রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাগবাজারে ‘অঙ্গন মিলন সেবা’: স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও সচেতনতার তিন দিনের উদ্যোগ, News

 

বাগবাজারে ‘অঙ্গন মিলন সেবা’: স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও সচেতনতার তিন দিনের উদ্যোগ




কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ কলকাতার বাগবাজার ICDS-এর উদ্যোগে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হল তিন দিনব্যাপী ‘অঙ্গন মিলন সেবা’ কর্মসূচি।

বাগবাজার ICDS-এর CDPO সব্যসাচী গুইন-এর নেতৃত্বে ICDS পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শিশু ও নারীর স্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার বিভিন্ন বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তিন দিনের এই কর্মসূচিতে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জন্মগত ত্রুটি নির্ধারণের পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ বিকাশ ও পুষ্টি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ নিবারণ এবং শিশু ও নারীর সুরক্ষা নিয়ে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।



কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ, অভিভাবক এবং ICDS কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের যথাযথ পরিচর্যা এবং সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার ও ক্ষতিকর প্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আয়োজকদের মতে, শিশুদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন করে তোলাই এই ধরনের কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। তিন দিনের ‘অঙ্গন মিলন সেবা’ সেই লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে।




আজ কলকাতায় এলেন নীতিন নবীন দু’দিনের বঙ্গ সফরে সাংগঠনিক বৈঠকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি, News

আজ কলকাতায় এলেন নীতিন নবীন



দু’দিনের বঙ্গ সফরে সাংগঠনিক বৈঠকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি


স্টাফ রিপোর্টার | কলকাতা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন রবিবার কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর—দু’দিনের বঙ্গ সফরে তিনি দলের রাজ্য নেতৃত্ব, কোর গ্রুপের সদস্য, সাংসদ, বিধায়ক এবং সাংগঠনিক স্তরের বিভিন্ন পদাধিকারীর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। 


কলকাতা বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী-সহ দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সফরের প্রথম দিন নিউ টাউন কনভেনশন সেন্টারে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মাসিক রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’ শোনার কর্মসূচিতেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। 


দলীয় সূত্রের খবর, এই সফরে রাজ্যের সাংগঠনিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, বিভিন্ন স্তরের সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় এবং তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রাজ্যের সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। 


নীতিন নবীনের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন রাজ্যে বিভিন্ন নির্বাচন ও সাংগঠনিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা বাড়ছে। আগামী দিনে দলের সাংগঠনিক কর্মপরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে তাঁর বৈঠকগুলির দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। 


— স্টাফ রিপোর্টার

যোগাযোগ: ৯৩৩২৪৪৩২৭২

রামলালের পথ ।। ড.সৌমিত্র রায় ।। ছোট গল্প, Short Story


ছোট গল্প 

রামলালের পথ  

ড. সৌমিত্র রায়



শালবনীর ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। শালপাতার ডগায় শিশির, দূরে মোরগের ডাক, আর কুয়াশায় ঢাকা জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল মড়মড় করে ডাল ভাঙার শব্দ। ফুলমণি দাওয়ায় দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল। আবার শব্দ হল। সে ফিসফিস করে বলল, “দাদু, কে ওখানে?” ঘর থেকে হরিপদ বেরিয়ে এসে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। “ও তো রামলাল!” ফুলমণির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল। “রামলাল! সত্যি?” কুয়াশার পর্দা সরতেই বিশাল শরীরটা দেখা গেল। ধীর পায়ে রাস্তার ধারে এগিয়ে আসছে রামলাল। ফুলমণি দৌড়তে যাবে, এমন সময় হরিপদ তার হাত ধরে ফেলল। “দূরে থাক!” “কেন দাদু? ও তো রামলাল! ও তো আমাদের চেনে।” হরিপদ মৃদু হেসে বলল, “চেনে বলেই তো দূরত্বটা মানতে হবে। মনে রাখিস, রামলাল আমাদের পরিচিত, কিন্তু পোষা নয়।” ফুলমণি একটু অভিমান করে বলল, “তাহলে সবাই ওকে এত ভালোবাসে কেন?” হরিপদ বলল, “ভালোবাসে বলেই ওকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে। ভালোবাসা মানে কাছে গিয়ে গায়ে হাত দেওয়া নয়। কখনও কখনও দূরে দাঁড়িয়ে তার পথটা খালি করে দেওয়াই ভালোবাসা।”

রামলাল ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের এক বৃদ্ধা নিজের বাড়ির দাওয়ায় একটি বড় পাত্রে জল রেখে সরে দাঁড়ালেন। ফুলমণি অবাক হয়ে বলল, “দাদু, দেখলে? ঠাকুমা ওর জন্য জল রেখে দিল!” হরিপদ বলল, “গরমের দিনে অনেকে জল দেয়। কেউ চাল দেয়, কেউ সবজি দেয়। রামলাল এই গ্রামের কাছে অন্যরকম।” “অন্য হাতিরা কি অন্যরকম?” হরিপদ এবার একটু গম্ভীর হল। “হ্যাঁ। রামলালকে মানুষ চেনে। অন্য হাতির পাল এলেই কিন্তু মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। ধান নষ্ট হয়, বাড়ি ভাঙে, রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। কখনও মানুষ আহত হয়, কখনও প্রাণও যায়। আবার সেই হাতিরাও মানুষের তৈরি বিদ্যুতের তারে, রেললাইনে, রাস্তা বা যানবাহনের সঙ্গে সংঘাতে প্রাণ হারায়। তাই গল্পটা শুধু রামলালের ভালোবাসার গল্প নয়, ফুলমণি। গল্পটা মানুষ আর হাতি—দু’জনের বাঁচার গল্প।”

এই সময়েই জঙ্গলমহলে এল অর্কদীপ সেন। কলকাতার একটি সংবাদপত্রের তরুণ সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার। কাঁধে ক্যামেরা, পিঠে ব্যাগ, হাতে নোটবুক। অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে হাতির উপদ্রবের ছবি তুলতে। ফোনে সম্পাদক বলেছিলেন, “অর্ক, ভালো ছবি চাই। ফসলের ক্ষতি, বাড়িঘর ভাঙা, মানুষের আতঙ্ক—সব নথিবদ্ধ করো।” অর্কদীপ জিজ্ঞেস করেছিল, “হাতিদের দিকটাও লিখব?” ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সম্পাদক বলেছিলেন, “খবরের মতো কিছু পেলে লিখবে।” ফোন কেটে যাওয়ার পর অর্কদীপ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তাহলে দেখি, জঙ্গলমহল আসলে কী গল্প বলে।”

প্রথম দিনেই সে বুঝল, এই জঙ্গল শুধু হাতির নয়, মানুষেরও। ভোরে গ্রামের কয়েকজন মহিলা বাঁশের ঝুড়ি হাতে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলেন। অর্কদীপ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছেন?” একজন মহিলা বললেন, “জঙ্গলে।” “কী আনবেন?” “ছাতু।” অর্কদীপ অবাক হয়ে বলল, “ছাতু?” মহিলা হেসে বললেন, “হ্যাঁ বাবু। বর্ষার পরে জঙ্গলে অনেক ছাতু ওঠে। চেনা ছাতু তুলে আনি। কিছু বাড়িতে রান্না হয়, কিছু হাটে বিক্রি করি।” “শহরেও যায়?” “যায় তো। ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর হয়ে শহরের বাজারেও যায়। আমাদের কাছে জঙ্গল শুধু জঙ্গল নয় বাবু—খাবার, রোজগার, জীবন।” অর্কদীপ ক্যামেরা তুলল। ক্লিক। ভেজা শালপাতা, বাঁশের ঝুড়ি আর তাতে সাজানো ছাতু তার ক্যামেরায় বন্দি হল।

দুপুরে হরিপদের বাড়িতে বসে অর্কদীপ সেই ছবি দেখাচ্ছিল। ফুলমণি পাশে বসে বলল, “সব ছাতু কিন্তু খাওয়া যায় না।” অর্কদীপ বলল, “তুমি চেনো?” ফুলমণি গর্ব করে বলল, “আমাদের গ্রামের সবাই চেনে। ভুল ছাতু খেলে কিন্তু বিপদ।” হরিপদ বলল, “জঙ্গলকে চেনা সহজ নয় বাবু। কোন ছাতু খাওয়া যায়, কোনটা বিষ, কোথায় সাপ, কোথায় হাতির পথ—সব জানতে হয়।” অর্কদীপ বলল, “শহরের মানুষ ভাবে জঙ্গল মানেই শুধু গাছ আর পশু।” হরিপদ হেসে বলল, “শহরের মানুষ জঙ্গলকে দূর থেকে দেখে। আমরা জঙ্গলের সঙ্গে থাকি।”

দুপুরে ফুলমণি অর্কদীপের সামনে পান্তাভাতের থালা রেখে দিল। সঙ্গে কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন আর আলুভর্তা। “নিন,” ফুলমণি বলল। অর্কদীপ হেসে বলল, “এটা আবার কী?” “পান্তাভাত। শহরে খাননি?” “খেয়েছি। কিন্তু এভাবে নয়।” হরিপদ বলল, “এখানে পান্তাভাত শুধু খাবার নয় বাবু। গরমের দিনে এটাই ভরসা।” অর্কদীপ একমুঠো ভাত মুখে দিয়ে বলল, “সত্যিই তো!” হরিপদ ধীরে ধীরে বলল, “এই মাটিতেই ধান হয়। এই মাটির ধান মানুষ খায়। আবার হাতিও সেই ধানের গন্ধ পায়। সেখান থেকেই অনেক ঝামেলা।” ফুলমণি প্রশ্ন করল, “দাদু, তাহলে দোষ কার?” হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “শুধু মানুষকে দোষ দিলে সত্যি বলা হবে না। শুধু হাতিকেও দোষ দিলে হবে না। আসল কথা হল—দু’জনের পথ কোথায়?” অর্কদীপ নোটবুকে লিখল—“দু’জনের পথ কোথায়?”

সন্ধ্যায় অর্কদীপ অরুণবাবুর সঙ্গে দেখা করল। অরুণবাবু গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, কিন্তু বইয়ের বাইরেও জঙ্গল, প্রাণী আর গ্রামের জীবন নিয়ে তার দীর্ঘদিনের আগ্রহ। অর্কদীপ জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আমরা তো প্রতিদিন শুনি হাতির উপদ্রব। কিন্তু সমস্যাটা আসলে কত বড়?” অরুণবাবু বললেন, “ছোট নয় অর্ক। পশ্চিমবঙ্গে ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের দীর্ঘ সময়ের হিসাব দেখলে ছবিটা উদ্বেগজনক। মানব–হাতি সংঘাতের ২,০৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ১,৭৬১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ২৯৮ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৭৫৩টি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।” ফুলমণি বিস্ময়ে বলল, “এত মানুষ? এত হাতি?” অরুণবাবু মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ। তাই এটাকে শুধু ‘হাতির উপদ্রব’ বললে পুরো সত্যিটা বলা হয় না।”

অর্কদীপ বলল, “হাতিগুলো কীভাবে মারা যায়?” অরুণবাবু বললেন, “বিভিন্নভাবে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, রেললাইনে ট্রেনের ধাক্কায়, মানুষের সঙ্গে সংঘাতে, কখনও শিকার বা বিষপ্রয়োগের মতো কারণেও। অর্থাৎ মানুষ যেমন হাতির কারণে প্রাণ হারায়, হাতিও মানুষের তৈরি নানা বিপদের শিকার হয়।” হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ফসল বাঁচাতে গিয়ে যদি হাতি মরে, আর হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষ মরে—তাহলে সেটা কেমন বাঁচা?” ঘরে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।

অর্কদীপ আবার জিজ্ঞেস করল, “শুধু হাতির ক্ষেত্রেই কি এমন?” অরুণবাবু বললেন, “না। হাতি বড় প্রাণী বলে তার সংঘাত আমাদের চোখে বেশি পড়ে। কিন্তু বনভূমি আর মানুষের বসতি যখন কাছাকাছি চলে আসে, তখন নানা বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের সংঘাত হতে পারে। কোথাও বুনো শূকর ফসল নষ্ট করে, কোথাও গৌর বা বাইসন লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, কোথাও চিতাবাঘকে ঘিরে আতঙ্ক তৈরি হয়। বনপ্রান্তে গবাদি পশু, খাবার, জল কিংবা মানুষের চলাচলও কখনও বন্যপ্রাণের সঙ্গে সংঘাতের কারণ হতে পারে।”

ফুলমণি বলল, “তাহলে সব প্রাণীই কি মানুষের শত্রু?”

অরুণবাবু হেসে বললেন, “না। আর মানুষও বন্যপ্রাণের শত্রু নয়। সমস্যা হয় যখন দু’জনের বেঁচে থাকার জায়গা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।”

অর্কদীপ বলল, “তাহলে হাতিরা বারবার গ্রামে আসে কেন?”

অরুণবাবু মাটিতে কাঠি দিয়ে একটা রেখা টেনে বললেন, “ধরো, এইটা জঙ্গল। এই পথ দিয়ে বহু বছর ধরে হাতিরা চলেছে। তারপর এখানে রাস্তা হল, এখানে বাড়ি হল, এখানে বিদ্যুতের লাইন গেল, এখানে ধান চাষ শুরু হল। হাতির কাছে কিন্তু সেই পুরনো পথের স্মৃতি মুছে যায়নি। ফলে যে পথ একসময় জঙ্গলের ছিল, সেটাই আজ মানুষের বসতি বা কৃষিজমির মধ্যে পড়েছে।”

“তাহলে করিডর?” অর্কদীপ প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ, হাতির চলাচলের নিরাপদ করিডর খুব গুরুত্বপূর্ণ। করিডর শুধু হাতির রাস্তা নয়, মানুষের নিরাপত্তার পথও। হাতির চলাচলের নিরাপদ সংযোগ থাকলে লোকালয়ে ঢোকার চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।”

ফুলমণি বলল, “হাতিরা কি এত দূর হাঁটে?”

অরুণবাবু বললেন, “খাবার, জল আর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাতি অনেক দূর যেতে পারে। তাদের চলাচলের পথ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই একটা পথ বন্ধ করে দিলে সমস্যা শুধু সেই জায়গায় থেমে থাকে না।”

সেই রাতেই খবর এল—গ্রামের ধানক্ষেতে হাতির পাল ঢুকেছে।

চারদিকে চিৎকার পড়ে গেল।


“হাতি এসেছে!”

“সবাই বেরোও!”

“ধান শেষ করে দেবে!”

হরিপদ বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল, “কেউ কাছে যাস না!”

এক যুবক বলল, “কাকা, চুপ করে থাকলে তো সব ধান খেয়ে দেবে!”

হরিপদ বলল, “ধান আবার হবে। মানুষ মরলে মানুষ ফিরে আসবে?”

অর্কদীপ ক্যামেরা হাতে এগোচ্ছিল।

হরিপদ তাকে বলল, “তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“ছবি তুলতে।”

“কতটা দূর থেকে?”

অর্কদীপ একটু হেসে বলল, “যতটা দূর থেকে বেঁচে থাকা যায়।”

“তাহলে যা। কিন্তু সাহস দেখাতে যাস না।”

অন্ধকারের মধ্যে হাতির পাল দেখা গেল। সামনে বড় কয়েকটি হাতি, মাঝখানে ছোট হাতি। ধানের গন্ধে তারা এগিয়ে এসেছে। গ্রামের মানুষের চিৎকারে হাতিরা অস্থির হয়ে উঠল। ফুলমণি অর্কদীপের পাশে এসে ফিসফিস করে বলল, “ছবি তুলছেন না?” অর্কদীপ ক্যামেরা নামিয়ে বলল, “না।” “কেন?” “ওদেরও ভয় লাগছে।” “হাতির আবার ভয় লাগে?” “যখন চারদিক থেকে মানুষ চিৎকার করে, তখন কার না ভয় লাগে?” ফুলমণি আর কথা বলল না।

পরদিন ভোরে ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে কৃষক গদাধর মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল। ধানের বেশির ভাগটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। অর্কদীপ তার পাশে বসে বলল, “কতটা ক্ষতি হয়েছে?” গদাধর শুকনো গলায় বলল, “এই ধান দিয়ে মেয়ের বিয়ের খরচের কিছুটা মেটাব ভাবছিলাম। এখন কী করব জানি না।” অর্কদীপ ক্যামেরা তুলেছিল, কিন্তু ছবি তুলতে পারল না। গদাধর বলল, “ছবি তুলুন বাবু। কিন্তু শুধু আমার ভাঙা ধান দেখাবেন না। লিখবেন, এই ধানটাই আমার সংসার।” অর্কদীপ বলল, “লিখব।”

কয়েকদিন পর অর্কদীপ আবার অরুণবাবুর কাছে গেল। “মানুষের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেই কি সমস্যা মেটে?” অরুণবাবু বললেন, “ক্ষতিপূরণ জরুরি, কিন্তু শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে সংঘাত কমে না। আগে সংঘাত কোথায় হচ্ছে তা বুঝতে হবে। তারপর আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত বনকর্মীদের পৌঁছনোর ব্যবস্থা, নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, রেলপথে সতর্কতা, ফসল রক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং হাতির চলাচলের পথ রক্ষা—সব একসঙ্গে ভাবতে হবে।” অর্কদীপ বলল, “অর্থাৎ শুধু হাতি তাড়ালে হবে না?” অরুণবাবু মাথা নাড়লেন। “আজ তাড়ালে কাল আবার আসবে। কারণ পথটা তার। আমরা যদি তার পথ বন্ধ করি, সে আমাদের পথেই আসবে।”

তারপর এল সেই দুঃখের দিন। চ্যাংশোলের এক কিশোর রামলালকে দেখতে গিয়েছিল। রামলালকে ঘিরে মানুষের ভিড় জমেছিল। কে আগে দেখবে, কে কাছে যাবে—এই উত্তেজনার মধ্যে ট্রাক্টরের কাছে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কিশোরটি গুরুতর আহত হল। পরে আর বাঁচানো গেল না।

খবরটা শুনে ফুলমণি স্তব্ধ হয়ে গেল। “দাদু... রামলালকে দেখতে গিয়েই যদি কেউ মারা যায়, তাহলে রামলাল কি খারাপ?” হরিপদ বলল, “না রে। রামলাল খারাপ নয়।” “তাহলে?” “ভালোবাসারও নিয়ম আছে।” অর্কদীপ বলল, “রামলালকে দেখতে গেলে যদি আমরা খুব কাছে চলে যাই, বিপদ আমাদেরও, রামলালেরও।” ফুলমণি ধীরে বলল, “তাহলে ওকে ভালোবাসব কীভাবে?” হরিপদ বলল, “দূর থেকে।” “কত দূর?” “যতটা দূর থেকে ও নিজের মতো থাকতে পারে।”

এর কিছুদিন পর রামলালের পায়ে আঘাতের খবর এল। তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। গ্রামের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। ফুলমণি ছুটে এসে বলল, “দাদু, রামলাল অসুস্থ?” “হ্যাঁ।” “ও কি আবার হাঁটতে পারবে?” হরিপদ বলল, “বন দফতর দেখছে। আশা রাখ।” এক বৃদ্ধ বললেন, “রামলালের কিছু হলে জঙ্গলটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাবে।” অন্যজন বলল, “ও তো আমাদেরই একজন হয়ে গেছে।” অর্কদীপ শুনছিল। সে বলল, “আপনারা ওকে এত ভালোবাসেন?” বৃদ্ধটি বললেন, “ভালোবাসি বাবু। কিন্তু তাই বলে ওকে ঘরে পুষব নাকি? ওর ঘর জঙ্গলেই।” কথাটা অর্কদীপের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর রামলালকে আবার হাঁটতে দেখা গেল। ফুলমণি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “দাদু! দাদু! রামলাল হাঁটছে!” হরিপদের চোখে জল এসে গেল। “হাঁটুক। নিজের জঙ্গলের পথে হাঁটুক।” অর্কদীপ ছবি তুলল। কিন্তু তার অনুসন্ধান তখনও শেষ হয়নি।

এক রাতে অফিসের নির্দেশ ছাড়াই অর্কদীপ আবার জঙ্গলে বেরিয়ে পড়ল। সহকর্মী ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিল, “এত রাতে কোথায়?” অর্কদীপ বলেছিল, “হাতির পথ দেখতে যাচ্ছি।” “অফিস তোকে বলেনি!” “অফিস খবর চায়। আমি গল্প খুঁজতে যাচ্ছি।”

জঙ্গলের ধারে গাড়ি থামতেই হরিপদ বলল, “আলো নিভিয়ে দে।” “কেন?” “সামনে হাতি আছে।” অর্কদীপ নিঃশব্দে ক্যামেরা হাতে নিল। দূরে গাছ ভাঙার শব্দ। তারপর হাতির ডাক।

চাঁদের আলোয় দেখা গেল একটি বড় পাল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে মানুষের বসতি। পিছনে জঙ্গল। মাঝখানে রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি আর মানুষের তৈরি বাধা।

অর্কদীপ ফিসফিস করে বলল, “এটাই কি ওদের পুরনো পথ?”

হরিপদ বলল, “ছিল।”

“এখন?”

“এখন রাস্তা।”

অর্কদীপের বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল। “তাহলে ওরা যাবে কোথায়?”

হরিপদ ধীরে বলল, “ওরা পথ হারায়নি বাবু। আমরা ওদের পথ বদলে দিয়েছি।”


হাতির পাল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে অন্যদিকে চলে গেল। অর্কদীপ ক্যামেরা তুলেছিল। কিন্তু ছবি তুলল না।


সে শুধু বলল, “এটাই তো আসল খবর।”


পরদিন অর্কদীপ তার সংবাদপত্রের জন্য দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখল। শিরোনাম দিল—“রামলালের পথ কোথায়?” প্রতিবেদনে সে লিখল, “রামলালকে জঙ্গলমহলের মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু রামলালের মতো পরিচিত প্রতিটি হাতিকে মানুষ চেনে না। অনেক হাতির পাল ফসলের ক্ষতি করে, বাড়িঘর ভাঙে, মানুষের জীবনে আতঙ্ক তৈরি করে। আবার মানুষের তৈরি বিদ্যুতের তার, রেললাইন ও অন্যান্য বিপদের কারণে হাতিও প্রাণ হারায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বনভূমির খণ্ডিত হওয়া, রাস্তা, রেল, বসতি ও কৃষিজমির বিস্তার। একই ভূদৃশ্যের ওপর মানুষ ও বন্যপ্রাণের নির্ভরতা বাড়লে সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘হাতির উপদ্রব’ বলে দেখলে পুরো সত্যিটা ধরা পড়ে না।”


সে আরও লিখল, “জঙ্গলমহলের মানুষের জীবনও জঙ্গলের সঙ্গে জড়িত। পান্তাভাতের ধান আসে এই মাটি থেকে, বর্ষার ছাতু অনেক পরিবারের খাবার ও আয়ের উৎস, মহুয়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদও বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই বন সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণী সংরক্ষণ নয়; বননির্ভর মানুষের জীবন ও জীবিকাকেও বোঝা।”


প্রতিবেদনের শেষ লাইনে অর্কদীপ লিখল, “মানুষের জন্য নিরাপদ জীবন, হাতির জন্য নিরাপদ পথ এবং বন্যপ্রাণের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখলে সমাধান মিলবে না। সহাবস্থান কোনও আবেগের কথা নয়; এটি পরিকল্পনা, বিজ্ঞান, সতর্কতা এবং মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়।”


পরদিন সকালে সম্পাদক ফোন করলেন।

“অর্কদীপ।”

“হ্যাঁ, স্যার।”

“তুই অফিসের নির্দেশের বাইরে গিয়েছিলি।”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু একটা কথা বলি—এই রিপোর্টটাই আমাদের দরকার ছিল।”

অর্কদীপ হেসে বলল, “স্যার, আমি প্রথমে হাতির ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, আসলে মানুষেরও ছবি তুলছি।”

কয়েক মাস পর গ্রামের স্কুলে অরুণবাবু নতুন ক্লাস নিলেন।

“বল তো ফুলমণি, হাতি দেখলে কী করবে?”

“দূরে থাকব।”

“আর?”

“ভিড় করব না।”

“আর?”

“দৌড়ে কাছে যাব না।”

“আর?”

“বন দফতরকে খবর দেব।”

অরুণবাবু হাসলেন। “খুব ভালো। আর রামলাল হলে?”

ফুলমণি একটু হেসে বলল, “ও হলেও একই নিয়ম।”

“কেন?”

ফুলমণি এবার নিজেই উত্তর দিল, “কারণ রামলাল আমাদের চেনে, কিন্তু ও হাতি। আর ওর নিজের একটা পথ আছে।”

অরুণবাবু বললেন, “এই কথাটাই মনে রাখবে।”


সেদিন বিকেলে ফুলমণি দাওয়ায় দাঁড়িয়ে দেখল, রামলাল ধীরে ধীরে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে দৌড়াল না।


হরিপদ বলল, “আজ কাছে যাবি না?”

ফুলমণি মাথা নাড়ল।

“না দাদু। ওর পথটা খালি রাখব।”

অর্কদীপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা হাতে সেই দৃশ্য দেখছিল।

ফুলমণি তাকে দেখে বলল, “ছবি তুলছেন না?”

অর্কদীপ মৃদু হেসে বলল, “আজ না।”

“কেন?”

“আজ ছবির চেয়ে মুহূর্তটা বড়।”

রামলাল ধীরে ধীরে শালের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাতাসে পাতার শব্দ। দূরে পাখির ডাক। ফুলমণি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

হরিপদ ধীরে বলল, “মানুষ বাঁচুক, হাতিও বাঁচুক।”

ফুলমণি বলল, “আর দু’জনেরই নিজের নিজের পথ থাকুক।”

অর্কদীপ নোটবুক বন্ধ করল।

তার মনে হল—এতদিন সে খবর লিখেছে। আজ সে একটি পথের গল্প লিখল।

রামলালের পথ।

সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

কবিতা ।। ক্লান্ত শ্বাসমল ।। মহাদেব নাথ, Mahadeb Nath


কবিতা
ক্লান্ত শ্বাসমল
মহাদেব নাথ


ফেরার ব্যস্ততা নিয়ে কুড়িয়েছিলাম  মাটি 

তখন তারা ফুটেছিল


এক একটা রোদের নাম

তার কতটুকুই বা চশমা 


এইসব অভাবনীয় ক্ষতি নিয়ে 

গাছ হলাম


এক ক্রোশ দূর 

কী সুন্দর নরম পেলব


ছাতা ফুটো হয়ে রোদ পড়ে 

 আমরা ভাবছি এই তো বসন্ত 


লাগাতার উৎসব 

তখন ঘরে ফেরার কী তোড়জোড়


আমরাও যে যার দিকে ফিরিয়ে নিলাম নদী

সংস্কার থেকেই এদের পাপ স্খলন হবে 


লাঙলে লাঙলে লাগাতার হরতাল 

পালিয়ে যে যাব

তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল কি


কেমন হবে আধ খাওয়া প্রশ্নের  উত্তর 

যারা খুঁজেছিল 

তাদের দুচোখে  এখন ঘোমটা আলো 


আর কোনো সুরু পথ সে সুযোগ নেয়নি 


আলাদা হয়েছিল ক্লান্ত শ্বাসমল

রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

কবিতা ।। অমরত্বের ভার ।। রীতা বেরা পাল, Rita Bera Pal

কবিতা

অমরত্বের ভার

রীতা বেরা পাল



অমরত্ব নাকি আশীর্বাদ—

শুনে হেসেছিলাম একদিন,

ভাবতাম, মৃত্যু মানেই তো শেষ,

তাই বাঁচা যত দীর্ঘ, ততই ঋণহীন।


কিন্তু আজ বুঝি—

শেষ না থাকলে শুরুগুলোও ক্লান্ত হয়ে যায়,

প্রতিটি প্রিয় মুখ একদিন হারিয়ে যায়

আর আমি শুধু থেকে যাই।


সময়ের নদী বয়ে চলে,

সবাই ভেসে যায় আপন ঠিকানায়,

আমি একা দাঁড়িয়ে থাকি তীরে—

অতীতের কণ্ঠস্বর কানে বাজায়।


অমরত্ব মানে শুধু শ্বাস নয়,

অগণিত বিদায় বুকে নিয়ে বাঁচা,

হাজার বছরের স্মৃতির ভিড়ে

নিজেকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলা।


তাই আজ বলি—

মৃত্যু কোনো শত্রু নয়,

সে-ই তো শেষের কোমল দরজা,

যেখানে ক্লান্ত আত্মা পায় বিশ্রয়।


অমরত্ব?

সে শুধু এক দীর্ঘ পথ—

যেখানে আলো কম,

আর ছায়ারাই হয়ে ওঠে একমাত্র সঙ্গী…

শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বিশেষ রচনা ।। অবলুপ্তির পথে চন্দ্রকোনার বনক মাটির চাষ ।। মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি ।। Mangalprasad Maity

বিশেষ রচনা

অবলুপ্তির পথে চন্দ্রকোনার বনক মাটির চাষ

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি



ভারতবর্ষের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা-২ ব্লকের অধীন হরিসিংপুর, বাচকা, টোকাহাদুয়া, ডালিমা বাড়ি ইত্যাদি কয়েকটি গ্রাম। এই গ্রামগুলি একসময় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল সেখানকার বনক মাটির চাষের জন্য। বনক মাটিকে অনেকে  ‘অ্যালামাটিও’ বলে থাকেন। বনক বা  অ্যালামাটি যাই বলা হোক না কেন একসময় এই বনক মাটির চাষ এখানকার বেশির ভাগ পরিবারেরই অন্যতম প্রধান জীবিকা হয়ে হয়ে উঠেছিল। বিরাট একটা অর্থ সংস্থান হত এই মাটির চাষ করে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে বনক মাটির চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার এই মাটি শুধুমাত্র চন্দ্রকোনার এই গ্রামগুলিতেই পাওয়া যায় বিশেষ করে হরিসিংপুর গ্রামে।    

   চন্দ্রকোণা টাউন থেকে ঘাটাল যাবার পথে প্রায় দু’কিলোমিটার পূর্বে জয়ন্তীপুর বাসস্ট্যান্ড। এই জয়ন্তীপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তর দিকে আড়াই-দু’কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই পড়বে ডালিমাবাড়ি, টোকাহাদুয়া, বাচকা, এবং হরিসিংপুর গ্রামগুলি। ৩ নং বসনছোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন এই গ্রামগুলির মানুষজন আলু, ধান, সর্ষে, তিল ইত্যাদি চাষাবাদের পাশাপাশি এই একটি বিশেষ ধরনের চাষ ‘বনক মাটির’ চাষ করে থাকেন। সোনালি হলুদাভ বিশেষ এই ধরনের মাটি পাকাবাড়ি, হাঁড়ি, কলসি ইত্যাদিতে রঙ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। 



 



মালসায় করে রোদে শুকনো হচ্ছে বনক মাটি

   শীতের শেষ এবং গ্রীষ্মকাল এই সময়ে এই গ্রামগুলিতে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে রাস্তার দু’ধারে কিংবা ফাঁকা জায়গায় শ’য়ে শ’য়ে মাটির মালসা, বা সরা সারিবদ্ধভাবে বিছানো রয়েছে। তাতে মাটির ঘোলা জল শুকোতে দেওয়া হয়েছে। এই মাটিই শুকিয়ে হচ্ছে বনক মাটি। ভালো করে লক্ষ্য করলে আর দেখা যাবে এখানে-সেখানে সাদা-হলুদ রঙের মাটির স্তুপ। পাশেই বড়ো বড়ো গর্ত আর খাদ। দেখলেই মনে হবে ওই  গর্তগুলো থেকে মাটি তোলা হয়েছে। 

  সাধারণত শুকনো আবহাওয়ায় বিশেষ করে শীতের শেষ সময় থেকে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত বণক মাটি তৈরির মূল কাজটি চলে। বছরের অন্য সময়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট নিচের থেকে মাটি খুঁড়ে সাদা-হলুদাভ বিশেষ ধরনের মাটিটি ঝুড়ির সাহায্যে মাথায় করে উপরে তোলা হয়। তারপর তা ভালোভাবে রোদে শুকনো করে গুঁড়ো করা হয়। যত ভালো গুঁড়ো হবে তত ভালো কাজ হবে। একটা আশ্চর্যের ব্যাপার এই নির্দিষ্ট মাটিটি এই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি।   

   বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শুকনো অবহাওয়ায় শুকনো গুঁড়ো মাটিটিকে একটি গর্তে ফেলে জল দিয়ে প্রচণ্ডভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘোলাটে জল ছেউনির সাহায্যে বা বালতি করে আর একটি গর্তে ফেলা হয়। সেখান থেকে আর একটি গর্তে নিয়ে যাওয়া হয় গাঢ় হলদে সোনালি রঙের জলটি। সেই জল পর পর বালতি করে তুলে সার সার করে রাখা মাটির তৈরি একটি নির্দিষ্ট সাইজের মালসাতে ঢালা হয়। একটিতে ঢালা হয়-পাশের মালসাটি খালি থাকে। যদি পাঁচশো মালসা থাকে তবে আড়াইশো মালসায় জল ঢালা হয়, বাকি আড়াইশো মালসা খালি থাকে। 

                  



   এরপর সারাদিন ফেলে রাখার পর মালসার জলের মাটিটি বসে যায়। উপরের জলটি পাশেই খালি রাখা অপর মালসাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর রোদের প্রচণ্ড তাপে মালসার মাটি শুকনো হয়ে গেলে সেই উজ্জ্বল সোনালি বর্ণের মাটিটিই বনক বা অ্যালামাটি রূপে পরিণত হয়ে যায়। আরো ভালো করে শুকনো করে তা বস্তায় ভরে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। এক হাজার মালসা বা সরা থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচ বস্তা মাটি উঠে। দু’রকমের মাটি তৈরি করা হয়। একটা মোটা ধরণের আর একটা পাতলা। মোটা বনক মাটির পঞ্চাশ কেজির বস্তার দাম চারশো টাকা আর পাতলা একেবারে চকচকে সোনালি মাটির পঞ্চাশ কেজি বস্তার দাম সাতশো টাকা।  চন্দননগর, কলকাতা, রানাঘাট, বহরমপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে খদ্দেররা এসে এই বনক মাটি কিনে নিয়ে যান। বেশির ভাগ ব্যবসাদাররা আসেন হুগলি জেলার চন্দননগর থেকে। 


 


   শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখনো যারা এই বনক মাটির শিল্প বা চাষটিকে ধরে রেখেছেন তাদের কয়েকজন হলেন নেপাল ধাড়া, টেম্পু ধাড়া, নিতাই ধাড়া, অরুণ দোলুই, মৃত্যুঞ্জয় খাঁ, রমাপ্রসাদ ধাড়া, খোকন খাঁ , শ্যামাপ্রসাদ ধাড়া। সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তারা জানালেন - একসময় এই বনক মাটির চাষ অত্যন্ত লাভজনক ছিল, অর্থনীতিতে একটা জোয়ার আনতে পেরেছিল। কিন্তু সেই সুসময় আজ আর নেই। নানারকম কৃত্রিম রঙ বাজারে এসে যাওয়ার ফলে এই বনক মাটির চাহিদা কমে গেছে একেবারে। যার ফলে বনকমাটির শিল্প আজ কঠিন সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে। এই শিল্পের কাঁচামাল হল মাটি। এই মাটি যদিও কিনতে হয় না তবু এই শিল্প চাহিদার অভাবে মার খাচ্ছে। দেড়শো-দুশো বছরের পুরনো এই বনক মাটির চাষ অবলুপ্তির পথে। এলাকার ৩০০ থেকে ৩৫০টি পরিবার এই বণক মাটি চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই শিল্প থেকে তেমন আর আয় না হওয়ায় অনেক পরিবার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে মাত্র আট ৮ থেকে ১০টি পরিবার এই বনক মাটির চাষ করে থাকেন। বনক মাটি কেনার আগেকার মতো সেই খদ্দের বা ব্যবসাদার নেই। 



  এই বণকমাটি শিল্পে আরো যে সমস্যাগুলি প্রকট হয়ে উঠে তা হল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ এটি। বর্তমানে প্রায় কুড়ি ফুট খুঁড়লে তবে এই মাটি পাওয়া যায়। এতটা নিচ থেকে মাটি তোলাটাই একটা কঠিন ব্যাপার। তারপর দিনকে দিন মালসা বা সরার দাম বাড়ছে। এই মাটি তোলা একটি বিপজ্জনক কাজ। গর্ত করে মাটি তুলতে গিয়ে অনেক সময় বড়ো বড়ো ধসের মধ্যে পড়তে হয়। ১৯৮৯ সালে ১২ পৌষ গ্রামের তিনটি শিশু ধসের মধ্যে মাটি চাপা পড়ে প্রাণও হারিয়েছে। তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর সমিতির পক্ষ থেকে ওই দিনটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে থাকে। বনকমাটি সংরক্ষণের জন্য একটি সমিতি গঠিত হয়েছিল। যা হরিসিংপুর গ্রামে অবস্থিত। সেই সমিতির অফিসে প্রত্যেকটি চাষির উত্‍পন্ন মাল জমা রাখা হয়। বনক মাটির চাষ কমে যাওয়ায় এই সমিতির অস্তিত্বও সংকটের মুখে। তবু সমিতি সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে এই বনক মাটির চাষ বা শিল্পকে ধরে রাখতে। তবে কতদিন এই শিল্প বেঁচে থাকবে সেই ব্যাপারে দেখা দিয়েছে বিরাট একটা প্রশ্নচিহ্ন।   

(*)


শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

কবিতা ।। ফাঁকি ।। শান্তিময় মুখোপাধ্যায়, Poetry

কবিতা

ফাঁকি

শান্তিময় মুখোপাধ্যায় 



পূর্বাচলের দিকে চোখ রেখে তিনি দেখছেন 

ডানা মেলে উড়ে যাওয়া

একটুকরো আলো 

ক্রমশ অস্তাচলগামী 

হতে 

হতে 

কিভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে সায়াহ্নে


নিস্তরঙ্গ লংপ্লেইং 

বিরহ আর দহনজ্বালা উগরে দিচ্ছে

শেষ বোশেখের খাঁ খাঁ বেলায়


পোষা গীতবিতানের পাতা খুলে 

দিগন্তের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে

ঘুরে বেড়ানো এখন শুধু সুর ভুলে

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

মকরডুবের কবিতা ।। সৌমিত্র রায় ।। কবিতা, poem

মকরডুবের কবিতা

সৌমিত্র রায়



তুমি ভুলে গিয়েছো 

জলস্রোতে স্নান করার বিজ্ঞান 

'আদিম'- তোমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল 


তুমি কি মনে রেখেছো 

'অধুনা'- তোমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ 

পঞ্চকোষ আর পঞ্চভূতের 

সু-সমতার জন্য জলস্রোতে স্নান !


ঢেউয়ের মুহূর্মুহূ জন্ম-মৃত্যু... তরঙ্গ...

তোমার প্রকৃতি-বন্ধু হওয়ার সাক্ষী থাকবে

একটা ডুব 

মকরডুব...


সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ 

স্নানের বিজ্ঞান। জ্ঞানের মকরে। একাকার হোক...


কলকাতা। ১১ জানুয়ারি ২০২৬। সন্ধ্যা ৭টা ০১

বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

ঔদ্ধত্য ।। সৌমিত্র রায় ।। কবিতা

 ঔদ্ধত্য

সৌমিত্র রায়



কী ঘটছে রাজ্যে !!

বলতে পারবো- বাদ দে ?


কিছু বলবো বলে, অন করি ফেসবুক,  

কিছু লিখবো বলে, আঙুল ছোঁয়ায় স্ক্রিনে।


দেখো 

তাকিয়ে আছে 

সেল্ফি তোলার মুখ।

কিন্তু 

নিউজ আপডেট 

ভাসে সারাটি দিনের।


সেসব কি তুমি 

এড়িয়ে যাচ্ছো কবি?

এড়াতে পারছো

সেখবর, সেই ছবি?

এড়াতে পারলে তুমিই সেরার সেরা,

মেলার বাজেট এবং ফুলের তোড়া

তোমার জন্য ।

তুমি ধন্য ।। ধন্য ধন্য ধন্য 


কিছু বলবো বলে, অন করি ফেসবুক,  

কিছু লিখবো বলে, আঙুল ছোঁয়ায় স্ক্রিনে।

রানি যখন উন্মত্ত 

কিছু না লেখাটাও ঔদ্ধত্য 


তুমি সত্য দেখছো

এবং সত্য লিখছো 


লেখার ঔদ্ধত্যও বাড়ছে দিনে দিনে ।।


মেদিনীপুর // ৮ জানুয়ারি ২০২৬ // রাত ৯টা২২

মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন - ১২ ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)





বার

(১২)

আমেরিকার স্বাধীনতা

 ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার প্রায় একশত আঠাশ বছর পরে একশো দুই জন ইংরেজ পুরুষ এবং মহিলা সেই নতুন মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামের একটি জাহাজে উঠে আমেরিকায় যাত্রা করে। ইতিহাসে তাঁরা পিলগ্রিম ফাদারস নামে পরিচিত। ষোলো  এবং সতেরো  শতিকায় ইংল্যান্ডে একটি ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিছু গোঁড়া খ্রিস্টান ইংল্যান্ডের প্রচলিত ধর্মব্যবস্থা এবং গির্জার বিরোধিতা করে সেগুলির আমূল সংস্কার দাবি করেছিল। গির্জার শুদ্ধিকরণ চাওয়া এই লোকদের পিউরিটান বলা হয়। কিছুদিনের জন্য তাঁরা ইংল্যান্ডের শাসন ক্ষমতাও দখল করেছিল। কিন্তু তুমুল যুদ্ধ– বিগ্রহের শেষে তাঁদের সেই ক্ষমতা হারাতে হয়। তখন ইংল্যান্ডের প্রচলিত ধর্মব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন বলে মনে হওয়ায় একশত দুইজন পিউরিটান নতুন দেশে নতুন জীবন আরম্ভ করার জন্য আমেরিকার উদ্দেশ্যে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তাঁরা গিয়ে আমেরিকার উপকূলে উপনীত হয়। আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত স্থাপন করা প্রথম দলটি ছিল এই ১০২ জন পিলগ্রিম ফাদার্স।

 পিলগ্রিম ফাদার্সের অনুকরণ করে  তারপরেও ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে মানুষ আমেরিকায় যেতে শুরু করে। কালক্রমে তাঁরা প্রায় এক হাজার মাইল  ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে তেরোটি  উপনিবেশ স্থাপন করে। বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে একটি অচিন- অজান মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার জন্য এগিয়ে আসা এই মানুষগুলির স্বভাব ছিল অতি দুঃসাহসী এবং কঠোর পরিশ্রমী। একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিকের ভাষায় বলতে গেলে সেই দিনে ভীরু এবং অলস প্রকৃতির মানুষ মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার কথা কল্পনাই করতে পারত না। নতুন মহাদেশের সব সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আত্মরক্ষা করা প্রয়োজন হওয়ার ফলে তাদের পরিশ্রম শক্তি এবং আত্মনির্ভরশীলতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

 ইংরেজরা আমেরিকায় স্থাপন করা তেরোটি উপনিবেশ প্রথম অবস্থায় ইংল্যান্ডের রাজা এবং সংসদের অধীন ছিল। কিন্তু উপনিবেশকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। স্বাধীনচেতা এবং আত্মবিশ্বাসী উপনিবেশকারীরা চিরকাল অন্যের আজ্ঞাকারী হয়ে থাকার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশে যায়নি। অন্যদিকে আমেরিকা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে থাকা ইংল্যান্ডের শাসক চক্র উপনিবেশকারীদের আবেগ অনুভূতি বুঝতে পারেনি বা বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। ফলে কিছুদিনের মধ্যে উপনিবেশকারীরা এবং তাঁদের পূর্বের স্বদেশ ইংল্যান্ডের মধ্যে মনোমালিন্যের সূত্রপাত হল।

  ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট তথা সংসদে উপনিবেশকারীদের একজনও প্রতিনিধি ছিল না।অথচ সংসদ উপনিবেশকারীদের ওপরে একের পর এক করের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের আপত্তি এবং অসন্তোষের এটাই ছিল প্রধান কারণ। তারা এই বলে ধ্বনি তুলেছিল যে ইংল্যান্ডকে যে সংসদে উপনিবেশকারীদের একজনও প্রতিনিধি নেই সেই সংসদের উপনিবেশকারীদের ওপরে কর বসানোর কোনো নৈতিক অধিকার নেই।

 কিন্তু ইংল্যাণ্ডের সংসদে উপনিবেশকারীদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর কোনো প্রয়োজন অনুভব করল না। বরং তারা আমেরিকায় আমদানি করা চায়ের ওপরে কর লাগিয়ে আগুনে ঘি ঢালার ব্যবস্থা করল। উপনিবেশকারীরা অনুভব করলেন যে ইংল্যান্ডের রাজা এবং সংসদের এই কার্য তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে; অর্থাৎ প্রতিবাদ করার সময় উপস্থিত হয়েছে। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কয়েকটি জাহাজ বোস্টন বন্দরে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন উপনিবেশকারী রেড ইন্ডিয়ানের ছদ্মবেশ ধরে জাহাজে উঠল এবং ৩৪০ টি চায়ের বাক্স সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমেরিকার ইতিহাসে বস্টন টি পার্টি নামে অভিহিত এই ঘটনাটি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের বিদ্রোহ সূচনা করল।

 ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের আসল যুদ্ধ আরম্ভ হল ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে। এই যুদ্ধ সাত বছর ধরে চলেছিল ।সমস্ত উপনিবেশকারীরাই যুদ্ধ তথা স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিল এরকম নয়। নগরে বাস করা বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ইংল্যান্ডের রাজার প্রতি অনুগত  ছিল এবং স্বাধীনতার দাবির বিরোধিতা করেছিল। এমনকি যে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি অতি মহত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনিও বহুদিন পর্যন্ত উপনিবেশকারীদের স্বাধীনতার দাবি সমর্থন করেন নি। তিনি ইংল্যান্ডের সঙ্গে একটা বোঝাবুঝিু  এবং আপোষ হওয়াটা চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার দাবির সমর্থকরা ছিল নিজের সংকল্পে অটল। তাঁদের ভাগ্য ভালো যে তাদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন জর্জ ওয়াশিংটনের মতো একজন জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং চরিত্রবান মানুষ। প্রধানত তার বিচক্ষণ নেতৃত্বের ফলেই সামরিকভাবে দুর্বল  উপনিবেশকারীদের পক্ষে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করা সম্ভব হল। আমেরিকার স্বাধীন হওয়ার পরে সেই নতুন রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন জর্জ ওয়াশিংটন।

 কিন্তু নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করার জন্য যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার উপনিবেশকারীদের ধৈর্য ছিল না। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার এক বছর পূর্ণ না হতেই  ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে প্রতিটি উপনিবেশের নেতৃ স্থানীয় লোকরা তাঁদের সামগ্রিক সমস্যা গুলির বিষয়ে আলোচনা করার জন্য বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের শহর ফিলাডেলফিয়ায় সমবেত হলেন। একনাগারে কয়েক সপ্তাহ আলোচনা করে তাঁরা অবশেষে ১৩ টি উপনিবেশ একত্রিত করে একটি স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার জন্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের  ৪ জুলাই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হল। আধুনিক বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করা এই ঘোষণা পত্রটি রচনা করেছিলেন টমাস জেফারসন। তিনি পরবর্তীকালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও হয়েছিলেন। তিনি একজন বহুমুখী  প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন।  আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতিদের ভেতরে তাকেও একজন বলে ধরা হয়।

  আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার সুদূর প্রসারী  তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে হেন্ড্রিক  উইলিয়াম ভেন লুন  তার ‘মানবজাতির কাহিনি’(The Story of Mankind ) নামের বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন–’ বন্দুকের যে গুলি লেক্সিংটনের যুদ্ধ আরম্ভ করেছিল, সেই গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল পৃথিবীর সর্বত্র। কথাটা কিছুটা অতিরঞ্জিত হল। চীন জাপান এবং রাশিয়ার মানুষ এই গুলির শব্দ শুনতে পান নি। কিন্তু এই গুলির শব্দ আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে ইউরোপের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বারুদ স্তূপ  স্পর্শ করে সেখানে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।  বিশেষ করে ফ্রান্সে যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সেই বিস্ফোরণ পেট্রোগ্রাড  থেকে মাদ্রিদ পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ কাঁপিয়ে তুলেছিল। তার ফলস্বরূপ হওয়া  বিশাল ধ্বংসস্তূপের নিচে চিরকালের জন্য  সমাধিস্থ হয়ে গিয়েছিল  পুরোনো রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি  এবং পুরোনো কূটনীতি।’

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

শোনো কে বাজায় ।। শান্তিময় মুখোপাধ্যায় , Shantimoy Mukhopadhyay

শোনো কে বাজায় 

শান্তিময় মুখোপাধ্যায়  



রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছিলেন "জগতের প্রত্যেক অণু পরমাণু এক মহাপ্রাণের ঐক্যসূত্রে হিল্লোলিত দেখিতে পাই--এক মহাপ্রাণের অনন্তকম্পিত বীণাতন্ত্রী হইতে এই বিপুল বিশ্বসংগীত ঝংকৃত..."। ধ্বনিতে আকৃষ্ট হয়ে আমরা প্রথমে তার উৎস নির্ধারণ করতে পারি না।মন যখন যে স্তরে অবস্থান করে তদনুযায়ী সে এই অনন্তস্পন্দিত বীণাতন্ত্রী থেকে নিঃসৃত ধ্বনি যা আদি থেকে অনাদির ব্যপ্তি নিয়ে রণিত হয়েই চলেছে তাকেই বিচ্ছিন্ন,অমার্জিতভাবে পেতে থাকে।দূরাগত সেই অব্যক্তকে প্রথমে আমরা খুঁজি বাইরে।যা বিশাল, ভূমা যা,তা যে আমারই একান্ত,চিরন্তন অনুভব তা আমরা প্রথমে ধারণা করতে পারি না।মনে হয় এই পৃথিবী, ওই আকাশই বুঝি সব অনুভব, ভাবনা, চিন্তা নিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে।অতিমানসলোকের কোনো এক স্তরে তাই কখনো শোনা যায় সমুদ্রকল্লোল কখনো ঝিঁ ঝিঁ ডাক কখনো বা রিনরিন নূপুরগুঞ্জন।শব্দ যে নাদে পরিণত হয়ে জ্যোতি রূপে প্রকাশমান হতে পারে একথা ভারতীয় দর্শন স্বীকৃত হলেও আধুনিক পদার্থবিদ্যা বোধহয় তাকে অস্বীকার করতে পারে না।আর বিশ্বপ্রকৃতির প্রতিটি বস্তু(তা সে জীব বা জড় যাই হোক না কেন)-র মধ্যে গন্ডি বা কাঠামো ভাঙার যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তা-ই তো বন্দিনী অহল্যার আত্মমুক্তির আকাঙ্খা। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের সীমাহীন ব্যাকুলতা।কবি তাই সহজেই বলতে পারেন "মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে" আর জলধিকিনারে পদাবলীকর্তাদের শ্রীমতি উন্মুখ প্রহর গোনেন "হরি গেলা মধুপুর হম কুলবালা"।


জীব আর ব্রহ্মের সম্পর্ককে যদি আমরা প্রকৃতি ও পুরুষের সম্পর্ক ধরি, বৈষ্ণবীয় কল্পনায় তাহলে দেখবো বিশ্বের রাসচক্রের কেন্দ্রে এক নিত্যমিথুনের ছবি। "একাত্মনাবপি দেহভেদং গতৌ"-- অভিন্ন আত্মা হয়েও দুটি দেহে ভিন্ন।আর চক্রের পরিধি জুড়ে সেই অনন্ত মিথুনেরই কায়ব্যুহ। এই রসের লীলা চলেছে সর্বত্রই --- জ্ঞানে,প্রেমে,কর্মে বা শক্তির উল্লাসে।রস যেন প্রেমেরই একান্ত।তা আস্বাদন ভিন্ন প্রেমের নাড়িতে রক্তধারার টান লাগে না।সব রসের ধারা সেখানে হারায়।তৈত্তিরীয় উপনিষদে বিশ্ব তাই " রসো বৈ সঃ"।অনন্ত প্রকৃতি যখন পরমা হয়ে হয়ে ফুটে উঠে পরমের সঙ্গে মিলিত হয়,অনাদিকালের তৃষ্ণা তখন এই মহামিলনে পরিতৃপ্ত হয়।যুগ যুগান্তরে অনন্ত রূপের মধ্যে দিয়ে মিলনাকাঙ্খা এই মহাসম্মিলনেই নিবৃত্ত হয়। এই অবস্থায় প্রকৃতি ক্রমশ পুরুষে ও পুরুষ ক্রমশ প্রকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে মহা সামরস্য সংঘটিত করে।নিকুঞ্জলীলায় রসের এই মহানুষ্ঠানই রাস।  


রাসের প্রসঙ্গে স্বভাবতই এসে পড়েন কৃষ্ণ,তাঁর যাবতীয় ব্যুৎপত্তি নিয়ে।সংস্কৃতে "কৃষ" ধাতুর অর্থ চর্চা করা,অনুসন্ধান করা।অনুশীলনের দ্বারা মনকে সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম পর্দায় বেঁধে যে সত্ত্বাকে অধিগত করা যায় তাই-ই কৃষ্ণ।আবার "কৃষ" ধাতুর অন্য অর্থ আকর্ষণ করা।এই সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে থাকা সূর্য তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহকে ক্রমাগত নিজের দিকে আকর্ষণ করে চলেছে।ফলে নিজের কক্ষপথে তারা অবিরত ভ্রাম্যমাণ। ঠিক এভাবেই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিজের দিকে আকর্ষণ করে চলেছেন বলে তিনি কৃষ্ণ। অন্য দিক দিয়ে দেখলে লাল,হলুদ প্রভৃতি যতো রং তাদের মধ্যে কালো রঙের traction power সবচেয়ে বেশি। কৃষ্ণ শব্দের আর একটি অর্থ তাই বোধহয় কালো।"কৃষ"ধাতুর ভিন্নতম একটি অর্থ "অহম অস্মি" অর্থাৎ আমি আছি।আর ভূ-ধাতু -- হওয়া,থাকা।অতএব কৃষ্ণ মানে আমরা তাই সহজেই বলতে পারি : যিনি আছেন বলে আমি আছি। আমার মধ্যে তার সুমধুর প্রকাশ যখন সব ভোলানো সুরে বাঁশিগ্রস্থ করে তোলে কৃষ্ণাকর্ষণের শুরু বোধহয় তখনই।


অসীমের প্রতি,বৃহতের প্রতি এই আকর্ষণই প্রেম।ভক্তিরসে যা সংপৃক্ত।ভক্তি আর প্রেম তাই একে অন্যের পরিপূরক।দুয়ের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য নেই।প্রেম মনের,ভাবের। আর ভাব যখন ভাষায় প্রকাশিত হয়ে মাটিতে নেমে আসে তা হয়ে দাঁড়ায় ভক্তি।শাস্ত্রকারেরা তাই বলেছেন "প্রেম ভক্তি স্বরূপিনী"।প্রেমের সংসিদ্ধিকত্ব,উত্তরতত্ত্বই ভক্তি।আবার ভক্তি বলতে বোঝায় ভজ+ক্তিন।অর্থাৎ মনের সব বৃত্তি যখন স্থূল থেকে,জাগতিকতা থেকে প্রত্যাহত হয়ে পরমের দিকে ধাবিত হয় তাই-ই ভক্তি।বৈষ্ণবতত্ত্বে এটিই হ্লাদিনী শক্তি।পরমের প্রতি তার যে আকর্ষণ তা অন্তর্মুখীনতারই প্রতিভাস।ভয়হীনা,লজ্জাহীনা রাধা তাই প্রেমযমুনায় পাগলিনীর মতো ডুব দেন একান্তে,সহজ অনুরাগে।এ পোড়া বাঁশির জ্বালা তিনিই বোঝেন অন্যে বোঝে না দূর অধরার সুরে যিনি কখনো দংশিত হন নি --- "মুরলী শুনিয়া মোহিত হইবে সহজ কুলের বালা/দ্বিজ চন্ডীদাস কয় তখনি জানিবে পিরিতি কেমন জ্বালা"।

বাঁধন ছেঁড়ার সাধন ।। শান্তিময় মুখোপাধ্যায় ।। Shantimoy Mukhopadhyay

বাঁধন ছেঁড়ার সাধন

শান্তিময় মুখোপাধ্যায় 



"আমায় মুক্তি যদি দাও বাঁধন খুলে" গীতবিতানের পূজা পর্যায়ের ১৮৬ নং এই গানটির সঙ্গে কমবেশি সকলেই আমরা পরিচিত। যদিও রবীন্দ্রনাথের অনেক গান বা কবিতায় নানাভাবে মুক্তির উপস্থাপন আছে তবু এই বিশেষ গানটি নিয়েই যতো মাথাব্যথা। কেননা ঠিক এর পরের লাইনটিতে আছে মারাত্মক এক বিস্ফোরণ --- "আমি তোমার বাঁধন নেবো তুলে"। কেন মুক্ত হবার পরও কেউ পুনরায় অবরুদ্ধ হতে চান, এটা কি শুধুই লিরিকের খাতিরে নাকি এর পেছনে লুকিয়ে অন্য কোনো দর্শন বা ব্যপ্তি যা একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক(spiritual) ও বস্তুকেন্দ্রিক (material) ! এ যেন অনেকটা শ্রম বিভাজনের মতো বৌদ্ধিক(spiritual) এবং কায়িক(physical বা material)। যা-ই হোক, মুক্তির প্রসঙ্গ তখনই আসে যখন বন্ধনের প্রশ্ন থাকে।এ-বন্ধন নানা ভাবে,নানা কিসিমে।কি শিল্পে,কি সাহিত্যে, কি মানসিকতা, জীবনের সবদিকেই পরিব্যপ্ত।যাকে কেন্দ্র করে শিল্প, সাহিত্য, চিন্তাভাবনা প্রভৃতির মুক্তি ধারণা গড়ে উঠেছে।আর ভারতীয় দর্শনে তো মুক্তি একটা ইজম বা মতবাদ হিসেবেই সুপরিচিত। দুজন কবির দুটো পংক্তি দিয়ে আলোচ্য ওই দু-ধরণের মুক্তির উদাহরণ টানা যেতে পারে। প্রথম উদাহরণ হিসেবে এখানে অবশ্যই " আমার মুক্তি আলোয় আলোয় "--- রবী ঠাকুরের গানের পংক্তিটি যেমন উল্লেখ্য তেমনই দ্বিতীয়টি কাজী নজরুল ইসলামের " আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী ছল করে দেখা অনুক্ষণ"-- কে রাখাই যায়।সর্বোপরি "মুক্ত বেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতর বঙ্গে/আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থ বরদ বঙ্গে"--- কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-র আমরা কবিতাটি তো আমাদের এই সমগ্র বাংলাদেশকেই যেন বুকে ধরে আছে।


বাস্তবে আদৌ কি মুক্তি বলে কিছু আছে না তা পাওয়া যায়? এ প্রশ্ন হয়তো সর্বজনীন। তবু যখন একটা শাসন বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আর একটা ব্যবস্থায় পৌঁছুনো যায় তখন তা কি আদপেই বন্ধনহীনতা! অথবা এক দেশ থেকে অন্য এক দেশে পাড়ি দেওয়া, এমনকি মানসিক এক স্তর থেকে অন্য স্তরে থিতু হওয়া সত্যিই কি একটা গন্ডি অতিক্রান্ত হয়ে আর একটা  ঘেরাটোপে বদ্ধ হওয়া নয়! একটা পাখিকেও যখন খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিই আর দূর আকাশে তার ক্রমাগত মিলিয়ে যাওয়া দেখি আপাত দৃষ্টিতে তখন মুক্তির একটা মানে খুঁজে পেলেও মনে হয় একটা শূন্য অতিক্রম করে আরো বড়ো কোনো শূন্যে সে কি সত্যিই নি:সীম হতে পারবে! কেননা সাধারণ ভাবে পরিচিত যে আকাশ,সে তো আসলে বায়ুমন্ডল।বিভিন্ন গ্যাস ও জলীয় বাষ্পের সমাহার।মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে চারদিক থেকে পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে ঘিরে আছে।সূর্যের সাতটি রঙের মধ্যে একমাত্র নীল রঙ ক্ষুদ্রতর তরঙ্গের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তাকে নীলাভ দেখায়। আবার এই বায়ুমন্ডলেরও পাঁচটি স্তর।তাদের পরিবেশ ও আয়তনও নির্দিষ্ট। সুতরাং তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া যায় পাখিটি আকাশে বায়ুমন্ডলের কোনো এক স্তরে গিয়ে পৌঁচেছে তাহলেও সে কি মুক্ত নাকি অন্য এক পরিবেশ বা পরিস্থিতির আবর্তে গন্ডিবদ্ধ! আবার ভারতীয় দর্শনে আকাশ হলো জগতের পাঞ্চভৌতিক উপাদানগুলির মধ্যে পঞ্চম(ব্যোম)।তার নিচে চতুর্থ উপাদান বায়ু।ফলে ধরে নেয়াই যায় যে বায়ুমন্ডলের পঞ্চম স্তর অর্থাৎ ট্রাপোস্ফিয়ারের পরের অসীম মাধ্যাকর্ষণহীন সেই শূন্যই আকাশ। ভারতীয় দর্শনানুসারে যা সর্বাপেক্ষা ডেলিকেট বা সুক্ষ্ম। কারণ অন্য উপাদানগুলির বাকি সবগুলিই শারীরিক পরিকাঠামোয় প্রত্যক্ষত অথবা অনুভূত।অথচ এই পাঞ্চভৌতিক দেহ গঠনেও তার আনুপাতিক হার শতকরা ছয়।


স্বভাবতই বিশাল ব্যপ্তি নিয়ে থাকা এই মুক্তি বিষয়টি যদি বন্ধনের বিপরীত হয়ে থাকে তাহলে বন্ধন কি সেই প্রশ্নটিও কিন্তু অনাবশ্যক নয়। উত্তর খুঁজতে আমাদের মহোপনিষদের শরণাপন্ন হতে হবে।"পদার্থভাবনাদার্ঢ্যং বদ্ধ ইত্যাভিধীয়তে"(২।৪১) অর্থাৎ দৃঢ় পদার্থভাবনাই বন্ধন।আর একটু এগিয়ে যোগবশিষ্ঠ রামায়নে এটি উল্লিখিত হলো "পদার্থবাসনাদার্ঢ্যং বদ্ধ ইত্যাভিধীয়তে"(২।৩৫।৩) যার মানে দাঁড়ায় শুধু পদার্থ ভাবনাই নয় তাকে কেন্দ্র করে যে বাসনা বা ইচ্ছা তাও বন্ধনস্বরূপ। 


ফলে আমাদের কবিঠাকুরও বিভাস-বাউলে গান বেঁধে ফেললেন " এই কথাটা ধরে রাখিস মুক্তি তোরে পেতেই হবে / যে পথ গেছে পারের পানে সে পথে তোর যেতেই হবে" (গীতবিতান,পূজা পর্যায়,১৯০)।তা তিনি যখন গান বাঁধলেনই তখন আমাদেরও মুক্তির সুলুকসন্ধানে আর কোনো বাধা রইলোনা। পাণিনির কাছ থেকে আমরা জেনে গেলাম এই মুক্তি শব্দটির উৎপত্তি 'মুচ্' ধাতু থেকে যার অর্থ মোক্ষণ, মোক্ষ বা মুক্তি (অষ্টাধ্যায়ী ৭।৩।৫২)। বেদের দ্রষ্টারা বললেন এ মুক্তি অমৃত থেকে নয় মৃত্যুরূপ বন্ধন থেকে, কামনা-বাসনা থেকে।গীতায় দেখলাম পাপ থেকে মুক্তি ; কর্ম,বন্ধন এবং সর্বোপরি দেহ থেকে। আর মহাভারতে বলা হলো বাসনার নিবৃত্তিই মুক্তি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে যা মোক্ষ, নির্বাণ, অর্হৎ, অপবর্গ, কৈবল্য, নি:শ্রেয়স প্রভৃতি নানা সমার্থবোধক শব্দে পরিভাষিত। 


মুক্তির প্রকারভেদ নিয়ে দর্শনশাস্ত্রে ইতরবিশেষ প্রায় একই রকম মত থাকলেও 'সুতসংহিতা' কিন্তু একে পরমামুক্তি এবং অবরা মুক্তি এই দুই ভাগে বিভাজিত করেছে।পরমামুক্তি জ্ঞানলব্ধ (মুক্তি), পরমার্থ বা ব্রহ্মে লীন হওয়া। আর অবরা মুক্তি চার প্রকার --- (১) সালোক্য অর্থাৎ ইষ্ট বা অভীষ্টর সঙ্গে একই লোকে থাকা (২) সারূপ্য অর্থাৎ ইষ্টদেবতার রূপ প্রাপ্ত হওয়া (৩)সামীপ্য, অর্জুনের মতো ইষ্টের সান্নিধ্যে থাকা (৪) সাযুজ্য, অনেকটা ঘুমের মতো, গভীর নিদ্রায় যেমন বাহ্যিক কিছুই অনুভূত হয়না নিজের মধ্যে নিজেই মগ্ন থেকে যে সুখ পাওয়া যায় সেরকমই ইষ্টে নিমগ্ন থাকা। যেন রবীন্দ্রগানের গানের সেই কলিদুটি "দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে"। আর অবরা মুক্তিতে জীব আপাত মুক্ত হলেও ব্যক্তিত্ব ও অপ্রাকৃত দেহ,মন ইত্যাদি অবলুপ্ত না হবার ফলে শুধু ব্রহ্মসাম্য প্রাপ্ত হন মাত্র।দুর্গাদাস তর্কবাগীশ প্রণীত 'শব্দকল্পদ্রুম'-এ 'মুচ্' ধাতুর ব্যাখ্যায় মুক্তি আবার এরকম মানে পেয়েছে : বন্ধনরহিতীভাবে অকর্ম্মকোহম্ গজ: কর্ত্তারিক্ত: এবং পাপন্মুক্ত ইত্যর্থ:(কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ সংস্করণ, পৃ: ১০৪৩)।


মুক্তির সাতকাহন ঘেঁটে তাহলে কি শেষপর্যন্ত আমরা সংযমের পথ ধরে পঞ্চেন্দ্রিয়ের সব পথ বন্ধ করে বৈরাগ্য সাধনায় রত হবো নাকি এই পৃথিবীর  রূপ, রস, গন্ধ, সুর, তাল, ছন্দ, লয় ইত্যাদির নানা বাঁধনে নিজেকে বেঁধে কবির মতোই উচ্চকিত হবো --- " মোহ মোর মুক্তিরূপে উঠিবে জ্বলিয়া, / প্রেম মোর ভক্তিরূপে রহিবে ফলিয়া "(নৈবদ্য-৩০) তা ঠিক করার দায় কিন্তু আমাদেরই।

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das) এগার (১১) বৈজ্ঞানিক এবং আবিষ্কারক বেঞ্জামিন

 বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)





দশ

(১০)

বৈজ্ঞানিক এবং আবিষ্কারক বেঞ্জামিন

  বেঞ্জামিন তার শৈশব থেকে নানা ধরনের সরঞ্জাম আবিষ্কার করে এবং যন্ত্রপাতির সঙ্গে খেলাধুলা করতে ভালবাসতেন। এই বিশেষ প্রতিভা তিনি পিতার কাছ থেকে জন্মসূত্রে লাভ করেছিলেন ।নানা ধরনের সমাজ সেবার কাজ এবং গভীর অধ্যয়নে নিমগ্ন হয়ে থাকার সময়ও তিনি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম উদ্ভাবন করার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। উদাহরণস্বরূপ ফিলাডেলফিয়ায় আসার কিছুদিনের মধ্যে তিনি এক ধরনের নতুন যান্ত্রিক উনুন নির্মাণ করেছিলেন। ফিলাডেলফিয়া স্টোভ নামের এই যান্ত্রিক উনুনটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে অনেকে তার নকল করে ইউরোপে রপ্তানি করেছিল। বেঞ্জামিন ইচ্ছা করলে তার যান্ত্রিক উনুনটির পেটেন্ট নিয়ে , অর্থাৎ তার বিনা অনুমতিতে অন্যে সেটা নকল করে নির্মাণ করতে না পারার আইনগত ব্যবস্থা করে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতেন। কিন্তু বেঞ্জামিনের টাকা রোজগারের কোনো ইচ্ছা ছিল না। তার যান্ত্রিক উনুনটি মানুষের উপকারে আসুক– তিনি শুধু এটাই চেয়েছিলেন।

  ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণভাবে গড়ে উঠার পরে বেঞ্জামিন অনুভব করলেন যে এখন তিনি সমাজ জীবন থেকে অবসর নিয়ে জীবনের বাকি থাকা সময়টুকু বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অধযয়নের জন্য উৎসর্গ করতে পারেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি স্পেন্স নামের একজন ইংরেজ বৈজ্ঞানিকের কাছ থেকে কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কিনে নিয়ে বিদ্যুৎ শক্তির বিষয়ে গবেষণা করতে শুরু করলেন। এটা ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। এভাবে গবেষণা করে থাকার সময় একদিন তিনি বিদ্যুৎ শক্তির সাহায্যে একটি মোরগকে মারতে গিয়ে চেষ্টা করে নিজেই প্রায় মরতে বসেছিলেন। সে যাই হোক না কেন, তাঁর বিদ্যুৎ শক্তির গবেষণা এই ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

 বিদ্যুৎ শক্তির বিষয়ে মানুষ প্রথমে করা প্রায় সমস্ত পরীক্ষা ছিল স্থির বিদ্যুৎ সম্পর্কীয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিকরা বিদ্যুৎ প্রবাহের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। এই ক্ষেত্রে অগ্রণীদের ভেতরে একজন ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন।১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি ঘুড়ি উড়িয়ে প্রমাণ করেন যে বিদ্যুৎ শক্তি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় প্রবাহিত হতে পারে। এই পরীক্ষাটির জন্য বেঞ্জামিন একটি সিল্কের ঘুড়ি তৈরি করে তার উপরে একটি সূঁচোলো তার জুড়ে দিলেন। ঘুড়িটি উড়ানোর জন্য ব্যবহার করা লম্বা লিনেন সুতার একটি প্রান্ত তারটির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে তিনি অন্য প্রান্তে একটি সিল্কের ফিতা বেঁধে নিলেন। লিলেন সুতাটি পরিবাহী এবং সিল্কের ফিতাটি অপরিবাহী।সিল্কের ফিতাটার সঙ্গে জোড়া দেওয়া জায়গায় একটা চাবি বেঁধে দেওয়া হল। একদিন বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে তুফান চলে থাকার সময় তিনি সিল্কের ফিতাটা হাত দিয়ে ধরে থেকে ঘুড়িটি আকাশে উড়িয়ে দিলেন। তার পরে তিনি চাবিটার কাছে হাতের মুঠিটা আনলে চাবিটা থেকে বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। এভাবে তিনি প্রমাণ করতে পারলেন যে মেঘ থেকে বিদ্যুৎ শক্তি ভিজে থাকা লিলেন সুতো দিয়ে চাবিটা পর্যন্ত বয়ে আসতে পারে। বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন ছিলেন সমস্ত দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারা বহুদর্শী মানুষ। এই পরীক্ষা করার সময় তিনি নিজেকে এবং সিল্কের ফিতাটাকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। কারণ ফিতাটা ভিজলে তা বিদ্যুৎ পরিবাহী হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটাতে পারত। তিনি এই পরীক্ষাটি করার কিছুদিন পরে একজন রুশ বিজ্ঞানী একই পরীক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পড়েছিলেন।

  বিদ্যুৎ শক্তির গবেষণার ক্ষেত্রে বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিনের এই চমকপ্রদ সাফল্যের পরে বৈজ্ঞানিক হিসেবে তার খ্যাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। তার গবেষণার ভিত্তিতে লেখা একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লন্ডনের বিশ্ব বিখ্যাত রয়েল সোসাইটিতে পাঠ করা হল। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এটা ছিল একটি অতি দুর্লভ সম্মান। অবস্থা এরকম দাঁড়াল যে আমেরিকার চেয়ে ইউরোপের মানুষ বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিনের বৈজ্ঞানিক প্রতিভার মূল্য অনেক বেশি উপলব্ধি করলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুইয়ের মনোযোগ ও আকর্ষণ করল। সেই সময় জার্মানির শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট জীবিত ছিলেন। কান্ট বেঞ্জামিনকে নতুন প্রমিথিউস বলে আখ্যা দিয়ে অভিনন্দন জানালেন। গ্রিক পুরাণের মতে প্রমিথিউস মানুষকে দেবার জন্য স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনেছিলেন। বেঞ্জমিনও মেঘ থেকে বিদ্যুৎ শক্তি আহরণ করে প্রায় একই কাজ করেছিলেন। সেই জন্যই দার্শনিক কান্টের চোখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক যুগের প্রমিথিউস।

  আজকের দিনে ‘বাইফোকাল চশমা’ খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু এই বায়ো ফোকাল চশমা যে বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন উদ্ভাবন করেছিলেন সে কথা খুব কম মানুষই জানে। মানুষের চোখে দূরের জিনিস দেখার এবং কাছের জিনিস দেখার ব্যবস্থা এক নয়। মানুষের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেলে বা অন্য কোনো প্রকারে তার বিকার ঘটলে মানুষ কখনও দূরের জিনিস ভালো করে দেখতে পারেনা এবং কখনও কাছের জিনিস ভালো করে দেখতে না পারার মতো অবস্থা হয়। কিন্তু কখনও দূরের এবং কাছের জিনিস ভালো করে দেখতে পারার ক্ষমতা একই সঙ্গে হ্রাস পেতে পারে।এরকম অবস্থায় মানুষকে দূরের জিনিস ভালো করে দেখার জন্য এক ধরনের চশমা এবং কাছের জিনিস ভালো করে দেখার জন্য অন্য এক ধরনের চশমা ব্যবহার করতে হয়। ফলে মানুষকে সব সময় দুই জোড়া চশমা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। মানুষের নানাবিধ ব্যবহারিক সমস্যার সমাধান করার জন্য নিজের মস্তিষ্ক খাটিয়ে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করাটা ছিল বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিনের বৈজ্ঞানিক চিন্তার একটি প্রধান লক্ষ্য।দুই জোড়া চশমা সবসময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর অসুবিধাটা লক্ষ্য করে সেই সমস্যার সমাধান করার জন্য বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন চেষ্টা করলেন। তার ফলস্বরূপ উদ্ভাবিত হল ‘বায়োফোকাল চশমা’। এটা হল এমন এক ধরনের চশমা– যার দ্বারা মানুষ একইসঙ্গে দূরের এবং কাছের জিনিস ভালো করে দেখতে পারে। চশমা উদ্ভাবন করেছিলেন এমন একটি সময়ে– যে সময়ে তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের কঠিন দায়িত্ব পালন করে সব সময় তাকে ব্যস্ত থাকতে হত।

  বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হয়ে ফ্রান্সে থাকার সময় ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট মানুষ প্রথমবারের জন্য আকাশে বেলুন পাঠায়। সেই দৃশ্য দেখার জন্য সেদিন অন্যান্য মানুষের মধ্যে বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিনও উপস্থিত ছিলেন। একজন প্রথম শ্রেণির বৈজ্ঞানিক হিসেবে ইতিমধ্যে ইউরোপে তিনি সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। সেই জন্য সমালোচকদের মধ্য থেকে একজন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলেন–’ মানুষ প্রথমবারের জন্য আকাশে বেলুন ওড়াচ্ছে; এর ফলে মানবজাতির কোনো উপকার হবে বলে আপনি মনে করেন কি?’ উত্তরে বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন বললেন–’ নতুন করে জন্ম হওয়া একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমরা যা ভাবি, ঠিক সেই একই কথা বলা যেতে পারে প্রথমবারের জন্য আজ আকাশে ওড়া এই বেলুনটির বিষয়ে।’ সমস্ত কথায় বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন এতটাই দূরদর্শী ছিলেন যে আকাশে উড়তে পারা বেলুনটি মানুষের ভবিষ্যতের উপরে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সেদিনই অনুমান করেছিলেন। উড়োজাহাজের আবিষ্কার হতে তখনও অনেক দেরি ছিল; কিন্তু যে বেঞ্জামিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার আগে সেই দেশকে প্রথম শ্রেণীর বিশ্বশক্তি রুপে কল্পনা করেছিলেন, সেই বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিন আকাশে বেলুন উড়তে দেখেই অনুমান করতে পেরেছিলেন যে এটা ভবিষ্যতে যুদ্ধবিগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে বদলে দেবে।

সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫

গোরখ পান্ডের হিন্দি কবিতা ।। অনুবাদ : নীলাঞ্জন কুমার, Gorakh Pandey

গোরখ পান্ডের হিন্দি কবিতা 

অনুবাদ : নীলাঞ্জন কুমার 





( ১৯৪৫ সালে গোরখ পান্ডের জন্ম উত্তর প্রদেশের দেবরিয়া গ্রামে । প্রথমে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ও পরে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে । পরবর্তীতে স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। অবশেষে ১৯৮৯ সালে আত্মঘাতী হন। হিন্দি ও ভোজপুরি ভাষায় কবিতা লিখেছেন। তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। )


আপনি কি নিরো


বাঁশি বাজান নিশ্চিন্তে

আনন্দে গান, জ্বলছে জ্বলুক শহর

আপনি কি নিরো নাকি জেগে

আসল মুখটা আপনি একটু দেখান। 


ভয় পায় 


ভয় পায় ওরা

কিন্তু কি জন্যে ওরা ভয় পায় 

সব কিছু অর্থাৎ 

গোলা বারুদ পুলিশ থাকা সত্ত্বেও?


ভয় পায় কারণ কি?

অস্ত্র হীন আর গরীব মানুষ গুলো 

একদিন ওদের ভয় পাওয়াই

চিরতরে বন্ধ করে দেবে।


সমকালীন 


এই মুহূর্তে কোথাও আর্তনাদ 

কোথাও শুরু হল নাচ

কোথাও শিশুর জন্ম হল

আবার কোথাও আরম্ভ হল সেনার চলাচল।

রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫

পিসি সরকার ও ম্যাজিক রেমেডিজ । সৌমিত্র রায় । কবিতা, poetry

পিসি সরকার ও ম্যাজিক রেমেডিজ

সৌমিত্র রায়





১) দুর্যোগ ও কার্নিভাল 


মরছে মানুষ বানে জলে

দিদি নাচছেন কার্নিভালে

দিদির নাইকো হুঁশ,

              ।

উদ্ধার আর ত্রাণের কাজে, 

কোথায় শাসক জনতা মাঝে?

দিদি আনন্দে বেহঁশ!


ঘাটাল ডুবলো ছ'বার বানে,

নাই সমাধান 'দেব' দর্শনে,

'মাস্টার প্ল্যান' আশা।

              ।

ভোট কিনবেন ছলে বলে,

দৃষ্টি ঘোরান কার্নিভালে

ঔষধ তাই খাসা!

অরহ্যান ভেলি কানিকের কবিতা ।। ভাবানুবাদ: নীলাঞ্জন কুমার , Niranjan Kumar

অরহ্যান ভেলি কানিকের কবিতা 

ভাবানুবাদ: নীলাঞ্জন কুমার 



(অরহ্যান ভেলি কানিক। জন্ম ( ১৯১৪ ) ও পড়াশোনা তুরস্কের ইস্তাম্বুল।  বাবা ছিলেন তুরস্কের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার প্রতিষ্ঠাতা। ভেলি,মিনিস্ট্রি অব এডুকেশনে বছর খানেক চাকরি করার পরে তা ছেড়ে দেন ও কবিতায়

নিজেকে নিয়োজিত করেন। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্যে মাত্র ৩৬ বৎসর বছরে ( ১৯৫০ ) তাঁর অকাল মৃত্যু হয়। তাঁর কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫১ ও ১৯৭৫ সালে। ) 


আহা, দিনগুলো 


আহা কি সব সুন্দর দিন আমায়

শেষ করে দিয়েছিল - 

এই রকম একটি দিনে আমি কাজ ছেড়েছিলাম 

তারপর পড়ে গেলাম মাদকের খপ্পরে 

আবার একদিন সে এলে তাকে নিয়ে 

প্রেমে ডুবলাম, আর

তারপর একদিন বাড়ির জন্য 

খাবার নিতে ভুলে গেলাম।

সত্যি বলতে এসব আহা আহা দিন 

বারবার আমার সঙ্গে খেলা করে 

আসলে কবিতা লেখার পাগলামি 

আর এইসব বেয়াক্কেলে দিনগুলো 

আমায় সত্যিকারের শেষ করে দিল।


স্যুইসাইড


কাউকে না জানিয়ে ঝুপ করে মরে গেলে

আর আমার মুখের কোণে রক্ত লেগে থাকলে 

যারা আমায় কোনদিনও দেখেনি বা জানেনা

তারা বলবে বেচারা নিশ্চয়ই কাউকে 

ভালোবেসে দাগা খেয়েছে ;

আর যারা চিনতো কিংবা জানতো তারা 

বলে উঠতো , লোকটা বেঁচে গেল কষ্ট থেকে।

অবশ্য কেবল আমিই জানতাম 

আসল কারণ এর কোনটাই নয়।

মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শক্ত পোক্ত ।। নীলাঞ্জন কুমার ।। কবিতা, Nilanjan Kumar

শক্ত পোক্ত 

নীলাঞ্জন কুমার 



টক শো তে হাজারো তরজা

ব্রেকিং নিউজের জোয়ার 

বুদ্ধিজীবীর চুলচেরা বিশ্লেষণ 

 সাংবাদিকের অবিরাম ছোটাছুটি 

কোন শক্তপোক্ত সুসময় এনে দিলো না।


 হাওয়া বাতাসের এখন মনখারাপ 

ঝরে পড়ছে কান্না হয়ে

লুম্পেনের বাজানো লারেলাপ্পা গানেও

 কোন জোশ আসছে না

মড়া পোড়া গন্ধতে গা গোলাচ্ছে

আর ছুঁয়ে থাকছে হিসেবী কুচক্রী।


এসব ঝেড়ে ফেলতে চাইলে

চাই শক্তপোক্ত জনস্রোত...

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

হে মহাজীবন ।। অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় ।। কবিতা, Arindam Chattopadhyay

হে মহাজীবন

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় 



হে মহাজীবন, তোমার ভেতর দেখি 

সমুদ্র জলের মতন ওঠা নামা-

নোনা হাওয়ায় ভেতর ঢেউয়ের গর্জন

চোখের ভেতর রূপোলী ফেনা 

অযাচিত ভাবে ছিটকে এসে লাগে

 অনুভূত হয় শীতল জলকণা

এভাবেই,

 যে বালির ওপর জমা হয় পায়ের ছাপ 

তা নতুন দূরন্ত ঢেউয়ের দাপটে

কেমন অদৃশ্য হয়ে যায়

এরকম ভাবেই

একটা জীবন যায়, অন্য জীবন আসে।


হে মহাজীবন, তোমার ভেতর ঘনায়

আঁধার ঘন রাত-

চারিদিকে নিস্তব্ধতার গল্প শুনি

দূরতম প্রান্ত থেকে আসে ঝিঁঝি পোকার ডাক

বাতাসে কেমন যেন  মাদকতা

তবুও আকাশ জুড়ে ছড়ানো নক্ষত্র আলো

যেন কোন মেহফিল

একটা চক্রকারের ভেতর পৃথিবী 

 পরক্ষণেই এসে দাঁড়ায় রৌদ্র আলো।


হে মহাজীবন, তোমার ভেতর দিয়েই

যুদ্ধক্ষেত্রে জেগে উঠি-

মাটির ধুলোর ভেতর বারুদ গন্ধ

কানে আসে মিছিল গর্জন

পায়ের কাছে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্ত চিৎকার 

ঘামে ভেজা শিক্ত শরীর 

পরাজয়কে দূরে সরিয়ে রেখে জয়ী হয়ে উঠি।


হে মহাজীবন, তোমার ভেতর জেগে ওঠে স্বপ্ন

হতাশার ধুলো সরিয়ে দিই

দূরে অরণ্য থেকে আসে অরণ্যশব্দ

আকশের ওপর দিয়ে রঙিন পাখির উড়ান

যেন শিশুর হাসির মতন

তুমি এভাবেই 

নিয়ে আসো একটা নতুন পৃথিবী

তার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠি।



১০ টি আটপৌরে কবিতা ।। এ কে সরকার শাওন ।। বাংলাদেশ, Atpoure

১০ টি আটপৌরে কবিতা

এ কে সরকার শাওন




১. বিকেল

চা, বৃষ্টি, বারান্দা

দু'জনে 

নরম আলোয় ছুঁয়েছে  মন।


২. জীবন

আয়েশি  ঘুম   ভাঙ্গা

এলার্ম

অন্তহীন  ছুটে চলে অবিরাম! 


৩. মা

ভাত, ডাল, ভাজি

ঘ্রাণ

স্মৃতি ফিরিয়ে আনে শৈশব। 


৪. একলা

চেয়ার, বই, বাতি

নিঃশব্দ

সময় ধীরে   হাঁটে চুপিচুপি।


৫. প্রেম

তীর্যক চোখ, হাসি, 

তাঁর 

অকথিত ভাষায় ভিজে মন।


৬. কাপুরষ 

ইচ্ছে  হবো হবো

দুঃসময়ে 

আজ হতে হলো কাপুরষ!


৭. দুপুর

ঘাম, ছায়া, জানালা

নীরবতা

শরীর নুইয়ে পড়ে অলসতায়।


৮. বৃষ্টি

ছাতা, জল, পথ

ভিজে

ফুটপাথে জমাট নোংরা জল।


৯. গ্রাম

ধান, গরু, গোপাট

সবুজবীথি 

কলকাকলীতে মম ছুঁয়ে যায়।


১০. বন্ধু

হাসি, গল্প, সন্ধ্যে

চিরকাল

ভাঙা বেঞ্চেও থাকে আনন্দ!

রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫

মায়ের স্কুলটা ।। প্রণয় ফুকন ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস , কবিতা, Pranay Phukan

মায়ের স্কুলটা

প্রণয় ফুকন 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস 



হঠাৎ জানি কী হল সেদিন!

প্রয়াত মা শিক্ষকতা করা 

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দেখতে ইচ্ছা হল। 

হয়তো মায়ের সুবাস পাব কোথাও!

স্কুলটি তালা বন্ধ।

মরচে ধরা গেটের ওপারে 

পরিত্যক্ত সীমানায় গাছ লতা জঞ্জালের স্তূপ।

জানালা দিয়ে দেখলাম, 

মেঝেতে ভাঙ্গা-চোরা  ডেক্স বেঞ্চ চেয়ার টেবিল গুলি 

মায়ের বসা চেয়ারটা চিনতে পারলাম না।


গ্রামের মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম, 

–কী হয়েছে?

–কয়েক বছর হল 

ছেলে মেয়ে নেই 

স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে। 

–গ্রামের ছেলে মেয়েরা কোথায় পড়ে? 

–শহরের ইংরেজি স্কুলে ।

–এত দূরে? 

–স্কুল ভ্যানে করে সকালে যায়, সন্ধ্যেবেলা ফিরে 

–মাঠে ফুটবল,নদীর তীরে দৌড়াদৌড়ি?

–সেই সব আজকাল আর নেই।


কোনোমতে চোখের জল সামলে

ফিরে আসতে লাগলাম। 

পেছন থেকে বিবর্ণ স্কুলটি বলতে লাগল,

‘দুঃখ করে লাভ নেই বাবা, কাঁদিস না।

তোরা নিজেরাই খুলে দিয়েছিস পশ্চিমের জানালা। 

বাতাসকে দোষ দিয়ে লাভ কি?’


থতমত খেয়ে গেলাম

এটাই তো সত্যি, আমরা একটি আত্মঘাতী জাতি। 

কোনো গ্লানি নেই, অনুতাপ নেই 

শিলাময় কঠিনতায়,

বিচ্ছিন্ন করেছি ভাষা, 

বিচ্ছিন্ন করেছি সংস্কৃতি। 


মনে পড়ল স্বর্গগামী মাকে।

আজীবন শিখিয়েছেন যিনি 

দুঃখিনী বর্ণমালা।

ক্ষমা কর মা,

আমরা তোমার ব্যর্থ অক্ষম সন্তান। 

আমরা হারিয়ে ফেলেছি আত্মসম্মান 

আমরা ক্ষমার অযোগ্য। 


আমাদের শক্তি দাও মা 

কোনো এক সর্বনাশ ঘটার আগেই 

আমরা ফিরিয়ে আনি আমাদের মর্যাদা 

আমাদের সন্তানের মুখে বন্দিত হোক 

তোমার মুখের ভাষা। 

আমাদের শক্তি দাও। 


(সত্য অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে)

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...