ডঃ মালিনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ডঃ মালিনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

বিদেহ নন্দিনী~ ৪২ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস , Bideha Nandini 42

 বিদেহ নন্দিনী~ ৪২ ( অন্তিম পর্ব )

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


 (৪২)

এই কয়েকদিন আমি যেখানেই বসেছি সেখানেই বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। লব কুশের রাজসভায় অপমান হবে বলে চিন্তায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। অবশ্য ঋষি বাল্মীকির তত্ত্বাবধানে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ  থাকবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। পুরোনো কথাগুলি রোমন্থন করে থাকার সময় হঠাৎ আত্রেয়ী  এসে উপস্থিত হল । আনন্দে চোখের জল ঝরিয়ে আত্রেয়ী বলল-‘ সীতা,আমি বলেছিলাম না রামচন্দ্র তোমার দুই পুত্রকে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই পুত্রদ্বয়ের জননীর খোঁজে আসবে দেখ।’ আমার কথা কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে । রাজা রামচন্দ্র আশ্রমে দূত পাঠিয়েছে। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত খবর নিয়েছি। তুমি অযথা চিন্তা করছিলে তোমার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছে বলে ভেবে। যজ্ঞের জন্য আবশ্যক পত্নীর স্থান পেয়েছে একটি সুবর্ণ সীতার মূর্তি। সুবর্ণ সীতার মূর্তি পাশে বসিয়ে রেখে রাঘবের যজ্ঞ  সম্পন্ন করার কথা জানতে পেরে আমার মন ছটফট করতে লাগল। অনুশোচনায় মনটা ভরে উঠল। মুহুর্তের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। দীর্ঘ বারো  বছর পরে মনের মধ্যে স্বামীকে স্মরণ করলাম। তাঁর চেহারা মনে করতে চেষ্টা করলাম। মনে হল তিনি যেন আগের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছেন। পরের মুহূর্তে আমার নিজের চেহারার কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। গত বারো বছরে আমার সৌন্দর্য সম্পূর্ন ম্লান হয়ে পড়েছে। আমার শরীরের উপরে দুঃখ-কষ্ট দরিদ্রতা ছাপ ফেলে গেছে। বর্তমানে আমার দেহ একেবারে শীর্ণ। তাই মনের মধ্যে ভয় হল কে জানে আমাকে দেখার পরে রাঘবের আমার প্রতি আগ্রহ যদি কমে যায়? আমি ভয়ে আত্রেয়ীকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম-‘ হে মাতা আমাকে সত্য কথা বল, আমি দেখতে কুরূপা হয়ে পড়েছি নাকি? স্বামী আমাকে চিনতে পারবে তো? আত্রেয়ী  আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-‘ কেন চিনতে পারবে না নিজের মনের মানুষকে? আমি তোমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে পাঠাব।

আত্রেয়ীর কথা শুনে আমার চটকরে লঙ্কা বিজয়ের পরে রঘুনন্দন আমার প্রতি করা ব্যবহারের কথা মনে পড়ল। নিমেষের মধ্যে আমি ম্লান হয়ে গেলাম। রামচন্দ্রের জীবনে ফিরে যাবার আগ্রহ নাই হয়ে গেল।পরে আত্রেয়ীর উৎসাহজনক কথা শুনে আমি মনকে পুনরায় সবল করতে চেষ্টা করলাম।

আত্রেয়ী এবং আশ্রমের অন্য মহিলারা আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রথের কাছে এগিয়ে নিয়ে এল। সেই সময় আমার মনের মধ্যে বিভিন্নভাবের আলোড়ন চলছিল। দুঃখ-কষ্ট, অভিমান, আনন্দ এবং দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি আমাকে আবেগিক করে তুলেছিল। আত্রেয়ীকে মুখ্য করে আশ্রমের প্রতিটি মানুষের চোখের জল ফেলার কারণ হয়ে আমি বিদায় নিলাম। সুসজ্জিত রথের উপরে রঘুবংশের ধ্বজা দেখে আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠল। সারথি সম্মান প্রদর্শন করে রথের দরজা খুলে দিলেন।সারথি হিসেবে  সুমন্ত্র এসেছিল। দীর্ঘ বারো বছর পরে সুমন্ত্রকে দেখে আমি আবেগিক হয়ে পড়েছিলাম। তবুও শোক সম্বরণ  করে সারথিকে কুশল বার্তা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি যথাযথ উত্তর দিলেন। অযোধ্যার বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হল না। রাঘবের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল যদিও সাহস করলাম না। তাই মৌন হয়ে রইলাম। মনটা ছটফট করতে থাকায় একবার সুমন্ত্রকে রাঘবের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে সারথি বলল মহর্ষি বাল্মীকি আপনাকে যজ্ঞস্থলে নিমন্ত্রণ করার জন্য রামচন্দ্রকে অনুরোধ করেছেন যাতে তাঁর জীবিত কালে আপনারও একটা গতি হয়। রামচন্দ্র বাল্মীকির অনুরোধ রক্ষা করে আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য এই রথ পাঠিয়েছেন।’

এইরকম একটা কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে আমার রথের উপর থেকে লাফ দিতে ইচ্ছে করছিল। কোনোমতে ধৈর্য ধরে থাকতে চেষ্টা করলাম যদিও আমার শরীর কাঁপতে লাগল। মাথাটা যেন ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণ এভাবে যাবার পরে আমার শরীর ঘামতে শুরু করল।  তখন মাথাটা কিছুটা হালকা  বলে অনুভব হল। সম্পূর্ণ সুস্থ বলে মনে হওয়ায়  ভাবলাম সুমন্ত্রকে আমার মনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লাভ নেই। এসেছি যখন গন্তব্য স্থানে নামতেই হবে।

তারপরে নিজের মনটাকে নিজেই এভাবে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করলাম-‘ রামচন্দ্রের বিনা অনুমতিতে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য রথ পাঠানোর কারও সাধ্য নেই।  স্বয়ং মাতা  কৌশল্যারও।  বোধ হয় রঘুনন্দন  নিজের মুখে নিমন্ত্রণ করতে লজ্জাবোধ করে  ঋষি বাল্মীকির অজুহাত নিয়ে  বাঁকা পথ অবলম্বন করেছে।  তার মধ্যে রাঘব প্রজাদের গুরুত্ব দেওয়া পুরুষ।  একবার নির্বাসন দেওয়া পরিবারকে  পুনরায় উপযাচক হয়ে নিমন্ত্রণ করলে  তাদের সামনে মান-সম্মান রাখা মুশকিল হবে বলেই হয়তো তিনি বাল্মীকির মাধ্যমে আমাকে ডেকেছেন।  এভাবে ভেবে আমি মনটাকে  প্রবোধ দিয়ে পুনরায়  আমার ছেড়ে যাওয়া দিনগুলির মধুর স্মৃতিগুলি রোমন্থন করে দেখতে চাইলাম। যাতে আমার মনে এবং অন্তরে তার প্রতি থাকা  ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা ,ভক্তি যেন ফিরে আসে।  

কথাগুলি ভেবে থাকার সময় কখন যে নৈমিষ  যজ্ঞক্ষেত্রে  পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। রথের ভেতর থেকে  সমগ্র যজ্ঞক্ষেত্রটাকে একবার ভালো করে দেখে নিলাম। লোকে লোকারণ্য। সারথি বলল-‘ সবাই আপনার আত্মশুদ্ধি ও সতীত্ব শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখার জন্য সমবেত হয়েছে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম আত্মশুদ্ধি? সতীত্বের শপথ? আমার দেহে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে বলে অনুভব হল। রথ থেকে নামব কিনা মনে মনে চিন্তা করলাম। তবে নামতে তো হবেই। না হলে কোথায় যাব? মনের শক্তি সংগ্রহ করে বললাম-‘ এসেছি যখন আরও একবার অপমানিত হতে হবে।’

আমি রথ থেকে নেমে একেবারে যজ্ঞক্ষেত্রের দিকে তাকালাম। বৃহৎ ক্ষেত্রটার ডান দিকের মাঝখানে বসেছে ব্রাহ্মণরা। পাশে একটি উচ্চ আসনে বসেছেন রাজা রামচন্দ্র। দূর থেকে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার পাশে নিচের আসনগুলিতে সারি পেতে বসেছে ভরত, লক্ষণ এবং শত্রুঘ্ন।  তাদের বাঁদিকে শাশুড়িরা এবং জা ও অন্যান্যরা। প্রত্যেকের দৃষ্টি আমার উপরে। আমি মাথা নিচু করে রইলাম। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ঋষি বাল্মীকি রথের কাছে এগিয়ে এলেন। আমি ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে যন্ত্রমানবের মতো ঋষির পেছন পেছন যেতে লাগলাম। ইতিমধ্যে সম্ভবত জনগণের মধ্যে যথেষ্ট কোলাহলের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জনের কথাবার্তার টুকরো আমার কানে এসে পড়ছে। দুই-একজন উচ্চস্বরে রামকে প্রশংসা করছে আমার আত্মশুদ্ধি  এবং সতীত্ব শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করার জন্য। সভাস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাল্মীকি আমার হাত ধরে রামচন্দ্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন-‘ হে রাজন এই যে তোমার পত্নী জানকী যাকে তুমি আজ থেকে বারো বছর আগে লোক অপবাদের ভয়ে অরণ্যে নির্বাসন দিয়েছিলে। কপাল ভালো ছিল যে সেই অরণ্যের কাছে আমার আশ্রম ছিল। সুদীর্ঘ বারো বছর বৈদেহী আমার তত্ত্বাবধানে। গত বারো বছর আমি তাকে প্রত্যক্ষ করে এসেছি। শুদ্ধরূপে শুদ্ধাচারী জীবনযাপন করে কাটিয়েছে কোশল বধূ জানকী। আমি তাকে কন্যার মতোই দেখে এসেছি। বর্তমানে তোমার কথামতো জানকীকে তোমার সামনে উপস্থিত করলাম।’ 

স্বামী রামচন্দ্র বোধ হয় আমার সাধারন বস্ত্র, অলংকার বিহীন দেহ, শীর্ণ শরীরের গঠন দেখে অবাক হয়েছিল। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন আমি সেই একই রূপসী সীতা হয়ে আছি। তিনি হয়তো অনুভব করছেন আমার এই চেহারা রাজপরিবারের সঙ্গে খাপ খাবে না। বিয়ের পরে আগেও আমি অনেকবার অনুভব করেছিলাম যে রাঘব আমার বাহ্যিক রূপটাকে বেশি গুরুত্ব দান করে । আমার মন এবং অন্তরকে নয়। আমার এই শীর্ণকায় অবস্থার জন্য প্রকৃতপক্ষে রাঘবই যে দোষী  একথা উপলদ্ধি করার মতো এই জগতের প্রভুর ততটুকু জ্ঞান আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। আমি ভিখারির বেশে হাজার হাজার লোকের সামনে প্রবেশ করায় তার হয়তো আত্মসম্মানে আঘাত লাগল। তাই সুমন্ত্রকে বললেন-‘ একে স্নান করিয়ে নববস্ত্র এবং অলংকার পরিয়ে এখানে নিয়ে আসা উচিত ছিল। আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম বলেই  দ্বিতীয়বার বিবাহের কথা একবারও ভাবিনি। আচ্ছা এখন জানকী শুদ্ধাচারী এবং সতীত্বের শপথ নিক। তারপর রাঘব ঋষির দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ হে মহর্ষি বাল্মীকি আমি আপনার কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করছি। তবুও লোক অপবাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সীতা পবিত্রতা এবং সতীত্বের শপথ গ্রহণ করুক।’ 

তার কথা শুনে আমার সমস্ত দেহের রক্ত যেন এক জায়গায় জমাট বেঁধে গেছে বলে মনে হল। আমি মাথার ঘোমটা খসিয়ে রামচন্দ্রের দিকে তাকালাম। আমার চোখে চোখ পড়ল। তিনি হয়তো আমার মুখে আগের লজ্জা লজ্জা ভাব, কমনীয়তা, কোমলতার পরিবর্তে দেখতে পেলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো শক্তি থাকা একটি মুখ। মুখে দৃঢ়তার ছাপ। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে তার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। ভাবলাম কথা না বাড়িয়ে আমি আমার ব্যবহারেই দেখিয়ে দেব যে আমি সেই আগের লজ্জাবতী সীতা নই। আমি তাকে নির্বাসনে দিয়েছি অন্তর থেকে। তিনি বুঝুন যে তার করা কার্যাবলীর প্রতিবাদ করার জন্য বর্তমানে আমার যথেষ্ট সাহস আছে। 

হঠাৎ আমার পিতৃসম  মহর্ষি বাল্মীকির কথা মনে পড়ল। তিনি হয়তো আমার এই ধরনের আচরণ দেখে অপ্রস্তুত হয়েছেন। অবশ্য গত বারো বছরে তিনি আমাকে দেখে শুনে ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছিলেন যে স্বামীর দ্বারা বারবার নির্যাতিতা হয়ে আমি একজন অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি। সে কথা তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন-‘হে জানকী, তোমাকে আমি পতি এবং দেবরের সঙ্গে বনবাসে কাটানোর সময় প্রথম দেখেছিলাম। সেই জানকী ছিল স্বামীর অবিহনে এক পাও চলতে না পারা, পতিবিনে  জগৎ অন্ধকার বলে ভাবা, ভালোবাসা,স্নেহ, দয়া, করুণায় ভরা দেবী। কিন্তু বর্তমানে আমি যে জানকীকে  দেখছি সে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে দুঃখ-কষ্ট আঘাতে কর্কশ হয়ে পড়া একজন মানুষ, যে একাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস করে।’ 

আমার বর্তমান প্রকৃতি ঋষি ভালোভাবেই জানেন বলে হয়তো কিছু না বলা কথা তিনি রাঘবকে  বললেন-‘ হে রাজন, আমি জীবনে  যতটুকু পূণ্য অর্জন করেছি, তার নামে শপথ করে বলছি বৈদেহী  কলুষহীন, নিষ্পাপ এবং নির্মল। লব কুশ তোমার ঔরসজাত পুত্র। তুমি বিনা দ্বিধায় সীতাকে  গ্রহণ কর। তাহলে তোমার এবং দেশের মঙ্গল হবে।’

বাল্মীকির কথা শুনে সমগ্র যজ্ঞক্ষেত্র নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই রাজা কী বলেন কী করেন তা দেখার জন্য বা শোনার জন্য আগ্রহে চেয়ে রইল। কিন্তু রাঘব নীরব । বোধহয় সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হচ্ছে। কারণ তিনি সবসময় প্রজার চিন্তাচর্চায় চলা পুরুষ। নিজস্বতা বলতে কোনো জিনিস নেই বলে মনে হয়। সব সময় প্রজারা তার জয়গান এবং গুনকীর্তন করাটাই চান। বোধহয় সেই জন্যই তিনি কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। রামচন্দ্রের মনের ভাব ঋষিবুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুনরায় বললেন-‘ তুমি সীতাকে নিষ্কলুষ জেনেও লোক অপবাদের ভয়ে নির্বাসন দিয়েছিলে। আজ আমি এই জনসমুদ্রের সামনে তোমাকে আবার বলছি সীতা একেবারেই পবিত্র, শুদ্ধাচারী। তবু যদি তোমার সন্দেহ হয় তাহলে  সীতা শুদ্ধতার শপথ নেবে।

ঋষির বাক্য শুনে আমি শিউরে উঠলাম। আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে সতী প্রমাণ করে রাজরানি করাতে চাইছেন। আমার জীবনের দুঃখের সমাধান  করতে চাইছেন ।ঋষি ইতিমধ্যে লব কুশকে পিতার দ্বারা  গ্রহণ করানোর কাজে সফল হয়েছেন। তিনি হয়তো তাই ভাবছেন আমাকে রামচন্দ্রের হাতে অর্পণ করে তিনি নিশ্চিত হবেন এবং শান্তিতে চোখ বুঝতে পারবেন। এদিকে বাল্মীকির কথায় জগতের প্রভু যেন কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলেন বলে মনে হল। তিনি সবাইকে শুনিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন-' হে মহর্ষি, আপনার কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য। তবু লোকঅপবাদ  মোচন করার জন্য সীতা সতীত্বের শপথ গ্রহণ করুক। তার এই কার্য নারী জাতিকে শীর্ষস্থানে উপনীত করার সঙ্গে সীতা নিজে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।' 

রাঘবের চালাকি করে বলা কথাগুলি শুনে আমার ক্রোধে কানদুটি গরম হল। মনে মনে  গুমড়ে থাকা কথাগুলি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হল। কিন্তু পিতৃ সম বাল্মীকির  কথা চিন্তা করে ধৈর্য ধরে রইলাম। তারপরে চারপাশে আমার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। দেখলাম শাশুড়ি কৌশল্যা যেন অস্বস্তি বোধ করছেন। লক্ষ্মণ বসা অবস্থায় ছটফট করছে । শত্রুঘ্ন এবং ভরত কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছে বলে মনে হল। উর্মিলা মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছে। হয়তো রাজা রামচন্দ্র ঘোষণা করা কথাটা রাজ পরিবারের কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। আমি ভালোভাবে জানি রাজপরিবার রাঘবের সব কথা সমর্থন না করতে পারে তা বলে কোনো একজন প্রতিবাদ ও করবে না। এমনকি মাতা কৌশল্যাও। আমাকে নির্বাসন দেওয়ার ক্ষেত্রে মাতা কৌশল্যার স্থিতি বড় রহস্যজনক। আমার নির্বাসন হয়ে যাবার পরে বাল্মীকির আশ্রমে আমি প্রতিদিনই ভাবতাম শাশুড়ি কৌশল্যা নিশ্চয় আমার কাছে আসবে। তার মধ্যে সেই সময় আমি গর্ভবতী ছিলাম। তার পুত্রের বীজ আমার গর্ভে সন্তান রূপে  আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আমি যেন সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারি তার জন্য শাশুড়ি কৌশল্যার আমার প্রতি যত্ন ছিল  অসীম ।আমাকে যেদিন নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল সেদিন শাশুড়ি বাড়িতে ছিলেন না। তাই আমি বাল্মীকির আশ্রমে প্রতিদিনই তিনি আমাকে  একবার দেখতে যাবেন  বলে আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম রাঘবকে তিরস্কার করে আমাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে অথবা তিনি নিজেই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমার কাছে চলে আসবেন বলে ভয় দেখাবেন। কিন্তু আমি ভাবার মতো কিছুই হল না। লব কুশ জন্ম হওয়ার পরে পর্যন্ত এই নারীকে স্নেহশীলা জননী বলে ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম অনেক পুণ্য করলেই এই ধরনের একজন নারীকে শাশুড়ি হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বাড়িতে কাজ করা একটি মেয়ের জন্য ও খবর করে থাকে। সেই জায়গায় রাজপরিবারের প্রত্যেকেই তাদের বড় বউকে রাঘব পরিত্যাগ করায় তারাও কীভাবে আমাকে পরিত্যাগ করতে পারল এই কথা ভেবে আমি অবাক হই। এখন শাশুড়ি কৌশল্যাকে অস্বস্তি অনুভব করতে দেখে আমার মনে তিনটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। প্রথমটি হল তিনি হয়তো ভেবেছেন শপথগ্রহণ হয়ে যাবার পরে সীতা পুনরায় রাজরানি হবে। গত বারোবছরে একদিনও খবর না নেওয়ার জবাব তিনি কীভাবে দেবেন। দ্বিতীয়তঃ হয়তো মাতা কৌশল্যা আমি লব কুশের মা হয়ে রাজপরিবারের ফিরে যাওয়াটা চাইছেন না অথবা দুই কুল রক্ষা করে কিছু একটা বলা উচিত হবে বলে ভাবছেন। যাতে আমি পুনরায় রাজরানি  হলেও  আমার মুখোমুখি হতে তার কোনো অসুবিধা না হয়।

কথাগুলি ভেবে হয়তো আমি অনেকক্ষণ তন্ময় হয়েছিলাম। হঠাৎ রামচন্দ্রের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারলাম আমার অন্য একটি অগ্নিপরীক্ষার সময় হয়েছে। রাঘব বললেন - কথাগুলিতে দেরি করা উচিত নয়।  সীতা দ্রুত শুদ্ধাচারী এবং সতীত্বের শপথ নিয়ে  পুনরায় রাজ পরিবারে ফিরে আসার ব্যবস্থা করুক ।'

ঠিক তখনই শত্রুঘ্নের  কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।  সাহস করে শত্রুঘ্ন জিজ্ঞাসা করল -' জানকীকে কেন শপথ নিতে হবে মহারাজ?  আপনি নিজেও জানেন যে তিনি একটি আয়নার মতো স্বচ্ছ এবং নিষ্কলুষ…'

  শত্রুঘ্ন আমার পক্ষ নিয়ে আরও কী সব বলেছিল।  কিছু কথা আমার কানে ঢুকল না।  কারণ আমি কিছুটা আবেগিক হয়ে পড়েছিলাম।  মনে  মনে  শত্রুঘ্নের সাহসের প্রশংসা করলাম। আমি ভালোভাবে বুঝতে পারলাম যে শত্রুঘ্ন দাদার সঙ্গ থেকে  দূরে সরে গিয়ে  মধুবনে নতুন নগর স্থাপন করে  প্রজা শাসন করতে শুরু করেছে বলেই হয়তো  সে উচিত সময়ে উচিত কথা  বলতে হয় বলে  বুঝতে পেরেছে।  কিন্তু দাদা রামচন্দ্র শত্রুঘ্নের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে  উচ্চ স্বরে বললেন -'জানকীর শুদ্ধতার  কথা  কেবল আমি ,তুমি বা  আমরা জানলেই হবে না।  লঙ্কা বিজয়ের পরে সবার সামনে সীতা সতীত্ব প্রমান করেছিল। সেই দৃশ্য দেবতারাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এবং তারপরেই আমি সীতাকে আমাদের রাজপরিবারে স্থান দিয়েছিলাম। কিন্তু  কিছুদিন ভালো ভাবে পার হয়ে যাবার পরে লোক অপবাদ  বড় প্রবল হয়ে উঠল। উপায়হীন হয়ে আমি জানকীকে নির্বাসন দিলাম।  অবশ্য তখনও আমি জানতাম  তিনি নিষ্কলুষ বলে।  কিন্তু আমার উপায় ছিল না। আমি ভালোভাবেই জানি লব কুশ আমার সন্তান। তবুও তিনি  জনগণের সামনে আত্ম শুদ্ধতা এবং সতীত্বের শপথ   নিলেই আমি বৈদেহী নন্দিনীকে গ্রহণ করব। 

  রাঘবের প্রতিটি শব্দ  আমার বুকে শেলের মতো বিধেঁছিল।  তাঁর কথা সহ্য করতে না পেরে আমি মাথা তুলে যথেষ্ট কঠিন কন্ঠে শত্রুঘ্নের   দিকে তাকিয়ে বললাম-'  শত্রুঘ্ন ,আমি কার কাছে শপথ নেব?  সেই স্বামীর কাছে  যে স্বামী শপথের অর্থ বুঝতে পারেনা ? অগ্নিপরীক্ষা হয়ে যাবার পরেও পত্নীকে সন্দেহ করতে ছাড়ে না,সেই  তার কাছে?'

আমাকে বল শত্রুঘ্ন কোন পুরুষের কাছে শপথ নেব? সেই কাপুরুষের কাছে যিনি নির্বাসনের কারণ দর্শাতে হবে বলে পালিয়ে বেরিয়েছিল? বেড়াতে নিয়ে যাবার ছলে জঙ্গলে ছেড়ে আসার জন্য ভাইকে নির্দেশ দিয়েছিল? এমন একজন কাপুরুষের কাছে?'

‘শত্রুঘ্ন, কার কাছে শপথ নেব? আমার সন্তানের সেই পিতার কাছে যে গর্ভেই সন্তানকে নির্বাসন দিলেন? যে পিতা সন্তান ভূমিষ্ঠ হল কিনা সেই খবর পর্যন্ত নিলেন না? সেই পিতার কাছে শপথ নেব কি যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেও ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করার জন্য জঙ্গলে ফেলে এসেছিল? সেই পুরুষকে সমস্ত জগৎ ভগবান বলে ভাবতে পারে আমার কিন্তু এরকম ব্যক্তিকে মানবের সারিতে স্থান দিতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার কথা শুনে যজ্ঞস্থলের সমবেত জনগণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপরে গুঞ্জন এবং কোলাহলের সৃষ্টি হল। ‘এই রমণী জগৎপতিকে এভাবে বলছে।

রাঘব হয়তো আমার কথায় কিছুটা লজ্জিত হলেন। তাই তিনি বললেন-‘ লজ্জা যে নারীর ভূষণ জানকী হয়তো তা ভুলে গেছে। রাজগৃহে স্থান লাভ করতে হলে তাকে সতীত্বের শপথ নিতেই হবে ।’  ব্রাহ্মণরা রামের কথায় সায় দিয়ে বললেন-‘প্রভু রামচন্দ্রের কথা জগত মেনে চলে। তাই জনক নন্দিনীও বিনা প্রতিবাদে প্রভুর কথা মেনে চলা উচিত।’ 

আমার ব্রাহ্মণদের উপরে ক্রোধ জন্মাল। মনে মনে ভাবলাম-‘ এই ব্রাহ্মণরা সমস্ত বিদ্বেষের মূল। যত নারীবিদ্বেষী শ্লোক, নিয়মকানুন আছে সমস্ত কিছু এদেরই প্রবর্তন করা। বৃদ্ধ বয়সে বিয়ে করে যুবতীদের সামলাতে না পেরে সমস্ত নারী জাতির জন্য কঠোর নিয়ম নীতি নির্ধারণ করলেন। কেবল তাই নয়, হীনজাতির লোক অধ্যয়ন করে পন্ডিত হতে পারে বলে ক্ষত্রিয় ছাড়া বাকি কোনো নিম্ন শ্রেণির লোক ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারবে না বলে নিয়ম প্রবর্তন করেন। অধ্যয়ন করা তো দূরের কথা, এমনকি হীনজাতি ভগবানের আরাধনা করলে বা তপস্যা করলে দেশে দুর্ভিক্ষ এবং অমঙ্গল হবে বলে নিয়ম করেছিলেন। আর সেই নিয়মকে শিরোধার্য করে আমার সামনে থাকা এই জগৎপতি শম্বুক নামের একজন শূদ্র কে তরোয়াল দিয়ে দু'খন্ড করেছিল, তপস্যার অপরাধে। তাই এই সমস্ত ব্রাহ্মণদের উপরে আমার কোনো শ্রদ্ধা ভক্তি নেই। এরা কোনো দিন ঋষি বাল্মীকির মতো হতে পারবে না। কথাটা ভেবে থাকার সময়ে হঠাৎ লক্ষ্ণণের কন্ঠস্বর শুনলাম-‘ হে মহারাজ অতীতের অগ্নিপরীক্ষায় সীতাদেবী কীভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন আমি নিজের চোখে দেখেছি। সমস্ত দেবতারা সীতাদেবীর পবিত্রতার কথা কীভাবে বলেছিল আপনার নিশ্চয় মনে আছে। অগ্নি লেলিহান শিখায় দগ্ধ করতে না পারা জানকীকে অগ্নি দেবতা কীভাবে অগ্নিকুণ্ড থেকে নিয়ে এসেছিলেন সেই দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। তাই আপনি মহর্ষি বাল্মীকির কথায় বিশ্বাস না করে পুনরায় কেন সীতাদেবীকে সামাজিক ভাবে অপমান করতে চাইছেন?'

উত্তরে রাঘব বললেন-‘ তখনকার কথা আলাদা ছিল। গত বারো বছরে সীতার  জীবনে কী ঘটেছে সেই বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। তাই জানকী শপথ নিলে হয়তো আমার তার ওপরে বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরে আসবে।’ 

রাঘবের কথা শুনে পুনরায় আমার শরীরটা শিউরে উঠল। এবার আমি মানুষটা এভাবে ঘুরে দাঁড়ালাম যাতে সমগ্র যজ্ঞস্থলের জনগণ আমাকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পায়। তারপর সমগ্র জনগণকে প্রণাম জানিয়ে বললাম-‘ হে অযোধ্যার জনগণ, এই মহারাজের কাছে শপথ নিয়ে বা কথা বলে কোনো লাভ নেই। তাই আমি আপনাদের দু'একটি কথা বলতে চাই। সত্যি কথাটা বলার সময় যদি কারও অন্তরে আঘাত লাগে তাহলে নিজ গুনে ক্ষমা করবেন। গত বারো বছর গার্হস্থ্য ধর্মের পরিবর্তে আমি সন্নাসীর মতো জীবন যাপন করছি। এখন আমার রাজরানি হওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। আপনারা জানেন যে আমি একজন রাজার সহধর্মিনী ছিলাম। তাকেই আমি সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারেননি। বনবাসে রাবণ আমাকে হরণ করেছিল। হরণ করার জন্য একমাত্র দাদা আর ভাই দুজনের ভুলগুলিই দায়ী।দুজনেই রাবণের বিধবা বোন শূপর্ণখার নাক কান কেটে শত্রুতা বৃদ্ধি করেছিল। রাবণের হাত থেকে আমাকে সেদিনই উদ্ধার করতে পারল না। তাতে আমার  কীভাবে দোষ হতে পারে? সম্পূর্ণ এক বছর পরে রাবণকে বধ করে লঙ্কা জয় করার পরে আপনাদের এই রাজা আমার প্রতি এরকম ব্যবহার করলেন যেন আমি রাবণকে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার বুদ্ধি দিয়েছিলাম। তিনি আমার সতীত্বের প্রমাণ চাইলেন। তাই অগ্নি পরীক্ষা হল। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম বলে রাঘব আমাকে গ্রহণ করেছিল যদিও তার অন্তর পরিষ্কার ছিল না। একদিন রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা রাক্ষস দেখতে কীরকম বলে জিজ্ঞেস করায় আমি মেঝেতে একটা ছবি এঁকে দেখিয়েছিলাম। ছবিটা দেখে তিনি আমাকে বাক্যবাণে প্রহার করে বললেন যে আমি নাকি এখনও রাবণকে ভুলতে পারিনি। আমি গর্ভবতী হওয়ার পরে তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। কিন্তু আপনাদের রাজা এটাও ভেবে দেখলেন না যে বনবাস থেকে ফিরে আসার কতদিন পরে আমি সন্তানসম্ভাবা হয়েছিলাম। আরেকদিন লোক অপবাদের ভয়ে আমাকে কারণ না দেখিয়ে নির্বাসনে পাঠালেন। তখন আমার গর্ভে ছিল পাঁচ মাসের সন্তান। পিতা বাল্মীকিকে  সেই সময়ে না পেলে আমি তমসা নদীতে প্রাণ বিসর্জন দিতাম। এখন আপনাদের সম্রাট রামচন্দ্র জানতে পেরেছেন যে লব কুশ তার সন্তান। ওরা দুজন শাস্ত্রবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা সমস্ত কিছুতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। কখনও হয়তো তারা প্রাপ্য রাজ্য দাবি করতে পারে। তাই আপনাদের চতুর  সম্রাট ওদের প্রাপ্য দাবি করার আগেই ঋষি বাল্মীকির কথা বিশ্বাস করে ওদের দুজনকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমি ভাবি না এই কাজ তিনি অন্তর থেকে করেছেন বলে। সবই লোক দেখানো কাজ। এখন নিজেকে দূষণমুক্ত করার জন্য এবং আপনাদের সবার কাছে তিনি উদার হৃদয় বলে পরিচিতি লাভ করার জন্য আমাকে পুনরায় রাজপ্রাসাদে জায়গা দিতে চাইছেন। এগুলি সবই লোক দেখানো কাজ মাত্র। আমি তার এই ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত ।কিন্তু এবার আর এসবে আমি ভুলব না। রাজভোগ রাজসুখে আর আমার প্রয়োজন নেই।'

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপরে পুনরায় শুরু করলাম-‘ হে জনগণ, বর্তমানে আমার দেহে কোনো সৌন্দর্য নেই। জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি বনবাসে কাটালাম। ক্রোধ, দুঃখ, মনোকষ্ট অভাব-অনটন আমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন আমি তাকে কী দিয়ে ভোলাব? যৌবন ভরপুর হয়ে থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে বাসি বস্তুর মতো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পরে ভবিষ্যতে যে ফেলে দেবেন না তার কী প্রমাণ আছে? তিনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না যখন আমি তাকে কীভাবে বিশ্বাস করব? আগেও তিনি আমার মনের চেয়ে দেহকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাকে বনবাসে পাঠানোর আগে এবং বনবাসের সময় মাঝেমধ্যে যে সমস্ত কথার শক্তিশেল নিক্ষেপ করেছিলেন সেগুলো উল্লেখ করে আপনাদের সম্রাটকে আপনাদের সামনে লঘু করার ইচ্ছে নেই। তবুও  জনমে জনমে আমি তার পত্নী হয়ে থাকতে চাই।’ 

কথাগুলি বলে আমি রাঘবের দিকে তাকালাম। তিনি ক্রোধে, লজ্জায় এবং অপমানে লাল হয়ে পড়েছেন। তার পর তিনি  গম্ভীর কণ্ঠে বললেন-‘ আমি আমার দোষ স্বীকার করছি। এখন শুধু জানকী শপথ গ্রহণ করুক।’

আমিও আর কথা না বাড়িয়ে সবাইকে প্রণাম জানিয়ে শপথ নিলাম –‘হে অযোধ্যার জনগণ যদি  লব কুশ রামের ঔরসজাত সন্তান হয় তাহলে পৃথিবী বিদীর্ণ হোক। আমার মনে যদি রামের বাইরে অন্য পুরুষের কথা জায়গা পেয়ে না থাকে তাহলে পৃথিবী বিদীর্ণ হবে।

যদি আমি শুদ্ধ, আমি পবিত্র, যদি আমি সতী তাহলে এই ভূমি বিদীর্ণ হয়ে খন্ড খন্ড হোক। মা বসুমতী আমাকে তার কোলে স্থান দিক।’

আমার শপথ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। চারপাশে প্রবল বেগে বাতাস বইতে লাগল। ভূমি কেঁপে উঠল, জায়গায় জায়গায় ফাটল দেখা গেল। মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সবাই ভগবানের নাম স্মরণ করতে লাগল। সমগ্র জনগণ সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল-' বিদেহ নন্দিনী সীতা নিষ্কলুষ এবং শুদ্ধ। এই ধরনের নারীকে অপমান করার পরিণাম ভয়াবহ হবে। চিৎকার-চেঁচামেচি হট্টগোল লেগে থাকার সময়ে হঠাৎ আমি দাঁড়িয়ে থাকা জায়গার সামনে এক বৃহৎ ফাটলের সৃষ্টি হল। সেই ফাটলের ভেতর থেকে একটা সিংহাসন বেরিয়ে এল। আমি অনুভব করলাম যেন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে সেই সিংহাসনে বসিয়ে নিচের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। তখনই আমি রাঘবের কন্ঠস্বর শুনলাম-' সীতা, আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। আমি তোমাকে বিশ্বাস ‍‌‌‌‌‌‌‌করছি।’

তাঁর কথা শুনে আমার ঠোঁটে একটা বক্র হাসি ফুটে উঠল। রাম এখানে সেখানে ধরে কোনোভাবে আমার কাছে এসে পৌঁছাল। তিনি আমাকে ধরতে চাইলেন কিন্তু আমি তাকে স্পর্শ করতে দিলাম না। আমি তার অশ্রুভরা চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললাম –‘হে স্বামী বিদায়।’ 

আমি পৃথিবীর মায়া মোহ ত্যাগ করে পাতালে চলে এলাম।

-------














বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৪১ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস । Bideha Nandini 41

 বিদেহ নন্দিনী~ ৪১

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


 (৪১)

প্রকাশ্য জনসভায় অপমানিত হওয়ার পরে আমি একটা দুঃস্বপ্নের মতোই তা ভুলতে চেষ্টা করলাম। অবশ্য স্বামী রামচন্দ্র আমার মন থেকে দুঃখ-শোক দূর  করে আমাকে প্রফুল্ল রাখার জন্য যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করছিলেন। আমিও অন্তরের দুঃখ অন্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রেখে স্বামীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। সেই রাতে আমরা সবাই বিভীষণের আতিথ্য গ্রহণ করলাম। ইতিমধ্যে আমাদের বনবাসের চৌদ্দ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র চার দিন বাকি ছিল। স্বামী আমাকে অযোধ্যা  ফিরে যাবার জন্য  প্রস্তুত হতে  বললেন।  লক্ষ্মণ  লংকা নগরের সৌন্দর্য, কারুকার্য, পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা ঘর দুয়ার , অট্টালিকা আর পথঘাট দেখে  এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি দাদাকে বললেন, দাদা সত্যি কথা বলতে গেলে আমার অযোধ্যা ফিরে না গিয়ে  এখানেই থাকতে ইচ্ছে করছে।  লক্ষ্ণণের কথায়  দাদা কিছুটা আহত হলেন বলে মনে হল।  তার মুখের থেকে তখনই দুটি বাক্য বেরিয়ে এল-‘  লক্ষ্ণণ  এই স্বর্ণ লঙ্কার প্রতি  আমার কোনো আগ্রহ নেই।  জননী জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও গরীয়সী। স্বামীর এই বাক্য দুইটি আমার অন্তর স্পর্শ করে গেল। স্বামী আমাকে ভরতের প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন-‘  আমরা সময়মতো পৌঁছে না গেলে  ভরত অঘটন ঘটাবে। তাই আজকেই আমাদের যাত্রা করতে হবে।  এদিকে লংকা থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত হেঁটে গেলে চারদিনেও পৌঁছাতে পারব না।  তাই বিভীষণ তাদের জ্যেষ্ঠভ্রাতা কুবেরের পুষ্পক রথে যাবার প্রস্তাব দিলেন। সেই পুষ্পক রথ রাবণ  কুবেরকে যুদ্ধে  হারিয়ে কেড়ে নিয়েছিল।  রাঘব বিভীষণের প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে পুষ্পক রথ আহ্বান করার সম্মতি প্রদান করলেন।  নিমেষের মধ্যে পুষ্পক রথ  এসে হাজির হল।  এই দিব্যরথ দেখতে অনেকটা একখণ্ড মেঘের মতো। আরোহীর ইচ্ছামতো এটা আপনা থেকেই  চলে।

  আমাদের অযোধ্যায় ফিরে যাবার জন্য  প্রস্তুত হতে দেখে বিভীষণ, বাঁদর, হনুমান এবং সুগ্রীবের মন্ত্রীবর্গও বেরিয়ে এল।  আমরা প্রত্যেকেই মনের আনন্দে পুষ্পক রথে বসলাম। সরমা,ত্রিজটা চোখের জলে ভেসে আমাকে বিদায় দিল।  স্বামী আমাকে এবং লক্ষ্ণণকে পাশে বসালেন। তিনি রথের উপর থেকে লঙ্কা নগরের সৌন্দর্য উপভোগ করে লক্ষ্ণণকে বললেন-‘ ভাই লক্ষ্ণণ, রাবণ যতই অত্যাচারী হোক না কেন তার রাজ্য এবং প্রজাদের প্রতি  থাকা অনুরাগ প্রশংসনীয়। সুনির্মিত নগর, সমগ্র রাজ্যে নির্মল পানীয় জলের ব্যবস্থা, সুন্দর পরিকল্পনায় নির্মাণ করা ঘর দুয়ার, পথঘাট ইত্যাদি তার প্রতিটি দিকে দক্ষতার কথাই প্রমাণ করে। তারপরে স্বামী আমাকে আকাশ থেকে নিচের দৃশ্য গুলি দেখিয়ে বলে যেতে লাগলেন –‘জানকী, ঐ যে ত্রিকুট পর্বত।সমতলের  ওই জায়গাটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। ওই যে ঢিপিটা দেখছ, সেখানেই আমি দুরাত্মা রাবণকে বধ করেছিলাম। ওই যে বড় রথের চাকাটা পড়ে আছে, সেখানে  কুম্ভকর্ণকে বধ করা হয়েছিল। মায়া সীতাকে বধ করে আমাদের মন ভেঙ্গে দেবার জন্য পুজো সম্পন্ন করতে যাওয়া  ইন্দ্রজিৎকে ওই গাছের কাছে লক্ষ্ণণ বধ করেছিল।’

তারপরে স্বামী সাগরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন-‘ এই যে বৃহৎ সেতু দেখছ,তা মহাবীর নলের তত্ত্বাবধানে বাঁধা সেতু ।’

সমুদ্রে সেতুবন্ধনের মতো বিস্ময়কর কাজ কীভাবে করতে পারল সে বিষয়ে আমি জানতে চাওয়ায় রাঘব  বললেন-' বৈদেহী, হনুমান   তোমার খবর দেবার পরে আমি এই কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম যে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সাগর কীভাবে পার হব। ধর্মাত্মা বিভীষণ আমাকে সমুদ্র দেবতার উপাসনা করার জন্য উপদেশ দিয়েছিল । তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে আমাদের বিখ্যাত পূর্বপুরুষ ইক্ষাকু বংশের রাজা সগর সমুদ্রের সৃষ্টি করেছিল। তিনি আমাদের প্রার্থনা নিশ্চয় শুনবেন। আমি সমুদ্রের তীরে সম্পূর্ণ তিনদিন তিনরাত কুশাসনে বসে সমুদ্র দেবতাকে ধ্যান করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হল না। সাগর অশান্ত হয়ে থাকল এমনকি এক একটি ঢেউ আমার কুশাসনকে ভিজিয়ে দিল। আমার সমগ্র দেবতাদের উপরে ভীষণ ক্রোধ জন্মেছিল। তাই হাতে তীর-ধনুক নিয়ে ভাবলাম এই বাণে সমুদ্রের দর্প চূর্ণ করে সমুদ্রের জল শুকিয়ে ফেলব। সাগরের সমস্ত জীব নাশ করব।আমার সৈন্যবাহিনী পায়ে হেঁটে সাগরের নিচ দিয়ে যেতে পারবে। আমার ক্রোধ দেখে সমুদ্রের জীব গুলি আর্তনাদ করতে লাগল। সাগরের জলে বাষ্পীভবন শুরু হল। হঠাৎ সমুদ্রের মাঝখান থেকে সাগর দেবতা বেরিয়ে এসে বললেন-' রঘুনন্দন, তুমি নিশ্চয় জান পঞ্চভূত অর্থাৎ পৃথিবী, আকাশ, জলবায়ু, আগুন, এবং বাতাস সব সময় নিজের স্বাভাবিক রীতি অনুসারে চলে। তার ব্যতিক্রম হয় না। আমি সাগর। আমার নিজের স্বাভাবিক ধর্ম আছে। আমি স্থির হয়ে লঙ্কায় যেতে দিতে পারি না । তাই রাঘব, তুমি জীবজগতে বিশৃংখলার সৃষ্টি কর না। সাগরে সেতু বেঁধে তুমি অনায়াসে সমুদ্র পার হতে পারবে। তোমার সৈন্যবাহিনীতে নল নামে বীর  রয়েছে সে প্রকৃতই বিশ্বকর্মার পুত্র। নল পিতার সমতুল্য । সমুদ্র দেবতা এভাবে বেশ কিছু উপদেশ দিয়ে যুদ্ধজয়ের কামনা করে অন্তর্হিত হলেন । 

কথাটা বলে স্বামী কিছুক্ষণের জন্য  অপেক্ষা করলেন। তারপর পুনরায় বললেন-' বুঝেছ জানকী,একশো যোজন দীর্ঘ এই পথটি দশ যোজন প্ৰস্থ হিসেবে নিয়ে নীল বাঁদর এবং ভালুক সেনার সাহায্যে নির্মাণ করে ফেলল । বিশাল শিলাখণ্ড ছাড়া ও সমস্ত ধরনের গাছ পেতে দিল সেই পথে।

  তারপর স্বামী একটুকরো অপূর্ব জায়গা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে  বললেন-' ওই যে গাছ বনে পরিপূর্ণ  হয়ে থাকা নগরটা দেখতে পাচ্ছ সেটাই কিষ্কিন্ধানগর। পাশে সেই প্রস্রবনগিরি।  তারই একটি গুহায় বর্ষাটা পার করেছি। ওই যে পাথরটা দেখছ, আমি তার উপরে বসে তোমার কথা ভেবে ম্রিয়মান হয়ে ছিলাম।'

  এদিকে কিষ্কিন্ধা নগরের নাম শুনে আমার একবার মহারানী তারাকে দেখার ইচ্ছা হল। হনুমানের মুখে তারা সম্পর্কে এত কিছু শুনেছি যে  একবার তাকে দেখার আগ্রহ জন্মাল । তাছাড়া আমার স্বামী যেহেতু বালীকে অন্যায় ভাবে বধ করেছে, তাই তারার সঙ্গে দেখা করে যাওয়া আমার নৈতিক কর্তব্য বলে বিবেচনা করছি। তাই আমার ইচ্ছার কথা স্বামীকে ব্যক্ত করায় তিনি সানন্দে আমার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করলেন। বানর রাজা সুগ্ৰীব ও আমার ইচ্ছায় অতিশয় আনন্দিত হলেন। আমরা সকলেই কিষ্কিন্ধায়  নামলাম।

মহারানী তারা আলাদাভাবে সকলকে সম্ভাষণ  জানালেন । সুগ্রীবের পত্নী রুমা সহ প্রতিটি মহিলাই আমাদের খুব আদর যত্ন করলেন। রুমা সারারাত আমাদের সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দিলেন। আমার বিরহে রাঘব কীভাবে কাটিয়েছিল সেই বিষয়েও বললেন। পুনরায় অযোধ্যা থেকে কিষ্কিন্ধায় আসার সময় সেদিনই স্বামী অঙ্গদকে যুবরাজ বলে ঘোষণা করলেন।

পরের দিন আমরা সকালে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করলাম। আমাদের সঙ্গে রুমা এবং আরও কয়েকজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। স্বামী আমাকে আগেরবারের মতোই পাশে বসিয়ে জায়গো গুলি দেখিয়ে যেতে লাগলেন-' বৈদেহী,ওই যে পর্বতটা দেখছ, সেটাই ঋষ্যমুক পর্বত। সেখানেই মিত্র সুগ্রীবের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল।' পম্পা সরোবরের  কাছে পৌঁছাতেই স্বামী আমাকে সরোবরের সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করতে দিয়ে বললেন-' বৈদেহী পম্পা সরোবরের সৌন্দর্য মানুষের ক্ষুধা তৃষ্ণা হরণ করে। এই সরোবরের পারে আমি তোমার বিরহে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ফেলেছিলাম। এখানেই আমি ধর্মপরায়ণ শর্বরীর দর্শন লাভ করেছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরে স্বামী পুনরায় আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন -'জানকী ,  চিনতে পারছ কি ওই জায়গাটায় আমাদের আশ্রম ছিল। ওই যে আমাদের পর্ণকুটির। গোদাবরী নদী। এখান থেকেই দুরাত্মা তোমাকে হরণ করেছিল। এটা মহর্ষি অগ‍্যস্ত  মুনির আশ্রম। আমরা ঋষিকে দর্শন করার কথা মনে আছে কি? ওই দিকে তাকিয়ে দেখ, অত্রি মুনির আশ্রম বলে চিনতে পারছ কি ?সেখানে মাতা অনুসূয়া তোমাকে স্নেহে আদরে আপ্লুত করে তুলেছিল। অলংকার এবং সাজপোশাকে তোমাকে সাজিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে ছিল, বৈদেহী তোমার মনে আছে কি?

কিছুটা দূরে যাবার পরে স্বামী পুনরায় বললেন -'জানকী এই পর্বতটা কি চিনতে পারছ?  গিরিরাজ চিত্রকূট। এখানে ভরত এসেছিল আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। ওই যে যমুনা নদীর তীরে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম।এখানে আমরা এক রাত কাটিয়ে ছিলাম। আজও আমরা এখানে এক রাত কাটাব। মুনির কাছ থেকেই রাজ্যের সমস্ত সংবাদ নেব।ভরতের আমাদের প্রতি যদি আগের স্নেহ অটুট আছে বলে জানতে পারি তাহলে  অযোধ্যায় প্রবেশ করব, না হলে ফিরে যাব। ক্ষীণ ধারার মতো যা বয়ে যেতে দেখছ সেটাই গঙ্গা নদী। তার তীরে নিষাদ রাজ গুহর শৃঙ্গবেরপুর। গাছটার নিচে আমরা রাত কাটিয়ে ছিলাম মনে পড়ছে। এরপরে আমরা পাব সরযূ নদী। তার তীরে আমাদের রাজ্য অযোধ্যা। তবে আমরা এখন ঋষির আশ্রমের একটু আগে গিয়ে নামব। '

আমরা আশ্রম থেকে বেশ কিছুটা দূরে রথ থেকে নেমে আশ্রমের অভিমুখে হাঁটতে লাগলাম। ঋষি ভরদ্বাজকে যাওয়ার সময় যে চেহারায় দেখে ছিলাম এখন চৌদ্দ বছর পরেও সেই একই চেহারা দেখে অবাক হয়েছিলাম। আমরা ঋষিকে প্রণাম জানালাম। মুনি ভরদ্বাজ চৌদ্দ বছর বনবাস সম্পূর্ণ করা সাধারণ কাজ নয় বলে  আমাদের আশীর্বাদ দেওয়ার সঙ্গে একটা বর দিতে চাইলেন।স্বামী হাতজোড় করে বললেন-' প্রভু আপনি যদি বড় দিতে চাইছেন, তাহলে এই বর দিন যাতে অযোধ‍্যায়  যাওয়ার পথে বিপরীত আবহাওয়াতেও গাছগুলি  সুস্বাদু ফলে ভরে ওঠে। মৌচাক গুলি যেন অনবরত রসে ভরপুর হয়ে থাকে।'

ঋষি তথাস্তু  বলে আশীর্বাদ করলেন।

আমরা মুনির কাছ থেকে অযোধ্যার সমস্ত খবর পেলাম।বিশেষ করে ভরত কঠোর ব্রতের মধ্য দিয়ে কীভাবে সুচারুরূপে রাজ্য শাসন করছে সেকথা  মুনি বড় আনন্দের সঙ্গে বললেন। ভরতের ভ্রাতৃ ভক্তির কথা বিভীষণ, হনুমান, এবং সুগ্রীবের মন্ত্রী প্রত্যেকেই গল্প শোনার মত স্বামীর কাছ থেকে শুনল। স্বামী ঋষির কাছ থেকে সমস্ত কিছু শুনে আশ্রম থেকেই নিষাদ রাজ গুহ এবং ভরতকে বার্তা পাঠালেন যে বর্তমানে আমরা রাজ্যের সীমানায় রয়েছি। সকালে অযোধ্যায় প্রবেশ করব। সেই রাতে আমরা সকলেই ভরদ্বাজ মুনির আতিথ্য  গ্রহণ করলাম। পরের দিন সকালে মুনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রথে উঠলাম। অযোধ্যার অভিমুখে । স্বামী বাঁদর বীরদের মনুষ্য রূপ ধারণ করে রথে ওঠার নির্দেশ দেন।

  রাঘব আমাকে রথের  উপর থেকে সরযূ নদী দেখিয়ে   বললেন -'জানকী,আমরা এখন অযোধ্যার মধ্যে প্রবেশ করব। তাই মাতৃভূমিকে প্রণাম জানাও। আমরা প্রত্যেকেই রথের উপর থেকে অযোধ্যা নগরকে প্রণাম জানিয়ে রাজ্যের সৌন্দর্য নয়নভরে দেখলাম ।এমনিতেই অযোধ্যা সুন্দর এবং সমৃদ্ধশালী, তারমধ্যে এখন আমরা আসব বলে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে । যেদিকেই তাকাই সেদিকেই জাঁকজমক। 

স্বামীর নির্দেশে পুষ্পক রথ মাটি স্পর্শ করল। ভরত এগিয়ে এসে আমাদের রথের ভেতরে সম্ভাষণ জানাল। দাদা রামচন্দ্রের চরণে মাথা রেখে তিনি চোখের জলে ভাসলেন। স্বামী ভরতকে রথের মধ্যেই জড়িয়ে ধরে নিজের কোলে বসিয়ে নিলেন।তারপর মানুষের রূপে আসা বীরদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

আমাদের অভ্যর্থনা  করার জন্য নতুন করে একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল।কুলু গুরু বশিষ্ঠ সহ, রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, পন্ডিত ,মন্ত্রী ,তিনজন মাতা ,দুই ভাই, তিনজন জা, বিখ্যাত শিল্পী, শ্রেষ্ঠ বৈদ্য, শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী ,প্রত্যেকেই এগিয়ে এসে পুষ্প মালা আর মিষ্টির ভাঁড় সহ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। অভ্যর্থনার কাজ শেষ হওয়ার পরে সুসজ্জিত চতুরঙ্গ সেনা, গায়ক বাদক, বিভিন্ন নর্তকীর দল, আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেল। ভরত দাদাকে অভ‍্যর্থনা জানানোর জন্য খড়ম মাথায় করে নিয়ে এসেছিল। তারপরে হাঁটু গেড়ে খরম জোড়া স্বামীর পায়ে পরিয়ে দিয়ে বলেছিল -'হে নরশ্রেষ্ঠ ভ্রাতা রাম, এই খড়মজোড়া তোমার চরণে পুনরায় পরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে এই বিশাল রাজ্য, রাজপাট সমগ্র দেশবাসীর সামনে আপনাকে ফিরিয়ে দিলাম। ধনবল,সৈন্য বল সহ সমস্ত সম্পদ আপনি যাবার সময় থেকে দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি আপনার দায়িত্ব পালন করে এখন কার্যভার আপনাকে অর্পণ  করতে পেরে  অত্যন্ত সুখী হয়েছি।'

আমরা ভরত শত্রুঘ্নকে রথে উঠিয়ে প্রথমেই গেলাম ভরতের আশ্রম নন্দীগ্রামে। মহাত‍্যাগী ভরত কী কঠোর ব্রতের মধ্য দিয়ে চৌদ্দ বছর সম্পন্ন করলেন তা স্বচক্ষে দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। আমাদের সঙ্গে আসা বীর অতিথিবৃন্দ ভরতের ভ্রাতৃভক্তি এবং দেশপ্রেম দেখে কেঁদে ফেলল। কিছুক্ষণ নন্দীগ্রামে থেকে আমরা পুনরায় অযোধ্যায় ফিরে এলাম।

আমাদের সঙ্গে আসা অতিথিদের পৃথক পৃথকভাবে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য শত্রুঘ্ন মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। উর্মিলা যদিও সব সময় মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তির  সঙ্গে ছিল, তার যেন কোনো কিছুতেই উৎসাহ, আগ্রহ, আন্তরিকতা নেই বলে মনে হচ্ছিল। আমাকে অভ্যর্থনা ইত্যাদি সমস্ত কাজ যন্ত্রের মতো করে যাচ্ছিল। উর্মিলাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল যেন সে ভালোবাসা, স্নেহ, অনুভূতি থাকা কোনো জীব নয়। একটি জীবিত পদার্থ মাত্র। ভরত বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সমস্ত শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, পণ্ডিত, মন্ত্রীদের এবং বন্ধুবর্গ কে একত্রিত করে দাদা রামচন্দ্র কে বিনতি জানালেন-' হে পূজনীয় শ্রেষ্ঠ ভ্রাতা রামচন্দ্র, আমি আগেও বলেছিলাম এবং এখন ও বলছি এই বিশাল রাজ্য সামলানো আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই আমি গুরু, পন্ডিত, মন্ত্রী, মাতা,ভ্রাতা, মিত্র সবার সামনে পুনর্বার বলছি আপনার অভিষেক আগামীকাল সম্পন্ন করতে হবে। তাই আপনার মুখে তথাস্তু শুনতে চাইছি।

রাঘব সম্মতি প্রদান করার সঙ্গে সঙ্গে সবাই জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। আমাদের দেখতে আসা অগণন মানুষের  মধ্যে আনন্দধ্বনি সমগ্র অযোধ্যা নগরকে  মুখরিত করে তুলল। পুনরায় মানুষ গুলির মধ্যে ব্যস্ততা আরম্ভ হল। দাদা ভাই তিনজনের জটার ভার খসিয়ে স্নান করার কার্য দেখার জন্য অনেক লোক সমবেত হল।

এদিকে বাঁদর বীর সেনাদের মধ্যে আনন্দের আর সীমা ছিল না। তাঁদের প্রভুর অভিষেক। ভরত অভিষেকের জন্য বিভিন্ন ঘাটের জল আনতে তাদের দায়িত্ব দিল।  কুলগুরু বশিষ্ঠ স্বামীর সঙ্গে আমাকেও মন্ত্র পাঠ করালেন।মহিলাদের হাসি ফুর্তির মধ্যে আমাকে  স্নান করিয়ে মহারানীর সাজ পোশাক পরিয়ে স্বামীর কাছে বসালেন।  পরম আনন্দের মধ্য দিয়ে অভিষেক কার্য সম্পন্ন হল । ছিন্নভিন্ন হওয়া পরিবারটা  পুনরায় একতার বন্ধনে  বাঁধা  পড়ায়  আমার আনন্দের আর সীমা রইল না।

  একটি রাজ্য থেকে রাজা দীর্ঘদিনের জন্য দূরে থাকাটা মঙ্গল জনক নয় । তাই আমাদের সঙ্গে আসা অতিথিবৃন্দকে কিছুদিন আনন্দ আহ্লাদের মধ্যে রেখে স্বামী নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেন।সবাইকে পুনরায় দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বামী নিজেও রাজকার্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চারপাশ থেকে কোশল রাজ্যকে উন্নতির শিখরে  অবতীর্ণ করানোর সংকল্প নিয়ে  রাঘব রাজ্যশাসনে মনোনিবেশ করলেন ।


বৃহস্পতিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৯ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, Bideha Nandini

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৯

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৯)

লঙ্কা নগরে দিনরাত কেবল কান্নার রোল। প্রতিটি বাড়িতে হয় কারও পিতা না হলে ভ্রাতা অথবা পতি বা পুত্রের  যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে বলতে শুনেছি। বাড়িতে নাকি পুরুষ মানুষ নাই হয়ে গেছে। অনবরত শুনতে থাকা কান্নার ধ্বনি আমাকে শোকাতুর করে  তুলল। নিজেকে দোষী বলে মনে হতে লাগল। যেন এতগুলি জীবের দুঃখের এবং বধের কারণ বলে আমার মনে হতে লাগল। জীবনের প্রতি মায়া একেবারে নাই হয়ে গেল । যে কোনো মুহূর্তে দেহের অবসান ঘটানোর কথা মনে পড়তে লাগল।

ইন্দ্রজিৎ বধের পরে যদিও স্বামী রামচন্দ্রের জয় নিশ্চিত বলে ভেবেছিলাম, পরে রাবণের যুদ্ধের পিপাসা ,উগ্রক্রোধ, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা চোখ দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ইন্দ্রজিৎ বধে শোকে জর্জরিত হয়ে পড়া রাবণ একটা সময়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। সেদিন সেইসময় রাবণের সঙ্গে মন্ত্রী সুপার্শ্ব না থাকলে আমি রাক্ষস রাজের তরোয়ালে দু'খন্ড হয়ে যেতাম। রাবণ ক্রোধে আর্তনাদ করে বলেছিল -'আমার পুত্র ইন্দ্রজিৎ শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দেবার জন্য নকল সীতা দু'খন্ড করে দেখিয়েছিল। কিন্তু আজ আমি আসল সীতাকে দু'টুকরো করব। এ কথা বলে রাবণ চিৎকার করে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে আমার দিকে তেড়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী সুপার্শ্ব আমার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত মেলে  বাধা দিয়ে বললেন-' হে মহারাজ দশানন, আপনি সাক্ষাৎ কুবেরের ভাই হয়ে একজন অবলা নারীকে বধ করার জন্য  বেরিয়ে এসেছেন। হে রাজন  বৈদেহীকে বধ করলে আপনার  যশস্যা  থাকবে না। স্ত্রীবধ করে আপনি পাপে ডুবতে চাইছেন কেন। হে বীর জনকনন্দিনীকে বধ করার চিন্তা মন থেকে পরিহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে চলুন । রামচন্দ্রকে আপনার যুদ্ধ করার কৌশল পরাক্রম দেখান। ত্রিভুবন জয় করা গৌরব অক্ষুন্ন রাখুন।'

মন্ত্ৰী  সুপার্শ্বের   কথা শুনে  রাবণ খোলা তরোয়াল  খাপে ভরিয়ে  আমার দিকে ক্রোধের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে  গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।  আমি নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পরে আমি অশোক বন থেকে  লংকা নগরীর  উল্লাস অনুমান করতে পেরেছিলাম।  রাক্ষসপুরীর আকাশ বাতাস  রণধ্বনিত হয়ে উঠেছিল।  রাক্ষস সৈন্য নতুন উদ্যমে  জয়ধ্বনি করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে গেল।মহিলারা প্রত্যেকে ফুল চন্দন চাল ছিটিয়ে রাজার মঙ্গল এবং জয়ের কামনা করে বিদায় দিলেন।

  রাবণ সুসজ্জিত হয়ে  যুদ্ধে গিয়েছিল যদিও আমার বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে আমার স্বামী রামচন্দ্র এই দুরাত্মার জীবনের অবসান ঘটাবে।তার হয়তো জন্মই হয়েছে এই পাপাত্মাকে নিপাত করার জন্য। তাই আমি উদ্বিগ্ন হয়ে  যুদ্ধের ফলাফলের জন্য পথ চেয়ে রইলাম। অন্তরে ভগবানকে প্রার্থনা জানিয়ে ছিলাম তিনি যেন রাম লক্ষ্ণণকে অনন্ত শক্তি প্রদান করে এই মহাযুদ্ধে দুজনের পথের সহায়ক হয়ে থাকেন।  আমি পুত্রবতী হওয়ার জন্য আমাকে যেন সধবা করে রাখেন ।

মনের মধ্যে কথাগুলি নাড়াচাড়া করে থাকার সময় ত্রিজটা এসে উপস্থিত হল।  এই কয়েকদিন  তিনি ঘরে ঘরে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বেড়ানোর কাজে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন । আমার কাছে বসে  প্রথমে আমার স্বাস্থ্যের খবর নিলেন।  তারপর তার মনের কথা বলতে শুরু করলেন -' মা সীতা, অধর্মী লোকের সুখ,শান্তি আর নিস্তার নেই। রক্তের গর্বে দুদিন ছটফট করে প্রতাপ দেখায় যদিও শেষ পরিণাম ভয়াবহ হয় । মহারাজ রাবণের যুদ্ধের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে ।অবশ্য তিনি রাম লক্ষ্ণণকে এমনিতেই ছেড়ে দেননি। তোর দেবর লক্ষ্ণণ কোনোমতে রক্ষা পেয়েছে। রাবণ শক্তিশালী বাণ মেরে ভাই বিভীষণকে বধ করতে যেতেই লক্ষ্ণণ দ্রুতগতিতে এসে বিভীষণকে আড়াল করে ফেলে। তারপরে অযোধ্যা নন্দন রাজার উপরে বাণ বর্ষণ করতে শুরু করে। বিভীষণকে রক্ষা করে বীরত্ব দেখানোয় ক্রোধিত রাবণ শ্বশুর ময়দান নির্মাণ করা এক প্রাণনাশ কারী বাণ লক্ষণের দিকে নিক্ষেপ করলেন। নিমেষের মধ্যে লক্ষ্ণণ ঢলে পড়ল। সবাই ভেবেছিল তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। কিন্তু বৈদ্য সুষেণ, মহাবীর জাম্ববন্ত,হনুমান ইত্যাদি বীরদের সেবা শুশ্রূষায় লক্ষ্ণণ সুস্থ হয়ে উঠেন। ভাইকে এভাবে আঘাত করায় রামচন্দ্র প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে তীক্ষ্ণ বাণে রাবণকে জর্জরিত করে ফেলছেন বলে এইমাত্র খবর এসেছে।

কথাটা বলে ত্রিজটা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর দুই হাত বুকের উপরে রেখে চোখদুটি বন্ধ করে ভক্তিভরে বলতে শুরু করলেন-‘ এখন যে যুদ্ধ হচ্ছে তা অতি ভয়াবহ। রামচন্দ্র যুদ্ধ করছেন মাটিতে দাঁড়িয়ে। রাজা রাবণ যুদ্ধ করছেন সুসজ্জিত রথের উপরে উঠে। সৎ লোকেরা অসমান যুদ্ধ সহ্য করতে পারেনা। তাই দেবরাজ ইন্দ্র সারথি মাতালের হাতে তার রথ পাঠিয়ে দিলেন রামচন্দ্রের জন্য। এর অর্থ সহজেই অনুমান করা যায়।’ কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্রিজটা চলে গেলেন।

আমিও ভয়,শঙ্কা, আশা নিরাশা অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বামী রামচন্দ্রের চরণ চিন্তা করে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে সরমা এল। তার মুখে উত্তেজনার ছাপ। তবুও ধীর-স্থিরভাবে আমার কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন- বৈদেহী,রণক্ষেত্রে রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে । সৈন্যদের মৃতদেহ পর্বতের রূপ ধারণ করেছে। রামচন্দ্র এবং রাবণের মধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পতি বিভীষণ পাঠানো গুপ্ত খবর অনুসারে দুইয়ের মধ্যে এত ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হচ্ছে যে পৃথিবী নাশ হয় বলে  সমস্ত প্রাণী ভয়ে কম্পমান হয়ে পড়েছে। এভাবে সরমা যুদ্ধের খবর দিতে থাকার সময় রাজপ্রাসাদের একদিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ এবং হৃদয়বিদারক ক্রন্দন ধ্বনি ভেসে এল। আমি কান খাড়া করে রইলাম।সরমা দ্রুত আমার কাছ থেকে রাজ প্রাসাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। আমি কান পেতে শুনতে চেষ্টা করেও কিছুই বুঝতে পারলাম না।কেবল মাত্র কান্না, চিৎকার, চেঁচামেচি, দৌড়াদৌড়ির শব্দ কানে এসে পড়ল। 

কয়েক মুহূর্ত পরে ত্রিজটা থেকে শুরু করে এককর্ণা,একাক্ষী,অকর্ণিকা ইত্যাদি রাক্ষসীরা আমার দিকে ছুটে এল।ত্রিজটা  চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলল-‘ জানকী,প্রভু রামচন্দ্র মহর্ষি অগ্যস্ত মুনি উপহার দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে মহা প্রতাপী, ত্রিভুবন বিজয়ী লঙ্কেশ্বরের জীবনের অবসান ঘটিয়েছে। কথাটা অবরুদ্ধ কন্ঠ বলে সরমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পাহারা দেওয়া প্রহরীরাও চিৎকার জুড়ে দিল।

সমস্ত লঙ্কা নগরী শোকে ডুবে গেল। ত্রিজটা এবং প্রহরীরা গলাগলি করে কাঁদতে কাঁদতে রাজপ্রাসাদের দিকে বেরিয়ে গেল। 

মহামন্ত্রী সুপার্শ্ব আমার নিরাপত্তার জন্য অশোকবনে দৌড়াদৌড়ি করে অন্য নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করলেন।


বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৭ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, Dr.Malini

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৭

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৭)
  কুম্ভকর্ণকে বধ করার পর থেকে  পাহারা দেওয়া রাক্ষসীরা একেবারে নিরীহ প্রাণীর মতো ব্যবহার করতে লাগল। আমার মন ভালো না থাকলে ওদের বিচার হতে পারে বলে ধরে নিয়ে আমাকে মিষ্টি ভাবে সম্ভাষণ জানাতে লাগল। কেউ কেউ বলেছিল আমাদের কোনো দোষ নেই। আমরা রাজার আদেশ পালন করছি মাত্র। রাজার নুন খেয়েছি যখন তার কথা শুনতেই হবে। তাই আমি ওদের আচার-ব্যবহার থেকেই  কোন দিন কার জয় কার পরাজয় অনুমান করতে পেরেছিলাম ।ওদের মধ্যে কথাবার্তা শুনে জানতে পেরেছিলাম যে ভাই কুম্ভকর্ণের মৃত্যুতে রাবণ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।শোক  সম্বরণ করতে না পেরে লঙ্কেশ্বর নাকি শোকে দুঃখে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। নিজের পিতাকে শোক এবং হতাশায় ভেঙ্গে পড়তে দেখে ত্রিশরা,দেবান্তক,নরান্তক  এবং অতিকায় নামে রাবণের চার পুত্র রামের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। চারজনই নাকি অনেক বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে মৃত্যুকে বরণ করে। 
একদিন হঠাৎ পাহারা দেওয়া রাক্ষসরা আমাকে আবার আগের মতো  কটু বচন শোনাতে লাগল। আমি ওদের ব্যবহারে অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেলাম। কে জানে রাম বাহিনীতে কোনো সংকট দেখা দিয়েছে কিনা? তা নাহলে ওরা পুনরায় কেন এ ধরনের ব্যবহার করবে? এদিকে রণক্ষেত্রের কোনো খবর পাচ্ছি না। সাধারণত ত্রিজটা ঘনঘন আসে। কিন্তু এই কয়েকদিন ত্রিজটা আসেনি।রাবণের চার পুত্রের একদিনেই মৃত্যু হওয়ায় রাজার পত্নীদের মধ্যে হাহাকার লেগেছে। বিশেষ করে পুত্র অতিকাইর মৃত্যু সংবাদে রাবণের পত্নী ধন্যমালিনী নাকি পাগলের মতো হয়ে পড়েছে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ জানাটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই মনটা শক্ত করে রাম বাহিনীর মঙ্গলের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম।
  পরেরদিন বিকেলের দিকে বিভীষণের পত্নী সরমা উপস্থিত হল। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত কিছু জানতে পারলাম। সরমা দ্রুত কথাগুলি বলে গেল -'জনক নন্দিনী, রাম বাহিনীতে বড় বিঘ্ন ঘটে গেল। তুমি সেসব কিছুই জান না ।না জানায় ভালোই হয়েছে ।আমি জানতে পেরে অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। সারারাত ছটফট করে কাটিয়েছি ।আজ সকালে পতি বিভীষণের গোপন সংবাদ পাওয়ার পর মনে আশা জেগেছে। কথাটা বলে সরমা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আমি রাম বাহিনীতে কী বিঘ্ন ঘটেছিল জানার জন্য ব্যগ্ৰ হয়ে পড়লাম।সরমার দুই হাত আঁকড়ে ধরে বললাম-' হে মাতা, স্বামী রামচন্দ্রের সেনাবাহিনীতে কী ঘটেছিল আমাকে খুলে বল। আমি প্রহরীদের ব্যবহারে এক ধরনের অমঙ্গলের আভাস পেয়েছিলাম। সরমা বলল-' পুত্র, ভ্রাতাকে হারিয়ে শোকে অধীর হয়ে পড়া রাবণকে আশ্বাস দিল রাবণ মন্দোদরীর পুত্র মেঘনাদ অর্থাৎ ইন্দ্রজিৎ ।ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে যেতে দেখে রাবণ পুনরায় উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল। ইন্দ্রজিৎ নিজে অদৃশ্য হয়ে থেকে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে একদিক থেকে বাঁদর সেনা ধ্বংস করে যেতে লাগল। সুগ্রীব, হনুমান, নীল, নল,জাম্ববন্তকে ধরে প্রত্যেকে বীর আহত হয়ে পড়ল। এমনকি তোমার স্বামী রামচন্দ্র এবং দেবর লক্ষ্মণ ও সেই  বাণে বিদ্ধ হল। ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে থাকার ফলে এই দুই মহাবীর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই একটা সময়ে দুজনেই রণক্ষেত্রে ঢলে পড়ল। রাম বাহিনীকে  সম্পূর্ণরূপে শেষ করে ইন্দ্রজিৎ বীরদর্পে লঙ্কায় ফিরে এল। অনেকদিন পরে রাবণের মুখেও হাসি ফুটল। এদিকে বাহিনীতে কেবল আমার পতি বিভীষণ সুস্থির অবস্থায় ছিলেন। হনুমান আঘাত পেয়েছিল যদিও সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এসেছিল। দুজনেই পড়ে থাকা বীরদের মধ্যে  চিৎকার করে করে উৎসাহজনক বাক্যে দেহে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েছিল। তারা  বলছিল-' হে বীর সকল, ভয় পেয়ো না ।তোমাদের কার ও মৃত্যু হয়নি ।রাম লক্ষ্মণের ও মৃত্যু হয়নি ।দুজনেই ব্রহ্মদেবের প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্ত্র পরিহার করে ইন্দ্রজিতের  বাণ সহ্য করে মাত্র মূর্ছিত হয়ে পড়েছে। কথাটা বলে সরমা কিছুক্ষণের জন্য চোখ দুটি বন্ধ করে স্থির হয়ে রইল। তারপর পুনরায় বলতে শুরু করল-' আমার পতি বিভীষণ জেনেছিল যে ব্রহ্মাস্ত্র সক্রিয় হয়ে থাকে মাত্র পাঁচ প্রহর। যাদের দেহে তখনও পর্যন্ত প্রাণ থাকে তাদের সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার জন্য এক বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন ।সেই ঔষধের বিষয়ে জানে একমাত্র বৃদ্ধ ভালুক জাম্ববন্ত। এদিকে জাম্ববন্ত ও রণে আহত হয়ে পড়ল। তার দেহে তখন ও প্রাণ আছে না নেই জানার কোনো উপায় নেই। কারণ সত্তরকোটি বাঁদর ভালুক পড়ে থাকা জায়গায় জাম্ববন্তকে খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়। দুজনে হাতে মশাল নিয়ে জাম্ববানকে  খুঁজতে শুরু করল।  একবার স্বামী বিভীষণ হঠাৎ জাম্ববান্তকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জাম্ববান্তের কানের কাছে চিৎকার করতে লাগল-' হে প্রভু, আপনার দেহে প্রাণ আছে কি ?জাম্ববন্ত নাকি বড় কষ্টে বলে উঠল-' দয়ালু বিভীষণ, আমাদের পবনপুত্র হনুমান কুশলে আছে তো ?আমার পতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-' হে বীর ,এতগুলি বীর , মহা বীরের  বিষয়ে জিজ্ঞেস না করে আপনি কেবল পবনপুত্র বিষয়ে কেন জিজ্ঞেস করলেন ?'
জাম্ববন্ত নাকি তখন বললেন-' তিনি কুশলে থাকলে বাকি সবাই প্রাণ পেয়ে  উঠবে। কথাটা শুনে হনুমান জাম্ববন্তের  পা'দুটি  ধরে প্রণাম জানিয়ে বলল-' আমি কুশলে আছি প্রভু। আমাকে আদেশ দিন আমি কী করতে পারি।' জাম্ববন্ত তখন হনুমানকে মহা সমুদ্র পার হয়ে সুদীর্ঘ আকাশ পথ অতিক্রম করে হিমালয় যেতে বললেন। সেখানে গেলে ঋষভ এবং কৈলাস পর্বত দেখতে পাবে। সেই পর্বত শৃঙ্গ ঔষধি গাছে পরিপূর্ণ। মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরনী এবং সন্ধানী নামের অদ্ভুত অজ্ঞান হয়ে থাকা প্রাণীদের জন্য মহৌষধ এই গাছকে ঔষধি হিসেবে প্রয়োগ  করলেই সবাই পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠবে বলে জাম্ববন্ত জানাল। জাম্ববন্তর কথা শুনে হনুমান বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পর্বতের উপরে উঠে নিজের দেহটা বিশাল করে তুললেন। তারপর আকাশপথে উত্তর দিকে যেতে শুরু করলেন। হনুমান লক্ষ্যস্থানে অবতরণ করে গাছ সমূহ জ্বলজ্বল করে থাকতে দেখলেন। পরে যখন তুলতে গেলেন তখন গাছগুলি অর্ন্তধান করল। হনুমান বুঝতে পারলেন যে কেউ কু-অভিপ্রায় এরকম করেছে। তা না হলে গাছগুলি ভুতে পাওয়া। তাই গাছের খোঁজে সময় নষ্ট না করে সমগ্র শৃঙ্গ টাকে পিঠে নিয়ে রাত ভোর হওয়ার আগেই রণক্ষেত্রে উপস্থিত হল। জাম্ববন্তের উদ্যোগে মহৌষধ উদ্ভিদের মহিমায় তখনও কোনমতে প্রাণে বেঁচে থাকা রাম বাহিনীর  দেহে শক্তি সঞ্চার হল। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। প্রতিজনই নাকি অসীম শক্তির অধিকারী হল। তোমার স্বামী এবং দেবর আগের চেয়েও জ্যোতির্ময় হয়ে পড়ল। বায়ুপুত্র আনন্দে গিরিশৃঙ্গ কে প্রণাম জানিয়ে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে ফিরে এল।’ 
সরমা কথাটা বলে শেষ করতেই আমরা রাম বাহিনীর জয় ধ্বনি শুনতে পেলাম। সেইজয়ধ্বনি শুনে সরমা সরল ভাবে বললেন- বৈদেহী সহজ সরল মানুষের কখনও মৃত্যু নেই। তাই তুমি চিন্তা করনা। আমার বিশ্বাস অতি দ্রুত প্রভু রামচন্দ্র তোমাকে উদ্ধার করবেন। এভাবে অনেক্ষণ আমার সঙ্গে কাটিয়ে সরমা চলে গেল। আমিও স্বামী রামচন্দ্রের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়লাম।


বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস Dr.Malini

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৬)
দুশ্চরিত্র রাবণের দুষ্কর্ম সমর্থন করে স্বামী রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়া প্রতিটি লঙ্কা বাসীকে আমি শত্রু বলে গণ্য করেছিলাম যদিও ব্যতিক্রম ছিল কুম্ভকর্ণ। আমি কুম্ভকর্ণের ছায়া ও দেখিনি যদিও সরমা,ত্রিজটা, কলা এবং প্রহরীদের মুখে যা শুনেছিলাম তা থেকেই এই মহাবীরের প্রতি আমার অন্তরে এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মেছিল । তাই কুম্ভকর্ণের মৃত্যুসংবাদ আমার অন্তরকে স্পর্শ করে গেল। 
কুম্ভকর্ণের মৃত্যু সমগ্র লঙ্কা মহানগরীকে বিষণ্ন করে তুলেছিল। সেই কারুণ্য আমি অশোক বনে বসেও অনুভব করছিলাম। এই কয়েকদিন আমার সঙ্গে কারও দেখা হয়নি। ত্রিজটাও ব্যস্ত ছিল  কুম্ভকর্ণের পত্নী বজ্রজ্বালার সঙ্গে। পতি হারা বজ্রজ্বালা নাকি বারবার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। মাঝখানে একদিন সময় বের করে ত্রিজটা আমার কাছে উপস্থিত হল। এসেই  চোখের জল ফেলে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে বলেছিল-' বুঝতে পেরেছ মা, লঙ্কাপুরী বর্তমানে সজ্জনের রাজত্ব নেই। মহাবীর কুম্ভকর্ণ বছরের মধ্যে অর্ধেক সময় শুয়ে কাটাত যদিও তিনি রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে জানতেন কে ভালো ,কে খারাপ । দাদা রাবণের পরের স্ত্রী হরণ, বলাৎকার, দর্প ইত্যাদি কথাগুলি কুম্ভকর্ণ মোটেই পছন্দ করত না ।তবুও দাদা রাবণ তার প্রাণ ছিল। তোকে হরণ করে আনার পরে কুম্ভকর্ণ দাদাকে সহস্রবার বলেছিল তোকে রামের হাতে পুনরায় অর্পণ করার জন্য । সেদিন যুদ্ধে যাওয়ার আগের মুহূর্তে কুম্ভকর্ণ দাদা রাবণকে বলেছিল-' হে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আজ দেশে যে অশান্তি হয়েছে, ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠেছে, তার জন্য দায়ী তুমি। ত্রিভুবন জয় করার পরে তুমি সুখে শান্তিতে নিজেও থাকা উচিত ছিল এবং প্রজাবর্গদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত ছিল। তোমার এতগুলি সুন্দরী স্ত্রী থাকতে তোমার লালসা সম্বরণ  না করে পরের স্ত্রী  হরণ করে ভীষণ অন্যায় কাজ করেছ। একথা আমি তোমাকে ঘুমোতে যাবার আগে বলেছিলাম। এখনও  বলছি বৌদি মন্দোদরী এবং ভাই বিভীষণ ভালো কথা বলার জন্য তুমি খারাপ পেয়েছিলে। বিভীষণকে তো রাজ্য থেকেই তাড়িয়ে দিলে। রাম লঙ্কা আক্রমণ করে কোনো দোষ করেনি। ঝগড়াটা তুমি সৃষ্টি করেছ। কুম্ভকর্ণের কথা শেষ না হতেই রাবণ ক্রোধে জ্বলে ওঠে বলেছিল-' আমার ভুল হোক ,বল বিক্রমের জন্যই হোক বা মোহে পরেই হোক যা করেছি সেখান থেকে আর ফিরতে পারব না। আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট মনে কষ্ট পেয়েছি ।এই সমস্ত কথা বলে আমাকে আর কষ্ট দিস না। এখন যা করা উচিত তাই কর।’
দাদার কথা শুনে কুম্ভকর্ণ বলেছিল-' হে ভাতৃ আমি তোমার সহোদর ভাই বলেই এ কথা বলছি। শত্রু হলে তোমাকে উসকে দিতাম। তোমার কুকর্মের জন্য খারাপ পাই যদিও বিপদে তোমাকে কখনও ছেড়ে যাব না। আমি এখন যুদ্ধে যাব। তুমি চিন্তা কর না, তোমার জয় অনিবার্য। আমি কিছুক্ষণ পরে রামচন্দ্রের শির তোমাকে এনে উপহার দেব।' একনাগাড়ে কথাগুলি বলে ত্রিজটা কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করল। তারপর চোখের জল মুছে পুনরায় বলল-' কুম্ভকর্ণকে রাবণ নিজ হাতে সাজিয়ে দিলেন। তারপর আলিঙ্গন করে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা করে দিলেন।' কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে ত্রিজটা পুনরায় বলতে শুরু করল-' বুঝেছ রাঘব ঘরনী, কুম্ভকর্ণ যুদ্ধে যে পরাক্রম দেখাল সে কথা রাম লক্ষ্ণণও ভুলতে পারবেনা । সেই পরাক্রম আমি নিজ চোখে দেখি নি যদিও যারা দেখেছে প্রত্যেকেই বলেছে কুম্ভকর্ণ রণক্ষেত্রে নামার সঙ্গে সঙ্গে নাকি বাঁদর সেনা ভয়ে এদিক ওদিক ছিটকে পালালো। কুম্ভকর্ণ বাঁদর সেনা গুলিকে আছড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গে  মুঠো মুঠো করে ধরে খেতে লাগল। হনুমান আকাশ থেকে একটা পর্বত নিয়ে কুম্ভকর্ণকে আঘাত করেছিল।কিন্তু কুম্ভকর্ণ তাতে ভ্রুক্ষেপ করল না, উল্টো হনুমানকে এরকম একটি আঘাত করল যে হনুমান রক্ত বমি করতে লাগল। তারপর মহাবীর বালির পুত্র অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল। দুজনের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হল।একবার অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের বুকে এত জোরে আঘাত করল যে কিছু সময়ের জন্য কুম্ভকর্ণ অচেতন হয়ে পড়ল ।কিন্তু চেতনা ফিরে পেয়ে অঙ্গদের  দেহে কুম্ভকর্ণ এরকম একটি কিল বসিয়ে দিল যে অঙ্গদ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তা দেখে সুগ্রীব তখনই কুম্ভকর্ণের উদ্দেশ্যে এক প্রকাণ্ড পর্বত তার বুকে নিক্ষেপ করলেন। কুম্ভকর্ণ হাতে থাকা শূল  সুগ্রীবের দিকে নিক্ষেপ করলেন।কিন্তু হনুমান শেষ পর্যন্ত শূল ধরে ফেলে ভেঙ্গে ফেলল। মহাক্রোধে কুম্ভকর্ণ মলয় পর্বতের শিখরটা তুলে নিয়ে সুগ্রীবকে আঘাত করল। সেই আঘাতে সুগ্রীব মাটিতে অচেতন হয়ে পড়ে গেল ।কুম্ভকর্ণ দ্রুত সুগ্ৰীবকে কাঁধে তুলে নিয়ে নগরে ফিরে এল। যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে রাজাকে বন্দি করতে পারলে যুদ্ধে সেখানেই ইতি পড়ে। সুগ্ৰীব যেহেতু রাম বাহিনীর রাজা,তাই তাকে  বন্দি করায় যুদ্ধের সেখানেই শেষ হল।
রাজাকে বন্দি করে যুদ্ধে ইতি টানায় রাক্ষসেরা কুম্ভকর্ণের জয়ধ্বনি দিতে লাগল। এদিকে কুম্ভকর্ণের কাঁধে এভাবে যেতে থাকার সময় সুগ্রীব ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পেল। তিনি কুম্ভকর্ণের নাক কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেললেন। বগলের নিচ দুটি ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন। সুগ্ৰীব এতটাই যন্ত্রণা দিতে লাগল যে সহ্য না করতে পেরে কুম্ভকর্ণ সুগ্রীবকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সুগ্ৰীব তৎক্ষণাৎ এক লাফে রামচন্দ্রের কাছে গিয়ে হাজির হল। নিজের অসাবধানতার জন্য সম্পূর্ণ ঘটনাটা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় লজ্জা, অপমান ক্রোধে কুম্ভকর্ণ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এলেন। এদিকে নাক কানের আঘাতের রক্ত, পেটের ক্ষুধা তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তাই প্রথমে দুই হাতে যতটা পারে কতগুলি বানর সেনা মুখে ভরিয়ে দিলেন। কুম্ভকর্ণের এই কার্যকে বাধা দেবার জন্য লক্ষ্মণ এগিয়ে এল। লক্ষণের তীব্র বাণ বর্ষণকে কুম্ভকর্ণ ভ্রুক্ষেপই করল না। তখন লক্ষ্মণ উগ্ৰবাণ মেরে কুম্ভকর্ণের কবচ খসিয়ে ফেলল। লক্ষ্মণের বীরত্ব দেখে কুম্ভকর্ণ বলেছিল -'লক্ষ্ণণ তোমার বীরত্ব দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি ।আমার সামনে ইন্দ্র, বরুণ, যম কেউ দাঁড়াতে পারে না। ‌তুমি সামান্য বালক হয়েও এতক্ষণ ধরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছ। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি সময় খরচ করব না ।আমি রামের সঙ্গে যুদ্ধ করব ।'লক্ষ্মণ কুম্ভকর্ণের কথা শুনে বলল-'  আচ্ছা ঠিক আছে ।রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে তোমার মনের আশ মিটিয়ে নাও ।ঐ যে রামচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধই তোমার জীবনের শেষ যুদ্ধ হবে।'
কুম্ভকর্ণকে  ক্ষিপ্র পদক্ষেপে রামের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বিভীষণ হাতে গদা  নিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়াল। ভাইকে দেখে কুম্ভকর্ণ কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল -'বৎস তুমি ভ্রাতাদের ছেড়ে রাঘবের পক্ষে যোগ দিয়েছ যখন তখন আমাকে প্রহার করতে পার।আমি আজ নিশ্চিত যে রাক্ষস কুলের মধ্যে তুমি বেঁচে থাকবে। কারণ তুমি ধর্মাত্মা। তোমার কখনও দুঃখ হবে না। এখন তুমি আমার পথ থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ আমি দেশরক্ষার জন্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছি ।আমার বিচার বুদ্ধি লোপ পেতে পারে। আমি ভুলেও তোমাকে বধ করতে চাইনা। কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারি। তাই আমার স্নেহের ভাই, তুমি আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ জ্যেষ্ঠ হিসেবে তোমাকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। দাদার কথা শুনে বিভীষণ চোখের জল ফেলতে ফেলতে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে রইল।
রামের সম্মুখীন হয়ে কুম্ভকর্ণ প্রথমে নিজের পরাক্রমের কথা ব্যাখ্যা করল। তারপর রামচন্দ্র কে বলল -' আমি জানি তুমি বিনা কারণে যুদ্ধ করছ না ।তুমি নিষ্কলুষ।আমি যেহেতু ভ্রাতার হয়ে যুদ্ধ করতে এসেছি তাই তোমাকে বধ করাটা নিশ্চিত ।মাত্র একবার তোমার বীরত্ব দেখতে চাইছি।'
  তারপর যুদ্ধ আরম্ভ হল। রাম ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ মেরেও কুম্ভকর্ণের  কোনো ক্ষতি করতে পারল না। শেষে বায়বাস্ত্র  নিক্ষেপ করে কুম্ভকর্ণের ডান হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ নাকি বা হাতে একটা গাছ উপড়ে নিয়ে রামের  দিকে তেড়ে গেল। রাম তখন ইন্দ্রমন্ত্রপুত অস্ত্র ছেড়ে কুম্ভকর্ণের বাঁ হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ মুখ হা করে রামের দিকে এগিয়ে গেল। রাম শক্তিশালী বাণ মেরে দুই পা কেটে ফেলায় কুম্ভকর্ণ মাটিতে ছিটকে পড়ল। তারপর রামচন্দ্র কুম্ভকর্ণের মাথা বিচ্ছিন্ন করে একেবারে রাবণের নগরে ফেলল। কুম্ভকর্ণের মৃত্যুর পরে রাজা রাবণ আর সমস্ত রাক্ষস কুল ভেঙে পড়েছে। কথাটা বলে ত্রিজটা কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে শোক সামলে নিয়ে বলল-' বুঝেছ মা,কুম্ভকর্ণ ইচ্ছা করলে মায়া যুদ্ধ করে প্রাণ রক্ষা করে থাকতে পারত। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ মায়া যুদ্ধকে কুম্ভকর্ণ অন্যায় যুদ্ধ বলে মনে করতেন। তাই ইন্দ্রজিৎ মায়া যুদ্ধ করে জয়লাভ করলে তিনি নাকি তাতে কোনো গৌরব নেই বলেছিলেন।
  ত্রিজটার কাছ থেকে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে শুনে আমারও চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। মনে মনে  ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালাম, কুম্ভকর্ণের আত্মা যেন শান্তি লাভ করে।

বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৫ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস ,Bideha Nandini-35

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৫

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৫)
দুদিন পরের কথা। সেদিন সকাল থেকে রাজপ্রাসাদের কোনো একটি দিক থেকে হুলুস্থুল ভেসে আসছিল। প্রথমে শুনেছিলাম উচ্চস্বরে করা সঙ্গীত। তারপরে চিৎকার-চেঁচামেচি। তারপরে একসঙ্গে বাজানো বহু শঙ্খের ভয়ঙ্কর শব্দ। এবার শুনলাম তাল, খোল, মৃদঙ্গ আদির শব্দ। মাঝখানে হাতির চিৎকার এবং বাঘের মত জন্তুর গর্জন। কী হয়েছে জানার জন্য ব্যগ্র হয়েছিলাম যদিও আমার মনের উদ্বিগ্নতা প্রহরীদের দেখাতে চাইছিলাম না। পরে দুপুরের দিকে ওদের কথাবার্তা থেকে জানতে পারলাম যে রাবণ ভাই কুম্ভকর্ণকে যেভাবেই হোক জাগানোর নির্দেশ দিয়েছে।
কুম্ভকর্ণ নামটা আমি শূপর্ণখার মুখে শুনেছিলাম যদিও গত এগারো মাস তার বিষয়ে কোনো কথা কারও মুখে শুনিনি। কখনও কেউ তার বিষয়ে নামটা উচ্চারণ করে থাকলেও আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি। পরে একদিন ত্রিজটা আমাকে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে সমস্ত কিছু বলেছিল। তাই সেদিন কুম্ভকর্ণকে এভাবে জাগানোর ব্যাপারটা আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল।
সেদিন বিকেল বেলা কলা এসে উপস্থিত হল। আমি তাকে বেশ কিছু দিন দেখিনি। আমি লক্ষ্য করেছিলাম কলা আগের চেয়ে অনেক গম্ভীর হয়ে পড়েছে। আগে সে আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীদের নানাভাবে বিরক্ত করত কিন্তু আজ তার মুখে কথাবার্তা একেবারে সীমিত। জীবনে দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে ঠকে শেখার মেয়েদের মতোই কলার ব্যবহার।
কলা আমার কাছে বসল। তারপর বলল-‘ আপনি হয়তো বর্তমানে মহাযুদ্ধে রামচন্দ্রের বাহিনীর অবস্থান বিষয়ে না জেনে চিন্তান্বিত হয়ে রয়েছেন। তাই মাতা সরমা আপনার চিন্তা দূর করার জন্য আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম নিশ্চয়ই ভালো খবরই হবে না হলে সরমা দেশের এই রকম পরিস্থিতিতে কলাকে এভাবে আমার কাছে পাঠাত না। তাই আমি কথাটা শোনার জন্য কলার মুখের দিকে আগ্রহসহকারে চেয়ে রইলাম।
কলা বলতে লাগল-‘ যুদ্ধে একজন একজন করে বীর, মহাবীর সকলের মৃত্যু হওয়ায় রাজা রাবণ তাঁর মহাবলী সেনাপতি প্রহস্তকে রাম বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পাঠালেন।প্রহস্ত পরম বিক্রমের সঙ্গে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করে রামচন্দ্রের অনেক সৈন্যবধ করে। পরে  রামচন্দ্রের নীল নামের সেনাপতি পর্বত সমান একটি পাথর এত জোরে ছুঁড়ে মারল যে প্রহস্ত জায়গাতেই মাটির সঙ্গে মিশে গেল। ভয়ে রাক্ষস সেনা ছুটে পালালো। প্রহস্তের মৃত্যুতে রাজা রাবণ খুব দুঃখ পেলেন। কারণ প্রহস্ত তার অতি বিশ্বাসী মন্ত্রী ছিল। খবর শুনে তিনি কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ক্রোধে রণভূমিতে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি এক দিক থেকে বাঁদর সেনা এবং বীরদের বধ করতে লাগলেন। রাজা রাবণকে বাঁদর সেনার উপরে ধ্বংসলীলা চালাতে দেখে রামচন্দ্রের মুখ্য সেনাপতি সুগ্রীব এগিয়ে এল। তবে রাবণের শরে সুগ্রীব চেতনা হারিয়ে এক জায়গায় লুটিয়ে পড়লেন। তারপরে রাজা রাবণের মুখোমুখি হল লঙ্কায় বিভীষিকা সৃষ্টি করে আসা মহাবীর বায়ুপুত্র হনুমান। হনুমান লাফ মেরে রাজা রাবণের রথের উপরে বসে নিয়ে নানা বাকবিতণ্ডা আরম্ভ করল।ক্রোধে  রাজা রাবণ হনুমানের বুকে এক ধাক্কা দিয়ে দিলেন। এক ধাক্কায় নাকি হনুমান কয়েকপাক ঘুরে কোনো ভাবে নিজেকে সামলে নিল। তারপর নাকি হনুমান ডান হাতে প্রচন্ড জোরে রাজা রাবণের গালে এক চড় বসিয়ে দিল। রাজা নাকি থতমত খেয়ে কিছুক্ষণ কিছু বলতেই পারলেন না। তারপরে রাবণ হনুমানের বক্ষস্থলে একটা কিল বসিয়ে দিল।হনুমান দূরে ছিটকে পড়ল। সেই সুযোগে রাবণ তাঁর সেনাপতি প্রহস্তকে বধ করা মহাবীর  নীলকে আক্রমণ করলেন। নীল নাকি অনেক বিক্রমের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাজা রাবণের অবস্থা কাহিল করে চলেছিল।শেষ পর্যন্ত রাবণ এক কোপে নীলকে অগ্নি বাণ মেরে পাঠালেন। সেই বাণে নীল ধরাশায়ী হল।’
   কলার মুখে মহাবীর নীল অগ্নিবাণে অসার হয়ে পড়ার কথা শুনে আমি বিস্মিত হলাম। মহাবীর হনুমানের মুখে শুনেছিলাম নীল নাকি অগ্নি দেবতার পুত্র। পাপিষ্ঠ রাবণ অগ্নিবান মারায় পিতৃদেব পুত্রকে রক্ষা করলেন না ।
আমার মনের অবস্থা দেখে কলা বলল,- 'মাতা আপনি ভয় পাবেন না ।কিছুক্ষণ পরে নীল পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নীলকে রাবণ ভূপতিত করতে দেখে আপনার দেবর লক্ষ্মণ এগিয়ে এল। লক্ষ্মণ এবং রাবণের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হল। রাজা রাবণের অনেক বাণ লক্ষ্মণ নাকি টুকরো টুকরো করে ফেলল।রাক্ষসরাজ রাবণ লক্ষ্মণক কোনো বাণেই পরাস্ত করতে না পেরে ব্রহ্মা প্রদত্ত শক্তিশেল বাণ নিক্ষেপ করলেন।সেই শেলে লক্ষ্মণ নিমেষের মধ্যে ঢলে পড়ল। রাবণ লক্ষ্মণকে সেই অবস্থায় বন্দি করার উদ্দেশ্যে দ্রুত রথ থেকে নেমে গিয়ে তুলে আনতে চাইলেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা তিনি নাকি লক্ষ্মণকে নাড়াতেই পারলেন না। যে রাজা রাবণ কৈলাস পর্বত, মন্দরাচল হেলাভরে তুলে ধরেছিল, সেই রাবণ মনুষ্য বলে উপহাস করা লক্ষ্মণকে তুলতে পারল না। ঠিক তখনই মহাবীর হনুমান তীব্র গতিতে এগিয়ে এসে রাবণের বুকে প্রচন্ড আঘাত করল। সেই আঘাতে রাবণের নাকি মাথা ঘুরতে লাগল, নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল। সেই সুযোগে হনুমান অবহেলায় লক্ষ্মণকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গিয়ে রামচন্দ্রের কাছে পৌঁছাল।ভাইকে এরকম অবস্থায় দেখে রামচন্দ্রের রাবণের উপরে প্রচন্ড ক্রোধ হল। তিনি দুর্জয় ধনু নিয়ে এগিয়ে যেতেই হনুমান নাকি বলল-' হে প্রভু রাবণ রথের উপরে উঠে যুদ্ধ করবে। আপনার রথ নেই ,তাই আমার কাঁধে উঠুন।' রামচন্দ্র কথার গুরুত্ব বুঝে হনুমানের পিঠে উঠে রাবণের সামনে এলেন। দশরথ নন্দন নাকি প্রথমে নিজের পরিচয় দিয়ে গর্জন করে রাবণকে তিরস্কার করলেন। তারপর তীক্ষ্ণ বাণে রাবণকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুললেন।রাবণ রামচন্দ্রের বাহন হয়ে আসা হনুমানকে এভাবে আঘাত করতে চাইলেন যাতে রামচন্দ্র মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু মহাবীর বায়ুপুত্র সমস্ত আঘাত সহ্য করে নিল। রামচন্দ্র রাজা রাবণের রথ,ধনু সমস্ত কিছু ভেঙ্গে ফেললেন। রাজার মুকুট খসে পড়ল।একবার একটা তীর এসে রাবণের বুকে বিঁধে  গেল। সঙ্গে সঙ্গে রাবণের বুক থেকে ধারাসারে রক্ত বইতে লাগল। আর ও একটা বাণ মেরে রামচন্দ্র রাবণকে তখনই বধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না।কেবলমাত্র উপহাস করে বললেন-' রাবণ, তুই খুব বীরত্ব দেখিয়েছিলি না, এখন বুঝতে পারলি  তোর বীরত্ব কতটা? আমি তোকে এই মুহূর্তে বধ  করতে পারি। আমি যেহেতু তোর মতো নিচ নয় তাই তোকে এই অবস্থায় মারব না। কিছুটা সময় দিচ্ছি ।লঙ্কায় ফিরে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আয়।'
  কলার কথা শুনে আমি স্বামীর উদারতা, মহানুভবতা এবং সততায় গর্বিত হয়ে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম দুরাত্মা রাবণ  এবং সমস্ত লঙ্কাবাসী এখন নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে আমার স্বামী কে? আমি কার পত্নী।
  কলা পুনরায় বলতে শুরু করল-' হে দেবী, ত্রিভুবন কাঁপানো রাক্ষসরাজ রাবণকে থর থর পদক্ষেপে রণক্ষেত্র থেকে পায়ে হেঁটে প্রাসাদে আসতে দেখে সমস্ত লঙ্কা নগরী ভয়ে কম্পমান হয়ে পড়েছে। বড়মা মন্দোদরী রাজা রাবণকে আপনাকে রামচন্দ্রের হাতে অর্পণ করে মিত্রতা স্থাপন করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু জ্যাঠা রাবণ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে আপনাকে কখন ও ফিরিয়ে দেবেন না। পুনরায় নাকি যুদ্ধ করবেন। তাই আজ আমার অন্য একজন জ্যাঠা কুম্ভকর্ণকে যেভাবেই হোক ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে যুদ্ধে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। কথাটা বলে কলা উঠে দাঁড়াল।আমার হাত দুটো খামচে ধরে কলা বলল-'পিতা বিভীষণ গোপনে পাঠানো সংবাদটুকু মাতা সরমা আপনাকে যেভাবেই হোক দিতে বলেছিলেন বলে আমি এসেছি। একথা বলে কলা দ্রুত আমার কাছ থেকে চলে গেল।

বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৪ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৪

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(৩৪)
  এই কয়েকদিন আমি বড় অশান্তিতে কাটিয়েছি। যুদ্ধ পুর্ণ গতিতে চলছে বলে জানতে পেরে আমার সঙ্গে কারও দেখা হয়নি। এমনকি পাহারা দিতে থাকা রাক্ষসীরা ও আমার কাছ থেকে বেশকিছু দূরত্ব রেখে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার দিন ত্রিজটা এসেছিল। তিনি দুঃখ করে আমাকে বলছিলেন-' জানকী, রাজা রাবণের দুর্বুদ্ধির জন্যই এখন রাক্ষস কুল ধ্বংস হবে। আজ সকালে যুদ্ধে বেরোনোর আগে রাবণকে মা নৈকসী এবং প্রপিতামহ মাল্যবান উপদেশ দিয়েছিল রামচন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার জন্য। দুজনেই লঙ্কেশ্বরকে কাছে বসিয়ে নিয়ে বলেছিল-' তুমি দেবতা, গন্ধর্ব, অসুর, নাগ, পশুপাখি সবার কাছে অবধ্য হবে বলে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিলে। সেই সময় নর-বানরকে গুরুত্ব দাওনি। এখন সামান্য বলে ভাবা এই নর-বানর তোমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেই রামচন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার জন্য উপদেশ দিচ্ছি। মনে রাখবে তুমি অমরত্বের বর  পাওনি।' কিন্তু মা এবং প্রপিতামহের কথায় লঙ্কেশ্বর  ক্রোধিত হলেন। তিনি দু'জনকেই অনেক আঘাত দিয়ে কথা বলে অভদ্রভাবে চলে গেলেন। এই বৃদ্ধ বয়সে মাতা নৈকসী ছেলের  কাছ থেকে কঠিন কথা শুনে খুব দুঃখ পেয়েছেন। লঙ্কা নগরীর চারপাশে নানা ধরনের অমঙ্গলের চিহ্ন কিছুদিন ধরে দেখে তিনি বড় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তারপরে ত্রিজটা মন শক্ত করে বলেছিল-' অবশ্য দশাননকে সহজে যুদ্ধে পরাজিত করা অসম্ভব। তিনি বুদ্ধিতে বৃহস্পতি ।এখন নগর রক্ষার জন্য লঙ্কার পূর্ব দুয়ারে রেখেছেন সেনাপতি প্রহস্তকে। তিনি সৈন‍্যসামন্ত নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন প্রতি আক্রমণ করার জন্য ।পশ্চিম দুয়ারে  সৈন্যসামন্ত নিয়ে রয়েছেন স্বয়ং ইন্দ্রজিৎ । উত্তর দুয়ারে শুক-সারণ আদি বীরের সঙ্গে রাজা রাবণ নিজে। দক্ষিণ দুয়ারে মহাপার্শ এবং সহোদর নামে দুই বীর।'কথাটা বলে আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খবরা খবর নিয়ে ত্রিজটা অশান্ত মনে বেরিয়ে গিয়েছিল
সেদিন থেকে ত্রিজটা আর অশোক বনে আসেনি।
  যুদ্ধের তীব্রতা আমি অশোক বন থেকেই অনুমান করতে পারছিলাম। অনবরত সৈন্য  সামন্ত চলাফেরার শব্দ, পতি পুত্র হারাদের  ক্রন্দনধ্বনি অশোক বনে পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার মধ্যে সবসময় ভয়,শঙ্কা এবং উদ্বিগ্নতা বিরাজ করছিল। আমিও মানসিক চাপে অশোক বনের নিচে একবার বসেছি একবার শুয়েছি। সময় কিছুতেই যায় না। এভাবে ছটফট করে থাকার সময় এককর্ণা নামে রাক্ষসী এসে হাজির হল। উত্তেজনায় তার সমগ্র মুখমন্ডল লাল হয়ে পড়েছে। ভয়ে ঢোক গিলে এককর্ণা বলল -'বাঁদর সেনা নগরের প্রাচীর ভেঙ্গে ভেতরে চলে এসেছে। প্রাচীরের চারপাশে যে সমস্ত গভীর জলের খাদ কুমির দিয়ে পরিপূর্ণ করে রাখা ছিল  সেই সমস্ত বাঁদর সেনারা  ভরাট করে ফেলেছে । বুজিয়ে  ফেলা  খালের উপর দিয়ে কোটি কোটি বানর সেনা হাতে প্রকাণ্ড শিল, গাছের ডাল নিয়ে পর্বতশীর্ষে রাক্ষস সেনা আক্রমণ করছে ।' নিঃশ্বাস না নিয়ে একনাগাড়ে বলতে থাকা এককর্ণা কথাগুলি বলে সাবধান হয়ে পড়ল। সে তখন বুঝতে পারল যে আমার কাছে তার এই কথাগুলি বলা উচিত হয়নি। এককর্ণা ভয়ে ভয়ে বলল-' 'প্রকৃতপক্ষে আমি ত্রিজটাকে এই খবরটা দিতে এসেছিলাম। আমি বেহুশের মত আপনাকে বলে ফেললাম। সে আরও কিছু বলতে যেতেই আমি বললাম তুমি কী বলছিলে আমি কিছুই শুনি নি বলে ভেবে নিও। 
আমি যুদ্ধের ভয়াবহতা অশোক বন থেকে অনুমান করার চেষ্টা করেছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে স্বামী রামচন্দ্র আমার খোঁজে অশোক বনে প্রবেশ করতে পারে বলে আশায় চেয়ে ছিলাম। সেদিন বিকেলে বিভীষণের পত্নী সরমা এল। তিনি কোনো ভুমিকা না করেই আমাকে বললেন বৈদেহী, বলতে শুনেছি রাক্ষস সৈন্যের জন্য এই যুদ্ধ হল এক নতুন অভিজ্ঞতা। বাঁদর সেনা তীর,ধনুক  নিয়ে যুদ্ধ করছে না। শিল,গাছের ডাল নিয়ে যুদ্ধ করছে। বাঁদরেরা যে ধরনে রাক্ষস সেনার উপরে শিল বর্ষণ করে গাছের ডালের আঘাতে  একদিক থেকে রাক্ষস সেনা নিঃশেষ করে চলেছে, রাক্ষস সেনার হাতের অস্ত্র হাতেই থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া বিশালদেহের বাঁদরেরা রাক্ষসের গায়ের মাংস দাঁত দিয়ে কামড়ে খন্ড খন্ড করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে ।আর ও কিছু বলতে যেতেই তার একজন বিশ্বাসী অনুচর দৌড়ে এসে জানাল যে যুদ্ধ বড় তীব্রতর হয়ে উঠেছে। কুম্ভকর্ণের পুত্র নিকুম্ভকে মহাবীর নীল বধ করেছে ।দুই পক্ষের বহু সেনা মৃত্যুর মুখে পড়েছে। খবরটা শুনে আমার চোখ জলে ভরে উঠল। হাজার হোক ভাইপো। তিনি আমাকে আর কিছুই বলতে পারলেন না। দ্রুত আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। 
সেদিন নাকি যুদ্ধ রাতেও চলছিল। অন্ধকারে রাক্ষসেরা মায়ার শক্তিতে অদৃশ্য হয়ে পড়ছিল যদিও রাম লক্ষ্মণের বাণ অদৃশ্য রাক্ষস সেনাকে বধ করছিল। 
আমি অস্থির মনে সেই রাতটা পার করলাম। পরের দিন আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীদের কথাবার্তা থেকে জানতে পারলাম যে মহাবীর ইন্দ্রজিতের সঙ্গে রামচন্দ্রের বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে মহাবীর বালীর পুত্র অঙ্গদ। অঙ্গদ নাকি ইন্দ্রজিতের অবস্থা শোচনীয় করে তোলায় উপায়হীন রাবণ পুত্র ব্রহ্মার কাছ থেকে লাভ করা বর প্রয়োগ করে মায়া যুদ্ধ আরম্ভ করেছে। ইন্দ্রজিৎ আকাশে অদৃশ্য হয়ে বাণ মেরে হাজার হাজার  বানর সেনা নিহত করছে। ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে থাকার জন্য রাম লক্ষ্মণ নাকি বাণ কোন দিক থেকে আসছে ধরতে না পেরে তারা প্রতিআক্রমণ করতে পারছে না। দাদা ভাই দুজনেই নাকি বিমূঢ় হয়ে পড়েছে ।এদিকে ইন্দ্রজিতের বাণ  দুজনের দেহ  ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে।  রাক্ষসের কথা শুনে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম।  আমার সর্ব শরীর কাঁপতে লাগল। চোখের জলে আমার দু গাল ভেসে গেল।  অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে আমি নিজের  মনকে  নিজেই প্রবোধ দিলাম,  মনে সাহস আনলাম।  তারপর গাছের নিচে  রাম বাহিনীর বিজয় এবং মঙ্গল কামনা করে  প্রার্থনায় নিমগ্ন হলাম।
  শেষ রাতের দিকে আমি রাক্ষস বাহিনীর জয়ধ্বনি শুনতে পেলাম । 'মহারাজ রাবণের  জয়, রাক্ষস গৌরব ইন্দ্রজিতের জয় ।' সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আনন্দ বাদ্যযন্ত্র বাজতে  লাগল।  আমি কান খাড়া করে  কথাগুলি শুনতে লাগলাম।  ঠিক তখনই এককর্ণা  দৌড়ে এসে তার সঙ্গীদের বলল  বড় শুভ সংবাদ।  ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে জয়ী হয়ে  ফিরে এসেছে। রাম লক্ষ্মণ দু'জনকেই ইন্দ্রজিৎ বধ করেছে।  আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না।  কাকে জিজ্ঞেস করব, কী করব কিছুই ভেবে  পেলাম না । তবু বিচলিত না হয়ে  মনটা স্থির করে ভাবলাম- আমার মন দুর্বল করার জন্য এই সমস্ত নিশ্চয়  রাবণের নতুন কৌশল। তাই অশান্ত মনে  ভোর হওয়ার জন্য  পথ চেয়ে রইলাম।  হয়তো ত্রিজটা, সরমা বা কলা   কেউ না কেউ তো আসবেই।
ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ পরে লেওয়া নামের একজন রাক্ষসী এল। আগে  তাকে আমি অশোক বনে কখনও দেখতে পাইনি। লেওয়া আমাকে প্রথমে প্রণাম জানাল। তারপর কোমল কন্ঠে বলল-' সীতাদেবী আমি মহারাজ রাবণের সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে আপনার পতি রাম এবং দেবর লক্ষ্মণ ইতিমধ্যে মহাবীর ইন্দ্রজিতের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে ।দুজনের মৃতদেহ যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছে ।আপনি ইচ্ছা করলে একবার গিয়ে দেখে আসতে পারেন ।রাজা রাবণ আপনার জন্য পুষ্পক রথ পাঠিয়ে দিয়েছেন।
লেওয়ার কথা শুনে আমার শরীর গরম হতে লাগল। আমার অন্তরে দুঃখ দেবার জন্য বিভিন্ন কৌশলে করা কার্য গুলির জন‍্য রাবণের উপরে প্রচন্ড ক্রোধে আমি দাঁত কামড়ে কিছু একটা উত্তর দিয়ে পাঠাতে গিয়ে থেমে গেলাম। হঠাৎ বুকটা ধক ধক করে  লাফাতে লাগল।  আমি যা দুর্ভাগা  হয়তো এই কথা সত্য হবে।  আমি নিঃশব্দে রথে উঠলাম।  আমার সঙ্গে উঠল পাহারা দেওয়া একদল রাক্ষসী।  ঠিক রথ চলার আগে আগে ত্রিজটা এসে আমার কাছে বসল। রথ রণক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে চলল।  অনেক দূর থেকে রক্তের স্রোত, বাঁদর , রাক্ষস এবং ভালুকের মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করলাম।  কিছুদূর যাবার পরে দেখলাম  রণক্ষেত্র নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে । রণক্ষেত্রের মাঝখানে রক্তে  মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে রাম লক্ষ্মণের দেহ।  চোখের জল ফেলে বাঁদর বাহিনী মৃতদেহ ঘিরে আছে।আমি  রথের ভেতরে অচেতন হয়ে পড়ে গেলাম।  যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম  তখন আমি পুনরায় অশোকবনে । আমি চিৎকার করে  কাঁদতে আরম্ভ করলাম।  কেঁদে-কেঁদে একটা সময় আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম ।আমার দুঃখ দেখে ত্রিজটা  সান্তনা দিয়ে বলল  মা,দুঃখ করিস না,  তোর পতি এবং দেবরের মৃত্যু হয় নাই বলেই মনে হচ্ছে । সর্প বাণে দুজনকে অচেতন করে রেখেছে বলে মনে হয়। মৃত ব্যক্তির মুখ এত সতেজ হতে পারে না।  ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে  যুদ্ধ করার সময় ইন্দ্র তাকে খুঁজে পায় না।  এভাবে অন্যায় যুদ্ধ করে  ইন্দ্রজিৎ সবাইকে জয় করে আসছে। আমার মনে হচ্ছে রাম লক্ষণের মৃত্যু হয়নি  এবার ইন্দ্রজিৎ বুঝতে পারবে যে তার সর্পবাণে  অবধ্য লোক রয়েছে । তাই মা ,তুই দুঃখ করিস না। আমি যা বলেছি তাই সত্য হবে।'ত্রিজটার কথা শুনে আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।
  সেদিন বিকেলের দিকে বিভীষণের পত্নী সরমা এল। তার মনটা অন্যদিনের তুলনায়  একটু  আনন্দিত।সরমা  ফিসফিস করে বলল-'  বৈদেহী, আমার পতি বিভীষণ গোপনে তোমার কাছে আমার মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছে।  সকালে আকাশে পুষ্পক রথ দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে অত্যাচারী রাজা রাবণ ও রাম লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়েছে বলে ভাবছে।  তাই হয়তো দুজনের অসার হয়ে পড়ে থাকা দেহ   দেখিয়ে তোমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য  চেষ্টা করছে যে রাম লক্ষ্মণ ইহ সংসার থেকে বিদায় নিয়েছে । আমার চুলে হাত বুলিয়ে সরমা পুনরায় বলল-'এখন রাম-লক্ষ্মণকে সর্পবাণ থেকে কীভাবে মুক্ত করা যেতে পারে বলছি শোনো।শুধু  তুমি নয়, ইন্দ্রজিৎ, রাবণ থেকে আরম্ভ করে সুগ্রীব এবং সমস্ত বাঁদর বাহিনী ও ভেবেছিল রাম লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়েছে।  কেবল আমার পতি বিভীষণ জানত যে কোনো উপায়ে সহস্র বিষধর-সাপের বাঁধন খুলতে পারলে দুজনেই পুনরায় জীবিত হয়ে উঠবে।  তাই সুগ্রীব ,হনুমান ,জাম্বুবান ইত্যাদির সঙ্গে আলোচনা করে  থাকার সময় হঠাৎ চারপাশে প্রচন্ড বেগে তুফান বইতে লাগল।  গাছপালা উপড়ে পড়ল ,সাগরের এক একটি ঢেউ আকাশ স্পর্শ করল।  প্রত্যেকেই এক আশ্চর্য শব্দ শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল বিষ্ণুর বাহন গরুড় এসেছে। গরুড়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে  রাম লক্ষনের দেহ থেকে  সাপের বাঁধন খুলে গেল। লঙ্কার সমস্ত সর্পকুল পালিয়ে গর্তে ঢুকল। গরুড় দুজনকে  স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে রাম লক্ষ্মণ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন।  গরুড়  রাম লক্ষ্মণ এবং সমস্ত বাহিনীকে আশীর্বাদ করে চলে গেল।  তারা দুজন সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার পতি  বুদ্ধি করে এই খবর তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।  তাই জানকী তুমি চিন্তা কর না ,আমি কোনো খবর থাকলে এনে দেব। এখন আসছি। এভাবে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় নিল।
  কিছুক্ষণ পরে আমি রাম-লক্ষ্মণের ধনুর টংকার শুনলাম। সেই ধ্বনিতে সমগ্র লঙ্কা মহানগরী ধ্বনিত  হল। মাঝরাতে আমি অশোক বন থেকে আবছাভাবে  বানর বাহিনী রামের জয়ধ্বনি দিতে শুনলাম।  সকালে প্রহরীদের কথাবার্তা থেকে আমি জানতে পারলাম রাবণ নাকি রাম লক্ষ্মণের পুনরায় জীবিত হওয়ার খবর পেয়ে একা সিংহাসনে বসে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন। তারপরে ধুস্ত্রাক্ষ,ব্রজদংষ্ঠ,অকম্পণ আদি বীর সেনার  সঙ্গে সৈন্য সামন্ত দিয়ে যুদ্ধে পাঠালেন ।পরে অঙ্গদ এবং হনুমানের হাতে প্রতিটি বীরের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।‌ এখন রাম বাহিনী নাকি রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে আসছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৩ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস , Bideha Nandini- 33

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৩

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(তেত্রিশ)
  এই কয়েকদিন আমার মনে মাত্র একটাই চিন্তা। রাম এবং তার সৈন্য বাহিনী মহাসমুদ্র কীভাবে পার হবে? হনুমান এবং কিস্কিন্ধার রাজা সুগ্রীবের জন্য চিন্তা নেই। কিন্তু বাকিরা ? আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসদের কথাবার্তা থেকে কিছুই বুঝতে পারছিনা। রামচন্দ্রের বাহিনী সাগর পার হতে পেরেছে কিনা, নাকি এখন ও ওপারে। এদিকে ত্রিজটা কিছুদিন ধরে আমার খবরা খবর নিতে আসছে না। আমি বড় দুশ্চিন্তায় ভুগছিলাম ।মনের মধ্যে কথাগুলি আলোচনা করার সময় একদিন বিভীষণের কন্যা কলা এসে উপস্থিত হল। তার মুখমন্ডল নিরানন্দ। কলা ফ‍্যাকাশে হাসি হেসে   আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল-' সীতাদেবী, আপনি এখন ও জানতে না পারা একটা সংবাদ দিতে এসেছি। 
আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম।
কলা বলতে আরম্ভ করল। জ্যাঠা রাজা রাবণের একজন গুপ্তচর সংবাদ এনেছে যে  আপনার স্বামী রামচন্দ্র,ভ্রাতা  লক্ষ্মণ এবং বড় বড় বাঁদর বীরের  সঙ্গে সাগর পার হয়ে এসে লঙ্কার সীমানায় ছাউনি পেতেছে। কলার বহুমূল্য কথা গুলি শুনে আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। কলা পুনরায় বলল-''জ্যাঠা রাজা রাবণ শুক নামের একজন রাক্ষসকে শত্রু পক্ষের শক্তির পরিমাণ জেনে আসার জন্য পাঠিয়েছিল। তাকে এর সঙ্গে এটাও  দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যাতে যেভাবেই হোক কিস্কিন্ধার রাজা সুগ্রীবকে কিস্কিন্ধায় ফেরৎ  পাঠিয়ে দিতে পারে। শুক টিয়া পাখির রূপ ধরে রামের ছাউনিতে গিয়েছিল। যদিও বাঁদর সেনারা তাকে রাক্ষস বলে বুঝতে পেরে কিল-লাথি মেরে তার অবস্থা কাহিল করে তুলেছিল। আপনার স্বামী নাকি শুককে প্রাণে না মেরে বন্দি করার আদেশ দিয়েছিল। শুককে বেশকিছুদিন রামচন্দ্রের ছাউনিতে বন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল। তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি  সম্পূর্ণ করে এখন শুককে  ছেড়ে দিয়েছে রাজা রাবণকে যুদ্ধের সংবাদ দেওয়ার জন্য। সেই শুক শত্রুপক্ষের বল বিক্রম দেখে শুনে রাজাকে একটা কথাই বলেছে যে রামচন্দ্রের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অসম্ভব। তাই সীতাদেবীকে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়াই ভালো হবে। কিন্তু জ্যাঠা আর কোথায় ভালো কথা শুনবে। শুকের মুখে শত্রু পক্ষের শক্তির কথা শুনে আজ তিনি নড়েচড়ে বসেন। কারণ শুক কেবল গুপ্তচরই নয়, একজন বড় বীরও । তাই রাবন বীর, সেনাপতি সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আদেশ দিয়েছে। কথাটা কলা দ্রুত বলে গেল ।
কলার কাছ থেকে খবরটা পাওয়ার পরে আমার মনে কিছুটা আশার আলো জ্বলে উঠল। সেদিন প্রথমবারের জন্য আমার রাক্ষস পুরীতে কিছুটা ঘুমের ভাব এসেছিল। পরেরদিন সকালে আমি আলুথালু মনে ত্রিজটা, সরমা এবং কলার  জন্য পথ চেয়ে বসে ছিলাম। কে জানে হয়তো ভালো খবর আসবে। তবে আমার আশায় ঠান্ডা জল ঢেলে মুখে উপহাসের হাসি নিয়ে রাবণ এসে উপস্থিত হল। এসেই বলতে শুরু করল-' সীতা, রামকে কেউ বধ করতে পারবেনা বলে বড় গর্ব করছিলে না। রামচন্দ্রের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারবেনা বলে অহংকার করেছিলে কিন্তু তোমার পতি রাম নিহত হয়েছে। সাগর পারের ছাউনিতে রাত্রিবেলা শুয়ে থাকার সময় আমার সৈন্যবাহিনী গিয়ে রামের শিবির লন্ডভন্ড করে ফেলার সঙ্গে তার শিরচ্ছেদ করেছে। তোমার দেবর লক্ষ্মণ, লঙ্কায় উৎপাত করে যাওয়া বাঁদর হনুমান, সুগ্রীব ,নীল,অঙ্গদ,নল সমস্ত বীর নিহত হয়েছে। তুমি দেখলে রাবণের  পরাক্রম ?এখন তুমি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করার বাইরে আর কোনো রাস্তা নেই। তাই এখন আমাকে পতি হিসেবে গ্রহণ করে লঙ্কার মহারানী হয়ে জীবন উপভোগ কর। রাবণের কথা শুনে আমি বজ্রাহত  হয়ে গেলাম ।রাবণ পুনরায় বলতে শুরু করল -'কী হল বিশ্বাস হচ্ছে না? এই বলে দশানন একজনকে ডেকে আদেশ দিল -'মুহুর্তের মধ্যে রামের শির এখানে নিয়ে আয়। জানকী নিজ চোখে একবার দেখে নিক।'
কয়েক মুহুর্ত পরেই একজন অনুচর তার এক হাতে স্বামী রামের কাটা শির অন্যহাতে রামের সেই বৃহৎ ধেনু নিয়ে হাজির হল। আমি স্বামীর মুখ  স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তারপরে একটা বিকট চিৎকার করে মাটিতে ঢলে পড়লাম।
  যখন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল তখন বিভীষণের পত্নী সরমাকে আমার কাছে দেখতে পেলাম ।আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। সরমা আমার চোখের জল মুছে দিল। তারপর সান্ত্বনা দিয়ে বলল-' বৈদেহী,তুমি শোকে ভেঙ্গে পড়ার কোনো কারণ নেই । রামচন্দ্রের মৃত্যু হয়নি। তুমি যা দেখলে তা রাক্ষসের মায়া মাত্র । তুমি যাতে লঙ্কেশ্বরের কাছে আত্মসমর্পন কর তার জন্য পাপীষ্ঠ এই চেষ্টা চালিয়েছে। আমাদের লঙ্কা নগরে বিদ্যুৎজিহ্ব নামে একজন রাক্ষস মায়া বিদ্যায় বড় দক্ষ। তাকে অবিকল রামের মতো একটা মাথা এবং ধনু মায়া বিদ্যার সাহায্যে তৈরি করে দিতে বলতে আমি নিজের কানে শুনে ছিলাম। যদি রামকে বধ করেছে তাহলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি কেন? আর রাবণ তোমাকে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে যেত না। অন্য সময় তোমার কাছে অনেকক্ষণ ধরে প্রেম নিবেদন করে থাকে।আজ তার সময় নেই। যুদ্ধের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। তাই হে কৌশল বধূ, ভেঙে না পড়ে মন শক্ত কর।তুমি একটু মন দিয়ে শোনো ,লঙ্কার পথে-ঘাটে রাক্ষস সেনার যুদ্ধের প্রস্তুতি শব্দ শুনতে পাবে ।যদি রাম এবং সমস্ত বীর নিহত হত তাহলে যুদ্ধযাত্রা কার জন্য?'
সরমা আমাকে আশ্বাস দিয়ে পুনরায় বলল-' তুমি মনের দুঃখে কোনো অঘটন ঘটাবে বলে আমি দ্রুত তোমাকে কথাগুলো বলতে এলাম। রাবণ যদি জানতে পারে যে আমি তোমার কাছে এসেছি তাহলে আমাকে জীবন্ত রাখবে না। অবশ্য আমি তার মতো পাপিষ্ট একটাকে ভয় করি না। কথাটা বলে সরমা  চলে গেল। আমি ও স্বামী রামচন্দ্রের চরণ চিন্তা করে সুদিনের জন্য পথ চেয়ে রইলাম। সেদিন বিকেলে ত্রিজটা  প্রায় দৌড়ে এল। ত্রিজটার চেহারা দেখেই আমার বুক কাঁপতে লাগল। ত্রিজটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে একনাগাড়ে বলতে লাগল, রাঘব ঘরনী মুহূর্তের মধ্যে যে বড় ঘটনা ঘটল তা দেখে শুনে পেটের মধ্যে আমার হাত-পা ঢুকে যাচ্ছে।শত্রুপক্ষের বীর এসে রাবণের সঙ্গে রঙ চরায় মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে । কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে ত্রিজটাকে জিজ্ঞাসা করলাম –‘কে সেই বীর? আমাকে একটু খুলে বলুন?’
হনুমানের মতোই একজন বাঁদর। নিজেকে কিষ্কিন্ধার রাজা এবং রামচন্দ্রের সেনাপতি সুগ্রীব বলে পরিচয় দিয়েছিল। তারপর ত্রিজটা ইস ইস করে বলল-‘ আমি বলেছিলাম না আমার স্বপ্নের কথা? কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে দেখেছ? রাজাকে একটা সাধারণ বাঁদর দিন দুপুরে চাকর-বাকরের সামনে এভাবে খড়কুটোর মতো প্রহার করল। তারপর ত্রিজটা  ঘটনাটা নিজের চোখে দেখার মতো করে বর্ণনা করে গেল। লঙ্কেশ্বর রঙচরায় বসে শত্রুপক্ষের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিরীক্ষণ করছিল। রংচরা  রাবণের আকাশচুম্বী অট্টালিকার একেবারে শীর্ষে। সেখান থেকে চারপাশটা অনেক দূর পর্যন্ত একেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। বোধহয় রামচন্দ্রের বাহিনী পর্বতের উপরে উঠে লঙ্কা নিরীক্ষণ করছিল। রাবনের দুই পাশে পরিচারিকা সুন্দর পাখা দিয়ে হাওয়া করছিল। মাথায় ছিল রাজমুকুট এবং বিজয় ছত্র। বোধহয়  শত্রুপক্ষ দেখেই চিনতে পারল যে ইনি হলেন রাজা রাবণ। রামচন্দ্রের সেনাপতি সুগ্রীব রাবণকে দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।সুবেল পর্বত থেকে এক লাফে রাবণের রংচরায় এসে পৌঁছাল। তারপর রাজাকে সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করার মতো ঘুসি, লাথি, চর মেরে গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলল। মাথার মুকুট খসিয়ে রাজাকে মাটিতে ছিটকে ফেলল। তারপর সুগ্রীব তর্জন গর্জন করে বলল –‘পাপিষ্ঠ,আমি রামচন্দ্রের মিত্রও,ভৃত্যও। তুই প্রভু রামচন্দ্রকে যত দুঃখ দিয়েছিস ,তোকে আমি আজ এমনিতে ছেড়ে দেব না।আমার হাতে আজ তোর প্রাণ যাবে।’ 
হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে রাবণ কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তিনি প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। পরের মুহূর্তে রাবণ নিজেকে সামলে নিলেন। তখন দুজনের মধ্যে মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হল।দুজনেই সমান শক্তিশালী।তাই চর,ঘুসি,লাথি,কিল সমান তালে চলতে লাগল। দশানন বুঝতে  পারল যে মল্ল যুদ্ধে বশ করা যাবে না। তাই তিনি মায়া যুদ্ধ করতে যেতেই সুগ্রীব পুনরায় এক লাফে সুবেক পর্বতে পৌঁছে গেল।
ত্রিজটার কাছ থেকে কথাগুলি শুনে আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম।মনে মনে ভেবেছিলাম স্বামী রামচন্দ্রের সেনাপতি যদি এই ধরনের চঞ্চল মনের হয় তাহলে বিপদ হবে। হনুমানের মতো সুগ্রীব শক্তিশালী মহাবীর সাহসী হলেও বাঁদর বাঁদরই। তাদের চরিত্রে মাঝেমধ্যে বাঁদরের নিজস্ব প্রকৃতি প্রকট হয়ে ওঠে। তাই সুগ্রীবকে মুখ্য করে সমস্ত বানর সেনাকে স্থিরচিত্ত প্রদান করার জন্য আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালাম।

বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩২ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস ।।Bideha Nandini-32

 

বিদেহ নন্দিনী~ ৩২

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(৩২)


(৩২)

হনুমানের দ্বারা  সংঘটিত হওয়া ঘটনাগুলির পরের কথা। একদিন বিকেলে বিভীষণের পত্নী সরমা এসে উপস্থিত হল। সরমাকে আসতে দেখে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। কারণ হনুমান কাণ্ডের পর থেকে সরমা, কলা আমার কাছে আসেনি। এমনকি আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীরাও খুব একটা কাছে আসতে সাহস করেনা। অবশ্য একদিন ত্রিজটা  কিছুক্ষণের জন্য এসেছিল। অনেকদিন পরে সরমাকে দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছিল, আমি সরমার চেহারা দেখে অবাক হয়েছিলাম। চোখ জোড়া লাল, তখন ও ছল ছল করছে। মুখ মলিন, সাজ-পোশাকের পারিপাট্য ছিলনা। অন্যান্য সময়ে সরমা প্রথমে আমাকে সম্ভাষণ জানায়। কিন্তু সেদিন মুখ দিয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ না করে সোজা আমার কাছে এসে বসল। তারপর আমার বা হাতে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। এই ধরনের অস্বাভাবিক কাণ্ডে আমি খুবই অবাক হলাম। মনে ভয় হল কে জানে আমাদের দুজনের মধ্যে কথাবার্তার আদানপ্রদান হয়তো রাবণ জানতে পেরে গেছে। তাই আমার কোনো বিপদ হবে বলে আশঙ্কা করে সরমা  কাঁদছে। কে জানে হয়তো রাবণ মা-মেয়ে দু'জনকেই অশোকবনে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে। আমি ডান হাতটা তার পিঠে বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সর্বগুণী সরমা আপনি এরকম করছেন কেন? এভাবে হৃদয় ভাঙ্গা কান্নায় কেন ভেঙে পড়ছেন? এই পৃথিবীতে এমন কে আছে যে আপনার অন্তরে দুঃখ দিতে পারে ?সরমা কান্না সম্বরণ করে নিয়ে বলল-' জানকী আমার স্বামী বিভীষণ তার চারজন অনুচরের সঙ্গে আজ লঙ্কা ত‍্যাগ করে চলে গেছে তোমার পতি রামচন্দ্রের কাছে। কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি স্তব্ধ হয়ে রয়েছি দেখে সরমা বলল -'তুমি হয়তো জান না তোমার স্বামী রাম, লক্ষ্মণ, কিস্কিন্ধার রাজা সুগ্রীব, হনুমান, বীর অঙ্গদ,নীল,নল আদি বীর সাগরের তীরে সমবেত হয়েছে লঙ্কা আক্রমণ করার জন্য। গুপ্তচরের কাছ থেকে এই খবর পাওয়ার পরেই আমার পতি বিভীষণ দাদা রাবণকে অনেক উপদেশ দিয়ে বলেছিল-' এখন ও সময় আছে ,রামের সঙ্গে মিত্রতা কর। আপনার বাকি মন্ত্রীরা যে সমস্ত মন রাখা কথা বলছে তাতে মোহিত না হয়ে  রামের সঙ্গে যুদ্ধ করা থেকে বিরত হন ।রামচন্দ্র আপনি ভাবার মতো সাধারণ পুরুষ নন।

এরকম একজন মহান পুরুষের পত্নীকে হরণ করে আপনি বড় অপরাধ করেছেন। সেই অপরাধের জন্য আপনার স্বর্ণালঙ্কা ধ্বংস হতে চলেছে। যদি ভেবে থাকেন, খর দূষণকে বধ করার জন্য সীতাকে হরণ করেছেন, তাহলে আপনার পক্ষে সেটা ভুল হয়েছে। কারন খর দূষণকে বধ করার জন্য রামচন্দ্র জনস্থানে যায়নি। তারাই সৈন‍্য সামন্ত নিয়ে রামচন্দ্রকে আক্রমণ করার জন্য এসেছিল। তাই রামচন্দ্র আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছে। তাই হে রাজন, রামের সঙ্গে শত্রুতার ভাব ত্যাগ করে মিত্রতা স্থাপন করুন। তাহলে আমাদের প্রত্যেকেরই কল্যাণ হবে। কিন্তু আমার পতির সহজ কথা শুনে রাবণের ক্রোধ হল। এমনকি রাবণ পুত্র ইন্দ্রজিৎ কাকাকে  অনেক তিরস্কার করলেন-' কাকা, তুমি বিখ্যাত পৌলস্ত বংশে জন্ম লাভ করে কেন এই ধরনের কথা বলছ আমি বুঝতে পারছি না। বিখ্যাত রাক্ষস বংশে জন্মগ্রহণ করে রাম লক্ষণ নামের দুজন সাধারণ মানুষকে ভয় করাটা শুধু লজ্জাজনক কথাই নয় এমনকি অপমানজনকও।স্নেহের কাকা, তুমি ভুলে গিয়েছ কি আমি ইন্দ্রকে বন্দি করে লঙ্কায় নিয়ে এসেছিলাম।ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতকে দাঁতে ধরে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে টেনে নামিয়ে ছিলাম। সমস্ত দেবতা  আমার ভয়ে কম্পমান। সমস্ত কিছু জেনে শুনে তুমি কেন রামচন্দ্রকে ভয় করার মতো কথা বলছ? ছেলের কাছ থেকে উৎসাহজনক কথা শুনে রাবণ বিভীষণকে সভাসদদের সামনে তিরস্কার করলেন-' ভাই বিভীষণ, বিষাক্ত সাপের সঙ্গে বাস করা যায় কিন্তু বাইরে মিত্রতা দেখিয়ে অন্তরে শত্রুতা ভাব নিয়ে থাকা দাদা ভাইয়ের একসঙ্গে থাকা বড় বিপদজনক কথা। আমি আজকে ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি, তুমি আমার বড় শত্রু। ত্রিজগতে আমার সম্মান, দমনকারী রূপ,যশ, সম্পদ, ঐশ্বর্য তোমার সহ্য হচ্ছে না।আমাকে পরাজিত করার জন্য তুমি শত্রুপক্ষকে  সাহায্য করবে।জাতি ভাইয়ের থেকে হতে পারা বিপদ সবচেয়ে ভয়ানক।  পদ্ম ফুলের পাপড়িতে  জলবিন্দু যেভাবে স্থায়ী হতে পারে না তেমনই তোমার মতো ভাইয়ের অন্তরেও আমার প্রতি স্নেহ স্থায়ী হতে পারে না। তুমি আজ যে কথা বললে আমার তোমাকে কারাদণ্ড দেওয়া উচিত ছিল।'

দাদার মুখে এই ধরনের কঠিন বচন শুনে পতি বিভীষণ দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে বললেন-' মহারাজ রাবণ, আমি আপনার এবং দেশের মঙ্গলের জন্য বলা কথা বলি বলে আপনার খারাপ লাগল। আমাকে আপনি যেহেতু শত্রু বলে ভেবেছেন তাই আমি চলে যাচ্ছি। আপনি মিত্রদের সঙ্গে লঙ্কাপুরী রক্ষা করতে থাকুন। একথা বলে পতি বিভীষণ আমার থেকেও বিদায় নিয়ে তার চারজন অনুচরসহ রামচন্দ্রের শিবিরের অভিমুখে চলে গেলেন। কথাটা বলে সরমা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আমি সরমার মনের অবস্থার কথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম। যদিও কী বলে সান্ত্বনা দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবুও স্বামীর বিষয়ে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম, হে ধর্মপ্রাণ সরমা আপনার শোক নিবারণ করার আমার শব্দের অভাব ঘটেছে। তাই আপনি নিজগুনে শোক সম্বরণ করুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে ধর্মাত্মা বিভীষণ কখন ও বিপদে পড়বে না। কারন আমার স্বামী রামচন্দ্রের অন্তর কোমল মহাসাগরের মতোই বিশাল, নির্মল। সব সময় সৎ পথে পরিচালিত চিন্তা সুস্থির এবং উচ্চ মার্গের। শরণাগতকে তিনি সর্বদা আশ্রয় দেন। স্বামী সহজ সরল মানুষকে চিনতে পারেন। তাই ধর্ম পুরুষ বিভীষণকে তিনি অন্তরে নিশ্চয়ই ঠাঁই দেবেন। তাই হে মাতা আমি আপনাকে পুনর্বার বলছি, যে পুণ্যাত্মা বিভীষণের কোনো অপকার হবে না। দুজন দুজনের উপকারে আসবে।তাই আপনি মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর করুন। মন শক্ত করে সহজ পথে থেকে আপনার দৈনন্দিন কর্তব্য করে যান। আপনি এভাবে  কান্নাকাটি করলে কলাদের কে বোঝাবে? তাই হে নিষ্কলুষ সরমা, ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে আপনি ধৈর্য ধরুন।'

এভাবে কিছুক্ষণ বুঝিয়ে বলার পরে সরমা চোখের জল মুছে আমার থেকে বিদায় নিয়ে যে পথে এসেছিল সেই পথে চলে গেল। এমনিতেই আমার অন্তর অনবরত কাঁদতে থাকে। তারমধ্যে নির্মল চরিত্রের মানুষগুলির দুঃখ দেখলে শোকে আমার হৃদয় যেন ভেঙ্গে যাবে বলে মনে হয়। তাই সেদিন অশোক গাছের নিচে বসে অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সরমার সঙ্গে আমার এটাই শেষ দেখা। এখন থেকে হয়তো সরমার চলাফেরা সীমিত করার জন্য রাবণ বাধ্য করবে। অবশ্য দুঃখের মধ্যে স্বামী রামচন্দ্রের লঙ্কা  আক্রমণের প্রস্তুতি চালানোর খবর শুনে বেঁচে থাকার জন্য কিছুটা প্রেরণা পেয়েছিলাম। খবরগুলি সঠিকভাবে জানার জন্য আমার হনুমানের মতো একজন সংবাদদাতার প্রয়োজন ছিল। তবে এই রাক্ষসপুরীতে  কোথায় পাব হনুমানের মতো গুণী, জ্ঞানী প্রাণী। কথাটা ভাবতে ভাবতেই ত্রিজটা এসে হাজির হল।ত্রিজটা  আমার কাছে বসে চুলটা আঁচড়ে  দিয়ে আদর করে বলল-' জনক নন্দিনী আমি তোকে বলেছিলাম না তোর দুঃখের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে?'

আমি সাধারন ভাবে বললাম-' তুমি তো সবসময় আমাকে সুখে ডুবিয়ে রাখতে চাও। আজ কী ধরনের সুখের কথা বলতে চাইছ একটু খুলে বলবে? 

ত্রিজটা উদাস মনে বলল-' মা, এখন তোর ভালো দিন আসা মানে রাক্ষসপুরীর দুর্দশা। কিন্তু উপায় নেই, লঙ্কেশ্বর কারও কথা শুনে না যখন সবাইকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে। 

আমি ত্রিজটার ডান হাতের উপরে আমার একটা হাত রেখে বললাম এভাবে কেন বলছ? সৎ লোককে কেউ  মারতে পারেনা। 

ত্রিজটা আমার কথায় খুব বেশি গুরুত্ব  না দিয়ে বলল-'তুই হয়তো জানিস না? দশরথ নন্দন, ভাই লক্ষ্মণ কিস্কিন্ধার রাজা সুগ্রীব সৈন্য সামন্ত নিয়ে   সাগরপাড়ে ছাউনি পেতেছে। লঙ্কা আক্রমণের উদ্দেশ্যে। তবু আমাদের রাজার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই ।ভাই বিভীষণ এবং কয়েকজন সভাসদ ছাড়া বাকি প্রত্যেকেই রাজাকে উত্তেজিত করে চলেছে। বিভীষণকে রাজা এভাবে তিরস্কার করল যে তিনি রাজ্য ছেড়ে রামচন্দ্রের শরণাগত হতে বাধ্য হলেন। কথাটা বলে ত্রিজটা কিছুক্ষন অপেক্ষা করল। তারপর পুনরায় বলল -'যদিও আমাদের রাজাকে চট করে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তবুও সভাসদরা এভাবে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাজাকে উত্তেজিত করা ঠিক নয় । তারা ভাবছে রাজা রাবণ দেবতা, অসুর,  গন্ধর্ব, যক্ষ, দানব সবাইকে যখন বশ করেছে তাহলে মানুষকে জয় করা তো কোনো বড় কথা নয়। তারমধ্যে সংখ্যায় মাত্র দুজন। বাকি সৈন্যরা বাঁদর, ভালুক। তবে  ওরা বুঝতে পারেনি যে এবার ব্যাপারটা আলাদা। রাবণ ব্ৰহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিল যে দেবতা, অসুর, গন্ধর্ব, যক্ষ,নাগ আদি তাকে পরাজিত করতে পারবে না।  মানবকে নিম্ন শ্রেণীর প্রাণী বলে মানুষের কথা গণনার মধ্যেই আনেনি।  তাই মানুষ, বাঁদর, ভালুক ইত্যাদির দ্বারা  তিনি যেন অবধ‍্য না হন এইরকম বর কামনা করেন নি। তাছাড়া রাম হলেন সাক্ষাৎ বিষ্ণু এবং ভাই লক্ষ্মণ তারই অংশ। আমি ত্রিজটার মুখে এত বড় কথা শুনে আশ্চর্য হয়েছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম ত্রিজটা বলা কথা গুলি তার  নিজের বিশ্লেষণ না রাক্ষস পুরীতে  দুই একজন জ্ঞানীর  মধ্যে আলোচিত কথাবার্তা। যাই হোক না কেন একজন রাক্ষসী এত অধ‍্যয়নপুষ্ট ব্যক্তির মতো কথা বলতে পারাটা আমাকে বিস্মিত করল।

  আমি ত্রিজটার সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম তিনি মানসিক দ্বন্দে ভুগছেন। একদিকে দেশপ্রেম, অন্যদিকে ন‍্যায়। তাই ত্রিজটাকে আশ্বাস দেবার জন্য বললাম-' হে জ্ঞানী সুহৃদ, তোমাকে আমি স্পষ্ট করে একটা কথা এখনই বলে রাখি, আমার স্বামী রামচন্দ্র অতি বিবেচক পুরুষ।তিনি ধর্মাত্মা, পুণ্যাত্মা ,বৃদ্ধ ,বালক কারও অপকার হতে দেবে না। তাই তুমি নিশ্চিন্ত থাক।তোমাদের লংকা, লংকাই থাকবে। মাত্র স্বামী রামচন্দ্র পাপী, অত্যাচারী সবাইকে বধ করে একটি সুন্দর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে।


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...