দেবব্রত রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেবব্রত রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

উপগ্রহের বার্তা || দেবব্রত রায় || গল্প

 উপগ্রহের বার্তা 

দেবব্রত রায়  




ববিতা জিগ্যেস করলো, ডিঙগো ডিয়ার, তুমি কি জান সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য কতটা মানে, হাও মাচ ডিফারেন্স বিটুইন ট্র্যু অ্যান্ড ফলস ? ববিতা ডিঙগোর দিদুন অর্থাৎ ,মায়ের মা । স্কুলের বেবিদের মতন করে দিদুনের কাঁধ পর্যন্ত চুল ছাঁটা।মাঝে মাঝেই ডিঙগোর দিদুন তাতে আবার রঙিন হেয়ার-ব্যান্ড ব্যবহার করেন আর,  কথা বলার সময় সেই ঝাপঝুপো চুলগুলো খুবই ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তিনি কথা বলেন। দিদুনের এইধরনের বেবি-বেবি অ্যাটিটিউড ডিঙগোর মোটেই ভালো লাগে না। ও ঘাড় শক্ত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ববিতা আবারও বলে, ডিঙগো, প্লিজ নটি বয়ের মতো অমন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না ! কথাগুলো বলেই , সে ডিঙগো-র কার্লি চুলের একটা গোছা ধরে একটু জোরেই টান দেয়। বলে, "শোন, চোখে যা দেখবে  তাই সত্যি আর, কানে যা শুনবে জেনো তার সবটাই  মিথ্যে!...আর, যেহেতু আমাদের চোখ এবং কানের মাঝখানের দূরত্ব হচ্ছে চার আঙুলের তাই, সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মাত্র চার আঙুলের ! " বলেই, ববিতা একটা বিজ্ঞের হাসি হাসলো।                                                                                                                                দিদুনের এই কথাগুলোর লক্ষ্য যে আসলে জিকো সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ডিঙগোর। কাল বাঁকুড়ার থেকে জিকো ফোন করে ডিঙগোর বাপি মানে, জিকো তার ছেলেকে হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে ডাক্তার কী-কী অ্যাডভাইজ দিয়েছেন সেই বিষয়েই আলোচনা করছিল।                                                                                           অথচ, জিকো কিন্তু ,একেবারেই অন্যরকম কথা বলে। সে বলে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল তা পরীক্ষা করে বুঝে নিতে হয় ! প্রয়োজনে তুমি কারোর সাহায্য নিতে পার কিন্তু , সিদ্ধান্তটা নিতে হবে তোমাকেই !                                                                                                                           কলকাতার এই বাড়িতে জিকো খুব কমই আসে । সে থাকে অনেক দূরে। সেই বাঁকুড়ায়। মাঝেমধ্যে যখন সে ডিঙগোদের সঙ্গে এসে থাকে তখন ডিঙগোর খুব ভালো লাগে, ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হয় কিন্তু, মায়ের ভয়ে ডিঙগো সেটা প্রকাশ করতে পারে না। সেসময় বাবাও ওই ক-দিনের জন্যে ডিঙগোর মতোই যেন একেবারে ছোট্টটি হয়ে যায় ! অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সটান জিকো-র কোলে শুয়ে পড়ে  বলে, মাথাটা একটু টিপে দাও দেখি মা ! ডিঙগো ক্লাস-টু পর্যন্ত জানত ,ওর ঠাম্মি-র নাম জিকো তাই, ঠাম্মি যখন ডিঙগোকে জিকো বলে ডাকত তখন ও বলত আমি তো ডিঙগো ,তোমার নাম তো জিকো ! ডিঙগো এখন জানে পৃথিবীর  একজন বিখ্যাত ফুটবলারের নাম জিকো।যাঁর জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে। ঠাম্মি তাঁর নামেই ওর নাম রেখেছিল জিকো। কিন্তু, মা আর,দিদুনের সেই নামটা পছন্দ নয় !                                                                                                                                                   মা যখন ঠাম্মির সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে তখন হেসে হেসে  কী সুন্দরভাবে কথা বলে কিন্তু, ফোনটা নামিয়ে রেখেই সে যেন জায়ান্টের মতো গরগর করতে থাকে ! বলে, ডাইনি বুড়িটা মরলে বাঁচি ! ব্যাঙ্কের টাকাগুলো হাতে পেলে অন্তত এই সময় কাজে লাগাতে পারতাম....

ডিঙগো ওর মায়ের সব কথাগুলো-র মানে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না কিন্তু , এটুকু সে বুঝতে পারে যে কথাগুলো খুবই নোংরা !  

একটা ছুটির দুপুরে সবাই যখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে ডিঙগো তখন ওর বাবার ফোনটা নিয়ে  চুপিচুপি নিজের পড়ার ঘরে এসে ঢোকে । এইসময় খাওয়াদাওয়া সেরে ঠাম্মি তার প্রিয় ক্রেডলটাই বসে গল্পের বই পড়ে। ডিঙগো ওর অনভ্যস্ত হাতে ঠাম্মির ফোন-নাম্বারটা টেপে।ও পাশে একটা সুন্দর রিংটোন বেজে ওঠে, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে......                                                                                                                                  " হ্যালো ! " ঠাম্মির গলা শুনতে পায় ডিঙগো। সে বলে, আমি এখন জিকো বলছি !                                                                        ঠাম্মি ওপাশ থেকে হাসি হাসি গলায় বলে, " এখন জিকো! " বেশ, বলো !                                                                    ঠাম্মির কথায় জিকো লজ্জা পায়। সে বলে, না, না , আমি জিকো-ই বলছি। তারপর, খুবই সিক্রেট একটা বিষয় আলোচনার মতো করে সে চুপিচুপি গলায় বলে, শোনো , আমি আর, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আদ্রিজা রিসেন্ট একটা  ম্যাটার ডিসকাভার করেছি !                                                                                                                                             ওপাশ থেকে ঠাম্মির কৌতুহলী গলা ভেসে আসে। বলে, তোমরা দুজনে ! তাই ! তা, কী ডিসকভার করেছো বল তো !                                                                                                                                                                                 না, মানে বিষয়টা আদ্রিজা-ই ডিসকাভার করেছে তবে ,আমিও সেটা গ্রান্ট করেছি ! কথাগুলো আবারও লজ্জা পাওয়া গলাতেই বললো জিকো !                                                                                                                                    বেশ তো ! তা, বিষয়টা কী ? ওপাশ থেকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় ঠাম্মি ।                                                              আমরা ডিসকাভার করেছি, কথাটা বলেই, জিকো  কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর,বলে, না, মানে তুমি মোটেই নও কিন্তু, বেশিরভাগ বড়োরা-ই, মানে দিদুন,মায়ের মতো বড়োরা ফোনে যা কিছু বলে জেনো তার বেশিরভাগ-ই মানে 99.9% একেবারেই ফলস ! কিন্তু, এই যে আমি ফোন করছি আমি কিন্তু , সত্যি বলছি! মানে, আমি বলতে চাইছি আসলে , সব শোনা কথাই কিন্তু , মিথ্যে নয়.....                                                                                                                                        জিকোর নরম মনের ভিতরে যে একটা নিদারুণ টানাপোড়েন চলছে সেটা আন্দাজ করতে পেরে জয়তীর বুকের কাছটা মুহূর্তে ভীষণ ভারি হয়ে ওঠে ! কোলের উপর রাখা বইখানা সে ধীরে ধীরে পাশে নামিয়ে রাখে । ছেলের মাত্র তিন বছর বয়সে নীলাঞ্জনকে হারায় জয়তী ! তারপর থেকে শুধুই লড়াই আর, লড়াই ! একদিকে অধ্যাপনা আরেকদিকে ছেলে মানুষ করা। সেসময় নীলাঞ্জনের মা, মানে জয়তীর শাশুড়ি ওদের ছেলে আর মাকে একেবারে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন অবশ্য,জয়তীও ছেলে আর, বৃদ্ধা শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যে অবহেলা হবে ভেবেই একবারের জন্যেও ওর নিজের মাকে সংসারের বিষয়ে মাথা ঘামাতে দেয়নি কারণ, জয়তী খুব ভালো করেই জানত , ওর মা সংসারে এলে শুধু নিজের মেয়ের কথা-ই ভাববে !  না তার ছেলের কথা ভাবতো , না ভাবতো নীলাঞ্জনের মায়ের কথা ! জয়তীর মা অবশ্য এসবের মধ্যেই জয়তীর জন্য দু-দুটো সম্বন্ধও দেখে ফেলেছিল ! ডঃ অরুণাংশু-ও ওকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন । সেও ছিল আরেক লড়াই !মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জয়তীর মনের সঙ্গে সেদিন লড়াইটা হয়েছিল এক মায়ের, এক পুত্রহারা বৃদ্ধার বৌমার দায়িত্ববোধের ! জয়তী যদিও ,ওর মা, ডঃ অরুণাংশু বসু এদের কারোর ডাকেই সেদিন সাড়া দেয়নি !                                                              আজ পাঁচবছর হলো জয়তীর মা মারা গেছেন! শাশুড়ী তারও অনেক আগেই। ছেলে সেই সবে জয়েন্টে চান্স পেয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে ! ডঃ অরুণাংশু বসু এখন সাউথ -অস্ট্রেলিয়ায়। ওখানকারই এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেই কবেই দেশ ছেড়েছেন তিনি ।     

  জয়তী কনসিভ হওয়ার একেবারে প্রথম দিন থেকেই নীলাঞ্জনের ইচ্ছে ছিল ওদের ছেলেই হোক বা, মেয়েই হোক সে ডাক্তার হবে ! জয়তী  বলেছিল, ছেলে-মেয়েদেরও তো নিজস্ব একটা 'সে ' থাকে ! নীলাঞ্জন কেন যে সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখো তুমি বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে ! তাহলে কি, নীলাঞ্জন আগে থেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল তাদের সন্তান বড়ো হওয়া পর্যন্ত সে থাকবে না ! নীলাঞ্জনের অনেক কথাবার্তা জয়তীর কাছে আজও রহস্যই থেকে গেছে ! দেখতে দেখতে আটান্নটা বছর কীভাবে যে কেটে গেল, জয়তী এখন আর সেসব যেন ভাবতেই পারেনা ! হয়তো,এরকমই হয় কিন্তু, নিজের জীবনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সেসময় ভীষণ জটিল বলেই মনে হয়েছিল তার !                                                                                    নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া পুরানো কাঠামো কি ফিরে আসে,জয়তী বুঝতে পারেনা ! তার এইটুকু জীবনে ঘটে যাওয়া কত ঘটনায় না জমে ছিল কোনো এক অন্ধকার গুহার ভিতরে ! আজকাল  একে একে সব যেন ফিরে আসছে জোয়ারের কলস্রোতে ! নীলাঞ্জন আর, জয়তীর একমাত্র সন্তান শঙখসুভ্র চ্যাটার্জি এখন কলকাতায় ভীষণ ব্যস্ত একজন ইয়াং অ্যান্ড হাইলি প্রমিসিং কার্ডিওলজিস্ট ! জয়তী ভাবে নিজের শরীর থেকে ছিন্ন হয়ে সুদূর কক্ষপথে চলে যাওয়া উজ্জ্বল চাঁদের জন্য মাঝরাতে এই গ্রহটা যখন একেবারেই নিঃসঙ্গ ওহয়ে পড়ে তখন কি, সকলের চোখের আড়ালে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে !  ক্রমশ এক নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে জয়তীর কানে দূর উপগ্রহ থেকে যেন  একটা বার্তা ভেসে আসছিল, হ্যালো, হ্যালো....আমি জিকো বলছি ! হ্যালো.......হ্যালো........        


সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০

বটুক বাবুর গল্প || দেবব্রত রায় || গল্প

বটুক বাবুর গল্প
দেবব্রত রায় 

       
                    এই যে কেউ কেউ চক্ষুষ্মান হলেই, ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ,ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ করে কোশ্ন করতেই থাকেন, কোবতে-টোবতে ক্যাঁও ৯খেন এবং কখনো কখনো  উত্তুর না পেয়ে জবরদস্তি উত্তরিও-টিও ঘেঁটে ঘটিঘঙ হয়ে তিনি যে কোথায়-কোথায়, কতটা ফাটেন তার জমা জলে ডেঙ্গি মশার পোষ্যাবাদ দেখেই সেটা বেশ পরিমেয় ! আসলে,আমি যে পত্রিকাটির জন্য লেখালেখি করি....
কী বললেন, আমার লেখা কস্মিনকালেও আপনার চোখে পড়েনি! আহা! ছাপা না-হলে তা পড়বে কীভাবে ! তবে, লেখা ছাপুক, না- ছাপুক আমি তো মশায় ওই  ই-ঈ পত্রিকার জন্যই লিখি তাই, বলছিলাম,আর-কি !  যাইহোক, ছাপা হোক বা,না-হোক,কবিতা লিখে আমার খুব আরাম হয় , ঠিক যেন বায়ু নিঃসরণের মতোই ! কারণ ,বাড়িতে যাই-ই হোক আর, বাইরেও জল-স্থল যাই খাইনা কেন, গ্যাস-অম্বল, বুক আইঢাই, অরুচি-অজীর্ণ সব একেবারে পয়সাআলা আত্মীয়ের জ্ঞাতিগুষ্টি-র মতোই, আঁকড়ে ধরে মশাই !
এই তো সেদিন ছেলের ব্যাকরণ মুকুলম বইটাতে সারাদিন এঁটুলির মতো চিপকে থেকে বিশেষ্য-বিশেষণ-তৎসম-তদভব কতকিছু-ই টুকলুস করে আপনার সাতদুগুণ গুষ্টি উদ্ধার হেতুক একখানা কবিতা লিখলাম আর, আপনি কি না, হপ্তাখানেক পরে এসে বললেন , বাহ!বাহ! খুব ভালো হয়েছে কোবতেটা ! আপনি না কি ওটাই আপনার বউয়ের জন্মদিনে প্রেমনিবেদংমিদং করে পড়ে শুনিয়েছেন ! কী বিপদ !
তা মাশায়, বিপদই বলুন আর, সামোসাই বলুন , দুটোতেই গ্যাস হবেই হবে এবং সেই গ্যাস গ্যাস-বেলুনের মতো আমাদেরকে কোনো জায়গাতেই স্থির হতে দেয় না! যেমন ধরুন, গত তিনদিন আগের একটা কবিতায় যা-যা এবং যাদের-যাদের কথা ভেবে বকের পালকের রঙ হলুদ আর বেড়ালের গলায় তুলসী-মালা শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলাম তা কিন্তুক এই মুহূর্তে কিছুতেই আর তিনদিন পূর্বের বাসি আমানি-র অবস্থায় বিলং করে না! অর্থাৎ,....ভোট শব্দটির মতোই ! ইভিএমে বাটন টেপার আগে তার গুরুত্ব এক আর, বাটন টেপার পরেই আরেক  !!!!!
ই-ঈ পত্রিকার সম্পাদিকা খুবই উজ্জ্বল এবং চৌম্বকীয় উচ্ছল ! তাকে ঘিরে আট-দশটি গ্রহ-উপগ্রহ তার হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর, না তে না মিলিয়ে চব্বিশঘণ্টা কীর্তন-দলের মতো ঘুরতেই থাকে ( তবে, টয়লেট এবং স্নানাগারের গেট অব্দিই তেনাদের কক্ষপথ  ) ! সেইসব বুধ শুক্কুদের পাশ কাটিয়ে আমার পরাণ কি আরাম ঢুলুঢুলু বুলবুলিটির পাশে আমি আজও  ঘেঁষতে পারিনি আর, তিনিও তৃষা হরিয়ে প্রাণ ভরিয়ে আমাকেও তার কাছে সামান্য ধুমকেতুর মতোও ডেকে নেননি অথচ, আমার বড়ো মামা জবাকুসুমসঙ্কাশ বাবুকেও একেবারে তুরগ-হারান  হারিয়ে তিনি প্রায় চব্বিশঘণ্টা-ই তার পরম উষ্ণতায় আমাকে উৎসারিত করে রেখেছেন ! যাইহোক,সেইসব কাফ-কাসুন্দি আপাতত,বরং মৃৎ-ভণ্ডে জমে ক্ষীর হোক !
যাইহোক, আসল কথাটা হলো গিয়ে এরকমই একটি আমজামকাঁঠালের কলম-বিনুনি কবিতায় পরপর দু-দুখানি সুখানীচঃ প্রেমপত্র লিখে হারি কি পড়ি করে সব গ্রহ-উপগ্রহের টেবিল-চেয়ারে ঠোক্কর খেতে খেতে সেই চুম্বনীয়ার সামনে গিয়ে সম্পূর্ণ সমাহিত হবার আগেই,পত্রমুকুল দুটি তার করকমলে ধরা কয়েনটির সম্মুখে আমার সমাধিফলকের মতো ঠুকে দিয়েই মুষ্টিমেয় ধোঁয়া আর, ছাই হয়ে বেরিয়ে এলাম! লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কলমের চেয়ে তার কয়েনের শক্তি-ই বেশি ! হেড পড়লে ইয়েস, টেল পড়লে  নো!
দিন পনেরোর মাথায় আমার একই অঙ্গে করোনারি থ্রম্বোসিস, সেরিব্রাল অ্যাটাক এবং কোভিড-১৯  হলেও বোধহয়, এতটা আঁতকে উঠতাম না !!!!!!
দেখলুম, সেই প্রেম পত্রের-ই একখানি প্রকাশিত হয়েছে পঁচিশের বৈশাখের রবীন্দ্র-সংখ্যায়, কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে!! আশংকায় আছি !
 সামনে এগারো-ই জৈষ্ঠ্য । জানি না , কী হবে  ¡¡¡¡¡¡¡

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২০

দিবাস্বপ্ন ইন লকডাউন || দেবব্রত রায় || করোনা-যুদ্ধের অণুগল্প

দিবাস্বপ্ন ইন লকডাউন
দেবব্রত রায় 


   
 








  নিশিকান্ত বোধহয়, একটু ঘুমিয়েই পড়েছিল । "বোধহয় "কেন, নিশ্চিত ঘুমিয়েই পড়েছিল নইলে, অমন একটা স্বপ্ন সে দেখলোই বা কী করে! কিন্তু, স্বপ্নটা যে ঠিক কী ছিল সেটাই নিশিকান্ত ঘুম থেকে জেগে উঠে আর মনে করতে পারছেনা !  নিজের মনেই নিশিকান্ত চুকচুক করে একটা শব্দ করে উঠলো । তবে, স্বপ্নটা যে বেশ বিন্দাস  ছিল সেটা কিন্তু  নিশিকান্ত হলপ করে বলতে পারে। কারণ,ঘুম ভাঙার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের জীভের-ই একটা চুকচুকুনি আওয়াজ নিশিকান্ত-র কানে এসে ঠেকেছিল। ঘুমটা একটু আলগা হতেই, নিশিকান্ত ঠোঁটের কোনে হাত বুলিয়ে যেন একটু লালার ছোঁয়াও পেয়েছিল ! 
  ঘুম থেকে উঠে নিশিকান্ত  অনেক্ষন বিছানায় গুম মেরে বসে রইলো। না, কিছুতেই স্বপ্নের বিষয়টা মনে পরছে না ওর। স্বপ্নের ব্যপারটা যাতে না গুল্লিয়ে যায় তাই পেটটা বাথরুমে টম্বুর হয়ে থাকা সত্বেও সে বিছানার থেকে এক ইঞ্চিও নড়লো না। ততক্ষণে ওর গিন্নী মাধবীলতা বন্ধ দরজায় ধপাধপ আওয়াজ করতে শুরু করেছে ! বললো , বলি, এগারোটা বেজে গেল, কখন আর স্নানঘরে যাবে শুনি ! 
  নিশিকান্ত-র মনটা ক্রমেই খারাপ হতে শুরু করলো।নিঘঘাত স্বপ্নটা ভালো ছিল কিন্তু, ঘুমটা ভাঙতেই সব কেমন যেন গোলমাল  হয়ে গেল ! কিছুতেই আর স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ছেনা ওর ! বাইরের আওয়াজগুলো ক্রমে যতই বাড়ছিল ততই যেন স্বপ্নটা নিশিকান্তর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল ! অনেক্ষন বিছানায়  গুম মেরে বসে বসেই নিশিকান্ত ভাবলো, জীবনে সে এই সময়ে কোনোকালেই ঘরে থাকেনা, ঘুম তো দূরস্ত।অর্থাৎ, দিনের বেলায় স্বপ্ন দেখা তার কস্মিনকালের অভ্যাসেও নেই আর   তাছাড়া, দিবাস্বপ্ন কার কবেই বা কী কাজে লেগেছে! কথাটা মনে হতেই নিশিকান্ত উঠে শোবার ঘরের দরজা-জানালাগুলো হাট করে খুলে দিল। কোত্থাও কোনো গাড়ি-ঘোড়া-র বেয়াদব আওয়াজ নেই, মেছোবাজারের অসহ্য চিৎকার-চেচামেচি নেই শুধু ,    বাইরের বাতাস আর, উজ্জ্বল আলো-র সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকে পড়ছে কতশত নাম জানা, না-জানা পাখির আওয়াজ ! নিশিকান্ত টের পেল একটু একটু করে তার ভেতরের সমস্ত ডিপ্রেশন হাওয়া আর, আলো এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ! 

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

একটি কম্পিউটার অসহায় জীবন || দেবব্রত রায় || কবিতা

একটি কম্পিউটার অসহায় জীবন
দেবব্রত রায় 

ভুতের রাজত্ব থেকে বেরিয়ে এসেও
একটি কম্প্যুকেয়ার-জীবন কখনোই
কাজের শেষ খুঁজে পায়না

কাজের গোঁয়ার্তুমি
ঊনত্রিশকে ত্রিশ
এবং শূণ্য তার
অপছন্দের হওয়ায়
 হাতে থাকা এক
 হু হু মনের সাময়িক বার্ণল

জোড়সংখ্যা দেখলেই,
একটি উত্তেজনা ক্রমাগত
বিজোড় সংখ্যা খোঁজে ,
শূণ্যস্থানে  এক বসায়
তারপর, তৈলাক্ত বাঁশটিও
হারমনিয়াম বাজিয়ে
কীর্তন গায়
হরি হে, দীনবন্ধু..........

শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

আমাদের ধর্মযুদ্ধ || দেবব্রত রায় || কবিতা

দেবব্রত রায়
আমাদের ধর্মযুদ্ধ

আমার দুটো হাত ডানা
হয়ে উঠতেই , আমি
আকাশচারী হয়ে যাই
অথচ, এই প্রজনন নির্ভর শরীর
শুধুমাত্র, প্রজন্মকে  এগিয়ে
নিয়ে যাওয়ার জন্যেই 
ডানা খসিয়ে
আবারও মানুষ হয়ে ওঠে

++++

গুজব এতটাই রোমাঞ্চকর
যে সত্যও কখনো কখনো
তার সামনে নতজানু  হয়ে পড়ে
সকাল সকাল রিফিল টুথপেষ্ট
গঙ্গার ঘাটে কুলকুচি সেরে
পবিত্র হয়
আর, এখান থেকেই
উৎপন্ন হয় একটি গুজব গর্ভিণী
দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ু
যার গলাটি জিরাফের মতোই লম্বা

**
যারা বলেন মাটি জল
ও বায়ু মিশিয়ে ঈশ্বর
তিলে তিলে পশু পাখি
এবং মানুষ তৈরি করেন
তারা ঠিকই বলেন
কারণ, মাটি জল ও বায়ু
ছাড়া এরা কেউই বেঁচে
থাকতে পারেনা
পৃথিবীকে কর্দমাক্ত
করার জন্য মানুষ
কখনো কখনো মাটি
জল ও বায়ুর ধর্ম নষ্ট করে
তিল থেকে একটি তালপুকুর
বানিয়ে ফেলে
***

শনিবার, ৯ মে, ২০২০

ক্রোধ || দেবব্রত রায় || অণুগল্প

ক্রোধ 
দেবব্রত রায় 



              বাসটার্মিনাসে টিকিট কাউন্টারের মেয়েটা হটাৎ-ই অনিমেষের দিকে পাঁচ-পাঁচটা নখপালিশ রাঙানো  লম্বা লম্বা আঙুলের একটা সপাট চড় দেখিয়ে বললো,"আপনার  ওই লাউবীজের মতো দাঁতগুলো মাড়ি থেকে ছাড়িয়ে আনতে আমার এক চড়ের বেশি দু-চড় লাগবে না, বুঝলেন! বউ-বোন জ্ঞান নেই,মেয়েছেলে হলেই  হলো! ওরাংওটাং,নোংরা বনমানুষ কো -থাকার ! "
                    এই গরমে বাঁকুড়ার থেকে এতটা পথ ঠেঙিয়ে এসেও কাজটা না হওয়ায় অনিমেষ এমনি -তেই রেগেছিল (যদিও,ঠেঙিয়ে আসা কথাটাএক্ষেত্রে ঠিক এপ্রোপ্রিয়েট নয় বলে অনেকেই হয়তো ফেবুতে প্রতিবাদের সাইক্লোন বইয়ে দেবেন কিন্তু, অনিমেষ তার এই শব্দ প্রয়োগের বিষয়ে একেবারেই অটল অনড়!কারণ, অনিমেষ এতটা পথ বাসে করে এসেছে বটে তবে, পুরো ভাড়া দিয়েও সারাটা পথ তাকে নিজের দুটো ঠ্যাঙের উপর ভরসা করেই  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসতে হয়েছে! অতএব, এক্ষেত্রে  ঠেঙিয়ে শব্দটি অনিমেষের মতে শুধু, সঠিকই নয়, একেবারে দুহাজার শতাংশ সঠিক!যাইহোক, কাজটা হলে তবুও ঠিক ছিল কিন্তু, সেটাও হয়নি!)  তারউপর এই ধরনের অভদ্রোচিত নোংরা কথাবার্তা! কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! অনিমেষ ভেতরে ভেতরে ক্রমশ ভিসুভিয়াস হয়ে উঠছিল  ফলে, যা হওয়া উচিৎ তাই হলো!  টিকিটকাউন্টারের মেয়েটা থামবার আর সুযোগই পেলোনা , অনিমেষ তার আগেই একেবারে অ্যাটম -বোমার মতো বার্স্ট করলো! সমস্ত হিতাহিতজ্ঞান ভুলে আপনি আজ্ঞের থেকে একেবারে তুই - তো কা রি তে নেমে এলো ! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে, ঘুষি পাকিয়ে লাফাতে লাফাতে অনিমেষ গাঁকগাঁক করে চিৎকার করে উঠলো, " অ্যাই অসভ্য-জানোয়ার মেয়েছেলে, কাকে কী বলছিস রে! আমাকে তুই চিনিস? বেরিয়ে আয়, কাউন্টার থেকে বেরিয়ে আয় বলছি! আমার লাউবিচির মতো দাঁত! আমি ওরাংওটাং! "
তীব্র গরমের দুপুরেও ওদের মূলত, অনিমেষের চিল -চিৎকারে বাসটার্মিনাসের এদিকওদিক ছাওয়ায় মাথা গুঁজে থাকা বেশকিছু লোক ততক্ষণে টিকিট কাউন্টারের সামনে এসে হাজির হয়েছে ! অনিমেষ এতক্ষণধরে লাফিয়ে ঝাপিয়ে এখন হ্যা হ্যা করে একটু দম নিচ্ছিল ! একটা লোক ওর পাশে দাঁড়িয়ে ফুট কাটলো। বললো,  " আইব্বাপ, দুদ্দিন চাগরি কত্তে না কত্তেই টেম্পো দেকচেন মেয়েছ্যানাটার! " 
গ্লোবালওয়ার্মিংয়ের প্রোভোকেশনে তখন দু-পক্ষই চরম উত্তেজনায় ফুটছে আর, তারই মধ্যে লোকটা ফুট কাটতেই, অনিমেষ দড়াম করে একটা পেল্লায় ঘুষি বসিয়ে দিল কাউন্টারের বাইরের দিকে থাকা কাঠের ডেস্কটার উপর ! উত্তেজনার এইরকম একটা চরম সিকোয়েন্সে
 আরও ভয়ংকর এবং সেল্ফি তোলার মতোই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে ভেবে পাবলিক ক্রমেই বেশ রসোসিক্ত হয়ে উঠছিল কিন্তু, কাউন্টারের মেয়েটি হটাৎ-ই যেন রণে ভঙগ দিল!ভেতরের সমস্ত হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া তোবড়ানো ফুটবলের মতোই সে কাচুমাচু মুখে খানিকক্ষণ অনিমেষের দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর, টিকিট কাউন্টারের সামনে জমা হওয়া ভীড়টাকে এবং স্বয়ং অনিমেষকেও একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা করে দিয়ে তার ঝাপঝুপো চুলের আড়ালে ঢাকা থাকা কানের ভেতর থেকে হেডফোনের দুটো ছোট ছোট স্পীকার বের করে আনলো তারপর, অনিমেষের দিকে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো," আমাকে দুটো মিনিট সময় দিন.... আসলে,একটা বাজে লোক ফোনে খুব ডিস্টার্ব করছে..... প্লিজ, কিছু মনে করবেন না! "
অনিমেষে একটু আগেই কিছু বলার জন্য বোধহয়,
হা-ব্যাদান  হয়েছিল কিন্তু, হটাৎ-ই এমন একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ তো বেরোলোইনা এমনকী, ভারতবর্ষের ম্যাপের মতো হা হয়ে যাওয়া নিজের মুখটাও সে বন্ধ করতেই যেন  ভুলে গেলো!
                         টিকিট কাউন্টারের সামনে জমা হওয়া ভীড়টা পাতলা হতে বেশি সময় লাগলো না!  কেউ কেউ তো সেল্ফি তুলতে না পেরে অনিমেষ এবং কাউন্টারের মেয়েটির দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগলো যেন ওরা খুন করার মতোই একটা সঙ্গীন অপরাধ করেছে! শুধু, একজন বুড়ি কপালে হাত ছুঁইয়ে বিড়বিড় করে বললো, কী জানে বাবা কী যুগ এলো! আগে জানতাম নারদঠাকুরই দেবতাদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে বেড়ায়,এখন দেখছি তোমাদের ফোনও....

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...