মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

কিছু বই কিছু কথা-২৯৩ || বাড়ি ফেরার পথ : রাজদীপ ভট্টাচার্য || আলোচক- অলোক বিশ্বাস

 কিছু বই কিছু কথা-২৯৩  || বাড়ি ফেরার পথ : রাজদীপ ভট্টাচার্য || আলোচক- অলোক বিশ্বাস



বাড়ি ফেরার পথ : রাজীব ভট্টাচার্য
আলোচক : অলোক বিশ্বাস

আমরা যারা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সিলেবাসে দীর্ঘদিন পরিক্রমা করতে করতে আর কিছু সনাতনী বাঙালিয়ানার ঐতিহ্যপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা পাঠ কোরে বাংলা কবিতা বা পদ্যর একটা পাকাপাকি চেহারা তৈরি কোরে ফেলেছি কবিতা পাঠের বা আবৃত্তির আসরে শুনতে চেয়েছি মাত্র ওই সিলেবাসভুক্ত কবিতাবলীকেই, তারা এক অন্যতর অভিজ্ঞতা বা সমস্যার মুখোমুখি হবো রাজদীপ ভট্টাচার্য সৃজনিত ১৬ পৃষ্ঠার কাব্য পুস্তিকাটি নিরীক্ষণ কোরে। প্রেমের কবিতাকে যে কতো ভয়ংকর সুন্দর করা যায়, দেখে চমকে উঠলাম আমি। গোটা কবিতাটিকে আগে তুলে নিই। কবিতাটির আলাদা শিরোনাম নেই। 'বাড়ি ফেরার পথ' গ্রন্থভুক্ত ২২ সংখ্যক কবিতা--- "ভরা পূর্ণিমায় ছাদে যেতে নেই। যখন বুঝলাম তাকিয়ে দেখি আকাশে পতাকার মতো চাঁদ। তার সামনে আঙ্গুল নাড়ছে নারকেল গাছের পাতা। তখন তোমার দিকে ফিরে তাকাতেই সে এক ম্যাজিক--- সারা গায়ে হলদে-কালো ডোরাকাটা দাগ, তুমিও অবাক হয়ে দেখলে আমাকে। বাঘ ও বাঘিনীর কদাচিৎ দেখা হয় আজকাল, আর দেখা হলে আকাশে হলুদ চাঁদ ওঠে।" কবি রাজদীপ ভট্টাচার্য ২০১০ সময়কাল থেকে লেখায় পর্যটনে নেমেছেন বলে তাঁকে আমি প্রথম দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত করছি। এবার কবিতাটির দিকে দৃষ্টি দিয়ে আমরা একটা শব্দে ফোকাস করি, শব্দটি হলো 'ম্যাজিক'। কবিতায় যে ম্যাজিকালিটি আছে সেটা ওই শব্দেই স্পষ্ট। আর শব্দটা প্রয়োগ না করলেও জাদুবাস্তবতা কি আমাদের অধরা থেকে যেতো ? কবিতায় ব্যবহৃত ভরা পূর্ণিমার রঙ কেমন সকলের জানা। সেই চাঁদকে কবি 'পতাকার মতো চাঁদ' বলেছেন। এই অবধি ঠিক ছিল প্রবহমান কবিতার বিচারে। কিন্তু, তারপর থেকেই বিশাল শিফ্ট ঘটলো কবিতায়। পাঠকের মগ্নচেতনা যেন ঝাঁকানি খেলো যখন কবিতার প্রেমিক হঠাৎ প্রেমিকার শরীরে হলুদ-কালো ডোরাকাটা দাগ দেখতে পেলো। আর পরিণামে প্রেমিকাও প্রেমিকের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে রইলো। অবশেষে কবি নিত্য বর্তমান ক্রিয়ার কাল ব্যবহারে বলেছেন--- "বাঘ ও বাঘিনীর কদাচিৎ দেখা হয় আজকাল, আর দেখা হলে আকাশে হলুদ চাঁদ ওঠে।" প্রেমিকা প্রেমিকের শরীরে হলুদ-কালো ডোরাকাটা দাগ দেখেছিলো কিনা, সেটা কবি লেখেননি। কবি লিখেছেন শুধু প্রেমিকা প্রেমিককে দেখে অবাক হয়েছিল। অবাক হওয়ারটা অবশ্যই প্রেমিকের অবাক হবার  সমপরিমাণ ছিলো। সেটার ইঙ্গিত আছে কবিতায়। এরপর কবি আর কোনো রাখঢাক রাখেননি। সরাসরি বলেছেন--- 'বাঘ বাঘিনীর কদাচিৎ দেখা হয় আজকাল, আর দেখা হলে আকাশে হলুদ চাঁদ ওঠে।' পূর্ণিমার ভরা আলোয় ছাদে ওঠার রোমান্টিকতা এবং এর সঙ্গে নারকেল গাছের আঙ্গুল সেই রোমান্টিকতাকে আরো প্রসারিত করেছে। আগেই বলে নিই, নারকেল গাছের নড়াকে কবি 'আঙ্গুল নাড়া' মনে করেছেন। এখানে যেমন নারকোল গাছকে পারসনিফায়েড করা হয়েছে তেমনি আদরের হাত বোলানোর প্রসঙ্গটি প্রচ্ছন্ন থাকেনি। আরো দুটি অবস্থা সৃষ্টি হলো। ১. প্রেমিক প্রেমিকাকে কবি বাঘ -বাঘিনীতে রূপান্তরিত করলেন। ২. পূর্ণিমার চাঁদের রঙকে হলুদ করা হলো। পুরো ব্যাপারটিকে কবি ম্যাজিকাল রিয়েলিটির আধারে নির্মাণ করলেন। অবশ্য এর সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতার সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্ককে টানলে ম্যাজিকাল রিয়ালিটিকে আপাতভাবে সরিয়ে রাখতে হয়। ব্যাপারটিতে জড়িয়ে আছে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ। কবিতার প্রথমে নবাচক বাক্য ব্যবহার কোরে সেই মনস্তাত্ত্বিক প্রসঙ্গকে জোরালো করেছেন কবি। পূর্ণিমায় ছাদে যেতে না চাওয়ার পিছনে কি জীবনের সংকটজনক কোনো ঘটনা বা সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতার আভাস আছে?। আছে কি দাম্পত্য কলহের কোনো পূর্ব সূত্র ? প্রেমিক প্রেমিকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ? তবু, উল্লিখিত চরিত্র দুটি ছাদে গেলো এবং পরস্পরের শরীরে দেখতে পেলো হলদে-কালো ডোরাকাটা দাগ যা হিংস্রতার প্রতীক। কবি যদিও স্পষ্ট করেছেন সেভাবেই উল্লেখ কোরে। দুজনকে চিহ্নিত করেছেন বাঘ-বাঘিনী রূপে। এই উল্লেখের মধ্যে হয়তো কোনো প্রাণীকুলের স্বভাবজাত মিলনের অবস্থাকে পাঠক নিতে পারতো। কিন্তু পূর্ণিমার চাঁদকে যখন কবি তাদের চোখ দিয়ে হলুদ কোরে দেখাচ্ছেন, তখন মানুষের আবহমান মানসিক সংকট চিত্রিত হচ্ছে এধরণের মেটাফোরের মাধ্যমে। যাইহোক, জাদু বাস্তবতা এবং সম্পর্কের সংকট উভয়ই ফোকাসড হলো ২২ সংখ্যক কবিতায়।
#
'বাড়ি ফেরার পথ' বইটিতে মন খারাপের প্রসঙ্গ এসেছে অনেকবার। ৯ সংখ্য  কবিতায় কবি সহজ স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন--- "মন খারাপ পেরোতে পেরোতে যাওয়া। যাকে ছুঁই, যেখানে ছুঁই শুধু বিষণ্ণতা। ঘুম ভেঙে উঠে তাঁবুর ছাদ থেকে, ভোরের দরজা থেকে বরফ সরাই।" কবি লক্ষ্য করেছেন, পাখিদের বিস্কুট ভেঙে ভেঙে দিলেও তারা বেশিক্ষণ থাকে না। হয়তো তারা মানুষের সঙ্গ সন্দেহ করে। হয়তো পাখিদের মানুষের মতো বিষণ্ণতায় ভোগার কোনো ব্যাপার নেই। তাই তারা মানুষের কাছে থাকার প্রয়োজনীয়তা ততোটা ভাবে না। তারা সহজে উড়ে যায়। কবি পারে না, মানুষ পারে না এতো সহজে উড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। সারাজীবন মানুষকে বরফ সরিয়ে যেতে হয়। এই বরফের আর এক নাম বিষণ্ণতা। এই বিষণ্ণতা থেকেই কবি ১০ সংখ্যক কবিতায় লিখছেন "এই পৃথিবীকে বেশি প্রশ্রয় দিও না।...এই পৃথিবীকে বেশি আদর দিও না আর, ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হবে!" মধ্যবিত্ত মানুষের মন কোনো কিছুতেই শান্তি পায় না। সকল প্রকার দুঃখ, দুঃস্বপ্ন, শোকবার্তা, একা একা কান্না, নালিশ, অভিমান ইত্যাদি মানসিক অবস্থার মধ্যে তার সর্বদা যাতায়াত। এর থেকে তার মুক্তি নেই। এর কোনো চিরকালীন সমাধান নাগরিক মধ্যবিত্তের জানা নেই। মাঝে মাঝে জীবনের মতো তার বাঁচতে ইচ্ছা করে। কবি 'মাঝে মাঝে' শব্দ ব্যবহার করেছেন বাঁচার ইচ্ছা প্রকাশে। এর অর্থ হলো সবসময় মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের মতো বাঁচার উপায় সম্ভবনাহীন। কবি সেই ঘুম না আসা স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন মেশানো মধ্যবিত্তের একজন। একটি দুর্ঘটনা দেখে মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থান কেমন হয়, সেটা স্পষ্ট হয়েছে কিছু পংক্তিতে ১২ সংখ্যক কবিতায়--- "ট্রেনে কাটা লাশ দেখলে আমি অদ্ভুত ভয় পাই। প্রথমে কয়েক পা পিছিয়ে আসি। তারপর ঘুরপথে আড়চোখে উৎসাহী ভিড়কে দূরে ঠেলে পার হই। অথচ, আমার স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে দ্বিখণ্ডিত দেহ। আমি তাকাতে চাই না। তবু মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে কারা আমাকে দেখায়। আমি স্তম্ভিত চোখে দেখি শুয়ে আছি পাথর শয্যায়..."
#
মাত্র এক ফর্মার বই। ২৭ টি কবিতা। টানা গদ্য ফর্মে লেখা। সমস্ত কবিতায় টানটান নাগরিক ভাষা। পদ্যের কোনো মেদ নেই। নেই অলঙ্কার উৎপ্রেক্ষা তথা বাকপ্রতিমা নির্মাণের প্রবণতা। নেই ছন্দের দোলাদুলি। সাদামাটা গদ্যে আন্তরিক সহজ উচ্চারণ।।কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোনো ভাষাবিপ্লব বা ভাষাজটিল খেলা নেই। নেই কোনো সামাজিক আন্দোলনের বা সমাজবাস্তবতা মূলক আবেগের প্যানপ্যানানি। কবি বাড়ি ফেরার পথের কথা বললেও, সেটা যে কতো কঠিন, কতো রহস্যময়, সেটা যে কতো খোঁজাখুঁজির ব্যাপার, এই পোয়েটিক ডিক্সন আয়ত্ত করেছেন কবিতার জীবনে। মনখারাপের কথা যদিও কবিতায় সারাক্ষণ মেঘের মতো বিরাজ করে না, এও সত্য। শিশুর মনখারাপের যে তাৎক্ষণিকতা আমরা লক্ষ্য করি, রাজদীপ ভট্টাচার্যর কবিতায়ও মনখারাপের স্থান সেভাবেই তাৎক্ষণিক। তা নাহলে কেন তিনি লিখবেন--- "প্রত্যেকের বুকের ভিতর কিছু গোপন সুড়ঙ্গ থাকে। মায়াবী ঢাকনা খুললেই কোথাও মা দুপুরের শেষে বসে সাবান কাচছে। ঘষে ঘষে পাজামার পায়া থেকে শুষে নিচ্ছে সাইকেলের কালি...আর আমি এইসব সুড়ঙ্গের মুখ চুপি চুপি ঢাকা দিয়ে রাখছি আড়ালে।" ভালো লাগলো যে কবিতার বইটি কাব্য বিষয়ক কোনো সংস্কার ছাড়াই লেখা হয়েছে। ভাষাকে তিনি সাম্প্রতিকতায় সংশ্লিষ্ট করেছেন। আপডেটেড ভাষায় লিখেছেন প্রতিটি কবিতা। আর মুহূর্তের অবস্থা ও ইভেন্টের বিবৃতিকে কবিতার নিজস্ব জাদুকাঠির ছোঁয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন যেমন নিজের মনের বিচারের কাছে, তেমনি পাঠকের প্রত্যাশাকে নিশ্চিত হৃদয়ের কোথায় গুরুত্ব সহকারে বিচার্য কোরে রেখেছেন। তিনি অকৃত্রিম ভাবে ১৭ সংখ্যক কবিতায় জানিয়েছেন--- "আমার কবিতাই আমার জীবন।"


1 টি মন্তব্য:

শব্দব্রাউজ ১৮৩ । নীলাঞ্জন কুমার Nilanjan Kumar

  শব্দব্রাউজ ১৮৩ । নীলাঞ্জন কুমার Nilanjan Kumar শব্দব্রাউজ ১৮৩ । নীলাঞ্জন কুমার বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা ১৬।৫।২০২১। সকাল ৮টা ৫০ম...