রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মানব অধিকার ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস Basudev Das,

 মানব অধিকার

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস





মানব অধিকারের কথা এই কয়েকদিন খুব শোনা যাচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধীর উনিশ মাসের একনায়কত্ব বাদ মানব অধিকারের বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে অধিক সচেতন করে তুলেছে। জরুরি অবস্থার সময় লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিনা বিচারে জেলে পাঠানো হয়েছিল, অনেকের ওপরে অবর্ণনীয় অত্যাচার করা হয়েছিল। শাসক চক্র থেকে ভিন্ন মত পোষণ করার এবং একনায়কত্ববাদের বিরোধিতা করাটাই ছিল তাঁদের একমাত্র অপরাধ। কিন্তু জরুরি অবস্থা প্রবর্তন করার বহু আগে থেকেই ভারতের বহু হাজার মানুষকে বিনা বিচারে জেলে রাখা হয়েছিল, তাদের অনেকের ওপরে অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছিল এবং অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নকশালপন্থী নামে পরিচিত এই সমস্ত লোক সন্ত্রাসবাদের সাহায্যে দেশের সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করার চেষ্টা করেছিল। যদিও এই সমস্ত মানুষ ১৯৬৮ সন থেকেই জেলে পচছিল, কিন্তু তাঁদের মুক্তি বা বিচারের জন্য মাঝে মাঝে উঠা দুই একটি বিক্ষিপ্ত ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ছাড়া কোনো প্রবল দাবি বা সংঘটিত জনমত গড়ে উঠেনি। ক্ষমতা দখল করতে পারলে জনতা পার্টি সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেবে বলে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরে এবং দেশের পরিবর্তিত মানসিক বাতাবরণে নকশালপন্থীদের মুক্তির দাবি ও দিনদিন প্রবলতর হয়ে উঠেছে।তাঁদের বেশিরভাগকেই ইতিমধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যে দুই তিন হাজার  লোক এখন ও বন্দি অবস্থায় রয়েছে ,আশা করা যাচ্ছে যে তাঁদেরকেও অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।

সমস্ত রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবির প্রতি আমরা নিঃশর্ত এবং অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছি। কিন্তু তাঁদের মুক্তির দাবির প্রসঙ্গে মানব অধিকারের বিষয়টিও ব্যাপক জনগণের আলোচনার বিষয় হয়ে পড়ার জন্য এই সুযোগে সেই সম্পর্কেও দু'একটি কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি। মানব অধিকার বলতে কী বুঝি? সংক্ষেপে মৌলিক মানবাধিকারটি হলঃ রাষ্ট্র বা অন্যান্য ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী জোর-জুলুম এবং বলপ্রয়োগ থেকে মুক্ত হয়ে থেকে এক ব্যক্তির নিজস্ব জীবন যাপনের অধিকার; প্রত্যেক ব্যক্তি জীবন যাপনের জন্য কাজ করার সুযোগ পাওয়ার অধিকার; চিন্তা, আলোচনা এবং মত প্রকাশের অধিকার, সরকার গঠনে প্রত্যেক ব্যক্তি অংশ নেবার অধিকার।

কিন্তু মানুষের সমস্ত অধিকারের চেয়ে বড় এবং মৌলিক অধিকার হল বেঁচে থাকার অধিকার, কিন্তু এই অধিকার নিঃশর্ত নয়। রাষ্ট্রকে মাঝেমধ্যে ব্যক্তির সেই অধিকার হরণ করতে হয়। নরহত্যা বা দেশদ্রোহিতার মতো বড় অপরাধে  অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যখন রাষ্ট্র মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে, তখন রাষ্ট্র সমাজের মঙ্গলের স্বার্থে ব্যক্তিবিশেষের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করে। ঠিক সেভাবে হিংসাত্মক উপায় বা সশস্ত্র বিপ্লবের পথে সমাজকে নতুন করে গড়ে তুলতে যাওয়া আদর্শবাদী লোকরাও সমাজের মঙ্গলের স্বার্থে মানুষকে হত্যা করে, আর তা করে অন্যের মানব অধিকার হরণ করে। হিংসা সবসময়ই নিন্দনীয় এবং বর্জনীয়; কিন্তু মানবপ্রেমের দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিপ্লবী হিংসাকে এক বাক্যে কেউ নিন্দা করতে পারেনি বা তার প্রয়োজনকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেনি। এর থেকে এটাই প্রতিপন্ন হয় যে একটি সম্পূর্ণরূপে হিংসামুক্ত, শোষণমুক্ত এবং অপরাধমুক্ত সমাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির মানব-অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু মানুষের কল্পনার সেই স্বর্গরাজ্য বাস্তবে কখনও পরিণত হতে পারেনা; তা চিরকাল থাকবে মানুষের একটি মহৎ স্বপ্ন, একটি মহতী কর্মপ্রেরণা, একটি ক্রম অপসৃয়মান লক্ষ‍্য। তার আনুষঙ্গিক পরিমাণ স্বরূপ পরম অর্থে  মানব অধিকারও একটি বিমূর্ত আদর্শ বা ধারণা মাত্র।

মানুষের মনস্তত্ত্ব অদ্ভুত। কেউ যদি নরহত্যা করে, সেই হত্যাকারী যথোচিত শাস্তি না পেয়ে রেহাই পেয়ে যাওয়াটাকে কেউ সমর্থন করে না । কিন্তু সেই একই হত্যাকারী যখন ফাঁসি কাঠে ঝোলার নির্জন কারাকক্ষে অপেক্ষা করে থাকে তখন নিহত ব্যক্তির কথা পুরোপুরি ভুলে গিয়ে মানুষের সমস্ত সহানুভূতি ধাবিত হয় ফাঁসির আসামীর প্রতি। আজ সন্ত্রাসবাদী, নকশালপন্থী বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সমস্ত মানুষ মুখর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সমস্ত লোক যে একদিন ঠান্ডা মস্তিষ্কে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, সে কথা বেশিরভাগ মানুষেরই স্মরণ নেই। বেশিরভাগ মানুষ এই কথাও ভুলে গেছে যে নকশালপন্থীদের হাতে নিহত হওয়া ভারতীয় পুঁজিবাদী শোষণের প্রধান পান্ডা একজনও ছিল না ,তাঁদের হাতে মারা পড়েছিল কেবল মাঝারি শ্রেণীর কিছু গ্রামীণ জমিদার বা শহুরে বাবু। শোষকশ্রেণিকে ভয় দেখানোর জন্য বা শিক্ষা দেবার জন্য নকশালপন্থীরা  বেছে নিয়েছিল এই শ্রেনীর দুর্বলতম লোকদের অর্থাৎ মানুষকে তাঁরা প্রতীকে পরিণত করেছিল। শোষক শ্রেণি সরকারের সহযোগিতায় যে দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করে নিয়ে তার নিরাপদ আশ্রয় থেকে কোটি কোটি মানুষকে তিলে তিলে হত্যা করে চলেছে , সেই দুর্গের শত যোজন কাছে যাওয়ার মতো নকশালপন্থীরা সাহস করেনি। আজ তাদের মুক্তির দাবি তোলার সময় এবং তাদের নিঃস্বার্থ আদর্শবাদিতার  গুণকীর্তন করার সময় এই কথাও বলার নিশ্চয় প্রয়োজন আছে যে তাঁদের কর্মপন্থা এবং রাজনৈতিক দর্শন ছিল ভুল । না হলে কেবল আবেগের উচ্ছাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে, আমাদের চিন্তা থেকে যুক্তি এবং নৈতিকতা হবে নির্বাসিত। 

আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব থেকে আরম্ভ করে ভারতের নকশালি সন্ত্রাসবাদী পর্যন্ত একটা কথা দেখা যায় যে কিছু আদর্শবাদী মানুষ যে সময়ে মানুষের মঙ্গল চিন্তার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসার পথ গ্রহণ করে সেইসময়ই কিছু স্যাডিস্ট প্রকৃতির স্বভাব নিষ্ঠুর লোক তাঁদের  ভিড়ে মিলে গিয়ে কেবল নিজের হত্যা প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে । বিপ্লবীদের দলে চাল থেকে তুষ বের করার কোনো উপায় নেই;এক সর্বগ্রাসী বিপ্লবী উন্মাদনার জোয়ার প্রকৃত আদর্শবাদী বিপ্লবী এবং বিকৃত- মানস খুনি অপরাধীকে একাকার করে তোলে । ফরাসি বিপ্লব এবং রুশ বিপ্লবের সময় যে সমস্ত মানুষ রক্তের নদী বইয়েছিল বা রক্তের হোলি খেলেছিল তাঁদের সবাই নিশ্চয় মানবপ্রেমিক বিপ্লবী সন্ন্যাসী ছিল না; অনেকেই ছিল রক্তলোলুপ পশু। ইতিহাসের পাঠকরা সে কথা জানে। সেই জন্য কেবল আবেগে বিহ্বল হয়ে বিপ্লবী নামধারী সমস্ত মানুষকে পূজার আসনে বসানোটা  মানুষের যুক্তি এবং বুদ্ধির প্রতি হবে অপমান স্বরূপ। প্রকৃত মানব প্রেমিক বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদী কি রকম হওয়া উচিত? তার পরাকাষ্ঠা  দেখিয়ে গিয়েছেন উনিশ শতকের  রাশিয়ান নিহিলিস্টরা। তুর্গেনিভের 'পিতা- পুত্র' উপন্যাস যারা পড়েছেন , তারা সেই ধরনের লোকের চরিত্রের কিছু আভাস পাবেন।( বস্তুতঃ তুর্গেনিভের সেই উপন্যাসেই 'নিহিলিস্ট' শব্দটি প্রথম বারের জন্য উচ্চারিত হয়)। মানুষের মঙ্গলের স্বার্থে রাশিয়ান নিহিলিস্টদের যখন কাউকে হত্যা করার প্রয়োজন হয়েছিল তখন তারা তাকে একটি কঠিন নিষ্ঠুর কর্তব্য বলে গ্রহণ করেছিল;তাঁরা বিশ্বাস করেছিল যে প্রকৃত বিপ্লবীর হৃদয়ে থাকতে হবে  a Christ-like all embracing compassion. একবার কয়েকজন রাশিয়ান নিহিলিস্ট  সন্ত্রাসবাদী ভুল করে একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করে; এই ঘটনায় তারা এতটাই অনুতপ্ত হল যে  নিৰ্দোষ মানুষকে হত্যা করার পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাঁরা নিজেরা আত্মহত্যা করে। প্রকৃত মানবপ্রেমিক বিপ্লবী এরকমই হওয়া উচিত‌। যে হিংসার মূলে থাকে সুগভীর মানব-প্রেম, কেবল সেই হিংসাই  নতুন সমাজের এবং নতুন মানুষের জন্ম দিতে পারে।

কিন্তু আসলে পারে কি? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে যে হিংসা সৃষ্টি করা কোনো সমাজই সম্পূর্ণ মানবাধিকার কখনও প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বাইবেলে বলা হয়েছেঃ 'যে সমস্ত লোক তরোয়ালের সাহায্যে বেঁচে থাকে, তরোয়ালের হাতেই সেই সমস্ত লোকের মৃত্যু ঘটবে।' ঠিক সেভাবে হিংসার  সাহায্যে সৃষ্টি হওয়া সমাজ বা রাষ্ট্রও হিংসার সাহায্য বর্তে থাকে। চিন্তা এবং মত প্রকাশের অধিকারকে অন্যতম মানব অধিকার বলে যদি স্বীকার করে নেওয়া হয়, তাহলে বলতে হবে যে বিপ্লবের পীঠস্থান রাশিয়ায় আজ সেই অধিকার নেই। সেই দেশে এখনও ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের একমাত্র স্থান কারাগার, পাগলা গারদ বা সাইবেরিয়ার হিম-মরুভূমিতে। অর্থাৎ মানব-অধিকারের নামে স্থাপিত হওয়া রাশিয়ায় দুটি মানবাধিকার যদি সম্পূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছে, অন্য কয়েকটি সেভাবে পায়নি। অর্থাৎ আদর্শ মানব সমাজ সৃষ্টি হতে এখনও অনেক বাকি। কিন্তু কেবল রাশিয়া কেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই কোনো সমাজ ব্যবস্থাতেই মানব অধিকার সমূহ কখন ও সম্পূর্ণ ভাবে স্বীকৃত হয়নি। যে সমস্ত মানুষ ইলিউশন বা মিথ্যা ধারণা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় না তারা আমেরিকান আইনজ্ঞ অলিভার ওয়েন্ডেল হোমসের এই কথায় নিশ্চয় সায় দেবে যে–'Every society rests on the death of men,the Government does not hesitate to kill when it sees fit and can.'

আমাদের বোধে আইনস্টাইনের বলা একটি কথা মানব- অধিকার বিষয়ে শেষ কথাঃ' মানব অধিকারের অস্তিত্ব এবং বৈধতা নক্ষত্রপুঞ্জে কেউ লিখে রাখেনি। মানুষের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকেই, সৌন্দর্য  এবং সুষমার প্রতি মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা থেকেই অধিকার গুলির ধারণা এবং প্রত্যয়ের  সৃষ্টি হয়েছে, এবং মানুষ তাত্ত্বিকভাবে সেই সমস্ত সহজে গ্রহণ করেছে; কিন্তু যে সমস্ত মানুষ মানব অধিকারের জন্য অভিলাষ এবং সাধনা করেছে, সেই একই মানুষ নিজের পশুপ্রবৃত্তি দ্বারা এভাবেই যুগে যুগে সেই অধিকার গুলিকে পদদলিত করেছে। মানুষের ইতিহাসের একটি বিরাট অধ্যায় সেই জন্য মানব অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কাহিনিতে  পরিপূর্ণ। এটা এক অন্তহীন সংগ্রাম এবং এই সংগ্রামে মানুষ কখনও চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তা বলে হতাশ হয়ে সেই সংগ্রাম চালিয়ে না গিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হবে সমাজের ধ্বংস।'


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শব্দব্রাউজ ৩০১ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-301, Nilanjan Kumar

  শব্দব্রাউজ ৩০০ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-299, Nilanjan Kumar শব্দব্রাউজ ৩০১ || নীলাঞ্জন কুমার বিপাশা আবাসন ।তেঘরিয়া মেন রোভ। কলকা...