সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ব্যক্তিত্ব || মানুষ গড়ার কারিগর সুব্রত মহাপাত্র || নিজস্ব কলম

ব্যক্তিত্ব || গড়ার কারিগর সুব্রত মহাপাত্র

নিজস্ব কলম



    আদর্শ শিক্ষক শুধুমাত্র ক্লাসে পড়ান না। তাঁর জীবনাচরণ, তাঁর সস্নেহ ছত্রছায়া দিয়ে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। সময় বিশেষে সেই দৃষ্টান্ত ছাপ ফেলে ছাত্র- ছাত্রীদের মনের ওপর,তাদের বোধবুদ্ধি র ওপর।  আজ এমনই এক শিক্ষকের কথা জানাবো  যিনি মনে করেন ছাত্রছাত্রীরাই তাঁর জীবনের অমূল্য সম্পদ,প্রাণের হৃদস্পন্দন।

তিনি হলেন  ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর ২ নম্বর ব্লকের বেলিয়াবেড়া কৃষ্ণ চন্দ্র স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়- এর সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রী সুব্রত মহাপাত্র। থাকেন মেদিনীপুর শহরের এক ভাড়া বাড়িতে। কর্মস্থল থেকে বাড়ীর দূরত্ব প্রায় ৯০ কিমি । সব দিন বাড়ী ফেরা তাঁর হয় না। বেশীরভাগ দিনই থেকে যান স্কুলের একটা রুমে। শুধু ক্লাসে পড়িয়ে বাড়ী ফিরে গেলাম আর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল- এমন নীতি সুব্রত বাবুর নয়। স্কুল ছুটির পর বহুদূরের সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যান এই মাষ্টারমশাই সাইকেলে চেপে।শুধু সমস্যা দেখেন তা নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন গরীব আদিবাসী ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা। তাদের নানান সমস্যা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছেন সুব্রত বাবু।একজন মাষ্টারমশাই হিসেবে  মনে করেন শুধু শিক্ষাদানই একজন প্রকৃত শিক্ষকের কাজ নয়, পাশাপাশি সমাজ সচেতকের ভূমিকাও পালন করা উচিত- এই সামাজিক মূল্যবোধই এই শিক্ষক মহাশয়ের মূলমন্ত্র। দায়সারা শিক্ষা পদ্ধতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না। এই বিষয়ে তাঁর মানসিকতা কেমন তা একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে বললে পাঠকরা বুঝতে পারবেন।

একদিন নবম শ্রেণীর ক্লাস নিচ্ছিলেন। বার বার পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! ক্লাসের মেধাবী ছাত্রীটিকে পড়া জিজ্ঞাসা করলে পড়া পারছে না। দু দিন ধরে একই অবস্থা। বকুনি দিয়ে জানতে চান কি সমস্যা ? অনেক পরে মুখ খোলে সুনিতা মুর্মু।- স্যার "বাবা রোজ সন্ধ্যার সময় চোলাই খেয়ে এসে বাড়ির সবাইকে মারধর করে - মা, বোন, ছোটো ভাই সবাইকে, এমনকি বয়স্ক দাদু ও বাদ যায় না। তাই পড়া করতে পারি নি।"

‌      বিষয়টা বুঝলেন মাষ্টারমশাই তাঁর দরদী মন দিয়ে। না এভাবে হবে না। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনোর জন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলেন না। শুরু করলেন এক অসম যুদ্ধ ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে। স্কুল ছুটির পর ছুটলেন হত দরিদ্র অশিক্ষিত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম গুলিতে।বোঝাতে শুরু করলেন পুরুষদের। বললেন চোলাই এর কুফলের কথা। নিজের খরচায় তৈরি করলেন পোস্টার। বাড়ী বাড়ী ঘুরে নিজে চেটালেন পোস্টার। পোস্টারে একটাই বার্তা -। "সমাজ ও পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে আজই আসুন মদ ও চোলাই থেকে দূরে থাকি"।  গ্রামের মহিলাদের  একজোট করলেন। স্কুল পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি যেমন নারায়নপুর, রামপুরা, নতুনডিহি, ডোমপাড়া, পানিপুখুরিয়া, ডুলুং নদীর ওপারে কইমা, মুচিনালা সহ অন্যান্য গ্রামগুলির পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে ঘরের পুরুষেরা সে ছোটো হোক বা বড়ো সবাই ঘুম থেকে উঠেই বসে যেত চোলাই নিয়ে। নেশায় বুদ হয়ে থাকতো। মৃত্যুও ঘটতো প্রতি পরিবার থেকে। এটাই ছিল নিয়ম। এই সময়ই যেন দেবদূতের মতো হাজির হলেন বেলিয়াবেড়া কৃষ্ণ চন্দ্র স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রী সুব্রত মহাপাত্র।ভালোবেসে বুঝিয়ে কখনও বা বকাঝকা করে আস্তে আস্তে প্রান্তিক মানুষগুলোর মনে নেশামুক্তির সুফলের বার্তা পুরে দিলেন। এরই সঙ্গে গ্রামের মা, বোন, বউদের করলেন একজোট। তারাও আশার আলো দেখতে পেলো। আস্তে আস্তে সুফল মিলতে শুরু করলো। 

‌ এই বিষয়টা দু চার লাইনে পড়তে যত সহজ মনে হলো ততটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়। এর পেছনে রয়েছে একজন আদর্শ শিক্ষকের আপ্রাণ চেষ্টা আর মরিয়া লড়াই। পেয়েছেন যথেচ্ছ হুমকি আর শাসানি ।কারণ আমরা প্রত্যেকেই জানি যে চোলাই এর পেছনে রয়েছে অনেক লম্বা হাত। অকুতোভয় এই মানুষটি তবুও কোন ভাবে পিছিয়ে আসেন নি।বরং এর বিরুদ্ধে প্রচার ও প্রসার চালিয়ে গেছেন। এমনই অদম্য মনোবল এই মানুষটির। এরপর পাশে পেয়েছেন পুলিশ o প্রশাসনকে ।এরপরে যখন দিনমজুর অভিভাবকেরা এসে বলে "মাস্টারবাবু নেশার আনন্দ অল্প সময়ের, এতে পরিবারের ক্ষতি হয়"।প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই উপলব্ধিই মাস্টারমশাই এর জীবনের পরম প্রাপ্তি।

‌শুধু নেশাই নয়।নাবালিকার বিয়ে গ্রামের একটি বড়ো সমস্যা। এর বিরুদ্ধেও ছুটে গিয়েছেন সুব্রতবাবু। নাবালিকার বিয়ে বন্ধের জন্য এক অভিনব পন্থা চালু করেছেন। পঞ্চম ও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির সময়(মেয়েদের) অভিভাবকদের মুচলেকা দিতে হবে এই মর্মে - "আঠেরো বছরের আগে আমার কন্যার বিবাহ দেবো না এবং তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ প্রদান করিব।" স্কুলে " কন্যাশ্রী ব্রিগেড" তৈরি করেছেন। স্কুলের ছাত্রীদের মনে এমন বীজমন্ত্র প্রদান করেছেন যে কোথাও নাবালিকার বিয়ে হচ্ছে শুনলে ছাত্রীরাই স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে খবর দিচ্ছে।এমন তিন - তিনটে নাবালিকার বিয়ে বন্ধ করে আবার স্কুলের আঙিনায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন মাস্টার মশাই। স্কুলছুটের সংখ্যা যেমন কমাতে পেরেছেন তেমনি নাবালিকার বিয়ের হারও যথেষ্ট নিম্নমুখী।

‌ গোপীবল্লভপুর ২ নম্বর ব্লকে" সরকারী ডিগ্রি কলেজ" স্থাপনের অন্যতম প্রধান কারিগর হলেন এই সুব্রত বাবু। এর জন্য সারা ব্লকের আপামর জনসধারণের মনে এক" শ্রদ্ধার আসনে"আসীন। এছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও আর্থিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই ব্লকে তৈরি হওয়া পশ্চিমবঙ্গের সর্বপ্রথম "কন্যাশ্রী পাঠাগার ও রিডিং রুম" এর প্রধান পরামর্শদাতা ও কনভেনর সুব্রত বাবু।

‌এই করোনা কালে ৮০ কিমি বাইকে পাড়ি দিয়ে যেসব প্রত্যন্ত গ্রামে অনলাইন পরিসেবার সুবিধা নেই সেই সব গ্রামের ফুলমণি, কানুরাম, সত্যানন্দ, পিন্টুদের এক ডাকেই হাজির তিনি।সামাজিক সুরক্ষবিধি মেনে ওদেরই উঠোনে বসে পড়া বুঝিয়ে দেন। প্রয়োজনে দুদিন থেকেও যান।এতটাই মানবিক তিনি। 

‌"কোনো কাজটাই ছোটো নয়" এই বার্তা স্কুলের ছেলে - মেয়েদের দেওয়ার জন্য নিজে হাতে  স্কুলের সমস্ত টয়লেট ও বাথরুম পরিষ্কার করেন।

‌আবার এই লকডাউন এর সময় মানবতার জয়গান গাইতে ত্রান সামগ্রী নিয়ে হাজির "কুষ্ঠ কলোনী "তে। ক্লাসে প্রথাগত শিক্ষার বাইরে নৈতিকতার ক্লাস নেন যাতে আগামী দিনে কোনো বৃদ্ধাশ্রম না থাকে, মা বাবা ই হলেন আসল ভগবান।

‌এই সমস্ত কাজকর্মের জন্য বিভিন্ন সংস্থা বা বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে সামাজিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। বিশিষ্ট লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, লেখিকা মীরাতুন নাহার,প্রাক্তন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অশোক কুমার গাঙ্গুলি, গায়ক রামকুমার চট্টোপাধ্যায়,ছোটো ও বড়ো পর্দার বিশিষ্ট অভিনেত্রী মিতা চ্যাটার্জী র হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।

‌এই আত্মসর্বস্ব পৃথিবীতে সর্বগ্রাসী লোভ, কপটতা আর মিথ্যাচারের জগতে; এমন আত্মকেন্দ্রিক সময়ে দাঁড়িয়ে এমন মানুষ সত্যিই দুর্লভ।নির্লোভ, সহজ জীবন যাপনে  বিশ্বাসী মানবতার জয়গান গাওয়া ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর দু নম্বর ব্লকের বেলিয়াবেড়া কৃষ্ণ চন্দ্র স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রী সুব্রত মহাপাত্র আক্ষরিক অর্থেই এক আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর। উনার কাছে ছাত্রছাত্রীরাই অমূল্য সম্পদ। এদের শিক্ষাদানই শুধু নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদের সুযোগ সুবিধার আর উন্নতির জন্য সন্তানস্নেহে বুকে আগলে রাখার নিরলস চেষ্টা করে চলেছেন।

‌আমরা ভুলে যাই" শিক্ষক" শব্দ টার গায়ে লেগে থাকে অনন্ত শ্রদ্ধা, সমীহ, সম্মান আর বিশ্বাস। এটা গড়ে তোলা এত সহজ নয়।তবে একজন প্রকৃত শিক্ষক নিজ গুণেই তা লাভ করে থাকেন। সুব্রত বাবু তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২টি মন্তব্য:

দশটি হাইকু || ফটিক চৌধুরী || কবিতা

  দশটি হাইকু ফটিক চৌধুরী ১. রবিঠাকুর কাছে টানে নীরবে বাড়ায় হাত। ২.প্রাণের টানে কবিতায় এসেছি কবিতা জানে! ৩.রাত বাড়ুক আসবে সুপ্রভাত তোমার ...