Sunday, August 9, 2020

ভালো আছো প্রিয় জল ? || জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

ভালো আছো প্রিয় জল ?   ||    জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়


লেলিহ শিখার মতো ঘিরেছে অন্ধকার
আত্মীয় হাত অচেনা দস্তানায় ঢাকা
কালো রক্তের বিষ মিশে যায় মাটির ভিতর
                       প্রতিরোধহীন
ভালো আছো প্রিয় জল?
এখনও দ্রাবকধর্ম অক্ষত তোমার?
এখনো কি ভোরের বাতাসে সুর খোঁজো!
হিমের গন্ধ মেখে কাকের মিটিঙে যাও
                                      তাপের প্রত্যাশায়......
ধুলো আর জঞ্জালে হাসিমুখ
                                   তোমার স্বচ্ছতার চাদর মুড়ে
যতকিছু বাতিলের বিষে আপনার চাতাল সাজাও
কালো রক্তে মাটির রূপান্তর ধুয়ে দেবে প্রিয় রসায়ন
যত রক্ত,ক্লেদ বা ক্লেশ তোমাকে ডাকে
তুমি কীভাবে বাঁচাবে নিজেকে
                 ইচ্ছাময় স্রোতে আর কি ভাসাবে
                            তেমন কাগজের নৌকো ?
                             হায় প্রিয় জল !

গোপেশ্বরপল্লি,বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া-৭২২১২২
কথা-৭০০১৪৫৬৭২১

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

১৪ ই আগস্টের পর লাহোরের ভোর এবং অন্যান্য । অচিন্ত্যকুমার সাঁতরা । এবং নৈকট্য । দুশো টাকা ।

যে সব গল্পকার অত্যন্ত কম লেখেন ও ভাবেন বেশি,  তাদের গদ্য পড়ে বোঝা যায় গভীরতার এক বিশেষ দিক । সে গভীরতা ছুঁয়ে যেতে কতখানি আনন্দ তা সচেতন পাঠক মাত্রই বোঝেন। বর্ষিয়াণ গদ্যকার অচিন্ত্যকুমার সাঁতরার সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থ ' ১৪ ই আগস্টের পর লাহোরের ভোর এবং অন্যান্য ' যদি সে রকম পাঠকের হাতে পড়ে তবে নিশ্চয়ই তারা সে আনন্দ অনুভব করবেন বলে বিশ্বাস । বইটির উৎসর্গ যা একাধারে উৎপল দত্ত, সনৎকুমার সাঁতরা,  দেশভাগ,  ১৯ শে মে ও বিদ্যাসাগরকে আলাদা আলাদা  ভাবে করা হয়েছে,  তাতে বোঝা যায় গ্রন্থের ভেতরে এক প্রতিবাদী অবস্থান লুকিয়ে আছে । গ্রন্থের পনেরটি গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য যন্ত্রণা, ক্রূরতা,  শ্লেষ ও তার থেকে বেরিয়ে আসার অদম্য ইচ্ছে। সেই  বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর আবেগ গ্রন্থটির বাস্তবতাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে গেছে, সে জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যয়ের দিকটি ধূসর মনে হয় । তিনি তাঁর গল্পে ব্যক্তি ভাবনাকে অতিরিক্ত টেনে আনার জন্য কিছু কিছু সময় খেই হারায় । অথচ তিনি যখন সংলাপের ভেতর দিয়ে  পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন,  তখন এক অসাধারণ অবস্থানে পোঁছে যায় । সে কারণে গল্পকারের সংলাপ  বহুল  বামফ্রন্ট সরকার আমলের নৃশংস সামাজিক অবস্থানের সামনে দাঁড়িয়ে ' রক্তরন্ধ্র ' কিংবা অর্থনৈতিক  অনুকূলতা মানুষকে সমস্ত 'ক্ষমতা'-র অধিকারী করার ব্যঙ্গাত্মক দিকটি  নিয়ে ' মুদ্রারাক্ষস ' জমে যায় । পাশাপাশি এক অভিনব চিন্তাধারার মধ্যে
দিয়ে লেখা  ' ঋষভ ' গল্প,  যেখানে বাবার চাকরি নিজে পাবার লোভে বাবাকে হত্যা করার চিন্তা করছে নায়ক, যা মূল্যবোধের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয় ।
             বইটির  আদ্যোপান্ত পড়ে অত্যন্ত সংক্ষেপে বলা   যায়  , যারা নতুন ধারার গল্প পড়তে চান তাদের বইটি পড়া প্রয়োজন । লেখককে অনুরোধ তিনি যেন 'অহর্নিশি' গল্পে দুপুরের খাবার 'লাঞ্চ  ' বসিয়ে দেন তিনটি ডিনার শব্দের বদলে ।

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ৯৭ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী

৯৭.
সুব্রত চেল ফোনে জানালো প্রলয় মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু-তারিখ।
০৮. ১০.২০০০ ।ওই দিনটা ছিল বিজয়াদশমী।
আজ বলব প্রদীপ হালদার - এর কথা। প্রথম কথাটি হল :  ' আমি বাঁকুড়ার লোক ' বলে যত্রতত্র  বুক বাজিয়ে থাকি। আজ নয় , স্কুলকাল থেকেই। বছরে দু-সপ্তাহ বাঁকুড়া-ভ্রমণ সঙ্গ করে পকেটে করে নিয়ে যেতাম কাচ-ফল। যা আমি বাঁকুড়ার তা প্রমাণ করার জন্য। কারণ আমি বাঁকুড়ার লোক হয়েও শুশুনিয়া দেখিনি। বিষ্ণুপুর দেখিনি। এমন দিনও ছিল আমার। ঠিক সেই সময়ে সুব্রত চেল-কে বললাম : আমাদের শুশুনিয়া নিয়ে চল। সেই দলে প্রদীপ হালদার ছিল।সেই ভ্রমণের আগে থেকেই প্রদীপের সঙ্গে ঘনিষ্টতা ছিল। এবং প্রদীপ হালদারের কবিতার সঙ্গেও পরিচিত ছিলাম। কেমন ছিল সে পরিচয় , সেটা জানানোটা আমার দায়িত্ব।
প্রদীপ হালদার ২৩.০৯.১৯৯৪ - এ লিখেছিল :
' স্বপ্নসন্ত্রাস কালীন রিপোর্ট ' কবিতাটি। যা ছাপা হয়েছিল কপা ৪৬ সংখ্যায়। প্রকাশকাল : ২৫ মার্চ ১৯৯৫ ।
প্রদীপ কীভাবে রিপোর্টটি লেখা শুরু করেছিল সেটা পড়া যাক :
' তারপর হিমশূন্যতায় টেনে হিঁচড়ে বের করা হল আমাকে। '
আর শেষ হয়েছিল :
' কার্নিসে তিনটি কাক গাইতে লাগল কোরাস , কেবলই তিনটি কাক ... '
কাকের সংখ্যা নিয়ে অধ্যাপকীয় সুলভ কোনো প্রশ্ন করার কোনো অধিকার আমার নেই। কারণ আমি অধ্যাপক নই।
প্রদীপের ' রাত্রিযাপন ' - এর তিন টুকরো থেকে তিনটি চিহ্ন :
১॥ আর , অদ্ভুত হালকা হয়ে আমি ভেসে বেড়াচ্ছি,
     রাত্রির প্যারালালে
২॥ চাকরি খুঁজতে খুঁজতে দিনগুলি ডিঙিয়ে যাই।
৩॥ ... কাল বাসস্টপে খুউব শান্ত দাঁড়াবো , ভাবি ,
    আজ উলটে দিই টাইমপিস।
প্রদীপ হালদারের বাসস্থান সম্পর্কে বাংলাকবিতার পাঠকের কোনো পরিচয় নেই। বেলেতোড়ের পাশে , হাঁটাপথে বনগাঁ । যেখানে গন্ধ বলতে ধানসেদ্ধ-র গন্ধ। আর শব্দ বলতে মুড়িভাজার শব্দ। সেখান থেকে প্রদীপ দেখাচ্ছে : রাত্রির প্যারালাল।
বলছে : দিনগুলি ডিঙিয়ে যাবার কথা। ভাবছে টাইমপিস উলটে দেবার কথা।
প্রদীপকে অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করব না। শেষ করব অভিবাদন জানিয়ে।
আনন্দ দাসের বাড়ি বনগাঁতে। অর্থাৎ প্রদীপ হালদারের প্রতিবেশি ।
এখন কবিতাপাক্ষিক -এর ১৪ সংখ্যায় আনন্দ- র কবিতা থেকে জানতে পারছি ওর বাসনার কথা :
' প্রতিদিন ভাবি মানুষের কাছে যাব
কিন্তু দৈনিক দুর্ঘটনা
আমার পালক খসিয়ে ফ্যালে ।'
আমি যতদূর চিনিজানি আনন্দকে , ও কিন্তু মানুষের সঙ্গেই থেকেছে।
আনন্দ দাস ' সুজাতা ' শিরোনামের কবিতাটিতে লিখেছিল :
' তেমন একটা বটের ছায়ায়
ঈশ্বরের জন্য চুপ করে বসা যেত।'
কিন্তু আজকের সুজাতা
' সারাদিন মাঠে মাঠে শাক তুলে
পায়েসের কথা গ্যাছে ভুলে ।'
অর্থাৎ আনন্দ-র অবস্থান মানুষের পাশেই।
ওই সময় আশিসকুমার রায়ও আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কপা ১৩ তে তার লেখাতে দেখতে পাচ্ছি আশিস লিখেছিল :
 ' চাপে ও তাপে / নদীরও গতি বদলায় ,'
এই দ্যাখার মধ্যে নিজস্বতা দেখতে পাচ্ছি।
আবার আশিসের ' খেলাঘর ' -এ দেখতে পেলাম
' চাঁদের আলো তোমার শরীর থেকে / মোম গলে যায়।আশিস একটা ছোটো পত্রিকা করত। যামিনী। আশিস তো শিল্পী যামিনী রায় -র প্রতিবেশি।
এই পর্বে একটা উল্লেখযোগ্য তথা ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করতে চাইছি।
আমাদের একটা ঘর হয়েছিল ।ঘরটির নাম দিয়েছিলাম মাদল । ২৪ জুলাই ২০০৪ - এ মোট ১৭ জন কবি সমবায়ী প্রথায় মোট ১০০ টি কবিতা লিখেছিলাম। বাংলাকবিতার ইতিহাসে এটি একটি  মনে রাখার মতো ঘটনা ।
এখন বলার কথা হল , এই ১৭ জন কবির মধ্যে একজন ছিল তিমিরকান্তি । এখানে উল্লেখ করার কারণ এখন তো বেলিয়াতোড় চ্যাপ্টার শেষ করতে চাইছি । আর তিমিরকান্তি তো এখনো আমার কাছে বেলেতোড়ের তিমিরকান্তি !

গ্রিসের নতুন কবিতা || রুদ্র কিংশুক || আঞ্জেলিকি সিগোরু-র কবিতা

গ্রিসের নতুন কবিতা 
রুদ্র কিংশুক 
আঞ্জেলিকি সিগোরু-র কবিতা


আঞ্জেলিকি সিগোরু (Angeliki Sigourou, 1973)-র  জন্ম আথেন্সে। তাঁর লেখাপড়ার বিষয় ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য। এছাড়া তিনি চর্চা করেছেন আধুনিক এবং ধ্রুপদী নৃত্য।  ফরাসি এবং অ্যারাবিক ভাষা থেকে তিনি গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেছেন বিপুল পরিমাণ সাহিত্য। মাহমুদ দারউইস এবং নাগিব মাহফুজের লেখা তাঁর লেখা তাঁর মাহফুজের লেখা তাঁর লেখা তাঁর অনুবাদে গ্রিক পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। বর্তমানে তিনি গ্রিক দ্বীপ সাইরসের বাসিন্দা।  তিনি আধুনিক নৃত্যের শিক্ষক হিসেবেও কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রতিষ্টিত নৃত্য সংগঠনের নাম আক্রপোদিতি।

১. রঙগুলি

এবং রঙগুলি এসেছিল। আগে তাদের অস্তিত্ব
 ছিল না। আর আমরা
তাদের বিশ্বাস করতাম
 তাদের চূড়ান্ততা  আর বৈপরীত্যে
সমস্ত রঙের সম্মিলনে এবং আলাদাভাবে প্রত্যেককেই
 আমরা বিশ্বাস করি

 রঙের মেঘ
সমুদ্র
গাছ
রক্ত
সূর্য
দিনের আকাশ
 রাতের আকাশ
কাঠ
জল
মাটি
আগুন

এজগতের সাফল্য
             তার পছন্দ করা গভীরের রঙ
 মহান গভীরের রঙ
     যদিও উপরে আকাশ নীল আর লাল
আর হয়তো এখানে সেখানে  সবজে সোনালী
 তাই গভীর পাপ নীরবে বাড়ে বাড়ে
 যাতে আমরা দেখতে পারি নতুন স্বর্গের স্বপ্ন
 জ্ঞানের
সংযমের
বিশুদ্ধ রঙের
 অপরাধ ছাড়া
আমার মিথ্যাগুলোকে যত্ন সহকারে নিও
আর গভীরে রঙ দিয়ে
 সত্যের উপরটা রাঙিয়ে দিও

                   স্বর্গের কোন রঙ নেই
                     সমুদ্রেরও
                     না এটা মিথ্যা

২. সিন্দুক

এই কারাগারের ভেতর থেকে আমি লিখি
আমি যে কখনো কারাবন্দি হইনি
আমার চারদিকে আমি এখন তাকাই এবং দেখি
 কারাগার ছাড়া কিছু না
এবং আমি তারপর আমার ভেতরে তাকাই
এবং কারাগার ছাড়া কিছু দেখিনা
 কারাগার যা তোমাকে শেখায় কীভাবে
লিখতে হবে
কীভাবে হতে হবে শব্দের প্রতি প্রতিরক্ষাসমর্থ
 কারাগার যা তোমাকে শেখায়
ভেতরে ঢোকা বাতাসের চেয়ে
 বাতাস যা বার হচ্ছে সর্বদায়
 বেশি
কারাগার -----সব কিছু যা আমি ভয় পেয়েছি
 হতে পারতো কারাগার
কুড়িটি আঙ্গুল যা যা দেখতে
লৌহদন্ডের মত
আমি ভাবতাম তাদের ক্ষমতা আমাকে
 বন্দী করার
আমি ভাবতাম তাদের অপারগতা
 আমাকে বন্দী করার

আটপৌরে কবিতা ৫৯১-৫৯৫ || নীলাঞ্জন কুমার || ধারাবাহিক বিভাগ

আটপৌরে কবিতা
নীলাঞ্জন কুমার



৫৯১

মনান্তর/ ঈর্ষা/ ক্রোধ
   ) বিবাদ (
চলচ্চিত্রের মতো ছুটে আসে ।

৫৯২

করমর্দন/  নমস্কার/ আলিঙ্গন 
   ) মিমাংসা  (
শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয় ।

৫৯৩

সসীম/ গন্ডি/  বন্দিত্ব
       ) সীমাবদ্ধ  (
ক'দিন বাদে অভ্যেসে পোঁছোয় ।

৫৯৪

ভক্ত/  পূজা/  নৈবেদ্য
      ) মন্দির  (
কেমন যেন পবিত্র লাগে ।

৫৯৫

বাউল/  গান/ মুক্তি
     ) আখড়া  (
দেহতত্ত্ব যেখানে অনন্ত স্বাদ  ।

নস্টালজিয়া ১০ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১০ 
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


স্মৃতির ঝাঁপি খুললেই দিনগুলো টুপটাপ বেরিয়ে আসে। সেগুলো সবই যে রঙিন ছিল তা নয়, তবু তখন কী যেন ছিল যা আজও মনে পড়লেই ভালো লাগে।আজ মেঘলা দিনে আমার ছোট্ট ব্যালকনি থেকে আকাশ দেখতে দেখতে ফেলে আসা বাদলঘন শ্যামল মোহ ঘেরা শৈশব আর কৈশোর ভিড় করে অজান্তেই। আগে বরাবর সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল আমার।  ঘুমাতে যে  ভালোবাসতাম না এমনটা নয়,আসলে মা বেশি  বেলা পর্যন্ত ঘুমান মোটেই পছন্দ করত না। তখন আমাদের সকাল সন্ধ্যা নিয়মিত পড়তে বসতে হত। টেলিভিশন ছিল না, তাই সময় অপচয়ের সুযোগ ছিল না।  কিন্তু মেঘলা দিনে আমার পড়তে মোটেই ভাল লাগত না।কিছুতেই মন বসতো না পড়াশোনায়। আমার বোন আর আমি সেদিন খুলে বসতাম 'সঞ্চয়িতা'। খুব ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের 'শিশু' র কবিতা আবৃত্তি করতাম। একটু বড় হলে আমার ছোটমামা উপহার দিয়েছিল 'সঞ্চয়িতা' আর 'সঞ্চিতা'। সে যে কী অমূল্য উপহার ছিল আজও তা অনুভব করি। মেঘলা দিনে আকাশের  খুব নিচ দিয়ে ভেসে যেত বাদল মেঘ। আমরা চলে যেতাম ছাদে  সঙ্গে 'সঞ্চয়িতা'। দুই বোনে অনন্ত আকাশের নিচে বসে মনপ্রাণ খুলে আবৃত্তি করে  পড়তাম  "হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে..." ,"গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা, কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা..."। একটার পর একটা বর্ষার কবিতা পড়তাম। যা পড়তাম তার অর্থ তখন বুঝতে পারতাম না, কিন্তু ধ্বনি মাধুর্য, ছন্দের দোলায় মন ভরে যেত ; কবিতা পাঠ করতে  করতে অদ্ভুত এক ঘোর লাগত মনে। বড় হয়ে যখন জীবনদেবতা তত্ত্ব পড়লাম তখন নতুন করে আবিষ্কার করলাম কবিকে আর এইসব কবিতাকে। আমার মা রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান শুনতে খুব ভালো বাসত। এই বাদল দিনে মা তার কাজের মাঝে আমাদের কবিতা পাঠ বেশ উপভোগ করত।দেখতে দেখতে  হয়তো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত,আমরা বইপত্র গুটিয়ে দুদ্দাড় নেমে আসতাম ছাদ থেকে।

Saturday, August 8, 2020

আজকের সূচি~

আজকের সূচি~

সবাই মিলে , সিনেমা হলে ~৮ || কান্তিরঞ্জন দে || পাড়ায় পাড়ায় পথসিনেমা ।।

সবাই মিলে , সিনেমা হলে ~৮
কান্তিরঞ্জন দে
           

 পাড়ায় পাড়ায় পথসিনেমা ।।

    অন্যপ্রসঙ্গে যাবার আগে সিনেমা দেখানো নিয়ে অত্যন্ত জরুরী আরও দু-চারকথা বলে নিই ।
      বর্তমানে সিনেমা দেখা ও দেখানোর ব্যবস্থা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে বলে , মাধ্যম হিসেবে সিনেমার শক্তি কিন্তু বিন্দুমাত্র কমে নি । উল্টে বেড়েছে ‌। এ যেন , "পঞ্চশরে  দগ্ধ করে , করেছ এ কি সন্ন্যাসী ? / বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে ।" ব্যাপারটা খুলে বলি -----
       সিনেমা তৈরির উপকরণ কিন্তু এখন আক্ষরিক অর্থে আমাদের হাতের মুঠোয় । ক্যামেরা আমাদের হাতের মুঠোয় । সিনেমা সম্পাদনা-র সফ্টওয়্যার এখন ঘরে ঘরে টেবিলে টেবিলে , ডেস্কটপ অথবা ল্যাপটপ কম্পিউটারে । নতুন প্রজন্মের সিনেমা তৈরি করিয়ে ছেলেমেয়েরা কিন্তু এর সুযোগ নিতে পারেন । ছোট ছোট ছবি করছেনও অনেকেই । লিটিল ম্যাগাজিন বার করা , কিংবা গানের দল ( ব্যাণ্ড ) খুলে ফেলার মতো , সিনেমা তৈরির দলগত কিংবা একক সুযোগ এখন অত্যন্ত সুলভ ।

       কিন্তু সেগুলো পরিবেশন করবেন কোথায় ? দেখাবেন কিভাবে ? সবাইকে কি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের পেছনে দৌড়বেন ? সে দৌড়ন । কিন্তু তার পাশাপাশি আরও একটি চমৎকার  উপায়  আছে।

     চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত থিয়েটার ছিল উত্তর কলকাতার স্টার , বিশ্বরূপা ( শ্রীরঙ্গম ) , কিংবা মিনার্ভা সহ অন্যান্য বাণিজ্যিক মঞ্চের হাতে বন্দি । গণনাট্য প্রযোজিত " নবান্ন " এসে থিয়েটারকে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছিল । কলকাতা মঞ্চের পাশাপাশি নবান্ন গ্রামে গঞ্জে মাঠে ঘাটে প্রচুর অভিনীত হয়েছিল ।
       প্রথমে গণনাট্য এবং পরে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের হাত ধরে নাটক ব্যাপারটা ক্রমশ জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে , পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে । বাণিজ্যিক মঞ্চে কম সে কম তিন-চার ঘন্টাব্যাপী নাটক সংক্ষিপ্ত হতে হতে একদিন মন্মথ রায়-এর হাত ধ‍রে একাঙ্ক নাটকে রূপান্তরিত হয় । দুই বাংলাতেই একাঙ্ক নাটক বিষয়ে ও উপস্থাপনায় বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।
     তারই হাত ধরে আসে , পথনাটিকা বা স্ট্রিট থিয়েটার । উৎপল দত্তের মতো জনপ্রিয় নাট্যকার-পরিচালক- অভিনেতা পর্যন্ত অসংখ্য মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি প্রায় পঞ্চাশটি পথনাটিকা লেখেন এবং পাড়ায় অভিনয় করে বেড়ান ।
    সত্তর দশকের গোড়ায় বাদল সরকার তো পথনাটিকাকে একটি আন্দোলনেরই চেহারায় পৌঁছে দেন। তাঁর দলের নাম ছিল --- শতাব্দী । আর , আন্দোলনটির নাম ছিল --- থার্ড থিয়েটার মুভমেন্ট ।
     বাদলবাবু তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে  কলকাতার বিভিন্ন পার্কে , বিভিন্ন কলেজের উঠোনে , মহাবোধি  সোসাইটি-র দোতলার হলঘরে  কিংবা স্রেফ বিভিন্ন  গ্রামে গঞ্জে শহরের পাড়ায় পাড়ায়, পথের মোড়ে তাঁর পথনাটিকা গুলোর অভিনয় করে বেড়াতেন । অভিনয় শেষে দর্শকদের সামনে গামছা অথবা চাদর মেলে ধরতেন।
      দর্শনী যা সংগ্রহ হতো , তাই দিয়ে সেদিনের প্রদর্শনীর খরচ উঠে যেত।
অথচ, বাদল সরকার পেশায় ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন টাউন প্ল্যানার- ইঞ্জিনিয়ার । তাঁর লেখা নাটক   শম্ভু মিত্রের ' বহুরূপী 'নাট্যদল ছাড়াও , পশ্চিমবাংলা , সারা ভারত এবং বাংলাদেশের অস‌ংখ্য নাট্যদল দীর্ঘকাল মঞ্চস্থ করেছে ।
     বাদল সরকার প্রবর্তিত পথনাটিকা বা স্ট্রিট থিয়েটার আজও জোরদার প্রতিবাদী আন্দোলনের একটি পথ ।

        সময় সমাজ  এখন অনেক বদলে গেছে । কিন্তু , মনের কথা , সমাজের কথা বলবার প্রয়োজন তো ফুরোয় নি । কোনওদিন কি ফুরোয় ?

      তাই ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সহজলভ্য সিনেমা তৈরি এবং প্রদর্শনের এই সুযোগে নতুন যুগের ছেলেমেয়েদের নেওয়া উচিত । গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক - রাজনৈতিক বিষয়ে ছোট ছোট গল্প তৈরি করে কাহিনীচিত্র এবং নানা বিষয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করবার সম্ভাবনা এখন বিপুল ।
     জেলায় জেলায় , পাড়ায় পাড়ায় এ রকম গ্রুপও অনেক তৈরি হয়েছে/ হচ্ছে বলে , খবর পাই । যেমন ----- কলকাতার পিপলস্ ফিল্ম কালেক্টিভ কিংবা হিন্দমোটর- উত্তরপাড়ার ' জীবনস্মৃতি ' সংগঠন ।

      পথ সিনেমা বানাবার নতুন পথ খুলে গেছে । নতুন  প্রজন্ম কি তার সুযোগ নেবেন ?

কিছু বই কিছু কথা || নীলাঞ্জন কুমার || এখন যা কিছু শর্ত

কিছু বই কিছু কথা । নীলাঞ্জন কুমার

এখন যা কিছু শর্ত । অসীমকুমার বসু । দি সী বুক এজেন্সি । একশো টাকা ।

দীর্ঘদিনের কবিতাচর্চী অসীমকুমার বসুর বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ পড়া থাকার জন্য তাঁকে নিয়ে একটা ধারণা ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় । বর্তমান কাব্যগ্রন্থ ' এখন যা কিছু শর্ত ' সেই ধারনা পোক্ত করে যে তিনি সব সময়ের জন্য একজন ভালো কবিতাকার । কারণ সেখানে পাওয়া যায়  : ' আমি একে একে খুলে রাখছি যাবতীয় অহঙ্কার/  নির্জন উপত্যকায়এই রাত্রে / মধুর বেদনায় ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ নেমে আসে । ( ' নির্জন উপত্যকায় রাত্রি)  -র মতো অসাধারণ  পংক্তি । তাঁর  কবিতা পড়ার জন্য যে মুহূর্তগুলো খরচা হয়ে যাচ্ছে , সেগুলো যে ভালো মুহূর্ত তা বুঝতে পারি কবির কবিতার প্রকরণ,  বিষয়ের প্রতি অসাধারণ মনোযোগ,  শব্দচয়নের আকর্ষণী ক্ষমতার জন্য । সে স্বাদ পাওয়া যায়:  ' এত ভুল প্রতিশ্রুতি এত বিভক্ত বাতাস/  তবু বারবার এই ছলনাময়ী ঝরোকার নীচে এসে দাঁড়াই। ' ( ঝরোকা ' ) পংক্তির সামনে দাঁড়ালে ।
         কবির ভেতরের সুচারু কবিতাযাপনের প্রশংসনীয় দিক  ' দশজন অনিমেষ ' কবিতার  এই সুন্দর পংক্তির ভেতর দিয়ে ছুটে আসে  : ' আমার চেনা অনিমেষের সঙ্গে/  কিন্তু ততক্ষণে সেই অনিমেষ/  মিলিয়ে গেছে ভীড়ের মধ্যে । /  সুতরাং আবার অপেক্ষা/  কবে আবার দেখা হয়ে যাবে/  চেনা অনিমেষের সঙ্গে ' তে।
          কবিকে যতই পড়ি তত ছুটে আসে ভেতরের গভীর দিক । ছুঁয়ে থাকে আলগোছে চেতনায়,  যার স্পর্শ ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না ।

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ৯৬ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য
প্রভাত চৌধুরী


৯৬.
' এমন অনেককে আমি জানি , যারা তাদের স্বপ্নগুলোকে থাকে থাকে সাজিয়ে রাখতে ভালোবাসে ।ঠিক যেমন বই-এর থাকে বই , কাপড়ের থাকে কাপড়।তাদের এই সাজিয়ে রাখার একটা রিদম্ আছে '।
কবিতাটি প্রলয় মুখোপাধ্যায় -এর। বেলিয়াতোড় চ্যাপ্টারের কবি। নয়ের দশকের কবি। বাংলাভাষার কবি।
কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাপাক্ষিক ৪৮ -এ।প্রকাশ তারিখ : ২২ এপ্রিল , ১৯৯৫ ।
আজ ০৭ অগাস্ট ,২০২০ ।
মধ্যবর্তী ব্যাবধান ২৫ বছরের অধিক। 
মান্যবর পাঠক , ২৫ বছর পর্যন্ত একটি কবিতা যেভাবে বেঁচে থাকে , তা দ্যাখার জন্য যেকোনো চশমা ব্যবহার করা যেতে পারে। চশমার কাচের রঙের ওপর নির্ভরশীল নয় কোনো প্রকৃত কবিতা। আমি কি কবিতার সঙ্গে প্রকৃত-কবিতার কোনো বিভাজন ঘটাতে চাইছি।  না , তা চাইছি না। তবে একটা বিভাজন তো চাইছি। রক্ষণশীল কবিতা থেকে আপডেটেড কবিতাকে আলাদা করতে চাইছি।
আমি আরো কয়েক পা এগিয়ে যেতে চাইছি।গিয়ে যে কবিতার মুক্তাঞ্চলের দ্যাখা পাবো , সেখানে প্রলয় মুখোপাধ্যায় -এর লিখে যাওয়া কবিতার রত্নাবলির যে সন্ধান পাবো , তার গুটিকয় চিহ্ন উপস্থাপিত করছি আপনাদের জন্য। আপনারাই বিচার করে দেখুন রত্নগুলি ঝুটা না আসল !
১॥ আমাদের চোখময় আরশোলামূলক বাদামি
    আভা আর নিশানা বৃষ্টিভেজা অল্পবয়সী
     বটগাছ।
২॥ আমার প্রত্যেকটি দাঁত নিলাম হয়ে যায়
৩॥  একটি কাপুরুষ হাসপাতালের
      নিষ্প্রাণ বিছানায় শুয়ে বেঁচে থাকার
       স্বপ্ন দেখছে একুশটি সদ্যজাত শিশু
এত দূর থেকে প্রলয় কি দেখতে পেয়েছিল মৃত্যুকে। আমি জানি না।
আমিও এত দূর থেকে সবটা দেখতে পাচ্ছি না। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই সুব্রত চেল-কে ফোন করতে হচ্ছে।
[07/08, 11:38 am] Kobi Prabhat Chowdhury: ৯৬॥ শেষাংশ

কবিতাপাক্ষিক ৮৯ - এ প্রকাশিত হয়েছিল পরম শ্রদ্ধেয় কবি অরুণ মিত্র - ' ওড়াউড়িতে নয় ' কবিতাটি।আর ওই সংখ্যাতেই ছিল প্রলয়-এর ' অসুস্থ আত্মকথন ' তিন পর্বের নাতিদীর্ঘ কবিতাটি।
অসুস্থ আত্মকথন -কে কীভাবে বিভাজন করবো।
১॥ যে আত্মকথনটি অসুস্থ
নাকি
২॥ অসুস্থজনের আত্মকথন
যেভাবে ব্যাসবাক্য নির্ণয় করি না কেন , তা করার জন্য কবিতাটির কাছে যেতেই হবে। কবিতা কোন দিকে নির্দেশ দিচ্ছে তা দ্যাখা যাক :
১॥ চুরি করে রাখা কিছুটা সকালের
      রোদ উপচে পরতেই
       কারা যেন ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে
       পড়ল তোমার চারপাশে।
২॥ আসলে জলরঙের একটা দিন ছিল আমার
     চুরি গেছে আর তার ওপরে লেখা ছিল
     আমার প্রথম প্রেমিকার সমস্ত
     কথোপকথনের কোরিওগ্রাফ।
৩॥ খুব সঙ্গত কারণেই আমাদের একদিন
      ফিরে আসতে হয় ব্যক্তিগত আবেশের
       তৈরি সূচিছিদ্র সুড়ঙ্গে
এই তিনটি উদ্ধৃতি থেকে কি জানতে পারলাম
আত্মকথনটি অসুস্থ না এটি অসুস্থজনের আত্মকথন।
জানাটা কি সত্যসত্যই একটি সিলেবাসের সঙ্গে যুক্ত !
সবকিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। পেতেই হবে এমন নির্দেশনামাও কোথাও ছাপা নেই।
,কপা ১১২ -তে ছিল  ' এই প্রজন্মের কবিতা ' , যার কথা গতকালের লেখাতে ছিল।ওই সংখ্যায় প্রলয়- এর ' হরিণডাঙা ' শিরোনামে ১১ পর্বের একটি দীর্ঘ কবিতা স্থান পেয়েছিল। এথেকে বলা যায় কবিতাপাক্ষিক প্রলয় মুখোপাধ্যায়-কে নতুন প্রজন্মের কবি হিসেবে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেছিল।
এখন ' হরিণডাঙা 'য় কী আছে তা অনুসন্ধান করে দ্যাখা যাক।
১॥ মাটি জানে তার অলসতার আড়াইশো কিমি
২॥ পাপের কথা আজ থেকে যাক
     রাশিফল থেকে সরেপড়ার প্রাকমুহূর্তে
৩॥  অনেক দূরে ট্রেনবাড়িটির শব্দে
৪॥ পৃথিবী মানেই হরিণডাঙা
৫॥ ওপারে যে নদী এপারে তার ভাসাবারান্দা
৬॥ আমার নদী আজ থেকে পৃথিবীর সবার হল
     তোমাদের সব আকাশ আজ থেকে আমি একা নিলাম / আজ থেকে শুধু হরিণডাঙাকে পিছিয়ে ফেলা
প্রলয় মুখোপাধ্যায় হরিণডাঙাকে পিছনে ফেলে কোথায় যে চলে গেল , জানি না। জানি যেখানে গেছে সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো ফেরিসার্ভিস
নেই।

ভালো আছো প্রিয় জল ? || জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

ভালো আছো প্রিয় জল ?   ||    জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় লেলিহ শিখার মতো ঘিরেছে অন্ধকার আত্মীয় হাত অচেনা দস্তানায় ঢাকা কালো রক্তের বিষ মিশে যা...