বাসুদেব দাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাসুদেব দাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৪

হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় ।। বাসুদেব দাস,Basudev Das

হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়

বাসুদেব দাস



১৫ আগস্ট সমগ্র ভারতবাসীর জীবনে এক স্মরণীয় কিন্তু বেদনাদায়ক দিন। শত শহীদের রক্তে রাঙানো ১৫ আগস্ট, আজ আমাদের জাতীয় জীবনে কোনো শিহরণ জাগায় না। দূরদর্শন ও বেতারে মন্ত্রীদের রাজনৈতিক আশ্বাস,লালকেল্লার শীর্ষে  তেরঙা ঝান্ডার উত্তোলন এবং কিছু সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় কর্তব্যের বর্ণাঢ্য সমাপ্তি ঘটে। আজকাল আর লতা মঙ্গেশকরের সুরেলা কন্ঠে ‘এ মেরি বতন কি লোগো জরা আখোঁমে ভর লোঁ  পানী’ শোনা যায় না।কেবল ও দূরদর্শনের  কল্যাণে এখন আমরা যথেষ্ট সাবালক এবং আধুনিক হয়ে উঠেছি। কোনো ধরনের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো মূর্খামি আমাদের নেই ।

আজ একটু পুরোনো দিনের দিকে ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করছে। দেখা যাক না স্বাধীনতা রূপ ছেলের হাতের মোয়াটা কি ব্রিটিশ রাজশক্তি আমাদের প্রতি দয়া দেখিয়ে দান করে গেছে নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অনেক রক্তাক্ত ইতিহাস। প্রথমে মেদিনীপুর থেকে ঘুরে আসা যাক। ১৯৩১ সনের ৩০ এপ্রিল। এপ্রিল মাসটা ইংরেজদের কাছে খুব একটা প্রীতিপ্রদ নয়। ১৯৩০ সনের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের সূর্যসেন এবং তাঁর  সতীর্থদের হাতে যে  ভীষণ মারটা খেতে হয়েছিল ব্রিটিশ সিংহ আজও তা পুরোপুরি হজম করে উঠতে পারেনি। পরের বছর ৭ এপ্রিল এই মেদিনীপুরের মাটিতেই লুটিয়ে পড়েছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেমস পেডি। আমাদের দেশের মায়েরা বর্গির  ভয় দেখিয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়ায়।

‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে’।

শ্বেতাঙ্গ জননীরাও খুব একটা আলাদা নয়। তাদের ভীত বিহ্বল কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে,Baby sleep on, Another April is coming.’এ হেন এপ্রিল মাসে ইংরেজরা একটু বেশি সতর্ক থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কী। দ্বিতীয়ত, মেদিনীপুর বলে কথা। সেদিনও সতর্কতার কোনো রকম অভাব ছিল না। সন্ধ্যায় ডিস্টিক্ট বোর্ড অফিসে সভার কাজ পরিচালনা করছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডগলাস। হঠাৎ সমস্ত রকম সতর্কতাকে অস্বীকার করে রিভলভার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুই বিপ্লবী তরুণ প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশু পাল। গুলি বর্ষণে মিস্টার ডগলাস গড়িয়ে পড়লেন। শুরু হল হইচই। বিপ্লবীরা ততক্ষণে ছুটে চলেছেন। কাজ শেষ। এবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাবার পালা।পেছনে ছুটে আসছে বিরাট পুলিশ বাহিনী এবং অগণিত রাজভক্ত প্রজার দল। ব্যবধান একটু একটু করে কমে আসছে। রিভলভার নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রভাংশু। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন তিনি। তবে রিভলভারে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেওয়ায় প্রদ্যোত ধরা পড়লেন। বন্দি বীরকে হাতের মুঠোয় পেয়ে ইংরেজদের আনন্দের আর সীমা রইল না। প্রদ্যোৎ কিন্তু নির্বিকার। থানায় ঢুকেই দারোগাকে লক্ষ্য করে বললেন—‘ বড্ড গরম লাগছে স্যার। একটু স্নান করব।’ কড়া পাহারায় স্নান সেরে এসে বললেন—‘ এবার একটু ঘুমোব। দেখবেন কেউ যেন আমাকে ডিস্টার্ব না করে।’ শত নির্যাতনেও প্রদ্যোতের কাছ থেকে তার সঙ্গীর নাম জানা গেল না। মহামান্য ইংরেজ বাহাদুর এবার অন্য পন্থা অবলম্বন করলেন। প্রদ্যোতের দাদা শর্বরীভূষণকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হল। অমানুষিক নির্যাতনে তিনি শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেলেন।বন্ধু ফণী দাস,ক্ষিতি সেন,  নরেন দাসও রেহাই পেল না। বিচারে প্রদ্যোতের প্রাণদণ্ড হল। ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারপতি আইসিএস জ্ঞানাঙ্কুর দে বিচারকের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন। তাঁর বক্তব্য আসামির বয়স কম। তাছাড়া দেখা যাচ্ছে প্রদ্যোতের রিভলভারে যান্ত্রিক গোলযোগ

ছিল। গুলি করেছে অন্য লোক। এ অবস্থায় ফাঁসির হুকুম সংবিধান বিরোধী। হাতের মুঠোয় পাওয়া সিংহশাবককে ছেড়ে দিতে ব্রিটিশ শক্তি রাজি নয়। মামলা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে গড়াল। হুকুমের কোনো পরিবর্তন হল না।

 ১৯৩৩ সনের ১২ জানুয়ারি। ভোর পাঁচটা। স্নান শেষে পুজো, এরপর চন্দন তিলক এঁকে  প্রস্তুত। প্রদ্যোত বলিষ্ঠ পা ফেলে ফাঁসিমঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে গেল এক অমূল্য তাজা প্রাণ। প্রদ্যোৎ হারিয়ে গেছে। তবে রয়ে গেছে কারাগার থেকে মাকে লেখা অমূল্য চিঠিগুলি।–‘মা তোমার প্রদ্যোৎ কি কখনও মরতে পারে? আজ চারদিকে চেয়ে দেখ লক্ষ লক্ষ প্রদ্যোৎ তোমার দিকে চেয়ে হাসছে। আমি বেঁচে রইলাম মা অক্ষয় অমর হয়ে।’

  ১৯৪৫ সালের ২৯ মার্চ। রেঙ্গুন থেকে ঝাঁসির রানী বাহিনীর দেড়শ সৈনিককে নিয়ে দেবনাথ দাস নেতাজির নির্দেশে ব্যাংককের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সঙ্গে রয়েছে রানী বাহিনীর সুদক্ষ লেফটেনান্ট প্রতিমা পাল এবং ক্যাপ্টেন রাওয়াতের নেতৃত্বে একশো আজাদি সৈনিক। তাদের প্রধান কাজ রানী বাহিনীর বোনেদের নিরাপত্তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।প্রথম দিন ভালোভাবেই কেটে গেল। বিপদ এল দ্বিতীয় দিন। সামনেই রয়েছে সীতাং নদী। খেয়া নৌকা ছাড়া ওপারে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। হঠাৎ আশেপাশের বিপদজ্ঞাপক সাইরেনগুলি একসঙ্গে বেজে উঠল। বুমমমম বুমমমম।গোটা অঞ্চল কেঁপে উঠল একের পর এক প্রচন্ড বিস্ফোরণে। মালপত্র নষ্ট হলেও কোনো প্রাণহানি হল না। এবারের যাত্রা ট্রেনে। আড়াইশো মানুষের জন্য একটি বগি মাত্র। তাও সাধারণ কামরা নয়।ওয়াগন। দরজার কোনো বালাই নেই। কে আগে উঠবে এ নিয়ে আজাদি সৈনিক এবং মেয়েদের মধ্যে লড়াই বেঁধে গেল । জওয়ানদের বক্তব্য বোনেরা আগে উঠুক। হাতে যতক্ষণ অস্ত্র রয়েছে ততক্ষণ তারা বোনেদের গায়ে আঁচর লাগতে দেবে না।স্টেলা  জোসেফাইন,কমলারা কিছুতেই রাজি নন। তাদের দাবি মরতে হয়তো আমরাই মরব। তবুও জওয়ান ভাইদের এভাবে মরতে দেব না। কে না জানে ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য আজাদী ভাইদের প্রয়োজন রয়েছে। বোনদের দাবির কাছে আজাদী ভাইদের হার মানতে হল। রাইফেল হাতে দরজা আগলে বসে রইলেন স্টেলা,জোসেফাইন,কমলা  প্রমুখ কয়েকজন মেয়ে। ওয়াগনের ছাদের ওপরে পরপর কয়েকটি বালির বস্তা সাজিয়ে মেশিনগান সহ পজিশন নিয়েছেন ক্যাপ্টেন রাওয়াৎ।প্রতিটি মুহূর্ত বিপদ সংকুল। ইঞ্জিনের সার্চলাইট নিভিয়ে রাতের আঁধারে যাত্রা শুরু হল। আলো জ্বালানো মানেই শত্রুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। গাড়িটা তখন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে । সহসা দূরে একটি আলোর বিন্দু দেখে ক্যাপ্টেন রাওয়াত সতর্ক হয়ে উঠেন। তার আশঙ্কা অমূলক নয়। বোঝা গেল ওটা শত্রুপক্ষের গেরিলাবাহিনীর সিগন্যাল। নিমেষের মধ্যে স্টেলা, জোসেফাই্ন, কমলা প্রমুখ নারী সৈন্যরা তৈরি হয়ে নিলেন ।ক্যাপ্টেন রাওয়াতের নির্দেশ পাওয়া মাত্র ছাদের 

ওপরের মেশিনগান গর্জে উঠল চারদিক কাঁপিয়ে ট্যা  ট্যা  ট্যা  ট্যা…।নিচ থেকে সাড়া দিল স্টেলা, জোসেফাইনের রাইফেল দ্রাম,দ্রাম।মাত্র কয়েক মিনিট …তারপরেই সব শান্ত।ট্রেন বিপদসীমা অতিক্রম করে এসেছে।কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার  হয়ে গেছে।হাবিলদার মিস স্টেলা ,---জোসেফাইন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন ।  আর কোনোদিনই তাদের কণ্ঠে শোনা যাবে না ‘মরতে হয় তো আমরাই মরব,তবুও জওয়ান ভাইদের আমরা মরতে দেব না।’কমলার কী হল ? বাঁ হাতে গুলি লেগেছে কমলার।পুরো বাঁ হাতটাই কেটে বাদ দিতে হল। তারপর পেরিয়ে গেল অনেকগুলি বছর। স্বাধীন ভারত এই অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মেয়েদের অবদানের কথা মনে রাখে নি। তাই ১৫  আগস্টের এই প্রভাতে কোনো  রাজনৈতিক নেতার মুখেই এঁদের নাম উচ্চারিত হতে না দেখলে আমাদের বিষ্মিত হওয়ার কিছু নেই ।

----------------

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি । । মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ৩

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi




তৃতীয় অধ্যায়, তৃতীয় অংশ ।। পাখিদের পাড়া- পড়শী

......

তৃতীয় অধ্যায়

তিন 

ফ্লাইট ফাইভ জিরো এইট সি।

কলকাতার সময় রাত বারোটা ত্রিশে প্লেইনটা 

কুনমিঙ অভিমুখে উড়ে যাবে। এখন সময় রাত এগারোটা বেজেছে।

আধ ঘন্টার মধ্যে হাতে থাকা টাকার কিছুটা য়ুবানে আর হিসাবের কিছু টাকা লাউ কিপে বদলে নিলাম।

আমার হাতে থাকা সাধারণ কাপড়-চোপড় ভরা ব্যাগটা নিয়ে আমি এগোচ্ছি চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের লাগেজ চেকআপ করার বিশেষ জায়গাটায়। ব্যাগটা এক্স রে মেশিনে পরীক্ষা করে সিকিউরিটি ট্যাগ ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়ায় এবার বোডিং পাশের দিকে এগিয়ে গেলাম। ব্যাগটা কাউন্টারের যথাস্থানে দিয়ে বোর্ডিং পাশটা নিয়ে অন্যান্য নিরাপত্তা জনিত কাজকর্ম গুলি সম্পূর্ণ করে লাউঞ্জে  এসে বসেছি। আমার হাতে একটা ক্যানন  ক্যামেরা। সিকিউরিটি চেক আপের সময় ক্যামেরার ব্যাগটিতে জলের বোতল ও ভরে রেখেছিলাম। লঙ্গে বসে দুটি ইংরেজি কাগজ এবং ম্যাগাজিনের পাতা এক দিক থেকে উল্টে যাচ্ছি। পেট ভর্তি, মোটেই ক্ষুধা লাগে নি, এমনকি যাত্রার উৎসাহের জন্য ঘুমও আসছে না। ফ্লাইটের সময় হয়েছে বলে ঘোষণা করায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে পাঁচ নম্বর গেটে এসে উপস্থিত হলাম।

এগারো  নাম্বার সারির এফ আসনটা আমার । জানালার পাশে। জানালার বাইরে কলকাতা বিমানবন্দরের উজ্জ্বল অনুজ্জ্বল আলোর রাশির বিচিত্র সমাহার। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যয় বিধর্ম বিমানটি আমার আসনের সামনের মনিটরে সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে গান শোনা পর্যন্ত সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। আমি সেসবে ভ্রুক্ষেপ করছি না। আসনটাকে হেলান দিয়ে আমি শরীরটাকে আসনে ছেড়ে দিলাম। আরামদায়ক আসনটিতে  শরীরটা শোবার ভঙ্গিমা গ্রহণ করেছে। চাইনিজ এয়ার হোস্টেজ একজন কাছে এসে আমাকে বিমানটা টেক অন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানাল। আমি আসনটা পুনরায় চেয়ারের মতো করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

নির্দিষ্ট সময় বারোটা ত্রিশ  মিনিটের পাঁচ মিনিট আগে বিমানটা উড়ার প্রস্তুতি নিল। কয়েকজন এয়ার হোস্টেজ নিয়মমাফিক বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ক কলা কৌশল দেখাল। কৌশল গুলি দেখানো হয়ে গেলে ক্যাপ্টেন এয়ার হোস্টেস কয়জনকে নির্দিষ্ট আসনে বসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিমানটা ধীরে ধীরে চালাতে শুরু করলেন। বিমানটা পার্কিং প্লেস থেকে এসে রান ওয়ে পৌঁছাল। রানওয়েতে ধীরে ধীরে দৌড়াতে আরম্ভ করা বিমানটির গতিবেগ ক্রমশ বাড়তে লাগল এবং বিমানটি ভূভাগ ছেড়ে আকাশ মার্গে উড়তে লাগল। ঊর্ধ্বগামী হেলানো বিমানটি একটা সময়ে মাঝ আকাশে সুস্থির অবস্থা পেল। বিভিন্ন যাত্রী শোবার জন্য নিজের নিজের আসনটাকে হেলিয়ে নেওয়ায় আমিও তাই করলাম। বিমান পরিচারিকারা কে কী খাবে তার ফরমায়েস নিচ্ছে। ভূরি-ভোজন করে আমার উদর পরিপূর্ণ। আমি কিছুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচারিকা জিজ্ঞেস করায় আমি ভদ্রতার সঙ্গে কিছুই লাগবে না জানালাম।

কুনমিঙ পৌঁছাতে পৌঁছাতে চিনের আকাশ রৌদ্র স্নাতা হয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ আট ঘন্টা আমাকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে কাগজপত্র আর বই পড়ে আর মানুষ দেখে কাটাতে হবে। বিমান থেকে নেমে এসে আমি লাউঞ্জে বসেছি। বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মানে পুনরায় সিকিউরিটি চেকআপ, কাস্টমসের চেকআপ, নানান ঝামেলা। অন্যদিকে আমার চাইনিজ ভিশা নেই। ঝামেলা কমানোর জন্য আমি লাউঞ্জে বসে থাকতে  বাধ্য হয়েছি। কুনমিঙ ব্যস্ত বিমানবন্দর। লোকজন আসছে যাচ্ছে। আমি খবরের কাগজের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি। কফি কিনে খাচ্ছি। মাঝখানে গিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করে এসেছি।

ব্যাগটা, ব্যাগটার কথা মনে পড়ায় আমি দ্রুত চারপাশে ব্যাগটা খুঁজতে লাগলাম। ধ্যাত, ব্যাগটা তো আমি ভিয়েতনামে পাব। আমি পুনরায় কাগজের পাতায় মনোনিবেশ করলাম। মাঝখানে একটু ঝিমুনির মতো এল।ঘুমের মধ্যে আবছাভাবে মাকে দেখতে পেলাম। চিতার আগুন দেখে এবং গুলি ফাটানোর শব্দ শুনে উড়ে যাওয়া বকের কয়েকটি ঝাঁক মানসপটে ভেসে উঠল। পাখিদের পাড়া-পড়োশির দু-একটি দৃশ্য আমার ঘুমের আমেজকে বিরক্ত করে দূরে চলে গেল। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার আমি এক কাপ কফির জন্য এগিয়ে গেলাম। পয়সাগুলি যুবানে না ভাঙ্গালেও চলে যেত। বিপনীটা  ডলারও গ্রহণ করে। আমার হাতে তো ডলারও ছিল না, তাই ডলার নেবার চেয়ে য়ুয়ান নিয়েছি, ঠিকই আছে।

বারোটার সময় কিছুটা ক্ষুধা পেল। চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার ইচ্ছা হল। চিনে চাইনিজ নুডুলস খাওয়ার মজাই হয়তো আলাদা হবে। একটা বিপনিতে  আমি নুডুলস এবং কফির কথা বললাম। ছোটো ছোটো চোখ  এবং কোমর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া চুলের পরিচারিকা  জিজ্ঞেস করল— ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলস? এখনকার নুডুলস বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। সেই জন্য আমি সম্মতি সূচক  ভাবে মাথা নাড়লাম। পরিচারিকাটিকে যথেষ্ট অতিথি পরায়ণ বলে মনে হল এবং সেই সাহসে ভর করে পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম— চাইনিজ ভাষায় কি বলে?

—-গুও য়িয়া ও মিয়ান।

পরিচারিকাটি  আমি অর্ডার দেওয়া ক্রস ব্রিজ রাইস নুডুলসের চাইনিজ তরজমা করে নিল। জানিনা আমি কতটা শুদ্ধভাবে শুনতে পেয়েছি। তবে দাম শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। নুডুলস এর দাম ৭৬ য়ুয়ান এবং এক কাপ কফির দাম পঁচিশ ওয়ান। মোট একশত য়ুয়ান। ভারতীয় হিসেবে এক হাজার দশ টাকা । অর্থাৎ আমার দুপুরের খাবার খরচ আমার দশ দিনের খরচের সমান।

আমার কাছে বসা একজন সাদা চামড়ার বিদেশি লোক এক কাপ কফি হাতে নিয়ে কীসব বিড়বিড় করছিল। নুডুলসটা খেয়ে  কফির কাপটা হাতে নিয়ে আমি মানুষটার কাছে বসায় তিনি আমার কাছে তার আপত্তির কথা বলতে লাগলেন।

—একই কফি, আমি কুনমিঙের  রেস্তোরায় সকালবেলা খেয়ে এসেছি, ত্রিশ য়ুয়ান  নিয়েছে, এখানে নিচ্ছে ছিয়াত্তর য়ুয়ান। দ্বিগুণেরও বেশি।

— নেবেই। সমস্ত এয়ারপোর্টে একই ব্যাবসা। দিল্লির কফি হাউসে যে কাপ কফির দাম ষাট  টাকা, সেই কাপ কফির দাম এয়ারপোর্টে  ২৬০ টাকা। আমি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যাইনি, হয়তো সেখানেও একই ব্যাপার হবে।

বিদেশি ভদ্রলোক কফির কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে কফি কাপের সম্পূর্ণ পয়সা উশল করার তৃপ্তি লাভ করার চেষ্টা করলেন।

দেড়টার সময় তিন নম্বর গেটের সামনে ভিয়েনটিয়েন  অভিমুখী বিমানের জন্য যাত্রীরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াতে লাগলেন । আমিও এসে দাঁড়ালাম । একই ফ্লাইটের আসন সংখ্যা । সঠিক সময় দুটোতে বিমানটা যাত্রা আরম্ভ করেই মাত্র আধা ঘন্টার ভেতরে ওয়েট্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হল । বিমানবন্দরে পুনরায় কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য প্রসাধন কক্ষে প্রবেশ করলাম ।আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে প্রসাধন কক্ষ সমূহ আন্তর্জাতিক মানদন্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ইমিগ্রেশন কাস্টমস চেক ইত্যাদি সম্পন্ন করে এবং কিছু পয়সা ভাঙ্গানোর জন্য বিদেশি মুদ্রা পরিবর্তন করা একটা কাউন্টারে গেলাম। লাওয়ের মুদ্রাকে কিপ বলা হয় । আমাদের এক টাকা একশত কুড়ি  দশমিক আটান্ন লাওয়ের সমান। এসব করে বিমানবন্দরের বাইরে যেতে চারটা বেজে গেল। 

আমি এখন বিদেশের মাটিতে। জীবনে প্রথমবারের জন্য বিদেশের মাটিতে পদার্পণ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমি দীর্ঘশ্বাস নেবার চেষ্টা করছি এবং চারপাশটা পলকে দেখে নিচ্ছি।

আমার এখন গন্তব্যস্থান ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস স্টেশন। বিমানবন্দর থেকে সেন্ট্রাল বাস স্টেশন প্রিপেইড ট্যাক্সিতে গেলে সাত ডলার নেয়।সাতান্ন  হাজার কিপ। নেটে বিভিন্ন পর্যটকের মতামত থেকে জানতে পেরেছি ভিয়েনটিয়েন সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাবার ভিন্ন সবচেয়ে সস্তা হল বাস পরিবহন ব্যবস্থা। তার জন্য আমি বিমানবন্দর থেকে মূল পথে মাত্র পঁচিশ  মিটার পায়ে হেঁটে গেলেই হল। পায়ে হাঁটা মানুষের পেছন পেছন এসে আমি মূল পথটা পেয়ে গেলাম। এখান থেকে ত্রিশ  নম্বর বাসে উঠলে সেন্ট্রাল বাস স্টেশনে যাওয়া যায়। দূরত্ব মাত্র তিন  কিলোমিটার।ভাড়া চার হাজার কিপ। আমাদের ওখানকার টেম্পোর মতো এখানে টুকটুক চলে । এখান থেকে টুকটুকে সেন্ট্রাল বাস আড্ডার ভাড়া পঞ্চান্ন  হাজার কিপ। কিন্তু দরদাম করলে ভাড়ার পরিমাণ হয় ত্রিশ হাজার কিপ। আমি ত্রিশ নম্বর বাস ধরে ভিয়েনটিয়েনের সেন্ট্রাল বাস আড্ডায় পৌঁছে গেলাম । এখন এখান থেকে যেতে হবে ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ  বাস স্টেশনে । দূরত্ব কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিট । ভিয়েনটিয়েনের সাদার্ণ বাস স্টেশনে যাওয়া পথটার নাম থার্টিন সাদার্ণ  রোড।


 এই বাস আড্ডা থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়, বাসের চলাচল ছাড়াও আমি যেতে চাওয়া লাওয়ের ছাভানক্ষেত প্রদেশে যাবার জন্যও বাস পাওয়া যায়।সেন্ট্রাল বাস আড্ডা থেকে সাদার্ণ  বাস আড্ডায় উনত্রিশ  নম্বর বাসে যাবার সুবিধা আছে। ভাড়া নেয় দুই হাজার কিপ। টুকটুকে ভাড়া ষাট  হাজার এবং ট্যাক্সিতে নব্বই  হাজার কিপ। আমি অল্প নয় বেশ কিছু পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। আমি আসা ত্রিশ নম্বর বাসটা সাদার্ণ বাস আড্ডায় ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে গেল। বাসটার বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক বলে মনে হল।স্থানীয় সময় অনুসারে এখন সন্ধ্যে  ছয়টা বাজে ।ছাভানক্ষেটে আমাদের গন্তব্য বাসটার সময় আটটায়। এই বাসটাকে তারা ভিআইপি বাস বলে।বাসটা বাতানুকূল। বসে এবং শুয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।বাসটাতে  শৌচাদি ক্রিয়ার ব্যবস্থা আছে। বসে গেলে ভাড়া এক লাখ দশ হাজার কিপ এবং শুয়ে গেলে এক লাখ কুড়ি হাজার কিপ। আমি অনলাইনে শুয়ে যাবার জন্য একটা টিকেট আগেই সংগ্রহ করে রেখেছি। লাওয়ের সমস্ত সুবিধা অনলাইনযোগে গ্রহণ করা যায়। নির্ধারিত দূরত্বে বাসটা আট থেকে নয় ঘন্টার ভেতরে পৌঁছে যায়।আমি  হাতে কিছু সময় থাকায় বাস আড্ডাটা ঘুরে দেখলাম। সহজ সরল ভাবে সুন্দর করে সাজানো । প্রাচুর্যের  চিহ্ন নেই । 

আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বাসটা যাত্রা  আরম্ভ করল। বাসের বাইরে ঘোরতর অন্ধকার ।কিছুই দেখা যায় না। হাতের ব্যাগটাকে বালিশ করে নিয়ে ক্যামেরাটা সাবধানে উপরে রেখেছি। পরিষ্কার এবং বাতানুকূল  বলে বাসটা ভালো লাগছে। ক্লান্তির জন্য ঘুম ভালো হওয়ায় রাতটা  কীভাবে পার হল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না । সকালবেলা সাড়ে চারটার সময় আমার গন্তব্যস্থল ছাভানক্ষেট পৌছে গেলাম। ছাভানক্ষেট   বাস আড্ডায়  সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।লোকগুলিকে দেখে আমার ইম্ফলের বাসআড্ডার কথা মনে পড়ে গেল।গাড়ির ডিজাইনের বাইরে এটা যেন জাতীয় চেহারা এবং পরম্পরায় আবৃত ইম্ফল বাস আড্ডা।

এটা লাওসের  ছাভানক্ষেট প্রদেশ।আকার আয়তনের দিক থেকে লাওসের  সর্ববৃহৎ প্রদেশ। জেলার সংখ্যা পনেরোটি। মাটির ক্ষেত্রফলের প্রায় ষাট  শতাংশ অংশ অরণ্যে পরিপূর্ণ।

আমাকে এখন এখান থেকে অনলাইনে নির্ধারিত করে রাখা, ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যেতে হবে।হোটেলটা এই বাস আড্ডা  থেকে দুই কিলোমিটার এবং মেকং নদী থেকে নাকি দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ মেকং নদী থেকে কত দূরে অবস্থিত তার দ্বারাই যেন দূরত্ব মাপে ।টুকটুকের চালকের কথা থেকে আমি তাদের এরকম মনোভাব জানতে পারলাম।

 টুকটুকের চালকটিকে  বললাম আমি ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটাতে যাব।

ভাড়ার কথা বলায় আমি বললাম ভাড়া হোটেল দেবে। আমি এখানে কোনো দাম দর করব না।টুকটুকের চালক আমাকে ছালা থঙ্গোয়ন  নামের হোটেলটার সামনে নিয়ে  গিয়ে গাড়িটা রাখল।

-- তুমি ভাড়াটা হোটেল থেকে নিয়ে নাও।

চালক কাউন্টারে গিয়ে বলায় হোটেলের পরিচারিকা তাকে ভাড়াটা দিয়ে দিল ।

  অযথা তর্ক বিতর্ক  দরদাম থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি এই ব্যবস্থাটিকে গ্রহণ করলাম জানিনা সময়ে হিতে বিপরীতহয় কিনা।

দুই লাও ভগ্নি  পরিচালনা করা ছালা থংগোয়ন  হোটেলটিতে মাত্র দশটি ঘর। তুলনামূলকভাবে হোটেলটিতে থাকার খরচ যথেষ্ট কম প্রতিদিনের জন্য আটশো ছয় টাকা।হোটেলের সামনে একটি কাঠের নাম ফলকে লেখা আছে-- ‘ওয়েলকাম টু ছালা থংগোয়ন বাংলো।’

  আমি হোটেলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। ছোটো সাধারন অথচ স্থানীয় রূপে সাজানো অভ্যর্থনা কক্ষে একজন লাও নারী। হয়তো দুই বোনের একজন।

হোটেলে ইংরেজি থাই এবং লাও ভাষা চলে। নেটে হোটেলটিতে থাকা বিভিন্ন সুবিধার বর্ণনা দেওয়ার সময় এই তিনটি ভাষা জানা মানুষের সুবিধা থাকার কথা জানিয়ে রাখা হয়েছে ।সেই জন্য আমি বিনা দ্বিধায় ইংরেজিতে সামনের পরিচারিকাটির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।

-- ওয়েলকাম।

 পরিচারিকাটি  আমাকে স্বাগত জানাল।

  --থ্যাঙ্ক ইউ। আজকে থেকে  থাকার জন্য আমি হোটেলে অনলাইনে একটি ঘর বুক করেছিলাম।

  --আপনার নাম, আপনি কোন দেশ থেকে এসেছেন?

  জনজাতীয় মুখাবয়বের পরিচারিকাটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

 আমার নাম এবং আমি ভারতীয় বলে বলায় তিনি আমাকে সাত  নম্বর ঘরটা আমার জন্য সংরক্ষিত করে রাখা আছে বলে জানালেন। তারপরে তিনি হোটেলের পঞ্জীয়ন খাতাটা বের করে আমাকে আমার নাম ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। পাসপোর্টের কথা জিজ্ঞেস করায়  আমি পাসপোর্টটা বের করে দেওয়ায় তিনি সেটার একটি ফটোকপি করে নিয়ে  আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। গতানুগতিক এবং রুটিন মাফিক কাজগুলি হওয়ার পরে তিনি আমাকে তার পেছন পেছন যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।

--আসুন আপনাকে আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিই।

  আমি পরিচারিকা অথবা হোটেলের দুই বোনের কোনো একজনের পেছন পেছন যেতে লাগলাম।

 গাছ বনে সাজিয়ে তোলা চৌহদে দেখতে পাওয়া প্রায় ভাগ তরুগুল্ম  আমার পরিচিত। অসমিয়া লোক নিজের চৌহদ  সাজানোর জন্য এই ধরনের গাছপালা যেভাবে ব্যবহার করে এখানেও সেরকম ব্যবহার করে দেখতে পাচ্ছি। জীর্ণশীর্ণ একটি পেঁপে গাছের ডালে কয়েকটি পেঁপে ধরে আছে । টকো এবং নারকেলের গাছ দেখে নিজের জায়গায় আসার মতো মনে হচ্ছে। নিজের জায়গায় রয়েছি বলে মনে হচ্ছে। নৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করার জন্য আমি দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম ।বাতানুকুল পরিবেশ থেকে বাইরে থাকার ফলে গায়ে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিল। শরীরে মাথায় জল  ঢালার পরে সেই অস্বস্তির অবসান  হল। বাইরে তাপমাত্রা ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক নয়। ফ্যানের বাতাসের নিচে  আমার ঘুমের ভাব হল। তখনই একজন পরিচারিকা আমার জন্য এক কাপ লাল চা নিয়ে এল। আমি এই চায়ের কাপের অপেক্ষায় ছিলাম । চায়ের কাপ টেবিলে রেখে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল সকালের  আহার আমি এখানেই খাব কিনা?

আমি বললাম—হ্যাঁ।

--কী খাবেন?

  সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ।

যেহেতু এখানে কী পাওয়া যায় আমি জানিনা এবং এই মুহূর্তে এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ইচ্ছা আমার ছিল না। কেবল ঘুমোতে ইচ্ছা করছিল। তাই বললাম নুডুলস

  --ননভেজ

  --হ্যাঁ ননভেজ। এক ঘন্টা পরে দিলেই হবে বলে বলায় সে মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।

  ঠিক এক ঘন্টা পরে একটা ট্রেতে একটা নুডুলসের বাটি এবং সঙ্গে আমার জন্য অপরিচিত কয়েকটি পদ খাবার জিনিস নিয়ে পরিচারিকা আমার ঘরে এল। পরিচারিকাটির বয়স পঞ্চাশের উর্ধ্বে ।দেখলে মনে হয় আমি নাম পঞ্জীয়ন করার সময় সাক্ষাৎ করা পরিচারিকাটির মতো একই বলে মনে হয়। আমি তাকে সাধারণভাবে  স্বাগতম জানালাম। সে টেবিলের উপর খাদ্য সামগ্রীর ট্রেটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।

সে  চলে যাবার পরে আমি নুডুলসের বাটিটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। খাবার জিনিসের প্রতি আমার কোন বৈষম্য নেই সেতে পারা ধরনের হলে আমি সমস্ত খাদ্য সামগ্রীকে গ্রহণ করি নুডুলস এর বাটিটা হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম পালংশাক,ভাজা রসুন ও মুরগির মাংসের রান্না করা নুডুলসটা খেতে বেশ স্বাদযুক্ত।বিশেষ কোনো মশলা ব্যাবহার না করে সিদ্ধ করে রান্না করা হয়েছে। ক্ষুধার তাড়নায় আমি পুরোটা দিয়ে পেট ভরিয়ে নিলাম। 

খাওয়া-দাওয়া শেষে আরও দশ মিনিটের মতো বিশ্রাম নিয়ে আমি  পরিচারিকাটির কাছে এলাম।

আমাকে আপ্যায়ণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা বলে মনে কর পরিচারিকাটিকে জিজ্ঞেস করলাম ডং সিথুয়ান গ্রামটা কত দূরে কোন জেলায়?

  --অ’ভিলেজ ফরেষ্ট্রি!দুর আছে। আমি যাইনি বলে ভালো করে জানি না। আপনি যেতে চান নাকি?

-- হ্যাঁ যেতে চাই

  আমার উত্তর শুনে সে কারও সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করল। তারা লাও ভাষায় কথা বলছে। কথা বলার সময় মানুষটা ফোনটা খামচে ধরে আমাকে জিজ্ঞেস করল ট্যাক্সি লাগবে।চাই কি?

আমি মাথা নড়লাম। তিনি পুনরায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কিছুক্ষণ মানুষটার সঙ্গে কথা বলে তিনি আমাকে বললেন আধঘন্টা পরে ট্যাক্সি এসে যাবে। গাড়ি ভাড়া আমি বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। আপনি রাস্তায় চাইলেও একটিও কিপো দেবেন না।

  --কেন?

  আমরা বন্দোবস্ত করে দিলে তাদের ভাড়া কম হয় বলে ভাবে। বেশি টাকা নিতে পারে না যে!

  আমি পরিচালিকাটিকে বিশ্বাস করলাম।

নির্দিষ্ট সময় আধঘন্টা পরেই ট্যাক্সি চালক এল। সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেশভূষায় একজন বয়স্ক চালক। হাসিমুখ। তাকে দেখে আমার এরকম মনে হল আমি যদি লাও ভাষা বুঝতে পারতাম এই ব্যক্তি আমাকে সারাটা যাত্রা পথে হাসির খোরাক জোগাতে পারত।

  আমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডং সিথুয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জেলাটির নাম দুবার দুজনের মুখে শুনেও মনে রাখতে পারলাম না। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। চালক আমার সঙ্গে কথা বলছে। ভারতের কথা, অসমের কথা ভারতে থাকা বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থস্থান গুলির কথা। সে আমাকে আমি বৌদ্ধ না মুসলমান জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম-- আমি হিন্দু। হিন্দু ধর্ম কেমন জিজ্ঞেস করায় আমি খুব সংক্ষেপে হিন্দু ধর্মের বিষয়ে ব্যাখ্যা করলাম। অসমের এক শৃঙ্গের গন্ডারের কথা বললাম। চালক আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। প্রায় তিন ঘন্টা পরে আমরা এসে জেলার সদর পেলাম। আমি ট্যাক্সি চালককে বললাম আমার গন্তব্যস্থান জেলা কৃষি এবং বন  বিষয়ার কার্যালয়। আমি চালক থেকে এ কথাও জানালাম যে কার্যালয়টিকে তারা ডাফো বলে।

আরক্ষীকে জিজ্ঞেস করে চালকটি আমাকে নির্দিষ্ট কার্যলের সামনে নিয়ে গেল।

 জেলা কৃষি এবং বন অফিসার নির্দিষ্ট সময়ে এসে কার্যালয়ে বসেছেন। মানুষটা প্রায় আমার বয়সী। আমাদের রাজ্যের যেকোনো জনজাতীয় অবয়বের পঞ্চাশ অনূর্ধ্ব ব্যক্তি। একজনের সঙ্গে আমি তার সাদৃশ্য দেখতে পেলাম। মানুষটা চশমা পরেছেন। অতি সাধারণ বেশভূষা ।আমি তাকে ভারতীয় ধরনে নমস্কার জানালাম। তিনিও প্রতি নমস্কার জানালেন। সম্ভবত ভারতীয় আদব কায়দা এবং রীতি-নীতির দ্বারা মানুষটা পরিচালিত। অথবা তাদের দেশেও আমাদের মতো নমস্কার দেবার নিয়ম আছে। আমি কথাটা জানতে পারলাম না। তিনি তাঁর নামটা বললেন কিন্তু আমি মনে রাখতে অপারগ হলাম ।নামটা জিজ্ঞেস করে লিখে রাখার জন্য আমার মোটেও ইচ্ছা হল না ।বিশেষ করে মানুষটির আন্তরিক ব্যবহারে ।আমি তাকে আমার উদ্দেশ্যের বিষয়ে জানালাম। তিনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করলেন। তারপরে তাদের উদ্দেশ্য এবং কাজ করার ধরনের উপরে এক বিস্তৃত ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বলা কথাগুলি সম্পূর্ণ বিদ্যাতনিক ধরনের এবং যান্ত্রিক ছিল বলে আমার মনে হল। তার বলা কথাগুলি আমার কাছে ইন্টারনেটে উপলব্ধ হওয়া বিভিন্ন প্রবন্ধ আদির মৌখিক রূপ বলে মনে হয়েছিল।

  আমি তার সামনে ডং সিথুয়ানে যাবার প্রস্তাব রাখলাম।

তিনি বললেন যেতে পারেন আমরা কীীভাবে কাজ করছি এবং সুফল লাভ করেছি দেখে আসতে পারেন। 

সম্পূর্ণ বাধ্যবাধকতা থাকা একটি কমিউনিস্ট দেশের বিষয়ে একজন কোনো আপত্তি ছাড়াই এভাবে বলায় আমি আশ্চর্যানিত হয়ে পড়লাম। তিনি নাকি ব্যস্ততার জন্য দু'একদিন যেতে পারবেন না। আমি গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তিনি করবেন। আমি কোনো অনুমতি পত্রের প্রয়োজন হবে নাকি জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন আপনি দেখতে যাবেন, আপনাকে আমাদের দেশ ভিসা দিয়েছে। আপনি একজন পর্যটক আপনি নিশ্চয়ই যেতে পারেন।

ডং সিথুয়ান  একটি গ্রামের নাম। সেই গ্রামটিকে অরণ্য গ্রাম হিসেবে প্রতিস্থাপিত করে নাম রাখা হয়েছে ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট।নামটি দেখছি  বেশি ব্যাবসায়িক বলে মনে হচ্ছে। ডং সিথুয়ান প্রোডাকশন ফরেস্ট দশটি গ্রাম নিয়ে হয়েছে এবং এখানে ছয়টি দল কর্মরত রয়েছে। তারা ব্যবহার করা মোট ক্ষেত্রফলের পরিমাণ ২১২ হাজার হেক্টর ।অফিসারটির কথা থেকে জানতে পারা গেল যে তারা সামূহিকভাবে অরণ্য সুরক্ষার চেয়ে অরণ্য উৎপাদনে বেশি মনোনিবেশ করেছে। সেই উৎপাদন একমুখী। একমাত্র কাঠ কেন্দ্রিক।

  অফিসারটি আমাকে য়ায়ৈ ফুজিটা, থমথন ভংভিছোক, হংফেট চানটাভোং এবং চোমভিলাই চান্থালেউনাভোঙের দ্বারা  ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘ডং ফুজয় এন্ড ডং সিথুয়ানে প্রোডাকশন ফরেস্টঃপেভিং দী ওয়ে ফর ভীলেজ ফরেষ্ট্রি’  নামে একটি গবেষণা পত্র তার ল্যাপটপ থেকে প্রিন্ট আউট করে নিয়ে বের করে দিলেন। সেটির উপরে আমি একবার চোখ বুলিয়ে দেখে বললাম-- ধন্যবাদ। 

আমার ধন্যবাদ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার ভাব দেখিয়ে তিনি বললেন—এটাতে আপনি আমাদের সমস্ত ধরনের কাজ কর্মের বিষয়ে আদ্যোপান্ত পড়তে পারবেন।এটা পড়লে আপনি ডং সিথুয়ানে না গেলেও হবে।পাকে-প্রকারে মানুষটা আমাকে ডং সিথুয়ানে না যাবার জন্য বলছেন বলে মনে হল।

  তারপরে তিনি দেখালেন ‘ভিলেজ ফরেষ্ট্রি হেন্ডবুক’আমি বললাম—এটা আমি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিয়েছি।

 অফিসারটি মুচকি হাসলেন।

 কথার মাঝখানে মানুষটা আমাকে এক কাপ লাল চা দিয়ে অভ্যর্থনা করতে ভুললেন না।

 অফিসারটি আমার সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন যদিও তার কথা আমার কাছে অনেকটাই যান্ত্রিক বলে মনে হল।আমাদের দেশেও যদি গণ্ডারের হত্যার কথা কোনো বিদেশি নাগরিক জিজ্ঞেস করে সংশ্লিষ্ট বন অফিসার এভাবেই হয়তো নিয়মমাফিক উত্তর দেবে।

 অফিসারকে ধন্যবাদসূচক নমস্কার জানিয়ে আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

 এখন আমরা যাব ডং সিথুয়ান গ্রামে।

 পাহাড়ি পথে আমাদের ট্যাক্সিটা এগিয়ে চলল।রাস্তার দুপাশে হালকা জনবস্তি।চাং ঘর,মুরগি এবং শুয়োর পালন,শুকনো আবহাওয়া—পরিবেশটা আসমের কোনো একটি পাহাড়ি জেলার লাও সংস্করণের মতোই মনে হল।প্রায় দেড় ঘন্টার মতো সময় পরে আমরা ডং সিথুয়ান গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম।যে গ্রামে আসার উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমি কয়েকটি নদী এবং কয়েকটি পাহাড় অতিক্রম করে এসেছি।

ডং সিথুয়ানে গ্রামে উপস্থিত হয়ে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে শুরু করেছি।সঙ্গে চালক এবং ক্যামেরাটা।গ্রামের মানুষ আমার কোনো কথাই বুঝতে পারছে না।  

চালকটি  দোভাষীর কাজ করছে যদিও সে অরণ্য গ্রাম সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলি গ্রামের মানুষকে বুঝিয়ে বলতে পারে নি।আমি ‘ডিছ-ট্রিক লেভেল ফরেষ্ট কাম ইটি’এবং ফরেষ্ট ম্যানেজমেন্টের কথা জিজ্ঞেস করেছি এবং চালকটি  হয়তো গ্রামবাসীদের অন্য কিছু বলছে।ফলে আমি যা চাইছি সেই ধরনের উত্তরগুলি পাচ্ছি না। তাই আমি যতটা সম্ভব ক্যামেরার ব্যবহার করছি।তাঁরা প্রতিটি গাছকে চিহ্নিত করার জন্য ক্রমিক সংখ্যা ব্যবহার করছে।অসমের চা বাগিচায় সেভাবে গাছকে চিহ্নিত করার পদ্ধতি আমি আগেই দেখতে পেয়েছি। আমাদের এখানে সাদা কালোতে লেখা হয় এবং এখানে দেখছি লাল কালিতে লেখা।গ্রামের মধ্যের এক জায়গায় গাছের চারা উৎপাদন কেন্দ্র একটাও দেখতে পেলাম।আমাদের এখানকার সামাজিক বনানীকরণের চারা উৎপাদন কেন্দ্রের মতো।পাহাড়ি গ্রামটির পথ ঘাটের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমি প্রতিটি পরিবারে বিভিন্ন ধরনের ছোটো বড়ো গাছ দেখতে পেয়েছি। কিছু পরিবারে দেখতে পেয়েছি  গাছগুলির নিচটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,তাতে অরণ্যের পরিবেশ নেই। 

সামগ্রিকভাবে পরিবেশ অধ্যয়ন করায় এই গ্রাম যাত্রা আমার জন্য লাভ দায়ক হল।বিশেষ করে থমথন সানটাভোঙ নামের কৃ্ষকটির থেকে যে কথাটা জানতে পারলাম সেটা আমার অনেক উপকার করল।তাঁদের এখানে আমাদের এখানকার মতো জুম খেত করা হয়।ফলে অরণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে পরিবেশের গাঁথনির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।অরণ্য ধ্বংস প্রতিরোধ করার জন্য অরণ্য গ্রামের ধারণা তাদের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে।কৃ্ষিজীবী গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের আর্থিক দিকটা অতিশয় দুঃখের।অরণ্য গ্রাম আরম্ভ হওয়ার পরে গ্রামবাসী লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে।লাওচে প্রতিবেশী দেশ সমূহকে কাঠ যোগান ধরে।তাঁদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য কাঠের ব্যাবসা অন্যতম।সানটাভোঙ আমাকে আন্তরিকতার সঙ্গে বলা কথাগুলি চালকটি দোভাষী হয়ে তর্জমা করে গেছেন।আমি এবার সানটাভোঙের দিকে আর একবার চালকের মুখের দিকে আমার মুখ ফিরিয়ে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

পর্যাপ্ত সময় গ্রামের চারদিকে ঘুরে-ফিরে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।আমার কথায় চালকটি অসম্মত হওয়ার  কোনো প্রশ্নই উঠে না।

—বড়ো ক্ষুধা পেয়েছে।

আমি চালকটিকে বললাম।

--'খাও নিউ’তে খাব।হবে কি?

আমি বুঝতে না পেরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম—কোথায়?

--খাও নিউ মানে হল ‘লাও ষ্ট্রীট ফুড’।

আমি চালকের কথায় সম্মতি জানালাম।পর্যটকদের জন্য এখানে কী ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার জানার প্রয়োজন ছিল।

--সেখানে পাওয়া সমস্ত খাদ্য পরম্পরাগত ভাবে প্রস্তুত করা হয়।

 চালক এভাবে বলায় আমার মন আনন্দে ভরে উঠল।শুনতে পেলাম লাওচে পশ্চিমী খাদ্যের প্রচলন নেই।সেই জন্য হয়তো ছালা থঙ্গোয়নের মেনুতে আমি সাধারণত দেখতে পাওয়া স্যাণ্ডউইচ,বার্গার,টোস্ট ইত্যাদি পশ্চিমী খাদ্যের নাম দেখতে পাইনি।নিজেকে চিনতে পারা এবং নিজের পরিচিতি বহন করে চলার জন্য খাদ্য সম্ভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।দেশটি নিজের খাদ্য সম্ভারকে সুরক্ষা দিতে জানে বলেই লাওচে বিদেশি পর্যটকের সমাহার অন্য এক কারক বলে ভাবার কারণ আছে।ভবিষ্যতের কার্যপন্থার হেতু কথাটা আমার জন্য মনে রাখার দরকার আছে।

চালকটি একটি ‘খাও নিউর’সামনে গাড়ি এনে রাখল।দোকানটা দেখতে আমাদের এখানে এক সময় চলা পিসিও বুথের মতো,সবুজ রঙে আবৃত।দোকানের নিচের ভাগে বিভিন্ন খাদ্য সম্ভারের আলোক ছবি সজ্জিত করে রাখা হয়েছে।

--এখানে সর্বাধিক জনপ্রিয় খাদ্য দ্রব্য কি?

আমি চালককে জিজ্ঞাসা করলাম।

--জ’,চিয়েন চাভান এবং থুম মুক হ্ং। 

চালক কী বলল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকায় এবার সে ইংরেজিতে বলল।

--ষ্টিকি রাইস,লাও বীফ জার্কি এবং পাপায়া সালাড।

কথাটা বলার সময় চালকের মুখটা লালায় ভরে উঠেছিল বলে মনে হল।

--বীফ?

বড়ো স্বাদের।খাবার পরে বলবে।

--আমি বীফ খাই না।ভারতবর্ষে দুই একটি গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে হিন্দুরা বীফ খায় না।

 চালক এরকম ভাব করল যেন কোথাও সে মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে।সে আমার সামনে দুঃখ প্রকাশ করে আমি নিরামিষ খাই নাকি জিজ্ঞেস করল।

 --বীফ ছাড়া সমস্ত মাংস খাই।

 --তাহলে আপনি ‘খাও পিক চেন’খান।হোম মেড চিকেন নুডলস স্যুপ।

 আমি তার কথায় সম্মতি জানিয়ে আঠালো ভাত,পেঁপের সালাড এবং বাড়িতে প্রস্তুত করা মুরগির নুডলস স্যুপ আনতে বললাম।আর চালককে বললাম আপনি বীফ খেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।আমি এই ধরনের শুচিবাইগ্রস্ত মানুষ নই।চালক আমার জন্য খাবার জোগাড় করে নিজে কিছুটা দূরে খেতে গেল।আঠালো ভাতটা আমাদের বরো চালের ভাতের মতো,কিন্তু ধবধবে সাদা।পেঁপের সালাডটা খেতে খুব সুস্বাদু।ছোটো ফুটো থাকা চালনি দিয়ে নুডলসের মতো লম্বা লম্বা করে কাটা।সঙ্গে ঝাল,নুন ইত্যাদি মিশ্রিত করেছে।চিকেন নুডলস খেতে আমাদের এখানকার স্যুপের মতোই,কেবল সসের ব্যবহার নেই বলে মনে হল।আমরা দুজনের দুপুরের আহারে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হল।বিভিন্ন বিদেশি লোক ‘খাও নিউ’তে ভিড় করেছে।তাদের দেখে আমার এরকম মনে হল যেন প্রত্যেকেই ‘লাও বীফ জার্কি’র প্রতি আগ্রহান্বিত।এটা লাওচের স্থানীয় খাদ্য।

 আমার ভবিষ্যত কর্মপন্থায় স্থানীয় খাদ্যের গুরুত্ব এক মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।‘খাও নিউ’ থেকে আমরা সেই অনুপ্রেরণা লাভ করলাম।     


  

 

শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৮ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৮

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৮)

" দাদু, আপনার জামাইয়ের ভাগ্যটা সত্যিই ভালো। অরুণার জামাই সত্যব্রত মুখার্জি অক্সফোর্ডের এম এ,এফ আর এ এস, এফ আর এস এস। বরোদা রাজ্যের ইলেকশন কমিশনার হয়ে চাকরিতে যোগদান করে নিজের কর্ম গুণে রাজ্যরত্ন উপাধি লাভ করেছে। এখন সত্যব্রত রাজ্যের ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে রয়েছে। এদিকে মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া এডিন বরার এমএ, বাড়ি ডিব্রুগড়ে। পৈতৃক আমল থেকে তারা চা ব্যাবসায়ী। তবে অরুণাকে বিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি থেকে। রত্নার বিয়েটা যে সম্বলপুর থেকে দিলেন—?"

' এত বছর সম্বলপুরে বসবাস করে আমার একটা সোসাইটি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সরকারি অফিসের অফিসার ছাড়াও সম্বলপুরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়িত হওয়ার ফলে সম্বলপুর মিউনিসিপ্যালিটিতে সরকারের দ্বারা মনোনীত সদস্য হিসেবে কাজ করছি। এভাবেও পরিচিতি বেড়েছে। এদের বাদ দিয়ে বিয়েটা কলকাতায় আয়োজন করতে খারাপ লাগল। তাই বিয়েটার আয়োজন সম্বলপুরে করলাম।'

' রত্নার বিয়েটা অসমে আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন—।'

' ভেবেছিলাম। বিয়েটা অসমে হলে আমাদের পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা করেছিলাম। তবে জানইত জ্ঞান, আমাদের সমাজ এখন ও পেছনে পড়ে আছে। অন্ধ সংস্কার-কুসংস্কার গুলি তাদের উদার হতে দেয়নি।। আত্মীয়দের একটা দলের কাছে আমি এখনও স্বধর্ম ত্যাগী, ম্লেচ্ছ ব্রাহ্ম। সাহিত্য লিখে নাম যশ হলেও এখনও তারা আমার বদনাম করে। এখনও তারা বলে থাকে, তোমার দিদিমণিকে বিয়ে করার জন্যই নাকি আমি ব্রাহ্ম হয়েছিলাম। আমি নাকি প্রজ্ঞা সুন্দরীর আঁচল ধরা, স্ত্রীর বশীভূত। প্রজ্ঞাসুন্দরীর রূপ যৌবনে এতই বিবশ যে তার সামনে আমার মুখে অসমিয়া কথা ফোটে না। এমনিতেই তারা আমার বদনাম করার সুযোগ ছাড়ে না। এমতাবস্থায় রত্নার বিয়ে অসমে আয়োজন করলে আত্মীয়রা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করেই আমি সেই চিন্তাটা বাদ দিয়েছি। যাই হোক না কেন, ডিব্রুগড় থেকে রোহিণীদের ১৫ জন বরযাত্রী সম্বলপুরে গিয়েছিল। জোড়া সাঁকো থেকে ঋতেনদা এবং গুয়াহাটি থেকে মাজিউ ও ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল। অরুণার বিয়ের মতো এতটা জাঁকজমক না হলেও রত্নার বিয়েটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। তারপরে জামাই পাওয়ার ভাগ্যের কথা বললে— হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ বিশেষ কোনো পণ্যের বলে এত ভালো জামাই পেয়েছি। সত্যিই সত্যব্রত, রোহিনী দুজনেই আমার কাছে দুটি রত্ন। ওরা বলে থাকে কাঠের ব্যাবসা ছেড়ে আমি ওদের সঙ্গে থাকা উচিত তবে জামাইরা যাই বলুক না কেন, মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মাসের পর মাস ধরে থাকাটা—-।'

' তাতে কী হয়েছে? মেয়েদের শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান করে তোলার জন্যই এই ধরনের উচ্চ শিক্ষিত ধনী জামাই পেয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে দেখাশোনা করাটা জামাইদের কর্তব্য।'

' ভবিষ্যতে কী হবে বলতে পারিনা। বার্ড কোম্পানি থেকে রিজাইন দেওয়ার পরে যে ব্যাবসা করতে শুরু করেছি, সেটা খুব একটা জমছে না। গত বছরের আগের বছর ঝাড়চোগোড়ার মাটি এবং সম্বলপুরের বাড়িটার কাগজপত্র জমা দিয়ে শতকরা ৯% সুদে পিসিকুমারের কাছ থেকে পাঁচ হাজাৰ  টাকা লোন নিয়েছিলাম ।লোনের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। এদিকে আমার শরীরের ব্যালেন্স নাই হয়ে গেছে।টানাহেঁচড়া করে দেহটাকে লাইনে রেখে কোনো মতে চলছি।

' হ্যাঁ আপনি রোগা হয়ে গেছেন।'

'রোগা হয়েছি মানে অর্ধেক হয়ে গেছি। মার্চ মাস থেকে এরকম মনে হচ্ছিল যেন আমার ভেতরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে রোহিণীবাপু গত মে মাসে আমাকে কলকাতায় নিয়ে এসেছে। আমাকে থার্টি ফোর বাই ওয়ান বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। এই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসারে মে মাসের পাঁচ  তারিখ থেকে পনেরো তারিখ পর্যন্ত কলকাতায় থেকে একদিন পরপর সাতটা ইঞ্জেকশন নিয়েছি।'

' এখন কীরকম আছেন?'

' আগের চেয়ে ভালো আছি। তবে নিজেকে আগের মতো সাউন্ড বলে মনে হচ্ছে না।'

' দাদু, আপনার রেস্ট দরকার। একনাগারে অন্তত এক মাসের জন্য আপনি রেস্ট নিন। ব্যাবসা ছেড়ে লেখালেখি ছেড়ে আপনি রেস্ট নিতে পারবেন না। এদিকে আপনার কলজের এক টুকরো 'বাঁহী' সম্পাদনা না করলেও সেটা প্রকাশ করা পর্যন্ত আপনাকে চিন্তাভাবনা করতে হয়। আপনি অমিয়কুমার দাসকে সম্পাদক করলেন। কম বয়সী অনভিজ্ঞ অমিয় দাস কীভাবে 'বাঁহী'র সম্পাদনা করবে বলুন তো?'

' দেখ জ্ঞান, ১৯২৯ সন থেকে সম্বলপুরে থেকে'বাঁহী'র সম্পাদনা ,প্রকাশ ,বিতরণ—- এই সবকটি দিক সামলানো আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়ে যদু বাপু এবং মাজিউর সঙ্গে কথা হল। এদিকে উৎসাহী লেখক অমিয়কুমার দাস নিজেই 'বাঁহী' প্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই কাজে জোর দিল বাণীকান্ত কাকতি। আমি তখন যদুবাবুকে চিঠি লিখলাম, কাকতির চিঠি পেলাম ,তোমারও চিঠি পেলাম। দু দিক থেকে দুজন যুবক অধিকারের তাপে বুড়ো অধিকার তখন নাজেহাল। তোমরা দুজনে যা ভালো দেখছ তাই কর। আমার অমতের কোনো কারণ নেই। কেবল মনে রাখবে —-'বাঁহী' আমার মানসপ্রতিমা, অযত্ন হলে আমি খুব কষ্ট পাব।'

তারপর থেকে অমিয়ের সম্পাদনায় 'বাঁহী' গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।'

' পেয়েছি ,কিন্তু সম্পাদনার মান আপনার থেকে নিচু হয়ে গেছে।'

' হবে। ধীরে ধীরে ভালো হবে। অমিয়ের আগ্রহ আছে। তাছাড়া তার সঙ্গে আমাদের বিরহী কবি যতীন্দ্রনাথ মানে আমার আদরের যদু বাপু লেগে আছে। সঙ্গে আছে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যকে গার্ড দিয়ে চালিয়ে নিতে পারা প্রতিভাবান বাণীকান্ত কাকতি। আমার বিশ্বাস এক বছরের ভেতরে'বাঁহী' পুনরায় আগের মতো হয়ে উঠবে।'

' তবে দাদু,ক্রিয়েটিভ রাইটিং বাদ দিয়ে আপনি যে এখন কেবল ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন?'

' এই বিষয়ে'বাঁহী'র কিছু পাঠকও প্রশ্ন তুলেছেন। আমি নাকি 'বাঁহী'কে ধর্মীয় আলোচনায় রূপান্তরিত করার প্ৰয়াস করছি। তবে জ্ঞান, কবিতা- গল্প- উপন্যাস ,শিশু সাহিত্য, নাটক ,প্রহসন ,কৃপাবরী রম্য রচনা, জীবনী লিখেছি। তারপরে শংকরদেব মাধবদেবের জীবনচরিত লিখতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের ভাগবত সাহিত্যে ধর্ম জ্ঞানের ঐশ্বর্যময় একটা ভান্ডার থেকে গেছে। এটা আমাদের সর্বসাধারণ মানুষের গোচরে আনার জন্য আমি আমার সাধ্য অনুসারে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।'

' আপনার এইসব তত্ত্বকথা পড়ে এরকম মনে হয় যেন আপনি ভাগবতের নীতি আদর্শ অনুসরণ করে বৈষ্ণব। সম্ভবত তার জন্যই আপনি প্রত্যেক বছর বাড়িতে নাম কীর্তনের আসর পাতেন। কিন্তু দিদিমণি যখন ব্রাহ্ম উপাসনার আয়োজন করেন, তখন ও আপনি বড়ো মনোযোগের সঙ্গে ব্ৰাহ্মগীত শ্রবণ করেন।'

' ব্রাহ্ম গীত শুনতে ভালোবাসি বলে তুমি ও আমাকে ব্রাহ্ম বলে ভাব নাকি?'

' আমি নিজে ব্রাহ্ম হয়ে আপনাকে এভাবে ভাবতে আমার ভালোই লাগবে। কিন্তু এই কথায় আপনার আসল স্থিতিটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

' অস্পষ্ট বা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই। আসলে আমি দেখলাম বৈষ্ণব এবং ব্রাহ্ম একটা বিন্দুতে গিয়ে এক হয়ে যায়। ব্রাহ্মরা সোজাসুজি ব্রহ্মের সাধনা করে। বৈষ্ণব ভক্তরা গোবিন্দ মহাপ্রভুর মাধ্যমে ব্রহ্মকে পাওয়ার জন্য নাম- কীর্তন সাধন- ভজন করে।'

' এবার গিয়ে কথাটা আমার বোধগম্য হল। তথাপি দাদু ,আমাকে খারাপ পাবেন না— রবি দাদু( রবীন্দ্রনাথ) এই সত্তর বছর বয়সেও তার সৃজনশীল সত্তাটা সক্রিয় রেখেছেন। এখনও  তার সৃষ্টিকর্মে অভিনবত্ব প্রকাশ পায়,তাঁর কবিতা গীতের ভাব গুলিও কী অভিব্যঞ্জনাপূর্ণ।'

' জ্ঞান, তুমি কার সঙ্গে আমার তুলনা করছ! রবি কাকা অনন্য, অসাধারণ। রবি কাকার হৃদয়-মন চেতনা-বোধ সৃষ্টির উন্মাদনায় দুরন্ত।তাঁর সৃষ্টির ধারা মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।'

' তবে আপনার অপূর্ব সৃষ্টি 'আমার জীবনস্মৃতি' খন্ড খন্ড ভাবে বেরিয়েছে— এটাও পড়তে খুব ভালো লাগে।'

' আসলে, আমি সেটা লিখতে চাইছিলাম না। আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধে লিখতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার হেড গার্জেন— মানে তোমার 'দিদিমনি', তিনি সবসময় লেগে থাকেন। তার জন্য কত কী কাগজপত্র আছে, কোন নোটবুকে কী টীকা লিখে রেখেছিলাম, তিনিই সেই সব খুঁজে বের করে আমার টেবিলে সাজিয়ে রাখেন। তবে নিজের কথা লিখতে ভালো লাগে না, বুঝেছ।'

' কেন?'

' আমার এই জীবন স্মৃতিটা,'বাঁহী'র দ্বাদশ বছরের আশ্বিন মাসের ষষ্ঠ সংখ্যায় লিখতে আরম্ভ করে চতুর্দশ বছরের আষাঢ় মাসের তৃতীয় সংখ্যায় শেষ করেছিলাম। কারণ জীবনটা আমার সমতলের সোজা পথ দিয়ে গতি করেনি। কত মানুষের সঙ্গে কত ঝগড়াঝাটি করলাম, আমার নিজের আত্মীয়রা ও আমার উপরে ক্রুদ্ধ হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে কার নামে কী লিখে ফেলি, কে কোন কথায় ঝামেলা পাকাবে এই ভয়ে আমার হাতের কলম কাঁপতে শুরু করে। এদিকে গৃহিণী মানে তোমার দিদিমণি ও আমাকে ধরেছে, তোমার জীবনস্মৃতিতে আমাদের ঘরোয়া কথাগুলি কেন লিখেছ? তাকে যদিও বা বললাম, লেখার সময় আমি ঘরোয়া এবং পরের কথা গুলি বেছে বের করে আলাদা করতে পারি না। কিন্তু নিজের আত্মীয়দেরতো এভাবে বলতে পারি না। তাই ভবিষ্যতে আর লিখব না বলে ভাবলাম। তখন আমার অবস্থা জ্বর ছাড়লেও জলপট্টি না ছাড়ার মতো অবস্থা হল। অবশেষে অনেক কথা বাদ দিয়ে লিখছি। এভাবে লিখতে গিয়ে স্মৃতিকথাটা সিস্টেমেটিক হয়নি। যখন যা মনে এসেছে তাড়াহুড়ো করে লিখে গেছি।'

' কিন্তু এখন পর্যন্ত যতখানি লিখেছেন, তা অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবন বোধের রসের রসালো।' জীবনস্মৃতিতে আপনি নিজেকে সমালোচনা করেছেন,নির্মমভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কৃপাবর বরুয়া হয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। দাদু, আমিও আপনাকে অনুরোধ করছি, যেভাবেই হোক না কেন এটাকে শেষ করবেন। এদিকে গতবছর( ১৯৩০ সন) জানুয়ারি মাসে কলকাতায় 'বেজবরুয়া সমিতি' গঠিত হয়েছিল—-।'

' হ্যাঁ বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া এবং রোহিণী কুমার বরুয়া অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে গঠন করা এই সমিতিটি আমার লেখাগুলির প্রচারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'

' কেবল প্রচারই নয়, আপনার সাহিত্য যাতে সাধারণ পাঠক বুঝতে পারে এবং যুবক লেখকদের মধ্যে যাতে আপনার রচনা প্রণালী এবং বর্ণবিন্যাসের বিস্তর অনুশীলন হয়, তার জন্যও তারা কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।'

' করুক, তারা যা ভালো বুঝে করুক। সেই বিষয়ে আমার দিক থেকে কিছু বলার নেই।'

আলোচনা চলছে জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে । অসাম সাহিত্য সভার বিশেষ আমন্ত্রণ অনুসরণ করে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা থেকে শিবসাগরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন । ডিসেম্বর মাসের বড়োদিনের আগের দিন লক্ষ্মীনাথ রেলে আমিনগাঁও এসে পৌঁছালেন। ফেরিতে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে সকাল আটটার সময় অন্যান্য বারের মতো এবারও তিনি জ্ঞানদাভিরামের দীঘলি পুকুরের পারে বাড়িতে এলেন। জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল তিনি শিবসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। 

শীতকাল। জ্ঞানদাভিরামের পত্নী ঠাকুর বাড়ির অন্য একজন কন্যা লতিকা লক্ষ্মীনাথের সেবা যত্নের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। লতিকার নির্দেশে চাকরানি করে দেওয়া গরম জলে লক্ষ্মীনাথ প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে স্নান করলেন। তারপর মুক্ত মন নিয়ে জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বাইরের বিশাল বারান্দার আরাম চেয়ারে বসলেন। লতিকা পটে গরম চা নিয়ে এসে কাপে কাপে ঢেলে দিলেন। চা খেতে শুরু করে লক্ষ্মীনাথ  এবং জ্ঞানদাভিরামেৰ মধ্যে এইভাবের আদান-প্রদান।

প্রায় এক ঘণ্টা সময় এভাবে আলোচনা করার পরে ভেতরের মহল থেকে লতিকা পুনরায় বেরিয়ে এলেন। হাসতে হাসতে লক্ষ্মীনাথকে বললেন,' আসুন দাদু, ব্রেকফাস্ট করবেন, আসুন—-।'

'বাঃ!' উচ্ছ্বসিত কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' ঠাকুরবাড়ির কন্যা হয়ে তুমি দেখছি অসমিয়াতে কথা বলছ!'

' আমি অসমিয়া পরিবারের পুত্রবধূ, অসমে থাকি। অসমিয়া বলতেই হবে।' মুচকি হেসে লতিকা বলল,' তবে দাদু, দিদিমণি এখনও আপনার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলে না। আপনি দিদিমণিকে অসমিয়া শেখান না নাকি?'

' না, শেখাই না। কিন্তু তিনি অসমিয়া বুঝতে পারেন। প্রয়োজন হলে অসমিয়া থেকে বাংলা বা ইংরেজিতে ও অনুবাদ করেন।'

' তবু দিদিমণি আপনার সঙ্গে অসমিয়াতে কথা বলেন না!'

' সত্যিই বলেন না। আসলে, বুঝেছ লতিকা— তিনি আমার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলতে হবে বলে আমি ফিল করিনা।' মুচকি হেসে লক্ষীনাথ বললেন ,' এটা নিয়ে অসমের কেউ কেউ আমার নামে নানান কটুক্তি করে। কিন্তু আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমার স্ত্রীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলে আমি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যেৰ কোনো লোকসান বা অপমান করছি নাকি?'

লক্ষ্মীনাথের গলার স্বর চড়ছিল। কিন্তু সামনে গম্ভীর ভাবে বসে থাকা জ্ঞানদাভিরামের দিকে তাকিয়ে তিনি নিজেকে সংযত করে বাংলায় বললেন,' আমাদের এইসব সংকীর্ণমনা অসমিয়ারা অসমিয়া‐বাঙালির সম্পর্কটার ক্ষতি করছে। আজ তোমাদের এই ঘরে বসে আমি হলফ করে বলছি , কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ওই ভাইদের মনে থাকা হিংসা বিদ্বেষ দূর হবে। ভাষিক বিদ্বেষ ভুলে অসমিয়া বাঙালি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হবে।'

বড়োদিনের দিন লক্ষ্মীনাথ গুয়াহাটি থেকে রেলে করে শিবসাগরে যাত্রা করলেন। পরেরদিন সকালে শিমুলগুড়ি জংশনে পৌঁছালেন। শিমুলগুড়ি স্টেশনে অপেক্ষা করে থাকা চন্দ্রকান্ত ভূঞা এবং আনন্দরাম লক্ষীনাথকে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপরে তারা আলাদা একটি ট্রেনে লক্ষ্মীনাথকে অন্য একটি ট্রেনে করে শিবসাগর শহরে নিয়ে এলেন। শিব সাগরের অনেক সংস্কৃতিবান ধনী ব্যক্তির বসবাস সত্বেও সম্বর্ধনা জানাবার জন্য সাহিত্য সভার কর্তা ব্যক্তিরা লক্ষ্মীনাথের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করলেন শিব সাগরের ডাকবাংলোয়।

ডিসেম্বরের ২৭ এবং ২৮ তারিখ( ১৯৩১ সন) কথা সাহিত্যিক জমিদার নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী দেবের সভাপতিত্বে সাহিত্য সভার অধিবেশন অনুষ্ঠিত হল। এই অধিবেশনে চৌধুরীদেব সভাপতি আসন থেকে লক্ষ্মীনাথকে 'রসরাজ' উপাধিতে ভূষিত করলেন।

লক্ষ্মীনাথকে মানপত্র দেবার জন্য দ্বিতীয় দিন অসম সাহিত্য সভা  বিশেষ একটি সভার আয়োজন করলেন। এই সভার ও সভাপতিত্ব  করলেন নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীদেব। সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দনের সূচনা করে বললেন,' আজ আমাদের অসম সাহিত্য সভার জীবনে অত্যন্ত সুন্দর এবং অভিনব এক অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে আমার—এই অভাজনের জীবনেরও এক স্মরণীয় দিন। আমাদের সাহিত্যিকদের ভেতরে উজ্জ্বল রত্ন যিনি আজীবন নিঃস্বার্থভাবে স্বদেশপ্রেমের অনুরাগে অসমিয়া ভাষার প্রাণ রক্ষা করে ভাষা সাহিত্যের ভিত দৃঢ় করেছেন। এবং যে অসমিয়া সমাজের জাতীয় জীবন পরিপুষ্ট করেছেন আমরা সমগ্র অসমিয়া জনগণের হয়ে একটি অভিনন্দন পত্র তার করকমলে অর্পণ করে তাকে সংবর্ধনা জানাতে চাইছি।'...

এভাবে ভূমিকা করে সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দন পত্রটা পাঠ করলেন।

অভিনন্দন পত্রটা সাঁচিপাতে সুন্দর করে ছাপা হয়েছে। কারুকার্য করা হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি ছোট বাক্স একটাতে পত্রটা ভরিয়ে পিতলের শরাই সহ লক্ষ্মীনাথের হাতে তুলে দেওয়া হল।সভায় জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজউদ্দিন হাজরিকা দেশনেতা কুলধর চলিহা এবং বাগ্নীবর নীলমণি ফুকন একটি করে সম্বর্ধনা সূচক বক্তৃতা দিলেন।

  এরপরে লক্ষ্মীনাথ লিখিত উত্তরপাঠ করলেন। অসম সাহিত্য সভার সভাপতি, সম্পাদক এবং সদস্যদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, ...আমি অভিনন্দন পাবার যোগ্য নই। অসমিয়া সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজ আমার চেয়ে যোগ্য মানুষ আছে তাদের ভেতর কেউ একজন এই অভিনন্দন পাওয়া উচিত ছিল। আর আপনারা সমূলে না করলেও কিছুটা ভুল করে একজন তৃতীয় শ্রেণির মানুষের মাথায় এই অভিনন্দনের মালতি ফুল অর্পণ করেছেন।

 নিজের লেখার বিষয়ে স্বভাবসিদ্ধ  রসবোধে তিনি ব্যক্ত করলেন,’শৈশব থেকে আমি কলম,দোয়াত কলম কলাপাতা, তারপরে তুলাপাতা হাতে নিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু কী লিখছি আজ পর্যন্ত আমি নিজেই ভালো করে বুঝতে পারিনি। কেউ বলছে সেই সব সাহিত্য হয়েছে কেউ বলছে সেসব নাকি আবর্জনার স্তূপ জমা হয়েছে। আবর্জনার স্তূপ হলেও আমার দুঃখ নেই। কারণ সেটাও গুরু সেবায় লাগবে। অন্তত এই পৌষ মাসের ঠান্ডায় সেই আবর্জনার স্তূপে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আগুন পোহালে সাহিত্য সভার সভ্যরা শীত থেকে রক্ষা পাবে। এবং তারা গলা খোলে বক্তৃতা দিতে পারবে।

 তারপরে আসাম সাহিত্য সভা রসরাজ উপাধি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে লক্ষ্মীনাথ গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরদর্শী মন্তব্য করলেন।‘যখন এই সভা সাহিত্যিককে দেওয়া উপাধিগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধির মতো গণ্য করা হবে, সেরকম দিন এলে কোনো একটি টোলের বা টোলের বাইরের কোনো একজন মোষের আঠালো দই, মালভোগ কলা এবং গুড় দিয়ে এক বাটি কোমল চালের জলপানের পরিবর্তে, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাহিত্যিক বা অসাহিত্যিক সেই ভুরি ভোজনকারী ভট্টাচার্যের কাছ থেকে কবিগুনাকর বা ভাস্কর উপাধির মতো উপাধিতে বিভূষিত হয়ে সাহিত্যক্ষেত্রের ভেতরে বা বাইরে জ্বলজ্বল করে থাকার আর আবশ্যকতা থাকবে না।’

অসম সাহিত্য সভার পরে  শিব সাগরের পলিটেকনিক স্কুলেও লক্ষ্মীনাথকে সংবর্ধনা জানানো হল। তারপরে আমিনগাঁও থেকে রেলে সম্বলপুরের উদ্দেশ্যে  যাত্রা করলেন। 

আসাম থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতা বা সম্বলপুর যাত্রা করার সময় প্রত্যেক বার লক্ষ্মীনাথের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসম সাহিত্যসভা তাকে সভাপতি পেতে জাতীয় সম্মান দেওয়ার পর থেকে তাকে নিয়ে অসমিয়া মানুষের মনে নতুন এক আবেগ, নতুন এক উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক সভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে সম্বর্ধনা,রসরাজ উপাধিতে বিভূষিত করা...লক্ষ্মীনাথ নিজেও অভিভূত হয়ে পড়েছেন। এভাবে তার চিন্তা চেতনায় অসম অসমিয়া জাতি এবং অসমিয়া ভাষা সাহিত্য নিজের ব্যাবসায়িক এবং সাংসারিক কাজকর্মের বাইরে তার সত্তাটা স্বদেশ এবং স্বজাতির মঙ্গলের জন্য নিবেদিত। এখন বহু গুণমুগ্ধ তাকে বিনম্রভাবে অসমে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করছেন। লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হয় যে জীবনের বাকি দিনগুলি অসমে অসমিয়া মানুষের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগবে। কিন্তু বৈষয়িক কথাগুলি বাধা দেয় বলে এই কথা মনের মধ্যে খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

  উপাধি অভিনন্দনে বিভূষিত হয়েও বেদনা ভারাকান্ত মন নিয়ে লক্ষ্মীনাথ জানুয়ারির এক তারিখ সম্বলপুর পৌছালেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষ করে ব্যাবসায় মনোযোগ দিলেন। কিন্তু ব্যাবসাতে মন বসল না। ব্যাবসা থেকে তার মন উঠে গেছে। কাঠের ব্যাবসার জন্য ঘন ঘন এদিকে ওদিকে যেতে হয়,ঠিকা পাবার জন্য রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দেখা করে খাতির যত্ন করতে হয়। এইসব আগের মতো আর পারছেন না ।অসম  থেকে আসার পর থেকে স্বদেশ স্বজাতিকে নিয়ে ভাব অনুভূতি গুলি তাকে কিছুটা উন্মনা উদাস করে ফেলেছে।

  তখনই একটি চিঠি পেলেন। লখিমপুর থেকে কুশল দুয়ারা লিখেছে।সেই কুশল দুয়ারা কলকাতা থাকার সময় যে ছেলেটি পড়াশোনার খরচ জোগাড় করার জন্য শনি রবিবার এবং ছুটির দিনগুলোতে বি বরুয়া কোম্পানিতে কেরানির কাজ করত। তারপরে গুয়াহাটি ছাত্র সম্মেলনের সভায় সভাপতিত্ব করার পরে বিদায় নিয়ে আসার দিন লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য কুশল তাড়াতাড়ি করে ফেরিতে উঠেছিল। এবং মায়ের হাতে বোনা একটা চেলেং  চাদর তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে শ্রদ্ধানতভাবে তাকে প্রণাম জানিয়েছিল। সেদিন কুশলও তাকে অসমে থাকার জন্য  বিনম্র কাতরতার সঙ্গে বলেছিল...।

‘রসরাজ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া স্যার’ বলে সম্বোধন করে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানিয়ে কুশল লিখেছে, ‘আপনি সদাশয়, আমার মতো অভাজনের প্রতি আপনি দয়াশীল। আপনাকে দুঃখ কষ্টের কথা বলতে সংকোচ হয় না। স্যার, মায়ের মৃত্যুর পরের বছর আমার  পরিবার গ্রহনীতে ওপারে চলে গেল। সে রেখে যাওয়া অনাথ সাত বছরের মেয়েটিকে বারো বছর লালন পালন করে গত মাসে বিয়ে দিয়ে কন্যাদায় থেকে মুক্ত হলাম। এখন ঘরে একা থাকি, নিজেই রান্না বান্না করে খাই।আমার অবস্থা দেখে গ্রামের কয়েকজন মানুষ আমাকে জগন্নাথ ধাম দর্শনের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু পুরীতে যাওয়ার কথা ভাবতেই আপনার কথা মনে পড়ল। সভা-সমিতির আমন্ত্রণ রক্ষা করে আপনি সম্বলপুর থেকে অসমে আসেন বলে খবর পেয়ে থাকি। কিন্তু অনেকটা দূরে থাকি বলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি না। এখন জগন্নাথ ধাম মন্দির দর্শনের চেয়েও আপনাকে দেখা এবং কাছে বসে আপনার দুই একটি কথা শোনাটা আমার কাছে বেশি আনন্দের। তাই পুরীর জগন্নাথ ধাম দর্শন করার আগে এই বছর জানুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ আপনি থাকা সম্বলপুরে আসার ইচ্ছা রাখছি কিছুক্ষণের জন্য দর্শন দিয়ে এই অভাজনকে কৃ্তার্থ করবেন বলে আশা করছি ইতি— কুশল দুয়ারা ।

অসমের লখিমপুর থেকে কুশলের এভাবে সম্বলপুরে আসাটাও তার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসার নিবেদন। কেউ শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাতে এলে তাকে অবহেলা করা যায় না। এমনিতেও কুশল বহুবছর থেকে তার পরিচিত, তার ভক্ত। কুশল আসার দিন টাঙ্গাটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ নিজেই সম্বলপুর স্টেশনে এলেন।

  সকালে ঝাড়চোগোড়ায় গাড়ি বদল করে সাড়ে সাতটার সময় কুশল সম্বলপুর পৌছাল। গাড়ি থেকে নেমে প্লাটফর্মের বাইরে এসে লক্ষ্মীনাথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুশল অবাক হয়ে গেল, ‘স্যার আপনি!’

  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি যদিও কুশলের চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ।এখনও পায়জামা পাঞ্জাবি পরা সেরকমই পাতলা চেহারা। শুধু চুলে পাক ধরেছে। 

‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

  ‘তা বলে আপনি নিজে স্টেশনে এসেছেন?’

  ‘সম্বলপুর তোমার অপরিচিত জায়গা। আমার বাড়ি খুঁজে বের করতে তোমার কষ্ট হবে। চল, টাঙ্গা নিয়ে এসেছি। টাঙ্গায় উঠ।’ 

কুশলের দুই চোখে অতলান্ত বিস্ময়! অসমিয়া ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তার মতো মাধ্যমিক স্কুলের সাধারণ একজন শিক্ষকের জন্য এতখানি করছে। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপরে লক্ষীনাথের পা দুটি স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে টাঙ্গায় উঠে সসঙ্কোচে তার বাঁ পাশে বসল।

 কুশল দেখল  বলদ গরু টানা টাঙাটা বেশ সুন্দর। টাঙ্গায় বসে যাওয়াটা আরামদায়ক। এভাবে যাবার সময় লক্ষ্মীনাথ প্রথমে কুশলের মেয়ে জামাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন,লখিমপুরে ‘বাঁহী’র জনপ্রিয়তা কী ধরনের জানলেন এবং লখিমপুরের কারা কারা প্রতিশ্রুতিমান লেখক সেটাও জিজ্ঞেস করলেন। কিছুক্ষণের ভেতরে কুশলকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি পৌঁছালেন।

উড়িষ্যার প্রধান নদী মহানদীর পারে লক্ষ্মীনাথের খড়ের চাল দেওয়া সুন্দর বাংলো। বাংলোটার পেছনদিকে নিম, আমলকি, আম, কাঁঠাল গাছ। সামনের দিকে সুন্দর ফুলের বাগানের সঙ্গে শাক সব্জির চাষ করার জন্য বাগান। বাগানের পেছনে লক্ষ্মীনাথ নিজ হাতে পাথর বালু এবং সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা একটি  বেঞ্চ। এই বেঞ্চে বসে লক্ষ্মীনাথ সকাল বিকেল সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদী এবং মহানবীর ওপারে সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করেন। দুই একরের চেয়ে অধিক ক্ষেত্রফল থাকা এই বাড়ির সামনের দিকে ইউরোপিয়ান ক্লাব বাঁদিকে সম্বলপুর পুলিশ অধিক্ষকের সরকারি বাসগৃহ এবং বাঁদিকে পলিটিক্যাল এজেন্ট যোগেন্দ্রনাথ সেনের বাংলো এবং ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস।

লক্ষ্মীনাথ অরুনা রত্নাকে বিয়ে দিয়েছেন। দীপিকা কলকাতার ডায়োসেশন কলেজের হোস্টেলে থেকে বিএ পড়ে, বাড়িতে প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথ ছাড়া চাকর বাকর মালি এবং টাঙ্গাচালক থাকে। বাংলোয় এসে লক্ষ্মীনাথ ভেতর মহলে নিয়ে গিয়ে আত্মীয়ের মতো কুশলকে আদর করে নিলেন। কুশল ভেবেছিল লক্ষীনাথের সঙ্গে কথাবার্তা বলে চা জল পান খেয়ে পুরীতে যাত্রা করবে। যাবার কথা বলায় লক্ষ্মীনাথ ক্রোধের সুরে বললেন, ‘এত দূর থেকে এসে্‌ছ, দুদিন না থেকে কীভাবে যাবে?তারপর লক্ষ্মীনাথ নিজে কুশলের জন্য থাকা ঘর,স্নানের ঘর দেখিয়ে তার শোবার ঘর  প্রস্তুত করে দিতে চাকরানীকে নির্দেশ দিলেন।

 অতিথি অভ্যাগত এলে প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবীও যত্ন করেন। গতরাতে রেলে থাকার জন্য কুশলকে অনাহারে থাকতে হয়েছিল। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দুপুর বেলার ভাত খেতে বসে প্রজ্ঞা রান্না কয়েক ধরনের তরকারি খেতে গিয়ে কুশল অমৃতের স্বাদ পেল।

লক্ষ্মীনাথ এখন জীবনের প্রান্ত বেলায় পা রেখেছেন। তার শরীরে  আগের বাঁধন নেই। চলাফেরা ও আগের মতো গতিশীল নয়। কিন্তু তার মনের বড়ো একটা পরিবর্তন হয়নি। কুশল দেখল বিকেলে লক্ষ্মীনাথ ব্যাডমিন্টন খেললেন, বিকেলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদীর  ধারে ভ্রমণ করলেন।রাতে ক্লাবে বসে স্থানীয় উড়িয়া বন্ধুদের সঙ্গে স্টেট এক্সপ্রেস ব্র্যান্ডের সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে ব্রিজ খেললেন। কুশল বয়সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে ছোটো। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে কোনো দিকেই কুশলের তুলনা হয় না। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ সাক্ষাৎ করা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কুশলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কুশল অন্যের কাছ থেকে অথবা কাগজে পত্রে সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথের কথা শুনেছিল। সেভাবে শুনে তাকে অসমিয়া জাতির অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ বলে মনে হয়েছিল। এখন বাড়িতে এসে তার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে কুশল বুঝতে পারল ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া বেশি মহান বেশি আপন।

 ‘স্যার, আগেরবার ব্রহ্মপুত্রের বুকে ফেরিতে দেখা হওয়ার সময় আমি আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম ...। রাতের আহার খাবার পরে মনে সাহস গুটিয়ে নিয়ে কুশল বলল, ‘তখন আপনি আমার সেই কথাটার উত্তর দেননি। এখন পুনরায় সেই কথাটা অনুচিত জেনেও বলছি—।’

ম্লান  হাসি হেসে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘এখান থেকে অসমে গিয়ে অসমিয়া মানুষের সঙ্গে আমার থাকা উচিত এই কথাটাই তো বলতে চাইছ।’

 কুশল ঢোক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

লক্ষ্মী নাথের মুখের হাসি শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘এবার শিবসাগর থেকে সম্বলপুরে আসার সময় আমিও এই কথাটা খুব অনুভব করেছি কুশল। অসমে থাকার সময় আমাদের মানুষের ভালবাসা পেয়ে মনটা সত্যি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন আমার অন্তরে এরকম মনে হচ্ছিল যে মাতৃভূমিতে থেকে জন্মভূমিতে থাকতে পারলে আমি বেশি সুখী হতে পারতাম। আমার আত্মা বেশি তৃপ্তি পেত। কিন্তু কুশল আমার যে সেরকম ক্ষমতা নেই ।আমার শরীরে এরকম শক্তিও নেই যে এই শরীর নিয়ে সপরিবারে অসমে ফিরে যাব।’

লক্ষ্মীনাথ এরকম বেদনার সুরে বলল যে কুশলের খারাপ লাগল। অপরাধীর মতো মুখ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার পুনরায় অসমে থাকার কথা বলে আমি আপনার মনে দুঃখ দিলাম নাকি?’

  ‘দুঃখ—না তুমি দুঃখ দাও নি। বরং এভাবে বলে তুমি আমার স্নেহের পাত্র হলে আর তুমি আমাকে ভালোবাস বলেই এভাবে বলতে পারলে। লক্ষ্মীনাথ বললেন,‘এমনিতেও কুশল বুঝেছ,কিছুদিন ধরে এরকম মনে হচ্ছে যেন অসমী মা আমাকে ডাকছে।আমাকে অসমে ফিরে যেতে হবে।আচ্ছা,এখানে আসার আগে চিঠিতে যে তুমি পুরীর জগন্নাথ বাবার চেয়ে আমাকে বেশি গুরুত্ব দিলে,কথাটা কী?’

 ‘স্যার,আপনি স্রষ্টা।আপনার সৃষ্ট সাহিত্য পড়ে হাজার হাজার ,লক্ষ লক্ষ মানুষ জেগে উঠছে।’অদ্ভুত এক মোহ-মুগ্ধতায় কুশল বলল, ‘ আমি একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক।আমি কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারি না যদিও আপনার সৃজন শক্তির মহিমা কিছুটা বুঝতে পারি।তাছাড়া বাবা জগন্নাথ ভগবান যদিও তাঁর সঙ্গে এভাবে এত কাছাকাছি বসে কথা বলতে পারব না।তাই আমার কাছে আপনি বাবা জগন্নাথের চেয়েও মহান।’

 কুশলের মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ চুপ,কিছু পরিমাণে আত্মসমাহিত।

 আরও অনেক কথা বলার আছে।কথা না বললেও লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে থাকাটা আনন্দের,শান্তির।কিন্তু রাত গভীর হয়ে আসছে।লক্ষ্মীনাথের শোবার সময় হয়েছে।এদিকে কুশলের এখানে থাকা দুদিন হয়ে গেছে।লক্ষ্মীনাথের স্নেহ ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকতে পেয়ে তার জীবনটা ধন্য হয়ে গেল।তার আরও দিন চারেক থাকার ইচ্ছে।কিন্তু ব্যাবসায়িক কাজের জন্য লক্ষ্মীনাথকে আগামীকাল ঝাড়চোগোড়া হয়ে কলকাতা যেতে হবে।তারপরেও তিনি দুদিন বাড়িতে থাকবেন না।তাই কুশল কাল সকালের রেলে পুরীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে।

সকালে কুশল জেগে উঠার আগেই লক্ষ্মীনাথ ঘুম থেকে উঠে তাকে ডাকল।সঙ্গে সঙ্গে উঠে প্রাতঃকৃ্ত্যাদি সেরে নিয়ে কুশল প্রস্তুত হল।লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞাকে প্রণাম করে কুশল বের হল।কিন্তু লক্ষ্মীনাথ তাকে একা যেতে দিল না।গাড়োয়ানকে ডেকে টাঙাটা বের করতে বললেন।তারপরে কুশলকে টাঙায় বসিয়ে লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর স্টেশনে এসে পুরীতে যাবার ট্রেনে উঠিয়ে দিলেন।

রেল ছাড়ার ঘন্টা বাজল।ইঞ্জিন উকি দিল।লক্ষ্মীনাথ জানালার পাশে বসা কুশলের দিকে নিজের ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন।কুশলের হাতটা স্পর্শ করতেই লক্ষ্মীনাথের মানসপটে সবুজ গাছপালায় ভরা শ্যাম্ল মাতৃভূমির চির-স্নেহের রূপটা ভেসে উঠল।তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন।কিন্তু বলতে পারলেন না।অবুঝ এক আবেগে তাঁর কণ্ঠ্ররোধ হয়ে গেল।তারপরে তাঁর চোখদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল।    




রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৭ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৭

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৭)

বার্ড কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্বলপুরের জঙ্গল নিয়েছিল। তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। কাঠের ব্যবসা চালানোর জন্য কোম্পানি ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও জঙ্গলের সন্ধান করে থাকে এবং লাভজনক জঙ্গলের সন্ধান পেলেই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সেই জঙ্গলের কাঠ থেকে শ্লিপার তৈরি করে বিক্রি করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। এইবার বার্ড কোম্পানি অসমের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় এবং অসম নেপালের সীমাবৰ্তী এলাকায় কয়েকটি জঙ্গল পেয়ে রেলওয়ে কোম্পানিতে শ্লিপার জোগানের কাজ অব্যাহত রাখবে বলে পরিকল্পনা করল।নিজেকে একজন দায়িত্বশীল জঙ্গল পরিদর্শক এবং জঙ্গলে চলা কাজের পরিচালক রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সক্ষম হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ কোম্পানির সাহেবদের বিশ্বাস‐ ভরসার পাত্র হয়ে পড়েছেন।তাই নতুন করে নেওয়া জঙ্গল গুলির কাজের দায়িত্ব দেবার জন্য ১৯২৭ সালের ৩০ জুলাই তারিখে কোম্পানির বড়ো সাহেব তারযোগে লক্ষ্মীনাথকে কলকাতার অফিসে ডেকে পাঠালেন। 

লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে কলকাতার অফিসে এলেন। সাহেব তাকে শিলঙের কাছাকাছি নতুন জঙ্গল নেবার কথা বললেন। জঙ্গলগুলির কাঠের কাজ পরিচালনা করার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। অসমের শিলঙের কাছাকাছি জঙ্গলে কাজ—এদিকে পরিবার থাকবে সম্বলপুরে, লক্ষ্মীনাথ এই দায়িত্বটা গ্রহণ করতে অসুবিধা অনুভব করলেন। মানে আগের মতো মনে সাহস পেলেন না। তবে চূড়ান্ত আর্থিক সংকটে তার অনুরোধ রক্ষা করে বার্ড কোম্পানি চাকরি দিয়েছিল। কোম্পানি থেকে বেতন, বোনাস পায় বলেই তিনি এখন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তার চেয়েও বড়ো কথা হল এই চাকরিটা ছেড়ে দিলে এত টাকা বেতনের অন্য একটি চাকরি কোথায় পাবেন?এ সমস্ত ভেবে লক্ষ্মীনাথ বার্ড কোম্পানির হয়ে অসমের জঙ্গলে কাঠের ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। কোম্পানির বড়ো সাহেব তখন শিলঙের জঙ্গল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীনাথকে একটা প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন।

লক্ষ্মীনাথ যে  অসমের শিলঙের জঙ্গলের কাজের দায়িত্ব নিল, কথাটা প্রথমে প্রজ্ঞাকে জানাল না। অক্টোবরের ১৯ তারিখ কলকাতা থেকে শিলং অভিমুখে যাত্রা করলেন । পরের দিন শিলং পৌঁছে কয়েক দিন ধরে অমলিং,ননগ্ৰাম ইত্যাদি জায়গার জঙ্গল ঘুরে ঘুরে ৯ নভেম্বর কলকাতায় এসে কোম্পানিকে জঙ্গল পরিদর্শনের প্রতিবেদন দাখিল করলেন । প্রতিবেদন পাঠ করে কোম্পানি লক্ষ্মীনাথকে অসমের যোগবানীতে যাবার নির্দেশ দিলেন।এবার অসমের জঙ্গলে যাওয়ার কথাটা প্রজ্ঞাকে না বলে কীভাবে থাকেন? অসমের জঙ্গলে গিয়ে এক সপ্তাহ দশ দিন থাকা নয়, দীর্ঘ আড়াই মাস থাকতে হবে। না জানিয়ে আড়াই মাস অসমের জঙ্গলে থাকাটা উচিত হবে না। অবশেষে প্রজ্ঞাকে বললেন। প্ৰজ্ঞা চিন্তিত হয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল অসমের জঙ্গলে আড়াই মাস থেকে কাঠের ব্যবসা দেখাশোনা করবে বলে সাহেবদের কথা দিয়ে এলে, সত্যিই তুমি পারবে?'

' কেন পারব না? এই কাজই তো করছি—।'

'ওগো, এখন তোমার বয়স হয়েছে। তুমি এখন তেষট্টি বছরের বুড়ো । তাছাড়া ,যখন তখন তোমার নাক দিয়ে রক্তপাত হতে থাকে, তখন তুমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড় যে তিন চার দিন বিছানা থেকে উঠতে পার না। তেমন কিছু হলে আসামের ওই গভীর জঙ্গলে কে তোমাকে দেখবে, শুনি? তাছাড়া তোমার হজম শক্তি কমে এসেছে। তোমার এখন প্রায়ই অম্বল হয়। বনে জঙ্গলে থাকলে দিনের পর দিন বাইরের খাবার খেতে হবে। ওভাবে তোমার পেটের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। কোম্পানির সাহেবরা তোমার এসব কথা বিবেচনা করল না ?'

প্রজ্ঞা অভিজ্ঞ, বিচার জ্ঞান সম্পন্ন। জঙ্গলে থাকা অবস্থায় স্বামীর কী কী অসুবিধা হতে পারে তার জন্য তিনি সচেতন বলেই এভাবে বললেন।আর তিনি সঠিক কথাই বললেন।

লক্ষ্মীনাথ কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অসহায় ভাবে প্রজ্ঞার দিকে তাকিয়ে বললেন ,'চাকরি বাঁচাতে হলে আমাকে আসামে যেতে হবে।'

' বয়সের কথাটা বিবেচনা করে কোম্পানির সাহেবরা জঙ্গলে না পাঠিয়ে তোমাকে অফিসের কাজ দিতে পারত।'

'ওহো, বার্ড কোম্পানির কাঠের ব্যাবসাটা জঙ্গল নিয়েই। এত বছর ধরে জঙ্গলের কাজ করছি—অভিজ্ঞতার জন্যই কোম্পানি আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। আর আমি কি শখ করে জঙ্গলে যাচ্ছি? আড়াই মাস তোমাকে ছেড়ে, মেয়েদের ছেড়ে জঙ্গলে থাকতে আমারে কি ভালো লাগবে? দেখ পরি, সবই তো বোঝ —সাংসারিক খরচ তো আছেই। কলকাতায় হোস্টেলে রেখে রত্না- দীপিকার ইংলিশ স্কুলে পড়ানোর খরচ, তারপর ওদেরকে বিয়ে দিতে হবে। বিয়ে দেওয়ার জন্য এখন থেকেই তো টাকা-পয়সা জমাতে হবে।'

কথাটা সত্য।সব কথাই বাস্তব। কঠোর এই বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া লক্ষ্মীনাথের উপায় নেই।

' সবই মানছি।' গম্ভীর কন্ঠে প্রজ্ঞা বলল, আমি কখনও তোমার কোনো কাজে বাধা দিই না। আমাদের বাড়িতে রেখে তুমি কত জায়গায় ঘুরে বেড়াও, কখন ও না করি না। এবারও তোমাকে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু তোমার এই বয়স আর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কেন যেন মনে হচ্ছে এখন তুমি এত দিনের জন্য আসামের জঙ্গলে থেকে কাজ করাটা তোমার পক্ষে ঠিক হবে না।'

তথাপি লক্ষ্মীনাথ যোগবানীতে এলেন। যোগবানী অসমের সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতিহীন নির্জন স্থান। জঙ্গল। ওখান থেকে এক ফারলঙের  মতো দূরত্বে নেপালের সীমা। এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একটা মারোয়াড়ি দোকান দেখতে পেলেন। দোকানের মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তিনি গোলার ছোটো একটি ঘর নিয়ে বাস করতে লাগলেন। লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে উড়িয়া কাজের লোক ভালুককে ( আসল নাম মুকুন্দ) নিয়ে এসেছেন। এই বনবাসে একান্ত অনুগত ভালুক হল তার সঙ্গী, তার রাঁধুনি এবং তার বিপদের বন্ধু। ভালুর সঙ্গে ছোটো গোলাটাতে থেকে লক্ষ্মীনাথ জঙ্গলের কাজকর্ম চালাতে লাগলেন।

কিন্তু থাকা খাওয়ায় কষ্ট হল। লক্ষ্মীনাথ মানুষের সঙ্গে কথা বলে হাসি ঠাট্টা করে থাকায় অভ্যস্ত। তার কাছে পান্ডব বর্জিত এই জায়গায় থাকাটা এক ধরনের বন্দিত্ব। অপূর্ব শ্যামলীমা নিয়ে এর প্রকৃতি উদার যদিও ৩-৪ দিন থেকেই লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়েন। বেশি অস্থির হয়ে পড়লে এটা ওটা কাজ দেখিয়ে তিনি কোম্পানির গুয়াহাটির অফিসে চলে আসেন এবং কোম্পানির বাগান রোডের বাসভবনে দুই এক দিন থেকে জীবনের শক্তি নিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যান। এভাবে তার দেহের অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে পড়ল। তিনি নিজেই অনুভব করলেন শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। ভগবানের কাছে ভরসা করার সঙ্গে কাজের ভালুকে সারথি করে জঙ্গলে থেকে তিনি কাজকর্মের দেখাশোনা করতে লাগলেন।

গহন অরণ্যে থেকে কাঠের কাজ।জন্তু-জানোয়ার ছাড়া ম্যালেরিয়ার বীজানু নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মশা, বিষাক্ত সাপ ,রাতে বিদ্যুতের আলো নেই, খাবার জলের অসুবিধা। অসমিয়া জাতীয় অনুষ্ঠান অসম সাহিত্য সভার সর্বজনপূজ্য প্রাক্তন সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এখন জীবিকার জন্য অনিশ্চিত এবং বিপদ সংকুল জীবন বেছে নিয়েছেন। তবে এটাই সত্য তিন কুড়ি বছর পার করা লক্ষ্মীনাথ এই সত্যটিকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন ।আগের বাসস্থান ছেড়ে তিনি নতুন করে কাজ আরম্ভ হওয়া গুয়াহাটির কাছে জঙ্গল লাইলাকে ঘর নিলেন।

লাইলাকের জঙ্গলে গাছ কাটা হয়,করাতিরা গাছ কেটে শ্লিপার তৈ্রি করে,সেখান থেকে গাড়োয়ানের মাধ্যমে গরুর গাড়িতে ননগ্রাম জঙ্গলের কাছে থাকা গোলায় এনে রেলের ইঞ্জিনিয়ারকে খাতির করে শ্লিপার ‘পাস’করাতে হয়।প্রতিটি খেপে লক্ষ্মীনাথ লাইলাক থেকে ননগ্রামে হেঁটে আসেন।এভাবে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে আসা যাওয়া করাটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

সম্বলপুর থেকে প্রজ্ঞার উদ্বেগভরা চিঠি আসতে লাগল।জঙ্গলে স্বামীর থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে,সেবা-যত্নের অভাবে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়ছে। প্রজ্ঞা তাকে দ্রুত সম্বলপুরে ফিরে যেতে অনুরোধ করল।পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন—‘পরি,আমি নিজেও এখানে থাকতে চাই না।কিন্তু কোনোমতে আর কটা দিন কাটিয়ে একেবারে কাজ ছেড়ে চলে আসব।কাল যতীশ দাস ডাক্তার দুঃখ করল যে আমাকে অন্যায়ভাবে এরকম ভয়ানক জঙ্গলে পাঠানো হয়েছে।এই জঙ্গলের জল-হাওয়া খুবই খারাপ।এখানে রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।ভীষণ ডেম্প।বার্ড কোম্পানির সাহেব বেটারা ভীষণ সেলফিস।নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে দিয়ে এভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছে।যাই হোক,সাবধানে আছি।জল ফুটিয়ে খাচ্ছি।ভালু আমাকে দেখাশোনা করছে।তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না।ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করবেন।’

কিন্তু ঈশ্বর লক্ষ্মীনাথের প্রতি সদয় হলেন না।জঙ্গলে তার কষ্ট বৃ্দ্ধি পেল।

এমনিতে মানুষের জীবনে অরণ্য একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।গাছপালায় সবুজ অরণ্যানী হল পাখ-পাখালি,জন্তু-জানোয়ারের বাসস্থান।জঙ্গলের নিজস্ব একটা রূপ আছে।এই রূপটি লক্ষ্মীনাথকে আকৃ্ষ্ট করে।এক সময়ে তিনি মৃগয়ায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন।বন্দুক হাতে নিয়ে বনে-জঙ্গলে ঢুকে মৃগয়ার উন্মাদনায় এক আনন্দ উপভোগ করতেন।মৃগয়া ছেড়ে দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথ বনে জঙ্গলের নৈ্সর্গিক রূপটা দেখতে পেলেন। বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাত– কী অপূর্ব রূপ, যেন রূপ সৌন্দর্যে অপরূপা হয়ে স্বপ্নপুরীর পরীরা মর্ত্য লোকে নেমে আসে। লক্ষ্মীনাথ চায়। এত কষ্ট, থাকা খাওয়ার এত অসুবিধাতেও প্রকৃতির এই রূপটি তাকে এক বিমল আনন্দ দান করে।

নির্জন অরণ্যের এই অপরূপ দৃশ্যগুলি লক্ষ্মীনাথের অন্তরের রোমান্টিক ভাব সত্তাটিকে  সজীব করে তোলে। লক্ষ্মীনাথের তখন প্রিয়তমা পত্নীর কথা মনে পড়ে। তার জন্যই অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনের শেষে অস্থায়ীভাবে থাকা বাড়িতে এসে কেরোসিনের ক্ষীণ আলোতে পত্নীকে চিঠি লিখতে বসেন। এভাবে একদিন দুদিন পরে পরে এই চিঠি লেখাটা হল প্রজ্ঞার সঙ্গে হৃদয়ের দরজা খুলে আলাপচারিতা। এভাবে বনবাসে থাকার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা কিছুটা প্রশমিত হয়, সামান্য হলেও দিনের ক্লান্তি নিরসন হয়।

লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে লেখেন,' তোমার পাঠানো মিষ্টি পেলুম। তুমি যে নাড়ু দিয়েছিলে, সেগুলো প্রায় একমাস ধরে খেলুম।' অন্য একটি চিঠিতে,' আমি জঙ্গলের ভেতরে তাঁবুতে আছি। ভালো আছি। একরকম চলে যাচ্ছে। আমার জন্য তুমি অস্থির হবে না। ঈশ্বরের ওপরে ভরসা রাখ, ঈশ্বর আমাকে একরকম করে চালিয়ে নেবেন।' পরবর্তী একটি চিঠিতে,' তোমার মুক্তার মতো হস্তলিপি এইমাত্র পেলুম। মনটা হু হু করছিল। তোমার অমন সুন্দর চিঠিখানা পড়তেই আগুনে জল পড়লে যেমন ঠান্ডা হয়, সেইরকম মনটা আমার তৎক্ষণাৎ  ঠান্ডা হয়ে গেল। তুমি যে কী ঔষধ জান, তুমি সত্যিই দেবী প্রজ্ঞা সুন্দরী।'

কিন্তু অসমের গহন অরণ্যে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা বা প্রেম অনুরাগে পত্নীকে চিঠি লেখাটা তার কাজ নয়। তিনি বার্ড কোম্পানির নির্দেশে এখানে এসেছেন। কোম্পানির সাহেবরা ধুরন্ধর ব্যাবসায়ী। বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে তাকে কোম্পানির ব্যাবসায়িক স্বার্থ দেখতেই হবে।

জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় কাজ হয় না। শ্লিপার তৈরির উপযোগী গাছের অবস্থান অনুসারে করাতিদের কোথায় কোথায় গাছ কাটতে হবে সেটা মহরি এবং করাতিয়ারা স্থির করে। এদিকে জঙ্গলের মধ্যে পথঘাট নেই। করাতিয়ারা কাজ করার জায়গায় পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কাজ দেখার জন্য কোনো কোনো দিন কুড়ি মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়।

একদিন এভাবে ঘুরে ঘুরে জঙ্গলের কাজ দেখতে দেখতে কখন যে সূর্য ডুবে গেল বুঝতেই  পারলেন না। এত গভীর জঙ্গল যে সূর্যের আলো দেখা যায় না।

রাতের অন্ধকার নেমে এল। সঙ্গী ভালুর সঙ্গে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ পথ হারিয়ে ফেললেন। তথাপি সাহস করে এগিয়ে যেতে গিয়ে জঙ্গলের লতা পাতা তাদের পা ঘিরে ধরল। জায়গাটা এত খারাপ যে তারা আর এগোতে পারলেন না।

এদিকে অনতিদূরে  বন্য জন্তু-জানোয়ারের চিৎকার শুনে লক্ষ্মীনাথ প্রমাদ গুণলেন। এরকম মনে হল যে তারা যেন আর রক্ষা পাবেন না। রাতের মধ্যে তারা জন্তু-জানোয়ারের শিকার হয়ে যাবেন। ভয়ে লক্ষ্মীনাথের গলা শুকিয়ে গেল।শেষে আর পারলেন না। ভয়ে ক্লান্তিতে পরিশ্রান্ত হয়ে একটা পাথরের ওপরে বসে পড়লেন।

মনিবের এই অবস্থা দেখে ত্রিশ বত্রিশ বছরের ভালু এখন কী করবে? কীভাবে এখান থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে? নিরুপায় হয়ে ভালু কাতর কণ্ঠে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাতে লাগল।

 ভগবান যেন ভালুর প্রার্থনা শুনলেন। কিছুক্ষণ পরে পাশ দিয়ে দুজন গারো করাতিকে যেতে দেখে ভালু ওদের ডাকল। কাকুতি মিনতি করে ওদেরকে ডেকে এনে পাথরে  শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকা মনিব লক্ষ্মীনাথকে দেখিয়ে ভালু সাহায্য চাইল।‌‌

লক্ষ্মীনাথকে পড়ে থাকতে দেখে গারো করাতি  দুজনের খারাপ লাগল। ওদের সঙ্গে বাঁশের চুঙ্গায় চা থাকে। ওরা লক্ষীনাথকে সেই চা খাওয়াল। ধীরে ধীরে লক্ষ্মীনাথ ও জ্ঞান ফিরে পেলেন। তারপরে গারো করাতি দুজন লক্ষ্মীনাথ এবং ভালুকে ওদের সঙ্গে হাঁটতে বললেন। কিন্তু লক্ষীনাথের অবস্থা এতই শোচনীয় এবং এতটাই দুর্বল যে হাঁটার শক্তি নেই। তিনি অসহায় ভাবে বললেন,' আমি হাঁটতে পারছি না।'

অবশেষে গারো মানুষ দুজনের একজন লক্ষ্মীনাথকে পিঠে তুলে নিয়ে তারা  থাকা জায়গাটায় নিয়ে এল।

মনিবের দুর্দশার দিকে তাকিয়ে বেচারা ভালু বলল,' 'সাহেব আমি কোনোদিন, আপনাকে এত কষ্ট করতে দেখিনি।'

নির্বিকার কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' কী আর করবি? বিধির বিধান কে খন্ডন করবে?'

' আপনাকে এভাবে কষ্ট করতে দেখলে মেম সাহেব কেঁদে ফেলতেন।'

জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এত অসুবিধা এত কষ্ট… সত্যি  লক্ষ্মীনাথ আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন, এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। এত অত্যাচার তার দেহ সহ্য করতে পারবে না। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে বার্ড কোম্পানির চাকরি ছাড়তে হবে। কিন্তু  কার্যক্ষেত্রে সেটা নয়। নয় মানে আর্থিক দিকটা চিন্তা করেই লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়তে পারেন না।

প্রজ্ঞা ছাড়া রত্না এবং দীপিকা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। অরুণা-সত্যব্রত উদ্বেগ প্রকাশ করে তাকে কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দেবার জন্য চিঠি লিখল। তারপরও লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়ল না। প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনুসারে তিনি আড়াই মাস পূর্ণ করেই চাকরি ছাড়বেন। কথাটা জানতে পেরে বরোদা থেকে অরুণা‐- সত্যব্রত টেলিগ্রাম করল,' রিজাইন ইমিডিয়েটলি এন্ড কাম ব্যাক টু হোম।'

তারপরেও লক্ষ্মীনাথ লিখলেন, এই জঙ্গল সত্যিই ভীষণ, ভয়ঙ্কর। এখানে এলে কান্না পায়। তবু বলছি, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে তোমরা ভেব না। কোনো মতে আর কটা দিন কাটিয়ে দেব।'

এভাবে চিঠি লিখল যদিও শেষে লক্ষ্মীনাথ আর পারলেন না। পরিশ্রমের পরে বিশ্রাম হয় না।জঙ্গলের প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিশোধিত পানীয় জল খাওয়া-দাওয়া চূড়ান্ত অনিয়ম। নাক দিয়ে রক্তপাত না হলেও লক্ষ্মীনাথের  বদহজম হতে লাগল ।সঙ্গে পিত্ত শূল বেড়ে চলল। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ল। অবশেষে লক্ষ্মীনাথ নিয়তির  সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য হলেন।

কার্কপেট্রিকের পরে দায়িত্ব নিলেন মিঃ জেনার। কিছুদিন পরে মিঃ জেনার কলকাতার মূল অফিসে বিভাগীয় দায়িত্বে বাহাল হলেন। ইতিপূর্বে তিনি কাজ করা পদে এলেন মিস্টার উইথঅল।পালমার নামে এক  কম বয়সী সাহেবের সঙ্গে মিঃ উইথঅল লক্ষ্মীনাথ কাজ চালিয়ে থাকা জঙ্গল দেখতে গেলেন। কাজকর্ম দেখে তারা লক্ষ্মীনাথের প্রশংসা করলেন।

 তার জন্য লক্ষ্মীনাথের মনটা পুনরায় পরিবর্তিত হল। পদত্যাগের কথা না লিখে লক্ষ্মীনাথ মিঃ জেনারকে জানালেন তিনি সুদীর্ঘ বারো বছর ধরে বার্ড কোম্পানিকে সেবা করে আসছেন।নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও ছুটি নেননি। কিন্তু গত দুমাস অসমের অস্বাস্থ্যকর জঙ্গলে থেকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। কলিক পেইন, ইনডাইজেশন এন্ড উইকনেসে আক্রান্ত হয়েছেন।তাই তাকে স্বাস্থ্যকর কোনো জায়গায় বদলি করা হোক অথবা তাকে তিন মাসের ছুটি মঞ্জুর করা হোক।

অবশ্য বার্ড কোম্পানির কর্তারা এত অকৃতজ্ঞ নয় তারা ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে লক্ষ্মীনাথের ছুটি মঞ্জুর করলেন কিন্তু লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেল না নিজের ইচ্ছামতো ছুটি পেয়েও মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া অশান্তিটা কমল না। আসলে গত দুই মাস জঙ্গলে থাকার কষ্ট এবং তিক্ততা তাকে এমন করে তুলেছে। তার জন্যই চাকরি থেকে তার মন উঠে গেছে। এটাই লক্ষ্মীনাথের চরিত্রের এক বৈশিষ্ট্য। কোনো কারণে একবার যদি কোথাও থেকে মনটা উঠে যায় তারপরে তিনি আর মনটাকে ঘুরিয়ে আনতে পারেন না। তখন তিনি বৈষয়িক লাভ লোকসানের কথা ভাবতে পারেন না ।ভোলানাথের সঙ্গে সংঘাত লাগার পরে বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও লক্ষ্মীনাথ এটাই করেছিলেন।

মোটের ওপর এখন তিনি বার্ড কোম্পানি ছাড়ার জন্য ভেতরে ভেতরে সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়লেন। কোম্পানি থেকে দ্রুত অব্যাহতি লাভ করার জন্যই তাড়াতাড়ি শিলং গেলেন্। অফিসে কোম্পানির হয়ে করতে লাগা কাজটুকু করলেন। চারদিন পরে গুয়াহাটিতে এসে স্লিপার পাঠানোর জন্য রেলের কামরার বন্দোবস্ত করলেন।পরের দিনই ডাকযোগে বার্ড কোম্পানিতে পদত্যাগপত্র প্রেরণ করলেন। ১৯২৮  সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।তার ১৪ দিন পরে গুয়াহাটি অফিসে এসে মিঃস্মার্ট সাহেবকে নিজের দায়িত্বে থাকা সমস্ত কিছু  বুঝিয়ে দিলেন।

দুই মাসেরও বেশি দিন জঙ্গলে থাকা হল। সাধারণ জনজীবনের চেয়ে অরণ্যের জীবনটা আলাদা। সম্বলপুরে ঝাড়চোগোড়া চামুন্ডা লুড-লোরি বরছাই ইত্যাদি জঙ্গলে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আসামের জঙ্গলে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা আলাদা। এখানকার জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশটা লক্ষ্মীনাথকে অন্যরকম করে তুলেছিল। প্রতিদিন দাড়ি কামানোতে অভ্যস্ত লক্ষ্মীনাথ গত দুই মাস একবারও দাড়ি কামান নি। চুল কাটেন নি। প্রিয়তমা পত্নী এবং প্রাণাধিক মেয়েদের থেকে দূরে থাকার জন্য তিনি চুল দাড়ি কাটার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন।সাজ পোশাকেও যত্ন নেননি। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে 

গুয়াহাটিতে এসে নাপিত ডেকে এনে চুল কেটে, দাড়ি কামিয়ে পরিষ্কার শার্ট প্যান্ট পরে পুনরায় তিনি ভব্য  সাহেব হয়ে পড়লেন।

বার্ড কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার পরে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো লাগলেও মার্চের এক তারিখ রেলে কলকাতায় যাবার সময় বিগত ১২ বছরের অনেক স্মৃতি তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। সেই সব তাকে বিরক্ত করল, ব্যথিত করল। তারপরে মনটা অনিশ্চয়তায় ভরে উঠল। 

অনিশ্চয়তাটা হল এর পরে কী করবেন? জমা টাকায় কিছুদিন ঘর-সংসার মেয়ে দুটির পড়ার খরচ চালাতে পারলেও তারপরে কীভাবে চলবে? রত্না দীপিকাকে বিয়ে দেবার টাকা সংগ্রহ করবেন কীভাবে? জীবনের বাকি থাকা দিনগুলি কীভাবে চালাবেন? প্রশ্নগুলি তাকে অস্থির করে তুলল। এরকম মনে হল যেন আগন্তুক দিনগুলি ভয়াবহ এক রূপ নিয়ে এগিয়ে আসছে।

 তথাপি লক্ষ্মীনাথ মনোবল হারালেন না। শেষে ভাবলেন বর্তমানেই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায়ই খোলা আছে। সেটা হল পুনরায় কাঠের ব্যাবসা করা। কিন্তু বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ব্যাবসা করতে  গিয়ে সফল হতে পারেননি। এখন তিনি তিন কুড়ি চার বছর বয়সে পড়া এই শরীর নিয়ে কাঠের ব্যবসা নেমে সফল হতে পারবেন কি?

 অসমিয়া জাতি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের উন্নতির জন্য সেবা দান করে অসমিয়া জাতীয় জীবনে একজন বরেণ্য পুরুষ বলে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তার জন্য অসমিয়া মানুষ তাকে ভালোবাসে, সভা সমিতিতে আমন্ত্রণ করে সহস্র জনের মধ্যে ফুলে শোভিত গামছা পরিয়ে হাতে শরাই তুলে দিয়ে তাকে সম্বর্ধনা জানায়। সহস্রজনের উচ্ছ্বাস ভরা হাততালি শুনে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন বলেই মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা এটাই যে বেঁচে থাকার জন্য বা নিজের পরিবারকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য উপাদানটুকু কীভাবে যোগাড় করবেন সেটা অসমিয়া জাতির কেউ চিন্তা করেন না।…এসব ভাবলে লক্ষ্মীনাথের মনের ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।তা বলে জাতীয় দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন না।

গুয়াহাটি থেকে কলকাতায় এসে জোড়াসাঁকোতে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একদিন থাকলেন। হোস্টেলে থাকা রত্না এবং দীপিকার সঙ্গে দেখা করে তাদের কলেজের ফি দিয়ে পরের দিন সম্বলপুরে এলেন।

 লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে প্রজ্ঞার অন্তরটা ব্যথিত হয়ে পড়ল। স্বামীর স্বাস্থ্য এত খারাপ হয়ে পড়েছে। প্রজ্ঞার এরকম মনে হল যেন সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু তার আবেগ উচ্ছ্বাস কম। তিনি সেদিনই ডাক্তার ডেকে এনে লক্ষীনাথের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেন। হজম ভালো হয় না, অম্লশূলে কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তার ঔষধ লিখে দিলেন। সেইসব খাইয়ে প্রজ্ঞা স্বামীর সেবা যত্ন করতে লাগলেন। 

পত্নীর সেবা যত্ন আদর পেয়ে লক্ষ্মীনাথও মনে মনে শপথ নিলে্‌ন, না ভবিষ্যতে আর কখনও প্রজ্ঞাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আর্থিক দিকে কষ্ট হলেও প্রজ্ঞা থেকে আলাদা হয়ে থাকবেন না।

 দুদিন বিশ্রাম নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় কাজে লাগবে বলে ভাবলেন। এমন সময় দুঃসংবাদ এল। ১৯২৮ সনের দুই  মে প্রাগজ্যোতিষপুরের  লৌহিত্যতট পঞ্চতীর্থে পন্ডিত হেমচন্দ্র গোস্বামী দেহত্যাগ করেছেন। তিনি দেহত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরম্পরার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অন্ত পড়ল।কলকাতায় থেকে জোনাকি প্রকাশের সময়ে অন্যতম প্রধান সহযোগী প্রিয় বন্ধু হেম গোঁসাইয়ের বিয়োগে লক্ষীনাথের অন্তরটা শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। লক্ষ্মীনাথ লিখলেন  সেদিন কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের ২৯ তারিখ আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিতে  গেলাম। কে জানত যে সেই বিদায়ই আমার কাছে শেষ বিদায় হবে। আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাতে আমি তার কাছে থাকতে পারি সেজন্য মাটি এক টুকরো নিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করতে বলেছিলেন, ‘আপনি আসুন দুজনে কাছাকাছি একসঙ্গে বসবাস করি।’

  আজ কার কাছে কে বাড়ি তৈরি করে থাকবে, নিয়তি কে জিজ্ঞেস করছি। আজ অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামীকে হারিয়ে যে ক্ষতি হল সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। অসমিয়া ভাষার সাহিত্য একজন একনিষ্ঠ সেবক হারাল।

  হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল ।এদিকে ব্যবহারিক বাস্তব বড়ো নিষ্ঠুর। লক্ষ্মীনাথ জীবিকার উপায় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক মনে নিয়েও কয়েকবার ঝাড়চোগোড়ায় গিয়ে উড়িষ্যার কোথাও জঙ্গল নেবার জন্য চেষ্টা করলেন। অবশেষে ১৯২৮ সনের ৭ মে লক্ষ্মীনাথ ৫৫৮৩ টাকার বিনিময়ে সম্বলপুর জেলার জমিদারের লাইরা জঙ্গল লিজে নিতে সক্ষম হলেন ।

প্রজ্ঞার সান্নিধ্য এবং সেবা যত্ন পেয়ে ভালো হলেও লক্ষ্মীনাথ সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন না। এদিকে নতুন করে নেওয়া জঙ্গলের কাজ পরিদর্শন করতে হবে। শ্লিপার পাস করাতে হবে। ‘বাঁহী’তে প্রবন্ধ লিখতে হবে এবং অসমের সমস্যার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জঙ্গল নিয়ে কাঠের ব্যবসা চালানো এবং সাহিত্যচর্চা করা দুটি একেবারে বিপরীত ধর্মী কাজ। তথাপি সম্বলপুরে নিজের বাড়িতে থেকে ধীরে সুস্থে ব্যাবসা চালানো ছাড়াও তিনি অসমিয়া সাহিত্য রচনায় মগ্ন হলেন।



  


সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৬ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৬

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das







  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৬)

' কাকাবাবু ,দেরিতে হলেও অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের একমাত্র জাতীয় অনুষ্ঠান' অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্স (অসম সাহিত্য সভা) অবশেষে আপনাকে স্বীকৃতি দিল।'

' হ্যাঁ যদু বাবা, খবরটা পেয়ে ভালোই লাগছে।'

অসমিয়া ভাষা সাহিত্যে অমূল্য অবদানের জন্য আপনাকে এই স্বীকৃতি।এখন আপনি কনফারেন্সের মাননীয় সভাপতি ।আপনার জন্য আমি গৌরব অনুভব করছি। আপনার সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানাবার জন্য সম্বলপুরে  যেতে চাইছিলাম। আপনি হয়তো কনফারেন্সের সম্পাদকের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পত্র পেয়েছেন?'

' পেয়েছি। কনফারেন্সের সপ্তম অধিবেশনের জন্য আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করার প্রস্তাব সহ নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়েছে। এবারের অধিবেশনটি গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হবে। এখন কনফারেন্সে একটা জাতীয় দায়িত্ব যখন অর্পণ করেছে, অস্বীকার করার তো উপায় নেই। আমি যাব,তবে বাড়িতে তোমার কাকিমাও নেই। তিনি বরোদায় অরুণার কাছে গিয়েছেন।'

' কাকিমা বরোদায়!'

' প্রথম ছেলের পরে এবার ছয় ডিসেম্বর অরুণা একটি শিশু কন্যার জন্ম দিয়েছে। প্রসূতির সেবা যত্নের জন্যই তোমার কাকিমাকেও যেতে হল। অবশ্য রত্না বাড়িতে। আমি কনফারেন্সে চলে গেলে ওকে একা থাকতে হবে। তাই রত্নাকেও সঙ্গে নিয়ে এলাম।'

' ভালোই হয়েছে। রত্না অধিবেশনে গান গাইতে পারবে।'

' আসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সভাপতি হয়েছি বলে জানতে পেরে আমাকে নিয়ে কলকাতায় এত হুলস্থূল।সম্বলপুর থেকে এসে কলকাতার সিক্স বাই ওয়ান দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে আছি বলে শুনে কলকাতা অসমিয়া ছাত্ররা আমাকে অভিনন্দন জানাল। তারপরে তারা সেন্ট পল গেস্ট হাউসে আমার সম্মানে টী‐ পার্টি দিল। সেখানে দুর্গাধর বরকাকতী , হরেকৃষ্ণ দাস এসেছিলেন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করে টী‐পাটিতে বক্তৃতা দিতে হল।'

' সেটাই হবে। এখন যেখানে যাবেন, সেখানেই জনগণ আপনাকে সম্বর্ধনা জানাবে। সম্বর্ধনা সভায় শৰাই এবং ফুলতোলা গামছা নিতে নিতে আপনার হাত ব্যথা হয়ে যাবে ।'

হবে যদু  বাবা। সেইসব শরাই -সম্বর্ধনা- ফুলতোলা গামছার কথা রাখ। কথাটা হল, ২৫ ডিসেম্বর রত্নাকে নিয়ে গুয়াহাটিতে রওয়ানা হওয়ার জন্য টিকেট কাটলাম। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে কি?'

' সেটা কি আর আপনাকে বলতে হবে? আপনি এখন লিটারেরি কনফারেন্সের পরম শ্রদ্ধাভাজন সভাপতি। আপনার সঙ্গে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্মানের, গৌরবের। শুধু আমি নয় আপনার সঙ্গে গল্প লেখক লক্ষ্মীধর শর্মাও যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে।'

' তার মানে যা বুঝতে পারছি, এখন আসাম লিটারেরি  কনফারেন্সের সভাপতির পদ  পাবার জন্যই তোমরা আমাকে সমাদর করবে। ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া কে মনে রাখবে না—-।'

না, কাকাবাবু, এভাবে বলবেন না। অন্যের কথা জানিনা, আমার জন্য আপনি যেকোনো পদাধিকারীর চেয়েও ব্যক্তি হিসেবে বেশি আদরের, বেশি মহান।'

' এই যে যদু, বিশেষণ লাগানো বড়ো বড়ো কথাগুলি এত বেশি বলনা।'

' কেন?'

' নিজের মানুষের মুখে সেইসব শুনলে বড়ো লজ্জা লাগে। আচ্ছা, কনফারেন্সের জন্য অভিভাষণটা লিখে তোমাকে পাঠিয়েছিলাম, সেটা পড়ে কেমন লাগল?'

' ভালো হয়েছে। আপনি অধিকার দিয়েছিলেন বলেই আমি কিন্তু ভালোভাবে দেখে দু-চারটা কথা যোগ করেছি। সেসব আপনার পছন্দ হয়েছে তো?'

' তুমি কবি, আমার আদরের কবি। কবির হাতে পড়েছে যখন আমার অপছন্দ হওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারেনা।'

অবশেষে যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা, লক্ষীধর শর্মা এবং কলকাতায় থেকে কলেজে পড়া কয়েকজন অসমের ছাত্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ এবং রত্না রেলগাড়িতে করে ২৬ ডিসেম্বর আমিনগাঁও পৌঁছালেন। আমিন গাঁও রেলগাড়ি থেকে নামার পরেই অসংখ্য লোকের ভিড়। ফেরিতে করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে পান্ডু ঘাটে নামার পরে ভিড় আরও বেড়ে গেল। সামনে উপচে পড়া জনতা দেখে লক্ষ্মীনাথের হৃদয় উথলে উঠল। এরা সবাই অসমের মানুষ, অসমিয়া মানুষ। সহজ সরল অসমিয়া মানুষের মনে মাতৃভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি এত অনুরাগ। অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথের অবদানের জন্যই তাকে ঘিরে জনগণের এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ। অবশ্য অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে অনেক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে লক্ষ্মীনাথ অসমিয়া সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা পল্লবিত করেছেন,সমৃদ্ধ করেছেন।জনতার উচ্ছ্বাসপূর্ণ জয়ধ্বনি শুনে লক্ষীনাথের এরকম মনে হল যেন এত বছর ধরে তার সেই সংগ্রাম, সেই শ্রম সার্থক হল।

পান্ডু স্টেশন থেকে লক্ষ্মীনাথ এবং রত্নাকে গন্তব্যস্থানে নিয়ে যাবার জন্য ট্যাক্সির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের নিয়ে ট্যাক্সিটা রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেল। লক্ষ্মীনাথের ইচ্ছা অনুসরণ করে তার  থাকার জায়গা ঠিক করা হল গুয়াহাটিৰ দিঘলী পুকুরের পারে থাকা আইন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জ্ঞানদাভিরাম বরুয়ার বাড়ি । জ্ঞানদাভিরামের বাড়ি পর্যন্ত  জনতার ভিড় দেখা গেল। অপূর্ব এই দৃশ্য দেখে লক্ষ্মীনাথ ভাবলেন ভাষা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে অসমিয়া আর দুঃখী হয়ে থাকবে না।

২৭ এবং ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৪ দুদিনের কার্যসূচি নিয়ে অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্সের  অসম সাহিত্য সভার অধিবেশন। ২৭ ডিসেম্বর সকাল বেলা ন’টা থেকে অধিবেশনের কার্যসূচি আরম্ভ হল। নানান রঙের ফুল এবং সবুজ পাতা দিয়ে সাজানো গাড়ি একটায় সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এবং রত্নাকে আদর করে এনে অধিবেশনের মঞ্চে বসতে দেওয়া হল। সভাপতির আসন অলংকৃত করা লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার বক্তৃতা শোনার জন্য সামনে অপেক্ষমান সাহিত্য অনুরাগী অগণন জনতা।

 সভা আরম্ভ হওয়ার পরে সাহিত্যিক সত্যনাথ বরা কনফারেন্সের প্রাসঙ্গিকতার কথা ব্যক্ত করলেন।তারপরে বর্তমান সভাপতি সৃষ্টি করা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সঙ্গে মাতৃভাষার প্রতি নবনির্বাচিত সভাপতির জাগ্রত অনুরাগ, অগ্রিম স্বদেশ প্রীতি এবং অসমিয়া ভাষার স্বতন্ত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে তার অবিরত সংগ্রামের কথা ব্যাখ্যা করে অভ্যর্থনার ভাষা পাঠ করলেন।

  কার্যসূচি অনুসারে এবার সভাপতি মহোদয়ের বক্তৃতা দেওয়ার পালা। নবনির্বাচিত সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অভিভাষণ লিখে এনেছেন। এটা যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা দেখে দেবার পরে ছাপা করার কাজে লক্ষ্মীধর শর্মা সাহায্য করেছিলেন।

ইতিপূর্বে প্রায় আট বছর আগে অসম ছাত্র সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে লক্ষ্মীনাথ এই গুয়াহাটিতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার চেয়েও এটিতে জনগণের উপস্থিতির সংখ্যা বেশি। সমস্ত বয়সের সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বিনম্র প্রণাম জানিয়ে লক্ষ্মীনাথ বক্তৃতা শুরু করলেন।

অভিভাষণে  লক্ষ্মীনাথ প্রাচীন অসম তথা কামরূপের স্থান, প্রাচীনকাল থেকে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের বিকাশ, প্রকৃত সাহিত্যের লক্ষণ, জাতীয় সাহিত্য ইত্যাদি  তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে নিজের মতামত তুলে ধরলেন। তারপরে পরিসমাপ্তির দিকে এগিয়ে তিনি ছাত্র সম্মেলনে তুলে ধরা বক্তৃতার সুরে বললেন,' শ্রদ্ধাভাজন সমবেত জনগণ আজ পুনরায় এটা জোর  দিয়ে বলি এবং আপনারা সবাই মূল্যবান বলে মনে করবেন, অসমিয়া ভাষার উন্নতিই হল অসমের উন্নতির প্রথম পদক্ষেপ। হতে পারে  আমাদের মানুষের লেখা সামান্য, হতে পারে আমাদের অবস্থা এত শক্তিশালী নয়— তা বলে ভারতের অন্যপ্রদেশের মানুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যেতে না পারায় মনকে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকব নাকি? এভাবে থাকলে ভারতীয় জাতীয় জীবনে আমাদের আসন কোথায় থাকবে? আজ ভারতীয় জাতীয় জীবনকে যে একটা নতুন স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেই ভাবের ঢেউ আমাদের হৃদয়– মন বোধ– চেতনায় আলোড়নের সৃষ্টি করবে না কি? লেখার সংখ্যা কম বলে আজকের বিশ্বের এই জাগরণের যুগেও আমরা ঘুমিয়ে থাকব নাকি? না ,আমরা শুয়ে থাকতে পারব না। আমরা আমাদের অসমিয়া নাম লোপ পেতে দিতে পারি না। আজকের এই নবজাগরণের যুগে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মতো  আমাদের অসমকে ও মর্যাদার আসন লাভ করতে হবে।

মাননীয় অসম প্রেমী জনগণ, আপনারা নিশ্চয় জানেন—কলকাতায় পড়াশোনা করতে যাওয়া মুষ্টিমেয় কিছু অসমিয়া ছাত্র অসমিয়া ভাষার উন্নতি সাধিনী সভার মাধ্যমে প্রথমে যে বীজ বপন করেছিল সেই বীজই এখন বটগাছ হয়ে শান্তির ছায়া রূপে সমগ্র অসমকে ঘিরে রেখেছে। পাঠশালার  সেই ছাত্রের গলা থেকে বের হওয়া ক্ষীণ কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে বিশাল হয়ে অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আজ পূব থেকে পশ্চিমে উত্তর থেকে দক্ষিনে সমগ্র অসমে একসঙ্গে সেই কন্ঠের সঙ্গে কণ্ঠস্বর মিলে উদাত্ত কণ্ঠে মাতৃভাষার আরতি করছে।

  বন্ধুরা আসুন আজ এই আনন্দের দিনে এই সাংস্কৃতিক মেলায় আমাদের যথাসাধ্য শক্তি স্বদেশ জাতির উন্নতির জন্য মাতৃভাষার সেবার জন্য উৎসর্গ করে জীবন ধন্য করি আসুন। মাতৃভাষার উন্নতিতেই আমাদের দেশের উন্নতি, মাতৃভাষার সেবাতেই দেশের সেবা, সেবার মাধ্যমে আমাদের লুপ্ত গৌরবের পুনরুত্থান সম্ভব হবে।… … …’

 সভাপতির অভিভাষণের পরে বিকেলে উজান বাজারের নাটঘরে (আজকের কুমার ভাস্কর নাট্য মন্দির) ছয়টা থেকে বিষয়বস্তু নির্বাচনের সভা বসেছে।গম্ভীর পরিবেশে উত্থাপিত প্রস্তাবের সমালোচনা তর্ক-বিতর্ক চলছে।

 রাত ন'টা বাজতে চলেছে। এই সময় একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা  ঘটল। মাথায় ফেল্ট হেট, হাতে লাঠি আর ডান হাতে অলেস্টার কোটটা ঝুলিয়ে নিয়ে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া সভাঘরে প্রবেশ করলেন।

  সভাপতির আসনে লক্ষীনাথ বসে পদ্মনাথকে দেখতে পেয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলেন না। কিন্তু তিনি এই জন্য অবাক হলেন যে পদ্মনাথ তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি বসে থাকা আসনের কাছে এসে ইউরোপীয় রীতিতে প্রথমেই টুপিটা খুলে বাঁ হাতে নিয়ে চট করে লক্ষ্মীনাথের হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন ‘মিস্টার বরুয়া উই আর মিটিং আফটার টুয়েন্টি ইয়ার্স।’

হ্যাঁ, আজ থেকে সুদীর্ঘ কুড়ি বছর আগে লক্ষ্মীনাথের কৃপাবরী প্রবন্ধ পদ্মনাথের সম্পাদনায় ঊষা তে প্রকাশ পাওয়ার পরে কাগজটা রাজ-রোষে পড়েছিল। প্রবন্ধটি প্রকাশ করার জন্য সম্পাদক সরকার এবং পাঠকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রবন্ধ প্রকাশ করবে না এবং সেই লেখক কৃপাবর বরুয়ার (লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার) সঙ্গে সম্পাদক কোনো সম্পর্ক রাখবে না বলে শপথ খেয়ে কাগজে বিবৃতি দেওয়ায় পদ্মনাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের বিরোধ শুরু হয়েছিল। তিক্ততাময় সেই বিরোধের জন্যই দুজনের মধ্যে এত বছর যোগাযোগ বন্ধ ছিল। আজ পদ্মনাথ নিজে এসে মিলনের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় লক্ষ্মীনাথ প্রথমে হতভম্ব হলেন। পরে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার আন্তরিকতায় কোনো খাদ নেই দেখে লক্ষ্মীনাথ আপ্লুত হলেন। তারপরে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের দুই অধিনায়ক যে মুহূর্তে কোলাকুলি করলেন সেই মুহূর্তে সভাস্থলে উপস্থিত থাকা লোকেরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালো এবং সমগ্র সভাঘর  নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল ।এই মিলনটা স্বর্গের দেবতার জন্যও উপভোগ্য নান্দনিক এক দৃশ্য।

অল অসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সমাপ্তির পরে লক্ষ্মীনাথ সংগীত সংঘের অধিবেশনে যোগ দিলেন। ইতিমধ্যে প্রিয় বন্ধু চন্দ্রকুমার তার সঙ্গে দেখা করলেন। মাজিউর সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথ অধিবেশনের ভাব ও গম্ভীর আনুষ্ঠানিকতায় গম্ভীর হয়ে পড়া মনটা হালকা করে নিলেন। সভাপতির পদ অলংকৃত করার পরেই সর্বসাধারণ অসমিয়া ভালোবাসার যে ধরনের প্রকাশ তাতে তিনি কিছু পরিমাণে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তার জন্যই তিনি সকলের অজ্ঞাতে চন্দ্রকুমারের সঙ্গে বসলেন। দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু বসে ব্যক্তিগত, নিজের নিজের সংসার, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া নিজের নিজের জীবিকা, দেশ-সমাজ, ‘বাঁহী’র সম্পাদনা প্রকাশ নিয়ে  সমস্যা, ‘বাঁহী’র নিয়মিত লেখকদের সৃজন প্রতিভা,তারপরে নিজের নিজের সৃষ্টিকর্ম ইত্যাদি এটা ওটা কত যে কথা…কথার শেষই হয় না।

 ‘বুঝেছ মাজিউ,সভাপতি হওয়ার পরে বক্তৃতা দেওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ অবশেষে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘আগামীকাল কটন কলেজের ছাত্রদের অনুরোধ রক্ষা করেও একটা বক্তৃতা দিতে হবে।’

‘তুমি এখন অসমিয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের শিরোমণি।’ চন্দ্র কুমার বললেন, ‘অসমিয়া জনগণের সঙ্গে অসমিয়া ছাত্ররা তোমার প্রেরণাদায়ক বাণী শুনতে চায়। তাই ছাত্রদের অনুরোধ রক্ষা না করে থাকতে পার না। তবে বেজ, কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি এখন তুমি যেন বিশেষ কোনো লেখার পরিকল্পনা করছ না?’

  পারিবারিক ঝামেলা বুঝেছ, অনেক ঝামেলা গেল।অরুণাকে বিয়ে দিলাম। এখন রত্নার জন্য ছেলে খোঁজ করছি। কন্যা দায়ের চিন্তা একটা লেগেই রয়েছে। তাছাড়া বার্ড কোম্পানির চাকরিতে ব্যস্ততা বেড়েছে। এইসবের মধ্যে মন মগজ সুস্থির করে নতুন কিছু লেখাই শুরু করতে পারছি না। অবশ্য তার মধ্যে সময় বের করে বৈষ্ণব তত্ত্বের উপরে কিছু প্রবন্ধ লিখেছি।

‘লেখাগুলি ভালো হয়েছে। এটা শুধু ধর্মীয় দর্শন নয়, ভালো সাহিত্যও। তুমি যেভাবে ভাগবতের তত্ত্ব দর্শন ব্যাখ্যা করেছ, সর্বসাধারণ অসমিয়া ভাগবতের সারকথা বুঝতে পারবে। আরও একটা কাজ কর।’


 ‘কী কাজ?’

 ‘তোমার জীবনটা সংঘাত-সংগ্রামে বৈচিত্র্যময়। আত্মজীবনী লিখতে শুরু কর।’

 ‘আত্ম-জীবনী! শোন মাজিউ, আত্মজীবনী লেখার কথা বলা সহজ। লিখব বলে ভাবতেও ভালো লাগে। কিন্তু লেখাটা সহজ নয়। আচ্ছা, অধিবেশনে তুলে ধরা আমার বক্তৃতাটা শুনে কিরকম লাগল?’

  ‘কাল তোমার আড়াই ঘন্টার অভিভাষণটা অসমিয়া-ভাষা সাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল।’

  আমার বক্তব্যে এরকম কী পেলে যে এটা একটা ঐতিহাসিক দলিল বলে তোমার মনে হল?’

 তোমার অভিভাষণের প্রতিটি শব্দে প্রকাশ পেয়েছে মাতৃভাষা অসমিয়ার প্রতি তীব্র অনুরাগ, জাগ্রত দেশ প্রেম এবং জীবনের প্রতি গভীর আশাবাদ।’

অল অসাম লিটারেরি কনফারেন্সের সভাপতি হয়ে বছরের বেশিরভাগ সময় সুদূর সম্বলপুরে থাকার জন্য লক্ষ্মীনাথ সংগঠনাত্মক কাজ সেভাবে ঠিক করতে পারলেন না। এদিকে বাঁহীর সম্পাদনা এবং প্রকাশ করার কাজ চন্দ্রকুমারকে দেওয়া হয়েছিল এবং কাগজটি ডিব্রুগড়ের অসমিয়া প্রেস থেকে বের হত। পরের বছর থেকে বাঁহী গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হতে লাগল। তার জন্য লক্ষ্মীনাথকে পুনরায় সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হল। বাঁহী সম্পাদনা, বৈষ্ণব তত্ত্বকথা লেখা এবং বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণ অনুসারে বক্ততা দান ছাড়া  লক্ষ্মীনাথ সত্যিই নিজেকে সৃষ্টি মূলক সাহিত্য রচনায়  মনোনিবেশ করতে পারছে না।

 এভাবে লক্ষ্মীনাথের জীবনের আরও একটি বছর অতিবাহিত হল। তিনি ষাট বছরে পা রাখলেন। মানসিকভাবে এখনও সক্ষম যুবকের মতো মনে হলেও শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এদিকে বার্ড কোম্পানির চাকরি— জঙ্গলে চলতে থাকা কাজ দেখতে হয়। কুলি-করাতিদের-গাড়োয়ানদের সাপ্তাহিক মজুরি দেবার জন্য প্রায় তিন চার দিনের জন্য জঙ্গলের মধ্যে তৈরি করা বাংলোতে থাকতে হয়।তারপরে দুর্গম জঙ্গল থেকে কাঠ বহন করে সম্বলপুর স্টেশনের কাছে থাকা গোলায় পাশ করানো, বিশ্রাম না নিয়ে কাজ করার জন্য তার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়ল।

এর মধ্যে একদিন রাতে সম্বলপুরে একটা কৃষি প্রদর্শনীতে প্রজ্ঞা রত্না এবং দীপিকার সঙ্গে স্থানীয় বাঙালিরা মঞ্চস্থ করা নাটক উপভোগ করে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথের নাক দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। অনেক রক্ত। রাত বারোটার সময় বাড়িতে এলেন। কোনোমতে রাত পার করে পরের দিন সকালবেলা ডাক্তার ডেকে আনা হল। ডাক্তার  হোমিওপ্যাথি ঔষধ দিলেন।সঙ্গে গরুর ঘি শুঁকতে এবং নস্যি নিতে বললেন ।

এভাবে করায় রক্ত পড়া বন্ধ হল কিন্তু একনাগারে প্রায় ছয় ঘন্টা রক্ত বের হওয়ার ফলে লক্ষীনাথ দুর্বল হয়ে পড়লেন।

 মাঝখানে ১৯২৬ সনের এপ্রিল মাসে ছেলে স্বরূপকুমার এবং ছোট্ট শিশু কন্যাটিকে নিয়ে বরোদা থেকে সত্যব্রত অরুনা এল। ওরা আসার পরে কলকাতা থেকে রত্না দীপিকাও এল। লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞার বাড়ি ভরে উঠল। সবাইকে একসঙ্গে দেখতে পেয়ে লক্ষ্মীনাথের সে কি আনন্দ। বাড়িতে থাকলে সর্বক্ষণ তিনি নাতি-নাতনির সঙ্গে থাকেন। নাতি স্বরূপের সঙ্গে এমনিতেই ছোটো ছেলের মতো খেলাধুলা করেন। লক্ষ্মীনাথ জামাই  সত্যব্রতকে  ‘বাবাজীবন’ বলে ডাকেন। সত্যব্রত শ্বশুর মশাইকে ‘পিতাজীবন’ বলে সম্বোধন করে সমবয়সী বন্ধুর মতো আনন্দ ফুর্তি করে পরিবেশ মুখরিত করে রাখেন। জামাইয়ের মধ্যে পুত্র সন্তানের রূপ কল্পনা করে লক্ষ্মীনাথ সত্যব্রতকে ভালোবাসেন।

লক্ষ্মীনাথ অল আসাম লিটারেরি কনফারেন্স বা অসম সাহিত্য সভার সপ্তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন। দুই বছর পরে সাহিত্য সভার নবম অধিবেশনটি অক্টোবর মাসের উনিশ এবং কুড়ি তারিখে ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সাহিত্যিক বেনুধর রাজখোয়া নির্বাচিত হলেন।বিভিন্ন দিক থেকে এই অধিবেশনটি গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য প্রধান সম্পাদক শরৎচন্দ্র গোস্বামী পত্রযুগে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়াকে উক্ত অধিবেশনে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। তাছাড়া কোকরাঝাড় থেকে কালিচরণ ব্রহ্ম, পূর্ণচন্দ্র তালুকদার এবং জৈনাউদ্দিন আহমদ, বিলাসীপাড়া থেকে চক্রধর দাস এবং ভূতনাথ সিংহ ধুবরির কমলাকান্ত শর্মা, হরনাথ বরুয়া, হরিনাথ পাঠক আদি পত্র যুগে অথবা তাঁরযোগে তাকে ধুবরি অধিবেশনে উপস্থিত থাকার জন্য বিনম্র অনুরোধ জানালেন। স্বাস্থ্য এতটা ভালো নয় যদিও লক্ষ্মীনাথ জাতির আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারলেন না। ১৯২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মেয়ে রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সম্বলপুর থেকে ধুবরির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

  সুদীর্ঘ ভ্রমণ। দুদিন লাগল। অক্টোবরের ১৬ তারিখ ধুবরি পৌঁছালেন। লক্ষ্মীনাথ রত্নার ধুবরির বিজনীতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হল। আনন্দ আগরওয়ালা তাদের বিশেষ যত্ন নিতে লাগলেন।

  ১৯ অক্টোবর তারিখ লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার কন্যা রত্নাবলীর অসমা-সুষমা কামরূপা যৌথ জননী ধরিত্রী দুহিতা’ গানটির দ্বারা অধিবেশনের কার্যসূচি আরম্ভ হল। রত্নার কন্ঠে লালিত্যময় সুরে এই ধরনের গান— শ্রোতা মন্ডলী অভিভূত হয়ে পড়ল। তারপরে সম্পাদকের স্বাগত ভাষণ। স্বাগত ভাষণের পরে সভাপতি বেনুধর রাজখোয়া মহাশয় মূল অভিভাষণ দিতে উঠে দাঁড়ালেন।

সভাপতি মহাশয়ের অভিভাষণের প্রথম দিকটা ভালোই, সারগর্ভ বক্তব্য।কিন্তু তারপরেই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে বঙ্গবাসীরা ধুবরি গোয়ালপাড়াকে বঙ্গের অংশ  করে নেবার চক্রান্ত করছে—এটা এক সময়ে অসমের স্কুল কাছাড়িতে  বাংলা ভাষার প্রবর্তন করার মতোই এক জঘন্য ষড়যন্ত্র’ বলে বলতেই ধুবড়ি বিলাসিপাড়ার বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ল । সভাস্থলে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হল।সভাপতি রাজখোয়া কোনোমতে নিজের অভিভাষণ শেষ করলেন।

তারপরে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার বক্তৃতা দেবার পালা এল। তার কণ্ঠস্বর গুরু গম্ভীর। শ্রুতিকর শব্দচয়নে ভাষা হৃদয়গ্রাহী। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলী শান্ত হল। প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্মীনাথ বললেন, …শেষে আমাদের গোয়ালপাড়ার ভাইবোনদের বলছি তারা আত্মবিস্মৃত হয়ে কতদিন থাকবে? আর কতদিন আপনারা বাকি সমগ্র অসমের নিজের মানুষ, নিজের ভাষাকে ভ্রম-সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে বিদেশি বা বিদেশি ভাবাপন্ন লোকের কথায় নিজের প্রাচীন বংশ গৌরব সভ্যতা-ভব্যতা বিসর্জন দিতে থাকবেন?সেদিন হোসেন শাহ গোয়ালপাড়া দখল করাটা নিয়ে আপনারা সুখী থাকবেন না প্রাচীন রামায়ণ মহাভারতের কাল থেকে ‘ট্রেছ’  করে নিজেকে সৌভাগ্যশালী করে ধন্য হবেন? নিজগুরু মহাপুরুষ শ্রী শংকরদেব, শ্রী মাধব দে্ব‌, শ্রী হরিদেবের ধর্ম প্লাবিত সুমহান-সুমধুর আচার-নিষ্ঠা, সাহিত্য-সংগীত, নৃত্য-গীতের সুশীতল ছায়ায় থেকে আপনারা নিজেকে বরেণ্য করবেন না পরের আশায় বনে বাস করে সকাতরে মুক্তা খসিয়ে নিজেকে দুঃখী এবং অন্যের চোখে হেয় করবেন? 

গোয়ালপাড়ার ভাইরা আমাদের জননী জন্মভূমি দীনা, হীনা, শীর্ণা।তা বলে প্রতিবেশী ধনীর গৃহিণীকে মাতৃ বলে সম্বোধন করাটা কর্তব্যের ভিতর পড়ে কি? মহাত্মা গান্ধী দুখিনী ভারত মাতার দুঃখে হাঁটু পর্যন্ত মোটা কাপড় পরে শীত গ্রীষ্ম কাটিয়ে মাতৃভূমির দুঃখ-কষ্ট দূর করার প্রাণপণ সাধনা করেছেন।আর বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের মা বঙ্গভূমিকে দেখে আপনারা নিজের দুঃখিনী অসম মাতাকে পরিত্যাগ করে সেই ধনী বঙ্গমাতাকে মা বলে মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া উচিত কি?’   

লক্ষ্মীনাথ থামলেন। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের বক্তৃতায় কাজ হল। সভা শান্ত হল। প্রত্যেকেই তাঁর ভাষণ মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে লক্ষ্মীনাথ তারপরে ইতিপূর্বে সভায় হুলস্থূল করা বাংলাভাষীদের উদ্দেশ্য করে বললেন—‘এই সম্পর্কে আমার বাঙালি বন্ধুদের বলি যে গোয়ালপাড়া যে অসমের বুক থেকে টুকরো করে নেওয়ার জন্য তাদের ভেতরে যারা ষড়যন্ত্র করছে তারা অনুগ্রহ করে সেটা পরিত্যাগ করুক। আমাদের প্রাণ থাকতে গোয়ালপাড়াকে আমরা কখনও অসমের বুক থেকে কেড়ে নিতে দেব না। সেরকম করতে গেলে অসমের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আগুন জ্বলবে। তাই আজ অতি বিনয় পূর্বক তাদের বলি যে দয়া করে ক্ষান্ত হন। আমার বিনীত প্রার্থনায় কাজ না হলে বাধ্য হয়ে আমাদের বলতেই হবে যে আমাদের গোয়ালপাড়া থেকে হ্যান্ডস অফ…।’

  পুনরায় বিরতি। লক্ষ্মীনাথ মঞ্চ থেকে সামনে বসা এবং পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অগণন জনতার দিকে একবার তাকালেন। তারপরে আবেগময় ভাষায় বলতে লাগলেন, ‘আজ আমরা ধুবরিতে আমাদের মায়ের চরণ কমল সেবা করার জন্য নিজের জীবন ধন্য করেছি। ভাইরা, উত্তষ্টিত জাগ্রত। এসো সবাই মিলে মাতৃভূমির সেবা করে মাতৃর অপায়-অমঙ্গল দূর করতে চেষ্টা করি।আজ এই মুহূর্তে, এই জাতীয় মহাযজ্ঞে, তোমরা ঈশ্বরকে সাক্ষী করে প্রতিজ্ঞা কর, যে শয়নে স্বপনে তোমাদের এই একটাই চিন্তা হোক –অমঙ্গল অজগর থেকে মুক্ত করে আমরা মাতৃভূমিকে সুখী করবই।’

 তারপরে কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘কিন্তু মাতৃভূমির সেবক হওয়ার স্পর্ধা রাখা এই বুড়োর গায়ে আগের মতো বল শক্তি নেই। আজ এই বুড়ো শরীর জর্জরীভূত, কলেবর ব্যাধিগ্রস্ত। তাই এই বুড়ো নারায়ণের চরণে করজোড়ে প্রার্থনা করছে—

 কাল অজগরে নিয়ে যায় টানি।

 রাখা রাখা প্রভু সারঙ্গপাণি।। 

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...