রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২০

রম্যরচনা || ভাইরাস || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা
ভাইরাস
কাশীনাথ সাহা

কোথা থেকে কি হয়ে গেল বোঝবার আগেই হম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো ঔর চাবি খো যায়ে।
আমরা দেশবাসী আর বিদেশবাসী সবাই গাড্ডায় পড়ে গেছি। বাজার বন্ধ, বেড়ানো বন্ধ, আড্ডা বন্ধ,পরকীয়া বন্ধ। কুড়ি পঁচিশ বছরের প্রাগৈতিহাসিক  বউকে আবার পালিশ মেরে চকচকে করে নিজের মতো করবার অসাধ্য সাধন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পালিশে বউ কতোটা চকচকে হয়েছে জানিনা তবে পালিশ করতে করতে আমি পালিশওয়ালা বনে গেছি। রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান!  বউ মশলা বাটছে আমি আলু কাটছি। বউ চপ ভাজছে আমি বেসন গুলছি।বউ তরকারিতে নুন দিল, ভালবেসে আমি আর একবার নুন দিলাম। বউ বলল পায়েস করবো, আমি বললাম তাই করো আমি আমি পেঁয়াজ বেঁটে  দিচ্ছি। বউ, অবাক, পায়েসে পেঁয়াজ কি হবে? আমি বললাম, কেন দেয়না? না পায়েসে পেঁয়াজ দেয় না।  কেন দেয়না?  আজ থেকে চালু হোক পায়েসে পেঁয়াজ দেওয়া। বউ হেসে লুটোপুটি।  এই করতে করতে আবার পুরাতন প্রেম মাথা চাড়া দিচ্ছে। পরকীয়া নয় স্বকীয় ভাইরাস। কে বলে কদমতলা ছাড়া প্রেম হয়না!  চার দেওয়ালের মধ্যে টগবগিয়ে প্রেম ফুটছে।  চলুক, অনন্তকাল চলুক এই চায়না সেলিব্রেশন। তবে চায়না মাল তো বেশিদিন লাস্টিং করবে না। ভাইরাস চলে গেলে ওপারে রইবে তুমি আমি রইবো এপারে...।
বউকে বললাম ছুটি চলছে চল পুরী যাই। বউ বলল দূর অসব্য ( আদরে ভ টা ব হয়ে গেছে) এখন তো লকডাউনে সব বন্ধ যাবে কি করে?  বউ ধরতে পারেনি সময়  বুঝেই কোপ মেরেছি। আমি বললাম তাই তো!  ঠিক আছে সমুদ্রকেই ঘরে নিয়ে আনছি। হোম ডেলিভারিতে দু বোতলের অর্ডার দিয়ে দিলাম। না, আপনারা যা ভাবছেন পুরোটা তা নয়। জিনিসটা ওটাই  তবে দুবোতল মানে গিন্নীর জন্য একটা নয়। দুটোই আমার জন্য। আজ একটা কাল একটা। সরকারের চিন্তা ভাবনাকে স্যালুট। আমাদের মতো গরীবের দুঃখ টা বুঝতে পেরে এটা ছাড় দিয়ে দিয়েছে । জিও। আগলে বার....  কা সরকার!
এই দুর্যোগে গরীবের কষ্টতো হচ্ছেই। হাহাকারে ভরে গেছে গরীবের উঠোন। কিন্তু সবচেয়ে বেশী কষ্ট নব্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েগুলোর। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, ছুতো ছাতায় ছুঁতে পারছে না। মান অভিমান নাই। একি কম যন্ত্রণার। রাজ্যসরকার, কেন্দ্র সরকার, পাটী, ক্লাব জনগণ  কেউ বুঝতে পারছে না ওদের দর্দ ভরি কহানী। এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আন জনে সজনি আমি বুঝি মরেছি মনে মনে...
এখন প্রচুর সমাজসেবী ময়দানে নেমে পড়েছে। হাতে পাঁচ টাকা দামের এক প্যাকেট বিস্কুট সাথে তিনজন ফটোগ্রাফার। হাসিহাসি মুখে পোজ মেরে উত্তমকুমার মার্কা ভুবন ভোলানো হাসি বিলোতে বিলোতে বিস্কুটটাই আর বিলানো হলো না। না হোক, আসছে বছর আবার হবে। ফটোটা জম্পেশ হয়েছে, বউ যা খুশি হবে....। এই নকলি মাকালদের দাপটে আসলি দাতারা আর হালে পানি পাচ্ছে না।
দেশভক্তিতে গদগদ করছে কিছু মানুষ। দেশের প্রতি এদের এতো প্রেম যে কোথায় ছিল বুঝতে পারিনি।  পনের টাকার মাক্স সত্তর টাকা।চাল, তেল ডাল আটা, চিনি সব হু হু করে গোষ্ঠী সংক্রমণের মত বিস্তার করছে।  আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ই ই ই ই...
কবিদের টাটকা কবিতায় ভরে উঠছে দিস্তা দিস্তা কাগজ। কি নেই কবিতায়৷!  ঝর্ণা আছে পাহাড় আছে  সাগর আছে নদী আছে। জৈবসারের মতো প্রেম আছে। আর করোনাতো বস্তা বস্তা।
 জিলে লে জিলে লে আও আও জিলে লে...
সংগীতের সুরও ভাইরাসে আক্রান্ত। সুর আছে কথা পাল্টে গেছে...
সরকার লকডাউন করেছে আমরা হরদিল জো প্যার করেগা ও গানা গায়েগা.. মৌজ মস্তিতে আমরা লকডাউন মানাচ্ছি। দুবেলা মোটরসাইকেল চক্কর মেরে দেখতে বের হচ্ছি কেমন চলছে মাদারি কা খেল!
সরকার বললো হাততালি দাও শঙ্খ বাজাও আমরা ঢাকঢোল তাসা ব্যান্ড খোল করতাল নিয়ে দুর্গাপূজার বিসর্জনের মতো বেরিয়ে পড়লাম দলবেঁধে। কি ফূর্তি!  আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
সরকার প্রদীপ জ্বালাতে বললো আমরা শুশুনিয়া পাহাড়টাই জ্বালিয়ে দিলাম। অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি, মুড়কির মোয়া চাই চাই ভাজা ভেটকি।
আমরা বেশ মজে আছি। কখনো পাখির নীড়ের মতো বনলতা সেনে কখনো আঁখ মারে ও লেড়কি আঁখ মারে ...
রামায়ন মহাভারতেও আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছি।  এজীবনে কতো সাধ ছিল কিছুই তো পেলাম না। কিন্তু লকডাউন তো পেলাম। সেটা কম কি?
রাজনীতির কচকচানি ভুলে আবার তো একসাথে হলাম কয়েকটি দিন । ধর্মান্ধতা সরিয়ে দু'চার দিন একটু হলেও তো মানবিক হলাম সেটা কি কম পাওনা।  মমতার বুক আবার মমতাময়। মোদীজির কন্ঠস্বরে দখিনা বাতাস। বামেদের হৃদয়েও বিপ্লব থেমে গিয়ে, মধু মালতি ডাকে আয়... । আর আমাদের মনেও বন্য প্রেমের ভাইরাস। বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো....

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আশ্চর্য সহবাস || শ্রাবণী গুপ্ত || কবিতা

আশ্চর্য সহবাস শ্রাবণী গুপ্ত একটা গোটা জীবন আমরা গাছের বেড়ে ওঠা দেখলাম জাফরীর মতো আলো-ছায়া এসে পড়ল আমাদের গায়ে, হৃদয়ে তবু ঘৃণা করতে গিয়ে আম...