রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

অনুবাদ এবং অসমিয়া সাহিত্য || বাসুদেব দাস

অনুবাদ এবং অসমিয়া সাহিত্য

বাসুদেব দাস 




সাধারণভাবে অনুবাদ বলতে আমরা বুঝি একটা ভাষায় রচিত (লিখিত বা কথিত)কোনো একটি পাঠ(কবিতা,প্রবন্ধ,গীত,গল্প ঈত্যাদি)অন্য একটি ভাষায় এভাবে পরিবর্তিত করা যাতে মূলের অর্থ,বক্তব্য বা সাহিত্যিক গুণরাজির খুব একটা ক্ষতি না হয় বা মূল পাঠের বিকৃ্তি না ঘটে।অনুবাদের মাধ্যামে একটি সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য একটি সংস্কৃতির যোগ সাধিত হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু রীতি এবং সূত্র প্রয়োগ করতে দেখা যায়। অনুবাদে লেখক এবং বিষয়বস্তু অর্থাৎ মূল পাঠ,লেখক এবং পাঠক,লেখক এবং অনুবাদকের এক ভারসাম্যযুক্ত সম্পর্ক রক্ষা করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এর জন্য মূল পাঠের প্রতি অনুবাদকের আন্তরিকতা এবং আনুগত্য থাকা বাঞ্ছনীয়,মূল রচনার মর্ম তাকে উপলদ্ধি করতে হবে।সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে অনুবাদ বলা যেতে পারে।অনুবাদকের উৎস ভাষা (Source language)এবং লক্ষ্য ভাষা (Target language)এই দুটিতেই পুরো দখল থাকতে হবে।

সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ শব্দটিকে বোঝানোর জন্য কয়েকটি শব্দ রয়েছে। সেগুলি নিচে আলোচনা করা হল। 

বিবর্ত -এর অর্থ হল পরিবর্তিত করা। 

পরিভাষা-অন্য ভাষায় প্রকাশ করা।পারিভাষিক শব্দ হল কোনো ভাষার বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা বিশেষ অর্থবাচক শব্দের অন্য ভাষায় করা রূপান্তর। 

ভাষান্তর-একটি ভাষার কথা এবং ভাবকে অন্য ভাষায় প্রকাশ করা। 

অনুবাদ-সবচেয়ে অধিক পরিচিত অনুবাদ শব্দের প্রকৃ্ত অর্থ হল পুনরুক্তিমূলক অনুকরণ ব্যাখ্যাসহ পুনরুক্তিকরণ। অনুবাদ অভিধাটি অনুবাদের কাজকে এক ধরনের ব্যাখ্যা বা নির্বাচন অর্থাৎ ইন্টারপ্রিটেশনের ইঙ্গিত দান করে। অনুবাদক কেবল মূল পাঠটি পড়েনই না,তিনি সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যায় উপনীত হয়ে এগিয়ে যান। 

অনুসৃষ্টি-ইংরেজিতে ব্যবহৃত ‘ট্রান্সক্রিয়েশন’শব্দের প্রতিশব্দ রূপে আজকাল অনুসৃষ্টি শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।এটি হল একধরনের সৃষ্টিশীল এবং মূল পাঠের কিছুটা পরিবর্তিত রূপ যার মধ্যে অনুবাদকের সৃষ্টিশীলতাকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। 

ভাঙনি-অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ বোঝাতে ‘ভাঙনি’শব্দটিও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।ইংরেজি থেকে ভাঙা হয়েছে বা ভঙা কবিতা এই ধরনের প্রয়োগ অসমীয়া ভাষায় লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ আমরা পার্বতী প্রসাদ বরুয়ার ভঙা কবিতার কথা বলতে পারি। 

অনুবাদকে পুনর্লেখন ও বলা হয়ে থাকে। সুসান বেসনেট (Susan Bassnett : Translation Studies)অনুবাদকে সাহিত্য কর্মের বিভিন্ন রূপের পুনর্লেখন বলেছেন।আন্দ্রে লাফেভার ও একই কথা বলেছেন। সুসানের মতে পুনর্লেখনের মাধ্যমেই একটি সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যতে ও বেঁচে থাকে। সেদিক থেকে দেখলে আমরা বলতে পারি যে অনুবাদ মূল পাঠককে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে অনুবাদ কেবল পুনর্লেখনই নয় পুনর্পঠন ও,কেন না অতীতের কোনো একটি পাঠ আজকের দিনে অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক তা নতুন করে পড়বে এবং আজকের দৃষ্টিভঙ্গি মূল পাঠকের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকটা সরে আসায় অনুবাদক নতুন করে নির্বাচনে উপনীত হতে পারেন। 

অনুবাদ এক ধরনের কঠিন কলা। যে কোনো কলার মতোই অনুবাদেও সাধনা এবং একাগ্রতার প্রয়োজন। সাধারণভাবে অনুবাদ কলাকে চারভাগে ভাগ করা যায়-তথ্যগত,জ্ঞানগত,আক্ষরিক এবং ভাবগত। সাধারণত সাংবাদিক,সম্পাদক এবং তথ্য যোগানের বিভাগ সমূহ তথ্যগত অনুবাদ অনুসরণ করে। খবরের কাগজে এবং বিজ্ঞাপনে অনুবাদ করার সময় তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপনায় অধিক গুরুত্ব দান করা হয় যদিও কিছু ক্ষেত্রে পটভূমি অথবা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে না পারলে এই ধরনের অনুবাদে ভুল তথ্য তুলে ধরার সম্ভাবনা থাকে।জ্ঞানগত অনুবাদকে ইংরেজিতে Knowledge Text বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের অনুবাদে মূল সমস্যা হল পরিভাষার সমস্যা। উৎস ভাষায় থাকা কোনো শব্দের প্রতিশব্দ যদি লক্ষ্য ভাষায় না থাকে তাহলে তা নির্মাণ করে নিতে হবে।কাজটা যথেষ্ট কঠিন।আক্ষরিক অনুবাদকে আপাততঃ দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর ও সমস্যা রয়েছে। বিষয়বস্তুর সম্যক জ্ঞান ছাড়া আক্ষরিক অনুবাদ কেবল অসফলই নয় পাঠককে বিপথগামী করার ও সম্ভাবনা থাকে। অক্ষরের পরিবর্তে অক্ষর বা শব্দের পরিবর্তে শব্দ অনুবাদের সজীবতা হারায়। আক্ষরিক অনুবাদে সবচেয়ে বড় বাধা হল প্রয়োজনীয় শব্দ ভাণ্ডারের বাধা। উৎস ভাষায় ব্যবহৃত সমাজে এরকম কিছু ফল,ফুল,পাখি,যন্ত্রপাতি উপকরণের প্রচলন থাকতে পারে যা কিনা লক্ষ্য ভাষার সমাজে ব্যবহৃত হয় না। প্রচলিত লোক উৎসব,পূজা-পার্বণ,লোক বিশ্বাস,লোকগীত আদির নামসমূহ আক্ষরিক অনুবাদ করলে নক্ষ্য ভাষার পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে।মূলের কথাকে ব্যাখ্যার দ্বারা স্পষ্ট করতে গেলে সৌন্দর্যহানির আশঙ্কা থাকে। এই ধরনের ক্ষেত্রে পাদটীকা ব্যবহার করাই শ্রেয়। 

অনুবাদকের একটি বড় সমস্যা হল দীর্ঘ বাক্যের অনুবাদ। মূলের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে দীর্ঘ বাক্য অনুবাদ করা বেশ দুরুহ।এক্ষেত্রে দীর্ঘ বাক্যকে ছোট ছোট বাক্যে ভাগ করে নিলে সুবিধা হয়। 

মূল লেখকের চেয়েও অনুবাদকের দায়িত্ব অনেক বেশি। লেখক মুক্ত মনে চিন্তা এবং অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য তার কনমকে স্বাধীনতা দিতে পারেন। তিনি ব্যবহার করা শব্দের নাড়ী-নক্ষত্র জানেন। অনুবাদকের দায়িত্ব মূল লেখকের চিন্তা-ভাবনাকে অন্য একদল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য রূপে তুলে ধরা।কখন ও এই নতুন পাঠক হয় কয়েক দশক এমনকি কয়েক শতকের পরবর্তীকালের।তাই মূল পাঠ এবং অনূদিত পাঠের মধ্যে সময়,সংস্কৃতি এবং পরিবেশের আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকতে পারে। 

অনুবাদের শুরুতেই পশ্চিমের জগতে বিশেষ করে বাইবেল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধর্মীয় পাঠের অনুবাদের আলোচনায় বিশ্বস্ততাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে লক্ষ্য করা যায়।প্লেটোর ফরাসি অনুবাদক এতিয়ান দলে মৃত্যুর পরে কী আর থাকে এই সংক্রান্ত আলোচনার এক জায়গায় নিজে থেকে তিনটি অতিরিক্ত শব্দ যোগ করে মূল পাঠকে বিকৃ্ত করার অপরাধে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। শব্দগুলি ছিল riendut tout অর্থাৎ কিছুই নেই -মৃত্যুর পরে কিছুই থাকে না।

প্রখ্যাত মালয়ালী লেখক কে সচ্চিদানন্দন এক জায়গায় বলেছেন ভারতীয়দের অনুবাদ সম্পর্কে বোধ বা চেতনা রয়েছে যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Translation Consciousness.ভারতের মতো একটি বহুভাষিক দেশে দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেকেই অনবরত এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় আসা যাওয়া করে থাকি,কম বেশি অনুবাদ করে থাকি।শত শত বছর ধরে ভারতে সাহিত্য বা সাহিত্য নয়,বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা সংক্রান্ত লেখালিখি সংস্কৃত থেকে অনূদিত হয়ে আসছে। মাতৃভাষায় পঠিত অনেক পাঠ,অনেক পুঁথির অংশবিশেষ আমরা পড়ে আসছি এবং এগুলি যে অনুবাদ তা আমরা জানিই না। এই ধরনের অনুবাদে মূল পাঠকে ঘরোয়া করে তোলার প্রক্রিয়াটিকে আমরা Domestication বলে থাকি।অন্যদিকে মূলের সুর,অলঙ্কা্র,শৈ্লী সম্পর্কীয় বৈশিষ্টা অটুট রেখে যে অনুবাদ করা হয় তাকে foreignization বলা হয়।

মহাকবি ভার্জিল বলেছিলেন,’হারকিউলেসের গদা বহন করার চেয়ে হোমার অনুবাদ করাটা বেশি শক্ত।‘একই সুরে পণ্ডিতপ্রবর কৃ্ষ্ণকান্ত সন্দিকৈ ১৮৪২ সনে ‘চেতনা’নামে একটি পত্রিকায় ’অনুবাদর কথা’(অনুবাদের কথা) শীর্ষক রচনায় বলেছেন,’ভীমের গদা বহন করার চেয়ে কালিদাস অনুবাদ করা বেশি কঠিন।’অনুবাদের প্রয়োজন আছে কিনা,অনুবাদের প্রচলন মৌ্লিক সাহিত্যের প্রসারে বাধার সৃষ্টি করবে কিনা এই সব ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এক সময়ে অসমের বিদ্বৎ সমাজ চিন্তিত ছিলেন। তখন কৃ্ষ্ণকান্ত সন্দিকৈ মহাশয় উপরে উল্লিখিত প্রবন্ধটি লিখে অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করেন।শ্রীসন্দিকৈ অনুবাদের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যুক্তি দেখিয়ে চেকোস্লাভ,যুগোস্লাভ এবং হাঙ্গেরির মৃতপ্রায় ভাষা কীভাবে অনুবাদের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তা আলোচনা করেছেন।অসমিয়া ভাষায় সন্দিকৈ্র আলোচ্য প্রবন্ধটিই অনুবাদ বিষয়ে লেখা প্রথম সুচিন্তিত প্রবন্ধ।পাশ্চাত্ত্যের কোনো কোনো সমালোচক অনুবাদ,মূলের মতো অবিকল একই হলে সর্বাঙ্গওসুন্দর হয় বলে যে মত প্রকাশ করেছেন তা তিনি সমর্থন করেননি। তিনি ভাবানুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে কেবল ভাবানুবাদ সম্ভব বলেছেন।হোরেস,ড্রাইডেন,ইত্যাদি প্রসিদ্ধ কবি-চিন্তাবিদদের মতামত বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন যে সর্বসাধারণের গ্রহণযোগা এবং বোধগম্য হওয়ার জন্য অনুবাদ সরল এবং প্রধানত ভাবপ্রকাশক হতে হবে।পাঠাপুঁথির কথা আলাদা,তা শব্দানুগত হলেও ক্ষতি নেই,কিন্তু সাহিত্যের মূল লক্ষ্য হল সৌন্দর্য সৃষ্টি যা কেবল শব্দানুসরণে সম্ভব নয়। 

সাহিত্যের বিভিন্ন  বিভাগের মধ্যে কবিতার অনুবাদ নিঃসন্দেহে কঠিনতম।রবার্ট ফ্রষ্টের মতে,অনুবাদে যা হারিয়ে যায় তাই হল কবিতা।(Poetry is that which is lost in translation)।কবিতার ভাব এবং ভাষা সবাই আয়ত্ত করতে পারেন না।তাই কবিতার অনুবাদকের কয়েকটি অতিরিক্ত গুণ থাকা উচিত।কবিতার অনুবাদে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের অনেকেই কবিতার অনুবাদ করেছেন।জার্মান কবি গ্যেটে ‘ওডিসি’র অনুবাদ,রিলকের অনূদিত চিনোর সনেট,এজরা পাউণ্ডের অনূদিত চিনা এবং ইটালিয় কবিতা,হোল্ডারলিন অনূদিত সফোক্লিসের কবিতা,এমনকি রবীন্দ্রনাথ ও নিজের এবং অন্যের কবিতা অনুবাদ করেছেন।কবিতার অনুবাদ কতটা সফল হতে পারে তা নিয়ে সমালোচক মহলে মতভেদ রয়েছে। পোপের করা হোমারের অনুবাদে ম্যাথিউ আর্নল্ড চরম বিকৃ্তি দেখতে পেয়েছিলেন।তিনি অন্যান্যবিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের অনুবাদে কখনও স্টাইলের,কখন ও ধারণার আবার কখনও মূল রচনা থেকে সরে যেতে দেখেছেন।শ্রী অরবিন্দ বলেছেন কবি যদি নিজের কবিতা নিজেই অনুবাদ করেন তাহলে তাতে মূলের গুণ অনেকটাই বজায় থাকে। অনুবাদের সৌন্দর্য রক্ষার খাতিরে কখনও কখনও কবিতার মধ্যে গদ্য সংযোগ করাটাও শ্রীঅরবিন্দের মতে দোষনীয় নয়। মূল কথা হল সৌ্ন্দর্যানুভূতি বজায় রাখা।অনুবাদক কে কিছু স্বাধীনতা দেওয়া উচিত,তবে ভাবের বিকৃ্তি এবং ভাষার স্থলনের প্রতিও তাকে সচেতন হতে হবে। 

অসমিয়া সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে অনুবাদের এক বিরাট ভূমিকা বর্তমান। বাংলা,অসমিয়া এবং উড়িয়া একটা সময়ে একই ভাষা পরিবারভুক্ত ছিল। তাছাড়া ইংরেজ সরকার নিজেদের শাসনকার্যের সুবিধার জন্য দীর্ঘকাল অসমে সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রচলন করেছিল।এটা ছিল অসমিয়া জাতীয় জীবনে বড় বেদনার দিন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অসমিয়া ভাষার পুনঃপ্রতিষ্ঠা অসমিয়া জনজীবনের অন্যতম কর্তব্য হয়ে পড়েছিল। যে ভাষার ওপরে বাংলার উপভাষার বদনাম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজ সেই অসমিয়া ভাষার গল্প,কবিতা,উপন্যাস,প্রবন্ধ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতির কেবল প্রচার ও প্রসার ঘটানোই নয়,অসমের জন্য কীভাবে তা গৌ্রব বহন করে আনছে আমার আজকের আলোচনায় তার ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেবার চেষ্টা করব। 

উত্তর-পূর্ব ভারত নানা জাতি এবং জনগোষ্ঠীর মিলনভূমি। অসমিয়া,নাগা,মিজো,মণিপুরী,খাসি,বড়ো জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ক্ষেত্র এই উত্তর পূর্বাঞ্চল। বিপুল প্রাকৃ্তিক সম্পদ,ঐতিহ্যশালী সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে অসম তথা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এর কারণ হিসেবে আমরা বলতে পারি অসম অথবা সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমাজ,সাহিতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদের সীমাহীন অজ্ঞতা।এই ক্ষেএে অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে।

অসমিয়া সাহিত্য আজ অসমের ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বিশ্বমুখী হয়ে উঠছে।মহাপুরুষ শঙ্করদেবের বিচিত্র বিপুল সৃষ্টির ঐশ্বর্য,জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার অসীম সম্ভাবনা পূর্ণ রচনারাজিতে সমগ্র বিশ্বকে আপন করে নেবার প্রয়াস,চিরন্তন সত্য-সুন্দরের উপাসনা আজ বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে,অসমিয়া সাহিত্য কীভাবে অনূদিত হয়ে অন্য ভাষার মানুষকে আগ্রহী করে তুলছে তার একটা আভাস দেবার চেষ্টা থাকবে। একই সঙ্গে ভারতীয় অন্যান্য ভাষা থেকে বিশেষ করে বাংলা থেকে বিপুল হারে অনুবাদ কীভায়ে আজও অসমিয়া সাহিত্যকে শক্তিশালী করে তুলছে তার ও একটি পরিচয় দেবার চেষ্টা করব।

১৮৭৭ সনে এ কে গার্ণির পত্নী শ্রীমতি গার্ণি ক্যাথরিন মোলেন্সের ‘করুণা এবং ফুলমণির বিবরণ’অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। সম্ভবত এটিই অসমিয়া ভাষায় প্রথম অনূদিত বাংলা উপন্যাস।এর পরে দীর্ঘকালের বিরতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯৫০ সনে শঙ্খনাথ ভট্টাচার্য সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃ্ষ্ণকান্তের উইল’অসমিয়ায় অনুবাদ করেন।বিধুভূষণ চৌধুরীর সম্পাদনায় বইটি শিলঙে্র চপলা বুকস্টল থেকে প্রকাশিত হয়। সেইসময় চপলা বুক স্টল বাংলা বই পত্রের প্রকাশনা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’উপন্যাসটি ও ১৯৬৩ সনে রজনীকান্ত শাস্ত্রীর অনুবাদে বিধুভূষণ চৌধুরীর সম্পাদনায় চারু সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে নিশিপ্রভা ভূঞার অনুবাদে ‘সীতারাম’এবং ‘আনন্দমঠ’প্রকাশিত হয়। 

অসমের সচেতন পাঠক সমাজ অন্যান্য লেখকদের মতোই রবীন্দ্র সাহিত্য মূল বাংলায় পড়তে অভ্যস্থ হলেও সাহিত্য আকাদেমির প্রয়াসকে সফল করে তোলার জন্য রবীন্দ্রসাহিত্য অনুবাদে অনেক প্রথিতযশা লেখক এগিয়ে আসেন।১৯৫১ সনে উমাকান্ত শর্মা রবীন্দ্রনাথের’রাজর্ষি’উপন্যাস অনুবাদ করেন। সাহিত্য আকাদেমি থেকে ১৯৬৩ সনে কেশব মহন্তের অনুবাদে ‘যোগাযোগ’,১৯৬৫ সনে সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরির অনুবাদে ‘গোরা’,১৯৬৮ সনে মহেন্দ্র বরার অনুবাদে ‘বিনোদিনী’ এবং ২০০৫ সনে পরাগকুমার ভট্টাচার্যের অনুবাদে ‘ঘরে বাইরে’প্রকাশিত হয়। 

ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মতো শরৎচন্দ্র অসমেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।বাণী মন্দির থেকে মানবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদে আগে একবার ‘দেবদাস’প্রকাশিত হয়েছিল।সম্প্রতি দীপিকা চক্রবর্তীর অনুবাদে পূর্বাঞ্চল প্রকাশনা থেকে আবার ‘দেবদাস’এবং ‘পরিণীতা’প্রকাশিত হয়েছে।আশি বছরের এই বৃ্দ্ধাকে কলকাতা শরৎ সমিতি থেকে পুরস্কৃত করা হয়।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘সেই সময়’উপন্যাস ও দীপিকা চক্রবর্তীর অনুবাদে সাহিত্য আকাদেমি থেকে প্রকাশিত হয়।আমাদের দেশে সাহিত্য আকাদেমির মতোই ন্যাশনেল বুক ট্রাস্ট আঞ্চলিক সাহিত্যের বইপত্র প্রকাশে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে।

মনু সেনের অনুবাদে কলকাতার ভবানী পাবলিশিঙ থেকে ১৯৭৯ সনে আশপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’এবং ১৯৭৭ সনে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’প্রকাশিত হয়। মৈত্রেয়ী দেবী ছিলেন অসমের বহু লেখক লেখিকা আর পাঠকদের প্রাণের মানুষ।এভাবেই মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকেও অসমের অগণিত পাঠক পাঠিকা সাদরে বরণ করে নিয়েছেন। সাহিত্য আকাদেমি থেকে কুলনাথ গগৈ্র অনুবাদে ‘অরণ্যের অধিকার’প্রকাশিত হয়েছে। 

এই প্রসঙ্গে গুয়াহাটির অন্যতম পাবলিশার্স লয়ার্স বুকস্টলের কর্ণধার প্রয়াত খগেন্দ্রনাথ দত্ত বরুয়ার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই। এতবড় একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি একক প্রচেষ্টায় বাংলা থেকে অসমিয়া ভাষায় অসংখ্য গল্প উপন্যাস অনুবাদ করে দুটি ভাষার মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন স্থাপন করেন। 

এবার আমার বক্তব্যে কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এসে যাবে।তার জন্য আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। অসমে জন্ম সূত্রে অসমিয়া সমাজ এবং সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। তবু আজ মনে হয় শৈশবে অসমিয়া ভাষা সাহিত্য চর্চার খুব একটা অনুকূল পরিবেশ ছিল না। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে বই পড়া একটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। অনুবাদের মাধ্যমে কলেজ জীবনেই দেশ-বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।কিন্তু আজ ভাবতে অবাক লাগে যে তখন ও অসমিয়া সাহিত্যের কোনো গ্রন্থের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না।হঠাৎ একদিন হোমেন বরগোহাঞির ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়)উপন্যাসটি হাতে আসে। প্রথমে কিছুটা অসুবিধা হলেও বইটি শেষ করে আমার মন এক অপূর্ব আনন্দে ভরে যায়। বাপুকণ আর হেবাঙের মধ্য দিয়ে আমি নতুন করে আবিষ্কার করি শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথকে।‘পথের পাঁচালী’র অপু আর দুর্গা  এতদিন থেকে আমার মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।আমার অজান্তেই এবার দুর্গার সঙ্গে অন্য একটি নাম আমার মনে স্থায়ী আসন করে নিল,তা হল বাপুকণের বোন মাখনী। বইটি আমার মনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে আমার মনের এই আনন্দের ভাগ বাংলা সাহিত্যের পাঠক পাঠিকার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইলাম।এর সঙ্গেই শুরু হল অসমিয়া সাহিত্যের পাঠ এবং অনুবাদ।

১৯৯৭ সনের ডিসেম্বর মাসে চাকরি সূত্রে আমি কলকাতা বদলি হয়ে আসি।ততদিনে আমার মনে একটা সঙ্কল্প দানা বাঁধতে শুরু করেছে,তা হল অসমিয়া সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি অনুবাদের মাধ্যামে বাংলার বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পরিচিত করে তোলা। কলকাতায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। প্রথম দিকে কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন রিসার্চ সেন্টারের সন্দীপ দত্ত আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দেন।তখনই অনুবাদ পত্রিকা,জনপদ প্রয়াস,গোধূলি মন,অমৃতলোক,কালপ্রতিমা,ভাষাবন্ধন,বর্তিকা,পরিচয়,ইত্যাদি পত্র পত্রিকার সংস্পর্ষে আসি এবং অসমিয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে থাকি। অনুবাদ পত্রিকার একটি গৌ্রবময় ইতিহাস রয়েছে।১৯৭৫ সনের জানুয়ারি মাসে পত্রিকাটির জন্ম হয়।জন্মলগ্ন থেকেই পত্রিকাটি নিরলসভাবে ভারতীয় তথা বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার পাঠক সমাজকে জুগিয়ে আসছে। পত্রিকাটির লেখকসূচিতে রয়েছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,শঙ্খ ঘোষ,ননী শূরের মতো প্রথিতযশা অনুবাদকরা।

অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ভীষণ মূল্যবান। সেটা হল অনুবাদের ক্ষেত্রে কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?উৎস ভাষা,লক্ষ্য ভাষা,লেখক,অনুবাদক না পাঠক কে? ওমর খৈয়ামের অনুবাদক ছিলেন ফিটজারেলদ।এতদিন পর্যন্ত আমরা জেনে এসেছি ওমর খৈয়ামের একজন শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে ফিটজারেলদের কোনো রকম জুড়ি ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সূত্রে আমরা অনেকেই জানি যে ওমর খৈয়ামের অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি কবির প্রতি খুব একটা সুবিচার করেন নি,অনেক জায়গাতেই তিনি মূলের চেয়ে স্বীয় ক্ল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুবাদ হয়তো জনপ্রিয় হয়েছে,কিন্তু মূল কবিতার বিকৃ্তি ঘটেছে। 

একই উৎস থেকে এসেছে বলে বাংলা এবং অসমিয়ার মধ্যে সাদৃশা প্রচুর। তবু অসমিয়া যে একটি স্বতন্ত্র ভাষা সে কথা তো আজ সর্বজন স্বীকৃ্ত। নিকট সাদৃশা হেতু একটা সমস্যার ও সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিক্ষিত বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষেরা আজও মনে করেন ‘অসমিয়া তো বাংলার মতোই,তাই আলাদা ভাবে তা শেখার কী প্রয়োজন বা অনুবাদের কী প্রয়োজন। একটা কথা ঠিক ,বাংলা জানা থাকলে অসমিয়া সহজেই শিখে নেওয়া যায়,কিন্তু তা বলে অসমিয়া তো বাংলাই এটা বেশি সরলীকরণ।অসমিয়া সমাজে একটি পুরোনো ঐতিহ্য রয়েছে,সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর পরিচয় না থাকলে অনুবাদক ব্যর্থ হতে বাধ্য।অসমিয়া সমাজে ‘নামঘর’এর একটি বিশেষ ভূত্মিকা রয়েছে।এটা ঠিক আমাদের ঠাকুর ঘর বা চণ্ডিমণ্ডপ বলতে যা বুঝি তা নয়। নামঘর সমাজ নিরপেক্ষ নয়। বাংলায় ‘গলায় গামছা দিয়ে আনা’বোঝালে কাউকে অপমান করা বোঝানো হয়। অথচ অসমিয়া সমাজ জীবনে ‘গামোছা’অত্যন্ত সম্মানের।কোনো অনুষ্ঠানে কাউকে সম্মান জানাতে হলে হাতে বোনা ‘গামোছা’গলায়পরিয়ে সম্মান জানানো হয়। অসমের কোনো কোনো অঞ্চলে মাকে ‘বৌ’,বৌটি বলে সম্বোধন করা হয়। এটা আদরের সম্বোধন।বাংলায় ছেলে বা মেয়ে বোঝাতে তৃ্তীয় পুরুষে শুধু মাত্র ‘সে’ব্যবহার করা হয়।অসমিয়া ভাষায় ছেলে বোঝাতে তৃ্তীয় পুরুষে ‘সি’ আর মেয়ে বোঝতে ‘তাই’ব্যবহার করা হয়। এভাবেই অনুবাদের সূত্রে একটা জাতির সংস্কৃতির বি্ভিন্ন দিকগুলি পরতে পরতে অনুবাদকের চোখের সামনে খুলে যেতে থাকে,অনুবাদক তখন এক নতুন মনোজগত আবিষ্কারের আনন্দে পারপার্শ্বিক ভুলে এগিয়ে যান তাঁজ নিজের তৈরি যাত্রাপথে। 

বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার মধ্যে একটা ঐক্য সূত্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে’ভাষা বন্ধন’প্রকাশিত হয়।এর সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী,নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিত্বরা। এই পত্রিকায় আমি প্রথমে নিরুপমা বরগোহাঞির ‘সন্তানের সন্ধানে জননী’গল্পটি অনুবাদ করি। গল্পটি অনেকেরই ভালো লেগেছিল। ২০০৪ সনের মার্চ মাসে সম্পাদক মণ্ডলীর অনুরোধে আমি কয়েকজন অসমিয়া কবির কবিতার বাংলা অনুবাদ করি। কবিদের মধ্যে ছিলেন নীলমণি ফুকন,হোমেন বরগোহাঞি,হীরেন ভট্টাচার্য,হরেকৃ্ষ্ণ ডেকা,রাম গগৈ,নীলিম কুমার এবং তোষপ্রভা কলিতা। 

২০০৬ সনের ডিসেম্বর মাসে ত্রিপুরার অক্ষর পাবলিকেশন আমার করা ৪৯টি অসমিয়া গল্পের অনুবাদ নিয়ে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করে। অসমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হীরেন গোঁহাই বইটির ভূমিকা লেখেন। আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলেন পঙ্কজ ঠাকুর। মামণি রয়সম গোস্বামী গুয়াহাটির একটি অনুষ্ঠানে বইটির উন্মোচন করেন। অত্যন্ত দুঃখের কথা যে প্রকাশক আমাকে এই সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানান নি বা অনুষ্ঠানে কোনোরকম আমন্ত্রণও জানান নি। আমি প্রকাশককে সঙ্কলনটিতে (মুখাবয়ব বিশেষ সংখ্যা) প্রচুর ভুল থাকার কথা জানিয়ে পত্রিকাটি এই অবস্থায় প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু প্রকাশক আমার কথায় কোনোরকম গুরুত্ব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে পত্রিকাটি সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেন।এই ঘটনায় আমি খুবই মর্মাহত হই।প্রকাশকের এতটাই দুঃসাহস যে  বছর দুই তিনেক  পরে কলকাতা আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় সমস্ত ভুল ত্রুটি সহ ম্যাগাজিনটিকে বই আকারে প্রকাশ করে দেয়। প্রছদে কোথাও অনুবাদক হিসেবে আমার নাম নেই। কেবল সম্পাদক হিসেবে পঙ্কজ ঠাকুরের নাম দেওয়া রয়েছে।ভেতরের পাতায় প্রকাশকের কথায় লেখা আছে-‘বস্তুত একটি বিশেষ সংখ্যা হিসেবে এই সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালে।উনপঞ্চাশটি অসমীয়া ছোট গল্পের অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ একা হাতে করেছেন বাসুদেব দাস  এজন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক ও নেন নি।‘আমার বক্তব্য হল পারিশ্রমিক নেবার সুযোগ ছিল কি? কারন ম্যাগাজিনটিকে যে বই আকারে প্রকাশ করা  হয়েছে (কোনো রকম পরিমার্জনা ছাড়াই)তাই আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নি।আমাকে কোনো রকম কপি দেওয়া বা আমার অনুমতি নেওয়া দূরের কথা।এখানেই শেষ নয়,বইটিতে অনুবাদক হিসেবে নাম দেওয়া আছে বুলা দত্ত,বাসুদেব দাশ। অথচ প্রকাশকের মতেই গ্রন্থের ৪৯ টি গল্পের সবগুলিই আমার অনুবাদ।এর রহস্য আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নি। এমন একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ অনিচ্ছাসত্ত্বেও এখানে উল্লেখ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হল যারা অনুবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তাদের  জানানো যে আজও অনুবাদকপ্রকাশকের খেয়াল খুশির কাছে কতটা অসহায়। 

২০১১ সনের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বাংলা আকাডেমি আয়োজিত ‘ইন্টার ন্যাশনেল বেঙ্গল স্টাডিজ’শীর্ষক সেমিনারে আমন্ত্রিত হই। সেখানে সুদূর অসমের নলবাড়ি থেকে আগত নলবাড়ি কলেজের অধ্যাপিকা দর্শনা গোস্বামীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।দর্শনার গবেষণা পত্র ছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের ‘অচিনপুর’।কথাটা জেনে একদিকে আমি যেমন গর্ব অনুভব করেছিলাম তেমনই লজ্জা ও দুঃখ ও অনুভব করেছিলাম। কেননা অসমিয়া পাঠক যতটা আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে বাংলা ভাষা ভাষী পাঠকরা কি তার সিকিভাগ আগ্রহ নিয়ে অসমিয়া সাহিত্য পড়ে? কথাটা কেবল আমার নয়।২০১১ সনে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কথাসাহিত্য উৎসবে আমি আমঅন্ত্রিত হই। সেখানে অনুবাদ সংক্রান্ত একটি আলোচনা চক্রে কন্নড় ভাষার আলোচক জাতীয় গ্রন্থাগারের বন্ধুবর মিঃকুমারাপ্পা বড় দুঃখ করে বলেছিলেন কন্নড় ভাষার পাঠক পাঠিকা বড় আগ্রহের সঙ্গে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করলেও বাংলা ভাষা ভাষী পাঠক কিন্তু প্রাদেশিক ভাষার সাহিত্য পাঠ করতে খুব একটা আগ্রহ বোধ করে না। তাঁরা প্রাদেশিক ভাষায় রচিত সাহিত্য পাঠ করার চেয়ে স্পেনিস,ফরাসি,জার্মান অথবা কন্টিনেন্টাল আহিত্য পড়তেই ভালোবাসে।আমার মনে হয় কথাটা খুব একটা মিথ্যা নয়।একবার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি মালয়ালম ভাষা শেখার জন্য একটা কোর্সে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। কোর্স কোঅর্ডিনেটর আমাকে দুঃখের সঙ্গে জানান যে ছাত্র ছাত্রীর অভাবে তাঁরা কোর্সটা চালাতে পারছে না,বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।আমার ফোন নাম্বার রেখে আসতে অনুরোধ করা হয় এবং বলা হয় যে কম করেও পাঁচজন ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হলে আমাকে জানানো হবে। তখন যেন আমি ভর্তিহয়ে যাই। দুর্ভাগ্যবশত ছাত্র ছাত্রীর অভাবে ক্লাস শুরু করা যায়নি বলে আমার ও মালয়ালম ভাষা শেখা হয় নি।

আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশ অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অনুবাদ তার জায়গা করে নিয়েছে। যে জাতি বা দেশ অন্য জাতি বা দেশের চিন্তাধারা বা ভাব সম্পদ অনুবাদের মাধ্যমে আহরণ করে না তা চিরকাল পড়ে থাকে। সক্রেটিস,প্লেটো,অ্যারিস্টটলের রচনা সমূহ যদি অনুবাদের মাধ্যমে দেশবিদেশে ছড়িয়ে না পড়ত তাহলে আমরা যে মানব সভ্যতাকে নিয়ে গর্ব করে থাকি তা পেতাম কি? 

আলোচ্য প্রবন্ধে আমি  সাহিত্যের অনুবাদের মধ্যাই সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি।অনুবাদের তত্ত্ব সংক্রান্ত যে জটিলতা রয়েছে তা নিয়ে লেখার মতো পাণ্ডিতা বা পড়াশোনা কোনোটাই আমার নেই।কাজেই সে পথে যাবার চেষ্টা করিনি।অসমিয়া সাহিত্যের অনুবাদের সূত্রে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি,যা আমার প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিয়ে চলেছে সেই অনুবাদ,সেই আনন্দেরই কিছু কথা আপনাদের সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।

----------

 






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu   আটপৌরে ২২/৬ আটপৌরে২২/৬ ১. পৃথিবী ...