গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২১ জুলাই, ২০২৩

ছোট গল্প ।। অবলোকন ।। সোমনাথ মুখার্জী, Story, Somnath Mukherjee

ছোট গল্প ।। অবলোকন

সোমনাথ মুখার্জী 



এখন রাত দুটো বাজতে তিন মিনিট বাকী। সময় যে মূল্যবান তার খবর সৌগত এখন সেভাবে মানে না। অথবা বলা যায় রাখতে বাধ্য নয়। হয়ত তাও নয়। আজ এই মুহূর্তে মানসিক  অবস্থান এমন এক পরিস্থিতির শিকার, ভাবলে মন নির্বাক বা অবশ হয়ে যায়। মা মৃত্যু শয্যায় শায়িতা। প্রযুক্তি তখন এতরকমের সবল ছিল না। ডাক্তার  ডাকার জন্য পথে নামতে হয়েছে। বাড়িতে ল্যান্ডলাইন নেই। অন্য কেউ সাহায্যের প্রত্যাশা পূরণ করে নি। সৌগত অসহায় অবস্থায় চারপাশে তাকাল। কয়েকটি কুকুর ওর দিকে নির্লিপ্ত চাহনিতে তাকিয়ে। আশ্চর্য হল। শ্যামবাজার  পাঁচ মাথার মোড় ছাড়িয়ে বাগবাজার যাবে। হাতঘড়ির সময় এখন দুটো পনেরো। ঘড়ি দেখা ওর বাতিক। হঠাৎ মন কেমন করে উঠল। অবচেতনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল চরমতম দুঃখের কথা। কী করণীয় ভাবনার দোলাচলে হারিয়ে গেল। চোখের জল আচমকা বাধা মানল না। সৌগত জানে সবকিছুই। তাও সত্যি মেনে নিতে পারাটা মনের জোর আকাঙ্খা করে।
ডাক্তার ডেথ্ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। সৌগত বাবার দিকে তাকাল। আজ বাবাকে চিনতে পারল না। মুখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙে পরেছে মাথায়। বাবা তাকিয়ে আছে অপলক। ও কিছুটা জানে বাষট্টি সালে প্রেমের বিয়ে কতখানি জটিল ছিল। মা এবং ছেলের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। সৌগত বুঝেছিল মায়ের ভেতরে অসাধারণ স্বচ্ছতা যেন সবসময় আলোকিত হয়ে আছে। কত কথা মা অবলীলায় বলত। আজ এখন মায়ের স্থির অবয়বের দিকে তাকালে কেমন যেন অসহায় বোধ হয়। বাবা বলল হতাশ শব্দে, খোকা কী দেখছিস!!
সৌগত বলল,কিছু নয়। দেখছি। বাবা এবার আমাদের কী হবে! গলা ধরে এল।
বাবা বলল,আজ কত কথা মনে পরছে। আমার জন্য সবকিছুকে সরিয়ে সাহস দেখিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। আজ দেখছি ওই জিতে গেল। সকলকে আপন করতে ওর জুড়ি নেই। সকাল হোক্ দেখবি কত মানুষ আসবে। ঝরঝর করে কেঁদে উঠল বাবা।
ভোর হয়ে আসছে। হঠাৎ স্বপ্নটা ভেঙে গেল। উঠে বসে সৌগত ভাবল,আজ‌ও সব কেমন স্পষ্ট মনে আছে মা। ভালো থেকো তুমি।


শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

গল্প বেঁচে থাক্ , সুখী হ ..... অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়

  গল্প

বেঁচে থাক্ , সুখী  হ .....

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়




সার্বভৌম দেশের এর থেকে বেশী  গণতান্ত্রিক বাধ্য প্রজা আর কি রকম হবে ! খেতে পেলে খায়, ঘুম না পেলে ঘুমায় না ।থাকার জন্য গাছের তলা কিংবা  অব্যবহারযোগ্য  কোন শেডের নীচের জায়গাটুকুই যথেষ্ট নয়  ?  হাঁ, ওরা অনায়াসে এই প্রশ্ন সত্য যুগের বরপ্রাপ্ত বাণের মত ছুঁড়তে  পারে  । উদাসী ব্যস্ত  মানুষের বর্ম এতটাই শক্তিশালী যে, এইধরনের বান মোটেই বিদ্ধ করেনা । কিংবা এতটাই  করে যে, কেন্দ্রাতিগ বলের মত অন্য ঠিকানায় অঙ্গুলি নির্দেশ করে  । এদের কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই  । রেগে যাওয়ারও কোন অধিকার নেই  । শুধু অধিকার আছে ভিক্ষে চাওয়ার । জন্ম থেকে কেবল ভয় তাদের পিছু ছাড়ে না । দয়া করে কেউ কিছু দিলে  কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায়  ।

        ঠিক যেমন আজ এক দয়ালু ব্যক্তি কিছু গরম ভাত তরকারি দিয়ে  গেলেন  । না , কোন ক্যান্টিন থেকে সে জানে না ; জানার কথাও নয় । তিনটে বাচ্চা ছেলে মেয়ের মা প্রণাম করে আশীর্বাদ দিল অপটু বাংলায় ।আবার  বিকেলের দিকে ছেলে তিনটের জন্য অন্য দুজন দিয়ে গেলেন জামা প্যান্ট  । তাদেরকেও প্রণাম জানাল মা । নিজে শতচ্ছিন্ন মলিন পোশাকে থাকলেও , ভিক্ষে পেয়ে ছেলেমেয়েগুলো  তো দুদিন একটু আনন্দে থাকল । তার অনেক কিছু না থাকার মধ্যে ভোটও নেই ।এতটুকু আগ্রহও নেই । তা সত্যি, যে জিনিস যখন তখন কেউ কেড়ে নিতে পারে,  তা থাকা না থাকাই তো সমান । মা শুনতে পেল একজন আরেকজনকে বলছেন,  শুভ নববর্ষ  । যাই হোক , Happy New Year এর মত আর আনন্দ কই ! বাংলা নতুন বছর ক্যামন যেন ম্যাড়মেড়ে । গল্প করতে করতে  বাংলা বছরের মত কোথায় মিলিয়ে গেল  ।

           বাচ্চা তিনটের মা ভাবল, এই গরম ভাত, নতুন জামা কি তাহলে নতুন বছরের জন্য  ? নতুন বছর তো খোব ভাল  ! তাহলে এবার অনেক কিছুই হবে ....। ছেলে মেয়েগুলো যদি পড়তে পারত .....। আর ইংজিরি শিখে গেলে , আর ভিক্ষে করতে হোত না ।

       শেষমেষ সেই মা আশীর্বাদ করে বসল , বাংলা নতুন বছরকেই । বেঁচে থাক্ বাবা নতুন বছর  । সুখী হ  ।

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

মিথ্যা কথা || সৈয়দ আব্দুল মালিক || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

 

মিথ্যা কথা

সৈয়দ আব্দুল মালিক

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

    




আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল সাড়ে চার মাইল।

     হেঁটে আসা যাওয়া করি।আমাদের গ্রামের-আমাদের শ্রেণির ছেলে আমাদের স্কুলে আমিই।অন্য ক্লাসের ছেলে আছে।আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনের পথটা দিয়ে এক মাইল গিয়ে-বড় রাস্তায় উঠি এবং অন্য ছেলেদের সঙ্গে স্কুলে যাই।

     ক্লাস সিক্সে পড়তাম।অভ্যাস ছাড়া আমার মতো ছোট একটি ছেলে দিনে নয়মাইল হাঁটতে পারতাম না।তবে পড়াশোনা না করলে নয়,সাইকেল কেনার মতো পয়সা নেই,বাড়ির আশেপাশে কোনো স্কুল নেই।

     পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

     ক্লাস এইটের পবন নেওগ আমাদের অঞ্চল থেকেই সাইকেলে করে স্কুলে যায়।কখনও দেরি হতে দেখলে পবন আমাকে তার সাইকেলে তুলে নেয়।

     কখনও নেয় না।

     বড় রাস্তা দিয়ে পবনদের ঘরের ওদিকে তোষেশ্বর স্যার যায়।তার একটা বহুদিনের পুরোনো শব্দ করা সাইকেল আছেবেল না বাজালেও পুরো সাইকেলটাই দূর থেকে বাজতে থাকে।তোষেশ্বর স্যার যে আসছে তা আমরা ঘুরে না তাকিয়েও বুঝতে পারি এবং সঙ্গে সঙ্গে একপাশে সরে দাঁড়াই।কেবল তোষেশ্বর স্যারই নয় অন্য শিক্ষকদের ও আমি খুব ভয় করতাম।তোষেশ্বর স্যার আমাদের ভূগোল পড়ায় এবং ইংরেজি ট্রানশ্লেষণ করায়।ভূগোলে আমি খারাপ।এত বড় একটা পৃথিবী,তাতে এতগুলো দেশ,মহাদেশ,কত নদী-পর্বত,নগর-সাগর মনেই থাকে না।তার মধ্যে আমার ভূগোলের জ্ঞান যোরহাট,গোলাঘাট এবং আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল-এর মধ্যেই আবদ্ধ।আমার ম্যাপগুলো বড় দীর্ঘ হয়ে যায়।একবার লঙ্কা দ্বীপ আঁকার সময় একেবারে তোষেশ্বর স্যারের মুখের মতো হয়েছিল।এই জিনিসটা আবিষ্কার করে আমি উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে হেসেছিলাম এবং বড় আমোদ এবং রহস্য বলে মনে হয়েছিল।কোনোভাবে তোষেশ্বর স্যার যেন দেখতে না পায় সেজন্য লুকিয়ে রেখেছিলাম।

     একদিন আমরা পুরো ক্লাসটা একটা বড় অপরাধ করে ফেললাম।আমাদের একটা ম্যাপ বাড়ি থেকে এঁকে নিয়ে যেতে বলেছিল-আমরা তা পারলাম না।কয়েকজন এঁকে এনেছিল।ওদেরকেও আনেনি বলতে বলে দিলামকারণ দুয়েকজন নিলে আর বাকিরা না নিলে ,যারা নেয়নি তাদের শাস্তি বেশি হবে।মিথ্যা কথা বলারও কোনো উপায় নেই।

     প্রত্যেকেই আনেনি বলল।

     ‘ম্যাপ এঁকে আনলি না কেন?’স্যার রাগের সঙ্গে বললেন।

     আমরা চুপ।

     উত্তরটা আগে থেকে ভেবে রাখা হল না।স্যার সবার মুখের দিকে একবার রাগত চোখে তাকালেন।তারপরে গম্ভীরভাবে বললেন-‘ভালোই হয়েছে হোমটাস্ক করে আনিসনি।এক ঘণ্টা ডিটেইন।’

     আমাদের সবার শুকনো মুখ এবং শুকনো গলা আরও শুকিয়ে গেল।

     ‘এখন এঁকে দেব স্যার’।কে একজন দুঃসাহস করে বলল।

     ‘তুই বেঞ্চের উপরই দাঁড়িয়ে থাক-’একই গম্ভীর এবং কড়া সুরে স্যার বলে উঠলেন।

     আর কারও কিছু বলার সাহস হল না।তোষেশ্বর স্যারের রাগ সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন।

     তারপর সেদিন ভূগোল পড়িয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বললেন,‘পুরো এক ঘণ্টা।কেউ পালাতে পারবি নাকেউ ছুটি নিয়েও যেতে পারবি না।’

     অসহায় ভাবে আমরা প্রথমে একবার স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করলাম।স্যারের কথার নড়চড় হয় না।

     এমনিতে কখনও কোনো ছাত্রের পরের ক্লাসগুলোতে উপস্থিত থাকতে ইচ্ছা না করলে কোনো ছাত্র পেট কামড়াচ্ছে বা মাথা ব্যথা করছে বলে ছুটি নিয়ে যায়।কিন্তু তোষেশ্বর স্যার ডিটেইন করেছেন,ছুটি নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

     সেদিন জৈষ্ঠ্য মাসের বড় কড়া রোদ।আমাদের ক্ষুধাও পেয়েছিল,তৃষ্ণাও পেয়েছিল।আমরা গ্লাসের পর গ্লাস জল খাচ্ছিলাম।কিন্তু পুরো ক্লাসের ছেলেরা চুপ করে বসে রইল।কেউ নড়াচড়া করার সাহস করল না।তোষেশ্বর স্যার চেয়ারটাতে যে বসলেন,বসেই রইলেন,নড়াচড়া করার নামগন্ধ নেইস্যারকে এভাবে দেখে আমাদের আরও বেশি ভয় করতে লাগল।স্কুলের অন্য ক্লাসের সমস্ত শিক্ষক এবং ছাত্ররা বাড়ি চলে গেল।চারপাশটা বেশ নীরব নিস্তব্ধ।

     আমাকে আবার পায়ে হেঁটে সাড়ে চার মাইল যেতে হবে।ছুটি দিতে বলার জন্য কয়েকবার উশখুশ করলাম,সাহসে কুলোল না।তখনকার দিনে আজকালকার মতো মাস্টার ছাত্রদের ভয় করত না।কারণ ছাত্ররা মাস্টারদের ঘেরাও-টেরাও করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না।

     কাঁটায় কাঁটায় এক ঘণ্টা হওয়ার পরে আমাদের ছুটি দিল।আমরা সুরসুর করে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ে দ্রুতপায়ে বাড়িমুখো হলাম,বাড়ি পৌছাতে আজ রাত হবে।

     একমাইলের মতো হাঁটার পরে আমি একা হয়ে গেলাম।সঙ্গের ছেলেরা সবাই যে যার দিকে চলে গেল।আমার খুব খারাপ লাগতে লাগল।

     একাই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলাম।পেছনে তোষেশ্বর স্যারের সাইকেলের ঘর্ঘর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি,হ্যাঁ তোষেশ্বর স্যার স্কুল থেকে বাজার হয়ে ফিরছেন।

     কিছু জিজ্ঞেস করবেন বলে ভয় হল।পথের একপাশ ধরে দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইলাম।

     আমার কাছে এসে স্যার ধীরে ধীরে সাইকেল চালালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,‘একা যে-সঙ্গে্র ছেলেরা কোথায় গেল?’

     ভয়ে ভয়ে বললাম,‘ওরা চলে গেছে স্যার।’

     তোষেশ্বর স্যার সাইকেল থেকে নামলেন এবং কড়া ভাবে বললেন,‘দেখি এদিকে আয়।’

     ভয়ে আমার তালু শুকিয়ে গেল।

     তবু সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

     ‘উঠ,সাইকেলে উঠতে পারবি?পেছনে বসলে আমি চালাতে পারব না।এখানে আগে বস।’-বলে আমার বগলের নিচে হাত দিয়ে সাইকেলে তুলে নিলেন এবং নিজেও সাইকেলে উঠে চালাতে লাগলেন।আমি স্যারের দুটো হাত আর বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

     আমাদের গ্রামে প্রবেশ করার রাস্তাটায় এসে তিনি আমাকে বললেন,‘ওদিকে আমার একটু কাজ আছে।চল’।

     স্যার আমাকে আমার বাড়ির দরজার সামনে নামিয়ে দিলেন।কিছুই বললেন না এবং সোজাসুজি না গিয়ে আবার যে পথে এসেছিলেন সেইপথে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন।

     আমি বুঝতে পারলাম এদিকে স্যারের কাজ ছিল না।আমাকে বাড়িতে রেখে যাবার জন্যই এতটা পথ এগিয়ে এলেন।

     স্যার ও একটা মিথ্যা কথা বললেন।

--------

      

 

     লেখক পরিচিতিঃ অসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার সৈয়দ আব্দুল মালিক ১৯১৯ সনে অসমের শিবসাগর জেলার নাহরণিতে জন্মগ্রহণ করেন।যোরহাট সরকারি হাইস্কুল থেকে পাশ করে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ করেন।পরবর্তীকালে যোরহাট জেবি কলেজে অধ্যাপনা করেন।লেখকের গল্প সঙ্কলন গুলির মধ্যে ‘পরশমণি’,শিখরে শিখরে’,শুকনো পাপড়ি’বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।‘অঘরী আত্মার কাহিনী’উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।                                                                     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

উপগ্রহের বার্তা || দেবব্রত রায় || গল্প

 উপগ্রহের বার্তা 

দেবব্রত রায়  




ববিতা জিগ্যেস করলো, ডিঙগো ডিয়ার, তুমি কি জান সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য কতটা মানে, হাও মাচ ডিফারেন্স বিটুইন ট্র্যু অ্যান্ড ফলস ? ববিতা ডিঙগোর দিদুন অর্থাৎ ,মায়ের মা । স্কুলের বেবিদের মতন করে দিদুনের কাঁধ পর্যন্ত চুল ছাঁটা।মাঝে মাঝেই ডিঙগোর দিদুন তাতে আবার রঙিন হেয়ার-ব্যান্ড ব্যবহার করেন আর,  কথা বলার সময় সেই ঝাপঝুপো চুলগুলো খুবই ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তিনি কথা বলেন। দিদুনের এইধরনের বেবি-বেবি অ্যাটিটিউড ডিঙগোর মোটেই ভালো লাগে না। ও ঘাড় শক্ত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ববিতা আবারও বলে, ডিঙগো, প্লিজ নটি বয়ের মতো অমন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না ! কথাগুলো বলেই , সে ডিঙগো-র কার্লি চুলের একটা গোছা ধরে একটু জোরেই টান দেয়। বলে, "শোন, চোখে যা দেখবে  তাই সত্যি আর, কানে যা শুনবে জেনো তার সবটাই  মিথ্যে!...আর, যেহেতু আমাদের চোখ এবং কানের মাঝখানের দূরত্ব হচ্ছে চার আঙুলের তাই, সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মাত্র চার আঙুলের ! " বলেই, ববিতা একটা বিজ্ঞের হাসি হাসলো।                                                                                                                                দিদুনের এই কথাগুলোর লক্ষ্য যে আসলে জিকো সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ডিঙগোর। কাল বাঁকুড়ার থেকে জিকো ফোন করে ডিঙগোর বাপি মানে, জিকো তার ছেলেকে হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে ডাক্তার কী-কী অ্যাডভাইজ দিয়েছেন সেই বিষয়েই আলোচনা করছিল।                                                                                           অথচ, জিকো কিন্তু ,একেবারেই অন্যরকম কথা বলে। সে বলে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল তা পরীক্ষা করে বুঝে নিতে হয় ! প্রয়োজনে তুমি কারোর সাহায্য নিতে পার কিন্তু , সিদ্ধান্তটা নিতে হবে তোমাকেই !                                                                                                                           কলকাতার এই বাড়িতে জিকো খুব কমই আসে । সে থাকে অনেক দূরে। সেই বাঁকুড়ায়। মাঝেমধ্যে যখন সে ডিঙগোদের সঙ্গে এসে থাকে তখন ডিঙগোর খুব ভালো লাগে, ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হয় কিন্তু, মায়ের ভয়ে ডিঙগো সেটা প্রকাশ করতে পারে না। সেসময় বাবাও ওই ক-দিনের জন্যে ডিঙগোর মতোই যেন একেবারে ছোট্টটি হয়ে যায় ! অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সটান জিকো-র কোলে শুয়ে পড়ে  বলে, মাথাটা একটু টিপে দাও দেখি মা ! ডিঙগো ক্লাস-টু পর্যন্ত জানত ,ওর ঠাম্মি-র নাম জিকো তাই, ঠাম্মি যখন ডিঙগোকে জিকো বলে ডাকত তখন ও বলত আমি তো ডিঙগো ,তোমার নাম তো জিকো ! ডিঙগো এখন জানে পৃথিবীর  একজন বিখ্যাত ফুটবলারের নাম জিকো।যাঁর জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে। ঠাম্মি তাঁর নামেই ওর নাম রেখেছিল জিকো। কিন্তু, মা আর,দিদুনের সেই নামটা পছন্দ নয় !                                                                                                                                                   মা যখন ঠাম্মির সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে তখন হেসে হেসে  কী সুন্দরভাবে কথা বলে কিন্তু, ফোনটা নামিয়ে রেখেই সে যেন জায়ান্টের মতো গরগর করতে থাকে ! বলে, ডাইনি বুড়িটা মরলে বাঁচি ! ব্যাঙ্কের টাকাগুলো হাতে পেলে অন্তত এই সময় কাজে লাগাতে পারতাম....

ডিঙগো ওর মায়ের সব কথাগুলো-র মানে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না কিন্তু , এটুকু সে বুঝতে পারে যে কথাগুলো খুবই নোংরা !  

একটা ছুটির দুপুরে সবাই যখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে ডিঙগো তখন ওর বাবার ফোনটা নিয়ে  চুপিচুপি নিজের পড়ার ঘরে এসে ঢোকে । এইসময় খাওয়াদাওয়া সেরে ঠাম্মি তার প্রিয় ক্রেডলটাই বসে গল্পের বই পড়ে। ডিঙগো ওর অনভ্যস্ত হাতে ঠাম্মির ফোন-নাম্বারটা টেপে।ও পাশে একটা সুন্দর রিংটোন বেজে ওঠে, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে......                                                                                                                                  " হ্যালো ! " ঠাম্মির গলা শুনতে পায় ডিঙগো। সে বলে, আমি এখন জিকো বলছি !                                                                        ঠাম্মি ওপাশ থেকে হাসি হাসি গলায় বলে, " এখন জিকো! " বেশ, বলো !                                                                    ঠাম্মির কথায় জিকো লজ্জা পায়। সে বলে, না, না , আমি জিকো-ই বলছি। তারপর, খুবই সিক্রেট একটা বিষয় আলোচনার মতো করে সে চুপিচুপি গলায় বলে, শোনো , আমি আর, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আদ্রিজা রিসেন্ট একটা  ম্যাটার ডিসকাভার করেছি !                                                                                                                                             ওপাশ থেকে ঠাম্মির কৌতুহলী গলা ভেসে আসে। বলে, তোমরা দুজনে ! তাই ! তা, কী ডিসকভার করেছো বল তো !                                                                                                                                                                                 না, মানে বিষয়টা আদ্রিজা-ই ডিসকাভার করেছে তবে ,আমিও সেটা গ্রান্ট করেছি ! কথাগুলো আবারও লজ্জা পাওয়া গলাতেই বললো জিকো !                                                                                                                                    বেশ তো ! তা, বিষয়টা কী ? ওপাশ থেকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় ঠাম্মি ।                                                              আমরা ডিসকাভার করেছি, কথাটা বলেই, জিকো  কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর,বলে, না, মানে তুমি মোটেই নও কিন্তু, বেশিরভাগ বড়োরা-ই, মানে দিদুন,মায়ের মতো বড়োরা ফোনে যা কিছু বলে জেনো তার বেশিরভাগ-ই মানে 99.9% একেবারেই ফলস ! কিন্তু, এই যে আমি ফোন করছি আমি কিন্তু , সত্যি বলছি! মানে, আমি বলতে চাইছি আসলে , সব শোনা কথাই কিন্তু , মিথ্যে নয়.....                                                                                                                                        জিকোর নরম মনের ভিতরে যে একটা নিদারুণ টানাপোড়েন চলছে সেটা আন্দাজ করতে পেরে জয়তীর বুকের কাছটা মুহূর্তে ভীষণ ভারি হয়ে ওঠে ! কোলের উপর রাখা বইখানা সে ধীরে ধীরে পাশে নামিয়ে রাখে । ছেলের মাত্র তিন বছর বয়সে নীলাঞ্জনকে হারায় জয়তী ! তারপর থেকে শুধুই লড়াই আর, লড়াই ! একদিকে অধ্যাপনা আরেকদিকে ছেলে মানুষ করা। সেসময় নীলাঞ্জনের মা, মানে জয়তীর শাশুড়ি ওদের ছেলে আর মাকে একেবারে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন অবশ্য,জয়তীও ছেলে আর, বৃদ্ধা শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যে অবহেলা হবে ভেবেই একবারের জন্যেও ওর নিজের মাকে সংসারের বিষয়ে মাথা ঘামাতে দেয়নি কারণ, জয়তী খুব ভালো করেই জানত , ওর মা সংসারে এলে শুধু নিজের মেয়ের কথা-ই ভাববে !  না তার ছেলের কথা ভাবতো , না ভাবতো নীলাঞ্জনের মায়ের কথা ! জয়তীর মা অবশ্য এসবের মধ্যেই জয়তীর জন্য দু-দুটো সম্বন্ধও দেখে ফেলেছিল ! ডঃ অরুণাংশু-ও ওকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন । সেও ছিল আরেক লড়াই !মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জয়তীর মনের সঙ্গে সেদিন লড়াইটা হয়েছিল এক মায়ের, এক পুত্রহারা বৃদ্ধার বৌমার দায়িত্ববোধের ! জয়তী যদিও ,ওর মা, ডঃ অরুণাংশু বসু এদের কারোর ডাকেই সেদিন সাড়া দেয়নি !                                                              আজ পাঁচবছর হলো জয়তীর মা মারা গেছেন! শাশুড়ী তারও অনেক আগেই। ছেলে সেই সবে জয়েন্টে চান্স পেয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে ! ডঃ অরুণাংশু বসু এখন সাউথ -অস্ট্রেলিয়ায়। ওখানকারই এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেই কবেই দেশ ছেড়েছেন তিনি ।     

  জয়তী কনসিভ হওয়ার একেবারে প্রথম দিন থেকেই নীলাঞ্জনের ইচ্ছে ছিল ওদের ছেলেই হোক বা, মেয়েই হোক সে ডাক্তার হবে ! জয়তী  বলেছিল, ছেলে-মেয়েদেরও তো নিজস্ব একটা 'সে ' থাকে ! নীলাঞ্জন কেন যে সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখো তুমি বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে ! তাহলে কি, নীলাঞ্জন আগে থেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল তাদের সন্তান বড়ো হওয়া পর্যন্ত সে থাকবে না ! নীলাঞ্জনের অনেক কথাবার্তা জয়তীর কাছে আজও রহস্যই থেকে গেছে ! দেখতে দেখতে আটান্নটা বছর কীভাবে যে কেটে গেল, জয়তী এখন আর সেসব যেন ভাবতেই পারেনা ! হয়তো,এরকমই হয় কিন্তু, নিজের জীবনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সেসময় ভীষণ জটিল বলেই মনে হয়েছিল তার !                                                                                    নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া পুরানো কাঠামো কি ফিরে আসে,জয়তী বুঝতে পারেনা ! তার এইটুকু জীবনে ঘটে যাওয়া কত ঘটনায় না জমে ছিল কোনো এক অন্ধকার গুহার ভিতরে ! আজকাল  একে একে সব যেন ফিরে আসছে জোয়ারের কলস্রোতে ! নীলাঞ্জন আর, জয়তীর একমাত্র সন্তান শঙখসুভ্র চ্যাটার্জি এখন কলকাতায় ভীষণ ব্যস্ত একজন ইয়াং অ্যান্ড হাইলি প্রমিসিং কার্ডিওলজিস্ট ! জয়তী ভাবে নিজের শরীর থেকে ছিন্ন হয়ে সুদূর কক্ষপথে চলে যাওয়া উজ্জ্বল চাঁদের জন্য মাঝরাতে এই গ্রহটা যখন একেবারেই নিঃসঙ্গ ওহয়ে পড়ে তখন কি, সকলের চোখের আড়ালে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে !  ক্রমশ এক নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে জয়তীর কানে দূর উপগ্রহ থেকে যেন  একটা বার্তা ভেসে আসছিল, হ্যালো, হ্যালো....আমি জিকো বলছি ! হ্যালো.......হ্যালো........        


শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

ন্যায্য মূল্য ।। কার্তিক ঢক্।। গল্প

ন্যায্য মূল্য ।। ছোটোগল্প

কার্তিক ঢক্



চোর বললো ফেরত করতে পারবো না দাদা। খেঁকিয়ে উঠে বিপুল বললো,পারবি না মানে?

মানে- মাল গ'লে গেছে। গলে গেছে! সে কিরে শালা,শ্বশুরের দেওয়া আশীর্বাদটা

 রাতারাতি গলিয়ে ফেলেছিস! 

চোর বললো,দিনকাল যা পড়েছে সুমেরু কুমেরুর বরফ গলে যাচ্ছে ধান্ধাবাজির পাল্লায় পড়ে,আর সোনা তো আপনার এক টুকরো। 

আচ্ছা !  বেশ বড়ো বড়ো  কথা বলতে পারিসতো,কথাটা বেশ তির্যক ভাবে বললো বিপুল।

সে আর কি করবো বলুন,মুখচোরা হ'লে আজকাল কেউ খেতে পায় নাকি।

বিপুল বললো তা বেশ বেশ,তো বাবা ঘরে এতো জিনিসপত্র থাকতে আমার ওই আংটি খানাই তোমাকে নিতে হোলো?

আঁজ্ঞে আমার গুরু বলেছেন যতো কম মাল হাতাবি,ধরাপড়বি ততো কম।এই দেখুন না নারদা - ফারদা কান্ড গুলো, কম কম খাচ্ছিলো - চলে যাচ্ছিলো। আঁঠি শুদ্ধ  গিলতে গিয়েই শালা কি অবস্থা... 

বিপুল হাত দেখিয়ে তাকে থামতে বলে বললো আচ্ছা, ঠিক আছে ঠিক আছে,আংটির পরিবর্তে  যা দাম হয় দে।

চোর এবার একটু গদগদ হয়ে বললো এতোটা কি আর পারা যায় বলুন? মাল বেচে পেয়েছি তো মোটে হাজার টাকা।নেহাত মূর্খামির জেরে ধরা পড়েগেছি তাই। এতো দিতে পারবো না।বিপুল এবার কড়া সুরে ধমকে বললো,তুই দিবি না তোর বাপ দেবে। চোর একটু আমতা আমতা করে বললো, এ-ই দেখুন, আবার বাপকে টানছেন কেনো? বাপ তো আর চুরি করতে আসেনি! তাছাড়া বাপের সেরকম অবস্থা হলে কি আর চুরিবিদ্যায় আসতাম বলুন?।বিপুল নাক কুঁচকে বললো,বেটা প্লেন চালাতো! তোর বাপকে টানবো তোর দাদুকে টানবো।তোর চোদ্দগুষ্টিকে টানবো, আমাকে চিনিস না।বিপুলকে থামিয়ে ছিঁচকে বললো,তাতে আপনারই খরচ বাড়বে,তাদেরও তো অবস্থা একই রকম।

বিপুল রাগে গর্ গর্ করতে করতে বললো,তোকে আমি পুলিশে দেবো।

চোর এবার হেসে ফেললো, বললো তাতেও তো আপনার লোকসান,পুলিশ  হিস্যা নেবে, দামে কম পড়ে যাবেনা?

বিপুলের এবার মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা, সে চীৎকার করে উঠলো, নিকুচি করেছে তোর পুলিশের, এই বলে হাঁকদিয়ে ঘরের চাকরটাকে ডাকলো, এই কানাই নাইলনের দড়িটা নিয়ে আয় তো, এই হাড়বজ্জাতটাকে নারকেল গাছটায় বেঁধে রাখবো সারাদিন। বেটা চুরি করবি আবার বাটপাড়িও।দেখাচ্ছি মজা।

চোরটি এবার ঘাবড়ে গিয়ে বললো, বললাম তো আপনার টাকা ফেরৎ দিয়ে দেবো। মওকা বুঝে বিপুল রাগ আরো চড়িয়ে দিয়ে বললো, দেবো আবার কি রে,আধ ভ'রির দাম এখনি ফেল। চোর,  ঐখনি কোথায় পাবো? আমাকে ম্যানেজ করতে হবে তো।দুদিন সময় চাই। বিপুল সমঝদারের মতো সম্মতি জানালো,তা তো বটে,তা তো বটেই,তবে দুদিন নয়,তোকে আমি একদিন সময় দিলাম।

এই বলে, তার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা লিখে নিলো, মোবাইলে ফটাফট চোরের ছবিও তুলেনিলো কয়েকটা।

চোর এবার বলে উঠলো, একটা কথা জিঙ্গেস করবো দাদা? আবার কি বলবি, বিপুল বিরক্ত হয়ে বললো, বলে ফেল।চোর খুব বিনীত ভাবে বললো, আজ্ঞে ওজনটা আপনি ঠিক বলছেন তো? 

বিপুল তাকে মারতে উদ্যত হ'লে চোর বলে না না এতে তো আপনার কোনো দোষ নেই,  আজকাল সোনার দোকানে  এসব হয়-ই তো,তাই বলছিলাম।

তারপর এসব ঝুট-ঝামেলা মিটে যাবার পর আসল সমস্যাটা দাঁড়ালো সোনার মূল্য নির্ধারণ এর সময়। বাজারে সোনার দাম তরতর করে উঠছে,  নামছে। আজ একরকম দাম তো কাল এক রকম দাম।

বিপুল আজকের খবরের কাগজটা খুলে সোনার দাম দেখিয়ে বললো,  আঠাশ হাজার ছ'শো  - মানে আধ ভ'রিতে  চোদ্দ হাজার. …

বিপুলকে থামিয়ে চোর এবার খেঁকিয়ে উঠলো,  তাতো হবে না, কাল সোনার দাম ছিলো চব্বিশ হাজার। খামোকা এক হাজার তিনশো টাকা গচ্চা দিতে যাবো কেনো ? চুরিটা তো হয়েছে কাল, রাত বারোটার  আগে। আপনি যখন  রাতের খাবার  খেয়ে হাত ধুতে গিয়ে আংটিটা বেসিনের উপর রেখে বাথরুমে গেলেন, সেই ফাঁকে সঁটকেছি ওটা।

অতএব  কালকের দামেই দাম দেবো,বেশ জোরের সঙ্গেই চোর বললো।

এদিকে বিপুল বলে ন্যায্যমূল্যের কথা ওদিকে চোরও বলে ন্যায্যমূল্যের কথা।

সে নিয়ে শুরু হলো বচসা এবং তা গেলো তুঙ্গে। ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে বিপুল চোরের গালে কসে মারলো একচড়,অমনি চোরও সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিলো বিপুলের গালে। আর চড়টা পড়বি পড় বিপুলের ঠান্ডা লেগে ফুলে যাওয়া দাঁতের ঠিক গোড়ায়। ব্যাস, একটা কাতর গোঁঙানি দিয়ে বিপুল একেবারে চীৎপাত্, আর কাতর সুরেই চীৎকার করতে লাগলো চোর চোর...


চোর চীৎকার শুনে বাড়ির সব সদস্যরা যে যেমন অবস্থায় ছিলো ছুটে এলো বিপুলের রুমে,বিপুলের বৌ  শুধু নেই বাপের বাড়ি  যাওয়ায়। সবাই মিলে একসাথে  ঝাঁকুনি দিতে লাগলো বিপুলকে। ঠেলার চোটে বিপুল জেগে উঠে ঘুম জড়ানো গলায় বলে উঠলো চো- চো- চোর কোথায়! চোর? সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে বিপুলের দিকে। বিপুল চোখ কচলে তার ডানহাতের পাঞ্জার দিকে তাকিয়ে দেখলো

অনামিকায় জ্বল জ্বল করছে শ্বশুর মশায়ের দেওয়া আশীর্বাদ...

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বেঁচে থাকা || প্রশান্ত দে || অণুগল্প

বেঁচে থাকা
প্রশান্ত দে


প্রতিবছর দুর্গাপূজা পেরোলে কারু বাগ্দীর বয়স একবছর করে বাড়ে।দেখতে দেখতে তাঁর বয়স হয়ে গেল তিনকুড়ি ষোল।এক বয়সে ছুতোরের কাজে তাঁর বেশ নামডাক ছিল।এখন আর তাকে বাছলা আগর কিংবা বাটালি চালাতে হয় না।বাছলা চালানো কোমরের ঝোঁকটা একটু বেশিই বেড়েছে বয়েসের ফলে।দুইছেলে চেন্নাইয়ে এক প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করে। টাকা যৎসামান্য যা পাঠায় তাতেই বুড়াবুড়ির চলে যায়।
ছেলেরা বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে সেখানেই থাকে।পূজা র্পার্বনে মেড়সমেত আসে আর কয়েকদিন থেকে চলে যায়।ছেলেদের রোজগারপাতি ভালৈই হওয়াতে তাদের সাবেক টালির চালার সামনে একখানা চার কামরার ঘরও উঠে দাঁড়িয়েছে।কিন্তু চালাটা দালান ঘরের সমস্ত সৌন্দর্য ম্লান করে দিচ্ছে ।এই নিয়ে ছেলেরা যতবার আসে ততবারই বাবাকে অভিযোগ করেএবং বলে "বাবা!,ঐ পুরাতন টালির চালাটা ভেঙে দাও"
কিন্তু বৃদ্ধ প্রতিবারই নিষেধ করে বলে ,"থাকনা ,এটা তোদের কি খাচ্ছে?"
ছেলেরা কোনভাবেই বুঝতে পারেনা ব্যপারটা কি।আর তেমন ভাবে বুঝার চেষ্টাও করেনা এই ভেবে যে আর কটা দিনই বা থাকি!এখানে অতিথির মতো আসি আর রিটার্ন টিকিট কাটাই থাকে ...চলে যাই।
বাবা অসুস্থ শুনে দু- ছেলেই ছেলে মেয়ে বৌ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।বাবার ফোনে আব্দার মতোএইবার এই অসময়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসা ।আজ যাব কাল যাব করতে করতে একমাস হয়ে গেল।বৃদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠেছে।এইদিকে দুর্গাপূজা এগিয়ে আসছে দেখে মায়ের কথামতো পূজার পরই সবাই যাবার সিদ্ধান্ত নিল।
পূজা আর দিন পনের বাকি।দুই ভাই সুজন ও বিজন ঠিক করল যে অনেক দিন হয়ে গেল ঘরটার রং করা হয় নাই তাই এইবার যখন আগের থেকেই আছি তখন ঘরটায় একটু রং করিয়ে দিই। নিজেদের প্রস্তাব বাবার কাছে রাখল।বাবা খুশি হল।এবং বলল ,"পুরানো ঘরটাও একটু খড়ি বুলিয়ে দিতে পারবি? পিছনদিকটা চাকলা ছাড়ছে...নিচগুলা ঝিটে খেয়ে ফেলেছে"
পুরানো ঘরটার কথা শুনে সুজন বলল,"তুমি যে কি বল বাবা....,ঐ ঘরটার আর প্রয়োজনটা কি?আমরা চাইছি ঘরটা ভেঙে ফেলি।ঘরের সামনেটা একটু পাওয়া যাবে"।আর তাতে সায় দিল বিজন।
বৃদ্ধ ছেলেদের উত্তেজনা দেখে আর বলার সাহস না পেয়ে শরীর ঝুঁকিয়ে সরে পড়ে যেতে যেতে  বলল,"আমি বেঁচে থাকতে ঐ ঘর ভাঙতে দুব নাই।তোরা তোদের ঘর রং করাবি করা ,পারিস যদি একলিটার আলকাতরা এনে দিবি।"
আলকাতরার কথা শুনে বিজন একটু জোরে  বলল,"আগের দু-লিটার আলকাতরা শেষ হয়ে গেল?
বৃদ্ধ পিতা ছেলের এহেন প্রশ্নে থমকে দাঁড়াল এবং ছেলেদের সন্দেহ দূর করতে ঘুরে কাছে এসে  বলল,"না অল্প আছে"
বিজন --কোথায় এত লেপ-ছ?
বৃদ্ধ ,"দেখতে চাস ?" বলে দু ছেলেকে চালাটাতে ডেকে নিয়ে গেল।ঘরের বর্গা গুলো দেখিয়ে বলল,"কিছু দেখতে পাচ্ছিস?
ছেলেরা দেখতে পেল ঘরের সমস্ত বর্গা একরকম ঘুনে খেয়ে ফেলেছে একটার একহাত পরিমান ছাড়া।
সুজন  দেখেই বলল,"এত আলকাতরা এই একটা জায়গায় লেপেছ!
--কেন জানিস?
--না ।না বললে জানবো কি করে?
--তোর দাদু এই জায়গাটায় আমাকে বাছলা চালাতে শিখিয়েছিল।দেখছিস নাই ...একটু বেশিই কেটে ফেলেছি।আর সেই শিক্ষা দিয়েই কতঘরের ছাদন দিয়েছি ।তোদের আমি বড় করেছি।তোরা আজ চেন্নাই গেছিস"
বৃদ্ধ কথাগুলো বলার পর একটু আনমনা হয়ে গেল।মনে হল সেই মুহুর্ত টা ফুটে উঠেছে।তারপর ধীরে ধীরে ভাঙা কন্ঠস্বরে  বলল,"আমি ....যতদিন বেঁচে আছি .....আমার মধ্যে .....তোদের দাদুও বেঁচে আছে রে"
সুজন ও বিজন মাথা নিচু করে চালাটা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো।

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গল্প : || নতুন ভোর || কমল কৃষ্ণ কুইলা

গল্প : 

নতুন ভোর
কমল কৃষ্ণ কুইলা


দিনটি ছিল ২৮ শে আগস্ট, ২০১৮ । একটি মন্দিরে সুন্দরভাবে পবিত্রতার সাথে নিষ্ঠাভরে প্রশান্ত ও কবিতা বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ।

এবার আমি লেখনীর মাধ্যমে প্রশান্ত ও কবিতার অতীত জীবনের কিছু মর্মান্তিক ঘটনা তুলে ধরতে চাই । জনসমক্ষে আনতে চাই ।

প্রশান্তর বাবা পেশায় ছিলেন একজন কৃষক । মাঠে যে পরিমান ফসল চাষ হয়, তাতে টেনেটুনে বড়জোর ছয় মাস সংসার চলে যায় । চিন্তা থেকে যায় বাদবাকি ছয় মাসের । দিন মজুরি করেই চাল কিনে বাকি ছয়মাস সংসার চালাতে হয় । এভাবেই চলতে থাকে কয়েক বছর ।

একদিন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে দিনমজুরি কাজ করতে করতেই ঘরের চালের উপর থেকে নিচে পড়ে যায় । পঙ্গু হয়ে বিছানা নেয় প্রশান্তর বাবা । বিনাচিকিৎসায় বাড়িতেই পড়ে থাকতে হয় দিনের পর দিন ।

পরিবারে দ্রুত ঘনীভূত হয় দারিদ্র্যতার মেঘ । কেননা প্রশান্তর বাবা দীনেশ বাবু ছিলেন পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ।

শেষ পর্যন্ত প্রশান্তর মা সরস্বতী দেবী নিরুপায় হয়ে এক প্রতিবেশি বাবুর বাড়িতে ঝি চাকরের কাজ নেয় । বাবুরা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়ে আধসের অথবা মন হলে একসের খুদ দিয়ে খালাস । তাই অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতে হয় ।

শেষ পর্যন্ত তাই ভিক্ষাবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয় সরস্বতী দেবীকে ।

 প্রশান্তকে দিনের পর দিন খালি পেটে স্কুলে যেতে হয় । শুধুমাত্র এক গ্লাস জল খেয়ে । কখনওবা গাছের একটি পেয়ারা খেয়ে । বারো কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটেই যেতে হত । বইপত্র সব ভিক্ষা করেই জোগাড় করতে হয়েছে তাকে  । কেননা তার আর কোনও উপায় ছিল না ।

এইভাবেই দিন মাস বছর কেটে যায় । স্কুলের পাঠ শেষ করে সে কলেজে পাড়ি জমায় । শুরু হল আর এক লড়াই । রোজ চার ঘণ্টা জলপথ অতিক্রম করে কলেজে যাতায়াত করতে হত তাকে ।

এইভাবেই অনেক চড়াই উৎরাই অতিক্রম করার পর সে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে ।

এরপর পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে সে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় । পথের সম্বল বলতে মা বাবার আশীর্বাদ আর দু-টাকা ।

সে অনেক আশা নিয়ে কলকাতা এল বটে কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথাও জুটল না ।

শেষ পর্যন্ত রেল স্টেশনই হল তার একমাত্র ঠিকানা ।

স্টেশনে রাত্রি যাপন আর দিনে লেবারের কাজ করেই দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতে হল তাকে ।

এইভাবেই বেশ কিছুদিন চলতে থাকে । অতঃপর শরীর না টানায় একদিন সে লেবারের কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ।

 খবরের কাগজে কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে সেলসম্যানের কাজকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সে ।

এইকাজ করতে করতেই একজনের সহযোগিতায় সে একটি মেগা সিরিয়ালে কাজের সুযোগ পেয়ে যায় ।

পরবর্তী সময়ে সে সমাজসেবী হিসাবে একটি এনজিওতে যোগদান করে ।

বর্তমানে সে এনজিও, ফিল্ম মেকিং এবং অফিস জব নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে ।

 অনেক চেষ্টা করেও সে একজন ভালো সত্যিকারের জীবন সঙ্গিনী  জোগাড় করে উঠতে পারেনি ।

এই নিয়ে সে দিনের পর দিন চোখের জল ফেলতে থাকে ।

অবশেষে ঈশ্বর তার ডাকে সাড়া দিলেন ।

এতদিন পর সে সত্যি কারের একজন সৎ নিষ্ঠাবান পবিত্র ও দরদী মনের মানুষ খুঁজে পেল ।

মেয়েটির নাম কবিতা । তার জীবনটাও দুঃখ, কষ্ট ও যন্ত্রণায় ভরা । বহুবার তাকে জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে ।
একজন নরপিশাচের পাল্লায় পড়ে মেয়েটির শেষ হতে বসেছিল । কিন্তু ঈশ্বরের অসীম কৃপায় সে বেঁচে যায় ।

কবিতা এখন প্রশান্তকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেয়ে খুবই সুখী; তার আর কোনও দুঃখ নেই ।

অনেক স্বপ্ন নিয়ে নব দম্পতি সুখে ও শান্তিতে নতুন জীবন শুরু করল ।

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মধ্যবিত্ত || তাসফীর ইসলাম (ইমরান) || বাংলাদেশ-এর গল্প

মধ্যবিত্ত || তাসফীর ইসলাম (ইমরান)



দিনশেষে অভিনয়ের মিথ্যে হাসিগুলো রাতের আঁধারে বড্ড কষ্ট দেয়। রাত গভীর হয়ে আসলেই সব কষ্টগুলো নিরবে আঘাত হানে। ধুকে ধুকে খায় আমার মতো হাজারো নিম্নমধ্যবিত্ত কে!
-ওভারব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে আছি আমি। সন্ধার সূর্যটা বহু আগেই বাড়ি ফিরে গেছে, রাস্তার সোডিয়াম হলুদ বাতিগুলোও জ্বলে উঠেছে আলোকময় নগরীকে আরেকটু আলোকিত করে দিতে। এই সময় বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে মানুষের,ফিরে যাওয়ার নিরব প্রতিযোগীতা যেন শুরু হয়ে যায়। ভীড় বাড়ে বাসে, এই যাত্রাবাড়ি,গুলিস্তান,মিরপুর,শ্যামলী,   ডাক হাঁকায় কন্ট্রাক্টাররা। আর যাত্রিদের ফিরে যাবার আকুলতা দেখতে থাকি আমি। মানুষের জীবনটা বড় বিচিত্র। দিন শেষে রাতে পরিবারের পিছুটান এড়াতে পারেনা মানুষ। অবাক লাগে মাঝে মাঝে এরকম পিছুটান। আমার পাশেও ভীড় বাড়ে,অস্থায়ী বাসিন্দারা ফিরতে শুরু করেছে আপন নীরে। শুধু আমিই ব্যস্ততার পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাতের জ্বলন্ত বেনসন এন্ড হেজেসটাও আপন মহিমায় উজ্বল হয়ে উঠছে। আমাদের পৃথিবীটাও হয়ত কোন জ্বলন্ত সিগারেট,প্রতি মুহুর্তেই ছোট হয়ে আসছে। আমার মত নিম্নমধ্যবিত্ত বেকারের হাতে এজিনিস বেমানান। তবুও আজকের দিনে একটু বিলাসিতা হতেই পারে। এইভাবেই প্রতিটি রাত কেটে যায় "আমি" টার। আমিটা হলো আমাদের গল্প মূখ্য চরিত্রের অধিকারী -গল্পের নায়ক সুহাস। এভাবেই কেটে যায় তার প্রতিটি রাত।

আবার, খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায়। ভোরের শিশির ভেজা মাঠে পা ডুবিয়ে শীতল হওয়াকে আত্মসাৎ করা, নিস্তব্ধ প্রস্তরখন্ডের আড়ালে বসে নদীর কলতানকে আত্মস্থ করা আর নীরবে নিভৃতে পাখিদের কলরবমুখর ধ্বনিকে অনুভব করার মাঝেই কেটে যায় সুহাসের' এর রাঙা সকাল। অতঃপর দিনের বাকিটা সময় কেটে যায় নানা আয়োজনে। ক্লাসের পর আবার টিউশনি-তে যেতে হয়। মধ্যবিত্তের সংসার; বাবা অবসর নিয়েছে অনেক দিন আগে। সামান্য টাকায় সংসার প্রায় অচল। তবুও থমকে নেই সুহাস। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ছুটে চলেছে পরিবারের দু-মুঠো সুখের ভীড়ে। সুহাস (বাসাই) তে সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করছে - পড়াশোনা প্রায়ই শেষের দিকে একটা সেমিস্টার বাকি আছে। তার প্রখর মস্তিষ্কে পড়াশোনা এক অনবদ্য শক্তি। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের চাওয়া পাওয়াকে পূর্ণতা দিতে ছুটে চলেছে সুহাস। বাবা-মায়ের স্বপ্নের প্রতিটি মুকুল ছুঁতে আপ্রাণ চেষ্টা তার।
বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরনের জন্য আজ সে স্মৃতির শহর ছেড়ে বহুদুর গিয়ে পড়াশোনা করছে। বাড়িতে আছে অসুস্থ বাবা, মা ও আদরের ছোট বোন। সুহাস পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট্ট একটা চাকরি করে। টিউশনি লজিন করে নিজে পড়াশোনা করে আর চাকরির টাকা বাড়িতে পাঠায়। কিন্তু ওই কয়টা টাকায় কিভাবে চলে তার পরিবার। তবুও সে থেমে নেই।
ছোট বোন এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে ফরম ফিলাপের জন্য টাকা লাগবে কিন্তু সাহস করে ভাইকে বলতে পারছে না,অন্যদিকে তার বাবাও অনেক অসুস্থ।
সুহাসের ফোন-

- হ্যালো মা! তুমি কেমন আছো?
- আলহামদুলিল্লাহ বাবা আমি ভালো আছি।
- তুই কেমন আছো?
- তোমরা ভালো আছো জেনেই আমি ভালো আছি।
- বাবা, তোকে একটা কথা বলতাম!
- জ্বী মা বলো। বাবা শান্তার পরীক্ষার ফরম ফিলাপের তারিখ এসে গেছে। কালকের ভিতরে ফরম ফিলাপ না করলে শান্তাকে আর পরীক্ষা দিতে দিবে না।
- আচ্ছা ঠিক আছে মা। শান্তাকে চিন্তা করতে না করো আমি কাল সকালের ভিতরেই টাকা পাঠিয়ে দিবো।
- তোর অনেক কষ্ট হইতে আছে বাবা। আমি আর সইতে পারি না বাবা। এর থেকে আমার মরন হলে ভালো হতো।
- এইসব তুমি কি আবোল-তাবোল বলতে আছো মা। একদিন ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন ভোর আসবে আমাদের জীবনে। বাবা কেমন আছে মা?
- তোর বাবা আর কি-রকম থাকবে! যখন ঔষধ খায় তখন ভালো। তবে বুকের ব্যাথাটা একটু বাড়ছে।
- তুমি টেনশন কইরো না মা। আমি আগামী মাসে বেতন পেয়ে বাড়ি আসতে আছি। তখন বাবাকে ঢাকা নিয়ে এসে ভালো ডাক্তার দেখাবো।

ফোনটা রেখে দেয় সুহাস। দু'চোখ দিয়ে অঝড়ে টলটল করে পানি পড়তে আছে। কি করবে সুহাস?
সুহাসের মালিকটা খুব ভালো একজন মানুষ। সে সুহাসের পারিবারিক অবস্থার বিষয়ে সব জানে। কিছু টাকা দিয়ে সুহাসকে দেশের বাড়ি পাঠায়। সুহাসের দেশের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায়। সুহাস নদীপথে বাড়ি চলে যায়,গিয়ে বাবাকে বলে -

- বাবা তুমি আমার সাথে ঢাকা চলো। ঢাকা গিয়ে তোমাকে বড় ডাক্তার দেখাবো। তুমি তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।
- নারে বাবা। আমি ঠিক আছি আমার ঢাকা যেতে হবে না। তুই আসছো এতেই আমি ভালো হয়ে গেছি।

কিছুতেই সুহাসের বাবা ঢাকা গেলো না। সে তো জানে তার ছেলের পকেটে টাকা নেই। কি দিয়ে সে বড় ডাক্তার দেখাবে।
সুহাস ফিরে গেল কর্মস্থলে। গিয়ে মালিকের কাছে আরেকটা পার্টটাইম জবের কথা বলতে মালিক তার বেতন কিছু বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাতে কি হবে?
কিছুদিন পরে বাড়ি থেকে নাইমের ফোন।
নাইম সুহাসের চাচাতো ভাই।

- সুহাস কই তুই?
- আমি তো ক্যাম্পাস থেকে বের হলাম মাত্র। কাজে যাবো এখন।
- ভারাক্রান্ত কন্ঠে নাইম বলো উঠলো - সুহাস তুই তাড়াতাড়ি আয় চাচা স্ট্রোক করেছে। আমরা তাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাইতে আছি। তুই তাড়াতাড়ি আয় চাচি অনেক কান্না করতে আছে।

তাড়াতাড়ি ফিরে আসলো সুহাস। ডাক্তারের কাছে গেলো ডাক্তার বললো আপনার বাবার ফুসফুসে ক্ষত। অতিদ্রুত একটা অপারেশন করতে হবে অনেক টাকা লাগবে। আপনি টাকা দিন আমরা অপারেশনের ব্যাবস্তা করি।
এত টাকা কোথায় পাবে সুহাস? -
সিনথিয়ার কাছে হাত পাততেও নারাজ হলো না। সিনথিয়া সুহাসের ভালোবাসার মানুষ। মনে মনে সে চিন্তা করে মেয়েটার কাছ থেকে হাত পেতে অনেক টাকা এনেছি। এখন টাকা চাইতে নিজেরও লজ্জা করে। আর যাই হোক, সিনথি  নিশ্চয়ই আমাকে বুঝতে পারবে; এই বিপদের সময় ও একটা না একটা ব্যাবস্থা করবেই। টাকা ও ঠিকই দিলো।
কিন্তু সুহাস পারবে কি তার বাবাকে বাঁচাতে?
অপারেশন থিয়েটার রুম থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললো - দুঃখিত আপনার বাবাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। কথাটা শুনে সুহাস আর সুহাসের মাঝে নেই। মেঝেতে শুয়ে পড়লো সুহাস। আর বলতে থাকে বাবা আমি হেরে গেলাম। দারিদ্রতার কাছে আমি হেরে গেলাম। পারিনি তোমাকে বাঁচাতে বাবা। আমায় ক্ষমা করে দিও তুমি। সুহাসের মা এসে বলে বাবা তুই হারিস নি। তুই ভেঙ্গে পরিস না বাবা।  না, মা আমি ঠিক আছি। কেটে যায় কিছুদিন।
শুনতে পায় সিনথিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে।
এখন কি করবে সুহাস?
সবই কি নিয়তির খেলা!
রাতের অন্ধকারে সুহাস একা একা হাঁটছে আর ভাবছে -

দারিদ্রতা বড্ড সাদাকালো করে দেয় জীবনটাকে। মধ্যবিত্তের ছকের ভেতর থেকে বেরুতে পারিনি আমিও,তাইত বাবাকে বাঁচাতে পারিনি আমি, ভালোবাসার সিনথিকেও বিয়ে করতে পারলাম না। সবই কি আমার ভাগ্যের দোষ! নাকি দারিদ্রতা? নাকি আমি নিম্নমধ্যবিও সেজন্য। নানা প্রশ্ন ঘিরে আসছে। মা চাকরির কথা তুললে নিরবই ছিলাম আমি। ছকের জীবনটায় বাধা পরে গেছি আমরা, এই জীবনটাতেই সুখ খুঁজে নিতে চাই। আমি যে খুব অসুখি তা না, সুখেই আছি আমি। চারপাশের প্রাপ্তির খাতার দশমিক অংশটাও সুখ দিয়ে যায় আমাকে। অতৃপ্তির সুখ বিস্মিত করে,অবাক হয়ে ভাবি সুখটা আমাদের মাঝেই কত সহজে লুকিয়ে থাকে। শুধু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তা চোখে পড়েনা, আমরা ফেলতেই চাইনা। আমরা তুলনায় আটকে থাকি,সুখের তুলনাটা খুব সহজেই করে ফেলি, কিন্তু দু:খটা? কষ্ট পাওয়ার শত কারণের মাঝে সেই কষ্টে হাসার কারণ থাকে সহস্রাধিক। ভীষন সুখি মানুষ আমি, সুখ আমাকে একটু বেশীই ভালবাসে,তাইত আলিঙ্গন করে নেয় আমাকে,কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে প্রিয় বাবাকে, ভালোবাসার মানুষটিকে- এত সুখ আমি কিভাবে রাখবো। মৃদু হাসি আমি। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, তার সকল আলো দিয়ে আধারে রেখে যাচ্ছে আমাদের,আমাকে। আচ্ছা, রাতটা কেন আসে? সুখের খাতার সাদা পাতা দেখতে,নাকি আদিমতার নেশাটা লুকিয়ে দিতে? হয়ত কোন চাঁপা আর্তনাদ কেই পথ খুঁজে দিয়ে যায় লাল সূর্য। রাতটা বড় নি:সঙ্গ কাটে আমার। একমাত্র রাতেই আমার আমিটার সাথে পরিচিত হই আমি। আজ রাতটা শুধু আমার জন্যে। চাপা আর্তনাদ কে বালিশ চাপা দিয়েই ঘুমোতে যাব আমি। হয়ত ঘুমাতে পারব,অথবা বালিশে কোন বর্ষার দমকা নামবে। আসলে আমরা অনিশ্চয়তার মাঝে বাস করি। এই অনিশ্চয়তার জন্যেই হয়ত প্রাপ্তির সুখটা এত দামী। একজন মধ্যবিও পরিবারের সন্তান বলেই আজ দারিদ্রতার কাছে আমি হেরে গেলাম। অতি সাধারণ সাদামাটা আমি যে এই অনিশ্চয়তার সম্ভাব্যতার ভগ্নাংশে বেঁচে থাকি।
কি করবো আমি? কি করার আছে আমার!
আমি যে মধ্যবিও!
হ্যাঁ আমি নিম্নমধ্যবিত্ত।
এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০

বটুক বাবুর গল্প || দেবব্রত রায় || গল্প

বটুক বাবুর গল্প
দেবব্রত রায় 

       
                    এই যে কেউ কেউ চক্ষুষ্মান হলেই, ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ,ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ করে কোশ্ন করতেই থাকেন, কোবতে-টোবতে ক্যাঁও ৯খেন এবং কখনো কখনো  উত্তুর না পেয়ে জবরদস্তি উত্তরিও-টিও ঘেঁটে ঘটিঘঙ হয়ে তিনি যে কোথায়-কোথায়, কতটা ফাটেন তার জমা জলে ডেঙ্গি মশার পোষ্যাবাদ দেখেই সেটা বেশ পরিমেয় ! আসলে,আমি যে পত্রিকাটির জন্য লেখালেখি করি....
কী বললেন, আমার লেখা কস্মিনকালেও আপনার চোখে পড়েনি! আহা! ছাপা না-হলে তা পড়বে কীভাবে ! তবে, লেখা ছাপুক, না- ছাপুক আমি তো মশায় ওই  ই-ঈ পত্রিকার জন্যই লিখি তাই, বলছিলাম,আর-কি !  যাইহোক, ছাপা হোক বা,না-হোক,কবিতা লিখে আমার খুব আরাম হয় , ঠিক যেন বায়ু নিঃসরণের মতোই ! কারণ ,বাড়িতে যাই-ই হোক আর, বাইরেও জল-স্থল যাই খাইনা কেন, গ্যাস-অম্বল, বুক আইঢাই, অরুচি-অজীর্ণ সব একেবারে পয়সাআলা আত্মীয়ের জ্ঞাতিগুষ্টি-র মতোই, আঁকড়ে ধরে মশাই !
এই তো সেদিন ছেলের ব্যাকরণ মুকুলম বইটাতে সারাদিন এঁটুলির মতো চিপকে থেকে বিশেষ্য-বিশেষণ-তৎসম-তদভব কতকিছু-ই টুকলুস করে আপনার সাতদুগুণ গুষ্টি উদ্ধার হেতুক একখানা কবিতা লিখলাম আর, আপনি কি না, হপ্তাখানেক পরে এসে বললেন , বাহ!বাহ! খুব ভালো হয়েছে কোবতেটা ! আপনি না কি ওটাই আপনার বউয়ের জন্মদিনে প্রেমনিবেদংমিদং করে পড়ে শুনিয়েছেন ! কী বিপদ !
তা মাশায়, বিপদই বলুন আর, সামোসাই বলুন , দুটোতেই গ্যাস হবেই হবে এবং সেই গ্যাস গ্যাস-বেলুনের মতো আমাদেরকে কোনো জায়গাতেই স্থির হতে দেয় না! যেমন ধরুন, গত তিনদিন আগের একটা কবিতায় যা-যা এবং যাদের-যাদের কথা ভেবে বকের পালকের রঙ হলুদ আর বেড়ালের গলায় তুলসী-মালা শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলাম তা কিন্তুক এই মুহূর্তে কিছুতেই আর তিনদিন পূর্বের বাসি আমানি-র অবস্থায় বিলং করে না! অর্থাৎ,....ভোট শব্দটির মতোই ! ইভিএমে বাটন টেপার আগে তার গুরুত্ব এক আর, বাটন টেপার পরেই আরেক  !!!!!
ই-ঈ পত্রিকার সম্পাদিকা খুবই উজ্জ্বল এবং চৌম্বকীয় উচ্ছল ! তাকে ঘিরে আট-দশটি গ্রহ-উপগ্রহ তার হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর, না তে না মিলিয়ে চব্বিশঘণ্টা কীর্তন-দলের মতো ঘুরতেই থাকে ( তবে, টয়লেট এবং স্নানাগারের গেট অব্দিই তেনাদের কক্ষপথ  ) ! সেইসব বুধ শুক্কুদের পাশ কাটিয়ে আমার পরাণ কি আরাম ঢুলুঢুলু বুলবুলিটির পাশে আমি আজও  ঘেঁষতে পারিনি আর, তিনিও তৃষা হরিয়ে প্রাণ ভরিয়ে আমাকেও তার কাছে সামান্য ধুমকেতুর মতোও ডেকে নেননি অথচ, আমার বড়ো মামা জবাকুসুমসঙ্কাশ বাবুকেও একেবারে তুরগ-হারান  হারিয়ে তিনি প্রায় চব্বিশঘণ্টা-ই তার পরম উষ্ণতায় আমাকে উৎসারিত করে রেখেছেন ! যাইহোক,সেইসব কাফ-কাসুন্দি আপাতত,বরং মৃৎ-ভণ্ডে জমে ক্ষীর হোক !
যাইহোক, আসল কথাটা হলো গিয়ে এরকমই একটি আমজামকাঁঠালের কলম-বিনুনি কবিতায় পরপর দু-দুখানি সুখানীচঃ প্রেমপত্র লিখে হারি কি পড়ি করে সব গ্রহ-উপগ্রহের টেবিল-চেয়ারে ঠোক্কর খেতে খেতে সেই চুম্বনীয়ার সামনে গিয়ে সম্পূর্ণ সমাহিত হবার আগেই,পত্রমুকুল দুটি তার করকমলে ধরা কয়েনটির সম্মুখে আমার সমাধিফলকের মতো ঠুকে দিয়েই মুষ্টিমেয় ধোঁয়া আর, ছাই হয়ে বেরিয়ে এলাম! লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কলমের চেয়ে তার কয়েনের শক্তি-ই বেশি ! হেড পড়লে ইয়েস, টেল পড়লে  নো!
দিন পনেরোর মাথায় আমার একই অঙ্গে করোনারি থ্রম্বোসিস, সেরিব্রাল অ্যাটাক এবং কোভিড-১৯  হলেও বোধহয়, এতটা আঁতকে উঠতাম না !!!!!!
দেখলুম, সেই প্রেম পত্রের-ই একখানি প্রকাশিত হয়েছে পঁচিশের বৈশাখের রবীন্দ্র-সংখ্যায়, কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে!! আশংকায় আছি !
 সামনে এগারো-ই জৈষ্ঠ্য । জানি না , কী হবে  ¡¡¡¡¡¡¡

রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

অণুগল্প || অবিচার || দীপক মজুমদার

অণুগল্প 
অবিচার || দীপক মজুমদার 



সুজন মজুমদার ।  জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরডাঙ্গাপাড়া গ্রামের এক  হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে।বাবা ভাগচাষী। ওর একটাই স্বপ্ন ছিল পড়াশুনা করে একদিন  শিক্ষক হবে সে। 2000-এ HS  পাশ করতে করতে অভাবের সংসারে একমাত্র রোজগারে বাবা যখন প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যায় তখন  ওর মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।তবুও অদম্য জেদ নিয়ে সে পড়াশুনা চালিয়ে যায় । খুব ভাল মার্কস নিয়ে সে একে একে  BA অনার্স , MA এবং শেষে BEd ট্রেনিংও কমপ্লিট করে।কিন্তু  নিজের পড়াশুনার জন্য শেষ আশ্রয়টুকু বিক্রি করে দিতে হয়।পড়াশুনার পাঠ শেষ করার পর শুরু হয়  SSC -র প্রস্তুতি। তাও এর ওর বাড়ীতে থেকে ।তখন  ওর পকেটে একটা কানাকড়িও ছিলনা । ছিলনা  মাথাগোঁজার জায়গা বা দুবেলা খাবার । বন্ধুদের  সামান্য সাহায্য ছিল ওর ভরসা । ভেবেছিল চাকরী পেলে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ওর স্বপ্ন  অধরা থেকে গেল । চাকরীতো পেলই না বরং ভাগ্যে জুটল কঠিন নির্মম বাস্তব। 2011-এ SSC-TET পাশ করে কম্বাইনড্ মেরিট লিষ্টে পিজি ক্যাটেগুরিতে ভাল রেন্ক করা সত্ত্বেও ওর চাকরী হলনা।অথচ ওর পরে রেন্ক করা অনেকেরই চাকরী হয়ে গেল । বঞ্চিত হল সুজন ।ফলে সে মনের দিক থেকে আরও ভেঙ্গে পড়ল ।এভাবেই অতিরিক্ত  দূঃশ্চিন্তায় কিছুদিন পর  যথারীতি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। দিনের পর দিন পাগলের মত  অনাহারে অসহায় ভাবে কখনো স্কুলের বারান্দায় কখনো বা খোলা আকাশের নীচে সে রাত কাটাতে থাকে। ও যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে  প্রায় বিড়বিড় করে কিছু বলে।ওর প্রতি যে অবিচার হয়েছে ঈশ্বরের কাছে  হয়ত বা তারই বিচার চায় ।রাষ্ট্র ওর সাথে একরকমের প্রতারণা করল বলা চলে। রাষ্ট্রের মদতে  চাকরী দেওয়ার নামে  যারা চাকরী বিক্রি করে তাদের কাছে ওর মেধা হেরে গেল। আজ ওর থেকে কম যোগ্যরা মেধাতালিকা কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শিক্ষকতা করছে ।এটি হল আজকের দিনে শিক্ষার মূল্যায়ণের নমুনা! হতভাগা শিক্ষা ব্যবস্থা! একটা ছেলে উচ্চশিক্ষিত হতে গিয়ে সব হারাল।বাবা-মা-ভিটে-বাটি-বাঁচার স্বপ্ন .....! একজন পরাজিত সৈনিকের মত সে আজ মৃত্যুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে ।

রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২০

অবুঝ দিনের গল্প || তাসফীর ইসলাম (ইমরান) || বাংলাদেশের গল্প

অবুঝ দিনের গল্প
তাসফীর ইসলাম (ইমরান)




বিঃ দ্রঃ- বেশ কয়েক বছর আগের (সৃজনী বিদ্যানিকেতন পবিপ্রবি স্কুল & কলেজ) শিক্ষার্থীর বাস্তবতার কাহিনী অবলম্বনে আমার এই কাল্পনিক গল্প- ভুল ত্রুটি হলে মার্জিত করবেন।
-সময়টা ছিলো ২০১৭ সাল।
সকাল থেকেই অনেক বৃষ্টি। মেঘাচ্ছন্ন আকাশটাকে কুয়াশায় যেন চারদিক থেকে ডেকে রেখেছে। আজ কিভাবে কলেজে যাবো?
কলেজের সময়টাও যে হয়ে গেছে। ৮ টায় ক্লাস শুরু। ৭ টা ৩০ এর আগে যদি না যেতে পারি তাহলে তো গেট বন্ধ করে দিবে আর ভিতরে যেতে পারবো না। যাইহোক, কলেজ তো ফাঁকি দেয়া যাবে না। সকাল থেকে এই ভাবনা নিয়ে বিছানায় বসে আছেন আমাদের এই গল্পের নায়ক আফরান জিয়াউল (অনন্ত)। অনন্ত মধ্যবিও পরিবারের সন্তান। নিজের স্বপ্ন পূরনের জন্য পড়াশুনা করতে নিজের স্মৃতির শহর থেকে অন্য শহরে এসেছে। অনন্ত বরিশালের সেরা ও অন্যতম স্কুল এন্ড কলেজ সৃজনী বিদ্যানিকেতনের ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাএ। বিছানা থেকে উঠেই দাঁত ব্রাশ করে কিছু না খেয়েই রওনা দিলো কলেজের উদ্দেশ্য। কি খাবে? ব্যাচেলর মানুষ হোটেলের খাবার ছাড়া তো তাঁদের পেটে অন্য কিছু যায় না। তাড়াহুড়া করে বৃষ্টির মধ্যে ধেয়ে চলেছে কলেজের দিকে। গেটের কাছে যেতেই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা। ধাক্কাটা ও অবশ্য ইচ্ছা করে দেয় নি। তবুও মেয়েটার কাছে সরি বলে। সরি বলতেই মেয়েটা বলে উঠে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ধাক্কা দিতে ইচ্ছা করে আর বলেন সরি! সব ছেলেরাই এক রকম। অসভ্য যওসব।  অনন্ত কিছু না বলে চুপ হয়ে ক্লাসে চলে যায়। ক্লাসে গিয়ে আনমনে এক কোনায় বসে থাকে। আর চিন্তা করে আমি কি ইচ্ছা করে মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়েছি? মেয়েটি কি আসলেই সুন্দর?  মনের মধ্যে আজেবাজে চিন্তা ঘুরপাক করতে আছে। জানতে হবে মেয়েটার নাম কি,কোন ক্লাসে পরে। হঠাৎ তার বন্ধুু এসে বললো কিরে অনন্ত তোর মন খারাপ কলেজে আসার পর থেকে তোকে দেখছি আনমনা, চুপচাপ কি হয়েছে?
অনন্তঃ বলিস না, আমি অসভ্য!
বন্ধুুঃ কি আবোল-তাবোল বলো? কে বলছে তুই অসভ্য?
অনন্তঃ একটা মেয়ে।
বন্ধুুঃ নাম কি? পরে কিসে?
অনন্তঃ জানিনা কিছু। তবে, জানি আমাদের স্কুল শাখায় পরে।
বন্ধুুঃ আচ্ছা, টিফিন সময়ে দেখলে আমাকে দেখিয়ে দিস। নাম, ঠিকানা, সব তথ্য তোকে এনে দিবো।
অনন্তঃ আচ্ছা ঠিক আছে।
এই বলে শেষ হয় দুই বন্ধুুর আলাপন। টিফিনের সময় চলে এলো। ঘন্টা পরতেই অনন্ত দৌড়ে চলে যায় মাঠের দিকে। ঐ মাঠের ভিতর দিয়েই তো মেয়েটা বাহিরে বের হবে। কিন্তু মেয়েটার তো কোনো দেখা নেই। টিফিন টাইম শেষ হয়ে ক্লাস বসানোর ঘন্টা পরে গেল। কিন্তু সেই সুন্দরী মেয়েটার সাথে অনন্তের দেখা মিললো না। সেদিনের মতো কলেজ ছুটি হয়ে গেল। অনন্ত আর তার সেই বন্ধুু আস্তে আস্তে বাসার দিকে ফিরে যাচ্ছে।  ও আচ্ছা, বন্ধুুর নামটাই তো বলা হলো না। বন্ধুুর নাম সাইফুল। সাইফুলও তার স্বপ্ন পূরনের জন্য তার স্মৃতির শহর ছেড়ে এই ব্যাস্তনগরীতে আসছে পড়াশোনা করতে। তাই দুই বন্ধুর মধ্যে খুব ভালো মিল। দুইজন একসাথেই থাকে। দুজনের মনের খবরই দুজন জানে। বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পরে অনন্ত। আবার বিকালে যে তার টিউশনি, প্রাইভেট আছে। মধ্যবিও অনন্তের টিউশনি করেই  তো নিজেকে চলতে হয়। সেদিন রাতে দুই বন্ধুু পড়াশোনা রেখে ভালোবাসার কথা বলে। কাকে বলে ভালোবাসা? কেন হয় ভালোবাসা? নানা অহেতুক চিন্তা করে দুজন ঘুমিয়ে পরে। সকাল সকাল আবার কলেজে যেতে হবে। তাদের প্রতিদিনের সবকিছুই তো নিয়ম মাফিক রুটিন করা। পরেরদিন কলেজে গিয়েই আবার সেই মেয়েটাকে প্রথম খোঁজ করলো। কিন্তু আজও মেয়েটার দেখা মিললো না। এভাবে ৩/৪ দিন কেটে যায়। কোনো খবর নেই মেয়েটার। নাম ঠিকানাও অজানা। একদিন টিফিন সময়ে অনন্তেরা মাঠে বল খেলে হঠাৎ বল গিয়ে সেই মেয়েটার পায়ের সামনে পরে। বল নিয়ে আসতে যায় অনন্ত। সামনে গিয়ে তাকাতেই দেখে সেই সুন্দরী। অনন্ত দেখে চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ  বলে ওঠে তোমার নাম কি? তোমাকে অনেক খোঁজ করছি। মেয়েটা কিছু না বলে শুধু মুচকি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। পাশ থেকে একটা মেয়ে বলে উঠলো মেঘবালিকা তুই বলটা দিয়ে দিলি। অনন্ত শুনে যায় নাম মেঘবালিকা।
এখন, আপনাদের বুঝতে তো কোনো অসুবিধা নেই, মেঘবালিকা কে? হ্যাঁ বলছি মেঘবালিকা হচ্ছে এই গল্পের উন্মাদ নায়ক অনন্তের অবুঝ নায়িকা।
কেন জানি সেদিনের পর থেকে মুচকি হাসিটার উপর ক্রাশ খেয়ে মেঘবালিকার প্রেমে পরে যায় অনন্ত। মেয়েটা তখন দশম শ্রেনিতে পরে। সব তথ্য জেনে নেয় অনন্ত। দিন দিন মায়াটা বাড়তে থাকে। কিন্তু মেঘবালিকাকে সে বলে উঠতে পারে না সে তাকে ভালোবাসে। শুধু টিফিন সময়ে মাঠের ভিতরে দাঁরিয়ে থেকে মেঘবালিকাকে একনজর দেখে। এভাবে কেটে যায় কয়েকমাস। মেঘবালিকা কিছুটা বুঝতে পারে যে অনন্ত তাকে পছন্দ করে। তাই মেঘবালিকাও প্রতিদিন টিফিন সময়ে মাঠের এক কোনায় এসে দাঁড়াতো যাতে অনন্ত তাকে একনজর হলেও দেখতে পায়। অনন্ত ঠিক করে একটা চিঠি দিবে মেঘবালিকাকে। খুব যতনে একটা চিঠি লিখে -
প্রিয় মেঘবালিকা,
কেমন আছো তুমি?
আমার মনের ভিতরে জমিয়ে রাখা কিছু না বলা কথা তোমাকে বলছি।
আজ শেষ বিকেলের পাহাড় ছুঁয়ে ছুটে আসা দমকা হাওয়ার জড়িয়ে দেয়া মেঘের মতো ছোট্ট একটি ঘটনা আমার সব দ্বিধাকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো! বুঝলাম, মহাকাল যে হাস্যকর ক্ষুদ্র সময়কে “জীবন” বলে আমাকে দান করেছে। সেই জীবনে তুমি-ই আমার একমাত্র মানুষটি, যার পাঁচটি আঙ্গুলের শরণার্থী আমার পাঁচটি আঙ্গুল, যার বুকের পাঁজরে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ আমার ঘ্রাণশক্তির একমাত্র গন্তব্য। যার এলোমেলো চুলে আমি-ই হারিয়ে যাবো। আর আমি হারিয়ে যাবো ভালবাসতে বাসতে!!!
যার দুটো অদ্ভুত সুন্দর মধুভরা ঠোঁটের উষ্ণতায় আর তাই জীবনটা আজ ঠিক সেই অদ্ভুত ফুলগুলোর মতই সুন্দর, যা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। আর তুমি আমায় পরম মততায় আলতো জড়িয়ে ধরে তোমার ঠোঁটের সেই খুব মিষ্টি ছোঁয়ায় ভরে দিয়েছিলে সেই পুরোটা পাহাড়ি বিকেল। আর তখন সেই দূর পাহাড়ের দুষ্ট বাতাস এসে আমাকে চুপি চুপি কানে কানে বলে দিলো, “তোমার বাম পাঁজরের হারেই আমার এই দেহটি তৈরি, যাকে স্বামী বলে!”
আজ প্রতিটি ক্ষণ হৃদয়ে যে পরম সত্য অনুভব করলাম- আমি শুধুই তোমার। সে শেষ ঠিকানা আমি পেলাম। কখনই তা মিথ্যা হতে দিওনা, কখনই ছেড়না আর। আজ আমার ভীষণ সুখী হাত দু’টো, আর দৃষ্টি ঘুরিও না ঐ অদ্ভুত সুন্দর চোখজোড়ার, সেখানে অপলক তাকিয়ে বৃষ্টির সাথে আমিও আনন্দ হয়ে ঝরেছিলাম!
তোমাকে ভালবাসি প্রচন্ড- এরচেয়ে কোনও সত্য আপাতত আর জানিনা!!
ভালবাসি তোমায়!
জীবনের থেকেও অনেক বেশি।
ইতি
সেই অসভ্য ছেলেটি অনন্ত।
এখন কিভাবে চিঠিটা মেঘবালিকার কাছে পাঠাবে। আর পাঠানোর পরে যদি মেঘবালিকা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয় নানা দূরশ্চিন্তা ঘিরে ফেলছে অনন্তকে।
এদিকে অনন্তের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসছে। কি করবে সে বুঝতে পারছে না। চিন্তা করে পরীক্ষার পরেই ভালো একটা জায়গায় ভর্তি হয়ে মেঘবালিকা সবকিছু জানাবো। পরীক্ষা দেয় অনন্ত পরীক্ষাও খুব ভালো হয়। ভর্তি পরীক্ষা দেবার পরে ভালো একটা ভার্সিটি চান্স পায়। হাতে সেই যত্নে পোষা পুরনো চিঠিটাকে নিয়ে ছুটে চলে যায় ক্যাম্পাসে আজ সবকিছু প্রানখুলে মেঘবালিকা বলবে। গিয়ে দেখতে পায় মেঘবালিকা আর তার বান্ধবী কথা বলছে। দুজনের কথাই শুনতে পায় অনন্ত। অনন্তকে নিয়েই কথা হতে ছিল। মেঘবালিকাকে তার বান্ধবী বলতে ছিলো আজ অনন্ত ভাইকে ক্যাম্পাসে দেখছি। তোর সাথে দেখা হয়েছিল। অনন্ত ভাই মনে হয় তোকে ভালোবাসতো। মেঘবালিকা মৃদু স্বরে বলে উঠলো শুধু অনন্ত না আমিও তাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু বলে উঠতে পারি নি। কারন, ভালোবাসা আমার জন্য না। কেউ বুঝবে না আমাকে। মাঝপথে অনন্তের জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। আমি না হয় অভিমানের দেওয়ালটাকে পুষে রেখে বাঁচতে পারবো। কিন্তু সে তো পারবে না। সে তো আমায় বড্ড ভালোবাসতে। বান্ধবী বলে উঠলো আজ তাহলে তার সাথে দেখা কর একটু সে তো চলে যাবে আর আসবে না।
অনন্ত কথা গুলো শোনার পরে চলে যাবার সময় হঠাৎ মেঘবালিকার সাথে দেখা হয়।
কিছু কথা হয়,
কেমন আছো মেঘবালিকা?
আমি খুব ভালো আছি।
আপনি?
অনন্ত বলে উঠে আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করতাম। কিন্তু মেঘবালিকা বলে উঠলো ওগুলো আবেগ ছিলো। আমি সবকিছু মজা মনে করতাম।
-পরে অনন্ত গাড়িটা নিয়ে চলে গেল দূরে, অনেক দূরে......ওরা চলে যেতেই মেঘবালিকার বুকটা হাহাকার করে উঠল, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হলো- "আমি মিথ্যে বলেছি অনন্ত। আমিও তোমাকে জীবনের থেকে বেশি ভালোবাসি। তোমার ধারণা ঠিক অনন্ত , আমি মানসিক ভাবে আসলেই দুর্বল। আমি ভালো নেই অনন্ত , আমি ভালো নেই।
জানি না কেন, এরপর আমি আর সামনে দাঁড়ানো অনন্ত মুখটা দেখতে পাব না। শুধু আমার নিজেকে দেখতে পাব। যেন চারদিকে আয়না। আয়না নাকি প্রতারণা করে না—যা সামনে থাকে, তা-ই ফুটিয়ে তোলে। নিজের অবয়ব হারিয়ে আমি তাকে খুঁজে ফিরব যেন কতকাল। জানি না কোন ভঙ্গি অদেখা মুখটাতে মানাবে। সেই ভঙ্গিটা আমি পাগলের মতো খুঁজে ফিরব। খুঁজতেই থাকব। সেই পর্যন্ত অনন্ত তুমি ভালো থেকো।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

সন্দেশ || দেবাশিষ সরখেল || গল্প

সন্দেশ
দেবাশিষ সরখেল


দেশের নাম সন্দেশ। সেই দেশে এক মুখোশহীন মানুষ ঢুকে পড়েছে। এ্যাতো টাইট সিকিউরিটি সিস্টেম থাকতে ব্যাটা ঢুকলো কি করে। রাজরাজেশ্বর ভেবে পান না।
এদেশে মানুষ মানে মুখোশ, মুখোশের আড়ালে সব মানুষ।
এও অতি গোপন সূত্রে শোনা যাচ্ছে, বেশ কিছু বেয়াদপ মূখোশ ফেলে গান শুনছে, প্রেম, স্নেহ দাম্পত্যের ব্যাপারে ঐ আহাম্মকের লেকচারবাজী দেখছে। সংখ্যা করোনা সঙ্ক্রমনের মতো বাড়তির দিকে। সংক্রমণই বটে।
অবশেষে সেই যাদুকরের কাছে রাজরাজেশ্বর নিজে হাজির।
-দেখি তোমার ক্ষমতা, আমায় মুখোশমুক্ত করো।
যাদুকর বলেন, এ তো রক্তমাংস, অস্থিমজ্জাময় খোলা যাবে না।
বলেন, তোমার পে-টিএম বলো, যত চাও দিচ্ছি কিম্বা ক্যাশ নিলে ক্যাশ, ঝামেলা থাকবে না।
যাদুকর নিরুত্তর। একটুও ভয় না পেয়ে রহস্যের হাসি হাসে।
ক্ষোভে, অভিমানে গভীর নিশীথে রাজরাজেশ্বর সূর্যোকরো হল প্রাসাদের গায়ে সজোরে মাথা ঠোকেন, মুখোশ ভেঙে চৌচির।
খণ্ড মুকুটের ওপর এক কুকুর ঠ্যাং তোলে।

 
দেবাশিষ সরখেল
রঘুনাথপুর
পুরুলিয়া (পশ্চিমবঙ্গ), সূচক – ৭২৩১৩৩
ফোন – ৯৯৩২৬৬৭৮৮১

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২০

রিক্সাওয়ালা || প্রশান্ত দে || গল্প

রিক্সাওয়ালা
প্রশান্ত দে



ঝড়ে চারিদিক বিপর্যস্ত।রাত হলেই এলাকা জুড়ে নেমে আসছে অন্ধকার।রাস্তার ধারে ছায়া প্রদায়ী মহীরুহ সমুলে উৎপাটিত হয়েছে।তাও আবার রাস্তার উপর।কোথাও বৈদ্যুতিক খুঁটির কোমর ভেঙেছে আরার কোথাও ধ্বজা।রাস্তার উপর বা পাশে ইলেকট্রিক তার কুন্ডলীপাঁকিয়ে পড়ে আছে।রাস্তার ধার বা মাঝ বরাবর ভয়ে ভয়ে সবাই রাস্তা পারাপার করছে।একদিন দু-দিন করতে করতে আজ সাতদিন হয়ে গেল লাইট জ্বলে নাই ,পাখা ঘুরে নাই ,মোবাইলে চার্জ নাই ।এমনকি চার্জ নাই টটোর ব্যাটারিতে।অলিগলিতে কোনো টোটো দেখা যাচ্ছে নাই।তেমন দেখা যাচ্ছে নাই বড়ো রাস্তাতেও ।বাজার হাট রেলস্টেশন বাসস্টপ  যেতে হচ্ছে পায়ে হেঁটেই।এতে মানুষের চোখে মুখে দিনে দিনে চিন্তার ছাপ বাড়ছে।
সবার মুখেই একটাই কথা ,"আজ সাতদিন হয়ে গেল কবে যে স্বাভাবিক হবে!আর এখন রিক্সাওয়ালা গুলোও নাই যে দশটাকার রাস্তা কুড়িটাকাতেও যাব।'
টটো ধরার আশা নিয়ে শাঁখারিপাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে অনাদি শাঁখারি।পরিস্থিতি বুঝে আগে ভাগেই বেরিয়ে পড়েছে।টোটো পেলে টটো, না হলে পায়ে হেঁটেই স্টেশনে যাবে।রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটা টোটো আসছে দেখে তাঁর আনন্দে মনটা একটু দোলা দিয়ে উঠল।
টটোটা কাছে আসতেই বলল,"এই টটো ,স্টেশন যাবে?
--হুম
এখন টটোগুলো ধাকে সা ভাড়া হাঁকাচ্ছে।কারন জিজ্ঞাসা করলে বলছে,"দূরে গিয়ে ব্যাটারি চার্জ করে আনতে হচ্ছে।এতে একদিন এমনিই চলে যাচ্ছে।আমাদের কষ্টটা বুঝুন।"
আগের দিন চেপে ঠকতে হয়েছে তাই চাপার আগেই জিজ্ঞাসা করল,"কত?"
-পঞ্চাশ
-না ।যাও।
হেঁটেই যাবে মতলব এঁটে ফেলল।হাঁটতে যেই শুরু করেছে পথে সুভা মানে সুভাষ কাইতির সঙ্গে দেখা।মাথায় চেনা সেই গামছার পাঁগড়ী।গায়ে পুরানো রিক্সাচালানো গেঞ্জি।তবে সেই খোঁচা খোঁচা গোঁফ -দাঁড়ি নাই।মুখ পরিষ্কার।
দেখেই অনাদি বলল,"কি রে সুভা এখন তো রিক্সটা নিয়ে বেরোতে পারতিস।তা না করে মাথাটা নিচু করে হেঁটে পালাচ্ছিস।"
সুভাষ কিছু বলবেনা ভেবেছিল।কিন্তু এমন উপযাচক হয়ে বলাতে থমকে দাঁড়াল।এবং বলল,"সব শেষ হয়ে গেছে কাকা।"
--কি সব শেষ হয়ে গেছে?
--এই আমার।রিক্সটা নিয়ে দিনের পর দিন ঘর থেকে বেরিয়েছি।কোনো দিন রোজগার হয়েছে আবার কোনোদিন হয় নাই।"
---আজ তো নিয়ে আসতে পারতিস?
---আর কার জন্য করবো কাকা !সন্ধা হলে ঘরে ফিরে----"
সুভাষ বলতে পারছে নাই যে তাঁর ছেলেটা আর নাই।চোখ মুছুতে মুছতে মাথা থেকে গামছাটা খুলে গেল।
মাথাটা দেখেই  অনাদি শাঁখারি  বলল",কি হয়েছে? মাথা ন্যাড়া কেন?
সুভাষ নিজের মনকে নিঙড়াতে নিঙড়াতে বলল,"বিনা রোজগারে ঘর গেছি ।বুঝার ফুরসৎ পাইনি যে ছেলেঠাকে রোগে ধরেছে।দিন পনের আগে আমাদের সঙ্গে আড়ি করে চলে গেছে।"
"-কাঁদিস না শুভা ।কাঁদিস না।মনকে সংযত কর।রিক্সটা নিয়ে আবার আয়।কাজে থাক।"
--সেটাও নেই কাকা।অভাব অভাব।সেটাকে কাটাইয়ের দরে বিক্রি করে  ছেলের শেষ কাজটা করেছি---"
অনাদি শাঁখারি চৌমাথায় কোমর ভাঙা বৈদ্যতিক খুঁটিটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল---
আর তখনই একটা টটো সুভাষের রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার স্থানটাতে দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়েই যাচ্ছে,"স্টেশন ---স্টেশন---"

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

কনট্রাকচুয়াল' || অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় || অণুগল্প

'কনট্রাকচুয়াল'
 অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়


কোলাহল মাঝে মাঝেই নির্জনের কাছে পৌঁছে যায়। একরকম উত্যক্ত করে বলা যায়। এ যাবৎ তার জীবনকৃতির সম্মানস্বরূপ সে কি কি সম্মান, সম্বর্ধনা পেয়েছে; আরও কি কি পেতে চলেছে ইত্যাদি....। স্বভাবসিদ্ধভাবেই নির্জন,  কোলাহল থেকে একটু দূরেই থাকতে চায়। কিন্তু এ ভাবেই কোলাহল এসে নির্জনকে ধাক্কা মারে। নির্জনের কিশোরকুমারের সেই গানের কথা মনে পড়ে,  কি যেন -- ' যা চেয়েছি কেন তা পাই না ; যা পেয়েছি কেন তা  চাই না।'  এ জন্যই কি নির্জনের বন্ধু -বান্ধব খুব একটা বেশী নেই! অন্যদিকে কোলাহলের  বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে । এমন কি চোর ছ্যঁচড়, মাতালদের সঙ্গেও।
কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে চায়ের আড্ডা শেষ করে হেঁটে হেঁটেই বাড়ির  দিকে রওনা দিল নির্জন । পেছন থেকে তার নাম ধরে অচেনা গলায় কে যেন ডাকছে। দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই দ্যাখে, তার দিকে ছুটে আসছে কোলাহল। কছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, এ্যই নির্জন, আজকের 'সোনার বাংলা' কাগজটা দেখেছিস ?  নির্জন ঈষৎ বিরক্তি নিয়ে বলল, না দেখিনি। কেন?  কোলাহল অত্ত্যুৎসাহে বলল, তুই অনেক পিছিয়ে আছিস্ দেখছি। 'আন্তর্জাতিক বিনিময় চক্র' এবার আমাকে সেরা ব্যক্তিত্বের সম্মাননা দিচ্ছে..। নির্জন বলল, বাহ, খুব ভাল। অসন্তুষ্ট  কোলাহল বলল, দ্যাখ্ তুই ওই ফেসবুকের মত উত্তর দিবি না। কত বড় ঘটনা, তুই বল!  নির্জন মুখে হাসি এনে বলল, নিশ্চয়।  তুই আমাদের গর্বিত করলি । কোলাহল উৎসাহিত হয়ে একটা আন্তর্জাতিক হাসি উপহার দিল।
   দু-এক দিন পর সেই চায়ের আড্ডাতেই নির্জন ও তার বন্ধুরা শুনতে পেল কোলাহলের সম্মাননার প্রসঙ্গ। একজন আরেকজনকে বলছে, এখন যত ছেলেমেয়ে চাকরিতে ঢুকছে, তার একটা বড় অংশ কনট্রাকচুয়াল। আরেকজন বলল, হ্যাঁ, তো কি হয়েছে !  লোকটি বলল, আমাদের কোলাহলবাবুও 'কনট্রাকচুয়াল'। প্রথমটায় বুঝতে না পেরে সবাই একটু যেন থমকে গেল। তারপর একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল । একজন হাল্কা গলায় বলল, কি বললি বুঝতে পারলাম না। অন্যজন মুচকি হেসে বলল, সব কথায় কান দিতে নেই ।

বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০

চপ || দেবাশিষ সরখেল || গল্প

চপ
দেবাশিষ সরখেল


রঘু ও তাপস দু’জনেই মূলত ফুটপাতে চপ বিক্রি করে। কে আসল এবং কার ঢপের চপ, তা সময়ই বলবে। তাপসের দোকান অনেক পুরোনো, তার কিছু বাঁধা খদ্দের আছে। সে সারাদিন খুলে রাখে। তার দোকানে আড্ডা জমে। চপের সাথে চা, ফুলুরি, কুচো নিমকি ইত্যাদিও থাকে। চপ সে তিনটাকা করে নেয়। চা ইত্যাদিতে খরচ পুষিয়ে যায়। চপে লাভ কম।
এবার রঘুর চপের দাম দু’টাকা। তার দোকানে কোনো আড্ডাবাজি নেই। সারাদিন সে থাকে না। বিকেলে ঘন্টা তিনেক। তার চপের ভেতর ফুলকপি, বাদাম, কাজু ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বলেস্বাদ উত্তম। তবু প্রথমার্ধে তেমন পাত্তা পায় নি। ধীরে ধীরে ভীড় বাড়তে থাকে। চপ আমি খাই না। পেটে সয় না, তবু তার চপ নাকি প্রখ্যাত মাখন দত্তের সমতুল্য। ফলে লোভে পড়ে কিনলাম, খেলামও।
একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলাম, তোমার দু’টাকায় পুষিয়ে যায় ? বলে, না দাদা। খরচ তিন টাকা। প্রতি চপে দু’টাকা লস্‌। ওর খদ্দের আর সিকিভাগ আছে। দেখবেন অতি শিগগির ঝাঁপ বন্ধ হবে। তখন আমি দাম বাড়িয়ে চার পিস চার টাকা করব।
রঘুর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সে নির্বিকার ঠোঙায় চপ ভরছে।

দেবাশিষ সরখেল
রঘুনাথপুর
পুরুলিয়া (পশ্চিমবঙ্গ), সূচক – ৭২৩১৩৩
ফোন – ৯৯৩২৬৬৭৮৮১

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

চিঠি || প্রশান্ত দে || গল্প

চিঠি
প্রশান্ত দে




শেষবারের মতো আবর্জনা ফেলে ডাম্পিং গ্ৰাউন্ড থেকে ফিরে গেল পৌরসভার গাড়িটা।ঐ গাড়িটার প্রায় পিছন পিছন আসছিল সুমনা।কিন্তু মাঝে যানজটে আটকে গিয়ে আর আসা হয়নি।যতটুকু রাস্তা এসেছে ততটুকুই বাতাসে উড়ে যাওয়া কাগজ,প্লাস্টিক নজর করে এসেছে- যদি উড়ে যায় চিঠিটা!
মাঝে মাঝে মা-য়ের প্রতি বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলেছে ,'কি দরকার ছিল সুটকেশটা পরিষ্কার করার!"
ডাম্পিং গ্ৰাউন্ডে পৌঁছে সুমনা দিশাহারা হয়ে গেছে।এত আবর্জনা!কোনটাইবা আজকের?
আজকের খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেল,একজায়গায় একটু ধূঁয়া উঠছে।সেই জায়গাটায় আগে হাত দিয়ে খুঁজতে লাগল সুমনা।
সেই পথ দিয়েই সাইকেল চালিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল সুমনার কলেজের ইয়ারমেট দিলিপ।দিলিপ প্রথমে একটা চারচাকা গাড়ি ও এক চল্লিশ উর্ধ্ব মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল দূরথেকে।কাছে আসতেই একটু কৌতুহল নিয়ে তাকাতেই মহিলাটিকে চিনি চিনি মনে হল।কিন্তু যেভাবে হাত দিয়ে আবর্জনা ঘাটছে তাতে সুমনা বলে বিশ্বাস হল না।তবুও কাছে গিয়ে বলল,কি এমন খুঁজছেন?আপনাকে একটু সাহায্য করতে পারি?"
সুমনা খুঁজতে খুঁজতেই  মুখ তুলে দিলিপের দিকে তাকাল ।এবং দিলিপের গালের বড়ো কালো তিলটাকে দেখেই চিনে নিয়ে বলল,'আপনি দিলিপ না?'
দিলিপও বলব বলব করে বলেই ফেলল,সুমনা'
দুই ইয়ারমেটের এতদিন পরে দেখা।সুমনা চিঠির দুঃচিন্তা একটূ ভুলে গেল।
দিলিপ বলল,"কি খুঁজছিলি
-না -কিছু না
কিছু তো একটা বটে,না হলে এমন উদগ্ৰীব হয়ে খুঁজছিলি কেন?'
সুমনা বলেই ফেলল।সৌমেনের হাতে লেখা শেষ চিঠিটার কথা।
দিলিপ অবাক হয়ে বলল,'তুই এখনো সৌমেন কে ভুলিসনি?
কি করে ভুলি বল?ওই আমার প্রথম ও শেষ।
সুমনার চোখ জলে ছল্ ছল্ করে উঠেছে দেখে আর কথা না বাড়িয়ে দিলিপও তার কাজে হাত লাগাল।
এই কাজের মধ্যেই দু-জনের কথা হচ্ছে।ভালো-মন্দ বাড়ির খবর।
-তোর মেয়ে এখন কিসে পড়ছে?
-চতুর্থ শ্রেনিতে ।ভীষন জলি।সারা ঘর একাই তোলপাড় করে।
তারপর একটু সময় নিয়ে দিলিপ বলল, সেদিন যদি তুই অ্যাবরসন না করাতিস আজ তোকে এমন চিঠির জন্য খুঁজে মরতে হত না।যে ছবিটা চিঠিতে ফুটে উঠতো তা সন্তানেও কম ছিল না।'
-"কি করব বল?তোরা তো সব জানিস।সৌমেন হঠাৎ নিরুদ্দেশ হল।কলকাতা যে গেল আর ফিরলই নাই।
তারপর সমাজ---"
এই খোঁজা খুঁজির মধ্যেই সুমনার হাতটা একটা বস্তায় লাগল।মনে হল বস্তাটা একটু নড়ে উঠল।সুমনা ভয়ে মা-গো বলে পিছিয়ে গেল।
কি-হলো?বলে দিলিপ সুমনার কাছে গেল।
এবং দেখতে পেল একটা বস্তা ।মুখটা বাঁধা।এবং নড়ছে।
দিলিপ ভয়ে ভয়ে বস্তাটাকে তুলে রাস্তায় রাখতেই একটা সদ্যজাত শিশুর কান্না শুনতে পেল।
দিলিপ বুকে  সাহস নিয়ে ধীরে ধীরে বস্তার মুখটা খুলল।
দেখতে পেল, একটি ফুটফুটে শিশু।
সুমনা ভেবে পাচ্ছে না এই শিশুটির কি হবে।
দিলিপ বলল,তুই এককাজ কর কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।তুই একে ঘর নিয়ে গিয়ে নিজের মেয়ের মতো মানুষ কর'
সুমনা রাজি হয়ে গেল।
দিলিপ সুমনার কোলে শিশুটিকে তুলে দিয়ে বলল,জানবি চিঠিটা পেয়ে গেছি।
আর হ্যাঁ তোর মেয়ের নাম রাখবি ,চিঠি।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

বাবার ডায়েরী || তাসফীর ইসলাম (ইমরান) || গল্প

বাবার ডায়েরী
তাসফীর ইসলাম (ইমরান)


বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা বরাবরই সাপে - নেউলে। ছোট বেলা থেকেই আমি কেন জানি বাবাকে সহ্য করতে পারতাম না। এটা নয় যে উনি আমার আপন বাবা নন,নিজের আপন বাবা হওয়া সত্ত্বেও আমি তাকে খুব অপছন্দ করতাম। আমার অপছন্দের তালিকায় যতো লোক ছিল তার মধ্যে বাবা অন্যতম। মা এ নিয়ে আমাকে অনেক কথা বলেছিল আমি পাত্তা দিতাম না। আমি যখন ক্লাশ ২ এ পড়ি তখন মা খুব অসুস্থ হয়ে পরে ,যদিও কারণটা আমি ছিলাম। আমি সেদিন ভুল করে ঘরে রাখা ইঁদুর মারা ওষুধ খাবারের মধ্যে কোনভাবে মিশিয়ে দেই ,যার কারণে মা অসুস্থ হয়ে যায়। এর এক বছর পর আমার আর একটা ভুলের কারণে মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে বাবা আমাকে সহ্য করতে পারত না।
আমি বাবা ,মায়ের একমাত্র ছেলে। যদিও মা মারা যাবার পর বাবা একাই আমায় মানুষ করেছে ,২য় বার বিয়ের কথা ভাবে নি। মা যে বছর মারা গেল সে বছর আমরা খুব আর্থিক সমস্যায় পরে যাই। আমি বাবার কাছে একটা সাইকেল চাই ,কিন্তু বাবা দেয়নি। সেদিনের পর থেকে আমি বাবাকে বাবা বলে ডাকতাম না। সবসময় আপনি বলেই ডাকতাম। কোন কিছুর দরকার ছাড়া বাবার সাথে ২য় কেন কথা আমি বলতাম না। আমাদের মাঝের এই দূরত্বটা দিন দিন বেড়েই চলছিল আর সেদিকে আমার কোন ভ্রুক্ষেপেই ছিল না।
আজ আমি ভাল সরকারি চাকরি পেয়েছি। পড়াশোনার সুবাদে বাবার থেকে অনেক আগেই সরে এসেছি,তবে এ নিয়ে আমি খুব খুশি ,ওই মানুষটার মুখ অন্তত দেখতে হতো না। আমার প্রয়েজনীয়,টাকা মাসের শুরুতেই বাবা পাঠিয়ে দিত ,কখনো কখনো প্রয়েজন থেকে বেশিও দিত। আমি কখনো জানার চেষ্টা করিনি টাকাগুলো কোথা থেকে দিত। আমার এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না। এটা ওনার দায়িত্ব যেটা উনি পালন করতে বাধ্য।
চাকরি পাওয়ার ১ মাস পর আমি বিয়ে করে নিলাম,আমার নিজের পছন্দের মেয়েকে। বাসায় জানানের প্রয়োজন মনে করিনি,এমনকি বাবার থেকে অনুমতিও নেই নি। ওই লোকটার ছায়াআমার নতুন জীবনে পরুক আমি তা চাই নি। বিয়ে করার সপ্তাহ খানিক বাদে গ্রাম থেকে আমার ফোনে কল এলো। রহিম চাচা ফোন করে বলল বাবা খুব অসুস্থ ,আমাকে একবার দেখতে চায়। আমি যাই নি ,কাকাকে বলে দিয়েছি ," আমি চাকরির জন্য আসতে পারব না,টাকা পাঠাচ্ছি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ,আমি এসে কি করব আমি তো আর ডাক্তার নই।" বলে ফোনটা রেখে দিলাম।
২য় দিন পর গ্রাম থেকে ফোন এলো বাবা মারা গেছে,কবরটা যেন দিয়ে আসি। এবার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গ্রামে গেলাম। গিয়ে দেখলাম বাড়ি ভর্তি লোকজন,প্রায় প্রত্যেকে কান্নাকাটি করছে। আমার চোখ দিয়ে একফোঁটা জলও বের হলো না। বাবার দাফনের কাজ শেষ করে ভাবলাম সেদিন এই রওনা,দেব। কিন্তু গ্রামের সবার অনুরোধে রাতটা থাকলাম।
রাতে ঘরের মধ্যে পুরোনো জিনিসগুলো ঘাটিয়ে দেখছিলাম। মা,বাবার ঘরে গিয়ে টেবিলের ড্রোয়ারটা খুলতেই একটা ডায়েরি চোখে পরল। যেহেতু আমার সময়ও কাটছিল না তাই আমি ডায়েরিটা নিয়ে পড়তে লাগলাম।
৭-৮-১৯৯৩
আজ আমার ঘর আলো করে আমার খোকা এসেছে। আজ আমি সব থেকে বেশি খুশি। বাবা হওয়ার আনন্দ যে এতোটা আমি তা এর আগে কখনো বুঝতে পারি নি। আমার খোকাকে আমি আদরে রাখব সারাজীবন ,আমার যতোই দুংখ,কষ্ট আসুক আমি সেটা খোকাকে বুঝতে দেব না।
" আজ আমার খোকা বাবা ডেকেছে ,বাবা ডাকটায় এতোটা মধু মেশানো থাকে আমি জানতাম না ,আমার আয়ু আমার খোকা যেন পায়। " ডায়েরির ২য় পাতায় লেখা।
আমি একে একে সব পাতাগুলো পড়তে লাগলাম
জানিস খোকা তোর মাকে আমি ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম ,আজ তোর একটা ভুলের কারণে আমি আমার জীবনের অর্ধাঙ্গীনিকে হারালাম ,খুব কষ্ট হচ্ছে জানিস খোকা ? তাই তোকে একটু বকেছি আর সেটা নিয়ে তুই আমার সাথে রাগ করে কথা বলিস না প্রায় ৭ দিন হয়ে গেল। আমি তোর মুখ থেকে বাবা ডাকটা কি শুনতে পাব না?
তোর জন্য একটা সাইকেল কিনব বলে টাকা জোগাড় করেছিলাম ,কিন্তু দেখ তোর করিম চাচার মেয়ের অসুখে সে টাকাটাও হাতছাড়া হয়ে গেল। তুই রাগ করিস নি তো খোকা ?
৫- ২- ২০১২
খোকা তুই আজ কতোদিন হয়ে গেল আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছিস ,তোর মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে না পেলেও তোর মুখটা তো দেখতে পেতাম তাই না বল? আমি এমন অভাগা বাবা যে কিনা তোকে কিছুই দিতে পারিনি ,তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে খোকা ,আসবি একটি বার ? জানিস খোকা তোর কথা ভেবেই আমি ২য় বিয়ে করিনি। আমি চেয়েছি তুই যেন সুখে থাকিস। খোকা তুই যখন চাকরি পাবি আমি তোর জন্য টুকটুকে একটা লাল বউ এনে দেব ,সে অধিকারটুকু আমায় দিস আমি কিন্তু তোর "না" শুনব না এবার।
২-১-২০১৫
খোকা তোর পড়াশোনার খরচ দিতে একে একে সব বিক্রি করে দিয়েছি শুধু এই ভিটেটুকু ছাড়া। তুই হয়তো জানিস না তোর মায়ের মৃত্যুর ১ বছর পরই আমার চাকরিটা চলে যায়,তারপর তোকে যে কি করে মানুষ করেছি সেটা আমি নিজেই জানি। আমার শরীরটা ইদানিং ভাল নেই। ডাক্তার বলল কি যেন অপরাশেন করতে হবে,অনেক টাকা লাগবে। এতো টাকা পাব কই বল? আমি জানি আমার খোকা চাকরি পেলে ঠিক আমায় সুস্থ করে তুলবে।
১৬-৩-২০১৮
শরীরটা আজ খুব খারাপ লাগছে তোর রহিম চাচাকে দিয়ে ফোন করে তোকে আসতে বললাম,আমি ফোন করলে তো তুই ধরিস না। তুই একবার আসিস খোকা আসবি তো ?
১৮-৩-২০১৮
রহিম বলল তোর নাকি ছুটি নেই ,তুই আসতে পারবি না। আমার না তোকে দেখার খুব শখ খোকা,মৃত্যুর আগে শেষবার তোর মুখটা দেখা বুঝি আর হলো না। আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমার বুঝি আর তোর বউকে দেখা হলো না,শেষ বয়সে তোর ছেলেমেয়েদের সাথে হামাগুঁড়ি খেলা হলো না ঠিক যেমন তোর,সাথে করতাম। আমাকে ঘোড়া বানিয়ে তোর ছেলেমেয়ে খেলা,করত ঠিক তোর মতো। সে শখ আর মিটল না। আলমারিতে একটা শাড়ি রাখা আছে তোর বউকে দিস। আমি মনে হয়,তোর যোগ্য বাবা হতে পারলাম না, তোকে কোন সুখেই দিতে পারিনি।। তোর এই অভাগা বাপটাকে ক্ষমা করিস পারলে। তুই ঘুমিয়ে পড়লে আমি রোজ তোর বিছানার পাশে বসে থাকতাম ,তুই কখনো বুঝতেই পারিস নি ! সম্ভব হলে আমার কবরটা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাস ! তোকে খুব ভালবাসি খোকা !
"তোর অপরাধী বাবা। "
ডায়রীর শেষ পাতায় আর কিছু লেখা নেই। শুধু ডায়েরির মাঝে আমার একটা ছবি ছাড়া। আমি বুঝতে পারলাম আমি কাঁদছি। ডায়েরিটা টেবিলে রেখে এক দৌড়ে বাবার কবরের কাছে গিয়ে বাবার কবরে উপড়ে পরে কাঁদতে লাগলাম আর বলতে লাগলাম ," বাবা ,আমায় মাফ করে দেও,আমি তোমাকে কখনোই বুঝিনি ,আমি খুব বড় পাপি বাবা ,আমায় তুমি মাফ করে দেও। " আমার কান্নার শব্দে নিঝুম রাতটাও যেন আরও চুপসে গেল। এ জীবনে হয়তো আমার পাপের ক্ষমা নেই আজ প্রকৃতিও তারই সাক্ষী দিচ্ছে।
" বাবার ডায়েরী"
# বিঃ দ্রঃ বাবা - মা কোনোদিন কোনো সন্তানের অমঙ্গল চায় না। বাবা-মা বেঁচে থাকতে সবাই তাদের খেদমত করো। হারালে বুঝবে বাবা - মা কি ছিল,তাদের অভাব।

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

কথোপকথনে, মৃত্যু ও আমি, || অমিতাভ দত্ত || গল্প

কথোপকথনে, মৃত্যু ও আমি,
অমিতাভ দত্ত


ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত নিশিথে। আলোহীন বসে আছি মুখোমুখি , মৃত্যুর কল্পিত ছবি আঁকি রং তুলি হাতে, আচ্ছা মৃত্যুর অবয়ব দেখেছি আঁধারে অতল অন্ধকারে, তুমি সুন্দর দুর্নিবার অনির্বাণ গহ্বরে, আঁধারের আলোয় উদ্ভাসিত মুখচ্ছবি, দেখেছি তোমায়, তুমি সত্য, আমি দেখেছি তোমায়, যেতে পারি বন্ধুর মতো, বাদাম ভেঙে খেতে খেতেই চলে যাব,
আর সবার মতো নয়, আমার ইচ্ছে হলে তবেই। তুমি কি জানো ; ওগো সুন্দর, ভীষণ ভালোবাসি আঁধারে চুমোচুমি, এবং, তোমার নিকষ আঁধার বনভূমি, যেখানে কালো ক্যানভাসে আঁকে ছবি, বন বীথিকা সারি সারি শাখাপ্রশাখা, ভালো লাগে কালো আমার , এখন আলোয় উদ্ভাসিত মোহময় পাখির খাঁচায় বন্দী পড়ে আছি। যেতে পারি এখনই এই আঁধারেই , বাগানের সব গাছে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে যে দিন, আর, কুঁড়ি গুলো পিছু থেকে হাত নেড়ে ডাকলে পরে, আমি জানি; তুমিও ভীষণ ক্লান্ত শব দেহ বয়ে,
জব্‌ স্যাটিসফাইড নও তুমি,
যাই হোক না কেন, তুমি এস কোন বর্ষা মুখর আঁধার রাতে, আষাঢ় শ্রাবণে অঝোর ধারার প্লাবনে, বৃষ্টি ধারায় ধৌত ফুলের মিষ্ট সুবাসে , ঝমঝম বৃষ্টির নৃত্যের তালে লয়ে মেঘের ঘনঘটায়, প্রবল গর্জনে, গর্ভ স্থাপন বীজ বপনের পরে, চলে যাব শীঘ্রই , তবে এখন না, তুমি ভীষণ ভুলে যাও ইদানিং, লিখে রেখো আকাশের বুকে আমার নাম, আমি মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক মানুষ, আমি মৃত্যুঞ্জয়..........., দেখা হবে বন্ধু, তোমার সাথে ; সেই বরষায় বর্ষণ ধারায় ঘন অন্ধকার কালো রাত্তিরে, বীজ স্থাপনের পরে.......... একটুখানি গোছানো হলে পরে, প্রদীপে তেল দিয়ে যেও,
ও ঘরে সরিয়ে নিও প্রদীপ খানি, আঁধার আমার ভালো লাগে............. তুমি অচেনা নও বন্ধু ; বহুবার দেখেছি তোমায় আমি , এখন ক্লান্তির বলিরেখা তোমার কপালে, গভীর অনুভূতি জাগে আমার
অস্তিত্বের দ্যোতক প্রতিধ্বনিত অনুরণনে, বেশ এস, যাবো নিশ্চয়ই , আঁধার আমার ভালো লাগে........... দূরে নয়,
বেহালার সুর ভেসে আসে,
বাতাসেরা চুম দিয়ে লুকায় দূরে............. অমারাতি বড়ই ভালো লাগে, আমি অমাজিৎ,
আমি মৃত্যুঞ্জয়, চলে যাব পায়ে ঠেলে দিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ; কচুপোড়া সব ফেলে দিয়ে তবে বাগানের সব গাছে  ফুল ফোটা দেখে , শূন্যের কারবারি কখনও আমি, হতে পারিনি .............ওরে , বীজ ধান তুলে রাখ ভরে........... আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বৃষ্টিরা ঝরবে বলে , মেঘদল খেলা করে, চমকায় বিদ্দ্যুলতা শম্পা সুন্দরী, কেতকী অবগাহন স্নানে আশায় আশায়, উজ্জ্বল উজ্জীবিত পূর্ণ প্রস্ফুটিত , সুবাস ছড়ায় ছড়ায়, যা আহ্লাদ তার, তা সবই আমানত, মেঘরাজে, জলে মাছ খেলা করে , ফুল ফোটে ডালে ডালে, বাতাসের এলোমেলো দোলা দিয়ে যায়, মাঝি মাল্লারা বায় দাঁড় মাঝ দরিয়ায়, বউ তার চেয়ে আছে দূর সীমানায় , ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া সুর, ভাসে বুকে নুন ভাতের সুগন্ধের প্লাবিত হাওয়ায়, মিলনান্তক বেহালার সুরে গর্ভবতী হয় লোকালয়, খেলা করে গর্ভাশয়ে যৌবনের গান সুর তাল ছন্দ, শূন্য ; তোমার প্রেমের পরশ রেখো দক্ষিণ হস্তের 'পরে , কে জাগে এতো সুন্দর নির্জনে একাকি, একাকিত্বের বেদনব্যথায় আলুথালু অবিন্যস্ত শয্যায়, বক্ষ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সৌন্দর্য্যায়ণে আশালতা দোলে, অরণ্যের চন্দন সুবাস ভেসে আসে প্রাণের গভীরে, সুবাসিত সুভাষিত চন্দন , জাগায় যৌবন দ্যুতিময় সুদীপ্ত
ঝম্পক তালে, মেঘদূত রচে প্রেমর চূড়ান্ত পর্যায়ে , অলিখিত কামনা বাসনার দিনলিপি, খসে পড়ে উড়নী অকারণে, ওড়ে অঞ্চল দুষ্টু বাতাসে ............
                  

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...