কান্তিরঞ্জন দে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কান্তিরঞ্জন দে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২১

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২২ || কান্তিরঞ্জন দে || Box Office

 সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২২

কান্তিরঞ্জন দে




মানুষের মিত্র ::সৌমিত্র


     সিনেমার হিরো হয়ে জনপ্রিয় হওয়া  কঠিন । কিন্তু আরও কঠিন সেই জনপ্রিয়তা দীর্ঘ দীর্ঘদিন ধরে   বজায় রাখা । তার চেয়েও কঠিন----প্রিয়জন হয়ে ওঠা  বা মানুষের মিত্র হয়ে ওঠা । সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন ধরে খুব সফলতার সঙ্গে সেই কাজটিই করে যেতে পেরেছিলেন ।  কি করে পারলেন ?


       ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার  নামক প্রথম ছবিতেই তিনি সফল হলেন । কিন্তু সেই  সাফল্য তাঁর মাথা ঘুরিয়ে দেয় নি । বরং , ওই সফলতার কারণেই তিনি  সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগের একটা পথ সারা জীবনের জন্য পেয়ে গেলেন।

 ছোটবেলা থেকে নাটক করতেন । কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে সেই চর্চা শিশিরকুমার ভাদুড়ীর মতো মহৎ শিল্পীর সান্নিধ্যে এসে আরও বেগবান হলো । রূপবান মানুষটি যৌবনের প্রথম দিনগুলো থেকেই শিল্প সংস্কৃতিমূলক কাজের মাধ্যমে জনজীবনে নিবিড় মেলামেশা করতেন । অপুর সংসার-এর   পর সিনেমাই   তাঁর কাছে হয়ে উঠল নিবিড় গণসংযোগের  প্রধানতম উপায় ।


      কবিতা লেখা , আবৃত্তি করা , নাটক লেখা কিংবা অনুবাদ করা , নাটক সব দিক থেকে পরিচালনা করা ------- এর সব ক'টাই তাঁর জনসংযোগ উদ্যমের ফসল । কিন্তু সবার মতো তিনিও জানতেন, একসঙ্গে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য সিনেমার চেয়ে বড় হাতিয়ার আধুনিক যুগে আর কিছু নেই । সেই কারণেই বাংলায় টেলিভিশন সিরিয়াল যখন  বিনোদনের জোরালো মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল , তিনি কিন্তু তাঁর খ্যাতি প্রতিষ্ঠা , সামাজিক উচ্চতাকে আঁকড়ে ধ‍রে নাক উঁচু করে ঘরে বসে রইলেন না । সিরিয়ালের অভিনয়েও অংশ নিতে লাগলেন । নব্বই দশকের মাঝামাঝি এক-দুই সিজন  পেশাদার যাত্রা মঞ্চেও অভিনয় করলেন ।

     অনেকে এর পেছনে অর্থলোভের গন্ধ পেতে পারেন । কিন্তু এই অনুমান ঠিক নয় । সৌমিত্রবাবু মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসতেন ।  সে কারণেই  সিনেমার পর্দা , মঞ্চ , টিভি কিংবা যাত্রা---অভিনয়ের যতগুলো মাধ্যম আছে-----সব ক"টিতেই তাঁর পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও পরিশ্রম ঢেলে দিয়েছিলেন ।


      সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে তাঁর সিনেমায় প্রবেশ । পরের দু-তিন বছরের মধ্যেই তপন সিংহ , অজয়  কর , অসিত সেন , মৃণাল সেন-এর  মতো দক্ষ ও মেধাবী পরিচালকদের ছবিতে  কাজ করার সূত্রে চলচ্চিত্র জগতে  সহজেই তাঁর  প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল । খুব অল্পদিনের মধ্যেই উত্তমকুমারের পাশাপাশি রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে বাংলা সিনেমায় তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছল ।

    কিন্তু তিনি তো শুধু অর্থ কিংবা গ্ল্যামারের মোহে সিনেমা জগতে আসেন নি । এসেছেন সিনেমা নামক  শিল্পমাধ্যম এবং অভিনয়কে ভালোবেসে । ততদিনে অবশ্য অভিনয় তাঁর পুরো সময়ের জীবিকা কিংবা পেশা হয়ে গেছে ।


       আমাদের দেশে পেশাদার শব্দটি প্রায়শই বিকৃত অর্থে ব্যবহার হয় । পরিপূর্ণ পেশাদার মানে কিন্তু শুধুই অর্থপিশাচ বোঝায় না । পেশাদার মানে-----যিনি অর্থ কিংবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার সম্পূর্ণ নৈপুণ্য এবং গুণে মানে সেরা কাজটি দেবেন । সেই অর্থে একজন মুদি দোকানদার , ছুতোর মিস্ত্রি কিংবা সিনেমার অভিনেতা----সবাই পেশাদার ।

    সিনেমায় সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয়ে সর্বোৎকৃষ্ট গুণমানে পৌঁছনোর জন্য সারাজীবন তাঁর মেধা , পরিশ্রম , নিষ্ঠা , অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতা বিনিয়োগ করে গেছেন । অভিনয় করেছেন ভালোবেসে । শারীরিক ক্ষমতার তুঙ্গে থাকবার জন্য আজীবন ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করে গেছেন । শুধু রূপ যৌবন ধরে রাখার জন্যই নয় । একজন অভিনেতা ( পর্দার কিংবা মঞ্চের ) যদি পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত একশো শতাংশ ফিট না থাকেন, তবে তার রিফ্লেক্স কমে যাবে । তিনি ভালো অভিনয় করতেই  পারবেন  না ।  


      দ্বিতীয় কথা , সারা পৃথিবীর মতো বাংলাতেও দর্শক নানা শ্রেণীর হয় । শুধুমাত্র পুরষ্কার প্রত্যাশী ছবিতেই অভিনয় করব , অন্য কোনও ধরণের ছবিতে অভিনয় করব না ------- এ রকম গোঁ ধরে বসে থাকলে , আর যাই হোক , তিনি জনতার শিল্পী হতে পারবেন না ।


        সৌমিত্রবাবু জনতার শিল্পীই হতে চেয়েছিলেন । আগেই বলেছি , অভিনয় তাঁর কাছে ছিল জনসংযোগ তৈরির হাতিয়ার । সে কারণেই , অভিনয় জীবনের দু তিনবছরের মধ্যেই শুধু রোম্যান্টিক হিরোর চরিত্রে আটকে না থেকে , নানা ধরণের বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন । বারবার নিজের ইমেজ ভেঙ্গেছেন।  এই ইমেজ ভাঙ্গার প্রচেষ্টা তাঁর আমৃত্যু জারী ছিল ।

       ঝিন্দের বন্দী ( তপন সিংহ /১৯৬১) ছিল সৌমিত্রবাবুর জীবনের সাত নম্বর ছবি । সেখানে তিনি ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন নি । অন্যদিকে, তেরো নম্বর ছবি " অভিযান"-এ ( সত্যজিৎ রায় / ১৯৬২) ছবিতেই তিনি ইমেজ ভাঙা কর্কশ রুক্ষ পাঞ্জাবী ড্রাইভার নর সিংয়ের চরিত্রে  প্রাণঢালা অভিনয় করেছিলেন ।

এই ভাবে প্রৌঢ় বয়সে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর শেষ ছবি " প্রতিশোধ " ( সুখেন দাস /২৯৮১) ছবিতেও ভিলেন কিংবা স্বপন সাহা পরিচালিত  আপাদমস্তক বাণিজ্যিক ছবি " মিনিষ্টার ফাটাকেষ্ট " ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে পেছ-পা হন নি ।


       এই কারণেই যতদিন বেঁচে ছিলেন , ততদিন তিনি ছিলেন দুই বাংলার নয়নের মণি । অবিভাজ্য বাঙালি সংস্কৃতির শেষ বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ।

      তাই তাঁর অসুস্থতার দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে সারা পৃথিবীর বাঙালিরা আন্তরিক ভাবে তাঁর আরোগ্য কামনা করে গেছেন । মৃত্যুর পরে করোণা ভয় উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ তাঁর  শেষযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন ।

      সব দিক থেকে , সত্যি অর্থে খাঁটি এই জনতার শিল্পীকে আমার আভূমি প্রণাম ।

শনিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২১

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪) || কান্তিরঞ্জন দে || বাংলা সিনেমা ও বাংলাদেশ (২)

 সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪)

কান্তিরঞ্জন দে




বাংলা সিনেমা ও বাংলাদেশ (২)


         মুক্তিযুদ্ধের পরে পূব বাংলার   বাঙালির  এতদিনের অবরুদ্ধ প্রাণ যেন  প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল । নতুন গঠিত দেশে সামাজিক- অর্থনৈতিক হাজার সমস্যা । কিন্তু এর মধ্যেও বাঙালির সংস্কৃতি চর্চায় নতুন বাতাস এল ।  বাংলা সিনেমাও তার বাইরে রইল না ।

       ১৯৭০ সালে জহির রায়হান পরিচালিত " জীবন থেকে নেয়া " সিনেমাটি সাংস্কৃতিক জগতে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল । ছবিটায় কারিগরি অনেক ত্রুটি আছে । কিন্তু বিষয় যদি জোরদার এবং প্রাণবন্ত হয়  তাহলে , টাকা পয়সার দৈন্য কিংবা কারিগরি সীমাবদ্ধতা যে কোনও ব্যাপারই নয় , এ ছবি তা প্রমাণ করে দিয়েছিল । একটি পরিবারের দৈনন্দিন সাংসারিক গল্পের মধ্যেও যে দেশ- জাতি-কালের প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তোলা যায় , জীবন থেকে নেয়া তারই জ্বলন্ত উদাহরণ ।


        এই রকম সময়ে ১৯৭৩ সালে এবং ১৯৭৬ সালে ঋত্বিক ঘটক এবং রাজেন তরফদারের " তিতাস একটি নদীর নাম " এবং " পালঙ্ক " সিনেমা দুটি বাংলাদেশের সিনেমা জগতে যেন নতুন ঢেউ নিয়ে এল ।

        বাণিজ্যিক সিনেমাতেও এল নতুন জোয়ার ।  অবিভাজ্য বাঙালি জাতি বরাবরই রূপকথা , লোককথা ভালো বাসে । ১৯৬৫ সালে লোককথা ভিত্তিক সিনেমা " রূপবান " পূব বাংলায় ব্যাপক হিট করেছিল । তবে স্বাধীনতার পরে ১৯৮৯ সালের " বেদের মেয়ে জোসনা " পুরনো দিনের সব রেকর্ড ভেঙে দিল । এমন কি , সিনেমাটি কলকাতাতেও  রি-মেক হয়ে সুপার ডুপার হিট হয়ে   অবিভাজ্য বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিল । দুই বাংলার বুদ্ধিজীবীরা মাথা চুলকে এই ছবির তুমুল জনপ্রিয়তার রহস্য খুঁজতে লাগলেন । বাংলা সিনেমায়  এ যাবৎ সর্বকালীন হিট ছবি ছিল গুপী গাইন বাঘা বাইন । বেদের মেয়ে জোসনা গুগাবাবা-র রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেল ।


           তার মানে অবশ্য এ নয় যে, বাংলাদেশের সিনেমা থেকে যাবতীয় সমস্যা- দুর্দশা এক লহমায়  ভ্যানিশ হয়ে গেল। আসলে দুই বাংলাতেই সিনেমা তৈরির সমস্যা একই ধরণের । ১) টাকা পয়সার সমস্যা । ২)  রুচিহীন অপরিণত দর্শক আধিক্যের সমস্যা । কলকাতার মতো ঢাকাতেও সুস্থ রুচির সিনেমাকে  প্রতিনিয়ত মোটা দাগের বিনোদনের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই চালিয়ে যেতে হয় ।


       এরই মধ্যে আশির দশকের শুরুর দিক থেকে আমজাদ হোসেন , তারেক মাসুদ , তানভীর মোকাম্মেল , মোরশেদুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন মেধাবী পরিচালক ব্যাতিক্রমী সিনেমা বানাতে শুরু করলেন । তারেক মাসুদ-এর  " মাটির ময়না " সিনেমাটি  ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক  চলচ্চিত্র রসিকদের সম্ভ্রম আদায় করে নিল । দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এক মোটর দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ মারা গেছেন ।


      টিভি , ভিডিও , ডিজিটাল প্রযুক্তি কলকাতার মতো ঢাকার বাংলা সিনেমার জগতেও একই রকমের  ঝামেলা এনে ফেলেছে । ওখানেও প্রচুর সিনেমা হল একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এককালে বাংলাদেশের টিভি ধারাবাহিক গুলোর খুব সুনাম ছিল । কিন্তু হায়, ঢাকার টিভি ধারাবাহিকের মানও আজ ক্রমশ নীচের দিকে নামছে । বাংলাদেশের টেলিফিল্ম গুলো খুবই উন্নতমানের । সেখান থেকে গত কয়েকবছরে নতুন নতুন অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী , পরিচালক উঠে এসেছেন ।


       স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদ তৈরি হয়েছিল । কিন্তু সরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিকতা একটা প্রধান বাধা । আজ ওই উন্নয়ন পর্ষদ সম্পর্কে দুর্নীতি ও সরকারি টাকার অপব্যবহারের অনেক অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় । 


        কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের সিনেমার যে জিনিসটি আমাদের নজর কাড়ে , তা হচ্ছে , গল্পের বিষয় বস্তুর নতুনত্ব , সোনার বাংলার অপরূপ প্রকৃতির অসামান্য চিত্রায়ণ এবং একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা অভিনেত্রীর দুর্দান্ত অভিনয় । চঞ্চল চৌধুরী কিংবা জয়া আহসানের অভিনয়ের খ্যাতি আজ কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলাতেই সমান জোরদার । জয়া আহসানের অভিনয় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও নজর কেড়েছে ।


         এক কথায় , হাজার সমস্যা সত্ত্বেও কলকাতার সিনেমার পাশাপাশি ঢাকার বাংলা সিনেমাও কিন্তু সমানতালে এগিয়ে চলেছে । বরং সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে ওখানকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ এবং ধারাবাহিক চর্চা অনেক জোরালো । কলকাতার চেয়ে একটু বেশিই জোরালো । সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে কলকাতায়  বছরে যত বই প্রকাশিত হয় , ঢাকায় প্রকাশিত হয় , তার চেয়ে অনেক বেশি ।  গৌতম ঘোষ- বুদ্ধদেব দাশগুপ্তদের পরে কলকাতা থেকে খুব বেশি বাংলা সিনেমা কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে আনতে পারে নি । আগামী কয়েক বছরে  বাংলাদেশের কোনও পরিচালক যদি বার্লিন-ভেনিস-কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে সর্বোচ্চ  সম্মান অর্জন করে নিয়ে আসে , আমি কিন্তু অবাক হব না ।


       এই সব নানা কারণে , যারা সব দিক দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির , বিশেষত , বাংলা সিনেমার উন্নতি চান , তাদের বাংলাদেশের  বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার কোনও উপায় নেই ।


       সুখে দুঃখে , সমস্যায়- সম্ভাবনায়  কলকাতা এবং ঢাকার বাংলা সিনেমার মধ্যে আরও কিছু মিল অমিল আছে । বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আরও কিছু কথা বাকি রয়ে গেল । পরের সপ্তাহে সেগুলো নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে রইল ।

রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪) || কান্তিরঞ্জন দে || ধারাবাহিক বিভাগ

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪)

কান্তিরঞ্জন দে



বাংলা সিনেমা ও বাংলাদেশ (২)


         মুক্তিযুদ্ধের পরে পূব বাংলার   বাঙালির  এতদিনের অবরুদ্ধ প্রাণ যেন  প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল । নতুন গঠিত দেশে সামাজিক- অর্থনৈতিক হাজার সমস্যা । কিন্তু এর মধ্যেও বাঙালির সংস্কৃতি চর্চায় নতুন বাতাস এল ।  বাংলা সিনেমাও তার বাইরে রইল না ।

       ১৯৭০ সালে জহির রায়হান পরিচালিত " জীবন থেকে নেয়া " সিনেমাটি সাংস্কৃতিক জগতে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল । ছবিটায় কারিগরি অনেক ত্রুটি আছে । কিন্তু বিষয় যদি জোরদার এবং প্রাণবন্ত হয়  তাহলে , টাকা পয়সার দৈন্য কিংবা কারিগরি সীমাবদ্ধতা যে কোনও ব্যাপারই নয় , এ ছবি তা প্রমাণ করে দিয়েছিল । একটি পরিবারের দৈনন্দিন সাংসারিক গল্পের মধ্যেও যে দেশ- জাতি-কালের প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তোলা যায় , জীবন থেকে নেয়া তারই জ্বলন্ত উদাহরণ ।


        এই রকম সময়ে ১৯৭৩ সালে এবং ১৯৭৬ সালে ঋত্বিক ঘটক এবং রাজেন তরফদারের " তিতাস একটি নদীর নাম " এবং " পালঙ্ক " সিনেমা দুটি বাংলাদেশের সিনেমা জগতে যেন নতুন ঢেউ নিয়ে এল ।

        বাণিজ্যিক সিনেমাতেও এল নতুন জোয়ার ।  অবিভাজ্য বাঙালি জাতি বরাবরই রূপকথা , লোককথা ভালো বাসে । ১৯৬৫ সালে লোককথা ভিত্তিক সিনেমা " রূপবান " পূব বাংলায় ব্যাপক হিট করেছিল । তবে স্বাধীনতার পরে ১৯৮৯ সালের " বেদের মেয়ে জোসনা " পুরনো দিনের সব রেকর্ড ভেঙে দিল । এমন কি , সিনেমাটি কলকাতাতেও  রি-মেক হয়ে সুপার ডুপার হিট হয়ে   অবিভাজ্য বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিল । দুই বাংলার বুদ্ধিজীবীরা মাথা চুলকে এই ছবির তুমুল জনপ্রিয়তার রহস্য খুঁজতে লাগলেন । বাংলা সিনেমায়  এ যাবৎ সর্বকালীন হিট ছবি ছিল গুপী গাইন বাঘা বাইন । বেদের মেয়ে জোসনা গুগাবাবা-র রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেল ।


           তার মানে অবশ্য এ নয় যে, বাংলাদেশের সিনেমা থেকে যাবতীয় সমস্যা- দুর্দশা এক লহমায়  ভ্যানিশ হয়ে গেল। আসলে দুই বাংলাতেই সিনেমা তৈরির সমস্যা একই ধরণের । ১) টাকা পয়সার সমস্যা । ২)  রুচিহীন অপরিণত দর্শক আধিক্যের সমস্যা । কলকাতার মতো ঢাকাতেও সুস্থ রুচির সিনেমাকে  প্রতিনিয়ত মোটা দাগের বিনোদনের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই চালিয়ে যেতে হয় ।


       এরই মধ্যে আশির দশকের শুরুর দিক থেকে আমজাদ হোসেন , তারেক মাসুদ , তানভীর মোকাম্মেল , মোরশেদুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন মেধাবী পরিচালক ব্যাতিক্রমী সিনেমা বানাতে শুরু করলেন । তারেক মাসুদ-এর  " মাটির ময়না " সিনেমাটি  ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক  চলচ্চিত্র রসিকদের সম্ভ্রম আদায় করে নিল । দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এক মোটর দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ মারা গেছেন ।


      টিভি , ভিডিও , ডিজিটাল প্রযুক্তি কলকাতার মতো ঢাকার বাংলা সিনেমার জগতেও একই রকমের  ঝামেলা এনে ফেলেছে । ওখানেও প্রচুর সিনেমা হল একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এককালে বাংলাদেশের টিভি ধারাবাহিক গুলোর খুব সুনাম ছিল । কিন্তু হায়, ঢাকার টিভি ধারাবাহিকের মানও আজ ক্রমশ নীচের দিকে নামছে । বাংলাদেশের টেলিফিল্ম গুলো খুবই উন্নতমানের । সেখান থেকে গত কয়েকবছরে নতুন নতুন অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী , পরিচালক উঠে এসেছেন ।


       স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদ তৈরি হয়েছিল । কিন্তু সরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিকতা একটা প্রধান বাধা । আজ ওই উন্নয়ন পর্ষদ সম্পর্কে দুর্নীতি ও সরকারি টাকার অপব্যবহারের অনেক অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় । 


        কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের সিনেমার যে জিনিসটি আমাদের নজর কাড়ে , তা হচ্ছে , গল্পের বিষয় বস্তুর নতুনত্ব , সোনার বাংলার অপরূপ প্রকৃতির অসামান্য চিত্রায়ণ এবং একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা অভিনেত্রীর দুর্দান্ত অভিনয় । চঞ্চল চৌধুরী কিংবা জয়া আহসানের অভিনয়ের খ্যাতি আজ কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলাতেই সমান জোরদার । জয়া আহসানের অভিনয় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও নজর কেড়েছে ।


         এক কথায় , হাজার সমস্যা সত্ত্বেও কলকাতার সিনেমার পাশাপাশি ঢাকার বাংলা সিনেমাও কিন্তু সমানতালে এগিয়ে চলেছে । বরং সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে ওখানকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ এবং ধারাবাহিক চর্চা অনেক জোরালো । কলকাতার চেয়ে একটু বেশিই জোরালো । সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে কলকাতায়  বছরে যত বই প্রকাশিত হয় , ঢাকায় প্রকাশিত হয় , তার চেয়ে অনেক বেশি ।  গৌতম ঘোষ- বুদ্ধদেব দাশগুপ্তদের পরে কলকাতা থেকে খুব বেশি বাংলা সিনেমা কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে আনতে পারে নি । আগামী কয়েক বছরে  বাংলাদেশের কোনও পরিচালক যদি বার্লিন-ভেনিস-কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে সর্বোচ্চ  সম্মান অর্জন করে নিয়ে আসে , আমি কিন্তু অবাক হব না ।


       এই সব নানা কারণে , যারা সব দিক দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির , বিশেষত , বাংলা সিনেমার উন্নতি চান , তাদের বাংলাদেশের  বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার কোনও উপায় নেই ।


       সুখে দুঃখে , সমস্যায়- সম্ভাবনায়  কলকাতা এবং ঢাকার বাংলা সিনেমার মধ্যে আরও কিছু মিল অমিল আছে । বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আরও কিছু কথা বাকি রয়ে গেল । পরের সপ্তাহে সেগুলো নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে রইল ।

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৩) || কান্তিরঞ্জন দে || বাংলা সিনেমা ও বাংলাদেশ

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৩)

কান্তিরঞ্জন দে



বাংলা সিনেমা  ও  বাংলাদেশ


        বাংলা সিনেমার আলোচনা বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাকে বাদ দিয়ে কখনোই হতে পারে না । অন্তত  হওয়া উচিত নয় । কেন না , কাঁটাতারের ভৌগোলিক কিংবা রাজনৈতিক বিভাজন সত্বেও , সাহিত্য-ছবি আঁকাআঁকি- গানবাজনা-নাটক-থিয়েটার এবং শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো বাংলা সিনেমাও স্বভাব চরিত্রে এক এবং অবিভাজ্য । গুণমানে কিছু তফাৎ অবশ্যই আছে।

       এই জরুরী কথাটা আমরা অনেক সময়েই ভুলে যাই । ২০১৯ সালে কলকাতায় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাংলা সিনেমার একশো বছর পালন করা হয়েছিল । কারণ , ১৯১৯ সালে তৈরি " বিল্বমঙ্গল " বাংলা ভাষায় তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা । কিন্তু এই উৎসব উপলক্ষে যাবতীয় লেখালেখি কিংবা  আলোচনায় কোথাও কিন্তু বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা প্রসঙ্গ আসেই নি । অন্তত আমার নজরে পড়ে নি । এটি একটি মারাত্মক অন্যায় বলেই মনে করি ।


         ১৮৯৬ সালে বোম্বাই এবং কলকাতায় প্রথম সিনেমা দেখানোর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা শহরেও  সিনেমা প্রদর্শনী  হয় । ঢাকার বয়স কলকাতার অন্তত।দ্বিগুণ । কিন্তু ব্রিটিশ ভারতে ঢাকা ছিল একটি বিভাগীয় সদর শহর মাত্র ।

কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হবার সুবাদে অন্য সব ক্ষেত্রের মতো সিনেমা দেখানো এবং  সিনেমার তৈরি সুযোগও  এখানে তড়তড় করে বাড়তে থাকে । ঢাকায় প্রথম সিনেমা দেখানো হয় ১৮৯৮-তে । প্রথম সিনেমা হল তৈরি হয় ১৯০৫-এ। 

      ঢাকায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা তৈরি হলো, ১৯৩১ সালে নবাবদের পয়সা এবং উদ্যোগে । ছবির নাম " লাস্ট কিস্ । " একজন  আবদুল সোবহান নামে এক সুদর্শন যুবক এতে নারী সেজে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করলেন ।  ঢাকায় প্রথম সবাক ডক্যুমেন্টারী ছবি  তৈরি হয় ১৯৪৮ সালে ।

      বাংলা দু-টুকরো হবার পরেও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা সহ তৎকালীন সমগ্ৰ পূর্ব পাকিস্তানে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত সিনেমা সহ কলকাতায় তৈরি সব ধরণের বাংলা দেখতে কোনও অসুবিধে ছিল না ।  ৬৫-র যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার সেই সুবিধে পূব বাংলার বাঙালিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় । এর মধ্যে ১৯৪৭-র পর থেকে পূব বাংলায় সিনেমা হলের সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকে , তেমনি বাংলা ভাষায় সিনেমার পত্র পত্রিকার প্রকাশও অনেক বেড়ে যায় । সেই সময় পূব বাংলায়  উর্দু সিনেমার পাশাপাশি  হাজার অসুবিধের মধ্যেও বাংলা সিনেমা তৈরি করা ছাড়েন নি বাঙালিরা ।

      এখানে বিস্তারিত লিখবার সুযোগ নেই ।  তবুও সংক্ষেপে বলা যাক যে----১৯৪৭- ১৯৭১, বাংলাদেশ জন্ম নেবার আগের এই  তেইশ বছরেই ওখানে  পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদ (১৯৫৭) গঠিত হয় । ১৯৬০ সালে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সূচনা হয় । সালাউদ্দিন কিংবা সুভাষ দত্তের মতো উদ্যমী পরিচালকেরা ওখানে অর্থবহ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে থাকেন । 

       ১৯৭০ সালে জহির রয়হান পরিচালিত " জীবন থেকে নেয়া " সিনেমাটি  পূর্ব বাংলার সিনেমা জগতকে আমূল কাঁপিয়ে দিয়ে যায় । বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সুস্থ বাংলা সিনেমার ধারা ওখানে ক্রমশ বেগবান হতে থাকে । একদিকে  জহির রায়হান , আলমগীর কবির-এর মতো পরিচালকেরা অর্থবহ সিনেমা বানাতে থাকেন , অন্যদিকে মুহম্মদ খশরু-র মতো চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকেরা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নতুন ধরণের চলচ্চিত্রে উদ্ধুদ্ধ করতে থাকেন ।


        এর মধ্যেই চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ । ১৯৭১-এ জন্ম নেয় বাংলাদেশ । ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে । এখন বাংলাদেশের বিজয়  মাস চলছে ।

       এই বিজয় মাসে তাই বাংলা সিনেমার কোনও রকমের আলোচনাই বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা ছাড়া হতে পারে না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সিনেমা নিয়ে বাকি আলোচনা করব পরের সপ্তাহে ।

শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২২ || কান্তিরঞ্জন দে || শনিবারের গদ্য

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২২

কান্তিরঞ্জন দে




মানুষের মিত্র ::সৌমিত্র


     সিনেমার হিরো হয়ে জনপ্রিয় হওয়া  কঠিন । কিন্তু আরও কঠিন সেই জনপ্রিয়তা দীর্ঘ দীর্ঘদিন ধরে   বজায় রাখা । তার চেয়েও কঠিন----প্রিয়জন হয়ে ওঠা  বা মানুষের মিত্র হয়ে ওঠা । সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন ধরে খুব সফলতার সঙ্গে সেই কাজটিই করে যেতে পেরেছিলেন ।  কি করে পারলেন ?


       ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার  নামক প্রথম ছবিতেই তিনি সফল হলেন । কিন্তু সেই  সাফল্য তাঁর মাথা ঘুরিয়ে দেয় নি । বরং , ওই সফলতার কারণেই তিনি  সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগের একটা পথ সারা জীবনের জন্য পেয়ে গেলেন।

 ছোটবেলা থেকে নাটক করতেন । কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে সেই চর্চা শিশিরকুমার ভাদুড়ীর মতো মহৎ শিল্পীর সান্নিধ্যে এসে আরও বেগবান হলো । রূপবান মানুষটি যৌবনের প্রথম দিনগুলো থেকেই শিল্প সংস্কৃতিমূলক কাজের মাধ্যমে জনজীবনে নিবিড় মেলামেশা করতেন । অপুর সংসার-এর   পর সিনেমাই   তাঁর কাছে হয়ে উঠল নিবিড় গণসংযোগের  প্রধানতম উপায় ।


      কবিতা লেখা , আবৃত্তি করা , নাটক লেখা কিংবা অনুবাদ করা , নাটক সব দিক থেকে পরিচালনা করা ------- এর সব ক'টাই তাঁর জনসংযোগ উদ্যমের ফসল । কিন্তু সবার মতো তিনিও জানতেন, একসঙ্গে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য সিনেমার চেয়ে বড় হাতিয়ার আধুনিক যুগে আর কিছু নেই । সেই কারণেই বাংলায় টেলিভিশন সিরিয়াল যখন  বিনোদনের জোরালো মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল , তিনি কিন্তু তাঁর খ্যাতি প্রতিষ্ঠা , সামাজিক উচ্চতাকে আঁকড়ে ধ‍রে নাক উঁচু করে ঘরে বসে রইলেন না । সিরিয়ালের অভিনয়েও অংশ নিতে লাগলেন । নব্বই দশকের মাঝামাঝি এক-দুই সিজন  পেশাদার যাত্রা মঞ্চেও অভিনয় করলেন ।

     অনেকে এর পেছনে অর্থলোভের গন্ধ পেতে পারেন । কিন্তু এই অনুমান ঠিক নয় । সৌমিত্রবাবু মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসতেন ।  সে কারণেই  সিনেমার পর্দা , মঞ্চ , টিভি কিংবা যাত্রা---অভিনয়ের যতগুলো মাধ্যম আছে-----সব ক"টিতেই তাঁর পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও পরিশ্রম ঢেলে দিয়েছিলেন ।


      সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে তাঁর সিনেমায় প্রবেশ । পরের দু-তিন বছরের মধ্যেই তপন সিংহ , অজয়  কর , অসিত সেন , মৃণাল সেন-এর  মতো দক্ষ ও মেধাবী পরিচালকদের ছবিতে  কাজ করার সূত্রে চলচ্চিত্র জগতে  সহজেই তাঁর  প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল । খুব অল্পদিনের মধ্যেই উত্তমকুমারের পাশাপাশি রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে বাংলা সিনেমায় তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছল ।

    কিন্তু তিনি তো শুধু অর্থ কিংবা গ্ল্যামারের মোহে সিনেমা জগতে আসেন নি । এসেছেন সিনেমা নামক  শিল্পমাধ্যম এবং অভিনয়কে ভালোবেসে । ততদিনে অবশ্য অভিনয় তাঁর পুরো সময়ের জীবিকা কিংবা পেশা হয়ে গেছে ।


       আমাদের দেশে পেশাদার শব্দটি প্রায়শই বিকৃত অর্থে ব্যবহার হয় । পরিপূর্ণ পেশাদার মানে কিন্তু শুধুই অর্থপিশাচ বোঝায় না । পেশাদার মানে-----যিনি অর্থ কিংবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার সম্পূর্ণ নৈপুণ্য এবং গুণে মানে সেরা কাজটি দেবেন । সেই অর্থে একজন মুদি দোকানদার , ছুতোর মিস্ত্রি কিংবা সিনেমার অভিনেতা----সবাই পেশাদার ।

    সিনেমায় সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয়ে সর্বোৎকৃষ্ট গুণমানে পৌঁছনোর জন্য সারাজীবন তাঁর মেধা , পরিশ্রম , নিষ্ঠা , অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতা বিনিয়োগ করে গেছেন । অভিনয় করেছেন ভালোবেসে । শারীরিক ক্ষমতার তুঙ্গে থাকবার জন্য আজীবন ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করে গেছেন । শুধু রূপ যৌবন ধরে রাখার জন্যই নয় । একজন অভিনেতা ( পর্দার কিংবা মঞ্চের ) যদি পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত একশো শতাংশ ফিট না থাকেন, তবে তার রিফ্লেক্স কমে যাবে । তিনি ভালো অভিনয় করতেই  পারবেন  না ।  


      দ্বিতীয় কথা , সারা পৃথিবীর মতো বাংলাতেও দর্শক নানা শ্রেণীর হয় । শুধুমাত্র পুরষ্কার প্রত্যাশী ছবিতেই অভিনয় করব , অন্য কোনও ধরণের ছবিতে অভিনয় করব না ------- এ রকম গোঁ ধরে বসে থাকলে , আর যাই হোক , তিনি জনতার শিল্পী হতে পারবেন না ।


        সৌমিত্রবাবু জনতার শিল্পীই হতে চেয়েছিলেন । আগেই বলেছি , অভিনয় তাঁর কাছে ছিল জনসংযোগ তৈরির হাতিয়ার । সে কারণেই , অভিনয় জীবনের দু তিনবছরের মধ্যেই শুধু রোম্যান্টিক হিরোর চরিত্রে আটকে না থেকে , নানা ধরণের বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন । বারবার নিজের ইমেজ ভেঙ্গেছেন।  এই ইমেজ ভাঙ্গার প্রচেষ্টা তাঁর আমৃত্যু জারী ছিল ।

       ঝিন্দের বন্দী ( তপন সিংহ /১৯৬১) ছিল সৌমিত্রবাবুর জীবনের সাত নম্বর ছবি । সেখানে তিনি ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন নি । অন্যদিকে, তেরো নম্বর ছবি " অভিযান"-এ ( সত্যজিৎ রায় / ১৯৬২) ছবিতেই তিনি ইমেজ ভাঙা কর্কশ রুক্ষ পাঞ্জাবী ড্রাইভার নর সিংয়ের চরিত্রে  প্রাণঢালা অভিনয় করেছিলেন ।

এই ভাবে প্রৌঢ় বয়সে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর শেষ ছবি " প্রতিশোধ " ( সুখেন দাস /২৯৮১) ছবিতেও ভিলেন কিংবা স্বপন সাহা পরিচালিত  আপাদমস্তক বাণিজ্যিক ছবি " মিনিষ্টার ফাটাকেষ্ট " ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে পেছ-পা হন নি ।


       এই কারণেই যতদিন বেঁচে ছিলেন , ততদিন তিনি ছিলেন দুই বাংলার নয়নের মণি । অবিভাজ্য বাঙালি সংস্কৃতির শেষ বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ।

      তাই তাঁর অসুস্থতার দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে সারা পৃথিবীর বাঙালিরা আন্তরিক ভাবে তাঁর আরোগ্য কামনা করে গেছেন । মৃত্যুর পরে করোণা ভয় উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ তাঁর  শেষযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন ।

      সব দিক থেকে , সত্যি অর্থে খাঁটি এই জনতার শিল্পীকে আমার আভূমি প্রণাম ।

শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ২১ || সিনেমা ও বিরতি || কান্তিরঞ্জন দে

 সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ২১)


সিনেমা ও বিরতি 

কান্তিরঞ্জন দে



       নমস্কার ।  উৎসবকালীন বিরতির পর আবার ফিরে এলাম । আমরা যখন সবাই মিলে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাই, তখন ছবির মোটামুটি আধাআধি সময়ে পর্দায় ভেসে ওঠে-------" বিরতি "।এ  আমাদের চেনা অভিজ্ঞতা।

       এই সুযোগে দর্শকেরা

হাত-পা  কোমরের খিল ছাড়িয়ে নেন । কেউ প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারেন । কেউ কেউ চা-কফি-ধূমপান করে নেন । অনেকেই  পেট ভরানোর কাজটি করেন ।  আসলে বিরতি হলো সিনেমা দেখার অবিচ্ছেদ্য অংশ । টানা  সিনেমা দেখা সত্যিই মুস্কিলের ব্যাপার । ষাটের দশকের বিখ্যাত হলিউডি ছবি " বেন হুর " কিংবা সত্তর দশকে রাজ কাপুর পরিচালিত " মেরা নাম জোকার " সহ আরও বেশ কিছু সিনেমায় দু তিনবার বিরতি দিতে হতো । কেন না, সেগুলো ছিল দু-ঘন্টার চেয়েও অনেক লম্বা সময় ধরে চলা সিনেমা ।

     

     টিভি ধারাবাহিকের যুগে বিজ্ঞাপনের বিরতি একটি বহু চেনা শব্দ । এই সময়ে ঘরোয়া দর্শক বিশ্রাম নিতে পারেন, অথবা হাতের কাজ এগিয়ে রাখতে পারেন। এমনকি , টিভিতে বহুল জনপ্রিয় সিনেমা দেখানোর সময় , কখনও কখনও বিজ্ঞাপনের বিরতি এতই লম্বা হয় যে , হাতের কাজ সেরে ফেলাও সম্ভব হতে পারে । একটি ধারাবাহিকের ২৫ মিনিটের এপিসোডে বিজ্ঞাপন বিরতি আসে সাধারণত , পাঁচ মিনিট পরপর । খবরের ক্ষেত্রে সেটি ১০/১৫ মিনিট অন্তর । ক্রিকেট হলে এই বিরতি আসবে ওভার শেষের  কিংবা উইকেট পতনের ঠিক পরেই । ফুটবলের ক্ষেত্রে বিরতি আবার  গোল, ফাউল, অফ-সাইড যে কোনও মুহুর্তেই আসতে পারে । অর্থাৎ , সুযোগ পেলেই হলো । এই বিজ্ঞাপনের বিরতিতে দর্শক পাবেন বিশ্রাম অথবা বিরক্তি । আর প্রযোজক বা চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পাবেন টাকা, অর্থাৎ , মুনাফা।

     ইউ টিউব কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা দেখার সময়  বিজ্ঞাপন-বিরতি আসতে পারে , যে কোনও মুহুর্তেই ।

     


      অথচ,   সিনেমায়  বিরতি ব্যাপারটিকে  একেবারেই  হাল্কাভাবে দেখা চলে না । কেন না , শুধু সিনেমা দেখা  বা  দেখানোর ক্ষেত্রেই নয় , সিনেমা বানানোতেও বিরতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । বিরতি সিনেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

      আমরা যখন কথা বলি, তখন একদমে কখনোই বলি না । সেটা অসম্ভব ব্যাপার । লেখার সময়েও দাঁড়ি কমা ব্যবহার করি । সেও ওই বিরতি দেবার জন্যেই । বিদ্যাসাগর মশাইয়ের আগের আমল পর্যন্ত লিখিত বাংলায় কোনও বিরাম চিহ্ন  বা  বিরতি চিহ্ন ছিল না । লিখিত  ইংরিজি ভাষার অনুসরণে বাংলা ভাষায় দাঁড়ি-কমা-কোলন-সেমি কোলন-জিজ্ঞাসা কিংবা বিস্ময়বোধক চিহ্ন ব্যবহারের শুরু ।


        সিনেমা যেহেতু  আর পাঁচটা মনের ভাব প্রকাশের ভাষার মতোই শিল্প মাধ্যমের একটি ভাষা , সুতরাং তাতে যে বিরতির ব্যবহার থাকবে, এ আর আশ্চর্যের কথা কি ।  লিখিত ভাষায় যেমন দাঁড়ি কমা, সিনেমায় তেমনি কাট, ফেড ইন , ফেড আউট, ডিজলভ্ ইত্যাদি  পদ্ধতির ব্যবহার । এগুলো সবই সিনেমার বিরতি চিহ্ন ।

      আবার গল্প-উপন্যাসে যেমন পরিচ্ছেদ বা পর্ব বিভাগ আছে , সিনেমায় সেগুলোর ব্যবহার সিন (  Scene ) কিংবা সিকোয়েন্স ( Sequence ) হিসেবে । 

        অভিনয়ের সময়ে অভিনেতা- অভিনেত্রীদের সংলাপ বলতে হয় , বিরতি দিয়ে দিয়ে । কণ্ঠস্বরের ওঠানামা কিংবা জোরে আস্তে  সংলাপ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে চরিত্রের মনের ভাব ও বক্তব্য প্রকাশ করতে হয় । তেমনি কখনও কখনও নীরব অভিব্যক্তি  দিয়েও অভিনয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটানো যায় । বস্তুত , সিনেমা যেহেতু দৃশ্যমাধ্যম , ফলে একটি সার্থক সিনেমা শব্দ, সংলাপ , সংগীতের তুলনায় নৈঃশব্দ্যের ভূমিকা নেহাত কম নয় । এই নৈঃশব্দ্য অনেকসময়ই সিনেমায় বিরাম চিহ্নের দায়িত্ব পালন করে ।

     মঞ্চ হোক , অথবা পর্দা , একটি কথা খুব শোনা যায় ------পজ অ্যাক্টিং ( Pause acting ) । অর্থাৎ সংলাপের মধ্যে মধ্যে নীরবতার বুনন । তাতে অভিনয়ের অভিঘাত  আরও  তীক্ষ্ণ হয় । কমেডি অভিনয়ের ক্ষেত্রে এটি এক মোক্ষম হাতিয়ার । যে অভিনেতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম  বিরতি অভিনয় যত ভালো , তাঁর কমেডি অ্যাক্টিং তত উচ্চপর্যায়ের । উত্তমকুমার  কিংবা রবি ঘোষের অভিনয়শৈলী খুঁটিয়ে দেখলেই পাঠক আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেন । 

      সিনেমায় দৃশ্যের নাটকীয়তা , বিশেষত , ভয়- সাসপেন্স- উদ্বেগের মুহূর্ত তৈরির ক্ষেত্রে একটি তুমুল শব্দময় দৃশ্যের পরে পরেই একটি নিঃশব্দ মুহূর্ত তীব্র  অভিঘাত  সৃষ্টি করে । সত্যজিৎ রায় সহ  আমাদের দেশের অথবা বিদেশের যে কোনও মহৎ পরিচালকের সিনেমা দেখলেই , পাঠক আমার বক্তব্যের সারমর্ম বুঝতে পারবেন। 

     দুটি দৃশ্যের মধ্যে ডিজলভ্ , মিক্স কিংবা ফেড ইন, ফেড আউট ব্যবহার করে  কাহিনীতে সময়ান্তর অথবা সময়ের ব্যবধান বোঝানো সম্ভব । এও বিরতি চিহ্নেরাই কারসাজি ।


       সুতরাং সিনেমায় বিরতি মানেই শুধুই পপকর্ণ খাওয়া আর পেপসি কোলায় গলা ভেজানোর অবসর বোঝায় না ।  শক্তি সামন্ত থেকে সত্যজিৎ রায়----- যে কোনও সিনেমা নির্মাতাকেই তাই সিনেমা তৈরির সময় বিরতি নামক অস্ত্রের সাহায্য নিতেই হয় । 

     তাই  বলছিলাম , বিরতি সিনেমারই এক অবিভাজ্য অংশ।

শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২০ || কান্তিরঞ্জন দে || সিনেমায় উৎসব, উৎসবের সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ২০

কান্তিরঞ্জন দে







    সিনেমায় উৎসব।। উৎসবের সিনেমা

       উৎসবের মরশুম এখনও চলছে । তাই সিনেমায় বাঙালির পুজো- পার্বণ, উৎসব  কিভাবে এসেছে সে নিয়ে আরও দু- চার কথা বলাই যায় ।
     ১৯১৯-এ প্রথম  বাংলা পূর্ণাঙ্গ কাহিনীচিত্রের জন্ম । আর এই সময় থেকেই বাংলা ( এবং ভারতীয় ) সিনেমা ধর্মভিত্তিক গল্প এ পুজো- পার্বণ , বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এবং লোক কাহিনী , পুরাণ ও পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে সিনেমা বানানোর রমরমা বাড়তে থাকে । এর কারণ কি ? কারণটা খুব সোজা ।
  ১) এই সব গল্প নিয়ে ছবি বানালে দর্শকদের ছবির গল্পটা জানা থাকে । ফলে , দর্শককে চট করে সিনেমা হলে টেনে আনা যাবে । ২) ধর্ম এবং ধর্মীয় গল্প বাঙালি ( এবং ভারতীয় ) জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে দর্শক মহলে সিনেমাগুলি দেখার একটা আগ্রহ সবয়সময়েই থাকবে । ৩) সিনেমায় গল্প বলার ক্ষেত্রে আবেগ একটা বড় উপাদান । আর ধর্মীয় গল্পগুলোতে  আবেগের ঘনঘটার কোনও খামতি নেই । সুতরাং গল্পে একটা নাটকীয়তা তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ । ৪) সিনেমায় মানুষ বিস্মিত হতে ভালোবাসে । আজও সিনেমায় কোনও এক রকমের চমক থাকলে দর্শকের দৃষ্টি চট করে আকর্ষণ করা সহজ হয় । সেদিক থেকে ধর্মীয় এবং পৌরাণিক কাহিনীগুলো একেবারে আইডিয়াল  । সিনেমার আদিকালে , সেই দুর্বল কারিগরির যুগেও পর্দায় চমক লাগানো নানারকম কারিকুরি ( আজকালকার ভাষায়, যাকে বলে স্পেশাল এফেক্টস্ ) দেখানোর অঢেল সুযোগ পাওয়া যায় । যেমন---- রাম রাবণের যুদ্ধে তীর ছোঁড়াছুড়ি , কিংবা দেবদেবীর অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড ।

      ফলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলা ( এবং ভারতীয় ) সিনেমায় দেবী দুর্গা , মা- কালী , মা লক্ষ্মী , শ্রীকৃষ্ণ , মহাদেব- শিব, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ইত্যাদি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে অজস্র সিনেমা তৈরি হতো । আজকাল পৌরাণিক সিনেমার ধারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়লেও , একেবারে অবলুপ্ত হয়ে গেছে , এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না ।
      আগেই বলেছি , সিনেমা দেখা ব্যাপারটা নিজেই একটা উৎসবের সমান । ফলে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সিনেমা বানালে ভক্ত দর্শকদের আনুকূল্যে সে সমস্ত ছবি বক্স অফিসে রমরমিয়ে চলত । প্রযোজকের নিশ্চিত মুনাফা , আর পরিচালকের মানসিক শান্তি নিশ্চিত জুটে যেত । এই ধরণের ছবিগুলো হলে রিলিজ হতো মূলত উৎসবের মরশুমেই । সিনেমা হয়ে উঠত উৎসবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

    উৎসবের সময় লোকের হাতে দু-চারপয়সা বেশি থাকে । ফলে এই ধরণের ছবি দেখাটা অধিকাংশ দর্শকের কাছে উৎসব উদযাপনের জরুরী অংশ হয়ে উঠত ।

      বেশি দূরে যাবার দরকার নেই। সত্যজিৎ রায় সহ বহু বিখ্যাত পরিচালকই খ্যাতি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবার পরেও চাইতেন , তাদের সিনেমাগুলো যেন পুজোর সময়ে হলে রিলিজ করে । তাহলে দর্শক সংখ্যা অনেক বেশি বেশি করে পাওয়া যাবে ।
       বাংলায় উৎসবের মরশুম   ভাদ্র- আশ্বিন মাসে , শরৎকালে দূর্গাপুজোর সময় শুরু হয়। চলে একেবারে সেই ইংরিজি নতুন বছর পেরিয়ে সেই দোল- উৎসব  পর্যন্ত । এই সময় শরৎ- হেমন্ত- শীত- বসন্ত কাল পর্যন্ত আবহাওয়াও থাকে অত্যন্ত চমৎকার । ফলে মানুষের মেজাজ মর্জি এই সময় অনেকটা হাল্কা থাকে 
    সে কারণেই , আজও বাংলা সিনেমার ছোটবড়ো নির্বিশেষে সমস্ত প্রযোজক , ডিস্ট্রিবিউটর এবং হল মালিকেরা চান , তাদের ছবিগুলো যেন এই উৎসবের মরশুমেই রিলিজ করে ।

     সে কারণেই , একদা বাংলাভাষায় দূর্গা , লক্ষ্মী , কালী , কৃষ্ণ , রামকৃষ্ণ , শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে অজস্র , অসংখ্য সিনেমা তৈরি হয়েছে । ভক্তিমান দর্শক আনন্দ পেয়েছেন । প্রযোজক লাভের কড়ি ঘরে তুলেছেন । বাংলা ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রি সচ্ছলতার মুখ দেখেছে । 

     এতে কি  ইণ্ডাস্ট্রি সচল থাকলেও এর ফলে বাংলা সিনেমা কি সমৃদ্ধ হয়েছে ?? রুচিশীল , সংবেদনশীল , শিক্ষিত বাঙালি এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন । এক কথায় এর উত্তর হল----- না । কারণ , সিনেমা এই অলৌকিক ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছবি ক‍রতে গিয়ে অনেক সময়েই তার স্বধর্ম থেকে চ্যূত হয়েছে । এমন কি , অনেক সময় সে  রুচিসম্পন্ন সাহিত্য থেকেও অনেকটা দূরে সরে গেছে ।
    
     আমরা সাহিত্য এবং সিনেমার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে বলতে উৎসব প্রসঙ্গে চলে এসেছিলাম । আগামী সপ্তাহে আবার সিনেমা ও সাহিত্য  বিষয়ে ফিরে যাবার ইচ্ছে আছে ।


শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৯) || কান্তিরঞ্জন দে || উৎসব ও সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৯)

কান্তিরঞ্জন দে



উৎসব ও সিনেমা

------------------------------


       সিনেমা নিজেই একটা উৎসবের সমান ।  সবাই মিলে  সিনেমা দেখা কিংবা দেখতে যাওয়া একটা উৎসব । অনেকগুলো  সৃষ্টিশীল মানুষ  মিলে একটা সিনেমা তৈরি  একটা সমবেত উদযাপন । বর্তমান যুগে  একা একা সিনেমা যদিও  বা  দেখা যায়  , একা একা সিনেমা বানানো একেবারেই অসম্ভব ।


       সিনেমা কিসের  উৎসব ? কিসের আবার ? দৃষ্টিসুখের । প্রায় দু ঘন্টা কিংবা কাছাকাছি সময় ধরে আমরা ( বড় অথবা ছোট )  পর্দায় যে গল্পটি উপভোগ করি ----তা তো আসলে এক ধরণের বিনোদনই । অনেকে ভাবেন , বিনোদন মানে শুধুই হাসি , শুধুই আনন্দ । কিন্তু গভীর আনন্দেও তো আমাদের চোখে কখনও কখনও জল আসে । আসে না কি ? ভারতীয় হোক , অথবা পাশ্চাত্যের-----নন্দনতত্ত্ব বলে , এ-ও  এক ধরণের  গভীথ বিনোদন । ইংরিজিতে এর একটা গুরুগম্ভীর নাম আছে----- ক্যাথারাসিস । আবার , নায়ক- নায়িকার দুঃখে   কাঁদে  না , এমন পাষণ্ড দর্শক কেউ আছে নাকি । ওই  কান্নাও আমাদের চিত্তকে বিশুদ্ধ করে । এ-ও একধরণের  ক্যাথারাসিস বা আত্মমোক্ষণ ।


          যাই হোক, অতশত জটিল তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা যাব না । ভারতবর্ষ মহাকাব্যের দেশ । এ দেশের মানুষ  গোষ্ঠীগতভাবে  পাশ্চাত্যের  মানুষের  চেয়ে  অনেক বেশি আবেগ নির্ভর । অতএব, এ দেশে খুব বেশি যুক্তি বুদ্ধি নির্ভর  শুকনো ইন্টেলেকচুয়াল সিনেমা বানালে  দর্শক আনুকূল্য পাওয়া ভীষণ মুস্কিল । এ কথা বহুবছর ধরে বারেবারে প্রমাণিত ।


        সত্যজিৎ রায়ের কথাই ধরুন না । তাঁর তৈরি  পথের পাঁচালী দেখতে দেখতে কাঁদেন না , বা কাঁদেন নি , এমন দর্শক ভূ-ভারতে আছে নাকি ?  ভিন রাজ্যের কিংবা , ভিন দেশের অ-বাংলাভাষী মানুষেরা , এমনকি সাহেব-মেমরা পর্যন্ত , আজও পথের পাঁচালী দেখে চোখ মুছতে মুছতে হল থেকে বেরোন । এ হচ্ছে এক উঁচু স্তরের বিনোদন । সিনেমার গল্পের বিষয়বস্তু যত গভীর রসের হবে , পরিচালক যত গভীর দক্ষতার সঙ্গে সিনেমার ভাষার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে তাকে পর্দায় হাজির করতে পারবেন ------ দর্শক তত বেশি গভীর রসের বিনোদন পাবেন । অবশ্য,   দর্শককেও তার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে বৈ কি । এ দুনিয়ায় মুফতে , বিনা পরিশ্রমে কোনও দিন কিছু পাওয়া যায় ?


       এই কথাতেই ফিরে আসি আমাদের বিগত কয়েকদিনের আলোচনায় । দর্শক সিনেমা দেখায় নিজেকে শিক্ষিত করতে চাইলে ,তাকে  শিল্প সংস্কৃতির প্রতিটি শাখা বিষয়েই ন্যূনত  ধারণাটুকু নিয়ে রাখতে হবে । আর  চিত্র পরিচালক হতে চাইলে তো প্রতিটি শিল্প মাধ্যম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতেই হবে।


       আগের দুটো কিস্তিতে সিনেমার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম । আগামীতে এ বিষয়ে আরও কিছু কথা বলে নিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে যাব"খন ।


      শেষে আবার বলি , শারদ উৎসব যেমন শুধুমাত্র ঠাকুর দেখার ব্যাপার নয় , গভীর অনুচিন্তনের ব্যাপারও বটে । সিনেমাও তেমনি শুধুই চোখের খিদে মেটানোর ব্যাপার নয় ।

     যারা অতশত সাতপাঁচ ভাবতে রাজি নন, এমন কি, তেমন মানুষজনও   উৎসবের পাঁচদিনের মধ্যে একদিন , ঘোরাঘুরি , ঠাকুর দেখা , রেস্টুরেন্টে ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া-র পাশাপাশি  সপরিবারে সিনেমা দেখার জন্যও বরাদ্দ রাখেন।


       সিনেমা এখানেই বাঙালির কাছে উৎসবের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে ।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১৮) || কান্তিরঞ্জন দে || সাহিত্য এবং / অথবা সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১৮)

কান্তিরঞ্জন দে



সাহিত্য  এবং / অথবা সিনেমা


      আগেই বলেছি , বাংলায় সাহিত্য এবং সিনেমা এই দুটো শিল্প মাধ্যমে  আজও কিছু ভুল বোঝাবুঝি আছে ।  এর কারণ , বাংলা সংস্কৃতির সংসারে সাহিত্য হল বড় ভাই এবং সিনেমা মাধ্যম তার অনুজ ।  তাই এই দুই মাধ্যমের সম্পর্কটি বুঝতে অনেকেই ভুল করেন ।

       প্রথমেই বুঝতে হবে যে সিনেমা প্রয়োজনে  সাহিত্য থেকে গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি উপকরণ হিসেবে নেয় ঠিকই ,  তবে সাহিত্যকে অনুসরণ কিংবা অনুকরণ করবার কোনও দায় সিনেমার নেই । দুটো সম্পূর্ণ আলাদা শিল্প মাধ্যম । দুটোর প্রকাশ রীতি একেবারেই আলাদা । একটা যদি আপেল হয় , অন্যটি কমলালেবু । দুটোই রসালো ফল । ব্যস্ , দুজনের মধ্যে মিল বলতে এটুকুই । আর কিছু নয় ।


        সত্যজিৎ রায়ের " পথের পাঁচালী " বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিত্র রূপান্তর মাত্র । হুবহু চিত্র অনুবাদ কখনোই নয় । পথের পাঁচালী প্রায় চারশো পাতার উপন্যাস । অসংখ্য চরিত্র  এবং অসংখ্য ঘটনা   মিলিয়ে এক মহৎ সাহিত্যকর্ম। " আম আঁটির ভেঁপু " সিগনেট প্রেস প্রকাশিত তারই এক কিশোর পাঠ্য সংক্ষিপ্ত সংস্করণ । সেটিও মাত্র দেড়শো পাতা আয়তনের হলেও তাতেও প্রচুর চরিত্র এবং ঘটনা ।

     সত্যজিৎ রায় ওই আম আঁটির ভেঁপু থেকেই সিনেমার জন্য প্রয়োজনীয় চরিত্র এবং ঘটনাগুলোকে সিনেমার উপযোগী করে সাজিয়ে সিনেমার নিজস্ব উপস্থাপন রীতির ব্যাকরণ মেনে পর্দায় হাজির করেছিলেন । উপন্যাসে ইন্দির ঠাকরুণ মারা যান , উপন্যাস শুরুর কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যেই । সত্যজিৎ রায়  সিনেমার প্রয়োজনে ( বলা ভালো , সিনেমার নাটকীয়তার প্রয়োজনে ) এই চরিত্রটিকে বাঁচিয়ে রাখেন আরও বেশ কিছুক্ষণ । এইরকম টুকিটাকি পরিবর্তন সিনেমাটিতে আরও বেশ কিছু  ছিল ।

         ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট পথের পাঁচালী রিলিজ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে সময় সিনেমার বৈশিষ্ট্য না বোঝা বেশ কিছু  সাহিত্য প্রেমিক হৈ চৈ বাঁধিয়ে বসেছিলেন । তাদের অভিযোগ----- সত্যজিৎ পথের পাঁচালীকে বিকৃত করেছেন । ১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায় যখন রবীন্দ্রনাথের  বড় গল্প " নষ্টনীড়" থেকে চারুলতা নির্মাণ তখন তো হৈ হট্টগোল একেবারে তুঙ্গে উঠেছিল । পরিচয় পত্রিকায় লম্বা চিঠি লিখে সত্যজিৎবাবুকে প্রায় পাখি পড়ার মতো করে ব্যাখা করতে হয়েছিল যে , সিনেমায়  মূল গল্প কি কি  অদলবদল জরুরী ছিল এবং কেন সেগুলো জরুরী ছিল ।


       সত্যজিৎ রায় ছাড়াও বাংলার আরও অনেক পরিচালকদের ছবি নিয়েও বিশুদ্ধ সাহিত্য প্রেমিকেরা  বিভিন্ন সময়েই আপত্তি তুলতেন । আজকাল অবশ্য এ ব্যাপারটা একটু কমেছে ।

       তবুও বলব , আজও বাংলায় সিনেমা মাধ্যমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য গুলো উপলব্ধি করবার লোক যথেষ্ট কম । বাংলায় সাহিত্য নির্ভর সিনেমা বানানোটাই অনেকটা কমে গেছে । সে কারণেই হয়তো চ্যাঁচামেচিটা কমেছে । যথার্থ সিনেমা রসিক ও বোদ্ধার সংখ্যা খুব একটা যে বেড়েছে , এমন কথা বলা মুস্কিল ।


        সাহিত্য নির্ভরতা ছিল , বাংলা সিনেমার পক্ষে সে-ও একরকমের ভালো ছিল । এখন তো সিনেমার নামে  বাংলা সিনেমায় বাইরের চাকচিক্যের দিকে যতটা নজর দেওয়া হয় , বিষয়ের গভীরতার দিকে ততটা নজর দেওয়া হয় কি ?


         পশ্চিমবঙ্গের ( এবং সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশেরও ) বাংলা সিনেমার  নিজস্ব ভাষা খুঁজে নিয়ে , নিজের পায়ে দাঁড়াতে যথেষ্ট দেরি আছে । কত দেরি ? বলা খুব মুস্কিল । 

     সব কিছু দেখে শুনে মনে হয় , বর্তমান যুগের বাংলা সিনেমা সাহিত্যের হাত ছেড়ে একসময়  পেছন দিকে হাঁটা শুরু করেছিল । ইদানীং  আবার সবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ।

     সামনে এগোচ্ছে কি ? সে কথা জোর বলা খুব মুস্কিল।

শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ~১৭ || কান্তিরঞ্জন দে || অক্ষর ও দৃশ্য ।। সাহিত্য ও সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১৭)

কান্তিরঞ্জন দে



  অক্ষর ও দৃশ্য ।। সাহিত্য   ও     সিনেমা   ।


        প্রচলিত  সব শিল্পমাধ্যমের   ভেতরের আসল বস্তুগুলোকে  হজম করে তবেই  সিনেমা মাধ্যমটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে---- এ কথা আগেই বলেছি । সাহিত্য দিয়েই শুরু করা যাক।

     সাহিত্যরসিক  জাতি হিসেবে  বাঙালি  মহলে  সিনেমার  সঙ্গে   সাহিত্যের আজও কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি রয়ে গেছে । অনেক অভিজ্ঞ সাহিত্যিকও অনেক সময়  সাহিত্য-ভিত্তিক সিনেমার স্বাতন্ত্র্য  মানতে চান না , অথবা আসল ব্যাপারটা তার জানা নেই বলে , বুঝতে ভুল করেন।


       সাহিত্যের যতগুলো শাখা আছে ------- কবিতা , গল্প , উপন্যাস , নাটক, প্রবন্ধ --------- তার   সবক'টি  তৈরি হয় , অক্ষরের পর অক্ষর  , অর্থাৎ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে । আর সিনেমা তৈরি হয় , দৃশ্যের ( শট ) পর  দৃশ্য সাজিয়ে । এইখানেই দুটো মাধ্যমের মধ্যে একেবারে মৌলিক তফাৎ হয়ে যায় ।

     অক্ষর বা শব্দ ব্যাপারটা তো বুঝি , কিন্তু শট ( Shot ) কি জিনিস ? এ হচ্ছে দৃশ্যের একেবারে মৌলিক একক । ক্যামেরা একবার খুলে বন্ধ করার আগে একবারে যা রেকর্ড  করে নিতে পারল , তাকেই আমরা বলতে পারি শট । সংক্ষেপে একে বলা যেতে পারে দৃশ্যাংশ । সাহিত্যে যেমন ---প্যারাগ্রাফ , সিনেমায় তেমনি   সিন  ( Scene )। সাহিত্যে  যেমন ------ পরিচ্ছেদ  বা পর্ব , সিনেমায় তেমনি সিকোয়েন্স ( Sequence ) । সিকোয়েন্সের পর সিকোয়েন্স সাজিয়ে সাজিয়েই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমা ।


       সাহিত্য ও সিনেমা দুটি মাধ্যমই মূলত গল্প বলার কাজ করে থাকে । তথ্য, তত্ত্ব , যুক্তি দিয়ে গদ্য সাহিত্যে  যখন কিছু প্রকাশ করি ---- তখন তাকে বলি , প্রবন্ধ। আর সিনেমাতেও দৃশ্য পরম্পরার মধ্য দিয়ে তথ্য, তত্ত্ব , যুক্তি হাজির করতে পারি । তখন তাকে বলব ----তথ্যচিত্র । কথাটা ইংরিজি ডক্যুমেন্টারী শব্দের বাংলা অনুবাদ । বাংলাদেশের চলচ্চিত্র রসিক বন্ধুরা আরও সুন্দর করে বলেন ----- প্রামান্য চিত্র বা দলিল চিত্র । 


      সাহিত্য এবং সিনেমা দুই-ই  গল্প করার কাজ করলেও মাধ্যম ভেদে তাদের উপস্থাপনার পদ্ধতি ,খুব  স্বাভাবিক কারণেই আলাদা । গল্প বা উপন্যাসে চরিত্রের মনের মধ্যে কি ঘটছে , সেটা বোঝাবার জন্য লেখককে অনেক সময়ই পাতার পর পর বর্ণনা দিতে হয় । সিনেমায় যেহেতু সবটাই  চাক্ষুষ করা যায় ,  সেক্ষেত্রে পর্দায় হয়তো একটা ছোট কোনও ঘটনা বা কাজ ( অ্যাকশন ) দিয়েই বিষয়টা চট্ করে বোঝানো যেতে পারে । 

     এখানে একটা জিনিস পরিস্কার করে নিই ।  কাঁচা বাণিজ্যিক  হিন্দি সিনেমার কুপ্রভাবে আজকাল অ্যাকশন বললেই ঢিসুম ঢিসুম মারপিট বোঝেন । কিন্তু ইংরিজি " অ্যাকশন " শব্দের আসল অর্থ তো ---- কাজ । ঢিসুম ঢিসুম মারপিট থেকে চোখের  পলক ফেলার মতো সূক্ষ্ম জিনিস ---- সব কিছুই তাই সিনেমায় অ্যাকশন । 


       এ কারণেই , অভিনয় ------- যা গল্প বলা সিনেমার অন্যতম হাতিয়ার , তাকে ইংরিজিতে বলা হয়----- অ্যাক্টিং। আমি যা নই , আমার চলন-বলন , আচরণ , কথাবার্তা , অর্থাৎ সামগ্রিক  কাজের মধ্য দিয়ে  সেটাকে ফুটিয়ে তোলাটাই হল , অভিনয়  অথবা অ্যাক্টিং।


       সিনেমায় অভিনয়ের অন্যতম উপাদান  হল সংলাপ বা ডায়ালগ ------- যা  গল্প-উপন্যাসেরও  প্রধান উপাদান ।  সিনেমা যেহেতু দৃশ্যগত মাধ্যম, তাই সেখানে সংলাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সংযমী এবং সতর্ক থাকতে হয় ।  সিনেমায় যদি শ্রুতিনাটক , মঞ্চনাটক কিংবা যাত্রার মতো একগাদা " ডায়ালগ " থাকে , তবে তা অতিকথন দোষে দুষ্ট হতে বাধ্য । যতই মারকাটারি হোক , কিংবা শুনতে যতই  জমকালো হোক , সিনেমায় বাড়তি  সংলাপ একেবারেই চলে না । 


     সাহিত্যের শাখাগুলোর সঙ্গে সিনেমা মাধ্যমটির  সম্পর্ক এবং তফাৎ নিয়ে আরও কিছু কথা  আছে । কিন্তু , সে সব  বলব , রয়ে সয়ে , ধাপে ধাপে । একবারে টানা বলে গেলে , আপনাদের ধৈর্যচ্যূতি ঘটতে পারে ।

শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২০

ব্যক্তিত্ব || কান্তিরঞ্জন দে ----- দৈনিক বাংলার নিজস্ব কলম

ব্যক্তিত্ব || কান্তিরঞ্জন দে

-----



দৈনিক বাংলার নিজস্ব কলম


         জন্ম ১৯৫৭। কলকাতায় । পড়াশুনো নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে। দর্শনে স্নাতক । সাহিত্য , সিনেমা এবং সাংবাদিকতার টানে এবং পারিবারিক কারণে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাঠ  অসমাপ্ত রাখতে বাধ্য হন।

       গল্প-কবিতা লেখা এবং  অভিনয়-আবৃত্তি-বিতর্ক চর্চার শুরু নরেন্দ্রপুরের স্কুল জীবন থেকেই । কলেজ জীবনে  ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন । আকাশবাণী-র যুববাণী বিভাগে প্রায় দশবছর কথিকা রচনা ও পাঠ করেছেন । যুগান্তর , পরিবর্তন , আজকাল সহ বিভিন্ন খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিনে এই সময় থেকেই নিয়মিত লেখালেখি ।

         বর্তমান সংবাদপত্রে সাব-এডিটরের চাকরি করেছেন বেশ কিছুদিন ।

     নন্দন এবং  চিত্রবাণী - কলকাতার চলচ্চিত্র কেন্দ্রে চিত্রনাট্য রচনা এবং চলচ্চিত্রের বিভিন্ন একাধিক কোর্সের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন । আনন্দবাজার পত্রিকার বিখ্যাত চিত্র সাংবাদিক শ্রী তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রায় বছর দুয়েক স্টিল ফোটোগ্রাফিরও তালিম নিয়েছেন ।

     সহকারী পরিচালক কিংবা সহযোগী চিত্রনাট্যকার হিসেবে টালিগঞ্জে যাতায়াত শুরু আশি-র দশকের শেষ ভাগ থেকে ।

    ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ ---এই আট বছরে সরকারি-বেসরকারি প্রযোজনায় পাঁচটি তথ্যচিত্র, সংবাদচিত্র এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র পরিচালনা করেছেন । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-----১৯৯৭ সালে নেতাজী-র জন্ম শতবর্ষে কলকাতা দূরদর্শনের জন্য " সুভাষচন্দ্র ও মহাজাতি সদন " শীর্ষক ২৭ মিনিটের ডক্যুমেন্টারী ছবিটি ।

        ১৯৯৪ সাল থেকে ডঃ স্বপন সাহা , মণি অধিকারী , দীপরঞ্জন বসু , সনৎ দাশগুপ্ত এবং রাজা সেন সহ একাধিক পরিচালকের সঙ্গে বহু ছবিতে চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং সহকারী ও সহযোগী পরিচালক  হিসেবে কাজ করেছেন ।

    এককালে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিনা নামে বেশ কিছু টিভি সিরিয়ালের  একাধিক এপিসোডও  লিখেছেন ।

   তার লেখা উল্লেখযোগ্য টেলি ফিল্ম ----- চন্দ্রাবতী কথা , রাজার কুমার , শ্বেত কপোত , মারণ অস্ত্র , শীত , অজ্ঞাতবাস ইত্যাদি ।

     প্রহর শেষে , কৃষ্ণকান্তের উইল , মৌ বনে আজ ইত্যাদি ছবিতে সহযোগী পরিচালক ও সহ চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবে কাজ করেছেন ।

      রাজা সেন পরিচালিত " মায়ামৃদঙ্গ " কাহিনীচিত্রের চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং গীতিকার হিসেবে ২০১৬ সালে RADIO MIRCHI চ্যানেল থেকে বছরের সেরা ফিল্মি গীতিকারের পুরষ্কার পেয়েছেন ।

     বছর চারেক কলকাতার একটি বে-সরকারি ফিল্ম ইনস্টিটিউটে সিনেমার ইতিহাস এবং চিত্রনাট্য রচনার  বিষয়ে শিক্ষকতাও করেছেন ।

  

      সিনেমা সহ সাহিত্য ও শিল্পের নানা বিষয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লেখেন । সুবক্তা ।


      প্রকাশিত গ্রন্থ ------বর্ণ সঙ্কর ( দুই বন্ধুর সঙ্গে যৌথ কবিতার বই ) , রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র ভাবনা ও সত্যজিৎ রায়  ( প্রবন্ধের বই ) ।  বিখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে গতবছর প্রকাশিত গ্রন্থ " সাক্ষাৎ-স্মৃতি " পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছে ।


     ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীত সহ দেশ বিদেশের  সব ধরণের গান শুনতে ভালোবাসেন । আর ভালোবাসেন সারাদিন বই পড়তে এবং দিনভর আড্ডা দিতে ।



  

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ১৬ || কান্তিরঞ্জন দে || সিনেমা দেখার " হাজার মজা "

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ১৬

কান্তিরঞ্জন দে



সিনেমা দেখার  " হাজার মজা "


          হাজার না হলেও , সিনেমা দেখার " মজা"টা  বহু স্তর বিশিষ্ট । সিনেমা যেহেতু শিল্প মাধ্যমের সংসারে নবীনতম সদস্য , তাই সে যুগ  যুগ ধরে প্রচলিত  চিত্রকলা , সংগীত , কবিতা , গল্প ,উপন্যাস,নাটক , স্থাপত্যবিদ্যা কিংবা ভাস্কর্যের মতো প্রচলিত শিল্প মাধ্যমগুলির  অন্তর্নিহিত বিভিন্ন গুণাবলী আত্মস্থ করেই নিজে আধুনিকতম শিল্পমাধ্যম হয়ে উঠেছে ।


        সুতরাং , সিনেমা দেখার একান্ত  নিজস্ব " মজা"টা  ঠিকঠাক পেতে গেলে আপনাকে ওই সমস্ত শিল্প মাধ্যমগুলোর সবকটারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো  সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক ধারণাটুকু নিয়ে রাখতে হবে ।


     বিখ্যাত চলচ্চিত্র- সমালোচক , পরিচালক এবং  ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সর্বভারতীয় স্তরের অন্যতম সংগঠক শ্রী চিদানন্দ দাশগুপ্ত    সিনেমার   সংজ্ঞা দিতে  গিয়ে ভারি চমৎকার করে বলেছেন  যে , ------- " সিনেমা  , এ যাবৎ প্রচলিত সব ক'টি শিল্পমাধ্যমের , বিজ্ঞান   দ্বারা সংযুক্ত  একটি   সংমিশ্রণ ।"


     সিনেমায়  আপনি পেইন্টিয়ের রঙ, রূপ , রেখা এবং বস্তু সংস্থাপন বা কম্পোজিশনের  মজা পাবেন । গল্প-উপন্যাসের কাহিনী বর্ণনার আনন্দ পাবেন । কাব্যের রহস্যময়তা পাবেন । তাছাড়াও পাবেন সংগীতের তাল লয় ছন্দ   ও   গতিবৈচিত্র্যের মজা  এবং স্থাপত্য ও ভাস্কর্যবিদ্যার গঠন ও নির্মাণশৈলীর  কারুকাজ। অতএব , বুঝতেই পারছেন , ওইসব মাধ্যমগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে যদি আপনার মৌলিক ধারণা থাকে , তাহলে আপনার পছন্দের সিনেমাটি  ( সেটি ক্ল্যাসিক হোক চাই , না হোক )  দেখতে দেখতে আপনি এক বহুমাত্রিক আনন্দের ভাগিদার হয়ে উঠতে পারবেন। সিনেমা তখন আপনার কাছে  শুধুই মজা-র ব্যাপার কিংবা সস্তার বিনোদন হয়ে থাকবে না । গভীর অর্থবহ এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে ।

এই যে এতগুলো শিল্পের বৈশিষ্ট্য , সিনেমায় সেটি সংমিশ্রণের  কাজটি  করে থাকে  বিজ্ঞান ।  সহজ করে বলতে গেলে পদার্থবিদ্যা এবং ইলেকট্রনিকস্। লেখকের হাতের মূল উপকরণ যেমন কালি,  কলম , কাগজ  ( হাল আমলে সেটা অবশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কালি-কম্পিউটার-কী বোর্ড ।) , সিনেমার ক্ষেত্রে তেমনি মূল উপকরণ হচ্ছে ক্যামেরা । আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে ---লেন্স । এই লেন্স বস্তুটি মানুষের চোখের দৃষ্টির চেয়েও বেশি শক্তিশালী । ফলে,  ক্যামেরাম্যান ( সিনেম্যাটোগ্রাফার )   অথবা পরিচালক স্বয়ং , যিনিই ক্যামেরাটা চালান না কেন , তিনি  লেন্সের ওই ফুটোর মধ্য দিয়েই বস্তুময় বিশ্বরূপকে ধারণ করেন । এই লেন্স ব্যাপারটি হচ্ছে পদার্থবিদ্যা-র মধ্যেকার অপটিকস্ নামক চর্চার অন্তর্ভুক্ত । 

            সেই জন্যই পুণে বা কলকাতার সরকারি ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ক্যামেরার শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হতে চাইলে আপনার ফিজিক্সে অনার্স থাকতেই হবে। 

       আপনি যদি  নিছক সুরসিক সিনেমা দর্শকও হতে চান , তাহলেও আপনাকে বিভিন্ন দূরত্বের লেন্স এবং তাদের মধ্যেকার পার্থক্য  বিষয়ে মোটামুটি ওয়াকিবহাল থাকতেই হবে।

      লেন্স দিয়ে যে ছবি তোলা হল , ক্যামেরায় আজকাল সেটা ধারণ ( রেকর্ড ) করা হয় ,ইলেকট্রনিক  পদ্ধতিতে । বছর দশেক আগেও এ ক্ষেত্রে রসায়নবিদ্যা-র ( কেমিস্ট্রির ) একটা ভূমিকা ছিল । তখন লেন্সের ফুটো দিয়ে আলো ঢুকিয়ে পাতলা  রাসায়নিক  আস্তরণ ওয়ালা পলিথিনের ফিল্মের ওপরে আলো-ছায়া দিয়ে ছবি ধারণ  ( রেকর্ড ) করা হত । এ হল একধরণের আলোছায়ার আঁকিবুকি । পরে ল্যাবরেটারিতে বিশেষ রাসায়নিক তরল দিয়ে সেই ফিল্মটিকে নানা পর্বে ধুয়ে ধুয়ে  ছবিটিকে পরিস্ফুট বা স্পষ্ট  করা হত । স্টিল ছবির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ছিল একই । এখন অপটিক্যাল ফিল্ম বিলুপ্ত । ফলে ,  ল্যাবরেটরিগুলোও সব উঠে গেছে । সারা পৃথিবী থেকেই ।

ছবি ধারণ ও পরিস্ফুটনের ক্ষেত্রে রসায়নের জায়গা এখন নিয়েছে , ইলেকট্রনিকস্।


        আপনি যখন , সিনেমাহলে , কিংবা টিভিতে , কিংবা কম্পিউটারে , কিংবা হাতের মুঠোফোনে একটি সিনেমা দেখছেন , তখন সেটি স্পষ্ট দেখছেন না ঝাপসা দেখছেন ----- তার ওপর আপনার সিনেমা দেখার আনন্দ পাওয়া না পাওয়া অনেকটা নির্ভর করে বৈকি । যেমন  টাইপিং কিংবা ছাপার গোলমালে  আপনার প্রিয় উপন্যাসের রসগ্রহণ ভেস্তে যেতে পারে , তেমনি সিনেমার ক্ষেত্রেও পর্দায় আপনি  সিনেমাটা কতটা নিখুঁত দেখতে পাচ্ছেন , তার ওপরে অনেককিছু নির্ভর করে । 

    সিনেমাহল ছাড়া অন্যান্য সিনেমা দেখার পদ্ধতি গুলো  দর্শক হিসেবে আপনি নিজে হাতে অনেকটা কন্ট্রোলও করতে পারেন।


      সে যাই হোক , ব্যাপারটা তাহলে দাঁড়াল এই যে ----- সিনেমার গভীর আনন্দ পেতে গেলে আপনাকে শুধু আগ্রহী হলেই হবে না ।  রসিক হিসেবে নিজেকে যোগ্য করে তুলতেও হবে । বুজতেই পারছেন  ------ জটিলকে সহজ করে তোলার নামই আধুনিকতা । যন্ত্রযুগের শিল্পমাধ্যম সিনেমা তাই , আপনার কাজ থেকে আরেকটু উদ্যম আশা করে ।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৫) || কান্তিরঞ্জন দে || সিনেমা দেখুন মগজ দিয়ে ।

 সবাই মিলে সিনেমা হলে  (১৫)

কান্তিরঞ্জন দে



সিনেমা দেখুন মগজ দিয়ে ।


       সিনেমা দেখতে গেলে চক্ষুষ্মান তো হতেই হবে।  কিন্তু , শুধু একজোড়া চোখ থাকলেই ঠিকঠাক সিনেমা দেখা যায় না । তার জন্যে চাই অন্তর্দৃষ্টি । এই অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয় মগজ আর হৃদয়ের ঠিকঠাক মেলবন্ধনে । 


        বিশ্ব  , ভারত   এবং বাংলা  সিনেমার আদিযুগ থেকে তৈরি সিনেমাগুলি  ধারাবাহিক ভাবে আপনার দেখা আছে ? তাহলে আপনি সিনেমার শিল্পরূপের রসগ্রহণে অনেকটা তৈরিই আছেন , বলা চলে । যে সব ছবিগুলি আপনার ইতিমধ্যেই ভালো লেগেছে , সেগুলো বারবার দেখুন । কম্পিউটারে কিংবা স্মার্টফোনে ফ্রেম থামিয়ে থামিয়ে দেখুন । কোনও একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য , কেন আপনার ভালো লেগেছে ও লাগছে , সেটা অনুভব করবার চেষ্টা করুন । মগজ  অর্থাৎ , বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করুন । এই  মুঠোবন্দি সিনেমার যুগে  এইভাবে খণ্ড খণ্ড করে সিনেমা দেখা অসম্ভব বা কঠিন কিছু নয় । চল্লিশের দশকের গোড়ায় চ‌লচ্চিত্র- উৎসাহী সত্যজিৎ রায় তার অফিসের টিফিন টাইমে, ম্যাটিনি শো শুরুর অনেক আগে , ধর্মতলা পাড়ার সিনেমা হলগুলোতে গিয়ে ( মূলত , লাইটহাউস সিনেমা হলে ) প্রোজেক্টরম্যানকে " খুশি " করে একেকদিন একেকটা রিল বারবার চালিয়ে চালিয়ে দেখতেন ।


         সিরিয়াসলি যদি সিনেমা দেখতে চান, তাহলে আপনার পছন্দমতো , অথবা কোনও অভিজ্ঞ- সিনেমা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো আগাম একটি লিস্টি বানিয়ে নিন । মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ জীবনে চলচ্চিত্রে উৎসাহী মৃণাল সেন , তার দৈনন্দিন ডায়েরিতে এ রকম একটা তালিকা তৈরি করে রাখতেন । কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় বার করে এই ভাবে তালিকা মিলিয়ে সিনেমা দেখতেন ।


        ১৯৪৭/ ৪৮ সাল বা তার পরবর্তী বেশ কিছু বছরে ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হিসেবে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল, চিদানন্দ দাসগুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্তেরা তাদের সোসাইটির শো-তে একটি ছবি একবার দেখে ভালো লাগলে , নির্দিষ্ট দৃশ্যের রীলগুলো বারবার বারবার চালিয়ে চালিয়ে দেখতেন ।

          সেই ৭০ /৭২ বছর আগে কোথায় ভিডিও ক্যাসেট ? কোথায় সিডি ? কোথায় ডেস্কটপ- ল্যাপটপ আর কোথায়ই বা মুঠোফোনে ইউ টিউব ?? কি অদম্য উৎসাহ  আর তীব্র আগ্রহ একবার ভাবুন ।

     এদের মধ্যে পরবর্তী কালে সবাই তো আর পরিচালক হন নি । কিন্তু অনেকেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র গবেষক , তাত্ত্বিক, প্রাবন্ধিক হয়েছেন । যারা তা হন নি , তাদের   মধ্যেও অনেকেই পরবর্তী কালে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের গুণী সংগঠক অথবা সরকারের বিভিন্ন চলচ্চিত্র কেন্দ্রের প্রশাসক হিসেবে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । যারা সে-সবও হন নি, তারা খাঁটি গুণী চলচ্চিত্র-রসিক দর্শক হয়েছেন ।


       আপনি সিনেমা মাধ্যমের সিরিয়াস দর্শক হতে চাইলেও আপনাকে মন-হৃদয়-মনন দিয়েই  সিনেমা দেখতে শিখতে হবে।


         কিন্তু প্রিয় সিনেমাটি ফ্রেম থামিয়ে থামিয়ে ( ফ্রিজ বা স্টিল করে ) আপনি কি দেখবেন ? সেটা আগে ঠিক করে রাখবেন । কোনওদিন শুধু চিত্রনাট্যের চলনের দিকে মনোযোগ দিলেন । পর্দায় গল্পটা কিভাবে বলা হচ্ছে , সেটা খেয়াল করতে করতে গেলেন ।

       এইভাবে , কোনওদিন দেখলেন শুধু ক্যামেরার কাজের দিকটা । কোনওদিন দেখলেন শুধু দৃশ্য কাটাছেঁড়া , অর্থাৎ সম্পাদনা-র  দিকটা । কোনওদিন শুধু অভিনয় । কোনওদিন শুধু সংগীতের  বা পোশাক-আশাক কিংবা লোকেশনের ব্যবহার । প্রথম প্রথম আপনার একটু অসুবিধে হবে, সম্পূর্ণ মনসংযোগর । বিশেষত , ছবিটি যদি চিরায়ত ক্লাসিক ফিল্ম হয় , তাহলে তো হবেই । কিন্তু কিছুদিন পর দেখবেন ,আপনি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন । আপনার নেশা লেগে যাবে ।

      সিনেমার সব ক'টি বিভাগ আলাদা করে দেখতে দেখতে আপনি পরিচালকের  গুণপনা এবং বিশেষত্ব ও নিজস্বতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন । তখন আপনি হয়তো টাইটেল কার্ড না দেখেও ,  এটি কার তৈরি সিনেমা, সেটা ধরতে পারবেন । যেমন গলা শুনেই আপনি ধরতে পারেন, এই গানটা কোন শিল্পীর গাওয়া । কিংবা ভাষা এবং গদ্যভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারেন, এই গল্প বা উপন্যাসটি কোন সাহিত্যিকের লেখা ।


       প্রতিটি বিভাগ খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আপনি পরিচালককে যেমন চিনতে পারবেন , তেমনি শিল্প মাধ্যম হিসেবে সিনেমা-র সঙ্গেও আপনার নিবিড় পরিচয় হবে ।

      

     আমাদের দেশে গত ১১৫ বছর  যাবৎ প্রতি বছর সিনেমা তৈরি হয় প্রচুর । হাজার হাজার । নানান ভাষায় । কিন্তু , খুব দুঃখের হলেও এটা নির্মম সত্যি যে , আমাদের দেশ চলচ্চিত্র সাক্ষরতায় পৃথিবীর বহু ছোট ছোট দেশের তুলনায় আজও অনেক অনেক পেছিয়ে । এ দেশে প্রতি বছর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে " শিক্ষিত " যুবক-যুবতী   হয়তো বেরোচ্ছে প্রচুর । কিন্তু , সত্যিকারের সিনেমা রসিকের জন্ম হচ্ছে কই ??

    নইলে , ভাবুন না , শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গে আজও শিক্ষিত সম্প্রদায় সিনেমাকে " বই" বলে ?


      হায় !! এ অন্ধকার কাটবে কবে ? কিভাবে ??

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৪) || কান্তিরঞ্জন দে || কিভাবে সিনেমা " দেখব ?"

 সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৪)



কিভাবে সিনেমা "  দেখব ?"


       সত্যি সত্যি যদি সিনেমার রূপ রস দৃশ্যসুখ উপভোগ করতে চান, তাহলে আগ্রহের সঙ্গে আপনাকে কতগুলো দিকের নিয়মিত চর্চা করতেই হবে । যেমন------

      ১) ১৮৯৫ সালে সিনেমার জন্ম লগ্ন থেকে বিশ্ব সিনেমার ধারাবাহিক ইতিহাস জেনে নিতে হবে । এটা করতে পারেন---( ক)  বাংলা এবং ইংরিজিতে সিনেমার ইতিহাসের বইপত্র পড়ে । ( খ ) ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভাইদের তোলা আদি সিনেমা থেকে একদম সাম্প্রতিক কালের সিনেমা, আপনি পরপর পেয়ে যাবেন ইউ টিউব চ্যানেলে ।


        দেশে দেশে নানা ধরণের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের  মতো সিনেমা মাধ্যমটিও দেশ ভেদে নানান বৈচিত্র্যে  ভরপুর । হলিউডের সিনেমাই পৃথিবীর একমাত্র সিনেমা নয় । ব্রিটিশ ফিল্ম এবং অ্যামেরিকান ফিল্ম ভাষা এবং  সংস্কৃতির দিক থেকে অনেকটা একইরকম লাগে । 

      কিন্তু, জার্মানি , ফ্রান্সের মতো পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে পোল্যাণ্ড কিংবা চেকোশ্লভাকিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সিনেমার সঙ্গে হলিউডের  সিনেমার ধরণধারণ অনেকটাই আলাদা ।

     ফ্রান্স, জার্মানি , পোল্যাণ্ড তো নানা ধরণের চলচ্চিত্র রীতির আন্দোলনের জন্যও বিখ্যাত ।


      তেমনি আবার , দক্ষিণ অ্যামেরিকা বা ল্যাতিন অ্যামেরিকার  সিনেমায় গল্প কথন রীতি একেবারেই আলাদা । সেখানে সিনেমায় গল্প বলার রীতিকে ভেঙ্গে চুরে , কাহিনীর গতিকে আগুপিছু করে দারুণ  বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে পরিবেশন করেন ওরা । নিয়মিত ওই সব সিনেমা দেখতে দেখতে তার মজাটাও পেতে থাকবেন আপনি ।


        এশিয়ার মধ্যে জাপানী চলচ্চিত্র, বিশেষত আকিরা কুরোশওয়া পরিচালিত ছবিগুলি তো সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্র রসিকদের কাছেই অসম্ভব প্রিয় । কুরোশওয়া তো হলিউড ফিল্ম কোম্পানি গুলোরও টনক নাড়িয়ে দিয়েছিল ।


    গত ২৫/ ৩০ বছরে ইরাণে নির্মিত সিনেমা , কিংবা কোরিয়ার সিনেমা তাদের  অভিনব ও আধুনিকতম সিনেমা রীতিতে সারা পৃথিবীতেই হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে ।


     আমাদের দেশে হিন্দি সিনেমাকে আমরা বরাবরই বাণিজ্যিক সিনেমার প্রতিভূ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত । কিন্তু সিরিয়াস চলচ্চিত্র রসিকেরা জানেন , সেই ১৯৩০-এর দশক থেকেই হিন্দি সিনেমা জগতেও প্রচুর ব্যতিক্রমী ছবি তৈরি হয়েছে । গত ১০/১৫ বছরে অনেক  শিক্ষিত তরুণেরা এসে মুম্বাই সিনেমাতেও  বেশ কিছু বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমা তৈরি করেছেন / করছেন ।


     বাংলা সিনেমার কথা আর আলাদা করে বলছি না । বাঙালির পক্ষে  সেই তিরিশের দশকে নিউ থিয়েটার্সের আমল থেকে সত্যজিৎ- ঋত্বিক-মৃণাল-তপন সিংহ- তরুণ মজুমদার হয়ে হাল আমলের বাংলা সিনেমার  গুণাগুণ  ধারাবাহিক ভাবে জেনে নেওয়া কঠিন কোনও ব্যাপার নয় ।


     সিনেমা যেহেতু চিত্রকলা , সংগীত , গল্প-উপন্যাস- কবিতা-নাটক   সবক'টি  প্রচলিত শিল্প মাধ্যমের সংমিশ্রণে তৈরি হয় , তাই সিনেমার ধারাবাহিক ইতিহাস জানবার পর এই প্রচলিত শিল্প মাধ্যম গুলির সব ক'টি সম্পর্কেই আপনাকে অন্তত প্রাথমিক ধারণাটুকু চর্চার মধ্য দিয়ে তৈরি করে নিতেই হবে । বিশেষত , চিত্রকলা এবং সংগীত ( পাশ্চাত্য সংগীতের সোনাটা ফর্ম ) সম্পর্কে ধারণা থাকলে, যে কোনও দেশের , যে কোনও রীতির সিনেমার রস গ্রহণ আপনার পক্ষে অনেক সহজ ও আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে ।

      ভালো সিনেমার গভীর রসগ্রহণ যে কত আনন্দজনক , যারা জানেন , তারা জানেন । বুঝহ রসিকজন , যে জানহ সন্ধান ।


    ঠিকঠাক ভাবে  সিনেমা দেখতে পারার  মধ্য দিয়ে গভীর আনন্দ পাওয়ার আরও কিছু সুলুক সন্ধান আছে ।

     সে সব পদ্ধতি নিয়ে আরও কিছু কথা বলবার ইচ্ছে রইল , পরের বারে ।।

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে- ১৩ || কান্তিরঞ্জন দে || সাপ্তাহিক বিভাগ

সবাই মিলে সিনেমা হলে- ১৩
কান্তিরঞ্জন দে


 সিনেমা দেখাটাও একটা শিল্প
--------------------------------------

     চোখ থাকলেই সিনেমা দেখা যায় না । কান থাকলেই গান শোনা যায় না । তার জন্যে অন্যরকমের  চোখ কান লাগে। এ আবার কি ধরণের কথা ? হ্যাঁ মশাই , ঠিকই বলছি ।
      কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেই কি সাহিত্যের পাঠক হওয়া যায় ? তার জন্যে মানসিকতা চাই , আগ্রহ চাই , এবং সবচেয়ে বেশি চাই চর্চা । ইংরিজিতে যাকে বলে----অ্যাপটিচিউড্ , ইন্টারেস্ট অ্যাণ্ড প্র্যাক্সিস। একটু খোলশা করে বলুন তো মশাই ।

         অক্ষর জ্ঞান ছাড়া গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ পড়া  অসম্ভব । কিন্তু , সিনেমা দেখতে গেলে শুধু দৃষ্টিশক্তি আর শ্রবণশক্তি থাকলেই চলে । ঠিক কিনা ? একদম ঠিক ।
         আজ্ঞে না । একদম ভুল । কিরকম ? সিনেমা দেখতে গেলে শুধু একজোড়া চোখকান হলেই চলে না । তারসঙ্গে লাগে মগজ ও হৃদয় । আহা, সে তো যে কোনও শিল্প উপভোগের ক্ষেত্রেই সত্যি । অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের ক্ষেত্রে এ সত্যটা স্বীকৃতি পেয়ে গেলেও , সিনেমার  ক্ষেত্রে অনেকেই এখনও এই সত্যটা মানতে চান না । তারা মনে করেন ,  দেখবার জন্য দুটো চোখ ( একটা হলেও অসুবিধে নেই ), আর শোনবার জন্য দুটো কান , আর হাতে কিছু সময় থাকলেই সিনেমা দেখা যায়। আজকাল তো আবার সিনেমা দেখবার জন্য পকেটে হার্ড ক্যাশ থাকারও দরকার নেই ।

      আজ্ঞে না মশাই । সিনেমা ব্যাপারটা অত শস্তা নয় । সিনেমা দেখতে গেলে ওই ব্যাপারগুলো তো লাগেই । তার সঙ্গে লাগে বুদ্ধি আর আবেগ মেশানো চর্চা । এই চর্চা সিনেমার প্রতি তীব্র ভালোবাসা ছাড়া সম্ভবই নয় । কেন না , তীব্র ভালোবাসাই তীব্র আগ্রহের জন্ম দেয় । আর আগ্রহ থেকেই আসে চর্চার অভ্যেস ।

      সারা পৃথিবীতে সিনেমা একটা সিরিয়াস আর্ট ফর্ম-----এই সত্যটা আজ সারা পৃথিবীতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে । সুতরাং তাকে সঠিকভাবে উপভোগ করতে গেলে এই শিল্পমাধ্যমটিকে   ভালোভাবে বোঝা দরকার । আর  বোঝা ব্যাপারটা ধারাবাহিক চর্চা ছাড়া সম্ভবই নয় । সিনেমা তৈরির কলাকৌশল , সিনেমা শিল্পের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা ও বিভাগ , দেশবিদেশে সিনেমা তৈরির নানারকমের রীতিনীতি এবং বিভিন্ন দশকে সিনেমা মাধ্যমে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন গুলো হয়েছে , সেগুলো সম্পর্কে একজন দর্শক যত বেশি ওয়াকিব হাল থাকবেন ,  সিনেমা দেখে তিনি  তত  বেশি  গভীর আনন্দ আবিষ্কার করতে পারবেন।

      যেমন ,  গানের তাল , লয় , ছন্দ , সুরের বিস্তার সম্বন্ধে যার যত বেশি  সক্রিয় চর্চা, তিনি যেমন নানা ধরণের গান শোনার মজাটা তত বেশি উপভোগ করতে পারেন----সিনেমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক  তাই ।

     সিনেমা দেখতে শেখানোর পদ্ধতি হিসেবে তাই চলচ্চিত্র বিদ্যা বা ফিল্ম স্টাডিজ বিষয়টার জন্ম । আমাদের পশ্চিমবঙ্গে  অ-সরকারি ভাবে  চলচ্চিত্র বিদ্যা চর্চার শুরু ১৯৭০-এর দশকে । এই বিষয়ের পথিকৃৎ ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ সম্প্রতি ৮৫ বছর বয়সে কলকাতায় মারা গেলেন । সরকারি উদ্যোগে কলকাতায় এই বিদ্যার চর্চার শুরু হয় ১৯৮৭ সাল নাগাদ। আর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজে পাঠ্য বিষয় হিসেবে এটি চালু হতে থাকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ।

      যৌবনে সত্যজিৎ রায় যখন সিনেমা দেখতে যেতেন , তখন সঙ্গে পকেট ডায়রি আর পেন নিয়ে যেতেন । ছবির উল্লেখযোগ্য নানা খুঁটিনাটি তিনি তাঁর ডায়েরিতে নোট করে নিতেন ।

        একজন সিরিয়াস সিনেমা প্রেমী দর্শক থেকে সত্যজিৎ  রায় ভবিষ্যতে বিশ্ববিখ্যাত চিত্র পরিচালক হয়ে ওঠেন । সবাই হয়তো চিত্র পরিচালক হবেন না । কিন্তু সিনেমা যারা সত্যি সত্যি ভালোবাসেন , তারা জানেন---- সিনেমা দেখতে জানাও একটি সুন্দর শিল্প ।

       সিনেমা  কিভাবে ভালো করে দেখা যায় , সিনেমা দেখা ব্যাপারটা কখন কিভাবে শিল্প হয়ে ওঠে, এ নিয়ে পরের বারে আলাপ করার ইচ্ছে রইল ।

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১২) || কান্তিরঞ্জন দে || করোণা সংকট ও ( বাংলা ) সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে  ( ১২)
কান্তিরঞ্জন দে

    করোণা সংকট ও ( বাংলা ) সিনেমা


         আগে প্রাণ । তার পরে তো খাওয়া দাওয়া আনন্দ ফূর্তি । সাহিত্য , নাটক , ছবি আঁকা , গান কিংবা সিনেমা শোনা ও দেখার প্রশ্ন। করোণা অতিমারী বিশ্বজুড়ে মানুষের সভ্যতাকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে । একটা পুঁচকে এককণা ভাইরাসের সন্ত্রাসে পৃথিবীর নিয়মকানুন ওলোট পালোট হয়ে যেতে বসেছে । সিনেমাও এই সংকটের বাইরে নয় । বিশ্বের কোথাওই নয় ।

         গত ছ'মাস হল এ দেশে ও রাজ্যে সিনেমা হলগুলি বন্ধ । অত্যাধুনিক মাল্টিপ্লেক্স গুলোতেও মানুষের প্রবেশ নিষেধ । প্রথম কয়েকমাস তো  খাওয়াদাওয়া , বাজারহাট ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছিল । ঘরবন্দি মানুষ ঘরে বসে করোণার খবর ও মৃতের সংখ্যা গোণা ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে নি । সিনেমা দেখা বন্ধ । শ্যুটিং বন্ধ হয়ে যাবার কারণে ডেইলি সোপ টিভি সিরিয়াল গুলো দেখানোও বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হল ।

      কিন্তু সিনেমা-সিরিয়াল তো আপনার-আমার বিনোদন মাত্র নয় । কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন রুটিরুজিও বটে । বিনোদন বিতরণ বন্ধের চেয়েও বড় কথা,  সামাজিক জীবনের অন্য আর সমস্ত দিকের মতো বিনোদন শিল্পে জড়িত অসংখ্য মানুষের পেটেও  টান ধরিয়ে দিয়েছে , করোণা অতিমারী ।

        বাংলা ফিল্ম এমনিতেই সারাজীবন হাজার রকমের সমস্যায় ভোগে । করোণা তাকে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ।

        ইতিহাসে দেখা যায় , বড় বড় সংকটের সময়ে , সেই সংকট থেকে বাঁচতেই মানুষ বিজ্ঞানের সহায়তায় নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেই সংকট থেকে বাঁচার পথ তৈরি করে নিয়েছে । এইভাবেই মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে ।
        দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিনী সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উপায় হিসেবে ইন্টারনেট পদ্ধতির আবিষ্কার করেছিল । কয়েক দশকের মধ্যেই সেই প্রযুক্তিই হয়ে গেল----ইন্টার ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট । আধুনিক কালের বিশ্বজোড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধানতম হাতিয়ার । নব্বই দশকে অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে সেই প্রযুক্তি বাকি সমস্ত ক্ষেত্রের মতো বিনোদন শিল্পেরও প্রধানতম অবলম্বন হয়ে উঠল । মনে রাখতে হবে, গত ২০ বছরে ইন্টারনেট তথা ডিজিটাল টেকনোলজি-র যে অগ্রগতি-----তা কিন্তু সারা পৃথিবীতে একযোগে ঘটেছে । অ্যামেরিকার মতো ধনী দেশ , কিংবা ভারত- বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ এক্ষেত্রে একই সারিতে । যন্ত্রপাতিতে হয়তো সামান্য ঊনিশ-বিশ ফারাক আছে । খুব বেশি তফাৎ কিছু নেই ।

      ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সিনেমাহলের বড়পর্দার সিনেমা এমনিতেই একটা মোক্ষম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল । আমাদের দেশে , বিশেষত  চলচ্চিত্র জগতে এই চ্যালেঞ্জটা বাংলা সিনেমা ব্যাপারটাকে বেশ বড়সড়  সমস্যার মুখে ফেলে দিয়েছে । হিন্দি সিনেমা জগতে পুঁজি-মূলধন অনেক অনেক বেশি । ফলে সেখানে সমস্যা সামাল দেবার উপায় আছে । কিন্তু বাংলা সিনেমার বাজার সীমাবদ্ধ বাজার । আঞ্চলিক বাজার । আজ যদি সমগ্ৰ বাংলা এক ও অখণ্ড থাকত , তাহলে হয়তো বর্তমান সমস্যা সামাল দেওয়া ততটা কঠিন হতো না । কিন্তু এখনকার বাংলা সিনেমার এই ছোট্ট বাজারে ডিজিটাল প্রযুক্তির হানা তাকে সত্যি সত্যি বড় বিপদের মুখে এনে ফেলেছে । মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো এসে উপস্থিত হয়েছে করোণা ।

        করোণা আক্রমণের ৩/৪ মাসের মধ্যেই সাবধানতা অবলম্বন করে কিছু সিরিয়ালের শ্যুটিং এবং টেলিকাস্ট শুরু করা গেছে । বলা ভালো , প্রাণের দায়ে পেটের দায়েই বাধ্য হয়েই সেগুলো চালু করতে হয়েছে । সিনেমার শ্যুটিং পুরোদমে এখনও চালু করা যায় নি ।  বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের রোদে কিংবা আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টির কারণে সিনেমার আউটডোর শ্যুটিং এমনিতেই অন্যান্য বছর বন্ধ থাকে । শরৎকালে আবার আউটডোর শ্যুটিং চালু হয় । শরৎ ও শীতকাল হচ্ছে বাইরে বাইরে শ্যুটিংয়ের আদর্শ সময় । অর্থাৎ, সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ । খুব বেশি হলে এপ্রিলের গোড়ার দিক । তার মধ্যে সিনেমা হল-মাল্টিপ্লেক্স বন্ধ । তাহলে উপায় ?

        উপায় নেই । পূর্ব ভারতে প্রযোজকদের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইস্টার্ন ইণ্ডিয়া মোশন পিকচার্স প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (  E.I.M.P.P.A বা ইম্পা ) গত সপ্তাহে মিটিংয়ের শেষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে সিনেমা হলগুলি খোলার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে চিঠি দিয়েছে । কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই আবেদন তারা আগেই জানিয়েছে । বোঝা যাচ্ছে , করোণা সংকট তাদের কাছে সত্যসত্যিই  বেঁচে থাকার লড়াই ।
     সিনেমা - সিরিয়ালে অভিনয় কিংবা কলাকুশলীর কাজ কোনও মাসমাইনের বাঁধা চাকরি নয় । এই পেশায় কোনও পেনশন , প্রভিডেন্ট ফান্ড , গ্র্যাচুইটি নেই । অতএব, ক্যামেরা বন্ধ , কিংবা শ্যুটিং বন্ধ, মানে রোজগার বন্ধ ।
      খুব সম্প্রতি রাজ্য সরকার কলাকুশলীদের স্বল্প পরিমাণে হলেও, এককালীন কিছু অর্থসাহায্য করেছেন । অভিনেতা এবং কলাকুশলীদের সংগঠনগুলো বেশ কয়েকবছর আগে এদের জন্য কিছু ইনস্যুরেন্স-এর ব্যবস্থা করেছেন । ব্যস্, আর্থিক নিরাপত্তা বলতে এটুকুই ।

     করোণা  পরবর্তী কালে বাংলা সিনেমা এবং বাংলা সিনেমা বাঁচবে কিনা , সেটা পুরোপুরিই নির্ভর করছে , তার অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীরা বাঁচবেন কিনা, তার ওপর ।
     খুব সফল পরিচালক কিংবা দীর্ঘদিন ধরে খুব সফল হিরো হিরোইনরা হয়তো কিছুদিন বাড়তি বাঁচবেন । কিন্তু বাকিরা ?? তাদের কথা নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না ।
       আর সিনেমা  প্রদর্শন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত  এবং সিনেমা হলের কর্মচারীরা ?? অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির আক্রমণে তারা এমনিতেই ধুঁকছিলেন । করোণা দৈত্য তাদের আর বাঁচতে দেবে কিনা , সে প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে হবে ।

     এ ছাড়া তো কোনও পথ দেখি না ।

শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ১১ || কান্তিরঞ্জন দে || হাল বাংলার সিনেমা বাংলা সিনেমার হাল

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ১১ 
কান্তিরঞ্জন দে


হাল বাংলার সিনেমা
বাংলা সিনেমার হাল 

       মাত্র কয়েকদিন আগে পথের পাঁচালী সিনেমা মুক্তির ৬৫ বছর পূর্ণ হল । খাঁটি সিনেমার ভাষায় তৈরি প্রথম সার্থক বাংলা সিনেমা ,  তথা ভারতীয় সিনেমা । ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট সত্যজিৎ রায় প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে , ভারতীয়রাও শিল্পগুণসম্পন্ন সিনেমা বানাতে পারে ।
        অনেকের আজও ধারণা ----- পথের পাঁচালী বোধহয় বাংলা বাজারে ভালো চলে নি । ওসব সত্যজিৎ রায়- টায়দের ছবি বিদেশে প্রাইজ - টাইজ পায় ঠিকই । কিন্তু হুঁ হুঁ বাবা !! বাংলা বাজার বড় কঠিন ঠাঁই । এখানে সিনেমা নিয়ে অত সিরিয়াস হলে ব্যবসা করা মুস্কিল । অনেক প্রযোজক পরিচালকের এটাই মনের কথা ।
     
       কিন্তু , ভাবনাটা একেবারে ভুল । বসুশ্রী ,বীণা , শ্রী সহ অন্যান্য হলে প্রথম রিলিজ করে পথের পাঁচালী ভালোই ব্যবসা দিয়েছিল । আজও দিয়ে চলেছে । বসুশ্রীতে এ ছবি টানা ১৪ সপ্তাহ চলেছিল ।
      ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবির মধ্যে   ৩ /৪ টি বাদ দিলে , সত্যজিৎ রায়ের অধিকাংশ ছবি প্রথম রিলিজেই বাণিজ্য সফল । যেগুলো প্রথম দফায় ফ্লপ , সেগুলো সহ সত্যজিতবাবুর সব  ছবিই আজও ধারাবাহিক  প্রফিট দিয়ে আসছে ।  ব্যবসার ভাষায় একে বলে , রিপিট বা রি-সেল ভ্যালু ।
    শুধু রায়সাহেব কেন , ঋত্বিক ঘটক , মৃণাল সেন , বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত , উৎপলেন্দু চক্রবর্তী , অপর্ণা সেন , গৌতম ঘোষ----- প্রত্যেকের ছবির  রিপিট ভ্যালু অত্যন্ত ভালো ।
      অন্যদিকে মশলাদার বাণিজ্যিক ছবি , আজ হিট হয়েছে , কিন্তু  পরের বছর সে ছবি দেখবার দর্শক নেই , এমন  আকছার ঘটে ।
    সিনেমাকে সব সময় মনে রাখতে  হয় , সে একইসঙ্গে শিল্প এবং বাণিজ্য দুই-ই । এখনকার  বাংলা সিনেমার সবগুলো  সম্পর্কে সে কথা বলা চলে কি ? হাল আমলের বাংলা সিনেমার হাল কি ? এ প্রশ্নের এককথায় উত্তর হল---- হাঁড়ির হাল । আমি করোণা সংকটের আগের সময়ের কথাই বলছি ।

       পথের পাঁচালী-র সময় থেকে গত ৬৫ বছরে বাংলা সিনেমা কতটা এগিয়েছে , সে খতিয়ান নেবার প্রয়োজন  আছে বৈ কি । সারা পৃথিবীতেই সিনেমা একইসঙ্গে বাণিজ্য এবং শিল্প । যাকে বলে , কমার্শিয়াল বা পপুলার আর্ট ।
      উত্তমকুমার মারা যাবার পরে , গত ৪০ বছরে বাংলা  সিনেমার ব্যবসার জগতে এমন কিছু ফাটকা কারবারী ঢুকে বসে আছেন , যারা  শিল্প বোঝার তো প্রশ্নই উঠছে না।  সিনেমা বাণিজ্যটাও ভালো করে বোঝেন না । যারা বোঝেন , তারা আবার মৌরসি পাট্টায় বিশ্বাসী । নতুন প্রযোজক-পরিবেশকদের চট্ করে বাজারে ঢুকতে দিতে চান না ।
     ফাটকা কারবারীরা  সৎ ও অসৎ নানা উপায়ে বেশ কিছু পয়সা কামিয়ে মোহ এবং লালসার বশে সিনেমায় টাকা ঢালতে চলে আসেন । সিনেমা মাধ্যমটির বৈশিষ্ট্য , গুণাগুণ  কিছু সম্পর্কেই এদের কোনও ভালোবাসা বা আগ্রহ নেই ।এরা চান সিনেমার ঘাড়ে চেপে যেন তেন প্রকারেন টাকা কামাতে । সিনেমা এদের কাছে স্রেফ মুনাফা ধরার কল।

     ১৯৫০-৬০ - ৭০ দশকের পরিচ্ছন্ন পারিবারিক ছবিগুলো কিন্তু বাণিজ্যিক ছবিই ছিল। সেগুলো হিটও হত । কারণ প্রযোজকেরা জানতেন , সিনেমার গুণাগুণ নির্ভর করে তার গল্পে ও পরিচালনায় । শুধু নায়ক নায়িকার সুন্দর মুখ দেখিয়ে কখনও ব্যবসা নিশ্চিত করা যায় না । সেই সময়ের সিনেমাগুলোর  রিপিট ভ্যালু আজও দুর্দান্ত ।  উত্তম-সুচিত্রা জুটির ছবি হলে তো কথাই নেই ।

     হাল হামলের বাংলা সিনেমার ব্যবসা ততটা নিশ্চিত কি ?? হ্যাঁ মানছি ---১৯৮০-র দশক থেকে টেলিভিশন এবং ইদানীংকালে  ওটিটি প্ল্যাটফর্ম  এসে সিনেমা ব্যবসাকে অনেক জটিল করে দিয়েছে ।
        কিন্তু ভালো গল্প , দক্ষ পরিচালনা এবং ভালো উপাদান দিলে দর্শক চিরকাল সে সিনেমাকে মাথায় করে রাখে । কিন্তু আমোদ বিতরণের নামে যুক্তিহীন নাচাগানা , মারপিট , ঝলমলে পোশাক-আশাক ,  চোখ ধাঁধানো লোকেশন দেখিয়ে দর্শককে বেশিদিন বোকা বানিয়ে রাখা যায় না ।  এর সঙ্গে বস্তাপচা আবেগকে যারা  সিনেমা হিট করানোর একমাত্র শর্টকাট ভাবতেন ---- আজ তাদের মাথায় হাত ।
      অন্যদিকে , ঝকঝকে মাল্টিপ্লেক্সের কথা ভেবে যারা  স্মার্ট প্রেমকাহিনী কিংবা বড়লোকী  ড্রয়িংরুম ড্রামাকেই একমাত্র ফর্মূলা ভেবে বসেছিলেন , তাদের জারিজুরিও আজ শেষ হতে বসেছে ।

     আসলে ভেজাল সিনেমা ব্যবসায়ী এবং অতিচালাক সিনেমা নির্মাতারা ভুলে যান যে ----- গ্রাম হোক কিংবা শহর  ------ সব জায়গার দর্শক সবসময় চান ভালো গল্প , ভালো অভিনয় , ভালো গান , এবং পরিচ্ছন্ন  বুদ্ধিদীপ্ত  পরিচালনার কাজ । দর্শককে অশিক্ষিত এবং বোকা ভাবা-র রোগ হাল আমলের বাংলা সিনেমার ঘাড়ে একেবারে চেপে বসেছে ।

      সেদিক থেকে দেখতে গেলে , বাইরের চাকচিক্য অনেক বেড়েছে , প্রযুক্তিগত  সুযোগসুবিধে অনেক সহজলভ্য হয়েছে ঠিকই ।         
      কিন্তু বাইরে থেকে  যতই ঝকঝকে দেখাক, পথের পাঁচালীর  আমল থেকে হাল আমলের বাংলা সিনেমার হাল কতটা ফিরেছে-----সে সন্দেহ থেকেই গেছে ।

    করোণা সংকট বাংলা সিনেমা ব্যবসার হাল কোনদিকে নিয়ে যাবে ?
  সে প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করবার ইচ্ছে রইল ।

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১০ ) || কান্তিরঞ্জন দে || সিনেমা কি স্বাধীন ?

সবাই মিলে সিনেমা হলে  ( ১০ )
কান্তিরঞ্জন দে
৷৷৷৷৷


   সিনেমা কি স্বাধীন ?

        সিনেমা কি একটি স্বাধীন- স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম ? এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ এ দেশে আজও আছে । রকমসকম দেখে তাই মনে হয়। মূল প্রশ্নে যাবার আগে এ প্রসঙ্গে দু- চারটে কথা বলে।নিই ।
       যেহেতু ভারতবর্ষে সিনেমার বাড়বাড়ন্ত সাহিত্যের হাত ধরে , তাই এ প্রশ্নটা  সিরিয়াস সিনেমাপ্রেমীদের মনে আজও ওঠে। অবশ্য , সিনেমা আদৌ শিল্প মাধ্যম কিনা , সে বিতর্কও সিনেমার জন্মের বহুবছর পর্যন্ত টিঁকে ছিল। এখন আর দেশে-বিদেশে এ নিয়ে কেউ সন্দেহ করেন না। কিন্তু সিনেমার স্বাধীন সত্তা নিয়ে সংশয়ের খোঁচাটা রয়েই গেছে।
       ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে  মুরারী ভাদুড়ীকে ( নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ীর ছোটভাই ) অনুযোগ জানিয়েছিলেন যে, ------- " ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে ।"
        অনুসরণ নয় । পাঠক " চাটুবৃত্তি " শব্দটি খেয়াল করবেন। কারণ, এটা তো সত্যি যে , গত শতাব্দীর ২০ দশক  থেকে ৫০-৬০- ৭০ দশক পর্যন্ত বাংলা সিনেমা কাঙালের মতো বাংলা সাহিত্যের পিছু পিছু হেঁটেছে ।
     পথের পাঁচালী-র  মধ্য দিয়ে সিনেমা এ দেশে সাহিত্যের হাত ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছিল। অনভ্যস্ত পণ্ডিতেরাও তখন পথের পাঁচালী সিনেমার সাহিত্যিক বিচ্যুতি নিয়ে অনর্থক চ্যাঁচামেচি করেছিলেন । সত্যজিৎ রায়ই আমাদের দেশে " অকৃত্রিম"  সিনেমার প্রবর্তক ।
     সত্যজিৎ বারবার সাহিত্যকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন ঠিকই । কিন্তু সে শুধুই উপাদান-উপকরণ মাত্র ।।  "বইয়ের " চিত্র রূপায়ণ কখনোই নয় ।

      তা সত্ত্বেও অবশ্য অন্যান্য পরিচালকদের   পর্দায়     " বই " বানানো থেমে থাকে নি । ১৯৮০ সালে উত্তমকুমারের মৃত্যু পর্যন্ত সে ধারা সদর্পে চলেছিল । উত্তম-সুচিত্রার টান ছাড়াও জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাসটি  সিনেমায় দেখতে যাবার দর্শক তখনও পর্যন্ত নেহাত কম ছিল না । বর্তমানে সে উন্নত প্রজাতির দর্শকশ্রেণীও লুপ্তপ্রায় ।

    ৭০ দশক থেকে সুখেন দাস এবং ৮০-র দশক থেকে অঞ্জন চৌধুরী ,  সাহিত্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের বানানো গল্পে পর্দায় পরপর হিট " বই " বানিয়েছেন । তাতে ব্যবসা বেড়েছে কিন্তু বাংলা সিনেমা ক্রমশ  গোল্লায়  গেছে ।
      বর্তমানে বাংলা সিনেমা এক মিশ্র প্রজাতির বস্তু । কিছু সাহিত্য  । কিছু দক্ষিণী রি-মেক । আর কিছু গপ্পো প্রযোজকদের উদ্ভট কল্পনাপ্রসূত । সাহিত্যের সুরুচির গর্বটুকুও বাঙালির সিনেমা হারিয়ে বসে আছে ।

      ডঃ সুকুমার সেনের মতো পণ্ডিতদের অনেকেই  বহুদিন পর্যন্ত সিনেমাকে শিল্পমাধ্যম হিসেবে স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না । কারণ ? সিনেমার মধ্যে চিত্রকলা-সংগীত-শব্দ-সাহিত্য-স্থাপত্য-নৃত্য , প্রাক-সিনেমার সব ক'টি শিল্পই মিলেমিশে আছে । এটাই যে তার অভিনবত্ব ও কৌলিন্য----সেটা এই পণ্ডিতেরা  উপলব্ধিই করতে পারেন নি ।

       আজও আমাদের দেশে সিনেমা স্বতন্ত্র-স্বাধীন শিল্প মাধ্যম কিনা, সেই ধোঁয়াশা রয়েই গেছে ।
      সিনেমাকে যে চেহারায় আমরা এ দেশে দেখি , সেটি প্রাচীন প্রচলিত ভারতীয় বিনোদনের এক বিকৃত পাঁচমেশালি রূপ মাত্র ।
     তাকে আর যাই হোক, স্বাধীন কোনভাবেই বলা চলে না । কেন ? তার নানা কারণ আছে ।
      বারান্তরে সেগুলো বলা যাবে 'খন ।

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে- ৯ || কান্তিরঞ্জন দে || ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও বাংলা সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে  (৯)

  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন 
               ও
     বাংলা  সিনেমা 

      সিনেমা তো মানুষের কাছে পৌঁছনোর শক্তিশালী উপায় । কিন্তু , সে কি সময়ের হাত ধরে চলে ? এর উত্তর একইসঙ্গে হ্যাঁ এবং না ।
     সিনেমা একইসঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য । সিনেমা বানাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লাগে । তাই সে অধিকাংশ সময়ই মানুষকে খুশি রাখতেই ব্যস্ত থাকে । মানুষকে সচেতন করার কথা অনেকসময়ই ভুলে যায়।
     এই যেমন , ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন । এ ব্যাপারে , ভারতীয় সিনেমার কথা ছেড়েই দিচ্ছি । বাংলা সিনেমার ভূমিকা কি ? উহুঁ, বলবার মতো কিছু নয় ।

     এই প্রসঙ্গটা কেন উঠল, বলি । উনিশশো ৪০-৫০ এর দশকে , ভারতে সিনেমা যখন গরীব বড়লোক নির্বিশেষে সব  মানুষকে মাতিয়ে তুলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে , তখন  একদল সমাজ সচেতন শিল্পী এই প্রশ্ন তুললেন যে , শিল্পের দায় সমাজের কাছে ?  না শুধুই বিনোদনের কাছে ? বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী , গণনাট্য পন্থী শিল্পীরাই মূলত প্রশ্নটা তুললেন । কিন্তু তারাও গল্প-কবিতা - উপন্যাস - গান নাটকে সমাজ সচেতনতার পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হয়েও সিনেমা প্রসঙ্গে প্রায় নীরব রইলেন । এর কারণ সম্ভবত এই যে , সিনেমা তৈরি জিনিসটাই বড়লোকি  ব্যাপার । আমাদের কাজ গরীব-গুরবো , খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে । সুতরাং , এই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আর কি হবে ?

       উনিশশো ২০-৩০-৪০এর দশকে এ দেশে ব্রিটিশ বিরোধী জনজোয়ার যখন তুঙ্গে , তখন বাংলা সিনেমায় কি সেই আন্দোলনের কোনও প্রতিফলন ছিল ? ইতিহাস বলছে --- ছিল না । প্রযোজক- পরিচালকেরা তখন দর্শকদের শুধু বিনোদন দিয়ে পয়সা কামাতেই ব্যস্ত ছিলেন । দেশের স্বাধীনতার কাছে তাদের কোনও দায়বদ্ধতা ছিল না ।

      এর কারণ কি ? সাহসের অভাব ? নাকি , পয়সার অভাব ? ইতিহাস বলছে ----প্রথমটা । কেন না , জাঁকজমকপূর্ণ  ধর্মমূলক- পৌরাণিক গল্প , রাজা- রাজড়ার গল্প , সংসারের গণ্ডগোলের গল্প কিংবা নারী-পুরুষের প্রেম বিরহের বড় বড় বাজেটের গল্প বলতে , কই ? তাদের তো পয়সার অভাব হয় নি । পর্দায়  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গল্প বললে ইংরেজ সরকার চটে যাবে যে । মুনাফা লোটবার ক্ষতি হবে না ?

      ১৯৪২ সালে " ভারত ছাড়ো " আন্দোলন শুরু হবার দু বছর পরে , ১৯৪৪ সালে বিমল রায় পরিচালিত " উদয়ের পথে " ছবিটি মুক্তি পায় এবং বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য পায় । ছবিটি সমাজসচেতন  অবশ্যই । কিন্তু সরাসরি তাকে সরকার বিরোধী ছবি বলা চলে না ।
      ১৯৪৮ এবং ১৯৫১ সালে হেমেন গুপ্ত মশাই  নিশ্চিন্তে " ভুলি  নাই " এবং " ৪২ " নামে স্বাধীনতা আন্দোলন নির্ভর দুটি ছবি বানিয়েছিলেন । নিশ্চিন্তে , কারণ দেশ ততদিনে স্বাধীন হয়ে গেছে যে। ব্রিটিশ বিরোধিতা ততদিনে সিনেমায়  বাণিজ্যিক  সফলতা আনবার মশলায় পরিণত হয়ে গেছে । সদ্যস্বাধীন দেশে  দুটি ছবিই ভালো চলেছিল । তারপরেও নানা সময়ে " চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন " ( লুণ্ঠন ? সাহেবরা বলত । আসলে তা  দখল )  , " শহীদ ক্ষুদিরাম " , " শপথ নিলাম " এ রকম বেশ কিছু  ব্রিটিশ সরকার বিরোধী সিনেমা তৈরি হয়েছিল বটে ,কিন্তু ততদিনে দেশ অনেকগুলো স্বাধীনতা দিবস পার করে ফেলেছে ।

      তাই , ইতিহাসের খাতিরে এ কথা বলতে আমরা বাধ্য যে , বাংলায়  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সিনেমার মতো এত শক্তিশালী এই  গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রায় শূন্য।

      তাছাড়া , ৪০-এর দশক থেকে আজ পর্যন্ত  পশ্চিমবাংলায়  গ্রামজীবন এবং গরীব মানুষদের নিয়ে অনেক সমাজ সচেতন সিনেমা তৈরি হলেও , সেগুলো কোনদিনই ভারতীয় বা বাংলা সিনেমার মূলধারার স্বীকৃতি আদায় করতে পারে নি ।

      কেন ? সে অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ । পরে কখনও আলোচনা করা যাবে ।
   
        কিন্তু বিষয়টি আমাদের ভাবায় ।

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

সবাই মিলে , সিনেমা হলে ~৮ || কান্তিরঞ্জন দে || পাড়ায় পাড়ায় পথসিনেমা ।।

সবাই মিলে , সিনেমা হলে ~৮
কান্তিরঞ্জন দে
           

 পাড়ায় পাড়ায় পথসিনেমা ।।

    অন্যপ্রসঙ্গে যাবার আগে সিনেমা দেখানো নিয়ে অত্যন্ত জরুরী আরও দু-চারকথা বলে নিই ।
      বর্তমানে সিনেমা দেখা ও দেখানোর ব্যবস্থা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে বলে , মাধ্যম হিসেবে সিনেমার শক্তি কিন্তু বিন্দুমাত্র কমে নি । উল্টে বেড়েছে ‌। এ যেন , "পঞ্চশরে  দগ্ধ করে , করেছ এ কি সন্ন্যাসী ? / বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে ।" ব্যাপারটা খুলে বলি -----
       সিনেমা তৈরির উপকরণ কিন্তু এখন আক্ষরিক অর্থে আমাদের হাতের মুঠোয় । ক্যামেরা আমাদের হাতের মুঠোয় । সিনেমা সম্পাদনা-র সফ্টওয়্যার এখন ঘরে ঘরে টেবিলে টেবিলে , ডেস্কটপ অথবা ল্যাপটপ কম্পিউটারে । নতুন প্রজন্মের সিনেমা তৈরি করিয়ে ছেলেমেয়েরা কিন্তু এর সুযোগ নিতে পারেন । ছোট ছোট ছবি করছেনও অনেকেই । লিটিল ম্যাগাজিন বার করা , কিংবা গানের দল ( ব্যাণ্ড ) খুলে ফেলার মতো , সিনেমা তৈরির দলগত কিংবা একক সুযোগ এখন অত্যন্ত সুলভ ।

       কিন্তু সেগুলো পরিবেশন করবেন কোথায় ? দেখাবেন কিভাবে ? সবাইকে কি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের পেছনে দৌড়বেন ? সে দৌড়ন । কিন্তু তার পাশাপাশি আরও একটি চমৎকার  উপায়  আছে।

     চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত থিয়েটার ছিল উত্তর কলকাতার স্টার , বিশ্বরূপা ( শ্রীরঙ্গম ) , কিংবা মিনার্ভা সহ অন্যান্য বাণিজ্যিক মঞ্চের হাতে বন্দি । গণনাট্য প্রযোজিত " নবান্ন " এসে থিয়েটারকে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছিল । কলকাতা মঞ্চের পাশাপাশি নবান্ন গ্রামে গঞ্জে মাঠে ঘাটে প্রচুর অভিনীত হয়েছিল ।
       প্রথমে গণনাট্য এবং পরে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের হাত ধরে নাটক ব্যাপারটা ক্রমশ জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে , পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে । বাণিজ্যিক মঞ্চে কম সে কম তিন-চার ঘন্টাব্যাপী নাটক সংক্ষিপ্ত হতে হতে একদিন মন্মথ রায়-এর হাত ধ‍রে একাঙ্ক নাটকে রূপান্তরিত হয় । দুই বাংলাতেই একাঙ্ক নাটক বিষয়ে ও উপস্থাপনায় বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।
     তারই হাত ধরে আসে , পথনাটিকা বা স্ট্রিট থিয়েটার । উৎপল দত্তের মতো জনপ্রিয় নাট্যকার-পরিচালক- অভিনেতা পর্যন্ত অসংখ্য মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি প্রায় পঞ্চাশটি পথনাটিকা লেখেন এবং পাড়ায় অভিনয় করে বেড়ান ।
    সত্তর দশকের গোড়ায় বাদল সরকার তো পথনাটিকাকে একটি আন্দোলনেরই চেহারায় পৌঁছে দেন। তাঁর দলের নাম ছিল --- শতাব্দী । আর , আন্দোলনটির নাম ছিল --- থার্ড থিয়েটার মুভমেন্ট ।
     বাদলবাবু তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে  কলকাতার বিভিন্ন পার্কে , বিভিন্ন কলেজের উঠোনে , মহাবোধি  সোসাইটি-র দোতলার হলঘরে  কিংবা স্রেফ বিভিন্ন  গ্রামে গঞ্জে শহরের পাড়ায় পাড়ায়, পথের মোড়ে তাঁর পথনাটিকা গুলোর অভিনয় করে বেড়াতেন । অভিনয় শেষে দর্শকদের সামনে গামছা অথবা চাদর মেলে ধরতেন।
      দর্শনী যা সংগ্রহ হতো , তাই দিয়ে সেদিনের প্রদর্শনীর খরচ উঠে যেত।
অথচ, বাদল সরকার পেশায় ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন টাউন প্ল্যানার- ইঞ্জিনিয়ার । তাঁর লেখা নাটক   শম্ভু মিত্রের ' বহুরূপী 'নাট্যদল ছাড়াও , পশ্চিমবাংলা , সারা ভারত এবং বাংলাদেশের অস‌ংখ্য নাট্যদল দীর্ঘকাল মঞ্চস্থ করেছে ।
     বাদল সরকার প্রবর্তিত পথনাটিকা বা স্ট্রিট থিয়েটার আজও জোরদার প্রতিবাদী আন্দোলনের একটি পথ ।

        সময় সমাজ  এখন অনেক বদলে গেছে । কিন্তু , মনের কথা , সমাজের কথা বলবার প্রয়োজন তো ফুরোয় নি । কোনওদিন কি ফুরোয় ?

      তাই ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সহজলভ্য সিনেমা তৈরি এবং প্রদর্শনের এই সুযোগে নতুন যুগের ছেলেমেয়েদের নেওয়া উচিত । গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক - রাজনৈতিক বিষয়ে ছোট ছোট গল্প তৈরি করে কাহিনীচিত্র এবং নানা বিষয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করবার সম্ভাবনা এখন বিপুল ।
     জেলায় জেলায় , পাড়ায় পাড়ায় এ রকম গ্রুপও অনেক তৈরি হয়েছে/ হচ্ছে বলে , খবর পাই । যেমন ----- কলকাতার পিপলস্ ফিল্ম কালেক্টিভ কিংবা হিন্দমোটর- উত্তরপাড়ার ' জীবনস্মৃতি ' সংগঠন ।

      পথ সিনেমা বানাবার নতুন পথ খুলে গেছে । নতুন  প্রজন্ম কি তার সুযোগ নেবেন ?

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...