অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

কান্না /// দেবাশীষ সরখেল //// অণুগল্প

 কান্না /// দেবাশীষ সরখেল



চায়ের দোকানে কাজ করে বালক ।চা দেয় ,ঘুগনি মুড়ি দেয় ,মাঝেমধ্যে ভাবরা ছঁাকে।

      কলকাতার এক বাবু জয়চন্ডী পাহাড়ে বেড়াতে এসে তাকে দেখে খুব খুশি হলেন ।বললেন,  যাবি আমার সাথে ?তোকে চায়ের গ্লাস ধুতে হবে না । সারাদিন তেমন কাজ নেই ।কেবল ঘর মুছবি ,ভাবড়া ছাঁকবি আর টিভি দেখবি ।

পরদিন বালকের বাবা চুপি চুপি বাবুর হোটেলের ঘরে এসে উপস্থিত া বলে ,দোকান মালিকের কাছে৫০০০ টাকা অগ্রিম নেওয়া আছে । যদি দিয়ে দেন ।ও মুক্তি পেয়ে যাবে ,আপনার সাথে যাবে ।৫০০ টাকা বেতন আর খাওয়া দাওয়া দেবেন ।

বাবু তো এককথায় রাজি ।ফেরার দিন গাড়ি নিয়ে বালকের বাড়িতে এসে দেখে ,গ্রাম জুড়ে খুব কান্নাকাটি চলছে ।

       ব্যাপার কি ? না , বুড়ো মারা গেছে ।বয়স ৯৭ ।বিছানায় পড়েছিল১৩ বছর ।

  বাবু অবাক হলেন ।এর জন্য এত কান্নাকাটি  ?বহুদিন আগে থেকেই তো তার নাম খরচের খাতায় লেখা ছিল  ।

বালকও কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে উঠে বসলো ।

      শক্তিগড়ে গাড়ি থামার পর বাবু তাকে তিনখানা বড় ছানার ল্যাংটা খাওয়ালেন , মুহূর্তে কান্না ভুলে গেল বালক ।

          কলকাতায় এসে আরামে থাকতে লাগল ।  ঘর মোছা আর টিভি দেখা ।মাঝে মাঝে সে ভাবরা পিঠে ছেঁকে দেয় । বাবুর বউ খুব খুশি  । কিন্তু তার কি অসুখ কে জানে, বিছানায় সর্বক্ষণ শুয়ে থাকে  ।

       তারপর একদিন টুপ করে মরে গেল ।বড্ড ভাবরা খেতে ভালোবাসতো ।বালক দেখল ,ফুল সাজানো গাড়ি এলো া মুহূর্তে তাকে নিয়ে চলে গেল ।

        আবার বাবু নতুন মেয়ে মানুষ নিয়ে এলেন।

  কোথাও কোন কান্না নেই ।অনুশোচনা নেই ।বালক ভয় পেল এবার ।বলল , আমি আর এখানে থাকবো না ।

  বাবু বারবার কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন ।বালক গোঁজ হয়ে বসে থাকে ।

 বারবার পীড়াপীড়ি করায় সে একটি কথাই বলল ,কি করে এখানে থাকি, এখানে কেউ কাঁদে না যে  ?

শুক্রবার, ২১ জুলাই, ২০২৩

ছোট গল্প ।। অবলোকন ।। সোমনাথ মুখার্জী, Story, Somnath Mukherjee

ছোট গল্প ।। অবলোকন

সোমনাথ মুখার্জী 



এখন রাত দুটো বাজতে তিন মিনিট বাকী। সময় যে মূল্যবান তার খবর সৌগত এখন সেভাবে মানে না। অথবা বলা যায় রাখতে বাধ্য নয়। হয়ত তাও নয়। আজ এই মুহূর্তে মানসিক  অবস্থান এমন এক পরিস্থিতির শিকার, ভাবলে মন নির্বাক বা অবশ হয়ে যায়। মা মৃত্যু শয্যায় শায়িতা। প্রযুক্তি তখন এতরকমের সবল ছিল না। ডাক্তার  ডাকার জন্য পথে নামতে হয়েছে। বাড়িতে ল্যান্ডলাইন নেই। অন্য কেউ সাহায্যের প্রত্যাশা পূরণ করে নি। সৌগত অসহায় অবস্থায় চারপাশে তাকাল। কয়েকটি কুকুর ওর দিকে নির্লিপ্ত চাহনিতে তাকিয়ে। আশ্চর্য হল। শ্যামবাজার  পাঁচ মাথার মোড় ছাড়িয়ে বাগবাজার যাবে। হাতঘড়ির সময় এখন দুটো পনেরো। ঘড়ি দেখা ওর বাতিক। হঠাৎ মন কেমন করে উঠল। অবচেতনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল চরমতম দুঃখের কথা। কী করণীয় ভাবনার দোলাচলে হারিয়ে গেল। চোখের জল আচমকা বাধা মানল না। সৌগত জানে সবকিছুই। তাও সত্যি মেনে নিতে পারাটা মনের জোর আকাঙ্খা করে।
ডাক্তার ডেথ্ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। সৌগত বাবার দিকে তাকাল। আজ বাবাকে চিনতে পারল না। মুখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙে পরেছে মাথায়। বাবা তাকিয়ে আছে অপলক। ও কিছুটা জানে বাষট্টি সালে প্রেমের বিয়ে কতখানি জটিল ছিল। মা এবং ছেলের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। সৌগত বুঝেছিল মায়ের ভেতরে অসাধারণ স্বচ্ছতা যেন সবসময় আলোকিত হয়ে আছে। কত কথা মা অবলীলায় বলত। আজ এখন মায়ের স্থির অবয়বের দিকে তাকালে কেমন যেন অসহায় বোধ হয়। বাবা বলল হতাশ শব্দে, খোকা কী দেখছিস!!
সৌগত বলল,কিছু নয়। দেখছি। বাবা এবার আমাদের কী হবে! গলা ধরে এল।
বাবা বলল,আজ কত কথা মনে পরছে। আমার জন্য সবকিছুকে সরিয়ে সাহস দেখিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। আজ দেখছি ওই জিতে গেল। সকলকে আপন করতে ওর জুড়ি নেই। সকাল হোক্ দেখবি কত মানুষ আসবে। ঝরঝর করে কেঁদে উঠল বাবা।
ভোর হয়ে আসছে। হঠাৎ স্বপ্নটা ভেঙে গেল। উঠে বসে সৌগত ভাবল,আজ‌ও সব কেমন স্পষ্ট মনে আছে মা। ভালো থেকো তুমি।


রবিবার, ৩ জুলাই, ২০২২

রথ বনাম পথ ।। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।। অণুগল্প

 রথ বনাম পথ 

 অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।



    তোকে বারবার বলছি যে, আমিই বড়ো । শিবেশের কথার জোরালো প্রতিবাদ করলো তিন্নি । না, আমি বড়ো । শিবেশ বলল, দ্যাখ আমাকে বয়সে বড়ো হতে হয় : এটাই নিয়ম ।তিন্নি রসালো জিলিপিতে জোর এক কামড় দিয়ে বলল, এসব নিয়ম তৈরী করা । মেয়েদের ছোট করে রাখা । শিবেশের জিলিপি শেষ । তুই কি মেলাতে এসেও নিস্তার দিবি না? তোরা প্রায় একই রকম । তিন্নি প্রতিবাদ করল । তোমরাও তো বাবা ছোট করে এনজয় কর । এই ইগো ফাইটের কোন মানে আছে ? শিবেশ হাতে জল নিতে বলল , অভিধানে খুঁজতে হবে । বলে হেসে ফেলল । আমাদের দুজনকেই দুজনের দরকার । এটাই বড় কথা । তিন্নি রসালো আঙুল চেটে নিয়ে বলল, এগজাক্টলি । বোঝ বাবা একটু বোঝ ।

     হাত মুখ ধুয়ে শিবেনের দাঁড়ানো মোটরসাইকেলে এসে বসলো তিন্নি । শিবেশ পাশে এসে দাঁড়ালো । 

------- তিন্নি তোর ঐ কবিতার লাইনটা মনে আছে?

-------- কি ?

--------- 'পথ ভাবে আমি বড় রথ ভাবে আমি .....' 

-------- মনে থাকবে না কেন ? ওটা কোটেশন করে লাস্ট ইয়ারে কোশ্চেন এসেছিল । 

------ আমাদেরও হয়েছে একই অবস্থা । রথ সাজিয়ে কি হবে যদি তার সঠিক পথ না থাকে ! আবার পথও তো অপেক্ষা করে রথের জন্য । তাই না ?

------- কি আর নতুন কথা বললি ! তবে পথটাও বেশ ইম্পর্টেন্ট ।

------ দাঁড়া, তাহলে রিসার্চ করতে বসি । কিছু কিছু পুরনো কথা মনে করতে হয় ইয়ার । ভুলে যাই আমরা ।

----- আমি যেরকম ? ' এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হোতো তুমি বলতো ....' 

      শিবেশ তিন্নির পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলল, একটু থামাবি ? দ্যাখ ঐ রথ বেরিয়েছে । চল একটু দড়ি ধরেটান দি । তিন্নি খিলখিল হেসে বলে, পুণ্য হবে ? হবে তো ? শিবেশ বলল, পুণ্য চোখে দেখা যায় না রে ! কাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে । বুঝলি ? তিন্নির আদুরে ধমক । অ্যাই, তুই এই মেলাতে এসেও আমার ক্লাস নিবি ? আর, এত ভিড়ে দড়ি ছুঁতে পারবি ? শিবেশ বলল, চল আমি তো আছি ।

       আজ জগন্নাথ দেবের রথ আর পথের মিলন । অসংখ্য মানুষের পদচিহ্নে তার জয়যাত্রা ঘোষিত হচ্ছে । বিভিন্ন রঙের পোশাকে বর্ণময় হচ্ছে সেই পথ । ঐতিহ্য তো এটাই । জগৎ অনেক মহীয়ান হোক্ ।

     শিবেশ, তিন্নি ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল সেই রথের দড়ি ছোঁয়ার জন্য, যে রথ তার নির্দিষ্ট পথে চলেছে । সেই পুণ্য যেন সবাইকে ছুঁয়ে যায় । ছুঁয়ে যেতে পারে... ।


              -----------*****-----------

শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

রুণুর দুঃখ / অভিজিৎ চৌধুরী। অণু গল্প। Abhijit Chowdhury

 রুণুর দুঃখ / অণু গল্প

অভিজিৎ চৌধুরী



এক রাগী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মানে এখনও আছেন।যে রুমটায় বসেন তার নাম মুশকিল আসান।ঘরে এলে,দেখা করলে মুশকিল আসান হয় বটে তবে বকাও খেতে হয় ব্যাপক।

বকা দিয়ে তিনি অবশ্য জামা দেন,লজেন্স দেন আবার কলমও দেন।

প্রায় ভাবেন রাগ করবেন না বরং একটা দ্বীপ কিনবেন।রাগ মানে তো লস বা লোকসান।

দ্বীপ কিনবেন হাভানা বা কেপ অফ গুড হোপ।কেউ উনাকে এমনটা বলেছে।কিন্তু রাগনতো কমে না,যতোই রাগ নিরোধক ক্যালপল খান না!ফলে দ্বীপ কেনা হয়ন আর।

একদিন হল কি- কলকাতায় খুব বৃষ্টি হল।জলে জলাকার চারিদিক।রুণু ম্যাডাম আবার অফিস কামাই করতেন না।কিন্তু সেদিন উপায় নেই,গাড়িবডুবে যাচ্ছে জলে।অগত্যা যাওয়া হল না।ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখলেন বাড়িটা যেন দ্বীপের মধ্যে এক জেগে রয়েছে।স্বপ্নও দেখলেন বিস্তর।একদিনের ছুটিতে দ্বীপের স্বপ্ন সার্থক হতে দেখে আনন্দ হল বেশ।সন্ধেয় অনেক দিন পর বাগমারিতে ব্যাঙসহ প্রচুর শেয়ালও হুক্কা হুয়া জুড়ে দিল কারণ তাদের গর্তে জল ঢুকে গেছিল।

রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরদিন সকালে রোদ দেখে আনন্দ হল খুব।রাগও দেখলেন নেই।থার্মোমিটারে রাগের তাপমাত্রা ৯৮।

সেই থেকে রুণুর দুঃখের অবসান হল।

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

যোগ – বিয়োগ || অভিজিৎ চৌধুরী IDY, Short Story,

 যোগ – বিয়োগ

অভিজিৎ চৌধুরী



বাবা বলল,তোর টিম নামতে পারছেনা।তুই তো স্ট্রাইকার।

প্রচণ্ড চোট ডান পায়ে ফাইনালে নামতে পারব না।

বাবা নাছোড়বান্দা, অগত্যা নামতে হল।

অনেক বছর পর।শালবনির মাঠ।

ইস্এই বলটা বি ডি ও সাহেব মিস করলেন!

মাটিতে লুটিয়েও পড়তে পারলাম না,কোন রিফ্লেক্স এখন নেই।

শেঠি ডায়াগনস্টিক সেন্টার মাস ছয়েক পর।

মাসেল পেইন!

ডাক্তারবাবু এক্স – রে প্লেট দেখছিলেন।

খেলতে নেমেছিলাম।

বয়স কতো! 

সাতান্ন।

বেকেনবাওয়ার নাকি মিশেল প্লাতিনি! কোন এক্সারসাইজ করেন!

মুখ নীচু করে বললাম, না।

প্রথমে ফিজিওথেরাপি, তারপর ব্যায়াম।

মাঠে দৌড়াচ্ছে একজন।

কাকীমা বললেন,কেমন আছ!

মোটামুটি।বয়স হয়ে গেল অনেক।

সাচিতা সাচিতা।

একজন এলেন।

তোমার বয়স কতো! 

সাতান্ন।

তোমার বয়সি।নো পেইন কারণ যোগা।

কাকীমা আবার বললেন,ওর কাছে শিখবে!

আমি বললাম,যোগা! 

হ্যা।অনেকে শিখছে তোমার বয়সি বা আর বেশী।

মাঠে তাকিয়ে দেখলাম অনেকেই মাস্ক খুলে প্রাণায়াম করছেন।

আমিও শুরু করলাম যতোদিন না রুটিন থেকে বিয়োগ করছি।

ভাবতেই আবার মাসেল পেইন।

উফ্।

কি হলো তোমার! 

কিছু না,করব।


বুধবার, ১২ মে, ২০২১

অণুগল্প || ফাঁকে ফাঁকে || বিনোদ মন্ডল

অণুগল্প 

ফাঁকে ফাঁকে 

বিনোদ মন্ডল 



    দশ বছরের ধিঙ্গি মেয়ে বাংলায় পেয়েছে পঞ্চাশে পাঁচ। স্কুল থেকে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে সবেমাত্র সোফায় সেঁটে বসেছে আনন্দী। বাংলার দিদিমণি। প্রিয় সিরিয়াল হাঁ করে গিলবে টানা ঘন্টা দুই। তার আগেই মেয়ের হাতবোমায় হাঁ হয়ে গেল সে। 

     টিভি'র সাউন্ড মিউট করে দিলো সে। পোস্ট মর্টেম শুরু করলে খাতাটার। মাথায় ঝড়। উঠোনের কাঁঠাল গাছে কাল-

পেঁচার পাখশাট। 

     এই একরত্তি মেয়ে জন্মানোর পর টানা ছ'মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নেয় আনন্দী। মেয়াদ শেষে সবে চালু হওয়া সি সি এল আবার তিন মাস। এইভাবে এপ্রিল থেকে নভেম্বর প্রায় সারা সেশান স্কুল যেতে হয়নি সেবার। তবে বার্ষিক পরীক্ষার খাতা দেখে দিয়েছিলো যেচে। 

     সেদিনের একটা ঘটনা চকিতে ভেসে উঠলো মনে। সোমা নামের একটি মেয়ে নব্বুইয়ের মধ্যে নয় পেয়েছিলো। তার গার্ডিয়ান কল হয়। ক্লাস নাইনে। কেন এত কম নম্বর পেয়েছে জিগ্যেস করায় মেয়েটি বলেছিলো, বাংলার ক্লাশই তো হয়নি! আর তার বাবা বলেছিলো -- হাড় হিম করা কয়েকটি কথা। আমাকে স্কুলে না ডেকে, আপনারই তো আমাদের বাড়িতে ক্ষমা চাইতে যাওয়া উচিত ছিলো!  বুঝবেন, যখন নিজের বাচ্চা একই গাড্ডায় পড়বে। কারণ, তার কপালেও তো আপনার মতো কেউ জুটবে! 

     মা বাংলার দিদিমণি। শহরের নামজাদা সরকারি স্কুলে। তার দশ বছরের মেয়ে মাতৃভাষায় পেয়েছে পঞ্চাশে পাঁচ। বিজ্ঞাপণের ফাঁকে ফাঁকে এক চিলতে রোদের মতো সিরিয়াল শেষ হয়ে যাচ্ছে আনন্দী সেনের।

রবিবার, ৯ মে, ২০২১

' সুপ্রভাত আসুক ' --- অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়

 '  সুপ্রভাত আসুক '  

                 

                 ---   অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়    



এ পাড়া থেকে ও পাড়া । এক প্রান্তর থেকে আরেক প্রান্তর । প্রায় বিরামহীন খুঁজে বেড়াচ্ছে ।সন্ধান চাই  । যে ভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে । না হলে যে শান্তি নেই  ।

    মলিন পোশাক, ক্ষয়ে যাওয়া চটি , চোখে মুখে ক্লান্তি আর চিন্তার ছাপের পেটেন্ট নিয়ে লোকটি এ ভাবেই প্রিয়জনকে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে ।শহরের এক চক এলাকায় তার শ্রান্ত শরীর নিয়ে বসে পড়ে । কোনো পাড়া থেকে ভেসে আসছে গান-- 'শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ পথে পথে ....।' আজ পঁচিশে বৈশাখ । কোভিড-19 প্রোটোকল মেনে সেভাবে কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না । বেশিরভাগই ভারচুয়াল । 'কোরোনা' প্রতিরুদ্ধ কিছু কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে বাজার হাট আংশিক খোলা ।তাই লোকজনও বাইরে কম । মনে হচ্ছে ভয়ার্ত সভ্যতা যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে । লোকটি উঠে এসে এক টোটো চালককে জিজ্ঞেস করে--

----- হাঁগো, তুমি তাকে দেখেছো ?

------ কাকে  ?

------- ঐযে গো, যে হারিয়ে গেছে ।খুঁজে পাচ্ছি না ।

----- কোথায় বাড়ি  ?

----- তার তো সব জায়গায় থাকার কথা ।

----- ভগবানের মতো  ? পাগল ভেবে দু-একজন যাত্রী নিয়ে হাসতে হাসতে চলে যায় টোটো ।

   লোকটি দমে যায় না । আবার হাঁটতে থাকে । অন্য একটি পাড়া থেকে রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসে । 'আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে....'। কিছুদূর গিয়ে একটি মেডিক্যাল স্টোর থেকে ধোপদুরস্ত এক লোককে বেরুতে দ্যাখে । লোকটি তার সামনে গিয়ে পথ আটকায় । লোকটি প্রশ্ন করে--

------- হ্যাঁ গো, তুমি  দেখেছো ?

------- কি দেখেছি ! কাকে ?

------- ঐযে গো, যে হারিয়ে গেছে ! অনেক খুঁজছি জানো !

------- তোমার কে হয়, কোথায় থাকে  ?

------- নিজের লোক গো ! তোমারও ।

------- কি বলছো বুঝতে পারছিনা । দোকানের মালিক পাগল ভেবে ধমকে সরিয়ে দিলে ।

লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছে,  এক অপ্রতিরোধ্য মানুষ । মনের ভেতর যেন এক অনুসন্ধানের গবেষণাগার কাজ করে চলেছে । আবার চলতে শুরু করল । মাঝেমধ্যে গান বেজে ওঠার মধ্যে দিয়েই আজ মনে হচ্ছে পঁচিশে বৈশাখ । এখন যেমন, ' প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে....' --

      লোকটি একটি অফিসের সামনে এসে পড়ল । অল্প কিছু লোক বাইরে পড়ে থাকা ফ্ল্যাগ , ফেস্টুন ইত্যাদি ঘরে ঢোকাচ্ছে । আর নিজেদের মধ্যে  দেশের দশের কথা আলোচনা করছে । লোকটি ভাবল, বেশ কয়েকজনকে তো দেখছি ; কেউ না কেউ বলতে পারবে ।

----- এইযে দাদা'রা , কতদিন খুঁজে বেড়াচ্ছি, তাকে খুঁজে দেবে?

প্রথম জন---- শালা, নিজেদের কত সমস্যায় ফেটে যাচ্ছে ...। আবার কি হারিয়েছে খুঁজতে হবে!

দ্বিতীয় জন--- তুই কে ? কোথায় থাকিস্  ?

------ আমাকে হতভাগা বলে গো । সব জায়গায় থাকি ।

দ্বিতীয় জন--- কাকে খুঁজছিস ?

------- যে হারিয়ে গেছে  ।

তৃতীয় জন--- কতদিন আগে ?

-------- ঠিক মনে করতে পারছি না গো ।

প্রথম জন---- এই  ফোট ! তোর পাগলামি ছাড়িয়ে দেব।

দ্বিতীয় জন---- তার নামটা মনে করে বল দেখি  । বল--

------ হ্যাঁ,  মনে পড়েছে । নামটা জানি গো ।

দ্বিতীয় জন--- কি ?

------- সুপ্রভাত  ।

তৃতীয় জন--- প্রভাত নামে তো অনেকেই আছে ।কিন্তু সুপ্রভাত .....

দ্বিতীয় জন----- না না চিনি না ।যা এখান থেকে যা ।

       প্রথম জনের ধমকের চোটে আবার পথে নামল লোকটি । এ পথের শেষ দেখতে পায় না সে । প্রশ্ন আছে , উত্তর নেই ।

   বাইরে যতই ক্লান্ত ধ্যস্ত দেখাক, লোকটি কিন্তু দমে যাবার পাত্র নয় । তাই সে এগিয়ে যেতে থাকল প্রশ্ন নিয়ে । তাকে খুঁজে পেতে হবে । দূর থেকে ভেসে আসছে--- ' নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে....।'


           ----------------***--------------

রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১

অলিম্পিয়া বেনেট || ইমরান শ্বাহ || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস

 অলিম্পিয়া বেনেট

 ইমরান শ্বাহ

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস



অলি বেনেটের এই ধরনের পরিণতি হবে বলে ভুলেও ভাবিনি। অলি বেনেটকে  নিয়ে কখনও গল্প লিখতে বসব সেকথাও ভাবি নি। পৃথিবীর নিয়মের ঠেলা ধাক্কায় কিছু ভালোবাসা, কিছু স্বস্তি চাওয়া একজন সাধারন মাপের মহিলা বলেই ধরে নিয়েছিলাম অলি বেনেটকে। অলি বেনেটের শরীরে  দুই-একটি বিশেষত্ব থাকলেও অলিবেনেটে  বিশেষত্ব  ছিল না। কিন্তু এখন যতই চিন্তা করছি অলি বেনেটকে ততই রহস্যময়ী বলে মনে হচ্ছে। না, অলি বেনেট সাধারণ নয় ।তাকে নিয়ে লিখতে বসে ভয় হচ্ছে ।এই আত্মগর্বী মানুষটার প্রতি আমি অন্যায় করতে যাচ্ছি না তো ? আমি কতটুকুই বা জানি অলি বেনেটের ফসিল হয়ে পড়া দ্বন্দ্বাক্রান্ত,কূহকাচ্ছন্ন ,নারী মনের কথা! এই সমস্ত ছোটখাটো সাংসারিক লেনদেনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অলি বেনেট নামে নারীর হয়তো যে প্রচ্ছন্ন মহীয়সীতা তা বুঝে ওঠার সময় এখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে ।সুযোগ এসেছিল ,বোকার মতো সেই সুযোগ হারিয়েছি। কত কথাই শুনেছিলাম। নিজে জানার ,দেখার ,বোঝার সুযোগ পেয়েছিলাম। অলি বেনেট নামের একসময়ের শহরটির মনে ধরা নগর নারীর বিষয়ে। সব কথা আজ আর মনে নেই। মনে রাখার জন্য চেষ্টাও করা হল না। রোমন্থন করলে এই মানুষটির যে ছবি মনে পড়ে তা যেন অসম্পূর্ণ ,ছাড়া ছাড়া । কংকালটা রয়েছে, রঙগুলি বিস্মৃতির বৃষ্টি ধুয়ে নিয়েছে । অলি বেনেটের কথা লিখতে বসে আমার অবস্থা উপরে উপরে পড়ে গিয়ে পরীক্ষার হলে বসা পরীক্ষার্থীর মতো হয়েছে । বইয়ে সব রয়েছে বলে মনে পড়ছে অথচ কলমের ডগায় কিছুই আসছে না । কবিতার একটি পঙক্তি মনে পড়ছে ‌।এক একটি পংক্তি সারি ভুলে গেছি। যা লেখব তা হয়তো হয়ে উঠবে গাঁজাখুরি। নাম্বার পাওয়ার অযোগ্য । আমার তাস খেলার বন্ধুমহল অবশ্য অনেকদিন আগেই অলি বেনেটকে নিয়ে একটা গল্প লেখার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল। তার কারণও ছিল । তখন অলিবেনেট  ছিল ছোট্ট শহরে ছোট ছেলে থেকে বড় পর্যন্ত সবারই আড্ডার এক নম্বরের আলোচনার বিষয় । অলি বেনেটের কথায় অনেক ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়ে যায় । প্রধানত কলেজের যুবকদের কাছে। এরা অলি বেনেটের কাছে   খুব বেশি প্রশ্রয় পায় নি। কেবল দেখেছিল অলি বেনেট এক রহস্যঘন আকর্ষণীয় জিনিস। পঞ্চান্ন  বছরের বিশ্বেশ্বর হাকিমের সঙ্গে অলি বেনেটের কী সম্পর্ক,ত্রিশ  বছরের আবেদালি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে অলি বেনেটের কী সম্পর্ক, পিতৃহীন বিরাট অর্থের মালিক মুরুলির সঙ্গে অলি বেনেটের কিসের এত মাখামাখি ,এই ধরনের সম্পর্কের অজস্র মুখরোচক গল্প বাতাসে উড়ে এসে আমাদের আড্ডা গরম করে জমিয়ে তোলে। অলি বেনেটের সম্পর্কে যেকোনো গল্প তা সে যতই নিরর্থক হোক না কেন,বিনা তর্কে বিশ্বাস করে নেবার জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত। আমাদের কথা হল আড্ডায় জমে যাওয়া যেকোনো বিষয় হলেই হল ।গাঁজা মেনে না নিয়ে যুক্তিতর্কের অবতারণা করা হলে আড্ডার মেজাজ নষ্ট হয়।

আমি তখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি । এক ডজনের মতো গল্প লিখে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করে রীতিমতো লেখক হয়ে বসেছি। আমার বন্ধু মহলে আর ও দুই তিন চার জন ছোটখাটো গল্পকার এবং কবি ছিল । তা সত্ত্বেও অলি বেনেটের গল্পটা লেখার জন্য সবাই আমাকে আনন্দের সঙ্গে স্বত্ব ছেড়ে দিয়েছিল। তার কারণ অলি বেনেটের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে, পথে ঘাটে হেসে কথা বলা, একাধিকবার একই রিক্সায় উঠে যাওয়া  স্বচক্ষে দেখা  অনেককেই পাওয়া যাবে। ওরা ভেবেছিল অলি বেনেট সম্পর্কে  আমি অনেক কিছু জানি । আমি স্বভাবত কম কথা বলি। কম কথা বলা মানুষ বেশি কথা জানে বলে ওদের ধারণা হয়েছে। আর একটা কথা । হয়তো অন্তত কয়েক জন ভেবেছিল, যা ভাবার জন্য ওদের উপরে আমার রাগ হয়েছিল, করুণা ও জন্মেছিল। সংকীর্ণ গণ্ডির  কয়েকটি মাত্র কথা নিয়ে ব্যস্ত থাকা  ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। মানুষের স্বভাবই এরকম। পথ দিয়ে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে একসঙ্গে হেঁটে গেলে ওদের মধ্যে কিছু না কিছু থাকতে পারে ভাবার আগে যে কথা আমরা সংখ্যাগুরু দল ভাবি সেটা কী তা না বললেও চলে। আর অলি বেনেটের  সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে বসে -যাক সেই সমস্ত কথা।

জীবন থেকে ইতিমধ্যে কয়েকটি বছর খসে পড়েছে। চাকরিবাকরি করছি। সারা পৃথিবীর মনে এই একটি প্রশ্নই রয়েছে এবং সেই অবস্থায় পৌঁছেছি যদিও বিয়ে-সাদি করার নতো মনে এখনও সাহস জোগাতে পারিনি। প্রেম-বিয়ে জীবন ইত্যাদি বস্তুগুলির ধারণা বাস্তবের আঘাত পেতে পেতে দিনদিন পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। বেশি মধুর থেকে কম মধুর হয়ে এসেছে। ধূসর থেকে  ধূসরতর । গল্প-টল্প লেখায় আজকাল আর খুব একটা প্রেরণা নাই। তখন লিখেছিলাম রাতকে দিন করার উচ্ছ্বাসে।এখন কখনও সাহিত্যের প্রতি থাকা একটা নৈতিক কর্তব্যবোধের তাগিদে ধরে বেঁধে কলম হাতে নিই। কেবল উচ্ছ্বাসের দ্বারা ভালো সাহিত্য তৈরি হয় না। উচ্ছ্বাস না থাকলে কলম চালিয়ে যাওয়াই কঠিন। সমস্যা অবসর ও নেই।একমাস ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলাম, বহুদিন থেকে মনে মনে পরিকল্পনা করে থাকা একটা উপন্যাস লিখব বলে। আসার সময় ধরে-বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার ভয় বুকে নিয়ে উপন্যাস লেখা কঠিন দেখছি।এমনই একদিনে অলি বেনেটের সঙ্গে দেখা হল। অনেকদিন পরে।  

পোর্টিকতে বসে উপন্যাসটার কথাই ভাবছিলাম। মনের মধ্যে হতাশার ভাব এসেছিল। ছুটিটা বোধহয় এমনিতেই  যাবে। শেষ করা দূরের কথা উপন্যাসটা আরম্ভ করাই বোধহয় হয়ে উঠবে না। নিজের ওপরেই অকারণে রাগ হয়েছিল। অন্যের উপরে। অসমিয়া কিছু লেখক-পাঠক-প্রকাশক সমালোচক জোগাড় করে নিয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছা করছিল। এমনিতে কেমন যেন অসহায় অসহায় বলে মনে হচ্ছিল। তখনই দেখি ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে অলি বেনেট।একদিনের সোনার বরণ হারিয়ে কিছুতেই বাধা না মানা চুল গুলি আর হাঁটার ধরণ থেকেই চিনতে পারলাম।

আগের মতোই ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। আগে অলি বেনেট রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে নতুন করে ভর্তি হওয়া পোষ না মানা মিলিটারির নির্ভীক বুকের মতো উন্নত জঙ্ঘা কাঞ্চনজঙ্ঘার উত্তুঙ্গতাকে নেচে নেচে অবজ্ঞা করে করে গিয়েছিল। এখন সেখানে কিছুই নেই। তার পরিবর্তে  ঝক ঝকে দাঁত বের করে হাসছে। তন্বী বলে এক কথায়  বলে দিতে পারা অলি বেনেটকে এখন খুব বেশি শুকনো বাঁশের বেড়া বলা যেতে পারে।আগের মতোই গাউন পরেছে যদিও তা রেশমের জন্য নয়, তেল চকচকের জন্য জ্বলজ্বল করা জীর্ণ এক বস্ত্র মাত্র। হাইহিলের জুতোয় এক ইঞ্চি ধুলো। এক পাটিতে ফিতা আছে ,অন্য পাটিতে নেই। আগে দেখলে হাতিদাঁত অথবা মোমবাতির কথা মনে পড়ে যাওয়া পায়ের গুলের  স্বাস্থ্যহীনতা এবং যত্নহীনতার অজস্র আঁকবাঁক বিদ্যমান। অলি বেনেট অথবা আট নয় বছর আগের অলি বেনেটের ছায়া অলিবেনেট ভেতরে প্রবেশ করল। 

আমি এক দৃষ্টে তাকিয়ে বসেছিলাম।

‘হ্যালো বিমান,তুমি কখন এলে,হোয়েন?-ও মাই ডার্লিং-হাউ লাভলি ইউ হ্যাভ গ্রোন!’

আর আমি কোথায় পালিয়ে বাঁচব? বুঝতেই পারলাম না। কী বিপদ!কী আক্রমণ!ছোঁ-মারা চিল পাখির মতো এসে অলি বেনেট আমাকে জড়িয়ে ধরল এবং পটাপট গালে মুখে এক কুড়ি চুমু খেয়ে ফেলল। কোনো দিনই দাঁত না মাজা মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। কোনো দিন না ধোওয়া ,হয়তো না খোলাও ঘর্মাক্ত কাপড় চোপড় থেকে মদ মদ গন্ধ বের হচ্ছে। কোনো দিন না কাটা এই বড় বড় নখ যখিনীর মতো গায়ে বিঁধছে। বুঝ ঠেলা। সাত শ্ত্রুকে ঈশ্বর বাঁচিয়ে রাখুক। 

সম্ভাষণের পর্ব শেষ হল। একথা সেকথার পরে ঘপ করে একবার অলি বেনেট আমার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, ওহো ছয় মাস। আচ্ছা ডার্লিং,এখনই আমাকে দশটা টাকা দাও তো। খুব দরকার।মিঃভূঞার গ্রেভে একটা ক্রুস পুঁততে হবে।আজ তার মুক্তির দিন।ডোন্ট মাইণ্ড।কাল পরশু ইউ উইল গেট ইট।কামিং জিন্টুজ মানি –‘মে বি টু-ডে’।…’

অনুরোধের চেয়ে হুকুমের পরিমাণ বেশি ছিল।অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।রকেটের দুনিয়ায় পরিবর্তনও এত বেগে হয় তা ভাবি নি। মাঝখানে আমি এই আট নয় বছর এদিকে-ওদিকে ছিলাম এবং তার সুযোগে মিঃভূঞা গ্রেভে। জিন্টু একেবারে টাকা পাঠানোর মতো হয়ে গেল।প্রহেলিকা প্রহেলিকা বলে মনে হচ্ছিল।কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বেঁচে গেলেই হল।অলি বেনেটের চাহিদা পূরণ করে দিলাম।

মাকে যখন ঘটনাটা বললাম সামনেই বসে থাকা ভন্টি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।আমার নিজেকে বোকা বোকা বলে মনে হচ্ছিল।যাই হোক মা এক ধমক দিয়ে ভন্টিকে দূরে পাঠিয়ে অলি বেনেটের কথা আমাকে বলেছিল।মা বলেছিল…কথাগুলি একটু আগে থেকেই শুরু করা যাক।

আমি যখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি তখন অলি বেনেট পপুলারিটির চূড়ান্ত শিখরে।ছেলে থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবার মুখে মুখে অলি বেনেট। পায়ে হেঁটে হাইহিলের জুতো পরে সর্বাঙ্গ দুলিয়ে দশটার সময় স্কুলে যায়।পথে দেখা হলে পরিচিত-অপরিচিত প্রত্যেকেই সুন্দর করে হাসি-‘কী খবর,ভালো?’-বলে কথা বলে যায়।নিজে চিনতে না পারলেও বোধহয় অলি বেনেট ধরে নেয় সবাই অলি বেনেটকে জানে। কথাটা সত্য। স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় বেনেট সবসময় রিক্সায় আসে।এসেই বাড়িতে কী খেল কী না খেল সেজে গুজে আবার বেরিয়ে যায়। এক প্রহর রাত পর্যন্ত অলি বেনেট কোথায় যায়,কী করে সেই সমস্ত তত্ত্ব স্বয়ং ভগবানও জানে কী না সন্দেহ রয়েছে। রাতে বাড়ি প্রবেশ করার সময় জিন্টুর নাক ডাকে।আর নাক ডাকে স্কুলের চৌকিদার জিন্টুর বিকেলের রাখাল রঘুনাথের।একটা শিশুও জিন্টু চৌকিদারনীর তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছে বলা যেতে পারে।আর তারপরে মানুষের মুখে মুখে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য হাজার গল্প রূপ লাভ করলে কাকে আর দোষ দেওয়া যেতে পারে।চাঁদের বুকে খরগোসের বসে থাকার কথা,স্বাতী নক্ষত্রের চোখের জলে মুক্তো হওয়ার কথা,সুন্দর সুন্দর কল্পনা করতে পারা দেশের মানুষ আমরা।আমাদের কল্পনা যখন লাগাম ছাড়া হয়ে নারী পুরুষের অবৈধতা,কেলেঙ্কারী,কথা কল্পনা করায় উঠেপড়ে লাগে তার দৌড় কতটা হয় সহজেই মনে করা যেতে পারে।কার সাধ্য রোধে তার গতি!আর অলি বেনেট নির্বিকার।

তখন আমার ডজন চারেক গল্প লেখা হয়ে গেছে।আমাদের ছোট শহরটিতে আমিই এক প্রকার শিয়াল রাজা।মাসিক,পাক্ষিক,সাপ্তাহিকে গল্প বেরিয়েছে।বিকেল চারটের সময় কলেজ থেকে গম্ভীর পদক্ষেপে একা একা বাড়ি ফিরে আসি। একা আসার কারণ ছিল। নির্জনতাকে ভালোবাসার চেয়েও অন্য কোনো একটা কারণ। আর কলেজ থেকে ফিরে আসার সময় প্রায়ই পথে অলি বেনেটের সঙ্গে দেখা হয়।পেছন থেকে রিক্সায় আমাকে পেছন ফেলে এগিয়ে যায়।কখনও ডাকে না।প্রায়ই ডাকে।আমার গল্প কোথাও বের হলেই ডাকে।‘-ওহো সুইট বিমান,তোমার গল্পটা পড়লাম।ওহো সুইট-কী নাম ছিল গল্পটার?-‘অলি বেনেট সব সময় আমার গল্প পড়ে আর সব সময় নামটা মনে থাকে না।

তারপরে একদিন।

কলেজ থেকে এসেছি।হঠাৎ একটা রিক্সা পেছন থেকে এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।অলি বেনেট!-‘কাম অন ডার্লিং বয়।’-আমার কোনো-‘চাই না আমি হেঁটে যাব।’আমার কথা না শুনে অলি বেনেট আমাকে রিক্সায় তুলে নিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল।দুটো রুমের ছিমছাম বাড়ি। আসবাব পত্র বিশেষ নেই।বর্ণনা দেওয়ার চেয়ে না দিলেই অলি বেনেটের বাড়িটার বিষয়ে উচিত কথা বলা হবে মনে হয়।

‘আমি বিছানাটায় বসেছিলাম।আমার পাশে বসেছিল অলি বেনেট।কোনো প্রস্তাবনা ছাড়াই পেছন থেকে অলি বেনেট সাপের মতো মিহি দুটো হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।অনতিবৃহৎ সুদৃঢ় স্তন যুগল আমার পিঠে যেন বিঁধে যাচ্ছিল।আমি ঘামছিলাম।অলি বেনেট খুব ধীরে ধীরে বলেছিল-‘একটা গল্প লিখবে বিমান।আমার গল্প।ইউ মাস্ট রাইট ইট,-অফকোর্স।’ 

বলার মতো কথা খুঁজতে গিয়ে আমি ইতস্তত করছিলাম।একটু দূরে সরে বসার জন্য চেষ্টা করে শরীরটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করছিলাম। আমাকে ছেড়ে না দিয়ে অলি বেনেট বলেছিল-‘ইউনিক,একটা স্টোরি হবে জান? দেখায় আমি মেটার অফ ফ্যাক্ট হতে পারি। কিন্তু আসলে নয়।তোমাকে আমি সব কথা বলব। তোমাকে লিখতেই হবে।আজ নয়,অন্য একদিন নিরলে বসব কেমন। আজ তুমি চলে যাও।’

…বন্ধু মহলে খবর পৌছে গিয়েছিল। আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নবাণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলাম। অন্য কথার অবতারণা করে এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। ফলে ওদের সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছিল। শেষে আমাদের তাসের আড্ডার স্পষ্টবাদী সভ্য রমেশ তাসজোড়া সাফল করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল , ‘ঠিক আছে,আমাদের বিমান ভাইয়ের হয়ে গেছে। যা ভাই,আমাদের কী? আমার একটা কথা খালি মনে রাখবি –সি উইল ডেভায়ার ইউ রাইট টু দি বোনস।অলি বেনেটের শরীরে নরখাদকের রক্ত আছে। এক নাম্বার মেন-হান্টার। এণ্ড,ইউ আর সফট এনাফ।’

কান মাথা লাল করে বসে থাকা ছাড়া আর কী করতে পারি আমি!

তারপর থেকে আমি অলি বেনেট থেকে পালিয়ে বেড়াতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বেশিদিন পারলাম না।একদিন পথে পাকড়াও করে অলি বেনেট আমাকে নিয়ে বাড়ি গেল। ভয়ে ভয়ে ইষ্ট নাম জপ করে আমি ভেজা বেড়ালের মতো বসে ছিলাম।আমার সামনে বসেছিল অলি বেনেট।আগুনের মতো যৌবনবতী যুবতি আমাকে জড়িয়ে ধরে নি। তুলনামূলক ভাবে কৃশকায় আমাকে বিছানায় টেনে নিয়ে যায়নি। অনেক সময় অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পরে অলি বেনেট সত্যিই আমাকে নিজের জীবনের কাহিনি বলেছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি বসে বসে শুনেছিলাম,কিন্তু ভয়ে ভয়ে। 

আমরা বিসর্জন দেওয়ার জন্য নানা রকম রং মেখে প্রতিমা সাজাই। কে জানে এই অন্তরঙ্গতার পরিণতি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে কিনা? অলি বেনেটের কাহিনি বলছিলাম। ধীরে ধীরে রাতের বয়স বাড়ছিল। কখন পালাই ,কখন পালাই মনে হচ্ছিল। এত রাত পর্যন্ত অলি বেনেটের সঙ্গে কাটানোর পরে কে জানে আমার জীবনে সূর্যের আলো আগামীকাল সকালবেলা আগুন হয়ে আসবে না। কিন্তু হায় এখন ভাবছি, তখন কিছুটা মনোযোগ না দিয়ে কত টুকরো হীরে হারিয়ে ফেললাম!

'তোমার খুব ভয় হচ্ছে তাইনা? বুঝতে পারছি'- অলিবেনেট নির্লজ্জের মতো হাসছিল,- মানুষেই আমাকে ভয় করে। করবেই। এই যে মানুষগুলি আমার বদনাম করে- আই ডোন্ট কেয়ার এ ফিগ- জান? কখন ও দুঃখ হয়। ডিউ ড্রপের  মতো নিষ্কলুষ একজন মানুষের সঙ্গে আমার বদনাম হলে আমার দুঃখ হয়। কী করবে !আমি নিরুপায় ।আর এই মানুষগুলি এত খারাপ, কেউ বুঝতে চায় না ।কেউ না ।সেইজন্যই নিজের কথা নিজের মধ্যেই রাখি ,কাউকে কিছু বলি না। তুমি হয়তো আমাকে বুঝতে পারবে ,এই ভুল আমি কেন করি।তোমার গল্প আমি পড়েছি ,আমি বুঝেছি অসহায় নারীর প্রতি তোমার কমপ‍্যাশন আছে। তুমি বুঝতে পারবে। তুমি আমার গল্পটা লেখ। লেখবেই। অন্তত আমার জন্যই তোমাকে ভালোবাসা। আয়না দেখতে আমার ভালো লাগে। কত ভালো লাগবে তোমার গল্পে আমার নিজেকে সজীব হয়ে উঠতে দেখে। আর ও ভালোভাবে হয়তো নিজেকে চিনতে পারব।…'

অপূর্ব !অদ্ভুত আর অপূর্ব! এই ধরনের আবেগ মাখানো ভাষায় এক নারী আত্মকাহিনি বলতে পারে। আমি জানি সেই অন্তর উজাড় করা ভাষায় আমি আজ আর লিখতে পারব না ।কোনোদিনই পারতাম না। আজও মনে আছে সেই আবেদন ।সেই মনের কথা উজার করে বলার এক আকূতি। ক্ষমা কর আমাকে অলি বেনেট - তোমার কাহিনি আমি আমার অক্ষম ভাষায়  বলতে গিয়ে অক্ষমনীয়  পাপ ও যদি করে ফেলি ।

মিঃভূঞার সঙ্গে অলি বেনেটের প্রথম যখন পরিচয় হয়, তখন বেনেট প্রথম বার্ষিকের ছাত্রী।চঞ্চল প্রজাপতি অলি বেনেট তখন অযুত রোমিও য়ের স্বপ্ন জুলিয়েট। কিন্তু অলি বেনেট মিঃ ভূঞার  সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে বুঝতে পারলেন প্রেম কেবল একটি কোমল শব্দই নয় । অলি বেনেট বুঝতে পারলেন এই পৃথিবীতে একমাত্র যুবক যার জন্য অজস্র জীবনের তপস্যা উৎসর্গ করে দেওয়া যেতে পারে । ফুলশয্যার রাতে এই যুবক অলি বেনেটকে বলতে পারবে,তোমার আমার প্রেমের গাথায় ফুলশয্যার রাতের  খুব বড় কোনো মানে নেই জান অলি? কারণ-'

কারণ প্রেমের জন্য যে প্রেম তাতে বস্তুজীবনের কোনো মানে নেই। কারণ  অলি বেনেটের  জীবন বৃত্তান্ত শোনার পরে মিস্টার ভূঞা অলি বেনেটকে সহানুভূতিতে গলে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন-' তোমাকে আমি বিশ্বের  চোখে মহান আসন  দেব অলি। আমি দেখিয়ে দেব  জন্মের চেয়ে প্রেম অন্তর অনেক বড়।' আর  অলি বেনেট-তাকে যদি ভুল বলা যেতে পারে- ভুলটা করে ফেলেছিল।  হাসতে হাসতে। সামান্য একটা কথা ভেবে লাভ ইজ এ বিউটিফুল থিং বাট ইট স্পয়েলস ক্যারেক্টার ।-দায়িত্বের কাছে আত্মসমর্পণ যদি চরিত্রহীনতা হয় তাহলে সেই চরিত্রহীনতাকে  অলি বেনেট কপালে তিলক করে পরতে রাজি।

একটা কম বেশি পরিমাণে গতানুগতিক কাহিনি। উজান অসমের কোনো একটি চা বাগানের নাগা ক্রিশ্চান নার্স ছিলেন আলমলা রেংমা। খুব শীঘ্রই আলমলা সাহেব ডাক্তারের মেম হয়ে    অলমলা বেনেট হয়ে পড়েছিল। সেই এক অনেক নারী করে আসা পুরোনো ভুলের চিহ্ন স্বরূপ পৃথিবীতে  এসেছিল অলিম্পিয়া বেনেট এক  রহস্যময় ভবিষ্যৎ সামনে নিয়ে।  যথানিয়মে ডাক্তার সাহেব বেনেট দেশে ফিরে যাওয়ার পরে আলমলা বেনেট পুনরায় নার্সিং নিয়ে  মেয়েকে বড় করার চিন্তায় জীবন নিয়োজিত  করেছিল। লোকেরা বলে হয়তো খুব একটা মিথ্যা কথা নয় নার্স গিরি ছাড়াও আলামালা আরও অনেক কিছু করতেন। করতে হয়েছিল। বড় কথা নয়। আর আমার জন্য মেয়ের ভবিষ্যৎ অনেক বড় আর মেয়েটিকে কনভেন্টে রেখে পরিয়ে কলেজ অবধি নিয়ে যাবার জন্য একটা বিশাল খরচ। একজন নার্স কত টাকা বেতন পায়? অলি বেনেট যখন আইএ পাস করে তার ঠিক পরেই জিন্টুর জন্ম হয়। ভুতের ওপর দানোর মতো   এই সময়ে  আলামলার মৃত্যু হয়। তখন মিস্টার ভূঞা ছিলেন  এই পৃথিবীতে  জাত পাত নিয়ে আশ্ৰয় হীন। একটা প্রেসে চাকরি করে টিউশন করে পড়াশোনা চালাচ্ছিল। তার চেয়েও বড় কথা  মিঃ ভূঞা ছিলেন ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সাংঘাতিক মেধাবী ছাত্র । 

দায়িত্বের জন্য জীবন উৎসর্গ করে মহৎ ত্যাগ আদর্শ গ্রহণ করার মধ্যেই তো দয়িতা  নারীর প্রানের শান্তি। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং জারজ সন্তান জন্ম দেওয়ার কেলেঙ্কারিতে মিস্টার ভূঁইয়াকে সংশ্লিষ্ট করে মানুষের চোখে ছোট করে তুলতে অলি বেনেট রাজি হল না। মিস্টার ভূঞা যে অলি বেনেটের প্রাণের দেবতা। এখন নয়। এখন নয়। পরে আরও  পরে। অর্থহীন এক  উচ্ছ্বাস অলি বেনেটকে পেয়ে বসেছিল। কিছু একটা বড়, কিছু একটা দশজন মেয়ে করতে না পারা নিজেকে অসামান্য প্রেমিকা বীরাঙ্গনা বলে প্রতীয়মান করার লোভ হয়েছিল প্রেম বস্তু অন্ধ করে ফেলা এই মেয়েটির মনে। 

মিস্টার ভূঞার ওপরে অনুরোধ,  অনুযোগ নয় রীতিমতো হুকুম হল। তাকে পড়াশোনা চালু রাখতে হবে। আর খুব নাম করে বিএ তার পরে এম এ   পাশ করতে হবে। এই সমস্ত প্রেস ট্রেস টিউশনি ফিউশনি আর চলবে না। খরচ? কিছু একটা হবে।

মিস্টার ভূঞা থার্ড ইয়ারে নাম লেখালেন। জিন্টুকে সঙ্গে নিয়ে অলি বেনেট সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ছোট শহরে  এলেন। একটি নবপ্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে । সেই সময় আইএ পাশ শিক্ষয়িত্রী পাওয়া কঠিন ছিল। নতুন স্কুল, খুব বেশি বেতন দিতে পারবে না । নিজের যোগ্যতা এবং কর্মদক্ষতায় অলি বেনেট চাকরিতে স্থায়ী হয়ে গেলেন । কিন্তু সত্তর আশি টাকায় কোনোমতেই সংসার চলে না। আরও টাকার প্রয়োজন। আর ও…

  দুই তিনটা টিউশনি যোগাড় করে নিয়েছিল। কিন্তু আরও টাকা চাই। বাধ্য হয়ে অলি বেনেট আপাতদৃষ্টিতে কুৎসিত ,হয়তো হীন, একটা পন্থা বেছে নিলেন। অলি বেনেট বলেছিল…

' হীনতা সহ্য করা খুব কঠিন কথা, বিমান । কিন্তু আমার মনের দ্বন্দ্ব তোমাকে কীভাবে বোঝাবো? একদিকে প্রেম অন্য দিকে পৃথিবী। দুঃখীর পৃথিবীতে প্রেম বেঁচে থাকে না। লাভ নকস এট দী ডোর এণ্ড ফ্লাইজ বাই দী উইণ্ড এট দী সাইট অফ পভার্টি। মিস্টার ভূঞা বড়লোক হতে না পারলে আমাদের প্রেম সম্পূর্ণ হতে পারবে না। কোমল জিন্টু কষ্ট পাবে । বাধ্য হয়ে আমি মানুষের সঙ্গে খুব মেলামেশা করতে লাগলাম। এই শহরে এমন কোনো বাড়ি নেই এমন একজন বিভিন্ন বয়সের মানুষ নেই যার সঙ্গে আমি অন্তত মাসে এক ঘন্টা সময় কাটাই নি। এত নিচ এই মানুষগুলি। আমি কাছে গেলেই যেন সবাই তৎপর হয়ে উঠে। আমার মন পাওয়ার জন্য। মন অথবা দেহ। আমার জন্য যেন সবাই সাগর মন্থন করতে প্রস্তুত । এই কয়েক বছরে আমি কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, কত চক্রান্ত, কত প্রলোভন। মিস্টার ভূঞার  প্রতি আমার ,আমার প্রতি মিঃ ভূঞার । ডিভাইন লাভের  জোর যদি না থাকত তাহলে হয়তো আমি ইতিমধ্যে উড হেভ বিকাম এ রেগুলার প্রস্টিটিউট।'

খিলখিল করে পুনরায় নির্লজ্জের মতো হেসেছিল অলি বেনেট। তাহলে কীসের খোঁজে মানুষের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াও তুমি?- জিজ্ঞেস করিনি যদিও সেটাই আমার প্রশ্ন হয়ে আমার ঠোঁটের ডগায় এসে থেমে গিয়েছিল। অলি বেনেট বলেছিল-‘ তুমি হয়তো দেখেছ ব্যাগটা আমার কত বিশাল। মানুষ ভুল বুঝে, এর মধ্যে কিছু থাকেনা। জান বিমান, ভাত  আমি প্রায়ই খাইনা। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভদ্রলোকের সঙ্গে মেলামেশা করে চা টা খেয়ে আমার পেট ভরে যায়। দেখতেই তো পাচ্ছ, আমি একটু সুবিধা পেলেই ব্যাগটিতে সবার অজান্তে নিমকিটা, আপেলটা ভরিয়ে নিই। সপ্তাহে দুই চার দিন কারও  কারও বাড়িতে ভাতও জুটে যায়। জিন্টুর জন্য অল্প ভাত বানাই। আমার চলে যায়। ভাত খাবার সময় অতিথি এলে তুমি তো আর তাড়িয়ে দিতে পার না।‘

আমার লজ্জা লাগছিল। অলি বেনেট কিন্তু হাসতে হাসতে বলছিল । ‘আর তো বেশিদিন নেই । লেট মিস্টার ভূঞা কাম। আমাদের বিয়ে হবে। পুরো শহরটাকে খাওয়াব। ভূঞা চাকরি করবে আর সবাই জানতে পারবে হু ইজ জিন্টু  ভূঞা।'

আশ্চর্য এবং বেশ প্রলোভনযুক্ত মনে হয়েছিল যদিও অলি বেনেটের গল্পটা তখন আর লেখা হল না। শেষের কাজটিতে অলিবেনেটের স্বার্থপরতাকে আমি সহজভাবে নিতে পারিনি। সেই জন্য। হয়তো আমার তাসের বন্ধু মহলকে ভয় পেয়েছিলাম। কী ঠিক,  রমেশ সোজা সুজি বলে দিতে পারে এসব তোর উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা । আসলে তুই লস্ট আণ্ডার দেট  সিলেকশন গাউন। আর রমেশ তো শুধু আমাকে বলেই ছেড়ে দেবে না । সেই জন্য।…. 

…. টাকা দশটা নিয়ে অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে  অলি বেনেট চলে গিয়েছিল। মা তারপরে অলি বেনেটের তার পরের ঘটনাগুলি বলেছিল। শোনা কথা। খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাছাড়া এই সমস্ত খবর তৈরি করা মানুষ আমি জানা খবরটুকু জানেনা । যাইহোক মায়ের বলা কাহিনীর সঙ্গে আমার মুক্ত কল্পনা যোগ দিলে অলি  বেনেটের গল্পটা  এই ধরনের হবে।

অনেক কষ্ট করে অর্জিত এবং অনেক হীনতা সহ্য করে পাঠানো অলি বেনেটের টাকায় মিস্টার ভূঞা  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি নিয়ে এমএ পাস করলেন । আনন্দে উল্লসিত হয়ে অলি বেনেট চিঠির পরে চিঠি দিয়ে যেতে লাগলেন । প্রথমে মিঃ ভূঞা  উত্তর দিতেন ।-'আর কিছুদিন অপেক্ষা কর অলি। আমি এখানে একটি কলেজে চাকরি করছি। কিছু টাকা তো লাগবে । কিছুদিন অপেক্ষা কর । আমি আসছি।'

কিন্তু মিস্টার ভূঞা এল না। কোনো একটা তারিখ থেকে তার চিঠি  কমে এল। তারপর কোনো একটি তারিখে বন্ধ হয়ে গেল। অলি বেনেটের অন্তর চমকে উঠলঃ' আমার জন্য নয়। অন্তত তুমি জিন্টুর  জন্য একটু তাড়াতাড়ি কর। ওকে আর কতদিন তুমি জারজ করে রাখবে ?সে বড় হয়েছে ।বাবা কোথায় জিজ্ঞাসা করে।টাকার কথা তুমি ভেবনা।'

তারচেয়েও যদি মিঃভূঞা  উত্তরে  একটা বিষের বোতল দুটো প্রাণীর জন্য পাঠিয়ে দিতেন।মিঃ ভূঞা লিখলেন-' প্রেমে পড়ার ভুল একটা বয়সে মানুষ করেই থাকে। সেই ভুলকে খামচে ধরে থাকা মূর্খতা মাত্র। তোমার বংশগৌরব আমার চেয়ে তুমি বেশি ভালো করে জান। সেটা আমি ক্ষমা করতে পারি।  কিন্তু এটা? আমি এখানে  থাকাকালীন  তুমি সেখানে করা কীর্তিকলাপগুলিকে  তুমি প্রত্যেকটাই মিথ্যা বলবে নাকি? টাকার কথা  ভাবতে তুমি সহজেই মানা করে দিতে পার। দিনটা কাটানোর জন্য স্কুল আছে  রাত কাটানোর জন্য ….। যাক সেইসব ভাবা ও পাপ । জিন্টুর কথা এত করে ভেবনা ।মা বাবার বিয়ে না হলেও সন্তানকে ফেলা যায়না তার প্রমান তো তুমিই। তা ভূঞাই লেখুক বা বেনেটই লেখুক  আমার আপত্তি নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করলে তোমার মাঝখানের এই অতীতটা মুছে ফেলা যাবে না। আমি চিৎকার করে করে জিন্টু আমার ছেলে বললেও পৃথিবীর মনে প্রশ্ন থেকেই যাবে। সত্যিই কি তাই? তুমি হয়তো শুনে সুখী হবে আমি এখানে আমার মতোই শিক্ষিত খুব উচ্চ বংশের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি । আমার অতীতকে হাসতে হাসতে মেনে নিতে পারা মেয়ে। তোমার প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব। অনুগ্রহ করে জানাবে জিন্টু কত টাকা মাসে পেলে চলতে পারবে। তুমি ও...।'

আত্মহত্যা করাই উচিত ছিল যদিও এর পরেও অলি বেনেট বেঁচে থাকল। এখন অলি বেনেটের দিনরাত্রির চিন্তা হল জিন্টুকে মানুষ করে তোলা। এত বড় মানুষ যাতে পরবর্তী কালে তার আর  পিতৃ পরিচয়ের কোনো দরকার না পড়ে। জিন্টুর পরিচয়ের কাছে যেন মিস্টার ভূঞার পরিচয় খর্ব হয়ে পড়ে। সে  হবে এক প্রেম  প্রত‍্যয়ের সন্তান। কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। কত ক্ষুদ্র এই পরিচয় । কিছুটা লোভ, অল্প কামনার জন্য এই ব্যক্তি এক দেব শিশুকে ডেকে এনে অন্ধকার হিমের  রাতে উঠোনে বের করে দিতে পারে কাঁদতে কাঁদতে ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাবার জন্য । কত সংকীর্ণ এই পরিচয়।

অলি বেনেট আর একটি কথাও বলল না। চিঠি লিখল না। মিস্টার ভূঞাকে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চেষ্টা করে জিন্টুকে বুকের রক্তে মানুষ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিরবচ্ছিন্ন সেই প্রচেষ্টার কথা বলে মা বলেছিল 'জিন্টুই ছিল  অলি বেনেটের জীবন। মানুষটা ছেলেটির জন্য কী না করেছিল। এমন না হয়ে  আর কী হবে!'

তারপর থেকেই অলি বেনেটের সেরকম হল। ক্লাস ফোর কী  ফাইভে পড়ার সময় জিন্টুকে নিষ্ঠুর ভগবান অলি বেনেটের  কাছ থেকে কেড়ে নিলেন। মৃত্যুর পরে এক সপ্তাহ অলি বেনেট বাড়ি থেকে বের হয়নি । তারপর বেরিয়ে এল।

আমার ভুল হতে পারে ।কিন্তু ভুল হলে সুস্থ থাকলে অলি বেনেট ক্ষমা করতেন বলে আমি জানি। আজকাল অলি টো টো করে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। পেলে খায়, না পেলে নেই। কাপড় চোপড়ের কোনো খবর নেই। জুতোর ফিতে নেই, কারও সঙ্গে দেখা হলেই জিন্টুর কথা বলে। কীভাবে এম এ তে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। কীভাবে রিসার্চ  করে ডক্টর হয়েছে। ডাকঘরে গিয়ে খবর করে বারবার চিঠি এবং মানি অর্ডার আছে কিনা । মিস্টার ভূঞা এখন কোথায় জানিনা। কখনও দেখা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা আছে। জিন্টুকে নিজের অন্য এক চেতনার দেশে অলি বেনেট খুব বড় মানুষ করে তুলেছে,অলি বেনেট নামে একজন মাতা। মিঃভূঞার উপরে কোনো অভিযোগ নেই অলি বেনেট নামের একটি ছোট ক্ষীণাঙ্গী প্রেম সর্বস্বা নারীর। অন্য চেতনার দেশে অলি বেনেট কোনোদিন কাছে না আসা প্রেমিককে ভুল করে মৃত বলে ধরে নিয়ে তার কল্পিত প্রেমে এখনও প্রেমের ক্রুস পুঁতে। সব সময়। অলিম্পিয়া বেনেট নামে একজন প্রেমিকা।... 

---------

  লেখক পরিচিতি-অসমিয়া সাহিত্যের প্রসিদ্ধ গল্পকার,কবি, ঔপন্যাসিক ইমরান শ্বাহ ১৯৩৩ সনে শিবসাগরের ধাই আলিতে জন্মগ্রহণ করেন। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ‘বনবাসী’ নামে কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে অপরিচিতা, ক্রান্তিরেখা ,জবানবন্দি, সাগরিকা,বর্ণালী, বনজ‍্যোৎস্না, আদি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।পথিক,প্রতিবিম্ব, পোড়া মাটির মালিতা,বন্দী বিহঙ্গম কান্দে, হয়তো বা দেবদাস, কুকুহা অন্যতম গল্প সংকলন। অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি ইমরান শ্বাহ অসম ভ‍্যালি লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড এবং পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হন।

 




 


 





 






শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

গল্প বেঁচে থাক্ , সুখী হ ..... অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়

  গল্প

বেঁচে থাক্ , সুখী  হ .....

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়




সার্বভৌম দেশের এর থেকে বেশী  গণতান্ত্রিক বাধ্য প্রজা আর কি রকম হবে ! খেতে পেলে খায়, ঘুম না পেলে ঘুমায় না ।থাকার জন্য গাছের তলা কিংবা  অব্যবহারযোগ্য  কোন শেডের নীচের জায়গাটুকুই যথেষ্ট নয়  ?  হাঁ, ওরা অনায়াসে এই প্রশ্ন সত্য যুগের বরপ্রাপ্ত বাণের মত ছুঁড়তে  পারে  । উদাসী ব্যস্ত  মানুষের বর্ম এতটাই শক্তিশালী যে, এইধরনের বান মোটেই বিদ্ধ করেনা । কিংবা এতটাই  করে যে, কেন্দ্রাতিগ বলের মত অন্য ঠিকানায় অঙ্গুলি নির্দেশ করে  । এদের কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই  । রেগে যাওয়ারও কোন অধিকার নেই  । শুধু অধিকার আছে ভিক্ষে চাওয়ার । জন্ম থেকে কেবল ভয় তাদের পিছু ছাড়ে না । দয়া করে কেউ কিছু দিলে  কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায়  ।

        ঠিক যেমন আজ এক দয়ালু ব্যক্তি কিছু গরম ভাত তরকারি দিয়ে  গেলেন  । না , কোন ক্যান্টিন থেকে সে জানে না ; জানার কথাও নয় । তিনটে বাচ্চা ছেলে মেয়ের মা প্রণাম করে আশীর্বাদ দিল অপটু বাংলায় ।আবার  বিকেলের দিকে ছেলে তিনটের জন্য অন্য দুজন দিয়ে গেলেন জামা প্যান্ট  । তাদেরকেও প্রণাম জানাল মা । নিজে শতচ্ছিন্ন মলিন পোশাকে থাকলেও , ভিক্ষে পেয়ে ছেলেমেয়েগুলো  তো দুদিন একটু আনন্দে থাকল । তার অনেক কিছু না থাকার মধ্যে ভোটও নেই ।এতটুকু আগ্রহও নেই । তা সত্যি, যে জিনিস যখন তখন কেউ কেড়ে নিতে পারে,  তা থাকা না থাকাই তো সমান । মা শুনতে পেল একজন আরেকজনকে বলছেন,  শুভ নববর্ষ  । যাই হোক , Happy New Year এর মত আর আনন্দ কই ! বাংলা নতুন বছর ক্যামন যেন ম্যাড়মেড়ে । গল্প করতে করতে  বাংলা বছরের মত কোথায় মিলিয়ে গেল  ।

           বাচ্চা তিনটের মা ভাবল, এই গরম ভাত, নতুন জামা কি তাহলে নতুন বছরের জন্য  ? নতুন বছর তো খোব ভাল  ! তাহলে এবার অনেক কিছুই হবে ....। ছেলে মেয়েগুলো যদি পড়তে পারত .....। আর ইংজিরি শিখে গেলে , আর ভিক্ষে করতে হোত না ।

       শেষমেষ সেই মা আশীর্বাদ করে বসল , বাংলা নতুন বছরকেই । বেঁচে থাক্ বাবা নতুন বছর  । সুখী হ  ।

মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১

নারী দিবসের গল্প || হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

নারী দিবসের গল্প

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়



বুড়ো আঙুল ভাব,কড়ি আঙুল আড়ি।টুসুর সঙ্গে আমার কড়ি আঙুলের সম্পর্ক।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল দুজন দুজনকে কড়ি আঙুল দেখানো মাত্র টুসু চলে আসে আমার ঘরে।

ঘরে টুসুর জন্য বিভিন্ন ফ্লেভারের ক‍্যাডবেরি,লজেন্স রাখা আছে।টুসুর ক্লাস ফোর।লরেটো।টুসু একটার বেশি নেয় না।

তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আবার কড়ি আঙুল দেখিয়ে বেরিয়ে যায়।আমরা সামনা সামনি বাড়িতে থাকি ।টুসুর বাবা সুমিত কাজের জন্য বাইরে থাকে।তিন চার মাস বাদে বাড়ি এলে টুসু আর আমাকে পাত্তা দেয় না।বাবার সঙ্গে তখন তার যত গল্প।মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো না।সারাক্ষণ পড়তে বলে।একদিন সকালে নীল রঙের ফতুয়ার সঙ্গে সাদা পায়জামা পরে ব্রাশ করছি,দেখি স্কুল বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে টুসু।আর নাচ প্র‍্যকটিস করছে।বেচারির অন্য কোনো সময় নেই।

লেখাপড়ার খুব চাপ  ।

হঠাৎ টুসু দেখতে পায় হলুদ জামা আর বেগুনি জিনস পরা একটি মেয়ে।গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসছে।এগিয়ে এসে আমার নাম জিজ্ঞেস করল।টুসু নাচতে নাচতে নিয়ে আসে আমার কাছে।

নীলাঞ্জনাকে আমার দরজা চিনিয়ে দেয়।

আমি দরজা খুলে আকাশ থেকে পড়ি।

টুসু একবার আমার দিকে তাকায়, একবার নীলাঞ্জনার দিকে।তারপর কড়ি আঙুল দেখিয়ে

ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে নেমে যায়।

শনিবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২১

অনুগল্প: || কালো মেয়ের কথা || চন্দনা দত্ত

 অনুগল্প:

             কালো মেয়ের কথা
                      চন্দনা দত্ত



 
  মিসকালো  বিধবা ব‌উটা যে মাধ্যমিক পাশ তা কেউ জানত না।বহু কষ্টে একে তাকে ধরে পঞ্চায়েত দপ্তরে ঝাড়ু দেওয়ার ঠিকে কাজটা জোগাড় করে। সারা দিন তাকে গাধার খাটুনি খাটতে হয়। কিন্তু পয়সা পায় দু মাস বা তিন মাস ছাড়া। তাকে সবার চেয়ার টেবিল ঘর পরিষ্কার রাখতে হয়। একটু এদিক ওদিক হলেই মুখ ঝামটা খেতে হয়। গায়ের রং নিয়ে খোটা শুনতে হয়।এই কেলে মাগীটাকে কে জোটাল বলত। দাঁড়া নতুন পঞ্চায়েত গঠন হলে তোকে আগে বাদ দেওয়া করাব। লুকিয়ে সে ফেলে দেওয়া কাগজ পত্র বা এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা ব‌ই পত্র পড়ে।তার ধারনা ছিল যে সে মাধ্যমিক পাশ এটা জানতে পারলে তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে। কিন্তু তার এই বিদ্যার কথা জানত একজন রাজনৈতিক নেতা।
 দেখতে দেখতে পঞ্চায়েত নির্বাচন এসে গেল। নির্বাচনের পর নতুন বডি তৈরি হল। বি ডি ও অফিস থেকে আসা আধিকারিক মহাশয় যখন ঘোষনা করলেন যে এবারের মত প্রধান নির্বাচিত হলেন সরলা মাল। অর্থাৎ সেই কালো মেয়েটা। তাকে বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী করা হয়েছিল। যে জানত যে সরলা মাল মাধ্যমিক পাশ সে বহু কষ্টে বুঝিয়ে তাকে নির্বাচনে প্রার্থী করে।তার পর নির্বাচনে জেতা এবং প্রধান হ‌ওয়া।
  কিন্তু এরপর বাঁধল গোল। সরলা কিছুতেই প্রধানের চেয়ারে বসবেনা। সেখানে নতুন তোয়ালে দিয়ে ঢাকা নতুন চেয়ার এসেছে। সে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল।বাবুগো তোমরা আমাকে নিয়ে একি করলে।যারা আমাকে নিয়ে মস্করা করত আজ তারা ম্যাডাম বলছে, বাবুগো আমি প্রধান হবনি। তাকে সবাই মিলে বোঝায় যে চিরকাল সবার সমান যায়না।আজ তোর দিন।নে যা বোস ঐ চেয়ারটায় সমাজটাকে পাল্টানোর চেষ্টা কর।
   পরদিন সরলা মাল প্রধানের চেয়ারে বসতে সচিব কতগুলো বিলে স‌ই করাতে নিয়ে আসে। সরলা এই সব ব্যাপার গুলো জানত তাই সচিব কে নতুন করে বোঝাতে হয় না। সরলা প্রথম বিলটাতে স‌ই করতে গিয়ে দেখে এটা ঝাড়ুদার হিসেবে তার‌ই করা তিন মাসের বকেয়া বিল।
             ___________________
Garhbeta ,
Dist-Paschim Medenipur

শনিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২১

অনুগল্প || "প্রার্থনা" || অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।

অনুগল্প || "প্রার্থনা" 

                  অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।




নতুন বছরে আর তাকে পাওয়া যাবে না ।এই নিরুদ্দেশ যেন এক অসীম যাত্রাপথের পথিকের অনন্তকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা মাত্র । তার পদচিহ্নও সেভাবে ছাপ ফেলতে পারল কই ! আবার অন্ধকার মানেই তো আলোর অস্তিত্ব আছে  । সে আলো  অগোচরে থাকে ।প্রতিসৃত সব চোখে হয়না  ।

         এভাবেই কুড়ির শূন্য  আমাদের  চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে  আমাদের অসহায়তা, বিপন্নতা, পারলৌকিক গমন কীভাবে লোভাতুর,সেচ্ছাচার জীবনকে নগ্ন করে দেয় ।

    এইতো শূন্য মুছে গিয়ে এক এসে পড়ল ।একটু একটু করে জীবন আরো পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাক্  ।তাকে, তাদেরকে হয়তো ভিন্ন ভাবে খুঁজে পাব  ।

      পাপন তার বাবাকে বলল, আর কতক্ষণ চার্চে বসে থাকবে বাবা ! মোমবাতি জ্বালিয়ে দাও । ছেলের ডাকে সম্বিত ফিরে পেল বাবা । পরম যত্নে জ্বালাতে থাকল মোমবাতিগুলো ।   


        

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

যাত্রা || ভাস্কর ঠাকুরীয়া || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

 যাত্রা

ভাস্কর ঠাকুরীয়া 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 




ভরহীন সমর ফুল,তারা এবং রামধেনুর মধ্য দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল।রেশমি মেঘের কোষগুলি    হয়ে ত্বক এবং পেশীর মধ্য দিয়ে আসা যাওয়া করছিল।অজানা পাখির গান এবং ডানার তালে তালে রামধেনুর ভেতরে থাকা নানা ধরনের পরিচিত অপরিচিত রঙ বিস্ফোরিত হয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে যেতে লাগল।মাঝে মধ্যে তারা বুক ভেদ করে হৃদয়ে কুটকুট করছিল।

‘কনভালসন হচ্ছে।’

সিস্টারের রুক্ষ চিৎকার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যেন বিপদের ধ্বনি বাজিয়ে দিল।সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ তার দিকে দৌড়ে এল।

‘Phenytoin নিয়ে এস তাড়াতাড়ি।’

কার্ডিয়াক মনিটরে পড়তে পড়তে কর্মরত চিকিৎসক সঙ্গের জনকে চিৎকার করে বলল।দুজনে মিলে তাকে চেপে ধরল,একজন সিস্টার জিভ আটকে গিয়ে যাতে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা নাহয় তারজন্য জিভটা চামচ দিয়ে ধরে রেখেছিল।

কনিষ্ঠ চিকিৎসক তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ফেনাগুলি সাকসন মেশিন দিয়ে বের করে দিচ্ছিল।‘ইনটিউব’এর প্রয়োজন হতে পারে ,তৈরি থেক।’

যুদ্ধকালীন ক্ষিপ্রতায় প্রতিটি মানুষ তার সঙ্গে লড়াই করছিল।প্রায় আধা ঘণ্টা পরে সমরের আস্ফালন গুলি কমে এল।অক্সিজেনের পরিমাণ,হৃদয় স্পন্দন,হৃদ বৈদ্যুতিক রেখাগুলি  সাধারণ অবস্থায় ফিরে এল।ক্ষণিকের জন্য হলেও মানুষগুলি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।কিছুক্ষণ আগের স্বর্গীয় পরিভ্রমণের পরিতৃপ্তি এবং এখনকার নাটকীয় পরিস্থিতির মাঝখানের বিভাজনের রেখাটার অবস্থিতি সমরের কাছে অত্যন্ত সূক্ষ্ণ ছিল। ব্রহ্মমণ্ডলের কোনো অজানা গ্রহের প্রাণী যেন মনে হওয়া সবুজ গাউন,চশমা,মুখের আবরণ ও টুপি পরা চিকিৎসকটি সমরের চোখের মণিতে টর্চের আলো ফেলল।মণির গহ্বরটা আলোতে ছোট-বড় হতে লাগল।কিছুক্ষণ আগে সে কোথায় কীভাবে উড়ে বেড়াচ্ছিল তা ভাবতে ইচ্ছা করছিল।তার মনে হল তার চিন্তার চালিকা শক্তিটা যেন বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে। 

স্পেশশিপের মতো দেখতে এই অত্যাধুনিক আই সি ইউ টার পরিচিত অপরিচিত নানারকমের যন্ত্রপাতি,কম্পিউটার এবং প্রায় মহাকাশচারীর মতো কাপড় পরা মানুষগুলি কী করছে,কেন করছে,এই জায়গাটা কোনো পরমানবিক অনুসন্ধান  কেন্দ্র না কোনো মহাকাশযান এইসব প্রশ্ন একবারও মনে আসেনি।আলো-ছায়ায় টিটি শব্দ করতে থাকা যন্ত্রগুলির মধ্যে সে নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিল।যে কোনো মুহূর্তে সে অনুভূতির পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

মাঝে মধ্যে কারও মুখে শুনে ‘সাত দিন হল,অবস্থা একই আছে।’তার কাছে কিন্তু দিন-রাত সময়ের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।অবুঝভাবে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে।মানুষ আসে,মানুষ যায়। পরিচালিকা এসে পাউডারের গুড়িগুলি সমস্ত শরীরে মেখে নেয়।চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করে।জমাদার এসে শরীরের আবর্জনা গুলি পরিষ্কার করে যায়।কিন্তু এই সবের সঙ্গে তার কোনো করণীয় থাকে না।এক অজানা শক্তি তাকে পরিচিত-অপরিচিত সময়ের পৃথিবীতে নিয়ে যায়। তার মধ্যে কোনোটি সমরের পরিচিত অতীত,কোনোটা বাস্তব এবং কোনোটা হয়তো অপরিচিত কালহীন সত্তা সঞ্চয়।

এভাবেই সে দেখেছিল শৈশবে মাঠে শুয়ে শুয়ে দেখা জ্বলজ্বল করতে থাকা তারার আকাশটা।সেদিন সে একটা তারা থেকে অন্য তারা পর্যন্ত রেখা টেনে,গাছ,হাতি বানিয়ে আনন্দ লাভ করেছিলেন।নিচে অগণন জোনাকি পোকা নেচে বেড়াচ্ছিল,তার বাইরে সমস্ত কিছুতে অন্ধকার। দাদারা ভেলাঘর তৈরিতে ব্যস্ত থাকায় সে নরার স্তূপে পড়ে সেগুলিতে হারিয়ে যাওয়া ছন্দ মিলিয়ে রাতের ঝিঁ ঝিঁ পোকা এবং পাশের পুকুরের ব্যাঙগুলির সঙ্গীতের তালে তালে নাচতে লাগল।নিজের অজান্তে কখন ঘুমিয়ে পড়ল বলতেই পারে না।

সেই রাতটা থেকে সে সিগারেটের ধোঁয়ার মতো কুন্ডলি পাকিয়ে সেই আই সি ইউ তে ফিরে এসেছিল না অন্য কোনো জগতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল সেটা ভাবার জন্য সমরের চালিকা শক্তির আধুনিক যন্ত্রটিতে তার কোনো অনুমোদিত কার্যক্রমণিকা ছিল না। 

সেই বিছানা  থেকে সে অনেকগুলি জায়গায় গেছে।গ্রামের বাড়ির বকুল ডালের গন্ধের মধ্যে,বনভোজের স্ফুর্তির অন্তহীনতায়,আগে শাসন করতে না পারা,বুকে সঘন কম্পনগুলির মধ্য দিয়ে সে চলে গিয়েছিল। কখনও কখনও তার যাত্রা অসম্পূর্ণ রেখেই সে কুন্ডলী পাকিয়ে তার বিছানায়   ফিরে আসে,চারপাশে উৎকণ্ঠিত টুপি এবং মুখোস পরা মুখগুলি দেখে সমর ভাবতে চেষ্টা করে এসব কী হচ্ছে? সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে,ইলেকট্রনিক মনিটরগুলির বিপারগুলি চিৎকার করে উঠে ,ধমনীতে লাগানো ইঞ্জেকশনের মধ্য দিয়ে আরও কিছু ওষুধ যায়-তারপরে ঘটনাগুলি স্থবির হয়ে থাকে।মানুষগুলি অন্য একটি বিছানার রোগির কাছে চলে যায়,নাহলে তারা পাশের টেবিল চেয়ারগুলিতে বসে বিশ্রাম নেয়,ফোনে কথা বলে না হলে সেখানে বসে বসেই ঘুমোতে চেষ্টা করে।

ঘর থেকে বহু হাজার মাইল দূরের তার তিক্ত দৈনন্দিন জীবন যুদ্ধের গণিতগুলিতে কিন্তু সে একবারও যায়নি। সঙ্গীহীন আশ্চর্য শহরটিতে ক্যাশ বুক,লেজার বুক,ভাউচার জমা এবং খরচের অমিল সংখ্যাগুলি,নাহলে পাবগুলিতে দুই হাজার ডেসিবেল সঙ্গীতের তালে তালে আলজিভ ঠেলে টেনে বইয়ের খাওয়া সময়গুলিতেও সে একবারও যায়নি।

সাতদিন হল সে একভাবে পড়ে আছে।বিকেলে একজন এসে তার নাম ধরে ডাকল ‘সমর,সমর!এই’?আওয়াজটা দূর থেকে ভেসে আসার মতো সে অস্পষ্টভাবে শুনতে  পেয়েছিল।কপালে চাপ দিয়ে সে চোখদুটি মেলে তাকাল।সিনেমার Extra Terrestroal  প্রাণীর মতো দেখতে মুখগুলি সে চিনতে পারছিল না।

কোমৰ,বুক,বুকের হাড়্গুলিতে সে এক অসহ্য ব্যথা অনুভব করল।শ্বাস-প্রশ্বাসে ভাঙ্গা হাড়্গুলি একে অপরের সঙ্গে চাপা খেয়ে খট খট করে শব্দ করছে। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে মুখ দিয়ে ‘ঘোৎ’করে শব্দ করল।তাকে চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষগুলির গুঞ্জন শুনতে পেল।সামনের অস্পষ্ট মুখগুলি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল ঠিক যেভাবে ক্যামেরার জুম লেন্সগুলি ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবি স্পষ্ট করে তোলে। সবুজ আবরণে শরীরের বেশিরভাগ ঢেকে রাখা মানুষগুলিকে তার পরিচিত বলে মনে হল না,মাত্র একজন ছাড়া। জুমের পেছনে দাঁড়িয়ে একান্ত মনে তার দিকে তাকিয়ে থাকা গোলাপি গালের সজল মেয়েটিকে দেখে তার 

মনে কিছু একটা ভাব আসতে লাগল।‘ও কে?সে ওকে জানে নাকি?সেই চোখদুটি,মাস্কটার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে থাকা মুখটা এবং দেখা না দেখার মাঝখানে নববিবাহিতার সিঁদূরের ফোঁটাটা তার কেমন যেন পরিচিত বলে মনে হল।

‘সা-গ-রি-কা।’

সাগরিকা তার পুরোনো সহকর্মী। এই আজব অপরিচিত শহরে তার প্রথম বন্ধু।

তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা চারটি অক্ষর বাকি কয়েকজন বুঝতে না পারার মতো হলেও ফুটে উঠল।উঃআঃ ছাড়া অন্য কেউ আর কিছু শুনতে পেল না।

কমা স্কেলে কিছুটা ইম্প্রুভমেন্ট দেখাচ্ছে।কিন্তু এখনও বিপদমুক্ত বলা যাবে না। Head Injury র সঙ্গে  Multiple fracture ও রয়েছে।তাই কোনোকিছুই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।’চিকিৎসকের কথা শেষ হওয়ার আগেই খট খট করে শব্দ করে সাগরিকা বেরিয়ে গেল।

সাগরিকা এখানে কেন এসেছে এবং সেই বা এখানে কীভাবে এল?

এই আন্তর্জাতিক শহরটিতে আসার দুই বছরের মধ্যেও অ্যাকাউন্টেন্সির অফিস,তার হিসেব পত্র বস বেঁধে দেওয়া সময় সীমার বাইরে তার জীবনে কিছুই ছিল না।এলার্ম ঘড়ির চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে মুখ ধুয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে অফিসে পৌছায়,তারপরে কম্পিউটার,ব্যালেন্স সিট এসবই।রাতের বেলা ঘরে ঘুমোতে আসা হয়।বেতন যে বেশি পাচ্ছে,সে যে কাজটাকে খুব ভালোবাসে তা ও নয়।কেবল করতে হয় বলে করে চলেছে।এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য চাকরিতে ঢুকলেও তাকে এটাই করতে হবে।তাই আজকাল সে আর এসব নিয়ে ভাবে না। 

আগে সাগরিকার সঙ্গে  কফিবারে কাটানো সময়গুলি সে মুখের মূলধন হিসাবে ঘোষণা না করেই মেনে নিয়েছিল।ওরা মাত্র ফুলের বিষয়ে আলোচনা করত।ড্যাফোডিল,টিউলিপ,সূর্যমুখী,গোলাপ কোনটার কী রঙ ভালো লাগে,কীভাবে রোপণ করতে হয়,কোথায় কীভাবে কলমের চাষ করতে হয়,কোন গাছের বনসাই ওরা করেছে ,কী করতে বাকি থেকে গেল-এক কাপের পরে আরেক কাপ কফি এবং পেস্ট্রি খেয়ে ঘণ্টার পরে ঘণ্টা ধরে ওরা এইসব বিষয়ে কথা বলছিল।

সমরের প্রিয় ফুলগুলি বকুল,টগর,যেগুলির সঙ্গে সে বড় হয়েছিল সেইসব বিষয়ে সাগরিকার জ্ঞান অবশ্য যথেষ্ট কম,তথাপি দুজনের ফুলের প্রতি কৌতূহল থাকার জন্য ওদের সময়টুকু যেন ভালোভাবে পার হয়ে যেত।আলোচনায় সবসময় ঘুরে ফিরে রজনীগন্ধার কথা আসত।রজনীগন্ধার রূপ, গন্ধ, কোমলতা  ওদের দুজনেরই অত্যন্ত প্রিয়।প্রতিদিনই ওদের কথায় একবার না একবার রজনীগন্ধার প্রসঙ্গ উঠত।ওদের সম্পর্কটা ফুলের ছিল ঠিক প্রেম নয়,বন্ধুত্বও বলা যায় না।কিছুদিন পরে তার বিয়ে হয়ে গেল,ওদেরই এক্সিকিউটিভ প্রভজ্যোতি সিংহের সঙ্গে।আশ্চর্যজনক ভাবে সে ফুল বা সেই ধরনের জিনিস ভালোবাসে না।Fitness Conscious প্রভজ্যোতি তার জিমনেসিয়াম,ডায়েট এবং অফিস ছাড়া অন্য কোনো কিছুই বুঝতে পারত না,আর সাগরিকা এক কথায় তার বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিল।

তারপরে সমরের জীবনটা কোনো কারণ ছাড়াই রুটিন হয়ে পড়েছিল।অফিস আসে আর যায়,রাতে রুমে পড়ে থাকে।সপ্তাহান্তে পাব বা ডিস্কে সুরাপান করে,গাড়ি নিয়ে মেডরেস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে।কিন্তু এসবেও কোনো আগ্রহ বা আনন্দ তাঁর ছিল না।কাজগুলি করতে হয় বলে করে যেত। একবার সে বাড়িতেও এসেছিল কিন্তু বাড়িতেও তার জন্য কিছু ছিল না। গ্রাম থেকে তারা উঠে এসে শহরে ঘর বানিয়েছে আর শহরটা তার অপরিচিত।সে তার শৈশবের পরিচিত গ্রামে একবার গিয়েছিল।গ্রামের সঙ্গীরা ইতিমধ্যে জীবিকার তাড়নায় অন্য শহরে চলে গেছে।তার পরিচিত চাষের জমি,গ্রামের নামঘরটা ,বাতাবী লেবু দিয়ে বল খেলার মাঠটা তার অপরিচিত প্রাণহীন বলে মনে হচ্ছিল।

সেখান থেকে ফিরে এসে পুনরায় সে গাণিতিক অফিসের  গণনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।তারপর সে আর বাড়ি ফিরে যায়নি।অফিস পাব,রুম এইগুলির মধ্যে সে পুনরায় ডুবে গেল।সাগরিকার সঙ্গে  মাঝে মধ্যে দেখা হয় কিন্তু ক্রিসেন্থিমাম বা রজনীগন্ধার কথা বলার মতো কারও অবসর থাকে না। অফিসে আসা কাজগুলি সময় সীমার মধ্যে শেষ করার জন্য প্রায়ই তাদের অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়।বহুরাষ্ট্রীয় অফিসটার শাখাটা সম্মুখিন হওয়া প্রতিটি সমস্যাকে সমরদের নিজেদের সমস্যা বলে ভাবতে হত।কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি ওদের নিজেদের সমস্যা হয়েই থাকে।সপ্তাহান্তে পাওয়া আটচল্লিশ ঘণ্টা ছুটিতে সমর এবং সহকর্মী দুজন অত্যাধুনিক পাবগুলিতে সুরাপান করে নাহলে গাড়ি নিয়ে শহরের বাইরের হাইওয়েগুলিতে অনর্গলভাবে ঘুরে বেড়ায়।সঙ্গীদের এইসবের প্রতি ভীষণ আগ্রহ। সমর কেবল তাদের সঙ্গে থাকে সময় পার করার জন্য।নিশ্বাস নেওয়াটাকেও সে যান্ত্রিক জীবনের রুটিন বলেই ধরে নিয়েছিল।

সেদিনও সপ্তাহান্তে ওরা বেরিয়ে এসেছিল।মন চাইলেও বন্ধ করতে না পারা যান্ত্রিকতার ওপরে হঠাৎ সমরের রাগ উঠে গেল।ডিস্কোটাতে অন্ধকারের মাঝেমধ্যে লাল নীল আলোগুলি সবাইকে ছূঁয়ে যাচ্ছিল।ডিস্ক জকি পুরোনো জনপ্রিয় একটা গানকে খন্ড বিখন্ড করে মাঝে মধ্যে দ্রুত এবং ভাঙ্গরার তালে তালে দুই হাজার ওয়াটের শব্দ বাক্স গুলির মাধ্যমে সবাইকে শোনাচ্ছিল।সমরের সঙ্গী কয়েকজন তার তালে তালে নাচার জন্য নৃ্ত্যের কার্পেটের দিকে এগিয়ে গেল।বারের এক কোণে একটা টুলে বসে হাতে বীয়রের ক্যান নিয়ে থাকার সময় হঠাৎ ধৈর্যচ্যুতি হয়ে সমর ডিস্কোবার থেকে বেরিয়ে এল।

গাড়ির ইঞ্জিনটা চালিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে কথাগুলি ভাবতে লাগল-নিজের গ্রাম,নগরে নতুন করে বানানো তাদের ছোট বাড়িটা,তার অফিস,অট্টালিকা,ডিস্কোথেক কোথাও সে নিজেকে খুঁজে পায়নি।শিখণ্ডীর পৃথিবীতে জীবন নামের যেন অন্য কোথাও।

‘Life is elsewhere’

সে বিড়বিড় করল।গাড়ির এক্সিলেটরে ধীরে ধীরে চাপ দিল,গাড়িটা বোধহয় এগিয়ে যাচ্ছিল।গতির কাঁটাটা ,একশো,একশো কুড়ি,একশো চল্লিশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার কাঁটা ছুঁয়ে চলল। রাত দুটো বাজে যদিও রাস্তায় কিছু গাড়ি ঘোড়া চলছিল।ঠিক তখনই সামনের একটা বিশালকায় লড়ির হেড লাইটের আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।লড়ির হর্ণটা তার কানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকট অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের শব্দ হল।

তারপরে…

তারপরে কী হল সমরের মনে নেই।

ফুল তারা এবং রামধেনুর মধ্য দিয়ে ভরহীন যাত্রার মাঝে মধ্যে সে এসে স্পেস শিপ সদৃশ আইসিইউ তে আশ্রয় লাভ করে,মানুষগুলিকে দেখে,ততটাই। বুকের ভাঙ্গা হাড় গুলি থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়া ব্যথায় কাতর হয়ে সে চোখ মেলে তাকাল,সেইসময় তার চারপাশে কেউ ছিল না। অনবরত তার টিউব-লাইটগুলি জ্বলে থাকে বলে তখন দিন ছিল না রাত সে বুঝতে পারেনি।চিকিৎসক এবং একজন নার্স তার থেকে কিছুটা দূরে থাকা একজন রোগীর নাক দিয়ে খাদ্যনালী পর্যন্ত একটা পাইপ ভরানো ছিল।নিশ্বাসে রাস্তাটা বন্ধ হতে চলার জন্য নাক এবং মুখ দিয়ে খোপ খোপ শব্দ হচ্ছিল।তার অন্যপাশের রোগীটির মুখে অক্সিজেন এবং মাস্ক নিয়ে প্রশান্ত ভাবে শুয়ে ছিল।একজন পরিচারিকা রোগীর কেস হিস্ট্রিতে ওষুধ পত্রের হিসেব লিখছে।বাইরে যাবার ইচ্ছায় সে পা টা তুলতে চেয়েছিল।না।পা,হাত,মাথা কোনো অংশই সে চেষ্টা করেও নাড়াতে পারল না।অশেষ কষ্ট করে সে চোখের পাতাটা মেলতে পেরেছিল।সামনের সমস্ত কিছুই কেমন যেন অস্পষ্ট আর ধোঁয়া ধোঁয়া বলে মনে হল।যেন ফোকাশের বাইরের কুয়াশা ঢেকে রাখা লেন্সের মধ্য দিয়ে জিনিসগুলি দেখছে।যন্ত্রগুলি,কাছের রোগীরা,হাতে ওষুধের ট্রে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সিস্টার সবাই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল।

একটা মায়াবী অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে সে,সমরের দেহ থেকে বেরিয়ে ভরহীনতায় ফুল-তারার আলোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। রঙ এবং বর্ণনার বাইরের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে চোখ মেলে সে অফিসটা দেখল।সেখানে সবাই আগের মতোই কাজ করছে এবং কফিবারে প্রভজ্যোতি এবং সাগরিকা কফি খাচ্ছে।প্রভজ্যোতি তাকে ট্রাইসেপ এবং লেটি-মাছ দর্চি নামের মাসল দুটোর জন্য এবং পাসাটা সেট ব্যায়াম করার সুখবরটা আনন্দ মনে দিচ্ছে,সঙ্গে্র ডিস্কো প্রেমিকরা ডিস্কোথেকে হাতে বীয়রের ক্যান নিয়ে নেচে চলেছে।চোখদুটি বন্ধ করে পুনরায় সে রঙের ঢেউয়ে ভেসে যেতে লাগল। সে পুনরায় তার গ্রামের মাঠ থেকে  আকাশটা দেখতে  পেল,দূরের পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া ফুটফুটে হলদে সরষের খেতগুলি,গ্রামের বিলনিতে লালুকি,মাছের সঙ্গে ফোঁটা ভেটগুলি। দেহাতীত সমর ভেসে পুনরায় সেই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের দশ ইঞ্চির বেড়ার মধ্য দিয়ে এসে তার কর্মচারীদের ব্যস্ত অবস্থায় দেখল।প্রত্যেকেই একজন রোগীকে উত্তেজিত ভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।দুজন চিকিৎসক তাঁর বুকে চেপে ধরে কার্ডিও পাল্মনারি রিসাসসিটেশন  করছিল।রোগীর কার্ডিয়াক মনিটরের রেখাটা প্রায় সমান হয়ে কিছু স্বাভাবিক শব্দ করছিল আর পালস অক্সিমিটারের পরিমাণগুলি অনেকটা এদিক ওদিক হচ্ছিল।

চিকিৎসক এবার ডিফিব্রিলেটরটা হাতে নিয়ে রোগীর বুকে বৈদ্যুতিক সংযোগ করলেন।রোগিটি লাফিয়ে উঠল,সবাই মনিটরের দিকে তাকাল-না,রেখাটা এখনও সমান।একজন পালস দেখল-‘পায় নি’।

চোখের মণিতে আলো ফেলতেই মণির গহ্বরটা বড় হয়েছে।তারপরে আর করার কিছুই নেই।এক এক করে মানুষগুলি চলে গেল। একজন মৃত্যুর প্রমাণ পত্র লিখতে লাগল।সমর রোগীর দিকে তাকাল-গভীর প্রশান্তিতে সে নিশ্চিত মনে চিত হয়ে পড়েছিল।দুচোখে মহাশূন্যের দিকে ভাবহীন দৃষ্টি,সে ভালোভাবে মনে করে দেখল ,কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত সেই দেহটার অধিকারী সে নিজেই ছিল।

কর্কশ শব্দ করে স্ট্রেচারটা তার দেহটাকে ঠেলে আইসিইউ এর বাইরে বের করে নিচ্ছিল।বাইরের কিছু কৌতূহলী মুখ তার পথ ছেড়ে দিল।আর তার সঙ্গে সঙ্গে বের হল,স্ট্রেচারের চাকাগুলির গতি বাড়তে লাগল।

ক্রমশ বেড়ে আসা দূরত্বের সেই ভিড়টার মধ্যে সাগরিকার রঙিণ মুখটা সে দেখতে পেল।তার হাতে রজনীগন্ধার একটা স্তবক ছিল।স্তবকটার মাদকতা ভরা গন্ধটা শীতল সরীসৃ্পের মতো ছড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল…।  

-----------











শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

অনুগল্প || অতিমারি || বিনোদ মন্ডল

 অনুগল্প

অতিমারি

বিনোদ মন্ডল 



কেষ্টপদ'র দোকানে দাঁড়ালেই নানা স্বাদের দুঃখ আমার চারদিকে ভনভন করে যায়। 

তবু দাঁড়াই। কেন না, আমার আপাত-নিরাপদ বাঁচার সঙ্গে 

কেষ্টর কষ্টকর বাঁচার প্রতিতুলনা করে মন ঢেঁকুর  তুলতে পারে। 

আট বাই দশ ফুটের দোকান, বাজারে। সেখানে সকালে গুচ্ছের দুধ, দই, রুটি বিক্রি হয়। সঙ্গে কেক,বিস্কুট, চা-পাতা,চানাচুর। ইপি নুডলসের পাশে শুয়ে থাকে পাস্তা কিংবা

লেজ্। কুড়কুড়ে। কাচের আলো ঝলমল কুলুঙ্গিতে সাবান, সেন্ট, ব্রাশ, পেস্ট। এখানেই শেষ নয়। একটা দুই বাই আড়াই ফুট টেবিলে স্বপ্ন

বিক্রি হয়। কেষ্ট আবার ব্যঙ্গ করে বলে ডি এ নেই তো কী আছে, আমার কাছে ডিয়ার নিন। লটারির কাউন্টার। মাঝে মাঝে গাঁদার মালায় সেজে ওঠে, প্রাপ্তির দাক্ষিণ্যে। 

 কেষ্ট থাকে একটা মন্দিরের লাগোয়া এক চিলতে ভাড়া বাড়িতে। মা-বউ অসুস্থ। ছেলেটা বি এ ফেল। টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। খেয়ালখুশি মতো দোকানে বসে। নিজের সুগার। ওষুধ -ডাক্তারে জর্জরিত কেষ্ট। দোকানঘরের

দেদার দেনা। কিস্তি ফেল আছে কয়েকটা। 

 এপ্রিল থেকে অক্টোবর প্রায় গৃহবন্দি ছিলাম। নভেম্বরে সামান্য বের হলাম। ডিসেম্বরের শুরুতে একদিন পথে দেখি ওর ছেলে কুনালকে। উভয়ের মাস্ক থাকায় ও আমায় চিনল না। কুনাল তার পাশেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুকে বলছে-- আব্বে, দেশের কে কোথায় কতো কামালো, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। করোনা ছিল বলে না ক' মাসে বাপ ব্যাটা প্রায় বিশ লাখ কামালাম। কেউ প্রাইসরেট দ্যাখেনি,  দাম দর করে নি। বেঁচে থাক লকডাউন। বেঁচে থাক্ মন্দা। মহামারি জিন্দাবাদ !

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

মিথ্যা কথা || সৈয়দ আব্দুল মালিক || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

 

মিথ্যা কথা

সৈয়দ আব্দুল মালিক

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

    




আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল সাড়ে চার মাইল।

     হেঁটে আসা যাওয়া করি।আমাদের গ্রামের-আমাদের শ্রেণির ছেলে আমাদের স্কুলে আমিই।অন্য ক্লাসের ছেলে আছে।আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনের পথটা দিয়ে এক মাইল গিয়ে-বড় রাস্তায় উঠি এবং অন্য ছেলেদের সঙ্গে স্কুলে যাই।

     ক্লাস সিক্সে পড়তাম।অভ্যাস ছাড়া আমার মতো ছোট একটি ছেলে দিনে নয়মাইল হাঁটতে পারতাম না।তবে পড়াশোনা না করলে নয়,সাইকেল কেনার মতো পয়সা নেই,বাড়ির আশেপাশে কোনো স্কুল নেই।

     পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

     ক্লাস এইটের পবন নেওগ আমাদের অঞ্চল থেকেই সাইকেলে করে স্কুলে যায়।কখনও দেরি হতে দেখলে পবন আমাকে তার সাইকেলে তুলে নেয়।

     কখনও নেয় না।

     বড় রাস্তা দিয়ে পবনদের ঘরের ওদিকে তোষেশ্বর স্যার যায়।তার একটা বহুদিনের পুরোনো শব্দ করা সাইকেল আছেবেল না বাজালেও পুরো সাইকেলটাই দূর থেকে বাজতে থাকে।তোষেশ্বর স্যার যে আসছে তা আমরা ঘুরে না তাকিয়েও বুঝতে পারি এবং সঙ্গে সঙ্গে একপাশে সরে দাঁড়াই।কেবল তোষেশ্বর স্যারই নয় অন্য শিক্ষকদের ও আমি খুব ভয় করতাম।তোষেশ্বর স্যার আমাদের ভূগোল পড়ায় এবং ইংরেজি ট্রানশ্লেষণ করায়।ভূগোলে আমি খারাপ।এত বড় একটা পৃথিবী,তাতে এতগুলো দেশ,মহাদেশ,কত নদী-পর্বত,নগর-সাগর মনেই থাকে না।তার মধ্যে আমার ভূগোলের জ্ঞান যোরহাট,গোলাঘাট এবং আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল-এর মধ্যেই আবদ্ধ।আমার ম্যাপগুলো বড় দীর্ঘ হয়ে যায়।একবার লঙ্কা দ্বীপ আঁকার সময় একেবারে তোষেশ্বর স্যারের মুখের মতো হয়েছিল।এই জিনিসটা আবিষ্কার করে আমি উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে হেসেছিলাম এবং বড় আমোদ এবং রহস্য বলে মনে হয়েছিল।কোনোভাবে তোষেশ্বর স্যার যেন দেখতে না পায় সেজন্য লুকিয়ে রেখেছিলাম।

     একদিন আমরা পুরো ক্লাসটা একটা বড় অপরাধ করে ফেললাম।আমাদের একটা ম্যাপ বাড়ি থেকে এঁকে নিয়ে যেতে বলেছিল-আমরা তা পারলাম না।কয়েকজন এঁকে এনেছিল।ওদেরকেও আনেনি বলতে বলে দিলামকারণ দুয়েকজন নিলে আর বাকিরা না নিলে ,যারা নেয়নি তাদের শাস্তি বেশি হবে।মিথ্যা কথা বলারও কোনো উপায় নেই।

     প্রত্যেকেই আনেনি বলল।

     ‘ম্যাপ এঁকে আনলি না কেন?’স্যার রাগের সঙ্গে বললেন।

     আমরা চুপ।

     উত্তরটা আগে থেকে ভেবে রাখা হল না।স্যার সবার মুখের দিকে একবার রাগত চোখে তাকালেন।তারপরে গম্ভীরভাবে বললেন-‘ভালোই হয়েছে হোমটাস্ক করে আনিসনি।এক ঘণ্টা ডিটেইন।’

     আমাদের সবার শুকনো মুখ এবং শুকনো গলা আরও শুকিয়ে গেল।

     ‘এখন এঁকে দেব স্যার’।কে একজন দুঃসাহস করে বলল।

     ‘তুই বেঞ্চের উপরই দাঁড়িয়ে থাক-’একই গম্ভীর এবং কড়া সুরে স্যার বলে উঠলেন।

     আর কারও কিছু বলার সাহস হল না।তোষেশ্বর স্যারের রাগ সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন।

     তারপর সেদিন ভূগোল পড়িয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বললেন,‘পুরো এক ঘণ্টা।কেউ পালাতে পারবি নাকেউ ছুটি নিয়েও যেতে পারবি না।’

     অসহায় ভাবে আমরা প্রথমে একবার স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করলাম।স্যারের কথার নড়চড় হয় না।

     এমনিতে কখনও কোনো ছাত্রের পরের ক্লাসগুলোতে উপস্থিত থাকতে ইচ্ছা না করলে কোনো ছাত্র পেট কামড়াচ্ছে বা মাথা ব্যথা করছে বলে ছুটি নিয়ে যায়।কিন্তু তোষেশ্বর স্যার ডিটেইন করেছেন,ছুটি নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

     সেদিন জৈষ্ঠ্য মাসের বড় কড়া রোদ।আমাদের ক্ষুধাও পেয়েছিল,তৃষ্ণাও পেয়েছিল।আমরা গ্লাসের পর গ্লাস জল খাচ্ছিলাম।কিন্তু পুরো ক্লাসের ছেলেরা চুপ করে বসে রইল।কেউ নড়াচড়া করার সাহস করল না।তোষেশ্বর স্যার চেয়ারটাতে যে বসলেন,বসেই রইলেন,নড়াচড়া করার নামগন্ধ নেইস্যারকে এভাবে দেখে আমাদের আরও বেশি ভয় করতে লাগল।স্কুলের অন্য ক্লাসের সমস্ত শিক্ষক এবং ছাত্ররা বাড়ি চলে গেল।চারপাশটা বেশ নীরব নিস্তব্ধ।

     আমাকে আবার পায়ে হেঁটে সাড়ে চার মাইল যেতে হবে।ছুটি দিতে বলার জন্য কয়েকবার উশখুশ করলাম,সাহসে কুলোল না।তখনকার দিনে আজকালকার মতো মাস্টার ছাত্রদের ভয় করত না।কারণ ছাত্ররা মাস্টারদের ঘেরাও-টেরাও করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না।

     কাঁটায় কাঁটায় এক ঘণ্টা হওয়ার পরে আমাদের ছুটি দিল।আমরা সুরসুর করে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ে দ্রুতপায়ে বাড়িমুখো হলাম,বাড়ি পৌছাতে আজ রাত হবে।

     একমাইলের মতো হাঁটার পরে আমি একা হয়ে গেলাম।সঙ্গের ছেলেরা সবাই যে যার দিকে চলে গেল।আমার খুব খারাপ লাগতে লাগল।

     একাই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলাম।পেছনে তোষেশ্বর স্যারের সাইকেলের ঘর্ঘর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি,হ্যাঁ তোষেশ্বর স্যার স্কুল থেকে বাজার হয়ে ফিরছেন।

     কিছু জিজ্ঞেস করবেন বলে ভয় হল।পথের একপাশ ধরে দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইলাম।

     আমার কাছে এসে স্যার ধীরে ধীরে সাইকেল চালালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,‘একা যে-সঙ্গে্র ছেলেরা কোথায় গেল?’

     ভয়ে ভয়ে বললাম,‘ওরা চলে গেছে স্যার।’

     তোষেশ্বর স্যার সাইকেল থেকে নামলেন এবং কড়া ভাবে বললেন,‘দেখি এদিকে আয়।’

     ভয়ে আমার তালু শুকিয়ে গেল।

     তবু সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

     ‘উঠ,সাইকেলে উঠতে পারবি?পেছনে বসলে আমি চালাতে পারব না।এখানে আগে বস।’-বলে আমার বগলের নিচে হাত দিয়ে সাইকেলে তুলে নিলেন এবং নিজেও সাইকেলে উঠে চালাতে লাগলেন।আমি স্যারের দুটো হাত আর বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

     আমাদের গ্রামে প্রবেশ করার রাস্তাটায় এসে তিনি আমাকে বললেন,‘ওদিকে আমার একটু কাজ আছে।চল’।

     স্যার আমাকে আমার বাড়ির দরজার সামনে নামিয়ে দিলেন।কিছুই বললেন না এবং সোজাসুজি না গিয়ে আবার যে পথে এসেছিলেন সেইপথে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন।

     আমি বুঝতে পারলাম এদিকে স্যারের কাজ ছিল না।আমাকে বাড়িতে রেখে যাবার জন্যই এতটা পথ এগিয়ে এলেন।

     স্যার ও একটা মিথ্যা কথা বললেন।

--------

      

 

     লেখক পরিচিতিঃ অসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার সৈয়দ আব্দুল মালিক ১৯১৯ সনে অসমের শিবসাগর জেলার নাহরণিতে জন্মগ্রহণ করেন।যোরহাট সরকারি হাইস্কুল থেকে পাশ করে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ করেন।পরবর্তীকালে যোরহাট জেবি কলেজে অধ্যাপনা করেন।লেখকের গল্প সঙ্কলন গুলির মধ্যে ‘পরশমণি’,শিখরে শিখরে’,শুকনো পাপড়ি’বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।‘অঘরী আত্মার কাহিনী’উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।                                                                     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

উপগ্রহের বার্তা || দেবব্রত রায় || গল্প

 উপগ্রহের বার্তা 

দেবব্রত রায়  




ববিতা জিগ্যেস করলো, ডিঙগো ডিয়ার, তুমি কি জান সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য কতটা মানে, হাও মাচ ডিফারেন্স বিটুইন ট্র্যু অ্যান্ড ফলস ? ববিতা ডিঙগোর দিদুন অর্থাৎ ,মায়ের মা । স্কুলের বেবিদের মতন করে দিদুনের কাঁধ পর্যন্ত চুল ছাঁটা।মাঝে মাঝেই ডিঙগোর দিদুন তাতে আবার রঙিন হেয়ার-ব্যান্ড ব্যবহার করেন আর,  কথা বলার সময় সেই ঝাপঝুপো চুলগুলো খুবই ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তিনি কথা বলেন। দিদুনের এইধরনের বেবি-বেবি অ্যাটিটিউড ডিঙগোর মোটেই ভালো লাগে না। ও ঘাড় শক্ত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ববিতা আবারও বলে, ডিঙগো, প্লিজ নটি বয়ের মতো অমন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না ! কথাগুলো বলেই , সে ডিঙগো-র কার্লি চুলের একটা গোছা ধরে একটু জোরেই টান দেয়। বলে, "শোন, চোখে যা দেখবে  তাই সত্যি আর, কানে যা শুনবে জেনো তার সবটাই  মিথ্যে!...আর, যেহেতু আমাদের চোখ এবং কানের মাঝখানের দূরত্ব হচ্ছে চার আঙুলের তাই, সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মাত্র চার আঙুলের ! " বলেই, ববিতা একটা বিজ্ঞের হাসি হাসলো।                                                                                                                                দিদুনের এই কথাগুলোর লক্ষ্য যে আসলে জিকো সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ডিঙগোর। কাল বাঁকুড়ার থেকে জিকো ফোন করে ডিঙগোর বাপি মানে, জিকো তার ছেলেকে হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে ডাক্তার কী-কী অ্যাডভাইজ দিয়েছেন সেই বিষয়েই আলোচনা করছিল।                                                                                           অথচ, জিকো কিন্তু ,একেবারেই অন্যরকম কথা বলে। সে বলে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল তা পরীক্ষা করে বুঝে নিতে হয় ! প্রয়োজনে তুমি কারোর সাহায্য নিতে পার কিন্তু , সিদ্ধান্তটা নিতে হবে তোমাকেই !                                                                                                                           কলকাতার এই বাড়িতে জিকো খুব কমই আসে । সে থাকে অনেক দূরে। সেই বাঁকুড়ায়। মাঝেমধ্যে যখন সে ডিঙগোদের সঙ্গে এসে থাকে তখন ডিঙগোর খুব ভালো লাগে, ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হয় কিন্তু, মায়ের ভয়ে ডিঙগো সেটা প্রকাশ করতে পারে না। সেসময় বাবাও ওই ক-দিনের জন্যে ডিঙগোর মতোই যেন একেবারে ছোট্টটি হয়ে যায় ! অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সটান জিকো-র কোলে শুয়ে পড়ে  বলে, মাথাটা একটু টিপে দাও দেখি মা ! ডিঙগো ক্লাস-টু পর্যন্ত জানত ,ওর ঠাম্মি-র নাম জিকো তাই, ঠাম্মি যখন ডিঙগোকে জিকো বলে ডাকত তখন ও বলত আমি তো ডিঙগো ,তোমার নাম তো জিকো ! ডিঙগো এখন জানে পৃথিবীর  একজন বিখ্যাত ফুটবলারের নাম জিকো।যাঁর জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে। ঠাম্মি তাঁর নামেই ওর নাম রেখেছিল জিকো। কিন্তু, মা আর,দিদুনের সেই নামটা পছন্দ নয় !                                                                                                                                                   মা যখন ঠাম্মির সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে তখন হেসে হেসে  কী সুন্দরভাবে কথা বলে কিন্তু, ফোনটা নামিয়ে রেখেই সে যেন জায়ান্টের মতো গরগর করতে থাকে ! বলে, ডাইনি বুড়িটা মরলে বাঁচি ! ব্যাঙ্কের টাকাগুলো হাতে পেলে অন্তত এই সময় কাজে লাগাতে পারতাম....

ডিঙগো ওর মায়ের সব কথাগুলো-র মানে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না কিন্তু , এটুকু সে বুঝতে পারে যে কথাগুলো খুবই নোংরা !  

একটা ছুটির দুপুরে সবাই যখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে ডিঙগো তখন ওর বাবার ফোনটা নিয়ে  চুপিচুপি নিজের পড়ার ঘরে এসে ঢোকে । এইসময় খাওয়াদাওয়া সেরে ঠাম্মি তার প্রিয় ক্রেডলটাই বসে গল্পের বই পড়ে। ডিঙগো ওর অনভ্যস্ত হাতে ঠাম্মির ফোন-নাম্বারটা টেপে।ও পাশে একটা সুন্দর রিংটোন বেজে ওঠে, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে......                                                                                                                                  " হ্যালো ! " ঠাম্মির গলা শুনতে পায় ডিঙগো। সে বলে, আমি এখন জিকো বলছি !                                                                        ঠাম্মি ওপাশ থেকে হাসি হাসি গলায় বলে, " এখন জিকো! " বেশ, বলো !                                                                    ঠাম্মির কথায় জিকো লজ্জা পায়। সে বলে, না, না , আমি জিকো-ই বলছি। তারপর, খুবই সিক্রেট একটা বিষয় আলোচনার মতো করে সে চুপিচুপি গলায় বলে, শোনো , আমি আর, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আদ্রিজা রিসেন্ট একটা  ম্যাটার ডিসকাভার করেছি !                                                                                                                                             ওপাশ থেকে ঠাম্মির কৌতুহলী গলা ভেসে আসে। বলে, তোমরা দুজনে ! তাই ! তা, কী ডিসকভার করেছো বল তো !                                                                                                                                                                                 না, মানে বিষয়টা আদ্রিজা-ই ডিসকাভার করেছে তবে ,আমিও সেটা গ্রান্ট করেছি ! কথাগুলো আবারও লজ্জা পাওয়া গলাতেই বললো জিকো !                                                                                                                                    বেশ তো ! তা, বিষয়টা কী ? ওপাশ থেকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় ঠাম্মি ।                                                              আমরা ডিসকাভার করেছি, কথাটা বলেই, জিকো  কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর,বলে, না, মানে তুমি মোটেই নও কিন্তু, বেশিরভাগ বড়োরা-ই, মানে দিদুন,মায়ের মতো বড়োরা ফোনে যা কিছু বলে জেনো তার বেশিরভাগ-ই মানে 99.9% একেবারেই ফলস ! কিন্তু, এই যে আমি ফোন করছি আমি কিন্তু , সত্যি বলছি! মানে, আমি বলতে চাইছি আসলে , সব শোনা কথাই কিন্তু , মিথ্যে নয়.....                                                                                                                                        জিকোর নরম মনের ভিতরে যে একটা নিদারুণ টানাপোড়েন চলছে সেটা আন্দাজ করতে পেরে জয়তীর বুকের কাছটা মুহূর্তে ভীষণ ভারি হয়ে ওঠে ! কোলের উপর রাখা বইখানা সে ধীরে ধীরে পাশে নামিয়ে রাখে । ছেলের মাত্র তিন বছর বয়সে নীলাঞ্জনকে হারায় জয়তী ! তারপর থেকে শুধুই লড়াই আর, লড়াই ! একদিকে অধ্যাপনা আরেকদিকে ছেলে মানুষ করা। সেসময় নীলাঞ্জনের মা, মানে জয়তীর শাশুড়ি ওদের ছেলে আর মাকে একেবারে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন অবশ্য,জয়তীও ছেলে আর, বৃদ্ধা শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যে অবহেলা হবে ভেবেই একবারের জন্যেও ওর নিজের মাকে সংসারের বিষয়ে মাথা ঘামাতে দেয়নি কারণ, জয়তী খুব ভালো করেই জানত , ওর মা সংসারে এলে শুধু নিজের মেয়ের কথা-ই ভাববে !  না তার ছেলের কথা ভাবতো , না ভাবতো নীলাঞ্জনের মায়ের কথা ! জয়তীর মা অবশ্য এসবের মধ্যেই জয়তীর জন্য দু-দুটো সম্বন্ধও দেখে ফেলেছিল ! ডঃ অরুণাংশু-ও ওকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন । সেও ছিল আরেক লড়াই !মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জয়তীর মনের সঙ্গে সেদিন লড়াইটা হয়েছিল এক মায়ের, এক পুত্রহারা বৃদ্ধার বৌমার দায়িত্ববোধের ! জয়তী যদিও ,ওর মা, ডঃ অরুণাংশু বসু এদের কারোর ডাকেই সেদিন সাড়া দেয়নি !                                                              আজ পাঁচবছর হলো জয়তীর মা মারা গেছেন! শাশুড়ী তারও অনেক আগেই। ছেলে সেই সবে জয়েন্টে চান্স পেয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে ! ডঃ অরুণাংশু বসু এখন সাউথ -অস্ট্রেলিয়ায়। ওখানকারই এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেই কবেই দেশ ছেড়েছেন তিনি ।     

  জয়তী কনসিভ হওয়ার একেবারে প্রথম দিন থেকেই নীলাঞ্জনের ইচ্ছে ছিল ওদের ছেলেই হোক বা, মেয়েই হোক সে ডাক্তার হবে ! জয়তী  বলেছিল, ছেলে-মেয়েদেরও তো নিজস্ব একটা 'সে ' থাকে ! নীলাঞ্জন কেন যে সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখো তুমি বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে ! তাহলে কি, নীলাঞ্জন আগে থেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল তাদের সন্তান বড়ো হওয়া পর্যন্ত সে থাকবে না ! নীলাঞ্জনের অনেক কথাবার্তা জয়তীর কাছে আজও রহস্যই থেকে গেছে ! দেখতে দেখতে আটান্নটা বছর কীভাবে যে কেটে গেল, জয়তী এখন আর সেসব যেন ভাবতেই পারেনা ! হয়তো,এরকমই হয় কিন্তু, নিজের জীবনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সেসময় ভীষণ জটিল বলেই মনে হয়েছিল তার !                                                                                    নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া পুরানো কাঠামো কি ফিরে আসে,জয়তী বুঝতে পারেনা ! তার এইটুকু জীবনে ঘটে যাওয়া কত ঘটনায় না জমে ছিল কোনো এক অন্ধকার গুহার ভিতরে ! আজকাল  একে একে সব যেন ফিরে আসছে জোয়ারের কলস্রোতে ! নীলাঞ্জন আর, জয়তীর একমাত্র সন্তান শঙখসুভ্র চ্যাটার্জি এখন কলকাতায় ভীষণ ব্যস্ত একজন ইয়াং অ্যান্ড হাইলি প্রমিসিং কার্ডিওলজিস্ট ! জয়তী ভাবে নিজের শরীর থেকে ছিন্ন হয়ে সুদূর কক্ষপথে চলে যাওয়া উজ্জ্বল চাঁদের জন্য মাঝরাতে এই গ্রহটা যখন একেবারেই নিঃসঙ্গ ওহয়ে পড়ে তখন কি, সকলের চোখের আড়ালে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে !  ক্রমশ এক নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে জয়তীর কানে দূর উপগ্রহ থেকে যেন  একটা বার্তা ভেসে আসছিল, হ্যালো, হ্যালো....আমি জিকো বলছি ! হ্যালো.......হ্যালো........        


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...