রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

যাত্রা || ভাস্কর ঠাকুরীয়া || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

 যাত্রা

ভাস্কর ঠাকুরীয়া 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 




ভরহীন সমর ফুল,তারা এবং রামধেনুর মধ্য দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল।রেশমি মেঘের কোষগুলি    হয়ে ত্বক এবং পেশীর মধ্য দিয়ে আসা যাওয়া করছিল।অজানা পাখির গান এবং ডানার তালে তালে রামধেনুর ভেতরে থাকা নানা ধরনের পরিচিত অপরিচিত রঙ বিস্ফোরিত হয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে যেতে লাগল।মাঝে মধ্যে তারা বুক ভেদ করে হৃদয়ে কুটকুট করছিল।

‘কনভালসন হচ্ছে।’

সিস্টারের রুক্ষ চিৎকার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যেন বিপদের ধ্বনি বাজিয়ে দিল।সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ তার দিকে দৌড়ে এল।

‘Phenytoin নিয়ে এস তাড়াতাড়ি।’

কার্ডিয়াক মনিটরে পড়তে পড়তে কর্মরত চিকিৎসক সঙ্গের জনকে চিৎকার করে বলল।দুজনে মিলে তাকে চেপে ধরল,একজন সিস্টার জিভ আটকে গিয়ে যাতে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা নাহয় তারজন্য জিভটা চামচ দিয়ে ধরে রেখেছিল।

কনিষ্ঠ চিকিৎসক তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ফেনাগুলি সাকসন মেশিন দিয়ে বের করে দিচ্ছিল।‘ইনটিউব’এর প্রয়োজন হতে পারে ,তৈরি থেক।’

যুদ্ধকালীন ক্ষিপ্রতায় প্রতিটি মানুষ তার সঙ্গে লড়াই করছিল।প্রায় আধা ঘণ্টা পরে সমরের আস্ফালন গুলি কমে এল।অক্সিজেনের পরিমাণ,হৃদয় স্পন্দন,হৃদ বৈদ্যুতিক রেখাগুলি  সাধারণ অবস্থায় ফিরে এল।ক্ষণিকের জন্য হলেও মানুষগুলি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।কিছুক্ষণ আগের স্বর্গীয় পরিভ্রমণের পরিতৃপ্তি এবং এখনকার নাটকীয় পরিস্থিতির মাঝখানের বিভাজনের রেখাটার অবস্থিতি সমরের কাছে অত্যন্ত সূক্ষ্ণ ছিল। ব্রহ্মমণ্ডলের কোনো অজানা গ্রহের প্রাণী যেন মনে হওয়া সবুজ গাউন,চশমা,মুখের আবরণ ও টুপি পরা চিকিৎসকটি সমরের চোখের মণিতে টর্চের আলো ফেলল।মণির গহ্বরটা আলোতে ছোট-বড় হতে লাগল।কিছুক্ষণ আগে সে কোথায় কীভাবে উড়ে বেড়াচ্ছিল তা ভাবতে ইচ্ছা করছিল।তার মনে হল তার চিন্তার চালিকা শক্তিটা যেন বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে। 

স্পেশশিপের মতো দেখতে এই অত্যাধুনিক আই সি ইউ টার পরিচিত অপরিচিত নানারকমের যন্ত্রপাতি,কম্পিউটার এবং প্রায় মহাকাশচারীর মতো কাপড় পরা মানুষগুলি কী করছে,কেন করছে,এই জায়গাটা কোনো পরমানবিক অনুসন্ধান  কেন্দ্র না কোনো মহাকাশযান এইসব প্রশ্ন একবারও মনে আসেনি।আলো-ছায়ায় টিটি শব্দ করতে থাকা যন্ত্রগুলির মধ্যে সে নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিল।যে কোনো মুহূর্তে সে অনুভূতির পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

মাঝে মধ্যে কারও মুখে শুনে ‘সাত দিন হল,অবস্থা একই আছে।’তার কাছে কিন্তু দিন-রাত সময়ের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।অবুঝভাবে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে।মানুষ আসে,মানুষ যায়। পরিচালিকা এসে পাউডারের গুড়িগুলি সমস্ত শরীরে মেখে নেয়।চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করে।জমাদার এসে শরীরের আবর্জনা গুলি পরিষ্কার করে যায়।কিন্তু এই সবের সঙ্গে তার কোনো করণীয় থাকে না।এক অজানা শক্তি তাকে পরিচিত-অপরিচিত সময়ের পৃথিবীতে নিয়ে যায়। তার মধ্যে কোনোটি সমরের পরিচিত অতীত,কোনোটা বাস্তব এবং কোনোটা হয়তো অপরিচিত কালহীন সত্তা সঞ্চয়।

এভাবেই সে দেখেছিল শৈশবে মাঠে শুয়ে শুয়ে দেখা জ্বলজ্বল করতে থাকা তারার আকাশটা।সেদিন সে একটা তারা থেকে অন্য তারা পর্যন্ত রেখা টেনে,গাছ,হাতি বানিয়ে আনন্দ লাভ করেছিলেন।নিচে অগণন জোনাকি পোকা নেচে বেড়াচ্ছিল,তার বাইরে সমস্ত কিছুতে অন্ধকার। দাদারা ভেলাঘর তৈরিতে ব্যস্ত থাকায় সে নরার স্তূপে পড়ে সেগুলিতে হারিয়ে যাওয়া ছন্দ মিলিয়ে রাতের ঝিঁ ঝিঁ পোকা এবং পাশের পুকুরের ব্যাঙগুলির সঙ্গীতের তালে তালে নাচতে লাগল।নিজের অজান্তে কখন ঘুমিয়ে পড়ল বলতেই পারে না।

সেই রাতটা থেকে সে সিগারেটের ধোঁয়ার মতো কুন্ডলি পাকিয়ে সেই আই সি ইউ তে ফিরে এসেছিল না অন্য কোনো জগতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল সেটা ভাবার জন্য সমরের চালিকা শক্তির আধুনিক যন্ত্রটিতে তার কোনো অনুমোদিত কার্যক্রমণিকা ছিল না। 

সেই বিছানা  থেকে সে অনেকগুলি জায়গায় গেছে।গ্রামের বাড়ির বকুল ডালের গন্ধের মধ্যে,বনভোজের স্ফুর্তির অন্তহীনতায়,আগে শাসন করতে না পারা,বুকে সঘন কম্পনগুলির মধ্য দিয়ে সে চলে গিয়েছিল। কখনও কখনও তার যাত্রা অসম্পূর্ণ রেখেই সে কুন্ডলী পাকিয়ে তার বিছানায়   ফিরে আসে,চারপাশে উৎকণ্ঠিত টুপি এবং মুখোস পরা মুখগুলি দেখে সমর ভাবতে চেষ্টা করে এসব কী হচ্ছে? সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে,ইলেকট্রনিক মনিটরগুলির বিপারগুলি চিৎকার করে উঠে ,ধমনীতে লাগানো ইঞ্জেকশনের মধ্য দিয়ে আরও কিছু ওষুধ যায়-তারপরে ঘটনাগুলি স্থবির হয়ে থাকে।মানুষগুলি অন্য একটি বিছানার রোগির কাছে চলে যায়,নাহলে তারা পাশের টেবিল চেয়ারগুলিতে বসে বিশ্রাম নেয়,ফোনে কথা বলে না হলে সেখানে বসে বসেই ঘুমোতে চেষ্টা করে।

ঘর থেকে বহু হাজার মাইল দূরের তার তিক্ত দৈনন্দিন জীবন যুদ্ধের গণিতগুলিতে কিন্তু সে একবারও যায়নি। সঙ্গীহীন আশ্চর্য শহরটিতে ক্যাশ বুক,লেজার বুক,ভাউচার জমা এবং খরচের অমিল সংখ্যাগুলি,নাহলে পাবগুলিতে দুই হাজার ডেসিবেল সঙ্গীতের তালে তালে আলজিভ ঠেলে টেনে বইয়ের খাওয়া সময়গুলিতেও সে একবারও যায়নি।

সাতদিন হল সে একভাবে পড়ে আছে।বিকেলে একজন এসে তার নাম ধরে ডাকল ‘সমর,সমর!এই’?আওয়াজটা দূর থেকে ভেসে আসার মতো সে অস্পষ্টভাবে শুনতে  পেয়েছিল।কপালে চাপ দিয়ে সে চোখদুটি মেলে তাকাল।সিনেমার Extra Terrestroal  প্রাণীর মতো দেখতে মুখগুলি সে চিনতে পারছিল না।

কোমৰ,বুক,বুকের হাড়্গুলিতে সে এক অসহ্য ব্যথা অনুভব করল।শ্বাস-প্রশ্বাসে ভাঙ্গা হাড়্গুলি একে অপরের সঙ্গে চাপা খেয়ে খট খট করে শব্দ করছে। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে মুখ দিয়ে ‘ঘোৎ’করে শব্দ করল।তাকে চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষগুলির গুঞ্জন শুনতে পেল।সামনের অস্পষ্ট মুখগুলি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল ঠিক যেভাবে ক্যামেরার জুম লেন্সগুলি ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবি স্পষ্ট করে তোলে। সবুজ আবরণে শরীরের বেশিরভাগ ঢেকে রাখা মানুষগুলিকে তার পরিচিত বলে মনে হল না,মাত্র একজন ছাড়া। জুমের পেছনে দাঁড়িয়ে একান্ত মনে তার দিকে তাকিয়ে থাকা গোলাপি গালের সজল মেয়েটিকে দেখে তার 

মনে কিছু একটা ভাব আসতে লাগল।‘ও কে?সে ওকে জানে নাকি?সেই চোখদুটি,মাস্কটার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে থাকা মুখটা এবং দেখা না দেখার মাঝখানে নববিবাহিতার সিঁদূরের ফোঁটাটা তার কেমন যেন পরিচিত বলে মনে হল।

‘সা-গ-রি-কা।’

সাগরিকা তার পুরোনো সহকর্মী। এই আজব অপরিচিত শহরে তার প্রথম বন্ধু।

তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা চারটি অক্ষর বাকি কয়েকজন বুঝতে না পারার মতো হলেও ফুটে উঠল।উঃআঃ ছাড়া অন্য কেউ আর কিছু শুনতে পেল না।

কমা স্কেলে কিছুটা ইম্প্রুভমেন্ট দেখাচ্ছে।কিন্তু এখনও বিপদমুক্ত বলা যাবে না। Head Injury র সঙ্গে  Multiple fracture ও রয়েছে।তাই কোনোকিছুই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।’চিকিৎসকের কথা শেষ হওয়ার আগেই খট খট করে শব্দ করে সাগরিকা বেরিয়ে গেল।

সাগরিকা এখানে কেন এসেছে এবং সেই বা এখানে কীভাবে এল?

এই আন্তর্জাতিক শহরটিতে আসার দুই বছরের মধ্যেও অ্যাকাউন্টেন্সির অফিস,তার হিসেব পত্র বস বেঁধে দেওয়া সময় সীমার বাইরে তার জীবনে কিছুই ছিল না।এলার্ম ঘড়ির চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে মুখ ধুয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে অফিসে পৌছায়,তারপরে কম্পিউটার,ব্যালেন্স সিট এসবই।রাতের বেলা ঘরে ঘুমোতে আসা হয়।বেতন যে বেশি পাচ্ছে,সে যে কাজটাকে খুব ভালোবাসে তা ও নয়।কেবল করতে হয় বলে করে চলেছে।এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য চাকরিতে ঢুকলেও তাকে এটাই করতে হবে।তাই আজকাল সে আর এসব নিয়ে ভাবে না। 

আগে সাগরিকার সঙ্গে  কফিবারে কাটানো সময়গুলি সে মুখের মূলধন হিসাবে ঘোষণা না করেই মেনে নিয়েছিল।ওরা মাত্র ফুলের বিষয়ে আলোচনা করত।ড্যাফোডিল,টিউলিপ,সূর্যমুখী,গোলাপ কোনটার কী রঙ ভালো লাগে,কীভাবে রোপণ করতে হয়,কোথায় কীভাবে কলমের চাষ করতে হয়,কোন গাছের বনসাই ওরা করেছে ,কী করতে বাকি থেকে গেল-এক কাপের পরে আরেক কাপ কফি এবং পেস্ট্রি খেয়ে ঘণ্টার পরে ঘণ্টা ধরে ওরা এইসব বিষয়ে কথা বলছিল।

সমরের প্রিয় ফুলগুলি বকুল,টগর,যেগুলির সঙ্গে সে বড় হয়েছিল সেইসব বিষয়ে সাগরিকার জ্ঞান অবশ্য যথেষ্ট কম,তথাপি দুজনের ফুলের প্রতি কৌতূহল থাকার জন্য ওদের সময়টুকু যেন ভালোভাবে পার হয়ে যেত।আলোচনায় সবসময় ঘুরে ফিরে রজনীগন্ধার কথা আসত।রজনীগন্ধার রূপ, গন্ধ, কোমলতা  ওদের দুজনেরই অত্যন্ত প্রিয়।প্রতিদিনই ওদের কথায় একবার না একবার রজনীগন্ধার প্রসঙ্গ উঠত।ওদের সম্পর্কটা ফুলের ছিল ঠিক প্রেম নয়,বন্ধুত্বও বলা যায় না।কিছুদিন পরে তার বিয়ে হয়ে গেল,ওদেরই এক্সিকিউটিভ প্রভজ্যোতি সিংহের সঙ্গে।আশ্চর্যজনক ভাবে সে ফুল বা সেই ধরনের জিনিস ভালোবাসে না।Fitness Conscious প্রভজ্যোতি তার জিমনেসিয়াম,ডায়েট এবং অফিস ছাড়া অন্য কোনো কিছুই বুঝতে পারত না,আর সাগরিকা এক কথায় তার বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিল।

তারপরে সমরের জীবনটা কোনো কারণ ছাড়াই রুটিন হয়ে পড়েছিল।অফিস আসে আর যায়,রাতে রুমে পড়ে থাকে।সপ্তাহান্তে পাব বা ডিস্কে সুরাপান করে,গাড়ি নিয়ে মেডরেস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে।কিন্তু এসবেও কোনো আগ্রহ বা আনন্দ তাঁর ছিল না।কাজগুলি করতে হয় বলে করে যেত। একবার সে বাড়িতেও এসেছিল কিন্তু বাড়িতেও তার জন্য কিছু ছিল না। গ্রাম থেকে তারা উঠে এসে শহরে ঘর বানিয়েছে আর শহরটা তার অপরিচিত।সে তার শৈশবের পরিচিত গ্রামে একবার গিয়েছিল।গ্রামের সঙ্গীরা ইতিমধ্যে জীবিকার তাড়নায় অন্য শহরে চলে গেছে।তার পরিচিত চাষের জমি,গ্রামের নামঘরটা ,বাতাবী লেবু দিয়ে বল খেলার মাঠটা তার অপরিচিত প্রাণহীন বলে মনে হচ্ছিল।

সেখান থেকে ফিরে এসে পুনরায় সে গাণিতিক অফিসের  গণনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।তারপর সে আর বাড়ি ফিরে যায়নি।অফিস পাব,রুম এইগুলির মধ্যে সে পুনরায় ডুবে গেল।সাগরিকার সঙ্গে  মাঝে মধ্যে দেখা হয় কিন্তু ক্রিসেন্থিমাম বা রজনীগন্ধার কথা বলার মতো কারও অবসর থাকে না। অফিসে আসা কাজগুলি সময় সীমার মধ্যে শেষ করার জন্য প্রায়ই তাদের অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়।বহুরাষ্ট্রীয় অফিসটার শাখাটা সম্মুখিন হওয়া প্রতিটি সমস্যাকে সমরদের নিজেদের সমস্যা বলে ভাবতে হত।কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি ওদের নিজেদের সমস্যা হয়েই থাকে।সপ্তাহান্তে পাওয়া আটচল্লিশ ঘণ্টা ছুটিতে সমর এবং সহকর্মী দুজন অত্যাধুনিক পাবগুলিতে সুরাপান করে নাহলে গাড়ি নিয়ে শহরের বাইরের হাইওয়েগুলিতে অনর্গলভাবে ঘুরে বেড়ায়।সঙ্গীদের এইসবের প্রতি ভীষণ আগ্রহ। সমর কেবল তাদের সঙ্গে থাকে সময় পার করার জন্য।নিশ্বাস নেওয়াটাকেও সে যান্ত্রিক জীবনের রুটিন বলেই ধরে নিয়েছিল।

সেদিনও সপ্তাহান্তে ওরা বেরিয়ে এসেছিল।মন চাইলেও বন্ধ করতে না পারা যান্ত্রিকতার ওপরে হঠাৎ সমরের রাগ উঠে গেল।ডিস্কোটাতে অন্ধকারের মাঝেমধ্যে লাল নীল আলোগুলি সবাইকে ছূঁয়ে যাচ্ছিল।ডিস্ক জকি পুরোনো জনপ্রিয় একটা গানকে খন্ড বিখন্ড করে মাঝে মধ্যে দ্রুত এবং ভাঙ্গরার তালে তালে দুই হাজার ওয়াটের শব্দ বাক্স গুলির মাধ্যমে সবাইকে শোনাচ্ছিল।সমরের সঙ্গী কয়েকজন তার তালে তালে নাচার জন্য নৃ্ত্যের কার্পেটের দিকে এগিয়ে গেল।বারের এক কোণে একটা টুলে বসে হাতে বীয়রের ক্যান নিয়ে থাকার সময় হঠাৎ ধৈর্যচ্যুতি হয়ে সমর ডিস্কোবার থেকে বেরিয়ে এল।

গাড়ির ইঞ্জিনটা চালিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে কথাগুলি ভাবতে লাগল-নিজের গ্রাম,নগরে নতুন করে বানানো তাদের ছোট বাড়িটা,তার অফিস,অট্টালিকা,ডিস্কোথেক কোথাও সে নিজেকে খুঁজে পায়নি।শিখণ্ডীর পৃথিবীতে জীবন নামের যেন অন্য কোথাও।

‘Life is elsewhere’

সে বিড়বিড় করল।গাড়ির এক্সিলেটরে ধীরে ধীরে চাপ দিল,গাড়িটা বোধহয় এগিয়ে যাচ্ছিল।গতির কাঁটাটা ,একশো,একশো কুড়ি,একশো চল্লিশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার কাঁটা ছুঁয়ে চলল। রাত দুটো বাজে যদিও রাস্তায় কিছু গাড়ি ঘোড়া চলছিল।ঠিক তখনই সামনের একটা বিশালকায় লড়ির হেড লাইটের আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।লড়ির হর্ণটা তার কানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকট অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের শব্দ হল।

তারপরে…

তারপরে কী হল সমরের মনে নেই।

ফুল তারা এবং রামধেনুর মধ্য দিয়ে ভরহীন যাত্রার মাঝে মধ্যে সে এসে স্পেস শিপ সদৃশ আইসিইউ তে আশ্রয় লাভ করে,মানুষগুলিকে দেখে,ততটাই। বুকের ভাঙ্গা হাড় গুলি থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়া ব্যথায় কাতর হয়ে সে চোখ মেলে তাকাল,সেইসময় তার চারপাশে কেউ ছিল না। অনবরত তার টিউব-লাইটগুলি জ্বলে থাকে বলে তখন দিন ছিল না রাত সে বুঝতে পারেনি।চিকিৎসক এবং একজন নার্স তার থেকে কিছুটা দূরে থাকা একজন রোগীর নাক দিয়ে খাদ্যনালী পর্যন্ত একটা পাইপ ভরানো ছিল।নিশ্বাসে রাস্তাটা বন্ধ হতে চলার জন্য নাক এবং মুখ দিয়ে খোপ খোপ শব্দ হচ্ছিল।তার অন্যপাশের রোগীটির মুখে অক্সিজেন এবং মাস্ক নিয়ে প্রশান্ত ভাবে শুয়ে ছিল।একজন পরিচারিকা রোগীর কেস হিস্ট্রিতে ওষুধ পত্রের হিসেব লিখছে।বাইরে যাবার ইচ্ছায় সে পা টা তুলতে চেয়েছিল।না।পা,হাত,মাথা কোনো অংশই সে চেষ্টা করেও নাড়াতে পারল না।অশেষ কষ্ট করে সে চোখের পাতাটা মেলতে পেরেছিল।সামনের সমস্ত কিছুই কেমন যেন অস্পষ্ট আর ধোঁয়া ধোঁয়া বলে মনে হল।যেন ফোকাশের বাইরের কুয়াশা ঢেকে রাখা লেন্সের মধ্য দিয়ে জিনিসগুলি দেখছে।যন্ত্রগুলি,কাছের রোগীরা,হাতে ওষুধের ট্রে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সিস্টার সবাই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল।

একটা মায়াবী অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে সে,সমরের দেহ থেকে বেরিয়ে ভরহীনতায় ফুল-তারার আলোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। রঙ এবং বর্ণনার বাইরের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে চোখ মেলে সে অফিসটা দেখল।সেখানে সবাই আগের মতোই কাজ করছে এবং কফিবারে প্রভজ্যোতি এবং সাগরিকা কফি খাচ্ছে।প্রভজ্যোতি তাকে ট্রাইসেপ এবং লেটি-মাছ দর্চি নামের মাসল দুটোর জন্য এবং পাসাটা সেট ব্যায়াম করার সুখবরটা আনন্দ মনে দিচ্ছে,সঙ্গে্র ডিস্কো প্রেমিকরা ডিস্কোথেকে হাতে বীয়রের ক্যান নিয়ে নেচে চলেছে।চোখদুটি বন্ধ করে পুনরায় সে রঙের ঢেউয়ে ভেসে যেতে লাগল। সে পুনরায় তার গ্রামের মাঠ থেকে  আকাশটা দেখতে  পেল,দূরের পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া ফুটফুটে হলদে সরষের খেতগুলি,গ্রামের বিলনিতে লালুকি,মাছের সঙ্গে ফোঁটা ভেটগুলি। দেহাতীত সমর ভেসে পুনরায় সেই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের দশ ইঞ্চির বেড়ার মধ্য দিয়ে এসে তার কর্মচারীদের ব্যস্ত অবস্থায় দেখল।প্রত্যেকেই একজন রোগীকে উত্তেজিত ভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।দুজন চিকিৎসক তাঁর বুকে চেপে ধরে কার্ডিও পাল্মনারি রিসাসসিটেশন  করছিল।রোগীর কার্ডিয়াক মনিটরের রেখাটা প্রায় সমান হয়ে কিছু স্বাভাবিক শব্দ করছিল আর পালস অক্সিমিটারের পরিমাণগুলি অনেকটা এদিক ওদিক হচ্ছিল।

চিকিৎসক এবার ডিফিব্রিলেটরটা হাতে নিয়ে রোগীর বুকে বৈদ্যুতিক সংযোগ করলেন।রোগিটি লাফিয়ে উঠল,সবাই মনিটরের দিকে তাকাল-না,রেখাটা এখনও সমান।একজন পালস দেখল-‘পায় নি’।

চোখের মণিতে আলো ফেলতেই মণির গহ্বরটা বড় হয়েছে।তারপরে আর করার কিছুই নেই।এক এক করে মানুষগুলি চলে গেল। একজন মৃত্যুর প্রমাণ পত্র লিখতে লাগল।সমর রোগীর দিকে তাকাল-গভীর প্রশান্তিতে সে নিশ্চিত মনে চিত হয়ে পড়েছিল।দুচোখে মহাশূন্যের দিকে ভাবহীন দৃষ্টি,সে ভালোভাবে মনে করে দেখল ,কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত সেই দেহটার অধিকারী সে নিজেই ছিল।

কর্কশ শব্দ করে স্ট্রেচারটা তার দেহটাকে ঠেলে আইসিইউ এর বাইরে বের করে নিচ্ছিল।বাইরের কিছু কৌতূহলী মুখ তার পথ ছেড়ে দিল।আর তার সঙ্গে সঙ্গে বের হল,স্ট্রেচারের চাকাগুলির গতি বাড়তে লাগল।

ক্রমশ বেড়ে আসা দূরত্বের সেই ভিড়টার মধ্যে সাগরিকার রঙিণ মুখটা সে দেখতে পেল।তার হাতে রজনীগন্ধার একটা স্তবক ছিল।স্তবকটার মাদকতা ভরা গন্ধটা শীতল সরীসৃ্পের মতো ছড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল…।  

-----------











কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

চ্যাটমোড লিখনশৈলীতে লেখা কবিতা-৪৩ || সৌমিত্র রায় || "i-যুগ"-এর কবিতা

  চ্যাটমোড লিখনশৈলীতে লেখা কবিতা-৪৩ সৌমিত্র রায়  "i-যুগ"-এর কবিতা সিংহপুর; ১৬-০১-২০২১; দুপুর ২:০৯; টেরি গাঁদা ৷ থোপা গাঁদা ৷ গাঁদা...