Santosh Kumar Karmakar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Santosh Kumar Karmakar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৩১ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Santosh Kumar Karmakar

হে আমার স্বদেশ- ৩১

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(৩১)

প্রতি বছরের মতো এবারও লক্ষ্মীনাথ নিজের বাড়িতে কলকাতায় থাকা সমস্ত অসমিয়া আত্মীয়-স্বজন,বন্ধুবান্ধব এবং কলেজ স্ট্রিট, প্রতাপ চ্যাটার্জী স্ট্রিটের অসমিয়া ছাত্রদের ডেকে শঙ্করদেবের জন্মতিথি পালন করল। যতই জরুরি থাকুক না কেন, বিশেষ এই দিনটিতে লক্ষ্মীনাথ নিজের ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজ করে না। দুদিন আগে থেকে নিমন্ত্রণ এবং প্রসাদের জন্য বুট-মুগ, ফল-মূল কিনে আনে। গুরুজনার তিথির দিন ঘরের পরিবেশটা শিবসাগরের পৈতৃক বাড়িটার মতো হয়ে পড়ে। শুধু সাদা পাজামা এবং আসাম সিল্কের পাঞ্জাবি পরে গলায় ফুলাম গামছা পরে সাত্ত্বিক আচার-আচরণের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ সত্রের গোঁসাইর রূপ ধারণ করে।

রত্নেশ্বর মহন্ত ছাত্রদের দিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজটুকু করিয়ে নেয়। আয়োজন সমাপ্ত হলে সবাই নাম প্রসঙ্গে বসে। নাম চলে। নামের শেষের দিকে লক্ষ্মীনাথ নিজে ভোরতাল নিয়ে উচ্চকণ্ঠে নাম গান গাইতে শুরু করে। এবারও সবকিছু সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হল। ভাব গম্ভীর কন্ঠে রত্নেশ্বর মহন্ত ভাগবতের একটি অধ্যায় পাঠ করলেন। তারপর উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে প্রসাদ বিতরণের পর্ব চলল। এই সময় লক্ষ্মীনাথের মাথা ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে মাথা ঘোরানিটা বেড়ে গেল। কিন্তু নিজের শারীরিক অসুবিধার কথা কাউকে বলল না। সবাই বিদায় নেওয়ার পরে ভেতর মহলে আসার পরে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তারপরেই তার নাক দিয়ে কাঁচা রক্ত পড়তে লাগল।

পিতার নাক দিয়ে রক্তের ধারা বইতে দেখে অরুণা চিৎকার করতে লাগল। প্রজ্ঞা সহজে বিচলিত হয় না। সে ধৈর্য হারায় না।প্রতিকূল কিছু ঘটলে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে।অরুণাকে চিৎকার করতে নিষেধ করে সে স্বামীর কাছে এগিয়ে এল। লক্ষ্মীনাথের কাঁধে থাকা উত্তরীয় দিয়ে নাক মুখ মুছে দিয়ে ঠান্ডা জলে কপাল-মাথা ধুয়ে দিল। পুনরায় ধীরে ধীরে কপাল মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে শোবার কোঠায় এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপরে একগ্লাস জল খাইয়ে তার কাছে বসল।

পত্নীর সেবা শুশ্রূষা পেয়ে লক্ষ্মীনাথ আশ্বস্ত হল। তবে তার শরীরে সীমাহীন ক্লান্তি। সঙ্গে কী রকম একটা আমেজ, কীরকম এক প্রশান্তি। লক্ষ্মীনাথের চোখ জোড়া আপনা থেকেই বুজে এল।

সব সময়েই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত, কাজের মধ্যে ও কথায় নানা অঙ্গভঙ্গি করে সবাইকে হাসাতে থাকা বাবাকে এভাবে চোখ বুজে নির্জীব হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে কিশোরী অরুণা অস্থির হয়ে' পাপা' বলে ডাকতে শুরু করল। কিন্তু প্রজ্ঞা মুখে আঙ্গুল রেখে তাকে চুপ থাকতে বলল। পরমেশ্বর ব্রহ্ম বলে জ্ঞান করা মহাপুরুষ শংকরদেবের জন্মতিথিতে এভাবে নাম প্রসঙ্গ করে ভক্তদের আপ্যায়ন করার পরে লক্ষ্মীনাথ আধ্যাত্বিক আত্মপ্রসাদ লাভ করে। তারপরেও তার অন্তরে যেন আরও কীসের একটা যন্ত্রনা থেকে যায়। এভাবে নাক দিয়ে রক্তক্ষরণটা তারই কোনো বহিঃপ্রকাশ নাকি?

প্রজ্ঞা প্রশ্নটার উত্তর পেল না। কিন্তু তিনি ভালোভাবে বুঝতে পারলেন যে এখন দীর্ঘ সময়ের জন্য লক্ষ্মীনাথের বিশ্রামের প্রয়োজন। ঘুমে ঢলে পড়ার পরেও কিছুক্ষণ মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে আদর করে বিছানার ওপরে মশারি টাঙিয়ে দিল। তারপর আলো কমিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞা অরুণাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

একনাগারে কয়েক ঘণ্টা গভীর নিদ্রায় অতিবাহিত করার পরে শরীরের ক্লান্তি‐ অবসাদ নাই হয়ে গেল। রাত পার হয়ে ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ভোরের কোমল আলো ভেসে এল। ঘুম আসার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে পুনরায় সেই শৈশবে ফিরে গেল।

শৈশবকালে লক্ষ্মীনাথ এবং তার দাদা ভাইদের দেখাশোনা করা রবিনাথ দাদু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে পারত না।এদিকে লক্ষ্মীনাথের পিতৃদেব ছিলেন ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করা পুরুষ। দেরি করে ঘুমোতে দেখলেই পিতৃদের বকাবকি করে রবিনাথকে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিত। এখন লক্ষ্মীনাথ সেই দৃশ্যটিকে স্বপ্নে দেখতে লাগল। লক্ষ্মীনাথ দেখল-বাবা বকাবকি করছে,'অলস অকর্মণ্যের মতো তুমি এখনও বিছানায় পড়ে আছ। এতই ঘুম। শক্ত সমর্থ শরীরটাতে এত আলস্য।'

তখনই লক্ষ্মীনাথের ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করল মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখ মেলে তাকিয়েই দেখল, পাশে বসে প্রজ্ঞা তারদিকে মমতা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।

' ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসছিলে।' প্রজ্ঞা বলল,' স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?'

ঘুমিয়ে পড়ার পরে লক্ষ্মীনাথ সারারাতে একবারও জেগে উঠে নি যদিও প্রজ্ঞা ঘুমোতে পারেনি। পাশের বিছানায় মেয়ে দুটিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে স্বামীর কাছে বসে পুনরায় তার নাক থেকে রক্ত বেরিয়েছে কিনা, কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা লক্ষ্য করেছে এবং কিছুক্ষণ পরে পরে আদর করে তার মাথা পিঠ মালিশ করে দিয়েছে। এটা লক্ষীনাথ ও জানে। অসুস্থ অবস্থায় সে পত্নীর ভালোবাসা আর ও নিবিড়ভাবে অনুভব করে। শুধুমাত্র রন্ধন বিদ্যায় নিপুণা নয়, গৃহসজ্জা, তৈলচিত্র অঙ্কনে পারদর্শিনী নয়,অপরূপ রূপ যৌবনে ভালোবাসায় অনুরঞ্জিতা নয়, সেবা-যত্ন করার ক্ষেত্রেও সে একজন আদর্শ নারী। প্রজ্ঞাসুন্দরী বাঙালি, প্রায় ষোলো বছর দাম্পত্য জীবন অতিক্রম করার পরেও তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে। তবু লক্ষ্মীনাথ সুখী।অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য গতকাল রাতে ভালোবাসার আদান প্রদান হয়নি। প্রজ্ঞার ডান হাতটা নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' হ্যাঁ বাড়ির স্বপ্ন দেখছিলাম।'

'কাল নাম প্রসঙ্গ করার সময় তোমার বুঝি মায়ের কথা মনে পড়ছিল?'

' মায়ের কথা!'

' হ্যাঁ মায়ের কথা আর দেশের কথা মনে পড়লেই তো তুমি এমন হয়ে যাও। বিজনেসের যদি কোনো অসুবিধা না হয়, তাহলে চল না সবাই মিলে একবার আসাম ঘুরে আসি।'

' তুমি আসাম যাবে?'

' হ্যাঁ যাব।'

' সত্যি বলছ?'

' বলছি তো যাব।'

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মাথাব্যথা নাই হয়ে গেল। উৎফুল্লিত হয়ে বলল,' ঠিক আছে, চল, এবার পুজোয় অসমেই যাই।

সত্যিই পরিবারের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ অসমে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। তার আগে প্রজ্ঞা ঘরোয়া ডাক্তার সত্যব্রত মিত্রকে ডাকিয়ে এনে লক্ষ্মীনাথের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাল। নাম কীর্তন শেষ হওয়ার পরেই কেন লক্ষ্মীনাথের নাক দিয়ে এভাবে রক্ত বের হল, সেই বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। ডক্টর মিত্র বললেন, কীর্তন করার সময় অতি মানসিক এক আবেগে তার রক্তচাপ বেড়ে যায়। রক্তক্ষরণের জন্য সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ও এটা নিয়ে চিন্তা করার মতো কোনো অসুখ নয়।

রেল কোম্পানি দুর্গা পূজার মাসে রেহাই মূল্যে ভ্রমণের সুযোগ দেয়। লক্ষ্মীনাথ এই সুযোগটা গ্রহণ করল। প্রজ্ঞা, অরুণা-রত্না, চাকর ভাগীরথী- কাশীনাথ এবং আয়াকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ শিয়ালদহ থেকে ১৯০৫ সনের অক্টোবরের ৮ তারিখ রাতে গোয়ালন্দ মেইলে অসমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। বি ব্রাদার্স কোম্পানি থেকে আলাদা হয়ে আসাম- বেঙ্গল খোলার পরে লক্ষ্মীনাথ শিবসাগর থেকে ভাই হরিনাথকে ডেকে এনে ম্যানেজার রাখল। লক্ষ্মীনাথের অনুপস্থিতে হরিনাথ ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে।

ইতিমধ্যে ১৯০৫ সনের সাত জুলাই ভারত সরকারের তরফ থেকে বঙ্গ বিভাজনের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠল। দুই-একজন স্বার্থান্বেষী জমিদার, ব্যবসায়ী এবং মুসলমান বুদ্ধিজীবী ছাড়া প্রত্যেকেই এই বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য এগিয়ে এল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণকুমার মিত্র, মতিলাল ঘোষ ইত্যাদি নেতার উপস্থিতিতে ১৭ই জুলাই খুলনার বাগেরহাটে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় ইংরেজের বিরুদ্ধে বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হল। এই প্রস্তাব অনুসারে যতদিন পর্যন্ত বঙ্গ-ভঙ্গ আইন রদ হবে না, ততদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ পণ্য সামগ্রী বর্জন করা হবে। ১৭ এবং ১৮ তারিখ রিপন কলেজে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশে 'বয়কট' আন্দোলনকে এক পবিত্র শপথ হিসেবে গ্রহণ করা হল। সাত আগস্ট কলকাতার টাউন হলে পাঁচহাজার জন ছাত্র এবং অগণন লোকের সমাবেশে অনুষ্ঠিত সভায় পৌরোহিত্য করলেন কাশিমবাজারের মহারাজা মুনিন্দ্রচন্দ্র নন্দী। এই সভায় ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গ বিভাজন আইনকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করা হল এবং ইতিপূর্বে রিপন কলেজে অনুষ্ঠিত সভায় ছাত্রসমাজ গ্রহণ করার বিদেশি সমগ্র বর্জন করার সিদ্ধান্তটাকে অনুমোদন জানানো হল। এই ধরনের এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে জন্মভূমি অসম যাত্রা করল।

যাত্রার পরের দিন ভোর বেলা গোয়ালন্দে পৌঁছল। গোয়ালন্দ থেকে দুপুর বেলা দুটোর সময় ডিব্রুগড় গামী জাহাজ ছাড়বে। এদিকে বড়ো হওয়ার জন্য জাহাজটা নদীর তীরে লাগাতে পারল না। মাঝ-নদীর মূল স্রোতে নোঙ্গর করল। তবে পাশের একটি অপেক্ষাকৃত ছোটো জাহাজে উঠে প্রাতঃকালীন কাজটুকু করে সকালের চা জল খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিল। তারপরে সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা থেকে রিজার্ভ করা আর এস এন কোম্পানির'ঘাজি' জাহাজের একটি কেবিনে উঠল। দুপুর আড়াইটা থেকে উজানের দিকে জলযাত্রা আরম্ভ হল। জাহাজটা রাত সাড়ে নয়টার সময় ধুবরিতে এসে নোঙ্গর করল। পরের দিন সকাল দশটার সময় জাহাজ ধুবরি ছেড়ে গেল।

অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ।শারদীয়া পরিবেশ।এখন ব্রহ্মপুত্রের দুকুল প্লাবিত নয়।স্রোতের বেগ ও কম। তার জন্য মেইল জাহাজ 'ঘাজি' অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে উজানের দিকে যেতে পারছে। নদীর দুইপাশের সবুজ মাঠ, মাঠে চড়তে থাকা গরু- ছাগল, গাছ-পালায় শ্যামল দূর দূরান্তের গ্রাম… চিত্রময় দৃশ্য। কেবিনের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অরুণা এই গতিশীল দৃশ্য গুলি দেখছে। আয়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রত্না ও অপরিসীম কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে তাদের পূর্বপুরুষের দেশটা দেখছে। আগে না দেখা কিছু দেখলেই আয়াকে জিজ্ঞেস করছে, এদিকে প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ কেবিন থেকে বেরিয়ে ডকে উঠল। এখন ডকে অন্য কেউ নেই ।লক্ষ্মীনাথ- প্রজ্ঞা দক্ষিণ দিকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

জাহাজের গতিবেগ বৃদ্ধি পেল। দুইপারের সবাই পার হয়ে গেছে। কয়েকটি গ্রাম এবং দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত পার হওয়ার পরে নদীর তীর থেকে কিছু দূরে পাহাড় দেখতে পেল। পাহাড়গুলি এত উঁচু নয়। গাছ পালায় সবুজ পাহাড়ের গায়ে সূর্যের কিরণ পড়ে মনোরম এক দৃশ্য সৃষ্টি করেছে ।পাহাড়গুলির পরে নীল আকাশ, নীল আকাশের কোলে অলস ভাবে ভেসে বেড়ানো সাদা সাদা মেঘ… রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রজ্ঞা নয়ন ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করল। সুখ এবং তৃপ্তির হাসিতে তার মুখটা অনুপম হয়ে উঠল।

শৈশব থেকে জন্মভূমির এই সুন্দর দৃশ্য দেখলেও আজ এভাবে প্রিয়তমা পত্নী ,স্নেহের দুই মেয়ে এবং চাকর আয়াদের নিয়ে মাতৃভূমির মুখ দিয়ে বয়ে যাওয়া মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র দিয়ে জলযাত্রার সময় দেখা মাতৃভূমির রূপ‐ লক্ষ্মীনাথের মনে অনুভূত হওয়া পূর্বের সেই সুখ আনন্দের সঙ্গে আলাদা একটি মাত্রা সংযোজিত হল। প্রকৃতির প্রাণময় মুখগুলির দিকে তাকিয়ে সে ভাবুক হয়ে পড়ল।

সুদূর অতীতের কথা স্মরণ করে লক্ষ্মীনাথ বলল যে আজ যে জলপথে যন্ত্রচালিত বিশাল জাহাজে তারা উজান অসমের দিকে যাচ্ছে এই একই পথে একদিন তাদের পূর্বজ কলিবর বরুয়া কান্যকুজ্ব থেকে সেই সময়ের বৈঠা দিয়ে চালিত ছোটো নৌকায় তীর্থ ভ্রমণ করতে এই অসমে এসেছিল।

মনোযোগের সঙ্গে শুনে প্রজ্ঞা তখন আশ্চর্য প্রকাশ করে বলল যে কান্যকুজ্ব থেকে লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষেরা যেহেতু অসমে এসেছিলেন তাই তারা অসমিয়া ছিলেন না। প্রজ্ঞার কথাটা স্বীকার করে মুচকি হেসে লক্ষ্মীনাথ বলল যে উজান অসমের উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা অধিকাংশই মূলত অসমিয়া ছিল না। বর্তমান কামরূপ এবং প্রাগজ্যোতিষপুর ছাড়া অসম ছিল বনে জঙ্গলে এবং পাহাড়ে পরিপূর্ণ পাহাড়ি এবং জনজাতি লোকের বাসভূমি। কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মার রাজত্বকালে সভ্যতা- সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছিল। তাঁর রাজত্বকালে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাঙ অসমে এসেছিলেন। তারপরে দ্বাদশ শতিকায় পূর্বের পাটকাই পর্বত পার হয়ে আহোমরা এসে জনজাতি গোষ্ঠীর রাজাদের পরাজিত করে আজকের অসমের ভিত গড়েছে। তখন থেকে অসমিয়া ভাষার বিকাশ আরম্ভ হয় এবং আশ্চর্যের কথা এটাই যে অসমে রাজ্য স্থাপন করে আহোম রাজ পুরুষরা মাতৃভাষা তাই ভাষাকে দেশের ভাষা না করে স্থানীয় অসমিয়া ভাষাকে স্বীকৃতি দিল এবং হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করল । তারপরের সেই কনৌজ থেকে অসমে এসে বসবাস করতে থাকা বারভূঞার শিরোমনি শঙ্করদের বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করার জন্য অসমের সমস্ত জায়গায় সত্র- নামঘর প্রতিষ্ঠা করে অসম বাসীদের একতার বন্ধনে বাঁধল এবং অসমিয়া সাহিত্য- সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করল।

প্রজ্ঞা তখন সরল ভাবে জিজ্ঞেস করল যে লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষরা যখন অসমিয়া ছিলেন না, তখন সে অসমিয়া ভাষা- সাহিত্যের জন্য এভাবে লড়াই করছে কেন? প্রজ্ঞার এই প্রশ্নটি লক্ষ্মীনাথকে অস্বস্তিতে ফেলল।তাঁর কিছুটা রাগও হল। পরের মুহূর্তে বুঝতে পারল প্রজ্ঞা তাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার মধ্যে অস্বাভাবিকতা নেই। অনেকক্ষণ দক্ষিণের উদার আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, সেটাই হল আজকের অসমিয়া জাতির ইতিহাস। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অসমিয়া না হলেও তাদের অসমে জন্ম হয়েছে। অসমে জন্মগ্রহণ করে মায়ের মুখে অসমিয়া কথা শুনেছে। তাই মায়ের ভাষাই তাঁর ভাষা। মায়ের পরিচয়ই তাঁর পরিচয়। তাই মাতৃভাষার অস্তিত্ব এবং স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য তাকে লড়াই করতেই হবে। সন্তানের জন্য সেটাই প্রধানতম দায়িত্ব এবং কর্তব্য।

শিয়ালদা থেকে যাত্রা আরম্ভ করে সপ্তম দিন সকালে কোকিলামুখ পৌঁছাল। কোকিলামুখের ভাসমান ডাকবাংলোয় বসে চা খেল। এগারোটার সময় জোরহাটে থাকা দাদা গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে ডাকবাংলোয় এল। এতদিনে সাহিত্যিক রূপে কলকাতা তথা সমগ্র অসমে বিখ্যাত হয়ে পড়া লক্ষ্মীনাথ গোবিন্দচন্দ্রের ভাই। ডাকবাংলোয় উঠার জন্য কড়া মেজাজের অভিভাবক গোবিন্দচন্দ্র লক্ষ্মীনাথকে গালিগালাজ করতে লাগল। তারপরে তিনি লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।

দাদা গোবিন্দচন্দ্রের বাড়িতে স্নান করে ,খাওয়া দাওয়া করে লক্ষ্মীনাথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশ্রাম নিয়ে সাত দিনের যাত্রার ক্লান্তি দূর করল। বিকেলবেলা রায় বাহাদুর জগন্নাথ বরুয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য লক্ষ্মীনাথ বের হল।

বিএ জগন্নাথ বরুয়া কয়েকটি চা বাগানের মালিক। নামে ধামে ধনসম্পত্তিতে তিনি কেবল জোরহাটে নয়, সমগ্র অসমে একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি।তাঁর বাসস্থানটিও বিশাল। বিশাল গেট পার হয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে লক্ষ্মীনাথ ভেতরে ঢুকে নিজের উপস্থিতির কথা বলে একজন কর্মচারীকে ভেতরে পাঠাল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিএ জগন্নাথ বরুয়া বেরিয়ে এলেন। পরনে সাহেবদের পরা ঘরোয়া পোশাক। মাস খানেক আগে কলকাতায় তাঁকে সুস্থ দেখেছিলেন। বয়সের সঙ্গে অসুখ তাকে কাহিল করে ফেলেছে। ওষুধপত্র খেয়েও শরীরটাকে সুস্থ রাখতে পারেননি।

কুশল সংবাদ আদান প্রদান করে থাকার সময় সাদা পোশাক পরা আধবয়সী একজন খানসামা একটা সুন্দর পটে উচ্চমানের চা নিয়ে এল। লক্ষ্মীনাথের কাছ থেকে চায়ে চিনি দুধের অনুপাত জিজ্ঞেস করে খানসামা এক কাপ চা লক্ষ্মীনাথের দিকে এগিয়ে দিল। চিনি দুধ না দিয়ে পাতলা লিকারের চা ঢেলে খানসামা জগন্নাথ বরুয়ার হাতে তুলে দিল।

চায়ের কাপটা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে জগন্নাথ বরুয়া বললেন, কলকাতা থেকে এলে, পার্টিশন কার্যকরী হওয়ার পরে কলকাতা আন্দোলনমুখী হয়ে পড়েছে। খবরের কাগজে দেখলাম বন্দেমাতরম স্লোগান দিয়ে হাজার হাজার জনতা কলকাতার রাজপথে নেমে এসেছে। রবিবাবু ' বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পুণ্য হোক পূণ্য হোক হে ভগবান' বলে গেয়ে পার্টিশনের বিরোধিতা করছেন।'

' হ্যাঁ কাকাবাবু, আন্দোলনটা দিন দিন বেড়েই চলেছে।'

' আর ও বাড়বে।'

' কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বাঙালির প্রতিবাদের কাছে নতিস্বীকার না করে পার্টিশন রদ করবে না। ১৮৫৭ সনের সিপাহী বিদ্রোহের চেয়ে ভয়াবহ আন্দোলন ছিল। সেটাকে আন্দোলন না বলে বিদ্রোহ বলাই সঙ্গত। সেই বিদ্রোহকে দমন করেছে যখন, এখন এত বছরে ভারতবর্ষে আরও স্থায়ীভাবে রাজত্ব করা ব্রিটিশ এই আন্দোলনকে সহজেই দমন করতে পারবে।'

' দমন করলে জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি আরও বেশি করে সংঘবদ্ধ হয়ে উঠবে।

' কিন্তু দাদা ব্রিটিশ আমাদের দেশের উন্নতির জন্য কাজ করেছে। আমাদের অসমের কথাই ধরুন, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার উন্নতি করেছে। আসামে যে এত লাভজনক চায়ের চাষ হতে পারে, এটা ব্রিটিশেরই আবিষ্কার। তাছাড়া রেললাইন পেতেছে ভালো ভালো জাহাজ কোম্পানি আসার জন্য অসমের জলপথের ও উন্নতি হয়েছে। জেলায় জেলায় প্রশাসনীয় অফিস স্থাপন করে আইনশৃঙ্খলা ধরে রেখেছে।'

' তুমি তাহলে ব্রিটিশ শাসনের পোষকতা কর। তবে লক্ষ্মীনাথ যতই যা বলনা কেন, আমাদের জন্য ব্রিটিশরা বিদেশি। তুমি সাহিত্যের সাধনা করছ। তোমার জ্ঞান- বুদ্ধি আমার চেয়ে বেশি। তুমি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবে যে দেশের মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না।'

ইংরেজিতে শুদ্ধ বক্তৃতার দ্বারা তৎক্ষণাৎ শ্রোতামন্ডলীকে আকর্ষণ করতে পারার ক্ষমতা থাকা জগন্নাথ বরুয়াও ব্রিটিশ ভক্ত। ১৯০২ সালে সপ্তম এডওয়ার্ডের অভিষেক উপলক্ষে ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা নিমন্ত্রিত হয়ে তিনি বিলাতে গিয়েছিলেন। অভিষেক উৎসব হয়ে যাওয়ার পরে লন্ডনের মেয়র প্রতিনিধিদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য টাউন হলে ভোট সভার আয়োজন করেছিল। সেই ভোজসভায় জগন্নাথ বরুয়া ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে অভ্যাগতদের সম্ভাষণ জানিয়েছিল। বক্তৃতাটি এতই মনোগ্রাহী হয়েছিল যে ম্যানচেস্টার গার্ডেন ইত্যাদি বিলাতের কাগজে বরুয়া মহাশয়কে প্রশংসা করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা রায়বাহাদুর উপাধিতে সম্মানিত জগন্নাথ বরুয়ার কন্ঠে এখন ইংরেজ শাসনের বিরোধিতার সুর শুনে লক্ষ্মীনাথ অবাক হল। কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তাহলে আপনি বলতে চাইছেন নাকি যে এখন আমাদেরও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে।'

'কবে আন্দোলন করতে হবে, সঠিকভাবে বলতে পারছিনা। কিন্তু বেশিদিন যে অপেক্ষা করতে হবে না সেটা অনুমান করতে পারছি।’ জগন্নাথ বরুয়া বললেন ' তারপরে ‘বন্তি’পত্রিকাটা রিভাইভ করার জন্য পদ্মনাথ যে অশেষ চেষ্টা,খবরটা পেয়েছ বোধহয়।’

‘হ্যাঁ, দুই মাস আগে পদ্ম বরুয়া কলকাতায় আমার এবং ভোলা দাদার সঙ্গে দেখা করেছিল। আমরা আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করেছি। ইতিমধ্যে 'বন্তি' পুনরায় ছাপা হয়েছে।

' পারবে। পদ্মনাথ ধরেছে যখন 'বন্তি' বের হবেই। পদ্মনাথ খুবই সিনসিয়ার। যে কাজ শুরু করে, একেবারে একনিষ্ঠ হয়ে লেগে থাকে। আচ্ছা তুমি তো এবার কলকাতা থেকে পরিবার এবং মেয়েদের নিয়ে এসেছ। তোমার দাদা তো জি বেজ বরুয়ার বাড়িতে আছে, নয় কি।

'হ্যাঁ কাকাবাবু।'

' জোরহাটে কয়েকদিন থাকবে কি?'

' হ্যাঁ থাকব। তারপরে গোলাঘাটে যাব। আজকাল আমাদের মা শ্রীনাথ দাদার সঙ্গে গোলাঘাটে থাকে।'

' মিসেস কে নিয়ে একদিন আমাদের বাড়িতে ভাত খেতে এসো। গাড়ি পাঠিয়ে দেব। গাড়িতে তাদের নিয়ে এসো।'

লক্ষ্মীনাথের দাদা ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে গতিশীল চরিত্রের মানুষ হল গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া। স্বভাবটা কিছুটা উগ্র হলেও তিনি খুব কর্মী মানুষ। গোবিন্দচন্দ্রের জন্যই গোলাপ বেজবরুয়া কলকাতায় পড়াশোনা করতে সক্ষম হয়েছিল। এবং টাকা-পয়সা সংগ্রহ করে তিনিই গোলাপ বেজবরুয়াকে বিলাত পাঠিয়েছিলেন।তাঁর জন্যই এন্ট্রান্স পাশ করার পরে পিতা দীননাথের ইচ্ছার বিরুদ্ধে লক্ষ্মীনাথ কলকাতায় যেতে পেরেছিল । তিনি লক্ষীনাথ কে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে কালীঘাটের বেনীমাধব হালদারের ঘরে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন এবং মির্জাপুরের রিপন কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথের নাম ভর্তি করেছিলেন।

গোবিন্দচন্দ্র সাজ-পোশাক , চাল-চলনে একেবারে সাহেব। ভাব-ভঙ্গিতেও ইংরেজ। মুখে ইংরেজি কথা-বার্তা। পারিবারিক পরম্পরা অনুসরণ করে তিনি ইংরেজ ভক্ত অসমিয়া। সভা-সমিতিতে তিনি মুক্ত কণ্ঠে বলেন‐ ইংরেজের পান্চুয়ালিটি, ইংরেজের ডিসিপ্লিন, ইংরেজের সাহস, ইংরেজের একতা, ইংরেজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, ইংরেজদের দেশ ভক্তি আমাদের চাই। গোবিন্দচন্দ্র খাওয়া দাওয়ায় নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণের নিয়ম-নীতি মানে না। তিনি মুসলমান স্পর্শ করা পাউরুটি খান, মুরগির ডিম খান, হুইস্কি ব্রান্ডি ও অনায়াসে পান করেন। তবে এইসব নিয়ে কোন লুকোচুরি নেই। তিনি একজন মুক্ত মনের মানুষ। অবশ্য বাড়ির বৈষ্ণব আচার- অনুষ্ঠান মানেন। তিনি বলেন,' সাহেব হলেও আমি অহিন্দু নই।' কিন্তু তাঁর দোষটা হল, তিনি কার ও মন রক্ষা করে অথবা স্থান- কাল- পাত্র বিচার করে কথা বলতে পারেন না। তাই অধিকাংশ মানুষ তাকে পছন্দ করে না। মাত্রাধিক সাহেবিবায়ুগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে বিশিষ্টতা দেখাতে যত্নশীল। তার জন্যই নিজের গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া নামটা সংক্ষেপে জি বেজবরুয়া করে নিয়েছেন এবং মানুষ তাঁকে সেভাবে ডাকলেই খুশি হন।

এইসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও এই গোবিন্দচন্দ্র বেজবরুয়া সমসাময়িক অসমের একজন অন্যতম শিক্ষাবিদ। এতদিনে তিনি একরকম একক প্রচেষ্টায় উজান অসমে ছয়টি ইংরেজি স্কুল স্থাপন করেছেন। সেগুলি হল দেরগাও এবং চারিগাওয়ে একটি করে মাইনর স্কুল, গোলাঘাট, যোরহাট, জাঁজি এবং শিব সাগরে একটি করে হাই স্কুল। স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেকটিতে একজন করে হেডমাস্টার এবং মাস্টারের নিযুক্তি দিয়ে নিজে ঘুরে ঘুরে স্কুল পরিদর্শন করেন, পরিচালনা করেন। এখন তিনি নিজে যোরহাট হাই স্কুলের হেডমাস্টার।

বিএ পাশ করার পরে সরকারি চাকরি পেয়েও চাকরিতে যোগদান না করার জন্য গোবিন্দচন্দ্র লক্ষ্মীনাথকে খুব গালিগালাজ করেছিলেন। এখন ও তাঁর কথায় সেরকম ভাবই প্রকাশ পেল। রায়বাহাদুর জগন্নাথ বরুয়ার বাড়ি থেকে এসে লক্ষ্মীনাথ দাদার সঙ্গে বসে ভোলানাথ বরুয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক সংঘাতের কথা বলতেই গোবিন্দচন্দ্র তাঁর স্বভাবসুলভ কর্কশ কণ্ঠে বলল‐' তুই যখন সেই অর্ধশিক্ষিত ধুরন্ধর ব্যবসায়ীটার সঙ্গে ব্যবসা করতে শুরু করলি তখনই ভেবেছিলাম তোকে সর্বনাশে পেয়েছে। তবে তুই হলি একটা 'গোঁয়ার গোবিন্দ' প্রাণী। একবার নিজে যেটা ভাববি, সর্বনাশ জেনে ও সেটাই কামড়ে পড়ে থাকবি। ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে নিজের মতো ব্যবসা শুরু করেছিস, ব্যবসায় তুই এগোতে পারবি না। শোন, আমরা ব্যবসায়ী নই। আমরা বেজবরুয়া বংশের ছেলে। বাবা ঠিকই বলেছিলেন, আমাদের রক্তে ব্যবসায়ীর গুণাবলী নেই।'

কথাগুলির বিরোধিতা করতে গেলেই গোবিন্দচন্দ্র তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। লক্ষ্মীনাথ চুপ করে দাদার কথা শুনতে লাগল।

' আর গোলাপ, তাকে কিসে পেয়েছে যে চৌদ্দ পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হল ?'চরম বিরক্তি এবং ক্রোধে গোবিন্দ চন্দ্র বললেন,' বিজাতি ব্রাহ্ম বিয়ে করে তুই তবুও দুই এক বছর পরে পরে বাড়িতে আসিস। বাবা খারাপ পাবে বলে কথাটা গোপন রেখে কত কষ্টে টাকা জোগাড় করে, আমি গোলাপকে বিলাতে পাঠালাম। বিলেতে গিয়ে ডাক্তার হয়ে আসা সেই মহা মূর্খটা এখন অসমে আসেই না। তারপরে সে পুনরায় কয়েকটি সন্তান থাকা একটি বিধবাকে বিয়ে করেছে! আর সেই বিয়েতে তুই কিনা তাকে সাহায্য করলি! হায় হায়, এসব কি হল! বাবা বেঁচে থাকলে এইসব দেখে শুনে নিশ্চয় আত্মহত্যা করতেন।'

লক্ষ্মীনাথ এই দাদার ক্রোধ প্রশমিত করার উপায় জানেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসতে হাসতে বলল,' মেজ দাদা, তুমি মিছামিছি রাগ করছ। গোলাপদাদা বিদেশে গিয়ে অভাবে পড়ে কোনো উপায় না পেয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। তারপরে তিনি যে এরকম একজন বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেছেন, তাকে ভালো লেগেছে বলেই। ভালোবাসলে কী করবে? ভালোবাসা তো কোনো বিচার মানে না। এমনিতেও কোন রূপসী যুবতি পঞ্চাশ বছরের বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বিয়ে বসতে চাইবে? তবে যতই গালিগালাজ কর না কেন, বিয়ের পরে গোলাপ দাদার ভালোই চলছে। শেষ বয়সে বিয়ে করে ঘর-সংসার পেতে একটু যদি সুখ পায় পেতে দাও।'

' আর ওটা শিবসাগর থেকে হরিকে নিয়ে গিয়ে বিজনেসে লাগালি,‐- সে তো একটা অপদার্থ, অলস। তোর সঙ্গে থেকেও ওর কি কোনো গতি হবে? সে নিজে কিছু করে খেতে পারবে কি?'

' ও শৈশব থেকে শিবসাগরে থাকা। ওর শরীর থেকে এখন ও দিখৌপরিয়ার গন্ধ যায়নি। কলকাতার হাবভাব বুঝতে সময় লাগবে।'

' তুই তাকে সহজ-সরল ভাবলে ভুল হবে। ও একটা নির্বোধ। কড়া শাসনে না রাখলে ও পথে আসবে না।'

' হবে হবে। সে নিশ্চয় নিজে থেকে কিছু একটা করে খেতে পারবে।'

' তারমানে তুই ওর কথাটা সিরিয়াসলি নিস নি। লখী তোকে আর শুধরানো গেল না। কোনো কথাকেই তুই গুরুত্ব দিস না।'


রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ২৫ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, He Amar Swadesh

 হে আমার স্বদেশ- ২৫

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস







  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(২৫)

বাড়ি-ঘর হল, আর্থিক দিকেও স্বচ্ছলতা এল, হাওড়ায় প্রভাব প্রতিপত্তিও কিছুটা হল। পত্মী সুখ, সন্তান-সুখের সঙ্গে সাহিত্যিক হিসেবে সুনাম-যশ ও লাভ করল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জন্যই সুখ ভোগটা নিরবচ্ছিন্ন নয় ।

সুরভি বড়ো হয়ে উঠতে লাগল। সুরভি সুন্দরী, কথাবার্তা আদুরে। গুণেও সে ব্যতিক্রম। ঠাকুর বংশের কলকাতার অন্যান্য জায়গায় থাকা আত্মীয়-স্বজনদের ভেতরে সেরকম মেয়ে একটিও নেই।

চার বছর বয়সও হয়নি। এখনই সে ইংরেজি নার্সারি রাইমসের একটি বড়ো বইয়ের প্রতিটি কবিতা মুখস্থ করে ফেলল। অবশ্য 'টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার' বলতে গিয়ে সে' টুনি কোল টুনিকোল লিটোল স্টার বলে। অন্যান্য ইংরেজি কবিতা মুখস্ত বলতে পারে। কোনো কার্যের নিমিক্ত মানুষের প্রশংসা করতে গিয়ে 'থেঙ্ক ইউ' বলতে গিয়ে 'ফেঙ্ক ইউ' বলতে শিখেছে। প্রাণময়ী সুরভি লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞার সম্পর্কটাকে আরও নিবিড় করে তুলল। তাকে নিয়ে দুজনের কত আনন্দ, কত যে স্বপ্ন! তার মুখের দিকে তাকালেই লক্ষ্মীনাথের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। অনাবিল অপত্য স্নেহের আবেগে সুরভির মধ্যে সে জ‍্যেঠাশ্বশুর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরার কথা ভাবে। ইন্দিরা বুদ্ধিমতী, বিদ্যায় সরস্বতী, সাহিত্য–সংস্কৃতিতে অনুরাগ থাকা অসামান্য রূপসী কন্যা। সুরভির চলন-বলন ,কথা-বার্তা, কাণ্ড-কারখানা সেই বয়সের ইন্দিরার মতোই। সমবয়সী মেয়েদের থেকে এত আলাদা, এত চমকে দেওয়ার মতো যে কখনও কখনও লক্ষ্মীনাথের মনে প্রশ্ন জেগে ওঠে–এই মেয়ে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে তো? সেরকম মনে হওয়ার পর মুহূর্তে তিনি নিজেকে সাবধান করেন, না নিজের সন্তানকে নিয়ে এরকম ভাবাটা ঠিক নয়। লক্ষ্মীনাথ তখন আকূল কণ্ঠে পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায়,' প্রভু আমার মনে এরকম একটি আশঙ্কার জন্য আমাকে ক্ষমা কর। সুরভিকে তুমি দীর্ঘায়ু কর। নারীর সমস্ত গুনে তাকে মহিমাময়ী করে তোল।'

বাড়িতে থাকার সময়টুকু লক্ষ্মীনাথের সর্বক্ষণের সঙ্গী সুরভি। প্রতিটি কথায় সুরভির বাবাকে চাই। বাবার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, বাবার সঙ্গে খেলাধুলা, বাবার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, বাবার কাছেই তার যত ধরনের দাবি।

একদিন সকালবেলা সে একা বাইরের বারান্দায় পুতুল নিয়ে খেলছিল। তখন সে দেখল সামনের রাস্তা দিয়ে একজন ফেরিওয়ালা মাটির তৈরি সুন্দর সুন্দর পুতুল নিয়ে যাচ্ছে। হাতের কাঠের পুতুলটা ফেলে রেখে দৌড়ে গিয়ে গেটের কাছে গিয়ে বলল ও ফেরিওয়ালা আমাকে একটি পুতুল দেবে ? কৃষ্ণনগর থেকে আগত মাঝবয়সি ফেরিওয়ালা স্নেহের সুরে বলল ,'আমি যে এগুলি বিক্রি করতে এনেছি, মা।'

' কত দাম?'

' চার আনা। তুমি তোমার মায়ের কাছ থেকে চার আনা চেয়ে নিয়ে এসো, আমি তোমাকে দেব।'

সুরভি দৌড়ে লক্ষ্মীনাথের কাছে এল,' পাপা তুমি আমাকে চার আনা দাও তো, আমি পুতুল কিনব।'

লেখার টেবিল থেকে উঠে লক্ষ্মীনাথ বাইরে বেরিয়ে এসে রং করা পুতুলগুলি দেখে ফেরিওয়ালাকে বিদায় দিয়ে সুরভিকে বলল, ওইগুলি মাটির পুতুল মা। খেলতে গেলেই ভেঙ্গে যাবে।'

ফেরিওয়ালাকে চলে যেতে দেখে সুরভি অভিমানী হয়ে পড়ল। নিমেষের মধ্যে তার মুখ লাল হয়ে উঠল।' যাও তোমার সঙ্গে আমার আড়ি' বলে সুরভি ভেতরে গিয়ে রুমের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল

লক্ষ্মীনাথ স্নেহের সুরে ডাকল,' সুরভি, সুরভি–।'

সে শুনল। কিন্তু উত্তর দিল না। লক্ষ্মীনাথ পুনরায় বলল, সুরভি মা আমার দরজা খোল‐।'

সুরভি দরজা খুলল না। এদিকে ঘরটা অন্ধকার। এতই অন্ধকার যে দিনের

বেলাতেও প্রদীপ না জ্বালিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলে গা ছমছম করে।চেঁচামেচি শুনে প্রজ্ঞা দৌড়ে এল। ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে' তোমার আদরের জন্যই মেয়ে এত অন্যায় জেদ করছে' বলে লক্ষ্মীনাথকে বকাবকি করল। পত্নীর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে লক্ষ্মীনাথ সুরভির চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ল। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে থাকা পোকামাকড় সুরভিকে কামড়াতে পারে। কোনো উপায় না পেয়ে দরজার একেবারে সামনে মুখে এনে লক্ষ্মীনাথ কাকুতি মিনতি করে বলল, 'লক্ষ্মী মা আমি তোমাকে চার আনাই দেব। এই যে পয়সা নিয়ে এসেছি। এবার দরজা খুলে বেরিয়ে এসো।'

ভেতর থেকে সুরভি জিজ্ঞেস করল,' সত্যি করে বল, দেবে।'

' হ্যাঁ দেব। এইতো তোমাকে দেবার জন্যই পয়সা হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।'

' তার জন্য মা আমাকে বকুনি দেবে না তো?'

' না, দেবে না।'

' সত্যি?'

' হ্যাঁগো, সত্যি।'

' তিন সত্যি বল।'

' সত্যি, সত্যি, সত্যি। এবার দরজা খোল।'

অবশেষে দরজার খিল খুলে সুরভি বেরিয়ে এল। বাবার কাছ থেকে চার আনার মুদ্রাটা নিয়ে সুরভি হেসে ফেলল।

তার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে প্রজ্ঞা বলল,' কী দস্যি মেয়ে হয়েছে রে বাবা! ওরে তুই যে ওই অন্ধকার ঘরটায় এতক্ষন থাকলি, তোর একটুও ভয় করল না ?'

ব্যস্ততার মধ্যেও লক্ষ্মীনাথ লেখালেখি চালিয়ে গেছে।সকালে লেখালেখির কাজ করে। মনটা তখন প্রফুল্ল থাকে, সতেজ থাকে। লেখাগুলিও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে। অসম থেকে এত দূরে, অসমিয়া সমাজের বাইরে,ব্যবসার ক্ষেত্রে সারাদিন বাঙালি মানুষের সঙ্গে থাকে। এমনকি প্রিয়তমা পত্নী এবং আদরের মেয়েটির সঙ্গেও বাংলায় কথা বলে। অথচ লক্ষ্মীনাথ অসমের কথা ভাবে, অসমিয়া জাতির কথা ভাবে। অসমিয়া জাতির উন্নতির কথা ভেবে অসমিয়া ভাষা-সাহিত্যের সাধনা করে। সেই সাধনায় বসে যখন অসমিয়া সাহিত্যের কথা ভাবে, তখন বাংলা তথা ভারতের অন্যভাষার উন্নতি দেখে তার মনটা বিষাদ-বেদনায় ভরে উঠে।অন্য সাহিত্যের উন্নতি-বিকাশের কথা ভেবে সে হীনমন্যতার যন্ত্রণায় কষ্ট পায়। সে তখন মাতৃভাষায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অন্তরের গভীর থেকে অনুপ্রেরণা অনুভব করে। নিত্য নতুন উদ্যমে লিখতে শুরু করে। লিখতে গিয়ে অনুভব করে অনেক কিছু লেখার আছে। কবিতা, গল্প ,উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ইত্যাদি রচনার জন্য তাকে আরও একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে।

এর মধ্যে তিন দিন প্রসব বেদনায় কষ্ট পেয়ে ১৯০০ সনের সতেরো নভেম্বর সকালবেলা প্রজ্ঞা আরও একটি কন্যা সন্তানের জন্মদান করে।তখন সুরভিও জোড়াসাঁকোতে। খবরটা শুনেই লক্ষ্মীনাথ জোড়াসাঁকো এল। সুরভি ভেতর থেকে দৌড়ে এসে বলল,‐ 'পাপা আমার একটি ছোট বোন হয়েছে।'

' ও তাই নাকি! চলো তো দেখি‐।'

' কিন্তু সবাই বলছে, আমার বোনটা নাকি কালো হয়েছে।'

' কালো হয়েছে!'

' আসলে জান পাপা, বোনটা কালো হয়নি। আমার থেকে একটু কম ফর্সা হয়েছে। কিন্তু ওরা আমার কথা মানছেই না।'

সদ্যোজাত শিশুটির সঙ্গে ইতিমধ্যে সুরভির আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।তার বিষয়ে কেউ খারাপ ভাবে কিছু বললে সুরভির কাছে তা বেদনাদায়ক হয়ে পড়ে। লক্ষ্মীনাথ সুরভির দুঃখ, মন খারাপটা বুঝতে পারল। সুরভির গালে আদর করে হাত বুলিয়ে বলল-' মা তুমি একটুও মন খারাপ কর না, যে যাই বলুক তোমার বোন কালো হতে পারেনা।

  লক্ষ্মীনাথ দ্বিতীয় কন্যার নাম রাখল অরুণা। দুদিন পরে প্রজ্ঞা, নবজাতকন্যা এবং সুরভিকে নিয়ে বাড়িতে এল। দ্বিতীয়বার কন্যা সন্তান জন্মনেওয়ায় প্রজ্ঞার মনটা কিছুটা খারাপ ছিল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ তাকে বোঝাল পুত্র সন্তানের জন্য কামনা করা যেতে পারে। কামনা পূরণ করাটা তাদের হাতে নেই। তাই পরমেশ্বর যা দিয়েছে তাকে আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করে নিতে হয়। অরুণার জন্মের আট দিন পরের ঘটনা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই লক্ষীনাথ দেখল সুরভি ঢোক গিলতে পারছে না। সুরভির কিছু একটা হলেই লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়ে। মুহূর্তের জন্য না থেমে সে ঘরোয়া চিকিৎসক ডক্টর সত্যব্রত মিত্রকে ডেকে আনল।ডক্টর মিত্র সুরভির গলা পরীক্ষা করে বলল ডিপথেরিয়া হয়েছে।ডিপথেরিয়া-ডিপথেরিয়া শিশু-কিশোরদের জন্য ভয়ংকর সংক্রামক রোগ।লক্ষ্মীনাথের ভেতরটা কেঁপে উঠল, কাতর সুরে ডাক্তারকে দ্রুত ভালো চিকিৎসা দানের জন্য অনুরোধ করল, ডাক্তার মিত্র ওষুধ লিখে দিলেন। সেই অনুসারে ওষুধ খাওয়ানো হল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা ওষুধে কাজ দিল না। বরং ক্রমশ রোগটা দ্রুত বাড়তে লাগল। ঢোক গিলতে না পারার জন্য সুরভির কষ্ট বেড়ে গেছে। জলীয় খাদ্য ছাড়া কিছুই খেতে পারছে না দেখে লক্ষ্মীনাথ দিশাহারা হয়ে পড়ল। অবশেষে বিকেলে সবাইকে নিয়ে জোড়াসাঁকো চলে এল।

পথে গাড়িতে সুরভি লক্ষ্মীনাথের ঘোড়ার দিকে মুখ করে বসল। গঙ্গার উপরে ব্রিটিশের তৈরি হাওড়ার সেতু পার হওয়ার সময় সুরভি বলল,' পাপা আমার ঠান্ডা বাতাস লাগছে। আমি সামনের দিকে বসব।'

সুরভি লক্ষীনাথের কোল থেকে নেমে বাবার দিকে মুখ করে বসল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি পাওয়ার পরেই ডক্টর ডি এন চ্যাটার্জীকে খবর দেওয়া হল। তিনি এসে পরীক্ষা করে ওষুধ দিলেন। ডক্টর চ্যাটার্জির ওষুধেও সুরভির অবস্থার উন্নতি হল না। প্রতিদিন তার অবস্থার অবনতি হতে লাগল। শেষ মুহূর্তে হোমিওপ্যাথিক ডঃ জে এন মজুমদারকে ডেকে আনা হল।তাঁর চিকিৎসাতেও লাভ হল না। সুরভি লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞার হৃদয় জুড়ে ছিল। কিন্তু ১৯০০ সনের ডিসেম্বরের ৪ তারিখ মঙ্গলবার দিন তাদের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে রেখে সুরভি চলে গেল।

লক্ষ্মীনাথ ইতিপূর্বে কখনও এত বড় শোক পায় নি। সে আদরের সুরভির শোক সহ্য করতে পারল না। শোকে সে এতই কাতর হয়ে পড়ল যে তাকে বিছানা নিতে হল। সুরভির মৃতদেহ কে নিমতলা শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করে এল ,সে বলতেই পারে না। সুরভিকে যমের কাছে অর্পণ করে সবার বাধা নিষেধ সত্ত্বেও পরের দিন সকালে লক্ষ্মীনাথ- প্রজ্ঞা নবজাতক কন্যা শিশুটিকে নিয়ে জোড়াসাঁকো থেকে হাওড়ার ডবসন রোডের বাড়িতে ফিরে গেল।

কিন্তু ঘরের ভেতর ঢুকতে গিয়ে যেদিকেই তাকাচ্ছে, সুরভির স্মৃতি তাকে অস্থির করে তুলছে। সুরভিও ফুল ভালোবাসত। ফুলের বাগান দেখাশোনা করার সময় গাছের চারার আশেপাশে মালির সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন চারায় ফুল ফুটতে দেখে অদম্য এক উৎসাহে বাবাকে সেই খবরটা জানাত। বিকেলের দিকে লক্ষ্মীনাথ অতুল বাবুর সঙ্গে লনটেনিস খেলত, পাশের পাথরের বেঞ্চে বসে সুরভি তাদের খেলা দেখত। বাড়িতে কোনো অতিথি এলেই দৌড়ে গিয়ে খবরটা দিয়ে বাবাকে ডেকে আনত। সেই সুরভিকে আর এই ঘরে দেখতে পাওয়া যাবে না। শুনতে পাবে না সুরভির কথা-বার্তা। লক্ষ্মীনাথের চোখ থেকে অবিরল ধারায় অশ্রু-জল নেমে এল। সে অন্ধকার দেখল। সুরভি ছাড়া এই বাড়িতে সে কীভাবে থাকবে?

সুরভির মৃত্যুর পরে ঠাকুর পরিবারের প্রত্যেকের মনে বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে এল। শোকাচ্ছন্ন মন নিয়ে তারা লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞাকে সমবেদনা জানাতে এল। লক্ষ্মীনাথের ভায়রা আশুতোষ চৌধুরী একজন গম্ভীর প্রকৃতির লোক। সুরভির মৃত্যুর খবর শুনে তার দুচোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

আত্মজার বিয়োগে এত সুতীব্র যন্ত্রণা, বেঁচে থাকার মুহূর্তগুলি এত দহনকারী। তথাপি সময় এগিয়ে যায়, সময়ই মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। গভীর শোক- দুঃখ থেকে নিজেকে উদ্ধার করার জন্য লক্ষ্মীনাথ ভাগবত-গীতার আশ্রয় নিল। বিশেষ করে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের অষ্টবিংশ শ্লোকটি তার মনটিকে অনেকটাই সুস্থির করে তুলল।‐

'অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত

অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিববেদনা।।’

শ্লোকটা পড়ে নিজের মনে বারবার উচ্চারণ করে লক্ষ্মীনাথ উপলব্ধি করল, এই সংসারে সমস্ত জীব প্রথম অবস্থায় অব্যক্ত, মধ্যে ব্যক্ত অর্থাৎ প্রকাশিত। তারপরে মৃত্যু হলে পুনরায় অব্যক্ত হয়। তাই মৃত ব্যক্তির জন্য শোক কিসের জন্য?

লক্ষ্মীনাথের জ্যাঠা শ্বশুর ভারতের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথের বিদূষী কন্যা ইন্দিরা সুরভির মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে একটি কবিতা লিখে পাঠাল,

' সুরভি ছিল তোমার নাম,

তাই বুঝি ফুলের মতন

 সৌরভ করিয়া বিতরণ

দুদিনে ত‍্যজিলে মর্ত‍্যধাম।

সে সৌরভ চির দিন-রাত

রহিল মোদের এই ঘরে,

তুমি থাক দেবতার তরে,

অমর অমল পারিজাত তরে।'

প্রজ্ঞাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ মাঝেমধ্যে সম্বলপুরে বেড়াতে গিয়েছিল। সম্বলপুরের সরকারি উকিল যোগেন্দ্রনাথ সেন এম এ বি এল এবং তার শিক্ষিত সহধর্মিনী কবি এবং গ্রন্থকার সরোজ কুমারী দেবী লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞার বন্ধু হয়ে উঠেছিল। সম্বলপুরে বেড়াতে এসে তাদের ঘরে লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞা অতিথি হয়েছিল। সরোজ কুমারী দেবী আগে সুরভিকে দেখেনি। মৃত্যুর পরে সুরভির একটি ছবি দেখে তিনি শত প্রণোদিতভাবে এই কবিতাটি লিখে পাঠালেন,

'... এসেছিল পথ ভুলে

 মা-বাপের স্নেহ-কোলে,

সহসা ভেঙ্গেছে মোর খেলার বাসনা।

তাই সে গভীর রাতে

 গেছে সরগের পথে

ধরার বাঁধন খুলি স্নেহের কামনা।

….

সুখের স্বপ্ন প্রায়

চকিতে মিলায় হায়

শুধু ভেঙ্গে দিয়ে গেল দুটি হৃদিকুল।

স্বর্গের সুরভি সে যে সুরভির প্রায় ।

ঢালিয়া জগতে সারা

চলে গেছে মুগ্ধ করি মানব হিয়ায়

সুরভি পরশ করে

কে কোথা পেয়েছে ভবে,

শুধু অনুভব করে শিরায় শিরায়।

স্মৃতির নিরালা ঘরে,

জাগাইয়া অশ্রু থরে,

স্নেহ মন্দাকিনী ধারে সিঞ্চিও তাহায়।'

প্রত্যেকের এত শোকের প্রকাশ, শোক প্রকাশ করার জন্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের এত সমবেদনা, সহানুভূতি প্রকাশ করে অথবা কবিতা রচনা করে প্রেরণ, মৃত্যুকে নিয়ে গীতার অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক বাণী– আত্মার অংশ হয়ে ইহ সংসারে এসে অকালে বিদায় নেওয়াটাকে হৃদয় মেনে নিতে পারে না। লক্ষ্মীনাথ সুরভিকে ভুলতে পারল না। তার জন্যই সে মাঝেমধ্যে বড়ো আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে। লক্ষ্মীনাথ সুরভিকে অমর করে রাখার জন্য কিছু একটা করতে চায়। শেষে সে সিদ্ধান্ত নিল, প্লাস্টার অফ প্যারিসে সুরভির একটা মূর্তি তৈরি করবে। কথাটা প্রজ্ঞাকে জানাল। অবিরল ধারায় জল ফেলে প্রজ্ঞা সম্মতি দিল।

লক্ষ্মীনাথ একদিনের জন্যও অপেক্ষা করল না। কৃষ্ণনগরের যদু পাল মাটি এবং প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি তৈরিতে নিপুণ শিল্পী। সে যদু পালকে ডাকিয়ে আনল। যত টাকাই খরচ হোক না কেন, যদু পালকে সুরভির মূর্তি তৈরি করতে বলল। সুরভির ছবি দেখে যদু পাল মূর্তি তৈরি করতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যে মূর্তিটি হুবহু সুরভির রূপ ধারণ করল। সেটা প্রাণহীন হলেও মূর্তিটিতে প্রাণময়ী সুরভিকে দেখতে পেয়ে লক্ষ্মীনাথের বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণাটা কিছু কমল। আর মূর্তি তৈরি করিয়েই লক্ষ্মীনাথ ক্ষান্ত হল না। ইট ,বালি ,সুরকি আনিয়ে ঘরের সামনে মন্দিরের মতো একটি পাকা ঘর তৈরি করার জন্য মিস্ত্রি লাগাল।

সুরভির মৃত্যুর পর থেকে লক্ষ্মীনাথ ব্যবসায় মন দিতে পারছিল না। অফিস গেলেও কাজগুলি সুষ্ঠুভাবে করতে পারছিল না। স্বাভাবিকভাবেই পার্টি গুলির সঙ্গে কথার খেলাপ হয়েছে। পাওনা টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না পেয়ে কয়েকজন ঠিকাদার অতুলবাবুর মাধ্যমে ভোলানাথের কাছে অভিযোগ করেছে। এদিকে ব্যবসা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ভোলানাথকে প্রায়ই সম্বলপুর, ঝাড়চোগড়া, আসানসোলে যেতে হয়– তার জন্য ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথকে কিছুই বলতে পারছে না। সুরভির অকাল মৃত্যুর জন্য ভোলানাথ ও শোকাহত। কিন্তু লক্ষ্মীনাথের ভারসাম্যহীন আবেগ দেখে তার ভালো লাগেনি। লক্ষ্মীনাথের প্রতি তিনি কিছু পরিমাণে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন তথাপি সহ্য করে যাচ্ছিলেন ।কিন্তু বাড়ির সামনে আর ও একটি পাকা ঘর তৈরি করার কাজে লক্ষ্মীনাথকে হাত দিতে দেখে তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না।

' বেজ ইট ,বালি, সুরকি এনে মিস্ত্রি লাগিয়েছ, কিসের ঘর তৈরি করছ এখানে?

লক্ষ্মীনাথ সরল ভাবে বলল, 'দাদা একটা ছোটো মন্দির তৈরি করব বলে ভাবছি।

' মন্দির ?এখানে আবার কিসের মন্দির?' 'সুরভির মূর্তি তৈরি করেছে আপনি তো দেখেছেন ।মূর্তিটি এত সুন্দর হয়েছে,অবিকল সুরভি।' লক্ষ্মীনাথের কণ্ঠস্বরে আবেগ, সেই মূর্তিটা এই মন্দিরে স্থাপন করব।'

  ভোলানাথের মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। যেন রাগে এখনই লক্ষ্মীনাথকে গালিগালাজ করবেন। কিন্তু লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার কপাল কুঁচকে উঠল। তারপর একটি তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললেন–' এভাবে এখানে সুরভির মূর্তি স্থাপনের জন্য মন্দির তৈরি করছ, কথাটা আমার সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত ছিল।'


বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

হে আমার স্বদেশ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Santosh Kumar Karmakar

 হে আমার স্বদেশ

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস




  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


  আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


এক

'লক্ষ্মী–।'

বৈঠকখানা থেকে বাবার আওয়াজ ভেসে এল।

লক্ষ্মীনাথ বাইরের বারান্দার কাঠের বেঞ্চে বসে আছে। গতকাল গোলাঘাট থেকে মেজদা গোবিন্দ্রচন্দ্র এসেছিলেন। রাতে বাবার সঙ্গে কলেজে পড়ার জন্য লক্ষ্মীনাথকে কলকাতা পাঠানোর ব্যাপারে কথা হয়েছে। আজ সকালে গোলাঘাট রওনা হওয়ার সময় মেজদা লক্ষ্মীনাথকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন। তথাপি লক্ষ্মীনাথ আশ্বস্ত হতে পারছে না। কারণ, অন্যদিনের তুলনায় বাবা আজ বেশি গম্ভীর। সকালে ঠাকুর ঘরে পূজা আহ্নিক করতে বেশি সময় নিয়েছেন। নাম কীর্তনের সময় বাবার গলাটা ধরে আসছিল। তার চেয়েও বড় কথা, ঠাকুর ঘরের কাজগুলি ওকে দিয়েই করান। আজ সেগুলি শ্রীনাথকে দিয়ে করালেন। তার মানে মেজদা ওকে কলকাতা পাঠানোর ব্যাপারে চাপ দেওয়াটা বাবার ভালো লাগেনি।

বাবা কেন কলকাতা পাঠাতে চান না লক্ষ্মীনাথ জানে। কিন্তু  উপায় কী? সে যে দুই দাদা গোলাপ চন্দ্র এবং গোবিন্দচন্দ্রের মতো  কলকাতায় গিয়ে পড়াশোনা করবে বলে ভেবে নিয়েছে।

বাবার ডাক শুনেও লক্ষ্মীনাথ সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিতে পারেনি। তবু সে বৈঠকখানা ঘরের দিকে এগিয়ে গেল ।

'বাবা লক্ষ্মী–।' 

এবারের ডাকে মন খারাপ মেশানো স্নেহ। বাবার এই স্নেহটুকু তার মনে সৃষ্টি হওয়া ভয় আর আশঙ্কাটা কিছু পরিমাণে  কমিয়ে দিল ‌। সে  বিনম্র সুরে জানাল, 'আসছি ,বাবা।'

কলকাতা যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে বাবা দুঃখ পেয়েছেন। ছেলে হয়ে বাবার দুঃখ এবং মন খারাপের কারণ যে হওয়া উচিত নয়, তা লক্ষ্মীনাথ বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেন বলেই লক্ষ্মীনাথের মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বৈঠকখানা ঘরে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।

হাতল থাকা একটি বড় ছেলে দীননাথ বেজবরুয়া বসে আছেন।সত্তরের কাছাকাছাকাছি বয়স যদিও সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি দুবার বিয়ে করেছেন। দুই পক্ষের তেরো  জন জীবিত সন্তানের পিতা তিনি। আচার-আচরণে দীননাথ নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণ। ইংরেজ সরকারের হাকিমের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে নিজের বাড়ি শিবসাগরে বসবাস করছেন । তা বলে অবসর জীবনের জড়তা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ব্রাহ্ম লগ্ন থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত বৈষ্ণব আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দেহমন নিয়ন্ত্রিত করে থাকেন। তাছাড়া আহার নিদ্রাতেও তিনি  সাত্ত্বিক।এই বয়সেও বংশ-পরম্পরা গত ভাবে লাভ করা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চা করছেন এবং জনগনের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রয়েছেন। শিবসাগরে সামাজিক কাজকর্মেও তিনি সক্রিয় । এদিকে প্রতিদিন বিকেলে শিবসাগরের বয়োজ্যেষ্ঠ জনগণ বিভিন্ন সত্র থেকে আগত সত্রাধিকার  এবং শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরা তাঁর বাসগৃহে সমবেত হন । তাঁদের সঙ্গে দশম- ইত্যাদি শাস্ত্রপুরাণ পাঠ, গীতা ভাগবতের তাত্ত্বিক আলোচনা- ব্যাখ্যায় সমগ্র বাড়িটা প্রাণ পেয়ে উঠে।

অন্যদিকে এই সময়ে দীননাথ সাপ্তাহিক ইংরেজি -অসমিয়া ' আসাম নিউজ' কাগজ পড়েন। কাগজ কলম নিয়ে খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধের ভুল বের করে সম্পাদককে চিঠি লেখেন । এখন কাগজটা সামনের নিচু টেবিলটাতে পড়ে রয়েছে । তার মানে কাল রাতে লক্ষ্মীনাথের বিষয়ে গোবিন্দচন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করা কথাগুলি নিয়ে  তার মন এখনও  অস্থির হয়ে রয়েছে। মানসিক এই অস্থিরতার জন্যই তিনি খবরের কাগজটিতে  মনোসংযোগ করতে পারেননি। 

দীননাথ ছেলের দিকে তাকালেন। লক্ষ্মীনাথ এন্ট্রান্স পাস করার দেড় মাস হয়েছে। পড়াশোনায় মাঝারি ধরনের যদিও স্বভাব চরিত্র ভালো। ধর্ম কর্মেও মতি রয়েছে। সে এখন আঠারো বছরের তরুণ। চেহারাটা বেশ আকর্ষণীয়। চোখেমুখে একটা সপ্রতিভ ভাব ফুটে উঠেছে। মেজো ছেলে গোবিন্দচন্দ্রের মতো এত গতিশীল মনের না হলেও লক্ষ্মীনাথ বুদ্ধিমান। দীননাথ লক্ষ্মীনাথের মধ্যে সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেখতে পান। ছেলের মুখের দিকে তাকালে দীননাথ পিতৃ  গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে উঠেন। মনের মধ্যে অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও এখনও ছেলের দিকে তাকিয়ে তার ভালো লাগল। অন্তঃসলিলা অপত্য স্নেহে তাঁর অন্তর সিক্ত হয়ে উঠল।

ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে দীননাথ ধীরকণ্ঠে  বললেন–' গতকাল রাতে তোর মেজদার সঙ্গে তোর বিষয়ে অনেক কথা হল। তোর দাদা আমাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে বলল। কলকাতা যাবার খরচসহ তোর অন্যান্য সমস্ত খরচের দায়িত্ব ও বহন করবে বলে জানাল। সমস্ত কিছু শুনে আমি আর অমত করতে পারলাম না। তবে আমি কেন তোকে কলকাতা যাওয়ায় বাধা দিয়েছিলাম, তা তুই বুঝতে পেরেছিস কি?'

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা লক্ষ্মীনাথের পক্ষে খুব কঠিন। পিতার দিকে তাকিয়ে অসহায় সুরে সে শুধু বলল,' পেরেছি, বাবা।'

' পেরেছিস, বুঝতে পেরেও কলকাতায় গিয়ে পড়াশোনা করার এত আগ্রহ।' দীননাথ মনে মনে বিড়বিড় করলেন। তার পরই তার মুখে ক্রোধের ভাব দেখা গেল,' ওরে, তোরা কি জানিস না– আমাদের পূর্বপুরুষরা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন, পন্ডিত মানুষ ছিলেন। আমাদের পূর্বপুরুষ কলিবর  কনৌজ  থেকে এসে তখনকার সময়ের স্বর্গদেউ জয়ধ্বজ সিংহের অনুরোধে অসমে এই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর পান্ডিত‍্যে  অভিভুত হয়ে জয়ধ্বজ সিংহ রাজসভায় তাকে বেজবরুয়ার (রাজবৈদ‍্য) পদ প্রদান করেছিলেন। সেদিন থেকেই আমরা বংশ-পরম্পরা ভাবে বেজবরুয়া। তখন থেকেই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চার মাধ্যমে মানুষকে সেবা করাটাই আমাদের কর্ম এবং ধর্ম। আমাদের এই শাস্ত্র প্রাচীন যদিও সনাতন, শাশ্বত। এই শাস্ত্রের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে এমন কিছু গুণ আছে , যা বিশ্ব ভূমন্ডলের অন্য কোনো দেশে দেখতে পাওয়া যায়না। অথচ তোরা, তোদের দাদা ভাইদের মধ্যে কোনো একজন এর মুল্য বুঝলি না। আমিও তোদের বোঝাতে পারলাম না। আজকের শিক্ষা, বিশেষ করে কলকাতার ইংরেজি শিক্ষা তোদের নিজের দেশের ঐতিহ্য পরম্পরাকে অবজ্ঞা করতে শেখাল–।' 

লক্ষ্মীনাথ তখন ডাক্তার গোলাপ দাদার কথা বলতে চাইল। পিতার প্রবল বিরোধিতায় ডাক্তারি পাশ করে গোলাপ দাদা বলেছিল, ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে আজকের যুগে অ্যালোপ্যাথি ডাক্তারি বিদ্যার দ্রুত প্রসার হয়ে চলেছে। নতুন যুগের মানুষ এলোপ্যাথি চিকিৎসার প্রতিই  আকৃষ্ট হয়েছে । তাই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের বর্তমান আছে যদিও ভবিষ্যৎ নেই । তবে এসব  কথা বলা যাবে না। বললে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নিষ্ঠাবান বাবা দুঃখ পাবেন। ক্রোধে গর্জন করে উঠবেন। এক পলকের জন্য পিতার রোষতপ্ত  মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় মাথা নিচু করল।

' এখনও আমার সেই দিনটির কথা মনে পড়ে। এটা আমার জন্য, তোদের জন্য, এই বেজবরুয়া বংশের প্রত্যেকের জন্য কত বড় গৌরবের কথা।' দীননাথ তারপর বলতে লাগলেন,' স্বর্গদেব পুরন্দর সিংহ আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আমার  আমার পাণ্ডিত্য- পারদর্শিতার কথা জানতে পেরেছিলেন। তারপর আমাকে কামরূপের  কামাখ‍্যা ধামে নিয়ে গিয়ে কামাখ্যা দেবীর সামনে শপথ করিয়ে নিয়ে রংপুরের রাজবৈদ্য নিযুক্ত করেছিলেন। সাহেবরা দেশের শাসনভার গ্রহণ না করলে আজও আমি সসম্মানে স্বর্গ দেবের সেবা করে যেতাম। কিন্তু এসব নিয়ে তোরা গর্ববোধ করিস না। এদিকে আমার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল রাজকুমার নামে বাঙালি ছেলেটি। আমার কাছে কাজ শিখে সে বৈদ্য হয়ে টাকা পয়সা রোজগার করছে। চিকিৎসার টাকায় সে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার প্রতিপালন করছে। অথচ আমার নিজের ছেলেদের মধ্যে একজনেরও আজ পর্যন্ত এই বিদ্যার প্রতি কোনো রকম আগ্রহ বা আসক্তি দেখতে পেলাম না। যা দেখছি, এত যত্নে, এত আগ্রহের সঙ্গে অধ্যয়ন করা আয়ুর্বেদের জ্ঞান এবং এত বছর ধরে লাভ করা অভিজ্ঞতার  কিছুই আমার ছেলেদের দিয়ে যেতে পারব না।' 

দীননাথ চুপ করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পুনরায় বললেন,' তোর আগের দুজন কলকাতা গিয়ে ইংরেজি পড়াশোনা করে প্রবাসী হল। ওরা আর বাড়ির প্রতি কোনো আগ্রহ বোধ করে না। ইংরেজি শিখে  তুইও বাইরে থাকবি। তোরা সবাই বাইরে থাক, বাড়িতে কে থাকবে? আমার জীবিত কালটা কোনোভাবে পার হয়ে যাবে। আমার মৃত্যুর পরে পরিবারটা  কে দেখবে? আচ্ছা, আয়ুর্বেদে তোর আগ্রহ নেই, মানছি। কলকাতা না গিয়ে অসমে থেকে ওকালতি পড়তে পারিস। ওকালতি পড়ে কালীপ্রসাদ চলিহার  মতো উকিল হয়ে শিব সাগরে প্র্যাকটিস করতে পারতিস।'

' বাবা–।' নীরব থাকতে না পেরে অনুযোগের সুরে লক্ষ্মীনাথ বলল,' আপনিইতো নাম ভর্তি করেও ওকালতি ব্যবসাটা ভালো নয় বলে দাদার নামটা পরে কাটিয়ে এনেছিলেন।'

' নাম কাটিয়ে দিয়েছিলাম সত্যি–।' প্রতিবাদ করে ওঠার জন্য লক্ষ্মীনাথের উপর রুষ্ট না হয়ে কণ্ঠস্বর নামিয়ে  এনে দীননাথ বললেন,' কিন্তু কলকাতার ইংরেজি শিক্ষা তোর দাদার সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি করে দিল। আর এখন আমার কি বয়স হয়নি? দাদারা বড় হয়েছে, পড়াশোনা করে অর্থ উপার্জন করছে। চোখের সামনে ওরা থাকলে বুকে সাহস পাই, ভরসা পাই। কী আর বলব। তোদের এসব বলে লাভ নেই। এসব তোরা বুঝতে পারবি না, বুঝতে চেষ্টাও করবি না। তোদের কাছে আমার এই ওজর আপত্তির কোনো মূল্য নেই। আসলে, আমার কোনো ছেলে চিকিৎসক হয়ে জনগণের সেবা করুক, ছেলেরা বাড়িতে থেকে বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি ঘটাক– এটাতে  যেন প্রভু ঈশ্বরের সায়  নেই। কৃষ্ণ, কৃষ্ণ!'

অবশেষে নিজেই প্রভু ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করলেন যখন,লক্ষ্ণীনাথের কলকাতায় পড়তে যাবার কথাটা দীননাথ মেনে নিতে প্রস্তুত হয়েছেন। লক্ষ্মীনাথের মনটা নেচে উঠতে চাইছিল। কিন্তু বাবার সামনে আনন্দ বা উচ্ছ্বাস  প্রকাশ করাটা উচিত হবে না ।

' কলকাতার কলেজে পড়ার এতই ইচ্ছা যখন-যা, আমি আর বাধানিষেধ আরোপ করব না।' একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে দীননাথ অবশেষে বললেন,' কলেজে নাম লেখানোর সময় হল বোধহয়?'

উৎসাহিত হয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' কলেজের নাম লেখানোর দিন পার হয়ে গেছে, বাবা। এন্ট্রান্সের ফলাফল বের হওয়ার পরে কলকাতায় যাব কি যাব না করতে করতেই দেড় মাস পার হয়ে গেল।'

' যাবিই যখন, তৈরি হয়ে নে।' এবার স্বাভাবিক সুরে দীননাথ বললেন–' কাপড়-চোপড়, বিছানাপত্র কী কী লাগবে সব জোগাড় কর। কলকাতা, ওটা বাঙ্গালীদের রাজ্য। তোর জন্য পুরোপুরি বিদেশ। সেখানে গিয়ে প্রথম তুই কোনো পাত্তাই পাবিনা। তাছাড়া শুনতে পাচ্ছি আমাদের অসমিয়া ছাত্ররা নাকি মেসে থাকে। মেসে নানা ধরনের লোকের বসবাস। তাতে আচার- সংস্কার নেই। জাতের বিচার নেই। তাই তুই মেসে থাকতে পারবি না। তোর সঙ্গে মেজ দাদা গোবিন্দ যাবে। সে চার বছর কলকাতায় ছিল। কলকাতার সমস্ত কিছু জানে। থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে সেই তোকে রেখে  আসবে ।'

লক্ষ্মীনাথের প্রাণে মুক্তির বাতাস লাগল। দুই চোখের সামনে কলকাতার কল্পিত দৃশ্যগুলি ভেসে বেড়াতে লাগল। ইংরেজরা গড়ে তোলা কলকাতা এখন ভারতবর্ষের রাজধানী। কলকাতা থেকেই ভারতের শাসন নীতি পরিচালনা করা হয়। ইংরেজরা কলকাতায় বসতি স্থাপন করার পরেই বাঙালিরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠল এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হয়ে তারা আধুনিকতার দিকে পা বাড়াল। তারপরে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হল। স্থাপিত হল অনেকগুলি কলেজ। সেই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করা বাঙালিরা অসমে স্থাপিত বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক রূপে নিযুক্ত হয়ে অসমিয়াদের শিক্ষিত করে তুলল। অসমের যে সমস্ত স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব– আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন,গঙ্গাগোবিন্দ ফুকন,গুনাভিরাম বরুয়া... তারাও কলকাতায় শিক্ষা লাভ করা ব্যক্তি । কলকাতায় শিক্ষা গ্রহণ করে অসমে ফিরে এসে অসমিয়া সন্তানরা হাকিম - মুন্সেফ  হয়েছে । সেই একই পথ অনুসরণ করে এই বাড়ির সু-সন্তান গোবিন্দ চন্দ্র - গোলাপচন্দ্রও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি রূপে বংশের সুনাম ছিনিয়ে এনেছে। আজ লক্ষ্মীনাথের জন্যও সেই পথ উন্মুক্ত হল।

যাত্রার জন্য জোর প্রস্তুতি চলল। জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশ্বাসী দীননাথ মহাশয় পঞ্জিকা পুঁথি দেখে দিন স্থির করলেন । প্রথমে অনুমতি না দিলেও তিনি কোনো বিষয়ে কঠোর মনোভাবের মানুষ নন । বুঝিয়ে বললে তিনি বাস্তবকে স্বীকার করে নেন। এদিকে জাতীয় শিক্ষা- সংস্কৃতি- ঐতিহ্য পরম্পরার বিষয়ে সচেতন যদিও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তিনি উদার। তাছাড়া দস্যু লুণ্ঠনকারী মানের আক্রমণ থেকে ইংরেজরা অসমিয়া জাতিকে রক্ষা করেছে চাঁদপুরে ইংরেজরা অসমের জনজীবনে স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে। ইংরেজরাই স্কুল স্থাপন করে অসমিয়াদের শিক্ষিত করে তুলেছে। এইসব কারণে তিনি ইংরেজদের শ্রদ্ধা করেন। এখন যেহেতু ইংরেজরা এ দেশের রাজা, তাই প্রজাদের রাজার ভাষা  শিখতেই হবে। যুগের জন্যও এটি প্রয়োজন এবং সেই অনুসারে সন্তানদের যোগ্য করে তোলাটা পিতার কর্তব্য।

এভাবে ভেবে লক্ষ্মীনাথকে কলকাতা যাবার অনুমতি দিয়ে দীননাথ বসে থাকলেন না। খুব শীঘ্রই ছেলেকে রওয়ানা করার জন্য নিজেই উদ্যোগী হয়ে পড়লেন। তিনি গোলাঘাটে থাকা গোবিন্দচন্দ্রকে খবর দিলেন। এদিকে শিব সাগর থেকে প্রথম যেতে হবে দিসাংমুখ। দিসাংমুখ থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন লাগানো জাহাজে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে কলকাতা যাত্রা । শিব সাগর থেকে দিসাংমুখ প্রায় সাত মাইল পথ । জিনিসপত্র নিয়ে এতটা পথ যাওয়ার উপায় ঘোড়া অথবা হাতি ।  দীননাথ বাড়ির চাকর ধনীকে ভুটিয়া ঘোড়াটা প্রস্তুত করার আদেশ দিয়ে গরুর গাড়িতে করে লক্ষ্মীনাথের জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেওয়া স্থির করলেন।

লক্ষ্মীনাথ কলকাতা যাত্রা করবে। মনের অসন্তুষ্টি জড়তা কাটিয়ে উঠে দীননাথ ছেলের যাত্রা করানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলেও ঠানেশ্বরীর মাতৃমন বিষন্ন হয়ে পড়ল। দীননাথের প্রথম পত্নীর মৃত্যুর পরে ঠানেশ্বরীকেই অন্দরমহলের দায়িত্ব সামলাতে হয়েছিল। কাজের লোকজন থাকলেও বড় সংসার। তাছাড়া অতিথি, অন্দরমহলের কাজের লোকদের সামলানো - উদয়াস্ত খাটতে হয়।তাই মা হয়েও লক্ষ্মীনাথকে সেভাবে আদর যত্ন করার সময় পান না।  তবে লক্ষ্মীনাথ  যে মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা পায়নি এমন নয়। জন্মের এক বছর পরে বড়মাই লক্ষ্মীনাথকে যত্নআত্তি করেছিলেন।বড়মার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ খাওয়া-দাওয়া করত,ঘুমোত। মাঘ মাসের ভোরে উঠে বড়মার সঙ্গে দিখৌ নদীতে স্নান করতে যেত। তাঁর সঙ্গে কার্তিক মাসে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালাত, আকাশ বাতি জ্বালাত।বড়মা ছেলেটিকে এত আদর যত্ন করার জন্য কোনো দুঃখ ছিল না। কিন্তু এখন ছেলেটি বাড়ি ছেড়ে সুদূর কলকাতায় যাবে– কলকাতা, ওটা বিদেশ। মানুষ আলাদা, ভাষা আলাদা।কলকাতার কোথায় থাকবে, কী খাবে, তার সামনে কে যত্ন করে ভাত বেড়ে দেবে? কথাগুলির ভাবলেই ঠানেশ্বরীর বুকটা হাহাকার করে উঠে।

যাত্রার আগের দিন। টিনের বাক্সে কাপড়চোপড় ভরিয়ে , ধনীর মাধ্যমে বিছানাপত্র বেঁধে লক্ষ্মীনাথ বিছানায় শুয়েছে মাত্র।ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল ঠানেশ্বরী। কাছে দাঁড়িয়ে করুণভাবে লক্ষীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

 আসন্ন  বিদায়ের কথা ভেবে মায়ের যে এই অবস্থা লক্ষ্মীনাথ তা বুঝতে পারল। বিছানা থেকে উঠে মাকে সান্তনা দেবার সুরে বলল,' দুঃখ করছ কেন! পড়াশোনার জন্য বিদেশ তো যেতেই হবে।'

ঠাণেশ্বরীর দুই চোখ ছলছলে  হয়ে এল। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,' কলকাতা বড় শহর। সেখানে গিয়ে কোথায় থাকবি?'

' জাতের বিচার নাই বলে বাবা মেসে  থাকতে মানা করলেন। মেজদাদা  নাকি তার কোনো পরিচিত  বামুন মানুষের ঘরে আমার থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে।'

' তারা তো বাঙ্গালী।'

' কলকাতায় বামুনের বাড়িতে থাকতে হলে তো বাঙালির ঘরেই থাকতে হবে।'

' বাঙালিরা মশলা ঝাল খায়।সেই সব খেতে পারবি?'

কলকাতায় গেলে মায়ের রান্না, মা আদর করে তৈরি করা খাবার পাবেনা। মায়ের কাতর মুখটির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের খারাপ লাগল। কিন্তু মন খারাপের ভাবটা বাইরে না দেখিয়ে শুকনো কন্ঠে বলল,' খেতে তো হবেই। বিদেশে তা ছাড়া আর উপায় কি?'

ঠাণেশ্বরীর কোমল মনটা কেঁপে উঠল। এরকম মনে হতে লাগল তিনি বড় কিছু একটা হারাতে চলেছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য অসম থেকে ছেলেরা কলকাতা গিয়েই থাকে। শিবসাগর থেকেও অনেক ছেলেরা গেছে। এমনকি, এই বাড়ি থেকেও গিয়েছিল। লক্ষ্মীনাথের যাওয়াটা  নতুন কথা নয়। তথাপি তিনি নিজেকে প্রবোধ দিতে পারলেন না।তাঁর দুচোখ   থেকে জলের ধারা অবিরাম গড়িয়ে পড়তে লাগল।

'মা, কাঁদছ? লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়ল,ইস এত কান্নার কী আছে? পড়াশোনা শেষ করে ফিরে আসব তো।'

ঠানেশ্বরী বেদনার্ত কাতর স্বরে বলে উঠল,' তুই কি আবার ফিরে আসবি?'

অন্যান্য দিনের চেয়ে কিছুক্ষণ আগেই জেগে উঠল। জেগে উঠেই নিত্যকর্ম সেরে পুকুরে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ঠাকুর পূজার জন্য ফুল তুলতে ফুলের বাগানে ঢুকে ছিল। এখন এই কাজটা ভাই লক্ষ্মণ করে। কিন্তু আজ লক্ষ্মীনাথ করতে লাগল। বিদ্যা অর্জনের জন্য বাড়ি থেকে যাত্রা করবে, জীবনের জন্য এটি একটি পবিত্র ব্রত। তার জন্য মনে ভক্তি  সমন্বিত ভাব আনতে হয়। ফুল তুলে এনে লক্ষ্মীনাথ ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করল। বাবার পূজার কোষা– অর্ঘ্য, থাল চন্দনের ঝুড়ি ইত্যাদি ধুয়ে সাজিয়ে দিল। চন্দন পিষল। তারপরের ঠাকুর ঘরে বসে দাদা শ্রীনাথ এবং ভাই লক্ষণের সঙ্গে গীত - ভটিমা গাইল( ঈশ্বর বা গুরুকে উদ্দেশ্য করে রচনা করা গান) । লক্ষ্মীনাথই আজ কীর্তন পুথি খুলে কীর্তন গাইল। এভাবে চলতে থাকা অবস্থায় অন্য দিনের মতো আজও দীননাথ এসে পুজোয় বসল। পুজোর পরে নাম প্রসঙ্গের শেষে আশীর্বাদ পর্ব শেষ হল।তারপরে কাসি ঘন্টা বাজানো হল।... শৈশব থেকে লক্ষ্মীনাথ বাড়িতে এই বৈষ্ণব আনুষ্ঠানিতা দেখে আসছে। পিতার অনুশাসন নির্দেশে এই সমস্ত পালন করে লক্ষ্মীনাথ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই সবই  এই বাড়ির সংস্কার। এই সংস্কার লক্ষ্মীনাথের  অন্তরকে শুদ্ধ করে তুলেছে। এই শুদ্ধতাই তাকে আনন্দ দান করে। আর আজ যে বাড়ি ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে, এই  শুদ্ধাচার এবং নৈতিক পবিত্রতা নিয়েই যাবে।

সকালের নাম প্রসঙ্গ, পুজো পাঠ সমাপন করে দীননাথ জল খাবার খেলেন। জলখাবার খেয়ে উঠে তিনি লক্ষ্মীনাথকে ডেকে পাঠালেন, 'যাবার জন্য সবকিছু তৈরি তো?'

' হ্যাঁ, বাবা।' আমি একবার চট করে আমাদের গোস্বামী স‍্যারকে প্রণাম জানিয়ে আসি।'

' হেডমাস্টার চন্দ্রমোহন গোস্বামী?'

' হ্যাঁ, বাবা।'

' যাওয়া উচিত। শুভ কর্মে বের হওয়ার আগে গুরুর আশীর্বাদ নিতেই হবে। এমনিতেও তিনি কলকাতার মানুষ। সম্ভ্রান্ত পরিবারের গোঁসাই। তিনি নিশ্চয় তোকে কিছু পরামর্শ দেবে। কিন্তু গোস্বামীর স্যারের কাছে যাবার আগে আমার কয়েকটা কথা শুনে নে।' গম্ভীর কণ্ঠে দীননাথ বললেন শাস্ত্রে বিদেশে নিয়ম নাস্তি' বলে একটা কথা থাকলেও বিদেশে ম্লেচ্ছদের কথা কান্ড থেকে দূরে সরে থাকতে হবে । কলকাতায় আমাদের হিন্দু মানুষের সংখ্যাই বেশি।তাই সেখানেও জাতের বিচার যে নাই তা নয় । আর তুই যেহেতু কলকাতায় সৎ  ব্রাহ্মণ একজনের বাড়িতে থাকবি, তাই নিত্য গঙ্গা স্নান করবি, আমাদের নিয়ম নীতি অনুসরণ করে সন্ধ্যা আহ্নিক করবি।সুবিচার থাকলে নাম প্রসঙ্গ ও করবি। এই সমস্ত করলে প্রভু গোবিন্দ তোকে শক্তি দেবে, নিয়মিত আচরণ তোর অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তুলবে।'

লক্ষ্মীনাথ পলকহীন চোখে পিতার ভালোবাসায় স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ।

তারপর দীননাথ পাশের পড়ার টেবিলে রাখা একটি ছোট নোটবুক নিয়ে লক্ষ্মীনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা তুই নিয়ে যা। সঙ্গে রাখবি। ঘরের আচার-আচরণ পালনের সঙ্গে বিদেশে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকবি। জনক-জননী, দাদা ভাই আত্মীয়স্বজন না থাকা বিদেশে নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হবে। তার জন্য কোন অসুখে কী ঔষধ খেতে হবে ,কী কি ধরনের সাবধানতা গ্রহণ করতে হবে …. এই নোটবুকটিতে সমস্ত লিখে দিলাম ।'

শুরুতে বিরোধিতা করা পিতাকে এতটা তৎপর হতে দেখে লক্ষ্মীনাথ অবাক হল। ছেলে কলকাতায় যাবে, সেখানে যাতে কুশলে মঙ্গলে থাকে তার জন্য পিতা এত চিন্তা করছেন। পিতা এত দায়িত্বশীল, এত স্নেহপ্রবণ। লক্ষ্মীনাথের পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা বেড়ে গেল । নোটবুকটা হাতে নিয়ে স্থির ভাবে তাকিয়ে রইল।

' দাঁড়িয়ে আছিস! দীননাথ বললেন , সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে ধনী গরুর গাড়িতে রওয়ানা হয়ে গেছে। তোরা দুজন একসঙ্গে ঘোড়ায়  যাবি। ফিরে আসার সময় ধনী ঘোড়াটা নিয়ে আসবে । এখন যা স্যারকে প্রণাম করে আয় গিয়ে–।'

চন্দ্রমোহন গোস্বামীর বাড়ি কলকাতায়। তিনি এখন শিবসাগরের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্কুল জীবনে লক্ষ্মীনাথ অনেক শিক্ষকের সংস্পর্শে এসেছে। সেই সব শিক্ষকের স্মৃতি খুব একটা সুখের নয়। কিন্তু হেডমাস্টার চন্দ্রমোহন গোস্বামী প্রথম থেকেই লক্ষ্মীনাথের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন। গোস্বামীর পাণ্ডিত্য বিশাল।একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ  হল, তিনি ছাত্র বৎসল এবং স্নেহপ্রবণ। ছাত্রদের মধ্যে তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে একবার তিনি কোহিমা বদলি হয়ে যাওয়ায়, কেবল তার অধীনে পড়াশোনা করার জন্যই পদ্মনাথ গোহাঞিবরুয়া পায়ে হেঁটে কোহিমায়  গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।

গোস্বামী স্যার এখন বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরা স্বাস্থ‍্যবান পুরুষ। চোখে কালো ফ্রেমের পাওয়ার থাকা চশমা। বাইরের বারান্দায় লক্ষ্মীনাথকে দেখেই গোস্বামী স্যার বেরিয়ে এলেন।

' ও, লক্ষী এসেছিস–।' প্রসন্ন হাসিতে গোস্বামী বললেন, তুই যে আজ কলকাতায় যাচ্ছিস, আমি জানি। তবে তুই একা যাচ্ছিস না সঙ্গে কেউ যাবে?'

'মেজদাদা যাবে।'

'গোবিন্দ সঙ্গে যাবে যখন তোর কোনো চিন্তা নেই।'

' স্যার আপনার আশীর্বাদ নিতে এসেছি।'বলেই, লক্ষ্মীনাথ চন্দ্রমোহন গোস্বামীর পর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।

লক্ষ্মীনাথকে  দুই হাতে আদর করে তুলে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে চন্দ্রমোহন গোস্বামী বললেন, আশীর্বাদ নিতে এসেছিস, তোদের প্রতি আমার আশীর্বাদ সবসময়ই রয়েছে। কিন্তু একটা কথা,  উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্য কলকাতা যাচ্ছিস – কলকাতায় ভালোর সঙ্গে খারাপও রয়েছে। কলকাতার ভালোগুলি অত্যন্ত ভালো। তার জন্যই কলকাতা এখন ভারতের শিক্ষা- সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি। আশা করছি শিক্ষা সংস্কৃতির দিক দিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা আধুনিক কলকাতার ভালো দিকটা তুই   গ্রহণ করবি। আচ্ছা, বেরিয়েছিস –- তোদের বাড়িতে গিয়ে বাবার সঙ্গে একবার দেখা করা উচিত ছিল। স্কুলের কাজের চাপে যেতে পারলাম না।'

' হবে, স্যার।' সবিনয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' আপনি কলকাতা গেলে জানাবেন। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব।'

' ঠিক আছে। আমি এখান থেকেই তোকে বিদায় জানাচ্ছি।'

' ঠিক আছে, স‍্যার। তাহলে আসছি ।'

আচ্ছা, এগিয়ে যা–। দুই হাত জোড় করে লক্ষ্মীনাথের নিরাপদ যাত্রার জন্য পরমেশ্বরের কাছে মিনতি জানিয়ে চন্দ্রমোহন উচ্চারণ করলেন দুর্গা– দুর্গা।'

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...