হোমেন বরগোহাঞি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হোমেন বরগোহাঞি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১১ মে, ২০২২

এইচ জি ওয়েলস এবং জোসেফ স্টালিনের কথোপকথন ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস ,Homen Bargohain

এইচ জি ওয়েলস এবং জোসেফ স্টালিনের কথোপকথন

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-- বাসুদেব দাস




কুড়ি শতকের সবচেয়ে প্রতিভাশালী এবং প্রভাবশালী লেখকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে একজন অগ্রগণ্য লেখক হলেন এইচ জি ওয়েলস। তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞান থেকে নানা সংকেত নিয়ে ওয়েলস কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক কাল্পনিক কাহিনি রচনা করেছিলেন। এই কাহিনি গুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এইযে তিনি যে সমস্ত ঘটনা কেবল কল্পনায় ভেবেছিলেন সেগুলিই পরবর্তীকালে বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ তাঁর 'The First Men in the Moon' নামে উপন্যাসটির কথাই বলতে পারি। মানুষ চন্দ্রে  পদার্পণ করার বহু আগেই ওয়েলস তাঁর উপন্যাসে এরকম একটি সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর অন্য একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক উপন্যাসের নামই ছিল The Shape of Things to Come। সেই কাল্পনিক কাহিনির ভিত্তিতে একটি সিনেমাও করা হয়েছিল, এবং আমরা হাই স্কুলের ছাত্র হয়ে থাকার সময় সিনেমাটা দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। মোটকথা এইচ জি ওয়েলস তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত কল্পনার সাহায্যে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যার অনেক সম্ভাব্য প্রগতি আগে থেকেই অনুমান করতে পারতেন, আর তাঁর বিজ্ঞান ভিত্তিক উপন্যাস গুলিতে অনাগত ভবিষ্যতের ছবির জীবন্ত রূপটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সেই জন্য তিনি একজন আধুনিক প্রফেট রূপে পরিচিত হয়ে পড়েছিলেন। 

ওয়েলসের দ্বিতীয় ধরনের উপন্যাসের উপজীব্য তথা বিষয়বস্তু ছিল আধুনিক মানুষের নানাবিধ জটিল সমস্যা; বিশেষ করে মানবিক সম্পর্কের জটিলতা। তাঁর এই শ্রেণির উপন্যাসের  ভেতরে Kipps এবং Tom Bungay সমধিক প্রসিদ্ধ। কোনো কোনো সমালোচকের মতে এই শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধেক ডজন  উপন্যাসের মধ্যে একটি হল ওয়েলসের Tom Bungay.

সর্বসাধারণ পাঠকের জন্য ওয়েলসের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় বইটি হল An Outline of the History of the World। উইল ডুরান্ট প্রতিটি শিক্ষিত মানুষের অবশ্যপাঠ্য বলে বিবেচিত যে একশোটি গ্রন্থের তালিকা প্রস্তুত করেছেন সেই একশোটি  গ্রন্থের মধ্যে একটি হল ওয়েলসের An  Outline of the History of the World। গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে ওয়েলসের জীবনীকার লভেট  ডিকসন লিখেছেন–' পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের আগে থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সময় জুড়ে লেখা সাতশ পঞ্চাশ হাজার শব্দের এই গ্রন্থটি একজন মাত্র মানুষ এক বছরে লিখে শেষ করেছিলেন। এই গ্রন্থটি ওয়েলসের জ্ঞান আহরণের শক্তি, সেই জ্ঞানকে সুবিন‍্যস্ত করতে পারার ক্ষমতা এবং সর্বোপরি সুদীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে পারা শক্তির চিরস্থায়ী কীর্তিস্তম্ভ হয়ে থাকবে।'

এই তিন ধরনের সাহিত্য কর্মের জন্যই ওয়েলসকে আধুনিক যুগের একজন প্রভাবশালী লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর আরও একটি গ্রন্থ পড়ে খুব খুশি হয়েছিলাম এবং বইটির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলাম। An Experiment With Living নামের এই গ্রন্থটি ছিল ওয়েলসের আত্মজীবনী। আমি কটন কলেজের ছাত্র হয়ে থাকার সময় কলেজ লাইব্রেরি থেকে বইটি এনে পড়েছিলাম। এখন লাইব্রেরিতে বইটি আছে কিনা সে কথা  আমি জানিনা। কটন কলেজ লাইব্রেরির যে সমস্ত বইয়ের নাম আমি আমার বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ করেছি সেইসব বই গুলির বেশিরভাগই এখন লাইব্রেরিতে পাওয়া যায় না বলে এখনকার ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে জানিয়েছে। কটন কলেজের লাইব্রেরি থেকে এত দ্রুত বইগুলি হারিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি।

এইচ জি ওয়েলস ছিলেন  সমাজবাদী। ব্রিটেনে যে ধরনের সমাজবাদের  আদর্শ গড়ে উঠেছিল সেই সমাজবাদে তিনি মানুষের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৯৩৪ সনে ওয়েলস দ্বিতীয়বারের জন্য সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণ করতে যান। সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী মুষ্টিমেয় লেখক কয়জনের ভেতরে একজন ছিলেন ওয়েলস। অন‍্যদিকে,সেই সময়ই সোভিয়েত রাশিয়ার সর্বময় কর্তা জোসেফ স্টালিন ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতা। মস্কোতে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার একদিন পরে ওয়েলস স্টালিনের সঙ্গে দেখা করে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটি ব্রিটেনের The New Statesman and Nation নামের খবরের কাগজ ২৭ অক্টোবর (১৯৩৪) সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েলস ব্যক্ত করা মতামতের স্বপক্ষে এবং বিপক্ষে একটি দীর্ঘ উত্তপ্ত বিতর্কের সূচনা হয়েছিল। বিতর্কটিতে ওয়েলসের বিরোধিতা করা লেখক তথা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে  বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জর্জ বার্নার্ড শ্ব এবং আর্নেস্ট টলার।( বার্নার্ড শ্ব এবং ওয়েলসের বৌদ্ধিক সংঘাত তথা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমসাময়িক ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের একটি মুখরোচক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল)। ওয়েলসকে সমর্থন করার জন্য এগিয়ে এসেছিল জে এম কেইনসের  মতো বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। বিভিন্ন বই এবং প্রবন্ধে আমি এই বিখ্যাত বিতর্কটির উল্লেখ পড়তে পেয়েছিলাম যদিও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ওয়েলস এবং স্টালিনের কথোপকথনটা আমি পড়ার সুযোগ পেলাম এই সেদিন মাত্র – মাত্র এক সপ্তাহ আগে। আধুনিক যুগের প্রফেট রূপে পরিচিত ওয়েলস ১৯৩৪ সনেই, অর্থাৎ কমিউনিজম এবং সোভিয়েত রাশিয়ার প্রভাব তুঙ্গে উঠার সময়টুকুতে কমিউনিজমের কীরকম ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন তার কিছু ইঙ্গিত এই সাক্ষাৎকারটিতে  রয়েছে।' আমার অসম' এর পাঠকদের মনে কৌতুহল জাগানোর জন্য স্টালিন এবং ওয়েলসের মধ্যে হওয়া কথোপকথনের আংশিক আভাস অতি সংক্ষিপ্ত রূপে নিচে দেওয়া হল।

প্রথমেই একটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে স্টালিনের প্রতি ওয়েলস পোষণ করেছিলেন বিশেষ শ্রদ্ধার মনোভাব। ওয়েলসের চোখে স্টালিন ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী, স্বৈরাচারী এবং মতান্ধ একনায়ক, কিন্তু স্টালিনের চরিত্র নিষ্কলঙ্ক বলে ওয়েলস বিশ্বাস করেছিলেন। এছাড়া ওয়েলসের মতে সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী দুজন রাষ্ট্রনেতার ভেতরে একজন ছিলেন স্টালিন। অন্যজন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট। অন্যদিকে, ওয়েলসের  বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং প্রভাবের খবর নিশ্চয় স্টালিনের কানে গিয়েছিল।(স্টালিন ছিলেন বইয়ের পোকা); ওয়েলসের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেই স্টালিন তাকে important public man বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও দুই জনই বেশিরভাগ কথায় এক মত হতে  পারেন নি। উদাহরণস্বরূপ ওয়েলস বিশ্বাস করেছিলেন যে রুজভেল্টের New Deal নীতি পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল এবং দেশটিকে সমাজবাদী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সমাজবাদী  অর্থনীতি মানেই হবে পরিকল্পিত অর্থনীতি– যার চালিকাশক্তি হবে রাষ্ট্র। ওয়েলসের কথা বিশ্বাস করতে হলে বলতে হবে যে রুজভেল্ট এবং স্টালিন দুজনে পৃথক বিন্দু থেকে যাত্রা আরম্ভ করা সত্ত্বেও দুইজন একই গন্তব্যস্থলে গিয়ে উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল । কিন্তু স্টালিন ওয়েলসের কথা একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত রাশিয়ার  গন্তব্যস্থল সম্পূর্ণ পৃথক । স্টালিনের মতে রুজভেল্টের New Deal কোনো বৈপ্লবিক  পরিবর্তনকামী নতুন অর্থনৈতিক নীতি নয়; তা হল কেবল পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বিকার  সৃষ্টি করা অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধার পাবার জন্য অবলম্বন করা একটা সাময়িক কৌশল মাত্র। এই ধরনের সাময়িক কৌশল পুঁজিবাদের সংকট কখনও স্থায়ীভাবে দূর করতে পারেনা।

স্টালিনের কথা শুনে ওয়েলস জোর দিয়ে বললেন যে রুজভেল্টের New  Deal এর কার্যকরী পরিণাম অতি শক্তিশালী হওয়া বলে তিনি বিশ্বাস করেন এবং সঙ্গে তিনি এই কথাও বিশ্বাস করেন যে New Deal এর মূল আদর্শ হল ( এংলো স্যাক্সন অর্থে) সমাজবাদী আদর্শ। কিন্তু ওয়েলসের এই যুক্তি মানতে স্টালিন কোনো মতেই রাজি নয়, কারণ তার মতে রাষ্ট্র অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে পুঁজিবাদী অর্থনীতি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকা পর্যন্ত সমাজবাদী অর্থনীতি প্রবর্তন করা কখনও সম্ভব নয়।

এখানে ওয়েলস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন। সমাজবাদ তথা সাম্যবাদে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ে বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। ওয়েলস বললেন যে সমাজবাদ এবং ব্যক্তিবাদ কালো এবং সাদার মতো বিপরীত ধর্মী বস্তু হতে পারে না। এই দুটির মধ্যে থাকতে পারে অনেক মধ্যবর্তী পর্যায়। ব্যক্তিবাদ কখনও দস্যুতার নামান্তর হতে পারে, কিন্তু অনুশাসন এবং সু-সংগঠনের বলে সেটাই কখনও হয়ে পড়তে পারে সমাজবাদের সমতুল্য। পরিকল্পিত অর্থনীতি কার্যকরী করতে হলে যে জিনিসের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল অর্থনীতির সংগঠকদের দক্ষতা এবং অনুশাসন। সংগঠন ছাড়া সমাজবাদ কখনও সম্ভব হতে পারে না।

ব্যক্তিবাচক সমাজবাদের সম্পর্কে বক্তব্য সমর্থন করে স্টালিন বললেন যে ব্যক্তিবাদ এবং সমাজবাদের সংঘর্ষ অনিবার্য বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তার মতে একমাত্র সমাজবাদী সমাজই ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে । কিন্তু ব্যক্তি এবং সমাজের সংঘাত অনিবার্য না হলেও শোষক ধনী শ্রেণি এবং শোষিত শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই। শোষক  এবং শোষিতের স্বার্থ এত বিপরীতমুখী যে সেই দুটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা অসম্ভব।

মানব সমাজকে ধনী এবং দরিদ্র– কেবল এই দুটো শ্রেণির মধ্যে ভাগ করতে ওয়েলস কিন্তু রাজি হলেন না। তাঁর মতে পশ্চিমের দেশগুলিতে এই রকম অনেক ধনী মানুষ রয়েছে – মূলধন উপার্জন করা লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি করাটাই যাদের জীবনের একমাত্র বা প্রধান উদ্দেশ্য নয়। এইরকম অনেক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ এবং অর্থনীতির সংগঠক রয়েছেন যারা লাভ অর্জন করা ছাড়াও অন্য কিছু একটা করতে চায়। তারা পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা বুঝতে পারেন এবং তার পরিবর্তন সাধন করতে চান। কিন্তু তারা তথাকথিত শ্রেণিসংগ্রাম অনিবার্য বলে কখনও বিশ্বাস করেন না।

ধনী এবং দরিদ্রের বাইরেও আরও একটি মধ্যবর্তী শ্রেণি –‘টেকনিকেল ইন্টেলেজিন্সিয়া’ -থাকার কথা স্টালিনও স্বীকার করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেক সৎ এবং আদর্শবাদী মানুষ থাকার কথা মেনে  নিতেও তিনি রাজি হলেন।কিন্তু তিনি এই কথা জোর দিয়ে বললেন যে মানব-সমাজকে সর্বপ্রথমে ধনী এবং দরিদ্র,সম্পদের অধিকারী এবং সর্বহারা ,শোষক এবং শোষিত -এই দুটি শ্রেণিতে ভাগ করে নিতেই হবে।এই দুটি শ্রেণির মধ্যে হওয়া সংঘর্ষে মধ্যবর্তী শ্রেণিটি কখনও ধনীর পক্ষ নেয়,কখনও দারিদ্রের পক্ষ নেয়,অনেক সময় তারা নিরপেক্ষ হয়ে থাকে।কিন্তু শ্রেণি-সংগ্রাম চলতে থাকবেই,আর তার চূড়ান্ত পরিণাম নির্ণয় করবে সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণি।

স্টালিনের শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্ব বা তার অনিবার্যতা মেনে নেবার জন্য ওয়েলস কোনোমতেই রাজি হলেন না।তাঁর মতে পুঁজিপতিদের মধ্যে এরকম অনেক মানুষ আছে যারা কেবল লাভের আশাতেই কাজ করে না। অনেক পুঁজিপতির সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা এত বেশি বৃ্দ্ধি পেয়েছে যে তাদের থেকে সোভিয়েট রাশিয়াও শিক্ষা নিতে পারে।কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল এই যে ব্যক্তিগত মুনাফার ভিত্তিতে গড়ে উঠা ব্যবস্থাটা ক্রমশ ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে;এরকম অবস্থায় পুঁজিবাদী এবং সমাজবাদী বিশ্বকে সংঘর্ষের পথে ঠেলে দেবার পরিবর্তে বিশ্বের সবগুলি গঠনমূলক আন্দোলন এবং শক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা করাটা্ই অধিক বাঞ্ছনীয় হবে।  

  ওয়েলসের কথা শুনে স্টালিন প্রথমেই এই কথা স্বীকার করে নিলেন যে সোভিয়েত রাশিয়া পুঁজিপতিদের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করেছে। কিন্তু পুঁজিপতিরা যে লাভের লোভ পরিহার করে নিঃস্বার্থ সমাজ সেবকের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে একথা মেনে নিতে তিনি রাজি হলেন না। তাঁর মতে পুঁজিপতিরা মুনাফার সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাদের তার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। পুঁজিপতিদের বাদ দিয়ে আরও একটি মধ্যবর্তী শ্রেণি আছে – টেকনিকেল ইন্টেলে জিন্সিয়া তথা কারিগরি বুদ্ধিশালী লোকেরা– যাদের উপরে সম্পূর্ণ ভরসা করা যায় না। অক্টোবর বিপ্লবের পরে তাদের অনেকেই বিপ্লবকে ব্যর্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল; নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তাঁরা অস্বীকার করেছিল। অবশ্য কিছুদিন পরেই নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে তারা নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ার কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এল। এইসব অভিজ্ঞতা থেকে একটা শিক্ষাই পেতে পারি আর সেটা হল এই যে পৃথিবীটার পরিবর্তন করতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা না হলেই নয়। ওয়েলস এই কথাটা সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেন বলে স্টালিন অভিযোগ করলেন। হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলে সর্বাধিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেউ পৃথিবীটার পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকতে হবে কার হাতে? তা থাকতে হবে একটি বৃহৎ শ্রেণির হাতে– যে শ্রেণিকে  একদিন পুঁজিপতি শ্রেণির স্থান নিতে হবে। সেই শ্রেণিটি হল শ্রমিকশ্রেণি। কারিগরি লোকদের সহায় সহযোগিতা নিশ্চয় নিতে হবে, কিন্তু সেইসব লোক কখনও একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে না।

স্টালিনঃ পৃথিবীর রূপান্তর সাধন হল  একটি বৃহৎ , জটিল এবং কষ্টকর প্রক্রিয়া। এই বৃহৎ কাজের জন্য একটি বৃহৎ শ্রেণির প্রয়োজন। বড় জাহাজ বের হয় দীর্ঘ সমুদ্র–যাত্রায়।

ওয়েলসঃ কথাটা ঠিক। কিন্তু দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার জন্য একজন ক্যাপ্টেন এবং একজন নেভিগেটরেরও প্রয়োজন আছে।

স্টালিনঃ সে কথা সত্যি। কিন্তু দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার জন্য সর্বপ্রথমে যে জিনিসের দরকার তা হল একটি বড় জাহাজ। জাহাজহীন নেভিগেটরের কাজ কি? তিনি একজন কাজকর্মহীন বেকার।

ওয়েলসঃ কিন্তু আপনি বলা বড় জাহাজটি হল মানব- সমাজ; তা একটি  জাহাজ নয়।

ওয়েলস একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করে স্টালিনকে জিজ্ঞেস করলেন–' মিঃ স্টালিন , ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপ্লবের বিষয়ে আপনি যত কথা জানেন সেরকম জানা মানুষ খুব কমই আছে। জনতা নিজে নিজে কখনও জেগে উঠে কি? এটা একটি প্রমাণিত সত্য নয় কি যে সব সময় একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীই বিপ্লব করে?

ওয়েলসের এই কথাটা অস্বীকার করা স্টালিনের পক্ষে সম্ভব হল না। তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবার জন্য একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রয়োজন। কিন্তু তিনি এর সঙ্গে এই কথাও যোগ করে দিলেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অন্তত নিষ্ক্রিয় সমর্থনের ওপরে নির্ভর না করে সবচেয়ে প্রতিভাশালী, পরিশ্রমী এবং শক্তিশালী সংখ্যালঘুর পক্ষেও সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্টরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সপক্ষে প্রচার অভিযান চালিয়েছিল। ওয়েলস অনুভব করেছিলেন যে কমিউনিস্টদের এই কার্য অত্যন্ত ভুল হয়েছে। এক সময়ে বিভিন্ন দেশে যখন অত্যাচারী একনায়কের স্বৈরাচার চলেছিল, তখন হয়তো সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সপক্ষে চালানো প্রচার অভিযানের কিছু যুক্তি ছিল। কিন্তু সেই পুরোনো ব্যবস্থা এখন নিজে নিজেই ভেঙ্গে পড়েছে। আধুনিক পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের উপরে জোর না দিয়ে বেশিকরে জোর দেওয়া উচিত দক্ষতা, যোগ্যতা এবং উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির ওপরে। সশস্ত্র বিদ্রোহের স্বপক্ষে কমিউনিস্টরা চালানো প্রচারকার্য পশ্চিমের গঠনমূলক মনোভাবাপন্ন লোকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

স্টালিন ও একটা কথা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে; সেই সবের অবক্ষয় আরম্ভ হয়েছে। কিন্তু তিনি ওয়েলসকে এ কথাও মনে করিয়ে দিলেন যে ধ্বংসমুখী পুরোনো ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করার জন্য এবং বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিত্যনতুন প্রচেষ্টাও আরম্ভ হয়েছে। তাছাড়া পুরোনো ব্যবস্থাটা নিজে নিজে ভেঙে পড়েনি। একটা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে তার জায়গায় নতুন একটি ব্যবস্থার উত্থান ঘটানোটা একটা বৈপ্লবিক প্রক্রিয়া– যার সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে শ্রেণি- সংঘর্ষ। পুঁজিবাদ পচতে শুরু করেছে সত্যি; কিন্তু এটা একটা পচা কাজ নয় যে এটা নিজে নিজে ভেঙে মাটিতে গড়িয়ে পড়বে। একটি সমাজ ব্যবস্থার জায়গায় অন্য একটি সমাজ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হলে বিপ্লবের প্রয়োজন হয়, আর বিপ্লব হল একটি যন্ত্রণাময় নিষ্ঠুর সংগ্রাম, জীবন-মরণ সংগ্রাম। তাছাড়া শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাওয়া পুরোনো ব্যবস্থার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য নতুন ব্যবস্থাকে সদা সতর্ক হয়ে থাকতে হয়। কমিউনিস্ট হিংসাকে আদর্শ পন্থা বলে বিবেচনা করে না, কিন্তু হিংসার উত্তর দিতে হবে হিংসার দ্বারাই। উদাহরণস্বরূপ ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে অহিংসা কখনও কার্যকরী হতে পারে না ।

স্টালিনের যুক্তিতে ওয়েলস সম্পূর্ণ ভরসা করলেন না। তিনি পুনরায় স্টালিনকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে পুঁজিবাদী বিশ্বে যে প্রতিক্রিয়াশীল হিংসা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে সংঘটিত দুর্বৃত্তের দৌরাত্ম্যের রূপ লাভ করেছে তার বিরুদ্ধে পুরোনো ধরনের গোঁড়া সমাজবাদী হিংসা প্রয়োগ করে কোনো লাভ হবে না । বরং সমাজবাদীরা আইনের আশ্রয় নিয়ে এবং পুলিশের সাহায্যে সেরকম প্রতিক্রিয়াশীল হিংসার প্রতিরোধ করার জন্য চেষ্টা করাটা বেশি সমীচীন হবে ।

কিন্তু স্টালিন কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ওয়েলসকে ঘুরিয়ে এই কথা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে ভগ্নপ্রায় তথা মুমূর্ষ সমাজ ব্যবস্থাও স্বইচ্ছায় ইতিহাসের মধ্য থেকে প্রস্থান করতে চায় না।  সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে পুরোনো সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া অনেকে অনুভব করেছিল; কিন্তু তাকে ধরাশায়ী করার জন্য ক্রমওয়েলকে শক্তি প্রয়োগ  করতে হয়েছিল। জারের রাশিয়ার সমাজ ব্যবস্থা অনেকদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল । কিন্তু তাকেও উৎখাত করার জন্য বিপুল রক্তপাত ঘটাতে হয়েছিল। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে স্টালিনের মতে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া যেভাবে নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না, ঠিক সেইভাবেই সেই সমাজব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য শক্তি প্রয়োগ অপরিহার্য ।

স্টালিনের যুক্তি শুনে ওয়েলস বললেন– শক্তি প্রয়োগ যে করতে হয় সে কথা আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু আমি ভাবি যে প্রচলিত আইন যে সমস্ত সুযোগ করে দেয় সেইসবের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করে, অর্থাৎ সেইসবের সঙ্গে যথাসম্ভব নিজেকে খাপ খাইয়ে সংগ্রামের রূপ  নির্ধারণ করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। প্রতিক্রিয়াশীল আক্রমণ থেকে সেই আইনগুলিকে রক্ষা করা উচিত। পুরোনো ব্যবস্থাটিকে উপর্যুপরি আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলার কোনো দরকার নেই, কারণ তারা নিজে নিজেই ভেঙ্গে পড়ছে। সেই জন্যই আমি ভাবি যে পুরোনো ব্যবস্থা এবং আইনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ এখন অচল এবং পুরোনো কালীন হয়ে পড়েছে। আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা নিচে দেওয়া অনুসারে স্পষ্ট রূপে প্রকাশ করতে চাইঃ প্রথম, আমি শৃংখলার পক্ষপাতী; দ্বিতীয়, বর্তমানের ব্যবস্থা যতদূর পর্যন্ত শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করতে পারে না ততদূর পর্যন্ত আমি বর্তমানের ব্যবস্থার বিরোধিতা করি; তৃতীয়, সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যে সমস্ত শিক্ষিত মানুষের সহায় সমর্থনের দরকার হবে তাদের শ্রেণিসংগ্রামের আদর্শ প্রচারে সমাজবাদ থেকে দূরে ঠেলে দেবে।

শিক্ষিত মানুষের প্রসঙ্গে স্টালিন ওয়েলসকে জিজ্ঞেস করলেন–' আপনি যে শিক্ষিত মানুষের কথা বলছেন, কী ধরনের শিক্ষিত মানুষের কথা মনে রেখে আপনি এই কথা বলছেন? সতেরো শতকের ইংল্যান্ডে এই শিক্ষিত মানুষগুলিই পুরোনো ব্যবস্থার স্বপক্ষে দাঁড়ায়নি কি? আঠারো শতকের শেষে ফ্রান্সে এবং অক্টোবর বিপ্লবের সময় রাশিয়াতে এই শিক্ষিত মানুষ গুলি কার পক্ষে ছিল? আসলে শিক্ষা হল একটা অস্ত্র, তার ব্যবহার কীরকম ফল দেবে সেটা নির্ভর করবে অস্ত্রটা যে ব্যবহার করবে তার ওপর। কোনো সন্দেহ নেই সর্বহারা এবং সমাজবাদের জন্য শিক্ষিত মানুষের দরকার হবে। সমাজবাদ স্থাপন করার কাজে গজমূর্খ সর্বহারাকে সহায় করতে পারেনা। কিন্তু শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে। আমরা কোন শিক্ষিত মানুষগুলির কথা বলছি সে কথাও চিন্তা করে দেখতে হবে।'

এতক্ষণ স্টালিন ওয়েলসের প্রতিটি যুক্তির বিরোধিতা করে থাকলেও একটা কথায় কিন্তু ওয়েলসের সঙ্গে একমত হতে তিনি বাধ্য হলেন। ওয়েলস বলেছিলেন যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত বিপ্লব হতে পারে না। নিজের কথার সমর্থনে ওয়েলস দুটো ঐতিহাসিক উদাহরণ দিলেন। জার্মানি পুরোনো শিক্ষা- ব্যবস্থায় হাত  না দেওয়ার ফলে দেশটা কখনও রিপাবলিক হতে পারল না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্য ব্রিটিশ শ্রমিক দল সাহস দেখাতে পারেনি।

স্টালিন ওয়েলসের সেই কথার সঙ্গে একমত হয়ে বললেন–' এখন আপনি কিছুক্ষণ আগে বলা তিনটি কথার উত্তর দিতে আমাকে অনুমতি দান করুন।

প্রথম, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন একটি বিরাট সামাজিক শক্তি। সেই শক্তিটা হল শ্রমিক শ্রেণি।

দ্বিতীয়, মূল শক্তিটার সঙ্গে একটা সহায়ক শক্তির দরকার। সেই সহায়ক শক্তিটাকে কমিউনিস্টরা  পার্টি বলে। এই পার্টিতে থাকে বুদ্ধিমান শ্রমিকরা এবং শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কারিগরি শ্রেণির লোকরা। শিক্ষিত শ্রেণি তখন শক্তিশালী হয়- যখন তারা শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে থাকে। শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে গেলেই শিক্ষিত শ্রেণি দুর্বল শূন্যতায় পর্যবসিত হয়।

তৃতীয়, পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন হয়, নতুন রাজনৈতিক শক্তি নতুন আইন প্রণয়ন করে এবং নতুন শৃঙ্খলা স্থাপন করে। সেই নতুন শৃঙ্খলা হল বৈপ্লবিক শৃঙ্খলা।

ওয়েলস স্টালিনকে বলেছিলেন যে তার প্রথম পছন্দ হল শৃঙ্খলা। কিন্তু স্টালিন কেবল সেই ধরনের শৃঙ্খলা চান, যে শৃঙ্খলা শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের পরিপন্থী নয়। স্টালিন ওয়েলসের এই ধারণা ভ্রান্ত বলে খন্ডন করতে চেষ্টা করলেন যে কমিউনিস্টরা খুব হিংসা- প্রিয়। শাসকশ্রেণীর যদি শ্রমিকশ্রেণিকে স্ব-ইচ্ছায় নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি হয়, তাহলে হিংসার পথ পরিহার করতে  কমিউনিস্টদের কোনো আপত্তি নেই কিন্তু ইতিহাসে সেরকম ঘটনা ঘটার কোনো নজির নেই।

ওয়েলসের সঙ্গে দীর্ঘ কথা বলে স্টালিনের মনে একটা ধারণা হয় যে ওয়েলস বিপ্লবের চেয়ে সংস্কারের  উপর বেশি জোর দিচ্ছে, বা দুটিকেই সমার্থক করে ফেলছে। সংস্কার এবং বিপ্লবের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে স্টালিন ওয়েলসকে বলেন–' নিচ থেকে আসা জনগণের চাপে পড়ে বুর্জোয়া শ্রেণি কখনও আংশিক সংস্কারের দাবি মেনে নেয়; কিন্তু প্রচলিত আর্থ–সামাজিক ব্যবস্থার আঘাত লাগতে দেয় না। তারা বিশ্বাস করে যে শ্রেণি- শাসন  অব্যাহত রাখার জন্য জনগণকে কিছু কনসেশন   দেওয়া দরকার। এটাই হল সংস্কারের মূল কথা। কিন্তু অন্যদিকে, বিপ্লবের অর্থ হল একটি শ্রেণি থেকে অন্য একটি শ্রেণিতে ক্ষমতা হস্তান্তর। সেই জন্যই কোনো সংস্কারকে বিপ্লবের আখ্যা দেওয়া যায় না।'

স্টালিনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ওয়েলস সোভিয়েত রাষ্ট্রের কিছু প্রশংসা করে বলেন–' আমি মাত্র গতকালই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু আমি ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যবান পুরুষ এবং নারীর মুখগুলি দেখতে পেয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ ইতিমধ্যে করা হয়েছে।১৯২০ সনের অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার পার্থক্যটা সত্যিই বিস্ময়কর।

স্টালিনঃ আরও অনেক কাজ করতে পারা যেত– যদি বলশেভিকরা আরও কিছু বুদ্ধিমান হত।

ওয়েলসঃ ওহো , আমি সে কথা মানিনা। বলশেভিকরা নয়, মানুষ নামের প্রাণীটা যদি আরও অল্প বুদ্ধিমান হত…। নিখুঁত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে সমস্ত গুণের দরকার সেই সব মানুষের মস্তিষ্কে নেই। মানুষের মগজ পুনর্গঠন করার জন্য একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা আবিষ্কার করতে পারলে সেটা সত্যিই একটি ভালো কথা হত।'(হাসি)

----------------

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।







 


শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

বন্দি ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-- বাসুদেব দাস,Homen Bargohain

 বন্দি

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-- বাসুদেব দাস





আমার প্রিয় লেখক কয়েকজনের ভেতরে আর্জেন্টিনার লেখক জর্জ লুই বরখেছ অন্যতম। একজন লেখককে সারা জীবন ধরে ভালোবাসা সম্ভব নয়। জীবনের ঋতুতে ঋতুতে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়, নতুন নতুন প্রয়োজন অনুভূত হয়। জীবনের একটি বিশেষ ঋতুতে বা বিশেষ একটি আধ্যাত্বিক সংকটের সময় যে লেখকের রচনার মধ্যে আমরা আশ্রয় বা আনন্দ খুঁজে পাই, সেই একই লেখকের প্রতি অন্য সময় আমরা অনুভব করি কেবল শীতল উদাসীনতা। পঞ্চাশের গণ্ডি পার হওয়ার পরে প্রায় পাঁচ বছর আমার মনের নিত্যসঙ্গী ছিল জর্জ লুই বরখেছ। আমার কাছে তাঁর প্রয়োজন এখন আগের চেয়ে কিছু কমেছে । কিন্তু তা বলে আমর প্রিয় লেখকের তালিকা থেকে এখনও তিনি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যাননি।অনেক মানুষ যেভাবে জীবনের ক্লান্তিকর গতানুগতিকতা থেকে সাময়িক মুক্তি চেয়ে দেশ বিদেশে ভ্রমণ করতে যায়, আমিও ঠিক সেই একই উদ্দেশ্যে বরখেছের যেকোনো বই হাতে নিয়ে বসি। তারপরে আমার মনের কী অবস্থা হয় তা জানতে হলে আপনাদেরও তার যেকোনো গ্রন্থের পাতা উল্টে দেখতে হবে কিন্তু আমি কীভাবে ধরে নিই যে আপনি হাত বাড়ালেই বরখেছের বই আপনি পাবেনই? বরং না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেই জন্য আমি নিচে বরখেছের গল্পের একটি নমুনা দিলাম।এটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প নয়। কিন্তু তার সৃষ্ট জগতটির রূপাভাস এখানে পরিস্ফুট। জীবন সুন্দর, জীবন ভয়ঙ্কর, জীবন রহস্যময়। সেই সুন্দর ভয়ঙ্কর রহস্যময় জীবন বরখেছের লেখনীতে আশ্চর্য ভাবে ধরা দেয়।

জুনিন  বা তাপালকুত এই গল্পটি তাঁরা প্রায়ই বলে। রেড ইন্ডিয়ানদের একটি আক্রমণের পরে গ্রাম থেকে একটি ছেলে নাই হয়ে  গেল।মানুষের বলা অনুসারে রেড ইন্ডিয়ানরা ছেলেটিকে বন্দি করে নিয়ে যায়।ছেলেটির মা-বাবার তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।অনেক বছর পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একজন সৈ্নিক এল।তিনি গ্রামের লোকজনদের বললেন যে একজন রেড ইণ্ডিয়ানের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল।তাঁর চোখদুটির রঙ আকাশী নীল।সেই রেড ইণ্ডিয়ানটাই তাদের ছেলে হতে পারে।অবশেষে তাঁরা সেই মানুষটাকে খুঁজে পেল।(ঠিক কী পরিস্থিতিতে মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া গেল তার সঠিক বিবরণ কাহিনিটিতে নেই।আর আমিও যে কথা ভালোভাবে জানি না সে কথা কল্পনায় সৃষ্টি করে নিতে চাই না)। তাঁরা ভাবলেন যে তারা মানুষটিকে নিজের পুত্র বলে চিনতে পারল। অরণ্যের মধ্যে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে মানুষটা মানুষের ভাষা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো আপত্তি না করে তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। ফিরে গেলেন উদাস, নির্বিকার বাধ্য হয়ে। ঘর পেয়েই তিনি থমকে গেলেন, কারণ অন্য মানুষরাও থমকে রইলেন। তিনি দরজার দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। হঠাৎ দেখি তিনি মাথাটা নিচু করলেন,তিনি একটা চিৎকার করলেন তার পরে তিনি মহিলাদের ঘরের সামনে দিয়ে দৌড় মেরে একেবারে রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন।বিন্দুমাত্র ইতস্তত নয়া করে তিনি মাকড়সার জালে ভরা রান্নাঘরের চিমনিতে হাত ঢুকিয়ে মোষের শিঙের নাল লাগানো একটা কটারি বের করে আনলেন।সে যখন একটি ছোট ছেলে ছিল তখনই সে সেখানে কটারিটা লুকিয়ে রেখেছিল। আনন্দে তার চোখদুটি তিরবির করে উঠল।তাঁর মা-বাবার চোখেও আনন্দে চোখের জল দেখা দিল। কারণ তারা নিজের ছেলেকে চিনতে পারলেন।

খুব সম্ভব এরপরে অন্যান্য স্মৃতি ও তাঁর মনে এসেছিল, কিন্তু রেডইন্ডিয়ানটি বেশিদিন সেই ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থাকতে পারল না। একদিন তিনি তাঁর পরিচিত এবং কাঙ্ক্ষিত অরণ্যের সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। অতীত এবং বর্তমান সংমিশ্রিত হয়ে কুহেলিকায় পরিণত হওয়া সেই চিত্তবিভ্রমকারী মুহূর্তে তিনি ঠিক কি অনুভব করেছিলেন সে কথা আমি কখনও ভালোভাবে জানতে পারব না। সেই প্রবল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মুহূর্তে হারানো সন্তানটির পুনর্জন্ম হয়েছিল, না তার মৃত্যু হয়েছিল, অথবা একটি শিশুর মতো বা অন্তত একটি কুকুরের মতো সে সেই মুহূর্তে নিজের মা-বাবাকে এবং বাড়িটিকে চিনতে সক্ষম হয়েছিল– সে কথা জানতে যে আমার এত ইচ্ছা করে।

গল্পটা এতটুকুই। গল্পটি যদি আপনার মনে কোনো রেখাপাত করে না থাকে তাহলে তার সমস্ত দোষ আমার অক্ষম অনুবাদের। বরখেছকে Master of precision বলা হয়ে থাকে। অসমিয়া ভাষা সেই আশ্চর্য প্রতিভা এখনও আয়ত্ত করতে পারেনি। তা ছাড়া লেখক মানুষ জানে যে মনের জগতে নানা রহস্যময় ঘটনার ফলে কখনও শব্দগুলি লেখকের সঙ্গে ভীষণভাবে সহযোগিতা করে, এবং লেখকের দাবি এবং প্রয়োজন অনুসারে তারা অতিশয়  বাধ্যতা এবং নমনীয়তা দেখায়। কখনও কিন্তু তারা প্রচন্ড অভিমান করে লেখকের সঙ্গে পদে পদে অসহযোগিতা করে  এবং তাকে বিপদে ফেলে। বরখেছের গল্পের আমি করা অসমিয়া অনুবাদ অত্যন্ত খারাপ হয়েছে। আপনারা ইংরেজি অনুবাদে গল্পটি পড়ে দেখার চেষ্টা করবেন।বরখেছ সমস্ত রচনা স্পেনিশ ভাষায় লিখেছেন যদিও তিনি নিজে ইংরেজি ভাষা ভালো করে জানেন,তাঁর মা ইংরেজ, এবং তিনি তাঁর রচনার ইংরেজি অনুবাদে সাহায্য করেন।

ঠিক আছে, সেই সব কথা থাক। কেবল একবার কল্পনা করতে চেষ্টা করুন –বরখেছের গল্পের সেই ছেলেটি আপনিও নন কি ? পশুর কোনো স্মৃতি শক্তি নেই। থাকলেও তা ক্ষণস্থায়ী অথবা তার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত।স্মৃতি একান্তভাবেই মানবিক। এবং কী রহস্যময় সেই স্মৃতির জগত। 


লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।  




শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২২

লেখার সহজ উপায় ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস, Homen Borgohain

 লেখার সহজ উপায়

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস



কয়েকদিন আগে একজন লেখককে ' আমার অসম' এর জন্য একটি বিশেষ লেখা দিতে অনুরোধ করেছিলাম। লেখার বিষয়টাও আমিই ঠিক করে দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর কাছ থেকে লেখাটা না পেয়ে আমি তাকে তাগাদা দিতে আরম্ভ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন যে তাঁর প্রবন্ধের খসড়াটা ইতিমধ্যেই লিখে শেষ করেছেন; কিন্তু ফেয়ার কপিটা লিখতে কিছু সময় লাগছে ।তাঁর কথা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। একজন লেখককে যদি তার প্রতিটি লেখা দুবার করে লিখতে হয়, তাহলে তিনি জীবনে কতগুলি লেখার সুযোগ পাবেন? আমি অবাক হওয়ার আরও একটি বিশেষ  কারণ ছিল এই যে আমি নিজে কখনও আমার কোনো লেখা দুবার করে লিখিনি। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে আমার কলমের ডগা দিয়ে যাই  বের হয় তাকেই বেদবাক্য বলে গ্রহণ করে নিই, বাক্য গুলিকে যথাসম্ভব পরিপাটি করার চেষ্টা করি না। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কাজ করার কৌশল উদ্ভাবন করে নেয়। এই ক্ষেত্রে ভালো-খারাপ এর প্রশ্ন ওঠেনা। আমি আমার লেখাগুলি দ্বিতীয়বার লেখার বা ফেয়ারর কপি করার প্রয়োজন বোধ করি না কেবল এই জন্য যে লেখার আগে আমি প্রতিটি বাক্যকে অনেকবার ভেঙ্গেচুড়ে নিয়ে বাক্যগুলি মোটামুটি ভাবে ভালো হয়েছে বলে অনুভব করার পরেই সেগুলি কাগজে লিখি। আমার নিজের বিশ্বাস যে এভাবে মগজের ভেতরে বাক্যগুলি যথাসম্ভব নিখুঁত করে গঠন করে নিলে সেগুলি দ্বিতীয় বার লেখার চেয়ে বা ফেয়ার কপি করার চেয়ে সময় কম লাগে।

আমি এই কথা কখন ও বলি না যে ফেয়ারকপি করাটা একটি খারাপ অভ্যাস, বা আমি যেভাবে লিখি সেই নিয়মটাকেই সবাই অনুসরণ করা উচিত। কিছু লেখা– বিশেষ করে কবিতা, নাটক এবং উপন্যাসের মতো সৃজনধর্মী লেখা – ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অনেকবার লেখার প্রয়োজন হতে পারে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে নাকি তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়া The Old Man and the Sea নামের উপন্যাসটি দুশোবার নতুন করে লিখেছিলেন। টলস্টয় তাঁর ' যুদ্ধ এবং শান্তি' নামের সুবৃহৎ মহাকাব্যিক উপন্যাসটি লেখার সময় দিনের সাত ঘণ্টা করে পরিশ্রম করে কখনও কখনও এক সপ্তাহে মাত্র কুড়ি পৃষ্ঠা লিখতে পেরেছিলেন; অর্থাৎ মাত্র এক পৃষ্ঠা লিখতে তাঁর সময় লেগেছিল প্রায় আড়াই ঘন্টা। কোনো কোনো কবি কিন্তু আব্দুল লেখকদের চেয়েও এক কাঠি ওপরে। উদাহরণস্বরূপ রবার্ট লুই স্টিভেনসনের কথা বলা যেতে পারে। তিনি নিজের এপিটাফ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য Requiem নামের একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু সুদীর্ঘ দশ বছর ধরে তিনি কবিতাটিকে ঘষেমেজে মসৃণ করতে করতে অবশেষে তা পরিণত হল মাত্র আট সারির একটি ছোট কবিতা । মাত্র একটি কবিতাকে নিটোল রূপ দেবার জন্য দশ  বছর ধরে পরিশ্রম করে স্টিভেনশন অবশেষে যে কবিতাটা জগত কে উপহার দিলেন, সেই কবিতাটি হল:

Requiem 

Under the wide and starry sky

Dig the grave and let me lie:

Glad did I live and gladly die

And I laid me down with a Will.


This be the verse you grave for me:

Here he lies where he longed to be:

Home is the sailor ,home from sea,

And the hunter home from the hill.



এই সমস্ত কথাই সত্যি। কিন্তু আমি বলতে চাওয়া   কথাটা হল এই যে কবিতা এবং উপন্যাসের মতো সৃষ্টিধর্মী রচনাগুলি অনেকবার ঘষে-মেজে এবং পালিশ করে থাকার প্রয়োজন হলেও খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিনে সচরাচর প্রকাশিত বক্তব্যধর্মী রচনা গুলির জন্য বারবার লিখে থাকার বা ফেয়ার  কপি করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রথম ধরনের লেখার ক্ষেত্রে লেখক শব্দ- চয়ন, শব্দ- স্থাপন আঙ্গিক  এবং প্রকাশভঙ্গি নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ঠ চিন্তা এবং পরিশ্রম করতে হয়, লেখাগুলি বারবার কাটাকুটি করে সেগুলিকে একটি আকাঙ্ক্ষিত আকৃতিতে আনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু  বক্তব্যধর্মী লেখার জন্য লেখকের নিজের বক্তব্যটুকু পরিষ্কারভাবে চিন্তা করে নিয়ে সেগুলিকে সরল এবং শুদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করতে পারলেই যথেষ্ট। লেখকের কলম থেকে কেবল তখনই শব্দগুলি সহজে বেরিয়ে আসতে চায় না– যখন বলতে চাওয়া বিষয়টি সম্পর্কে লেখকের সম্যক চিন্তা পরিষ্কার নয়, তাঁর ভাষাও স্বচ্ছন্দ নয়।

অবশ্য চিন্তা পরিষ্কার হলেই যে ভাষাও নিজে  থেকে সাবলীল হবে সেটাও ঠিক নয়। বেশিরভাগ লেখকই লিখতে বসে এক ধরনের দুশ্চিন্তাজনিত মানসিক অস্থিরতা অনুভব করে। তাকে এরকম একটা ভয় গ্রাস করে ফেলে যে তাঁর লেখাটা যত ভালো হওয়া উচিত ততটা ভালো হয়তো হবেনা; বাক্যগুলি সুগঠিত এবং সুন্দর করার জন্য তিনি যে রকম শব্দ ব্যবহার করা উচিত সেরকম শব্দগুলি তার কলমের ডগা দিয়ে হয়তো বের হয়ে আসবে না। এই উদ্বেগজনিত ভয়ই তাঁর চিন্তা স্রোতকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে– যার ফলে তার কলমের ডগা দিয়ে বের হতে চাওয়া শব্দগুলি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বারবার থমকে থাকে। রুফিনা দাঁড়িয়ে যেরকম নিজের চেহারা সম্পর্কে মাত্রাধিক ভাবে সচেতন ঠিক তেমনি নিজের সুস্পষ্ট বক্তব্য না থাকা লেখকরাও ভাষার সৌন্দর্য সম্পর্কে প্রয়োজনাধিক ভাবে  সচেতন। তাঁরা লিখতে বসে দুশ্চিন্তাজনিত মানসিক অস্থিরতায় ভোগার সেটাই প্রধান কারণ। এই ধরনের সমস্ত মানসিক কষ্ট উপশম করতে পারার অমোঘ বিধান দিয়ে গেছেন রবার্ট লীণ্ড। তিনি বলেছেন –'The safe rule in writing is to say what one precisely means-even if it appears to destroy the shape of the sentence.If the sense does not give the sentence good shape,then all the high sounding words in the dictionary will not do so.  উপরে লেখকের   যে সমস্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলি কেবল সাধারণ লেখকের   সমস্যা নয়। মূলত দার্শনিক হয়েও সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো প্রতিভাধর ও লেখককেও একই ধরনের সমস্যা ব‍্যতিব‍্যস্ত  করেছিল। How I write নামের একটি রচনায় রাসেল এই সমস্যাগুলির বিষয়ে আলোচনা করে তিনি নিজে কী ভাবে সমস্যাবলীর সমাধান করলেন সেই কথাও বর্ণনা করেছেন। রাসেলের অভিজ্ঞতা থেকে সমস্ত লেখকই শিক্ষা নিতে পারে ।

যে কোনো লেখকের মতোই বার্ট্রান্ড রাসেল ও জীবনের প্রথম বর্ষের অনেক বিখ্যাত লেখকের গদ্যশৈলীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জন স্টুয়ার্ট মিল ,লোগান পিয়ার্সল স্মিথ, ওয়াল্টার পেটার এবং গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অতি দ্রুত তিনি   এই সিদ্ধান্তে এলেন যে গদ্য রচনার ক্ষেত্রে তাকে নিজের আদর্শ নিজেই তৈরি করে নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ লোগান পিয়ার্সল  স্মিথ তাকে  উপদেশ দিয়েছিলেন যে একজন লেখক তাঁর প্রত্যেকটি লেখা দুইবার লেখা উচিত।One must always rewrite। সেই উপদেশ পালন করার জন্য রাসেল আবিষ্কার করলেন যে তার দ্বিতীয়বারের সংশোধিত লেখাটির চেয়ে প্রথমবারের লেখাটি সব সময় বেশি ভালো হয় ।এই আবিষ্কারের ফলে তিনি অনেক শক্তি এবং সময় বাঁচাতে সক্ষম হলেন।

লেখক জীবনের শুরুতে রাসেল  সেই যন্ত্রণাদায়ক সমস‍্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন -যে সমস‍্যা  ছোট বড় সমস্ত  লেখককে জীবনের একটা সময়ে পীড়িত  করে। লিখতে বসে তার মনে প্রায়ই এরকম ভাব হয়েছিল যে লেখাটা যেন  তার সাধ্যের অতীত।'I would fret myself into a nervous state from fear that it was never going to come right.I would make one unsatisfying attempt after another,and in the end have to discard them all.' রাসেল কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করলেন? অনেক চিন্তা করেও তিনি দেখলেন যে কিছু একটা বিষয়ে লেখার জন্য ঠিক করে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক চিন্তাভাবনা টুকু করার পরে তিনি যদি তার চিন্তা অবচেতন মনে রাখেন, পাখির ডিমে তা দেওয়ার মতো তাঁর  অবচেতন মন স্টার চিন্তায় উসকে দিতে থাকে, সচেতনভাবে মন থেকে কোন কথা বের করে আনার জন্য তিনি তাড়াহুড়ো করেন না ,সেরকম একটি সময়ে তিনি বলতে চাওয়া কথাগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অবারিত গতিতে বেরিয়ে আসে তার মন থেকে। Having,by a time of very intense concentration ,planted the problem in my sub-consciousness ,it would germinate underground until,suddenly,the solution emerged with  blinging clarity ,so that it only remained to write down what had appeared as if in a revelation.

সমস্ত বৃত্তির মানুষই অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা করে বা করা উচিত। লেখকরা ও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ ডক্টর স্যামুয়েল  জনসন লেখকদের দেওয়া উপদেশের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ইংরেজ লেখকদের  উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে ভালো ইংরেজি গদ্য লেখার জন্য প্রতিটি লেখককে গভীর মনোযোগ দিয়ে জোসেফ এডিসনের গদ্য সম্ভার পাঠ করা উচিত। কীভাবে পড়া উচিত, কীভাবে লেখা উচিত– এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ইংরেজি ভাষায় অনেক বই এবং প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ওপরে উল্লেখ করা বার্ট্রান্ড রাসেল ছাড়াও এইচ জি ওয়েলস, রবার্ট লীণ্ড, সমারসেট মম এবং জর্জ অরওয়েল ইত্যাদি লেখকদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। জর্জ অরওয়েল, হ্যারল্ড লাস্কির মতো বিশ্ববন্দিত পণ্ডিতরাও দুর্বোধ্য এবং  দুষ্পাঠ্য গদ্যের কঠোর সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখেছেন। গদ্যশৈলীর ক্রমোৎকর্ষ  সাধন করার জন্য  এই ধরনের অবিরাম  চেষ্টার ফলেই ইংরেজি ভাষা আজ  বিশ্ব ভাষায় পরিণত হয়েছে । অবশ্য এই ক্ষেত্রে ইউরোপের অন্যান্য উন্নত ভাষাগুলি পেছন পড়ে থেকে নেই । ফরাসিদের গদ্য সাধনা প্রায় কিংবদন্তিতুল্য ।

অসমিয়া ভাষায় কিছু উৎকৃষ্ট গদ্ রচিত হয়েছে যদিও  সাধারণভাবে অসমিয়া গদ্যের মান আশানুরূপ উন্নত বলা যেতে পারে না। গদ্য রচনার বিষয়ে  চিন্তা চর্চা ও যেভাবে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। গদ্যের গুরুত্ব বোঝার জন্য ইএম ফ্রস্টারের একটি উক্তি স্মরণ করলেই যথেষ্ট হবে । আমি আমার একাধিক রচনায় তাঁর এই উক্তিটি উদ্ধৃত করেছি। কিন্তু আমি সেই একই উক্তিকে মন্ত্রের মতো বারবার আওড়াতে চাই –' গদ্যের অবনতি ঘটলে ভাবের আদান প্রদানের সমস্ত সুগম পথ বন্ধ হয়ে যায়, আর তার ফলে সভ্যতার বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।' 

--------- 

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।  





বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২

কীভাবে মরা উচিত ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, Homen Borgohain

 কীভাবে মরা উচিত

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



(১)

জীবনের অনিবার্য পরিণতি হল মৃত্যু।কিন্তু কেবল মানুষেরই মৃত্যু আছে,মানুষের বাইরে অন্য কোনো প্রাণীর মৃত্যু নেই।কথাটা বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হলেও এটাই সত্য।মৃত্যুর সঙ্গে চেতনা এবং অহংবোধ জড়িত।পৃ্থিবীতে প্রাণের কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে একমাত্র মানুষই চেতনা তথা আত্মচেতনা নামের এই রহস্যময় গুণটি আয়ত্ত করতে সমর্থ হয়েছে।প্রকৃ্তির নিয়ম অনুযায়ী সমস্ত প্রাণীরই জীবলীলা একদিন হঠাৎ স্তব্ধ হয়।কিন্তু একমাত্র মানুষের বাইরে অন্য কোনো প্রাণীই তাকে মৃত্যু বলে জানে না।মৃত্যুর ধারণা একান্তভাবে মানুষের আবিষ্কার। চেতনার বিকাশের ফলে মানুষের মনে অহংবোধের জন্ম হয়।একমাত্র মানুষই নিজেকে বলতে সক্ষম হল ‘আমি’-অর্থাৎ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমি একটি অদ্বিতীয় সত্তা।মানুষের এই অহংবোধ তাঁর মনে অমরত্বের কল্পনা জাগিয়ে তুলে।মানুষ নিজের মধ্যে থাকা এই ‘আমি’টার চির বিলুপ্তি চায় না,চায়না চেতনার চির সমাপ্তি।মৃত্যুকে আবিষ্কার করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে উদয় হল মৃত্যু-ভয়।একভাবে দেখতে গেলে এই মৃত্যু এবং মৃত্যু-ভয় মানুষের ধর্ম,দর্শন,সাহিত্য এবং শিল্প কলার মূল চালিকাশক্তি।আর্থার কোয়েস্টলার এক কথায় ঘোষণা করেছেন যে মৃত্যু না থাকলে মানুষ কবিতা লিখত না,সাহিত্য সৃষ্টি করত না,ধর্মের ধারণাও তার মনে আসত না।

মানুষের জীবনের একটি প্রধান সমস্যা হল মৃত্যু-ভয়।মানুষ সচেতনভাবে মৃত্যুর কথা চিন্তা না করলেও তাঁর অবচেতন মনে চিরু-জাগরুক হয়ে থাকে মৃত্যু- ভয়।এই মৃত্যু-ভয় তাঁর জীবনের ওপরে বিষাদের একটি দীর্ঘ ছায়া বিস্তার করে থাকে।মৃত্যু-ভয় জয় করার জন্য মানুষ নানা উপায় অবলম্বন করে।সেইসবের মধ্যে প্রধান উপায়টি হল পরকাল এবং আত্মার অমরত্বের কল্পনা। মৃত্যু-ভয়ই হল ধর্মের জন্মদাতা।সমস্ত ধর্মই মানুষকে এই সান্ত্বনা দান করে যে মৃত্যুকে ভয় করার কোনো কারণ নেই,কারণ আত্মা অমর।কিন্তু আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী ধার্মিক লোকদের মধ্যেও বেশিরভাগই কেন জানি আত্মার অমরত্বের বিষয়ে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারে না।জীবনের দীপশিখা একবার নিভে যাবার পরে সে অনন্ত অন্ধকারে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে নাকি-এই গোপন ভয় মানুষকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে।

কিন্তু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়।যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যু-ভয়কে জয় করতে পেরেছে। কেউ পেরেছে ধর্মীয় আশ্বাসের সাহায্যে,আবার কেউ পেরেছে যুক্তির সাহায্যে। সব মানুষেই মৃত্যুভয় জয় করতে চায়। মৃত্যু ভয় জয় করার একটি প্রধান উপায় হল মৃত্যু-ভয় জয় করা মানুষের উদাহরণ থেকে শিক্ষা লাভ করা। এই ধরনের হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। আমি এখানে কেবল দুটি উদাহরণ দিতে চাই। দুটি উদাহরণই আমি পড়েছি বার্ণার্ড লউনের The Lost Art of Healing নামের গ্রন্থে। বার্ণার্ড লউন একজন বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী। ১৯৮৫ সনে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল। তিনি বইটির এক জায়গায় বলেছেন,চূড়ান্ত বিচারে ভালো মরণ হল ভালোভাবে যাপন করা একটি জীবনের দর্পণ মাত্র।১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে জেইমস বসওয়েল ডেভিড হিউমকে তাঁর মৃত্যুশয্যায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম ছিলেন তাঁর যুগের একজন নেতৃস্থানীয় মানবতাবাদী। যেহেতু হিউম এখন মৃত্যুর দরজায় উপস্থিত হয়েছেন ,সেইজন্য এই কট্টর নিরীশ্বরবাদী মৃত্যুভয়ে কাতর হয়ে ঈশ্বরের দয়া ভিক্ষা করবে নাকি সেকথা জানার জন্য জেইমস বসওয়েলের মনে ভীষণ কৌতূহল হল। মৃত্যু এবং চরম বিনাশের চিন্তা হিউমকে আতঙ্কিত করছে নাকি সেকথা জানার জন্য বসওয়েল তাকে প্রশ্ন করলেন। হিউম উত্তর দিলেন –‘জন্মের আগেও আমি ছিলাম না,মৃত্যুর পরেও আমি থাকব না। জন্মের আগে আমার অস্তিত্ব না থাকার কথাটা যদি আমাকে আতঙ্কিত না করে,তাহলে মৃত্যুর পরে আমার অস্তিত্ব না থাকা কথাটা কেন আমাকে আতঙ্কিত করবে?’হিউম নির্ভয় মনে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছে।জীবনের অন্তিম মুহূর্তে হিউমের মনে বিরাজ করা গভীর প্রশান্তি বসওয়েলকে গভীরভাবে অভিভূত করেছে। মৃত্যু-ভয় বিন্দুমাত্র কাতর করতে না পারা ডেভিড হিউমের অবিচলিত মানসিক প্রশান্তি সমসাময়িক ব্রিটেনের ওপরেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।‘

ডেভিড হিউম যেমন তাঁর যুগের একজন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন,ঠিক তেমনই লিউয়িস টমাস ছিলেন কুড়ি শতিকার একজন শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং জীব বিজ্ঞানী।বহু বছর তিনি য়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যাথলজি বিভাগের মুরব্বি অধ্যাপক ছিলেন।সেখান থেকে অবসর নিয়ে তিনি Memorial Sloan Kettering Institute of Cancer Research এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি যতটা বিখ্যাত,ঠিক ততটাই বিখ্যাত একজন অসাধারণ প্রতিভাশালী লেখক তথা প্রাবন্ধিক হিসেবে। বিজ্ঞানের বিষয়-বস্তু নিয়ে লেখা তাঁর বই এবং রচনাগুলি উচ্চমানের সাহিত্য সৃষ্টি বলে স্বীকৃ্তি লাভ করেছে।তাঁর দুটি বহু পরিচিত গ্রন্থ হল  The Lives of A Cell এবং Notes of a Biology Watcher.  

লিউয়িস টমাসের মৃত্যুর বিষয়ে বার্ণাড লউন তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন –মৃত্যুর বারোদিন আগে নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা রজার রসেনব্লাট লিউয়িস টমাসের একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন। টমাস তাকে বলেছিলেন –‘মৃত্যু যখন একটা অধিবিদ্যামূলক তথা দার্শনিক ঘটনা ছিল,তখন মৃত্যুকে এক প্রকারের শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছিল।কিন্তু আজকাল মৃত্যুর প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ হয়।ফলে একে একটা ব্যর্থতার প্রকাশ বলে ধরা হয়।একজন মরনোন্মুখ রোগি একপ্রকারের কিম্ভূত-কিমাকার জীব।সমস্ত অস্বাভাবিকতার ভেতরে মৃত্যুর দীর্ঘ প্রক্রিয়াটাই হল মানুষের জন্য সবচেয়ে অগ্রহণীয়। এ যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটা অপরাধ। আমাদের সংস্কৃতি তথা জীবন দর্শনে আগে না হওয়া একটা ঘটনা ঘটতে আরম্ভ করেছে।সেটা হল এই যে আজকাল আমরা মৃত্যুর জন্য লজ্জিত হই। আমরা মৃত্যু থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করি।আমরা যেভাবে চিন্তা করি সেদিক থেকে দেখতে গেলে মৃত্যু হল একটা ব্যর্থতা।  আসলে মৃত্যুর যন্ত্রণা বলে কোনো জিনিস নেই।আমি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে মৃত্যুর মুহূর্তে যন্ত্রণা সম্পূর্ণ নাই হয়ে যায়।  শরীর মরতে শুরু করার সময় একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে।মানুষের শরীরে হাইপোথেলামাছ এবং পিটুইটারি গ্রন্থি শরীরে পেষ্টাইড হরমোন মুক্ত করে দেয়।এণ্ডরফিনস।যন্ত্রণা অনুভব করা কোষগুলিতে তারা লেপ্টে লেগে থাকে। মোটের উপর আমি বিশ্বাস করি যে মৃত্যুর সময়ে প্রকৃতি মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল হয়।’ 

সাংবাদিক তাকে এবার জিজ্ঞেস করলেন-‘মরার সময় কীরকম অনুভূতি হয়।’

টমাস উত্তর দিলেন –দুর্বলতা।এটা দুর্বলতা।আমি আমার শরীরের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করেছি।’

কীভাবে মরা উচিত সেকথা জানার জন্য কোনো আর্ট আছে কি?’-রসেলব্লাট জিজ্ঞেস করলেন।

লিউয়েস টমাস উত্তর দিলেন-কীভাবে বেঁচে থাকা উচিত তার নিশ্চয় একটা উত্তর আছে।‘ 


(২)


ডেভিড হিউমের দর্শন এবং লিউয়িস টমাসের বিজ্ঞান –এই দুটির বিষয়ে আমি বিশেষ কিছু জানি না।অবশ্য ডেভিড হিউমের দর্শনের চেয়ে লিউয়িস টমাসের বিজ্ঞানের বিষয়ে নামমাত্র বেশি কথা জানি।কিন্তু দুজনের জীবনের বিষয়ে আমি কিছু কথা জানি।আগেই বলা হয়েছে যে ডেভিড হিউম ছিলেন তাঁর যুগের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ভাবুক এবং দার্শনিক।তাঁর বিখ্যাত দার্শনিক বই দুটির নাম হল –Inquiry Concerning Human Understanding এবং    Treatise of Human Nature  তাঁর এই দুটি বইকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ বলে মনে করা হয়।

ডেভিড হিউমের মৃত্যুর পরে তাঁর বন্ধু বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বন্ধুকে লেখা একটি চিঠিতে ডেভিড হিউমের বিষয়ে লিখেছিলেনঃ আমাদের একজন অসামান্য প্রতিভাবান এবং কখন ও ভুলতে না পারা বন্ধুর মৃত্যু হল।তাঁর দর্শনের বিষয়ে বিভিন্ন জন নিজের নিজের বিশ্বাস এবং দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে তাঁকে হয় প্রশংসা করবে না হয় নিন্দা করবে।কিন্তু তাঁর চরিত্র এবং আচরণ সম্পর্কে কখনও কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। আমার এভাবেও বলতে ইচ্ছা করে যে তাঁর মানসিক ভারসাম্য এবং প্রশান্তির তুলনা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।তাঁর মিতব্যয়িতা এরকম ছিল যে নিজের চরম আর্থিক দুর্দশার সময়েও তিনি অন্যকে সাহায্য করা থেকে কখন ও বিরত ছিলেন না।সমাজে শান্তিতে বাস করতে হলে মানসিক প্রফুল্লতার প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি।কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসিক প্রফুল্লতা হয় চপলতা এবং তরলতার নামান্তর মাত্র।কিন্তু ডেভিড হিউমের মানসিক প্রফুল্লতার সঙ্গে জড়িত হয়েছিল ব্যাপক জ্ঞান,গভীর চিন্তা,অসামান্য বোধশক্তি এবং কঠোর মানসিক সংযম।অতি জ্ঞানী এবং সদাচারী মানুষ বলে বললে যে ধরনের মানুষের কথা আমাদের মনে পড়ে ,ঠিক তেমনই একজন মানুষ ছিলেন ডেভিড হিউম।’

জীবনের সর্বশেষ বছরটিতে ডেভিড হিউম একটি আত্মজীবনী মূলক রচনা লিখেছিলেন। আত্মজীবনীটা লিখতে গিয়ে তাঁর প্রয়োজন হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার শব্দের।অ্যাডাম স্মিথের বর্ণনায় আমরা ডেভিড হিউম নামের মানুষটির স্বভাব চরিত্রের একটি মোটামুটি আভাস পেয়েছি। ডেভিড হিউম নিজে নিজের বিষয়ে কী ভেবেছিলেন সেই বিষয়ে জানার জন্য তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে কয়েকটি নির্বাচিত অংশ নিচে উদ্ধৃত করা হল-‘অহঙ্কার অনুভব না করে নিজের বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে কিছু বলা শক্ত। সেজন্য আমি খুব সংক্ষেপে বলব।আমি যে নিজের বিষয়ে লিখতে শুরু করেছি তাতেই অহঙ্কার ফুটে উঠেছে বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্ত আমি কেবল নিজের লেখার বিষয়েই সংক্ষিপ্ত কিছু কথা লিখব।সেটাই আমার জীবন,কারণ আমার সমগ্র জীবন লেখাপড়ার কাজেই অতিবাহিত হয়েছে। আমার বেশিরভাগ লেখাই প্রথম অবস্থায় এই ধরনের এরকম কোনো কৃতকার্যতার মুখ দেখেনি যে যার জন্য আমি গর্ব অনুভব করতে পারি ।…

আমি ফ্রান্সে থাকার সময় Treatise of Human Nature নামের বইটি লিখেছিলাম। ১৭৩৮ সালের শেষের দিকে আমি বইটি প্রকাশ করলাম । কিন্তু এই বইটির মতো দুর্ভাগা বই বোধহয় অন্য কোনো মানুষ লিখেননি। ছাপাখানা থেকে সেটা বের হল একটা মৃত শিশু হয়ে । বইটি কার ও মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারল না । কিন্তু আমার স্বভাবটা  ছিল রঙ্গীন এবং আশাবাদী। বইটির ব্যর্থতার আঘাত সামলে নিয়ে আমি পুনরায় গভীর মনোযোগের সঙ্গে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যয়ন করতে আরম্ভ করলাম।... 

' আমার বইটির বিষয়বস্তুর চেয়ে তার লেখার ধরনটাই বইটির ব্যর্থতার কারণ বলে আমি মনে করেছিলাম। বইটি প্রকাশ করার জন্য আমি যেন বড় বেশি তাড়াহুড়ো করে ছিলাম। সেই জন্য আমি বইটির প্রথম অংশটি নতুন করে লিখে তাকে আমার দ্বিতীয় বই অর্থাৎ Inquiry Concerning Human Understanding এ সন্নিবিষ্ট করলাম । কিন্তু এই বইটি ও প্রায় প্রথম বইটির মতোই পাঠকদের দ্বারা  অবহেলিত হয়ে রইল। কিন্তু আমার স্বাভাবিক মানসিক শক্তি এ রকমই ছিল যে এইসব হতাশা আমাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারল না। তারপরে আমি Political Discourses এবং Inquiry Concerning The Principles of Morals নামের দুটি বই রচনা করলাম। ইতিমধ্যে আমার প্রথম দুটি বই বিষয়ে সরকারি ভাবে আলোচনা হতে শুরু করেছিল। বই দুটির   নতুন সংস্করণ ও প্রকাশ করতে হয়েছিল। বই দুটির নিন্দাসূচক সমালোচনাও হয়েছিল। কিন্তু আমি এই বলে একটা সংকল্প নিয়েছিলাম এবং তাকে কঠোর ভাবে পালন করেছিলাম যে আমি কখনও কার ও সমালোচনার উত্তর দেব না; আর যেহেতু আমার সহজে রাগ হত না, এইজন্য আমি সমস্ত সাহিত্যিক বাকবিতণ্ডা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলাম। এইসব ছিল ক্রমান্বয়ে আমার খ‍্যাতি  বৃদ্ধির লক্ষণ। সে আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ জুগিয়েছিল। প্রতিটি কথার খারাপ দিকের চেয়ে ভালো দিকটার  উপরেই আমার চোখ পড়ত। আমি মনে করি যে বছরে ১০  হাজার পাউন্ড উপার্জন হওয়া একটি জমিদারির মালিক হওয়ার চেয়ে এরকম একটি মনের অধিকারী হতে পারাটা বহুগুণে বেশি কাম্য।…

'১৭৭৫ সনের বসন্তকালে আমার পাকস্থলীর একটা অসুখ আরম্ভ হয়। প্রথম অবস্থায় আমি তার জন্য বিশেষ চিন্তিত হইনি। কিন্তু পরে আমি অনুভব করলাম যে এই অসুখ আরোগ্য হওয়ার আশা নেই এবং এটা আমার প্রান হরণ করবে। আমার মৃত্যু তাড়াতাড়ি হওয়াটাই কামনা করেছিলাম। পাকস্থলীর অসুখটা থেকে আমি বিশেষ কোনো যন্ত্রণা অনুভব করিনি; কিন্তু তারচেয়ে আশ্চর্যের কথা এই যে আমার স্বাস্থ্যের দ্রুতগতিতে অবনতি হওয়া সত্ত্বেও আমি মুহূর্তের জন্য ও মানসিক  প্রফুল্লতা হারাইনি। বরং আমি এটাই বলতে চাই যে আমার জীবনের কোনো একটা সময় পুনরায় যাপন করার জন্য আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমার অসুস্থতার এই সময়টিকেই আমি বেছে নেব। আমি যত আগ্রহে বই পড়ি তত উৎসাহে আমি মানুষের সঙ্গ ও উপভোগ করি ।

'শেষে  নিজের চরিত্রের বিষয়ে আমি এটাই বলতে চাই যে আমি একজন নরম প্রকৃতির মানুষ। আমার নিজের মনের ওপরে সংযম আছে। আমি একজন মুক্তমনা, সমাজ প্রিয়  এবং রঙ্গিন স্বভাবের মানুষ । আমি মানুষের প্রতি অনুরক্ত হতে পারি । আমার সমস্ত কামনা- বাসনা এবং আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে আমি মধ্যম পন্থা অনুসরণ করে চলি। সাহিত্যিক খ‍্যাতির প্রতি আমার দুর্বলতা আছে । কিন্তু উপর্যপরি হওয়া হতাশা আমার মনে কোনো তিক্ততার সৃষ্টি করতে পারেনি। যুবক এবং ফুর্তিবাজ মানুষ আমার সঙ্গ যে রকম ভালোবাসে, ঠিক তেমনি ভালোবাসি গহীন গম্ভীর অধ্যয়নশীল মানুষও। মার্জিত স্বভাবের মহিলার সঙ্গ আমাকে বিশেষভাবে আনন্দ দেয়। তারাও আমার সঙ্গ পছন্দ করে বলে আমি অনুভব করি । বেশিরভাগ বিখ্যাত মানুষই মিথ্যা অপবাদ এবং কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে থাকতে পারে না । কোনো মিথ্যা অপবাদ কলঙ্ক আমাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি । আমার বন্ধুরা আমার স্বভাব চরিত্রের স্বপক্ষে ওকালতি করার মতো কোনো পরিস্থিতি কখন ও উদ্ভব হয় নি; অন্যদিকে আমার নিন্দুকরাও আমার নিন্দা করার জন্য কোনো কারণ বা সুযোগ খুঁজে পায়নি। আমার নিজের বিষয়ে এই কথাগুলি বলতে আবার যে বিন্দুমাত্র অহংকার ফুটে উঠেনি সে কথা আমি বলব না; কিন্তু  সেই  অহংকার যথার্থ নয় বলেও আমি ভাবি না। তখন আমি নিজের বিষয়ে যে কথাগুলো বললাম সেই কথাগুলির সত্যাসত্য যে কোনো মানুষই অতি সহজে পরীক্ষা করে দেখতে পারে।' 

-------

 

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।








  



শুক্রবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২২

নরকের কথা ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস, Homen Bargohain

 নরকের কথা

হোমেন  বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস



কিছুদিন আগে নবকান্ত বরুয়া আমার বিষয়ে লেখা একটি প্রবন্ধে এরকম একটি বাক্য লিখেছেন–' আমি তখন 'নরক' নিয়ে ব্যস্ত; হোমেনেরও 'নরক'টি সম্পর্কে কিছুটা খবর পেয়েছিলাম।

আমার 'নরক' এর খবর আমি নিজেই দিয়েছিলাম। বেশিরভাগ মানুষই একটি কথা জানে না যে নবকান্ত বরুয়া কেবল কবি বা গদ্যশিল্পী নয়, তিনি একজন ভাল চিত্রকরও। কবি নবকান্তের প্রতি আমি যতটা আকৃষ্ট হয়েছিলাম প্রায় ততটাই আকৃষ্ট হয়েছিলাম চিত্রকর নবকান্তের প্রতিও।তাঁর দুটি ছবি দেখার পরে আমার মনে এরকম একটি বাসনা হল যে আমার জীবনের প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতে  হবে নবকান্ত বরুয়াকেই।

আমি কটন কলেজের ছাত্র হয়ে থাকার সময়েই ' 'রামধেনু'তে ঘনঘন প্রকাশিত আমার কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধগুলি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। এভাবে বললেও  বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না যে ছাত্র অবস্থাতে আমি একজন' প্রতিষ্ঠিত' লেখকের মর্যাদা লাভ করেছিলাম। কিন্তু আমার জীবনের যে প্রথম বই ছাপার অক্ষরে দেখার আমি আশা করেছিলাম তা গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধের বই ছিল না। এটি ছিল একটি উপন্যাস।কিন্তু  তা ছিল একটি অলিখিত উপন্যাস। অর্থাৎ আমি যদিও মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে আমার জীবনের প্রথম প্রকাশিত বইটি তবে একটি উপন্যাস, কিন্তু উপন্যাসের একটি শব্দও আমি লিখতে আরম্ভ করিনি অথবা লিখতে পারিনি।

হাতে কলম নিয়ে আমি একটি উপন্যাস লিখতে বসিনি সত্যি, কিন্তু আমার মস্তিষ্কের ভেতরে উপন্যাসটি অনবরত গুনগুন করছিল। রাম জন্মাবার আগেই রামায়ণ রচিত হওয়ার মতোই উপন্যাসটি লেখার আগেই তার নামটা ঠিক করে ফেলেছিলামঃ' নরকাগ্নি'। তৎসম শব্দের প্রতি আমার দুর্বলতার কথা এখন প্রত্যেকেই জানে। এই দুর্বলতা আরম্ভ হয়েছিল আমার শৈশবেই। তার একটি কারন আমি এই বলে অনুমান করি যে আমার সাত আট বছর বয়স থেকে আমার কাব‍্যানুরাগী পিতা  আমাকে বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং অসমিয়া কবি ভোলানাথ দাসের অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত কাব্য গুলি পড়ে শোনাতেন, এবং সেইসব কাব্যের সংস্কৃত শব্দের ধ্বনি মাধুর্য আমার কোমল মনে মন্ত্রের মতো ক্রিয়া করেছিল । অবশ্য বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজে এই কথা অনুভব করতে লাগলাম যে আমি যে সমস্ত উদ্দেশ্য নিয়ে যে ধরনের গদ্য লিখতে চাই সেরকম গদ্যে তৎসম শব্দের প্রাধান্য বেশি থাকতে হবে।সে যাই হোক না কেন সেই বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনা এখানে খুব প্রাসঙ্গিক হবে না।

আমার জীবনের প্রথম অলিখিত উপন্যাসটির জন্য আমি কি বিষয়-বস্তু বেছে নিয়েছিলাম তার আভাস দেবার জন্য উপন্যাসটির নামটিই যথেষ্টঃ' নরকাগ্নি'। নামটি আমাকে এভাবে গ্রাস করে ধরেছিল যে উপন্যাসের নামে একটি মাত্র শব্দ নৌ  লিখতেই আমি প্রচ্ছদটা আঁকানোর জন্য ব্যাগ্ৰ হয়ে পড়লাম। আমার জীবনে এই সমস্ত ঘটনা ঘটার সময় নবকান্ত বরুয়া কটন কলেজের অধ্যাপক এবং আমি ঢকুয়াখনা হাই স্কুলের শিক্ষক । আমি তাকে চিঠি লিখে অনুরোধ করলাম যে আমার  'নরকাগ্নি' নামের একটি উপন্যাসের প্রচ্ছদের নক্সা এঁকে দ্রুত আমাকে পাঠিয়ে দিতে হবে । এই অনুরোধ করার সময় স্বাভাবিকভাবেই আমি তাকে উপন্যাসটির বিষয়বস্তু ও কিছুটা আভাস দিতে হয়েছিল। নবকান্ত বরুয়ার এভাবেই আমার নরকটির কিছু খবর পেয়েছিল। আমার চিঠি পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই তিনি গভীর অর্থ ব্যঞ্জক একটি নক্সা এঁকে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জীবনের দীর্ঘ আকাবাকা পথে ঘুরে বেড়ানোর সময় অন্য অনেক জিনিস হারানোর মতো নবকান্ত অতিশয় যত্ন করে এঁকে  দেওয়া সেই ছবিটাও হারিয়ে গিয়েছে । কিন্তু ছবিটির স্মৃতি আমার মন থেকে এখনও হারিয়ে যায়নি।

' নরকাগ্নি' কখনও লেখা হল না। কিন্তু আমার জীবনের প্রথম প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদের নক্সা নবকান্ত বরুয়াকেই  আঁকতে হবে বলে আমি যে ইচ্ছা করেছিলাম সেই ইচ্ছা পূরণ করে তিনি' বিভিন্ন কোরাস'এর প্রচ্ছদ এঁকে  দিয়েছিলেন। সেটি ছিল আমার জীবনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।

পঞ্চাশের দশকে নবকান্ত বরুয়া লেখা কবিতাগুলির ভেতরে দুটি বিখ্যাত কবিতা হল' মাকে চিঠিঃ নরক থেকে' এবং' নরকে  ডন জুয়ান'। এর থেকে বোঝা যায় যে আমি যে সময়ে আমার নরককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, প্রায় একই সময়ে নবকান্ত বরুয়া ব্যস্ত ছিলেন তাঁর নিজের নরক নিয়ে। তাই নবকান্ত বরুয়া আমার বিষয়ে লেখা প্রবন্ধটির এক জায়গায় লিখেছেন–' আমি তখন 'নরক' নিয়ে ব্যস্ত; হোমেনেরও ' নরক' টির বিষয়ে কিছু খবর পেয়েছিলাম।'

বিভিন্ন ধর্ম যেসমস্ত নরকের কল্পনা করেছে সেই সমস্ত নরকে প্রত্যেক পাপী একসঙ্গে বাস করে। তাই নরকের অভিজ্ঞতা সমস্ত পাপীর একই রকম। কিন্তু নবকান্ত বরুয়া যে নরকের কথা বলেন , সেই নরক ধর্ম কল্পনা করা পরকালের নরক  নয়। সেই নরক হল পার্থিবজীবনে লাভ করা একটি অন্তরের অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক কবিতা। এটা যেহেতু একান্তভাবে ব্যক্তিগত নরক, তাই কোনো দুজন মানুষের নরক কখনও এক হতে পারে না। প্রত্যেক মানুষই নিজের নিজের নরক নিজের অন্তরে বহন করে নিয়ে বেড়ায়। সেই জন্য যদিও নবকান্ত বরুয়া এবং আমি দুজনে প্রায় একই সময়ে নরকে বাস করেছিলাম, কিন্তু আমাদের দুজনের নরকের ভূগোল এবং ইতিহাস ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। খবরের কাগজ পড়ে আমি বসনিয়া বা রুয়ান্ডার খবর পাই, কিন্তু সেইসমস্ত জায়গা আমি কখনও দেখিনি বা দেখতে পাবার আশাও নেই। ঠিক সেভাবে নবকান্ত বরুয়ার কবিতা পড়ে আমি তাঁর নরকের অল্পস্বল্প খবর পেলেও তাঁর নরকের বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার নেই। থাকাটা  সম্ভব নয়।

কিন্তু আমার নিজের নরকের বিষয়ে দু'একটি কথা আমি নিশ্চয় বলতে পারি।

আমার নরক-বাস আরম্ভ হয়েছিল তখন – যখন আরম্ভ হয়েছিল আমার জীবনের বসন্তকাল, অর্থাৎ যৌবন। কথাটা খুব অবাক বলে মনে হচ্ছে না? কিন্তু যদি আমরা একথা মনে করি যে আর্থার র‍্যাঁবো তাঁর 'নরকে এক ঋতু'(Une saison en enter) নামের বিখ্যাত কবিতা লিখে শেষ করেছিল মাত্র উনিশ  বছর বয়সে, তারপর তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন কবিতার নামে ক অক্ষরটিও   লিখেননি, তখন যৌবনের সঙ্গে নরকের কাছাকাছি সম্পর্ক আবিষ্কার করার জন্য খুব একটা বেশি কষ্ট করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। নরকের অভিযান একটি অতি বিপদসংকুল দুঃসাহসিক অভিযান। একমাত্র যৌবনকালেই এরকম অভিযান সম্ভবপর। নবকান্ত বরুয়ার নরক সম্পর্কীয় কবিতাদুটি  পড়ে দেখুন তো। ভাটিতে চলা কোনো বয়সের মানুষ এরকম কবিতা লিখে না, লিখতে পারেনা।

নরক একটি জায়গা নয়, আসলে এটি একটি মনের অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ জা পল সাঁত্রের নরকের সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর মতে  The hell is other অন্য মানুষেরাই হল নরক।

আমাকে নরকের খবর দেওয়া প্রথম মানুষটি  ছিলেন ফরাসি কবি শার্ল  বোদলেয়ার । আমরা কলেজে পড়ার সময় ইংরেজি সাহিত্যের চার সীমা অতিক্রম করে মহাদেশীয় সাহিত্যের খবর নিতে শুরু করেছিলাম। তখনই আমি বোদলেয়ার এবং র‍্যাঁবোকে আবিষ্কার করেছিলাম। সেই আবিষ্কারের উন্মাদনা আজও আমার মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। আমি তৃতীয় বার্ষিকের ছাত্র থাকাকালীন জা পল সাঁত্রে লেখা বোদলেয়ারের বিখ্যাত জীবনী পড়ার সুযোগ পেলাম। তারপর থেকেই বহুদিন পর্যন্ত বোদলেয়ার ছিল আমার মনের নিত্য-সঙ্গী। তাঁর কবিতা আমাকে এভাবে অস্থির করেছিল যে তার কয়েকটি কবিতা ইংরেজি থেকে অসমিয়াতে অনুবাদ করার পরেই আমি কিছুটা শান্তি পেয়েছিলাম। সেরকম একটি অনুবাদ (সাতজন বুড়ো মানুষ)  রামধেনুতে   প্রকাশিত হয়েছিল। সেটাই ছিল বোদলেয়ারের কবিতার প্রথম অসমিয়া অনুবাদ।

পরে অবশ্য বীরেশ্বর বরুয়াও বোদলেয়ারের কয়েকটি কবিতা অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন।

বোদলেয়ারের কাছে বেঁচে থাকার অর্থ ছিল জীবনটাকে নির্মমভাবে ধ্বংস করা। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন স্পর্শকাতর' এবং আতিশয্য- প্রবণ। অনন্ত নিঃসঙ্গতা হবে তাঁর চিরসঙ্গী– সে কথা তিনি শৈশবেই বুঝতে পেরেছিলেন।তাঁর জীবনে হ্যামলেটের জীবনে ঘটা একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল।তাঁর জন্মের সময়ে পিতার বয়স ছিল ৬২ বছর  এবং মায়ের ছাব্বিশ বছর। বোদলেয়ার বাবাকে ভালোবাসতেন;কিন্তু মাকে মনে মনে ঘৃণা করতেন। মায়ের প্রতি সেই ঘৃণা তীব্রতর হল– যখন বোদলেয়ারের পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পরে মা অশোভনীয় দ্রুততার সঙ্গে একজন সামরিক অফিসারকে বিয়ে করলেন। পিতার মৃত্যুর পরে বোদলেয়ারের হাতে যখন কিছু ধনসম্পত্তি এল, অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সেই ধনসম্পত্তি উড়িয়ে শেষ করলেন অপরিমেয় মদ্যপান এবং বেশ্যা  গমন করে। বেশ‍্যা গমনের  ফলে তিনি সেই সময়ের দুরারোগ্য সিফিলিস রোগের দ্বারা আক্রান্ত হলেন । রোগীর যন্ত্রণা দমন করে রাখার জন্য তিনি অবিরাম ভাবে নানা নেশার জিনিস খেতে লাগলেন। মানুষের শরীর অনেক অত্যাচার সহ্য করতে পারে, কিন্তু সবকিছুর একটা সীমা আছে। বোদলেয়ার নিজের শরীরটার ওপরে এত অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিলেন যে মাত্র ৪০ বছর বয়সে তাঁর সম্পূর্ণ শরীর ভেঙ্গে পড়ল। তারপরও তিনি ছয় বছর বেঁচে ছিলেন, কিন্তু জীবনের শেষের দুইটি বছর সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত ভাবে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। তিনি শরীরের কোনো অঙ্গ নাড়াচাড়া করতে পারতেন না, কথা বলতে পারতেন না, নিজের নামটা মনে করতে পারতেন না, এমনকি আয়নায় নিজের মুখটাকেও চিনতে পারতেন না।নরক! 

কিন্তু এই মানুষটির একটি অন্য জীবনও ছিল। সেই জীবনটি ছিল কঠোর তপস্যা এবং সাধনার জীবন। শারীরিক জীবনে যে মানুষ ছিলেন চরম উচ্ছৃঙ্খল এবং এক অসংযমী, সেই একই মানুষ কবিতা লিখতে বসে হয়ে পড়েছিল কঠোর সংযমী এবং পরিশ্রমী।তাঁর কবিতার তথা ধ‍্যানের বিষয় ছিল যন্ত্রণা, উন্মাদনা, অবক্ষয়, কুশ্রীতা, মৃত্যু, অবসাদ.... এই সমস্ত বিষয়ে তিনি আহরণ করেছিলেন নিজের জীবন থেকে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। অন্যভাবে বলতে গেলে বোদলেয়ারের কবিতা হল তাঁর নরক বাসের বর্ণনা।তাঁর সমসাময়িক একজন ফরাসি লেখক বোদলেয়ারের বিষয়ে বলেছিলেন–' দান্তে নরকে  কেবল বেড়াতে গিয়েছিলেন কিন্তু বোদলেয়ার নরক থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন । বোদলেয়ারের কবিতা বিশ্বজনীনতা লাভ করার কারণ হল এটাই যে সীমাহীন  দুঃখ ,বিষাদ এবং বেদনা বোদলেয়ার নিজের জীবনে স্বেচ্ছায় ভোগ করে অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সেইসব বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে রেখে গিয়েছেন নিজের কবিতায় ।

ভারতে যে বছর সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল সেই বছরেই অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত  হয় বোদলেয়ারের কবিতা সংগ্রহ Les Fleurs Du Mal (The Flowers of Evil)। বোদলেয়ারের কবিতা সিপাহী বিদ্রোহের চেয়ে অনেক বড় বিপ্লব সংঘটিত ওষুধের বাজার করল মানুষের মনোজগতে। বইটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর নিন্দা এবং অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতে কবির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিচারক বোদলেয়ারকে ঈশ্বর- নিন্দার অভিযোগ থেকে  অব্যাহতি দিলেন যদিও অশ্লীলতার অভিযোগে ছয়টি কবিতা পাঠ 

থেকে বাদ দিতে হল। বোদলেয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনে এই বলে ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁর কবিতায় অসৎ এবং অমঙ্গলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে সত্যি, কিন্তু এসবের উদ্দেশ্য হল পাঠকের মনে অসৎ এবং অমঙ্গলের প্রতি ভীতি সঞ্চার করা । সমগ্র জীবন পাপাচারে লিপ্ত হয়ে থাকা বোদলেয়ারের মনে গভীর আকর্ষণ ছিল ধর্মের প্রতি – বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক ভক্তিবাদের প্রতি । পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে বোদলেয়ার এগিয়ে গিয়েছিলেন ধর্মের উপকূলের দিকে।  

বোদলেয়ারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় ফ্রান্সের কোনো একজন কবি বা লেখকই উপস্থিত ছিলেন না; নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যাওয়া কবি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল সকলের দ্বারা অবজ্ঞা এবং উপহাসের পাত্র হয়ে। কিন্তু মৃত্যুর পরে তিনি স্বীকৃত হয়েছেন আধুনিক যুগের অন্যতম প্রভাবশালী কবিরূপে। ইয়েটস, এলিয়ট, এজরা পাউন্ড... আধুনিক যুগের এমন একজন কবি নেই যিনি বোদলেয়ারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছেন।

প্রথম যৌবনের সোনালি বছরগুলিতে আমি আমার মস্তিষ্কে বহন করে নিয়ে বেরিয়েছিলাম 'নরকাগ্নি' নামের একটি উপন্যাস; মনে মনে সেই উপন্যাসটি লিখে থাকার সময় আমার নরক-বাসের অভিজ্ঞতা হয়েছিল।না, কথাটা এভাবে বললে বোধহয় বেশি শুদ্ধ হবে যে আমি ভেতরে ভেতরে নরকের আগুনে পুড়ে মরেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে পরিকল্পনা করেছিলাম' নরকাগ্নি' নামের একটি উপন্যাস। অবশ্য আমার এই নরকটি ধর্ম কল্পনাই করেনি । দুরন্ত যৌবনের উচ্ছ্বাসে জীবনের অর্থ এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে ক্ষণে ক্ষণে আমার মনে উদিত হওয়া হাজারটা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আমার মন সমস্ত বিশ্ব বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল, আর সেই বিদ্রোহ আমার অর্ন্তজীবন লন্ডভন্ড করে সৃষ্টি করা নরকের আগুনে আমি পুড়ে মরেছিলাম। সেই আগুনে ইন্ধন জুগিয়ে ছিল বোদলেয়ার এবং র‍্যাঁবো ইত্যাদি আধুনিক কবিদের কবিতাই।

এটা হল আমার নরকের কথা। নবকান্ত বরুয়ার নরকটির কথা তিনিই বলতে পারবেন। সেই বিষয়ে কিছু একটা ধারণা করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।

------- 

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।






শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

কর্মব্যস্ততা ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-- বাসুদেব দাস । Homen Bargohain

 কর্মব্যস্ততা

হোমেন বরগোহাঞি 

মূল অসমিয়া থেকে  বাংলা অনুবাদ-- বাসুদেব দাস



মানুষের বয়স হিসাব করার জন্য আমরা সাধারণত মাত্র একটি মাপকাঠি ব্যবহার করিঃ সেটা হল রৈখিক সময়ের পরিমাণ। উদাহরণস্বরূপ ১৯৫০ সনে জন্মগ্রহণ করা একজন মানুষের বয়স ২০০০ সনে হবে ৫০ বছর। বয়সের এই হিসেবটিকে একমাত্র হিসেব বলে স্বতঃসিদ্ধ হিসেব বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বয়সের এই কালানুক্রমিক হিসেব ছাড়াও আরও একটি হিসেব আছে। সেটিকে মনস্তাত্ত্বিক হিসেবে বলা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ একজন ৮০  বছরের মানুষের জরাজীর্ণ শরীরে বাস করতে পারে একটি ৪০  বছরের যৌবন সুলভ সতেজ মন; অন্যদিকে একজন ৪০ বছরের মানুষের মনটা হতে পারে একজন ৮০  বছরের মানুষের মনের মতো নিরুদ্যম, নিরুৎসুক এবং জীবন-বিমুখ। বয়সের  অনুভূতি অন্য একটি কথার ওপরেও নির্ভর করে। অপুষ্টি ,অনিয়ম বা নানা ধরনের রোগব্যাধি যদি শরীরটাকে দুর্বল বা ধ্বংস করে, তাহলে পূর্ণ যৌবনেও একজন মানুষ নিজেকে অকাল বৃদ্ধ বলে অনুভব করতে পারে? অন্যদিকে নিষ্ঠার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি পালন করে দেহ মন সুস্থ রাখতে পারলে আশির  গণ্ডি অতিক্রম করা মানুষও যৌবনের প্রাণ-প্রাচুর্য অনুভব করতে পারে। ৮০  বছর বয়সে জর্জ ক্লিমাঞ্চো (প্রথম  বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী) একজন সুন্দরী যুবতীকে দেখে সরব  স্বগতোক্তি করেছিলেনঃ ইস, এখন যদি আমার বয়স ৭০ হত !' অর্থাৎ ৭০ বছর বয়সে তার হৃদয়ে বিরাজ করছিল জীবনের বসন্ত ঋতু।

পৃথিবীর সমস্ত দেশেই  মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বাইবেল মানুষের আয়ু নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল সত্তর বছর। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে ৭০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন অত্যন্ত কম। উন্নয়নশীল বা  অনুন্নত দেশগুলিতে মানুষের আয়ু বৃদ্ধির প্রবণতা এরকম হয়েছে যে আগামী শতকে সেই সমস্ত দেশের মানুষও ৭০ বছরের চেয়ে বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। মানুষ বেশি বছর বেঁচে থাকার একমাত্র অর্থ হল এই যে মানুষের দুঃখ হবে আগের চেয়ে বেশি দীর্ঘকালীন। সাধারণ অর্থে বার্ধক্য মানেই দুর্বলতা, স্থবিরতা এবং জীবনটাকে ভোগ করার অক্ষমতা।যদি তাই হয়, তাহলে মানুষের আয়ু বৃদ্ধির  ফলে কী লাভ হবে– যদি বর্ধিত আয়ুটুকু বেশিরভাগ মানুষের জন্যই মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষাকে আরও বেশি দীর্ঘ করে তোলা ছাড়া অন্য কিছু না করে? যখন ৮০ বছরের মানুষকেই দীর্ঘজীবী বলে ভাবা হয়েছিল, তখন এরকম একজন মানুষের বার্ধক্য স্থায়ী হয়েছিল খুব বেশি দশ বা পনেরো বছর। যদি আগামী শতকের মানুষের আয়ু নব্বই বছরে বৃদ্ধি পায় এবং সমগ্র পৃথিবীতে কোটি  কোটি মানুষ শতায়ু হয়, তাহলে বার্ধক্য স্থায়ী হবে কুড়ি বছর বা তার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রতীক্ষা- কাল হবে দ্বিগুণ।

কিন্তু কেবল বার্ধক্যের  যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষা দীর্ঘ করার জন্যই নিশ্চয় মানুষের আয়ু বৃদ্ধি হয়নি। আয়ু বৃদ্ধি মানুষের সামনে একটা নতুন প্রত্যাহ্বান হয়ে দাঁড়িয়েছে। সফলভাবে সেই প্রত্যাহ্বানের মোকাবিলা করতে হলে মানুষকে এমন কিছু উপায় উদ্ভাবন করতে হবে এবং জীবন-যাপনের প্রণালীতে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটাতে হবে যার ফলে মানুষের যৌবন এখনের চেয়ে বেশী দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বার্ধক্যও হবে উপভোগ্য।

কিছুদিন আগে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী গবেষণা করে এই কথা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকা মানুষেরা আশি নব্বই  বছর বয়সেও জীবনটা পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করে; অন্যদিকে অলস এবং নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করা বেশিরভাগ মানুষই পঞ্চাশ -ষাঠ  বছর বয়সে বেঁচে থাকার উদ্যম এবং আনন্দ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আমরা এই কথাটা জানার জন্য ১৯৯৯ সনে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলাফল জানার জন্য অপেক্ষা করার কোনো দরকার নেই।১৯১২ সনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া এ্যালেক্সিস কেরেল অনেক বছর আগেই এই কথা বলে গেছেন।'Man,The Unknown' নামের বিখ্যাত গ্রন্থটিতে তিনি লিখেছেন–' কাজ তথা পরিশ্রম সমস্ত শারীরিক এবং মানসিক কর্ম- দক্ষতা  বৃদ্ধি করে। পেশীগুলি যতই বেশি করে কাজ করে ততই সেগুলি বেশি শক্তিশালী হয়। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলির মতোই বুদ্ধি এবং নৈতিক চেতনাও পরিশ্রম তথা অনুশীলনের অভাবে মৃতপ্রায় হয়। ব্যক্তির সর্বাধিক বিকাশের জন্য যে জিনিস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তাহল অবিরাম কর্মোদ্যম। প্রধানত বৌদ্ধিক এবং নৈতিক অনুশাসনের সাহায্যে আমরা নিজেকে পুননির্মাণ করতে পারি। বিশেষ করে মধ্যবয়স এবং বৃদ্ধ বয়সে এই ধরনের অনুশাসন বেশি প্রয়োজনীয়।'

প্রায় একই কথা বার্ট্রান্ড রাসেলও বলেছেন আজ থেকে প্রায় আড়াই কুড়ি বছর আগে লেখা তাঁর একটি রচনায়।তাঁর মতে সমস্ত সুখী মানুষের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল এই যে তাঁরা সব সময়ে কর্মব্যস্ত হয়ে থাকে। রাসেল আরও একটি ভালো কথা বলেছেন। নদী তার উৎস থেকে বের হওয়ার সময় সংকীর্ণ এবং ছোট হয়ে থাকে। যতই সে সাগরের কাছাকাছি যায় ততই সে বিস্তৃত হতে আরম্ভ করে। রাসেলের মতে মানুষের জীবনটাও সেই রকমের হওয়া উচিত। জীবনের প্রথম দিকে মানুষ নিজেকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে থাকে; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে। কিন্তু রাসেলের মতে জীবনের শেষ বয়সে মানুষের কর্মক্ষেত্র এভাবে প্রসারিত হওয়া উচিত– যাতে সে  তার সমাজকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। আয়ু বৃদ্ধির ফলে মানুষের বার্ধক্য আগের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘকালীন হবে। সেই সময়টুকুই যদি বৃদ্ধ লোকেরা নানা ধরনের সমাজসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করে, তাহলে বৃদ্ধ লোকেরা এবং তাদের সমাজ উভয়েই  উপকৃত হবে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও বলেছেন যে বৃদ্ধ লোকরা বেঁচে থাকার আনন্দ পেতে হলে তারা যেকোনো কাজে উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যস্ত হয়ে থাকলেই হবে না; যে সমস্ত কাজ তাদের সমাজের সঙ্গে বেশি করে যুক্ত এবং জড়িত করে সেইসব কাজ তাদের জীবন আনন্দময় করে তুলবে। তাই নতুন শতকের মানুষের বার্ধক্য মৃত্যুর প্রতীক্ষার  পরিবর্তে হতে হবে জীবনের সাধনা।

--------

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।






শুক্রবার, ৫ নভেম্বর, ২০২১

কোলেস্টরেল ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das,

কোলেস্টরেল

হোমেন বরগোহাঞি



মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস

কোলেস্টরেল শব্দটির সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার বেশিদিন হয়নি। মাত্ৰ দশ বছর আগে শব্দটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। কিন্তু পরিচয়ের প্রথম মুহূর্ত থেকেই এই শব্দটি আমার জীবনে স্থায়ী বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে।

বিভীষিকার কথা বলার আগে প্রথমে কোলেস্টরেল  বিষয়ে কিছু কথা বলে নেওয়াটা উচিত হবে– কারণ পাঠকদের মধ্যে অনেকেরই এই রহস্যময় পদার্থটির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকতে পারে। যেভাবে দশ বছর আগে আমার ছিলনা।

অত‍্যন্ত  সংক্ষেপে বলতে গেলে কোলেস্টরেল হল স্টেরইড জাতীয় এরকম এক ধরনের জিনিস যা সমস্ত মেরুদন্ডী প্রাণীর শরীরে থাকে। শরীরের সুষম বিকাশ এবং সুস্থতার জন্য এটা একটি দরকারি জিনিস। প্রাণী-দেহের মস্তিষ্ক ,মেরুদন্ড এবং লিভারে বেশি পরিমাণে জমা হওয়া এই জিনিসটি ডি ভিটামিন এবং অন্য কয়েক ধরনের স্টেরইড হরমোন তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই এরকম একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে যে সমস্ত জিনিস প্রাণী দেহের বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য খুবই সহায়ক, সেই একই জিনিসের পরিমাণ নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি হলে তা প্রাণী দেহের জন্য ভীষণ ক্ষতি কারক হয়।কোলেস্টরলও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।

শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি হলে রক্তবাহী শিরাগুলিতে  জমা হতে শুরু করে কোনো বাধা না পেয়ে যদি রক্তবাহী শিরায় কোলেস্টরেল জমা হতে থাকে তাহলে তার ফলে শিরাগুলি ক্রমশ শক্ত এবং টান হতে শুরু করে। শিরাগুলির স্থিতিস্থাপকতাও হ্রাস পেতে শুরু করে।তখন শিরা গুলির মধ্য দিয়ে সুকলমে রক্ত চলাচল করতে পারে না।জল জোগানোর জন্য ব্যবহৃত পাইপের ভিতরে কাদা এবং অন্যান্য আবর্জনা জমা হলে জলের গতিবেগ যেভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়, রক্তবাহী শিরায় বেশি পরিমাণে কোলেস্টরেল জমা হলে ঠিক সেই একই অবস্থা হয়।রক্তবাহী শিরা গুলির মধ্য দিয়ে রক্তের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হলে রক্তের গতিবেগ বৃদ্ধি করার জন্য হৃদপিণ্ডকে বেশি জোর দিতে হয়। তার ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং তার অবধারিত পরিনাম স্বরূপ শরীরে স্ট্রোক,থ্রম্বোসিস এবং হৃদপিন্ডের অসুখের  মতো নানা প্রাণঘাতী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে মাত্রাধিক কোলেস্টরেল হল আপনার জীবনের প্রতি একটি বড় বিপদ সংকেত।

এখন প্রশ্ন হল– শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কত হওয়া উচিত? অসমের চিকিৎসকরা রক্ত পরীক্ষা করে দেওয়া প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে মানুষের শরীরে কোলেস্টরেল ১৩০ মিলিগ্রাম থেকে ২৫০  মিলিগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।অর্থাৎ কোলেস্টরেল ১৩০ মিলিগ্রামের কম এবং ২৫০ মিলিগ্রামের  বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু ডক্টর হান্স ডিয়েহল নামের একজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের এই হিসাব একেবারেই ভুল। তাঁর মতে শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ ১৬০ মিলিগ্রামে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলেই শরীর বিপদ মুক্ত হয়ে থাকতে পারে।

এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটি হল– শরীরে কোলেস্টেরল কেন বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ তা কেন বিপদসীমা অতিক্রম করে?

ওপরেই একবার বলা হয়েছে যে একমাত্র মেরুদন্ডী প্রাণীর শরীরেই কোলেস্টোরেল থাকে। উদ্ভিদ কখনও নিজের দেহে কোলেস্টরেল তৈরি করে না।তাই ওপরের প্রশ্নটির একমাত্র উত্তর হল এই যে মানুষ যখন জান্তব উৎস থেকে পাওয়া মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ঘি, মাখন এবং চীজ ইত্যাদি খাদ্যগুলি বেশি পরিমাণে খায়,তখনই শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।যে মানুষ কোলেস্টরলের পরিমাণ আদর্শ ঊর্ধ্ব সীমার ভেতরে রেখে নিজের জীবন বিপদমুক্ত করে রাখতে চায়, তিনি এই ধরনের আহার একেবারে না খেয়ে বা খুব কম পরিমাণে খেয়ে শাকসব্জি এবং ফলমূল বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে ধনী মানুষের রোগ গুলি থেকে নিস্তার পেতে হলে দুঃখী মানুষের আহার ভালোবাসতে শিখতে হবে। কোলেস্টেরল বেশি পরিমাণে থাকা খাদ্য গুলি ডিমের কুসুম, জীবজন্তুর লিভার এবং চারপেয়ে জন্তুর মাংস। একটিমাত্র ডিমের কুসুমে ২৫০ মিলিগ্রাম এবং তিন আউন্স লিভারে ৩৭০  মিলিগ্রাম কোলেস্টরেল থাকে। তাই যে সমস্ত মানুষের কোলেস্টরেল ইতিমধ্যেই বিপদসীমা অতিক্রম করেছে  তাদেরকে এই দুই ধরনের খাদ্য সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। সঙ্গে ঘি- মাখন ইত্যাদি চর্বি জাতীয় আহার খাওয়াও ছেড়ে দিতে হবে।

এখন কোলেস্টরেল আমাদের জীবনে সৃষ্টি করা স্থায়ী বিভীষিকার প্রসঙ্গে আসা যেতে পারে। আমি নিজেকে লোভী বা ভোজনবিলাসী মানুষ বলে ভাবি না। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বলে জানলে যে কোনো লোভনীয় খাদ্যকেও আমি ত‍্যাগ করতে পারি। কিন্তু তা বলে আমি সর্ব ত্যাগী এবং জিতেন্দ্রিয় সন্ন্যাসীও নই। সবসময় না হলেও অন্তত মাঝেমধ্যে সুস্বাদু সুখাদ্য আস্বাদ করতে কার না ইচ্ছে হয়? বন্ধু বান্ধব বা আত্মীয় কুটুম্ব যখন আন্তরিক ভালোবাসায়  নিমন্ত্রণ করে একবেলা ভাত খাওয়াতে চায়, তখনও কেবল কোলেস্টোরেলের ভয়ে তাদের কীভাবে নিরাশ করব? কিন্তু সত্যটা হল এই যে কোলেস্টরেল নামের এই রহস্যময় জিনিসটির বিষয়ে আদ্যোপান্ত জানার দিনটি থেকে সুস্বাদু সুখাদ্য খাওয়ার আনন্দ থেকে আমি সমূলে  বঞ্চিত হয়েছি। কখনও খেলেও বা খেতে বাধ্য হলেও ভয়ে ভয়ে খাই– কে জানে হয়তো শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বিপদসীমা অতিক্রম করে যায়!

কোলেস্টরেল নিয়ে এই Obsession বা ভূতগ্রস্ততা অবশ্য কেবল আমার হয়নি। যে সমস্ত লোক খাদ্য-রসিক, সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনও - তাদের প্রত্যেকেই এই ভূতের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। শরীরে কোলেস্টোরেল সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি করে ডিম। অন্যদিকে ডিম অনেক মানুষের ব্রেকফাস্টের অপরিহার্য অঙ্গ। বিশেষ করে পশ্চিমী দেশের। কয়েক বছর আগে বিখ্যাত সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী বার্ণাড লেভিন The Manchester guardian পত্রিকায় লেখা একটি প্রবন্ধ কলকাতার The Statesman পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। প্রবন্ধটিতে বার্নার্ড লেভিন  কোলেস্টোরেলের তত্ত্বটিকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে লিখেছেন যে ডিম খেলেই কোলেস্টেরল বৃদ্ধি হয় এ কথা তিনি বিশ্বাস করেন না, কারণ তিনি প্রতিদিন ব্রেকফাস্টে চারটি ডিমের অমলেট খান এবং আমৃত্যু খেয়ে যাবেন।কোলেস্টরেল হলেও তিনি পরোয়া করেন না। তিনি পরোয়া করতে না পারেন, কিন্তু তবুও সেই বিষয়টিকে নিয়ে তাকে যে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখতে হয়েছে সেটাই প্রমাণ করে যে কোলেস্টরেল আধুনিক চেতনার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে।

বিখ্যাত শিল্পপতি রুচি মোদি নাকি ৭৮ বছর বয়স পর্যন্ত দিনে ১৮ টি ডিম খেতেন। এখন তিনি আশির কোঠা পার হয়েছেন সেই জন্য ডিমের পরিমাণ চারটিতে নামিয়ে এনেছেন। কিন্তু এত বেশি ডিম খাওয়া সত্ত্বেও তিনি কোলেস্টরেল জনিত কোনো অসুখে ভোগেন নি। বরং তারুণ্য সুলভ শক্তিতে তিনি এখনও ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এবং এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যানের গুরু দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এইসব দেখে শুনে আমার বন্ধু চন্দ্রধর ত্রিপাঠী কোলেস্টরেলের তত্ত্ব ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিতে চান এবং আমার সঙ্গে সেই বিষয়ে ভয়ঙ্কর তর্ক করেন।(তাঁর কোলেস্টেরলের মাত্রা একটা সময়ে প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম হয়েছিল)। কিন্তু বার্নার্ড লেভিন বা রুচি মোদি সারাজীবন ধরে এত ডিম খাওয়া সত্ত্বেও তারা কেন মাত্রাধিক কোলেস্টেরলের কবলে পড়েন নি তার ব্যাখ্যা অন্যভাবে করতে হবে। উইনস্টন চার্চিল সারাজীবন ধরে এত বেশি পরিমাণে সূরা এবং ধূমপান করেছিলেন যে তাঁর  স্বাস্থ্য  জীবনের মাঝবয়সে ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।কিন্তু তিনি কর্মক্ষম ছিলেন ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে চার্চিলের  শরীরে থাকা একটি বিশেষ জিনের (gene) জন্য তিনি নিজের দেহের কোনো ক্ষতি না করে এত বিপুল পরিমানের আ্যলকোহল এবং নিকোটিন সহ্য করতে পেরেছেন। তিনি একটি ব্যতিক্রম মাত্র,নিয়ম নন। কোলেস্টরেলের ক্ষেত্রেও বার্ণাড লেভিন এবং রুচি মোদিকে  নিশ্চয় ব্যতিক্রমী বলা যেতে পারে। 

আমাকে কিন্তু কোলেস্টরেলের ভয় এত কাবু  করেছে যে আমি আমার প্রিয় খাদ্য ডিম এবং পশুর মাংস খাওয়া একেবারে ছেড়ে দিয়েছি।কয়েক বছর আগে আমার কোলেস্টরেল ২৩১ মিলিগ্রাম হয়েছিল।পরের বছর আমি তা ১৬৮ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছিলাম। নানা কারণে গত বছর তা আবার সামান্য বেড়েছে। কিন্তু আমি যে পুনরায় তাকে আদর্শ সীমায় নামিয়ে আনতে পারব সেই বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

ডক্টর হান্স ডিয়েহলের মতে কোলেস্টেরলের আদর্শ সীমা হল নিজের বয়সের সঙ্গে ১০০ যোগ দিলে যে সংখ্যা হয় ঠিক তত মিলিগ্রাম। অর্থাৎ একজন ৬০  বছরের মানুষের শরীরে কোলেস্টরেলের  পরিমাণ হওয়া উচিত ১৬০ মিলিগ্রাম।

আমরা কলেজে পড়ার সময় বাঙালি লেখক সন্তোষ কুমার ঘোষের ' কিনু গোয়ালার গলি' নামের একটি উপন্যাস খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই উপন্যাসটির জন্য কোনো কোনো সমালোচক তাকে সমারসেট মমের  সঙ্গে তুলনা করেছিল। উপন্যাসটি পড়ে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। উপন্যাসটির বেশিরভাগ কথাই এখন ভুলে গেছি। ভুলতে পারিনি– কোনোদিনই ভুলতে পারব না – উপন্যাসটির একটি বাক্য। বেশ্যালয়ে যেতে চাওয়া একজন যুবককে অন্য একজন উপদেশ দিচ্ছে–' ক্ষণস্বর্গের বিনিময়ে অনন্ত নরক বরণ করে নিও না।' কেবল বেশ্যালয় কেন – জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই এই উপদেশ প্রযোজ্য।লোভ এবং দুর্বলতা জয় করতে না পেরে বেশিরভাগ মানুষই ক্ষণস্বর্গের বিনিময়ে  অনন্ত নরক বরণ করে নেয়। জিহ্বায় সুখাদ্যের তৃপ্তি মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত স্থায়ী হয়, কিন্তু সেই কয়েকটি মুহূর্তের তৃপ্তি লাভ করার জন্য অনেক মানুষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক খাদ্য খেয়ে বা অতিভোজন পরে নানা যন্ত্রণা-দায়ক রোগ-ব্যাধি নিমন্ত্রণ করে আনে।

আমি ভাবি– প্রত্যেক মানুষেরই জীবনের অন্যতম বীজমন্ত্র হওয়া উচিত–' ক্ষণস্বর্গের বিনিময়ে অনন্ত নরক বরণ করে নিও না।'


লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।

















শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২১

টনি মরিসনের স্বর্গ ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

 টনি মরিসনের স্বর্গ

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস



কয়েক বছর আগে টনি মরিসন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত একমাত্র তিনিই আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ লেখিকা যিনি নোবেল পুরস্কারের দ্বারা সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৯৮ সনের ১৯  জানুয়ারির ' টাইম' ম্যাগাজিনে টনি মরিসনের বিষয়ে একটি বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল । সেই প্রবন্ধের মাধ্যমে তাকে সমসাময়িক আমেরিকান লেখকদের ভেতরে অতি উচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রবন্ধটিতে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে তাঁর Beloved নামের উপন্যাসটি। এখানে একটি কথা বলতে পেরে খুব ভালো লাগছে যে বিদূষী  অসমিয়া মহিলা এবং আমার বন্ধু ডঃ লক্ষ্মী গোস্বামী তাঁর বাৎসরিক আমেরিকা ভ্রমণে গিয়ে ফিরে আসার সময় আমার জন্য উপহার হিসেবে এনেছিলেন টনি মরিসনের Beloved নামের উপন্যাসটি। টনি মরিসনের একমাত্র এই উপন্যাসটি ছাড়া তাঁর বিষয়ে আমার জ্ঞানের একমাত্র উৎস হল ওপরে উল্লেখ করা ' টাইম' ম্যাগাজিনের প্রবন্ধটি।

সেই প্রবন্ধটি পড়েই আমি জানতে পারলাম যে ১৯৬৪ সনে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথা তিনি মাঝে মাঝে চিন্তা করছিলেন। কিন্তু প্রধানত দুটি কারণে তিনি পুনর্বার বিবাহ করবেন না বলে ঠিক করলেন । প্রথম কারণটি ছিল তাঁর সন্তান দুটি । তাঁর জীবনে একজন নতুন মানুষ স্বামী হয়ে এলে সন্তান দুটির প্রতিক্রিয়া কী হবে তিনি সেই বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিলেন না। তার চেয়ে বড় কারনটা এই ছিল যে তিনি নিজের নিঃসঙ্গতা এবং স্বাধীনতার প্রেমে পড়েছিলেন।I did not want to give up the delight of not having to answer to another person.

কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে টনি মরিসনের একটি সরল এবং অকপট স্বীকারোক্তি। একবার কোনো সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন–' আপনার মতে স্বর্গের সংজ্ঞা কী? জীবনের কী ধরনের অবস্থায় আপনি স্বর্গ সুখ পাওয়া যেন অনুভব করেন ?'... আমার জন্য স্বর্গ হবে একনাগাড়ে নয় দিন কারও মুখ না দেখে কারোর সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে একা থাকার সুযোগ পাওয়া। সম্পূর্ণ একা। কারও প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব নেই, আমার ওপরে কারও কোনো দাবি নেই, আমার যখন যা ইচ্ছা করে তাই পাব... এর চেয়ে অধিক স্বর্গসুখ আর  কি আছে? একনাগাড়ে এভাবে চারদিন আমি এর আগেই পেয়েছি, কিন্তু নয়টি দিন কখনও পাইনি। আজ পর্যন্ত পাইনি।

ওপরে যদিও আমি বললাম যে টনি মরিসনের সংজ্ঞা আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে, কিন্তু তার সঙ্গে এই কথাটাও যোগ দেওয়া উচিৎ হবে মনে হয় যে এরকম একটি স্বর্গের জন্য আমাকে কিন্তু কখনও হা–হুতাশ করতে হয়নি। তার কারণ হল এই যে এইরকম একটি স্বর্গ আমি অনেক আগেই নিজের জন্য সৃষ্টি করে নিয়েছি। টনি মরিসন বলেছেন যে তিনি একনাগাড়ে চারদিন নিঃসঙ্গ এবং বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেছেন, কিন্তু সেই জীবনকে তিনি স্বর্গ বলে  মানতে চাননি । একনাগাড়ে এই ধরনের নয়টি  দিন পেলেই তিনি স্বর্গসুখ পাওয়া বলে অনুভব করবেন। আমি কিন্তু নিজের জীবন যাপনের এরকম একটি প্রণালী উদ্ভাবন করে নিয়েছি যে মাসের ত্রিশ  দিনের মধ্যে পঁচিশ দিনই বা দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তেইশ ঘণ্টাই আমি কেবল নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকি বা অধিক শুদ্ধ করে বলতে গেলে নিজের কাজকে নিয়েই বেঁচে থাকি । আর যেহেতু আমার সমস্ত কর্ম এবং চিন্তার কেন্দ্রে বিরাজ করছে মানুষ – সেই জন্য আমি কখনও নিজেকে মানব বিদ্বেষী নিঃসঙ্গতা বিলাসী মানুষ বলে ভাবি না। আমি মানুষের সঙ্গও খুব ভালোবাসি। মানুষের সঙ্গ আমি কতটা প্রাণভরে উপভোগ করি সে কথা আমাকে খুব কাছ থেকে দেখা প্রতিটি মানুষই জানে। কিন্তু তা বলে কৃত্রিম ভদ্রতার দাবিতে আমি আমার কাজের সময়টুকু কোনো মানুষকে আড্ডার জন্য দিতে রাজি নই । চিন্তাশীল পন্ডিত জেকব  ব্রনৌস্কি মানুষের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন যে মানুষ হল এক ধরনের সামাজিক নিঃসঙ্গ প্রাণী। মানুষের এই সংজ্ঞাটা আমার খুব ভালো লাগে। আমি সামাজিক নিঃসঙ্গ প্রাণী হওয়ার জন্য সব সময় চেষ্টা করে থাকি। আমার সমাজ লাগবেই, কিন্তু সেই সমাজের মধ্যেও আমার যখন ইচ্ছে যায় তখনই আমি হতে পারব নিঃসঙ্গ এবং বিচ্ছিন্ন । কেবল তখনই চিন্তা  করা এবং কাজ করাটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে ।

কিন্তু সমস্ত মানুষই আমার মতো ' অভদ্র', কঠোর এবং ভাগ্যবান নয়; হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ আমি আমার ঘনিষ্ঠ এবং বিশেষ স্নেহ ভাজন একজোড়া স্বামী-স্ত্রীর কথা বলি। সম্প্রতি গুয়াহাটির অনেক জায়গায় গড়ে ওঠা অ্যাপার্টমেন্ট কলোনিগুলির কোনো একটিতে তারা থাকে। দুজনেই চাকরিজীবী, মহিলাটি আবার ভালো লেখিকা। চাকরির জন্য দিনের আট ঘণ্টা সময় দেওয়া ছাড়াও লেখার জন্য তাকে দিনে কম করে তিন ঘন্টা সময় দিতে হয়। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য এই যে যে কলোনিতে তারা থাকে সেই কলোনির বেশিরভাগ বাসিন্দা হল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি অফিসার, কর্মচারী । চাকরি থেকে অবসর নেওয়া অসমিয়া মানুষ ঘরে ঘরে আড্ডা দেওয়া ছাড়া করার অন্য কোনো কাজ খুঁজে পায় না । তাদেরই আড্ডা প্রীতি  এবং অন‍্যের সুবিধা অসুবিধার প্রতি চরম উদাসীনতার বলি হয়েছেন এই প্রতিভাবান স্বামী স্ত্রী। লেখাপড়া করার জন্য সময় পাওয়া দূরের কথা, অনাহুত এবং অবাঞ্ছিত অতিথির উৎপাতে তারা ক্ষণিকের জন্য অবসর গ্রহণেরও সময় পায়না। সময় নেই,অসময় নেই,সবসময়ই অতিথির উৎপাত। সারাদিন  হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ঘরে পা রেখেছেন মাত্র আড্ডা দেবার জন্য ওত পেতে থাকা অতিথি  এসে হাজির। চাকরি করা সমস্ত দম্পতি অন্তত রবিবারের দিনটি  নিজেদের জন্য আলাদা করে পেতে চায়। ফ্রী একটিমাত্র দিনে কিছু ভালোমন্দ খেয়ে বিশ্রাম নিতে পারলে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি কঠোর পরিশ্রম করার জন্য দেহ আর মনে শক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের অসমিয়া সমাজের নিয়ম-কানুন অদ্ভুত । চাকরিজীবী দম্পতিকে রবিবারেও ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম না দিতে তাঁরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। রবিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অতিথি– যেন অন্যের জীবনের কাজ করার সময় এবং সুখ-শান্তি হরণ করা ছাড়া অসমিয়া মানুষের অন্য কোনো কাজ নেই। বোধহয় অসমিয়া মানুষের এই নিষ্ঠুর স্বভাবের কথা কোনো ভাবে জানতে পেরে জাঁ পল সাত্রে তার একটি রচনায় লিখেছিলেন–The hell is other people!

আমার মনে এরকম একটি ধারণা বদ্ধমূল হতে শুরু করেছে যে প্রভাবশালী অসমিয়ারাও নিজের প্রতিভার অনুপাতে কাজ করতে না পারার একটি প্রধান কারণ হল অনাহূত এবং অবাঞ্ছিত অতিথির উৎপাত এবং অন্যের সুবিধা অসুবিধার প্রতি চরম উদাসীনতা। 

---------



লেখক পরিচিতি- ১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।










শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা || হোমেন বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Basudeb Das

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস



চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে' উদয়ের পথে' নামে একটি বাংলা কথা ছবি খুব নাম করেছিল। যতদূর মনে পড়ে, ছবিটির কাহিনির লেখক ছিলেন জ্যোতির্ময় রায়। পরিচালকও তিনি ছিলেন। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রাধারমন ভট্টাচার্য এবং বিনীতা  রায়। আমি কিন্তু ছবিটা দেখতে পেলাম না, কারণ আমি শহরে পড়তে যাবার আগেই সিনেমাটা।সিনেমা হল থেকে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের মুখে ছবিটির খুব সুখ্যাতি শুনে বইটি জোগাড় করে পড়লাম।কাহিনিটার মূলকথাটুকুর বাইরে বাকি বেশিরভাগ কথাই এখন ভুলে গেছি; কিন্তু ভুলতে পারিনি উপন্যাসটিতে নায়িকার উদ্দেশে তার পিতা বলা এই কথাগুলি–'আমার ভালোবাসা চাইনা ,আমার চাই শ্রদ্ধা।'

নায়িকার পিতা প্রচন্ড অভিমানি ভালোবাসা চাই না বলে বললেন যদিও আমরা তার কথা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারিনা। মানসিকভাবে বিকৃত লোক ছাড়া এ ধরনের কোনো মানুষ থাকতেই পারে না যে কারও না কারও ভালোবাসা চায়না। কিন্তু মানুষের জীবনে জটিলতার অন্ত নেই। ভালোবাসার অভাব মানুষের হৃদয়ে একটা বিষম শূন্যতার সৃষ্টি করলেও কখনও কখনও মানুষকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মধ্যে ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে শ্রদ্ধাকে বেছে নিতে হয়। 'উদয়ের পথে'র পিতাও মেয়ের ভালোবাসা নিশ্চয় চেয়েছিল। কিন্তু শিল্পপতি পিতার শ্রমিক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ওঠা মেয়ে যখন তাকে বলে যে সে বাবাকে ভালোবাসে কিন্তু শ্রদ্ধা করেনা, তখন পিতাকেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে হল যে ভালোবাসার চেয়ে তিনি অনেক বেশি মূল্য দেন শ্রদ্ধাকে।

যে মানুষ ভালোবাসার সঙ্গে সমান পরিমাণে শ্রদ্ধাও লাভ করে তার চেয়ে ভাগ্যবান মানুষ আর কে আছে? কিন্তু সমস্ত মানুষের সেই সৌভাগ্য হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ভালোবাসা নির্ভর করে জৈবিক কারণ বা সম্পর্কের ওপরে। কিন্তু নিজের চেষ্টা বা সাধনা ছাড়া কেউ অন্যের শ্রদ্ধা পেতে পারে না। কিন্তু পিতা-মাতা-সন্তানকে বা সন্তান পিতা মাতাকে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়েই ভালোবাসে। পিতা-মাতা  সন্তানের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাদের আদর্শ চরিত্রের মানুষ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সন্তান চরিত্রহীন পিতা-মাতাকে বা পিতা মাতা অবাধ্য এবং উচ্ছৃঙ্খল সন্তানকে অন্তর থেকেই ঘৃণা করে, কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা মমতার বন্ধন সেই ঘৃণা ছিন্ন করতে পারেনা। সংসারে এই ধরনের পত্নীর সংখ্যা খুব কম হবেনা– যারা নিজের স্বামীর প্রতি সংস্কার বা লিবিডোর এর বশবর্তী হয়ে কম বেশি পরিমাণে প্রেম অনুভব করে; কিন্তু একেবারেই শ্রদ্ধা অনুভব করে না। বহু বছর আগে নবাব সিরাজদৌলার বিষয়ে লেখা একটি জীবনী মূলক প্রবন্ধে পড়েছিলাম যে নবাব ছিলেন অত্যন্ত লম্পট এবং চরিত্রহীন; কিন্তু তবুও তিনি তাঁর পত্নীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। প্রবন্ধের লেখক এই বলেও মন্তব্য করেছেন যে নারী চরিত্রের এটি একটি দুর্বোধ্য রহস্যঃ অনেক সময় তারা অপাত্রে উজাড় করে দেয়  অন্তহীন প্রেম। কথাটির সরল অর্থ এটাই হয় যে নারীর প্রেম পাওয়ার জন্য পুরুষের বিশেষ কোনো সাধনা না করলেও হয়; প্রকৃতি তাকে যে বিশেষরূপে সাজিয়েছে তাই কোনো এক বিশেষ নারীকে তার প্রতি আকৃষ্ট করবে। কিন্তু সেই নারীর চোখে নিজেকে শ্রদ্ধার যোগ্য করে তুলতে হলে তার নিজের দিক থেকে কিছু চেষ্টার দরকার হবে। অনেক বিবাহিত জীবনে প্রেমও নেই শ্রদ্ধাও নেই । সেই ধরনের দম্পতি নিশ্চয় চরম দুর্ভাগা। অনেক বিবাহিত জীবনে প্রেম এবং শ্রদ্ধার যেকোনো একটি আছে, দুটি নেই। তাদের জীবনে চিরকাল একটা শূন্যতা থেকে যায়। সেটাই একমাত্র পরিপূর্ণ সুখী বিবাহিত জীবন– যেখানে স্বামী এবং পত্নী পরস্পরের প্রতি তীব্র প্রেমের সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধাও অনুভব করে। কিন্তু তাদের জীবনেও কখনও এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে কি–যে পরিস্থিতিতে' উদয়ের পথে'র পিতা-কন্যার উদ্দেশ্যে বলার মতো তারাও পরস্পরের উদ্দেশ্যে বলতে বাধ্য হয়– 

'প্রেম না হলেও আমার চলবে, প্রেমের চেয়েও আমি  বেশি করে চাই শ্রদ্ধা।'

যে কোনো দম্পতির জীবনে এরকম সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। সেই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব তাদের কাছে ছেড়ে দিয়ে আমরা সমাজের অন্য একটি ক্ষেত্রে আসি । একটু গভীরভাবে ভাবলেই  দেখা যাবে যে মানুষ শ্রদ্ধার চেয়ে ভালোবাসাকে বেশি মূল্য দিতে গেলেই জীবনের বা সমাজের ক্ষতি করতে পারা নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। পিতা যদি সৎ বা অসৎ যে কোনো উপায়ে বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করে সন্তানের সমস্ত আবদার পূরণ করে তাহলে সন্তান সেরকম পিতাকে  নিশ্চয় ভালোবাসে ।

কিন্তু সন্তানের চরিত্র গঠনের জন্য তার কিছু আবদার অপূরণ হয়ে থাকা উচিত নয় কি? পিতা-মাতা যদি  সন্তানের ভালোবাসার চেয়ে  শ্রদ্ধাকে বেশি মূল্য দিতে শেখে, অর্থাৎ তারা সন্তানের চোখে  নিজেকে শ্রদ্ধার যোগ্য করে তোলার জন্য কিছু নৈতিক গুণ আয়ত্ত করে তাহলে তার ফলে সন্তানের যত  মঙ্গল হবে ততখানি মঙ্গল সন্তানকে ধনসম্পত্তি দিয়ে পুঁতে ফেললেও হবে না। অন্যের ভালবাসা পাওয়ার জন্য অনেক সময় নিজে কিছু দুর্বল হওয়ার প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ পিতা-মাতা স্নেহাধিক‍্যের বশবর্তি হয়ে অনেক সময় সন্তানকে খারাপ বা ক্ষতিকারক কাজে বাধা দেয় না– যদি সন্তান দুঃখ পায় বা তাদের খারাপ পায় এই ভেবে! কিন্তু অন্যের শ্রদ্ধা পাবার জন্য অনেক সময় কঠোর হওয়ার প্রয়োজন হয়। মানুষের মঙ্গলের জন্য কখনও  অপ্রিয় কথা বলে তাদের বিরাগভাজন হতে হয়। অন্যের ভালোর জন্য যে মানুষ প্রয়োজনের সময় কঠোর হতে পারে তাকে হয়তো মানুষ ভালোবাসে না কিন্তু প্রত্যেকেই তাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করে। যে সমস্ত মানুষ ভালোবাসার চেয়ে শ্রদ্ধাকে সবথেকে বেশি মূল্য দেয় তারাই সমাজের প্রকৃত মঙ্গল সাধন করে। শ্রদ্ধাকে বিন্দুমাত্র মূল্য দিতে না চাওয়া মানুষ কীভাবে সমাজের সর্বনাশ করতে পারে সে কথা আজকের অসমে আমরা প্রত্যেকেই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। 


--------------



লেখক পরিচিতি- ১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি ংপকাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।









রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১

কথা–বার্তা || হোমেন বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudeb Das

 কথা–বার্তা

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস




আমি 'আজকাল' এর সাংবাদিক হয়ে থাকা সময়ের কথা। বছরে কয়েকবার বরাক উপত্যকায় গিয়ে থাকতে হত বলে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিজন লেখক এবং সাংবাদিকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে রকমই একজন লেখক বন্ধু একদিন শিলচরে আমাকে বললেন–' হোমেনদা, আপনাদের অসমিয়া লেখকরা অতি অদ্ভুত মানুষ। সেরকম মানুষ আমি ভারতের অন্য কোনো জায়গায় দেখিনি। আপনার সঙ্গে অবশ্য আমার কেবল শিলচরেই দেখা হয়েছে,আর এখানে দেখা পাওয়া অবস্থায় আপনাকে স্বাভাবিক মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু গুয়াহাটিতে ফিরে গিয়ে আপনিই বা কী মূর্তি ধারণ করেন সে কথা আমি জানি না।'

আমি বন্ধুটির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকানোয় তিনি ব্যাখ্যা করতে আরম্ভ করলেন–' বছরে তিন চার বার আমি গুয়াহাটিতে যাই। সেখানে থাকা সময়টুকুতে বিখ্যাত অসমিয়া লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছা করে– ঠিক কলকাতায় গেলে যেভাবে ইচ্ছা করে বিখ্যাত বাঙালি লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে। বাঙালি লেখকদের সঙ্গে দেখা করাটা খুবই সহজ। যার কাছেই যাই,তিনিই আদর-যত্ন করে বসতে দেন,আন্তরিক ভাবে কথা বলেন,বিদায় নেবার সময় অন্তত ভদ্রতার খাতিরে পুনরায় আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু অসমিয়া লেখকদের আচরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। দেখা করার উদ্দেশ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে  যখন তাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি,তখন তাদের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারি যে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে তারা বিরক্ত হচ্ছেন,তাদের নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বরই তাদের বিরক্তি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে দেয়।অনেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে দর্শনার্থীকে দর্শন দিতে অস্বীকার করেন। ভদ্রতার খাতিরে কেউ বাড়িতে ডাকলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলে কোনো সুখ পাওয়া যায় না; মিনিট কয়েক কথা বলার পরে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে হিম-শীতল ভদ্রতা ছাড়া অভ্যাগতকে দেবার তাঁর অন্য কিছু নেই।তাঁর কাছে দ্বিতীয় বার না আসার জন্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতে হয়। মোটের উপর আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে এরকম একটি ধারণা হয়েছে যে অসমিয়া লেখকরা অন্যের সঙ্গে গলাগলি করতে খুব একটা বেশি ভালোবাসে না; নিজের কাজ এবং নিজের পরিবারের মধ্যে তাঁরা নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। এখন আপনি আমাকে বলুন– আমার ধারনাটা শুদ্ধ না ভুল?

এর আগে আমি কখনও এরকম একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি, তাই আমি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুটির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। কিন্তু মনে মনে আমি স্বগতোক্তি করলাম–' অন্য অসমিয়া লেখকের কথা আমি বলতে পারিনা কিন্তু গুয়াহাটিতে আমার সঙ্গে দেখা হলে তোমাকে যে এরকম একটি ধারণা নিয়েই আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে হত সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।' কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমি শিলচরের বাঙালি বন্ধুটিকে বললাম–' মানুষ নিজের মুখটা নিজে দেখতে পায় না,নিজের মুখটার বিষয়ে একটা ধারণা করার জন্য মানুষকে আয়নায় নিজের মুখের প্রতিবিম্ব  দেখতে হয়। ঠিক সেভাবে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ জানার জন্য অনেক সময় অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে হয়। অসমিয়া লেখকদের বিষয়ে আপনি এইমাত্র যে কথাটা আমাকে বললেন সেই কথাটা এর আগে আমার মনে কখনও আসেনি। কিন্তু আপনার কথা শোনার পরে আমি এখন অনুভব করছি যে আপনার কথায় কিছুটা হলেও সত্যতা থাকতে পারে। প্রত্যেক জাতির মানুষের কিছু স্বকীয় জাতিগত বৈশিষ্ট্য থাকে। উদাহরণস্বরূপ ইংরেজদের গোমড়া স্বভাবের মানুষ বলে বলা হয়। তারা উপযাচক হয়ে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে না, আর অন্যরা তাদের সঙ্গে উপযাচক হয়ে কথা বলতে চাইলেও তাঁরা একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আমি অবশ্যই একথা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি না, বই পড়ে এবং অন্যের মুখ থেকে শুনে বলছি। ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক মন্টেস্কুর মতে ইংরেজরা সবসময়ই এত ব্যস্ত হয়ে থাকে যে ভদ্র বা মার্জিত হওয়ার  জন্য তারা সময় পায়না। বাঙালিদের স্বভাব এর ঠিক বিপরীত। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বেশি সময় মুখ বন্ধ করে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কথা বলতে না চাওয়া  মানুষকেও উপযাচক হয়ে কথা বলে কিছুক্ষণের মধ্যে আপন করে নেওয়ায়  তারা ওস্তাদ। বাঙালিরা যে অসমিয়াদের তুলনায় অনেক বেশি কথা বলতে ভালোবাসে, সঙ্গপ্রিয় এবং উচ্ছ্বাসপ্রবণ সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আড্ডা বাঙ্গালীদের সৃষ্টি। দেখে দেখে অসমিয়ারা আড্ডা দিতে মাঝে মাঝে চেষ্টা করলেও অল্পভাষী এবং উচ্ছ্বাসরহিত অসমিয়াদের স্বভাবের সঙ্গে আড্ডা নামের জিনিসটা খাপ খায় না। কলকাতার কফি হাউস জাতীয় প্রতিষ্ঠান যে অসমে দেড়শ দুশো বছরের পরেও হয়ে উঠতে পারল না তার প্রধান কারণ এটা নয় যে গুয়াহাটিতে উপযুক্ত জায়গা বা পরিবেশের অভাব।... অসমিয়া মানুষদের বিষয়ে আপনার ধারনাটাই বোধহয় শুদ্ধ; পৃথিবীর বহু জাতির মানুষদের চেয়ে  অসমিয়ারা কথা কম বলে, উচ্ছ্বাস বা  আবেগ কম করে প্রকাশ করে, আর পারতপক্ষে অন্যদের থেকে,একটা নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করে চলে।'

কোনো মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জানিয়ে আমাকে ফোন করলেই  পনেরো বছর আগে শিলচরের বাঙালি বন্ধুর সঙ্গে হওয়া ওপরের কথাগুলি আমার মনে পড়ে যায়। আমি নিজে একথা জানি যে আমার আত‍্যন্তিক  নিঃসঙ্গতা প্রীতি এবং নীরবতা প্রীতি প্রায় মনোবিকারের  পর্যায়ে পড়ে। সমস্ত অসমিয়া মানুষই আমার মতো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে সমস্ত অসমিয়া নন এমন মানুষের সঙ্গে আমি দেখা করতে না চেয়ে ঘুরিয়ে পাঠাই তাদের কেউ কেউ কেবল আমার আচরণের ওপর ভিত্তি করে সাধারণভাবে অসমিয়া মানুষ সম্পর্কে ভুল ধারণা করাটা অসম্ভব নয়।কিন্তু আমার নীরবতা প্রীতির অর্থ এটা নয় যে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে মোটেই  ভালোবাসি না। সবসময় না হলেও মাঝে মধ্যে মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি ব্যাকুলতা অনুভব করি। আমি কি ধরনের কথাবার্তা বেশি পছন্দ করি তার তিনটি নমুনা নিচে দেওয়া হল।

বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর Portraits From Memory নামের গ্রন্থে জোসেফ কনরাড সম্পর্কীয় প্রবন্ধটিতে লিখেছেন–' জোসেফ কনরাডের সঙ্গে  আমার প্রথমবার দেখা হতেই আমরা দুজন এভাবে কথা বলতে শুরু করলাম যে কথা বলার সময়ই আমাদের দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বেড়ে যেতে লাগল। ভাসা-ভাসা অর্থহীন কথার স্তরের পর স্তর অতিক্রম করে আমরা অবশেষে উপনীত হলাম কেন্দ্রস্থ অগ্নিকুন্ডে।এই ধরনের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আগে কখনও হয়নি। এরকম একটি জায়গায় একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমরা আধা আতঙ্কিত এবং আধা রোমাঞ্চিত হলাম এবং পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই সময়ে আমরা যে ধরনের আবেগ অনুভব করেছিলাম,তা ছিল তীব্র প্রেমের মত নিবিড় এবং একই সঙ্গে সর্বগ্রাসী। হতবুদ্ধি হয়ে আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিলাম এবং জীবনের প্রাত্যহিক সাধারণ কথাগুলির মধ্যে আমি পথ খুঁজে পেলাম না।

দ্বিতীয় নমুনাটি দিতে চাইছি পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা থেকে । অবশ্য এই সত্য কাহিনিটি আমার একটি পূর্ব প্রকাশিত প্রবন্ধে(নৈরাশ্য, নৈঃসঙ্গ এবং যন্ত্রনা) ইতিমধ্যে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য বিষয়ের প্রয়োজনে একই কাহিনিকে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করতে চাইছি।

পেড্রো গার্ফিয়াস স্পেন দেশের কবি। নেরুদার বন্ধু। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে তিনি স্বদেশ থেকে পালিয়ে এসে  স্কটল্যান্ডে একজন লর্ডের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কাছেই ছিল একটি মদের দোকান।গার্ফিয়াস প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মদের দোকানে যাওয়ার অভ্যাস করলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ইংরেজি ভাষার ই- অক্ষরটিও জানেন না, তাই নীরব হয়ে বসে সম্পূর্ণ একা মদ খেয়ে থাকা ছাড়ার বাইরে তার অন্য কিছু করার উপায় ছিল না।গার্ফিয়াসের প্রতি দয়া পরবশ হয় একদিন মদের দোকানের স্কটিশ মালিক তার সঙ্গে মদ খাবার জন্য গার্ফিয়াসকে নিমন্ত্রণ করলেন। দুজনেই উনুনের পাশে বসে অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু তাদের কেউ কারও ভাষা জানেন না বা বুঝতে পারেন না, তাই দপদপ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পটপট শব্দ ছাড়া দুজন মানুষের মধ্যে সেই বিশাল নীরবতা ভাঙ্গার অন্য কোনো শব্দই ছিল না। কিন্তু একে অপরের ভাষা জানেন না বলেই কতক্ষন আর এভাবে চুপচাপ মদ খাওয়া যায়? কয়েকদিন পরে দুজনই মুখ খুলতে লাগলেন।

কেউ কারও কথা বুঝতে পারেন না। কিন্তু রাতের পর রাত দুজন পরস্পরের উদ্দেশ্যে অনর্গল কথা বলে যায়। দুজনেই পরস্পরের কথা শুনে থাকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে। প্রত্যেকেই নিজের কথা বলে অন্যে বুঝতে না পারা ভাষায়। অথচ দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের আত্মীয়তা নিবিড়তা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠতে থাকে। অবশেষে অবস্থা এমন হল যে প্রতি রাতে একে অপরের সঙ্গে দেখা না হলে আর কথা না বললে কেউ থাকতে পারেন না।

লোভনীয় কথাবার্তার তৃতীয় নমুনাটি নেওয়া হয়েছে ওয়র্ডসওয়ার্থের জীবন থেকে। ওয়র্ডসওয়র্থ  এবং কোলরিজ দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। দুজনেই যুক্তভাবে প্রকাশ করা 'Lyrical Ballads' নামের কাব্যগ্রন্থ ইংরেজি সাহিত্যে যুগান্তর এনেছিল। অবশ্য দুজনের স্বভাবের খুব বেশি মিলছিল  না। কোলরিজ  ছিলেন কথাবার্তায় অত্যন্ত চৌকশ,কথা বলতে পেলে তিনি সবকিছু ভুলে যেতেন। অন্যদিকে,ওয়র্ডসওয়র্থ ছিলেন মাপজোক করে কথা বলা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ।

একদিন ওয়র্ডসওয়র্থ কোলরিজের বাড়িতে বেড়াতে এলেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে তিনি এক জায়গায় বসলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার মতো সময় তিনি  সম্পূর্ণ নীরব হয়ে বসে রইলেন।ওয়র্ডসওয়র্থের স্বভাব ভালো করেই জানতেন বলেই কোলরিজের মুখ থেকে একটি শব্দও বের হল না। বিদায় নেবার সময় ওয়র্ডসওয়র্থ বললেন–' আজ সন্ধ্যা বেলাটা খুব ভালোভাবে কাটল। একটি অপূর্ব সুন্দর সন্ধ্যা।'

একেই বলে কথা বলা। মাঝেমধ্যে আমারও খুব ইচ্ছা করে এভাবে কথা বলতে।


------------










Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...