Friday, October 19, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৫৩ । ১৯-০১০-২০১৮



দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন




(৬)
দুর্গা পূজার  অপর  একটি  গুরুত্বপূর্ণ লোকাচার  হল কুমারী  পূজা।  এই কুমারী  পূজার উৎসমূলে  রয়েছে তান্ত্রিক  লোকাচার  বলা ভালো  আর্যেতর  সমাজের  আদিম  লোকবিশ্বাস  ।আর্য  সভ্যতা বরাবরই  পুরুষতান্ত্রিক  । প্রকারান্তরে  অনার্য  সভ্যতা  ছিল মাতৃতান্ত্রিত।  রজঃস্বলা হওয়ার পুর্বে কুমারীর মধ্যে  এক পবিত্রশক্তি  নিহিত  থাকে -  পৃথিবীর প্রাচীনতম সমস্ত সভ্যতার মধ্যেই  এই বিশ্বাস বিদ্যমান ছিল ।  বর্তমানের কুমারীপূজা সেই আদিম  জনজাতির পালনীয় লোকাচারের সুসংস্কৃত ও  বিবর্তিত রূপ।  এই  প্রথা আদিম  লোকসমাজ থেকে  তন্ত্রের হাত ধরে দুর্গাপূজার প্রবেশ লাভ করেছে।  ‘ত্রানার্জন তন্ত্রে’  বলা হয়েছে –
“হোমদিকং হি  সকলং কুমারী পূজনং বিনা।
পরিপুর্ণ ফলং ন সাৎ পূজয়া ভবেদ ধ্রুবম্‌।।“
কুমারীর পুজা বিনা দুর্গাপূজার পরিপূর্ণ ফললাভ  অসম্পূর্ণ।  ‘রুদ্রযামল’ গ্রন্থে  কুমারীর ধ্যান মন্ত্র উল্লিখিত হয়েছে – “বালরূপক ত্রৈলোক্যসুন্দরীং বরবর্ণিনীম্‌।
নানালণকার নক্সাঙ্গীং ভদ্রবিদ্যা প্রকাশিনীম্‌।
ধায়েৎ কুমারীং জননীং পরমানন্দরূপিচীম্‌।।“
‘দেবীপুরাণ’ ও  বৃহদ্ধর্মপুরাণ’ এ কুমারী  পূজার  বিধান  দৃষ্ট  হয়,  সেখানে  এক থেকে শুরু  করে ষোল বৎসর বয়স্ক সুলক্ষণা কন্যাকে  যথাবিধি  পূজার বিধান আছে।  তন্ত্রে  এক থেকে শুরু  করে ষোল  বছর বয়স্কাকন্যাদের  ষোড়শ দেবী  নামে চিহ্নিত করার রীতি আছে।  যেমন  ১ বছর বয়স্কা কন্যাকে  সন্ধ্যা  কন্যাকে  সন্ধ্যা  নামে  চিহ্নিত করা হয়।  বাকিনামগুলি যথাক্রমে -  সরস্বতী ,  ত্রিধামূর্তি , কালিকা, সুভগা,  উমা,  মালিনী ,  কুব্জিকা, কালসন্দর্ভা, অপরাজিতা , রুদ্রানী, ভৈরবী,  মহালক্ষ্মী, পীঠনায়িকা, ক্ষেত্রজ্ঞা ও অম্বিকা। ‘যোগিনীতন্ত্র কুমারী  নির্বাচনে জাতিভেদ মানতে  বিষেধ  করেছেন।  এটি অবশ্যই দুর্গাপূজার এক উদারতার দিক,  সহিষ্ণুতার দিক।  তন্ত্রগ্রন্থাদিতে  কুমারীপুজার  মাহাত্ম্য বিশেষভাবে  বর্ণিত হয়েছে।  কুমারীকে  ফুল দিলে  তার ফল হয়  মরুপর্বতের  সমান। কুমারীকে  মিষ্টি  ও অন্ন  ভোজন করালে  ত্রিলোককে  ভোজন করানো  হয়।  কুমারী  তুষ্ট  হলে  স্বয়ং প্রসন্না  হবেন -  এই ভাবনা থেকেই  কুমারী  পুজার আয়োজন । নারীর  প্রতি শ্রদ্ধাই দেবীকে  শ্রদ্ধা – এই  শিক্ষাই  দেয়  এই লোকাচার    আদিম  মাতৃতান্ত্রিক  সমাজ ব্যবস্থায়  নারীর  কর্তৃত্বকে  কিছুটা  হলেও  স্বীকৃতি  জানানো  হয়েছে  এই  প্রথার  মাধ্যামে।  এখানেই  এর  প্রাসঙ্গিকতা    সার্থকতা।
দুর্গাপূজার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন লোকাচারটি হল বরণ  বা সিন্দুরখেলা।  দশমীয় সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের প্রাক্কালে  ত্রয়োস্ত্রীরা দেবীবরণ করেন । থালায় দুধ,  পানের বাটা,  মিষ্টি, আলতা,  সিন্দুর সাজিয়ে বিবাহিত মহিলারা দেবীকে শেষ আপ্যায়ণ করেন। প্রথমে সন্দেশ করেন।  থালায় দুধ ইত্যাদি খাওয়ানোর পর আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেবীর মুখে পানের বাটা (সাজা পানকে থেঁতো করে) দেওয়া হয়।  স্বামীগৃহে যাত্রার পূর্বে যাত্রাপথে দেবীর মুখ মুছিয়ে  দেবীর মুখে পানের বাটাদেওয়া হয়।  কানে কানে বলেন – আসছে  বছর আবার এসো।  এরপর বয়স্কাসধনা  প্রশাস্ত্রিপাত্র (বরণডালা)  দিয়ে দেবীকে  বরণ করেন ও কনাঞ্জলি করেন।  কনাঞ্জলি বাঙালী  বিবাহ  অনুষ্ঠানে কন্যার পতিগৃহে  যাত্রার পূর্বে  পালিত  হয়।  আসলে  বরণের  সময় দেবী  যেন  আর দেবী নন,  স্বরের  কন্যা। তাই  তাকে  বিদায়ের  অনুষ্ঠানি ও লৌকিক।
এছাড়া আরো অনেক  (ছোটখাট)  লোকাচার পালিত হয়।  প্রবন্ধের বিস্তার  ভয়ে  অতিসংক্ষেপে  যেগুলি  আলোচিত  হল – ১ দেবতাকে ভোগ নিবেদন শাস্ত্রীয়  বিধি  অনুসারে  হলেও  দুর্গাপূজায় অনেকস্থানেই দেবীকে  ভোগউৎসর্গ করা হয় সম্পূর্ণ লৌকিক মতে।  যেমন বিষ্ণুপুরের ভট্টাচার্য বাড়িতে  পান্তাভাত,  পোড়া চেং মাছ,  জামিরের  রস ও  লবণ  সহযোগে  ভোগ দেওয়া হয়।  কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজায়  দশমীতে  দেবীকে  পান্তাভাত ও কচুশাকের ভোগ নিবেদন হয়।  দশমীতে কন্যা পতিগৃহে দুরদেশ যাত্রা করবে তাই  তার নারীর শীতল রাখতে এই ব্যবস্থা । ২।  দশমীতে দেবীর দর্পণ বিসর্জনের পর (একটি মালমায়  হলুদ খোলা  জলে ধান দুর্বা মিশ্রিত  করে দর্পনে দেবীর  প্রতিবিম্বিত  অবস্থায় দর্পনটিকে হলুদ জলে নিমজ্জন)  উক্ত হলুদ জলে হাত ডোবালে মহিলাদের  রঞ্জন বিদ্যার উন্নতি ও সুনাম হবে-  এমনই  লোকবিশ্বাস। ৩.  সন্ধিপূজার  ঘাটালের বরদার বিশালাক্ষী দেবীর মন্দিরে  পাশাপাশি রাখা দুটি  মোমবাতির  শীর্ষ এক হয় সন্ধীক্ষণ নির্ণয়  ৪.  সন্ধিপূজায়  ১০৮ পদ্ম নিবেদন প্রসঙ্গে  রামচন্দ্রে  কিংবদন্তীটি ও লৌকিক  ৫.  বিসর্জনের সময় পরস্পরের গায়ে  জলকাদা  করা আদিম শবরজাতির জনপ্রিয় লোকউৎসব ছিল।  অনুসন্ধানে  করলে এমন আরো বহু  লোকাচারের  সন্ধান মিলবে।
তথ্যসূত্র –
১. পূজা কার্বন – যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধি।
২.  দুর্গারূপে ও রূপান্তরে – পূর্বা  সেনগুপ্ত।
৩. ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য -  শশিভূষণ  দাশগুপ্ত।
৪. শাক্তপীঠ  ক্ষীরগ্রাম ও দেবী  যোগ্যদা – যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী।
৫. সাংস্কৃতিক  ইতিহাসের  প্রসঙ্গ -  ড.  দীনেশ চন্দ্র সরকার।
৬.  পুরাণ প্রবেশ  গিরীন্দ্র শেখর  বসু।
৭.  দূর্গাপূজা পদ্ধতি -  শ্রিশ্যামাচ রণ কবিরত্ন।
৮.  মহিষাসুর  মর্দ্দিনী দুর্গা-  স্বামী  প্রজ্ঞানানন্দ ।
৯. ঘাটালের কথা – প্রনব রায় ও পঞ্চানন  রায়।
১০. ব্রাহ্মণ ভুমের প্রাচীন  দুর্গোতসব – সুগত পাইন -   পুরালোকবার্তা  (ISSN – 2319-7614) 2013 Vo. v

Thursday, October 18, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা -৬৫২ । ১৮-০১০-২০১৮


দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন



 (৫)
দূর্গাপুজা যে আদিতে  শস্যদেবী (বৃক্ষলতা০ র পূজা  ছিল তার  আরো একটি প্রমাণ  হল দশমীর  বিসজনান্তে  দশমীর বিসজনান্তে একটি  কুলাচার  যা অপরাজিতা পূজা  নামে পরিচিত।  দশমীর ঘট  বিসর্জনের পর ঈশান কোণে  অষ্টাদলপদ্ম  অঙ্কিত  করে তার  উপর একটি  নীল   অপরাজিতার  লতাকে  স্থাপন  করে তার  পূজা  করা হয়।  দুর্গার  সমাপন্তে দেবী  অপরাজিতার  কাছে পূজার  যাবতীয় ত্রুটি নিরসনের  জনয ক্ষমাভিক্ষা  ও বিজয়  প্রার্থনা করা হয় -  “অপরাজিতা  রুদ্রলতা করতু বিজয়ং মম।“ পুজার পর  লতাটি  বাহুতে  বাঁধার প্রথা আছে।  আবার  কোথাও  কোথাও  লতাটিকে  খন্ড  খন্ড  করে হরিদ্রাসিক্ত  বস্ত্রে  বেঁধে  হলুদসূত্র  দ্বারা  বাহুতে  পরার  চল আছে।  এই বিধানটি  কালিকাপূরাণোক্ত । সেখানে  দেবী  অপরাজিতার  ধ্যান মন্ত্র ও উদ্ধৃত  হয়েছে—
“নীলোৎপলদলশ্যামাং ভূজগাভরণজ্জ্বলাম্‌।  বালেন্দুমৌলিনীং দেবীং  নয়নত্রিয়ান্বিতাম্‌।।
শঙ্খ চক্রধরাং দেবীং বরদাং ভয়নাশিনিম্‌।  পীনোত্তুঙ্গ স্তনা শ্যামাং  বরপদ্মসুমালীনিম্‌।।“
বিভিন্নপুরাণেও  দেবী  অপরাজিতার কথা পাওয়া যায়।  ‘মৎস্যপুরাণ  থেকে জানা যায় যে  অন্ধকারসুরের  রক্তপান করার জন্য মহাদেব দেবী  অপরাজিতাকে সৃষ্টি করেছিলেন। আবার বামনপুরান মতে দেবী  মহর্ষি গৌতম ও অহল্যার  কন্যারুপে আবির্ভুত হন এবং  দেবী  সতীর  সখীত্ব  লাভ করেন।  বরাহ পুরাণ  অনুসারে  মহিষাসুরের  সঙ্গে দেবী দূর্গার  যুদ্ধ  চলাকারে  ব্রহ্মা বিষ্ণু ও শিবের চক্ষু  থেকে জয়া, বিজয়া,  জয়ন্তী ও অপরাজিতা এই  চার সহচারী  দেবীর জন্ম হয়েছিল।  আবার দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী তে দেবী  অপরাজিতা কে চৌষট্টি  যোগিণিগ্ণের অন্যতমা  হিসাবে বর্ণ্না করা হয়েছে। পৌরাণিক  উল্লেখ  থাকলেও  অপরাজিতা  পূজা  একান্তই  লৌকিক।  এই সকল  পৌরাণিক  অভিক্ষেপ অর্বাচীন।  পূজাটির  বিধিতে  লৌকিক  দারনা  ও ভাবনার প্রকাশ  সুপষ্ট।
দুর্গাপূজাতে  পশুবলির  বিধান আছে।  শ্রী শ্রী  চন্ডীর দ্বাদশ  অধ্যায়ের  ভগবতী বাক্যে  বলা হয়েছে –
“সর্ব মমৈর্ত  ন্মাহাত্ম্যং সম  সন্নিধিকারকল্ম।
পশুপুষ্পার্ম্যধুপৈওশ্চ গন্ধদীপেন্তসোভমৈঃ।।“
‘কালিকাপুরাণের’  ৬৭ তম অধ্যায়ের বলিদানের  বিস্তারিত  বিবরণ  দৃষ্ট  হয়।  সেখানে  বলা হয়েছে নরবলিত  দেবী  উপাসকের  প্রতি   সহস্রবৎসর, মহিধবলিত দশ বৎসর , ছাগ/  মেষ বলিতে  ক বৎসর  কুষ্মানাদি (চালুকমড়ো,  শম্পা  ইক্ষুদন্ড,  বাতাবি ইত্যাদি)  বলিদান  দেবী  সাধকের  প্রতি একমাস  প্রসন্ন থাকেন।  ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ‘    নরবলির  প্রসস্তি  লক্ষ্য  করা যায় –
নরবলি  পেলে দেবী  সহস্র  বৎসর।
পূজকের  প্রতি থাকে তুষ্ট নিবন্তর।।‘
দূর্গাপূজায়  মহানবমী তিথি  ও সন্ধিক্ষনে বলিদান  করা হয়ে থাকে।  মহাষ্টিমী তিথিতে  বলিদান  নিষিদ্ধ।  তবে  কোথাও  কোথাও  কুলানুচার  বশতঃ তেও বলিদান  হয়।  কেশপুরের  আড়ঢ়াগড়ে  কবি কঙ্কন মুকুন্দচক্রবর্তীর আশ্রয়ডাটা  বাঁকুড়া  রায়ের  বংশে  মহাষ্টমী তিথিতে আটটি  বলিদান  হয়।  নরবলির প্রতিকল্প  রূপে  কোথাও  কোথাও  চালুকমুড়ো,  পিটুলের  নরমুর্তি  চোলের  গুঁড়ো কে জলে  ভিজিয়ে  মন্ড  করে নরমূর্তি তৈরী  করা হয়) কে  মানকচুর  পাতায়  মুড়ে বলি  দেওয়া  হয়,  একে শত্রুবলি বলা হয়।  আবার  কোথাও  কোথাও  বৈষ্ণবমতানুসারে  ঘনীভূত  ক্ষীরের ছাগশিশু প্রস্তুত  করেও   বলিদান করা হয়।  বলিদানের পর সত্তর রক্ত  মৃন্ময়পাত্রে  সৈন্ধবলবন,  বন্দলী, শর্করা ও মধু সংযুক্ত  করে দৈবীর  বাসপার্শ্বে স্থাপিত  হয়।  বর্তমানে বলিদান শাস্ত্রীয় বিধি বলে  প্রতীয়মান হলেও  মূলে  এটি আদিম  লোকাচারজাত। আদিম যুগ থেকেই মানুষ  উৎর্বরতা শক্তির বৃদ্ধি,  বিপদ আপদ থেকে  মুক্তির  জন্য এবং  অতিবৃষ্টি  বা অনাবৃষ্টির হাত  থেকে রক্ষা পেতে  বলিদান করে আসছে।  হরপ্পা থেকে প্রাপ্ত  একটি  শিলের  একপাশে  এক দেবীমুর্তী  ও তার বিপরীত  পাশে  নরবলির চিত্র খোদিত  আছে।  গ্রীক  ঐতিহাসিক  হেরোডোটাসের  বিবরণ থেকেও  জানা যায়  যে খ্রীষ্টজন্মের কয়েক  শতাব্দী  পূর্ব  থেকেই   ভারতে  নরবলির প্রচলন ছিল।  এই সব তথ্য প্রমাণ  করে ভারতীয় সভ্যতার প্রায় উন্মেষলগ্ন  থেকেই   বলিদান প্রথা প্রচলিত । ফ্রেজার প্রমুখ পণ্ডিতগণ  আদিম  লৌকিক প্রথা হিসাবেই চিহ্নিত করেছেন। দুর্গাপুজায়  পালনীয়  বলিদান সম্পর্কেও এই কথাটি  প্রযোজ্য।  চালুকমড়ো  নরবলির  পরিবর্ত বলে আজও  বহুবিধবা এটি  ভক্ষণ  করেন না -  এ প্রথাও লৌকিক। 
চলছে ...

Wednesday, October 17, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৫১ । ১৭-১০-২০১৮


দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন



 (৪)
মহাসপ্তমীর  প্রাতে  নবপত্রিকার স্নান  ও মণ্ডপে স্থাপনের  পর দেবীর মূল পূজার সূচনা হয়।  নবপত্রিকা কি? 
“রম্ভা কচ্চী  হরিদ্রা  চ জয়ন্তী  বিল্বদাড়িম্বৌ।
অশোক  মানকশ্চৈব ধান্যেতি নবপত্রিকা।।“
কলা,  কচু,  হলুদ, জয়ন্তী, বেল,  ডালিম,  অশোক,  মান ও ধান -  এই নয়টি  গাছকে  শ্বেত  অপরাজিতা লতার দ্বারা বন্ধন করে বস্ত্রাবৃত  ও সিন্দুরাদি  দ্বারা  ভূষিত  করে দেবীর  দক্ষিণে  গণেশের  পাশে স্থাপন  করা হয়।  সাধারণ  লোকে একে  গণেশের  বৌ বা  কলা বৌ  বলে থাকে।  পুষ্পাঞ্জলি প্রদানের  সময় মস্ত্র উচ্চারিত হয় -  “নবপত্রিকাবাসিন্যৈঃ  নব্দুর্গায়ৈঃ নমঃ নমঃ।‘  এর থেকে  সহজেই  বোঝা যায় যে এই নয়টি  বৃক্ষলতায়  নয়জন  দেবী  অবস্থান  করছেন।  এঁরা হলেন -  কাদলীতে  - ব্রহ্মানি,  কচুতে – কালিকা,  হ্লুদে -  দুর্গা  জয়ন্তীতে – কার্ত্তিকী,  বিল্বশাখায় – শিবা, ডালিমে -  রক্তদন্তিকা,  অশোকে শোকরহিতা,  মানকচুকে  চামুন্ডা,  ধানে দেবী  লক্ষ্মী।  বৃক্ষলতায় দেবতার অস্তিত্ব কল্পনা প্রাক্‌  আর্যযুগের  অর্থাৎ লৌকিক ।  ে প্রসঙ্গে হরপ্পা  উৎখনন  কেন্দ্র থেকে  আবিস্কৃত  একটি অসম  চতুষ্কোণ  ফলকে  খোদিত  নারীমূর্তির কথা মনে পড়ে যায়।  ফলকটিতে দেখা যা য় মুর্তির মাথা ভূমি স্পর্শ করেছে,  পদদ্বয়  আকাশের  দিকে প্রসারিত  । মুর্তির যোনীদেশ থেকে  শষ্যপল্লব  নির্গমনশীল ।  এই নারীমূর্তির সঙ্গ বৈদিকযুগের  দেবী  শাকম্ভরীর  ভাবনাগত  সাদৃশ্য আছে।  মার্কন্ডয় পুরাণে শাকম্ভরী দেবী দুর্গারই নামভেদ।  সেখানে বলা হয়েছে দেবী  তাঁর দেহ থেকে  উৎপন্ন  শাক (শস্য)  দ্বারা  এই জগত  পালন করেন,  তাই তাঁর  এই নাম –
“ততোহহমখিলং লোকমাত্মদেহসমুদ্ভবৈঃ।
ভ্লিষ্যামি সুরাঃ  শাকৈরাবৃষ্টেঃ  প্রাণধারকৈঃ।।
শাকস্তরীতি  বিখ্যাতিং তদা খাস্যামহংভূবি>’’
-সেকান অতিবৃষ্টের সময়ে আমি আমার নিজদেহ  থেকে  বনির্গত শস্য সমূহের  দ্বারা  সমস্ত  জগতবাসীর ভরণপোষণ  করব,  এই কারণে আমি শাকম্ভ্রী নামে আখ্যাত হব।
নবপত্রিকা প্রকৃতবিচারে  শস্যবধূর  প্রতীক।  আবার  অনেকে একে  কৃষি সভ্যতার নিদর্শণ হিসাবে গ্ণ্য  করার  পক্ষপাতী।  ‘দেবীমাহাত্ম্য’ গ্রন্থ  থেকে জানা যায় শরৎকালে  শস্যসম্পদের  বৃদ্ধি কামনায়  বঙ্গদেশে শাকম্ভরীদেবীর  অর্চনা হত।  রামায়ণ  ও কোটিল্যের অর্থশাস্ত্র  এও শস্যধিষ্টাত্রী  দেবীরুপে শাকম্ভরীর উল্লেখ  আছে।  উক্ত  আলোচনা থেকে  বোঝা  যায়  নবপত্রিকা বা  কলা বৌ  আসলে লৌকিক  আচার, জাত।  পরবর্তীকালের পৌরাণিক  ভাষ্য  দ্বারা প্রাচীন  লৌকিক  বৃক্ষলতার  পূজার  সঙ্গে  দুর্গাপূজাকে  মেলাবার  সচেতন প্রয়াস  মাত্র।  এই প্রসঙ্গে  ড.  শশিভূষণ দাশগুপ্তের  মন্তব্যটি  স্মরণীয় “এই শস্য বধুকেই  দেবীর  প্রতীক  গ্রহণ করিয়া  প্রথমে  পূজা  করিতে  হয়,  তাহার  কারণ শারদীয়া  পূজার  মূলে বোধ হয় এই শস্য  দেবীর  পূজা।  পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গা পূজার  বিধিতে  এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা  দেওয়া  হয়েছে ...  বলা  বাহুল্য ে সবই হ ইল। পৌরাণিক  দুর্গাদেবীর  সহিত  এই শস্য  দেবীকে  সর্বাংশে  মিলাইয়া  লইবার  একটা  সচেতন  চেষ্টা>”
চলছে ...

Tuesday, October 16, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৫০। ১৬-১০-২০১৮


দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন





 (৩)
শারদীয়া  দুর্গাপূজার  একটি  অত্যাবশ্যকীয়  আচার হল বোধন।  প্রচলিত  মত হল  রাব ণ বধের  জন্য শ্রীরামচন্দ্র  অকালে  (দক্ষিনায়ন কালে) দেবীর  বোধন করেছিলেন। মূল বাল্মীকি  রামায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক  দেবী  দূর্গার পূজার কথা নেই। সেখানে রাবণের  সঙ্গে যুদ্ধজয়ের  জন্য  অগ্যস্তমুনির নির্দেশে শ্রীরাম  ‘হৃদ্যাদিত্যস্তব’ করেছিলেন;  যা ছিল  প্রকৃতপক্ষে সুর্যের বন্দনা।  ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধনের  মন্ত্র হিসাবে  ‘কালিকাপুরাণের একটি শ্লোক  আজও  ব্যবহৃত  হয় -- 
‘রামস্য অনুগ্রহার্থায় রাবণস্য বধায় চ।
রাত্রাবেবমহাদেব  ব্রহ্মন্য বোধিতা পুরু।।‘
অর্থাৎ রাবণ ব্ধার্থে ও রামচন্দ্রকে  অনুগ্রহার্থে ব্রহ্মা পুরাকালে  দেবীর বোধন করেছিলেন।  বোধন কথার অর্থ হল জাগরণ বা  জাগ্রত করা। কিন্তু  প্রশ্নজাগে বোধন করা হয় কেন?  পুরান  কারদের অভিমত হল শ্রাবণ  থেকে পৌষ  এই ছয় মাস কালে  দক্ষিনায়ন হওয়ায়  তা দেবতাদের রাত্রি  বা নিদ্রার কাল।তাই  দেবীকে  জাগরিত  করতেই  বোধনের ব্যবস্থা।
অর্থাৎ রাবণ  বধার্থে  ও রামচন্দ্রকে  অনুগ্রহার্থে  ব্রহ্মা পুরাকালে  দেবীর  বোধন করেছিলেন। ‘বোধন’  কথার অর্থ হল জাগরণ বা জাগ্রত  করা। কিন্তু  প্রশ্নজাগে  বোধন করা হয় কেন?  পুরাণ  কারদের  অভিমত  হল – শ্রাবণ থেকে পৌষ -  এই ছয়  মাস কাল  দক্ষিণায়ন হওয়ায়  তা দেবতাদের রাত্রি  বা নিদ্রার কাল।  তাই দেবীকে জাগরিত  করতেই  বোধনের ব্যবস্থা।
বোধনের আচারটি  ভালোভাবে  লক্ষ্য করলে দেখা যাবে  যে বোধন মণ্ডপে  অনুষ্ঠিত  হয় না।  বিল্ববৃক্ষমুলে  এটি অনুষ্ঠিত  হয়।  বিল্ববৃক্ষের  তলায়  শরকাঠী  পুঁতে  সূত্র দিয়ে বেষ্টন করে এক  বস্ত্রগৃহ  নির্মিত  হয়। এর  অভ্যন্তরস্থিত  বেদীতে  আলক্তক,  সূত্র,  যুগ্ম শ্রীফল,  ছুরিকা ইত্যাদি রাখা হয়।  এই সমস্ত  উপাচারের  উপস্থিতি আমাদের সুতিকাগারের  কথা স্মরণ করায়।  যুগ্ম  শ্রীফল মাতা ও সন্তানের প্রতীক।  নাড়ী  ছেদনের জন্য ছুরিকর্ণ  ও নারী বন্ধনের জন্য সূত্র। আলতা  শোণিতের  দ্যোতক।   আরো  উল্লেখ্য বোধন  কখনোই  দিবাভাগে অনুষ্ঠিত হয় না।  হয় সাংয়কালে বৈদিক  যুগ থেকেই  রাত্রিকাল  সন্তান প্রসবের জন্য স্বীকৃত।  এখন প্রশ্ন জাগাই  স্বাভাবিক  কার জন্মের জন্য এই আচার?  আর যার হোক দেবীর  জন্ম কখনোই হতে পারে না।  দেবী স্বয়ং বিশ্বপ্রসবিনী।   আসলে  এই জন্ম  অগ্নির।  কাঠে  অগ্নি  সুপ্ত থাকে তাই তাকে জাগ্রত  করার প্রয়াস।  কারণ  দুর্গাপূজার  সঙ্গে  শরৎকালীন রুদ্রযজ্ঞের সাদৃশ্য আছে।  পরবর্তীকালে দেবী  দুর্গাকে  অগ্নিস্বরুপা  কল্পনা করা হয়েছে।  উদ্দেশ্য   বোধনকে  শাস্ত্রীয় মর্যাদাদান।  তা সত্ত্বেও  এই ব্যাখ্যা  খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্য হয় নি।  যদি  দেবতারা  নিদ্রিতই  থাকতেন তবে  কাজাগরী লক্ষ্মী,  দিপান্বিতা শ্যামা ও  জগদ্ধাত্রী পূজায় বোধন করা হয় না কেন সে প্রশ্ন জাগে।  সুতরাং বোধন  যে মূলত লোকাচার  সে স ম্প র্কে  সন্দেহের  অবকাশ  নেই। তবে  মূলের  কারণটি  আজ বিস্মৃত।
চলছে ...

Monday, October 15, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৪৯ । ১৫-১০-২০১৮


দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন


 (২)
দুর্গাপূজাকে কলির  অশ্বমেধ  বলা হয়ে থাকে।  শাস্ত্রীয়  বিধি  বিধান  অনুসারে  এই পূজা  অনুষ্ঠিত হয়।  কিন্তু পূজা  প্রচলনের সেই  আদিপর্বে এই পূজা  কেবল  লোকসমাজের  মধ্যেও  প্রচলিত  ও সীমিত  ছিল।  পূর্বে  উল্লিখিত  চৈনিক  বিবরণ  গ্রন্থ থেকে জানা যায়  অযোধ্যা অঞ্চলের ডাকাতরা  শরত  কালে  সুপুরুষ  বলি দিয়ে দেবী দূর্গার পূজা  করত।  জীমূত বাহন  ও তাঁর গ্রন্থে দুর্গাপূজাকে শবর জাতির পূজা  বলে উল্লিখিত  করেছেন।  পুরাণবিদ  আচার্য যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ও শবর জাতির পালিত  ‘শবরওৎসব’  কে আমাদের  ‘শারদোৎসবের’ বীজ  বলে মন্তব্য করেছেন। সুতরাং দেবীদুর্গার পূজা প্রচলনের সূচনালগ্নে যে তা মূল ধারার পূজা  ছিল না সে বিষয়ে সকলেই একমত। ধীরে ধীরে এই পূজা বৃহত্তর  সমাজে  অনুপ্রবিষ্ট  হয়েছে।  নানা পৌরাণিক  ও শাস্ত্রীয়  বিধি আচার এর সঙ্গে যুক্ত  করা হয়েছে।  বর্তমানের  দুর্গা পূজারবিধি  ভালোভাবে  লক্ষ্য করলে তার মধ্যে বহু অসংলগ্নতা ও আগন্তুক আচার দৃষ্ট হয়।  আবার বহু  লৌকিক আচারের  আর্যীকরণ ঘটেছে।  তবে  তার অন্তর  থেকে লৌকিক  স্বভাবকে  চিরতরে  মুছে  ফেলা সম্ভব হয়নি।  দুর্গাপূজার এরকমই  কিছু  শাস্ত্রীয় নামধারী  লৌকিক  আচার সম্পর্কে আমাদের  অনুসন্ধান  নিয়েই  এই প্রবন্ধ।
দুর্গাপূজার লোকাচারের  সবচেয়ে  বড় উদাহরণ হল দেবী  দূর্গার প্রতিমাটি।  যেখানে আমরা দেবী দূর্গার পুত্র ও কন্যারুপে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশকে  দেখতে পাই। বস্তুত কার্তিক  গণেশ  দেবীর পুত্র হলেও লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে কোন পুরাণেই দেবীর  কন্যারুপে  কল্পনা করা হয়নি।  বরং দেবীর রূপভেদ রুপেই  নির্দেশিত হতে দেখি।  দুর্গাপূজায় শ্রী শ্রী চণ্ডীপাঠ  অবশ্য পালনীয়  বিধি গুলির  অন্যতম।  সেখানেও লক্ষ্মী  সরস্বতী ও দুর্গাকে  এক দেবীশক্তিরই রূপভেদ রুপে  বর্ণ্না দৃষ্ট  হয় –
“লক্ষ্মী  লজ্জে মহাবিদ্যে  শ্রদ্ধে পুষ্টি  স্বধে  ধ্রুবে।
সেধে সরস্বতী বরে  ভুতি  বাভ্রবি  তামসি (১১/১২, ২৩)
কালিকাপুরাণে  ও দবীভাগবত পুরাণে কুমার কার্তিকের জন্ম কথা আছে।  তারকাসুর বধের  জন্য শিব  ও শক্তির মিলনে কুমার কার্তিকের জন্ম হয়।  তবে দেবী স্বয়ং  পুত্রকে  লালন পালন করতে পারেননি।  ছয়জন  কৃত্তিকা  দ্বারা দেবীর এই জ্যেষ্ঠ সন্তান লালিত  পালিত  হাওয়ায় এঁর নাম হয় কার্তিক।  ‘ব্রহ্মবৈরর্তপুরান’ থেকে জানা যায় এই  কারনে দেবীর মনতুষ্টি (সন্তান পালন না  করতে পারার কারনে)  না হওয়ার তিনি দেবাদিদেবের কাছে দ্বিতীয়  সন্তানের প্রার্থনা করেন।  পার্বতীর এই কনিষ্ঠপুত্র ই গণেশ ।  এই হল পুরাণ কথা।  তবে  লোককাহিনী  অনুসারে গণেশকেই  জ্যেষ্ঠ ও কার্তিকে কনিষ্ঠ রুপে কল্পনা করা হয়।  ময়ুর বাহন  কার্তিক ও মষিক বাহনগণেশের পৃথিবী  পরিক্রমার  প্রতিযোগিতার  গল্প আমরা সবাই জানি।  দেবী দূর্গার মর্ত্যাবতরণ কে আমরা তাঁর পূত্র কন্যা   সহ  বাপের বাড়ি আমার রূপক হিসাবে  কল্পনা করতেই  অভ্যস্ত ।দুর্গা  প্রতিমার চালচিত্রে দেবীর  শংখপরা মহাদেবের ভিক্ষা, নন্দীর  পোটলা বাঁধা – ইত্যাদি চিত্রগুলই  লৌকিক  ভাবনাজ্জাত। সুতরাং একথা  বলা যেতেই  পারে যে বঙ্গদেশে  দেবি দুর্গার প্রতিমা  নির্মাণে লৌকিক  ভাবনার প্রভাব  সুস্পষ্ট।
চলছে ...

Sunday, October 14, 2018

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৪৮ । ১৪-১০-২০১৮


দুর্গাপূজার লোকাচার
সুগত পাইন



(১)
দেবী দুর্গার পূজা  প্রবর্ত ও তার প্রচলন কাল সম্পর্কে  বিদ্বানমহলে  বহুমত  প্রচলিত  আছে।  সবচেয়ে  প্রতিষ্ঠিত  অভিমতটি  হল – ষোড়শ শতাব্দীতে  তাহিরপুরের  মহারাজা  কংসনারায়াণ  কর্তৃক দেবী পূজার  উদ্ভব।  দ্বিতীয়  জনপ্রিয় মতটি  নদীয়ার  রাজা  কৃষ্ণচন্দ্র  কর্তৃক  অষ্টাদশ  শতাব্দীতে দেবীপূজা  প্রচলনের কথা বলে।  এই প্রসঙ্গে দূর্গাপূজাবিধি সংক্রান্ত  কতকগুলি  প্রকরণগ্রন্থ ও তাদের  রচনাকালের  উল্লেখ  করা যেতে পারে।  বৈষ্ণবকবি  বিদ্যাপতি  তাঁর  ‘দুর্গাভক্তি তরঙ্গিণী  রচনা  করেছিলেন চতুর্দশ  শতকে। এই শতকেই রচিত  হয়েছিল শূলপাণির ‘দুর্গোৎসব  বিবেক’  , বাচস্পতি মিশ্রের  ‘বাসন্তী পূজা প্রকরণ’ এর মতো গ্রন্থ।  পঞ্চদশ ও ষোড়শ  শতাব্দীর মধ্যবর্তী  সময়ে  রচিত  হয়েছিল  স্মার্ত পণ্ডিত   রঘুনন্দনের  ‘দুর্গোপূজাতত্ত্ব’।  রঘুনন্দের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা  রামকৃষ্ণ রচনা হয়েছিল স্মার্ত পণ্ডিত  রঘুনন্দের ‘দুর্গাপূজাতত্ত্ব’ ও  ‘দূর্গোৎসবতত্ত্ব’।  রঘুনন্দের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামকৃষ্ণ  রচনা  করেছিলেন -  দুর্গার্চন কৌমুদী। জীমূত বাহনের  দুর্গোৎসব নির্ণয়’ ও  দুর্গোৎসবতত্ত্ব’।  রঘুনন্দনের শতাব্দীতে। তবে  এই সমস্ত প্রকরণ গ্রন্থগুলির সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম  গ্রন্থ হল একাদশ শতকে রচিত  ভবদেব ভট্টের ‘দুর্গাপূজাপ্রকরণ’।  অর্থাৎ একাদশ শতাব্দী থেকেই   দুর্গাপূজাপ্রকরণ বিষয়ক গ্রন্থদি রচিত হতে শুরু করে।  সাধারণত পূজা প্রচলনের পরই  দত্বিষয়ক গ্রন্থাদির প্রয়োজন হয়।  অর্থাৎ  উপরোক্ত  আলোচনা থেকে আমরা দুর্গার পূজাকে একাদশ শতাব্দীর  পূর্ববর্তী বলতেই  পারি।  সালতামামি  অনুসারে  দুর্গার পূজার প্রাচীনতম  উল্লেখ পাওয়া যায়  সপ্তম  শতাব্দীর চৈনিক  পরিব্রাজক হিউএন চাঙের  জীবনী লেখক  শমন  হুইলির গ্রন্থ থেকে।
চলছে ...

Friday, October 12, 2018

অভিমানী, ক্রোধী, ৷ সৌমিত্র রায়

অভিমানী, ক্রোধী, প্রেম-প্রকৃতির নীতি
........................................................
সৌমিত্র

কেউ কি গেয়েছে গান ?
                     প্রাণভরে ;
বৃষ্টি করেছে নৃত্য ?
    মূষলধারায় ঝরে ;
কেন আজ মাতাল হাওয়া ;
          প্রাণঘাতি ;
তিতলি মানে নি কেনো ;
আক্রান্তের কাতর মিনতি ;

এ কেমন অভিমান
এ কেমন রাগ
হে প্রকৃতি, মিলিমিশি জীবনে,
এ কেমন ক্রোধী অনুরাগ.....

তছনছ.... তছনছ...

ভয় নয় ;
ঘৃণা নয় ;
ক্রোধ নয় ; দোষারোপ নয় ~
ঝড় আর ঝঞ্ঝার প্রতি ;

এসো থাকি সচেতন ; কাটিয়ে উঠি
সাময়িক ; প্রেম-প্রকৃতির নীতি ৷

৷৷ শান্তি ৷৷

অভিমানী, ক্রোধী, ৷ সৌমিত্র রায়

অভিমানী, ক্রোধী, প্রেম-প্রকৃতির নীতি
........................................................
সৌমিত্র

কেউ কি গেয়েছে গান ?
                     প্রাণভরে ;
বৃষ্টি করেছে নৃত্য ?
    মূষলধারায় ঝরে ;
কেন আজ মাতাল হাওয়া ;
          প্রাণঘাতি ;
তিতলি মানে নি কেনো ;
আক্রান্তের কাতর মিনতি ;

এ কেমন অভিমান
এ কেমন রাগ
হে প্রকৃতি, মিলিমিশি জীবনে,
এ কেমন ক্রোধী অনুরাগ.....

তছনছ.... তছনছ...

ভয় নয় ;
ঘৃণা নয় ;
ক্রোধ নয় ; দোষারোপ নয় ~
ঝড় আর ঝঞ্ঝার প্রতি ;

এসো থাকি সচেতন ; কাটিয়ে উঠি
সাময়িক ; প্রেম-প্রকৃতির নীতি ৷

৷৷ শান্তি ৷৷

Thursday, October 11, 2018

ওয়েব ব্যাথা -- গোপেশ রায়। 2

কবিতা
ওয়েব ব্যাথা
-- গোপেশ রায়।
এখানে যখন গোধূলির আলো
ওখানে তখন রাত্রি শেষ
তবু মনে হয় পাশের বাড়ির
উঠানে রায়েছে এক অনুরাগ দেশ ।
টাচে থাকাথাকি আছে কিছু বাকি
টাচ পাওয়া থেকে দূরে
রঙ ছড়ানোর মন টলে যায়
আকাশ নীলের ঘরে ।
এস সখা তুমি দিবস নিশিথে
সকাল কিংবা সাঁজে,
পরিপাটি করে চুল এলো করে
ওয়েব নেটের মাঝে ।
ছড়িয়ে কুসুম মুক্তো হাসির
পাঠাই গোপন কথা
চোখ ছলছল মন উচাটন
ভরে নিই কিছু ব্যাথা ।
কাছে নাই তবু কাছে আছ তুমি
আপনজনের মতো --
ভাবি সুখে আছ খুশির তুফানে
সহি ব্যাথা আমি যতো ।
ইথারে সহসা খবর দিয়েছো
আসিবে আগামী মাসে
হৃদয় আমার নাচিছে সহসা
আকুল সকাল সাঁজে ।

Sunday, October 7, 2018

পোস্টমডার্ন ও কাব্যযোগ-৩। মুরারি সিংহ । বাংলা । ০৭-১০-২০১৮


পোস্টমডার্ন ও কাব্যযোগ

মুরারি সিংহ




এখন তন্ত্রধর্মের গুহ্য ব্যাপার-স্যাপারগুলোর ভিতর না ঢুকে তার সারকথা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। কারণ তথাগতের ধর্ম ছিল বেদ-বিরোধী তথা প্রাতিষ্ঠানিকতার বিপক্ষে একই সঙ্গে প্রান্তবাসী লোকসমাজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও ছিল অত্যন্ত প্রবল। অনার্য-জনের প্রতি উদার হবার কারণে তাদের অনেক লোকাচার বৌদ্ধধর্মকে সমৃদ্ধ করেছে জনপ্রিয় করেছে। বুদ্ধদেব বললেন বুদ্ধ কোনো ব্যক্তি-মানুষ নয়, বুদ্ধ আসলে একটি শুদ্ধ মানুষের ধারণা।প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বুদ্ধ হয়ে ওঠার অনন্ত সম্ভাবনা আছে। তবে তাকে বুদ্ধত্ব বা পূর্ণত্ব অর্জন করতে গেলে ক্রমাগত অভ্যাসের মাধমে নিজের অন্তর্নিহিত সদগুণগুলিকে বিকশিত ও পল্লবিত করতে হবে। তার জন্যে চাই তীব্র ইচ্ছা ধারাবাহিক চেষ্টা ও নিঃস্বার্থ সাধনা। এই সাধণার প্রক্রিয়া থেকেই বৌদ্ধতন্ত্রের জন্ম। বৌদ্ধতন্ত্র চেয়েছিল মানুষের নিজের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিকে আবিষ্কার করার ও জাগানোর আনন্দটিকে সাধারণ মানুষের মধ্য পৌঁছে দিতে। তাঁরা বলেছিলেন মানুষের যে দুঃখ-কষ্ট তার মূল কারণ তার অতৃপ্তি, যোগের মাধ্যমে সেই অতৃপ্তিকে পরিহার করে প্রবল আনন্দময় তৃপ্তি লাভ করতে হবে এবং সেই তৃপ্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে।
তন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে এখন আমি আমার 'পোস্টমডার্ন ও জয়-মা-কালী' বইটি থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি- "তন্ত্র বলতে আমরা বুঝি তাঁত বোনা। শব্দটির বুৎপত্তি-গত অর্থও তারই কাছাকাছি। 'তন্ত্র' শব্দটিকে যদি দুটি ভাগে ভাঙা যায় তাহলে তার দুটি অংশ পাওয়া যায় – 'তন' এবং 'ত্র''তন' অর্থে বিস্তার, এবং 'ত্র' অর্থে মুক্তি; অর্থেৎ সামগ্রিক ভাবে 'তন্ত্র'-এর শব্দ-গত অর্থে দাঁড়ায় 'মুক্তির বিস্তার' বা 'মুক্তিকে বিস্তৃত করা'তন্ত্রের কাজ তিনটি, মানব-জীবনের ধাঁচাটিকে বোনা, বিস্তৃত করা এবং তাকে ছড়িয়ে দেওয়া। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করা। তন্ত্ররহস্যে তন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এইভাবে তন্যতে বিস্তারয়তে জ্ঞানম্ অনেন ইতি তন্ত্রম্। অর্থাৎ তন্ত্র হল সেই বিদ্যা বা শাস্ত্র যার দ্বারা মানুষের ভিতর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে।... তন্ত্র মানে একজন মানুষের প্রকৃত সত্তার উন্মোচন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় সংকট থেকে একজন মানুষের মনে যে নানান টানাপোড়েন তৈরি হয়, নিয়মিত তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে ওই মানুষ তার সেই দোনামনাগুলি থেকে মুক্তি পেতে পারে।... তন্ত্রের সারকথা যতটা বুঝেছি তার থেকে বোঝা যায়, তন্ত্র মানে অতি একান্তে নিজের সঙ্গে বসা; নিজেরই মুখোমুখি হওয়া, অর্থাৎ নিজের ভিতর-আমির সঙ্গে এক নিবিষ্ট কথোপকথন বা আলাপচারিতা। সাধারণত মনে হতে পারে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি এ যেন তা নয়, আবার হয়ত এটাই প্রকৃত ধর্ম। আসলে একান্তে বসে নিজেকে নিয়ে একটু ভাবলে দেখা যায় প্রতিদিনের নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার তানাপোড়েনে একজন মানুষের 'আমি' নামক সত্তাটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এমনিতেই মানুষের ভিতরের 'আমি' বেশি ভার সহ্য করতে পারে না, সে সব সময় নিজেকে ভারহীন রাখতে চায়, বেশ নির্ভার, ফুরফুরে, হাসিখুশি। নাচতে চায়, খেলতে চায়, গাইতে চায়।কিন্তু যত গণ্ডগোল বাধায় বাইরের 'আমি'-টা; বাইরের আমি মানে যে-আমি সবসময় আমার ধন, আমার সম্পদ, আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার ঘটিবাটি করে বেড়ায় অর্থাৎ সে অহং-স্বর্বস্ব; ভারী। এই বাইরের আমি ভিতরের আমিকে মুক্ত থাকতে দেয় না; নানা রকম ভার চাপায়। যার 'আমি' যত ভারী হয়, তার আমি তত দ্রুত এবং তত বেশী করে ভাঙে।...প্রকৃতির কোলেই অতি নির্জনে বসে একমনে চিন্তা করে নিজের সেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন আমিগুলোকে এক জায়গায় আনতে বা আরো নিবিড় হয়ে তাদের অতিক্রম করে নিজেরই গভীরে এক বৃহত্তর আমির খোঁজ করে তার মধ্যে মানুষ নিজেকে বিলীন করতে পারে।

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন । বাংলা-৬৫৩ । ১৯-০১০-২০১৮

দুর্গাপূজার লোকাচার সুগত পাইন (৬) দুর্গা পূজার   অপর   একটি   গুরুত্বপূর্ণ লোকাচার   হল কুমারী   পূজা।   এই কুমারী   পূ...