রবিবারের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রবিবারের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

মিথ্যা কথা || সৈয়দ আব্দুল মালিক || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

 

মিথ্যা কথা

সৈয়দ আব্দুল মালিক

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস

    




আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল সাড়ে চার মাইল।

     হেঁটে আসা যাওয়া করি।আমাদের গ্রামের-আমাদের শ্রেণির ছেলে আমাদের স্কুলে আমিই।অন্য ক্লাসের ছেলে আছে।আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনের পথটা দিয়ে এক মাইল গিয়ে-বড় রাস্তায় উঠি এবং অন্য ছেলেদের সঙ্গে স্কুলে যাই।

     ক্লাস সিক্সে পড়তাম।অভ্যাস ছাড়া আমার মতো ছোট একটি ছেলে দিনে নয়মাইল হাঁটতে পারতাম না।তবে পড়াশোনা না করলে নয়,সাইকেল কেনার মতো পয়সা নেই,বাড়ির আশেপাশে কোনো স্কুল নেই।

     পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

     ক্লাস এইটের পবন নেওগ আমাদের অঞ্চল থেকেই সাইকেলে করে স্কুলে যায়।কখনও দেরি হতে দেখলে পবন আমাকে তার সাইকেলে তুলে নেয়।

     কখনও নেয় না।

     বড় রাস্তা দিয়ে পবনদের ঘরের ওদিকে তোষেশ্বর স্যার যায়।তার একটা বহুদিনের পুরোনো শব্দ করা সাইকেল আছেবেল না বাজালেও পুরো সাইকেলটাই দূর থেকে বাজতে থাকে।তোষেশ্বর স্যার যে আসছে তা আমরা ঘুরে না তাকিয়েও বুঝতে পারি এবং সঙ্গে সঙ্গে একপাশে সরে দাঁড়াই।কেবল তোষেশ্বর স্যারই নয় অন্য শিক্ষকদের ও আমি খুব ভয় করতাম।তোষেশ্বর স্যার আমাদের ভূগোল পড়ায় এবং ইংরেজি ট্রানশ্লেষণ করায়।ভূগোলে আমি খারাপ।এত বড় একটা পৃথিবী,তাতে এতগুলো দেশ,মহাদেশ,কত নদী-পর্বত,নগর-সাগর মনেই থাকে না।তার মধ্যে আমার ভূগোলের জ্ঞান যোরহাট,গোলাঘাট এবং আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল-এর মধ্যেই আবদ্ধ।আমার ম্যাপগুলো বড় দীর্ঘ হয়ে যায়।একবার লঙ্কা দ্বীপ আঁকার সময় একেবারে তোষেশ্বর স্যারের মুখের মতো হয়েছিল।এই জিনিসটা আবিষ্কার করে আমি উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে হেসেছিলাম এবং বড় আমোদ এবং রহস্য বলে মনে হয়েছিল।কোনোভাবে তোষেশ্বর স্যার যেন দেখতে না পায় সেজন্য লুকিয়ে রেখেছিলাম।

     একদিন আমরা পুরো ক্লাসটা একটা বড় অপরাধ করে ফেললাম।আমাদের একটা ম্যাপ বাড়ি থেকে এঁকে নিয়ে যেতে বলেছিল-আমরা তা পারলাম না।কয়েকজন এঁকে এনেছিল।ওদেরকেও আনেনি বলতে বলে দিলামকারণ দুয়েকজন নিলে আর বাকিরা না নিলে ,যারা নেয়নি তাদের শাস্তি বেশি হবে।মিথ্যা কথা বলারও কোনো উপায় নেই।

     প্রত্যেকেই আনেনি বলল।

     ‘ম্যাপ এঁকে আনলি না কেন?’স্যার রাগের সঙ্গে বললেন।

     আমরা চুপ।

     উত্তরটা আগে থেকে ভেবে রাখা হল না।স্যার সবার মুখের দিকে একবার রাগত চোখে তাকালেন।তারপরে গম্ভীরভাবে বললেন-‘ভালোই হয়েছে হোমটাস্ক করে আনিসনি।এক ঘণ্টা ডিটেইন।’

     আমাদের সবার শুকনো মুখ এবং শুকনো গলা আরও শুকিয়ে গেল।

     ‘এখন এঁকে দেব স্যার’।কে একজন দুঃসাহস করে বলল।

     ‘তুই বেঞ্চের উপরই দাঁড়িয়ে থাক-’একই গম্ভীর এবং কড়া সুরে স্যার বলে উঠলেন।

     আর কারও কিছু বলার সাহস হল না।তোষেশ্বর স্যারের রাগ সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন।

     তারপর সেদিন ভূগোল পড়িয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বললেন,‘পুরো এক ঘণ্টা।কেউ পালাতে পারবি নাকেউ ছুটি নিয়েও যেতে পারবি না।’

     অসহায় ভাবে আমরা প্রথমে একবার স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করলাম।স্যারের কথার নড়চড় হয় না।

     এমনিতে কখনও কোনো ছাত্রের পরের ক্লাসগুলোতে উপস্থিত থাকতে ইচ্ছা না করলে কোনো ছাত্র পেট কামড়াচ্ছে বা মাথা ব্যথা করছে বলে ছুটি নিয়ে যায়।কিন্তু তোষেশ্বর স্যার ডিটেইন করেছেন,ছুটি নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

     সেদিন জৈষ্ঠ্য মাসের বড় কড়া রোদ।আমাদের ক্ষুধাও পেয়েছিল,তৃষ্ণাও পেয়েছিল।আমরা গ্লাসের পর গ্লাস জল খাচ্ছিলাম।কিন্তু পুরো ক্লাসের ছেলেরা চুপ করে বসে রইল।কেউ নড়াচড়া করার সাহস করল না।তোষেশ্বর স্যার চেয়ারটাতে যে বসলেন,বসেই রইলেন,নড়াচড়া করার নামগন্ধ নেইস্যারকে এভাবে দেখে আমাদের আরও বেশি ভয় করতে লাগল।স্কুলের অন্য ক্লাসের সমস্ত শিক্ষক এবং ছাত্ররা বাড়ি চলে গেল।চারপাশটা বেশ নীরব নিস্তব্ধ।

     আমাকে আবার পায়ে হেঁটে সাড়ে চার মাইল যেতে হবে।ছুটি দিতে বলার জন্য কয়েকবার উশখুশ করলাম,সাহসে কুলোল না।তখনকার দিনে আজকালকার মতো মাস্টার ছাত্রদের ভয় করত না।কারণ ছাত্ররা মাস্টারদের ঘেরাও-টেরাও করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না।

     কাঁটায় কাঁটায় এক ঘণ্টা হওয়ার পরে আমাদের ছুটি দিল।আমরা সুরসুর করে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ে দ্রুতপায়ে বাড়িমুখো হলাম,বাড়ি পৌছাতে আজ রাত হবে।

     একমাইলের মতো হাঁটার পরে আমি একা হয়ে গেলাম।সঙ্গের ছেলেরা সবাই যে যার দিকে চলে গেল।আমার খুব খারাপ লাগতে লাগল।

     একাই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলাম।পেছনে তোষেশ্বর স্যারের সাইকেলের ঘর্ঘর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি,হ্যাঁ তোষেশ্বর স্যার স্কুল থেকে বাজার হয়ে ফিরছেন।

     কিছু জিজ্ঞেস করবেন বলে ভয় হল।পথের একপাশ ধরে দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইলাম।

     আমার কাছে এসে স্যার ধীরে ধীরে সাইকেল চালালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,‘একা যে-সঙ্গে্র ছেলেরা কোথায় গেল?’

     ভয়ে ভয়ে বললাম,‘ওরা চলে গেছে স্যার।’

     তোষেশ্বর স্যার সাইকেল থেকে নামলেন এবং কড়া ভাবে বললেন,‘দেখি এদিকে আয়।’

     ভয়ে আমার তালু শুকিয়ে গেল।

     তবু সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

     ‘উঠ,সাইকেলে উঠতে পারবি?পেছনে বসলে আমি চালাতে পারব না।এখানে আগে বস।’-বলে আমার বগলের নিচে হাত দিয়ে সাইকেলে তুলে নিলেন এবং নিজেও সাইকেলে উঠে চালাতে লাগলেন।আমি স্যারের দুটো হাত আর বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

     আমাদের গ্রামে প্রবেশ করার রাস্তাটায় এসে তিনি আমাকে বললেন,‘ওদিকে আমার একটু কাজ আছে।চল’।

     স্যার আমাকে আমার বাড়ির দরজার সামনে নামিয়ে দিলেন।কিছুই বললেন না এবং সোজাসুজি না গিয়ে আবার যে পথে এসেছিলেন সেইপথে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন।

     আমি বুঝতে পারলাম এদিকে স্যারের কাজ ছিল না।আমাকে বাড়িতে রেখে যাবার জন্যই এতটা পথ এগিয়ে এলেন।

     স্যার ও একটা মিথ্যা কথা বললেন।

--------

      

 

     লেখক পরিচিতিঃ অসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার সৈয়দ আব্দুল মালিক ১৯১৯ সনে অসমের শিবসাগর জেলার নাহরণিতে জন্মগ্রহণ করেন।যোরহাট সরকারি হাইস্কুল থেকে পাশ করে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ করেন।পরবর্তীকালে যোরহাট জেবি কলেজে অধ্যাপনা করেন।লেখকের গল্প সঙ্কলন গুলির মধ্যে ‘পরশমণি’,শিখরে শিখরে’,শুকনো পাপড়ি’বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।‘অঘরী আত্মার কাহিনী’উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।                                                                     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৮

বুড়ো শিকড়ের আত্মকথন রাহুল গঙ্গোপাধ্যায় ৷ বাংলা ৷ নবপর্যায়-৫৯৯ ৷ ২৬-০৮-২০১৮


বুড়ো শিকড়ের আত্মকথন
রাহুল গঙ্গোপাধ্যায়



ধুপধাপ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার।হয়তো তার অংশ থেকে, তারই মতো আরেকবার ভ্রূণ তৈরি করার প্রস্তুতি।ভ্রূণ কিভাবে সৃষ্টি হয়? সৃষ্টিশীল সৃজনশক্তি ছাড়া ভ্রূণ একথা জানেনা।ভ্রূণ ক্রমশঃ সময়ের সাথে বিক্রিয়াকারী জারন ফসলে, এক আগামীর রূপক শিকড়।জটিলতা বাড়ে তখনই, যখন সে ভাবে ~ কেনোই বা এতোসব ভাবছে সে।কিন্তু ছেদচিহ্ন ওই ধুপধাপ চারপেয়ে শব্দগুলো।এতদিন, সে দেখে এসেছে জল → জলতরী ← তড়িৎ → তড়িৎকোষ → কোষীয় → কোষীজনন → অববাহিকা → অ্যামাইনো অ্যাসিড → অ্যামিবা → সরীসৃপ → উভচর।কিন্তু চারপেয়ে?নিরামিষ ও মাংসাশী যতদিন ছিল, সে শুধু সাক্ষ্য দিয়ে গেছে খাদ্যচক্রের, কিন্তু খাদ্যচক্রের দশাও কি পাল্টায়?সে উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আরো উঁচু হয়, চেষ্টা করে আস্ত একটা পাহাড় প্রসব করার।কিন্তু সূর্যপিরামিড, সেই ডানা, সেই মেঘছানা, শীতশীত টুপটাপ ~ এরা মানবে কেন।সে সংযত হতে শেখে, আর তখনই তার ফুসফুসে ঢুকে পড়ে নিষিদ্ধ নিষেকের তরল "যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।রাগ নয়, ভালোবাসা চাই"।সে তখনও শেখে নি ভালোবাসার শব্দগুলো ঠিক কিরকম ও কি কি?
যখন বুঝতে পারে, তখন চারপেয়েরা তার আশেপাশে পরস্পর ভালোবাসায় মত্ত।তারা বসত চায়, সে আশ্রয় দেয়।এই গ্রহে, এটাই হয়তো সেই প্রকৃত মহৎ কাজ।চারপেয়ে ছানাগুলোকে, সে হাত বাড়িয়ে মেঘ পেড়ে দেয়।কখনো জল দেয়, আলো ও আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নদীকে বলে ঝর্ণা হয়ে রঙিন ম্যাজিক দেখাতে।বাছা আমার সাত রাজার ধন, এক মাণিক / আয় সোনা কোলে আয় ~ কোলে থেকেই তুই বড়ো হয়ে ওঠ, রোদছায়ার জাদুকর হ।
@


সময়-পথিক হাঁটতে থাকে, পক্ষীরাজ চড়ে পাখপাখালি পাল্কিপালক, গল্পদাদুর ঘরে


রবিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৮

রবিবারের গল্প ।

 রবিবারের গল্প 


তিথি আমার কেউ নয়
.................................
 মনোজিকুমার দাস

আমি তাকে প্রথম দেখি বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় একটা বইয়ের স্টলে সে একটা বইয়ের পাতায় চোখ রেখে একমনে পড়ছিল কাছে যেতেই আমার চোখ পড়ে বইটির পাতার শেষ অংশের ’পর আমিও তো এই বইটাই খুঁজছি! বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরালেই আমার চোখ পড়ে মেয়েটির মুখের ‘পর মুখটি খুবই সুন্দর পরনে সিল্কের নীল শাড়ি, গায়ে  টকটকে গাঢ় লাল ভেলভেটের ব্লাউজ ব্লাউজের হাতা দুটো কনুই পর্য্ন্ত

একবার দেখেই বুঝতে পারলাম মেয়েটি নজর কাড়ার মত সুন্দরী বুকস্টলের ছেলেটি কাছে এগিয়ে গিয়ে কাঙ্খিত বইটি চাইলে ছেলেটি বলল,“ একটাই বই আছে, তাতো ওই আপার হাতে।” সে আমাকে কথাটা বলে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ আপা ওটা কি নেবেন? না নিলে এদিকে দেন।” ছেলেটির কথা যেন মেযেটির কানেই গেল না একজনকে বঞ্চিত করে কোন কিছু দখল করার ইচ্ছে আমার কোন কালেই ছিল না তাই বুকস্টলের ছেলেটিকে কিছু না বলেই ওখান থেকে পাশের স্টলের দিকে হাঁটা দিলাম

পাশের কয়েকটা স্টলে বইটি খুঁজে না পেয়ে ভাবলাম, যাকগে নেট থেকে ডাউনলোড করে নিলেই হবে হলে ফিরে নাটকের রিহার্সেলের কথা মনে পড়ায় বইটির কথা মন থেকে উবে গেল নাটকের সংলাপ মুখস্ত করাই এখন আমার আসল কাজ পরশু ফাইনাল রিয়ার্সেল রাফাত ভাই বারবার বলেছেন সংলাপ মুখস্ত করতে সংলাপ মুখস্ত করায় ব্যস্ত থাকায় আমি পরের দু’দিন রুমের বাইরে পা বাড়াতে পারলাম না                                                                 

 ফাইনাল রিয়ার্সেলের দিনটা এগিয়ে এল আমি সকাল সকাল ভার্সিটির নাট্যকলা বিল্ডিং এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম রিয়ার্সেলের পর একদিন সময় পাওয়া যাবে ভেবে স্বস্তিবোধ করলাম ভার্সিটির নাট্যসপ্তাহের প্রথম রাতে রবীন্দ্রনাথের বিদায় অভিশাপ অভিনীত হরে কঙ্কনা দেবযানী আর আমি কচ সাজব নাটক পরিচালনায় রাফাত ভাইয়ের নামডাক আছে আমি ওখানে পৌঁছানোর আগেই রাফাত ভাই পৌঁছে গেছেন আমার ভাল লাগাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না কঙ্কনা ওখানে তখনো না পৌঁছায় রাফাত ভাই অস্বস্তিতে আছেন, আমি তার মুখ দেখে বুঝতে পারলাম রাফাত ভাই ও আমি দু’জনেই ভাবছিলাম কঙ্কনা কেন আসছে না রাফাত ভাইয়ের ভাবনার সঙ্গে আমার ভাবনার তফাত অবশ্রই আছে কঙ্কনার মুখটা আমার মনের কোণে ভেসে উঠল কঙ্কনা মুখটা ভাবতে ভাবতে হঠা করে পরশুদিন মেলায় দেখা মেয়েটার মুখ আমার মনের পর্দার কেন যেন দেখা দিল ভাবলাম,  মেয়েটির মুখ কী কঙ্কনার মুখের মতো? মন বলল, মেয়েটি দেখতে হয়তো কঙ্কনার মতো, নয়তো কঙ্কনার চেয়েও সুন্দরী রাফাত ভাইয়ের উচ্চকন্ঠ কানে আসায় চিন্তায় ছেদ পড়ল ‘ বাচ্চু, তোমাকে পই পই করে বলেছিলাম কঙ্কনাকে না নিয়ে সোহেলিকে নিতে কিন্তু তুমি গো ধরলে কঙ্কনাকে নিতেই হবে এখন সামলাও-----” আমি রাফাত ভাইয়ের কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলাম,“ ওই যে কঙ্কনা আসছে সত্যি সত্যি কঙ্কনা রিয়ার্সেল রুমের দিকে এগিয়ে আসছে, কঙ্কনার সঙ্গে ও আবার কে ,ওই মেয়েটি কি আমার চেনা? আমি মনে মনে ভাবলাম রাফাত ভাই ও হয়তো ওই মেযেটির কথাই ভাবছেন কঙ্কনা দেরিতে আসায় তিনি তার উপর রেগে আছেন , তা রাফাত ভাইয়ের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে

রাফাত ভাই কিন্তু কঙ্কনার ’পর শেষ পর্য্ন্ত রেগে থাকতে পারলেন না কঙ্কানার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এমন ও সামনে এলে রাগী লোকের মুখেও হাসি ফোটে কঙ্কনা এগিয়ে এসে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “ রাফাত ভাই, নিশ্চয়ই আমার ’পর রেগে আছেন, আর রেগে থাকারই কথা তবে আমার কথা শুনলে আমার ‘পর রেগে থাকতে পারবেন না।” রাফাত ভাই ওকে থামিয়ে দিয়ে তার কাছে জানতে চাইলেন কী ঘটেছিল তার কঙ্কনা কী জবাব দিল তা আমার কানে গেল না কারণ তখন আমার মনটা কঙ্কনা সঙ্গে আসা মেয়েটার দিকে, আমার মনে হল, এই মেয়েটিকে কী গত পরশু বইয়ের স্টলে দেখেছিলাম আমি ভেবে পাচ্ছি না সেই মেয়েটি কীভাবে এখানে আসবে? পরে কঙ্কনা রাফাত ভাইকে কী বলছে তা শোনার জন্য কান পাতলাম তার কথা শুনে তাজ্জব! মেয়েটি কঙ্কনার কাজিন , মামাতো বোন মেযেটির নাম তিথি আমি ভাবলাম, বাঁচা গেছে, মেয়েটি আমাকে চিনতে পারেনি ও’দিন মেয়েটি যে ভাবে মুখ গুঁজে বইটি পড়ছিল তাতে তার আমাকে দেখবার কথা নয় রাফাত ভাইয়ের সঙ্গে কঙ্কনার কথা বলার মাঝে ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার চোখচোখি হল কোন মেয়ে আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেবে আমি কখনো ভাবতেই পারিনে, কারণ আমার চেহারায় এধরনের পরুষালি মোহনীয়তা আছে এজন্যই আমার বন্ধুরা আমাকে রমনীমোহন বলে মজা পায় সেদিন মেযেটির সঙ্গে আমার কোন কথা হল না

মেয়েটির সঙ্গে আমার আলাপ হল অভাবিত রূপেই বলতে হয় ‘ বিদায় অভিশাপ ‘ অভিনয়ের শেষে গ্রীনরুমের দরজায় তিথিকে ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবলাম, মেযেটি নিম্চয়ই তার কাজিন কঙ্কনাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে পরমূহুর্তেই মেয়েটির কথায় আমার ভুল ভাঙ্গল

 “ অসাধারণ অভিনয়ের জন্য কনগ্রাচুলেশন!” আমার হাতে ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিয়ে মেয়েটি বলল আমি এমনটা ভাবিনি কঙ্কনা এখানে নেই ভেবে আমি স্বস্তিবোধ করলাম আমি জানি, আমার প্রতি কঙ্কনার একটা সফ্ট কর্ণার আছে কঙ্কনার কাজিন তিথি আমাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানানোকে কি কঙ্কনা ভাল চোখে দেখবে? এখানে বলতে দ্বিধা নেই আমারও কঙ্কনাকে ভাল লাগে

 তিথি আমাকে একা পেয়ে অনেক কথাই বলল তার কথা বলার ধরন দেখে আমি বুঝলাম, মেয়েটি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে, কথা বলার সময় ওর গালে টোল পড়ে এ জন্যে হয়তো কথা বলার সময় ওকে সুন্দর দেখায় কঙ্কনা কিন্তু তিথি নামের কাজিনটির মতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে না ও যা বলার তা এক নিশ্বাসে বলে ফেলে  

“শান্তিনিকেতনে আমিও কয়েকবার দেবযানী সেজেছি  প্রত্যেকবারই দিব্যজোতি কচ এর ভূমিকায় ছিল আপনার অভিনয়----” মেয়েটিকে থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম,“ আমার অভিনয় নিশ্চয়ই তার মতো হয়নি।” বলেন কী আপনার কাছে দিব্য! মেয়েটি উচ্ছসিত ভঙ্গিতে বলে উঠল তার উচ্ছাস আমাকে মুগ্ধ করল ওর কথা থেকে জানতে পারলাম, সে শান্তিনিকেতনের নাট্যকলার ছাত্রী, এবার ফাইনাল ইয়ার চলছে আমার মোবাইল ফোনের নম্বরটা আমার কাছে থেকে জেনে নিয়ে সে আমাকে একটি মিসড কল দিয়ে তার নম্বরটা আমাকে জানিয়ে দিল

 সেদিনের পর তিথির সাথে আমার আবার দেখা হল আজিজ সুপার মার্কেটের উপরতলার  প্রথমা বুকস্টলে কঙ্কনার সাথে সে ওখানে এসেছে কঙ্কনা সামনের দিকে কাউন্টার বই খুঁজছিল সেদিন কঙ্কনার সাথে আমার কথা হলেও ওর কাজিন তিথির সাথে আমার কোন হল না

 সেদিন রাতেই আমি তিথির ফোন পেলাম সে অভিযোগের সাথে সুরে প্রশ্ন করল,“ কেন আপনি আমার সাথে প্রথমা বুকস্টলে কথা বললেন নি? কঙ্কনা আপা বই দেখতে ব্যস্ত ছিল সে সময় আমার সাথে কথা বলতে পারতেন।” কেন আমি আগ বাড়িতে তার সাথে আলাপ করি নি তা আমি মেয়েটিকে কীভাবে বুঝাব কঙ্কনার সামনে কোনক্রমেই তার কাজিনের সঙ্গে কথা বলা ঠিক হত না, মেয়েটি যাই মনে করুক না কেন

আমি তার কথার জবাব দিতে ইতস্তত করলে মেয়েটি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলল,“ কাল তো আপনার সঙ্গে দেখা হবে না কাল আবার কঙ্কনা আপার সঙ্গে সপিং এ যেতে হবে তবে পরশু বিকেলে আমরা কি একান্তে কোথায়ও মিলিত হতে পারি না?” নয় ছয় করে তার প্রস্তাব এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে শেষে একটু ভেবে বললাম, “ শ্রীমঙ্গল থেকে বেড়াতে আসা তিথিকে কি আপনার কঙ্কনা আপা কিংবা আপার মা একা আপনাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেবে?” “ তাহলে কঙ্কনা আপাদের বাড়িতেই আসেন, জমিয়ে গল্প করা যাবে।” তিথি আমার কথার পৃষ্ঠে জবাব দিল আমি কী বলব তা ভেবে না পেয়ে বলে ফেললাম,“ আপনার কঙ্কনা আপা না বললে আমি কেমন করে তাদের বাড়িতে যাই?”    “ তা বেশ আমার কথা আপনি যখন আসবেন না, তখন কঙ্কনা আপার দিয়েই আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে দেখব তখন আপনি না এসে থাকেন কী করে।” আমি তার কথার জবাবে বললাম,“ আপনার কঙ্কনা আপা এখন আমাকে তাদের বাড়িতে যেতে বলবেন না।” ঠিক আছে, কঙ্কনা আপাকে বলেই দেখি না কেন “ তিথি এই বলে ফোন কেটে দিল

কঙ্কনার আমন্ত্রণ ছাড়াই হর হামেশাই বিকেলের দিকে কঙ্কনাদের বাড়িতে যেতাম আমি গেল কঙ্কনার মা খুশি হতেন কঙ্কনা খুশি হত কিনা তা নাইবা বললাম কঙ্কনার মায়ের কথাবার্তায় আমি বুঝতে পেরেছিলাম তার মনে আমার ও কঙ্কনাকে ঘিরে একটা সুপ্ত বাসনা আছে

তুমি এমন হয়ে যাবে আমি সেদিনই বুঝেছিলাম তোমাকে কি দাওয়াত করে আনতে হবে?” কঙ্কনা একটু উষ্মার সঙ্গেই আমাকে প্রশ্ন করল।“ কোন দিন বুঝেছিলে?” আমি তার প্রশ্নে জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করলাম                                                   ন্যাকামি করো না আমার সুন্দরী বোনকে দেখে মজেছো সে দিন থেকেই আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তিন দিন তুমি আমাকে ফোন কর না, অথচ তিথির সাথে তুমি সারাক্ষণই কথা বলছ আমি কিছু বুঝি না তা ভাবলে কীভাবে!”  আমি আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করলে ক্ঙ্কনা একটু কড়া সুরে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলল, “ আজ বিকেলে আমাদের এখানে এস, সামনা সামনি বসে তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া করব্ ” আমি কিছু বলার আগেই ও লাইন কেটে দিল

আমি কঙ্কনাকে ভাল করেই চিনি , ও কিছু বলতে রাখডাক করে না কথা বলার সময় ওর গালে তিথির মতো টোল না পড়লেও কঙ্কনা কিন্তু কম সুন্দরী না! আমি ভাবলাম, এখন তিথিকে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ, তিথিকে ভাল লাগলেও  আমার ফোনটা বেজে উঠল আমি যা ভেবেছি তাই, তিথির ফোন!“ এবার আসছেন তো?” তিথি মিষ্টি গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করল।“ দু:খিত ,আমার মায়ের শরীর ভাল না, এইমাত্র খবর পেলাম আমি এখনই দেশের বাড়ি ভোলা রওনা হচ্ছি।” আমি বানিয়ে তিথিকে বললাম ফোনের ওপ্রান্ত থেকে তিথির বিষণ্ন কন্ঠ ভেসে এল

তারপর দু’বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে আমি কিন্তু দেবযানীর সাথে কচ এর মতো আচরণ করিনি কঙ্কনা ও আমি এক বছর ছয় মাসের মতো ঘর করছি এর মধ্যে আমাদের ছেলে অভি’র জন্ম হয়েছে  এখনো আমরা কচ ও দেবযানীর ভূমিকায় অভিনয় করি ঢাকার বেইলী রোড়ের নাটক পাড়ার মঞ্চে

তিথির সাথে কঙ্কনার যোগাযোগ আছে কিনা আমি জানি না আমি ওর কোন খোঁজ খবর নেই না কারণ আমি জানি তিথি আমার কেউ নয়




Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...