Sunday, May 24, 2020

রম্যরচনা || যুদ্ধ চাই || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা || যুদ্ধ চাই
কাশীনাথ সাহা

না, একটা যুদ্ধ না হলে কিছুতেই মন মানছে না।  কতদিন যে যুদ্ধ  দেখিনি। যুদ্ধ না দেখে দেখে মন মেজাজটা কেমন ছিবড়ে হয়ে গেছে। সেই কবে একটা কার্গিল যুদ্ধ হয়েছিল, সে তো প্রায় দু যুগ হতে চলল। সুসভ্য মানুষ যুদ্ধ ছাড়া কি বাঁচতে পারে! যুদ্ধ হবে, রক্ত ঝরবে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে, এসব দেখেও শান্তি। আগেকার মানুষ কত বিচক্ষণ ছিল, ইচ্ছে হলেই দুমদাম যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তো ছিলই। আহা কি সুন্দর যুদ্ধ। দেখিনি তবে মহাভারতে তো পড়েছি। ১৭ না১৮ দিন ধরে লাগাতার ফাটাফাটি। একদিন ভীষ্ম মরছে তো একদিন দ্রোনাচার্য।  একদিন  ভীম পুত্র ঘটোৎকচ তো পরদিন অশ্বত্থামা।   আহা শুনেই মনে হতো লাঠি ছুরি যা হোক কিছু একটা নিয়ে ময়দানে নেমে পড়ি। তারপরেও তো কম যুদ্ধ হয়নি। পানিপথের, যুদ্ধ, হলদিঘাটের যুদ্ধ। আহা কতো নিরীহ মানুষের রক্তে লাল হয়ে গেছল মাটি। কত মানুষ মরেছে। কত মা সন্তান হারিয়েছে,  পত্নী হারিয়েছে তাঁর প্রিয় মানুষ কে। চারিদিকে আর্তনাদ , হাহাকার, কি মর্মান্তিক। এই দেখুন কেমন যেন বেলাইন হয়ে যাচ্ছি। আরে বাবা যুদ্ধ হবে আর মানুষ মরবে না তা হয় নাকি! নিরামিষ যুদ্ধ তো হয় না। মানুষ মানুষকে মারবে না, তাহলে আর লড়াই কিস লিয়ে। কোন গায়ক যেন গান গেয়েছেন, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না। মানুষ মানুষের জন্য সহানুভূতি দিতে যাবে কোন দুঃখে!  মানুষের জন্ম হয়েছে মানুষকে মারবার জন্য। এই যে প্রথম, দ্বিতীয় বড় বড় দু দুটা বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেল, তাতে কোন সহানুভূতির হাওয়া উঠেছিল শুনি। হিরোশিমা নাগাশাকি তে দুটো অমানবিক না পরামানবিক বোম ফেলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বর্গের না নরকের পথ দেখিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা সেটা কম বীরত্বের কথা! সেটাও তো মানুষ মানুষের জন্য করেছিল।
সেই যে দু দুটো বড় মাপের যুদ্ধ হয়ে গেল তারপর আর যুদ্ধ কোথায়! ভারত পাকিস্তান লাগব লাগব করেও ময়দানে নামছে না। আমার বউ সেদিন আমাকে একটু ভালবাসা দিতে দিতে বলছিল হ্যাঁ গো আগের মত আর যুদ্ধ হচ্ছে না কেন গো।ইস  আমার কত দিনের ইচ্ছা একটা যুদ্ধ দেখি,  কিন্তু মানুষ কি অপগন্ড রে বাবা একটাও যুদ্ধ হচ্চে না। হ্যা গো তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ না গো কিছু করতে পার কি না!  আমি ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালী। আমরা যুদ্ধের কি বুঝি!  আমাদের যত লড়াই ঘরের বউয়ের সাথে। সপ্তাহে চারদিন তো বটেই। লবনে ঝোল নাই লড়াই। বোতামে জামা নাই লড়াই। গ্যাসে সিলিন্ডার নাই লড়াই। এই লড়াই নিয়ে আমাদের ঘরকন্না, এর বাইরে প্রতিবেশীদের সাথে মাঝে মাঝে হয়। ফুল থেকে গাছ তুলল কে? কুকুর কেন ঘেউ ঘেউ করে?  এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে লড়াই। তার বাইরে বের হতে পারি না। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। বউ একটু বেশী রেগে গেলে বীরদর্পে পশ্চাৎপরণ।  না এই নিরামিষাশী জীবনে থেকে থেকে ঘেন্না ধরে গেল। একটা জবরদস্ত লড়াই চাই। লড়াই লড়াই লড়াই চাই লড়াই করে বাঁচতে চাই। আগে তবু নন্দীগ্রাম,গড়বেতা,কেশপুর,নেতাই, এইসব খুচখাঁচ লড়াই চলছিল এখন সেটাও নাই। পঞ্চায়েত নির্বাচনে হবো হবো করেও ঠিক জমলো না। লোকসভা ভোটেও সেরকম লাস পড়ে নি। ভাল্লাগে না। বাঙালীরা লড়াই করতে পারে না কিন্তু  তা বলে লড়াই দেখতে ভাল লাগে না তা তো নয়। এই ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনে সরকার ওটাও দেখতে দেবে না। দিদি আর মোদী যে কি করে ভেবে পাই না।
কিচেন থেকে মিসেসের একটু চড়া গলা শুনতে পাচ্ছি।  সকালে বারবার বলে দিয়েছিল সর্ষের তেল আনতে। ভুলে গেছি।  মনে হচ্ছে সেই ব্যাপারেই অস্ত্রে শান দিচ্ছে। না এখন ঘরে থাকাটা নিরাপদ নয়। বাইরে গিয়ে একটু তেল দিয়ে আসি। ও স্যরি তেল দিতে নয় নিয়ে আসি। আসলে সকাল থেকে বউকে, পাড়ার নেতাকে, অফিসের নেতাকে, অফিসের বসকে তেল দিতে দিতে তেল দেওয়ার কথাটাই মগজে আগে ল্যান্ড করে গেল। তাই মুখ ফসকে তেল দেওয়ার কথাটাই আগে বেরিয়ে গেল।  না ভাই আসি,  যুদ্ধ নিয়ে না হয় পরে আলোচনা করা যাবে। এখন আসি। গুড বাই।

No comments:

Post a Comment

আটপৌরে সিরিজ : ৫ || অলোক বিশ্বাস || কবিতা

আটপৌরে সিরিজ : ৫  অলোক বিশ্বাস অন্যতাপ্রবণ ----------------- মন্দিরের ঘণ্টা বাজলেও মানুষেরা পছন্দ করে ঝর্নার ধ্বনি ট্র্যাডিশন -...