নিরুপমা বরগোহাঞি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নিরুপমা বরগোহাঞি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৮, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

একজন বুড়ো মানুষ-১৮,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(শেষ অধ্যায়)

কমলারা বাড়ি তৈরি করার তিন বছর পরে বিজয় ভরালী আধুনিক রোগ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। এই রোগ তার কলজেয় বাসা বেঁধেছিল। শেষের দিকে তিনি কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু অসুস্থতার শুরুতে যখন তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারতেন,তখন সঞ্জয় কে বলে রেখেছিলেন যে তার যেন কোনো চিকিৎসা করা না হয়। 'এই অসুখে মৃত্যু যখন অবধারিত, যন্ত্রণার দিনগুলি দীর্ঘায়িত করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাকে শান্তিতে মরতে দে পোনা।' বিজয় ভরালী বলে রেখেছিলেন।
কিন্তু তবু ডাক্তার না এনে সঞ্জয় থাকতে পারেনি। বাবাকে সে  বলছিল-' মৃত্যুর ওপরে ডাক্তারের হাত নেই সত্যি, কিন্তু ডাক্তার রোগির যন্ত্রনা কিছুটা হলেও তো উপশম করতে পারে।'
তাই ডাক্তার এসেছিল। শহরের নামকরা বিদেশি ডিগ্রিতে বিভূষিত ডাক্তার। বিজয় ভরালী আর কোনো আপত্তি করেননি‌। সঞ্জয়ের কথা ভেবেই আপত্তি করতে ইচ্ছা করে নি, একেবারে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু হলে সঞ্জয়ের সান্ত্বনা কোথায় থাকে।
কিন্তু শেষের দিকে ডাক্তার যখন তাকে ভেলোরে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিল, তখন বিজয় ভরালী  সঞ্জয়ের সামনে আর ও একবার আপত্তি করলেন।' আমাকে শান্তিতে মরতে দে পোনা। এই বুড়ো  বেমারি  শরীরটাকে আর টানা হেঁচড়া করে কষ্ট দিস না।' বিজয় ভরালী হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকটি সেন্টিমেন্টাল কথাও সেদিন ছেলেকে বলে ফেলেছিলেন- জীবনের প্রথম এবং শেষ বারের জন্যঃ ‘আমার জন্য দুঃখ করিস না পোনা। তোর মাকে ছেড়ে অনেক দিন আছি। সৌভাগ্য যে তোর মা  কেনা মাটিতেই আমি মরতে চলেছি। এই জমিটা তোর মা বাড়ি তৈরি করব বলে অনেক আশায় ,কষ্টে সঞ্চিত  টাকা দিয়ে কিনেছিল।'
বাবার সেই ইচ্ছাকে সঞ্জয় মেনে নিয়েছিল। বাড়িতে রেখেই সে বাবার চিকিৎসা করতে লাগল। সারাদিন বাবার দেখাশুনা করার জন্য  সে একজন নার্স রেখে দিয়েছিল।
প্রথম অবস্থায় বিজয় ভরালী নিজে নিজে  চলাফেরা করতেন। ধীরে ধীরে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। এখন দিনরাত তাকে কেবল শুয়ে থাকতে হয়। শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকা ছাড়া আর কিছু করার সামর্থ্য রইল না। ভাবনাগুলিও যেন ধীরে ধীরে অস্পষ্ট ধূসর হয়ে আসতে লাগল। বই পত্রের সঙ্গে বহুদিন থেকেই সম্পর্ক নাই হয়ে গেছে। শুয়ে থেকে এখন সময়গুলি পার হয়ে যেতে লাগল। ভোর হয়, তিনি শুয়ে থাকেন, দুপুর হয় তখনও তিনি শুয়ে থাকেন, সন্ধ্যে নামে আর তারপর রাত আসে, তিনি কিন্তু শুয়েই থাকেন- কখনও চোখদুটি খুলে, কখও চোখ দুটি বুজে। রোগের যন্ত্রণায় কিন্তু বেশিরভাগই ঘুম আসেনা, কেমন যেন একটা আচ্ছন্ন  ভাব ওকে ঘিরে থাকে। মাঝে মাঝে তার সময়ের খবর নিতে ইচ্ছা করে, সামনের বারান্দায় বসে তাকিয়ে থাকা রাজপথের জ্বলন্ত জগতটার খবর জানতে ইচ্ছা করে, কয়টা বা বাজে এখন …বাড়ির সামনের পথ দিয়ে ছেলেমেয়েদের হাসতে হাসতে কথা বলতে বলতে দলবেঁধে স্কুলে যাবার সময় হয়েছে কিনা বা বোধহয় এতক্ষণে রূপুককে খাইয়ে-দাইয়ে সামনের বারান্দায় এনে আয়া তার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করছে, রুপুর মুখে এখন কথা ফুটেছে, বড় কথা বলে সে, বড় আদুরে কথা তার, হয়তো এখন সে আয়ার সঙ্গে বাইরে খেলতে খেলতে নানা কথা বলে চলেছে। কিন্তু সেই কথাগুলির একটা শব্দও এখানে এই বিছানা থেকে তিনি শুনতে পান না। কিন্তু এখন তার মানুষের কথা শুনতে খুব ইচ্ছা করে- দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, শুয়ে শুয়ে কাটানো তার এই ঘরটা এত নির্জন।এক প্রান্তের এই নিঃসঙ্গ ঘরটাতে মনে হয় বাইরের জগতের কোনো শব্দ ভেসে আসে না।
ক্লান্ত চোখজোড়া বুজে নেন বিজয় ভরালী। চোখদুটো মেলে ঘরের একই জিনিসগুলিকে দিনের পর দিন আর কত দেখা যায়।অনেকদিন ধরে শয্যাশায়ী হয়ে থাকা রোগিরা বা কী করে…বিয়ের আগে নাকি ইলার একবার একটা পায়ের হাড় ভেঙ্গেছিল,পুরো দুমাস নাকি সে শয্যাশায়ী ছিল,পা-টা প্লাস্টার করা ছিল।শুয়ে শুয়ে ইলার নাকি অসম্ভব বিরক্ত লাগছিল। একজন কেউ তার কাছে না থাকলে ইলা নাকি চেঁচামিচি করত-কিন্তু তবুও মাঝে মধ্যে তাকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে হত। তখন নাকি ইলা তার বিছানার কাছে থাকা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে সময় কাটিয়ে দিত। জানালার দিকেই নাকি ওদের একটা প্রকাণ্ড সজনে গাছ ছিল।গাছটা তার ডালপাতাগুলি মেলে জানালা দিয়ে দেখা আকাশটা একেবারে ঢেকে ফেলেছিল। ইলার নাকি শুয়ে শুয়ে সেই গাছটা,তার ডালে বসে থাকা দুই একটি পাখি ,তার শাখা প্রশাখার মধ্য দিয়ে দেখা নীল আকাশের আভাস দেখে দেখে খুব ভালো লাগত।
বিজয় ভরালীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে-তার কাছে অনবরত কেউ একজন যেন বসে থাকে-বড় ইচ্ছা করে তার-কিন্তু ইলার মতো বাড়ির কার কাছে বা সে আবদার করে? তার জানালা দিয়ে  বাইরে তাকিয়ে চোখ জুড়োনোর জন্য জানালার ওপাশেই একটা প্রকান্ড পাকা দোতলা ঘর,তাকাতে  তাকাতে তার চোখজোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়ত। জানালার ফাঁক দিয়ে নীল আকাশের কিছুটা আভাস দেখা গেলেও ! আকাশ! একসময়ে ‘ব্লেসেড ডেমোজেল’কবিতাটা তার বড় প্রিয় ছিল,কলেজ জীবনে সেই কবিতাটা পড়ে  তার গায়ে অদ্ভুত শিহরণ খেলে গিয়েছিল,ইলাকেও একদিন তিনি খুব আবেগের সঙ্গে সেই কবিতাটা পড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল আর ইলা সশব্দে কেঁদে ফেলেছিল। বুজে থাকা চোখজোড়া আপনা থেকেই খুলে যায় বিজয় ভরালীর আর ব্যর্থ আশার দৃষ্টি জানালার কাছ থেকে ফিরে আসে।আশা-কে জানে একটু আকাশ হয়তো দেখা যাবে-সেই আকাশ,যার সোনার রেলিঙে ভর দিয়ে ইলা হয়তো ‘ব্লেসেড ডেমোজেলর’মতোই তাঁর দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে…কাঁদতে পারলে বোধহয় মনটা হাল্কা হয়ে যায়,কিন্তু তিন আজ পর্যন্ত কাঁদতে পারেন নি। আচ্ছা পোনা বড় হওয়ার পরে কখনও কেঁদেছে কি?শৈশবে তো সে ইলার কাছে কথায় কথায় বায়না ধরে কাঁদত…। আচ্ছা ,তার মৃত্যুতে পোনা কাঁদবে কি? কাঁদলেও কাঁদতে পারে।কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে পোনা আসলে দুঃখ করে কাঁদার মতো কিছু নেই। তাঁর কাছে মৃত্যু মানে এই পৃথিবী থেকে মুক্তি,যে পৃথিবীকে ইলা প্রাণভরে ভালোবাসত।কিন্তু যে পৃথিবী তার কাছে চিরকাল নিষ্ঠুর এবং উদাসীন হয়ে রইল-নাহলে জীবনে তিনি তো কারও কোনো অপকার করার কথা মনে পড়ে না,একটা সত্যনিষ্ঠ সাধুর জীবন কাটিয়েছেন তিনি,কিন্তু তার বিনিময়ে তাকে কেন এত দুঃখ কষ্ট পেতে হল? ইলাকে তার কাছ থেকে অকালে কেড়ে নিয়েই তো ক্ষান্ত রইল না জীবন,তাঁর একমাত্র পুত্রের জীবনেও কেন সুখ আহ্লাদ দেখা থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখল? তাই তার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটো শারিতে আজ তিনি পৃথিবীর কাছে শেষ বিদায় চাইতে চান-‘হে উদাসীন পৃথিবী,আমাকে সম্পূর্ণ ভোলবার আগে,তোমার নির্মম পদপ্রান্তে আজ রেখে যাই আমার প্রণতি-’ …পুনরায় চোখদুটো বুজে নেয় বিজয় ভরালী-’ইস, এই মাছিদের এত অত্যাচার,নার্স যে সারাটা দিন কোথায় থাকে,সময়মতো ওষুধটুকু খাইয়ে যাওয়া ছাড়া তার কাছে আসতেই চায় না,কিন্তু তারই বা দোষ কোথায়,নার্সের শুশ্রূষা তো পয়সার বিনিময়ে,অন্তরের তাগিদায় তো নয়। পোনা তো ছুটি নিয়ে আমার কাছে থাকতে চেয়েছিল,আমিইতো প্রবল প্রতিবাদ করেছিলাম এখন প্রয়োজন নেই বলে’-বিজয় ভরালী ভাবলেন এবং তাঁর শীর্ণ মুখে একটা ম্লান হাসির ঢেউ খেলে গেল-‘এখনই দরকার নেই-অর্থাৎ আমার মৃত্যুর সময় হয়নি।’কার কখন মৃত্যু হবে তা কি মানুষ আগে থেকে কখনও জানতে পারে,ইলার যে হঠাৎ মৃত্যু হবে তা কি ইলা নিজেই কোনোদিন বুঝতে পেরেছিল বা আভাস পেয়েছিল? অথচ পোনার জন্মের সময় দেখছি দুজনেই বিভীষিকা দেখে দেখে মৃত্যুর জন্য পথ চেয়ে থাকা সত্ত্বেও মৃত্যু তো এল না? … ইস মাছির কী অত্যাচার,নার্স কোথায় যে গেল।’দুর্বল মাথাটাকে খুব ধীরে ধীরে নাড়িয়ে বিজয় ভরালী মুখ থেকে মাছিগুলিকে তাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে।…
খুব ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে সঞ্জয় বাবার ঘরে প্রবেশ করে।দূর থেকে বাবার বুজে থাকা চোখজোড়া দেখে তার মনে হল যে যন্ত্রণার মধ্যেও বাবার হয়তো তন্দ্রার ভাব এসেছে। সেই ঘুমের ব্যাঘাত না করে সে যথাসম্ভব নিঃশব্দে বাবার বিছানার কাছে চলে এল।
বিজয় ভরালী চোখদুটি বন্ধ করে অসারভাবে পড়েছিলেন। সেদিকে তাকিয়ে সঞ্জয় দেখল –অনেকদিন না কামানো আধা-পাকা কাঁচা দাড়ির আড়ালে  বাবার ঢুকে যাওয়া গাল দুটির গর্ত প্রকট হয়ে পড়েছে,বুজে থাকা চোখদুটির কোণে কিছুটা পিঁচুটি জমে আছে,মুখটা বড় অসহায়ভাবে হা করে আছে,কয়েকটা মাছি মুখের আশেপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। হাড়-চামড়া সর্বস্ব একটা শীর্ণ হাত কম্বলের নিচ থেকে বেরিয়ে বিছানার পাশে ঝুলে আছে-একহাতে বাবার মুখের মাছিগুলি তাড়াতে শুরু করে উদ্গত দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা যেন বাবার ঘুমের কোনোরকম ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে তার জন্য সাবধান হয়ে মুখটা ঘোরানোর সময় সঞ্জয়ের চোখদুটি বাবার বিছানার ওপাশে থাকা বুক সেলফের ওপর পড়ল -বই সর্বস্ব জীবন কাটানো বাবার বইগুলি অনাদৃতভাবে সেলফের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে,সেগুলির ওপরে ধুলোর আস্তরণ।অনেকদিন থেকেই বাবা এই বইগুলি ছূঁতে পারেন নি-আর-আর এই জীবনে কোনোদিন পারবেন না।
হঠাৎ সঞ্জয়ের চোখের কোণে দুফোঁটা জল জমা হল। ধীরে ধীরে বিজয় ভরালী ঘোলা চোখদুটি মেলে তাকালেন।
‘কে?’ …
‘পোনা-’ বিজয় ভরালী প্রায় অস্পষ্ট কন্ঠে বললেন। আর তারপরে বিজয় ভরালী দেখলেন –শৈশবে কথায় কথায় মায়ের কাছে কান্নাকাটি করা ছেলেটি এখন বড় হয়ে বাবার কাছে দুইহাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদছে।
---------
 




বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৭, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

  একজন বুড়ো মানুষ-১৭,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৭)

সঞ্জয় আর কিছু বলল না, চোখ দুটো বুজে  মনে মনে পড়ে রইল.। আর সে দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালীর বুকটা একটা অব্যক্ত বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। সঞ্জয়ের এত কম অসুখ-বিসুখ হয় যে তাকে এভাবে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা দৃশ্যের কথা মনেই পড়ে না। সেইজন্য যেন এখন তাকে একটা বড় অসহায় শিশু বলে মনে হতে লাগল। তাঁর বড় ইচ্ছে হল যেন তিনি উঠে গিয়ে সঞ্জয়ের কপালে একটু হাত বুলিয়ে দেয়,, কিন্তু ইচ্ছে হলেও তিনি চেয়ার থেকে নাড়াচাড়া করতে পারলেন না, সামনে বইটা মেলে নিয়ে সেখানে তিনি পাথরের মূর্তির মত বসে রইলেন আর তারপরে তার মনের চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো একটি নারীমূর্তি। ইলা। কিন্তু আজ সেই মুখ হাসি ভরা নয়, উদ্বেগে কাতর। পোনার যখন ছয় সাত  বছর বয়স তখন তার বোধহয় একবার এভাবে সর্দি জ্বর হয়েছিল। বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল। তিনি এখন  দেখা এই উদ্বিগ্নতায় ভরা মুখ নিয়ে ইলা পোনার বিছানার কাছে বসে ছিল। বিছানা কিন্তু তখন এত ধবধবে পরিস্কার ছিল না। এমনকি পোনাকে দেখার জন্য তখন কোনো ডাক্তার ও আসেনি। ইলা দিন-রাত তার কাছে বসে বসে গরম তেলে রসুন ভিজিয়ে সেই তেল তার বুকে পিঠে মালিশ করে দিয়েছিল ।বিকেলবেলা গরম জলে পা ধুইয়ে সেই গরম তেল দিয়ে সেক দিয়েছিল। মাথা টিপে, হাত পা টিপে, তার কাছে বসে ছিল ইলা। বিজয় ভরালীরও বার দুয়েক সর্দি জ্বর হওয়ার সময় এই একই পরিচর্যায় ইলা তাকে সুস্থ করে তুলেছিল। কিন্তু এখন সেই পরিচর্যার বদলে ডাক্তার এবং প্রেসক্রিপশনে লেখা নানা ওষুধপত্র এসেছে। মাথাটা টিপে দিলে পোনা কিছুটা আরাম পেত নাকি? কিন্তু বিজয় ভরালী নড়াচড়া করতে পারলেন না। চেয়ারে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বিজয় ভরালীর তন্ময়তা ভাঙলো পুনরায় ছেলের কণ্ঠস্বরে -'তুমি ভাত খাও গিয়ে বাবা-'
' ভাত?ও হ‍্যাঁ, এগারোটা বাজে দেখছি, পোনার টেম্পারেচারটা নেওয়ার সময়ও হয়ে গেছে এখন,  ওর খাবার ব্যবস্থাও করতে হবে-।' বিজয় ভরালী তৎপর হয়ে উঠলেন।
সঞ্জয় কিন্তু প্রায় কিছুই খেতে পারছিল না - না কি খাচ্ছিল না? ভাতের পাতে বসে হাত দিয়ে ভাতগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে বিজয় ভরালী ভাবলেন কমলার উপরে অভিমান করেই কিছু খেল না নাকি পোনা? কিন্তু অভিমান কথাটাও আজকের যুগের আধুনিকা মেয়ের ক্ষেত্রে খাটে না নাকি- স্বাধীন দেশের স্বাধীন মেয়ে কমলা। এখনও সে চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থেকে স্বামীর সেবা শুশ্রূষা করে ঘরোয়া জঞ্জাল শেষ করে, ছেলে মেয়ে লালন পালন করে, জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারে কি? কখন ও পারে না। তাছাড়া বিজয় ভরালী পুরোনো যুগের মানুষ হলেও সেটা নিশ্চয় চান না।  মেয়েরা চিরদিন বাড়ির চার সীমানার মধ্যে বন্দী হয়ে থাকুক সেটাকে তিনি কখনও  মেনে নিতে পারেন না। আগের দিনে সত্যিই অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক অত্যাচারে জর্জরিত হতে হত। বউ হিসেবে শাশুড়ি ননদিনীর অত্যাচার, স্ত্রী হিসেবে স্বামীর অত্যাচার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো ধরনের সম্বন্ধ না থাকা কোনো বিষয়েই  নিজের মতামত বলতে না থাকা সত্যিই বড় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হত সেই সময়ের নারীদের। এখন যে তারা মুক্তি পেয়েছে সেটা বড় ভালো কথা। এতে বিজয় ভরালী খুবই সন্তুষ্ট। তাদের সময়ে পথে-ঘাটে মেয়েদের খুব কমই দেখা যেত, যুবতী মেয়েদের তো আর ও কম কম দেখা যেত। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যেই এই দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হল। এখন যেন ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়েরা, যুবতীরা, আধবয়সী মহিলারা, রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে এখন যুবতী মেয়েদের যেমন সপ্রতিভ পোশাক, সপ্রতিভ চলাফেরা পৃথিবীর কাউকে পরোয়া না করা ভাব নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে  বিজয় ভরালীর বুড়ো চোখ বিষ্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে যায়। সত্যিই এই দ্রুত নারী জাগরণ বড় শুভ লক্ষ্মণ-কিন্তু-কিন্তু-বিজয় ভরালীর পুরোনো দিনের কুসংস্কারাচ্ছনন্ন মনটা যেন একটু কুঁচকে যায় -প্রকৃত স্বাধীনতা বড় ভালো জিনিস, তা মনের মুক্তি আনে,মনের প্রসারতা বৃদ্ধি করে-কিন্তু স্বাধীনতার নামে তার অপব‍্যবহার?  এই যে মেয়েরা এতটা স্বাধীন হয়েছে- তা মেয়েদের মনকে মুক্ত প্রগতিশীল করে তুলেছে কি? আধুনিক অসমিয়া পত্রপত্রিকায় পড়া কিছু বীভৎস গল্প-উপন্যাসের কথা বিজয় ভরালীর মনে পড়ে যায়। কেবল বই পড়ে জীবন কাটানো মানুষ বিজয় ভরালী, তাই সমস্ত ধরনের লেখা তিনি পড়েন। আর এখনকার পত্রপত্রিকায় কি লিখেছে তা জানার জন্য তিনি অসমীয়া পত্র পত্রিকা পড়েন এবং সেই সব পড়ে তিনি অনেক আধুনিক লেখকের পাণ্ডিত্য  এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ শক্তির  প্রতি সশ্রদ্ধ প্রশংসার ভাবও পোষণ করেন কিন্তু তার মধ্যেও এরকম কিছু গল্প উপন্যাস পড়েছেন যা পড়ে তিনি মাঝেমধ্যে বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন । বিজয় ভরালী তখন  ভেবেছেন -' অসমীয়া যুবতীরা স্বাধীন হয়ে এই মুক্তির জীবন কাটাচ্ছে নাকি? অন্তত রাস্তায় দেখা  যুবক-যুবতীর কিছু অংশ নিশ্চয়  এই জীবনকে বেছে নিয়েছে। সেসব পড়ে তখন তার মনে পড়ে যায় রাসেলের একটা কথা -'two things ,viz . Motor-cars and contraceptives have revolutionized the modern civilization…'
একটুখানি খাওয়া ভাতের থালায় এক গ্লাস জল ঢেলে দিয়ে চেয়ারটা একটু জোরেই টেনে বিজয় ভরালী খাবার টেবিল থেকে উঠে এলেন। তারপরে গামছায় হাতদুটি মুছতে মুছতে মনটাকে খুব কঠোর করার চেষ্টা করে নিজের মনে বিড়বিড় করলেন-’আজ কমলা স্কুল থেকে এলে ওকে কয়েকদিন ছুটি নিতে বলব। স্বামীর অসুখের সময় কোনো মহিলা এভাবে স্বামীকে ফেলে রেখে যাওয়া উচিত নয় ।
কিন্তু সেই ভাবা কথা তার মনের মধ্যেই থেকে গেল।বিকেলে কমলা স্কুল থেকে এসে তাকে সঞ্জয়ের জ্বরের কথা জিজ্ঞেস করল, কী খেয়েছে,না  খেয়েছে জিজ্ঞেস করল, আর তারপরে যখন কমলা সঞ্জয়ের কাছে গিয়ে তার কপালে হাত দিয়ে জ্বরের উত্তাপ পরীক্ষা করল,বিজয় ভরালী  ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কমলাকে বলার কথাটা তার মনের মধ্যেই অকথিত থেকে গেল। 
তিন চারদিন ধরে জ্বরে ভুগে  সঞ্জয় তারপর একদিন ভালো হয়ে উঠল।...পৃথিবীতে সব কিছুর শেষ আছে। একদিন বিজয় ভরালীরও জীবনের শেষ সময় এসে উপস্থিত হল।

বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৬, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১৬,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৬)

কিন্তু কেবলমাত্র কাজকর্মের ব্যবস্থায় সুবিধা করে দেওয়ার মধ্যেই কি আজকের মানুষ সন্তুষ্ট রয়েছে? সংসারের ঘরোয়া কাজকর্ম গুলি এখন আর জীবন গুলিকে নীরস এবং গতানুগতিক করে রাখতে পারে না। এখন ঘরে ঘরে রেডিও ,শহরের সর্বত্র সিনেমা হলের প্রাচুর্য,চারদিকে কালচারাল ক্লাব,-শহরে সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন, বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন,নাটক সমারোহ চলতেই থাকে। বিজয় ভরালী  মনে মনে স্বীকার করেন -আজকের মানুষ সত্যিই জীবনটাকে সরস, বৈচিত্র্যপূর্ণ করে রেখেছে ,জীবনটাকে সুন্দর নিখুঁত করে বেঁচে থাকতে জানে।
 কিন্তু তবু, বিজয় ভরালী ভাবেন, এত সৌন্দর্যের ভেতরে, এত নিখুঁত,সুরুচিপূর্ণ জীবনযাত্রার মধ্যে,এত প্রগতি এবং সর্ববিধ উন্নতির মধ্যে তার মন অহরহ কী একটা জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছে ?এত বিরাট অগ্রগতির মধ্যে কী অভাববোধ তাকে এত পীড়িত করে মারছে। বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বিজয় ভরালীর। সেই জিনিসটার নাম বোধহয় হৃদয়।আর -বিজয় ভরালী ভাবলেন, সেই অভাববোধের এক জীবন্ত প্রতীক বোধহয় কমলার এই সুসজ্জিত ,স্বাচ্ছন্দ‍্যপূর্ণ সুন্দর ঘরটি এবং এই সুন্দর ঘরটির সামনের একটুখানি বাগানটির নানা রঙের সুন্দর বিলাতি ফুলগুলি। এই ফুলগুলিও  ঘরটার  মতোই এত সুন্দর, কিন্তু বর্ণই তার একমাত্র সারবস্তু, কোনো গন্ধ নেই, চোখকেই কেবল তৃপ্তি দিতে পারে,সুগন্ধ  বিলিয়ে কোনোদিন কারো প্রাণ পূলক চঞ্চল করে তুলতে পারেনা। কমলার ঘর সঞ্জয় অনেক আরাম দেবে অনেক স্বাচ্ছন্দ দেবে কিন্তু গৃহ প্রবেশের দিন দুটি মানুষ দেখে পেট ভরে খাওয়ানো সঞ্জয়ের মনকে সামান্য একটি ঘরোয়া সুখ-দেওয়ার থেকেও বঞ্চিত করে রাখল কমলা এই বাহ‍্যিক সাজসজ্জার বিনিময়ে আধুনিক যুগের উন্নত মানের মানুষের ঘরের বোধহয় এটাই নিয়ম নতুন ঘরটি নেওয়ার কিছুদিন পরে সঞ্জয় অসুস্থ হল। বড় অসুখ নয় অবশ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ ছিল না সেই জন্য বোধহয় কমলা স্কুল থেকে ছুটি নেওয়ার কোনো আবশ্যকতা বোধ করল না অবশ্য সঞ্জয়ের বাধা সত্ত্বেও সে ডাক্তার ডেকে আনল আজকের দিনে কোন ঠিক নেই কিসের থেকে কি হয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না তাই সময়মত সাবধান হওয়া ভালো।
বিজয় ভরালী বাড়িতে থাকার জন্য বোধহয় কমলা স্কুল ক্ষতি করার কথা ভাবলো না যেদিন সঞ্জয়ের প্রায় একশো এক ডিগ্রী জ্বর উঠল কমলা গিয়ে বিজয় ভরালীকে বলল যে সে যতক্ষণ স্কুলে থাকবে ততক্ষণ যেন তিনি সঞ্জয়ের খবর নেন  টেবিলেএকটা বোতলে মিকচার রাখা আছে সে সে নটার সময় এক দাগ খাইয়েছে, তিন ঘন্টা পরে পরে এক দাগ করে খাওয়াতে হবে, তিনি যেন ঘড়ি দেখে খাওয়ান। ফ্লাক্সে গরম জল রাখা আছে খেতে চাইলেই সেখান থেকে দেওয়া যেতে পারে এগারোটার সময় ভাবিত দেবে চিনি দিয়ে পছন্দ করলে চিনি দিয়ে তা না হলে লেবু চিপে নুন দিয়ে খেতে দিলে হবে আরেকটু কথা কমলা বলল টেম্পারেচার টা দুই ঘন্টা পর পর দেখে কাগজে লিখে রাখতে হবে ডাক্তার আবার বিকেলে আসবে তিনি টেম্পারেচার চার্টটা দেখতে চাইবেন। টেবিলে কাগজ কলম যত্ন করে রাখা আছে থার্মোমিটার ও রয়েছে।
 সমস্ত বিধি ব্যবস্থা করে দিয়ে কমলা স্কুলে চলে গেল, কমলা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজয় ভরালী গিয়ে হাজির হলেন সঞ্জয় দেওয়ালের দিকে মুখ করে নিঃসারে পড়েছিল বিজয় ভরালীর পায়ের শব্দে মাথা কাত করে তাকালো মুখে কিছুই বলল না বাবা দেখতে পেল তার চোখ দুটো লাল হয়ে রয়েছে আবার জ্বর বাড়ছে নাকি! তিনি টেবিলের কাছে গেলেন এটি জিনিস টেবিলে পরিপাটি করে সাজানো।জ্বর লেখা চার্টটার উপরে থার্মোমিটার টা রেখে দেওয়া আছে।  বিজয় ভরালী দেখলেন এক ঘন্টা জ্বরের উত্তাপ মাপা হয় গেছে কিন্তু তবু তিনি থার্মোমিটারটা হাতে নিয়ে সঞ্জয়ের কাছে গিয়ে বললেন -'দেখি একবার জ্বরটা।' কিন্তু সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলল 'লাগবেনা-'
' কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না কি পোনা?'
'ওহো'- আবার মাথা নাড়লো সঞ্জয় ছেলের জন্য কিছুই করতে না পেরে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে টেবিলের পাশে থাকা একটা চেয়ার টেনে এনে বিজয়  ভরালী তাতে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ তিনি এভাবে বসে বসেই ঘরটার চারপাশে তাকালেন রোগীর জন্য ঘরটিকে যে আদর্শ ঘর করে তোলা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই সমস্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সঞ্জয়ের সবার থেকে প্রতিটি কাপড়ে ধবধবে পরিস্কার রোগির জন্য প্রতিটি জিনিস টেবিলের যত্ন করে রাখা আছে টেবিলে পেতে রাখা ঢাকনিটাও অত্যন্ত পরিষ্কার ।কোনো অবস্থাতেই কমলার কোনো ত্রুটি নেই, বিজয় ভরালী ভাবলেন।
' বাবা তুমি যাও। আমার কিছুই লাগবে না' হঠাৎ একবার দুর্বল কন্ঠে সঞ্জয় বলে উঠল।
'কী বলছ পোনা?'- বিজয় ভরালী কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েছিল-'ও' আমার যাবার কথা- কোন অসুবিধা নেই আমি এখানে বসে থাকি, এই বইটাই না হয় পড়তে থাকি -'

মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৫ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১৫,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৫)
বড় সত্যি কথা,বিজয় ভরাল মাথা নাড়ে,হ্যাঁ,বড় সত্যি কথা।তাদের জীবনটা সত্যিই একটা সঙ্কীর্ণ বৃত্তে আবর্তিত হয়ে শেষ হয়ে গেল-জীবনের নানা রঙিন সম্ভাবনার দরজাগুলি তাদের জন্য চিরদিন রুদ্ধ হয়ে রইল। সামান্য একটা বাড়ি তৈরির কাজে তাদের যুগের মানুষ এখনকার মানুষের মতো নিখুঁত সৌন্দর্য-জ্ঞানের পরিচয় দিতে জানল না,সেই একই দেওয়ালে সাদা বা মাটি রঙের চূন দেওয়া,কাঠগুলিতে কালো আলকাতরার রঙ বা বার্ণিশ ঘষা –এতে ঘরগুলিতে কী যে সুরুচির পরিচয় ফুটে উঠে-দেওয়ালে ডিসটেম্পার,জানালা দরজার কাঠে নানা রকম সুন্দর রঙের পেইন্ট। তার সঙ্গে মিলিয়ে পর্দা লাগানো হয়েছে। কমলাও তো কাঠের রঙের সঙ্গে মেলানোর জন্য এই বাড়িতে এসে আট টাকা গজের নতুন পর্দা কিনেছে,পুরোনো বাড়ির পর্দাগুলির রঙ নাকি এই জানালা দরজার সঙ্গে ম্যাচ করেনা,তাছাড়া আগের পর্দাগুলি এই বাড়ি থেকে অনেক ছোট-এই সমস্ত কথা সেদিন কমলা জানালায় পর্দা লাগানোর সময় বিজয় ভরালীকে বুঝিয়ে বলছিল-বিজয় ভরালী তখন সামনের বারান্দায় বসেছিলেন।
‘খরচ অবশ্য অনেক পরে গেল বাবা-’সেদিন কমলা আরও বলেছিল-‘কিন্তু আমাদের একটা স্ট্যণ্ডার্ড আছে তো,বাড়িটা সাজিয়ে গুছিয়ে না রাখলে আমাদের সোসাইটিতে মান থাকে না। আমিতো একটু কম দামি পর্দাই লাগিয়েছি,আমার সঙ্গের একজন বান্ধবীর বাড়িতে সেদিন দেখে এলাম একেবারে ষোলো টাকা গজের পর্দা লাগিয়েছে-অবশ্য ওদের কথা আলাদা,স্বামী একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার,বাইরের অনেক টাকা-ওরা ষোলো কেন,বত্রিশ টাকা দামি পর্দায় কাপড় নিতে পারে,আমাদের এর মতো ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো বাইরের আয় নেই-’শেষের কথাগুলি যেন খুব ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছিল কমলা।
কমলা ঝুলানো সেই নতুন সুন্দর ডিজাইন এবং সুন্দর রঙের পর্দাগুলির দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালী ভাবল –তাদের দিনে বাড়িগুলি যেরকম ছিল পর্দাগুলিও ছিল তথৈবচ।অনেকের বাড়িতে তো মহিলারা চাদর ছিঁড়ে গেলে পর্দারূপে ব্যবহার করা হত,ইলাও একবার সেটাই করেছিল,এক টুকরো রঙিন সাবান কিনে এনে পুরোনা সাদা চাদর কয়েকটিতে নীল রঙ লাগিয়ে পর্দা দিয়ে ইলা ঘর সাজিয়েছিল। সেই পর্দা দেখলে এখন কমলাদের মুখে এখন বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠবে।কিন্তু আজকের মানুষ কি কেবল বাড়ি সাজানোর ক্ষেত্রেই সুরুচির পরিচয় দিয়েছে?নিজেকে সাজানোর ক্ষেত্রেও এখনকার মানুষের পারিপাট্য এবং সৌন্দর্যবোধের পরিচয় ফুটে বের হচ্ছে। ছোট থেকে বড় পর্যন্ত এখনকার মানুষ নিখুঁতভাবে নিজেদের সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। আগের দিনের ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজে খালি পেয়ে যেত,আধ মলিন ইস্ত্রিবিহীন কাপড়-চোপড় পরে,কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়ের কাপড়-চোপড়ের পরিপাট্য,জুতো-মোজায় সুশোভিত পা,নতুন নতুন স্টাইলের চুল আঁচড়ানোর নিদর্শন দেখলে ভালোই লাগে। বারান্দায় বসে রাস্তার জনতার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এই সমস্ত লক্ষ্য করতে করতে বিজয় ভরালী ভাবতে থাকেন।তাদের দিনে কেবল ধনী মানুষের বাড়ির ছেলে মেয়ে বা পুরুষ মহিলার জন্যই কাপড়-চোপড়ের বিলাসিতা একচেটিয়া ছিল,কিন্তু এখনকার সময়ে তো কাপড় চোপড় দেখে বোঝা সম্ভব না কার আর্থিক অবস্থা কেমন। বিজয় ভরালীর পুরোনো দিনের অজটিল মন ভেবে পায় না –আজকের এই অতি অভাব অনটনের দিনে দেশের সমস্ত মানুষ কীভাবে এত দামি কাপড় পরতে পারছে।এখনকার মানুষ তো তাদের মতো কোনোমতে খেয়ে-ঘুমিয়ে গরু মোষের মতো জীবন কাটাতে পারে না।এখনকার মানুষের জীবনধারায় কমলার বক্তব্য অনুসারে রুচিবোধ এবং কালচার ওতপ্রোতভাবে ঢুকে গেছে।আধুনিক মানুষ সমস্ত কিছুই নিখুঁতভাবে করতে চাইছে।জীবনগুলি জটিল হয়ে পড়েছে সত্যি –কিন্তু এই জটিলতাই যে প্রগতির নিদর্শন।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জীবনে কত আরাম,কত স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে-সত্যিইতো –বিজয় ভরালী ভাবলেন,এখন তাহারা গুয়াহাটি শহরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যেতে চাইলে সিটি বাস নাহলে ট্যাক্সিতে গেলেই চলে,আশে পাশে যেতে হলেতো রিক্সা আছেই।কিন্তু তাদের দিনে দূর দূরান্তের কোনো জায়গায় যেতে হলে কত অসুবিধা-চার চাকার ঘোড়া গাড়িতে থেকেচ থেকেচ করে ধীরে ধীরে যেতে থাকা,শরীরে ঝাঁকুনি –সময়ের বাজে খরচ,কত অসুবিধা।আশেপাশে যেতে হলে পা দুটিই অবলম্বন,এখনকার মতো তো রিক্সার আরাম নেই।ভেবে দেখতে গেলে বর্তমান জীবনধারার সমস্ত দিকে আরাম এবং স্বাচ্ছন্দ্যেই তো ভরে রয়েছে।আগের দিনের বাড়িগুলিতে মহিলাদের কত অসুবিধা ছিল-গোধূলি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ল্যাম্প-প্রদীপ জ্বালাতে হয়,বর্ষার আবহাওয়ায় দূরে থাকা রান্নাঘরগুলিতে  বৃষ্টিতে ভিজে আসা যাওয়া করার কত অসুবিধা ছিল,এখনকার মতোতো ঘরে ঘরে জলের কল ছিল না,আর থাকলেও এক জায়গায় মাত্র একটা কল থাকে,তা দিয়েই সব জায়গায় কাজ চালাতে হয়,কিন্তু এখন আধুনিক মানুষের উন্নত চিন্তাশীল মনে জীবনধারার সমস্ত ক্ষেত্রে আরামের ব্যবস্থা করে নিয়েছে,এখনকার গৃহিনীদের জন্য সবজায়গায় জলের কল-রান্নাঘরে কল,মুখ-ধোওয়ার জায়গায় কল,বাথরুমে কল,বাসন ধোওয়া জায়গায় কল।তাদের সময়কার মহিলারা কি এত সুবিধার,এত আরামের ব্যবস্থার কথা ভাবতে পেরেছিল?সেইজন্যই বোধহয় তখনকার দিনের এক একটি বাড়ি কেবল সজ্জাহীন অনাড়ম্বরই ছিল না,সেইসব বাড়ি এখনকার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত নোঙরাও ছিল।তখনকার গৃহিণীর আজকের মতো সুরুচিবোধতো ছিলই না পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং পারিপাট্যেরও খুব অভাব ছিল।বোধহয় কাজ কর্মের সুবিধা না থাকা বাড়িগুলিতে কাজের বোঝা পরিশ্রান্ত করা সেই মহিলাদের ঘর সাজানো বা পরিষ্কার করে রাখার জন্য খুব কম উৎসাহই অবশিষ্ট থাকত।        


বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৪, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১৪,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,



(১৪)

‘কিন্তু কমলা, দেশের দুরবস্থার কথা ভেবে তুমি লোকজনকে নিমন্ত্রণ করা থেকে বিরত রয়েছ,, যদি দেশের প্রতি তোমার এতটাই ভালোবাসা তাহলে গৃহ প্রবেশের খরচ করার জন্য রাখা টাকাটা আমরা প্রতিরক্ষা পুঁজিতে দিয়ে দিই এস-'
আজ বোধহয় কমলাকে ভালোভাবে ক্রোধিত করে তোলার জন্য সঞ্জয় উঠেপড়ে লেগেছে .।চিন্তিতভাবে বিজয় ভরালী ভাবলেন। কী হয়েছে আজ পোনার? আগে তো কখনও কমলার সঙ্গে এভাবে সে বাদ প্রতিবাদ করত না।’
 ‘ঠিক বলেছ, প্রতিরক্ষা পুঁজিতে হাত উপুড় করে দিনের পরে দিন দান দক্ষিনা করতে থাকি আর এদিকে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হোক- তার রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষার যা খুশি হোক- আমার ছেলে রক্ষা নাপাক, দেশরক্ষা পেলেই আমার হবে- এত উদার মনের মানুষ হতে পারব না। স্বীকার করছি আমার মন ছোট, আমার মন নিচ।’
‘তোমার ছেলের জন্য বড় চিন্তা, তাই না কমলা? কিন্তু এত চিন্তা কর যে তুমি কী নিশ্চিন্ত মনে একজন অপরিচিত আয়ার হাতে তাকে তুলে দিয়ে সারাদিনের জন্য চলে যেতে পার!’
 তুমি এখাোন  থেকে বেরোও। তোমার চিৎকারে এখন সোনা জেগে যাবে। তোমার অনেক উপদেশ শুনলাম- ছেলে কীভাবে বড় করতে হবে সেই উপদেশ অন্তত তোমার কাছ থেকে না শুনলেও আমার চলবে। তুমি চাও এখন থেকেই আমার আঁচলের নিচে ছেলেকে ঢেকে রেখে তোমার মত অলস ও অসাংসারিক এবং বাজে ধরনের আবেগিক করে তুলি। সেটা আমি কখনও হতে দেব না। চোখের সামনে তোমাকে দেখে আমার ছেলেকে দ্বিতীয় একটি তুমি হওয়া থেকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করব। আমি আমার ছেলের জন্য এরকম একটি ঘরের সৃষ্টি করব যেখানে বড় হয়ে এসে জীবনে আলস্য কাকে বলে জানবে না, বেহিসেবি কাকে বলে জানবে না এবং আজেবাজে সেন্টিমেন্টের জন্য কোনো ধরনের কোনো প্রশ্রয় সে আমার কাছ থেকে কখন ও পাবে না। দেখি, তুমি এখন এখান থেকে বের হও।’
 একটা দীর্ঘনিশ্বাস বিজয় ভরালীর অন্তর ভেদ করে বেরিয়ে এল। তিনি আজ তা রোধ করার কোনো চেষ্টাই করলেন না। আসলে তার কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। সঞ্জয়ের আট বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন এই অতি কোমল বয়সে ছেলেটি ঘরের আসল মমতা, আসল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ল। আজ সুদীর্ঘ ২২ বছর পরে সেই ভাবটা পুনরায় মনে উদয় হল বিজয় ভরালীর। কিন্তু এবার আর সঞ্জয়ের কথা ভেবে নয়, সঞ্জয়ের ছোট্ট শিশুটির কথা ভেবে। অবশেষে কমলারা একদিন সেই রিফাইনারির ঘরটা ছেড়ে দিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেল।
নতুন বাড়িতে মোট সাতটা ঘর। তারই এক প্রান্তের একটি ঘরে বিজয় ভরালীর থাকার ব্যবস্থা করে  দেওয়া হল। ঘরটা ভালোই, বাড়ির একপ্রান্তের মাথায় সেই ঘরটা, তাই সেখান থেকে তিনি সামনের রাস্তার জনসমাগম দেখে  দেখেও এখন অনেক সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু পথের এত মানুষ গাড়ির কোলাহলের এত কাছে থেকেও বিজয় ভরালীর হঠাৎ মনে হল তার নিঃসঙ্গতা যেন বেশি বেড়ে গেল। কমলারা বাড়ির ওপাশে তিনটি রুম নিয়ে থাকত, আর বিজয় ভরালীর রুমটি হল একেবারে এই মাথায়, মাঝখানে ড্রইংরুম এবং করিডর তাকে কমলাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এখন তিনি সঞ্জয় আর কমলার কথাবার্তা শোনাতো দূরের কথা, বাচ্চার কান্না পর্যন্ত শুনতে পান না। ফলে এক ভীষণ নিঃসঙ্গ এবং অসহায় ভাবে তার মন হাহাকার করতে লাগল। সেই অবস্থায় তিনি নিজের মনকে তিরস্কার করলেন যে ছেলে বৌমার কথা লুকিয়ে লুকিয়ে শোনার শাস্তি ভগবান তাকে এভাবেই দিলেন। 
তারপরে সঞ্জয় এবং কমলার ভেতরে হওয়া কোনো কথার বিজয় ভরালী শুনতে পেলেন না। কিন্তু কানে না শোনা কথা গুলি তিনি এখন কল্পনার শ্রবণেন্দ্রিয়তে জোরে জোরে যেন আঘাত করতে লাগল। আগেই শুনে রাখা কথাগুলোর উপরে নির্ভর করে তিনি যেন কল্পনাতে ছেলে বৌমার প্রতিটি কথাই শুনতে পাচ্ছেন আর তার নিঃসঙ্গ কর্মহীন নিস্তব্ধ জগতে  সেই কাল্পনিক প্রতিবাদের শব্দগুলি তার মনকে খুব রূঢ়ভাবে আঘাত করতে লাগল। কোনো কোনো সময় নিজেকে নিয়ে তিনি খুব অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন। এতদিন তার মনে একটা সৌম্য শান্ত কারুণ্য বিরাজ করছিল।,বই পড়ছিলেন,দৈনন্দিন জাগতিক প্রয়োজনের সামান্য কাজগুলি সমাধান করতেন এবং ধীরে মন্থর গতিতে উদাস শান্তির জীবনটা এগিয়ে চলছিল। কিন্তু এখন কমলাদের বাড়ি তৈরি করার সময় থেকে তার মনের সেই শান্তি হারিয়ে গেল। মন নামের আপদ  থেকে ইলার মুক্তির মাধ্যমে চিরদিনের জন্য মুক্তি পাওয়া ভাবা মানুষটার মনটা এখন চিরস্থায়ীভাবে অশান্ত চঞ্চল হয়ে রইল।কী কুক্ষণে যে তার ছেলের বাড়ি তৈরি করার কথাগুলো শোনার জন্য জঘন্য কৌতুহল মনকে চেপে ধরেছিল।কী খুঁজতে গিয়ে কী পেলেন-অমৃতের খোঁজে গিয়ে হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হতে হয়েছে।
কিন্তু- বিজয় ভরালী ভাবলেন, ছেলের ঘরোয়া জীবনের সম্ভেদ না জানলে তার মন শান্তিতে থাকত সত্যিই কিন্তু সেই শান্তি হত অসত্যের ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত ।মিথ্যা শান্তি, সেই শান্তি তাকে স্বার্থপর তৃপ্তিতে সবসময় ডুবিয়ে রাখতে সত্যি কিন্তু তারই রক্তমাংসের একটা অংশ চিরদিন অশান্তিতে একা একা দিন যাপন করত- কী দরকার এরকম ফাকি এবং প্রবঞ্চনায় ভরা মানসিক শান্তির? নিজের মনেই মাথা নাড়লেন বিজয় ভরালী। তার সামনে বই খোলা পড়েছিল কিন্তু এই চিন্তাগুলি মনটাকে সব সময় এভাবে অধিকার করে রইল যে আজ কাল যেন তিনি আগের মতো আর পড়াশোনায় মনসংযোগ করতে পারেন না। বই নাকি মানুষের জীবনের প্রধান সঙ্গী আর সে কথা বিজয় ভরালীর জীবনে এই সেদিন পর্যন্ত সত‍্য ছিল। কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন বই ও সঙ্গী হতে ব্যর্থ হয়।
নিঃসঙ্গ একটা জীবন না কাটালে বোধহয় চিন্তাগুলি এত বেশি চেপে ধরত না। বিজয় ভরালী ভাবেন, এবং তার প্রতিকার হিসাবেই তিনি এখন নিজের রুমটা যথেষ্ট বড়োসড়ো হওয়া সত্ত্বেও সামনের বারান্দায় বসে প্রায়ই সামনের পথ দিয়ে আসা যাওয়া করা মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার হাতে এখন আগের মতো বই থাকে না কিন্তু শুধুমাত্র রাস্তার মানুষের ভিড়ের লোভেই নয় অন্য একটি বড় লোভ বারবার বিজয় ভরালীকে সামনের বারান্দায় বের করে আনে। আয়া সামনের বারান্দায় রূপুকে  প্রায়ই প‍্যারাম্বুলেটরে শুইয়ে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে বেড়ায়। নাতিকে দেখার সেই লোভে তিনি ঘরের ভেতরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। কিন্তু একবার দুবার ওকে কোলে তুলে নেওয়া ছাড়া বেশিক্ষণ মনের আশ মিটিয়ে আদর করার সাহস করেন না। কে জানে হয়তো কমলা অসন্তুষ্ট হবে.. কমলা মনে করে দাদুর কাছ থেকে বেশি আদর পেলে নাতি অলস হয়ে উঠবে, বাস্তব জগতের কঠোরতার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার জন্য জীবনটাকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুলতে পারবে না। আধুনিক মানুষ, আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রায় কত জটিলতার মারপ‍্যাঁচ-কত সমস্যা দেখা দিয়েছে। আধুনিক মানুষের সামনে, বিজয় ভরালীর মতো পুরোনো কালের বুড়ো মানুষ একজন কী বুঝবে- বোধহয় তার বিষয়ে এভাবেই ভাবে কমলা। বোধহয় ভাবে কেন,কমলা তো বলেই,-’বাবাদের সেই good old days আর নেই,কিন্তু বাবা সেই অতীতের চোখেই আজকের জগৎটাকে দেখছেন,সেইজন্যি বাবা ভাবছেন-বাড়িটা তৈ্রি করতে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে পড়ল…’ আচ্ছা কমলা কী কথায় এই কথাগুলি পোনাকে শুনিয়েছিল এখন তাঁর মনে পড়ছে।কমলার বাড়ি তৈ্রি করতে এত বেশি টাকা খরচ হচ্ছিল যে তিনি একদিন কমলাকে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন বাড়িতে এত বেশি খরচ না  করে একটু সাধারণভাবে করলে হয় না কি?হাতে যে আর টাকা নেই।কিন্তু কমলা বলেছিল ,চলে না,কারণ মানুষের জীবনের মান এখন অনেক উন্নত হয়েছে,এখন মানুষ কেবল গ্রু-পশুর মতো সাধারণভাবে খেয়ে -ঘুমিয়ে জীবন কাটাতে চায় না,এখন মানুষ আর্টিষ্টিকভাবে জীবন যাপন করতে শিখেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৩ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

একজন বুড়ো মানুষ-১৩,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৩)
সঙ্গে সঙ্গে কমলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে তার চিন্তার স্ৰোতে বাধা পড়ল-' উপদেশ এবং উপদেশ- আজকাল তোমার মুখে উপদেশ ছাড়া আর অন্য কোনো কথা নেই। কিন্তু আমি এত বোকা নই বুঝেছ, পুরুষ জাতিটা সবসময় এভাবে বড় বড় কথা বলে, আদর্শের দোহাই দিয়ে মহিলাদের পায়ের নিচে রেখে আসছে, ঘরের মহৎ আদর্শের ছবি তুলে ধরে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। তোমরা সমস্ত পুরুষরাই এক। যতোই বিলাতে, আমেরিকায় পাস করে আস না কেন, তোমরা সবাই এক। মেয়েদের পরাধীন করে রাখার কথাটা যুগ যুগ ধরে তোমাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে গেছে। তোমাদের আর আমার চিনতে বাকি নেই। সবার দিন চিরকাল সমান যায় না। আমাদের মেয়েদের দিন এখন শুরু হয়েছে বুঝেছ, আমরাও-' এরপরে কমলার এই ধরনের কথা চলতে থাকল। আর বিজয় ভরালীখেয়াল করল  সঞ্জয়ের কণ্ঠস্বর আর শোনা গেল না। বইটা চোখের সামনে মেলে নিয়ে তিনি ও পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মনের চোখে ভেসে উঠল আর ও একটি স্তব্ধ মূর্তি -ছেলে সঞ্জয়ের।
একদিন কমলাদের বাড়ি তৈরি করার কাজ শেষ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে কমলার একটি ছেলের জন্ম হয়েছিল।
বিজয় ভরালী সেই একদিনই যা বাড়ি তৈরির কাজ দেখতে গিয়েছিলেন। তার পরে আর যাননি। এখন বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হওয়ায় আরও একদিন যেতে হল। শিশুটিকে ভাবিত এবং খাসিয়া আয়ার কাছে রেখে কমলা শশুর এবং স্বামীর সঙ্গে বের হল। বাড়িটা সত্যি সুন্দর হয়েছে।  কমলার মুখ গর্ব এবং আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।  ঘরের ভেতর ঘুরে ঘুরে সে শশুরকে সমস্ত বাড়িটা দেখাল। সামনের বারান্দা, ড্রইং  রুম এবং একটা বাথরুমে ছাই রঙের মোজাইক করা। বাথরুমে একটা প্রকাণ্ড শুভ্র বাথ-টাব।বেডরুমের দেয়ালগুলোতে কায়দা করে কয়েকটা দেওয়াল আলমারি করা হয়েছে। পর্দা লাগানোর জন্য দরজার চৌকাঠে ব্যবস্থা করে রাখা আছে। কমলা ঘুরে ঘুরে শ্বশুরকে সব কিছু দেখাল। সামনের বারান্দার কাছে এভাবে পাকা করে রাখা হয়েছে যে সেখানে টবে ফুল রোপণ করা যাবে। বিজয় ভরালী মন খুলে বাড়িটার প্রশংসা করলেন। সত্যিই কমলা বেশ হিসেবি মেয়ে। বাড়ির দরজা জানালার রং ও খুব সুন্দর হয়েছে।কমলার রুচির প্রশংসা করতে হবে। সেদিন রাতে বিজয় ভরালী বাড়ি তৈরি সম্পর্কে সঞ্জয় এবং কমলাকে কথা বলতে শুনলেন। ইতিমধ্যেই এটা ঠিক হয়েছিল যে রিফাইনারির ঘরটা ছেড়ে দিয়ে নিজের বাড়িতে চলে যাবে। শিশুটি জন্মের পর থেকে ঘরটা যেন আর ও ছোট হয়ে পড়েছিল। তারমধ্যে খাসিয়া আয়াটির ও থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তাই ভালো একটি দিনক্ষণ দেখে গৃহপ্রবেশের কথা ভাবছিল। ভালো দিন দেখার কথায় কমলা জোর দিচ্ছিল। তখন বিজয় ভরালী  মনে মনে হাসছিলেন। বাইরের চালচলনে অতি আধুনিক এই প্রগতিশীলা মেয়েটির মন দেখছি আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আগের দিনের অশিক্ষিত মহিলাদের মতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তিনি নিজে বুড়ো  হয়েও আচার অনুষ্ঠানের প্রতি তার ততটা নিষ্ঠা ছিল না। অবশ্য সেই সমস্ত তার ভালো লাগে, সেই পূজা-পার্বণ,ধূপ ধুনোর গন্ধ মনটাকে  পবিত্র করে। কিছু একটা শুভ এবং মঙ্গলের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে -তাই, তার চেয়ে বেশি মূল্য তিনি তাতে আরোপ করেন না।  তার জন্য  বাইরের আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জীবনের কাজকর্মগুলি শুভ এবং মঙ্গলময় করে তোলার চেয়ে ভেতরের সৎ প্রেরণায় জীবনটাকে সুন্দর করে তোলা বেশি আবশ্যকীয়। ইলার কিন্তু জীবনকে সৎ সুন্দর এবং মঙ্গলময় করে তোলার এই দুই ধরনের আন্তরিকতাই  ছিল। তার এখন সেই কথাগুলি কমলাকে বলতে ইচ্ছা করল। ইচ্ছা হল বলি যে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের উপরে নির্ভর করে তোমার গৃহ পবিত্র এবং  শুভ করে তোলার উপরে জোর দেওয়ার চেয়ে তোমার নিজের কল্যাণ হাতের স্পর্শে গৃহলক্ষীর প্রকৃত কর্তব্য নিষ্ঠা এবং দায়িত্বে তুমি তোমার ঘর বেশি মঙ্গলময় করে তুলতে পারবে কমলা। তোমার ঘরটা তুমি দেখতে খুব সুন্দর করেছ। সমস্ত সুযোগ সুবিধা আরাম স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাই তুমি সেখানে করে রেখেছ।তোমার সেই অতি সুন্দর ঘরটিতে দেহগুলি পরম আরামে দিন কাটাতে পারবে। কিন্তু সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় কথা নয় কমলা। তোমার গৃহে, তোমার স্বামী, তোমার সন্তান, মনের অনাবিল শান্তি এবং স্বাচ্ছন্দে বাস করতে পারে। তোমার সৌম্যশান্ত কল্যাণ রূপের মঙ্গল স্পর্শ ওরা সব সময় অনুভব করে জীবন পথে চলতে পারে ।তার জন্য তুমি চেষ্টা কর কমলা, তার জন্য তোমার বাড়ির অভ্যন্তর এবার গড়ে তোল। 
কিন্তু ইলা তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মনের মতো কথা সে কার সঙ্গে বলতে পেরেছে?কমলার সঙ্গে তিনি আর পারবেন না, কমলার সামনে পড়লেই আজকাল তিনি অপরাধীর মতো সংকুচিত হয়ে পড়েন। মুখের কথা যেন হারিয়ে যায়। তাই এই ধরনের একটি শব্দ কমলার সামনে উচ্চারণ করার কথা একেবারেই অভাবনীয় হবে।কমলার কথামতো গৃহ প্রবেশের দিন বামুন ডেকে পূজা করে গৃহ প্রবেশ করা হয়েছিল। সেসবই বোধহয় দুজনে আলোচনা করছে-সঞ্জয়  এবং কমলা,বিজয় ভরালী চোখদুটো বইয়ের পাতায় রেখে, কান দুটি অভ্যাসবশত সজাগ করে রাখেন।কমলা প্রথম উত্থাপন করেছিল-' একজন বামুন ঠাকুরের কথা বলেছিলাম,বলেছ তো? ' আমার সঙ্গের একজনকে বলে রেখেছিলাম, দুই-একদিনের মধ্যে ঠিক করে দেবে বলেছে । তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সঞ্জয় পুনরায় বলল -কমলা, কেবল পূজা করেই গৃহপ্রবেশের উৎসব করবে? লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে  খাওয়ানোর দরকার ছিল না? আমার সঙ্গের বন্ধুবান্ধবরা তো বলেই রেখেছে। অফিসের সবাইকে ডাকতে হবে কিন্তু ,না হলে কাকে রেখে কাকে বাদ দেব।' কমলা বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তাঁর ক্রোধে ভরা কণ্ঠস্বর বিজয় ভরালী শুনতে পেলেন। 'শুধু অফিসের মানুষগুলোকে ডাকলেই হবে,  সমগ্র রিফাইনারির মানুষগুলোকেও ডাকছ না কেন?আমি বাড়িটা বন্ধক দিয়ে টাকা ধার করে তাদের চা মিষ্টি খাওয়াব? ছেলের বাবা হলে তবু যদি তোমার বেহিসাবি স্বভাবটা দূর হত। বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে যে নিঃস্ব হতে হয়েছে তোমার বোধহয় সেই খবর নেই।
 একটি ঘর তৈরি করা তো এখন ও বাকি।  আজকালকার এত অভাবের দিনে কোনো মানুষ সামান্য উপলক্ষে নিমন্ত্রণ করে টাকা পয়সা খরচ করে?  আর আমি কোথাও শুনিনি যে গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে উৎসব পেতে কেউ দুনিয়ার লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে। 'আমার মা কিন্তু করতেন কমলা। মা বোধহয় তার সঙ্গে কাঙ্গালী ভোজনও করাতেন ।' সঞ্জয় যেন কমলাকে নয়, নিজেকে বলছে সেভাবে খুব ধীরে ধীরে আত্মগত ভাবে কথাটা বলল। বিজয় ভরালীর সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে গেল।' আমার মা'- সঞ্জয় তার মায়ের নাম নিচ্ছে।
একটু বড় হওয়ার পর থেকে সঞ্জয়কে আর কোনোদিন বিজয় ভরালী মায়ের নাম নিতে শুনেননি। তাই বিজয় ভরালীর ধারণা  হয়েছিল যে সঞ্জয় তার মাকে ভুলে গেছে। সে কথা ভেবে সেদিন তার একটু দুঃখ হয়েছিল। একটি মাত্র ছেলে জীবিত থাকাকালীন যেন প্রাণ ছিল সেই ছেলেই এভাবে আমাকে ভুলে গেল কিন্তু মনে মনে একটু খুশি হয়েছিল যাক ছেলেটি মাকে হারানোর দুঃখ ভুলতে পেরেছে। তার পরে আজ এত বছর পরে সঞ্জয়ের মুখে প্রথম তার মায়ের নাম নিতে শুনল। মাকে তাহলে সে ভাবার মতো  একেবারেই ভুলে যায়নি। বিজয় ভরালীর বুকটা কেঁপে উঠল। কিছু একটা যেন গলা পর্যন্ত উঠে এসে গলাটাকে রুদ্ধ করে দিল। না, না মাকে একেবারেই ভুলে যায়নি, এমনকি মায়ের স্বভাব পর্যন্ত মনে আছে পোনার। সঞ্জয়ের প্রতি হঠাৎ কৃতজ্ঞতায় বিজয় ভরালীর অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে সঞ্জয়দের রুমটা কমলার কথার শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল-' তোমার মা কাঙ্গালী ভোজন  কেন বাঙালি ভোজন ও করাতে পারতেন-'  কমলা তিক্তভাবে রসিকতা করে বলল। কিন্তু তখনকার যুগ ছিল আলাদা। তখন আজকের মতো জিনিসপত্রের এত আগুন ছোঁয়া দাম ছিল না-'
' কিন্তু কমলা যুগ আলাদা হলেও মানুষের মন একই থাকে, অন্যকে যারা ভালোবাসে তারা সবসময়ই সমস্ত অভাব-অভিযোগের মধ্যেও অন্যদের ভালোবাসা বিলিয়ে থাকে। আমার মা আজকের যুগে হলেও গৃহপ্রবেশ উৎসব করতেন। তার জন্য প্রয়োজন হলে তিনি বাথরুমে বাথ-টাব না লাগিয়ে সেই টাকা দিয়ে  মানুষকে খাওয়াতেন-'
জ্বলন্ত আগুনে যেন ঘী পড়ল- 'তারমানে তুমি এটাই প্রমাণ করতে চাইছ যে আমার মন তোমার মায়ের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ।সেই জন্য আমি গৃহ প্রবেশ উৎসবে মানুষকে ডেকে খাওয়াতে পারি না। দেশে যখন মানুষ এক মুঠো চালের জন্য হাহাকার করে মরছে, তখন আমি একদল মানুষকে ডেকে অর্ধেক খাবার নষ্ট করে অপচয় করতে চাইছি না বলে আমার মন তোমার মায়ের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেল-'



শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১২, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১২,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১২)
পরম তিক্ততা এবং ধিক্কারে ভরা মন নিয়ে কমলাদের কথামতো বিজয় ভরালী বৌমা দেখিয়ে এবং বুঝিয়ে দেওয়া দেওয়া মতে ঘরের ভিত এবং অর্ধেক তৈরি দেওয়াল গুলি দেখে যেতে লাগল এবং মুখে তৃপ্তির আওয়াজ তুলে দেখে যেতে লাগল- এবং মাথা নাড়াতে লাগল। কমলা পরম উৎসাহে শ্বশুরকে বুঝিয়ে যেতে লাগল- ‘এটা হবে ড্রইংরুম, এটা করিডর, আগের দিনের ঘর গুলিতে এই করিডর বলে কোনো জিনিস থাকত না বাবা, করিডরই বা কেন-কী প্লেন করে  যে বাড়িগুলি বানানো হত।রান্নাঘরগুলি এক মেইল দূরে,বাথরুম গুলি আরও দূরে, পায়খানার তো কথাই নেই, এদিকে সামনের দিকে ফুল গাছের সঙ্গে যেখানে সেখানে সুপারি গাছের চারা, নারকেল গাছের চারা, কলাগাছের ঝোপ,বিশেষ করে কিছু মানুষ জানালার কাছে এভাবে কলাগাছ গুলি রোপণ করে  যে তার ফলে ঘরের ভেতরে অন্ধকার এবং অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায়। সত্যিই আগের মানুষগুলি অবাক হওয়ার মত ছিল। কোনোরকমে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকতে হয় বলে থাকত, কিন্তু সেই বাড়ি গুলিকে সুন্দর করে সুরুচিসম্পন্ন এবং স্বাস্থ্যকর ভাবে তৈরি করতে হয় সেই সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না, কেয়ারও করত না। গরু মোষের মত খেয়েদেয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই হল-’ বিতৃষ্ণা এবং অবজ্ঞায় কমলার সুন্দর মুখটা যেন বিকৃত হয়ে পড়েছিল,কমলা আরও বলে যাচ্ছিল-‘করিডোরের একদিকে দুটো বেডরুম, বাথরুমের সঙ্গে লাগোয়া সেনিটারি, এদিকে পাকঘর, বর্তমানে চিমনির ব্যবস্থা করে রাখব, কিন্তু পরে গ্যাস নিতে পারলে চিমনিটা উঠিয়ে দিলেই হবে।– এদিকটায়, এদিকটায় পাকা নালা করতে হবে-’ কমলার অনেক উৎসাহ এবং সঙ্গে সঙ্গে অনেক হিসেব অনেক প্ল্যান। ওদের নির্মাণরত বাড়ির পেছনের জমিতে শ্বশুর এবং স্বামীকে নিয়ে গিয়ে কমলা বলল-‘এখানে ছোট একটি ঘর ভাড়া দিতে পারা যাবে। পেছনের জমি হলেও ঘরের সামনের দিকটা সাইডের দিকে করে দেব, সেদিকে একটা ছোট আঁকাবাঁকা রাস্তা করে দেব যাতে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে মেইন রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া যায়। আজকাল গুয়াহাটিতে ঘরের ভাড়া যেভাবে বেড়ে চলেছে এই ছোট ঘর থেকে আমরা কম করেও দেড়শো থেকে দুশো টাকা ভাড়া পাব-’ নিজের  হিসেববুদ্ধি পরিকল্পনার জন্যই হোক বা ভবিষ্যতের সম্ভাবনার জন্যই হোক কমলার মুখে তৃপ্তির একটা সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বিজয় ভরালীর মনে হল তিনি নিজে যেভাবে কমলার কোনো কথায় কথা বলেননি ছেলেও ঠিক সেভাবেই নীরব হয়ে রয়েছে। তিনি সেটা শুভ লক্ষণ বলেই ধরে নিলেন। বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে সব ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর সমান উৎসাহ না থাকলেও মতভেদ না থাকাটা বাঞ্ছনীয়। 
বাড়ি তৈরি দেখে ফিরে আসতে প্রায় রাত হয়ে গেল অবশ্য তারা সেই হিসেব করেই গিয়েছিল। কারণ সেদিন ছিল ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের দিন, বিকেলে বেড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ভালোই লাগবে। 
ফিরে আসার পথে বিজয় ভরালীর  এর আগের বার মাটি দেখতে আসার কথা মনে পড়ল। জীবনে কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি অবাক করে দেয়। ইলার সঙ্গে শেষবার তিনি যখন মাটি দেখতে এসেছিলেন সেদিনও ছিল ফাল্গুন মাসের জ্যোৎস্না রাত। কেবল জ‍্যোৎস্নাই নয় পূর্ণিমাও, আগের দিন  দোলের উৎসব হয়ে গিয়েছিল। ওরা তখন মঙ্গলদৈ ছিল। সেদিন ছিল সোমবার। তাই ইলার অনুরোধে পড়ে সোমবার  সঙ্গে আরও একটি দিন ছুটি নিয়ে বিজয়রা মঙ্গলদৈ থেকে শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। দোলের দিন বিকেলে ইলা প্রস্তাব করল যে ওদের মাটিটা একবার দেখে আসা যেতে পারে। পূর্ণিমার দিন রাতের বেলা সুন্দর জ্যোৎস্না থাকবে, পায়ে হেঁটে আসতে বড় ভালো লাগবে। আপত্তির কারণ ছিলনা। পোনা তখন ছয় বছরের, সারাটা দিন মনের আনন্দে দোল খেলার পরে সে তখন ক্লান্ত, গল্প বলার লোভ দেখিয়ে দিদিমা তাকে আটকে রাখল।
মাটি দেখে ওরা সেদিন প্রায় একই সময়ে ফিরেছিল। চারপাশে ঘন জঙ্গল, ওদের জমিতেও সেই একই জার্মান বনের জঙ্গল। ওরা আঁকাবাঁকা ছোট রাস্তা দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জমিটা দেখছিল। পশ্চিম দিকে থাকা মানুষের বাগানটা দেখতে দেখতে ইলা ভবিষ্যতে সেখান থেকে বকফুল, চাঁপা ফুল আনার কথা বলেছিল। তারপর বিকেল হতেই জোছনার আলোতে সেই আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ওরা ফিরে এসেছিল। চারপাশে মুক্ত আকাশ, বাড়িঘর কম থাকা মুক্ত আকাশের নিচে জ‍্যোৎস্নার বিস্তার। ওরা দুজন নীরবে কিছু দূর এগিয়ে যাবার পরে একঝাঁক বাতাসের সঙ্গে বনফুলের মৃদু সৌরভ এসে ওদের নাকে বারবার লাগতে লাগল। আর ইলা উচ্ছ্বসিত সুরে বলে উঠেছিল-‘বসন্তকালে বিকেলের দিকে রাস্তা দিয়ে যেতে থাকলে এভাবে মাঝে মাঝে যে সুন্দর বকুল ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় তাতে মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। তখন তার উত্তরে বিজয় কেবল গুনগুন করে উঠেছিল-‘হঠাৎ কখন সন্ধ্যাবেলায় নাম হারা ফুল গন্ধ এলায়-’ বিজয় ভরালী একটা দীর্ঘশ্বাস রোধ করলেন। মোটরটা ধীরে ধীরে চালাচ্ছিল সঞ্জয়। পেছনের সিটে বসে কমলা বাড়ির নানা কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল। সামনের বারান্দায় কীধরনের মোজাইক করা হবে, খরচ পড়লেও পড়বে,দুটিতে না হলেও অন্তত ড্রইংরুমের সঙ্গে একটা লাগোয়া বাথরুমেতো মোজাইক করতেই হবে, জানালা দরজা গুলিতে ‘আইভরি’ রঙ্গের পেইন্ট লাগাতে হবে আর তারপরে হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য একটা তীব্র মধুর ফুলের সুগন্ধ চলন্ত গাড়ির ভেতরে ঢুকেই আবার নাই হয়ে গেল। অবাক হয়ে গেল, যেন গাড়ির গতি বেগে সেই সুগন্ধ বহনকারী মলয় বাতাস পরাজয় স্বীকার করে পিছিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষণিকের সেই সৌরভ হলেও বিজয় ভরালী সেই গন্ধটা চিনতে পারলেন।বাতাবী লেবুর ফুলের গন্ধ। নামহীন বন‍্য ফুলের সন্ধ্যার সুবাস পাওয়ার ভাগ্য কি অজস্র বাড়ি ঘরের চাপে মহানগরের মানুষগুলির জন্য হারিয়ে যায়নি? এখনও যে বাতাবী লেবুর ফুলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে -এটা একটা ভাগ্যের কথা। এরকম দিন আসবে যখন শহরের প্রতিটি বাতাবী লেবুগাছ কাটা পড়ে গিয়ে সেই জায়গায় ছোট হলেও একটি ঘর বাড়ি তৈরি করে এতদিন ধরে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকা মাটিটার একটা সদ্গতি করতে পারা গেল বলে মালিক মনে মনে তৃপ্তি লাভ করবে। এভাবেই মানুষ একদিন অরণ্য সভ্যতা প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করে ফেলবে। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে চলা এই দুর্ভাগা মানুষগুলির প্রতি বিজয় ভরালীর হঠাৎ খুব করুনা জাগল। ফাল্গুন মাসের সেই মায়াময় জ্যোৎস্নার সন্ধ্যেবেলা মলয়া বাতাসকে ক্রমশ পিছনে ফেলে সঞ্জয়ের গাড়ি গুয়াহাটি তেল শোধনাগারের বিরাট বিরাট বাড়ি গুলির দিকে এগিয়ে চলল। তৈরি হতে চলা বাড়িটি সম্পর্কে কমলার নানা জল্পনা-কল্পনা, পরিকল্পনা চলতে থাকল কীভাবে ঘরটি অতি-আধুনিক, অতি আরামপ্রদ, অতি সুবিধার করা যেতে পারে। আর কিছু একটা করুন অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়া মন নিয়ে বিজয় ভরালী ছেলের কাছে স্তব্ধ হয়ে বসে বাইরের পৃথিবীটা দেখতে লাগলেন।
কমলার বাড়ি তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এদিকে ওদের জীবনে নতুন অতিথির আগমনের সময় ও প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল। ইতিমধ্যে সঞ্জয় এবং কমলার   অন্তর্জীবনের অনেক কথাই বিজয় জানতে পেরে গিয়েছিল। শুনব না শুনবো না করেও তিনি অনেক কথা শুনে ফেলেছিলেন। নিজের মনকে কঠোরভাবে শাসন করার চেষ্টা করেও নিজের উপরই বিতৃষ্ণায় তিতি বিরক্ত হয়েও, কমলা খারাপ পায় জেনেও বাইরের ড্রয়িংরুমের সোফায় সংকুচিত হয়ে বসে অনেক কথা বিজয় ভরালী শুনতে পেল। অবশ্য তিনি শোনা মতে সঞ্জয় কোনোদিন বেশি কথা বলে না। কিন্তু কখনও যদি দুজনের মধ্যে কথা নিয়ে বাক প্রতিবাদ চলে তখন প্রথম প্রথম সঞ্জয় দুই-একটি স্পষ্ট এবং রূঢ়কথা বলতে শুনতে পান কিন্তু তারপর সঞ্জয় চুপ করে যায়। কমলা তারপর অনেক কিছু বলে যায় কিন্তু তিনি সঞ্জয়ের কথা খুব কম শুনতে পান। অবশ্য ওদের প্রতিটি কথা তার কানে যায় না কারণ তিনি সেই সমস্ত কথা না শোনার চেষ্টা করেন এবং দেওয়ালের ও পাশের সেই দূরত্ব থেকে প্রতিটি কথা খুব মনোযোগ দিয়ে না শুনলে স্পষ্টভাবে শোনা সম্ভব নয়। আস্তে করে বললে তো কথাই নেই। এভাবে শুনতে থাকা অবস্থায় বিজয় ভরালী একদিন কমলা সঞ্জয়কে বলতে শুনল –‘সারাদিন স্কুলে কাজ করে এখন এই অবস্থায় খুব ক্লান্ত লাগে। তোমার মতো কেবল বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এমনকি উঠে গিয়ে ভাত খেতে শরীরটা নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে না।’ 
তুমি স্কুলের কাজটা ছেড়ে দেও না কেন কমলা? এত কষ্ট করে কাজ করার কী দরকার তোমার? আর এরপরে তুমি স্কুলে যেতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যতের শিশুটির কী দুর্গতি হবে ভেবেছ? কোমল কন্ঠে সঞ্জয় বলল।
বিজয় ভরালী অনুমান করলেন, কমলা বোধহয় এবার উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসেছে, কারণ কিছুক্ষণ পরেই কমলাকে  চিৎকার করে বলতে শুনেছিল-‘ চিরদিন, চিরকাল মেয়েদের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাওয়া পুরুষের দলের একেবারে উপযুক্ত কথাটাই তুমি বলছ। গরু-ছাগলের মতো সন্তানের জন্ম দিয়ে ওদের প্রতিপালন করে জীবনটা শেষ করে দিই, জীবনের লেখাপড়া অন্য সমস্ত কথা ধ্বংস হয়ে যাক। এটাই যদি তোমার মনোবৃত্তি, সাধারণ অশিক্ষিত একটি মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন?’ প্রায় করুন হয়ে ওঠা সঞ্জয়ের কন্ঠ পুনরায় শোনা গেল-‘ তোমার ধারনা ভুল কমলা। জীবনের কোনো কাজেই ক্ষুদ্র তুচ্ছ নয়। জীবনকে যদি তুমি ভালোবাসতে শেখ সারাটা দিন ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেও তুমি যে জীবন কাটাতে পারবে, সংসারের সমস্ত কাজে আনন্দ লাভ করতে পারবে, বাইরের জগতের হাজার কাজও হয়তো তোমার জীবনে ততটা মোহনীয় সুখের করে তুলতে পারবে না। ঘরের ক্ষুদ্র সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে এমন কিছু কাজ করতে  পারা যায় যা হয়তো মানুষের জীবন পূর্ণ করে তুলতে পারে, সুন্দর করে তুলতে পারে, ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তুলতে পারে-’ 
ছেলের কথা শুনে বিজয় ভরালী চমকে উঠলেন।মানুষ অনেক সময় সন্তানের কথা বলতে গিয়ে বলে যে মায়ের মতো হয়েছে বা বাপের মতো হয়েছে। সঞ্জয়ের চেহারা কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে কার মতো হয়েছে সঠিকভাবে বলা কঠিন। কিন্তু এই মুহূর্তে সঞ্জয়ের কথাগুলি বিজয় ভরালীর মনে পুনরায় ইলার ছবিটা জাগিয়ে তুলল। সঞ্জয়ের চেহারা দেখে বিজয় ভরালীর কখন ও ইলাকে মনে পড়েনি। কিন্তু আজ তার হঠাৎ দেখা সঞ্জয়ের এই মানসিক রূপ খুব বেশি করে ইলাকে মনে করিয়ে দিল। ইলার সঙ্গে সঞ্জয়ের এত বেশি মিল রয়েছে কোনো দিন আগে জানতে পারেননি।





শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১১, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 

একজন বুড়ো মানুষ-১১,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,




(১১)

এখন তিনি ভাত খেয়ে উঠলেন। ভাবিত গিয়ে কিছুক্ষণ পরে ওদের দুজনকে ভাত খেতে ডেকে আনবে।বিজয় ভরালীর দেখতে ইচ্ছা করল কমলাও  তার মতো থালায় ভাত ফেলে যায় কিনা। আজ তার জন্যই কমলাকে সঞ্জয়ের কথা শুনতে হয়েছে। মন খারাপ করে কমলা সম্পূর্ণ ভাত খেতে পারবে কিনা কে জানে? নাকি অভিমানে ভাতের কাছে আসবেনা। তার সঞ্জয়কে একবার দেখতে ইচ্ছে করল।  ক্লান্তিতে তার  মূর্তিটা কেমন রূপ ধারণ করেছে একবার দেখতে ইচ্ছে করল। বাড়িটা এত নির্জন বলে মনে হচ্ছে। সঞ্জয় সঞ্জয় বা কমলা কারও কোনো কথাই তার কানে আসছে না আর তিনি তো ভালো করেই জানেন এই স্তব্ধতার মূলে রয়েছেন  তিনি। অর্থাৎ কমলা এবং সঞ্জয় দুজনের মধ্যে অশান্তির জন্য তিনি দায়ী।  তিনি বিজয় ভরালী। একজোড়া দম্পতির সুখের ঘর তার জন্যই গড়ে উঠতে পারল না। পরদিন বিকেলে কিছু এরকম ঘটনা ঘটল যার জন্য বিজয়   ভরালীকে আবার ভাবতে হল যে তিনি আগের দিন বোধহয় সমস্ত কথা তিলকে তাল করে ফেলেছেন না হলে আগের দিন এত অসুখী বলে ভাবা দম্পতিকে আজ আবার কীভাবে এত আনন্দ করে বাড়ি তৈরি করার কাজ দেখার জন্য বেরিয়ে পড়তে দেখা যেতে পারে। 

সেদিন ছিল শনিবার।বিকেল চারটের পরে কমলা প্রায় হাসিমুখে শ্বশুরের কাছে এসে বলল-‘বাবা, বাড়ি তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। আপনি তো একবারও দেখতে যাননি। একবার দেখে আসি চলুন।  এতটুকু কথা। কিন্তু তাতেই হঠাৎ অত্যন্ত বেশি খুশি হয়ে গেলেন বিজয় ভরালী। ‘আমি গিয়ে আর কী করব? তোমরাই গিয়ে দেখে আস।’ মুখে খুব মোলায়েম হাসি ছড়িয়ে বিজয় ভরালী বললেন-‘না,বাবা আপনিও নিজে একবার দেখে আসা ভালো। আপনার ছেলে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে আপনাকে যেন তেন ভাবে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য।’

ও, তাহলে বাড়ি তৈরি দেখতে নিয়ে যাবার আসল গরজটা পোনার, কমলার নয়। তবু সন্তুষ্টির ভাবটা অক্ষুন্ন থেকে গেল তার এবং তার পরে দ্বিতীয়বার আর কোনো আপত্তি না করে বৌমার কথা মতো বাড়ি তৈরীর কাজ দেখার জন্য বিজয় প্রস্তুত হল। গাড়িতে উঠে বসার পরে ছেলে গাড়ি চালাতে আরম্ভ করার পরে কিন্তু হঠাৎ এক গভীর বিষাদের অনুভূতি  তার সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলল। পুরো রাস্তাটা বিজয় ভরালী অন্যমনস্ক হয়ে রইলেন। বাড়ি ? ইলার মাটিতে তৈরি হতে চলা বাড়ি দেখতে চলেছেন তিনি। আজ বহু বছর পরে বিজয় ভরালী নিজের জমিতে পা রাখলেন। প্রথমে তিনি জমিটা চিনতে পারেননি। আর চিনতে পারেননি তার জমির কাছাকাছি ঘরগুলি। প্রথম যখন তিনি এই জমিটা কিনেছিলেন তখন তার পশ্চিমদিকে মাত্র একজন মানুষের একটি বাড়ি ছিল। বাকিটা ছিল জার্মান বনের জঙ্গল। এখন বিজয় ভরালী  দেখলেন তার চারপাশে বাড়ি আর বাড়ি। পশ্চিম দিকে আগে যে বাড়িটি ছিল, তার সামনে ছিল সবজি বাগান এবং গাছপালার বাগান।  সুপুরি, নারকেল,আমলকি  এবং কাঁঠাল এই কয়েকটি গাছ বিজয় ভরালী সেই বাগানে চিনতে পেরেছিল কিন্তু ইলা তার মধ্যে আরও কয়েকটি গাছ তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। ‘ওই যে গাছটা দেখছেন, আমলকি গাছের কাছে সেটি হল বক ফুলের গাছ। বকের মতো সাদা এবং বক পাখির মতো মিহি এবং চ্যাপ্টা ফুল গাছটিতে   হয় বলে ওটা বক ফুলের গাছ। ফুলগুলি ভেজে খাওয়া যায় জানেন? এখন অবশ্য আমি গাছে একটাও ফুল দেখছি না। ওই যে কাঁঠাল গাছের ওপাশে, সেটা হল কাঁঠাল চাঁপা ফুলের গাছ। তবে ফুলগুলি পুষ্ট হয়ে ওঠার পরে আমি কাঁঠালের গন্ধের চেয়ে  তাতে পাকা মালভোগ কলার গন্ধ বেশি করে পাই।… তবে জমির মালিক কেন যে ফুল-ফল সমস্ত গাছগুলি এভাবে মিশিয়ে রোপন করেছেন- আমি এখানে বাড়ি তৈরি করলে তাদের কাছ থেকে বকফুল এবং চাঁপা ফুলের ডাল এনে আমাদের জমিতে লাগাব-’ ইলা সেদিন বলেছিল। কমলা হয়তো ইলার  মতো সেভাবে বকফুল,চাঁপা ফুলের গাছ রোপন করার কথা একবারও ভাবত না, আর যদি ভাবত কোথাও কোন কোণে একটু জমি বের করে রোপন করার কথা, তার জন্য কিন্তু তখন কমলার চোখের সামনে পশ্চিম দিকের বাড়িটিতে কোনো ফল বা ফুলের গাছের অস্তিত্বই ছিল না।বিজয় ভরালী যখন নিজের এই জমিতে এসেছিলেন তখন পশ্চিম দিকের বাড়িটিতে এই বাগানটা ছিল কিন্তু আজ তিনি দেখলেন যে সেই বাগানটা নেই। তারই জায়গায় একটি নতুন কংক্রিটের ঘর তৈরি হয়েছে। তাই বিজয় ভরালীর মনে হতে লাগল যে কোনো জাদুকরের জাদু দন্ডের স্পর্শে একটি বাগান এক রাতের মধ্যে দালানে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। নিজের জমিতে এতদিন না আসাটা সম্ভব হয়েছিল বিজয় ভরালীর, আর যখন সঞ্জয়দের জমি দেখানোর প্রয়োজন হয়েছিল সেই কাজটা করে দিয়েছিল সঞ্জয়ের মামা। দুকাঠা জমি কিনে দিয়েছিল সঞ্জয়ের দাদু বা তার ছেলেদের পরিচিতি বেশি ছিল। অবশ্য তিনি আর জীবিত নেই, সঞ্জয়ের দিদিমারও মৃত্যু হয়েছে। মামাদের সঙ্গে সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর একদিন একজন মামা তাকে নিয়ে গিয়ে জমিটা দেখিয়ে দিয়েছিল তার সঙ্গে এও বুঝিয়েছিল যে সঞ্জয়ের এখন আর জমিটা ফেলে রাখা উচিত হবে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি করা ঠিক হবে।

অনেক ক্ষণ অবাক হয়ে বিজয় ভরালী পশ্চিম দিকের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেবল তো সামনের দিকেই নয়,পেছনেও নতুন একটা ঘর উঠিয়েছেন বাড়ির লোকেরা। বাড়ি আর বাড়ি, যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই চোখজোড়া নতুন নতুন বাড়িতে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে বিজয় ভরালীর। অনেকদিন আগে যখন ইলা এবং সে এভাবে এই জমিতে দাঁড়িয়ে ছিল তখন জায়গাটা চারপাশের শ্যামলিমা তাদের দুচোখে শান্তির প্রলেপ মেখে  দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে আজকের এই আশ্চর্য প্রস্তর নগরটি দেখার জন্য সে বেঁচে রইল না। ইলা বোধহয় আর্তনাদ করে উঠত। ইলার মত গাছপালাকে নিয়ে কোনো ভাব বিলাস না থাকলেও আজ চারপাশের এই অগনন বাড়িগুলির দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মানুষ সভ্য শিক্ষিত হয়েছে, মানুষ প্রগতির সিঁড়িতে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে আর সেই প্রগতির একটি প্রতীক যেন এই সুন্দর নতুন নতুন ডিজাইনের বাড়িগুলি। অরণ্য- যেখানে হয়তো এখনো মিশ্রিত হয়ে আছে আদিম বর্বরতার গন্ধ,তাকে মানুষের প্রগতি কামী মন বিনা দ্বিধায় নিষ্ঠুরভাবে একদিক থেকে ধ্বংস করে চলেছে।

‘বাবা, আপনি দেখছি কিছু দেখছেন না। এদিকে আসুন তো, আমি ভাবার তুলনায়  কাজ কিন্তু বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।’ কমলার কথায় যেন বিজয় ভরালীর চেতনা ফিরে এল কিন্তু কমলার কথা তো সত্য নয়। তিনি তো দেখেননি এমন নয়। নিজের না হলেও এতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের বাড়িগুলি তিনি দেখছিলেন।

কমলার নির্দেশ অনুসারে কমলারা যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখানে এগিয়ে যেতে গিয়ে বিজয় ভরালীর চোখ কমলার দিকে গেল-এত সুন্দর লাগছে বৌমাকে‌! আজ যেন বৌমাকে প্রথমবারের জন্য তিনি দেখলেন। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মি-যার অপূর্ব সোনালী আভা অনেক অসুন্দরীকেও  কয়েক মুহূর্তের জন্য সুন্দরী করে তুলে-সেই সময়ে এসে পূর্ণ ভাবে  কমলার গালে মুখে সমস্ত শরীরে পরে ছিল। সেই মনোহর মূর্তির দিকে এক পলক অবাক হয়ে তাকিয়ে হঠাৎ বিজয় ভরালী অনুভব করলেন বৌমাকে এত সুন্দর লাগলেও যেন তার মনটা ঠিক তৃপ্ত হতে পারছেনা। কমলার সমস্ত দেহের কী এক অসৌন্দর্য্য যেন তার চোখ দুটিকে পীড়া দিচ্ছে, মনটা পবিত্র, আনন্দ এবং স্নেহে ভরে উঠার পরিবর্তে যেন এক ধরনের অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করছে-- আর সেভাবে আরেক মূহূর্ত তাকিয়ে থাকার পরে যেন বিজয় ভরালীর মনে বিদ্যুৎ চমকের মতো তার কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। এত রুচি বিহর্গিত পোশাক কমলা পরেছে, একটা পাতলা কাপড় এমন ভাবে টেনেটুনে শরীরে মুড়ে নিয়েছে যে তার ফলে কমলার সমস্ত দেহ প্রকট হয়ে উঠেছে- এমন একটি ব্লাউজ পরেছে যে কাঁধের অর্ধেক থেকে তার শুভ্র বাহু অনাবৃত হয়ে সূর্যের আলোতে ঝলসে উঠেছে। এতদিন পর্যন্ত শীতের দিন ছিল তাই বৌমার এই ধরনের পোশাক বিজয় ভরালী আগে কখনও দেখেননি। এখন হয়তো গরম পড়তে শুরু করায় স্কুলেও এই পোশাক পরে কমলা যেতে শুরু করেছে। কিন্তু স্কুলে যাবার সময় তো তিনি কমলাকে কখনও সেভাবে দেখেননি। 

আজ বউমার মূর্তি দেখে ভাবলেন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘আমার এই দেহখানি তুলে ধর, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর’ কিন্তু আজকের মেয়েরা এসব কী করতে শুরু করেছে? নিজের দেহখনি দেবালয়ের প্রদীপ না করে তারা নিজেদের প্রদর্শনীর বস্তু করে চলেছে। ওরা ভুলে গেছে যে অতি বেশি প্রকট করা দেহ পুরুষের মনে কামনা জায়গাতে পারে মাত্র কিন্তু সেই দেহকে নিয়ে কোনোদিন কোনো রোমাঞ্চ জাগাতে পারে না। কোনো অজানা রহস্যের আকর্ষনে পুরুষকে আকর্ষিত করা যায়না। আর সেই অস্ত্র নিয়ে কোনো কবি কখনও সৌন্দর্যের মধুর বন্দনা গান রচনা করার কোনো প্রেরণাই খুঁজে পেতে পারে না। 

আরও কিছু ভাবতেই হঠাৎ বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল যে তিনি বৌমার শরীর নিয়ে এসব কী রুচি বিহর্গিত কথা ভাবছেন- তিনি বিপত্নীক, বৃদ্ধ, কমলার শ্বশুর। ছিঃ ছিঃছিঃ- মুহূর্তের মধ্যে আত্মধিক্কারে বিজয় ভরালীর মনটা ভরে গেল-ছিঃ ছিঃছিঃ-বুড়ো বয়সে সত্যিই তার প্রকৃতির ভালোভাবেই অধঃপতন ঘটেছে।ছিঃ ছিঃছিঃ-





বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১০ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, (৯)

 একজন বুড়ো মানুষ-১০,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,



(১০)
 
‘কিন্তু প্রফেসর হলে তোমার বাবা তো আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে দিত না, কমলা?’ সঞ্জয় হাসতে হাসতে বলা কথাটা বাবা শুনতে পেল।
‘এসব  বাজে কথা ছাড়। তুমি হয়তো মনে মনে ভাবছ বাবা সোফায় বসলে কী এমন অপরাধের কথা হল- আমাকে হয়তো মনে মনে খারাপ পেয়েছ। কিন্তু তোমরা তো আমার কষ্ট বোঝনা, সোফার ঢাকনি গুলি ধুয়ে পরিষ্কার করে আমাকে ইস্ত্রি করে রাখতে হয়। একটি রবিবার মাত্র সময় পাই। আমার কত কাজ থাকে, তার মধ্যে যদি একজন মানুষ অনবরত বসে থাকে, ঘনঘন ঢাকনি নোংরা হবে,ইস্ত্রি ভাঙবে, আমার পরিশ্রম দ্বিগুণ হবে- সেইসব তোমরা কেউ ভাবনা-’ 
‘কমলা! হঠাৎ সঞ্জয়ের চিৎকারে বিজয় ভরালী প্রায় চমকে উঠেন।–‘তোমার সেই ঢাকনিগুলি আমি এখনই গিয়ে ছিঁড়ে ফেলব। তোমারও পরিশ্রমও কমবে আর আমার বাবাও আরামে বসে বই পড়তে পারবে। মনে রাখবে আমার বাবার একটু সুখ,একটু আরামের কাছে আমার সমস্ত কিছু তুচ্ছ-’
কমলা এরপরে কী বলে তা শোনার জন্য বিজয় ভরালী সেখানে দাঁড়াল না। খুব নিঃশব্দে চোরের মতো পা টিপে টিপে  গিয়ে তিনি আবার ড্রইংরুমে উপস্থিত হলেন। যে বইয়ের খুঁজে তিনি তার ঘরে ঢুকে ছিলেন, সেই বই কিন্তু আনাই হল না। ড্রইং রুমে ঢুকে তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন এবং শূন্য দৃষ্টিতে সুসজ্জিত সোফাগুলির  দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন-‘ তোমার কাছে আমাকে কেন ডেকে নিচ্ছ না ইলা, আমার তো পৃথিবীতে আর কোনো কাজ বাকি নেই, আমি তো এখন সংসারের ভার মাত্র…’
কিন্তু আশ্চর্যের কথা, বিজয় ভরালীর মনে কিন্তু কোনো দুঃখের অনুভূতি জাগল না। হঠাৎ যেন মনটা এক ধরনের নতুন সুখের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
‘ সঞ্জয় তাহলে তার বুড়ো অকর্মণ্য বাবার জন্য এত বেশি চিন্তা করে?’
এই কথাটা ইলার মৃত্যুর আজ এত বছর পরে প্রথমবারের জন্য বিজয় ভরালী জানতে পারলেন। কিন্তু কমলাকে এভাবে চিৎকার করে প্রায় চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো করে কথা বলা সঞ্জয়ের উচিত হয়নি। একেবারেই উচিত হয়নি। অবশ্য আজই তিনি সঞ্জয়কে এত জোরে কথা বলতে শুনলেন। বোধহয় তার কথা বলেই সঞ্জয় ধৈর্য ধরতে পারেনি- তার কথা বলেই। বিজয় ভরালীর  মনটা অনেকক্ষণ অভিভূত হয়ে রইল।
  কিন্তু কিছুক্ষণ পরে অন্য একটি কথা এবার তার মনটা অধিকার করল। সঞ্জয়ের যে বাড়ি তৈরি করার প্রতি কোনো উৎসাহ, উদ্দীপনা নেই, সেটা তো আজ ভালো ভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ল। যেখানে মনের প্রেরণা থাকে না তাতে অল্প কাজ করে ক্লান্ত লাগে। নিজের অতীত জীবনের কথা বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল। কোদাল দিয়ে মাটি কোপানোর অভ্যাস তার ছিল না, কিন্তু কী প্রেরণার বলে অফিসে কাজ করে আসার পরেও বিকেলে আবার কোদাল চালিয়ে বাগানে কাজ করে করে সারা বিকালটা পার করে দিতে পারত- কীভাবে?  আজ তো তিনি নিজের কানে শুনলেন যে সঞ্জয়ের অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বাড়ি তৈরির কাজ দেখতেও ক্লান্ত লাগে। এই ক্লান্তির কারণ কী শরীর না মনের? দুটিই চিন্তার কারণ। যুবক বয়সে একজনের যদি এতই ক্লান্ত লাগে যে অফিস থেকে এসে বাড়ির মোটর গাড়িতে গিয়ে একবার বাড়ি তৈরির কাজ দেখে এসে বিছানায় শুয়ে পড়তে হয় তাহলে নিশ্চয় কোনো অজানা অসুখ ভেতরে ভেতরে জীবনীশক্তি ধ্বংস করে আনছে, বড় ভয়ের কথা। কিন্তু দ্বিতীয় কারণটা হলেও কম ভয়ের কথা নয়। শরীরের চেয়ে মনের অসুখ কম ভয়াবহ নয়। তার নিজের মন নামক জিনিসটার বোধহয় কবেই মৃত্যু হয়েছে- মনের প্রয়োজন, মনের ইচ্ছা, এই ধরনের কথাগুলি তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন। কিন্তু তার জন্য তার কারণ আছে। মন-প্রাণ সমর্পণ করে দেওয়া কথাটা একদিন তার কাছে আক্ষরিকভাবেই সত্য ছিল। যাকে সমর্পণ করেছিল তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই তার মন প্রাণেরও অপমৃত্যু ঘটেছে। একদিন জগত কেবল জেনেছিল যে ইরা নামের মেয়েটির জীবনটা শেষ হয়ে গেল- কিন্তু এটা কেউ জানতে পারল না যে তার সঙ্গে তার স্বামীর জীবনটাও শেষ করে রেখে গেল। কিন্তু তার কথা সম্পূর্ণ আলাদা- তাছাড়া তিনি এখন জীবনের অপরাহ্নে উপনীত হয়েছেন। কিন্তু জীবনের এই শুরুতে যদি সঞ্জয়ের মনের এই অবস্থা হয় যে সামান্য কাজ একটা করে ক্লান্ত লাগে,বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে- তাহলে এটা তো বেশ চিন্তার বিষয়। বিজয় ভরালী  হঠাৎ কিংকর্তব‍্য বিমূঢ় হয়ে পড়েন। এখন তিনি কী করবেন? কার সঙ্গে পরামর্শ করবেন? নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ, বড় অসহায় মনে হয় তার। কমলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন সঞ্জয়ের কি হয়েছে? সঞ্জয়ের এই অবস্থা সম্পর্কে তার কি ধারণা? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা কথাও মনে পড়ে গেল যে কমলার জন্যইতো সঞ্জয়ের এরকম হতে পারে। কোনো কারণে হয়তো কমলাকে নিয়ে সঞ্জয় সুখী হতে পারেনি, হয়তো কমলা বাড়ি তৈরি করার প্রেরণা জোগাতে পারেনি। বিজয় ভরালীর মনটা ছটফট করে উঠে। সেই অসহায় এবং নিঃসঙ্গ ভাবটা যেন আরও বেড়ে যায়। কিন্তু কেন এরকম হল? এরকম তো হওয়ার তো কথা ছিল না- কমলাকে তিনি অনেক দেখে শুনে পছন্দ করে ঘরের লক্ষী করে এনেছিলেন। এরকম স্ত্রীকে পেয়ে সঞ্জয় খুব খুশি হয়েছে বলেই ধারণা ছিল তার। তিনি একাই নন অন্যান্যরা ও সেভাবেই ভাবে। অনেকেই এখনও মুখ ফুটে প্রশংসা করে যে বিজয় ভরালীর পছন্দ একেবারে ঠিক- কোথা থেকে এই ধরনের একজন রূপে-গুণে লক্ষ্মী-সরস্বতী মেয়ে খুঁজে নিয়ে এসেছে। কিন্তু পুনরায় মনটা তার ধড়ফড় করে উঠে। ভেতরে যদি সমস্যা থাকে বাইরের হাজার প্রশংসা তো সেই সমস্যা দূর করা যায় না। বিজয় ভরালী  নিজের চিন্তায় এতই মগ্ন ছিলেন যে তিনি কখন যে সোফার এক কোণে বসে পড়েছেন, কখন যে বই হাতে তুলে নিয়েছেন সে খেয়াল ছিলনা। খেয়াল হল কারও একজনের কণ্ঠস্বরে। প্রথমে কিন্তু মানুষটা কি বলছেন তা তিনি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। এতটাই অন্যমনস্ক ছিলেন। দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করায় শুনতে পেলেন, সঞ্জয় ঘরে আছে কিনা মানুষটা জিজ্ঞেস করছে। এবার তিনি বসা থেকে লাফ মেরে উঠলেন এবং বললেন-‘ আছে, আছে। আপনি ভিতরে এসে বসুন। আমি ডেকে  দিচ্ছি-’ ভেতরে যেতে গিয়েও কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় বিজয় ভরালী কিছুক্ষণের জন্য থমকে নিচের দিকে ঝুঁকে সোফার কোনগুলি টেনেটুনে ঠিক করে রেখে ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি তাহলে আবার নিজের অজান্তে সোফায় বসে পড়েছিলাম বিজয় ভরালী মনে মনে ভাবলেন। অথচ না বসেই বা তিনি কি করেন? আজকে যদি হঠাৎ তিনি আবার নিজের ঘরে বসে পড়তে শুরু করেন, বিশেষ করে উজ্জ্বল আলোর নতুন বাল্ব লাগিয়ে দেবার পরে কমলারা সন্দেহ করবে না যে তিনি ওদের দুজনের কথাবার্তা শুনেছেন। সেই লজ্জা তিনি কোথায় রাখবেন? অন্যদিকে কমলার অসন্তুষ্টির কথা জেনে  সোফায় বসতেও ইচ্ছে করে না। বিজয় ভরালীর মনটা অশান্তিতে ভরে যায়। অতি সামান্য কথা নিয়ে জগতে মানুষের এই ধরণের বিপদও হতে পারে?
ভাবতে ভাবতে সেই প্রসঙ্গে পুনরায় সঞ্জয় কমলাকে বলা কথাগুলি তার মনে পড়ে যায়-‘ মনে রাখবে কমলা বাবার একটু সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কাছে আমার সমস্ত কিছুই তুচ্ছ।’ কথাগুলি কানে বাজতে থাকে। সঞ্জয় তার জন্য এত ভাবে? তার সুখ-দুঃখের প্রতি সঞ্জয়ের এত নজর? মনটা সুখী হতে গিয়েও কিন্তু পুনরায় অশান্তিতে ভরে ওঠে। স্বার্থপরের মতো তিনি কেবল নিজের সুখের কথা ভাবছেন। কিন্তু ছেলের দেওয়া সুখের বিনিময়ে তিনি ছেলেকে কি দিয়েছেন? ছেলের জন্য তিনি এমন একটি সংসার পেতে  দিলেন- যার বিনিময় ফল হল এই যে আজ তার ছেলে অকালে বুড়ো হয়ে পড়ছে, অল্প কাজ করে ক্লান্তিতে বিছানা নিতে হচ্ছে। মনের মধ্যে আবার একটা ছটফটানি জেগে উঠে। নিজের ছেলের, অত্যন্ত আদরের একমাত্র ছেলে, ইলার অস্তিত্বের একমাত্র চিহ্ন- তাই ভাগ্যকে মেনে নেওয়া বিজয় ভরালী আজ আর নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারেননা যে তিনি তো ভালো হবে ভেবেই অনেক কিছু চিন্তা করে সঞ্জয়ের সংসার পেতে দিয়েছিলেন, তার থেকে অমৃতের সৃষ্টি হবে বলে বিশ্বাস করে তিনি তার কর্তব্য সম্পাদন করেছিলেন। কিন্তু এখন যদি অমৃত না ফলে বিষের জন্ম হয় তার জন্য তো তিনি দায়ী নন। তার ছেলের ভাগ্য দায়ী।
রাতে ভাত খাওয়ার পরে বিজয় ভরালীর বাড়িটা একটা নির্জন শ্মশানের মতো মনে হতে লাগল। একা একা বসে তিনি কিছুক্ষণ ভাত খেলেন তারপরে আর খেতে পারলেন না। উঠে গেলেন, ভাবিত এসে জিজ্ঞেস করল-‘ ভাত খেলে না কেন তুমি? রান্না খারাপ হয়েছে? তিনি ভাবিতকে আশ্বাস  দিয়ে বললেন যে কোনো কিছু খারাপ হয়নি, অন্য দিনের মতোই বেশ ভালো হয়েছে রান্না, তার শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না। আর একটি কথা, পরের মুহূর্তে সাবধান হয়ে বিজয় ভরালী ভাবিতকে বললেন তার শরীর ভালো নেই এ কথা যেন ভুলেও সঞ্জয়কে না বলা হয়। মিছামিছি এই রাতের বেলা চিন্তা করবে।তার আসলে শরীরটা ভালোই আছে, তার মানে হল বিকেলে কিছু একটা খেয়ে যেন তার পেটটা একটু খারাপ হয়েছে। ভাবিতকে সত্য মিথ্যা কিছু বলে বুঝিয়ে দিয়ে বিজয় ভরালী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আজ তার কী হয়েছে?
এরপরে সঞ্জয় আর কমলা ভাত খেতে আসবে। এটাই নিয়ম।প্রত্যেকদিনই বিজয় ভরালীকে প্রথম খেতে দেওয়া হয়,তারপরে সঞ্জয়েরা খেতে আসে। অবশ্য এটা রাতের ব্যবস্থা। দিনে সবার আগে কমলা ভাত খায়,কারণ তার স্কুল আছে।তারপর শ্বশুরকে ভাবিত খেতে দেয়। বিজয় ভরালীর ইচ্ছা করে তিনি ছেলের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু সঞ্জয় হয়তো তাতে খুব আপত্তি করবে ভেবে তিনি মুখ ফুটে কিছু বলেন না। সবার শেষে খায় সঞ্জয়। দুপুরে খাবার জন্য তাদের কিছুক্ষণের বিরতি থাকে। বিজয়ের ভাবতে খারাপ লাগে যে সঞ্জয় ভাত খেতে খেতে হয়তো ভাত ঠান্ডা কড়কড়ে হয়ে যায়।তিনি ভাবিতকে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেন-‘পোনার ভাত তরকারিটা গরম করে রাখার ব্যবস্থা করেছ তো? অবশ্য এই কথাটিও ভাবেন যে কমলা নিশ্চয় ভাবিতকে শিখিয়ে রেখে গেছে যে সঞ্জয় অফিস থেকে এলে ভাত তরকারি যেন গরম করে দেওয়া হয়।









বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৮ ,নিরুপমা বরগোহাঞি,বাসুদেব দাস,

 


একজন বুড়ো মানুষ

নিরুপমা বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস,




(৮)

পোনাকে নিয়ে ইলা যে সমস্ত কাণ্ড করে, দেখে দেখে বিজয়ের হাসি উঠলেও মনটা সঙ্গে সঙ্গে বেদনায় ভারী হয়ে যায়। পোনার জন্মের সময় ইলাকে কোনো মতে বাঁচানো গেল যদিও তাঁর পুনরায় মাতৃ হতে পারার ক্ষমতা ডাক্তার চিরদিনের জন্য ধ্বংস করে দিতে বাধ্য হয়েছিল-ইলাকে বাঁচাতে গিয়ে। প্রথমে ইলা না জানলেও বিজয়ের সে কথা ইলার কাছ থেকে বেশিদিন গোপন করে রাখতে ইচ্ছা হল না। কথাটা শুনে ইলা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু জীবনের সমস্ত কথা হাসি মুখে নিতে চেষ্টা করার একটা আশ্চর্য গুন ছিল ইলার। অতি সামান্য কথায় কাঁদলেও জীবনের গভীর দুঃখ গুলি হাসিমুখে সহজভাবে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সব সময়। সেদিনও কথাটা শুনে সে মুখে হাসি টেনে বলেছিল –‘ঈশ্বর আমাদের যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত- নয় কি? একেবারে তো বঞ্চিত করে রাখে নি, সেটাও কি কম অনুগ্রহ?’

পরে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিল কিনা বিজয় জানেনা। কিন্তু একটা কথা লক্ষ্য করেছে যে পোনার প্রতি ইলার আদর অত্যাচার যেন দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। পোনা একটু কাঁদলেই ইলা অস্থির হয়ে পড়ে। নানা ধরনে ফুসলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে, আদর করে সহস্র নামে ডাকে, সেই নামগুলির অর্থ খুঁজতে গেলে একটা দুটোর বাইরে বাকিগুলি অর্থ খুঁজে বের করা কষ্টকর হবে। সারাদিনে সময় নেই, অসময় নেই, এটা ওটা খাওয়ানোর জন্য জোর করে থাকে। ক্ষুধা না থাকা অবস্থায় না খাবার জন্য পোনা কান্নাকাটি করলে ইলা গভীর আক্ষেপের সঙ্গে জানায় যে কোনো কোনো ছেলে মেয়েকে সে পোনার মতো না খেয়ে থাকতে দেখেনি। কিন্তু এই না খাওয়া ছেলেটিও খুব সুন্দর স্বাস্থ্যবান,গোলগাল হওয়ার পরেও ইলার চোখে সে না খেয়ে ক্ষীণ হয়েই রইল। ইলা নিজে যথেষ্ট রোগা ছিল, তাই পোনার মতো একটা শক্ত সমর্থ শিশুকে যখন অনবরত কোলে নিয়ে থাকত, বিজয়ের সেই দৃশ্য দেখে ইলার জন্য খুব মায়া হত। কিন্তু ইলা কখনও বেশিক্ষণের জন্য বিশ্বাস করে চাকরের হাতে পোনাকে ছেড়ে দিত না। আর এভাবে অতি আদর এবং প্রশ্রয়ের মধ্য দিয়ে চার বছর পর্যন্ত পোনা ইলার কোল জুড়ে রইল। তাঁর পাঁচ বছরের সময়ও মাঝে মধ্যেই তাকে কোলে নিয়ে আদর করার চেষ্টা করেনি তা নয়, কিন্তু তখন পোনা নিজেকে বড় বলে ভাবতে শিখেছে, সে ইলা চুমু খাওয়া গাল দুটি সজোরে মুছে ফেলে ‘ছি’বলে জোর করে কোল থেকে নেমে দৌড়ে চলে যায়।

শাসন কাকে বলে পোনা প্রায় কোনোদিনই জানতে পারল না। বিজয় মাঝেমধ্যে বলে-‘এত আদর করে করে, এত প্রশ্রয় দিয়ে তুমি ছেলেটিকে নষ্ট করবে ইলা। মাঝেমধ্যে ওকে শাসন করার দরকার।‘ তখন ইলা প্রত্যুত্তরে বিজয়কে উল্টোভাবে বুঝিয়েছিল-‘ আদর পেয়ে ছেলে মেয়ে খারাপ হয় বলে আমি কখনও মনে করি না,মা-বাবা ভালো হলে, ঘরের পরিবেশ ভালো হলে, সেই মা-বাবার বাড়ির ছেলে মেয়ে ভালো হবেই। আমাকে বাবা সেদিনও বুঝিয়েছে-পোনাকে যেন আমরা বেশি শাসন না করি, আমরা কেবল আমাদের ঘরটিকে আদর্শ ঘর করে গড়ে তুললেই পোনার জীবন ও আপনা থেকেই সৎপথে পরিচালিত হবে। বাবা আরও কী বলেছে জান-গর্বে ফুলে উঠনা যেন- বাবা বলেছে- আপনার মতো মানুষের ছেলে নাকি কখনও খারাপ হতে পারে না।’

কিন্তু তবুও একদিন দুদিন যে ইলা পোনাকে শাসন করেনি এমন নয়, দু'একদিন মেরেছিল- কিন্তু পোনাকে মেরে উঠে ইলা নিজেই কেঁদে ফেলেছিল।

একটিমাত্র ছেলে হওয়ার জন্যই নাকি পোনা ছোট থেকেই খুব ভাবুক এবং তার সঙ্গে ধর্মভীরু ছিল। পাঁচ ছয় বছরে সে বই পড়তে শুরু করে, তার মধ্যেই বেশি করে আকৃষ্ট হয় রামায়ণ এবং  মহাভারতের প্রতি। তারপর একদিন সে মাকে হেসে হেসে বলল যে মৃত্যুর পরে সে যখন স্বর্গে যাবে তখন মহাভারত-রামায়ণের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে  তার দেখা হবে। তখন তার খুব মজা লাগবে। আর তার সবচেয়ে মজা লাগবে ধুর্ত নারদের সঙ্গে দেখা হলে। পোনার বয়স তখন ছয় বছর। তার কিছুদিন পরে তার মা রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকার’ ‘প্রশ্ন’ পড়লে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এবং বালিশে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল।পোনা মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল তাঁর কী হয়েছে- কোথায়  দুঃখ পেয়েছে। বাবা তো অফিস গিয়েছে, তাহলে মায়ের সঙ্গে কে রাগ করল? সে তো কখনও মায়ের সঙ্গে রাগ করে না। এই সমস্ত কিছুর উত্তরে মা তাকে কিছু বলল না। কেবল তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে আরও বেশি করে কাঁদতে লাগল। বিজয় এসে কথাগুলি শুনে গম্ভীর হয়ে গেল, আর ইলাকে বলল-‘তুমি ছেলেটিকে আরও বেশি সেন্টিমেন্টাল করে তুলবে ইলা। এটা ভালো কথা নয়। ভাবপ্রবণতা মানুষকে অনর্থক কিছু দুঃখ এনে দেয়। পোনার এভাবে আরও বেশি ভাবুক হয়ে উঠাটা আমার ভালো লাগেনা। তুমি যে তাকে বাড়িতে পড়িয়ে উঁচু ক্লাসে নাম ভর্তি করার কথা ভাবছ,সেটাতে আমার আপত্তি রয়েছে। কালকেই ওকে আমি স্কুলে ভর্তি করে দেব। সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করে স্বভাবের কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে। 

পরেরদিন বিজয় পোনাকে স্কুলে ভর্তি করে দিল। পোনার সঞ্জয় নামটা ইলা বিজয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ততদিনে সেই নামটা অব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখন স্কুলের ছেলেদের মুখে সঞ্জয় নামটা প্রচলিত হতে লাগল। তারপর একদিন পোনা হাসতে হাসতে মাকে বলল- ‘মা,মা  তোমরা আমাকে সঞ্জয় নামটা দেওয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছি। মহাভারতের সঞ্জয় খুব জ্ঞানী এবং ধার্মিক ছিল তাই না মা? একটা কথা জান মা, আমাদের স্কুলের ছেলেগুলি বড় গাধা, ওরা মহাভারতের সঞ্জয়কে জানে না।’ 

প্রায় সাত বছর বয়সে পোনা স্কুলে গিয়েছিল- এক বছর পরে, তার প্রায় আট বছর বয়সের সময় তার মায়ের মৃত্যু হল। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘বাবা,বুড়ো হলে মানুষ মরে স্বর্গে যেতে পারে কি? আমার মতো শৈশবে মরে স্বর্গে যাওয়া যায় না?’ ইলার মতো যখন তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে বিজয় পোনাকে জড়িয়ে ধরে নি, সেদিন কিন্তু এই কথাগুলি শুনে সে পোনাকে সজোরে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল।

পোনার তিন বছর বয়সে দু কাঠা জমি কিনতে পারার মতো টাকা ইলা জমাতে পেরেছিল। কিন্তু টাকা জমানোর সঙ্গে সঙ্গেই তো আর  জমি কেনা যায়না। ভালো মাটি খুঁজে দেখতে হয়। আর তারপরেই কেনা যায়। ওরা গুয়াহাটিতে জমি কিনবে বলে ঠিক করেছিল। ইলার পিতা অবশেষে একদিন দুকাঠা  ভালো জমি দেখে দিয়েছিল। আর বিজয় একদিন তার কর্মস্থল থেকে গিয়ে সেই মাটি কিনে এসেছিল। জমি কেনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির জল্পনা-কল্পনা বেড়ে গিয়েছিল। ওদের ভবিষ্যতের ঘরের বর্ণনা শুনে শুনে বিজয়ের যেন মনের মধ্যেই সেই বাড়ির একটি ছবি আঁকা হয়ে গেছিল। একটি সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছবির মত বাড়ি। তার জানালা-দরজাগুলি কাঠ গুলিতে পাতলা সবুজ রং। পাঁচটা ঘর। তার মধ্যে একটি ওদের শোবার ঘর,একটি পোনার,একটি অতিথিদের জন্য,একটি খাবার ঘর,আর পঞ্চমটিতে  ইলার জন্য সাজানো একটা সুন্দর লাইব্রেরী। রান্নাঘরের সংলগ্ন আরও একটি ছোট ঘর অবশ্য থাকবে। সেটা হবে ইলার ঠাকুরঘর।এই বাড়ির জন্য দুকাঠা  জমির এক কাঠাও লাগবেনা। কিন্তু সামনের দিকে ফুলের বাগান এবং পেছনে সবজির বাগান মিলিয়ে দুকাঠা পূর্ণ হবে।

বাড়ি তৈরি করার জন্য আরও টাকার প্রয়োজন। তাই ইলা স্বপ্ন সিদ্ধির দ্বিতীয় এবং শেষ ধাপে উঠার জন্য পুনরায় টাকা জমাতে শুরু করল। তারপর যখন সেই টাকা প্রায় সম্পূর্ণ জমা হয়ে গেল তখনই হঠাৎ মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে ইলা বিজয় আর পোনাকে ছেড়ে স্বর্গে চলে গেল। স্বর্গে চলে গেল, কারণ বিজয়ের ধারণা স্বর্গ ছাড়া ইলা আর কোথাও যেতে পারে না। ইলার ক্ষেত্রে তার পোনার মতোই একই ভাবে ভাবতে ইচ্ছা করে যে মানুষ মৃত্যুর পরে স্বর্গে যায়।

বিজয় নিজেই বড় করে ইলার কপালে সিঁদুরের ফোটা দিয়ে দিয়েছিল। উজ্জ্বল মুখটা যেন মৃত্যুর পরেও হাসির স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিল। এই মুখে হাসি কখনও কোনো অসন্তুষ্টিতে বা কাউকে খারাপ পেয়ে মলিন হয়নি। এখন মৃত্যুর পরেও একই থেকে গেল l ইলার এই মুখটা স্মরণ করে তারপরে অনেকদিন বিজয় মনে মনে গুনগুন করে উঠেছে-‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা,তোমার হাসিটি ছিল বড় সুখে ভরা-‘

  ইলার সেই মাটিতে আজ কমলা বাড়ি তৈরি করতে চলেছে। 

রোদটা ধীরে ধীরে বড় প্রখর হতে চলেছে। বিজয় ভরালী তাঁর টাক মাথায় হাত বুলালেন।

ভেতরে কমলা হাসতে হাসতে সঞ্জয় কে বলল-‘আজ বাবার কাণ্ড দেখেছ? আমি বাড়ির নক্সা দেখিয়ে আসার পর থেকে সামনে বই নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। অন্যান্য দিন যিনি সব সময় দশটায় নিয়মিতভাবে স্নান করেন,সে কথা আজ ভুলেই গেছেন। কমলা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, তারপর আবার হাসতে হাসতে বলল-‘আজ আমাদের বাড়ির নক্সা দেখে জীবনের প্রায় শেষ অবস্থায় বোধহয় এখন প্রথম বাড়ি তৈরি করার জল্পনা-কল্পনা করছেন। 

‘বুড়ো বয়সে তো অনিয়ম শরীর সহ্য করে না। তুমি সময় মত কেন বাবাকে ডেকে দিলে না? কমলা কিছুটা উদ্বিগ্নতার সুরেই সঞ্জয় বলল।

‘ বাবার স্বাস্থ্যের জন্য যদি এতই চিন্তা তুমি নিজেই কেন ডাকলে না? আমি কীভাবে সব দিকে লক্ষ্য রাখব। সকাল থেকে যে মেয়েদের হোমটাস্কের এই খাতাগুলি নিয়ে  আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আমার প্রতি যদি তুমি কখনও বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে। আমাদের সঙ্গে কত বিবাহিতা শিক্ষার্থীকে যে তাদের স্বামীরা কতভাবে সাহায্য করে- এমনকি রবিবার হোমটাস্কের খাতাগুলি দেখে দেয়। আমি তো আর সেরকম ভাগ্য করে আসিনি।


বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৭,নিরুপমা বরগোহাঞি,বাসুদেব দাস,

 


(৭)

সেই প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর না দিয়ে ইলা কেবল জিজ্ঞেস করেছিল-‘মৃত্যুর কথা ভাবতে দিনের বেলা তো এত ভয় লাগে না, রাতের বেলা কেন এত ভয় হয়?’ বিজয়ের হাত দুটি  সজোরে চেপে ধরেছিল ইলা। 

বিজয়ের শরীরটা হঠাৎ করে শিউরে উঠেছিল,কিন্তু মুখে সে শান্ত,ম্লান হাসি ফুটিয়ে ধীরভাবে বলেছিল-‘এই প্রশ্নটি অনন্তকালের সমগ্র মানুষের প্রশ্ন ইলা। কিন্তু তুমি এই সমস্ত কথা কেন মিছে মিছি ভাবছ ইলা? আমি তোমাকে কতবার বলেছি তুমি মিথ্যে আজেবাজে চিন্তা করে শরীরটাকে শেষ করতে শুরু করেছ। তোমার কিছুই হবে না- আমি আছি না, আমাকে ছেড়ে তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। ডাক্তার তো রয়েছেই, সমস্ত ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে। আমরা দুজনে রাতের পর রাত এভাবে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরবে প্রার্থনা করে থাকি। সেই আকাশ থেকে একটি দেবশিশু এসে তোমার কোল আলোকিত করে তুলবে। তোমার ভালোবাসার ঘর ভরিয়ে ফেলবে। আমাদের দুজনের জীবন পূর্ণ করে তুলবে ইলা,তুমি মিছে ভয় করছয়ে।।

রাত। অদ্ভুত শক্তি এই রাতের। দিনের আলোতে যে আবেগ মাখানো কথাগুলি বিজয় সেদিন উচ্চারণ করতে পারত না রাতের মায়াময় স্পর্শে সেই কথাগুলি সে অনর্গল ইলাকে বলে গিয়েছিল। কিন্তু তবু এই আবেগকে ভেদ করেও এক ভয়াবহ অপার্থিব চেতনা রাতে ওদের মাঝখানে বারবার যেন বয়ে নিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রতিটি রাত এই ধরনের বিভীষিকাময় ছিল না। অন্ধকার রাত ক্রমশ পার হয়ে যায়,জ‍্যোৎস্নার মায়াময় রাতগুলি এগিয়ে আসে। গভীর রাতের সেই জ‍্যোৎস্না অপার্থিব, রহস্যময়। কিন্তু জ্যোৎস্না  রাত  ওদের কাছে বিভীষিকা বয়ে আনে না, আনে এক অতি করুণ মাধুর্য।মনগুলি  আবেগের কান্নায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এই অপরূপ মোহনীয় জ্যোৎস্নার রাতগুলি মৃত্যুচেতনা জাগিয়ে তোলে,  সুদূর অজানা দেশ থেকে কে যেন ডাকে,কিন্তু সেই আহ্বান ভয়ের পরিবর্তে মনগুলিকে  করে তোলে অতি করুণ, বিষন্ন, কিন্তু সেই বিষণ্ণতাও যে এত মধুর। 

ইলা লাগানো রজনীগন্ধা এবং জুঁই ফুলগুলি সাদা হয়ে সামনে ফোটে থাকে। শুভ্র জ্যোৎস্না ওদের সেই শুভ্রতাকে আরও অপরূপ করে তোলে।  শরীরকে স্নিগ্ধ করে তোলা এক ঝাঁক মলয় বাতাস  এসে সেই ফুলগুলির মৃদু সুবাসে জায়গাটা ভরিয়ে ফেলে। আর সেই সুগন্ধের পরিপূর্ণ আঘ্রাণ নিয়ে বিজয় ইলাকে বলে- ‘জান ইলা, কলেজে পড়ার সময় আমার মনটা এখনের চেয়ে রোমান্টিক এবং কবিত্বপূর্ণ ছিল। কখনও বা রাতে জেগে উঠে আমি প্রিয় কবিতার একটি বই খুলে বসি। আবেগে আমার গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। কবিতার বই বন্ধ করে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসি। জ্যোৎস্নারাত হলে সেই নিস্তব্ধ সমগ্র বিশ্ব প্লাবিত করার দিকে তাকিয়ে ভাবি এত অদ্ভুত সুন্দর  জ্যোৎস্নারাত গুলি যুগ যুগ ধরে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থেকে এভাবে অপচয় হয়ে আসছে আর অপচয় হতে থাকবেও। এত বিপুল সৌন্দর্যের কী বিরাট অপচয়!

জোছনার আলোতে ইলাকে কিছুটা হাসতে দেখে বিজয়। খুব ক্লান্ত সেই হাসি, তারপরে সে বলে- 

‘পৃথিবীতে কেবল জ্যোৎস্নারই অপচয় হচ্ছে নাকি? সেই  কোটি কোটি শিশু সন্তানের কথা ভাবুন তো, যাকে জন্ম দিতে গিয়ে মায়েরা দশ মাস কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এত কষ্টে জন্ম দেওয়া শিশুগুলির অনেকেরই জন্মের পরেই মৃত্যু হয়ে যায়-মায়েদের এত কষ্ট,এত হিয়াভরা কান্না ব্যর্থ করে সন্তানেরা মরে যায়- এটাও কি পৃথিবীর কম অপচয়?’

সেদিন রাতে বিজয় ইলার নিজের মৃত্যু ভয়ের সঙ্গে আরও এক ভয়ের কথা জানতে পারল তার- ওদের অনাগত শিশুটির মৃত্যুহয়।

  কিন্তু ইলার সেই ভয় একদিন অমূলক হয়ে গেছিল। মা বা সন্তান কার ও মৃত্যু হল না। সুস্থ -সবল পোনাকে জন্ম দিয়ে ইলাও বেঁচে রইল,অবশ্য সে প্রায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছিল।

তারপর ধীরে ধীরে দিন পার হয়ে যেতে লাগল। ইলা ও ক্রমে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল।আর মানুষের চিরন্তন স্বভাব অনুসারেই সেও মৃত্যুর সঙ্গে প্রায় সাক্ষাতের মতোই সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ভুলে পুনরায় সংসারের মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ল,পুনরায়  ঘর বাঁধার স্বপ্ন রচনায় মশগুল হয়ে পড়ল।

গ্রীষ্মকালের রাতে খাবার পরে সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ারে আরাম করে বসে ইলার সঙ্গে ঘরোয়া সুখ দুঃখের আড্ডা মারাটা বিজয়ের একটা প্রিয় অভ্যাস।একদিন এভাবেই দুজন কথা বলার সময় এটা ওটা কথার পরে ইলা বলল-‘আমাদের এই চন্দ্রমল্লিকা ফুলগুলি থেকে কী সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে।’কথাটা বলে  কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সে,বোধহয় সুগন্ধটুকুর আঘ্রাণ সে পুরোপুরিভাবে নিয়ে নিল। তারপর পুনরায় বলল –সত্যিই আমাদের এই দেশি ফুলগুলির সঙ্গে কোনো ফুলের  তুলনা হয়না। বিলেতি ফুলগুলির বাইরের রূপ আছে সত্যি কিন্তু ‘রূপে কি করে,গুণে হে সংসার তরে’-  জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এই কথাগুলি বোধহয় সত্যি। এই রাতের বেলা আমরা ভালোভাবে ফুলগুলোকে দেখিনি কিন্তু চোখকে ভালোভাবে  তৃপ্তি দিতে না পারলেও আমাদের নাককে  তৃপ্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনকেও তৃপ্তি দিয়েছে-‘ আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল ইলা। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগল-‘আমার বহুদিনের স্বপ্ন কি জানেন? রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ গল্পের নায়িকার মতো  বাড়ির সামনে একটি দেশি ফুলের বাগান করা- যেখানে গন্ধের চেয়ে রঙের প্রাধান্য, ফুলের চেয়ে পাতার বৈচিত্র থাকবে না। আর টবে লাগানো কোনো সাধারণ গাছ-চারার কাছে কাঠি পুতে কাগজে কাগজে কোনো ল্যাটিন নাম লিখে সগৌরবে তার প্রচার করা হবে না। চন্দ্রমল্লিকা,  যুথি মালা, গোলাপ,  টগর এবং কবরী ফুলের কিছু বেশি প্রাদুর্ভাব হবে। প্রকাণ্ড একটি বকুল গাছের গোড়ার জায়গাটা সাদা মার্বেল পাথরে বাঁধানো হবে-’  এতটুকু পর্যন্ত বলে ইলা সশব্দে হেসে ঊঠে পুনরায় বলেছিল-‘ অবশ্য আমার সেই বাগানের সামনে দুর্ভাগ্যবশতঃ গঙ্গা নদী থাকবে না। কিন্তু ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ নীতি অবলম্বন করে  আমি গঙ্গা নদীর পরিবর্তে বাগানের সঙ্গে একটি পুকুর  খনন করব বলে কল্পনা করছি।অবশ্য পুকুর মানে চৌবাচ্চা জাতীয় বাঁধানো ছোট একটি পুকুর। বকুল গাছের নিচটাও পাকা বাঁধা- আমরা আর মার্বেল পাথর কোথায় পাব- তারপরে গ্রীষ্মকালে রাতে এভাবে বারান্দায় চেয়ারে না বসে আমার সেই পাকা-বেদীতে গিয়ে বসব। উপর থেকে টুপ টুপ করে সুগন্ধি বকুল ফুল গুলি ঝড় বাতাস এলে আমাদের শরীরে টুপ টুপ করে খসে পড়বে। সামনেই অন্যফুল গুলির সুগন্ধও বাতাসে চারপাশে ছড়িয়ে দেবে। আমাদের সেই কুঞ্জবন গন্ধে বিভোর হয়ে উঠবে। আর আমি সেই ঠান্ডা পাকা বেদিতে আপনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ব- আর- আর- তারপরে আমি যদি মরেও যাই, কোনো খেদও থাকবে না-’ পুনরায় হেসে উঠল ইলা, কিন্তু এবার যেন সেই হাসিতে আগের মত উচ্ছলতা ছিল না। 

অন্ধকারে বিজয়ের শরীরটা মৃদুভাবে শিউরে উঠল। সে রবীন্দ্রনাথের খুব ভক্ত। জীবনের অনেক কথায় তার মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙক্তি গুলি ভেসে আসে। অবশ্য এখন বিজয় ভরালী বইপত্র পড়ে জানতে পেরেছে যে আজকের সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথের লেখাকে আগের মতো অপরিসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখে না। কিন্তু তিনি আগের যুগের একজন বুড়ো মানুষ, এখনও আগের মতোই রবীন্দ্রনাথের লেখা ভালোবাসেন। তখনও ভালোবাসতেন। আর ইলাকে বিয়ে করে এনে তাকেও ভালবাসতে শেখালেন। কিন্তু ইলা বোধহয় সে ভাবার চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল। সে তো এভাবে ইলার মতো গল্প পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলতে পারেনি। ‘নিশীথের’সংলাপ গুলিও তার মুখস্থ নেই, কিন্তু তিনি গল্পটা পড়েছেন। গল্পটির কেবল পরিণতি নয়, তার নায়িকার বিখ্যাত হাসি থেকে রূপের  ছবিও সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের মনে পড়ে গেল। ‘তোমারও যে কল্পনার দৌড় ইলা-’ বিজয় অল্প হেসে খুব সহজ এবং সাধারন ভাবে কথা বলার চেষ্টা করল- ‘আজ এতদিন পরে তুমি এভাবে কথা বলছ, আগে কখনও না বলা-’ 

পুনরায় জোরে হেসে উঠেছিল ইলা- ‘কারন কি জানেন? রাত, চারপাশের এই রাতের মায়া- কিন্তু আমার স্বপ্ন হলে দিনরাত দুটির মতোই সত্য হতে হবে, অর্থাৎ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য আমি আপ্রান চেষ্টা করব।’ এবার গম্ভীর  হয়ে পড়েছিল ইলা, ‘কোনো একটি গল্প কিছু একটা কথা ভালো লাগে তাকে অনুসরণ করলাম বলেই যে সম্পূর্ণ গল্পটা সত্য হবে, সেই ভয়ে করতে গেলে সংসারে অনেক কাজ করাই দেখছি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি মেয়ে ছিল, সে খুব সুন্দর করে তাঁতে ফুল তুলতে জানত। কিন্তু বেচারি বিয়ের  পরেই বিধবা হল,তার কাছ থেকে আমাদের আশেপাশের অনেক ছেলেমেয়ে তাঁতে ফুল ফোটাতে শিখল। তার মত একই রঙের সুতো একই নমুনার ফুল ফোটাতে লাগল। সেদিন কি তারা ভয় পেয়েছিল একদিন তাদেরও মেয়েটির মতন অবস্থা হবে-

’ সেদিন রাতে ইলার মনপ্রান খুলে গিয়েছিল। রাতের মায়া বোধহয় তাকে সেদিন গভীর ভাবে মোহাবিষ্ট করেছিল। বিজয় স্তব্ধ হয়ে বসে শুনতে থাকল আর ইলা বলে গেল-‘ আপনি আমাকে সেদিন বলেছিলেন- এক কাঠা জমি কেনার টাকাতো জমা হল, এখন দেখেশুনে এক কাঠা জমি কিনে নেওয়া ভালো। আপনি আমাকে এটাও বললেন-‘আমরা তিনটি প্রাণীর সংসার, ছোট একটি জমিতে ছোট্ট ঘর একটা বানাতে পারলেই হবে। আপনার ধারণা, আমি অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়েছি। পোনার জন্মের পরে আমাদের খরচ আরও বেড়ে গেছে, তাই জমিটা কেনা হলে আমরা সেই কষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি। কিন্তু কষ্ট করেছি বলেই তো সেই জমি ঘর আমার আরও অনেক বেশি আদরের,বেশি মায়ার। আর সেই জন্যই তো সেই বাড়ির স্বপ্ন দেখতে এত ভালো লাগে। কিন্তু এক কাঠা জমি কিনে একটা  ঘর বানালে আমার এতদিনের জল্পনা-কল্পনা যে বৃথা যাবে। এতটুকু জমিতে আমার ফুলের বাগানটা কীভাবে হবে, পেছনের বাগানটাই বা  কীভাবে করব? আমার কত কল্পনা- সামনের বাগানের ফুলের গন্ধে চারপাশ বিভোর হয়ে থাকবে। কেবলমাত্র একটা বাড়ি যেন শুধু মানুষের খাওয়া থাকার মত ব্যবহারের জীবনের দিকে সচেতন করে দেয় কিন্তু তার সঙ্গে বাগানটা মানুষের সৌন্দর্যপ্রিয় মনটা প্রকাশ করে। আপনি কি হাসছেন?- মানুষের সৌন্দর্য প্রিয়তাকে এভাবে সঙ্কীর্ণতার মধ্যে বন্দি করতে দেখে? বাবা বলেন-‘জীবনে  কোনো কথাকেই ক্ষুদ্র বলে উপহাস করতে নেই। বড় বড় শিল্পীর কাছে সৌন্দর্যের ধারণা বিরাট, তাদের সৌন্দর্য সৃষ্টি ও একই ভাবে বিশাল, কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের এটা সাধারন স্বপ্ন এবং সাধনা।’ আমি তো কখনও একটা সুন্দর ছবি আঁকতে পারিনা, একটা  সুন্দর কবিতা লিখতে পারি না, কিন্তু আমার কাছে আমার বাগানই আমার ছবি, আমার কবিতা। সেই বাগানের ফুল দিয়ে আমি আমার ঠাকুরঘর আরও পবিত্র করব,আমার বাড়িটা আরও সুন্দর করে সাজাব, প্রতিবেশীদের শুভ কাজে প্রয়োজন হলে সেই বাগানের ফুল তুলে দিয়ে মনে তৃপ্তি লাভ করব। আমাদের বাগানের শাকসবজির সবুজ চেহারা দেখে চোখ জুড়োবে,নিজে খাব,প্রতিবেশীদের বিলাব। আমাদের বাগানের কুল গাছের নিচে শীতকালের রোদ নিয়ে আমাদের পোনা তার সঙ্গীদের সঙ্গে কুল কুড়োবে, গ্রীষ্মকালে আম গাছের নিচে আম কুড়োবে-’

‘ইলা-’ এতক্ষণের স্তব্ধতা জোর করেই যেন দূর করে বিজয় এইবার প্রায় চিৎকার করে উঠল –‘তোমার কল্পনা যেভাবে দৌড়াচ্ছে, রাতও যে সেভাবে দৌড়ে প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে,সে খবর আছে কি?’

মুহূর্তের জন্য কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সঙ্গে সঙ্গে ইলা জোরে হেসে উঠেছিল- ও হো,রাত মোটেই দৌড়াচ্ছে না। প্রথমে আমাকে সে জাদু করে নিয়ে শেষে সে নিজেই আমার অভাবনীয় কল্পনার দৌড় দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

‘একটু আস্তে আস্তে হাসো ইলা। তোমার হাসিতে পোনা তো জেগে উঠবেই, আশেপাশের প্রতিবেশীরাও জেগে উঠবে।’

‘ও আমার সোনা। এতক্ষণ সে একা একা শুয়ে আছে-’ একদৌড়ে ভেতরে চলে গেল ইলা,আর ঘুমন্ত পোনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অজস্র সময় মুখ ভরিয়ে দিতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে  একটা  উদ্গত  নিশ্বাস রোধ করে বিজয় জ্বলতে থাকা আলোটা একটু কমিয়ে শুয়ে পড়ল।


বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৬ || নিরুপমা বরগোহাঞি || বাসুদেব দাস,

একজন বুড়ো মানুষ,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,




(৬)


কিন্তু স্বল্প শিক্ষিতা ইলা বাড়িতে বসে বসে কত বই পড়ত!কীভাবে বইয়ের কথাগুলি জীবনের

সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিতে পেরেছিল।আর তারজন্যই বোধহয় তার জীবনটা ইলা এত

বর্ণাঢ্য,এত সজীব করে রাখতে পেরেছিল।

ইলার সেই বৈশিষ্ট্যের জন্যই বোধহয় একটা ঘর বাঁধার স্বপ্নে একদিন ওরা দুজনেই এত

বেশি মশগুল হয়ে থাকতে পেরেছিল।

বিয়ের চার মাস পরে ইলা একদিন  বিজয়কে খুব অবাক করে দিল।

‘এই ১০০ টাকা নিন।’ অফিসে যাবার সময় বিজয়ের দিকে খুচরো ১০০ টাকা এগিয়ে দিয়ে ইলা

বলেছিল। তারচোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল- বিজয়কে অবাক করে দিতে পারার মধুর আনন্দের গোপন

হাসিতে।

‘টাকা? কিসের টাকা?’ ইলা ভাবা মতোই  বিজয় অবাক হয়েছিল।

‘এতদিন যে আমার সঙ্গে একটা ঘর বাঁধার এত জল্পনা-কল্পনা করলে,মাটির না হলে সেই ঘর কোথায়

বাঁধবে? সেই জন্য এক টুকরো মাটির জন্য এই টাকাটা আমি একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিলাম।

একবার কোথাও একটা গল্পে একটা চোরের কাহিনি পড়েছিলাম- সে কিছু একটা ভালো কাজ করে এসে

স্ত্রীকে বলেছিল যে সে সেদিন নিজের বিষয়ে একটা কথা আবিষ্কার করেছেঃ কথাটা হল যে চুরি করার মতো

জঘন্য কাজ করা একটা খারাপ মানুষ হলেও আসলে সে ততটা খারাপ নয়। আজ এই জমানো ১০০ টাকা বাক্স

থেকে বের করে সেই চোরের মতোই আমি নিজের বিষয়ে একটা অভাবনীয় সত্য আবিষ্কার করলাম,সেটা কী

জানেন?’

‘কি?’ প্রথম দিন থেকে সেদিন পর্যন্ত স্ত্রী বিজয়কে কেবল অবাকই করে এসেছে।

‘ যে আমি মানুষটা আপনি সব সময় বলার মতো বেহিসাবি অসাংসারিক হলেও কিছুটা অত্যন্ত হিসেবি-’

এইবার বিজয় হেসে ফেলেছিল। তারপর স্ত্রীর দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল –‘তোমাকে

আমি কিসের জন্য বেহিসেবি বলি তুমি তো তা জান। নিজের জন্য তুমি কিছুই নিতে চাও না। অন্য মহিলাদের

মধ্যে নিজের কাপড়চোপড় কেনার একটা আগ্রহ থাকে কিন্তু তোমার মধ্যে দেখেছি সে সবের জন্য কোনো

আগ্রহ নেই। তুমি কেবল ব্যস্ত অতিথি অভ‍্যাগতদের সেবা যত্ম করায়।  আমার বন্ধুবান্ধবদের তুমি জোর

করে খাওয়াতে ভালোবাস। সেই টাকা বাঁচিয়ে তুমি যদি নিজের জন্য কিছু কিনতে। আমার বন্ধুদের তুমি আদর

যত্ন করলে আমি খুশি হই। বিয়ের আগে বেচারাদের এক কাপ চা খাওয়াতে পারতাম না। কিন্তু তুমি এখন ওদের

শুধু চা-ই নয়,সঙ্গে অন্য অনেক কিছু খাওয়াও বলে আমার বন্ধুর সংখ্যা এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

সেই খরচ যদি কিছু পরিমাণ কমিয়ে তুমি নিজের জন্য কিছু একটা যদি চেয়ে নিতে, আমি নিজে না দিলে কোনোদিন

কোনো জিনিস তুমি আমার কাছ থেকে চেয়ে নাও না-’

এইবার ইলা বিজয়ের কথার মধ্যে বাধা দিয়ে বলে উঠল যে –‘আপনি সবসময় এই কথাটা কেন বলেন?

আমি কিসের অভাবে আছি যে প্রয়োজন না হলেও একগাদা কাপড়চোপড় গহনা চেয়ে নেব ? আর দেখুন আপনি

নিজে মনে মনে যে কথাটা ভালোবাসেন, কেবল আমার কথা ভেবে তা খারাপ পেতে নিজেকে বাধ্য করেছেন।এতদিন

আপনার একটা বাড়ি ছিল না, যেখানে বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে  খাওয়াতে পারেন।  সত্যি-মিথ্যা এখন

আমাদের ছোট্ট একটা বাড়ি হয়েছে, সেই বাড়িতে লোকজন আসছে- আপনি তাতে মনে মনে খুশি হলেও নিজের

মনকে  অস্বীকার করতে চাইছেন। আর দেখুন নিজেকে সাজানোর মতো  এত সস্তা অথচ মূল্যবান জিনিস

থাকতে  মিছামিছি কেন টাকা খরচ করতে যাব?

‘সস্তা অথচ মূল্যবান? কী অদ্ভুত জিনিস সেটা?’বিজয় পুনরায় অবাক হয়েছিল।

‘এই যে-’কপাল এবং সিঁথির সিঁদূরের ফোঁটার দিকে ইলা অঙ্গুলি নির্দেশ করল। পবিত্র রহস্যময়

হাসিতে মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে বিজয় ইলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। 

ধীরে ধীরে তাঁর চোখ দু'টি মুগ্ধ আবেশে কোমল হয়ে এল। সত্যি । এই সিঁদুরের ফোঁটা ইলাকে এতটা মানায়, অন্য

কোনো মহিলাকে বোধহয় এত সুন্দর দেখায় না-অন্তত এটাই বিজয়ের ধারণা।


  তবু বিজয়  পুনরায় একই কথা বলল – ‘ভেবেছিলাম-  ‘শাড়ি গহনা গাড়ির কামনা সমস্ত মেয়েদেরই কম

বেশি পরিমাণে থাকে  কিন্তু তুমি যে কেন এর ব্যতিক্রম হলে-’ এর বেশি আর কিছু বিজয় বলতে পারল না, কিন্তু

মনে মনে ভাবল, ইলার কাপড় গয়নার প্রতি আগ্রহ নেই  নাকি অন্য দিকে বেশি খরচ করে বলেই এইসব

জিনিসের  নাম নিতে চায় না?’ ওদের দুটি প্রাণীর  ঘরে ইলা কত মানুষকে  কাছে টেনে নিয়েছে। ইতিমধ্যে  ইলা

পাড়ার কারও বৌদি,  কারও দিদি, কারও মামি, কারও বা ছোট বোন  হয়ে উঠেছে।ওদের ছোট্ট বাড়িটা  একটি

একান্নবর্তি পরিবারের বাড়ির মতোই যেন বৃহৎ হয়ে পড়েছে।  ফলে আজ কারও ছেলে জন্ম হয়েছে, সঙ্গে

সঙ্গে  অফিসে যাওয়ার সময় এসে বলবে  ছেলেটিকে আজ দেখতে যেতে হবে,  অফিস থেকে আসার সময় যেন

বিজয়  উপহার দেওয়ার জন্য এক টুকরো কাপড়,বেবি পাউডারের প্যাকেট কিনে নিয়ে আসে।  আবার একদিন

হয়তো মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বিজয় বাদলকে না পাঠিয়ে নিজেই ভালো করে বাজার করে আনতে হবে কারণ

মেয়েটিকে তার স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হবে। কখনও আবার ইলার পাতানো কোনো মাসি

অসুস্থ হয়ে পড়বে তখনও বিজয়কে বাজার থেকে ফলমূল কিনে এনে দিতে হবে। শুধু হাতে কখনও ইলা রোগীর

খবর নিতে যায় না। আর যদি কারও বিয়ে অন্নপ্রাশন বা জন্মদিনের নিমন্ত্রণ থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

সবচেয়ে ভালো উপহারটা দিতে হবে। সঙ্গে কৈফিয়ত হিসাবে বিজয়কে বলবে- বিয়ে বা অন্নপ্রাশন এসব তো আর

প্রতিদিনের ঘটনা নয়, তাই কৃপণতা করে সাধারণ জিনিস কিনে দেওয়া উচিত নয়। সঙ্গে বাবা বলা কথাটা বলবে-‘

মানুষ তো কখনও ধনে বড় হয় না, মনে প্রকৃত বড় হয়।’

এই সমস্ত কিছুই নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখছে বিজয়। ইলার কোনো ইচ্ছাতে কোনো দিন সে

বাধানিষেধ আরোপ করেনি। বরং এসবের মধ্যে একটি বড় সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছে। সে যে বাড়ির লোকজনের কাছ

থেকে ইলাকে বঞ্চিত করে রেখেছে, সেই বাড়ির অনাস্বাদিত আত্মীয়তার ভালোবাসা এরকম কিছু কৃত্রিম

সম্বন্ধের মধ্য দিয়ে ইলা যেন পেতে এবং দিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও মাঝে মধ্যে বিজয় না ভেবে পারেনা

যে এতগুলি পাতানো মানুষকে ভালোবাসা বিলিয়ে ইলা যেন নিজের সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন হয়ে রয়েছেন।

অবশ্য একটা কথায় ইলা খুব সচেতন। বিজয়ের সমস্ত ধরনের সুখ-সুবিধার প্রতি তার সব সময়ই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

এতগুলি নকল দেবর, ননদ, ভাই-বোন, মাসি-পিসির প্রতি কর্তব্য করতে গিয়েও সে কখনও বিজয়কে দেখাশোনা

করার ক্ষেত্রে কোনোরকম ত্রুটি হতে দেয়নি। বাদল থাকলেও ইলা বেশিরভাগ দিন নিজের হাতে চা করে ভাত

রেঁধে বিজয় কে খাওয়ায়। বাড়িতে বোধহয় ইলা কোনোদিন রান্নাবান্না করোনি। মা বাবার একমাত্র মেয়ে তাই

হয়তো কোনো কাজ করতে দেয়নি। তাই ইলার রান্নায় পটুতা একেবারে ছিল না। এমনকি বাদলও ইলার চেয়ে বেশি

ভালো করে রান্না করত। কিন্তু ইলার নিজেই রান্না বান্না করে খাওয়ানোয় উৎসাহ দেখে একদিনও সে খাবার

সময় রান্না খারাপ হয়েছে বলেনি। খাবার সময় ইলা সামনে বসে দেখাশোনা করে।তার মুখে তৃপ্তির ভাব ফুটে

উঠতে দেখে সে কোনোদিন রান্নার ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে পারেনি। সেই অভ্যাসটা সব সময়ের জন্য থেকে গেল।

কোনোদিন সে কারও রান্না নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।

কিন্তু এতগুলি টাকা কীভাবে ইলা সঞ্চয় করতে পারল?

‘আমার কিন্তু খুব অবাক লাগছে এতগুলি টাকা তুমি এই কয়েকদিনের মধ্যে কীভাবে জমাতে পারলে

ইলা?’

একটা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল ইলা। ‘আপনি আমার বিষয়ে যে একটা ভুল ধারণা নিয়ে এতদিন

রয়েছেন সেটা বুঝতে পারলেন? কাপড় বা গাড়ির প্রতি আগ্রহ আমারও রয়েছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড়

আগ্রহ হল নিজের একটা বাড়ির প্রতি। দিনের মধ্যে কতবার যে আমি নিজের একটা বাড়ির কল্পনা করি, বিশেষ

করে শাকসব্জি এবং ফুল গাছ দেখাশোনা করার সময় সেই কল্পনা খুব বেশি ভাবে করি। আমাদের বাড়ির বাগানে

আমরা কী কী ফুল লাগাব, বাগানের পেছনে কী কী ফলের গাছ লাগাব এই সমস্ত নানাকথা। তাছাড়া আমরা থাকা

বাড়িতে অসুবিধা গুলির জন্যও আমাদের নিজের বাড়ির কথা মনে ভাবতে ভালো লাগে। নিজে বাড়ি তৈরি করলে

সমস্ত সুবিধা দেখে শুনে নিতে হবে।’

ইলার কথা শোনার মতো বিজয়ের সময় ছিল না। অফিসের সময় প্রায় পার হয়ে যাচ্ছিল,তাই দ্রুত ইলার

হাত থেকে ১০০ টাকা নিয়ে সে অফিসের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলল।

পথে বেরিয়ে বিজয় নিজেকে একা পেল। তখন ইলার জমানো টাকার কথা ভাবার মতো অবকাশ পেল। ভেবে

ভেবে ইলার প্রতি তার ভালোবাসা এবং সহানুভূতিতে মনটা কোমল হয়ে এল। বাড়ি একটার প্রতি এতটা আকুলতা


থাকা মেয়েটি নিজের বাড়ি থেকে বঞ্চিত হয়ে রইল। জীবনের কোনো একটি পরিহাস যেন এর মধ্যে মধ্যে নিহিত

রয়েছে। দুই হাতে টাকা পয়সা খরচ করার অভ্যাস থাকা মেয়েটির এই একশো টাকা জমানোর মূলে একটা বাড়ির

প্রতি থাকা উদগ্র বাসনার পরিচয় পেয়ে বিজয় অভিভূত হয়ে গেল। পকেটে থাকা একশো টাকার উপরে সে

একবার আদর করে হাত বুলালো। আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের আবেগের প্রকাশে নিজের মুখে মুচকি হাসি খেলে

গেল।

ছয় মাসে একশো টাকা জমানোর পর ইলা কিন্তু এক বছরে আশি টাকার বেশি জমাতে পারল না। কারণ

ইতিমধ্যে ওদের মধ্যে পোনা এসেছে। সেই জন্য বেশ ভালো পরিমাণ টাকা খরচ হয়ে গেল। সেই টাকা খরচ হল শুধু

মাত্র পোনাকে এই পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য নয়,তার জন্মের সময় তার মায়ের জীবনের আলো চিরদিনের

জন্য ঘুচে যাচ্ছিল।বিজয় প্রায় পাগলের মতো দুই হাতে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে সেবার

ইলাকে বাঁচিয়ে তুলল। মাটির জন্য জমানো টাকা থেকে কিছু খরচ হয়ে গেল। ভালো হয়ে উঠার পরেই ইলা যেদিন

জানতে পারল যে তার এত কষ্ট করে মাটির জন্য সঞ্চিত করে রাখা টাকায় হাত পড়েছে, তার চোখ ছলছল হয়ে

এল। জমানো টাকা কোথায় বাড়বে এতো দেখছি কমে গেল। ইলার দুঃখ দেখে বিজয়ের নিজেকে অপরাধী বলে মনে

হচ্ছিল। তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে ইলাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছিল-‘মাটির জমানো টাকা খরচ করার জন্য

তোমার দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু আমার সেই সময়ের অবস্থা ভেবে দেখতো,পোনার জন্মের সময় খরচ করার জন্য

সঞ্চিত টাকাগুলো খরচ হয়ে গেল। দুই একজন বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করলাম। তোমার বাবা

নানা জিনিসপত্র পাঠিয়ে আমাকে নানাভাবে সাহায্য করলেন। পোনাকেও সোনার হার দিলেন। আমি তো কখনও

তোমার বাবার কাছে এত পাওয়ার পরে আবার টাকার কথা বলতে পারতাম না। এমনকি তিনি নিজেই আমাকে

জিজ্ঞেস করেছিলেন টাকা পয়সার দরকার হবে কিনা বলে। আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম যে লাগবেনা, তোমার

জমানো কিছু টাকা আছে। তারপর বিজয় রসিকতা করার চেষ্টা করে বলল-‘বাড়ি ঘর দিয়ে কী হবে ইলা যদি সেই

ঘরের ঘরনী আমাকে ছেড়ে চলে যেত?’

কথাগুলি বলেই কিন্তু বিজয় সেদিন অনুতাপ করেছিল। মাঝে মধ্যে তার মুখে কী সব অশালীন রসিকতা

চলে আসে? ইলার মৃত্যুকে নিয়ে পর্যন্ত রসিকতা করতে পারল সে। অথচ এই মৃত্যুর ছায়া দেখে সে এবং ইলা

পোনার জন্মের আগের কয়েকটি দিন কত রাত দুশ্চিন্তার মধ্যে ঘুমের ক্ষতি করে কি সাংঘাতিক ভাবেই না

সময় কাটিয়ে ছিল। অন্য অনেক দম্পতির মতো তাদেরকে অনাগত শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে, ছেলে হলে কী

নাম রাখবে মেয়ে হলে কী নাম রাখবে এই সব জল্পনা-কল্পনার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকতে হয়েছিল

কারণ ওদের মধ্যে পোনা আসবে বলে জানতে পারার দিন থেকে ইলা নানা অসুখে ভুগতে শুরু করেছিল। সবার চেয়ে

বড় যে কথাটা ডাক্তার এবং নিজেদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল তা হল ইলার ক্রমশ বেড়ে চলা রক্তশূন্যতা। অনেক

ওষুধপত্র খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ইলাকে বাঁচানো গিয়েছিল। মা ইলাকে নিজের সঙ্গে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু ইলা

রাজি হয়নি। সেই অসম্মতি প্রকাশ করে সে মায়ের কাছে মনে মনে লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের কথা ভেবেই

বাপের বাড়িতে যেতে রাজি হয়নি। সে দূরে থাকলে প্রতিটি রাত বিজয় কতটা অস্থির হয়ে উঠবে এই ভয়ঙ্কর

সত্যটা সে জানত। তাই মায়ের কাছে থাকলে তার অনেক সুবিধা হবে জেনেও সে যায়নি। এমনকি বিজয়ও জোর

করেছিল মায়ের কাছে রেখে আসার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইলা নিজের মতে অচল অটল হয়ে রইল।শেষ

পর্যন্ত পোনার জন্মের কিছুদিন আগে থেকে মা এসে তাদের সঙ্গে থাকতে লাগল।

মৃত্যুর সঙ্গে বিজয়ের তখনও পর্যন্ত কোনো পরিচয় ছিল না। সে যখন খুবই ছোট তখন তার এক

দিদির মৃত্যু হয়েছিল। সে কথা তার মনে পড়ে না। তারপরে তাদের বাড়িতে কারও মৃত্যু হয়নি। এদিকে কিছুটা বড়

হওয়ার পরে তার স্বভাব অনুসারে বইপত্রের মধ্যে ডুবে থেকে এরকম একটি জগত গড়ে তুলল যে তখনকার

গ্রামের সমাজের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ রইল না। গ্রামের সামাজিক কোনো কাজে সে কোনোদিন যোগ

দেয়নি। তার স্বভাব কে স্বীকার করে নিয়ে গ্রামের কোনো মানুষ তাকে কোনো কাজে ডাকত না। সেজন্য গ্রামে

কেউ মারা গেলে শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য তাকে কেউ কোনোদিন অনুরোধ করেনি। সেই সব কাজে সবসময় তার

দাদারাই অংশগ্রহণ করত।এভাবেই সে স্কুলের জীবনটা পার করে দিল। কলেজ জীবনে তাকে কোনোদিন কোনো

বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয় পরিজনের মৃত্যুর খবর শোনার মত দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হতে হয় নি। মৃত্যুর সঙ্গে

তার পরিচয় একমাত্র বইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেই পরিচয় ছিল ভাসা ভাসা। বহু চিন্তাশীল মানুষের চিন্তা রাজ্যে

মৃত্যু একটি বিশেষ স্থান জুড়ে থাকে। জীবনের সঙ্গে একটা এড়াতে না পারার সঙ্গী হয়ে বাস করে সেই


মৃত্যুচেতনা। কিন্তু বিজয় অন্য অনেক মানুষের চেয়ে গভীর চিন্তার মানুষ হলেও মৃত্যুকে নিয়ে কোনোদিন বিশেষ

কিছু ভাবনা চিন্তা করেনি। জীবনে প্রথমবারের জন্য ইলাই তাকে মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন করে তুলল। পোনার

জন্মের আগের দিনগুলিতে ইলা তাকে প্রায়ই বলত যে সে আর বেশি দিন বেঁচে থাকবে না। সংসারের মায়ার বন্ধন

দৃঢ় করতে গিয়ে সে মায়ার বন্ধন ছিন্ন করতে চলেছে। সত্যি ইলা অনেক অসুখে ভুগল। কত রাত যে সে  ছটফট

করে উজাগরে কাটিয়েছে। প্রথমদিকে গরমের দিন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে গরম পড়ে এল। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে

ইলার ঘুম ও কমে এসেছিল।ছটফটানি বেড়ে গিয়েছিল। সেই সমস্ত রাতে ইলা কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে শেষে

সামনের বারান্দায় কিছুটা শান্তির আশায় বেরিয়ে যেত। ইলার সঙ্গে বিজয়েরও ঘুম আসছিল না। ইলার ঘোর

প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেও সামনের বারান্দায় বেরিয়ে যেত হাতপাখা নিয়ে। দুটো বেতের চেয়ারে দুজনে অনেক সময়

বসে থাকত। কখনও নীরবে কখনও দুই একটা কথা বলত। নীরব মুহূর্তগুলি কিন্তু বিজয়ের কাছে শান্ত ছিল না।

ইলার জন্যও নিশ্চয়। ওদের সামনে বিশাল অন্ধকারে,আকাশের বিনিদ্র অগণন তারা, চারপাশের সুপ্তির নিবিড়-

নিস্তব্ধতা, তার মাঝে মধ্যে হঠাৎ যেন কোনো নামহীন অজানা দেশ থেকে বয়ে আসা একঝাঁক হালকা বাতাস

ওদের মনে এক অপার্থিব বিষ্ময় এবং ভয়ে গা শিরশির করে উঠা অনুভূতি মন গুলিকে ভাব গম্ভীর স্তব্ধতায়

ভরে ফেলত। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যেত এবং অন্ধকারে রহস্যময়

ছায়ামূর্তির মতো মনে হওয়া ইলার দিকে তাকিয়ে বিজয়ের প্রাণ আকুলি বিকুলি করে উঠল- ইলা যেন ইতিমধ্যেই

জগত ছেড়ে গিয়ে কায়াহীন মূর্তি ধরে তার কাছে বসে আছে। তীব্র মৃত্যুচেতনায় যেন বিজয়ের সমস্ত সত্তা

কেঁপে উঠেছিল। সামনের স্তব্ধ আকাশের অগনন তারার দিকে তাকিয়ে তার মনে রবি ঠাকুরের কবিতার পংক্তি

বারবার যাওয়া-আসা করছিল-‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে/ আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে-’ আর তারপরেই

খুব ভয় পেয়ে সে ইলার হাতদুটি নিজের মুঠিতে ঢুকিয়ে নিয়ে তার এতক্ষণের ভয়াবহ অনুভূতির অসত্যতার

উপলব্ধিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে খুব আদর করে ইলাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘কী ভাবছ ইলা?’

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...