Bideha Nandini লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Bideha Nandini লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

বিদেহ নন্দিনী~ ৪২ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস , Bideha Nandini 42

 বিদেহ নন্দিনী~ ৪২ ( অন্তিম পর্ব )

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


 (৪২)

এই কয়েকদিন আমি যেখানেই বসেছি সেখানেই বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। লব কুশের রাজসভায় অপমান হবে বলে চিন্তায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। অবশ্য ঋষি বাল্মীকির তত্ত্বাবধানে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ  থাকবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। পুরোনো কথাগুলি রোমন্থন করে থাকার সময় হঠাৎ আত্রেয়ী  এসে উপস্থিত হল । আনন্দে চোখের জল ঝরিয়ে আত্রেয়ী বলল-‘ সীতা,আমি বলেছিলাম না রামচন্দ্র তোমার দুই পুত্রকে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই পুত্রদ্বয়ের জননীর খোঁজে আসবে দেখ।’ আমার কথা কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে । রাজা রামচন্দ্র আশ্রমে দূত পাঠিয়েছে। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত খবর নিয়েছি। তুমি অযথা চিন্তা করছিলে তোমার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছে বলে ভেবে। যজ্ঞের জন্য আবশ্যক পত্নীর স্থান পেয়েছে একটি সুবর্ণ সীতার মূর্তি। সুবর্ণ সীতার মূর্তি পাশে বসিয়ে রেখে রাঘবের যজ্ঞ  সম্পন্ন করার কথা জানতে পেরে আমার মন ছটফট করতে লাগল। অনুশোচনায় মনটা ভরে উঠল। মুহুর্তের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। দীর্ঘ বারো  বছর পরে মনের মধ্যে স্বামীকে স্মরণ করলাম। তাঁর চেহারা মনে করতে চেষ্টা করলাম। মনে হল তিনি যেন আগের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছেন। পরের মুহূর্তে আমার নিজের চেহারার কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। গত বারো বছরে আমার সৌন্দর্য সম্পূর্ন ম্লান হয়ে পড়েছে। আমার শরীরের উপরে দুঃখ-কষ্ট দরিদ্রতা ছাপ ফেলে গেছে। বর্তমানে আমার দেহ একেবারে শীর্ণ। তাই মনের মধ্যে ভয় হল কে জানে আমাকে দেখার পরে রাঘবের আমার প্রতি আগ্রহ যদি কমে যায়? আমি ভয়ে আত্রেয়ীকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম-‘ হে মাতা আমাকে সত্য কথা বল, আমি দেখতে কুরূপা হয়ে পড়েছি নাকি? স্বামী আমাকে চিনতে পারবে তো? আত্রেয়ী  আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-‘ কেন চিনতে পারবে না নিজের মনের মানুষকে? আমি তোমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে পাঠাব।

আত্রেয়ীর কথা শুনে আমার চটকরে লঙ্কা বিজয়ের পরে রঘুনন্দন আমার প্রতি করা ব্যবহারের কথা মনে পড়ল। নিমেষের মধ্যে আমি ম্লান হয়ে গেলাম। রামচন্দ্রের জীবনে ফিরে যাবার আগ্রহ নাই হয়ে গেল।পরে আত্রেয়ীর উৎসাহজনক কথা শুনে আমি মনকে পুনরায় সবল করতে চেষ্টা করলাম।

আত্রেয়ী এবং আশ্রমের অন্য মহিলারা আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রথের কাছে এগিয়ে নিয়ে এল। সেই সময় আমার মনের মধ্যে বিভিন্নভাবের আলোড়ন চলছিল। দুঃখ-কষ্ট, অভিমান, আনন্দ এবং দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি আমাকে আবেগিক করে তুলেছিল। আত্রেয়ীকে মুখ্য করে আশ্রমের প্রতিটি মানুষের চোখের জল ফেলার কারণ হয়ে আমি বিদায় নিলাম। সুসজ্জিত রথের উপরে রঘুবংশের ধ্বজা দেখে আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠল। সারথি সম্মান প্রদর্শন করে রথের দরজা খুলে দিলেন।সারথি হিসেবে  সুমন্ত্র এসেছিল। দীর্ঘ বারো বছর পরে সুমন্ত্রকে দেখে আমি আবেগিক হয়ে পড়েছিলাম। তবুও শোক সম্বরণ  করে সারথিকে কুশল বার্তা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি যথাযথ উত্তর দিলেন। অযোধ্যার বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হল না। রাঘবের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল যদিও সাহস করলাম না। তাই মৌন হয়ে রইলাম। মনটা ছটফট করতে থাকায় একবার সুমন্ত্রকে রাঘবের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে সারথি বলল মহর্ষি বাল্মীকি আপনাকে যজ্ঞস্থলে নিমন্ত্রণ করার জন্য রামচন্দ্রকে অনুরোধ করেছেন যাতে তাঁর জীবিত কালে আপনারও একটা গতি হয়। রামচন্দ্র বাল্মীকির অনুরোধ রক্ষা করে আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য এই রথ পাঠিয়েছেন।’

এইরকম একটা কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে আমার রথের উপর থেকে লাফ দিতে ইচ্ছে করছিল। কোনোমতে ধৈর্য ধরে থাকতে চেষ্টা করলাম যদিও আমার শরীর কাঁপতে লাগল। মাথাটা যেন ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণ এভাবে যাবার পরে আমার শরীর ঘামতে শুরু করল।  তখন মাথাটা কিছুটা হালকা  বলে অনুভব হল। সম্পূর্ণ সুস্থ বলে মনে হওয়ায়  ভাবলাম সুমন্ত্রকে আমার মনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লাভ নেই। এসেছি যখন গন্তব্য স্থানে নামতেই হবে।

তারপরে নিজের মনটাকে নিজেই এভাবে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করলাম-‘ রামচন্দ্রের বিনা অনুমতিতে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য রথ পাঠানোর কারও সাধ্য নেই।  স্বয়ং মাতা  কৌশল্যারও।  বোধ হয় রঘুনন্দন  নিজের মুখে নিমন্ত্রণ করতে লজ্জাবোধ করে  ঋষি বাল্মীকির অজুহাত নিয়ে  বাঁকা পথ অবলম্বন করেছে।  তার মধ্যে রাঘব প্রজাদের গুরুত্ব দেওয়া পুরুষ।  একবার নির্বাসন দেওয়া পরিবারকে  পুনরায় উপযাচক হয়ে নিমন্ত্রণ করলে  তাদের সামনে মান-সম্মান রাখা মুশকিল হবে বলেই হয়তো তিনি বাল্মীকির মাধ্যমে আমাকে ডেকেছেন।  এভাবে ভেবে আমি মনটাকে  প্রবোধ দিয়ে পুনরায়  আমার ছেড়ে যাওয়া দিনগুলির মধুর স্মৃতিগুলি রোমন্থন করে দেখতে চাইলাম। যাতে আমার মনে এবং অন্তরে তার প্রতি থাকা  ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা ,ভক্তি যেন ফিরে আসে।  

কথাগুলি ভেবে থাকার সময় কখন যে নৈমিষ  যজ্ঞক্ষেত্রে  পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। রথের ভেতর থেকে  সমগ্র যজ্ঞক্ষেত্রটাকে একবার ভালো করে দেখে নিলাম। লোকে লোকারণ্য। সারথি বলল-‘ সবাই আপনার আত্মশুদ্ধি ও সতীত্ব শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখার জন্য সমবেত হয়েছে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম আত্মশুদ্ধি? সতীত্বের শপথ? আমার দেহে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে বলে অনুভব হল। রথ থেকে নামব কিনা মনে মনে চিন্তা করলাম। তবে নামতে তো হবেই। না হলে কোথায় যাব? মনের শক্তি সংগ্রহ করে বললাম-‘ এসেছি যখন আরও একবার অপমানিত হতে হবে।’

আমি রথ থেকে নেমে একেবারে যজ্ঞক্ষেত্রের দিকে তাকালাম। বৃহৎ ক্ষেত্রটার ডান দিকের মাঝখানে বসেছে ব্রাহ্মণরা। পাশে একটি উচ্চ আসনে বসেছেন রাজা রামচন্দ্র। দূর থেকে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার পাশে নিচের আসনগুলিতে সারি পেতে বসেছে ভরত, লক্ষণ এবং শত্রুঘ্ন।  তাদের বাঁদিকে শাশুড়িরা এবং জা ও অন্যান্যরা। প্রত্যেকের দৃষ্টি আমার উপরে। আমি মাথা নিচু করে রইলাম। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ঋষি বাল্মীকি রথের কাছে এগিয়ে এলেন। আমি ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে যন্ত্রমানবের মতো ঋষির পেছন পেছন যেতে লাগলাম। ইতিমধ্যে সম্ভবত জনগণের মধ্যে যথেষ্ট কোলাহলের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জনের কথাবার্তার টুকরো আমার কানে এসে পড়ছে। দুই-একজন উচ্চস্বরে রামকে প্রশংসা করছে আমার আত্মশুদ্ধি  এবং সতীত্ব শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করার জন্য। সভাস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাল্মীকি আমার হাত ধরে রামচন্দ্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন-‘ হে রাজন এই যে তোমার পত্নী জানকী যাকে তুমি আজ থেকে বারো বছর আগে লোক অপবাদের ভয়ে অরণ্যে নির্বাসন দিয়েছিলে। কপাল ভালো ছিল যে সেই অরণ্যের কাছে আমার আশ্রম ছিল। সুদীর্ঘ বারো বছর বৈদেহী আমার তত্ত্বাবধানে। গত বারো বছর আমি তাকে প্রত্যক্ষ করে এসেছি। শুদ্ধরূপে শুদ্ধাচারী জীবনযাপন করে কাটিয়েছে কোশল বধূ জানকী। আমি তাকে কন্যার মতোই দেখে এসেছি। বর্তমানে তোমার কথামতো জানকীকে তোমার সামনে উপস্থিত করলাম।’ 

স্বামী রামচন্দ্র বোধ হয় আমার সাধারন বস্ত্র, অলংকার বিহীন দেহ, শীর্ণ শরীরের গঠন দেখে অবাক হয়েছিল। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন আমি সেই একই রূপসী সীতা হয়ে আছি। তিনি হয়তো অনুভব করছেন আমার এই চেহারা রাজপরিবারের সঙ্গে খাপ খাবে না। বিয়ের পরে আগেও আমি অনেকবার অনুভব করেছিলাম যে রাঘব আমার বাহ্যিক রূপটাকে বেশি গুরুত্ব দান করে । আমার মন এবং অন্তরকে নয়। আমার এই শীর্ণকায় অবস্থার জন্য প্রকৃতপক্ষে রাঘবই যে দোষী  একথা উপলদ্ধি করার মতো এই জগতের প্রভুর ততটুকু জ্ঞান আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। আমি ভিখারির বেশে হাজার হাজার লোকের সামনে প্রবেশ করায় তার হয়তো আত্মসম্মানে আঘাত লাগল। তাই সুমন্ত্রকে বললেন-‘ একে স্নান করিয়ে নববস্ত্র এবং অলংকার পরিয়ে এখানে নিয়ে আসা উচিত ছিল। আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম বলেই  দ্বিতীয়বার বিবাহের কথা একবারও ভাবিনি। আচ্ছা এখন জানকী শুদ্ধাচারী এবং সতীত্বের শপথ নিক। তারপর রাঘব ঋষির দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ হে মহর্ষি বাল্মীকি আমি আপনার কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করছি। তবুও লোক অপবাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সীতা পবিত্রতা এবং সতীত্বের শপথ গ্রহণ করুক।’ 

তার কথা শুনে আমার সমস্ত দেহের রক্ত যেন এক জায়গায় জমাট বেঁধে গেছে বলে মনে হল। আমি মাথার ঘোমটা খসিয়ে রামচন্দ্রের দিকে তাকালাম। আমার চোখে চোখ পড়ল। তিনি হয়তো আমার মুখে আগের লজ্জা লজ্জা ভাব, কমনীয়তা, কোমলতার পরিবর্তে দেখতে পেলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো শক্তি থাকা একটি মুখ। মুখে দৃঢ়তার ছাপ। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে তার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। ভাবলাম কথা না বাড়িয়ে আমি আমার ব্যবহারেই দেখিয়ে দেব যে আমি সেই আগের লজ্জাবতী সীতা নই। আমি তাকে নির্বাসনে দিয়েছি অন্তর থেকে। তিনি বুঝুন যে তার করা কার্যাবলীর প্রতিবাদ করার জন্য বর্তমানে আমার যথেষ্ট সাহস আছে। 

হঠাৎ আমার পিতৃসম  মহর্ষি বাল্মীকির কথা মনে পড়ল। তিনি হয়তো আমার এই ধরনের আচরণ দেখে অপ্রস্তুত হয়েছেন। অবশ্য গত বারো বছরে তিনি আমাকে দেখে শুনে ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছিলেন যে স্বামীর দ্বারা বারবার নির্যাতিতা হয়ে আমি একজন অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি। সে কথা তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন-‘হে জানকী, তোমাকে আমি পতি এবং দেবরের সঙ্গে বনবাসে কাটানোর সময় প্রথম দেখেছিলাম। সেই জানকী ছিল স্বামীর অবিহনে এক পাও চলতে না পারা, পতিবিনে  জগৎ অন্ধকার বলে ভাবা, ভালোবাসা,স্নেহ, দয়া, করুণায় ভরা দেবী। কিন্তু বর্তমানে আমি যে জানকীকে  দেখছি সে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে দুঃখ-কষ্ট আঘাতে কর্কশ হয়ে পড়া একজন মানুষ, যে একাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস করে।’ 

আমার বর্তমান প্রকৃতি ঋষি ভালোভাবেই জানেন বলে হয়তো কিছু না বলা কথা তিনি রাঘবকে  বললেন-‘ হে রাজন, আমি জীবনে  যতটুকু পূণ্য অর্জন করেছি, তার নামে শপথ করে বলছি বৈদেহী  কলুষহীন, নিষ্পাপ এবং নির্মল। লব কুশ তোমার ঔরসজাত পুত্র। তুমি বিনা দ্বিধায় সীতাকে  গ্রহণ কর। তাহলে তোমার এবং দেশের মঙ্গল হবে।’

বাল্মীকির কথা শুনে সমগ্র যজ্ঞক্ষেত্র নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই রাজা কী বলেন কী করেন তা দেখার জন্য বা শোনার জন্য আগ্রহে চেয়ে রইল। কিন্তু রাঘব নীরব । বোধহয় সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হচ্ছে। কারণ তিনি সবসময় প্রজার চিন্তাচর্চায় চলা পুরুষ। নিজস্বতা বলতে কোনো জিনিস নেই বলে মনে হয়। সব সময় প্রজারা তার জয়গান এবং গুনকীর্তন করাটাই চান। বোধহয় সেই জন্যই তিনি কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। রামচন্দ্রের মনের ভাব ঋষিবুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুনরায় বললেন-‘ তুমি সীতাকে নিষ্কলুষ জেনেও লোক অপবাদের ভয়ে নির্বাসন দিয়েছিলে। আজ আমি এই জনসমুদ্রের সামনে তোমাকে আবার বলছি সীতা একেবারেই পবিত্র, শুদ্ধাচারী। তবু যদি তোমার সন্দেহ হয় তাহলে  সীতা শুদ্ধতার শপথ নেবে।

ঋষির বাক্য শুনে আমি শিউরে উঠলাম। আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে সতী প্রমাণ করে রাজরানি করাতে চাইছেন। আমার জীবনের দুঃখের সমাধান  করতে চাইছেন ।ঋষি ইতিমধ্যে লব কুশকে পিতার দ্বারা  গ্রহণ করানোর কাজে সফল হয়েছেন। তিনি হয়তো তাই ভাবছেন আমাকে রামচন্দ্রের হাতে অর্পণ করে তিনি নিশ্চিত হবেন এবং শান্তিতে চোখ বুঝতে পারবেন। এদিকে বাল্মীকির কথায় জগতের প্রভু যেন কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলেন বলে মনে হল। তিনি সবাইকে শুনিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন-' হে মহর্ষি, আপনার কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য। তবু লোকঅপবাদ  মোচন করার জন্য সীতা সতীত্বের শপথ গ্রহণ করুক। তার এই কার্য নারী জাতিকে শীর্ষস্থানে উপনীত করার সঙ্গে সীতা নিজে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।' 

রাঘবের চালাকি করে বলা কথাগুলি শুনে আমার ক্রোধে কানদুটি গরম হল। মনে মনে  গুমড়ে থাকা কথাগুলি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হল। কিন্তু পিতৃ সম বাল্মীকির  কথা চিন্তা করে ধৈর্য ধরে রইলাম। তারপরে চারপাশে আমার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। দেখলাম শাশুড়ি কৌশল্যা যেন অস্বস্তি বোধ করছেন। লক্ষ্মণ বসা অবস্থায় ছটফট করছে । শত্রুঘ্ন এবং ভরত কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছে বলে মনে হল। উর্মিলা মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছে। হয়তো রাজা রামচন্দ্র ঘোষণা করা কথাটা রাজ পরিবারের কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। আমি ভালোভাবে জানি রাজপরিবার রাঘবের সব কথা সমর্থন না করতে পারে তা বলে কোনো একজন প্রতিবাদ ও করবে না। এমনকি মাতা কৌশল্যাও। আমাকে নির্বাসন দেওয়ার ক্ষেত্রে মাতা কৌশল্যার স্থিতি বড় রহস্যজনক। আমার নির্বাসন হয়ে যাবার পরে বাল্মীকির আশ্রমে আমি প্রতিদিনই ভাবতাম শাশুড়ি কৌশল্যা নিশ্চয় আমার কাছে আসবে। তার মধ্যে সেই সময় আমি গর্ভবতী ছিলাম। তার পুত্রের বীজ আমার গর্ভে সন্তান রূপে  আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আমি যেন সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারি তার জন্য শাশুড়ি কৌশল্যার আমার প্রতি যত্ন ছিল  অসীম ।আমাকে যেদিন নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল সেদিন শাশুড়ি বাড়িতে ছিলেন না। তাই আমি বাল্মীকির আশ্রমে প্রতিদিনই তিনি আমাকে  একবার দেখতে যাবেন  বলে আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম রাঘবকে তিরস্কার করে আমাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে অথবা তিনি নিজেই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমার কাছে চলে আসবেন বলে ভয় দেখাবেন। কিন্তু আমি ভাবার মতো কিছুই হল না। লব কুশ জন্ম হওয়ার পরে পর্যন্ত এই নারীকে স্নেহশীলা জননী বলে ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম অনেক পুণ্য করলেই এই ধরনের একজন নারীকে শাশুড়ি হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বাড়িতে কাজ করা একটি মেয়ের জন্য ও খবর করে থাকে। সেই জায়গায় রাজপরিবারের প্রত্যেকেই তাদের বড় বউকে রাঘব পরিত্যাগ করায় তারাও কীভাবে আমাকে পরিত্যাগ করতে পারল এই কথা ভেবে আমি অবাক হই। এখন শাশুড়ি কৌশল্যাকে অস্বস্তি অনুভব করতে দেখে আমার মনে তিনটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। প্রথমটি হল তিনি হয়তো ভেবেছেন শপথগ্রহণ হয়ে যাবার পরে সীতা পুনরায় রাজরানি হবে। গত বারোবছরে একদিনও খবর না নেওয়ার জবাব তিনি কীভাবে দেবেন। দ্বিতীয়তঃ হয়তো মাতা কৌশল্যা আমি লব কুশের মা হয়ে রাজপরিবারের ফিরে যাওয়াটা চাইছেন না অথবা দুই কুল রক্ষা করে কিছু একটা বলা উচিত হবে বলে ভাবছেন। যাতে আমি পুনরায় রাজরানি  হলেও  আমার মুখোমুখি হতে তার কোনো অসুবিধা না হয়।

কথাগুলি ভেবে হয়তো আমি অনেকক্ষণ তন্ময় হয়েছিলাম। হঠাৎ রামচন্দ্রের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারলাম আমার অন্য একটি অগ্নিপরীক্ষার সময় হয়েছে। রাঘব বললেন - কথাগুলিতে দেরি করা উচিত নয়।  সীতা দ্রুত শুদ্ধাচারী এবং সতীত্বের শপথ নিয়ে  পুনরায় রাজ পরিবারে ফিরে আসার ব্যবস্থা করুক ।'

ঠিক তখনই শত্রুঘ্নের  কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।  সাহস করে শত্রুঘ্ন জিজ্ঞাসা করল -' জানকীকে কেন শপথ নিতে হবে মহারাজ?  আপনি নিজেও জানেন যে তিনি একটি আয়নার মতো স্বচ্ছ এবং নিষ্কলুষ…'

  শত্রুঘ্ন আমার পক্ষ নিয়ে আরও কী সব বলেছিল।  কিছু কথা আমার কানে ঢুকল না।  কারণ আমি কিছুটা আবেগিক হয়ে পড়েছিলাম।  মনে  মনে  শত্রুঘ্নের সাহসের প্রশংসা করলাম। আমি ভালোভাবে বুঝতে পারলাম যে শত্রুঘ্ন দাদার সঙ্গ থেকে  দূরে সরে গিয়ে  মধুবনে নতুন নগর স্থাপন করে  প্রজা শাসন করতে শুরু করেছে বলেই হয়তো  সে উচিত সময়ে উচিত কথা  বলতে হয় বলে  বুঝতে পেরেছে।  কিন্তু দাদা রামচন্দ্র শত্রুঘ্নের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে  উচ্চ স্বরে বললেন -'জানকীর শুদ্ধতার  কথা  কেবল আমি ,তুমি বা  আমরা জানলেই হবে না।  লঙ্কা বিজয়ের পরে সবার সামনে সীতা সতীত্ব প্রমান করেছিল। সেই দৃশ্য দেবতারাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এবং তারপরেই আমি সীতাকে আমাদের রাজপরিবারে স্থান দিয়েছিলাম। কিন্তু  কিছুদিন ভালো ভাবে পার হয়ে যাবার পরে লোক অপবাদ  বড় প্রবল হয়ে উঠল। উপায়হীন হয়ে আমি জানকীকে নির্বাসন দিলাম।  অবশ্য তখনও আমি জানতাম  তিনি নিষ্কলুষ বলে।  কিন্তু আমার উপায় ছিল না। আমি ভালোভাবেই জানি লব কুশ আমার সন্তান। তবুও তিনি  জনগণের সামনে আত্ম শুদ্ধতা এবং সতীত্বের শপথ   নিলেই আমি বৈদেহী নন্দিনীকে গ্রহণ করব। 

  রাঘবের প্রতিটি শব্দ  আমার বুকে শেলের মতো বিধেঁছিল।  তাঁর কথা সহ্য করতে না পেরে আমি মাথা তুলে যথেষ্ট কঠিন কন্ঠে শত্রুঘ্নের   দিকে তাকিয়ে বললাম-'  শত্রুঘ্ন ,আমি কার কাছে শপথ নেব?  সেই স্বামীর কাছে  যে স্বামী শপথের অর্থ বুঝতে পারেনা ? অগ্নিপরীক্ষা হয়ে যাবার পরেও পত্নীকে সন্দেহ করতে ছাড়ে না,সেই  তার কাছে?'

আমাকে বল শত্রুঘ্ন কোন পুরুষের কাছে শপথ নেব? সেই কাপুরুষের কাছে যিনি নির্বাসনের কারণ দর্শাতে হবে বলে পালিয়ে বেরিয়েছিল? বেড়াতে নিয়ে যাবার ছলে জঙ্গলে ছেড়ে আসার জন্য ভাইকে নির্দেশ দিয়েছিল? এমন একজন কাপুরুষের কাছে?'

‘শত্রুঘ্ন, কার কাছে শপথ নেব? আমার সন্তানের সেই পিতার কাছে যে গর্ভেই সন্তানকে নির্বাসন দিলেন? যে পিতা সন্তান ভূমিষ্ঠ হল কিনা সেই খবর পর্যন্ত নিলেন না? সেই পিতার কাছে শপথ নেব কি যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেও ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করার জন্য জঙ্গলে ফেলে এসেছিল? সেই পুরুষকে সমস্ত জগৎ ভগবান বলে ভাবতে পারে আমার কিন্তু এরকম ব্যক্তিকে মানবের সারিতে স্থান দিতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার কথা শুনে যজ্ঞস্থলের সমবেত জনগণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপরে গুঞ্জন এবং কোলাহলের সৃষ্টি হল। ‘এই রমণী জগৎপতিকে এভাবে বলছে।

রাঘব হয়তো আমার কথায় কিছুটা লজ্জিত হলেন। তাই তিনি বললেন-‘ লজ্জা যে নারীর ভূষণ জানকী হয়তো তা ভুলে গেছে। রাজগৃহে স্থান লাভ করতে হলে তাকে সতীত্বের শপথ নিতেই হবে ।’  ব্রাহ্মণরা রামের কথায় সায় দিয়ে বললেন-‘প্রভু রামচন্দ্রের কথা জগত মেনে চলে। তাই জনক নন্দিনীও বিনা প্রতিবাদে প্রভুর কথা মেনে চলা উচিত।’ 

আমার ব্রাহ্মণদের উপরে ক্রোধ জন্মাল। মনে মনে ভাবলাম-‘ এই ব্রাহ্মণরা সমস্ত বিদ্বেষের মূল। যত নারীবিদ্বেষী শ্লোক, নিয়মকানুন আছে সমস্ত কিছু এদেরই প্রবর্তন করা। বৃদ্ধ বয়সে বিয়ে করে যুবতীদের সামলাতে না পেরে সমস্ত নারী জাতির জন্য কঠোর নিয়ম নীতি নির্ধারণ করলেন। কেবল তাই নয়, হীনজাতির লোক অধ্যয়ন করে পন্ডিত হতে পারে বলে ক্ষত্রিয় ছাড়া বাকি কোনো নিম্ন শ্রেণির লোক ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারবে না বলে নিয়ম প্রবর্তন করেন। অধ্যয়ন করা তো দূরের কথা, এমনকি হীনজাতি ভগবানের আরাধনা করলে বা তপস্যা করলে দেশে দুর্ভিক্ষ এবং অমঙ্গল হবে বলে নিয়ম করেছিলেন। আর সেই নিয়মকে শিরোধার্য করে আমার সামনে থাকা এই জগৎপতি শম্বুক নামের একজন শূদ্র কে তরোয়াল দিয়ে দু'খন্ড করেছিল, তপস্যার অপরাধে। তাই এই সমস্ত ব্রাহ্মণদের উপরে আমার কোনো শ্রদ্ধা ভক্তি নেই। এরা কোনো দিন ঋষি বাল্মীকির মতো হতে পারবে না। কথাটা ভেবে থাকার সময়ে হঠাৎ লক্ষ্ণণের কন্ঠস্বর শুনলাম-‘ হে মহারাজ অতীতের অগ্নিপরীক্ষায় সীতাদেবী কীভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন আমি নিজের চোখে দেখেছি। সমস্ত দেবতারা সীতাদেবীর পবিত্রতার কথা কীভাবে বলেছিল আপনার নিশ্চয় মনে আছে। অগ্নি লেলিহান শিখায় দগ্ধ করতে না পারা জানকীকে অগ্নি দেবতা কীভাবে অগ্নিকুণ্ড থেকে নিয়ে এসেছিলেন সেই দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। তাই আপনি মহর্ষি বাল্মীকির কথায় বিশ্বাস না করে পুনরায় কেন সীতাদেবীকে সামাজিক ভাবে অপমান করতে চাইছেন?'

উত্তরে রাঘব বললেন-‘ তখনকার কথা আলাদা ছিল। গত বারো বছরে সীতার  জীবনে কী ঘটেছে সেই বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। তাই জানকী শপথ নিলে হয়তো আমার তার ওপরে বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরে আসবে।’ 

রাঘবের কথা শুনে পুনরায় আমার শরীরটা শিউরে উঠল। এবার আমি মানুষটা এভাবে ঘুরে দাঁড়ালাম যাতে সমগ্র যজ্ঞস্থলের জনগণ আমাকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পায়। তারপর সমগ্র জনগণকে প্রণাম জানিয়ে বললাম-‘ হে অযোধ্যার জনগণ, এই মহারাজের কাছে শপথ নিয়ে বা কথা বলে কোনো লাভ নেই। তাই আমি আপনাদের দু'একটি কথা বলতে চাই। সত্যি কথাটা বলার সময় যদি কারও অন্তরে আঘাত লাগে তাহলে নিজ গুনে ক্ষমা করবেন। গত বারো বছর গার্হস্থ্য ধর্মের পরিবর্তে আমি সন্নাসীর মতো জীবন যাপন করছি। এখন আমার রাজরানি হওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। আপনারা জানেন যে আমি একজন রাজার সহধর্মিনী ছিলাম। তাকেই আমি সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারেননি। বনবাসে রাবণ আমাকে হরণ করেছিল। হরণ করার জন্য একমাত্র দাদা আর ভাই দুজনের ভুলগুলিই দায়ী।দুজনেই রাবণের বিধবা বোন শূপর্ণখার নাক কান কেটে শত্রুতা বৃদ্ধি করেছিল। রাবণের হাত থেকে আমাকে সেদিনই উদ্ধার করতে পারল না। তাতে আমার  কীভাবে দোষ হতে পারে? সম্পূর্ণ এক বছর পরে রাবণকে বধ করে লঙ্কা জয় করার পরে আপনাদের এই রাজা আমার প্রতি এরকম ব্যবহার করলেন যেন আমি রাবণকে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার বুদ্ধি দিয়েছিলাম। তিনি আমার সতীত্বের প্রমাণ চাইলেন। তাই অগ্নি পরীক্ষা হল। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম বলে রাঘব আমাকে গ্রহণ করেছিল যদিও তার অন্তর পরিষ্কার ছিল না। একদিন রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা রাক্ষস দেখতে কীরকম বলে জিজ্ঞেস করায় আমি মেঝেতে একটা ছবি এঁকে দেখিয়েছিলাম। ছবিটা দেখে তিনি আমাকে বাক্যবাণে প্রহার করে বললেন যে আমি নাকি এখনও রাবণকে ভুলতে পারিনি। আমি গর্ভবতী হওয়ার পরে তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। কিন্তু আপনাদের রাজা এটাও ভেবে দেখলেন না যে বনবাস থেকে ফিরে আসার কতদিন পরে আমি সন্তানসম্ভাবা হয়েছিলাম। আরেকদিন লোক অপবাদের ভয়ে আমাকে কারণ না দেখিয়ে নির্বাসনে পাঠালেন। তখন আমার গর্ভে ছিল পাঁচ মাসের সন্তান। পিতা বাল্মীকিকে  সেই সময়ে না পেলে আমি তমসা নদীতে প্রাণ বিসর্জন দিতাম। এখন আপনাদের সম্রাট রামচন্দ্র জানতে পেরেছেন যে লব কুশ তার সন্তান। ওরা দুজন শাস্ত্রবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা সমস্ত কিছুতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। কখনও হয়তো তারা প্রাপ্য রাজ্য দাবি করতে পারে। তাই আপনাদের চতুর  সম্রাট ওদের প্রাপ্য দাবি করার আগেই ঋষি বাল্মীকির কথা বিশ্বাস করে ওদের দুজনকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমি ভাবি না এই কাজ তিনি অন্তর থেকে করেছেন বলে। সবই লোক দেখানো কাজ। এখন নিজেকে দূষণমুক্ত করার জন্য এবং আপনাদের সবার কাছে তিনি উদার হৃদয় বলে পরিচিতি লাভ করার জন্য আমাকে পুনরায় রাজপ্রাসাদে জায়গা দিতে চাইছেন। এগুলি সবই লোক দেখানো কাজ মাত্র। আমি তার এই ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত ।কিন্তু এবার আর এসবে আমি ভুলব না। রাজভোগ রাজসুখে আর আমার প্রয়োজন নেই।'

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপরে পুনরায় শুরু করলাম-‘ হে জনগণ, বর্তমানে আমার দেহে কোনো সৌন্দর্য নেই। জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি বনবাসে কাটালাম। ক্রোধ, দুঃখ, মনোকষ্ট অভাব-অনটন আমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন আমি তাকে কী দিয়ে ভোলাব? যৌবন ভরপুর হয়ে থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে বাসি বস্তুর মতো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পরে ভবিষ্যতে যে ফেলে দেবেন না তার কী প্রমাণ আছে? তিনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না যখন আমি তাকে কীভাবে বিশ্বাস করব? আগেও তিনি আমার মনের চেয়ে দেহকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাকে বনবাসে পাঠানোর আগে এবং বনবাসের সময় মাঝেমধ্যে যে সমস্ত কথার শক্তিশেল নিক্ষেপ করেছিলেন সেগুলো উল্লেখ করে আপনাদের সম্রাটকে আপনাদের সামনে লঘু করার ইচ্ছে নেই। তবুও  জনমে জনমে আমি তার পত্নী হয়ে থাকতে চাই।’ 

কথাগুলি বলে আমি রাঘবের দিকে তাকালাম। তিনি ক্রোধে, লজ্জায় এবং অপমানে লাল হয়ে পড়েছেন। তার পর তিনি  গম্ভীর কণ্ঠে বললেন-‘ আমি আমার দোষ স্বীকার করছি। এখন শুধু জানকী শপথ গ্রহণ করুক।’

আমিও আর কথা না বাড়িয়ে সবাইকে প্রণাম জানিয়ে শপথ নিলাম –‘হে অযোধ্যার জনগণ যদি  লব কুশ রামের ঔরসজাত সন্তান হয় তাহলে পৃথিবী বিদীর্ণ হোক। আমার মনে যদি রামের বাইরে অন্য পুরুষের কথা জায়গা পেয়ে না থাকে তাহলে পৃথিবী বিদীর্ণ হবে।

যদি আমি শুদ্ধ, আমি পবিত্র, যদি আমি সতী তাহলে এই ভূমি বিদীর্ণ হয়ে খন্ড খন্ড হোক। মা বসুমতী আমাকে তার কোলে স্থান দিক।’

আমার শপথ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। চারপাশে প্রবল বেগে বাতাস বইতে লাগল। ভূমি কেঁপে উঠল, জায়গায় জায়গায় ফাটল দেখা গেল। মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সবাই ভগবানের নাম স্মরণ করতে লাগল। সমগ্র জনগণ সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল-' বিদেহ নন্দিনী সীতা নিষ্কলুষ এবং শুদ্ধ। এই ধরনের নারীকে অপমান করার পরিণাম ভয়াবহ হবে। চিৎকার-চেঁচামেচি হট্টগোল লেগে থাকার সময়ে হঠাৎ আমি দাঁড়িয়ে থাকা জায়গার সামনে এক বৃহৎ ফাটলের সৃষ্টি হল। সেই ফাটলের ভেতর থেকে একটা সিংহাসন বেরিয়ে এল। আমি অনুভব করলাম যেন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে সেই সিংহাসনে বসিয়ে নিচের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। তখনই আমি রাঘবের কন্ঠস্বর শুনলাম-' সীতা, আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। আমি তোমাকে বিশ্বাস ‍‌‌‌‌‌‌‌করছি।’

তাঁর কথা শুনে আমার ঠোঁটে একটা বক্র হাসি ফুটে উঠল। রাম এখানে সেখানে ধরে কোনোভাবে আমার কাছে এসে পৌঁছাল। তিনি আমাকে ধরতে চাইলেন কিন্তু আমি তাকে স্পর্শ করতে দিলাম না। আমি তার অশ্রুভরা চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললাম –‘হে স্বামী বিদায়।’ 

আমি পৃথিবীর মায়া মোহ ত্যাগ করে পাতালে চলে এলাম।

-------














বৃহস্পতিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৯ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, Bideha Nandini

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৯

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৯)

লঙ্কা নগরে দিনরাত কেবল কান্নার রোল। প্রতিটি বাড়িতে হয় কারও পিতা না হলে ভ্রাতা অথবা পতি বা পুত্রের  যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে বলতে শুনেছি। বাড়িতে নাকি পুরুষ মানুষ নাই হয়ে গেছে। অনবরত শুনতে থাকা কান্নার ধ্বনি আমাকে শোকাতুর করে  তুলল। নিজেকে দোষী বলে মনে হতে লাগল। যেন এতগুলি জীবের দুঃখের এবং বধের কারণ বলে আমার মনে হতে লাগল। জীবনের প্রতি মায়া একেবারে নাই হয়ে গেল । যে কোনো মুহূর্তে দেহের অবসান ঘটানোর কথা মনে পড়তে লাগল।

ইন্দ্রজিৎ বধের পরে যদিও স্বামী রামচন্দ্রের জয় নিশ্চিত বলে ভেবেছিলাম, পরে রাবণের যুদ্ধের পিপাসা ,উগ্রক্রোধ, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা চোখ দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ইন্দ্রজিৎ বধে শোকে জর্জরিত হয়ে পড়া রাবণ একটা সময়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। সেদিন সেইসময় রাবণের সঙ্গে মন্ত্রী সুপার্শ্ব না থাকলে আমি রাক্ষস রাজের তরোয়ালে দু'খন্ড হয়ে যেতাম। রাবণ ক্রোধে আর্তনাদ করে বলেছিল -'আমার পুত্র ইন্দ্রজিৎ শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দেবার জন্য নকল সীতা দু'খন্ড করে দেখিয়েছিল। কিন্তু আজ আমি আসল সীতাকে দু'টুকরো করব। এ কথা বলে রাবণ চিৎকার করে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে আমার দিকে তেড়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী সুপার্শ্ব আমার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত মেলে  বাধা দিয়ে বললেন-' হে মহারাজ দশানন, আপনি সাক্ষাৎ কুবেরের ভাই হয়ে একজন অবলা নারীকে বধ করার জন্য  বেরিয়ে এসেছেন। হে রাজন  বৈদেহীকে বধ করলে আপনার  যশস্যা  থাকবে না। স্ত্রীবধ করে আপনি পাপে ডুবতে চাইছেন কেন। হে বীর জনকনন্দিনীকে বধ করার চিন্তা মন থেকে পরিহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে চলুন । রামচন্দ্রকে আপনার যুদ্ধ করার কৌশল পরাক্রম দেখান। ত্রিভুবন জয় করা গৌরব অক্ষুন্ন রাখুন।'

মন্ত্ৰী  সুপার্শ্বের   কথা শুনে  রাবণ খোলা তরোয়াল  খাপে ভরিয়ে  আমার দিকে ক্রোধের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে  গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।  আমি নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পরে আমি অশোক বন থেকে  লংকা নগরীর  উল্লাস অনুমান করতে পেরেছিলাম।  রাক্ষসপুরীর আকাশ বাতাস  রণধ্বনিত হয়ে উঠেছিল।  রাক্ষস সৈন্য নতুন উদ্যমে  জয়ধ্বনি করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে গেল।মহিলারা প্রত্যেকে ফুল চন্দন চাল ছিটিয়ে রাজার মঙ্গল এবং জয়ের কামনা করে বিদায় দিলেন।

  রাবণ সুসজ্জিত হয়ে  যুদ্ধে গিয়েছিল যদিও আমার বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে আমার স্বামী রামচন্দ্র এই দুরাত্মার জীবনের অবসান ঘটাবে।তার হয়তো জন্মই হয়েছে এই পাপাত্মাকে নিপাত করার জন্য। তাই আমি উদ্বিগ্ন হয়ে  যুদ্ধের ফলাফলের জন্য পথ চেয়ে রইলাম। অন্তরে ভগবানকে প্রার্থনা জানিয়ে ছিলাম তিনি যেন রাম লক্ষ্ণণকে অনন্ত শক্তি প্রদান করে এই মহাযুদ্ধে দুজনের পথের সহায়ক হয়ে থাকেন।  আমি পুত্রবতী হওয়ার জন্য আমাকে যেন সধবা করে রাখেন ।

মনের মধ্যে কথাগুলি নাড়াচাড়া করে থাকার সময় ত্রিজটা এসে উপস্থিত হল।  এই কয়েকদিন  তিনি ঘরে ঘরে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বেড়ানোর কাজে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন । আমার কাছে বসে  প্রথমে আমার স্বাস্থ্যের খবর নিলেন।  তারপর তার মনের কথা বলতে শুরু করলেন -' মা সীতা, অধর্মী লোকের সুখ,শান্তি আর নিস্তার নেই। রক্তের গর্বে দুদিন ছটফট করে প্রতাপ দেখায় যদিও শেষ পরিণাম ভয়াবহ হয় । মহারাজ রাবণের যুদ্ধের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে ।অবশ্য তিনি রাম লক্ষ্ণণকে এমনিতেই ছেড়ে দেননি। তোর দেবর লক্ষ্ণণ কোনোমতে রক্ষা পেয়েছে। রাবণ শক্তিশালী বাণ মেরে ভাই বিভীষণকে বধ করতে যেতেই লক্ষ্ণণ দ্রুতগতিতে এসে বিভীষণকে আড়াল করে ফেলে। তারপরে অযোধ্যা নন্দন রাজার উপরে বাণ বর্ষণ করতে শুরু করে। বিভীষণকে রক্ষা করে বীরত্ব দেখানোয় ক্রোধিত রাবণ শ্বশুর ময়দান নির্মাণ করা এক প্রাণনাশ কারী বাণ লক্ষণের দিকে নিক্ষেপ করলেন। নিমেষের মধ্যে লক্ষ্ণণ ঢলে পড়ল। সবাই ভেবেছিল তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। কিন্তু বৈদ্য সুষেণ, মহাবীর জাম্ববন্ত,হনুমান ইত্যাদি বীরদের সেবা শুশ্রূষায় লক্ষ্ণণ সুস্থ হয়ে উঠেন। ভাইকে এভাবে আঘাত করায় রামচন্দ্র প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে তীক্ষ্ণ বাণে রাবণকে জর্জরিত করে ফেলছেন বলে এইমাত্র খবর এসেছে।

কথাটা বলে ত্রিজটা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর দুই হাত বুকের উপরে রেখে চোখদুটি বন্ধ করে ভক্তিভরে বলতে শুরু করলেন-‘ এখন যে যুদ্ধ হচ্ছে তা অতি ভয়াবহ। রামচন্দ্র যুদ্ধ করছেন মাটিতে দাঁড়িয়ে। রাজা রাবণ যুদ্ধ করছেন সুসজ্জিত রথের উপরে উঠে। সৎ লোকেরা অসমান যুদ্ধ সহ্য করতে পারেনা। তাই দেবরাজ ইন্দ্র সারথি মাতালের হাতে তার রথ পাঠিয়ে দিলেন রামচন্দ্রের জন্য। এর অর্থ সহজেই অনুমান করা যায়।’ কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্রিজটা চলে গেলেন।

আমিও ভয়,শঙ্কা, আশা নিরাশা অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বামী রামচন্দ্রের চরণ চিন্তা করে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে সরমা এল। তার মুখে উত্তেজনার ছাপ। তবুও ধীর-স্থিরভাবে আমার কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন- বৈদেহী,রণক্ষেত্রে রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে । সৈন্যদের মৃতদেহ পর্বতের রূপ ধারণ করেছে। রামচন্দ্র এবং রাবণের মধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পতি বিভীষণ পাঠানো গুপ্ত খবর অনুসারে দুইয়ের মধ্যে এত ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হচ্ছে যে পৃথিবী নাশ হয় বলে  সমস্ত প্রাণী ভয়ে কম্পমান হয়ে পড়েছে। এভাবে সরমা যুদ্ধের খবর দিতে থাকার সময় রাজপ্রাসাদের একদিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ এবং হৃদয়বিদারক ক্রন্দন ধ্বনি ভেসে এল। আমি কান খাড়া করে রইলাম।সরমা দ্রুত আমার কাছ থেকে রাজ প্রাসাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। আমি কান পেতে শুনতে চেষ্টা করেও কিছুই বুঝতে পারলাম না।কেবল মাত্র কান্না, চিৎকার, চেঁচামেচি, দৌড়াদৌড়ির শব্দ কানে এসে পড়ল। 

কয়েক মুহূর্ত পরে ত্রিজটা থেকে শুরু করে এককর্ণা,একাক্ষী,অকর্ণিকা ইত্যাদি রাক্ষসীরা আমার দিকে ছুটে এল।ত্রিজটা  চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলল-‘ জানকী,প্রভু রামচন্দ্র মহর্ষি অগ্যস্ত মুনি উপহার দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে মহা প্রতাপী, ত্রিভুবন বিজয়ী লঙ্কেশ্বরের জীবনের অবসান ঘটিয়েছে। কথাটা অবরুদ্ধ কন্ঠ বলে সরমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পাহারা দেওয়া প্রহরীরাও চিৎকার জুড়ে দিল।

সমস্ত লঙ্কা নগরী শোকে ডুবে গেল। ত্রিজটা এবং প্রহরীরা গলাগলি করে কাঁদতে কাঁদতে রাজপ্রাসাদের দিকে বেরিয়ে গেল। 

মহামন্ত্রী সুপার্শ্ব আমার নিরাপত্তার জন্য অশোকবনে দৌড়াদৌড়ি করে অন্য নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করলেন।


বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৭ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, Dr.Malini

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৭

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৭)
  কুম্ভকর্ণকে বধ করার পর থেকে  পাহারা দেওয়া রাক্ষসীরা একেবারে নিরীহ প্রাণীর মতো ব্যবহার করতে লাগল। আমার মন ভালো না থাকলে ওদের বিচার হতে পারে বলে ধরে নিয়ে আমাকে মিষ্টি ভাবে সম্ভাষণ জানাতে লাগল। কেউ কেউ বলেছিল আমাদের কোনো দোষ নেই। আমরা রাজার আদেশ পালন করছি মাত্র। রাজার নুন খেয়েছি যখন তার কথা শুনতেই হবে। তাই আমি ওদের আচার-ব্যবহার থেকেই  কোন দিন কার জয় কার পরাজয় অনুমান করতে পেরেছিলাম ।ওদের মধ্যে কথাবার্তা শুনে জানতে পেরেছিলাম যে ভাই কুম্ভকর্ণের মৃত্যুতে রাবণ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।শোক  সম্বরণ করতে না পেরে লঙ্কেশ্বর নাকি শোকে দুঃখে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। নিজের পিতাকে শোক এবং হতাশায় ভেঙ্গে পড়তে দেখে ত্রিশরা,দেবান্তক,নরান্তক  এবং অতিকায় নামে রাবণের চার পুত্র রামের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। চারজনই নাকি অনেক বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে মৃত্যুকে বরণ করে। 
একদিন হঠাৎ পাহারা দেওয়া রাক্ষসরা আমাকে আবার আগের মতো  কটু বচন শোনাতে লাগল। আমি ওদের ব্যবহারে অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেলাম। কে জানে রাম বাহিনীতে কোনো সংকট দেখা দিয়েছে কিনা? তা নাহলে ওরা পুনরায় কেন এ ধরনের ব্যবহার করবে? এদিকে রণক্ষেত্রের কোনো খবর পাচ্ছি না। সাধারণত ত্রিজটা ঘনঘন আসে। কিন্তু এই কয়েকদিন ত্রিজটা আসেনি।রাবণের চার পুত্রের একদিনেই মৃত্যু হওয়ায় রাজার পত্নীদের মধ্যে হাহাকার লেগেছে। বিশেষ করে পুত্র অতিকাইর মৃত্যু সংবাদে রাবণের পত্নী ধন্যমালিনী নাকি পাগলের মতো হয়ে পড়েছে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ জানাটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই মনটা শক্ত করে রাম বাহিনীর মঙ্গলের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম।
  পরেরদিন বিকেলের দিকে বিভীষণের পত্নী সরমা উপস্থিত হল। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত কিছু জানতে পারলাম। সরমা দ্রুত কথাগুলি বলে গেল -'জনক নন্দিনী, রাম বাহিনীতে বড় বিঘ্ন ঘটে গেল। তুমি সেসব কিছুই জান না ।না জানায় ভালোই হয়েছে ।আমি জানতে পেরে অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। সারারাত ছটফট করে কাটিয়েছি ।আজ সকালে পতি বিভীষণের গোপন সংবাদ পাওয়ার পর মনে আশা জেগেছে। কথাটা বলে সরমা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আমি রাম বাহিনীতে কী বিঘ্ন ঘটেছিল জানার জন্য ব্যগ্ৰ হয়ে পড়লাম।সরমার দুই হাত আঁকড়ে ধরে বললাম-' হে মাতা, স্বামী রামচন্দ্রের সেনাবাহিনীতে কী ঘটেছিল আমাকে খুলে বল। আমি প্রহরীদের ব্যবহারে এক ধরনের অমঙ্গলের আভাস পেয়েছিলাম। সরমা বলল-' পুত্র, ভ্রাতাকে হারিয়ে শোকে অধীর হয়ে পড়া রাবণকে আশ্বাস দিল রাবণ মন্দোদরীর পুত্র মেঘনাদ অর্থাৎ ইন্দ্রজিৎ ।ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে যেতে দেখে রাবণ পুনরায় উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল। ইন্দ্রজিৎ নিজে অদৃশ্য হয়ে থেকে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে একদিক থেকে বাঁদর সেনা ধ্বংস করে যেতে লাগল। সুগ্রীব, হনুমান, নীল, নল,জাম্ববন্তকে ধরে প্রত্যেকে বীর আহত হয়ে পড়ল। এমনকি তোমার স্বামী রামচন্দ্র এবং দেবর লক্ষ্মণ ও সেই  বাণে বিদ্ধ হল। ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে থাকার ফলে এই দুই মহাবীর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই একটা সময়ে দুজনেই রণক্ষেত্রে ঢলে পড়ল। রাম বাহিনীকে  সম্পূর্ণরূপে শেষ করে ইন্দ্রজিৎ বীরদর্পে লঙ্কায় ফিরে এল। অনেকদিন পরে রাবণের মুখেও হাসি ফুটল। এদিকে বাহিনীতে কেবল আমার পতি বিভীষণ সুস্থির অবস্থায় ছিলেন। হনুমান আঘাত পেয়েছিল যদিও সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এসেছিল। দুজনেই পড়ে থাকা বীরদের মধ্যে  চিৎকার করে করে উৎসাহজনক বাক্যে দেহে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েছিল। তারা  বলছিল-' হে বীর সকল, ভয় পেয়ো না ।তোমাদের কার ও মৃত্যু হয়নি ।রাম লক্ষ্মণের ও মৃত্যু হয়নি ।দুজনেই ব্রহ্মদেবের প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্ত্র পরিহার করে ইন্দ্রজিতের  বাণ সহ্য করে মাত্র মূর্ছিত হয়ে পড়েছে। কথাটা বলে সরমা কিছুক্ষণের জন্য চোখ দুটি বন্ধ করে স্থির হয়ে রইল। তারপর পুনরায় বলতে শুরু করল-' আমার পতি বিভীষণ জেনেছিল যে ব্রহ্মাস্ত্র সক্রিয় হয়ে থাকে মাত্র পাঁচ প্রহর। যাদের দেহে তখনও পর্যন্ত প্রাণ থাকে তাদের সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার জন্য এক বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন ।সেই ঔষধের বিষয়ে জানে একমাত্র বৃদ্ধ ভালুক জাম্ববন্ত। এদিকে জাম্ববন্ত ও রণে আহত হয়ে পড়ল। তার দেহে তখন ও প্রাণ আছে না নেই জানার কোনো উপায় নেই। কারণ সত্তরকোটি বাঁদর ভালুক পড়ে থাকা জায়গায় জাম্ববন্তকে খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়। দুজনে হাতে মশাল নিয়ে জাম্ববানকে  খুঁজতে শুরু করল।  একবার স্বামী বিভীষণ হঠাৎ জাম্ববান্তকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জাম্ববান্তের কানের কাছে চিৎকার করতে লাগল-' হে প্রভু, আপনার দেহে প্রাণ আছে কি ?জাম্ববন্ত নাকি বড় কষ্টে বলে উঠল-' দয়ালু বিভীষণ, আমাদের পবনপুত্র হনুমান কুশলে আছে তো ?আমার পতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-' হে বীর ,এতগুলি বীর , মহা বীরের  বিষয়ে জিজ্ঞেস না করে আপনি কেবল পবনপুত্র বিষয়ে কেন জিজ্ঞেস করলেন ?'
জাম্ববন্ত নাকি তখন বললেন-' তিনি কুশলে থাকলে বাকি সবাই প্রাণ পেয়ে  উঠবে। কথাটা শুনে হনুমান জাম্ববন্তের  পা'দুটি  ধরে প্রণাম জানিয়ে বলল-' আমি কুশলে আছি প্রভু। আমাকে আদেশ দিন আমি কী করতে পারি।' জাম্ববন্ত তখন হনুমানকে মহা সমুদ্র পার হয়ে সুদীর্ঘ আকাশ পথ অতিক্রম করে হিমালয় যেতে বললেন। সেখানে গেলে ঋষভ এবং কৈলাস পর্বত দেখতে পাবে। সেই পর্বত শৃঙ্গ ঔষধি গাছে পরিপূর্ণ। মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরনী এবং সন্ধানী নামের অদ্ভুত অজ্ঞান হয়ে থাকা প্রাণীদের জন্য মহৌষধ এই গাছকে ঔষধি হিসেবে প্রয়োগ  করলেই সবাই পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠবে বলে জাম্ববন্ত জানাল। জাম্ববন্তর কথা শুনে হনুমান বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পর্বতের উপরে উঠে নিজের দেহটা বিশাল করে তুললেন। তারপর আকাশপথে উত্তর দিকে যেতে শুরু করলেন। হনুমান লক্ষ্যস্থানে অবতরণ করে গাছ সমূহ জ্বলজ্বল করে থাকতে দেখলেন। পরে যখন তুলতে গেলেন তখন গাছগুলি অর্ন্তধান করল। হনুমান বুঝতে পারলেন যে কেউ কু-অভিপ্রায় এরকম করেছে। তা না হলে গাছগুলি ভুতে পাওয়া। তাই গাছের খোঁজে সময় নষ্ট না করে সমগ্র শৃঙ্গ টাকে পিঠে নিয়ে রাত ভোর হওয়ার আগেই রণক্ষেত্রে উপস্থিত হল। জাম্ববন্তের উদ্যোগে মহৌষধ উদ্ভিদের মহিমায় তখনও কোনমতে প্রাণে বেঁচে থাকা রাম বাহিনীর  দেহে শক্তি সঞ্চার হল। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। প্রতিজনই নাকি অসীম শক্তির অধিকারী হল। তোমার স্বামী এবং দেবর আগের চেয়েও জ্যোতির্ময় হয়ে পড়ল। বায়ুপুত্র আনন্দে গিরিশৃঙ্গ কে প্রণাম জানিয়ে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে ফিরে এল।’ 
সরমা কথাটা বলে শেষ করতেই আমরা রাম বাহিনীর জয় ধ্বনি শুনতে পেলাম। সেইজয়ধ্বনি শুনে সরমা সরল ভাবে বললেন- বৈদেহী সহজ সরল মানুষের কখনও মৃত্যু নেই। তাই তুমি চিন্তা করনা। আমার বিশ্বাস অতি দ্রুত প্রভু রামচন্দ্র তোমাকে উদ্ধার করবেন। এভাবে অনেক্ষণ আমার সঙ্গে কাটিয়ে সরমা চলে গেল। আমিও স্বামী রামচন্দ্রের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়লাম।


বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস Dr.Malini

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৬)
দুশ্চরিত্র রাবণের দুষ্কর্ম সমর্থন করে স্বামী রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়া প্রতিটি লঙ্কা বাসীকে আমি শত্রু বলে গণ্য করেছিলাম যদিও ব্যতিক্রম ছিল কুম্ভকর্ণ। আমি কুম্ভকর্ণের ছায়া ও দেখিনি যদিও সরমা,ত্রিজটা, কলা এবং প্রহরীদের মুখে যা শুনেছিলাম তা থেকেই এই মহাবীরের প্রতি আমার অন্তরে এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মেছিল । তাই কুম্ভকর্ণের মৃত্যুসংবাদ আমার অন্তরকে স্পর্শ করে গেল। 
কুম্ভকর্ণের মৃত্যু সমগ্র লঙ্কা মহানগরীকে বিষণ্ন করে তুলেছিল। সেই কারুণ্য আমি অশোক বনে বসেও অনুভব করছিলাম। এই কয়েকদিন আমার সঙ্গে কারও দেখা হয়নি। ত্রিজটাও ব্যস্ত ছিল  কুম্ভকর্ণের পত্নী বজ্রজ্বালার সঙ্গে। পতি হারা বজ্রজ্বালা নাকি বারবার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। মাঝখানে একদিন সময় বের করে ত্রিজটা আমার কাছে উপস্থিত হল। এসেই  চোখের জল ফেলে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে বলেছিল-' বুঝতে পেরেছ মা, লঙ্কাপুরী বর্তমানে সজ্জনের রাজত্ব নেই। মহাবীর কুম্ভকর্ণ বছরের মধ্যে অর্ধেক সময় শুয়ে কাটাত যদিও তিনি রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে জানতেন কে ভালো ,কে খারাপ । দাদা রাবণের পরের স্ত্রী হরণ, বলাৎকার, দর্প ইত্যাদি কথাগুলি কুম্ভকর্ণ মোটেই পছন্দ করত না ।তবুও দাদা রাবণ তার প্রাণ ছিল। তোকে হরণ করে আনার পরে কুম্ভকর্ণ দাদাকে সহস্রবার বলেছিল তোকে রামের হাতে পুনরায় অর্পণ করার জন্য । সেদিন যুদ্ধে যাওয়ার আগের মুহূর্তে কুম্ভকর্ণ দাদা রাবণকে বলেছিল-' হে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আজ দেশে যে অশান্তি হয়েছে, ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠেছে, তার জন্য দায়ী তুমি। ত্রিভুবন জয় করার পরে তুমি সুখে শান্তিতে নিজেও থাকা উচিত ছিল এবং প্রজাবর্গদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত ছিল। তোমার এতগুলি সুন্দরী স্ত্রী থাকতে তোমার লালসা সম্বরণ  না করে পরের স্ত্রী  হরণ করে ভীষণ অন্যায় কাজ করেছ। একথা আমি তোমাকে ঘুমোতে যাবার আগে বলেছিলাম। এখনও  বলছি বৌদি মন্দোদরী এবং ভাই বিভীষণ ভালো কথা বলার জন্য তুমি খারাপ পেয়েছিলে। বিভীষণকে তো রাজ্য থেকেই তাড়িয়ে দিলে। রাম লঙ্কা আক্রমণ করে কোনো দোষ করেনি। ঝগড়াটা তুমি সৃষ্টি করেছ। কুম্ভকর্ণের কথা শেষ না হতেই রাবণ ক্রোধে জ্বলে ওঠে বলেছিল-' আমার ভুল হোক ,বল বিক্রমের জন্যই হোক বা মোহে পরেই হোক যা করেছি সেখান থেকে আর ফিরতে পারব না। আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট মনে কষ্ট পেয়েছি ।এই সমস্ত কথা বলে আমাকে আর কষ্ট দিস না। এখন যা করা উচিত তাই কর।’
দাদার কথা শুনে কুম্ভকর্ণ বলেছিল-' হে ভাতৃ আমি তোমার সহোদর ভাই বলেই এ কথা বলছি। শত্রু হলে তোমাকে উসকে দিতাম। তোমার কুকর্মের জন্য খারাপ পাই যদিও বিপদে তোমাকে কখনও ছেড়ে যাব না। আমি এখন যুদ্ধে যাব। তুমি চিন্তা কর না, তোমার জয় অনিবার্য। আমি কিছুক্ষণ পরে রামচন্দ্রের শির তোমাকে এনে উপহার দেব।' একনাগাড়ে কথাগুলি বলে ত্রিজটা কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করল। তারপর চোখের জল মুছে পুনরায় বলল-' কুম্ভকর্ণকে রাবণ নিজ হাতে সাজিয়ে দিলেন। তারপর আলিঙ্গন করে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা করে দিলেন।' কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে ত্রিজটা পুনরায় বলতে শুরু করল-' বুঝেছ রাঘব ঘরনী, কুম্ভকর্ণ যুদ্ধে যে পরাক্রম দেখাল সে কথা রাম লক্ষ্ণণও ভুলতে পারবেনা । সেই পরাক্রম আমি নিজ চোখে দেখি নি যদিও যারা দেখেছে প্রত্যেকেই বলেছে কুম্ভকর্ণ রণক্ষেত্রে নামার সঙ্গে সঙ্গে নাকি বাঁদর সেনা ভয়ে এদিক ওদিক ছিটকে পালালো। কুম্ভকর্ণ বাঁদর সেনা গুলিকে আছড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গে  মুঠো মুঠো করে ধরে খেতে লাগল। হনুমান আকাশ থেকে একটা পর্বত নিয়ে কুম্ভকর্ণকে আঘাত করেছিল।কিন্তু কুম্ভকর্ণ তাতে ভ্রুক্ষেপ করল না, উল্টো হনুমানকে এরকম একটি আঘাত করল যে হনুমান রক্ত বমি করতে লাগল। তারপর মহাবীর বালির পুত্র অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল। দুজনের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হল।একবার অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের বুকে এত জোরে আঘাত করল যে কিছু সময়ের জন্য কুম্ভকর্ণ অচেতন হয়ে পড়ল ।কিন্তু চেতনা ফিরে পেয়ে অঙ্গদের  দেহে কুম্ভকর্ণ এরকম একটি কিল বসিয়ে দিল যে অঙ্গদ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তা দেখে সুগ্রীব তখনই কুম্ভকর্ণের উদ্দেশ্যে এক প্রকাণ্ড পর্বত তার বুকে নিক্ষেপ করলেন। কুম্ভকর্ণ হাতে থাকা শূল  সুগ্রীবের দিকে নিক্ষেপ করলেন।কিন্তু হনুমান শেষ পর্যন্ত শূল ধরে ফেলে ভেঙ্গে ফেলল। মহাক্রোধে কুম্ভকর্ণ মলয় পর্বতের শিখরটা তুলে নিয়ে সুগ্রীবকে আঘাত করল। সেই আঘাতে সুগ্রীব মাটিতে অচেতন হয়ে পড়ে গেল ।কুম্ভকর্ণ দ্রুত সুগ্ৰীবকে কাঁধে তুলে নিয়ে নগরে ফিরে এল। যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে রাজাকে বন্দি করতে পারলে যুদ্ধে সেখানেই ইতি পড়ে। সুগ্ৰীব যেহেতু রাম বাহিনীর রাজা,তাই তাকে  বন্দি করায় যুদ্ধের সেখানেই শেষ হল।
রাজাকে বন্দি করে যুদ্ধে ইতি টানায় রাক্ষসেরা কুম্ভকর্ণের জয়ধ্বনি দিতে লাগল। এদিকে কুম্ভকর্ণের কাঁধে এভাবে যেতে থাকার সময় সুগ্রীব ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পেল। তিনি কুম্ভকর্ণের নাক কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেললেন। বগলের নিচ দুটি ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন। সুগ্ৰীব এতটাই যন্ত্রণা দিতে লাগল যে সহ্য না করতে পেরে কুম্ভকর্ণ সুগ্রীবকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সুগ্ৰীব তৎক্ষণাৎ এক লাফে রামচন্দ্রের কাছে গিয়ে হাজির হল। নিজের অসাবধানতার জন্য সম্পূর্ণ ঘটনাটা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় লজ্জা, অপমান ক্রোধে কুম্ভকর্ণ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এলেন। এদিকে নাক কানের আঘাতের রক্ত, পেটের ক্ষুধা তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তাই প্রথমে দুই হাতে যতটা পারে কতগুলি বানর সেনা মুখে ভরিয়ে দিলেন। কুম্ভকর্ণের এই কার্যকে বাধা দেবার জন্য লক্ষ্মণ এগিয়ে এল। লক্ষণের তীব্র বাণ বর্ষণকে কুম্ভকর্ণ ভ্রুক্ষেপই করল না। তখন লক্ষ্মণ উগ্ৰবাণ মেরে কুম্ভকর্ণের কবচ খসিয়ে ফেলল। লক্ষ্মণের বীরত্ব দেখে কুম্ভকর্ণ বলেছিল -'লক্ষ্ণণ তোমার বীরত্ব দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি ।আমার সামনে ইন্দ্র, বরুণ, যম কেউ দাঁড়াতে পারে না। ‌তুমি সামান্য বালক হয়েও এতক্ষণ ধরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছ। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি সময় খরচ করব না ।আমি রামের সঙ্গে যুদ্ধ করব ।'লক্ষ্মণ কুম্ভকর্ণের কথা শুনে বলল-'  আচ্ছা ঠিক আছে ।রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে তোমার মনের আশ মিটিয়ে নাও ।ঐ যে রামচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধই তোমার জীবনের শেষ যুদ্ধ হবে।'
কুম্ভকর্ণকে  ক্ষিপ্র পদক্ষেপে রামের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বিভীষণ হাতে গদা  নিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়াল। ভাইকে দেখে কুম্ভকর্ণ কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল -'বৎস তুমি ভ্রাতাদের ছেড়ে রাঘবের পক্ষে যোগ দিয়েছ যখন তখন আমাকে প্রহার করতে পার।আমি আজ নিশ্চিত যে রাক্ষস কুলের মধ্যে তুমি বেঁচে থাকবে। কারণ তুমি ধর্মাত্মা। তোমার কখনও দুঃখ হবে না। এখন তুমি আমার পথ থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ আমি দেশরক্ষার জন্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছি ।আমার বিচার বুদ্ধি লোপ পেতে পারে। আমি ভুলেও তোমাকে বধ করতে চাইনা। কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারি। তাই আমার স্নেহের ভাই, তুমি আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ জ্যেষ্ঠ হিসেবে তোমাকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। দাদার কথা শুনে বিভীষণ চোখের জল ফেলতে ফেলতে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে রইল।
রামের সম্মুখীন হয়ে কুম্ভকর্ণ প্রথমে নিজের পরাক্রমের কথা ব্যাখ্যা করল। তারপর রামচন্দ্র কে বলল -' আমি জানি তুমি বিনা কারণে যুদ্ধ করছ না ।তুমি নিষ্কলুষ।আমি যেহেতু ভ্রাতার হয়ে যুদ্ধ করতে এসেছি তাই তোমাকে বধ করাটা নিশ্চিত ।মাত্র একবার তোমার বীরত্ব দেখতে চাইছি।'
  তারপর যুদ্ধ আরম্ভ হল। রাম ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ মেরেও কুম্ভকর্ণের  কোনো ক্ষতি করতে পারল না। শেষে বায়বাস্ত্র  নিক্ষেপ করে কুম্ভকর্ণের ডান হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ নাকি বা হাতে একটা গাছ উপড়ে নিয়ে রামের  দিকে তেড়ে গেল। রাম তখন ইন্দ্রমন্ত্রপুত অস্ত্র ছেড়ে কুম্ভকর্ণের বাঁ হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ মুখ হা করে রামের দিকে এগিয়ে গেল। রাম শক্তিশালী বাণ মেরে দুই পা কেটে ফেলায় কুম্ভকর্ণ মাটিতে ছিটকে পড়ল। তারপর রামচন্দ্র কুম্ভকর্ণের মাথা বিচ্ছিন্ন করে একেবারে রাবণের নগরে ফেলল। কুম্ভকর্ণের মৃত্যুর পরে রাজা রাবণ আর সমস্ত রাক্ষস কুল ভেঙে পড়েছে। কথাটা বলে ত্রিজটা কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে শোক সামলে নিয়ে বলল-' বুঝেছ মা,কুম্ভকর্ণ ইচ্ছা করলে মায়া যুদ্ধ করে প্রাণ রক্ষা করে থাকতে পারত। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ মায়া যুদ্ধকে কুম্ভকর্ণ অন্যায় যুদ্ধ বলে মনে করতেন। তাই ইন্দ্রজিৎ মায়া যুদ্ধ করে জয়লাভ করলে তিনি নাকি তাতে কোনো গৌরব নেই বলেছিলেন।
  ত্রিজটার কাছ থেকে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে শুনে আমারও চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। মনে মনে  ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালাম, কুম্ভকর্ণের আত্মা যেন শান্তি লাভ করে।

বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৪ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৪

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(৩৪)
  এই কয়েকদিন আমি বড় অশান্তিতে কাটিয়েছি। যুদ্ধ পুর্ণ গতিতে চলছে বলে জানতে পেরে আমার সঙ্গে কারও দেখা হয়নি। এমনকি পাহারা দিতে থাকা রাক্ষসীরা ও আমার কাছ থেকে বেশকিছু দূরত্ব রেখে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার দিন ত্রিজটা এসেছিল। তিনি দুঃখ করে আমাকে বলছিলেন-' জানকী, রাজা রাবণের দুর্বুদ্ধির জন্যই এখন রাক্ষস কুল ধ্বংস হবে। আজ সকালে যুদ্ধে বেরোনোর আগে রাবণকে মা নৈকসী এবং প্রপিতামহ মাল্যবান উপদেশ দিয়েছিল রামচন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার জন্য। দুজনেই লঙ্কেশ্বরকে কাছে বসিয়ে নিয়ে বলেছিল-' তুমি দেবতা, গন্ধর্ব, অসুর, নাগ, পশুপাখি সবার কাছে অবধ্য হবে বলে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিলে। সেই সময় নর-বানরকে গুরুত্ব দাওনি। এখন সামান্য বলে ভাবা এই নর-বানর তোমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেই রামচন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার জন্য উপদেশ দিচ্ছি। মনে রাখবে তুমি অমরত্বের বর  পাওনি।' কিন্তু মা এবং প্রপিতামহের কথায় লঙ্কেশ্বর  ক্রোধিত হলেন। তিনি দু'জনকেই অনেক আঘাত দিয়ে কথা বলে অভদ্রভাবে চলে গেলেন। এই বৃদ্ধ বয়সে মাতা নৈকসী ছেলের  কাছ থেকে কঠিন কথা শুনে খুব দুঃখ পেয়েছেন। লঙ্কা নগরীর চারপাশে নানা ধরনের অমঙ্গলের চিহ্ন কিছুদিন ধরে দেখে তিনি বড় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তারপরে ত্রিজটা মন শক্ত করে বলেছিল-' অবশ্য দশাননকে সহজে যুদ্ধে পরাজিত করা অসম্ভব। তিনি বুদ্ধিতে বৃহস্পতি ।এখন নগর রক্ষার জন্য লঙ্কার পূর্ব দুয়ারে রেখেছেন সেনাপতি প্রহস্তকে। তিনি সৈন‍্যসামন্ত নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন প্রতি আক্রমণ করার জন্য ।পশ্চিম দুয়ারে  সৈন্যসামন্ত নিয়ে রয়েছেন স্বয়ং ইন্দ্রজিৎ । উত্তর দুয়ারে শুক-সারণ আদি বীরের সঙ্গে রাজা রাবণ নিজে। দক্ষিণ দুয়ারে মহাপার্শ এবং সহোদর নামে দুই বীর।'কথাটা বলে আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খবরা খবর নিয়ে ত্রিজটা অশান্ত মনে বেরিয়ে গিয়েছিল
সেদিন থেকে ত্রিজটা আর অশোক বনে আসেনি।
  যুদ্ধের তীব্রতা আমি অশোক বন থেকেই অনুমান করতে পারছিলাম। অনবরত সৈন্য  সামন্ত চলাফেরার শব্দ, পতি পুত্র হারাদের  ক্রন্দনধ্বনি অশোক বনে পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার মধ্যে সবসময় ভয়,শঙ্কা এবং উদ্বিগ্নতা বিরাজ করছিল। আমিও মানসিক চাপে অশোক বনের নিচে একবার বসেছি একবার শুয়েছি। সময় কিছুতেই যায় না। এভাবে ছটফট করে থাকার সময় এককর্ণা নামে রাক্ষসী এসে হাজির হল। উত্তেজনায় তার সমগ্র মুখমন্ডল লাল হয়ে পড়েছে। ভয়ে ঢোক গিলে এককর্ণা বলল -'বাঁদর সেনা নগরের প্রাচীর ভেঙ্গে ভেতরে চলে এসেছে। প্রাচীরের চারপাশে যে সমস্ত গভীর জলের খাদ কুমির দিয়ে পরিপূর্ণ করে রাখা ছিল  সেই সমস্ত বাঁদর সেনারা  ভরাট করে ফেলেছে । বুজিয়ে  ফেলা  খালের উপর দিয়ে কোটি কোটি বানর সেনা হাতে প্রকাণ্ড শিল, গাছের ডাল নিয়ে পর্বতশীর্ষে রাক্ষস সেনা আক্রমণ করছে ।' নিঃশ্বাস না নিয়ে একনাগাড়ে বলতে থাকা এককর্ণা কথাগুলি বলে সাবধান হয়ে পড়ল। সে তখন বুঝতে পারল যে আমার কাছে তার এই কথাগুলি বলা উচিত হয়নি। এককর্ণা ভয়ে ভয়ে বলল-' 'প্রকৃতপক্ষে আমি ত্রিজটাকে এই খবরটা দিতে এসেছিলাম। আমি বেহুশের মত আপনাকে বলে ফেললাম। সে আরও কিছু বলতে যেতেই আমি বললাম তুমি কী বলছিলে আমি কিছুই শুনি নি বলে ভেবে নিও। 
আমি যুদ্ধের ভয়াবহতা অশোক বন থেকে অনুমান করার চেষ্টা করেছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে স্বামী রামচন্দ্র আমার খোঁজে অশোক বনে প্রবেশ করতে পারে বলে আশায় চেয়ে ছিলাম। সেদিন বিকেলে বিভীষণের পত্নী সরমা এল। তিনি কোনো ভুমিকা না করেই আমাকে বললেন বৈদেহী, বলতে শুনেছি রাক্ষস সৈন্যের জন্য এই যুদ্ধ হল এক নতুন অভিজ্ঞতা। বাঁদর সেনা তীর,ধনুক  নিয়ে যুদ্ধ করছে না। শিল,গাছের ডাল নিয়ে যুদ্ধ করছে। বাঁদরেরা যে ধরনে রাক্ষস সেনার উপরে শিল বর্ষণ করে গাছের ডালের আঘাতে  একদিক থেকে রাক্ষস সেনা নিঃশেষ করে চলেছে, রাক্ষস সেনার হাতের অস্ত্র হাতেই থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া বিশালদেহের বাঁদরেরা রাক্ষসের গায়ের মাংস দাঁত দিয়ে কামড়ে খন্ড খন্ড করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে ।আর ও কিছু বলতে যেতেই তার একজন বিশ্বাসী অনুচর দৌড়ে এসে জানাল যে যুদ্ধ বড় তীব্রতর হয়ে উঠেছে। কুম্ভকর্ণের পুত্র নিকুম্ভকে মহাবীর নীল বধ করেছে ।দুই পক্ষের বহু সেনা মৃত্যুর মুখে পড়েছে। খবরটা শুনে আমার চোখ জলে ভরে উঠল। হাজার হোক ভাইপো। তিনি আমাকে আর কিছুই বলতে পারলেন না। দ্রুত আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। 
সেদিন নাকি যুদ্ধ রাতেও চলছিল। অন্ধকারে রাক্ষসেরা মায়ার শক্তিতে অদৃশ্য হয়ে পড়ছিল যদিও রাম লক্ষ্মণের বাণ অদৃশ্য রাক্ষস সেনাকে বধ করছিল। 
আমি অস্থির মনে সেই রাতটা পার করলাম। পরের দিন আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীদের কথাবার্তা থেকে জানতে পারলাম যে মহাবীর ইন্দ্রজিতের সঙ্গে রামচন্দ্রের বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে মহাবীর বালীর পুত্র অঙ্গদ। অঙ্গদ নাকি ইন্দ্রজিতের অবস্থা শোচনীয় করে তোলায় উপায়হীন রাবণ পুত্র ব্রহ্মার কাছ থেকে লাভ করা বর প্রয়োগ করে মায়া যুদ্ধ আরম্ভ করেছে। ইন্দ্রজিৎ আকাশে অদৃশ্য হয়ে বাণ মেরে হাজার হাজার  বানর সেনা নিহত করছে। ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে থাকার জন্য রাম লক্ষ্মণ নাকি বাণ কোন দিক থেকে আসছে ধরতে না পেরে তারা প্রতিআক্রমণ করতে পারছে না। দাদা ভাই দুজনেই নাকি বিমূঢ় হয়ে পড়েছে ।এদিকে ইন্দ্রজিতের বাণ  দুজনের দেহ  ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে।  রাক্ষসের কথা শুনে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম।  আমার সর্ব শরীর কাঁপতে লাগল। চোখের জলে আমার দু গাল ভেসে গেল।  অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে আমি নিজের  মনকে  নিজেই প্রবোধ দিলাম,  মনে সাহস আনলাম।  তারপর গাছের নিচে  রাম বাহিনীর বিজয় এবং মঙ্গল কামনা করে  প্রার্থনায় নিমগ্ন হলাম।
  শেষ রাতের দিকে আমি রাক্ষস বাহিনীর জয়ধ্বনি শুনতে পেলাম । 'মহারাজ রাবণের  জয়, রাক্ষস গৌরব ইন্দ্রজিতের জয় ।' সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আনন্দ বাদ্যযন্ত্র বাজতে  লাগল।  আমি কান খাড়া করে  কথাগুলি শুনতে লাগলাম।  ঠিক তখনই এককর্ণা  দৌড়ে এসে তার সঙ্গীদের বলল  বড় শুভ সংবাদ।  ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে জয়ী হয়ে  ফিরে এসেছে। রাম লক্ষ্মণ দু'জনকেই ইন্দ্রজিৎ বধ করেছে।  আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না।  কাকে জিজ্ঞেস করব, কী করব কিছুই ভেবে  পেলাম না । তবু বিচলিত না হয়ে  মনটা স্থির করে ভাবলাম- আমার মন দুর্বল করার জন্য এই সমস্ত নিশ্চয়  রাবণের নতুন কৌশল। তাই অশান্ত মনে  ভোর হওয়ার জন্য  পথ চেয়ে রইলাম।  হয়তো ত্রিজটা, সরমা বা কলা   কেউ না কেউ তো আসবেই।
ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ পরে লেওয়া নামের একজন রাক্ষসী এল। আগে  তাকে আমি অশোক বনে কখনও দেখতে পাইনি। লেওয়া আমাকে প্রথমে প্রণাম জানাল। তারপর কোমল কন্ঠে বলল-' সীতাদেবী আমি মহারাজ রাবণের সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে আপনার পতি রাম এবং দেবর লক্ষ্মণ ইতিমধ্যে মহাবীর ইন্দ্রজিতের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে ।দুজনের মৃতদেহ যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছে ।আপনি ইচ্ছা করলে একবার গিয়ে দেখে আসতে পারেন ।রাজা রাবণ আপনার জন্য পুষ্পক রথ পাঠিয়ে দিয়েছেন।
লেওয়ার কথা শুনে আমার শরীর গরম হতে লাগল। আমার অন্তরে দুঃখ দেবার জন্য বিভিন্ন কৌশলে করা কার্য গুলির জন‍্য রাবণের উপরে প্রচন্ড ক্রোধে আমি দাঁত কামড়ে কিছু একটা উত্তর দিয়ে পাঠাতে গিয়ে থেমে গেলাম। হঠাৎ বুকটা ধক ধক করে  লাফাতে লাগল।  আমি যা দুর্ভাগা  হয়তো এই কথা সত্য হবে।  আমি নিঃশব্দে রথে উঠলাম।  আমার সঙ্গে উঠল পাহারা দেওয়া একদল রাক্ষসী।  ঠিক রথ চলার আগে আগে ত্রিজটা এসে আমার কাছে বসল। রথ রণক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে চলল।  অনেক দূর থেকে রক্তের স্রোত, বাঁদর , রাক্ষস এবং ভালুকের মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করলাম।  কিছুদূর যাবার পরে দেখলাম  রণক্ষেত্র নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে । রণক্ষেত্রের মাঝখানে রক্তে  মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে রাম লক্ষ্মণের দেহ।  চোখের জল ফেলে বাঁদর বাহিনী মৃতদেহ ঘিরে আছে।আমি  রথের ভেতরে অচেতন হয়ে পড়ে গেলাম।  যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম  তখন আমি পুনরায় অশোকবনে । আমি চিৎকার করে  কাঁদতে আরম্ভ করলাম।  কেঁদে-কেঁদে একটা সময় আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম ।আমার দুঃখ দেখে ত্রিজটা  সান্তনা দিয়ে বলল  মা,দুঃখ করিস না,  তোর পতি এবং দেবরের মৃত্যু হয় নাই বলেই মনে হচ্ছে । সর্প বাণে দুজনকে অচেতন করে রেখেছে বলে মনে হয়। মৃত ব্যক্তির মুখ এত সতেজ হতে পারে না।  ইন্দ্রজিৎ অদৃশ্য হয়ে  যুদ্ধ করার সময় ইন্দ্র তাকে খুঁজে পায় না।  এভাবে অন্যায় যুদ্ধ করে  ইন্দ্রজিৎ সবাইকে জয় করে আসছে। আমার মনে হচ্ছে রাম লক্ষণের মৃত্যু হয়নি  এবার ইন্দ্রজিৎ বুঝতে পারবে যে তার সর্পবাণে  অবধ্য লোক রয়েছে । তাই মা ,তুই দুঃখ করিস না। আমি যা বলেছি তাই সত্য হবে।'ত্রিজটার কথা শুনে আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।
  সেদিন বিকেলের দিকে বিভীষণের পত্নী সরমা এল। তার মনটা অন্যদিনের তুলনায়  একটু  আনন্দিত।সরমা  ফিসফিস করে বলল-'  বৈদেহী, আমার পতি বিভীষণ গোপনে তোমার কাছে আমার মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছে।  সকালে আকাশে পুষ্পক রথ দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে অত্যাচারী রাজা রাবণ ও রাম লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়েছে বলে ভাবছে।  তাই হয়তো দুজনের অসার হয়ে পড়ে থাকা দেহ   দেখিয়ে তোমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য  চেষ্টা করছে যে রাম লক্ষ্মণ ইহ সংসার থেকে বিদায় নিয়েছে । আমার চুলে হাত বুলিয়ে সরমা পুনরায় বলল-'এখন রাম-লক্ষ্মণকে সর্পবাণ থেকে কীভাবে মুক্ত করা যেতে পারে বলছি শোনো।শুধু  তুমি নয়, ইন্দ্রজিৎ, রাবণ থেকে আরম্ভ করে সুগ্রীব এবং সমস্ত বাঁদর বাহিনী ও ভেবেছিল রাম লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়েছে।  কেবল আমার পতি বিভীষণ জানত যে কোনো উপায়ে সহস্র বিষধর-সাপের বাঁধন খুলতে পারলে দুজনেই পুনরায় জীবিত হয়ে উঠবে।  তাই সুগ্রীব ,হনুমান ,জাম্বুবান ইত্যাদির সঙ্গে আলোচনা করে  থাকার সময় হঠাৎ চারপাশে প্রচন্ড বেগে তুফান বইতে লাগল।  গাছপালা উপড়ে পড়ল ,সাগরের এক একটি ঢেউ আকাশ স্পর্শ করল।  প্রত্যেকেই এক আশ্চর্য শব্দ শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল বিষ্ণুর বাহন গরুড় এসেছে। গরুড়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে  রাম লক্ষনের দেহ থেকে  সাপের বাঁধন খুলে গেল। লঙ্কার সমস্ত সর্পকুল পালিয়ে গর্তে ঢুকল। গরুড় দুজনকে  স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে রাম লক্ষ্মণ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন।  গরুড়  রাম লক্ষ্মণ এবং সমস্ত বাহিনীকে আশীর্বাদ করে চলে গেল।  তারা দুজন সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার পতি  বুদ্ধি করে এই খবর তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।  তাই জানকী তুমি চিন্তা কর না ,আমি কোনো খবর থাকলে এনে দেব। এখন আসছি। এভাবে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় নিল।
  কিছুক্ষণ পরে আমি রাম-লক্ষ্মণের ধনুর টংকার শুনলাম। সেই ধ্বনিতে সমগ্র লঙ্কা মহানগরী ধ্বনিত  হল। মাঝরাতে আমি অশোক বন থেকে আবছাভাবে  বানর বাহিনী রামের জয়ধ্বনি দিতে শুনলাম।  সকালে প্রহরীদের কথাবার্তা থেকে আমি জানতে পারলাম রাবণ নাকি রাম লক্ষ্মণের পুনরায় জীবিত হওয়ার খবর পেয়ে একা সিংহাসনে বসে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন। তারপরে ধুস্ত্রাক্ষ,ব্রজদংষ্ঠ,অকম্পণ আদি বীর সেনার  সঙ্গে সৈন্য সামন্ত দিয়ে যুদ্ধে পাঠালেন ।পরে অঙ্গদ এবং হনুমানের হাতে প্রতিটি বীরের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।‌ এখন রাম বাহিনী নাকি রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে আসছে।

বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ২৯ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস || Bideha Nandini-29

 বিদেহ নন্দিনী~ ২৯

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(২৯)
হনুমান স্বামী রামকে কতটা শ্রদ্ধা ভক্তি করত সেকথা  আমি তার বক্তব্যের মধ্যে আভাস পেয়েছিলাম। রামের সঙ্গে প্রথম দর্শনের কথা বলার সময় হনুমানের চোখ জলে ভরে উঠেছিল ।দুই হাত বুকের উপরে রেখে চোখ দুটি বুজে স্বামীর নাম স্মরণ করে সে প্রথম সাক্ষাতের কথা বর্ণনা করেছিল।
  হনুমান সুগ্রীব এবং অন্য বাঁদরেরা স্বামী রাম এবং লক্ষ্মণকে ঋষ‍্যমূক পর্বতের পাদদেশে প্রথম দেখেছিল। দুজনেরই হাতে তীর ধনুক এবং তরোয়াল দেখে বাঁদররাজ  সুগ্রীব নাকি প্রথমে ভয় পেয়েছিল। কে জানে তারা হয়তো কিষ্কিন্ধার রাজা বালীর কোনো গুপ্তচর।  যদিও সুগ্রীব নাকি ভালো করেই জানত যে দাদা বালী তাকে আক্রমণ করার জন্য ঋষ্যমূক পর্বতে কখনও আসবে না কারণ সেই পর্বতে মাতঙ্গ মুনির আশ্রম । সেই অঞ্চলে পা রাখলেই  নাকি  বালীর মৃত্যু হবে বলে মাতঙ্গ মুনির অভিশাপ রয়েছে। তথাপি রাম লক্ষ্মণকে দেখে সুগ্ৰীব দাদার গুপ্তচর বলে অনুমান করে ভয়ে অস্থির হয়ে পড়েছিল। হনুমান তাকে সাহস দিয়ে  বলেছিল-'হে মহারাজ, আপনি বালীর  এখানে প্রবেশ নিষেধ  জেনেও কেন এত ভয় পাচ্ছেন? অল্পতেই ভয় পেয়ে মনের উদ্বিগ্নতা, চঞ্চলতা প্রকাশ করে বাঁদর জাতির অস্থির স্বভাবকে প্রকাশ করছেন। আপনাকে এই অঞ্চলের সবাই বাঁদর রাজা বলে  মেনে নিয়েছে । সে রকম ক্ষেত্রে যদি আপনি নিজেই এত ভয় পেয়ে অস্থির হয়ে পড়েন,তাহলে বাকি বাঁদরদের অবস্থা কী হবে ?
হনুমানের কথা শুনে সুগ্রীব নাকি কিছুটা সুস্থির হয়ে সেই দুজন কে তা জেনে আসার জন্য তাকে পাঠালেন। 
হনুমান ভাবল যদি সে বাঁদরের রূপে গিয়ে সাক্ষাৎ করে হয়তো তাকে  কোনো গুরুত্ব দেবে না ।তাই সে নাকি তখনই একজন তপস্বীর বেশ ধরে রাম লক্ষ্মণের সঙ্গে দেখা করে বলেছিল-' হে বীরদ্বয়,আপনারা বল্কল  পরিধান করলেও দেখে বড় পরাক্রমী রাজকুমার  যেন মনে হচ্ছে। কিছু ব্রত পালন  করছেন বলে মনে হচ্ছে। রাম লক্ষ্মণের চেহারা দেখে নাকি বিস্মিত হনুমান দুজনেরই দেহের সৌন্দর্য স্পষ্ট কন্ঠে সুন্দর ভাষায় বর্ণনা করে পুনরায় বলেছিল -'আপনারা কে জানার জন্য আমি এখানে এসেছি। প্রকৃতপক্ষে আমি একজন বাঁদর।নাম হনুমান। আমার পিতা পবন দেবতা এবং মাতা অঞ্জনা। এই স্থান সুগ্রীব নামের একজন বাঁদরের অধিপতির বাসভূমি। আমি সেই ধর্মাত্মা সুগ্রীবের মন্ত্রী হনুমান। রাজা সুগ্ৰীবকে  তার দাদা বালী নানাভাবে  উৎপীড়ন  করে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি তাঁর পত্নী রুমা বালীর কবলে। সুগ্রীবের আদেশ অনুসরণ করে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। যদি ইচ্ছা করেন ধর্মাত্মা সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করতে পারেন।'
স্বামী রামচন্দ্র নাকি হনুমানের স্পষ্ট কথাবার্তা এবং ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মিত্রতায় সম্মতি জানাল। হনুমান পরমানন্দে দুজনকে কাঁধে উঠিয়ে রাজা সুগ্ৰীবের কাছে নিয়ে গেল।
রাজা সুগ্রীব নাকি রাম লক্ষ্মণের আগমনে আনন্দ লাভ করে সম্ভাষণ জানিয়ে বলল-' হে প্রভু রাম আমি হলাম বাঁদর আর আপনি জীবশ্রেষ্ঠ  নর । তথাপি আপনি আমার সঙ্গে মিত্রতা করতে চাওয়াটা আমারই সৌভাগ্য। তাই আমি আমার দিক থেকে মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দিলাম। এভাবে বলার পরে নাকি দুজন দুজনকে আলিঙ্গন করলেন।সুগ্ৰীব নাকি তার আসনের কাছে শাল গাছের ডাল ভেঙ্গে এনে আসন তৈরি করে স্বামী রামচন্দ্রকে বসিয়ে বললেন- 'হে মিত্র আজ থেকে আমরা দুজন দুজনের সুখ দুঃখের সমভাগী হব।'
হনুমান ও নাকি চন্দন গাছের একটা ডাল ভেঙ্গে এনে আসন তৈরি করে লক্ষ্মণকে বসাল। স্বামী নিজের পরিচয় এবং বর্তমানে কী উদ্দেশ্যে এখানে এসে পৌঁছেছেন সেই সমস্ত দুঃখের কথা বিশদভাবে বলতেই সুগ্রীব নাকি ভেতর থেকে একটা পুঁটলি এনে স্বামীকে দেখিয়ে বললেন যে-'  একদিন হঠাৎ আকাশ পথ থেকে একজন নারী এই পুঁটলিটা  তাদের কাছে নিচে ফেলে দিয়েছিল। নারীটি হা রাম হা রাম বলে আতুর হয়ে চিৎকার করছিল। তারা নাকি নিচে থেকে দেখে অনুমান করেছিল যে নারীটিকে কোনো রাক্ষস গায়ের জোরে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। স্বামী নাকি আমার চাদরের আঁচলে বাঁধা অলংকার দেখে শোক করতে লাগলেন।হনুমান এবং লক্ষ্মণ তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে প্রকৃতিস্থ করে তুলল।
  তারপর স্বামী রামচন্দ্র সুগ্রীবের বিষয়ে জানতে চাওয়ায় সুগ্ৰীব বলল-' হে আমার মিত্র রাঘব,আমার দুঃখের সীমা নেই। আমি অতি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা বালী আমার শত্রু ।আমার পত্নী রুমাকে গায়ের জোরে কেড়ে নিয়েছে। আমাকে বধ করার জন্য সুযোগ খুঁজছে। তাই আমি প্রাণের ভয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি। হে প্রভু, আমি আপনার একান্ত সেবক।আপনাকে আমাকে বালীর কাছ থেকে রক্ষা করতে হবে। এটা আমার আপনার কাছে প্রার্থনা। স্বামী নাকি তখনই সুগ্ৰীবকে  কথা দিলেন যে তার পত্নীকে গায়ের জোরে কেড়ে নেওয়ার জন্যই বালিকে বধ করবে।
  স্বামী দুই ভাইয়ের মধ্যে কীসের জন্য এতটা শত্রুতা তা জানতে চাইলে সুগ্রীব পুনরায় বললেন- 'এর আগে আমাদের দুজনের মধ্যে খুব মিল ছিল।এখন শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। একদিন একটি মায়াবী নামের দৈত‍্য কিস্কিন্ধা নগরের তোরণে দাঁড়িয়ে তর্জন গর্জন করে বালীকে যুদ্ধে আহ্বান করে। একজন স্ত্রীর জন্য বালী এবং মায়াবীর মধ্যে শত্রুতা ছিল। সেই সময়ে বালী ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ জেগে উঠে তার ক্রোধ হয় এবং মায়াবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে বের হয়ে আসে। আমরা সকলেই তাকে বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু বালীকে যুদ্ধে যেতে দেখে আমি ওর পেছন পেছন গেলাম। মায়াবী আমাদের দুই ভাইকে একসঙ্গে দেখে পালালো। বালী আর আমি তাকে অনুসরন করলাম। কিছুদূর যাবার পরে দৈত্যটা একটা প্রকাণ্ড গুহার ভেতরে ঢুকে গেল। বালী 'একে আজ বধ করে ছাড়ব' বলে দৈত‍্যটাকে অনুসরণ করলেন। যাবার সময় সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাকে গুহার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। এভাবে অনেকদিন পার হয়ে গেল। একদিন হঠাৎ গুহার ভেতরে গর্জন শুনতে পেলাম। তার কিছুক্ষণ পরেই গুহার মুখ দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়ে আসছে দেখে  আমি বুঝতে পারলাম মায়াবীর হাতে বালীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমার মনটা দুঃখে ভরে উঠল।
কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকার পরে আমার ভয় হল হয়তো দৈত‍্যটা  গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে মেরে ফেলবে। তাই আমি দৈত‍্যটা  যাতে বেরিয়ে আসতে না পারে, সেভাবে গুহার মুখটা একটা বিশাল পাথর দিয়ে বন্ধ করে কিস্কিন্ধায় ফিরে এলাম। বালীর মৃত্যুর খবরটা আমি কিন্তু আর কাউকে  জানাইনি। পরে মন্ত্রীরা জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারল যে বালী আর নেই। এদিকে রাজাহীন রাজ্য বিপদজনক।তাই প্রত্যেকে আমাকে নিয়ম অনুসরণ করে  রাজ সিংহাসনে বসাল। অনেকদিন পরে হঠাৎ একদিন বালী এসে উপস্থিত হল। আমি রাজ সিংহাসনে বসে ছিলাম দেখে  প্রচন্ড ক্রোধে প্রথমেই আমার মন্ত্রীদের বন্দি করল। আমাকে কেন গুহার মুখটা বন্ধ করে চলে আসতে হল সে কথা বারবার বোঝানোর জন্য চেষ্টা করেছিলাম।-' আমি সেই কাজটা ইচ্ছা করে করেছিলাম বলে ভেব না।আমাদের কপাল ভালো যে তুমি ফিরে এলে। এখন তোমার রাজ্য তুমি নাও।আমি আগের মতোই তোমার সেবক হয়ে থাকব। কিন্তু দাদা বালী আমার কথা না শুনে গালিগালাজ এবং তিরস্কার করে আমার সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিল। কথাটা বলে সুগ্রীব চোখের জল ফেলতে লাগল।
স্বামী রামচন্দ্র নাকি তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন -' হে মিত্র সুগ্রীব, তোমার শোক সম্বরণ কর। আমি নিশ্চয় তোমার উপকার করব। সুগ্রীব স্বামীকে বিশ্বাস করেছিল ঠিকই কিন্তু রামের পরাক্রমের ওপরে তার নাকি সন্দেহ জন্মেছিল। কারণ সুগ্রীব দাদা বালীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বীর যে এই সংসারে থাকতে পারে, তা ভাবতেই পারেনি। তাই নাকি দুজনকে বারবার বালীর পরাক্রমের কথা বর্ণনা করছিল। এমনকি স্বামীর বালীর সঙ্গে যুদ্ধ করার সামর্থ্য আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ভেবেছিল। মাত্র স্পষ্ট করে কথাটা বলতে পারছিল না। স্বামী আর লক্ষ্মণ নাকি সুগ্রীবের মনের ভাব বুঝতে পেরেছিল। তাই লক্ষ্ণণ হেসে জিজ্ঞেস করল-' বল তো মিত্র  দাদা কী কাজ করে দেখালে বালীকে বধ করতে পারবে বলে তোমার বিশ্বাস হবে?'
সুগ্রীব নাকি তখন দাদা বালির পরাক্রমের কথা বর্ণনা করে কয়েকটি শাল গাছ দেখিয়ে বলেছিল যে বালী এই সাতটা শাল গাছ তীর মেরে ভেদ করতে পারে। এখন রামচন্দ্র যদি এভাবে বাণ মেরে শালগাছ কয়েকটি ভেদ করে দেখাতে পারে তাহলে সে নিশ্চিন্ত হবে আর যুদ্ধে বালীকে পরাজিত করতে পারবে বলে বিশ্বাস করবে।সুগ্রীবের কথা শুনে স্বামী নাকি তার মনের সন্তুষ্টির জন্য তার দুর্জয় ধনুটা তুলে নিয়ে টংকার দেয়। তারপর একটা বাণ জুড়ে শালগাছ গুলির দিকে নিক্ষেপ করে। চোখের নিমেষেই বাণ এক এক করে সাতটি শাল গাছ ভেদ করে পুনরায় সেই বাণ স্বামীর তূনে এসে প্রবেশ করে। এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে সুগ্রীব নাকি স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। তারপর নাকি সে স্বামীকে প্রণাম জানিয়ে বলেছিল,-'হে পরমপুরুষ আমার মনে আর তিলমাত্র সন্দেহ নেই। আপনি শুধু বালী কেন, সমস্ত জগৎ কে জয় করতে পারবেন। আমাকে উদ্ধার করা কার্যে সুগ্রীব যাতে সম্পূর্ণরূপে মনোবল, বাহুবল নিয়োগ করতে পারে তার জন্য স্বামী নাকি প্রথমেই সুগ্রীবের কাজটুকু করে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন। তাই তারা খুব দ্রুত কিস্কিন্ধা যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন।

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ২৮ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,Badudeb Das.

 বিদেহ নন্দিনী~ ২৮

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(আঠাশ)

  হনুমানকে বিদায় দিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় ভুগছিলাম। সমস্ত বাধা অতিক্রম করে হনুমান গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে পারবে বলে যদিও আমার বিশ্বাস ছিল তবু এক অজানা ভয়ে আমার বুক কাঁপছিল। চিন্তা,ভয়, দুঃখ, মন খারাপ নিয়ে আমি মানুষটা স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। এদিকে রাবণ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটাতে পারে বলেও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সময় যেন আর যাচ্ছিল না। তাই হনুমান স্বামী রামচন্দ্রের বিষয়ে বলা কথাগুলি রোমন্থন করে সময় অতিবাহিত করছিলাম। হনুমানের সঙ্গে রাম লক্ষ্মণের কীভাবে দেখা হয়েছিল, আমার বিরহে স্বামী রামচন্দ্র কীভাবে উন্মাদ হয়ে পড়েছিল, সেই সমস্ত কথা বড় সুমধুর ভাষায় আমাকে বলেছিল। লক্ষ্মণের কাছ থেকে শোনা কথাগুলি হনুমান যেভাবে আমার সামনে বর্ণনা করেছিল সেই দৃশ্য যেন সে নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল।
আমাকে আশ্রমে একা ফেলে রেখে চলে যাওয়ায় স্বামী রামচন্দ্র নাকি লক্ষ্ণণের উপরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি নাকি ভাইকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন-'ভাই লক্ষ্মণ তুমি বৈদেহীকে একা কেন ফেলে রেখে এলে?আমি ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত জানকীকে  রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম। তুমি আমার আদেশ কেন অমান্য করলে? সীতার উপরে আক্রমণ করা হয়তো রাক্ষসদের উদ্দেশ্য। না হলে আমার মতো অবিকল শব্দ কন্ঠ থেকে বের করে মারীচ ওভাবে নিশ্চয় চিৎকার করত না।তুমি এই সামান্য কথাটা বুঝতে পারলে না যে রাক্ষস আমাকে বিনাশ করতে পারবে না।এখন যদি ফিরে গিয়ে আশ্রমে সীতাকে না পাই আমি বেঁচে থাকব না।'
লক্ষ্ণণ নাকি দাদাকে আমার করা ব্যবহার এবং বাক্যবাণ সহ্য করতে না পেরে চলে গিয়েছিল বলায় রামচন্দ্র পুনরায় অসন্তোষের সঙ্গে বলেছিল -'বৌদি তোমাকে এভাবে বললেও এভাবে তাকে নিঃসঙ্গ ফেলে রেখে আসা উচিত হয়নি। মেয়ে মানুষ রাগ করে কোনো কথা বললেই তুমি তোমার দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসাটা উচিত হয়েছে কি ?এভাবে ক্রোধ, ভয়,শঙ্কা নিয়ে  আশ্রমে  ফিরে এসে যখন আমাকে দেখতে পেল না স্বামী নাকি হাহাকার করতে লাগল। তিনি চিৎকার করে করে লক্ষ্মণকে বলেছিলেন-' দেখ লক্ষ্মণ সীতাকে নিশ্চয় রাক্ষস ধরে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। তোমার ভুলের জন্য সীতা আর নেই। না হলে আশ্রমের চারপাশে এরকম নিস্তব্ধ পরিবেশ কেন? অন্যদিকে জীবজন্তুরা এভাবে স্তব্ধ হয়ে  রয়েছে কেন? হরিণগুলি কেমন মন খারাপ করে আছে দেখেছ? চারপাশটা কেমন শূন্য মনে হচ্ছে। একথা বলেই তিনি নাকি আমাকে চারপাশে খুঁজতে লাগলেন। স্বামী উন্মাদের মতো হাতি, বাঘ, ভালুক, হরিণ এবং যত গাছপালা  আছে তাদের কাছে আমার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন।স্বামীর চোখজোড়া নাকি লাল হয়ে পড়েছিল। কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছিল। কেউ আমার খবর দিতে না পারায় তিনি নাকি কাঁদতে কাঁদতে লক্ষ্ণণকে বলেছিলেন-' ভাই,আমার জন্য মৃত্যুই শ্রেয়। আমি সীতাকে রাক্ষসের আহার হওয়ার জন্য এনেছিলাম। আমি মৃত্যুবরণ করব। তুমি অযোধ্যায় গিয়ে এই খবর দিও। কথাটা বলে তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলেছিলেন-' তবে লক্ষ্মণ আমি মরেও শান্তি পাব না। পরলোকে পিতৃদেব বলবে --'বাছা, তোমাকে বনবাসের আদেশ দিয়েছিলাম আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে। সেটাও তুমি সম্পূর্ণ করতে পারলে না। এখন আমার বাক্য কে রক্ষা করবে? এটাই কি পুত্রের কর্তব্য? কিন্তু সীতা অবিহনে আমি তো বেঁচে থাকতে পারব না।
দাদাকে এভাবে ব্যাকুল আর হতাশ হয়ে পড়তে দেখে লক্ষ্মণের নাকি খুব চিন্তা হয়েছিল। সে বলেছিল-' দাদা তুমি এই জগতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ।তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে বাকি সাধারণ মানুষ কীভাবে শোক সামলাবে ।প্রকৃতপক্ষে শোক করার চেয়ে বৌদির সন্ধানে যাওয়া ভালো হবে। অন্তত আমরা জানতে পারব বৌদিকে কোনো রাক্ষস বধ করেছে নাকি কেউ হরণ করে নিয়েছে। তাই মন দৃঢ় করে আমার সঙ্গে চল।আমার বিশ্বাস আমরা  নিশ্চয় কোনো না কোনো খবর পাব।'
লক্ষ্ণণের উৎসাহজনক কথা স্বামীর মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করল। তিনি লক্ষ্মণের সঙ্গে আমাকে খুঁজতে বের হলেন। দুজনেই নাকি পঞ্চবটী বন, দণ্ডকারণ্য, সমস্ত জায়গা গোদাবরী নদীর ঘাট, বালুচর, সমস্ত জায়গায় আমার খোঁজ করেন। হঠাৎ তাদের মনে হয়েছিল একটা হরিণ যেন কোনো খবর দিতে চাইছে। হরিণটা বারবার আকাশের দিকে তাকায় আর দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যায়। তবে তারা তাঁকে অনুসরণ না করার জন্য আবার ফিরে আসে। প্রথম লক্ষ্মণই নাকি ব‍্যাপারটা লক্ষ‍্য করে দাদাকে বলেছিল-' দাদা এই হরিণটা নিশ্চয় আমাদের কিছু বলতে চাইছে। না হলে সে কেন বারবার একবার আকাশের দিকে আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মণের কথাটা নাকি দাদা ও সমর্থন করায় দুজনেই হরিণটাকে অনুসরণ করল।কিছুদূর যাবার পরে তারা নাকি কিছু ফুল পড়ে থাকতে দেখল। ফুলগুলি দেখেই নাকি স্বামী চিনতে পারল‌। কারণ সেদিন সকালে তিনি নিজেই সেই ফুল আমাকে খোঁপায় বাঁধার জন্য এনে দিয়েছিলেন। ফুলগুলি দেখে স্বামী নাকি পুনরায় শোকে ভেঙ্গে পড়লেন। চোখের জল ফেলে পুনরায় এগিয়ে গেলেন ।কিছুদূর যাবার পরে তারা নাকি পায়ের ছাপ দেখতে পেলেন। পায়ের প্রকাণ্ড ছাপ এবং মাঝে মধ্যে আমার ছোট পদচিহ্ন। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আর একটু দূরে যেতেই তারা একটা ভাঙ্গা রথ, ধনুর টুকরো, সোনার কবচ, ছত্র, অজস্র রক্তের ফোঁটা দেখতে পেলেন। সেইসব দেখে নাকি স্বামী নিশ্চিন্তে হয়েছিলেন যে হয়তো আমাকে নিয়ে দুটো রাক্ষসের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। ঝগড়ায় জয়ী হয়ে  রাক্ষসটা হয় আমাকে হরণ করেছে না হয় খেয়ে ফেলেছে। সেই সময় স্বামী নাকি ক্রোধে অধীর হয়ে দেবতাদের দোষারোপ করে বলেছিল-' জানকীকে আমি আর ফিরে পাব না। অসহায় বৈদেহীকে ধর্ম ও রক্ষা করল না। দেবরাজ ইন্দ্র বা দেবতারা নিশ্চয়ই তাকে রক্ষা করতে পারত কিন্তু তারা সাহায্য করল না। দেবতারা নিশ্চয় আমাকে দুর্বল ভাবে। আমি আজ বুঝতে পারলাম যে আমার দয়া, দাক্ষিণ্য, সরল অন্তর এই সমস্ত কিছুই দোষে পরিণত হয়েছে। না হলে আমার স্ত্রীকে কোনো দুর্বৃত্ত অপহরণ করার সময় বা মেরে খেয়ে ফেলার সময় রক্ষা করার জন্য কোনো দেবতাই  এগিয়ে এল না কেন?'
তারপর নাকি তিনি ক্রোধের সঙ্গে বলেছিলেন-' লক্ষ্ণণ এখন থেকে আমার কাছ থেকে দয়া, করুণা, সরল শান্ত স্বভাব আর আশা কর না। জগত এখন থেকে আমার কেবল প্রতাপই দেখতে পাবে। আমার শর তিন লোকে জীবের জীবন স্তব্ধ করে দেবে। দেবতা, গন্ধর্ব, দৈত্য-দানব কেউ রেহাই পাবে না। আমি সৃষ্টি বিনাশ করব। পর্বতের শিখর  চূর্ণ-বিচূর্ণ করব, সমুদ্র শুকিয়ে ফেলব।' স্বামীর চোখ ক্রোধে নাকি লাল হয়ে উঠেছিল। ঘামের বিন্দু স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি লক্ষ্ণণের কাছ থেকে তীর-ধনুক নিয়ে শর যোজনা করতে যেতেই লক্ষ্মণ হাতজোড় করে প্রার্থনা করে-' হে দাদা রামচন্দ্র, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আপনি এই কাজ করবেন না। আপনার  গুণ রাশি আপনার ভূষণ ।এইগুলি আপনার যশ বাড়িয়েছে। কোনো একজন দুরাত্মার জন্য সমস্ত জগৎ ধ্বংস করবেন না। আপনি লোক পালক দাদা ।আপনার দয়া, ক্ষমা, করুনা, সরলতা এই গুণগুলি আপনার পরিচয় হয়ে থাকতে দিন। এভাবে লক্ষ্মণ অনেকক্ষণ বোঝানোর ফলে স্বামী নাকি শান্ত হয়। তার কিছুক্ষণ পরেই দুজনে নাকি পুনরায় আমার সন্ধানে খোঁজখবর শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে নাকি তারা দেখতে পায় রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকা পক্ষীরাজ জটায়ুকে। স্বামী নাকি প্রথমে জটায়ু পাখির রূপে কোনো রাক্ষস বলে ভেবেছিল। কোনোমতে হাঁফাতে হাঁফাতে জটায়ু বলে -'রাম তুমি ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়ানো তোমার পত্নী সীতাকে রাবণ হরণ করে নিয়েছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেও প্রতিরোধ করতে পারলাম না ।তারপর নাকি জটায়ুর সঙ্গে রাবণের কী ধরনের যুদ্ধ হয়েছিল আর রাবণ কীভাবে তার পা দুটি এবং পাখা কেটে ফেলে রেখে গেছে সে কথা বলেই জটায়ু প্রাণ ত্যাগ করে। জটায়ুর মৃত্যুতে দুজনেই খুব কান্নাকাটি করে‌ নিয়ম অনুসারে দাহ কার্য সমাধা করে, পিণ্ড আদি কার্য সমাধা করেন।তারপর দুজনেই পুনরায় আমার খোঁজে  দুর্গম অরণ্যের মধ্যে যাত্রা শুরু করেন। যেতে যেতে  তাঁরা একটা গুহা দেখতে পেল। ওটার ভেতর নাকি ভীষণ অন্ধকার। দুজনে গুহার সামনে দিয়ে পার হয়ে যাবার সময় একজন ভয়ঙ্কর চেহারার রাক্ষসী তাদের দিকে এগিয়ে এসে সোজা লক্ষ্মণের হাত ধরে বলল-' আমার নাম আয়োমুখী। আমি তোমাকে পতি হিসেবে গ্রহণ করছি। আমাকে পতি হিসেবে পাওয়াটা তোমার পরম ভাগ্য বলে ভাববে। তুমি আমার সঙ্গে এই অরণ্যে বিচরণ করতে পারবে।'
এমনিতেই দুজন আমার চিন্তায় ম্রিয়মাণ হয়েছিল। তারমধ্যে রাক্ষসী এসে উপস্থিত হল। রাক্ষস রাক্ষসী বললেই ওদের মনটা তিক্ততায় ভরে উঠছিল। লক্ষ্ণণ নাকি মুখে কিছু না বলে সোজা তরোয়াল বের করে তার নাক কান আর স্তন কেটে ফেলল।যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে আয়োমুখী পালিয়ে গেল।
হনুমানের কাছ থেকে ঘটনাটা শোনার পরে আমার মনটা যেন কেমন হয়ে গেল।রাগ, দুঃখে মন খারাপ ছিল বলেই একজন মহিলাকে এভাবে অত্যাচার করাটা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না ।কিন্তু সেই সময় আমাকে কীভাবে উদ্ধার করতে পারবে সেই কথায় চিন্তামগ্ন হয়ে থাকার জন্য  সেই ঘটনায় সেই সময় আমি গুরুত্ব কম দিয়েছিলাম। তবুও হনুমানকে বলেছিলাম, হে বীর, আমার স্বামী আমার জন্য আকুল হয়ে  ঘুরে বেড়াচ্ছে তার চেয়ে সুখের কথা আমার কাছে আর কিছু হতে পারে না। তাই আমাকে এই ধরনের কথাই বলে যাও। দুই দাদা ভাই মহিলার অঙ্গচ্ছেদ করার কথা আমাকে বল না।'
হনুমান পুনরায় আরম্ভ করেছিল। এই ঘটনার পরে রাম লক্ষ্মণ আরও গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে কোন দিকে যেতে হবে সেটা বুঝতে পারছিল না। এভাবে যেতে যেতে হঠাৎ তারা কিছু শব্দ শুনতে পেল। শব্দ গুলি গাছপালা ভাঙ্গার মতো। দুজনে এদিকে ওদিকে তাকাতেই একটা বীভৎস চেহারার রাক্ষসের ওপরে চোখ পড়ল।রাক্ষসটার মাথা ছিল না। পেটে একটি প্রকাণ্ড মুখ। চোখ দুটো লাল আর বড়। তার হাত দুটি বেশ লম্বা। শরীরটা নাড়াচাড়া না করে বসে থাকা থেকে অনেক দূরের জিনিস ও নাগাল পায়। রাক্ষসটার নাম কবন্ধ। রাম লক্ষণ সাবধান হতে না হতেই কবন্ধ হাতের দ্বারা দু'জনকেই কাছে টেনে আনল। তারপর নাকি গর্জন করে বলল -'তোরা দুটি কে? সন্ন্যাসীর সাজপোশাক পরেছিস। কিন্তু হাতে তরোয়াল, কাঁধে  ধেনু।এই অরণ্যে কী কাজে এসেছিস? তাদের উত্তরের অপেক্ষা না করে রাক্ষসটা পুনরায় বলেছিল-' আচ্ছা ভালোই হয়েছে। তোরা আজ আমার মুখের সামনে এসে উপস্থিত হলি।  কী খাব কী খাব বলে মনে হয়েছিল। এখন তোরা দুজনেই আমার আহার হবি ।'
দুজনেই নাকি যথেষ্ট ভয় পেয়েছিল।লক্ষ্মণ দাদাকে রাক্ষসের হাত দুটি কাটার কথা বলায় কবন্ধ  রেগে উঠে লক্ষণকে মুখের ভেতর ঢোকাতে  যেতেই রাম তরোয়াল দিয়ে তার ডান হাতে কোপ বসাল। সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণও এক কোপে বাঁ হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারপর এক আশ্চর্য কান্ড ঘটল। কবন্ধ নাকি  জ্ঞানী মানুষের মতো বলতে লাগল-' হে নরশ্রেষ্ঠ, আমি এখন বুঝতে পারলাম আপনারা কে? আপনারা আমার দুটি হাত কেটে রাক্ষস জীবন থেকে মুক্তি দিলেন। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ আমার কথা শুনে যান।এভাবে বলে কবন্ধ তার  কথা বলতে লাগল। আগে নাকি কবন্ধ এরকম কুৎসিত চেহারার  ছিলনা।বড় সুন্দর পুরুষ ছিল। লোকসমাজে তার প্রভাব ছিল অসীম। কিন্তু তার মতিগতি ভালো ছিলনা। শৈশবে ভয়ানক রাক্ষসের রূপ ধরে সবাইকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পেত।বিশেষ করে ঋষি মুনিদের । একদিন স্থূলশিরা নামের একজন  মহর্ষিকে ভয় দেখাতে যেতেই ঋষি অভিশাপ দিলেন-'  দুরাত্মা,  তুই যে বীভৎস চেহারা সেজে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছিস তোর সেই চেহারা স্থায়ী হোক। ঋষিকে কাকুতি-মিনতি করায়   তিনি নাকি বললেন যখন রাম লক্ষ্ণণ দুই ভাই  তোর দুটি হাত  কেটে তোকে জ্বালিয়ে দেবে তখনই তুই তোর পূর্বের রূপ ফিরে পাবি।'
ঋষির শাপে কবন্ধ রাক্ষস হয়ে পড়ল। এবার নাকি দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য  কবন্ধ তপস্যায় বসল।  ব্রহ্মা তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে সেই আশীর্বাদ প্রদান করলেন।  দীর্ঘজীবী বর লাভ করার পরে কবন্ধ নাকি আরও অত‍্যাচারী  হয়ে উঠেছিল । এমনকি দেবরাজ ইন্দ্রকে জয় করার জন্য স্বর্গ আক্রমণ করেছিল। ইন্দ্র তার বজ্র নিক্ষেপ করে কবন্ধের  মুখ, মাথা চোখ আদি শরীরের বিভিন্ন অংশ ভেতরে ঢুকিয়ে চিহ্ন নাই করে দিল।কবন্ধ অনেক প্রার্থনা করার পরে ইন্দ্র নাকি তার হাত দুটিকে লম্বা করে দিল যাতে নাড়াচাড়া না করে বসা থেকেই শিকার ধরে খেতে পারে। মুক্তির বিষয়ে দেবরাজ ইন্দ্র নাকি সেই একই কথা বলল। কবন্ধের কথা শোনার পরে দুই দাদা ভাই নিজেদের দুর্দশার কথা  জানাল।তাদের কথা শুনে কবন্ধ নাকি বলল-' আমার আত্মা  রাক্ষস দেহে আবদ্ধ হয়ে থাকা পর্যন্ত আমি পূর্বের দিব্য দৃষ্টি লাভ করতে পারব না আপনারা আমার দেহটা দাহ করলে আমি হয়তো আপনাদের উপকারে আসা কিছু কথা বলতে পারব। রাম লক্ষ্ণন কবন্ধের ইচ্ছা পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে দিব্যরূপী কবন্ধ বলতে লাগল-' হে রাঘব, দুর্দশা ভুগতে থাকা একজন ব্যক্তি একজন দুর্দশাগ্রস্ত লোকের কাছ থেকেই সাহায্য লাভ করে এই নীতিকে সমস্যা বলা হয় । সীতাদেবী কে খুঁজে পাবার জন্য যার কাছ থেকে সাহায্য খুঁজে নিতে হবে তার নাম হল সুগ্রীব। একজন বাঁদর। তিনি বর্তমানে ঋষ্যমূক পর্বতের একটি গুহায় চারজন সহচরের  সঙ্গে বাস করছে। দাদা বালী তাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সুগ্ৰীবই হবে  তোমার মিত্র। সুগ্রীব সূর্যদেবতার পুত্র। এই জগতে যত রাক্ষস আছে সবাই সুগ্রীবের কথা জানে । তাই তোমার সীতাকে উদ্ধার করায় কোনো অসুবিধা হবে না। তোমরা এই জায়গা থেকে পশ্চিম দিকে যেতে থাক। যেতে যেতে একটা পদ্ম ফুলের মনোরম সরোবর দেখতে পাবে।নাম পম্পা সরোবর।তার ফুল কখনও মূর্ছা যায় না।আর কেউ ছি়ঁড়ে না।পম্পা সরোবরের পূব দিকে ঋষ‍্যমূক পর্বত। তুমি সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা করলেই সুফল পাবে। আর সেও তার হারানো রাজ্য ফিরে পাবে।একথা বলে কবন্ধ অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর নাকি রাম লক্ষ্মণ তাদের প্রতীক্ষায় থাকা তপস্বিনী শবরীর আশ্রমে প্রবেশ করে তার আতিথ্য গ্রহণ করলেন।
হনুমানের  মুখে কথাগুলি শোনার পরে আমি ভাবুক হয়ে পড়েছিলাম। এতদিন আমার মনে গুমড়ে থাকা কিছু কথা মনে পড়ছিল। আমাকে রাবণ হরণ না করলে স্বামী কখনও শবরী  আশ্রমে বা কবন্ধ বাস করা সেই গভীর অরণ্যে প্রবেশ করতেন না ।কারণ জনস্থানের রাক্ষস বধ করার পরে আমরা তিনজনেই আলোচনা করে বনবাসের শেষের বছরটা কেবল পঞ্চবটীতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাকে কথা দেওয়ার পরে স্বামী পুনরায় পঞ্চবটী ছেড়ে কোথাও যাবার প্রস্তাব দিতেন না । রাম কবন্ধকে রাক্ষস জীবন থেকে মুক্তি দিতে পারবে বলে উচ্চারণ করা মহর্ষি ব্রহ্মা এবং ইন্দ্রের  কথা সত্যে প্রতিষ্ঠা করার কোনো সুবিধাই থাকত না। ঠিক সেভাবে রাম লক্ষ্মণ শুশ্রূষা করার পরে দেহত্যাগ করার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকা তপস্বিনী শবরীর বিষয়ে শোনার পরে আমার সন্দেহ দৃঢ় হল যে রাবণের দ্বারা  আমাকে হরণ  করানোর কার্য করিয়েছে দেব দেবতারা সবাই মিলে। তাদের ইচ্ছায় আমরা নেচেছি। তারা চেয়েছেন যে আমার স্বামীর দ্বারা পরম প্রতাপী রাবণের সঙ্গে জগতের সমস্ত রাক্ষসকুল নিধন হোক।তার জন্য প্রয়োজন হলে আমার জীবনের অন্ত হোক বা কাল পর্যন্ত কলঙ্ক থাকা ঘটনা ঘটুক বা আমি পথের ভিখারী হই তাতে দেব-দেবতাদের কোনো ক্ষতি হবে না ।কথাটা ভেবে আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম।কিন্তু পরে হনুমান স্বামীর সঙ্গে তার প্রথম দর্শনের কথা বলতে আরম্ভ করায় আমি বাস্তবে ফিরে এলাম। 


বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ২৬ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস Bideha Nandini- 26

 বিদেহ নন্দিনী~ ২৬

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(ছাব্বিশ)

ভোর রাতের স্বপ্ন ফলবেই এমন কথা যদিও বিশ্বাস করিনা,ত্রিজটার স্বপ্ন আমাকে কিছুটা মনোবল জুগিয়েছিল। তাই অনেকক্ষণ ত্রিজটার কথাগুলি মনের মধ্যে রোমন্থন করছিলাম। হঠাৎ  কাউকে আস্তে কিন্তু স্পষ্ট কন্ঠে স্বামী রামচন্দ্রের গুণানুকীর্তন করতে শুনলাম। আমি এদিক ওদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে মনের ভুল ভাবলাম। অনাহারে অনিদ্রায় থাকায় আমার মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করছে না বলে মনে হল।  তারমধ্যে দুদিন থেকে আমার  অনবরত বাঁচোখ ,বাহু, দাবনা কাঁপছিল। বোধহয় দুর্বল হওয়ার জন্য  স্নায়ুর  বিকার ঘটেছে। একদিন ত্রিজটাকে  জিজ্ঞাসা করায়  আশ্বাস দিয়ে বললেন -'বাঁ দিকের চোখ কাঁপা ভালো। শুভসংবাদ পাবি।' আমি ত্রিজটার কথায় কিছুই বললাম না। মনে হল তার স্বভাব এরকমই । প্রতিটি কথারই অর্থ খুঁজে পায় । তাছাড়া আমার মনকে ভালো রাখার জন্যই কখনও খারাপ কথা বলে না। কিছুক্ষণ পরে আবার একইভাবে সুমধুর সুরে কাউকে আমাদের অতীত ইতিহাস কীর্তন করতে শুনলাম। কেউ নির্ভুলভাবে স্বামী রামচন্দ্রের জন্ম রহস্য, বিবাহ,রাজা দশরথের দ্বারা  রামচন্দ্রের অভিষেকের আয়োজন, মাসি শাশুড়ির কুবুদ্ধির ফলে  বনবাসে আগমন, বনবাসে রামচন্দ্রের স্বর্ণমৃগের সন্ধানে যাওয়া এবং রাবণ কর্তৃক সীতা হরণ, রামচন্দ্র পত্নীর খোঁজে কীভাবে সর্বত্র তল্লাশি করে বেড়াচ্ছেন এই সমস্ত কিছুই সুললিত স্বরে পাঠ করার মতো বলে চলেছে। আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, গলা বাড়িয়ে এদিকে ওদিকে তাকালাম। হঠাৎ গাছের উপরে একটা ছোট বাঁদরকে দেখতে পেলাম। বাঁদরটা স্থির ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ভাবলাম এটা কে? মায়াবী রাক্ষস নাকি?  আমি বাঁদরটাকে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলাম। ইতিমধ্যে বাঁদরটা গাছ থেকে নেমে এসে আমাকে হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে ছিল। বাঁদরটাকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল এটা মায়ার সাহায্যে বাঁদরের রূপ নিয়েছে ঠিকই কিন্তু রাক্ষস নয়। হলেও আমার বিপদের বন্ধু হতে পারে। আমি মনের ভেতর কথাগুলি চিন্তা করে থাকার সময়ে বাঁদরটা খুব ভক্তিভাবে বলতে শুরু করল- হে মা, আপনি কে? আপনার তপস্বিনীর বেশ, চোখের জল দেখে আমার মনে হচ্ছে আপনি বোধহয় সীতাদেবী, দণ্ডকারণ্য থেকে যাকে হরণ করা হয়েছিল। সকাল থেকে গাছের ডালে নীরবে বসে থেকে সমস্ত কথাবার্তা শুনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে। তাই হে মাতা, প্রভু রামচন্দ্রের দূত হয়ে আমি যার অন্বেষণে এখানে এসেছি আপনি সেই সীতাদেবী নন কি?

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাঁদরটা নিজের পরিচয় দিল- 'আমি প্রকৃতপক্ষে কিস্কিন্দার রাজা সুগ্রীবের মন্ত্রী,মহারাজ সুগ্রীব রামচন্দ্রের পরম মিত্র এবং আমি প্রভু রামচন্দ্রের পরম ভক্ত। আমার নাম হনুমান।আমার পিতা বায়ু দেবতা এবং মাতার নাম অঞ্জনা।' তারপরে হনুমান রাম লক্ষ্ণণের  সঙ্গে কীভাবে দেখা হল, সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা হল,সমস্ত কিছু সংক্ষেপে বর্ণনা করল। হনুমানের কথাগুলো শুনে আমার বিশ্বাস হয়েছিল যদিও এখনও সন্দেহ দূর হয়নি। আমার ইতস্ততঃ মনোভাব দেখে বাঁদরটা স্বামী রামচন্দ্রের শরীরের বিভিন্ন চিহ্ন বর্ণনা করল এবং আমরা দুজন আলাপ করা কিছু কথা বলল। যে সমস্ত আমাদের দুজনের বাইরে আর কারও পক্ষে জানার উপায় ছিল না। তবুও আমার মন পরিষ্কার না হতে দেখে বাঁদরটা পুনরায় বলল-হে জনক  নন্দিনী, আপনি আমাকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করবেন না। আমি এরকম একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে সন্দেহ করেছিলাম। তাই প্রভু রামচন্দ্র সব সময় পরে থাকা আংটিটা আপনাকে দেখানোর জন্য আমাকে দিয়ে পাঠিয়েছে। স্বামীর নাম চিহ্নিত করা আংটিটা দেখেই আমি চিনতে পারলাম। বিয়ের দিন হোমের গোড়ায় পরানো আংটি। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু বইতে লাগল। আমি রুদ্ধ কন্ঠে বললাম-' হে পরম সুহৃদ তুমি রাক্ষসের দ্বারা বেষ্টিত সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত এই রাক্ষস পুরীতে কীভাবে এসে পৌঁছালে তা ভেবে অবাক হচ্ছি। তুমি যে অসাধ্য সাধন করে আমাকে খুঁজে বের করেছ এটি তোমার দৃঢ়তা,কার্য ক্ষমতা শক্তি এবং অপরাজেয় মনের পরিচায়ক। তোমার প্রভুর তুমি উপযুক্ত দূত। তবে এখানে প্রকাশ্যেই এভাবে কথা বলা সমীচীন হবে না। তাই অতি সাবধানে আমাদের কথা বলতে হবে। আজ আমার কপাল ভালো। ত্রিজটা আমাকে পাহারা দেওয়া সমস্ত রাক্ষসীকে তাড়িয়ে দিয়েছে। হনুমানকে আমার মিত্র বলে জানার পরে আমি স্বামীর বিষয়ে জানার জন্য ব্যগ্ৰ হয়ে পড়লাম।অনেক প্রশ্ন একসঙ্গে মনের মধ্যে ভিড় করে এল। তবুও আমার মনের মধ্যে মাঝেমধ্যে উদয় হওয়া কথাটা জিজ্ঞেস করলাম- 'হে বীরশ্রেষ্ঠ হনুমান,প্রথমেই আমি তোমার কাছ থেকে একটা কথা জানতে চাইছি। আমার স্বামী রামচন্দ্র এতদিন কেন আমাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেনি। তিনি তো ত্রিভুবন কাঁপানো পুরুষ। নাকি চোখের আড়াল হওয়ার  সঙ্গে সঙ্গে আমি মনের আড়ালেও চলে গেছি। অনেকদিন হয়ে যাওয়ায় আমার প্রতি তার স্নেহ কমে গেল নাকি? প্রশ্নগুলি করার সময় আমাকে শোক ঘিরে ধরেছিল। তাই স্পষ্ট কন্ঠে কথাগুলি বলতে পারছিলাম না।

হনুমান আমার কথা বুঝতে পারল। সে আমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য বলল-' হে দেবী, প্রভু রামচন্দ্র জানে না যে আপনি লঙ্কাতে আছেন। আমি গিয়ে বললে তবেই জানতে পারবে। তারপরে দেখবেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাগরে সেতুবন্ধ করে সোজা আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। আপনিতো দেখেননি প্রভু প্রিয়তমা পত্নীর চিন্তায় কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। সব সময় আপনার ভাবনায় ডুবে থাকেন। পত্নী সীতাদেবীর গুণের কথা বলতে গিয়ে তার কথা যেন আর শেষ হতে চায় না। হে মাতা, প্রভু রামচন্দ্র এক মুহূর্তের  জন্যও আপনার কথা ভুলে যায়নি। আপনার বিরহে খেতে বা শুতে পারছেন না। মশা কামড়ালেও টের পান না। কখনও কিছুক্ষণের জন্য ঘুম এলেও পরমুহূর্তে আপনার নাম ধরে চিৎকার করে উঠেন।'

স্বামী আমার বিরহে ব্যাকুল হয়ে রয়েছে বলে জেনে অন্তরটা ভরে উঠেছিল। যদিও তাকে এত দুঃখ সহ্য করতে হয়েছে ভাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকটা ব‍্যথায় ভরে গেল। তাই হনুমানকে দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়া ভালো হবে ভেবে বললাম- 'হে রামভক্ত হনুমান, তোমাকে দুদিনের মতো লুকিয়ে থেকে যাবার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমি সেই কথা বলতে পারব না। তুমি অতি শীঘ্র গিয়ে স্বামীকে আমার খবর দিয়ে উদ্ধার কাজের ব্যবস্থা কর। না হলে আমার জীবনের অন্তিম কাল ঘনিয়ে আসতে আর মাত্র দুমাস বাকি।  সকালে তুমি গাছের ডাল থেকে রাবণের সমস্ত কথা নিশ্চয়ই শুনেছ। আমার একটা দিনই এক যুগ বলে মনে হচ্ছে। আমি দিন দিন যেভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছি, স্বামী উদ্ধার করার আগেই আমার প্রাণ বায়ু বেরিয়ে যাবে মনে হচ্ছে । আমার কথা শুনে দয়ালু হনুমান অন্তরে বড় দুঃখ পেল। সে আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল-' হে মাতা, আপনি চিন্তা করবেন না । আমি গিয়ে প্রভু রামচন্দ্রকে আপনার খবর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এসে পড়বেন। আপনি যদি ইচ্ছা করেন,আমি এখনই আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। আপনি আমার পিঠে উঠে বসুন, আমি এক লাফে সুবিশাল সমুদ্র পার হয়ে আপনাকে প্রভু রামচন্দ্রের কাছে নিয়ে যাব। হনুমানের কথা শুনে আমার প্রথমবারের জন্য মুখে হাসি বের হল। আমি বললাম -'তুমি কী আশ্চর্য কথা বলছ? এত ছোট বাঁদর একটা আমাকে কীভাবে পিঠে তুলে নেবে? সঙ্গে সঙ্গে হনুমান আমার কাছ থেকে একটু দূরে সরে গেল। কয়েকটি গাছের আড়ালে সে শরীরটা এভাবে বাড়াতে লাগল যে হনুমানের মাথা আকাশ পর্যন্ত গিয়ে স্পর্শ করল। শরীরটা মেরু পর্বতের মতো হল। আমি অবাক হয়ে সেই রূপ দর্শন করলাম।তারপর বললাম-'হে বাছা, তুমি যথার্থই বায়ুপুত্র। তুমি এই মুহূর্তে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস হয়েছে। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে তিনটি কারণে যাবনা। প্রথমটি হল, তুমি উড়ে যাওয়ার সময় আমি হয়তো ঠিক ভাবে বসতে না পেরে সাগরে পড়ে যাব। দ্বিতীয়ত, আমাকে নিয়ে যেতে দেখলে রাক্ষসরা দলবেঁধে তোমাকে আক্রমণ করবে। তুমি আমাকে পিঠে নিয়ে প্রত্যাক্রমণ  করতে পারবেনা। তৃতীয়তঃ তুমি আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলে আমার স্বামী রামের গৌরব হবে না। তিনি নিজে এসে দুরাত্মা রাবণকে বধ করে আমাকে উদ্ধার করুক। তাই তুমি যেভাবে এসেছিলে সেভাবে দ্রুত গিয়ে রামকে আমার সংবাদ দাও। হনুমান বলল-' আমার সঙ্গে যে  আপনার দেখা হয়েছে প্রভু রামচন্দ্রকে সেকথা বিশ্বাস করানোর জন্য কিছু একটা চিহ্ন দিয়ে দিন।'

হনুমানের কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেল। কী চিহ্ন দিয়ে পাঠাব। আমার হাতে কী আছে। যে কয়েকটি অলংকার দেহে ছিল সেগুলিও রাবণ হরণ করার সময় চাদরের আঁচল ছিঁড়ে  বানর দলের মধ্যে এই ভেবে ফেলে দিয়েছিলাম- যেন এই অলংকার গুলি স্বামীকে দেখিয়ে আমার খবর দিতে পারে। এখন চিহ্ন হিসেবে দিয়ে পাঠানোর মতো আমার হাতে কিছুই নেই। তাই ভাবলাম হনুমানকে এমন একটা কথা বলি যা আমাদের দুজনের বাইরে আর কেউ জানে না। কথাটা হল -আমরা চিত্রকূটে বাস কটার সময় একদিন একটা দাঁড়কাক আমাকে বড় বিরক্ত করছিল। সে বারবার আমাকে ঠোকর দিচ্ছিল। আমি তাকে তাড়ানোর জন্য মাটির ঢিল ছুঁড়ে মেরেও কোনো কাজ হচ্ছিল না। স্নান করতে যাওয়ার পরেও ওটা বারবার উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিল। স্বামী রামচন্দ্র দাঁড়কাকটার কান্ড দেখে বেশ মজা পেয়েছিল এবং আমাকে ক্ষ্যাপাচ্ছিল। আমি অভিমান করে তার বসে থাকা অবস্থায় কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে যখন আমি জেগে উঠলাম স্বামী বললেন ‘এখন আমার পালা’ বলে তিনি আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঠিক তখনই দাঁড়কাকটা এল। সে বারবার আমার বুকে ঠোকরাতে লাগল। স্বামীর ঘুম ভেঙ্গে যাবে ভেবে আমি নড়াচড়া না করে চুপ করে বসে রইলাম। দাঁড়কাকটা ঠুকরে ঠুকরে রক্ত বের করে দিল। তখনই স্বামী রামচন্দ্র জেগে উঠলেন। আমার অবস্থা দেখে তিনি দাঁড়কাকটার উপর প্রচন্ড ক্রোধে কুশ বন নিয়ে ব্রহ্মাস্ত্র মন্ত্রে বেঁধে দাঁড়কাকটার দিকে নিক্ষেপ করলেন। ব্রহ্মাস্ত্র দাঁড়কাকের দিকে তেড়ে গেল।  ভয়ে কাকটা ত্রিভুবন ঘুরে বেড়াল। নিরুপায় হয়ে  কাকটা এসে স্বামীর পায়ে আশ্রয় নিল। তখন আমরা জানতে পারলাম, কাকটা প্রকৃতপক্ষে দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র। স্বর্গ থেকে নেমে এসে ছদ্মবেশে নানা দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়েছিল। সমস্ত কিছু জানার পরে রামচন্দ্র বললেন -'তোমার প্রাণ রক্ষা করলাম,কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র কিছু একটা বিনাশ করবেই। তখন কাকরূপী ইন্দ্রপুত্র বলল- 'আমার একটা চোখকে বিনষ্ট করুন।'

প্রাণরক্ষা হওয়ায় ইন্দ্রপুত্র স্বামীকে প্রণাম জানিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। ঘটনাটা বলে আমি হনুমান কে অনুরোধ করলাম-' হে বীর, এই কথাটা যে ভাবে বলেছি সেভাবেই গিয়ে রামকে বলবে ,আর বলবে যে আমাকে আঘাত করার জন্য তিনি একটা সাধারন কাককেও ব্রহ্মাস্র  নিক্ষেপ করেছিলেন। এখন রাক্ষসরাজ রাবণ আমাকে হরণ করে এত অত্যাচার করা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে সহ্য করে চলেছেন?

আমার কথা শুনে হনুমান আশ্বাস দিয়ে বলল-' হে, মাতা জনক নন্দিনী, আমি আপনার অন্তরের দুঃখ ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। আমি সমস্ত কথা প্রভুকে বিস্তৃতভাবে বলব। এখন আমি বিদায় ভিক্ষা করছি।' এ  কথা বলে হনুমান  আমার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে প্রণাম জানিয়ে প্রস্থান করল।

কিছুক্ষণ পরে হনুমান পুনরায় ফিরে এসে বলল- 'হে দেবী , আপনাকে একটা কথা বলে যাবার জন্য এলাম।‍ লংকা এসেছি যখন এদের শক্তির সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়ে যেতে চাই। তাই আমি কিছু অঘটন ঘটাব। আপনি ভয় পাবেন না ।'এই বলে সে পুনরায় বিদায় নিয়ে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পরে হনুমান  তার দেহটা বিশাল করে রাবণের অশোক বন একদিক থেকে উচ্ছন্ন করে যেতে লাগল। কেবলমাত্র আমার বসে থাকা ঔষধ গাছ এবং তার আশেপাশের কিছু গাছ বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত গাছ উপড়ে ফেলে বিশৃংখলার সৃষ্টি করল। আমাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। ওদের দেখে হনুমান শরীরটাকে আর ও বড় করে তুলল। রাক্ষসীরা আমাকে জেরা করতে লাগল-' সীতা এ কে? এখানে কেন এসেছিল? কে পাঠিয়েছিল? আমাদের সমস্ত কিছু খুলে বলতে হবে।'

আমি নির্ভীকভাবে বললাম-' আমি কীভাবে জানব? তোমাদের এই মায়াপুরীতে  কে কখন কী রূপ ধারণ করে তোমরাই তো জানবে। রাক্ষসীরা পুনরায় বলল-' তোমাকে তার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম।' আমি অবাক হয়ে বললাম -'কী সব বলছ? আমি ওকে দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়েছি। কথা বলতে যাব কেন? রাক্ষসীরা  আমার কথায় বিশ্বাস করল না ।ওরা  দ্রুত রাবণের কাছে গিয়ে নালিশ করল।


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...