Saturday, September 5, 2020

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১২) || কান্তিরঞ্জন দে || করোণা সংকট ও ( বাংলা ) সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে  ( ১২)
কান্তিরঞ্জন দে

    করোণা সংকট ও ( বাংলা ) সিনেমা


         আগে প্রাণ । তার পরে তো খাওয়া দাওয়া আনন্দ ফূর্তি । সাহিত্য , নাটক , ছবি আঁকা , গান কিংবা সিনেমা শোনা ও দেখার প্রশ্ন। করোণা অতিমারী বিশ্বজুড়ে মানুষের সভ্যতাকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে । একটা পুঁচকে এককণা ভাইরাসের সন্ত্রাসে পৃথিবীর নিয়মকানুন ওলোট পালোট হয়ে যেতে বসেছে । সিনেমাও এই সংকটের বাইরে নয় । বিশ্বের কোথাওই নয় ।

         গত ছ'মাস হল এ দেশে ও রাজ্যে সিনেমা হলগুলি বন্ধ । অত্যাধুনিক মাল্টিপ্লেক্স গুলোতেও মানুষের প্রবেশ নিষেধ । প্রথম কয়েকমাস তো  খাওয়াদাওয়া , বাজারহাট ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছিল । ঘরবন্দি মানুষ ঘরে বসে করোণার খবর ও মৃতের সংখ্যা গোণা ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে নি । সিনেমা দেখা বন্ধ । শ্যুটিং বন্ধ হয়ে যাবার কারণে ডেইলি সোপ টিভি সিরিয়াল গুলো দেখানোও বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হল ।

      কিন্তু সিনেমা-সিরিয়াল তো আপনার-আমার বিনোদন মাত্র নয় । কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন রুটিরুজিও বটে । বিনোদন বিতরণ বন্ধের চেয়েও বড় কথা,  সামাজিক জীবনের অন্য আর সমস্ত দিকের মতো বিনোদন শিল্পে জড়িত অসংখ্য মানুষের পেটেও  টান ধরিয়ে দিয়েছে , করোণা অতিমারী ।

        বাংলা ফিল্ম এমনিতেই সারাজীবন হাজার রকমের সমস্যায় ভোগে । করোণা তাকে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ।

        ইতিহাসে দেখা যায় , বড় বড় সংকটের সময়ে , সেই সংকট থেকে বাঁচতেই মানুষ বিজ্ঞানের সহায়তায় নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেই সংকট থেকে বাঁচার পথ তৈরি করে নিয়েছে । এইভাবেই মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে ।
        দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিনী সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উপায় হিসেবে ইন্টারনেট পদ্ধতির আবিষ্কার করেছিল । কয়েক দশকের মধ্যেই সেই প্রযুক্তিই হয়ে গেল----ইন্টার ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট । আধুনিক কালের বিশ্বজোড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধানতম হাতিয়ার । নব্বই দশকে অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে সেই প্রযুক্তি বাকি সমস্ত ক্ষেত্রের মতো বিনোদন শিল্পেরও প্রধানতম অবলম্বন হয়ে উঠল । মনে রাখতে হবে, গত ২০ বছরে ইন্টারনেট তথা ডিজিটাল টেকনোলজি-র যে অগ্রগতি-----তা কিন্তু সারা পৃথিবীতে একযোগে ঘটেছে । অ্যামেরিকার মতো ধনী দেশ , কিংবা ভারত- বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ এক্ষেত্রে একই সারিতে । যন্ত্রপাতিতে হয়তো সামান্য ঊনিশ-বিশ ফারাক আছে । খুব বেশি তফাৎ কিছু নেই ।

      ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সিনেমাহলের বড়পর্দার সিনেমা এমনিতেই একটা মোক্ষম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল । আমাদের দেশে , বিশেষত  চলচ্চিত্র জগতে এই চ্যালেঞ্জটা বাংলা সিনেমা ব্যাপারটাকে বেশ বড়সড়  সমস্যার মুখে ফেলে দিয়েছে । হিন্দি সিনেমা জগতে পুঁজি-মূলধন অনেক অনেক বেশি । ফলে সেখানে সমস্যা সামাল দেবার উপায় আছে । কিন্তু বাংলা সিনেমার বাজার সীমাবদ্ধ বাজার । আঞ্চলিক বাজার । আজ যদি সমগ্ৰ বাংলা এক ও অখণ্ড থাকত , তাহলে হয়তো বর্তমান সমস্যা সামাল দেওয়া ততটা কঠিন হতো না । কিন্তু এখনকার বাংলা সিনেমার এই ছোট্ট বাজারে ডিজিটাল প্রযুক্তির হানা তাকে সত্যি সত্যি বড় বিপদের মুখে এনে ফেলেছে । মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো এসে উপস্থিত হয়েছে করোণা ।

        করোণা আক্রমণের ৩/৪ মাসের মধ্যেই সাবধানতা অবলম্বন করে কিছু সিরিয়ালের শ্যুটিং এবং টেলিকাস্ট শুরু করা গেছে । বলা ভালো , প্রাণের দায়ে পেটের দায়েই বাধ্য হয়েই সেগুলো চালু করতে হয়েছে । সিনেমার শ্যুটিং পুরোদমে এখনও চালু করা যায় নি ।  বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের রোদে কিংবা আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টির কারণে সিনেমার আউটডোর শ্যুটিং এমনিতেই অন্যান্য বছর বন্ধ থাকে । শরৎকালে আবার আউটডোর শ্যুটিং চালু হয় । শরৎ ও শীতকাল হচ্ছে বাইরে বাইরে শ্যুটিংয়ের আদর্শ সময় । অর্থাৎ, সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ । খুব বেশি হলে এপ্রিলের গোড়ার দিক । তার মধ্যে সিনেমা হল-মাল্টিপ্লেক্স বন্ধ । তাহলে উপায় ?

        উপায় নেই । পূর্ব ভারতে প্রযোজকদের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইস্টার্ন ইণ্ডিয়া মোশন পিকচার্স প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (  E.I.M.P.P.A বা ইম্পা ) গত সপ্তাহে মিটিংয়ের শেষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে সিনেমা হলগুলি খোলার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে চিঠি দিয়েছে । কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই আবেদন তারা আগেই জানিয়েছে । বোঝা যাচ্ছে , করোণা সংকট তাদের কাছে সত্যসত্যিই  বেঁচে থাকার লড়াই ।
     সিনেমা - সিরিয়ালে অভিনয় কিংবা কলাকুশলীর কাজ কোনও মাসমাইনের বাঁধা চাকরি নয় । এই পেশায় কোনও পেনশন , প্রভিডেন্ট ফান্ড , গ্র্যাচুইটি নেই । অতএব, ক্যামেরা বন্ধ , কিংবা শ্যুটিং বন্ধ, মানে রোজগার বন্ধ ।
      খুব সম্প্রতি রাজ্য সরকার কলাকুশলীদের স্বল্প পরিমাণে হলেও, এককালীন কিছু অর্থসাহায্য করেছেন । অভিনেতা এবং কলাকুশলীদের সংগঠনগুলো বেশ কয়েকবছর আগে এদের জন্য কিছু ইনস্যুরেন্স-এর ব্যবস্থা করেছেন । ব্যস্, আর্থিক নিরাপত্তা বলতে এটুকুই ।

     করোণা  পরবর্তী কালে বাংলা সিনেমা এবং বাংলা সিনেমা বাঁচবে কিনা , সেটা পুরোপুরিই নির্ভর করছে , তার অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীরা বাঁচবেন কিনা, তার ওপর ।
     খুব সফল পরিচালক কিংবা দীর্ঘদিন ধরে খুব সফল হিরো হিরোইনরা হয়তো কিছুদিন বাড়তি বাঁচবেন । কিন্তু বাকিরা ?? তাদের কথা নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না ।
       আর সিনেমা  প্রদর্শন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত  এবং সিনেমা হলের কর্মচারীরা ?? অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির আক্রমণে তারা এমনিতেই ধুঁকছিলেন । করোণা দৈত্য তাদের আর বাঁচতে দেবে কিনা , সে প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে হবে ।

     এ ছাড়া তো কোনও পথ দেখি না ।

No comments:

Post a Comment

বিশ্বজিৎ || ঘোড়া || কবিতা

  বিশ্বজিৎ ঘোড়া তুমি বরাবর শিক্ষা নিতে ভালবাসো।শিক্ষার ভেতরেও একটা শিক্ষা থাকে।অচেনা গলির ঘ্রাণ... রক্ত আছে মাংস আছে তুমিও বোঝ নদী কীভাবে বা...