গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২১

করঞ্জতলায় সজনেফুলের গল্প ।। শ্রীজিৎ জানা ।। বিশেষ গদ্য, Srijit Jana

করঞ্জতলায় সজনেফুলের গল্প।

শ্রীজিৎ জানা



সভ্যতার আদিরূপ হল গ্রাম। সভ্যতার উৎসভূমি। অকৃত্রিম চিরহরিৎ এক প্রাণময় সত্ত্বা। বৃক্ষ লতা গুল্মের স্নেহশীতল ছায়া,সবুজ শস্যফসলের প্রাচুর্যে ভরা ক্ষেত্রলক্ষ্মী,কাদামাটি মাখা হাড়খাটুনির বিনন্দ রাখাল কৃষক, আটফেরে শাড়ী আর শাঁখাপলা মেটে সিঁদুর পরা দশভূজা কৃষাণী, শালুকফোটা পুকুর- দিঘি,কলমিদামে ভরা খালবিল,টোপরপানা ভরা নয়ানজুলি, আঁকনবাকন নদী,মেঠো আলপথ,পাখির কলতান, মুক্ত বাতাস,থইথই রোদ্দুর,ফুলফুল জোছনা,ঝিরঝির বিষ্টি, টুপটাপ হিম,মাটির উঠোন,আলপনা আঁকা দেয়াল,তুলসীমঞ্চ,শাঁখের আওয়াজ, শ্রীখোল- খঞ্জনির মাদকতা- আরো কত কি! আরে কত কি!
লগি ঠেলে নৌকায় খেয়াপার,গরুর গাড়ির দুলুনি চাল, একাঠা বা জোড়া তালডোঙা চড়ে বর্ষার মাঠে কলম্বাসের দিকভ্রমণ,দুব্বো - বাজামুথা ঘাস মাড়িয়ে মাঠময়,পাড়াময়,বনময় হন্টনে হরষিত চিত্ত! বাগানের সিঁদুরে আম,গাছপাকা কাঁঠাল,কাঁটালি- মত্তমান-নোনাবউ কলা,কুড়ুকজাম থেকে বড়জাম,ডাঁশা পেয়ারা,জামরুল, নোনাআতা,মাদার- ফলবতী গাঁ! ঘরের গাইয়ের দুধ,চিনিপাতা দই,নেবুপাতা দিয়ে মারা ঘি,ঘোলমুথানি(ঘোলমউনি) দিয়ে মোয়া মাখন আর ঘোল-রেঁস্তোরার সুইট লস্যিকে হার মানায়। গেঁয়ো প্রবাদে আছে- দুধ দুর্বল,ঘোল মহাবল!
উনুনে কড়াই চাপিয়ে দিলেই হোলো। গাঁয়ে সব মিলবে টাটকা, তাজা। উঠোন ধারে ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠা লাউশাক,ডগমগানো পুঁই,কঞ্চির বেড়া জড়ানো সিম- উচ্ছে- ঝিঙে- বরবটি,ঘড়ের চালে লতানো চালকুমড়ো,কচুর লতি,তেলাকুচোশাক,খুলেখাড়া,মাটের আল ঘেঁষে থাকা শুশনি, খলবলানো কই-শিঙি-মাগু,শাল-শোল,ট্যাংরা- পুঁটি- মুরলা প্রভৃতি সতেজ মাছ আনাজপাতি দুধ ফলমূল মিলে আমিষ- নিরামিষের সমাহারে গ্রাম 'সুস্বাস্থ্য পুষ্টি বর্ধনম্'।
শহুরে পরিসরে এমন অমূল্য প্রাপ্তি দূর কি বাত্। কিম্বা সমস্তই নাগরিক দরজায় হাজির হয়,কিন্তু সেই প্রাপ্তিযোগের ভেতর খানিক আনন্দ উঁকি দিলেও,তা পরিপূর্ণ তৃপ্তি দ্যায় না। মাটির দুয়ারে হাঁটুমুড়ে বসে অভাবের কলাপাতায় শাকভাতের পঙক্তিভোজের সন্তুষ্টি ঝাঁচকচকে ডাইনিং টেবিলে সাহেবি মেনু আর স্পুন- কাটারের যুদ্ধ হেরে ভুত হোয়ে যাবে।
শুধু সবুজের ছায়া, বুকভরা তাজা বতাসে নিঃশ্বাস,টাটকা তরিতরকারি নয়, গ্রাম এগিয়ে আছে তার হৃদয়- ঐশ্বর্যে, আদিগন্ত ছড়ানো তার হীরেমাণিক মনের প্রসারতায়,ধুলোমাটির সরসতাভরা সৌহার্দ্যে,আপন কোরে কাছে টেনে নেবার সরলতায়, সম্পর্কের গভীর প্রেমবন্ধনে,সেবায়,উদারতায়,আতিথেয়তায় আর ভক্তিভাবের পরাকাষ্ঠায়।
আদিম মানুষ তার গুহাজীবন,যাযাবর জীবন পেরিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে প্রবেশ করেছে। নদীতীরে জল,আগুন শস্যফসলের ভরসায় সবুজের ছায়াতলে গড়ে উঠেছে গ্রাম। গ্রাম্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল অনুশাসন। সম্পর্কের নিবিড়তা। কোনো কোন ক্ষেত্রে সেযুগে কিম্বা বর্তমানেও গ্রাম্য শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিরূপ চিত্র মনকে ব্যাথিত করে। তবে তা গ্রামের সার্বিক দিককে কলুষিত করে না। বৈদিক আমলে কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়ে গ্রাম তৈরী হত। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠত বিশ বা জন। আর কয়েকটি জন নিয়ে হত দেশ বা রাষ্ট্র।গ্রামণি গ্রাম শাসন করতেন। মহাকবি ত্রিবিক্রম ভট্ট তাঁর সংস্কৃত 'নলচম্পূ ' গ্রন্থে তৎকালীন গ্রামের বর্ণনায় রিখেছেন-"যত্র চতুরগোপশোভিতাঃ সংগ্রামা ইব গ্রামাঃ"! বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ ' চর্যাপদ' এর পাতায় আঁকা হোয়েছে মমতামাখা নিটোল এক গ্রামের চালচিত্র।
তারপর আমার গল্প ফুরোলো,নটে গাছটি মুড়োলো।
পুরোপুরি না মুড়িয়ে গেলেও,সভ্যতার উৎসভূমি ভীষণ বিপন্নতার শিকার। তীব্র জৈবনিক চাহিদা আর অত্যুগ্র জীবনযাপনের মোহ- আবর্তে শহর এবং নগরের জন্ম। শহর- নগর যদি বৃক্ষের বহিরঙ্গ প্রকাশের পত্রপুষ্পফল হয়,তবে গ্রামগঞ্জ তার কান্ড,শাখাপ্রশাখা, শিকড়। শহর অথবা নগর তার বেঁচে থাকার রসদ আহরণ করে চলেছে গ্রামের বুক থেকে। গ্রাম অদ্যাবধি নাগরিক সভ্যতার স্তন্যদাত্রী মাতৃস্বরূপা। সাপ যেভাবে তার শাবককে খেয়ে নেয়,নাগরিক রাক্ষুসে প্রবৃত্তি ধ্বংস করতে চেয়েছে গ্রামীণ জীবনধারাকে। ছলনাময়ীর মতো প্রলুব্ধ করেছে গ্রাম্য সরলতাকে। কালাজাদুর তুকতাক বিদ্যার মতো ফুসলে নিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে গেঁয়ো রূপ। শহর সদা চক্রান্তকারী, যার কুটিল চক্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে মেঠো মন ও মানসিকতা। তাহলে কি মাটির আলপথে মোরাম, পিচ অথবা কংক্রিটের আস্তরণ পড়বে না?মাটির দেয়াল পাকা হবে না? বৈদ্যুতিক আলো জ্বলবে না ঘুটঘুটে অন্ধকার মোছাতে?সমস্তরকম পরিষেবা কি উন্নততর হবে না? নিশ্চয় হওয়া জরুরি। কিন্তু যখন উন্নয়নের মোহে নিজস্ব কৃষ্টি ভূলুণ্ঠিত হয়,আধুনিকীকরণের নাগপাশে শ্বাসরুদ্ধ হয় গ্রাম্যধর্ম, গ্রাম্য সংস্কৃতি, তখন তা মৃত্যুর নামান্তর। যখন মাটির দেয়ালে গোবর- মাটির লাতা দেওয়া বিরাট ক্যানভাসের পিটুলিগোলার আলপনা মুছে যায়, লেখা হয় রাজনৈতিক অভব্য ও উস্কানিমূলক শ্লোগান,যখন পেরেকে ঝোলানো কালীঠাকুরের পটের স্থানে জায়গা করে নেয় নগ্ন নায়িক- নায়িকা, তখন আসলে শেকড়ে পচনধরা রোগকেই সূচিত করে। মাটির সাথে শেকড়ের বন্ধন ছিন্ন হতে থাকে। সামান্য ঝোড়ো হাওয়াতেই ভয় লাগিয়ে দ্যায় বৃক্ষ পতনের। সভ্যতা নড়ে ওঠে।

একটাকার শ্যাম্পু পতায় কেশচর্চায় মাততে চেয়েছে গ্রাম্য কিশোরী। পাঁচ টাকার সাতদিনে মুখ ফর্সা করা ক্রিমের দৌলতে সাত নম্বর মুখ ফর্সা দেখিয়ে শ্যামলা বর্ণের কিশোরীর মাথা খেতে চেয়েছে। তাকে বকরবার বোঝানো হয়েছে কালো রঙ অশুভ,অপছন্দের,ঘৃণার। গৌরাঙ্গী হতে হবে।যত ফর্সা মুখ তত কদর। তত আকর্ষণীয়। কিশোরী নিজস্ব রঙ মুছতে মরিয়া হয়েছে। দশ টাকার বেবিফুডের বিজ্ঞাপনে চনমনে চকচকে শহুরে বাচ্চাদের এপাং ওপাং ঝপাং মিউজিকে নাচিয়ে বোঝাতে চেয়েছে বাচ্চাকে টল স্ট্রং শার্প করতে মাতৃদুগ্ধ অপেক্ষা ওগুলোই যেন অত্যাবশ্যক। পরোক্ষে মার্কেটিং কায়দায় সুড়সুড়ি স্তন্যদানে মায়ের বক্ষ সৌন্দর্য হানি হয়। শিশুর মা- বাব ডাকের ক্রমেই বিবর্তন ঘটেছে। পারিবারিক কাঠামোয় লেগেছে শহুরে চেকনাই। একান্নবর্তী পরিসর ছোট ছোট বৃত্তে বাঁচতে চেয়েছে। কেউবা শিকল কেটে বেঁধেছে নগরের নিয়ন আলোয় ভেজা সুখী গৃহকোণ। বিশ্বের হালহকিকত তার ঠোঁটস্থ,নামী ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে দেশদশের খবরে মন উদভ্রান্ত,শুধু যে শীতলা মন্দিরের আটচালায় গায়ে লেগে আছে শৈশবের গন্ধ তার ভগ্নদশায় মন কাঁদেনা। সামান্য সাহায্যের হাত প্রাসারিত হয় না। গ্রাম মনে মনে কষ্ট পায়।

গ্রাম দুয়োরানী। এককালে কতকিছু ছিল তার আঁচল তলায়। পাড়ায় বিশু সাপুড়ে আসতো সাপ খেলাতে। ডুগডুগি বাজিয়ে গান ধোরতো- বেহুলা ঘুমাস না গো/ লোহার বাসর ঘরে/ কালনাগিনী মারবে ছোবল লখীন্দর বরে। অম্নি পাশে বসে থাকা সাগরেদ ধুয়া ধোরতো। বিশু সাপুড়ে সাপপিড়ির ঢাকনা সাপের ফণার সামনে ঘুরিয়ে,নিজের হাঁটু দুলিয়ে, গোখরোর লেজ বাঁহাতে ধরে কতনা কারসাজি দেখাতো। গাঁয়ের ছেলে থেকে বুড়ো সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতো। বিনিময়ে বিশু সাপুড়ের ঝোলায় জুটতো চাল- পয়সা। তবে মেয়েমহলে কিছু শিকড়বাকড় গতিয়ে উপরি কামাই কোরতো। আজকাল কদাচিৎ চোখে পড়ে সাপুড়েদের।
একসময় পাড়ায় আসর বসাতো পটুয়ার দল। পুরুষ- মহিলা উভয়েই পটের গান গেয়ে রামায়ণ,মহাভারত,মনসামঙ্গলের কাহিনীচিত্র আঁকা পট দেখাত। পড়ায় আজকাল একেবারেই তারা আসে না। ভানুমতীর খেলা দেখাতে আসতো যাযাবর অথবা কাগমারা জাতির মেয়েরা। 'লাগ ভেলকি লাগ' বলে চোখ থেকে মার্বেলগুটি,হাতের মুঠোর ভেতর পাখির ছানা,পেট থেকে জল বের করার মতো আশ্চর্য ভেলকিবাজি দেখিয়ে পাড়াগাঁকে তাক লগিয়ে দিত। সাথে কত সাপ, মাছ ও পশুর হাড় ঝোলা থেকে বের করে তুকতাকের ওষুধ বিক্রি কোরতো। তারাও আর আসে না।
গাঁয়ের চন্ডীতলায় বোসতো রামযাত্রা কিম্বা কিষ্টযাত্রার(কৃষ্ণযাত্রা) আসর। সে এক ভারী মজার ব্যাপার। ডে- লাইট বা বাতি লাগানো বড়ো হ্যাজাক লাইটে আলোকিত যাত্রার আসর।' সীতার বনবাস' পালায় রাম- সীতার দুঃখে কেঁদেকেটে একসা হত পাড়ার ঠাকুমা- জেঠিমা- মায়েরা। রাতে যে রাম, যার পায়ে মাথা ঠেকানোর উপক্রম ঠাকুমার,সকালে সেই রাম দর্শন দিতেন বাড়ির দরজায়। মুখে মেকাপ নেই। গৌরবর্ণ রাম এখন কালোবরণ জগেন,হাতে থলি,উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাক- মাগো,চাল,আলু,পয়সা,কেরোসিন যা পারেন দয়া করে দেবেন। ঠাকুমার তখনো রামভক্তির ঘোর কাটে না। গলায় আঁচল বেড় দিয়ে থালাভরা চাল- আলু ঢেলে দেয় রামের থলিতে।
কিষ্টযাত্রায় ছিল রোমান্টিক ব্যাপারস্যাপার! গাঁয়ের স্কুলঘরে সারাদিন রাধা লুকিয়ে থাকতো। সন্ধ্যায় সোজা আসরে। পালা যখন জমজমাট, ঠিক তখন রাধার গলার মালা নিয়ে ' মালাডাকা' শুরু হতো। কে কত দরে উঠবে! যার ডাক বেশি হবে আসরের মাঝে তার গলায় নিজ হাতে রাধা পরিয়ে দেবে মালা। এনিয়ে সেসময় গাঁয়ে কত মুখোরোচক গল্প অামোদ ছড়িয়ে দিত গাঁয়ে। কিষ্টযাত্রা প্রায় উঠে গ্যাছে গাঁ থেকে। রামায়ণ গানের আসর বসেনা বল্লেই চলে। গ্রামের শীতলা ও মনসামন্দিরে বাৎসরিক পুজোর সময় নিয়মরক্ষায় শীতলামঙ্গল ও মনসামঙ্গল গান হয়। সুদেষ্ণা কিম্বা সনকার পুত্রহারানো শোকে গাঁয়ের চোখে জল আর আসে না। ডিজে নামক শব্দদানবের তান্ডবে ও দানবীয় নৃত্যকলায় গ্রাম্যমন বিমর্ষ হোয়ে পড়ে।
মাঝেমধ্যেই গাঁয়ে কবিগানের লড়াই হতো। তরজা গান। ঢোল- কাঁসির বাজনার সাথে ছন্দময় সুরেলা বাকবিতণ্ডা। কখনো পুরাণের কথা তো কখনো লঘুরস সুরে বেঁধে শ্রোতাদের মন মাতিয়ে দিত। কত ব্যাঞ্জনার প্যাঁচ লুকিয়ে থাকতো তাদের গানে,অপর জনকে সেই জট খুলতে হত। যেমন- 'কত রঙ্গ দেখাবি মন্ডলে/ বলি,কাতলা মাছে তামুক খায়/ আম গাছেতে ঠ্যাঙ তুলে'! এখন শুধুমাত্র কোন কোন মন্দিরে নিয়মমেনে কবিগান করান মন্দির কমিটি ভক্তিতে নয়-ভয়ে।নইলে দেব- দেবীর কোপে পড়তে হবে।
আগের দিনে প্রায় গ্রামেই যাত্রার দল থাকত। ভীমপুজোতে, গাজনে যাত্রার কম্পিটিশন চলতো। মাঝরাত অব্দি লন্ঠন - লম্ফের আলোয় মহড়া চলতো কারো দলিজঘরে নতু্বা ক্লাবঘরে। পুরুষই মহিলার চরিত্রে পার্ট কোরতো কখনোকখনো। কত হাসি -মজার ব্যাপার ছিল তাতে। কখনো আবার ফিমেল চরিত্র ভাড়া করে আনা হতো।দু' তিনটা গাঁয়ের মাঝে একজন যাত্রার মাস্টার থাকতেন। তিনি ডিরেক্টর। তলাপার্টিও ভাড়ার। আজ দশটা গ্রাম ঘুরলেও একটা যাত্রাদল মিলবে কিনা সন্দেহ!

গাঁয়ে আজ আর খোলঘর খুঁজে পাবে না। রোজ সন্ধ্যায় যেখানে শ্রীখোল- মৃদঙ্গ- খঞ্জনী - হারমোনিয়াম সহযোগে হরিনামের মহড়ার আসর বোসতো। মাটির খোলঘর এখন পাকার পার্টি অফিস। চন্ডীতলার গালগল্প, বটতলার সালিশ, দালানের হাসিঠাট্টা, দাওয়ার হুল্লোড়, বৈঠকখানার মজলিশ কোনো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। এখন গ্রাম্য রাস্তার দু'ধারে,পাড়ায়- পাড়ায় ছাউনি দেওয়া বাঁশের মাচা। সেখানে তাস পিটানোর সাথে রাজনৈতিক কুটকচালি। প্রত্যেক পার্টির আলাদা আলাদা মাচা। তাতে দলের ঝাণ্ডা বাঁধা। গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে আবহাওয়া গরম থাকে। কত কিছুর ছক কষা হয়!গোপন শলাপরামর্শ! গ্রাম ভয় পায়।

গাঁয়ের কিশোর- কিশোরী পুকুরে আজকাল ঝাঁপাইঝুড়ি করে না। ডুব সাঁতারে এপারওপার হয় না। তরতরিয়ে গাছে উঠতে পারে না। গাঁয়ের মাটির ঘরের দখিন দুয়ারে ঢেঁকি দেখতে পাওয়া ভাগ্যের! পানের ডাবর,হুঁকো,গড়গড়া, গুলামাথির চাঁচি, তালপাতার চাটাই,খেজুর পাতার তালই আরো কত কি খোয়া যাচ্ছে গ্রাম থেকে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা না দিতে পেরে ক্রমেই অপসৃত হচ্চে গ্রাম্যতা, লোকাচার। একসময় স্কুলের ছেলেমেয়েরা সরস্বতীপুজোর জন্য গান গেয়ে চাল- পয়সা আদায় কোরতো বাড়ি বাড়ি। দলবেঁধে কোরাসে গাইত- সরদে বরদে গো মা / জ্ঞানদে জ্ঞানদায়িনী।
ভোরে মশা তাড়ানোর লড়াই হতো পাড়ায় পাড়ায়। হাতে খড়ের আঁটির ধোঁয়া করে দলবেঁধে গান ধোরতো এক পাড়ার ছেলেমেয়েরা অন্য পাড়ার উদ্দ্যেশ্যে- ধা রে মশা ধা/ নলবনকে যা/ নলবনে তোর বাসা/ মারবো কদাল পাশা / এপাড়া থেকে ওপাড়া যা/ ওপাড়ার সবার রক্ত চুষে খা। পৌষ- সংক্রান্তির মকর পরবের দিন ভোরে গাঁয়ে বড়দের পাশাপাশি ছোটদের মধ্যে 'মকরডুব' দেওয়ার ধুম পড়ে যেত। একে কনকনে শীত,তার উপর পুকুরে ডুব! পুকুর পাড়ে খড়কুটোর আগুন আগে থেকেই রেডি রাখা থাকতো। এক কোমর জলে নেমেই দ্রুত ছড়া আউড়ানো শুরু করে দিত ছোটরা-- এক ডুবে শুচি / দু'ডুবে মুচি / তিন ডুবে মুসলমান/ চার ডুবে গঙ্গাস্নান! ছড়া শেষ হওয়া মাত্রই টপাটপ করে চারটে ডুব। তারপর ছুট্টে আগুনে হাত- পা সেঁকে নিত সব্বাই। এরপর মাঝ- সকালে মন্দিরে মন্দিরে মকর আনতে যাওয়ার হিড়িক লাগতো। গাঁয়ের ছোটরা আজ সেভাবে মকরডুব দ্যায় না।
পয়লা বৈশাখে আগে বাড়ি বাড়ি পাঁজি পড়তে আসতে আচার্য্যি ঠাকুর। বাড়ির কর্তা প্রথমে যে কোন ফল বা হরিতকি হাতে নিয়ে শুনতো পাঁজির ফল। আচার্য্যি ঠাকুর শোনাতেন-শনি রাজা কুজো মন্ত্রী জলানামধিপো সিতঃ/ শশীঃ শস্যাধিপো জ্ঞেয়ঃ সংবর্তশ্চ মেঘনায়কঃ। তার পর ছোটদের মাথায় পাঁজি বুলানো পর্ব চলতো। তাতে নাকি ছোটদের মাথা সারাবছর ঠান্ডা থাকবে। আচার্য্যি ঠাকুর পাঁজি পড়তে আর পাড়ায় আসেন না। এমনকি রাখীপূর্ণিমায় গাঁয়ের পাড়ায় পাড়ায় রাখী পরাতে আসতেন এই আচার্য্যি ঠাকুর অথবা ঠাকরুন। হাতে রাখী বাঁধতেন আর বলতেন মন্ত্র-যেন বন্ধো বলীরাজা দানেবেন্দ্রো মহাবলঃ/তেন ত্বাং প্রতিবধ্নামি রক্ষো মা চল চল।

গাঁয়ে তখন দাদু- ঠাকুমারা কথায় কথায় ছড়া কাটতেন। কত জীবনদর্শন, কত ব্যাঞ্জনা,কত আমোদ লুকিয়ে থাকতো তাতে। আজকাল সেই দাদুঠাকুমাদেরও সন্ধ্যে থেকে টিভির কাছে আটকে থাকতে দেখা যায় রাত অব্দি। তখন ছড়া কেটে ছোট- বড়োদের মধ্যে গাঁয়ে রাগানোর চল্ ছিল। কারো নাম হয়তো ভুটি।হয়তো বা সে একটু মোটা চেহারার। অম্নি সবাই তাকে ক্ষ্যাপাতো এই বলে- ভুটি ভুটভুট করে/ ভুটির ভাত কম পড়ে/ ভুটি ধুমসা গতরি/ ভুটির হবে মোটা শ্বাশুড়ি! এর মধ্যে যদিও মনে আঘাত পাবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হোতো না। সামান্য মনকষাকষি ও হাসিঠাট্টার মধ্যে মিটমাট হোয়ে যেত।
কত গ্রাম্য খেলাধুলা হারিয়ে গেছে গাঁয়ের সবুজ মাঠ থেকে। বৌবসন্ত,গাদি,চিনিবিস্কুট,আঁটুলবাটুল,পাতালুকানি,পাঁচগুটি, অষ্টা,মোগলপাঠান- এমন কত্ত খেলা জানেই না আজকের গাঁয়ের শিশুকিশোর। তার বদলে সদর্পে জায়গা করে নিয়েছে পাবজি,ফ্রিফায়ার নামক রকমারি কত ভিডিও গেম। তাদের হিরো এখন ছোটা ভীম,বেনটেন, মটু - পাতলু,অগি কিম্বা নিনজা হাতড়ি। কেনো মনে হয় যেন আজকের গ্রামীণ শিশুকিশোররা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তাদের ছেলেবেলা। মা- বাবারাও চাইছেন মনন নয়,মেধায় যেন উন্নত হয় তাদের সন্তানসন্ততি।
গ্রাম্য হাটগুলো বাজার হোয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। একদা হাটুরেদের মধ্যেকার কথাবার্তার আন্তরিকতা তা হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু ক্রেতা- বিক্রেতার মাঝে বিকিকিনি আর দরকষাকষি। গঞ্জের চা দোকানগুলো একএকটি রাজনৈতিক দলের ঠেকে পরিণত হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় ঐক্যজোট বিনষ্ট। স্বর্থপরতা নামক ভয়ঙ্কর অসুখ নিঃশব্দ আততায়ীর মতো শেষ করে দিচ্ছে গ্রামীণ ঔদার্যের অস্থিমজ্জাকে।
হয়তো বিষাদগীতিকা হোয়ে হৃদয়ের পাড় ভেঙে দিচ্ছে গ্রাম্য কথার ইতিউতি। কালের অগ্রগমনের সাথে গ্রাম্য রূপ- ধর্মের এমন পটপরিবর্তন হয়তো স্বাভাবিক। অনেকক্ষেত্রে কাম্যও বটে। শুধু হাস্যকর হয় কাকের ময়ূর হোয়ে ওঠার ব্যর্থ আয়োজন ও আয়াস। শিকড়ে পচন ধরতে দিলে সমগ্র বৃক্ষের যে পতন আসন্ন - তা বুঝেও গোড়ায় ইচ্ছকৃতভাবে ঘুণ ধরতে দেওয়া একধরণের ব্যাধি। এমন ব্যাধি নিরাময় হোক। গ্রাম বেঁচে থাক। সভ্যতা বেঁচে থাকবে।











সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

শীতের রসচরিত || শ্রীজিৎ জানা || মুক্ত কথা

শীতের রসচরিত

শ্রীজিৎ জানা



  কথায় বলে ' রসেবশে বাঙালি '! গঙ্গা পদ্মা দুইপারই রসে টইটুম্বুর।রস খালি গলায় নহে,বলায় নহে, নোলাতেও একশোয় একশ।যেই হেমন্ত ফিরল গ্যালারিতে অম্নি শীতের ইনিংস শুরু।উত্তুরে হাওয়া, বরফকুচি শীতলতা,আর কাঁচা হলুদবরণ রোদের আদুুরে আহ্লাদ।মাঝেমধ্যে ঘন কুয়াশার আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে জুবুথুবু অবস্থা যেন শীতবুড়ির।বঙ্গে শীত বাঙালি রসিয়ে উপভোগ করে।রসনায় লকলকিয়ে ওঠে নোলা।হিমেল ঋতুতেভোজের থালায় বহুপদের ছড়াছড়ি।শীত মানেই তো পিঠেপুলি, পায়েস,পাটালি,মোয়া সন্দেশ।সরুচাকলি,পুরপিঠে,আস্কেপিঠে,ঝিনুকপিঠে,মুঠিপিঠে,পাতাপিঠে,নকশি পিঠে,লবঙ্গলতিকা, চন্দ্রপুলি, পাটিসাপটা, হৃদয়হরণ-কতনা বাহারি নাম! শীতের পিঠেপুলিতে মজেছিলেন ফুলিয়ার কৃত্তিবাস, ওপারে বরিশালের বিজয় গুপ্ত।মঙ্গলকাব্যের কবির পিঠেপ্রীতি প্রকাশিত হল ছন্দের বাঁধনে--মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস/ দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স/দুগ্ধে পিঠা ভালোমতো রান্ধে ততক্ষণ /রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন"! পিঠের প্রসঙ্গ ওঠামাত্রই পিঠোপিঠি আসবেই রসনারঞ্জন,গুড় মহাশয়। আর শীতের গুড়ের গূঢ়কথা লুক্কায়িত খেজুর রসে।
খেজুর গাছের রসের হদিশ প্রথম কে দ্যান তা দেবা ন জানন্তি।তবে খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই নাকি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ চলত।"১৮৯৮ সালে বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের এক মহাভোজে উপস্থিত ছিলেন ইতসিং। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় তখনকার নেপালে সমস্ত বৌদ্ধ বিহারে যত সংঘ ছিল,সব এসেছিল সেখানে- প্রায় ১৩০০০ ভিক্ষু একত্রে খাচ্ছিলেন। সেকালে ভিক্ষুদের মধ্যে নানা ধরণের পানা বা সরবত খাওযার চল ছিল।তাও বলে গেছেন ইতসিং। তিনি যেসব সরবতের কথা বলেন সেগুলো হল- চোচপান(=ডাবের জল),মোচপান(=কোন এক গাছের বা ফলের রস),...খর্জূরপান(এটি সম্ভবত খেজুররস)।[বঙ্গভূমিকা-সুকুমার সেন]।
সংস্কৃত খর্জুর থেকে খেজুর শব্দ।সাহেবসুবোরা বলেন ডেটপাম।বিজ্ঞানসম্মত নাম ফিনিক্স ডিকটিলিফেরা।আরব দেশে খেজুর তুমুর নামে পরিচিত। সেখানে আবার রূপ-গুন বিচারে কত নামের রকমফের।কাঁচা খেজুর কিমরি,পাকা ও নরম রুতাব,পূর্ণাঙ্গ খেজুর খলাল,পাকা ওশুকনো খেজুর তমব।বালুময় দেশ ফলেই সন্তুষ্ট। আমাদের চাহিদা ফলাতীত। "প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ"! মানে খর্জুর বৃক্ষের প্রাণরস আহোরণ। মানে বৃক্ষবারি। যেমন সমুদ্রমন্থনে অমৃত লাভ,তেমন খেজুরগাছের হৃদয় সেঁচে রসামৃত গ্রহন। অতঃপর পাকশালার নিপুন পাকপ্রণালীর জাদুতে নবরূপে নবস্বাদে রসাস্বাদন! তবে খেজুরগাছের অন্তরভরা মধুরস এভাবে নিঙড়ে নেওয়া অনেকটাই হৃদয়হীন মনে হতেই পারে। কিন্তু ভোজনরসিক মাত্রই বলবেন রসনা তৃপ্তিতে -অধিকিন্তু ন দোষায়ঃ।
শীতের খেজুররস আহা কতনা অমৃতময়! মহান আল্লাহ তাঁর করুণার বাণী শুনিয়ে বললেন-"মানুথ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমিই প্রচুর বর্ষণ করি। পরে আমি উৎকৃষ্ট রূপে ভুমি বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য,আঙুর,শাকসব্জি,জাইতুন খেজুর "[সুরা আবাস আয়াত/২৪-৩২]।মানে মনখুলে রসসাগরে ডুবে যাও। রসের ভাঁড়ার পূর্ণ করবেন সৃষ্টিকর্তা।মরু অঞ্চলের লোকজন এমন মধুময় রস থেকে বঞ্চিত।বঙ্গদেশ যে রসে হাবুডুবু ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রশস্তিতে লিখলেন-"হায়রে শিশির তোর কি লিখিব যশ/ কালগুনে অপরূপ কাঠে হয় রস/ পরিপূর্ণ সুধাবিন্দু খেজুরের কাঠে/কাঠ কেটে উঠে রস যত কাঠ কাটে/ দেবের দুর্লভ ধন জীবনের ঘড়া/ একবিন্দু রস খেলে বেঁচে ওঠে মড়া"! মানে খেজুররস মৃতসঞ্জীবনী সুধা।শুধু কবি কিম্বা খাদ্যরসিক নয়,পুষ্টিবিশারদ হাত খুলে লিখলেন খেজুরফল ও রসের গুণাগুণ -"খেজুর ফ্রুকটোজ এবং গ্লাইসেমিক সমৃদ্ধ সুস্বাদু একটি ফল।খেজুর হল চিনির বিকল্প।রক্তে শর্করা বাড়ায়। শক্তির উৎস হিসেবে কার্যকরী খেজুর শরীরের ক্লান্তি দূর করে। খেজুর থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন বি- সিক্স মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।পরিমাণে ৩০০ গ্রাম খেজুর থেকে পাওয়া যায় ৯০ ক্যালোরি,এক গ্রাম প্রোটিন,১৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম,২.৮গ্রাম ফাইবার"। অতএব রসিকজন "খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন।"
খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধার দক্ষ কারিগররা হল শিউলী।ভারি মিষ্টি নামের পেশা। তাঁদের তিনমাসের রসের কারবার।অঘ্রান- পৌষ- মাঘ।বছরের বাকি সময় দিনমজুর বা চাষাবাদ বা মীন ধরে দিন গুজরান করে। স্থানভেদে এঁদের নাম বদলে যায়। কোথাও শিউলী,কোথাও গাছি বা গেছাল,কোথাও আবার ফার্সি।হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন খেজুররস সংগ্রহের কাজ করে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল বাদে প্রায় সব জেলাতেই শিউলীদের দেখা মেলে।বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাতে গাছিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আগে শীতের কাকভোরে বাঁশের বাঁকে শিকা ঝুলিয়ে তাতে কলসি বসিয়ে রস নামাতে হাঁটা দিত গাছিরা। কখনো কোমর থেকে ঝুলত হাোড়ি। এখন অনেকেই সাইকেল ব্যবহার করে। হাটবাজার থেকে কলসি বা ভাঁড় এনে পুনরায় তাকে খড়কুটো জ্বালিয়ে পোড়ানো হয়। কখনো আবার চুনজল দিয়ে কলসিকে জীবাণুমুক্ত করা হয়।শিউলীদের পিঠ বা কোমর ঝুলে তালপাতা আর বাঁশের বাখারি দিয়ে তৈরী ঠোঙা।তাতে থাকে ধারালো হাঁসুয়া।লম্বা খেজুর গাছের খাঁজকাটা খাপিতে পা দিয়ে তরতরিয়ে উঠে যায গাছিরা।তবে আগের দিন রসালো গাছ চিনেঝাঁকড়া কাঁটাপাতাময় খেজুর গাছের মাথার নীচের শুকনো ডাঁটা পাতা পরিষ্কার করে আসে তারা। তারপর সঠিক জায়গায় তৈরী করে 'কঠা'।এবছর শীতে যেদিকে কঠা বানানো হয়,পরের শীতে তা গাছের অন্যদিকে বানাতে হয়।লকলকে ধারালো হাুসুয়া দিয়ে প্রথমে অর্ধচন্দ্রাকারে চেঁছে গাছের সাদা অংশ বের করা হয়। পরে সেখানে হাঁসুয়ার নরু ডগা দিয়ে ইংরেজির ভি(v) আকৃতির চ্যানেল তৈরি করে তাতে লাগানো হয়'চুঙি'।
শিউলীর দক্ষ হাতের কর্মগুণে কঠা থেকে চুঙি বেয়ে রস কলসিতে জমা হতে থাকে।শিউলীদের ভাষায় "খেজুরগাছে রাতের বেলায় রসের জোয়ার আসে"।তবে সব গাছে রসের উৎসার সমান হয় না। গাছিরা গাছ দেখে চিনে নেয়। গাছের পাতা সবুজ হলে রসের জোয়ার, পাতা হলদেটে হলে অনেকটাই ' শুষ্কং কাষ্ঠং'।শিউলীরা ভোরবেলার খেজুর রসকে বলে 'জিরেনরস',আর বিকেলের রসকে বলে'ওলা'।রস ভর্ত্তি কলসি রোদে রেখে দিলেই তা গেঁজিয়ে হয় তাড়ি।চলতি কথায় বলে খেজুরতাড়ি।তখন খেজুরতাড়ি পানে হাল্কা নেশার আমেজ ধরে শরীরে।বিজ্ঞানের পরিভাষায কোহলসন্ধান প্রক্রিয়ায এমন রূপান্তর।রুমাল থেকে নিমেষে হল বিড়াল। তবে বিভিন্ন এলাকায় শীত মরশুমে খেজুরতাড়ি উত্তেজক মাদকরস রূপে বেশ জনপ্রিয়!
শিউলীরা সাধারণত খেজুরগাছে চড়ে দিনে দুবার।শীতের কুয়াশা মেখে ভোরে আর রোদ্দুরে ডুবে বিকেলে।রস এনে ঢালা হয় ' শালতি ' নামক পাত্রে।তবে আগের দিনে মাটির খলা বা কড়াই ব্যবহৃত হত। হালফিলে অ্যালুমিনিয়ামের কড়া বা শালতির চল।খেজুরগুড় তৈরির উনুনকে বলে 'গুড়চুলা'।হাতা মেরে মেরে রস পাকিয়ে গুড় প্রস্তুত হয়।সাদা রস আগুনের পাকে লাল বর্ণ ধারণ করে। কিছুটা কালচে লাল।গন্ধে ম ম করে চারদিক।এমনি সাধারণ রস থেকে তৈরি গুড়কে গাছিরা বলে ' সোডগুড়'। নলেনগুড় হয় জিরেন কাঠের রস থেকে। যে কঠা থেকে রস নিঃসৃত হয়,তাকে দুতিন দিন বিশ্রাম দিলে তাকে বলে জিরেনকাঠ।তারপর সেই জিরেনকাঠের রস থেকে পরম উপাদেয় গন্ধমেদুর নলেন গুড়ের জন্ম হয়।নলেনগুড়ের পরমান্ন,পাটালি,মিষ্টি,সন্দেশ, মোয়াতে মজে থাকে এপার- ওপারবঙ্গের বঙ্গপুঙ্গব।ভোজনান্তে নলেনজাত মিষ্টিতে হয় পেটপ্রিয় বাঙালির " মধুরেন সমাপয়েৎ"! ইদানীং বহির্বিশ্বে খেজুর রসজাত নোলেনগুড়ের যথেষ্ট কদর।ইংল্যান্ড, আমেরিকা,আরব,ইরাণ,কেনিয়া,শ্রীলংকা প্রভৃতি কত দেশের পাকাশালায এবং ভোজের আসরে নোলেনগুড়ের মিষ্টিপদ রসনারঞ্জনে ব্যস্ত। ঝাঁচকচকে অত্যাধুনিক কিচেনে নামকরা অভিজাত মিষ্টিপদের পাশে স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকে নোলেনগুড়ের মিষ্টান্ন।পশ্চিমবঙ্গের দুই চব্বিশ পরগনা,বিশেষ করে জয়নগর,অন্যদিকে পূর্বমেদিনীপুরে খেজুররস ও গুড়ের রমরমা।ওই দুই জেলায় শিউলীর সংখ্যা যথেষ্ট।
গাছিদের কামানি সাকুল্যে শীতের নব্বই দিন। বিভিন্ন জেলায় গাছিরা ছড়িয়ে পড়ে।অস্থায়ী ডেরা বাঁধে।গাছের মালিকদের কাছ থেকে গাছ লিজ নেয়।বিনিময়ে গাছমালিককে প্রতিগাছ পিছু মাসে ৫০ - ৬০ টাকা দ্যায় অথবা তিন- চার কেজি খেজুরগুড় দিতে হয়। বেশিরভাগ শিউলী নিজেরাই হুড় বানায়। পাইকারি ৭০-৮০ টাকা আর খুচরো ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি করে।সকলকে রসের মৌতাতে ডুবিয়ে রাখলেও, মিঠে গুড়ের মিষ্টি আমেচে ভোজনরসিকদের সুখানুভূতি দিলেও শিউলীদের জীবনের বারমাস্যা বড়ই করুণ। শিউলীদের সংখ্যা কমছে পাশাপাশি নবপ্রজন্ম এই পেশার থেকে সরে আসছে। সরকারও শিউলীদের প্রতি চোখতোলা থাকছেন।সেক্ষেত্রে আশার কথা হতে পারে,যদি বিদেশী চাহিদাকে মাথায় রেখে খেজুরগুড়ের বিপণনকে আধুনিক মোড়কে প্রোজেক্ট করে শিউলীদের লক্ষ্মী লাভের সৌভাগ্য খুলে দ্যায়। কিন্তু আরো দুশ্চিন্তার কথা হল খেজুর গাছের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা। সাধারণত এদেশে খেজুরগাছ রোপণ করা হয় না।তার উপর ইটভাটার জ্বালানীতে খেজুরগাছ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেকসময অবাঞ্ছিত হিসেবে কেটে ফেলা হচ্ছে।প্রশ্ন হল গাছ না থাকলে গাছিরা টিকে থাকবে কিভাবে? শীত আসবে,সময় মেনে শীত ফিরে যাবে।শুধু চীরবঞ্চিত থাকবে খাদ্যরসিকদের স্বাদকোরক।বড্ড হতশ্রী লাগবে শীতের পিঠেপুলি উৎসব।অতএব রসিকজন সাধু সাবধান।নিরস হইও না।'মধুহীন কোরো না গো তব মন কোকোনদে'! কিম্বা ' নিরসঃ তরুবর' বলে রসদাতা খেজুর গাছের গোড়ায় কোপ মারা বন্ধ করুন।আর যাঁরা রসের কারিগর তাঁদের প্রতি রসভরা চিত্তে সদয় হোন।রসপায়ী মাত্রই রসদাতার রক্ষা করা গুরুদায়িত্ব। শীতের পিঠে নোলেনে চুবিয়ে মুখগহ্বরে চালান্ দেওয়া মাত্রই স্বাদগ্রন্থি যেভাবে আহ্লাদে আট- দশখানা হয়,খাদ্যনালীর অলিন্দে যে রসের ঝরনা ঝরে,লালাগ্রন্থি যেভাবে পুলকে রসবৃষ্টি করে,তেমন সুখানুভূতি থেকে পরম রসময়ও বঞ্চিত।হে দূর্লভ মনুষ্যজন্ম! রসকষহীন হৃদয় আর রসজাত নোলেন বিহীন শীতঋতু যেন ' মণিহারা ফণী',যেন 'পানী বিনা মীন' দুই সমান।তাহলে হে রসময় খর্জুরবৃক্ষরূপে নিরন্তর রস বর্ষণ করুন- মনুষ্যকূল রসের সাগরে ডু্ে থাকুক নিরন্তর।

তথ্যৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃঋণ--সুমরুদ্দিন খাঁ ( শিউলী, হেঁড়িয়া,পূর্ব মেদিনীপুর)
ইন্টারনেট



রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২০

কবিতা কেন লিখি || রবীন বসু || গদ্য

কবিতা কেন লিখি

রবীন বসু





না, আমি প্রেমে পড়ে কবিতা লিখিনি। বা প্রত্যাখ্যাত হয়ে। স্কুলের শেষ ধাপে কিংবা কলেজে প্রথম দিকে এক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম পুরস্কার হিসেবে হাতে পেয়েছিলুম নগদ ২৫ টাকা আর কিছু বই। বইগুলোর মধ্যে ছিল বিশেষ দুটি বই। যা পরবর্তীতে আমার জীবন ও তার লক্ষ্যের অভিমুখ ঠিক করে দিয়েছিল। প্রথমটি বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধের বই "কালের পুতুল" আর দ্বিতীয়টি হল কবি "আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা"। এর আগে যা কবিতা পড়া তা ওই পাঠ্য বইয়ে। যৌবনের সেই রোমাঞ্চিত সময়ে সারারাত ধরে ওই আশ্চর্য বইটির পাতা উলটে গেলাম। পাতায় পাতায় ছন্দময় জীবনের এক আলোকিত উদ্ভাস। দেশজ শব্দ, দেখা চিত্রকল্প, পুরাণ-মিথ, লোকজীবনের প্রেম, নারী, ফেলে আসা গ্রাম, আটপৌরে জীবন…সব অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দের দোলায় ভাসতে ভাসতে আমার গহিন মনোলোকে স্থায়ী ছাপ ফেলে দিল "সোনালী কাবিন" । সেই আমার কবিতাকে প্রথম ভালোলাগা। আর সেই ভালোলাগার হাত ধরে পর পর এলেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য আধুনিক কবিরা। আমার সমগ্র সত্তায় এইভাবে কবিতা জড়িয়ে গেল। ছড়িয়ে গেল তার শিকড় গভীরে। মাথার মধ্যে আজও ঘোরে---


"কবিতা তো শৈশবের স্মৃতি

কবিতা চরের পাখী, কুড়ানো হাসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস

ম্লানমুখ বউটির দড়িছেড়া হারানো বাছুর

কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।"

( আল মাহমুদ ) 


হ্যাঁ, এই সরল আপাত নিরাভরণ শব্দসমষ্টির গভীরে যে জীবনছবি, যে দ্যোতনা তা আমাকে আকৃষ্ট করল। অজান্তে কেন জানিনা একটা সুর সব সময় আমার যাপন-ঘিরে প্রবাহিত হতে লাগলো। ট্রামে বাসে ট্রেনে, এমনকি ভিড়ের মধ্যে বা নির্জনতায় আমার মধ্যে ছবি জাগতে লাগলো। তারই হাত ধরে কিছু শব্দ, কিছু উচ্চারণ উঠে এলো আপনা-আপনি। আর নির্মাণ হতে শুরু করল কবিতা। এই নির্মাণপর্ব না দেখানো যায়, না বোঝানো যায়। বোধের গভীরের এক অবাক বিস্ময়। 

আর এই বিস্ময়কে রূপদান করতে গিয়ে আমাদের শব্দের আশ্রয় নিতে হয়। প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে সংহত করে নিজের জ্ঞান মেধা অনুভব ও অনুসন্ধানের সবটুকু দিয়ে একটা কবিতা নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু এবার প্রশ্ন হল কবিতা কেন লিখব? বা লিখি। মানুষ হিসেবে সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, এমনকি নিজের কাছেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যার উত্তর আমরা পেতে চাই। কিংবা নিজস্ব কিছু ভাবনা অনুভব আর্তি অপরকে শোনাতে চাই, যার ফলশ্রুতিতে কবিতা লেখা। আমার নিজের অভিমত সমাজ মানুষ হিসেবে, রাষ্ট্রের সচেতন নাগরিক হিসেবে কবিরও একটা দায়িত্ব থাকে, যারা অনুচ্চার, সংশয়িত, বিশৃঙ্খল, প্রতিবাদহীন ক্ষয়িত নিরন্ন মানুষ তাদের কথা বৃহত্তর মঞ্চে তুলে ধরা। আমিও ব্যক্তিগত ভাবে সময়ের দুর্বিনীত আচরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে থাকতে পারিনা। সমাজের প্রতিটা আলোড়নে গভীর আর্তি আর সংবেদন নিয়ে উপস্থিত হই আমার কবিতায়। আমি সমাজ-বাস্তবতায় বিশ্বাসী । 

আবার আমার যে আত্মগত বোধ তাকে খনন করি ক্রমাগত। খননের পর যে ধ্বংসাবশেষ ওঠে, সেখানে ম্যাগনিফাইং ফেলে তন্ন তন্ন খুঁজি নিজের অর্জন সমৃদ্ধি ব্যর্থতা বা বিকৃতি। আলো ফেলি সুদূর অতীত, ছেড়ে আসা গ্রাম, স্মৃতির নদী, আমার চারপাশের বহমান জীবন, ভালোবাসার মানুষজন, স্বজনবন্ধু, হারানো মুখ আর অনির্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। আমি বিশ্বাস করি এতদিন ধরে যেসব কবিতা লিখেছি, তা এই মহাবিশ্বের ইথার তরঙ্গের কোথাও না কোথাও থেকে যাবে। আর অনেক সময় পরে কোন উন্নততর মানবপ্রজাতি এসে  তার পাঠোদ্ধার করবে। এই আশায় আমি কবিতা লিখি। 


সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০

অল্প পরিসরে, আজকের সাহিত্য ও আমরা || অমিতাভ দত্ত || গদ্য

অল্প পরিসরে, আজকের সাহিত্য ও আমরা
অমিতাভ দত্ত


সারা পৃথিবীটাই হচ্ছে গিয়ে; একটা বাজার। এই কথাটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এবং, আজকের দিনের সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি, তা ও হচ্ছে গিয়ে এই বাজারেরই বিশাল মার্কেটিংয়ের মার্কেট। এ বাজারজাত সমস্যা সারা পৃথিবী জুড়েই , আগেও ছিল,
আর, তা কিন্তু এখনো রয়েছে। কারণ, সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়েই চলে। সে সিস্টেমের বাইরে কিছুই নয়। আমরা আমাদের চারপাশে যে সিস্টেমটাকে দেখে আসছি, সেটা হচ্ছে গিয়ে লাভ ভিত্তিক; বা মুনাফা ভিত্তিক। টাকা লাগাও ; পুঁজি লাগাও ; বিক্রি কর ; আর লাভ কর ; মুনাফা কর ; আর যত খুশি কামাও। এই হচ্ছে গিয়ে সিস্টেম। তা ; সাহিত্য কি এই সিস্টেমের বাইরে নাকি!? সারা বিশ্ব জুড়েই সাহিত্যও এক বিশাল বাজার। কিন্তু সাহিত্য ক্ষেত্রে ; ইদানিং  মারাত্মক ভয়ঙ্কর আকারের রূপ ধারণ করেছে এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ; এবং  সাহিত্য ব্যবসায়ীদের লোভ। মারাত্মক অবস্থা। আচ্ছা বলুনতো , মানুষ তাহলে বাঁচবেনই বা কি করে!? মিথ্যে চাকচিক্যময় শঠতার ইমিটেশন ভাষা এবং শব্দের ব্যবহারে নিত্য নতুন নতুন বাঁধনে আমাদের বেঁধে ফেলছে এবং অল রেডি বেঁধে ফেলেছে। না না, শুধু আমাকেই নয়, সব্বাইকেই , এবং সমস্ত ক্ষেত্রেই বলা যায়, আমাদের বেঁধে ফেলেছে। লাভ ; মুনাফা মানেই লোভ , এবং সেখান থেকেই বৈষম্যের জন্ম। কারণ যারা বেঁধেছে , তারা তো মাত্র হাতেগোনা গুটিকয় মাত্র ! বাকি সবটাই ক্রেতা। এ তো গেল ধনবাদী সিস্টেমের সমস্যার কথা। কিন্তু এ কি শুনছি! ট্রেন বাসে ফিসফাসে প্রায়ই শুনি, কবির কবিতা চুরি হচ্ছে, কবি কণ্ঠের স্বরচিত কবিতা পাঠের ; বা, আবৃত্তির ভিডিও চুরি হচ্ছে, কবিতা ছেপে দেবো বলে , টাকা মেরে দিয়েছে , বই ছেপে দেবো বলে টাকা নেওয়া হয়েছে , অথচ বই ছাপানো হয় নি, আজীবন সদস্যের নাম করে আড়ালে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে , ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কতশতই শুনি। আরো বাকি বন্ধুরা যারা যতটুকুই জানেন , তা সিরিয়াস সাহিত্যের স্বার্থে প্রবন্ধ আকারে বা আর্টিকেল হিসেবে লিখুন, এবং তা সৎ সাহিত্যেরই উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই স্বার্থেই লিখুন। শক্তিশালী বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্যকে বাঁচিয়ে তুলতে দৃঢ়তার সাথে কলম ধরুন। ভাঙচুর না করলে , নূতন ভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে জায়গাটা তৈরি করে না নিলে , কোন ভালো নতুন কিছুই নির্মাণ করা সম্ভব নয়। যিনি যতটুকুই জানেন, সর্বত্র সেই গোপন কথা ছড়িয়ে দিন, এবং মানুষের সর্বসমক্ষে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন। ইদানিং নয়, বেশ কিছু কাল যাবৎ ধরেই লিটিল ম্যাগাজিনের নামের আড়ালে লোভের লাভের মুনাফার , এবং প্রতারণা ঠগবাজির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  আমাদের মনে রাখা উচিত, লিটিল ম্যাগাজিন শঠতার প্রতারণার প্রবঞ্চনার মুনাফার জায়গা নয়, লিটিল ম্যাগাজিন একটা সিরিয়াস সাহিত্যের প্লাটফর্ম, লিটিল ম্যাগাজিন একটি আন্দোলনের মঞ্চ। লিটিল ম্যাগাজিনের জন্মের একটা ইতিহাস আছে, লিটিল ম্যাগাজিনের একটা প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার একটি স্বর্ণোজ্জ্বল চরিত্রের লিখিত ইতিবৃত্ত আছে। লিটিল ম্যাগাজিন হলো গিয়ে সিরিয়াস সাহিত্য আন্দোলনের এক ধারাবাহিক বহতা নদী। যেখানে নূতন লেখক লেখিকারা যাঁরা তাঁদের লেখনী শক্তির দ্বারা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরবেন , এবং এই নোংরা সমাজকে ভেঙে নতুন সমাজ নির্মাণের পথ দেখাবেন। এছাড়াও, যেখান থেকে উঠে আসবেন নূতন নূতন প্রতিবাদী লেখক লেখিকাদের মুখ, এবং প্রতিবাদী লেখক লেখিকাদের এবং লেখা। সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করে, সাহিত্য নির্বাক মানুষের মুখে ভাষা এনে দেয়, সাহিত্য মনুষ্য সমাজের বুকে সাহস এনে দেয়, সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে পথে নামায়, এবং মিছিলে পথ হাঁটায়। রাষ্ট্র সৎ সাহিত্যের সাহিত্যিককে লেখক লেখিকাদের জেল খাটায় ; এমনকি বহু লেখক লেখিকাদের মৃত্যুও বরণ করতে হয়েছে , এবং সে ইতিহাসও লিখিত সাহিত্যের প্রতি পাতায় পাতায়। এ কথা ঐতিহাসিক সত্য, এবং তা শুধুমাত্র আমার দেশেই নয়, সারা পৃথিবীব্যাপী এই ইতিহাস লিখিত রয়েছে। আসলে কি জানেন ; সারা বিশ্বব্যাপী সমস্ত রাষ্ট্র নায়কেরা এই লোভ সর্বস্ব লাভ এবং মুনাফা ভিত্তিক সিস্টেমটাকে চালাতে গিয়ে ; বহু অকর্ম কুকর্ম করতে হয় , এবং এ কারণেই ওরা ভীষণ আতঙ্কে থাকে। ফলশ্রুতিতে এরা লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক লেখিকাদের , এবং সৎ সাহিত্যের লেখক লেখিকাদের ভীষণ ভয় পায়। এ কারণেই , সে ভয় থেকেই এই অমানবিক সিস্টেমের চালক রাষ্ট্র নায়কেরা লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের লেখক লেখিকাদের, এবং সিরিয়াস সৎ সাহিত্যিকদের গারদে পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তাঁদের লেখনী বাজেয়াপ্ত করা হয়। সাহিত্য আন্দোলন নিছক খেলা নয়, সাহিত্য আন্দোলন আগুন। সাহিত্য সমাজের বুকে প্রেম ভালোবাসা মানবতা জাগিয়ে তোলে, এবং , সাহিত্য মানুষকে ভাবতে শেখায়। সাহিত্য আগুন, অতএব আগুন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ফল মনুষ্য সমাজকেই ভুগতেই হবে।  সাহিত্যকে মুদ্দা করে নাম সুনাম কেনা, একে ফেলে দিয়ে, তাকে ল্যাং মেরে ফেলে সরিয়ে দিয়ে উত্তরীয় পরা ; ছবির তোলা, সাহিত্য নয়। শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য , এবং লিটিল ম্যাগাজিনের আড়ালে ঠগবাজির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া, আমাদের যে ভাবেই হোক রুখতেই হবে। নইলে সিরিয়াস সাহিত্য চাকচিক্যময় ইমিটেশন শব্দের মিথ্যা সাতকাহন কথার ভীড়ে হারিয়ে যাবে, এবং মৃত্যু ঘটবে। শুকিয়ে যাবে সাহিত্যের বহতা নদীর জল।
কড়া বুড়ি গন্ডা কাহন ইত্যাদি ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগেকার ধারাপাতে পেয়েছি। তা আমার বলবার বক্তব্য হলো গিয়ে, আজকাল বেশ কিছু শঠ প্রতারক সাহিত্যের অঙ্গনে ঢুকে লিটিল ম্যাগাজিনের নামের আড়াল নিয়ে ; ভয়ঙ্কর রকমের ঠগবাজির খেলায় মেতে উঠেছে , এবং সে কম্ম তারা বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে ; মিথ্যা সাতকাহন কথার চাকচিক্যময় জড়ির পর্দার আড়ালে। লেখাজোকাও গতিপথ হারিয়েছে , এবং বিষয় হারিয়ে ফেলেছে। বহু নূতন নূতন লেখক লেখিকা এই ঠগবাজি চক্রান্তের জালে পড়ে ; এই সমস্ত ব্যওসাদারদের পাল্লায় পড়ে ঠকেছেন। লিটিল ম্যাগাজিন এখন আর সাংগঠনিক সিস্টেমের কাঠামো নয়, ভালো মানুষকে ঠকানোর মাধ্যম মাত্র। লিটিল ম্যাগাজিন আসলে সাংগঠনিক কাঠামো, একক ব্যবস্থা নয়। লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে , রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কলম ধরা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে কারাবাস করা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে মৃত্যু বরণ করা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিছিলে
হাঁটা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে উত্তরীয় নয়, ফুলের মালা নয়, সার্টিফিকেট নয়, মেমেন্টো নয়, লিটিল ম্যাগাজিন হচ্ছে গিয়ে , সততা সত্য, এবং একটা সাংগঠনিক সিস্টেম।  গুটিকয় সৎ সাহিত্য পত্রিকা যে নেই, তা কিন্তু নয়, আছে, কিন্তু তাতে করে, সেই শক্তি নিয়ে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। প্রবাহমান ধারা কোথায়!? মিথ্যা বিজ্ঞাপনের জৌলুসে, মিথ্যা সাতকাহন কথার ভীড়ে , সাহিত্যের আসল কাজটাই বিঘ্নিত হচ্ছে। সাহিত্যের বাজারে সারা পৃথিবী জুড়েই এই লিটিল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার আন্দোলন আজও পর্যন্ত চলেই আসছে। ক্ষীণ দূর্বল আকারে হলেও , সবটাই এখনো শেষ হয়ে যায় নি। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন আবার জাগবেই, এবং জাগিয়ে তুলতেই হবে।  কারণ, আমরা সবাই-ই এই শোষণ জুলুম অত্যাচার নির্যাতনের সিস্টেমের সাথেই জড়িয়ে রয়েছি , আসলে লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আমার বাংলাতেও এই আন্দোলন আজও জারী রয়েছে, কিন্তু অল্প সংখ্যক কতিপয় সৎ লিটিল ম্যাগাজিন সংগঠন দিয়ে এ লড়াইয়ের ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আমার তো মনে হয় না। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ভাস্বর করে তুলতে যৌবন দ্যুতিময় যুবক যুবতীরা সাংগঠনিক বলিষ্ঠ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে না এলে, এ লড়াইয়ে জেতার সম্ভাবনা খুবই কঠিন। লিটিল ম্যাগাজিনের অর্থই হচ্ছে গিয়ে, গ্রুপ লিডার শীপের সিস্টেম। কোন একক ব্যক্তির নয়। একক ব্যক্তির পরিচালনার মানেই হচ্ছে গিয়ে, ব্যক্তিগত মালিকানার সিস্টেম। অর্থাৎ , লাভ এবং লোভ।  সাহিত্যের এ গ্লানিময় তাপ উত্তাপ থেকে মুক্তি পেতে, এই কদর্য সাহিত্যাকাশের আজকের যোধন থেকে বাঁচতে ,বা মুক্তি পেতে,  আমাদের এই লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে আরো গতিশীল করতে, যৌথ সাংগঠনিক সিস্টেম ডেভেলপ করেই এগিয়ে আসতে হবে।  একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, লিটিল ম্যাগাজিন নাকি ক্ষণজন্মা, কিন্তু, লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের ক্ষেত্রে তা প্রাণের অনুরণন , এবং জীবনের লক্ষণ। ঠিক যেমন বহতা নদীর জলে ময়লা ভেসে চলে যায়, ঠিক তেমনিই। আমি ট্রেনে বাসে চায়ের দোকানে আড্ডায়, এই আজকের সাহিত্যের অবস্থার অ-কথা কু-কথা প্রায়ই শুনে থাকি, এবং তা শুনে মনে ভীষণ কষ্টও পেয়ে থাকি। এবং, এও সত্য যে, ম্যাজিকের মতো ফুস করে ঠিক হয়ে যাবে এ বিশ্বাস করি না। কিন্তু বদলটা মানুষকেই করতে হয়, সেটা খুব ভালো করেই জানি। অতএব সাধু, সাবধান সাবধান সাবধান , লিটিল ম্যাগাজিনের নামে ব্যবসা বন্ধ আমাদের করতেই হবে । লিটিল ম্যাগাজিনের আড়ালে, ঠগবাজি চক্রান্তবাজি ভেদাভেদ মুনাফাবাজি, নাম কেনা, মালা পরা , উত্তরীয় পরা ইত্যাদি ইত্যাদি নয়, লিটিল ম্যাগাজিন
আসলে সিরিয়াস সাহিত্যের একমাত্র সার্বজনীন প্লাটফর্ম।
🌑🌕🌑🌕🌅🌱🌳🌹🎻🦚🌄⛵🛶⛵🛶🛶
    শেয়ার করুন দয়া করে।
                     অমিতাভ দত্ত।
৯৪৭৫২৩৩

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০

নস্টালজিয়া ৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ৬
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


জীবনের  এই এলোমেলো দিনে আরো বেশি করে মনে পড়ে  শৈশব ও কৈশোরের মুহূর্তগুলো । সেই আনন্দের দিনগুলো আজ বারবার  আমাকে পিছু ডাকে। এখন ঘরবন্দি এই শ্রাবণের বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় সেই ডাক আরও নিবিড় ভাবে মনে বাজে। আমাদের শহরটা একসময়ে নবাবের রাজধানী ছিল বলেই হয়তো নদীর ধারে হলেও এর অবস্থান বেশ উঁচুতে। চারদিকে বন্যা পরিস্থিতি হলেও আমাদের লালবাগে কখনও বন্যা হতো না। তখন  কালবৈশাখীর ঝড় হতো আর বৃষ্টি হলে শিল পড়ত  খুব মনে আছে । পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঝড় উঠলেই  ঘরে থাকতাম না, একটু এদিক ওদিক কাছাকাছি বেরিয়ে পড়তাম আম কুড়োনোর লোভে। ওখানে তখন অনেক আমবাগান ছিল পা বাড়ালেই । আমাদের বাড়ির কাজের মাসির মেয়ে মালতির সঙ্গে একবার  অনেকটা দূরে আম কুড়াতে গিয়ে মায়ের কাছে খুব মার খেয়েছিলাম।পরে 'আম আঁটির ভেঁপু'' পড়ার সময় এক নিঃশ্বাসে  গোগ্রাসে পড়েছিলাম বইটা, আর গল্পের  কোনো জায়গা বুঝতে কোনো হোঁচট খেতে হয় নি আমাকে।  মালতি আমাদের বাড়িতেই থাকত তখন সবসময়,  ও যে বাড়ির কেউ নয় তা  কখনোই মনে হতো না। মা মানুষকে খাওয়ানো বা আদর যত্ন করতে কোনো ত্রুটি রাখত না ; আমাদের সঙ্গে একই খাবার দাবার খেতো সেও।  শ্রাবণ মাস শেষ হলে রোদ্দুরের রংটা কেমন পাল্টে যেত বেশ বুঝতে পারতাম ।তখন আমাদের আনন্দের অবধি থাকতো না দুটো কারণে । এক , দুর্গা পুজোর সময় এগিয়ে আসা আর অন্যটা হোলো পুঁটুদিদের বাড়ির মনসা পুজো । পুঁটুদির বোন বুড়ি আমার বন্ধু হলেও ওদের সব ভাই বোনের সাথে আমার খুব ভাব ছিল। ওদের বাড়ির বাগানে আমরা প্রতিদিন বিকেলে  সবাই মিলে খেলা করতাম ।পুঁটুদির কাছে সরস্বতী পুজোর সময় শাড়ি পারতাম। ছোটবেলায় আমার  নিত্য অবাধ যাতায়াত ছিল ওদের বাড়িতে। ওদের বাড়ির মনসা পুজো হতো ভাদ্রমাসে। পুজোর অন্যতম বড়ো আকর্ষণ ছিল মনসার গান । সাতদিন ধরে চলতো সেই মনসামঙ্গল পালা। মজার বিষয় হলো বেহুলা,  মনসা, সনকা এসব চরিত্রে ছেলেরা মেয়ের সাজে অভিনয় করতো আর অভিনয়ের সময় তাদের একটুও ছেলে বলে মনেই হতো না। এই তেওয়ারি বাড়ির মনসা পুজোর কথা আশেপাশের এলাকায় অনেকেই জানতো। খুব ভিড় হতো লোকজনের। ইলেকট্রিক আলোর জোর বেশি থাকতো না এবং ঘনঘন লোডশেডিং হতো বলে হ্যাজাক জ্বালিয়ে চারিদিক আলোকিত করে সন্ধ্যার সময় পালা শুরু হতো আর রাত্রি দশটা পর্যন্ত চলতো। ওদের  চর কুঠিবাড়ির শিষ্যরা আসতো এই মনসা গান করতে একথা ওরাই বলতো। একটা জীর্ণ ম্যাটাডোর করে সবাই আসতো আর আলাদা একটা  সাজের গাড়ি আসতো। পালা সুরুর আগে ওদের গ্রিনরুমের দরজায় আমরা ছোটরা  ভিড় করতাম। একজন হনুমান সেজে আমাদের খুব আনন্দ দিত। আমার ঐ কিশোরী  বয়সে বেহুলার দুঃখ গাথা  মনকে খুব ছুঁয়ে যেত এখনও মনে পড়ে।

রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য ৪৮ || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৪৮.
ঢাকিরা বাজায় ঢাক খালেবিলে।
তিনি বলেছিলেন।আমরা সকলেই কথাটা জানতাম।তাঁর আগে আমরা কেউ বলিনি। একারণে ঢাকের কথা বা বাদ্যি এসে গেলেই তাঁর কথা মনে পড়ে যায়।এটি আদিখ্যেতা নয়। এটিই আমার স্বভাব।
আর ঢাক যখন বাজাব , তখন নিজের ঢাক নিজেই বাজাব। বাজনদার-দের ডাকতে যাব কেন। অর্থাৎ আত্মপ্রচার একটি কৌশল মাত্র।
এখন আরো একটা কথা বলে রাখতে চাইছি। আমরা ঢাক এবং ঢোল -কে মিশিয়ে ঢাকঢোল বলে থাকি।মনে রাখতে হবে ঢাক এবং ঢোল দুটি ভিন্ন তালবাদ্য।
ঢোল-এর কণ্ঠস্বর ততটা তীব্র নয় , ঢাকের ঢক্কানিনাদ  সুদূরপ্রসারী। অতএব গ্রহণ করলাম ঢাক।

এই পর্বে এমন কিছু কথা বলব , যা খুব একটা শ্রুতিমধুর নয়। তবে আমি যা বলব তা আমার বিশ্বাস থেকে বলব। একেই সম্ভবত আত্মবিশ্বাস বলে। আমার পুত্রবৎ এক কবি বলে থাকে আমার ' কনফিডেন্সের কথা।সে খুব একটা ভুল বলে না। আমি যা করি বা এতদিন যা করেছি তা করার জন্য 'আত্মবিশ্বাস ' একটি জরুরি পরিসেবা । আমি অন্তর থেকে যা করতে চেয়েছি , সেই কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাজ থেকে সরে আসিনি।
এবার আমার কার্যাবলি এবং তার প্রভাব সম্পর্কে গুটিকয় কথা সবিনয়ে নিবেদন করছি।

১. কবিতাপাক্ষিক প্রতি পক্ষে ধারাবাহিকভাব নিয়মিত প্রকাশ হয়ে যাবার পর অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন --- এই কাজটা করা অসম্ভব নয়। এর ঠিক পরেপরেই নয় , পঞ্চাশটা সংখ্যা প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়াগুলি লক্ষ করা গেল ।
ক. বাঁকুড়ার বেলবনী থেকে রাজকল্যাণ চেল - এর সুযোগ্য নেতৃত্বে ' কবিতা দশদিনে ' পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু হয়।
খ.  পুরুলিয়া থেকে অংশুমান কর-এর উদ্যোগে 'নাটমন্দির' প্রতিমাসে বের হতে থাকে।
গ. যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অর্ণব সাহা-র পরিচালনায় সাপ্তাহিক কবিতা পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকে।
বলার কথা হল এই পত্রিকাগুলির মূল সংগঠকরা সকলেই কবিতাপাক্ষিকের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিল। এবং এটাও ঢাক পিটিয়ে বলত--- আমার অনূপ্রেরণা ছিল এই পত্রিকাগুলির ভাবনা- চিন্তায়।  এটাই ছিল চরম- বাস্তব ।
ে পারি --- আমার অনূপ্রেরণা ছিল এই পত্রিকাগুলির ভাবনা- চিন্তায়।  এটাই ছিল চরম- বাস্তব ।

এই বাস্তবতা থেকেই একটি রূপচর্চা -র বাণিজ্যিক পত্রিকা কবিতা প্রকাশ শুরু করেছিল। কবিতাপাক্ষিক-এর একচেটিয়া আধিপত্য-কে খর্ব করার জন্য। ওদের লক্ষ্য কিছুটা পূরণ হয়েছিল নিশ্চয় । অনেকেই দল বেধে রূপচর্চার দিকে ঢলে গিয়েছিল। তাতেও কবিতাপাক্ষিক বন্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের লক্ষ্য তখনো পূরণ হয়নি। আজও হয়নি।
আমরা কবিতাকে আপডেট করতে চেয়েছি প্রথম থেকেই। এখনো সেই আপডেট করার কাজ করে চলেছি।

রূপচর্চা-র পত্রিকাতে সবটা হয়ে উঠছিল না। অবশেষে ' কৃত্তিবাস ' - কে পুনরায় জীবিত করতে হল। যে পত্রিকা মৃত ঘোষিত ছিল , হয়ত মৃত নয় , ভেন্টিলেটারে ছিল , তাকে আবার সজীব করা হল।
এসব কর্মকাণ্ড কিন্তু কবিতার পরিসরকে অগ্রসর করেছে। অনেক নতুন নতুন কবি উঠে আসতে লাগল। কবিতার স্বীকৃতি আসতে লাগল। যে প্রতিষ্ঠান কবিতার নির্বাসন চেয়েছিলেন , তারা বুঝতে পেরেছিলেন কবিতাকে নির্বাসনে পাঠাবার কোনো ক্ষমতাই তাঁদের নেই।
কবিতা এমন একটি মাধ্যম যার মৃত্যু নেই। মানুষ যতদিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখবে ততদিন কবিতাও থাকবে।
ঢাকটিকে নামিয়ে রাখলাম। আগামীকাল বাঁশি শোনাবো।

শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য ৪৭ || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৪৭.
সন্ধের অনুষ্ঠানের আগে আরো যাঁরা কবিতা পাঠ করেছিলেন সেই নামগুলি জানিয়ে রাখছি।
সমরেন্দ্র রায় শুভব্রত দত্তগুপ্ত নুরুল আমিন বিশ্বা


স মানবেন্দ্রনাথ সাহা ইন্দ্রনীল রায় তিলক সরকার কুমুদ চক্রবর্তী এম. নাজিম আব্বুস শুক্কুর সরকার রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায় মলয় মিশ্র জ্যোৎস্না সেন রাজন গঙ্গোপাধ্যায় লিপিকা ঘোষ সুশান্ত বিশ্বাস আরতি মজুমদার সাদিক সরকার।
উপস্থিত থেকেও কবিতা পড়েননি এমন কয়েকজন :
রকিউদ্দিন ইউসুফ কৃষ্ণেন্দু ঘোষ শুভ চট্টোপাধ্যায় অনুপম ভট্টাচার্য।
আরো কিছু নাম যে বাদ থেকে গেল তার গ্যারান্টি দিলাম না।
এবার সন্ধের অনুষ্ঠানে । অনুষ্ঠানটিকে অর্জুন মিশ্র বা নাসের হোসেন নামকরণ করেছিল :
' অরণি ' -র আবৃত্তি ও ' দীধিতি ' -র ভারতপথিক।
মৃণাল রায় - এর  ' অরণি ' - র অনুষ্ঠানে ছিল কবিতা পাঠের সঙ্গে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার গান 'পাথরে পাথরে নাচে আগুন '।
এরপর দীধিতি-র  নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান ' ভারত পথিক '।  যার উদ্দেশ্য ছিল ' প্রাদেশিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি স্থাপন '।
এই অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেছিল কিশোরীরা।নাম : শাঁওলী শুচিস্মিতা বনানী তানিয়া প্রিয়াংকা মামাই মৌমিতা অনন্যা দেবমিতা মৌসুমী সোমদত্তা সুপর্ণা রুচিস্মিতা ইভা সোমা আভেরী শ্রাবন্তী চন্দনা দেবলীনা।
কণ্ঠসংগীত : লাইলী পিয়ালি সুরথ সৌমিত্র সঞ্জীব।
পাঠ : অরিন্দম প্রশান্ত রৃপসা।
যন্ত্রানুষঙ্গে : সৌমেন্দু সুব্রত বাবন গৌতম।
নৃত্য পরিচালনা : ইভা সেন।
সংগীত পরিচালনা :  লাইলী সেনগুপ্ত।
দুটি বাদে সব গান সংগ্রহ  : ঝর্না ব্যানার্জি। নাচের বিশেষ মুদ্রাগুলিও তিনিই নির্বাচন করে দিয়েছিলেন।
রাজস্থান ও পাঞ্জাবের  গানদুটি সংগ্রহ : আশিস উপাধ্যায়।
এইসব কিছুকে মিলিয়ে বা মিশিয়ে আলেখ্যটি সাজিয়েছিলেন সঞ্জীব সেনগুপ্ত।
অনুষ্ঠান শেষ হবার পর মান্যবর শঙ্খ ঘোষ স্ব-ইচ্ছায় মঞ্চে উঠে শিল্পীদের সঙ্গে দ্যাখা করেন।
এটিকে আমাদের বড়ো অর্জন  বলেই আমি মনে করি।
আগামীকাল অন্যদেশ।

বুধবার, ১৭ জুন, ২০২০

নস্টালজিয়া ৩ || পৃৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৩ || পৃৃথা চট্টোপাধ্যায়


আজ লিখতে বসে অনুভব করছি আমার জীবনের শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে শীতকালের আনন্দ ও ব্যাপ্তি কতখানি ছিল । এই শীতের কথা নিয়েই পাতার পর পাতা অনায়াসে লিখে ফেলতে পারি । শীত পড়লেই পিকনিক আর বনভোজনের হিড়িক লাগত আমাদের মনে । শীতকালের  কুল আমার একটি  প্রিয় ফল ছিল । তখন আমাদের কাছে কোনো টাকা পয়সা থাকত না।আত্মীয় স্বজন বেড়াতে এলে যদি দশ বিশ টাকা দিয়ে যেত সেটাই জমিয়ে রাখতাম। তার থেকে কুড়ি ,পঁচিশ বা পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে  জুম্মানের  বাগানের কুল কিনে খেতাম বন্ধুদের সাথে । সরস্বতী পুজোর আগে অবশ্য কখনোই কুল খেতাম না।  আমাদের ছোটবেলা এখনকার বাচ্চাদের মতো গৃহবন্দি নির্বান্ধব ছিল না। পাড়ায় অনেক বন্ধু  ছিল । আমরা প্রায় সমবয়সী বা একটু বড় ছোট ছেলে মেয়ে  সবাই মিলে খুব খেলাধূলা করতাম। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে খেলতাম নানাধরনের খেলা। মা খুব রাগী ছিল বলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতেই হতো না হলে খেলার অনুমতি মিলত না। শীতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বনভোজনের আনন্দই ছিল আলাদা। সবাই বাড়ি থেকে চাল,ডাল, আলু,তেল ,নুন, লঙ্কা, তেজপাতা আর ডিম সংগ্রহ করে একসাথে কাছাকাছি তেওয়ারিদের,সুলতানের অথবা মসজিদের পিছনে ফাক্কু নবাবের বাগানে  বনভোজন করা  হতো। হরেক রকমের চাল ডালের মিশ্রণে সেই খিচুড়ির স্বাদ অমৃত লাগত আর  আমাদের  অপটু হাতের  ডিমের কারির স্বাদের তুলনা মেলা ছিল ভার। পুরো ডিসেম্বর-জানুয়ারি ধরে আমরা যে কতবার বনভোজন করতাম তার হিসাব থাকতো না। আমাদের মায়েরাও সেই সময় এতে বাধা দিত না, বরং উৎসাহ দিত আর মাঝে মাঝেই বড়রা দেখে আসত রান্নার সময়  আমাদের যেন আগুনে কোনো বিপত্তি না ঘটে। এখনকার ছোটদের জীবনযাপন দেখে ,ওদের শৈশবের অনেক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে দেখে খুব কষ্ট হয়।   শীতকালে ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতাম। সবজির বাজারে যেতে আমার খুব ভালো লাগত। টাটকা পালং-পিড়িং-মটর-ছোলার শাক, ফুলকপি,বেগুন,বাঁধাকপি,কড়াইশুঁটি,বিট,গাজর,
টমেটো ইত্যাদি শাক সবজির  রঙিন সমাহার আমার মন ভরিয়ে দিত। মাছের বাজারে জ্যান্ত ছোট মাছ ট্যাংরা, শোল, মৌরলা,  কই,খয়রা,রায়খয়রা,  পুঁটি, দেশি রুই, কাতলা, চিংড়ি  এসব দেখেশুনে কিনত। বাবা খুব ভালো রান্না করতে পারত আর ভোজন রসিক ছিল বলে বেশ গুছিয়ে বাজার করতো। আমার এখনো বাজার করতে ভালো লাগে তবে এখন বারোমাস সবকিছু পাওয়া যায় বলে শীতের বাজারের আর  আলাদা কোনো আকর্ষণ নেই আমার কাছে ।রবিবার খাসির মাংস ছিল বাঁধা, হবেই।ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে  মুরগির মাংস হতো না,বাবা মোটেই পছন্দ করতো না বলেই হয়তো । খুব  মশলাদার ঝাল রান্না হত আমাদের বাড়িতে । এদেশের মানুষ হলেও আমাদের বাড়ির রান্না একটু ভিন্ন নবাবি ধরনের ছিল ।পোলাও,  বিরিয়ানি, চিংড়ির মালাইকারি  আমার ঠাকুমা, বাবা,  কাকা সবাই অসাধারণ  রান্না করত। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সেভাবে আর রান্না করতে পারত না । সবকিছু বাবার মতে হতো বলে মা  প্রায়ই ভুলে যেত রান্নার উপাদানগুলো । তবে মা ঘিভাত খুব ভালো  রান্না করতো।   আমাদের ওখানে তখন গোবিন্দভোগ নয় , কামিনীভোগ চালের চল বেশি ছিল ।  মা পুষ্পান্ন বলতো  ঘিভাতকে আর  গোপাল ঠাকুরকে  প্রায়ই এই পুষ্পান্ন ,পায়েসের ভোগ দিত তাতে আমাদেরও ভালই পেটপুজো  হতো।

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

নস্টালজিয়া || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া 
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


জায়গাটা মফঃস্বল। ছোট শহর । ভাঙা গম্বুজ, প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আর চলতি পথের ধারে ছড়িয়ে আছে অতীতের ইতিহাস -সুপ্রাচীন নবাবি আমলের  ঐতিহ্য । শীতকাল। ভোরের অস্পষ্ট আলো ফুটছে খুব ধীরে, সন্তর্পণে । ঝুপঝুপে অন্ধকার । পাখিরা বাসায় বসেই ডাকছে।দু-একটা টাঙা অর্থাৎ ঘোড়ার গাড়ির  চলাচল শুরু হয়েছে ঘোড়ার খুড়ের খুটখাট শব্দে। গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা চারিধার।গবার চায়ের দোকানটা স্টেশন  চত্বরে প্রথম খোলে। কলকাতাগামী ফার্স্ট প্যাসেঞ্জার আসবে ।যাত্রীরা  সোয়েটার,  চাদর, টুপি, মাফলারে জবরদস্ত ঢেকে একে একে হাজির হচ্ছে স্টেশনে। লোকজন বেশির ভাগই আসছে হেঁটে ।মাত্র একটা রিক্সা এল যাত্রী নিয়ে । গাছপালায় ঘেরা শহরে পুরোনো বাড়িগুলো স্হবির প্রপিতামহের  স্মৃতি নিয়ে জাঁকিয়ে বসে আছে । ভোরের আলোআঁধারিতে ফসলের খেত ভালো দেখা যায় না । তবে একটু ঠাহর করে দেখলে বোঝা যায় শীতকালীন সবজি চাষের খেত।  ফুলকপি, বাঁধা কপি, পালং, সরষে ,ছোলার খেতে শিশির ভেজা সবুজের  হাতছানি।  স্টেশনের কাছাকাছি বাড়ি কম।  সিম, বরবটি শশার মাচায় দু একটা দোয়েল শিস্ দিয়ে ফিরছে।

সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৩৬.
 আমি কবি ভূমেন্দ্র গুহ-কে চিনতাম না। চিনতাম ড: বি এম গুহরায়-কে। তখন আমি হেলথ ডাইরেকটরেট-এর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভালাপমেন্ট ব্রাঞ্চে। সহকর্মী ফটিক সেন আর আমি দুজনে টি এ সি বা টেকনিক্যাল অ্যাডভাইশরি কমিটির কাজকর্মের দায়িত্বে। প্রায় প্রতিমাসে টিএসি-র মিটিং। সেই মিটিং-এ প্রদত্ত এবং উপস্থাপিত সমস্য ডকুমেন্ট পেশ করতে হত আমাদের ।
শান্তিময় মুখোপাধ্যায় তখন মেডিক্যাল কলেজে। একদিন বলল আপনি কি জানেন ডা: বি এম গুহরায় হচ্ছেন কবি ভূমেন্দ্র গুহ । ময়ূক-এর ভূমেন্দ্র গুহ। নামটার সঙ্গে পরিচয় ছিল।আমার কবিপত্র-পর্বে স্নেহাকর ভট্টাচার্য-র সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তখনই শুনেছিলাম ময়ূক-এর কথা। ময়ূক-এর জীবনানন্দ-সংখ্যার কথা।জগদিন্দ্র মণ্ডল ভূমেন্দ্র গুহ-র কথা।
আমার অফিস টেবিলে সবসময় কাচের নীচে কবিতাপাক্ষিক - এর বেশ কয়েকটি সংখ্যার মলাট থাকতো। ডা: গুহরায় সেসব নিয়মিত দেখেছেন। কোনোদিন ভুল করেও সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি।
শান্তিময় চিনিয়ে দেওয়ার পর যেদিন প্রথম দ্যাখা হল , বলেছিলাম : আপনি তো খারাপ লোক মশায় ! আপনিই যে ভূমেন্দ্র গুহ আমাকে জানাননি তো।
ডাক্তারবাবু ( পরে এই সম্বোধনটাই মেনে চলতাম) কিছু না বলে হেসেছিলেন মাত্র।
তারপর ফিরে এলেন কবিতায় । কবিতাপাক্ষিক , হ্যাঁ একমাত্র কবিতাপাক্ষিকেই শুরু করলেন কবিতা লেখা। 
নিজ উদ্যোগেই কবিতার প্রকাশিত হল কবিতাপাক্ষিক-এর ব্যানারে । আমাদের বিন্দুমাত্র পরিশ্রম করতে হয়নি। ওই সময় শান্তিময়-এরও একটা নতুন কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল।
তখনো আমরা অফসেটের মুখ দেখিনি। ডাক্তরবাবুর কল্যাণে অফসেট চিনেছিলাম। গসেন-এ গিয়েছিলাম। চণ্ডী গাঙ্গুলি-র প্রেস।মানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়-এর বাবা। উল্টোদিকের অপেক্ষাকৃত ছোটো একটা প্রেসে।
এর বেশ কিছুদিন পর  ' দরগা রোড ' পত্রিকার পরিকল্পনা।
তার আগেই দরগা রোডের বাড়িতে আমাদের নৈশ আড্ডা শুরু হয়ে গেছে। সেই আড্ডায় যাঁরা যেতেন সব মুখ আমার মনে নেই  তবে শান্তিময় , কালীকৃষ্ণ গুহ , প্রকাশ কর্মকার , অজয় দাশগুপ্ত সহ আরো অনেকে যেতেন। সব থেকে বেশি মনে আছে নিমাইদার কথা। নিমাইদা ছিলেন ডাক্তারবাবুর দরগা রোডের বাড়ির অল ইন অল।জল বরফ গ্লাস পানীয় এবং খাবারদাবার সবকিছু সময় মতো পৌঁছে যেত নিমাইদার সৌজন্যে ।
একদিন বুকে ব্যথা মতন মনে হল। সোজা মেডিক্যাল কলেজ। ই সি জি করে দিল শান্তিময়। দেখে একটু হেসেছিল মাত্র।
আমি একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা দরগা রোড। ডাক্তারবাবু তখন স্নানযাত্রায়। আমি ইসিজি দ্যাখাতে চাইলাম। উনি সেদিকে তাকালেন না। একটা পেগ রেডি করে বললেন খেতে থাকুন , আমি স্নানটা শেষ করে আসি। প্রায় পনেরো মিনিট পর বাইরে এলেন।আমার তখন গ্লাস ফাঁকা। অন্য কোনো ইভেন্টে মনোযোগ না দিয়ে আমার গ্লাসটা পূর্ণ করে দিলেন।বললেন : এটা শেষ করুন। আমি রেডি হয়ে নিই। অগত্যা। আবার পনেরো মিনিট।  একদিকে আমার  গ্লাস শৃন্য , অন্যদিকে ডাক্তারবাবুও রেডি।
কথা মতো শুয়ে পরলাম। স্টেথো দিয়ে , হাতের তালু দিয়ে , আঙুল দিয়ে , ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায় আধঘণ্টা ধরে দেখে। বিড়বিড় করে কিছু কাঁচা খিস্তি। শেষে বললেন : আমি ডাক্তার বি এম গুহরায় বলেদিলাম , এখন কেন , আপনি যতদিন বাঁচবেন আপনার কখনো হার্টের কোনো অসুখ হবে না।
সেই ভরসাতেই এখনো ডাং ডাং করে চালিয়ে যাচ্ছি।
আগামীকাল আরো কিছু

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ৩৫ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৩৫.
আগের দিনের সুতো ধরে চলে যাচ্ছি যূথিকা-র সেদিনের স্মৃতিতে। যূথিকা-র তখন কাজ ছিল আমাদের জন্য বাড়ির তৈরি টিফিন পৌঁছে দেওয়া। তখন মোবাইল থেকে বছর দশেক পেছিয়ে। যূথিকা অন্যদিন বাস থেকে যেখানে নামে , ততদূর বাস যায়নি। জীবনদীপে নেমে পড়তে হয়েছিল ।ততক্ষণে জানা হয়ে গিয়েছিল বইমেলায় আগুন লেগেছে। যৃথিকার দুহাতে দুটি ব্যাগ। টিফিন + শীতের পোশাক + ট্রানজিস্টার রেডিও। নাসেরের কবিতাপাঠ শোনার জন্য রেডিও।
হাঁটতে হাঁটতে মেলার গেট। গেট থেকে স্টলের পথে। দমকল কর্মীরা পথ রোধ করেন। বলেন --- স্টলে কেউ নেই। সবাই বেরিয়ে গেছেন।
যূথিকা-র বাড়ি ফিরে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। বাস বন্ধ। মেট্রো খোলা। এক হৃদয়বান ভদ্রলোক মেট্রোর টিকিট করে দিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে আমাদের দেখে জীবন ফিরে পেয়েছিল। আর আমিও চিন্তা মুক্ত হয়েছিলাম।

পরদিন সকাল সকাল মেলায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। কাজ ছিল আগুন থেকে রক্ষার জন্য যে বইগুলিকে বাইরের ফাঁকা জায়গায় রেখে এসেছিলাম , সেগুলো তো স্টলে তুলে রাখতে হবে। লোকজন আসার আগে। তারপর স্টল খুলতে হবে।
ঢুকেই পরিস্থিতি বুঝে গিয়েছিলাম। আমাদের দিকটার  পোড়া কাঠ পোড়া বই ছাড়া কিছুই খুঁজে পাইনি। যেখানে বই রেখে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে এক গোছা পোড়া বই সযত্নে তুলে নিয়ে ' প্রতিদিন ' দপ্তর।
ওখানে টেবিলে বসে লিখলাম ' আমাদের মুদ্রিত অক্ষর পুড়েছে , কলম পোড়েনি ' ।
পরদিন ওই লেখাটাই পোস্ট এডিটোরিয়াল হয়েছিল।
সেদিন সিদ্ধান্ত নিলাম কবিতাপাক্ষিক - এর পরবর্তী সংখ্যার বিষয় :
অগ্নিদগ্ধ বইমেলা সম্পর্কে সকলের প্রতিক্রিয়া চাওয়া হবে। যাঁরা লেখা দেবেন সেগুলো নিয়েই প্রকাশিত হবে কবিতাপাক্ষিক ৯২ ।
যাঁরা লেখা দিয়েছিলেন সেই নামগুলি উল্লেখ না করলে অকৃতজ্ঞ থেকে যাবো। নামগুলি :
অরুণ মিত্র আলোক সরকার বিনয় মজুমদার ভূমেন্দ্র গুহ দিব্যেন্দু পালিত প্রভাত চৌধুরী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সুজিত সরকার প্রমোদ বসু সমরেন্দ্র দাস কামাল হোসেন ব্রত চক্রবর্তী সুবোধ সরকার গৌতম ঘোষদস্তিদার নাসের হোসেন সুব্রত চেল মল্লিকা সেনগুপ্ত শান্তিময় মুখোপাধ্যায় সুমিতেশ সরকার শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
এতজনের আত্মগত উচ্চারণ ভুলিয়ে দিয়েছিল শোক। এখনো আমরা গর্বিত।
আমাদের অক্ষর পুড়ে যেতেই পারে , কিন্তু কলম পুড়ে যেতে পারে না। যাবেও না।
এসব নিয়েই এত বছর !
আগামীকাল দ্যাখা হবে নতুন কোনো চৌরাস্তায়

শনিবার, ৬ জুন, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য ৩৫ || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৩৫.
ভিন্ন যে গল্পটি এই কিস্তিতে আমি লিখব ,তা আলাদা ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছি না । মাননীয় পাঠক নিজচোখে তা দেখে নেবেন। এমনটাই আমার বিশ্বাস।
তার আগে অন্য গুটিকয় ঘটনা জেনে রাখুন।মনেও রাখুন। জানা সবকিছুই মনে রাখার আবশ্যিকতা থাকে না। এ-কারণে মনে রাখার সঙ্গে জেনে রাখাকে জুড়ে দিলাম।
1996- এর বইমেলায় কবিতাপাক্ষিক প্রথম অংশ গ্রহণ করে। টেবিলে নয়। কবিতাপাক্ষিক কোনোদিনই লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বরাদ্দ টেবিলে বসেনি।এটাও জানানোর প্রয়োজন ছিল।
স্টল নম্বর ছিল : W 443 .
200 স্কোয়ার ফুট স্টল। অর্ধেকটা আমাদের। বাকিটা
' কোরক ' - এর ।
সেবার কবিতাপাক্ষিক প্রকাশ করেছিল মোট ৪৩ টি বই। তার মধ্যে কবিতার বই-এর সংখ্যা ৪০ টি।
আরো উল্লেখ করা যেতে পারে --- কবিতাপাক্ষিক-এর সঙ্গে ছিল  অমৃতলোক , হাওয়া ৪৯ , দরগা রোড ,কবিকৃতি , রক্তমাংস ,অর্কেস্ট্রা ,বিজল্প ,দাহপত্র , মোনালিসা , মউল , শিস ,কবিতা দশদিনে প্রমুখ  পত্রিকা। ওই স্টলটাই যেন বা লিটল ম্যাগাজিন। মেলার বারোদিন যেন কবির হাট। কবিদের নিজ বাসভূমি।
আমি আসলে  লিখতে চাইছিলাম 1997- এর সেই বইমেলার কথা। যে বইমেলায় আমাকে লিখতে হয়েছিল :
আমাদের মুদ্রিত অক্ষর পুড়েছে , কলম পোড়েনি।
 সেবার কবিতাপাক্ষিক- এর নিজস্ব স্টল। অবস্থান প্যাভেলিয়নের ভেতর। স্টল দেখে মন ভরে গিয়েছিল। এত সুন্দর তার ডেকোরেশন। তাছাড়া একদম নিজস্ব। কোনো ভাগীদার নেই। 
নিজেদের মতো করে স্টল সাজিয়ে নিয়েছিল রজত-শান্তনু ।অর্থাৎ রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়।নাসের তো ছিলই।তখন স্টল চালাতো রজত-শান্তনু-রাজা।
মেলার তৃতীয় বা চতুর্থ দিন। মেলা শুরু হয়েছে। স্টল ভর্তি কবিজনেরা। হঠাৎ কানে এল - আগুন লেগেছে। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আকাশে ধোঁয়া। এক কোণের আকাশে। ভাবতেও পারিনি এই আগুনের ক্ষমতা কতটা ! কিছুক্ষণ পর  দূরের একটা -দুটো স্টল পুড়তে শুরু করেছে। আমাদের তরুণের আগুনকে কাছ থেকে দেখবে বলে চলে গেছে। আমার সঙ্গে ছিল রজতশুভ্র গুপ্ত। দুর্গাপুরের। আমরা দু-জন তখন স্টলের বই একটা ফাঁকা জায়গায় বের করছি। আমাদের ধারণা হয়েছিল স্টলে আগুন লাগলেও বাইরে বের করে রাখতে পারলে বইগুলোকে বাঁচাতে পারব।
রজতশুভ্র বেশ লম্বা এবং শক্তিশালী।ওর ভরসাতেই প্রায় সব বই স্টল থেকে বাইরে বের করতে সমর্থ হয়েছিলাম। আমরা আনন্দে মুখর।আমরা আমাদের কাজ সার্থকভাবে সম্পন্ন করছি।
কাজের নেশায় ছিলাম। বুঝতে পারিনি আমরা যখন বই করছিলাম , তখন মেলা জনশূন্য । একজন মানুষ নেই। আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে আগুন। তিনদিক ঘিরে ফেলেছে আগুন। রজতশুভ্র আমাকে ভরসা দিচ্ছে। আমি রজতশুভ্র-কে। যেদিকে আগুন নেই , কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সেদিকেই হাঁটতে শুরু করলাম দুজন। ওদিকে তো গেট নেই। টিনের দেওয়াল। সেসব ভাবনায় ছিল না।  একটা টিনের কিছুটা ফাঁক ছিল। সেই ফাঁক গলে উলটো দিকের বাটা-মাঠে। আমার চেনা মাঠ। ফুটবল খেলেছি।বেঁচে গেলাম। এটুকুই মনে হয়েছিল।
আর এখনো মনে আছে আমার মূর্খামিকে পাত্তা না দিয়ে রজতশুভ্র আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি। সেই ভয়ংকর সময়ে  দায়িত্ব নিয়ে আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
বাড়ি ফিরে শুনলাম যূথিকা আমাদের জন্য টিফিন নিয়ে মেলায় গেছে।
সে- গল্প আগামীকাল

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৩৩.
গত দু-তিন দিন শুধুমাত্র নামের তালিকা-ই পেশ করে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা যে নামাবলি নয় , তা বলাই বাহুল্য।নামাবলি হলে একটাই নাম বারবার ধ্বনিত হত। একই নামগানে মুখরিত হত চব্বিশ প্রহর তলা। আমি কখনোই সেই নামগানের মূলগায়েন হতে চাইনি। বাঘা বাইনও হতে চাইনি। প্রথম থেকেই বহুস্বর  -এর পক্ষেই নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করেছিলাম।সুদৃঢ় করেছিলাম।
আমি চেয়েছিলাম ' কবিতার জন্য পরিচ্ছন্ন আর নিভৃত একটু স্থান '।এটাও আমার নিজের কথা নয়।এই লক্ষ্যটি মান্যবর কবি বুদ্ধদেব বসুর।
কবি বুদ্ধদেব-এর এই ইচ্ছাটিকে মান্যতা দিয়ে বলেছিলাম --- কবিতাচর্চার নিজ বাসভূমি কবিতাপাক্ষিক।
আমার এই চাওয়াটা কি খুব একটা অন্যায্য মনে হচ্ছে আপনার। আমি কি কোনো অন্যায় আবদার করেছিলাম !
না করিনি। সেদিনও করিনি। আজও করি না। যা আমার প্রাপ্য নয় , সেদিকে কোনোদিন হাত বাড়াইনি।আমি জানি আমার হাতের দৈর্ঘ্যের মাপ তথা পরিমাপ।
আমি বরং মনে করি অদ্যাবধি আমি যা যা পেয়েছি , তার মধ্যে অনেক কিছুই আমার অতিরিক্ত পাওয়া। আমার থেকে অনেক যোগ্য মানুষ আছেন , তাঁরা এজীবনে কিছুই পেলেন না। তাঁদের না-পাওয়াটা দেখতে পেলাম , জানতে পারলাম , বুঝতেও সক্ষম হলাম ; কিন্তু জেনেবুঝে চুপচাপ বসে রইলাম। এক মিলিমিটারও সরে বসলাম না , নিজের অবস্থান থেকে। আমি উদ্যোগ নিলে কিছুটা নাড়াচাড়া যে হত না , এমনটাও আমি মনে করি না। কিন্তু নীরবে সবটা মেনে নিয়েছি , এমনটাই কি আমার মনে হয় !

আমাকে যাঁরা ঘনিষ্টভাবে দেখেছেন , আমার সঙ্গে আত্মজনের মতো মিশেছেন , তাঁরা সকলেই জানেন --- আমি সাম্প্রদায়িক হতে পারি , কিন্তু আমি বন্ধুবৎসল। আমার এই সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে ধর্মের কোনো যোগসূত্র নেই। আমার সম্প্রদায় হল কবিতা-সম্প্রদায়। সেই হিসেবে তো কবিতা-ধর্মও এসে যাচ্ছে । অতএব আমি সাম্প্রদায়িক।
আমার বিশ্বাস আমার এই  আমার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন , আমি তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছি।
কারণ একটা আছে নিশ্চয়ই। যাঁরা আমার মঙ্গল কামনা করেছেন , তাঁরা আমাকে অসহায় মনে করে সুপরামর্শগুলি দিতেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না আমি কখনোই অসহায় ছিলাম না। আমার সঙ্গে সবসময় থাকে আমার সংকল্প। আমার বিশ্বাস।
আমি নিজের কাছে অবিশ্বাসী হতে পারিনি কোনোদিন।পারবো না কোনোদিন।
আমি জানি আমার মঙ্গল -অমঙ্গলের ওপর কবিতার মঙ্গল-অমঙ্গল নির্ভরশীল নয়। আমি যে সাম্প্রদায়িক , একথাটা তো আগেই বলে রেখেছি।
অন্যকথা আগামীকাল।

বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || ধারাবাহিক গদ্য

 সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৩২.
আলোক সরকারের কাব্যসমগ্র ১ 
প্রকাশিত হয়েছিল 10 ডিসেম্বর 1994
প্রকাশ -স্থল : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল কাউন্সিল এব এডুকেশন সভাগৃহে
আরম্ভের গান : সজল বন্দ্যোপাধ্যায়।
আনুষ্ঠানিক প্রকাশ : দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রথম কপি প্রাপক : কালীকৃষ্ণ গুহ
প্রধান অতিথি : প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত
সভাপতি : দীপংকর দাশগুপ্ত
 বক্তব্য বলেছিলেন : দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত দীপংকর দাশগুপ্ত ড: সুমিতা চক্রবর্তী তরুণ মিত্র সুধেন্দু মল্লিক জহর সেনমজুমদার সুব্রত সেনগুপ্ত ।
আলোক সরকারের কবিতাপাঠ : রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় শান্তনু কুণ্ডু কানাইলাল জানা নাসের হোসেন বিউটি পাল সোমা মণ্ডল ড: নীলাদ্রি বিশ্বাস কালীকৃষ্ণ গুহ এবং স্বয়ং আলোক সরকার।
সঞ্চালনা এবং প্রারম্ভিক বক্তব্য : রবীন্দু বিশ্বাস।
সভাশেষের রবীন্দ্রগান : মৌ ভট্টাচার্য ।
উপস্থিতির নামগুলি : ভূমেন্দ্র গুহ জগদিন্দ্র মণ্ডল অজয় দাশগুপ্ত অশোক রায়চৌধুরী বিজয় মাখাল দীপ সাউ নমিতা চৌধুরী বাপী সমাদ্দার সমীরণ মজুমদার গোপাল আচার্য অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র শান্তিময় মুখোপাধ্যায় শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় সৌগত রায় অয়ন গোস্বামী আবদুল কাফি প্রসূন ভৌমিক সাম্যব্রত জোয়ারদার মানসকুমার চিনি সুমিতেশ সরকার অর্ণব সাহা স্বরূপ চন্দ অভিরূপ সরকার ।
এই অনুষ্ঠান-সূচি  কবিতাপাক্ষিক ৪০ সংখ্যা থেকে  সংকলিত হল।
পাঠক লক্ষ করছেন আমি গত কয়েক কিস্তিতে নামের দীর্ঘ তালিকা পেশ করে চলেছি। এটাই এই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য। আমি প্রমাণ করতে চাইছি আমাদের কবিতাপক্ষিক কেবলমাত্র একটি পত্রিকাই ছিল না , ছিল বাংলাকবিতার এক সংঘ , মহাসংঘ।সম্মিলিত  এক উদ্যোগের নাম ছিল কবিতাপাক্ষিক।এক ছাতার নীচে সমগ্র তরুণ প্রজন্মকে  একত্রিত করতে সমর্থ হয়েছিল কবিতাপাক্ষিক।
এটা বা এই সমীকরণটি যে সকলে খোলা মনে মেনে নেবেন এটা ভাবা ঠিক হবে না।
একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল কিছুটা গোপনে , কিছুটা ঘোমটার আড়ালে।
সেসব কথা বলার জন্যই সৌমিত্র রায়-এর জন্য এই গদ্যটি।
অপেক্ষা করুন এবং পড়তে থাকুন।

সোমবার, ১ জুন, ২০২০

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৩০.
গত কিস্তিতে ছিল বইমেলা দৈনিক- এর।বা বকেয়াকথা। আগে বলার কথা ।এখন ফিরে যাচ্ছি বাজোরিয়া গেস্ট হাউজে।মনে আছে নিশ্চয়ই। বাঁকুড়ার লালবাজারের এই গেস্টহাউজটির কথা।
সঞ্চালক জ্যোৎস্না কর্মকার কবিদের নাম ডাকা শুরু করে দিলেন। একে একে কবিতা পড়লেন :
রফিক উল ইসলাম গৌতম ব্রহ্মর্ষি তপন ত্রিপাঠী কার্তিক মোদক সুমিতেশ সরকার দেবাশিস চাকী লক্ষ্মণচন্দ্র মল্লিক নাসের হোসেন প্রবুদ্ধ বাগচী শান্তিময় মুখোপাধ্যায় রণজিৎ দাশগুপ্ত সৈয়দ কওসর জামাল কানাইলাল জানা হিমাদ্রিশেখর দত্ত গোপাল আচার্য অলোক বিশ্বাস উত্তর বসু শৈলেন গড়াই দিলীপ ভৌমিক শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় দীপ সাউ জয়দীপ চক্রবর্তী রমেশ তালুকদার কুমুদবন্ধু নাথ জমর সাহানী নিখিল পাণ্ডে বুদ্ধদেব চক্রবর্তী স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায় শ্যামলী রায় শরৎ ভট্টাচার্য পার্থজিৎ ভক্ত গৌতম ভট্টাচার্য নমিতা মুখার্জি সত্য পতি ঝর্না মুখার্জি দোলন বন্দ্যোপাধ্যায় মানসকুমার চিনি প্রদীপ কর অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যুৎ পরামাণিক চঞ্চল দুবে সচ্চিদান্দ হালদার জীতেন চ্যাটার্জি শেখ আপ্তার আলি শ্যামাপদ কর্মকার সুদেব বক্সী মানু রানা দীনবন্ধু চট্টরাজ পার্থসারথি কর্মকার রামকৃষ্ণ মাজী নয়ন রায় চন্দন চৌধুরী তারাশংকর চক্রবর্তী ভূদেব কর শ্যামল মাহাতা স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় মনোরঞ্জন চ্যাটার্জি মোহন সিংহ শর্বানী পাল উজ্জ্বল পাল  বঙ্কিমচন্দ্র কর্মকার রূপাই সামন্ত অপরেশ মুখোপাধ্যায় প্রণব চট্টোপাধ্যায় গুরুপদ মাহান্ত প্রদীপ হালদার আনন্দ দাস জ্যোৎস্না কর্মকার অনিন্দ্য রায় প্রলয় মুখোপাধ্যায় সোমনাথ কবিরাজ। সুব্রত চেল-এর কবিতা পাঠ করেন নাসের হোসেন ।আমার কবিতা পাঠ করেছিল শুভ্রা সাউ ও সুমিতেশ সরকার। রাজকল্যাণ চেল-এর কবিতা পড়েছিল সুশান্ত মাজী।
আবৃত্তি করে শোনান : ডা: নীলাদ্রি বিশ্বাস রামরঞ্জন ঘোষাল।
অনুষ্ঠানের পরেই ছিল প্রেস- বৈঠক।
ছিল বাঁকুড়া জেলা কবিতা উৎসব , কিন্তু একে কি সারা বাংলা কবিতা উৎসব বলা যায় না?
সারা রাতের হৈ-হুল্লোড়ের কথা লেখা যাবে না। তবে প্রতিষ্ঠিত কবিরা সারারাত একজন কবিকে ঘিরে বেশ মজা করেছিলেন, এটা লিখে রাখলাম। নামগুলি মুছে দিলাম।
শেষেরও শেষ আছে । পরদিন সকালে বাসে যেতে যেতে পকেটে হাত দিয়ে দেখি একটা লাল গোলাপ। মনে পড়ল ফুটফুটে এক কিশোরী আগের দিন সেটা দিয়ে বলেছিল :দোহাই , আমাদের ভুলে যাবেন না।
ভুলে যাওয়া খুব কষ্টকর কাজ ,গোলাপ ! আজও ভুলে যাইনি ।
1995-এর সেই কিশোরী আজ মধ্যবয়সের রমণী। সে কি মনে রেখেছে আমাকে ,আমাদের।

প্রবন্ধ || শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

প্রবন্ধ || শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

 || এক ||
   রাঢ় বাংলার অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল শীলাবতী অববাহিকা। অঞ্চলটির ব্যাপ্তি ও পরিসর তেমন দীর্ঘ না হলেও বঙ্গের প্রত্ন ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ছোট নাগপুরের মালভূমি শীলাবতী নদীটির উত্সনক্ষেত্র। বৃষ্টির জলে পুষ্ট অববাহিকা ঘিরে যেমন উর্বর ভূমি বৈচিত্র্য তেমনই নৃতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্বের নানান তীর্থ নিয়ে সে মহিমাময়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসে আমরা পেয়ে থাকি রাঢ় বঙ্গের নদী মযুরাক্ষী, দামোদর, দ্বারকেশ্বর, শীলাবতী ও কংসাবতীর ভূমি অঞ্চলটি ছিল গৌরবময়। প্রতিটি নদী ঘিরেই ইতিহাসের নানা একক খুঁজে পাওয়া যায়। এবং অবিরাম সন্ধানের এই কাজ চলছেই। বঙ্গ তথা ভারতবর্ষের জাদুঘরে বিভিন্ন উপাদান সংগৃহীত রয়েছে। তত্কাালীন যুগে লেখা নানা গ্রন্থও এই বিষয়ের সাক্ষ্য দেয়। তবে শীলাবতী নদীর অববাহিকা ঘিরে, তার ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও অন্যান্য বিষয়কে নিয়েই এই আলোচনার অবতারণা।
   মালভূমি থেকে সাগর অব্দি নদীটির পরিক্রমা পথের দু’পাশের পুরোনো জনপদ ও নতুন গড়ে ওঠা জনপদ সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়ে বঙ্গে তার বয়ে যাওয়া, পরে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে মিশে যাওয়া নতুন নাম রূপনারায়ণের পূর্ব মেদিনীপুর ও হাওড়া জেলার মধ্য দিয়ে গিয়ে সাগরে মিলিত হওয়া। স্বাভাবিকভাবেই ভৌগোলিক নানান বৈচিত্র্য তাকে সম্পৃক্ত করেছে। কোথাও সে পাথুরে মালভূমি, কোথাও উর্বর সমভূমি আবার কোথাও নরম জলাভূমিতে অধ্যুষিত। আর গড়ে ওঠা জনপদগুলির বৈশিষ্ট্য বিবিধ তারতম্যে ঋদ্ধ।
   বিস্তারিত তথ্যে যাবার আগে শীলাবতী নদী সৃষ্টির কিছু ইতিহাস জেনে নিই। এই নদীর জন্মরহস্য নিয়ে অনেক জনশ্রুতি ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন এলাকায়। তার মধ্যে একটি জনশ্রুতি যা ইন্দপুর অঞ্চলে খুব প্রচলিত। এই জনশ্রুতির কথা বলতে গেলে পাশাপাশি জয়পণ্ডা নদীর কথাও এসে পড়বে। কাহিনিটি এইরকম – “মানভূমি ন’পাড়া গাঁয়ে একজন মহাজন ছিল। তার নাম ছিল জয়। লোকে বলত জয় পণ্ডা। জয়পণ্ডা বিবাহিত ছিল। তার বাড়িতে এক দাসী ছিল। তার নাম ছিল শীলাবতী। শীলাবতী ছিল ওই গ্রামেরই শূদ্রদের মেয়ে। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও পণ্ডা সেই দাসী শীলাবতীর সঙ্গে অবৈধ প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। এই কথা লোক জানাজানি হয়ে গেলে পণ্ডার আসল স্ত্রী ক্ষোভে, দু:খে, অপমানে আত্মহত্যা করে। এভাবে হঠাত্‍ পণ্ডার স্ত্রী মারা গেলে পণ্ডা গঙ্গাস্নানে যাবার জন্য মনস্থির করে এবং গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। পণ্ডা গঙ্গাস্নানে যাচ্ছে দেখে দাসী শীলাবতী বায়না ধরে তাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু পণ্ডা শীলাবতীর অনুরোধ রাখতে রাজি হয় না। এত দীর্ঘপথ অতিক্রম করে যাওয়া স্ত্রীলোকের পক্ষে অতীব কঠিন কাজ বলে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কোনোরকমে নিরস্ত করে। শীলাবতী তখন নিজ চুল ও নখ কেটে একটা কৌটোয় ভরে পণ্ডাকে দেয় গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করার জন্য। পণ্ডা তা নিয়ে যায়। শীলাবতীর দেওয়া চুল নখে ভরা কৌটো গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করে পণ্ডা গঙ্গাস্নান সমাপন করে। পণ্ডা ভাবে শীলাবতীর নখ ও চুল গঙ্গায় দেওয়া হয়েছে মানে তার শূদ্রজীবন শুদ্ধ হয়েছে। অতএব সে বাড়ি গিয়ে শীলাবতীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করবে। মনের মধ্যে একরাশ আনন্দ নিয়ে গৃহাভিমুখে রওনা হয়। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই পণ্ডা লোকমুখে শুনতে পায় শীলাবতী নদী হয়ে বয়ে গেছে। 

রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়-এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

২৯.
প্রথম বর্ষ পূর্তি থেকে দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তির দূরত্ব মাত্র এক বছর। এটা পাটিগণিতের হিসেব।জ্যামিতি এবং কো-অর্ডিনেট জিওমেট্রিতে দূরত্ব কতটা বাড়বে না কমবে তা মেপে দেখার সুযোগ নেই।
প্রথম বর্ষ পূর্তি : 24 এপ্রিল 1994 |আদ্রা ,পুরুলিয়া
দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তি :23 এপ্রিল 1995 | বাজোরিয়া গেস্ট হাউস, লালবাজার , বাঁকুড়া।
কবিতাপাক্ষিক ৪৯ - এ কবিতা সংবাদ  শুরু করেছিলাম :
বাঁকুড়ার কড়া রোদ এত লাবণ্যময় মনে হল কেন  ?   এই কেন-র উত্তর তখন দেওয়া হয়নি। এখন ঢাক পিটিয়ে বলতে পারি কবিতার নিয়মিত পাক্ষিক পত্রিকা তখন পর্যন্ত টানা দু-বছর প্রকাশের কোনো ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বাঁকুড়া লালবাজার মোড়ে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তিতে মালা দিতে সমবেতভাবে গিয়েছিলাম। মাল্যদান করেছিলেন উৎসব কমিটির পক্ষে মোহন সিংহ এবং আমি।
দেবনাথ কুণ্ডু-র পরিচালনায় ভারতীয় সংগীত বিদ্যাপিঠের ছাত্রীদের রবীন্দ্রগান দিয়ে শুরু হয়েছিল কবিতাউৎসব।
মঞ্চের নাম : শক্তি চট্টোপাধ্যায় সুনীর বসু মঞ্চ।
উদ্বোধক-সভাপতি : কবি অবনী নাগ।
প্রধান অতিথি : পবিত্র মুখোপাধ্যায়।
স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ : সমরেন্দ্র দাশ।
লেখক প্রভাত চট্টোপাধ্যায় এবং কবি রবি গঙ্গোপাধ্যায় - কে ঢোকরার পঞ্চপ্রদীপ এবং উত্তরীয় দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
 এই উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল  ভূদেব কর-এর কবিতার বই। তাছাড়া  প্রকাশিত হয়েছিল বাঁকুড়া জেলার বিশিষ্ট পত্রিকা কলম্বাস ,সত্যসাধন চেল সম্পাদিত ভোরবেলা , প্রলয় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত উদ্ভিদ , আশিসকুমার রায় সম্পাদিত যামিনী তৎসহ বীরভূমের ময়ূরেশ্বর থেকে শৈলেন গড়াই সম্পাদিত জীবন।
বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রাজকল্যাণ চেল পরিকল্পিত কবিতা উৎসব কমিটির স্মারকগ্রন্থ। যার মূল বিষয় : বাংলাকবিতার পাঠক পুনরুদ্ধার।
কবিতাপাঠের সঞ্চালক : জ্যোৎস্না কর্মকার।
এসব কথা আমি ভুলে যেতেই পারি , কিন্তু যা একবার লেখা হয়ে যায় তা মুছে ফেলার ক্ষমতা যেকেবল আমার নেই , এমনটা ভেবে আমাকে দুর্বল ভেবে বসবেন না। ইতিহাস-কে মুছে ফেলার ক্ষমতা কারোই নেই।
কবিতাপাঠের ইতিবৃত্ত আগামীকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখলাম , কিন্তু নৈশাহারের বৃত্তান্ত আজই পেশ করছি।
বাঁকুড়া-র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পৃষ্ঠপোষক বাবুলাল জালানের বাড়িতে আমন্ত্রণ ছিল সকলের।
বুফে ডিনার। জালানের বাড়ির মহিলা এবং পুরুষেরা সকলে মিলে যে আপ্যায়ন করেছিলেন তার কথা আজও ভুলে যাইনি। ঠিক এরকম অভ্যর্থনা আর কোথাও পেয়েছি তেমনটাও মনে পড়ছে না।
তবে একটা কথা এখনো ভুলে যাইনি । একজন কবি পরিবেশিত একটি খাদ্যকে শনাক্ত করতে পারছিলেন না। আমি বলেছিলাম--- মুগের ডাল। অরিজিন্যাল সোনামুগের ডাল। ওই কবি বিস্মিত হয়েছিলেন। নাম জানানো যাবে না।

শনিবার, ৩০ মে, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

২৮.
কথা ছিল দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তি উৎসবের কথা লিখব এই কিস্তিতে। কিন্তু পালটে গেল সেই সিদ্ধান্ত। বিকেলে নাসের-এর সঙ্গে কথাবার্তা হয়। সেই বার্তা-বিনিময়ে উঠে এল বইমেলা দৈনিক - এর কথা। পুরো হল :
কবিতাপাক্ষিক বইমেলা দৈনিক।
দৈনিক বাংলা-র জন্য এই লেখাটিতে বইমেলা দৈনিক-এর কথা বাদ পড়ে যাওয়াটা ক্ষমারও অযোগ্য। তা হোক ।দেরিতে এল। যা না-আসার থেকে শ্রেয়।
কবিতাপাক্ষিক ১৬- তে  ৯ পৌষ ১৪০০ বা 25 ডিসেম্বর 1993 , ব্যাক কভারে ঘোষণা করেছিলাম :
26 জানুয়ারি  1994 থেকে শুরু হচ্ছে কলকাতা বইমেলা।
28 জানুয়ারি থেকে 06 ফেব্রুয়ারি  , এই দশদিন প্রকাশিত হতে চলেছে : কবিতাপাক্ষিক বইমেলা দৈনিক।
কী কী থাকবে তার দশদফা সূচি।
এই দৈনিক- এ নাসেরকে এডিটোরিয়াল টিমে যুক্ত করা গিয়েছিল। যদিও নাসেরের মৃদু আপত্তি ছিল।
দৈনিকের সাইজ ঠিক হয়েছিল ট্যাবলয়েড। যা সংবাদ দৈনিকের অর্ধেক।
সিদ্ধান্ত হয়েছিল যেখানে বা যে মেশিনে দৈনিক সংবাদপত্র ছাপা হয় , বইমেলা দৈনিকও সেই মেশিনেই ছাপা হবে। এজন্য সংবাদ প্রতিদিনের সঙ্গেও কথা বলিছিলাম। শেষে বন্ধু কবি শ্যামল বসু-র যোগাযোগে ঠিক করেছিলাম চৌরঙ্গি-র একটি প্রেস। যেখানে তখন গণশক্তি , ওভারল্যান্ড প্রভৃতি দৈনিকগুলি ছাপা হত।
এর জন্য নিউজপ্রিন্টের একটা গোটা রোল তুলে দিয়েছিলাম প্রেসকে।
আর পেজ মেকাপের দায়িত্ব পালন করেছিলেন শিল্পী রমাপ্রসাদ দত্ত। তিনি নিজ দায়িত্ব নিয়ে পুরো কাজটা করেছিলেন। এবং ছাড়া-র অলংকরণের জন্য দুই তরুণ শিল্পীকে নিয়ে এসেছিলেন। বলা উচিত নয় , তবু বলছি , এই সম্পূর্ণ কাজের জন্য রমাপ্রসাদ দত্ত- কে এক টাকা দেবারও সাহস দেখাতে পারিনি। রমাপ্রসাদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে আমরা সেই যুদ্ধে জয় লাভ করেছিলাম।
কাজটা চলছিল 36 ডি , হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের কবিতাপাক্ষিক তথা আমার গৃহকোণে। রমাপ্রসাদ জানালেন কাজের জায়গাটা ছোটো হয়ে যাচ্ছ

কাজটা চলছিল 36 ডি , হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের কবিতাপাক্ষিক তথা আমার গৃহকোণে। রমাপ্রসাদ জানালেন কাজের জায়গাটা ছোটো হয়ে যাচ্ছে। তা শুনে কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন প্রস্তাব দিলেন ওঁর ফ্ল্যাটে করা যেতে পারে। অতএব সূর্যতোরণ , সি আই টি রোড , ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজের পাশে উঠে এল কাজের জায়গা।

এই পত্রিকার যাবতীয় ড্যামি শিটগুলি পেয়েছিলাম প্রতিদিন মারফৎ।এবং তা কথাসাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় -এর সৌজন্যে
আগে ম্যাটার ডি টি পি করে আর্টপুল বানিয়ে ড্যামিশিটে কেটে কেটে পেস্ট করতে হত।অলংকরণ সহ। পুরো পাতা মেকাপ করতে হত। প্রতিদিন চার পৃষ্ঠা। দশদিনে 4×10 =40 পৃষ্ঠা। এই অযোগ্য কবিরা এটা করতে সমর্থ হয়েছিল একটি মাত্র শব্দের ওপর ভিত্তি করে। শব্দটি হল : সংকল্প । আমরা করবই।আমাদের পারতেই হবে।  মাত্র ১৬ টি পাক্ষিক সংখ্যা বা আট মাসের কার্যক্রম থেকে দশদিন দৈনিক প্রকাশের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না ভুল তার বিচার করা হত। কিন্তু এখনো হয়নি। না হবার কারণ আমার 'সাক্ষাৎকার ' পর্বের কবিতাগুলি লেখা। এখন আপশোশ করি , কেন লিখতে গিয়েছিলাম সাক্ষাৎকার। কেন লিখেছিলাম , কীভাবে , কোন পরিস্থিতিতে লিখেছিলাম , এই লেখাতেই সেসব জানিয়ে দেব। কথা দিলাম।
চৌরঙ্গি থেকে পার্ক স্ট্রিট বইমেলার হাঁটাপথ।তাও ট্যাক্সিতেই ভরসা রেখেছিলাম ।
সেবার কবিতাপাক্ষিক -এর নিজস্ব স্টল কিংবা টেবিলও ছিল না।আমরা বসেছিলাম সমীরণ মজুমদারের ' অমৃতলোক '- এর টেবিলে এবং তার সামনের মাঠে। ভেবেছিলাম মেলার মধ্যে কিছু হকারের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করা যাবে। সেটা পারা যায়নি।কিন্তু কবিকৃতি , কবিপত্র এবং প্রো রে নাটা-র টেবিলে বিক্রি করেছিল এই পত্রিকাগুলি। সব থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল , মহাদিগন্ত-সম্পাদক কবি উত্তম দাশ তাঁর স্টল থেকে বইমেলা দৈনিক বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ,যিনি শুধুমাত্র মহাদিগন্ত স্টলের গেটে দাঁড়িয়ে বইমেলা দৈনিক বিক্রি করেছেন দশদিন।দশ- দশটা সারাদিন। আজকের দিনসমীরণে এটা ভাবাও যায় না।
আগামীকালের চিন্তা আগামীকালই জানে। আমি নিমিত্তমাত্র।

শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

২৭.
কানাইলাল জানা-র 2/1 এ, বেকার রোডের বাড়ির কবিতাপাঠের একটা ক্যালেন্ডার আপনাদের জন্য পেশ করছি।
25 মে , 1994 ॥ সঞ্চয়িতা কুণ্ডুর কবিতাপাঠ
26 জুন, 1994 ॥ রফিক উল ইসলাম চৈতালী চট্টোপাধ্যায়- - দু-জন
24 জুলাই, 1994॥ নয়ের দশকের চার কবি অর্ণব সাহা আবীর সিংহ মানসকুমার চিনি সুমিতেশ সরকার
এইদিনের অনুষ্ঠানটি হয়েছিল কালীঘাট মিলন সংঘ সভাঘরে।
28 আগস্ট ,1994 ॥ জয় গোস্বামী প্রমোদ বসু
25 সেপ্টেম্বর ,1994 ॥ আটের দশকের চার কবি অলোক বিশ্বাস জহর সেনমজুমদার নাসের হোসেন সুব্রত চেল
সুব্রত সেদিন অনুপস্থিত ছিল।

27 নভেম্বর ,1994 ॥ পবিত্র মুখোপাধ্যায়। এদিন পবিত্র মুখোপাধ্যায় ছাড়াও তার কবিতা পড়েছিলেন উপস্থিত বেশ কয়েকজন কবি।

কবিতাপাক্ষিক ১ থেকে ৪১ তম সংখ্যা পর্যন্ত কবিতা সংবাদ লিখতাম আমি। নামে কিংবা বেনামে।
৪২- ৪৩ সংখ্যা থেকে নাসের হোসেন অর্জুন মিশ্র কলমনামে কবিতাসংবাদ লেখা শুরু করেছিল। তারিখটা নোট করুন  28 জানুয়ারি ,1994। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত বিরামহীন। মাঝে আবার আলাদা করে শিল্পসংবাদও লিখতে হয়েছে।বড়ো ছোটো কোনো পত্রিকার এরকম কোনো কলাম-রাইটার্স খুঁজে দেখতে পারেন। পাবেন না।
মার্চ মাসে কবিতা পাঠ করেছিলেন কালীকৃষ্ণ গুহ এবং মলয় রায়চৌধুরী। কানাইলালের বাড়িতে।

দেখতে দেখতে দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তির ঘণ্টা বেজে গেল।কবিতাপাক্ষিক -এর ২য় বর্ষ পূর্তি এবং বাঁকুড়া জেলা কবিতা উৎসব ৷ 23 এপ্রিল , 1995 ৷ বাজোরিয়া গেস্ট হাউস , লালবাজার ,বাঁকুড়া।

ওই উৎসবের আহ্বায়ক : ডা: দীপংকর মাজী , বেলিয়াতোড়।

এটা উল্লেখ করার কারণ তখনো শহর বাঁকুড়ায় কবিতাপাক্ষিকের ইয়েস-ম্যান কবি- সংগঠক একজনও পাওয়া যায়নি। যারা ছিল সকলেই নবীন যুবক।এবং প্রকৃত অর্থে কবি।
আগামীকাল সে-খবর।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

প্রভাত চৌধুরী || সৌমিত্র রায়-এর জন্য গদ্য || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়-এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

২৬.
আগের অধ্যায়ে , লেখার নয় , ব্যক্তিগত সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২২/ বি , প্রতাপাদিত্য রোডের সঙ্গে যুক্ত ছিল ৩৬ / ডি , হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠিকানাটি , কবিতাপাক্ষিক পর্বে ঠিক এই সমীকরণেই ৩৬ ডি-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল ২/১ এ, বেকার রোড।তরুণ কবি কানাইলাল জানা-র বাড়ি বা আবাসন। কানাইলাল কারা-বিভাগের মাঝারি আধিকারিক। সেই সুবাদে জেলের আবাসনে থাকার অধিকার পেয়েছিল। আয়তনে বেশ বড়ো। ইংরেজ আমলের স্থাপত্য। আর কানাই-এর পরিচর্যায় বিভিন্ন ফুলের গাছ। আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল। এখানেই কবিতাপাঠের আসর হতে পারে। কানাইও রাজি হয়ে গেল।আমরা তো রাজি ছিলামই।
তখনো কিন্তু নাসের হোসেন নামটি কবিতাপাক্ষিক সম্পাদকমণ্ডলীতে যুক্ত হয়নি। অথচ ইতিমধ্যেই নাসের তার ভূমিকা পালন করতে শুরু করে দিয়েছে। 
 এবার একটা ছক কেটে নিচ্ছি।
২৫ মে , ১৯৯৪ ॥ কবিতাপাঠ : সঞ্চয়িতা কুণ্ডু ।
২৬ জুন , ১৯৯৪ ॥ কবিতাপাঠ:রফিক উল ইসলাম
                             চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
ওই সময় এ রকম একক কবিতাপাঠের আয়োজন করার কথা ভাবাও যেত না। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম এবং করেও দেখিয়েছিলাম।
কিছু প্রাসঙ্গিক কথা। আমন্ত্রণ- পত্র লিখে ফেলল নাসের হোসেন। তার ওপর অলংকরণ করা হল। তখন অলিতে- গলিতে এত জেরক্স অফসেট ছিল না। টেরিটিবাজারের একটা জায়গায় ছাপা হত। আমরাও পৌঁছে গেলাম জেরক্স অফসেটে। এই ফরম্যাটও আমরা নিয়ে এসেছিলাম কবিতার বাসভূমিতে।
এবার ৩৬ ডি , হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে  অঘোষিত মিছিল করে যেতাম ২/১ এ, বেকার রোডে। সে এক অভিনব মিছিল ! প্রায় সকলের হাতে তালাই -মাদুর - অল্পসল্প টিফিন।আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের খাড়া দেওয়ালের পাশ দিয়ে আমাদের কবিতাযাত্রা। আজ মনে পড়ে গেলে অবাক হয়ে যাই।
আর সকাল থেকে কানাইলাল জানা-র পরিশ্রমে তখন  ঝকঝক করছে ছাদ এবং ঘর। এই নিষ্ঠার কথা ভুলে গেলে রবীন্দ্রনাথ আমায় ক্ষমা করবেন না।
প্রথম দিন কবিতা পড়েছিল সঞ্চয়িতা কুণ্ডু।আর ওর পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেছিলেন আলোক সরকার রবীন্দু বিশ্বাস কালীকৃষ্ণ গুহ অনন্ত দাশ প্রমুখ অগ্রজ এবং বিশিষ্ট কবিরা।
বাংলাকবিতার ইতিহাসে এই ঘটনা বিরল। আমরা এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছি এটি ঘোষণা করলাম। নতুন দৃষ্টিভঙ্গির শুরু করলাম --- এটা ঢোলশোহরত করেদিলাম। এটা শুনতে পেলেন অনেকেই। আর বধিররা যে কোনো কিছুই শুনতে পান না , এটা আর নতুন করে বললাম না।
আগামীকাল আসুক।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...