Saturday, July 25, 2020

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ৬ || কান্তিরঞ্জন দে || প্রতি শনিবার

সবাই মিলে সিনেমা হলে~ ৬
কান্তিরঞ্জন দে


 হলগুলো সব গেল কোথায় ?

        কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ সিনেমাহল বন্ধ হয়ে গেছে । কেন ?
       ১৯৭৫ সালে ভারতে পাকাপাকি ভাবে টিভি এল ।দূরদর্শনে সম্প্রচার ব্যবস্থা চালু হল । সাতবছর একটি  সরকারি চ্যানেল রমরম করে চলতে লাগল । পরে বাংলায় আরও একটি চ্যানেল যোগ হল । ১৯৮২-তে এশিয়াডের পরে ভারতের ঘরে ঘরে টিভি ঢুকতে লাগল । ব্যক্তিগত প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে সিরিয়াল অথবা টেলিফিল্ম তৈরি করে সরকারি দূরদর্শনে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হল ।
      তখনও রাতের দিকে সরকারি চ্যানেলে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল।

      এরপর এল মেগা সিরিয়াল বা ডেইলি সোপ অপেরার যুগ । ততদিনে ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ( ভি সি পি ) প্রযুক্তি এসে গেছে । শুরু হল ঘরে ঘরে  সপরিবারে জনবিচ্ছিন্ন ভাবে সিনেমা উপভোগের যুগ ।
     গ্রামে গ্রামে  পর্দা টাঙিয়ে ভিডিওতে  সিনেমা দেখানো জনপ্রিয় হয়ে উঠল । ভিডিও- র   হাত ধরে এসে পড়ল  সি ডি ( কমপ্যাক্ট ডিস্ক )-র  জমানা ।

       পুরো সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থাটাই একবারে বিকেন্দ্রিত হয়ে গেল । সিনেমা দেখার জন্য  সিনেমাহলেই যাবার  আর তত  প্রয়োজন রইল না ।

     যা ছিল  বিরাট বড় অন্ধকার ঘরে অনেকে সম্মিলিত আনন্দ উপভোগের  উপায় , সেই স্থবির ব্যবস্থা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেল দিগ্ বিদিকে ।

     দিল্লি দূরদর্শনে রামায়ণ এবং মহাভারত সিরিয়াল দুটির জনপ্রিয়তা আর বাংলায় প্রতিদিন ঘরে বসে মেগা সিরিয়াল দেখতে পাবার মজা সিনেমা হলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিল ।

     এর পরে ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে লোকের হাতে হাতে এসে গেল 
অ্যাণ্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ফোন ।  ইউটিউব , নেটফ্লিক্স , অ্যামাজন , হটস্টার ইত্যাদির কল্যাণে লোকের পকেটে পকেটে এখন সিনেমা । সঙ্গে টেবিলে কম্পিউটার আর কোলের ওপর ল্যাপটপ তো আছেই ।

       সিনেমা হলের ব্যবসা এর মধ্যে বাঁচে কি করে ? অপরিস্কার অডিটোরিয়াম , নোংরা বাথরুম , ছেঁড়াখোঁড়া গদি আঁটা চেয়ার আর মাথার ওপর ঘটাং ঘটাং করে ঘুরতে থাকা ফ্যানের গরম হাওয়া সহ্য করে কে আর  হলে সিনেমা দেখতে যাবার কষ্ট সহ্য করে ? কেনই বা করবে ?

     ফলে , যা হবার তাই হল । কলকাতা এবং পশ্চিমবাংলায় গত ৩০-৩৫ বছরে একের পর এক সিনেমাহল বন্ধ হয়েই চলেছে । ঢাকা  এবং  সারা     বাংলাদেশেও  একই অবস্থা । বন্ধ সিনেমাহলের জমিতে কোথাও তৈরি হল শপিং মল । কোথাও উঠল মাল্টিস্টোরিড 
হাউসিং  ফ্ল্যাটবাড়ি । অনেকগুলোই এখনও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মাথায় নিয়ে ভুতের বাড়ির মতো বন্ধ হয়ে অন্ধকারে পড়ে রয়েছে ।

      আশি-র দশকের গোড়াতেও পশ্চিমবঙ্গে চালু সিনেমাহলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০০-র  কাছাকাছি । আজ সে সংখ্যাটা কমতে কমতে সারা রাজ্যে মেরে কেটে ২৫০-ও হবে কি না সন্দেহ ।

      সিনেমা দেখা সারা পৃথিবী জুড়েই ছিল একটা সমবেত উদযাপন । একটা দলবদ্ধ বিনোদন বা উৎসব । আজ তা নির্জন এককের নিঃসঙ্গ দিনলিপি ।
     সিনেমা দেখতে গেলে লোকে শো-এর আগে পরে চা , চানাচুর , ঝালমুড়ি , আলুর চপ খাবেই । সিনেমা দেখার শেষে রেস্টুরেন্টে চপ, কাটলেট, মোগলাই পরোটাসহ   ভালোমন্দ খেয়ে অথবা  সপরিবারে কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফেরাই ছিল দস্তুর । আমরাই তো কলেজ জীবনে  এসপ্ল্যানেডের হলগুলোয় সিনেমা দেখতে গেলে লুকিয়ে চুরিয়ে একটু আধটু  ড্রিংক করতে শিখেছিলুম ।

      হাল আমলের বিনোদন ব্যবসায়ীরা সিনেমা দেখার এই কার্নিভাল মেজাজটারই  সুযোগ নিলেন । এলাকায় এলাকায় গড়ে উঠল মাল্টিপ্লেক্স । একই ছাদের তলায়  তিন চারটে সিনেমার মধ্যে  পছন্দসই যে কোনও একটা দেখবার সুযোগ  হল । সঙ্গে রইল খানা-পিনা , কেনাকাটা , আড্ডা দেবার ব্যবস্থা । বউ বাচ্চা , বন্ধুবান্ধব নিয়ে সমবেতভাবে আনন্দ পাবার পশরা । এখন অব্দি সিনেমা দেখা এইখানে এসে ঠেকেছে ।

     সিনেমা- র সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সিনেমার সরবরাহ ( ডিস্ট্রিবিউশন ) এবং প্রদর্শন ( এক্সিবিশন ) ব্যবস্থা । তারও আমূল ভোল বদল হয়ে গেছে ।
      তাতে অবশ্য , সবাইম মিলে সিনেমাহলে যাবার মজাটা একটুও কমে নি । কমেছে কি ?
        শুধু , আমাদের শৈশবের , কৈশোরের , যৌবনের আনন্দের উপবনগুলো সময়ের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে ।

No comments:

Post a Comment

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ১০০ || প্রভাত চৌধুরী

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য প্রভাত চৌধুরী ১০০. আজ ১০০ তম পর্ব। আজ দৈনিক বাংলা-র জন্য বরাদ্দ করলাম। বাংলায় অনুবাদ করলে যা দাঁড়াবে , তা...