শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি॥ মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি ॥ আজ শেষপর্ব॥

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি॥
 মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি



॥ আজ শেষপর্ব॥

শীলাবতী অববাহিকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকারী এরকমই আর একটি মেলা হল ভেদুয়া গ্রামের ভেদুয়াসিনির মেলা। সন্ধিপুর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম উত্তরবিল ও ভেদুয়া গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে এই মেলাটি বসে। হিন্দুদের দেবতা কিন্তু মেলাটির যাবতীয় আয়োজন করে এই দুই গ্রামের মুসলমান সম্প্রদায়। ভেদুয়াসিনি বনদেবী। এর পুজো করেন নেকড়াইশোল গ্রামের লায়েক সম্প্রদায়। কিন্তু মেলাটি পরিচালনা করেন মুসলমান ভাইয়েরা। মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে মেলাটি বসে, চলে তিন-চারদিন ধরে। হিন্দুর দেবতাকে মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করছেন মুসলমানেরা। যা শীলাবতী অববাহিকাকে মহিমান্বিত করেছে। এরকমই আর একটি চিত্র দেখি শীলাবতী নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে রঘুনাথপুর গ্রামে। এখানে মুসলমানের পীরকে রক্ষা করছেন হিন্দু ভাইয়েরা। যা এক অনন্য নজির। শীলাবতী অববাহিকাতেই বুঝি এমন দৃষ্টান্ত মেলে।       

শীলাবতী অববাহিকার ভৌগোলিক অবস্থান যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই এর গতিবিধিও অত্যন্ত বিচিত্রতায় ভরা। বলা যেতে পারে আশ্চর্য রকমের সুন্দর। এই নদীর প্রচুর বাঁক। আর প্রতি বাঁকে বাঁকে গড়ে উঠেছে জনপদ এবং সেখানেই রয়েছে সেই এলাকার মানুষজনের গড়ে ওঠা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। কালের স্রোতে অনেক এলাকাই নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। যুগ যুগ ধরে ভাঙাগড়ার খেলা খেলতে সে এগিয়ে চলেছে। বয়স্ক এবং প্রবীণ মানুষদের মুখে শুনেছি এখনকার যে শীলাবতী আমরা দেখছি অন্য পাশ দিয়ে বয়ে যেত। একদিক ভেঙেছে, অন্যদিক গড়েছে। কোথাও আবার ভাঙন হয়েছে দু’দিকেই। ফলে চাষযোগ্য জমিও অনেক শীলাবতীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। গড়বেতা এলাকায় এই নদী যতখানি চওড়া-যত পূর্বদিকে অর্থাত্‍ ঘাটালের দিকে এগিয়ে গেছে তত তার প্রসারতা কমেছে। চন্দ্রকোণা-ঘাটাল সড়কে বাঁকার কাছে এই নদী যথেষ্টভাবেই সরু। তাই বলে বর্ষাকালে এর বিধ্বংসী রূপ কম নয়। ভরা বর্ষায় সে বীভত্সল রকমের ভয়ঙ্করী চেহারা
নেয়। ঘাটালের যে নতুন বাসস্ট্যান্ড তা প্রায় শীলাবতী নদীর পাড় ঘেঁষেই। এখানকার শীলাবতীতে জোয়ার আসে। স্বাভাবিকভাবেই ঘাটালের শিল্প-সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি শীলাবতীকে কেন্দ্র করেই। গড়বেতার গনগনি ডাঙা যেমন শীলাবতী তীরবর্তী একটি উল্লেখযোগ্য স্থান, তেমনি ঘাটালেও একেবারে শীলাবতী নদীর উপরে একটি দর্শনীয় বস্তু আছে তা হল

‘ভাসাপোল’। এই ভাসাপোল এখানকার যোগাযোগের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আগেই বলেছি ঘাটাল একটি বন্যাপ্রবণ এলাকা। শীলাবতীর বন্যায় প্রায় প্রতি বছর প্লাবিত হয়ে পড়ে। শীলাবতীর বুকে অবস্থিত এই ভাসাপোলটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ভাসাপোল কখনো ডুবে যায় না। শীলাবতীর জল যত বাড়ে ভাসাপোলও তত উপর দিকে উঠতে থাকে। যার ফলে লোকজনের পারাপার হতে অসুবিধা হয় না। ঘাটাল শহরের দু’প্রান্তকে সংযোগ স্থাপনে রক্ষা করে চলেছে এই ভাসাপোল। কতকগুলি নৌকাকে এক করে তার উপর পাটাতন দিয়ে তৈরি এই ভাসাপোল। আর সবসময় জলের উপর এই পোল ভেসে থাকে বলে এর নাম হয়েছে ভাসাপোল। এটি ঘাটাল শহরের একটি ঐতিহ্য।   
   শুধু ঘাটাল কেন-কোমরপুর, দেউলবেড়িয়া, ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোণা সব এলাকাগুলিই শীলাবতী অববাহিকায়। চন্দ্রকোণার রাজা চন্দ্রকেতুর সঙ্গে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজার সন্ধি স্থাপিত হয়েছিল সন্ধিপুর গ্রামে-যা শীলাবতী অববাহিকায়। এরকম অজস্র ঘটনার নীরব সাক্ষী শীলাবতী নদী। যে কোনো নদী সেই এলাকার জনমানসে বিরাট একটা ছাপ ফেলে। শীলাবতীও তার ব্যতিক্রম নয়। এলাকার গ্রাম-শহর-নগর জীবনের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে। জড়িয়ে গেছে মানুষের সুখ-দু:খে। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সৃষ্টির অনবদ্য উপাদান হয়ে উঠেছে। এই প্রবন্ধের লেখকেরও অনেক গল্প, উপন্যাস ও কবিতার উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে এই শীলাবতী নদী। এই লেখকের সেরকমই একটি কবিতা হল -               

শীলাবতী     
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

আমাদের শীলাবতী প্রিয় ছোটো নদী
কুলুকুলু রব তুলে বয় নিরবধি।
বোশেখ মাসেতে দেখি হাঁটু ভরা জল
তার’পরে খেলা করে শিশুরা সকল।

শ্রাবণে সে ফেঁপে ওঠে, ডেকে আনে বান
ঘোলাজল স্রোতবুকে গেয়ে যায় গান।
ছোটো ছোটো ডিঙাগুলি ফিরে পায় প্রাণ
ভাটিয়ালি সুর বাঁধে গাঁয়ের কিষাণ।

শরতের কাশফুল হাসে দুই তীরে
তার সে মধুর ছায়া দোল খায় নীরে।
অপরূপ সেই ছবি, কী অসাধারণ!
দেখে মন ভরে যায়, জুড়ায় নয়ন। 

ফাগুনে চাঁদের হাসি পড়ে বালুচরে
যেন সোনা রাশরাশ আলো মেখে ঝরে।
বাতাসের সাথে কথা করে কানাকানি
কত কথা, কী যে কথা কী জানি কী জানি!

সে যে বড়ো আমাদের আপনার জন
সুখেদুখে মিশে আছে মায়ের মতন।
মধুর পরশ পাই তার কাছে গেলে
এমন শান্তি কোথাও আর নাহি মেলে।

 
১৮
   যে শীলাবতীকে নিয়ে আমাদের এত গর্ব, এত অহঙ্কার সেই শীলাবতীর বর্তমান রূপ কেমন? কেমন আছে আমাদের সাধের শীলাবতী? উত্তরে বলতে হয় শীলাবতীর বর্তমান অবস্থা মোটেই ভালো নয়। সে ভালো নেই। একসময় যে শীলাবতী রীতিমতো প্রাণচঞ্চলা ছিল, বেগবতী ছিল সে আজ কেমন যেন নিষ্প্রাণ, স্রোতহীন। বর্ষার ক’মাস ছাড়া শীলাবতীর বুকে এখন আর জল গড়ায় না। বছরের ছ’মাস জল থাকে, ছ’মাস জল থাকে না। বলা যেতে পারে শীলাবতী এখন বন্ধ্যাদশা লাভ করেছে। আর এই বন্ধ্যাদশা যত সময় যাচ্ছে তত প্রকট হচ্ছে। কোনো কোনো বছর ভরা শ্রাবণেও শীলাবতী খরা থাকে। বুকে তার এক ফোঁটা জল গড়ায় না। যাকে বলে একেবারে শুকনো-খটখটে। বুকে তার শুধু ধূ ধূ সাদা বালুকরাশি। শীলাবতী রীতিমতো মজে গেছে। একসময় এই শীলাবতী নদী থেকে প্রচুর সুস্বাদু মাছ মিলত। অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করত এই শীলাবতী থেকে মাছ ধরে। আজ সেই সব যেন ইতিহাস হতে চলেছে। সারা বছর যদি নদীতে জলই না থাকল তবে মাছ জন্মাবে কী করে? শুধু মাছ কেন? বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপের অস্তিত্ব আজ বিলুপ্ত। ‘মাছরাঙা ঝুপ করে’ আর জলে এসে পড়ছে না। হাঁসের দল চরে বেড়াচ্ছে না, পানকৌড়ি ডুবসাঁতার দিচ্ছে না। এককথায় নদীটার পুরো পরিবেশ এবং তার ইকোসিস্টেমটাই গেছে বদলে। যা আমাদেরকে এক চরম সর্বনাশের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে শিহরিত করছে।
   শীলাবতীর এই বন্ধ্যাদশার জন্য জীবকুলের উঠেছে নাভিশ্বাস। চাষিরা চাষের ক্ষেতে জল দিতে পারছে না, গবাদি পশুরা না পাচ্ছে গা ডোবার জল। গ্রামের মেয়েদের কাছে নদীটা হল সই। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা চিরকালের বন্ধু। নদীর বুকে জল না থাকায় সে বন্ধুত্ব কবেই শেষ হয়ে গেছে। পোয়াতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
   তবু শীলাবতী শীলাবতীই। অনেক সুখ-দু:খের সাথি হয়ে সে যুগের পর যুগ বয়ে চলেছে। অনেক ইতিহাস সে সৃষ্টি করেছে। আরও অনেক যুগ নিশ্চয় বয়ে যাবে। ভবিষ্যতে আরও অনেক নতুন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। জনশ্রুতি অনুযায়ী শূদ্র কন্যা শীলাবতী অনেক পথ অতিক্রম করে, অনেক ঘাট পেরিয়ে একদিন গঙ্গার স্রোতে মিলিত হয়েছিল। এই ইতিহাস এতটাই দীর্ঘ তাকে সম্যকভাবে তুলে ধরার কাজটা রীতিমতো কঠিন ও দুরূহ। তবু চেষ্টা করেছি, তবে তা অতি সামান্যই, নিতান্তই নগণ্য। আগামীদিনে হয়তো আরও কেউ কেউ এগিয়ে আসবেন শীলাবতী অববাহিকার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে পূর্ণরূপে তুলে ধরার মহান দায়িত্ব নিয়ে-তাদের জন্য আগাম শুভেচ্ছা রইল আমার।

|| সমাপ্ত ||

সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০

শিলাবতীর কৃৃষ্টি ও ইতিহাস || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃষ্টি ~১৫
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


১৫





“চিঠিপত্র  - ৩

সম্পাদক, ‘টেরাকোটা’ সমীপেষু।।
সবিনয় নিবেদন,


‘টেরাকোটা’ মে-জুন সংখ্যায় প্রকাশিত মঙ্গলপ্রসাদ মাইতির ‘নাককটি দেবী নয় – দেবমূর্তি’, রচনার সঙ্গে যে আলোকচিত্রটি প্রকাশিত হয়েছে, এবং এবিষয়ে শ্রী মাইতি যে বিবরণ দিয়েছেন, টা অনুসরণে জানাই, মূর্তিটি সেনযুগের প্রস্তর ভাস্কর্য (১১শ – ২১শ শতক), সূর্যদেবতার মূর্তি, মূর্তির পাদপীঠে খোদিত দ্রুত ধাবমান সপ্তাশ্ব। ভারতীয় মূর্তিতত্ত্বের ‘মথুরারীতিতে’ নির্মিত এই মূর্তির শীর্ষে চন্দ্রবিন্দু, দুদিকে উড়ন্ত যক্ষ। মূর্তির নিচে বোধহয় মাঝে সারথি অরুণ, একদিকে তাঁর স্ত্রী ঊষা, অন্যদিকে সংজ্ঞা। আরও নিচে সূর্যের দুই পুত্র অশ্বিনীকুমার(অশ্বিনী ও রেবন্ত) অশ্বিনীকুমারদ্বয় সম্পর্কে মতভেদে, ‘নিরুক্ত’ রচয়িতা ‘য়াস্ক’ এর মতে, বেদে এঁরা পৃথিবী ও স্বর্গ, দিবা ও রাত্রি, আকাশের দুই পুত্র, সিন্ধুর পুত্র বিবস্বান ও করন্যুর যমজপুত্র ইত্যাদি। সেকথা অবশ্য অন্যত্র আলোচ্য। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাবল্যের যুগ সেন রাজত্বকালে যে সংখ্যাতীত হিন্দু ভাস্কর্য নির্মিত হয়, আলোচ্য সূর্যমূর্তিটি তারই অন্যতম বলে মনে করা যেতে পারে। ‘নাককাটি’ প্রসঙ্গে জানাই, পশ্চিমবঙ্গের বহুস্থানে মৃত্তিকাগর্ভ থেকে প্রাপ্ত প্রস্তরমূর্তি কোদালের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ধমানের মঙ্গলকোট মুর্শিদাবাদ বীরভূম জেলার নানস্থানে প্রাপ্ত এই ধরনের নাককাটা মূর্তি ‘নাককাটি’ নামেই পূজিত হন। বিশেষ করে জৈন তীর্থঙ্কদের ‘কায়ত্সর্গ’ মুদ্রার ভাগ্যেই এমন ঘটনা বেশি ঘটেছে। আলোচ্য রচনার প্রতিবেদক শ্রীযুক্ত মাইতি মহাশয়কে ধন্যবাদ এমন মুল্যবান প্রত্নতত্ত্বর সচিত্র বিবরণ প্রকাশ করার জন্য। আগ্রহীজনকে অনুরোধ, বেহালা রাজ্য সরকারি প্রত্ন গ্যালারিতে রক্ষিত উত্তরবঙ্গের শীতলকুচি থেকে প্রাপ্ত ১২শ শতকের কোষ্ঠীপাথরের সূর্যমূর্তিটি একবার দেখে নিন।
                                                                 
                                             ত্রিপুরা বসু
                                                               দুর্গাপুর – ৭১৩২১১”
 এত কথা এই কারণে বলা যে শীলাবতী অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নবম থেকে একাদশ শতকে এখানে সূর্যপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে সূর্যবিগ্রহ কুড়িয়ে পাওয়ার মধ্য দিয়েই এর প্রমাণ মেলে।
 
   গড়বেড়িয়া নাককাটি সূর্যবিগ্রহ নিয়ে যেমন মেলা বসে-সেরকমই আর একটি মেলা হল সন্ধিপুরের ‘ভবানী মেলা’ বা ‘ভবানী উত্সয়ব’। যা একান্তভাবেই জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতির অনন্য প্রতীক। আর এটিও শীলাবতী অববাহিকাতেই অনুষ্ঠিত হয়।   
   উত্তর-পূর্ব গড়বেতার শেষ প্রান্তে এবং পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি ও বাঁকুড়া জেলার সংযোগস্থল সন্ধিপুরে দীর্ঘকাল ধরে বিরাট এই  মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে যা এলাকায় ‘ভবানী মেলা’ নামে পরিচিত। ঐতিহ্যপূর্ণ এই মেলাটি আরম্ভ হয় প্রতিবছর মাঘী পুর্ণিমার দিন এবং চলে তিনদিন ধরে। অবশ্য এর রেশ থাকে সাতদিনেরও বেশি। এই ভবানী উত্সযব বা ভবানী মেলা এলাকার মানুষের কাছে অতি প্রিয় উত্সেব। শুধু স্থানীয় এলাকা নয়-গড়বেতা, চন্দ্রকোণা, জয়পুর, কোতুলপুর প্রভৃতি থানার এবং বহু দূর-দূরান্তের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মেলায় কাতারে কাতারে সামিল হন প্রাণের আনন্দে। জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, সাম্প্রদায়িকতা সবকিছু দূর করে এই মেলা সকল মানুষকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছে। সেই দিক দিয়ে এই মেলা যেমন ঐতিহ্যপূর্ণ, তেমনই গৌরবময়। সন্ধিপুর ছাড়া ভারতবর্ষের আর কোথাও এরকম ভবানী মেলা অনুষ্ঠিত হয় না।
   ইতিহাসের বীর নায়ক ছত্রপতি শিবাজী শক্তি ও সাহস সঞ্চয়ের জন্য শিবনের গিরিদুর্গে যে দেবী ভবানীর আরাধনা করেছিলেন সেই অষ্টভুজা দেবী ভবানীর পূজা করা হয় এখানে। সেই উপলক্ষেই মেলাটির নাম হয়েছে ভবানী উত্সাব বা ভবানী মেলা। দেবী ভবানী ভক্ত শিবাজীকে অস্ত্র প্রদান করছেন সেই মূর্তিটিই এখানে গড়া হয়।
   এই ভবানী মেলার প্রতিষ্ঠা করেন কাতরাবালি গ্রামের কর্মবীর প্রয়াত রাঘব চন্দ্র সরকার। আর এ কাজে সাহায্য করেন প্রখ্যাত বিপ্লবী শ্রী অরবিন্দ ঘোষের ভাবশিষ্য এবং বোমারু বারীন ঘোষের অনুগামী দাদা বসন্তকুমার সরকার। এলাকার যুব- সম্প্রদায় যাতে দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করতে পারে এবং জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয় তাই এই ভবানী মেলার সূচনা। ১৯৪৬ সালে দেশবিভাগের আত্মঘাতী কলহে যখন উন্মত্ত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লিপ্ত দেশের মানুষ, মরছে হিন্দু, মরছে মুসলমান-ঠিক তখনই পরস্পরের মধ্যে  সদ্ভাব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অনুষ্ঠিত এই
ভবানী উত্সাব। বলতে দ্বিধা নেই অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ঘটতে পারেনি এই ভবানী মেলার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণে। সেই যে মহত্‍ উদ্দেশ্য নিয়ে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল সেই সুরটি আজও অদ্বিতীয়ভাবে ধরে রেখেছে এই মেলা।
১৬
   একটি গ্রাম্য মেলার যা যা বৈশিষ্ট্য তার সব কিছুর সন্ধান মেলে সন্ধিপুরের এই ভবানী মেলাতে। বহু মানুষের মিলনভূমিই যদি মেলা হয়ে থাকে, হাজারো মানুষের মিলনে, আনন্দ কোলাহলপূর্ণ ভাব বিনিময়ের কেন্দ্রস্থল যদি মেলা হয়ে থাকে, জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রাণ স্পন্দনের ক্ষেত্রস্থল যদি মেলা হয়ে থাকে তবে সন্ধিপুরের এই ভবানী মেলা তারই সার্থক একটি প্রতিমূর্তি। এখানে কোনো বিভেদ নেই, কোনো রাজনৈতিক কোঁদল বা দলাদলি নেই-সবকিছুর উর্ধ্বে থেকে সবাই এখানে এক-সবাই এখানে অভিন্ন। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে উঁচুজাত, কে নিচুজাত, এই ঘৃণ্য প্রশ্ন এখানে দেখা যায় না। একঘেয়েমির ক্লান্তি এড়াতে, দু’দন্ড শান্তির নি:শ্বাস ফেলতে কাতারে কাতারে অসংখ্য মানুষ এখানে ছুটে আসে। হাজারো সমস্যা ও যন্ত্রণায় বিধ্বস্ত সংসারী মানুষেরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও শান্তি ও আনন্দ লাভ করে। আছে দিন যাপনের গ্লানি, প্রাণ ধারণের হাজারো সংকট, আছে অর্থনৈতিক সমস্যা – তবু মানুষ ছুটে আসে এখানে বহু দূর-দূরান্ত থেকে।
   ভবানী মেলা ভবানী মেলাই। এটি একটি অতীব সুন্দর গ্রামীণ মানুষের মেলা। এর কাছে বর্তমান বসানো আধুনিক মেলাগুলির কোনো তুলনাই হয় না। এই মেলাকে ঘিরে মানুষের অন্তরের টান অভূতপূর্ব। মানুষ যতদিন থাকবে-সমাজ যতদিন থাকবে ততদিন এই মেলাও থাকবে বলে অনুমান করা যায়। জাতীয় সংহতি, সম্প্রীতি রক্ষায় এই ভবানী মেলার গুরুত্ব অপরিসীম।
   বর্তমানে এই ভবানী উত্সববের পরিচালনা করেন নেজাতীনগর শ্রীপতি শিক্ষাসদনের পরিচালন সমিতি এবং ভবানী উত্সতব কমিটি। এই কমিটি গঠিত হয়েছে হিন্দু-মুসলমান, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষদের নিয়ে। মেলার তিনদিন উত্সতবকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় নানা অনুষ্ঠান। যাত্রাগান, কীর্তন, বাউল, পুতুল নাচ, ছৌনাচ ইত্যাদি। লোকায়ত অজস্র অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। ভবানী পুজোর প্রথম দিনে নেতাজীনগর শ্রীপতি শিক্ষাসদন তাদের বিদ্যালয়ের বার্ষিক একটি অনুষ্ঠানও করে থাকে। কৃতী ছাত্রছাত্রী, আবৃত্তি, খেলাধুলা প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় সফল প্রতিযোগীদের পুরস্কার দেওয়া হয়। উপস্থিত থাকেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক মণ্ডলীসহ জেলা ও রাজ্যের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। বর্তমানে নেতাজীনগর শ্রীপতি শিক্ষাসদন হাইস্কুলের যে উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাঙ্ক ইত্যাদি গড়ে উঠেছে তার মূলেও ভবানী উত্সতবের অবদান অনেকখানি।
   এই ভবানী উত্সযব এলাকার মানুষকে শুধু আনন্দই দেয় না, পারস্পরিক সম্প্রীতির এক মিলনক্ষেত্র। রাজনীতি, দলমত, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এখানে এসে আবৃত্তি করে থাকেন কবিগুরুর মহামন্ত্র:- “এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান।” এখানেই এই মেলার সার্থকতা ও ঐতিহাসিক মূল্য।

সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি ৯ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক গদ্য

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি ৯
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


এ ব্যাপারে পুরাতত্ত্ববিদরা এবং পুরাতত্ত্ব সম্বন্ধীয় লেখক-লেখিকারা কী বলছেন একটু দেখে নেওয়া যাক। “নাককাটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” এই শিরোনামে আমার লেখা একটি বিশেষ নিবন্ধ ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার জৈষ্ঠ-১৪১৭-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এটি প্রত্নতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা। যার সম্পাদনা করেন তুলসীদাস 
মাইতি এবং প্রদীপ কর। যাই হোক পত্রিকাতে নিবন্ধটি প্রকাশ হওয়ার পর বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদেরা যা বলেছেন, এবং লিখিতভাবে মতামত দিয়েছেন   তা হুবহু তুলে ধরছি।

‘টেরাকোটা’ পত্রিকার শ্রাবণ ১৪১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘নাককটি’ মূর্তি প্রসঙ্গে চিঠি 
“চিঠিপত্র – ১ 
Dr. Tapas Bandyopadhyay
Keeper
State Archaeolojical Museum, West Bengal
Director of Archaeolojy and museums,
Government of West Bengal
1, Satyen Roy Road, Behala,
Kolokata-700034
Dated-09.07.2010

মাননীয় যুগ্ম সম্পাদক মহাশয়, টেরাকোটা
প্রত্নতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা,
বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া
মহাশয়, 
   আপনাদের উদ্যোগে প্রকাশিত তথ্যবহুল সুমুদ্রিত পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা হাতে পেলাম। “নাককটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” শীর্ষক রচনা প্রসঙ্গে জানাই সেটা সূর্যদেবের বিগ্রহ। এই ধরনের বিগ্রহ সাধারনভাবে সপ্তাশ্ব বাহিত রথে সম্পদস্থানক ভঙ্গিতে প্রস্ফুটিত পদ্মফুল দুই হস্তে ধরণ করে দন্ডি-পিঙ্গল, ছায়া-সংগা, ঊষা-প্রত্যুষা সহ দন্ডায়মান অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। পদদ্বয় জুতার দ্বারা আচ্ছাদিত। দুই পায়ের মাঝে দণ্ডায়মানা পৃথিবী ও সম্মুখে রথের সারথি অরুণ। কটিদেশে ছুরি। জুতা ও অস্ত্রের সংযোজনা সম্ভবত: অগ্নি উপাসক পশ্চিম এশীয় জনগণের প্রভাব সঞ্জাত। বিগ্রহে দাড়িযুক্ত প্রতিকৃতিটি পিঙ্গলের। অপর পার্শ্বস্থ প্রতিকৃতিটি দন্ডির। দন্ডি এবং পিঙ্গলের পাশে যথাক্রমে ছায়া ও সংগা দণ্ডায়মানা। ধনুকে তির ছুঁড়ে ঊষা এবং প্রত্যুষা অন্ধকার দূর করছেন। অবশিষ্ট সবকটি রচনাই আমার আনন্দ ও বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। আপনাদের পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি। 
   ভবিষ্যতে পত্রিকা উপরোক্ত ঠিকানা পাঠালে প্রাপ্তিযোগ সুনিশ্চিত হবে। 
                                                       ধন্যবাদান্তে-
                                                      তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়
পুনশ্চ – সূর্য মূর্তিটি সম্ভবত পালযুগের। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রচুর বিগ্রহ অষ্টম-দ্বাদশ শতকে নির্মিত হতে দেখা গেছে”।

 “চিঠিপত্র – ২

শ্রী প্রদীপ কর,
সম্পাদক ‘টেরাকোটা’
বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, পিন-৭২২১২২

প্রিয়বরেষু,
      আপনাদের ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার ২য় সংখ্যায়(জুন,২০১০; জৈষ্ঠ,১৪১৭), শ্রী মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি লিখিত “নাককাটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই। 
১৪
   মূর্তিটির আলোকচিত্র খুব সুস্পষ্ট না হলেও মঙ্গলপ্রসাদবাবুর বিবরণ সহযোগে নিরীক্ষণ করলে বুঝতে পারা যায় যে, মূর্তিটি আসলে কালো কোষ্ঠীপাথরে তৈরি সূর্যবিগ্রহ। তবে মূর্তিটি ভগ্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত। 
   বলা বাহুল্য, পূর্বভারতে সূর্যবিগ্রহের পূজা খ্রি: নবম-দশ-একাদশ শতকে প্রচলিত ছিল। আজকের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া-হুগলি-পশ্চিম মেদিনীপুর সহ এক বিস্তীর্ণ এলাকায় সূর্যপূজার ‘পাথুরে প্রমাণ’ পাওয়া গিয়েছে, অর্থাত্‍ নানা আকারের সূর্যবিগ্রহ ভাস্কর্যের সন্ধান মিলেছে। বিহার ও ঝাড়খন্ড রাজ্যেও সূর্যপূজার প্রমাণ হিসাবে সূর্যবিগ্রহ ভাস্কর্য নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এমনকি ‘সূর্যপুত্র রেবন্ত’র অশ্বারোহী ভাস্কর্যের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে। 
   সূর্যমূর্তি ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রস্ফুটিত বিশ্বপদ্মের উপর ঋজুভাবে দণ্ডায়মান সূর্য, তাঁর দুই হাতে ধরা সনাল পদ্ম, পদ্ম দুটি মূর্তির মাথর দু’পাশে সমান্তরাল সমদূরত্বে থাকে; পায়ে থাকে রণপাদুকা অর্থাত্‍ হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা জুতার মতো আবরণ; পরণে থাকে উদীচ্য বেশ; কটিদেশ(কোমর) ঢাকা থাকে সূক্ষ্ম ও অলঙ্কৃত ‘অব্যঙ্গ’; গলায় থাকে স্বর্গীয় পারিজাত কুসুমের মালা এবং উপবীত সদৃশ বস্তু; বিগ্রহের পায়ের নিচে বা কাছে থাকে সপ্ত-অশ্ববাহিত ‘একচক্র’ রথের সারথি কশ্যপ-তনয় ‘অনরু’(যার ঊরুদ্বয় নাই); মতান্তরে ‘অরুণ’, এবং অনরু চালিত রথ, বিগ্রহের উভয়পার্শ্বে থাকে সূর্যপত্নীদ্বয় ধনুর্বাণধারী ঊষা এবং প্রত্যুষা, এছাড়াও বহুসময় অপরাপর সূর্যপত্নী ছায়া ও সংজ্ঞার মূর্তিও থাকে, অবশ্যই থাকে দণ্ডধারী দন্ডী এবং মসীপত্র ও লেখনী সহ কুন্তী মূর্তি। সূর্যমূর্তির মাথার উপর আকাশদেশে, উভয়দিকে , থাকে স্বর্গীয় পুষ্পমাল্য হস্তে উড়ন্ত গন্ধর্ব বা বিদ্যাধর। সাধারণভাবে এইসব বৈশিষ্ট্যই সূর্যমুর্তি ভাস্কর্য চেনার অন্যতম সহজ উপায়। 
   আলোচ্যক্ষেত্রে, সমগ্র ভাস্কর্যটি খোদাই করার ক্ষেত্রে তিন ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। মূর্তির দেহকাণ্ড বা ‘টরসো’ খোদাই করা হয়েছে ত্রিমাত্রিকভাবে (‘স্কাল্পচার-ইন-দ্য-রাউণ্ড’ পদ্ধতিতে); মূর্তির মাথা এবং পা-ভাগ, পার্শ্ব সহচরীদ্বয় খোদাই করা হয়েছে উচ্চাবচ(হাই রিলিফ) পদ্ধতিতে; আর অপরাপর অংশ কোথাও ‘হাই-রিলিফ’,কোথাও নতোন্নত বা ‘লো-রিলিফ’পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। 
   এছাড়া আলোকচিত্রটি থেকে যতদূর বোঝা যাচ্ছে, সমগ্র ভাস্কর্যটি ‘ত্রিরথ’ পাদপীঠের উপর বিন্যস্ত। সালঙ্কারা বিগ্রহের মাথায় রয়েছে কিরীটমুকুট, দুইকানে কুণ্ডল, দুই বাহুতে বাজুবন্ধ। প্রচলিত শিল্পরীতি অনুসৃত হয়েছে আলোচ্য মূর্তির ক্ষেত্রে।
   আলোচ্য সূর্যবিগ্রহ  ভাস্কর্যটির প্রাপ্তিস্থান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা জনপদ হওয়ায়, এই ধারণা দৃঢ়মূল হল যে, হাজার বছর পূর্বে আজকের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নানান অংশে, সূর্যবিগ্রহের পূজার্চনার প্রচলন ছিল। খ্রি: ১৯৮২-৮৩ সনে ঝাড়গ্রাম মহকুমার থানাধীন দোলগ্রাম এলাকায় বন-ঝোপের মধ্যে সূর্যপুত্র অশ্বারোহী রেবন্তমূর্তির ভগ্নাবশেষ দেখতে পেয়েছিলাম। সম্ভবত তার কাছাকাছি একটি সূর্যমূর্তির মতো অবশেষ ছিল। ভগ্ন মূর্তির মাথাটি, স্থানীয় আদিবাসী ছাত্রাবাসে হলুদ-লঙ্কা মসলা পেশায় করার কাজে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। 
   পরিক্রমাকালে বহু জায়গাতেই দেখেছি, গ্রামবাসীরা এ ধরণের প্রাচীন মূর্তি ভাস্কর্য বা বিগ্রহাদি পাওয়ার পর সিঁদুর লেপে পূজার্চনা করছেন, নতুবা ধান্দাবাজ ফড়ে দালাল মারফত কালোবাজারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনা তামাম ভারতবর্ষে ঘটে চলেছে অবিরাম ধারায়। আমরা পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন ইতিহাস পড়ি বটে, কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক কোনও পক্ষের মনেই ইতিহাস চেতনা জাগ্রত হয় না। নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আমরা হতচেতন। হাল আমলে মার্কিনি কালচারে তো গোটা দেশ আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেক্ষেত্রে ‘টেরাকোটা’ সম্পাদকমণ্ডলী ও কর্মীবৃন্দ এবং সুলেখক শ্রী  মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি ধন্যবাদের পাত্র, কারণ তাঁরা আপন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যধারার সন্ধান নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন, অন্তত তাঁদের সীমিত ক্ষমতায় নথিবন্ধকরণের প্রাথমিক কাজটুকু আন্তরিকভাবে করছেন। এ কাজ অব্যাহত থাকুক, এই প্রার্থনা রইল। 
                                                         শুভেচ্ছাসহ,
তাং-১৯ আগস্ট, ২০১০                                      শিবেন্দু মান্না 
                                                      কদমতলা, হাওড়া – ৭১১১০১”

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক


শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
 পর্ব~ ৮



মালবন্দি গ্রাম থেকে সোজা দক্ষিণে যে রাস্তাটি চলে গেছে আনন্দনগর ও ঘোড়ামারা গ্রামের দিকে তারই মাঝখানে পড়ে বিশাল এক পাথর চাটান। এই পাথর চাটানের দিকে একটুখানি চোখ রাখলেই দেখা যাবে কত সুন্দর করে নির্দিষ্ট মাপে মাপে সাইজ করে পাথর কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে। কী করে যে সেই পাথর তোলা হয়েছে মনে প্রশ্ন জাগবেই।
এবড়ো-খেবড়ো ভাব নেই কোথাও, সব সরল আকারে আয়তকার মাপে কাটা। পাথর কাটার এমন অদ্ভুত যন্ত্রপাতি কোথায় যে পেয়েছিল তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।
 
   ঠিক এরকমই দৃশ্য চোখে পড়ে এই পাথর চাটান থেকে আধ কিলোমিটার পশ্চিমে আরও এক পাথর চাটানে। এত পাথর কেটে কী কাজে লাগিয়েছিল তাতেও প্রশ্ন জাগে। মনে করা হচ্ছে সেই সময় যে সময় লায়কালি গড় নির্মিত হয়েছিল সেখানে এইসব পাথর যেত। কিংবা এমনও হতে পারে সেইসময় নানাস্থানে যে মন্দির নির্মিত হয়েছিল সেখানেও এই পাথরগুলি যেত।
 
   আবার মালবান্দির পাথর চাটান থেকে আরও খানিকটা দূরে বড়ডাঙা বরাশোল নামক স্থানে অন্য একটি নিদর্শন চোখে পড়ে। এখানে একটি জায়গায় প্রায় তিন হাত ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট একটি গোলাকার মতো জায়গা। যেমন মসৃণ- তেমনই সুন্দর করে কাটা। ঠিক চার-পাঁচ জন ঘুমোতে পারে সেরকম মাপে। একটি নয়। এরকম দু’তিনটি। পাশাপাশি। অনুমান করা হচ্ছে এখানেই রাত্রে ঘুমাতেন নায়েক বিদ্রোহীরা। বিছানার সংখ্যা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাদি দেখে মনে করা হচ্ছে – ছোটো ছোটো চার পাঁচজনের দলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করতেন তারা এবং এইভাবে সারা অঞ্চলটি করায়ত্ত করেছিলেন।
   কিন্তু দু:খের বিষয় উপযুক্ত সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে তথ্যসমৃদ্ধ এইসব অপূর্ব নিদর্শন ও চিহ্নগুলি ধীরে ধীরে লোপ লোপ পেতে চলেছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে মানব ইতিহাসের অন্তরালে। নির্বিচারে চলছে পাথর ভাঙার কাজ। সেই পাথর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে লায়কালি আমলের নিদর্শনগুলিও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরনো দিনের সে সব অমূল্য সম্পদ ও ঐতিহ্যের অনেকটাই ধ্বংস পেয়েছে ইতিমধ্যে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারের এখনই উচিত এর উপযুক্ত একটা সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেওয়া। অযথা দেরি করলে আর কিছুদিনের মধ্যেই মালবান্দির জঙ্গল থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে লায়কালি আমলের বহুমূল্য অপূর্ব-সুন্দর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি।


   মালবান্দি গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত বলদঘাটা গ্রাম। এই গ্রামের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহ্য হোল এখানকার দ্বাদশ শিবালয়। মালবান্দি হয়ে এই গ্রামে ঢোকার ঠিক আগেটায় বামদিকে শীলাবতী নদীর একেবারে পাড় ঘেঁষে এই দ্বাদশ শিবালয়ের অবস্থান। ১২ টি মন্দির নিয়ে এককালে গড়ে উঠেছিল এই দ্বাদশ শিবালয়। ছ’টি মন্দির ইতিমধ্যে শীলাবতী নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে। যে ছ’টি মন্দির অবশিষ্ট আছে তাও ভাঙাচোরা। বর্তমানে মানুষ এখানে ঢোকে না। যত সাপ, শিয়াল, বেজি আর চামচিকের বাস। কথিত এখানকার কালাচাঁদ সামন্ত নামে এক সামন্তরাজ এই দ্বাদশ শিবালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দ্বাদশ শিবালয়ে এককালে বারোমাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকতো। রাসমেলা, বারুণীমেলা, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো সব জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠিত হোত। কিন্তু আজ তা কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে। এখন এখানে পুজো হয় না, সন্ধ্যায় বাতি জ্বলে না। নি:সীম – নি:সাড়ে পড়ে থাকে এই ভগ্ন দেউল। এখন এটি বলদঘাটা গ্রামের সংরক্ষণহীন পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ।

 
   এবারে আসছি ‘নাককটি মেলা’র কথায়। বলদঘাটা গ্রামের ওপাশে শীলাবতী নদী পেরোলেই পড়ে গড়বেড়িয়া গ্রাম। এই গ্রামেই বসে নাককটি মেলা। আজ থেকে প্রায় ৭০/৭২ বছর আগে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা-১ ব্লকের গড়বেড়িয়া নিবাসী স্বর্গীয় যতীন্দ্রনাথ পাল তাঁর পুকুর খনন কালে একটি পাথরের মূর্তি পান। বর্তমানে মূর্তিটি যতীন্দ্রনাথ পাল মহাশয়ের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে।
   মূর্তিটি আসলে কিসের মূর্তি তা প্রত্নতাত্ত্বিকরা হয়তো বলতে পারবেন, কিন্তু এলাকাবাসী জানেন না কিসের মূর্তি। মূর্তিটির শরীরিক গঠন এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথেষ্ট অভিনবত্ব আছে। মূর্তিটি এখানে কিভাবে এল তা ইতিহাস বলবে কিন্তু পর্যবেক্ষন করে যা দেখা যাচ্ছে তাতে করে মূর্তিটি কোনো দেবী নয়, দেবমূর্তি। অন্তত তার চেহারা, সাজগোজ এবং পরণের পোশাক বলছে।

   কালো শিলাপাথর দিয়ে মূর্তিটি তৈরি। একটি কাঠামোর মধ্যে মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে। মনে করা হচ্ছে রথের উপরে চড়ে তিনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন। রাজকীয় একটা ভাবমূর্তি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে এই দেবমূর্তিটির মধ্যে। কাঠামোর দৈর্ঘ্য
৩ ফুট ২ ইঞ্চি, চওড়া ১ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং পুরু দেড় ইঞ্চি। মূল মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ২ ফুট ৮ ইঞ্চি, অবশ্যই মাথার মুকুটসহ।
   মূল মূর্তির গলায় হার আছে। দু’হাতে বাহুমূলে বাজুবন্ধ আছে। কোমরে আছে কোমরবন্ধ। কর্ণমূলেও আছে দুল। বক্ষপ্রদেশ এবং উদর খোলা। রাজপুত্ররা যেভাবে পোশাক পরিধান করে থাকে তিনি সজ্জিত। মাথায় রাজমুকুট। দু’পাশে কাঁধ পর্যন্ত চুল। হাতে কী ধরা ছিল বোঝার উপায় নেই কর হাতের তালু দু’টোই ভাঙা। মূর্তিটির হাত যেমন নেই তেমনি নাকটাও নেই। আদিবাসীরা যারা কোদাল দিয়ে পুকুর কাটছিল তাদের কোদালের আঘাতে নাকটা কত গিয়েছিল তাই তখন থেকেই জনশ্রুতি ‘নাককাটি’। এই মূর্তিকে সামনে রেখে যে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয় তার নাম নাককাটি মেলা।
   যাই হোক মূর্তিটির মধ্যে আরও যে বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল – মূর্তিটির পায়ে নাগরা জুতো আছে। মজা পরে আছেন। সবই কিন্তু পাথরের তৈরি। মূর্তিটির একেবারে পায়ের তলায় আর একটি মূর্তি। মনে করা হচ্ছে তিনি রথের সারথি। তার নিচে সাতটি ছুটন্ত ঘোড়া। লাগাম দিয়ে বাঁধা। মূর্তিটির ডানদিকে একটি মূর্তি ঠিক গণেশের মতো, বামদিকে একই মাপের আর একটি মূর্তি, গণেশ নয় তবে কার্তিক হতে পারে। ধনুর্বাণ নয়, গদা ধরে আছেন তিনি, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। এই কার্তিক এবং গণেশের নিচে দু’পাশে একটি করে নারী মূর্তি। হাতে করে ফুল না শঙ্খ ধরে আছেন পরিষ্কার নয়।
   আসল মূর্তির পিছনে একটি চক্র আছে। যার উপরে ‘৺’ চিহ্নটি আঁকা। তার দু’পাশে দু’টি মূর্তি ভাসমান অবস্থায়। যেন তারা পদ্মফুলের উপরে ভেসে আছেন, দেবমূর্তিকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এই মূল মূর্তির দু’দিকে যে মূর্তিগুলি আছে তাদের দৈর্ঘ্য ১ ফুট আড়াই ইঞ্চি করে। মূর্তিটির বামদিকের গলা থেক একটি মালার মতো অলঙ্কার জঙ্ঘা ছুঁয়ে ডানদিকের কোমরে শেষ হয়েছে। মালাও হতে পারে, নয়তো পৈতে।
   এই মূর্তিখানি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি অনুরূপ কাঠামোর মতো আর একটি মূর্তি বসানো। এটিও পাওয়া যায় গড়বেড়িয়া মৌজাতেই। তবে এটি গড়বেড়িয়ার পশ্চিম দিকের মৌজাতে পাওয়া যায়। ক্ষেত থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নাম ক্ষেত্রপাল। এটিও শিলাপাথরের তৈরি। মূর্তিটির বৈচিত্র্য কিছুটা আলাদা। মাথা, মাথার মুকুট থেকে বক্ষপ্রদেশের শেষ প্রান্ত পাওয়া গেছে। এটিও পুরুষ মূর্তি। যেটুকু পাওয়া গেছে তার দৈর্ঘ্য ১ ফুট ৮ ইঞ্চি। শুধুমাত্র মুকুটেরই দৈর্ঘ্য ১৫ ইঞ্চি। এই মূর্তির দু’পাশে দু’টো মূর্তি আছে। বাজুবন্ধ আছে। অনুমান করা হচ্ছে একই সময়কালে তৈরি।
   এই দেবমূর্তিটি পাওয়ার ইতিহাস জানতে গিয়ে গুরুদাস পাল মহাশয়ের মুখ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও বেশ চমকপ্রদ এবং বিস্ময়ের। শ্রীপাল কথপ্রসঙ্গে বলেন – তাঁদের বাড়ির মূর্তি পাওয়ার খবর শুনে তাঁর মাস্টারমশাই – নাম প্রফুল্লবাবু (পদবী বলতে পারেননি) কামারপুকুর থেকে এসেছিলেন। তিনি এখানে এসে পুকুরপাড়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি মূর্তি কুড়িয়ে পান। যার উচ্চতা এক ফুটের মতো। তিনি সেই মূর্তিটি নিয়ে চলে যান। কীসের মূর্তি তা গুরুদাসবাবু বলতে পারেননি।
   শ্রীপাল আরও যে কথা জানান – তাঁর স্বর্গত পিতা যতীন্দ্রনাথ পাল বলেছিলেন যে তাদের বাড়ির অনতিদূরে পূর্বদিকের পুকুরের পাড়ে মাটির নিচে একটি ৪ ফুট চওড়া দেওয়াল পাওয়া গিয়েছিল। সেটি এখনো আছে তবে মাটির নিচে কোথায় চাপা পড়ে আছে জানেন না। যতীন্দ্রনাথ পাল বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন।
   তবে এখানে যে একটি গড় ছিল তা সর্বব সত্য। এখানে গড়ের পুকুর বলে একটি পুকুর আছে। সম্প্রতি এটিকে স্থানীয় পঞ্চায়েত সংস্কার করেছে। এখানের গড়ে পাথরগুলি সুন্দর সাইজ করে কাটা। তার কিছু পাথর গুরুদাস পাল তাঁর বাড়ির কাজে লাগিয়েছেন এবং কিছু পাথর পার্শ্ববর্তী রাজবল্লভপুরবাসীরা নিয়ে যান। পাশাপাশি গ্রামের লোকেরা আটচালা বানানোর কাজে লাগিয়েছেন।
   যতীন্দ্রনাথ পাল দেবমূর্তিটি পাওয়ার পর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দক্ষিণ দিকে শীলাবতী নদীর ধারে গঙ্গারাম পালের বাড়ির কাছে একটি বেলগাছের তলায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে একটি মেলা বসান যার নাম ‘নাককাটির মেলা’। শীলাবতী নদী গর্ভে সে স্থান কবেই তলিয়ে গেছে। মূর্তিটি যাতে সংরক্ষিত থাকে তাই যতীন্দ্রনাথ পাল পরবর্তীকালে নিজের বাড়িতে
নিয়ে চলে আসেন। সেখানেই আছে মূর্তিটি। কিন্তু মেলাটি আজও চলে প্রতিবছর মাঘ মাসের ৩ এবং ৪ তারিখে সেই শীলাবতী নদীর ধারেই। পুরাতত্ত্ববিদরা এখানে এলে অনেক কিছুই পেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি ৭ ম পর্ব || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি 
৭ ম পর্ব॥
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


মেদিনীপুর যদি স্বাধীনতা যুদ্ধের পীঠভূমি হয় তবে এই জেলার গড়বেতা, চন্দ্রকোনাসহ এর উত্তরাঞ্চল এই স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্সনস্থল। কারণ এই উত্তরাঞ্চল থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিরাট গণবিদ্রোহ তথা গণ আন্দোলন যা ইতিহাসে ‘লায়কালি’ বা ‘নায়েক’ বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ইতিহাসবিদরা যাকে অনেকে বলেছেন ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’। ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির অব্যবহিত পরেই শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন এবং চলেছিল প্রায় ১৮২৩ সাল পর্যন্ত। ঐ সময় মেদিনীপুরের উত্তরাঞ্চলের তত্কাঅলীন বগড়ী পরগণা বা বগড়ী রাজ্যের গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, ক্ষীরপাই, রামজীবনপুর প্রভৃতি জায়গায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই লায়কালি বা নায়েক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। যার বহু নিদর্শন এবং অপূর্ব সব তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে এই এলাকার বিভিন্ন আনাচে-কানাচে ও এখানকার জঙ্গলে, বিশেষ করে মালবান্দির জঙ্গলে।
   স্থানীয় ইতিহাসের বক্তব্য ব্রিটিশ শাসকরা যখন তাদের শক্ত শিকড় প্রোথিত করতে চাইছে ভারতের বিভিন্ন শহর-নগর এবং গ্রাম-গঞ্জের আনাচে-কানাচে, ঠিক সেই সময়েই মেদিনীপুর জেলার উত্তরাঞ্চলে গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, ক্ষীরপাই, রামজীবনপুর প্রভৃতি স্থানে এখানকার তত্কা্লীন রাজা-মহারাজা থেকে শুরু করে চাষি, তাঁতি-জেলে-নায়েক- মাজি ইত্যাদি তথাকথিত নিম্নশ্রেণির লোকেরা তথা নিচু তলার মানুষেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘লায়েক বা নায়েক বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে। যার নেতৃত্ব দেন বগড়ীর তদানীন্তন রাজা ছত্রসিংহের প্রধান সেনাপতি অচল সিং এবং চন্দ্রকোনার নায়েক সর্দার যুগল ও কিশোর নামে দুই ভাই। এছাড়া সুবল, ফাগু প্রমুখ অসংখ্য নায়েক সর্দার এই বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তবে সর্বাধিনায়ক ছিলেন সেনাপতি অচল সিং।
   ইংরেজ কর্তৃক এই অঞ্চলের অধিবাসীদের উপর অমানুষিক অত্যাচার, নারীদের উপর দানবিক ও বর্বরোচিত নির্যাতন, তাদের চাষের জমিতে জোর করে তুঁত ও নীল চাষ করানো, ভূস্বামীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, জমির
খাজনাবৃদ্ধি, তন্তুবায় সম্প্রদায়ের জাতীয় বৃত্তির অধিকার খর্ব করা, এবং তাদের আঙুল কেটে নেওয়া ও জেলেদের মাছ ধরায় হস্তক্ষেপ ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদই ছিল এই নায়েক বিদ্রোহ।
   অচল সিং- এর নেতৃত্বে বগড়ী পরগণার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই নায়েক বিদ্রোহ দুর্বার আকার ধারণ করে। ইংরেজদের চলার গতি হয় শ্লথ। নায়েক বিদ্রোহীরা যত্রতত্র লুকিয়ে থেকে লালমুখো ইংরেজ সৈন্যদের একাকী যখনই পায় তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে। এইভাবে বহু ইংরেজ সৈন্য মারা যায়। ফলে ইংরেজরা প্রমাদ গুণে। নায়েক বিদ্রোহকে কীভাবে দমন করা যায় তার সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে থাকে তারা। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য এই অঞ্চলে আসে বিখ্যাত ইংরেজ সেনাধ্যক্ষ চার্লস রিচার্ডসন এবং মি. হেনরী। অনেক চক্রান্ত ও জাল বিস্তার করে অবশেষে বিদ্রোহীদের অনেককেই ধরে ফেলে তারা। ধরা পড়েন যুগল-কিশোর সহ বহুনায়েক সর্দার। ১৮১২ খৃষ্টাব্দে বর্তমান চন্দ্রকোনা থানার উত্তরদিকে ৬৮ নং মৌজা বসনছোড়ার অন্তর্গত ‘ফাঁসিডাঙ্গা’ নামক জায়গায় যুগল-কিশোরের ফাঁসি দেওয়া হয়। আর এইসব নায়েক সর্দারের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বলেই এই জায়গার নাম হয় ফাঁসিডাঙা।
   কথিত যুগল-কিশোর সহ প্রথম সারির নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য এখানে একটি ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। যার ধ্বংসাবশেষ আজও বর্তমান। আর এই মঞ্চেরই পাশে ছিল বিশাল এক বটগাছ। তারই তলায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে অসংখ্য নায়েক বিদ্রোহীদের কাউকে আগুনে পুড়িয়ে, কাউকে ডালকুত্তা দিয়ে খাইয়ে, কাউকে বুলেটের গুলিতে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়। আর বাকি নায়েক বীরদের ঐ বিশাল বটগাছের ডালে ডালে গলায় দড়ি দিয়ে টাঙিয়ে তাদের প্রাণবায়ু কেড়ে নেওয়া হয়। স্থানীয ইতিহাসের ভাষায় সে এক ভয়ঙ্কর-বীভত্সয় হত্যাকাণ্ড। কয়েক বত্স র আগে পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের নীরব সাক্ষী বটগাছটা ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। তা না থাক- আনন্দের কথা, চন্দ্রকোনা পুরসভা কয়েক বছর আগে নায়েক বীরদের স্মরণে এখানে একটি শহিদবেদি তৈরি করে দিয়েছেন।
   নায়েক বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাঁটি অর্থাত্‍ নায়েক শিবির গড়বেতার গনগনি ডাঙা ইংরেজ কর্তৃক ধ্বসপ্রাপ্ত হলে সর্বাধিনায়ক অচল সিং শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যান। জঙ্গলের ভিতরে হেথায়- হোথায় লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। অভুক্ত অবস্থায় ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ধরা পড়েন আরও তিরিশজন নেতার সাথে।  অচল সিংকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় মেদিনীপুরে। সেখানে পুরাতন জেলখানা সংলগ্ন মাঠ অর্থাত্‍ মারাঠা দুর্গে ইংরেজরা তাঁর ফাঁসি দেয়। এইভাবেই এক মর্মস্পর্শী ঘটনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সৈনিক এবং নায়েক বীরের মহান জীবন। দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য যাঁর অসাধারণ আত্মত্যাগ, দুরন্ত দেশপ্রেম এবং সংগ্রামী চেতনা গড়বেতার বুকে আজ এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে সম্প্রতি গড়বেতায় তৈরি হয়েছে ‘অচল সিং সস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গন’।

   এই নায়েক বা লায়কালি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দু’শো বছরেরও বেশি সময় আগে। তখন মেদিনীপুর জেলার উত্তরাঞ্চলের এই এলাকাটি ছিল গভীর জঙ্গলে ঢাকা। বগড়ী থেকে শুরু করে গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, ক্ষীরপাই পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল ঘন জঙ্গল। শাল-মহুয়া- কুড়চি- আটাং গাছে ভরা সে জঙ্গলের গভীরতা এত বেশি ছিল যে সাধারণ মানুষের ঢোকার সাহসই হ’ত না। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার ঘুরে বেড়াতো যত্র-তত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় অকুতোভয় নায়েক বীরেরা তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে শ্বাপদ সংকুল এই অরণ্যকেই বেছে নিয়েছিলেন। এছাড়া নিজেরা আত্মগোপন করে থাকার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে স্থানে নির্মাণ করেছিলেন গুপ্তঘাঁটি। যা ‘লায়কালি গড়’ নামে অভিহিত। এইসব গড়গুলিতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রও মজুত থাকতো।
 
   সেই দু’শো বছরেরও বেশি আগে ঘটে যাওয়া লায়কালি আমলের বহু নিদর্শন ও তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে গড়বেতা, বগড়ী, চন্দ্রকোনার বিভিন্ন অঞ্চলে। আগেই জানিয়েছি ফাঁসিডাঙার কথা, চন্দ্রকোনার অন্তর্গত এই স্থানে যুগল-কিশোর সহ অসংখ্য বীর নায়েকের ফাঁসি হয়েছিল। গড়বেতা- ১নং ব্লকের ১২ নং খড়কুশমা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন মালবান্দির জঙ্গলে যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে লায়কালি আমলের অসংখ্য অপূর্ব নিদর্শন। যা দেখলে সত্যিই অবাক না হয়ে থাকা যায় না।

সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃৃষ্টি~ ৬ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার


শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃৃষ্টি~ ৬
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

এর পরের দিন ২ মাঘ গড়বেতা শহর থেকে পনেরো কিলোমিটার এবং পাথরা থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে ১২ নম্বর খড়কুশমা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন এই মালবান্দি গ্রামে বিখ্যাত এক মেলা তা হোল ‘ভৈরবী মেলা’। এই  গ্রামের বুকেই মণ্ডলপাড়া এবং নায়েকপাড়ার মাঝখানে বিরাজ করছেন দেবী ভৈরবী। এই অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভৈরবী একজন ব নদেবী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে পূজিতা হয়ে আসছেন। দেবী খুব জাগ্রত। বহুদূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে দেবীর মাহাত্ম্য। প্রতিদিনই এর নিত্যসেবা হয়ে থাকে। তবে পূজা সাধারণত কোনও কুলীন ব্রাহ্মণ বা ভট্টাচার্য করেন না। পূজা করেন এখানকার লায়েক বা নায়েক সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় দু’শো বছরেরও আগে
এই এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল ‘নায়েক’ বা ‘লায়কালি বিদ্রোহ’। অনুমান করা হচ্ছে এই নায়েক সম্প্রদায়ের মানুষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই বনদেবী ভৈরবীর আবাহন করেছিলেন। আর তখন থেকেই এই দেবীর আরাধনা ও পূজা হয়ে আসছে।
   দেবীর মাহাত্ম্য এতটাই বিখ্যাত যে স্থানীয় মানুষ তো বটেই আশ-পাশের বহু গ্রামের মানুষ দেবীকে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্য করে থাকেন। স্বামী-সংসার-সন্তানদের মঙ্গল কামনায় এলাকার মানুষ এখানে পূজা দিতে আসেন নৈবেদ্য সাজিয়ে। ছেলেমেয়েরা যাতে পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করে, ভালো ফল করে, গর্ভবতী মেয়ে-বৌমারা যাতে ভালোভাবে সন্তান প্রসব করতে পারে – তারই আশীর্বাদ প্রার্থনা করে পুজো দিয়ে যান পুণ্যার্থীরা। আবার কারও জিনিস চুরি বা খোয়া গেলেও তা ফিরে পাবার প্রত্যাশাতেও অনেকে পুজো দিয়ে যান। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় – আশেপাশের যত গ্রাম আছে – গাইগরুর বাছুর হলে একুশদিন বা একমাস পর এক ঘটি দুধ দেবীর নামে উত্সীর্গ করে যান প্রায় প্রতিটি পরিবারই। যার ফলে পরিবারের বয়স্ক বা বয়স্কাদের কেউ না কেউ এই দেবী ভৈরবীকে দুধ না খাওয়ানো পর্যন্ত নিজেও ততদিন খান না সেই গরুর দুধ।
   এখানে এই মালবান্দি গ্রামে দেবীর পূজা প্রতিদিনও হলেও বছরের যে দিনটিতে খুবই সাড়ম্বরে এবং জাঁকজমকভাবে পূজা দেওয়া হয় তা হোল ২ রা মাঘ। মকর সংক্রান্তির পর এই ২ রা মাঘ এলাকায় একটি বিশেষ দিন। কারণ এই দিনই দেবী ভৈরবীর পূজাকে কেন্দ্র করে বিরাট একটি মেলা বসে। যে মেলার নাম ‘ভৈরবী মেলা’। এই মেলার খ্যাতি বহু দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। মালবান্দি গ্রামের যে একটি বিশেষ পরিচিতি ঘটেছে তা এই ভৈরবী মেলাকে কেন্দ্র করেই।
   মেলাটি একদিনের। সকালে শুরু – সন্ধে দশটার মধ্যেই শেষ। এই সময়ের মধ্যে বহু মানুষের সমাগম ঘটে এদিন। বিকেলের দিকে ভিড় তো একেবারে উপচে পড়ে। অসংখ্য-অজস্র মানুষের সমাগমে সারা মেলা প্রাঙ্গণ সরগরম হয়ে উঠে। মেলাতে যারা আসে তারা মাটির কালো ঘোড়া এবং চিনি দিয়ে দেবীকে প্রণাম করে। বছরের পর বছর কালো ঘোড়া জমতে জমতে একেবারে স্তূপ হয়ে গেছে। দূ’পাশে লম্বালম্বিভাবে সে কালো ঘোড়ার পাহাড়। দেবীকে দেখতে তাই অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো জায়গা পেরিয়ে যেতে হয়। সারা বিকেল এবং সন্ধে যে মেলায় অজস্র লোকের উপস্থিতি – রাত দশটার দিকে তা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়।
   জনশ্রুতি – রাত্রে এখানে কারুরই থাকার নিয়ম নেই। কারণ বনদেবী ভৈরবী নাকি বাঘের রূপ পরিগ্রহ করে এখানে আসেন। কথাটার সত্যতা কতখানি তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে যেটা মনে করা হয় তা হোল এই মেলার দিন দেবীর সামনে অসংখ্য ছাগবলি হোত। আগে এই এলাকাটি গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল। চারদিক ছিল ঘন ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। স্বাভাবিকভাবেই পূর্বে এখানে ছাগবলির গন্ধে নেকড়ে-টেকড়ে বা ঐ জাতীয় কিছু আসতেই পারে। হয়তো সে কারণেই তখন থেকে এই নিয়ম চালু হয়ে গেছে। তা যাই হোক – মেলার দিন রাত্রে আর এখানে কেউ থাকে না।
   বর্তমানে এই মেলার ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান। তবু এই মেলাকে ঘিরে আজও যে উত্সাএহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় তা মালবান্দি গ্রামবাসীর কাছে গর্বের বিষয় বৈকি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমাগম ঘটে এই মেলায়। সম্প্রীতি ও সদ্ভাব রক্ষায় এই মেলা তাই এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেছে। তাছাড়া দিন যাপনের গ্লানি-প্রাণধারণের ক্লান্তিকর অবসাদ ভুলে দূ’দণ্ডের জন্য হলেও অসংখ্য মানুষ যে একটুখানি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলার সুযোগ পান – সেখানেও রয়েছে মেলাটির সার্থকতা।

   ভৈরবী মেলা ছাড়াও শীলাবতী অববাহিকায় অবস্থিত মালবান্দি গ্রামটি আরও যে কারণে বিখ্যাত তা হল তার নীলকুঠি। ইংরেজরা যে সত্যিই একদিন এদেশে তাদের শক্ত শিকড় প্রোথিত করেছিল, একেবারে প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিস্তার করেছিল তাদের সাম্রাজ্যের জাল – মালবান্দি গ্রামে এলেই তা বোঝা যায়। তাদের তৈরি নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আজও তার সাক্ষ্য, প্রমাণ দেয়। 
   আজ যেখানে তৈরি হয়েছে মালবান্দি আশুতোষ বিদ্যামন্দির অর্থাত্‍ মালবান্দি হাইস্কুল তা এককালে ছিল ইংরেজদের নীলকুঠি। নীলকুঠিরই একাংশের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তার ভিতের উপরই গড়ে তোলা হয়েছে এই হাইস্কুল। সত্তর দশকের শেষের দিকে আমি এই হাইস্কুলেরই একজন ছাত্র ছিলাম। সেই সুবাদে ইংরেজদের তৈরি এই নীলকুঠিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার বা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় দু’শো মিটার লম্বা এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায়
দেড়শো মিটার চওড়া – এই জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছিল এই নীলকুঠি। চারদিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের ভিতর ছিল বিশাল বিশাল বিল্ডিংগুলি। বিল্ডিং নির্মানের কৌশল এবং তার কারুকার্য দেখলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হবেই।
   দক্ষিণদিকে লম্বালম্বি বিরাট এক বিল্ডিং। চোখ রাখলেই দেখা যাবে এই বিল্ডিং-এ ছিল অসংখ্য কক্ষ। কক্ষগুলির সামনের হলটি দালান কোঠার অপরূপ কারুকার্য। পূর্বদিকে একটি বিল্ডিং – আর একটি বিল্ডিং ছিল পশ্চিম প্রান্তে। পশ্চিম প্রান্তের এই বিল্ডিংটিকে ভেঙে পরে পঠন-পাঠনের জন্য একটি বড়ো শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। পূর্বপ্রান্তের বিল্ডিংটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। তবে ভাঙাচোরা অবস্থায়। দেওয়ালের ভিতর শিকড় চালিয়েছে বেশ কিছু গাছ। ফলে বিশাল বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণদিকের বিল্ডিং-এর পিছন দিকে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল উঁচু গম্বুজ। যা এখন সাপ,পেঁচা আর চামচিকেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ভিতরের ধাপগুলি দেখে বোঝা যায় এই গম্বুজের ভিতর দিয়ে একদিন ওঠানামা করা যেত।
   পশ্চিমপ্রান্তের বিল্ডিংটির সামান্য উত্তরে ছিল বিরাট আকারের একটি কুয়ো। ছাত্রাবস্থায় ওয়ার্ক-এডুকেশনের কাজ করতে গিয়ে নীলকুঠিরই ভাঙা ইঁট, নুড়ি, পাথর, চুন-সুরকির টুকরো কুড়িয়ে কুড়িয়ে সেই গর্ত বুজিয়েছি। বড়োরা ভয় দেখিয়ে বলত- ওটা কুয়ো ছিল না, ওটা ছিল মানুষ মারার গর্ত। যেসব চাষিরা নীল এবং তুঁত চাষ করতে রাজি হোত না তাদের নীলকর সাহেবরা ধরে এনে অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন করত। অত্যাচার সইতে না পেরে যারা মারা যেত তাদের এই গর্তে ফেলে দেওয়া হোত। এর সত্যতা কতটুকু তা বলবে ইতিহাস। কিন্তু আমরা এইসব কাহিনি শুনতে শুনতে সত্যিই ভয়ে শিউরে উঠতাম। কী জানি, হয়তো হবেও বা – কারণ নীলকর সাহেবরা তো কম অত্যাচারী ছিল না। তাদের নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা তো ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়ানো। অনুরূপ নীলকুঠির সন্ধান মেলে মালবান্দি গ্রাম থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তরে শীলাবতী নদী ও খালের ওপাশে চমকাইতলায়। যেখানে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাদড়া আশুতোষ বিভাবরী বিদ্যামন্দির। চমকাইতলাতে নীলকুঠি ছাড়াও আছে চমত্কালরিনী দেবী। এই চমত্কা কারিনী দেবী থাকার জন্য এই জায়গার নাম হয়েছে চমকাইতলা। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যে চমকাইতলা নামটি একদিন সারা বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। তা যাই হোক শীলাবতী অববাহিকায় একসময় যে ব্যাপক নীল চাষ হোত, নীলকর সাহেবদের দমন-পীড়ন নীতি চরমে উঠেছিল, এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা নীলকুঠি ও  তার ধ্বংসাবশেষ এই প্রমাণ দেয়। আর যার ফলেই এই অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল ‘নায়েক বিদ্রোহ’ বা ‘লায়কালি বিদ্রোহ’।

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
৫||

শীলাবতী অববাহিকা কৃষির দিক দিয়ে যেমন বেশ উন্নত, তেমনি সংস্কৃতির দিক দিয়েও খুব একটা পিছিয়ে নেই। বিভিন্ন জনজাতির স্ব স্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন আছে, তেমনি আছে বিভিন্ন সর্বজনীন অনুষ্ঠান। শীলাবতী তীরবর্তী বিভিন্ন রাজবাড়ির দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানের কথা আগেই বলেছি। যে অনুষ্ঠানটি শীলাবতী অববাহিকাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে তা হল এখানকার হিন্দু জনজাতির টুসু পরব বা মকর সংক্রান্তির উত্সনব। নবান্ন উত্সাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মকরসংক্রান্তির উত্সনব এলাকার মানুষের যেন আত্মার উত্সতব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যেন তাদের প্রাণের উত্স ব। মাটির একেবারে কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ অর্থাত্‍ যাদেরকে আমরা বলে থাকি তথাকথিত অনুন্নত ও অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ, কিংবা চিহ্নিত করে থাকি ধুলো-মাটির না হয় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ বলে – তাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় উৎসব ৷
এই মকর সংক্রান্তির উত্সধব। অনেকে একে পৌষ সংক্রান্তির উত্সাব বা পৌষ পার্বণও বলে থাকেন। যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন – এই উত্স বকে ঘিরে এই অববাহিকার পল্লীবাংলার প্রতিটি পরিবারে মানুষদের মধ্যে যে বিপুল
আনন্দ, উত্সা্হ ও উদ্দীপনা দেখগা যায় তা আর অন্য কোনো উত্সাবে দেখা যায় না। এমনকি বাঙালির শ্রেষ্ঠ উত্সেব শারদীয় উত্সকবেও না। এ সময় এখানকার ঘরে ঘরে বয়ে যায় এক অনাবিল আনন্দের জোয়ার।
   মাঠে মাঠে পাকা সোনালি ধান। সে ধান ঘরে আসে। ভরে উঠে ধানের যত গোলা। অন্নের অভাব তখন নেই ঘরে। তাই তো মানুষ এ সময় প্রাণের আনন্দে নেচে উঠে। মকর সংক্রান্তির মহাপর্বটা পৌষ মাসের শেষ এবং মাঘ মাসের প্রথম দু’একদিনের মধ্যে চলতে থাকলেও তার শুরু কিন্তু এক মাস আগে থেকে। অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন অর্থাত্‍ সংক্রান্তির দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় পৌষ সংক্রান্তির জন্য দিন গোনা। বাঁকুড়া জেলার সিমলাপাল, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা, চন্দ্রকোণা, ঘাটাল এলাকার বিভিন্ন ব্লকে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন থেকেই উত্সীব শুরু হয়ে যায়। এই দিন গোধূলি বেলায় গাঁয়ে-ঘরের মেয়েরা বিশেষ করে ছোট ছোট মেয়েরা মাঠ থেকে কাটা ধান গাছের তিনটি গোড়া তুলে আনে। সেটাকে সারা রাত জাগিয়ে রেখে পরের দিন একটি আল্পনা আঁকা ও প্রদীপ বসানো মালসায় তা তুলে পুজো করে। এটিকে বলা হয় ‘তুসু’ বা ‘টুসু’ ঠাকুর। বাড়ির বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা আর অনুন্নত সম্প্রদায়ের ঘরে বাড়ির বৌয়েরা পর্যন্ত বেশ সুর করে গান ধরে এই টুসুর পুজো করে। নানারকম বৈচিত্র্যময় সে সুর। এলাকায় প্রচলিত কয়েকটি টুসু গানের নমুনা –
(এক) ‘এ চালে পুঁই ও চালে পুঁই/পুঁয়ে ধরল মিচুড়ি-পুঁয়ে ধরল মিচুড়ি/রাত দুপুরে খবর এল মরল টুসুর শাশুড়ি – মরল টুসুর শাশুড়ি। / মরে গেছে ভালোই হয়েছে/চন্দন কাটে পুড়াবো – চন্দন কাটে পুড়াবো। চন্দন কাঠে না পুড়িয়ে /গঙ্গার জলে ভাসাব – গঙ্গার জলে ভাসাব।’
(দুই) ‘আমার টুসু লাইতে(নাইতে) যাবে/ জোড়া শঙ্খ বাজিয়ে – জোড়া শঙ্খ বাজিয়ে।’   
   পুরো একটি মাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় ধূপ-ধুনো জ্বেলে এই টুসুর পুজো চলে। পূজা শেষে শাঁখ বাজানো হয়। এই টুসু পুজোর সাথে সাথে প্রতি হিন্দু বাড়িতেই এই সময়েই প্রতি বৃহস্পতিবার বারলক্ষ্মীর পূজা করা হয়। একটি থালাতে কিছু ধান দিয়ে তার উপর একটি ঘটি বা গ্লাস রাখা হয়। ঘটির ভিতরে থাকে জলসহ দুর্বা ঘাস। প্রতি বৃহস্পতিবার পুরোহিত এসে এই লক্ষ্মীর পূজা করে যায়।
   পৌষ মাসের শেষদিন মকর সংক্রান্তি। এর দিন পনেরো-কুড়ি আগে থেকেই ঘরে ঘরে পড়ে যায় মহাধুম। বাড়িতে বাড়িতে নতুন নতুন পোশাক-আশাক কেনার তোড়জোড় পড়ে যায়। মকর সংক্রান্তির ভোরে স্নান করে নতুন পোশাক পড়তে হবে এটা যেন একটা রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে। মকর সংক্রান্তি মানেই তো পিঠে-পুলির উত্সহব। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের বাড়িতে পিঠে-পুলির আয়োজন করা হয়। স্থানীয ভাষায় একে ‘পুরপিঠে’ বলা হয়। কপি, মসুর ডাল, আলু, নারকেল, তিল, পোস্ত, দুধের চাঁছি ইত্যাদি দিয়ে সে হরেক রকমের পুরপিঠে। দু’দিন আগে থেকেই পাড়ার ঢেঁকিতে ঢেঁকিতে পড়ে যায় চালের গুড়ি কোটার পালা। সারাদিন-রাত-ভোর পল্লীবাংলার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয় এই ঢেঁকির শব্দ। এই সময় এখানকার যে কোনো গ্রামে যে কেউ ঢুকলেই বুঝতে পারবে গ্রাম-গঞ্জ কিভাবে নবান্ন উত্সনবে মেতে উঠেছে। অবশ্য ঢেঁকির চল ধীরে ধীরে কমে আসছে।
   ঘরের বৌ-ঝিয়েদের তো এই সময়ে হাজারো ব্যস্ততা। এতটুকু সময় থাকে না অবসর নেওয়ার মতো। নতুন ধান উঠছে বাড়িতে। সেই ধান সেদ্ধর পালা শুরু হয়। গাঁয়ের ধান ভাঙানো কলগুলিতে প্রচুর ভিড় পড়ে এজন্য। মকর সংক্রান্তির আগের দিন সন্ধেবেলা তৈরি করা হয় নতুন চালের পিঠে-পুলি। নানা রকমের পিঠে। একদিকে বৌয়েরা-গিন্নীরা পিঠে তৈরিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে বাচ্চা মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের টুসুকে পূজা করার জন্য। এই দিন সারা রাত ধরে প্রহরে প্রহরে চলে এই পূজা। অধিকাংশ পাড়াতেই আজ আর খালিমুখে টুসুর গান গাওয়া হয় না। মাইক ব্যবহার করে এই গান করে।
   সারারাত জেগে টুসুর গান গেয়ে পূজা করে । ভোরবেলা থেকেই শুরু হয়ে যায় তা জলে ভাসানোর তোড়জোড়। এদিন সকাল থেকেই শীলাবতী নদীর ঘাটে ঘাটে পড়ে যায় সব বয়সী মানুষের স্নান করার ধুম। মেয়েরা একটু দেরিতে স্নান করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্নান করেই পরিধান করে সদ্য কিনে আনা নতুন জামা-প্যান্ট-চুড়িদার-পাজামা। বড়ো বড়ো মেয়েরা এবং ঘরের বৌয়েরা পড়ে নতুন কাপড়। থরে থরে নদীর স্রোতে ভেসে যায় টুসুর পাদপদ্মে অর্পিত হরেক রকমের ফুল।

   স্নান করে এসেই বাড়িতে শীতের রোদ গায়ে মেখে শুরু হয় পিঠে-পুলি খাওয়ার পর্ব। শীতের মিঠে রোদ নিতে নিতে মেয়েরা তাদের চুল খুলে দিয়ে খেতে শুরু করে। খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অনেক জায়গায় বনভোজনে মেতে উঠে। কিশোর-যুবকরা ক্রিকেট, ভলিবল নিয়ে মাঠে ছুটে যায়। বাড়ির গিন্নীরা ব্যস্ত হয় বারলক্ষ্মীর
পূজার আয়োজন করতে। প্রতি বাড়িতে পুরোহিত এসে এই লক্ষ্মীর পূজা করে যায়। পূজা বলতে একটি ‘ধানের আঁটিকে’ লক্ষ্মী হিসাবে ধরা হয়। পুরোহিত সেই ধানের আঁটিকে পূজা করে খড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে যায়। এও আর এক মজার জিনিস। পুরোহিত যে ধানের আঁটিটিকে পুজো করে যায় সেখানে থাকে তিনটি গোবর সারের ডেলা এবং গাড়ুতে জল। সন্ধের পর শিয়াল ডেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির যে কেউ ঐ পূজা করা গোবর ও জল নিয়ে সাতপাক ঘুরে কেউ বা তিন পাক ঘুরে একেবারে ঘরের ভিতরে গিয়ে রেখে প্রণাম করে। একে বলা হয় ‘সার ধরা’। তখন প্রতি বাড়িতে বেজে ওঠে শাঁখ। অবশ্য কিছু কিছু সম্প্রদায় তার পরের দিন এই সার ধরে। মাহিষ্য এবং সদগোপ ক্ষেত্রবিশেষে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শিয়ালের ডাককে হিন্দুরা খুবই পবিত্র এবং শুভ জিনিস বলে মনে করে। সেইজন্য অনেকে এই সারামাস শিয়ালের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করে না। মকর দিন রাত্রেও পিঠেপুলির আয়োজন করা হয়। পিঠে তৈরির শেষে সর্বত্র ‘বাওনি বাঁধা’ হয়। খড়ের ছোট ছোট বিচুলি করে তাতে ফুল দিয়ে গোয়াল ঘরে, ধানের মরাই-এ, ধানের পালুই-এ, ঘরের পুরোনো হাঁড়িতে, পিঠের হাঁড়িতে এবং অন্যান্য নানা পবিত্র স্থানে এই বাওনি বাঁধা হয়। একে বলে বাওনি বাঁধা।
   মকর স্নান শেষ হলেই যে এই উত্স বের পরিসমাপ্তি ঘটে যায় তা নয়। পরের মাঘ মাসের প্রথম কোটা দিন তো হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র দিন। যত যেখানে দেব-দেবতা-ঠাকুর আছে তার পূজা দেওয়া হয় এই সময়। এই হচ্ছে একটা সময় যখন প্রতি দেব-দেবতা বছরে একবার হলেও পূজা পূজা পায়। তবে বেশির ভাগই বনদেবতা বা বনদেবী। নামও সব অদ্ভুত ধরনের। কারও নাম বাঁশদেবতা, কেউ বাসকাসিনি, কেউ পাথরাসিনি, কেউ ভৈরবী ইত্যাদি সব নাম। সারা বছর পূজা হয় না বলে এইসব দেবতার স্থানগুলো জঙ্গলে ভরে যায়, ঝোপে-ঝাড়ে ঢেকে যায়। মকর সংক্রান্তির এই সময় স্থানগুলো পরিষ্কার করে সেখানে ন্যাতা-ঝাঁটা দিয়ে পূজা করা হয়। বেশির ভাগ স্থানেই এজন্য দেওয়া হয় ছোট ছোট মাটির ঘোড়া ও হাতি। গড়বেতা, চন্দ্রকোণা এবং ঘাটাল ব্লকের প্রায় প্রতি গ্রামেই এই সব দেব-দেবতাদের স্থান। অনেক দেবতার স্থানে এই উপলক্ষে মেলা বসে। তার মধ্যে মালবান্দির, ভৈরবী মেলা, পাথরার পাথরাসিনি মেলা, ভেদুয়া গ্রামে ভেদোসিনির মেলা, গড়বেড়িয়ার নাককাটি মেলা, শ্যামানন্দপুরের দোমহনির মেলা ইত্যাদি।
 
   দোমহনির মেলাটি বসে মকরসংক্রান্তির সকালে খোদ শীলাবতীর চরে। শীলাবতী নদীটি যেখানে দুভাগে ভাগ হয়েছে সেখানে বিরাট এক বালুচর আছে সেই চরে মেলাটি হয়। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ মকর স্নান করতে আসে। সেই উপলক্ষে মেলাটি বসে। বেলা বারোটার মধ্যেই মেলা শেষ। স্নান সেরে সবাই বাড়ি ফিরে যায়, মেলাও শেষ হয়ে যায়। তবে সেই মেলার আর ঐতিহ্য নেই বললেই চলে। পরেরদিন অর্থাত্‍ ১ মাঘ দোমহনির থেকে সামান্য দূরে পাথরাতে বসে পাথরাসিনির মেলা। শীলাবতীর তীরেই তবে ডাঙাতে এই মেলাটি বসে। একসময় এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। নেকড়ে ইত্যাদি ঘোরাঘুরি করত। সামনে লোকালয় ছিল না। দূর থেকে লোকজন এসে পাথরাসিনির পুজো দিত। এখন এই বনদেবীর সামনে জঙ্গল নেই, লোকালয় গড়ে উঠেছে। ১৯৭৮ সালের বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় শিমুলিয়া ও আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন উঠে গিয়ে পাথরাতে বসবাস করছে। পাথরাসিনিকে নিয়েও এখানে লোকশ্রুতি আছে। অনেক পাথরের সঙ্গে এখানে গরুর গাড়ির চাকার মতো দুটি বিশাল আকারের পাথর আছে। একে অন্যের উপর জড়িয়ে। জনশ্রুতি আছে, পাথরের চাকা দুটি একে অন্যকে ছুঁয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে শীলাবতীর জলে নামতে যাচ্ছিল। সামনেই কয়েকজন রাখাল বালক গরু চরাচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন দেখতে পায় ওই পাথরের চাকা দুটি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে নদীর জলের দিকে। সাহসী সেই রাখাল বালক ছুটে এসে সেই পাথরদুটির উপর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে দেয়। কী আশ্চর্য! প্রস্রাব করার সঙ্গে সঙ্গেই গড়িয়ে যাওয়া পাথরদুটি নিশ্চল হয়ে পড়ে। যে অবস্থায় যাচ্ছিল সেই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে যায়। সেই পাথর দুটি আজও বিদ্যমান। তখন থেকেই পাথরাসিনির পুজোর চল হয়েছে বলে ধারণা।

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি~ ৫ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি~ ৫
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

আমার নিজের গ্রাম রাজবল্লভপুর সহ বৃকভানুপুর, কিশোরপুর, গড়বেড়িয়া, এলনা, লাউমারা, রঘুনাথপুর, বড়াই, দেওয়ান, কালিন্দীপুর, পাঁচামি, নিত্যানন্দপুর, চৈতন্যপুর, ধর্মপোতা ইত্যাদি গ্রামগুলি এই শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী স্থানে অর্থাত্‍ বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাকালে এই গ্রামগুলির মানুষজনের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। প্রায় বছরই শীলাবতীর বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়ে গ্রামগুলি। বাইরের সঙ্গে তখন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এলাকাগুলি। যাতায়াতের একমাত্র যোগাযোগ তখন নৌকা। বন্যাতে প্রায় প্রতি বছরই এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ১৯৭৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার কথা ভাবলে তো শিউরে উঠতে হয়। সেবার শীলাবতীর বিধ্বংসী বন্যায় সে যে কী ক্ষতি হয়েছিল তা এককথায় অবর্ণনীয়।
কাঁচা মাটির বাড়ি একটিও ছিল না সেবার। সব বন্যার জলে তলিয়ে গিয়েছিল। কত নিরীহ গবাদি পশুর যে প্রাণহানি ঘটেছিল তার ইয়ত্তা নেই। বিঘার পর বিঘা চাষযোগ্য জমি সেই বন্যাতে বালিচাপা পড়ে গিয়েছিল। তার রেশ এখনো এত বছর পরেও এলাকার মানুষজনকে বহন করে বেড়াতে হচ্ছে। ১৯৭৮ সাল। তখন এই প্রবন্ধকারের বয়স ছিল ১৩ বছর। ক্লাস এইটের ছাত্র ছিলাম। সচোক্ষে দেখেছিলাম সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যার মারাত্মক রূপ। মনে পড়ছে সেই বন্যার সময় আমাদের পরিবারকেও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র উঁচু ভিটায়
গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। প্রায় এক মাস অন্যত্র বসবাস করতে হয়েছিল। শুধু আমাদের নয় এরকম দুর্ভোগ অসংখ্য মানুষকে পোয়াতে হয়েছিল। এখনো পোয়াতে হয়। এমনিতেই শীলাবতী বেশ শান্ত, ধীর। কিন্তু বর্ষার জল পেলেই সে ফুলে ফেঁপে উঠে। ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলিতে। আমরা প্রতি বছরই ঘাটালে যে বন্যার কথা শুনি, শুনি ঘাটাল বন্যায় ভেসে গেছে তা এই শীলাবতী নদীর জন্যই।
   একসময় শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী গ্রামগুলিতে রাস্তাঘাট বলতে কিছু ছিল না। হাঁটু অব্দি, কোথাও কোমর অব্দি কাদায় ভরাট থাকত। মোটর বাইক তো দূরের কথা সাধারণ বাই সাইকেল পর্যন্ত নিয়ে যাতায়াত করা যেত না প্রায় অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত। এখন রাস্তাঘাটগুলির অনেক উন্নতি ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের মানুষই যে যার এলাকায় সারাবছর নদী পারাপার হওয়ার জন্য বাঁশের সেতু বানিয়েছে। কিন্তু বর্ষাকালে সে সেতু আর থাকে না। বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। বন্যার জল সরে গেলে গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে আবার সে সেতু বানায়। সারা বছর ভাঙাগড়ার খেলা চলে। ভাঙাগড়ার অনন্য নজির বোধহয় এই এলাকাতেই আছে।
 
 
   যাইহোক শীলাবতী নদী তীরবর্তী জমিগুলি বেশ পেলব এবং উর্বর। যার ফলে নদীর দুধারের জমিগুলিতেই ব্যাপক চাষবাস হয়ে থাকে। ধান, আলু গম, তিল সর্ষে, মটর, মুগ ইত্যাদির রমরমা চাষ এখানে। আর হয়ে থাকে ব্যাপক শাক-সবজি ও কাঁচা আনাজপতির চাষ। কপি, বেগুন, মূলো, পালং, করলা, উচ্ছে, বরবটি, সিম, ওল, কচু, তরমুজ, কুঁদরি, পটল ইত্যাদি। কী চাষ নেই এখানে? সব চাষ হয়ে থাকে শীলাবতীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। আর সেসব বাজারজাত করার জন্য যত্রতত্র গড়ে উঠেছে সবজিবাজার। এখান থেকে প্রচুর শাকসবজি কলকাতা হয়ে অন্যত্র দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছে। এই কাঁচা আনাজপাতির চাষবাস করে এলাকার অনেকেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। তবে বর্তমানে এখানে অর্থনৈতিক কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে মূলত আলু চাষের উপর। শীলাবতীর অববাহিকা জুড়ে আলুর ব্যাপক চাষ। টন টন আলু এখানে উত্পমন্ন হয়। তা সংরক্ষনের জন্য গড়বেতা, হুমগড়, গোয়ালতোড়, চন্দ্রকোণা, ঘাটাল, আরামবাগ প্রভৃতি এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হিমঘর। আলু চাষ হওয়ার জন্য এই সব এলাকায় অনেকেই আলু ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। গড়ে উঠেছে আলু ব্যবসায়ী সমিতি। তাই যে বছর আলুর দাম থাকে সে বছর এলাকার চাষিদের মুখে আনন্দের সীমা পরিসীমা থাকে না, কিন্তু যে বছর আলুর দাম ঠিকমতো থাকে না সে বছর চাষিদের মাথায় হাত পড়ে যায়। আলু চাষের পাশাপাশি ধান চাষও হয়ে থাকে প্রচুর। আউশ, আমন এবং বোরো এই তিন রকমেরই ধান চাষ হয়ে থাকে বিভিন্ন এলাকায়। বর্ষাকালে যেহেতু ঘাটাল এলাকাটি শীলাবতীর জলে ডুবে থাকতো তাই এখানে বর্ষাকালে তেমন ধান চাষ হোত না, হোত বোরো চাষ। যা শীতের মরশুমে হয়। তবে ইদানিং বন্যার প্রকোপ কিছুটা কম হওয়ার এই এলাকাতেও আমন ধানের চাষ হচ্ছে।
  একসময় শীলাবতীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আখ এবং পাট চাষ হোত প্রচুর। জমির পর জমি আখ চাষ হোত। বছর শেষে শাল বসত, গুড় তৈরি হোত। কিন্তু সেসব আজ ইতিহাস। আলু চাষ এসে যাওয়ায় আখ ও পাটের চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। একবছর তো আর একটা চাষের জন্য একটা জমিকে ফেলে রাখা যায় না। আলু চাষ আসায় আর একটা সুবিধা হল, জমিগুলো প্রায় তিনফসলি হয়ে গেল। যার ফলে এখনকার বেশির ভাগ জমিই তিনফসলি, কোনো কোনো জমি দোফসলি। একফসলি জমি আর নেই বললেই চলে।

সোমবার, ২২ জুন, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃষ্টি ৪ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

৪ ||

শীলাবতী নদী অববাহিকার হুমগড় এলাকার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-এলাকায় 'রামাইত গোস্বামী'দের বসবাস।বাঁকুড়ার মতো পশ্চিম মেদিনীপুরেও উৎকল ব্রাহ্মণ শ্রেণির বসবাস রয়েছে। এই উত্কবল ব্রাহ্মণ সমাজ সাধারণত উড়িষ্যার অধিবাসী। কিন্তু এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল ব্যাপী তাদের বসবাস কেন বিষয়টি
গবেষণা সাপেক্ষ। এই উচ্চ সংস্কৃতির সমাজ ছাড়াও দীর্ঘকাল ব্যাপী অনার্য অন্ত্যজশ্রেণির লোকেরাও এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল বসবাস করে এসেছে। সাঁওতাল, মাহালি, ভূমিজ প্রভৃতি আদিবাসী জনজাতি যেমন আছে তেমনই বাউরি, বাগতি, ডোম প্রভৃতি জাতি গোষ্ঠীর মানুষ তাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি নিয়ে বিদ্যমান। তাম্বুলি, সদগোপ, তিলি, গোপ, কৈবর্ত্য, ধীবর সম্প্রদায়ের মানুষও অনেক আছে। তবে সবচেয়ে একটা বড়ো সম্প্রদায় যারা আছে তারা হল মাহিষ্য সম্প্রদায়। কিছু গ্রাম আবার সম্পূর্ণ মুসলমান অধ্যুষিত। মায়তা, গড়বেতা, মাল্লা, কাঁকড়াশোল, পাটপুর, লক্ষ্যাটাপল, শিমুলিয়া, কুলডাঙ্গা, লোধা, জান্দা, বৃকভানুপুর, রাজবল্লভপুর, মালবান্দি, কিশোরপুর, গড়বেড়িয়া, বলদঘাটা, গোপালপুর, বিরাজপুর,
কেশেডাল,  রঘুনাথপুর, লাউমারা, খুড়শি, ধর্মপোতা, চৈতন্যপুর, নিত্যানন্দপুর, পলাশচাবড়ি, কড়াশিয়া প্রভৃতি গ্রামগুলি একেবারে শীলাবতী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। প্রায় সবগুলিই মাহিষ্য অধ্যুষিত গ্রাম। এলনা গ্রামে জেলে কৈবর্ত্যের বসবাস। গড়বেড়িয়া ও কিশোরপুর গ্রামে কিছু মানুষ কুম্ভকার সম্প্রদায়ের। আবার দেওয়ান, মহেশপুর, কল্লা গ্রামগুলিতে অধিক সংখ্যক জনগণ মুসলমান সম্প্রদায়ের। বড়াই গ্রামে সদগোপের পাশাপাশি ডোম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ আছে যারা বাঁশের নানারকম জিনিস যেমন-কুলো, ধামা, ধুচনি, ঝুড়ি তৈরি করে এবং তা বেচে জীবিকা নির্বাহ করে। শীলাবতীর তীরে অবস্থিত চন্দ্রপুর গ্রামে মানুষ আবার গোয়ালা সম্প্রদায়ের। চাঁড়ালিয়া এবং ঝাঁপুর এই দুটি গ্রামের মানুষ বাগদি সম্প্রদায়ের। আবার মালবান্দি গ্রামে মাহিষ্য সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি কয়েকঘর মাহালি সম্প্রদায়ের মানুষ আছে। এই মাহালিদেরও প্রধান জীবিকা বাঁশশিল্প। বাঁশ থেকে নানারকম জিনিস তৈরি করে তা কাছে-দূরের হাটে বেচে তা থেকে যা আয় হয় তাই দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করে।
   মঙ্গলাপোতা গ্রামের লাগোয়া একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম হল খড়কুশমা। এই খড়কুশমাতে মিশ্র জনজাতির বাস। প্রায় আধাআধি মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ, সদগোপ, তিলি, শুঁড়ি, ছুতোর, মৃতশিল্পী, কায়স্থ, কুম্ভকার, মাহিষ্য ইত্যাদি করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস।

   খড়কুশমা গ্রাম থেকে শীলাবতী নদীটি সোজা পূর্বদিকে বয়ে এসেছে। এখান থেকে  পাঁচ কিলোমিটার পর শিমুলিয়া গ্রামের কাছে নদীটি দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। যা   এই প্রবন্ধের লেখক অর্থাত্‍ আমার রাজবল্লভপুর গ্রাম থেকে দু’কিলোমিটার পশ্চিমে। জায়গাটিকে বলা হয় দোমোহনি, সংক্ষেপে দো’মনি। এই দো’মনিতেই শীলাবতী নদীটি বিভক্ত হয়েছে। এক ভাগ যথেষ্ট চওড়া এবং কিছুটা অগভীর হয়ে খানিকটা দক্ষিণমুখো এগিয়ে বিরাট একটা মোড় নিয়ে সোজা পূর্ব দিকে বেরিয়ে গেছে। আর অপরটি সামান্য উত্তরে বাঁক নিয়ে পড়ে সেটিও পূর্ব দিকে বয়ে গেছে। এটির চওড়া কিছুটা কম, কিন্তু গভীরতা বেশি। সারা বছরই এতে জল থাকে। প্রথমটিকে বলা হয় আসল শীলাবতী এবং উত্তর দিকে বয়ে যাওয়া স্রোতরেখাটিকে বলা হয় তার খাল। এটি এমনই বিধ্বংসী যে বলার নয়। শোনা যায় এটি আগে একটি সরু নালার মতো ছিল। এলাকার মানুষজন চাষবাসের জন্য সেচের জল যোগাতে এই নালাটি কেটেছিল। তাই এটিকে ‘কেঠে খাল’ বা ‘কেঠিয়া খাল’ বলা হয়। কালক্রমে এই কেঠে খালটিই আসল শীলাবতীকে হারিয়ে দিয়েছে। যাই হোক এই শীলাবতী এবং শীলাবতী নদীর বিধ্বংসী খাল বর্ষাকালে দু’টিই ভীষণ রূপ ধরণ করে। সে যে কী ভয়ঙ্কর রূপ তা না দেখলে বোঝা যাবে না। পলি মাটি মেশানো ঘোলা জল বুকে নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে যায় নিচের দিকে। যখন পাড় উপচে ছাপিয়ে যায় বন্যার জল তখন সাঁড়াশির মতো চেপে ধরে এখানকার গ্রামগুলিকে।

আমার নিজের গ্রাম রাজবল্লভপুর সহ বৃকভানুপুর, কিশোরপুর, গড়বেড়িয়া, এলনা, লাউমারা, রঘুনাথপুর, বড়াই, দেওয়ান, কালিন্দীপুর, পাঁচামি, নিত্যানন্দপুর, চৈতন্যপুর, ধর্মপোতা ইত্যাদি গ্রামগুলি এই শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী স্থানে অর্থাত্‍ বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাকালে এই গ্রামগুলির মানুষজনের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। প্রায় বছরই শীলাবতীর বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়ে গ্রামগুলি। বাইরের সঙ্গে তখন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এলাকাগুলি। যাতায়াতের একমাত্র যোগাযোগ তখন নৌকা। বন্যাতে প্রায় প্রতি বছরই এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ১৯৭৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার কথা ভাবলে তো শিউরে উঠতে হয়। সেবার শীলাবতীর বিধ্বংসী বন্যায় সে যে কী ক্ষতি হয়েছিল তা এককথায় অবর্ণনীয়। কাঁচা মাটির বাড়ি একটিও ছিল না সেবার। সব বন্যার জলে তলিয়ে গিয়েছিল। কত নিরীহ গবাদি পশুর যে প্রাণহানি ঘটেছিল তার ইয়ত্তা নেই। বিঘার পর বিঘা চাষযোগ্য জমি সেই বন্যাতে বালিচাপা পড়ে গিয়েছিল। তার রেশ এখনো এত বছর পরেও এলাকার মানুষজনকে বহন করে বেড়াতে হচ্ছে । ১৯৭৮ সাল। তখন এই প্রবন্ধকারের বয়স ছিল ১৩ বছর। ক্লাস এইটের ছাত্র ছিলাম। সচোক্ষে দেখেছিলাম সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যার মারাত্মক রূপ। মনে পড়ছে সেই বন্যার সময় আমাদের পরিবারকেও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র উঁচু ভিটায়
গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। প্রায় এক মাস অন্যত্র বসবাস করতে হয়েছিল। শুধু আমাদের নয় এরকম দুর্ভোগ অসংখ্য মানুষকে পোয়াতে হয়েছিল। এখনো পোয়াতে হয়। এমনিতেই শীলাবতী বেশ শান্ত, ধীর। কিন্তু বর্ষার জল পেলেই সে ফুলে ফেঁপে উঠে। ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলিতে। আমরা প্রতি বছরই ঘাটালে যে বন্যার কথা শুনি, শুনি ঘাটাল বন্যায় ভেসে গেছে তা এই শীলাবতী নদীর জন্যই।
   একসময় শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী গ্রামগুলিতে রাস্তাঘাট বলতে কিছু ছিল না। হাঁটু অব্দি, কোথাও কোমর অব্দি কাদায় ভরাট থাকত। মোটর বাইক তো দূরের কথা সাধারণ বাই সাইকেল পর্যন্ত নিয়ে যাতায়াত করা যেত না প্রায় অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত। এখন রাস্তাঘাটগুলির অনেক উন্নতি ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের মানুষই যে যার এলাকায় সারাবছর নদী পারাপার হওয়ার জন্য বাঁশের সেতু বানিয়েছে। কিন্তু বর্ষাকালে সে সেতু আর থাকে না। বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। বন্যার জল সরে গেলে গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে আবার সে সেতু বানায়। সারা বছর ভাঙাগড়ার খেলা চলে। ভাঙাগড়ার অনন্য নজির বোধহয় এই এলাকাতেই আছে।
 
 
   

সোমবার, ১৫ জুন, ২০২০

শীলাবতী নদীর অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি- ৩ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী নদীর অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি- ৩
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি



১৮০০-১৮২০ খ্রিস্টাব্দে গড়বেতা ও চন্দ্রকোনা এলাকায় যে নায়েক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তাতে যত্রতত্র লায়কালি গড় বা গুপ্তঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। এইসব গড় বা গুপ্তঘাঁটিগুলিতে নায়েক বিদ্রোহীরা থাকতো তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। কথিত গড়বেতার এই গনগনি ডাঙাতেই ছিল নায়েক বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাঁটি। যা ইংরেজরা বোমার আঘাতে ধ্বংস করে দেয়। শীলাবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই গনগনি খুলাতেই সম্প্রতি শুটিং হয়েছে জনপ্রিয় বাংলা সিরিয়াল ‘কিরণমালা’র অনেকখানি অংশ যা অনেক দর্শকই দেখেছেন বা এখনো দেখছেন। শীলাবতী অববাহিকা সেই দিক দিয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে।
   গড়বেতার গনগনিডাঙার কথা বললেই চলে আসে এখানকার দেবী সর্বমঙ্গলার কথা। শীলাবতীর তীরে গড়বেতাতে দেবী সর্বমঙ্গলা এখানে দীর্ঘদিন ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন। এখানকার দেবী খুবই জাগ্রত। এই পুজোকে ঘিরেও ছড়িয়ে আছে অজস্র লোককাহিনি যা গড়বেতার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত করেছে। এলাকার মানুষ দেবী সর্বমঙ্গলাকে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা করে থাকেন। শুধু এলাকার মানুষ নন, বহু দূর-দূরান্ত থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত ও পূণ্যার্থী ছুটে আসেন এই সর্বমঙ্গলার মন্দিরে। ভক্তিভরে দেবীর চরণে পুজো দেন তারা।
 
   গড়বেতা থেকে আট কিলোমিটার পূর্বে শীলাবতী নদীর তীরেই অবস্থান করছে মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি। ঐতিহ্যের দিক দিয়ে এটিও একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় এই মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি আসলে ছিল রাজাদের আমোদ-প্রমোদের বাগানবাড়ি। যা বগড়ীর রাজা ছত্রসিংহ নির্মাণ করেছিলেন। প্রচলন করেছিলেন দুর্গাপুজোর। যা মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো নামে পরিচিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এখানে যে ঘটটি আছে তা আসলে গড়বেতার সর্বমঙ্গলার আসল ঘট। যেটি রাজা ছত্রসিংহ নিয়ে চলে এসেছিলেন জোরপূর্বক। সেই দেবীর ঘট আর ফেরত যায়নি। সেই ঘট এখানে পুঁতে রাজবাহাদুর ছত্রসিংহ এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘট এখানে পোঁতা হয়েছিল বলেই এখানকার নাম হয়েছে মঙ্গলাপোতা।
    ইতিহাস অবশ্য অন্য কথাও বলে। মঙ্গলাপোতার এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন রাজা গজপতি সিংহ। যাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৩৯১-১৪২০ খ্রিস্টাব্দ। এই বংশের নবম রাজা যিনি ছিলেন তাঁর নামও রাজা ছত্রসিংহ। এই ছত্রসিংহের রাজত্বকাল ছিল ইং-১৬২২-১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দ। ইনিও মঙ্গলাপোতাতে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করতে পারেন। তা যাই শীলাবতী অববাহিকায় অবস্থিত এই মঙ্গলাপোতাতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রাজবাড়ির সে বনেদিয়ানা আজ আর নেই, নেই সে আভিজাত্যও। কালের গর্ভে রাজবাড়ি প্রায় ধ্বংসের মুখে। কিন্তু ঐতিহ্য হিসাবে রয়ে গেছে এখানকার পুজো। মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো খুবই বিখ্যাত। বহুদূরদূরান্তের মানুষ একসময় এই পুজো দেখতে ভিড় করতেন। এই পুজোকে ঘিরে মানুষের  উত্সারহ ও উদ্দীপনা আর আনন্দের শেষ ছিল না। এখানে ঘটস্থাপন করার ফলে দুর্গাপুজোর সময় যা কিছু হয় তা প্রথমে মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোতে হয়-তারপর এখানকার তোপধ্বনি শুনে গড়বেতাতে দেবী সর্বমঙ্গলার পুজো হয়, গড়বেতার সর্বমঙ্গলার পুজোর তোপধ্বনি শুনে গোয়ালতড়ে দেবী সনকা মায়ের পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় চারশো তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুর্গাপুজোর এই নিয়মবিধি চলে আসছে এখানে। যা ঐতিহ্যের পরম্পরাকে রক্ষা করছে। মঙ্গলাপোতা রাজবাড়িতে দেবী সর্বমঙ্গলার আসল ঘট থাকা ছাড়াও এখানে আছে রাজবাড়ির নানান ইতিহাস। যা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ। আছে রাজবাড়ির ভগ্ন দেউল, লায়কলি আমলের তৈরি সুড়ঙ্গ অর্থাত্‍ লায়কালি গড়। আছে সেই তরবারি যে তরবারি দিয়ে রাজা সামসের জং বাহাদুর খয়ের মল্লকে পরাজিত করে রাজবাড়ি পুনরুদ্ধার করেন। আছে দেবী সর্বমঙ্গলার ঐতিহাসিক ঘট, কালীবুড়ি এবং রাধাকান্ত জিউ। ১৯৮০ সালে এই রাজবাড়ির অদূরেই জঙ্গল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল যশোবন্ত সিংহের নাম খোদাই করা তিনটি কামান। দু’টি ব্রোঞ্জের, এবং একটি লোহার। পরে তা কলকাতার প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে।                         
 
   শীলাবতী নদীর অববাহিকার হুমগড় এলাকার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-এলাকায় ‘রামাইত গোস্বামী’দের বসবাস। অনেকগুলি পরিবার এখানে রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় তারা মহারাষ্ট্র থেকে বাংলায় এসে বসবাস করে। আমরা সচরাচর যেটা জানি তা হল ‘গোস্বামী’ পদবী নামধারীরা সাধারণত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকেন। কিন্তু এখানকার হুমগড় এলাকার গোস্বামীরা রামের উপাসক বা রামের ভক্ত। আর রামের উপাসক বলেই এখানকার



সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার


শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

২)

 শীলাবতীর নখ ও চুল গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গঙ্গায় মিলিত হবার জন্য বইতে শুরু করে দিয়েছে। এই সংবাদ শুনে পণ্ডা মূর্ছিত হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে এক কূপ গঙ্গাজল ছিল তা উল্টে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেও নদী হয়ে বইতে থাকে। সেই নদীই জয়পণ্ডা নামে পরিচিত”। 
   নিচের দিকে বইতে থাকে জয়পণ্ডা। কান্তোড় গ্রামের কাছে এসে শীলাবতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। মূলত এই হল শীলাবতী ও জয়পণ্ডা নদী দুটির সৃষ্টির কাহিনি। এই কাহিনিতে আমরা অসবর্ণ প্রেম ও বিবাহের উপাখ্যান পাই যা অনেকটা প্রাচীন জনজীবনের বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত।
   দ্বিতীয় আর একটি কাহিনি আছে যাতে অনেকটা মহাভারতীয় কচ ও দেবযানী উপাখ্যানের প্রভাব বিদ্যমান। এটি অমিয়বাবুর গেজেটিয়ারে বর্ণিত। কাহিনিটি এইরকম:-
   “জনৈক ঋষির আশ্রমে জয় নামে এক শিষ্য ছিল। জয় আশ্রমের বিদ্যা অর্জন করে পণ্ডিত হয়। তার নাম হয় জয়পণ্ডা বা জয় পণ্ডিত। ঋষি কন্যা শীলাবতীর ইন্দ্রমায়ায় পড়ে যায় জয় এবং তাকে বিবাহ করে নিয়ে যেতে চায়। শীলবতী তার অতি বৃদ্ধ পিতাকে অসহায় একা ফেলে যেতে রাজি ছিল না কিন্তু তত্সবত্ত্বেও জয় তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে নদী হয়ে বয়ে যায়। জয়পণ্ডাও তখন নদী হয়ে বয়ে গিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হয়।”
   এর সত্যাসত্য যাই থাক শীলাবতীকে ঘিরে এরকম অজস্র লোককাহিনি ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র।   
 
   পুরুলিয়া জেলা ছুঁয়ে বাঁকুড়া জেলার মধ্যে যে অংশটি আছে ঐতিহ্যের দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ। জানা যায় জৈনরা বাংলাদেশের যে অংশটিতে প্রবেশ করে তাদের প্রচার ও অবস্থান নির্দিষ্ট করেছিল তার মধ্যে এই অঞ্চলটিও অন্যতম একটি ক্ষেত্র। বাঁকুড়া জেলার মটগোদা, ভেলাইডিহা, কাপাসখেড়িয়া, সিমলাপাল, জোড়সা, শ্যামসুন্দরপুর প্রভৃতি এলাকায় এখনো যত্রতত্র জৈন মূর্তি ছড়িয়ে আছে। পার্শ্বনাথ, নেমিনাথ, অম্বিকানাথ প্রমুখ জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি গুলি থেকেই বোঝা যায় অনার্য অঞ্চলের সঙ্গেই কতটা জড়িয়ে গিয়েছিল উত্তর সংস্কৃতির জৈন কৃষ্টি। অঞ্চলটির বিভিন্ন গরাম থানে সিনি ঠাকুরের পুজো অর্চনাr প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আর এই সিনি ঠাকুর সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা জৈন তন্ত্র দেব-দেবী থেকেই এই দেবতার সৃষ্টি।
   জোড়শা, দেউলভিড়া(পাঁচমুড়া), হাড়মাসড়া প্রভৃতি জনপদের প্রাচীন দেউলগুলি নানান ইতিহাসের সাক্ষী। সিমলাপাল রাজবাড়ির মন্দিরের দেয়ালে জৈনমূর্তি রয়েছে। হাড়মাসড়ার প্রাচীন জৈন দেউলটির কাছেই পুকুর পাড়ে এক অপূর্ব জৈন মূর্তি পড়ে রয়েছে। এ সবই জৈন কৃষ্টির নিদর্শন।
   পরবর্তীকালে অনার্য সংস্কৃতির সঙ্গে আর্য সংস্কৃতির মিলনের নানা ছবি এই অঞ্চলের ইতিহাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতিরও অল্প নিদর্শনও মেলে। হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব দশম একাদশ শতাব্দী থেকে পড়তে থাকে দ্রুত। এলাকা থেকে পাওয়া নানা পুঁথি বিষ্ণুপুরের ‘আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন’-এ সংরক্ষিত আছে। বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বৈষ্ণব প্রভাবও যে ছিল তার নিদর্শন দেখি। মল্লভূমে শ্রীনিবাস আচার্যের আগমন ও তাকে ঘিরে সংস্কৃতির যে নব রূপায়ন তাও এই অঞ্চলে পড়তে দেখা যায়।
 
   বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমান্ত এলাকার অনেকখানি জুড়ে শীলাবতী নদী সংলগ্ন ভূমি। গড়বেতার অন্তর্গত বগড়ী, হুমগড়, কান্তোড় প্রভৃতি অঞ্চলগুলি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যেই অবস্থিত। মঙ্গলাপোতা, দেউলকুন্দ্রা, সোনাদ্বিপা প্রভৃতি গ্রামাঞ্চলগুলিও আছে। বগড়ী ও হুমগড় অঞ্চলটির ইতিহাস উল্লেখযোগ্য ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস থেকে জানা যায় কয়েক শতাব্দী আগে এখানেই গড়ে উঠেছিল অচ রাজ্য। বগড়ীতেই ছিল তার রাজধানী। বিখ্যাত কৃষ্ণরায়ের(কিষ্ট রায়) দেউল শীলাবতীর ধারে আজও আছে। মায়তা গ্রামে তার একটি অংশ আজও বিদ্যমান। এই বগড়ীর দোলমেলা বিখ্যাত একটি মেলা রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমার সময় এই মেলা বসে।  বগড়ী রাজবাড়িরই রাজ সেনাপতি অচল সিং-এর নেতৃত্বে ইংরেজদের সঙ্গে বিখ্যাত ‘নায়েক বিদ্রোহ’ বা লায়কালি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই নায়েক বিদ্রোহের কথা বলতে গেলে গড়বেতার গনগনি খুলা বা গনগনি ডাঙার কথা এসে পড়বে। যে গনগনি খুলা বা ডাঙা আজ পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ পিকনিক স্পট হিসাবে প্রখ্যাতি লাভ করেছে। এই গনগনি ডাঙার অবস্থান একেবারে শীলাবতী নদীর তীর ঘেঁষে। স্থানীয় ইতিহাস বলছে – ভয়ঙ্কর অথচ আশ্চর্য সুন্দর এই যে গনগনি ডাঙা তা একসময় শ্বাপদসঙ্কুল ও বিপজ্জনক ছিল। মানুষজন এখানে খুব একটা আসত না। নেকড়ে বা অন্যান্য হিংস্র পশুর আবাস্থল ছিল এই জায়গাটা। শোনা যায়- গড়বেতা হাসপাতালে আগে কোনো মর্গ ছিল না। মানুষ মারা গেলে এই গনগনি খুলাতে ফেলে দিয়ে যাওয়া হত। একসময় বহু নরকঙ্কাল এখানে ঝুলে থাকতে দেখা গেছে।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...