সন্তোষ কুমার কর্মকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সন্তোষ কুমার কর্মকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৫১ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

 হে আমার স্বদেশ- ৫১

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৫১)

মত্যু অপ্রতিরোধ্য।মৃত্যু অমরত্ব দানের প্রতিবন্ধক।কিন্তু মানবীয় কর্ম এবং মানবতা উন্মেষকারী সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তাকে অমরত্ব প্রদান করে।লক্ষ্মীনাথের একটি মানবীয় সৃষ্টির অন্য একটি স্বীকৃ্তি দিল তেজপুরের তরুণ কিন্তু প্রতিশ্রুতিবান কবি-লেখক জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা।জ্যোতিপ্রসাদ শুধুমাত্র নতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কবি-লেখক নয়।তিনি অসমের কেউ না করা একটা কাজের পরিকল্পনা নিয়েছেন।লক্ষ্মীনাথ রচনা করা নাটক ‘জয়মতী’র আধারে তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন।চলচ্চিত্রটি ১৯৩৫ সনের ১০ মার্চ কলকাতার রাওনাক হলে প্রথমবারের জন্য প্রদর্শন করার আয়োজন করা হল।উন্মোচনী সভায় উপস্থিত থাকবেন প্রযোজক প্রমথেশ চন্দ্র বরুয়া,সুগায়ক সাইগল,মিঃহাঞ্চ,হেমন্ত কুমার চৌধুরী আদি বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি।সভা উদ্বোধন করার জন্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া আমন্ত্রিত হলেন।

নিজের সৃষ্ট একটি নাটক ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে,সেটি আবার অসমের প্রথম চলচ্চিত্র,উন্মোচিত হবে ভারতের সাংস্কৃতিক মহানগর কলকাতায়—উদ্বোধন করার আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ খুবই আনন্দিত হলেন।  

উৎসাহের সঙ্গে সভায় এসে উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বললেন , ‘আজ আমাদের অসময়ের জন্য এটি একটি গৌরবের দিন। এই ‘জয়মতী’নামে ছবিটি শ্রীমান জ্যোতিপ্রসাদের অশেষ চেষ্টা ,অপরিসীম ধৈর্য ,সূক্ষ্ম শিল্প চেতনা ,অভিনয় দক্ষতা এবং উদার ভাবে ধন ব্যয় করার ফসল। তিনি প্রকৃত অর্থে একজন শিল্পী।তার মধ্যে  শিল্পীর সমস্ত গুণ বর্তমান। আমি আশা করছি এভাবে তিনি আরও অধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সমগ্র ভারতে  অসমের গৌরব বৃদ্ধির সঙ্গে অসমীয়ার মনে জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলবেন’।

  লক্ষ্মীনাথের পার্থিব  জীবনের সূর্য অস্তায়মান।সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতির সঙ্গে মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা সম্বর্ধনা পেলেও জাগতিক ঘটনাক্রমে তাকে মাঝেমধ্যে বিমর্ষ করে ফেলে ।শিবসাগর থেকে খবর এল রায় সাহেব এবং অনোরারি  ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া লক্ষ্মীনাথের প্রিয় এবং ছোটো দাদা জগন্নাথ বেজবরুয়ার ৪ জুলাই (১৯৩৫) মৃত্যু হয়েছে। এদিকে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়, সুখ দুঃখের পরামর্শদাতা ,বন্ধু ছোটো দাদা ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোকগমন করেছেন। এই দুজন আত্মীয়ের মৃত্যু বার্ধক্যজনিত কারণে।মানুষের জীবনে এভাবেই মৃত্যু আসে। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া লক্ষ্মীনাথ সেটা জানেন। তথাপি আপনজনের বিয়োগের শোকটা অসহনীয়। শোকে-দুঃখে কষ্ট পেয়ে থাকার সময় তার এরকম মনে হয় যেন মৃত্যু দেবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

  জীবনের শেষ বেলার উদাসী চেতনা ভারাক্রান্ত করলেও তার মধ্যেও সম্বলপুরে তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা বাড়ল। এখানে আসার কিছুদিন পর থেকেই এখনকার ইউরোপিয়ান ক্লাব ,বেঙ্গলি ক্লাব আদির সদস্য হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যসূচির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। এখনকার ভিক্টোরিয়া হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ বা নিজে লেখা নাটক  মঞ্চস্থ করার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ শৈশবে নাটকে অভিনয় করেছেন। তার জন্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে তিনি একজন সাংস্কৃতিক পুরুষ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে পড়েছেন। এদিকে তিনি ক্রফর্ট হাইস্কুলের পরিচালনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া কয়েক বছর আগে থেকে তিনি সম্বলপুর মিউনিসিপালিটি বোর্ডের সরকারের মনোনীত সদস্য।। মিউনিসিপালিটি বোর্ডের তিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার পরিকল্পনা এবং তত্ত্বাবধানে মিউনিসিপালিটির বর্তমান অফিস ঘরটা নির্মাণ করা হয়েছিল।।

এত  প্রভাব প্রতিষ্ঠা যদিও তার কাঠের ব্যাবসায়ে উন্নতি হল না।।সত্যিই সম্বলপুরে ব্যাবসাটা জমাতে পারলেন না। তার মধ্যে টুকটাক করে কোনোমতে সাংসারিক খরচটা বের হয়ে আসে।। এভাবে কষ্ট হচ্ছে। লক্ষ্মীনাথ পুনরায় আর্থিক সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এসব দেখে অরুণা সত্যব্রত অস্থির হয়ে পড়ল।সত্যব্রতের  উপর্যুপরি  অনুরোধ এবং অরুণা কান্নাকাটি করার জন্য প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় বরোদা রওনা হলেন ।

বরোদায় এসে এবার প্রায় ৪০ দিন থাকলেন।বরোদার আর্য কন্যা মহাবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া সভায় মহারাজা গায়কোয়ারের সঙ্গে বসে জামাই সত্যব্রত মুখার্জির জ্ঞান উন্মেষকারী বক্তৃতা শুনলেন। লক্ষ্মীনাথ খুশি হলেন ।জামাই বক্তৃতা দিতে থাকা দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে তার বুক ভরে উঠল। তাছাড়া এবার বিশেষ কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়া হল না। স্বাস্থ্য জনিত কারণে বাংলোয় থেকে দুই নাতি-নাতনীর সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন।বিদায় নেওয়ার দিন সকাল বেলা থেকে লক্ষ্মীনাথ গম্ভীর হয়ে পড়লেন। প্রকাশ না করলেও তার মনে এরকম একটা ভাব হল যেন এটাই তার শেষ বরোদা ভ্রমণ।

বরোদায় থাকার সময়ই দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। দুই বছর আগে থেকেই তাকে দাঁতও অসুবিধা দিয়ে আসছে। কলকাতায় গিয়ে কয়েকটি গোড়ার দাঁত ফেলতে হবে। সম্বলপুরে আসার পরে তার ডাক্তার দাঁত না ফেলে নতুন একটা দাঁত লাগিয়ে দিলেন তবে সেটাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা হল। এমনিতেই একদিন বাথরুমে  পড়ে গিয়ে প্রজ্ঞা ব্যথা পেল।সার্জন এসে ব্যান্ডেজ বেঁধে ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরও অস্থির যন্ত্রণায় প্রজ্ঞা সারা রাত জেগে কাটাল। পরের দিন থেকে লক্ষ্মীনাথ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। জ্বর এতটাই বেশি যে বিছানা নিতে হল। খবর পেয়ে সিভিল সার্জন বাড়িতে এসে পরীক্ষা করে লক্ষ্মীনাথকে ঔষধ খেতে দিলেন ।

মোট কথা কমজোরী হয়ে পড়া লক্ষ্মীনাথের শরীরটাতে দ্রুত নানা রকম রোগ  বাসা বানিয়ে নিল ।অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন খুব বেশিদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন না ।অবশ্য তার জন্য হা–হুতাশ  নেই।তাকেও জীবনের মহামুহূর্তগুলিকে স্বীকার করে নিতে হবে। তার জন্য এখনই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। তারই একটা প্রস্তুতি হিসেবে লক্ষ্মীনাথ ১৯৩৬ সনের ২৫ নভেম্বর সম্বলপুরের বাড়িটা দান রূপে মেয়ে অরুণা মুখার্জির নামে রেজিস্ট্রি করে দিলেন।

তারপরে কিছুদিন ভালোই চলল। পরের বছর মে মাস থেকে লক্ষ্মীনাথের পুরোনো বদহজম এবং অম্ল শূলের অসুখটা বৃদ্ধি পেল। পেটের ব্যথা শুরু হল, কিছু খেলেই ঢেকুড় উঠে, বমি হয়। আহারে লক্ষীনাথের এত রুচি, খেতে এত ভালোবাসেন, অথচ খেতে পারেন না। স্বামীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে দেখে প্রজ্ঞা সম্বলপুরের সিভিল সার্জনকে ডেকে আনালেন। লক্ষ্মীনাথকে  পরীক্ষা করে সার্জন ঘোষণা করলেন, ‘ডিউডেনাল আলসার।’ লক্ষ্মীনাথের অন্ত্রে ঘা হয়েছে।

বাবার অসুখের কথা শোনার পরেই ডিব্রুগড় থেকে রত্না এল। সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত সব সময় কর্মব্যস্ত থাকা বাবাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে রত্নার চোখ ছল ছল হয়ে উঠল। বাবার উন্নত চিকিৎসা এবং সেবা– শুশ্রুষার প্রতি রত্ন গুরুত্ব দিল। তাতেই লক্ষ্মীনাথ কিছুটা সুস্থ হলেন বলে মনে হল। বরোদা থেকে অরুণা– সত্যব্রত এল। একটু সুস্থ হয়ে ওঠার পরে কিছুদিনের জন্য বাবাকে রত্না নিজের সঙ্গে রাখবে বলল। তার জন্য সে বাবাকে ডিব্রুগড়ে  নিয়ে যাবে। অন্যদিকে অরুণাও বাবাকে বরোদায় নিয়ে যেতে চাইছে। এটা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে তর্ক হল। কিন্তু রত্নার জিদের কাছে অরুণাকে হার মানতে হল। মা-বাবাকে নিয়ে রত্না কলকাতায় এল। সত্যিই বাবার অন্ত্রে ঘা হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কলকাতার একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাল। কলকাতার ডাক্তার একই কথা বললেন এবং লক্ষ্মীনাথকে বিশ্রাম নেবার পরামর্শ দিলেন।

অবশেষে ১৯৩৭ সনের আগস্ট মাসের ২১ তারিখ ডাঃ ভুবনেশ্বর দাস, রত্না এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ ডিব্রুগড়ির রওনা হলেন।

রওয়ানা হওয়ার দ্বিতীয় দিন তারা পান্ডু এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আসবেন বলে খবর পেয়ে চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, জ্ঞানদাভিরাম আদি পান্ডু স্টেশনে এসে দেখা করলেন। অসুস্থ যদিও আরাম কেদারায় বসে লক্ষ্মীনাথ প্রফুল্লিত । যেন তাঁর কোনো অসুখ নেই। আগের মতোই সবার সঙ্গে আনন্দ স্ফুর্তি করে কথাবার্তা বললেন ।ডঃ দাসকে আলাদাভাবে ডেকে এনে জ্ঞানদাভিরাম লক্ষ্মীনাথের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। কিছুটা সন্দেহের ভাব নিয়ে ডঃ দাস বললেন ’ অবস্থা খারাপ নয়। ভালো হয়ে যাবেন, যদি মাঝখানে অভাবনীয় কোনো সমস্যা উপস্থিত না হয়।’

বন্ধুবর চন্দ্রকুমার, আত্মীয় জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বিনন্দ বেজবরুয়ার( লক্ষ্মীনাথের দাদা) ছেলে আনন্দ বেজবরুয়াও এসে উপস্থিত হলেন। লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞা, রত্না এবং রত্নার মেয়েদের রেলে উঠিয়ে দিয়ে তারা সঙ্গে আনা গাড়িতে গুয়াহাটিতে এসে উপস্থিত হলেন। গুয়াহাটি স্টেশনে আর্ল ল কলেজের অনেক ছাত্র এবং অনেক ভদ্রলোক লক্ষ্মীনাথকে সম্বর্ধনা জানাল। চন্দ্রকুমার লক্ষ্মীনাথকে দুদিন  গুয়াহাটিতে থেকে বিশ্রাম নিয়ে যেতে বলল। রত্না রাজি হল না। সেদিনই গুয়াহাটি থেকে রেলে যাত্রা করল। পরের দিন তারা তিনসুকিয়া গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং সেখান থেকে মোটরে ডিব্রুগড় উপস্থিত হলেন।

মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া নতুন করে একটা বাড়ি তৈরি করেছেন। এই বাড়িটা ব্রহ্মপুত্রের তীরে। সুন্দর করে তৈরি করা বিশাল বাড়িটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো বাতাস। লক্ষ্মীনাথের মতো রোগির পক্ষে স্বাস্থ্যকর জায়গা। বাড়িটাতে ঢুকেই মহাবাহ ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আসা নির্মল বায়ু সেবন করে লক্ষ্মীনাথের ভালো লাগল। মাতৃভূমি অসমের প্রাণধারা ব্রহ্মপুত্রের পারে থাকার জন্য তিনি যেন নতুন শক্তি লাভ করলেন।

খবরের কাগজের মাধ্যমে অসমের জনগণ লক্ষ্মীনাথের অসুস্থতার কথা জানতে পারল। ডিব্রুগড়ে থাকার দুদিন পর থেকেই জনগণের চিঠিপত্র আসতে লাগল। সেইসব করে উত্তর লেখার জন্য সাহিত্য পুথীর সমালোচনা করার জন্য অসুস্থ শ্বশুরের মনের ওপরে চাপ পড়বে। তার স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়ে পড়বে। তাই দায়িত্বশীল জামাই রোহিণী খবরের কাগজে বিবৃতি দিলেন,’ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া সম্প্রতি কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্যের পথে। তিনি বর্তমানে মোটামুটি সুস্থ থাকলেও আরও কিছুদিনের জন্য তার বিশ্রাম নেওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই আশা করি, দেশবাসী যেন তার কাছ থেকে চিঠির উত্তর, পুথি সমালোচনা, সাহিত্যের ইতিহাস ইত্যাদির মতামত না চায় এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের জন্য তাকে কিছুদিনের জন্য রেহাই দেয় ।’

ঠিক তখনই ইতিহাসবিদ বেনুধর শর্মা শিবসাগর থেকে ডিব্রুগড়ে গিয়ে রোগ শয্যায় পড়ে থাকা লক্ষ্মীনাথকে দেখতে চাইলেন। রোহিণী প্রথমে তাকে অনুমতি দিলেন না। তারপরে বেনুধরের  নাম বলায় লক্ষ্মীনাথ আকুল অগ্রহে বেনুধরকে শয্যার পাশে ডাকলেন। বেনুধরকে দেখে আনন্দিত হলেন যদিও লক্ষ্মীনাথ বিছানা থেকে উঠতে পারলেন না। নিস্তেজ ভাবে বিছানায় পড়ে রইলেন। তার পা দুটির শোচনীয় অবস্থা দেখে বেনুধরের মন খারাপ হয়ে গেল।

তারপরেই ‘দৈনিক বাতরির’ ২৪ আগস্ট( ১৯৩৭) সংখ্যায় প্রকাশ পেল,’ অসমীয়া জনগণ এই পুণ্য ভাদ্র মাসের ৩ তারিখ সরকারিভাবে ঘরে ঘরে পালন করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক জীবনী এবং মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শংকরদেবের নির্মল চরিত্র যে বেজবরুয়া মহাশয়ের অমর লেখনীতে অমিয়া ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, এই তিন তারিখ অসমিয়া জনগণ যেন সেই বেজবরুয়া মহাশয়ের সম্পূর্ণ আরোগ্য কামনা করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায়।’

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অসমিয়া জাতির প্রাণপুরুষ।’ দৈনিক বাতরি’র এই আবেদনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অসমিয়া জনগণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীনাথের আরোগ্য কামনা করে সভা সমিতি এবং নাম কীর্তন অনুষ্ঠান করলেন।

‘ দৈনিক বাতরি’র সহকারী সম্পাদক করুণাকান্ত গগৈ বেজবরুয়ার জামাই রোহিণী বরুয়াকে অনুরোধ করলেন,’ অসমের সমস্ত মানুষই শ্রীযুক্ত বেজবরুয়া মহাশয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এই সন্দর্ভে জনগণ একটি করে বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তাই আপনার কাছ থেকে বেজবরুয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ পাব বলে আশা করছি।’

সঙ্গে সঙ্গে রোহিণী জানাল,’ এখন পূজনীয় বেজবরুয়া মহাশয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো হওয়ার পথে। কোনোরকম শারীরিক বিকার নাই বললেই হয়। রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে এবং রুচিসহকারে খেতেও পারছেন। কারও সাহায্য ছাড়াই উঠাবসা করতে পারছেন। এমনকি আমাদের অতিথি নিবাস থেকে আমরা থাকা ঘরটিতে বিনা সাহায্যে নিজে নিজে হেঁটে যেতে পারছেন। সম্প্রতি তিনি ডাঃ প্রভাত চন্দ্র দাস, এমবিডিটি মহাশয়ের চিকিৎসাধীনে রয়েছেন।ডঃ দাসের বক্তব্য অনুসারে, বেজবরুয়া মহাশয়কে দু-এক দিনের মধ্যে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া যাবে।’

সত্যিই স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হল। চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন। লক্ষ্মীনাথ নিজেই ‘ দৈনিক বাতরি’ খবরের কাগজের মাধ্যমে নিবেদন জানালেন,’ অসমের জনগণের আশীর্বাদ এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছি। তাই এই খবরের কাগজের মাধ্যমে খবরটা সবাইকে জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।’ আমার এই অসুস্থতা আমাকে একটা গৌরব এবং আনন্দের খবর দিয়ে গেল। আমি আগে জানতাম না যে আমি আমার মাতৃভূমি অসম দেশের কাছে এত ভালোবাসার পাত্র।’

শরীরে শক্তি লাভ করে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি থেকে বের হলেন। চলাফেরা করতে লাগলেন। দুই এক জায়গায় যেতে লাগলেন। কিন্তু তাকে একা বের হতে দেওয়া হয় না। সঙ্গে প্রজ্ঞা, রোহিণী,রত্না… কোনো একজন থাকেই।

নভেম্বরের দুই তারিখ ডিব্রুগড় ‘আলোচনী ক্লাব’এর উদ্বোধনী উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু বক্তৃতা দিতে উঠে দেখেন উদাত্ত ভাবে বক্তৃতা দেওয়ার আগের সেই শক্তি নেই ।তথাপি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লক্ষীনাথ বললেন এখন আমার দিক থেকে আপনাদের আশীর্বাদ ছাড়া দেওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ বামুনের এটাই পেশা। তারপরে কলকাতায় উ-ভা-ই-সা  সভার বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে তিনি বললেন এত বছর আগের আলোচনা ক্লাব মরে ছিল বলে বলেছে সে আসলে মরেনি এটা কেবল ‘সাসপেন্ডেন্ট অ্যানিমেশন।’

 এভাবে বাইরে বেরিয়ে, গুনমুগ্ধদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়ায় লক্ষ্মীনাথের দেহে বাসা বাঁধা জড়তাটা কিছু কমে এল। ভাঙ্গা মনে আশাও কিছুটা জাগল।এই সংসারে তার দিন ঘনিয়ে এসেছে বলে বুঝতে পেরেও নিজের ওপরে একটা ভরসার সৃষ্টি হল।আশা নেই যদিও বেঁচে থাকার মোহটা মরে যায়নি।। মৃত্যু শাশ্বত, নিষ্কাম মনোভাবে মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত জেনেও লক্ষ্মীনাথ সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারলেন না। তার মানে তার মনটি আরও কিছুদিন পর্যন্ত বিশ্বসংসারের আলো বাতাস উপভোগ করতে চায়।

 ডিব্রুগড় সাহিত্য সভা সাহিত্যরথী সংবর্ধনা জানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর রবিবার বিকেল তিনটের সময় অসমিয়া নাট্য মন্দিরে একটি জনসভার আয়োজন করল। সভার উদ্দেশ্য হল (ক)বর্তমান অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য আনন্দ প্রকাশ করে তাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন এবং (খ)অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেজবরুয়া মহাশয়ের বাণী শ্রবণ।

 সভার কাজ আরম্ভ হল।শ্রীমিঠারাম বরা সভাপতির আসন গ্রহণ করলেন।সভাপতির নির্দেশ অনুসারে সম্পাদক আনন্দরাম হাজরিকা  অভিনন্দন পত্র পাঠ করে সেটা লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার হাতে অর্পণ করলেন। সভায় উপস্থিত থাকা জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজুদ্দিন আহমদ হাজারিকা, তুলসীপ্রসাদ দত্ত, গনেশরাম ফুকন আদি বেজবরুয়াকে  সম্বর্ধনা জানিয়ে  কিছু কথা বললেন।অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য সদিচ্ছা সূচক প্রস্তাব গ্রহণ করার পরে হাতে তালি দিয়ে লক্ষীনাথ  বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন।

  ‘মাননীয় সভাপতি মহোদয় এবং সভায় উপস্থিত অসম প্রেমী সুধী সমাজ,

  আমি আমার  অসুস্থ অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে উঠার মূলে প্রথমে জনগণের আশীর্বাদ দ্বিতীয়ত ডাক্তার, তৃতীয়ত আমার পরিবার এবং আমার মেয়েদের যত্ন। যমরাজা আমাকে ভালো করে দৌড় করিয়েছেন। তবে বামুনের ছেলে যদিও টিকি না থাকায় আমাকে ধরতে পারলেন না। দেশ দস্তুর মতে আমার মাথার সামনের দিকে চুলের গোছাটা ,সেই গোছায় যম ধরতে গিয়েছিল।কিন্তু আমি এক দৌড়ে পগার পার।সেইজন্যই আমি আজ সশরীরে এই সভায় বিদ্যমান।’

 শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।

 ভূমিকা শেষ করে লক্ষ্মীনাথ তারপরে বললেন,‘আজকাল যেখানে সেখানে শোনা যায়, ‘আমাদের দেশটা গেল,বিজাতীয় হয়ে গেল।আমি বলি—‘ভয় কর না,চিন্তা কর না।বিদেশির স্রোত দেখে চমকে যেও না।পরিবর্তন সৃষ্টির নিয়ম।ভাস্কর বর্মার দিনের অসম এবং আজকের অসম দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক।

 এখানে একটা গল্প বলি।সত্য যুগে বটগাছের গুটিগুলি ছিল একটি লাউয়ের সমান।বটগাছের নিচে বিশ্রাম নেবার সময় গুটি পড়ে অনেক পথিকের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল।তথাপি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার হুঁশ নেই।এভাবে কিছুদিন যাবার পরে একদিন গুটি খসে পড়ে একজন বামুনের মৃত্যু হল।এবার কিন্তু ব্রহ্মার আসন টলল।তিনি স্বয়ং এসে বটগাছকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন বামুন মারলি?’

বটগাছ উত্তর দিল, ‘তাকে মরতে হবে বলে মারলাম।তাতে আবার কি অসুবিধা হল?বামুনের প্রতি তোমার এত পক্ষপাতিত্ব কেন?

বটগাছের অভদ্র উত্তর শুনে ব্রহ্মা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অভিশাপ দিলেন।‘বটগাছ,আজ থেকে তোর গুটিগুলি এই এতটুকু হয়ে যাবে।সেদিন থেকে বটগাছের গুটিগুলি ছোটো হয়ে গেল।কিন্তু গুটির ভেতরে সার বা ভাইটালিটির জন্যই ছোট্ট একটি গুটি থেকে আজও যেখানে সেখানে এক একটি প্রকাণ্ড বটগাছ জন্মায়।

তাই বিদেশি চারপাশ থেকে চেপে ধরে অসমিয়া জাতিকে আকারে ছোটো করে ফেলা সত্ত্বেও ভাইটালিটি থাকলে অসমিয়া কখনও মরতে পারে না।    

গীতার কথামতো বলি, কাজ করে যাও— ফলের অপেক্ষা কর না। অন্যেরা কী বলে সেদিকে তাকিও না। মাত্র ঈশ্বরে মতি রেখে সমস্ত কাজের ফলাফল তার হাতে সঁপে দিয়ে কাজ করে যাও।নিখুঁত অসমিয়া ভাষা বলবে, লিখবে। অসমিয়া সাজ পোশাক পরবে। শুধু শুধু বিদেশির অনুকরণ করবে না ।

নহি কল্যাণ কৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গছতি। ‘

লক্ষ্মীনাথের কন্ঠে আগের মতো ভাবের উচ্ছ্বাস নেই। কঠিন শব্দের প্রয়োগ নেই। বক্তৃতা ও সংক্ষিপ্ত।খুবই কম সময়ে তিনি সমাপ্তি টানলেন। সঙ্গে সঙ্গে  এক ধরনের সংযোগহীনতার যন্ত্রণায় তাঁর অন্তরটা কেঁপে উঠল। বড়ো দুর্বল অনুভব করলেন । ধীরে ধীরে নিস্তেজ  পদক্ষেপে নিজের আসনে এসে বসলেন। 

এটাই লক্ষ্মীনাথের শেষ জনসভা এবং শেষ বক্তৃতা। এমনিতে সুস্থ বলে মনে হলে ও ভেতরে ভেতরে লক্ষ্মীনাথ দুর্বল হয়ে পড়লেন। ইচ্ছা থাকলেও বেশি দিন যে বেঁচে থাকতে পারবেন না এই বিষয়ে তিনি নিজেও নিশ্চিত হলেন। কাউকে বললেন না। উল্টে সম্বলপুর ফিরে যাওয়ার কথাই বলতে থাকেন। কিন্তু দুই কুড়ি বছর ধরে সুখ-দুঃখের সঙ্গী, ঘর সংসার সমস্ত ক্ষেত্রে সুযোগ্যা , পরম বান্ধবী প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। এই বিষয়ে তিনি কন্যা রত্নার সঙ্গে কথা বললেন। মমতাময়ী রত্না বাবাকে সম্বলপুরে  নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করল। মেজ জামাই রোহিণী কুমার ও দায়িত্বশীল। সম্বলপুরে যাবার জন্য টিকিট কাটার কথা বলতেই তিনি বলেন,’ বাবা নতুন একটা বাড়ি করছি। বাড়িটা তৈরি না হওয়ার আগে আপনি সম্বলপুর যেতে পারবেন না।’

বাবার শারীরিক অবস্থাটা ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়ছে শুনে বরোদায় থাকা অরুণা অস্থির হয়ে পড়ল। দীপিকাকে নিয়ে বাবার মনে যে একটা অশান্তি আছে অরুণা জানে। অরুণা চিঠি লিখে দীপিকাকে দেশে ফিরে আসতে লিখল । অন্য একটি চিঠিতে লন্ডন স্থিত ব্যাপ্টিস্ট মিশনারির কর্মকর্তাদেরও অনুরোধ জানাল যাতে অন্তত কিছুদিনের জন্য দেশে এসে দীপিকা অসুস্থ পিতাকে দেখে যাবার সুযোগ পায়। অরুণার সকাতর আবেদন অস্বীকার করতে না পেরে প্রধান নান দীপিকার ছুটি মঞ্জন করলেন। অবশেষে ইংল্যান্ড থেকে স্ট্রথেডেন নামক জাহাজে বোম্বাই, সেই রাতেই রেলে বোম্বাই থেকে কলকাতায় এবং কলকাতা থেকে ১৯৩৮ সনের এক ফেব্রুয়ারি দীপিকা ডিব্রুগড় পৌঁছাল।

দীপিকা এখন দীপিকা বেজবরুয়া  নয়। দীপিকা এখন সিস্টার দীপিকা। আগের চেয়ে তার স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। আড়াই বছর শীত প্রধান ইংল্যান্ডে থাকার ফলে গায়ের রং উজ্জ্বল হয়েছে। তাছাড়া তার পরনে নানের পোশাক, গলায় সাদা সুতোয় ঝুলানো যিশুখ্রিস্টের মূর্তি। দীপিকা খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী।

সে এসে সামনে দাঁড়াতেই লক্ষ্মীনাথের মনে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হল। এটা রাগ নয়, ক্ষোভ নয়, খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছে বলে তার প্রতি ঘৃণা নয়। এটা ভালোবাসা। সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা। দীপিকার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের অন্তর এক অদ্ভুত শান্তি লাভ করল। এই শান্তির সঙ্গে কীসের এক আনন্দ। ব্যাখ্যাতীত এক আনন্দে লক্ষ্মীনাথের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

এদিকে খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী হওয়ার জন্য আত্মসমাহিত যদিও বাবার আদর  ভালোবাসা অনুভব করে দীপিকার দুই চোখ ও জলে ভরে  উঠল।

খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া নিয়ে এক সময় দীপিকার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের তীব্র বিরোধ হয়েছিল। এখন দুজনের মধ্যে মিলন হতে দেখে বাড়ির সবাই আনন্দিত হল।

তারপরে দীপিকা সহজ হয়ে পড়ল। আগের মতোই কথা বলতে লাগল। বোম্বাই থেকে জাহাজে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ যাত্রা, ঐতিহ্যপূর্ণ ইংল্যান্ডের  কোথায় কীভাবে থাকে, সেখানকার নানদের সঙ্গে তার দৈনন্দিন জীবন, তাদের সেবামূলক কর্ম, তাদের উপাসনা… লক্ষ্মীনাথ আগ্রহ নিয়ে দীপিকার কথা শুনল। বিদেশিনী নানদের সঙ্গে দীপিকা ভালই আছে, নিজেকে সেবামূলক কাজে উৎসর্গ করেছে বলে জানতে পেরে লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেলেন। তারপরে দীপিকার সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর আলোচনা হল। শারীরিক অসুস্থতার জন্য বাবার যে কষ্ট হচ্ছে, এই বিষয়ে দীপিকা সচেতন। বাবার মানসিক শান্তির জন্য সে বাইবেলের স্তোত্র এবং কিছু গান গেয়ে শোনাল। অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে মেয়ে এভাবে গান গেয়ে স্তোত্র শুনিয়ে শান্তি পাচ্ছে দেখে লক্ষ্মীনাথ সুখী হলেন।

অবশেষে অন্তঃসলিলা ভালোবাসা এবং আত্মিক এক অনুভূতিতে উদার লক্ষ্মীনাথ দীপিকার কাঁধে ডান হাতটা রেখে বললেন,’ মা দীপি, ঈশ্বরের ওপর নির্ভরতা এবং ভালোবাসায় যদি আন্তরিকতা থাকে— তোর মঙ্গল হবেই। রাম ,রহিম, যিশু যার মাধ্যমেই চলার পথ বেছে নিস না কেন, আন্তরিক সমর্পণ তোকে তোর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবেই দেবে। ‘

‘পাপা—।’দীপিকার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,’আজ তুমি একথা বলছ !’

‘আমি বলছি নারে,আমাদের ভাগবতে এসব কথা আছে।শ্বাশত বাণীতে সমৃদ্ধ আমাদের ভাগবতের কথাই আমি বলছি।যাই হোক,তুই সুখী হ,মা।তোর আত্মা শান্তিতে থাকুক।’

তারপরে পিতার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে দীপিকা কলকাতা যাত্রা করার দিন ঠিক করল।ছোটো মেয়ের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের এই বিদায় বড়ো করুণ।ডিব্রুগড় স্টেশন থেকে দীপিকা ট্রেইনে কলকাতা যাত্রা করবে।তার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।একটা মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্মীনাথ তাকে চোখের আরাল করতে পারে নি।তার জন্যি তিনি স্টেশনে  গিয়ে দীপিকাকে বিদায় জানাতে চাইলেন।রত্না,রোহিণী এমনকি প্রজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়া দেহটা নিয়ে  স্টেশনে যেতে লক্ষ্মীনাথকে বাধা দিল।কিন্তু তিনি মানলেন না।দেহ সাথ না দিলেও কন্যার প্রতি ভালোবাসা এবং শুধুমাত্র মনের জোরে লক্ষ্মীনাথ অবশেষে স্টেশনে এসে দীপিকাকে সাশ্রু নয়নে বিদায় জানালেন।

দীপিকা আসার পরে উদার চেতনায় লক্ষ্মীনাথের মনের পরিবর্তন ঘটল।  পুনরায় কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেলেন।তার জন্যই রত্না রোহিণী বিরোধিতা করা সত্ত্বেও লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুরে ফিরে যাবার জন্য লক্ষ্মীনাথ ট্রেনের টিকেট কাটলেন।যাত্রার তারিখ ১৮ মার্চ বলে ধার্য করা হল।সঙ্গে তিনি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারাকে জানিয়ে দিলেন,’২০ মার্চ সকালবেলা দার্জিলিং মেলে বোধ করি সাতটার সময় শিয়ালদহ গিয়ে পৌছাব।শিয়ালহ  থেকে হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।  হাওড়াতে সারাদিন থেকে সেদিনই বোম্বে মেইল ধরে সেদিনই সম্বলপুর চলে যাব। হাওড়াতে তোমাকে পেলে বেশ মজা হবে।’ কিন্তু এবারও রত্না প্রচন্ড বিরোধিতা করল,’বাবা এই শরীর নিয়ে তুমি এতদূর জার্নি করতে পারবে না।এই অবস্থায় আমি তোমাকে যেতে দিতে পারব না।’ অবশেষে জেদি কন্যা রত্নার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথকে আপোষ করতে হল।

এমন সময় গুয়াহাটি থেকে চন্দ্র কুমার আগরওয়ালার মৃত্যু সংবাদ এল ( ২ মার্চ ১৯৩৮ সাল)। অভিন্ন হৃদয় চন্দ্রকুমারের মৃত্যু সংবাদ শুনে লক্ষ্মীনাথ মর্মাহত হলেন। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বহু সমস্যার সমাধান করা বন্ধু। চন্দ্রকুমার ছিলেন তার জন্য বেঁচে থাকার এক অন্যতম শক্তি। চন্দ্র কুমার ছিল তার জন্য জীবনটা উপভোগ করার, জীবনটাকে বিস্তার করার প্রাণময় এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। চন্দ্রকুমার ছিল তার বহু সৃষ্টির প্রেরণা দাতা। চন্দ্রকুমার ইহসংসার ত্যাগ করার খবর শুনে লক্ষ্মীনাথের অন্তরটা কেঁপে উঠল। এবার তার এরকম মনে হল  যেন মৃত্যুদূত তার দরজার  সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুখে দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন,’ বন্ধু ,সখা ,সুহৃদ— কাজটা উল্টো হয়ে গেল । আমারই যাবার কথা ছিল । আমাকে ছেড়ে তুমি এগিয়ে গেলে । এটা ঈশ্বরের কী ধরনের ইচ্ছা ? তুমি চলে যাবার খবর শুনে আমার আঙ্গুল অবশ হয়ে পড়েছে ,গলা শুকিয়ে আসছে, জিভ কড়কড়ে হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রভু আমাকে গায়ে জোর দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে কি?’

মাজিউকে হারিয়ে মানসিকভাবে লক্ষ্মীনাথ বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিছুই ভালো লাগছে না। লেখা মেলা করার শক্তি তো আগেই নাই হয়ে গিয়েছিল। একটু আধটু বই পত্র পড়তেন। এখন পড়ার জন্য কিছু একটা মেলে ধরলেই অবশ আচ্ছন্নতার সঙ্গে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে আসে। রত্নার মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটছিল। ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন তার মনটা আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ে। তাঁর মনটা শান্ত করার জন্য কাছে বসে প্রজ্ঞা ব্রাহ্ম  গীত গায়। না এভাবে শান্তি পাচ্ছেন না। তারপরে মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের রবিবার তাকে আনন্দ দেবার জন্য রোহিণী এবং রত্না ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজের আয়োজন করল। একটা মোটর বোটের ব্যবস্থা করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বের হলেন।

ভটভট শব্দে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে মটর বোট এগিয়ে চলেছে। এখন ব্রহ্মপুত্রের দুই পার উত্তাল জলরাশিতে প্লাবিত নয়। তীর থেকে জল নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই তীরের  গাছপালায় চৈত্র মাসের ধূসরতা। তীর থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত বালুময় চর পার হয়ে মূল জলধারা। ধীরগতিতে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রকে এখন বিবাগী বলে মনে হচ্ছে। তথাপি নদীবক্ষের মুক্ত পরিবেশে এসে লক্ষ্মীনাথ আনন্দিত হলেন।

ব্রহ্মপুত্রের বালুচরের কাছে নৌকায় তার জন্ম। শৈশবে বাবার সঙ্গে এই নদী দিয়ে নৌকায় অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া, উচ্চ শিক্ষার্থী গোবিন্দ দাদার সঙ্গে দিশাং মুখ থেকে এই নদী দিয়ে কলকাতায় যাত্রা… এই নদী দিয়ে যাত্রা করার সময় দুই পারের বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজ গাছপালা চিত্রময় গ্রাম ওপরের বিশাল নীলাকাশ, জ্যোৎস্না রাতের রুপালি আলো ঝকঝকে তীরের বনভূমি… সবকিছু মনে পড়ছে।

পরিবারের সবার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের চরে বনভোজন খেলেন। মোটর লঞ্চ দাঁড়িয়ে থাকা জায়গায় একটা চালতে গাছের নিচ থেকে চালতে কুড়িয়ে প্রফুল্ল মনে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি ফিরলেন। তাকে প্রফুল্ল চিত্ত দেখে প্রজ্ঞা, রত্না এবং রোহিণীও খুশি হলেন। কিন্তু সেদিন বিকেল থেকেই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। সঙ্গে তার পুরোনো অন্ত্রের ঘা টা চাগাড় দিয়ে উঠল। রোগটা এত খারাপ ভাবে বেড়ে গেল যে আগে থেকে তাকে চিকিৎসা করতে থাকা ডঃ দাস দেওয়া কোনো ঔষধেই কাজ দিল না। ২৫ মার্চের রাত থেকে লক্ষ্মীনাথ ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়লেন। তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। শেষ রাতের দিকে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন ।

১৯৩৮ সালের ২৬ মার্চ । শনিবার । সকালে ব্রহ্মপুত্রের পারে বিদায়ের করুণ সুর বেজে উঠল। বাতাস নিস্তব্ধ হল। সকালের সজীবতা নাই হয়ে গেল। শয্যাগত লক্ষ্মীনাথ কাতর ভাবে বুকের পাশটাতে বসে থাকা পত্নীর দিকে তাকালেন । ইতিমধ্যে অন্তিম মুহূর্তের আশঙ্কায় প্রজ্ঞার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। তার দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে। তথাপি নিজেকে সামলে স্বামীর শিথিল শক্তিহীন ডান হাতটা চেপে ধরল। পায়ের কাছে বসে থাকা রত্না এবং মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিণী পরমেশ্বরের কাছে লক্ষ্মীনাথের জীবনের জন্য মিনতি করছে । কিন্তু না সবকিছুই অসার হয়ে গেল । জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল । লক্ষ্মীনাথ চিরকালের জন্য চোখ বুজলেন। 

যিনি ব্রহ্মপুত্রের জলে ভাসমান নৌকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি প্রাণের সম্পত্তি স্বরূপ ব্রহ্মপুত্র নদীটিকে কৃপা বরুয়ার শেষ উইলে অসমিয়া জাতিকে দান করে গেছেন, সেই তিনি আজ লুইতের তীরে দেহত্যাগ করলেন।দেশকে ভালোবাসা যেখানে সেখানে দেশের গুণ গাওয়া মাতৃভাষার সামান্য অপমান অবহেলা হলেও বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে মেতে উঠা এবং যার জীবনের মূল মন্ত্র দেশ, দেশের জাতি এবং মাতৃভাষা সেই লক্ষ্মীনাথ অসম মায়ের কোলে চির বিশ্রাম নিলেন ।

মুহূর্তের মধ্যে  দুঃসংবাদটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।চা ব্যাবসায়ী রোহিণী কুমার বরুয়ার বাসভবনে সাহিত্যরথীকে অন্তিম দর্শন করার জন্য জনতার স্রোত বইতে লাগল। ডিব্রুগড়ের সমস্ত শিক্ষানুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। কিছু সরকারি অফিস খোলা থাকলেও জেলা উপায়ুক্ত এই উপলক্ষে সোমবার দিনের দুটো থেকে সরকারি  কার্যালয়ের ছুটির আদেশ দিলেন।

 শনিবার দিন নগরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন শিক্ষা অনুষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী,ছাত্র-ছাত্রী রোহিণীকুমার বরুয়ার বাসভবনের প্রাঙ্গণে সমবেত হলেন।ন্তিম শয়নে শায়িত্ত বেজবরুয়ার দেহটা ফুল দিয়ে সাজিয়ে নাম কীর্তন করে নগর পরিভ্রমণ করে নদীর ঘাটে নিয়ে আসা হল।

লুইতের তীরে চিতা সাজানো হল।

 ইতিমধ্যে শিবসাগর থেকে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন এসে উপস্থিত হয়েছে।

 হিন্দু সংস্কার মতে অপুত্রক বা পুত্রের অপারগতার ক্ষেত্রে অন্তেষ্টিক্রিয়ার অধিকারী হয় বিবাহিত স্ত্রী কন্যা এবং জামাতা। দৌহিত্র হিসেবে অরুনার পুত্র স্বরূপ কুমার মুখার্জি লক্ষ্মীনাথের মুখাগ্নি করার অগ্রাধিকার পায়। কিন্তু এখন বরোদা থেকে এনে মুখাগ্নি করানোটা অসম্ভব কথা। তাছাড়া জীবিত থাকতেই এই বিষয়ে লক্ষ্মীনাথ সজ্ঞানে বিধান দিয়ে গেছেন। তার ইচ্ছা অনুসারে ভাগ্নেপুত্র পুষ্প ফুকন তার মুখাগ্নি করল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চিতাগ্নি জ্বলে উঠল।লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার দেহটা পঞ্চভূতে বিলীন হল। 

লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার প্রয়াণের কথা শুনে প্রবীণ সাহিত্যিক পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ বেজবরুয়া জন্মভূমি থেকে দূরে দূরে অন্য প্রাদেশিক ভূমিতে কাটিয়েছেন। তথাপি ‘চরণে জানে মরণের ঠাঁই’ এই নীতি অনুসারে তার  লুইতিয়া নশ্বর দেহটি লুইতের বালুতে এসে বিলীন হয়ে গেল।

 কবি যতীন্দ্রনাথ দুয়ারা তার শোকগাথায় ব্যক্ত করলেন,

 লুইতের বুকে জন্ম লভিলে

 লুইতের বুকে মহাপ্রয়াণ

 লুইতের সুরে সুর বেঁধে নিয়ে

 দিলে অসমকে হারানো প্রাণ।

বঙ্গের অভিজাত দেশ পত্রিকা লিখল অসমিয়া সাহিত্যের ভান্ডারে  বেজবরুয়া মহাশয়ের দান অতুলনীয়।বাংলার সহিত তাহার অন্তরের যোগ ছিল। ব্যাবসা সূত্রে তিনি সম্বলপুরে বাস করিতেন। উড়িষ্যার সঙ্গেও তাহার যোগাযোগ ছিল। তাহার সাহিত্য সৃষ্টিতে বাংলা উড়িষ্যা এবং অসমের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।

বেজবরুয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানতে পেরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শোক প্রকাশ করে লিখলেন—‘ভারতবর্ষের প্রত্যেক প্রদেশে তাহার আপন আপন ভাষার পূর্ণ ঐশ্বর্য উদ্ভাবিত হলে তবেই পরস্পরের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠ অর্ঘের দান--প্রতিদান সার্থক হইতে পারিবে এবং সেই উপলক্ষেই শ্রদ্ধা সমন্বিত ঐক্যের সেতু প্রতিষ্ঠিত হইবে। জীবনে লক্ষ্মীনাথ  বেজবরুয়ার এই সাধনা অতন্দ্রিত ছিল। মৃত্যুর মধ্য দিয়া তাহার এই প্রভাব বল লাভ করুক এই কামনা করি।’ 


  


    


শনিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৯ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

 হে আমার স্বদেশ- ৪৯

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৯)

(৪৯)

লক্ষ্মীনাথের পুত্র মুখদর্শনের সৌভাগ্য হল না। সেটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বিশেষ করে পত্নী প্রজ্ঞার মনে একটা অভাববোধ থাকলেও তার বাহ্যিক প্রকাশ নেই। আজ পর্যন্ত আত্মীয় পরিজনের কেউ বেজবরুয়া দম্পতিকে এই নিয়ে দুঃখ বা মন খারাপ প্রকাশ করতে দেখে নি। সমস্ত দিক দিয়ে সুন্দর করে গড়ে উঠা পাঁচ বছরের সুরভি মারাত্মক ডিপথেরিয়া রোগে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করায় লক্ষ্মীনাথ শোকে দুঃখে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তবে সময় সুরভির অভাবটা অনেকখানি পূরণ করে দিয়েছে।১৯০০ সনের ১৭ অক্টোবর দ্বিতীয়া কন্যা অরুণার জন্ম হয়। তার প্রায় তিন বছর পরে ১৯০৩ সালের ৩ নভেম্বর রত্নার জন্ম হয় এবং ১৯০৮  সনের ৪ নভেম্বর জন্ম হয় চতুর্থ কন্যা দীপিকার।

জীবিতদের মধ্যে তিন জনই কন্যা সন্তান। তা বলে তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথ কোন ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করেননি। খরচ সাপেক্ষ যদিও প্রতিটি মেয়েকে কলকাতার ইংলিশ স্কুলে পড়ার সুবিধা করে দিয়েছেন। তিনজনই কলকাতার বিখ্যাত মিশনারি স্কুল ডায়োসেশন স্কুল অথবা কলেজের ছাত্রী। কোন কলেজে পড়ানো ছাড়াও  হাওড়াতে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথ তাদের জন্য সংগীত এবং নৃত্যকলা শিক্ষার জন্য গৃহশিক্ষিকা নিযুক্ত করে দিয়েছেন।

অরুণা  ডায়োসেশন কলেজ থেকে ১৯১৮ সনে মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপরে একই কলেজ থেকে ১৯২০ সনে সে বিএ পাস করে। এই সময় সত্যব্রত মুখার্জির সঙ্গে অরুণার বিয়ে হয় এবং দুটি ছেলে মেয়ের মা হয়ে ১৯২৮ সনে ইংরেজি সাহিত্যে এমএস শ্রেণিতে উঠেন। রক নাও বিয়ের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। তৃতীয় কন্যা দীপিকা ১৯৩০ সালে বিএ পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে বিটি পড়তে শুরু করেন।

পাঁচ বছর বয়সে সুরভি  হয়ে উঠেছিল প্রাণময়ী, প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারা বুদ্ধিমতী মেয়ে। অরুণা সহজ- সরলহাস্যময়ী। কিছু একটা বললে সহজেই মেনে নেয় এবং সে লক্ষ্মীনাথের বাধ্য মেয়ে। রত্নার মন এতটা খোলামেলা নয়। কিছু একটা পছন্দ না হলে বা মতের মিল না হলে সেটা নিয়ে সে তর্ক করে। যুক্তি দিয়ে বুঝাতে পারলে তবেই রত্না কথাটা মেনে নেয়। ছোটো মেয়ে দীপিকা তিন বোনের চেয়ে একটু আলাদা। সে কথা কম বলে। অরুনা রত্নার মতো সবার সঙ্গে কথা বলে না। স্কুল কলেজে বান্ধবী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাবধানী এবং কিছুটা অর্ন্তমুখী স্বভাবের মেয়ে। বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বি টিতে নাম লাগানোর পরে দীপিকা আরও গম্ভীর হয়ে পড়ল।

সুরভি অকালে চলে গেল। উচ্চশিক্ষিত বরোদার রাজসভার উচ্চ পদের বিষয়া সত্যব্রতের  সঙ্গে বিয়ে হয়ে ঘর সংসার সামলে ছেলে মেয়ের মা হয়ে অরুণা এখন সুখী গৃহস্বামীনী ।এদিকে  ডিব্রুগড়ের ধনী চা ব্যাবসায়ী রোহিনীকুমার বরুয়াকে বিয়ে করে রত্নাও ইতিমধ্যে দুটি কন্যা সন্তানের মা হয়ে ডিব্রুগড়ে থেকে ঘর সংসার করছে। সত্যব্রত রোহিণী দুই জামাই লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞার খোঁজখবর নেয়, অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তাদের কেউ তাদের সঙ্গে থাকেনা। সঙ্গে থাকার জন্য দাবিও করা যায় না। দাবি করার অধিকার নেই।

এখন কন্যার সন্তানের জন্ম হলে ঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠে। কিন্তু মা-বাবার বাড়িতে লালিত পালিত হয়ে যখন পতিগৃহে চলে যায়, তখন ঘরটা শূন্যতায় ভরে পড়ে। অতি আদরের অরুণা এবং রত্না পতি গৃহে চলে গিয়েছে। ইতিমধ্যে দীপিকাও বিবাহ যোগ্যা হয়ে উঠেছে। তাকেও  বিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে। তারপরে কেবল প্রজ্ঞাকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ কীভাবে এই বাড়িতে থাকবেন?.... কথাটা ভাবতেই তার বুকটা কেমন যেন করে ওঠে।

কিন্তু—।

সেদিন দীপিকার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল।

দীপিকাকে নিয়ে প্রজ্ঞা কলকাতায় যাবে। লক্ষ্মীনাথ ঝাড়চোগোড়া পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দেবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দীপিকা অন্যদিনের মতো লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল না। বের হবার সময় দীপিকাকে মাত্রাধিক শান্ত এবং বিশেষ কোনো কথায় মানসিকভাবে সংকল্পবদ্ধ যেন মনে হল। বলল না যদিও লক্ষীনাথের মনে প্রশ্নের উদয় হল, দীপিকা এটা কেন করল? তারপর এই প্রশ্নটি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াল? তার মনে একটা আশঙ্কার সৃষ্টি হল, অশুভ কিছু একটা ঘটতে চলেছে নাকি?

দীপিকাকে ডায়োসেশন কলেজের হোস্টেলে রেখে জোড়াসাঁকোতে দাদা ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে এক রাত কাটিয়ে প্রজ্ঞা কলকাতা থেকে সম্বলপুরে ফিরে আসার দিনই লক্ষ্মীনাথ প্রসঙ্গটা উত্থাপন করলেন। তিনি কথাটা যতটা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন, প্রজ্ঞা সেভাবে নেয়নি। প্রজ্ঞা বলল যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা 'প্রণাম' করাটাকে খুব একটা পছন্দ করে না। এদিকে দীপিকা মিশনারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে ।কলেজের প্রিন্সিপাল শিক্ষকরা খ্রিস্টান ।শ্রেণীকক্ষের পাঠ্যসূচি ছাড়াও খ্রিস্টান ধর্মের বিষয়ে আলোচনা হয় ।যিশুর বাণী শোনানো হয় এবং বাইবেলের গীত গাওয়া হয়। তাই দীপিকার ওপরে এইসবের প্রভাব পড়তেই পারে। প্রজ্ঞার  কথা শুনে লক্ষ্মীনাথ আরও বেশি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।

'দীপির ওপরে খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব। কিন্তু ওই একই কলেজে অরুণা পড়েছে ,রত্নাও পড়েছে। ওই কলেজ থেকেই ওরা বিএ পাস করেছে। ওদের ওপরে তো খ্রিস্টান ধর্মের ঐরকম প্রভাব পড়েনি।'

' ওহো, এত উত্তেজিত হচ্ছে কেন? সবার স্বভাব চরিত্র তো আর একরকম হয় না।'

' আমি কিন্তু দীপিকে অন্যরকম দেখছি। এমনিতেই আমার সঙ্গে অরুণা ,রত্নার মতো এত ফ্রি নয়। তার মধ্যে কিছু দিন ধরে আমার সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দিয়েছে। ওর মনের মধ্যে কী ঢুকেছে, ওর সঙ্গে বসে ভালোভাবে কথা বলে জানার চেষ্টা কর। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কোথায় একটা গন্ডগোল হতে চলেছে।'

' ঠিক আছে।আমি আজই ওকে চিঠি লিখছি।'

স্বামীর উৎকণ্ঠার কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞা ছোটো মেয়ে দীপিকাকে চিঠি লিখল। দশ দিন পরে চিঠির উত্তর এল। লক্ষ্মীনাথ যা আশঙ্কা করেছিল, কথা সেটাই। খুব কম কথায় সরল ভাবে দীপিকা খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অনুরাগের কথা জানিয়ে মায়ের কাছে চিঠি লিখেছে। চিঠিটার কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ আরও বেশি অস্থির হল। এত প্রাচীন, এত ঐশ্বর্যময় সনাতন হিন্দুর সন্তান দীপিকার মনে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অনুরক্তি জেগেছে।দীপিকার ওপরে লক্ষ্মীনাথের আরও রাগ হল। রাগ হল ডায়োসেশন   স্কুল কলেজের কর্মকর্তাদের ওপরে। শিক্ষদানের উদ্দেশ্য দেখিয়ে তারা এভাবে কম বয়সী মেয়েদের কাঁচা মনে খ্রিস্টান ধর্মের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে ভারতীয় হিন্দুদের খ্রিস্টান করার পরিকল্পনা করছে।

উত্তেজনায় লক্ষ্মীনাথ কী করবেন কী করবেন না ভেবে পেলেন না। উত্তেজনা কমে আসার পরে তার মনে পড়ল এখনও তো রোহিণী রত্না কলকাতায় আছে। লক্ষ্মীনাথ তাদের কাছে সাহায্য চাইলেন। তারা ডায়োসেশন কলেজের হোস্টেলে গিয়ে দীপিকার সঙ্গে দেখা করল। কিন্তু হোস্টেলটা খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত। হোস্টেলে বসে এই বিষয়ে দীপিকার সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। তারা দীপিকাকে কলকাতার বাড়িতে ডাকল। কিন্তু দীপিকা দিদির বাড়িতে গেল না।

কথাটা জেনে লক্ষ্মীনাথ দিশাহারা হয়ে পড়লেন। তিনি বড়ো জামাইকে চিঠি লিখলেন। বড়ো জামাই বরোদার রাজ্যে উচ্চ পদে আসীন, বিদেশের ডিগ্রিধারী এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী। লক্ষ্মীনাথের বিশ্বাস সত্যব্রত বুঝিয়ে সুঝিয়ে খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব থেকে দীপিকাকে উদ্ধার করতে পারবে। সত্যব্রতও চেষ্টার ত্রুটি করল না। কিন্তু ইতিমধ্যে খ্ৰিষ্ট ধর্মের প্রতি দীপিকার আস্থা  বিশ্বাস দৃঢ়  হয়ে পড়েছে। যে সমস্ত কথা বলে চিঠির মাধ্যমে সত্যব্রত বোঝানোর চেষ্টা করল দীপিকা সেইসব কথার এরকম যুক্তিপূর্ণ উত্তর দিল যে সত্যব্রত এই বিষয়ে আর এগোতে পারল না।

এবার লক্ষ্মীনাথ অসহায় হয়ে পড়লেন। অশান্তিতে তাঁর আহারে রুচি নাই হয়ে গেল। ব্যাবসায় মন উঠে গেল। লেখাপড়ায় মন বসাতে পারলেন না। রাতের ঘুম নাই হয়ে গেল।

এটা কি হল? মা-বাবা হিসেবে তারা এত যত্ন নেয়, এত আদর করেন, তার প্রতিটি দাবী পূরণ করেন… তথাপি দীপিকা কেন এরকম হল? বাড়িতে প্রজ্ঞার জন্য ব্রাহ্ম ধর্মের উৎসব উপাসনা চলতেই থাকে। প্রতিদিন সকাল বিকেল ব্রাহ্ম গীত গাওয়া হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় সাহায্য করা ছাড়া লক্ষ্মীনাথ ভাগবত ছাড়েননি কীর্তন ছাড়েননি। ভাগবতে বর্ণিত বৈষ্ণবের রসাল বাণী তার জীবনের জন্য অমৃত সুধা অর্থাৎ লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞার বাড়িতে ধর্মীয় আচার সংস্কারের একটি পরম্পরা রয়েছে। ধর্মীয় পরম্পরা এবং নীতি নিয়মের মধ্য দিয়ে তারা জীবনের পথে এগিয়ে চলেছে। মা বাবার মধ্যে এই সমস্ত দেখে শুনেও তাদের ছোটো সন্তান দীপিকা খ্রিষ্টান  হতে যাচ্ছে! কেন? কেন সে খ্রিস্টান হতে চলেছে?তাকে শিক্ষা দানের  ক্ষেত্রে কি ভুল হয়েছে নাকি ?নাকি লক্ষ্মীনাথের নিজের জীবন চর্চায় কোনোরকম ভুল থেকে গেছে?

এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও লক্ষীনাথ কোনো উত্তর পেলেন না ।তা বলে তিনি মনে মনে বসে থাকতেও পারলেন না। এবার লক্ষ্মীনাথ নিজেই দীপিকার কাছে চিঠি লিখতে বসলেন। চিঠিতে নিজের বংশের কথা জানাবেন। বংশের সমৃদ্ধ ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরাৰ কথা জানাবেন। আজ থেকে সাত বছর আগে লক্ষ্মীনাথ তাদের বংশের অতীত ঐতিহ্যের কথা জানিয়ে দীপিকাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিৰ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে পুনরায় লিখলেন— তাদের আদি পুরুষ ছিলেন কলিবর বরুয়া। তিনি তীর্থ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কনৌজ থেকে অসমের হয়গ্রীব মাধব এবং কামাখ্যা দেবীর মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি বেদ–বেদাঙ্গ শাস্ত্রে প্রগাঢ় পণ্ডিত ছিলেন। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নিপুন ছিলেন এবং তার পান্ডিত্যের কথা জেনে তখনকার অসমের রাজা জয়ধ্বজসিংহ এক হাজার পোড়া নিষ্কর মাটি এবং ধনধান্য দিয়ে সংস্থাপন করে রাজার চিফ মেডিকেল অফিসার বা বেজবরুয়া  উপাধি দিয়েছিলেন… ইত্যাদি ।তাছাড়া লক্ষ্মীনাথের মাতা ছিলেন মহাভারতের আঠারোটি  পর্ব অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করা বিখ্যাত লেখক মাধব কন্দলির বংশোদ্ভূত। তাদের বংশ পরিবারের সবাই ধর্মপরায়ণ। হিন্দুর ধর্ম গীতা ভাগবতের উদার বৈষ্ণবের অমল অমৃত সুধায় জীবনচর্চা এবং বিকাশের নীতিতে গভীরভাবে আস্থাভাজন। নিজের বংশের শিক্ষিত সংস্কৃতিবান পুরুষরা ছিলেন হিন্দু। সনাতন হিন্দু ধর্মের এই ধরনের সমৃদ্ধ ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও সেই বংশের সন্তান হয়ে দীপিকা কেন বিদেশী খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে অনুরাগী হয়ে উঠল?

দীর্ঘ হলেও চিঠিটা লেখার পরে লক্ষ্মীনাথের মনটা কিছুটা শান্ত হল। তিনি আশা করলেন এই চিঠিটা দীপিকার মন- মানসিকতায় পরিবর্তন আনবে।

কিন্তু লক্ষীনাথের আশা-অসার হল। পিতার চিঠি পেয়েই দীপিকা নিজের স্থিতি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল।

চিঠির ভাষা সরল। খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি দীপিকার বিশ্বাস গভীর, বিশ্বাসের কারণগুলি উদাহরণ তথ্যের আধারে স্পষ্ট। চিঠিটা পড়ে লক্ষ্মীনাথের মাথার ওপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলেন, খ্রিস্টান ধর্মের রাহু গ্রাস থেকে দীপিকাকে উদ্ধার করা যাবে না। লক্ষ্মীনাথ তারপরে পুনরায় একটি চিঠি লিখলেন। দীপিকার চিঠিতে উল্লেখ করা যুক্তিগুলিকে বিরোধিতা করে দীর্ঘ চিঠি। কিন্তু চিঠিটা ডাকে দেবার পরেও তিনি শান্ত হতে পারলেন না।

ধর্মের প্রতি আস্থা বিশ্বাস নিয়ে বাপ বেটির মধ্যে বৌদ্ধিক যুদ্ধ আরম্ভ হল। অপ্রত্যাশিত এবং অসম যুদ্ধটা দেখে ধৈর্যশীলা প্রজ্ঞা চিন্তিত হয়ে পড়ল ।অবশেষে প্রজ্ঞা নিজে কলকাতায় গিয়ে দীপিকাকে বাড়িতে নিয়ে এল।

দীপিকা বাড়িতে আসতে চায়নি। প্রজ্ঞা ' তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় কষ্ট পাচ্ছেন ।খেতে পারছেন না ।এক মাস ধরে ঘুমোতে পারছেন না ।গত সপ্তাহ থেকে মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে অন্ধকার ঘরের মেঝেতে নিশাচরের মতো পায়চারি করতে শুরু করেছেন ।অনাহার অনিদ্রায় তোমার পাপার ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেছে ।ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন' ইত্যাদি বলার পরে তবে দীপিকা বাড়িতে এল।

বাড়িতে এসেও দীপিকা পিতার মুখোমুখি হয়নি।সারাদিন নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে থাকে। দুপুরবেলা রাতে খাবার টেবিলে একসঙ্গে বসে যদিও প্রয়োজন ছাড়া একটিও কথা বলে না। সে আগের চেয়েও শান্ত হয়ে পড়েছে। চলাফেরাতে ও ধীর স্থির। ২৪ বছর বয়সী মেয়েটিকে ৩৪ বছরের মহিলা বলে মনে হয়। তার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের রাগ হয়, অসহনীয় যন্ত্রণাটা এতটাই  বেড়ে যায় তাকে বকাবকি করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ পিতা, স্নেহশীল পিতা। অপত্য স্নেহের বাঁধনে তিনি বিবশ। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারেন না। 

ধর্মের প্রতি বিশ্বাস আনুগত্য নিয়ে স্বামী এবং মেয়ের মধ্যে এই টানা হেঁচড়া আর কতদিন চলবে ?এই অশান্তি সহ্য করা যায় না। ধর্মের চেয়ে পিতার সঙ্গে কন্যার সম্পর্কটা বড়ো। ধর্মের চেয়ে মানবতা বেশি আদরণীয়। স্বামী এবং মেয়েকে কষ্ট পেতে দেখে প্রজ্ঞারও কষ্ট হয়। অবশেষে সে বলে,' তোমরা একসঙ্গে বসে তোমাদের সমস্যা সংকট গুলি মিটিয়ে নাও না কেন?'

' সমস্যা-সংকট! আমি কি সমস্যা‐ সংকট সৃষ্টি করলাম?' লক্ষ্মীনাথের কন্ঠস্বরে উত্তেজনা,' এই সমস্যা- সংকটের মূলেতো তোমার ছোটো মেয়ে।'

' পাপা—।' সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীপিকা বিনীতভাবে বলল' এটা কোনো সমস্যা বা সংকট নয়।'

'কেন সমস্যা-সংকট নয়?'

' ধর্মীয় এবং উচ্চমান বিশিষ্ট ঐতিহ্যপূর্ণ আচার সংস্কারে আবদ্ধ বেজবরুয়া বংশের মেয়ে হয়ে তুমি খ্রিস্টান হতে চলেছ এ আমি কীভাবে মেনে নেব?'

' কিন্তু পাপা, এই বেজবরুয়া বংশের ডাক্তার গোপালচন্দ্র বেজবরুয়া‐- আমার জ্যেঠামশাই খ্রিষ্টান হয়েছিলেন।'

' হ্যাঁ হয়েছিলেন। আর খ্রিস্টান হওয়ার পরেও গোলাপ দাদার সঙ্গে আমাদের রিলেশন ছিল। তোমার মা আর আমি এক বিধবার সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্ম মতে চাৰ্চে গিয়ে ওর বিয়ে দিয়েছিলাম। মৃত্যুর পরে আমিই খ্রিস্টান ধর্ম মতে ওর ক্রিমেশনের  যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু তোমার জ্যেঠামশাই ডাক্তার গোলাপ বেজবরুয়া কেন খ্রিস্টান হয়েছিলেন সে তুমি জান?'

দীপিকা চুপ। শান্ত দৃষ্টিতে সে উত্তেজিত বাবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

' না ,তুমি জান না। ডাক্তার বেজবরুয়া খ্রিস্টান হয়েছিলেন টাকা পয়সার অভাবে ,ভালোবাসার অভাবে। কিন্তু তোমার তো টাকা–কড়ির কোনো অভাব হয়নি। তুমি খ্রিস্টান হতে যাচ্ছ নিজের মনে ভেবে নেওয়া ভালোবাসার অভাবে। মিশনারি কলেজের পরিবেশে তোমার খ্রিস্টান শিক্ষক শিক্ষিত্রীরা তোমার মন তোমার চেতনা বোধকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। ওরা তোমার ব্রেনটাকে এমনভাবে ওয়াশ করেছে যে তুমি এখন ভাবছ যে তোমার মা বাবা বোন ভগ্নিপতিরা কেউ তোমাকে ভালোবাসে না।। এই সংসারে তুমি একা। তাই তুমি বিধর্মী বিদেশিদের কাছে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ। অর্থহীন কুয়াশায় তোমার হৃদয় মন চেতনাবোধ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।দীপি তুমি মরীচিকার পেছনে ছুটছ, দীপি তুমি মরীচিকার পেছনে ছুটছ।'

কথাগুলি নির্মম। এত নির্মম ভাষায় লক্ষ্মীনাথ কোনোদিন দীপিকাকে বকাবকি করেনি। এদিকে দীপিকা বাবা এভাবে বলবে ভাবতে পারেনি। তথাপি সে সহ্য করল। কথাগুলি সাংঘাতিকভাবে আঘাত করলেও বাবা বলেছে বলেই সে সহ্য করল।

' চিঠিতে তুমি উল্লেখ করেছ, তুমি খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কথা সবাইকে জানালেও তোমার কোনো আপত্তি নেই। তোমার এত আস্পৰ্ধা! তুমি এত বেপরোয়া ! কোথায় দাঁড়িয়ে কোন সাহসে তুমি এত বড়ো কথা লিখলে ? আজ যে তুমি খ্রিস্টান ধর্মকে সর্বোৎকৃষ্ট ভেবে তুমি খ্রিস্ট ধর্মের প্রবক্তা যিশুর শরণাপন্ন হলে খ্রিস্টান ধর্মের মূল গ্রন্থ বাইবেলে আছে — বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদিতে ছিল শব্দ। শব্দই হল ভগবান। কিন্তু এই মত এই বিশ্বাস আমাদের গীতা ভাগবতে আছে। আমরা যে নাম কীর্তন করি— নাম, নামতো শব্দ । নাম মানে শব্দব্রহ্ম । নাম জপ করলেই ভগবানকে পাওয়া যায়। সুতরাং খ্রিস্টান ধর্মপুঁথিতে আমাদের ধর্ম থেকে আলাদা কিছুই লেখেনি।' 

' তাহলে তো বিরোধের কোনো প্রশ্নই থাকেনা পাপা।' অবিচলিত কন্ঠে দীপিকা বলল,' গীতা– ভাগবতের কথা বাইবেলের লেখা থাকলে আমি বাইবেল আশ্রয় করে কি অন্যায় করলাম?'

লক্ষ্মীনাথ থতমত খেয়ে গেল। দীপিকা এত বুদ্ধিদীপ্তভাবে তার কথার উত্তর দিল। এবার তিনি ভালোভাবে বুঝতে পারলেন, দীপিকাকে বোঝানোটা সহজ হবে না। তিনি ভেতরে ভেতরে হতাশ হলেন। হতাশায় অস্থির হয়ে পড়ছিলেন যদিও নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনে বললেন, 'দীপি কথাগুলি ওভাবে ভাবছিস কেন? নিজেদের আধ্যাত্বিক চেতনা সম্পন্ন বিশাল ধর্মীয় জ্ঞান এবং জীবন দর্শন থাকতে পরধর্মের দিকে কেন হাত বাড়াবি? এটা তোর ভুল হচ্ছে। তুই ভুল পথে পা বাড়াচ্ছিস ।আমাদের উপনিষদে আছে আত্মানাং বিদ্ধি' তার অর্থ হল তুমি নিজেকে জানবার চেষ্টা কর। তুমি তোমার আত্মাকে জেনে নিজের মানুষকে জানার চেষ্টা কর। নিজেকে এবং নিজের মানুষকে জানলেই তুমি ভালোবাসার সন্ধান পাবে। আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছি ,মঙ্গলময় ভগবানের দয়ায় তুই যেন সেই ভালোবাসার সন্ধান পাস।আত্মজ্ঞান এবং আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে তুই যেন বিশ্বজগতকে চিনতে পারিস।'

ভগবানের কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে দীপিকার চোখে মুখে অদ্ভুত এক রূপ ফুটে উঠল। এরকম মনে হল যে সে যেন এখানে থেকেও না থাকার মতো হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে বাবার দিকে তাকাতেই তার দেহটা কিছুটা কেঁপে উঠল বলে মনে হল। তারপর তার চোখ দিয়ে দুই ধারায় অশ্রু নেমে এল।

দীপিকার চোখ জোড়া দিয়ে কেন এভাবে অশ্রু ধারা নেমে এল লক্ষ্মীনাথ বুঝতে পারলেন না। কিন্তু দীপিকা তার আদরের সন্তান, তার আত্মার একটি অংশ। সন্তানের চোখে অশ্রু ঝরতে দেখে পিতা লক্ষ্মীনাথ সহ্য করতে পারলেন না। তার কথাগুলি দীপিকাকে আঘাত করেছে। আঘাতের যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরেই সে অশ্রু বিসর্জন করছে। এই উপলব্ধির বেদনা ও অপার। তার জন্যই রাতে ঘুমোতে এসে প্রজ্ঞার দিকে তাকাতেই লক্ষ্মীনাথের এরকম অবস্থা হল যেন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়বেন। প্রজ্ঞা সান্ত্বনা দিতেই তার আবেগ বেড়ে গেল। বিছানায় পরে  বালিশে মাথা গুঁজে গভীর কন্ঠে বলল,' পরি ,আমাদের কোথায় ভুল হল? কী অন্যায় করেছি যে আমাদের সন্তান খ্রিস্টান হয়ে আমাদের ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?'

প্রজ্ঞা কী বলবে? অসহায় অশ্রুপাত ছাড়া স্বামীকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা তাঁর নেই।

লক্ষ্মীনাথের চেষ্টা বিফল হল। তাঁর জীবনটা ঘাত প্রতিঘাতে পরিপূর্ণ। ঘাত প্রতিঘাতের সঙ্গে সংগ্রাম করেই এত বছর এগিয়েছে। সমস্ত ক্ষেত্রে তিনি জয়লাভ করেননি। শিক্ষাজীবনের মাধ্যমিক স্তরে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়া, এমএ এবং আইন পরীক্ষায় বিফল হওয়া, সরল বিশ্বাসে কাঠের ব্যাবসা আরম্ভ করে ডবসন রোডের বাড়িটা ভোলানাথের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য পরবর্তীকালে তার সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই বাড়িটার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, পৃথকভাবে ব্যাবসা আরম্ভ করে বিশ্বযুদ্ধের জন্য  ব্যাবসায় শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হওয়া, বয়স এবং স্বাস্থ্যের জন্য বার্ড কোম্পানির চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়া…এসবের কোনো ব্যর্থতাই আজকের ব্যর্থতার সমতুল নয়। তাঁর জীবন জোড়া সাধনার কোনো জ্ঞান কোনো প্রচেষ্টাই দীপিকাকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হল না। এভাবে দীপিকার খ্রিস্টান হওয়াটা তার সত্তায় এক প্রচন্ড আঘাত।

এই আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে কিছুটা সময় লাগবে। দীপিকাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আর কোনো উপায় নেই জেনেও বুকের মধ্যে জমা হয়ে থাকা বিভিন্ন ক্ষোভ প্রকাশের সঙ্গে ক্ষীণ একটা আশা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ ডায়োসেশন কলেজের শিক্ষার্থী সিস্টার ডরোথি ফ্রান্সিসকে একটা চিঠি লিখলেন,

Dear sister Dorothy Francis ,(Sambalpur,26th August 1932)

I am informed that my daughter Dipika is going to embrace Christianinity …you should have informed her parents if any move has been made towards it.The parents have never relinquished entirely in your favour.They have placed her in your charge for education not for conversion to a religion not of her parents.

…She is a young girl,quite inexperienced in worldly matters and also impressionable ,and your duty is not to fan the fire,she being quite alone and far from home influence.You should have informed her parents all about her mental changes.Does your silence not prove that you did not want to give any chance to her parents to get her out of your influence?I did not think this will go to the credit of the authorities of the Diocesan college and school…

After this do you think that the Hindoos and other the communities will trust Diocesan?

I do not think that you have fully realised the gravity of the situation that by such active or passive or tacit move will create a great agitation in Calcutta amongst the Bengali community and will go towards injuring the reputation of the college, and people will think twice before they made up their minds to send their girls to Diocesan.

I ,therefore, request you to desist from the move, and send my daughter out of the of your influence and place…

Trusting you will kindly adop my suggestion and keep my request ,and thus avoid further complication.

Yours sincerely 

L.N.Bezbaroa


ভাবার চেয়েও চিঠিটার ভাষা কড়া হয়ে গেল।কিন্তু চিঠিটা প্রেরণ করেও কোনো লাভ হল না।সিস্টার ডরোথি ফ্রান্সিস বা ডায়োসেশন কলেজের কর্ম-কর্তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার ছোটো মেয়ে দীপিকা বেজবরুয়া খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়ে সিস্টার দীপিকা হয়ে কিছু বছর কলকাতাতায় বসবাস করলেন।তারপরে ১৯৩৫ সনের ১৪ সেপ্টেম্বর বোম্বাই গিয়ে সেখান থেকে জলপথে ইংলেণ্ড যাত্রা করলেন। 




শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৮ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৮

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৮)

" দাদু, আপনার জামাইয়ের ভাগ্যটা সত্যিই ভালো। অরুণার জামাই সত্যব্রত মুখার্জি অক্সফোর্ডের এম এ,এফ আর এ এস, এফ আর এস এস। বরোদা রাজ্যের ইলেকশন কমিশনার হয়ে চাকরিতে যোগদান করে নিজের কর্ম গুণে রাজ্যরত্ন উপাধি লাভ করেছে। এখন সত্যব্রত রাজ্যের ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে রয়েছে। এদিকে মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া এডিন বরার এমএ, বাড়ি ডিব্রুগড়ে। পৈতৃক আমল থেকে তারা চা ব্যাবসায়ী। তবে অরুণাকে বিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি থেকে। রত্নার বিয়েটা যে সম্বলপুর থেকে দিলেন—?"

' এত বছর সম্বলপুরে বসবাস করে আমার একটা সোসাইটি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সরকারি অফিসের অফিসার ছাড়াও সম্বলপুরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়িত হওয়ার ফলে সম্বলপুর মিউনিসিপ্যালিটিতে সরকারের দ্বারা মনোনীত সদস্য হিসেবে কাজ করছি। এভাবেও পরিচিতি বেড়েছে। এদের বাদ দিয়ে বিয়েটা কলকাতায় আয়োজন করতে খারাপ লাগল। তাই বিয়েটার আয়োজন সম্বলপুরে করলাম।'

' রত্নার বিয়েটা অসমে আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন—।'

' ভেবেছিলাম। বিয়েটা অসমে হলে আমাদের পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা করেছিলাম। তবে জানইত জ্ঞান, আমাদের সমাজ এখন ও পেছনে পড়ে আছে। অন্ধ সংস্কার-কুসংস্কার গুলি তাদের উদার হতে দেয়নি।। আত্মীয়দের একটা দলের কাছে আমি এখনও স্বধর্ম ত্যাগী, ম্লেচ্ছ ব্রাহ্ম। সাহিত্য লিখে নাম যশ হলেও এখনও তারা আমার বদনাম করে। এখনও তারা বলে থাকে, তোমার দিদিমণিকে বিয়ে করার জন্যই নাকি আমি ব্রাহ্ম হয়েছিলাম। আমি নাকি প্রজ্ঞা সুন্দরীর আঁচল ধরা, স্ত্রীর বশীভূত। প্রজ্ঞাসুন্দরীর রূপ যৌবনে এতই বিবশ যে তার সামনে আমার মুখে অসমিয়া কথা ফোটে না। এমনিতেই তারা আমার বদনাম করার সুযোগ ছাড়ে না। এমতাবস্থায় রত্নার বিয়ে অসমে আয়োজন করলে আত্মীয়রা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করেই আমি সেই চিন্তাটা বাদ দিয়েছি। যাই হোক না কেন, ডিব্রুগড় থেকে রোহিণীদের ১৫ জন বরযাত্রী সম্বলপুরে গিয়েছিল। জোড়া সাঁকো থেকে ঋতেনদা এবং গুয়াহাটি থেকে মাজিউ ও ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল। অরুণার বিয়ের মতো এতটা জাঁকজমক না হলেও রত্নার বিয়েটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। তারপরে জামাই পাওয়ার ভাগ্যের কথা বললে— হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ বিশেষ কোনো পণ্যের বলে এত ভালো জামাই পেয়েছি। সত্যিই সত্যব্রত, রোহিনী দুজনেই আমার কাছে দুটি রত্ন। ওরা বলে থাকে কাঠের ব্যাবসা ছেড়ে আমি ওদের সঙ্গে থাকা উচিত তবে জামাইরা যাই বলুক না কেন, মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মাসের পর মাস ধরে থাকাটা—-।'

' তাতে কী হয়েছে? মেয়েদের শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান করে তোলার জন্যই এই ধরনের উচ্চ শিক্ষিত ধনী জামাই পেয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে দেখাশোনা করাটা জামাইদের কর্তব্য।'

' ভবিষ্যতে কী হবে বলতে পারিনা। বার্ড কোম্পানি থেকে রিজাইন দেওয়ার পরে যে ব্যাবসা করতে শুরু করেছি, সেটা খুব একটা জমছে না। গত বছরের আগের বছর ঝাড়চোগোড়ার মাটি এবং সম্বলপুরের বাড়িটার কাগজপত্র জমা দিয়ে শতকরা ৯% সুদে পিসিকুমারের কাছ থেকে পাঁচ হাজাৰ  টাকা লোন নিয়েছিলাম ।লোনের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। এদিকে আমার শরীরের ব্যালেন্স নাই হয়ে গেছে।টানাহেঁচড়া করে দেহটাকে লাইনে রেখে কোনো মতে চলছি।

' হ্যাঁ আপনি রোগা হয়ে গেছেন।'

'রোগা হয়েছি মানে অর্ধেক হয়ে গেছি। মার্চ মাস থেকে এরকম মনে হচ্ছিল যেন আমার ভেতরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে রোহিণীবাপু গত মে মাসে আমাকে কলকাতায় নিয়ে এসেছে। আমাকে থার্টি ফোর বাই ওয়ান বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। এই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসারে মে মাসের পাঁচ  তারিখ থেকে পনেরো তারিখ পর্যন্ত কলকাতায় থেকে একদিন পরপর সাতটা ইঞ্জেকশন নিয়েছি।'

' এখন কীরকম আছেন?'

' আগের চেয়ে ভালো আছি। তবে নিজেকে আগের মতো সাউন্ড বলে মনে হচ্ছে না।'

' দাদু, আপনার রেস্ট দরকার। একনাগারে অন্তত এক মাসের জন্য আপনি রেস্ট নিন। ব্যাবসা ছেড়ে লেখালেখি ছেড়ে আপনি রেস্ট নিতে পারবেন না। এদিকে আপনার কলজের এক টুকরো 'বাঁহী' সম্পাদনা না করলেও সেটা প্রকাশ করা পর্যন্ত আপনাকে চিন্তাভাবনা করতে হয়। আপনি অমিয়কুমার দাসকে সম্পাদক করলেন। কম বয়সী অনভিজ্ঞ অমিয় দাস কীভাবে 'বাঁহী'র সম্পাদনা করবে বলুন তো?'

' দেখ জ্ঞান, ১৯২৯ সন থেকে সম্বলপুরে থেকে'বাঁহী'র সম্পাদনা ,প্রকাশ ,বিতরণ—- এই সবকটি দিক সামলানো আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়ে যদু বাপু এবং মাজিউর সঙ্গে কথা হল। এদিকে উৎসাহী লেখক অমিয়কুমার দাস নিজেই 'বাঁহী' প্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই কাজে জোর দিল বাণীকান্ত কাকতি। আমি তখন যদুবাবুকে চিঠি লিখলাম, কাকতির চিঠি পেলাম ,তোমারও চিঠি পেলাম। দু দিক থেকে দুজন যুবক অধিকারের তাপে বুড়ো অধিকার তখন নাজেহাল। তোমরা দুজনে যা ভালো দেখছ তাই কর। আমার অমতের কোনো কারণ নেই। কেবল মনে রাখবে —-'বাঁহী' আমার মানসপ্রতিমা, অযত্ন হলে আমি খুব কষ্ট পাব।'

তারপর থেকে অমিয়ের সম্পাদনায় 'বাঁহী' গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।'

' পেয়েছি ,কিন্তু সম্পাদনার মান আপনার থেকে নিচু হয়ে গেছে।'

' হবে। ধীরে ধীরে ভালো হবে। অমিয়ের আগ্রহ আছে। তাছাড়া তার সঙ্গে আমাদের বিরহী কবি যতীন্দ্রনাথ মানে আমার আদরের যদু বাপু লেগে আছে। সঙ্গে আছে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যকে গার্ড দিয়ে চালিয়ে নিতে পারা প্রতিভাবান বাণীকান্ত কাকতি। আমার বিশ্বাস এক বছরের ভেতরে'বাঁহী' পুনরায় আগের মতো হয়ে উঠবে।'

' তবে দাদু,ক্রিয়েটিভ রাইটিং বাদ দিয়ে আপনি যে এখন কেবল ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন?'

' এই বিষয়ে'বাঁহী'র কিছু পাঠকও প্রশ্ন তুলেছেন। আমি নাকি 'বাঁহী'কে ধর্মীয় আলোচনায় রূপান্তরিত করার প্ৰয়াস করছি। তবে জ্ঞান, কবিতা- গল্প- উপন্যাস ,শিশু সাহিত্য, নাটক ,প্রহসন ,কৃপাবরী রম্য রচনা, জীবনী লিখেছি। তারপরে শংকরদেব মাধবদেবের জীবনচরিত লিখতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের ভাগবত সাহিত্যে ধর্ম জ্ঞানের ঐশ্বর্যময় একটা ভান্ডার থেকে গেছে। এটা আমাদের সর্বসাধারণ মানুষের গোচরে আনার জন্য আমি আমার সাধ্য অনুসারে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।'

' আপনার এইসব তত্ত্বকথা পড়ে এরকম মনে হয় যেন আপনি ভাগবতের নীতি আদর্শ অনুসরণ করে বৈষ্ণব। সম্ভবত তার জন্যই আপনি প্রত্যেক বছর বাড়িতে নাম কীর্তনের আসর পাতেন। কিন্তু দিদিমণি যখন ব্রাহ্ম উপাসনার আয়োজন করেন, তখন ও আপনি বড়ো মনোযোগের সঙ্গে ব্ৰাহ্মগীত শ্রবণ করেন।'

' ব্রাহ্ম গীত শুনতে ভালোবাসি বলে তুমি ও আমাকে ব্রাহ্ম বলে ভাব নাকি?'

' আমি নিজে ব্রাহ্ম হয়ে আপনাকে এভাবে ভাবতে আমার ভালোই লাগবে। কিন্তু এই কথায় আপনার আসল স্থিতিটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

' অস্পষ্ট বা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই। আসলে আমি দেখলাম বৈষ্ণব এবং ব্রাহ্ম একটা বিন্দুতে গিয়ে এক হয়ে যায়। ব্রাহ্মরা সোজাসুজি ব্রহ্মের সাধনা করে। বৈষ্ণব ভক্তরা গোবিন্দ মহাপ্রভুর মাধ্যমে ব্রহ্মকে পাওয়ার জন্য নাম- কীর্তন সাধন- ভজন করে।'

' এবার গিয়ে কথাটা আমার বোধগম্য হল। তথাপি দাদু ,আমাকে খারাপ পাবেন না— রবি দাদু( রবীন্দ্রনাথ) এই সত্তর বছর বয়সেও তার সৃজনশীল সত্তাটা সক্রিয় রেখেছেন। এখনও  তার সৃষ্টিকর্মে অভিনবত্ব প্রকাশ পায়,তাঁর কবিতা গীতের ভাব গুলিও কী অভিব্যঞ্জনাপূর্ণ।'

' জ্ঞান, তুমি কার সঙ্গে আমার তুলনা করছ! রবি কাকা অনন্য, অসাধারণ। রবি কাকার হৃদয়-মন চেতনা-বোধ সৃষ্টির উন্মাদনায় দুরন্ত।তাঁর সৃষ্টির ধারা মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।'

' তবে আপনার অপূর্ব সৃষ্টি 'আমার জীবনস্মৃতি' খন্ড খন্ড ভাবে বেরিয়েছে— এটাও পড়তে খুব ভালো লাগে।'

' আসলে, আমি সেটা লিখতে চাইছিলাম না। আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধে লিখতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার হেড গার্জেন— মানে তোমার 'দিদিমনি', তিনি সবসময় লেগে থাকেন। তার জন্য কত কী কাগজপত্র আছে, কোন নোটবুকে কী টীকা লিখে রেখেছিলাম, তিনিই সেই সব খুঁজে বের করে আমার টেবিলে সাজিয়ে রাখেন। তবে নিজের কথা লিখতে ভালো লাগে না, বুঝেছ।'

' কেন?'

' আমার এই জীবন স্মৃতিটা,'বাঁহী'র দ্বাদশ বছরের আশ্বিন মাসের ষষ্ঠ সংখ্যায় লিখতে আরম্ভ করে চতুর্দশ বছরের আষাঢ় মাসের তৃতীয় সংখ্যায় শেষ করেছিলাম। কারণ জীবনটা আমার সমতলের সোজা পথ দিয়ে গতি করেনি। কত মানুষের সঙ্গে কত ঝগড়াঝাটি করলাম, আমার নিজের আত্মীয়রা ও আমার উপরে ক্রুদ্ধ হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে কার নামে কী লিখে ফেলি, কে কোন কথায় ঝামেলা পাকাবে এই ভয়ে আমার হাতের কলম কাঁপতে শুরু করে। এদিকে গৃহিণী মানে তোমার দিদিমণি ও আমাকে ধরেছে, তোমার জীবনস্মৃতিতে আমাদের ঘরোয়া কথাগুলি কেন লিখেছ? তাকে যদিও বা বললাম, লেখার সময় আমি ঘরোয়া এবং পরের কথা গুলি বেছে বের করে আলাদা করতে পারি না। কিন্তু নিজের আত্মীয়দেরতো এভাবে বলতে পারি না। তাই ভবিষ্যতে আর লিখব না বলে ভাবলাম। তখন আমার অবস্থা জ্বর ছাড়লেও জলপট্টি না ছাড়ার মতো অবস্থা হল। অবশেষে অনেক কথা বাদ দিয়ে লিখছি। এভাবে লিখতে গিয়ে স্মৃতিকথাটা সিস্টেমেটিক হয়নি। যখন যা মনে এসেছে তাড়াহুড়ো করে লিখে গেছি।'

' কিন্তু এখন পর্যন্ত যতখানি লিখেছেন, তা অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবন বোধের রসের রসালো।' জীবনস্মৃতিতে আপনি নিজেকে সমালোচনা করেছেন,নির্মমভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কৃপাবর বরুয়া হয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। দাদু, আমিও আপনাকে অনুরোধ করছি, যেভাবেই হোক না কেন এটাকে শেষ করবেন। এদিকে গতবছর( ১৯৩০ সন) জানুয়ারি মাসে কলকাতায় 'বেজবরুয়া সমিতি' গঠিত হয়েছিল—-।'

' হ্যাঁ বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া এবং রোহিণী কুমার বরুয়া অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে গঠন করা এই সমিতিটি আমার লেখাগুলির প্রচারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'

' কেবল প্রচারই নয়, আপনার সাহিত্য যাতে সাধারণ পাঠক বুঝতে পারে এবং যুবক লেখকদের মধ্যে যাতে আপনার রচনা প্রণালী এবং বর্ণবিন্যাসের বিস্তর অনুশীলন হয়, তার জন্যও তারা কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।'

' করুক, তারা যা ভালো বুঝে করুক। সেই বিষয়ে আমার দিক থেকে কিছু বলার নেই।'

আলোচনা চলছে জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে । অসাম সাহিত্য সভার বিশেষ আমন্ত্রণ অনুসরণ করে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা থেকে শিবসাগরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন । ডিসেম্বর মাসের বড়োদিনের আগের দিন লক্ষ্মীনাথ রেলে আমিনগাঁও এসে পৌঁছালেন। ফেরিতে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে সকাল আটটার সময় অন্যান্য বারের মতো এবারও তিনি জ্ঞানদাভিরামের দীঘলি পুকুরের পারে বাড়িতে এলেন। জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল তিনি শিবসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। 

শীতকাল। জ্ঞানদাভিরামের পত্নী ঠাকুর বাড়ির অন্য একজন কন্যা লতিকা লক্ষ্মীনাথের সেবা যত্নের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। লতিকার নির্দেশে চাকরানি করে দেওয়া গরম জলে লক্ষ্মীনাথ প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে স্নান করলেন। তারপর মুক্ত মন নিয়ে জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বাইরের বিশাল বারান্দার আরাম চেয়ারে বসলেন। লতিকা পটে গরম চা নিয়ে এসে কাপে কাপে ঢেলে দিলেন। চা খেতে শুরু করে লক্ষ্মীনাথ  এবং জ্ঞানদাভিরামেৰ মধ্যে এইভাবের আদান-প্রদান।

প্রায় এক ঘণ্টা সময় এভাবে আলোচনা করার পরে ভেতরের মহল থেকে লতিকা পুনরায় বেরিয়ে এলেন। হাসতে হাসতে লক্ষ্মীনাথকে বললেন,' আসুন দাদু, ব্রেকফাস্ট করবেন, আসুন—-।'

'বাঃ!' উচ্ছ্বসিত কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' ঠাকুরবাড়ির কন্যা হয়ে তুমি দেখছি অসমিয়াতে কথা বলছ!'

' আমি অসমিয়া পরিবারের পুত্রবধূ, অসমে থাকি। অসমিয়া বলতেই হবে।' মুচকি হেসে লতিকা বলল,' তবে দাদু, দিদিমণি এখনও আপনার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলে না। আপনি দিদিমণিকে অসমিয়া শেখান না নাকি?'

' না, শেখাই না। কিন্তু তিনি অসমিয়া বুঝতে পারেন। প্রয়োজন হলে অসমিয়া থেকে বাংলা বা ইংরেজিতে ও অনুবাদ করেন।'

' তবু দিদিমণি আপনার সঙ্গে অসমিয়াতে কথা বলেন না!'

' সত্যিই বলেন না। আসলে, বুঝেছ লতিকা— তিনি আমার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলতে হবে বলে আমি ফিল করিনা।' মুচকি হেসে লক্ষীনাথ বললেন ,' এটা নিয়ে অসমের কেউ কেউ আমার নামে নানান কটুক্তি করে। কিন্তু আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমার স্ত্রীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলে আমি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যেৰ কোনো লোকসান বা অপমান করছি নাকি?'

লক্ষ্মীনাথের গলার স্বর চড়ছিল। কিন্তু সামনে গম্ভীর ভাবে বসে থাকা জ্ঞানদাভিরামের দিকে তাকিয়ে তিনি নিজেকে সংযত করে বাংলায় বললেন,' আমাদের এইসব সংকীর্ণমনা অসমিয়ারা অসমিয়া‐বাঙালির সম্পর্কটার ক্ষতি করছে। আজ তোমাদের এই ঘরে বসে আমি হলফ করে বলছি , কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ওই ভাইদের মনে থাকা হিংসা বিদ্বেষ দূর হবে। ভাষিক বিদ্বেষ ভুলে অসমিয়া বাঙালি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হবে।'

বড়োদিনের দিন লক্ষ্মীনাথ গুয়াহাটি থেকে রেলে করে শিবসাগরে যাত্রা করলেন। পরেরদিন সকালে শিমুলগুড়ি জংশনে পৌঁছালেন। শিমুলগুড়ি স্টেশনে অপেক্ষা করে থাকা চন্দ্রকান্ত ভূঞা এবং আনন্দরাম লক্ষীনাথকে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপরে তারা আলাদা একটি ট্রেনে লক্ষ্মীনাথকে অন্য একটি ট্রেনে করে শিবসাগর শহরে নিয়ে এলেন। শিব সাগরের অনেক সংস্কৃতিবান ধনী ব্যক্তির বসবাস সত্বেও সম্বর্ধনা জানাবার জন্য সাহিত্য সভার কর্তা ব্যক্তিরা লক্ষ্মীনাথের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করলেন শিব সাগরের ডাকবাংলোয়।

ডিসেম্বরের ২৭ এবং ২৮ তারিখ( ১৯৩১ সন) কথা সাহিত্যিক জমিদার নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী দেবের সভাপতিত্বে সাহিত্য সভার অধিবেশন অনুষ্ঠিত হল। এই অধিবেশনে চৌধুরীদেব সভাপতি আসন থেকে লক্ষ্মীনাথকে 'রসরাজ' উপাধিতে ভূষিত করলেন।

লক্ষ্মীনাথকে মানপত্র দেবার জন্য দ্বিতীয় দিন অসম সাহিত্য সভা  বিশেষ একটি সভার আয়োজন করলেন। এই সভার ও সভাপতিত্ব  করলেন নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীদেব। সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দনের সূচনা করে বললেন,' আজ আমাদের অসম সাহিত্য সভার জীবনে অত্যন্ত সুন্দর এবং অভিনব এক অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে আমার—এই অভাজনের জীবনেরও এক স্মরণীয় দিন। আমাদের সাহিত্যিকদের ভেতরে উজ্জ্বল রত্ন যিনি আজীবন নিঃস্বার্থভাবে স্বদেশপ্রেমের অনুরাগে অসমিয়া ভাষার প্রাণ রক্ষা করে ভাষা সাহিত্যের ভিত দৃঢ় করেছেন। এবং যে অসমিয়া সমাজের জাতীয় জীবন পরিপুষ্ট করেছেন আমরা সমগ্র অসমিয়া জনগণের হয়ে একটি অভিনন্দন পত্র তার করকমলে অর্পণ করে তাকে সংবর্ধনা জানাতে চাইছি।'...

এভাবে ভূমিকা করে সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দন পত্রটা পাঠ করলেন।

অভিনন্দন পত্রটা সাঁচিপাতে সুন্দর করে ছাপা হয়েছে। কারুকার্য করা হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি ছোট বাক্স একটাতে পত্রটা ভরিয়ে পিতলের শরাই সহ লক্ষ্মীনাথের হাতে তুলে দেওয়া হল।সভায় জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজউদ্দিন হাজরিকা দেশনেতা কুলধর চলিহা এবং বাগ্নীবর নীলমণি ফুকন একটি করে সম্বর্ধনা সূচক বক্তৃতা দিলেন।

  এরপরে লক্ষ্মীনাথ লিখিত উত্তরপাঠ করলেন। অসম সাহিত্য সভার সভাপতি, সম্পাদক এবং সদস্যদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, ...আমি অভিনন্দন পাবার যোগ্য নই। অসমিয়া সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজ আমার চেয়ে যোগ্য মানুষ আছে তাদের ভেতর কেউ একজন এই অভিনন্দন পাওয়া উচিত ছিল। আর আপনারা সমূলে না করলেও কিছুটা ভুল করে একজন তৃতীয় শ্রেণির মানুষের মাথায় এই অভিনন্দনের মালতি ফুল অর্পণ করেছেন।

 নিজের লেখার বিষয়ে স্বভাবসিদ্ধ  রসবোধে তিনি ব্যক্ত করলেন,’শৈশব থেকে আমি কলম,দোয়াত কলম কলাপাতা, তারপরে তুলাপাতা হাতে নিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু কী লিখছি আজ পর্যন্ত আমি নিজেই ভালো করে বুঝতে পারিনি। কেউ বলছে সেই সব সাহিত্য হয়েছে কেউ বলছে সেসব নাকি আবর্জনার স্তূপ জমা হয়েছে। আবর্জনার স্তূপ হলেও আমার দুঃখ নেই। কারণ সেটাও গুরু সেবায় লাগবে। অন্তত এই পৌষ মাসের ঠান্ডায় সেই আবর্জনার স্তূপে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আগুন পোহালে সাহিত্য সভার সভ্যরা শীত থেকে রক্ষা পাবে। এবং তারা গলা খোলে বক্তৃতা দিতে পারবে।

 তারপরে আসাম সাহিত্য সভা রসরাজ উপাধি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে লক্ষ্মীনাথ গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরদর্শী মন্তব্য করলেন।‘যখন এই সভা সাহিত্যিককে দেওয়া উপাধিগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধির মতো গণ্য করা হবে, সেরকম দিন এলে কোনো একটি টোলের বা টোলের বাইরের কোনো একজন মোষের আঠালো দই, মালভোগ কলা এবং গুড় দিয়ে এক বাটি কোমল চালের জলপানের পরিবর্তে, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাহিত্যিক বা অসাহিত্যিক সেই ভুরি ভোজনকারী ভট্টাচার্যের কাছ থেকে কবিগুনাকর বা ভাস্কর উপাধির মতো উপাধিতে বিভূষিত হয়ে সাহিত্যক্ষেত্রের ভেতরে বা বাইরে জ্বলজ্বল করে থাকার আর আবশ্যকতা থাকবে না।’

অসম সাহিত্য সভার পরে  শিব সাগরের পলিটেকনিক স্কুলেও লক্ষ্মীনাথকে সংবর্ধনা জানানো হল। তারপরে আমিনগাঁও থেকে রেলে সম্বলপুরের উদ্দেশ্যে  যাত্রা করলেন। 

আসাম থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতা বা সম্বলপুর যাত্রা করার সময় প্রত্যেক বার লক্ষ্মীনাথের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসম সাহিত্যসভা তাকে সভাপতি পেতে জাতীয় সম্মান দেওয়ার পর থেকে তাকে নিয়ে অসমিয়া মানুষের মনে নতুন এক আবেগ, নতুন এক উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক সভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে সম্বর্ধনা,রসরাজ উপাধিতে বিভূষিত করা...লক্ষ্মীনাথ নিজেও অভিভূত হয়ে পড়েছেন। এভাবে তার চিন্তা চেতনায় অসম অসমিয়া জাতি এবং অসমিয়া ভাষা সাহিত্য নিজের ব্যাবসায়িক এবং সাংসারিক কাজকর্মের বাইরে তার সত্তাটা স্বদেশ এবং স্বজাতির মঙ্গলের জন্য নিবেদিত। এখন বহু গুণমুগ্ধ তাকে বিনম্রভাবে অসমে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করছেন। লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হয় যে জীবনের বাকি দিনগুলি অসমে অসমিয়া মানুষের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগবে। কিন্তু বৈষয়িক কথাগুলি বাধা দেয় বলে এই কথা মনের মধ্যে খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

  উপাধি অভিনন্দনে বিভূষিত হয়েও বেদনা ভারাকান্ত মন নিয়ে লক্ষ্মীনাথ জানুয়ারির এক তারিখ সম্বলপুর পৌছালেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষ করে ব্যাবসায় মনোযোগ দিলেন। কিন্তু ব্যাবসাতে মন বসল না। ব্যাবসা থেকে তার মন উঠে গেছে। কাঠের ব্যাবসার জন্য ঘন ঘন এদিকে ওদিকে যেতে হয়,ঠিকা পাবার জন্য রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দেখা করে খাতির যত্ন করতে হয়। এইসব আগের মতো আর পারছেন না ।অসম  থেকে আসার পর থেকে স্বদেশ স্বজাতিকে নিয়ে ভাব অনুভূতি গুলি তাকে কিছুটা উন্মনা উদাস করে ফেলেছে।

  তখনই একটি চিঠি পেলেন। লখিমপুর থেকে কুশল দুয়ারা লিখেছে।সেই কুশল দুয়ারা কলকাতা থাকার সময় যে ছেলেটি পড়াশোনার খরচ জোগাড় করার জন্য শনি রবিবার এবং ছুটির দিনগুলোতে বি বরুয়া কোম্পানিতে কেরানির কাজ করত। তারপরে গুয়াহাটি ছাত্র সম্মেলনের সভায় সভাপতিত্ব করার পরে বিদায় নিয়ে আসার দিন লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য কুশল তাড়াতাড়ি করে ফেরিতে উঠেছিল। এবং মায়ের হাতে বোনা একটা চেলেং  চাদর তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে শ্রদ্ধানতভাবে তাকে প্রণাম জানিয়েছিল। সেদিন কুশলও তাকে অসমে থাকার জন্য  বিনম্র কাতরতার সঙ্গে বলেছিল...।

‘রসরাজ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া স্যার’ বলে সম্বোধন করে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানিয়ে কুশল লিখেছে, ‘আপনি সদাশয়, আমার মতো অভাজনের প্রতি আপনি দয়াশীল। আপনাকে দুঃখ কষ্টের কথা বলতে সংকোচ হয় না। স্যার, মায়ের মৃত্যুর পরের বছর আমার  পরিবার গ্রহনীতে ওপারে চলে গেল। সে রেখে যাওয়া অনাথ সাত বছরের মেয়েটিকে বারো বছর লালন পালন করে গত মাসে বিয়ে দিয়ে কন্যাদায় থেকে মুক্ত হলাম। এখন ঘরে একা থাকি, নিজেই রান্না বান্না করে খাই।আমার অবস্থা দেখে গ্রামের কয়েকজন মানুষ আমাকে জগন্নাথ ধাম দর্শনের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু পুরীতে যাওয়ার কথা ভাবতেই আপনার কথা মনে পড়ল। সভা-সমিতির আমন্ত্রণ রক্ষা করে আপনি সম্বলপুর থেকে অসমে আসেন বলে খবর পেয়ে থাকি। কিন্তু অনেকটা দূরে থাকি বলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি না। এখন জগন্নাথ ধাম মন্দির দর্শনের চেয়েও আপনাকে দেখা এবং কাছে বসে আপনার দুই একটি কথা শোনাটা আমার কাছে বেশি আনন্দের। তাই পুরীর জগন্নাথ ধাম দর্শন করার আগে এই বছর জানুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ আপনি থাকা সম্বলপুরে আসার ইচ্ছা রাখছি কিছুক্ষণের জন্য দর্শন দিয়ে এই অভাজনকে কৃ্তার্থ করবেন বলে আশা করছি ইতি— কুশল দুয়ারা ।

অসমের লখিমপুর থেকে কুশলের এভাবে সম্বলপুরে আসাটাও তার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসার নিবেদন। কেউ শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাতে এলে তাকে অবহেলা করা যায় না। এমনিতেও কুশল বহুবছর থেকে তার পরিচিত, তার ভক্ত। কুশল আসার দিন টাঙ্গাটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ নিজেই সম্বলপুর স্টেশনে এলেন।

  সকালে ঝাড়চোগোড়ায় গাড়ি বদল করে সাড়ে সাতটার সময় কুশল সম্বলপুর পৌছাল। গাড়ি থেকে নেমে প্লাটফর্মের বাইরে এসে লক্ষ্মীনাথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুশল অবাক হয়ে গেল, ‘স্যার আপনি!’

  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি যদিও কুশলের চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ।এখনও পায়জামা পাঞ্জাবি পরা সেরকমই পাতলা চেহারা। শুধু চুলে পাক ধরেছে। 

‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

  ‘তা বলে আপনি নিজে স্টেশনে এসেছেন?’

  ‘সম্বলপুর তোমার অপরিচিত জায়গা। আমার বাড়ি খুঁজে বের করতে তোমার কষ্ট হবে। চল, টাঙ্গা নিয়ে এসেছি। টাঙ্গায় উঠ।’ 

কুশলের দুই চোখে অতলান্ত বিস্ময়! অসমিয়া ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তার মতো মাধ্যমিক স্কুলের সাধারণ একজন শিক্ষকের জন্য এতখানি করছে। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপরে লক্ষীনাথের পা দুটি স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে টাঙ্গায় উঠে সসঙ্কোচে তার বাঁ পাশে বসল।

 কুশল দেখল  বলদ গরু টানা টাঙাটা বেশ সুন্দর। টাঙ্গায় বসে যাওয়াটা আরামদায়ক। এভাবে যাবার সময় লক্ষ্মীনাথ প্রথমে কুশলের মেয়ে জামাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন,লখিমপুরে ‘বাঁহী’র জনপ্রিয়তা কী ধরনের জানলেন এবং লখিমপুরের কারা কারা প্রতিশ্রুতিমান লেখক সেটাও জিজ্ঞেস করলেন। কিছুক্ষণের ভেতরে কুশলকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি পৌঁছালেন।

উড়িষ্যার প্রধান নদী মহানদীর পারে লক্ষ্মীনাথের খড়ের চাল দেওয়া সুন্দর বাংলো। বাংলোটার পেছনদিকে নিম, আমলকি, আম, কাঁঠাল গাছ। সামনের দিকে সুন্দর ফুলের বাগানের সঙ্গে শাক সব্জির চাষ করার জন্য বাগান। বাগানের পেছনে লক্ষ্মীনাথ নিজ হাতে পাথর বালু এবং সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা একটি  বেঞ্চ। এই বেঞ্চে বসে লক্ষ্মীনাথ সকাল বিকেল সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদী এবং মহানবীর ওপারে সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করেন। দুই একরের চেয়ে অধিক ক্ষেত্রফল থাকা এই বাড়ির সামনের দিকে ইউরোপিয়ান ক্লাব বাঁদিকে সম্বলপুর পুলিশ অধিক্ষকের সরকারি বাসগৃহ এবং বাঁদিকে পলিটিক্যাল এজেন্ট যোগেন্দ্রনাথ সেনের বাংলো এবং ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস।

লক্ষ্মীনাথ অরুনা রত্নাকে বিয়ে দিয়েছেন। দীপিকা কলকাতার ডায়োসেশন কলেজের হোস্টেলে থেকে বিএ পড়ে, বাড়িতে প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথ ছাড়া চাকর বাকর মালি এবং টাঙ্গাচালক থাকে। বাংলোয় এসে লক্ষ্মীনাথ ভেতর মহলে নিয়ে গিয়ে আত্মীয়ের মতো কুশলকে আদর করে নিলেন। কুশল ভেবেছিল লক্ষীনাথের সঙ্গে কথাবার্তা বলে চা জল পান খেয়ে পুরীতে যাত্রা করবে। যাবার কথা বলায় লক্ষ্মীনাথ ক্রোধের সুরে বললেন, ‘এত দূর থেকে এসে্‌ছ, দুদিন না থেকে কীভাবে যাবে?তারপর লক্ষ্মীনাথ নিজে কুশলের জন্য থাকা ঘর,স্নানের ঘর দেখিয়ে তার শোবার ঘর  প্রস্তুত করে দিতে চাকরানীকে নির্দেশ দিলেন।

 অতিথি অভ্যাগত এলে প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবীও যত্ন করেন। গতরাতে রেলে থাকার জন্য কুশলকে অনাহারে থাকতে হয়েছিল। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দুপুর বেলার ভাত খেতে বসে প্রজ্ঞা রান্না কয়েক ধরনের তরকারি খেতে গিয়ে কুশল অমৃতের স্বাদ পেল।

লক্ষ্মীনাথ এখন জীবনের প্রান্ত বেলায় পা রেখেছেন। তার শরীরে  আগের বাঁধন নেই। চলাফেরা ও আগের মতো গতিশীল নয়। কিন্তু তার মনের বড়ো একটা পরিবর্তন হয়নি। কুশল দেখল বিকেলে লক্ষ্মীনাথ ব্যাডমিন্টন খেললেন, বিকেলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদীর  ধারে ভ্রমণ করলেন।রাতে ক্লাবে বসে স্থানীয় উড়িয়া বন্ধুদের সঙ্গে স্টেট এক্সপ্রেস ব্র্যান্ডের সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে ব্রিজ খেললেন। কুশল বয়সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে ছোটো। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে কোনো দিকেই কুশলের তুলনা হয় না। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ সাক্ষাৎ করা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কুশলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কুশল অন্যের কাছ থেকে অথবা কাগজে পত্রে সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথের কথা শুনেছিল। সেভাবে শুনে তাকে অসমিয়া জাতির অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ বলে মনে হয়েছিল। এখন বাড়িতে এসে তার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে কুশল বুঝতে পারল ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া বেশি মহান বেশি আপন।

 ‘স্যার, আগেরবার ব্রহ্মপুত্রের বুকে ফেরিতে দেখা হওয়ার সময় আমি আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম ...। রাতের আহার খাবার পরে মনে সাহস গুটিয়ে নিয়ে কুশল বলল, ‘তখন আপনি আমার সেই কথাটার উত্তর দেননি। এখন পুনরায় সেই কথাটা অনুচিত জেনেও বলছি—।’

ম্লান  হাসি হেসে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘এখান থেকে অসমে গিয়ে অসমিয়া মানুষের সঙ্গে আমার থাকা উচিত এই কথাটাই তো বলতে চাইছ।’

 কুশল ঢোক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

লক্ষ্মী নাথের মুখের হাসি শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘এবার শিবসাগর থেকে সম্বলপুরে আসার সময় আমিও এই কথাটা খুব অনুভব করেছি কুশল। অসমে থাকার সময় আমাদের মানুষের ভালবাসা পেয়ে মনটা সত্যি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন আমার অন্তরে এরকম মনে হচ্ছিল যে মাতৃভূমিতে থেকে জন্মভূমিতে থাকতে পারলে আমি বেশি সুখী হতে পারতাম। আমার আত্মা বেশি তৃপ্তি পেত। কিন্তু কুশল আমার যে সেরকম ক্ষমতা নেই ।আমার শরীরে এরকম শক্তিও নেই যে এই শরীর নিয়ে সপরিবারে অসমে ফিরে যাব।’

লক্ষ্মীনাথ এরকম বেদনার সুরে বলল যে কুশলের খারাপ লাগল। অপরাধীর মতো মুখ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার পুনরায় অসমে থাকার কথা বলে আমি আপনার মনে দুঃখ দিলাম নাকি?’

  ‘দুঃখ—না তুমি দুঃখ দাও নি। বরং এভাবে বলে তুমি আমার স্নেহের পাত্র হলে আর তুমি আমাকে ভালোবাস বলেই এভাবে বলতে পারলে। লক্ষ্মীনাথ বললেন,‘এমনিতেও কুশল বুঝেছ,কিছুদিন ধরে এরকম মনে হচ্ছে যেন অসমী মা আমাকে ডাকছে।আমাকে অসমে ফিরে যেতে হবে।আচ্ছা,এখানে আসার আগে চিঠিতে যে তুমি পুরীর জগন্নাথ বাবার চেয়ে আমাকে বেশি গুরুত্ব দিলে,কথাটা কী?’

 ‘স্যার,আপনি স্রষ্টা।আপনার সৃষ্ট সাহিত্য পড়ে হাজার হাজার ,লক্ষ লক্ষ মানুষ জেগে উঠছে।’অদ্ভুত এক মোহ-মুগ্ধতায় কুশল বলল, ‘ আমি একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক।আমি কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারি না যদিও আপনার সৃজন শক্তির মহিমা কিছুটা বুঝতে পারি।তাছাড়া বাবা জগন্নাথ ভগবান যদিও তাঁর সঙ্গে এভাবে এত কাছাকাছি বসে কথা বলতে পারব না।তাই আমার কাছে আপনি বাবা জগন্নাথের চেয়েও মহান।’

 কুশলের মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ চুপ,কিছু পরিমাণে আত্মসমাহিত।

 আরও অনেক কথা বলার আছে।কথা না বললেও লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে থাকাটা আনন্দের,শান্তির।কিন্তু রাত গভীর হয়ে আসছে।লক্ষ্মীনাথের শোবার সময় হয়েছে।এদিকে কুশলের এখানে থাকা দুদিন হয়ে গেছে।লক্ষ্মীনাথের স্নেহ ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকতে পেয়ে তার জীবনটা ধন্য হয়ে গেল।তার আরও দিন চারেক থাকার ইচ্ছে।কিন্তু ব্যাবসায়িক কাজের জন্য লক্ষ্মীনাথকে আগামীকাল ঝাড়চোগোড়া হয়ে কলকাতা যেতে হবে।তারপরেও তিনি দুদিন বাড়িতে থাকবেন না।তাই কুশল কাল সকালের রেলে পুরীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে।

সকালে কুশল জেগে উঠার আগেই লক্ষ্মীনাথ ঘুম থেকে উঠে তাকে ডাকল।সঙ্গে সঙ্গে উঠে প্রাতঃকৃ্ত্যাদি সেরে নিয়ে কুশল প্রস্তুত হল।লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞাকে প্রণাম করে কুশল বের হল।কিন্তু লক্ষ্মীনাথ তাকে একা যেতে দিল না।গাড়োয়ানকে ডেকে টাঙাটা বের করতে বললেন।তারপরে কুশলকে টাঙায় বসিয়ে লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর স্টেশনে এসে পুরীতে যাবার ট্রেনে উঠিয়ে দিলেন।

রেল ছাড়ার ঘন্টা বাজল।ইঞ্জিন উকি দিল।লক্ষ্মীনাথ জানালার পাশে বসা কুশলের দিকে নিজের ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন।কুশলের হাতটা স্পর্শ করতেই লক্ষ্মীনাথের মানসপটে সবুজ গাছপালায় ভরা শ্যাম্ল মাতৃভূমির চির-স্নেহের রূপটা ভেসে উঠল।তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন।কিন্তু বলতে পারলেন না।অবুঝ এক আবেগে তাঁর কণ্ঠ্ররোধ হয়ে গেল।তারপরে তাঁর চোখদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল।    




রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৭ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৭

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৭)

বার্ড কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্বলপুরের জঙ্গল নিয়েছিল। তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। কাঠের ব্যবসা চালানোর জন্য কোম্পানি ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও জঙ্গলের সন্ধান করে থাকে এবং লাভজনক জঙ্গলের সন্ধান পেলেই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সেই জঙ্গলের কাঠ থেকে শ্লিপার তৈরি করে বিক্রি করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। এইবার বার্ড কোম্পানি অসমের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় এবং অসম নেপালের সীমাবৰ্তী এলাকায় কয়েকটি জঙ্গল পেয়ে রেলওয়ে কোম্পানিতে শ্লিপার জোগানের কাজ অব্যাহত রাখবে বলে পরিকল্পনা করল।নিজেকে একজন দায়িত্বশীল জঙ্গল পরিদর্শক এবং জঙ্গলে চলা কাজের পরিচালক রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সক্ষম হওয়ায় লক্ষ্মীনাথ কোম্পানির সাহেবদের বিশ্বাস‐ ভরসার পাত্র হয়ে পড়েছেন।তাই নতুন করে নেওয়া জঙ্গল গুলির কাজের দায়িত্ব দেবার জন্য ১৯২৭ সালের ৩০ জুলাই তারিখে কোম্পানির বড়ো সাহেব তারযোগে লক্ষ্মীনাথকে কলকাতার অফিসে ডেকে পাঠালেন। 

লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে কলকাতার অফিসে এলেন। সাহেব তাকে শিলঙের কাছাকাছি নতুন জঙ্গল নেবার কথা বললেন। জঙ্গলগুলির কাঠের কাজ পরিচালনা করার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। অসমের শিলঙের কাছাকাছি জঙ্গলে কাজ—এদিকে পরিবার থাকবে সম্বলপুরে, লক্ষ্মীনাথ এই দায়িত্বটা গ্রহণ করতে অসুবিধা অনুভব করলেন। মানে আগের মতো মনে সাহস পেলেন না। তবে চূড়ান্ত আর্থিক সংকটে তার অনুরোধ রক্ষা করে বার্ড কোম্পানি চাকরি দিয়েছিল। কোম্পানি থেকে বেতন, বোনাস পায় বলেই তিনি এখন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তার চেয়েও বড়ো কথা হল এই চাকরিটা ছেড়ে দিলে এত টাকা বেতনের অন্য একটি চাকরি কোথায় পাবেন?এ সমস্ত ভেবে লক্ষ্মীনাথ বার্ড কোম্পানির হয়ে অসমের জঙ্গলে কাঠের ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। কোম্পানির বড়ো সাহেব তখন শিলঙের জঙ্গল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীনাথকে একটা প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন।

লক্ষ্মীনাথ যে  অসমের শিলঙের জঙ্গলের কাজের দায়িত্ব নিল, কথাটা প্রথমে প্রজ্ঞাকে জানাল না। অক্টোবরের ১৯ তারিখ কলকাতা থেকে শিলং অভিমুখে যাত্রা করলেন । পরের দিন শিলং পৌঁছে কয়েক দিন ধরে অমলিং,ননগ্ৰাম ইত্যাদি জায়গার জঙ্গল ঘুরে ঘুরে ৯ নভেম্বর কলকাতায় এসে কোম্পানিকে জঙ্গল পরিদর্শনের প্রতিবেদন দাখিল করলেন । প্রতিবেদন পাঠ করে কোম্পানি লক্ষ্মীনাথকে অসমের যোগবানীতে যাবার নির্দেশ দিলেন।এবার অসমের জঙ্গলে যাওয়ার কথাটা প্রজ্ঞাকে না বলে কীভাবে থাকেন? অসমের জঙ্গলে গিয়ে এক সপ্তাহ দশ দিন থাকা নয়, দীর্ঘ আড়াই মাস থাকতে হবে। না জানিয়ে আড়াই মাস অসমের জঙ্গলে থাকাটা উচিত হবে না। অবশেষে প্রজ্ঞাকে বললেন। প্ৰজ্ঞা চিন্তিত হয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল অসমের জঙ্গলে আড়াই মাস থেকে কাঠের ব্যবসা দেখাশোনা করবে বলে সাহেবদের কথা দিয়ে এলে, সত্যিই তুমি পারবে?'

' কেন পারব না? এই কাজই তো করছি—।'

'ওগো, এখন তোমার বয়স হয়েছে। তুমি এখন তেষট্টি বছরের বুড়ো । তাছাড়া ,যখন তখন তোমার নাক দিয়ে রক্তপাত হতে থাকে, তখন তুমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড় যে তিন চার দিন বিছানা থেকে উঠতে পার না। তেমন কিছু হলে আসামের ওই গভীর জঙ্গলে কে তোমাকে দেখবে, শুনি? তাছাড়া তোমার হজম শক্তি কমে এসেছে। তোমার এখন প্রায়ই অম্বল হয়। বনে জঙ্গলে থাকলে দিনের পর দিন বাইরের খাবার খেতে হবে। ওভাবে তোমার পেটের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। কোম্পানির সাহেবরা তোমার এসব কথা বিবেচনা করল না ?'

প্রজ্ঞা অভিজ্ঞ, বিচার জ্ঞান সম্পন্ন। জঙ্গলে থাকা অবস্থায় স্বামীর কী কী অসুবিধা হতে পারে তার জন্য তিনি সচেতন বলেই এভাবে বললেন।আর তিনি সঠিক কথাই বললেন।

লক্ষ্মীনাথ কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অসহায় ভাবে প্রজ্ঞার দিকে তাকিয়ে বললেন ,'চাকরি বাঁচাতে হলে আমাকে আসামে যেতে হবে।'

' বয়সের কথাটা বিবেচনা করে কোম্পানির সাহেবরা জঙ্গলে না পাঠিয়ে তোমাকে অফিসের কাজ দিতে পারত।'

'ওহো, বার্ড কোম্পানির কাঠের ব্যাবসাটা জঙ্গল নিয়েই। এত বছর ধরে জঙ্গলের কাজ করছি—অভিজ্ঞতার জন্যই কোম্পানি আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। আর আমি কি শখ করে জঙ্গলে যাচ্ছি? আড়াই মাস তোমাকে ছেড়ে, মেয়েদের ছেড়ে জঙ্গলে থাকতে আমারে কি ভালো লাগবে? দেখ পরি, সবই তো বোঝ —সাংসারিক খরচ তো আছেই। কলকাতায় হোস্টেলে রেখে রত্না- দীপিকার ইংলিশ স্কুলে পড়ানোর খরচ, তারপর ওদেরকে বিয়ে দিতে হবে। বিয়ে দেওয়ার জন্য এখন থেকেই তো টাকা-পয়সা জমাতে হবে।'

কথাটা সত্য।সব কথাই বাস্তব। কঠোর এই বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া লক্ষ্মীনাথের উপায় নেই।

' সবই মানছি।' গম্ভীর কন্ঠে প্রজ্ঞা বলল, আমি কখনও তোমার কোনো কাজে বাধা দিই না। আমাদের বাড়িতে রেখে তুমি কত জায়গায় ঘুরে বেড়াও, কখন ও না করি না। এবারও তোমাকে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু তোমার এই বয়স আর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কেন যেন মনে হচ্ছে এখন তুমি এত দিনের জন্য আসামের জঙ্গলে থেকে কাজ করাটা তোমার পক্ষে ঠিক হবে না।'

তথাপি লক্ষ্মীনাথ যোগবানীতে এলেন। যোগবানী অসমের সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতিহীন নির্জন স্থান। জঙ্গল। ওখান থেকে এক ফারলঙের  মতো দূরত্বে নেপালের সীমা। এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একটা মারোয়াড়ি দোকান দেখতে পেলেন। দোকানের মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তিনি গোলার ছোটো একটি ঘর নিয়ে বাস করতে লাগলেন। লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর থেকে উড়িয়া কাজের লোক ভালুককে ( আসল নাম মুকুন্দ) নিয়ে এসেছেন। এই বনবাসে একান্ত অনুগত ভালুক হল তার সঙ্গী, তার রাঁধুনি এবং তার বিপদের বন্ধু। ভালুর সঙ্গে ছোটো গোলাটাতে থেকে লক্ষ্মীনাথ জঙ্গলের কাজকর্ম চালাতে লাগলেন।

কিন্তু থাকা খাওয়ায় কষ্ট হল। লক্ষ্মীনাথ মানুষের সঙ্গে কথা বলে হাসি ঠাট্টা করে থাকায় অভ্যস্ত। তার কাছে পান্ডব বর্জিত এই জায়গায় থাকাটা এক ধরনের বন্দিত্ব। অপূর্ব শ্যামলীমা নিয়ে এর প্রকৃতি উদার যদিও ৩-৪ দিন থেকেই লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়েন। বেশি অস্থির হয়ে পড়লে এটা ওটা কাজ দেখিয়ে তিনি কোম্পানির গুয়াহাটির অফিসে চলে আসেন এবং কোম্পানির বাগান রোডের বাসভবনে দুই এক দিন থেকে জীবনের শক্তি নিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যান। এভাবে তার দেহের অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে পড়ল। তিনি নিজেই অনুভব করলেন শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। ভগবানের কাছে ভরসা করার সঙ্গে কাজের ভালুকে সারথি করে জঙ্গলে থেকে তিনি কাজকর্মের দেখাশোনা করতে লাগলেন।

গহন অরণ্যে থেকে কাঠের কাজ।জন্তু-জানোয়ার ছাড়া ম্যালেরিয়ার বীজানু নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মশা, বিষাক্ত সাপ ,রাতে বিদ্যুতের আলো নেই, খাবার জলের অসুবিধা। অসমিয়া জাতীয় অনুষ্ঠান অসম সাহিত্য সভার সর্বজনপূজ্য প্রাক্তন সভাপতি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এখন জীবিকার জন্য অনিশ্চিত এবং বিপদ সংকুল জীবন বেছে নিয়েছেন। তবে এটাই সত্য তিন কুড়ি বছর পার করা লক্ষ্মীনাথ এই সত্যটিকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন ।আগের বাসস্থান ছেড়ে তিনি নতুন করে কাজ আরম্ভ হওয়া গুয়াহাটির কাছে জঙ্গল লাইলাকে ঘর নিলেন।

লাইলাকের জঙ্গলে গাছ কাটা হয়,করাতিরা গাছ কেটে শ্লিপার তৈ্রি করে,সেখান থেকে গাড়োয়ানের মাধ্যমে গরুর গাড়িতে ননগ্রাম জঙ্গলের কাছে থাকা গোলায় এনে রেলের ইঞ্জিনিয়ারকে খাতির করে শ্লিপার ‘পাস’করাতে হয়।প্রতিটি খেপে লক্ষ্মীনাথ লাইলাক থেকে ননগ্রামে হেঁটে আসেন।এভাবে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে আসা যাওয়া করাটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

সম্বলপুর থেকে প্রজ্ঞার উদ্বেগভরা চিঠি আসতে লাগল।জঙ্গলে স্বামীর থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে,সেবা-যত্নের অভাবে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়ছে। প্রজ্ঞা তাকে দ্রুত সম্বলপুরে ফিরে যেতে অনুরোধ করল।পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে লক্ষ্মীনাথ লিখলেন—‘পরি,আমি নিজেও এখানে থাকতে চাই না।কিন্তু কোনোমতে আর কটা দিন কাটিয়ে একেবারে কাজ ছেড়ে চলে আসব।কাল যতীশ দাস ডাক্তার দুঃখ করল যে আমাকে অন্যায়ভাবে এরকম ভয়ানক জঙ্গলে পাঠানো হয়েছে।এই জঙ্গলের জল-হাওয়া খুবই খারাপ।এখানে রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।ভীষণ ডেম্প।বার্ড কোম্পানির সাহেব বেটারা ভীষণ সেলফিস।নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে দিয়ে এভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছে।যাই হোক,সাবধানে আছি।জল ফুটিয়ে খাচ্ছি।ভালু আমাকে দেখাশোনা করছে।তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না।ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করবেন।’

কিন্তু ঈশ্বর লক্ষ্মীনাথের প্রতি সদয় হলেন না।জঙ্গলে তার কষ্ট বৃ্দ্ধি পেল।

এমনিতে মানুষের জীবনে অরণ্য একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।গাছপালায় সবুজ অরণ্যানী হল পাখ-পাখালি,জন্তু-জানোয়ারের বাসস্থান।জঙ্গলের নিজস্ব একটা রূপ আছে।এই রূপটি লক্ষ্মীনাথকে আকৃ্ষ্ট করে।এক সময়ে তিনি মৃগয়ায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন।বন্দুক হাতে নিয়ে বনে-জঙ্গলে ঢুকে মৃগয়ার উন্মাদনায় এক আনন্দ উপভোগ করতেন।মৃগয়া ছেড়ে দেওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথ বনে জঙ্গলের নৈ্সর্গিক রূপটা দেখতে পেলেন। বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাত– কী অপূর্ব রূপ, যেন রূপ সৌন্দর্যে অপরূপা হয়ে স্বপ্নপুরীর পরীরা মর্ত্য লোকে নেমে আসে। লক্ষ্মীনাথ চায়। এত কষ্ট, থাকা খাওয়ার এত অসুবিধাতেও প্রকৃতির এই রূপটি তাকে এক বিমল আনন্দ দান করে।

নির্জন অরণ্যের এই অপরূপ দৃশ্যগুলি লক্ষ্মীনাথের অন্তরের রোমান্টিক ভাব সত্তাটিকে  সজীব করে তোলে। লক্ষ্মীনাথের তখন প্রিয়তমা পত্নীর কথা মনে পড়ে। তার জন্যই অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনের শেষে অস্থায়ীভাবে থাকা বাড়িতে এসে কেরোসিনের ক্ষীণ আলোতে পত্নীকে চিঠি লিখতে বসেন। এভাবে একদিন দুদিন পরে পরে এই চিঠি লেখাটা হল প্রজ্ঞার সঙ্গে হৃদয়ের দরজা খুলে আলাপচারিতা। এভাবে বনবাসে থাকার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা কিছুটা প্রশমিত হয়, সামান্য হলেও দিনের ক্লান্তি নিরসন হয়।

লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে লেখেন,' তোমার পাঠানো মিষ্টি পেলুম। তুমি যে নাড়ু দিয়েছিলে, সেগুলো প্রায় একমাস ধরে খেলুম।' অন্য একটি চিঠিতে,' আমি জঙ্গলের ভেতরে তাঁবুতে আছি। ভালো আছি। একরকম চলে যাচ্ছে। আমার জন্য তুমি অস্থির হবে না। ঈশ্বরের ওপরে ভরসা রাখ, ঈশ্বর আমাকে একরকম করে চালিয়ে নেবেন।' পরবর্তী একটি চিঠিতে,' তোমার মুক্তার মতো হস্তলিপি এইমাত্র পেলুম। মনটা হু হু করছিল। তোমার অমন সুন্দর চিঠিখানা পড়তেই আগুনে জল পড়লে যেমন ঠান্ডা হয়, সেইরকম মনটা আমার তৎক্ষণাৎ  ঠান্ডা হয়ে গেল। তুমি যে কী ঔষধ জান, তুমি সত্যিই দেবী প্রজ্ঞা সুন্দরী।'

কিন্তু অসমের গহন অরণ্যে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা বা প্রেম অনুরাগে পত্নীকে চিঠি লেখাটা তার কাজ নয়। তিনি বার্ড কোম্পানির নির্দেশে এখানে এসেছেন। কোম্পানির সাহেবরা ধুরন্ধর ব্যাবসায়ী। বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে তাকে কোম্পানির ব্যাবসায়িক স্বার্থ দেখতেই হবে।

জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় কাজ হয় না। শ্লিপার তৈরির উপযোগী গাছের অবস্থান অনুসারে করাতিদের কোথায় কোথায় গাছ কাটতে হবে সেটা মহরি এবং করাতিয়ারা স্থির করে। এদিকে জঙ্গলের মধ্যে পথঘাট নেই। করাতিয়ারা কাজ করার জায়গায় পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কাজ দেখার জন্য কোনো কোনো দিন কুড়ি মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়।

একদিন এভাবে ঘুরে ঘুরে জঙ্গলের কাজ দেখতে দেখতে কখন যে সূর্য ডুবে গেল বুঝতেই  পারলেন না। এত গভীর জঙ্গল যে সূর্যের আলো দেখা যায় না।

রাতের অন্ধকার নেমে এল। সঙ্গী ভালুর সঙ্গে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ পথ হারিয়ে ফেললেন। তথাপি সাহস করে এগিয়ে যেতে গিয়ে জঙ্গলের লতা পাতা তাদের পা ঘিরে ধরল। জায়গাটা এত খারাপ যে তারা আর এগোতে পারলেন না।

এদিকে অনতিদূরে  বন্য জন্তু-জানোয়ারের চিৎকার শুনে লক্ষ্মীনাথ প্রমাদ গুণলেন। এরকম মনে হল যে তারা যেন আর রক্ষা পাবেন না। রাতের মধ্যে তারা জন্তু-জানোয়ারের শিকার হয়ে যাবেন। ভয়ে লক্ষ্মীনাথের গলা শুকিয়ে গেল।শেষে আর পারলেন না। ভয়ে ক্লান্তিতে পরিশ্রান্ত হয়ে একটা পাথরের ওপরে বসে পড়লেন।

মনিবের এই অবস্থা দেখে ত্রিশ বত্রিশ বছরের ভালু এখন কী করবে? কীভাবে এখান থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে? নিরুপায় হয়ে ভালু কাতর কণ্ঠে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাতে লাগল।

 ভগবান যেন ভালুর প্রার্থনা শুনলেন। কিছুক্ষণ পরে পাশ দিয়ে দুজন গারো করাতিকে যেতে দেখে ভালু ওদের ডাকল। কাকুতি মিনতি করে ওদেরকে ডেকে এনে পাথরে  শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকা মনিব লক্ষ্মীনাথকে দেখিয়ে ভালু সাহায্য চাইল।‌‌

লক্ষ্মীনাথকে পড়ে থাকতে দেখে গারো করাতি  দুজনের খারাপ লাগল। ওদের সঙ্গে বাঁশের চুঙ্গায় চা থাকে। ওরা লক্ষীনাথকে সেই চা খাওয়াল। ধীরে ধীরে লক্ষ্মীনাথ ও জ্ঞান ফিরে পেলেন। তারপরে গারো করাতি দুজন লক্ষ্মীনাথ এবং ভালুকে ওদের সঙ্গে হাঁটতে বললেন। কিন্তু লক্ষীনাথের অবস্থা এতই শোচনীয় এবং এতটাই দুর্বল যে হাঁটার শক্তি নেই। তিনি অসহায় ভাবে বললেন,' আমি হাঁটতে পারছি না।'

অবশেষে গারো মানুষ দুজনের একজন লক্ষ্মীনাথকে পিঠে তুলে নিয়ে তারা  থাকা জায়গাটায় নিয়ে এল।

মনিবের দুর্দশার দিকে তাকিয়ে বেচারা ভালু বলল,' 'সাহেব আমি কোনোদিন, আপনাকে এত কষ্ট করতে দেখিনি।'

নির্বিকার কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' কী আর করবি? বিধির বিধান কে খন্ডন করবে?'

' আপনাকে এভাবে কষ্ট করতে দেখলে মেম সাহেব কেঁদে ফেলতেন।'

জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এত অসুবিধা এত কষ্ট… সত্যি  লক্ষ্মীনাথ আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন, এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। এত অত্যাচার তার দেহ সহ্য করতে পারবে না। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে বার্ড কোম্পানির চাকরি ছাড়তে হবে। কিন্তু  কার্যক্ষেত্রে সেটা নয়। নয় মানে আর্থিক দিকটা চিন্তা করেই লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়তে পারেন না।

প্রজ্ঞা ছাড়া রত্না এবং দীপিকা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। অরুণা-সত্যব্রত উদ্বেগ প্রকাশ করে তাকে কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দেবার জন্য চিঠি লিখল। তারপরও লক্ষ্মীনাথ চাকরি ছাড়ল না। প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনুসারে তিনি আড়াই মাস পূর্ণ করেই চাকরি ছাড়বেন। কথাটা জানতে পেরে বরোদা থেকে অরুণা‐- সত্যব্রত টেলিগ্রাম করল,' রিজাইন ইমিডিয়েটলি এন্ড কাম ব্যাক টু হোম।'

তারপরেও লক্ষ্মীনাথ লিখলেন, এই জঙ্গল সত্যিই ভীষণ, ভয়ঙ্কর। এখানে এলে কান্না পায়। তবু বলছি, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে তোমরা ভেব না। কোনো মতে আর কটা দিন কাটিয়ে দেব।'

এভাবে চিঠি লিখল যদিও শেষে লক্ষ্মীনাথ আর পারলেন না। পরিশ্রমের পরে বিশ্রাম হয় না।জঙ্গলের প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিশোধিত পানীয় জল খাওয়া-দাওয়া চূড়ান্ত অনিয়ম। নাক দিয়ে রক্তপাত না হলেও লক্ষ্মীনাথের  বদহজম হতে লাগল ।সঙ্গে পিত্ত শূল বেড়ে চলল। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ল। অবশেষে লক্ষ্মীনাথ নিয়তির  সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য হলেন।

কার্কপেট্রিকের পরে দায়িত্ব নিলেন মিঃ জেনার। কিছুদিন পরে মিঃ জেনার কলকাতার মূল অফিসে বিভাগীয় দায়িত্বে বাহাল হলেন। ইতিপূর্বে তিনি কাজ করা পদে এলেন মিস্টার উইথঅল।পালমার নামে এক  কম বয়সী সাহেবের সঙ্গে মিঃ উইথঅল লক্ষ্মীনাথ কাজ চালিয়ে থাকা জঙ্গল দেখতে গেলেন। কাজকর্ম দেখে তারা লক্ষ্মীনাথের প্রশংসা করলেন।

 তার জন্য লক্ষ্মীনাথের মনটা পুনরায় পরিবর্তিত হল। পদত্যাগের কথা না লিখে লক্ষ্মীনাথ মিঃ জেনারকে জানালেন তিনি সুদীর্ঘ বারো বছর ধরে বার্ড কোম্পানিকে সেবা করে আসছেন।নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও ছুটি নেননি। কিন্তু গত দুমাস অসমের অস্বাস্থ্যকর জঙ্গলে থেকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। কলিক পেইন, ইনডাইজেশন এন্ড উইকনেসে আক্রান্ত হয়েছেন।তাই তাকে স্বাস্থ্যকর কোনো জায়গায় বদলি করা হোক অথবা তাকে তিন মাসের ছুটি মঞ্জুর করা হোক।

অবশ্য বার্ড কোম্পানির কর্তারা এত অকৃতজ্ঞ নয় তারা ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে লক্ষ্মীনাথের ছুটি মঞ্জুর করলেন কিন্তু লক্ষ্মীনাথ শান্তি পেল না নিজের ইচ্ছামতো ছুটি পেয়েও মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া অশান্তিটা কমল না। আসলে গত দুই মাস জঙ্গলে থাকার কষ্ট এবং তিক্ততা তাকে এমন করে তুলেছে। তার জন্যই চাকরি থেকে তার মন উঠে গেছে। এটাই লক্ষ্মীনাথের চরিত্রের এক বৈশিষ্ট্য। কোনো কারণে একবার যদি কোথাও থেকে মনটা উঠে যায় তারপরে তিনি আর মনটাকে ঘুরিয়ে আনতে পারেন না। তখন তিনি বৈষয়িক লাভ লোকসানের কথা ভাবতে পারেন না ।ভোলানাথের সঙ্গে সংঘাত লাগার পরে বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও লক্ষ্মীনাথ এটাই করেছিলেন।

মোটের ওপর এখন তিনি বার্ড কোম্পানি ছাড়ার জন্য ভেতরে ভেতরে সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়লেন। কোম্পানি থেকে দ্রুত অব্যাহতি লাভ করার জন্যই তাড়াতাড়ি শিলং গেলেন্। অফিসে কোম্পানির হয়ে করতে লাগা কাজটুকু করলেন। চারদিন পরে গুয়াহাটিতে এসে স্লিপার পাঠানোর জন্য রেলের কামরার বন্দোবস্ত করলেন।পরের দিনই ডাকযোগে বার্ড কোম্পানিতে পদত্যাগপত্র প্রেরণ করলেন। ১৯২৮  সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।তার ১৪ দিন পরে গুয়াহাটি অফিসে এসে মিঃস্মার্ট সাহেবকে নিজের দায়িত্বে থাকা সমস্ত কিছু  বুঝিয়ে দিলেন।

দুই মাসেরও বেশি দিন জঙ্গলে থাকা হল। সাধারণ জনজীবনের চেয়ে অরণ্যের জীবনটা আলাদা। সম্বলপুরে ঝাড়চোগোড়া চামুন্ডা লুড-লোরি বরছাই ইত্যাদি জঙ্গলে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আসামের জঙ্গলে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা আলাদা। এখানকার জঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশটা লক্ষ্মীনাথকে অন্যরকম করে তুলেছিল। প্রতিদিন দাড়ি কামানোতে অভ্যস্ত লক্ষ্মীনাথ গত দুই মাস একবারও দাড়ি কামান নি। চুল কাটেন নি। প্রিয়তমা পত্নী এবং প্রাণাধিক মেয়েদের থেকে দূরে থাকার জন্য তিনি চুল দাড়ি কাটার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন।সাজ পোশাকেও যত্ন নেননি। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে 

গুয়াহাটিতে এসে নাপিত ডেকে এনে চুল কেটে, দাড়ি কামিয়ে পরিষ্কার শার্ট প্যান্ট পরে পুনরায় তিনি ভব্য  সাহেব হয়ে পড়লেন।

বার্ড কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার পরে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো লাগলেও মার্চের এক তারিখ রেলে কলকাতায় যাবার সময় বিগত ১২ বছরের অনেক স্মৃতি তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। সেই সব তাকে বিরক্ত করল, ব্যথিত করল। তারপরে মনটা অনিশ্চয়তায় ভরে উঠল। 

অনিশ্চয়তাটা হল এর পরে কী করবেন? জমা টাকায় কিছুদিন ঘর-সংসার মেয়ে দুটির পড়ার খরচ চালাতে পারলেও তারপরে কীভাবে চলবে? রত্না দীপিকাকে বিয়ে দেবার টাকা সংগ্রহ করবেন কীভাবে? জীবনের বাকি থাকা দিনগুলি কীভাবে চালাবেন? প্রশ্নগুলি তাকে অস্থির করে তুলল। এরকম মনে হল যেন আগন্তুক দিনগুলি ভয়াবহ এক রূপ নিয়ে এগিয়ে আসছে।

 তথাপি লক্ষ্মীনাথ মনোবল হারালেন না। শেষে ভাবলেন বর্তমানেই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায়ই খোলা আছে। সেটা হল পুনরায় কাঠের ব্যাবসা করা। কিন্তু বি বরুয়া কোম্পানি থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ব্যাবসা করতে  গিয়ে সফল হতে পারেননি। এখন তিনি তিন কুড়ি চার বছর বয়সে পড়া এই শরীর নিয়ে কাঠের ব্যবসা নেমে সফল হতে পারবেন কি?

 অসমিয়া জাতি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের উন্নতির জন্য সেবা দান করে অসমিয়া জাতীয় জীবনে একজন বরেণ্য পুরুষ বলে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তার জন্য অসমিয়া মানুষ তাকে ভালোবাসে, সভা সমিতিতে আমন্ত্রণ করে সহস্র জনের মধ্যে ফুলে শোভিত গামছা পরিয়ে হাতে শরাই তুলে দিয়ে তাকে সম্বর্ধনা জানায়। সহস্রজনের উচ্ছ্বাস ভরা হাততালি শুনে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন বলেই মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা এটাই যে বেঁচে থাকার জন্য বা নিজের পরিবারকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য উপাদানটুকু কীভাবে যোগাড় করবেন সেটা অসমিয়া জাতির কেউ চিন্তা করেন না।…এসব ভাবলে লক্ষ্মীনাথের মনের ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।তা বলে জাতীয় দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন না।

গুয়াহাটি থেকে কলকাতায় এসে জোড়াসাঁকোতে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একদিন থাকলেন। হোস্টেলে থাকা রত্না এবং দীপিকার সঙ্গে দেখা করে তাদের কলেজের ফি দিয়ে পরের দিন সম্বলপুরে এলেন।

 লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে প্রজ্ঞার অন্তরটা ব্যথিত হয়ে পড়ল। স্বামীর স্বাস্থ্য এত খারাপ হয়ে পড়েছে। প্রজ্ঞার এরকম মনে হল যেন সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু তার আবেগ উচ্ছ্বাস কম। তিনি সেদিনই ডাক্তার ডেকে এনে লক্ষীনাথের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেন। হজম ভালো হয় না, অম্লশূলে কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তার ঔষধ লিখে দিলেন। সেইসব খাইয়ে প্রজ্ঞা স্বামীর সেবা যত্ন করতে লাগলেন। 

পত্নীর সেবা যত্ন আদর পেয়ে লক্ষ্মীনাথও মনে মনে শপথ নিলে্‌ন, না ভবিষ্যতে আর কখনও প্রজ্ঞাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আর্থিক দিকে কষ্ট হলেও প্রজ্ঞা থেকে আলাদা হয়ে থাকবেন না।

 দুদিন বিশ্রাম নিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় কাজে লাগবে বলে ভাবলেন। এমন সময় দুঃসংবাদ এল। ১৯২৮ সনের দুই  মে প্রাগজ্যোতিষপুরের  লৌহিত্যতট পঞ্চতীর্থে পন্ডিত হেমচন্দ্র গোস্বামী দেহত্যাগ করেছেন। তিনি দেহত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরম্পরার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অন্ত পড়ল।কলকাতায় থেকে জোনাকি প্রকাশের সময়ে অন্যতম প্রধান সহযোগী প্রিয় বন্ধু হেম গোঁসাইয়ের বিয়োগে লক্ষীনাথের অন্তরটা শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। লক্ষ্মীনাথ লিখলেন  সেদিন কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের ২৯ তারিখ আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিতে  গেলাম। কে জানত যে সেই বিদায়ই আমার কাছে শেষ বিদায় হবে। আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাতে আমি তার কাছে থাকতে পারি সেজন্য মাটি এক টুকরো নিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করতে বলেছিলেন, ‘আপনি আসুন দুজনে কাছাকাছি একসঙ্গে বসবাস করি।’

  আজ কার কাছে কে বাড়ি তৈরি করে থাকবে, নিয়তি কে জিজ্ঞেস করছি। আজ অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামীকে হারিয়ে যে ক্ষতি হল সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। অসমিয়া ভাষার সাহিত্য একজন একনিষ্ঠ সেবক হারাল।

  হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল ।এদিকে ব্যবহারিক বাস্তব বড়ো নিষ্ঠুর। লক্ষ্মীনাথ জীবিকার উপায় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। হেমচন্দ্রের মৃত্যু শোক মনে নিয়েও কয়েকবার ঝাড়চোগোড়ায় গিয়ে উড়িষ্যার কোথাও জঙ্গল নেবার জন্য চেষ্টা করলেন। অবশেষে ১৯২৮ সনের ৭ মে লক্ষ্মীনাথ ৫৫৮৩ টাকার বিনিময়ে সম্বলপুর জেলার জমিদারের লাইরা জঙ্গল লিজে নিতে সক্ষম হলেন ।

প্রজ্ঞার সান্নিধ্য এবং সেবা যত্ন পেয়ে ভালো হলেও লক্ষ্মীনাথ সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন না। এদিকে নতুন করে নেওয়া জঙ্গলের কাজ পরিদর্শন করতে হবে। শ্লিপার পাস করাতে হবে। ‘বাঁহী’তে প্রবন্ধ লিখতে হবে এবং অসমের সমস্যার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জঙ্গল নিয়ে কাঠের ব্যবসা চালানো এবং সাহিত্যচর্চা করা দুটি একেবারে বিপরীত ধর্মী কাজ। তথাপি সম্বলপুরে নিজের বাড়িতে থেকে ধীরে সুস্থে ব্যাবসা চালানো ছাড়াও তিনি অসমিয়া সাহিত্য রচনায় মগ্ন হলেন।



  


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...