মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৫ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১৫,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৫)
বড় সত্যি কথা,বিজয় ভরাল মাথা নাড়ে,হ্যাঁ,বড় সত্যি কথা।তাদের জীবনটা সত্যিই একটা সঙ্কীর্ণ বৃত্তে আবর্তিত হয়ে শেষ হয়ে গেল-জীবনের নানা রঙিন সম্ভাবনার দরজাগুলি তাদের জন্য চিরদিন রুদ্ধ হয়ে রইল। সামান্য একটা বাড়ি তৈরির কাজে তাদের যুগের মানুষ এখনকার মানুষের মতো নিখুঁত সৌন্দর্য-জ্ঞানের পরিচয় দিতে জানল না,সেই একই দেওয়ালে সাদা বা মাটি রঙের চূন দেওয়া,কাঠগুলিতে কালো আলকাতরার রঙ বা বার্ণিশ ঘষা –এতে ঘরগুলিতে কী যে সুরুচির পরিচয় ফুটে উঠে-দেওয়ালে ডিসটেম্পার,জানালা দরজার কাঠে নানা রকম সুন্দর রঙের পেইন্ট। তার সঙ্গে মিলিয়ে পর্দা লাগানো হয়েছে। কমলাও তো কাঠের রঙের সঙ্গে মেলানোর জন্য এই বাড়িতে এসে আট টাকা গজের নতুন পর্দা কিনেছে,পুরোনো বাড়ির পর্দাগুলির রঙ নাকি এই জানালা দরজার সঙ্গে ম্যাচ করেনা,তাছাড়া আগের পর্দাগুলি এই বাড়ি থেকে অনেক ছোট-এই সমস্ত কথা সেদিন কমলা জানালায় পর্দা লাগানোর সময় বিজয় ভরালীকে বুঝিয়ে বলছিল-বিজয় ভরালী তখন সামনের বারান্দায় বসেছিলেন।
‘খরচ অবশ্য অনেক পরে গেল বাবা-’সেদিন কমলা আরও বলেছিল-‘কিন্তু আমাদের একটা স্ট্যণ্ডার্ড আছে তো,বাড়িটা সাজিয়ে গুছিয়ে না রাখলে আমাদের সোসাইটিতে মান থাকে না। আমিতো একটু কম দামি পর্দাই লাগিয়েছি,আমার সঙ্গের একজন বান্ধবীর বাড়িতে সেদিন দেখে এলাম একেবারে ষোলো টাকা গজের পর্দা লাগিয়েছে-অবশ্য ওদের কথা আলাদা,স্বামী একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার,বাইরের অনেক টাকা-ওরা ষোলো কেন,বত্রিশ টাকা দামি পর্দায় কাপড় নিতে পারে,আমাদের এর মতো ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো বাইরের আয় নেই-’শেষের কথাগুলি যেন খুব ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছিল কমলা।
কমলা ঝুলানো সেই নতুন সুন্দর ডিজাইন এবং সুন্দর রঙের পর্দাগুলির দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালী ভাবল –তাদের দিনে বাড়িগুলি যেরকম ছিল পর্দাগুলিও ছিল তথৈবচ।অনেকের বাড়িতে তো মহিলারা চাদর ছিঁড়ে গেলে পর্দারূপে ব্যবহার করা হত,ইলাও একবার সেটাই করেছিল,এক টুকরো রঙিন সাবান কিনে এনে পুরোনা সাদা চাদর কয়েকটিতে নীল রঙ লাগিয়ে পর্দা দিয়ে ইলা ঘর সাজিয়েছিল। সেই পর্দা দেখলে এখন কমলাদের মুখে এখন বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠবে।কিন্তু আজকের মানুষ কি কেবল বাড়ি সাজানোর ক্ষেত্রেই সুরুচির পরিচয় দিয়েছে?নিজেকে সাজানোর ক্ষেত্রেও এখনকার মানুষের পারিপাট্য এবং সৌন্দর্যবোধের পরিচয় ফুটে বের হচ্ছে। ছোট থেকে বড় পর্যন্ত এখনকার মানুষ নিখুঁতভাবে নিজেদের সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। আগের দিনের ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজে খালি পেয়ে যেত,আধ মলিন ইস্ত্রিবিহীন কাপড়-চোপড় পরে,কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়ের কাপড়-চোপড়ের পরিপাট্য,জুতো-মোজায় সুশোভিত পা,নতুন নতুন স্টাইলের চুল আঁচড়ানোর নিদর্শন দেখলে ভালোই লাগে। বারান্দায় বসে রাস্তার জনতার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এই সমস্ত লক্ষ্য করতে করতে বিজয় ভরালী ভাবতে থাকেন।তাদের দিনে কেবল ধনী মানুষের বাড়ির ছেলে মেয়ে বা পুরুষ মহিলার জন্যই কাপড়-চোপড়ের বিলাসিতা একচেটিয়া ছিল,কিন্তু এখনকার সময়ে তো কাপড় চোপড় দেখে বোঝা সম্ভব না কার আর্থিক অবস্থা কেমন। বিজয় ভরালীর পুরোনো দিনের অজটিল মন ভেবে পায় না –আজকের এই অতি অভাব অনটনের দিনে দেশের সমস্ত মানুষ কীভাবে এত দামি কাপড় পরতে পারছে।এখনকার মানুষ তো তাদের মতো কোনোমতে খেয়ে-ঘুমিয়ে গরু মোষের মতো জীবন কাটাতে পারে না।এখনকার মানুষের জীবনধারায় কমলার বক্তব্য অনুসারে রুচিবোধ এবং কালচার ওতপ্রোতভাবে ঢুকে গেছে।আধুনিক মানুষ সমস্ত কিছুই নিখুঁতভাবে করতে চাইছে।জীবনগুলি জটিল হয়ে পড়েছে সত্যি –কিন্তু এই জটিলতাই যে প্রগতির নিদর্শন।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জীবনে কত আরাম,কত স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে-সত্যিইতো –বিজয় ভরালী ভাবলেন,এখন তাহারা গুয়াহাটি শহরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যেতে চাইলে সিটি বাস নাহলে ট্যাক্সিতে গেলেই চলে,আশে পাশে যেতে হলেতো রিক্সা আছেই।কিন্তু তাদের দিনে দূর দূরান্তের কোনো জায়গায় যেতে হলে কত অসুবিধা-চার চাকার ঘোড়া গাড়িতে থেকেচ থেকেচ করে ধীরে ধীরে যেতে থাকা,শরীরে ঝাঁকুনি –সময়ের বাজে খরচ,কত অসুবিধা।আশেপাশে যেতে হলে পা দুটিই অবলম্বন,এখনকার মতো তো রিক্সার আরাম নেই।ভেবে দেখতে গেলে বর্তমান জীবনধারার সমস্ত দিকে আরাম এবং স্বাচ্ছন্দ্যেই তো ভরে রয়েছে।আগের দিনের বাড়িগুলিতে মহিলাদের কত অসুবিধা ছিল-গোধূলি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ল্যাম্প-প্রদীপ জ্বালাতে হয়,বর্ষার আবহাওয়ায় দূরে থাকা রান্নাঘরগুলিতে  বৃষ্টিতে ভিজে আসা যাওয়া করার কত অসুবিধা ছিল,এখনকার মতোতো ঘরে ঘরে জলের কল ছিল না,আর থাকলেও এক জায়গায় মাত্র একটা কল থাকে,তা দিয়েই সব জায়গায় কাজ চালাতে হয়,কিন্তু এখন আধুনিক মানুষের উন্নত চিন্তাশীল মনে জীবনধারার সমস্ত ক্ষেত্রে আরামের ব্যবস্থা করে নিয়েছে,এখনকার গৃহিনীদের জন্য সবজায়গায় জলের কল-রান্নাঘরে কল,মুখ-ধোওয়ার জায়গায় কল,বাথরুমে কল,বাসন ধোওয়া জায়গায় কল।তাদের সময়কার মহিলারা কি এত সুবিধার,এত আরামের ব্যবস্থার কথা ভাবতে পেরেছিল?সেইজন্যই বোধহয় তখনকার দিনের এক একটি বাড়ি কেবল সজ্জাহীন অনাড়ম্বরই ছিল না,সেইসব বাড়ি এখনকার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত নোঙরাও ছিল।তখনকার গৃহিণীর আজকের মতো সুরুচিবোধতো ছিলই না পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং পারিপাট্যেরও খুব অভাব ছিল।বোধহয় কাজ কর্মের সুবিধা না থাকা বাড়িগুলিতে কাজের বোঝা পরিশ্রান্ত করা সেই মহিলাদের ঘর সাজানো বা পরিষ্কার করে রাখার জন্য খুব কম উৎসাহই অবশিষ্ট থাকত।        


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পূরবী~ ৫৯ || অভিজিৎ চৌধুরী || Purabi~ 59

  পূরবী~ ৫৯ অভিজিৎ চৌধুরী শেষ লেখা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ একদিন লিখলেন,  মিথ্যে  বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছো নিপুণ হাতে। তীর্থও জানে,একদওন সব শূন্য কর...