অনুবাদ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৫

সেই বুড়ো মানুষটির জন্য ।। মীনাক্ষী বুঢ়াগোঁহাই ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস, অনুবাদ গল্প

 সেই বুড়ো মানুষটির জন্য

 মীনাক্ষী বুঢ়াগোঁহাই

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস



  গড়িয়া পুকুরে বড়শি বেয়ে থাকা দিগন্তকে দাদুল দূর থেকে চিৎকার করে বলল,’ এই দিগন্ত, রত্ন মাস্টার মারা গেছে ,জানিস কি?’ ঘন্টা দুয়েক আগে এদিক দিয়ে মাস্টার মাঠের উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল নাকি? তখন দিগন্ত বড়শির সাজসরঞ্জাম তৈরি করতে ব্যস্ত ছিল। কীভাবে মানুষটার মৃত্যু হল বলে জিজ্ঞেস করবে ভাবতে ভাবতেই দাদুল অনেক দূরে চলে গেল।ফোর জিরো সেভেন বুড়োকে ধাক্কা মেরেছে নাকি ?

 তাড়াতাড়ি করে দিগন্ত বড়শি গুছিয়ে রাখতে লাগল। সে যখন রত্নমাস্টারের বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছাল , তখন জায়গাটা মানুষে ভরে পড়েছে। মাস্টারের ঘরের দরজার সামনে, ভেতরে বাইরে কেবল মানুষই মানুষ ।এতগুলি মানুষ এত তাড়াতাড়ি কীভাবে জানতে পারল যে রত্ন মাস্টারের মৃত্যু হয়েছে ।শোবার ঘর থেকে হাজরিকা ডাক্তার চোখের জল মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছে। পেছন পেছন মাথা নিচু করে শইকীয়া কম্পাউন্ডার।ডাক্তারও কাঁদে? দিগন্তের মনে মনে হাসি পেয়ে গেল। রত্নমাস্টারের বড়ো ছেলে এবং হাজরিকা ডাক্তার স্কুলে একসঙ্গে পড়াশোনা করা, সেই জন্যই মানুষকে দেখিয়ে কাঁদছে বোধ হয়।

 কী হয়ে মানুষটার মৃত্যু হল জিজ্ঞেস করবে বলে ভেবেও সে জিজ্ঞেস করার মতো আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না। প্রত্যেকেই ভদ্র ঘরের মানুষ। দুই একজন অপরিচিত মানুষও রয়েছে। তখনই দূরে শৈলেনকে দেখতে পেয়ে সে কাছে এগিয়ে গেল। শৈলেনের হাতে চিমটি কেটে সে জিজ্ঞেস করল,’ কী হয়েছিল রে? আমি ভালো করে জানি না বুঝেছিস।’ হার্ট ফেল’ করেছে বলে শুনেছি।’

 ‘ হার্টফেল ?অন্তরে কোনো আঘাত পেলে তবে হে হার্টফেল করবে ।দিগন্ত শৈলেন কে বুঝানোর চেষ্টা করল। শৈলেন কী জানি বলে অন্য মানুষের ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। দিগন্ত এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল।রত্নমাস্টারের স্ত্রী হাউ মাউ করে চিৎকার করতে থাকবে বলে সে ভেবেছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কারও কান্না ভেসে আসছে না। কোনো ধরনের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কেবল গহীন গম্ভীর মানুষগুলি জমায়েত হয়ে রয়েছে। ধুর এটা কি মরা মানুষের ঘর? শৈলেনের কাছে গেল।’ দিদি বাড়িতে নেই নাকি? সে শৈলেনকে জিজ্ঞেস করল।

 রত্নমাস্টারের স্ত্রী এই অঞ্চলের প্রত্যেকেরই দিদি।উনিশশো একান্ন না বাহান্ন সনে তিনি এই অঞ্চলে মেট্রিক পাশ করা প্রথম মেয়ে। সেই তখন থেকে ছেলে বুড়ো প্রত্যেকেরই তিনি দিদি এবং এখন তার নাতি নাতনির বয়সের ছেলেমেয়েরাও তাকে দিদি বলেই ডাকে। নিজের সম্পর্কের মানুষগুলি ছাড়া অন্যেরা যদি তাকে কাকিমা মাসি বলে সম্বোধন করে, তখন তিনি খুব একটা খুশি হন না। বিশেষ করে কেউ যদি তাকে বড়োমা বা মাসি বলে ডাকে তাকে নির্ঘাত গালি খেতে হবে।—মাসি বলে ডাকা ছেলেটিকে বলবে—’ এই আমি তোর মায়ের দিদি নাকি? তোর মায়ের আগে জন্ম হয়েছিল না আমার আগে হয়েছিল— তুই দেখেছিলি নাকি পুনরায় বড়মা ডাকা ছেলেটিকে বলবে আমাদের মাস্টারকে বুড়ো পেয়েছিস নাকি যে আমি তোর বড়োমা হব। কেউ বুড়ি বলে মন্তব্য করলে তো তার অবস্থা শেষ ।

 দিগন্ত যদিও তার নাতি তথাপি মানুষটার স্বভাবটা জানে বলে সে শৈলেনের সামনে দিদি নাই নাকি বলে জিজ্ঞেস করল । শৈলেন বলল না দিদি গতকাল অরুণা দিদির বাড়িতে গিয়েছে। অরুণা দিদি মানে রত্নমাস্টারের বড়ো মেয়ে, কোনো একটি কলেজের অধ্যাপিকা— অঞ্চলের প্রথম এমএ,তাই তিনি সকলেরই দিদি। দিগন্ত এবার আশ্বস্ত হল।

 রত্নমাস্টার এবং দিদি ছাড়া এই প্রকাণ্ড বাড়িটাতে এখন কেউ থাকে না। তারা দুজনের মধ্যে একজন একজন করে কোথাও মানে ছেলেমেয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই রত্নমাস্টারের আকস্মিক মৃত্যুর জন্য আশেপাশের প্রত্যেকেই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরা। তাকেই প্রত্যেকে এটা কর,ওটা কর বলে চলেছে। কেউ বলছে— কাউকে পাঠিয়ে দে,কেউ বলছে ওয়ারলেস মেসেজ কর, আবার কেউ বলছে ছেলেদের ফোন নাম্বার খুঁজে দেখ, মারা গেছে বলে দে।তার মধ্যে আবার কেউ বলছে বড়ো ছেলেকে খবর দিলেই হবে— তার কাছ থেকেই বাকি সবাই জানতে পারবে ।মোটকথা চারপাশে মৃদু গুঞ্জন, চাপা উত্তেজনা।

 রত্নমাস্টারের সম্পর্কীয় ভাই চন্দ্রের চোখ হঠাৎ দিগন্তের উপরে পড়ল। ও, তুইও এসেছিস। অন্যেরা কেউ না এলে মুখাগ্নি করার দায়িত্বটা তুই পাবি, থাক থাক।’ বলে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দিগন্তের শরীরটার মধ্যে যেন বিছা লেগেছে। সে সেখান থেকে চলে আসবে বলে ভাবল, কিন্তু এতগুলি মানুষের আকর্ষণ তাকে বেঁধে রাখল।

  এই বাড়ির ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী দিগন্তই হত। আজ এতগুলি মানুষের মধ্যে রত্নমাস্টারের একমাত্র আত্মীয় সেই। কিন্তু সেই আত্মীয়তা সমাজ স্বীকৃত নয়,, যার জন্য দিগন্তও এই মানুষগুলির সঙ্গে সাধারণ হয়ে রত্নমাস্টারের মৃতদেহটা ঘিরে আছে।

রত্ন মাস্টার মানুষের সামনে বলেছিল,’ সেই মেয়েটি বললেই হবে দিগন্ত আমার নাতি সে যে আমার নাতি তার লক্ষণ কিছু আপনারা দেখেছেন কি? তার চেহারাতেই রয়েছে নাকি তার বুদ্ধিবৃত্তিতে রয়েছে? আমার ছেলে মেয়েদের কেউ কোথাও সেকেণ্ড ডিভিসন পেয়েছে কি? সেই দিগন্ত নামে ছেলেটি –ক্লাস সেভেনে যে তিনবার ফেইল করেছে সে আমার নাতি হতে পারে কি?’রত্নমাস্টারকে সবসময় ঘিরে থাকা তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর অন্য কথাতেও যেমন সায় দেয় সেভাবে এই কথাতেও সায় দিয়েছিল।

 কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা নেতা না হয়েও এই অঞ্চলে রত্নমাস্টারের প্রতিপত্তি অসীম। জীবনের মধ্যভাগ পর্যন্ত তিনি অবশ্য এত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন না। একটি সামান্য হাইস্কুল খুলে তেমনই সমাজসেবা এবং জীবনসংগ্রাম আরম্ভ করেছিলেন। প্রচুর অভিজ্ঞতা এবং কঠোর শ্রমে তিনি স্কুলটা উজ্জীবিত করে তোলার সঙ্গে অঞ্চলটির উন্নয়নশীল কাজকর্মে এভাবে জড়িত হয়ে পড়লেন যে তাকে বাদ দিয়ে সেই অঞ্চলের জনগণ অন্য মানুষের কথা ভাবতেই পারে না।

 সেই প্রতিষ্ঠিত ,প্রতিপত্তিশীল রত্নমাস্টারের বড়োছেলের সঙ্গে বদনাম হল তরুলতা নামের সাধারণ ঘরের সাধারণ একটি মেয়ের। মাস্টারের ছেলেটি তখন ইঞ্জিনিয়ারিঙের প্রথম সেমিস্টারে। কিন্তু সে সেই সময়ে কোনোমতেই স্বীকার করল না যে তরুলতার গর্ভের সন্তানটির সেই পিতা। সে মাত্র বলেছিল যে ইঞ্জিনিয়ারিঙের টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আসার পরে সে তরুর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিল এবং ওদের একসঙ্গে থাকতে অন্য মানুষেরাও দেখেছিল। কিন্তু এই ধরনের সাংঘাতিক কিছু একটা ? না, না –মোটকথা জয়ন্ত জনসভায় না থেকে হ্যাঁ করল না।সেদিন তরুলতা কেবল চোখের জল ফেলতে ফেলতে তার দিকে একবার অঙ্গুলি নির্দেশ করল। তারপর থেকে সে সেই যে নিশ্চুপ হয়ে পড়ল এখনও সেই নিশ্চুপই রয়েছে।

 বর্তমানে তার সমস্ত কাজকর্ম ,চিন্তাধারা দিগন্তকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে জয়ন্ত ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে ,ঘর-সংসার করে বৈধ পিতৃ্ত্বের অধিকারীও হয়েছে ।

 আর দিগন্ত রত্নমাস্টারকে অস্বস্তিতে ফেলে দিগন্ত নামের ছোটোখাটো গাধা ছেলেটি মাস্টারের জীবনবৃত্তের চারপাশে ঘুরতে থাকল।

 দিগন্তের জীবনের এই সতেরোটা বছর কেবল রত্নমাস্টার নামে মানুষটার কথা ভাবতেই পার হয়ে গেল। আশ্চর্যের কথা । তার ক্ষুদ্র জীবনের সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্নার কথা সে রত্নমাস্টারকে বোঝাতে চায়,দেখাতে চায় । সারাদিনে একবার রত্নমাস্টারকে না দেখলে তার ভালো লাগে না। এমন কী নতুন কাপড় পরলেও সে রত্নমাস্টারের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। তার জীবনের সবচেয়ে ইম্পরটেন্ট ব্যক্তিটিই হলেন রত্নমাস্টার। সে মাস্টারের চোখের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেখাতে চাইছিল। কিন্তু হঠাৎ রত্নমাস্টারের মৃত্যু ঘটায় সবকিছুই কেমন যেন উলোট পালট হয়ে গেল।

 দিগন্ত মাঝে মধ্যে একা কথা বলে। অন্যের চোখে একা একা কথা বলা মনে হলেও আসলে দিগন্ত কল্পনায় রত্নমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে। তার অজান্তে সে রত্নমাস্টারকে বলতে চাওয়া কথাগুলি তার মুখ দিয়ে শব্দ করে বেরিয়ে যায়। তরুলতা এই মুহূর্তগুলিতে তাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কী আছে রত্নমাস্টারের শরীরে? দিগন্ত যে সেই মানুষটাকে এত গুরুত্ব দেয়। অথচ সে যে মানুষটাকে ভালোবাসে তা তো নয়। দিগন্তের বন্ধুরা দিগন্তের একমাত্র শত্রু বলতে রত্নমাস্টারকে বোঝে।

 আসলে মানুষের জীবনে শত্রু বলে ভাবা ব্যক্তিটিই বোধহয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।মানুষ শত্রুর চোখের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শত্রুর অন্তরে জ্বলনের সৃষ্টি করতে চায়। সেই শত্রুর মৃত্যুর পরে কাকে দেখাবে নিজের ঐশ্বর্য ,সুখ-শান্তি ?প্রেমিকা এবং শত্রুর মধ্যে পার্থক্য কি?ঘুম থেকে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কার কথা ভাবা হয় ? শত্রুর না প্রিয়জনের?দুটিই দেখছি একাকার হয়ে যায়। রত্নমাস্টারের মৃত্যুতে দিগন্ত যেন হঠাৎ নিঃস্ব হইয়ে পড়ল।

 দিগন্ত বাড়ি এল।মাকে খবরটা দেওয়ার পরে মা তার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপরে স্বাভাবিক ভাবেই নিজের অর্ধ সমাপ্ত ঘরোয়া কাজগুলি করতে লাগল।

 দিগন্ত নিজের চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে ভাবল, এই সুন্দর পৃ্থিবীটা রত্ন মাস্টারের চোখের সামনে থেকে সরে গেল। সেও ইঞ্জিনিয়ার হবে বলে ভেবেছিল।তার পিতা জয়ন্তের মতো।সে কল্পনা করেছিল,ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রত্নমাস্টারের দীর্ঘ পদূলিতে সে গাড়ি থেকে নামবে।দুই হাতে কোট-টাই ঠিক করে বারান্দায় বসে থাকা রত্নমাস্টারের কাছে গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলবে, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হলাম।’

 শেষ রাতে রত্নমাস্টারের পত্নী বড়ো ছেলে জয়ন্ত এবং মেয়ে অরুণা এসে উপস্থিত হল। বাড়িতে তখন কান্নার রোল উঠল। দিগন্তদের বাড়ি থেকেও কান্নার রোল ভেসে আসতে লাগল ।সকালবেলা মৃতদহ নিয়ে খোল বাজিয়ে শবযাত্রা আরম্ভ হল। দিগন্ত বাড়ির ভেতরেই থাকবে বলে ভেবেছিল যদিও এক দুর্বার আকর্ষণ পুনরায় তাকে রত্নমাস্টারের মৃতদেহের কাছে নিয়ে গেল।

 সেদিনই একটার সময় শব দাহ করা হল। চিতার আশেপাশে তখনও পুরুষ মহিলারা জায়গাটা পরিপূর্ণ করে রেখেছিল। বেশিরভাগ মানুষ যে যার বাড়িতে চলে যাবার পরে দিগন্তও বাড়ি ফিরে এল। মা তাকে স্নান করার জন্য জল- গামছা এগিয়ে দিল। স্নান করে এসে অন্যান্য দিনের মতোই সে মাকে বলল, ‘মা খুব ক্ষুধা পেয়েছে। তাড়াতাড়ি ভাত দে।’ মা তার হাত ধরে বাড়ির পেছনদিকে বাগানের কাছে টেনে নিয়ে গেল। মা তাকে আস্তে করে বলল—‘তোকে আজ ভাত খেতে হবে না। তুই আজ এক বেলা উপোস করবি।’

  দিগন্ত যেন ক্রোধে ফেটে পড়বে। যে বাড়ি তাকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দান করেনি, যে মানুষটা রাস্তাঘাটে দেখলেই তাকে উপহাস ছাড়া আর কোনভাবেই সম্ভাষণ জানাতো না–সেই মানুষটার মৃত্যুতে দিগন্তকে একবেলা উপোস করতে হবে। ‘কেন উপোস করব’বলতে না বলতেই মা ফিসফিস করে তাকে বলতে লাগল—‘আমার শপথ দিগন্ত, তুই অন্য কারও কাছে বলবি না। আসলে রত্ন মাস্টারই তোর পিতা।পিতার বয়সের একজন মানুষকে বদনাম করতে ইচ্ছা হল না বলেই আমি জয়ন্তই তোর পিতা বলে বলছিলাম।পিতার মৃত্যুতে তুই … ।

 দিগন্তের পায়ের পাতা থেকে উপর পর্যন্ত ঝিনঝিন করতে লাগল। মা তার পরের কথাগুলি কী বলছে তার কানে প্রবেশ করল না। সে মায়ের মুখের দিকে কখনও না তাকানো অদ্ভুত মুখাকৃতির একজন মানুষকে দেখার মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

------------

 লেখক পরিচিতি-মেঘালয়ের তুরা গভর্ণমেন্ট কলেজের অসমিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা।প্রকাশিত গ্রন্থ –হাতি খুতরার সপোন,অনুবাদ-লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার,বিভিন্ন পত্র পত্রিকার লেখিকা।একজন প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন লেখিকা।


সোমবার, ১০ মে, ২০২১

বিতৃষ্ণা সৌরভ কুমার চলিহা মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 বিতৃষ্ণা

সৌরভ কুমার চলিহা

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস





' এই যে দেখুন জামাইবাবু, ঠিক আপনি যেমন চাইছেন সেই ধরনের রুম', সহাস্য মুখে পিকলু বলল (আমার শালা), ‘এটা আপনার খুব পছন্দ হবে। এখানে এই কয়েকদিন থেকে আপনার ভালো লাগবে। সেকেন্ড ফ্লোর এবং থার্ড ফ্লোরে কয়েকটি রুম দেখিয়ে ছিল কিন্তু সেগুলি স্কোয়ার, আপনি যেমন চাইছেন অবলং নয় পাশে অন্যান্য রুমের হাল্লাও অনেক, শেষে আমি ইনসিস্ট করায় টপ ফ্লোরে  এটা পেয়ে গেলাম, জাস্ট দা রাইট সাইজ, নিরিবিলি-।'

অন্যমনস্কভাবে পিকলুর কথাগুলি শুনছি, মনে হচ্ছে যেন অনেক দূর থেকে শব্দগুলি আসছে, যেন রেকর্ড করা-হ‍্যাঁ, ঠিক এ রকমই একটি রুমের কথা আমি বলে থাকি- দীর্ঘ নিরিবিলি, রাস্তার হট্টগোল স্পর্শ করতে পারে না। পুবের দিকে দুটো জানালা, ভোরের রোদ আসে, সারাদিন ফুরফুরে বাতাস আসে, পর্দা কাঁপে, কাঠ এবং প্লাইউডের প্যানেলিং গুলিও আমি যেরকম চেয়েছিলাম পাতলা আখরোট রঙের, সম্ভব হলে একটা এসি(এখানে অবশ্য ফ্যান আছে) উত্তর দিকে একটি বড় জানালা,তার নিচে লেখাপড়া করার লম্বা টেবিল, বইয়ের থাক এবং  আলমারি, দূরের রাস্তা দেখা যায়, উঁচু উঁচু নারিকেল, সুপুরি-কলা- দেবদারুর শ‍্যামলিমা, তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, পাতাগুলি কাঁপে, গাছগুলি হেলে দুলে, ইচ্ছা হলে সেদিকেই তাকিয়ে থাকা যায়-’

মীরা প্রত্যাশিতভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বলল,' পছন্দ হয়েছে কি? মাত্র তো কয়েক দিনের জন্য এবং-'

পছন্দের কথাই যদি উঠেছে, তাহলে কেবল কয়েকদিনের কথা কেন? হ‍্যাঁ, ঠিক আমি কল্পনা করার মতোই একটা রুম, কিন্তু কেমন যেন ধোঁয়াশা, নিরানন্দ একটি ছবি, যেন একটা এঁকে রাখা ছবি, দ্বিমাত্রিক এবং অসত্য, কিছু একটা যেন বুকটা চেপে ধরে - অনিশ্চয় সূচক  একটা 'হু'শব্দ করলাম( আর বিরক্ত ভাবে মনে মনে বললাম, ঠিক, পছন্দের রুম, কিন্তু এখানে এভাবে কে থাকতে চায়, নিয়ে যাও, এখনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, আমার নিজের বেডরুমে নিয়ে যাও-)

' আর দেখ, এদিক থেকে দূরের গাড়ি ঘোড়া ও দেখা যায়', মীরা বলল এবং উত্তর দিকের জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল। গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, জানলাটা বাঁকা করে চোখে পড়ল, বিছানায় পা দুটি দিয়ে ছেঁচড়ে  পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম, একটা ব্যথা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, মীরা বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও ,আমি বালিশটা ঠিক করে দিই, এখানে হেলান দিয়ে নাও-',' না,পারব, পারব', ক্ষুব্ধস্বরে বললাম, আর বালিশে মাথাটা হেলান দিয়ে নিলাম । দেখলাম,কয়েকটা অট্টালিকার ফাঁক দিয়ে বহুদূরে রাস্তার একটা টুকরো দেখা যায়, একটা বাস স্টপ, একজন মানুষ অপেক্ষা করছে, বাস এল, মানুষটাকে আর দেখা গেল না, বাস চলে গেল, পুনরায় দুজন মানুষ এসে সেখানে সমবেত হল-ও , সেদিন পর্যন্ত তো আমিও এভাবে বাসস্টপে অপেক্ষা করেছি, বাস এসেছে, উঠেছি, বাস ছেড়ে দিয়েছে- আমিও কি আর এভাবে বাসে উঠতে পারব না, আমিও জানি-

পরিষ্কার নীল আকাশ,কেবল এখানে সেখানে দুই এক টুকরো মেঘ, এখন বাতাস নেই ,গাছের পাতা নিস্পন্দ, শ্রান্তভাবে চোখ ফিরিয়ে পূবের জানালার দিকে তাকালাম।  এইবিল্ডিংটার প্রায় গা ঘেঁষে অন্য একটি নির্মীয়মান দালান,এই তলাটার কিছু নিচে, দেখা যায় একটা কাঁচা ছাদ, শিল-ইটা- লোহা লক্কর এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মেঝেতে এখানে-সেখানে সিগারেটের প্যাকেট , কাঠের কুঁচি, ছেড়া কাগজ এবং প্লাস্টিকের ঠোঙা, পেপসির বোতল, দুটো সিমেন্টের বস্তায় মাথা দিয়ে একজন শ্রমিক লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। কাছে একটা লাল রংয়ের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক -বোধহয় ঠিকাদার বা মুহুরি -একটা ছোট খাতায় পেন্সিল দিয়ে কিছু একটা লিখছে- আমিও তো একদিন এভাবে আমার ঘরের ছাদ ঢালাই করার সময় উপরে উঠে গেছি, প্লাস্টিকের চেয়ার বা মোড়া একটাতে বসেছি। সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে শ্রমিকদের কাজ করা দেখেছি, ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছি। কখন ও দরকার পড়লে আমি কি পারব না এভাবে ছাদের উপরে হেলায় উঠে গিয়ে - নিচে আরও দেখা যায় সারি সারি কয়েকটি অসাম টাইপের কুটির, সবশেষে একটা মন্দিরের মতো দুতলা দালান দু'পাশে হাতির শুঁড়ের মতো রেলিং দিয়ে ঘেরা সিঁড়ি- ও ,জামাইবাবু, ওটা সত্য সাধন আশ্রমের ক্যাম্পাস, সকাল-সকাল সেখানে ছেলেমেয়েরা খুব সুন্দর সুর দিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র গায়, ভজন গায়, খুব শুদিং(Soothing) সেই ফিল্ডটিতে যোগাভ্যাস করে- আপনার শুনে খুব ভালো লাগবে-' সাদা ইউনিফর্ম পরা পরিচারিকা দুজন মীরাকে সুইচ গুলি বুঝিয়ে দিয়েছে, এটা  রুম সার্ভিস,এটা  ইমারজেন্সি, এটা টেলিফোনের এক্সটেনশন , এটা টিভির সুইচ এবং রিমোট, এটা দেরাজে কাপড়-চোপড়, এই সেলফে খাবার জিনিস রাখা যেতে পারে, টুথপেস্ট স্নো পাউডার ঔষধ পত্র ...মেয়ে দুটির কথাবার্তা এবং মীরার হু হা কানে এল যেন একটা বিমিশ্রিত চিৎকারের মতো,মন দিলে বোঝা যায়, কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না ,যেন এক ঝাঁক মৌমাছির গুঞ্জন ,একটি শব্দের পর্দা ,ধ্বনি গুলির অর্থ আছে- কিন্তু অর্থহীন, অর্থহীন...।

এই গুঞ্জরণের মধ্যে ধুমধাম পদক্ষেপে এসে হাজির হল আমাদের পরিবারের ডক্টর জেহিরুদ্দিন আহমেদ ( বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক),ঝলমলে হাসি মুখ,' এই যে -এসে গেল? বেশ বেশ, ভালো হয়েছে, হাঃ হাঃ সব অ্যারেঞ্জমেন্ট টিপটপ? এখন কী রকম ফিল করছেন? ও দিদি, এখানে এসে কী রকম লাগছে? রুমটা সুন্দর। তাই না ?এটা তাদের এক ধরনের ভিআইপি রুম। এক্সপেন্সিভ অবশ্য ।কিন্তু হোয়াট অফ ডেট ?আপনাদের কয়েকদিন রিলাক্স মুডে কমফোরটেবলী কাটানো উচিত।এটাই মেইন কথা। একটা রিফ্রেশিং চেঞ্জ ,আলাদা সিন সিনারি, আলাদা মানুষ হাঃ হাঃ আচ্ছা দিদি ,আমাকে এখন যেতে হবে। (ঘড়ি দেখল), পরে আসব, দেখে যাব হাউ ইউ আর গেটিং অন-?'

বিব্রত ভাবে হাসলাম, মনে হল তার আনন্দ উৎসাহ নিতান্তই কৃত্রিম ,অর্থহীন-

' দাঁড়াও দাঁড়াও ,মীরা বলল এবং  কিছুটা দূরে গিয়ে কিছু একটা বলল, নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কথা ,কিন্তু আসলে, এইসবের কী অর্থ আছে, কী অর্থ থাকতে পারে-

' আচ্ছা ,আমিও আসি তাহলে এখন,মীরা বলল, ধোপার  কাছ থেকে তোমার পায়জামা গেঞ্জি বোধহয় এতক্ষণে রাজেন নিয়ে এসেছে, সেইসব না হলে তো হবেনা- তোমার ভাত খাওয়ার ইচ্ছা নেই বলছ, আমি কমপ্লান এবং কী কী পাই দেখে নিয়ে আসি- ও ,আর তুমি বলা জিনিস গুলি-,তুমি এখন বিশ্রাম নাও, ইচ্ছা হলে চা-কফি যা হয় কিছু একটা খেয়ে নিও- এই সৃইচটা টিপলে লোক আসবে- কিছু লাগলে নিচের ডেক্সে  ফোন কর। আর দেখ-।'

শব্দ, শব্দ, শব্দ। দরকারি কিন্তু তুচ্ছ ,নগণ্য trivial, অদরকারি, অর্থহীন, শব্দ, শব্দ ,শব্দ -রুমটা খালি হয়ে গেল।

  বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কোনো কিছু না ভাবার চেষ্টা করলাম, অর্থাৎ এখানে থাকলে  কী রকম অনুভব করে থাকব না ভাবার চেষ্টা করলাম। অর্থাৎ ভাবার চেষ্টা করলাম যে আমি এখানে থাকব না, আমি এখানে থাকতে পারব না...ভোর  হয়েছে, জানলা দিয়ে প্রবেশ করছে পাতলা মিষ্টি রোদ আর ফুরফুরে বাতাস ,জানালার কার্নিশে দুটো শালিকের কিচিরমিচির, নিচে দূরে কোথাও সমবেত কণ্ঠে কিশোর-কিশোরীর বন্দনা গানের রেশ পেতে চলেছে বোধ হয়। ওরা আমার চেয়ে অনেক আগে উঠেছে। গলা বাড়িয়ে দেখা  যায় হাতির শুড়ের  ঘরটার সামনের ঘাসে সাদা ইউনিফর্ম পরা দলবেঁধে ছেলেমেয়েরা দুজন প্রশিক্ষক শিক্ষয়িত্রী, সত‍্য সাধন আশ্রমের দৈনন্দিনতার শুরু- দেখে ভালো লাগা উচিত, শুনে ভালো লাগা উচিত, কিন্তু কোনো ভাবাবেগ তো আসছে না, প্রতিক্রিয়া আসে কেবল একটা গভীর নির্লিপ্তি… সন্ধ্যে হয়েছে, ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে, নিচের কোথায় টিনের চালে সেই সেদিনের বিস্মৃত বাদল নুপুর রুমঝুম ঝু্‌ম, বই কাগজ গুলির উপরে একটা গোল আলোর ছাপ ফেলে ঢেকে দেওয়া টেবিল লাইট জ্বলছে, চোখ বুজে বুজে শুনছি জানালার পর্দা কয়েকটি বৃষ্টির ঝাপটায় পতপত করছে, হাতে হয়তো একটা সিগারেট এক কাপ কফি বা কিছু একটা ড্রিংক- কিন্তু না, এই রুমটিতে সেই সব বিসদৃশ যেন লাগে, অবাঞ্ছিত বলে মনে হয়, এই সুন্দর রুমটিতে সেইসব আমার চাই না, লাগেনা, ভাল লাগেনা, খারাপ লাগে, দুঃখ হয়, কষ্ট হয় ,ও কোমরের নিচের অংশে পুনরায় একটা জ্বালাময়ী ব্যথা চাড়া দিয়ে উঠছে, এক পাশে শোয়ার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। একহাতে কোমরের নিচে চাপ দিয়ে স্থির হয়ে পড়ে থেকে ব্যথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলাম... শব্দ, কারও কথাবার্তা... ও, দরজাটা কিছুটা খোলা রয়েছে, মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে আবার খুলে যাচ্ছে, কোনমতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে দেখলাম দরজাটা আরও কিছু মেলে দেওয়া যায়, ও ওই যে আধাআধি বাঁকা করে দেখাযায় করিডোরের ও পাশের প্রতিবেশী ২১৩ নম্বর রুম দরজাটা আধ খোলা, দরজার বাইরে একজন চশমা পরা মাঝবয়সী মানুষ সাফারি সুট পরা, হাতে একটা সুটকেস, দরজা মুখে শাড়ি পরা একজন আধবয়সী মহিলা, ডান হাতে একটা পান জর্দা বাক্স সেখান থেকে মানুষটা পান একটা মুখে ভরিয়ে দিয়েছে। দুজনের ফাঁক দিয়ে দরজার ভেতর দিকে ফ্রক পরা একটি ছোট মেয়ে হুইল চেয়ারে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এবং হাত তুলে মানুষটাকে কিছু বলছে। মহিলাটি শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে এবং মৃদু স্বরে কিছু বলছিল, মানুষটা স্যুটকেসটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে মেয়েটির গালে এবং চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যায় না- পারলে কি আর এই দুদিন থেকে যেতাম না, এরকম হঠাৎ কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এসে যাবে কে জানত, কেঁদনা সোনামণি, আর দুদিন পরে তো এখান থেকে বেরোবে- স্পষ্ট বোঝা যায় না, কিন্তু বোধহয় মানুষটার হঠাৎ জরুরি টেলিগ্রাম এল, তাকে আগামীকাল যেভাবেই হোক কলকাতায় গিয়ে পৌঁছাতে হবে। মানুষটা স্যুটকেসটা তুলে নিল। হুইল চেয়ার এবং মহিলা ভেতরে ঢুকে গেলেন,২১৩ নম্বর রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। ব্যাথাটা কমে আসছে,আঃ কী ভাগ্যবান মানুষ, এখন টেলিগ্রামের কল্যাণে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল, কীলাকি মানুষ- আর আমি, আমি কবে...

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ, কথাবার্তা, দরজা খুলল,মীরা এবং পিকলু, হাতে বিভিন্ন প্যাকেট।‘ এই যে আমরা এলাম। তুমি আছ?’ কর্কশ কন্ঠে বললাম, ‘না থেকে আর কি করব? কী বাজে কথা জিজ্ঞেস করছ?কোথায় যাব? কীভাবে যাব?’

মীরা থমকে দাঁড়াল, আমার মুখের দিকে তাকাল, পিকলু ও থমকে দাঁড়াল( তার মুখের ‘জামাইবাবু, এখন কেমন-’ বন্ধ হয়ে গেল) তারপরে অবরুদ্ধ কন্ঠে মীরা মৃদু অভিযোগের সুরে মীরা বলল-‘ কেন এভাবে রাগ করছ? কথার কথা মাত্র বলেছি- ও, তোমার সবগুলি কাপড় পেয়েছি। কিছু খেয়েছ কি?’ ঠিক আছে, এখনই কিছু একটা করে দিচ্ছি। তোমার কমপ্লান এনেছি, ক্রিম কেক এনেছি, চকলেট হরলিক্স, ক্যাডবেরি চকলেট পেয়েছি, অ্যাপেল টাপেল ও কিছু এনেছি- ও এই যে তোমার নোটবুকটা- এই নাও আজকের কাগজ- আর এটা তোমার আগাথা ক্রিস্টি-( আড়চোখে তাকালাম 4-50 From Paddington –বড়িয়া, ডিটেকটিভ কাহিনি, মিস মাপল  আছে, কিন্তু এখানে তো আর সেটা উপভোগ করতে পারবনা, কোনো ইন্টারেস্ট পাব না- ও আর আজকের কাগজ, কে পড়তে পারে সেই সব অখাদ্য মাথামুণ্ডু...)

মীরা ঘণ্টা টিপেএকজন পরিচারিকাকে ডাকল,ঠোঁট চেপে ক্লিষ্ট মুখে মেয়েটির সঙ্গে কিছু বলতে লাগল, পিকলু আমার কাছে বসে নিয়ে ঘনঘন হাত ঘড়ি দেখতে লাগল, বলে উঠল, দিদি, আমি তো এখন আর থাকতে পারব না। যাই এখন- জামাইবাবু, আপনি বসু্‌ন, আমি আবার আটটার সময় আসব-।’

‘দাঁড়া, দাঁড়া, কফি খেয়ে যা।’

‘না দিদি, টাইম হবে না, এলাম- আটটার সময় তো একবার আসবি-প্রায় পলায়ন করার মতো পিকলু আমার দিকে তাকিয়ে একটা অনিশ্চয় হাসি হেসে বেরিয়ে গেল। পরিচারিকা ও বেরিয়ে গেল

‘ নাও, এটাই এখন খেয়ে নাও।’

দু'কাপ ধূমায়মান কফি,সজীব গন্ধ,  দুটি প্লেটে দুটুকরো ক্রিম কেক,দেখতেই সুস্বাদু কিন্তু যেন কিছু জিদে জোর করে খাবার অনিচ্ছে একটা আনার চেষ্টা করলাম। মীরাও পাশে বসল, মুখ চাপা। মনে হল যেন একবার নিঃশ্বাস টেনে ফুঁপিয়ে উঠল, চোখ ছল ছলে, চামচ দিয়ে কফি নাড়ালো। চাপা কন্ঠে বলল,-‘ তুমি এরকম করতে থাকলে আমি কী করব, আমি কী দোষ করেছি।’

আমিও চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে কফি নাড়ালাম এবং বললাম,‘  না তোমাকে আর কোথায় দোষ দিলাম।’

‘তোমার মন-মেজাজ ভালো হবে বলে এখানে এলাম, অন্য পরিবেশ পাবে, আলাদা আলাদা মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, ভালো লাগবে। সবাই মিলে তোমাকে সমস্ত সুবিধা করে দিয়েছে, সব রকম আরামের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, এই দুই-তিনদিন চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে রিলাক্স মুডে মনটা ফুর্তিতে রেখে কাটিয়ে দিলেই তো হল, মীরা আরও একবার ফুঁপিয়ে উঠল, আঙ্গুল দিয়ে চোখ মুছল, বলল, না সব সময় মুখ  গুমড়ে রয়েছ, মুখ বিকট করে রেখেছ- আমিও তো মানুষ, আমাকে এত  কষ্ট দিয়ে তুমি কী সুখ পাও-।’

‘না, তোমাকে কেন কষ্ট দিতে যাব,কষ্ট তুমি নিজেই পাচ্ছ।’

‘এভাবেই যদি এখানে কাটাতে হয় তাহলে কেন এখানে এলে-?’

‘এখানে এসেছি? কোথায় আমি এখানে এলাম? আমি তো নিজে আসিনি ,নিজে আসতে পারলে তো কথাই আলাদা ছিল। এখানে স্ট্রেচারে করে তুলে আমাকে নিয়ে এলে। আমার স্কুটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, আমার পা ভেঙেছে, দুদিন পরেই ডঃ আহমেদ অপারেশন করে ঠিক করে দেবে, চার দিন পরেই আমি এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ি যেতে পারব –সব বুঝতে পারছি, এই কয়েকটি দিন তোমাদের চাওয়া অনুসারে হাসি ফুর্তিতে থেকে পার করে দিতে পারি, কিন্তু এটাও কি বুঝতে পার না  যে  আমার জন্য  এটা একটা প্লেজার ট্রিপ  নয়,এটা একটা হলিডে হোম নয় , এটা একটা হাসপাতাল -।'

------------


লেখক পরিচিতি-১৯৩০ সনে অসমের মঙ্গলদৈ শহরে সৌরভ কুমার চলিহার জন্ম। এটা ছদ্মনাম। প্রকৃত নাম সুরেন্দ্রনাথ মেধি। অসমিয়া ছোটগল্পের নতুন রীতির প্রবর্তক সৌরভ কুমার চলিহা পঞ্চাশের দশকে ‘অশান্ত ইলেকট্রন’ নামে একটি গল্প লিখে সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ গুলি যথাক্রমে ‘অশান্ত ইলেকট্রন’, ‘এহাত দাবা’, ‘গোলাম’, ‘জন্মদিন’ ‘নির্বাচিত সংকলন’দুপুরিয়া ইত্যাদি। গোলাম গ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন ।২০১১ সনে মৃত্যু হয়।



রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২১

মাতৃ || পদুমী গগৈ || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 মাতৃ

পদুমী গগৈ

মূল অসমিয়া  থেকে  বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস



কারেং ইংতিপীয়ে ছেলে বরসিংকে চিৎকার করে বলল, ‘বরসিং, তুই বড় অলস হয়েছিস। কোথায় গিয়েছিলি? পড়াশোনা ছেড়ে দিলি যে। আগামী বছর মেট্রিক দিতে হবে। পড়াশোনা করছিস না কেন?

- পড়াশোনা করে কী লাভ হবে মা? চাকরি  পাব কি?'- বরসিং সমান স্বরে উত্তর দিল।

-কেবল চাকরি করার জন্য পড়াশোনা নাকি? নিজেকে জানার জন্য, নিজেকে জানার জন্য বিন্দুমাত্র শিক্ষার প্রয়োজন নেই নাকি? পৃথিবীর কাণ্ডকারখানাগুলি জানার জন্য পড়াশোনা করা প্রয়োজন। আমরা অন্ধকারে রইলাম। তুই ভালো করে পড়াশোনা কর। তাহলেই আসল চোখ খুলবে।’

‘আচ্ছা মা, আমার একটা কথা শুন। খেরনির দিকে বড় গন্ডগোল হয়েছে। ডিমাছারা  কার্বিদের কাটছে, কার্বিরা  ডিমাছাদের।’

-এরকম কথাও হতে পারে নাকি বাবা?’

-‘হয়েছে তো! থংদের বাড়িতে টিভিতে এইমাত্র দেখে এলাম। বাড়িগুলি পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। মানুষ গুলিকে কচুকাটা করেছে। ইতিহাসে পড়া তখনকার দিনে মানের আক্রমণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’

-কী বলছিস বাবা? আমি একেবারে বিশ্বাস করতে পারছি না। পবিত্ররা মানে ওদের গোষ্ঠীর মানুষ গুলি কেন সেরকম কাজ করতে যাবে? করবে না, এরকম কাজ ওরা করবে না। যুগ যুগ ধরে…’

-‘তুই বিশ্বাস করিস বা না করিস টিভিতে কিন্তু দিচ্ছে । মিথ্যা যদি…’

-‘কে জানে ভগবান। কী হয়েছে দেশটিতে। এই সেদিন সিংহাসন পাহাড়টিতে এতগুলো মানুষ কাটাকাটি করে মরল, সেই রক্তের দাগ এখনও শুকোয়নি, আজ আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। কল্কি অবতার হয়েছে বুঝেছিস। মেরে কেটে একাকার। আমাদের পরিবারের মানুষগুলি কে কোথায় আছে খবর নিয়ে দেখতো।’ একথা বলে কারেং সুপারির থলেটা কোমরে গুজে খাঙটা  পিঠে নিয়ে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে গেল কাছাং আর কাবে।

কারেং ইংতিপীরের অবস্থা খুব ভালো নয়। মেয়ে দুটির বিয়ে দেওয়ার পরে তার স্বামী স্বার্থের মৃত্যু হয়। স্বার্থে বেঁচে থাকতেও আর্থিক অবস্থা যে খুব একটা ভালো ছিল তা নয়, কিন্তু স্বার্থে বেঁচে থাকতে তাকে এভাবে জীবন সংগ্রামে ব্রতী হতে হয়নি। সে তার শক্তি অনুযায়ী তাকে সুখেই  রেখেছিল। কিন্তু এখন  তাকেই প্রতিটি সমস্যার সমাধান করতে হয়। পাহারিয়া জমি দুই বিঘা আছে মাত্র। তারমধ্যে জুম  চাষ করে। আউশ ধান  আর মাকৈ। সঙ্গে মিষ্টি কুমড়ো, মেস্তাটেঙা, লঙ্কা ইত্যাদি।  কুমড়ো সেখানে হয় না। কুমড়োর চাষ করে না। কারবি মানুষের বাধা নিষেধ আছে‌। আউশ ধানটা ভালোই হয়। মাকৈগুলিও যথেষ্ট  পুরুষ্ট হয়। মা ছেলে দুজনেরই কয়েক মাস চলে যায়। তারপরে? এই জঙ্গলই ওদের ভান্ডার। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসিমুখে একমুঠো রান্না করে বরসিংকে খাওয়ায়। তারপরে নিজেও খেয়ে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে যায়। প্রতিদিন না হলেও  প্রায়ই জঙ্গলে গিয়ে কচু,ঢেঁকি শাক,চালতা, ভেকুরী,কলা গাছের মোচা সংগ্রহ করে এনে বিকেলের বাজারে বিক্রি করে। বিক্রি ভালোই হয়। আজকাল লোকেরা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা শাকসবজি বেশি করে খায় যদিও বন্য শাক সবজির চাহিদা কম নয়। বিক্রি করে যা পায় তাই দিয়ে চাল, শুকনো মাছ,নুন, তেল ,কেরোসিন তেল সংগ্রহ করে আনে। হলুদ, মিঠাতেল এমনিতেই খুব কম প্রয়োজন হয়। হলুদের প্রয়োজন হয় না বললেও চলে। মিঠাতেলের ব্যবহার ও ততটাই  সীমিত। প্রায়ই মেস্তাটেঙা, ভেন্ডি তিলের সঙ্গে শুকনো মাছের ঝোল রান্না করে। সেই তরকারি খেয়ে বরসিং বড় তৃপ্তি লাভ করে। তার আর কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। একটা শুকনো মাছ পুড়ে এক টুকরো আদা এবং রসুন, একটা পুষ্ট কাঁচা লঙ্কা পাটাতে বেঁটে নেওয়া চাটনি দিয়ে এক থালা  ভাত অনায়াসে খেতে পারে। মাঝেমধ্যে বরসিঙের খুব শুয়োরের  মাংস খেতে ইচ্ছে করে। সম্ভব হলে সে প্রতিদিনই মাংস খেতে চায় কিন্তু প্রতিদিন কীভাবে তা সম্ভব ?মাঝেমধ্যে আনে যখন হাতে অতিরিক্ত দুপয়সা আসে। শুয়োরের মাংসের তেল লাগে না।বাঁশের গজালি সিদ্ধ করে খায়।

আজকাল দেশে সত্যি কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে সে জানে না। কেবল বন্ধ আর বন্ধ। কে বন্ধ দেয়, কেন বন্ধ দেয় সে কিছুই জানেনা। সেইসব জানার জন্য সে বরসিংকে পড়াশোনা করে জ্ঞান অর্জন করার জন্য তাগাদা দিয়ে থাকে। বন্ধ যখন হয়, তখন তাদের বড় কষ্ট হয়। উপোস থাকতে হয়। জঙ্গল আছে বলেই ওরা এখন ও বেঁচে আছে।

সেইদিনগুলিতে জঙ্গলে গিয়ে কাঠ আলু খুঁড়ে  এনে সিদ্ধ করে লিকার চায়ের সঙ্গে উদরপূর্তি করে। আজ কারেঙের  মন খারাপ। সকাল-সকাল মানুষের মৃত্যুর খবর। বাড়িঘর জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেওয়ার খবর। মানুষগুলি এত ঝগড়াঝাটি করছে কেন? ডিমাছারা  কেন কার্বিদের কাটছে? কার্বিই  বা কেন ডিমাছাদের? সে কিছুই জানেনা। সঙ্গে আসা কাছাং  এবং কায়েও জানে না। ওদের সেইসব জানার সময়ই বা কোথায় ? ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে একমুঠো রান্না করে খাইয়ে-দাইয়ে কারেঙের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে হয়। জঙ্গলে একা এলে  চলবে না। জঙ্গলে অনেক শরীরী অশরীরী  জিনিস  আছে। বিপদ ঘটলে কী হবে?

গত দুদিন ধরে বাজারে পুরুষ মানুষেরা দলবেঁধে কিছু একটা করছে। ব্যাপারটা সবার চোখে পড়েছে। কথা বলছে না সাপ খেলা দেখছে ওরা তা জানেনা। ওরা তারমধ্যে অংশগ্রহণ করেনি। আগেও থাকে না পেছনেও থাকে না। ওদের সেই সময় কোথায়? ওরা পুরুষ মানুষ নয় যে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেই অপ্রয়োজনে কাটিয়ে দিতে পারবে। আর্থিক সমস্যা সমাধান করার পরেও সমস্ত পরিবারের দায়িত্ব ওদের উপর ন্যস্ত থাকে। তাই তারা কিছুই জানেনা। বর্তমানে দেশে কী সমস্যা চলছে। ইচ্ছে করে পুরুষ মানুষের মতো মুক্ত মনের হয়ে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু পারবে কি? বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব মহিলাদের। সমস্ত প্রাণীর কল্যাণের জন্য যেন মহিলাদের সৃষ্টি। ওদের মনে এই ধরনের মনোভাব সব সময় খেলা করে। গ্রাহকের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে শাক সবজি গুলি বিক্রি হওয়ার  সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় কয়েকটি  জিনিসপত্র কিনে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়।

আজ কারেঙরা অনেক  ঢেঁকিয়া পেয়েছে। সপ্তাহে বৃষ্টির পরে ঢেঁকি শাক নতুন করে জন্মেছে । ওরা মনের আশ মিটিয়ে শাক তুলেছে সংগ্রহের ক্ষেত্রে কায়েও দক্ষ নয় তবু কাছাং  এবং সে দুজনেই কায়েওকে সমান ভাগ দেয়। তিন জনই সমান ভাগে ভাগ করে নিয়ে বাজারের দিকে এগিয়ে যায়। যাত্রা কালে ওরা গোষ্ঠী সংঘর্ষের কথাই বলে। কাছাং জানাল যে ডিফু ,হোজাই ইত্যাদি রিলিফ ক্যাম্পে বহু মানুষকে থাকতে হচ্ছে।

-আমাদের এখানেও যদি হয়।কায়েও আশঙ্কা প্রকাশ করে।

- 'ভয় লাগছে।' কাছাং বলল।

-' পবিত্রদের গ্রামের মানুষেরা কখনও এরকম কাজ করবে না। গভীর আত্মপ্রত্যয়ের  সঙ্গে কারেং বলল।

- 'পদ্ম নামের মানুষটিকে কিন্তু বিশ্বাস করা যায় না'। বিতৃষ্ণার সঙ্গে কাছাং উচ্চারণ করল।

-না, না কিছু হবে না কারেং অভয় দিল।- আমরা দুটি গ্রামের মানুষ সেই সুদূর অতীত থেকে মিলে মিশে আছি। এখন ও কিছু হবে না।'

- হয়তো । সেই পবিত্রকে  তুই তোর বুকের দুধ কম খাইয়েছিস?কায়েও  আনন্দ মিশ্রিত অনুভবের সঙ্গে বলল।

-' ওর মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। সেদিন তাঁর কণ্ঠ শুকিয়ে গিয়েছিল। কান্নায় গাছের পাতা ঝরছিল, হৃদয় পুড়ে যাচ্ছিল। সইতে না পেরে বলেছিলাম-' আমার বুকের দুধ চুষতে থাক। বরসিঙের ভাগেরটা দুজনে ভাগ করে খা। বুকের দুধ না ছাড়া পর্যন্ত পবিত্র আমার বুকের দুধ খেয়ে ছিল। কারেঙ গর্ব এবং আনন্দ মিশ্রিত সুরে  বলে।

কথা বলতে বলতে তারা বাজারে গিয়ে পৌঁছায়। বাজারে খুব একটা লোকজন নেই। ডিমাছা গ্রামে গত রাতে কারা যেন ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। রাতের বেলায় কী হবে কেউ বলতে পারে না। ওদেরকে একজন সাবধান করে দিল। ওরা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। বিক্রির চিন্তা ছেড়ে বাড়ির দিকে ফিরে চলল।

  কারেঙ আকাশের দিকে তাকাল। পূব দিক থেকে এক খন্ড কালো মেঘ ভেসে আসছে। তার বুকটা দুরু দুরু করে কেঁপে উঠল। পবিত্রের কথা মনে পড়ল। এই লঙ্কা দাহনে ওদের বাড়ি-ঘর নষ্ট হয়নি তো? পবিত্রদের বাড়ির সঙ্গে বহুদিনের পুরোনো আত্মীয়তা। বরসিঙের দাদু চনা সিঙকে একটি সামান্য  অপরাধে জনগণ একঘরে করার দিন থেকে। সেই নির্বাসিত জ্বালাময় দিনগুলিতে সাহস দিয়েছিল পবিত্রের দাদু গোবিন্দ । সেই তখন থেকেই দুটো পরিবারের মধ্যে প্রীতির বন্ধন অটুট রয়েছে আজ এই মুহূর্তে অতীতের মতোই মিলা প্রীতি অটুট থাকবে তো?

রাত দুপুরে অদূরের পাহাড়ের বুকটা তীব্রভাবে জ্বলজ্বল করছিল। সমতলে থাকা কোনো এক রং কিমিত…. না না, সে আর ভাবতে পারছেনা। ওখানে বরসিঙের মামারবাড়ি। তার জন্ম বাড়িটা আছে কি? তার চোখ দিয়ে ধারাসার অশ্রু বইতে লাগল।

বরসিং, উঠ দেখি। তোর মামার বাড়িটা আছে না নেই? বরসিঙকে কারেঙ জাগাল।

'কী বলছ মা?'

পাহাড়ের বুকটা কীভাবে লাল হয়ে উঠেছে, একবার তাকিয়ে দেখ।

' দাঁড়া ,আমি এক পাক ঘুরে আসি। বলেই সে মামার বাড়ির দিকে দৌড় লাগালো। গিয়ে দেখে সব শেষ। মানুষ, পশু-পাখি, সবাই অঘরী  হয়ে গেছে। শুয়োর, কুকুর ইত্যাদি অনেক গৃহপালিত জীব অগ্নিদগ্ধ হয়ে বিকৃত রূপ ধারণ করেছে। গর্ভবতী পখিলা পথের পাশে পড়ে কোঁকাচ্ছে। শিশু হেম সিঙের পিঠটা বড়খারাপ ভাবে পুড়ে গেছে । দিদা কাদমের ডান পা ভেঙে গেছে। সে সেখানে অপেক্ষা করতে পারল না। শোকে কাবু হয়ে পড়ল। সে সোজাসুজি বাড়িতে চলে এল। এসে শুনতে পেল ইতিমধ্যে পবিত্রদের গ্রামের চারজনকে কেউ নিধন করেছে। এবার কার পালা এই নরমের যজ্ঞে আহুতি দেওয়ার?

দুপুর রাত। দরজাটা কেউ একজন চট করে খুলে ফেলল। কারেং ডাকল, বর সিং। বরসিঙের কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে ধড়মড়  করে উঠে বসে বরসিঙকে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বেড়াল। মাথার কাছে টর্চটা এনে জ্বালিয়ে দেখে কাপড় চাপা  দিয়ে একদল বরসিঙকে   নিয়ে যাচ্ছে। একজনকে সে চিনতে পারল। সে তাকে  চিৎকার করে ডাকতে গিয়েও  থমকে গেল। কেবলমাত্র আতঙ্কিত মনে ওদের পেছন পেছন দৌড়ে যেতে লাগল। অন্ধকারের বুকে ওরা হারিয়ে গেল।

চেতনা ফিরে পাবার পরে কারেঙ শক্ত হয়ে হাটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে। গত কাল রাত থেকে দরজা দুফালা হয়ে খোলা পড়ে রয়েছে। এখন কত রাত হয়েছে  সে জানে না। সে ক্ষুধা তৃষ্ণা ঘুম কিছুই অনুভব করছে না। অনুভব করছেনা শীত বা গ্ৰীষ্ম। তার চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে। এক নির্বিকার প্রস্তর মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে সে। সে যেন যুগযুগান্তর ধরে এরকমই ছিল। সেকি কখন ও চেতনা ফিরে পাবে? আকাশে অষ্টমীর চাঁদ। দরজার সামনের আমগাছটার ছায়া এসে উঠোনে পড়েছে। নিশাচর  পাখি একটা বিকট চিৎকার করে  উড়ে গেল। দূরে শিয়ালের হুক্কাহুয়া। কারেং এক ভাবেই  স্থির হয়ে বসে রয়েছে। হঠাৎ কেউ একজন দৌড়ে এসে ঘরের ভেতর ঢুকল।কারেং যেন বহু যুগ পরে জেগে উঠল। বরসিং  হাউমাউ করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে থাকে। চুমুর পর চুমু খেয়ে যেতে লাগল।

সে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ডাকল,' মা'!

কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত কড়মড় করে গায়ের জোরে  ঠেলে দিয়ে বলল ,' তুই?'

- হ্যাঁ মা, তোর পাপী পুত্র পবিত্র। ওরা আমাকে তাড়িয়ে এনেছে মা।' 

  ঘরের বারান্দায় ওদের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে তার সামনে পবিত্রকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হবে। প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞায় ওরা আবার নিজেদের হাত রক্তাক্ত করবে। কারেং  উঠে দাঁড়াল। চট করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

-' খুড়ি!'

-' কী হল?'

-' দরজা খোলো।'

-' কেন?'

-' পবিত্রকে চাই!'

-ক্ষোভ এবং করুণা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,' এখানে পবিত্র নেই!'

–----------

লেখক পরিচিতি-১৯৫৭ সনে পদুমী গগৈ কার্বি আংলঙের ডিফুতে জন্মগ্রহণ করেন । নতুন দিল্লির ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজের প্রমোশন ইনস্টিটিউট থেকে  ডিপ্লোমা প্রাপ্তি । 'বাগদত্তা'নামে ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে । ২০০৪ সনে ' সাবিত্রী বরগোহাঁই পুরস্কার লাভ করেন।'

' যাত্রার উপকূলত','বীরাঙ্গনা' নামে দুটি উপন্যাস ছাড়া ও কবিতা, শিশু উপন্যাস এবং শরৎচন্দ্রের ‘পল্লীসমাজ’ এবং ‘গৃহদাহ’ অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন।২০১৭ সনে শরৎ চর্চা পুরস্কার লাভ করেন।


  


রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১

অলিম্পিয়া বেনেট || ইমরান শ্বাহ || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস

 অলিম্পিয়া বেনেট

 ইমরান শ্বাহ

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস



অলি বেনেটের এই ধরনের পরিণতি হবে বলে ভুলেও ভাবিনি। অলি বেনেটকে  নিয়ে কখনও গল্প লিখতে বসব সেকথাও ভাবি নি। পৃথিবীর নিয়মের ঠেলা ধাক্কায় কিছু ভালোবাসা, কিছু স্বস্তি চাওয়া একজন সাধারন মাপের মহিলা বলেই ধরে নিয়েছিলাম অলি বেনেটকে। অলি বেনেটের শরীরে  দুই-একটি বিশেষত্ব থাকলেও অলিবেনেটে  বিশেষত্ব  ছিল না। কিন্তু এখন যতই চিন্তা করছি অলি বেনেটকে ততই রহস্যময়ী বলে মনে হচ্ছে। না, অলি বেনেট সাধারণ নয় ।তাকে নিয়ে লিখতে বসে ভয় হচ্ছে ।এই আত্মগর্বী মানুষটার প্রতি আমি অন্যায় করতে যাচ্ছি না তো ? আমি কতটুকুই বা জানি অলি বেনেটের ফসিল হয়ে পড়া দ্বন্দ্বাক্রান্ত,কূহকাচ্ছন্ন ,নারী মনের কথা! এই সমস্ত ছোটখাটো সাংসারিক লেনদেনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অলি বেনেট নামে নারীর হয়তো যে প্রচ্ছন্ন মহীয়সীতা তা বুঝে ওঠার সময় এখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে ।সুযোগ এসেছিল ,বোকার মতো সেই সুযোগ হারিয়েছি। কত কথাই শুনেছিলাম। নিজে জানার ,দেখার ,বোঝার সুযোগ পেয়েছিলাম। অলি বেনেট নামের একসময়ের শহরটির মনে ধরা নগর নারীর বিষয়ে। সব কথা আজ আর মনে নেই। মনে রাখার জন্য চেষ্টাও করা হল না। রোমন্থন করলে এই মানুষটির যে ছবি মনে পড়ে তা যেন অসম্পূর্ণ ,ছাড়া ছাড়া । কংকালটা রয়েছে, রঙগুলি বিস্মৃতির বৃষ্টি ধুয়ে নিয়েছে । অলি বেনেটের কথা লিখতে বসে আমার অবস্থা উপরে উপরে পড়ে গিয়ে পরীক্ষার হলে বসা পরীক্ষার্থীর মতো হয়েছে । বইয়ে সব রয়েছে বলে মনে পড়ছে অথচ কলমের ডগায় কিছুই আসছে না । কবিতার একটি পঙক্তি মনে পড়ছে ‌।এক একটি পংক্তি সারি ভুলে গেছি। যা লেখব তা হয়তো হয়ে উঠবে গাঁজাখুরি। নাম্বার পাওয়ার অযোগ্য । আমার তাস খেলার বন্ধুমহল অবশ্য অনেকদিন আগেই অলি বেনেটকে নিয়ে একটা গল্প লেখার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল। তার কারণও ছিল । তখন অলিবেনেট  ছিল ছোট্ট শহরে ছোট ছেলে থেকে বড় পর্যন্ত সবারই আড্ডার এক নম্বরের আলোচনার বিষয় । অলি বেনেটের কথায় অনেক ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়ে যায় । প্রধানত কলেজের যুবকদের কাছে। এরা অলি বেনেটের কাছে   খুব বেশি প্রশ্রয় পায় নি। কেবল দেখেছিল অলি বেনেট এক রহস্যঘন আকর্ষণীয় জিনিস। পঞ্চান্ন  বছরের বিশ্বেশ্বর হাকিমের সঙ্গে অলি বেনেটের কী সম্পর্ক,ত্রিশ  বছরের আবেদালি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে অলি বেনেটের কী সম্পর্ক, পিতৃহীন বিরাট অর্থের মালিক মুরুলির সঙ্গে অলি বেনেটের কিসের এত মাখামাখি ,এই ধরনের সম্পর্কের অজস্র মুখরোচক গল্প বাতাসে উড়ে এসে আমাদের আড্ডা গরম করে জমিয়ে তোলে। অলি বেনেটের সম্পর্কে যেকোনো গল্প তা সে যতই নিরর্থক হোক না কেন,বিনা তর্কে বিশ্বাস করে নেবার জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত। আমাদের কথা হল আড্ডায় জমে যাওয়া যেকোনো বিষয় হলেই হল ।গাঁজা মেনে না নিয়ে যুক্তিতর্কের অবতারণা করা হলে আড্ডার মেজাজ নষ্ট হয়।

আমি তখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি । এক ডজনের মতো গল্প লিখে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করে রীতিমতো লেখক হয়ে বসেছি। আমার বন্ধু মহলে আর ও দুই তিন চার জন ছোটখাটো গল্পকার এবং কবি ছিল । তা সত্ত্বেও অলি বেনেটের গল্পটা লেখার জন্য সবাই আমাকে আনন্দের সঙ্গে স্বত্ব ছেড়ে দিয়েছিল। তার কারণ অলি বেনেটের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে, পথে ঘাটে হেসে কথা বলা, একাধিকবার একই রিক্সায় উঠে যাওয়া  স্বচক্ষে দেখা  অনেককেই পাওয়া যাবে। ওরা ভেবেছিল অলি বেনেট সম্পর্কে  আমি অনেক কিছু জানি । আমি স্বভাবত কম কথা বলি। কম কথা বলা মানুষ বেশি কথা জানে বলে ওদের ধারণা হয়েছে। আর একটা কথা । হয়তো অন্তত কয়েক জন ভেবেছিল, যা ভাবার জন্য ওদের উপরে আমার রাগ হয়েছিল, করুণা ও জন্মেছিল। সংকীর্ণ গণ্ডির  কয়েকটি মাত্র কথা নিয়ে ব্যস্ত থাকা  ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। মানুষের স্বভাবই এরকম। পথ দিয়ে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে একসঙ্গে হেঁটে গেলে ওদের মধ্যে কিছু না কিছু থাকতে পারে ভাবার আগে যে কথা আমরা সংখ্যাগুরু দল ভাবি সেটা কী তা না বললেও চলে। আর অলি বেনেটের  সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে বসে -যাক সেই সমস্ত কথা।

জীবন থেকে ইতিমধ্যে কয়েকটি বছর খসে পড়েছে। চাকরিবাকরি করছি। সারা পৃথিবীর মনে এই একটি প্রশ্নই রয়েছে এবং সেই অবস্থায় পৌঁছেছি যদিও বিয়ে-সাদি করার নতো মনে এখনও সাহস জোগাতে পারিনি। প্রেম-বিয়ে জীবন ইত্যাদি বস্তুগুলির ধারণা বাস্তবের আঘাত পেতে পেতে দিনদিন পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। বেশি মধুর থেকে কম মধুর হয়ে এসেছে। ধূসর থেকে  ধূসরতর । গল্প-টল্প লেখায় আজকাল আর খুব একটা প্রেরণা নাই। তখন লিখেছিলাম রাতকে দিন করার উচ্ছ্বাসে।এখন কখনও সাহিত্যের প্রতি থাকা একটা নৈতিক কর্তব্যবোধের তাগিদে ধরে বেঁধে কলম হাতে নিই। কেবল উচ্ছ্বাসের দ্বারা ভালো সাহিত্য তৈরি হয় না। উচ্ছ্বাস না থাকলে কলম চালিয়ে যাওয়াই কঠিন। সমস্যা অবসর ও নেই।একমাস ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলাম, বহুদিন থেকে মনে মনে পরিকল্পনা করে থাকা একটা উপন্যাস লিখব বলে। আসার সময় ধরে-বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার ভয় বুকে নিয়ে উপন্যাস লেখা কঠিন দেখছি।এমনই একদিনে অলি বেনেটের সঙ্গে দেখা হল। অনেকদিন পরে।  

পোর্টিকতে বসে উপন্যাসটার কথাই ভাবছিলাম। মনের মধ্যে হতাশার ভাব এসেছিল। ছুটিটা বোধহয় এমনিতেই  যাবে। শেষ করা দূরের কথা উপন্যাসটা আরম্ভ করাই বোধহয় হয়ে উঠবে না। নিজের ওপরেই অকারণে রাগ হয়েছিল। অন্যের উপরে। অসমিয়া কিছু লেখক-পাঠক-প্রকাশক সমালোচক জোগাড় করে নিয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছা করছিল। এমনিতে কেমন যেন অসহায় অসহায় বলে মনে হচ্ছিল। তখনই দেখি ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে অলি বেনেট।একদিনের সোনার বরণ হারিয়ে কিছুতেই বাধা না মানা চুল গুলি আর হাঁটার ধরণ থেকেই চিনতে পারলাম।

আগের মতোই ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। আগে অলি বেনেট রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে নতুন করে ভর্তি হওয়া পোষ না মানা মিলিটারির নির্ভীক বুকের মতো উন্নত জঙ্ঘা কাঞ্চনজঙ্ঘার উত্তুঙ্গতাকে নেচে নেচে অবজ্ঞা করে করে গিয়েছিল। এখন সেখানে কিছুই নেই। তার পরিবর্তে  ঝক ঝকে দাঁত বের করে হাসছে। তন্বী বলে এক কথায়  বলে দিতে পারা অলি বেনেটকে এখন খুব বেশি শুকনো বাঁশের বেড়া বলা যেতে পারে।আগের মতোই গাউন পরেছে যদিও তা রেশমের জন্য নয়, তেল চকচকের জন্য জ্বলজ্বল করা জীর্ণ এক বস্ত্র মাত্র। হাইহিলের জুতোয় এক ইঞ্চি ধুলো। এক পাটিতে ফিতা আছে ,অন্য পাটিতে নেই। আগে দেখলে হাতিদাঁত অথবা মোমবাতির কথা মনে পড়ে যাওয়া পায়ের গুলের  স্বাস্থ্যহীনতা এবং যত্নহীনতার অজস্র আঁকবাঁক বিদ্যমান। অলি বেনেট অথবা আট নয় বছর আগের অলি বেনেটের ছায়া অলিবেনেট ভেতরে প্রবেশ করল। 

আমি এক দৃষ্টে তাকিয়ে বসেছিলাম।

‘হ্যালো বিমান,তুমি কখন এলে,হোয়েন?-ও মাই ডার্লিং-হাউ লাভলি ইউ হ্যাভ গ্রোন!’

আর আমি কোথায় পালিয়ে বাঁচব? বুঝতেই পারলাম না। কী বিপদ!কী আক্রমণ!ছোঁ-মারা চিল পাখির মতো এসে অলি বেনেট আমাকে জড়িয়ে ধরল এবং পটাপট গালে মুখে এক কুড়ি চুমু খেয়ে ফেলল। কোনো দিনই দাঁত না মাজা মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। কোনো দিন না ধোওয়া ,হয়তো না খোলাও ঘর্মাক্ত কাপড় চোপড় থেকে মদ মদ গন্ধ বের হচ্ছে। কোনো দিন না কাটা এই বড় বড় নখ যখিনীর মতো গায়ে বিঁধছে। বুঝ ঠেলা। সাত শ্ত্রুকে ঈশ্বর বাঁচিয়ে রাখুক। 

সম্ভাষণের পর্ব শেষ হল। একথা সেকথার পরে ঘপ করে একবার অলি বেনেট আমার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, ওহো ছয় মাস। আচ্ছা ডার্লিং,এখনই আমাকে দশটা টাকা দাও তো। খুব দরকার।মিঃভূঞার গ্রেভে একটা ক্রুস পুঁততে হবে।আজ তার মুক্তির দিন।ডোন্ট মাইণ্ড।কাল পরশু ইউ উইল গেট ইট।কামিং জিন্টুজ মানি –‘মে বি টু-ডে’।…’

অনুরোধের চেয়ে হুকুমের পরিমাণ বেশি ছিল।অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।রকেটের দুনিয়ায় পরিবর্তনও এত বেগে হয় তা ভাবি নি। মাঝখানে আমি এই আট নয় বছর এদিকে-ওদিকে ছিলাম এবং তার সুযোগে মিঃভূঞা গ্রেভে। জিন্টু একেবারে টাকা পাঠানোর মতো হয়ে গেল।প্রহেলিকা প্রহেলিকা বলে মনে হচ্ছিল।কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বেঁচে গেলেই হল।অলি বেনেটের চাহিদা পূরণ করে দিলাম।

মাকে যখন ঘটনাটা বললাম সামনেই বসে থাকা ভন্টি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।আমার নিজেকে বোকা বোকা বলে মনে হচ্ছিল।যাই হোক মা এক ধমক দিয়ে ভন্টিকে দূরে পাঠিয়ে অলি বেনেটের কথা আমাকে বলেছিল।মা বলেছিল…কথাগুলি একটু আগে থেকেই শুরু করা যাক।

আমি যখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি তখন অলি বেনেট পপুলারিটির চূড়ান্ত শিখরে।ছেলে থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবার মুখে মুখে অলি বেনেট। পায়ে হেঁটে হাইহিলের জুতো পরে সর্বাঙ্গ দুলিয়ে দশটার সময় স্কুলে যায়।পথে দেখা হলে পরিচিত-অপরিচিত প্রত্যেকেই সুন্দর করে হাসি-‘কী খবর,ভালো?’-বলে কথা বলে যায়।নিজে চিনতে না পারলেও বোধহয় অলি বেনেট ধরে নেয় সবাই অলি বেনেটকে জানে। কথাটা সত্য। স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় বেনেট সবসময় রিক্সায় আসে।এসেই বাড়িতে কী খেল কী না খেল সেজে গুজে আবার বেরিয়ে যায়। এক প্রহর রাত পর্যন্ত অলি বেনেট কোথায় যায়,কী করে সেই সমস্ত তত্ত্ব স্বয়ং ভগবানও জানে কী না সন্দেহ রয়েছে। রাতে বাড়ি প্রবেশ করার সময় জিন্টুর নাক ডাকে।আর নাক ডাকে স্কুলের চৌকিদার জিন্টুর বিকেলের রাখাল রঘুনাথের।একটা শিশুও জিন্টু চৌকিদারনীর তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছে বলা যেতে পারে।আর তারপরে মানুষের মুখে মুখে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য হাজার গল্প রূপ লাভ করলে কাকে আর দোষ দেওয়া যেতে পারে।চাঁদের বুকে খরগোসের বসে থাকার কথা,স্বাতী নক্ষত্রের চোখের জলে মুক্তো হওয়ার কথা,সুন্দর সুন্দর কল্পনা করতে পারা দেশের মানুষ আমরা।আমাদের কল্পনা যখন লাগাম ছাড়া হয়ে নারী পুরুষের অবৈধতা,কেলেঙ্কারী,কথা কল্পনা করায় উঠেপড়ে লাগে তার দৌড় কতটা হয় সহজেই মনে করা যেতে পারে।কার সাধ্য রোধে তার গতি!আর অলি বেনেট নির্বিকার।

তখন আমার ডজন চারেক গল্প লেখা হয়ে গেছে।আমাদের ছোট শহরটিতে আমিই এক প্রকার শিয়াল রাজা।মাসিক,পাক্ষিক,সাপ্তাহিকে গল্প বেরিয়েছে।বিকেল চারটের সময় কলেজ থেকে গম্ভীর পদক্ষেপে একা একা বাড়ি ফিরে আসি। একা আসার কারণ ছিল। নির্জনতাকে ভালোবাসার চেয়েও অন্য কোনো একটা কারণ। আর কলেজ থেকে ফিরে আসার সময় প্রায়ই পথে অলি বেনেটের সঙ্গে দেখা হয়।পেছন থেকে রিক্সায় আমাকে পেছন ফেলে এগিয়ে যায়।কখনও ডাকে না।প্রায়ই ডাকে।আমার গল্প কোথাও বের হলেই ডাকে।‘-ওহো সুইট বিমান,তোমার গল্পটা পড়লাম।ওহো সুইট-কী নাম ছিল গল্পটার?-‘অলি বেনেট সব সময় আমার গল্প পড়ে আর সব সময় নামটা মনে থাকে না।

তারপরে একদিন।

কলেজ থেকে এসেছি।হঠাৎ একটা রিক্সা পেছন থেকে এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।অলি বেনেট!-‘কাম অন ডার্লিং বয়।’-আমার কোনো-‘চাই না আমি হেঁটে যাব।’আমার কথা না শুনে অলি বেনেট আমাকে রিক্সায় তুলে নিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল।দুটো রুমের ছিমছাম বাড়ি। আসবাব পত্র বিশেষ নেই।বর্ণনা দেওয়ার চেয়ে না দিলেই অলি বেনেটের বাড়িটার বিষয়ে উচিত কথা বলা হবে মনে হয়।

‘আমি বিছানাটায় বসেছিলাম।আমার পাশে বসেছিল অলি বেনেট।কোনো প্রস্তাবনা ছাড়াই পেছন থেকে অলি বেনেট সাপের মতো মিহি দুটো হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।অনতিবৃহৎ সুদৃঢ় স্তন যুগল আমার পিঠে যেন বিঁধে যাচ্ছিল।আমি ঘামছিলাম।অলি বেনেট খুব ধীরে ধীরে বলেছিল-‘একটা গল্প লিখবে বিমান।আমার গল্প।ইউ মাস্ট রাইট ইট,-অফকোর্স।’ 

বলার মতো কথা খুঁজতে গিয়ে আমি ইতস্তত করছিলাম।একটু দূরে সরে বসার জন্য চেষ্টা করে শরীরটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করছিলাম। আমাকে ছেড়ে না দিয়ে অলি বেনেট বলেছিল-‘ইউনিক,একটা স্টোরি হবে জান? দেখায় আমি মেটার অফ ফ্যাক্ট হতে পারি। কিন্তু আসলে নয়।তোমাকে আমি সব কথা বলব। তোমাকে লিখতেই হবে।আজ নয়,অন্য একদিন নিরলে বসব কেমন। আজ তুমি চলে যাও।’

…বন্ধু মহলে খবর পৌছে গিয়েছিল। আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নবাণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলাম। অন্য কথার অবতারণা করে এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। ফলে ওদের সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছিল। শেষে আমাদের তাসের আড্ডার স্পষ্টবাদী সভ্য রমেশ তাসজোড়া সাফল করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল , ‘ঠিক আছে,আমাদের বিমান ভাইয়ের হয়ে গেছে। যা ভাই,আমাদের কী? আমার একটা কথা খালি মনে রাখবি –সি উইল ডেভায়ার ইউ রাইট টু দি বোনস।অলি বেনেটের শরীরে নরখাদকের রক্ত আছে। এক নাম্বার মেন-হান্টার। এণ্ড,ইউ আর সফট এনাফ।’

কান মাথা লাল করে বসে থাকা ছাড়া আর কী করতে পারি আমি!

তারপর থেকে আমি অলি বেনেট থেকে পালিয়ে বেড়াতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বেশিদিন পারলাম না।একদিন পথে পাকড়াও করে অলি বেনেট আমাকে নিয়ে বাড়ি গেল। ভয়ে ভয়ে ইষ্ট নাম জপ করে আমি ভেজা বেড়ালের মতো বসে ছিলাম।আমার সামনে বসেছিল অলি বেনেট।আগুনের মতো যৌবনবতী যুবতি আমাকে জড়িয়ে ধরে নি। তুলনামূলক ভাবে কৃশকায় আমাকে বিছানায় টেনে নিয়ে যায়নি। অনেক সময় অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পরে অলি বেনেট সত্যিই আমাকে নিজের জীবনের কাহিনি বলেছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি বসে বসে শুনেছিলাম,কিন্তু ভয়ে ভয়ে। 

আমরা বিসর্জন দেওয়ার জন্য নানা রকম রং মেখে প্রতিমা সাজাই। কে জানে এই অন্তরঙ্গতার পরিণতি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে কিনা? অলি বেনেটের কাহিনি বলছিলাম। ধীরে ধীরে রাতের বয়স বাড়ছিল। কখন পালাই ,কখন পালাই মনে হচ্ছিল। এত রাত পর্যন্ত অলি বেনেটের সঙ্গে কাটানোর পরে কে জানে আমার জীবনে সূর্যের আলো আগামীকাল সকালবেলা আগুন হয়ে আসবে না। কিন্তু হায় এখন ভাবছি, তখন কিছুটা মনোযোগ না দিয়ে কত টুকরো হীরে হারিয়ে ফেললাম!

'তোমার খুব ভয় হচ্ছে তাইনা? বুঝতে পারছি'- অলিবেনেট নির্লজ্জের মতো হাসছিল,- মানুষেই আমাকে ভয় করে। করবেই। এই যে মানুষগুলি আমার বদনাম করে- আই ডোন্ট কেয়ার এ ফিগ- জান? কখন ও দুঃখ হয়। ডিউ ড্রপের  মতো নিষ্কলুষ একজন মানুষের সঙ্গে আমার বদনাম হলে আমার দুঃখ হয়। কী করবে !আমি নিরুপায় ।আর এই মানুষগুলি এত খারাপ, কেউ বুঝতে চায় না ।কেউ না ।সেইজন্যই নিজের কথা নিজের মধ্যেই রাখি ,কাউকে কিছু বলি না। তুমি হয়তো আমাকে বুঝতে পারবে ,এই ভুল আমি কেন করি।তোমার গল্প আমি পড়েছি ,আমি বুঝেছি অসহায় নারীর প্রতি তোমার কমপ‍্যাশন আছে। তুমি বুঝতে পারবে। তুমি আমার গল্পটা লেখ। লেখবেই। অন্তত আমার জন্যই তোমাকে ভালোবাসা। আয়না দেখতে আমার ভালো লাগে। কত ভালো লাগবে তোমার গল্পে আমার নিজেকে সজীব হয়ে উঠতে দেখে। আর ও ভালোভাবে হয়তো নিজেকে চিনতে পারব।…'

অপূর্ব !অদ্ভুত আর অপূর্ব! এই ধরনের আবেগ মাখানো ভাষায় এক নারী আত্মকাহিনি বলতে পারে। আমি জানি সেই অন্তর উজাড় করা ভাষায় আমি আজ আর লিখতে পারব না ।কোনোদিনই পারতাম না। আজও মনে আছে সেই আবেদন ।সেই মনের কথা উজার করে বলার এক আকূতি। ক্ষমা কর আমাকে অলি বেনেট - তোমার কাহিনি আমি আমার অক্ষম ভাষায়  বলতে গিয়ে অক্ষমনীয়  পাপ ও যদি করে ফেলি ।

মিঃভূঞার সঙ্গে অলি বেনেটের প্রথম যখন পরিচয় হয়, তখন বেনেট প্রথম বার্ষিকের ছাত্রী।চঞ্চল প্রজাপতি অলি বেনেট তখন অযুত রোমিও য়ের স্বপ্ন জুলিয়েট। কিন্তু অলি বেনেট মিঃ ভূঞার  সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে বুঝতে পারলেন প্রেম কেবল একটি কোমল শব্দই নয় । অলি বেনেট বুঝতে পারলেন এই পৃথিবীতে একমাত্র যুবক যার জন্য অজস্র জীবনের তপস্যা উৎসর্গ করে দেওয়া যেতে পারে । ফুলশয্যার রাতে এই যুবক অলি বেনেটকে বলতে পারবে,তোমার আমার প্রেমের গাথায় ফুলশয্যার রাতের  খুব বড় কোনো মানে নেই জান অলি? কারণ-'

কারণ প্রেমের জন্য যে প্রেম তাতে বস্তুজীবনের কোনো মানে নেই। কারণ  অলি বেনেটের  জীবন বৃত্তান্ত শোনার পরে মিস্টার ভূঞা অলি বেনেটকে সহানুভূতিতে গলে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন-' তোমাকে আমি বিশ্বের  চোখে মহান আসন  দেব অলি। আমি দেখিয়ে দেব  জন্মের চেয়ে প্রেম অন্তর অনেক বড়।' আর  অলি বেনেট-তাকে যদি ভুল বলা যেতে পারে- ভুলটা করে ফেলেছিল।  হাসতে হাসতে। সামান্য একটা কথা ভেবে লাভ ইজ এ বিউটিফুল থিং বাট ইট স্পয়েলস ক্যারেক্টার ।-দায়িত্বের কাছে আত্মসমর্পণ যদি চরিত্রহীনতা হয় তাহলে সেই চরিত্রহীনতাকে  অলি বেনেট কপালে তিলক করে পরতে রাজি।

একটা কম বেশি পরিমাণে গতানুগতিক কাহিনি। উজান অসমের কোনো একটি চা বাগানের নাগা ক্রিশ্চান নার্স ছিলেন আলমলা রেংমা। খুব শীঘ্রই আলমলা সাহেব ডাক্তারের মেম হয়ে    অলমলা বেনেট হয়ে পড়েছিল। সেই এক অনেক নারী করে আসা পুরোনো ভুলের চিহ্ন স্বরূপ পৃথিবীতে  এসেছিল অলিম্পিয়া বেনেট এক  রহস্যময় ভবিষ্যৎ সামনে নিয়ে।  যথানিয়মে ডাক্তার সাহেব বেনেট দেশে ফিরে যাওয়ার পরে আলমলা বেনেট পুনরায় নার্সিং নিয়ে  মেয়েকে বড় করার চিন্তায় জীবন নিয়োজিত  করেছিল। লোকেরা বলে হয়তো খুব একটা মিথ্যা কথা নয় নার্স গিরি ছাড়াও আলামালা আরও অনেক কিছু করতেন। করতে হয়েছিল। বড় কথা নয়। আর আমার জন্য মেয়ের ভবিষ্যৎ অনেক বড় আর মেয়েটিকে কনভেন্টে রেখে পরিয়ে কলেজ অবধি নিয়ে যাবার জন্য একটা বিশাল খরচ। একজন নার্স কত টাকা বেতন পায়? অলি বেনেট যখন আইএ পাস করে তার ঠিক পরেই জিন্টুর জন্ম হয়। ভুতের ওপর দানোর মতো   এই সময়ে  আলামলার মৃত্যু হয়। তখন মিস্টার ভূঞা ছিলেন  এই পৃথিবীতে  জাত পাত নিয়ে আশ্ৰয় হীন। একটা প্রেসে চাকরি করে টিউশন করে পড়াশোনা চালাচ্ছিল। তার চেয়েও বড় কথা  মিঃ ভূঞা ছিলেন ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সাংঘাতিক মেধাবী ছাত্র । 

দায়িত্বের জন্য জীবন উৎসর্গ করে মহৎ ত্যাগ আদর্শ গ্রহণ করার মধ্যেই তো দয়িতা  নারীর প্রানের শান্তি। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং জারজ সন্তান জন্ম দেওয়ার কেলেঙ্কারিতে মিস্টার ভূঁইয়াকে সংশ্লিষ্ট করে মানুষের চোখে ছোট করে তুলতে অলি বেনেট রাজি হল না। মিস্টার ভূঞা যে অলি বেনেটের প্রাণের দেবতা। এখন নয়। এখন নয়। পরে আরও  পরে। অর্থহীন এক  উচ্ছ্বাস অলি বেনেটকে পেয়ে বসেছিল। কিছু একটা বড়, কিছু একটা দশজন মেয়ে করতে না পারা নিজেকে অসামান্য প্রেমিকা বীরাঙ্গনা বলে প্রতীয়মান করার লোভ হয়েছিল প্রেম বস্তু অন্ধ করে ফেলা এই মেয়েটির মনে। 

মিস্টার ভূঞার ওপরে অনুরোধ,  অনুযোগ নয় রীতিমতো হুকুম হল। তাকে পড়াশোনা চালু রাখতে হবে। আর খুব নাম করে বিএ তার পরে এম এ   পাশ করতে হবে। এই সমস্ত প্রেস ট্রেস টিউশনি ফিউশনি আর চলবে না। খরচ? কিছু একটা হবে।

মিস্টার ভূঞা থার্ড ইয়ারে নাম লেখালেন। জিন্টুকে সঙ্গে নিয়ে অলি বেনেট সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ছোট শহরে  এলেন। একটি নবপ্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে । সেই সময় আইএ পাশ শিক্ষয়িত্রী পাওয়া কঠিন ছিল। নতুন স্কুল, খুব বেশি বেতন দিতে পারবে না । নিজের যোগ্যতা এবং কর্মদক্ষতায় অলি বেনেট চাকরিতে স্থায়ী হয়ে গেলেন । কিন্তু সত্তর আশি টাকায় কোনোমতেই সংসার চলে না। আরও টাকার প্রয়োজন। আর ও…

  দুই তিনটা টিউশনি যোগাড় করে নিয়েছিল। কিন্তু আরও টাকা চাই। বাধ্য হয়ে অলি বেনেট আপাতদৃষ্টিতে কুৎসিত ,হয়তো হীন, একটা পন্থা বেছে নিলেন। অলি বেনেট বলেছিল…

' হীনতা সহ্য করা খুব কঠিন কথা, বিমান । কিন্তু আমার মনের দ্বন্দ্ব তোমাকে কীভাবে বোঝাবো? একদিকে প্রেম অন্য দিকে পৃথিবী। দুঃখীর পৃথিবীতে প্রেম বেঁচে থাকে না। লাভ নকস এট দী ডোর এণ্ড ফ্লাইজ বাই দী উইণ্ড এট দী সাইট অফ পভার্টি। মিস্টার ভূঞা বড়লোক হতে না পারলে আমাদের প্রেম সম্পূর্ণ হতে পারবে না। কোমল জিন্টু কষ্ট পাবে । বাধ্য হয়ে আমি মানুষের সঙ্গে খুব মেলামেশা করতে লাগলাম। এই শহরে এমন কোনো বাড়ি নেই এমন একজন বিভিন্ন বয়সের মানুষ নেই যার সঙ্গে আমি অন্তত মাসে এক ঘন্টা সময় কাটাই নি। এত নিচ এই মানুষগুলি। আমি কাছে গেলেই যেন সবাই তৎপর হয়ে উঠে। আমার মন পাওয়ার জন্য। মন অথবা দেহ। আমার জন্য যেন সবাই সাগর মন্থন করতে প্রস্তুত । এই কয়েক বছরে আমি কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, কত চক্রান্ত, কত প্রলোভন। মিস্টার ভূঞার  প্রতি আমার ,আমার প্রতি মিঃ ভূঞার । ডিভাইন লাভের  জোর যদি না থাকত তাহলে হয়তো আমি ইতিমধ্যে উড হেভ বিকাম এ রেগুলার প্রস্টিটিউট।'

খিলখিল করে পুনরায় নির্লজ্জের মতো হেসেছিল অলি বেনেট। তাহলে কীসের খোঁজে মানুষের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াও তুমি?- জিজ্ঞেস করিনি যদিও সেটাই আমার প্রশ্ন হয়ে আমার ঠোঁটের ডগায় এসে থেমে গিয়েছিল। অলি বেনেট বলেছিল-‘ তুমি হয়তো দেখেছ ব্যাগটা আমার কত বিশাল। মানুষ ভুল বুঝে, এর মধ্যে কিছু থাকেনা। জান বিমান, ভাত  আমি প্রায়ই খাইনা। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভদ্রলোকের সঙ্গে মেলামেশা করে চা টা খেয়ে আমার পেট ভরে যায়। দেখতেই তো পাচ্ছ, আমি একটু সুবিধা পেলেই ব্যাগটিতে সবার অজান্তে নিমকিটা, আপেলটা ভরিয়ে নিই। সপ্তাহে দুই চার দিন কারও  কারও বাড়িতে ভাতও জুটে যায়। জিন্টুর জন্য অল্প ভাত বানাই। আমার চলে যায়। ভাত খাবার সময় অতিথি এলে তুমি তো আর তাড়িয়ে দিতে পার না।‘

আমার লজ্জা লাগছিল। অলি বেনেট কিন্তু হাসতে হাসতে বলছিল । ‘আর তো বেশিদিন নেই । লেট মিস্টার ভূঞা কাম। আমাদের বিয়ে হবে। পুরো শহরটাকে খাওয়াব। ভূঞা চাকরি করবে আর সবাই জানতে পারবে হু ইজ জিন্টু  ভূঞা।'

আশ্চর্য এবং বেশ প্রলোভনযুক্ত মনে হয়েছিল যদিও অলি বেনেটের গল্পটা তখন আর লেখা হল না। শেষের কাজটিতে অলিবেনেটের স্বার্থপরতাকে আমি সহজভাবে নিতে পারিনি। সেই জন্য। হয়তো আমার তাসের বন্ধু মহলকে ভয় পেয়েছিলাম। কী ঠিক,  রমেশ সোজা সুজি বলে দিতে পারে এসব তোর উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা । আসলে তুই লস্ট আণ্ডার দেট  সিলেকশন গাউন। আর রমেশ তো শুধু আমাকে বলেই ছেড়ে দেবে না । সেই জন্য।…. 

…. টাকা দশটা নিয়ে অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে  অলি বেনেট চলে গিয়েছিল। মা তারপরে অলি বেনেটের তার পরের ঘটনাগুলি বলেছিল। শোনা কথা। খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাছাড়া এই সমস্ত খবর তৈরি করা মানুষ আমি জানা খবরটুকু জানেনা । যাইহোক মায়ের বলা কাহিনীর সঙ্গে আমার মুক্ত কল্পনা যোগ দিলে অলি  বেনেটের গল্পটা  এই ধরনের হবে।

অনেক কষ্ট করে অর্জিত এবং অনেক হীনতা সহ্য করে পাঠানো অলি বেনেটের টাকায় মিস্টার ভূঞা  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি নিয়ে এমএ পাস করলেন । আনন্দে উল্লসিত হয়ে অলি বেনেট চিঠির পরে চিঠি দিয়ে যেতে লাগলেন । প্রথমে মিঃ ভূঞা  উত্তর দিতেন ।-'আর কিছুদিন অপেক্ষা কর অলি। আমি এখানে একটি কলেজে চাকরি করছি। কিছু টাকা তো লাগবে । কিছুদিন অপেক্ষা কর । আমি আসছি।'

কিন্তু মিস্টার ভূঞা এল না। কোনো একটা তারিখ থেকে তার চিঠি  কমে এল। তারপর কোনো একটি তারিখে বন্ধ হয়ে গেল। অলি বেনেটের অন্তর চমকে উঠলঃ' আমার জন্য নয়। অন্তত তুমি জিন্টুর  জন্য একটু তাড়াতাড়ি কর। ওকে আর কতদিন তুমি জারজ করে রাখবে ?সে বড় হয়েছে ।বাবা কোথায় জিজ্ঞাসা করে।টাকার কথা তুমি ভেবনা।'

তারচেয়েও যদি মিঃভূঞা  উত্তরে  একটা বিষের বোতল দুটো প্রাণীর জন্য পাঠিয়ে দিতেন।মিঃ ভূঞা লিখলেন-' প্রেমে পড়ার ভুল একটা বয়সে মানুষ করেই থাকে। সেই ভুলকে খামচে ধরে থাকা মূর্খতা মাত্র। তোমার বংশগৌরব আমার চেয়ে তুমি বেশি ভালো করে জান। সেটা আমি ক্ষমা করতে পারি।  কিন্তু এটা? আমি এখানে  থাকাকালীন  তুমি সেখানে করা কীর্তিকলাপগুলিকে  তুমি প্রত্যেকটাই মিথ্যা বলবে নাকি? টাকার কথা  ভাবতে তুমি সহজেই মানা করে দিতে পার। দিনটা কাটানোর জন্য স্কুল আছে  রাত কাটানোর জন্য ….। যাক সেইসব ভাবা ও পাপ । জিন্টুর কথা এত করে ভেবনা ।মা বাবার বিয়ে না হলেও সন্তানকে ফেলা যায়না তার প্রমান তো তুমিই। তা ভূঞাই লেখুক বা বেনেটই লেখুক  আমার আপত্তি নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করলে তোমার মাঝখানের এই অতীতটা মুছে ফেলা যাবে না। আমি চিৎকার করে করে জিন্টু আমার ছেলে বললেও পৃথিবীর মনে প্রশ্ন থেকেই যাবে। সত্যিই কি তাই? তুমি হয়তো শুনে সুখী হবে আমি এখানে আমার মতোই শিক্ষিত খুব উচ্চ বংশের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি । আমার অতীতকে হাসতে হাসতে মেনে নিতে পারা মেয়ে। তোমার প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব। অনুগ্রহ করে জানাবে জিন্টু কত টাকা মাসে পেলে চলতে পারবে। তুমি ও...।'

আত্মহত্যা করাই উচিত ছিল যদিও এর পরেও অলি বেনেট বেঁচে থাকল। এখন অলি বেনেটের দিনরাত্রির চিন্তা হল জিন্টুকে মানুষ করে তোলা। এত বড় মানুষ যাতে পরবর্তী কালে তার আর  পিতৃ পরিচয়ের কোনো দরকার না পড়ে। জিন্টুর পরিচয়ের কাছে যেন মিস্টার ভূঞার পরিচয় খর্ব হয়ে পড়ে। সে  হবে এক প্রেম  প্রত‍্যয়ের সন্তান। কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। কত ক্ষুদ্র এই পরিচয় । কিছুটা লোভ, অল্প কামনার জন্য এই ব্যক্তি এক দেব শিশুকে ডেকে এনে অন্ধকার হিমের  রাতে উঠোনে বের করে দিতে পারে কাঁদতে কাঁদতে ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাবার জন্য । কত সংকীর্ণ এই পরিচয়।

অলি বেনেট আর একটি কথাও বলল না। চিঠি লিখল না। মিস্টার ভূঞাকে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চেষ্টা করে জিন্টুকে বুকের রক্তে মানুষ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিরবচ্ছিন্ন সেই প্রচেষ্টার কথা বলে মা বলেছিল 'জিন্টুই ছিল  অলি বেনেটের জীবন। মানুষটা ছেলেটির জন্য কী না করেছিল। এমন না হয়ে  আর কী হবে!'

তারপর থেকেই অলি বেনেটের সেরকম হল। ক্লাস ফোর কী  ফাইভে পড়ার সময় জিন্টুকে নিষ্ঠুর ভগবান অলি বেনেটের  কাছ থেকে কেড়ে নিলেন। মৃত্যুর পরে এক সপ্তাহ অলি বেনেট বাড়ি থেকে বের হয়নি । তারপর বেরিয়ে এল।

আমার ভুল হতে পারে ।কিন্তু ভুল হলে সুস্থ থাকলে অলি বেনেট ক্ষমা করতেন বলে আমি জানি। আজকাল অলি টো টো করে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। পেলে খায়, না পেলে নেই। কাপড় চোপড়ের কোনো খবর নেই। জুতোর ফিতে নেই, কারও সঙ্গে দেখা হলেই জিন্টুর কথা বলে। কীভাবে এম এ তে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। কীভাবে রিসার্চ  করে ডক্টর হয়েছে। ডাকঘরে গিয়ে খবর করে বারবার চিঠি এবং মানি অর্ডার আছে কিনা । মিস্টার ভূঞা এখন কোথায় জানিনা। কখনও দেখা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা আছে। জিন্টুকে নিজের অন্য এক চেতনার দেশে অলি বেনেট খুব বড় মানুষ করে তুলেছে,অলি বেনেট নামে একজন মাতা। মিঃভূঞার উপরে কোনো অভিযোগ নেই অলি বেনেট নামের একটি ছোট ক্ষীণাঙ্গী প্রেম সর্বস্বা নারীর। অন্য চেতনার দেশে অলি বেনেট কোনোদিন কাছে না আসা প্রেমিককে ভুল করে মৃত বলে ধরে নিয়ে তার কল্পিত প্রেমে এখনও প্রেমের ক্রুস পুঁতে। সব সময়। অলিম্পিয়া বেনেট নামে একজন প্রেমিকা।... 

---------

  লেখক পরিচিতি-অসমিয়া সাহিত্যের প্রসিদ্ধ গল্পকার,কবি, ঔপন্যাসিক ইমরান শ্বাহ ১৯৩৩ সনে শিবসাগরের ধাই আলিতে জন্মগ্রহণ করেন। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ‘বনবাসী’ নামে কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে অপরিচিতা, ক্রান্তিরেখা ,জবানবন্দি, সাগরিকা,বর্ণালী, বনজ‍্যোৎস্না, আদি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।পথিক,প্রতিবিম্ব, পোড়া মাটির মালিতা,বন্দী বিহঙ্গম কান্দে, হয়তো বা দেবদাস, কুকুহা অন্যতম গল্প সংকলন। অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি ইমরান শ্বাহ অসম ভ‍্যালি লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড এবং পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হন।

 




 


 





 






রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

অনুবাদ এবং অসমিয়া সাহিত্য || বাসুদেব দাস

অনুবাদ এবং অসমিয়া সাহিত্য

বাসুদেব দাস 




সাধারণভাবে অনুবাদ বলতে আমরা বুঝি একটা ভাষায় রচিত (লিখিত বা কথিত)কোনো একটি পাঠ(কবিতা,প্রবন্ধ,গীত,গল্প ঈত্যাদি)অন্য একটি ভাষায় এভাবে পরিবর্তিত করা যাতে মূলের অর্থ,বক্তব্য বা সাহিত্যিক গুণরাজির খুব একটা ক্ষতি না হয় বা মূল পাঠের বিকৃ্তি না ঘটে।অনুবাদের মাধ্যামে একটি সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য একটি সংস্কৃতির যোগ সাধিত হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু রীতি এবং সূত্র প্রয়োগ করতে দেখা যায়। অনুবাদে লেখক এবং বিষয়বস্তু অর্থাৎ মূল পাঠ,লেখক এবং পাঠক,লেখক এবং অনুবাদকের এক ভারসাম্যযুক্ত সম্পর্ক রক্ষা করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এর জন্য মূল পাঠের প্রতি অনুবাদকের আন্তরিকতা এবং আনুগত্য থাকা বাঞ্ছনীয়,মূল রচনার মর্ম তাকে উপলদ্ধি করতে হবে।সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে অনুবাদ বলা যেতে পারে।অনুবাদকের উৎস ভাষা (Source language)এবং লক্ষ্য ভাষা (Target language)এই দুটিতেই পুরো দখল থাকতে হবে।

সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ শব্দটিকে বোঝানোর জন্য কয়েকটি শব্দ রয়েছে। সেগুলি নিচে আলোচনা করা হল। 

বিবর্ত -এর অর্থ হল পরিবর্তিত করা। 

পরিভাষা-অন্য ভাষায় প্রকাশ করা।পারিভাষিক শব্দ হল কোনো ভাষার বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা বিশেষ অর্থবাচক শব্দের অন্য ভাষায় করা রূপান্তর। 

ভাষান্তর-একটি ভাষার কথা এবং ভাবকে অন্য ভাষায় প্রকাশ করা। 

অনুবাদ-সবচেয়ে অধিক পরিচিত অনুবাদ শব্দের প্রকৃ্ত অর্থ হল পুনরুক্তিমূলক অনুকরণ ব্যাখ্যাসহ পুনরুক্তিকরণ। অনুবাদ অভিধাটি অনুবাদের কাজকে এক ধরনের ব্যাখ্যা বা নির্বাচন অর্থাৎ ইন্টারপ্রিটেশনের ইঙ্গিত দান করে। অনুবাদক কেবল মূল পাঠটি পড়েনই না,তিনি সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যায় উপনীত হয়ে এগিয়ে যান। 

অনুসৃষ্টি-ইংরেজিতে ব্যবহৃত ‘ট্রান্সক্রিয়েশন’শব্দের প্রতিশব্দ রূপে আজকাল অনুসৃষ্টি শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।এটি হল একধরনের সৃষ্টিশীল এবং মূল পাঠের কিছুটা পরিবর্তিত রূপ যার মধ্যে অনুবাদকের সৃষ্টিশীলতাকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। 

ভাঙনি-অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ বোঝাতে ‘ভাঙনি’শব্দটিও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।ইংরেজি থেকে ভাঙা হয়েছে বা ভঙা কবিতা এই ধরনের প্রয়োগ অসমীয়া ভাষায় লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ আমরা পার্বতী প্রসাদ বরুয়ার ভঙা কবিতার কথা বলতে পারি। 

অনুবাদকে পুনর্লেখন ও বলা হয়ে থাকে। সুসান বেসনেট (Susan Bassnett : Translation Studies)অনুবাদকে সাহিত্য কর্মের বিভিন্ন রূপের পুনর্লেখন বলেছেন।আন্দ্রে লাফেভার ও একই কথা বলেছেন। সুসানের মতে পুনর্লেখনের মাধ্যমেই একটি সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যতে ও বেঁচে থাকে। সেদিক থেকে দেখলে আমরা বলতে পারি যে অনুবাদ মূল পাঠককে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে অনুবাদ কেবল পুনর্লেখনই নয় পুনর্পঠন ও,কেন না অতীতের কোনো একটি পাঠ আজকের দিনে অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক তা নতুন করে পড়বে এবং আজকের দৃষ্টিভঙ্গি মূল পাঠকের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকটা সরে আসায় অনুবাদক নতুন করে নির্বাচনে উপনীত হতে পারেন। 

অনুবাদ এক ধরনের কঠিন কলা। যে কোনো কলার মতোই অনুবাদেও সাধনা এবং একাগ্রতার প্রয়োজন। সাধারণভাবে অনুবাদ কলাকে চারভাগে ভাগ করা যায়-তথ্যগত,জ্ঞানগত,আক্ষরিক এবং ভাবগত। সাধারণত সাংবাদিক,সম্পাদক এবং তথ্য যোগানের বিভাগ সমূহ তথ্যগত অনুবাদ অনুসরণ করে। খবরের কাগজে এবং বিজ্ঞাপনে অনুবাদ করার সময় তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপনায় অধিক গুরুত্ব দান করা হয় যদিও কিছু ক্ষেত্রে পটভূমি অথবা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে না পারলে এই ধরনের অনুবাদে ভুল তথ্য তুলে ধরার সম্ভাবনা থাকে।জ্ঞানগত অনুবাদকে ইংরেজিতে Knowledge Text বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের অনুবাদে মূল সমস্যা হল পরিভাষার সমস্যা। উৎস ভাষায় থাকা কোনো শব্দের প্রতিশব্দ যদি লক্ষ্য ভাষায় না থাকে তাহলে তা নির্মাণ করে নিতে হবে।কাজটা যথেষ্ট কঠিন।আক্ষরিক অনুবাদকে আপাততঃ দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর ও সমস্যা রয়েছে। বিষয়বস্তুর সম্যক জ্ঞান ছাড়া আক্ষরিক অনুবাদ কেবল অসফলই নয় পাঠককে বিপথগামী করার ও সম্ভাবনা থাকে। অক্ষরের পরিবর্তে অক্ষর বা শব্দের পরিবর্তে শব্দ অনুবাদের সজীবতা হারায়। আক্ষরিক অনুবাদে সবচেয়ে বড় বাধা হল প্রয়োজনীয় শব্দ ভাণ্ডারের বাধা। উৎস ভাষায় ব্যবহৃত সমাজে এরকম কিছু ফল,ফুল,পাখি,যন্ত্রপাতি উপকরণের প্রচলন থাকতে পারে যা কিনা লক্ষ্য ভাষার সমাজে ব্যবহৃত হয় না। প্রচলিত লোক উৎসব,পূজা-পার্বণ,লোক বিশ্বাস,লোকগীত আদির নামসমূহ আক্ষরিক অনুবাদ করলে নক্ষ্য ভাষার পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে।মূলের কথাকে ব্যাখ্যার দ্বারা স্পষ্ট করতে গেলে সৌন্দর্যহানির আশঙ্কা থাকে। এই ধরনের ক্ষেত্রে পাদটীকা ব্যবহার করাই শ্রেয়। 

অনুবাদকের একটি বড় সমস্যা হল দীর্ঘ বাক্যের অনুবাদ। মূলের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে দীর্ঘ বাক্য অনুবাদ করা বেশ দুরুহ।এক্ষেত্রে দীর্ঘ বাক্যকে ছোট ছোট বাক্যে ভাগ করে নিলে সুবিধা হয়। 

মূল লেখকের চেয়েও অনুবাদকের দায়িত্ব অনেক বেশি। লেখক মুক্ত মনে চিন্তা এবং অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য তার কনমকে স্বাধীনতা দিতে পারেন। তিনি ব্যবহার করা শব্দের নাড়ী-নক্ষত্র জানেন। অনুবাদকের দায়িত্ব মূল লেখকের চিন্তা-ভাবনাকে অন্য একদল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য রূপে তুলে ধরা।কখন ও এই নতুন পাঠক হয় কয়েক দশক এমনকি কয়েক শতকের পরবর্তীকালের।তাই মূল পাঠ এবং অনূদিত পাঠের মধ্যে সময়,সংস্কৃতি এবং পরিবেশের আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকতে পারে। 

অনুবাদের শুরুতেই পশ্চিমের জগতে বিশেষ করে বাইবেল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধর্মীয় পাঠের অনুবাদের আলোচনায় বিশ্বস্ততাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে লক্ষ্য করা যায়।প্লেটোর ফরাসি অনুবাদক এতিয়ান দলে মৃত্যুর পরে কী আর থাকে এই সংক্রান্ত আলোচনার এক জায়গায় নিজে থেকে তিনটি অতিরিক্ত শব্দ যোগ করে মূল পাঠকে বিকৃ্ত করার অপরাধে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। শব্দগুলি ছিল riendut tout অর্থাৎ কিছুই নেই -মৃত্যুর পরে কিছুই থাকে না।

প্রখ্যাত মালয়ালী লেখক কে সচ্চিদানন্দন এক জায়গায় বলেছেন ভারতীয়দের অনুবাদ সম্পর্কে বোধ বা চেতনা রয়েছে যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Translation Consciousness.ভারতের মতো একটি বহুভাষিক দেশে দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেকেই অনবরত এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় আসা যাওয়া করে থাকি,কম বেশি অনুবাদ করে থাকি।শত শত বছর ধরে ভারতে সাহিত্য বা সাহিত্য নয়,বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা সংক্রান্ত লেখালিখি সংস্কৃত থেকে অনূদিত হয়ে আসছে। মাতৃভাষায় পঠিত অনেক পাঠ,অনেক পুঁথির অংশবিশেষ আমরা পড়ে আসছি এবং এগুলি যে অনুবাদ তা আমরা জানিই না। এই ধরনের অনুবাদে মূল পাঠকে ঘরোয়া করে তোলার প্রক্রিয়াটিকে আমরা Domestication বলে থাকি।অন্যদিকে মূলের সুর,অলঙ্কা্র,শৈ্লী সম্পর্কীয় বৈশিষ্টা অটুট রেখে যে অনুবাদ করা হয় তাকে foreignization বলা হয়।

মহাকবি ভার্জিল বলেছিলেন,’হারকিউলেসের গদা বহন করার চেয়ে হোমার অনুবাদ করাটা বেশি শক্ত।‘একই সুরে পণ্ডিতপ্রবর কৃ্ষ্ণকান্ত সন্দিকৈ ১৮৪২ সনে ‘চেতনা’নামে একটি পত্রিকায় ’অনুবাদর কথা’(অনুবাদের কথা) শীর্ষক রচনায় বলেছেন,’ভীমের গদা বহন করার চেয়ে কালিদাস অনুবাদ করা বেশি কঠিন।’অনুবাদের প্রয়োজন আছে কিনা,অনুবাদের প্রচলন মৌ্লিক সাহিত্যের প্রসারে বাধার সৃষ্টি করবে কিনা এই সব ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এক সময়ে অসমের বিদ্বৎ সমাজ চিন্তিত ছিলেন। তখন কৃ্ষ্ণকান্ত সন্দিকৈ মহাশয় উপরে উল্লিখিত প্রবন্ধটি লিখে অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করেন।শ্রীসন্দিকৈ অনুবাদের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যুক্তি দেখিয়ে চেকোস্লাভ,যুগোস্লাভ এবং হাঙ্গেরির মৃতপ্রায় ভাষা কীভাবে অনুবাদের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তা আলোচনা করেছেন।অসমিয়া ভাষায় সন্দিকৈ্র আলোচ্য প্রবন্ধটিই অনুবাদ বিষয়ে লেখা প্রথম সুচিন্তিত প্রবন্ধ।পাশ্চাত্ত্যের কোনো কোনো সমালোচক অনুবাদ,মূলের মতো অবিকল একই হলে সর্বাঙ্গওসুন্দর হয় বলে যে মত প্রকাশ করেছেন তা তিনি সমর্থন করেননি। তিনি ভাবানুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে কেবল ভাবানুবাদ সম্ভব বলেছেন।হোরেস,ড্রাইডেন,ইত্যাদি প্রসিদ্ধ কবি-চিন্তাবিদদের মতামত বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন যে সর্বসাধারণের গ্রহণযোগা এবং বোধগম্য হওয়ার জন্য অনুবাদ সরল এবং প্রধানত ভাবপ্রকাশক হতে হবে।পাঠাপুঁথির কথা আলাদা,তা শব্দানুগত হলেও ক্ষতি নেই,কিন্তু সাহিত্যের মূল লক্ষ্য হল সৌন্দর্য সৃষ্টি যা কেবল শব্দানুসরণে সম্ভব নয়। 

সাহিত্যের বিভিন্ন  বিভাগের মধ্যে কবিতার অনুবাদ নিঃসন্দেহে কঠিনতম।রবার্ট ফ্রষ্টের মতে,অনুবাদে যা হারিয়ে যায় তাই হল কবিতা।(Poetry is that which is lost in translation)।কবিতার ভাব এবং ভাষা সবাই আয়ত্ত করতে পারেন না।তাই কবিতার অনুবাদকের কয়েকটি অতিরিক্ত গুণ থাকা উচিত।কবিতার অনুবাদে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের অনেকেই কবিতার অনুবাদ করেছেন।জার্মান কবি গ্যেটে ‘ওডিসি’র অনুবাদ,রিলকের অনূদিত চিনোর সনেট,এজরা পাউণ্ডের অনূদিত চিনা এবং ইটালিয় কবিতা,হোল্ডারলিন অনূদিত সফোক্লিসের কবিতা,এমনকি রবীন্দ্রনাথ ও নিজের এবং অন্যের কবিতা অনুবাদ করেছেন।কবিতার অনুবাদ কতটা সফল হতে পারে তা নিয়ে সমালোচক মহলে মতভেদ রয়েছে। পোপের করা হোমারের অনুবাদে ম্যাথিউ আর্নল্ড চরম বিকৃ্তি দেখতে পেয়েছিলেন।তিনি অন্যান্যবিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের অনুবাদে কখনও স্টাইলের,কখন ও ধারণার আবার কখনও মূল রচনা থেকে সরে যেতে দেখেছেন।শ্রী অরবিন্দ বলেছেন কবি যদি নিজের কবিতা নিজেই অনুবাদ করেন তাহলে তাতে মূলের গুণ অনেকটাই বজায় থাকে। অনুবাদের সৌন্দর্য রক্ষার খাতিরে কখনও কখনও কবিতার মধ্যে গদ্য সংযোগ করাটাও শ্রীঅরবিন্দের মতে দোষনীয় নয়। মূল কথা হল সৌ্ন্দর্যানুভূতি বজায় রাখা।অনুবাদক কে কিছু স্বাধীনতা দেওয়া উচিত,তবে ভাবের বিকৃ্তি এবং ভাষার স্থলনের প্রতিও তাকে সচেতন হতে হবে। 

অসমিয়া সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে অনুবাদের এক বিরাট ভূমিকা বর্তমান। বাংলা,অসমিয়া এবং উড়িয়া একটা সময়ে একই ভাষা পরিবারভুক্ত ছিল। তাছাড়া ইংরেজ সরকার নিজেদের শাসনকার্যের সুবিধার জন্য দীর্ঘকাল অসমে সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রচলন করেছিল।এটা ছিল অসমিয়া জাতীয় জীবনে বড় বেদনার দিন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অসমিয়া ভাষার পুনঃপ্রতিষ্ঠা অসমিয়া জনজীবনের অন্যতম কর্তব্য হয়ে পড়েছিল। যে ভাষার ওপরে বাংলার উপভাষার বদনাম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজ সেই অসমিয়া ভাষার গল্প,কবিতা,উপন্যাস,প্রবন্ধ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতির কেবল প্রচার ও প্রসার ঘটানোই নয়,অসমের জন্য কীভাবে তা গৌ্রব বহন করে আনছে আমার আজকের আলোচনায় তার ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেবার চেষ্টা করব। 

উত্তর-পূর্ব ভারত নানা জাতি এবং জনগোষ্ঠীর মিলনভূমি। অসমিয়া,নাগা,মিজো,মণিপুরী,খাসি,বড়ো জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ক্ষেত্র এই উত্তর পূর্বাঞ্চল। বিপুল প্রাকৃ্তিক সম্পদ,ঐতিহ্যশালী সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে অসম তথা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এর কারণ হিসেবে আমরা বলতে পারি অসম অথবা সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমাজ,সাহিতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদের সীমাহীন অজ্ঞতা।এই ক্ষেএে অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে।

অসমিয়া সাহিত্য আজ অসমের ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বিশ্বমুখী হয়ে উঠছে।মহাপুরুষ শঙ্করদেবের বিচিত্র বিপুল সৃষ্টির ঐশ্বর্য,জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার অসীম সম্ভাবনা পূর্ণ রচনারাজিতে সমগ্র বিশ্বকে আপন করে নেবার প্রয়াস,চিরন্তন সত্য-সুন্দরের উপাসনা আজ বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে,অসমিয়া সাহিত্য কীভাবে অনূদিত হয়ে অন্য ভাষার মানুষকে আগ্রহী করে তুলছে তার একটা আভাস দেবার চেষ্টা থাকবে। একই সঙ্গে ভারতীয় অন্যান্য ভাষা থেকে বিশেষ করে বাংলা থেকে বিপুল হারে অনুবাদ কীভায়ে আজও অসমিয়া সাহিত্যকে শক্তিশালী করে তুলছে তার ও একটি পরিচয় দেবার চেষ্টা করব।

১৮৭৭ সনে এ কে গার্ণির পত্নী শ্রীমতি গার্ণি ক্যাথরিন মোলেন্সের ‘করুণা এবং ফুলমণির বিবরণ’অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। সম্ভবত এটিই অসমিয়া ভাষায় প্রথম অনূদিত বাংলা উপন্যাস।এর পরে দীর্ঘকালের বিরতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯৫০ সনে শঙ্খনাথ ভট্টাচার্য সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃ্ষ্ণকান্তের উইল’অসমিয়ায় অনুবাদ করেন।বিধুভূষণ চৌধুরীর সম্পাদনায় বইটি শিলঙে্র চপলা বুকস্টল থেকে প্রকাশিত হয়। সেইসময় চপলা বুক স্টল বাংলা বই পত্রের প্রকাশনা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’উপন্যাসটি ও ১৯৬৩ সনে রজনীকান্ত শাস্ত্রীর অনুবাদে বিধুভূষণ চৌধুরীর সম্পাদনায় চারু সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে নিশিপ্রভা ভূঞার অনুবাদে ‘সীতারাম’এবং ‘আনন্দমঠ’প্রকাশিত হয়। 

অসমের সচেতন পাঠক সমাজ অন্যান্য লেখকদের মতোই রবীন্দ্র সাহিত্য মূল বাংলায় পড়তে অভ্যস্থ হলেও সাহিত্য আকাদেমির প্রয়াসকে সফল করে তোলার জন্য রবীন্দ্রসাহিত্য অনুবাদে অনেক প্রথিতযশা লেখক এগিয়ে আসেন।১৯৫১ সনে উমাকান্ত শর্মা রবীন্দ্রনাথের’রাজর্ষি’উপন্যাস অনুবাদ করেন। সাহিত্য আকাদেমি থেকে ১৯৬৩ সনে কেশব মহন্তের অনুবাদে ‘যোগাযোগ’,১৯৬৫ সনে সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরির অনুবাদে ‘গোরা’,১৯৬৮ সনে মহেন্দ্র বরার অনুবাদে ‘বিনোদিনী’ এবং ২০০৫ সনে পরাগকুমার ভট্টাচার্যের অনুবাদে ‘ঘরে বাইরে’প্রকাশিত হয়। 

ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মতো শরৎচন্দ্র অসমেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।বাণী মন্দির থেকে মানবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদে আগে একবার ‘দেবদাস’প্রকাশিত হয়েছিল।সম্প্রতি দীপিকা চক্রবর্তীর অনুবাদে পূর্বাঞ্চল প্রকাশনা থেকে আবার ‘দেবদাস’এবং ‘পরিণীতা’প্রকাশিত হয়েছে।আশি বছরের এই বৃ্দ্ধাকে কলকাতা শরৎ সমিতি থেকে পুরস্কৃত করা হয়।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘সেই সময়’উপন্যাস ও দীপিকা চক্রবর্তীর অনুবাদে সাহিত্য আকাদেমি থেকে প্রকাশিত হয়।আমাদের দেশে সাহিত্য আকাদেমির মতোই ন্যাশনেল বুক ট্রাস্ট আঞ্চলিক সাহিত্যের বইপত্র প্রকাশে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে।

মনু সেনের অনুবাদে কলকাতার ভবানী পাবলিশিঙ থেকে ১৯৭৯ সনে আশপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’এবং ১৯৭৭ সনে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’প্রকাশিত হয়। মৈত্রেয়ী দেবী ছিলেন অসমের বহু লেখক লেখিকা আর পাঠকদের প্রাণের মানুষ।এভাবেই মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকেও অসমের অগণিত পাঠক পাঠিকা সাদরে বরণ করে নিয়েছেন। সাহিত্য আকাদেমি থেকে কুলনাথ গগৈ্র অনুবাদে ‘অরণ্যের অধিকার’প্রকাশিত হয়েছে। 

এই প্রসঙ্গে গুয়াহাটির অন্যতম পাবলিশার্স লয়ার্স বুকস্টলের কর্ণধার প্রয়াত খগেন্দ্রনাথ দত্ত বরুয়ার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই। এতবড় একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি একক প্রচেষ্টায় বাংলা থেকে অসমিয়া ভাষায় অসংখ্য গল্প উপন্যাস অনুবাদ করে দুটি ভাষার মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন স্থাপন করেন। 

এবার আমার বক্তব্যে কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এসে যাবে।তার জন্য আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। অসমে জন্ম সূত্রে অসমিয়া সমাজ এবং সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। তবু আজ মনে হয় শৈশবে অসমিয়া ভাষা সাহিত্য চর্চার খুব একটা অনুকূল পরিবেশ ছিল না। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে বই পড়া একটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। অনুবাদের মাধ্যমে কলেজ জীবনেই দেশ-বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।কিন্তু আজ ভাবতে অবাক লাগে যে তখন ও অসমিয়া সাহিত্যের কোনো গ্রন্থের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না।হঠাৎ একদিন হোমেন বরগোহাঞির ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়)উপন্যাসটি হাতে আসে। প্রথমে কিছুটা অসুবিধা হলেও বইটি শেষ করে আমার মন এক অপূর্ব আনন্দে ভরে যায়। বাপুকণ আর হেবাঙের মধ্য দিয়ে আমি নতুন করে আবিষ্কার করি শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথকে।‘পথের পাঁচালী’র অপু আর দুর্গা  এতদিন থেকে আমার মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।আমার অজান্তেই এবার দুর্গার সঙ্গে অন্য একটি নাম আমার মনে স্থায়ী আসন করে নিল,তা হল বাপুকণের বোন মাখনী। বইটি আমার মনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে আমার মনের এই আনন্দের ভাগ বাংলা সাহিত্যের পাঠক পাঠিকার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইলাম।এর সঙ্গেই শুরু হল অসমিয়া সাহিত্যের পাঠ এবং অনুবাদ।

১৯৯৭ সনের ডিসেম্বর মাসে চাকরি সূত্রে আমি কলকাতা বদলি হয়ে আসি।ততদিনে আমার মনে একটা সঙ্কল্প দানা বাঁধতে শুরু করেছে,তা হল অসমিয়া সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি অনুবাদের মাধ্যামে বাংলার বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পরিচিত করে তোলা। কলকাতায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। প্রথম দিকে কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন রিসার্চ সেন্টারের সন্দীপ দত্ত আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দেন।তখনই অনুবাদ পত্রিকা,জনপদ প্রয়াস,গোধূলি মন,অমৃতলোক,কালপ্রতিমা,ভাষাবন্ধন,বর্তিকা,পরিচয়,ইত্যাদি পত্র পত্রিকার সংস্পর্ষে আসি এবং অসমিয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে থাকি। অনুবাদ পত্রিকার একটি গৌ্রবময় ইতিহাস রয়েছে।১৯৭৫ সনের জানুয়ারি মাসে পত্রিকাটির জন্ম হয়।জন্মলগ্ন থেকেই পত্রিকাটি নিরলসভাবে ভারতীয় তথা বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার পাঠক সমাজকে জুগিয়ে আসছে। পত্রিকাটির লেখকসূচিতে রয়েছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,শঙ্খ ঘোষ,ননী শূরের মতো প্রথিতযশা অনুবাদকরা।

অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ভীষণ মূল্যবান। সেটা হল অনুবাদের ক্ষেত্রে কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?উৎস ভাষা,লক্ষ্য ভাষা,লেখক,অনুবাদক না পাঠক কে? ওমর খৈয়ামের অনুবাদক ছিলেন ফিটজারেলদ।এতদিন পর্যন্ত আমরা জেনে এসেছি ওমর খৈয়ামের একজন শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে ফিটজারেলদের কোনো রকম জুড়ি ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সূত্রে আমরা অনেকেই জানি যে ওমর খৈয়ামের অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি কবির প্রতি খুব একটা সুবিচার করেন নি,অনেক জায়গাতেই তিনি মূলের চেয়ে স্বীয় ক্ল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুবাদ হয়তো জনপ্রিয় হয়েছে,কিন্তু মূল কবিতার বিকৃ্তি ঘটেছে। 

একই উৎস থেকে এসেছে বলে বাংলা এবং অসমিয়ার মধ্যে সাদৃশা প্রচুর। তবু অসমিয়া যে একটি স্বতন্ত্র ভাষা সে কথা তো আজ সর্বজন স্বীকৃ্ত। নিকট সাদৃশা হেতু একটা সমস্যার ও সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিক্ষিত বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষেরা আজও মনে করেন ‘অসমিয়া তো বাংলার মতোই,তাই আলাদা ভাবে তা শেখার কী প্রয়োজন বা অনুবাদের কী প্রয়োজন। একটা কথা ঠিক ,বাংলা জানা থাকলে অসমিয়া সহজেই শিখে নেওয়া যায়,কিন্তু তা বলে অসমিয়া তো বাংলাই এটা বেশি সরলীকরণ।অসমিয়া সমাজে একটি পুরোনো ঐতিহ্য রয়েছে,সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর পরিচয় না থাকলে অনুবাদক ব্যর্থ হতে বাধ্য।অসমিয়া সমাজে ‘নামঘর’এর একটি বিশেষ ভূত্মিকা রয়েছে।এটা ঠিক আমাদের ঠাকুর ঘর বা চণ্ডিমণ্ডপ বলতে যা বুঝি তা নয়। নামঘর সমাজ নিরপেক্ষ নয়। বাংলায় ‘গলায় গামছা দিয়ে আনা’বোঝালে কাউকে অপমান করা বোঝানো হয়। অথচ অসমিয়া সমাজ জীবনে ‘গামোছা’অত্যন্ত সম্মানের।কোনো অনুষ্ঠানে কাউকে সম্মান জানাতে হলে হাতে বোনা ‘গামোছা’গলায়পরিয়ে সম্মান জানানো হয়। অসমের কোনো কোনো অঞ্চলে মাকে ‘বৌ’,বৌটি বলে সম্বোধন করা হয়। এটা আদরের সম্বোধন।বাংলায় ছেলে বা মেয়ে বোঝাতে তৃ্তীয় পুরুষে শুধু মাত্র ‘সে’ব্যবহার করা হয়।অসমিয়া ভাষায় ছেলে বোঝাতে তৃ্তীয় পুরুষে ‘সি’ আর মেয়ে বোঝতে ‘তাই’ব্যবহার করা হয়। এভাবেই অনুবাদের সূত্রে একটা জাতির সংস্কৃতির বি্ভিন্ন দিকগুলি পরতে পরতে অনুবাদকের চোখের সামনে খুলে যেতে থাকে,অনুবাদক তখন এক নতুন মনোজগত আবিষ্কারের আনন্দে পারপার্শ্বিক ভুলে এগিয়ে যান তাঁজ নিজের তৈরি যাত্রাপথে। 

বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার মধ্যে একটা ঐক্য সূত্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে’ভাষা বন্ধন’প্রকাশিত হয়।এর সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী,নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিত্বরা। এই পত্রিকায় আমি প্রথমে নিরুপমা বরগোহাঞির ‘সন্তানের সন্ধানে জননী’গল্পটি অনুবাদ করি। গল্পটি অনেকেরই ভালো লেগেছিল। ২০০৪ সনের মার্চ মাসে সম্পাদক মণ্ডলীর অনুরোধে আমি কয়েকজন অসমিয়া কবির কবিতার বাংলা অনুবাদ করি। কবিদের মধ্যে ছিলেন নীলমণি ফুকন,হোমেন বরগোহাঞি,হীরেন ভট্টাচার্য,হরেকৃ্ষ্ণ ডেকা,রাম গগৈ,নীলিম কুমার এবং তোষপ্রভা কলিতা। 

২০০৬ সনের ডিসেম্বর মাসে ত্রিপুরার অক্ষর পাবলিকেশন আমার করা ৪৯টি অসমিয়া গল্পের অনুবাদ নিয়ে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করে। অসমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হীরেন গোঁহাই বইটির ভূমিকা লেখেন। আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলেন পঙ্কজ ঠাকুর। মামণি রয়সম গোস্বামী গুয়াহাটির একটি অনুষ্ঠানে বইটির উন্মোচন করেন। অত্যন্ত দুঃখের কথা যে প্রকাশক আমাকে এই সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানান নি বা অনুষ্ঠানে কোনোরকম আমন্ত্রণও জানান নি। আমি প্রকাশককে সঙ্কলনটিতে (মুখাবয়ব বিশেষ সংখ্যা) প্রচুর ভুল থাকার কথা জানিয়ে পত্রিকাটি এই অবস্থায় প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু প্রকাশক আমার কথায় কোনোরকম গুরুত্ব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে পত্রিকাটি সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেন।এই ঘটনায় আমি খুবই মর্মাহত হই।প্রকাশকের এতটাই দুঃসাহস যে  বছর দুই তিনেক  পরে কলকাতা আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় সমস্ত ভুল ত্রুটি সহ ম্যাগাজিনটিকে বই আকারে প্রকাশ করে দেয়। প্রছদে কোথাও অনুবাদক হিসেবে আমার নাম নেই। কেবল সম্পাদক হিসেবে পঙ্কজ ঠাকুরের নাম দেওয়া রয়েছে।ভেতরের পাতায় প্রকাশকের কথায় লেখা আছে-‘বস্তুত একটি বিশেষ সংখ্যা হিসেবে এই সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালে।উনপঞ্চাশটি অসমীয়া ছোট গল্পের অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ একা হাতে করেছেন বাসুদেব দাস  এজন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক ও নেন নি।‘আমার বক্তব্য হল পারিশ্রমিক নেবার সুযোগ ছিল কি? কারন ম্যাগাজিনটিকে যে বই আকারে প্রকাশ করা  হয়েছে (কোনো রকম পরিমার্জনা ছাড়াই)তাই আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নি।আমাকে কোনো রকম কপি দেওয়া বা আমার অনুমতি নেওয়া দূরের কথা।এখানেই শেষ নয়,বইটিতে অনুবাদক হিসেবে নাম দেওয়া আছে বুলা দত্ত,বাসুদেব দাশ। অথচ প্রকাশকের মতেই গ্রন্থের ৪৯ টি গল্পের সবগুলিই আমার অনুবাদ।এর রহস্য আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নি। এমন একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ অনিচ্ছাসত্ত্বেও এখানে উল্লেখ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হল যারা অনুবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তাদের  জানানো যে আজও অনুবাদকপ্রকাশকের খেয়াল খুশির কাছে কতটা অসহায়। 

২০১১ সনের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বাংলা আকাডেমি আয়োজিত ‘ইন্টার ন্যাশনেল বেঙ্গল স্টাডিজ’শীর্ষক সেমিনারে আমন্ত্রিত হই। সেখানে সুদূর অসমের নলবাড়ি থেকে আগত নলবাড়ি কলেজের অধ্যাপিকা দর্শনা গোস্বামীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।দর্শনার গবেষণা পত্র ছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের ‘অচিনপুর’।কথাটা জেনে একদিকে আমি যেমন গর্ব অনুভব করেছিলাম তেমনই লজ্জা ও দুঃখ ও অনুভব করেছিলাম। কেননা অসমিয়া পাঠক যতটা আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে বাংলা ভাষা ভাষী পাঠকরা কি তার সিকিভাগ আগ্রহ নিয়ে অসমিয়া সাহিত্য পড়ে? কথাটা কেবল আমার নয়।২০১১ সনে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কথাসাহিত্য উৎসবে আমি আমঅন্ত্রিত হই। সেখানে অনুবাদ সংক্রান্ত একটি আলোচনা চক্রে কন্নড় ভাষার আলোচক জাতীয় গ্রন্থাগারের বন্ধুবর মিঃকুমারাপ্পা বড় দুঃখ করে বলেছিলেন কন্নড় ভাষার পাঠক পাঠিকা বড় আগ্রহের সঙ্গে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করলেও বাংলা ভাষা ভাষী পাঠক কিন্তু প্রাদেশিক ভাষার সাহিত্য পাঠ করতে খুব একটা আগ্রহ বোধ করে না। তাঁরা প্রাদেশিক ভাষায় রচিত সাহিত্য পাঠ করার চেয়ে স্পেনিস,ফরাসি,জার্মান অথবা কন্টিনেন্টাল আহিত্য পড়তেই ভালোবাসে।আমার মনে হয় কথাটা খুব একটা মিথ্যা নয়।একবার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি মালয়ালম ভাষা শেখার জন্য একটা কোর্সে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। কোর্স কোঅর্ডিনেটর আমাকে দুঃখের সঙ্গে জানান যে ছাত্র ছাত্রীর অভাবে তাঁরা কোর্সটা চালাতে পারছে না,বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।আমার ফোন নাম্বার রেখে আসতে অনুরোধ করা হয় এবং বলা হয় যে কম করেও পাঁচজন ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হলে আমাকে জানানো হবে। তখন যেন আমি ভর্তিহয়ে যাই। দুর্ভাগ্যবশত ছাত্র ছাত্রীর অভাবে ক্লাস শুরু করা যায়নি বলে আমার ও মালয়ালম ভাষা শেখা হয় নি।

আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশ অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অনুবাদ তার জায়গা করে নিয়েছে। যে জাতি বা দেশ অন্য জাতি বা দেশের চিন্তাধারা বা ভাব সম্পদ অনুবাদের মাধ্যমে আহরণ করে না তা চিরকাল পড়ে থাকে। সক্রেটিস,প্লেটো,অ্যারিস্টটলের রচনা সমূহ যদি অনুবাদের মাধ্যমে দেশবিদেশে ছড়িয়ে না পড়ত তাহলে আমরা যে মানব সভ্যতাকে নিয়ে গর্ব করে থাকি তা পেতাম কি? 

আলোচ্য প্রবন্ধে আমি  সাহিত্যের অনুবাদের মধ্যাই সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি।অনুবাদের তত্ত্ব সংক্রান্ত যে জটিলতা রয়েছে তা নিয়ে লেখার মতো পাণ্ডিতা বা পড়াশোনা কোনোটাই আমার নেই।কাজেই সে পথে যাবার চেষ্টা করিনি।অসমিয়া সাহিত্যের অনুবাদের সূত্রে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি,যা আমার প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিয়ে চলেছে সেই অনুবাদ,সেই আনন্দেরই কিছু কথা আপনাদের সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।

----------

 






রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১

হয়তোবা দেবদাস || ইমরান শ্বাহ || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

 হয়তোবা দেবদাস

ইমরান শ্বাহ 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস 



ইন্দ্রাণীকে কথাগুলি বলা ভালো হবে বলে ভাবল হিমাদ্রি।সিদ্ধার্থকে বলা না বলা একই কথা।প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না।কথা তো বলেই না।সমস্ত কিছু বুঝতে পারলেও কথা বলে না।অংশগ্রহণ করে না।সিদ্ধার্থ কী এক অদ্ভুত চর্রিত্র।বোঝা যায় না।হিমাদ্রি,ইন্দ্রাণীই নয় কেউ সিদ্ধার্থকে বোঝার চেষ্টা করে না। 

কী হবে?ছবিটা কল্পনা করতে চেষ্টা করল হিমাদ্রি।সিদ্ধার্থ কোনো আগ্রহ দেখায় না।কিছু তো বলেই না।ইন্দ্রাণীর অতীতের কথা জেনেও সিদ্ধার্থ কীভাবে এত নির্বিকার হতে পারে।ব্যাখ্যাতীত এক রোগ।অন্য কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণীয় হতে পারে না।আর ইন্দ্রাণী।স্তব্ধ হয়ে বসে থাকবে।এক ঘণ্টা ।দুঘন্টা।হয়তো সম্পূর্ণ একটি দিন।তারপরে সামান্য দুই একটা কথা বলবে।আর স্বাভাবিক হয়ে যাব। সহজ হয়ে যাব।

এই রকমই।এভাবেই জীবন চলতে থাকে।মানুষের সমাজ চলতে থাকে।মানুষের বাইরে অন্য জীব-জন্তুর ক্ষেত্রে যেসব স্বাভাবিক ভাবে হয়ে থাকে ,সেইসব প্রায়ই লুকিয়ে চুরিয়ে হয়।

প্রতিবাদ একটা শক্তিশালী শব্দ।অস্বীকারও।এর জন্য সাহস চাই।মূলতঃ নৈতিক সাহস।আপোষ আর স্বীকার নরম,হালকা শব্দ।প্রচলন বেশি। আশ্রয়ে চলতে থাকে,সমাজ এবং মানুষ।

প্রথমে ইন্দ্রাণী সহজ সরলই ছিল।সহজ সরল শিক্ষায় জীবন চালিয়ে নেওয়া অগণন মানুষের মতোই সহজ সরল। বোঝাতে সময় লাগত।কাঁদতে থাকত।তারপর কথাগুলি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল।বিদ্যুতের আলো পূর্ণিমার চাঁদকে ভুলিয়ে দেওয়ার পরে জীবনের জটিলতা কমে যায়।অথবা,জটিলতাকেই জীবন বলে মনে হয়।

মানুষ কী বলে,বা বলবে,ভাবার অভ্যাস হিমাদ্রিদের নেই।উদারতার অর্থ কতটা সংকীর্ণ বা কতটা প্রশস্ত হতে পারে তার বিচার মনস্তত্ত্ববিদদের কাজ।কথা হল,তারা কারও কাছে ঋনী নয় বা কারও কাছ থেকে কিছু পাবার মতো নেই।তাই নিজের ওপরে কারও মাতব্বরী মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।এক ড্রাগাশক্তি,যার প্রধান শ্ত্রু ডাক্তার।

সমস্ত মানুষ যদি সচ্ছল হত,সমান শিক্ষিত এবং গুণী হত,তাহলে তো সমাজ বা সামাজিক বন্ধন ততটা গুরুত্বপূর্ণ হত না।সমবায়।সকলের সমান লাভ।কারও কোনো লোকসান নেই।এখন অবশ্য সমাজ এক বিশেষ কূটনৈতিক অর্থে সমবায়।যেখানে দুজনের লাভ হলেই সেই নাম লাভ করে।গণতন্ত্রের মতো, একটা নাম,যা কোথাও পাওয়া যায় না।

তিনজনেই ভাত খেতে বসেছিল।বিরল ঘটনা।একটি আধুনিক ঘরে আজকাল সবাই এক সঙ্গে বসে খাওয়ার ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।সংস্কৃতি মঞ্চে উঠার পরে ছোট ছোট কথায় কেউ কান দেয় না।

ইন্দ্রাণী,সিদ্ধার্থ,হিমাদ্রি।

তিনজনেই নীরবে খাচ্ছিল।কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই হিমাদ্রি হঠাৎ বলল--‘চন্দ্রশেখরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’

ভাতের গ্রাসটা মুখে দিতে গিয়েও ইন্দ্রাণী থেমে গেল। সিদ্ধার্থ কোনোরকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মাংসের পাত্রটা কাছে টেনে নিল।হিমাদ্রির কথা শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না।

-‘কোথায়?’ 

নিরুদ্বিগ্ন,কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে গিয়ে ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল।

-আজকাল গুয়াহাটিতে থাকে।বেশ ভালো অবস্থা।ফ্ল্যাট কিনেছেন।মাকে নিয়ে গেছে।

-বিয়ে করেছে বোধ হয়?

-না।বেশ টাক পড়েছে।

-হবে।পঁয়তাল্লিশ।

-হিসেব আছে?

-থাকবে না।

-একটু খারাপই লাগল।

-খারাপ?কেন?কোনো অসুখ?

-সেইসব নয়।আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।

-এখন আমি তোমাকে বুঝতে পারছি না।কী বলতে চাইছ তুমি?

-দুই একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

  -কী বলে?

-প্রত্যেকেই ভালোবাসে।কোনো খারাপ অভ্যাস নেই।হাসি-স্ফুর্তিতে থাকে।জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ করে।কেবল একটা কথা।

-কী?

-প্রচুর পরিশ্রম করে।প্রচুর উপার্জন করে।কিন্তু মানুষটার অর্থোপার্জনের ক্ষুধা দুর্বোধ্য।কিছু একটা অনুরাগ।নেশা।

-আমি চন্দ্রের সঙ্গে একবার দেখা করব।নিয়ে যাবে।

-চল।

সিদ্ধার্থ তখন খাওয়ার টেবিলে একটা বই পড়তে শুরু করেছে।বইটার নাম ‘সী স্টুপস টু কঙ্কার’।

দরকার আছে কি?

দরকার নেই।না আছে।নেই।আছে।

এরকমই হয়।

যেমন ছিল মানুষ তেমনই থাকতে চায়। বা আশা করে।পুনরায় মানুষ পরিবর্তন চায়।নাম দাও প্রগতি।আশা করে।সেখানেই অনেক দ্বন্দ্ব।যাব কি যাব না।করব কি করব না।

পঞ্চতারকা হোটেল প্রেক্ষাগৃহ।অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহের স্বয়ংসম্পূর্ণ মঞ্চ।সংস্কৃতি রক্ষা বা উদ্ধারের সভা।গামছা।জাপি।সভাপতি উচ্চবংশের।বিশিষ্ট অতিথি প্রতিবেশী দেশের।নির্দিষ্ট বক্তা বলিউডের।


- হোটেলটা ভালোই ।

-সেন্ট্রাল এসিতে সামান্য ব্যাঘাত।

- দিপাং কোথায়? 

-অনেকটা দূরে।

- লোকসংস্কৃতি। ভগ্নাবশেষ ।

-সেখানে যাওয়ার চেয়ে বইপত্রে ভালোভাবে পাবেন ।লাইব্রেরীতে ।ভেনিসে ?

-ও ।আগামী ডিসেম্বরে। সিডি ?

-পাবেন। খাঁটি নয়। অভিনয় করাও।। -আজকাল অভিনয়ই আসল।

চন্দ্রশেখরকে ইন্দ্রাণী কথাগুলি বুঝিয়ে বলছিল। প্রেম ।জীবন ।যুক্তি ।বয়স কম হলেও তিনি সদাই বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো ছিলেন। কালকের কথা মনে রেখে আজকের কথা ভাবতেন ।

বাবার কথাগুলি অহরহ ইমরানের কানে বাজছিল। প্রতিটি শব্দ। রেকর্ডিং শোনানোর মতো তিনি সেগুলি চন্দ্রশেখরকে শুনিয়েছিলেন ।

আবেগ,অনুভূতি এই সমস্ত প্রয়োজন। কার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আবেগ সর্বস্ব হলে জীবন চলে না। জীবনে যুক্তিসম্মত বাস্তব জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। আবেগ জীবন মিষ্টি করে তুলতে পারে। আবেগ নিয়ে বেঁচে থাকা যায়না।

যুক্তির কাজ থেকে যায় ।আবেগের কাজ প্রায়ই দীর্ঘশ্বাসে শেষ হয়। তাজমহলে যত আবেগ আছে ততটা অভিযান্ত্রিক যুক্তিও আছে। ফোটো তোলা কতজন শাহজাহানের কবিতা পড়েছে।

-শাহজাহানের কবিতা ।

হ্যাঁ ।শাহজাহান ।-দেখ মমতাজ। তোমাকে একবার দেখার জন্য যমুনার ঢেউ গুলি কীভাবে দৌড়ে এসেছে। মমতাজ -আর তোমাকে আমার পাশে দেখে কীভাবে দৌড়ে পালাচ্ছে ।-আবেগ, আবেগ, আবেগ- বিলাস। আজকের কবি খুব বেশি তাজমহল ,তাজমহল করে না ।তাজ নয়, তেজের (রক্তের) মহল।

হ্যাঁ তাইতো। জীবনটাতে বড় দুঃখ। কী পেলাম তোদেরকে কি দিলাম ।কিছুই নেই ।বড় দুঃখ ।মিনিটে শ-হাজার টাকা খরচ করে মানুষ আকাশে উড়ে। আমি ভাড়ার টাকা হিসেব করে রিক্সায় উঠতে ভয় করি।

মানুষ প্রেমে পড়েই বুঝেছিস। কেউ কেউ নিজের অজান্তে‌। কেউ চেষ্টা করে ।আমরাও পড়েছিলাম। কার ও কথা না শোনে। বিয়েও করেছি। তারপর থেকেই দুজনেরই প্রাণান্তকর অবস্থা। জীবিকা। জীবন। হিসাব-নিকেশ। সেখানে কোনো কিছুরই জায়গা ছিল না। অতীত বাদই । ভবিষ্যতের কথাও ভয়ে ভয়ে ভাবা । ওকে কখন ও ধমক দিয়ে পরে নিজেই নিজেকে শাপ শাপান্ত করছিলাম । আমাকে কখন ও মুখোমুখি কিছু বলে দিয়ে সে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত। মানুষটার অন্ধকারে বিছানায় কেঁপে ওঠা বুঝতে পেরেছিলাম।

-বড় দুঃখ ।

-জীবন না। জীবন…

'মাছি হয়ে চুমো দেব গালে' এতটুকু পর্যন্তই ভালো ।পরের পর্যায়টা ।একটা চড় ।একটা মাছির….

চন্দ্রশেখরকে ইন্দ্রাণী কথাগুলি বুঝিয়ে বলছিল। চন্দ্রশেখর হাসছিল আর হাসছিল। সবসময়ই হাসিটা ছিল তার কবচ। কার ও সাধ্য নেই ভেদ করে মনটা দেখে । 

-ঠিক। ঠিক ।অভিজ্ঞ মানুষ ।জীবন দেখা মানুষ ।

- আমাকে কী করতে বলছ?

-তোমার পিতা । পিতা স্বর্গ ।পিতা ধর্ম ।তাঁর অধিকার। তোমার কর্তব্য ।

-তুমি ?

-অনভিজ্ঞ। কিছু করব ।ভেবোনা ।সুখী হও। ইন্দ্রানী সিদ্ধার্থকে বিয়ে করল। একটি নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তার জন্য। মানে নিশ্চিন্ত। নিশ্চিন্ত মানুষ শক্তিশালী হয়। ইন্দ্রাণীও হল।

-সিদ্ধার্থ।

-একই জায়গার মানুষ ।ঘরটা সম্পর্কে ইন্দ্রানীরা জানত। পুরোনো ধনী। মাটি-বাড়ি। ধন সম্পত্তি ।কাজ কারবার ।ঘোরাফেরার কাজটা হিমাদ্রি করে। সিদ্ধার্থের কাগজের কাজ। ছোটখাট একটা অফিস চালায় ।হিমাদ্রি ইন্দ্রাণীকে বিয়ের আগে সিদ্ধার্থের বিষয়ে সমস্ত কথা বলেছিল ।ইন্দ্রাণী হিমাদ্রি কলেজের সহপাঠী। সাধারণভাবে স্বাভাবিক মানুষ হলেও সিদ্ধার্থ অন্য ধরনের ছিল। পড়াশোনা ,সঙ্গীত শিল্প, এই সমস্ত নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ইন্দ্রাণীকে দেবার মত সময় পায়না ।ইন্দ্রাণী এবং হিমাদ্রিকে কেন্দ্র করে একটা ঘর চলে। তিন বছরের সুমন্ত ও সঙ্গীর আশায় হিমাদ্রির কাছে আসে। কখন ও ইন্দ্রাণীর খারাপ লাগে। পত্নী, প্রিয়া ,এই শব্দগুলি হঠাৎ মনে এলে অসহায় বোধ হয় ।জীবনের সুখ-দুঃখ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। পিতা।

স্বীকার করে নেওয়াতেই, নিতে পাড়াতেই জীবনের এক অর্থ মিশে থাকে। কত অর্থ জীবনের। অর্থ খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ার আসল অর্থ নেই।  সময়ে সু্যোগের ব্যবহার করতে হয় বলা মানুষটা বড় নিরুদ্বিগ্ন মানুষ ছিল না হয়তো। পৃথিবী ক্রমাগত চার্বাকের দখলে চলে যাচ্ছে নাকি? আরেকদিন ইন্দ্রাণী ,হিমাদ্রি এবং চন্দ্রশেখর একসঙ্গে বসে ছিল।

তুমি এসব কি করছ। এই বয়স পর্যন্ত এভাবে একা।

কেন? কী ভুল হয়েছে? 

নিশ্চয়তা ,সচ্ছলতা এবং কী কী শিক্ষা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। জীবন এবং যুক্তি।

আমি নয় পিতা, আমিতো সেই পথই বেছে নিলাম। ভাবার কথা কী আছে ।যে যুক্তিতে আমি সংসার করলাম, সেই যুক্তিতে তুমি সংসার ত্যাগ করার কী অর্থ হতে পারে ?

তাইতো ।তুমি ভুল করেছ।আমি সংসার ত্যাগ করলাম কোথায় ?আমিও তো তাই করেছি ।তোমার পিতার কথা ছিল, নিশ্চয়তা সচ্ছলতা কে নিয়ে ।সেটা আমার ছিল না। তার খোঁজে যাত্রা আরম্ভ করলাম। একটা গৌণ কারণ ছিল। তোমার থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন ছিল। একটা আবেগ এড়ানোর জন্য অন‍্য আবেগের ব্যবহার। শূলে শূল। বাড়িঘর বিক্রি করে এখানে চলে এসে কাজ শুরু করলাম ।একটাই কাজ অর্থোপার্জন।

এখন তো তোমার অনেক টাকা ।

অনেক টাকা ।কিন্তু ….একটা পথে যেতে থাকার সময় কখন যে আমি নতুন প্রেমে পড়ে গেলাম, নিজেই বলতে পারিনা ।একটা নেশা। একটা সর্বগ্রাসী অনুরাগ। তুমি বুঝবে না,ইন্দ্রাণী। আজ আমি যা চাই তাই পেতে পারি। কিন্তু ….

কিন্তু ?

সেই আবেগ কোথায় ।এই নতুন প্রেম আমাকে ভুলিয়ে রাখে।বিভোর করে রাখে।

নতুন প্রেম ,চন্দ্র ?

প্রেম ।অথবা পলায়ন ।অথবা সন্ধান ।কি নাম তার ?

হয়তোবা  ….দেবদাস । অন্য এক।

---------


 


রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

২০৮৪ || ভাস্কর ঠাকুরীয়া || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

 ২০৮৪

ভাস্কর ঠাকুরীয়া 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 



‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েই থাকে,তাই আমাদের অতীতের দিকে ঘুরে তাকানোর দরকার।প্রতিটি ক্লাসেই নয় কি?’বিদায় বেলায় প্রফেসর বিপ্লব ফুকন ছাত্র-ছাত্রীদের সে কথাই বললেন।ইউরোপের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে গৃহযুদ্ধ,প্রাকৃ্তিক দুর্যোগ,দুর্ভিক্ষে জর্জরিত স্বদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা তাঁর মতো অবস্থানে থাকা যে কোনো লোকের জন্যই আবেগ চালিত চরম মূর্খামি।কিন্তু প্রফেসার ফুকন তাঁর সিদ্ধান্তে অটল,কোনো কিছুই তার মনকে টলাতে পারে না। 

‘শহিদ হওয়ার এতই যদি সখ এখানেই বন্দুক তুলে নাও,ইউরোপেতো গণশত্রুর অভাব নেই।’এনী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল।তাঁর অধীনে গবেষণা করার সময়ই ওদের দুজনের মধ্যে অনুরাগের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের জলপানিতে দুজন অখ্যাত গণশত্রু লালুকসোলা এবং বদন বরফুকনের বংশগাঁথনি সম্পর্কে এনী গবেষণা করছিল।গত কয়েকদশকের ঘটনারাজি সৃষ্টি করা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সচেতনতা এবং বিপ্লব ফুকনের অহরহ যত্ন এবং জনপ্রিয়তার জন্য আজকাল ইউরোপের ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে পূর্ব হিমালয়ের যে কোনো বিষয়েই অধ্যয়ন করাটা ফ্যাশন হয়ে উঠেছে।হবে নাই বা কেন।ভূবিজ্ঞান,পরিবেশ বিজ্ঞান,গোলকীয় উষ্ণতা,সমাজবিজ্ঞান,চিকিৎসাবিজ্ঞান-প্রতিটি গবেষণার জন্য এই জায়গাটা উর্বরভূমি।

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হয়তো শেষবারের জন্য স্বদেশ বলে উড়োজাহাজে বসলেন বিপ্লব ফুকন।আবহাওয়া যদি ঠিক থাকে প্রায় ছয় ঘণ্টার যাত্রাপথ।বসে পড়েই স্বভাবগত ভাবে কম্পিউটারটা খুলে বসলেন বিপ্লব ফুকন।স্মৃতিচারণার জন্য খুলে নিলেন শহিদ নামের ফাইলটা।তিনি ইতিহাসের মানুষ,তার মধ্যে এই অঞ্চল নিয়ে বিশেষজ্ঞ,এই সংক্রান্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় একটি টিভি চ্যানেলের জন্য একটা ছোট ছবি করেছিলেন।তারই প্রারম্ভিক স্থিরচিত্র,ভিডিও-অডিও সাক্ষাৎকার এবং শুটিঙের রাশ ফুটেজগুলো পুনরাবিষ্কার করে তার ভালো লাগল। প্রজেক্টটার অনেক বছর হয়ে গেছে।আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অঞ্চল্টির সমস্যাগুলো তুলে ধরায় বেশ সহায়ক হয়েছিল এই ছোট ছবিটা। প্রথমে তিনি স্থিরচিত্রগুলো খুলে নিলেন—কোনোটা উঁচু,কোনোটা বেঁটে,কোনোটা ভগ্ন-রাজ্যটির চারপাশে কেবল শহিদ বেদী।

নোঙরা বেদী,গোলাকার বেদী,পরিত্যক্ত বেদী-যেদিকেই তাকান না কেন,যেদিকেই না যান না কেন-চারপাশে কেবল শহিদ বেদী।রাজ্যের প্রতিটি অংশেই একটা নয় অন্য একটি বেদী দৃষ্টিগোচর হবেই। মাতৃভূমি যেন শহিদের কারখানা।

তখনই ভেসে উঠল তার আপন শহরের পুরোনো চৌরাস্তাটা।এখন জায়গাটা বসতি এলাকা।তার মাঝখানে আগে বীরদর্পে দাঁড়িয়েছিল সেই সুউচ্চ শহিদ বেদীটা।এখন সেটা ভাঙণের জন্য ভেঙ্গে যাওয়া রিফিউজিদের প্রস্রাবস্থল। হাতে অগ্নিশিখা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বিপ্লবীর ভাস্কর্যের নিচে লেখা কবিতাগুলো আজকাল প্রস্রাবকারীর লক্ষ্যবিন্দু। যেন কোনো লক্ষ্যভেদী প্রতিযোগিতায় সোনার পদক পাওয়া যাবে কবিতাগুলোতে আঘাত করতে পারলে-এরকম একটি মনোভাব প্রতিজন প্রস্রাবকারীর মুখে।

আপনি জানেন কি আপনি এইমাত্র প্রস্রাব করা খুঁটিটা একটা একশো বছরের স্মৃতিফলক?’

‘ও আপনি আবার কোথা থেকে এসে হাজির হলেন? আমরা তো সে কথা জানতাম না।‘মানুষটা লজ্জা পেয়ে উত্তর দিয়েছিল।

‘১৯৮৩ সনে কী ঘটেছিল সেটা আপনি জানেন কি?’

‘সেটাতো একশো বছর আগের কথা,আমরা কীভাবে জানব?’ 

‘মৃত্যুও তো একটা শিল্প—এই কবিতাটা আপনি কোথায় পড়েছেন?’ 

লোকটি ইতস্তত করল।কিছুক্ষণ আগে তিনি সেই বাক্যের ওপরেই…

লোকটির অবস্থা দেখে ফুকনের রাগও হচ্ছিল,হাসিও পাচ্ছিল।ওদের সমগ্র জেলাটা ভাঙনে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে,তারপরে সাঁতরে-টাঁতরে পথে নানা স্বয়ম্ভু উগ্রপন্থী সরকারের নির্যাতন পার হয়ে এতখানি পথ অতিক্রম করে শরনার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।ওরা কী জানবে এই শহরের ইতিহাস,এখানে যাদের জন্ম হয়েছে তারাই দেখছি ভুলতে শুরু করেছে।স্থানীয় সরকার শুয়োরের খোঁয়ারের মতো থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে ঠিক,কিন্তু অন্য কোনো ব্যবহার্য সুবিধা নেই,কী কদর্য জীবন।আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে যদি কোনো সাহায্যের বন্দোবস্থ না হয় যে কোনো মুহূর্তেই মহামারী আরম্ভ হতে পারে। এই সংস্থাগুলি কী করে বিপ্লব তাই ভাবে। সে ব্যক্তিগতভাবে,সরকারের হয়ে,এমনকি দুটো উগ্রপন্থী দল থেকেও নির্ভয় দান করে কতবার সাহায্যের আবেদন করল,কিন্ত এখনও আবেদনগুলি তাদের লালফিতার মারপ্যাঁচেই আটকে আছে।একসময়ের সবুজ অরণ্যে এখন খরা এবং সংঘর্ষ মরুভূমি সদৃশ করে তুলেছে। গ্লেসিয়ার গলে অঞ্চলটা একটি ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ করে তুলেছে,তার ওপরে এই  গোষ্ঠী সংঘর্ষ,দুর্ভিক্ষ মহামারীর দিনে হাজার হাজার মানুষ মরতে শুরু করেছে।কিন্তু এখনও এখানে কাজ করার জন্য ওদের চাই সরকার এবং উগ্রপন্থী দুদিক থেকেই সুরক্ষার পূর্ব শর্ত।তাহলেই তারা পুনরায় আরম্ভ করবে জনসেবার অভিযান। পাঁচ বছর আগে দুজন ইউক্রেনের চিকিৎসক হত্যারই পরিণাম এটি। অবশ্য এর ফলে লাভবান হয়েছে সরকার এবং অগণন সশস্ত্র দুটি দলই। সমস্ত জনহিতকরতার জন্য আসা সমস্ত টাকা পয়সা এখন খরচ হচ্ছে ওদের উচ্চস্তরের মানুষগুলির হাতে।

আসলে এর বিরুদ্ধে কথা বলার নীতিগত অধিকার বিপ্লবেরও নেই।কারণ এই ধরনের উপার্জিত পয়সায় সে কেমব্রিজের স্নাতক,সুইজারল্যাণ্ডের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার,অনেক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এই অঞ্চলটির নীতি গঠনের সহায়ক পরামর্শদাতা।সেরকম এক অনুন্নত জায়গা থেকে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসে পৌছানোর আড়ালে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার চেয়েও বিপ্লব ফুকনের পিতার প্রতিপত্তি এবং অগাধ  সম্পত্তির কর্তৃ্ত্ব হয়তো বেশি। সেকথাটা তিনি স্বীকার করেন। বিপ্লব ফুকনের পিতা বদন ফুকন একজন অভিজাত রাজনীতিবিদ। এত বছর রাজ্যে আসা সমস্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সাহায্য পুঁজি তিনিই তদারক করতেন।অনেকের মতে অন্য ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদকে হাতের মুঠোতে রাখার জন্য তিনিই দুটো উগ্রপন্থী দল সৃষ্টি করেছেন। বড়ফুকন তাই সমগ্র অঞ্চলেই সর্বজনের দ্বারা ঘৃণিত,কিন্তু তার বিরুদ্ধে কথা বলার মতো সাহস কারও নেই।পিতার সাহায্যেই বিপ্লব ফুকন নিজের জীবন বানিয়েছে সেই গ্লানির জন্যই নাকি তিনি এই অঞ্চলটির ইতিহাস,স্থাপত্য এবং সাহিত্যকেই নিজের কেরিয়ার হিসেবে গড়ে তোলেন।এই ছোট ছবিটার আড়ালের উদ্দেশ্য ছিল আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই অঞ্চলটির সমস্যা গুলির ওপরে আলোকপাত করা।

ঠিক তখনই মনিটরে ভেসে ঊঠল দাদুর স্মৃতিসৌধের ছবিটা।আকারে প্রকারে সেটাও একটা শহিদ বেদীই। কোনো সময়েই বাবার সঙ্গে সহজ হতে না পারার জন্য নাকি দাদু শৈশবে তাঁর একজন শ্রেষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিল।এই অঞ্চল,তার ইতিহাসের আদিপাঠের প্রথম শিক্ষক ছিলেন দাদু।এই বিপ্লব নামটাও দাদুরই দেওয়া।দাদুর যৌবনের দিনের দুঃসাহসিকতার কাহিনি বিপ্লব ফুকনকে আজও চমকিত করে আসছে।একশো সতেরো বছরের পরিপূর্ণ জীবনের পরে বার্ধক্যজনিত কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর স্মৃতিসৌধটা যেন শহিদ বেদীর আকারে হয়।

‘কিন্তু শহিদ বেদীই কেন ?’বিপ্লব ফুকন জিজ্ঞেস করেছিলেন।

‘কারণ আমরা শহিদের যুগের মানুষ’,দাদু গৌ্রবের সঙ্গে বলেছিলেন—‘আমার জ্যাঠা ১৯৪২ সনের শহিদ,আমার কাকা ১৯৬২ সনের শহিদ এবং আমার বেশ কিছু সহযোগী ১৯৮০ থেকে ২০০০ সনের মধ্যে নানা বিষয়ের শহিদ।এর পরেও অনেক আপনজন শহিদের স্মৃতি আমাকে আজ পর্যন্ত তাড়িত করে। 

‘কিন্তু আপনিও তো অনেককে শহিদ করেছিলেন ?’নিজের যৌবনে দাদু প্রথমে একজন বিখ্যাত উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।কমরেডের হত্যার প্রতিশোধের জন্য তিনি নিঁখুত নিশানায় অনেককে নিহত করেছিলেন।মানুষের মনে আর সরকারি দস্তাবেজে তাঁরাও শহিদ।

‘সমগ্র রাজ্য শহিদে ভরে গেছে ,আপনি যাকে শহিদ বলেন অন্যেরা তাকে দেশদ্রোহী বলে।আপনার সংগঠন যাকে সুবিধাভোগী,বিশ্বাসঘাতক ভেবে হত্যা করেছিলেন,অন্য সংগঠন গুলি তাকে দেশপ্রেমী হিসেবে মরণোত্তর শহিদের সম্মান জানিয়েছিল।আমি এই কথাটাই বুঝতে পারি না—আসলে কে শহিদ?’

সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজেই বিপ্লব ফুকন ছোট ছবিটা আরম্ভ করেছিলেন।ফোল্ডারটা অঞ্চলটির ভিন্ন অংশের শহিদ বেদীর ছবি এবং ভিডিওতে পরিপূর্ণ হয়েছিল। বেশিরভাগ বেদীর অবস্থাই অত্যন্ত শোচনীয়।কোনোটা ডাস্টবিন,কোনোটার উপরে এখন মণিহারী দোকান,বেশিরভাগই ক্রিকেট খেলার স্টাম্প হিসেবে ব্যবহার হয় আর রাতের বেলা সুরা পান অথবা যৌন অভিসারের আসর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।১৯৪২,১৯৬২,১৯৭৯,১৯৮৩,১৯৯২…ভিন্ন ভিন্ন পন্থী স্থাপন করা বেদীগুলির আকার প্রায় একই ধরনের।যদিও খসে যেতে শুরু করেছে, কয়েকটিতে এখনও মৃতের নাম পড়ার অবস্থায় রয়েছে।কয়েকটিতে শহিদের এবং শহিদটি যে পন্থীরই হোকনা কেন ,আশ্চর্য জনক ভাবে প্রায় বেশিরভাগ শহিদ বেদীতেই ক্ষোদিত রয়েছে সেই বিখ্যাত কবিতাটা । বিখ্যাত বলেই বলতে হবে,কারণ সেই অর্ধ শতকের বেশিরভাগ ফলকেই ক্ষোদিত আছে  সেই কবিতার স্তবকটা। কিন্তু সেই কবির কোনো চিহ্ন নেই।  

‘আমরা বড় আবেগিক জাতি,ঠিক আছে তাতে কোনো আপত্তি নেই।কিন্তু সমস্যাটা হল আমাদের ভুলে যাবার প্রবণতাটা তার চেয়ে বেশি।’ কবিটির বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় দাদু বলেছিলেন।‘আর তার জন্যই আমরা নাকি একই ভুল বারবার করে থাকি।’

অভিজ্ঞতা পুষ্ট জীবনের অধিকারী দাদু সম্পূর্ণ সত্যি কথা বলেছিলেন।তিনি নিজের জীবনে অনেক পরিবর্তন দেখে এসেছিলেন। একজন বিপ্লবী,সংগ্রামী থেকে উগ্রপন্থীতে,তারপর সফল ব্যবসায়ী এবং নির্বাচিত জননেতায় –সমস্ত অভিজ্ঞতাই তার জীবনে আছে।মৃত্যু তাকে অনেকবার কাছ থেকে ছুঁয়ে গেলেও প্রতিবারই তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন।তাঁর অমেক  সহযোগী কিন্তু এত ভাগ্যবান ছিলেন না,এমনকি দাদুর খোঁজে চালানো এক সামরিক অভিযানে তাঁর বৃ্দ্ধ পিতামাতা সহ কবি পরিবারের পাঁচজন মানুষ মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করেছিল।তারা প্রত্যেকেই আজ শহিদ।অন্যদিকে তিনি নিজের হাতে কখনও জীবন রক্ষার জন্য ,কখনও সময়ভেদে পরিবর্তিত হওয়া আদর্শের জন্য এবং অনেকবার সরকারি গুপ্তনীতির আদেশে অনেক মানুষের ওপরে গুলি চালিয়েছেন,সেই মৃতরাও আজ শহিদ।কিন্ত একজনের নামও আজ জনগণের মনে নেই।পরবর্তীকালে দাদুও বেশিরভাগ নাম,মৃত্যুর কারণ ভুলে গিয়েছিলেন।হয়তো সময়ের গতিতে তাঁদের সেই সমস্যাটির,সেই মৃত্যুর মূল্যও নাই হয়ে গিয়েছিল।সেজন্যই হয়তো কোনো চিহ্নই নেই সেই শহিদের,তাদের কারও মনে নেই।

আর মনে রাখার জন্য সময়ই বা কোথায়?প্রকৃতি প্রলয় সদৃশ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গের গ্লেসিয়ার গলে সাগরগুলি ফুলে উঠেছে,এদিকে নদীগুলিতে জল নেই। বারবার ইউরোপীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে হওয়া বড় ধরনের ভূমিকম্প,সাগরের ক্ষয় এবং বনাঞ্চলের ওপরে নির্বিচার আক্রমণের ফলে অঞ্চলটি এখন একটি অনুর্বর গৃহযুদ্ধ চলতে থাকা দ্বীপ। এতদিনে প্রবহমান নদী উপনদী গুলিতে এক ফোঁটাও জল নেই। দুর্ভিক্ষ মহামারীতে মানুষ মরতে শুরু করেছে। তথাপি সরকারি হোক বা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদিই হোক কোনোটারই বিন্দুমাত্র অহংকার কমেনি।এখনও অস্তিত্ব রক্ষা, সাত পুরুষের সংস্কৃতি ইত্যাদি শব্দকে নির্লজ্জ ভাবে ব্যবহার করে নিজের নিজের ব্যভিচার চালিয়ে যাচ্ছে। খোকনের পিতা একজন অন্যতম ব্যভিচারী নেতা। কিন্তু এতদিন তার কোনো বিচার হয়নি। গত বারের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরে  বিচারের ভয়ে ইরাবতী উপকূলে স্বেচ্ছাচারী সামরিক নেতার সুরক্ষায় আত্মগোপন করে নিজের সেনাবাহিনী চালিয়ে যাচ্ছে। বিপ্লব হল এই প্রান্তের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি এবং তার পিতা সেই দেশেরই পলাতক অপরাধী। প্রত্যেকেই জানে বিপ্লব দেশে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দি হবে। এবং তিনি যতই যত্ন করুক না কেন তাদের পরিবারের প্রধান শত্রু এই নতুন সামরিক প্রধান তাকে দোষী প্রমাণিত করবে। বিশ্বজুড়ে জনপ্রতিক্রিয়ার জন্য তা যদি সম্ভব না হয় তখন হয়তো কোনো বিচার না করেই অঘটিত সংঘর্ষ একটা ঘটিয়ে বিপ্লবকে শেষ করে দেবে।  তাই প্রত্যেকেই তার স্বদেশের সামরিক আদালতের সাক্ষী হওয়ার জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছিল। পিতা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে পিতার বিরুদ্ধে থাকা অনেক অভিযোগের সহযোগী হিসেবে বিপ্লব ফুকনেরও নাম ছিল।ইউরোপের সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক সুরক্ষার অধিকারী প্রফেসর অবশেষে দেশের জনগণের আবেদনকেই বেশি গুরুত্ব দিলেন।অন্তত তার আগমনে সংবাদ মাধ্যম সৃষ্টি করা আলোকপাত আন্তরাষ্ট্রীয় সংগঠন গুলিকে এখানে কাজ পুনরায় আরম্ভ করতে বাধ্য করবে। দেশে ফিরে আসার আগে করা সংবাদ মেলে সে সেই অনুরোধই করেছিল। 'এটা আত্মহত্যার বাইরে কিছু নয়' প্রেমিকা এনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিল। 'কি করবে দেশপ্রেম এবং দেশদ্রোহ আমাদের বংশের কোষে কোষে' বিপ্লব বলেছিল। ইতিহাস খুললে  দেখতে পাবে প্রতি ১০০ বছর পর পর একই ধরনের কারণগুলির জন্য বারবার এই অঞ্চলটিতে  ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েই চলেছে, যতই চেষ্টা করনা কেন তুমি তাকে রোধ করতে পারবে না।

  'কিন্তু তোমার  যাবার কী প্রয়োজন?'

  'আমিও বোধহয় ইতিহাসের পাপ এবং প্রায়শ্চিত্তের একটি অঙ্গ হয়ে পড়েছি। এটাই তো তোমার গবেষণার বিষয়।'

  'শহিদ হওয়ার এত সখ?'

  ‘না। শহিদ কে তা বোঝানোর আমার দুর্বার আগ্রহ।’ 

এই প্রশ্নটির উত্তর বিপ্লব ফুকনের জীবনের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। তার উত্তরে একজন তাকে উল্টে জিজ্ঞেস করেছিল হাড়ে হিমজুরে আমরা এই মাটিরই মানুষ এবং এখন আমাদেরই অন্নজলের দুরবস্থা।তার বিরুদ্ধে কথা বললে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে  ওদের গুলি করা হয়েছিল। ওরা শহিদ না হলে শহিদ কে হবে? সত্যি কথা।

  একের পর এক ভিডিওগুলি বিপ্লব ফুকন দেখে গেল।

  আমরা পেটের জ্বালায় এখানে এসেছিলাম এবং তোমরা সবাই মিলে আমাদের গ্রাম গুলি জ্বালিয়ে দিলে। আসলে শহিদ বেদী গুলি হল সেই মৃতদেরই স্মৃতি সৌধ।': সেই মানুষের উত্তর বিপ্লবকে হুলের মতো বিঁধেছিল। তথাপি বিপ্লব ফুকন কোনো ধরনের সম্পাদনা না করেই কথাগুলি ডকুমেন্টারিটিতে ব্যবহার করেছিল।

' না হলে কি করব, বন্দুকটার জন্য আজ দুমুঠো খেতে তো পারছি। একজন জীবন্ত শহিদ বলেছিল।

  সাক্ষাৎকারটির কয়েকদিন পরে ছেলেটির অন্তর্দলীয় সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছিল। আর আজ সাক্ষাৎ গ্রহণকারীও একজন জীবন্ত শহিদই।

  যে কয়েকজন তাকে মেরেছে তারা নিশ্চয়ই মারা যাবে এটা নিশ্চিত।আমাদের এই নরককুণ্ডে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, আসলে আমরাই শহিদ, যারা মরার তারা তো মরেই গেল। শহিদের মা কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছিল। বিপ্লব সেই অংশটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। মহিলা হয়তো সত্যি কথাই বলছেন।

  উড়োজাহাজটা হিমালয় অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে তার মাতৃভূমিতে ফিরে আসছিল। দূরে কুয়াশার আড়ালে আড়ালে দৃশ্যমান হয়েছিল তার অত্যন্ত আপনজন দ্বীপটা,বিপ্লব ফুকন নিচের দিকে তাকালেন,সাগরের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকা স্নেহের রাজ্যটি  একটা শহিদ বেদীর মতোই মনে হল তার কাছে।


 


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...