মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০২২

স্মৃতিকথা- ১৮ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার, Nilanjan Kumar

স্মৃতিকথা- ১৮ ।। এই আমি চরিত্র


নীলাঞ্জন কুমার






                             ( গত মাসের পর)


                                      ।। ১৮।।


একথা সত্যি গড়বেতার জীবন থেকে অনেক বেশি আমার রাধানগরের কথা আজও মনে পড়ে ।এখানে যে ক'জন  বন্ধু পেয়েছি তারা ছিল আমার সমমর্মী । গড়বেতার কুটিলতা থেকে এখানে বেশ মুক্ত ছিলাম ।সকাল হলে মাঝে মাঝে গড়বেতা স্টেশনের প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করতাম ।স্টেশনের সামনে অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ আমায় টানতো ।সেখানে থেকে স্টেশন পেরিয়ে অনেক সময় বেশ কিছু দূর যেতাম । সেখানে ছিল রাধানগরের মতো আর একটা গন্ঞ্জ। যদিও রাধানগরের মতো অত বেশি মানুষের বসবাস সেখানে ছিল না। আমরা রাধানগরে আসার কিছুদিন পরেই বেশ কিছু বাস চলাচল শুরু হয়েছিল গড়বেতা রাধানগরের মধ্যে ।   তাতে গড়বেতা স্কুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সুবিধেজনক হয়ে উঠলো । তখন বাবাকে সাইকেল চড়িয়ে আমায় নিয়ে যেতে হত না গড়বেতায় । বিজয়শ্রী বাসটি নিয়মিত সাড়ে ন'টা তে আসতো রাধানগরে , আমরা গড়বেতা স্কুলে পৌছাতাম সাড়ে দশটার আগে,  আসার ক্ষেত্রে বাসের সুবিধাও পেয়েছি ।
                   রাধানগরে চলে যাবার পর অনেকেই আমার পেছনে লাগা ছেড়ে দিয়েছিল । কারণ তাদের কাছে আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলাম । মাত্র দু-একজন আমায় টার্গেট করার সুবিধা ছাড়েনি । যেহেতু প্রথম থেকেই আমি কিছুটা ধৈর্যশীল তাই বিষয়টা তেমন জমে ওঠেনি কোনদিন । বুঝতে পারতাম তারা ঈর্ষা আর হিংসেতে পুড়তো , আমার বৈশিষ্ট্য,  বাবার পদমর্যাদা,  আমাদের জীবনধারণের কারণেই ।
                    তবে রাধানগরে বেশ ভালোভাবেই গড়ে উঠেছিল আমার স্কুলপাঠ্যের প্রতি অমনোযোগিতা।
সংসার চালানোয় তিতিবিরক্ত বাবা মা আমার পড়াশোনার ক্ষেত্রে তেমন ধ্যান দিতে পারেনি । যদিও আমার জন্য প্রাইভেট টিচারের ব্যবস্থা ছিল । সময়টা ছিল নকশাল আমলের প্রথম পর্বের  । একদিন ভরাভরতি স্কুল চলাকালীন স্কুলে কয়েকটি বোমা পড়লো । ছাত্র আর মাস্টারমশাইদের  নিরাপত্তার কথা ভেবে হেড মাস্টারমশাই স্কুল ছুটি দিয়ে দিলেন সেইদিন । ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি নকশালদের  বিশেষ অনিহার প্রভাব দারুন পড়েছিল গড়বেতা হাইস্কুলে । তখন আমি ক্লাস এইটে । সে বছর স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষায় সব টিচার গার্ড দিতে অস্বীকার করায় সারা স্কুল জুড়ে চললো ব্যাপক গণ টোকাটুকি  । প্রত্যেকের মনে কি মজা!  তখন সকলে বাচ্চা । এই মজা যে ভবিষ্যতে সাজা হবে তা কি মাথায় আছে!  ফলে যা হবার তাই হল । প্রতিটি ছাত্র পাস করে উঁচু ক্লাসে চলে গেল । অন্য বছরে বাৎসরিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন যে টেনসন হত, তা এবছর উধাও । মহানন্দে ক্লাস নাইনে গিয়ে নাচানাচি শুরু করে দিলাম ।
             নাইনে ওঠার পর নতুন স্কিম নেওয়ার অর্থাৎ সায়েন্সর জন্য স্কুলে একটা পরীক্ষা নেওয়া হয় ।আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম ও পাস করেছিলাম । শেষে সায়েন্স নিয়ে আমার নতুন স্ট্রিম শুরু হয় । যদিও আমার সায়েন্স পছন্দসই ছিল না , তবু মা বাবার ইচ্ছেতে আমায় তা নিতে হয়েছিল । কারণ বাড়ির আর কোন ছেলে মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়েনি বলে । যাতে পরবর্তীকালে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার প্রতি আমার বিশেষ অনীহা দেখা দিয়েছিল  । এর মাস দুয়েকের মধ্যে বাবা মেদিনীপুরের শহরের  কাছাকাছি শালবনিতে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিলো শালবনির পন্ঞ্চায়েত আফিসারের সঙ্গে । বাবা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছিল গড়বেতা থেকে বেরিয়ে যেতে । কিন্তু মনোমত জায়গায় পোস্টিং হচ্ছিল না। মা বাবার পরিকল্পনা ছিল আবার মেদিনীপুর শহরে গিয়ে বসতি স্থাপন । পরবর্তীতে মেদিনীপুরে নিজের বাড়ি করে স্থায়ী বসবাস । দাদা তখন শালবনির আগের স্টপেজ গোদাপিয়াশালে স্কুলের টিচার । বাবা শালবনিতে বদলি হলে এক ঘণ্টাতে বাসে করে মেদিনীপুরে ফিরতে পারবে । দাদাও তাই করবে । সুতরাং সকলে মিলে একসঙ্গে থাকা যাবে । বাবার ট্রান্সফার বিষয়টি পেকে উঠলে বাবা মেদিনীপুর শহরে বাড়ি খোঁজা শুরু করলো । বাবার বন্ধু নির্মল দাশগুপ্ত স্থানীয় নাটকের দল 'নাট্যরূপার' কর্ণধার, মেদিনীপুর
মিউনিসিপলিটির কমিশনার, কর্ণেলগোলা নামে একটি এলাকায় এক পুরোনো দোতলা বাড়িতে ভাড়ার ব্যবস্থা করলো । এরপর আমায় নিয়ে বাবা মেদিনীপুর শহরে এলো স্কুলে ভর্তির জন্য । মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে যাতে ভর্তি হতে পারি ক্লাস নাইনে সায়েন্স নিয়ে তার জন্য ব্যাপক চেষ্টা করলেন নির্মল কাকু আর বাবা। শেষমেশ আমি সায়েন্স নিয়ে ক্লাস নাইনে ভর্তি হলাম । গড়বেতা স্কুলের থেকে বেশ আলাদা ছিল এই স্কুল । ভালো লাগছিল যে স্কুলে একদিন দাদা পড়েছে সে স্কুলে আমিও পড়াশোনা করব । বাবা ট্রান্সফার লেটার পেলে আমরা কর্ণেলগোলাতে রাধানগর থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এলাম । তারপর বাবা ও আমি মেদিনীপুর থেকে ট্রাকে করে রাধানগরে গিয়ে সব জিনিস নিয়ে কর্ণেলগোলাতে পৌছোলাম ।শুরু হল মেদিনীপুরে আমাদের আবার নতুন জীবনযাত্রা ।
                                                       ( চলবে)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Student Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...