রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

রম্যরচনা || ঘুষ একটি জাতীয় খাদ্য || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

ঘুষ একটি জাতীয় খাদ্য 
কাশীনাথ সাহা 

বিষয়টা নিয়ে ভাববার আছে। আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত আছে, জাতীয় পতাকা আছে, জাতীয় পশু আছে, জাতীয় পাখি আছে, বহু কিছুই জাতীয় আছে, কিন্তু জাতীয় খাদ্য বলে কোন কিছু খাবারকে জাতীয় খাবার হিসেবে এখনো তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়নি। বাঙালির একরকম খাবার, পাঞ্জাবির আর একধরনের খাবার, দক্ষিণ ভারতীয়দের আরও একরকম। নানা জাতি নানা ভাষাভাষীর এক এক বৈচিত্র্যময় খাবার । কেউ ঝাল খায়,কেউ টক, কেউ মিষ্টি,কেউ আমিষ কেউ নিরামিষ । না এতোবড় একটা দেশে একটা জাতীয় খাদ্য অবশ্যই হওয়া,উচিত ছিল । কিন্তু এই ভাবনাটাই কোন সরকারের মাথা থেকে কেন যে বের হয়নি বুঝতে পারলাম না।  এই ব্যাপারে সর্বধর্ম সমন্বয়ের খাদ্য  ঘুষ।হিন্দু মুসলিম পার্শি খ্রিস্টান শিখ, বাঙালী বিহারী, পাঞ্জাবী মারাঠি ঘুষ খায় না এমন পাবলিক পাবেন না। স্থান ভেদে ঘুষের মহিমা পাল্টে যায়। কোথাও ঘুষ তো কোথাও প্রণামী কোথাও সেলামী কোথাও ডোনেশন।
শিক্ষক অবসর নিয়ে ডি আই  অফিসে গিয়েছেন পেনশন তুলতে, গিয়ে শুনলেন ফাইল হারিয়ে গেছে। বেচারি জাতির মেরুদন্ড অফিসে নিজের মেরুদণ্ডটাই হারিয়ে ফেললেন। এখন উপায়? আছে, পিওন বুঝিয়ে দিল নিরুদ্দিষ্ট ফাইল স্বস্থানে ফিরে আসবার পদ্ধতি। শিক্ষক করুন ভাবে জিজ্ঞেস করলেন ফাইলটা,পাওয়া যাবে তো! পিওন টেবিলে থাপ্পড় মেরে বলল স্যর আমাদের এখানে কোন দুনম্বরী পাবেন না। এক নম্বর পথে হাজার পাঁচেক টাকা খসিয়ে হারানো ফাইল যথাস্থানে অধিষ্ঠিত হলো।
চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিককে কুড়ি টাকা নিতে দেখে যে ভদ্রলোক নির্বিবাদে গালিগালাজ করেন তিনি নিজের অফিসে দশ বিশ হাজার বাঁহাতে বুক চিতিয়ে নিতে দ্বিধা করেন না।
আমলা মন্ত্রী মন্ত্রীর ভাই ভাইপো ঘুষ খেয়ে কাউকে বদহজম হতে কক্ষনো দেখিনি। ঘুষ বেশ সহজপাচ্য খাবার। তবে ঘুষ খাওয়ারও একটা সিস্টেম আছে তার বাইরে বেলাইন হলেই হাজতবাস। সেটাও মন্দ নয়, জেল ফেরত মন্ত্রীদের কদরই আলাদা,। তখন শহীদের তকমা কপালে।
সাধুসন্ত মহাপুরুষ পীর পয়গম্বর মহামহিমান্বিত সজ্জন মানুষেরাও এখন নির্বিবাদে ঘুষ খায়। তবে খেলাটা আলাদা। একটু ভক্তি রসের সাথে ভোজবাজির মিশেল না,দিতে জানলে পা হড়কে যাবে।
স্বামী ঘুষ খায় স্ত্রী ঘুষ খায় রাজা খায় প্রজা খায় এমনকি ঠাকুর দেবতারাও খায়। কোথাও বাতাসা নাড়ু তো কোথাও কালো পাঁঠা।
কাজের মেয়ে পদ্মা বলল, দাদাবাবু কাল সন্ধ্যায় আপনাকে মহব্বত পার্কে দেখলাম বেশ সুন্দর একটা দিদিমণিকে নিয়া ঘুরতাছিলেন। দাদাবাবুর মুখ ফ্যাকাশে, তুই কোথায় ছিলি? আমিও ঘুরতাছিলাম।  তোর দিদিকে কিছু বলিস না যেন!
না বলবো না, তবে একটা ভাল শাড়ি কিনে দিতে হবে কিন্তু! নতুন শাড়ির আঁচলে মহব্বত পার্ক ঢাকা পড়ে যায়।
সুযোগ আছে অথচ ঘুষ খায়নি এমন মানুষ জাদুঘর ছাড়া পাওয়া যাবে না।
ডানপন্থী বামপন্থী চরমপন্থী মধ্যপন্থী উদারপন্থী উগ্রপন্থী সক্কলেই ঘুষ খায়। ঘুষে অরুচি এমন পন্থী বিরল।
সব কঠিন কাজেরই সহজ সমাধান  ঘুষ। সঠিক জায়গায় ঠিক মতো হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে পাঁচ ঘন্টা লম্বা লাইনে না  দাঁড়িয়ে দেবতার দর্শনও সহজলভ্য।
দারোগাবাবু বললেন এটা মার্ডার কেস। কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। যাবজ্জীবন ফাঁসি! নিরীহ মুখে ভদ্রলোক বললেন, আহা লোকটা এখনো মরেনিতো পায়ে চোট লেগেছে, রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিল আমি হাসপাতালে নিয়ে এসেছি এতে আমার অপরাধটা কোথায়!  দারোগাবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন তিনহাজার তিনশ পঁয়ষট্টি ধারায় চার্জ। যাবজ্জীবন না হলেও অন্তত আট বছর ফাঁসি হবেই। তাহলে উপায়?  উপায় আছে। রায় ও মার্টিনের সহজ ফর্মুলা!  ফেল কড়ি মাখো ফরচুন তেল, আমি কি তোমার পর।
বেকার শিক্ষিত চাকরি নেই?  চাকরির আশাও নেই?  আছে?  দশ বিশ লাখ জনসেবক জননেতার হাতে গুঁজে দাও। লিস্টে নাম বেরিয়ে যাবে।
তাই অনেক গবেষণা করে ভেবেচিন্তে মনে হলো ঘুষকে সর্বভারতীয় জাতীয় খাদ্য হিসেবে মান্যতা দেওয়া যেতেই পারে। এই ব্যাপারে ঘুষের বিপক্ষে হাত তুলবে এমন কেউ আছেন নাকি?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অবহেলা || দীপক মজুমদার || অন্যান্য কবিতা

অবহেলা দীপক মজুমদার আর গোপন রাখব না আমাদের সম্পর্কের ইতিবৃত্ত।  শব্দের খাঁজে লুকানো গোলাপের উষ্ণতা। ঝাউবনের নির্জনতায় জৌলুস সম্পৃক্তি। প্রি...