ কিছুটা সুস্থ হলেন বলে মনে হল। বরোদা থেকে অরুণা– সত্যব্রত এল। একটু সুস্থ হয়ে ওঠার পরে কিছুদিনের জন্য বাবাকে রত্না নিজের সঙ্গে রাখবে বলল। তার জন্য সে বাবাকে ডিব্রুগড়ে  নিয়ে যাবে। অন্যদিকে অরুণাও বাবাকে বরোদায় নিয়ে যেতে চাইছে। এটা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে তর্ক হল। কিন্তু রত্নার জিদের কাছে অরুণাকে হার মানতে হল। মা-বাবাকে নিয়ে রত্না কলকাতায় এল। সত্যিই বাবার অন্ত্রে ঘা হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কলকাতার একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাল। কলকাতার ডাক্তার একই কথা বললেন এবং লক্ষ্মীনাথকে বিশ্রাম নেবার পরামর্শ দিলেন।

অবশেষে ১৯৩৭ সনের আগস্ট মাসের ২১ তারিখ ডাঃ ভুবনেশ্বর দাস, রত্না এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ ডিব্রুগড়ির রওনা হলেন।

রওয়ানা হওয়ার দ্বিতীয় দিন তারা পান্ডু এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আসবেন বলে খবর পেয়ে চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, জ্ঞানদাভিরাম আদি পান্ডু স্টেশনে এসে দেখা করলেন। অসুস্থ যদিও আরাম কেদারায় বসে লক্ষ্মীনাথ প্রফুল্লিত । যেন তাঁর কোনো অসুখ নেই। আগের মতোই সবার সঙ্গে আনন্দ স্ফুর্তি করে কথাবার্তা বললেন ।ডঃ দাসকে আলাদাভাবে ডেকে এনে জ্ঞানদাভিরাম লক্ষ্মীনাথের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। কিছুটা সন্দেহের ভাব নিয়ে ডঃ দাস বললেন ’ অবস্থা খারাপ নয়। ভালো হয়ে যাবেন, যদি মাঝখানে অভাবনীয় কোনো সমস্যা উপস্থিত না হয়।’

বন্ধুবর চন্দ্রকুমার, আত্মীয় জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বিনন্দ বেজবরুয়ার( লক্ষ্মীনাথের দাদা) ছেলে আনন্দ বেজবরুয়াও এসে উপস্থিত হলেন। লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞা, রত্না এবং রত্নার মেয়েদের রেলে উঠিয়ে দিয়ে তারা সঙ্গে আনা গাড়িতে গুয়াহাটিতে এসে উপস্থিত হলেন। গুয়াহাটি স্টেশনে আর্ল ল কলেজের অনেক ছাত্র এবং অনেক ভদ্রলোক লক্ষ্মীনাথকে সম্বর্ধনা জানাল। চন্দ্রকুমার লক্ষ্মীনাথকে দুদিন  গুয়াহাটিতে থেকে বিশ্রাম নিয়ে যেতে বলল। রত্না রাজি হল না। সেদিনই গুয়াহাটি থেকে রেলে যাত্রা করল। পরের দিন তারা তিনসুকিয়া গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং সেখান থেকে মোটরে ডিব্রুগড় উপস্থিত হলেন।

মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া নতুন করে একটা বাড়ি তৈরি করেছেন। এই বাড়িটা ব্রহ্মপুত্রের তীরে। সুন্দর করে তৈরি করা বিশাল বাড়িটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো বাতাস। লক্ষ্মীনাথের মতো রোগির পক্ষে স্বাস্থ্যকর জায়গা। বাড়িটাতে ঢুকেই মহাবাহ ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আসা নির্মল বায়ু সেবন করে লক্ষ্মীনাথের ভালো লাগল। মাতৃভূমি অসমের প্রাণধারা ব্রহ্মপুত্রের পারে থাকার জন্য তিনি যেন নতুন শক্তি লাভ করলেন।

খবরের কাগজের মাধ্যমে অসমের জনগণ লক্ষ্মীনাথের অসুস্থতার কথা জানতে পারল। ডিব্রুগড়ে থাকার দুদিন পর থেকেই জনগণের চিঠিপত্র আসতে লাগল। সেইসব করে উত্তর লেখার জন্য সাহিত্য পুথীর সমালোচনা করার জন্য অসুস্থ শ্বশুরের মনের ওপরে চাপ পড়বে। তার স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়ে পড়বে। তাই দায়িত্বশীল জামাই রোহিণী খবরের কাগজে বিবৃতি দিলেন,’ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া সম্প্রতি কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্যের পথে। তিনি বর্তমানে মোটামুটি সুস্থ থাকলেও আরও কিছুদিনের জন্য তার বিশ্রাম নেওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই আশা করি, দেশবাসী যেন তার কাছ থেকে চিঠির উত্তর, পুথি সমালোচনা, সাহিত্যের ইতিহাস ইত্যাদির মতামত না চায় এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের জন্য তাকে কিছুদিনের জন্য রেহাই দেয় ।’

ঠিক তখনই ইতিহাসবিদ বেনুধর শর্মা শিবসাগর থেকে ডিব্রুগড়ে গিয়ে রোগ শয্যায় পড়ে থাকা লক্ষ্মীনাথকে দেখতে চাইলেন। রোহিণী প্রথমে তাকে অনুমতি দিলেন না। তারপরে বেনুধরের  নাম বলায় লক্ষ্মীনাথ আকুল অগ্রহে বেনুধরকে শয্যার পাশে ডাকলেন। বেনুধরকে দেখে আনন্দিত হলেন যদিও লক্ষ্মীনাথ বিছানা থেকে উঠতে পারলেন না। নিস্তেজ ভাবে বিছানায় পড়ে রইলেন। তার পা দুটির শোচনীয় অবস্থা দেখে বেনুধরের মন খারাপ হয়ে গেল।

তারপরেই ‘দৈনিক বাতরির’ ২৪ আগস্ট( ১৯৩৭) সংখ্যায় প্রকাশ পেল,’ অসমীয়া জনগণ এই পুণ্য ভাদ্র মাসের ৩ তারিখ সরকারিভাবে ঘরে ঘরে পালন করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক জীবনী এবং মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শংকরদেবের নির্মল চরিত্র যে বেজবরুয়া মহাশয়ের অমর লেখনীতে অমিয়া ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, এই তিন তারিখ অসমিয়া জনগণ যেন সেই বেজবরুয়া মহাশয়ের সম্পূর্ণ আরোগ্য কামনা করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায়।’

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অসমিয়া জাতির প্রাণপুরুষ।’ দৈনিক বাতরি’র এই আবেদনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অসমিয়া জনগণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীনাথের আরোগ্য কামনা করে সভা সমিতি এবং নাম কীর্তন অনুষ্ঠান করলেন।

‘ দৈনিক বাতরি’র সহকারী সম্পাদক করুণাকান্ত গগৈ বেজবরুয়ার জামাই রোহিণী বরুয়াকে অনুরোধ করলেন,’ অসমের সমস্ত মানুষই শ্রীযুক্ত বেজবরুয়া মহাশয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এই সন্দর্ভে জনগণ একটি করে বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তাই আপনার কাছ থেকে বেজবরুয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ পাব বলে আশা করছি।’

সঙ্গে সঙ্গে রোহিণী জানাল,’ এখন পূজনীয় বেজবরুয়া মহাশয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো হওয়ার পথে। কোনোরকম শারীরিক বিকার নাই বললেই হয়। রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে এবং রুচিসহকারে খেতেও পারছেন। কারও সাহায্য ছাড়াই উঠাবসা করতে পারছেন। এমনকি আমাদের অতিথি নিবাস থেকে আমরা থাকা ঘরটিতে বিনা সাহায্যে নিজে নিজে হেঁটে যেতে পারছেন। সম্প্রতি তিনি ডাঃ প্রভাত চন্দ্র দাস, এমবিডিটি মহাশয়ের চিকিৎসাধীনে রয়েছেন।ডঃ দাসের বক্তব্য অনুসারে, বেজবরুয়া মহাশয়কে দু-এক দিনের মধ্যে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া যাবে।’

সত্যিই স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হল। চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন। লক্ষ্মীনাথ নিজেই ‘ দৈনিক বাতরি’ খবরের কাগজের মাধ্যমে নিবেদন জানালেন,’ অসমের জনগণের আশীর্বাদ এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছি। তাই এই খবরের কাগজের মাধ্যমে খবরটা সবাইকে জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।’ আমার এই অসুস্থতা আমাকে একটা গৌরব এবং আনন্দের খবর দিয়ে গেল। আমি আগে জানতাম না যে আমি আমার মাতৃভূমি অসম দেশের কাছে এত ভালোবাসার পাত্র।’

শরীরে শক্তি লাভ করে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি থেকে বের হলেন। চলাফেরা করতে লাগলেন। দুই এক জায়গায় যেতে লাগলেন। কিন্তু তাকে একা বের হতে দেওয়া হয় না। সঙ্গে প্রজ্ঞা, রোহিণী,রত্না… কোনো একজন থাকেই।

নভেম্বরের দুই তারিখ ডিব্রুগড় ‘আলোচনী ক্লাব’এর উদ্বোধনী উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু বক্তৃতা দিতে উঠে দেখেন উদাত্ত ভাবে বক্তৃতা দেওয়ার আগের সেই শক্তি নেই ।তথাপি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লক্ষীনাথ বললেন এখন আমার দিক থেকে আপনাদের আশীর্বাদ ছাড়া দেওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ বামুনের এটাই পেশা। তারপরে কলকাতায় উ-ভা-ই-সা  সভার বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে তিনি বললেন এত বছর আগের আলোচনা ক্লাব মরে ছিল বলে বলেছে সে আসলে মরেনি এটা কেবল ‘সাসপেন্ডেন্ট অ্যানিমেশন।’

 এভাবে বাইরে বেরিয়ে, গুনমুগ্ধদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়ায় লক্ষ্মীনাথের দেহে বাসা বাঁধা জড়তাটা কিছু কমে এল। ভাঙ্গা মনে আশাও কিছুটা জাগল।এই সংসারে তার দিন ঘনিয়ে এসেছে বলে বুঝতে পেরেও নিজের ওপরে একটা ভরসার সৃষ্টি হল।আশা নেই যদিও বেঁচে থাকার মোহটা মরে যায়নি।। মৃত্যু শাশ্বত, নিষ্কাম মনোভাবে মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত জেনেও লক্ষ্মীনাথ সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারলেন না। তার মানে তার মনটি আরও কিছুদিন পর্যন্ত বিশ্বসংসারের আলো বাতাস উপভোগ করতে চায়।

 ডিব্রুগড় সাহিত্য সভা সাহিত্যরথী সংবর্ধনা জানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর রবিবার বিকেল তিনটের সময় অসমিয়া নাট্য মন্দিরে একটি জনসভার আয়োজন করল। সভার উদ্দেশ্য হল (ক)বর্তমান অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য আনন্দ প্রকাশ করে তাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন এবং (খ)অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেজবরুয়া মহাশয়ের বাণী শ্রবণ।

 সভার কাজ আরম্ভ হল।শ্রীমিঠারাম বরা সভাপতির আসন গ্রহণ করলেন।সভাপতির নির্দেশ অনুসারে সম্পাদক আনন্দরাম হাজরিকা  অভিনন্দন পত্র পাঠ করে সেটা লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার হাতে অর্পণ করলেন। সভায় উপস্থিত থাকা জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজুদ্দিন আহমদ হাজারিকা, তুলসীপ্রসাদ দত্ত, গনেশরাম ফুকন আদি বেজবরুয়াকে  সম্বর্ধনা জানিয়ে  কিছু কথা বললেন।অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য সদিচ্ছা সূচক প্রস্তাব গ্রহণ করার পরে হাতে তালি দিয়ে লক্ষীনাথ  বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন।

  ‘মাননীয় সভাপতি মহোদয় এবং সভায় উপস্থিত অসম প্রেমী সুধী সমাজ,

  আমি আমার  অসুস্থ অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে উঠার মূলে প্রথমে জনগণের আশীর্বাদ দ্বিতীয়ত ডাক্তার, তৃতীয়ত আমার পরিবার এবং আমার মেয়েদের যত্ন। যমরাজা আমাকে ভালো করে দৌড় করিয়েছেন। তবে বামুনের ছেলে যদিও টিকি না থাকায় আমাকে ধরতে পারলেন না। দেশ দস্তুর মতে আমার মাথার সামনের দিকে চুলের গোছাটা ,সেই গোছায় যম ধরতে গিয়েছিল।কিন্তু আমি এক দৌড়ে পগার পার।সেইজন্যই আমি আজ সশরীরে এই সভায় বিদ্যমান।’

 শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।

 ভূমিকা শেষ করে লক্ষ্মীনাথ তারপরে বললেন,‘আজকাল যেখানে সেখানে শোনা যায়, ‘আমাদের দেশটা গেল,বিজাতীয় হয়ে গেল।আমি বলি—‘ভয় কর না,চিন্তা কর না।বিদেশির স্রোত দেখে চমকে যেও না।পরিবর্তন সৃষ্টির নিয়ম।ভাস্কর বর্মার দিনের অসম এবং আজকের অসম দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক।

 এখানে একটা গল্প বলি।সত্য যুগে বটগাছের গুটিগুলি ছিল একটি লাউয়ের সমান।বটগাছের নিচে বিশ্রাম নেবার সময় গুটি পড়ে অনেক পথিকের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল।তথাপি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার হুঁশ নেই।এভাবে কিছুদিন যাবার পরে একদিন গুটি খসে পড়ে একজন বামুনের মৃত্যু হল।এবার কিন্তু ব্রহ্মার আসন টলল।তিনি স্বয়ং এসে বটগাছকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন বামুন মারলি?’

বটগাছ উত্তর দিল, ‘তাকে মরতে হবে বলে মারলাম।তাতে আবার কি অসুবিধা হল?বামুনের প্রতি তোমার এত পক্ষপাতিত্ব কেন?

বটগাছের অভদ্র উত্তর শুনে ব্রহ্মা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অভিশাপ দিলেন।‘বটগাছ,আজ থেকে তোর গুটিগুলি এই এতটুকু হয়ে যাবে।সেদিন থেকে বটগাছের গুটিগুলি ছোটো হয়ে গেল।কিন্তু গুটির ভেতরে সার বা ভাইটালিটির জন্যই ছোট্ট একটি গুটি থেকে আজও যেখানে সেখানে এক একটি প্রকাণ্ড বটগাছ জন্মায়।

তাই বিদেশি চারপাশ থেকে চেপে ধরে অসমিয়া জাতিকে আকারে ছোটো করে ফেলা সত্ত্বেও ভাইটালিটি থাকলে অসমিয়া কখনও মরতে পারে না।    

গীতার কথামতো বলি, কাজ করে যাও— ফলের অপেক্ষা কর না। অন্যেরা কী বলে সেদিকে তাকিও না। মাত্র ঈশ্বরে মতি রেখে সমস্ত কাজের ফলাফল তার হাতে সঁপে দিয়ে কাজ করে যাও।নিখুঁত অসমিয়া ভাষা বলবে, লিখবে। অসমিয়া সাজ পোশাক পরবে। শুধু শুধু বিদেশির অনুকরণ করবে না ।

নহি কল্যাণ কৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গছতি। ‘

লক্ষ্মীনাথের কন্ঠে আগের মতো ভাবের উচ্ছ্বাস নেই। কঠিন শব্দের প্রয়োগ নেই। বক্তৃতা ও সংক্ষিপ্ত।খুবই কম সময়ে তিনি সমাপ্তি টানলেন। সঙ্গে সঙ্গে  এক ধরনের সংযোগহীনতার যন্ত্রণায় তাঁর অন্তরটা কেঁপে উঠল। বড়ো দুর্বল অনুভব করলেন । ধীরে ধীরে নিস্তেজ  পদক্ষেপে নিজের আসনে এসে বসলেন। 

এটাই লক্ষ্মীনাথের শেষ জনসভা এবং শেষ বক্তৃতা। এমনিতে সুস্থ বলে মনে হলে ও ভেতরে ভেতরে লক্ষ্মীনাথ দুর্বল হয়ে পড়লেন। ইচ্ছা থাকলেও বেশি দিন যে বেঁচে থাকতে পারবেন না এই বিষয়ে তিনি নিজেও নিশ্চিত হলেন। কাউকে বললেন না। উল্টে সম্বলপুর ফিরে যাওয়ার কথাই বলতে থাকেন। কিন্তু দুই কুড়ি বছর ধরে সুখ-দুঃখের সঙ্গী, ঘর সংসার সমস্ত ক্ষেত্রে সুযোগ্যা , পরম বান্ধবী প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। এই বিষয়ে তিনি কন্যা রত্নার সঙ্গে কথা বললেন। মমতাময়ী রত্না বাবাকে সম্বলপুরে  নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করল। মেজ জামাই রোহিণী কুমার ও দায়িত্বশীল। সম্বলপুরে যাবার জন্য টিকিট কাটার কথা বলতেই তিনি বলেন,’ বাবা নতুন একটা বাড়ি করছি। বাড়িটা তৈরি না হওয়ার আগে আপনি সম্বলপুর যেতে পারবেন না।’

বাবার শারীরিক অবস্থাটা ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়ছে শুনে বরোদায় থাকা অরুণা অস্থির হয়ে পড়ল। দীপিকাকে নিয়ে বাবার মনে যে একটা অশান্তি আছে অরুণা জানে। অরুণা চিঠি লিখে দীপিকাকে দেশে ফিরে আসতে লিখল । অন্য একটি চিঠিতে লন্ডন স্থিত ব্যাপ্টিস্ট মিশনারির কর্মকর্তাদেরও অনুরোধ জানাল যাতে অন্তত কিছুদিনের জন্য দেশে এসে দীপিকা অসুস্থ পিতাকে দেখে যাবার সুযোগ পায়। অরুণার সকাতর আবেদন অস্বীকার করতে না পেরে প্রধান নান দীপিকার ছুটি মঞ্জন করলেন। অবশেষে ইংল্যান্ড থেকে স্ট্রথেডেন নামক জাহাজে বোম্বাই, সেই রাতেই রেলে বোম্বাই থেকে কলকাতায় এবং কলকাতা থেকে ১৯৩৮ সনের এক ফেব্রুয়ারি দীপিকা ডিব্রুগড় পৌঁছাল।

দীপিকা এখন দীপিকা বেজবরুয়া  নয়। দীপিকা এখন সিস্টার দীপিকা। আগের চেয়ে তার স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। আড়াই বছর শীত প্রধান ইংল্যান্ডে থাকার ফলে গায়ের রং উজ্জ্বল হয়েছে। তাছাড়া তার পরনে নানের পোশাক, গলায় সাদা সুতোয় ঝুলানো যিশুখ্রিস্টের মূর্তি। দীপিকা খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী।

সে এসে সামনে দাঁড়াতেই লক্ষ্মীনাথের মনে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হল। এটা রাগ নয়, ক্ষোভ নয়, খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছে বলে তার প্রতি ঘৃণা নয়। এটা ভালোবাসা। সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা। দীপিকার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের অন্তর এক অদ্ভুত শান্তি লাভ করল। এই শান্তির সঙ্গে কীসের এক আনন্দ। ব্যাখ্যাতীত এক আনন্দে লক্ষ্মীনাথের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

এদিকে খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী হওয়ার জন্য আত্মসমাহিত যদিও বাবার আদর  ভালোবাসা অনুভব করে দীপিকার দুই চোখ ও জলে ভরে  উঠল।

খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া নিয়ে এক সময় দীপিকার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের তীব্র বিরোধ হয়েছিল। এখন দুজনের মধ্যে মিলন হতে দেখে বাড়ির সবাই আনন্দিত হল।

তারপরে দীপিকা সহজ হয়ে পড়ল। আগের মতোই কথা বলতে লাগল। বোম্বাই থেকে জাহাজে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ যাত্রা, ঐতিহ্যপূর্ণ ইংল্যান্ডের  কোথায় কীভাবে থাকে, সেখানকার নানদের সঙ্গে তার দৈনন্দিন জীবন, তাদের সেবামূলক কর্ম, তাদের উপাসনা… লক্ষ্মীনাথ আগ্রহ নিয়ে দীপিকার কথা শুনল। বিদেশিনী নানদের সঙ্গে দীপিকা ভালই আছে, নিজেকে সেবামূলক কাজে উৎসর্গ করেছে বলে জানতে পেরে লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেলেন। তারপরে দীপিকার সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর আলোচনা হল। শারীরিক অসুস্থতার জন্য বাবার যে কষ্ট হচ্ছে, এই বিষয়ে দীপিকা সচেতন। বাবার মানসিক শান্তির জন্য সে বাইবেলের স্তোত্র এবং কিছু গান গেয়ে শোনাল। অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে মেয়ে এভাবে গান গেয়ে স্তোত্র শুনিয়ে শান্তি পাচ্ছে দেখে লক্ষ্মীনাথ সুখী হলেন।

অবশেষে অন্তঃসলিলা ভালোবাসা এবং আত্মিক এক অনুভূতিতে উদার লক্ষ্মীনাথ দীপিকার কাঁধে ডান হাতটা রেখে বললেন,’ মা দীপি, ঈশ্বরের ওপর নির্ভরতা এবং ভালোবাসায় যদি আন্তরিকতা থাকে— তোর মঙ্গল হবেই। রাম ,রহিম, যিশু যার মাধ্যমেই চলার পথ বেছে নিস না কেন, আন্তরিক সমর্পণ তোকে তোর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবেই দেবে। ‘

‘পাপা—।’দীপিকার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,’আজ তুমি একথা বলছ !’

‘আমি বলছি নারে,আমাদের ভাগবতে এসব কথা আছে।শ্বাশত বাণীতে সমৃদ্ধ আমাদের ভাগবতের কথাই আমি বলছি।যাই হোক,তুই সুখী হ,মা।তোর আত্মা শান্তিতে থাকুক।’

তারপরে পিতার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে দীপিকা কলকাতা যাত্রা করার দিন ঠিক করল।ছোটো মেয়ের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের এই বিদায় বড়ো করুণ।ডিব্রুগড় স্টেশন থেকে দীপিকা ট্রেইনে কলকাতা যাত্রা করবে।তার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।একটা মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্মীনাথ তাকে চোখের আরাল করতে পারে নি।তার জন্যি তিনি স্টেশনে  গিয়ে দীপিকাকে বিদায় জানাতে চাইলেন।রত্না,রোহিণী এমনকি প্রজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়া দেহটা নিয়ে  স্টেশনে যেতে লক্ষ্মীনাথকে বাধা দিল।কিন্তু তিনি মানলেন না।দেহ সাথ না দিলেও কন্যার প্রতি ভালোবাসা এবং শুধুমাত্র মনের জোরে লক্ষ্মীনাথ অবশেষে স্টেশনে এসে দীপিকাকে সাশ্রু নয়নে বিদায় জানালেন।

দীপিকা আসার পরে উদার চেতনায় লক্ষ্মীনাথের মনের পরিবর্তন ঘটল।  পুনরায় কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেলেন।তার জন্যই রত্না রোহিণী বিরোধিতা করা সত্ত্বেও লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুরে ফিরে যাবার জন্য লক্ষ্মীনাথ ট্রেনের টিকেট কাটলেন।যাত্রার তারিখ ১৮ মার্চ বলে ধার্য করা হল।সঙ্গে তিনি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারাকে জানিয়ে দিলেন,’২০ মার্চ সকালবেলা দার্জিলিং মেলে বোধ করি সাতটার সময় শিয়ালদহ গিয়ে পৌছাব।শিয়ালহ  থেকে হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।  হাওড়াতে সারাদিন থেকে সেদিনই বোম্বে মেইল ধরে সেদিনই সম্বলপুর চলে যাব। হাওড়াতে তোমাকে পেলে বেশ মজা হবে।’ কিন্তু এবারও রত্না প্রচন্ড বিরোধিতা করল,’বাবা এই শরীর নিয়ে তুমি এতদূর জার্নি করতে পারবে না।এই অবস্থায় আমি তোমাকে যেতে দিতে পারব না।’ অবশেষে জেদি কন্যা রত্নার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথকে আপোষ করতে হল।

এমন সময় গুয়াহাটি থেকে চন্দ্র কুমার আগরওয়ালার মৃত্যু সংবাদ এল ( ২ মার্চ ১৯৩৮ সাল)। অভিন্ন হৃদয় চন্দ্রকুমারের মৃত্যু সংবাদ শুনে লক্ষ্মীনাথ মর্মাহত হলেন। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বহু সমস্যার সমাধান করা বন্ধু। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বেঁচে থাকার এক অন্যতম শক্তি। চন্দ্র কুমার ছিল তার জন্য জীবনটা উপভোগ করার, জীবনটাকে বিস্তার করার প্রাণময় এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। চন্দ্রকুমার ছিল তার বহু সৃষ্টির প্রেরণা দাতা। চন্দ্রকুমার ইহসংসার ত্যাগ করার খবর শুনে লক্ষ্মীনাথের অন্তরটা কেঁপে উঠল। এবার তার এরকম মনে হল  যেন মৃত্যুদূত তার দরজার  সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুখে দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন,’ বন্ধু ,সখা ,সুহৃদ— কাজটা উল্টো হয়ে গেল । আমারই যাবার কথা ছিল । আমাকে ছেড়ে তুমি এগিয়ে গেলে । এটা ঈশ্বরের কী ধরনের ইচ্ছা ? তুমি চলে যাবার খবর শুনে আমার আঙ্গুল অবশ হয়ে পড়েছে ,গলা শুকিয়ে আসছে, জিভ কড়কড়ে হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রভু আমাকে গায়ে জোর দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে কি?’

মাজিউকে হারিয়ে মানসিকভাবে লক্ষ্মীনাথ বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিছুই ভালো লাগছে না। লেখা মেলা করার শক্তি তো আগেই নাই হয়ে গিয়েছিল। একটু আধটু বই পত্র পড়তেন। এখন পড়ার জন্য কিছু একটা মেলে ধরলেই অবশ আচ্ছন্নতার সঙ্গে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে আসে। রত্নার মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটছিল। ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন তার মনটা আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ে। তাঁর মনটা শান্ত করার জন্য কাছে বসে প্রজ্ঞা ব্রাহ্ম  গীত গায়। না এভাবে শান্তি পাচ্ছেন না। তারপরে মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের রবিবার তাকে আনন্দ দেবার জন্য রোহিণী এবং রত্না ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজের আয়োজন করল। একটা মোটর বোটের ব্যবস্থা করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বের হলেন।

ভটভট শব্দে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে মটর বোট এগিয়ে চলেছে। এখন ব্রহ্মপুত্রের দুই পার উত্তাল জলরাশিতে প্লাবিত নয়। তীর থেকে জল নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই তীরের  গাছপালায় চৈত্র মাসের ধূসরতা। তীর থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত বালুময় চর পার হয়ে মূল জলধারা। ধীরগতিতে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রকে এখন বিবাগী বলে মনে হচ্ছে। তথাপি নদীবক্ষের মুক্ত পরিবেশে এসে লক্ষ্মীনাথ আনন্দিত হলেন।

ব্রহ্মপুত্রের বালুচরের কাছে নৌকায় তার জন্ম। শৈশবে বাবার সঙ্গে এই নদী দিয়ে নৌকায় অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া, উচ্চ শিক্ষার্থী গোবিন্দ দাদার সঙ্গে দিশাং মুখ থেকে এই নদী দিয়ে কলকাতায় যাত্রা… এই নদী দিয়ে যাত্রা করার সময় দুই পারের বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজ গাছপালা চিত্রময় গ্রাম ওপরের বিশাল নীলাকাশ, জ্যোৎস্না রাতের রুপালি আলো ঝকঝকে তীরের বনভূমি… সবকিছু মনে পড়ছে।

পরিবারের সবার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজন খেলেন। মোটর লঞ্চ দাঁড়িয়ে থাকা জায়গায় একটা চালতে গাছের নিচ থেকে চালতে কুড়িয়ে প্রফুল্ল মনে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি ফিরলেন। তাকে প্রফুল্ল চিত্ত দেখে প্রজ্ঞা, রত্না এবং রোহিণীও খুশি হলেন। কিন্তু সেদিন বিকেল থেকেই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। সঙ্গে তার পুরোনো অন্ত্রের ঘা টা চাগাড় দিয়ে উঠল। রোগটা এত খারাপ ভাবে বেড়ে গেল যে আগে থেকে তাকে চিকিৎসা করতে থাকা ডঃ দাস দেওয়া কোনো ঔষধেই কাজ দিল না। ২৫ মার্চের রাত থেকে লক্ষ্মীনাথ ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়লেন। তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। শেষ রাতের দিকে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন ।

১৯৩৮ সালের ২৬ মার্চ । শনিবার । সকালে ব্রহ্মপুত্রের পারে বিদায়ের করুণ সুর বেজে উঠল। বাতাস নিস্তব্ধ হল। সকালের সজীবতা নাই হয়ে গেল। শয্যাগত লক্ষ্মীনাথ কাতর ভাবে বুকের পাশটাতে বসে থাকা পত্নীর দিকে তাকালেন । ইতিমধ্যে অন্তিম মুহূর্তের আশঙ্কায় প্রজ্ঞার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। তার দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে। তথাপি নিজেকে সামলে স্বামীর শিথিল শক্তিহীন ডান হাতটা চেপে ধরল। পায়ের কাছে বসে থাকা রত্না এবং মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিণী পরমেশ্বরের কাছে লক্ষ্মীনাথের জীবনের জন্য মিনতি করছে । কিন্তু না সবকিছুই অসার হয়ে গেল । জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল । লক্ষ্মীনাথ চিরকালের জন্য চোখ বুজলেন। 

যিনি ব্রহ্মপুত্রের জলে ভাসমান নৌকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি প্রাণের সম্পত্তি স্বরূপ ব্রহ্মপুত্র নদীটিকে কৃপা বরুয়ার শেষ উইলে অসমিয়া জাতিকে দান করে গেছেন, সেই তিনি আজ লুইতের তীরে দেহত্যাগ করলেন।দেশকে ভালোবাসা যেখানে সেখানে দেশের গুণ গাওয়া মাতৃভাষার সামান্য অপমান অবহেলা হলেও বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে মেতে উঠা এবং যার জীবনের মূল মন্ত্র দেশ, দেশের জাতি এবং মাতৃভাষা সেই লক্ষ্মীনাথ অসম মায়ের কোলে চির বিশ্রাম নিলেন ।

মুহূর্তের মধ্যে  দুঃসংবাদটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।চা ব্যাবসায়ী রোহিণী কুমার বরুয়ার বাসভবনে সাহিত্যরথীকে অন্তিম দর্শন করার জন্য জনতার স্রোত বইতে লাগল। ডিব্রুগড়ের সমস্ত শিক্ষানুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। কিছু সরকারি অফিস খোলা থাকলেও জেলা উপায়ুক্ত এই উপলক্ষে সোমবার দিনের দুটো থেকে সরকারি  কার্যালয়ের ছুটির আদেশ দিলেন।

 শনিবার দিন নগরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন শিক্ষা অনুষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী,ছাত্র-ছাত্রী রোহিণীকুমার বরুয়ার বাসভবনের প্রাঙ্গণে সমবেত হলেন।ন্তিম শয়নে শায়িত্ত বেজবরুয়ার দেহটা ফুল দিয়ে সাজিয়ে নাম কীর্তন করে নগর পরিভ্রমণ করে নদীর ঘাটে নিয়ে আসা হল।

লুইতের তীরে চিতা সাজানো হল।

 ইতিমধ্যে শিবসাগর থেকে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন এসে উপস্থিত হয়েছে।

 হিন্দু সংস্কার মতে অপুত্রক বা পুত্রের অপারগতার ক্ষেত্রে অন্তেষ্টিক্রিয়ার অধিকারী হয় বিবাহিত স্ত্রী কন্যা এবং জামাতা। দৌহিত্র হিসেবে অরুনার পুত্র স্বরূপ কুমার মুখার্জি লক্ষ্মীনাথের মুখাগ্নি করার অগ্রাধিকার পায়। কিন্তু এখন বরোদা থেকে এনে মুখাগ্নি করানোটা অসম্ভব কথা। তাছাড়া জীবিত থাকতেই এই বিষয়ে লক্ষ্মীনাথ সজ্ঞানে বিধান দিয়ে গেছেন। তার ইচ্ছা অনুসারে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন তার মুখাগ্নি করল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চিতাগ্নি জ্বলে উঠল।লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার দেহটা পঞ্চভূতে বিলীন হল। 

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার প্রয়াণের কথা শুনে প্রবীণ সাহিত্যিক পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ বেজবরুয়া জন্মভূমি থেকে দূরে দূরে অন্য প্রাদেশিক ভূমিতে কাটিয়েছেন। তথাপি ‘চরণে জানে মরণের ঠাঁই’ এই নীতি অনুসারে তার  লুইতিয়া নশ্বর দেহটি লুইতের বালুতে এসে বিলীন হয়ে গেল।

 কবি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা তার শোকগাথায় ব্যক্ত করলেন,

 লুইতের বুকে জন্ম লভিলে

 লুইতের বুকে মহাপ্রয়াণ

 লুইতের সুরে সুর বেঁধে নিয়ে

 দিলে অসমকে হারানো প্রাণ।

বঙ্গের অভিজাত দেশ পত্রিকা লিখল অসমিয়া সাহিত্যের ভান্ডারে  বেজবরুয়া মহাশয়ের দান অতুলনীয়।বাংলার সহিত তাহার অন্তরের যোগ ছিল। ব্যাবসা সূত্রে তিনি সম্বলপুরে বাস করিতেন। উড়িষ্যার সঙ্গেও তাহার যোগাযোগ ছিল। তাহার সাহিত্য সৃষ্টিতে বাংলা উড়িষ্যা এবং অসমের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।

বেজবরুয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানতে পেরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ভারতবর্ষের প্রত্যেক প্রদেশে তাহার আপন আপন ভাষার পূর্ণ ঐশ্বর্য উদ্ভাবিত হলে তবেই পরস্পরের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠ অর্ঘের দান--প্রতিদান সার্থক হইতে পারিবে এবং সেই উপলক্ষেই শ্রদ্ধা সমন্বিত ঐক্যের সেতু প্রতিষ্ঠিত হইবে। জীবনে লক্ষ্মীনাথ  বেজবরুয়ার এই সাধনা অতন্দ্রিত ছিল। মৃত্যুর মধ্য দিয়া তাহার এই প্রভাব বল লাভ করুক এই কামনা করি।’ 


  


    


সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৬ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৬

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das







  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৬)

' কাকাবাবু ,দেরিতে হলেও অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের একমাত্র জাতীয় অনুষ্ঠান' অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্স (অসম সাহিত্য সভা) অবশেষে আপনাকে স্বীকৃতি দিল।'

' হ্যাঁ যদু বাবা, খবরটা পেয়ে ভালোই লাগছে।'

অসমিয়া ভাষা সাহিত্যে অমূল্য অবদানের জন্য আপনাকে এই স্বীকৃতি।এখন আপনি কনফারেন্সের মাননীয় সভাপতি ।আপনার জন্য আমি গৌরব অনুভব করছি। আপনার সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানাবার জন্য সম্বলপুরে  যেতে চাইছিলাম। আপনি হয়তো কনফারেন্সের সম্পাদকের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পত্র পেয়েছেন?'

' পেয়েছি। কনফারেন্সের সপ্তম অধিবেশনের জন্য আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করার প্রস্তাব সহ নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়েছে। এবারের অধিবেশনটি গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হবে। এখন কনফারেন্সে একটা জাতীয় দায়িত্ব যখন অর্পণ করেছে, অস্বীকার করার তো উপায় নেই। আমি যাব,তবে বাড়িতে তোমার কাকিমাও নেই। তিনি বরোদায় অরুণার কাছে গিয়েছেন।'

' কাকিমা বরোদায়!'

' প্রথম ছেলের পরে এবার ছয় ডিসেম্বর অরুণা একটি শিশু কন্যার জন্ম দিয়েছে। প্রসূতির সেবা যত্নের জন্যই তোমার কাকিমাকেও যেতে হল। অবশ্য রত্না বাড়িতে। আমি কনফারেন্সে চলে গেলে ওকে একা থাকতে হবে। তাই রত্নাকেও সঙ্গে নিয়ে এলাম।'

' ভালোই হয়েছে। রত্না অধিবেশনে গান গাইতে পারবে।'

' আসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সভাপতি হয়েছি বলে জানতে পেরে আমাকে নিয়ে কলকাতায় এত হুলস্থূল।সম্বলপুর থেকে এসে কলকাতার সিক্স বাই ওয়ান দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে আছি বলে শুনে কলকাতা অসমিয়া ছাত্ররা আমাকে অভিনন্দন জানাল। তারপরে তারা সেন্ট পল গেস্ট হাউসে আমার সম্মানে টী‐ পার্টি দিল। সেখানে দুর্গাধর বরকাকতী , হরেকৃষ্ণ দাস এসেছিলেন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করে টী‐পাটিতে বক্তৃতা দিতে হল।'

' সেটাই হবে। এখন যেখানে যাবেন, সেখানেই জনগণ আপনাকে সম্বর্ধনা জানাবে। সম্বর্ধনা সভায় শৰাই এবং ফুলতোলা গামছা নিতে নিতে আপনার হাত ব্যথা হয়ে যাবে ।'

হবে যদু  বাবা। সেইসব শরাই -সম্বর্ধনা- ফুলতোলা গামছার কথা রাখ। কথাটা হল, ২৫ ডিসেম্বর রত্নাকে নিয়ে গুয়াহাটিতে রওয়ানা হওয়ার জন্য টিকেট কাটলাম। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে কি?'

' সেটা কি আর আপনাকে বলতে হবে? আপনি এখন লিটারেরি কনফারেন্সের পরম শ্রদ্ধাভাজন সভাপতি। আপনার সঙ্গে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্মানের, গৌরবের। শুধু আমি নয় আপনার সঙ্গে গল্প লেখক লক্ষ্মীধর শর্মাও যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে।'

' তার মানে যা বুঝতে পারছি, এখন আসাম লিটারেরি  কনফারেন্সের সভাপতির পদ  পাবার জন্যই তোমরা আমাকে সমাদর করবে। ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া কে মনে রাখবে না—-।'

না, কাকাবাবু, এভাবে বলবেন না। অন্যের কথা জানিনা, আমার জন্য আপনি যেকোনো পদাধিকারীর চেয়েও ব্যক্তি হিসেবে বেশি আদরের, বেশি মহান।'

' এই যে যদু, বিশেষণ লাগানো বড়ো বড়ো কথাগুলি এত বেশি বলনা।'

' কেন?'

' নিজের মানুষের মুখে সেইসব শুনলে বড়ো লজ্জা লাগে। আচ্ছা, কনফারেন্সের জন্য অভিভাষণটা লিখে তোমাকে পাঠিয়েছিলাম, সেটা পড়ে কেমন লাগল?'

' ভালো হয়েছে। আপনি অধিকার দিয়েছিলেন বলেই আমি কিন্তু ভালোভাবে দেখে দু-চারটা কথা যোগ করেছি। সেসব আপনার পছন্দ হয়েছে তো?'

' তুমি কবি, আমার আদরের কবি। কবির হাতে পড়েছে যখন আমার অপছন্দ হওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারেনা।'

অবশেষে যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা, লক্ষীধর শর্মা এবং কলকাতায় থেকে কলেজে পড়া কয়েকজন অসমের ছাত্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ এবং রত্না রেলগাড়িতে করে ২৬ ডিসেম্বর আমিনগাঁও পৌঁছালেন। আমিন গাঁও রেলগাড়ি থেকে নামার পরেই অসংখ্য লোকের ভিড়। ফেরিতে করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে পান্ডু ঘাটে নামার পরে ভিড় আরও বেড়ে গেল। সামনে উপচে পড়া জনতা দেখে লক্ষ্মীনাথের হৃদয় উথলে উঠল। এরা সবাই অসমের মানুষ, অসমিয়া মানুষ। সহজ সরল অসমিয়া মানুষের মনে মাতৃভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি এত অনুরাগ। অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথের অবদানের জন্যই তাকে ঘিরে জনগণের এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ। অবশ্য অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে অনেক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে লক্ষ্মীনাথ অসমিয়া সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা পল্লবিত করেছেন,সমৃদ্ধ করেছেন।জনতার উচ্ছ্বাসপূর্ণ জয়ধ্বনি শুনে লক্ষীনাথের এরকম মনে হল যেন এত বছর ধরে তার সেই সংগ্রাম, সেই শ্রম সার্থক হল।

পান্ডু স্টেশন থেকে লক্ষ্মীনাথ এবং রত্নাকে গন্তব্যস্থানে নিয়ে যাবার জন্য ট্যাক্সির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের নিয়ে ট্যাক্সিটা রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেল। লক্ষ্মীনাথের ইচ্ছা অনুসরণ করে তার  থাকার জায়গা ঠিক করা হল গুয়াহাটিৰ দিঘলী পুকুরের পারে থাকা আইন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জ্ঞানদাভিরাম বরুয়ার বাড়ি । জ্ঞানদাভিরামের বাড়ি পর্যন্ত  জনতার ভিড় দেখা গেল। অপূর্ব এই দৃশ্য দেখে লক্ষ্মীনাথ ভাবলেন ভাষা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে অসমিয়া আর দুঃখী হয়ে থাকবে না।

২৭ এবং ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৪ দুদিনের কার্যসূচি নিয়ে অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্সের  অসম সাহিত্য সভার অধিবেশন। ২৭ ডিসেম্বর সকাল বেলা ন’টা থেকে অধিবেশনের কার্যসূচি আরম্ভ হল। নানান রঙের ফুল এবং সবুজ পাতা দিয়ে সাজানো গাড়ি একটায় সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এবং রত্নাকে আদর করে এনে অধিবেশনের মঞ্চে বসতে দেওয়া হল। সভাপতির আসন অলংকৃত করা লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার বক্তৃতা শোনার জন্য সামনে অপেক্ষমান সাহিত্য অনুরাগী অগণন জনতা।

 সভা আরম্ভ হওয়ার পরে সাহিত্যিক সত্যনাথ বরা কনফারেন্সের প্রাসঙ্গিকতার কথা ব্যক্ত করলেন।তারপরে বর্তমান সভাপতি সৃষ্টি করা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সঙ্গে মাতৃভাষার প্রতি নবনির্বাচিত সভাপতির জাগ্রত অনুরাগ, অগ্রিম স্বদেশ প্রীতি এবং অসমিয়া ভাষার স্বতন্ত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে তার অবিরত সংগ্রামের কথা ব্যাখ্যা করে অভ্যর্থনার ভাষা পাঠ করলেন।

  কার্যসূচি অনুসারে এবার সভাপতি মহোদয়ের বক্তৃতা দেওয়ার পালা। নবনির্বাচিত সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অভিভাষণ লিখে এনেছেন। এটা যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা দেখে দেবার পরে ছাপা করার কাজে লক্ষ্মীধর শর্মা সাহায্য করেছিলেন।

ইতিপূর্বে প্রায় আট বছর আগে অসম ছাত্র সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে লক্ষ্মীনাথ এই গুয়াহাটিতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার চেয়েও এটিতে জনগণের উপস্থিতির সংখ্যা বেশি। সমস্ত বয়সের সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বিনম্র প্রণাম জানিয়ে লক্ষ্মীনাথ বক্তৃতা শুরু করলেন।

অভিভাষণে  লক্ষ্মীনাথ প্রাচীন অসম তথা কামরূপের স্থান, প্রাচীনকাল থেকে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের বিকাশ, প্রকৃত সাহিত্যের লক্ষণ, জাতীয় সাহিত্য ইত্যাদি  তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে নিজের মতামত তুলে ধরলেন। তারপরে পরিসমাপ্তির দিকে এগিয়ে তিনি ছাত্র সম্মেলনে তুলে ধরা বক্তৃতার সুরে বললেন,' শ্রদ্ধাভাজন সমবেত জনগণ আজ পুনরায় এটা জোর  দিয়ে বলি এবং আপনারা সবাই মূল্যবান বলে মনে করবেন, অসমিয়া ভাষার উন্নতিই হল অসমের উন্নতির প্রথম পদক্ষেপ। হতে পারে  আমাদের মানুষের লেখা সামান্য, হতে পারে আমাদের অবস্থা এত শক্তিশালী নয়— তা বলে ভারতের অন্যপ্রদেশের মানুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যেতে না পারায় মনকে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকব নাকি? এভাবে থাকলে ভারতীয় জাতীয় জীবনে আমাদের আসন কোথায় থাকবে? আজ ভারতীয় জাতীয় জীবনকে যে একটা নতুন স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেই ভাবের ঢেউ আমাদের হৃদয়– মন বোধ– চেতনায় আলোড়নের সৃষ্টি করবে না কি? লেখার সংখ্যা কম বলে আজকের বিশ্বের এই জাগরণের যুগেও আমরা ঘুমিয়ে থাকব নাকি? না ,আমরা শুয়ে থাকতে পারব না। আমরা আমাদের অসমিয়া নাম লোপ পেতে দিতে পারি না। আজকের এই নবজাগরণের যুগে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মতো  আমাদের অসমকে ও মর্যাদার আসন লাভ করতে হবে।

মাননীয় অসম প্রেমী জনগণ, আপনারা নিশ্চয় জানেন—কলকাতায় পড়াশোনা করতে যাওয়া মুষ্টিমেয় কিছু অসমিয়া ছাত্র অসমিয়া ভাষার উন্নতি সাধিনী সভার মাধ্যমে প্রথমে যে বীজ বপন করেছিল সেই বীজই এখন বটগাছ হয়ে শান্তির ছায়া রূপে সমগ্র অসমকে ঘিরে রেখেছে। পাঠশালার  সেই ছাত্রের গলা থেকে বের হওয়া ক্ষীণ কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে বিশাল হয়ে অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আজ পূব থেকে পশ্চিমে উত্তর থেকে দক্ষিনে সমগ্র অসমে একসঙ্গে সেই কন্ঠের সঙ্গে কণ্ঠস্বর মিলে উদাত্ত কণ্ঠে মাতৃভাষার আরতি করছে।

  বন্ধুরা আসুন আজ এই আনন্দের দিনে এই সাংস্কৃতিক মেলায় আমাদের যথাসাধ্য শক্তি স্বদেশ জাতির উন্নতির জন্য মাতৃভাষার সেবার জন্য উৎসর্গ করে জীবন ধন্য করি আসুন। মাতৃভাষার উন্নতিতেই আমাদের দেশের উন্নতি, মাতৃভাষার সেবাতেই দেশের সেবা, সেবার মাধ্যমে আমাদের লুপ্ত গৌরবের পুনরুত্থান সম্ভব হবে।… … …’

 সভাপতির অভিভাষণের পরে বিকেলে উজান বাজারের নাটঘরে (আজকের কুমার ভাস্কর নাট্য মন্দির) ছয়টা থেকে বিষয়বস্তু নির্বাচনের সভা বসেছে।গম্ভীর পরিবেশে উত্থাপিত প্রস্তাবের সমালোচনা তর্ক-বিতর্ক চলছে।

 রাত ন'টা বাজতে চলেছে। এই সময় একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা  ঘটল। মাথায় ফেল্ট হেট, হাতে লাঠি আর ডান হাতে অলেস্টার কোটটা ঝুলিয়ে নিয়ে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া সভাঘরে প্রবেশ করলেন।

  সভাপতির আসনে লক্ষীনাথ বসে পদ্মনাথকে দেখতে পেয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলেন না। কিন্তু তিনি এই জন্য অবাক হলেন যে পদ্মনাথ তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি বসে থাকা আসনের কাছে এসে ইউরোপীয় রীতিতে প্রথমেই টুপিটা খুলে বাঁ হাতে নিয়ে চট করে লক্ষ্মীনাথের হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন ‘মিস্টার বরুয়া উই আর মিটিং আফটার টুয়েন্টি ইয়ার্স।’

হ্যাঁ, আজ থেকে সুদীর্ঘ কুড়ি বছর আগে লক্ষ্মীনাথের কৃপাবরী প্রবন্ধ পদ্মনাথের সম্পাদনায় ঊষা তে প্রকাশ পাওয়ার পরে কাগজটা রাজ-রোষে পড়েছিল। প্রবন্ধটি প্রকাশ করার জন্য সম্পাদক সরকার এবং পাঠকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রবন্ধ প্রকাশ করবে না এবং সেই লেখক কৃপাবর বরুয়ার (লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার) সঙ্গে সম্পাদক কোনো সম্পর্ক রাখবে না বলে শপথ খেয়ে কাগজে বিবৃতি দেওয়ায় পদ্মনাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের বিরোধ শুরু হয়েছিল। তিক্ততাময় সেই বিরোধের জন্যই দুজনের মধ্যে এত বছর যোগাযোগ বন্ধ ছিল। আজ পদ্মনাথ নিজে এসে মিলনের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় লক্ষ্মীনাথ প্রথমে হতভম্ব হলেন। পরে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার আন্তরিকতায় কোনো খাদ নেই দেখে লক্ষ্মীনাথ আপ্লুত হলেন। তারপরে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের দুই অধিনায়ক যে মুহূর্তে কোলাকুলি করলেন সেই মুহূর্তে সভাস্থলে উপস্থিত থাকা লোকেরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালো এবং সমগ্র সভাঘর  নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল ।এই মিলনটা স্বর্গের দেবতার জন্যও উপভোগ্য নান্দনিক এক দৃশ্য।

অল অসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সমাপ্তির পরে লক্ষ্মীনাথ সংগীত সংঘের অধিবেশনে যোগ দিলেন। ইতিমধ্যে প্রিয় বন্ধু চন্দ্রকুমার তার সঙ্গে দেখা করলেন। মাজিউর সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথ অধিবেশনের ভাব ও গম্ভীর আনুষ্ঠানিকতায় গম্ভীর হয়ে পড়া মনটা হালকা করে নিলেন। সভাপতির পদ অলংকৃত করার পরেই সর্বসাধারণ অসমিয়া ভালোবাসার যে ধরনের প্রকাশ তাতে তিনি কিছু পরিমাণে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তার জন্যই তিনি সকলের অজ্ঞাতে চন্দ্রকুমারের সঙ্গে বসলেন। দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু বসে ব্যক্তিগত, নিজের নিজের সংসার, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া নিজের নিজের জীবিকা, দেশ-সমাজ, ‘বাঁহী’র সম্পাদনা প্রকাশ নিয়ে  সমস্যা, ‘বাঁহী’র নিয়মিত লেখকদের সৃজন প্রতিভা,তারপরে নিজের নিজের সৃষ্টিকর্ম ইত্যাদি এটা ওটা কত যে কথা…কথার শেষই হয় না।

 ‘বুঝেছ মাজিউ,সভাপতি হওয়ার পরে বক্তৃতা দেওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ অবশেষে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘আগামীকাল কটন কলেজের ছাত্রদের অনুরোধ রক্ষা করেও একটা বক্তৃতা দিতে হবে।’

‘তুমি এখন অসমিয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের শিরোমণি।’ চন্দ্র কুমার বললেন, ‘অসমিয়া জনগণের সঙ্গে অসমিয়া ছাত্ররা তোমার প্রেরণাদায়ক বাণী শুনতে চায়। তাই ছাত্রদের অনুরোধ রক্ষা না করে থাকতে পার না। তবে বেজ, কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি এখন তুমি যেন বিশেষ কোনো লেখার পরিকল্পনা করছ না?’

  পারিবারিক ঝামেলা বুঝেছ, অনেক ঝামেলা গেল।অরুণাকে বিয়ে দিলাম। এখন রত্নার জন্য ছেলে খোঁজ করছি। কন্যা দায়ের চিন্তা একটা লেগেই রয়েছে। তাছাড়া বার্ড কোম্পানির চাকরিতে ব্যস্ততা বেড়েছে। এইসবের মধ্যে মন মগজ সুস্থির করে নতুন কিছু লেখাই শুরু করতে পারছি না। অবশ্য তার মধ্যে সময় বের করে বৈষ্ণব তত্ত্বের উপরে কিছু প্রবন্ধ লিখেছি।

‘লেখাগুলি ভালো হয়েছে। এটা শুধু ধর্মীয় দর্শন নয়, ভালো সাহিত্যও। তুমি যেভাবে ভাগবতের তত্ত্ব দর্শন ব্যাখ্যা করেছ, সর্বসাধারণ অসমিয়া ভাগবতের সারকথা বুঝতে পারবে। আরও একটা কাজ কর।’


 ‘কী কাজ?’

 ‘তোমার জীবনটা সংঘাত-সংগ্রামে বৈচিত্র্যময়। আত্মজীবনী লিখতে শুরু কর।’

 ‘আত্ম-জীবনী! শোন মাজিউ, আত্মজীবনী লেখার কথা বলা সহজ। লিখব বলে ভাবতেও ভালো লাগে। কিন্তু লেখাটা সহজ নয়। আচ্ছা, অধিবেশনে তুলে ধরা আমার বক্তৃতাটা শুনে কিরকম লাগল?’

  ‘কাল তোমার আড়াই ঘন্টার অভিভাষণটা অসমিয়া-ভাষা সাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল।’

  আমার বক্তব্যে এরকম কী পেলে যে এটা একটা ঐতিহাসিক দলিল বলে তোমার মনে হল?’

 তোমার অভিভাষণের প্রতিটি শব্দে প্রকাশ পেয়েছে মাতৃভাষা অসমিয়ার প্রতি তীব্র অনুরাগ, জাগ্রত দেশ প্রেম এবং জীবনের প্রতি গভীর আশাবাদ।’

অল অসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সভাপতি হয়ে বছরের বেশিরভাগ সময় সুদূর সম্বলপুরে থাকার জন্য লক্ষ্মীনাথ সংগঠনাত্মক কাজ সেভাবে ঠিক করতে পারলেন না। এদিকে বাঁহীর সম্পাদনা এবং প্রকাশ করার কাজ চন্দ্রকুমারকে দেওয়া হয়েছিল এবং কাগজটি ডিব্রুগড়ের অসমিয়া প্রেস থেকে বের হত। পরের বছর থেকে বাঁহী গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হতে লাগল। তার জন্য লক্ষ্মীনাথকে পুনরায় সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হল। বাঁহী সম্পাদনা, বৈষ্ণব তত্ত্বকথা লেখা এবং বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণ অনুসারে বক্ততা দান ছাড়া  লক্ষ্মীনাথ সত্যিই নিজেকে সৃষ্টি মূলক সাহিত্য রচনায়  মনোনিবেশ করতে পারছে না।

 এভাবে লক্ষ্মীনাথের জীবনের আরও একটি বছর অতিবাহিত হল। তিনি ষাট বছরে পা রাখলেন। মানসিকভাবে এখনও সক্ষম যুবকের মতো মনে হলেও শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এদিকে বার্ড কোম্পানির চাকরি— জঙ্গলে চলতে থাকা কাজ দেখতে হয়। কুলি-করাতিদের-গাড়োয়ানদের সাপ্তাহিক মজুরি দেবার জন্য প্রায় তিন চার দিনের জন্য জঙ্গলের মধ্যে তৈরি করা বাংলোতে থাকতে হয়।তারপরে দুর্গম জঙ্গল থেকে কাঠ বহন করে সম্বলপুর স্টেশনের কাছে থাকা গোলায় পাশ করানো, বিশ্রাম না নিয়ে কাজ করার জন্য তার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়ল।

এর মধ্যে একদিন রাতে সম্বলপুরে একটা কৃষি প্রদর্শনীতে প্রজ্ঞা রত্না এবং দীপিকার সঙ্গে স্থানীয় বাঙালিরা মঞ্চস্থ করা নাটক উপভোগ করে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথের নাক দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। অনেক রক্ত। রাত বারোটার সময় বাড়িতে এলেন। কোনোমতে রাত পার করে পরের দিন সকালবেলা ডাক্তার ডেকে আনা হল। ডাক্তার  হোমিওপ্যাথি ঔষধ দিলেন।সঙ্গে গরুর ঘি শুঁকতে এবং নস্যি নিতে বললেন ।

এভাবে করায় রক্ত পড়া বন্ধ হল কিন্তু একনাগারে প্রায় ছয় ঘন্টা রক্ত বের হওয়ার ফলে লক্ষীনাথ দুর্বল হয়ে পড়লেন।

 মাঝখানে ১৯২৬ সনের এপ্রিল মাসে ছেলে স্বরূপকুমার এবং ছোট্ট শিশু কন্যাটিকে নিয়ে বরোদা থেকে সত্যব্রত অরুনা এল। ওরা আসার পরে কলকাতা থেকে রত্না দীপিকাও এল। লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞার বাড়ি ভরে উঠল। সবাইকে একসঙ্গে দেখতে পেয়ে লক্ষ্মীনাথের সে কি আনন্দ। বাড়িতে থাকলে সর্বক্ষণ তিনি নাতি-নাতনির সঙ্গে থাকেন। নাতি স্বরূপের সঙ্গে এমনিতেই ছোটো ছেলের মতো খেলাধুলা করেন। লক্ষ্মীনাথ জামাই  সত্যব্রতকে  ‘বাবাজীবন’ বলে ডাকেন। সত্যব্রত শ্বশুর মশাইকে ‘পিতাজীবন’ বলে সম্বোধন করে সমবয়সী বন্ধুর মতো আনন্দ ফুর্তি করে পরিবেশ মুখরিত করে রাখেন। জামাইয়ের মধ্যে পুত্র সন্তানের রূপ কল্পনা করে লক্ষ্মীনাথ সত্যব্রতকে ভালোবাসেন।

লক্ষ্মীনাথ অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্স বা অসম সাহিত্য সভার সপ্তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন। দুই বছর পরে সাহিত্য সভার নবম অধিবেশনটি অক্টোবর মাসের উনিশ এবং কুড়ি তারিখে ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সাহিত্যিক বেনুধর রাজখোয়া নির্বাচিত হলেন।বিভিন্ন দিক থেকে এই অধিবেশনটি গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য প্রধান সম্পাদক শরৎচন্দ্র গোস্বামী পত্রযুগে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়াকে উক্ত অধিবেশনে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। তাছাড়া কোকরাঝাড় থেকে কালিচরণ ব্রহ্ম, পূর্ণচন্দ্র তালুকদার এবং জৈনাউদ্দিন আহমদ, বিলাসীপাড়া থেকে চক্রধর দাস এবং ভূতনাথ সিংহ ধুবরির কমলাকান্ত শর্মা, হরনাথ বরুয়া, হরিনাথ পাঠক আদি পত্র যুগে অথবা তাঁরযোগে তাকে ধুবরি অধিবেশনে উপস্থিত থাকার জন্য বিনম্র অনুরোধ জানালেন। স্বাস্থ্য এতটা ভালো নয় যদিও লক্ষ্মীনাথ জাতির আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারলেন না। ১৯২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মেয়ে রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সম্বলপুর থেকে ধুবরির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

  সুদীর্ঘ ভ্রমণ। দুদিন লাগল। অক্টোবরের ১৬ তারিখ ধুবরি পৌঁছালেন। লক্ষ্মীনাথ রত্নার ধুবরির বিজনীতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হল। আনন্দ আগরওয়ালা তাদের বিশেষ যত্ন নিতে লাগলেন।

  ১৯ অক্টোবর তারিখ লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার কন্যা রত্নাবলীর অসমা-সুষমা কামরূপা যৌথ জননী ধরিত্রী দুহিতা’ গানটির দ্বারা অধিবেশনের কার্যসূচি আরম্ভ হল। রত্নার কন্ঠে লালিত্যময় সুরে এই ধরনের গান— শ্রোতা মন্ডলী অভিভূত হয়ে পড়ল। তারপরে সম্পাদকের স্বাগত ভাষণ। স্বাগত ভাষণের পরে সভাপতি বেনুধর রাজখোয়া মহাশয় মূল অভিভাষণ দিতে উঠে দাঁড়ালেন।

সভাপতি মহাশয়ের অভিভাষণের প্রথম দিকটা ভালোই, সারগর্ভ বক্তব্য।কিন্তু তারপরেই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে বঙ্গবাসীরা ধুবরি গোয়ালপাড়াকে বঙ্গের অংশ  করে নেবার চক্রান্ত করছে—এটা এক সময়ে অসমের স্কুল কাছাড়িতে  বাংলা ভাষার প্রবর্তন করার মতোই এক জঘন্য ষড়যন্ত্র’ বলে বলতেই ধুবড়ি বিলাসিপাড়ার বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ল । সভাস্থলে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হল।সভাপতি রাজখোয়া কোনোমতে নিজের অভিভাষণ শেষ করলেন।

তারপরে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার বক্তৃতা দেবার পালা এল। তার কণ্ঠস্বর গুরু গম্ভীর। শ্রুতিকর শব্দচয়নে ভাষা হৃদয়গ্রাহী। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলী শান্ত হল। প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্মীনাথ বললেন, …শেষে আমাদের গোয়ালপাড়ার ভাইবোনদের বলছি তারা আত্মবিস্মৃত হয়ে কতদিন থাকবে? আর কতদিন আপনারা বাকি সমগ্র অসমের নিজের মানুষ, নিজের ভাষাকে ভ্রম-সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে বিদেশি বা বিদেশি ভাবাপন্ন লোকের কথায় নিজের প্রাচীন বংশ গৌরব সভ্যতা-ভব্যতা বিসর্জন দিতে থাকবেন?সেদিন হোসেন শাহ গোয়ালপাড়া দখল করাটা নিয়ে আপনারা সুখী থাকবেন না প্রাচীন রামায়ণ মহাভারতের কাল থেকে ‘ট্রেছ’  করে নিজেকে সৌভাগ্যশালী করে ধন্য হবেন? নিজগুরু মহাপুরুষ শ্রী শংকরদেব, শ্রী মাধব দে্ব‌, শ্রী হরিদেবের ধর্ম প্লাবিত সুমহান-সুমধুর আচার-নিষ্ঠা, সাহিত্য-সংগীত, নৃত্য-গীতের সুশীতল ছায়ায় থেকে আপনারা নিজেকে বরেণ্য করবেন না পরের আশায় বনে বাস করে সকাতরে মুক্তা খসিয়ে নিজেকে দুঃখী এবং অন্যের চোখে হেয় করবেন? 

গোয়ালপাড়ার ভাইরা আমাদের জননী জন্মভূমি দীনা, হীনা, শীর্ণা।তা বলে প্রতিবেশী ধনীর গৃহিণীকে মাতৃ বলে সম্বোধন করাটা কর্তব্যের ভিতর পড়ে কি? মহাত্মা গান্ধী দুখিনী ভারত মাতার দুঃখে হাঁটু পর্যন্ত মোটা কাপড় পরে শীত গ্রীষ্ম কাটিয়ে মাতৃভূমির দুঃখ-কষ্ট দূর করার প্রাণপণ সাধনা করেছেন।আর বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের মা বঙ্গভূমিকে দেখে আপনারা নিজের দুঃখিনী অসম মাতাকে পরিত্যাগ করে সেই ধনী বঙ্গমাতাকে মা বলে মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া উচিত কি?’   

লক্ষ্মীনাথ থামলেন। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের বক্তৃতায় কাজ হল। সভা শান্ত হল। প্রত্যেকেই তাঁর ভাষণ মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে লক্ষ্মীনাথ তারপরে ইতিপূর্বে সভায় হুলস্থূল করা বাংলাভাষীদের উদ্দেশ্য করে বললেন—‘এই সম্পর্কে আমার বাঙালি বন্ধুদের বলি যে গোয়ালপাড়া যে অসমের বুক থেকে টুকরো করে নেওয়ার জন্য তাদের ভেতরে যারা ষড়যন্ত্র করছে তারা অনুগ্রহ করে সেটা পরিত্যাগ করুক। আমাদের প্রাণ থাকতে গোয়ালপাড়াকে আমরা কখনও অসমের বুক থেকে কেড়ে নিতে দেব না। সেরকম করতে গেলে অসমের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আগুন জ্বলবে। তাই আজ অতি বিনয় পূর্বক তাদের বলি যে দয়া করে ক্ষান্ত হন। আমার বিনীত প্রার্থনায় কাজ না হলে বাধ্য হয়ে আমাদের বলতেই হবে যে আমাদের গোয়ালপাড়া থেকে হ্যান্ডস অফ…।’

  পুনরায় বিরতি। লক্ষ্মীনাথ মঞ্চ থেকে সামনে বসা এবং পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অগণন জনতার দিকে একবার তাকালেন। তারপরে আবেগময় ভাষায় বলতে লাগলেন, ‘আজ আমরা ধুবরিতে আমাদের মায়ের চরণ কমল সেবা করার জন্য নিজের জীবন ধন্য করেছি। ভাইরা, উত্তষ্টিত জাগ্রত। এসো সবাই মিলে মাতৃভূমির সেবা করে মাতৃর অপায়-অমঙ্গল দূর করতে চেষ্টা করি।আজ এই মুহূর্তে, এই জাতীয় মহাযজ্ঞে, তোমরা ঈশ্বরকে সাক্ষী করে প্রতিজ্ঞা কর, যে শয়নে স্বপনে তোমাদের এই একটাই চিন্তা হোক –অমঙ্গল অজগর থেকে মুক্ত করে আমরা মাতৃভূমিকে সুখী করবই।’

 তারপরে কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘কিন্তু মাতৃভূমির সেবক হওয়ার স্পর্ধা রাখা এই বুড়োর গায়ে আগের মতো বল শক্তি নেই। আজ এই বুড়ো শরীর জর্জরীভূত, কলেবর ব্যাধিগ্রস্ত। তাই এই বুড়ো নারায়ণের চরণে করজোড়ে প্রার্থনা করছে—

 কাল অজগরে নিয়ে যায় টানি।

 রাখা রাখা প্রভু সারঙ্গপাণি।। 

বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, দ্বিতীয় অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

***/..

আমরা ভারতীয় পর্যটকদের পকেটের দিকে তাকিয়ে হাঁটা মানুষ। ডলারের তুলনায় টাকার মানদণ্ডের দুর্বলতা আমাদের  কাছে সত্যিই পরিতাপের। ১৯৪৭ সনে এক টাকা এক ডলারের সমান ছিল। আজ এক ডলারের মান প্রায় ৬৭ টাকা। ৪৭ সনের মতো টাকার মান ডলারের সমান হলে ভারতীয়রা অনায়াসে পর্যটক হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত। লাউসে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আমার মনে প্রথমে ডলারের কথাই এল। হলেও যাব বলে ভাবছি যখন খরচের অংক বেশি করে না করাই ভালো— আমি ভাবলাম।

আমার দেশ আমাকে পৃথিবীর যে কোনো দেশে যাবার অনুমতি পত্র অথবা পারপত্র দিয়েছে।

পারপত্র বের করতে যথেষ্ট পয়সা খরচ করতে হয় এবং অনেক সময় লাগে— বিভিন্ন জন বলা কথার ওপর নির্ভর করে আমারও সেরকম ধারণা ছিল। তবে কথাটা শুদ্ধ নয়। আমি অনলাইনে আবেদন করলাম। প্রয়োজনীয় টাকাও ইব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করলাম। তারা আমাকে অনলাইনযোগে নির্দিষ্ট দিন তারিখ জানাল। নির্দিষ্ট দিনে আমি গুয়াহাটি পারপত্র কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আমার তথ্য সমূহ পারপত্র কার্যালয়ে প্রদান করতে হবে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেৰ কাছ থেকে আপত্তিহীনতার প্রমাণপত্র। আমার ব্যাংকের শাখার পরিচালকের থেকে আমি আপত্তিহীনতার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করলাম। চাকরি করা ব্যক্তির জন্য এটাই গুরুত্বপূর্ণ নথি। সঙ্গে লাগবে বিভাগীয়ভাবে প্রদান করা পরিচয়পত্রটি। তাছাড়া ভোটার তালিকা, জন্মের প্রমাণপত্র, স্থায়ী নিবাসীর প্রমাণপত্র যাকে আমরা পিআরসি বলি, এই সমস্ত কিছু নিয়ে আমি গুয়াহাটি পারপত্ৰ কার্যালয়ে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হলাম। নির্দিষ্ট সময় মানে অতি নিৰ্দিষ্ট। আমার অনলাইন আবেদনের বিপরীতে তারা আমাকে দেওয়া তথ্য সমূহে সময় ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। সেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা পরে নিরাপত্তারক্ষী আবেদনকারীকে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না।

পারপত্র কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে একটা অন্যরকম পরিবেশের সম্মুখীন হলাম। অসমের কোনো কার্যালয়ে না দেখা পরিবেশ। একের পর এক টেবিল অতিক্রম করে গিয়ে তৃতীয় টেবিলটিতে আমার দুটি হাতের ছাপ এবং আলাদা আলাদা প্রত্যেকটি আঙ্গুলের ছাপ নিল। সঙ্গে ক্যামেরা দিয়ে আমার আলোক ছবি গ্রহণ করল। নথিপত্র গুলি ফটোকপি করে আমার মূল নথি গুলি ফিরিয়ে দেওয়ায় আমি জিজ্ঞেস করলাম—আমার হয়ে গেছে নাকি?

— হ্যাঁ। হয়ে গেছে।

আমার সামনে থাকা হৃষ্টপুষ্ট কর্ম তৎপর মেয়েটি বলল।

— পারপত্রটি কবে কীভাবে পাব?

— আপনি আপনার ঠিকানায় ডাকে পেয়ে যাবেন।

আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটির কথামতোই এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই আমি আমার পারপত্রটা লাভ করলাম। পারপত্রের সাদা পৃষ্ঠাগুলি উল্টে উল্টে ভাবলাম— কবে এখানে কোনো দেশের ভিসার মোহর লাগাতে পারব!

সম্ভবত সেই মুহূর্তটি এসে আমার সামনে উপস্থিত হল।

লাউসে ভিসার জন্য অনলাইন আবেদন করা যায়। আমি সেই সুবিধা গ্রহণ করলাম। তিনটি কাজের দিনে তারা ভিসার কাজ করে দেয়। ভিসার জন্য আমাকে টাকার হিসেবে এগারো  হাজার ছশো আটানব্বই টাকা পঁচাশি পয়সা দিতে হল। টাকা জমা দেবার পরে কাজ এগুলো এবং আমি লাউস সরকারের কাছ থেকে তাদের দেশে প্রবেশ করার অনুমতিপত্র লাভ করলাম।

এখন আমার সামনে উত্থাপিত প্রশ্নটা হল লাউসের রাজধানী ভিয়েনটিয়েনে কীভাবে যাওয়া যায় । অর্থাৎ কোন পরিবহন ব্যবস্থায়। তার জন্য আমাকে দুটি কথায় মনোযোগ দিতে হল। প্রথম কথা হল কোন পরিবহন ব্যবস্থায় কম খরচে যাওয়া যেতে পারে। আর দ্বিতীয় কথাটা হল সময়। অবশ্য এটা ওটার পরিপূরক। সময় কম লাগলে খরচের মাত্রাও কম হতে দেখা যায়। আমি কলকাতা থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাবার সুবিধার বিষয়ে অনুসন্ধান করলাম । তিনটি বিমান পরিবহন সংস্থা কলকাতা থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। সেগুলি হল চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স, বিমান বাংলাদেশ এবং এয়ার ইন্ডিয়া।

চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমান কলকাতা থেকে কুনমিঙ এবং কুনমিঙ থেকে ভিয়েনটিয়েনে উড়ে যায়। একইভাবে ফেরার পথ আছে ভিয়েনটিয়েন থেকে নানিং, নানিং থেকে কুনমিঙ এবং কুনমিঙ হয়ে কলকাতা। কলকাতা থেকে কুনমিঙে সময় লাগে দুই ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট কুনমিঙ  থেকে ভিয়েনটিয়েনে মাত্র ত্ৰিশ মিনিট। অথচ গোটা যাত্রা পথে সময় লাগে বারো ঘন্টা ত্রিশ মিনিট। কারণ হল সকালবেলা পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে কুনমিঙ পৌছান আকাশযানটা কুনমিঙ ছাড়ে বিকেল দুটোয়। ফিরে আসতে সময় লাগে তেরো ঘণ্টা পাঁচ মিনিট। বিমানের টিকেটের জন্য খরচ পড়ে ছশো সাত দশমিক নয় এক ডলার অর্থাৎ চল্লিশ  হাজার তিনশো উনচল্লিশ টাকা একুশ পয়সা। বিমানটা কলকাতা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ব্যাংককে যায়। ব্যাংকক থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাবার জন্য তারা থাই এয়ারওয়েজের বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেয়। যাবার সময় বিমান পরিবহন ব্যবস্থা সময় নেয় বাইশ ঘন্টা পঞ্চান্ন মিনিট। অবশ্য ফিরে আসার সময় যথেষ্ট কম সময় লাগে। মাত্র সাত ঘন্টা চল্লিশ  মিনিট।

খরচের দিক দিয়ে এয়ার ইন্ডিয়াৰ বিমানের রেট অনেকটা বেশি।সাতষট্টি দশমিক শূন্য পাঁচ ডলার। অর্থাৎ একান্ন হাজার একশ আঠাশ টাকা ষোলো পয়সা। তার কারণ আছে। কেননা বিমানটা কলকাতা থেকে মুম্বাই, মুম্বাই থেকে ব্যাংকক এবং ব্যাংকক থেকে ভিয়েনটিয়েনে যায়। সময় লাগে উনিশ ঘন্টা। এভাবে ফিরে আসে ভিয়েনটিয়েন থেকে ব্যাংকক, ব্যাংকক থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে কলকাতা আসে। সময় লাগে কুড়ি ঘন্টা পঁয়ত্ৰিশ মিনিট।

সমস্ত ভেবে শুনে আমি চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমানে ভিয়েনটিয়েনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।কুনমিঙ এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে হওয়ার সময়টুকুতে চাইনিজ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের চাল চলন দেখেই সময় কাটাব এবং বই পড়ব।কুনমিঙেৰ সঙ্গে পরাধীন অসমের ভালো যোগাযোগ ছিল। যোরহাটের ররৈয়া বিমানবন্দর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুনমিঙে নিয়মিত যুদ্ধবিমান এবং মাল বহনকারী বিমান চলাচল করত। সেই স্মৃতি স্মরণ করার জন্য কোনো বিমানবন্দরের অপেক্ষা গৃহ নিশ্চয় উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ভিয়েনটিয়েনে আসা যাওয়া টিকিটের ব্যবস্থা ও হয়ে গেল। তেরো আগস্ট যাত্রা আরম্ভ হবে এবং আঠারো আগস্ট যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে। তেৰো  থেকে আঠারো  আগস্ট পর্যন্ত সরকারি বন্ধ। তাই ষোল থেকে আঠাৰো  আগস্ট পর্যন্ত ছুটি নিতে হল। সমস্ত জোগাড় করে এখন যাত্রার দিনটির জন্য আমি অধীর ভাবে অপেক্ষা করছি। বিদেশের মাটিতে পা রাখার সুযোগ লাভ— এই কথাটাই আমাকে আহ্লাদিত করে রেখেছে।

বারো আগস্টের রাতের রাজধানী এক্সপ্রেস উঠে আমি তিনসুকিয়া থেকে গুয়াহাটি পৌছালাম। রেলস্টেশন থেকে সোজাসুজি গোপীনাথ বরদলৈ আন্তরাষ্ট্রীয় বিমানবন্দর। দশটার ইন্ডিগো বিমানে কলকাতা যাত্রার জন্য বিমানের টিকেট, লাওসের টিকেট কাটার দিন একসঙ্গে কেটে রেখেছিলাম। কলকাতা পৌঁছাতে এক ঘন্টার চেয়ে একটু বেশি সময় লাগল। এই এক ঘণ্টা সময় আমি প্রায় ঘুমিয়ে কাটালাম। রাতে ঘুম হয়নি বলে আমার সুন্দর ঘুম হল। বিমানটা টেক অফ করার সময় চাকার ঘর্ষণে আমি জেগে গেলাম।

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আমার বন্ধু সুদীপ্ত সে আমার সহপাঠী ছিল সেও ব্যাংকে চাকরি করে যদিও তার আর আমার ব্যাংকের শিরোনাম পৃথক। কলকাতায় যাব বলে তাকে জানানোয় সে বলল যে সেদিন যেহেতু তারও বন্ধ তাই দুপুরের আহার একসঙ্গে করতে চায়। সুদীর্ঘ  দিনের বিরতিতে আমার সঙ্গে তার দেখা হবে। মনের মধ্যে ভালো এবং খারাপের মিশ্রিত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। তার পরিবার-পরিজন আছে। তার বউ আমি কেন বিয়ে করিনি বলে জিজ্ঞেস করলে কি উত্তর দেব সেটা আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি। না হলে কখন ও কখন ও বড়ো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।

বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুখেই সুদীপ্ত আমার জন্য দাঁড়িয়েছিল। সে আমাকে দেখতে পেয়ে হাত তুলে দিল। আমি তার কাছে দৌড়ে যাবার মত করে গিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগটা মাটিতে রেখে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। এক মুহূর্তের মধ্যে আমি পড়াশোনা করা বিদ্যালয়টা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি তাকে ছেড়ে দিয়ে এবার তার হাত দুটি জড়িয়ে ধরলাম।

পরস্পরের খবরা-খবর সাধারণভাবে বিনিময় করে সে আমার ব্যাগটা নেবার ইচ্ছা জানাল।

— আরে ভাই তুই আমার বন্ধুহে, বন্ধু পাঠিয়ে দেওয়া গাড়ির চালক নয়!

একটার দিকে এগিয়ে দেওয়া হাতটা গুটিয়ে নিয়ে সে নির্দিষ্ট একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

— তোর গাড়ি?

আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম। মাথা নেড়ে বলল —হ্যাঁ।

— আরে বাবা খুব সুন্দর গাড়ি নিয়েছিস!

আমি তাকে খ্যাপানোর জন্য বললাম। হাতে থাকা রিমোট কন্ট্রোলে গাড়ির দরজা খুলে নিয়ে আমাকে সামনের আসনে বসতে বলল আরক্ষী আটক করা অতি অবাধ্য অপরাধীর মতো আমি গাড়িতে উঠলাম। আমার বেগটা সেই ডিকিতে ভরিয়ে নিল। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে কলকাতা মহানগর বেশ ভালোই দূর। এঁকেবেঁকে বিভিন্ন পথে এসে সে একটা বিশাল মাল্টি স্টোরিড বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপরে ডিকি থেকে আমার ব্যাগটা বের করে হাতে নিয়ে সে লিফটের জন্য এগিয়ে এল।

সুদীপ্তের ফ্লাটের বৈঠকখানাটাও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সুগৃহিনীর হাতের স্পর্শে লাবণ্য মধুর। ঘরে ঢুকে আমি চারপাশে চোখ বোলালাম। শীতল এবং মসৃণ কার্পেটে খালি পায়ে হেঁটে কোনো তারাখচিত  হোটেলের লনে হাঁটছি বলে মনে হল। আমাদের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে সুদীপ্তের ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

— নমস্কার বৌদি।

— নমস্কার।

সুদীপ্তের পত্নী সাবলীল অসমিয়ায় জিজ্ঞেস করলেন— আপনি ভালোভাবে এসেছেন? পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?

—হ‍্যাঁ, কোনোরকম অসুবিধা হয়নি ।ভালোভাবে পৌঁছে গেছি।

আমি সুদীপ্তের স্ত্রীর মুখ থেকে চোখ না সরিয়ে বললাম। সুদীপ্তও কথাটা নিয়ে মজা করছিল।

— এভাবে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছিস যে?

সুদীপ্তের বন্ধুত্ব সুলভ প্রশ্নটি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সুদীপ্তের পত্নীর সামনে নিয়ন্ত্রণ না হারানোর জন্য আমি বললাম— পত্নী বিষয়ক আমার কোনো ধারণা নেই। মুখের দিকে তাকিয়ে সেই ধারণা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

— তবে এর চেয়ে আর বেশি এগোস না।

— সুদীপ্ত তোর পুরোনো স্বভাবের আর বদল হল না।

এক ধরনের গর্জে উঠার মতো বললাম।

— বাঁদর যত বুড়ো হয় তত গাছের উপরে উঠে। আমরা মানুষরা বাঁদরের জাত, তাই বুড়ো হচ্ছি মানে ততই গাছের—

আমি সুদীপ্তকে আর কথা বলার সুযোগ দিতে চাইলাম না। আমাকে  কথার সুর বদল করার চেষ্টা করতে দেখে, সে তার পত্নীকে  আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।

— এই যে আমার স্ত্রী। একতারা সাহা।

— আমি জিজ্ঞেস করলাম একটা তাঁর নাকি একটা তারা। আচ্ছা এত সুন্দর অসমিয়া বলে যে?

সুদীপ্ত সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল— কেন বলবে না? গুয়াহাটির মেয়ে যে।

আপনারা বসুন ,আমি চা নিয়ে আসছি।

সুদীপ্তের স্ত্রী একতারা ভেতরে চলে গেল।

— ছেলেমেয়েরা?

— আমাদের দ্বিতীয় শনিবার বন্ধ, ওদের তো আর বন্ধ নেই।

আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।

সুদীপ্ত দেখিয়ে দেওয়া অনুসারে আমি হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। বাথরুমটাও বেশ সুন্দর। তারাখচিত হোটেলের বাথরুমের মতো। সুদীপ্তের গাড়ি– বাড়ি দেখে আমি কিন্তু নিজেকে একবারও প্রশ্ন করলাম না— আমি সারা জীবনে কী করলাম? এই প্রশ্নটি কখন ও আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হলে আমি উত্তরটা তৈরি করে রেখেছি— আমি শুরু করেছি মাত্র। এমন একটি কাজ যা দশের উপকার করতে পারে, হিতসাধন করতে পারে।

একতারা এনে দেওয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে আমাদের মধ্যে আরম্ভ হল স্মৃতি রোমন্থন। কোথা থেকে আরম্ভ হয়েছে আমাদের কথা কোথায় শেষ হয় আমরা দুজনে আন্দাজ করতেও পারলাম না। কত কথাই যে আমরা বললাম। সুদীপ্ত তার বিয়ের কথা বলল ।কর্মক্ষেত্রের কথা বলল ।বলল জীবনের বহু উত্থান এবং পতনের বহু অ-কথিত কাহিনি। একতারা আমাদের দুজনের জন্য দুপুরের আহার তৈরি করার সঙ্গে মাঝেমধ্যে এসে দুই পাঁচ মিনিট আমাদের সান্নিধ্যে কাটিয়ে যায়। মুখে সে কিছুই বলে না, কেবল আমাদের কথা শুনে যায়। একতারার মুখে হাসি আছে দেহের গঠনে আছে লাস্যময় ভঙ্গিমা। সুদীপ্তের কথা আর বলে লাভ নেই, মুখের কোনো লাগাম নেই কখন যে একতরার সামনে কী সব বলে দেবে ভেবে ভয় হয় । ভয় করার কী আছে , আমাকে অপ্রস্তুত অথবা বেকায়দায় ফেলার জন্য সে আগে থেকেই চেষ্টা করে থাকে। কেবল আমি তাকে সুযোগ না দিলেই হল।

সুদীপ্ত জিজ্ঞেস করল— উদয় এখনও সময় পার হয়ে যায় নি তুই বিয়ে টিয়ে করলি না, তবে এখন অন্য কোনো বিশেষ কাজে ব্যস্ত আছিস নাকি?

এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে আমার বেশ কিছু সময় লাগল। আমি এক দিক থেকে আদ্যোপান্ত বলে যেতে লাগলাম। আর একতারা গভীর মনোযোগের সঙ্গে আমার কথা শুনতে লাগল। আমি বলতে থাকা বিষয় সম্পর্কে সুদীপ্তের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। সেই জন্য সে অনেক কথা বুঝতে পারছিল না এবং আমাকে পরপর প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। আমি তাকে ছোটো ছোটো কথায় জবাব দিয়ে যাচ্ছিলাম। অনামিকার জীবনে এসে পড়ার দুর্ভাগ্যের প্রতি সে সহানুভূতি প্রকাশ করেও নিজের চরিত্রকে শোধরাতে না পারা সুদীপ্ত জিজ্ঞেস করতে ভুলল না — মহিলাটিকে দেখতে কেমন ?

একতারা সুদীপ্তের পিঠে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিল। নারীসুলভ সেই অভিব্যক্তিতে কি লুকিয়ে ছিল জানিনা, হয়তো সুদীপ্তের চরিত্রের কিছু ত্রুটি শুধরানোর ব্যর্থ চেষ্টা । আমি সুদীপ্তকে কোনো উত্তর দিইনি। এই ধরনের প্রশ্ন উত্তর দিতে আমি মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি। সুদীপ্ত জানে বলে এরকম প্রশ্ন আমাকে প্ৰায়ই করে ব্যতিব্যস্ত করে আমোদ লাভ করে। 

আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দুই চারটি কথা আমি সুদীপ্তকে জানালাম।। সে আমাকে শুভেচ্ছা জানালেও যদিও আমি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেবার ব্যাপারটাকে সে মোটেই সম্মতি জানাল না। তার মতে আমি চাকরি করে থাকা অবস্থাতেই সবার সেবা সমাজ সেবামূলক কাজ গুলি চালিয়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত। আমি সুদীপ্তের মনের ভাবকে সম্মান জানালাম এবং অবশেষে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেব না বলে তাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হল।

 তুই যেভাবে নিজের খেয়াল খুশি মতো কাজ করিস তোর কথা বলতে পারি না। তুই হঠাৎ চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিবি।তাই তুই আমার কাছে এই ধরনের শপথ খেতে হবে না।

--কোনোমতেই চাকরিটা ছাড়বেন না দাদা।

 একতারার কন্ঠে আবদার এবং  স্নেহ মিশ্রিত সুর।  বহুদিনের পরিচিত কোনো আত্মীয়ের আত্মিক দাবি। অবশেষে আমি পতি পত্নীর কাছে শপথ খেয়ে নিস্তার পেলাম। আমাকে যে মা কালীর নাম উচ্চারণ করে কানে ধরতে হল না, আমি অল্পতেই রক্ষা পেলাম বলে মনে হল।

 দুপুর বেলা একতারা অতি তৃপ্তিদায়ক খাবার রান্না করে আমাদের খাওয়াল। সরষে বাটা দিয়ে রান্না করা ইলিশ মাছ, আলু টমেটো দিয়ে  রান্না চিতল মাছ এবং লঙ্কা দিয়ে  রান্না করা স্থানীয় মুরগির মাংস। জুহা চালের ফুরফুরে গন্ধে ভাত খাওয়া ঘরটা ইতিমধ্যে ভরে উঠেছে।এইসব খাদ্য সম্ভার দিয়ে একবেলা খাওয়া আমার কাছে স্বপ্নেরও  অগোচর।

আমরা ভাত খাবার সময় একতারা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসার জন্য বিদ্যালয় গেল।

-- ছেলেমেয়েদের স্কুল কাছে নাকি?

 আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম।

 না তা নয়। পাঁচ কিলোমিটারের মতো দূরে। গাড়ি নিয়ে যাবে যখন এখনই চলে আসবে।

 সুদীপ্তের পত্নী একতারা রান্নাবান্না করে ছেলে মেয়েকে আনতে স্কুলে গেছে ভাব তেই আমার কেমন ভালো লেগে গেল। সুদীপ্ত প্রতিজন স্বামী আকাঙ্ক্ষা করার মতো কর্মদক্ষ সুপত্নী লাভ করেছে। খাওয়া-দাওয়া হওয়ার পরে সুদীপ্ত আমাকে শোবার জন্য বলল।

 -- রাতের ফ্লাইটে ঘুম নাও হতে পারে। সেজন্য একটু ঘুমিয়ে নে।

-- দিনে ঘুমালে বরং রাতে ঘুম আসবে না

  ফ্লাইটে দেওয়া একটা পেগ খেয়ে নিবি। তবে তুই তো আবার সে স্পর্শ করবি না। যা হওয়ার হবে, একটু রেস্ট নিয়ে নে।

 সুদীপ্তকে একটু অবসর দেওয়ার ইচ্ছায় আমি তাকে সম্মতি জানালাম এবং সে দেখিয়ে দেওয়া অতিথির জন্য ব্যবহৃত ঘরটাতে ঢুকে গেলাম। সুদীপ্ত ঘরে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির তাপমান ঠিক করে দিল। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কততে রাখবে।  আমি বললাম তোর ইচ্ছা। সে হয়তো ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেখেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরে সুদীপ্ত অতি ধীরে ধীরে ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে গেল। বিছানাতে শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুম এসে পড়ল। আমি বিছানার কাছেই থাকা সেদিনের হিন্দু কাগজটা মেলে ধরলাম এবং মূল খবরটাতে চোখ বোলাতে লাগলাম।

সুদীপ্ত আমাকে যখন জাগিয়ে দিল তখন কলকাতা মহানগরকে রাতের অন্ধকার ঘিরে ধরেছে। আমি মুখ হাত বেসিনের জলে ধুয়ে বৈঠকখানা ঘরে সুদীপ্তের কাছে বসলাম। একতারা ম্যাগি এবং কফি তৈরি করে সাজিয়ে টেবিলে রেখেছে।দুপুরের ভুরি-ভোজের পরে আমার খুব একটা ক্ষুধা ছিল না।আমি কেবল কফি খেলাম।একতারা আমাকে ম্যাখি খাওয়াবার জন্য  খুব চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমি রাজি হলাম না।

 সুদীপ্ত বিবিসির কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছে। মূল শীর্ষক খবরের পরে পরিবেশন করছে আবহাওয়ার খবর।

-- চিনে বৃষ্টি হতে পারে। চিনে হলে লাউসেও হবে।

-- হলে হবে। বৃষ্টি দিলে কী আর এমন বড়ো কথা হল ।

 চিনের বৃষ্টি নিয়ে সুদীপ্ত আমাকে এরকম একটা পাঠ পড়াতে চেষ্টা করল যেন আমি চিনের বৃষ্টিতে ভেসে গিয়ে সাগরে পড়ব। আমি জানি চিনের বৃষ্টির বদনাম রয়েছে। বৃষ্টি হলে দুর্যোগ না হয়ে থাকে না। পাহাড়ি লাউসে সেরকম হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমি সুদীপ্তকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম রাত বারোটা ত্রিশের সময় আমার ফ্লাইটের সিডিউল। এগারোটা ত্রিশে আমাকে বিমানবন্দর পৌঁছাতে হবে। আমি আটটার সময় সুদীপ্তকে বললাম-‘আমার সময় হয়েছে, আমি যাই।’

-- ‘পাগল হয়েছিস নাকি তুই? ভেবেছিস আমি প্লেনের সময় জানি না।ঠিক সময় মতো আমি পৌঁছে দেব তুই মিছামিছি এত ব্যস্ত হয়ে পরিস না।’

 সুদীপ্তের কথা শুনে আমি চুপ করে যেতে বাধ্য হলাম, কেননা একতারা সুদীপ্তের চেয়েও বেশি।

  ‘আপনি রাতের খাবার খেয়ে যাবেন।আমি বাজার করে এনেছি।’

 আমি বুঝতেই পারলাম না কোন ফাঁকে একতারা গিয়ে বাজার করে এনেছে ।সুদীপ্ত সত্যিই ভাগ্যবান পুরুষ। ছেলে মেয়েদের স্কুলথেকে আনা, বাজার করে এনে রান্নাবান্না করা ,এই বিদূষী  গৃহিণী সমস্ত কাজ নিজেই সমাপন করে। বেশ শক্তিমান এনার্জেটিক।

 সুদীপ্ত আমাকে এবার তার ব্যক্তিগত রুমে নিয়ে গেল। বাঃ এত সুন্দর! আমার অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল ।তারা চিহ্নিত একটি হোটেলের মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সমস্ত সুবিধা সংলগ্ন ।সে ঘরের শীতাতপ যন্ত্রটিকে নির্দিষ্ট ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ফ্যান চালিয়ে দিল। দুটো সুইচ দেওয়ার পরে ঘরটিতে মসৃণ রঙে সমুজ্জল  হয়ে পড়ল। আমি কোনো কল্পনা রাজ্যে বসবাস করা যেন অনুভব করতে লাগলাম।

  —তুই সত্যি মদ খাস না?

–উহু।

আমি সজোরে মাথা নাড়লাম।

 —মদ খাওয়া মানুষের সঙ্গে বসতে তোর আপত্তি আছে নাকি?

 —মোটেও নেই।যদি হে অদরকারী কথাগুলি আবোল-তাবোল ভাবে বকতে শুরু না করিস।

 —তুই কি সমস্ত মদ খাওয়া মানুষকে মদ্যপী বলে ভাবিস নাকি?

  —ভাবি না বলেই তো বসায় আপত্তি নেই বলে বললাম।

  কথা বলতে থাকার মধ্যে সে একটা সেলফ খুলল। সেলফটিতে  বিভিন্ন ধরনের কারুকাৰ্য খচিত  মদের  বোতল। তারই একটা বের করে এনে সে সেলফেই সাজিয়ে ৰাখা বিশেষ জায়গাটিতে রাখল। তারপরে এসে নিচের বড়োসড়ো একটি সেলফ খুলল।আসলে আমি সেলফ বলে ভুল করেছিলাম। সেটি একটি সুন্দর দেখতে ছোট্ট ফ্রিজ। সে ফ্রিজ থেকে জলের বোতল এবং একটি সোডার বোতল বের করে আনল। আমি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাকিয়ে থাকলাম। তার বোতল থেকে জল এবং সোডা মেশানোর প্রক্রিয়া দেখতে লাগলাম। মদের গ্লাসটিতে জল ঢালায় সৃষ্টি হওয়া রিমঝিম শব্দ আমাকে বেশ আকর্ষণ করল।

 গ্লাসটিতে আলগোছে জড়িয়ে ধরে সুদীপ্ত সেলফগুলির কাছ থেকে এসে আমার সামনে চেয়ারে বসল। একসঙ্গে পড়াশোনা  এবং চাকরি করা সুদীপ্তের ঐশ্বর্য দেখে আমি কিছুটা বিমুগ্ধ এবং কিছু পরিমাণে হতচকিত হয়ে পড়লাম। সত্যিই জীবন  মানুষকে কীভাবে গড়ে তোলে।মানুষের জীবনটা জলের চেয়েও তরল। যে ধরনের পরিবেশে রাখা যায় জীবনটা তার চেয়েও বেশি সেরকম পরিবেশে নিজেদের গড়ে নেয় ।

  গ্লাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে সুদীপ্ত নিজের জীবন-বীক্ষা আরম্ভ করল।

 —উদয়শংকর কী আছে জীবনটাতে ?কী আছে তুইও বলতে পারিস না ।আমিও পারিনা।

 সুদীপ্ত আমার দিকে এভাবে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমার মনে হল সে আমার কাছ থেকে উত্তর চাইছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে মৌন হয়ে থাকায় সে পুনরায় বলতে লাগল।

মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাবে। পরিবার নিয়ে ছেলেটি চাকরি করে দূরে থাকবে, যেভাবে আমি রয়েছি। কী করব তখন বুড়ো বুড়ি?যান্ত্রিক জীবনের এই পর্যায় আমাদের ইতিমধ্যে সমস্ত আত্মীয় কুটুম্ব থেকে দূরে নিয়ে এসেছে। সুদীপ্ত গ্লাসটাতে একটা দীর্ঘ চুমুক দিল। আমার হাতে উত্তর আছে কিন্তু আমি নিরুত্তর হয়ে রইলাম। সুদীপ্তের চোখে না পড়ার মতো করে আমি মনে মনে হাতের ঘড়িটার দিকে লক্ষ্য করছিলাম যদিও সে দেখতে পেল। তবে সময়ের প্রতি আমার লক্ষ্য করাকে গুরুত্ব দিল না।

-- তুই কিছুই বলছিস না যে?

 কী বলব সুদীপ্ত? আমরা একই পৃথিবীতে বসবাস করলেও আমরা দুজন দুটি  পৃথক পৃথিবীর বাসিন্দা। আমার ধারণার সঙ্গে তোর ধারণা সম্পূর্ণ পৃথক। আমি সঙ্গী চেয়ে প্রকৃতি এবং মানুষের কাছে যাই। আর তুই, আমার বলার দরকার নে্‌ই, তুই নিজেই জানিস তোর স্থান আর স্থিতি তোকে যেভাবে গড়ে তুলেছে তুই সেভাবেই  গড়ে উঠেছিস। তাই দুঃখ প্রকাশ করে লাভ নেই।আর যদি জীবনের কোনো বাঁকে দাঁড়িয়ে তুই নিজের পথের পরিবর্তন করতে চাস, প্রকৃতি আর মানুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চাস আমার ফোন নাম্বার তোর কাছে আছে। আমাকে ফোন করিস।

 কথার মধ্যে মাঝে মাঝে সুদীপ্ত হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে এবং মাঝেমধ্যে ঐশ্বর্যশালী পৃথিবীর একজন বাসিন্দা হয়ে  উল্লসিত হয়ে পড়ে।সুদীপ্ত গ্লাসে দ্বিতীয় পেগ ঢেলে নেয়নি। আমাকে রেখে এসে নাকি আরও দুটি পেগ নেবে একা একা। হতাশা এবং বর্ণহীন নিঃসঙ্গতাতাকে জড়িয়ে ঘুমানো মানে পুনরায় গতানুগতিক একটি দিনের শুরু।

-- চল একতারা ডাকছে।

 মোবাইল ফোনটার অনুজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে সুদীপ্ত বলল।

 আমি তার এই বাক্যগুলির জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলাম।

 ভাত খাওয়ার টেবিলে বিভিন্ন তরকারি এবং একজন মানুষের জন্য একটা থালা সাজানো ছিল। আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে একা খেতে হবে।সে সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল--এই আর কি ।

 একা ভাতের থালায় বসতে যাওয়া আমার পক্ষে একটু সংকোচের ছিল। এক তারা আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল-‘ইনি আপনাকে রেখে এসে খাবে।’আমি আগেই বুঝতে পেরেছি যদিও একতারার কথায় আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। 

--এত কষ্ট করে এতগুলি--

-- কোথায় আর এত রেঁধেছি।

 একতারা ঢাকনায় দিয়ে রাখা থালাগালি থেকে একের পরে এক ঢাকনা সরাতে লাগল।

  থালাটা সামনে এনে আমি ভাতের থালাটা সাজিয়ে রাখা হাতাটা ভাতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। গরম বাসমতি চালের ভাতের গন্ধটা আমার নাকের ভিতরে ঢুকে গেল। মাংস এবং একটু তরকারি ভাতের ওপরে ঢেলে দিলাম। কাজুবাদাম, কিসমিস, মগজ এবং মসলা দিয়ে রান্না পাঁঠার মাংস। গন্ধ এবং স্বাদে মনে হল আমার ক্ষুধা আরও বেড়ে গেছে। শুধু ভাত এবং মাংস নিতে দেখে একতারা পনির, বিন এবং গাজর দিয়ে রান্না করা মিক্সড ভেজ এক হাতা আমার থালার কাছে সাজিয়ে রাখল। অন্য একটি থালা থেকে বেসন গোটা সর্ষে দিয়ে রাঁধা ক্যাপসিকামের বড়া দুটিও  খালার ওপরে রাখল। একতারা পুনরায় কিছু দিতে তৈরি হতেই আমি বললাম-- এত পারব না, দেবেন না।

 ভালো করে খেলে তবে আপনার ঘুম ভালো ঘুম হবে।গিয়েই ফ্লাইটে শুয়ে পড়বেন। অসুবিধা কোথায়?

 একতারার আন্তরিকতাকে বাধা দিতে না পারার জন্য পরিমাণের চেয়েও আমাকে বেশি করে খেতে হল। আমার বাধা না মেনে পুনরায় একহাতা মাংস অবশিষ্ট ভাতের ওপরে জোর করে ঢেলে দিল। ভাতও দিতে চেয়েছিল, হাত দুটি দিয়ে থালাটা ঢেকে ধরে কোনোমতে রক্ষা। নারীর সুলভ আন্তরিকতা একতারা কে আমার সামনে একজন অতিথি পরায়ন সুগৃহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।স্বামীর বন্ধুকে আপ্যায়ন করায় একতা্তারা কোনো ত্রুটি রাখেনি। এরকম একজন একতারা থাকার পরেও সুদীপ্ত নিঃসঙ্গ।

 একতারা এবং তার পরিচ্ছন্ন ঘর থেকে বিদায় নিতে  হওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাত্র একটা দিন অথচ এরকম মনে হলো যেন বহু দূর অতীত থেকে রক্ষা করে আসা বছর বছর ধরে রাখা  আন্তরিক সম্পর্ক। একতারা বিদায়ের সময় বারবার বলল --আবার আসবেন অনুগ্রহ করে। সম্পর্ক রক্ষা করবেন। ফিরে যাবার সময় পারলে চলে আসবেন।

 ফিরে আসার সময় আসা হবে না। আমি দুপুরবেলা কলকাতা পৌছাব আর এক ঘন্টা পরেই আমার গুয়াহাটির জন্য ফ্লাইট। তার মধ্যে সেদিন ব্যাংক খোলা থাকবে। সুদীপ্ত অসম্ভব ব্যস্ত থাকবে।

  একতারার কথায় মনে হল সম্ভবত সুদীপ্তের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে আসা আমি একমাত্র ব্যক্তি ।তাই মনের আশ মিটিয়ে একতারা নিজেই বাজার করেছে নিজেই রেঁধেছে এবং নিজেই আপ্যায়ন করেছে। মানুষের হৃদয়ে মনিকোঠায় সম্পর্ক রক্ষার জন্য আকাঙ্ক্ষা সঞ্চিত হয়ে থাকে। সেই আকাঙ্ক্ষাকে অবহেলা করলেই আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি আর হতাশাগ্রস্ত।

 সুভাষচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিদেশ উড়ানের মূল প্রবেশদ্বারে নামিয়ে সুদীপ্ত চলে গেল। যাবার সময় তার দুচোখ জলে ভরে উঠল বলে মনে হল।

 -সময় পেলে আসবি। কোথায় আসবি? তোকে আবার জীবনে দেখতে পাব কিনা?

 -পাবি। কেন পাবি না। তুই তোর বাড়ি দেখালি আমি একদিন তোকে আমার সমাজটা দেখাব।

ফিরে যাওয়া সুদীপ্তের দিকে অনেকক্ষণ আমি নিরন্তর তাকিয়ে রইলাম।। সে যাবার পরে তবেই আমার বিদেশ ভ্রমণের ঔৎসুক্য শুরু হল।

 







রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪২ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪২

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।

   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(৪২)

ভেতরে প্রবেশ করার সময় লক্ষ্মীনাথ ভাবল,এখনই প্রজ্ঞাকে সম্বলপুরে যাবার কথাটা বলব না। এদিকে তাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই 'পাপা,পাপা' বলে ডেকে উৎসাহে রত্না-দীপিকা দৌড়ে এল। তিনি দীপিকাকে কোলে তুলে চুমু খেলেন, রত্নাকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করলেন। মজার কথা বলে, মুখটাকে নানা ধরনে বিকৃত করে, পাখ- পাখালির আওয়াজ নকল করে ওদের হাসালেন। তারপরে প্রজ্ঞা যখন বিকেলের চা-জল খাবারের জন্য ডাইনিং টেবিলে ডাকল, তখন কথাটা না বলে আর থাকতে পারলেন না। আর কীভাবে এত বড়ো কথাটা স্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবেন?পরোটা,আলুর দম এবং মিষ্টি খেতে খেতে লক্ষ্মীনাথ কথাটা বলল। বার্ড কোম্পানির বড়ো সাহেব আইরন সাইড তার কাজে নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ পদোন্নতি দিয়ে তাকে উড়িষ্যার সম্বলপুরেরর কাছে নতুন করে নেওয়া জঙ্গল পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়েছেন। বেতন বৃদ্ধি করার সঙ্গে থাকার জন্য বাংলো, চাকর-বাকরের খরচ এবং গাড়ির খরচ দেবার বন্দোবস্ত করেছেন। পরিবারের সঙ্গে এখন সম্বলপুরে থেকে জঙ্গলের কাজকর্ম চালাতে হবে। বড়ো সাহেবের অনুরোধ এড়াতে না পেরে সম্বলপুরে যাবেন বলে তিনি কথা দিয়ে এসেছেন। 

সমস্ত কথা শুনে লক্ষ্মীনাথ আশঙ্কা করা অনুসারে প্রজ্ঞা দুঃখ মন–খারাপে ভেঙ্গে পড়ল না। কারণ, ঘর সংসারের প্রতিদিনের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বিগত এক বছর ধরে লক্ষ্মীনাথকে যে কী পরিমানের পরিশ্রম করতে হচ্ছে, প্রজ্ঞা দেখতে পাচ্ছেন। মাসে দুবার করে কোম্পানির কাজে বাইরে গিয়ে সাত দিনের মতো বাইরে থাকেন। বাড়িতে থাকলেও উদয় অস্ত পরিশ্রম করতে হয়। নিজের পড়াশোনা লেখালেখি ছাড়া'বাঁহী' সম্পাদনার কাজ, হাওড়া কোর্টে বসে মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে সভা-সমিতিতে যোগদান, বিকেল থেকে রাত এক প্রহর পর্যন্ত বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে সাহিত্য আলোচনা, তারপরে আত্মীয় কুটুমের সঙ্গে সামাজিকতা রক্ষা করা… সংবেদনশীলা প্রজ্ঞা স্বামীর কষ্ট বুঝতে পারেন। সম্বলপুরে যাওয়া নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলে যেতে অস্বীকার করলে আর্থিক সংকটে পড়া স্বামীর কষ্ট আরও বাড়বে। তাই কলকাতায় থাকতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে তিনি হাসিমুখে সম্বলপুরে যাওয়াটাকে সমর্থন করলেন।

পত্নীর অনুকূল মতামত পেয়ে লক্ষ্মীনাথ নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু সম্বলপুর যাবেন বললেই তো আর যাওয়া যায় না। কারণ, এখন তিনি একা নন। প্রজ্ঞা ছাড়া তিনটি কন্যা সন্তান। ওরা তিনজনই কলকাতার ডায়োসেশন স্কুলে পড়াশোনা করছে। ওদের পড়াশোনার যাতে ক্ষতি না হয়, এবং তার জন্য কলকাতায় ওদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ২২ নম্বর রোজমেরির 'লরেলস' বাড়িটা বন্ধকে আছে,সেটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত,সম্বলপুরে গিয়ে থাকার জন্য একটা বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে হবে। কেবল বাসস্থানের বন্দোবস্ত করলেই হবে না নতুন বাসস্থানে থাকার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার সুবিধা করতে পারা যাবে কিনা সে সমস্ত দেখে তবেই প্রজ্ঞা, অরুণা, রত্না- দীপিকাদের নিয়ে যেতে পারবেন। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাঁর ' কলজের এক টুকরো' বাঁহী'র প্রকাশনার কী হবে? আসলে 'লরেলস' ঘরটায় তাঁর পড়াশোনা করার ঘরটাই হল 'বাঁহী'র অফিস, সম্পাদনা কক্ষ এবং বিতরণ কেন্দ্র। তিনি সম্বলপুরে থাকতে শুরু করলে,'বাঁহী'র এই সমস্ত কাজ কীভাবে করবেন? সম্বলপুরে বদলি হওয়ার জন্য যদি 'বাঁহী' প্রকাশ না হয়, তাহলে সেটা হবে তার মৃত্যুর সমান।

এ সমস্ত কথা বিবেচনা করে ১৯১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর লক্ষীনাথ প্রথমে একাই সম্বলপুরে গিয়ে আগে থেকে পরিচিত বন্ধু সরকারি উকিল যোগেন্দ্রনাথ সেনের বাড়িতে অতিথি হলেন। মিস্টার সেন সদাশয় ব্যক্তি। তাঁর পরিচিত স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে বাস করার উপযোগী 'মিশনারি হাউস' নামে একটি বাংলোৰ  বন্দোবস্ত করলেন। পড়ে পাশেই থাকা অন্য একটি বাড়িতে লক্ষ্মীনাথ স্থায়ীভাবে থাকবেন বলে স্থির করলেন। স্থায়ী  ভাবে থাকতে চাওয়া বাড়িটা উড়িষ্যার প্রধান নদী মহানদীর তীরে। অনেকটা জায়গা নিয়ে টোলের মধ্যে খড়ের চালায় নির্মিত বাড়ির পরিবেশটি মনোরম। তবে পরবর্তীকালে কিছু মেরামত করতে হবে। সেইসব করে নিলে থাকার জন্য ভালোই হবে এবং এই বাড়িটা প্রজ্ঞারও পছন্দ হবে বলে তার মনে বিশ্বাস জন্মাল।

বাসস্থানের ব্যবস্থা করার পরেই কোম্পানি নতুন করে নেওয়া জঙ্গলের কাজের জন্য লক্ষীনাথ তৎপর হয়ে পড়লেন। তিনি মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনে সুশীল কুমার মিত্রকে কেরানি, মাসিক ১০ টাকা বেতনে কুবেরকে মুন্সি এবং মাসিক ৭ টাকা বেতনে দুজন চাপরাশি নিযুক্ত করলেন। তার দুইদিন পরে এক টাকা অগ্রিম দিয়ে স্টেটসম্যান কাগজ নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাছাড়া নতুন পরিবেশে থাকার জন্য আরও কিছু জিনিসের প্রয়োজন হল।

খাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ঠিক করে বিহার এবং উড়িষ্যা সরকারের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য নেওয়া জঙ্গলের প্রাথমিক খবরা-খবর নেবার জন্য লক্ষীনাথ দুজন চাপরাশির সঙ্গে কুবের মুনশিকে পাঠালেন। এদিকে নিজের বাংলোর ঘরোয়া কাজকর্মের জন্য একজন চাপরাশিকে নিযুক্ত করলেন। তারপরে জঙ্গলের গাছ কেটে স্লিপার  তৈরির জন্য করাতিদের কাজে লাগিয়ে তিনি কলকাতায় এলেন।

কলকাতার হাওড়ার বাড়িতে এসে দেখলেন, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রজ্ঞা বিছানায়। পরের দিন রত্নার ও জ্বর হল। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বার্ড কোম্পানির অফিসে এসে সম্বলপুর জঙ্গলে আরম্ভ করা কাজের অগ্রগতির বিষয়ে সবিশেষ জানালেন। সবকিছু শুনে মিস্টার কাৰ্কপেট্রিক সম্বলপুরে অফিস করার জন্য এক হাজার টাকা দেওয়ার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মাসিক বেতন আরও ৫০ টাকা বৃদ্ধি করলেন। অবশ্য বেতন বাড়িয়ে দেওয়াটা এমনিতে নয়। কোম্পানি সম্বলপুরে থাকা গ্রাফাইটের কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্বটাও লক্ষ্মীনাথের ওপরে চাপিয়ে দিল।

প্রজ্ঞা এবং রত্না সুস্থ হওয়া পর্যন্ত হাওড়া বাড়িতে থেকে লক্ষীনাথ রত্নাকে নিয়ে সম্বলপুরে এলেন। নতুন বাড়িতে রান্নাবান্না করে খাওয়ার অসুবিধা। তার জন্য নয় টাকা মাসিক বেতনে একজন রাঁধুনি ঠিক করলেন।

এতগুলি  বন্দোবস্ত করার পরেও লক্ষ্মীনাথ সুস্থির হতে পারলেন না। কিছু কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো, বাজার-টাজার করা, কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানার জন্য বা কাজ সম্পর্কে করাতি বা শ্রমিককে নির্দেশ দেওয়ার জন্য ঘন ঘন জঙ্গলে যেতে হয়। তার জন্য একটা বাহনের প্রয়োজন। কিন্তু কলকাতার মতো সম্বলপুরে ঘোড়া গাড়ির এত প্রচলন হয়নি। সম্বলপুরে বাহন হল টাঙ্গা।

টাঙ্গা হল বলদ এবং একজোড়া গরুতে টানা গাড়ি। বলদ গরু ভালো হলে টাঙ্গা ঘোড়ার গাড়িকেও হারিয়ে যেতে পারে। এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় ঘোড়া গাড়ির চেয়ে টাঙ্গা বেশি কার্যকর। পাথুরে পথে ঘোড়া দ্রুত খোঁড়া হয়, কিন্তু বলদ গরুর ক্ষেত্রে এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু উড়িয়া টাঙাওয়ালাদের কথার কোনো দাম নেই। কথা দিয়েও কথার রক্ষা না করার জন্য লক্ষীনাথ কয়েকবার অসুবিধায় পড়েছে। তার জন্যই রাগ করে ৩০০ টাকার বিনিময়ে তিনি টাঙ্গা কিনে ফেললেন।

১৯১৭ সনের অক্টোবর মাস থেকে মেঘপাল নামের জায়গার কাছে থাকা একটা জঙ্গলে কাজ আরম্ভ হল। সম্বলপুর থেকে মেঘপালের দূরত্ব ত্ৰিশ  মাইল। জঙ্গলটার নাম পৰ্চলিখনম। বড়ো জঙ্গল। গাছ কেটে করাতিয়ারা শ্লিপার তৈরি করে গরুর গাড়িতে সেইসব শ্লিপার বহন করে সম্বলপুরের রেলস্টেশনের কাঠের ডিপোতে পাঠিয়ে রেলের ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে'পাস' করোনাটাই প্রধান কাজ। শুনতে খুব সহজ মনে হলেও এটা আসলে বর্ষাকালে ভরা ব্রহ্মপুত্রকে ডিঙি নৌকা নিয়ে পাড়ি দেওয়ার মতো প্রাণান্তকর। একদিন দুদিন নয়। কয়েক দিন ধরে লেগে থেকে রেলের ইঞ্জিনিয়ার এবং মুহুরিকে খিদমত করতে হয়। কিন্তু আশেপাশে থাকা খাওয়ার কোনো সুবিধা নেই। অবশেষে লক্ষ্মীনাথ বার্ড কোম্পানির বড়ো সাহেবকে অসুবিধা গুলি বুঝিয়ে বললেন। এদিকে জঙ্গলের বিবরণ শুনে তার মনে শিকার করার বাসনা জাগল। জঙ্গলের কাজ দেখার জন্য এসে সেই সুযোগে শিকার করা শুরু করে এই বাংলোয় তিনি দু চার দিন থাকতে পারবেন বলে বলায় সাহেব খুশি হলেন। এভাবে বড়ো সাহেবের অনুমোদন আদায় করে লক্ষ্মীনাথ মেঘপালে অন্তত তিন বছর থাকতে পারার মতো একটা বাংলো সাজিয়ে নিলেন।

এখন, সম্বলপুরে লক্ষ্মীনাথের কাজ প্রধানত জঙ্গলে। দিনের পর দিন জঙ্গলে থাকতে হবে। সাধারণ জঙ্গল নয়। একেবারে গভীর অরণ্য। এই অরণ্য, বাঘ ভালুক  শুয়োরের বিচরণ স্থল। রাতে তো কথাই নেই, দিনের আলোতেও এইসব হিংস্র জানোয়াৰৰা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। তাই এই ধরনের বিপদ সংকুল অরণ্যে আত্মরক্ষার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র নেওয়াটা শাস্ত্ৰ সম্মত। লক্ষ্মীনাথ একটা দুনলীয়া বন্দুক এবং ৪০৫ উইনচেস্টের রাইফেল কিনে নিয়ে বন্দুক চালানোর কলা-কৌশল শিখে নিল।

অবশ্য এর আগে হাওড়া ডবসন  রোডে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথ একটা একনলীয়া বন্দুক কিনেছিলেন। সেটা আত্মরক্ষা অথবা জন্তু-জানোয়ার শিকার করার জন্য নয়। বন্দুকটা কিনেছিলেন চৌৰ্যকর্মে লিপ্ত হওয়া বাড়ির চাকরদের ভীতি প্রদর্শন করার জন্য।

ঘটনাটা বড়ো আমোদজনক।

ভায়রাভাই  ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরীর আমন্ত্রণ ক্রমে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্মিকী প্রতিভা মঞ্চস্থ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ নাটকটির প্রধান চরিত্র প্রথম দস্যুর ভূমিকায় অভিনয় করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কন্যা অরুনা নিয়েছিল সরস্বতীর ভূমিকা। নাটকটির আখড়া করার জন্য লক্ষ্মীনাথ প্রতিদিন বিকেল বেলা সপরিবারে হাওড়া থেকে বালিগঞ্জে যেতেন। বাড়িতে চাকর কয়েকজনকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে বেরিয়ে যেতেন এবং বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে নটা দশটা বাজত। বিকেলে তিন চার ঘণ্টা সময় খোলা বাড়ি  চাকর বাকরদের মাথায় চৌৰ্য প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।

প্রথম কয়েক দিন লক্ষ্মীনাথ ওদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলেন না। তারপরে যখন ওদের দৌরাত্ম তো বেড়ে গেল সচেতন হলেন। কাপড়ের আলমারির কাপড়গুলিকে কে উলটপালট করেছে, অলংকারের বাক্স থেকে অলংকার রূপবান কোথায় গেল— এই সমস্ত কথায় লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞা যখন নজর দিলেন তখন নিজেদের নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য চাকরের দল বাইরে থেকে আসা চোরের ওপর দোষ চাপিয়ে দিল। চোর ধরার জন্য লক্ষ্মীনাথ পুলিশ ডেকে আনলেন। পুলিশ ওদের দুই একজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে থানায় নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু কোমল হৃদয়ের লক্ষ্মীনাথ নিজের চাকরের ওপরে পুলিশের অত্যাচারের কথা ভেবে বাধা দিলেন। তার মতিগতি দেখে পুলিশ বিরক্ত হয়ে চলে গেল। ফলে ষড়যন্ত্রকারী চোর কুলের জয় হল এবং তার পরেও নতুন নতুন পদ্ধতিতে বাড়ির জিনিসগুলি চুরি হতে লাগল।

একদিন দুদিন নয়। দীর্ঘ একমাস ধরে এটা চলতে লাগল। অবশেষে বন্ধু বান্ধবের পরামর্শ অনুসরণ করে লক্ষ্মীনাথ একটা বন্দুক কিনে আনলেন। সেই বন্দুকটা চোরকে গুলি করে মারার জন্য নয় ভয় দেখানোর জন্য। বন্দুক দেখে সত্যি সত্যি তারা প্রথমে ভয় পেল এবং ভয়ে ভয়ে বন্দুকধারী মালিকের আচরণ দেখতে লাগল। দুদিন পরে ধুরন্ধর ভৃত্য মণ্ডলী বুঝতে পারল যে হরিণের মাথার প্রকাণ্ড শিং যেরকম, ওদের মালিকের হাতে বিভীষণ বন্দুকটাও সেরকম।

অর্থাৎ বন্দুকের মতো একটি মারনাস্ত্র ব্যবহার করার জন্য বিশেষ মুহূর্তে যতখানি কঠোর বা নির্মম হওয়া প্রয়োজন, লক্ষ্মীনাথের সেটা নেই।এহেন লক্ষ্মীনাথ কীভাবে ওদের গুলি করবে?

এমনিতেও লক্ষ্মীনাথ জীবহত্যা এবং জীবের প্রতি নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারতেন না। এমনকি রান্না করার জন্য আনা জীবন্ত কৈ মাছ, মাগুর মাছ, গরৈ মাছ আছড়ে মারাটাও তিনি দেখতে পারতেন না। মায়ের বকুনি খেয়েও সেই সমস্ত জীবন্ত মাছ পুকুরে ছেড়ে দিতেন। হাঁস, পায়রা, ছাগলী মারার কথা শোনা ছাড়া কখনও চোখে দেখেন নি। কারণ, তাঁরা হলেন মহাপুরুষীয়া মানুষ। সেইসব ভক্ষণ করা তাদের কাছে ছিল নিষিদ্ধ এবং যারা খায়, তাদের মনে মনে ঘৃণা করতেন। বৈবাহিক সূত্রে শাক্ত বংশের পরিবারের মেয়ে তাদের বাড়িতে এলে সেরকম বধুকে 'ছাগলী খাওয়া ঘরের’ বলে বাক্য বাণে প্রহার করতেন। এরকম সাত্ত্বিক মহাপুরুষীয়া পরিবারের সন্তান লক্ষ্মীনাথ হাতে বন্দুক নিয়ে গুলি করে জীব হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করবেন?

কিন্তু অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার লক্ষ্মীনাথকে মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণব নীতি-নিষ্ঠা বেঁধে রাখতে পারল না। কলকাতা থাকার সময় সাংসারিক, বৈষয়ি্‌ক, সামাজি্‌ক, সাংস্কৃতিক ব্যস্ততার মধ্যেও মনোরঞ্জনের জন্য তিনি ইন্ডিয়া ক্লাবে গিয়ে বিলিয়ার্ড খেলতেন, লন টেনিস খেলতেন, বৌদ্ধিক পরিতৃপ্তির জন্য কলকাতার বৌদ্ধিক সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রায়ই আলোচনা করতেন। টাউনহল বা অন্যান্য স্থানে ধর্ম সাহিত্য- দর্শনের কোনো বক্তৃতা হলে শুনতেন। তাছাড়া কলকাতার স্টা্‌র, জুবিলী থিয়েটার হলে নতুন নাটক উপভোগ করা ছিল তার জন্য নেশার মতো। সম্বলপুরে আসার পরে সেই সব থেকে বঞ্চিত হলেন। তাই নতুন পরিবেশে বিনোদনের উপায় রূপে তার মনে শিকার করার রাজসিক চেতনা জেগে উঠল। এভাবে লক্ষ্মীনাথ এক পা দু পা করে মৃগয়া নামক ব্যসনে আসক্ত হয়ে পড়লেন। নিরীহ পাখ-পাখালি থেকে শিকারের যাত্রা আরম্ভ হল। তাই একসময়ের জীব হত্যা বিরাগী লক্ষ্মীনাথ জীব হত্যানুরাগী হওয়ার দিকে পদক্ষেপ বাড়ালেন।

সম্বলপুরের জঙ্গলের বড়ো গাছ এবং মহুয়া গাছে দলেদলে হাইঠা পড়ে।বিশেষ করে বড়োগাছের ফল পাকলে এবং মহুয়া ফুল ফুটলে হাইঠা বেশি করে পড়ে।ওপরের দিকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়লেই পটাপট গোটা পাঁচেক হাইঠা নিচে খসে পড়ে।হাইঠা খেতে ভালো।তারপরে শীতকালে হিমালয় থেকে অনেক প্রজাতির রাজহাঁস এসে মহানদী এবং মহানদীর পারের বিল ,বন্ধ পুকুর ইত্যাদিতে পড়ে।ধিতরাজ,লালমুণ্ডি,হুইচ,লিংটিল,চাকৈচকোৱা,ঘিলাহাঁস,ডাহুক,কোড়া,কাম চড়াই ইত্যাদি কোলাহল করে।ওরা জলচর জন্তু,মাছ,শামুকের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ, পদ্ম,ভেট,শালুক,দলঘাস ইত্যাদি ভক্ষণ করে।লক্ষ্মীনাথ সেই সবও শিকার করতে লাগলেন।অবশ্য রন্ধন পটীয়সী গৃহকর্তৃী প্রজ্ঞাসুন্দরীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরে শিকার করা জীবের রসনাযুক্ত ভোজনের আনন্দ অথবা নিরানন্দ ঘটে।আসলে,প্রজ্ঞাও এই ধরনের নিরীহ জীবহত্যা ভালোবাসেন না।কিন্তু চাকর-বাকরদের এই ধরনের জীবের মাংস ভক্ষণের প্রবল আগ্রহ দেখে লক্ষ্মীনাথ উৎসাহিত হয়ে উঠেন।তখন পত্নীর বাধা নিষেধে ভ্রূক্ষেপ না করে উৎসাহী চাকরদের সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ শিকার করার জন্য বেরোতে লাগলেন।এভাবে অচিরেই তিনি একজন বিখ্যাত শিকারি হয়ে উঠলেন।

জঙ্গলের কাজ দেখার জন্য মাসে তিন-চারবার করে লক্ষ্মীনাথকে সম্বলপুর থেকে মেঘপালে যেতে হয়।কাজ-কর্ম বুঝে নেবার জন্য মেঘপালের বাংলোয় দুই-চারদিন,কখনও এক সপ্তাহ থাকতে হয়।মেয়ে তিনটি কলকাতায় থাকলে প্রজ্ঞা একা থাকে।তখন প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে্ মেঘপালে যেতে চান।এমনিতে ছুটিতে বাড়িতে এসে অরুণা,রত্না এবং দীপিকা জঙ্গলে কীধরনের জন্তু-জানোয়ার ঘুরে বেড়ায় দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়ল।ওদের আগ্রহ-ইচ্ছা পূরণ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ পরিবারের সঙ্গে্ মেঘপালের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।অরুণা-রত্নার জন্য ছোটো টাটু ঘোড়া একজন কিনে দিলেন।ওদের দুজনকেই টাটু ঘোড়ায় উঠিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞা এবং দীপিকাকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ টাঙ্গায় উঠে মেঘপালে এলেন।

গরমের দিন।মেঘপালের বাংলোর বাইরের উঁচু বারান্দায় বসে মেয়ে তিনজন এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে বসে লক্ষ্মীনাথ বিকেলের চা খাচ্ছেন।এমন সময় একটা মানুষ এসে খবর দিলেন যে কাছেই একটা খালে একটা ভালুক জল খাচ্ছে। দুপায়া জন্তু শিকার করে হাত পাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের মনের মধ্যে ইতিমধ্যে চারপেয়ে জন্তু শিকার করার আগ্রহ জেগে উঠেছে।তিনি খপ করে কাছেই রাখা বন্দুকটা হাতে নিয়ে ভালুক মারার জন্য উঠলেন।

সঙ্গে সঙ্গে গৃহিনী প্রজ্ঞা এবং দুই কন্যারত্ন অরুণা-রত্না লক্ষ্মীনাথকে জড়িয়ে ধরল, ‘না,তুমি যাবে না।’

‘কেন,কেন যাব না?’

‘ভালুক ভয়ঙ্কর জানোয়ার।’প্রজ্ঞা বলল, ‘কোন মুহূর্তে কী হয়ে যায় ঠিক নেই।’

বন্দুক থাকলেও তুমি একা। তাছাড়া গুলি সঠিকভাবে না লাগলে বিপদ ঘটতে পারে। হিংস্র ভালুক আক্রমণ করে তোমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলবে।

পত্নীর এই সাবধান বাণী, উৎসাহী শিকারী, লক্ষ্মীনাথের পুরুষত্বে আঘাত হানল কিন্তু দুই কন্যা অরুনা এবং রত্নার কোমল মুখ দুটির দিকে তাকিয়ে তিনি শান্ত হতে বাধ্য হলেন।

  আরেকদিন সন্ধের সময় লক্ষ্মীনাথ পরিবারের সঙ্গে মেঘপালের বাংলোতে বসে থাকার সময় চেঁচামেচি এবং ভাঙ্গা টিন বাজাতে শুনলেন। সঙ্গে কিছু মানুষকে হাতে খড়ের মশাল নিয়ে দৌড়াতে দেখা গেল। ঘটনাটা কী খবর নিয়ে জানতে পারলেন যে একটা বন্য হাতি কাছেই ধানক্ষেতের ভেতরে ঢুকে ধান খেতে শুরু করেছে।সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকটা নিয়ে লক্ষীনাথ সেদিকে দৌড়ে যেতে চাইতেই পুনরায় সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। প্রিয়তমা পত্নী প্রজ্ঞাসুন্দরী এবং স্নেহময়ী কন্যা অরুণা রত্নার হাতে তিনি বন্দি হয়ে পড়লেন অর্থাৎ পত্নী কন্যার স্নেহ ভালবাসার বাঁধন অস্বীকার করে লক্ষ্মীনাথ চারপেয়ে জানোয়ার শিকার করতে যেতে পারলেন না।

  এটা যে কেবল পত্নী এবং কন্যা দুজনের ভালোবাসার বাঁধন তাই নয় আসলে এখনও লক্ষীনাথ সম্পূর্ণভাবে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শিকার করার জন্য যে সাহস এবং গুলি করে বধ করার মুহূর্তে যতখানি নির্মম হওয়া প্রয়োজন এতদিন চেষ্টা করেও সেটা তিনি অর্জন করতে পারেন নি। শিকার করে মাংস ভক্ষণ করলেও এখনও জীবের রক্তাক্ত শরীর দেখলে প্রবল যন্ত্রণাবোধ হয়। তাই তিনি এখনও চার পায়ে জন্তুর ওপরে গুলি চালাতে সাহস অর্জন করতে পারেন নি। কিন্তু চারপেয়ে জন্তুর শিকার না করা পর্যন্ত লক্ষ্মীনাথ শিকারি হিসেবে জাতে উঠতে পারবেন না।

 সকালবেলা আটটা বাজে। মেঘপালের বাংলো থেকে টাঙ্গায় উঠে লক্ষ্মীনাথ একা সম্বলপুরের দিকে যাত্রা করছেন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ। গভীর জঙ্গলের জন্য সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। এই সময়ে জন্তু জানোয়ার অবাধে বিচরণ করে বেড়ায়। এদিকে হিংস্র বাঘ ভালুকও দেখতে পাওয়া যায়। তাই আত্মরক্ষার জন্য লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দুনলীয়া বন্দুকটা থাকেই।

 কিছুদূর এগিয়ে যাবার পরে লক্ষীনাথ দেখলেন তার সামনে দিয়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে প্রকাণ্ড শিং থাকা ফুটফুটে হরিণ যাচ্ছে এবং তার পেছনে পেছন যাচ্ছে পাঁচটি স্ত্রী হরিণ। বন্য জীব জঙ্গলের সবুজ পরিবেশে সবসময় সুন্দর। সত্যি কী অপরূপ দৃশ্য। নিবিড় বনের শান্ত পরিবেশে পুরুষ হরিণটির সঙ্গে পাঁচটি স্ত্রী হরিণের স্বচ্ছন্দ বিচরণের বিরল দৃশ্য দেখে লক্ষ্মীনাথের বড়ো ভালো লাগল। তিনি টাঙ্গা চালককে ধীরে ধীরে চালাতে বলে পরম তৃপ্তির সঙ্গে নয়নাভিরাম সেই দৃশ্যটি দেখতে লাগলেন।

 কিন্তু টাঙ্গার বলদ এবং গরু তাড়ানো যুবকটি নিজের বিবেচনা অনুসরণ করে টাঙ্গা রাখল। তারপরে লক্ষ্মীনাথের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন—হুজুর এটা চিতল। মারুন, মারুন।

 লক্ষ্মীনাথের মনে শিকারের বাসনা জেগে উঠল।তাঁর বসা সিটের কাছে রাখা বন্দুকটা নিয়ে ধীরে ধীরে টাঙ্গা থেকে নেমে এলেন।পুরুষ হরিণের দিকে বন্দুকের নিশানা করে একঝাঁক গুলিতে তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু হরিণ গুলি বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে অবাক চোখে লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে রইল। আর তাদের চোখ গুলিতে সেই একই অকপট ভাব। জঙ্গলে বাস করা জানোয়ার যদিও ওদের চোখে মুখে স্বর্গীয় পবিত্রতা। তার চেয়ে আশ্চর্যের কথা বন্দুকের নিশানা করে দাঁড়ান শিকারি লক্ষ্মীনাথকে দেখেও তারা তাকে শত্রু বলে ভাবেনি অথবা জঙ্গলের প্রশান্তময় এই অঞ্চলে লক্ষ্মীনাথের এই সহিংস মূর্তি দেখে হরিণ পরিবারটি অবাক হয়ে গিয়েছে। 

শিং থাকা পুরুষ হরিণটার দিকে বন্দুক নিশানা করে আছে যদিও লক্ষীনাথের মনে তখন এক অদ্ভুত সামাজিক তত্ত্বের উদয় হল। এটা তিনি কী করতে চলেছেন? পুরুষ হরিণটা বহুবিবাহকারী। তিনি যদি তাকে গুলি করে হত্যা করেন তাহলে তার পাঁচটি স্ত্রী অকালে বৈধব্য গ্রহণ করে অনাথ হবে। ভারত থেকে এখনও বহুবিবাহ প্রথা উচ্ছেদ হয়নি। তাই এই পুরুষ হরিণটি কোনো অনৈতিক কাজ করেনি। ক্ষণিকের উত্তেজনা এবং সুখের জন্য এই ধরনের পাপকার্যে লিপ্ত হওয়াটা উচিত হবে কি?

 কিন্তু লক্ষীনাথ তখনও ভাবছেন স্বামীর অবর্তমানে অনাথা অবলা স্ত্রী পশুদের কী হবে? তার জন্যই তিনি বন্দুকের ট্রিগার টিপে গুলি চালাতে পারছেন না।

 ইতিমধ্যে শিং থাকা হরিণটির সম্ভবত বাস্তব চেতনা জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল বিপদ সমাগত। তার জন্যই বাল্লালি বালাই কৌ্লীন্য প্রথার সমর্থক হরিণটি এক লাফে জঙ্গলে প্রবেশ করল। তার সঙ্গে তার পাঁচ জন স্ত্রী তখনই স্বামীকে অনুগমন করল।

‘ হুজুর এ আপনে কেয়া কিয়া? প্রচন্ড হতাশা এবং বিরক্তির সঙ্গে টাঙ্গাচালক বলল, ‘এইসা মৌকা ফির কাহা মিলেগা? ফায়ার না করকে আপনি ইতনা আচ্ছা মৌকা জানে দিয়া।’

 ইতিমধ্যে লক্ষীনাথের মন থেকে সামাজিক তত্ত্বের ভূতটি বিদায় নিয়েছে। নিজেকে ফিরে পাওয়ার পরেই তার মুখে গ্লানিময় যন্ত্রণা ভরে উঠল। তারপরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি টাঙ্গাচালক যুবকটির দিকে তাকাতে পারলেন না।


       

    


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...