এই আমি চরিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এই আমি চরিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৩

স্মৃতিকথা- ৩৫ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার,Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা-  ৩৫


                          এই আমি চরিত্র


                             নীলাঞ্জন কুমার


                           ( গত মাসের পর ) 
  



                                  ।। ৩৫।।


সে সময় বরুণের বাড়িতে গিয়ে মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতাম । বরুণের বাড়ি থেকে গেলে বেশ খানিকটা মাঠ পেরিয়ে যেতে হত । শরৎকালে সেখানে কাশফুল ফুটতো । আমি ওই মাঠ দিয়ে ওই সময় হাঁটলে কাশফুলগুলো আমার প্যান্টে জড়িয়ে যেত । বরুণের বাড়ি গিয়ে তা ঝেড়ে নিতাম ।এখন মনে হয় সে কি সুন্দর আমেজ । বরুণ যখন কাগজের নৌকা  বের করতে শুরু করে তার প্রস্তুতি পর্বেআমিই ছিলাম প্রধান সহায়ক । আমিই ওকে উৎসাহিত করেছিলামমৃণাল দার বাড়িতে  ও যখন কাজ করতো সে সময় । ধীরে ধীরে ও এক ফর্মার একটি কাগজ বের করলো । যেখানে আমি ছিলাম প্রায় মুখ্য সহায়ক  । আশ্চর্যের বিষয় আজ চল্লিশ বছর হয়ে গেল বরুণ ঠিক একই আকার ওই ষোল পৃষ্ঠার কাগজটি বজায় রেখেছে । ধারার কোন পরিবর্তন হয়নি । যে নামাঙ্কন প্রথম সংখ্যাতে ( বরুণের আঁকা)  তা এখনও বজায় রেখেছে । বরুণের একটি ছেলে হয়েছিল । প্রথম থেকে সে স্পেশাল চাইল্ড । হায়ার সেকেন্ডারিতে ভালো রেজাল্ট করেছিল । কিন্তু তাকে ইহলোকে ধরে রাখতে পারেনি বরুণ । এতো সুন্দর ও ভালো মানুষকে কে যে ওপরতলায় দুঃখ দেয় বুঝি না ।
      যা হোক দুঃখ তো জীবনের অঙ্গ । সঙ্গে থাকবে আনন্দও । ১৯৮১ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ আছে চাবিকাঠি বের হল । প্রচ্ছদ এঁকেছিল সুদীপ মাইতি । সুন্দর করেছিল প্রচ্ছদ । ও শিল্পী প্রণবেশ মাইতির নিকটাত্মীয় । তখন মেদিনীপুরের রাজাবাজারে সঞ্জয়ের মেস বাড়ির পাশে শিল্পী শ্যামল ঘোষের বাসা ছিল । ওখানে সমস্ত মেদিনীপুরের কমবয়সী  চিত্রশিল্পীরা আসতো  ।  আমি আর সঞ্জয় যোগ দিতাম ওদের সঙ্গে প্রায়ই । ওরা ষড়ঙ্গ।নামে একটি সংস্থা খুলেছিল । সেই ষড়ঙ্গ থেকে একবার রবীন্দ্র জয়ন্তী হয়েছিল । আমি তাতে গান গেয়েছিলাম এক শ্রুতি নাটকে। বেশ জমেছিল সেই অনুষ্ঠান । শিশুকথা নামে একটি কাগজ ওখান থেকে প্রকাশিত হয়েছিল । অনতিবিলম্বে তা বন্ধ হয়ে যায় । তখন বাকপ্রতিমার কাজ আর এই সব করে বেড়াচ্ছি । সুতরাং আনন্দ তো আর ধরে না ।
     এদিকে বাকপ্রতিমার অফিসে কাজ চলছে । বইপত্রের ছাপাছুপির কাজ শুরু হল মেদিনীপুরেরদুটি প্রেসে । একটি মেদিনীপুরেরবলরাম দাসের
গল্প বই আর একটি মেদিনীপুরে গণনাট্য সংঘের কৃষ্টি সংসদ শাখার প্রাণপুরুষ শ্রীজীব গোস্বামীর ' জোয়া ' নাটকের ।  এই প্রকাশনার বিষয় নিয়ে আমার শ্রীজীব গোস্বামীর সঙ্গে আলাপ । শ্রীজীব গোস্বামীর আসল নাম  বাসুদেব দাশগুপ্ত । যিনি নাটক লিখতেন শ্রীজীব গোস্বামী নামে আর গান লিখতেন ও সুর দিতেন বাসুদেব দাশগুপ্ত নামে । একদিন বাকপ্রতিমার অফিসে ওঁনাকে প্রস্তাব দিলাম আমি যোগ দিতে চাই কৃষ্টি সংসদে। উনি সানন্দে রাজি হলেন । তার কয়েকদিন পর আমার কৃষ্টি সংসদে আগমন ।
                                                            (  চলবে)

মঙ্গলবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

স্মৃতিকথা-।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা- ৩৪



                         এই আমি চরিত্র


                         নীলাঞ্জন কুমার


                      (  গত মাসের পর )

 


                               ।।৩৪।।

     ' আছে চাবিকাঠি ' আমার প্রথম বই তা ছাপা শুরু  হয়ে গেল মেদিনীপুরের মহাতাবপুরে উপত্যকা দৈনিক  পত্রিকার প্রেসে  সেই সঙ্গে স্বরলিপি পত্রিকা চালু হয়ে গেল । সেই সময়ের থেকে উপত্যকার সম্পাদক তাপস মাইতির সঙ্গে আমার আলাপ । মৃণাল কান্তি কালীর কাছে মাঝে মাঝে আসতেন কবি ও প্রাবন্ধিক দীপঙ্কর দাস,  যিনি এক সময় '  যুগযাত্রী ' নামে একটি সংবাদপত্র  প্রকাশ করেছিলেন তাছাড়া ' রোদ্দুর ' নামে একটি অত্যন্ত মানসম্পন্ন লিটল ম্যাগাজিনের কয়েকটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন । তিনি পেশাতে ছিলেন আইনজীবী । মেদিনীপুর জেলা জজ কোর্টে প্রাকট্রিস করতেন । ধীরে ধীরে উনি হলেন আমার কাছের জন ।
             '  স্বরলিপি ' পত্রিকা বেরতে শুরু হল । সে সময়ে মেদিনীপুরের ভালো ভালো লেখকদের লেখা প্রকাশ করতে লাগলাম । তার সঙ্গে শুরু হল' উজ্জয়িনী ' পত্রিকার লেখা আনার কাজ । এছাড়া অন্যান্য দিকগুলো দেখতে হত আমাকে ।তখন থেকে শুরু হয়ে গেল প্রকৃতার্থে একটি ভালো পত্রিকার সম্পাদনার অভিজ্ঞতা । সঙ্গে চললো মনুসংহিতা কপির কাজ । মনোসংহিতা প্রি বুকিং শুরু হয়ে গেল কলকাতাতে বেনিয়াটোলার ভোলানাথ প্রকাশনীতে । যা হোক তখন বিশেষ উন্মাদনা আমার মনে । হাজারো স্বপ্ন । মৃণাল দা ও স্বপ্ন দেখতেন । উনি  দু দুবার আমার সহকারী নিয়েছিলেন । তারা টেকেনি । পরে আমিই ঠিক করলাম বরুণ বিশ্বাসকে । বরুণ এখন একটি সরকারি অফিস থেকে রিটায়ার্ড করেছে । দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে সে ' কাগজের নৌকা ' পত্রিকা বছরে বেশ কয়েকটি সংখ্যা
সম্পাদনা করে মেদিনীপুর শহর থেকে । বরুণের বাবা ছিলেন মেদিনীপুর কেন্দ্রিয় কারাগারের একজন কর্মচারী । ওর বাড়িতে বহু বহুবার গেছি ।সেখানে বরুণের দুই বন্ধু কল্যাণ দাস ও দেবাশিস বিষ্ণু রায়ের সঙ্গে আমার আলাপ । বর্তমানে দুজনেই প্রয়াত । ওরাও কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্মচারী ছিল । ওদের মধ্যে সামান্য সাহিত্য গুণ ছিল । যা আজকের অবস্থানে হাস্যকর

মঙ্গলবার, ১ আগস্ট, ২০২৩

স্মৃতিকথা- ৩৩ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা-  ৩৩


                       এই আমি চরিত্র


                            নীলাঞ্জন কুমার




      গ্রাজুয়েট হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেল মেদিনীপুরের বিশিষ্ট কবি হিসেবে পরিচিত ও লিটল ম্যাগাজিন প্রেমী বর্তমানে প্রয়াত মৃণালকান্তি কালীর সঙ্গে । মৃণাল বাবু পারিবারিক দিক দিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন । শহরের পাহাড়ি পুর  এলাকায় তাঁদের  বিশাল বাড়ি । তিন ভাই এক বাড়িতে থাকতেন । সম্পন্ন পরিবারের মানুষটি শহরের লিটল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । যখন মেদিনীপুরে পঞ্চাশ দশকে পুরনো সাহিত্য ছেড়ে নতুন কবিরা নতুন সাহিত্য নিয়ে আসছেন সেই সময় তিনি ' আকাশ ' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছেন কিছুদিন । তাছাড়া ' অনুপমা সান্যালের শব ' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর প্রকাশিত হয়েছিল। যাতে জীবনানন্দের অনুকরণ ছিল স্পষ্ট ।
                  মৃণাল বাবু আটের দশকে একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য তরুণ কর্মঠ কবি খুঁজেছিলেন । সেই সঙ্গে তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রকাশনী সংস্থা খোলার । কবিতার প্রতি আমার উৎসাহ দেখে তিনি আমায় প্রস্তাব দেন তাঁর সংস্থার কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে যাতে যোগ দিই। যা আমি আসলেই শুরু হবে । পারিশ্রমিক সে সময় তিনশো টাকা । আমি তো বগ্ বগ্ খুশি । সাহিত্য করতে পারব সে সঙ্গে টাকা আসবে এ সুযোগ ছাড়ে কে! 
         বাবা মাকে এ কথা জানালে ওরা তো দারুন খুশি। তাদের মতে যাহোক ছেলেটা দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে । অচিরেই প্রকাশনীর কাজ শুরু হয়ে গেল । নামকরণ হলো বাকপ্রতিমা ।আস্তে আস্তে আমরা আরও সখ্য হয়ে উঠলাম । তখন আমার কাব্যগ্রন্থের প্রস্তাব উনি দিলেন । বেরবে আমার প্রকাশনী সংস্থা স্বরলিপি প্রকাশনী থেকে । প্রতি মাসে ' স্বরলিপি ' নামে একটি ডবল ক্রাউন চার পৃষ্ঠা কবিতার কাগজ আমি সম্পাদনা করব স্থির হল । বলা যায় প্রকৃতার্থে শুরু হয়ে গেল সাংস্কৃতিক যাপন । বাকপ্রতিমা সংস্থা শুরু হল ওনার বাড়ির সামনের ঘরে । আমি মনুসংহিতা কপি করার দায়িত্ব পেলাম । সেই সঙ্গে তা পড়াও হতে থাকলো । তখন ভারতবর্ষে জেরক্স মেশিন আসেনি ।   আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল । নাম দিলাম      'আছে চাবিকাঠি '। পুরো টাকা মৃণাল কান্তি কালী দিলেন । ওনাকে মৃণাল বাবু বলে ডাকতাম । ওঁর স্ত্রী র
' বকুনি ' তে ওঁকে তারপর মৃণাল দা বলে ডাকতাম । অচিরেই দাদা ভাই সম্পর্ক গড়ে উঠলো । যা হোক সংস্থার কাজের কারনে আমায় কলকাতা আসতে হত । যোগাযোগ করতাম কলেজ স্ট্রিটের ভোলানাথ প্রকাশনী র মালিক সুরেশ বাবুর  সঙ্গে। উনি মৃণাল দার বন্ধু ছিলেন । ধীরে ধীরে এই পাবলিকেশনের  কি কি বই প্রকাশ হবে তার তালিকা ঠিক করে আজকাল পত্রিকাতে বেশ বড় বিজ্ঞাপন দেওয়া  হল । যা দেখে মেদিনীপুর চমকে গেল । বাকপ্রতিমার কথা তখন শিল্প সাহিত্য মহলে মুখে মুখে ঘুরছে । সেই সঙ্গে বাকপ্রতিমার লিটল ম্যাগাজিন ' উজ্জ্বয়িনী ' র কাজ আরম্ভ হল । সম্পাদক মৃণালকান্তি কালী আর  সহ সম্পাদক নীলাঞ্জন কুমার । বলা যায় বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কবিতা সমান তালে চলতে লাগল ।


                                                       ( চলবে)

মঙ্গলবার, ৪ জুলাই, ২০২৩

স্মৃতিকথা- ৩২ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার ( গত মাসের পর ) Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা- ৩২


                              এই আমি চরিত্র

                              নীলাঞ্জন কুমার

                              (  গত মাসের পর )


                                     ।। ৩২।।






ধীরে ধীরে কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেল, যেহেতু কবিতা লেখা ও কবিতার বিষয় পড়া ছাড়া আর একটি কাজ মন দিয়ে করেছিলাম তা হল নিয়মিত কলেজ করা ও নোটস্ নেওয়া । আমি বুঝতে পারতাম কোন কোন প্রশ্ন আসতে পারে । আমি প্রত্যেক পেপারে দশটা করে প্রশ্ন ঝরঝরে রেডি করে ছিলাম আর প্রাকট্রিকাল গুলো মন দিয়ে করার কারণে নিশ্চিত ছিলাম যেভাবে হোক পাস করবই ।
              ভাগ্য কিনা জানিনা, যে দশটা করে প্রশ্ন প্রত্যেক পেপারে করেছিলাম তার মধ্যে পাঁচটি ছ'টি করে কমন প্রশ্ন পেয়ে গেলাম । লিখে লিখে ইয়া মোটা করে ফেললাম উত্তরপত্র গুলো । বুঝতে পারলাম পৃথিবীর কেউ আমায় ফেল করাতে গেলেও পারবে না ।প্রাকট্রিকালেও তাই হল, প্রতিটি প্রাকট্রিকালেও নিখুঁত ভাবে উত্তর লিখলাম । এরপর আমি মুক্ত বিহঙ্গ । তখন টোটো কোম্পানী । সাইকেলে চোঁ চোঁ করে শহর মেদিনীপুর ঘোরা আর কবিতা কবিতা কবিতা গান গান গান । এই সব করে তিন মাস কেমন করে কেটে গেল । তার মধ্যে আমরা আমাদের নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশ করেছি । ছাদ পলেস্তারা হয়েছে, তখনও রঙ হয়নি । প্রায় মাস তিনেক বিনে ইলেকট্রিকে ছিলাম ।
                যেদিন আমার পার্ট টুর রেজাল্ট আউট ঠিক তার পরের দিন ছিল সরস্বতী পূজা ।এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো । আমি মোটামুটি ভাবে পাস করলাম। আমার বন্ধু সঞ্জয় চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলাম মা বাবা আর দিদিকে খবর দিতে । আমরা এসে পৌচেছি আর মা দেখি বড়বাজার থেকে রিকশো করে সরস্বতী ঠাকুর নিয়ে বাড়ি ঢুকছে । সঞ্জয় আর আমাদের সে কি আনন্দ! পরের দিন মহা ধুমধাম করে পুজো হল । নতুন ঘরে প্রথম ।
            পরীক্ষা পাসের পর সাপের পাঁচ পা দেখলাম । কবিতাকেন্দ্রিক পড়াশোনা বাদে বাকি পড়া থেকে আজীবন মুক্ত হলাম । তখন কবিতা আর গান একমাত্র সঙ্গী । এসময় নতুন বন্ধু হলো প্রয়াত চিত্রশিল্পী শ্যামল ঘোষ । এছাড়া প্রয়াত কবি অভিজিৎ সিংহ, সঞ্জয় চক্রবর্তী, মানস দে তো আছেই । সেই সঙ্গে আলাপ হলো সুসাথী পত্রিকার সম্পাদক ছড়াকবি প্রদীপ দেব বর্মনের সঙ্গে । প্রদীপ দেব বর্মন আমার থেকে বেশ বড়ই ছিল। বাড়ি মেদিনীপুর শহরে বাড় মানিকপুরে । সবাই সমচিন্তক তাই আমরা মিশে গেলাম । আমরা প্রথমের দিকে জমায়েত হতাম রবীন্দ্রনগরের রাজপ্রসাদ মাহাতোর প্রেসে । সেখানে আসতো উপরোক্ত কয়েকজন বাদে রবিবার সকালে অমৃতলোক পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত সমীরণ মজুমদার, কবি অচিন্ত্য নন্দী, কবি আশিস ত্রিপাঠি, কাগজের নৌকা পত্রিকার সম্পাদক বরুণ বিশ্বাস , শায়েরি লেখক লোকেশ গিরি, বর্ষিয়ান চিত্রশিল্পী গোষ্ঠ পাখিরা সহ আরো কয়েকজন আড্ডা কবিতা গান নিয়ে মশগুল থাকতাম । তখন আমার সিগারেট বিড়ি দুটোই চলতো । তা আমাকে সাপ্লাই দিতো প্রদীপ দেব বর্মন ।উনি মেদিনীপুর জেলার সদর হাসপাতালে কাজ করতেন । লোকেশের একটি শায়েরির বই কলকাতার বিশ্ববাণী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল । আমি পরে তা মেদিনীপুরের দৈনিক বিপ্লবী সব্যসাচী পত্রিকাতে বিস্তৃত সমালোচনা করেছিলাম।

                                                            ( চলবে)

মঙ্গলবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৩

স্মৃতিকথা -২৯ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা -২৯

                    

                            এই আমি চরিত্র

                             নীলাঞ্জন কুমার


                          ( গত মাসের পর)



                                  ।। ২৯ ।।


কলেজের থার্ড ইয়ারের সময় থেকে এভাবে কলকাতা যাওয়া শুরু হয়ে গেল । মাসে একবার কখনো কখনো দু - বার আমি কলকাতা যেতে লাগলাম । পাতিরাম তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় আর ' কথা ও কাহিনি ' তে তখন বসে বসে পড়ার ব্যবস্থা ছিল,  সেখানে আমি পড়তাম আর পড়তাম । ৩ টাকা ৫পয়সার মাছ ভাত আর আলুচোখা খাওয়া প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হতে গিয়েছিল । প্রায়ই হোটেলের মালিককে ৩ টাকা দিতাম । বলতাম পাঁচ পয়সা   নেই । মালিক রাগ করতো, ছোট বড় কথা বলতো । কিন্তু ওই পর্যন্ত । আমিও পাঁচ পয়সা বাঁচানোর আনন্দ পেতাম । তখন ভাবতাম যদি সত্যি সত্যি কলকাতাতে বাস করতে পারি তবে মনের মতো পড়তে লিখতে পারব । ১৯৯৪ সালে কলকাতাতে পাকাপাকি আসার পর সে স্বপ্ন সফল হয়েছে । তখন আমার চাকরিস্থল ছিল কলেজস্ট্রিটের কাছে আর আমি অফিস সেরে ওখানে এসে পড়তাম আর
পড়তাম ।
                 যাহোক আবার পুরনো কথায় ফিরে আসি , থার্ড ইয়ারের ক্লাস,  কলকাতাতে সাহিত্যের পড়াশোনা , মেদিনীপুর জেলা লাইব্রেরি,  রাজনারায়ণ লাইব্রেরি, গুরুদাসের খড়্গপুরের পুরাতন বাজারের বাড়ি ইত্যাদি নিয়ে দিন কাটানোর মুহূর্তগুলো বেশ রঙিন হয়ে উঠতো । ধীরে ধীরে কলেজের দিন কমছে,  থার্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা সামনে,  সত্যি বলছি পরীক্ষার পড়ায় তেমন তাগিদ নেই ।  মাঝে মাঝে মনে হয় কি হবে পরীক্ষা দিয়ে,  আদৌ কি চাকরি পাব?  কারণ সত্তরের দশকের থেকে চাকরির যে টানাটানি তা আমাকে ভাবিয়ে ছাড়তো । ক্রমাগত চাকরি বিষয়ে হতাশা আরো তীব্র হল । যখন দেখতাম পাড়ার শিক্ষিত বেকাররা দুপুরে বাড়িতে ঘুমোচ্ছে আর পাড়ার রকে বসে মেয়েদের অশ্লীল ইঙ্গিত করছে । আমার দিদিরা বড় হচ্ছে । বড়দির বিয়ের ব্যবস্থা চলছে । ঠিক সেই সময়ে আমাদের কর্নেলগোলার বাড়িওলা বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়ে দিল । আমরা জানতাম অনেক দিন হয়ে গেল এবার হয়তো বাড়ি ছাড়তে হবে । বাবা বাড়ি খোঁজা শুরু করতে লাগল । বাবার মাথায় দিদির বিয়ে,  আমাদের পড়াশোনা,  দাদার প্রায় বেকারত্ব,  সেই সঙ্গে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ । বাবা মা সে সময় স্থির করলো এবার নিজের বাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে । সেই স্বপ্ন সফল করারআগ্রহ নিয়ে বাবা কর্নেলগোলা থেকে বেশ দূরে জগন্নাথ মন্দিরের কাছে নতুন বাজারে বাবার পুরনো বন্ধু বেদব্যাস দে- র বাড়িতে ভাড়া ঠিক করলো ।বেদব্যাস বাবু অনেক দিন আগে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর কয়লার দোকান ছিল বাড়ির সামনে কয়েক কাঠা জমির ওপর । ওখানে পরবর্তীকালে  তাঁর পরিবার ঘর তৈরি করে । আমরা কর্নেলগোলা থেকে উঠে গেলাম সেই বাড়িতে । নতুন বাড়ি নতুন পরিবেশ বেশ কিছু অসুবিধে হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে হল নতুন বাড়ির পরিকল্পনার কারণে । বাবা আস্তে আস্তে জমি খুঁজতে লাগল। কিছু জমি দেখতে দেখতে মেদিনীপুরের জর্জকোর্টের প্রায় পাশেই অরবিন্দ নগরের  ৫ কাঠা জমি মা বাবার পছন্দ হলো । বাবা এক সমবায় সমিতি থেকে লোন নিয়ে জমিটা কিনলো। আমরা বাড়ির ব্যাপারে পরিকল্পনা করতে শুরু করলাম । 



      এদিকে মেদিনীপুরের নতুন বাজার থেকে খড়্গপুরের পুরাতন বাজার খুব বেশি দূরে নয়,  বাসে মাত্র আধ ঘণ্টার মতো । তাই গুরুদাসের বাড়ি নিয়মিত যাওয়া শুরু হয়ে গেল । ওদের বাড়ি এত ভাল লাগত যে অনেক সময় ওদের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠতো । যা বুঝতে পারলেও না গিয়ে পারতাম না । গুরুদাসের বাবা ওদের সঙ্গে আমার যোগাযোগের আগে মারা গিয়েছিলেন । ছিলেন গুরুদাসের তিন দাদা,  মা, ঠাকুমা,  দিদি বোন  । দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল,  বোন তখন বেশ ছোট,  আর এক দাদা বাইরে থাকতেন । তাঁর এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ।

                                                             ( চলবে)

মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

স্মৃতিকথা- ২৭ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 

স্মৃতিকথা- ২৭


    এই আমি চরিত্র

    নীলাঞ্জন কুমার




                     ( গত মাসের পর)

   


                            ।। ২৭।।




সেকেন্ড ইয়ারে উঠে পড়ার কিছু চাপ পড়লেও সাহিত্য গান আর রাজনীতি করার বাধা ছিল না। এ সময় বিশেষ ভাবে পরিচিত হলাম তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় (যে মুম্বাইতে একটি বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে জড়িত) আর গুরুদাস দত্তের সঙ্গে । তমাল থাকতো কর্ণেলগোলায় আমাদের ভাড়া বাড়ির কাছে । আর গুরুদাস জগন্নাথ মন্দিরের কাছে । গুরুদাসের দাদার ভুষিমালের দোকান ছিল গোলকুঁয়া চকে ।সেটিও আমার বাড়ির কাছে । ওখানে গুরুদাস দোকানে বসতো ।আমাদের আড্ডা ছিল এই দোকান ঘিরে । বেশ কিছুদিন দোকানটি ছিল পরে বন্ধ হয়ে যায় ।তখন ওদের সঙ্গে জমাটি বন্ধুত্ব। তমালের আর গুরুদাসের সঙ্গে তখন জমাটি বন্ধুত্ব । ওদের বাড়িতে তখন নিত্যি আনাগোনা । তখন আমার বোহেমিয়ান অবস্থা । কখন বাড়িতে আছি কখন বাইরে যাচ্ছি কেউ তার খোঁজ রাখেনা বললেই চলে ।তবে তার যেখানে থাকি রাতে পড়াশোনা আর নিয়মিত ক্লাস করে যেতাম । সেই সঙ্গে দুপুরে কলা বিভাগের ক্লাস করতাম । আর ছিল লাইব্রেরি । এ সময় সিনেমা দেখার নেশা চড়ে গিয়েছিল । তখন মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমা ( এখন তা আর নেই) য় দুপুরে বিভিন্ন থার্ড ক্লাস হিন্দি সিনেমা দেখানো হত তার ইয়ত্তা নেই । আমি সপ্তাহে অন্তত একদিন সেই সব ছবি দেখতাম । কত যে তিন আনার ( ১৯পয়সা) সিটে বসে সেই সব সিনেমা দেখেছি!

        সেকেন্ড ইয়ারে এসে বুঝতে পারলাম কলেজে পাস করা কত জরুরি । সে সময় গুরুদাস মেদিনীপুর শহর থেকে চলে গেল খড়্গপুরের পুরাতন বাজারের এক ভাড়া বাড়িতে । ওর বাড়িটা তখন হয়ে উঠলো আমার দ্বিতীয় বাড়ি । তখন বাসভাড়া ছিল মেদিনীপুর থেকে খড়্গপুরের স্টুডেন্ট কনসেসনে কুড়ি পয়সা । কখনো সখনো রাত কাটিয়েছি ওদের বাড়িতে । ওর সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতাম পুরাতন বাজারের এক সিনেমা হলে । রাতে বাড়ি ফিরলাম । কখনো সখনো গুরুদাসের সঙ্গে পড়াশোনা করতাম । ও আমাকে বায়োলজি বইএর ইংরেজি থেকে বাংলা করে দিত । যাতে আমার সুবিধা হয় । আমার এক সহপাঠিনী আমাকে একটি বাংলা বায়োলজি প্রশ্ন উত্তরের বই দিয়েছিল । সেটা পরীক্ষার পড়ার ক্ষেত্রে দারুন উপকার দিয়েছিল ।

          ' জরাজীর্ণ বাড়ির দলে ' কবিতার মিনি পুস্তিকার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ' ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ' কাব্যগ্রন্থ থেকে উৎসাহিত হয়ে লিখে ফেললাম ' নিউক্লিআস' নামে আরো একটি মিনি কাব্য পুস্তিকা । এই পুস্তিকাটির কয়েকটি কবিতা এখনো মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে । যেমন মাত্র দুটি লাইনের পুস্তিকার সব শেষের কবিতাটি

' জল ঝরিয়ে ফোটাস যুঁই/ কেন রে এমন বৃষ্টি তুই ।' এর মতো সে সময়ের লেখা যা আজও লোম খাড়া করে । পুস্তিকার দাম ছিল পঞ্চাশ পয়সা । কিছু বিক্রি হয়েছিল । এইভাবে চলতে চলতে কলেজের সেকেন্ড ইয়ারও উতরে গেলাম।

                                                 ( চলবে)

Show quoted text

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০২২

স্মৃতিকথা- ২৪ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা- ২৪



                        এই আমি চরিত্র

                            নীলাঞ্জন কুমার

                            (গত মাসের পর )



                                  ।। ২৪।।


' জরাজীর্ণ বাড়ির দলে ' পুস্তিকার ভেতর একটি কবিতা নিয়ে বেশ আলোড়ন হয়েছিল । কারণ তা আমি সুর করে গাইতাম । কবিতার নাম ' কংকাল কংকাল ' । তখন আমি সামান্য সময় নারী বিরোধী ছিলাম । নারী দেখলেই মুখ উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিতাম । যা হোক  মেদিনীপুর শহরে মেদিনীপুর কলেজের সামনে গোটা রাস্তায় তখন  ( এখনো হয়) প্রচুর প্রতিমার পুজো হত।প্রচুর ক্লাব ওখানে পুজো করতো , যাতে থাকতো সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কীর্তিকলাপ ; যা দেখার জন্য গোটা শহর মেদিনীপুর কলেজের  সামনে গোটা রাস্তায় তখন সরস্বতী পুজো দেখার জন্যে সন্ধ্যা থেকে হামলে পড়তো । এই চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে এক কিশোরী আমার বুকের মধ্যে এসে পড়লো । আর তখনই মনে হল এ মেয়ে নয়,  এ কংকাল ।সেখান থেকেই কবিতাটার লেখার আইডিয়া । কবিতার প্রথম
কয়েকটি লাইন:  ' কংকাল কংকাল/ সব কিছু কংকাল/  যেখানেই যাও সেখানেই দেখবে/  কংকাল কংকাল/  ওই দ্যাখো আধুনিকা নারীদের বুকে আঁটো ব্রা/ গায়ের কোথাও ঢিলেঢালা নেই/  বাইরে থেকে দেখতে পাবে সব/  কিন্তু ভেতরে দ্যাখ কংকাল কংকাল ।' ' জরাজীর্ণ ...' তে প্রকাশিত হওয়ার কারণে বেশ কিছু জায়গায় লেখাটি গিয়েছিল । জনৈকা নারী কবিতাটি পড়ে বিরক্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশে যাবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল । তবে শেষ অবধি যায়নি । কেউ কেউ আমার নাম দিয়ে ফেলল ' কংকাল কবি' । আমার তাতেই আনন্দ,  কংকাল বলুক কিংবা যা বলুক কবি তো বলছে । ওতেই হবে ।
                সে সময় কর্ণেলগোলায়  আঢ্যদের দুই ভাই এর সঙ্গে বেশ ভাব হল । ওদের নাম নূপুর আর বাঁশি । ওদের বাবা পুলক আঢ্য ছিলেন একজন কবি   ওদের ছিল চালের দোকান । তারপর আমার দেখাদেখি ওরা মাইকের দোকান দিল সঙ্গে ডেকোরেশনের ব্যাপার  ।  ওদের ওখানে প্রচারের জন্য প্রতিদিন ওই সময়ের বিভিন্ন গান বাজানো হত । মাঝে মধ্যে আমায় নিয়ে আসর বসতো । আমি মাইকে কংকাল গাইতাম । জানতাম না কিংবা বুঝতাম না ওরা হাসাহাসি করার জন্য এসব কান্ড করছে । একদিন দেখি এক মহিলা সেই গান গাইছে । আমায় দেখে সে থতমত!
            ' কংকাল ' হিট  ( ? ) করার পর আমি আর নূপুর মিলে ' অভিযাত্রী 'নামে  একটি পত্রিকা বার করলাম । তার সঙ্গে' উদয় ' নামে আর একটি পত্রিকা বার হল । পয়সা দিল নূপুর । মাত্র একটি করে সংখ্যা বের হয়েছিল । অভিযাত্রী তে  আমার আর নূপুরের কবিতা প্রকাশ হল , উদয়ে বিভিন্ন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ।সে যে কি কিম্ভুতকিমাকার জিনিস হল তা বোঝানো সম্ভব নয় । এদিকে মেদিনীপুর কলেজের লাইব্রেরি প্রায় দখল হতে চলেছে আমার । মোট ৭/৮টি দেওয়াল পত্রিকা এক সঙ্গে সম্পাদনা করছি । বিভিন্ন মনন সন্ঞ্জাত পত্রিকাগুলি বহু ছাত্র ছাত্রীরা পড়ছে ।
আমি মাঝেমধ্যে লাইব্রেরি গিয়ে দেখে এসেছি কেউ কেউ পত্রিকা পড়ছে কিনা । দেখি ভীড় করে সবাই পড়ছে । কিন্তু কোন মন্তব্য কারো মুখে নেই । তবে মুখ দেখে বুঝেছি তারা আশ্চর্য হচ্ছে এতগুলো পত্রিকা সম্পাদনা করছে ' নীলাঞ্জন কুমার ' নামে একজন ! পত্রিকাগুলির নাম ছিল 'অভিযাত্রী' ,  'অভিষেক' , 'আরো কিছু ' , ' টেলপিস ' ইত্যাদি । ফাস্ট ইয়ার বলে সব মুক্ত ভাবে করতে পেরেছিলাম ।বাড়িতে কিংবা বাইরে থাকতো আমার সঙ্গে নোটবই আর পেন । তাতে যা খুশি লিখতাম । সে সব এখনও আমার কাছে যত্নে আছে । যে সব মাঝেমধ্যে দেখে বুঝি এগুলো না করলে আমি যতটুকু এসেছি আসতে পারতাম না ।

মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০২২

স্মৃতিকথা -২৩ এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার ।। Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা -২৩


                          এই আমি চরিত্র

                            নীলাঞ্জন কুমার





                           ( গত মাসের পর)

                                 । । ২৩।।

বাবা মায়ের আশীর্বাদে  যেমন তেমন করে পাস করে গেলাম হায়ার সেকেন্ডারি । তখন যেমন তেমন করে পাস করাটাই ছিল বিরাট ব্যাপার ।১৯৭৫ সালে হায়ার সেকেন্ডারিতে পাস করেছিল সম্ভবত আট কি নয় শতাংশ ছাত্রছাত্রীরা ।আমি তাদের মধ্যে অবশ্যই অন্যতম । সুতরাং আমায় কে আর পায়! বাড়িতে বেশ আনন্দ,  মায়ের বেশি আনন্দ কারণ বাউন্ডুলেটা এ যাত্রা রক্ষা পেল । পরের যাত্রা কি হবে ভগবান জানেন । এবার ভরতি হওয়ার পালা কলেজে । বিনা ঝন্ঞ্ঝাটে মেদিনীপুর কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম । তখন এখনকারমতো লাইন দিতে হত না । মেদিনীপুর কলেজ মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুল থেকে এক পাঁচিলের দুরত্ব ।  স্কুলে শুধু ছেলেরা পড়তো । কলেজ এসে মহিলাদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়ার  স্বাদ পেলাম । প্রথম প্রথম আমাদের মধ্যে জড়ত্ব ছিল । মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতো না প্রথমের দিকে ।ওরা একজোট হয়ে থাকতো । তারপর দুপক্ষের মধ্যে জড়ত্ব কাটতে শুরু করলো ।  তখন সব মেয়েরা শাড়ি পরে আসতো কলেজে । কলেজে ক্লাসঘর ছাড়া আর একটি অত্যন্ত অন্তরঙ্গ জায়গা ছিল তা হল লাইব্রেরি হল। হাজার হাজার বই সেলফে । ছেলেমেয়েরা বই দিচ্ছে নিচ্ছে ।দেখতে ভালো লাগতো । লাইব্রেরি ঢুকতেই যে জিনিষটি  আমার ভীষণ ভালো লাগতো তা হল গেটের পাশেই বেন্ঞ্চের ওপর বোর্ড দিয়ে আটকানো দু-একটি কবিতার দেওয়াল পত্রিকা । আমার খুব ইচ্ছে হত পত্রিকাগুলোয় কবিতা শিখি । কিন্তু প্রথম প্রথম কলেজে এসেছি । বেশ নতুন পরিবেশ । চারদিকে ছেলেমেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে । সিনিয়র ছাত্রছাত্রীরা  অন্তরঙ্গভাবে  মেলামেশা করছে । আমার তরুণ মন সেসব মেয়ে দেখতো । মনে মনে  ইচ্ছে টিচ্ছে যে হত না তা বলবো না । কিন্তু ওই পর্যন্তই । তবে আমার বেশি ইচ্ছে ছিল সাহিত্য আর সাহিত্য । রাতের বেলা ঘুমোনোর আগে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে শুতে যেতাম যাতে ভালো কবিতা লিখে উঠতে পারি। তখন খ্যাতি বুঝতাম না । ভালো লেখার আকাঙ্ক্ষা চেপে বসেছিল । বেশ কিছু লেখা লিখে ফেলেছি কিন্তু তা মনঃপূত হচ্ছিল না বলে দু বছর কোথাও লেখা প্রকাশের উদ্যোগ নিইনি । সময়ের সঙ্গে কলেজে বন্ধু হতে শুরু করলো স্বাভাবিক নিয়মে । কলেজিয়েট স্কুলে কিছু ছেলে আমার সঙ্গে পাস করে কলেজে পড়া শুরু করলো । সে সময় পাসকোর্সে তিন বছর পড়তে হত কলেজে । ফাস্ট ইয়ার,  সেকেন্ড ইয়ার ও ফাইনাল ইয়ার । ফাস্ট ইয়ার মানে নিয়ম মেনে ক্লাস করো,  ঘুরে বেড়াও,  খেলে বেড়াও আর কলেজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নাও,  বাড়িতে পড়াশোনা ত্যাগ করো । সেকেন্ড ইয়ার থেকে কলেজ ছাত্র ছাত্রীরা সিরিয়াস হতো ও ফাইনাল পাস করে চাকরি করতো । এই ছিল সে সময় নিয়ম। তখন আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীভূত ছিলাম । মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি । মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়নি । মাত্র তিনটি কলেজ মেদিনীপুর কলেজ , কৈবল্যদায়িনী কলেজ অব কমার্স আর মহিলাদের জন্য গোপ কলেজ । গোপ কলেজ যাবার জন্য বাসের ব্যবস্থা ছিল । আমার ছোড়দি গোপ কলেজ থেকে পাস করেছিল । ওই কলেজের প্রকৃত নাম রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয় । বড়দি আমি আর দাদা মেদিনীপুর কলেজের থেকে পাস করা । তাছাড়া আর একটি কলেজ আছে  সেটি বি টি কলেজ ।  এছাড়া একটি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ মেদিনীপুর আছে ।
               কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ার সময় কবিতার জন্য ব্যাপক উন্মাদনা শুরু হয়ে গেল ।তখন কাগজে কাগজে চিঠিপত্র লেখা আর পোষাচ্ছে না  । নিজের কবিতা ছাপার জন্য ভীষণ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলাম ।
আমার এক বন্ধু তাপস দাস মেদিনীপুরের হাঁসপুকুর এলাকাতে থাকতো । আমি সেখানে নিয়মিত যেতাম । তার সঙ্গে পরিকল্পনা করলাম ছোট্ট বই ছাপতে হবে । তাতে থাকবে আমার কিছু কবিতা আর একটি গল্প । নাম দেওয়া হবে ' জরাজীর্ণ বাড়ির দলে '  । সেইমতো কর্ণেলগোলায় আমাদের বাসার কাছে রূপলেখা প্রেসে গিয়ে  দরদাম শুরু করি । দরদাম করে  ২০০ কপি অস্টোত্তর শতনাম মার্কা  বই এর কস্টিং হল ৯০ টাকা । তাপস আমাকে অনেক কষ্টে ৩০ টাকা দিয়েছিল বাড়িতে  লুকিয়ে । বাকি ৬০ টাকা কি করে জোগাড় হবে তা নিয়ে আমাদের কি দুশ্চিন্তা ! হঠাৎ মনে হল আমার কাছে সাঁই বাবার একটা লকেট আছে । যা দাদার ছিল । সেটি লুকিয়ে বিক্রি করলাম । পেলাম ১০টাকা । বাকি  ৫০ টাকা  বাড়ি থেকে টাকা সরিয়ে টরিয়ে টাকা আর লেখা জমা দিলাম প্রেসে । বই বেরলো । সে যে কি কুচ্ছিত বই হলো তা কহতব্য নয় । কিন্তু নিজের নাম আর কবিতা দেখে আমার সে কি আনন্দ!  কিছু বই বিক্রি হল বন্ধুদের কাছে । বইটির দাম ছিল ৩৫ পয়সা । বিক্রি হল ২৫ পয়সায় । অতি সামান্য বিক্রি হতেই আমার আনন্দ চতুর্গুণ । আমি তখন কলেজে কবি বলে  কিছু ছাত্রর কাছে পরিচিত হচ্ছি । মনে আছে 'জরাজীর্ণ বাড়ির দলে' -র মধ্যে কয়েকটি লেখা এই বয়সেও অবাক করে । একটি ছেলে যা মাত্র ষোল সতের বছরেকি করে লিখতে পারে ভেবে বিস্মৃত হই । কবিতার নাম ' 'আবরণ' যার প্রথম দুটি লাইন:  ' ওরা কেউদেখেনা আমাক/  ওরা দেখে আমার রঙিন সোয়েটার ।  ' যা তখন একজন গ্রামীণ  ছেলের কাছে পাওয়া দুষ্কর ছিল ।

                                                  ( চলবে)






বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

স্মৃতিকথা- ২২ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার Nilanjan Kumar ( গত মাসের পর)

 স্মৃতিকথা- ২২


                        এই আমি চরিত্র


                             নীলাঞ্জন কুমার

                             ( গত মাসের পর)

                                 ।।   ২২ ।।




   আসতে আসতে কিন্তু চলে আসতে শুরু করেছে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা । সত্তর দশকে ক্লাস ইলেভেনে দুটি পরীক্ষা হত , তাদের নাম ছিল প্রিটেস্ট আর টেস্ট । তারপর হতো হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল । ফাইনাল পরীক্ষা হত এপ্রিল মাসে । তার তিন মাস পর রেজাল্ট আউট । মা তখন আমার হায়ার সেকেন্ডারি নিয়ে বিশেষ চিন্তিত । কারণ হাফ বাউন্ডুলে চরিত্রটি আদপে পাস করতে পারবে কিনা তা নিয়ে মায়ের মাথাব্যথা  ।মা জানতো আমি লুকিয়ে লেখালিখি করি,  গুনগুন করে গান গাই আর কেমন উদাস হয়ে থাকি ।কি যেন ভেবে চলি । পড়াশোনা মানে স্কুলের ক্লাস,  অক্ষয় স্যারের কাছে সায়েন্স,  হেরম্ব স্যারের কাছে ইংরেজি আর বঙ্কিম স্যারের কাছে বিনে পয়সায় বায়োলজি পড়া। এছাড়া মাঝেমধ্যে অশোক স্যারের খড়গপুর ইন্দার বাড়িতে সায়কোলজি পড়তে যাওয়া ।অর্থাৎ চাপ আছে কিন্তু মনে ফুরফুরে ভাব অটুট । বর্তমানের ছেলেপুলেরা যেভাবে মাধ্যমিক ও হায়ার সেকেন্ডারি বিষয়ে সচেতন , আমি ছিলাম তার ঠিক উল্টো । বাবা এসব লক্ষ্য করত না , সব ছেড়ে দিয়েছিল মায়ের ওপর । ফলে আমার চাপ বিরাট ভাবে এসেছিল মায়ের ভেতর । এখন তা বুঝতে পারি । যতদিন আসছে ফাইনাল পরীক্ষার ততই মাস্টারমশাইরা চাপ বাড়াচ্ছেন । টেস্ট পেপার থেকে বেছে বেছে প্রশ্ন দেওয়া হচ্ছে । আসলে সে সময় এখনকার মতো নব্বই শতাংশ ছাত্রছাত্রীরা পাস করতো না । মাত্র সাত আট শতাংশ পাস করলেই বিরাট ব্যাপার । তখন ফাস্ট ডিভিশনে পাস করলে মানুষ তাকে দেখতে আসতো ।
                  কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে ছাপিয়ে চলছিল আমার সাহিত্য সঙ্গীত সাধনা । তখন বিভিন্ন কাগজে 
চিঠিপত্র বিভাগে চিঠি লিখছি আর তা ক্রমাগত প্রকাশিত হচ্ছে । আমি যেন আরো উল্লসিত হয়ে পড়ছি নিজের লেখার বিষয়ে । বাড়িতে যেহেতু নিয়মিত ' দেশ ' ' অমৃত ' পত্রিকা আসত তাই দেশ পত্রিকাতে আমার নিজের কলমের ওপর ' বিরাট ' ভরসা করে   তৎকালীন সময়ে 'শাঙ্গদেব'  ( রাজেশ্বর মিত্র) - এর গানের ওপর প্রতি সপ্তাহে যে নিবন্ধ লিখতেন তাঁর একটি রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যের ওপর আক্রমণ করে লিখে ফেললাম একটি বেশ বড় চিঠি । পাঠিয়ে দিলাম সাধারণ ডাকে । আশ্চর্য বেশ কিছু দিনের মধ্যেই চিঠিটি বেশ ভালো জায়গায় প্রকাশিত হল। 'অমৃত ' পত্রিকাতে লিখলাম সিনেমা নিয়ে । তাও প্রকাশিত হল । তাছাড়া সেসময় ' আনন্দলোক ' পত্রিকা সদ্য প্রকাশিত হচ্ছে । তাতে সেসময় সাধারণ পাঠকের মতামতের জন্য ' প্রিয় মহাশয় ' নামে একটি বিভাগ ছিল যাতে বিভিন্ন সিনেমা কিংবা সিনেমা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছাপা হত । আমি ছিলাম ওই বিভাগের নিত্যি লেখক । তখন আমার কি মজা! সদ্য গোঁফ গজানো এই আমি চরিত্রটি পত্র পত্রিকায় নিজের লেখা ও নাম ছাপা  ( অবশ্যই নীলাঞ্জন কুমার)  দেখার জন্য পাগল । তাছাড়া একজন মফস্বলের কিশোরের ওই সব কাগজে লেখা বেরনো মানে সে সময় স্বাভাবিকভাবেই বিরাট বিষয় । মেদিনীপুর শহরে তখন অনেকে জেনে গেছে নীলাঞ্জন কুমার-টি কে ? তখন অনেকে আমাকে বিস্ময়ের চোখে দেখে । সুতরাং হাওয়ায় ওড়া ব্যাপারটা সেই সময় বেশ অনুভব করছি । যা অবশ্যই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কেটে গেছে । পাশাপাশি বাবা মায়ের চোখের আড়ালে হায়ার সেকেন্ডারি পড়ার বাইরে ব্যাপক অন্য বই পড়ে যাচ্ছি । আসলে আমার স্থির বিশ্বাস ছিল যেমন তেমন করেই হোক না কেন,  আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাস করবোই ।

                                       ( আগামী মাসে চলবে)

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২

স্মৃতিকথা- ২১ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার ।। ( গত মাসের পর)

 স্মৃতিকথা- ২১

                              এই আমি চরিত্র


                              নীলাঞ্জন কুমার


                            ( গত মাসের পর)   



                                ।। ২১।।


সে সময় স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ চিন্তা করার মতো অবস্থান আমার ছিল না । নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারের মধ্যে জন্ম হওয়া এই আমি চরিত্রটি  তখন কল্পনার পাখা মেলে ভাসছে বলা যায় । মেদিনীপুর শহরে আবার আসার পর বলা যায় কিছু কিছু পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হয় । তাদের কেউ কেউ ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে অলিগন্ঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে ।যাহোক এবার শুরু হল পড়ার বাইরের বই পড়ার আনন্দ । বাড়িতে বাবা মা কখনো সখনো বাড়িতে শোভা বাড়ানোর জন্য কবিতার বই কিনে আনতো । নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ' উলঙ্গ রাজা' আমি বাবার কেনা বই থেকে পড়েছি । তাছাড়া আমার দাদার সে সময় সামান্য হলেও সাহিত্য স্পৃহা জন্মেছিল । দাদা বাড়িতে তার বন্ধুদের কাছ থেকে আনতো কৃত্তিবাস পত্রিকার তৎকালীন সংখ্যা ।দাদার সে সময়ের বিশেষ বন্ধু ছিল অচিন্ত্য নন্দী । যিনি এখন আমার বিশেষ কবি বন্ধু । দাদা তাঁর কাছ থেকেও আনতো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের,  অজিত বাইরী,  মতি মুখোপাধ্যায়,  বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের  কবিতার বই      ।আমি সেগুলো পড়তাম আর ভাবতাম কোনদিনও আমি এরকম লিখতে পারবো !
                 কর্ণেলগোলার ভাড়া বাড়িতে তখন আসতেন মায়ের ছোটমামা কেষ্ট চক্রবর্তী । তিনি থাকতেন শহরের বক্সি বাজারে । উনি ছিলেন মেদিনীপুরের তৎকালীন সময়ের নামকরা কবি ও  গীতিকার । রবীন্দ্রনাথের ধারায় তাঁর লেখা মেদিনীপুরে বেশ জনপ্রিয় ছিল । যদিও ওঁর কোন কাব্যগ্রন্থ কোনদিনও বেরোয়নি । তবু বহু পুরনো পত্রিকাতে  তাঁর অন্তমিলের কবিতা ছড়া ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেত মেদিনীপুর জেলায় ।সেই সময় মেদিনীপুরে একই স্তরের তিনজন কবিতা লেখক খ্যাতিলাভ করেন । তাঁরা হলেন কেষ্ট চক্রবর্তী,  বিভূতি বিদ্যাবিনোদ,  সু-মো-দে ( যাঁর পুরো নাম ছিল সুরেন্দ্র মোহন দে ) সকলেই এখন প্রয়াত । কিন্তু দুর্ভাগ্য এই,  তাঁরা মেদিনীপুর জেলার বাইরে নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন নি । কেষ্ট চক্রবর্তীকে আমি চশমা দাদুন বলে ডাকতাম । বড় বেলায় ছোট দাদু বলতাম । এছাড়া আমরা বিশেষ করে দিদিরা নাম দিয়েছিল 'এভারগ্রিন দাদু '। উনি রেডিওতে গান লিখতেন ।তাঁর বেশ কিছু গান রেডিওতে শুনেছি । দু-একটি ছায়াছবিতে  তাঁর লেখা গান রেকর্ড হয়েছিল ।
               ছোট দাদুন  মাঝে মধ্যে তাঁর কেনা সদ্য বেরোন টেপ রেকর্ডারটি আমাদের বাড়ি নিয়ে আসতেন । তখন আমাদের কি আনন্দ!  আমরা ওঁনার যন্ত্রটিতে আমাদের গান রেকর্ড  করতাম । আসলে তিনি ছিলেন আমাদের কাছে আনন্দের ঝলকানি । আমার ওঁর কাছে বায়না ছিল তাঁকে আমাদের বাসাতে এসে একটা করে ছড়া বা কবিতা লিখে যেতে হবে । তার জন্য আমি খাতাও কিনেছিলাম । উনি নিয়মিত সে দাবি মানতেন । তাছাড়া মাঝে মধ্যে আমাদের জন্য ছন্দের ছড়া বা কবিতা লিখে পোস্ট করতেন । বলতে হয় ছোট দাদুন আমার লেখার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রেরণা এনে দিয়েছিল । ওঁর দেখাদেখি আমি গান লিখতে শুরু করেছিলাম । তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি । প্রথম যে গান লিখেছিলাম সেটির প্রথম অংশ: ' মন আজ মেতেছে/ তবু যাই চলে/ কেন শুধু বাধা দাও/  দুয়ার দাও খুলে/  মন তবু মানে না/  তুমি ছাড়া জানে না ।' এই অযৌক্তিক গানটির সুরও দিয়েছিলাম । যা হয়েছিল  কিম্ভূতকিমাকার। এর পরের গান ছিল: 'দোল এসেছে দোল/ হৃদয় তুফান তোল/  প্রাণে আজ তুমুল লহর/  পর আজ খুশির ঝালর/  বাজাও মধুর বোল' ইত্যাদি ইত্যাদি । যার সুরও দিয়েছিলাম । যা মাঝে মধ্যে এখনও গুণ গুণ  করি । এর পরের গান সামান্য পরিণত হল । তার প্রথম অংশ  : ' এ হিয়ায় কাঁটার ব্যথা/  কত আর সইব বলো/  এ হিয়ার জ্বালা যত/  কত আর কইব বলো । ' এভাবে বেশ কিছু গান লেখা ও সুর দেওয়া শুরু হল । যেমন ময়মনসিংহের গীতিরূপ ' সোনাই মাধব ' -এর একটি গান অনুসারে লিখলাম ' বন্ধুরে হে, ঝএ বন্ধু কইবাম তোরে/ বউ আমার রাইগ্যা গিয়া বইস্যা আছে গোঁসাঘরে । ' অথবা শ্যামা সঙ্গীত ' তোকে যদি নাই পেলাম মা/  নামাবলী কি বা হবে/  অরূপ রতন যদি না পাই/  মানিক রতন কি বা হবে ।''ইত্যাদি ইত্যাদি।
                     তখন কার্যত গান আমায় পেয়ে বসেছে ।
গান গাইছি লিখছি সুর দিচ্ছি , ভাবছি আর মনে মনে কিশোর কুমার হওয়ার কথা চিন্তা করছি ।পাশাপাশি কবিতাও চলছে ঢিমেতালে । সে সময়ের কবিতাগুলো 
(অবশ্যই ছাপার অযোগ্য) তখন আমার কাছে যেন বুকের মধ্যে ধরে রাখার মতো ব্যাপার! তখন ভাবতেই
পারছি না কি করে আমি লিখে যাচ্ছি , গানে সুর দিচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি । সামনে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা  (তখন ক্লাস ইলেভেনের পর হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল হত) কিন্তু আমি মজে আছি গান কবিতাতে।বাড়িতে পড়াশোনা তথৈবচ । তবে নিয়মিত ক্লাস যত্ন করে করতাম । কেরিয়ার বিষয়ে ভাবনা ব্যাপারটা ছিল না। ।মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে কাটাচ্ছি সময় ।আমরা যা আনন্দ করেছি জীবনে তা এখনকার ছেলেপুলেরা কল্পনাতে আনতে পারবে না। সে কারণে আমাদের আর্থিক কেরিয়ার তেমন গড়ে ওঠেনি,  কিন্তু তাতে আমার কোনদুঃখ নেই । কারণ আমি যা হতে চেয়েছিলাম তা শত কেরিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখলে হয় না । অবশ্য কতখানি স্বপ্ন সফল করতে পারব তা জানি না । তবে হাজার বাঁক নিয়ে রসেবসে আছি ।
                                           ( চলবে)



মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২

স্মৃতিকথা- ২০ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার ।। ( গত মাসের পর),Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা- ২০


                    এই আমি চরিত্র

                     নীলাঞ্জন কুমার





                 ( গত মাসের পর)
                          ।। ২০।।


ক্লাস টেনে থেকে স্কুলে প্রচারিত হয়ে গেল আমি কবিতা লিখি,  গান লিখি সুর দিই আর গাই । ছেলেরা আমাকে বেশ অবাক চোখে দেখতো । প্রতিদিন টিফিনের সময় আমার গান আর রবিনের বেঞ্চ  বাজনা শুরু হয়ে যেত । মজা নিত সহপাঠীরা । এ যেন প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তাদের । ক্লাস টেনে স্কুলের সঙ্গীত প্রতিযোগিতায়  ক্লাসের উৎসাহে আমি গানে নাম দিলাম । গাইলাম আধুনিক গান,  সেই পুজোর বিখ্যাত গান ' এই যে নদী যায় সাগরে ' । পেয়েছিলাম দ্বিতীয় পুরস্কার । আমার তখন সে কি আনন্দ!  পুরস্কার পাওয়ার পর বাড়িতে দেখালাম । বাবা মা আনন্দ পেলেও সামনে তেমন প্রকাশ করেনি । কারণ সামনে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা । সত্যি সত্যি তখন আমাকে উচ্ছ্বাস দেখানো সাজে না ।
            তখন মেদিনীপুর শহরকে ভালো করে চেনার চেষ্টা করছি । ছোটবেলায় যখন এ শহরে থাকতাম  তখন যে যে জায়গায় ঘুরেছি সেগুলো দেখতে দেখতে খুব ছোটবেলার কথা মনে হত । দেখতাম হাতিশালার গলিতে সেই গনেশ দাদুনের বাড়ি । তার মুদি খানার দোকান । সেখানে  বাদল কাকু ঘোর ব্যবসায়ী হয়ে বসে আছে ।আমাকে সে চিনতে পারে না। আমিও পরিচয় দিতাম না। সেই অলিগন্ঞ্জ প্রাইমারি সামনে দিয়ে যেতে যেতে নস্টালজিয়া গ্রাস করতো ।
                 মনে পড়ে যেত ছোটবেলায় বাবার সাইকেলের হাতলে বসে প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া । রাজনারায়ণ লাইব্রেরির সামনে ছোট্ট পার্কেদিদিদের সঙ্গে স্লিপে চড়া । একবার স্লিপের এক জায়গায় ভাঙা ছিল । সেখানে কেটে গিয়ে কি রক্তারক্তি কান্ড । গনেশ দাদুনের বাড়িতে বোলতার কামড়ে হাত ফুলে ঢোল হয়ে গেল । মা স্রেফ চুন দিয়ে সারিয়ে দিল । মনে আছে তখন রাজনারায়ণ লাইব্রেরির একটু দূরে হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে । আমি পকেট ভর্তি করে নুড়ি পাথর তুলে আনতাম । বাড়িতে সেই পাথর নিয়ে এসে খেলতাম । আজ সে সব অতীত । মনে মনে হাসিও পায় । তখন আমার কাছে পৃথিবী কত ছোট ছিল!  আর সেই ক্লাস টেনের এই আমি চরিত্রটি বুঝতে পারছে শুধু খেলাধূলা মজা নয়,  বাস্তব বলেও  একটা জিনিস আছে । সে বড় কঠোর । রাস্তাঘাট মানুষজন সে বাস্তব আমায় শেখায়  । স্কুলের টিচারবর্গ আমাদের এই কঠোর বাস্তবের কথা শোনায় ।বলেন পড়াশোনা কর,  না হলে কোন উপায় নেই । বিভূতি মুখোপাধ্যায় নামে আমাদের ক্রেমিস্ট্রি টিচার বলতেন,  দেখবি তোরা  ক' দিন বাদে পাঁচ ছ টাকাতে চাল পাবি না ।কুড়ি টাকা দিয়ে কিনতে হবে । মন দে পড়াশোনাতে । কলেজে উঠে পাস করে চাকরির চেষ্টা কর। না হলে খেতে পাবি না । কথাটা যে কত বড় সত্য,  তা আজ বুঝিয়ে বলতে হবে না ।
            সে সময়  বাবা মা-র দুঃখ বোঝার মতো মন ছিল না।  তারা আমাকে কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড়াতে দিত না। আমি বুঝতাম না বাবা মাস মাইনে যা পেতো তাতে কিভাবে আমাদের চলতো । ফলে আমি স্বাধীনভাবে কল্পনা করতে পেরেছি । ছোটবেলা থেকে অন্নচিন্তা চমৎকারা ঘিরে ধরেনি । বাবা মা শুধু চাইতো আমি যেন পড়াশোনা করে পাসটা করে যাই , আর একটা চাকরি পাই । সেই সঙ্গে পরিপূর্ণ ভদ্রলোক হই । মা বাবার ভেতরে অনেক ঝগড়াঝাঁটি  হয়েছে , খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়েছে । কিন্তু কেউ কাউকে অশ্লীল কথা বলেনি । তাই বাজে কালচার আমার মধ্যে ঢুকতে পারেনি ।  না হলে ভবিষ্যৎ হয়তো অন্য ধারায় যেতে পারতো ।
                                        (  চলবে)






মঙ্গলবার, ৭ জুন, ২০২২

স্মৃতিকথা- ১৯ । এই আমি চরিত্র । Nilanjan Kumar ( গত মাসের পর)

 স্মৃতিকথা-  ১৯



                           এই আমি  চরিত্র


                           ( গত মাসের পর)




                                 ।। ১৯।।


মেদিনীপুর শহরের কর্ণেলগোলা তল্লাটটি বেশ বর্ধিষ্ণু জায়গা । আমাদের ভাড়া বাড়ি থেকে দেখা যায় আমার নতুন স্কুল মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল আর তার পাশে মেদিনীপুর কলেজ । আমাদের একটা ঘর ছিল হল ঘরের মতো । সেই ঘর দিয়ে দেখা যেত রাস্তাঘাট আর ছাদে উঠলেই পেয়ে যেতাম সারা কর্ণেলগোলার ভিউ । শীতকালে বিশাল ছাদটি ছিল আমার নিজস্ব জায়গা । কর্ণেলগোলায় আসার পড়ার চাপ কিছুটা বাড়লো । তখন ক্লাস নাইনে । সায়েন্স নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছি ।কিন্তু সত্যি বলতে পড়ায় তেমন মন নেই । রোজ স্কুল যাই ঠিকমতো ক্লাস করি এই পর্যন্ত । সারাদিন মনটা কেমন উড়ু উড়ু । কিছু কৌতুহলী দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি । তার ভেতর জানার চেষ্টা করি । অবিলম্বে সারা ক্লাস বুঝে গেছে আমি বেশ অন্যরকম ।পাড়ায় মেতে থাকতাম আমার সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে । বাবা মা আমার মনোভাব বুঝে আমার স্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই অক্ষয় রায়ের টিউশন ক্লাসে ভর্তি করে দিলো । অক্ষয় বাবু ছিলেন দাদারও মাস্টারমশাই । দাদার সঙ্গে কথা বলে উনি আমাকে ভর্তি নেন  ।অক্ষয় বাবু পড়াতেন সায়েন্স সাবজেক্ট আর ওই স্কুলেরই আরেক  মাস্টারমশাই পঙ্কজাক্ষ নন্দ পড়াতেন ইংরেজি আর বাংলা । আর একজন স্কুল মাস্টারমশাই মনোজ বাবু  যিনি নির্মল হৃদয় আশ্রমে ( চার্চ স্কুলে) পড়াতেন । তিনি বায়োলজি দেখাতেন ।
          স্বাভাবিকভাবেই ক্লাসের পড়া টিউশন খেলাধুলা নিয়ে জীবন কাটতে শুরু করলো । কর্ণেলগোলা থেকে অক্ষয় রায়ের টিউশন ক্লাস বেশ খানিকটা দূরে ছিল । যেতে হত রবীন্দ্র নগরে ।সপ্তাহে ছ'দিন পড়ানো হত তখনকার দিনে পঁচিশ টাকায়! কার্যত অনেকখানি সময় পড়াশোনার সঙ্গে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে পড়ার দিকে কিছুটা হলেও মনোনিবেশ ঘটলো। সব দিক থেকে মোটামুটি একটা জায়গাতে এলেও বাদ সাধলো অঙ্ক। অক্ষয় বাবু নাকাল হয়ে শেষ অবধি ক্লাস সিক্স থেকে অঙ্ক করানো শুরু করলেন । অঙ্ক তাতেও আশানুরূপ এগোল না ।
                       স্কুলে কিছু সহপাঠী হয়ে গেল । তার ভেতর থেকে এখনকার ভাষাতে বেস্টফ্রেন্ড হয়ে দাঁড়ালো রবীন্দ্রনাথ দে নামে এক সহপাঠী । রবিনের অশেষ গুণ । সে মেদিনীপুরের বিখ্যাত মিষ্টি দোকান ছোট বাজারের রাসু ময়রার নাতি । বাড়ির ছোট ছেলে, আমারই মত । তার হাতের আঁকা ছিল অসাধারণ । স্কুলে ক্লাসে বসে অবলীলায় মাস্টারমশাইদের ছবি আঁকতো সে খাতার নীচে কাগজ লুকিয়ে । তাছাড়া হাতের মুদ্রার মাধ্যমে সে অসাধারণ কোকিল ডাকতো । একবার তাকে নিয়ে মজার ঘটনা ঘটেছিল স্কুলে । কলেজিয়েট স্কুলে যেখানে প্রেয়ার হত সেখানে একটা বাঁধানো  বটগাছ ছিল । সে গাছে উঠে সে মাঝে মাঝে অসাধারণ  কোকিল ডাকতো । ক্লাস টেনে পড়ার সময় বর্ষাকালে টিফিনের সময় রবি গাছে উঠে কোকিলের ডাক ডাকতে শুরু করলো । পাশে অ্যাসিসটেন্ট হেড মাস্টারমশাই বিভূতি বসুর চেম্বার । তিনি বর্ষাকালে কোকিলের  ডাক শুনে হকচকিয়ে গেলেন । আওয়াজ অনুসরণ করে দেখেন একটা ছেলে আনমনে হাত দুটো মুঠো করে মুখে দিয়ে কোকিল ডেকে যাচ্ছে । সারা স্কুলের ছাত্র বিভূতি বাবুকে দারুন ভয় পেত । আড়ালে তাঁকে ' কাঠ বিভূতি ' বলতো ।  বিভূতি বাবু এসব দেখে স্বভাবসুলভ গলায় এক হুঙ্কার ছাড়লেন । রবি চমকে উঠে দেখে বিভূতি বাবু । ভয়ে সে উঁচু ডাল থেকে মারলো এক লাফ । বিভূতি বাবু ভয় পেয়ে গেলেন,  ছেলেটার কিছু হল না তো! কিন্তু আশ্চর্য পরক্ষণেই রবি চোখের নিমেষে উধাও হয়ে ক্লাসে এসে বসলো যেন কিছুই হয়নি।

                                                                    ( চলবে)

মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০২২

স্মৃতিকথা- ১৮ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

স্মৃতিকথা- ১৮ ।। এই আমি চরিত্র


নীলাঞ্জন কুমার






                             ( গত মাসের পর)


                                      ।। ১৮।।


একথা সত্যি গড়বেতার জীবন থেকে অনেক বেশি আমার রাধানগরের কথা আজও মনে পড়ে ।এখানে যে ক'জন  বন্ধু পেয়েছি তারা ছিল আমার সমমর্মী । গড়বেতার কুটিলতা থেকে এখানে বেশ মুক্ত ছিলাম ।সকাল হলে মাঝে মাঝে গড়বেতা স্টেশনের প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করতাম ।স্টেশনের সামনে অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ আমায় টানতো ।সেখানে থেকে স্টেশন পেরিয়ে অনেক সময় বেশ কিছু দূর যেতাম । সেখানে ছিল রাধানগরের মতো আর একটা গন্ঞ্জ। যদিও রাধানগরের মতো অত বেশি মানুষের বসবাস সেখানে ছিল না। আমরা রাধানগরে আসার কিছুদিন পরেই বেশ কিছু বাস চলাচল শুরু হয়েছিল গড়বেতা রাধানগরের মধ্যে ।   তাতে গড়বেতা স্কুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সুবিধেজনক হয়ে উঠলো । তখন বাবাকে সাইকেল চড়িয়ে আমায় নিয়ে যেতে হত না গড়বেতায় । বিজয়শ্রী বাসটি নিয়মিত সাড়ে ন'টা তে আসতো রাধানগরে , আমরা গড়বেতা স্কুলে পৌছাতাম সাড়ে দশটার আগে,  আসার ক্ষেত্রে বাসের সুবিধাও পেয়েছি ।
                   রাধানগরে চলে যাবার পর অনেকেই আমার পেছনে লাগা ছেড়ে দিয়েছিল । কারণ তাদের কাছে আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলাম । মাত্র দু-একজন আমায় টার্গেট করার সুবিধা ছাড়েনি । যেহেতু প্রথম থেকেই আমি কিছুটা ধৈর্যশীল তাই বিষয়টা তেমন জমে ওঠেনি কোনদিন । বুঝতে পারতাম তারা ঈর্ষা আর হিংসেতে পুড়তো , আমার বৈশিষ্ট্য,  বাবার পদমর্যাদা,  আমাদের জীবনধারণের কারণেই ।
                    তবে রাধানগরে বেশ ভালোভাবেই গড়ে উঠেছিল আমার স্কুলপাঠ্যের প্রতি অমনোযোগিতা।
সংসার চালানোয় তিতিবিরক্ত বাবা মা আমার পড়াশোনার ক্ষেত্রে তেমন ধ্যান দিতে পারেনি । যদিও আমার জন্য প্রাইভেট টিচারের ব্যবস্থা ছিল । সময়টা ছিল নকশাল আমলের প্রথম পর্বের  । একদিন ভরাভরতি স্কুল চলাকালীন স্কুলে কয়েকটি বোমা পড়লো । ছাত্র আর মাস্টারমশাইদের  নিরাপত্তার কথা ভেবে হেড মাস্টারমশাই স্কুল ছুটি দিয়ে দিলেন সেইদিন । ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি নকশালদের  বিশেষ অনিহার প্রভাব দারুন পড়েছিল গড়বেতা হাইস্কুলে । তখন আমি ক্লাস এইটে । সে বছর স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষায় সব টিচার গার্ড দিতে অস্বীকার করায় সারা স্কুল জুড়ে চললো ব্যাপক গণ টোকাটুকি  । প্রত্যেকের মনে কি মজা!  তখন সকলে বাচ্চা । এই মজা যে ভবিষ্যতে সাজা হবে তা কি মাথায় আছে!  ফলে যা হবার তাই হল । প্রতিটি ছাত্র পাস করে উঁচু ক্লাসে চলে গেল । অন্য বছরে বাৎসরিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন যে টেনসন হত, তা এবছর উধাও । মহানন্দে ক্লাস নাইনে গিয়ে নাচানাচি শুরু করে দিলাম ।
             নাইনে ওঠার পর নতুন স্কিম নেওয়ার অর্থাৎ সায়েন্সর জন্য স্কুলে একটা পরীক্ষা নেওয়া হয় ।আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম ও পাস করেছিলাম । শেষে সায়েন্স নিয়ে আমার নতুন স্ট্রিম শুরু হয় । যদিও আমার সায়েন্স পছন্দসই ছিল না , তবু মা বাবার ইচ্ছেতে আমায় তা নিতে হয়েছিল । কারণ বাড়ির আর কোন ছেলে মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়েনি বলে । যাতে পরবর্তীকালে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার প্রতি আমার বিশেষ অনীহা দেখা দিয়েছিল  । এর মাস দুয়েকের মধ্যে বাবা মেদিনীপুরের শহরের  কাছাকাছি শালবনিতে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিলো শালবনির পন্ঞ্চায়েত আফিসারের সঙ্গে । বাবা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছিল গড়বেতা থেকে বেরিয়ে যেতে । কিন্তু মনোমত জায়গায় পোস্টিং হচ্ছিল না। মা বাবার পরিকল্পনা ছিল আবার মেদিনীপুর শহরে গিয়ে বসতি স্থাপন । পরবর্তীতে মেদিনীপুরে নিজের বাড়ি করে স্থায়ী বসবাস । দাদা তখন শালবনির আগের স্টপেজ গোদাপিয়াশালে স্কুলের টিচার । বাবা শালবনিতে বদলি হলে এক ঘণ্টাতে বাসে করে মেদিনীপুরে ফিরতে পারবে । দাদাও তাই করবে । সুতরাং সকলে মিলে একসঙ্গে থাকা যাবে । বাবার ট্রান্সফার বিষয়টি পেকে উঠলে বাবা মেদিনীপুর শহরে বাড়ি খোঁজা শুরু করলো । বাবার বন্ধু নির্মল দাশগুপ্ত স্থানীয় নাটকের দল 'নাট্যরূপার' কর্ণধার, মেদিনীপুর
মিউনিসিপলিটির কমিশনার, কর্ণেলগোলা নামে একটি এলাকায় এক পুরোনো দোতলা বাড়িতে ভাড়ার ব্যবস্থা করলো । এরপর আমায় নিয়ে বাবা মেদিনীপুর শহরে এলো স্কুলে ভর্তির জন্য । মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে যাতে ভর্তি হতে পারি ক্লাস নাইনে সায়েন্স নিয়ে তার জন্য ব্যাপক চেষ্টা করলেন নির্মল কাকু আর বাবা। শেষমেশ আমি সায়েন্স নিয়ে ক্লাস নাইনে ভর্তি হলাম । গড়বেতা স্কুলের থেকে বেশ আলাদা ছিল এই স্কুল । ভালো লাগছিল যে স্কুলে একদিন দাদা পড়েছে সে স্কুলে আমিও পড়াশোনা করব । বাবা ট্রান্সফার লেটার পেলে আমরা কর্ণেলগোলাতে রাধানগর থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এলাম । তারপর বাবা ও আমি মেদিনীপুর থেকে ট্রাকে করে রাধানগরে গিয়ে সব জিনিস নিয়ে কর্ণেলগোলাতে পৌছোলাম ।শুরু হল মেদিনীপুরে আমাদের আবার নতুন জীবনযাত্রা ।
                                                       ( চলবে)


বুধবার, ৬ এপ্রিল, ২০২২

স্মৃতি কথা - ১৭ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার , Nilanjan Kumar ( গত সংখ্যার পর)

 স্মৃতি কথা  - ১৭                



                       এই আমি চরিত্র  

                       নীলাঞ্জন কুমার

                    ( গত সংখ্যার পর)




   রাধানগর নামের   গন্ঞ্জের মতো শহরটি গড়বেতার আমলাগোড়া অন্ঞ্চলে পড়ে । অজিত গনের  ( শুনেছি তিনি প্রয়াত হয়েছেন)  বাড়িটি ছিল রাধানগর হাটের এলাকার লাগোয়া । সম্ভবত শুক্রবার হাট বসতো । এছাড়া আর কোন নিয়মিত বাজার ছিল না। । ফলে এক সপ্তাহের সবজি মাছ আমাদের ওই দিন তুলে নিতেহত। ওই বাড়িতে বেশ কয়েকজন সহ ভাড়াটে ছিল। তারা মানুষ হিসেবে মন্দ ছিল না । বেশ মিলমিশ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ভাড়া নেবার দিকটিতে ছিল দুটি বড় বড় ঘর,  একটি ছোট ঘর যেটি আমার জন্য ধার্য করা হয়েছিল । বাবা অফিসার পর্যায়ের লোক বলে অজিত গন কোনদিনও ভাড়া চাইতে আসেননি । বাবা তার দুই ছেলেকে  ( যাদের নামেই বাড়িটি ছিল)  ২৫ টাকা করে ৫০ টাকা  জোর করে পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আসতো ।
            রাধানগরের বাড়ির পেছনে ছিল বিশাল মাঠ ।সেখানে বাচ্চা ও তরুণরা গরমকালে ফুটবল,  শীতে ক্রিকেট ও ভলিবল খেলতো । আমিও খেলতাম বাচ্চাদের সঙ্গে । ক্রিকেটে বাঁ হাতে বল করতাম । কিছুটা জোরেই করতাম । ব্যাটে ছিলাম একেবারেই গবেট । যা হোক প্রথমের দিকে স্কুলে যাবার ক্ষেত্রে বেশ কষ্ট হতো । বাবা আমাকে রডে বসিয়ে সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যেত । যখন স্কুলে  নামতাম তখন পা দুটো ঝিনঝিনেতে অবশ । প্রথমের দিকে একটি মাত্র বাস চলতো গড়বেতা থেকে রাধানগর পর্যন্ত । মাঝে মধ্যে স্কুল থেকে ফেরার সময় সেই বাস পেতাম  নাহলে হেঁটে যেতাম মাইল তিনেক রাস্তা । হাঁটতে লাগতো প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট । রাধানগরের গড়বেতা হাইস্কুলের কয়েকজন মাস্টারমশাই থাকতেন যেমন বন্দিরাম সরকার,  অমিতমাধব সেন । এঁরা আমাকে খুব ভালোবাসতেন । অমিত বাবু ভালো গান করতেন । আমি একবার ওঁর সঙ্গে স্কুলের বাৎসরিক ফাংসনে উদ্বোধনী সঙ্গীত গেয়েছিলাম রবীন্দ্র সংগীত ' সবারে করি আহ্বান ' । কিছু ছাত্র ও শিক্ষক বাহবা দিয়েছিল ।অমিত বাবু ও বন্দিরাম বাবু ছিলেন বাবার বন্ধু বিশেষ । রাধানগরে থাকাকালীন বন্দিরাম বাবু ও আরও কিছু মানুষ মিলে অভিনয়ের আয়োজন করতো ।হাটতলায় একটি মন্ঞ্চ ছিল  ( সেখানে দুর্গা পূজাও হতো ) সেখানে নাটক হতো । বাবার পরিচালনায় জোছন দস্তিদারের ' দুই মহল ' নাটকটি খুব নাম করেছিল । এছাড়া বাবার আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নবরন্ঞ্জন শাখা ' রাজা রামমোহন ' নাটক ওখানে আয়োজন করেছিল ।
           গড়বেতা স্কুলে রাধানগর থেকে আর একজন সহপাঠী যেত । তার ডাকনাম ছিল কাতু । আমি কাতু বলেই ডাকতাম । ওদের রাধানগরে বিরাট ওষুধের দোকান ছিল । আমরা বিকেলে খেলাধুলা করতাম । এসব নিয়ে রাধানগরে বেশ ছিলাম । আমাদের বাড়ির একটু দূরে' চন্ডিদাস চিত্র মন্দির ' নামে তাঁবুর সিনেমা ছিল । অস্থায়ী এই সিনেমা বর্ষাকালে বন্ধ থাকতো । প্রতিদিন ভালো ভালো গান বাজতো সিনেমা শুরুর আগে ।আমি আমার স্বভাবসুলভ দিক দিয়ে ওই সিনেমায় স্টিল ফটো দেখে আসতাম নতুন সিনেমা এলে । প্রায় দেড় বছর এই রাধানগরে থাকার সময় এক কলেজ পড়ুয়ার কাছে টিউশন পড়তে পড়তে যেতাম । তার বাড়ি আমার বাড়ির   পাশেই ছিল ।
               রাধানগরে দেখেছি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষি । সে সময় গরীব মানুষদের  মাইলো নামে এক ধরনের আমেরিকান শস্য রেশনে দেওয়া হতো ।সে নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা প্রত্যক্ষ করেছি । মাইলো নিয়ে হাজারো অভিযোগ করতো বিরোধীরা। অথচ এখন দেখি মাইলো হেল্থ ড্রিঙ্ক হিসেবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ।বোঝা যায় দিন কিভাবে বদলে যাচ্ছে ।
       
                                              ( আগামী সংখ্যায়)




মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

স্মৃতিকথা - ১৬ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জনকুমার ।। ১৬।। ( গত সংখ্যার পর)Nilanjan Kumar

স্মৃতিকথা - ১৬


                         এই আমি চরিত্র

                          নীলাঞ্জন কুমার


                            ।। ১৬।।

                  ( গত সংখ্যার পর) 




স্মৃতিকথা এমনই একটি বিষয় যার ভেতর থেকে নিজেকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করা যায় । মনে রাখতে হবে সবার স্মৃতিকথা সমান হয় না ।সবার সমস্যা,  সমাধান,  হতাশা,  আনন্দ এক নয় । ঈশ্বরের এই অনবদ্য উপহার আমাদের ভাবায় শেখায় আর পরিশিলিত করে । গড়বেতার স্মৃতিকথা একটু বেশি করে মনে আছে কারণ এখানে আনন্দের থেকে দুঃখের ঘটনার সংখ্যা বেশি । যে ছ বছর আমি ওখানে ছিলাম তা কোনদিনও দুঃখহীন ছিল না । আর তা সহপাঠীদের  কারণে । আমি যত তাদের জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করতাম তারা আমাকে বিচ্ছিন্ন করে চলে যেত । তারা আমার নানারকম  ব্যঙ্গাত্মক নামকরণ করেছিল । মাঝেমধ্যে মনে হত আমাকে কি তারা ক্লাউন ভাবতো ? অথবা মানসিকতার দিক দিয়ে একদম তাদের আলাদা চরিত্র হওয়ার কারণেই  কি ? আমাদের পরিবারটিকে এলাকার মানুষজন নানারকম সঙ্কটে ভোগানোর চেষ্টা করতো। এই পরিবারটি আলাদা রকমের ছিল বলে এক অদ্ভুত ঈর্ষা অনেকের চোখে মুখে দেখেছি । এর ফলশ্রুতি কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ।
            একথা সত্যি যে,  পন্ঞ্চুবাবুর বাড়িতে এসে কিছুটা আরামেই ছিলাম । যদিও আমাদের পাশের সহ ভাড়াটেদের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয়েছিল ।পরে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয় । বাড়িওয়ালার সঙ্গে বেশ মিলমিশ হয়েছিল । বাড়িওয়ালার মনি নামে এক বাচ্চা মেয়ে আমাদের ঘরে আসতো । আমরা তাকে বেশ ভালোবাসতাম। এই বাড়িতেই আস্তে আস্তে বুঝে উঠতে শুরু করি মানুষ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হতে পারে ।গড়বেতা শহর বড় বেশি বাস্তব চিনিয়েছে আমাকে  । এতে ভবিষ্যতে আমার কিছু লাভ হলেও আমার তৎকালীন মন মানতে চাইতো না । প্রতিবেশীদের ভেতর রেষারেষির জীবন আমায় হতাশ করতো । তখন আমায় আনন্দ দিতো পোষা পাখিটি । বুঝতে পারতাম সে আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো । কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে বেশিদিন বাঁচানো গেল না । পাশাপাশি সহপাঠীদের আমার ওপর বিদ্বেষ কমলো না । কোন একটা বাহানা বানিয়ে তারা আমায় নাস্তানাবুদ করে আনন্দ পেতো । আমি পারতপক্ষে তাদের এড়িয়ে চলতাম । আশ্চর্যের কথা এক কাল্পনিক মেয়েকে নিয়ে তারা আমার সঙ্গে জড়িয়ে রসালো  গল্প ফেঁদেছিল ও প্রচার শুরু করেছিল । তখন আমার নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কোন জ্ঞান ছিল না । সহপাঠীরা এই গল্প সত্যি ভেবে নিয়ে এক আদিম আনন্দের চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকতো । মুখে থাকতো ব্যঙ্গের হাসি । এর কারণ আমার এ নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা না করা । যা ওদের হিংসে আরো বাড়িয়ে দিতো ।
               আসলে ওদের কাছে এটা প্রধান ছিল আমি গড়বেতার ভূমিপুত্র নই । তাই মানসিক নির্যাতন করে আশ মেটানো তাদের কাছে খুব সহজ ব্যাপার ছিল । জীবনের ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া এই আমি দেখলাম বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা। এই ভয়াবহ রাত কোনদিনও ভুলতে পারবো না । বাবা মা যে ঘরে থাকতো সে ঘরে চড়াও হল কিছু ডাকাত । তারা শাবল দিয়ে দরজা ভাঙতে শুরু করলো । বাবা মা কোনক্রমেভেতরের দালানে এসে চিৎকার শুরু করলো । চিৎকারে কিছু লোক জড়ো হয়ে তারা হৈ হুল্লোড় শুরু করলে ডাকাত দল ভয় পেয়ে মায়ের কয়েকটি সোনার  বালা হাতিয়ে পাশের ফাঁকা মাঠ দিয়ে বেরিয়ে গেল । পরের দিন পুলিশ এলো । কেউ ধরা পড়লো না । আমাদের ট্রমা হয়ে গেল । শেষে বাবা মা স্থির করলো এ বাডিতে থাকা অসম্ভব । বাবা আবার বাড়ির খোঁজ করতে লাগলো । গড়বেতা থেকে মাইল তিনেক দূরে রাধানগরে ( যেখানে গড়বেতা স্টেশনটি আছে)  সেখানে অজিত গনের বাড়িতে চলে যাওয়া স্থির হল ।

                                                         ( চলবে)



আমার স্যামসাং গ্যালাক্সি স্মার্টফোন থেকে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

স্মৃতিকথা ১৫ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 

স্মৃতিকথা ১৫                  

                              এই আমি চরিত্র

                                নীলাঞ্জন কুমার


                          ( গত সংখ্যার পর)



                                 ।। ১৫।।

নিয়মমতো দিন যাচ্ছে,  আমি নিজেকে জানার চেষ্টা করছি । আমি কে? কোথা থেকে এলাম?  এই সব রহস্য নিয়ে চিন্তাভাবনা  আমাকে মাঝে মধ্যে পেয়ে বসতো । এই আমি চরিত্র যে কেবলমাত্র চরিত্রই,  অন্য কিছু নয় তা বোঝার মতো বয়স হয়নি বলে জিজ্ঞাসাগুলো জিজ্ঞাসাই রয়ে গেছে । কালো কালো অক্ষরের বই এর পাতাগুলো পড়তে পড়তে সেই পড়া কৌতুহল তৈরি করতে পারে জীবনের অন্তর্গত প্রশ্নগুলোর । মা বাবা তাদের মতো করে আমাদের প্রতিপালন করছে এও যে এক নিত্যনৈমিত্তিকতা । সব মিলিয়ে গতানুগতিক জীবন পদ্ধতি আমার কাছে পছন্দসই ছিল না।  আমি চাইছিলাম প্রাণবন্ত জীবন, যা আমাকে সবসময় এগিয়ে নিয়ে যাবে ।
                 একথা বলতে পারি,  আমি চাইছিলাম এক ছোট্ট মফস্বল শহরের সংকীর্ণ জীবন থেকে বেরিয়ে অনেক বেশি স্পেশ । সংকীর্ণ মানসিকতার সহপাঠী,  যাদের সঙ্গে একটু বেশি মেলামেশার চেষ্টা করতাম তাদের নিচু মানসিকতা আমাকে ব্যথিত করতো । আমি কিছু বলতে চাই নিজের মতো করে কারোর কারোর কাছে । বুঝতে পারতাম তারা তাতে আগ্রহী নয় । তারা চায় তাদের কথা সবাই শুনুক । আমি কারোর কথা শুনবো না । যদি তার মধ্যে কেউ একটু করে উজ্জ্বল মনে হত তাকে দমন করার জন্য তারা কতখানি নিচে নামতে পারতো তা কহতব্য নয় । সে কারনে প্রকৃত বন্ধু আমি পাইনি গড়বেতাতে। তখন আমার সঙ্গী ছিল আমার ছোড়দি । সে আমার কথা কতটা বুঝতো জানা নেই,  কিন্তু চুপ করে আমার কথা শুনতো । তাতেই আমার আনন্দ ছিল ।
            গড়বেতার সহপাঠীদের মানসিকতার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা হওয়ার কারনে আমার মানুষের থেকে নৈসর্গিক দিক বেশি করে টানতো । মনে আছে চুনারাম সাঁওতালের গরুর গাড়িতে করে আমাদের পরিবারের বগড়ির মেলা দেখতে যাওয়া । মাঝে মধ্যে সকলে মিলে বাড়ির সামনে অরুণোদয় সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া । যা আমার দিনযাপনের গ্লানিকে কিছুটা হালকা করে দিত ।
            বন্ধুহীন এই আমি মনে মনে যে ভাবনা ভাবতাম তার ভেতর থেকে উপলব্ধি গড়ে উঠতো তা হল আমার ভেতর এমন কিছু আছে যা নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারি । আমার চিন্তাভাবনার ভেতরে যে জিজ্ঞাসা গড়ে উঠতো তা যে সাধারণ মানুষের থেকে অন্যরকম তা ওই বয়সেই বুঝতে পারতাম । মা বাবার মোটা দাগের গল্প দিদিদের নিজেদের ভেতর পুরুষ নিয়ে আলোচনা বড় ক্লিশে মনে হত ।আমার ভাবুক অবস্থান যে বাস্তবের বাইরে তা বাবা মা বুঝতে পারতো । তারা আমায় বোঝাতো পড়াশোনা ভালো না করলে না খেয়ে মরতে হবে  কিন্তু আমি তা কানে তুলতাম না । প্রতি বছর যা হোক তা হোক করে পাস করা এই আমি নিজস্ব কেরিয়ার নিয়ে কোনদিনও ভাবতাম না । গানের ভেতর দিয়ে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করতাম । তাই নিয়ে হাজারো উল্লাস তখন আমায় ঘিরে । বাবা প্রতি পুজোর সময় কিনে আনতো এইচ এম ভি র শারদীয়ার গানের বই ' শারদঅর্ঘ ' ।আমি এই গানের কথাগুলোর সঙ্গে রেডিও র  অনুরোধের আসরের নতুন পুজোর গানগুলো  মেলাতাম । এও আমার আর এক আনন্দ । আর ছিল আমাদের এক টিয়া পাখি । তাকে কত নামে ডাকতাম । আমার আজব ভালোবাসা পাখিটির কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠতো । আমি তার ভালো নাম দিয়েছিলাম ' মন্ঞ্জুলিকা ' ডাক নাম ' মুনমুন ' । সে পাখির কথা আমার আজও অক্ষত আছে ।

                                                             ( চলবে)



আমার স্যামসাং গ্যালাক্সি স্মার্টফোন থেকে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২২

স্মৃতিকথা ১৪ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা ১৪

                               এই আমি চরিত্র

                              নীলাঞ্জন কুমার


                             ( গত সংখ্যার পর) 





গড়বেতার আর এক বিশেষত্ব ছিল রাজনীতি । পলিটিক্স এমন পর্যায়ে এখানে পৌচেছিল যে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেপুলেদের ভেতরও তা ছড়িয়ে পড়েছিল । লেগে থাকতো নিয়মিত মিছিল মিটিং । মাঝে মধ্যে বি ডি ও অফিস ঘেরাও করতো বিরোধী দল। বেশ মনে আছে এখানে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রাজনীতিতে । একজন সিপিআই এর সরোজ রায় । অন্যজন কংগ্রেসের  পন্ঞ্চানন সিংহ রায় । পন্ঞ্চানন বাবু আমাদের গড়বেতা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন । গড়বেতায়  দেখেছি ধর্মঘট নিয়ে মানুষের ব্যাপক মাতামাতি । দু পক্ষই  বেশ জোরালো ছিল । একে অপরের নেতৃত্ব নিয়ে ছড়া কাটা হত । তখন দু- তিনটে ছড়া বাচ্চা ছেলেপুলেদের মুখে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল । শ্রদ্ধেয়দ্বয় প্রয়াত  প্রফুল্ল চন্দ্র সেন ও অতুল্য  ঘোষকে কেন্দ্র করে মজাদার ছড়া সিপিআই বানিয়েছিল যা আমরা নিয়মিত বাচ্চাদের মুখে শুনতাম । যেমন: 
             ' বাজার থেকে কিনলাম বেগুন
                               দেখতে প্রফুল্ল
                 বাড়িতে এসে কুটে দেখি
                                কানা অতুল্য । '

কিংবা, 
              ' অতুল্য বেগুন কানা
                 ভোট পাবে এক আনা '

আবার কংগ্রেস থেকে ছড়া বানানো হত শ্রদ্ধেয় প্রয়াত  সরোজ রায় কে কেন্দ্র করে :

               ' হায় হায় হায় হায়
                  হারবে রে সরোজ রায় । '

কিংবা,

         ' ভোটে হেরে মুখ লুকিয়ে
                 বলতো কে যায় ?

        সরোজ রায় সরোজ রায় সরোজ রায় ।'

      আমি দেখেছি একবার পন্ঞ্চানন সিংহ রায় আর একবার সরোজ রায় কে জিততে । তবে গড়বেতা থেকে  ছ বছর  বাদে মেদিনীপুর শহরে স্হায়ীভাবে চলে আসার পর আর খোঁজ রাখা হয়নি জেতা হারার বিষয়ে । যা হোক এভাবে কাটছিল দিন কিন্তু করালী বাবুর বাড়িতে নিত্যি ঝামেলা শুরু হওয়ায় বাবা নতুন করে ঘর খুঁজতে লাগলো । পাওয়াও গেল একটা সুন্দর বাড়ি । যার ভেতর দুটি ঘর ও বাইরে প্রশস্ত দালান । যার ফলে খেলাধুলা করার ক্ষেত্রে  বেশ প্রশস্ত জায়গা পাওয়া গেল । তখন সিক্স থেকে সেভেন উঠেছি  ।
                   বাড়িওলার নাম পন্ঞ্চানন । গড়বেতা চটিতে  তাঁর ছিল মিষ্টি দোকান । তাই সকলে তাকে পন্ঞ্চু ময়রা বলতো । ভদ্রলোকের দোকানের পানতুয়া স্টাইলে অসাধারণ 'মাতৃভোগ ' এখনো মুখে লেগে আছে । বাবা যখন গড়বেতায়  এক বছর একলা থাকতো তখন বাবার রাতের খাবার ছিল ছ টা রুটি আর দুটি  মাতৃভোগ । সেই থেকে বাবার সঙ্গে পন্ঞ্চু বাবুর আলাপ  । যাই হোক ভালো ঘরদোর পেয়ে আমরা বেশ গুছিয়ে বসলাম । দাদা তখন কলকাতায় ভাগ্য অন্বেষনে বড়মামা র কাছে । পরবর্তীতে গোদাপিয়াশালে শিক্ষকতায় যোগ দেয় ।
                        আমার স্কুলের পড়ার দিকে যতটা মন তার থেকে অনেক বেশি মন প্রকৃতির প্রতি । সারাক্ষণ নানান ভাবনায় সময় কাটে । বাড়ির  সামনের ধূধূ মাঠ যেন আমায় টানে । বাড়ির ছাদের  থেকে শিলাবতী নদী রূপোলি রেখার মতো দেখা যায় ।  যা আমাকে বিশেষ ভাবে নাড়া দেয় । আমি যেন নিজেকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করি ।পড়ার বইএর বদলে দেশ,  অমৃত,  আনন্দবাজার পত্রিকা বেশি টানে । সেই সঙ্গে মুন্সেফ অফিসের সামনের পানের দোকানের থেকে দশ পয়সা ভাড়া দিয়ে স্বপন কুমারের লেখা গোয়েন্দা কাহিনির সিরিজ পড়ার বইএর মধ্যে লুকিয়ে রেখে পড়ে ফেলার অভ্যাস রপ্ত হয়ে গেছে । সেই সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে স্বপন কুমারের বই ও কিনেছিলাম । সেগুলো বাঁধাই করেছিলাম । কালের নিয়মে তা নিশ্চিহ্ন হয়েছে ।

                                                            ( চলবে) 
              


মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১

স্মৃতিকথা - ১৩ || এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

 স্মৃতিকথা - ১৩


                        এই আমি চরিত্র

                          নীলাঞ্জন কুমার



                                ।।  ১৩ ।।

                           (গত মাসের পর)

খুব ভালোভাবে মনে আছে গড়বেতা হায়ার সেকেন্ডারি
স্কুলে ঢুকতে গিয়ে একটি বাণীর মুখোমুখি আমাদের হতে হত । একটি তোরণের ওপর বাণীটি ছিল। বাণীটি:
                  " কী চাই ?
                     নহে মনীষীর মেধা
                      নহে মনীষীর মতো
                      নহে মৃত শাস্ত্র বাণী
                       চাহি নিত্য সত্য পথ "

তোরণ দিয়ে ঢুকলেই শুরু হল সারি সারি দোতলা ক্লাস ঘর । স্কুলের পেছনে বোর্ডিং । কিছু ছাত্র সেখান থেকে পড়াশোনা করতো। তার পরে ছিল খেলার মাঠ । পরিবেশ হিসেবে স্কুলটি ছিল আদর্শ ।

গনগনির ডাঙাকে স্থানীয় লোকজন ' খুলা' বলতো । গড়বেতাতে গিয়ে কিছু নতুন নতুন ভাষা শিখেছিলাম,
যেমন মহিষকে ' কাড়া' রামছাগলকে ' বদা ' ইত্যাদি ইত্যাদি । লাল মাটির এই এলাকায় গ্রীষ্ম কালে জল কেনা হত টিন প্রতি চার আনা করে । মিষ্টির দোকানে
মিষ্টি র সঙ্গে এক গ্লাস ফ্রি জল দেওয়া হতো । বাকি লাগলে বেশি পয়সা লাগতো । আমাদের বাড়ির পাশে
দু দুটি দোকান ছিল ।  এদের মধ্যে মানিক কাকুর সঙ্গে
আমার ভাব ছিল বেশি । তার ছিল স্টেশনারী দোকান । পরবর্তীতে মনোমালিন্য  হয়ে মুখ দেখাদেখি  বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।
          আমাদের খেলাধুলা বলতে প্রধান ছিল গুলি খেলা । গুলি আমাদের পকেটে পকেটে থাকত ।  আর
থাকতো সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে বানানো কার্ড । তখন সিগারেটের কত নাম চারমিনার,  সিজার্স, ক্যাপস্টান,  পাসিং শো , গোল্ড ফ্লেক,  উইলস ফ্লেক এই সব। চারমিনারের রেট ছিলো কম , আর পাসিং শো-রেট ছিল বেশি । নির্দিষ্ট গুলি টল দিয়ে মেরে আমরা জিততাম নয় হারতাম সিগারেটের কার্ড। এমন খেলা এখন দেখা যায় না ।
      আস্তে আস্তে মেদিনীপুর শহর থেকে আসা এই আমি চরিত্রটি ক্রমশ গড়বেতাতে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা
করলাম । কিন্তু আমার চিন্তা ও ধারনার মধ্যে কারোর তেমন মিলত না । ফলে মাঝে মধ্যে নিঃসঙ্গ হতে  লাগলাম । তখন চলে যেতাম গড়বেতা মুন্সেফ কোর্ট ও থানার পাশে যেখানে লন টেনিস খেলা হত তার একমাত্র দর্শক হতাম। কারোর সঙ্গে মিশতে মন চাইতো না। কারণ মিশতে গিয়ে দেখেছি সমবয়সীদের ভেতরে  স্বার্থপরতা । তাই তারা আমাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না । তাছাড়া একজন এইরকম ছেলের সাথে পেছনে লাগার আনন্দ কেই বা ছাড়তে পারে । সহপাঠীরা চুটিয়ে আমার পেছনে লাগতো । অনেক সময় তা হেনস্থার পর্যায়ে চলে যেত । অন্তর্মুখী এই চরিত্র তাই লন টেনিসের জায়গা বিকেলের জন্য বেছেছিল । লন টেনিস খেলতেন মুন্সেফ কোর্টের জাজ , স্কুল টিচার , সরকারি অফিসারদের মতো গণ্যমান্যরা ।
                  চটির ভাড়া বাড়িতে থাকার সময় প্রথম প্রথম আমার পরিবারের সঙ্গে দোতলার পরিবারের
মেলামেশা থাকলেও পরে তা ছিল না । পরে কুঁয়োর জলকে কেন্দ্র করে ঝগড়া ও শেষ আবধি থানা পুলিশ
অবধি পৌঁছোয় ।  গড়বেতা নিয়ে মা একটি কথা বলতো  , ' এখানে পরিবেশ ভালো হলেও মানুষ ভালো নয় । '  আমি ছোট ছিলাম তবু এর কিছু কিছু দেখেছি ।এখন মনে হয় এই এলাকার সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির পার্থক্য তার প্রধান কারণ। দু-চারজন ছাড়া তেমনভাবে কারোর সঙ্গে মিশতে পারতাম না। দিদিদের ক্ষেত্রে স্কুলের মেয়েরা ওদের পেছনে লাগতো । দিদিরা এসে সে সব গল্প মায়ের সঙ্গে করতো। মা দিদিদের উচিত জবাব দেবার শিক্ষা দিত ।    ( চলবে)

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...