শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা || হোমেন বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Basudeb Das

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস



চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে' উদয়ের পথে' নামে একটি বাংলা কথা ছবি খুব নাম করেছিল। যতদূর মনে পড়ে, ছবিটির কাহিনির লেখক ছিলেন জ্যোতির্ময় রায়। পরিচালকও তিনি ছিলেন। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রাধারমন ভট্টাচার্য এবং বিনীতা  রায়। আমি কিন্তু ছবিটা দেখতে পেলাম না, কারণ আমি শহরে পড়তে যাবার আগেই সিনেমাটা।সিনেমা হল থেকে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের মুখে ছবিটির খুব সুখ্যাতি শুনে বইটি জোগাড় করে পড়লাম।কাহিনিটার মূলকথাটুকুর বাইরে বাকি বেশিরভাগ কথাই এখন ভুলে গেছি; কিন্তু ভুলতে পারিনি উপন্যাসটিতে নায়িকার উদ্দেশে তার পিতা বলা এই কথাগুলি–'আমার ভালোবাসা চাইনা ,আমার চাই শ্রদ্ধা।'

নায়িকার পিতা প্রচন্ড অভিমানি ভালোবাসা চাই না বলে বললেন যদিও আমরা তার কথা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারিনা। মানসিকভাবে বিকৃত লোক ছাড়া এ ধরনের কোনো মানুষ থাকতেই পারে না যে কারও না কারও ভালোবাসা চায়না। কিন্তু মানুষের জীবনে জটিলতার অন্ত নেই। ভালোবাসার অভাব মানুষের হৃদয়ে একটা বিষম শূন্যতার সৃষ্টি করলেও কখনও কখনও মানুষকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মধ্যে ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে শ্রদ্ধাকে বেছে নিতে হয়। 'উদয়ের পথে'র পিতাও মেয়ের ভালোবাসা নিশ্চয় চেয়েছিল। কিন্তু শিল্পপতি পিতার শ্রমিক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ওঠা মেয়ে যখন তাকে বলে যে সে বাবাকে ভালোবাসে কিন্তু শ্রদ্ধা করেনা, তখন পিতাকেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে হল যে ভালোবাসার চেয়ে তিনি অনেক বেশি মূল্য দেন শ্রদ্ধাকে।

যে মানুষ ভালোবাসার সঙ্গে সমান পরিমাণে শ্রদ্ধাও লাভ করে তার চেয়ে ভাগ্যবান মানুষ আর কে আছে? কিন্তু সমস্ত মানুষের সেই সৌভাগ্য হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ভালোবাসা নির্ভর করে জৈবিক কারণ বা সম্পর্কের ওপরে। কিন্তু নিজের চেষ্টা বা সাধনা ছাড়া কেউ অন্যের শ্রদ্ধা পেতে পারে না। কিন্তু পিতা-মাতা-সন্তানকে বা সন্তান পিতা মাতাকে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়েই ভালোবাসে। পিতা-মাতা  সন্তানের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাদের আদর্শ চরিত্রের মানুষ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সন্তান চরিত্রহীন পিতা-মাতাকে বা পিতা মাতা অবাধ্য এবং উচ্ছৃঙ্খল সন্তানকে অন্তর থেকেই ঘৃণা করে, কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা মমতার বন্ধন সেই ঘৃণা ছিন্ন করতে পারেনা। সংসারে এই ধরনের পত্নীর সংখ্যা খুব কম হবেনা– যারা নিজের স্বামীর প্রতি সংস্কার বা লিবিডোর এর বশবর্তী হয়ে কম বেশি পরিমাণে প্রেম অনুভব করে; কিন্তু একেবারেই শ্রদ্ধা অনুভব করে না। বহু বছর আগে নবাব সিরাজদৌলার বিষয়ে লেখা একটি জীবনী মূলক প্রবন্ধে পড়েছিলাম যে নবাব ছিলেন অত্যন্ত লম্পট এবং চরিত্রহীন; কিন্তু তবুও তিনি তাঁর পত্নীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। প্রবন্ধের লেখক এই বলেও মন্তব্য করেছেন যে নারী চরিত্রের এটি একটি দুর্বোধ্য রহস্যঃ অনেক সময় তারা অপাত্রে উজাড় করে দেয়  অন্তহীন প্রেম। কথাটির সরল অর্থ এটাই হয় যে নারীর প্রেম পাওয়ার জন্য পুরুষের বিশেষ কোনো সাধনা না করলেও হয়; প্রকৃতি তাকে যে বিশেষরূপে সাজিয়েছে তাই কোনো এক বিশেষ নারীকে তার প্রতি আকৃষ্ট করবে। কিন্তু সেই নারীর চোখে নিজেকে শ্রদ্ধার যোগ্য করে তুলতে হলে তার নিজের দিক থেকে কিছু চেষ্টার দরকার হবে। অনেক বিবাহিত জীবনে প্রেমও নেই শ্রদ্ধাও নেই । সেই ধরনের দম্পতি নিশ্চয় চরম দুর্ভাগা। অনেক বিবাহিত জীবনে প্রেম এবং শ্রদ্ধার যেকোনো একটি আছে, দুটি নেই। তাদের জীবনে চিরকাল একটা শূন্যতা থেকে যায়। সেটাই একমাত্র পরিপূর্ণ সুখী বিবাহিত জীবন– যেখানে স্বামী এবং পত্নী পরস্পরের প্রতি তীব্র প্রেমের সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধাও অনুভব করে। কিন্তু তাদের জীবনেও কখনও এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে কি–যে পরিস্থিতিতে' উদয়ের পথে'র পিতা-কন্যার উদ্দেশ্যে বলার মতো তারাও পরস্পরের উদ্দেশ্যে বলতে বাধ্য হয়– 

'প্রেম না হলেও আমার চলবে, প্রেমের চেয়েও আমি  বেশি করে চাই শ্রদ্ধা।'

যে কোনো দম্পতির জীবনে এরকম সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। সেই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব তাদের কাছে ছেড়ে দিয়ে আমরা সমাজের অন্য একটি ক্ষেত্রে আসি । একটু গভীরভাবে ভাবলেই  দেখা যাবে যে মানুষ শ্রদ্ধার চেয়ে ভালোবাসাকে বেশি মূল্য দিতে গেলেই জীবনের বা সমাজের ক্ষতি করতে পারা নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। পিতা যদি সৎ বা অসৎ যে কোনো উপায়ে বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করে সন্তানের সমস্ত আবদার পূরণ করে তাহলে সন্তান সেরকম পিতাকে  নিশ্চয় ভালোবাসে ।

কিন্তু সন্তানের চরিত্র গঠনের জন্য তার কিছু আবদার অপূরণ হয়ে থাকা উচিত নয় কি? পিতা-মাতা যদি  সন্তানের ভালোবাসার চেয়ে  শ্রদ্ধাকে বেশি মূল্য দিতে শেখে, অর্থাৎ তারা সন্তানের চোখে  নিজেকে শ্রদ্ধার যোগ্য করে তোলার জন্য কিছু নৈতিক গুণ আয়ত্ত করে তাহলে তার ফলে সন্তানের যত  মঙ্গল হবে ততখানি মঙ্গল সন্তানকে ধনসম্পত্তি দিয়ে পুঁতে ফেললেও হবে না। অন্যের ভালবাসা পাওয়ার জন্য অনেক সময় নিজে কিছু দুর্বল হওয়ার প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ পিতা-মাতা স্নেহাধিক‍্যের বশবর্তি হয়ে অনেক সময় সন্তানকে খারাপ বা ক্ষতিকারক কাজে বাধা দেয় না– যদি সন্তান দুঃখ পায় বা তাদের খারাপ পায় এই ভেবে! কিন্তু অন্যের শ্রদ্ধা পাবার জন্য অনেক সময় কঠোর হওয়ার প্রয়োজন হয়। মানুষের মঙ্গলের জন্য কখনও  অপ্রিয় কথা বলে তাদের বিরাগভাজন হতে হয়। অন্যের ভালোর জন্য যে মানুষ প্রয়োজনের সময় কঠোর হতে পারে তাকে হয়তো মানুষ ভালোবাসে না কিন্তু প্রত্যেকেই তাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করে। যে সমস্ত মানুষ ভালোবাসার চেয়ে শ্রদ্ধাকে সবথেকে বেশি মূল্য দেয় তারাই সমাজের প্রকৃত মঙ্গল সাধন করে। শ্রদ্ধাকে বিন্দুমাত্র মূল্য দিতে না চাওয়া মানুষ কীভাবে সমাজের সর্বনাশ করতে পারে সে কথা আজকের অসমে আমরা প্রত্যেকেই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। 


--------------



লেখক পরিচিতি- ১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি ংপকাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Anandamangal, Soumitra Roy।। আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়

আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়