পাখিদের পাড়া পড়শী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পাখিদের পাড়া পড়শী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি । । মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, তৃতীয় অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

......

তৃতীয় অধ্যায়

তিন 

ফ্লাইট ফাইভ জিরো এইট সি।

কলকাতার সময় রাত বারোটা ত্রিশে প্লেইনটা 

কুনমিঙ অভিমুখে উড়ে যাবে। এখন সময় রাত এগারোটা বেজেছে।

আধ ঘন্টার মধ্যে হাতে থাকা টাকার কিছুটা য়ুবানে আর হিসাবের কিছু টাকা লাউ কিপে বদলে নিলাম।

আমার হাতে থাকা সাধারণ কাপড়-চোপড় ভরা ব্যাগটা নিয়ে আমি এগোচ্ছি চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের লাগেজ চেকআপ করার বিশেষ জায়গাটায়। ব্যাগটা এক্স রে মেশিনে পরীক্ষা করে সিকিউরিটি ট্যাগ ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়ায় এবার বোডিং পাশের দিকে এগিয়ে গেলাম। ব্যাগটা কাউন্টারের যথাস্থানে দিয়ে বোর্ডিং পাশটা নিয়ে অন্যান্য নিরাপত্তা জনিত কাজকর্ম গুলি সম্পূর্ণ করে লাউঞ্জে  এসে বসেছি। আমার হাতে একটা ক্যানন  ক্যামেরা। সিকিউরিটি চেক আপের সময় ক্যামেরার ব্যাগটিতে জলের বোতল ও ভরে রেখেছিলাম। লঙ্গে বসে দুটি ইংরেজি কাগজ এবং ম্যাগাজিনের পাতা এক দিক থেকে উল্টে যাচ্ছি। পেট ভর্তি, মোটেই ক্ষুধা লাগে নি, এমনকি যাত্রার উৎসাহের জন্য ঘুমও আসছে না। ফ্লাইটের সময় হয়েছে বলে ঘোষণা করায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে পাঁচ নম্বর গেটে এসে উপস্থিত হলাম।

এগারো  নাম্বার সারির এফ আসনটা আমার । জানালার পাশে। জানালার বাইরে কলকাতা বিমানবন্দরের উজ্জ্বল অনুজ্জ্বল আলোর রাশির বিচিত্র সমাহার। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যয় বিধর্ম বিমানটি আমার আসনের সামনের মনিটরে সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে গান শোনা পর্যন্ত সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। আমি সেসবে ভ্রুক্ষেপ করছি না। আসনটাকে হেলান দিয়ে আমি শরীরটাকে আসনে ছেড়ে দিলাম। আরামদায়ক আসনটিতে  শরীরটা শোবার ভঙ্গিমা গ্রহণ করেছে। চাইনিজ এয়ার হোস্টেজ একজন কাছে এসে আমাকে বিমানটা টেক অন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানাল। আমি আসনটা পুনরায় চেয়ারের মতো করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

নির্দিষ্ট সময় বারোটা ত্রিশ  মিনিটের পাঁচ মিনিট আগে বিমানটা উড়ার প্রস্তুতি নিল। কয়েকজন এয়ার হোস্টেজ নিয়মমাফিক বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ক কলা কৌশল দেখাল। কৌশল গুলি দেখানো হয়ে গেলে ক্যাপ্টেন এয়ার হোস্টেস কয়জনকে নির্দিষ্ট আসনে বসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিমানটা ধীরে ধীরে চালাতে শুরু করলেন। বিমানটা পার্কিং প্লেস থেকে এসে রান ওয়ে পৌঁছাল। রানওয়েতে ধীরে ধীরে দৌড়াতে আরম্ভ করা বিমানটির গতিবেগ ক্রমশ বাড়তে লাগল এবং বিমানটি ভূভাগ ছেড়ে আকাশ মার্গে উড়তে লাগল। ঊর্ধ্বগামী হেলানো বিমানটি একটা সময়ে মাঝ আকাশে সুস্থির অবস্থা পেল। বিভিন্ন যাত্রী শোবার জন্য নিজের নিজের আসনটাকে হেলিয়ে নেওয়ায় আমিও তাই করলাম। বিমান পরিচারিকারা কে কী খাবে তার ফরমায়েস নিচ্ছে। ভূরি-ভোজন করে আমার উদর পরিপূর্ণ। আমি কিছুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচারিকা জিজ্ঞেস করায় আমি ভদ্রতার সঙ্গে কিছুই লাগবে না জানালাম।

কুনমিঙ পৌঁছাতে পৌঁছাতে চিনের আকাশ রৌদ্র স্নাতা হয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ আট ঘন্টা আমাকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে কাগজপত্র আর বই পড়ে আর মানুষ দেখে কাটাতে হবে। বিমান থেকে নেমে এসে আমি লাউঞ্জে বসেছি। বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মানে পুনরায় সিকিউরিটি চেকআপ, কাস্টমসের চেকআপ, নানান ঝামেলা। অন্যদিকে আমার চাইনিজ ভিশা নেই। ঝামেলা কমানোর জন্য আমি লাউঞ্জে বসে থাকতে  বাধ্য হয়েছি। কুনমিঙ ব্যস্ত বিমানবন্দর। লোকজন আসছে যাচ্ছে। আমি খবরের কাগজের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি। কফি কিনে খাচ্ছি। মাঝখানে গিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করে এসেছি।

ব্যাগটা, ব্যাগটার কথা মনে পড়ায় আমি দ্রুত চারপাশে ব্যাগটা খুঁজতে লাগলাম। ধ্যাত, ব্যাগটা তো আমি ভিয়েতনামে পাব। আমি পুনরায় কাগজের পাতায় মনোনিবেশ করলাম। মাঝখানে একটু ঝিমুনির মতো এল।ঘুমের মধ্যে আবছাভাবে মাকে দেখতে পেলাম। চিতার আগুন দেখে এবং গুলি ফাটানোর শব্দ শুনে উড়ে যাওয়া বকের কয়েকটি ঝাঁক মানসপটে ভেসে উঠল। পাখিদের পাড়া-পড়োশির দু-একটি দৃশ্য আমার ঘুমের আমেজকে বিরক্ত করে দূরে চলে গেল। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার আমি এক কাপ কফির জন্য এগিয়ে গেলাম। পয়সাগুলি যুবানে না ভাঙ্গালেও চলে যেত। বিপনীটা  ডলারও গ্রহণ করে। আমার হাতে তো ডলারও ছিল না, তাই ডলার নেবার চেয়ে য়ুয়ান নিয়েছি, ঠিকই আছে।

বারোটার সময় কিছুটা ক্ষুধা পেল। চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার ইচ্ছা হল। চিনে চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার মজাই হয়তো আলাদা হবে। একটা বিপনিতে  আমি নুডুলস এবং কফির কথা বললাম। ছোটো ছোটো চোখ  এবং কোমর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া চুলের পরিচারিকা  জিজ্ঞেস করল— ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলস? এখনকার নুডুলস বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। সেই জন্য আমি সম্মতি সূচক  ভাবে মাথা নাড়লাম। পরিচারিকাটিকে যথেষ্ট অতিথি পরায়ণ বলে মনে হল এবং সেই সাহসে ভর করে পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম— চাইনিজ ভাষায় কি বলে?

—-গুও য়িয়া ও মিয়ান।

পরিচারিকাটি  আমি অর্ডার দেওয়া ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলসের চাইনিজ তরজমা করে নিল। জানিনা আমি কতটা শুদ্ধভাবে শুনতে পেয়েছি। তবে দাম শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। নুডুলস এর দাম ৭৬ য়ুয়ান এবং এক কাপ কফির দাম পঁচিশ ওয়ান। মোট একশত য়ুয়ান। ভারতীয় হিসেবে এক হাজার দশ টাকা । অর্থাৎ আমার দুপুরের খাবার খরচ আমার দশ দিনের খরচের সমান।

আমার কাছে বসা একজন সাদা চামড়ার বিদেশি লোক এক কাপ কফি হাতে নিয়ে কীসব বিড়বিড় করছিল। নুডুলসটা খেয়ে  কফির কাপটা হাতে নিয়ে আমি মানুষটার কাছে বসায় তিনি আমার কাছে তার আপত্তির কথা বলতে লাগলেন।

—একই কফি, আমি কুনমিঙের  রেস্তোরায় সকালবেলা খেয়ে এসেছি, ত্রিশ য়ুয়ান  নিয়েছে, এখানে নিচ্ছে ছিয়াত্তর য়ুয়ান। দ্বিগুণেরও বেশি।

— নেবেই। সমস্ত এয়ারপোর্টে একই ব্যাবসা। দিল্লির কফি হাউসে যে কাপ কফির দাম ষাট  টাকা, সেই কাপ কফির দাম এয়ারপোর্টে  ২৬০ টাকা। আমি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যাইনি, হয়তো সেখানেও একই ব্যাপার হবে।

বিদেশি ভদ্রলোক কফির কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে কফি কাপের সম্পূর্ণ পয়সা উশল করার তৃপ্তি লাভ করার চেষ্টা করলেন।

দেড়টার সময় তিন নম্বর গেটের সামনে ভিয়েনটিয়েন  অভিমুখী বিমানের জন্য যাত্রীরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াতে লাগলেন । আমিও এসে দাঁড়ালাম । একই ফ্লাইটের আসন সংখ্যা । সঠিক সময় দুটোতে বিমানটা যাত্রা আরম্ভ করেই মাত্র আধা ঘন্টার ভেতরে ওয়েট্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হল । বিমানবন্দরে পুনরায় কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য প্রসাধন কক্ষে প্রবেশ করলাম ।আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে প্রসাধন কক্ষ সমূহ আন্তর্জাতিক মানদন্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ইমিগ্রেশন কাস্টমস চেক ইত্যাদি সম্পন্ন করে এবং কিছু পয়সা ভাঙ্গানোর জন্য বিদেশি মুদ্রা পরিবর্তন করা একটা কাউন্টারে গেলাম। লাওয়ের মুদ্রাকে কিপ বলা হয় । আমাদের এক টাকা একশত কুড়ি  দশমিক আটান্ন লাওয়ের সমান। এসব করে বিমানবন্দরের বাইরে যেতে চারটা বেজে গেল। 

আমি এখন বিদেশের মাটিতে। জীবনে প্রথমবারের জন্য বিদেশের মাটিতে পদার্পণ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমি দীর্ঘশ্বাস নেবার চেষ্টা করছি এবং চারপাশটা পলকে দেখে নিচ্ছি।

আমার এখন গন্তব্যস্থান ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস স্টেশন। বিমানবন্দর থেকে সেন্ট্রাল বাস স্টেশন প্রিপেইড ট্যাক্সিতে গেলে সাত ডলার নেয়।সাতান্ন  হাজার কিপ। নেটে বিভিন্ন পর্যটকের মতামত থেকে জানতে পেরেছি ভিয়েনটিয়েন সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাবার ভিন্ন সবচেয়ে সস্তা হল বাস পরিবহন ব্যবস্থা। তার জন্য আমি বিমানবন্দর থেকে মূল পথে মাত্র পঁচিশ  মিটার পায়ে হেঁটে গেলেই হল। পায়ে হাঁটা মানুষের পেছন পেছন এসে আমি মূল পথটা পেয়ে গেলাম। এখান থেকে ত্রিশ  নম্বর বাসে উঠলে সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাওয়া যায়। দূরত্ব মাত্র তিন  কিলোমিটার।ভাড়া চার হাজার কিপ। আমাদের ওখানকার টেম্পোর মতো এখানে টুকটুক চলে । এখান থেকে টুকটুকে সেন্ট্রাল বাস আড্ডার ভাড়া পঞ্চান্ন  হাজার কিপ। কিন্তু দরদাম করলে ভাড়ার পরিমাণ হয় ত্রিশ হাজার কিপ। আমি ত্রিশ নম্বর বাস ধরে ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস আড্ডায় পৌঁছে গেলাম । এখন এখান থেকে যেতে হবে ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ  বাস স্টেশনে । দূরত্ব কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিট । ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ বাস স্টেশনে যাওয়া পথটার নাম থার্টিন সাদার্ণ  রোড।


 এই বাস আড্ডা থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়, বাসের চলাচল ছাড়াও আমি যেতে চাওয়া লাওয়ের ছাভানক্ষেত প্রদেশে যাবার জন্যও বাস পাওয়া যায়।সেন্ট্রাল বাস আড্ডা থেকে সাদার্ণ  বাস আড্ডায় উনত্রিশ  নম্বর বাসে যাবার সুবিধা আছে। ভাড়া নেয় দুই হাজার কিপ। টুকটুকে ভাড়া ষাট  হাজার এবং ট্যাক্সিতে নব্বই  হাজার কিপ। আমি অল্প নয় বেশ কিছু পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। আমি আসা ত্রিশ নম্বর বাসটা সাদার্ণ বাস আড্ডায় ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে গেল। বাসটার বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক বলে মনে হল।স্থানীয় সময় অনুসারে এখন সন্ধ্যে  ছয়টা বাজে ।ছাভানক্ষেটে আমাদের গন্তব্য বাসটার সময় আটটায়। এই বাসটাকে তারা ভিআইপি বাস বলে।বাসটা বাতানুকূল। বসে এবং শুয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।বাসটাতে  শৌচাদি ক্রিয়ার ব্যবস্থা আছে। বসে গেলে ভাড়া এক লাখ দশ হাজার কিপ এবং শুয়ে গেলে এক লাখ কুড়ি হাজার কিপ। আমি অনলাইনে শুয়ে যাবার জন্য একটা টিকেট আগেই সংগ্রহ করে রেখেছি। লাওয়ের সমস্ত সুবিধা অনলাইনযোগে গ্রহণ করা যায়। নির্ধারিত দূরত্বে বাসটা আট থেকে নয় ঘন্টার ভেতরে পৌঁছে যায়।আমি  হাতে কিছু সময় থাকায় বাস আড্ডাটা ঘুরে দেখলাম। সহজ সরল ভাবে সুন্দর করে সাজানো । প্রাচুর্যের  চিহ্ন নেই । 

আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বাসটা যাত্রা  আরম্ভ করল। বাসের বাইরে ঘোরতর অন্ধকার ।কিছুই দেখা যায় না। হাতের ব্যাগটাকে বালিশ করে নিয়ে ক্যামেরাটা সাবধানে উপরে রেখেছি। পরিষ্কার এবং বাতানুকূল  বলে বাসটা ভালো লাগছে। ক্লান্তির জন্য ঘুম ভালো হওয়ায় রাতটা  কীভাবে পার হল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না । সকালবেলা সাড়ে চারটার সময় আমার গন্তব্যস্থল ছাভানক্ষেট পৌছে গেলাম। ছাভানক্ষেট   বাস আড্ডায়  সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।লোকগুলিকে দেখে আমার ইম্ফলের বাসআড্ডার কথা মনে পড়ে গেল।গাড়ির ডিজাইনের বাইরে এটা যেন জাতীয় চেহারা এবং পরম্পরায় আবৃত ইম্ফল বাস আড্ডা।

এটা লাওসের  ছাভানক্ষেট প্রদেশ।আকার আয়তনের দিক থেকে লাওসের  সর্ববৃহৎ প্রদেশ। জেলার সংখ্যা পনেরোটি। মাটির ক্ষেত্রফলের প্রায় ষাট  শতাংশ অংশ অরণ্যে পরিপূর্ণ।

আমাকে এখন এখান থেকে অনলাইনে নির্ধারিত করে রাখা, ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যেতে হবে।হোটেলটা এই বাস আড্ডা  থেকে দুই কিলোমিটার এবং মেকং নদী থেকে নাকি দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ মেকং নদী থেকে কত দূরে অবস্থিত তার দ্বারাই যেন দূরত্ব মাপে ।টুকটুকের চালকের কথা থেকে আমি তাদের এরকম মনোভাব জানতে পারলাম।

 টুকটুকের চালকটিকে  বললাম আমি ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যাব।

ভাড়ার কথা বলায় আমি বললাম ভাড়া হোটেল দেবে। আমি এখানে কোনো দাম দর করব না।টুকটুকের চালক আমাকে ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটার সামনে নিয়ে  গিয়ে গাড়িটা রাখল।

-- তুমি ভাড়াটা হোটেল থেকে নিয়ে নাও।

চালক কাউন্টারে গিয়ে বলায় হোটেলের পরিচারিকা তাকে ভাড়াটা দিয়ে দিল ।

  অযথা তর্ক বিতর্ক  দরদাম থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি এই ব্যবস্থাটিকে গ্রহণ করলাম জানিনা সময়ে হিতে বিপরীতহয় কিনা।

দুই লাও ভগ্নি  পরিচালনা করা ছালা থংগোয়ন  হোটেলটিতে মাত্র দশটি ঘর। তুলনামূলকভাবে হোটেলটিতে থাকার খরচ যথেষ্ট কম প্রতিদিনের জন্য আটশো ছয় টাকা।হোটেলের সামনে একটি কাঠের নাম ফলকে লেখা আছে-- ‘ওয়েলকাম টু ছালা থংগোয়ন বাংলো।’

  আমি হোটেলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। ছোটো সাধারন অথচ স্থানীয় রূপে সাজানো অভ্যর্থনা কক্ষে একজন লাও নারী। হয়তো দুই বোনের একজন।

হোটেলে ইংরেজি থাই এবং লাও ভাষা চলে। নেটে হোটেলটিতে থাকা বিভিন্ন সুবিধার বর্ণনা দেওয়ার সময় এই তিনটি ভাষা জানা মানুষের সুবিধা থাকার কথা জানিয়ে রাখা হয়েছে ।সেই জন্য আমি বিনা দ্বিধায় ইংরেজিতে সামনের পরিচারিকাটির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।

-- ওয়েলকাম।

 পরিচারিকাটি  আমাকে স্বাগত জানাল।

  --থ্যাঙ্ক ইউ। আজকে থেকে  থাকার জন্য আমি হোটেলে অনলাইনে একটি ঘর বুক করেছিলাম।

  --আপনার নাম, আপনি কোন দেশ থেকে এসেছেন?

  জনজাতীয় মুখাবয়বের পরিচারিকাটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

 আমার নাম এবং আমি ভারতীয় বলে বলায় তিনি আমাকে সাত  নম্বর ঘরটা আমার জন্য সংরক্ষিত করে রাখা আছে বলে জানালেন। তারপরে তিনি হোটেলের পঞ্জীয়ন খাতাটা বের করে আমাকে আমার নাম ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। পাসপোর্টের কথা জিজ্ঞেস করায়  আমি পাসপোর্টটা বের করে দেওয়ায় তিনি সেটার একটি ফটোকপি করে নিয়ে  আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। গতানুগতিক এবং রুটিন মাফিক কাজগুলি হওয়ার পরে তিনি আমাকে তার পেছন পেছন যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।

--আসুন আপনাকে আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিই।

  আমি পরিচারিকা অথবা হোটেলের দুই বোনের কোনো একজনের পেছন পেছন যেতে লাগলাম।

 গাছ বনে সাজিয়ে তোলা চৌহদে দেখতে পাওয়া প্রায় ভাগ তরুগুল্ম  আমার পরিচিত। অসমিয়া লোক নিজের চৌহদ  সাজানোর জন্য এই ধরনের গাছপালা যেভাবে ব্যবহার করে এখানেও সেরকম ব্যবহার করে দেখতে পাচ্ছি। জীর্ণশীর্ণ একটি পেঁপে গাছের ডালে কয়েকটি পেঁপে ধরে আছে । টকো এবং নারকেলের গাছ দেখে নিজের জায়গায় আসার মতো মনে হচ্ছে। নিজের জায়গায় রয়েছি বলে মনে হচ্ছে। নৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করার জন্য আমি দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম ।বাতানুকুল পরিবেশ থেকে বাইরে থাকার ফলে গায়ে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিল। শরীরে মাথায় জল  ঢালার পরে সেই অস্বস্তির অবসান  হল। বাইরে তাপমাত্রা ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক নয়। ফ্যানের বাতাসের নিচে  আমার ঘুমের ভাব হল। তখনই একজন পরিচারিকা আমার জন্য এক কাপ লাল চা নিয়ে এল। আমি এই চায়ের কাপের অপেক্ষায় ছিলাম । চায়ের কাপ টেবিলে রেখে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল সকালের  আহার আমি এখানেই খাব কিনা?

আমি বললাম—হ্যাঁ।

--কী খাবেন?

  সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ।

যেহেতু এখানে কী পাওয়া যায় আমি জানিনা এবং এই মুহূর্তে এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ইচ্ছা আমার ছিল না। কেবল ঘুমোতে ইচ্ছা করছিল। তাই বললাম নুডুলস

  --ননভেজ

  --হ্যাঁ ননভেজ। এক ঘন্টা পরে দিলেই হবে বলে বলায় সে মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।

  ঠিক এক ঘন্টা পরে একটা ট্রেতে একটা নুডুলসের বাটি এবং সঙ্গে আমার জন্য অপরিচিত কয়েকটি পদ খাবার জিনিস নিয়ে পরিচারিকা আমার ঘরে এল। পরিচারিকাটির বয়স পঞ্চাশের উর্ধ্বে ।দেখলে মনে হয় আমি নাম পঞ্জীয়ন করার সময় সাক্ষাৎ করা পরিচারিকাটির মতো একই বলে মনে হয়। আমি তাকে সাধারণভাবে  স্বাগতম জানালাম। সে টেবিলের উপর খাদ্য সামগ্রীর ট্রেটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।

সে  চলে যাবার পরে আমি নুডুলসের বাটিটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। খাবার জিনিসের প্রতি আমার কোন বৈষম্য নেই সেতে পারা ধরনের হলে আমি সমস্ত খাদ্য সামগ্রীকে গ্রহণ করি নুডুলস এর বাটিটা হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম পালংশাক,ভাজা রসুন ও মুরগির মাংসের রান্না করা নুডুলসটা খেতে বেশ স্বাদযুক্ত।বিশেষ কোনো মশলা ব্যাবহার না করে সিদ্ধ করে রান্না করা হয়েছে। ক্ষুধার তাড়নায় আমি পুরোটা দিয়ে পেট ভরিয়ে নিলাম। 

খাওয়া-দাওয়া শেষে আরও দশ মিনিটের মতো বিশ্রাম নিয়ে আমি  পরিচারিকাটির কাছে এলাম।

আমাকে আপ্যায়ণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা বলে মনে কর পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম ডং সিথুয়ান গ্রামটা কত দূরে কোন জেলায়?

  --অ’ভিলেজ ফরেষ্ট্রি!দুর আছে। আমি যাইনি বলে ভালো করে জানি না। আপনি যেতে চান নাকি?

-- হ্যাঁ যেতে চাই

  আমার উত্তর শুনে সে কারও সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করল। তারা লাও ভাষায় কথা বলছে। কথা বলার সময় মানুষটা ফোনটা খামচে ধরে আমাকে জিজ্ঞেস করল ট্যাক্সি লাগবে।চাই কি?

আমি মাথা নড়লাম। তিনি পুনরায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কিছুক্ষণ মানুষটার সঙ্গে কথা বলে তিনি আমাকে বললেন আধঘন্টা পরে ট্যাক্সি এসে যাবে। গাড়ি ভাড়া আমি বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। আপনি রাস্তায় চাইলেও একটিও কিপো দেবেন না।

  --কেন?

  আমরা বন্দোবস্ত করে দিলে তাদের ভাড়া কম হয় বলে ভাবে। বেশি টাকা নিতে পারে না যে!

  আমি পরিচালিকাটিকে বিশ্বাস করলাম।

নির্দিষ্ট সময় আধঘন্টা পরেই ট্যাক্সি চালক এল। সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেশভূষায় একজন বয়স্ক চালক। হাসিমুখ। তাকে দেখে আমার এরকম মনে হল আমি যদি লাও ভাষা বুঝতে পারতাম এই ব্যক্তি আমাকে সারাটা যাত্রা পথে হাসির খোরাক জোগাতে পারত।

  আমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডং সিথুয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জেলাটির নাম দুবার দুজনের মুখে শুনেও মনে রাখতে পারলাম না। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। চালক আমার সঙ্গে কথা বলছে। ভারতের কথা, অসমের কথা ভারতে থাকা বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থস্থান গুলির কথা। সে আমাকে আমি বৌদ্ধ না মুসলমান জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম-- আমি হিন্দু। হিন্দু ধর্ম কেমন জিজ্ঞেস করায় আমি খুব সংক্ষেপে হিন্দু ধর্মের বিষয়ে ব্যাখ্যা করলাম। অসমের এক শৃঙ্গের গন্ডারের কথা বললাম। চালক আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। প্রায় তিন ঘন্টা পরে আমরা এসে জেলার সদর পেলাম। আমি ট্যাক্সি চালককে বললাম আমার গন্তব্যস্থান জেলা কৃষি এবং বন  বিষয়ার কার্যালয়। আমি চালক থেকে এ কথাও জানালাম যে কার্যালয়টিকে তারা ডাফো বলে।

আরক্ষীকে জিজ্ঞেস করে চালকটি আমাকে নির্দিষ্ট কার্যলের সামনে নিয়ে গেল।

 জেলা কৃষি এবং বন অফিসার নির্দিষ্ট সময়ে এসে কার্যালয়ে বসেছেন। মানুষটা প্রায় আমার বয়সী। আমাদের রাজ্যের যেকোনো জনজাতীয় অবয়বের পঞ্চাশ অনূর্ধ্ব ব্যক্তি। একজনের সঙ্গে আমি তার সাদৃশ্য দেখতে পেলাম। মানুষটা চশমা পরেছেন। অতি সাধারণ বেশভূষা ।আমি তাকে ভারতীয় ধরনে নমস্কার জানালাম। তিনিও প্রতি নমস্কার জানালেন। সম্ভবত ভারতীয় আদব কায়দা এবং রীতি-নীতির দ্বারা মানুষটা পরিচালিত। অথবা তাদের দেশেও আমাদের মতো নমস্কার দেবার নিয়ম আছে। আমি কথাটা জানতে পারলাম না। তিনি তাঁর নামটা বললেন কিন্তু আমি মনে রাখতে অপারগ হলাম ।নামটা জিজ্ঞেস করে লিখে রাখার জন্য আমার মোটেও ইচ্ছা হল না ।বিশেষ করে মানুষটির আন্তরিক ব্যবহারে ।আমি তাকে আমার উদ্দেশ্যের বিষয়ে জানালাম। তিনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করলেন। তারপরে তাদের উদ্দেশ্য এবং কাজ করার ধরনের উপরে এক বিস্তৃত ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বলা কথাগুলি সম্পূর্ণ বিদ্যাতনিক ধরনের এবং যান্ত্রিক ছিল বলে আমার মনে হল। তার বলা কথাগুলি আমার কাছে ইন্টারনেটে উপলব্ধ হওয়া বিভিন্ন প্রবন্ধ আদির মৌখিক রূপ বলে মনে হয়েছিল।

  আমি তার সামনে ডং সিথুয়ানে যাবার প্রস্তাব রাখলাম।

তিনি বললেন যেতে পারেন আমরা কীীভাবে কাজ করছি এবং সুফল লাভ করেছি দেখে আসতে পারেন। 

সম্পূর্ণ বাধ্যবাধকতা থাকা একটি কমিউনিস্ট দেশের বিষয়ে একজন কোনো আপত্তি ছাড়াই এভাবে বলায় আমি আশ্চর্যানিত হয়ে পড়লাম। তিনি নাকি ব্যস্ততার জন্য দু'একদিন যেতে পারবেন না। আমি গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তিনি করবেন। আমি কোনো অনুমতি পত্রের প্রয়োজন হবে নাকি জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন আপনি দেখতে যাবেন, আপনাকে আমাদের দেশ ভিসা দিয়েছে। আপনি একজন পর্যটক আপনি নিশ্চয়ই যেতে পারেন।

ডং সিথুয়ান  একটি গ্রামের নাম। সেই গ্রামটিকে অরণ্য গ্রাম হিসেবে প্রতিস্থাপিত করে নাম রাখা হয়েছে ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট।নামটি দেখছি  বেশি ব্যাবসায়িক বলে মনে হচ্ছে। ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট দশটি গ্রাম নিয়ে হয়েছে এবং এখানে ছয়টি দল কর্মরত রয়েছে। তারা ব্যবহার করা মোট ক্ষেত্রফলের পরিমাণ ২১২ হাজার হেক্টর ।অফিসারটির কথা থেকে জানতে পারা গেল যে তারা সামূহিকভাবে অরণ্য সুরক্ষার চেয়ে অরণ্য উৎপাদনে বেশি মনোনিবেশ করেছে। সেই উৎপাদন একমুখী। একমাত্র কাঠ কেন্দ্রিক।

  অফিসারটি আমাকে য়ায়ৈ ফুজিটা, থমথন ভংভিছোক, হংফেট চানটাভোং এবং চোমভিলাই চান্থালেউনাভোঙের দ্বারা  ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘ডং ফুজয় এন্ড ডং সিথুয়ানে প্রোডাকশন ফরেস্টঃপেভিং দী ওয়ে ফর ভীলেজ ফরেষ্ট্রি’  নামে একটি গবেষণা পত্র তার ল্যাপটপ থেকে প্রিন্ট আউট করে নিয়ে বের করে দিলেন। সেটির উপরে আমি একবার চোখ বুলিয়ে দেখে বললাম-- ধন্যবাদ। 

আমার ধন্যবাদ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার ভাব দেখিয়ে তিনি বললেন—এটাতে আপনি আমাদের সমস্ত ধরনের কাজ কর্মের বিষয়ে আদ্যোপান্ত পড়তে পারবেন।এটা পড়লে আপনি ডং সিথুয়ানে না গেলেও হবে।পাকে-প্রকারে মানুষটা আমাকে ডং সিথুয়ানে না যাবার জন্য বলছেন বলে মনে হল।

  তারপরে তিনি দেখালেন ‘ভিলেজ ফরেষ্ট্রি হেন্ডবুক’আমি বললাম—এটা আমি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিয়েছি।

 অফিসারটি মুচকি হাসলেন।

 কথার মাঝখানে মানুষটা আমাকে এক কাপ লাল চা দিয়ে অভ্যর্থনা করতে ভুললেন না।

 অফিসারটি আমার সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন যদিও তার কথা আমার কাছে অনেকটাই যান্ত্রিক বলে মনে হল।আমাদের দেশেও যদি গণ্ডারের হত্যার কথা কোনো বিদেশি নাগরিক জিজ্ঞেস করে সংশ্লিষ্ট বন অফিসার এভাবেই হয়তো নিয়মমাফিক উত্তর দেবে।

 অফিসারকে ধন্যবাদসূচক নমস্কার জানিয়ে আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

 এখন আমরা যাব ডং সিথুয়ান গ্রামে।

 পাহাড়ি পথে আমাদের ট্যাক্সিটা এগিয়ে চলল।রাস্তার দুপাশে হালকা জনবস্তি।চাং ঘর,মুরগি এবং শুয়োর পালন,শুকনো আবহাওয়া—পরিবেশটা আসমের কোনো একটি পাহাড়ি জেলার লাও সংস্করণের মতোই মনে হল।প্রায় দেড় ঘন্টার মতো সময় পরে আমরা ডং সিথুয়ান গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম।যে গ্রামে আসার উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমি কয়েকটি নদী এবং কয়েকটি পাহাড় অতিক্রম করে এসেছি।

ডং সিথুয়ানে গ্রামে উপস্থিত হয়ে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে শুরু করেছি।সঙ্গে চালক এবং ক্যামেরাটা।গ্রামের মানুষ আমার কোনো কথাই বুঝতে পারছে না।  

চালকটি  দোভাষীর কাজ করছে যদিও সে অরণ্য গ্রাম সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলি গ্রামের মানুষকে বুঝিয়ে বলতে পারে নি।আমি ‘ডিছ-ট্রিক লেভেল ফরেষ্ট কাম ইটি’এবং ফরেষ্ট ম্যানেজমেন্টের কথা জিজ্ঞেস করেছি এবং চালকটি  হয়তো গ্রামবাসীদের অন্য কিছু বলছে।ফলে আমি যা চাইছি সেই ধরনের উত্তরগুলি পাচ্ছি না। তাই আমি যতটা সম্ভব ক্যামেরার ব্যবহার করছি।তাঁরা প্রতিটি গাছকে চিহ্নিত করার জন্য ক্রমিক সংখ্যা ব্যবহার করছে।অসমের চা বাগিচায় সেভাবে গাছকে চিহ্নিত করার পদ্ধতি আমি আগেই দেখতে পেয়েছি। আমাদের এখানে সাদা কালোতে লেখা হয় এবং এখানে দেখছি লাল কালিতে লেখা।গ্রামের মধ্যের এক জায়গায় গাছের চারা উৎপাদন কেন্দ্র একটাও দেখতে পেলাম।আমাদের এখানকার সামাজিক বনানীকরণের চারা উৎপাদন কেন্দ্রের মতো।পাহাড়ি গ্রামটির পথ ঘাটের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমি প্রতিটি পরিবারে বিভিন্ন ধরনের ছোটো বড়ো গাছ দেখতে পেয়েছি। কিছু পরিবারে দেখতে পেয়েছি  গাছগুলির নিচটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,তাতে অরণ্যের পরিবেশ নেই। 

সামগ্রিকভাবে পরিবেশ অধ্যয়ন করায় এই গ্রাম যাত্রা আমার জন্য লাভ দায়ক হল।বিশেষ করে থমথন সানটাভোঙ নামের কৃ্ষকটির থেকে যে কথাটা জানতে পারলাম সেটা আমার অনেক উপকার করল।তাঁদের এখানে আমাদের এখানকার মতো জুম খেত করা হয়।ফলে অরণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে পরিবেশের গাঁথনির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।অরণ্য ধ্বংস প্রতিরোধ করার জন্য অরণ্য গ্রামের ধারণা তাদের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে।কৃ্ষিজীবী গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের আর্থিক দিকটা অতিশয় দুঃখের।অরণ্য গ্রাম আরম্ভ হওয়ার পরে গ্রামবাসী লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে।লাওচে প্রতিবেশী দেশ সমূহকে কাঠ যোগান ধরে।তাঁদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য কাঠের ব্যাবসা অন্যতম।সানটাভোঙ আমাকে আন্তরিকতার সঙ্গে বলা কথাগুলি চালকটি দোভাষী হয়ে তর্জমা করে গেছেন।আমি এবার সানটাভোঙের দিকে আর একবার চালকের মুখের দিকে আমার মুখ ফিরিয়ে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

পর্যাপ্ত সময় গ্রামের চারদিকে ঘুরে-ফিরে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।আমার কথায় চালকটি অসম্মত হওয়ার  কোনো প্রশ্নই উঠে না।

—বড়ো ক্ষুধা পেয়েছে।

আমি চালকটিকে বললাম।

--'খাও নিউ’তে খাব।হবে কি?

আমি বুঝতে না পেরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম—কোথায়?

--খাও নিউ মানে হল ‘লাও ষ্ট্রীট ফুড’।

আমি চালকের কথায় সম্মতি জানালাম।পর্যটকদের জন্য এখানে কী ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার জানার প্রয়োজন ছিল।

--সেখানে পাওয়া সমস্ত খাদ্য পরম্পরাগত ভাবে প্রস্তুত করা হয়।

 চালক এভাবে বলায় আমার মন আনন্দে ভরে উঠল।শুনতে পেলাম লাওচে পশ্চিমী খাদ্যের প্রচলন নেই।সেই জন্য হয়তো ছালা থঙ্গোয়নের মেনুতে আমি সাধারণত দেখতে পাওয়া স্যাণ্ডউইচ,বার্গার,টোস্ট ইত্যাদি পশ্চিমী খাদ্যের নাম দেখতে পাইনি।নিজেকে চিনতে পারা এবং নিজের পরিচিতি বহন করে চলার জন্য খাদ্য সম্ভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।দেশটি নিজের খাদ্য সম্ভারকে সুরক্ষা দিতে জানে বলেই লাওচে বিদেশি পর্যটকের সমাহার অন্য এক কারক বলে ভাবার কারণ আছে।ভবিষ্যতের কার্যপন্থার হেতু কথাটা আমার জন্য মনে রাখার দরকার আছে।

চালকটি একটি ‘খাও নিউর’সামনে গাড়ি এনে রাখল।দোকানটা দেখতে আমাদের এখানে এক সময় চলা পিসিও বুথের মতো,সবুজ রঙে আবৃত।দোকানের নিচের ভাগে বিভিন্ন খাদ্য সম্ভারের আলোক ছবি সজ্জিত করে রাখা হয়েছে।

--এখানে সর্বাধিক জনপ্রিয় খাদ্য দ্রব্য কি?

আমি চালককে জিজ্ঞাসা করলাম।

--জ’,চিয়েন চাভান এবং থুম মুক হ্ং। 

চালক কী বলল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকায় এবার সে ইংরেজিতে বলল।

--ষ্টিকি রাইস,লাও বীফ জার্কি এবং পাপায়া সালাড।

কথাটা বলার সময় চালকের মুখটা লালায় ভরে উঠেছিল বলে মনে হল।

--বীফ?

বড়ো স্বাদের।খাবার পরে বলবে।

--আমি বীফ খাই না।ভারতবর্ষে দুই একটি গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে হিন্দুরা বীফ খায় না।

 চালক এরকম ভাব করল যেন কোথাও সে মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে।সে আমার সামনে দুঃখ প্রকাশ করে আমি নিরামিষ খাই নাকি জিজ্ঞেস করল।

 --বীফ ছাড়া সমস্ত মাংস খাই।

 --তাহলে আপনি ‘খাও পিক চেন’খান।হোম মেড চিকেন নুডলস স্যুপ।

 আমি তার কথায় সম্মতি জানিয়ে আঠালো ভাত,পেঁপের সালাড এবং বাড়িতে প্রস্তুত করা মুরগির নুডলস স্যুপ আনতে বললাম।আর চালককে বললাম আপনি বীফ খেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।আমি এই ধরনের শুচিবাইগ্রস্ত মানুষ নই।চালক আমার জন্য খাবার জোগাড় করে নিজে কিছুটা দূরে খেতে গেল।আঠালো ভাতটা আমাদের বরো চালের ভাতের মতো,কিন্তু ধবধবে সাদা।পেঁপের সালাডটা খেতে খুব সুস্বাদু।ছোটো ফুটো থাকা চালনি দিয়ে নুডলসের মতো লম্বা লম্বা করে কাটা।সঙ্গে ঝাল,নুন ইত্যাদি মিশ্রিত করেছে।চিকেন নুডলস খেতে আমাদের এখানকার স্যুপের মতোই,কেবল সসের ব্যবহার নেই বলে মনে হল।আমরা দুজনের দুপুরের আহারে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হল।বিভিন্ন বিদেশি লোক ‘খাও নিউ’তে ভিড় করেছে।তাদের দেখে আমার এরকম মনে হল যেন প্রত্যেকেই ‘লাও বীফ জার্কি’র প্রতি আগ্রহান্বিত।এটা লাওচের স্থানীয় খাদ্য।

 আমার ভবিষ্যত কর্মপন্থায় স্থানীয় খাদ্যের গুরুত্ব এক মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।‘খাও নিউ’ থেকে আমরা সেই অনুপ্রেরণা লাভ করলাম।     


  

 

বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, দ্বিতীয় অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

***/..

আমরা ভারতীয় পর্যটকদের পকেটের দিকে তাকিয়ে হাঁটা মানুষ। ডলারের তুলনায় টাকার মানদণ্ডের দুর্বলতা আমাদের  কাছে সত্যিই পরিতাপের। ১৯৪৭ সনে এক টাকা এক ডলারের সমান ছিল। আজ এক ডলারের মান প্রায় ৬৭ টাকা। ৪৭ সনের মতো টাকার মান ডলারের সমান হলে ভারতীয়রা অনায়াসে পর্যটক হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত। লাউসে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আমার মনে প্রথমে ডলারের কথাই এল। হলেও যাব বলে ভাবছি যখন খরচের অংক বেশি করে না করাই ভালো— আমি ভাবলাম।

আমার দেশ আমাকে পৃথিবীর যে কোনো দেশে যাবার অনুমতি পত্র অথবা পারপত্র দিয়েছে।

পারপত্র বের করতে যথেষ্ট পয়সা খরচ করতে হয় এবং অনেক সময় লাগে— বিভিন্ন জন বলা কথার ওপর নির্ভর করে আমারও সেরকম ধারণা ছিল। তবে কথাটা শুদ্ধ নয়। আমি অনলাইনে আবেদন করলাম। প্রয়োজনীয় টাকাও ইব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করলাম। তারা আমাকে অনলাইনযোগে নির্দিষ্ট দিন তারিখ জানাল। নির্দিষ্ট দিনে আমি গুয়াহাটি পারপত্র কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আমার তথ্য সমূহ পারপত্র কার্যালয়ে প্রদান করতে হবে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেৰ কাছ থেকে আপত্তিহীনতার প্রমাণপত্র। আমার ব্যাংকের শাখার পরিচালকের থেকে আমি আপত্তিহীনতার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করলাম। চাকরি করা ব্যক্তির জন্য এটাই গুরুত্বপূর্ণ নথি। সঙ্গে লাগবে বিভাগীয়ভাবে প্রদান করা পরিচয়পত্রটি। তাছাড়া ভোটার তালিকা, জন্মের প্রমাণপত্র, স্থায়ী নিবাসীর প্রমাণপত্র যাকে আমরা পিআরসি বলি, এই সমস্ত কিছু নিয়ে আমি গুয়াহাটি পারপত্ৰ কার্যালয়ে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হলাম। নির্দিষ্ট সময় মানে অতি নিৰ্দিষ্ট। আমার অনলাইন আবেদনের বিপরীতে তারা আমাকে দেওয়া তথ্য সমূহে সময় ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। সেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা পরে নিরাপত্তারক্ষী আবেদনকারীকে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না।

পারপত্র কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে একটা অন্যরকম পরিবেশের সম্মুখীন হলাম। অসমের কোনো কার্যালয়ে না দেখা পরিবেশ। একের পর এক টেবিল অতিক্রম করে গিয়ে তৃতীয় টেবিলটিতে আমার দুটি হাতের ছাপ এবং আলাদা আলাদা প্রত্যেকটি আঙ্গুলের ছাপ নিল। সঙ্গে ক্যামেরা দিয়ে আমার আলোক ছবি গ্রহণ করল। নথিপত্র গুলি ফটোকপি করে আমার মূল নথি গুলি ফিরিয়ে দেওয়ায় আমি জিজ্ঞেস করলাম—আমার হয়ে গেছে নাকি?

— হ্যাঁ। হয়ে গেছে।

আমার সামনে থাকা হৃষ্টপুষ্ট কর্ম তৎপর মেয়েটি বলল।

— পারপত্রটি কবে কীভাবে পাব?

— আপনি আপনার ঠিকানায় ডাকে পেয়ে যাবেন।

আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটির কথামতোই এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই আমি আমার পারপত্রটা লাভ করলাম। পারপত্রের সাদা পৃষ্ঠাগুলি উল্টে উল্টে ভাবলাম— কবে এখানে কোনো দেশের ভিসার মোহর লাগাতে পারব!

সম্ভবত সেই মুহূর্তটি এসে আমার সামনে উপস্থিত হল।

লাউসে ভিসার জন্য অনলাইন আবেদন করা যায়। আমি সেই সুবিধা গ্রহণ করলাম। তিনটি কাজের দিনে তারা ভিসার কাজ করে দেয়। ভিসার জন্য আমাকে টাকার হিসেবে এগারো  হাজার ছশো আটানব্বই টাকা পঁচাশি পয়সা দিতে হল। টাকা জমা দেবার পরে কাজ এগুলো এবং আমি লাউস সরকারের কাছ থেকে তাদের দেশে প্রবেশ করার অনুমতিপত্র লাভ করলাম।

এখন আমার সামনে উত্থাপিত প্রশ্নটা হল লাউসের রাজধানী ভিয়েনটিয়েনে কীভাবে যাওয়া যায় । অর্থাৎ কোন পরিবহন ব্যবস্থায়। তার জন্য আমাকে দুটি কথায় মনোযোগ দিতে হল। প্রথম কথা হল কোন পরিবহন ব্যবস্থায় কম খরচে যাওয়া যেতে পারে। আর দ্বিতীয় কথাটা হল সময়। অবশ্য এটা ওটার পরিপূরক। সময় কম লাগলে খরচের মাত্রাও কম হতে দেখা যায়। আমি কলকাতা থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাবার সুবিধার বিষয়ে অনুসন্ধান করলাম । তিনটি বিমান পরিবহন সংস্থা কলকাতা থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। সেগুলি হল চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স, বিমান বাংলাদেশ এবং এয়ার ইন্ডিয়া।

চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমান কলকাতা থেকে কুনমিঙ এবং কুনমিঙ থেকে ভিয়েনটিয়েনে উড়ে যায়। একইভাবে ফেরার পথ আছে ভিয়েনটিয়েন থেকে নানিং, নানিং থেকে কুনমিঙ এবং কুনমিঙ হয়ে কলকাতা। কলকাতা থেকে কুনমিঙে সময় লাগে দুই ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট কুনমিঙ  থেকে ভিয়েনটিয়েনে মাত্র ত্ৰিশ মিনিট। অথচ গোটা যাত্রা পথে সময় লাগে বারো ঘন্টা ত্রিশ মিনিট। কারণ হল সকালবেলা পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে কুনমিঙ পৌছান আকাশযানটা কুনমিঙ ছাড়ে বিকেল দুটোয়। ফিরে আসতে সময় লাগে তেরো ঘণ্টা পাঁচ মিনিট। বিমানের টিকেটের জন্য খরচ পড়ে ছশো সাত দশমিক নয় এক ডলার অর্থাৎ চল্লিশ  হাজার তিনশো উনচল্লিশ টাকা একুশ পয়সা। বিমানটা কলকাতা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ব্যাংককে যায়। ব্যাংকক থেকে ভিয়েনটিয়েনে যাবার জন্য তারা থাই এয়ারওয়েজের বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেয়। যাবার সময় বিমান পরিবহন ব্যবস্থা সময় নেয় বাইশ ঘন্টা পঞ্চান্ন মিনিট। অবশ্য ফিরে আসার সময় যথেষ্ট কম সময় লাগে। মাত্র সাত ঘন্টা চল্লিশ  মিনিট।

খরচের দিক দিয়ে এয়ার ইন্ডিয়াৰ বিমানের রেট অনেকটা বেশি।সাতষট্টি দশমিক শূন্য পাঁচ ডলার। অর্থাৎ একান্ন হাজার একশ আঠাশ টাকা ষোলো পয়সা। তার কারণ আছে। কেননা বিমানটা কলকাতা থেকে মুম্বাই, মুম্বাই থেকে ব্যাংকক এবং ব্যাংকক থেকে ভিয়েনটিয়েনে যায়। সময় লাগে উনিশ ঘন্টা। এভাবে ফিরে আসে ভিয়েনটিয়েন থেকে ব্যাংকক, ব্যাংকক থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে কলকাতা আসে। সময় লাগে কুড়ি ঘন্টা পঁয়ত্ৰিশ মিনিট।

সমস্ত ভেবে শুনে আমি চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমানে ভিয়েনটিয়েনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।কুনমিঙ এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে হওয়ার সময়টুকুতে চাইনিজ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের চাল চলন দেখেই সময় কাটাব এবং বই পড়ব।কুনমিঙেৰ সঙ্গে পরাধীন অসমের ভালো যোগাযোগ ছিল। যোরহাটের ররৈয়া বিমানবন্দর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুনমিঙে নিয়মিত যুদ্ধবিমান এবং মাল বহনকারী বিমান চলাচল করত। সেই স্মৃতি স্মরণ করার জন্য কোনো বিমানবন্দরের অপেক্ষা গৃহ নিশ্চয় উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ভিয়েনটিয়েনে আসা যাওয়া টিকিটের ব্যবস্থা ও হয়ে গেল। তেরো আগস্ট যাত্রা আরম্ভ হবে এবং আঠারো আগস্ট যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে। তেৰো  থেকে আঠারো  আগস্ট পর্যন্ত সরকারি বন্ধ। তাই ষোল থেকে আঠাৰো  আগস্ট পর্যন্ত ছুটি নিতে হল। সমস্ত জোগাড় করে এখন যাত্রার দিনটির জন্য আমি অধীর ভাবে অপেক্ষা করছি। বিদেশের মাটিতে পা রাখার সুযোগ লাভ— এই কথাটাই আমাকে আহ্লাদিত করে রেখেছে।

বারো আগস্টের রাতের রাজধানী এক্সপ্রেস উঠে আমি তিনসুকিয়া থেকে গুয়াহাটি পৌছালাম। রেলস্টেশন থেকে সোজাসুজি গোপীনাথ বরদলৈ আন্তরাষ্ট্রীয় বিমানবন্দর। দশটার ইন্ডিগো বিমানে কলকাতা যাত্রার জন্য বিমানের টিকেট, লাওসের টিকেট কাটার দিন একসঙ্গে কেটে রেখেছিলাম। কলকাতা পৌঁছাতে এক ঘন্টার চেয়ে একটু বেশি সময় লাগল। এই এক ঘণ্টা সময় আমি প্রায় ঘুমিয়ে কাটালাম। রাতে ঘুম হয়নি বলে আমার সুন্দর ঘুম হল। বিমানটা টেক অফ করার সময় চাকার ঘর্ষণে আমি জেগে গেলাম।

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আমার বন্ধু সুদীপ্ত সে আমার সহপাঠী ছিল সেও ব্যাংকে চাকরি করে যদিও তার আর আমার ব্যাংকের শিরোনাম পৃথক। কলকাতায় যাব বলে তাকে জানানোয় সে বলল যে সেদিন যেহেতু তারও বন্ধ তাই দুপুরের আহার একসঙ্গে করতে চায়। সুদীর্ঘ  দিনের বিরতিতে আমার সঙ্গে তার দেখা হবে। মনের মধ্যে ভালো এবং খারাপের মিশ্রিত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। তার পরিবার-পরিজন আছে। তার বউ আমি কেন বিয়ে করিনি বলে জিজ্ঞেস করলে কি উত্তর দেব সেটা আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি। না হলে কখন ও কখন ও বড়ো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।

বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুখেই সুদীপ্ত আমার জন্য দাঁড়িয়েছিল। সে আমাকে দেখতে পেয়ে হাত তুলে দিল। আমি তার কাছে দৌড়ে যাবার মত করে গিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগটা মাটিতে রেখে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। এক মুহূর্তের মধ্যে আমি পড়াশোনা করা বিদ্যালয়টা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি তাকে ছেড়ে দিয়ে এবার তার হাত দুটি জড়িয়ে ধরলাম।

পরস্পরের খবরা-খবর সাধারণভাবে বিনিময় করে সে আমার ব্যাগটা নেবার ইচ্ছা জানাল।

— আরে ভাই তুই আমার বন্ধুহে, বন্ধু পাঠিয়ে দেওয়া গাড়ির চালক নয়!

একটার দিকে এগিয়ে দেওয়া হাতটা গুটিয়ে নিয়ে সে নির্দিষ্ট একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

— তোর গাড়ি?

আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম। মাথা নেড়ে বলল —হ্যাঁ।

— আরে বাবা খুব সুন্দর গাড়ি নিয়েছিস!

আমি তাকে খ্যাপানোর জন্য বললাম। হাতে থাকা রিমোট কন্ট্রোলে গাড়ির দরজা খুলে নিয়ে আমাকে সামনের আসনে বসতে বলল আরক্ষী আটক করা অতি অবাধ্য অপরাধীর মতো আমি গাড়িতে উঠলাম। আমার বেগটা সেই ডিকিতে ভরিয়ে নিল। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে কলকাতা মহানগর বেশ ভালোই দূর। এঁকেবেঁকে বিভিন্ন পথে এসে সে একটা বিশাল মাল্টি স্টোরিড বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপরে ডিকি থেকে আমার ব্যাগটা বের করে হাতে নিয়ে সে লিফটের জন্য এগিয়ে এল।

সুদীপ্তের ফ্লাটের বৈঠকখানাটাও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সুগৃহিনীর হাতের স্পর্শে লাবণ্য মধুর। ঘরে ঢুকে আমি চারপাশে চোখ বোলালাম। শীতল এবং মসৃণ কার্পেটে খালি পায়ে হেঁটে কোনো তারাখচিত  হোটেলের লনে হাঁটছি বলে মনে হল। আমাদের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে সুদীপ্তের ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

— নমস্কার বৌদি।

— নমস্কার।

সুদীপ্তের পত্নী সাবলীল অসমিয়ায় জিজ্ঞেস করলেন— আপনি ভালোভাবে এসেছেন? পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?

—হ‍্যাঁ, কোনোরকম অসুবিধা হয়নি ।ভালোভাবে পৌঁছে গেছি।

আমি সুদীপ্তের স্ত্রীর মুখ থেকে চোখ না সরিয়ে বললাম। সুদীপ্তও কথাটা নিয়ে মজা করছিল।

— এভাবে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছিস যে?

সুদীপ্তের বন্ধুত্ব সুলভ প্রশ্নটি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সুদীপ্তের পত্নীর সামনে নিয়ন্ত্রণ না হারানোর জন্য আমি বললাম— পত্নী বিষয়ক আমার কোনো ধারণা নেই। মুখের দিকে তাকিয়ে সেই ধারণা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

— তবে এর চেয়ে আর বেশি এগোস না।

— সুদীপ্ত তোর পুরোনো স্বভাবের আর বদল হল না।

এক ধরনের গর্জে উঠার মতো বললাম।

— বাঁদর যত বুড়ো হয় তত গাছের উপরে উঠে। আমরা মানুষরা বাঁদরের জাত, তাই বুড়ো হচ্ছি মানে ততই গাছের—

আমি সুদীপ্তকে আর কথা বলার সুযোগ দিতে চাইলাম না। আমাকে  কথার সুর বদল করার চেষ্টা করতে দেখে, সে তার পত্নীকে  আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।

— এই যে আমার স্ত্রী। একতারা সাহা।

— আমি জিজ্ঞেস করলাম একটা তাঁর নাকি একটা তারা। আচ্ছা এত সুন্দর অসমিয়া বলে যে?

সুদীপ্ত সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল— কেন বলবে না? গুয়াহাটির মেয়ে যে।

আপনারা বসুন ,আমি চা নিয়ে আসছি।

সুদীপ্তের স্ত্রী একতারা ভেতরে চলে গেল।

— ছেলেমেয়েরা?

— আমাদের দ্বিতীয় শনিবার বন্ধ, ওদের তো আর বন্ধ নেই।

আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।

সুদীপ্ত দেখিয়ে দেওয়া অনুসারে আমি হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। বাথরুমটাও বেশ সুন্দর। তারাখচিত হোটেলের বাথরুমের মতো। সুদীপ্তের গাড়ি– বাড়ি দেখে আমি কিন্তু নিজেকে একবারও প্রশ্ন করলাম না— আমি সারা জীবনে কী করলাম? এই প্রশ্নটি কখন ও আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হলে আমি উত্তরটা তৈরি করে রেখেছি— আমি শুরু করেছি মাত্র। এমন একটি কাজ যা দশের উপকার করতে পারে, হিতসাধন করতে পারে।

একতারা এনে দেওয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে আমাদের মধ্যে আরম্ভ হল স্মৃতি রোমন্থন। কোথা থেকে আরম্ভ হয়েছে আমাদের কথা কোথায় শেষ হয় আমরা দুজনে আন্দাজ করতেও পারলাম না। কত কথাই যে আমরা বললাম। সুদীপ্ত তার বিয়ের কথা বলল ।কর্মক্ষেত্রের কথা বলল ।বলল জীবনের বহু উত্থান এবং পতনের বহু অ-কথিত কাহিনি। একতারা আমাদের দুজনের জন্য দুপুরের আহার তৈরি করার সঙ্গে মাঝেমধ্যে এসে দুই পাঁচ মিনিট আমাদের সান্নিধ্যে কাটিয়ে যায়। মুখে সে কিছুই বলে না, কেবল আমাদের কথা শুনে যায়। একতারার মুখে হাসি আছে দেহের গঠনে আছে লাস্যময় ভঙ্গিমা। সুদীপ্তের কথা আর বলে লাভ নেই, মুখের কোনো লাগাম নেই কখন যে একতরার সামনে কী সব বলে দেবে ভেবে ভয় হয় । ভয় করার কী আছে , আমাকে অপ্রস্তুত অথবা বেকায়দায় ফেলার জন্য সে আগে থেকেই চেষ্টা করে থাকে। কেবল আমি তাকে সুযোগ না দিলেই হল।

সুদীপ্ত জিজ্ঞেস করল— উদয় এখনও সময় পার হয়ে যায় নি তুই বিয়ে টিয়ে করলি না, তবে এখন অন্য কোনো বিশেষ কাজে ব্যস্ত আছিস নাকি?

এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে আমার বেশ কিছু সময় লাগল। আমি এক দিক থেকে আদ্যোপান্ত বলে যেতে লাগলাম। আর একতারা গভীর মনোযোগের সঙ্গে আমার কথা শুনতে লাগল। আমি বলতে থাকা বিষয় সম্পর্কে সুদীপ্তের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। সেই জন্য সে অনেক কথা বুঝতে পারছিল না এবং আমাকে পরপর প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। আমি তাকে ছোটো ছোটো কথায় জবাব দিয়ে যাচ্ছিলাম। অনামিকার জীবনে এসে পড়ার দুর্ভাগ্যের প্রতি সে সহানুভূতি প্রকাশ করেও নিজের চরিত্রকে শোধরাতে না পারা সুদীপ্ত জিজ্ঞেস করতে ভুলল না — মহিলাটিকে দেখতে কেমন ?

একতারা সুদীপ্তের পিঠে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিল। নারীসুলভ সেই অভিব্যক্তিতে কি লুকিয়ে ছিল জানিনা, হয়তো সুদীপ্তের চরিত্রের কিছু ত্রুটি শুধরানোর ব্যর্থ চেষ্টা । আমি সুদীপ্তকে কোনো উত্তর দিইনি। এই ধরনের প্রশ্ন উত্তর দিতে আমি মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি। সুদীপ্ত জানে বলে এরকম প্রশ্ন আমাকে প্ৰায়ই করে ব্যতিব্যস্ত করে আমোদ লাভ করে। 

আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দুই চারটি কথা আমি সুদীপ্তকে জানালাম।। সে আমাকে শুভেচ্ছা জানালেও যদিও আমি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেবার ব্যাপারটাকে সে মোটেই সম্মতি জানাল না। তার মতে আমি চাকরি করে থাকা অবস্থাতেই সবার সেবা সমাজ সেবামূলক কাজ গুলি চালিয়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত। আমি সুদীপ্তের মনের ভাবকে সম্মান জানালাম এবং অবশেষে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেব না বলে তাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হল।

 তুই যেভাবে নিজের খেয়াল খুশি মতো কাজ করিস তোর কথা বলতে পারি না। তুই হঠাৎ চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিবি।তাই তুই আমার কাছে এই ধরনের শপথ খেতে হবে না।

--কোনোমতেই চাকরিটা ছাড়বেন না দাদা।

 একতারার কন্ঠে আবদার এবং  স্নেহ মিশ্রিত সুর।  বহুদিনের পরিচিত কোনো আত্মীয়ের আত্মিক দাবি। অবশেষে আমি পতি পত্নীর কাছে শপথ খেয়ে নিস্তার পেলাম। আমাকে যে মা কালীর নাম উচ্চারণ করে কানে ধরতে হল না, আমি অল্পতেই রক্ষা পেলাম বলে মনে হল।

 দুপুর বেলা একতারা অতি তৃপ্তিদায়ক খাবার রান্না করে আমাদের খাওয়াল। সরষে বাটা দিয়ে রান্না করা ইলিশ মাছ, আলু টমেটো দিয়ে  রান্না চিতল মাছ এবং লঙ্কা দিয়ে  রান্না করা স্থানীয় মুরগির মাংস। জুহা চালের ফুরফুরে গন্ধে ভাত খাওয়া ঘরটা ইতিমধ্যে ভরে উঠেছে।এইসব খাদ্য সম্ভার দিয়ে একবেলা খাওয়া আমার কাছে স্বপ্নেরও  অগোচর।

আমরা ভাত খাবার সময় একতারা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসার জন্য বিদ্যালয় গেল।

-- ছেলেমেয়েদের স্কুল কাছে নাকি?

 আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম।

 না তা নয়। পাঁচ কিলোমিটারের মতো দূরে। গাড়ি নিয়ে যাবে যখন এখনই চলে আসবে।

 সুদীপ্তের পত্নী একতারা রান্নাবান্না করে ছেলে মেয়েকে আনতে স্কুলে গেছে ভাব তেই আমার কেমন ভালো লেগে গেল। সুদীপ্ত প্রতিজন স্বামী আকাঙ্ক্ষা করার মতো কর্মদক্ষ সুপত্নী লাভ করেছে। খাওয়া-দাওয়া হওয়ার পরে সুদীপ্ত আমাকে শোবার জন্য বলল।

 -- রাতের ফ্লাইটে ঘুম নাও হতে পারে। সেজন্য একটু ঘুমিয়ে নে।

-- দিনে ঘুমালে বরং রাতে ঘুম আসবে না

  ফ্লাইটে দেওয়া একটা পেগ খেয়ে নিবি। তবে তুই তো আবার সে স্পর্শ করবি না। যা হওয়ার হবে, একটু রেস্ট নিয়ে নে।

 সুদীপ্তকে একটু অবসর দেওয়ার ইচ্ছায় আমি তাকে সম্মতি জানালাম এবং সে দেখিয়ে দেওয়া অতিথির জন্য ব্যবহৃত ঘরটাতে ঢুকে গেলাম। সুদীপ্ত ঘরে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির তাপমান ঠিক করে দিল। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কততে রাখবে।  আমি বললাম তোর ইচ্ছা। সে হয়তো ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেখেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরে সুদীপ্ত অতি ধীরে ধীরে ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে গেল। বিছানাতে শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুম এসে পড়ল। আমি বিছানার কাছেই থাকা সেদিনের হিন্দু কাগজটা মেলে ধরলাম এবং মূল খবরটাতে চোখ বোলাতে লাগলাম।

সুদীপ্ত আমাকে যখন জাগিয়ে দিল তখন কলকাতা মহানগরকে রাতের অন্ধকার ঘিরে ধরেছে। আমি মুখ হাত বেসিনের জলে ধুয়ে বৈঠকখানা ঘরে সুদীপ্তের কাছে বসলাম। একতারা ম্যাগি এবং কফি তৈরি করে সাজিয়ে টেবিলে রেখেছে।দুপুরের ভুরি-ভোজের পরে আমার খুব একটা ক্ষুধা ছিল না।আমি কেবল কফি খেলাম।একতারা আমাকে ম্যাখি খাওয়াবার জন্য  খুব চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমি রাজি হলাম না।

 সুদীপ্ত বিবিসির কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছে। মূল শীর্ষক খবরের পরে পরিবেশন করছে আবহাওয়ার খবর।

-- চিনে বৃষ্টি হতে পারে। চিনে হলে লাউসেও হবে।

-- হলে হবে। বৃষ্টি দিলে কী আর এমন বড়ো কথা হল ।

 চিনের বৃষ্টি নিয়ে সুদীপ্ত আমাকে এরকম একটা পাঠ পড়াতে চেষ্টা করল যেন আমি চিনের বৃষ্টিতে ভেসে গিয়ে সাগরে পড়ব। আমি জানি চিনের বৃষ্টির বদনাম রয়েছে। বৃষ্টি হলে দুর্যোগ না হয়ে থাকে না। পাহাড়ি লাউসে সেরকম হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমি সুদীপ্তকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম রাত বারোটা ত্রিশের সময় আমার ফ্লাইটের সিডিউল। এগারোটা ত্রিশে আমাকে বিমানবন্দর পৌঁছাতে হবে। আমি আটটার সময় সুদীপ্তকে বললাম-‘আমার সময় হয়েছে, আমি যাই।’

-- ‘পাগল হয়েছিস নাকি তুই? ভেবেছিস আমি প্লেনের সময় জানি না।ঠিক সময় মতো আমি পৌঁছে দেব তুই মিছামিছি এত ব্যস্ত হয়ে পরিস না।’

 সুদীপ্তের কথা শুনে আমি চুপ করে যেতে বাধ্য হলাম, কেননা একতারা সুদীপ্তের চেয়েও বেশি।

  ‘আপনি রাতের খাবার খেয়ে যাবেন।আমি বাজার করে এনেছি।’

 আমি বুঝতেই পারলাম না কোন ফাঁকে একতারা গিয়ে বাজার করে এনেছে ।সুদীপ্ত সত্যিই ভাগ্যবান পুরুষ। ছেলে মেয়েদের স্কুলথেকে আনা, বাজার করে এনে রান্নাবান্না করা ,এই বিদূষী  গৃহিণী সমস্ত কাজ নিজেই সমাপন করে। বেশ শক্তিমান এনার্জেটিক।

 সুদীপ্ত আমাকে এবার তার ব্যক্তিগত রুমে নিয়ে গেল। বাঃ এত সুন্দর! আমার অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল ।তারা চিহ্নিত একটি হোটেলের মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সমস্ত সুবিধা সংলগ্ন ।সে ঘরের শীতাতপ যন্ত্রটিকে নির্দিষ্ট ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ফ্যান চালিয়ে দিল। দুটো সুইচ দেওয়ার পরে ঘরটিতে মসৃণ রঙে সমুজ্জল  হয়ে পড়ল। আমি কোনো কল্পনা রাজ্যে বসবাস করা যেন অনুভব করতে লাগলাম।

  —তুই সত্যি মদ খাস না?

–উহু।

আমি সজোরে মাথা নাড়লাম।

 —মদ খাওয়া মানুষের সঙ্গে বসতে তোর আপত্তি আছে নাকি?

 —মোটেও নেই।যদি হে অদরকারী কথাগুলি আবোল-তাবোল ভাবে বকতে শুরু না করিস।

 —তুই কি সমস্ত মদ খাওয়া মানুষকে মদ্যপী বলে ভাবিস নাকি?

  —ভাবি না বলেই তো বসায় আপত্তি নেই বলে বললাম।

  কথা বলতে থাকার মধ্যে সে একটা সেলফ খুলল। সেলফটিতে  বিভিন্ন ধরনের কারুকাৰ্য খচিত  মদের  বোতল। তারই একটা বের করে এনে সে সেলফেই সাজিয়ে ৰাখা বিশেষ জায়গাটিতে রাখল। তারপরে এসে নিচের বড়োসড়ো একটি সেলফ খুলল।আসলে আমি সেলফ বলে ভুল করেছিলাম। সেটি একটি সুন্দর দেখতে ছোট্ট ফ্রিজ। সে ফ্রিজ থেকে জলের বোতল এবং একটি সোডার বোতল বের করে আনল। আমি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাকিয়ে থাকলাম। তার বোতল থেকে জল এবং সোডা মেশানোর প্রক্রিয়া দেখতে লাগলাম। মদের গ্লাসটিতে জল ঢালায় সৃষ্টি হওয়া রিমঝিম শব্দ আমাকে বেশ আকর্ষণ করল।

 গ্লাসটিতে আলগোছে জড়িয়ে ধরে সুদীপ্ত সেলফগুলির কাছ থেকে এসে আমার সামনে চেয়ারে বসল। একসঙ্গে পড়াশোনা  এবং চাকরি করা সুদীপ্তের ঐশ্বর্য দেখে আমি কিছুটা বিমুগ্ধ এবং কিছু পরিমাণে হতচকিত হয়ে পড়লাম। সত্যিই জীবন  মানুষকে কীভাবে গড়ে তোলে।মানুষের জীবনটা জলের চেয়েও তরল। যে ধরনের পরিবেশে রাখা যায় জীবনটা তার চেয়েও বেশি সেরকম পরিবেশে নিজেদের গড়ে নেয় ।

  গ্লাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে সুদীপ্ত নিজের জীবন-বীক্ষা আরম্ভ করল।

 —উদয়শংকর কী আছে জীবনটাতে ?কী আছে তুইও বলতে পারিস না ।আমিও পারিনা।

 সুদীপ্ত আমার দিকে এভাবে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমার মনে হল সে আমার কাছ থেকে উত্তর চাইছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে মৌন হয়ে থাকায় সে পুনরায় বলতে লাগল।

মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাবে। পরিবার নিয়ে ছেলেটি চাকরি করে দূরে থাকবে, যেভাবে আমি রয়েছি। কী করব তখন বুড়ো বুড়ি?যান্ত্রিক জীবনের এই পর্যায় আমাদের ইতিমধ্যে সমস্ত আত্মীয় কুটুম্ব থেকে দূরে নিয়ে এসেছে। সুদীপ্ত গ্লাসটাতে একটা দীর্ঘ চুমুক দিল। আমার হাতে উত্তর আছে কিন্তু আমি নিরুত্তর হয়ে রইলাম। সুদীপ্তের চোখে না পড়ার মতো করে আমি মনে মনে হাতের ঘড়িটার দিকে লক্ষ্য করছিলাম যদিও সে দেখতে পেল। তবে সময়ের প্রতি আমার লক্ষ্য করাকে গুরুত্ব দিল না।

-- তুই কিছুই বলছিস না যে?

 কী বলব সুদীপ্ত? আমরা একই পৃথিবীতে বসবাস করলেও আমরা দুজন দুটি  পৃথক পৃথিবীর বাসিন্দা। আমার ধারণার সঙ্গে তোর ধারণা সম্পূর্ণ পৃথক। আমি সঙ্গী চেয়ে প্রকৃতি এবং মানুষের কাছে যাই। আর তুই, আমার বলার দরকার নে্‌ই, তুই নিজেই জানিস তোর স্থান আর স্থিতি তোকে যেভাবে গড়ে তুলেছে তুই সেভাবেই  গড়ে উঠেছিস। তাই দুঃখ প্রকাশ করে লাভ নেই।আর যদি জীবনের কোনো বাঁকে দাঁড়িয়ে তুই নিজের পথের পরিবর্তন করতে চাস, প্রকৃতি আর মানুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চাস আমার ফোন নাম্বার তোর কাছে আছে। আমাকে ফোন করিস।

 কথার মধ্যে মাঝে মাঝে সুদীপ্ত হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে এবং মাঝেমধ্যে ঐশ্বর্যশালী পৃথিবীর একজন বাসিন্দা হয়ে  উল্লসিত হয়ে পড়ে।সুদীপ্ত গ্লাসে দ্বিতীয় পেগ ঢেলে নেয়নি। আমাকে রেখে এসে নাকি আরও দুটি পেগ নেবে একা একা। হতাশা এবং বর্ণহীন নিঃসঙ্গতাতাকে জড়িয়ে ঘুমানো মানে পুনরায় গতানুগতিক একটি দিনের শুরু।

-- চল একতারা ডাকছে।

 মোবাইল ফোনটার অনুজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে সুদীপ্ত বলল।

 আমি তার এই বাক্যগুলির জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলাম।

 ভাত খাওয়ার টেবিলে বিভিন্ন তরকারি এবং একজন মানুষের জন্য একটা থালা সাজানো ছিল। আমি সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে একা খেতে হবে।সে সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল--এই আর কি ।

 একা ভাতের থালায় বসতে যাওয়া আমার পক্ষে একটু সংকোচের ছিল। এক তারা আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল-‘ইনি আপনাকে রেখে এসে খাবে।’আমি আগেই বুঝতে পেরেছি যদিও একতারার কথায় আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। 

--এত কষ্ট করে এতগুলি--

-- কোথায় আর এত রেঁধেছি।

 একতারা ঢাকনায় দিয়ে রাখা থালাগালি থেকে একের পরে এক ঢাকনা সরাতে লাগল।

  থালাটা সামনে এনে আমি ভাতের থালাটা সাজিয়ে রাখা হাতাটা ভাতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। গরম বাসমতি চালের ভাতের গন্ধটা আমার নাকের ভিতরে ঢুকে গেল। মাংস এবং একটু তরকারি ভাতের ওপরে ঢেলে দিলাম। কাজুবাদাম, কিসমিস, মগজ এবং মসলা দিয়ে রান্না পাঁঠার মাংস। গন্ধ এবং স্বাদে মনে হল আমার ক্ষুধা আরও বেড়ে গেছে। শুধু ভাত এবং মাংস নিতে দেখে একতারা পনির, বিন এবং গাজর দিয়ে রান্না করা মিক্সড ভেজ এক হাতা আমার থালার কাছে সাজিয়ে রাখল। অন্য একটি থালা থেকে বেসন গোটা সর্ষে দিয়ে রাঁধা ক্যাপসিকামের বড়া দুটিও  খালার ওপরে রাখল। একতারা পুনরায় কিছু দিতে তৈরি হতেই আমি বললাম-- এত পারব না, দেবেন না।

 ভালো করে খেলে তবে আপনার ঘুম ভালো ঘুম হবে।গিয়েই ফ্লাইটে শুয়ে পড়বেন। অসুবিধা কোথায়?

 একতারার আন্তরিকতাকে বাধা দিতে না পারার জন্য পরিমাণের চেয়েও আমাকে বেশি করে খেতে হল। আমার বাধা না মেনে পুনরায় একহাতা মাংস অবশিষ্ট ভাতের ওপরে জোর করে ঢেলে দিল। ভাতও দিতে চেয়েছিল, হাত দুটি দিয়ে থালাটা ঢেকে ধরে কোনোমতে রক্ষা। নারীর সুলভ আন্তরিকতা একতারা কে আমার সামনে একজন অতিথি পরায়ন সুগৃহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।স্বামীর বন্ধুকে আপ্যায়ন করায় একতা্তারা কোনো ত্রুটি রাখেনি। এরকম একজন একতারা থাকার পরেও সুদীপ্ত নিঃসঙ্গ।

 একতারা এবং তার পরিচ্ছন্ন ঘর থেকে বিদায় নিতে  হওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাত্র একটা দিন অথচ এরকম মনে হলো যেন বহু দূর অতীত থেকে রক্ষা করে আসা বছর বছর ধরে রাখা  আন্তরিক সম্পর্ক। একতারা বিদায়ের সময় বারবার বলল --আবার আসবেন অনুগ্রহ করে। সম্পর্ক রক্ষা করবেন। ফিরে যাবার সময় পারলে চলে আসবেন।

 ফিরে আসার সময় আসা হবে না। আমি দুপুরবেলা কলকাতা পৌছাব আর এক ঘন্টা পরেই আমার গুয়াহাটির জন্য ফ্লাইট। তার মধ্যে সেদিন ব্যাংক খোলা থাকবে। সুদীপ্ত অসম্ভব ব্যস্ত থাকবে।

  একতারার কথায় মনে হল সম্ভবত সুদীপ্তের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে আসা আমি একমাত্র ব্যক্তি ।তাই মনের আশ মিটিয়ে একতারা নিজেই বাজার করেছে নিজেই রেঁধেছে এবং নিজেই আপ্যায়ন করেছে। মানুষের হৃদয়ে মনিকোঠায় সম্পর্ক রক্ষার জন্য আকাঙ্ক্ষা সঞ্চিত হয়ে থাকে। সেই আকাঙ্ক্ষাকে অবহেলা করলেই আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি আর হতাশাগ্রস্ত।

 সুভাষচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিদেশ উড়ানের মূল প্রবেশদ্বারে নামিয়ে সুদীপ্ত চলে গেল। যাবার সময় তার দুচোখ জলে ভরে উঠল বলে মনে হল।

 -সময় পেলে আসবি। কোথায় আসবি? তোকে আবার জীবনে দেখতে পাব কিনা?

 -পাবি। কেন পাবি না। তুই তোর বাড়ি দেখালি আমি একদিন তোকে আমার সমাজটা দেখাব।

ফিরে যাওয়া সুদীপ্তের দিকে অনেকক্ষণ আমি নিরন্তর তাকিয়ে রইলাম।। সে যাবার পরে তবেই আমার বিদেশ ভ্রমণের ঔৎসুক্য শুরু হল।

 







শনিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, প্রথম অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

......

তৃতীয় অধ্যায়

এক

রামমলের রান্না, বিলাস পাশোয়ানের লন্ড্রি, ব্যাংকের নির্দিষ্ট চেয়ারটা এবং আমার শোবার ঘরের নির্দিষ্ট বিছানাটার আবর্তে আমার জীবন চরকি থেকে একটা বছরের অধিক কাল অতিবাহিত হল। ব্যাংকের চাকরির হইচইয়ের মধ্যে পড়ে পাখিদের পাড়া-প্রতিবেশীর সবুজময় দিনগুলির কথা আমি প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে সুনন্দ ফোন করে, কাকা বাবু ফোন করে। ব্যাংকের ব্যস্ততার মধ্যে ফোন করলে নৈমিত্তিকভাবে তাদের প্রত্যুত্তর দিই। ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করি। তারা আমার খবর জিজ্ঞাসা করলে বলি–আমার খবরের সোম—শনি নেই। প্রতিদিন একই।

মাঝেমধ্যে সুনন্দ জিজ্ঞেস করে—- উদয়দা, কবে আসবে?

__ যাব দাঁড়াও। সময় করে উঠতে পারছি না।

__ আপনার সত্যিই আমাদের কথা মনে পড়ে কি?

আমি নিরুত্তর হয়ে যাই।

__ তোমাদের মনে পড়ে। কিন্তু আবার ভুলে যাই।

একদিন অপরিচিত একটা ফোন নাম্বার থেকে একটি অপরিচিত মেয়ের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

__ দাদা। আপনি ভালো আছেন?

__ হ্যাঁ ভালো আছি। আমি অতি সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।

__ দাদা।আমাদের আপনার একেবারে মনে পড়ে না?

__পড়ে কিন্তু—-

আমাদের কথা মনে পড়ে বলছেন যে বলুন তো আমি কে?

আমি একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম।

__ তুমি আমাদের প্রকৃতি শিবিরে অংশগ্রহণ করেছিলে না।

__ করেছিলাম।আমি জ্যোতিমালা।

__নামটি শোনা শোনা বলে মনে হচ্ছে।

__কী বলছেন দাদা আপনি? আমাদের সত্যিই ভুলে গেলেন। আমি সুনন্দদার বোন।

__ তুই যে ফোন করতে পারার মতো আজকাল লজ্জা থেকে মুক্ত হলি, সাহস গোটাতে পাড়ার মতো হলি আমি কীভাবে জানব।

__ সেই জন্যই আপনার এখানে একবার আসা উচিত।আসুন আবার।

__ যাচ্ছি দাঁড়া, লজ্জাশীলা মেয়েটি যে নির্লজ্জ হলি, কথায় পটু হলি সেটাই দেখতে যেতে হবে।

কাকাবাবু বহুদিন খবর নেয়নি। আমিও নিই নি। ভুলে গেলে ভুলে যাওয়াটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে যায়। মাঝেমধ্যে মনে পড়ে, ভাবি ফোন করব পরে আবার কাজের চাপে ভুলে যাই। একদিন কাকাবাবুর ফোন পেলাম। কাকাবাবু ফোনে বলা কথাগুলি ছিল প্রশ্নবোধক, ক্ষোভ উপহাস এবং তাচ্ছিল্যের  মিশ্রণ।

— তুমি যদি ছেলে মেয়েদের একটা গতি করে দিতে না পার ওদের সময় নষ্ট করলে কেন? ওদের মনে নেশা ধরিয়ে মাঝপথে ছেড়ে দিলে  হবে! 

— কাকাবাবু।

— কথাটা এরকম নয়। তুমি এখানে আসার পর ছেলে মেয়েদের মনের পরিবর্তন হয়েছিল। ওরা তোমাকে অবলম্বন করে সমাজের উন্নতিকল্পে কিছু একটা করার হয়তো আশা করেছিল।

— কাকাবাবু আমাকে বলতে দেবেন?

— বল। বল।

— আমি কী করব তার পরিকল্পনার জন্য সময় দিতে হচ্ছে। সমস্ত প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ। আমি বৈশাখ মাসের বিহুর আগে উপস্থিত হব।

কাকাবাবু আমার কথায় সায় দিলেন এবং এভাবে বলার জন্য কিছু  মনে না করতে অনুরোধ করলেন। আমি বুঝতে পারি আন্তরিকতার মাত্রাধিক‍্যতার জন্য বিভিন্ন জন অত্যধিক উষ্মার সঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করে। জ্যোতিষের মৃত্যুর পরে কাকাবাবুর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। পুত্র শোকে জর্জরিত হয়ে মানুষটির মনের গঠনের কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকে যদি আমি দূর থেকে অনুমান করতে পারিনি। বৃদ্ধ অবস্থাও কাকাবাবুর ওপরে আধিপত্য স্থাপন করতে পারে। আমি জানিনা।

— আমি শুনেছি গুলির শব্দ এবং চিতার আগুন বকগুলির অনিষ্ট করার জন্য তুমি নাকি খারাপ পেয়েছ এবং সেই জন্যই তুমি আসছ না। সত্যি নাকি?

কাকাবাবু আমাকে আক্রমণ করছে না আমার কাছ থেকে সত্য কথা জানার প্রয়াস করছে আমি বুঝতে পারলাম না। তবুও আমি কাকাবাবুকে বললাম—

— কথাটা এরকম নয় কাকাবাবু। আপনাদের মধ্যে এভাবে যদি আলোচনা হয়ে থাকে আপনারা তাহলে আমার প্রতি অন্যায় করেছেন। বকগুলির অনিষ্ট হওয়ার জন্য আমার খারাপ লেগেছে। সে কথা সত্যি। কিন্তু চিতার স্থান নির্বাচন করার সময় আমি প্রতিবাদ করিনি। যেহেতু আমি সঠিক পথের সন্ধান দিলাম না বা দিতে পারলাম না এখন আমি তার জন্য আপনাদের ওপরে অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না। আমি বলার পরে আপনারা যদি আমার কথা না রাখতেন তাহলে হয়তো খারাপ পাওয়ার অবকাশ থাকতো।

আমি বুঝতে পারলাম না, আমার কথায় কাকাবাবুকে কতটা সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। কিন্তু আমার অনুপস্থিতির বিষয়ে তাদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের কথা চর্চা হয়েছে বলে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। সেটা নঞর্থক হলেও আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আমার অনুপস্থিতি তারা অনুভব করেছে সেটা আমি ভালোভাবে উপলব্ধি করছি। আমার কাছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আসলে তারা আমার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাটা আমিও চেয়েছিলাম। সামাজিক কাজ করতে গিয়ে নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে নেতৃত্ব আদর্শের সঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব অনুভব করে।

এই সময়ে নবজিৎ বর্মন, প্রণব কুমার ভাগবতী, জ্যোতিপ্রসাদ মানে জেপি, কীচক প্রত্যেকের কাছ থেকে আমি ফোন পেয়েছি। প্রত্যেকেই আমার সঙ্গে একত্রে কাজ করার আশা পোষণ করেছে। আমি কেন দূরে সরে গেছি তার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি তরুণদের আগ্রহকে পথ দেখানোর প্রয়োজন আছে। তারা প্রকৃতি শিবির অনুষ্ঠিত করার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছে। তারা প্রকৃতি শিবিরে নতুন নতুন বিষয় সন্নিবিষ্ট করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।আমি তাদের অনুরোধ এবং আগ্রহকে উপেক্ষা করতে চাই না। প্রকৃতির সংরক্ষণের ভিত বরকুরিহা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে,সেই ভিতে আবর্জনা জন্মাতে দিলে অন্যায় করা হবে।

তাদের আমি কীভাবে বলি হজরত মহম্মদকে বুড়ির নাতিকে চিনি খেতে বাধা দেওয়ার আগে নিজেও মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করার জন্য সময় নিতে হয়েছিল। গত একটি বছরে আমিও চেষ্টার ত্রুটি করিনি প্রতিমাসের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শনি এবং রবিবার বন্ধের সুবিধা নিয়ে আমি অসমের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি।ডিব্রু-চৈখোয়ার গুঁইজান ঘাটে গিয়েছি, অভয়া পুরীর আস্থায় গিয়েছি। চক্রশীলা পাহাড়ে গ্রামবাসী স্থাপন করা পর্যটন ব্যবস্থার খবরা-খবর নিয়ে এসেছি। পর্যটক দেখার জন্য মাজুলি গিয়েছি । তাদের জিজ্ঞাসা করেছি তারা কী ভালোবাসে। সুনন্দকে বলি — আমি মাজুলিতে এসেছি দাঁড়াও । সে জিজ্ঞেস করে — বেড়াতে ?  আমি তার মন্তব্যে সায় দিই। তাকে বলিনি তোমাদের জন্য আমি রাতের পর রাত ঘুমের ক্ষতি করে নাইট সুপার এবং রেলে ভ্রমণ করেছি। পুত্র শোকে বিষাদগ্রস্ত কাকাবাবুকে এই সমস্ত কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করি না। কখনও যাত্রা পথে সৌম্যদা  থাকে আমার সঙ্গে। তিনিই আমাকে বিভিন্ন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন— বেনুদাকে বল আমি তোমাকে পাঠিয়েছি। তিনি তোমাকে সমস্ত রকম ভাবে সাহায্য করবেন। শৈলেশ চৌধুরীকে বল— আমি তোমাকে তার কাছে পাঠিয়েছি। যা জানতে চাও তাকে ভালো করে জিজ্ঞেস করে নিও। তিনি তোমাকে নিশ্চয় সাহায্য করবেন। মাজুলি গড়মুরের রজনী বরদলৈকে আমি আগে থেকেই জানি। মাজুলি গেলে রজনী আমাকে সাহায্য করে। রজনীর গড়মড়ে একটি স্থানীয় কাপড়ের দোকান আছে। সেখানে আগত বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুবিধা রজনী করে দেয়। রজনীর দোকানে আসা বেশিরভাগ পর্যটক ফ্রান্সের। তারা কী ভালোবাসে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি। তারা চায় তারা বেড়াতে আসা জায়গাটা পৃথিবীর ভেতরে অনন্য হোক। পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর সেরকম পর্যটন স্থান না থাকাটা তাদের কাম্য।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সেরকম একঝাঁক স্বপ্ন মনের মধ্যে পুষে রেখেছি। বাস্তবে প্রতিফলিত করতে পারার মতো আমার পরিকল্পনা পূর্ণতা প্রাপ্তি না পাওয়ার জন্য আমি আমার পরিকল্পনার বিষয়ে বনকুরিহা পরিবারের কাছে ব্যক্ত করতে পারিনি। বলতে পারিনি সুন্দকে, নবজিত বৈশ্যকে, কীচককে, জেপিকে, বলতে পারিনি শিবিরে অংশগ্রহণ করা প্রকৃতি কর্মীদের, যারা আমাকে আন্তরিকতার সঙ্গে ফোন করে তাদের। আমি মানুষগুলিকে যে রকম বুঝেছি সেভাবে আমার পরিকল্পনার মানচিত্রটি সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছি । মানুষ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণাধীন । পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে আমার কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত করতে হলেও আমি নির্দিষ্ট গতি পথ থেকে  বিচ্যুত হই না। আমি আমার কাছে ইতিমধ্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নিয়েছি। সমগ্র পরিকল্পনাটা ছকে নিয়ে দুটি বিষয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত আমার মনে হয়েছে।১) অরণ্য গাঁও এবং ২) প্রকৃতি পর্যটন। জানিনা বিষয় দুটিতে আমি কতটা সফল হতে পারব।

অরণ্যগাঁও বা ভিলেজ ফরেস্ট্রির কথা আমার মনে এসেছিল সুনন্দের সঙ্গে গ্রামটির এক প্রান্ত থেকেও অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর প্রথম দিনটিতে। ভায়োলেট যে শীতার্ত  সকালবেলা প্রচন্ড শীতকেও অবজ্ঞা করে কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে কাঁচা মাটি র মেঝে মুছছিল , সেই দিনটিতে।

অরণ্যের মধ্যে বা অভয়ারণ্যের মাঝখানে গ্রাম থাকার খবর আমি পাই। ডিব্রু চৈখোয়া অভয়ারণ্যের মধ্যে লাইকা এবং দুধিয়া নামের গ্রাম দুটি থাকার কথা আমি জানি। মাঝেমধ্যে সেই গ্রামগুলিকে নিয়ে হুলস্থূল হতেও শুনেছি। গ্রাম কয়টি উচ্ছেদ করার জন্য কোনো কোনো প্রকৃতি কর্মী দাবী জানিয়ে আসার বিপরীতে কোনো কোনো প্রকৃতি কর্মী গ্রামবাসীর ওপরে অরণ‍্য সুরক্ষার দায়-দায়িত্ব অর্পণ করার কথা বলে। নিজের দাবির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। কখনও কেউ বিপরীত পক্ষের যুক্তি শোনে না আর শুনলেও মেনে চলে না।

অরণ‍্যের মধ্যে গ্রাম থাকার মতো গ্রামটিকে যদি অরণ‍্যে রূপান্তরিত করতে পারা যায়— ধারণাটি আমার মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি উৎফুল্ল হয়ে পড়লাম। ধারণাটিকে কীভাবে বিস্তৃত করা যায় অহরহ আমার মনে সেই চিন্তা খোঁচাতে লাগল। গ্রাম অরণ্যের পরিষ্কার ছবি একটি মনে এঁকে নিতে পারছিলাম না বলে সুনন্দ এমনকি সৌম্যদাকেও আমি আমার ধারণার বিষয়ে বলতে পারছিলাম না। আমি শুধু ভেবে নিয়েছিলাম গ্রামবাসীর সহযোগে এই গ্রামে একটি সুন্দর অরণ্য গড়ে উঠতে পারে।। অরণ্যটিই মানুষগুলির জন্য জীবন জীবিকা হতে পারে। তারা গাছপালা রোপণ করবে, প্রতিপালন করবে সেটা হবে তাদের সম্পত্তি। ফলের গাছ লাগাবে, উৎপাদন তাদের ব্যবসায়িকভাবে লাভান্বিত করবে। গাছ তাদের ছায়া দেবে, শুকনো ডাল পাতা  তাদের  ইন্ধন যোগাবে, গাছ তাদের কাঠ দেবে আর গ্রামের অরণ্যের পরিবেশ আমাদের প্রত্যেকের জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত করবে । তার জন্য আমাদের পদ্ধতিগতভাবে এগোতে হবে। গ্রামবাসীকে সজাগ করতে হবে। গাছ রোপণের জন্য অনুপ্রাণিত করতে হবে। গ্রামবাসীর জন্য প্রশিক্ষণ এবং সজাগতার ব্যবস্থা করতে হবে। সমুজ্জল হয়ে বেরিয়ে আসা গ্রামবাসী সৃষ্টি করবে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ এবং বিরল উদাহরণ সেই গ্রাম অরণ‍্যের ওপরে ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। আমার দ্বিতীয় চিন্তা প্রকৃতি পর্যটন। দেশি এবং বিদেশি পর্যটক আসবে, গ্রাম অরণ‍্যের মধ্যে জীবনের কয়েক দিন অতিবাহিত করবে, সবুজ খুঁজে পাবে, পাখির কাকলির মধ্যে জীবনের হারানো ছন্দ ফিরে পাবে। মন মগজের কোনো ক্ষতস্থান হয়ে পড়বে সুস্থ। তারা নগর মহানগর থেকে আসা মানুষ। গ্রামবাসীর সঙ্গে মনের কথা বলবে, হাসবে, নাচতেও পারবে। আমাদের স্থানীয় খাদ্যে জিহ্বার স্বাদ পরিবর্তন করবে, নুন তেল মিশ্রিত করে আলু মাখা যে খাওয়া যায়  আমাদের কাছ থেকে শিখবে। ঢেকিয়া ভেজে খাওয়া যায়, খার খেলে যে পরিপাক প্রক্রিয়া সুষময়, কলার মোচার তরকারি যে আহারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে — আমি ধীরে ধীরে অতি বেশি কাল্পনিক হয়ে উঠতে থাকলাম ।

আমি ভেবেছিলাম অরণ্য গ্রামের কথা ভাবা আমিই প্রথমজন ব্যক্তি। একটি গ্রামে অরণ্যের প্রসার এবং প্রচার করে গ্রামটিকে অরণ্যে পরিবর্তন করতে যাওয়া আমিই একমাত্র ব্যক্তি। পৃথিবীর কোথাও কোনো অরণ্য গ্রামের ধারণা ভেবেছে নাকি জানার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রথমে আমি বেশ স্তম্ভিত  হলাম এবং তারপরে অনুপ্রাণিত। আমার ধারণার সঙ্গে পার্থক্য থাকলেও আমি তাদের বিষয়ে জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু কী আশ্চর্য আমার চিন্তার সঙ্গে কীভাবে অভিনব সাদৃশ্য থাকতে পারে! কথার সঙ্গে কথার মিল থাকে। অজান্তে চিন্তার মিল হয়তো সম্ভব হতে পারে– আর সেটাই আচম্বিতে আমার ক্ষেত্রে ঘটল।

অরণ্য গ্রামের সম্ভেদের খোঁজে আমি গ্রন্থের পরে গ্রন্থ অনুসন্ধান করতে লাগলাম । প্রকৃতি বিষয়ক গ্রন্থ পেলে প্রথমেই দেখি অরণ্য গ্রামের কথা, কোথাও কিছু পাই নাকি। উহু কোথাও পাইনি। অরণ্যের মধ্যে গ্রাম থাকার কথা পড়তে পাই। নেপালে আছে ।আফ্রিকার দেশে আছে। কিন্তু গ্রামটিকে অরণ্যে পরিবর্তিত করার কথা কোথাও পাই না তো দেখছি। আমি সেরকম ধারণা সৃষ্টি করা প্রথমজন ব্যক্তি হিসেবে আত্মসন্তোষ লাভ করতে লাগলাম।

আমার চিন্তায় যতি পড়তে বেশি সময় লাগল না। আমি পৃথিবীর একটি দেশের বিষয়ে পড়তে পেলাম যে দেশে অরণ‍্য গ্রামের ধারণা আছে। ছোটো একটি দেশ। নাম 'লাও পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক',লাওচ। তারা গত শতকের ৯৫ সনে ফিনল্যান্ড সরকার এবং এবং বিশ্বব্যাংকের সাহায্যে গ্রাম অরণ্যের ধারণায় কাজ করতে শুরু করেছে। তাদের জন্য অরণ্য গ্রাম স্থানীয় গ্রামবাসী এবং বনবিভাগের স্থানীয় অফিসারের মধ্যে অরণ্য সম্পদকে সুপরিকল্পিতভাবে উৎপাদনমুখীতার সঙ্গে ব্যবহার করার এক কৌশল।

বিষয়টির অভ্যন্তরে আমি এতই নিমজ্জিত হয়ে পড়লাম যে আমি লাউসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। একজন প্রকৃতি পর্যটক হিসেবে আমি লাউসের অরণ্য গ্রামের বিষয়ে যতটা পারি অধ্যয়ন করতে চেষ্টা করব।

সৌম্যদা এবং সুনন্দকে আমি এই বিষয়ে জানালাম না। জানালাম না কেন জানাবার ইচ্ছা হল না। হয়তো পাশের পরীক্ষার্থী নিজের খাতাটা প্রশ্ন দিয়ে ঢেকে রাখার মতো প্রবণতা আমার ওপরেও কাজ করল। ভাবলাম– এসে সমস্ত কথা বলব।


৩ // ১


রবিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ১৩ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

পাখিদের পাড়া পড়শী- ১৩

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




দ্বিতীয় অধ্যায়, পাখিদের পাড়া- পড়োশী


(১৩)


সৌম্যদা স্লাইড ব্যবহার করার ফলে প্রণব কুমার ভাগবতীর সুবিধা হল।

আজ শিবিরের দ্বিতীয় দিনের কার্যসূচিতে সে প্রজাপতির বিষয়ে বলবে। নির্দিষ্ট সময়ে সকাল ন'টার সময় প্রত্যেকেই এসে গঙ্গাপুকুরি হাইস্কুলের হল ঘরে মিলিত হয়েছে। জেনারেটর চালানো ছেলেটি জেনারেটারটা অতিরিক্ত ঠান্ডার জন্য স্টার্ট করতে পারছে না। অবশেষে কষ্ট করে লড়াই করে করে ছেলেটি জেনারেটরটা স্টার্ট করতে সক্ষম হল। বিদ্যুৎ যোগান অব্যাহত ছিল যদিও ছেলেটি সাবধানতা অবলম্বন করল। সৌম্যদাকে সামনে বসে থাকতে দেখে প্রণব কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। প্রণব মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র পড়ায়। নির্দিষ্ট ক্রমণিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে  থাকা পাঠক্রম। এই শিবিরে তারা প্রকৃতির বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর পাঠক্রম নির্ধারিত নয়। প্রতিদিন নতুন নতুন আবিষ্কার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমকে শক্তিশালী করে এসেছে। সেই জন্য সামনে অজস্র প্রশ্ন। হয়তো সেরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর প্রণবের অবগত নয়, সৌম্যদার সামনে মানসে  অনুষ্ঠিত হওয়া প্রকৃতি শিবিরের স্মৃতি প্রণবের মনে পড়ল। মনের মধ্যে দ্বিধা থাকায় কিছু কথা সে সেখানে স্পষ্টভাবে বলতে পারেনি।আজও যদি তার কোথাও ভুল হয়ে যায় সৌম্যদা কী ভাববে? কিছুই ভাববে না। প্রণব শিবিরে বক্তব্য রাখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে তৈরি হল। হাতে আনা পেন ড্রাইভটা উদয়শঙ্করের হাতে দিয়ে বলল – এটা নিন। বাটারফ্লাই নামের ফাইলটা পাওয়ার পয়েন্টে আছে। সেটা বের করে দিলেই হবে।শিবিরের শুরুতে উদয়শঙ্কর প্রণবকে অংশগ্রহণকারী প্রকৃতিপ্রেমীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল- ইনি আমাদের মধ্যে ডঃ প্রণবকুমার ভাগবতী। মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অসমিয়া পড়ান। গবেষণা করেছেন নদী বিষয়ক অসমিয়া উপন্যাস নিয়ে। তাছাড়া ইনি পাখি এবং প্রজাপতির ওপর অধ্যয়ন করছেন। আমাদের মধ্যে উপস্থিত হওয়া প্রণব কুমার ভাগবতী আজ তোমাদের প্রজাপতির বিষয়ে সম‍্যক জ্ঞান দিতে প্রয়াস করবেন।

অসমিয়া ভাষার প্রবক্তা দেখতে উচুঁ-লম্বা। যথেষ্ট ক্ষীণ। দুই চোখে অধ্যয়নপুষ্টতার উজ্জ্বলতা। চুল একদিকে করে আঁচড়ানো, প্রণবের গোঁফ বা মোচ বেশ আকর্ষণীয়। প্রজাপতির দুটো মেলে দেওয়া ডানার মতো। সেই জন্য প্রণবের মুখটা চট করে মনে রাখতে পারার মতো। পরনে সবুজ রঙের লং প্যান্ট এবং শার্ট। হাতে নিয়ে আসা ক্যামেরাটা প্রজেক্টর রাখা টেবিলের ওপর রেখে প্রণব আরম্ভ করল– এই ধরনের শিবিরে প্রজাপতির বিষয়ে বলার অভিজ্ঞতা আমার প্রায় নেই বললেই হয়। তাই আমি জানিনা সৌম্যদা আমি কী বলব,কীভাবে বলব।

প্রণব সৌম্যদার উদ্দেশ্যে বলা কথার প্রত্যুত্তরে সৌম‍্যদা বলল – প্রণব তুমি আরম্ভই করনি এভাবে কেন ভাবলে । মানসেও তুমি একই কথা বলেছিলে। প্রজাপতি আমাদের অংশগ্রহণকারীদের কাছে প্রায় নতুন কথা। প্রজাপতিও যে অধ্যয়নের বিষয় হতে পারে সে কথা অনেকের কাছেই অজ্ঞাত। তাই তুমি সুন্দরভাবে বলে যাও।

প্রণব প্রজেক্টর রাখা টেবিলটার কাছে এল। সে কিবোর্ডে এন্টার বাটন চাপার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম স্লাইডে লেখা ' ওয়েলকাম' শব্দটি উঁকি দিল। নিচে প্রণবের নামটা ডঃ প্রণব কুমার ভাগবতী।শ্লাইডটিতে  বিভিন্ন প্রজাতির কয়েকটি উড়তে থাকা প্রজাপতি সন্নিবিষ্ট  করা হয়েছে। প্রজাপতি গুলিকে ছোটো ছোটো আকৃতিতে সাজানো হয়েছে বলে দেখতে ভালো লাগছে। ভ্রাম্যমান থিয়েটারের' নেম কাস্টিং' এর মতো। প্রণব পরবর্তী শ্লাইডে স্ক্রিন প্রক্ষেপ করে নিজের বক্তব্য শুরু করল। 

– প্রজাপতির বর্গীকরণ প্রক্রিয়ায় শুরু করি আসুন। তার আগে তোমাদের জানিয়ে রাখি– প্রজাপতির অধ্যয়নকে বলা হয় লেপিড'পটেরোলজি আর যারা প্রজাপতি পর্যবেক্ষণ এবং অধ্যয়ন করে তাদেরকে বলা হয় লেপিড'পটেরিস্ট। সমগ্র পৃথিবীতে প্রজাপতির আঠারো হাজার প্রজাতি আছে। ভারতে থাকা প্রজাপতির প্রজাতির সংখ্যা হল এক হাজার পাঁচশো এক।

অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি প্রণবের মুখমন্ডল এবং অঙ্গভঙ্গির উপরে প্রসারিত হয়েছে। প্রত্যেকেই একান্ত মনে প্রণবের প্রজাপতি সম্পর্কীয় ব্যাখ্যা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ার মতো দেখাচ্ছে। সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়ের সঙ্গে আজ তাদের পরিচয় ঘটবে।

– প্রজাপতি 'এনিমেল কিংডম' প্রাণীজগতের অন্তর্ভুক্ত। তোমরা ইচ্ছা করলেই লিখে নিতে পার। তোমরা প্রায়  সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোটো বলে মনে হচ্ছে তাই তুমি বলেই সম্বোধন করব। প্রণব অংশগ্রহণকারীদের  প্রতিক্রিয়ার প্রতি মনোনিবেশ না করে বলতে শুরু করল।

–প্রজাপতি আর্থ'প্রডা পর্ব বা ফাইলামের অন্তর্ভুক্ত । ফেনী বা ক্লাস ইনছো , গোত্র বা লেপিড'পটেরা, উপগোত্র বা সাব অর্ডার রোপালোচেরা অতি বর্গ বা সুপার ফ্যামিলি পেপিলিঅ'নৈইডে।এই অতিবর্গের অধীনে কয়েকটি বর্গ বা ফ্যামিলি আছে প্রথমটি বর্গের  নাম পেপিলিঅ'নৈইডে। এই বর্গের প্রজাপতির সমূহকে 'সোয়ালো টেইলস এণ্ড প্রজাপতি বলে বলা হয় । প্রজাপতির সমূহ আকৃতিতে বড়ো এবং ঠেং সম্পূর্ণ উন্নত। এই বর্গের দুটি উপবর্গ এবং পৃথিবী জুড়ে এই বর্গে ১০৭ টা প্রজাতি বা স্পেসিজ  আছে। অন্য একটি বর্গ পাইরেডে। এই বর্গের প্রজাপতি সমূহকে 'হোয়াইট স এণ্ড ইয়েলো' প্রজাপতি বলে জানা যায় । এই বর্গের কোনো উপবর্গ নেই। প্রজাতির সংখ্যা ১০৯ টা। পাইরেডে বর্গের  প্রজাপতি সমূহের সমস্ত ঠেং কর্মক্ষম। অন্য একটি বর্গ নিমফেলাইডে। এই বর্গের  প্রজাপতিকে ' ব্রাছ ফুটেড প্রজাপতি' বলে জানা যায়। এই বর্গের উপবর্গের সংখ্যা ১০ টি ।নিমফেলাইডে বর্গে অন্তর্ভুক্ত প্রজাতির সংখ্যা হল পাঁচশো বাইশ। এই ধরনের  প্রজাপতি সামনের ঠেং  সমূহের দ্বারা হাঁটতে পারে না । পুরুষ প্রজাপতির ক্ষেত্রে দুর্বল ঠেংগুলি ব্রাশের মতো দেখায়। অন্য একটি বর্গ লিসেনাইডে।এই বর্গের প্রজাপতিকে ' ব্লুজ' প্রজাপতি বলে জানা যায়। এই বর্গের উপ-বর্গের সংখ্যা আটটি এবং প্রজাতির সংখ্যা ৪৪৩ টি। এই বর্গের প্রজাপতিদের সমস্ত ঠেং কার্যক্রম।সম্প্রতি 'রিঅ'ডিনাইডে বর্গকে লিসেনাইডে বর্গ থেকে পৃথক করা হয়েছে এবং প্রজাপতি সমূহকে ' পাঞ্চেস অ্যান্ড জুডিস ' প্রজাপতি বলে বলা হয়।লিসেনাইডে বর্গের হেসপেরিওডে নামে একটি অতি বর্গ আছে ।

প্রজাপতির বর্গীকরণের ওপরে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করে প্রণব শ্লাইডটা বদলে নিল এবং প্রকৃতি কর্মীদের দিকে লক্ষ্য করল। শ্লাইডটা ইংরেজিতে লেখা বর্গীকরণের ভাগ গুলি প্রণব অসমিয়াতে বলায় অংশগ্রহণকারীরা বুঝতে যথেষ্ট সুবিধে জনক হল পাইলাম বা অর্ডার বলে বললে তাদের মাঝখানের অনেকেই বুঝতে পারত না। প্রণব এইমাত্র পরিবর্তন করা শ্লাইডটিতে একটা প্রজাপতি এবং প্রজাপতিটার বিভিন্ন অঙ্গের নাম তীর চিহ্নের দ্বারা অঙ্কিত করে দেখানো হয়েছে।

– তোমরা দেখতে পাওয়া শ্লাইডটিতে এটা প্রজাপতির দেহাবয়ব বা এনাটমি। প্রজাপতির দেহাবয়ব মাথা এবং ১৩টা খন্ড বা সেগমেন্টের দ্বারা গঠিত। এই খন্ডগুলি বাহ্যিকভাবে সহজে দেখতে পাওয়া যায় না। এই পতঙ্গগুলির শরীর মুখ‍্যত  তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। শির, বক্ষ এবং উদর। শির ভাগে আছে একজোড়া এন্টেনা একজোড়া চোখ, দীর্ঘ নলের আকৃতি একটা প্রব'ছকিছ এবং একজোড়া সংবেদনশীল পালপস। এন্টেনার সাহায্যে প্রজাপতি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কী ধরনের তার সন্ধান করতে পারে। প্রজাপতির চোখ দৃষ্টিশক্তির জন্য ব্যবহৃত হয়। উড়ন্ত অবস্থায় মানুষের চোখের চেয়ে প্রজাপতির চোখ প্রায় তিনগুণ বেশি শক্তিশালী। প্রব'চকিছের সাহায্যে প্রজাপতি খাদ্য হিসেবে ফুল থেকে মধু শোষণ করে। অব্যবহৃত অবস্থায় প্রজাপতি প্রবছকিছ নামের অঙ্গটা সংকুচিত করে রাখতে পারে এবং প্রয়োজনে বের করে দেয়। সেভাবে পেড বা পালপসের সাহায্যে প্রজাপতি সংবেদন গ্রহণ করতে পারে। প্রজাপতির বক্ষ ভাগ তিনটি খন্ডে সংযুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে। প্রতিটি খন্ডে এক জোড়া করে ঠেং আছে, প্রথম দুটো খন্ডে এক জোড়া করে পাখনা আছে। পাখনার সামনের দিকটাকে সামনের পাখনা ফর উইং এবং পেছনের ভাগকে পুচ্ছ পাখনা, হাইন্ড উইংস হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রজাপতির ছয়টি ঠেং ছয় অংশে  ভাগ করা হয়েছে। সেই ভাগ গুলি তোমাদের খুব একটা প্রয়োজন নেই।

– বলুন স্যার। লিখে নিই, কখনও প্রয়োজন হতে পারে।

উৎসুক অংশগ্রহণকারী বিপাশা বলল।

– তাহলে লেখ। প্রজাপতির ঠেং ছয় অংশে  বিভক্ত, সেই ছয়টি অংশ ক্রমে কা, ট্রকেনটার ,ফিমার, টিবিয়া ,টারসাস এবং প্রিটারসাস।  

শ্লাইডে উল্লেখ না থাকার জন্য প্রণব শব্দগুলি ধীরে ধীরে  পুনর্বার আউরে গেল যাতে অংশগ্রহণকারীরা নিজের নিজের নোট বইয়ে শব্দগুলি শুদ্ধ করে লিখে নিতে পারে।

– হয়েছে? তোমরা জান আমরা নাক দিয়ে গন্ধ এবং জিহ্বা দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করি। প্রজাপতির ঠেঙের শেষ ভাগের টারসাস অংশে কেম'রিছিপ্টরছ বা রাসায়নিক সংবেদক গ্রহীতা আছে। তার সাহায্যে প্রজাপতি গন্ধ এবং স্বাদ লাভ করে। এমনকি নারী প্রজাপতি গাছের পাতায় ধাক্কা দিয়ে সেই গাছের পাতা থেকে নিঃসরিত হওয়া রাসায়নিক পদার্থ নিরীক্ষণ করে ডিম পাড়ার উপযুক্ত কিনা বলতে পারে। প্রজাপতি ঠেঙে থাকা রাসায়নিক সংবেদক গ্রহীতার সাহায্যে খাদ্যের উৎসেরও সন্ধান করে।

প্রণব শ্লাইডটা বদলে নিল। স্ক্রিনে ভেসে এল প্রজাপতির জীবন চক্র বিষয়ক কয়েকটি আলোকচিত্র। প্রথম ছবিটিতে প্রকৃতি কর্মীরা দেখতে পেল টনি কষ্টার নামক প্রজাপতির সহবাস, দ্বিতীয়তঃ ডিম পাড়ার দৃশ্য, তৃতীয়তঃ ডিম পাড়ার বিস্তৃতি।

– তোমাদের মধ্যে অনেকেই জান প্রজাপতির জীবন চক্র চারটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সেই সব ক্রমে এগ বা ডিম, ক্যাটারপিলার বা বিছা, পিউপা বা লেটা এবং এডাল্ট বা পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি। সহবাসের পরে প্রজাপতি ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম বিশেষ করে ওদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়া গাছের পাতা খুঁজে বেড়ায়। তার জন্য প্রজাপতি দৃষ্টিশক্তি এবং ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে। রাসায়নিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমে প্রত্যেক প্রজাপতির প্রজাতি নির্বাচিত গাছ বনের প্রজাতিকে ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করে। প্রজাতি ভেদে প্রজাপতির ডিমের আকার এবং  আকৃতি ভিন্ন হতে দেখা যায়। ডিম সমূহে থাকা আঠা জাতীয় পদার্থের সাহায্যে ডিমগুলি গাছের পাতায় সংযোজিত হয়ে থাকে।

প্রণব শ্লাইডটা বদলে দিয়ে ভিন্ন প্রজাতির ডিমের আকার এবং আকৃতি অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের দেখিয়ে দিয়ে পুনরায় প্রজাপতির জীবন চক্র ব্যাখ্যা করতে লাগল।

– নিষিক্ত ডিম গুলির ভেতরে বিছা জন্ম লাভ করে। ডিম থেকে বিছা জন্মানোর আগে ডিমের পাতলা খোসার মধ্যে দিয়ে বিছার গঠন স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাওয়া যায়। ডিম থেকে বিছা জন্মাতে প্রজাতি ভেদে তিন দিন থেকে সাত দিন সময় লাগে। বিছার প্রথম খাদ্য হল সে জন্ম লাভ করা ডিমের খোসাটা। তারপর ধীরে ধীরে আশ্রয় নেওয়া পাতার কোমল অংশ ভক্ষণ করতে শুরু করে যখন বিছার হনু পূর্ণাঙ্গ রূপে উন্নীত হয় তখন বিছা আশ্রয় নেওয়া গাছকে খাদ্য খাওয়া যন্ত্র একটার মতো একদিক থেকে সংহার রূপ ধারণ করে ভক্ষণ করতে শুরু করে। বিছার আকার বড়ো হয়ে গেলেও এর ত্বক বা ছালের আকার বৃদ্ধি হয় না। তখন বিছা  খাওয়া ছেড়ে দিয়ে নতুন ছাল গঠন হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। পুরোনো ছালের নিচ থেকে নতুন ছাল গঠন হলে বিছা ছলম ছাড়ে। নতুন ছাল কঠিন হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা পুনরায় পূর্ণোদ‍্যমে খেতে শুরু করে। একটা বিছা নিজের জীবনকালে তিন থেকে চারবার ছলম ছাড়ে।

প্রণব শ্লাইডটা বদলে নিয়ে বিছার ছলম ছাড়ার কয়েকটি আলোকচিত্র স্ক্রিনে প্রদর্শন করল। দুজন প্রকৃতি কর্মী এরকম ভাব করল, বিছাগুলি দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীরে চুলকানি শুরু হয়েছে। কিছু কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটা সংবেদনশীল সাধারণ জৈবিক পরিক্রমা। প্রণব তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিল না। সে শ্লাইডটা না বদলে পুনরায় বিছার বিষয়ে বলতে লাগল।

– একটা বিছার শরীর ১৪টা খন্ডে গঠিত। বিছার শ্রবণ ক্ষমতা নেই কিন্তু স্পন্দন অনুভব করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্ত বিছা খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে এবং আশ্রয় নেওয়া গাছের ডালের উপরে বিশ্রামহীন ভাবে ঘুরে বেড়ায়। সেভাবে ঘুরে বেড়ানো বিছা উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে অন্য গাছ বেড়া পাথর ইত্যাদিতেও বাইতে শুরু করে। তোমরা সেরকম বিছা দেখতে পেয়েছ। সেই রকম বিছা  শরীরে থাকা অজীর্ণ  খাদ্য সমূহ বের করে ফেলে। দল বদ্ধ ভাবে থাকা বিছার জায়গার লক্ষ্য করলে তোমরা এই ধরনের বিষ্ঠা সতত দেখতে পাবে। উপযুক্ত স্থানে আশ্রয় নেওয়া বিছা পায়ের সাহায্যে নির্মাণ করা সিল্কের মতো সুতোয় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে ফেলে।

প্রণব শ্লাইডটা পাল্টে দিল এবং প্রজাপতির লেটা অবস্থার কয়েকটি আলোকচিত্র প্রকৃতি কর্মীদের সামনে প্রদর্শন করল।

– ধীরে ধীরে বিছাগুলি লেটায় পরিবর্তিত হয়। কয়েকটি নৈমিত্তিক পর্যায় অতিক্রম করার পরে লেটা থেকে জন্মলাভ করে প্রজাপতি। লেটার শির অংশ প্রথমে বিভক্ত হয় এবং নতুন করে জন্ম লাভ করা প্রজাপতি আশ্রয় নেওয়া পাতার নিচে ছেঁচড়ে যায়। সম্ভবত নিরাপত্তার সন্ধানে। তারপরে প্রজাপতি খাদ্যের সন্ধানে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই যুদ্ধ এবং সহবাসে লিপ্ত হয়। ফুল, ফলের রস, গাছ থেকে নির্গত রস, কাদামাটি ,জীবজন্তুর মূত্র এবং বিষ্ঠা, মৃত প্রাণীর শবদেহ ইত্যাদি থেকে আহার গ্রহণ করে। প্রজাপতির আয়ু গড় হিসেবে দুই থেকে চার সপ্তাহ। সোয়ালো টেইল,ব্রাশ ফুটেড প্রজাপতির আয়ুকাল  ৮ মাস পর্যন্ত হতে দেখা যায়। প্রজাপতির জীবন চক্র জলবায়ু খাদ্য এবং আশ্রয়স্থলের উপরে অত্যন্ত নির্ভরশীল।

প্রণব শ্লইডটা পুনরায় বদলে নিল ।

নীরব নিস্তব্ধভাবে প্রতিজন অংশগ্রহণকারী কথাগুলি শুনে চলেছে। কিন্তু প্রণবের সন্দেহ হচ্ছে তারা কথাগুলি কতটা বুঝতে পেরেছে। প্রজাপতির জীবন চক্র চারটা ভাগে বিভক্ত হলেও প্রতিটি ভাগের পরিবর্তন মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে হবে।প্রণব শ্লাইডে বুঝিয়ে গেছে যদিও কোথাও যেন বোঝাতে তার একটু অসুবিধা হয়েছে ।ইংরেজিতে হলে বলতে সুবিধা। অসমিয়া প্রতিশব্দ হাতড়ে  বেড়াতে হয় বলে প্রণব অসমিয়ার পরিবর্তে ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করেছে । অংশগ্রহণকারীরা শব্দ গুলির সঙ্গে কতটা পরিচিত সে বিষয়ে প্রণবের সন্দেহ আছে। ধীরে ধীরে তারা সমস্ত বুঝতে পারবে বলে প্রণব বিষয়বস্তু এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

– এবার আমরা প্রজাপতির আচরণের বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। তোমরা এই শ্লাইডের আলোক চিত্র গুলির মধ্য দিয়ে প্রজাপতির কিছু সাধারণ আচরণ প্রত্যক্ষ করেছ। প্রথম ছবিতে দেখতে পেয়েছ প্রজাপতি রোদ পোহাচ্ছে। ইংরেজিতে একে বাস্কিং বলা হয়। নিম্ন উষ্ণতায় প্রজাপতির দৈনন্দিন জীবন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত জন্মে। সেই জন্য সূর্যের প্রত্যক্ষ আলোতে শরীরে রোদ লাগিয়ে প্রজাপতি উত্তাপ সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় ছবিটিতে দেখতে পেয়েছ প্রজাপতিরা পাহাড়ের ঢালুতে একত্রিত হয়েছে, একে বলা হয় হিল টপিং। এগুলি পুরুষ প্রজাপতি। পাহাড়ের উঁচুতে আশ্রয় নিয়ে এই প্রজাপতি গুলি স্ত্রীপ্রজাপতির সঙ্গে সহবাস করার জন্য অপেক্ষা করছে। এই ছবিটি কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই প্রজাপতিটার প্রজাতির নাম কমন ক্র। এটা তার পেটের নিচে থাকা পেন্সিলের মত চুল দাঁড় করিয়ে নিয়ে অরণ্যের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে সহবাসের জন্য সান্নিধ্যের খোঁজে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় পেট্রোলিং। প্রজাতি ভেদে প্রজাপতির পেট্রোলিং প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে দেখা যায় । প্রজাপতি সহবাসের জন্য স্ত্রী প্রজাপতির সন্ধানে যেভাবে পাহাড় বেয়ে যায় সেভাবে খাল নর্দমা জল যাওয়া নালা ইত্যাদিতেও সামূহিকভাবে জমা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গাল্লি বাটমিং। নতুন করে জন্ম লাভ করা একটি বা ততোধিক পুরুষ প্রজাপতি দলবেঁধে কাঁদার উপরে পড়ে কাদা থেকে নুন এবং জল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রজাপতির এই আচরণকে বলা হয় মাডপুডিং।শেষের আলোকচিত্রটা প্রজাপতির সহবাস প্রক্রিয়ার। প্রজাপতির এই আচরণকে কোর্টশিপ বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রণব প্রজাপতির আচরণের বিষয়ে ব্যক্ত করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। বুঝতে পারুক বা না পারুক প্রকৃতিকর্মীরা তার বক্তব্য মন দিয়ে শুনছে।

– তোমাদের হয়তো বোঝায় কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে যখন শব্দগুলির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে তখন তোমাদের জন্য সবকিছু সহজ হয়ে যাবে ।কয়েকটি অতি প্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দের অসমিয়া প্রতিশব্দ তোমাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে দিই। তোমরা লিখে নিতে পার।

– হ্যাঁ স্যার লিখে নেব। আস্তে আস্তে বলবেন। পুনরায় বিপাশা প্রণবকে অনুরোধ করল।

– ঠিক আছে। একেবারে আস্তে আস্তে বলছি। তোমরা লিখে নাও। কিংডম‐ জগত, ফাইলাম‐পর্ব, ক্লাস‐শ্রেণি, অর্ডার‐ গোত্র, সাব অর্ডার- উপগোত্র, সুপার ফ্যামিলি- অতি বর্গ, ফ্যামিলি‐ বর্গ, সাব ফ্যামিলি‐ উপবর্গ, জেনাস‐ গণ এবং স্পেসিস‐ প্রজাতি। গণ এবং প্রজাতি প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম। প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম লিখতে বাঁকা অক্ষরে লেখা হয়। তোমরা সোজা করে লিখে নিচে লাইন টেনে দেবে। প্রাণী জগতের'দ্বি নামাকরণ পদ্ধতি' এবং বর্গ বিভাজনের শ্রেণীবদ্ধ সূত্রের উদ্ভাবক হলেন কেরলাস লিনিয়াস নামের একজন বৈজ্ঞানিক। তার মতেই জীবজন্তুর নামকরণ করে আসছি। তুমি যে মানুষ তোমারও একটা নাম আছে জান কি? সেটা হল হোমো সেপিয়েন্স ।

- আজ পর্যন্ত এতটুকু। ঠিক আছে সৌম্যদা? প্রজাপতির নিরাপত্তার জন্য গ্রহণ করা ব্যবস্থা, প্রব্রজন, জৈব  ভৌগোলিক কারক ইত্যাদি কিছু কথা বলা বাকি রইল। পরবর্তী সময়ে আমরা নিশ্চয় আলোচনা করতে সুযোগ পাব।

সৌম্যদা, উদয়শঙ্কর, সুনন্দ, নবদা, কীচক ,জ্যোতিপ্রসাদ, টিংকু মহন্ত, নব জিৎ বর্মন ইত্যাদি প্রণবের প্রজাপতি বিষয়ক কথাগুলি একাগ্রতার সঙ্গে শুনে যাচ্ছিল। প্রণব নিজের বক্তব্য শেষ করায় তারা নিজেদের সম্বিত ফিরে পেয়েছে বলে মনে হল। প্রজাপতির পৃথিবী থেকে তারা বাস্তবের পৃথিবীতে ফিরে এল। রংচং এ প্রজাপতিদের একটি নিজস্ব পৃথিবী আছে, আছে প্রকৃতির মধ্যে সুনির্দিষ্ট স্থান- অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যের কয়েকজন কল্পনাও করতে পারেনি। স্লাইডে বিভিন্ন প্রজাতির রঙ্গিন প্রজাপতির সঙ্গে ওরাও মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছিল। জীবনচক্রের বিছা অবস্থা থেকে অনেকের মনে ঘৃণার  মনোভাব উদয় হওয়া বা এলার্জি হলেও পূর্ণবয়স্ক প্রাপ্ত প্রজাপতির রং গ্রুপ এবং বাতাসে লাফিয়ে বেড়ানো নৃত্য দেখে তারা সত্যি আপ্লুত হয়ে পড়ল। বিছা অবস্থার কথা বলার সময় কয়েকজনের মুখে ভাব ভঙ্গির পরিবর্তন দেখে প্রণব বলেছিল‐- এরকম করা উচিত নয়। কয়েকদিন পরে বিছা থেকে জন্মগ্রহণ করা প্রজাপতির পেছনে তোমরা দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াবে।

- খুব ভালো লাগল প্রণব। তুমি আমাদের প্রত্যেককে অনেক অজানা তথ্য জানালে।

সৌম্যদা এগিয়ে এসে প্রণবের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল। প্রণব ভয়ে ভয়ে তার বক্তব্য শুরু করেছিল এবং শেষের দিকে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় শুরুর ভয়টা আর ছিল না।

- শুধুমাত্র প্রজাপতিকে বিষয় হিসেবে নিয়ে আগে কখনও বক্তব্য রাখার অভিজ্ঞতা ছিল না সৌম্যদা।

- অভিজ্ঞতা হওয়ার জন্য তোমাকে কোনোদিন কাজটা তো শুরু করতে হবে। প্রথম দিন আমাদের ও অভিজ্ঞতা ছিল না। তুমি শুরু করেছ এবং আশা রাখব নতুন প্রজন্মকে তুমি এই দীক্ষা দিয়ে যাবে।

- নিশ্চয় সৌম্যদা। এটা আপনাদের অনুপ্রেরণা। মানসে আপনি বলা কথাগুলি আমি অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছি । না হলে হয়তো আমি একা প্রজাপতির আলোকচিত্র সংগ্রহ করেই দিন কাটাতাম ।

- আমার নয়। উদয়শঙ্করের। এখানে করা সমস্ত কাজের ভালো-মন্দ- সবকিছু উদয়শঙ্করের। অবশ্য মানসের  কথা আলাদা।চল। ঠান্ডার দিন। বেলা পড়ে এলেই অন্ধকার হবে।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা ইতিমধ্যে খাবার স্থানের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেছে। প্রজেক্ট্রর চালানো বলীন ইতিমধ্যে তাঁর- কেবল- কর্ড গুলি খুলে সেগুলি নির্দিষ্ট বাক্সে ভরিয়ে রাখল। মাইক্রোফোন সেই ব্যবহার করেছে। সেসবও  সামলে সুমলে রাখল। জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হয়নি। এটা খুব ভাগ্যের কথা যে ঠান্ডার দিনেও বিদ্যুৎ সংযোগ একবারও ব্যাহত হয়নি।

অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকেই দল বেঁধে ঘাসের উপরে পেতে দেওয়া ত্রিপালে বসে ভাত খেতে শুরু করেছে। উদয় শঙ্করদের দেখে তাদেরও একসঙ্গে ভাত খাবার জন্য থানের  বাইরে ভোজ-ভাতের ব্যবস্থাপনা করা কয়েকজন ব্যক্তি অনুরোধ জানাল। সঙ্গে আছে বাপুটি। এই মানুষ কয়েকজনকে উদয়শঙ্কর চেনে না। আগে কখনও দেখেছে বলে তার মনে পড়ছে না। উদয়শংকররা দলটির সঙ্গে একসঙ্গে খেতে বসল। আজকের ভাতের সঙ্গে মাছের ব্যবস্থা করেছিল উদয়শংকর। মাছের ব্যবস্থা থাকার জন্য ওরা থানের বাইরে বনভোজ খাওয়া স্থানে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল।

ভাতের গ্রাস মুখে নিয়ে সুনন্দ দেখতে পেল বাঁধের দিক থেকে গ্রামের চারজন ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে থানের দিকে এগিয়ে আসছে। সুনন্দ ছেলেগুলিকে চিনতে পারল। গ্রামের ছেলে। ওদের দেখে সুনন্দর  বিপদের আশঙ্কা হল। কোথাও কিছু অঘটন ঘটেছে নিশ্চয়। আগে সৈন্য বাহিনীর লোক এলে কেউ দৌড়ে এসে সবাইকে এভাবে খবর দিত। এখন তো আর সেই দিন নেই। তাহলে কী হয়েছে! যেভাবে দৌড়াদৌড়ি করে ছেলেরা এসেছিল, অংশগ্রহণকারীদের ভাত খেতে দেখে ওরা প্রায় নিশ্চুপ হয়ে পড়ল এবং ইতস্তত করে থানের বারান্দায় বসে রইল। ওদের মুখাবয়বে উৎকণ্ঠা এবং চাঞ্চল্যের রেশ। সুনন্দা ভাবল নিশ্চয় কোনো গভীর ব্যাপার হয়েছে, কোনো অঘটন ঘটেছে।

আগে খেতে বসে অংশগ্রহণকারীরা ভাত খাওয়া হওয়ার পরে মুখ হাত ধুতে গেছে। ছেলেগুলোকে মুখহাত  ধুতে যাবার জায়গায় এগিয়ে যেতে সুনন্দ লক্ষ্য করল ।

সে যেরকম ছিল সেভাবে ভাতের থালা থেকে উঠে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল ।

- তোমার খাওয়া হয়েছে সুনন্দ?

উদয়শঙ্কর তাকে জিজ্ঞেস করল। সুনন্দ কোনো উত্তর দিল না।

- এভাবে খাওয়ার জিনিস নষ্ট করা একেবারেই অনুচিত। উদয়শঙ্করের দিকে তাকিয়ে সৌম্যদা বলল।

- সুনন্দ তো এভাবে উঠে যাবার ছেলে নয়। কিছু একটা হয়েছে তার।

সুনন্দ সোজা এগিয়ে গিয়ে দেখল ছেলেরা কাকাবাবুর বৌমা অনামিকার সঙ্গে কথা বলছে। সে অনন্ত বৌমাকে বলা কথাগুলি শুনতে পেল‐-' বৌদি কাকাবাবু আপনাকে খুঁজছে। আমাদের বলেছে আপনাকে নিয়ে যেতে।

‐ আমার হয়ে গেছে দাঁড়াও। সবাইকে একটু বলে আসি।

অনামিকা সুনন্দকে  বলল‐-' বাবা নাকি ডেকেছে। আমি আসছি। উনার অসুখ-বিসুখ করে থাকতে পারে।

সৌম্যদার  কাছে এসে অনামিকা সৌম্যদাকে বলল- দাদা আসছি। আমাদের বাড়িতে আসবেন। বাবা খুব খুশি হবে।

– যাবার আগে আমি কাকাবাবুকে একবার বলে যাব।সৌম্যদা প্রত্যুত্তরে বলল।

উদয়শঙ্করের দিকে তাকিয়ে অনামিকা সাধারণভাবে বলল— এলাম।

অনামিকা এগিয়ে যাওয়ায় সুনন্দ অনন্তকে একপাশে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল‐- কী ব্যাপার অনন্ত ।এত দৌড়াদৌড়ি করে যে অনামিকাকে ডেকে নিতে এসেছ। কাকাবাবুর কিছু—

অনন্ত কেউ যাতে শুনতে না পায় সেভাবে সুনন্দের কানের কাছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল– জ্যোতিষদা  মারা গেছে।

সুনন্দ বাঁ হাতটা নিজের মাথার ওপরে রেখে জিজ্ঞেস করল–কী ভাবে? জ্যোতিষদার কী হয়েছিল?

– আজ সকাল বেলা নকশালবাদীর সঙ্গে গোলাগুলিতে নাকি মৃত্যু হয়েছে– সেরকম খবর এসেছে।

অনন্ত আর বেশি কথা বলল না। সাধারণভাবে সেই কথাটা বলে অনন্ত অনামিকার পেছন পেছন প্রায় দৌড়ে যাবার মতো এগিয়ে গেল।

সুনন্দ দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটিতে বসে পড়ল।

দাঁড়িয়ে থাকা জায়গায় বসে পড়তে দেখে উদয়শঙ্কর দৌড়ে তার কাছে এল– কী হয়েছে সুনন্দ। তুমি এরকম করছ কেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুনন্দ প্রকৃতিস্থ হল।

– জ্যোতিষদা মারা গেছে।

– কী বলছ হে।কী বলছ। কাকাবাবুর ছেলে জ্যোতিষের মৃত্যু হয়েছে!

দুজনেই সৌম্যদার কাছে এসে সৌম্যদাকে কথাটা জানাল। সেই মুহূর্তে সৌম্যদার মনটাও বিমর্ষ হয়ে পড়ল। মুখটা লাল হয়ে দুচোখ কোনো অনির্দিষ্ট স্থানে স্থির হয়ে রইল। সেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রকৃতিস্থ হয়ে সৌম্যদা সুনন্দকে বলল– সুনন্দ যারা ভাত খায়নি তাদের কথাটা না জানিয়ে ভাত খাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কর। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবকিছু গুছিয়ে নাও। উদয়শংকর, না  করলেই নয় কাজ গুলি তাড়াতাড়ি করে ফেল। আমাদের কাকাবাবুর কাছে যেতে হবে।

সুনন্দ বাপুটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল– আর কতজন মানুষের খাওয়া বাকি আছে?

– আমরা চার পাঁচ জন।

– আমাদের এক জায়গায় যেতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি কর।

– এই বসছি ধরে নিন।

বাপুটি কয়েকজন মানুষের জন্য থালা  পেতে চিৎকার করতে লাগল– এরা নাকি কোথায় যাবে। তাড়াতাড়ি ভাত নিয়ে আয়। দেরি করলে এখানেই রাত হয়ে যাবে।

বাপুটির চিৎকার শুনে ভাত খেতে থাকা কয়েকজন এসে নিজের নিজের থালায় বসল। সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর ওদের ডাল- ভাত পরিবেশন করল। ওদের ভাত খাওয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানে হুলস্থূল লেগে গেল। অনন্তের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে আসা হরিশ পুনরায় ফিরে এসে সকলকে আদ্যোপান্ত বিস্তৃতভাবে জানাল।

– জ্যোতিষদারা নাকি সকালবেলা পেট্রোলিঙে বেরিয়ে গিয়েছিল। নকশালবাদিরা মাইন ফাটিয়ে ওদের ওপরে ধরাসার গুলি বর্ষণ করতে শুরু করে। জ‍্যোতিষদারা আক্রমণ করার কোনো সুযোগই পেল না। টিভির খবর অনুসারে মোট আটত্রিশ জন জোয়ানের বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছে।

হরিশের  কথা শুনে প্রত্যেকের মুখের কথা বন্ধ।

–কী বলছ হে বাপু, এত সুন্দর  লম্বা চওড়া ছেলেটা মারা গেল। মা-বাবা আর স্ত্রী কী নিয়ে বেঁচে থাকবে।

বাপুটির কথা শুনে প্রত্যেকের মুখ শোকে উথলে উঠল।

– এইতো সেদিন তার বিয়েতে গিয়েছিলাম। কী হাসিমুখ স্ফূর্তিবাজ ছিল ছেলেটি। সে আজ নেই। বিশ্বাস করতেও কঠিন মনে হচ্ছে। আর কাকাবাবুর বৌমা অনামিকা–

উদয়শঙ্কর কথাটা শেষ করতে পারল না। তার মুখটা বর্ষার কালো মেঘের মতো ভার হয়ে উঠল।

দুঃখ এবং শোকের মধ্যে বাপুটিরা সবকিছু গুছিয়ে রাখল। অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা তিনজনকেই জানিয়ে পরস্পর থেকে বিদায় নিল। তারা কী ঘটছে তার কিছুই আভাস পেল না। প্রণব নবজ্যোতিদেরও এভাবেই বিদায় জানাল। সৌম্যদা সুনন্দ এবং উদয়। নবদা এবং কীচক কথাটা জানতে পেরে সুনন্দদের  সঙ্গে থেকে গেল।

সৌম্যদা, উদয়শঙ্কর, নবজিৎ বৈশ্য ,কীচক, টিংকু এবং সুনন্দ তখনই গিয়ে কাকাবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হল। বাড়ির সামনে লোকে- লোকারণ্য।

কাকাবাবু উঠোনে পায়চারি করছে। দেখলেই বুঝতে পারা যায় মানুষটা অভাবনীয়ভাবে অস্থির হয়ে পড়েছেন।

সৌম্যদা এবং উদয়শঙ্করকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন।সৌম্যদা দুহাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে বুকের কাছে রেখে কাকাবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।

– ও যেদিন সৈনিকের ড্রেস পরেছিল আমি ওকে সেদিনই বিদায় দিয়েছিলাম। কেবল আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকি। সৈনিক মৃত্যুর কাছে ধার খেয়ে রেখেছে। সেইজন্যই সৈনিককে মৃত্যু তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

সৌম্যদা লক্ষ্য করলেন কাকাবাবু কথাগুলি অসংলগ্ন ভাবে বলছেন। মানুষটা হঠাৎ পড়ে যেতে পারে বলে ভয় হওয়ায় সৌম্যদা সাবধানতা অবলম্বন করে কাকাবাবুর প্রায় গায়ের কাছে দাঁড়াল।

কাকাবাবু ডুবন্ত সূর্যের দিকে মুখ করে বলে উঠল– ও  ঐদিকে গিয়েছে। ওই রাস্তায়। ওকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না ,ও কিন্তু আমাদের দেখতে পাচ্ছে।

তারপর কাকাবাবু সৈনিকের 'সাবধান পজিশনে' দাঁড়ালেন। উদয়শংকর লক্ষ্য করল কাকাবাবুর বা হাতের মুঠোটা বজ্র কঠোর। মানুষটা যেন ক্রমে পাথর হয়ে যাচ্ছেন। তিনি ডান হাত দিয়ে কপালে সেলাম ঠুকে চিৎকার করে উঠলেন– জয় হিন্দ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি আবার চিৎকার করে উঠলেন–জ‍্যেই হিন্দ। জ্যোতিষ অমর রহে। পুনরায় সুতীব্র কন্ঠে চিৎকার করলেন – জয় আই অসম । পিতৃ সৈনিক পুত্র সৈনিককে নিজের পদ্ধতিতে বিদায় জানাল। কত দুঃখকর হতে পারে সেই দৃশ্য, উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলেন। আবেগকে ধরে রাখতে না পেরে পুরুষ মহিলা ছেলে-মেয়ে প্রত্যেকেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। 

প্রত্যেককে কাঁদতে দেখে কাকাবাবু পুনরায় জোরে চিৎকার করে উঠলেন– বিশ্রাম।

কাকাবাবুর অবস্থা দেখে সৌম্যদা  একজন বয়স্ক লোকের কাছে এসে বললেন– কাকাবাবু, ইনি খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। আমাদের সান্ত্বনার ভাষা নেই। আপনি তাকে একটু দেখবেন। মানুষটার–

– তুমি ঠিকই বলেছ। হরগোবিন্দের একজন বন্ধু আছেন। তার কাছে খবর পাঠিয়েছি। তিনি এলে তাকেই হরগোবিন্দের দায়িত্ব দিতে হবে।

অন্যদিকে উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলল– আশেপাশে কোনো চিকিৎসকক আছে কি? যদি থেকে থাকে একটু আসতে বলবে। কাকিমার বা কী অবস্থা। তুমি পার যদি একবার খবর নিও।' ডেড বডি আসতে  সময় লাগবে।

সুনন্দ উদয়শংকরের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল– মধু বৈশ‍্য নামে একজন চিকিৎসক কাছাকাছি থাকেন। তিনি শুনে থাকলে না ডাকলেও এসে যাবেন। তাকে খবরটা দেবার ব্যবস্থা করি আর কাকিমার খবর নিই।

সুনন্দ বাড়ির ভেতর চলে গেল। সুনন্দ গ্রামের ছেলে, এভাবে যেতে পারে। উদয়শঙ্কর পারে না, তার মধ্যে আবার স্ত্রীলোক, কী অবস্থায় আছেন কে জানে! কেউ এগিয়ে দেওয়া একটা চেয়ারে  কাকাবাবু মাথা নিচু করে বসে আছে। চারপাশে মানুষের ভিড়। বাড়ির উঠোন, বাঁধের ওপরে জায়গা নেই। এরকম সময় একজন মহিলাকে পাগলের মতো বাঁধের ওপর দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। তার পেছন পেছন আসা পুরুষটি মহিলাকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করে বিফল হচ্ছে।

– ইনি জ্যোতিষের দিদি। পেছন পেছন আসা পুরুষটি মহিলার স্বামী।

কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন উদয়শঙ্করকে বলল। 

জ্যোতিষের দিদি হুড়মুড়  ভেতরে প্রবেশ করে বাবার পায়ের কাছে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। কাকাবাবু নির্নিমেষ  চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাকাবাবুর জামাই স্ত্রী কে মাটি থেকে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে ।অথচ পারছে না ।উদয়শঙ্কর মানুষটাকে সাহায্য করার জন্য জ‍্যোতিষের দিদির বাঁ হাতটা ধরে টেনে তুলল। স্বামীর গায়ে হেলান দিয়ে চিৎকার করতে করতে জ্যোতিষের দিদি ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। ঘরের ভেতরে কান্নার রোল উঠল।

উদয়শঙ্কর দেখতে পেল ভেতরের ঘর থেকে সুনন্দ বেরিয়ে আসছে।

– ভেতরের অবস্থা আরও খারাপ। মধু বৈশ‍্যকে নিয়ে আসতেই হবে। এদের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার বাইরে আর কোনো উপায় নেই। না হলে অঘটন ঘটে যেতে পারে। বৌমা অনামিকার হয়তো হুঁশই নেই। যেভাবে ঘাড় মটকে পড়ে আছে সেভাবেই রয়েছে। আমি কিন্তু সাড়া- শব্দ দেখিনি। কাকিমা মেয়ের আসার খবর পেয়ে উঠে বসেছেন এবং মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেছেন। মাঝেমধ্যে তিনি ছটফট করে উঠছেন।

– সুনন্দ, তুমি যাও। যত তাড়াতাড়ি পার একজন চিকিৎসকের ব্যবস্থা কর।

সুন্দের আর যেতে হল না।অনন্ত আর হরিশের সঙ্গে একজন চিকিৎসক অনিল রায়মেধি এসে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সুনন্দ ডাক্তারবাবুকে ভেতরে নিয়ে গেল। ডাক্তারবাবু অনামিকা বৌমার হাতে রক্তচাপ মাপার যন্ত্রটা দিয়ে এবং স্টেথোস্কোপ দিয়ে রক্তচাপ মাপলো।

– ঠিকই আছে। ঘুমিয়ে আছে যখন ঘুমোক। কান্নাকাটি করার জন্য ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে উঠলে একটু সাবধান হবেন। দেখবেন যাতে দেওয়ালে মাথা না ঠোকে।

উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে রায়মেধি  বললেন। তারপর কাকিমার রক্তচাপ মেপে তিনি বেগ থেকে ট্যাবলেটের একটি পাতা বের করে বললেন– এখান থেকে একটি ট্যাবলেট এখনই উনাকে খাইয়ে দিন।

— আমি কিছুই খাব না। আমি বলছি কিছুই খাব না–অ'অ'অ'–

কাকিমা চিৎকার করতে লাগলেন।

– আপনাকে খেতে হবে। একটু বুঝতে চেষ্টা করুন। আপনি এরকম করলে ডেকার কী হবে।

রায়মেধি কাকিমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কাকাবাবুর কথা বলায় কাকিমা রাজি হলেন এবং পাশের একজন মহিলা এনে দেওয়া জল নিয়ে ট্যাবলেটটা মুখে দিলেন ।

— এখন অন্তত রাতটা ভালোভাবে পার হবে। ইনি ঘুমিয়ে পড়বেন। কেউ ওকে বিরক্ত করবেন না ।

রায়মেধি বুঝিয়ে সুঝিয়ে জ্যোতিষের দিদিকেও একটি ট্যাবলেট খাইয়ে স্বামীকে বললেন –  বিছানায় নিয়ে একে ভালো করে শুইয়ে দিন । গরম কাপড় চোপড় গায়ে দিতে ভুলে যাবেন না। কাকাবাবুর রক্তচাপ সুস্থির । সারারাত কষ্ট পাওয়ার চেয়ে কাকাবাবুকেও  রায়মেধি একটা ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিলেন।

– তুমি আজ আমাকে যা দেবে তাই খাব।

কাকাবাবু জল ছাড়া ট্যাবলেটটা গিলে  ফেললেন। গলায় অস্বস্তি হওয়ায় তিনি হাতের ইশারায়  বললেন–জল,জল। কেউ হাতে থাকা জলের বোতলটা এগিয়ে দেওয়ায় কাকাবাবু তৎক্ষণাৎ কয়েক ঢোক জল খেয়ে ফেললেন।

– তোমার আজকাল খবরই পাইনা। ভালো আছ তো। আমার এমনিতে ভালো। কখনও কখনও শরীরটা একটু খারাপ লাগে। তোমার কাছে যাব বলে ভাবতে ভাবতেই তুমি এসে হাজির হয়েছ।

রায়মেধির বুঝতে বাকি রইল না যে কাকাবাবু ভুল বকতে শুরু করেছেন।

অনন্তের দিকে তাকিয়ে রায়মেধি  বললেন–' দাদাকে একটু ধর, আমরা দুজনে তাকে সুন্দর করে বিছানায় শুইয়ে দিই।

– আজ তুমি যা করবে তাতেই আমার সায় আছে।

কাকাবাবু সোজা হয়ে এরকম ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রইলেন যেন তিনি নতুন করে কিনে আনা শার্ট-প্যান্ট শরীরে ঠিকমতো ফিট হচ্ছে কিনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছেন।

রায়মেধি এবং অনন্ত কাকাবাবুকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন।সৌম্যদা এবং উদয়শঙ্কর দূর থেকেই এই সমস্ত কিছু লক্ষ্য করতে লাগল। তাদের করার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। পরিবারটার সদস্যরা সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে এবং প্রয়োজন হলে তাকে যখন তখন ডেকে দেবার জন্য বলে উপস্থিত দুই চারজনের কাছ থেকেই বিদায় নিয়ে রায়মেধিও চলে গেলেন।

সৌম্যদা এবং উদয়শংকর সুনন্দকে বলল – আমাদের আর এখানে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই । সকালবেলা আসব। জ্যোতিষের মৃতদেহ আসতে নিশ্চয় দেরি হবে । কখন এসে পৌছাবে কাল জানা যাবে । ফৌজের মানুষ দেখছি এখনও আসেনি ।

– আমরা শিবিরে থাকতেই এসে কাকাবাবুকে বলে গেছে নাকি । প্রথমে খবরটা কাকাবাবুকে হেড অফিস থেকে ফোনে জানিয়েছে এবং ঠিক তারপরে তাদের একজন অফিসার এসে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে গেছে ।

– তারা তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করে।ফৌজের কাজ করার পদ্ধতিই আলাদা। উদয়শঙ্কর সুনন্দের কথায় সায় দিল।

রাতটা প্রত্যেকেরই কোনোমতে পার হল। অনেক দেরি পর্যন্ত সৌম্যদা এবং উদয়শঙ্করের ঘুম আসেনি অথচ দুজনেই কথা বলছিল না । কেবল উদয়শংকর সৌম্যদাকে জিজ্ঞাসা করেছিল – সৌম্যদা আপনার রাজধানীর টিকিট কাটা ছিল না ?

— ছিল।এভাবে চলে যাওয়া তো ঠিক হবে না। আমি আগামীকাল অথবা না পারলে পরশুদিন নাইট সুপারে চলে যাব।

শেষ রাতের দিকে দুজনেরই একটু তন্দ্রার ভাব এসেছিল।

ঘুমের মধ্যে উদয়শংকর বহুদিন পরে মায়ের দেখা পেল । তার কাল্পনিক অবয়বের মায়ের সঙ্গে সে অনেক কথাই বলল। কী কথা বলল সকালের দিকে সে ভুলে গেল।তার শুধু মনে আছে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল– মা সম্পর্কীয়দের দুঃখ-কষ্ট দিয়ে মানুষগুলি কেন অকালে মরে যায় মা? উত্তরে মা কি বলেছিল উদয়শঙ্কর সকালবেলা কিছুতেই  মনে করতে পারল না। হাতে দাঁত মাজার ব্রাসটা নিয়ে সে এক ভাবে  এক জায়গায় অনেকক্ষণ বসে রইল। সৌম্যদা পেছন থেকে এসে ডাকায় তার সম্বিত ফিরে এল।

হরিণের দোকানে ঢুকে সৌম্যদা এবং উদয়শংকর যখন কুশিয়ার চক হয়ে কাকাবাবুর বাড়িতে পৌঁছালো তখন সকাল ন'টা  বাজে। কাকাবাবু তখনও ঘুম থেকে উঠেননি। রায়মেধি আটটার সময় এসে পরিবারের সবাইকে পরীক্ষা করে বলেছেন সব ঠিকঠাক আছে। তাদের এখন শুয়ে থাকতে দিন। 

উদয়শঙ্কর এবং সৌম্যদা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের কয়েকটি গাড়ি এসে কাকাবাবুর বাড়ির সামনে দাঁড়াল। তারা গ্রামের গ্রাম প্রধানকে ডেকে আনাল। জ্যোতিষের শেষকৃত্য কোথায় সম্পন্ন করা হবে গ্রাম প্রধান এবং গ্রামের নেতৃ স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করল। গ্রামের প্রত্যেকেই কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে বলে জানাল। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আশা চিকিৎসক পরিবারের সবাইকে একবার পরীক্ষা করল এবং সন্তুষ্ট মনে বলল– সব ঠিক আছে।

সৌম্যদার পরিচিত অফিসারও একজন তাদের মধ্যে ছিল। সৌম্যদার সঙ্গে  নাকি অফিসারটার সিকিমে পরিচয় হয়েছিল বলে জানা গেল।সৌম্যদা অফিসারকে বড়ো কুরিহায় কেন আসতে হয়েছে জানাল। গত দুদিন কীভাবে সৌম্যদারা শিবিরের আয়োজন করেছে সেই বিষয়েও অফিসারকে জানাতে হল। সৌম্যদার কাজকর্মকে অফিসার এরকম অবস্থাতেও প্রশংসা করতে ভুললেন না। অফিসারটি সৌম্যদাকে জানিয়ে গেল – সন্ধের দিকে জ্যোতিষের নশ্বর দেহ পিতৃভূমিতে আসার সম্ভাবনা আছে।

দৌড়াদৌড়ি, দীর্ঘশ্বাস, কান্নাকাটি মাঝখানে দিনটি কীভাবে পার হয়ে গেল উদয়শংকর বুঝতেই পারল না। কাকাবাবু সারাদিনের মধ্যে যথেষ্ট প্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছেন যদিও মানুষটা কারও সঙ্গেই বেশি কথাবার্তা বলেনি । সুনন্দের বক্তব্য অনুসারে বাড়ির প্রত্যেকেই সেরকমই আচরণ করেছে। হয়তো জ্যোতিষের নশ্বর দেহ এসে যাবার পরে পরিস্থিতি আবার বদলে যাবে। উদয়শঙ্কররা দেখা করা কাকাবাবুও তাদের সঙ্গে এসেছে।তাঁরা আসার পরে যথেষ্ট গম্ভীর হয়ে পড়ল। অনামিকা কাঁদতে চেয়েও কাঁদতে পারল না। কোনো অব্যক্ত বেদনা বেচারির গলা চেপে ধরেছে। অভাবনীয় পরিস্থিতিতে পড়ে বেচারি কাতর হয়ে পড়েছে।

কাকাবাবু জ্যোতিষের অন্তিম নিদ্রার জন্য স্থান নির্বাচন করে দিয়েছেন। বলেছেন– সে নদীকে খুব ভালোবাসত। তাতে সাঁতার কাটতে ভালোবাসত। আমাদের নদী তীরে মাটির গাছের নিচে বসে থেকে সে নদীর বেড়ে আসা জল দেখতে গিয়েছিল। সে সেখানেই থাকবে। অনন্তকাল তার প্রিয় নদীটার দিকে তাকিয়ে থাকবে।

বিএসএফের জোয়ান কয়েকজন স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় জ্যোতিষকে বিদায় জানানোর জন্য স্থাপন করা চিতা স্থানের তদারক করছে। নিজের সহকর্মীকে বিদায় জানানোর জন্য তারা আনুষ্ঠানিকতার সমস্ত দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখাশোনা করছে। কোথাও যেন কোনো খুঁত থেকে না যায়।

জ্যোতিষের শেষকৃত্য সমাপনের জন্য পাখির বাসা থেকে একটু দূরের নদীর তীরে সমতল  স্থান বেছে নেওয়া হয়েছে । সেটা জ্যোতিষের পিতৃভূমি । চিতা সাজানোর জন্য জায়গাটাকে বালি দিয়ে উঁচু করে বেঁধে নেওয়া হয়েছে । নির্দিষ্ট দূরত্বে জনসমাগমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাঁশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে । চিতাটা সাজিয়ে তার চারপাশে রাশি রাশি করে ফুলের মালা সাজানো হয়েছে। অন্ধকার দূর করার জন্য দূর থেকে তার টেনে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জ্যোতিষকে সামরিক মর্যাদা সহকারে বিদায় জানানোর জন্য সমস্ত ব্যবস্থা আড়ম্বরপূর্ণ করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করা হয়নি । দুঃখের মধ্যেও সমগ্র পরিবেশটা উৎসবমুখর হওয়ার মতো দেখাচ্ছে।কাজগুলি যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে চলেছে।

চিতার স্থান নির্বাচনে উদয়শঙ্করের আপত্তি ছিল। সেখানে চিতা সাজানো মানে পাখিদের প্রতিবেশীদের অসুবিধা হওয়াটা নিশ্চিত। তবে এই সময় কিছু বকের অসুবিধা হবে বলে বলার উদয়শঙ্করের সাহস হল না। অনামিকাকে বলতে পারলে হয়তো ফল পাওয়া যেত। মনের মধ্যে দোলা দেওয়া প্রতিক্রিয়া, উপায়হীন হয়ে নিজের মনের মধ্যে মেনে নিতে বাধ্য হয়ে পড়ল উদয়শঙ্কর।

বিএসএফের উদ্ধৃতি দিয়ে তার মধ্যে কেউ খবর দিয়েছে জ‍্যোতিষের নশ্বর দেহ বরঝার পৌঁছে গেছে। আর ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাওয়া উচিত। সময় তখন দুপুর একটা বাজে। আশেপাশের কোনো বাড়িতে উনুন জ্বলে নি। পরিবারের কে কী খেয়েছে খবর নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পরিবারের মূল মানুষ দুটি যদি জ্যোতিষদের বাড়িতে, ছেলেরা শ্মশান স্থানে, মেয়েরা বাঁধের ওপরে। উৎকণ্ঠিত সময় অনায়াসে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে।

তিনটের সময় সামরিক বাহিনীর গাড়িতে কফিনের ভেতরে জ্যোতিষের নশ্বর দেহ এসে পৌছাল। ছয় জন জোয়ান কফিনটা বহন করে এনে কাকাবাবুর উঠোনে রাখল। কান্নার রোল চারপাশে বিষাদ ছড়িয়ে দিল। আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা দুটি বেঞ্চের ওপরে কফিনটা রেখে কয়েকজন জোয়ান কফিনের আবরণ সরাতে লাগল। ঠিক সেই সময় ঘরের ভেতর থেকে জ্যোতিষের দিদি দৌড়ে এসে কফিনটার উপরে উবুর হয়ে পড়ল। এত ঠান্ডাতেও দিদি উড়তে থাকা শালটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। বিএসএফের দু একজন একটু সরে দাঁড়িয়ে দিদিকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মহিলার দিকে ইঙ্গিত করলেন। জ্যোতিষের জামাইবাবু দিদিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেও পারেনি। অর্ধসামরিক জোয়ান কয়েকজন নিরুত্তর। জামাই বাবুকে সাহায্য করার জন্য অনন্ত আর সুনন্দ এগিয়ে এল। অনন্ত আর সুনন্দ কোনোভাবে দিদিকে ধরে একটু সরিয়ে নিয়ে যেতে  সক্ষম হল। 

বিশেষ রাসায়নিক দ্রব্য ছিটিয়ে আনা জ্যোতিষীর নশ্বর দেহটা কফিনের ভেতর থেকে বের করে দুজন বেঞ্চের উপরে সাদা কাপড় পেতে সুন্দর করে সাজিয়ে তার উপরে ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকাটা সাজিয়ে দিল। রাশি রাশি ফুলের মালা এবং ফুলে সাজিয়ে তোলা হল ইহলীলা সংবরণ করা জ্যোতিষকে। বাড়ির ভেতর থেকে জ্যোতিষের মা এবং অনামিকারা বেরিয়ে এল। মা বারান্দা থেকে দৌড়ে এসে জ্যোতিষের মুখটায় একনাগারে কয়েকবার চুমু খেল।সৌম্যদা লক্ষ্য করল অনামিকা যথেষ্ট ধীর গম্ভীর। তিনি দেখে আশ্চর্য হলেন বধূটি দেখতে সাধারণ অসমিয়া মহিলার মতো শোকে কাতর হওয়ার মতো আচরণ করছে না। দেহান্তরিত হওয়া কোনো রাজনেতার পত্নীর মতো শান্ত এবং স্থির। অনামিকা জ্যোতিষের দু পা খামচে ধরে পা দুটির মাঝখানে মাথাটা গুঁজে দিল। মা এবং দিদি জ্যোতিষের শরীর দুই দিক থেকে জড়িয়ে ধরেছে। তারা কাঁদার শেষ শক্তিটুকুও ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। মুখ দিয়ে শুধু বেরিয়ে আসছে কিছু অস্ফুট যন্ত্রণাকাতর শব্দ। পাশের মহিলা একজন জ্যোতিষের পা দিয়ে অনামিকার সিঁথির সিঁদুর মোছে আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত করল।

অতি দুঃখজনক এবং শোক কাতর  পরিবেশের মধ্য দিয়ে জ্যোতিষকে পরিবারের লোকজন বিদায় জানাল। জামাইবাবু, জ্যোতিষের কাকাবাবুর ছেলেরা চাঙটা তুলে দেবার পরে চারজন জোয়ান জ্যোতিষের শেষ যাত্রার চাঙটা কাঁধ পেতে নিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনামিকাও শব যাত্রার সঙ্গী হবার জন্য এগিয়ে এল। দুই একজন মহিলা বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল।

– বাধা দিও না। ওকে যেতে দাও।কাকাবাবু মহিলা কয়জনকে বললেন।

অনামিকাকে বেরিয়ে আসতে দেখে জ্যোতিষের দিদি হেমাঞ্জলিও পাগলের মতো শোভাযাত্রার প্রথম ভাগে  ঢুকে পড়ল। উদয়শংকর প্রায়ই যে পথ দিয়ে পাখিদের প্রতিবেশীতে আসা যাওয়া করে, সেই পথ দিয়ে শোভযাত্রাটা এগিয়ে চলেছে। হাজারেরও বেশি মানুষের একটি শোভাযাত্রা। গ্রামের যুবক- যুবতী, বুড়ো- বুড়ি সবাই শোভাযাত্রায় যোগদান করেছে। এত অসংখ্য মানুষ অরণ‍্য পথটা একসঙ্গে ব্যবহার করার ফলে কী অবস্থা হতে পারে উদয়শঙ্কর একবার ভেবে দেখল। সবাই আবেগিক হয়ে আছে, এই সময় কাউকে কিছু বলার পরিবেশ নেই। কেবল বক গুলি বিশেষ কষ্ট না পেলেই হয়।

বহু সংখ্যক অর্ধ সামরিক অফিসার এবং জোয়ানের উপস্থিতিতে জ্যোতিষের নশ্বর দেহের শেষকৃত্য সমাপন করার জন্য প্রস্তুত করা হল। জ্যোতিষের কাকুর ছেলে হিতেশ মুখাগ্নির মাধ্যমে জ্যোতিষের নশ্বরদেহে অগ্নিসংযোগ করবে। পুরোহিত স্তোত্র পাঠ শুরু করেছে। চিতার উপরে নশ্বর দেহ সংস্থাপিত করা হয়েছে। শুভ্র পোশাক পরিহিতা অনামিকা হাত জোড় করে দাম্পত্য জীবনের সর্বস্ব অর্পণ করছে জ্যোতিষের উদ্দেশ্যে। নমস্কারের ভঙ্গিতে দুহাত দুই ঠোঁটের উপরে রেখে সে নির্বাক, নিস্পন্দ। যৌবনের দুপুর বেলা জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে সে আজ ক্লান্ত। দিনকে বিদায় জানানোর জন্য দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রাশি রাশি অন্ধকার। 

অর্ধ সামরিক বাহিনীর অফিসাররা, জেলা প্রশাসনের অফিসাররা জ্যোতিষকে অনন্ত শয্যায় ফুলের মালায় শেষ বিদায় জানাল।হিতেশ হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে এগিয়ে চলেছে । অর্ধ সামরিক বাহিনীর কোনো অফিসার জ্যোতিষকে জানাচ্ছে সেলুট। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা জোয়ানরা তার নির্দেশ পালন করে চলেছে। হাতে থাকা রাইফেল গুলি বিশেষ ভঙ্গিমায় রেখেছে। হিতেশ এগিয়ে চলেছে। তার হাতে জ্বলন্ত মশাল। সে মশালটা মৃত জ্যোতিষের মুখে লাগিয়ে দিয়েছে এবং চিতার চারপাশে এক পাক ঘুরে চলেছে। পুনরায় পুনরাবৃত্তি করছে। জোয়ানরা হুকুম তালিম করার জন্য আকাশের দিকে রাইফেল তাক করেছে।

গুড়ুম– গুড়ুম– গুড়ুম।

আকাশ বাতাস নিনাদিত  করে রাইফেলের শব্দ চারপাশকে ঘিরে ধরল।

উদয়শঙ্কর দুহাতে নিজের মুখটা ঢেকে  ফেলল।

তাৎক্ষণিক অপরিচিত শব্দে কিচিরমিচির শব্দ করে পাখিগুলি সাগরে দিশাহারা নাবিকের মতো এদিক ওদিক উড়ে চলেছে। উদয়শঙ্কর দেখতে পেল ঠোঁট দিয়ে টক টক শব্দ করে কয়েকটি বকও উড়তে শুরু করেছে।

গুড়ুম –গুড়ুম- গুড়ুম।

গুড়ুম– গুড়ুম– গুড়ুম ।

তিনবার তোপধ্বনি করে রাইফেল গুলি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রত্যেকেই সমস্বরে চিৎকার করে উঠল– জ্যোতিষ অমর রহে।

নুন, তিল এবং ঘি ছিটিয়ে দেওয়ায় চিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

উদয়শঙ্কর উড়তে থাকা বকের ঝাঁকটার দিকে লক্ষ্য করল। রাইফেলের শব্দ আর দপ দপ করে জ্বলে উঠা আগুনের আতঙ্কে শিহরিত হয়ে বকের ঝাঁকটা দিগ্বিদিক হারিয়ে যেদিকে সেদিকে উড়তে শুরু করেছে। নিজের বাসায় ফিরে আসার জন্য বলে মনে হচ্ছে। বকগুলি উড়ে গিয়ে দূরের একটি শিমুল গাছে এক এক করে বসতে লাগল। জ্যোতিষ ওদের দিকে কিছুক্ষণ নিমেষহীন ভাবে তাকিয়ে রইল।

ঘন্টা তিনেট পরে চিতার আগুন ধীরে ধীরে স্থিমিত হতে লাগল। সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত করে জ্যোতিষের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়ে গেল। একজন দুজন করে শেষ দলটিও সেই স্থান পরিত্যাগ করল।

পাখিদের পাড়া পড়োশিতে বকের ঝাঁকটা আজ সম্ভবত পুনরায় ফিরে আসবে না! তবুও তারা কী করে দেখার জন্য উদয়শংকর সারারাত নিভন্ত চিতার কিয়দংশ উষ্ণতা নিয়ে সেখানেই থেকে যেতে চাইল।

মঙ্গলবার, ৩০ মে, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শি- ১২ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pakhider Para Porshi

পাখিদের পাড়া পড়শি- ১২

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi








দ্বিতীয় অধ্যায়, 


(বারো)

সাতাশ তারিখ প্রজাপতি বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরটার পরিবর্তে পক্ষী বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরের ব্যবস্থা করা হল। আঠাশ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে প্রজাপতি বিষয়ক প্রকৃতি শিবির। অর্থাৎ এবারের প্রকৃতি শিবির দুদিনের জন্য অনুষ্ঠিত হবে। একনাগাড়ে কাজগুলি সম্পন্ন করতে হবে। না হলে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার সময় এসে যাবে। অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের অনুরোধের প্রতি উদয়শঙ্করকে গুরুত্ব দিতেই হবে। অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরাই তার কাছে মূলধন ,সামাজিক পুঁজি।

শিবিরের ব্যস্ততার মধ্যেও উদয়শঙ্কর বকের আস্থানার আশেপাশে একবার হলেও পদার্পণ করছে। দিনে কিছুক্ষণের জন্য না গেলে সে মনের মধ্যে অনুভব করে অসহ্যকর যন্ত্রণা।

বকগুলি প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। উদয়শংকর অতি মনোযোগের সঙ্গে ওদের লক্ষ্য করার সময় আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই থাকে। পুরুষ বকটি ঠোঁটের দুই অংশ দিয়ে টক টক শব্দ করে ধীরে ধীরে স্ত্রী বকটির কাছে হাজির হয়েছে। তারপর দীর্ঘ ঠোঁট দিয়ে গাছের একটি কোমল ডাল ভেঙে নিয়ে স্ত্রী বকটিকে অর্পণ করে প্রেম নিবেদন করছে, কোনো যুবক ছেলে একজন যুবতিকে প্রদান করা একটি গোলাপ ফুলের মতো। প্রজনন সক্ষম হওয়ার সামর্থ্য প্রদর্শন করে ধীরে ধীরে পুরুষ বকটির পায়ের সামনের ভাগ হলদে হয়ে পড়েছে । উদয়শঙ্করের জন্য দুঃখের বিষয় এটাই যে বক গুলির ডিম পাড়া পর্যন্ত ডিম থেকে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত– এই সুদীর্ঘ  সময় সে ওদের সঙ্গে থাকতে পারবে না । থাকতে পারবে না পাখিদের পাড়া-প্রতিবেশীতে। পাড়ায় অত‍্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে পাঁচটি বকের পরিবার ওদের ঘর তৈরি করেছে। গাছের ডালের শাখায় মঞ্চের মতো করে  গাছের ছোটো ছোটো ডাল বাঁশের মোড়ার টুকরো এবং গাছ পাতা দিয়ে তৈরি করেছে এক একটি ঝুপড়ি। ঝুপড়িতে ওদের সংসার দেখতে সত্যিই মনোরম ।

সুনন্দ সকাল বেলা চিৎকার চেঁচামেচি করায় সুনন্দের কণ্ঠস্বর শুনে বিছানা থেকে ধড়মড়  করে উঠে বসল উদয়শংকর।

– ঘুমাচ্ছিলেন উদয়দা?

–উহু। বিছানায় শুয়ে সঞ্জয়ের দৃষ্টি দিয়ে বকের বাসা নিরীক্ষণ করছিলাম।

– কী দেখলেন?

উদয়শঙ্কর  কী দেখতে পেল, কী দেখছিল সুনন্দকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

– তুমি কখনও এখানে দাঁড়িয়ে ওদিকে তাকিয়ে থাকলে গুয়াহাটি দেখতে পাও কি?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুনন্দ বলল– হ্যাঁ। দেখতে পাই। পরিষ্কার রাতে দূর দূরান্তে সাদা বিস্তৃত অঞ্চল দেখলে গুয়াহাটি মহানগরের আলো বলে মনে হয়। দীঘলী  পুকুরের পাড়ের কথা মনে পড়ে যায়। সেই জায়গাটা আমার ভালো লাগে। আর বর্ষার দিনে সে দিকে মেঘ দেখলে গুয়াহাটিতে বৃষ্টি পড়ছে বলে থাকি।

– এভাবে বিছানায় পড়ে থাকলে দেখতে পাই 'পাখিদের পাড়া পড়োশী' এবং প্রকৃতিশিবিরে অংশগ্রহণ করা অংশগ্রহণকারীদের। দেখতে পাই পাগলাদিয়ে নদীর দুই পার অধিক সবুজ হয়ে ওঠা, দেখতে পাই বড়শি বাইতে থাকা বিদেশি পর্যটক, উপন্যাস লিখতে আসা কোনো ভারতীয় লেখককে। আর, আর দেখতে পাই এখানকার ছেলেদের অভিধানে বেকার নামের শব্দটা নাই হয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতি তাদের ভাত দিচ্ছে, কাপড় দিচ্ছে, বেঁচে থাকার বাসনায় নতুন রঙ এবং মাত্রা দিচ্ছে। উদ্ধত যুবকদের মনে এসেছে কর্ম তৎপরতার উদ্দাম স্পৃহা।

– উদয়দা। এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে কত বছর কত যুগ লাগবে?

সন্ধিহান হয়ে জিজ্ঞেস করে সুনন্দ ।

– আরে বাবা। কাজ করা মানুষের জন্য জীবনটা অনেক ছোটো। বছর-যুগ লাগতে হলে দেখছি আমাদের জীবনের অর্থহীন আত্মাকে দায়িত্ব সমূহ সঁপে দিতে হবে। শিবিরে অংশগ্রহণ করা ছেলে মেয়েদের উৎসাহিত করে কাজে লাগাতে পারলে আগামী বছরে আমরা হয়তো কোনো সুফল দেখতে পাব।

সুনন্দ উদয়শংকরের কাছ  থেকে আগে এই ধরনের কথা শুনতে পায়নি। মানুষটা নিজের কল্পনাগুলি বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য বেশি তাড়াহুড়ো করছে হয়তো, তার জন্য সেও কখনও না ভাবা কথাও বলে ফেলেছে। মানুষটা মনের মধ্যে কী পরিকল্পনা পুষে রেখেছে জানার জন্য সুনন্দ ইচ্ছা প্রকাশ করায় ওদের সংকট ধীরে সুস্থে মনের কথাগুলি দুই একটা করে বলে গেল। উদয়শঙ্করের কথা শুনে সুনন্দের এমন মনে হল– সে যেন ধীরে ধীরে অন্য একটি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কল্পনার পৃথিবীটি বাস্তবের পৃথিবীতে পরিবর্তন করার অপ্রতিম ইচ্ছা পোষণ করে ওরা দুজন আগামী সপ্তাহে শিবিরে দুইদিন কীভাবে সুকলমে পার করবে তার পরিকল্পনা করতে লাগল।

– সুনন্দ, পাখি বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরটা পরিচালনা করবে সৌম‍্যদা এবং প্রজাপতি বিষয়ক শিবিরটা পরিচালনা করবে প্রণব কুমার ভাগবতী।

–দুজনেই আসবে কি? কী বলেছে আপনাকে?

– আসবে। আসবে। আমি ফোন করেছিলাম। সৌম্যদা আসতে পারবে বলেছে। কিন্তু তিনি বলেছেন এবারের শিবিরটা নাকি বন্ধ ঘরে করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রজেক্টর ব্যবহার করলে একটা জেনারেটর লাগবে। কারেন্ট কখন যাবে কখন আসবে তার ঠিকানা নেই। সৌম‍্যদা ব্যবস্থা করা যাবে কিনা বলে জিজ্ঞেস করায় আমি বললাম–হবে। সুনন্দই করবে। সুনন্দ হবে কি? আমি সৌম্যদাকে সম্মতি জানিয়ে বিপদে পড়লাম না তো!

– কোনো বিপদে পড়নি। ব্যবস্থা করা যাবে। অল্প হয়তো কষ্ট হবে। নদীতে মাছ মারতে আসার সময় যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম পখিনদা, তার ভাই প্রদীপের টেন্টহাউস থেকে জেনারেটর নিতে পারব। আমাদের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য জানতে পারলে খুব কম ভাড়া নেবে, হয়তো না নিতেও পারে। প্রজেক্টরও পাব। আমার একজন বন্ধু আছে, গুয়াহাটিতে ক্যামেরা, প্রজেক্টর আদির ভাড়ার ব্যবসা করে। তাকে বললে সে নিয়ে আসবে। কুছিয়া মাছ তার খুব প্রিয়, তাকে শুধু কুছিয়া মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ালেই হবে।

– তাহলে এগুলির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম।

– হবে আমি আজই তাদের দুজনকে বলে প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা করব।

সুনন্দের আশ্বাসে উদয়শংকর নিশ্চিত হল। উদয়শঙ্করের ভয় হয়েছিল– প্রজেক্টররের ব্যবস্থা করতে না পারলে সৌম্যদাকে কী বলবে।

সেদিন সন্ধেবেলা উদয়শঙ্করের ঘরে এসে সুনন্দ শিবিরের প্রথম দিনের দুপুরের আহার জোগাড় হওয়ার কথা উদয়শঙ্করকে জানাল। সুনন্দ বলল যে বিকেলের দিকে সে বগলস চকে  যাবার সময় বিপিন ডেকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মানুষটা বগলছ চ'ক বণিক সংস্থার সম্পাদক। সে সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল–' তোমরা নাকি আজকাল থানে কীসব কাজ করছ। সুনন্দু তাকে তারা কী কাজ করছে, কীভাবে করছে তা বিস্তৃতভাবে জানাল। প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপরে ডেকা, তার পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কিছু অংশ বর্ণনা করল। জায়গাটা এক সময় কীভাবে গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল, পাখ-পাখালিতে পরিপূর্ণ ছিল, এমনকি বিভিন্ন বন্য জীবজন্তুর মধ্যে একটা সন্তুলনের ভার দেখা যেত– মানুষের উপদ্রব্ পেয়ে সেই সমস্ত কীভাবে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল।তাঁর মন্তব্য অনুসারে তোমরা তরুণরা দায়িত্ব না নিলে শেষ রক্ষা করা যাবে না‌। জলাশয়ের বিভিন্ন পাখিগুলিও একদিন আমাদের মধ্য থেকে শকুন নাই হওয়ার মতো নাই হয়ে যাবে। সুনন্দ তখন বিপিনদাকে ২৭-২৮ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে চলা প্রকৃতি শিবিরের কথা জানাল এবং বলল–' দাদা যদি পারেন একবার এসে দেখে যাবেন। সুনন্দের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে বিপিন ডেকা তাকে জিজ্ঞেস করল— সুনন্দ, কতজন ছেলেমেয়ে হবে বলে মনে হয়। সুনন্দু তাকে জানাল যে ত্রিশ-চল্লিশ জনের মতো হতে পারে ।এখনই নির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলা একটু মুশকিল। সুনন্দকে মানুষটা অনুরোধ করার সুযোগই দিল না, তিনি নিজে থেকে বললেনঃ তাদের জন্য দুপুরের খাওয়া দাওয়া ব্যবস্থা করতে হবে। নয় কি? সুনন্দ লাগবে বলে জানাল। তখন বিপিন ডেকা বলল–– তাহলে সেদিনের দুপুরবেলার খাবারটা আমিই দেব। জীবনে কোনোদিন কোনো পুণ্যের কাজ করিনি। ভালো কাজ করতে ইচ্ছা বা ছেলেমেয়েগুলিকে এক বেলা খাইয়ে নিজের জীবনটাকে কিছুটা ধন্য করতে চেষ্টা করি। না কি বল! সুনন্দ মানুষটাকে মুচকি হেসে একটা ধন্যবাদ জানাল।

– ভালোই হয়েছে। এক বেলার সমস্যার সমাধান হল। পরের দিনে অবশ্য ছেলেমেয়ে কম হবে। সেদিনের সমস্যাটা আমিই সমাধান করে দেব।

সুনন্দ উদয়শঙ্করকে কী বলবে ভেবে পেল না।

– সুনন্দ। খাদ্য, প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা হল। আচ্ছা পাখির শিবিরটার কথা নিয়ে ভেবেছ?

– হ্যাঁ। বলতে ভুলে গেছি। পাখির শিবিরটা যেহেতু ব্যবহারিক না হয়ে বিদ্যায়তনিক হবে সেই জন্য আমি গঙ্গাপুখুরি হাইস্কুলের কথাই ভাবছি। স্কুলের হলঘরটিতে হলে খারাপ হবে না। আমি হেড স্যারের কানে কথাটা দিয়ে রেখেছি। স্যার বলেছেন প্রতুলকে বলে রাখবে। সে আমার থেকে চাবি নিয়ে নেবে এবং তোমাদের প্রয়োজনীয় ঘরটা তোমরা খুলে নেবে।

– সুনন্দ তুমি দেখছি ভেতরে ভেতরে সব ঠিক করেই ফেলেছ

– উদয় দা, আপনাকে জানাতে ভুলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।

সুনন্দের মনে জেগে ওঠা অপরাধবোধ দূর করার জন্য উদয়শঙ্কর বলল– এভাবে কেন ভাবছ। করার কাজ তুমি করে গেছ। এর মধ্যে জিজ্ঞেস করার তো কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।

– তবু। ঘরটা পছন্দ হবে কিনা জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।

– হয়তো ছিল। জনগণের কাজ সম্মতি সাপেক্ষে করা ভালো। তোমার যদি ভুল করেছ বলে মনে হয়ে থাকে, তাহলে তুমি শিখতে কৃপণতা করছ না। সামাজিক কাজের জন্য এটা হয়তো তোমার কাছে প্রথম পাঠ। অংশগ্রহণকারীদের জানানো হয়েছে কি?

– নবদা এবং কীচককে দায়িত্ব দিয়েছি। জেপিও দায়িত্ব নিয়েছে।

‐- ত্ৰিশ জনের বেশি যেন না হয়। আর দেখবে যাতে, একটু বেশি সচেতন অংশগ্রহণকারীর অংশগ্রহণ যেন সুনিশ্চিত করা যায়।

‐- সেই কথায় আমি একটু বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছি। যাতে ভবিষ্যতে তারা এই ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করতে পারে।

সুনন্দ এই কয়েকদিন প্রতিদিন সন্ধেবেলা এসে  উদয়শঙ্করকে  খবরা খবর জানিয়ে গেছে। নবদাএবং কীচকও এসেছিল । তারাও শিবিরের প্রস্তুতির বিষয়ে খবর নিয়ে গেছে । মোটের উপর প্রত্যেকেই উৎসাহী এবং উদ্বিগ্ন। 

শিবিরের দিন সকাল বেলা সৌম্যদা সোজাসুজি গঙ্গাপুখুরি হাই স্কুলে এল। গুয়াহাটিতেই একটু দেরি হওয়ায় তাড়াতাড়ি এসে বগলস চকে পৌঁছাতে পারল না। সৌম্যদা এসেই প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা কী ধরনের একবার দেখে নিল। সৌম্যদা সন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে হল উদয়শঙ্করের।

‐- ছেলেমেয়েরা আসার আগে একবার প্রজেক্টরটা স্টার্ট করে দেখ তো।

‐- দাদা ।আমি সবকিছু সংযুক্ত করে একবার দেখে নিয়েছি। ঠিকই আছে।

সুনন্দের বন্ধু বলীন বলল।

‐- আছে তো!

– হ্যাঁ আছে।

বলীন আশ্বাস দেওয়ায় সৌম্যদা উদয়শঙ্করকে  জিজ্ঞেস করল – কতজন প্রকৃতি কর্মী অংশগ্রহণ করবে ।

— ত্রিশ জন পঞ্জীয়নের টাকা দিয়েছে। আরও দুজন হয়তো বাড়তে পারে।তাঁরা আজ পঞ্জীয়ন করার কথা ছিল।

নটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শিবির আরম্ভ হল। বন্ধুরা কি করছে একবার দেখে যাই আর তিনি বলা অনুসারে তাঁর ছেলেগুলি দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করেছি কিনা দেখতে এসে শিবিরে উপস্থিত হয়েছিল বিপিন ডেকা। উদয়শঙ্কর বিপিন ডেকাকে শিবির উন্মোচনের দায়িত্ব দেওয়ায় মানুষটা আপত্তি করল– সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বলছি, আমি ব্যবসায়ী মানুষ, এই সমস্ত কিছু বুঝি টুঝি না। এত সম্মানের দায়িত্ব আমাকে দেবেন না।

সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর মানুষটার উপরে জোর করায় তিনি  বললেন– উপস্থিত জনগণ। আপনাদের শত কোটি প্রণাম। এই অভাজনকে এই দায়িত্ব দেওয়ায় আপনাদের শ্রদ্ধা এবং আমার চেয়ে বয়সে ছোটো সবাইকে ভালোবাসা জানাচ্ছি। সঙ্গে এই অভাজন দোষ ত্রুটির মার্জনা চেয়ে এই শিবিরটা উদ্বোধন করা হল বলে ঘোষণা করলাম।

হলঘরটা হাততালিতে ভরে গেল।

মানুষ কতটা আন্তরিক এবং সৌজন্যমুখী হলে নিজেকে হেয় করে দেখাতে পারে– বিপিন ডেকা সম্ভবত তার নৈষ্ঠিক উদাহরণ।

শিবিরের দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে সৌম্যদা নিজের ধরনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে পরিচিত হয় ক্রম সংখ্যা দাঁড়াল তেত্রিশ জন।

তৃতীয় পর্বে সৌম্যদা শিবিরের নির্দিষ্ট কার্য আরম্ভ করল।

পাখি কাকে বলে? বল, তোমরা কে জান? সব সময় দেখছ।

কী বলবে। সব সময় দেখছে অথচ বলার যেন কিছু নেই।

– বলার দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছে নাকি প্রত্যেকে? যাই হোক পাখি মানে হল– বিশেষ ধরনের ডানা, ঠোঁট থাকা ডিম পারা এক ধরনের উষ্ণ রক্তের মেরুদন্ডী প্রাণী যার উড়ার ক্ষমতা আছে। তার মধ্যে হয়তো দুই একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। তার মধ্যে বাদুর ডিম পারে না, বাচ্চা দেয়, উটপাখি উড়তে পারেনা।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারীদের প্রাগ ঐতিহাসিক সময় থেকে পাখির বিবর্তনের সম‍্যক জ্ঞান দিতে চেষ্টা করলেন-থেকোডেন্ট ডাইনোসর থেকে আরম্ভ করে প্র-আভিছ ,আর্কেয়রনিস এবং শেষে আধুনিক পাখির জন্ম কাহিনি। স্লাইডে দেখিয়ে দিলেন পাখিগুলির 'কম্পিউটার ইমেজ'। সৌম্যদা কিছু প্রাগ ঐতিহাসিক পাখির নাম বলল। সেইসব ক্রমে– জলচর পাখি হেছপেরোরনিছ, বৃহৎ আকৃতির স্থলচর  পাখি ডায়াট্রাইমা, ডায়াট্রাইমার পরবর্তী সময়ের বৃহৎ আকৃতির পাখি জলাভূমির অরণ্যে বাস করা পাখি হোয়াটিজিন ইত্যাদি অনেক। হোয়াটিজিন পাখির যে আলোকচিত্র সৌম্যদা স্লাইডে দেখাল সেটা সবাইকে বিস্মিত করে তুলল। এত সুন্দর এবং শক্তিশালী ছিল পাখিগুলি!

তারপরে সৌম্যদা আরম্ভ করল বর্তমানের পাখির ওপরে আলোচনা।

– তোমরা জান কি পাখি কেন উড়তে পারে? পাখির উড়তে পারার রহস্য কী, সে কথা প্রতিটি পক্ষীপ্রেমী তথা পক্ষী পর্যবেক্ষকের জানা উচিত।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতিপ্রেমিকদের মাঝখান থেকে কেউ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধৃষ্টতা করল না। কাকাবাবুর বৌমা অনামিকার চোখে চোখ পড়ল সৌম‍্যদার। দুজনেই দু'পাশে চোখ ঘুরিয়ে আনল–সৌম্যদাও  বলল না তুমি বল এবং বৌমা অনামিকাও বলার প্রয়াস করল না।

– পাখির দেহের গঠন, অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ, ওজন, ডানা এবং তার বিন্যাস, দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সজ্জা ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জীব বিজ্ঞানীরা পাখির এই অসাধারণ ক্ষমতার মূল উৎসের সন্ধান বের করতে সমর্থ হয়েছে। পাতলা অথচ শক্তিশালী শরীর, ডানার গঠন, ডানার বিন্যাস, পুচ্ছাংশ,ঠেং, ঠোঁট ইত্যাদি পাখির উড়ার কাজে সাহায্য করে। পাখির উড়ান প্রক্রিয়ায় ডানার ভূমিকা অনবদ্য। ডানা ঝাপটে পাখি বাতাসে উড়ে থাকতে এবং ডানা না ঝাপটে পাখি বাতাসে গ্লাইডারের মতো ভেসে থাকতে সক্ষম। পাখির ডানাটা মেলে ধরে পাখির বিন্যাস ডানার বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাওয়া যায় যে ডানার প্রথম অংশটা একটু স্থুল, তারপরে ক্রমান্বয়ে ডানাটা নিচের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ফলে উড়তে থাকার সময় পাখি বাতাসকে বেশিদূর পেছনদিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে পাখির গতিবেগ বৃদ্ধি পায় এবং এই বক্রতার জন্য ডানা ঝাপটে বাতাসের চাপ পাখির পিঠের উপরে কম পড়ে।

উড়তে শুরু করা এবং উড়তে থাকা পাখির ডানার সঞ্চালন দুটি শ্লাইডের সাহায্যে দেখিয়ে সৌম্যদা বুঝিয়ে বলা কথাটা আর ও সহজ সরলভাবে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করল। তারপরে সৌম্যদা প্রজেক্টরের মনিটরে প্রক্ষেপ করলেন বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন আকৃতির পাখি। পাখির শ্লাইডটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে সৌম্যদা পুনরায় বলতে শুরু করলেন।

– ডানা পাখির এক বিশেষ ধরনের আবরণ। সাধারণভাবে পাখির সংজ্ঞা দিলে বলা হয় ডানা থাকা সমস্ত প্রাণীই পাখি। আমাদের নখ আর চুলের মতো পাখির মূল উপাদান হল কেরাটিন। ডানা পাখির দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন রঙে রঙিন করে প্রকৃতি পাখির বিভিন্ন সামাজিক তথা নৈসর্গিক দিককে প্রভাবিত করে, পাখিকে মসৃণ করে রাখে। পাখির প্রজাতিভেদে পাখির রং আলাদা হয় বলে পাখির পর্যবেক্ষণ এবং সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ডানা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পাখির ডানা সময়ে সময়ে খসে পড়ে এবং সেই জায়গায় পুনরায় একই বর্ণের ডানা গজাতে দেখা যায়। পাখির ডানাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়– সেগুলি হল কনটুর বা আচ্ছাদন পাখি, ফিলোপ্লুম বা সূতালাহি পাখি আর প্লুমিউল বা কপাহী পাখি।

শ্লাইডে সৌম্যদা তিন শ্রেণির ডানার চিত্র প্রদর্শন করে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করে গেলেন। সঙ্গে বর্ণনা করলেন ডানার গঠন প্রণালী। শ্লাইডে দেখানোর জন্য অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি প্রেমিকদের বুঝতে যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে।

প্রতিটি ডানার মধ্য দিয়ে একটি কাঠি বা সেফট থাকে, তার দুপাশে কিছুটা ঊর্ধ্বগামী অবস্থায় কয়েকশো কোমল সুতোর মতো ফিলামেন্ট থাকে। প্রতিটি ফিলামেন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে বারবিউল  অথবা ছোটো ফিলামেন্ট। কাছের ফিলামেন্টকে খামচে ধরে রাখার জন্য প্রতিটি বারবিউলের সঙ্গে আছে কয়েকশো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অতি ক্ষুদ্র হুক।

সৌম্য দা স্ক্রিনে উদ্ভাসিত হওয়া প্রতিটি অংশ সুন্দর করে দেখাচ্ছে ।

–এখন আসছি পাখির পুচ্ছাংশে।পুচ্ছাংশের সাহায্যেই পাখি বাতাসে তীব্র গতিতে বিচরণ করার সময় দিক পরিবর্তন করে বাতাসে নিজের গতিবেগ  কমানো বাড়ানো করতে পারে, এমন কি বাতাসে ভেসে থাকার জন্য ও পাখি তার পুচ্ছাংশ ব্যবহার করে । প্রজাতি ভেদে পাখির পুচ্ছাংশের ব্যবহারে ধরন ধারন ভিন্ন । শরীরের ভর প্রয়োগ করে পাখি গাছের ডালে ভারসাম্য বজায় রাখতে জলের নিচে প্রবেশ করার জন্য ক্ষিপ্রতা বাড়ানোর আবশ্যক হিসেবে পাখি পুচ্ছাংশের  ব্যবহার করে। অভিব্যক্তি সূচক তথা ভাব বিনিময়ের জন্য প্রজাতিভেদে পাখির পুচ্ছাংশের গতিবিধি ভিন্ন । কিছু পাখির প্রজাতির পুরুষ এবং স্ত্রী পাখির পুচ্ছাংশ ভিন্ন অবয়ব এবং ভিন্ন রংয়ের হতে দেখা যায়। কোনো কোনো প্রজাতির পুচ্ছাংশ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার তথা প্রজনন ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় । পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এই সমস্ত এড়িয়ে চলতে না পারাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি বলা কথাগুলি তোমরা প্রত্যেকেই বুঝতে পেরেছ কি ?

সৌম্যদা শ্লাইডে প্রত্যেকেই সাধারণত দেখতে পাওয়া দশটা প্রজাতির পাখির ভিন্ন আকৃতির পুচ্ছাংশের রেখাচিত্র দেখালেন । এই রেখাচিত্রগুলিতে অঙ্কিত বিভিন্ন আকৃতির পুচ্ছাংশ সাধারণভাবে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তারপরে সৌম্যদা  পরবর্তী শ্লাইডটি স্ক্রিনে প্রক্ষেপ করলেন। তার মধ্যে অঙ্কিত রয়েছে দশ ধরনের ভিন্ন পাখির ঠ্যাঙের রেখাচিত্র । রেখাচিত্র সমূহের নিচে পাখি গুলির নাম লেখা আছে । প্রথমটিতে লেখা আছে কাঠঠোকরা পাখির ঠেং এবং শেষেরটিতে লেখা আছে বন্য মোরগের ঠেং। সৌম্যদা পাখির ঠেং গুলির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর সময় হঠাৎ প্রজেক্টর চালানো ছেলেটির অসাবধানতাবশত একটা হাত প্রজেক্টরে লেগে স্ক্রিন থেকে ছবিগুলো নাই হয়ে গেল। 

– তোমার নাম কি?

প্রজেক্টর চালানো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে সৌম্যদা জিজ্ঞেস করল।

– দাদা, বলীন। ছেলেটি সমীহের সঙ্গে বলল।

– বলীন, তুমি কাজটা ভালো করলে না। একটু দেখেশুনে–

সৌম্যদা অসন্তুষ্ট মনে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সৌম‍্যদাকে বেরিয়ে আসতে দেখে উদয়শঙ্কর পেছন পেছন বারান্দায় বেরিয়ে এল। বলীন অবশ্য বেশি সময় নিল না। দৌড়াদৌড়ি করে প্রজেক্টরটা ঠিক করতে সে সমর্থ হল।

– একটা মুডে কথা গুলি বলা হয়। মুড অফ হয়ে গেলে খারাপ লাগে।

বলীন প্রজেক্টরটা পুনরায় সঠিক অবস্থানে আনার পরে সৌম্যদা পাখির ঠেঙের ওপরে বলতে শুরু করলেন।

– পাখি যে  প্রাগ ঐতিহাসিক কালের কোনো একটি যুগে সরীসৃপ ছিল তার আভাস আমরা পাখির ঠেঙে দেখতে পাই। সেটা হল– প্রায় সমস্ত পাখির ঠেঙে আমরা ছাল বা স্কেল দেখতে পাই। সরীসৃপের শরীরে ছালগুলি বেশিরভাগ পাখির ডানায় রূপান্তরিত হলেও ঠেঙের দিকের ছাল সেরকমই থেকে গেল। পাখির ঠেং অধ্যয়ন অথবা পর্যবেক্ষণ করে পাখি গুলির বাসস্থান সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সেভাবে ঠেং পর্যবেক্ষণ করে পাখির জীবনযাত্রা প্রণালীর অনেক কথা জানতে পারা যায়। পাখির ঠেঙ কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতের মতো কাজ করে। ভূমি থেকে বাতাসে উড়ার সময় কিছুটা দৌড়ে যায়, ফলে পাখির শরীর বাতাসে ভেসে থাকায় সুবিধা হয়। এর জন্য পাখির ঠেঙের প্রয়োজন যথেষ্ট। পাখি সাঁতরানোর জন্য ঠেং ব্যবহার করে। মাংসাহারী পাখিগুলি শিকার ধরার জন্য ঠেঙের ব্যবহার করে।

শ্লাইডে থাকা এক একটি ঠেং দেখিয়ে সৌম্যদা পাখির ঠেঙের ব্যবহারের উপর বক্তব্য রাখলেন । পাখির ঠেঙের ওপরে  বলার পরে সৌম্যদা ল্যাপটপের ' এন্টার বাটনে' আঙ্গুল দিয়ে আস্তে করে টোকা দিয়ে শ্লাইডটা পরিবর্তন করে নিলেন । শ্লাইডটাতে দেখতে পাওয়া গেল পাখির কয়েক ধরনের ঠোঁটের রেখাচিত্র।

–এবার তোমাদের পাখির ঠোঁটের বিষয়ে কিছুটা আভাস দেবার চেষ্টা করব। আমাদের হাত, পাখির ঠোঁট। ঠোঁটের  সাহায্যে পাখি শিকার করে, খাদ্য গ্রহণ করে বা খাদ্য তুলে নেয়, আত্মরক্ষা, সন্তান লালন- পালন করা, ঘর তৈরি করা, শরীরের যত্ন নেওয়া এমনটি ঠোঁটের সাহায্যে পাখি নিজের স্বরের তারতম্য ঘটিয়ে বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বর বের করে।

সৌম্যদা শ্লাইডটার পরিবর্তন করল। শ্লাইডটাতে  দেখতে পাওয়া গেল বিভিন্ন পাখির রেখাচিত্র। সৌম‍্যদা এক এক করে বিভিন্ন পাখির ঠোঁটের বর্ণনা দিল এবং প্রতিটি ব্যবহারের বিষয়ে বলে গেল।

– বিভিন্ন খাদ্য খাওয়ার জন্য পাখির ঠোঁটের গঠন প্রণালী বিভিন্ন। এখানে তোমরা তাকিয়ে দেখ এই ধরনের ঠোঁট জল বা কাদা থেকে খাদ্য খাওয়ার জন্য, এগুলি ঠোঁট আবার পোকা ধরার জন্য, এই ঠোট গুলি বীজের অভ্যন্তর ভাগ খাওয়ার জন্য, এই ঠোঁটগুলি কাঠ ফুটো করার জন্য, এগুলি মাংস কাটার জন্য, এগুলি পোকা এবং গুটি খাওয়ার জন্য, এগুলি শস্য খাওয়ার জন্য, এগুলি ফল খাওয়ার জন্য, এগুলি মধু চোষার জন্য, এগুলি গভীর কাদা থেকে পোক ইত্যাদি খাবার জন্য, এগুলি মাছ শিকারের জন্য, এগুলি সবকিছু ভক্ষণের জন্য উপযোগী।

প্রতিটি ঠোঁটের খাদ্য উপযোগিতার বিষয়ে বলে যাবার সময় সৌম‍্যদা প্রতিটি ঠোঁটের উপরে হাতে থাকা ছোটো একটি লাঠি দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছেন। ফলে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকেরই ঠোঁট গুলি চিনতে সুবিধা হয়েছে।শ্লাইডে থাকা কয়েকটি ঠোঁট দেখে প্রতিজন প্রকৃতিপ্রেমী সেটা কোন পাখির ঠোঁট সহজে চিনতে পারতে সক্ষম হয়েছে।

– পাখির দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণ শক্তি এবং শ্রবণশক্তির বিষয়ে পাখি পর্যবেক্ষকরা প্রথমেই একটু জেনে নেওয়া আবশ্যক। পাখির দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। পাখির তীব্র গতি, আকাশ থেকে নিচের ভূপৃষ্ঠে দৃষ্টিপাতের প্রয়োজনীয়তা, অরণ্যে উড়ে বেড়ানোর সময় বাধাহীন ভাবে গাছের ডাল এবং শিলের পাহাড় গুলিকে স্পর্শ না করে বা ধাক্কা না খেয়ে উড়ে বেড়ানোর দক্ষতা, শিকার খুঁজে বেড়ানো অথবা নিজে শিকার হয়ে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়ানোর সময় পাখির তীব্র দৃষ্টিশক্তির অতীব প্রয়োজন। পাখি দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে বস্তুর দূরত্ব মাপতে পারে, সেই দূরত্ব কত গতিতে অতিক্রম করবে সেটা ঠিক করে। পাখির দৃষ্টিশক্তি যেমন প্রবল তেমনি ঘ্রাণ শক্তি বড়ো দুর্বল। ব্যতিক্রম হিসেবে নিউজিল্যান্ডের কিবি পাখির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কিবি পাখি প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন, ঘ্রাণ শক্তির উপরে নির্ভর করেই এই ধরনের পাখি গুলি জীবন যাপন করে। পাখির ঘ্রাণশক্তি ক্ষীন হলেও শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রবল। লক্ষ্মী পেঁচা ইঁদুরের ক্ষীন শব্দ শুনে ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও শিকার করতে পারে। সদ্য জন্মানো পাখির শাবক গুলির ও শ্রবণশক্তি প্রবল। উদাহরণ হিসেবে মা ঠোটে খাবার জিনিস এনে সাংকেতিক শব্দ করার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় থাকা সবগুলি শাবক খাবার জন্য ঠোঁট মেলে চিৎকার করতে শুরু করে। পাখির শ্রবণশক্তি পাখির অন্যতম প্রধান ইন্দ্রিয়শক্তি।

পাখির দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণ শক্তি এবং শ্রবণ শক্তির বিষয়ে বলার পরে সৌম্য শ্লাইডের পরিবর্তন করল।

– এগুলি পাখির বাসা। তোমরা প্রত্যেকেই জান পাখি ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হলে সেই বাচ্চাকে লালন পালন করে গড়ে তোলার জন্য পাখি বাসা তৈরি করে। প্রজননকার্য সম্পন্ন হওয়ার আগে থেকেই অথবা প্রজননকালে পাখির স্বভাবে বাসা তৈরি করার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। প্রজাতি ভেদে এই বাসা তৈরি করার দায়িত্ব তথা প্রবণতা পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়ের মধ্যে দেখা যায়। কিছু প্রজাতির মধ্যে তৈরি করার কাজটা কেবল পুরুষ পাখিকে করতে দেখা যায়, কিছু প্রজাতির মধ্যে আবার স্ত্রী পাখি বাসা তৈরি করার কাজ করে। কিছু পাখির প্রজাতির মধ্যে স্ত্রীপুরুষ উভয়েই  বাসা তৈরি করার কাজ করে । সাধারণত দেখা যায় বড়ো আকৃতির পাখিগুলি মুক্ত স্থানে বাসা তৈরি করে এবং ছোটো পাখিগুলি তুলনামূলক ভাবে গুপ্ত অঞ্চলে বা লুকিয়ে চুরিয়ে বাসা তৈরি করতে পছন্দ করে।প্রজাতি ভেদে এবং বসবাস করার পদ্ধতি ভেদে পাখিগুলি বিভিন্ন স্থানে বাসা তৈরি করে। কিন্তু প্রত্যেকটি প্রজাতি যখন বাসা তৈরি করে তখন তার আশেপাশে প্রাকৃতিক খাদ্য ভান্ডার আছে কিনা সেদিকেও লক্ষ্য রাখে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল নিরাপত্তা। শুধুমাত্র পাখির বাসা সম্পর্কে দুই ঘন্টা বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালে এই বিষয়ে আমরা তথ্য সহকারে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করব। আজ আমাদের কম সময়ের মধ্যে পাখির ওপরে সম্যক ধারণা একটা গ্রহণ করতে হবে।

সৌম্যদা শ্লাইডটা বদলে দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল পাখির কয়েকটি ডিম। পাখির ডিমগুলি প্রকৃতি কর্মীদের দেখিয়ে সৌম্যদা পুনরায় শ্লাইডটা বদলে দিল। এবার শ্লাইডে ভেসে উঠলো ডিমের গঠন এবং চার ধরনের ডিমের আকৃতি।

– তোমরা প্রত্যেকেই পাখির ডিম দেখেছ। খাবার জন্য আনা হাঁস বা মুরগির সিদ্ধ ডিমের কথা মনে কর। তারপরে ডিমের গঠন প্রণালীর এই রেখাচিত্রটির দিকে তাকাও। ডিমের বাইরের কঠিন আবরণটিকে ডিমের খোসা এবং ইংরেজিতে বলা হয় সেল। ডিমের খোসাটা ছাড়ানোর পরে একটা অত্যন্ত পাতলা ত্বক আমরা দেখতে পাই। তাকে অভ্যন্তরীণ বলে বলা হয়। ডিমের ভোঁতা অংশের দিকে একটি বাতাসের থলে থাকে। সিদ্ধ ডিমের সূঁচলো অংশের বিপরীত অংশ বাতাসের থলের মতো ভোঁতা।দেখেছ তো! তারপর দেখতে পাবে ডিমের সাদা অংশ । এটিকে এলবুমিন বলা হয়।অধিকাংশ প্রোটিন দিয়ে এই অংশ গঠিত । সাদা অংশের মাঝখানে থাকে ডিমের কুসুম বা ইয়ক। এটা ডিমের শক্তি ভান্ডার । এখানে থাকে ভ্রুণ । ভ্রুণ থেকে পাখির বাচ্চার জন্ম হয়। এটা অতি সাধারণ ব্যাখ্যা। তোমাদের মধ্যে যারা ডিমের আকৃতি শুধু গোলাকার বলে ভেবেছ– তোমরা এই আকৃতি চারটি দেখ। ডিমের আকৃতি চার ধরনের। গোলাকার, ডিম্বাকার, আপেক্ষিক ডিম্বাকার এবং প্রায় শঙ্কু আকারের। প্রকৃতিতে যে সমস্ত পাখি বেশি বিপর্যস্ত অথবা খাদ্য শৃংখলায় যে সমস্ত পাখির যোগদান অত্যন্ত বেশি সেই সব পাখি ছোটো ছোটো ভাগে বছরের বিভিন্ন সময় একাধিক ডিম পাড়ে। আকারের বড়ো পাখির ডিমও বড়ো আকারের । খাদ্যের প্রাচুর্যতার ওপরে নির্ভর করে পাখি একবার পাড়া ডিমের সংখ্যার তারতম্য হতে দেখা যায়। ডিমের বর্ণ সাধারণত সাদা হলেও প্রজাতি অনুসারে পাখির ডিমের বর্ণ নীল ,নীলাভ, সবুজ ,সবুজ মেটে রংয়ের,খয়েরি এবং ফুটফুটে হতে পারে।

সৌম্যদা পাখির ডিমের সমস্ত দিকের ওপরে আপাতদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করে গেলেন।

– তোমাদের পাখির বিষয়ে আদ্যোপান্ত বলার মতো আজ সময় হবে না। একেবারে সাধারণ ব্যাখায় এভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে তোমরা একটি ন্যূনতম ধারণা করতে পার। তোমাদের পাখির শ্রেণীবিভাজনের কথা বলতে চাইনি। সেটা পাখির পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এড়িয়ে চলা যায়। তোমাদের জানানোর জন্য এখন পাখি পর্যবেক্ষণের সময় মনে রাখার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথার ওপরে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

তখনই উদয়শঙ্কর সৌম্যদার কাছে এসে কানে কানে বলল– চায়ের বিরতি দেওয়া যাবে নাকি?

– তোমাদের জন্য দশ মিনিটের চা বিরতি। কেউ বাইরে থেকে আসতে চাইলে যেতে পার। কী নাম ছিল তোমার–বলীন– তুমিও তাড়াতাড়ি এক কাপ চা খেয়ে নাও।

তিন ঘন্টা সময় কীভাবে পার হয়ে গেল অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা বুঝতে পারল না। তাদের মধ্যে দুজন বাইরে গেল। দুজন জায়গায় বসেই আড়মোড়া ভেঙ্গে নিল। সবাইকে নিজের নিজের বসা জায়গায় চা এবং একটা করে সিঙ্গারা দেওয়া হল। সিঙ্গারা গুলি বিপিন ডেকা তার একজন কর্মচারীর মাধ্যমে তুলিকা মিঠাই ঘর থেকে আনিয়েছে। চা- সিঙ্গারা পর্ব দশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হল। সৌম্যদা পুনরায় শিবিরের আলোচনা আরম্ভ করল।

– তোমাদের পাখি পর্যবেক্ষণের কয়েকটি দরকারি কথা বলার প্রয়োজন আছে। পাখি পর্যবেক্ষণের অভ্যাস বর্তমানে প্রকৃতি বিজ্ঞানের অন্যতম অপরিহার্য এক কার্যক্রম। পাখি পর্যবেক্ষণ এবং অধ্যয়নকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় – অরিন্থোলজি আর যে সকল ব্যক্তি এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে বলা হয় অরিন্থোলজিস্ট।তোমাদের জেনে রাখা ভালো যে একটা পাখিকে দেখলে বা তার নাম জানলেই পাখির পর্যবেক্ষণ করা বোঝায় না। একটা পাখিকে পর্যবেক্ষণ করা মানে পাখিটির বাহ্যিক ক্রিয়া কলাপ , ভাব-ভঙ্গি ,ব্যবহার, জীবন-চক্র তথা জীবন নির্বাহের পদ্ধতিগত জ্ঞান এবং সর্বোপরি একটা পাখির সঙ্গে তার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধ এবং সম্পর্কের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার প্রয়াস করা। তার জন্য পাখি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে, অধ্যবসায়ের সঙ্গে পাখিটিকে অনুসরণ করতে হবে এবং পাখিটার সঙ্গে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হতে হবে।

পাখি পর্যবেক্ষণের শুরু করতে হবে পাখিটাকে শনাক্তকরণের মাধ্যমে। পাখিটা কী প্রজাতির তার নাম কী জানতে হবে। একজন পাখি পর্যবেক্ষক হিসেবে তুমি দেখতে হবে তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটা দেখতে কী ধরনের, পুরুষ না মহিলা, একা আছি না দলের মধ্যে আছে, খাদ্য সন্ধানে আছে না বিশ্রাম নিচ্ছে, ডানার যত্ন নিচ্ছে নাকি, পাখিটা কোথায় বসে আছে, কীভাবে বসে আছে, চুপচাপ বসে আছে না মুখ দিয়ে শব্দ করছে, তার কন্ঠস্বর কী ধরনের, হাঁটার সময় কীভাবে হাঁটছে, উড়ে যাবার সময় কীভাবে উড়ছে, একনাগারে কতটা উড়ে যাচ্ছে, গিয়ে কোথায় বসছে ইত্যাদি অনেক কথা নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে দেখা ব্যক্তিকে আমরা ভালো পর্যবেক্ষক হিসেবে অভিহিত করতে পারি।

সৌম্যদা বিরতিহীন ভাবে বলে চলেছেন।

‐ প্রথম কথা হল পাখিটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। অপরিচিত একটি পাখির সঙ্গে পরিচিত হতে হলে প্রথমেই পাখিটার আকৃতি কী রকম নোট বইয়ে  তা  লিপিবদ্ধ করবে। তার জন্য কিছু পাখিকে তুলনামূলক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ছোট্ট চড়ুই একটা ছয় ইঞ্চির হলে, শালিক পাখি নয় ইঞ্চির, পায়রা তেরো ইঞ্চির, কাক সতেরো ইঞ্চির, শকুন ছয়ত্ৰিশ ইঞ্চির‐ এসব পাখিকে মাধ্যমিক হিসেবে নিয়ে তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটা এর মধ্যে কোন মাপের ভেতরে পড়ে তা বের করে নেওয়া যেতে পারে। চড়ুই পাখির চেয়ে বড় হলে লিখবে‐- চড়ুই পাখি আর পাশে একটা যোগাত্মক চিহ্ন। ছোটো হলে লিখবে চড়ুই পাখি এবং পাশে লিখবে একটি বিয়োগ চিহ্ন। সমান হলে যোগ চিহ্নের  নিচে একটা বিয়োগ চিহ্ন বসিয়ে দেবে। এভাবে শালিক, পায়রা, কাক এবং শকুনের মাধ্যমে পাখি পর্যবেক্ষণের সময় তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটির আকৃতির মান বের করে নিতে পারবে। ক্রিকেট খেলার একজন দর্শক খেলার মাঠের কোন স্থানকে কী নামে জানা যায় না জানলে, কোন খেলোয়াড় কোথায় অবস্থান করছে জানতে অপারগ হয়। ফলে সে পরিশীলিত দর্শক হতে পারে না। সেভাবে একজন  পাখি পর্যবেক্ষক পাখির শরীরের কোন স্থানকে কী নামে জানা যায় তা না জানলে তাকে পরিশীলিত পর্যবেক্ষক বলা যায় না। এবং সেই ব্যক্তি পক্ষীর পর্যবেক্ষণে কোনো মতেই সফল হতে পারেনা।

পাখির শরীরের অংশগুলির নাম মনে রাখতে পারলে অপরিচিত একটি পাখির নির্দিষ্ট স্থানগুলিতে কী বর্ণের পাখি আছে তোমরা স্থান অনুসারে নোট বইয়ে টুকে নিতে পারবে। পাখিটার শরীরে কোন রঙের প্রাধান্য বেশি, পাখির ঠোঁটটা কী রংয়ের, কত লম্বা এবং কত ছোটো তোমাদের নোট বইয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে হবে। তারপর তোমরা লক্ষ্য করবে পাখিটার পুচ্ছাংশ। পুচ্ছাংশে কী রংয়ের প্রাধান্য লাভ করেছে, কতটা দীর্ঘ অথবা কতটা ছোটো, কোনো বিশেষত্ব রয়েছে কিনা, পুচ্ছাংশ নাচাতে থাকে না স্থির করে রাখে  ইত্যাদি কথাগুলি একাদিক্রমে নোট বইয়ে লিপিবদ্ধ করবে। এভাবে লিপিবদ্ধ করার ফলে তোমার নোট বইয়ে পাখিটা সম্পূর্ণরূপে ধরা দেবে। পাখি  পর্যবেক্ষণের কোনো গ্রন্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অথবা কোনো অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করলে পাখিটাকে শনাক্ত করতে তুমি সক্ষম হবে।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি প্রেমিকরা কীভাবে তার কথাগুলি  গ্রহণ করছে অনুধাবন করার জন্য কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইল। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী আগ্রহের সঙ্গে তার কথা শুনে গিয়েছে এবং বোঝার চেষ্টা করেছে।

– তোমরা বুঝতে পেরেছ কি?

– হ্যাঁ পেরেছি।

অস্ফুট কন্ঠে সবাই সমস্বরে বলে উঠল।

– তোমরা আর ও মনে রাখবে– পাখি পর্যবেক্ষণ কেবল চাক্ষুষ মাধ্যমেই করা হয় না, শ্রবণের  মাধ্যমেও করা হয়। সঙ্গে পাখি পর্যবেক্ষকের নিজের বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও কিছু বিশেষ গুণ থাকা দরকার । তোমাকে লক্ষ্য রাখতে হবে কীভাবে নিঃশব্দে অরণ্যে অথবা পাখি থাকা অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতে পারা যায় । তোমাদের বলেছি যে পাখির শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রবল। তাই তুমি করা অত্যন্ত সাধারন একটা শব্দে একটা পাখি উড়ে চলে যেতে পারে। তুমি পরিধান করা জুতো জোড়ার ওপর গুরুত্ব দেবে, হাঁটার সময় যেন খটখট করে শব্দ না করে । আরক্ষী বা সৈনিকের প্রয়োজনীয় পোশাক- পরিচ্ছদের কিছু দোকান থাকে। তোমাদের কাছে রঙ্গিয়ার রেল জংশনের কাছে সেই ধরনের দোকান আছে । সৈনিক ব্যবহার করা কাপড়ের জুতো কিনতে  পাওয়া যায়, সেটা ব্যবহার করতে পার। মনে রাখবে, পাখি পর্যবেক্ষণের সময় তুমি গুরুত্ব দিতে হবে তুমি পরিধান করা পোশাক- পরিচ্ছদের ওপরে। এ কথাও তোমাদের জেনে রাখা দরকার যে পাখির শ্রবণ শক্তির সঙ্গে পাখির দৃষ্টিশক্তিও খুব প্রখর। তাই তুমি পরিধান করা উজ্জ্বল রংয়ের পোশাক দেখলে পাখি পর্যবেক্ষণ তোমার পক্ষে সুখকর হবে না। সেই জন্য অরণ্যের সবুজের সঙ্গে খাপ খাওয়া খাকি, খয়েরি, অনুজ্জ্বল ,মেটে হলদে জলপাই সবুজ , ছাই রং ইত্যাদি অনুজ্জল রঙের পোশাক পরিধান করবে । সঙ্গে তুমি পরিধান করা কাপড় একেবারে ঢিলেঢালা হলে ভালো। অঙ্গ সঞ্চালন করার জন্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যেমন বুকে ভর দিয়ে এগোনোর জন্য, লাফানোর জন্য সুবিধে হয়। যতটা সম্ভব তুমি খালি চোখে পাখি পর্যবেক্ষণ করবে। বাইনোকুলারের অতিরিক্ত ব্যবহার তোমার চোখের ক্ষতি করতে পারে। পাখি পর্যবেক্ষণের সময় আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাখির ডানার সঠিক রং প্রত্যক্ষ করতে হলে পাখি পর্যবেক্ষণের সময় আলো সবসময় পর্যবেক্ষকের মাথার পেছন দিক থেকে এলে ভালো হয়, মুখোমুখি আলো হলে অর্থাৎ সূর্যের দিকে পাখি পর্যবেক্ষণ অসুবিধা জনক। পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ঋতু বা সময়  নেই। দিনের বা বছরের যে কোনো সময় পাখি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তবে সকালের দিকে এবং সন্ধ্যের সময় পাখি বেশি সক্রিয় হয়ে থাকে বলে সেই সময় পাখি পর্যবেক্ষণ করা ভালো। শীতের দিনে আমাদের এখানে পাখির প্রব্রজন ঘটে বলে শীতের দিনে প্রব্রজনকারী পাখি পর্যবেক্ষণ করতে সুবিধা। তোমরা সেই সুবিধা গ্রহণ করতে পার। ফাগুন চৈত্র মাসে শীর্ণ গাছে পাখি দেখতে ভালো,গাছের পাতার আড়াল নিতে পারেনা বলে পাখিকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পাখি যখন বাসা তৈরি করে, ডিম পেড়ে তা দেয় তখনও পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত সময় । শেষে তোমাদের জানিয়ে রাখি – কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে নিয়মিত ভাবে পাখি পর্যবেক্ষণ করতে হলে কৃত্রিম ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে থেকে সহজে পাখি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে । স্থানীয়ভাবে উপলব্ধ গাছ- পাতা- লতা ব্যবহার করে তৈরি ঝোপের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে অতি সন্তর্পনে কাছ থেকে পাখি পর্যবেক্ষণ করলে খুব সুফল পাওয়া যায়।বাজারে এলুমিনিয়াম রড এবং প্যারাসুট কাপড়ের তৈরি এক ধরনের কৃত্রিম ঝোপ কিনতে পাওয়া যায় ।

সৌম্যদা সাবলীল ভাবে বর্ণনা করে গেল । তার বর্ণনা শুনে অংশগ্রহণকারীরা কৃত্রিম ঝোপের ভেতরে প্রবেশ করে পাখি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা লাভের আনন্দ অনুভব করল ।সৌম্যদা পাখি পর্যবেক্ষণের সময় পাখির প্রতি গ্রহণ করা সাবধানতার কথাও বলল। ডিম পাড়া পাখি এবং ডিমের কোনোভাবেই অনিষ্ট করা অনুচিত ।সঙ্গে সৌম্যদা বলল কোনো কারনে পাখির ডিম বা বাচ্চা যাতে পর্যবেক্ষণকারীরা সংগ্রহ না করে । একটি একটি শ্লাইড পরিবর্তন করে সৌম্যদা বিভিন্ন পাখি দেখিয়ে গেল। সঙ্গে বলল– পাখিগুলি বিভিন্ন অবস্থানে বসবাস করে। তার মধ্যে জলাশয়, মাটি,তরুতৃণ, ঝোপ,খোড়ল,গুল্মে , বৃক্ষে বা জঙ্গলে বাসা তৈরি করে বসবাস করা পাখিগুলিকে শ্লাইডে আলাদা আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছে। অবশ্য তার মধ্যে কিছু পাখি যেমন বার্ড বাটন কোয়েল, এক ধরনের মেটে  রঙের পাখি অরণ্য, তৃণভূমি এবং এমনকি ঝোপ ঝাড়ে ও বসবাস করে।সৌম্যদা প্রায় তিনশো পাখি শ্লাইডে দেখিয়ে পাখিগুলি শনাক্তকরণের ভিত্তি এবং ইংরেজি নামগুলি মনে রাখার জন্য কী করা উচিত তার আভাস দিয়ে গেলেন।

-এই পাখিটা দেখ।কী নাম?

– বুলবুলি।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা সমস্বরে বলল।

‐- এই পাখিটার ইংরেজি নাম হল  রেড- ভেনটেড বুলবুল । ভেন্ট মানে ফুটো বিষ্ঠা বের হওয়ার ফুটো। এই পাখিটাৰ বিষ্ঠা বের হওয়া ফুটো থাকা জায়গাটা লাল। তার থেকে নাম হয়েছে রেড ভেন্টেড। এভাবে এই পাখিটা টুনি পাখি। এটাও তোমরা সচরাচর দেখতে পাওয়া পাখি। ইংরেজি নাম স্কেলি-ব্রেস্টেড  মুনিয়া। স্কেলি ব্রেস্টেড মানে বুকে ছাল থাকা। পাখিটা মুনিয়া ধরনের। তাই বুকে ছাল থাকা টুনি পাখির এই প্রজাতিটার ইংরেজি নাম স্কেলি ব্রেস্টেড মুনিয়া। পুনরায় একটি উদাহরণ দিচ্ছি‐ এই পাখিগুলো তোমরা দেখে থাক। অসমিয়া নাম নাচুনি চড়াই। ইংরেজি নাম হোয়াইট থ্ৰোটেড ফেন টেইল। থ্ৰোট মানে গলা। এই পাখির গলার দিকটা সাদা। অন্যদিকে ফ্যান মানে হাওয়া করা। নৃত্যরত পাখিটার পুচ্ছাংশ দেখতে পাখার মতো। এভাবে অনুবাদ করে নিলে পাখিগুলির নাম মনে রাখতে সুবিধা হবে। চেষ্টা করে দেখতে পার।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের দুই চারটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সেদিনের মতো প্রশিক্ষণ শিবির শেষ করল। সঙ্গে বলল যে আগামী বছরে ব্যবহারিকভাবে পাখির বিষয়ে শেখার জন্য পুনরায় একটি পর্যবেক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থা করা হবে ।শিবির সমাপ্ত করার পরে বিপিন ডেকা সৌম্যদার কাছে এগিয়ে এল এবং সৌম্যদার হাত দুটি জড়িয়ে ধরল। পাখির বিষয়ে জানতে পেরে মানুষটা আপ্লুত ।

‐চোখের সামনে দেখতে থাকা কথা অথচ আমরা জানি না ।আপনি আজ আমার জীবনটা ধন্য করে দিলেন। সৌম্যদা বিপিন ডেকাকে শিবিরে উপস্থিত থাকার জন্য ধন্যবাদ জানালেন ।পাখির সঙ্গে আগে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য এবং সৌম্যদার বই ইতিমধ্যে পড়ার জন্য সৌম্যদার বলা কথাগুলি সুনন্দ সহজে বুঝতে পারল ।সৌম্যদা বলা কথাগুলি 'অসমের পাখি পর্যবেক্ষণ'এর হাত পুঁথিতে সাবলীল ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি থেকে সুনন্দ যথেষ্ট উপকৃত হয়েছে।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...