চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২২

শব্দব্রাউজ ৬৭২।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-672, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৭২।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-672, Nilanjan Kumar



শব্দব্রাউজ- ৬৭২ । নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ৪।১১। ২২। সকাল সাতটা পন্ঞ্চাশ মিনিট ।


শব্দসূত্র: শুধুই স্বপ্ন আঁকি



শুধুই জীবন জুড়ে

স্বপ্নময় অধ্যায় ।



স্বপ্নকে ভালোবাসি বলে

তাকে ছুঁয়ে

মৌসুমী মন ভরাই ।



আঁকি আনন্দে

প্রতিদিনের দেখা স্বপ্ন

শব্দে শব্দে ....

আটপৌরে ৪১৭|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 417, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১৭|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 417, by Sudip Biswas





৪১৭.

তুঙ্গভদ্রা  


স্বনামধন্য। পাললিক। পর্বতশ্রেণী।


আবহমান 


জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্যে আমরা নদীমাতৃক

আটপৌরে- ৩৩|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 33, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ৩৩|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 33, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা- ৩৩


জ্ঞান


স্মৃতিশক্তি। দুর্বল। একই।

ভালো

জিনিস নতুন মনে হয়।


বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ২৭ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, He Amar Swadesh

হে আমার স্বদেশ- ২৭

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(২৭)

বি ব্রাদার্স কোম্পানির বিএন আর লাইনে শাল কাঠের ব্যবসায়িক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেল। কম দিনের মধ্যে এতই বৃদ্ধি পেল যে তার সাত দিনের খরচ যোগানোর জন্য লক্ষ্মীনাথ দশ পনেরো হাজার থেকে পঁচিশ ত্রিশ হাজার করে টাকা কলকাতা থেকে ঝাড়চোগড়াতে পাঠাতে লাগল। সাধারণত সেই টাকা অফিসের বিশ্বাসী কেরানি অথবা চাপরাশির মাধ্যমে পাঠানো হয়। পরিমান বেশি হলে লক্ষ্মীনাথ নিজেই সেই টাকা নিয়ে যায় এদিকে জঙ্গলের কাজ সরকারি কারেন্সি নোটে চলে না। নোট ভাঙ্গিয়ে টাকা,আধলি,সিকি এবং পয়সা করে না পাঠালে হয় না। কারণ অশিক্ষিত করতীয়া ,গাড়োয়ান, এবং কুলিরা নোটের মূল্য বুঝে না।

তাই প্রত্যেক সপ্তাহে হাজার হাজার টাকা ভাঙ্গিয়ে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের অস্থায়ী অফিসে বসে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়াটা একটি কষ্টদায়ক কাজ। তাছাড়া কলকাতা থেকে যেতে হয় রেলে। রেলে চোর ডাকাতের উপদ্রব থাকেই। তবে উপায় নেই। সময় মতো মজুরি না দিলে শ্রমিকরা কাজ করবে না। তারমধ‍্যে আবার এইসব কাজ বেশি হয়েছে। বেশি করে টাকা নিয়ে যেতে হবে। একটা লোহার বাক্সে কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ একা বেরোলো। এত টাকা পয়সা নিয়ে রাতের রেলে যেতে চলেছে ।প্রজ্ঞা একজন সঙ্গী নিয়ে যেতে বলল। কিন্তু ব্যয় সংকোচ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ সাহায্যকারী হিসেবে কাউকে নিল না। কেবল সেটাই নয় রেল কোম্পানিকে ফাঁকি দেবার জন্য লক্ষ্মীনাথ টাকা, আধুলি, সিকি ইত্যাদি মুদ্রার লোহার ভারী বাক্সটা বুক পর্যন্ত করল না। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ (১৯০২ সন) গত সপ্তাহ থেকে কাজের ভীষণ চাপ।অ'. এন্ড আরের কিটিং সাহেবের সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মীনাথ তাকে সেগুন কাঠের নমুনা দেখানোর জন্য শিবপুর টিম্বার ওয়ার্ডে গেল। জার্ডিন কোম্পানি এবং কালীকৃষ্ণ প্রামাণিকের কাছ থেকে পাওয়া চেকগুলি বেঙ্গল ব্যাংকে জমা দিল। শিবপুর লাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত কাঠ গুলি নীলামে বিক্রি করল। তাছাড়া চৌহদের ভেতরে নতুন ঘর একটা তৈরি করার জন্য দুজন পাকা মিস্ত্ৰি লাগাল। তাই সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত ব্যস্ত, যথেষ্ট পরিশ্রম হল। এদিকে গরমও পড়েছে । তারপরে ঝাড়-চোগড়াতে যাবার জন্য রেল ভ্রমণ। বসে বসে লক্ষ্মীনাথ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে গভীর ঘুমে নিদ্রামগ্ন। রাত একটার সময় রেলগাড়ি ঝাড়চোগড়া এসে পৌঁছাল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ জেগে উঠল না। স্টেশন ছেড়ে গাড়ির ইঞ্জিন হুইসেল দেওয়ার পরেই তার ঘুম ভাঙল, ধড়মড় করে উঠে বুঝতে পারল সর্বনাশ হয়ে গেছে। টাকার বাক্সটা যথাস্থানে আছে যদিও সেটাই যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলছে– 'বন্ধু আজ ফাঁদে পড়লে । বেঞ্চের উপরে চিত হয়ে পড়ে নাক ডাকতে থাক।গাড়ি ঝাড় চোগড়া পার হয়ে গেছে। লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়ল । অনিশ্চয়তা আর ভয়ে অন্তরটা শুকিয়ে গেল। এদিকে রেলগাড়ি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে। কী করবে। দু'ঘণ্টা পরে রেলগাড়ি রায়গড় পৌঁছালো ,একটা স্টেশনে ট্রেন বেশিক্ষণ থামেনা। এদিকে রাত তিনটা বেজেছে। নির্জন নিস্তব্ধ স্টেশন ।একটাও কুলি নেই। তবু মরণবাচন পণ করে প্রাণপণে টাকার ভারী বাক্সটা নিজেই টেনে হেঁচড়ে নিয়ে কোনোমতে প্লেটফর্মে ফেলে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল ।ইতিমধ্যে দুই মিনিট পার হয়ে গেছে। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে রেলগাড়ি স্টেশন পার হয়ে রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হারিয়ে গেল । জন প্রাণীহীন রায়গড় স্টেশনে ধনের বাক্সটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই আলো হাতে নিয়ে দেবদূতের মতো এগিয়ে এল স্টেশন মাস্টার। কণ্ঠস্বর শুনে তিনি বাঙালি বলে বুঝতে পেরে লক্ষ্মীনাথ ও অকূলে কুল পেল । নিজের অঘটনটার কথা দুঃখের সঙ্গে ব্যক্ত করে লক্ষ্মীনাথ স্টেশন মাস্টারের শরণাপন্ন হল । কথাবার্তা শুনে স্টেশন মাস্টার লক্ষ্মীনাথকে বাঙালি বলে ভাবলেন আর বিদেশে বাঙালি বাঙালির জন্য সবসময়ই সজ্জন। লক্ষ্মীনাথের প্রতি ও তার দয়া জন্মাল। সেটা লক্ষ্য করে লক্ষ্মীনাথ যেন তেন প্রকারেন ঝাড়চোগড়াতে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য স্টেশন মাস্টারকে অনুরোধ করল। এক ঘন্টা পরে একটা মাল গাড়ি এল। স্টেশন মাস্টার মালগাড়ির ফিরিঙ্গি গার্ডকে বলে স্টেশনে শুয়ে থাকা একজন কুলিকে ডাকল। তারপর কুলিটা ভারী বাক্সটা মালগাড়ির গার্ডের ডাবায় তুলে দিল।

অনিশ্চয়তার সঙ্গে পরিশ্রম, সময়ে খাওয়া-দাওয়া না হওয়া, বিশ্রাম নেই, ঘুম নেই ,বিগ ব্রাদার্স কোম্পানির উন্নতির জন্য লক্ষ্মীনাথ সমস্ত কিছু সহ্য করেছে। সেদিন চন্দ্রকুমার সতর্ক করে দেওয়ার জন্য মনে সংশয় সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল যদিও লক্ষ্মীনাথ এখন ও নিজেকে ভোলানাথের চেয়ে আলাদা মনে করে না। তার মনোভাবটা এরকম যে এত কষ্ট পরিশ্রম করা মানেই ভোলানাথের উন্নতি এবং ভোলানাথের উন্নতি মানে তার উন্নতি। কিন্তু আত্মভোলা লক্ষ্মীনাথ যেভাবে ভাবে সংসারের সবাই সেভাবে ভাবেনা।

অসম থেকে আগত ভোলানাথের আত্মীয়-স্বজনদের ভেতরে ভবানীচন্দ্র বরদলৈ, ভোলানাথের ভাগ্নে ভুবনচন্দ্র এবং মহীনারায়ণকে কোম্পানির বিভিন্ন কাজে লাগানো হল। কাঠের ব্যবসায়ের কাজে এরা অভিজ্ঞ নয়। দায়িত্ব পালনে এতটা আন্তরিক নয়। শৈশব থেকে অসমে থাকা, লেখাপড়ায় এত অগ্রণী নয় বলে লক্ষ্মীনাথের মতো তাদের কেউ গতিশীল মনের নয়। তার জন্যই ব্যবসায়ের দায়িত্বপূর্ণ বিশেষ করে টাকা-পয়সার লেনদেন এবং হিসাবপত্র রাখার কাজগুলি তাদের দেওয়া হল না। আগের মতো সেই সমস্ত কিছুর দায়িত্ব লক্ষ্মীনাথের কাছে রইল এটা ভোলানাথের আত্মীয় স্বজনদের পছন্দ হল না।। ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথকে বেশি গুরুত্ব দেয় সেটাও আত্মীয়দের কাছে লক্ষ্মীনাথ ঈর্ষার কারণ হয়ে পড়ল। অপদার্থরা নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারেনা যদিও অন্যে উপার্জন করা অর্থের প্রতি লোভ করে। তাদের আত্মীয় অকৃতদার ভোলানাথ বরুয়ায় নিজের ঘর সংসার নেই। কলকাতায় কাঠের ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী। ভোলানাথ বি ব্রাদারস কোম্পানির মালিক। স্বাভাবিক ভাবেই আত্মীয়রা উত্তরাধিকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগল। তাদের এই অভিলাস আকাঙ্ক্ষার কথা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রকাশ পেল এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যে জোর জল্পনা চলছে এই বিষয়ে প্রজ্ঞাও জানতে পারল। এই বিষয়ে লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে কথা বলল। লক্ষীনাথ প্রজ্ঞাকে এই বলে আশ্বস্ত করল যে দাদা হয়ে ভোলানাথ কখনও প্রাপ্য অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করবেনা। কিন্তু প্রজ্ঞার মনের আশঙ্কা দূর হল না। সে জোড়াসাঁকো গিয়ে এই বিষয়ে মা নিপময়ী দেবীর সঙ্গে কথা বলল। মেয়ে জামাইয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিপাময়ী দেবী অস্থির হয়ে পড়লেন। নিপময়ী দেবীও ভাবেন ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের দাদার মতো। তার জন্যই প্রতিবছর তিনি ভোলানাথকে জোড়াসাঁকোতে আমন্ত্রণ জানান এবং আদর অভ্যর্থনা করে খাইয়ে কিছু না কিছু একটা উপহার দেন। এবারও দুপুরবেলা খাবার জন্য ভোলানাথকে নিমন্ত্রণ করলেন। ভোজনের পরে ভোলানাথকে একটা মূল্যবান অভারকোট উপহার দিয়ে নিপময়ী দেবী বি বরুয়া কোম্পানির সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টা উত্থাপন করলেন। বি বরুয়া কোম্পানির উত্থানের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি অনুরোধ করলেন যে বিষয় সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ার ক্ষেত্রে ভোলানাথ যেন লক্ষ্মীনাথের প্রতি সুবিচার করেন। উপহার হাতে নিয়ে ভোলানাথ শান্ত হয়ে বসে রইল। নিপাময়ী দেবী পুনরায় অনুরোধ করার পরে ভোলানাথ গম্ভীর সুরে বললেন-‘ আচ্ছা দেখি এ ব্যাপারে আমি কী করতে পারি’ বলে বিদায় নিয়ে চলে এল। লক্ষ্মীনাথের শাশুড়ি মা সক্রিয় হয়ে উঠায় ভোলানাথের ভাগ্নে ভবানী আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সেদিনই আসাম থেকে তাদের আর ও একজন আত্মীয় এল। তার নাম গোলক। এইসব শুনে তিনি বাকিদের সঙ্গে সকাল থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত আলোচনা করলেন। তারা এটাও ভাবলেন যে প্রতিপত্তিশালী ঠাকুরবাড়ির মানুষ যখন উঠে পড়ে লেগেছে ভোলানাথের সম্পত্তির সিংহভাগ লক্ষ্মীনাথই পাবে, রক্তের সম্পর্ক থাকা আত্মীয়দের পাওয়ার আশা ক্ষীণ আর পেলেও কণা মাত্র পাবে।

এইসব নিয়ে আরও কথা বাড়ল। কথাগুলি জানতে পেরে একদিন ডবসন রোডের বাড়িতে বসে ভবানীকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে ভোলানাথ বলল,' দেখ ভবানী কেনার দিন থেকে পরিবারদের সঙ্গে বসবাস করছে যখন ডবসন রোডের এই বাড়িটা লক্ষ্মীনাথই পাবে, বিলাসপুরের বাড়িটা মহীকে দেওয়া হবে আর আসানসোলের বাড়িটা তোমাকে দেব।'

তখনই একদিন চন্দ্রের কাছ থেকে ভবানী শুনল যে ভোলানাথ আসানসোলের বাড়িটা চন্দ্রকে দেবে। হতাশ ভবানী অন্ধকার দেখল । এদিকে ভবানী বুঝতে পারল যে ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথকে ভালোবাসে এবং তার প্রতি ভোলানাথ খুবই সদয়। ভবানী লক্ষ্মীনাথের শরণাপন্ন হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ ভুবনের জন্য ভোলানাথের সম্পত্তির ভাগ দেবার কথা বলতে পারবে না বলে জানাল। তারপরেও অনুরোধ করায় লক্ষ্মীনাথ ভবানীকে নিজে বলার জন্য পরামর্শ দিল।

এতদিন পর্যন্ত ভোলানাথের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অনভিপ্রেত ঝগড়াটা মান সম্মান রক্ষা করে চলে আসছিল। তারপরের ঘটনাগুলি অত্যন্ত নিম্ন রুচির, অতিশয় গ্লানিদায়ক। চাহিদা মতো সাহায্য না পেয়ে ভবানী লক্ষ্মীনাথের বিরোধী হয়ে পড়ল। সে ভোলানাথের কাছে লক্ষ্মীনাথের বদনাম, গোলোককে ভোলানাথের একমাত্র উত্তরাধিকারী বলে প্রচার, বারবার অনুরোধ করার পরও লক্ষ্মীনাথ মহীর মেয়েটিকে ডবসন রোডের বাড়িতে থাকতে না দেওয়ার জন্য মহী 'আমি লক্ষ্মীনাথকে শিক্ষা দেব' বলে ধমক দেওয়া, ভুবন এবং ভুবনের ভাইকে ডবসন রোডের বাড়ির উপরের তলায় থাকতে দিতে হবে বলে কথাটায় লক্ষ্মীনাথ তীব্রভাবে বিরোধিতা করা ইত্যাদি ঘটনাক্রমের পরে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের সম্পর্কটা তিক্ত হয়ে পড়ল।

তারপরে ১৯০৪ সনের ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখ ক্লাইভ রোডের অফিসে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের একটা চিঠি পেল। চিঠিটা পড়ে তার মাথার উপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের সততার উপরে প্রশ্ন তুলেছে। তাছাড়া ব্যবসা পরিচালনায় তার দক্ষতার অভাব বলে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। তাই লক্ষ্মীনাথ ভবিষ্যতে বেঙ্গল ব্যাংক এবং হংকং ব্যাংকে লেনদেন করতে পারবে না বলে ভোলানাথ নির্দেশ দিয়েছে। তার মানে সে আর ভোলানাথের বিশ্বাসের পাত্র নয়। এটা অপমান ।সাংঘাতিক অপমান। লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হল যেন ভোলানাথ অন্যায় ভাবে প্রচন্ড শক্তিতে তার মাথায় আঘাত করেছে । তার মাথা ঘুরতে লাগল। মুহূর্তের জন্য ও থাকতে না পেরে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।

লক্ষ্মীনাথকে চিঠি দিয়ে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে উক্ত ব্যাংক দুটিকেও লক্ষ্মীনাথ সই করা চেকে টাকা দিতে নিষেধ করলেন। তার জন্যই পরদিন লক্ষ্মীনাথ সই করা চেকগুলি বেঙ্গল এবং হংকং ব্যাংক ফেরত পাঠাল। এটাও অপমান। এই অপমান সহ্য করতে না করতেই লক্ষ্মীনাথ আরও একটি চিঠি পেল। এই চিঠির ভাষা ও মারাত্মক। চিঠির মাধ্যমে ভোলানাথ নির্মমভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে তার ভাগ্নে এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রান্নাঘর, ডবসন রোডের নিচের মহলটা তখনই খালি করে দিয়ে পরিবার নিয়ে লক্ষ্মীনাথকে উপরতলায় উঠে যেতে হবে।

লক্ষ্মীনাথ দিশাহারা হয়ে পড়ল। কী করবে কী না করবে ভাবতে ভাবতেই পরের দিন অফিসের কর্মচারী গোপী আরও একটি চিঠি নিয়ে এল। এটিও ভোলানাথের চিঠি। পুনরায় সেই একই নির্দেশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রান্না ঘরসহ নিচের মহল খালি করে দিতে হবে। এইবার লক্ষ্মীনাথ অনুভব করল সত্যিই তার সর্বনাশ হল। তার চিৎকার করে করে বলতে ইচ্ছা হল অবশেষে রক্ষকই ভক্ষক হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ নিজেকে সামলে নিল। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল তার পক্ষে ডবসন রোডের নিচের মহল খালি করে দেওয়াটা সম্ভব নয়।

পরেরদিন ভাই ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে ভুবন ডবসন রোডের নিচের মহল দখল করতে এল। খালি করে দেব না বলে লক্ষ্মীনাথ নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল। কথাটা জানতে পেরে ভোলানাথ সম্বলপুর থেকে টেলিগ্রাম পাঠাল, বেজ. যত দ্রুত সম্ভব আমার নির্দেশ পালন কর। ভোলানাথ এতটাই উত্তেজিত, এতই ক্ৰোধিত হল যে পৃথক একটি টেলিগ্রাম করে অতুলকৃষ্ণ ঘোষকে নির্দেশ দিল লক্ষ্মীনাথ যাতে এখনই নিচের মহল ছেড়ে দেয় তার জন্য আপনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। অতুল কৃষ্ণ ঘোষ আত্মসম্মান থাকা ব্যক্তি।বি বরুয়া কোম্পানির কর্মচারী হয়ে তিনি কেন এই পারিবারিক মামলায় নিজেকে জড়িত করবেন? তিনি সঙ্গে সঙ্গে টেলিগ্রাম করে ভোলানাথকে জানিয়ে দিলেন আপনি নিজে এসে লক্ষ্মীনাথের ঘর ছেড়ে দেওয়ার কথাটা নিষ্পত্তি করুন। ভোলানাথ নিজে না এসে পরের দিন পুনরায় টেলিগ্রাম করে লক্ষ্মীনাথকে ধমক দিলেন এক্ষুনি নিচের মহল খালি করে না দিলে কথা খারাপ হবে।'

কিন্তু ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের মুখোমুখি হল না। কলকাতার বাইরে অথবা কলকাতার অজানা কোনো জায়গায় অবস্থান করে চিঠি লিখে অথবা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে এবং নিজের ভাগ্নেদের দ্বারা লক্ষ্মীনাথের উপরে চাপ প্রয়োগ করতে লাগল। লক্ষ্মীনাথ অফিসে যায় তবে ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজকর্ম করে না। অতুল কৃষ্ণ বাবু লক্ষ্মীনাথের আপনজন। তিনি সমস্ত কিছু জানেন। তিনি প্রকৃতই লক্ষ্মীনাথের শুভাৰ্থী। তার সঙ্গে কথাবার্তা হলে দুঃখ যন্ত্রণা কমবে কিন্তু তার সঙ্গে এইসব নিয়ে কথা বলতে খারাপ লাগে। কথা বলার কথা ভাবলেই মনে কী রকম একটা গ্লানির সৃষ্টি হয়। ঠেলা ধাক্কা দিয়ে দিনটা কোনোভাবে অতিক্রম করে ইন্ডিয়া ক্লাবে যায়। বিলিয়ার্ডস খেলা শুরু করে। আগের মতো খেলায় মনোসংযোগ করতে পারেনা। প্রতিটি গেমে হেরে ম্লান মুখে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়িতে প্রজ্ঞা এবং সাড়ে তিন বছরের শিশু কন্যা অরুণা। সংবেদনশীল প্রজ্ঞাৰ ভালোবাসা, প্রতিমুহূর্তের সেবা যত্ন তার কাছে বেঁচে থাকার শক্তি। প্রজ্ঞা ঘটে থাকা ঘটনাগুলি দেখছে ।লক্ষ্মীনাথের মনে ঘটনাগুলির প্রতিক্রিয়া জেনে সে বুঝতে পারে। নিজে কিছু বলে না। সেইসব নিয়ে কথা বললে লক্ষ্মীনাথের অন্তরে জ্বলতে থাকা ক্ষোভ- যন্ত্রণার আগুন আরও বাড়বে বলেই সে কিছু বলে না। সকাতরে ভালোবাসার দৃষ্টিতে লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সুদর্শন লক্ষ্মীনাথ সব সময় প্রফুল্ল থাকে, তাঁর কথায় কথায় কত রস, এখনও সতেরো আঠারো বছরের তরুণের মতো এটা ওটা কথা বলে তাকে হাসিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণবন্ত করে তোলে। সেই মানুষটা একেবারে নীরব- নিথর হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রজ্ঞার চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে।

এগারো দিনের মাথায় ভুবনকে সঙ্গে নিয়ে ঝাড়চোগড়া থেকে ভোলানাথ ডবসন রোডের বাড়িতে এল। কিন্তু এক কাপ চা ছাড়া সকালের জলখাবারের কিছুই খেল না ।লক্ষ্মীনাথকে দেখল যদিও কথা বলল না। প্রজ্ঞা মানসিকভাবে সাহসী মহিলা। সে ভোলানাথের মুখোমুখি হল। শান্ত কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে প্রজ্ঞা বলল,' বাইরে থেকে চিঠি আর টেলিগ্রামের মাধ্যমে আপনাদের যোগাযোগ হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে এটা কি চলছে বলুনতো ?দুই ভাই এক সঙ্গে বসে সমস্যা গুলি আলোচনা করে মিটিয়ে নিলে ভালো হত না কি? প্রজ্ঞা এভাবে বলার পরেও ভোলানাথের রাগ কমল না। বরং প্রজ্ঞার সঙ্গে তিনি কটু ব্যবহার করলেন। পরের দিন লক্ষ্মীনাথ অফিসে গেল না । মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। ইন্ডিয়া ক্লাবে গেল যদিও বিলিয়ার্ড না খেলে নিজের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবল। এবার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারল ,না, এভাবে চলতে পারে না। পুনরায় একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেবার সময় উপস্থিত হয়েছে। সেদিনই রাতে ভোলানাথ বাড়িতে এল। রাতের আহার খাবার সময় হল। টেবিলে সমস্ত কিছু তৈরি করে প্রজ্ঞা নিজেই ভোলানাথকে খাবার জন্য ডাকল। কিন্তু ভোলানাথ খাবার টেবিলে এল না। দেখে লক্ষ্মীনাথের আর সহ্য হল না। দীর্ঘ পদক্ষেপে ভোলানাথের রুমে প্রবেশ করে রোষতপ্ত কন্ঠে বলল –'দাদা এখন ডিনারের সময়। সবকিছু রেডি করে পরি আপনাকে ডেকেছে । আপনি ডিনারে আসেননি কেন?

ভোলানাথ বিছানায় আধা শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উঠল। স্থির দৃষ্টিতে লক্ষীনাথের দিকে তাকাল। তারপরে অবদমিত ক্রোধের সঙ্গে বলল যাকে আমি নিজের ভাই বলে ভেবেছিলাম সে যদি আমার আদেশ নির্দেশ না মানে তাহলে তার ওয়াইফ রান্না করে দেওয়া খাবার কীভাবে খাই ?

ভাই ,আপনি আমাকে আপনার ভাই বলে ভাবেন? ভাই বলে ভাবলে আপনি আমাকে চিঠির পরে চিঠি লিখে পাঠিয়ে বাড়ি ছাড়ার জন্য আদেশ দিতে পারতেন? টেলিগ্রাম করে এভাবে আমাকে ধমক দিতে পারতেন?

‘বেজ, তুমি উত্তেজিত হয়েছ? তোমার কণ্ঠস্বর তীব্র হয়ে উঠছে ।তুমি কি বলতে চাইছ?’

 ‘আমি বলতে চাইছি যে আসলে আপনি আমাকে নিজের ভাই বলে ভাবেন না। আমি আপনার ভাই বলে অন্যের সামনে পরিচয় দিয়ে আপনি আমাকে ইউটিলাইজ করেন। এত বছর আমাকে ইউটিলাইজ করে বি ব্রাদার্স কোম্পানি যখন কলকাতা তথা সমগ্র ইস্টার্ন ইন্ডিয়ায় এক নম্বর উড মার্চেন্টের ফার্ম রূপে প্রতিষ্ঠিত হল তখন আপনি আপনার ভাগ্নেদের উস্কানিতে আমাকে অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিতে চলেছেন । আপনি আমাকে শেষ করে দিয়েছেন ,আই হ্যাভ বিন রুইনড বাই ইউ।’

লক্ষ্মীনাথের উত্তেজনা বাড়ছে দেখে ভোলানাথ নিজের ক্রোধ উত্তেজনা সংযত করল। এমনিতেও সে বুদ্ধিমান। অনেক ধরনের বিপরীত পরিস্থিতি বেশ কৌশলের সঙ্গে নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে পারে । তার জন্যই সে কিছু সময় নিল। বিছানা থেকে নেমে বেশ বড়ো ঘরের মেঝেতে গম্ভীর ভাবে পায়চারি করে আগের চেয়ে কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলল,' ইউ হ্যাভ বিন রুইনড বাই মি'। আমার চরম শত্রু ও তোমার এই কথা বিশ্বাস করে না । তবে আমি তোমাকে রুইন করতে পারি। কিন্তু করব না। তোমাকে খারাপ পেয়েছি যদিও আমি তোমার সর্বনাশ চাই না ।’

‘আপনি আমাকে খারাপ পেয়েছেন? কেন?আমি কী অন্যায় করেছি?’

‘ সেই সব অনেক কথা।‌‌‌ সেই সব বলে তোমার সঙ্গে ঝগড়া বাড়াতে আমি চাইনা।’ ‘কিন্তু আপনাকে সেসব বলতেই হবে। কেন আপনি আমার বেঙ্গল এবং হংকঙ ব্যাংক থেকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি উঠিয়ে নিলেন? আমি কোথায় কী অবিশ্বাসের কাজ করেছি? আমাকে সমস্ত কিছু জানাতে হবে।’

‘ সেইসব বলার আগে তুমি আমাকে বলতো আমার এই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হওয়ার কথা নিয়ে আমাদের মধ্যে যখন কথাবার্তা চলছে তখন তোমার হয়ে তোমার শাশুড়ি মা আমাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ডেকে নিয়ে তোমার হয়ে কেন তিনি ওকালতি করতে গেলেন?'

‘তিনি আমার অভিভাবক । তাছাড়া আপনি আমাকে সহোদর ভাই বলে ভাবেন যখন তিনি আপনার আত্মীয় হিসেবে আপনাকে এই কথাটা বলতেই পারেন।’

‘ তথাপি বিজনেসের কথায় শ্বশুরবাড়ির মানুষকে জড়িত করাটা…’

‘ অথচ বিজনেসের শুরুতে আপনি ঠাকুরবাড়ির জামাই লক্ষ্মীনাথ আমার আদরের ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে কলকাতার অভিজাত মহলে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য যত্নশীল ছিলেন এবং সেটাকে বিজনেসের একটা ক্যাপিটাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ভোলানাথ দেখল লক্ষ্মীনাথ আগের মতো তাকে ভয় করছে না, সমীহ করছে না। তার জন্য কী বলবে ভেবে পেল না।

‘ দাদা? আমি যখন কলেজ স্ট্রিটের মেসে থাকতাম তখন থেকে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়। পরিচয় মানে ,আপনি নিজেই আমার মেসে এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। খোশ গল্প ,রঙ্গিন কথাবার্তা এভাবে বলতেন যে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। দিনের পর দিন আপনি আমার মন জয় করে নিয়েছিলেন। আমার হয়ে যাওয়া বিয়ের বিষয়ে উদার মন্তব্য দিয়ে আপনি আমার মন জয় করেছিলেন। কণ্ঠস্বরটা নামিয়ে লক্ষ্মীনাথ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল তারপর থেকে আপনার সঙ্গে আমার রিলেশন। আপনি যখন অসুস্থ হয়ে শয্যাগত হলেন তখন আমি এম এ এবং তার একমাস পরে বিএল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। পরীক্ষার পড়াশোনা একপাশে সরিয়ে রেখে এবং প্রজ্ঞাকে জোড়াসাঁকোতে রেখে দিনের পর দিন আপনার সঙ্গে থেকে আপনার অসুস্থ অবস্থায় আপনাকে সেবা শুশ্রূষা করেছিলাম। আর আপনার সেরকম অবস্থায় সেটাই কর্তব্য বলে আমার বিশ্বাস হয়েছিল। তার জন্য আমি পড়াশোনা করতে পারলাম না। আমার পরীক্ষা ভালো হল না। দুটো পরীক্ষাতেই ফেল করলাম।’

ভোলানাথ চুপ করে কথাগুলি শুনছে যদিও লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকাচ্ছে না।

‘একটা নিঃশ্বাস ফেলে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তারপরেও আমি আপনার সঙ্গ ছাড়িনি। আর সঙ্গ ছাড়িনি বলেই স্বাধীনভাবে কিছু একটা করার মানসে আপনার সঙ্গে ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলাম। আমি স্বীকার করছি, বেজবরুয়া বংশের সন্তান হওয়ার জন্য আমি ব্যবসার কিছুই জানতাম না। আজ ব্যবসার যা শিখেছি সেটা আপনার কাছ থেকেই শিখেছি। কিন্তু তার জন্য আপনি আমাকে যেভাবে যা করতে বলেছেন সেইসব করতে দ্বিধা করিনি ।কম বেশি হলেও আমার তরফ থেকে নিশ্চয় আন্তরিকতা নিষ্ঠার অভাব ছিল না। আপনি শুনেছেন গত বছর যে লোহার বড়ো বাক্সে টাকা-পয়সা নিয়ে একা রাতে ঝাড়চোগড়ায় যাবার সময় কী রকম বিপদে পড়েছিলাম– লাইফ রিক্স নিয়ে সেই বিপদ থেকে কোনো মতে রক্ষা পেয়েছিলাম। আপনার নির্দেশ অনুসারেই আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কালী কৃষ্ণ প্রামানিকের ফার্ম থেকে অতুল বাবুকে আনিয়েছি আর আপনি এটাও জানেন যে অতুলবাবু কেবল আমার জন্যই বি বরুয়া কোম্পানিতে যোগদান করেছেন। তারপরে –।'

পুনরায় লক্ষ্মীনাথ থামল। সহজাত রুচিবোধ তাকে এসব বলতে বাধা দিচ্ছিল। কিন্তু তার অন্তরে অপরিসীম যন্ত্রণা ।না বললে শান্তি পাবে না ।

'আপনাকে দাদার মতো সম্মান করি বলেই ডবসন রোডের এই বাড়ি কেনার সময় উকিলকে বলে আপনার নামে রেজিস্ট্রি করিয়েছিলাম। আপনি আমাকে আপন বলে ভাবতেন বলেই এই বাড়িটা মেরামতি করে নতুন করে কয়েকটি প্রয়োজনীয় রুম তৈরি করে লন টেনিসের গ্রাউন্ড নির্মাণ করেছি। সেসব করতে গিয়ে দিনে রাতে মিস্ত্রি এবং লেবারদের সঙ্গে লেগে দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনে আনার সময় আমার কতটা পরিশ্রম হয়েছে সেসব আপনি দেখেছেন ।এটা আমাদের দুজনের বাড়ি বলেই আমি এভাবে পরিশ্রম করেছিলাম। আর আমরা দুজনে সুখে আনন্দে থাকব বলেই করেছিলাম। অথচ বি ব্রাদার্স কোম্পানির উন্নতি, লক্ষ লক্ষ টাকার কারবার এবং কয়েক জায়গায় সম্পত্তি দেখে এই সেদিন অসাম থেকে আপনার আত্মীয়রা এসে প্রত্যেকেই সম্পত্তির ন্যায্য উত্তরাধিকারী বলে প্রতিপন্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এত অভিজ্ঞ এত বুদ্ধিমান হয়েও আপনি তাদের কথায় আমার পছন্দের নিচের মহলটা ছেড়ে দিতে বললেন। দাদা, এই বাড়ির প্রতিটি ঘরের প্রতিটি ইটে আমার হাতের স্পর্শ রয়েছে। এই বাড়ির এত সুন্দর কালারিং, পেছনে চাকরদের ঘর, ঘোড়ার আস্তাবল, সামনের বাগান, লন টেনিসের কোর্ট, সুরভির জন্য নির্মাণ করা স্মৃতি ঘর, এই সবকিছুই আমার প্লেনিং। আমি আপনাকে আর প্রজ্ঞাকে নিয়ে এই বাড়িতে থাকব বলেই এত যত্নের সঙ্গে এসব করেছি। অথচ এখন এই বাড়িতে আমি আমার পছন্দ অনুসারে থাকতে পারব না । শেষের দিকে লক্ষ্মীনাথের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল। অপরিসীম হতাশা এবং চূড়ান্ত বিরক্তিতে সে ভোলানাথের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল ।

লক্ষ্মীনাথের আবেগিক অবস্থাটার দিকে তাকিয়ে ভোলানাথের রাগ কমে এল। চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কোমল কন্ঠে বলল' ভাত বেড়ে বৌমা অপেক্ষা করে রয়েছে। চল, খেতে চল।’

সতেরো দিন পরে ভোলানাথ এবং লক্ষ্মীনাথ পুনরায় এক সঙ্গে রাতের আহার খেতে শুরু করল। প্রজ্ঞা পরিবেশন করল। প্রজ্ঞার রান্না করা তরকারি দিয়ে ভোলানাথ বেশ তৃপ্তি সহকারে খেল।

কিন্তু লক্ষ্মীনাথ খেতে পারল না। এখনও তার ক্রোধ কমেনি । তার আরও কিছু কথা বলার আছে ।বিশেষ করে নিজে না এসে ভোলানাথ বাইরে থেকে যে চিঠি এবং টেলিগ্রামে একটার পর একটা নির্দেশ পাঠিয়েছিল এবং তার এই ঝগড়াই যে অতুল কৃষ্ণ বাবুর মতো একজন ভদ্রলোককে জড়িত করে কাপুরুষের কাজ করেছিল এইসব লক্ষ্মীনাথের বলতে ইচ্ছা করল। কিন্তু কিছু ভোলানাথকে অনুতপ্ত দেখে লক্ষ্মীনাথের এসব কথা বলতে খারাপ লাগল।

খেয়ে উঠে ভোলানাথ আশ্বাস দেবার সুরে বলল,' বেজ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি ,কিছুদিনের মধ্যে সমস্ত নিষ্পত্তি করব। তোমার প্রতি যাতে কোনো অবিচার না হয় সেটাও দেখব ।’

লক্ষ্মীনাথ আশ্বস্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু এভাবে বলে ভোলানাথ তাকে অনুগ্রহ করতে দেখে তার মাথায় আগুন জলে উঠল।

' শুনুন দাদা, এই কয়েকদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।' লক্ষ্মীনাথের মুখ কঠিন। চোখ দুটি জ্বলছে,' আপনি বি ব্রাদার্স কোম্পানিতে আমার কী অবদান সেই বিষয়ে যা বিচার করার করবেন । কিন্তু আমার প্রতি আপনার মনে অবিশ্বাস জন্মেছে যখন আমি আর বি ব্রাদার্স কোম্পানিতে আপনার পার্টনার হয়ে থাকব না। দ্বিতীয়ত, ৩৮ নম্বর ডবসন রোডের এই বাড়িটা যেহেতু আপনার নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে, নীতিগতভাবে আমার আর এই বাড়িতে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমরা এই বাড়িটা ছেড়ে দেব। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেব। কিন্তু আলাদা একটি বাড়ি খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের এই নিচের মহলে থাকতে দিন।'



শব্দব্রাউজ ৬৭১।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-671, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৭১।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-671, Nilanjan Kumar



শব্দব্রাউজ- ৬৭১ । নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৯। ১০। ২০২২। সময় সকাল সাতটা পনেরো মিনিট ।



শব্দসূত্র: ঘরে ঘরে সুখ



ঘরে ঘরে হাজার সুখ

উঠে আসে

উজ্জ্বল রোদের সঙ্গে ।



ঘরে ঘরে হাজার উচ্ছ্বাস

উঠে আসে

একে অপরে মাখামাখি হলে ।



ঘরে ঘরে সুখ আমাকে

উজ্জীবিত করে,

ভরে উঠি । জ্বলে উঠি ।


আটপৌরে ৪১৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 416, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 416, by Sudip Biswas






৪১৬


বেলাইন


অসহায়। রেলপথ। ডিজিটাল। 


নিরাপত্তা 


কাগুজে আলাপের মতোই আগল।

আটপৌরে- ৩২|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 32, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ৩২|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 32, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা- ৩২


দ্বিবিধ


ঈশ্বরের। ভুলে। মানুষ।

না

কি মানুষের ভুলে ঈশ্বর?

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২

শব্দব্রাউজ ৬৭০।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-670, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৭০।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-670, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৬৭০। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৮। ১১ । ২২। সকাল সাতটা পঁয়ত্রিশ ।



শব্দসূত্র: গা গুলোনো বাস্তব



১।


গা গুলিয়ে যাওয়া

বাস্তবে

স্বপ্নের দাম নেই ।

ছুট্ ছুট্ ছুট্ দিনে

রুটি রুজির জীবন

জ্বালায় ।

এভাবে হত্যা হয় মুহূর্ত ....



২।


বাস্তব মনোমত হলে

কল্পনা জড়ায় ।


হাত ভরতি সুখ তখন স্পষ্ট ।

আটপৌরে- ৩১|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 31, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ৩১|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 31, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা- ৩১


উন্মোচন


খোলস। ছাড়লেই। সাপ।

বাঁচে

পুরনো ধারণায় মন মৃত।

আটপৌরে ৪১৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 415, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 415, by Sudip Biswas






৪১৫


নিকেশ 


ক্ষমতার। বাইরে। চলে।


পালাবদল 


আনন্দজলের ধেয়ানে বিভোর মুজরাই।

সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২২

শব্দব্রাউজ ৬৬৯।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-669, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৬৯।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-669, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৬৬৯। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৭। ১১।২২। সকাল সাড়ে দশটা ।



শব্দসূত্র: ইঙ্গিতে বুঝে নাও



বিক্রেতার বউনি

ইঙ্গিতে বোঝায়

শুভলাভ ,

ধৈর্য নামের বিষয়

সে শেখায়

নিভৃতে ।



স্বপ্ন বড় হলে

আসে জটিলতা,

আসে সমাধান

নিপুণ চিন্তায় ।



নাও ইঙ্গিত

নাও স্বপ্ন

নাও জটাজাল

নাও সমাধান

নিজের করে ।


আটপৌরে- ৩০|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 30, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ৩০|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 30, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা- ৩০


কেন?


ঈশ্বর। পূজা। চায়।

তাকে

আমি বিশ্বাস করি না।

আটপৌরে ৪১৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 414, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 414, by Sudip Biswas






৪১৪

ঊর্মীছন্দ


মিলনায়তনে। আমাদের। দেখা।


মোহনাস্থিত 


গল্পটা আসলে পৃথিবীর প্রলাপ।

রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২২

পাখিদের পাড়া পড়শী-৮ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী-৮

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  


Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi



দ্বিতীয় অধ্যায়, 

(আট)

উদরশঙ্কর কাকাবাবুর বাড়িতে কথা প্রসঙ্গে অরণ্যের নির্জনে শিয়াল ছাগলী ভক্ষণ করার কথা উল্লেখ করেছে মাত্র, কাকাবাবুর সঙ্গে কথা বলতে থাকা একজন আধবয়সী মহিলা হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল।

–ও আমার কাজলী, ও আমার অঞ্জলি, তোর কপালে এই দশা ছিল। কানা বিধাতা তোর এই অবস্থা করল। এত খুঁজলাম তোকে পেলাম না তো পেলামই না। কোথায় পাব?

উদয়শঙ্কর বুঝতে পারল যে সে না জায়গায় না বলা কথাটা বলে ফেলেছে। আধ বয়সী মহিলাকে কাঁদতে দেখে তার মনে দুঃখ হল। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কী করবে ভেবে না পেয়ে একবার সে সুনন্দের দিকে, আরেকবার কাকাবাবুর বাড়িতে আসা বৌমার কাকাবাবুর দিকে তাকাল। বৌমার কাকাবাবু আশ্চর্য ধরনে মৌন হয়ে রয়েছেন।

–তোমার এত আদরের ছাগলী কোথায় থাকে কী করে তুমি কিছুই জান না। এখন কাঁদলে তোমার ছাগলী ফিরে আসবে না। একটু মানুষের মতো ব্যবহার কর ।

না, মহিলার কান্না থামবে থামছে না তো থামছেই না ।মহিলাটির কান্নার প্রকোপ দেখে কাকাবাবু পুনরায় মুখ ভেঙচে বলে উঠলেন– এই বন্ধ কর তোমার এই সব। আজ তিনদিন পরে তোমার এত শোক উথলে উঠা ঠিক নয়।

  কাকিমা মহিলাটিকে ভেতরে ডেকে নিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হল। কিছুক্ষণ পরে মহিলাটি ভেতর থেকে এসে পুনরায় তারা বসে থাকা ঘরে ফিরে এল। এবার তাকে কিছুটা শান্ত বলে মনে হল।

– তুমি দেখা ছাগলীটা কাজলী রঙের কি?

মহিলাটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় উদয়শঙ্করকে জিজ্ঞেস করলেন।

  হ্যাঁ, একই কথা কেন বারবার জিজ্ঞেস করছ। কাকাবাবু মহিলাটিকে তিরস্কার করলেন।

– তুমি কী বুঝবে। ওটা ছাগলী ছিল না। আমাদের পরিবারের একজন ছিল। গরু ছাগলকে লালন পালন করলে বুঝবে ওরা মানুষকে কতটা ভালোবাসা দিতে পারে।

– হ্যাঁ বুঝতে পারছি ।তুমিই কেবল গরু ছাগল লালন-পালন করেছ।

 কাকাবাবু মহিলাটিকে উপহাস করে বলায় মহিলাটি কাকাবাবুর দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকাল।

উদয়শঙ্কর মহিলাটিকে সান্ত্বনা দেবার উদ্দেশ্যে বলল– এখন তো আর উপায় নেই ।গেল বলেই ধরে নিন।সুনন্দ তাদের কথাবার্তা মনে মন দিয়ে শুনতে থাকার সময় তার মোবাইলটা বেজে উঠল।

– হ্যালো। কীচক বল।

– আমি এবং নবদা তোমার বাড়িতে। তুমি কোথায় আছ?

  আমি কাকাবাবুর বাড়িতে। দুই মিনিট বসো। যাচ্ছি। নবদাকে বল বসতে ।

সুনন্দ ফোনটা অফ করে পকেটে ভরিয়ে নিল। –আমি একটু আসছি। কীচক এবং নবদা এসে আমার ঘরে বসে আছে। কাকাবাবুর দিকে তাকিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সুনন্দ বলল।

–এখনই চলে যাবে। এইমাত্র তো এলে। তোমার সঙ্গে কথাই বলা হল না। বৌমার কাকাবাবু বললেন।

 না কাকাবাবু। দুজন বন্ধু এসেছে। বাড়িতে অপেক্ষা করছে। তারা খারাপ পাবে ।সুনন্দের সঙ্গে উদয়শঙ্করও উঠল।

–ওদের দুজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি পথ চেয়েছিলাম। আজ যখন সুবিধা পেয়েছি ভালোই হল। চল আমিও যাব।

দুই কাকাবাবু কিছু বলার আগে সুনন্দা এবং উদয় শঙ্কর বেরিয়ে বারান্দায় পৌছে গেল।

– কোথায় যাচ্ছ ।কোথায় যাচ্ছ। দাঁড়াও ।দাঁড়াও। চা এনেছি ।

কাকিমা দুজনকেই ফিরিয়ে আনল।

– তোমরা কি ধরনের মানুষ! এতই ব্যস্ত ?

  কাকিমার কথায় সায় দিয়ে কাকাবাবু বললেন– যুবক ছেলে, বুড়ো দুজনের সঙ্গে বসে কি নিয়ে আড্ডা মারবে ।

 উদয়শঙ্কর প্রত্যুত্তরে বলল– কাকাবাবুকে নিয়ে আর পারা যায় না।এতটুকুতেই অভিমান হয়েছে।

–অভিমানের কথা নয় বাবা ।তোমরা বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কী কর আমাদেরও জানতে ইচ্ছে করে। সেই সমস্ত কথাই জিজ্ঞেস করতাম।

 অন্য সময় হলে উদয়শঙ্কর কাকাবাবুকে ওরা কী করছে ,কোথায় যাচ্ছে ,আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে বলত, কিন্তু আজ সময় নেই ।কাকাবাবুদের চেয়ে কীচক এবং নবজিতের সঙ্গে কথা বলাটা বেশি জরুরী। উদয়শঙ্করের মনে আগ্রহের সঞ্চয় করে রাখা বিভিন্ন কার্যরূপায়নের জন্য তারা দুজন হতে পারে সার্থক সারথি।

– কাকাবাবু সেরকম কোনো কথা নয় ।ওদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার প্রয়োজন ছিল। কাকাবাবুর অবাঞ্ছিত আবদারকে প্রত্যাখ্যান করে দুজনে বেরিয়ে গেল।

 সুনন্দের বাড়ির বৈঠকখানা ঘরে নবজিত এবং কীচক বসেছিল। বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎ বাতির অভাব দূর করছিল একটি হারিকেন ল্যাম্প। ল্যাম্পটির অনুজ্জ্বল আলোতে দুজনে কথা বলছিল। ঠান্ডার প্রকোপ যাতে ঘরটিকে কাবু করতে না পারে তার জন্য সুনন্দের মা দরজাটা ভেতর থেকে টেনে দিয়েছিল।

সুনন্দ দরজাটা টান মেরে খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল ।পিছে পিছে উদয়শঙ্কর।

কীচক এবং নবজিতের আড্ডার গতিতে বাধা পড়ল। ওরা দুজন সোজা হয়ে বসে নিল। উদয়শঙ্কর সামনের একটা চেয়ারে এবং সুনন্দ পাশের একটি চেয়ারে বসে পড়ল।

– এ হল নবজিৎ বৈশ্য। আরিকুছির জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। আমাদের এই বৃহত্তর অঞ্চলে সামাজিক জীবনের সঙ্গে নবদা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

পরিচয় সূচকভাবে উদরশঙ্কর এবং নবজিতের মধ্যে নমস্কার এবং প্রতি নমস্কারের আদান-প্রদান হল।

–ও হল কীচক বৈশ্য। টেট শিক্ষক ।ছয়গাঁও থেকে আরও ভেতরের দিকে একটি অঞ্চলে শিক্ষকতা করে। কীচক দেখতে নবজিতের চেয়ে অনেকখানি বেঁটে এবং কিছুটা অনুজ্জ্বল বর্ণের।

 মসৃণ ভাবে কামানো দাড়ি মুখটাকে সাদা দুপাটি দাঁত ফুটিয়ে তুলেছে। দুজনই শিক্ষক বলে জানতে পেরে উদয়শঙ্কর বলল আমি দেখছি শিক্ষকদের মধ্যে বসতে পারা একজন অতি গৌরবান্বিত ব্যক্তি।

  নবজিতের মতো কীচক জানানো নমস্কারের উদয়শঙ্কর প্রতি নমস্কার জানাল।

নবজিৎ বৈশ্য উঁচু লম্বা ধরনের ছেলে। উচ্চতায় ছয় ফুটের মতো হবে। ক্ষীণ লাবণ্যময় দেহাবয়ব। মার্জিত কেশ। নাকের নিচে হালকা গোঁফ। কথা বললে মুখে সূঁচলো বায়বিক অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে ।বয়স পঁয়ত্রিশ।অতিরিক্ত মেদ নবজিৎ বৈশ্যকে কিছু পরিমাণে ভুঁড়িওয়ালা করে তুলেছে। মেপে কথা বলে। অপ্রয়োজনে একটিও কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করে না বলে কম কথা বলে তার সুনাম অথবা বদনাম আছে। ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার জন্য বিদ্যালয়ে সব সময়ে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরিধান করলেও অন্য সময় লংপেন্ট শার্ট পরে। লং পেন্ট শার্টের ওপরে একটি সোয়েটার পরে আসা নবজিৎ মাথা ঢাকার জন্য একটি টুপি ব্যবহার করেছে।

নবর বিপরীতে কীচক ছোটোখাটো। সামান্য কৃষ্ণ বর্ণের। কথা বললে চকচকে দাঁত দুপাটি আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে পড়ে ।সাহিত্যের ওপরে দখল আছে ছেলেটির। সমসাময়িক গ্রন্থসম্ভার ছাড়াও পুরোনো অসমিয়া সাহিত্যের সঙ্গে কীচকের পরিচিতি সমবয়সীদের মধ্যে বহুলভাবে পরিচিত‌। বই পড়লে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে বলে সাহিত্যের আলোচনায় নির্দ্বিধায় অংশ নিতে পারে বলে কীচক সবার কাছে অতি পরিচিত।

– এক কাপ লাল চা?

  সুনন্দ কারও উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সোজা রান্নাঘরে প্রবেশ করল। সাতটা বেজে গেছে।

কথা প্রসঙ্গে কীচক উদয়শঙ্করকে জিজ্ঞাসা করল- উদয়দা, সুনন্দ আপনার কাছ থেকে পাওয়া পাখি বিষয়ক বইটি আমাকে দেখিয়েছে ।বইটি থেকে সে পাখির অনেক কথা শিখতে পেরেছে। সে আজকাল কথা প্রসঙ্গে পাখির কথা বলতে থাকে। আমাদের এখানে প্রকৃতি বিষয়ক সজাগতা বৃদ্ধির জন্য একটি প্রকৃতি শিবিরের ব্যবস্থা করা যেতে পারা যায় না কি?

– পারা যায়। অত্যন্ত সহজ কথা। শুধু পাখি নয় –প্রজাপতি ,বিভিন্ন পোকামাকড় ,স্থানীয় উদ্ভিদ ,স্থানীয় মাছ- কাছিম, অনামী গাছপালা– এই সমস্ত কিছুর উপরে আমরা অধ‍্যয়ন করতে পারি। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে ।প্রশিক্ষার্থী নিজস্ব আগ্রহের উপরে নির্ভর করে তার বিষয় নির্বাচিত করতে পারে ।

–শুভ কাজ শীঘ্র করাই ভালো নয় কি! আপনি থাকতে থাকতেই অর্থাৎ দু-একদিনে– আপনিই প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করুন।

– না না, আমি প্রশিক্ষক নই। আমি পাখির বিষয়ে এতটা দক্ষ অথবা বিশেষজ্ঞ নই ।

কীচক উদয়শঙ্করকে ভাববোধে প্রশ্ন করল –তাহলে বাইরে থেকে কাউকে আনাতে হবে নাকি!

– শুদ্ধ উত্তর হল সৌম‍্যদা। আমি তাকে দায়িত্ব দেব। তিনি হবেন আমাদের প্রশিক্ষক ।

সুনন্দ, কীচক এবং নবজিৎ সৌম‍্যদার নাম শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।

 সন্দেহের সুরে কীচক জিজ্ঞেস করল- সৌম্যদা সত্যিই আসবে কি ?

–আসবে। আসবে ।কেন আসবে না ।মানুষটা সারাটা জীবন জীবজন্তু পাখ-পাখালি নিয়ে কাটাল। তোমাদের পেলে তিনি আনন্দিত হবেন। তোমরা কীভাবে নেবে জানিনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত অনেক কাজ তোমরা এখানে করতে পার।

– যেমন?

- আজকেই বলতে চাইছি না। তোমাদের আগ্রহ আর ইচ্ছার উপরে নির্ভর করবে ।

–তবুও ?

নবজিৎ বৈশ‍্য জানার আগ্রহ প্রকাশ করল।

– পাগলাদিয়া নদীর বাঁধের ভেতরে থাকা জনশূন্য মাটিগুলিতে অরণ‍্য গড়ে তোলা যেতে পারে। এই মাটিগুলি কারও ম‍্যাদি মাটি। মাটির মালিককে পরিবেশ সচেতন করে তুলতে পারলেই সেই কাজ সম্ভব হবে। ধরে নিতে পার এই কাজ এক আন্দোলনের মতো। তোমরা এই ধরনের একটি কাজ কর যার জন্য তোমরা অসমের যুবক-যুবতীর কাছে আদর্শ স্বরূপ হয়ে পড়বে।

উদয়শঙ্কর আরও কিছু বলত হয়তো, দরজায় মৃদু টোকর দিয়ে প্রবেশ করা আগন্তুকের মুখের দিকে তাকিয়ে সে থেমে গেল।

– এসো এসো জেপি। ঠিক সময় মতো এসে পড়েছ। দাদা ও জয়প্রকাশ ।আমরা জেপি বলেই ডাকি ।সুনন্দ উদয়শঙ্করকে উদ্দেশ্য করে বলল। উদয়শঙ্কর হাতের ইঙ্গিতে জয়প্রকাশকে সামনের চেয়ারটায় বসতে আহ্বান জানাল। নমস্কার জানিয়ে জেপি চেয়ারটাতে বসল।

শীর্ণদেহের ত্রিশ বছরের তরুণ জ্যোতিপ্রসাদের মুখে অনবরত একটা হাসি লেগেই থাকে। মাথার চুল পেছনদিকে আঁচড়ানো ছেলেটির গালের হনু কিছুটা এগিয়ে আসা ।হাত-পা-বুক ত্রিশ বছরের তরুণ একজনের যেমন হওয়া উচিত তেমন নয়। শীর্ণ শরীর হলেও জয়প্রকাশ দুর্বল নয়, তরতাজা। এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে না পারার মতো চঞ্চল ।চোখে রয়েছে বুদ্ধিদীপ্ততা।পরনে সাধারণ পোশাক।ঘিয়া রঙের একটি সোয়েটার ,গলায় একটি মাফলার। পাতলা জিন্সের একটি লং পেন্ট এবং পায়ে বাটার গতানুগতিক ডিজাইনের একজোড়া জুতো।

– তুমিও শিক্ষকতা কর নয় কি?

-হ্যাঁ দাদা, কলগাছিয়ার দিকে।

– জেপি আমরা পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বলছিলাম। খারাপ পেয়ো না, আমিও তোমাকে জেপি বলেই ডাকব কিন্তু। জয়প্রকাশ মৌনতায় সম্মতি জানাল।

  উদয়শঙ্কর পুনরায় বলতে আরম্ভ করল তোমাদের জানা উচিত যে পাগলা দিয়া প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ।বিভিন্ন প্রজাতির পাখ-পাখালি, গাছপালা, স্থানীয় মাছ ইত্যাদিতে। তাই তোমরা তোমাদের চোখের সামনে অনাদৃত হয়ে পড়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদগুলিকে সমাদর করতে শিখতে পার।

 জয়প্রকাশ বলল–দাদা, আপনি আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন ।আমরা আপনার সঙ্গে আছি ।থাকব ।

সুনন্দক বলল –জেপি আমরা তিনজনই উদয়দাকে একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।

– কবে ?

-সেই সিদ্ধান্ত আজকেই নিতে হবে।

 তাদের আলোচনা শুনে উদয়শঙ্কর সৌম‍্যদাকে ফোন করল।

 –কেমন আছ উদয়শঙ্কর?

বিপরীত দিক থেকে সৌম‍্যদা উদয়শঙ্করকে জিজ্ঞেস করল।

– আছি সৌম‍্যদা।

–এবার তোমার পাখিদের পাড়া-পড়োশীর বক গুলির খবর বল। ওরা আছে কি? বাসা বাঁধতে শুরু করেছে? তারিখ অনুসারে সব কিছু নোট করে রাখতে ভুলবে না। বল ,কোনো বিশেষ কারণে ফোন করেছিলে কি?

– হ্যাঁ সৌম‍্যদা। এখানকার স্থানীয় ছেলেরা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পাখি পর্যবেক্ষণ বিষয়ক একটি শিবির অনুষ্ঠিত করতে চায়। তার জন্য আপনার উপস্থিতি প্রয়োজনীয়।

– ভালো কথা। এই মাসে আমার বিশেষ কোনো জরুরী ব্যস্ততা নেই। তাই তুমি এগোতে পার।

–সৌম্যদা আমরা আলোচনা করে আপনাকে তারিখটা আজকেই জানিয়ে দেব।

–ঠিক আছে ।

সৌম‍্যদা ফোন রেখে দিল।

 শনি এবং রবিবার নিয়ে একটি দুদিনের প্রশিক্ষণ শিবিরের তারিখ চারজন আলোচনা করে ঠিক করে ফেলল।

কীচক জিজ্ঞেস করল– প্রশিক্ষণ শিবিরে কতজন প্রশিক্ষার্থী থাকবে?

– তোমরা কতজন যোগাড় করতে পারবে ?

–সেরকম কোনো কথা নেই ।আপনারা যতজন জোগাড় করা প্রয়োজন বলে বলবেন–

–পঞ্চাশ জন ।হবে? পারবে ?

নবজিৎ বৈশ্য বলল- অনায়াসে পারব ।আপনি বললেই হল। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আমরা ছেলে মেয়ে সংগ্রহ করতে পারব ।

–সেভাবে হবে না। এবার প্রশিক্ষার্থী নির্বাচনে আমাদের কিছু 'ক্রাইটেরিয়া' থাকবে।

কীচক সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল –কী ধরনের ?

–প্রথম কথা প্রশিক্ষার্থীরা এখানকার স্থানীয় হতে হবে। দ্বিতীয়ত তারা প্রশিক্ষণের জন্য ন্যূনতম পরিমাণের হলেও মাশুল দিতে হবে। তার কারণ আছে ।স্থানীয় প্রশিক্ষার্থীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে আমরা এখানে কাজ করতে পারার মতো তাদেরকে সক্ষম করে তুলতে হবে। অন্যদিকে ভর্তি-মাসুল দিলে তাদের দায়িত্ববোধ থাকবে।

– হলেও পঞ্চাশ জন ছেলেমেয়ে হয়ে যাবে। নদীর দুই পারের গ্রাম কয়টিতে দুদিন গিয়ে প্রচার করলে তারা উৎসাহিত হয়ে শিবিরে অংশগ্রহণ করবে। আমার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা আছে ।কেবল প্রথম শিবিরের জন্য মা পঞ্চাশ টাকা করে দিলেই হল।

নবজিতের কথা শুনে উদয় শঙ্কর উৎসাহ এবং সন্তুষ্ট বোধ করল।

-আমাদের তারিখ ঠিক হল।মাশুল পঞ্চাশ টাকা ঠিক হল। প্রশিক্ষক ঠিক হয়েছে। শিবির উন্মোচন করার জন্য একজন ব্যক্তিকে নিমন্ত্রণ করতে হবে ।কাকাবাবু হলে কেমন হয়!

উদয়শঙ্কর যে উদ্দেশ্যে কথাটা বলতে যাচ্ছিল সুনন্দই সেটার সহজে সমাধান করে দিল। উদয়শঙ্কর বলল –আমাদের উন্মোচক ও ঠিক হয়ে গেল। এখন হাতে কাজে লেগে যাওয়ার কথা।

 একবার উদ্বোধকের বাড়িতে গিয়ে তাকে কথাটা জানিয়ে রেখে আসব নাকি ?

–রাত হয়ে গেছে।

 –কী আর রাত হয়েছে। আটটা বাজে। কাকাবাবুর বাড়িতে যখন তখন যাওয়া যায় । তাছাড়া আমাদের কাজ যখন এতটাই এগিয়ে গেছে, আজকেই গিয়ে বলে আসি।

 সনন্দ কাকাবাবুকে জানানোর জন্য তাগিদ অনুভব করল। উদয়শঙ্কর খুশি হল। জনগণের কাজে দুই চারজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিকে সংযোজিত করা মানে সমাজটিকে গুরুত্ব দেওয়া ।নবজিতে আর কীচক ও কাকাবাবুর বাড়িতে গিয়ে কথাটা জানিয়ে সামাজিকভাবে প্রক্রিয়াটা আরম্ভ করতে চাইল। কাকাবাবুর বাড়িতে দরজায় টোকা দিতে কাকাবাবু দৌড়ে এলেন ।

কী ধরনের মানুষ তোমরা ?এত রাতে !

–কাকাবাবু আপনার বাড়িতে আমাদের জন্য দিনরাত বলে কোনো কথা আছে নাকি?

-উদয়শঙ্কর, তুমি এভাবে বললে আমার একটু অসুবিধা হয়। তুমি জান তোমাদের কাজকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি ।

কাকাবাবু বাক্য শেষ না করতেই উদয়শঙ্কর কাকাবাবুর পায়ে হাত দিয়ে দু হাত মেলে দিয়ে এগিয়ে গেল।

– এই কী করছ? কী করছ? কী মানুষ হে তুমি ?

–কাকাবাবু ,অসমিয়া মানুষ ।সেই জন্যই –

–তবে এই অসময়ে চারজন কী কারণে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলে?

– কাকাবাবু, আমরা আসার জন্য আপনি কি সত্যিই খারাপ পেয়েছেন ?অসময় বলে বলছেন যে!

 উদয়শঙ্কর এভাবে বল না। কেন এলে বল।

– কিছুই না, এমনি এলাম।রাতের খাবারের জন্য–

– কাকাবাবু উপহাস করার মতো বললেন– সেই দুর্ভাগ্য আমার কখনও হবে না ।

কাকাবাবুকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে শুনে বৌমার কাকাবাবু সামনে এগিয়ে এলেন।

– আমি জানতাম তোমরা দুজন আসবেই।

 উদয়শঙ্কর এবং কীচক একসঙ্গে বলে উঠল– হ্যাঁ কাকাবাবু ।

কথাগুলি অযথা দীর্ঘ হয়ে চলেছে দেখে উদয় শঙ্কর সংক্ষিপ্ত করার জন্য সোজাসুজি ওরা যে প্রকৃতি শিবির অনুষ্ঠিত করতে চলেছে সে কথা জানাল এবং কাকাবাবুকে সেই শিবিরের উন্মোচক হওয়ার জন্য অনুরোধ করল।

  কাকাবাবু আপ্লুত হয়ে পড়লেন। নিজের গৃহের অনুষ্ঠানে ,কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কাকাবাবু আজ পর্যন্ত কোনো প্রকারের বিশেষ গুরুত্ব পাননি ।প্রত্যেকেই আর্মি বলে দূরে সরিয়ে রাখে। সুনন্দ এবং উদয়শঙ্করের প্রস্তাবে শীতের রাতটা কাকাবাবুর কাছে বসন্তের সাম্য- শান্ত সন্ধ্যার মতোই মনে হতে লাগল।

– কী বলছ হে। এই সমস্ত কাজ করার আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

– কাকাবাবু, করলেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়।

  এইবার দেখুন তো আপনার কেমন অভিজ্ঞতা হয়। উদয়শঙ্কর কাকাবাবুকে বিশেষ কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না ।

–তোমার সঙ্গে আর পারিনা ।যুবক ছেলে- মেয়েদের সঙ্গ পাব বলে ভালোই লাগবে। সামাজিক কাজ করার আমারও ইচ্ছে রয়েছে, নয় কি? তোমরা চাইছ যখন নিশ্চয় যাব। কাকাবাবুর কাছ থেকে সম্মতি পাওয়ার পরেরদিন থেকে সুনন্দরা অভিযান আরম্ভ করে দিল। সুনন্দ, কীচক এবং নবজিৎ নিকটবর্তী প্রায় প্রতিটি যুবক-যুবতির সঙ্গে দেখা করল। গরিষ্ঠ সংখ্যক যুবক -যুবতি ওদের প্রচেষ্টাকে খুব ভালোভাবে স্বাগত জানিয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল। ওদেরকে মাশুল দিয়ে নাম ভর্তি করার কথা বলা হয়েছিল। কেউ কেউ শিবিরেই দেবে বলে জানানোয় কতজন উপস্থিত থাকবে সেই সম্পর্কে সন্দেহ থেকে গেল। যদি সময় মতো না আসে। সেরকম হতে লাগে না কারণ নবজিৎ বৈশ্য এবং কীচকের কাছে তারা পরিচিত। প্রকৃতি শিবির অনুষ্ঠিত হবে বলে এবং তাতে যোগদান করার জন্য ছেলেমেয়েরা প্রস্তুত হচ্ছে বলে কীচকরা ইতিমধ্যে জানতে পেয়েছে। কাগজে পত্রে অসমের বিভিন্ন স্থানে প্রকৃতি শিবির অনুষ্ঠিত হওয়ার কাহিনি পড়ে জানতে পেরে ছেলেমেয়েরা ভেতরে ভেতরে শিবিরের প্রতি উৎসাহিত হয়ে উঠল।

– উদয় দা, শিবির অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে আমরা একদিন আপনার সঙ্গে সকাল থেকে দিনটা জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারি না?

–কেন পারবে না। ভালোই লাগবে।আমি তোমাদের আমার পাখিদের পাড়াপড়োশির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চেষ্টা করব। অরণ্যে প্রবেশ করলে অরণ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। বিশেষ কাজ নেই যদি কাল ভোরবেলাতে চলে এসো। উদয়শঙ্কর কীচকদের উৎসাহিত করল। পরের দিন ভোরবেলা কীচক , নবজ্যোতি, জেপি এসে উদয়শঙ্করের বাড়ির সামনে হাজির হওয়ায় উদয়শঙ্কর বিশ্বাসই করতে পারেনি। একেই বোধহয় বলে নেশা। আলাদা সচেতনতা এবং নেশা একত্রিত হলে ফলদায়ক হয়।

– তোমরা যে এত সকালবেলা আসবে আমি ভাবতেই পারিনি। খুব ভালো কথা। চল এখন। শীতের কুয়াশা ভেদ করে চারজন এগিয়ে চলল। শিশির এবং কুয়াশার সম্মিলিত শক্তির কাছে ওদের হার মানতে হল না বলে স্বস্তি বোধ করল ।

–ভালো ঠান্ডা পড়েছে।শীতের প্রকোপে কাবু হয়ে পড়া জেপি বলল।

–শীতের এক অনন্য অনুভব আছে।মাদকতা সেই অনুভব এবং মাদকতা লাভ করার জন্য নিজেকে কেবল সচেতন এবং প্রস্তুত করা শিখতে হয়। আজ শিখতে চেষ্টা করতো! নিজেকে কঠিন করে তোলো। প্রকৃতি কর্মীরা সামরিক বাহিনীর লোকের মতো সব সময় প্রস্তুত এবং সব সময় সহনশীল, কর্মতৎপর। তাদের দরকার তৃতীয় চোখ। বন্য প্রাণীর কাছে আমরা সবসময়ই অবিশ্বাসযোগ্য। নিজেকে এবং সন্তানকে নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থে বন্যপ্রাণী আক্রমণশীল।শীত, গ্রীষ্ম, জলাশয়, পাহাড় প্রকৃতি আন্দোলনের এক একটি উপাদান।আমাদের নিত্য সহচর। কীচক কিছু বলতে যাচ্ছিল,উদয়শঙ্করের কথা শুনে তার আর প্রয়োজন হলো না। উদয়শঙ্কর সব সময় আসা-যাওয়া করা পথটা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তার হাতে গাছের ডালের একটি লাঠি। লাঠিটা ভর দেবার জন্য নয়, নিরাপত্তার জন্য সে ব্যবহার করে। তার পেছন পেছন শোভাযাত্রার মতো এগিয়ে চলেছে নব, সুনন্দ, জ্যোতিপ্রসাদ এবং কীচক। উদয়শঙ্করের মন্তব্য শোনার পরে বাকিরা চুপ করে এগিয়ে চলেছে। জলাশয়টা পেতে আর একটু বাকি। সময় তখন ভোরবেলা। আশ্চর্য হওয়ার মতো নব জিৎ বৈশ্য উদয়শঙ্করকে জিজ্ঞেস করল উদয়দা ওটা কি? দৃশ্যটা দেখে নবজিত কিছুটা ভীত হয়ে পড়েছে।

 উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল- কোথায়? কোন দিকে?

-ঝোপটার ওদিকে। ওই যে।

নবজিৎ ঝোপটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। ওরা প্রত্যেকেই থেমে গেল।

-সাদা সাদা যে- কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকার মত মনে হচ্ছে নাকি?

 নবর আঙ্গুলের নির্দেশে উদয়শঙ্করের দিকে তাকাল এবং বলে উঠল- সর্বনাশ। ভীতিগ্রস্তভাবে জেপি চমকে উঠার মতো জিজ্ঞেস করল- কী হল?

নবজিৎ উদয়শঙ্করকে অনুরোধ জানাল-‘চলুন এগিয়ে গিয়ে দেখে আসি।

 শঙ্কিত জেপি বলল- না না, আমি যাব না।

কীচকও জেপিকে সমর্থন জানিয়ে বলল- আমিও যাব না।

-সুনন্দ, তুমি যাবে কি ?

-চলুন।

 অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুনন্দ তার সঙ্গে যেতে সম্মতি প্রকাশ করল।

 ওদের ততক্ষণে বুঝতে বাকি ছিল না ওদের সামনে কি দেখা যাচ্ছে।

 উদয়শঙ্কর বলল- কেউ অঘটন ঘটিয়েছে! নবজিৎ বৈশ্য বলল-চলুন কে দেখে আসি। আমাদের নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

 উদয়শঙ্কর নবজিৎকে উৎসাহিত করল- তোমার সাহস মানতে হবে। এটা আমাদের সামাজিক সমস্যা। আমাদের সম্মুখীন হতেই হবে।

উদয়শঙ্কর, নব এবং সুনন্দ এগিয়ে গেল। ঝোপটা থাকার জন্য ওরা ভালোভাবে কিছুই বুঝতে পারছে না বলে কিছুটা ঘুরে ওরা ঝোপটার বিপরীত দিকে উপস্থিত হল। ঝোপের বিপরীতে থাকা কেন্দু গাছের একটি ছোটোখাটো ডালে একটি যুবক ছেলের নিথর দেহ ঝুলে রয়েছে । ছেলেটির বয়স ২১ বছরের মতো হবে ।

– বেচারা গতরাতে কাজটা করেছে।

উদয়শঙ্কর ফাঁসি দেওয়া ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল।

- এই ধরনের অপঘাতী হওয়া মানুষকে দেখতে এমনিতেই ভালো লাগে না। তথাপি সুনন্দ দেখতো কে চিনতে পার কিনা? ভয়ে ভয়ে সুনন্দ ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল।

 এ তো দেখছি সোণ।সোণ দাস। ব’গলচ চকে তার একটি সেলুন আছে। সেলুন টা ভালো চলে। কী হল তার! কেন এই ছোটো ছেলেটি এরকম কাজ করল।

 ভীত সন্ত্রস্ত ভাবে সুনন্দ বলে উঠল।

- চল যাই। গ্রাম প্রধানকে খবর দিতে হবে। উদয়শঙ্কর তখনই সেখান থেকে বেরিয়ে এল। প্রথম দিন বাধা পড়ল ভেবে কীচক এবং জেপির মন বিষাদে ভরে উঠল। শিক্ষার সঙ্গে জড়িত এবং শিক্ষকতার চাকরি করলেও ওরা কিছু পরিমাণে অন্ধবিশ্বাসের বলি হয়ে রয়েছে যেন উদয়শঙ্করের মনে হল। ফলে তার দায়িত্ব বেড়ে গেল।

- তোমরা সেভাবে ভাবছ কেন? প্রথম দিন দ্বিতীয় দিন বলে কোনো কথা নেই। এইসব আমাদের সামাজিক দৈনন্দিন পরিঘটনা। আমাদেরকেই মোকাবেলা করতে হবে। এখন আমাদেরকেই কি গ্রাম প্রধানকে খবর দিতে হবে না? গ্রামবাসীদের জানাতে হবে না? আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। আগামীকাল সকালবেলা আমি এই পথে আবার আসব, আবার দেখব বকগুলিকে। আমি আমার কাজ করে যাব এবং সঙ্গে তোমাদের কাছ থেকেও সহযোগিতা চাইব।

-আমি আছি উদয়দা। আমি আগামীকাল আবার আপনার সঙ্গে আসব। নবজিত উদয়শঙ্করকে সমর্থন জানাল।

কীচক এবং জ্যোতিপ্রসাদের অবস্থা উদ্বিগ্নতায় পরিপূর্ণ, কী হবে কী করবে বুঝতে পারছেনা।

 ওরা থানের মধ্য দিয়ে এসে বাঁধে উঠল। মানুষের সেভাবে আসা যাওয়া আরম্ভ হয়নি। তার মধ্যে যার সঙ্গে দেখা হয়েছে তাকেই ঘটনাটির কথা বলায় কিছুক্ষণের মধ্যে হাহাকার লেগে গেল।একজন দুজন করে বাঁধের উপরে লোকজন জমা হতে লাগল। তখনও কেউ গিয়ে দেখে আসার সাহস করতে পারছে না। যুবকেরা কৌতূহল নিবারণ করার জন্য কথাটা শুনে দৌড়ে গেল।উদয়শঙ্করের সন্দেহ হল এত মানুষের উপস্থিতি দেখলে বকেরা ভয় পেয়ে যাবে।

বাঁধে প্রাতঃভ্রমনে আসা কেউ একজন ঘটনাটির বিষয়ে কাকাবাবুকে জানাল।

- কী!

কাকাবাবু আশ্চর্য হলেন। এত ছোটো ছেলে একটিও এসব করতে পারে ভেবে কাকাবাবু উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করলেন। দুই একজন করে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বাঁধের উপরে একত্রিত হল। নিমেষের মধ্যে পাখিদের পাড়া-পড়োশিতে হাহাকার লেগে গেল। সুনন্দ উদয়শঙ্করের কাছাকাছি এসে বলল- দাদা এন্ট্রিরের এই অঞ্চলের দুই চারজন ব্যক্তির সঙ্গে এই সুযোগে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেব কি?

-সুযোগ?

- সেরকম কিছু নয়। মানুষগুলি এক জায়গায় জমা হয়েছে যখন-

- অবশ্য কারও সঙ্গে পরিচিত হতে পাওয়া ভালো কথা। সুনন্দ একজন মানুষের কাছে গিয়ে তাকে সুনন্দের কাছে ডেকে এনে বলল ইনি হেমেনদা,হেমেন কলিতা। সেদিন যে জুলিয়েটের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তার ওপাশটিতে হেমেনদার বাড়ি। গঙ্গাপুখুরি হাইস্কুলের সামনের বাড়িটা।

হেমেনদা সুনন্দকে জিজ্ঞেস করলেন- আমি একে চিনতে পারছিনা।

-হেমেনদা ইনি উদয়শঙ্কর, ভাঙরা গোঁহাই খানের টুরিস্ট লজে কিছুদিন থেকে আছেন। আমাদের এই অঞ্চলের পাখ-পাখালির উপরে বিশেষ করে বকের উপরে অধ্যায়ন করতে এসেছেন।

- আপনিই নাকি? আপনার কথা শুনেছি। দেখা হয়ে ভালো লাগল। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন। আসবেন আমাদের বাড়িতে। দেখা হলে ভালো লাগবে। কথা বলব।

উদয়শঙ্করের সঙ্গে পরিচিত হয়ে হেমেনদা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গ্রাম প্রধানের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

হেমেনদা মানুষটা এই অঞ্চলের একেবারে সামাজিক ব্যক্তি। তিনি যা বলেন সবাই মেনে নেয়।

সুনন্দ এভাবে বলার পরে উদয়শঙ্কর হেমেনদার দিকে পুনরায় তাকাল। উঁচু লম্বা মানুষটা শরীরে বেশ শক্তি আছে। বলিষ্ঠ কন্ঠে স্পষ্ট কথা বলেন। ভিটিলিগ নামক ত্বকের পিগমেন্টের সাধারণ পরিবর্তন স্পর্শ করেছে।

 নতুন করে খবর পাওয়া দুই চারজন জন মানুষ বাঁধ থেকে নেমে জায়গাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । ফাঁসি দেওয়ার দৃশ্য দেখা মানসিকভাবে কষ্টকর। সবার পক্ষে সম্ভব নয়। যারা এই দৃশ্য দেখতে অপারগ বলে মনে করে তারা বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কথা আলোচনা করতে শুরু করেছে। গ্রাম প্রধান নলবাড়ি আরক্ষী থানায় যাবে ,খবর দিতে। তার সঙ্গে যাবে দিবাকর। সে তার মোটরসাইকেল আনতে বাড়িতে গেছে। গ্রাম প্রধান খবর দেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে একজন দণ্ডাধীশের সঙ্গে আরক্ষী এসে উপস্থিত হল। সঙ্গে দুইজন সুইপার। আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ করে ছেলেটির শব নিয়ে যেতে যেতে দুপুর হয়ে গেল। বাঁধের উপরে রাখা গাড়িতে শবটা ভার বেঁধে বহন করে আনতে হল। সেসব করতে গিয়ে অনেক সময় লেগে গেল।শবের পেছন পেছন আগত মানুষগুলি শবটা নিয়ে যাবার পরে নিজের নিজের কাজে ফিরে গেল। অঘটনটার শেষে পাখিদের পাড়া পড়োশি নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল ।

 দূর থেকে সমস্ত কাণ্ডকারখানা ভয়ে ভয়ে দেখতে থাকা পুরোহিত শর্মার সঙ্গে বাপুটি ধীরে ধীরে উদয়শঙ্করের কাছে এগিয়ে এল। তাকে দেখলে এরকম মনে হয় সে যেন মাটির উপর দিয়ে চলছে না। অপরিচিত কিছু একটা যেন তাকে চেপে ধরেছে আর সে কোন মতে হেঁটে চলেছে।

-আজ রাতে কোথায় থাকবেন?

-কেন অন্য দিনের মতোই থাকব।

 -রাতে এসে ধরলে

-কে?

উদয়শঙ্কর এরকম ভাব দেখাল যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না।

-যে মারা গেছে তার প্রেতাত্মা।

- দেখছি কী হয়।

- আপনি কাকাবাবুর বাড়িতে থাকবেন।

-না,সেখানে থাকব না। এখানেই থাকব এবং কাল সকালবেলা আলো-আঁধারিতে পুনরায় সেখানে যাব।

-কিছুতে ধরলে পাবেন মজাটা।

 উদয়শঙ্কর বাপুটিকে গুরুত্ব দিল না। পাখিদের পাড়া-পড়োশী থেকে ঘটনাবহুল আর ও একটি দিন এভাবে পার হয়ে গেল।

 কথা দেওয়া অনুসারে নবজিৎ সকালবেলা এসে উদয়শঙ্করের বাড়ি পৌঁছালো। দুজনেই একই রাস্তায় গিয়ে জলাশয়ের পারে উপস্থিত হল। গতকাল যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করার জন্য পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ঘাসগুলি এখনও নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে।


শব্দব্রাউজ ৬৬৮।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-668, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৬৮।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-668, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৬৬৮। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৬। ১১। ২২। সময় সকাল আটটা দশ মিনিট ।



শব্দসূত্র: খেলছি তুরুপের তাস



খেলছি নির্জিব বোড়ে

বুদ্ধির মারপ্যাঁচে হচ্ছে

সচল ,

খেলছি জেতার জন্য

সারাক্ষণ তাকে পুষি

স্বপ্নে ....



খেলছি তুরুপের তাস

নিঃস্ব জীবন থেকে

বৈভবে চলে যেতে ....



কি সাধারণ আমাদের খেলা!

আটপৌরে- ২৯|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 29, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ২৯|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 29, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা-২৯


ভুল


স্বর্গে। যেতে। চাও।

কেন?

আকর্ষণীয় কেউ ওখানে নেই।

আটপৌরে ৪১৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 413, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 413, by Sudip Biswas






৪১৩

ধ্রুব 


নিয়তিকে। বাধবো। ঊর্ধ্বতন। 


অনন্তকাল 


প্রলেপ ঢেলে নিভছে সুন্দর।

শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২২

শব্দব্রাউজ ৬৬৭।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-667, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৬৬৭।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-667, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৬৬৭। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৫। ১১। ২২। সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিট ।



শব্দসূত্র: স্বস্তি যখন মনে



দুর্ভোগের পরে স্বস্তি

নিঃশ্বাসে বোঝা যায়,

এই স্বতঃসিদ্ধ প্রবাহ

জাগায় .....


যখন এভাবেই জীবন

তখন হিসেব সাধারণ ।


মনে শব্দের খেলা

তবু স্তব্ধ হয় না ।

আটপৌরে- ২৮|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 28, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ২৮|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 28, by Pankaj Kumar Chatterjee





আটপৌরে কবিতা-২৮


বিবিধ


সত্য। কিছু। নেই।

আছে

নানা মুনির নানা মত।

আটপৌরে ৪১২|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 412, by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৪১২|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 412, by Sudip Biswas






৪১২

জলপাই 


অতিক্রম। আশংকায়। ভেতরটা।


উঠোনের


 মতোই ভাঙা ডিজাইনে করাতকাটা।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...