স্মৃৃৃৃতিকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃৃৃৃতিকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১

ম্মৃতিকথা ১১ :: এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার (গত মাসের পর) || Autobiogrphy, Nilanjan Kumar

 ম্মৃতিকথা ১১  


                               এই আমি চরিত্র


                                নীলাঞ্জন কুমার




                                   । ।   ১১।।


                                গত মাসের পর


ছ' জনের একটি পরিবারের কি করে মা কত কম পয়সায় চালাতেন তা বলে বোঝানো যাবে না । অথচ
কত কি না করেছি । খাওয়া দাওয়া মন্দ ছিল না । দিদিদের জামাকাপড় মা বানিয়ে দিত । সকাল থেকে হাড়ভাঙা খাটুনির করে মা আমাদের মুখে ভাত তুলে দিত। এখন বুঝি তা কতখানি কষ্টকর । আমরা চার ভাই বোন যে মানুষ হয়েছি তার প্রধান কৃতিত্ব মাকে দিতে হবে।  মা ছিল সৌন্দর্য বিলাসী । সারা ঘরদোর একদম পরিপাটি করে সাজানো থাকতো । বাবার বন্ধুরা
মা- র কতো প্রশংসা করত । বাবার নাটকের চর্চার ক্ষেত্রে  মায়ের নীরব সহযোগিতা দেখার মতো বিষয় ছিল। মা কোনদিন অভাবকে অভাব বলে মনে করতো না । হিসেবের মধ্যে দিয়ে চলার জন্য ঠিকঠাক চলে যেত ।
সেজন্য বেলা ভবনের ম্মৃতি সবচেয়ে মধুর স্মৃতি বলে মনে করি । দেবেন কাকু ছাড়া সাব টেনেন্ট হিসেবে আরো দুটি  পরিবার এসেছিল । তার মধ্যে বাবার একজন সহকর্মী ব্যানার্জি কাকু ও অন্যজন ভরত কাকুরাও বেশ ভালো ছিল । ব্যানার্জি কাকুর দুই ছেলের সঙ্গে সমবয়সী হিসেবে ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল ।
কিছুদিন পর ট্রান্সফারের কারণে ওরা চলে গিয়েছিল ।
ভরতকাকু বেশ ভালো মানুষ ছিল । ওদের একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিল , তাকে দারুণ ভালোবাসতাম । এভাবে চলছিল দিন । ধীরে ধীরে ক্লাস টু থেকে থ্রিতে  পৌছোলাম ।
                 এমন সময় বাবার প্রমোশন হল অফিসার পদে। সম্পূর্ণ হঠাৎ করে । বাবা ট্রান্সফার হলো এক্সটেনশন পন্ঞ্চায়েত অফিসার  হিসেবে গড়বেতা শহরের এক নম্বর ব্লকে । এতে সামান্য মাইনে বাড়লো । কিন্তু দুটো জায়গায় খরচ চালাতে মাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল সে সময় । বাবা শনিবার অবধি অফিস করে সোমবার গড়বেতা ফিরে যেত । এভাবে বাবা এক বছর চালিয়েছিল । তারপর একদিন বাবা সবাইকে নিয়ে গড়বেতা শহরে সংসার পাতলো । তখন আমি সবে ফোরে উঠেছি ।
            গড়বেতা শহরেটি ছিল বেশ ছোট । আমরা যখন প্রথমে যে ভাড়া বাড়িতে উঠেছিলাম সেখানে দুটি ঘর ছিল বেশ বড় । সামনে বিরাট উঠোন তার পাশে আরো একটা ঘর। নতুন জায়গায় এসে  সকলের যেমন আনন্দ হয় আমারও তেমনি হয়েছিল । ভর্তি হয়েছিলাম 
বাড়ির কাছে সিলভার জুবিলি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোরে।বাড়ির সামনে দিদিদের কিছু বান্ধবী হয়েছিল ।
দিদিরা খেলতো আইশ পাইস লুকোচুরি খেলা । খেলা শেষ হবার পর হত কপট মারামারি । সকলে বলত ' আদা গদা নুন তেল পাঁচ পুয়া বুন তেল ' ।
                 আমার স্কুল ছিল দুপুর বেলা । মর্নিং স্কুল থেকে হঠাৎ করে দুপুরের স্কুলে পড়াশোনার বিষয়ে প্রথম প্রথম অসূবিধে হত।  খুব ঘুম পেত স্কুলে ,তাছাড়া প্রাকৃতিক ডাক বিশেষ বিপদের সঙ্কেত দিত । আরো একটা বিষয় লক্ষ্য করা  গিয়েছিল বাবা অফিসার হওয়ার কারণে এই ছোট্ট মফস্বল শহরের অনেকেই আমায় এড়িয়ে চলত । কেউ কেউ পেছনে লাগত । আসলে কারো পেছনে লাগা কি জিনিস তার অভিজ্ঞতা হয়েছিল গড়বেতা এসে ।           

                                                ( চলবে)




মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১

স্মৃতিকথা - ১০ || এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার । ১০ । ( গত মাসের পর)

 স্মৃতিকথা - ১০

                            এই আমি চরিত্র
                          

                              নীলাঞ্জন কুমার
                                   ।   ১০ ।

                             ( গত মাসের পর)




  আমার একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল হরি সিনেমার ভেতরের করিডোরে প্রতি নতুন সিনেমায় স্টিল ফটো দেখে তার ডায়লগ কেমন হবে বা ঘটনাটা কেমন হবে এ নিয়ে অনেকক্ষণ কল্পনা করা । বাড়িতে রবিবার  দুপুরে রেডিওতে ' অনুরোধের আসর '  হতো আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত । আসলে রবিবার সকাল থেকে আমার ছিল দারুণ সময় । সকালে রেডিওতে শুনতাম 'শিশু মহল ' যাতে ইন্দিরা দেবী সকাল সাড়ে নটায় বলতেন ' ছোট্ট সোনা বন্ধুরা ভাই আদর আর ভালো বাসা নাও । কি ভালো আছোতো সব? ' তখন বাচ্চারা বলে উঠত সব ' হ্যাঁ ' । সকাল নয়টায় ছিল ' সঙ্গীত শিক্ষার আসর ' পঙ্কজ কুমার মল্লিকের পরিচালনয় শুনে শুনে শিখে নিয়েছিলাম রবীন্দ্র সঙ্গীত ' না না ভুল কোরো না গো ভুল করো না ' আর  ' নজরুল গীতি  ' ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি ' গান দুটি । তার সঙ্গে অনেক পাগলামি ঘিরে ছিল আমাকে । মনে আছে একটা হাস্যকর ঘটনা,  মা বাড়ির দালানে দুই বাটিতে কুরে রেখেছিল নারকেল । আমি আর ছোড়দি ছাদ থেকে এসে দেখি কেউ কোথাও নেই শুধু দুই বাটিতে নারকেল কোরা রাখা । একটি বাটিতে অন্য বাটির থেকে অনেকটা বেশি । দিদি বললো,  ' দ্যাখ কি সুন্দর নারকেল কোরা,  ওগুলো আমার আর তোর জন্য রাখা আছে । তুই ছোট  তাই তোরটা কম । আমরা  মহানন্দে খেতে শুরু করলাম। দিদির শেষ হবার আগেই আমার বাটি ফাঁকা । ছোড়দি শেষ করার আগে রান্না ঘরের থেকে মা বেরিয়ে আমাদের খাওয়া দেখে ' হায় হায় ' করতে করতে  ছোড়দির হাত থেকে বাটি ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ' সকলের জন্য নারকেল রেখেছিলাম, তোরা দুজনে খেয়ে নিলি?  '  শেষে বাকি সকলের জন্য ছোড়দির বাটির সামান্য অবশেষ জুটেছিল ।
              বলা যায় বেলা ভবনে থাকার সময় থেকে আমার বোধ ও বিবেচনা পোক্ত হতে শুরু করে । একটি ছোট্ট ছেলের কাছে বিরাট ছাদ বিরাট দালান আর তিনটি ঘর অবশ্যই অনেকটা । হাত পা ছড়িয়ে যথেষ্ট নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচা যায় ।নিয়মিত স্কুল যাওয়া ও সন্ধ্যায় পড়াশোনা বাদ দিলে সাংস্কৃতিক দিকটি বাড়িতে বেশ উজ্জ্বল ছিল । আমরা তিন ভাই বোন  ( দাদা নির্লিপ্ত থাকতো )  মাঝে মধ্যে লাগিয়ে দিতাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাড়ির ভেতরে । মা বাহবা দিতো । দুঃখ ছিল শ্রোতার অভাব । রাতে স্বপ্ন দেখতাম আমরা অনুষ্ঠান আর বাড়ির দালান ভরা মানুষ শুনছে আর হাততালি দিচ্ছে । আমরা মাঝেমধ্যে  মিটিং এ বসতাম, কত পরিকল্পনা করতাম আর অতি সামান্য তা বাস্তবায়িত হত ।  বাড়িতে আমার খেলার সামগ্রী বলতে ছিল একটা ট্রাই সাইকেল,  যা দাদার ছোট্ট বেলায় কেনা হয়েছিল । পরে দিদিদের হাত ঘুরে আমার হাতে এসেছিল । ঐ সাইকেলে আমায় বসিয়ে দূই দিদি টেনে টেনে সারা দালান ঘুরত । দারুণ আনন্দ পেতাম । ষাটের দশকের ছোটদের তেমন চাওয়া পাওয়া বিষয় ছিল আজকের দিনের থেকে নগন্য । তাতে ।আমরা ছিলাম খুশি । পার্থিব জিনিসের প্রতি অহেতুক আকর্ষণ , জন্মদিনের কেক কাটা , গিফট  ইত্যাদি তখন ছিল কল্পনার বাইরে । আমরা জানতামই না আমাদের জন্মদিন ও বছর ।জন্মদিনে আলাদা করে কোন আয়োজন করা হত না । আমরা  সে সব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না । তবে মায়ের চার ছেলে মেয়ে মানে ভরা সংসার আর আর তা নিয়ে মায়ের আলাদা আনন্দ ছিল । তবে সে আনন্দ কোনদিন আতিশয্যে পৌছোয়নি ।  তবে স্বাভাবিক ভাবে  দাদার সম্পর্কে বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে একটু বেশি প্রাধান্য দিলেও তার ভেতরে সংযম ছিল । মায়ের স্বপ্ন ছিল দাদা খুব ভালো রেজাল্ট করে ভালো চাকরি করবে তা মায়ের কথার স্পষ্ট হয়ে যেত ।
তবে বাবা ছিল একেবারেই অনাসক্ত । ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ত তা মনে থাকত না । এ নিয়ে বাড়িতে হাসাহাসি হত। রেজাল্ট বেরলে বাবা জিজ্ঞাসা করত পাস না ফেল । পাস মানে আনন্দ । আমরা খুশি করতে পারতাম । তখন এখনকার মত পরীক্ষা নিয়ে পারিবারিক আদিখ্যেতা ছিল না ।ফলে আমরা যথেচ্ছ খেলাধূলা,  গানবাজনা করেছি । পড়ার বিষয় বাবা কিছু দেখিয়ে দিত । আমরা যতখানি অ্যাকাডেমিক দিক থেকে পৌঁছাতে পেরেছি তা মা'র স্বপ্ন স্নেহ ও শাসনের গুণে ।              ( চলবে)






মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১

স্মৃতিকথা ৯ || এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার

  

স্মৃতিকথা ৯



                       এই আমি চরিত্র


                          নীলাঞ্জন কুমার








                                   ।।৯।।


বেলা ভবনের জীবন শৈশবের এক বিশেষ সময় আমার  কাছে । মনে আছে আমাদের উঠোনে কুমির চোর খেলার ঘটনা । নয়তো লম্বা দাগ কেটে কিৎকিৎ খেলা । দিদিদের কিছু বন্ধু আসত খেলতে ।  বাড়ির থেকে কিছু দূরে একটা মাঠে'   ' বৌ বাচকি ', ' রুমাল চোর ' খেলা হত । সেখান আমাদের চেয়ে বেশ বড় এক দিদি আমাদের খেলাতেন । আরো মনে আছে এদের মধ্যে একজন আমার সমবয়সী ছেলে আমাকে  ইংরেজি শব্দ  বলে  তার মানে জিজ্ঞাসা করতো । আমি জানতাম না বলে চুপ থাকতাম। ছেলেটির ভেতর সবজান্তা ভাব ফুটে উঠত । তা ক্রমশ বেড়ে উঠছিল । আমি একদিন বড়দির ইংরেজি বই থেকে শব্দ শিখে ছেলেটিকে তার মানে জিজ্ঞাসা করতে সে কঠিন ইংরেজীর উত্তর দিতে না পারলে আমি তা বলে দেবার পর আর কোন দিন আমায় সবজান্তা ভাব দেখাতে আসেনি । বেলা ভবনের পেছন দিকে ছোট্ট ডোবা মতো ছিল। সেখানে  দোলের আগের দিন নেড়াপোড়া হত। তার পাশে এক আদিবাসী মাহালি পরিবার বাস করত। যারা আমাদের বাড়িতে কাজকর্ম  করতো। পৌষ পার্বনে আমাদের পিঠে পুলি দিত। তারিয়ে তারিয়ে সে পিঠে খেতাম ।
             যাহোক এভাবে চলছিল ছোড়দিমণির সঙ্গে রিকশো করে স্কুল যাওয়া , দুপুরে বাড়ি ফিরে সামান্য
নিজে নিজে খেলাধুলা তারপর চান করে মায়ের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া সঙ্গে  ঘুম । বিকেলে খেলাধুলা তারপর সূর্য ডোবার আগে ঘরে ঢোকা ও পড়া শুরু করা । সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ঘুমে ঢোলা শুরু, চোখ হত জবা ফুলের মতো লাল । তারজন্য  মায়ের কাছে কত বকুনি খেয়েছি । রাত আটটায় পড়া শেষ । তারপর রাতের খাবার খেয়ে  টেনে ঘুম । একবারে সকালে বিছানা ছাড়া । এই ছিল আমার তখনের রুটিন । মনে আছে বাড়ির পেছনে  ছিল হরি সিনেমা,   সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যা শো র আগে গান বাজতো । আমার শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছলো গান গুলো । গানগুলো চিৎকার করে নেচে নেচে গাওয়া আমার বিশেষ মজা ছিল ।    কখনো গাইতাম বহুশ্রুত
' এপ্রিল ফুল ' ছবির গান ' এপ্রিল ফুল বনায়া তুমকো গুসসা আয়া ' কখনো আবার মুকেশের গান ' ডাম ডাম ডিগা ডিগা ' গানটির মধ্যে ' খুশিসে ম্যায় ভি গিরা ' কথাটি আমি অক্লেশে বানিয়ে ছিলাম ' খুশিসে মালপো গিরা ' । বাংলা গানের ক্ষেত্রে আমি ' পিছপা ' ছিলাম না। গেয়ে উঠতাম শ্যামল মিত্রের গান ' যদি কিছু আমারে শুধাও' গানটি ।
              মনে আছে প্রতি শুক্রবার  মাইকে প্রচার করতে করতে যেত সিনেমার । সঙ্গে থাকত সিনেমার হ্যান্ডবিল । সেই হ্যান্ডবিল নেবার জন্য রাস্তায় বাচ্চারা  হুল্লোড় করত । আমিও পেয়ে ছিলাম রাশি রাশি হ্যান্ডবিল  । অনেকদিন জমিয়ে রেখেছিলাম । কিন্তু কালের নিয়মে সব হারিয়েছে । সেইসব হ্যান্ডবিল যদি আজ থাকত,  তবে সেই বিষয় নিয়ে কত ভালো প্রবন্ধ লেখা যেত । লাল নীল হলুদ রঙের সস্তা কাগজে ছাপা হত সগৌরবে সগৌরবে  চলিতেছে রাজ কাপুরের অসাধারণ হিন্দি ছবি 'জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায় '।
কিংবা ' মায়ামৃগ ' ছবির হ্যান্ডবিলে ক্যাপশন ছিল  ' টাকা!  টাকা কি ভুলিয়ে দিতে পারে মায়ের অপত্য স্নেহ!  '  যা স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে ।  একটু বড় হলে যখন নিজে নিজে বাড়ি ফিরলাম তখন ছোট বাজারের রাসু ময়রার মিষ্টি দোকানের বিরাট দেওয়ালে বিরাট বিরাট সিনেমা পোস্টার শুক্রবার বদলানো হত । আমি   ' ভূতবাংলো 'ছবির  পোস্টার চেটানো হাঁ করে অনেকক্ষণ দেখেছিলাম বদলাতে ।
                                                          ( চলবে)


স্মৃতিকথা ৯ || এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার

 

স্মৃতিকথা ৯



                       এই আমি চরিত্র


                          নীলাঞ্জন কুমার








                                   ।।৯।।


বেলা ভবনের জীবন শৈশবের এক বিশেষ সময় আমার  কাছে । মনে আছে আমাদের উঠোনে কুমির চোর খেলার ঘটনা । নয়তো লম্বা দাগ কেটে কিৎকিৎ খেলা । দিদিদের কিছু বন্ধু আসত খেলতে ।  বাড়ির থেকে কিছু দূরে একটা মাঠে'   ' বৌ বাচকি ', ' রুমাল চোর ' খেলা হত । সেখান আমাদের চেয়ে বেশ বড় এক দিদি আমাদের খেলাতেন । আরো মনে আছে এদের মধ্যে একজন আমার সমবয়সী ছেলে আমাকে  ইংরেজি শব্দ  বলে  তার মানে জিজ্ঞাসা করতো । আমি জানতাম না বলে চুপ থাকতাম। ছেলেটির ভেতর সবজান্তা ভাব ফুটে উঠত । তা ক্রমশ বেড়ে উঠছিল । আমি একদিন বড়দির ইংরেজি বই থেকে শব্দ শিখে ছেলেটিকে তার মানে জিজ্ঞাসা করতে সে কঠিন ইংরেজীর উত্তর দিতে না পারলে আমি তা বলে দেবার পর আর কোন দিন আমায় সবজান্তা ভাব দেখাতে আসেনি । বেলা ভবনের পেছন দিকে ছোট্ট ডোবা মতো ছিল। সেখানে  দোলের আগের দিন নেড়াপোড়া হত। তার পাশে এক আদিবাসী মাহালি পরিবার বাস করত। যারা আমাদের বাড়িতে কাজকর্ম  করতো। পৌষ পার্বনে আমাদের পিঠে পুলি দিত। তারিয়ে তারিয়ে সে পিঠে খেতাম ।
             যাহোক এভাবে চলছিল ছোড়দিমণির সঙ্গে রিকশো করে স্কুল যাওয়া , দুপুরে বাড়ি ফিরে সামান্য
নিজে নিজে খেলাধুলা তারপর চান করে মায়ের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া সঙ্গে  ঘুম । বিকেলে খেলাধুলা তারপর সূর্য ডোবার আগে ঘরে ঢোকা ও পড়া শুরু করা । সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ঘুমে ঢোলা শুরু, চোখ হত জবা ফুলের মতো লাল । তারজন্য  মায়ের কাছে কত বকুনি খেয়েছি । রাত আটটায় পড়া শেষ । তারপর রাতের খাবার খেয়ে  টেনে ঘুম । একবারে সকালে বিছানা ছাড়া । এই ছিল আমার তখনের রুটিন । মনে আছে বাড়ির পেছনে  ছিল হরি সিনেমা,   সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যা শো র আগে গান বাজতো । আমার শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছলো গান গুলো । গানগুলো চিৎকার করে নেচে নেচে গাওয়া আমার বিশেষ মজা ছিল ।    কখনো গাইতাম বহুশ্রুত
' এপ্রিল ফুল ' ছবির গান ' এপ্রিল ফুল বনায়া তুমকো গুসসা আয়া ' কখনো আবার মুকেশের গান ' ডাম ডাম ডিগা ডিগা ' গানটির মধ্যে ' খুশিসে ম্যায় ভি গিরা ' কথাটি আমি অক্লেশে বানিয়ে ছিলাম ' খুশিসে মালপো গিরা ' । বাংলা গানের ক্ষেত্রে আমি ' পিছপা ' ছিলাম না। গেয়ে উঠতাম শ্যামল মিত্রের গান ' যদি কিছু আমারে শুধাও' গানটি ।
              মনে আছে প্রতি শুক্রবার  মাইকে প্রচার করতে করতে যেত সিনেমার । সঙ্গে থাকত সিনেমার হ্যান্ডবিল । সেই হ্যান্ডবিল নেবার জন্য রাস্তায় বাচ্চারা  হুল্লোড় করত । আমিও পেয়ে ছিলাম রাশি রাশি হ্যান্ডবিল  । অনেকদিন জমিয়ে রেখেছিলাম । কিন্তু কালের নিয়মে সব হারিয়েছে । সেইসব হ্যান্ডবিল যদি আজ থাকত,  তবে সেই বিষয় নিয়ে কত ভালো প্রবন্ধ লেখা যেত । লাল নীল হলুদ রঙের সস্তা কাগজে ছাপা হত সগৌরবে সগৌরবে  চলিতেছে রাজ কাপুরের অসাধারণ হিন্দি ছবি 'জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায় '।
কিংবা ' মায়ামৃগ ' ছবির হ্যান্ডবিলে ক্যাপশন ছিল  ' টাকা!  টাকা কি ভুলিয়ে দিতে পারে মায়ের অপত্য স্নেহ!  '  যা স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে ।  একটু বড় হলে যখন নিজে নিজে বাড়ি ফিরলাম তখন ছোট বাজারের রাসু ময়রার মিষ্টি দোকানের বিরাট দেওয়ালে বিরাট বিরাট সিনেমা পোস্টার শুক্রবার বদলানো হত । আমি   ' ভূতবাংলো 'ছবির  পোস্টার চেটানো হাঁ করে অনেকক্ষণ দেখেছিলাম বদলাতে ।
                                                          ( চলবে)



মঙ্গলবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

স্মৃতিকথা ৮ || এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার

 স্মৃতিকথা  ৮



                           এই আমি চরিত্র

                            নীলাঞ্জন কুমার






                                 ।।৮।।


                          ( গতমাসের  পর)

দেখতে দেখতে স্কুলের সঙ্গে পরিচিতি এলো,  সেই সঙ্গে এলো  বেশ কিছু সহপাঠী বন্ধু । কো-এডুকেশন প্রাইমারি স্কুলে কি মজায়  দিন কাটছিল তা বলে বোঝানো যাবে না।  পড়াশোনার সাথে সাথে খেলাধুলা, শনিবার শনিবার প্রেয়ারে আমার আলাদা করে গান গাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিল । গনেশ দাদুনের বাড়ি ধীরে ধীরে বসবাস করার অযোগ্য হয়ে যাচ্ছিল । বাবা ঘর খুঁজছিল , কিছুদিনের মধ্যে এই শহরের বল্লভপুর এলাকায় প্রায় নতুন একটি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল । বাড়ির মালিকের নাম নকুল কারক । তারা এ বাড়িতে থাকতেন না। একানে বাড়ি । আমরাই সব । ঘর ছিল পাঁচটি । মাত্র পন্ঞ্চাশ টাকা ভাড়াতে এই বাড়ি ষাটের দশকে ঈর্ষণীয় । দুটি টয়লেট থাকার সুবাদে বাবা দুটো ঘরে সাবটেনেন্ট বসিয়েছিল পঁচিশ টাকা ভাড়াতে । ফলে আমাদের আর্থিক দিক দিয়ে কিছু সুবিধে হয়েছিল । বাড়ির নাম বেলা ভবন ।  টাউন স্কুলের উল্টোদিকের গলির ভেতরে ছিল বাড়িটা । সামনে ছিল বেশ বড় একটা পুকুর । পাশে সরস্বতী মন্দির । এই মন্দিরটির একটা ইতিহাস আছে । মন্দিরে সারা বছর পুজো হত না। মাঘী পন্ঞ্চমীতে তিন দিন ধরে  পুজো হত । আসলে এটি জেলে পাড়ার মন্দির । এই মন্দিরটি বৃত্ত করে জেলে পাড়ার বসতি । এই সরস্বতীর নাম নীল সরস্বতী । এটি বৌদ্ধধর্মের একটি দেবী মূর্তি । দেবীর রঙ সাদা ,  তার দুই সখী অবস্থান করতো । বড় বয়সে এই মন্দিরটি নিয়ে দৈনিক বিপ্লবী সব্যসাচী পত্রিকায় লেখার জন্য খোঁজ নিতে গিয়ে জেনেছি এই সরস্বতী জলের দেবী । তাই মৎসজীবীরা এই পুজো করতেন । সরস্বতী কথার অর্থ এখানে জল অর্থাৎ সরসবতী । আর তার বাহন রাজহাঁস অর্থাৎ যার সঙ্গে জলের সম্পর্ক আছে ।
       এই বেলা ভবন ভাড়া নেবার সময় বাবা আমাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল । আমি ওখানে প্রথম ইলেকট্রিক লাইট দেখেছিলাম । বাবা আমাকে সুইচ টিপে দেখালো,  তারপর আমাকে টিপতে বললো । আমি টিপতেই আলো জ্বলতে আমার কি আনন্দ!  গনেশ দাদুনের বাড়ি থেকে বল্লভপুরে উঠে আসার পরেও  বহু বহুদিন  দাদুনের বাড়ির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল । মাঝেমধ্যে মা আমাকে নিয়ে ওদের বাড়ি যেত । দাদুন তখন বেঁচে নেই । দিদিমা কি খুশি হতেন আমাকে দেখে! 
           ন্যাড়া ছাদের একতলা এই বেলা ভবন বাড়িটি কোনদিন  বাড়িওলা দেখতে ও ভাড়া নিতে আসেন নি । আসলে এই নকুল বাবু বাবার কাছে কোন কারণে কৃতজ্ঞ ছিলেন সে কারণে বদান্যতা দেখাতেন   বাবার প্রতি । আমি ও দিদিরা গোটা বাড়িতে প্রচুর জায়গা পেয়ে খেলাধুলাতে মন দিলাম । তবে সন্ধ্যাতে পড়তে বসতেই হত । কিন্তু এই সময়টা আমার বড়ই কষ্টের সময় । খেলে আবার পর পড়তে বসলেই দুচোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসতো । সমানে ঘুমে ঢুলে পড়তাম আর ছোড়দি সমানে বকা দিয়ে যেত । শেষ রাত নটাতে খেয়ে দেয়ে সেই যে ঘুম,  উঠতাম একদম সকাল ।
              আমার স্কুল ছিল সকালে । স্কুল বল্লভপুর থেকে বেশ অনেকটা দূর বলে মা আমাকে সামনের রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাইমারিতে ভরতি করতে চেয়েছিলো । কিন্তু বাদ সাধলো আমার স্কুলের ছোড়দিমনি তরুলতা ঘোষ । তাঁর বাড়ি ছিল বল্লভপুর থেকে পায়ে হাঁটা দূরে । আমাদের সঙ্গে ছোড়দিমনির বেশ ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছিল । উনি আমাকে নাতির চোখে দেখতেন । মাঝেমধ্যে মায়ের সঙ্গে গল্প করতে আসতেন । সে সময় মা অন্য স্কুলে ভর্তির কথাটা পেড়েছিলেন ওঁনাকে । উনি বাধা দিয়ে  বলেছিলেন, সকালে আমার কাছে ওকে পাঠিয়ে দেবেন,  আমি ওকে স্কুলে নিয়ে যাব । তারপর থেকে দিদিমনির কাছে আমার দিদি আমাকে ওঁনার বাড়ি ছেড়ে আসতো তারপর আমি যেতাম ওঁর সঙ্গে স্কুলে আবার ওঁনার সঙ্গে ফিরে আসতাম ।
            এভাবে দিন কাটছিল । ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিলাম । জিজ্ঞাসা গড়ে উঠছিল,  বিস্ময় নিয়ে সারাক্ষণ থাকতাম । বাড়িতে  মায়ের  গানবাজনার চর্চা,   বাবার নাটকের চর্চা সব মিলিয়ে জীবন সুন্দর আর সুন্দর । স্কুলের   পড়াশোনার প্রতি সামান্য মনোযোগ থাকলেও কিন্তু অন্য পড়াশোনা অর্থাৎ খবরের কাগজ, দেশ,  অমৃত,  ঘরোয়া ইত্যাদি এলে তার ওপর হামলে পড়া আমার বিশেষ অভ্যাস ছিল ।  বাড়ির কাছাকাছি মাইকে বেশির ভাগ সময় বাংলা হিন্দি গান  বাজতো । আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল হরি সিনেমা । সে সিনেমায়  বিকেলে আকর্ষণের জন্য বাজতো সিনেমার গান । নিয়মিত এক গান বাজতে বাজতে আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল গানগুলো । দাদা ও বড়দির সঙ্গে বয়সের তারতম্যের কারণে তাদের সঙ্গে দুরত্ব ছিল আমার । মাঝেমধ্যে তারা স্নেহচ্ছলে আমার সঙ্গে খুনসুটি করতো, ওই পর্যন্ত ।
                                                (  চলবে )



মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

স্মৃতি কথা || নীলাঞ্জন কুমার || এই আমি চরিত্র ৩

স্মৃতি কথা । নীলাঞ্জন কুমার


                   এই আমি চরিত্র


                             

                          ।। ৩ ।।

                 ( গত মাসের পর )



বোধ বিষয়টি  বেশ রহস্যজনক । কোন মানুষের জন্মের পর তার কখন প্রকৃত বোধ আসবে তা কারো পক্ষে জানা অসম্ভব  , কারণ আমার জন্মের পর  প্রায় তিন বছর অবধি কোন বোধ না থাকায় বাবা মা দাদা দিদিদের সঙ্গে বোধের মধ্যে দিয়ে পরিচিত হতে হয়  ওই তিন বছর পরেই । জন্মের প্রথম তিন বছর আমি কি কি  করেছিলাম তার সামান্য পরিচয় পেয়েছিলাম বোধের পর মায়ের স্মৃতিচারণ ও স্রেফ কিছু ফোটোর মাধ্যমে । আমাদের   বাবা মা  যে প্রকৃত বাবা মা তাও জানতে হয় আমার জন্মগত ভাবে পাওয়া পরিবারের ভেতর দিয়ে । আর আশ্চর্য তাকে মেনেও নিই!  এর একমাত্র কারণ বাবা মায়ের আচরণ , যা আমাকে ভেতর থেকে বুঝতে বাধ্য করেছে এঁরা আমার জন্মদাতা দম্পতি । ১৯৫৯ সালের ১০ জানুয়ারি  (  সার্টিফিকেটে তাই পাওয়া যাচ্ছে) এই আমি চরিত্রটি পৃথিবীতে আসায় যে জন্ম হয়েছিল তার থেকে অনেক অনেক বেশি বড় মনে করি  যে দিন আমার বোধের জন্ম হয়েছিল । কার্যত বোধের যৌক্তিক দিক দিয়ে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম বাবা মা দাদা দিদি রূপে চরিত্রদের,  সেদিন থেকে আজ অবধি স্মৃতি আমার সঙ্গে আশ্চর্যজনক ভাবে জাগ্রত । যখন বোধ আসে তখন দেখেছিলাম এক লম্বা মতো কিশোর সিঁড়ি দিয়ে ছাদে যাচ্ছে,দুটি মেয়ে কি বলাবলি করছে,  আমার প্রথমে যে বিস্ময় মাখানো প্রশ্ন উঠে আসে,   এরা কে ?  এরপরে এক মহিলা এসে আমায় কোলে নেয় । তাকে আমি নিশ্চিন্তে জড়িয়ে ধরি। আর এক পুরুষের সঙ্গে পরিচিত হই সন্ধ্যায়। আমি বোধের চোখ দিয়ে দেখেছিলাম আমার মা বাবা দাদা দিদি । ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম আমরা মেদিনীপুর শহরের মীর বাজার এলাকায় হাতিশালার গলির ভেতরে একটি
একতলা বাড়িতে বসবাস করি । এই বাড়িতে স্বামী  , স্ত্রী ও চার ছেলে মেয়ে নিয়ে তমলুক শহরের  থেকে এসে কায়ক্লেশে দিনগুজরান করছেন । বাবার সংসারের প্রতি কিছু উদাসীনতা নিরন্তর যাত্রা থিয়েটারের প্রতি আকর্ষণ বাড়িতে সাংস্কৃতিক পরিবেশ থাকলেও,  অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সামান্য একজন সরকারি কনিষ্ঠ কেরানির সংসার চালানোর জন্য গৃহকর্ত্রীর প্রাণপাত প্রত্যক্ষ করেছি।
        বোধের পর আমি জানতে পেরেছিলাম মানুষকে চেনা ও মনে করার জন্য নামের প্রয়োজন হয় । এই নাম বিষয়টি বেশ ধাঁধালো , যার নামকরণ হচ্ছে  নাবালকত্বের কারণে তার মতামতের কোন প্রয়োজন থাকে না ।  জন্মের মাস ছয়েক পর অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানে পরিবার পরিজন মিলে শিশুটির ওপর একটি ' ভালো নাম ' দাগিয়ে দেয়।পরে তা সরকারি ভাবে খোদিত হয় ও আজীবন ইচ্ছে নয়তো  অনিচ্ছেয়  তাকে বয়ে বেড়াতে হয় । যদিও  নাম পরিবর্তনেরআইন আছে , তবু  ' বাপ মায়ের দেওয়া '  নামের সংস্কার নিয়ে অনেকেই পরিবর্তন করেন না । সেরকম আমারওএকটা ভালো নাম হয়েছিল,  দাদার নাম অশোক- এর মিল রেখে ' অন্ঞ্জন ' । এছাড়া বাড়ির সব থেকে ছোট হওয়ার কারণে বেশ কিছু ডাক নাম জুটেছিল । মামার বাড়ি থেকে ' টোটোন ' , বাবার দেওয়া   আদরের নাম 'বাঘা ' , মায়ের ' খোকন ' ও' বাপি ' । পরবর্তীতে একটি ডাক নাম সকলের কাছে প্রিয় হয়ে গেল ' বাপি '।
            এতগুলো নামধারী কিউট বাচ্চাটি  জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে যখন পৃথিবী দেখছে তখন সে খুঁজে পাচ্ছে বৃষ্টির সময় ভাড়া বাড়ির ছাদ থেকে জল পড়া । সকালে উঠে বাবার বাজার যাওয়া,  এরপর বাড়ি এসে  ভেজানো ছোলা বাদাম খেয়ে ডন বৈঠক আসন ও বারবেল  ভাঁজা , তারপর সাইকেল হাওয়া দেওয়া,  স্নান ও ঠাকুর প্রণাম,  ভাত খেয়ে ধুতি পান্ঞ্জাবী পরে  অফিস যাওয়া ।   দাদার মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে  এইটের ক্লাস করতে যাওয়া ও বিকেলে ফেরা,  দুই দিদি  ( বড়- র নাম কৃষ্ণা , ছোট-র কাবেরী,  দুজনেই বর্তমানে প্রয়াতা ) পড়তে যেত অলিগন্ঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে। আমি প্রায় সময়  পৌঁছে যেতাম টলোমলো পায়ে বাড়িওলা গনেশ চাবড়ীর বাড়ি ।  একই কম্পাউন্ডের মধ্যে সব ।  মা আমাকে গনেশ দাদুন বলতে শিখিয়েছিল। দাদুনের ছিল মীরবাজারের বাজারের ভেতরে মুদির দোকান । পরে  ওঁনার ছেলে বাদল কাকু  দোকানটি চালান । তাছাড়া তাঁর দুই মেয়ে যাদের আমি পিসি বলতাম তারা তখনই ছিলেন বিবাহিতা। দিদিমাও আমায় ভীষণ ভালোবাসতো । বেশ সুন্দর এক সাহচর্য গড়ে উঠেছিল আমাদের ওই পরিবারের সঙ্গে । মনে আছে পৌষ সংক্রান্তির দিনে দাদুন আমাদের কাঁসাই নদীর  ধারে মেলা দেখাতে নিয়ে যেতেন ।  তিনি প্রত্যেক ভিখিরিকে পয়সা দিতেন কখনো দিদিদের কখনো আমার হাত দিয়ে । আমাদের সে কি আনন্দ!  পৌষসংক্রান্তির মেলা মেদিনীপুরের এক বিশেষ মেলা । প্রতি বাড়িতে যেন মহোৎসব!  পাড়ায় পাড়ায় পিঠে পুলির গন্ধে ম ম আর ঘুড়িতে আকাশ ঢেকে যাওয়ার নতুন বোধ এই আমি চরিত্রের কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা ।এই দিন মা দিদিদের লেগে পড়তে দেখেছি পিঠেপুলির আয়োজনে । সকালে মা কুরে রাখতো চার পাঁচটি নারকেল আর গমকল থেকে ভাঙানো হত চালের গুঁড়ো । গমকলে ওই সময় দিন দশেক শুধু ভাঙানো হত চালগুঁড়ি ।খেজুর গুড়ের সঙ্গে সেই নারকেল কোরা গরম করে পুর তৈরি করে আমরা লেগে পড়তাম পিঠে উৎসবে। রাতে সামান্য পিঠে খেয়ে সকালে সবাই মিলে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে খেতে বসতাম খেজুর গুড় দিয়ে  সেদ্ধ পিঠে,  দুধেগুড়ে , পায়েস পিঠে ।  রাতে পিঠে করার সময় মা বাবাকে সাবধান করে দিত , কারণ বাবা পিঠে নষ্ট করে দেওয়ার মন্ত্র জানতো। বাবার কাছে শুনেছি,  বাবা তমলুকে মন্ত্রবলে  অনেকেরই বাড়ির পিঠে নষ্ট করে কুকৃর্তি বাঁধিয়েছিল ।

                                        (  ক্রমশ)

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

স্মৃতি কথা || নীলাঞ্জন কুমার || এই আমি চরিত্র

স্মৃতি কথা || নীলাঞ্জন কুমার

                    এই আমি চরিত্র

                              


                         ।। ২ ।।

                 ( গত মাসের  পর)

বাকি তিন দাদা-দিদি (  যারা এই স্মৃতি কথায় ইচ্ছে অনিচ্ছেয় এসে পড়বে)  একজন সদ্যোজাতের প্রতি পার্থিব মায়া মমতা নিয়ে পাশে থাকার জৈবিক গুণগুলি নিয়ে সে সময় আমার সঙ্গে ছিল মা বাবার সঙ্গে যা আমাকে বাড়তি কিছু দিয়েছিল । জন্মস্থান তমলুক শহরের পার্বতীপুরে, সেখানে দাদু কাকুদের স্নেহচ্ছায়া অন্যতম পাওয়া বলে মনে করি । স্বাভাবিকভাবেই এই সদ্যোজাত অবোধ চরিত্রটি তার সেই সময় থেকে মা বাবার কাছে তাদের স্মৃতিমতো (পরবর্তীতে  যখন বাবা মা আমায়  নিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়তো ) জেনেছে সেই অবোধ সময়ের কিছু খন্ড মুহূর্ত । যেমন,  খুব একটা মা বাবাকে বিব্রত করিনি,  কি যেন ভেবে যেতাম । ভেতরে ভেতরে একটা চন্ঞ্চলতা ছিল,  তেমন কিছু দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম । যার জন্যে মা আমায় আদর করে বলতো ' হাঁ করা ছেলে '। সবচেয়ে মজা হয়েছিল  আমার অন্নপ্রাশনের দিন , সেদিন ছিল ভীষণ বৃষ্টি । বৃষ্টির জন্য রুই কাতলা   মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না । তবে ছিল কেবল ইলিশ । বাবার মাথায় হাত , কি হবে! মা বুদ্ধি দিলো, অন্য মাছ নেই তো কি হয়েছে,  ইলিশ তো আছে । তাই সবাই খাবে । এলো ইলিশ,  সবাই মহানন্দে খেয়ে আমায় আশীর্বাদ করে চলে গেল । মা আর একটি কথা বারবার বলতো,  ওই দিন প্রথা অনুযায়ী আমার সামনে দেওয়া হয়েছিল  একটি রেকাবিতে একখানা রুপোর টাকা ও একটি বাবার সখের দামী সোনার নিব দেওয়া পারকার পেন । মায়ের  জবানিতে জানাই  :  যখন খোকনের  ( মা'র আমাকে দেওয়া ডাকনাম) সামনে এগুলো রাখা হল তখন কিছুক্ষণ  সেদিকে চেয়ে আস্তে আস্তে তুলে নিলো পেনটা । তখন ওর কি আনন্দ ! শক্ত মুঠোয় ধরে আছে,  মনে হচ্ছে আর ছাড়বে না । কিছুক্ষণ তাই নিয়ে খেলার পর এলো ঘুম , হাতে কিন্তু সেই কলম । ওর বাবা বুদ্ধি করে আস্তে আস্তে হাত থেকে পেনটা বের সেখানে ঢুকিয়ে দিলো একটা অন্য কলম । ঘুম থেকে উঠে অন্য পেন দেখে বাবুর কি কান্না!  অনেক কষ্টে ভোলাতে হয়েছিল ।
        আমি নামের এই চরিত্রের সঙ্গে মা বাবা সহোদর সহোদরা দাদা দিদি রূপে যে সব চরিত্র পাইয়ে দিয়েছেন   প্রকৃতি তাঁদের মধ্যে  হলেন বাবা মুক্তিদারন্ঞ্জন চক্রবর্তী, যিনি তাঁর তারুণ্যে যৌবনে তমলুক শহরের দামাল ব্যক্তি । ছিলেন যশস্বী অভিনেতা ,যাত্রা নাটকের পরিচালক । বাবা নিয়মিত তমলুকের কুস্তির আখড়ায় ব্যায়াম ও কুস্তি লড়তেন।  উনি মেদিনীপুর শহরের এক অনুষ্ঠানে নটসম্রাট হিসেবে বিভূষিতও হয়েছিলেন । ১৯৫৬ সালে  তমলুক বান্ধব সমাজের প্রযোজনায় কলকাতার চেতলায় অহীন্দ্র মন্ঞ্চে 'কেদার রায় ' নাটকে বাবা   'শ্রীমন্ত ' চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে স্বর্ণ পদক লাভ করেন। প্রতিযোগিতায় একজন বিচারক হিসেবে ছিলেন সাহিত্যিক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় । বাবার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাঁর লেখা উপন্যাসের সিনেমা ' না ' তে বাবাকে সুযোগ দিয়েছিলেন । কিন্তু তৎকালীন তিন ছেলে মেয়ের বাবা  (আমি তখনও পৃথিবীতে আসিনি  )  ও সরকারি চাকুরে হিসেবে সব ছেড়ে ছুড়ে  সিনেমাতে অভিনয় করা মানে সর্বনাশ , চরিত্র ও নিজেকে নষ্ট করে দেওয়ার পথ বেছে নেওয়ার সে সময়ে বদ্ধমূল ধারণার বশবর্তী হয়ে প্রধানতঃ দাদুর বাধায় সে প্রস্তাবে বাবা সায় দিতে পারেননি। পরে সে চরিত্র নবাগত বিকাশ রায়কে দেওয়া হয় । তাঁকে দেখি মেদিনীপুর জেলার শৌখিন নাটক ও যাত্রায় অসামান্য দক্ষতায়  অভিনয় ও পরিচালনা করতে । যা অবিভক্ত মেদিনীপুরের নাট্য ইতিহাসে আজও অম্লান ।১৯৯৮সালে ৭২ বছর বয়সে স্নায়বিক রোগের কারণে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দেন ।
          মা অশ্রুকণা চক্রবর্তী ছিলেন সে সময়ের  ডাকসাইটে  সুন্দরী ও কণ্ঠশিল্পী । স্বাধীনতার আগে মহিলাদের মাইকে গেয়ে ফাংসন করতে খুব একটা দেখা যেত না । যারা করেছেন তাদের মধ্যে মা একজন । '  বালুচরি ' সিনেমা খ্যাত  সুরকার  রাজেন তরফদারের শিষ্যা ছিলেন তিনি।  হুগলির  শেওড়াফুলির  এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হলেও মা ছিলেন ব্যতিক্রমী । তাঁর সাজপোশাক ছিল আধুনিক। যা মাত্র ষোল বছর বয়সে এক অনাধুনিক শহর তমলুকে বিয়ে হয়ে এসে পাড়াপড়শির অনেক কটুক্তি তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে । যা নিয়ে  পরে মাকে রসিয়ে রসিয়ে  দিদিদের সঙ্গে গল্প করতে শুনেছি । যেমন চল্লিশের দশকে কলকাতায়  নতুন ফ্যাশন উঠেছিল হাতকাটা ব্লাউজ পরা। মা প্রথম তমলুকে হাতকাটা ব্লাউজ পরেন । তা নিয়ে সারা পার্বতীপুরে মায়ের বিরুদ্ধে  গিন্নিবান্নিরা কটুক্তির বণ্যা বইয়ে দেয় । কিছুদিন পরে যারা কটুক্তি করতো তাদের একজনকে কোন বিয়েবাড়িতে মা হাতকাটা ব্লাউজ পরতে দেখেন ।মা তার দিকে তাকাতেই সেচোখ নামিয়ে নেয় । মায়ের কিছু কিছু গুণ আমার ভেতরে আছে বুঝতে পারি । যেমন অসম্ভব জেদ, স্থৈর্য ইত্যাদি । একটি অস্থির ও নানা জটিলতায় চলা একটি পরিবার তিনি যে কত কষ্ট সয়ে ধরে রেখেছিলেন তা শিক্ষণীয় । ২০০২সালে তিনি আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে যাবার পর তা ব্যাপকভাবে উপলব্ধি করতে পারি ।
   সত্যি বলতে কি, তমলুকের কোন সমৃতি প্রাকৃতিক কারণে বোধে আনা সম্ভব নয়।  বাবা চাকরির
বদলি গত কারণে মেদিনীপুর শহরে চলে আসেন সপরিবারে । তখন  আমার বয়স মাত্র আড়াই । তার কিছুদিন পরপরেই আমার বোধ আসে ।

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০

এই আমি চরিত্র || নীলাঞ্জন কুমার || স্মৃৃৃৃৃতিকথা

 এই আমি চরিত্র ||  নীলাঞ্জন কুমার || স্মৃৃৃৃৃতিকথা



 
                               ।। ১ ।।
   
      জন্ম থেকে এ অবধি এই আমি চরিত্র
      সব স্মৃতি ছুটে আসে হাসে কাঁদে নিরন্তর ।

দুষ্প্রাপ্য যে জীবনের পুরো বাষট্টি বসন্ত পেরিয়ে এহলম, তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার মধ্যে যে আনন্দ ও যন্ত্রণা বিদ্যমান সে স্বাদ আলাদা । অবিরাম শ্বাস প্রশ্বাস
রক্ত সংবহন ও ক্ষিদে তৃষ্ণার পার্থিব দিকগুলির ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে যে স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমাদের ভেতরে লেপটে থাকে তার কিছু কিছু কখনো কখনো নস্টালজিয়া মনে ভেসে ওঠে , তার স্বাদ জড়িয়ে ধরে ।
প্রৌঢ়ত্বের যে সব চিন্হ আশেপাশের লোকজনদের দেখে থাকি তা এখন আমার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব করেছে ।এ  বন্ধুত্বের জন্য দুঃখ নেই বেশ আনন্দই পাই।নস্টালজিয়া
অর্থাৎ ' স্মৃতি তুমি বেদনা ' বলে যাই গান লেখা হোক না কেন স্মৃতির মধ্যে যে চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে মনের ভেতর দিয়ে সরে সরে যায় তাতে আনন্দের ভাগ বেশি থাকে, দুঃখ থাকলেও । কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কখনো সখনও নিজেকে ভাববার চেষ্টা করছি, কিন্তু তাকে লিপিবদ্ধ করার মতো সুযোগ বা ভেতরের তাগিদ
অনুভব করার জন্য কেউ উস্কে দেয়নি বলে ছুঁয়ে থেকেছি নিজের ধারাবাহিক সৃজনের মধ্যে । পড়া লেখা ও সৃজনের বিভিন্ন দিক দিয়ে সময় কাটিয়ে কোন সময় থাকতো না অতীতে , তার ফলে নিজেকে সকলের থেকে আলাদা করা ও তাকে নিয়ে বিশ্লেষন করার সময় সুযোগ না থাকায় অতীত বড় বেশি ধুলোয় পড়েছিল । ধুলো উড়িয়ে সাফসুফ করে  আমার মধ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য অবশ্যই সময়ের প্রয়োজন ছিল ।আসলে অলক্ষ্যে হাত নেড়ে যিনি সম্মতি জানাচ্ছেন ও আমার অতীত লেখার জন্য স্নায়ুকোষ তাড়িত হচ্ছে সেরকম কারণে অপেক্ষা । নিরন্তর সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে তাতেও সেই  একজনের ইঙ্গিত প্রয়োজন হয় তা যে কোনো ভুক্তভোগী জানে ।
           কোটি কোটি শুক্রাণুর ভেতর দিয়ে মাত্র একটি মাতৃগর্ভে প্রবেশের মধ্যে প্রকৃতির যে অনিবার্য সৃষ্টির আকাঙ্খা , যা দম্পতির আনন্দজাত প্রবৃত্তির বশবর্তী,
তাকে দীর্ঘ দশ মাস দশ দিনের লালন পালনের পর এই আমি নামের ব্যক্তিটির মধ্যে যে চরিত্র ঢুকে পড়েছে, তাছাড়াও আরো অনেক কিছু যা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে । এই চরিত্রের মধ্যে পাই আমার বাবা মায়ের ম্যানারিজম, চিন্তাধারা, ইচ্ছে, আগ্রহ ও রুচির কিছু কিছু অজান্তে গেড়ে বসেছে । অসময়ের দোলাচল ও সুসময়ের আনন্দ নিয়ে ব্যস্ত এই আমি কোনদিনও কি সেভাবে ভেবে চলি কি আমার নিজস্বতা, কিংবা আনন্দ দুঃখ উভয়ই  আপেক্ষিক ! পারিবারিক নিয়মের গন্ডিতে বাঁধা এই আমি কিভাবে বন্দি হয়েছি সেই সেখানে, যেখান থেকে ছিঁড়ে বেরোবার শক্তি পাচ্ছি না ।উল্লাস ছুঁয়ে থাকতে থাকতে কোথা থেকে কে যেন লাগাম টেনে ধরছে, যার মধ্যে দিয়ে এই অকিন্ঞ্চিৎকর হোমোসেপিয়েন্সটির ভেতর গড়ে উঠেছে ভয়। দুঃখ যাতে না আসে তার জন্য আসছে      সাবধানতা ও শাসন নামে এক  নিয়ন্ত্রণ প্রথা । এসব টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে গড়ে ওঠে প্রবৃত্তি । যা ভেতরে ভেতরে রক্তে সংবহিত হয় ।এক নিজস্ব বৃত্তে নিজেকে আবদ্ধ রাখার আগ্রহ নিয়ে বাঁচি আমৃত্যু ।
          প্রাকৃতিক দিক দিয়ে দেখলে বুঝি, জন্মানোর সময় এক অদ্ভুত বেঁচে থাকার আগ্রহ নিয়ে জন্মাই । কিছুদিন বাবা মা রক্ষা করলেও পরে নিজেকেই রক্ষা করতে হয় । এ আমাদের প্রবৃত্তি। রক্ষা করতে না জানলে মৃত্যু অনিবার্য । যে বন্ধু হিসেবে মিত্র হিসেবে ছিল সে যে কোনো সময় শত্রু হয়ে ক্ষতিসাধন করতে পারে । এ কারণে আমাদের স্নায়ুকেন্দ্র সজাগ ।  যত অভিজ্ঞতা বাড়ে তত আমাদের চারপাশে  বৃত্ত রচনা করি । ধীরে ধীরে আমিতে রূপান্তরিত হই।
       একজন সত্যিকারের আমি সবসময় তার ভেতরের  আমিকে নিরন্তর প্রশ্ন করতে থাকে । সে কেন?কিভাবে? কি জন্যে? তার এই জন্মের জন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি ।এ প্রশ্ন সে করতেই থাকে করতেই থাকে আর মনকে সমাধানের পথে নিয়ে যেতে আগ্রহী করে তোলে ।প্রকৃত প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে সঠিক উত্তর খোঁজার আনন্দ যখন অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে তখন সে সৃষ্টির সঙ্গে মিশে যায় । রক্তে গড়ে ওঠে তার প্রিয় সংবহন, মনে হয় তার শরীরে অনেক বেশি অক্সিজেন পৌঁছে যায় কোথা থেকে! এক মিষ্টি যন্ত্রণার মধ্যে যেতে যেতে পরিণত হই আর খুঁজে বেড়াই সেই পথ যার মাধ্যমে সব সমাধানের পথ খুলে যায় ।
        একটি  প্রকৃত চরিত্র হয়ে ওঠে যখন সে তাকে ছুঁতে পারে ।সে এক গভীর তন্ময়তার মধ্যে দিয়ে নিজেকে খোঁজার বাসনা নিয়ে ধীরে ধীরে পুড়তে থাকে । পোড়ার জ্বালা ও জানার আগ্রহ মিলে মিশে যায় আর একের পর এক আগল খুলতে খুলতে এ চরিত্র সৃষ্টিশীল হয়ে যায় । সে সৃষ্টি মানুষের কাছে পোঁছোয়, এক বিশেষ বার্তা পায় ।
            তাই এই আমি চরিত্রটি ১৯৫৯ সালের ১০ জানুয়ারি  যখন জন্মেছিল তখন হয়তো  এ ধরনের এক চরিত্র হিসেবে এসেছিল মাটিতে । প্রথা অনুযায়ী তাকে আবাহনও করা হয়েছিল । তখন ছিল আতুড় ঘরের ব্যবস্থা । সেখানে একুশ দিন মায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে মাকে চিনতে চেষ্টা করা ওপৃথিবীর ভেতর মিশিয়ে দেবার প্রবণতা নিয়ে একঅদ্ভুত 
জীবনের সন্ধান ও তাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা আর পৃথিবীর কঠিন কঠোর রূপের সঙ্গে মানানোর যে প্রক্রিয়া তার সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা তখন প্রধান হয়ে উঠেছিল।
                                           (  ক্রমশ)

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...