বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১

বিশেষ নিবন্ধ || পাথরের লীলাক্ষেত্র পাথরায় গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র : মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি, Pathra, Mangalprasad Maity

 বিশেষ নিবন্ধ

...............

পাথরের লীলাক্ষেত্র পাথরায় গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

....



   গ্রামের নাম পাথরা। না এ কংসাবতীর তীরে মন্দিরময় পাথরা নয়। এ পাথরা গড়বেতা – ১ ব্লকের খড়কুশমা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন শিলাবতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা গ্রাম পাথরা। এই পাথরা গ্রামে এলেই আপনাকে চমকে উঠতে হবে এখানকার অপূর্ব অপূর্ব সব পাথর খণ্ড দেখে। প্রতিটি পাথর খণ্ডই বিশাল বিশাল আকারের ও মাপের। প্রকৃতির এ এক অপরূপ সৃষ্টি যেন। বিশাল বিশাল মাপের পাথরের চাঁই। চাঁই না বলে পাথরের পাহাড় বললেই চলে। দেখলেই মনে হবে সব পাথরখণ্ডগুলিই বুঝি গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে অদূরে বয়ে চলা শিলাবতী নদীর দিকে। পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেলেই মনে হবে এইসব দৈত্য আকারের পাহাড়প্রমাণ পাথরখণ্ডগুলি এক অপরের সঙ্গে ফিসফিসিয়ে যেন কথা বলছে। আমরা নারী-পুরুষের প্রণয়লীলার কথা জানি। এখানে এই পাথরায় এলে আপনার মনে হবে পাথরখণ্ডগুলি বুঝি একে অপরের সঙ্গে লীলা খেলায় মেতে উঠেছে। এক মায়াবী আকর্ষণ বুঝি প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের। শুধু তাই নয় যেই এখানে আসবে তারই মনে হবে পাথরগুলি বুঝি তার সঙ্গেও কথা বলতে চাইছে, বলতে চাইছে তাদের ইতিহাস। মনে হবে তারা মূক নয়, বধির নয়, জড় নয় – তারা সচল, তারা প্রাণচঞ্চল। এক আশ্চর্য অভূতপূর্ব পাথরের লীলাভূমি। যা এক বিরাট অংশজুড়ে বিদ্যমান। দেখলেই মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগবেই জাগবে কিভাবে সৃষ্টি হল এই পাথর ভূমি?

   গড়বেতা শহর থেকে পূর্বে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি। যা একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান। সেই মঙ্গলাপোতা লাগোয়া একটি মিশ্র সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম খড়কুশমা। হিন্দু-মুসলমান, ভূমিজ, কৈবর্ত্য, মাহিষ্য, ছুতোর, জেলে, কুমোর, রুইদাস, মারোয়াড়ি ইত্যাদি জনজাতির বসবাস এখানে। এই গ্রামের পরেই মাথুরি গ্রাম। এই মাথুরি গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই বনের মাঝে গড়ে ওঠা গ্রাম হল পাথরা। পূর্বে এখানে বেশি লোকজনের বসতি ছিল না। বর্তমানে এই পাথরা গ্রামে বড়ো জনবসতি যেটা গড়ে উঠেছে তা কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। ১৯৭৮ সালে শিলাবতী নদীতে দু’দুবার প্রলয়ঙ্করী বন্যা আসে। সেই বন্যায় নদীর ওপারে অনেক গ্রামের সঙ্গে শিমুলিয়া গ্রামটিও ভেসে যায়। বহু মানুষের বসতবাটি ধূলিসাত্‍ হয়ে যায়। অনেক চাষযোগ্য জমি বালিতে চাপা পড়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে ওই গ্রামের মানুষজন নৌকায় করে পাথরার ডাঙাতে এসে আশ্রয় নেয়। পরে বন্যার জল সরে গেলেও অনেকেই আর শিমুলিয়া গ্রামে ফিরে যায়নি। বছর’ভর বন্যার জ্বালা কে পোয়াবে তাই এখানে এই পাথরাতেই ভিটে বেঁধে বসবাস করতে থাকে। গড়ে ওঠে জনবসতির গ্রাম পাথরা।

   পূর্বে এই পাথরা ছিল একটি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা। ঘন শাল-মহুয়ার গাছে ভরাট ছিল এই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এত ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি ছিল যে সহজে মানুষ এখানে যাতায়াত করত না। ছিল হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভয়। বাঘ–নেকড়ে হামেশাই ঘুরে বেড়াত। এই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই বিরাজ করতেন জাগ্রত এক বনদেবী। এলাকাবাসী যার নাম দিয়েছে ‘পাথরাসিনি’। মকর সংক্রান্তির পরের দিন অর্থাত্‍ ১ মাঘ এখানে  এই বনদেবীর পুজাকে কেন্দ্র করে একটা মেলা বসত যাকে বলা হত ‘পাথরাসিনির মেলা।’ সামনে লোকালয় ছিল না। দূর থেকে লোকজন এসে পাথরাসিনির পুজো দিত। মেলাটি ছিল একদিনের। সকালে শুরু হত। সারাদিন ধরে চলত। সন্ধের মধ্যেই শেষ। বহু মানুষের সমাগম ঘটত কিন্তু রাত্রি নামার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষজন ফিরে যেত ঘরে। বনদেবী পাথরাসিনি নাকি বাঘের রূপ ধরে এখানে আসত। এখন এই বনদেবীর সামনে জঙ্গল নেই, লোকালয় গড়ে উঠেছে। আগেই বলেছি ১৯৭৮ সালের বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় শিমুলিয়া ও আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন উঠে গিয়ে পাথরাতে বসবাস করছে। পাথরাসিনিকে নিয়ে এখানে অনেক লোকশ্রুতি ছড়িয়ে আছে। অনেক পাথরের সঙ্গে এখানে গরুর গাড়ির চাকার মতো দুটি বিশাল আকারের পাথর আছে। একে অন্যের উপর জড়িয়ে। জনশ্রুতি আছে, পাথরের চাকা দুটি একে অন্যকে ছুঁয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে 

শিলাবতীর জলে নামতে যাচ্ছিল। সামনেই কয়েকজন রাখাল বালক গরু চরাচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন দেখতে পায় ওই পাথরের চাকা দুটি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে নদীর জলের দিকে। সাহসী সেই রাখাল বালক ছুটে এসে সেই পাথরদুটির উপর দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক কার্য করে ফেলে। আর কী আশ্চর্য! প্রাকৃতিক কার্য করার সঙ্গে সঙ্গেই গড়িয়ে যাওয়া পাথরদুটি নিশ্চল হয়ে পড়ে। যে অবস্থায় যাচ্ছিল সেই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে যায়। অন্য জনশ্রুতিও আছে যে এঁটো খাবার ছুঁড়ে দিতেই এই পাথর দুটি নিশ্চল হয়ে যায়। সেই পাথর দুটি আজও বিদ্যমান। তখন থেকেই পাথরাসিনির পুজোর চল হয়েছে বলে ধারণা। 

  স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায় এই পাথরাসিনির পুজোর ব্যাপারটা ঐতিহাসিক নায়েক বিদ্রোহের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকতে পারে। তত্‍কালীন বগড়ী পরগনার অধীন মঙ্গলাপোতা, মালবান্দি, ফাঁসিডাঙা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তা এক সময় গভীর জঙ্গলে পরিকীর্ণ ছিল। আর বগড়ীর রাজা ছত্রসিংহের প্রধান সেনাপতি অচল সিং-এর নেতৃত্বে যে নায়েক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়ে তা এই জঙ্গল এলাকাকে ঘিরেই। যার বহু নিদর্শন মালবান্দি, মঙ্গলাপোতা, ফাঁসিডাঙা, গনগনি ডাঙাতে ছড়িয়ে আছে। কারণ ওই সময়ে নায়েক বীররা জঙ্গলের মধ্যে বহু বনদেবীর পূজার প্রচলন করেছিল। মালবান্দি গ্রামে যেমন নায়েক বিদ্রোহের আমল থেকে দেবী ভৈরবীর পূজা হয়ে আসছে তেমনই এখানে এই ‘পাথরাসিনি’র পূজার প্রচলনও তারাই করতে পারে বলে অনুমান যেতেই পারে। অন্যমতে তারও অনেক আগে থেকে এই পুজো হয়ে আসছে। কারণ ‘সিনি’ ঠাকুরের পুজো শুরু হয় জৈনদের সময়ে। সেদিক তীক দেখতে গেলে এই পুজো অনেক পুরোনো। যাইহোক  এই পুজোগুলো কোনো উপবীতধারী ব্রাহ্মণেরা করেন না। এই পুজো করেন তথাকথিত অন্ত্যজশ্রেণির তপসিলি সম্প্রদায়ের নায়েক বা ওই সম্প্রদায়ের মানুষজন।

   বর্তমানে পাথরা গ্রামে ভালো রকম জনবসতি গড়ে ওঠায় এই ‘পাথরাসিনি’ বনদেবীর পুজো ভালোভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এখন মেলাটি একদিনের বদলে দুদিন ধরে হয়। মকর সংক্রান্তি এবং তার পরের দিন। জনবসতি গড়ে উঠলেও এই বনদেবীর স্থানটি এখনো বেশ ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। গাছেরগুল্ম শিকড়-আর লতা-পাতা দিয়ে ঘেরা স্থানটি। মূল দুটো পাথরকে পুজো করা হয় দেবতা জ্ঞানে। দুদিকে অজস্র মাটির ঘোড়া-হাতি। যা ভক্তরা নিয়ে এসে পুজো দিয়ে যান। সম্প্রতি এখানে গিয়েছিলাম। কথা হল এখানকার মানুষজনের সঙ্গে। এই পাথরাসিনির পুজো যারা করেন সেই পুরোহিত ৬৬ বছরের প্রবীণ নিমাই মণ্ডল জানালেন বহুকাল ধরে বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই পুজো করে আসছেন। তাঁর বাবা করেছেন, দাদু পুজো করেছেন। দাদুর বাবা পুজো করেছেন। এখন তাঁরা চন্দ্রকোণা ব্লকের অধীন আকনা গ্রামে থাকেন। পূর্বপুরুষেরা ছিলেন এখানকার মঙ্গলাপোতা গ্রামের বাসিন্দা। অপর পুরোহিত বংশীধারী কোটাল বললেন – তাঁরাও বংশপরম্পরায় এই বনদেবীর পুজো করে আসছেন। তাঁরা পাশেই খড়কুশমা গ্রামের বাসিন্দা। দুই পুরোহিতের মুখ থেকেই একটা কথা বেরিয়ে এল এই বনদেবী পাথরাসিনি বহুকাল আগে থেকেই এখানে পূজিত হয়ে আসছেন। এই দেবীর মাহাত্ম্য বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই দেবীকে ঘিরে বহু লোকশ্রুতি ছড়িয়ে আছে। গরু-বাছুর হারিয়ে গেলে এখানকার মানুষজন মানত করেন তা ফিরে পাওয়ার জন্য। আরও বহুকারণে মানুষ এখানে এই দেবীর কাছে ছুটে আসেন। সংসারের মঙ্গল কামনায়, শুভ কাজে দেবীর কাছে বর প্রার্থনা করেন। 

   মাথুরি গ্রামের বাসিন্দা ৪৩ বছরের যুবক সুশান্ত মাইতি বললেন- বর্তমানে এই ‘পাথরাসিনি’ পুজো ও তার মেলাকে ঘিরে ছ’জনের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। মাথুরি, পাথরা ও শিমুলিয়া এই তিনটি গ্রামের দুজন করে সদস্য আছেন। সুশান্ত মাইতি, ভবসিন্ধু সাউ প্রমুখেরা জানালেন। পাথরা তাদের কাছে একটি ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান। দেবী পাথরাসিনি ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রচুর পাথর। অফুরন্ত সে পাথরভাণ্ডারকে রক্ষা করা প্রয়োজন। যেভাবে নানা জায়গা থেকে অসাধু উপায়ে পাথর অন্যত্র চলে যাচ্ছে সেইজন্য সব সময় তাদের মনে ভয় এখানকার এই পাথরও অন্যত্র চলে যাবে না তো? কতদিন তাঁরা বুক আগলে রক্ষা করবেন অপূর্ব এই পাথর ক্ষেত্রকে? তাই এলাকার মানুষের দাবি সরকারিভাবে এই জায়গাটি ঘিরে দেওয়ার ব্যবস্থা হোক। এখানে পাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই হৃদয়গ্রাহী তা রাজ্যের বিভিন্ন মানুষের তুলে ধরার জন্য এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে গড়ে তুলতে পারলে ভালো হয়। 

   সত্যিই পাথরার পাথরের যে অপরূপ লালিমা তা দেখলেই মন ভরে উঠবে। কত কত যে পাথরের খণ্ড কতরকম অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। যেন পাথরের একটা আচ্ছাদন পুরো এলাকা জুড়ে। কিছু কিছু পাথরের খণ্ড নেমে এসেছে চাষের জমির উপর। সামনেই দোমোহনি। এখানে শিলাবতী নদী দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সে এক ভালোলাগার স্থান। তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে পশ্চিমে মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি। পূর্বে আট কিলোমিটার পূর্বে মালবান্দি। যে মালবান্দি নীলকুঠির জন্য বিখ্যাত। আছে মনোরম জঙ্গল। সব মিলে এখানে এই পাথরাতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতেই পারে। এটি হলে এখানকার ইতিহাসখ্যাত সুদৃশ্য সব পাথর খণ্ড যেমন রক্ষা পাবে তেমনই একটা দ্রষ্টব্য স্থানও গড়ে উঠবে। প্রয়োজন আছে সরকারি উদ্যোগের ও সদিচ্ছার।

(*)

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি 

গ্রাম-রাজবল্লভপুর 

পোস্ট-মালবান্দি

জেলা-পশ্চিম মেদিনীপুর 

পিন-৭২১১২৭

মোবাইল-৯৭৩২৬৪৯২৭৮               

           


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শব্দব্রাউজ ৩০২ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-302, Nilanjan Kumar

  শব্দব্রাউজ ৩০২ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-302, Nilanjan Kumar শব্দব্রাউজ ৩০২ || নীলাঞ্জন কুমার বিপাশা আবাসন । তেঘরিয়া মেন রোড । কল...