রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১

কথা–বার্তা || হোমেন বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudeb Das

 কথা–বার্তা

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস




আমি 'আজকাল' এর সাংবাদিক হয়ে থাকা সময়ের কথা। বছরে কয়েকবার বরাক উপত্যকায় গিয়ে থাকতে হত বলে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিজন লেখক এবং সাংবাদিকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে রকমই একজন লেখক বন্ধু একদিন শিলচরে আমাকে বললেন–' হোমেনদা, আপনাদের অসমিয়া লেখকরা অতি অদ্ভুত মানুষ। সেরকম মানুষ আমি ভারতের অন্য কোনো জায়গায় দেখিনি। আপনার সঙ্গে অবশ্য আমার কেবল শিলচরেই দেখা হয়েছে,আর এখানে দেখা পাওয়া অবস্থায় আপনাকে স্বাভাবিক মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু গুয়াহাটিতে ফিরে গিয়ে আপনিই বা কী মূর্তি ধারণ করেন সে কথা আমি জানি না।'

আমি বন্ধুটির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকানোয় তিনি ব্যাখ্যা করতে আরম্ভ করলেন–' বছরে তিন চার বার আমি গুয়াহাটিতে যাই। সেখানে থাকা সময়টুকুতে বিখ্যাত অসমিয়া লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছা করে– ঠিক কলকাতায় গেলে যেভাবে ইচ্ছা করে বিখ্যাত বাঙালি লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে। বাঙালি লেখকদের সঙ্গে দেখা করাটা খুবই সহজ। যার কাছেই যাই,তিনিই আদর-যত্ন করে বসতে দেন,আন্তরিক ভাবে কথা বলেন,বিদায় নেবার সময় অন্তত ভদ্রতার খাতিরে পুনরায় আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু অসমিয়া লেখকদের আচরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। দেখা করার উদ্দেশ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে  যখন তাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি,তখন তাদের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারি যে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে তারা বিরক্ত হচ্ছেন,তাদের নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বরই তাদের বিরক্তি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে দেয়।অনেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে দর্শনার্থীকে দর্শন দিতে অস্বীকার করেন। ভদ্রতার খাতিরে কেউ বাড়িতে ডাকলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলে কোনো সুখ পাওয়া যায় না; মিনিট কয়েক কথা বলার পরে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে হিম-শীতল ভদ্রতা ছাড়া অভ্যাগতকে দেবার তাঁর অন্য কিছু নেই।তাঁর কাছে দ্বিতীয় বার না আসার জন্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতে হয়। মোটের উপর আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে এরকম একটি ধারণা হয়েছে যে অসমিয়া লেখকরা অন্যের সঙ্গে গলাগলি করতে খুব একটা বেশি ভালোবাসে না; নিজের কাজ এবং নিজের পরিবারের মধ্যে তাঁরা নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। এখন আপনি আমাকে বলুন– আমার ধারনাটা শুদ্ধ না ভুল?

এর আগে আমি কখনও এরকম একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি, তাই আমি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুটির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। কিন্তু মনে মনে আমি স্বগতোক্তি করলাম–' অন্য অসমিয়া লেখকের কথা আমি বলতে পারিনা কিন্তু গুয়াহাটিতে আমার সঙ্গে দেখা হলে তোমাকে যে এরকম একটি ধারণা নিয়েই আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে হত সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।' কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমি শিলচরের বাঙালি বন্ধুটিকে বললাম–' মানুষ নিজের মুখটা নিজে দেখতে পায় না,নিজের মুখটার বিষয়ে একটা ধারণা করার জন্য মানুষকে আয়নায় নিজের মুখের প্রতিবিম্ব  দেখতে হয়। ঠিক সেভাবে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ জানার জন্য অনেক সময় অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে হয়। অসমিয়া লেখকদের বিষয়ে আপনি এইমাত্র যে কথাটা আমাকে বললেন সেই কথাটা এর আগে আমার মনে কখনও আসেনি। কিন্তু আপনার কথা শোনার পরে আমি এখন অনুভব করছি যে আপনার কথায় কিছুটা হলেও সত্যতা থাকতে পারে। প্রত্যেক জাতির মানুষের কিছু স্বকীয় জাতিগত বৈশিষ্ট্য থাকে। উদাহরণস্বরূপ ইংরেজদের গোমড়া স্বভাবের মানুষ বলে বলা হয়। তারা উপযাচক হয়ে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে না, আর অন্যরা তাদের সঙ্গে উপযাচক হয়ে কথা বলতে চাইলেও তাঁরা একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আমি অবশ্যই একথা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি না, বই পড়ে এবং অন্যের মুখ থেকে শুনে বলছি। ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক মন্টেস্কুর মতে ইংরেজরা সবসময়ই এত ব্যস্ত হয়ে থাকে যে ভদ্র বা মার্জিত হওয়ার  জন্য তারা সময় পায়না। বাঙালিদের স্বভাব এর ঠিক বিপরীত। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বেশি সময় মুখ বন্ধ করে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কথা বলতে না চাওয়া  মানুষকেও উপযাচক হয়ে কথা বলে কিছুক্ষণের মধ্যে আপন করে নেওয়ায়  তারা ওস্তাদ। বাঙালিরা যে অসমিয়াদের তুলনায় অনেক বেশি কথা বলতে ভালোবাসে, সঙ্গপ্রিয় এবং উচ্ছ্বাসপ্রবণ সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আড্ডা বাঙ্গালীদের সৃষ্টি। দেখে দেখে অসমিয়ারা আড্ডা দিতে মাঝে মাঝে চেষ্টা করলেও অল্পভাষী এবং উচ্ছ্বাসরহিত অসমিয়াদের স্বভাবের সঙ্গে আড্ডা নামের জিনিসটা খাপ খায় না। কলকাতার কফি হাউস জাতীয় প্রতিষ্ঠান যে অসমে দেড়শ দুশো বছরের পরেও হয়ে উঠতে পারল না তার প্রধান কারণ এটা নয় যে গুয়াহাটিতে উপযুক্ত জায়গা বা পরিবেশের অভাব।... অসমিয়া মানুষদের বিষয়ে আপনার ধারনাটাই বোধহয় শুদ্ধ; পৃথিবীর বহু জাতির মানুষদের চেয়ে  অসমিয়ারা কথা কম বলে, উচ্ছ্বাস বা  আবেগ কম করে প্রকাশ করে, আর পারতপক্ষে অন্যদের থেকে,একটা নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করে চলে।'

কোনো মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জানিয়ে আমাকে ফোন করলেই  পনেরো বছর আগে শিলচরের বাঙালি বন্ধুর সঙ্গে হওয়া ওপরের কথাগুলি আমার মনে পড়ে যায়। আমি নিজে একথা জানি যে আমার আত‍্যন্তিক  নিঃসঙ্গতা প্রীতি এবং নীরবতা প্রীতি প্রায় মনোবিকারের  পর্যায়ে পড়ে। সমস্ত অসমিয়া মানুষই আমার মতো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে সমস্ত অসমিয়া নন এমন মানুষের সঙ্গে আমি দেখা করতে না চেয়ে ঘুরিয়ে পাঠাই তাদের কেউ কেউ কেবল আমার আচরণের ওপর ভিত্তি করে সাধারণভাবে অসমিয়া মানুষ সম্পর্কে ভুল ধারণা করাটা অসম্ভব নয়।কিন্তু আমার নীরবতা প্রীতির অর্থ এটা নয় যে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে মোটেই  ভালোবাসি না। সবসময় না হলেও মাঝে মধ্যে মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি ব্যাকুলতা অনুভব করি। আমি কি ধরনের কথাবার্তা বেশি পছন্দ করি তার তিনটি নমুনা নিচে দেওয়া হল।

বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর Portraits From Memory নামের গ্রন্থে জোসেফ কনরাড সম্পর্কীয় প্রবন্ধটিতে লিখেছেন–' জোসেফ কনরাডের সঙ্গে  আমার প্রথমবার দেখা হতেই আমরা দুজন এভাবে কথা বলতে শুরু করলাম যে কথা বলার সময়ই আমাদের দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বেড়ে যেতে লাগল। ভাসা-ভাসা অর্থহীন কথার স্তরের পর স্তর অতিক্রম করে আমরা অবশেষে উপনীত হলাম কেন্দ্রস্থ অগ্নিকুন্ডে।এই ধরনের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আগে কখনও হয়নি। এরকম একটি জায়গায় একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমরা আধা আতঙ্কিত এবং আধা রোমাঞ্চিত হলাম এবং পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই সময়ে আমরা যে ধরনের আবেগ অনুভব করেছিলাম,তা ছিল তীব্র প্রেমের মত নিবিড় এবং একই সঙ্গে সর্বগ্রাসী। হতবুদ্ধি হয়ে আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিলাম এবং জীবনের প্রাত্যহিক সাধারণ কথাগুলির মধ্যে আমি পথ খুঁজে পেলাম না।

দ্বিতীয় নমুনাটি দিতে চাইছি পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা থেকে । অবশ্য এই সত্য কাহিনিটি আমার একটি পূর্ব প্রকাশিত প্রবন্ধে(নৈরাশ্য, নৈঃসঙ্গ এবং যন্ত্রনা) ইতিমধ্যে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য বিষয়ের প্রয়োজনে একই কাহিনিকে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করতে চাইছি।

পেড্রো গার্ফিয়াস স্পেন দেশের কবি। নেরুদার বন্ধু। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে তিনি স্বদেশ থেকে পালিয়ে এসে  স্কটল্যান্ডে একজন লর্ডের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কাছেই ছিল একটি মদের দোকান।গার্ফিয়াস প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মদের দোকানে যাওয়ার অভ্যাস করলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ইংরেজি ভাষার ই- অক্ষরটিও জানেন না, তাই নীরব হয়ে বসে সম্পূর্ণ একা মদ খেয়ে থাকা ছাড়ার বাইরে তার অন্য কিছু করার উপায় ছিল না।গার্ফিয়াসের প্রতি দয়া পরবশ হয় একদিন মদের দোকানের স্কটিশ মালিক তার সঙ্গে মদ খাবার জন্য গার্ফিয়াসকে নিমন্ত্রণ করলেন। দুজনেই উনুনের পাশে বসে অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু তাদের কেউ কারও ভাষা জানেন না বা বুঝতে পারেন না, তাই দপদপ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পটপট শব্দ ছাড়া দুজন মানুষের মধ্যে সেই বিশাল নীরবতা ভাঙ্গার অন্য কোনো শব্দই ছিল না। কিন্তু একে অপরের ভাষা জানেন না বলেই কতক্ষন আর এভাবে চুপচাপ মদ খাওয়া যায়? কয়েকদিন পরে দুজনই মুখ খুলতে লাগলেন।

কেউ কারও কথা বুঝতে পারেন না। কিন্তু রাতের পর রাত দুজন পরস্পরের উদ্দেশ্যে অনর্গল কথা বলে যায়। দুজনেই পরস্পরের কথা শুনে থাকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে। প্রত্যেকেই নিজের কথা বলে অন্যে বুঝতে না পারা ভাষায়। অথচ দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের আত্মীয়তা নিবিড়তা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠতে থাকে। অবশেষে অবস্থা এমন হল যে প্রতি রাতে একে অপরের সঙ্গে দেখা না হলে আর কথা না বললে কেউ থাকতে পারেন না।

লোভনীয় কথাবার্তার তৃতীয় নমুনাটি নেওয়া হয়েছে ওয়র্ডসওয়ার্থের জীবন থেকে। ওয়র্ডসওয়র্থ  এবং কোলরিজ দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। দুজনেই যুক্তভাবে প্রকাশ করা 'Lyrical Ballads' নামের কাব্যগ্রন্থ ইংরেজি সাহিত্যে যুগান্তর এনেছিল। অবশ্য দুজনের স্বভাবের খুব বেশি মিলছিল  না। কোলরিজ  ছিলেন কথাবার্তায় অত্যন্ত চৌকশ,কথা বলতে পেলে তিনি সবকিছু ভুলে যেতেন। অন্যদিকে,ওয়র্ডসওয়র্থ ছিলেন মাপজোক করে কথা বলা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ।

একদিন ওয়র্ডসওয়র্থ কোলরিজের বাড়িতে বেড়াতে এলেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে তিনি এক জায়গায় বসলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার মতো সময় তিনি  সম্পূর্ণ নীরব হয়ে বসে রইলেন।ওয়র্ডসওয়র্থের স্বভাব ভালো করেই জানতেন বলেই কোলরিজের মুখ থেকে একটি শব্দও বের হল না। বিদায় নেবার সময় ওয়র্ডসওয়র্থ বললেন–' আজ সন্ধ্যা বেলাটা খুব ভালোভাবে কাটল। একটি অপূর্ব সুন্দর সন্ধ্যা।'

একেই বলে কথা বলা। মাঝেমধ্যে আমারও খুব ইচ্ছা করে এভাবে কথা বলতে।


------------










কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...