কাশীনাথ সাহা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাশীনাথ সাহা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৩

রম্য রচনা ।। প্রেমের সাত কাহন ।। কাশীনাথ সাহা, Kashinath Saha

রম্য রচনা

প্রেমের সাত কাহন

কাশীনাথ সাহা 



সেই কবে শুনেছিলাম, প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে.... 

না,এখন জীবনে প্রেম একবার আসে না। বারেবারেই আসে যায়।প্রেমের খেলা কে বুঝতে পারে! না পারারই কথা! প্রেম যখন আসে সাইক্লোনের মতো বেগবান হয়ে আসে। তখন সেই উজানে ভেসে যেতেই হয়। স্বয়ং কৃষ্ণ রাধিকার প্রেমে যমুনার নীল জলে ভেসে গিয়েছিল। আমরা তো তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষ!  রাধাও তো তাই! কৃষ্ণ কদমের মগডালে বসে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে আর কলঙ্কিনী রাই রাত-বিরেতে ছুটে চলেছে সব লোকলাজ ভুলে।

আমাদের সেসময়ে প্রেম ছিল, একটু আড়ালে আবডালে। অভিভাবকরা সবাই কমল মিত্র। নয়তো মোগাম্বো! বাড়িতে কিশোরী মেয়ে থাকলে তাঁর ত্রি সীমানায় অলিখিত  ১৪৪ ধারা জারি থাকতো।চোখে চোখে তাকানো বহুৎ দূর কী বাত্ আড়চোখে তাকাতেও শরীর হিম হয়ে যেত। তবুও ওই সময়ে দাঁড়িয়ে কি করে যে শরৎ চন্দ্র দেবদাসের মতো মারকাটারি একখানা প্রেমের উপন্যাস নামিয়ে দিয়েছিল,ভাবলেই অবাক লাগে। তবে দেবদাস বাঙালিদের প্রেমের প্রাচীর ভাঙার প্রথম কাজটা করতে পেরেছিল। আর প্রেমে গাড্ডা খেলে মদ খাওয়াটা যে অপরাধ নয়, সেটাও বাঙালি প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ইংল্যান্ডের কোন এক যুবরাজ নাকি প্রেমের জন্য পুরো রাজ সিংহাসনটাই ত্যাগ করে দিয়েছেন। আমাদের সময়ে ভ্যালেন্সটাইন ডের মতো একটা গোটা প্রেমের দিন ছিল না। আমাদের প্রেম দিবস মানে সরস্বতী পূজা, স্বাধীনতা দিবস,২৬ শে জানুয়ারী। মানে যেদিন একটু খোলামেলা মেলামেশা করবার ১০% সুযোগ থাকতো।সেখানেই এক পলকে একটু দেখা, আরও একটু বেশি হলে ক্ষতি কি। ক্ষতি নেই!  কারণ ততোদিনে উত্তম সুচিত্রা-র নিরামিষ আমিষ প্রেম আমাদের তাতিয়ে দিয়েছে। এই পথ যদি না শেষ  হয়...  কানে কানে শুধু একবার বলো তুমি যে আমার... 

সেই সিন দেখে আমাদের পাড়ার রতনদা যে কতো মেয়ের কানে কানে বলেছিল, ওগো তুমি যে আমার...।সাথে সাথে মধুবালা দিলীপ কুমার কম যায় না! প্যার কিয়া কোয়ী চোরী নহী কিউ ছুপছুপ কা ইয়ে ডরনা ক্যায়া...। আহা প্রেম জমে ক্ষীর। প্রাণ যায়ে পর প্রেম না যায়ে। বহুদিন আসমুদ্রহিমাচল মজে ছিল সেই চোরাটানে।

তারপর এলো রাজেশ খান্নার যুগের প্রেম। সেই প্রেমকে টপকে দিয়ে ময়দানে নামলো অমিতাভ - রেখার মারকাটারি রসায়ন। এই প্রেম গাছের ডালে কিচিরমিচির প্রজাপতি প্রেম নয়। এক্কেবারে মারকাটারি প্রেম। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান! তারপর দিলবালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে..

দিকে দিকে যতো প্রেম বাড়ছে ততো কমছে প্রেমের নিরিবিলি জায়গা। ভিক্টোরিয়া, গড়ের মাঠ,গঙ্গার পাড়ে যাদের জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়, ওরা সত্যিই মহাপুরুষ। একটা চার ফুট জায়গায়  চারজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা। এক জোড়ার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে আর এক জোড়া প্রেমিক। কি করে পারে!

জানি না এই প্রেম হৃদয়  সর্বস্ব না শরীর সর্বস্ব!

কবি লিখেছেন না,

" তেমন করে ডাকতে পারো যদি

তবেই আমি শরীর জলে

গড়বো এক নদী"।

এখন ডাক তো আছে কিন্তু নদীতে যে চড়া পড়ে গেছে!

লেখকদের কথা শুনে মাঝে মাঝেই গুলিয়ে ফেলি, কোন প্যায় আসলি প্যার! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো বলেই দিয়েছেন, প্রেম মানেই পরকীয়া। ঘরের বউয়ের সাথে  সংসার করা যায়, কিন্তু প্রেম!  নৈব নৈব চ।ঘরকা মুরগি ডাল বরাবর।পেট ভরে মন ভরে না। প্রেমের জন্য পাশের বাড়ির শ্রীদেবী! আরে আরে আমাকে দোষ দিয়ে কি হবে, এখন সরকারও তো পরকীয়াকে আইনী সীলমোহর দিয়ে দিয়েছে। পরকীয়া আর আইনের চোখে অপরাধ নয়।  এতে জনসাধারণের লাভলোকসান কি হয়েছে জানি না। তবে পুলিশের উপরি রোজকারে একটু টান তো পড়েছেই। যখন তখন জলে জঙ্গলে, নদীর কিনারে আর চোখ রাঙিয়ে টাকা হড়পাতে পারছে না। 

প্রেম কোন কাঁটাতারের সীমানা মানে না। পাকিস্তানের প্রেমিকা প্রেমের টানে ইন্ডিয়ার কাঁটাতার টপকে এপারে চলে আসছে। এপারের প্রেমিকাও ছুটছে ওপারে। প্রেম সিগন্যাল মানে না... 

এপারে আমি আর ওই পারে তুমি, মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায়!  এখন সেই যুগ নেই। নদীতে ব্রীজ তৈরী হয়ে গেছে। সেই ব্রীজের উপর, দোলে দোদুল দোলনায় উড়ছে তাবৎ প্রেমিক যুগল!

সনাতনীদের যেমন রাধাকৃষ্ণ আছে। ওদেরও তেমন লায়লা- মজনু আছে৷ লায়লার টানে কতো মজনু যে, পাগলা হাওয়ায় বানভাসি হয়ে তলিয়ে গেছে তার ঠিকঠিকানা নাই।সিনেমাওয়ালারাও লায়লা মজনু, আর দেবদাস-এর দৌলতে কম কামায় নি।কোটি কোটি। আমাদের শ্রেয়া ঘোষালও তো ওরই জোরে উতরে গেছলো। ডোলা রে ডোলা রে.... 

প্রেমের যথার্থ বয়স কতো হওয়া উচিত?  এ বিষয়ে এখনও সম্ভবত কোন মাপকাঠি নেই। প্রেমের আবার বয়স কি। অমিতাভ যাঁহা সে খাড়া হোতা ওহিসে লাইন শুরু হোতা! প্রেমেও সেই অবস্থা। যে বয়সে পড়বে সেখানেই শুরু। গুরু গুরু...  শেষ বয়সে কি খেল দেখালে বস্!  মন্ত্রী, এম.এল. এ, কলকাতা পৌরসভার সবচেয়ে উঁচু পদটাকে এমন কি দিদিকেও বাইপাস সার্জারি করে বৈশালী - র হাত ধরে নিরুদ্দেশ হতে বুকের পাটা চাই ব্রাদার্স। হিম্মত লাগে। শোভন দা সেই হিম্মত দেখিয়েছেন। এরপর হয়তো লেখক নতুন উপন্যাস ফাঁদবেন " দেবদাস " এর মতো! শোভন - বৈশালীর ককটেল!  আমরা আম আঁটি চোষা পাবলিক শুধু দেখেই সার্থক। সাহস টা সৎ না অসৎ সেটা পরে বিবেচ্য,কিন্তু আমাদের সংসারী জনগণের সেই দুঃসাহসটাই নেই। 

পার্থদা অপার সম্পর্কটা জমবো জমবো করেও ঠিক জমলো না, কোথায় যেন একটা লক্ষ্মণের গন্ডীরেখায় আটকে আছে। কারামুক্তি হলে কি ঘটে সেটাও দেখার!

প্রেমে শক খেলে সবসময় সবাই দেবদাস হয়ে টালমাটাল হয়ে ভ্যাগাবন্ড হয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরতে ঘুরতে পার্বতীর বাড়ির সামনে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়বে এমন কোনও কথা নেই। এখন যুগ পাল্টেছে। চরিত্রও বদলে গেছে। এই তো এক প্রেমিক প্রেমিকার পরকীয়া সহ্য করতে না পেরে মাত্র বিয়াল্লিশ টা ছুরি মেরে প্রেমিকার জান খতম করে দিলো। তার মানে  প্রেমেও এখন আমিষ ঢুকে গেছে।  প্রেম আছে অথচ সন্দেহ নেই এমনটা সচরাচর চোখে পড়ে না। শিখা-র সাথে সুভাষের প্রেম তখন বেশ জমজমাট। বাংলার গ্রান্ড ক্যানিয়ন গনগনির লাল মাটিতে হাত ধরাধরি করে দুজনেই শিলাবতীর উপর সূর্যাস্ত দেখছে। দু'জনে দুজনের প্রেমে টইটম্বুর। সুভাষ বললো, তুমি আমার কল্পনার চেয়েও বেশি, অনেক অনেক বিউটিফুল। কথাটা শুনেই শিখা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। সম্পর্কেও লালবাতি জ্বেলে দিল। সেদিন থেকেই শিখা খুঁজে চলেছে, কল্পনা টা কে? একবার তার খোঁজ পেলে হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দিতাম! বোঝ ঠ্যালা।


আচ্ছা একটা জিনিস ঠিক মাথায় ঢুকে না। সিনেমার নায়ক নায়িকাদের যেমন হুড়দাড় প্রেম হয়। নেতা মন্ত্রীদের তেমন প্রেম হয়না কেন? আপত্তিটা কোথায়?  শাসক দলের নেতা নেত্রীর সাথে বিরোধী দলের নেতা নেত্রীর একটু আধটু প্রেম হলে, কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে!  বরং সেক্ষেত্রে নির্বাচনী সমঝোতা আরও গভীর হতো।লালের সাথে হলুদের, গেরুয়ার সাথে সবুজের একটু মাখোমাখো কিছু হলে বেশ জমতো কিন্তু। মোহব্বত কি নহী যাতা মোহাব্বত হো যাতি হ্যায়...

ঘটুক ঘটুক এমন অঘটন। আচ্ছা প্রেমের পরে বিবাহ নাকি বিবাহের পরে প্রেম কোনটা টেকসই? কোনটার স্থায়িত্ব বেশী? 

তবে এখন প্রেমেও অংক ঢুকে গেছে। মেয়েরা প্রেম করবার আগে ছেলের ঠিকুজি কুষ্ঠি মিলিয়ে দেখে নেয়ে। চাকরি যোগ কেমন!  হিসাব নিকেশ করে তবে ময়দানে নামে। অবশ্য একদিকে ঠিকই আছে। প্রেমের জোছনা সংসারের গাড্ডায় পড়লে সাঁতার না জানলে সলিল সমাধি। তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা....

প্রেমের পর রোজগার না থাকলে সে প্রেম ভোঁ কাট্টা। তবুও নিয়ম বহির্ভূত প্রেম কি হচ্ছে না। কিন্তু মাঝে মাঝে একই গাছের ডালে একই ওড়নায় দুজনেই ঝুলছে খবর পড়লেই, অমন নিয়ম বহির্ভূত প্রেমে আস্থা হারিয়ে ফেলি। 

প্রেমের কোনও জাতপাত নেই। কথায় প্রবচনে আছে, " পিরিতে মজিলে মন,কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম"! প্রেমের চোরা স্রোতে পড়লে! তোর কোঁকড়া কোঁকড়া চুলে যেন সমুদ্র ঢেউ খেলে। ও তোর লাল লাল ঠোঁটে যে বিড়ির ধোঁয়া ওঠে,  আমি সেখানেই পাগল হয়ে যাই"! এই হচ্ছে প্রেমের আসল কথা। সেখানে ব্রাহ্মণ কায়স্থ, চন্ডাল হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান সব একাকার। কবির কথা তখনই সার্বিকভাবে সার্থক হয়। " আমরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম... ইত্যাদি ইত্যাদি... 

 খুব গোপনে একটা কথা বলছি, দয়া করে পাঁচকান করে কেস খাওয়াবেন না। এই বয়সে জেলে যেতে চাইছি না। আচ্ছা ভেবে দেখেছেন কখনো। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একলা,মুখ্যমন্ত্রী একলা এমন কি বিরোধী দলের কেন্দ্র কিংবা রাজ্য প্রধান প্রতিপক্ষ দু'জনেই সিঙ্গেল!  এঁদের হাতে পড়ে দেশে প্রেম যে এখনও নিরাপদ আছে,  এটা ভেবেই আশ্চর্য হচ্ছেন নাকি? খুব কি ভুল বললাম।আপনারা একা থাকুন খেতি নাই, কিন্তু আমাদের অধম শ্রেণির প্রেমে কাঁটা বিছিয়ে দিবেন না, এটাই অনুরোধ। প্রেম ছাড়া বাঙালি বাঁচবে না, সিনেমা বাঁচবে না, সিরিয়াল বাঁচবে না, আর কবিদের বুক থেকে প্রেম ঝরে গেলে কবিতার কি হবে? কে লিখবেন... 

" তেমন করে ডাক দাও যদি

বসন্তে বসন্তে জলঝারি

সাড়া দিতে পারি আমি

অবিশ্বাস্য সাড়া দিতে পারি "!

 প্রেম না থাকলে তাজমহল ভিক্টোরিয়ার প্রত্যেকটা ইঁট খসে খসে পড়বে।দীঘার সী বিচ শুনসান হয়ে যাবে। গঙ্গার মিলেনিয়াম পার্ক ধূধূ মরুভূমির মতো ধুঁকবে।বইমেলা হারাবে তার জৌলুষ। মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল জনশূন্য হয়ে যাবে। ফুচকার স্টলে ভিড় থাকবে না।রেষ্টুরেন্ট খাঁ খাঁ করবে। সংগীত হারাবে সুর লয় তাল।সরস্বতী পূজা উঠে যাবে। পলাশ ফুলের রঙ ফিকে হয়ে যাবে।ভ্যালেন্সটাইন ডে ভ্যানিস হবেই হবে। গোলাপের চাহিদাই থাকবে না। রামধনু হারিয়ে ফেলবে তার সাত রঙের অহংকার! ধুসর হয়ে যাবে পৃথিবীর তাবৎ জৌলুষ!  সেজন্য প্রেম থাকুক দখিনা বাতাসের মতো বাঙালির পাঁজরে।শীতের একফালি রোদ্দুরের গরিমা নিয়ে আমাদের হৃদমাঝারে।

কিন্তু সমস্যা হলো 

" তকদীর হ্যায়, মগর কিসমত নেহী খুলতি

তাজমহল বনানা চাহাতা হুঁ

লেকিন মমতাজ নেহি মিলতি"!

বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০২২

মন ফাগুনের ডাক ।। কাশীনাথ সাহা ।।কবিতা, Kashinath Saha

মন ফাগুনের ডাক

কাশীনাথ সাহা 



সুর ছড়ানো আলোছায়ায়

ফাগুন দিল ডাক

পলাশ বনের দিনযাপনে

স্বপ্ন ভরা থাক।

শাল-পিয়ালের সবুজ শাখায় 

একতারাটির টান

এমন দিনে মাতন হাওয়ার

ছড়িয়ে দিলাম গান। 

আবির আর রঙের ছোঁয়ায়

প্রেমিক রাঙা মন

খুঁজে বেড়ায় আড়াল ভেঙে

অধরা বৃন্দাবন। 

সেই প্লাবনে রাধা ভাসে

কৃষ্ণ অভিসারে

ফাগুন বিকেল ডাক দিয়েছে

থাকবো না আর ঘরে।

ঘরের ভিতর ঘর বেঁধেছি

ঠিকানা নাই তার

আবির মেখে আসতে পারো

অবারিত দ্বার।

শিমুল পলাশ আগুন জ্বালায়

নীল আকাশের কোনে

থাকবো কেন অপরাহ্নে

ভরা এই ফাগুনে।

ফাগুন তুমি আগুন ছুঁয়ে

আমার কাছে এসো

তারপরেতে স্বপ্ন বুনে

একটু ভালবেসো। 

ভালবাসার মন ফাগুনে

দু'জনে যাবো ভেসে

জানি না তো কোন সে স্রোতে

ভাসবো নিরুদ্দেশে।

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

যেমন দেখেছি || কাশীনাথ সাহা || রম্যরচনা

রম্যরচনা
যেমন দেখেছি 
কাশীনাথ সাহা 


যা দেখছি তা সবটা বলা যাবে না। বলতেও নেই। কি দরকার দাদা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার! ঘাড়ে তো একটাই মাথা। বেশ পুরাতন। পুরাতন জিনিসে একটু জং ধরে। ধরাটাই স্বাভাবিক। আমার মাথাতেও ধরেছে। তবু্ও নিজের মাথা তো তাই সামান্য একটু মায়াদয়া আছে। এই বয়সে ধড় থেকে মাথাটা আলাদা করবার কোন সদিচ্ছা আমার নেই । অসময়ে শহীদ হতেও চাইছি না।  তাই যা দেখছি তার সবকিছু বলতে পারলাম না বলে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিলাম।  যেদিক গুলি নিরাপদ ভাবে বলা যায় সেই দিকগুলিতেই মেরুদণ্ড সোজা রেখে দু'চারটি কথা বলি।
প্রথমেই সাহিত্যের কথা বলি। গ্রামে গঞ্জে এখন কবিদের ছড়াছড়ি। লকডাউনে কবি আর কবিতার সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেছে। সরকার কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কোন নিষেধাজ্ঞা এখনো অব্দি জারি করেনি। ফলে গাছে গাছে এখন কবিতা প্রচুর ফলছে। তিন ফসলি দো ফসলি জমির কথাই এতোকাল শুনে এসেছি। এখন দশ ফসলি কবিও দেখছি। প্রতিদিন দশ বারোটা কবিতা কোন কোন কবি নামিয়ে দিচ্ছে। কলমের মুখ দিয়ে গলগল করে কবিতা বের হচ্ছে। কবিতা কেমন হচ্ছে সেটা বিবেচ্য নয়। কবিতা যে অনর্গল বের হচ্ছে সেটাই বিবেচ্য। ওই কবিতা পরিবেশনের জন্য ভাল ক্যাটারার আছে। আর কিছুই না বুঝতে পেরে অসাধারণ, অসামান্য বলবার কিছু উর্বর বোদ্ধা তো আছেই। কবি লিখলেন প্রেমের কবিতা, বোদ্ধা মন্তব্য করলেন, আপনার এই পোতিবাদি কোবিতা পড়ে আমি ভাসা হারিয়ে ফেলেছি। আমি মনতোমুগধো। আগে কোনদিন আমি এমন পোতিবাদী ভকতি মূলক কোবিতা খাওয়া দূরস্থ চেখে দেখবারও সামাননো সুযোগ পাইনি। মম্তব্যের ভাষা আর বানান দেখে কবির আক্কেল গুড়ুম!
কবি যদি মহিলা হয় তো পোয়া বারো। তখন প্রশংসা আর থামতেই চায় না। ওই স্তাবকদের নৈবেদ্যে মহিলা তুষ্ট হয় কিনা জানি না। নিশ্চয়ই কোন কোন কবি হয় নইলে এমন বোদ্ধার দল তো কবেই অবলুপ্ত হয়ে যেত। এরপর আছে চুলকানির পালা। পালা নয়, মহোৎসব!  তুমি আমার কবিতার প্রশংসা করো আমিও তোমাকে দেখবো। আমার কবিতা যেমনই হোক তোমাকে প্রশংসায় প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হবে। নই-লে আড়ি। দাদা দিদিকে দেখেন দিদি দাদাকে। সবার হাতে শিশি ভর্তি তেল। মালিশ, তেল মালিশ। এ খেলা চলছে নিরন্তর। আর এই করতে গিয়ে কবি, কবিতা দুজনেই ডুবে মরছে।প্রায় প্রতি কবির একটা চেনা গন্ডী আছে। সেই গন্ডীতে আছে পোষা বোদ্ধা। তাদের গন্ডীর কবিতা যতো নিকৃষ্ট মানের হোক না কেন। নৈবদ্যের ডালি নিয়ে ফুল বেলপাতা নিয়ে ভক্তকূল প্রতিক্ষায় থাকে।  চরণামৃত না খেয়ে সেই ভক্তকূল উঠবেই না। এখানেও দর্শন আছে। সে দর্শন সকলের বোধগম্য নয়। এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আনজনে..  সজনি আমি বুঝি মরেছি মনে মনে।
অবশ্য স্তাবক পরিবৃত না হয়েও ভাল কবিতা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই কবিতায় হৃদয় আছে, আলো আছে, প্রাণ আছে, উত্তাপ আছে, লাবণ্য আছে, গভীরতা আছে।  সেই কবিতার নাম শম্ভুনাথ রক্ষিত। বিনয় মজুমদার। যাঁদের মাথায় রাজনৈতিক ছত্রছায়া নেই। যাঁদের জন্য সুদৃশ্য মঞ্চ নেই। যাঁদের পেটে খিদে বাসি আমানির মতো শুয়ে থাকে। হৃদয়ে অক্ষরের মন্ত্রধ্বণি। চেতনায় আলোর ছটা।
এদের স্তাবককূল নেই। তবুও একদিন  এই কবিতাই আমাদের আলোকিত করবে। আমাদের পথ দেখাবে। আমাদের শুদ্ধ করবে।
হারিয়ে যাবে এই স্তাবক পরিবৃত অক্ষম কবিতার অহংকারী মুখ গুলি।

রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

রম্যরচনা || স্বাধীনতা || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

স্বাধীনতা
কাশীনাথ সাহা


স্বাধীনতা দিবস নাম শুনলেই আমাদের বুকে ডুগডুগির মতো একটা বাজনা বাজতে শুরু করে।বেশ মিঠিমিঠি সুরেলা। আমরা  একটা মৌজ অনুভব করি।  আর পনেরই আগষ্ট এলে তো কথাই নেই, ওইদিন  হড়পা বানের মত হু হু করে স্বাধীনতার আবেগ ঢুকে যায় আমাদের মগজে। সবাই মেতে উঠি স্বাধীনতার শব্দ তরঙ্গে।  যাঁর ভাঙা ঘরে ফাঁক ফোকর দিয়ে কোনদিন স্বাধীনতা ঢুকেনি তিনিও স্বাধীনতার গন্ধে মাতোয়ারা । স্কুলে স্কুলে স্বাধীনতার উৎসব, পাড়ায়, ক্লাবে, পাটী অফিসে, চা দোকানে, ফুচকা ষ্টলে জিলে লে জিলে লে স্বাধীনতা জিলে লে...!  নেতাদের ধবধবে পাঞ্জাবি, চুড়িদার। কোথাও সবুজ, কোথাও গেরুয়া। না লালেদের এখনও স্বাধীনতা দিবসে গা গরম হয় না। ইয়ে স্বাধীনতা ঝুটা হ্যায়...  ওরা এখনো সেখানেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিন্তু লাল মানে না বলে স্বাধীনতা দিবস তো থেমে থাকবে না। ক্লাবে পাড়ায় জনগণ মন..  দিয়ে শুরু তারপর বেলা বাড়বার সাথে সাথে স্বাধীনতা তেড়েফুঁড়ে বের হতে থাকে।  ডি জের জোরালো শব্দ ব্রহ্মে স্বাধীনতা স্বাদহীন হয়ে টগবগিয়ে ছুটতে থাকে।  আগে চটুল হিন্দি, বাংলা গান বাজতো। এখন প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মত ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। ওইদিন খাসি মুরগীর বাজার রমরমা।  স্বাধীনতা দিবসে একটু মাংস হবে না!  তা না হলে কিসের স্বাধীনতা! সাথে একটু ঢুকুঢুকু না হলে ফুল মস্তি হয় না। অতএব বন্ধ ক্লাব ঘরে  -- তা বলে কি মাল খাবো না যতই মারো কলসির কানা...।  পাড়ার স্কুলে মাষ্টার মশায় পতাকা টাঙাতে গিয়ে ভিরমি খায়। কোন রঙ টা উপরে গেরুয়া না সবুজ। গত বছর তো গেরুয়াটাই ছিল মনে হয়,  এবছর সংবিধান সংশোধন করে পতাকার রঙ সংশোধন করে দেয়নি তো। হেডস্যর মাথা চুলকায়। সমস্যার সমাধান করে দেয় পিওন হরিহর, বলে স্যর কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীও যা আর কন্যা কুমারী থেকে কাশ্মীরও তাই। যা চালভাজা তাই মুড়ি। যে দিকটা ভাল লাগছে সেই রঙটাই উপরে করে দিন স্যার। কথাটা মনে ধরে হেডস্যরের তিনি সবুজটা উপরে করতে যাচ্ছিলেন অংকের টিচার অতনুবাবু সদ্য সদ্য মোদী ভক্ত হয়েছেন তিনি তেড়ে এলেন। না না এসব চলবে না দেশজুড়ে এখন গেরুয়া ঝড়, গেরুয়াকে নিচে দেওয়া চলবে না, পাশ থেকে দু চারজন শিক্ষক শিক্ষিকা গলা মেলালেন চলবে না চলবে না। হেডস্যর পতাকা তোলা স্থগিত রেখেই বন্দেমাতরম  শ্লোগান দিলেন। বামপন্থিরা বন্দেমাতরম না বলে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল ইনকেলাব, গেরুয়া পন্থীরা আরও জোরে ভারত মাতা কী জয়, জয় শ্রীরাম। তারপর জনগণ মন তেও ঝামেলা একজন  যখন তব শুভ নামে জাগে তে চলছে অন্যজন তখন হিমা দাসের মতো স্প্রিন্ট টেনে জয় হে জয় হে তে পৌঁছে গেছে।
  এখন ফ্যাশনের যুগ ঠোঁট, খোঁপায়, হাতে তেরঙের হরেক বাহারি অলঙ্কার অহংকারে টগবগ করছে। আমাদের  পাড়ার মিঠুদি দোকানীকে জিজ্ঞেস করলো,  দাদা তেরঙা লিপস্টিক আছে? দোকানী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুদিকে মাথা নাড়ে। না দিদিমণি এখনও বাজারে ও জিনিস ল্যান্ড করেনি। তবে চিন শুনতে পেলে সামনের বছর বাজারে চিনা মাল ঠিক নামিয়ে দেবে।
খেলার মাঠেও স্বাধীনতা ফুটবল ম্যাচ। বিবাহিতদের সাথে অবিবাহিতদের। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে পরাধীন পুরুষদের সাথে স্বাধীন পুরুষদের মহাসংগ্রাম।
কবিরাও তেড়েফুঁড়ে নেমে যায় স্বাধীনতার পিন্ডি চটকে দিতে। সকাল থেকে ফেসবুকে কবিতায় কবিতায় ছয়লাপ।  যে যেমন পারে কবিতা নামিয়ে দিচ্ছে। এখানেও অবাধ স্বাধীনতা। নিষেধ করবে কে? আর করলেই বা শুনছেটা কে। প্রবল টর্নেডোর মতো এক একজনের কবিতা শুনলে শক্তপোক্ত মানুষেরও হার্টফেল অনিবার্য।
         রাতের দিকে স্বাধীনতা আরও জমে যায়। ক্লাবে ক্লাবে জমজমাট ফাংশন। হইচই মৌজ মস্তি।
বাধা দেবে কে? প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে পাড়ার নেতা নাহলে পঞ্চায়েত প্রধান।  যাঁরা স্বাধীনতার জন্য প্রান দিয়েছিলেন তাঁরা বেঁচেবর্তে থাকলে নিশ্চিত  এসব দেখে আর একবার প্রাণ বিসর্জন দিতেন।

রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

ভুল ভুলাইয়া (২য় তথা শেষ পর্ব ) || কাশীনাথ সাহা || প্রতি রবিবার

রম্য রচনা

ভুল ভুলাইয়া (২য় তথা শেষ পর্ব ) 
কাশীনাথ সাহা 

বিনোদবাবু দুর্গাপূজার সময় নবমীর সন্ধ্যায় বোনকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছিলেন। প্রচন্ড ভিড়। পথে নিজের মর্জি মতোন হাঁটা দায়। ভিড়ের ঠ্যালায় সামনে ভেসে চললেন পাল বিহীন নৌকার মতো। নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন বোনকে নিয়ে, ভিড়ের চাপে হাত ছাড়াছাড়ি শুধু নয়,হাত পাল্টাপাল্টি হয়ে বাড়ি ফিরলেন অন্য এক মহিলাকে নিয়ে। মারাত্মক ভুল। সেই ভুল থেকেই গিয়েছে বিনোদ বাবুর জীবনে। মহিলা তার হাত আর সরিয়ে নেয় নি, বিনোদ বাবুও হাত ছাড়েনি। এখন বেশ জমিয়ে সংসার করছে দু'জনে। বেশ সুখী দম্পতি। সংসারে ছোটখাটো ভুল হলে ওরা ঠিক মানিয়ে নেয়। কারণ ভুলের হাত ধরেই তো ওদের সংসারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন!
অতনুবাবুর চশমার কাঁচ বহুদিন হলো ভেঙে গেছে। চশমা ছাড়া তিনি স্পষ্ট দেখতে পান না। গিন্নিকে বহুবার বলেছে কাঁচ পাল্টে দিতে, গিন্নীর সময় হয়নি। ইতিমধ্যে এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়ে বাড়িতে দু'জনেই গেলেন ঘাটাল।বিয়ে ভালো ভাবেই মিটে গেল। হলঘরে টানা বিছানা। মাঝরাতে অতনুবাবু একে ওকে ডিঙিয়ে মাড়িয়ে বাথরুম গেলেন। ফিরে এসে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন। স্ত্রী অনেক রাতে উঠে দেখেন স্বামী পাশে নেই। ঘুম চোখে স্বামীকে খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন কিছুদূরে অন্য এক মহিলাকে ধরে বেশ আরামে তিনি ঘুমিয়ে আছেন। পরদিনই চশমার কাঁচ পাল্টে গেল। অবশ্য  এখনও বোঝা যায়নি, অতনুবাবুর ভুলটা সত্যি ভুল না ইচ্ছাকৃত অপরাধ!  এই নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাঝেই ঠোকাঠুকি হয়।
অফিস টাইমে বাসের কি রকম ভিড় ভুক্তভোগীরা নিশ্চয় জানেন। শিব্রাম চক্রবর্তীর কথায়, এমন ভিড় বাসে সামনে একজন প্যাসেঞ্জার উঠলে পেছনের গেট থেকে একজন টুপ্ করে খসে পড়ে।
সেই ভিড় বাসে বহুক্ষণ পা চুলকচ্ছি কিন্তু কোন অনুভূতি টের পাচ্ছি না। যেন পায়ে কোন সাড় নেই। ক্রমাগত চুলকেই যাচ্ছি। অনেকক্ষণ পরে পাশ থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে দাদা আর চুলকাবেন না,অনেকক্ষণ হলো এবার জ্বালা করছে!
রাতে টর্চ ভুল করে ফেলে আসা আর বর্ষাকালে ছাতা ফেলে আসার ভুল মানুষ মাত্রেই হয়। এ ভুলের শাস্তি নেই। বাজারে গিয়ে সবজি বিক্রেতাকে টাকা দিতে ভুলে বেশ অপ্রস্তুতে পড়তে হয়। ব্যাঙ্কে গিয়ে নিজের কলম অন্যকে দিয়ে ফেরৎ নিতে ভুল অহরহ হয়। যারা ভুল করে জীবনে একটা কলম বা ছাতা হারায়নি এমন হিসেবী মানুষ খুব একটা সহজ সরল হয় না। এদের বউদের জিজ্ঞেস করুন বুঝতে পারবেন ওদের বউরা কেউ সুখী নয়!  এটা আমার দর্শন।
কিছু মানুষ টাকা ধার নিয়ে ফেরত  দিতে ভুলে যান।বাবা ভোলানাথ!  এইসব মানুষকে টাকা ধার দেওয়ার আগে দশবার ভেবে দেখতে ভুলবেন না।
তারাপদবাবু ইদানিং বেশ নামী গল্পকার ও কবি। লেখক হিসেবে গোটা দশ বারোটা পুরস্কার পেয়ে গেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর লেখার ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। রেগুলার দু তিনটে গল্প আর গোটা দশেক গল্প ডেলিভারি করছেন। ব্যাপারটা আমাদের বেশ আশ্চর্যই লাগে। কারণ ইতিপূর্বে তিনি তেমন লেখালেখি করতেন বলে শুনিনি। অবশ্য আমরা শুনিনি বলে প্রতিভাবানের প্রতিভা থেমে থাকবে এমন কোন কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তারাপদবাবু ধরা পড়ে গেলেন। খুব প্রতিষ্ঠিত একজন সাহিত্যিকের গল্প হুবহু টুকলি করে নিজের নামে অন্য একটি পত্রিকায় ছাপিয়ে দিলেন। কিন্তু কথায় আছে চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন। ধরা পড়ার পর তারাপদবাবু অম্লান বদনে বললেন, আমার একটা ছোট্ট ভুল হয়ে গেছে। মানে পত্রিকার সম্পাদক বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, শারদ সংখ্যার জন্য ভাল গল্প চাই। গল্প পাঠান। সেই দেখে ওই লেখকের গল্পটা আমি পাঠিয়ে দিলাম, গল্পটা বেশ ভালোই। কিন্তু গল্পকারের নামের জায়গায় ভুল করে আমার নামটা দিয়ে দিয়েছি। সামান্য ভুল!  পরে দেখা গেল এই সামান্য ভুলটা উনি প্রায় সর্বত্রই করেন। কি আর করা যায় ভুল তো মানুষ মাত্রই করে। লেখক লেখিকারাও তো মানুষ? তাই না!
বিশিষ্ট সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন একবার ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একটা ভুল বার্তা বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে এসে দেখলেন যে মেয়েরা পাথরের উপর আছড়ে আছড়ে কাপড় কাচছে। উনি দেশে ফিরে লিখলেন, ভারতের মেয়েরা কাপড় দিয়ে পাথর ভাঙে। ভাবুন অবস্থা।
কিছুূদিন আগে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন বের হয়েছিল। নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে আগামীকাল শহীদ মিনার থেকে একটা যৌন মিছিল বের হবে। দলে দলে যোগ দিন। পরদিন যথাসময়ে শহীদ মিনার চত্তরে মানুষে মানুষে ছয়লাপ। উদ্যোক্তারা এতো ভিড় প্রত্যাশাই করে নি।সেইসময় উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হলো, দেখুন গতকালের বিজ্ঞাপনে একটা ছোট্ট ভুল হয়ে গেছে। মৌন মিছিলের বদলে প্রিন্টিং মিস্টেক হয়ে ওটা যৌন মিছিল হয়ে গেছে , এজন্য আমরা ক্ষমা চাইছি। ব্যস, মুহূর্তে ভিড় ফরসা। ওই এক ঘোষণায় জনগণ সব উৎসাহ হারিয়ে ফেললো। উদ্যোক্তাদের তখন  আফশোস কেন যে সামান্য ভুলটা সংশোধন করতে গেলাম!
সেদিন বিউটি পার্লার থেকে এক সুন্দরী মহিলাকে বের হতে দেখে চোখে বেশ ঘোর লাগলো। আহা কি দারুণ দেখতে,  চোখ দুটি টানা টানা মনে হয় যেন কাছে ডাকছে.... । কোন মহাপুরুষের ভাগ্য কে জানে!  আমি তাকিয়েই রইলাম। চোখের পলক আর পড়ে না। ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন। ওরকম অসভ্যের মতো কি দেখা হচ্ছে? ছিঃ লজ্জা করেনা।
আমি আধহাত জিব কাটলাম। না মা জননী আপনি যা ভাবছেন তা নয়, আমি মা জননীর মতোই আপনাকে...
বাকী কথা আর শেষ হলো না। মহিলা ধমকে উঠলেন। চোপ আর একটা কথাও না। নিজের বউকে মা জননী বলতে তোমার লজ্জা করছে না। বুড়ো ভাম কোথাকার!  ঘরে চলো তোমাকে কি করে  শায়েস্তা করতে হয় দেখাবো।
ভুলটা বুঝতে পেরে আরও একবার আধহাত জিব কেটে বললাম,  যাঃ মনীষা তুমি বড্ড বেরসিক, সামান্য রসিকতাটাও বোঝ না! 😀😀😀😀

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

রম্যরচনা || ভুল ভুলাইয়া~১ || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

ভুল ভুলাইয়া ( ১ম পর্ব)
কাশীনাথ সাহা

মানুষ মাত্রই ভুল করা। এক্কেবারে হক কথা। ভুল করা মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার। ভুল করুন ক্ষতি নেই, তবে ব্রাদার ভুলের মাত্রা জ্ঞানটা ঠিক রাখা চাই। ডোজ কমবেশি হলেই সব্বোনাশ। এমন ভুল করবেন না যে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত নেই।
আমাদের প্রথম ভুল কিশোর বয়সে। ওই বয়সেই বুকে কৃ্ষ্ণচূড়ার ফুল ফোটে। থোকা থোকা লাল নীল হলুদ বেগুনি ফুল।গন্ধ না থাকুক বাহার আছে। সেই সুগন্ধিতেই মানুষ প্রেমের গাড্ডায় পড়ে খাবি খায়। তুম মেরী দিল কা ধড়কন!  বার তের বছরের কিশোর, যার ভাল মতো দিল-ই তৈরী  হয়নি তারও ধড়কন!  ক্লাসে শিক্ষক মোগল সাম্রাজ্য বিস্তার পড়াচ্ছেন, আর ছাত্রের মাথায় তখন টুনি- টুনটুনি। টুনি বাল্ব জ্বলছে নিভছে। ঘোষাল পাড়ার টুনি দুপাশে বিনুনি ঝুলিয়ে স্কুলে যায়, ছাত্রের মন বৃন্দাবন। সেই টুনির টানে টালমাটাল। স্যর জিজ্ঞেস করলেন, দীপক দিল্লির সিংহাসনে প্রথম কোন মহিলা প্রথম সম্রাজ্ঞী হয়েছিল? দীপকের সিংহাসনে তখন টুনির ফোকাস। হাসি হাসি মুখে দীপক বলল, টুনি স্যর। টুনি? কোন টুনি?  মেরা দিল কা মোরব্বা। পাশ থেকে গনশা ত্রুটি সংশোধন করে দেয়। মোরব্বা নয় উল্লুক, মোহাব্বত। দিল কা মোহব্বত। সারা ক্লাসে তখন হাসির সুনামি। স্যর বললেন, বাবা দীপক এই বয়সে সকলেরই একটু আধটু ঘোর লাগে।  মোহব্বতের ঘোরটা কাটাও বাবা, নইলে গাড্ডায় পড়বে। সেই ঘোর আর কাটলো না। গীয়ার পাল্টে পাল্টে কোনরকমে ক্লাস নাইন। নাইনে তিনবার। ঘোর যখন কাটলো তখন জীবন এগিয়ে গেছে দীপক খাবি খাচ্ছে পচা ডোবায়।
বিয়ে করাও একটা মারাত্মক ভুল। মানুষ বিয়ে করে কেন? সারাজীবন গুঁতোগুঁতি করবার একটা হৃষ্টপুষ্ট পার্টনারের জন্য। সারাজীবন এ ওকে আঁচড়ায় ও একে গুঁতোয়। প্রেম ফ্রেম বোগাস। ওসব সিনেমা, গল্প উপন্যাসে হয়। বাস্তব জীবনে বসন্তকাল নেই। হয় গ্রীষ্ম নয় বর্ষা। জ্ঞানপাপী হয়ে তাই বিয়েটাই করে ফেলি। জীবনে বিয়ে করাও ভুল, বিয়ে না করাও ভুল। মানুষকে যে কোন একটা ভুল করতেই হয়। অতএব বিয়ে।। দিল্লীকা লাড্ডু না খেয়ে কেন পস্তানো!  খেয়েই দেখি যা থাকে কপালে। বউ মানে জ্যোৎস্না রাতে দীঘার সী বিচ। পূর্ণিমা রাতে খোলা ছাদে, সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে...। বিয়ের প্রথম প্রথম জ্যোৎস্না থাকে, দীঘা মন্দারমনির সী বিচ থাকে। রবি ঠাকুরের গান থাকে।বউয়ের নরম কোলে মাথা রেখে জয় গোস্বামী, সুনীল গাঙ্গুলিও লেজ ঝাপটায়। সবেতেই সুর। শ্যাওড়া গাছকেও দেবদারু মনে হয়। তারপর বছর ঘুরতেই সব প্রেম ফরসা। সব ধূ ধূ মরুভূমি। এই ভুলের হাত ধরে সন্তান জন্মায়। সেই সন্তানও ভুল করে  হিসেবের গন্ডগোলে এসে গেছে। মা বাবার দিন গোনার হিসেবের গন্ডগোলে ল্যান্ড করেছে। ভুল করে এসেই যখন পড়েছে, তখন গ্রীনরুমে থাকুক। এই নিয়ে স্বামী স্ত্রী তে অশান্তি। এখন স্ত্রী রা সহজে মা হতে চায় না  ওতে চটক কমে যায়। গ্লামার চটকে যায়। স্ত্রীর অভিযোগ, দিলে তো আমার জীবনটা বরবাদ করে!  এখন আমি কি করি!  বোগাস।
এই রকম ভুলের হাত ধরে সন্তান জন্মায়। নার্সিং হোমে নার্সের ভুলে সেই সন্তান আবার অদলবদল হয়ে যায়। বহুৎ কাঠখড় পুড়িয়ে থানা পুলিশ করে সেই সন্তান আবার স্ব মহিমায় স্বস্থানেই ফিরে আসে।
সংসার জীবনে ছোটখাটো ভুলও মারাত্মক হয়ে যায়। স্কুলের ফাস্ট বয় মাধ্যমিক পরীক্ষায় ব্যাক পেয়ে দুঃখ হতাশা অপমানে জীবনকে গুডবাই বলে ঝুলে পড়লো সিলিং ফ্যানে।পরে রিভিউ করে জানা গেল ছাত্রটি শুধু পাশই করে নি সব বিষয়ে ষ্টার মার্কস পেয়েছে। কিন্তু ছাত্র তখন ষ্টার হয়ে দূর আকাশে জ্বলজ্বল করছে।
বোঝার ভুলে বিপরীত প্রতিক্রিয়াও ঘটে যায়!  আমার বন্ধু সতীশকে ওর অফিসের বস বললেন, সতীশ প্রায় দেখছি, তোমার কাজকর্মের ভুল হচ্ছে। তুমি বড্ড অমনোযোগী হয়ে পড়ছো। আমারও প্রথম প্রথম ওরকম হতো। সেই সময় আমি ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যেতাম।সেখানে কিছুক্ষণ আমার স্ত্রী র সাথে সময় কাটিয়ে তার আদর সোহাগ একটু খেয়ে নিয়ে আবারও অফিসের কাজে মন দিতে পারতাম। আমার উপদেশটা মনে রেখ। পরদিন সতীশ বসের কথা মতো টিফিনের পর সময় কাটাতে আর আদর সোহাগ খেতে বসের বাড়ি চলে গেল। সবই ঠিকঠাক চলছিল। বসের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে  পালন করে আদর সোহাগও বেশ খাচ্ছিল তবুও বস যে কেন ওর চাকরিটা কেন খেয়ে নিয়েছিল সতীশ সেটাই এখনও বুঝতে পারলো না। ভুল একটা কোথাও হয়েছিল নিশ্চয়ই।
এই যে আমার কবি বলে একটুখানি পরিচিতি আছে।আমার এই কবি হওয়ার পেছনেও একটা ছোটখাটো ভুল আছে। খুব গোপনে বলি, পাঁচকান করবেন না। তখন সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়ে মল্লিকার প্রেমে ( শেরওয়াত নয়)  হাবুডুবু খেতে খেতে গোটা দশেক জম্পেশ প্রেমের কবিতা নামিয়ে দিলাম। লিখেই যখন ফেললাম, তখন সে কবিতা বাক্সবন্দী থাকে কেন!  ভাইকে বললাম কবিতা গুলো একটা পত্রিকার শারদ সংখ্যার জন্য ডাকে পাঠিয়ে দিতে। ভাই চটজলদি ভুল করে ( ইচ্ছাকৃতও হতে পারে)  আমার কবিতার বদলে দিদির ছেলের অন্নপ্রাশনের লম্বা ফর্দ খানা খামে ভরে পত্রিকা দপ্তরে পাঠিয়ে দিল। পত্রিকা সম্পাদক সেই ফর্দটাই কবিতা বলে ছাপিয়ে দিলেন। তিনি ভাবলেন নতুন আঙ্গিকের পোস্ট মর্ডান কোন কবিতা হবে। কবিতাটা বাজারে হেবি হিট করে গেল । যাকে বলে সুপার ডুপার হিট। আরও মস্ত বড়ো খবর সেই বছর আমি ওই কবিতাটির জন্য  জেলার শ্রেষ্ঠ কবির পুরস্কারটাও পেয়ে গেলাম। সেই যে দাঁড়িয়ে গেলাম তখন থেকে দাঁড়িয়েই আছি। মঞ্চ ছাড়া এখন আর কোথাও বসিই না! 😄
সৎ চরিত্রবান মানুষও সামান্য ভুলে জীবন থেকে হড়কে যায়।
ইদানিং বিচারকদেরও ভুল হচ্ছে। নিম্ন আদালত যাকে বেকসুর খালাস বলে রায় দিচ্ছে, উচ্চ আদালতের রায়ে সেই ব্যক্তিই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। উল্টোটাও হয়। ভুলটা যে কোথায় হচ্ছে ঠিক ধরতে পারছি না!
নেতা নেতৃদেরও ভুল হয়। কখনো ঐতিহাসিক কখনো প্রাগৈতিহাসিক ভুল। এই ভুলের জন্য বাংলার কপালে যদিও বা একবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শিকে ছিঁড়েছিল সেটাও জুটলো না!
ছুটির দিন স্বামী স্ত্রী নিকোপার্কে বেড়াতে গেছে।সেখানে স্ত্রী র হঠাৎ মনে পড়লো, এ্যাই তোমাকে ঘরের চাবিটা লাগাতে বলেছিলাম, ঠিক মতো লাগিয়েছিলে তো? স্বামী আধ হাত জিব কাটে, এই যাঃ এক্কেবারে ভুলে গেছি। কি হবে! রইলো নিকোপার্ক ঘোরা। দু'জন দুজনেই দোষ দিতে দিতে বাড়ি ফিরে দেখে দরজা হাট করে খোলা। ফাঁকা ঘর পেয়ে চোর সব ফাঁকা করে দিয়ে গেছে। রসিক চোর যাবার সময় সাদা কাগজে লিখে রেখে গেছে। দাদা দিদি আপনারা কি ভাল মানুষ। আমার কাজটা সহজ করে দেওয়ার জন্য বিজয়ার শুভেচ্ছা রইল। ইতি আপনাদের স্নেহধন্য - চোরভাই।

ক্রমশ....

রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

রম্যরচনা || বউ || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা


বউ
কাশীনাথ সাহা 


এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বলবার আগে অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হচ্ছে। আপনারা বুদ্ধিজীবী জনগণ, নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না, আমার এই অতি সতর্কতার কারণটা কি!  আসলে আমরা পুরুষেরা যতো বড়ো বীরপুরুষই হই না কেন বউয়ের চেয়ে বীরাঙ্গনা কেউ নই। আমাদের বাহান্ন বা ছাপ্পান্ন ইঞ্চি যে মাপেরই ছাতি থাকুক না কেন সব ঢিলে হয়ে যায় বউয়ের সামনে দাঁড়ালে। তাই একটু বাড়তি সতর্কতা। শত্রুর তো অভাব নেই। কে কখন গিন্নীর কানে চুপিচুপি ফুসমন্তর ঢেলে দেবে। তখন আমি কাশীনাথ থেকে মুহূর্তেই অনাথ।
বউ কি? বউ মানে Wife.  Wife হলো - without information fight everyone.
 তাহলে বিবাহ কি?  Marriage is a agreement of permanent disagreement.
একই ছাদের তলায় দু'জন আজীবন বক্সিং লড়ে যাব।দুজনেই ঝগড়া চালিয়ে যাব, তবুও বিবাহ করে বউ নিয়ে আনতে হয়। না আনলে চরিত্রের বারোটা বেজে যাবে। প্রতিবেশীরাই আপনার চরিত্রের বারোটা বাজিয়ে দেবে!
আমি যতোই কর্তা সেজে মাতব্বরি করি না কেন, গিন্নিই আসলি চীজ। তু চীজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত... তু চীজ বড়ি হ্যায় মস্ত...
আমি যদি মাথা হই বউ হলো ঘাড়। আমার নামেই উপরে অবস্থান। বউ মানে ঘাড় মাথার নিচে থাকলেও ঘাড় যেদিকে ঘোরাবে মাথা সেদিকেই ঘুরবে! সংসারে ওরাই প্রবল পরাক্রমশালী।
ছেলেবেলায় মাথায় কারও দুটা টিকি থাকলে বলতাম তাঁর ভাগ্যে দুটো বিয়ে আছে। তবে এখন এতোদিন সংসার ধর্ম পালন করে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি, বিয়ে করলে দুটো বিয়েই করা উচিত। একটা বউ থাকলে সবসময়ই স্বামীর সাথেই ঝগড়া করবে, কিন্তু দুটো বউ থাকলে দুই সতীনের ঝগড়ার মাঝখান থেকে আপনি বেঁচে যাবেন। যুক্তিটা সংবিধান বিরোধী হলেও ভাবতে পারেন!
এক বিজ্ঞানী মহাকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করতে করতে ভাবলেন নারী নিয়ে একটু গবেষণা করা দরকার। নারী নিয়ে গবেষণা করতে হলে নারী চাই। সেজন্য একটা বিয়েও করে ফেললেন। পরে তাঁর সমস্যা হলো বিয়ের পরে তিনি বিজ্ঞানটা কি সেটাই বেমালুম  ভুলে গেছেন।
অনেক পুরুষ মানুষ আছেন যাঁরা খুব বেশী বয়সে বিয়ে করেন।সেই এরকমই একজন ধনী ব্যক্তি প্রায় বিরাশি বছর বয়সে একটি খুবই কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করলেন। যথারীতি বিয়ে ভাল ভাবেই হলো। অতিথি সেবাও দারুন জম্পেশ করে হলো। অবশেষে ফুলশয্যা।  কিন্তু সমস্যা হলো ওই বয়সে বৃদ্ধ মানুষটি আর কিছুতেই  মনে করতে পারছেন না ফুলশয্যায় কি করতে হয়। আর মেয়েটি এতোই নাবালিকা যে সে জানেই না এই রাতে কি করতে হয়। তাই বলি যদি বিয়ে করতেই হয় সময়ে করুন। দুঃসময়ে নয়!
একটা কথা প্রায়ই ভাবি। মনে মনে ভাবি। সামান্যতমও প্রকাশ করি না। আচ্ছা ভাবুন তো,কৃষ্ণ রাধার জন্য কদমতলায় বাঁশি বাজিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতো। শাজাহান বিবির জন্য তাজমহল বানিয়ে ছিল। রাজা মহারাজা,জমিদারেরা বউয়ের জন্য কতো স্মৃতিসৌধ বানিয়েছেন। ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। কিন্তু স্বামীর জন্য কোন বউ কিছু  বানিয়েছে আজ পর্যন্ত শুনিনি। বানিয়েছে, সেটা এঁচোড়ের তরকারি নয়তো ভালবেসে বড়জোর মুড়িঘণ্ট। এজন্য সাবধানবাণী করে যাচ্ছি। যদি নিজের স্মৃতিতে কিছু বানাতে হয় নিজেই তৈরী করে যাবেন বউয়ের ভরসায় থাকবেন না।
স্বামী স্ত্রী র বিবাহ বিচ্ছেদ মামলার রায় বের হলো। বিচারক রায় দিলেন, স্ত্রী র ভরণপোষণের জন্য স্বামীর বেতনের অর্ধেক স্ত্রী কে দিয়ে দিতে হবে। স্বামী বেজায় খুশি। খুশিতে পাড়াপ্রতিবেশিকে মিষ্টি বিতরণ করতে লাগলো। এক প্রতিবেশী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কি ব্যাপার দাদা এতো ফূর্তি কিসের?  মাস ফুরোলে বেতনের অর্ধেক তো দিয়ে দিতে হবে। স্বামী হাসতে হাসতে বললো,ওটাই তো খুশির কারণ ভায়া। আগে তো বেতনের পুরো টাকাটাই বউয়ের হাতে তুলে দিতে হতো৷ তাহলে বুঝুন লাভটা কার হলো!
বউকে নিয়ে কাপড় দোকানে নিশ্চয়ই গেছেন!  আমিও গেছি । পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে বউকে নিয়ে গেছলাম পুজোর মার্কেটিং করতে। প্রথম প্রথম বিয়ে বুকে কলকল করছে আনন্দ। সন্ধ্যা ছটায় দোকানে ঢুকেছিলাম। ঝাড়াইবাছাই করে বউ কেনাকাটা করে যখন বের হলো তখন  রাত সাড়ে নটা। দশ হাজার ফিনিস। বউ ঘরে এনে সব কিছু খাটে ঢেলে দিল। আমি বড় আশা করে ছিলাম আমার জামা প্যান্টও নিশ্চিত ওখানে আছে। কিচ্ছু নেই । শুধু একটা লুঙ্গি আমার জন্য বরাদ্দ। ভারতবর্ষের মানচিত্রের নিচে শ্রীলঙ্কার অবস্থানের মতো আমার দৈনদশা। এ পর্যন্ত তবুও ঠিক ছিল । পরদিন ভোরবেলা তখনও ঘুম ভাঙেনি। মিসেস বললো, এ্যাই এই শাড়ির রঙগুলো কেমন যেন ওল্ড, প্রিন্টটাও সেকেলে এগুলো আজ পাল্টে অন্য শাড়ি নেব। তুমি সাথে যাবে।
বউকে ধার দিন ঠিক আছে কিন্তু ভুল করেও বউয়ের কাছে টাকা ধার নিবেন না। নিয়েছেন তো গাড্ডায় পড়েছেন। আমি চার বছর আগে বউয়ের কাছে দুহাজার টাকা ধার নিয়ে চারবার শোধ করেছি। কিন্তু বউ এখনও আমার কাছে আড়াই হাজার টাকা পায়। কোন ধারাপাতের কোন অংক সেটা আজও সমঝে উঠতে পারলাম না!
বউ নিয়ে আমরা স্বামীরা যতো আদিখ্যেতা দেখাই না কেন, আমরা কিন্তু কম শয়তান নই। সবসময়ই আমাদের নিজের বউয়ের চাইতে পরের বউকেই বেশী সুন্দরী মনে হয়। এই তো সেদিন সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরছি, দেখি আমার বাড়ির সামনে এক অপরূপ সুন্দরী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেন মাধুরী দিক্ষীত। আহা কোন সৌভাগ্যবানের বউ কে জানে!  ভগবান কেন যে সব সুন্দরী মহিলাকেই পরের বউ করে দেয় কে জানে। ঈশ্বরের এ বহুৎ পক্ষপাতিত্বের ব্যাপার। মহিলার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে জিজ্ঞেস করলাম, দিদিভাই আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?  মহিলা তীব্র কটাক্ষ করে বললো, আ মরণ নিজের বউকে দিদিভাই বলছো কেন!  মাথা খারাপ হয়নি তো?  বুঝলাম বাউন্ডারি মারতে গিয়ে হিট উইকেট করে ফেলেছি। গিন্নি পার্লার থেকে মাঞ্জা দিয়ে এসেছে। তাই চেনা চেনা লাগলেও চিনতে পারছিলাম না।
ভুলটা বুঝতে পেরে ঢোঁক গিললাম, নাগো একটু রসিকতা করছিলাম।
সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে। তবে পরের লাইনটা সর্বদা স্মরণে রাখবেন। স্বামী যদি নতমস্তকে বউয়ের কথা শুনে। এই দ্বিতীয় লাইনটার থেকে বেলাইনে হেঁটেছেন তো সংসার দাবানল!
 বউদের কক্ষনো কোন যুক্তিতেই হারাতে পারবেন না। ওরা কোন ব্যাপারেই নিজের ভুল স্বীকার করবে না। উল্টে ওদের ভুল আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দিবে। দিবেই।  সেদিন একটা নিমন্ত্রণ বাড়ি থেকে রাতে বাড়ি ফিরলাম। আমি টর্চ ধরে আছি বউ চাবি নিয়ে তালা খুলতে লাগলো, বহুক্ষণ চেষ্টা করেও যখন তালা খুলতে পারছে না দেখে বললাম, তুমি চাবিটা আমাকে দিয়ে টর্চটা দেখাও। বউ টর্চ ধরে থাকলো আমি চাবিকাঠিটা নিয়ে একবার ঘুরাতেই তালা খুলে গেল। বউ সাথে সাথে বললো, তুমি টর্চটাও ভালো করে ধরতে জানো না। দেখলে তো কি ভাবে টর্চ ধরতে হয়!
বউদের নিয়ে এসব বলছি বলে ভাববেন না আমি বউ বিরোধী। আমি মশায় ছা পোষা গৃহপালিত স্বামী। বউ ছাড়া দুদিনও চলে না। এই তো সেদিন বউ বাপের বাড়িতে গেল। ভাবলাম এবার আমি মুক্ত পুরুষ। পনেরই অগাস্টের স্বাধীনতা দিবসের মতো বেশ একটি ফুরফুরে ভাব এসে গেল মনে। গলা ছেড়ে গান ধরলাম,  আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে..... ।পরের লাইনগুলো আর মনে নেই। তাই ওই এক লাইনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চললো ঘন্টা খানেক । কিন্তু ওই দুদিন। তারপরই বউয়ের বিরহে মন ডানা ঝাপটাতে লাগলো । নিজের বউয়ের সাথে ঝগড়া করবার জন্য বউকে বাড়ী ফিরিয়ে এনে তবে শান্তি।

শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

চারটি লিমেরিক || কাশীনাথ সাহা || কবিতা

: লিমেরিক ১
কাশীনাথ সাহা

তোমার কথা ভেবে ভেবেই কাটলো সারারাত
সকালবেলায় তুমি হঠাৎ এলে অকস্মাৎ
তোমার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি
ঝরছে যেন রাশিরাশি
এই ফাগুনে তোমার বিয়ে পাত্র অলোকনাথ।

: লিমেরিক  ২

সুূদেষ্ণার খুব ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার  বর
দেশবিদেশে বেড়াবে দু'জনে পরস্পর
অবশেষে পাত্র পেল
কবি মানুষ লিখেন ভাল
কবিতায় মজে ওরা করছে ভালোই ঘর।

লিমেরিক ৩

পড়াশোনায় কোন দিনই ছিল না ভালো মনা
প্রতি বছর ফেল করতো এটা সবার জানা
কোনরকমে পেরিয়ে সিক্স
করতে নামলো পলিটিক্স
এখন মনা মন্ত্রীমশায় দশটি বছর টানা।

লিমেরিক ৪

গজানন ধরা পড়লো করতে গিয়ে চুরি
পাওয়া গেল নগদ টাকা সোনা দশ ভরি
পুলিশ থানায় আনলো ধরে
নেতাও এলো খানিক পরে
বললো ও পাটীর লোক পুলিশ বলে স্যরি।

বুধবার, ১৭ জুন, ২০২০

বৃষ্টির কবিতা || কাশীনাথ সাহা || কবিতা

বৃষ্টির কবিতা
কাশীনাথ সাহা











কালো মেঘে ঝিরিঝিরিয়ে
বৃষ্টি এলো হেঁটে
স্পর্শ দিল খোলা চুলে
অবিন্যস্ত ঠোঁটে।
খিলখিলিয়ে বৃষ্টি বলে
একলা কেন বসে
দেখছ নাকি বাইরে বাতাস
বইছে সবুজ ঘাসে।
সবুজ শিশু মাটি থেকে
দিচ্ছে মেলে ডানা
নদীর স্রোত খুঁজে নিচ্ছে
নিজস্ব ঠিকানা।
নতুন প্রাণ ডাকছে আয়
এসো আমার পাশে
ভালবাসায় ভরিয়ে দেব
ভরা শ্রাবণ মাসে।
এই না বলে বৃষ্টি আমার
ইচ্ছে ধরে টানে
আমিও তখন জল ছুঁয়েছি
দুরন্ত প্লাবনে।
বৃষ্টি আমি আমরা দু' ভাই
দুই জনেতে মিলে
বৃষ্টি মাতন ছড়িয়ে দিলাম
মাটির বেদিমূলে।
বৃষ্টি বলল আজকে আসি
আসবো আবার কাল
আমিও জানি আসতে হবেই
এখন বর্ষাকাল।
খিলখিলয়ে বৃষ্টি বলে
সবই বোঝ নাকি
ভালবাসার গন্ধ পেলেই
সেখানে আমি থাকি!
কাল সকালে আবার যদি
ডাকটি তোমার পাই
কবিতায় ভাসিয়ে দেব
এখন আমি যাই।
এই না বলে বৃষ্টি কণা
পেখন দুটি মেলে
দূর আকাশে নিরুদ্দেশ
কাল আসবে বলে।

রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

রম্যরচনা || কবিকথা || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা || কবিকথা
কাশীনাথ সাহা


আমাদের এই অভাগা দেশে অনেক কিছুরই অভাব আছে। চাকরি নেই, স্বাস্থ্য নেই, শিক্ষক নেই,ডাক্তার নেই। এমন অনেক নেই নিয়েই আমাদের দিনযাপনের রোজনামচা।কিন্তু এই পোড়া দেশে কবির আকাল হয়েছে এমন কথা কোনদিনই শোনা যায়নি। জন্মনিয়ন্ত্রণের সব বিধিনিষেধ কাটিয়ে কবিরা এখানে ছিল আছে এবং রমরমিয়ে থাকবে।
 কবিদের একটা নিজস্ব পোশাক আছে, বেশভূষাও আছে। হালকা  হালকা দাড়ি, শ্যাম্পু মারা চুল একটু উশকো খুশকো, হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুল পাঞ্জাবি, কাঁধে বাহারি ঝোলা। এটাই কবিদের সরকারি -বেসরকারি পোশাক। কিছু কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রমাণ করে। তাই তো!
এই এরকমই এক তরুণ কবি চলেছেন উদাস ভাবে মগজে কবিতা ভাঁজতে ভাঁজতে।সোজা পথে চলেছেন। পথে লেভেল ক্রসিং। ট্রেন আসছে তীব্র গতিতে। কিন্তু কবির ওসব সামান্য ব্যাপার দেখবার সময় নেই। বন্ধ গেটের তোয়াক্কা না করেই সে পৌঁছাতে চায় ওপারে!  পাবলিক চিৎকার করে ওঠে, থামুন থামুন...  ওরে ভাই দাঁড়াও।সকলেই সমবেত ভাবে কবিকে প্রায় টেনেই থামালেন। ট্রেন তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল। কবির চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি। প্রাণে বাঁচলেন সেটা কোন ব্যাপারই নয়। কবিতার লাইনটা বেলাইন হয়ে গেল,  ধুসস্...
সদ্য বিবাহিত বউকে নিয়ে কবি চলছেন শ্বশুরবাড়ী।বউকে পাশে বসিয়ে বের করলেন কবিতার খাতা।একটার পর একটা কবিতা পাঠ চললো। যথাসময়ে নির্দিষ্ট ষ্টেশনে ট্রেনও এসে গেল।বউ বললো, ওগো ষ্টেশন চলে এসেছে এবার নামো।কবির তখনও শ্রেষ্ঠ দুটো কবিতা পড়া বাকী। কবি বউকে আশ্বস্ত করলেন,আর দুটো কবিতা শুনে নাও, তারপর না হয় পরের ষ্টেশনে নামা যাবে!  নতুন বউ কি আর বলে, অগত্যা কবিতা শুরু হলো। ট্রেন ষ্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
শহরের কবি গ্রামের পরিবেশ দেখে কবিতা রচনা করছেন। বেশ মনোরম সবুজ স্নিগ্ধ পরিবেশ। কবিতার জন্য এক্কেবারে মারমার কাটকাট সকাল।কবি কবিতা আওড়াচ্ছেন - উপরে চাঁদ নিচে ঘাস চারিদিকে ছন্নছাড়া মানুষের বসবাস... আমি এই আলপথ ধরে যাই যদি তাঁর দেখা পাই...। পাশ দিয়ে মদনা মাতাল হাঁটছিল, থমকে দাঁড়িয়ে কবিকে আগাপাশতলা খুঁটিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করল, দাদা আমি তো শিবতলার কদমের ওখানে মাল খাই, বড্ড জল মেশায়। তিন চার গ্লাস খেলেও ঠিকমতো নেশা জমে না। পয়সাটাই জলে যায়। আপনার দেখছি জব্বর নেশা হয়েছে। কার কাছে খেলেন দাদা? ঠেকটা একটু বলে দিন দাদা আপনার গোলাম হয়ে থাকবো।
কবির পাড়ায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। একটি বেশ সুন্দরী মেয়ে আছে ওদের। সুন্দরী দেখলেই কবিদের বুকে প্রেম জন্মায়। এটা চরিত্রের দোষ নয়, কবি ধর্ম!  সেই মেয়ের নাম জানলেন কবি।  বড্ড মিষ্টি নাম, মল্লিকা। এক্কেবারে কবিতার মতো। মল্লিকাকে দেখে মল্লিকা বিষয়ক তেইশটা দীর্ঘ কবিতা নামালেন কবি।এক একটা কবিতা সাত আট পাতা।সেই কবিতা শেষ করে কবির কি উচ্ছ্বাস! আহা কি অসাধারণ কবিতা। কবিতা তো নয় যেন নায়াগ্রা জলপ্রপাত!  এই কবিতা শুনলে মল্লিকা তো কোন ছার মল্লিকার মা-ও কবির প্রেমে হাবুডুবু খাবে। পরদিন ভোরবেলায় মল্লিকাকে ঘুম থেকে তুলে কবি সেই কবিতা শোনাতে শুরু করলো। তেইশটা কবিতা যখন বেলা দশটায় শেষ হলো তখন মল্লিকা অজ্ঞান। ডাক্তারবাবু রোগী দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছিল?  মেয়ের হার্ট এতো দূর্বল কেন? নার্ভ ভীষণ উইক। মল্লিকার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আর বলবেন না ডাক্তারবাবু,  এক মুখপোড়া কবির ইয়া বড়ো বড়ো  তেইশটা কবিতা হজম করতে না পেরেই মেয়ের এই দূর্দশা। সেই কবিতা ঠিকঠাক হজম করাতে পাক্কা চারদিন নার্সিং হোমে থাকতে হলো মল্লিকাকে। ইতিমধ্যে সুযোগ পেয়ে নার্সিংহোম বিষয়ক গোটা কুড়ি কবিতা লিখে কবি হাজির নার্সিং হোমে। কিন্তু রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে সেই কবিতা মল্লিকাকে না শুনিয়ে নার্সকে শোনালেন কবি। নার্স তারপর পাশের বেডে শয্যাশায়ী। তাঁর এখনও জ্ঞান ফিরেনি। আর বিবেচক নার্সিংহোম কতৃপক্ষ গেটের বাইরে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে,  এখানে কবি ও কবিতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কবিরা একটু বাউণ্ডুলে হয়। কবির স্ত্রী কবির হাতে বাজারের ব্যগ ধরিয়ে  বাজার করতে পাঠালেন,ইলিশ মাছ কিনতে।  কবি বাজারের ব্যগ নিয়ে কলকাতা থেকে সোজা  বহরমপুর কবি সম্মেলনে। সেখান থেকে কবি বাড়িতে ফোন করলেন । মাছটা নিয়ে একটু বহরমপুর চলে এসেছি কবি সম্মেলনে। দু একদিন পরে ফিরছি।
কবিদের সাথে প্রেম করা যাবে কিন্তু বিবাহ নৈব নৈব চ! কবিতা দিয়ে প্রেম চলে সংসার চলে না। ঘরে চাল নেই কবিতা আছে, আলু নেই, তেল নেই কবিতা আছে। স্ত্রী-র কাপড় নেই কবিতা আছে। কবির স্ত্রী বললো হ্যাঁগো আমাদের তো চার বছর বিয়ে হলো এবার একটা ছেলেমেয়ে হলে হতো না। কবি স্বামী উদাস হয়ে বললো, মিনু আমি কবিতা ছাড়া আর কিছুই তোমাকে দিতে পারবো না। লক্ষীটি ভুল বোঝ না!
কবিরা একটু ভোলা মনের হয়। সব ভোলা মহেশ্বর! বউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে কবি। বউয়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বের হলো।কিন্তু বাড়ি ফিরে এলো অন্য বউয়ের হাত ধরে। ভিড়ে কবিতা ভাঁজতে ভাঁজতে বউয়ের হাত ছেড়ে অন্য মহিলাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে হাজির।সে বউ আলোয় কবিকে দেখে বললো, আপনি কে আপনি তো আমার স্বামী নয়! কবি চোখ কচলে বলে,দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। এখন কি হবে!  আপনি কে? মহিলা উত্তর দেয়, আমি কবি। আমিও তো কবি।  মহিলা সলজ্জ হেসে বলে ওমা তা-ই!  রতনে রতন চেনে।
কবির বাবা নার্সিংহোমে ভর্তি। এক্ষুনি রক্ত দিতে হবে। পেসেন্ট সিরিয়াস। কবি রক্ত শুনেই রক্ত বিষয়ে কবিতা লিখতে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন, রক্ত এনেছেন?  কবি আকাশ থেকে পড়লো, রক্ত? রক্ত কেন?
এ রক্ত কি নেবেন জননী প্রসন্ন দক্ষিণ হস্তে! ডাক্তারবাবু সব দেখে বললেন, আপনি তো মহামানব মশায়, আপনার একটু পায়ের ধুলো দিন মাদুলি করে পরবো।
কবি দীঘার সমুদ্রে স্নান করতে নেমেছেন। প্রবল ঢেউয়ে কবির গামছা ভেসে গেল। কবি অপেক্ষা করতে লাগলো পরবর্তী ঢেউয়েী জন্য। সমুদ্র কিছুই কেড়ে নেয় না, যা নেয় তা ফিরিয়েও দেয়। নগ্ন কবি কবিতায় মজে গেলেন... ঢেউয়ের চূড়ায় চূড়ায় ভেসে যায় শরীরের গ্লানি, কি হবে শরীর ঢেকে মিথ্যা আবরণে!!
রাঁচির পাগলা গারদ থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া ভদ্রলোক গঙ্গার পাড়ে বসে গঙ্গার ঢেউ গুনছে। ঢেউ গুলো গুনেই বাড়ি ফিরবে। কবি তক্কে তক্কে ছিল। গঙ্গার নির্জন পাড়ে এমন নিমগ্ন শ্রোতা পেয়ে তাকে পাকড়াও করে কবিতা শোনাতে লাগলো।দু চারটা কবিতা শোনার পরেই পাগলা দে ছুট।ওরে পালা পালা কবির পাল্লায় পড়বি না পাগলা করে ছাড়বে!  ছুটতে ছুটতে রাঁচির পাগলা গারদে আশ্রয় নিল। যাক বাবা বাঁচা গেল, এখানে পাগল আছে কিন্তু কবি নেই। দুদন্ড শান্তিতে থাকা যাবে।
কবি মৃত্যু শয্যায়। শিয়রে যমদূত মৃত্যু শমন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কবি শেষ নিঃশ্বাস কিছুতেই ছাড়ছে না। যা ছাড়ছে সবই কবিতা। অধৈর্য হয়ে যমদূত বললো, স্যর কবিতা রেখে এবার শেষ নিঃশ্বাসটা দয়া,করে ছাড়ুন। বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে কানাডার প্রেসিডেন্ট ওখানে অপেক্ষা করছে। কবিতার ভাবনায় ছেদ পড়তে কবি রুষ্ট হয়ে বললেন, তুমি তো বড্ড বেরসিক লোক হে, কবিতার কিসসু বোঝ না। তোমাদের যমলোকে কবিতা আছে  না নেই?
ভীরু চোখে যমদূত বললো, আজ্ঞে ওখানে এসব নেই স্যর, কোনদিন শুনিনি ।
কবির চোখে বিস্ময়। কবিতা নেই , আশ্চর্য!  একটু দাঁড়াও গোটা কয়েক কবিতার খাতা নিয়ে নিই। তোমাদের একটু কবিতা শোনানোর খুব দরকার। কবিতাহীন যমলোক ছিঃ! ততোক্ষণে যমদূত পগার পার। এই  যন্ত্রকে যমলোকে নিয়ে গিয়ে যন্ত্রণা বাড়িয়ে লাভ নেই। উঃ বাবা খুব বাঁচা বেঁচে গেছি!

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

রম্যরচনা || বেশ করেছি প্রেম করেছি... || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

বেশ করেছি প্রেম করেছি... 
কাশীনাথ সাহা 



না,এই ছোট্ট কথাটাই জোর দিয়ে বলবার তাকৎ তখন আমাদের ছিল না। ভীরু ভীরু চোখে দুরুদুরু বুকে পাড়ার মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকাতাম। যেভাবে দেখতাম তাতে পুরোটা দেখা হতো না। সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে সেই নীতিতে নারী দর্শন। তখনও হাম তুম এক কমরে মে বন্ধ হো ঔর চাবি খো জায়ে...  ববি রিলিজ করেনি। আমরাও অতোটা এঁচোড় পাকা হয়ে উঠিনি। তবুও তো বুকে প্রেম ঘাই মারে। ছলাৎ ছলাৎ। সদ্য কৈশোর ভাঙছি তখন । সেরকমই এক স্নিগ্ধ সকালে সরস্বতী পুজোর দিন শকুন্তলাকে একটা হলুদ গাঁদা ফুল কম্পমান হাতে দিয়ে দিলাম। করবী নয় গোলাপ নয়,রজনীগন্ধাও নয়, এক্কেবারে ভদ্র ফুল গাঁদা। ফুল ধরিয়ে দিতেই শকুন্তলা ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো। এমা তুমি আমায় ফুল দিলে কেন?  আমি তেমন মেয়ে নই.. .  ভ্যাঁ... । এখন আর আমার যদি বিয়ে না হয়!  ভ্যাঁ..। বোঝ ঠ্যালা। অতসতো ভেবে ফুল দিইনি। সেই গাঁদা শকুন্তলার বাবার হাত মারফত আমার বাবার কাছে ফিরে এলো। তারপরের ঘটনা আর ব্যাখ্যা না করাই ভাল। বুঝতে পারলাম গাঁদাফুলেও চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। তখন থেকেই ফুলে এ্যালার্জি।
একদিন কোথায় যেন শুনে ফেললাম, পিরিতি কাঁঠালের আঠা লাগালে পরে ছাড়ে না...  গোলেমালে গোলেমালে পিরিত করো না। গানটা একটু অসভ্য অসভ্য মনে হলেও সুরটা মন্দ নয়।
এইট নাইনে পড়ি, ক্লাসে গুনগনিয়ে গাইছিলাম। গানে বিভোর হয়ে ছিলাম, পেছনে অংকের স্যর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই গান শুনলেন। তারপর আমার পিঠে বাজানা বাজিয়ে দিলেন। শপাৎ শপাৎ মিউজিক। তারপর আর গোলেমালেও পিরিত করা হলো না।
ও এক জমানা থা। ও জমানা গুজর গয়া।  এখন অন্য জমানা, অন্য যুগ। এখন প্রেমের জন্য একটা গোটা দিনই বরাদ্দ হয়ে গেছে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে। দু'টাকার গোলাপ পঞ্চাশ টাকা পিস। জিও গুরু। পাড়ার গোকুলদার দোকানে সেদিন চপ কিনতে গেলাম। গোকুলদা,বললো আজ চপ কুড়ি টাকা পিস। কেন? কুড়ি টাকা করে কেন? গোকুলদা, বুদ্ধিজীবী মার্কা সলিড একখানা হাসি দিয়ে বললো, আজ ভেলেনটাইন ডে। তাতে কি হয়েছে?  কি পাতায় দিয়েচি দেখ। কদমপাতায়। যে গাছের তলে কেষ্ট ঠাকুর বাঁশি বাজালেই রাধা ছুটে আসতো সেই কদম পাতায়। বুঝলে কিছু । না বুঝলেও বুঝদার মাথা নাড়লাম। কদম পাতায় দুটো চপ কিললাম। মুড়ি মাখিয়ে খেলামও। কিন্তু কুছ কুছ হোতা হ্যায়ের মতো কিছুই হলো না। কদম পাতায় চপ খেলেই যদি কৃষ্ণ হওয়া যেত তাহলে সব ছাগলেই তো প্রেমিক কানাই! 
আমাদের সময় একটা মেয়ের মন পেতেই বুড়ো হয়ে যেতাম। ওপারে রইবে তুমি আমি রইবো এপারে...। এই করে করেই যৌবনে ফুলস্টপ পড়ে যেত। এখন তো শুনি রুমকির তিনটে প্রেমিক তো শ্যামলের চারটে প্রেমিকা। গার্ল ফ্রেন্ড আর বয় ফ্রেন্ড। জীবন কি দ্রুত ছুটছে। এক্কেবারে সাইক্লোন গতিতে।
সব প্রেম ছাদনা তলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। মাঝপথে বহু পরিযায়ী প্রেম রুট বদল করে নেয়।প্রেমিক তখন ভোকাট্টা ঘুড়ি!  এটাও প্রেমের ধর্ম। দেবদাসেরা আছে বলেই না পার্বতীদের এত রমরমা।
ভালবাসার বিয়ে তবু্ও বিয়ে ভেঙে যায় কেন!  ভাঙে কারণ একজন অনেক অনেক ভালবাসে আর একজন অনেককে ভালবাসে। তালে মিলে গন্ডগোল হলে বাঁধন তো আলগা হবেই! আলগা কর ওগো খোঁপার বাঁধন দিল ওহী মেরা খো গয়া...
আমরা একটা উত্তম -সুচিত্রা নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিলাম। সপ্তপদী, হারানো সুর, শিল্পীতে সেই যে আটকে গেলাম তার বাইরে আর দিলওয়ালে দুলহনিয়া হতে পারলাম কই!
তখন প্রেমের জায়গার অভাব ছিল না কিন্তু প্রেম ছিল না। এখন প্রেম আছে প্রেমের জায়গা কমে গেছে । তখন প্রেমপত্র ছিল । বাঁকা বাঁকা লাইনে কাঁপাকাঁপা হাতে প্রিয়তমা...  তারপর শরৎচন্দ্র রবিঠাকুরের বাছাই বাছাই কোটেশন। সেই কোটেশন মাইলের পর মাইল চলতেই থাকে। কোটেশনের আড়ালে কি যে বলতে চাই সেটাই বলা হয়ে ওঠে  না। সেই চিঠি যথাযথ স্থানে পাঠানো মানে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার মতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। তারপর!  তার আর পর নেই  নেই কোন ঠিকানা...  যা কিছু গিয়েছে থেমে যাক থেমে যাক না।
আমরা থেমে গেছি সময় এগিয়ে গেছে । এখন মুঠোয় বন্দী প্রেম তরঙ্গে ভাসিয়ে দিলেই হলো।
মৌচাকে মিঠু মুখার্জি বলতে পেরেছিল, বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো...। কিন্তু মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। সিনেমার প্রেম রুপালি পর্দাতেই আটকে থেকেছে তৃণমূল স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ,  হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে....
তবুও নিজেরা না পারলেও মাঝে মাঝে ভালবাসা দেখে ধন্য হয়েছি। ইংল্যান্ডের যুবরাজ চার্লস আর ডায়নার প্রেমের বৃষ্টিতে আমরাও কমবেশি সিক্ত হয়েছি । পতৌদি- শর্মিলা, দিলীপ কুমার -শায়রাবানু এইসব দেখে ধন্য হয়েছি। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছি।
আমাদের সেই সময়ে যা ছিল দুঃসাধ্য এখন তা সহজলভ্য। জানি না তাতে প্রেমের রামধনুর রঙ ফিকে হয়েছে না আরও রঙিন ঝলমলে হয়েছে!
কবির কবিতায়, সংগীতের সুরে, শিল্পীর ক্যানভাসে এখনো প্রেম টগবগ করে ফুটছে।  অফুরন্ত ভালবাসা। মুঠো মুঠো কুড়িয়ে নেব, নেব ভারে ভারে। কুড়িয়ে তো নেব রাখবো কোথায়! হৃদয় তো একটা ভাঙাচোরা আছে,  কিন্তু  হৃদয়ের ঝর্ণা ধারা আছে তো! তেমন করে দেখা হয়না আর...  তবুও মাঝে মধ্যে হোঁচট খাই। পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াই। না এই বয়সে আর বেলাইনে নৈব নৈব চ। রেল লাইনে বডি দেব মাথা দেব না।
প্রেম থাকুক প্রেমের জায়গায় আমি  আমার জায়গায় থাকি।
তবে যতোই আধুনিকতা আসুক, তৃনমূল, বিজেপি, কংগ্রেস বামফ্রন্ট যেই আসুক ভালবাসা ছিল আছে থাকবেও। চিন আমেরিকা, ভারত পাকিস্তান  ঝুট ঝামেলা চলুক, সমান্তরাল গতিতে প্রেম ও চলুক। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।
প্রেম না থাকলে হেমন্ত মান্না কিশোর রফি সন্ধ্যা লতা আরতি সব ফিকে। প্রেম মানেই শাখায় শাখায় কৃষ্ণচূড়া, নদীর চরে সূর্যাস্ত, দীঘার বালুতটে ঝাউপাতা, বইমেলার ধুলো,  বৃষ্টি ভেজা মাটির গন্ধ। 
তেমন করে ভালবাসতে পারলে পাথরও ঝর্ণা হয়ে যায়,  আর তুমি তো মানুষ!

রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

রম্যরচনা || ঘুষ একটি জাতীয় খাদ্য || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

ঘুষ একটি জাতীয় খাদ্য 
কাশীনাথ সাহা 

বিষয়টা নিয়ে ভাববার আছে। আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত আছে, জাতীয় পতাকা আছে, জাতীয় পশু আছে, জাতীয় পাখি আছে, বহু কিছুই জাতীয় আছে, কিন্তু জাতীয় খাদ্য বলে কোন কিছু খাবারকে জাতীয় খাবার হিসেবে এখনো তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়নি। বাঙালির একরকম খাবার, পাঞ্জাবির আর একধরনের খাবার, দক্ষিণ ভারতীয়দের আরও একরকম। নানা জাতি নানা ভাষাভাষীর এক এক বৈচিত্র্যময় খাবার । কেউ ঝাল খায়,কেউ টক, কেউ মিষ্টি,কেউ আমিষ কেউ নিরামিষ । না এতোবড় একটা দেশে একটা জাতীয় খাদ্য অবশ্যই হওয়া,উচিত ছিল । কিন্তু এই ভাবনাটাই কোন সরকারের মাথা থেকে কেন যে বের হয়নি বুঝতে পারলাম না।  এই ব্যাপারে সর্বধর্ম সমন্বয়ের খাদ্য  ঘুষ।হিন্দু মুসলিম পার্শি খ্রিস্টান শিখ, বাঙালী বিহারী, পাঞ্জাবী মারাঠি ঘুষ খায় না এমন পাবলিক পাবেন না। স্থান ভেদে ঘুষের মহিমা পাল্টে যায়। কোথাও ঘুষ তো কোথাও প্রণামী কোথাও সেলামী কোথাও ডোনেশন।
শিক্ষক অবসর নিয়ে ডি আই  অফিসে গিয়েছেন পেনশন তুলতে, গিয়ে শুনলেন ফাইল হারিয়ে গেছে। বেচারি জাতির মেরুদন্ড অফিসে নিজের মেরুদণ্ডটাই হারিয়ে ফেললেন। এখন উপায়? আছে, পিওন বুঝিয়ে দিল নিরুদ্দিষ্ট ফাইল স্বস্থানে ফিরে আসবার পদ্ধতি। শিক্ষক করুন ভাবে জিজ্ঞেস করলেন ফাইলটা,পাওয়া যাবে তো! পিওন টেবিলে থাপ্পড় মেরে বলল স্যর আমাদের এখানে কোন দুনম্বরী পাবেন না। এক নম্বর পথে হাজার পাঁচেক টাকা খসিয়ে হারানো ফাইল যথাস্থানে অধিষ্ঠিত হলো।
চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিককে কুড়ি টাকা নিতে দেখে যে ভদ্রলোক নির্বিবাদে গালিগালাজ করেন তিনি নিজের অফিসে দশ বিশ হাজার বাঁহাতে বুক চিতিয়ে নিতে দ্বিধা করেন না।
আমলা মন্ত্রী মন্ত্রীর ভাই ভাইপো ঘুষ খেয়ে কাউকে বদহজম হতে কক্ষনো দেখিনি। ঘুষ বেশ সহজপাচ্য খাবার। তবে ঘুষ খাওয়ারও একটা সিস্টেম আছে তার বাইরে বেলাইন হলেই হাজতবাস। সেটাও মন্দ নয়, জেল ফেরত মন্ত্রীদের কদরই আলাদা,। তখন শহীদের তকমা কপালে।
সাধুসন্ত মহাপুরুষ পীর পয়গম্বর মহামহিমান্বিত সজ্জন মানুষেরাও এখন নির্বিবাদে ঘুষ খায়। তবে খেলাটা আলাদা। একটু ভক্তি রসের সাথে ভোজবাজির মিশেল না,দিতে জানলে পা হড়কে যাবে।
স্বামী ঘুষ খায় স্ত্রী ঘুষ খায় রাজা খায় প্রজা খায় এমনকি ঠাকুর দেবতারাও খায়। কোথাও বাতাসা নাড়ু তো কোথাও কালো পাঁঠা।
কাজের মেয়ে পদ্মা বলল, দাদাবাবু কাল সন্ধ্যায় আপনাকে মহব্বত পার্কে দেখলাম বেশ সুন্দর একটা দিদিমণিকে নিয়া ঘুরতাছিলেন। দাদাবাবুর মুখ ফ্যাকাশে, তুই কোথায় ছিলি? আমিও ঘুরতাছিলাম।  তোর দিদিকে কিছু বলিস না যেন!
না বলবো না, তবে একটা ভাল শাড়ি কিনে দিতে হবে কিন্তু! নতুন শাড়ির আঁচলে মহব্বত পার্ক ঢাকা পড়ে যায়।
সুযোগ আছে অথচ ঘুষ খায়নি এমন মানুষ জাদুঘর ছাড়া পাওয়া যাবে না।
ডানপন্থী বামপন্থী চরমপন্থী মধ্যপন্থী উদারপন্থী উগ্রপন্থী সক্কলেই ঘুষ খায়। ঘুষে অরুচি এমন পন্থী বিরল।
সব কঠিন কাজেরই সহজ সমাধান  ঘুষ। সঠিক জায়গায় ঠিক মতো হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে পাঁচ ঘন্টা লম্বা লাইনে না  দাঁড়িয়ে দেবতার দর্শনও সহজলভ্য।
দারোগাবাবু বললেন এটা মার্ডার কেস। কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। যাবজ্জীবন ফাঁসি! নিরীহ মুখে ভদ্রলোক বললেন, আহা লোকটা এখনো মরেনিতো পায়ে চোট লেগেছে, রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিল আমি হাসপাতালে নিয়ে এসেছি এতে আমার অপরাধটা কোথায়!  দারোগাবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন তিনহাজার তিনশ পঁয়ষট্টি ধারায় চার্জ। যাবজ্জীবন না হলেও অন্তত আট বছর ফাঁসি হবেই। তাহলে উপায়?  উপায় আছে। রায় ও মার্টিনের সহজ ফর্মুলা!  ফেল কড়ি মাখো ফরচুন তেল, আমি কি তোমার পর।
বেকার শিক্ষিত চাকরি নেই?  চাকরির আশাও নেই?  আছে?  দশ বিশ লাখ জনসেবক জননেতার হাতে গুঁজে দাও। লিস্টে নাম বেরিয়ে যাবে।
তাই অনেক গবেষণা করে ভেবেচিন্তে মনে হলো ঘুষকে সর্বভারতীয় জাতীয় খাদ্য হিসেবে মান্যতা দেওয়া যেতেই পারে। এই ব্যাপারে ঘুষের বিপক্ষে হাত তুলবে এমন কেউ আছেন নাকি?

রবিবার, ২৪ মে, ২০২০

রম্যরচনা || যুদ্ধ চাই || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা || যুদ্ধ চাই
কাশীনাথ সাহা

না, একটা যুদ্ধ না হলে কিছুতেই মন মানছে না।  কতদিন যে যুদ্ধ  দেখিনি। যুদ্ধ না দেখে দেখে মন মেজাজটা কেমন ছিবড়ে হয়ে গেছে। সেই কবে একটা কার্গিল যুদ্ধ হয়েছিল, সে তো প্রায় দু যুগ হতে চলল। সুসভ্য মানুষ যুদ্ধ ছাড়া কি বাঁচতে পারে! যুদ্ধ হবে, রক্ত ঝরবে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে, এসব দেখেও শান্তি। আগেকার মানুষ কত বিচক্ষণ ছিল, ইচ্ছে হলেই দুমদাম যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তো ছিলই। আহা কি সুন্দর যুদ্ধ। দেখিনি তবে মহাভারতে তো পড়েছি। ১৭ না১৮ দিন ধরে লাগাতার ফাটাফাটি। একদিন ভীষ্ম মরছে তো একদিন দ্রোনাচার্য।  একদিন  ভীম পুত্র ঘটোৎকচ তো পরদিন অশ্বত্থামা।   আহা শুনেই মনে হতো লাঠি ছুরি যা হোক কিছু একটা নিয়ে ময়দানে নেমে পড়ি। তারপরেও তো কম যুদ্ধ হয়নি। পানিপথের, যুদ্ধ, হলদিঘাটের যুদ্ধ। আহা কতো নিরীহ মানুষের রক্তে লাল হয়ে গেছল মাটি। কত মানুষ মরেছে। কত মা সন্তান হারিয়েছে,  পত্নী হারিয়েছে তাঁর প্রিয় মানুষ কে। চারিদিকে আর্তনাদ , হাহাকার, কি মর্মান্তিক। এই দেখুন কেমন যেন বেলাইন হয়ে যাচ্ছি। আরে বাবা যুদ্ধ হবে আর মানুষ মরবে না তা হয় নাকি! নিরামিষ যুদ্ধ তো হয় না। মানুষ মানুষকে মারবে না, তাহলে আর লড়াই কিস লিয়ে। কোন গায়ক যেন গান গেয়েছেন, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না। মানুষ মানুষের জন্য সহানুভূতি দিতে যাবে কোন দুঃখে!  মানুষের জন্ম হয়েছে মানুষকে মারবার জন্য। এই যে প্রথম, দ্বিতীয় বড় বড় দু দুটা বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেল, তাতে কোন সহানুভূতির হাওয়া উঠেছিল শুনি। হিরোশিমা নাগাশাকি তে দুটো অমানবিক না পরামানবিক বোম ফেলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বর্গের না নরকের পথ দেখিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা সেটা কম বীরত্বের কথা! সেটাও তো মানুষ মানুষের জন্য করেছিল।
সেই যে দু দুটো বড় মাপের যুদ্ধ হয়ে গেল তারপর আর যুদ্ধ কোথায়! ভারত পাকিস্তান লাগব লাগব করেও ময়দানে নামছে না। আমার বউ সেদিন আমাকে একটু ভালবাসা দিতে দিতে বলছিল হ্যাঁ গো আগের মত আর যুদ্ধ হচ্ছে না কেন গো।ইস  আমার কত দিনের ইচ্ছা একটা যুদ্ধ দেখি,  কিন্তু মানুষ কি অপগন্ড রে বাবা একটাও যুদ্ধ হচ্চে না। হ্যা গো তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ না গো কিছু করতে পার কি না!  আমি ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালী। আমরা যুদ্ধের কি বুঝি!  আমাদের যত লড়াই ঘরের বউয়ের সাথে। সপ্তাহে চারদিন তো বটেই। লবনে ঝোল নাই লড়াই। বোতামে জামা নাই লড়াই। গ্যাসে সিলিন্ডার নাই লড়াই। এই লড়াই নিয়ে আমাদের ঘরকন্না, এর বাইরে প্রতিবেশীদের সাথে মাঝে মাঝে হয়। ফুল থেকে গাছ তুলল কে? কুকুর কেন ঘেউ ঘেউ করে?  এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে লড়াই। তার বাইরে বের হতে পারি না। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। বউ একটু বেশী রেগে গেলে বীরদর্পে পশ্চাৎপরণ।  না এই নিরামিষাশী জীবনে থেকে থেকে ঘেন্না ধরে গেল। একটা জবরদস্ত লড়াই চাই। লড়াই লড়াই লড়াই চাই লড়াই করে বাঁচতে চাই। আগে তবু নন্দীগ্রাম,গড়বেতা,কেশপুর,নেতাই, এইসব খুচখাঁচ লড়াই চলছিল এখন সেটাও নাই। পঞ্চায়েত নির্বাচনে হবো হবো করেও ঠিক জমলো না। লোকসভা ভোটেও সেরকম লাস পড়ে নি। ভাল্লাগে না। বাঙালীরা লড়াই করতে পারে না কিন্তু  তা বলে লড়াই দেখতে ভাল লাগে না তা তো নয়। এই ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনে সরকার ওটাও দেখতে দেবে না। দিদি আর মোদী যে কি করে ভেবে পাই না।
কিচেন থেকে মিসেসের একটু চড়া গলা শুনতে পাচ্ছি।  সকালে বারবার বলে দিয়েছিল সর্ষের তেল আনতে। ভুলে গেছি।  মনে হচ্ছে সেই ব্যাপারেই অস্ত্রে শান দিচ্ছে। না এখন ঘরে থাকাটা নিরাপদ নয়। বাইরে গিয়ে একটু তেল দিয়ে আসি। ও স্যরি তেল দিতে নয় নিয়ে আসি। আসলে সকাল থেকে বউকে, পাড়ার নেতাকে, অফিসের নেতাকে, অফিসের বসকে তেল দিতে দিতে তেল দেওয়ার কথাটাই মগজে আগে ল্যান্ড করে গেল। তাই মুখ ফসকে তেল দেওয়ার কথাটাই আগে বেরিয়ে গেল।  না ভাই আসি,  যুদ্ধ নিয়ে না হয় পরে আলোচনা করা যাবে। এখন আসি। গুড বাই।

রবিবার, ১৭ মে, ২০২০

রম্যরচনা || আমাদের রবীন্দ্রনাথ || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

আমাদের রবীন্দ্রনাথ 
কাশীনাথ সাহা 

আমাদের প্রাণের মানুষ, হৃদয়ের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। এক্কেবারে বুকের গভীরে সেঁটে বসে আছেন কবিগুরু। সারাবছর রবীন্দ্রনাথ ভুল করেও পড়িনা। রবীন্দ্র কবিতা ছুঁয়েও দেখি না। ভাগ্যিস তরুন মজুমদার, দাদার কীর্তি, ভালবাসা ভালবাসা র গঙ্গাজল চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে ছিল । তাই  না চাইলেও রবীন্দ্র সংগীত মাঝে মধ্যে গিলতে হয়। আর পাত্রেপক্ষের কাছে বাজারদর একটু উঁচুতে তুলে ধরতে, চরণ ধরিতে দিও গো আমারে নিও না নিও না সরায়ে... । ভালবেসে রবীন্দ্রচর্চার ফুরসৎ এখন বাঙালির নেই। তবে ফুরসৎ না থাকুক রবি ঠাকুরকে নিয়ে গর্ব আমাদের আঠারো আনা। বিশ্বকবি বলে কথা। তাও আবার বাঙালী আদমি। এই হকটা ছাড়া যায়? ঘরে শনি মনসা শীতলা মাকালীর সাথে একটা রবীন্দ্রনাথ নাথও ঢুকিয়ে দিই। শুভ- অশুভ সব কাজেই একটা লম্বা প্রণাম ঠুকে দিই। মা মাগো হে রবি ঠাকুর এই মামলার রায়টা যেন আমাদের পক্ষে যায় দেখবে ঠাকুর। বউমার এবারের সন্তানটা যেন পুত্র হয় দেখো ঠাকুর। জোড়া নারকেল, সন্দেশ দিয়ে পুজো দেব ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথকে আমরা,ধূপ ধুনোর আড়ালেই রেখে দিলাম, আপন করে আর নিতে পারলাম কই! আচ্ছা এমন কি আর হয়, মা ডাকছে তনু খাবি আয়, বারবার ডাকছে খেতে, কিন্তু তনু মজে আছে গোরাতে, তনু মজে আছে কাবুলিওয়ালায়।  এমনটা হয় নাকি?  আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশ একটা হুজুগে মেতে আছি। পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণের  বাইরে রবীন্দ্রনাথকে টেনে বের করতে পারলামই না। পঁচিশে বৈশাখ আগে স্কুল, কলেজ, গানের স্কুল আর সাহিত্য সংস্থা গুলিই গুছিয়ে করতো। ধোপদুরস্ত পোশাকআশাকে শাড়িতে ফুলে চন্দনে প্রাণহীন কণ্ঠে রবীন্দ্র বন্দনা জব্বর চলছিল। দেখ আমি কত্তো বড় সাংস্কৃতিক বোদ্ধা!  আমি কেমন রবীন্দ্র ভক্ত!  কিন্তু এখন রাজনৈতিক দলগুলিও সুযোগ বুঝে ময়দানে নেমে পড়েছে। পঁচিশে বোশেখ সকালবেলা পাটী অফিসের সামনে  দলীয় পতাকার নিচে ধুলোমলিন রবীন্দ্রনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাকিয়ে নয় রীতিমতো ভয়ে ভয়ে থাকেন। মান্যবর নেতা কি বলতে কি না বলে ফেলে। এই তো সেদিন এক দাপুটে নেতা গলার শিরা ফুলিয়ে বলে দিলেন বিদ্রোহী কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেশের গর্ব জাতির গর্ব  সমাজের গর্ব আমাদের পাটীর গর্ব। সেই যে তিনি লিখেছিলেন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বর্ধমানের বনলতা সেন...  আহা কি অপূর্ব বিদ্রোহী লাইন ... । বক্তৃতা শেষে দমাদ্দম হাততালি। জেলা সম্পাদক সৌমিত্রদা জিন্দাবাদ । রবীন্দ্রনাথ তোমার জন্য লড়ছি লড়বো। লড়াই লড়াই লড়াই চাই ...। ফটোর ভিতর রবীন্দ্রনাথ এইসব দেখে নিশ্চয়ই মূর্ছা গেছলেন!
রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঝোলে ঝালে অম্বলে সবেতেই কাঁঠালি কলা। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের চলে না। মদ দোকানের উদ্বোধন হচ্ছে,  বাজছে,  আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান....।বউভাতে চলছে , এই করেছ ভাল নিঠুর হে এই করেছ ভাল... । ছেলে ছোকরারা চেঁচিয়ে ওঠে, এসব প্যান প্যানানি গান বাদ দাও। নাচের গান দাও। ঝিনচাক ঝিনচাক। রবি ঠাকুর হঠে গেল। বেজে উঠলো, আঁখ মারে ও লেড়কি আঁখ মারে...।
পাড়ার প্যান্ডেলের মঞ্চে  দেড় বছরের নাতনিকে তুলে দিল দাদু । পঁচিশে বোশেখের শ্রাদ্ধ করে নাতনি  নেমে এলো। আর দাদু দিদা বাবা মায়ের বুক গর্বে গদগদ। সম্পাদক আগেই সাড় পাঁচশো চাঁদা ঝেড়ে এনেছে। সেও গদগদ কণ্ঠে বলে দিল, মুন্নিকে নিয়ে রাতে খেতে আসবেন দাদু। মূরগী মাংস ভাত। দাদু যখন একটু রাত করে মুন্নিকে নিয়ে খেতে এলেন, তখন ক্লাবশুদ্ধু সবাই মূরগীমাংস খেয়ে টলমল করছে। জিও রবীন্দ্রনাথ। তেরা ক্যায়া হোগা রে কালিয়া?
ম্যায় তেরা নমক্ খায়া সদ্দার।
আমরাও জ্ঞানে -অজ্ঞানে রবি ঠাকুরের নমক খেয়ে বসে আছি । সেই ছেলেবেলায় সহজ পাঠ নয়তো কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি...
আব গোলি খা!
আমাদের রবীন্দ্রচর্চা মানে বইয়ের তাকে যদি এক টুকরো ফাঁক ফোঁকর থাকে  সেখানে  সঞ্চয়িতা অথবা একটা গল্পগুচ্ছ গুঁজে দেওয়া। দেখ আমিও রবীন্দ্রনাথ পড়ি!
চৌরাস্তার মোড়ে রবীন্দ্রনাথ সারা বছর দাঁড়িয়ে থাকেন ধুলো ময়লা কাকের বিষ্ঠা আর শুকনো ফুলের মালা সাঁটিয়ে। একটু পরিচ্ছন্ন করবার শুভ ভাবনা আমাদের মস্তিষ্কে কখনো উদয় হয় না।
রোদ্দুরবাবু নামক বিখ্যাত উদীয়মান বাঙালিটি যেভাবে রবীন্দ্র সংগীতকে টেনে হিঁচড়ে নর্দমায় নামাচ্ছেন তা দেখে বাঙালী হিসেবে বুকের পাটা ক্রমশঃ চওড়া হচ্ছে। বাঙালী ছাড়া বাংলার এতোবড় সব্বোনাশ আর কে করতে পারে!  রোদ্দুর তুমি নিচে নামো আম বাঙালী আপ কা সাথ সাথ হ্যায়!
লেখক শংকরের একটি নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার কথা বলে আমার আজেবাজে বকরমবাজী থামাবো।
লেখক একবার ট্রেন ভ্রমণে কোথাও চলেছেন।উনি উপরের বার্থে আছেন। নিচে একপাশে তিনজন বাঙালির একটা দল আর কেরলের তিনজনের একটা দল। কেরলিয়ানরা সাহিত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিল। বাঙালীদের সহ্য হলো না। ওরা রীতিমতো ব্যঙ্গ করে বলতে লাগলো, আরে আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছে। ওদের আছেটা কে?   আরও  সব বক্রোক্তি। বহুক্ষণ শোনার পর কেরলের একজন বিনীতভাবে বলল,আপনারা ঠিকই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের মতো বিরল প্রতিভা শতাব্দীতে একজনও জন্মগ্রহণ করে না। তাঁর সাহিত্যের সাথে আর কারও তুলনা চলে না। আমরাও সেটা জানি। তা দাদা আপনারা তো বাঙালী । আমরা আপনাদের কণ্ঠে একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনতে চাই , যদি  একটা বলেন দয়া করে।  এতোক্ষণ যাঁরা গর্বে টগবগ করছিল  তাদের মুখ চুপসে গেল। ভুলভাল রবীন্দ্র কবিতা দু একটা লাইন বলবার পরে আর থলকূল খুঁজে পাচ্ছিল না। লেখক শংকর উপরের থেকে সব দেখছিলেন। এবার ভাবছেন, ওরা এবার না জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে টা ওরা ধরে ফেলে । ওদের করুন অবস্থা দেখে কেরলের লোকগুলো এবার বিনীতভাবে বললো,  তাহলে আমরাই দু'একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনাই, কিছু ভুলত্রুটি হলে মার্জনা করবেন । শংকর বিস্মিত হয়ে দেখলেন, কেরলের ওই অধিবাসীরা এরপর একটার পর একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা নির্ভুল ভাবে বলে যেতে লাগলেন ।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ বন্দনা অনেকটা অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো। কোনটা পা কোনটা শুঁড় কিছুই জানি না। কিন্তু পুজোটা জম্পেশ চালিয়ে যাচ্ছি  । জিও কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ তুমিও বেঁচে থাকো আমরাও বেঁচে থাকি। তুমি ফটোতে আমরা ভড়ংবাজিতে!

রবিবার, ১০ মে, ২০২০

রম্যরচনা || কাশীনাথ সাহা || লকডাউনের সুখ!

রম্যরচনা
কাশীনাথ সাহা 

লকডাউনের সুখ! 

আমাদের সুখটা যে কোথায় সেটা আজও বুঝতে পারলাম না। নিজের সবকিছু থাকলেও পরের সুখ দেখলেই আমাদের মটকা গরম হয়ে যায়।  ও কেন এতো সুন্দরী হলো? আরে বাবা ও সুন্দরী হলো তো হলো তাতে তোমার এতো গাত্রদাহ কেন?তুমি তো কুৎসিত নও!  নিজের বউ টুকটুকে এক্কেবারে মাধুরী দিক্ষীত। তাতেও সন্তুষ্ট নয়, ফাঁক ফোঁকরে চোরা পথে অন্যদিকে চোখ ।  পরের ভাল আমরা দেখতেই পারি না। পরের ভাল কিছু দেখলেই আমাদের চোখ টাটায়। চোখে জয়বাংলা!  আমার বর ডাক্তার ঠিক আছে, কিন্তু ওর স্বামী ইঞ্জিনীয়ার হলেই আমার সুখ ভোকাট্টা।
এই ভাইরাস সময়ে কোন কাজকম্মো নাই, অফিস আদালত  নাই  খাচ্ছি দাচ্ছি তিনবেলা নাক ডাকছি । এতো সুখ এই জন্মে আর কবে পেয়েছি?  একই বউকে বারবার দেখতে হচ্ছে বলে একটু যে বিরক্ত হচ্ছি না তা নয়। কিন্তু গলাভর্তি সুখের কাছে ওটুকু যন্ত্রণা কুছ ভী নেহি। সকাল দশটার সময় বেশ গভীর নিদ্রামগ্ন ছিলাম, গিন্নি গুঁতো দিল, কালরাতের এঁটো থালাগুলো এখনো পড়ে আছে  কখন মাজবে? আর বাসি কাপড় গুলো ধোবে কখন?  ঘুমঘুম চোখে বললাম, সকাল হয়ে গেছে! গিন্নি তারপর যে বাক্যবান বর্ষন শুরু করলো। সেটা একমাত্র  ভুক্তভোগীরাই বোঝে! সেই যে রামায়ণ না মহাভারতে কোথায় যেন পড়েছিলাম,  ' রোগীর যন্ত্রণা  সেজন বোঝে না হয়নি যে জন রোগী,  রোগীর যন্ত্রণা সেই বোঝে যে জন ভুক্তভোগী '। কথা না বাড়িয়ে কাজে মনোনিবেশ করলাম। আমি নির্বাচিত স্বামী নই মনোনীত স্বামী। আমার গনতান্ত্রিক  অধিকার কতোটুকু, সংবিধান দেখা হয়নি!  দেখার ফুরসতই পেলাম না। যখন ফুরসত পেলাম তখন গাড্ডায় পড়ে গেছি। এই দেখুন একেই বলে সুখে থাকতে ভুতে কিলানো। মিসেস যদি  একবারও আমার মনের কথা শুনতে পায় তাহলো আমার দফারফা। কি ভাবছেন, আমার মনের কথা ও বুঝবে কি  করে?  আপনি মহান ঈশ্বরের এই সৃষ্টিকে চিনেন না!  আমি এখন কি ভাবছি সেটা নস্যি আগামী বছর কি ভাবতে পারি সেটাও ওনারা জানেন। এই রহস্য ভেদ করবার জন্য ভগবান ওদের আর একটা সলিড অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে রেখেছেন।
লকডাউনের প্রথম দিন বউ আদুরে আদুরে গলায় বলল, হেঁ গো তুৃমি মাংস রাঁধতে জানো! বউয়ের কাছে বীরত্ব দেখানোর একটা চান্স পেয়ে বললাম পারি না মানে, আমার মাংস একবার খেলে জীবনে ভুলতে পারবে না। যাঃ দুষ্টু, কি যে বলো না, তোমার মাংস তো ডেলি খাচ্ছি। খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেছে আমি খাসি মাংসের কথা বলছি। নো বল করেছিলাম, শেওয়াগের ব্যাট ওভারবাউন্ডারি ঝেড়ে দিয়েছে।  ভুল শুধরে বললাম, আমার রান্না খাসি মাংস খাও জনম জনম ইয়াদ রাখোগী।
মাংস রান্না করে গিন্নিকে একবার  খাইয়ে এমন গাড্ডায় পড়েছি এখন প্রতিদিনই  মাছ মাংস সব রাঁধতে রাঁধতে আমি অফিসে চাকরি করতাম না হোটেলের কুক সেটাই ভুলতে বসেছি।
টিভিতে পত্র লিখন শিখছিলাম। রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি চালাচালিতে বাঙালি হিসেবে ক'দিনে বেশ সমৃদ্ধ হয়েছি। সেটাই মন দিয়ে শিখছিলাম। মিসেস আদুরে গলায় ডাকলো। কই গো বাজার থেকে একটু মিষ্টি আনো না। এতো আদুরে ডাককে অবহেলা করবার তাকৎ কোনও পুরুষ সিংহের আছে কিনা জানিনা। তবুও মিনমিন করে বললাম, আমাদের জেলা রেড জোন হওয়ার পর পুলিশ বাইরে বেরুলেই পেটাচ্ছে। দুদিন পরে আনলে হয় না?  বউ আদুরে গলায় বলল, তুমি কেমন স্বামী গো বউয়ের জন্য লোক হিমালয়ের চুঁড়া থেকে লাফ দেয়, আর তুমি সামান্য পুলিশের ডান্ডার ভয় করছো! ছিঃ।  অগত্যা। বাইরে বেরুনোর জন্য তৈরি হলাম। বউ বললো একটু দেশী মুরগির খোঁজ করবে তো,  কতোদিন দেশী মুরগী খাওয়া হয়নি।  আমি রাগে গরগর করতে করতে মিনমিনে গলায় বললাম,  মিথ্যা কথা বলো না, আমাকে তো ডেলি খাচ্ছো!৷ বউ আদুরে গলায় খিলখিলিয়ে বলল, ওমা তুমি দেশী কোথায় ওতো ব্রয়লার।টেস্ট লেস!

রবিবার, ৩ মে, ২০২০

রম্যরচনা || ওলোট পালোট || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা
ওলোট পালোট
কাশীনাথ সাহা

দমবন্ধ ঘরে আটকে আছি। যা জীবনে শিখতে পারিনি তাই শিখছি। জানতামই না আলু কাটবার পরে ধুতে হয়, টমেটো কাটবার আগে।  চা তৈরি করাটা এতো ভাল পারি, আমার চা খেয়ে গিন্নী আর চা করতে ময়দানে নামে না। কতো চেষ্টা করেছি বউয়ের মন রাখতে তবুও মাঝে মাঝে  গোল্লা পেয়ে যাচ্ছি। এই সেবার একশো ভাগের এক ভাগও যদি বাবা মায়ের পেছনে খরচ করতাম তাহলে মৃত্যুর পরে স্বর্গবাস কোন মাঈকী লাল ছাড়াতে পারতো না।
বসে আছি বউ করোনাকে উদ্দেশ্য করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, এই আপদটা যে কবে বিদায় হবে! আমি উদ্দেশ্য না বিধেয় বুঝতে পারলাম না। বউ বাইপাস করে ফেস ওয়াশ  করতে চেম্বারে ঢুকে পড়লো।
সেদিন একটু হালকা হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। রিমঝিম গিরে শাওন... ( বাকীটা জানিনা!) কি সুন্দর প্রেম-প্রেম ওয়েদার। সতের বছরের ওল্ড মডেল বউকেই একটু সোহাগ করতে মন চাইলো।  কিন্তু উনি মহাভারতে মজে আছেন। ধরা ছোঁয়া দিচ্ছেই না। ডন কো পকাড় না মুশকিল হি নহী নামুনকিন হ্যায়...।বিরক্ত হয়ে বললাম, তুমি একটা যাচ্ছেতাই, ভালবাসার ভ- ও বোঝ না। কিন্তু এ বউ সে বউ  নয়। শ্বশুর মশাই উকিল ছিল, সেখান থেকে কথার মারদাঙ্গাটা ভালোই রপ্ত করেছে। বউ বললো, ভালবাসার আমি কিছু বুঝি না? জিজ্ঞেস করে এসো আমাদের পাড়ার শ্যামলদা,অতনুদা,রূপমদাকে!  ওরা আমাকে একশোতে একশোদশ দেবে। অনিল কুম্বলের টপস্পিন দিতে গিয়ে শচীনের ওভার বাউন্ডারি খেয়ে ধরাশায়ী হয়ে গেলাম। আর কথা বাড়ালাম না। যুবী-র ছয় বলে ছ'টা ছক্কা এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
বউয়ের জন্মদিনটা এই গাড্ডায় পড়ে গেল। কি দেব!  কি দেব ভাবতে ভাবতেই দু'দিন খতম। তৃতীয় দিন মানে জন্মদিনে চারটা মাস্ক কিনে বউকে সোহাগি কণ্ঠে গুনগুনিয়ে বললাম, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ.... তারপরের অধ্যায়টা খুব একটা সুখকর হলো না। বউ পাক্কা সাতাশ ঘন্টা তের মিনিট একান্ন সেকেন্ড সেই মাস্ক পরে সেই যে মৌনব্রত শুরু করলো, তা বলে বোঝানো যাবে না।
কথাবার্তা বন্ধ, রান্না বন্ধ সব লকডাউন!
একা-একা গান গাইছিলাম, এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন...  কবে পাবো ওগো তোমার দরশন।(  নিমন্ত্রণ টা ভুলে গেছলাম)   নিছক ভদ্রলোকের নিপাট নিরামিষাশী সংগীত। বউ কোথায় ছিল,  আদা রসুন পেঁয়াজ হলুদ মাখা মুখ নিয়ে
ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ও সায়ন্তনীর দর্শন পাওনি বলে বড্ড মন খারাপ তাই না। বুড়ো হয়ে গেলে এখনো ছুঁকছুঁকানি স্বভাবটা গেল না।
আর একবার তোমার গলায় ওইসব ঢংয়ের গান শুনি তারপর দেখ আমি কি করি!  আমার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ। চৈত্র মাসের ধূ ধূ শিলাবতী..  তবুও ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম,  কি করবে?  একটু পুরুষোচিত বিক্রম দেখাবার ক্ষীণ প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু ঠিক সময়ে শর্টটা নিতে পারলাম না। চেয়েছিলাম ওমরীশপুরীর মতো থ্রো করতে  হয়ে গেল শচীনের কণ্ঠ। বউ বললো, কি করবো বলছি শোন, পাড়ার ঘরে ঘরে বলে আসবো তোমার তিনদিন ধরে হাঁচি হচ্ছে আর জ্বর গা হাত ব্যথা। তারপর বাকীটা আমাকে করতে হবে না, পাড়ার লোকেরাই বুঝে নেবে।
না আর কথা বাড়ালাম না। এরা মা কালীর বংশ পরম্পরা, মুখে যা বলছে তা যদি বাস্তবে করে দেয়,  তখন মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর হয়ে কোন
মর্গে শিফট হয়ে যাব স্বয়ং ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরও ওই বডির টের পাবে না।
লকডাউনে বডিটা লক করাই ছিল এবার  মুখটাও লক করে নিলাম।  আর সংগীত?  মাথা খারাপ!  নেড়া ক'বার বেলতলায় যায়?

শুক্রবার, ১ মে, ২০২০

অবরুদ্ধ সময়ের -অনুগল্প || বইমেলা || কাশীনাথ সাহা

অবরুদ্ধ সময়ের -অনুগল্প

বইমেলা
কাশীনাথ সাহা

বইমেলার ১২১ নম্বর স্টলে কবিতার বইয়ের তাকে হাত দিতে গিয়েই অপর্ণাকে দেখতে পেলাম।অপর্ণাও আমাকে দেখতে পেল। দুজনেরই চোখে বিস্ময় আর খুশির ছটা। অপর্ণা জিজ্ঞেস করলো, অর্ণবদা তুমি!  কি বই কিনছো?  কবিতার নিশ্চয়ই!  শঙ্খ ঘোষ না জয় গোস্বামী! নাকি মল্লিক! কার?
স্টল থেকে বেরিয়ে বাইরে এলাম। অপরাহ্নের আলোর মুগ্ধতা অপর্ণা -র শরীর ছুঁয়ে আমাকেও স্নাত করছে।
বইমেলার এক প্রান্ত থেকে আর এক সীমানা ছুঁয়ে এলাম।  ওর হাত মুঠোয় নিয়ে বুক ভরে টেনে নিলাম নতুন বইয়ের বৈভব। কবিতার নৈঃশব্দ্য বিন্যাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে চললাম দু'জনে। অনেকক্ষণ।

 অপর্ণা -র মৃত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক বছর আগের সেই দিনটিকে  পুনরায় স্পর্শ করলাম!

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২০

রম্যরচনা || ভাইরাস || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা
ভাইরাস
কাশীনাথ সাহা

কোথা থেকে কি হয়ে গেল বোঝবার আগেই হম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো ঔর চাবি খো যায়ে।
আমরা দেশবাসী আর বিদেশবাসী সবাই গাড্ডায় পড়ে গেছি। বাজার বন্ধ, বেড়ানো বন্ধ, আড্ডা বন্ধ,পরকীয়া বন্ধ। কুড়ি পঁচিশ বছরের প্রাগৈতিহাসিক  বউকে আবার পালিশ মেরে চকচকে করে নিজের মতো করবার অসাধ্য সাধন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পালিশে বউ কতোটা চকচকে হয়েছে জানিনা তবে পালিশ করতে করতে আমি পালিশওয়ালা বনে গেছি। রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান!  বউ মশলা বাটছে আমি আলু কাটছি। বউ চপ ভাজছে আমি বেসন গুলছি।বউ তরকারিতে নুন দিল, ভালবেসে আমি আর একবার নুন দিলাম। বউ বলল পায়েস করবো, আমি বললাম তাই করো আমি আমি পেঁয়াজ বেঁটে  দিচ্ছি। বউ, অবাক, পায়েসে পেঁয়াজ কি হবে? আমি বললাম, কেন দেয়না? না পায়েসে পেঁয়াজ দেয় না।  কেন দেয়না?  আজ থেকে চালু হোক পায়েসে পেঁয়াজ দেওয়া। বউ হেসে লুটোপুটি।  এই করতে করতে আবার পুরাতন প্রেম মাথা চাড়া দিচ্ছে। পরকীয়া নয় স্বকীয় ভাইরাস। কে বলে কদমতলা ছাড়া প্রেম হয়না!  চার দেওয়ালের মধ্যে টগবগিয়ে প্রেম ফুটছে।  চলুক, অনন্তকাল চলুক এই চায়না সেলিব্রেশন। তবে চায়না মাল তো বেশিদিন লাস্টিং করবে না। ভাইরাস চলে গেলে ওপারে রইবে তুমি আমি রইবো এপারে...।
বউকে বললাম ছুটি চলছে চল পুরী যাই। বউ বলল দূর অসব্য ( আদরে ভ টা ব হয়ে গেছে) এখন তো লকডাউনে সব বন্ধ যাবে কি করে?  বউ ধরতে পারেনি সময়  বুঝেই কোপ মেরেছি। আমি বললাম তাই তো!  ঠিক আছে সমুদ্রকেই ঘরে নিয়ে আনছি। হোম ডেলিভারিতে দু বোতলের অর্ডার দিয়ে দিলাম। না, আপনারা যা ভাবছেন পুরোটা তা নয়। জিনিসটা ওটাই  তবে দুবোতল মানে গিন্নীর জন্য একটা নয়। দুটোই আমার জন্য। আজ একটা কাল একটা। সরকারের চিন্তা ভাবনাকে স্যালুট। আমাদের মতো গরীবের দুঃখ টা বুঝতে পেরে এটা ছাড় দিয়ে দিয়েছে । জিও। আগলে বার....  কা সরকার!
এই দুর্যোগে গরীবের কষ্টতো হচ্ছেই। হাহাকারে ভরে গেছে গরীবের উঠোন। কিন্তু সবচেয়ে বেশী কষ্ট নব্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েগুলোর। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, ছুতো ছাতায় ছুঁতে পারছে না। মান অভিমান নাই। একি কম যন্ত্রণার। রাজ্যসরকার, কেন্দ্র সরকার, পাটী, ক্লাব জনগণ  কেউ বুঝতে পারছে না ওদের দর্দ ভরি কহানী। এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আন জনে সজনি আমি বুঝি মরেছি মনে মনে...
এখন প্রচুর সমাজসেবী ময়দানে নেমে পড়েছে। হাতে পাঁচ টাকা দামের এক প্যাকেট বিস্কুট সাথে তিনজন ফটোগ্রাফার। হাসিহাসি মুখে পোজ মেরে উত্তমকুমার মার্কা ভুবন ভোলানো হাসি বিলোতে বিলোতে বিস্কুটটাই আর বিলানো হলো না। না হোক, আসছে বছর আবার হবে। ফটোটা জম্পেশ হয়েছে, বউ যা খুশি হবে....। এই নকলি মাকালদের দাপটে আসলি দাতারা আর হালে পানি পাচ্ছে না।
দেশভক্তিতে গদগদ করছে কিছু মানুষ। দেশের প্রতি এদের এতো প্রেম যে কোথায় ছিল বুঝতে পারিনি।  পনের টাকার মাক্স সত্তর টাকা।চাল, তেল ডাল আটা, চিনি সব হু হু করে গোষ্ঠী সংক্রমণের মত বিস্তার করছে।  আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ই ই ই ই...
কবিদের টাটকা কবিতায় ভরে উঠছে দিস্তা দিস্তা কাগজ। কি নেই কবিতায়৷!  ঝর্ণা আছে পাহাড় আছে  সাগর আছে নদী আছে। জৈবসারের মতো প্রেম আছে। আর করোনাতো বস্তা বস্তা।
 জিলে লে জিলে লে আও আও জিলে লে...
সংগীতের সুরও ভাইরাসে আক্রান্ত। সুর আছে কথা পাল্টে গেছে...
সরকার লকডাউন করেছে আমরা হরদিল জো প্যার করেগা ও গানা গায়েগা.. মৌজ মস্তিতে আমরা লকডাউন মানাচ্ছি। দুবেলা মোটরসাইকেল চক্কর মেরে দেখতে বের হচ্ছি কেমন চলছে মাদারি কা খেল!
সরকার বললো হাততালি দাও শঙ্খ বাজাও আমরা ঢাকঢোল তাসা ব্যান্ড খোল করতাল নিয়ে দুর্গাপূজার বিসর্জনের মতো বেরিয়ে পড়লাম দলবেঁধে। কি ফূর্তি!  আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
সরকার প্রদীপ জ্বালাতে বললো আমরা শুশুনিয়া পাহাড়টাই জ্বালিয়ে দিলাম। অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি, মুড়কির মোয়া চাই চাই ভাজা ভেটকি।
আমরা বেশ মজে আছি। কখনো পাখির নীড়ের মতো বনলতা সেনে কখনো আঁখ মারে ও লেড়কি আঁখ মারে ...
রামায়ন মহাভারতেও আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছি।  এজীবনে কতো সাধ ছিল কিছুই তো পেলাম না। কিন্তু লকডাউন তো পেলাম। সেটা কম কি?
রাজনীতির কচকচানি ভুলে আবার তো একসাথে হলাম কয়েকটি দিন । ধর্মান্ধতা সরিয়ে দু'চার দিন একটু হলেও তো মানবিক হলাম সেটা কি কম পাওনা।  মমতার বুক আবার মমতাময়। মোদীজির কন্ঠস্বরে দখিনা বাতাস। বামেদের হৃদয়েও বিপ্লব থেমে গিয়ে, মধু মালতি ডাকে আয়... । আর আমাদের মনেও বন্য প্রেমের ভাইরাস। বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো....

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২০

ছড়া || রক্ষাকবচ কাশীনাথ সাহা

রক্ষাকবচ
কাশীনাথ সাহা

ঘরের থেকে বেরিয়ে ছিলাম জরুরী এক কাজে
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত বারোটা বাজে।
একা একাই পথ হাঁটছি নদীর ধারে ধারে
নির্জন পথে আর কেউ নেই সবাই ঘুমের ঘোরে।
চারিদিকে আর কেউ নেই  জনমানব শূন্য
আমিই শুধু একলা পথে জরুরী কাজের জন্য।
কিছুটা পথ যাওয়ার পরে অবাক কান্ড একী
ঝোপের পাশে ঘোমটা পরা শাঁকচুন্নি দেখি।
আমাকে দেখে শাঁকচুন্নির ফোকলা মুখে হাসি
বলল, তুই কবিতা লিখিস তোর নাম তো কাশী?
আজগুবি তোর কবিতা পড়েই আমার এমন দশা
ঘাড় মটকে খাবো তোকে দিয়ে পেঁয়াজ শশা।
করজোড়ে বলি থামো শাঁকচুন্নি দিদি
দুঃখের কথা বলছি তোমায় একটু শোন যদি।
হাঁচি-কাশি হচ্ছে ভীষণ সাথে আছে জ্বর।
শাঁকচুন্নি লাফিয়ে বলে তাহলে তুই সর।
না না বাবা ছোঁবনা তোকে ছোঁয়াচে রোগ ভারি
চারিদিকে এখন শুনি চলছে মহামারী,
বহুদিন খাইনি মানুষ, ইচ্ছে ছিল তাই
কবি মানুষের ঘাড় মটকে কবির রক্ত খাই।
কিন্তু তোকে ছোঁয়াও নিষেধ, পালিয়ে নিজেই বাঁচি
রক্ষা পেয়ে তখন  আমি জোরসে দিলাম হাঁচি৷




Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...