একজন বুড়ো মানুষ-১৮,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৮,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৭,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৬,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৫,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৪,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১৩,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১২,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ-১১,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
(১১)
এখন তিনি ভাত খেয়ে উঠলেন। ভাবিত গিয়ে কিছুক্ষণ পরে ওদের দুজনকে ভাত খেতে ডেকে আনবে।বিজয় ভরালীর দেখতে ইচ্ছা করল কমলাও তার মতো থালায় ভাত ফেলে যায় কিনা। আজ তার জন্যই কমলাকে সঞ্জয়ের কথা শুনতে হয়েছে। মন খারাপ করে কমলা সম্পূর্ণ ভাত খেতে পারবে কিনা কে জানে? নাকি অভিমানে ভাতের কাছে আসবেনা। তার সঞ্জয়কে একবার দেখতে ইচ্ছে করল। ক্লান্তিতে তার মূর্তিটা কেমন রূপ ধারণ করেছে একবার দেখতে ইচ্ছে করল। বাড়িটা এত নির্জন বলে মনে হচ্ছে। সঞ্জয় সঞ্জয় বা কমলা কারও কোনো কথাই তার কানে আসছে না আর তিনি তো ভালো করেই জানেন এই স্তব্ধতার মূলে রয়েছেন তিনি। অর্থাৎ কমলা এবং সঞ্জয় দুজনের মধ্যে অশান্তির জন্য তিনি দায়ী। তিনি বিজয় ভরালী। একজোড়া দম্পতির সুখের ঘর তার জন্যই গড়ে উঠতে পারল না। পরদিন বিকেলে কিছু এরকম ঘটনা ঘটল যার জন্য বিজয় ভরালীকে আবার ভাবতে হল যে তিনি আগের দিন বোধহয় সমস্ত কথা তিলকে তাল করে ফেলেছেন না হলে আগের দিন এত অসুখী বলে ভাবা দম্পতিকে আজ আবার কীভাবে এত আনন্দ করে বাড়ি তৈরি করার কাজ দেখার জন্য বেরিয়ে পড়তে দেখা যেতে পারে।
সেদিন ছিল শনিবার।বিকেল চারটের পরে কমলা প্রায় হাসিমুখে শ্বশুরের কাছে এসে বলল-‘বাবা, বাড়ি তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। আপনি তো একবারও দেখতে যাননি। একবার দেখে আসি চলুন। এতটুকু কথা। কিন্তু তাতেই হঠাৎ অত্যন্ত বেশি খুশি হয়ে গেলেন বিজয় ভরালী। ‘আমি গিয়ে আর কী করব? তোমরাই গিয়ে দেখে আস।’ মুখে খুব মোলায়েম হাসি ছড়িয়ে বিজয় ভরালী বললেন-‘না,বাবা আপনিও নিজে একবার দেখে আসা ভালো। আপনার ছেলে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে আপনাকে যেন তেন ভাবে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য।’
ও, তাহলে বাড়ি তৈরি দেখতে নিয়ে যাবার আসল গরজটা পোনার, কমলার নয়। তবু সন্তুষ্টির ভাবটা অক্ষুন্ন থেকে গেল তার এবং তার পরে দ্বিতীয়বার আর কোনো আপত্তি না করে বৌমার কথা মতো বাড়ি তৈরীর কাজ দেখার জন্য বিজয় প্রস্তুত হল। গাড়িতে উঠে বসার পরে ছেলে গাড়ি চালাতে আরম্ভ করার পরে কিন্তু হঠাৎ এক গভীর বিষাদের অনুভূতি তার সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলল। পুরো রাস্তাটা বিজয় ভরালী অন্যমনস্ক হয়ে রইলেন। বাড়ি ? ইলার মাটিতে তৈরি হতে চলা বাড়ি দেখতে চলেছেন তিনি। আজ বহু বছর পরে বিজয় ভরালী নিজের জমিতে পা রাখলেন। প্রথমে তিনি জমিটা চিনতে পারেননি। আর চিনতে পারেননি তার জমির কাছাকাছি ঘরগুলি। প্রথম যখন তিনি এই জমিটা কিনেছিলেন তখন তার পশ্চিমদিকে মাত্র একজন মানুষের একটি বাড়ি ছিল। বাকিটা ছিল জার্মান বনের জঙ্গল। এখন বিজয় ভরালী দেখলেন তার চারপাশে বাড়ি আর বাড়ি। পশ্চিম দিকে আগে যে বাড়িটি ছিল, তার সামনে ছিল সবজি বাগান এবং গাছপালার বাগান। সুপুরি, নারকেল,আমলকি এবং কাঁঠাল এই কয়েকটি গাছ বিজয় ভরালী সেই বাগানে চিনতে পেরেছিল কিন্তু ইলা তার মধ্যে আরও কয়েকটি গাছ তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। ‘ওই যে গাছটা দেখছেন, আমলকি গাছের কাছে সেটি হল বক ফুলের গাছ। বকের মতো সাদা এবং বক পাখির মতো মিহি এবং চ্যাপ্টা ফুল গাছটিতে হয় বলে ওটা বক ফুলের গাছ। ফুলগুলি ভেজে খাওয়া যায় জানেন? এখন অবশ্য আমি গাছে একটাও ফুল দেখছি না। ওই যে কাঁঠাল গাছের ওপাশে, সেটা হল কাঁঠাল চাঁপা ফুলের গাছ। তবে ফুলগুলি পুষ্ট হয়ে ওঠার পরে আমি কাঁঠালের গন্ধের চেয়ে তাতে পাকা মালভোগ কলার গন্ধ বেশি করে পাই।… তবে জমির মালিক কেন যে ফুল-ফল সমস্ত গাছগুলি এভাবে মিশিয়ে রোপন করেছেন- আমি এখানে বাড়ি তৈরি করলে তাদের কাছ থেকে বকফুল এবং চাঁপা ফুলের ডাল এনে আমাদের জমিতে লাগাব-’ ইলা সেদিন বলেছিল। কমলা হয়তো ইলার মতো সেভাবে বকফুল,চাঁপা ফুলের গাছ রোপন করার কথা একবারও ভাবত না, আর যদি ভাবত কোথাও কোন কোণে একটু জমি বের করে রোপন করার কথা, তার জন্য কিন্তু তখন কমলার চোখের সামনে পশ্চিম দিকের বাড়িটিতে কোনো ফল বা ফুলের গাছের অস্তিত্বই ছিল না।বিজয় ভরালী যখন নিজের এই জমিতে এসেছিলেন তখন পশ্চিম দিকের বাড়িটিতে এই বাগানটা ছিল কিন্তু আজ তিনি দেখলেন যে সেই বাগানটা নেই। তারই জায়গায় একটি নতুন কংক্রিটের ঘর তৈরি হয়েছে। তাই বিজয় ভরালীর মনে হতে লাগল যে কোনো জাদুকরের জাদু দন্ডের স্পর্শে একটি বাগান এক রাতের মধ্যে দালানে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। নিজের জমিতে এতদিন না আসাটা সম্ভব হয়েছিল বিজয় ভরালীর, আর যখন সঞ্জয়দের জমি দেখানোর প্রয়োজন হয়েছিল সেই কাজটা করে দিয়েছিল সঞ্জয়ের মামা। দুকাঠা জমি কিনে দিয়েছিল সঞ্জয়ের দাদু বা তার ছেলেদের পরিচিতি বেশি ছিল। অবশ্য তিনি আর জীবিত নেই, সঞ্জয়ের দিদিমারও মৃত্যু হয়েছে। মামাদের সঙ্গে সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর একদিন একজন মামা তাকে নিয়ে গিয়ে জমিটা দেখিয়ে দিয়েছিল তার সঙ্গে এও বুঝিয়েছিল যে সঞ্জয়ের এখন আর জমিটা ফেলে রাখা উচিত হবে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি করা ঠিক হবে।
অনেক ক্ষণ অবাক হয়ে বিজয় ভরালী পশ্চিম দিকের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেবল তো সামনের দিকেই নয়,পেছনেও নতুন একটা ঘর উঠিয়েছেন বাড়ির লোকেরা। বাড়ি আর বাড়ি, যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই চোখজোড়া নতুন নতুন বাড়িতে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে বিজয় ভরালীর। অনেকদিন আগে যখন ইলা এবং সে এভাবে এই জমিতে দাঁড়িয়ে ছিল তখন জায়গাটা চারপাশের শ্যামলিমা তাদের দুচোখে শান্তির প্রলেপ মেখে দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে আজকের এই আশ্চর্য প্রস্তর নগরটি দেখার জন্য সে বেঁচে রইল না। ইলা বোধহয় আর্তনাদ করে উঠত। ইলার মত গাছপালাকে নিয়ে কোনো ভাব বিলাস না থাকলেও আজ চারপাশের এই অগনন বাড়িগুলির দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মানুষ সভ্য শিক্ষিত হয়েছে, মানুষ প্রগতির সিঁড়িতে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে আর সেই প্রগতির একটি প্রতীক যেন এই সুন্দর নতুন নতুন ডিজাইনের বাড়িগুলি। অরণ্য- যেখানে হয়তো এখনো মিশ্রিত হয়ে আছে আদিম বর্বরতার গন্ধ,তাকে মানুষের প্রগতি কামী মন বিনা দ্বিধায় নিষ্ঠুরভাবে একদিক থেকে ধ্বংস করে চলেছে।
‘বাবা, আপনি দেখছি কিছু দেখছেন না। এদিকে আসুন তো, আমি ভাবার তুলনায় কাজ কিন্তু বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।’ কমলার কথায় যেন বিজয় ভরালীর চেতনা ফিরে এল কিন্তু কমলার কথা তো সত্য নয়। তিনি তো দেখেননি এমন নয়। নিজের না হলেও এতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের বাড়িগুলি তিনি দেখছিলেন।
কমলার নির্দেশ অনুসারে কমলারা যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখানে এগিয়ে যেতে গিয়ে বিজয় ভরালীর চোখ কমলার দিকে গেল-এত সুন্দর লাগছে বৌমাকে! আজ যেন বৌমাকে প্রথমবারের জন্য তিনি দেখলেন। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মি-যার অপূর্ব সোনালী আভা অনেক অসুন্দরীকেও কয়েক মুহূর্তের জন্য সুন্দরী করে তুলে-সেই সময়ে এসে পূর্ণ ভাবে কমলার গালে মুখে সমস্ত শরীরে পরে ছিল। সেই মনোহর মূর্তির দিকে এক পলক অবাক হয়ে তাকিয়ে হঠাৎ বিজয় ভরালী অনুভব করলেন বৌমাকে এত সুন্দর লাগলেও যেন তার মনটা ঠিক তৃপ্ত হতে পারছেনা। কমলার সমস্ত দেহের কী এক অসৌন্দর্য্য যেন তার চোখ দুটিকে পীড়া দিচ্ছে, মনটা পবিত্র, আনন্দ এবং স্নেহে ভরে উঠার পরিবর্তে যেন এক ধরনের অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করছে-- আর সেভাবে আরেক মূহূর্ত তাকিয়ে থাকার পরে যেন বিজয় ভরালীর মনে বিদ্যুৎ চমকের মতো তার কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। এত রুচি বিহর্গিত পোশাক কমলা পরেছে, একটা পাতলা কাপড় এমন ভাবে টেনেটুনে শরীরে মুড়ে নিয়েছে যে তার ফলে কমলার সমস্ত দেহ প্রকট হয়ে উঠেছে- এমন একটি ব্লাউজ পরেছে যে কাঁধের অর্ধেক থেকে তার শুভ্র বাহু অনাবৃত হয়ে সূর্যের আলোতে ঝলসে উঠেছে। এতদিন পর্যন্ত শীতের দিন ছিল তাই বৌমার এই ধরনের পোশাক বিজয় ভরালী আগে কখনও দেখেননি। এখন হয়তো গরম পড়তে শুরু করায় স্কুলেও এই পোশাক পরে কমলা যেতে শুরু করেছে। কিন্তু স্কুলে যাবার সময় তো তিনি কমলাকে কখনও সেভাবে দেখেননি।
আজ বউমার মূর্তি দেখে ভাবলেন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘আমার এই দেহখানি তুলে ধর, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর’ কিন্তু আজকের মেয়েরা এসব কী করতে শুরু করেছে? নিজের দেহখনি দেবালয়ের প্রদীপ না করে তারা নিজেদের প্রদর্শনীর বস্তু করে চলেছে। ওরা ভুলে গেছে যে অতি বেশি প্রকট করা দেহ পুরুষের মনে কামনা জায়গাতে পারে মাত্র কিন্তু সেই দেহকে নিয়ে কোনোদিন কোনো রোমাঞ্চ জাগাতে পারে না। কোনো অজানা রহস্যের আকর্ষনে পুরুষকে আকর্ষিত করা যায়না। আর সেই অস্ত্র নিয়ে কোনো কবি কখনও সৌন্দর্যের মধুর বন্দনা গান রচনা করার কোনো প্রেরণাই খুঁজে পেতে পারে না।
আরও কিছু ভাবতেই হঠাৎ বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল যে তিনি বৌমার শরীর নিয়ে এসব কী রুচি বিহর্গিত কথা ভাবছেন- তিনি বিপত্নীক, বৃদ্ধ, কমলার শ্বশুর। ছিঃ ছিঃছিঃ- মুহূর্তের মধ্যে আত্মধিক্কারে বিজয় ভরালীর মনটা ভরে গেল-ছিঃ ছিঃছিঃ-বুড়ো বয়সে সত্যিই তার প্রকৃতির ভালোভাবেই অধঃপতন ঘটেছে।ছিঃ ছিঃছিঃ-
একজন বুড়ো মানুষ-১০,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
একজন বুড়ো মানুষ
নিরুপমা বরগোহাঞি
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস,
(৮)
পোনাকে নিয়ে ইলা যে সমস্ত কাণ্ড করে, দেখে দেখে বিজয়ের হাসি উঠলেও মনটা সঙ্গে সঙ্গে বেদনায় ভারী হয়ে যায়। পোনার জন্মের সময় ইলাকে কোনো মতে বাঁচানো গেল যদিও তাঁর পুনরায় মাতৃ হতে পারার ক্ষমতা ডাক্তার চিরদিনের জন্য ধ্বংস করে দিতে বাধ্য হয়েছিল-ইলাকে বাঁচাতে গিয়ে। প্রথমে ইলা না জানলেও বিজয়ের সে কথা ইলার কাছ থেকে বেশিদিন গোপন করে রাখতে ইচ্ছা হল না। কথাটা শুনে ইলা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু জীবনের সমস্ত কথা হাসি মুখে নিতে চেষ্টা করার একটা আশ্চর্য গুন ছিল ইলার। অতি সামান্য কথায় কাঁদলেও জীবনের গভীর দুঃখ গুলি হাসিমুখে সহজভাবে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সব সময়। সেদিনও কথাটা শুনে সে মুখে হাসি টেনে বলেছিল –‘ঈশ্বর আমাদের যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত- নয় কি? একেবারে তো বঞ্চিত করে রাখে নি, সেটাও কি কম অনুগ্রহ?’
পরে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিল কিনা বিজয় জানেনা। কিন্তু একটা কথা লক্ষ্য করেছে যে পোনার প্রতি ইলার আদর অত্যাচার যেন দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। পোনা একটু কাঁদলেই ইলা অস্থির হয়ে পড়ে। নানা ধরনে ফুসলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে, আদর করে সহস্র নামে ডাকে, সেই নামগুলির অর্থ খুঁজতে গেলে একটা দুটোর বাইরে বাকিগুলি অর্থ খুঁজে বের করা কষ্টকর হবে। সারাদিনে সময় নেই, অসময় নেই, এটা ওটা খাওয়ানোর জন্য জোর করে থাকে। ক্ষুধা না থাকা অবস্থায় না খাবার জন্য পোনা কান্নাকাটি করলে ইলা গভীর আক্ষেপের সঙ্গে জানায় যে কোনো কোনো ছেলে মেয়েকে সে পোনার মতো না খেয়ে থাকতে দেখেনি। কিন্তু এই না খাওয়া ছেলেটিও খুব সুন্দর স্বাস্থ্যবান,গোলগাল হওয়ার পরেও ইলার চোখে সে না খেয়ে ক্ষীণ হয়েই রইল। ইলা নিজে যথেষ্ট রোগা ছিল, তাই পোনার মতো একটা শক্ত সমর্থ শিশুকে যখন অনবরত কোলে নিয়ে থাকত, বিজয়ের সেই দৃশ্য দেখে ইলার জন্য খুব মায়া হত। কিন্তু ইলা কখনও বেশিক্ষণের জন্য বিশ্বাস করে চাকরের হাতে পোনাকে ছেড়ে দিত না। আর এভাবে অতি আদর এবং প্রশ্রয়ের মধ্য দিয়ে চার বছর পর্যন্ত পোনা ইলার কোল জুড়ে রইল। তাঁর পাঁচ বছরের সময়ও মাঝে মধ্যেই তাকে কোলে নিয়ে আদর করার চেষ্টা করেনি তা নয়, কিন্তু তখন পোনা নিজেকে বড় বলে ভাবতে শিখেছে, সে ইলা চুমু খাওয়া গাল দুটি সজোরে মুছে ফেলে ‘ছি’বলে জোর করে কোল থেকে নেমে দৌড়ে চলে যায়।
শাসন কাকে বলে পোনা প্রায় কোনোদিনই জানতে পারল না। বিজয় মাঝেমধ্যে বলে-‘এত আদর করে করে, এত প্রশ্রয় দিয়ে তুমি ছেলেটিকে নষ্ট করবে ইলা। মাঝেমধ্যে ওকে শাসন করার দরকার।‘ তখন ইলা প্রত্যুত্তরে বিজয়কে উল্টোভাবে বুঝিয়েছিল-‘ আদর পেয়ে ছেলে মেয়ে খারাপ হয় বলে আমি কখনও মনে করি না,মা-বাবা ভালো হলে, ঘরের পরিবেশ ভালো হলে, সেই মা-বাবার বাড়ির ছেলে মেয়ে ভালো হবেই। আমাকে বাবা সেদিনও বুঝিয়েছে-পোনাকে যেন আমরা বেশি শাসন না করি, আমরা কেবল আমাদের ঘরটিকে আদর্শ ঘর করে গড়ে তুললেই পোনার জীবন ও আপনা থেকেই সৎপথে পরিচালিত হবে। বাবা আরও কী বলেছে জান-গর্বে ফুলে উঠনা যেন- বাবা বলেছে- আপনার মতো মানুষের ছেলে নাকি কখনও খারাপ হতে পারে না।’
কিন্তু তবুও একদিন দুদিন যে ইলা পোনাকে শাসন করেনি এমন নয়, দু'একদিন মেরেছিল- কিন্তু পোনাকে মেরে উঠে ইলা নিজেই কেঁদে ফেলেছিল।
একটিমাত্র ছেলে হওয়ার জন্যই নাকি পোনা ছোট থেকেই খুব ভাবুক এবং তার সঙ্গে ধর্মভীরু ছিল। পাঁচ ছয় বছরে সে বই পড়তে শুরু করে, তার মধ্যেই বেশি করে আকৃষ্ট হয় রামায়ণ এবং মহাভারতের প্রতি। তারপর একদিন সে মাকে হেসে হেসে বলল যে মৃত্যুর পরে সে যখন স্বর্গে যাবে তখন মহাভারত-রামায়ণের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে তার দেখা হবে। তখন তার খুব মজা লাগবে। আর তার সবচেয়ে মজা লাগবে ধুর্ত নারদের সঙ্গে দেখা হলে। পোনার বয়স তখন ছয় বছর। তার কিছুদিন পরে তার মা রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকার’ ‘প্রশ্ন’ পড়লে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এবং বালিশে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল।পোনা মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল তাঁর কী হয়েছে- কোথায় দুঃখ পেয়েছে। বাবা তো অফিস গিয়েছে, তাহলে মায়ের সঙ্গে কে রাগ করল? সে তো কখনও মায়ের সঙ্গে রাগ করে না। এই সমস্ত কিছুর উত্তরে মা তাকে কিছু বলল না। কেবল তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে আরও বেশি করে কাঁদতে লাগল। বিজয় এসে কথাগুলি শুনে গম্ভীর হয়ে গেল, আর ইলাকে বলল-‘তুমি ছেলেটিকে আরও বেশি সেন্টিমেন্টাল করে তুলবে ইলা। এটা ভালো কথা নয়। ভাবপ্রবণতা মানুষকে অনর্থক কিছু দুঃখ এনে দেয়। পোনার এভাবে আরও বেশি ভাবুক হয়ে উঠাটা আমার ভালো লাগেনা। তুমি যে তাকে বাড়িতে পড়িয়ে উঁচু ক্লাসে নাম ভর্তি করার কথা ভাবছ,সেটাতে আমার আপত্তি রয়েছে। কালকেই ওকে আমি স্কুলে ভর্তি করে দেব। সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করে স্বভাবের কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে।
পরেরদিন বিজয় পোনাকে স্কুলে ভর্তি করে দিল। পোনার সঞ্জয় নামটা ইলা বিজয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ততদিনে সেই নামটা অব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখন স্কুলের ছেলেদের মুখে সঞ্জয় নামটা প্রচলিত হতে লাগল। তারপর একদিন পোনা হাসতে হাসতে মাকে বলল- ‘মা,মা তোমরা আমাকে সঞ্জয় নামটা দেওয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছি। মহাভারতের সঞ্জয় খুব জ্ঞানী এবং ধার্মিক ছিল তাই না মা? একটা কথা জান মা, আমাদের স্কুলের ছেলেগুলি বড় গাধা, ওরা মহাভারতের সঞ্জয়কে জানে না।’
প্রায় সাত বছর বয়সে পোনা স্কুলে গিয়েছিল- এক বছর পরে, তার প্রায় আট বছর বয়সের সময় তার মায়ের মৃত্যু হল। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘বাবা,বুড়ো হলে মানুষ মরে স্বর্গে যেতে পারে কি? আমার মতো শৈশবে মরে স্বর্গে যাওয়া যায় না?’ ইলার মতো যখন তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে বিজয় পোনাকে জড়িয়ে ধরে নি, সেদিন কিন্তু এই কথাগুলি শুনে সে পোনাকে সজোরে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল।
পোনার তিন বছর বয়সে দু কাঠা জমি কিনতে পারার মতো টাকা ইলা জমাতে পেরেছিল। কিন্তু টাকা জমানোর সঙ্গে সঙ্গেই তো আর জমি কেনা যায়না। ভালো মাটি খুঁজে দেখতে হয়। আর তারপরেই কেনা যায়। ওরা গুয়াহাটিতে জমি কিনবে বলে ঠিক করেছিল। ইলার পিতা অবশেষে একদিন দুকাঠা ভালো জমি দেখে দিয়েছিল। আর বিজয় একদিন তার কর্মস্থল থেকে গিয়ে সেই মাটি কিনে এসেছিল। জমি কেনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির জল্পনা-কল্পনা বেড়ে গিয়েছিল। ওদের ভবিষ্যতের ঘরের বর্ণনা শুনে শুনে বিজয়ের যেন মনের মধ্যেই সেই বাড়ির একটি ছবি আঁকা হয়ে গেছিল। একটি সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছবির মত বাড়ি। তার জানালা-দরজাগুলি কাঠ গুলিতে পাতলা সবুজ রং। পাঁচটা ঘর। তার মধ্যে একটি ওদের শোবার ঘর,একটি পোনার,একটি অতিথিদের জন্য,একটি খাবার ঘর,আর পঞ্চমটিতে ইলার জন্য সাজানো একটা সুন্দর লাইব্রেরী। রান্নাঘরের সংলগ্ন আরও একটি ছোট ঘর অবশ্য থাকবে। সেটা হবে ইলার ঠাকুরঘর।এই বাড়ির জন্য দুকাঠা জমির এক কাঠাও লাগবেনা। কিন্তু সামনের দিকে ফুলের বাগান এবং পেছনে সবজির বাগান মিলিয়ে দুকাঠা পূর্ণ হবে।
বাড়ি তৈরি করার জন্য আরও টাকার প্রয়োজন। তাই ইলা স্বপ্ন সিদ্ধির দ্বিতীয় এবং শেষ ধাপে উঠার জন্য পুনরায় টাকা জমাতে শুরু করল। তারপর যখন সেই টাকা প্রায় সম্পূর্ণ জমা হয়ে গেল তখনই হঠাৎ মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে ইলা বিজয় আর পোনাকে ছেড়ে স্বর্গে চলে গেল। স্বর্গে চলে গেল, কারণ বিজয়ের ধারণা স্বর্গ ছাড়া ইলা আর কোথাও যেতে পারে না। ইলার ক্ষেত্রে তার পোনার মতোই একই ভাবে ভাবতে ইচ্ছা করে যে মানুষ মৃত্যুর পরে স্বর্গে যায়।
বিজয় নিজেই বড় করে ইলার কপালে সিঁদুরের ফোটা দিয়ে দিয়েছিল। উজ্জ্বল মুখটা যেন মৃত্যুর পরেও হাসির স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিল। এই মুখে হাসি কখনও কোনো অসন্তুষ্টিতে বা কাউকে খারাপ পেয়ে মলিন হয়নি। এখন মৃত্যুর পরেও একই থেকে গেল l ইলার এই মুখটা স্মরণ করে তারপরে অনেকদিন বিজয় মনে মনে গুনগুন করে উঠেছে-‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা,তোমার হাসিটি ছিল বড় সুখে ভরা-‘
ইলার সেই মাটিতে আজ কমলা বাড়ি তৈরি করতে চলেছে।
রোদটা ধীরে ধীরে বড় প্রখর হতে চলেছে। বিজয় ভরালী তাঁর টাক মাথায় হাত বুলালেন।
ভেতরে কমলা হাসতে হাসতে সঞ্জয় কে বলল-‘আজ বাবার কাণ্ড দেখেছ? আমি বাড়ির নক্সা দেখিয়ে আসার পর থেকে সামনে বই নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। অন্যান্য দিন যিনি সব সময় দশটায় নিয়মিতভাবে স্নান করেন,সে কথা আজ ভুলেই গেছেন। কমলা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, তারপর আবার হাসতে হাসতে বলল-‘আজ আমাদের বাড়ির নক্সা দেখে জীবনের প্রায় শেষ অবস্থায় বোধহয় এখন প্রথম বাড়ি তৈরি করার জল্পনা-কল্পনা করছেন।
‘বুড়ো বয়সে তো অনিয়ম শরীর সহ্য করে না। তুমি সময় মত কেন বাবাকে ডেকে দিলে না? কমলা কিছুটা উদ্বিগ্নতার সুরেই সঞ্জয় বলল।
‘ বাবার স্বাস্থ্যের জন্য যদি এতই চিন্তা তুমি নিজেই কেন ডাকলে না? আমি কীভাবে সব দিকে লক্ষ্য রাখব। সকাল থেকে যে মেয়েদের হোমটাস্কের এই খাতাগুলি নিয়ে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আমার প্রতি যদি তুমি কখনও বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে। আমাদের সঙ্গে কত বিবাহিতা শিক্ষার্থীকে যে তাদের স্বামীরা কতভাবে সাহায্য করে- এমনকি রবিবার হোমটাস্কের খাতাগুলি দেখে দেয়। আমি তো আর সেরকম ভাগ্য করে আসিনি।
(৭)
সেই প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর না দিয়ে ইলা কেবল জিজ্ঞেস করেছিল-‘মৃত্যুর কথা ভাবতে দিনের বেলা তো এত ভয় লাগে না, রাতের বেলা কেন এত ভয় হয়?’ বিজয়ের হাত দুটি সজোরে চেপে ধরেছিল ইলা।
বিজয়ের শরীরটা হঠাৎ করে শিউরে উঠেছিল,কিন্তু মুখে সে শান্ত,ম্লান হাসি ফুটিয়ে ধীরভাবে বলেছিল-‘এই প্রশ্নটি অনন্তকালের সমগ্র মানুষের প্রশ্ন ইলা। কিন্তু তুমি এই সমস্ত কথা কেন মিছে মিছি ভাবছ ইলা? আমি তোমাকে কতবার বলেছি তুমি মিথ্যে আজেবাজে চিন্তা করে শরীরটাকে শেষ করতে শুরু করেছ। তোমার কিছুই হবে না- আমি আছি না, আমাকে ছেড়ে তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। ডাক্তার তো রয়েছেই, সমস্ত ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে। আমরা দুজনে রাতের পর রাত এভাবে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরবে প্রার্থনা করে থাকি। সেই আকাশ থেকে একটি দেবশিশু এসে তোমার কোল আলোকিত করে তুলবে। তোমার ভালোবাসার ঘর ভরিয়ে ফেলবে। আমাদের দুজনের জীবন পূর্ণ করে তুলবে ইলা,তুমি মিছে ভয় করছয়ে।।
রাত। অদ্ভুত শক্তি এই রাতের। দিনের আলোতে যে আবেগ মাখানো কথাগুলি বিজয় সেদিন উচ্চারণ করতে পারত না রাতের মায়াময় স্পর্শে সেই কথাগুলি সে অনর্গল ইলাকে বলে গিয়েছিল। কিন্তু তবু এই আবেগকে ভেদ করেও এক ভয়াবহ অপার্থিব চেতনা রাতে ওদের মাঝখানে বারবার যেন বয়ে নিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রতিটি রাত এই ধরনের বিভীষিকাময় ছিল না। অন্ধকার রাত ক্রমশ পার হয়ে যায়,জ্যোৎস্নার মায়াময় রাতগুলি এগিয়ে আসে। গভীর রাতের সেই জ্যোৎস্না অপার্থিব, রহস্যময়। কিন্তু জ্যোৎস্না রাত ওদের কাছে বিভীষিকা বয়ে আনে না, আনে এক অতি করুণ মাধুর্য।মনগুলি আবেগের কান্নায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এই অপরূপ মোহনীয় জ্যোৎস্নার রাতগুলি মৃত্যুচেতনা জাগিয়ে তোলে, সুদূর অজানা দেশ থেকে কে যেন ডাকে,কিন্তু সেই আহ্বান ভয়ের পরিবর্তে মনগুলিকে করে তোলে অতি করুণ, বিষন্ন, কিন্তু সেই বিষণ্ণতাও যে এত মধুর।
ইলা লাগানো রজনীগন্ধা এবং জুঁই ফুলগুলি সাদা হয়ে সামনে ফোটে থাকে। শুভ্র জ্যোৎস্না ওদের সেই শুভ্রতাকে আরও অপরূপ করে তোলে। শরীরকে স্নিগ্ধ করে তোলা এক ঝাঁক মলয় বাতাস এসে সেই ফুলগুলির মৃদু সুবাসে জায়গাটা ভরিয়ে ফেলে। আর সেই সুগন্ধের পরিপূর্ণ আঘ্রাণ নিয়ে বিজয় ইলাকে বলে- ‘জান ইলা, কলেজে পড়ার সময় আমার মনটা এখনের চেয়ে রোমান্টিক এবং কবিত্বপূর্ণ ছিল। কখনও বা রাতে জেগে উঠে আমি প্রিয় কবিতার একটি বই খুলে বসি। আবেগে আমার গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। কবিতার বই বন্ধ করে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসি। জ্যোৎস্নারাত হলে সেই নিস্তব্ধ সমগ্র বিশ্ব প্লাবিত করার দিকে তাকিয়ে ভাবি এত অদ্ভুত সুন্দর জ্যোৎস্নারাত গুলি যুগ যুগ ধরে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থেকে এভাবে অপচয় হয়ে আসছে আর অপচয় হতে থাকবেও। এত বিপুল সৌন্দর্যের কী বিরাট অপচয়!
জোছনার আলোতে ইলাকে কিছুটা হাসতে দেখে বিজয়। খুব ক্লান্ত সেই হাসি, তারপরে সে বলে-
‘পৃথিবীতে কেবল জ্যোৎস্নারই অপচয় হচ্ছে নাকি? সেই কোটি কোটি শিশু সন্তানের কথা ভাবুন তো, যাকে জন্ম দিতে গিয়ে মায়েরা দশ মাস কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এত কষ্টে জন্ম দেওয়া শিশুগুলির অনেকেরই জন্মের পরেই মৃত্যু হয়ে যায়-মায়েদের এত কষ্ট,এত হিয়াভরা কান্না ব্যর্থ করে সন্তানেরা মরে যায়- এটাও কি পৃথিবীর কম অপচয়?’
সেদিন রাতে বিজয় ইলার নিজের মৃত্যু ভয়ের সঙ্গে আরও এক ভয়ের কথা জানতে পারল তার- ওদের অনাগত শিশুটির মৃত্যুহয়।
কিন্তু ইলার সেই ভয় একদিন অমূলক হয়ে গেছিল। মা বা সন্তান কার ও মৃত্যু হল না। সুস্থ -সবল পোনাকে জন্ম দিয়ে ইলাও বেঁচে রইল,অবশ্য সে প্রায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছিল।
তারপর ধীরে ধীরে দিন পার হয়ে যেতে লাগল। ইলা ও ক্রমে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল।আর মানুষের চিরন্তন স্বভাব অনুসারেই সেও মৃত্যুর সঙ্গে প্রায় সাক্ষাতের মতোই সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ভুলে পুনরায় সংসারের মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ল,পুনরায় ঘর বাঁধার স্বপ্ন রচনায় মশগুল হয়ে পড়ল।
গ্রীষ্মকালের রাতে খাবার পরে সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ারে আরাম করে বসে ইলার সঙ্গে ঘরোয়া সুখ দুঃখের আড্ডা মারাটা বিজয়ের একটা প্রিয় অভ্যাস।একদিন এভাবেই দুজন কথা বলার সময় এটা ওটা কথার পরে ইলা বলল-‘আমাদের এই চন্দ্রমল্লিকা ফুলগুলি থেকে কী সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে।’কথাটা বলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সে,বোধহয় সুগন্ধটুকুর আঘ্রাণ সে পুরোপুরিভাবে নিয়ে নিল। তারপর পুনরায় বলল –সত্যিই আমাদের এই দেশি ফুলগুলির সঙ্গে কোনো ফুলের তুলনা হয়না। বিলেতি ফুলগুলির বাইরের রূপ আছে সত্যি কিন্তু ‘রূপে কি করে,গুণে হে সংসার তরে’- জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এই কথাগুলি বোধহয় সত্যি। এই রাতের বেলা আমরা ভালোভাবে ফুলগুলোকে দেখিনি কিন্তু চোখকে ভালোভাবে তৃপ্তি দিতে না পারলেও আমাদের নাককে তৃপ্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনকেও তৃপ্তি দিয়েছে-‘ আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল ইলা। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগল-‘আমার বহুদিনের স্বপ্ন কি জানেন? রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ গল্পের নায়িকার মতো বাড়ির সামনে একটি দেশি ফুলের বাগান করা- যেখানে গন্ধের চেয়ে রঙের প্রাধান্য, ফুলের চেয়ে পাতার বৈচিত্র থাকবে না। আর টবে লাগানো কোনো সাধারণ গাছ-চারার কাছে কাঠি পুতে কাগজে কাগজে কোনো ল্যাটিন নাম লিখে সগৌরবে তার প্রচার করা হবে না। চন্দ্রমল্লিকা, যুথি মালা, গোলাপ, টগর এবং কবরী ফুলের কিছু বেশি প্রাদুর্ভাব হবে। প্রকাণ্ড একটি বকুল গাছের গোড়ার জায়গাটা সাদা মার্বেল পাথরে বাঁধানো হবে-’ এতটুকু পর্যন্ত বলে ইলা সশব্দে হেসে ঊঠে পুনরায় বলেছিল-‘ অবশ্য আমার সেই বাগানের সামনে দুর্ভাগ্যবশতঃ গঙ্গা নদী থাকবে না। কিন্তু ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ নীতি অবলম্বন করে আমি গঙ্গা নদীর পরিবর্তে বাগানের সঙ্গে একটি পুকুর খনন করব বলে কল্পনা করছি।অবশ্য পুকুর মানে চৌবাচ্চা জাতীয় বাঁধানো ছোট একটি পুকুর। বকুল গাছের নিচটাও পাকা বাঁধা- আমরা আর মার্বেল পাথর কোথায় পাব- তারপরে গ্রীষ্মকালে রাতে এভাবে বারান্দায় চেয়ারে না বসে আমার সেই পাকা-বেদীতে গিয়ে বসব। উপর থেকে টুপ টুপ করে সুগন্ধি বকুল ফুল গুলি ঝড় বাতাস এলে আমাদের শরীরে টুপ টুপ করে খসে পড়বে। সামনেই অন্যফুল গুলির সুগন্ধও বাতাসে চারপাশে ছড়িয়ে দেবে। আমাদের সেই কুঞ্জবন গন্ধে বিভোর হয়ে উঠবে। আর আমি সেই ঠান্ডা পাকা বেদিতে আপনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ব- আর- আর- তারপরে আমি যদি মরেও যাই, কোনো খেদও থাকবে না-’ পুনরায় হেসে উঠল ইলা, কিন্তু এবার যেন সেই হাসিতে আগের মত উচ্ছলতা ছিল না।
অন্ধকারে বিজয়ের শরীরটা মৃদুভাবে শিউরে উঠল। সে রবীন্দ্রনাথের খুব ভক্ত। জীবনের অনেক কথায় তার মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙক্তি গুলি ভেসে আসে। অবশ্য এখন বিজয় ভরালী বইপত্র পড়ে জানতে পেরেছে যে আজকের সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথের লেখাকে আগের মতো অপরিসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখে না। কিন্তু তিনি আগের যুগের একজন বুড়ো মানুষ, এখনও আগের মতোই রবীন্দ্রনাথের লেখা ভালোবাসেন। তখনও ভালোবাসতেন। আর ইলাকে বিয়ে করে এনে তাকেও ভালবাসতে শেখালেন। কিন্তু ইলা বোধহয় সে ভাবার চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল। সে তো এভাবে ইলার মতো গল্প পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলতে পারেনি। ‘নিশীথের’সংলাপ গুলিও তার মুখস্থ নেই, কিন্তু তিনি গল্পটা পড়েছেন। গল্পটির কেবল পরিণতি নয়, তার নায়িকার বিখ্যাত হাসি থেকে রূপের ছবিও সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের মনে পড়ে গেল। ‘তোমারও যে কল্পনার দৌড় ইলা-’ বিজয় অল্প হেসে খুব সহজ এবং সাধারন ভাবে কথা বলার চেষ্টা করল- ‘আজ এতদিন পরে তুমি এভাবে কথা বলছ, আগে কখনও না বলা-’
পুনরায় জোরে হেসে উঠেছিল ইলা- ‘কারন কি জানেন? রাত, চারপাশের এই রাতের মায়া- কিন্তু আমার স্বপ্ন হলে দিনরাত দুটির মতোই সত্য হতে হবে, অর্থাৎ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য আমি আপ্রান চেষ্টা করব।’ এবার গম্ভীর হয়ে পড়েছিল ইলা, ‘কোনো একটি গল্প কিছু একটা কথা ভালো লাগে তাকে অনুসরণ করলাম বলেই যে সম্পূর্ণ গল্পটা সত্য হবে, সেই ভয়ে করতে গেলে সংসারে অনেক কাজ করাই দেখছি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি মেয়ে ছিল, সে খুব সুন্দর করে তাঁতে ফুল তুলতে জানত। কিন্তু বেচারি বিয়ের পরেই বিধবা হল,তার কাছ থেকে আমাদের আশেপাশের অনেক ছেলেমেয়ে তাঁতে ফুল ফোটাতে শিখল। তার মত একই রঙের সুতো একই নমুনার ফুল ফোটাতে লাগল। সেদিন কি তারা ভয় পেয়েছিল একদিন তাদেরও মেয়েটির মতন অবস্থা হবে-
’ সেদিন রাতে ইলার মনপ্রান খুলে গিয়েছিল। রাতের মায়া বোধহয় তাকে সেদিন গভীর ভাবে মোহাবিষ্ট করেছিল। বিজয় স্তব্ধ হয়ে বসে শুনতে থাকল আর ইলা বলে গেল-‘ আপনি আমাকে সেদিন বলেছিলেন- এক কাঠা জমি কেনার টাকাতো জমা হল, এখন দেখেশুনে এক কাঠা জমি কিনে নেওয়া ভালো। আপনি আমাকে এটাও বললেন-‘আমরা তিনটি প্রাণীর সংসার, ছোট একটি জমিতে ছোট্ট ঘর একটা বানাতে পারলেই হবে। আপনার ধারণা, আমি অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়েছি। পোনার জন্মের পরে আমাদের খরচ আরও বেড়ে গেছে, তাই জমিটা কেনা হলে আমরা সেই কষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি। কিন্তু কষ্ট করেছি বলেই তো সেই জমি ঘর আমার আরও অনেক বেশি আদরের,বেশি মায়ার। আর সেই জন্যই তো সেই বাড়ির স্বপ্ন দেখতে এত ভালো লাগে। কিন্তু এক কাঠা জমি কিনে একটা ঘর বানালে আমার এতদিনের জল্পনা-কল্পনা যে বৃথা যাবে। এতটুকু জমিতে আমার ফুলের বাগানটা কীভাবে হবে, পেছনের বাগানটাই বা কীভাবে করব? আমার কত কল্পনা- সামনের বাগানের ফুলের গন্ধে চারপাশ বিভোর হয়ে থাকবে। কেবলমাত্র একটা বাড়ি যেন শুধু মানুষের খাওয়া থাকার মত ব্যবহারের জীবনের দিকে সচেতন করে দেয় কিন্তু তার সঙ্গে বাগানটা মানুষের সৌন্দর্যপ্রিয় মনটা প্রকাশ করে। আপনি কি হাসছেন?- মানুষের সৌন্দর্য প্রিয়তাকে এভাবে সঙ্কীর্ণতার মধ্যে বন্দি করতে দেখে? বাবা বলেন-‘জীবনে কোনো কথাকেই ক্ষুদ্র বলে উপহাস করতে নেই। বড় বড় শিল্পীর কাছে সৌন্দর্যের ধারণা বিরাট, তাদের সৌন্দর্য সৃষ্টি ও একই ভাবে বিশাল, কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের এটা সাধারন স্বপ্ন এবং সাধনা।’ আমি তো কখনও একটা সুন্দর ছবি আঁকতে পারিনা, একটা সুন্দর কবিতা লিখতে পারি না, কিন্তু আমার কাছে আমার বাগানই আমার ছবি, আমার কবিতা। সেই বাগানের ফুল দিয়ে আমি আমার ঠাকুরঘর আরও পবিত্র করব,আমার বাড়িটা আরও সুন্দর করে সাজাব, প্রতিবেশীদের শুভ কাজে প্রয়োজন হলে সেই বাগানের ফুল তুলে দিয়ে মনে তৃপ্তি লাভ করব। আমাদের বাগানের শাকসবজির সবুজ চেহারা দেখে চোখ জুড়োবে,নিজে খাব,প্রতিবেশীদের বিলাব। আমাদের বাগানের কুল গাছের নিচে শীতকালের রোদ নিয়ে আমাদের পোনা তার সঙ্গীদের সঙ্গে কুল কুড়োবে, গ্রীষ্মকালে আম গাছের নিচে আম কুড়োবে-’
‘ইলা-’ এতক্ষণের স্তব্ধতা জোর করেই যেন দূর করে বিজয় এইবার প্রায় চিৎকার করে উঠল –‘তোমার কল্পনা যেভাবে দৌড়াচ্ছে, রাতও যে সেভাবে দৌড়ে প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে,সে খবর আছে কি?’
মুহূর্তের জন্য কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সঙ্গে সঙ্গে ইলা জোরে হেসে উঠেছিল- ও হো,রাত মোটেই দৌড়াচ্ছে না। প্রথমে আমাকে সে জাদু করে নিয়ে শেষে সে নিজেই আমার অভাবনীয় কল্পনার দৌড় দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
‘একটু আস্তে আস্তে হাসো ইলা। তোমার হাসিতে পোনা তো জেগে উঠবেই, আশেপাশের প্রতিবেশীরাও জেগে উঠবে।’
‘ও আমার সোনা। এতক্ষণ সে একা একা শুয়ে আছে-’ একদৌড়ে ভেতরে চলে গেল ইলা,আর ঘুমন্ত পোনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অজস্র সময় মুখ ভরিয়ে দিতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে একটা উদ্গত নিশ্বাস রোধ করে বিজয় জ্বলতে থাকা আলোটা একটু কমিয়ে শুয়ে পড়ল।
একজন বুড়ো মানুষ,
নিরুপমা বরগোহাঞি,
অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,
(৬)
কিন্তু স্বল্প শিক্ষিতা ইলা বাড়িতে বসে বসে কত বই পড়ত!কীভাবে বইয়ের কথাগুলি জীবনের
সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিতে পেরেছিল।আর তারজন্যই বোধহয় তার জীবনটা ইলা এত
বর্ণাঢ্য,এত সজীব করে রাখতে পেরেছিল।
ইলার সেই বৈশিষ্ট্যের জন্যই বোধহয় একটা ঘর বাঁধার স্বপ্নে একদিন ওরা দুজনেই এত
বেশি মশগুল হয়ে থাকতে পেরেছিল।
বিয়ের চার মাস পরে ইলা একদিন বিজয়কে খুব অবাক করে দিল।
‘এই ১০০ টাকা নিন।’ অফিসে যাবার সময় বিজয়ের দিকে খুচরো ১০০ টাকা এগিয়ে দিয়ে ইলা
বলেছিল। তারচোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল- বিজয়কে অবাক করে দিতে পারার মধুর আনন্দের গোপন
হাসিতে।
‘টাকা? কিসের টাকা?’ ইলা ভাবা মতোই বিজয় অবাক হয়েছিল।
‘এতদিন যে আমার সঙ্গে একটা ঘর বাঁধার এত জল্পনা-কল্পনা করলে,মাটির না হলে সেই ঘর কোথায়
বাঁধবে? সেই জন্য এক টুকরো মাটির জন্য এই টাকাটা আমি একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিলাম।
একবার কোথাও একটা গল্পে একটা চোরের কাহিনি পড়েছিলাম- সে কিছু একটা ভালো কাজ করে এসে
স্ত্রীকে বলেছিল যে সে সেদিন নিজের বিষয়ে একটা কথা আবিষ্কার করেছেঃ কথাটা হল যে চুরি করার মতো
জঘন্য কাজ করা একটা খারাপ মানুষ হলেও আসলে সে ততটা খারাপ নয়। আজ এই জমানো ১০০ টাকা বাক্স
থেকে বের করে সেই চোরের মতোই আমি নিজের বিষয়ে একটা অভাবনীয় সত্য আবিষ্কার করলাম,সেটা কী
জানেন?’
‘কি?’ প্রথম দিন থেকে সেদিন পর্যন্ত স্ত্রী বিজয়কে কেবল অবাকই করে এসেছে।
‘ যে আমি মানুষটা আপনি সব সময় বলার মতো বেহিসাবি অসাংসারিক হলেও কিছুটা অত্যন্ত হিসেবি-’
এইবার বিজয় হেসে ফেলেছিল। তারপর স্ত্রীর দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল –‘তোমাকে
আমি কিসের জন্য বেহিসেবি বলি তুমি তো তা জান। নিজের জন্য তুমি কিছুই নিতে চাও না। অন্য মহিলাদের
মধ্যে নিজের কাপড়চোপড় কেনার একটা আগ্রহ থাকে কিন্তু তোমার মধ্যে দেখেছি সে সবের জন্য কোনো
আগ্রহ নেই। তুমি কেবল ব্যস্ত অতিথি অভ্যাগতদের সেবা যত্ম করায়। আমার বন্ধুবান্ধবদের তুমি জোর
করে খাওয়াতে ভালোবাস। সেই টাকা বাঁচিয়ে তুমি যদি নিজের জন্য কিছু কিনতে। আমার বন্ধুদের তুমি আদর
যত্ন করলে আমি খুশি হই। বিয়ের আগে বেচারাদের এক কাপ চা খাওয়াতে পারতাম না। কিন্তু তুমি এখন ওদের
শুধু চা-ই নয়,সঙ্গে অন্য অনেক কিছু খাওয়াও বলে আমার বন্ধুর সংখ্যা এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
সেই খরচ যদি কিছু পরিমাণ কমিয়ে তুমি নিজের জন্য কিছু একটা যদি চেয়ে নিতে, আমি নিজে না দিলে কোনোদিন
কোনো জিনিস তুমি আমার কাছ থেকে চেয়ে নাও না-’
এইবার ইলা বিজয়ের কথার মধ্যে বাধা দিয়ে বলে উঠল যে –‘আপনি সবসময় এই কথাটা কেন বলেন?
আমি কিসের অভাবে আছি যে প্রয়োজন না হলেও একগাদা কাপড়চোপড় গহনা চেয়ে নেব ? আর দেখুন আপনি
নিজে মনে মনে যে কথাটা ভালোবাসেন, কেবল আমার কথা ভেবে তা খারাপ পেতে নিজেকে বাধ্য করেছেন।এতদিন
আপনার একটা বাড়ি ছিল না, যেখানে বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে পারেন। সত্যি-মিথ্যা এখন
আমাদের ছোট্ট একটা বাড়ি হয়েছে, সেই বাড়িতে লোকজন আসছে- আপনি তাতে মনে মনে খুশি হলেও নিজের
মনকে অস্বীকার করতে চাইছেন। আর দেখুন নিজেকে সাজানোর মতো এত সস্তা অথচ মূল্যবান জিনিস
থাকতে মিছামিছি কেন টাকা খরচ করতে যাব?
‘সস্তা অথচ মূল্যবান? কী অদ্ভুত জিনিস সেটা?’বিজয় পুনরায় অবাক হয়েছিল।
‘এই যে-’কপাল এবং সিঁথির সিঁদূরের ফোঁটার দিকে ইলা অঙ্গুলি নির্দেশ করল। পবিত্র রহস্যময়
হাসিতে মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে বিজয় ইলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ধীরে ধীরে তাঁর চোখ দু'টি মুগ্ধ আবেশে কোমল হয়ে এল। সত্যি । এই সিঁদুরের ফোঁটা ইলাকে এতটা মানায়, অন্য
কোনো মহিলাকে বোধহয় এত সুন্দর দেখায় না-অন্তত এটাই বিজয়ের ধারণা।
তবু বিজয় পুনরায় একই কথা বলল – ‘ভেবেছিলাম- ‘শাড়ি গহনা গাড়ির কামনা সমস্ত মেয়েদেরই কম
বেশি পরিমাণে থাকে কিন্তু তুমি যে কেন এর ব্যতিক্রম হলে-’ এর বেশি আর কিছু বিজয় বলতে পারল না, কিন্তু
মনে মনে ভাবল, ইলার কাপড় গয়নার প্রতি আগ্রহ নেই নাকি অন্য দিকে বেশি খরচ করে বলেই এইসব
জিনিসের নাম নিতে চায় না?’ ওদের দুটি প্রাণীর ঘরে ইলা কত মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছে। ইতিমধ্যে ইলা
পাড়ার কারও বৌদি, কারও দিদি, কারও মামি, কারও বা ছোট বোন হয়ে উঠেছে।ওদের ছোট্ট বাড়িটা একটি
একান্নবর্তি পরিবারের বাড়ির মতোই যেন বৃহৎ হয়ে পড়েছে। ফলে আজ কারও ছেলে জন্ম হয়েছে, সঙ্গে
সঙ্গে অফিসে যাওয়ার সময় এসে বলবে ছেলেটিকে আজ দেখতে যেতে হবে, অফিস থেকে আসার সময় যেন
বিজয় উপহার দেওয়ার জন্য এক টুকরো কাপড়,বেবি পাউডারের প্যাকেট কিনে নিয়ে আসে। আবার একদিন
হয়তো মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বিজয় বাদলকে না পাঠিয়ে নিজেই ভালো করে বাজার করে আনতে হবে কারণ
মেয়েটিকে তার স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হবে। কখনও আবার ইলার পাতানো কোনো মাসি
অসুস্থ হয়ে পড়বে তখনও বিজয়কে বাজার থেকে ফলমূল কিনে এনে দিতে হবে। শুধু হাতে কখনও ইলা রোগীর
খবর নিতে যায় না। আর যদি কারও বিয়ে অন্নপ্রাশন বা জন্মদিনের নিমন্ত্রণ থাকে তাহলে তো কথাই নেই।
সবচেয়ে ভালো উপহারটা দিতে হবে। সঙ্গে কৈফিয়ত হিসাবে বিজয়কে বলবে- বিয়ে বা অন্নপ্রাশন এসব তো আর
প্রতিদিনের ঘটনা নয়, তাই কৃপণতা করে সাধারণ জিনিস কিনে দেওয়া উচিত নয়। সঙ্গে বাবা বলা কথাটা বলবে-‘
মানুষ তো কখনও ধনে বড় হয় না, মনে প্রকৃত বড় হয়।’
এই সমস্ত কিছুই নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখছে বিজয়। ইলার কোনো ইচ্ছাতে কোনো দিন সে
বাধানিষেধ আরোপ করেনি। বরং এসবের মধ্যে একটি বড় সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছে। সে যে বাড়ির লোকজনের কাছ
থেকে ইলাকে বঞ্চিত করে রেখেছে, সেই বাড়ির অনাস্বাদিত আত্মীয়তার ভালোবাসা এরকম কিছু কৃত্রিম
সম্বন্ধের মধ্য দিয়ে ইলা যেন পেতে এবং দিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও মাঝে মধ্যে বিজয় না ভেবে পারেনা
যে এতগুলি পাতানো মানুষকে ভালোবাসা বিলিয়ে ইলা যেন নিজের সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন হয়ে রয়েছেন।
অবশ্য একটা কথায় ইলা খুব সচেতন। বিজয়ের সমস্ত ধরনের সুখ-সুবিধার প্রতি তার সব সময়ই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
এতগুলি নকল দেবর, ননদ, ভাই-বোন, মাসি-পিসির প্রতি কর্তব্য করতে গিয়েও সে কখনও বিজয়কে দেখাশোনা
করার ক্ষেত্রে কোনোরকম ত্রুটি হতে দেয়নি। বাদল থাকলেও ইলা বেশিরভাগ দিন নিজের হাতে চা করে ভাত
রেঁধে বিজয় কে খাওয়ায়। বাড়িতে বোধহয় ইলা কোনোদিন রান্নাবান্না করোনি। মা বাবার একমাত্র মেয়ে তাই
হয়তো কোনো কাজ করতে দেয়নি। তাই ইলার রান্নায় পটুতা একেবারে ছিল না। এমনকি বাদলও ইলার চেয়ে বেশি
ভালো করে রান্না করত। কিন্তু ইলার নিজেই রান্না বান্না করে খাওয়ানোয় উৎসাহ দেখে একদিনও সে খাবার
সময় রান্না খারাপ হয়েছে বলেনি। খাবার সময় ইলা সামনে বসে দেখাশোনা করে।তার মুখে তৃপ্তির ভাব ফুটে
উঠতে দেখে সে কোনোদিন রান্নার ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে পারেনি। সেই অভ্যাসটা সব সময়ের জন্য থেকে গেল।
কোনোদিন সে কারও রান্না নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।
কিন্তু এতগুলি টাকা কীভাবে ইলা সঞ্চয় করতে পারল?
‘আমার কিন্তু খুব অবাক লাগছে এতগুলি টাকা তুমি এই কয়েকদিনের মধ্যে কীভাবে জমাতে পারলে
ইলা?’
একটা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল ইলা। ‘আপনি আমার বিষয়ে যে একটা ভুল ধারণা নিয়ে এতদিন
রয়েছেন সেটা বুঝতে পারলেন? কাপড় বা গাড়ির প্রতি আগ্রহ আমারও রয়েছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড়
আগ্রহ হল নিজের একটা বাড়ির প্রতি। দিনের মধ্যে কতবার যে আমি নিজের একটা বাড়ির কল্পনা করি, বিশেষ
করে শাকসব্জি এবং ফুল গাছ দেখাশোনা করার সময় সেই কল্পনা খুব বেশি ভাবে করি। আমাদের বাড়ির বাগানে
আমরা কী কী ফুল লাগাব, বাগানের পেছনে কী কী ফলের গাছ লাগাব এই সমস্ত নানাকথা। তাছাড়া আমরা থাকা
বাড়িতে অসুবিধা গুলির জন্যও আমাদের নিজের বাড়ির কথা মনে ভাবতে ভালো লাগে। নিজে বাড়ি তৈরি করলে
সমস্ত সুবিধা দেখে শুনে নিতে হবে।’
ইলার কথা শোনার মতো বিজয়ের সময় ছিল না। অফিসের সময় প্রায় পার হয়ে যাচ্ছিল,তাই দ্রুত ইলার
হাত থেকে ১০০ টাকা নিয়ে সে অফিসের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলল।
পথে বেরিয়ে বিজয় নিজেকে একা পেল। তখন ইলার জমানো টাকার কথা ভাবার মতো অবকাশ পেল। ভেবে
ভেবে ইলার প্রতি তার ভালোবাসা এবং সহানুভূতিতে মনটা কোমল হয়ে এল। বাড়ি একটার প্রতি এতটা আকুলতা
থাকা মেয়েটি নিজের বাড়ি থেকে বঞ্চিত হয়ে রইল। জীবনের কোনো একটি পরিহাস যেন এর মধ্যে মধ্যে নিহিত
রয়েছে। দুই হাতে টাকা পয়সা খরচ করার অভ্যাস থাকা মেয়েটির এই একশো টাকা জমানোর মূলে একটা বাড়ির
প্রতি থাকা উদগ্র বাসনার পরিচয় পেয়ে বিজয় অভিভূত হয়ে গেল। পকেটে থাকা একশো টাকার উপরে সে
একবার আদর করে হাত বুলালো। আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের আবেগের প্রকাশে নিজের মুখে মুচকি হাসি খেলে
গেল।
ছয় মাসে একশো টাকা জমানোর পর ইলা কিন্তু এক বছরে আশি টাকার বেশি জমাতে পারল না। কারণ
ইতিমধ্যে ওদের মধ্যে পোনা এসেছে। সেই জন্য বেশ ভালো পরিমাণ টাকা খরচ হয়ে গেল। সেই টাকা খরচ হল শুধু
মাত্র পোনাকে এই পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য নয়,তার জন্মের সময় তার মায়ের জীবনের আলো চিরদিনের
জন্য ঘুচে যাচ্ছিল।বিজয় প্রায় পাগলের মতো দুই হাতে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে সেবার
ইলাকে বাঁচিয়ে তুলল। মাটির জন্য জমানো টাকা থেকে কিছু খরচ হয়ে গেল। ভালো হয়ে উঠার পরেই ইলা যেদিন
জানতে পারল যে তার এত কষ্ট করে মাটির জন্য সঞ্চিত করে রাখা টাকায় হাত পড়েছে, তার চোখ ছলছল হয়ে
এল। জমানো টাকা কোথায় বাড়বে এতো দেখছি কমে গেল। ইলার দুঃখ দেখে বিজয়ের নিজেকে অপরাধী বলে মনে
হচ্ছিল। তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে ইলাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছিল-‘মাটির জমানো টাকা খরচ করার জন্য
তোমার দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু আমার সেই সময়ের অবস্থা ভেবে দেখতো,পোনার জন্মের সময় খরচ করার জন্য
সঞ্চিত টাকাগুলো খরচ হয়ে গেল। দুই একজন বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করলাম। তোমার বাবা
নানা জিনিসপত্র পাঠিয়ে আমাকে নানাভাবে সাহায্য করলেন। পোনাকেও সোনার হার দিলেন। আমি তো কখনও
তোমার বাবার কাছে এত পাওয়ার পরে আবার টাকার কথা বলতে পারতাম না। এমনকি তিনি নিজেই আমাকে
জিজ্ঞেস করেছিলেন টাকা পয়সার দরকার হবে কিনা বলে। আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম যে লাগবেনা, তোমার
জমানো কিছু টাকা আছে। তারপর বিজয় রসিকতা করার চেষ্টা করে বলল-‘বাড়ি ঘর দিয়ে কী হবে ইলা যদি সেই
ঘরের ঘরনী আমাকে ছেড়ে চলে যেত?’
কথাগুলি বলেই কিন্তু বিজয় সেদিন অনুতাপ করেছিল। মাঝে মধ্যে তার মুখে কী সব অশালীন রসিকতা
চলে আসে? ইলার মৃত্যুকে নিয়ে পর্যন্ত রসিকতা করতে পারল সে। অথচ এই মৃত্যুর ছায়া দেখে সে এবং ইলা
পোনার জন্মের আগের কয়েকটি দিন কত রাত দুশ্চিন্তার মধ্যে ঘুমের ক্ষতি করে কি সাংঘাতিক ভাবেই না
সময় কাটিয়ে ছিল। অন্য অনেক দম্পতির মতো তাদেরকে অনাগত শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে, ছেলে হলে কী
নাম রাখবে মেয়ে হলে কী নাম রাখবে এই সব জল্পনা-কল্পনার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকতে হয়েছিল
কারণ ওদের মধ্যে পোনা আসবে বলে জানতে পারার দিন থেকে ইলা নানা অসুখে ভুগতে শুরু করেছিল। সবার চেয়ে
বড় যে কথাটা ডাক্তার এবং নিজেদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল তা হল ইলার ক্রমশ বেড়ে চলা রক্তশূন্যতা। অনেক
ওষুধপত্র খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ইলাকে বাঁচানো গিয়েছিল। মা ইলাকে নিজের সঙ্গে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু ইলা
রাজি হয়নি। সেই অসম্মতি প্রকাশ করে সে মায়ের কাছে মনে মনে লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের কথা ভেবেই
বাপের বাড়িতে যেতে রাজি হয়নি। সে দূরে থাকলে প্রতিটি রাত বিজয় কতটা অস্থির হয়ে উঠবে এই ভয়ঙ্কর
সত্যটা সে জানত। তাই মায়ের কাছে থাকলে তার অনেক সুবিধা হবে জেনেও সে যায়নি। এমনকি বিজয়ও জোর
করেছিল মায়ের কাছে রেখে আসার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইলা নিজের মতে অচল অটল হয়ে রইল।শেষ
পর্যন্ত পোনার জন্মের কিছুদিন আগে থেকে মা এসে তাদের সঙ্গে থাকতে লাগল।
মৃত্যুর সঙ্গে বিজয়ের তখনও পর্যন্ত কোনো পরিচয় ছিল না। সে যখন খুবই ছোট তখন তার এক
দিদির মৃত্যু হয়েছিল। সে কথা তার মনে পড়ে না। তারপরে তাদের বাড়িতে কারও মৃত্যু হয়নি। এদিকে কিছুটা বড়
হওয়ার পরে তার স্বভাব অনুসারে বইপত্রের মধ্যে ডুবে থেকে এরকম একটি জগত গড়ে তুলল যে তখনকার
গ্রামের সমাজের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ রইল না। গ্রামের সামাজিক কোনো কাজে সে কোনোদিন যোগ
দেয়নি। তার স্বভাব কে স্বীকার করে নিয়ে গ্রামের কোনো মানুষ তাকে কোনো কাজে ডাকত না। সেজন্য গ্রামে
কেউ মারা গেলে শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য তাকে কেউ কোনোদিন অনুরোধ করেনি। সেই সব কাজে সবসময় তার
দাদারাই অংশগ্রহণ করত।এভাবেই সে স্কুলের জীবনটা পার করে দিল। কলেজ জীবনে তাকে কোনোদিন কোনো
বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয় পরিজনের মৃত্যুর খবর শোনার মত দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হতে হয় নি। মৃত্যুর সঙ্গে
তার পরিচয় একমাত্র বইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেই পরিচয় ছিল ভাসা ভাসা। বহু চিন্তাশীল মানুষের চিন্তা রাজ্যে
মৃত্যু একটি বিশেষ স্থান জুড়ে থাকে। জীবনের সঙ্গে একটা এড়াতে না পারার সঙ্গী হয়ে বাস করে সেই
মৃত্যুচেতনা। কিন্তু বিজয় অন্য অনেক মানুষের চেয়ে গভীর চিন্তার মানুষ হলেও মৃত্যুকে নিয়ে কোনোদিন বিশেষ
কিছু ভাবনা চিন্তা করেনি। জীবনে প্রথমবারের জন্য ইলাই তাকে মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন করে তুলল। পোনার
জন্মের আগের দিনগুলিতে ইলা তাকে প্রায়ই বলত যে সে আর বেশি দিন বেঁচে থাকবে না। সংসারের মায়ার বন্ধন
দৃঢ় করতে গিয়ে সে মায়ার বন্ধন ছিন্ন করতে চলেছে। সত্যি ইলা অনেক অসুখে ভুগল। কত রাত যে সে ছটফট
করে উজাগরে কাটিয়েছে। প্রথমদিকে গরমের দিন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে গরম পড়ে এল। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে
ইলার ঘুম ও কমে এসেছিল।ছটফটানি বেড়ে গিয়েছিল। সেই সমস্ত রাতে ইলা কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে শেষে
সামনের বারান্দায় কিছুটা শান্তির আশায় বেরিয়ে যেত। ইলার সঙ্গে বিজয়েরও ঘুম আসছিল না। ইলার ঘোর
প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেও সামনের বারান্দায় বেরিয়ে যেত হাতপাখা নিয়ে। দুটো বেতের চেয়ারে দুজনে অনেক সময়
বসে থাকত। কখনও নীরবে কখনও দুই একটা কথা বলত। নীরব মুহূর্তগুলি কিন্তু বিজয়ের কাছে শান্ত ছিল না।
ইলার জন্যও নিশ্চয়। ওদের সামনে বিশাল অন্ধকারে,আকাশের বিনিদ্র অগণন তারা, চারপাশের সুপ্তির নিবিড়-
নিস্তব্ধতা, তার মাঝে মধ্যে হঠাৎ যেন কোনো নামহীন অজানা দেশ থেকে বয়ে আসা একঝাঁক হালকা বাতাস
ওদের মনে এক অপার্থিব বিষ্ময় এবং ভয়ে গা শিরশির করে উঠা অনুভূতি মন গুলিকে ভাব গম্ভীর স্তব্ধতায়
ভরে ফেলত। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যেত এবং অন্ধকারে রহস্যময়
ছায়ামূর্তির মতো মনে হওয়া ইলার দিকে তাকিয়ে বিজয়ের প্রাণ আকুলি বিকুলি করে উঠল- ইলা যেন ইতিমধ্যেই
জগত ছেড়ে গিয়ে কায়াহীন মূর্তি ধরে তার কাছে বসে আছে। তীব্র মৃত্যুচেতনায় যেন বিজয়ের সমস্ত সত্তা
কেঁপে উঠেছিল। সামনের স্তব্ধ আকাশের অগনন তারার দিকে তাকিয়ে তার মনে রবি ঠাকুরের কবিতার পংক্তি
বারবার যাওয়া-আসা করছিল-‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে/ আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে-’ আর তারপরেই
খুব ভয় পেয়ে সে ইলার হাতদুটি নিজের মুঠিতে ঢুকিয়ে নিয়ে তার এতক্ষণের ভয়াবহ অনুভূতির অসত্যতার
উপলব্ধিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে খুব আদর করে ইলাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘কী ভাবছ ইলা?’