রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১

হয়তোবা দেবদাস || ইমরান শ্বাহ || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

 হয়তোবা দেবদাস

ইমরান শ্বাহ 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস 



ইন্দ্রাণীকে কথাগুলি বলা ভালো হবে বলে ভাবল হিমাদ্রি।সিদ্ধার্থকে বলা না বলা একই কথা।প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না।কথা তো বলেই না।সমস্ত কিছু বুঝতে পারলেও কথা বলে না।অংশগ্রহণ করে না।সিদ্ধার্থ কী এক অদ্ভুত চর্রিত্র।বোঝা যায় না।হিমাদ্রি,ইন্দ্রাণীই নয় কেউ সিদ্ধার্থকে বোঝার চেষ্টা করে না। 

কী হবে?ছবিটা কল্পনা করতে চেষ্টা করল হিমাদ্রি।সিদ্ধার্থ কোনো আগ্রহ দেখায় না।কিছু তো বলেই না।ইন্দ্রাণীর অতীতের কথা জেনেও সিদ্ধার্থ কীভাবে এত নির্বিকার হতে পারে।ব্যাখ্যাতীত এক রোগ।অন্য কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণীয় হতে পারে না।আর ইন্দ্রাণী।স্তব্ধ হয়ে বসে থাকবে।এক ঘণ্টা ।দুঘন্টা।হয়তো সম্পূর্ণ একটি দিন।তারপরে সামান্য দুই একটা কথা বলবে।আর স্বাভাবিক হয়ে যাব। সহজ হয়ে যাব।

এই রকমই।এভাবেই জীবন চলতে থাকে।মানুষের সমাজ চলতে থাকে।মানুষের বাইরে অন্য জীব-জন্তুর ক্ষেত্রে যেসব স্বাভাবিক ভাবে হয়ে থাকে ,সেইসব প্রায়ই লুকিয়ে চুরিয়ে হয়।

প্রতিবাদ একটা শক্তিশালী শব্দ।অস্বীকারও।এর জন্য সাহস চাই।মূলতঃ নৈতিক সাহস।আপোষ আর স্বীকার নরম,হালকা শব্দ।প্রচলন বেশি। আশ্রয়ে চলতে থাকে,সমাজ এবং মানুষ।

প্রথমে ইন্দ্রাণী সহজ সরলই ছিল।সহজ সরল শিক্ষায় জীবন চালিয়ে নেওয়া অগণন মানুষের মতোই সহজ সরল। বোঝাতে সময় লাগত।কাঁদতে থাকত।তারপর কথাগুলি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল।বিদ্যুতের আলো পূর্ণিমার চাঁদকে ভুলিয়ে দেওয়ার পরে জীবনের জটিলতা কমে যায়।অথবা,জটিলতাকেই জীবন বলে মনে হয়।

মানুষ কী বলে,বা বলবে,ভাবার অভ্যাস হিমাদ্রিদের নেই।উদারতার অর্থ কতটা সংকীর্ণ বা কতটা প্রশস্ত হতে পারে তার বিচার মনস্তত্ত্ববিদদের কাজ।কথা হল,তারা কারও কাছে ঋনী নয় বা কারও কাছ থেকে কিছু পাবার মতো নেই।তাই নিজের ওপরে কারও মাতব্বরী মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।এক ড্রাগাশক্তি,যার প্রধান শ্ত্রু ডাক্তার।

সমস্ত মানুষ যদি সচ্ছল হত,সমান শিক্ষিত এবং গুণী হত,তাহলে তো সমাজ বা সামাজিক বন্ধন ততটা গুরুত্বপূর্ণ হত না।সমবায়।সকলের সমান লাভ।কারও কোনো লোকসান নেই।এখন অবশ্য সমাজ এক বিশেষ কূটনৈতিক অর্থে সমবায়।যেখানে দুজনের লাভ হলেই সেই নাম লাভ করে।গণতন্ত্রের মতো, একটা নাম,যা কোথাও পাওয়া যায় না।

তিনজনেই ভাত খেতে বসেছিল।বিরল ঘটনা।একটি আধুনিক ঘরে আজকাল সবাই এক সঙ্গে বসে খাওয়ার ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।সংস্কৃতি মঞ্চে উঠার পরে ছোট ছোট কথায় কেউ কান দেয় না।

ইন্দ্রাণী,সিদ্ধার্থ,হিমাদ্রি।

তিনজনেই নীরবে খাচ্ছিল।কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই হিমাদ্রি হঠাৎ বলল--‘চন্দ্রশেখরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’

ভাতের গ্রাসটা মুখে দিতে গিয়েও ইন্দ্রাণী থেমে গেল। সিদ্ধার্থ কোনোরকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মাংসের পাত্রটা কাছে টেনে নিল।হিমাদ্রির কথা শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না।

-‘কোথায়?’ 

নিরুদ্বিগ্ন,কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে গিয়ে ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল।

-আজকাল গুয়াহাটিতে থাকে।বেশ ভালো অবস্থা।ফ্ল্যাট কিনেছেন।মাকে নিয়ে গেছে।

-বিয়ে করেছে বোধ হয়?

-না।বেশ টাক পড়েছে।

-হবে।পঁয়তাল্লিশ।

-হিসেব আছে?

-থাকবে না।

-একটু খারাপই লাগল।

-খারাপ?কেন?কোনো অসুখ?

-সেইসব নয়।আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।

-এখন আমি তোমাকে বুঝতে পারছি না।কী বলতে চাইছ তুমি?

-দুই একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

  -কী বলে?

-প্রত্যেকেই ভালোবাসে।কোনো খারাপ অভ্যাস নেই।হাসি-স্ফুর্তিতে থাকে।জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ করে।কেবল একটা কথা।

-কী?

-প্রচুর পরিশ্রম করে।প্রচুর উপার্জন করে।কিন্তু মানুষটার অর্থোপার্জনের ক্ষুধা দুর্বোধ্য।কিছু একটা অনুরাগ।নেশা।

-আমি চন্দ্রের সঙ্গে একবার দেখা করব।নিয়ে যাবে।

-চল।

সিদ্ধার্থ তখন খাওয়ার টেবিলে একটা বই পড়তে শুরু করেছে।বইটার নাম ‘সী স্টুপস টু কঙ্কার’।

দরকার আছে কি?

দরকার নেই।না আছে।নেই।আছে।

এরকমই হয়।

যেমন ছিল মানুষ তেমনই থাকতে চায়। বা আশা করে।পুনরায় মানুষ পরিবর্তন চায়।নাম দাও প্রগতি।আশা করে।সেখানেই অনেক দ্বন্দ্ব।যাব কি যাব না।করব কি করব না।

পঞ্চতারকা হোটেল প্রেক্ষাগৃহ।অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহের স্বয়ংসম্পূর্ণ মঞ্চ।সংস্কৃতি রক্ষা বা উদ্ধারের সভা।গামছা।জাপি।সভাপতি উচ্চবংশের।বিশিষ্ট অতিথি প্রতিবেশী দেশের।নির্দিষ্ট বক্তা বলিউডের।


- হোটেলটা ভালোই ।

-সেন্ট্রাল এসিতে সামান্য ব্যাঘাত।

- দিপাং কোথায়? 

-অনেকটা দূরে।

- লোকসংস্কৃতি। ভগ্নাবশেষ ।

-সেখানে যাওয়ার চেয়ে বইপত্রে ভালোভাবে পাবেন ।লাইব্রেরীতে ।ভেনিসে ?

-ও ।আগামী ডিসেম্বরে। সিডি ?

-পাবেন। খাঁটি নয়। অভিনয় করাও।। -আজকাল অভিনয়ই আসল।

চন্দ্রশেখরকে ইন্দ্রাণী কথাগুলি বুঝিয়ে বলছিল। প্রেম ।জীবন ।যুক্তি ।বয়স কম হলেও তিনি সদাই বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো ছিলেন। কালকের কথা মনে রেখে আজকের কথা ভাবতেন ।

বাবার কথাগুলি অহরহ ইমরানের কানে বাজছিল। প্রতিটি শব্দ। রেকর্ডিং শোনানোর মতো তিনি সেগুলি চন্দ্রশেখরকে শুনিয়েছিলেন ।

আবেগ,অনুভূতি এই সমস্ত প্রয়োজন। কার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আবেগ সর্বস্ব হলে জীবন চলে না। জীবনে যুক্তিসম্মত বাস্তব জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। আবেগ জীবন মিষ্টি করে তুলতে পারে। আবেগ নিয়ে বেঁচে থাকা যায়না।

যুক্তির কাজ থেকে যায় ।আবেগের কাজ প্রায়ই দীর্ঘশ্বাসে শেষ হয়। তাজমহলে যত আবেগ আছে ততটা অভিযান্ত্রিক যুক্তিও আছে। ফোটো তোলা কতজন শাহজাহানের কবিতা পড়েছে।

-শাহজাহানের কবিতা ।

হ্যাঁ ।শাহজাহান ।-দেখ মমতাজ। তোমাকে একবার দেখার জন্য যমুনার ঢেউ গুলি কীভাবে দৌড়ে এসেছে। মমতাজ -আর তোমাকে আমার পাশে দেখে কীভাবে দৌড়ে পালাচ্ছে ।-আবেগ, আবেগ, আবেগ- বিলাস। আজকের কবি খুব বেশি তাজমহল ,তাজমহল করে না ।তাজ নয়, তেজের (রক্তের) মহল।

হ্যাঁ তাইতো। জীবনটাতে বড় দুঃখ। কী পেলাম তোদেরকে কি দিলাম ।কিছুই নেই ।বড় দুঃখ ।মিনিটে শ-হাজার টাকা খরচ করে মানুষ আকাশে উড়ে। আমি ভাড়ার টাকা হিসেব করে রিক্সায় উঠতে ভয় করি।

মানুষ প্রেমে পড়েই বুঝেছিস। কেউ কেউ নিজের অজান্তে‌। কেউ চেষ্টা করে ।আমরাও পড়েছিলাম। কার ও কথা না শোনে। বিয়েও করেছি। তারপর থেকেই দুজনেরই প্রাণান্তকর অবস্থা। জীবিকা। জীবন। হিসাব-নিকেশ। সেখানে কোনো কিছুরই জায়গা ছিল না। অতীত বাদই । ভবিষ্যতের কথাও ভয়ে ভয়ে ভাবা । ওকে কখন ও ধমক দিয়ে পরে নিজেই নিজেকে শাপ শাপান্ত করছিলাম । আমাকে কখন ও মুখোমুখি কিছু বলে দিয়ে সে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত। মানুষটার অন্ধকারে বিছানায় কেঁপে ওঠা বুঝতে পেরেছিলাম।

-বড় দুঃখ ।

-জীবন না। জীবন…

'মাছি হয়ে চুমো দেব গালে' এতটুকু পর্যন্তই ভালো ।পরের পর্যায়টা ।একটা চড় ।একটা মাছির….

চন্দ্রশেখরকে ইন্দ্রাণী কথাগুলি বুঝিয়ে বলছিল। চন্দ্রশেখর হাসছিল আর হাসছিল। সবসময়ই হাসিটা ছিল তার কবচ। কার ও সাধ্য নেই ভেদ করে মনটা দেখে । 

-ঠিক। ঠিক ।অভিজ্ঞ মানুষ ।জীবন দেখা মানুষ ।

- আমাকে কী করতে বলছ?

-তোমার পিতা । পিতা স্বর্গ ।পিতা ধর্ম ।তাঁর অধিকার। তোমার কর্তব্য ।

-তুমি ?

-অনভিজ্ঞ। কিছু করব ।ভেবোনা ।সুখী হও। ইন্দ্রানী সিদ্ধার্থকে বিয়ে করল। একটি নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তার জন্য। মানে নিশ্চিন্ত। নিশ্চিন্ত মানুষ শক্তিশালী হয়। ইন্দ্রাণীও হল।

-সিদ্ধার্থ।

-একই জায়গার মানুষ ।ঘরটা সম্পর্কে ইন্দ্রানীরা জানত। পুরোনো ধনী। মাটি-বাড়ি। ধন সম্পত্তি ।কাজ কারবার ।ঘোরাফেরার কাজটা হিমাদ্রি করে। সিদ্ধার্থের কাগজের কাজ। ছোটখাট একটা অফিস চালায় ।হিমাদ্রি ইন্দ্রাণীকে বিয়ের আগে সিদ্ধার্থের বিষয়ে সমস্ত কথা বলেছিল ।ইন্দ্রাণী হিমাদ্রি কলেজের সহপাঠী। সাধারণভাবে স্বাভাবিক মানুষ হলেও সিদ্ধার্থ অন্য ধরনের ছিল। পড়াশোনা ,সঙ্গীত শিল্প, এই সমস্ত নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ইন্দ্রাণীকে দেবার মত সময় পায়না ।ইন্দ্রাণী এবং হিমাদ্রিকে কেন্দ্র করে একটা ঘর চলে। তিন বছরের সুমন্ত ও সঙ্গীর আশায় হিমাদ্রির কাছে আসে। কখন ও ইন্দ্রাণীর খারাপ লাগে। পত্নী, প্রিয়া ,এই শব্দগুলি হঠাৎ মনে এলে অসহায় বোধ হয় ।জীবনের সুখ-দুঃখ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। পিতা।

স্বীকার করে নেওয়াতেই, নিতে পাড়াতেই জীবনের এক অর্থ মিশে থাকে। কত অর্থ জীবনের। অর্থ খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ার আসল অর্থ নেই।  সময়ে সু্যোগের ব্যবহার করতে হয় বলা মানুষটা বড় নিরুদ্বিগ্ন মানুষ ছিল না হয়তো। পৃথিবী ক্রমাগত চার্বাকের দখলে চলে যাচ্ছে নাকি? আরেকদিন ইন্দ্রাণী ,হিমাদ্রি এবং চন্দ্রশেখর একসঙ্গে বসে ছিল।

তুমি এসব কি করছ। এই বয়স পর্যন্ত এভাবে একা।

কেন? কী ভুল হয়েছে? 

নিশ্চয়তা ,সচ্ছলতা এবং কী কী শিক্ষা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। জীবন এবং যুক্তি।

আমি নয় পিতা, আমিতো সেই পথই বেছে নিলাম। ভাবার কথা কী আছে ।যে যুক্তিতে আমি সংসার করলাম, সেই যুক্তিতে তুমি সংসার ত্যাগ করার কী অর্থ হতে পারে ?

তাইতো ।তুমি ভুল করেছ।আমি সংসার ত্যাগ করলাম কোথায় ?আমিও তো তাই করেছি ।তোমার পিতার কথা ছিল, নিশ্চয়তা সচ্ছলতা কে নিয়ে ।সেটা আমার ছিল না। তার খোঁজে যাত্রা আরম্ভ করলাম। একটা গৌণ কারণ ছিল। তোমার থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন ছিল। একটা আবেগ এড়ানোর জন্য অন‍্য আবেগের ব্যবহার। শূলে শূল। বাড়িঘর বিক্রি করে এখানে চলে এসে কাজ শুরু করলাম ।একটাই কাজ অর্থোপার্জন।

এখন তো তোমার অনেক টাকা ।

অনেক টাকা ।কিন্তু ….একটা পথে যেতে থাকার সময় কখন যে আমি নতুন প্রেমে পড়ে গেলাম, নিজেই বলতে পারিনা ।একটা নেশা। একটা সর্বগ্রাসী অনুরাগ। তুমি বুঝবে না,ইন্দ্রাণী। আজ আমি যা চাই তাই পেতে পারি। কিন্তু ….

কিন্তু ?

সেই আবেগ কোথায় ।এই নতুন প্রেম আমাকে ভুলিয়ে রাখে।বিভোর করে রাখে।

নতুন প্রেম ,চন্দ্র ?

প্রেম ।অথবা পলায়ন ।অথবা সন্ধান ।কি নাম তার ?

হয়তোবা  ….দেবদাস । অন্য এক।

---------


 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu   আটপৌরে ২২/৬ আটপৌরে২২/৬ ১. পৃথিবী ...