মধুছন্দা মিত্র ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি ৪ || মধুছন্দা মিত্র ঘোষ || ভ্রমণকথা

খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ


পর্ব – ৪

আলপুঝাহ্‌  বা  আলেপ্পি              

       কেরলের এই জলশহরের রূপেই মুগ্ধ হয়ে লর্ড কার্জন বলেছিলেন, ‘Venice of the East’সত্যিই যেন আলেপ্পিতে প্রাচ্যের ভেনিস নগরের আদল দেখা যায়, এখানকার অগনিত জলবিভাজিকার জন্য। একদিকে অতলান্ত আরবসাগর। অন্যদিকে ভেম্বানাদ, অষ্টমুড়ি, পুণ্যমুঢ়া নামের তিন তিনটি হ্রদ। আলপুঝাহ্‌-এ এর নাম ভেম্বানাদ হ্রদ। কুট্টানাড-এ এর নাম পুন্যামুঢ়া হ্রদ এবং কোচিতে এই একই হ্রদের নাম কোচি হ্রদ। নারকেলবিথী ছাওয়া ৬৫ টি খাল এখানে ১২ টি গ্রামকে মাকড়সার জালের মতো সংযুক্ত করেছে কিছু নদী ও নালা ও খাঁড়ির সমন্বয়ে। এইগুলি সবই জলে টইটুম্বুর থাকে সম্বৎসর। মালয়ালাম শব্দ, ‘ALA’ অর্থ হল ‘খাল’ এবং ‘PPUZJHA’ মানে হল নদী। অর্থাৎ বলা যেতে পারে আলপুঝাহ্‌, একাধারে খাল নদী খাঁড়ি উপহ্রদের মিলমিশে এক আজব জলশহর। আবার মালয়ালাম শব্দ ‘A LAYAAM’ মানে ‘Home’ বা ‘গৃহ’ এবং ‘PPUZHA’ মানে ‘Watercourse’ বা ‘River’ বা নদী। কেরলের বিখ্যাত ক্যানেল-ব্যাকওয়াটার-লেক-লেগুন-বিচ নিয়ে তৈরী এই চমৎকার জলপথ।          
         আগেই বলেছি, আমি এই ধারাবাহিকে শুধুই কেরলের জলসাম্রাজ্যের গল্প ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথাই শোনাবো। আমার ‘খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি’ নিয়ে কেট্টুভালম্‌ ভ্রমণের গল্প। জলপথ এই অঞ্চলে গনপরিবহণে বহুল ব্যাবহৃত হয়।  KSTA তথা কেরালা স্টেট ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির সরকারি জলযান আছে স্থানীয় মানুষদের যাতায়াতের জন্য।  National Water Way – 3 আলপুঝাহ্‌র ওপর দিয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি জলযান পরিবহণ ছাড়াও ব্যাক্তিগত লঞ্চ ও ডিঙিনৌকা অহরহ চলাচল করে এই জলপথে। ঘন্টা চুক্তিতেও ভাড়া করা যায় কেট্টুভালম্‌। আলেপ্পিতে থাকার জন্য ডাঙ্গায় যেমন প্রচুর হোটেল ও হোমস্টে আছে, জলেও রয়েছে হরেক কিসিমের হাউসবোট। দুপাশে নারকেল গাছের ছায়ায় কটেজধর্মী কিছু হোটেল ও ভাসমান রেস্তরাঁ রয়েছে।      
        লোনা জলের মৃদু সংগীত নিয়ে আলেপ্পির মূল আকর্ষণ এই ব্যাকওয়াটার আর হাউসবোট। প্রায় শ’দেড়েক বিভিন্ন মানের ও দামের হাউসবোট রয়েছে এখানে। আলেপ্পি ব্যাকওয়াটার পথে পুন্যামুঢ়া, মুহাম্মা, কায়িপ্পুরম, পাথিরামানাল, থানিমুক্কম, বুন্দ, কুমারাকোম বার্ড স্যাংচ্যুয়ারি তথা ভেম্বানাদ যাত্রাপথে বিশাল বিশাল এই হাউসবোটগুলো সারাদিনমান জলে জলে টহল করে রাতে পাড়ের কাছে নোঙর করে। প্রথমে যখন বোটে উঠলাম, একটা ঘিঞ্জি খালের মতো। কিছুক্ষণ চলার পরই বিশাল আকার ধারন করলো সেই জল-জগৎ। চলন্ত এই হাউসবোটের ডেকে এসে দাঁড়ালে, কেমন ‘টাইটানিক’ সিনেমার মতো উপলব্ধি হচ্ছিল। দোতলায় লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠে খাবারঘরে বুফে প্রথায় প্রচুর খাবার, ফল, ফলের রস, এবং ফিল্টার কফিও।      
         একটা দারুণ ‘ভিলেজ ট্যুর’ হয় এই জলযাত্রায়। কেরলের সনাতনী রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে চাইলে এই ‘ভিলেজ ট্যুর’ সত্যি অনবদ্য। আরামকেদারা বিশিষ্ট শিকারা চেপে, মালয়ালামবাসীদের এই জলপথ এবং তার উপযুক্ত ব্যাবহার খুব সুন্দরভাবে অবলোকন করা যায়। গ্রাম্য জনজীবন ও ওদের জীবনযাত্রার স্বাদকে কিছুটা হলেও টের পাওয়া যায়। এই অভিনব ট্যুরটির মেয়াদ সকাল ৭ টা থেকে বিকেল ৫ টা। বিকেলের দিকেও একটা ভিলেজ ট্যুরের ব্যাবস্থা আছে। অভিনব বললাম এই কারনে যে, এখানে কী হয়, সরকারি লঞ্চের সারেঙ তাঁর নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সকালের জলখাবার খাইয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে দিয়ে বিভিন্ন খাঁড়িপথে ঘোরাবেন। অদ্ভুত জলজীবন ওদের। প্রধান যানবাহন বলতে নৌকা। এবং নৌকাই। আমাদের শহুরে স্কুলের শিশুরা যেমন হৈ হৈ করে স্কুলবাসে বা পুলকারে চেপে স্কুলে যায়, এখানকার ছাত্রছাত্রীরা তেমনই স্কুল-বোটে চেপে স্কুলে যায়। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে ওই নৌকাই। এরা জলজীবনেই অভ্যস্ত। যা কিনা আমরা ডাঙার মানুষেরা ভাবতেই পারবো না, ওদের মতো এই কষ্টকর জীবনযাত্রাকে হাসি মুখে মানিয়ে নিতে। দুপুরে সেই মাঝির বাড়িতেই তাঁদের নিজস্ব দেশজ প্রথায় অতিথিদের মধ্যহ্নভোজের সাধারন আয়োজন থাকে। ভারি যত্নআত্তি করে পরিবেশন করে খাওয়াবেন সেই পরিবারের মানুষজন। মন্দ নয়। স্মৃতিতে থেকে যায় এগুলিই। এই অভিজ্ঞতানির্ভর অনুভূতিটাই তো দূর দেশে বেড়াতে এসে বিরাট প্রাপ্তি। ব্যাস, আর কী চাই।       
        জলপথে যেতে যেতে আমাদের বিকেলের ট্যুরের পথপ্রদর্শকের কাছে শুনে নিচ্ছিলাম টুকরো ইতিহাসকথা। ১৭৬২ সালে ত্রিবাঙ্কুর রাজার দেওয়ানের হাতেই গড়ে উঠেছিল আলপুঝাহ্‌। জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে তখন ছিল কিছু ঘরবাড়ি ও ধানজমি। এখানকার কুট্টানাড অঞ্চলকে বলা হয় ‘Rice Bowl of Kerala’সাগরপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ ফুট নিচে পর্যন্ত এখানে ধান চাষ হয়।  ১৯ শতক পর্যন্ত পোতাশ্রয় বা বন্দরনগরী রূপে আলপুঝাহ্‌র খ্যাতি ছিল। তারপর ২০ শতকের গোড়ায় কোচি বৃহত্তম এক বন্দরনগরী হিসেবে গড়ে ওঠায় কিছুটা গরিমা হারায় আলপুঝাহ্‌। আরও একটা বিষয় জানলাম ওঁর কাছে, এই আলেপ্পি বা আলপুঝাহ্‌ হলো ‘ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির আঁতুরঘর’ নামে পরিচিত। কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভি এস অচ্ছুতানন্দন, যিনি নাকি কম্যুনিস্ট পার্টির একজন বিখ্যাত নেতা ছিলেন, তাঁর জন্ম এই জলশহরেই। আমার ব্যাগে সবসময়ের জন্য মজুদ ছোট্ট ডায়েরিতে লিখে রাখি এইসব ইতিবৃত্ত। জল ভেঙে তরতর করে বয়ে চলা নাওয়ে বসে, সব কিছু চিনে চিনে নিচ্ছি। দু চোখ এতটুকু অন্যমনস্ক হওয়ার জো নেই। আশ্চর্য ছবির মতো নিপাট সাজানো স্নিগ্ধতা। চোখ জুড়ানো সবুজ দেখতে হলে কেরলের এই ‘খিড়কিজল’ ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যায় দেদার।     
        আগেই বলেছি, ব্যাকওয়াটারের দুই ধারে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দিনলিপি ঠারেঠোরে পরখ করতে জলবিহার যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ভাস্বর হয়ে থাকে। বাড়িঘর থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডাকঘর, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, স্বাস্থকেন্দ্রসহ সম্পূর্ণ গ্রাম্যজীবনের লাইফলাইন এই ব্যাকওয়াটার। ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’ বলেই হয়তো ঈশ্বর, এই শহরকে এত সুন্দর করে নিজের হাতে রঙতুলির টান দিয়েছেন। মাঝে প্রশিক্ষণরত একটি ‘স্নেক্‌বোট’ দেখতে পেলাম। এখানে পম্পা নদীতে স্নেক্‌বোট রেস, কেরলের একটি অতি বিখ্যাত ও দর্শনীয় প্রতিযোগিতাপ্রতিবছর অগাস্ট মাসের দ্বিতীয় শনিবার পম্পা নদী ও পুন্যামুঢ়া হ্রদে ‘চুন্দন ভাল্লম্‌’ অর্থাৎ স্নেক্‌বোট রেস মাতিয়ে তোলে আলেপ্পিকে। শতাধিক চুন্দন ভাল্লম্‌ নৌকা, ঘোষিত ১ লক্ষ টাকা মূল্যের ‘নেহেরু ট্রফি’ প্রতিযোগিতায় যোগ দেয়। কণ্ঠে তাদের থাকে চমৎকার ছন্দে গাওয়া ‘ভাঞ্চিপাট্টু’ লোকগান।       
        জলের মজলিসে কোথা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে সময়ের অনেকখানি। সুর্য তার রূপোলী রঙে ঝিলিক্‌ দিচ্ছিল জলে। তারপর কখন টুপ্‌ করে ঝরে গেল রোদ। এই সুরম্য ভ্রমণ একবার শুধু হাতছানি দিয়ে ডাকতেই ভুলে গেছিলাম আমার আগের অন্যান্য সব জলভ্রমণগুলির কথা। আগেও তো ভারতের বিভিন্ন স্থানে নদী, সাগর, হ্রদ, খাঁড়িতে কতো জলবিহার করেছি। আজ কেরলের হাউসবোটের ব্যালকনিতে বসে, দু পাশের অলীক দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে বেজায় নিঃস্ব হতে থাকি। নিজেকে ছুঁয়ে দেখি, আমার নিপাট নিজস্ব ভুবন কেমন ছোট হয়ে গেছে ওই বিশাল জল-বৈভবের কাছটিতে।            
          

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

খাঁড়িপথে ইচ্ছে পাড়ি || মধুছন্দা মিত্র ঘোষ || ভ্রমণকথা

খাঁড়িপথে ইচ্ছে পাড়ি
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

পর্ব – ৩

কুইলন 

        কত সফর যে লেগে থাকে ভ্রমণ মজলিসের পাতায় পাতায়। এই এখন যেমন চোখের নাগালে এক ঢাল লাবণ্য নিয়ে অপার জলরাশি। আমার সাবেকী বিস্ময়গুলো জোট বাঁধে। কেরালার বিখ্যাত বোট ক্রুজ বা হাউসবোট সফরের আরও একটি সুরম্য জলপথ হল, কুইলন বা কোল্লাম থেকে আলপুজ্জাহ্‌ বা আলেপ্পি পর্যন্ত খাঁড়ি পথ পরিক্রমা। কুইলন থেকে আট ঘন্টার জলপথে এই সফর, ভ্রমণ মানসিকতায় এক সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। পরিব্রাজকের ঝুলি তো এমনি করেই টইটুম্বুর হয়ে ওঠে। অদ্ভুত সুন্দর যাত্রাপথ। উন্মাদনায় দিশেহারা করছে এই পথের সারল্য। ভারি মনোরম সে সফরপথে, নীল-সবুজ নিসর্গ ও নিপাট নির্জনতা। দুই পাশে নিবিড় বনানী, আঁচলে তার সবুজ মায়ারঙের কারুকাজ। নিভৃত জলরাশির পাড়ে গ্রামীণ পথ, জেলে বস্তি, ঘরদুয়ার, বসতি। জলই যাদের জীবন-ভঙিমার অনেক কিছুই। একফালি গ্রামগুলির চোখের পাতায় যেন এখনও লেগে রয়েছে ঘুমের আদর। তাদের স্যাঁতস্যাঁতে শরীরে জল, জলগন্ধ।  
        স্থানীয় পরিবারগুলির প্রায় প্রত্যেকেরই নিজস্ব কাষ্ঠ নির্মিত ‘কেট্টুভালম’ রয়েছে। হাঊসবোটের সামনে সেই গ্রামের পণ্য বিক্রেতা কিছু কিছু নারীপুরুষ চলে আসেন। ফেরি করেন ডাবের জল ও শাঁস, কাজু, কলা, সব্জী। ওদিকে হাউসবোটে রান্নার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও প্রয়োজন মোতাবিক কিনে নেন পণ্যসামগ্রী। এইসব অঞ্চলের কাজুও খুব জনপ্রিয়। এখানকার কাজু কারখানাগুলিতে কাজু প্রক্রিয়াকরণ হয়ে প্যাকেটজাত হয়। হাঊসবোটের পর্যটকরাও ডেকে বসে হাত বাড়িয়ে কিনে নেন কাজু ও রকমারি মশলার প্যাকেট। কেরলের মশলার প্রশস্তি সারা বিশ্ব জুড়ে। খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকে দেশি বিদেশি বণিকেরা কেরল থেকে নিয়ে যেতেন মশলা, চা, রবার, কাজু, হাতির দাঁত, চন্দন কাঠ, কোকো ইত্যাদি। ‘অষ্টমুড়ি’ হ্রদের কোলে বানিজ্যশহর কুইলন নারকেল ছোবড়া, টাইলস, সিরামিক সামগ্রীর জন্যেও খ্যাত। চোখে পড়ছে ছোবড়া কারখানা। ছোবড়া প্রস্তুতকারক সংস্থাও রয়েছে অনেকগুলি। ব্যাকওয়াটারের প্রবেশদ্বার কুইলন থেকে নৌভ্রমণে দেখতে দেখতে চলা কেরলের নিপাট গ্রাম্যজীবন। কেনাকাটার ফাঁকফোকরে, জলযানের সহযাত্রীরা নিজেদের মধ্যে প্রীতি বিনিময় করে যান।  
         অতীতের কুইলন এখন ‘কোল্লাম’ নামে পরিচিত। সংস্কৃত শব্দ ‘কোল্লাম’ মানে ‘মরিচ’। যদিও আগে অঞ্চলটির কুইলন নাম ছিল। বর্তমানে নাম হয়েছে কোল্লাম। তবে এখনও কুইলন বলেই চেনেন অনেকে। কেরলের মালাবার উপকুলে কোল্লাম বা কুইলন একটি অতীতদিনের বানিজ্যশহর। এমনকি এখনও এটি কেরলের অতি ব্যাস্ত বানিজ্যিক শহর। সুদূর অতীতে জলপথেই কুইলন থেকে আলেপ্পি ও কোচিনে পণ্যবাহী জলযান চলাচল করত। ৭.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কোল্লাম খাঁড়ি পারাভুর হ্রদ এবং অষ্টমুড়ি হ্রদকেও জলের ভালোবাসায় জুড়েছে। কাল্লাদা নদী বাঁধা পড়েছে অষ্টমুড়ি হ্রদে। ইথিক্কারা নদী মিশেছে পারাভুর কয়াল হ্রদে। স্ফটিক স্বচ্ছ জলপথ, সবুজের সমারোহ। অসম্ভব সুন্দর কোল্লাম কেরলের অন্যান্য দ্রষ্টব্য পর্যটনপ্রিয় স্থলগুলি থেকে কোনও অংশে কম নয়। আদিগন্ত জলগাথার কাছে অবসর বিনোদনের নৌবিহারের উসকানিকে সামলানোই দায়।  
         আটটি খাঁড়িপথ মিলে সৃষ্টি হয়েছে ‘অষ্টমুড়ি’ হ্রদ। এই অষ্টমুড়ি লেক হল ‘গেট ওয়ে অফ কেরল ব্যাকওয়াটার’। এই হ্রদ ৭১ কিলোমিটার প্রসারিত তিরুবন্তপুরমের দিকে। হ্রদের ধারেই কেরল সরকারি পর্যটানাবাস। হাউসবোটে যেতে যেতেই দেখতে পাওয়া যায় কোথাও ধান জমি, কোথাও আবার একটুকরো জলা জমি। সেখানে ভিড় করে আছে নানান সামুদ্রিক পাখপাখালি। উৎসাহী পর্যটকের কাছে বেশ লোভনীয় দ্রষ্টব্য। ক্যামেরা সঙ্গে থাকলে তো কথাই নেই। এন্তার সাটার টেপার আওয়াজ তখন পর্যটকমহলে। অনেক পর্যটক ডিঙি নৌকাও ভেসে চলেছে। চলেছে সাজানো গোছানো মোটরবোট। সার দিয়ে বেতের চেয়ার পাতা মোটরবোটগুলিতে। জলের মধ্যে ঝোপঝাড়, কিছু নারকেল গাছ নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপের মত স্থলভূমি। কোথাও কোথাও জলরেখার ধার ঘেঁষে গাছপালা ঘরবাড়ি। মন্দির মসজিদ গির্জাও রয়েছে। কখনও একাকী পথ চলে গেছে গ্রামের পানে। কোনও গ্রামের সামনে টিনের পাতে ‘কথাকলি শিক্ষা কেন্দ্র’ বিজ্ঞাপন লেখা। কোচির বিখ্যাত ‘চায়না নেট’ এর মাধ্যমে মাছ ধরার তোড়জোড়ও নজর এড়াবেনা। ব্যাকওয়াটারের জলে রুপোলি শস্যই যাদের রুজিরুটি। 
       কেরল রাজ্য জলযান পরিবহন বিভাগ (KSWTC) এবং নানান বেসরকারি সংস্থারও ফেরি টার্মিনাল থেকে ডবল ডেকার লাক্সারি বোট, লাক্সারি বোটে আলপুঝাহ বা আলেপ্পি ছাড়াও অন্যান্য দ্বীপ ঘুরিয়ে আনে পর্যটক মরসুমে। অষ্টমুড়ি হ্রদ ও কাল্লদা নদীর সঙ্গমে রয়েছে মুনরো নামের এক দ্বীপ। ব্রিটিশ শাসক কর্নেল জন মুনরোর সম্মানে স্থানটির নামকরণ হয়েছে। তিনি কয়েকটি খাল খনন করে বেশ কয়েকটি ব্যাকওয়াটার অঞ্চল একীভূত করেছিলেন। বোট সাফারিতে বেরিয়ে আসা যায় এখানে। এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষন হল, ওনম মরসুমে নৌকা বাইচ। কাট্টাকয়াল নামের স্বচ্ছ হ্রদটির জল বয়ে গেছে ভাট্টাকয়াল জলায়। এইসব হরেক জলজ দৃশ্য ভুলিয়ে রাখে কদিনের জন্য ঘুরতে আসা ভ্রমণবিলাসী মনকে।  
        বশ্যতা না মানা সোঁদা গন্ধে মাতোয়ারা তাবৎ জলাভূম। কখনও শহরতলির কাছে আঁশটে গন্ধমাখা কোনও খালের ধারে কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের হাউসবোট ইন্দ্রপ্রস্থম। স্নানাগার ও রান্নাঘরে প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ, বাসনপত্র ধোওয়াধুয়ি, বাড়তি জল ছেঁচে পরিষ্কার করা ইত্যাদি নিত্য আবশ্যিক কাজকর্ম সারা হতে থাকে। রেলিং দেওয়া স্টিলের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় খাবারঘর। সেখানে থরে থরে রাখা পেল্লাই ক্যাসারলে সাজানো থাকে রুটি, ভাত, স্যালাড, দু’রকম তরকারি, মাছভাজা, ডাল, দই ইত্যাদি। রাতে মুরগি আর মালয়ালাম পদ্ধতিতে রান্না করা পোলাও বা বিরিয়ানি। সঙ্গে মিষ্টি। আর থাকে নানান ফল। আমরা দগ্ধ দিনে আকাশের কাছে জল চাই। এখানে অঢেল জল। ভেজা বাতাস, দূরে বিন্দু বিন্দু আলো, বিন্দু ছায়া। নাব্য এই কথামালায় জীবনের কী আশ্চর্য আনাগোনা। 
        গতে বাঁধা সফরসূচী থেকে জরা হট্‌ কে এই হাঊসবোট যাত্রা বয়ে আনে এক অন্য আনন্দ সন্দেহ নেই। হাউসবোটের ‘ভিজিটার লগ বুকে’ লিখে দিয়ে আসি ভালো লাগা মনের কয়েক ছত্র। অভিজ্ঞতার রসদ জমা হতে থাকে মনের কুঠুরিতে। পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া অন্য হাউসবোটের যাত্রীরা যখন অজানা বন্ধুত্ব আহ্বানে হাত নাড়েন, তখন বিনিময়ে আমাদেরও হাত নেড়ে জবাব দেওয়া --- কী যে মজার ছেলেমানুষি। প্রাপ্তির ঝুলি মায়ায় ভরে ওঠে কানায় কানায়জলবিহারের রমনীয় সৌন্দর্য, মুগ্ধতার অধিকারটুকু অচিরেই কেড়ে নেবে। বেশ টের পাই এই সফরনামায় ঋণী হয়ে পড়েছি  মালাবার উপকুলের রূপসী জলবিভাজিকাগুলির কাছে।

বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০

খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি ...২ || মধুছন্দা মিত্র ঘোষ || ভ্রমণকথা প্রতি বুধবার


খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি ...|| ভ্রমণকথা প্রতি বুধবার

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ 



পর্ব -  ২

কুমারাকোম 

        ক্ষুরধার প্রকৃতি বিন্যাস আর ছায়া ছায়া আকাশ প্রশ্রয়ে রেখেছে আজ কেরলের কুমারাকোম এলাকাটিকে। বেশীরভাগ পর্যটকই কোট্টায়ামের হোটেলে রাত্রিবাস করে পরের দিন কুমারাকোম বেড়াতে যান। আমাদেরও কুমারাকোম পছন্দ। জানা ছিল ওখানে একটি বিরল বার্ড স্যাংচুয়ার‍্যি আছে। প্রচুর পাখপাখালির আনাগোনা সেখানে। আমরাও কোট্টায়ামের নির্বাচিত হোটেলে রাত্রিবাস করে সকালে হাউসবোটের জলজ অভিজ্ঞতার শরিক হতে রওনা হলাম। যেখানে নৌকারা হাত মেলাচ্ছে, একধাপ ভ্রমণ খুলে যাচ্ছে তার একান্ত ছলাৎছল্‌ নিয়ে। হ্রদ সংলগ্ন জেটি থেকে চমৎকার সব হাউসবোটে জলবিভাজিকা সাঁতরে যাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। কোট্টায়াম থেকে খাঁড়ি পথে কুমারাকোমের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। এখান থেকে জলসফরে আলেপ্পিও ঘুরে আসা যায়। তবে আমরা আজ যাবো কুমারাকোম। সে জলভ্রমণে ভেম্বানাদের প্রকৃতিদত্ত দৃশ্যই সব ভুলিয়ে দেবে। 
        হাউসবোটে খাঁড়িপথে জলভ্রমণ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এই জলভ্রমণ ভ্রমণপিয়াসী মনে ‘চার চাঁদ লাগিয়ে দেয়’। দুর্ধর্ষ একটি ব্যাকওয়াটার গন্তব্য হল কুমারাকোম পথে পাড়ি দেওয়া। এটি মূলত একটি ছোট দ্বীপের মতো। সনাতনী কেরালার সৌন্দর্যের আঁচ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে গেলে কুমারাকোম নিশ্চয় শ্রেষ্ঠতার দাবি রাখে। কেরলের এইসব অঞ্চলের নদী বা উপনদী সমুদ্রের কাছাকাছি আসার পর বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারনে তাদের গতি কিছুটা ব্যাহত হয়ে যায়। ফলত কখনও সেখানে উদ্বৃত্ত বিশাল জলরাশি খুঁজে নেয় অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গা। সৃষ্টি হয় খাঁড়ি-নালার মতো প্রচুর জলবিভাজিকা। সেখানে জলের প্রবাহ সাগরের জোয়ার-ভাঁটা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জোয়ারের জলে তরতর করে এগিয়ে যায় জলযান। 
        আমাদের জলযানের নাম ‘ইন্দ্রপ্রস্থম’। নামটি বেশ। জেটি থেকে হাউসবোটের প্রবেশপথ পেরোতেই একটা বড় বসার ঘর, সেখানে অনেকগুলি দামি ও আরামপ্রদ সোফাসেট ও সেন্টারটেবিল পেতে রাখা। তারপর সেই বৈঠকখানা পেরিয়ে, টানা প্যাসেজের রেলিং দেওয়া বারান্দার একধারে ব্যাকওয়াটারের বিপুল জলরাশি, অন্যদিকে পর পর পাঁচটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিপাটি দুই শয্যার বিলাসবহুল ঘর। লাগোয়া স্নানাগার। ঘরের মধ্যে শৌখিন সোফা, প্রসাধনী টেবিল, স্টুল, নরম বিছানা। আর ঘরের একদিকে পুরো দেওয়াল জুড়ে কাঁচের জানলা। আপাদমস্তক কাঁচের জানলার ভারি পর্দা সরাতেই দিগন্তজোড়া জলরাশি। প্যাসেজের একদিকে স্টিলের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায় খাবারঘরে। প্রচন্ড একটা ভোঁ দিয়ে আমাদের বিশাল জলযান চলতে শুরু করেছে। পর্দা দুপাশে সরিয়ে বেঁধে রাখি, যেন এতোটুকুও দৃষ্টির আড়ালে না থাকে হ্রদের নিঃসীম লাবণ্য ঘেরা অসাধারন শোভা। দুই পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আরও অনেক বিশাল বিশাল হাউসবোট। কী তাদের রাজকীয় ঠাটবাট। প্রতিটি হাউসবোটই স্থাপত্য নৈপুণ্য শৈলীর অদ্ভুত মিশেল। এই রাজকীয় ময়ূরপঙ্খি জলযানের সুসজ্জিত ডেকে এসে বসতেই, ‘Welcome Drinks’ তথা ‘আমন্ত্রনি পানীয়’ হিসাবে সুদৃশ্য কাঁচের লম্বা গেলাসে মিষ্টি সুস্বাদু ডাবের জল পরিবেশন করা হল। জলযান ধীর গতিতে চলতে থাকে। হাউসবোটের ডেকে বিলাসবহুল সোফায় জ্যুত করে গা এলিয়ে বসি। সেই মুহুর্তে নিজেকে কেমন ‘জমিদারগিন্নি’ মনে হয়। 
        খাঁড়ি পথে ভেসে যেতে যেতে সঙ্গী করে নিচ্ছি দুই পাশের কেরল রাজ্যের গ্রাম্যজীবন। ঘাটে ঘাটে ডিঙি নৌকা বাঁধা। দুই পাড়ে জলে প্রায় নুইয়ে থাকা নারকেল গাছে ছাওয়া বাড়িঘরছায়া মেলে নুইয়ে রয়েছে তার সবুজ ঝালরের মতো পাতাগুচ্ছ। এইসব অঞ্চলে রবার, লবঙ্গ, গোলমরিচ এর আবাদ বেশি। এছাড়া নারকেল, কাজু ইত্যাদির ফলনও বেশ ভালো। ১০টি নদীর জলে পুষ্ট এই হ্রদ, তার মধ্যে মনিমালা, মিনাচিল, পম্বা, মুভাট্টাপুজাহ্‌, পেরিয়ার এবং আচেনকোভিল্‌ নদী উল্লেখযোগ্য। এরনাকুলাম, আলপুঝাহ্‌ ও কোট্টায়াম জেলা পরিবেষ্ঠিত এই হ্রদ। আগেই শুনেছিলাম, কুমারাকোম এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের নাম। তিনি নাকি এখানকারই কোনও এক গ্রামে বসে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত তথা পুরস্কৃত উপন্যাস ‘The God of small things’.     
         বিশাল ভেম্বানাদ হ্রদের একদিকে হল কুমারাকোম এবং খাঁড়িপথের একদম অন্য পাড়ে হল আলেপ্পি। পর্যটকরা অনেকেই কুমারাকোম পথেই যান, কারন এই খাঁড়িপথের পাশেই রয়েছে একটি পাখিরালয়। ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঘেরা ১৪ একর জমি জুড়ে এর বিস্তার। ১৮০ প্রজাতির পাখিদের মৌরুসিপাট্টা এখানে। এই অঞ্চলটি এককালে ব্রিটিশ আধিকারিক জর্জ হেনরি বেকার প্রথম আবিস্কার করেন। তাই এই অঞ্চলটিকে ‘বেকারস এস্টেট’ বলা হয়ে থাকে। বেকার সাহেব সেকালে এই স্থানটি ট্রাভাঙ্কোর রাজার কাছ থেকে কিনে নেন। এবং তিন পুরুষ ধরে জমিদারি বজায় থাকে। স্বাধীনতার পর ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্টে পড়ে যায় তাঁর এই জমিদারি। তখন রবার গাছ লাগিয়ে ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট থেকে অব্যহতি পেয়ে যান। ১৯৭৪ পর্যন্ত তাঁর বংশধরেরা এটি ধরে রেখেছিলেন। তারপর সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। রবার বাগান ও পক্ষীরালয় কেরল সরকার কিনে রিসর্ট নির্মান করে। এখানে পানকৌড়ি, জলমোরগ, পাতিহাঁস, মাছরাঙা, ব্রাম্ভনী চিল, ঈগল, কোকিল, প্যাঁচা, ইত্যাদি দেশজ পাখি এবং মুরহন, ইগ্রেট, সাইবেরিয়ান স্ট্রোক, হেরন, গার্গনে, টিল, অসপ্রে, ক্যাটেল ইগ্রেটস, ডার্টার, মার্স হেরিয়ার, লিটল কর্মোব্যান্টস ইত্যাদি পরিযায়ী পাখিদের জমাটি আড্ডা বসে। ওরা খুঁটে খায় দানা, ঠোঁটে গান নিয়ে। জুন থেকে অগস্ট দেশীয় পাখিদের দেখার মরসুমপরিযায়ী পাখিদের দেখা মেলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। কুমারাকোম পক্ষীআলয় তথা KTDC ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স থেকে ঝোপঝাড় বেষ্টিত একটি হাঁটাপথ আছে ওখানে রিসর্টের গা বেয়ে। কুমারাকোম পাখিরালয়টি ভেম্বানাদ পাখিরালয় নামেও পরিচিত। খাঁড়িপথে যেতে পাথিরামানল দ্বীপটি হল সুদূর সাইবেরিয়া থেকে উড়ান পথে আসা পাখিদের স্বর্গরাজ্য। 
        খাঁড়ি পথে চলতে চলতে এখানকার গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গেও ভাব জমে। জল-জঙ্গলই যাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে। তুখোড় স্নিগ্ধ নির্জনতা ছেয়ে আছে গ্রামগুলোতে। স্কুলের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা নিজস্ব ডিঙ্গি বেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। এই পথে মাঝেমাঝেই মাথার ওপর বড় সেতু পেরতে হচ্ছে। সেগুলি স্থলপথ। গাড়ি যানবাহন মানুষজন চলাফেরা করছে সেখানে। যখন এখানে থানেরকুক্কুম্‌ বাঁধ নির্মিত হয়নি, তখন সাগরের জল জোয়ারের সময় ক্যানেলে অবাধে চলে আসত। বর্তমানে বাঁধ হওয়ার পরে এই জোয়ারভাটার খেলাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলত খাঁড়ির জল এদিকটা আবার কিছুটা স্রোতহীন ও স্থির হয়ে থাকায় জলজ পুষ্প লতা গুল্ম খুব সহজেই বিস্তার পেয়ে সবুজে ছেয়ে গেছে খাঁড়িপথ।  
        হাউসবোট যাত্রার দুধারে নারকেল, কলা, ‘আইনি’ নামের স্থানীয় গাছগুলি ঝুঁকে আছে জলের বুকে। মিনচিল নদী ও ক্যানেলের জন্য জমা জলাভূমে কলা, আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, তেঁতুল, আনারস গাছের ফলন প্রায় প্রতিটি পরিবারের লাগোয়া জমিতে। কোথাও তো পুষ্প লতায় সবুজ ক্যানোপির মতো তৈরি হয়েছে। কোথাও আবার কচুরিপানা ও আগাছায় সেই জায়গাটা আদৌ জলভূমি না স্থলভূমি বোঝার উপায় নেই। কেরালার ভেম্বানাদ হ্রদটি কোচি থেকে কোট্টায়াম হয়ে আলপুজ্জাহ্‌ বা আলেপ্পি পর্যন্ত বিস্তারিত। মালয়ালাম গ্রামীণ মানুষদের দৈনন্দিন সহজ সরল জীবনের রোজনামচা, ব্যাকওয়াটার, ক্যানেল, লেগুন এইসব নিয়েই জলভরা সংসার। কুমারাকোম অনেকগুলি ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি এবং বিখ্যাত তার হাউসবোট ও বোট ক্রুজের জন্য। রাতে এক জায়গায় নোঙর করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থম। রাতের জলজীবন দেখার আশা বন্ধ হয়ে যায়। ভিজে ভিজে রাত। হাউসবোটের গা চুঁইয়ে মাস্তুলের আলো জলে একা পড়ে আছে। বেবাক নিস্তব্ধ চারদিক। স্তব্ধতারও যে একটা নিজস্ব শব্দ আছে টের পাই

বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০

খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি ... || মধুছন্দা মিত্র ঘোষ || ভ্রমণকথা প্রতি বুধবার

খাঁড়ি পথে ইচ্ছেপাড়ি ...
          মধুছন্দা  মিত্র ঘোষ



পর্ব – ১ 


        দাক্ষিণাত্যের কেরলকে বলা হয় ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’। খাল-খাঁড়ি-হ্রদ এর জালি আকার বিস্তৃতি, নারিকেলকুঞ্জ শোভিত বেলাভূমির অদ্বিতীয় কোলাজ নিয়েই  ‘Gods Own Country’ নামে পরিচিত কেরল রাজ্যটি। আবার নারকেল বনবীথিকায় ছাওয়া কেরলের অন্য প্রতিশব্দ, যেটির মালয়ালাম শব্দ ‘কেরা’ মানে হল ‘নারকেল’ আর ‘লাম’ মানে হল ‘দেশ’। অর্থাৎ নারকেলের আধিক্য থাকায় কেরালাকে বলা যেতে পারে ‘নারিকেলের দেশভূম’। উত্তর-দক্ষিণে মালাবার উপকূল জুড়ে লম্বালম্বি বিস্তৃত এই রাজ্য। পুরাণমতে পরশুরাম তাঁর শিষ্য তথা নাম্বুদ্রিপাদ ব্রাহ্মণদের বসবাসের জন্য এবং মর্তভূমে স্বর্গ সদৃশ্য যোগ্য বাসভূমির সন্ধান করতে একদা সহ্যাদ্রি পর্বতশীর্ষ থেকে তাঁর হাতের কুঠারটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। সমুদ্র সরে গিয়ে সৃষ্টি হয় মালাবার উপত্যকা। দাক্ষিণাত্যের মালভূমির ইতিহাস এখানে লতায় পাতায় জড়ানো। আদুর গায়ে নিসর্গ পড়ে থাকে এখানে। কেরালার বেশ কিছু অঞ্চল শুধুই জলনির্ভর। কেরলের অনেকখানি অংশে আরবসাগরের লোনা জল ঢুকে স্বাভাবিকভাবেই তৈরী হয়েছে খাঁড়ি। কোথাও আবার গড়ে উঠেছে খাঁড়ি-নদী-হ্রদের ত্রিবেণী সঙ্গম। আর এই বিখ্যাত খাঁড়িপথে ততোধিক বিখ্যাত ‘হাউসবোটে’ ঘুরে বেড়ানো ও রাত্রিবাস যেন সব পর্যটকের কাছেই এক ভরপুর বিনোদিনী স্বপ্ন।  
        মালাবার উপকুল সফরে যাবো, বহুল শোনা, প্রচুর ছবিতে দেখা কেরালা ব্যাকওয়াটারে ভেসে বেড়ানোর সুপ্ত ইচ্ছেকথা মনে বাসা বেঁধে তো ছিলই। পরিচিতজনেরা বলেন, আমার পায়ের তলায় নাকি সর্ষে দানা ছড়ানো। সেই সর্ষেদানা নির্ভর করেই এবারের গন্তব্য ছিল ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’। কলকাতা থেকেই অনলাইনের মাধ্যমে গাড়ি, হোটেল, হাউসবোট যা কিছু বন্দোবস্ত করা ছিল। তারমধ্যে সাধের জলজভ্রমণ ছিল এক্কেবারে প্রথমেই। আগেই বলেছি কেরলের অনেকটা অংশই জলনির্ভর। সাগরবাহিত সেইসব খাঁড়ির ধার ঘেঁষে ঘরদুয়ার, গাছগাছালি, জনপদ। এই এলাকাগুলির রোজনামচায় যানবাহন বলতে শুধুই নৌকা। এমনতর নৌকা-জীবনেই তারা অভ্যস্ত। জলপথেই তারা স্কুল-কলেজ-বাজারহাট-অফিস-চিকিৎসালয়-পণ্য আদানপ্রদান ইত্যাদি যাবতীয় কাজকর্ম করে থাকেন। এমন কী প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে নিজস্ব নৌকা। এই জলনির্ভর জীবিকা সামলান স্থানীয় মানুষজন। কেরল রাজ্যের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাঁড়িপথ ঘিরে সে এক অন্য জগত। প্রতিদিনের একমাত্র যানবাহন বলতে এই নৌকা। মালয়ালাম ভাষায় এই নৌকাগুলিকে বলা হয় ‘কেট্টুভালম’। 
        কেরল রাজ্যে সরকারি মদতে এই কেট্টুভালমকেই সামান্য অদলবদল করে হাউসবোটের আদল দিয়ে কেরলে পর্যটকদের জন্য সফরের আয়োজন করা হয়। বহু বেসরকারি সংস্থাও ক্রমশ এই হাউসবোট প্রকল্পে সামিল হতে থাকে। কেরল পর্যটন উন্নয়ন নিগম বা সংক্ষেপে KTDC তারপর থেকে বিভিন্ন ধরনের হাউসবোট প্যাকেজ ট্যুরে উদ্যোগী হয়। বর্তমানে কেরল ভ্রমণে এক বা দুই রাত্রি হাউসবোট সফরের জন্য বরাদ্দ রাখেন বেশীরভাগ উৎসাহী পর্যটক। বিভিন্ন মানের ও দামের হাউসবোট রয়েছে। বাইরে থেকে দেখতেও ময়ূরপঙ্খী নাওয়ের মতো। আর ভেতরটা রীতিমত চমক লাগানো। ঘরগুলি বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ফুল হাউসবোট মানে সেখানে থাকে দুইখানি দুই শয্যার ঘর, খাবারঘর তথা বসার বিলাসবহুল একটি ঘর। লাগোয়া রান্নাঘর। সেখানে পাচক মালয়ালাম রান্না অথবা সফরকারীর নিজস্ব ফরমায়েস মতো রান্না করে দেবেন। এছাড়াও কিছুটা সাধারন মানের হাউসবোটও রয়েছে। দামেও সেইগুলি কিছুটা হলেও সস্তা। প্রতিটিতেই রয়েছে বিস্তারিত কাঁচের জানলা ও শৌখিন পর্দা টাঙানো শয়নকক্ষ এবং লাগোয়া স্নানাগার। বিশাল এই হাউসবোটগুলি সারা দিনমান নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ঘোরাফেরা করে রাতে স্থলের ধার ঘেঁষে নোঙর করে থিতু হয়। 

কোট্টায়াম 

         কেরালার কোট্টায়াম শহরকে বলা হয়, ‘The Land of Letter, Lakes & Latex’কোট্টায়াম মূলত এক মাঝারি মাপের শহুরেকেন্দ্রিক এলাকা। ব্রিটিশ জমানায় স্থানটিকে ‘কোট্টিম’ বা ‘কোট্টিয়িম’ বলা হতো। কোট্টায়াম জেলার রাজধানি ও প্রশাসনিক শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১২৯৯০০। দোকানপাট যানবাহন হোটেল রেস্তোরাঁ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত জনপদ। কেরলের কাভানা নদী ও ভেম্বানাদ হ্রদের কোলে কোট্টায়াম। পূবে সবুজে ছাওয়া পশ্চিমঘাট পর্বত আর পশ্চিমে নীল জলের ভেম্বানাদ খাঁড়ি। বৃষ্টির আধিক্য থাকায় পর্ণমোচী ও চিরহরিৎ অরণ্য পরিবেষ্টিত বানিজ্যিক শহরটিতে চা কফি কোকো গোলমরিচ এলাচ ও রবারের চাষ হয়। বিশেষ করে রবার উৎপাদনের প্রশস্তি আছে খুবই। হাতে সময় থাকলে স্থানীয় ‘কোট্টায়াম ট্যাক্সি’ সংস্থা থেকে গাড়ি ভাড়া করে সারাদিনের সফরে ঘুরে নেওয়া যেতে পারে কাছে-দূরে বেশ কয়েকটি দ্রষ্টব্যস্থল। এখানে অবশ্য আলোচনা করবো শুধুই জলকথা। অসামান্য নৌকাবিহারের গল্প।  
         কোট্টায়ামে নদী আছে। হ্রদ আছে। খাঁড়ি আছে। পাহাড়টিলা আছে। আর আছে সম্ভ্রম জাগানো প্রকৃতি। আরও কত কী যে আছে। ভেম্বানাদ হ্রদ থেকে জলবিভাজিকা পথ গেছে আলপুঝাহ্‌ বা আলেপ্পি ও কুমারাকোম। বর্ষাকালে হ্রদ ও চারপাশ ঘেরা জল আর জল। কুট্টানাদ হ্রদ তখন ৭৭৭ বর্গকিলোমিটার বিস্তারে। ভেম্বানাদ হ্রদের জলে নৌকা সফরে চলে যাওয়া যায় ১০ একর সীমানা নিয়ে পাথিরামানাল দ্বীপ। একে বলা হয় ‘মধ্যরাতের দ্বীপ’। নির্জন দ্বীপটিতে রয়েছে ছোট মাঝারি জলাধার। চাষ হচ্ছে নানা ভেষজ উদ্ভিদের। এই হ্রদে রয়েছে আরও কয়েকটি দ্বীপসমুহ। এরমধ্যে পেরুম্বলম্‌ ও পল্লিপুরম্‌ দ্বীপও রয়েছে। অন্যদিকে ভাইপিন, মুল্লাভুকাদ, ভাল্লারপদম্‌, উইলিংডন ইত্যাদি দ্বীপগুলি সবই কোচি হ্রদের এক্তিয়ারে। কোচি বন্দরটাই উইলিংডন ও ভাল্লারপদম্‌ দ্বীপ নিয়ে।   
        মেঘকুয়াশার এক বিরহ রঙের মায়াময় সকাল ডুব খেয়ে রয়েছে। ভ্রমণ মৌতাতে মেতে আছি। বেশীরভাগ পর্যটকই কোট্টায়ামের হোটেলে রাত্রিবাস করে কুমারাকোম বেড়াতে যান। কোট্টায়ামে (KTDC) কেরল ট্যুরিজম দপ্তরের পেছনদিকেই পর্যটকপ্রিয় ভেম্বানাদ হ্রদ। হ্রদের জলে বিরাজ করছে বেশ কিছু অতিকায় ‘কেট্টুভলাম’ বা সোজা অর্থে হাউসবোট। হ্রদ সংলগ্ন জেটি থেকে বিভিন্ন খাঁড়িপথে জলবিহারের ব্যাবস্থা আছে। বিনোদনবিলাসী ভ্রমণার্থীদের অনেকেই আবার ভেম্বানাদ হ্রদেই নৌকাবিহার করছেন। আমরাও স্পিড বোটে হৈ হৈ করে জলক্রীড়ায় বিনোদনী অভিজ্ঞতার শরিক হয়ে থাকলাম। সে এক অদ্ভুত আনন্দ। বেড়াতে এসে মাঝেমাঝে নিজেকে প্রকৃতির কাছে স্রেফ উপুর করে দিই। দিতে হয়। 
       হ্রদ ও শহরের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব কোট্টায়ামের প্রতিটি কোনায়। প্রায় ২০৩৩.০১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কেরলের এই ভেম্বানাদ কয়্যাল বা ভেম্বানাদ কোল ভারতের একটি দীর্ঘতম হ্রদ। যার গভীরতা ৩৯ ফুট, দৈর্ঘে ৯৬.৫ কিলোমিটার। এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাভূমি এলাকা। হ্রদ আর পর্বতীয় অঞ্চলের মধ্যে যেন চ্যাপ্টা হয়ে আছে কোট্টাভালম হ্রদশহরটি। হ্রদের ধারে অগুনতি রিসর্ট ও হ্রদের জলে শতাধিক কেট্টুভালাম ভেসে রয়েছে। হ্রদের জল ছলাৎছল করছে কেট্টুভালামের গায়ে। অল্পচেনা এই শহরেই আজ এক দিনের অবসরের ঠেক। এখানেই রাত্রিবাস আমাদের।
       একে তো মালাবার উপকুলের এই চমৎকার হ্রদশহরে আসা, তারপর থাকাও হবে এক্কেবারে হ্রদের কিনারায়। আর কী চাই ! হ্রদমুখি ঘর। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকটা সময় হ্রদের পাড়ে বসে ও নৌকাবিহারে যথেচ্ছ মজা করে কেটেছে। হোটেলে ফিরে কফির কাপে আয়াসী চুমুক দিতে দিতে হ্রদের মুখোমুখি ব্যালকনিতে চেয়ার পেতে অনেকক্ষণ বসে থাকি। রাতের মায়াজড়ানো নির্জনতা জোটে ভেম্বানাদের জলবাসরে। বিস্তারিত ছড়িয়ে যাওয়া সে নির্জনতা ভারি মোহময়।  

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...