Sunday, May 17, 2020

রম্যরচনা || আমাদের রবীন্দ্রনাথ || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা

আমাদের রবীন্দ্রনাথ 
কাশীনাথ সাহা 

আমাদের প্রাণের মানুষ, হৃদয়ের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। এক্কেবারে বুকের গভীরে সেঁটে বসে আছেন কবিগুরু। সারাবছর রবীন্দ্রনাথ ভুল করেও পড়িনা। রবীন্দ্র কবিতা ছুঁয়েও দেখি না। ভাগ্যিস তরুন মজুমদার, দাদার কীর্তি, ভালবাসা ভালবাসা র গঙ্গাজল চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে ছিল । তাই  না চাইলেও রবীন্দ্র সংগীত মাঝে মধ্যে গিলতে হয়। আর পাত্রেপক্ষের কাছে বাজারদর একটু উঁচুতে তুলে ধরতে, চরণ ধরিতে দিও গো আমারে নিও না নিও না সরায়ে... । ভালবেসে রবীন্দ্রচর্চার ফুরসৎ এখন বাঙালির নেই। তবে ফুরসৎ না থাকুক রবি ঠাকুরকে নিয়ে গর্ব আমাদের আঠারো আনা। বিশ্বকবি বলে কথা। তাও আবার বাঙালী আদমি। এই হকটা ছাড়া যায়? ঘরে শনি মনসা শীতলা মাকালীর সাথে একটা রবীন্দ্রনাথ নাথও ঢুকিয়ে দিই। শুভ- অশুভ সব কাজেই একটা লম্বা প্রণাম ঠুকে দিই। মা মাগো হে রবি ঠাকুর এই মামলার রায়টা যেন আমাদের পক্ষে যায় দেখবে ঠাকুর। বউমার এবারের সন্তানটা যেন পুত্র হয় দেখো ঠাকুর। জোড়া নারকেল, সন্দেশ দিয়ে পুজো দেব ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথকে আমরা,ধূপ ধুনোর আড়ালেই রেখে দিলাম, আপন করে আর নিতে পারলাম কই! আচ্ছা এমন কি আর হয়, মা ডাকছে তনু খাবি আয়, বারবার ডাকছে খেতে, কিন্তু তনু মজে আছে গোরাতে, তনু মজে আছে কাবুলিওয়ালায়।  এমনটা হয় নাকি?  আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশ একটা হুজুগে মেতে আছি। পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণের  বাইরে রবীন্দ্রনাথকে টেনে বের করতে পারলামই না। পঁচিশে বৈশাখ আগে স্কুল, কলেজ, গানের স্কুল আর সাহিত্য সংস্থা গুলিই গুছিয়ে করতো। ধোপদুরস্ত পোশাকআশাকে শাড়িতে ফুলে চন্দনে প্রাণহীন কণ্ঠে রবীন্দ্র বন্দনা জব্বর চলছিল। দেখ আমি কত্তো বড় সাংস্কৃতিক বোদ্ধা!  আমি কেমন রবীন্দ্র ভক্ত!  কিন্তু এখন রাজনৈতিক দলগুলিও সুযোগ বুঝে ময়দানে নেমে পড়েছে। পঁচিশে বোশেখ সকালবেলা পাটী অফিসের সামনে  দলীয় পতাকার নিচে ধুলোমলিন রবীন্দ্রনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাকিয়ে নয় রীতিমতো ভয়ে ভয়ে থাকেন। মান্যবর নেতা কি বলতে কি না বলে ফেলে। এই তো সেদিন এক দাপুটে নেতা গলার শিরা ফুলিয়ে বলে দিলেন বিদ্রোহী কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেশের গর্ব জাতির গর্ব  সমাজের গর্ব আমাদের পাটীর গর্ব। সেই যে তিনি লিখেছিলেন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বর্ধমানের বনলতা সেন...  আহা কি অপূর্ব বিদ্রোহী লাইন ... । বক্তৃতা শেষে দমাদ্দম হাততালি। জেলা সম্পাদক সৌমিত্রদা জিন্দাবাদ । রবীন্দ্রনাথ তোমার জন্য লড়ছি লড়বো। লড়াই লড়াই লড়াই চাই ...। ফটোর ভিতর রবীন্দ্রনাথ এইসব দেখে নিশ্চয়ই মূর্ছা গেছলেন!
রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঝোলে ঝালে অম্বলে সবেতেই কাঁঠালি কলা। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের চলে না। মদ দোকানের উদ্বোধন হচ্ছে,  বাজছে,  আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান....।বউভাতে চলছে , এই করেছ ভাল নিঠুর হে এই করেছ ভাল... । ছেলে ছোকরারা চেঁচিয়ে ওঠে, এসব প্যান প্যানানি গান বাদ দাও। নাচের গান দাও। ঝিনচাক ঝিনচাক। রবি ঠাকুর হঠে গেল। বেজে উঠলো, আঁখ মারে ও লেড়কি আঁখ মারে...।
পাড়ার প্যান্ডেলের মঞ্চে  দেড় বছরের নাতনিকে তুলে দিল দাদু । পঁচিশে বোশেখের শ্রাদ্ধ করে নাতনি  নেমে এলো। আর দাদু দিদা বাবা মায়ের বুক গর্বে গদগদ। সম্পাদক আগেই সাড় পাঁচশো চাঁদা ঝেড়ে এনেছে। সেও গদগদ কণ্ঠে বলে দিল, মুন্নিকে নিয়ে রাতে খেতে আসবেন দাদু। মূরগী মাংস ভাত। দাদু যখন একটু রাত করে মুন্নিকে নিয়ে খেতে এলেন, তখন ক্লাবশুদ্ধু সবাই মূরগীমাংস খেয়ে টলমল করছে। জিও রবীন্দ্রনাথ। তেরা ক্যায়া হোগা রে কালিয়া?
ম্যায় তেরা নমক্ খায়া সদ্দার।
আমরাও জ্ঞানে -অজ্ঞানে রবি ঠাকুরের নমক খেয়ে বসে আছি । সেই ছেলেবেলায় সহজ পাঠ নয়তো কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি...
আব গোলি খা!
আমাদের রবীন্দ্রচর্চা মানে বইয়ের তাকে যদি এক টুকরো ফাঁক ফোঁকর থাকে  সেখানে  সঞ্চয়িতা অথবা একটা গল্পগুচ্ছ গুঁজে দেওয়া। দেখ আমিও রবীন্দ্রনাথ পড়ি!
চৌরাস্তার মোড়ে রবীন্দ্রনাথ সারা বছর দাঁড়িয়ে থাকেন ধুলো ময়লা কাকের বিষ্ঠা আর শুকনো ফুলের মালা সাঁটিয়ে। একটু পরিচ্ছন্ন করবার শুভ ভাবনা আমাদের মস্তিষ্কে কখনো উদয় হয় না।
রোদ্দুরবাবু নামক বিখ্যাত উদীয়মান বাঙালিটি যেভাবে রবীন্দ্র সংগীতকে টেনে হিঁচড়ে নর্দমায় নামাচ্ছেন তা দেখে বাঙালী হিসেবে বুকের পাটা ক্রমশঃ চওড়া হচ্ছে। বাঙালী ছাড়া বাংলার এতোবড় সব্বোনাশ আর কে করতে পারে!  রোদ্দুর তুমি নিচে নামো আম বাঙালী আপ কা সাথ সাথ হ্যায়!
লেখক শংকরের একটি নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার কথা বলে আমার আজেবাজে বকরমবাজী থামাবো।
লেখক একবার ট্রেন ভ্রমণে কোথাও চলেছেন।উনি উপরের বার্থে আছেন। নিচে একপাশে তিনজন বাঙালির একটা দল আর কেরলের তিনজনের একটা দল। কেরলিয়ানরা সাহিত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিল। বাঙালীদের সহ্য হলো না। ওরা রীতিমতো ব্যঙ্গ করে বলতে লাগলো, আরে আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছে। ওদের আছেটা কে?   আরও  সব বক্রোক্তি। বহুক্ষণ শোনার পর কেরলের একজন বিনীতভাবে বলল,আপনারা ঠিকই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের মতো বিরল প্রতিভা শতাব্দীতে একজনও জন্মগ্রহণ করে না। তাঁর সাহিত্যের সাথে আর কারও তুলনা চলে না। আমরাও সেটা জানি। তা দাদা আপনারা তো বাঙালী । আমরা আপনাদের কণ্ঠে একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনতে চাই , যদি  একটা বলেন দয়া করে।  এতোক্ষণ যাঁরা গর্বে টগবগ করছিল  তাদের মুখ চুপসে গেল। ভুলভাল রবীন্দ্র কবিতা দু একটা লাইন বলবার পরে আর থলকূল খুঁজে পাচ্ছিল না। লেখক শংকর উপরের থেকে সব দেখছিলেন। এবার ভাবছেন, ওরা এবার না জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে টা ওরা ধরে ফেলে । ওদের করুন অবস্থা দেখে কেরলের লোকগুলো এবার বিনীতভাবে বললো,  তাহলে আমরাই দু'একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনাই, কিছু ভুলত্রুটি হলে মার্জনা করবেন । শংকর বিস্মিত হয়ে দেখলেন, কেরলের ওই অধিবাসীরা এরপর একটার পর একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা নির্ভুল ভাবে বলে যেতে লাগলেন ।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ বন্দনা অনেকটা অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো। কোনটা পা কোনটা শুঁড় কিছুই জানি না। কিন্তু পুজোটা জম্পেশ চালিয়ে যাচ্ছি  । জিও কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ তুমিও বেঁচে থাকো আমরাও বেঁচে থাকি। তুমি ফটোতে আমরা ভড়ংবাজিতে!

No comments:

Post a Comment

ঈশ্বর || ইয়াসিন খান || কবিতা

  ঈশ্বর  ইয়াসিন খান একটা  বোধ কাজ করে মানুষের কাছে যাই একটা স্বপ্ন দেখি  আমার ঈশ্বর সাধনা  বাংলা মায়ের কোলে  গ্রাম আর নগর জীবন জুড়ে  অক্ষর আ...