সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

শীতের রসচরিত || শ্রীজিৎ জানা || মুক্ত কথা

শীতের রসচরিত

শ্রীজিৎ জানা



  কথায় বলে ' রসেবশে বাঙালি '! গঙ্গা পদ্মা দুইপারই রসে টইটুম্বুর।রস খালি গলায় নহে,বলায় নহে, নোলাতেও একশোয় একশ।যেই হেমন্ত ফিরল গ্যালারিতে অম্নি শীতের ইনিংস শুরু।উত্তুরে হাওয়া, বরফকুচি শীতলতা,আর কাঁচা হলুদবরণ রোদের আদুুরে আহ্লাদ।মাঝেমধ্যে ঘন কুয়াশার আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে জুবুথুবু অবস্থা যেন শীতবুড়ির।বঙ্গে শীত বাঙালি রসিয়ে উপভোগ করে।রসনায় লকলকিয়ে ওঠে নোলা।হিমেল ঋতুতেভোজের থালায় বহুপদের ছড়াছড়ি।শীত মানেই তো পিঠেপুলি, পায়েস,পাটালি,মোয়া সন্দেশ।সরুচাকলি,পুরপিঠে,আস্কেপিঠে,ঝিনুকপিঠে,মুঠিপিঠে,পাতাপিঠে,নকশি পিঠে,লবঙ্গলতিকা, চন্দ্রপুলি, পাটিসাপটা, হৃদয়হরণ-কতনা বাহারি নাম! শীতের পিঠেপুলিতে মজেছিলেন ফুলিয়ার কৃত্তিবাস, ওপারে বরিশালের বিজয় গুপ্ত।মঙ্গলকাব্যের কবির পিঠেপ্রীতি প্রকাশিত হল ছন্দের বাঁধনে--মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস/ দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স/দুগ্ধে পিঠা ভালোমতো রান্ধে ততক্ষণ /রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন"! পিঠের প্রসঙ্গ ওঠামাত্রই পিঠোপিঠি আসবেই রসনারঞ্জন,গুড় মহাশয়। আর শীতের গুড়ের গূঢ়কথা লুক্কায়িত খেজুর রসে।
খেজুর গাছের রসের হদিশ প্রথম কে দ্যান তা দেবা ন জানন্তি।তবে খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই নাকি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ চলত।"১৮৯৮ সালে বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের এক মহাভোজে উপস্থিত ছিলেন ইতসিং। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় তখনকার নেপালে সমস্ত বৌদ্ধ বিহারে যত সংঘ ছিল,সব এসেছিল সেখানে- প্রায় ১৩০০০ ভিক্ষু একত্রে খাচ্ছিলেন। সেকালে ভিক্ষুদের মধ্যে নানা ধরণের পানা বা সরবত খাওযার চল ছিল।তাও বলে গেছেন ইতসিং। তিনি যেসব সরবতের কথা বলেন সেগুলো হল- চোচপান(=ডাবের জল),মোচপান(=কোন এক গাছের বা ফলের রস),...খর্জূরপান(এটি সম্ভবত খেজুররস)।[বঙ্গভূমিকা-সুকুমার সেন]।
সংস্কৃত খর্জুর থেকে খেজুর শব্দ।সাহেবসুবোরা বলেন ডেটপাম।বিজ্ঞানসম্মত নাম ফিনিক্স ডিকটিলিফেরা।আরব দেশে খেজুর তুমুর নামে পরিচিত। সেখানে আবার রূপ-গুন বিচারে কত নামের রকমফের।কাঁচা খেজুর কিমরি,পাকা ও নরম রুতাব,পূর্ণাঙ্গ খেজুর খলাল,পাকা ওশুকনো খেজুর তমব।বালুময় দেশ ফলেই সন্তুষ্ট। আমাদের চাহিদা ফলাতীত। "প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ"! মানে খর্জুর বৃক্ষের প্রাণরস আহোরণ। মানে বৃক্ষবারি। যেমন সমুদ্রমন্থনে অমৃত লাভ,তেমন খেজুরগাছের হৃদয় সেঁচে রসামৃত গ্রহন। অতঃপর পাকশালার নিপুন পাকপ্রণালীর জাদুতে নবরূপে নবস্বাদে রসাস্বাদন! তবে খেজুরগাছের অন্তরভরা মধুরস এভাবে নিঙড়ে নেওয়া অনেকটাই হৃদয়হীন মনে হতেই পারে। কিন্তু ভোজনরসিক মাত্রই বলবেন রসনা তৃপ্তিতে -অধিকিন্তু ন দোষায়ঃ।
শীতের খেজুররস আহা কতনা অমৃতময়! মহান আল্লাহ তাঁর করুণার বাণী শুনিয়ে বললেন-"মানুথ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমিই প্রচুর বর্ষণ করি। পরে আমি উৎকৃষ্ট রূপে ভুমি বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য,আঙুর,শাকসব্জি,জাইতুন খেজুর "[সুরা আবাস আয়াত/২৪-৩২]।মানে মনখুলে রসসাগরে ডুবে যাও। রসের ভাঁড়ার পূর্ণ করবেন সৃষ্টিকর্তা।মরু অঞ্চলের লোকজন এমন মধুময় রস থেকে বঞ্চিত।বঙ্গদেশ যে রসে হাবুডুবু ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রশস্তিতে লিখলেন-"হায়রে শিশির তোর কি লিখিব যশ/ কালগুনে অপরূপ কাঠে হয় রস/ পরিপূর্ণ সুধাবিন্দু খেজুরের কাঠে/কাঠ কেটে উঠে রস যত কাঠ কাটে/ দেবের দুর্লভ ধন জীবনের ঘড়া/ একবিন্দু রস খেলে বেঁচে ওঠে মড়া"! মানে খেজুররস মৃতসঞ্জীবনী সুধা।শুধু কবি কিম্বা খাদ্যরসিক নয়,পুষ্টিবিশারদ হাত খুলে লিখলেন খেজুরফল ও রসের গুণাগুণ -"খেজুর ফ্রুকটোজ এবং গ্লাইসেমিক সমৃদ্ধ সুস্বাদু একটি ফল।খেজুর হল চিনির বিকল্প।রক্তে শর্করা বাড়ায়। শক্তির উৎস হিসেবে কার্যকরী খেজুর শরীরের ক্লান্তি দূর করে। খেজুর থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন বি- সিক্স মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।পরিমাণে ৩০০ গ্রাম খেজুর থেকে পাওয়া যায় ৯০ ক্যালোরি,এক গ্রাম প্রোটিন,১৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম,২.৮গ্রাম ফাইবার"। অতএব রসিকজন "খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন।"
খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধার দক্ষ কারিগররা হল শিউলী।ভারি মিষ্টি নামের পেশা। তাঁদের তিনমাসের রসের কারবার।অঘ্রান- পৌষ- মাঘ।বছরের বাকি সময় দিনমজুর বা চাষাবাদ বা মীন ধরে দিন গুজরান করে। স্থানভেদে এঁদের নাম বদলে যায়। কোথাও শিউলী,কোথাও গাছি বা গেছাল,কোথাও আবার ফার্সি।হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন খেজুররস সংগ্রহের কাজ করে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল বাদে প্রায় সব জেলাতেই শিউলীদের দেখা মেলে।বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাতে গাছিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আগে শীতের কাকভোরে বাঁশের বাঁকে শিকা ঝুলিয়ে তাতে কলসি বসিয়ে রস নামাতে হাঁটা দিত গাছিরা। কখনো কোমর থেকে ঝুলত হাোড়ি। এখন অনেকেই সাইকেল ব্যবহার করে। হাটবাজার থেকে কলসি বা ভাঁড় এনে পুনরায় তাকে খড়কুটো জ্বালিয়ে পোড়ানো হয়। কখনো আবার চুনজল দিয়ে কলসিকে জীবাণুমুক্ত করা হয়।শিউলীদের পিঠ বা কোমর ঝুলে তালপাতা আর বাঁশের বাখারি দিয়ে তৈরী ঠোঙা।তাতে থাকে ধারালো হাঁসুয়া।লম্বা খেজুর গাছের খাঁজকাটা খাপিতে পা দিয়ে তরতরিয়ে উঠে যায গাছিরা।তবে আগের দিন রসালো গাছ চিনেঝাঁকড়া কাঁটাপাতাময় খেজুর গাছের মাথার নীচের শুকনো ডাঁটা পাতা পরিষ্কার করে আসে তারা। তারপর সঠিক জায়গায় তৈরী করে 'কঠা'।এবছর শীতে যেদিকে কঠা বানানো হয়,পরের শীতে তা গাছের অন্যদিকে বানাতে হয়।লকলকে ধারালো হাুসুয়া দিয়ে প্রথমে অর্ধচন্দ্রাকারে চেঁছে গাছের সাদা অংশ বের করা হয়। পরে সেখানে হাঁসুয়ার নরু ডগা দিয়ে ইংরেজির ভি(v) আকৃতির চ্যানেল তৈরি করে তাতে লাগানো হয়'চুঙি'।
শিউলীর দক্ষ হাতের কর্মগুণে কঠা থেকে চুঙি বেয়ে রস কলসিতে জমা হতে থাকে।শিউলীদের ভাষায় "খেজুরগাছে রাতের বেলায় রসের জোয়ার আসে"।তবে সব গাছে রসের উৎসার সমান হয় না। গাছিরা গাছ দেখে চিনে নেয়। গাছের পাতা সবুজ হলে রসের জোয়ার, পাতা হলদেটে হলে অনেকটাই ' শুষ্কং কাষ্ঠং'।শিউলীরা ভোরবেলার খেজুর রসকে বলে 'জিরেনরস',আর বিকেলের রসকে বলে'ওলা'।রস ভর্ত্তি কলসি রোদে রেখে দিলেই তা গেঁজিয়ে হয় তাড়ি।চলতি কথায় বলে খেজুরতাড়ি।তখন খেজুরতাড়ি পানে হাল্কা নেশার আমেজ ধরে শরীরে।বিজ্ঞানের পরিভাষায কোহলসন্ধান প্রক্রিয়ায এমন রূপান্তর।রুমাল থেকে নিমেষে হল বিড়াল। তবে বিভিন্ন এলাকায় শীত মরশুমে খেজুরতাড়ি উত্তেজক মাদকরস রূপে বেশ জনপ্রিয়!
শিউলীরা সাধারণত খেজুরগাছে চড়ে দিনে দুবার।শীতের কুয়াশা মেখে ভোরে আর রোদ্দুরে ডুবে বিকেলে।রস এনে ঢালা হয় ' শালতি ' নামক পাত্রে।তবে আগের দিনে মাটির খলা বা কড়াই ব্যবহৃত হত। হালফিলে অ্যালুমিনিয়ামের কড়া বা শালতির চল।খেজুরগুড় তৈরির উনুনকে বলে 'গুড়চুলা'।হাতা মেরে মেরে রস পাকিয়ে গুড় প্রস্তুত হয়।সাদা রস আগুনের পাকে লাল বর্ণ ধারণ করে। কিছুটা কালচে লাল।গন্ধে ম ম করে চারদিক।এমনি সাধারণ রস থেকে তৈরি গুড়কে গাছিরা বলে ' সোডগুড়'। নলেনগুড় হয় জিরেন কাঠের রস থেকে। যে কঠা থেকে রস নিঃসৃত হয়,তাকে দুতিন দিন বিশ্রাম দিলে তাকে বলে জিরেনকাঠ।তারপর সেই জিরেনকাঠের রস থেকে পরম উপাদেয় গন্ধমেদুর নলেন গুড়ের জন্ম হয়।নলেনগুড়ের পরমান্ন,পাটালি,মিষ্টি,সন্দেশ, মোয়াতে মজে থাকে এপার- ওপারবঙ্গের বঙ্গপুঙ্গব।ভোজনান্তে নলেনজাত মিষ্টিতে হয় পেটপ্রিয় বাঙালির " মধুরেন সমাপয়েৎ"! ইদানীং বহির্বিশ্বে খেজুর রসজাত নোলেনগুড়ের যথেষ্ট কদর।ইংল্যান্ড, আমেরিকা,আরব,ইরাণ,কেনিয়া,শ্রীলংকা প্রভৃতি কত দেশের পাকাশালায এবং ভোজের আসরে নোলেনগুড়ের মিষ্টিপদ রসনারঞ্জনে ব্যস্ত। ঝাঁচকচকে অত্যাধুনিক কিচেনে নামকরা অভিজাত মিষ্টিপদের পাশে স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকে নোলেনগুড়ের মিষ্টান্ন।পশ্চিমবঙ্গের দুই চব্বিশ পরগনা,বিশেষ করে জয়নগর,অন্যদিকে পূর্বমেদিনীপুরে খেজুররস ও গুড়ের রমরমা।ওই দুই জেলায় শিউলীর সংখ্যা যথেষ্ট।
গাছিদের কামানি সাকুল্যে শীতের নব্বই দিন। বিভিন্ন জেলায় গাছিরা ছড়িয়ে পড়ে।অস্থায়ী ডেরা বাঁধে।গাছের মালিকদের কাছ থেকে গাছ লিজ নেয়।বিনিময়ে গাছমালিককে প্রতিগাছ পিছু মাসে ৫০ - ৬০ টাকা দ্যায় অথবা তিন- চার কেজি খেজুরগুড় দিতে হয়। বেশিরভাগ শিউলী নিজেরাই হুড় বানায়। পাইকারি ৭০-৮০ টাকা আর খুচরো ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি করে।সকলকে রসের মৌতাতে ডুবিয়ে রাখলেও, মিঠে গুড়ের মিষ্টি আমেচে ভোজনরসিকদের সুখানুভূতি দিলেও শিউলীদের জীবনের বারমাস্যা বড়ই করুণ। শিউলীদের সংখ্যা কমছে পাশাপাশি নবপ্রজন্ম এই পেশার থেকে সরে আসছে। সরকারও শিউলীদের প্রতি চোখতোলা থাকছেন।সেক্ষেত্রে আশার কথা হতে পারে,যদি বিদেশী চাহিদাকে মাথায় রেখে খেজুরগুড়ের বিপণনকে আধুনিক মোড়কে প্রোজেক্ট করে শিউলীদের লক্ষ্মী লাভের সৌভাগ্য খুলে দ্যায়। কিন্তু আরো দুশ্চিন্তার কথা হল খেজুর গাছের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা। সাধারণত এদেশে খেজুরগাছ রোপণ করা হয় না।তার উপর ইটভাটার জ্বালানীতে খেজুরগাছ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেকসময অবাঞ্ছিত হিসেবে কেটে ফেলা হচ্ছে।প্রশ্ন হল গাছ না থাকলে গাছিরা টিকে থাকবে কিভাবে? শীত আসবে,সময় মেনে শীত ফিরে যাবে।শুধু চীরবঞ্চিত থাকবে খাদ্যরসিকদের স্বাদকোরক।বড্ড হতশ্রী লাগবে শীতের পিঠেপুলি উৎসব।অতএব রসিকজন সাধু সাবধান।নিরস হইও না।'মধুহীন কোরো না গো তব মন কোকোনদে'! কিম্বা ' নিরসঃ তরুবর' বলে রসদাতা খেজুর গাছের গোড়ায় কোপ মারা বন্ধ করুন।আর যাঁরা রসের কারিগর তাঁদের প্রতি রসভরা চিত্তে সদয় হোন।রসপায়ী মাত্রই রসদাতার রক্ষা করা গুরুদায়িত্ব। শীতের পিঠে নোলেনে চুবিয়ে মুখগহ্বরে চালান্ দেওয়া মাত্রই স্বাদগ্রন্থি যেভাবে আহ্লাদে আট- দশখানা হয়,খাদ্যনালীর অলিন্দে যে রসের ঝরনা ঝরে,লালাগ্রন্থি যেভাবে পুলকে রসবৃষ্টি করে,তেমন সুখানুভূতি থেকে পরম রসময়ও বঞ্চিত।হে দূর্লভ মনুষ্যজন্ম! রসকষহীন হৃদয় আর রসজাত নোলেন বিহীন শীতঋতু যেন ' মণিহারা ফণী',যেন 'পানী বিনা মীন' দুই সমান।তাহলে হে রসময় খর্জুরবৃক্ষরূপে নিরন্তর রস বর্ষণ করুন- মনুষ্যকূল রসের সাগরে ডু্ে থাকুক নিরন্তর।

তথ্যৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃঋণ--সুমরুদ্দিন খাঁ ( শিউলী, হেঁড়িয়া,পূর্ব মেদিনীপুর)
ইন্টারনেট



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবেন বাসুদেব দাস

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবেন বাসুদেব দাস ৩ মার্চ বুধবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় তুলনামূলক বিভাগে রিফ্রেশার্স কোর্সে বক্তৃতা দেব...