চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

সোমবার, ১১ জুলাই, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ১৫ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস

 হে আমার স্বদেশ- ১৫

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস




  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(১৫)

বিয়ের তিন দিন পরেই লক্ষ্মীনাথ মেসে ফিরে এল। তাকে মেসে ফিরে আসতে দেখে সঙ্গীরা অবাক হল। আসলে, তারা ভেবেই নিয়েছিল যে ঠাকুরবাড়ির কন্যাকে বিয়ে করেছে যখন অন্যান্য জামাইয়ের মতো লক্ষীনাথও শশুর বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করবে। কিন্তু তাকে আগের মতো মেসে থাকতে দেখে মেসের সদস্যরা আনন্দিত হয়ে উঠল।

বিয়েতে নিমন্ত্রণ করে প্রত্যেকের জন্য লক্ষ্মীনাথ ভুরিভোজের ব্যবস্থা করেছিল। তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলেও দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এলেন না। এই দুজন ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথের অত্যন্ত সম্মানের। তাদের একজন হলেন গঙ্গাগোবিন্দ ফুকন। ঠাকুরবাড়ির কন্যার সঙ্গে বন্দোবস্ত হওয়া বিয়ে ভেঙ্গে দেবার জন্য শিবসাগর থেকে তার কাছে টেলিগ্রাম এসেছিল, নিমন্ত্রণ জানানোর সময় তিনি যেভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করার ভাব দেখালেন, তার জন্যই ফুকন মহাশয় এলেন না বলে লক্ষ্মীনাথ অনুমান করল। মুখে বিরোধিতা না করলেও তিনি ভেতরে ভেতরে লক্ষ্ণীনাথের ঠাকুরবাড়ি কন্যাকে বিয়ে করাটা মেনে নিতে পারেননি বলে মনে হল। কিন্তু কিছুদিন পরেই লক্ষ্মীনাথের এই ধারণাটা ভুল বলে প্রতিপন্ন হল। গঙ্গাগোবিন্দ ফুকন নববিবাহিত দম্পতিকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে সমাদরে খাওয়ালেন এবং গোল্ড স্মিথের ' ডেজার্টেড ভিলেজ' শীর্ষক বইটি উপহারস্বরূপ লক্ষ্মীনাথের হাতে তুলে দিলেন। একই ঘটনা ঘটল রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়ার ক্ষেত্রে। বিয়ের দিন কলকাতা থাকা সত্বেও তিনি সপরিবারে আসতে পারেননি। দশ দিন পরে বরুয়া মহাশয় নিজেই মেসে এসে লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করলেন। বাড়িতে অসুবিধা থাকার জন্য বিয়েতে আসতে পারেন নি বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং ফুকন মহাশয়ের মতোই বর কনেকে এক বেলা খাবার জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানালেন।

সেই অনুসারে নতুন কন্যা প্রজ্ঞাকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ রায়বাহাদুর বরুয়ার বাড়িতে গেলেন। তাঁর বিদূষী পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া রন্ধন বিদ্যায় নিপুণ। সঙ্গে বি এ পাশ করা তাদের কন্যা স্বর্ণলতার সহযোগিতায় নানাবিধ সুস্বাদু-ব‍্যঞ্জনে সস্ত্রীক লক্ষ্মীনাথ আপ্যায়িত হল। তৃপ্তি সহকারে খেল। খাওয়া দাওয়ার পরে বৈঠকখানা ঘরে বসার পরে শ্রীবরুয়া লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে বলল,' মামা তুমি নাকি যৌতুকের ধন গ্রহণ কর নি?'

প্রজ্ঞা কিছুটা ক্ষোভ এবং উষ্মার সুরে জানাল যে কর্তা মহাশয় তার কাছারির খাজাঞ্চির মাধ্যমে দশ হাজার টাকার একটা পুঁটলি বানিয়ে রেখেছিল। এভাবে নগদ দেওয়াটা ঠাকুরবাড়ির নিয়ম। সব জামাইকেই দেওয়া হয়েছে। সবাই গ্রহণ করে। তা সে বি এ এম এ পাস হোক বা বিলেত ফেরত হোক । কিন্তু লক্ষ্মীনাথ ব্যতিক্রম । সে যৌতুকের দশ হাজার টাকা গ্রহণ করতে অস্বীকার করল।

রায় বাহাদুর দীর্ঘ কাঁচা পাকা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে হাসতে লাগলেন।

' তুমিও নিতে পারতে, মামা। কারণ–।' হাসি সংবরণ করে রায়বাহাদুর হাতের তালু মেলে দিয়ে গোল করে দেখিয়ে বললেন আমরা বামুন মানুষ। বামুন সবসময় ডান হাতের তালু মেলে রাখে। উবুর করে রাখে না।'

এবার লক্ষ্মীনাথও কিছুই বলল না। কেবল মুচকি হাসল।

প্রজ্ঞা এবং স্বর্ণলতা উঠে ভেতর বাড়িতে গেল।

' তারপরে মামা, কেমন লাগছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল?'

লক্ষ্মীনাথ বলল,' ভালোই লাগছে। তারা সত্যিই সম্ভ্রান্ত, বিদ্বান এবং সংস্কৃতিবান।'

' কার কার সঙ্গে তোমার কথাবার্তা হল?'

' এখনও পরিচয় পর্ব চলছে। অন্দরমহলে মহিলাদের যে ধরনের স্নেহ ভালোবাসা এবং সম্পর্কীয় শালিদের সঙ্গে যেরকম মেলামেশা– তাদের অতিক্রম করে বড়দের সঙ্গে ভালোভাবে কথাবার্তা হওয়ার এখনও সুযোগ হয়নি।'

' কখনও এরকম মনে হয় কি যে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করে তোমার কোনো লোকসান হয়েছে?'

' না, এখনও সেরকম অনুভব হয়নি। পরিকে পত্নীরূপে লাভ করে আমি সুখী। বাঙালি হয়েও সে অসমিয়া একজন যুবককে হৃদয়ের পবিত্রতা এবং অনাবিল আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে।'

' এটাই এদের পরিবারের সদস্য সদস্যাদের বৈশিষ্ট্য। সত্যিই তারা ভাষা ধর্ম জাতির ক্ষেত্রে উদার। আমারও বিশ্বাস,পরির সঙ্গে তুমি সুখী হবে। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হয়েও সে তোমার কোনো কাজে বাধা দেবে না। বরঞ্চ সাহায্য করবে, অনুপ্রেরণা যোগাবে।'

' কিন্তু একটা ব্যাপারে একটু অসুবিধা হচ্ছে।' কণ্ঠস্বর নিচু করে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণে সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের অহমিকা কিছুটা প্রকাশ পায়।'

' হ্যাঁ, প্রকাশ পায়। এটা কিছুটা থাকবেই। বিদ্যা-বুদ্ধি, সাহিত্য- কলা, ধন- ঐশ্বর্য প্রভাব- প্রতিপত্তিতে তারা যে কলকাতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবার, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।'

' অসম সম্পর্কে তাদের ধারণা ভালো নয়।'

' কিন্তু তুমি তো এখন তাদের অসমিয়া জামাই। মুচকি হেসে রায়বাহাদুর বললেন, বুদ্ধি এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তুমি অসম এবং অসমিয়াদের সম্পর্কে তাদের খারাপ ধারণাগুলি দূর করতে চেষ্টা করবে। তারপরে তোমাদের বাড়ির খবর?'

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মুখটা ম্লান হয়ে গেল,' বাড়ির কথায় খুব কষ্ট পাচ্ছি মামা। বাড়ির প্রত্যেকেই আমার বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে এত বিরোধিতা করল! কেবল বিরোধিতাই নয়, অপপ্রচার চালালো। বিয়েতে কেউ এল না। বিয়ের পরে আজ পর্যন্ত কোনো খবরও করল না। এসব আমাকে অস্থির করে তোলে। একেক সময় এতটাই অস্থির হয়ে পড়ি যে কোনো কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারি না।'

' দেখ, তারা তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু তোমার থেকে যে প্রত্যাশা করেছিল, সেটা দিতে না পারার জন্য তোমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। এখন আজকের শিক্ষায় তুমি তাদের সীমাবদ্ধতাটুকু বুঝতে হবে। আজ তোমার যে অবস্থা, এক সময় আমিও সেই অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আইনগত বাধা ছিল না যদিও বিধবা বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করতে চাওয়ায় সাংঘাতিক প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিয়ের পরে আমাকে নিয়ে কত বদনাম, কত অপপ্রচার চলেছিল। আমার নিজের লোকদের সঙ্গে সংঘাত বেধেছিল। আমাকেও সবাই বর্জন করেছিল।এখন বিষ্ণুপ্রিয়াকে নিয়ে আমার যে সংসার,আমার যে কয়েকটি ছেলেমেয়ে ,ওরা যে ধরনের শিক্ষা লাভ করেছে বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করে আমি কোনো খারাপ কাজ করেছি বলবে নাকি?’

‘না না মামাবাবু,আপনি আমাদের কাছে এক বিরল আদর্শ।পরিকে বিয়ে করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার সময় আপনার কথা ভেবেই আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।’

‘যাই হোক না কেন ,বাড়ির মানুষ খারাপ পেলেও তুমি তাদের খারাপ পেয়ো না।আসলে,তাঁরা পুরোনো দিনের অন্ধসংস্কার কুসংস্কার নিয়ে আজকের পরিবর্তিত সমাজটির কথা বিচার করে।তার জন্যই তাঁরা আমাদের কাজের স্বীকৃ্তি দিতে পারে না।তাঁদের সঙ্গে তখনই আমাদের বিরোধের সৃষ্টি হয়।আমাদের কখনও কখনও কিছু অপ্রত্যাশিত সঙ্কটের সম্মুখীন হতে হবে।তার জন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে।নিজের নীতিতে দৃঢ় থাকতে হবে।সঙ্গে কর্ম করে যেতে হবে।তারপরে দেখবে ,একটা সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।এমনিতেও তুমি যেভাবে যা করছ,তোমার লেখনীর যে রকম শক্তি দেখছি,এই ধারাটা অব্যাহত রাখতে পারলে,বাড়ির সঙ্গে তোমার ব্যবধান হবেই এবং তোমার দ্বারা অসমিয়ার জাতীয় জীবনে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।’

এভাবে নব দম্পতিকে আমন্ত্রণ করে ভাত খাওয়ানোর পর্বটা কেবল লক্ষ্ণীনাথের শুভার্থীদের দিক থেকেই হল না,ঠাকুরবাড়ির আত্মীয় পরিজনদের থেকেও এই ধরনের আমন্ত্রণ আসতে লাগল। সুবিখ্যাত ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরীর সহধর্মিনী প্রতিভা দেবী প্রজ্ঞার দিদি।সেই হিসেবে ব্যারিস্টার চৌধু্রী লক্ষ্ণীনাথের ভায়রা।প্রতিভা দেবীর বিয়ের নয় বছর পরে এই বিয়েটা হল।তাঁদের সাদর নিমন্ত্রণ রক্ষা করে একদিন বিবিধ ব্যঞ্জনে ভূরি ভোজন করল।মহর্ষির মেজ ছেলে ভারতের সর্বপ্রথম সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথের সনির্বন্ধ নিমন্ত্রণও রক্ষা করতে হল।তাঁর সহধর্মিনীর নাম জ্ঞানদানন্দিনী।পুত্র সুরেন্দ্রনাথ এবং উচ্চশিক্ষিতা কন্যা ইন্দিরাকে নিয়ে তাঁরা থাকেন বিজিতলার এক প্রকাণ্ড অট্টালিকায়। তাঁদের বাড়িতে একটি টেনিসকোর্ট আছে। সেখানে সাহেবদের সঙ্গে বাড়ির সদস্যরা প্রায়ই টেনিস খেলে।তাছাড়া এই বাড়িতে হাইকোর্টের জজ ব্যারিস্টারদের পার্টি লেগেই থাকে।সুগৃহিনী মাতৃভাবাপন্ন জ্ঞানদানন্দিনীর আপ্যায়ন এবং সপ্রতিভ ইন্দিরার ব্যবহারে লক্ষ্ণীনাথ অভিভূত হয়ে পড়ল।

এভাবে প্রায় পনেরোদিন ধরে শুধু নিমন্ত্রণই রক্ষা করতে হল।

ইতিমধ্যে প্রজ্ঞা লক্ষ্ণীনাথের বাড়ির কথা জানতে পেরেছে।যাই হোক না কেন, বিবাহিত নারীর কাছে শ্বশুর বাড়িটাই নিজের বাড়ি।বিয়ের পরে সমস্ত নারীর মনে শ্বশুর বাড়ি সম্পর্কে অপার কৌ্তূহল থাকে।সমস্ত নারীই শ্বশুর শাশুড়ির ভালোবাসা পেতে চায়।ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে বৈ্বাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিয়ে বাড়ির অভিভাবকদের সঙ্গে লক্ষ্ণীনাথের বিরোধ,বিয়ের পরে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে লক্ষ্ণীনাথের যোগাযোগ নেই—নানান কথার মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞা জানতে পেরেছে।এটা নিয়ে লক্ষ্ণীনাথ যে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে,সেটাও বুঝতে পারছে। তাকে বিয়ে করার জন্যই যে লক্ষ্ণীনাথের সঙ্গে বাড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে,এটা প্রজ্ঞাকে সব সময় দহন করে থাকে। তার জন্যই লক্ষ্ণীনাথ যদি বাইরে থেকে ফিরে আসতে দেরি করে,সময়ে যদি খাওয়া দাওয়া না করে ,মুখে যদি সামান্যতম বিষাদের ভাব দেখে ,প্রজ্ঞা অস্থির হয়ে পড়ে।

‘বিয়ের পরেও কেন তুমি মেসবাড়িতে থাকছ,বলতো?’লক্ষ্ণীনাথকে বেরিয়ে যেতে দেখে প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল।

‘আমি যে এখন ‘জোনাকীর’সম্পাদক—’লক্ষ্ণীনাথ বলল,বিয়ের জন্য আগামী মাসের সংখ্যার সম্পাদনার কাজগুলি করা হয় নি। লেখাগুলি দেখে কালকের মধ্যে প্রেসে পাঠাতে হবে। সেসব এডিট করতে রাত সাড়ে বারোটা একটা বেজে যাবে। তাই আজকের রাতটা মেসেই থাকতে হবে।

তুমি মেসে থাকলে আমার যে এখানে রাতটা কীভাবে পার হয়,সেটা কি একটিবার ভেবেছ?’অভিমানে প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বর ভারী।

‘আজকের রাতটা কোনোরকমে কাটাও,লক্ষ্ণীটি।’

‘তাহলে আমাকে উপোস থাকতে হবে।’

‘উপোস থাকবে!সে কী কথা,পরি!’

 ‘তুমি মেসবাড়ির সব অখাদ্য খাবে,এখানে আমি মাছ-মুড়িঘন্ট-মাংস দৈ মিষ্টি খাব!’প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বর আড়ষ্ট হয়ে এল,তাছাড়া কর্তামশাই যে আমাদের ডাকলেন,কালই যাওয়া উচিত ছিল।আজও যদি যাওয়া না হয়,কথাটা খারাপ হবে না?’

কর্তামশাই মানে প্রজ্ঞার দাদু।লক্ষ্ণীনাথের দাদাশ্বশুর।মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে প্রবীণ,সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। পত্নীর অনুরাগের উষ্ণতা ভালোবাসার বন্ধনের সঙ্গে মহর্ষির আহ্বান।

লক্ষ্ণীনাথকে দাঁড়াতে হল।

‘কর্তামশাই আমাদের ডেকেছেন,আমাকে বলনি তো।’

‘তুমি এত ব্যস্ত থাক—বলব কখন বলতো?’ লক্ষ্ণনাথের পাশে এসে প্রজ্ঞা কাতর কন্ঠে বলল,মেস থেকে জোনাকীর লেখাপত্র সব এখানে নিয়ে এসো।কর্তামশাইর আশীর্বাদ নিয়ে আসার পরে এখানেই সেসব দেখবে।’

‘কেমনে অবজ্ঞা করি প্রজ্ঞাসুন্দরীর আজ্ঞা!’মজা করার সুরে লক্ষ্ণীনাথ বলল, ‘আচ্ছা তাই হোক প্রাণসখি।’

বিপত্নীক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এখন জোড়াসাঁকোর ঘরে থাকে না। তিনি পার্ক স্ট্রীটে প্রকাণ্ড একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে বড়পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ থাকেন। থাকে মহর্ষির বড় মেয়ে বিধবা সৌদামিনী দেবী।

সেজেগুজে দুজনেই বের হল।দারোয়ানকে বলে একটা গাড়ি ডেকে আনল।

এভাবে আত্মীয় কুটুম্বের বাড়িতে যাওয়া মানেই ঠাকুরবাড়ির বংশ পরিবারের ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে যাওয়া। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।তাঁরা জামাই লক্ষ্ণীনাথকে আদর আপ্যায়ন করে।মূ্ল্যবান উপহার দেয়।লক্ষ্ণীনাথও তাদের সম্মান করে। তবু লক্ষ্ণীনাথ একাত্মীয়তার একটা অভাব অনুভব করে।বিশেষ করে,অসম দেশ অসমিয়া মানুষ এবং অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁরা করা মন্তব্যগুলি লক্ষ্ণীনাথের পক্ষে অসহনীয় হয়ে পড়ে।চিন্তার কথা এই যে এই উপসর্গগুলি ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে।

পার্ক স্ট্রীট।কলকাতা মহানগরের অভিজাত এলাকা।এই এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল কম।পার্ক স্ট্রীটের অধিকাংশ বাসিন্দাই সাহেব।তাঁরা ইংরেজ সরকারের এক একজন উচ্চ পদস্থ অফিসার।তাই সমস্ত দিক থেকে সুরক্ষিত অঞ্চল।

গাড়ি থেকে নেমে গেট পার হয়ে লক্ষীনাথ এবং প্রজ্ঞা ভেতরে চলে এল। বিয়ের সময় মহর্ষিকে দূর থেকে দেখেছে বিয়ের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করে তাকে প্রণাম করেছে । কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ হয়নি । বৃদ্ধ যদিও সামর্থ্য রয়েছে । দীর্ঘ দেহে শুভ্র কেশে আকর্ষণীয় পুরুষ। ভেতরের ঘরে এসে লক্ষ্মীনাথকে বসতে বলে প্রজ্ঞা অন্দরমহলে ঢুকে যেতেই সৌদামণি দেবী বেরিয়ে এলেন। বয়স্ক বিধবা সৌদামণি দেবীই এই বাড়ির সমস্ত কিছু দেখাশোনা করেন। লক্ষ্ণীনাথ এবং প্রজ্ঞা তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। আশীর্বাদ করে তিনি ভাইঝিকে এবং জামাইকে বসতে বলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে থাকা সবার কুশল বার্তা জিজ্ঞেস করলেন । সঙ্গে সংক্ষেপে লক্ষ্মীনাথের পিতা মাতার কথাও জিজ্ঞেস করলেন । কিছুক্ষণ পরেই মহর্ষি ঘরে ঢুকলেন ।

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ উঠে তাকে প্রণাম করার জন্য এগিয়ে গেল।

' দাঁড়াও, দাঁড়াও ভায়া। লক্ষ্মীনাথকে থামিয়ে দিয়ে মহর্ষি বললেন ,' এক্ষুনি আমি তোমাদের প্রণাম নিচ্ছি না । প্রণাম নেওয়ার আগে তোমাদের যে উপহার দিতে হবে। বসো ,আগে কথাবার্তা হোক।'

পিছিয়ে এসে লক্ষ্মীনাথ পুনরায় আগের আসনে বসল।

' তা দাদুভাই, তোমার প্রতি যে আমার হিংসা হচ্ছে–।' মহর্ষি রসিকতা করলেন,' তুমি যে আমার এক অমূল্য সম্পত্তি কেড়ে নিলে। দিদিমণি আমার কাউকে পছন্দ করে না। বর খুঁজে খুঁজে আমরা হয়রান হয়ে পড়েছিলাম। তারপর তোমার কথা শুনতেই দিদিমণি একেবারে এক কথায় রাজি। তুমি তো ভায়া জাদু জান দেখছি।'

লজ্জায় লাল হয়ে প্রজ্ঞা মাথা নিচু করল।

লক্ষ্মীনাথের ঠোঁটেও লজ্জার হাসি।

তারপরে মহর্ষি লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষদের অসমে সংস্থাপনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। লক্ষ্মীনাথ বিনম্রভাবে জানাল যে অসমে বেজবরুয়া বংশের আদিপুরুষ ছিলেন কালিরাম বরুয়া। তদানীন্তন অসমের রাজার অনুগ্রহে তিনি কীভাবে অসমে সংস্থাপিত হলেন, কীভাবে তারা বেজবরুয়া বংশ বলে অসমে পরিচিতি লাভ করল, সেই সমস্ত বিস্তৃতভাবে বলল। মহর্ষি জিজ্ঞেস করেন নি যদিও লক্ষ্মীনাথ মাতৃকুলের বিষয়েও সংক্ষেপে বলল যে তার মাতা ঠানেশ্বরী দেবী মহাভারতের অষ্টাদশ পর্বের অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করা প্রাচীন কবি অনন্ত কুন্দলির বংশে জন্মগ্রহণ করা কন্যা।'

' তার মানে, যা দেখা যাচ্ছে– কনৌজ থেকে অসমে যাওয়া যখন, তোমাদের পূর্বপুরুষ' আসামী' ছিলেন না।'

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ একটা ঝাঁকুনি খেল। মাথা তুলে মহর্ষির দিকে তাকাল। না, মহর্ষির ভাবটা আক্রমণাত্মক নয়, ব্যঙ্গাত্মকও নয়। আশ্বস্ত হয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' তা তো বটেই কর্তামশাই। আসামে এসে যুগ যুগ ধরে থাকতে থাকতে আমাদের ভাষার পরিবর্তন হয়ে গেছে।'

' স্থানীয় প্রভাব। পৃথিবীর অনেক জাতির ক্ষেত্রেই এমনটা হয়।'

' এটা আসামেরই একটি বিশেষ বিশেষত্ব বলতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি, সুপ্রাচীনকাল থেকে বসবাস করা বিভিন্ন জাতি উপজাতি নিয়ে আজকের এই অসমিয়া জাতি একটি মিশ্রিত জাতি। স্থানীয় জাতি উপজাতি ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বাইরে থেকে আসামে গিয়ে আসামের জলবায়ুতে থাকতে থাকতে তারা অসমিয়া হয়ে যায়। এমনকি শ্যাম দেশের প্রবল পরাক্রান্ত আহোমরা আসাম জয় করে প্রচন্ড প্রতাপে ছয়শত বছর রাজত্ব করে যে বিশাল অসম দেশ স্থাপন করল, তারাও কিন্তু তাদের তাই ভাষা ভুলে অসমিয়া ভাষাকে মাতৃভাষা বলে গ্রহণ করেছে।'

আগ্রহের সঙ্গে শুনে কপাল কুঁচকে মহর্ষি বললেন,' তাই নাকি! সত্যিই আশ্চর্যের ব্যাপার তো! তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের দিদিমণিও আসামে গিয়ে' আসামী' হয়ে যাবে। তাহোক, তোমার সঙ্গে' আসামী' হয়েও দিদিমণি আমার সুখী থাকুক। তারপর তুমিও সাহিত্যের সেবক শুনে আনন্দিত হয়েছি। তুমি আমাদের জামাই হয়েছ। সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চটা আমাদের এই বংশের সকলের মজ্জায়-মজ্জায়। সাহিত্য আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন স্থাপন করে। আমাদের আরেক জামাই শব্দের শৃঙ্খলিত ধারায় সেটাই যে সুন্দরভাবে করবে , তাতে আর আশ্চর্যের কি?'

তারপরে তিনি ননী বলে ডাকায় ভেতর থেকে চৌদ্দ পনেরো বছরের একটি মেয়ে বেরিয়ে এল। মহর্ষি অনুচ্চস্বরে তাকে কিছু একটা আনতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সে একটি ট্রেতে করে একটি সুদৃশ্য বাক্স এবং একটি লাল গোলাপ যত্ন করে নিয়ে এল। বিশাল চেয়ারটা থেকে উঠে মহর্ষি ট্রে থেকে বাক্সটা নিয়ে খুলে একটা সোনার কলম বের করে আনলেন। লক্ষ্মীনাথের দিকে কলমটা এগিয়ে দিয়ে স্নেহ মাখানো সুরে বললেন,' আমি আশীর্বাদ করছি, তোমার এই কলম থেকে সুনিপুণ লেখা বের হবে।'

তারপরে নাতিনি প্রজ্ঞার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে হাতে গোলাপটা দিয়ে বললেন,' তোমার রূপ সৌরভ এই ফুলের সৌরভের মতো চারপাশের ছড়িয়ে পড়বে।'

বিয়ের পরে লক্ষ্মীনাথ বাঙালি আভিজাত্য, বাংলা ভাষার সাহিত্য এবং বঙ্গসংস্কৃতির চাপে কিছু পরিমাণে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছিল। সঙ্গে শিক্ষিত বাঙালিরাও যে উচাত্মিকা বোধে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের প্রতি হেয় জ্ঞান করে মন্তব্য করে , এটা তার কাছে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা সোনার কলম উপহার দিয়ে যে কথাগুলি বলে আশীর্বাদ করলেন, তাতে তার মন থেকে সেই সমস্ত অস্বস্তি যন্ত্রণা নাই হয়ে গেল। সোনার কলমটা হাতে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ দাদা শ্বশুরের দুই পা ছুঁয়ে ভক্তিভরে প্রণাম জানাল।

লক্ষ্মীনাথ অসমিয়া ভাষায় কবিতা, গল্প,প্রহসন, রম্য রচনা লেখে, একটি পত্রিকার সম্পাদনা করে… প্রজ্ঞা এই সমস্ত কিছুই আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করে। পড়ার চেষ্টা করে,কিছু কিছু বুঝতেও পারে। সেই সমস্ত নিয়ে লক্ষীনাথের সঙ্গে কথা বলে। তারপরে প্রজ্ঞা শ্বশুরবাড়ির কথা জিজ্ঞেস করে।

 অসমে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে।কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে শ্বশুর মশাই, শাশুড়ি মা এবং জায়েদের সঙ্গে কীভাবে অসমিয়ায় কথা বলবে সে কথা ভেবে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে। তখন লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞাকে বলে যে বাবা বাংলা বুঝতে পারেন, বলতেও পারেন। দাদারাও সুন্দর বাংলা বলতে পারে। প্রজ্ঞাকে অবাক হতে দেখে লক্ষ্মীনাথ বলে যে বাবাদের সময়ে অসমের স্কুলগুলিতে বাংলায় পড়ানো হত। এমনিতেও তাদের বাড়িতে অনেক বাংলা বই আছে। প্রত্যেকেই বাংলা বই পড়ে। এমনকি, ভালো বলতে না পারলেও লক্ষ্মীনাথের মা বাংলা বুঝতে পারেন।

প্রজ্ঞা শিবসাগরে বাঙালি আছে কিনা জানতে চাইল। লক্ষ্মীনাথ জানাল যে,যে স্কুলে সে পড়াশোনা করেছে সেখানকার কয়েকজন শিক্ষক বাঙালি। সে যে শিক্ষককে গুরু বলে অত্যন্ত সম্মান করে,তাঁর নাম চন্দ্রমহন গোস্বামী। অতি উচ্ছ্বসিত হয়ে লক্ষ্মীনাথ তারপর বলল যে কলকাতার বাঙালি চন্দ্রমোহন গোস্বামী তাকে খুব ভালোবাসেন। এনট্রান্স পাস করে কলকাতা আসার সময় তাঁর আশীর্বাদ নিয়েছিল।

কথাটা বলতেই লক্ষ্মীনাথের মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল।তাঁর মনের আকাশে শিবসাগরের দৃশ্যগুলি ভাসতে লাগল। বিয়ের দেড় মাস আগে গঙ্গাস্নান করার উদ্দেশ্যে কলকাতা এসে লক্ষ্ণণকে হারিয়ে সীমাহীন দুঃখ কষ্ট নিয়ে মা-বাবা বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। তারপরে তাদের মতের বিরুদ্ধে ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা প্রজ্ঞাকে বিয়ে করল… এই ব্যাপারে তারা কম দুঃখ পায়নি। এখন তারা শারীরিক কুশলে আছে তো? নাকি বার্ধক্য এবং লক্ষ্মণের অকাল মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে দুর্বল হয়ে পড়েছে? লক্ষ্মীনাথ পিতা মাতার চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ল। তার এই কাতরতা বৃদ্ধি পেল। আর এখানে, শ্বশুরের পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, আত্মীয় কুটুম্বের সঙ্গে যতই আন্তরিক হয়ে উঠেছে, যত স্নেহ ভালোবাসা পাচ্ছে, ততই শিবসাগরে থাকা আত্মীয় স্বজনদের কথা মনে পড়তে লাগল।

' উদাস হয়ে পড়লে যে!' এগিয়ে এসে সংবেদনশীল কাতরতার সঙ্গে প্রজ্ঞা বলল,' বুঝেছি, মায়ের কথা মনে পড়েছে।'

লক্ষ্মীনাথের অন্তর কাঁপে উঠল।

'আমাকে একবার শিবসাগর নিয়ে চল না গো।'

' তুমি শিবসাগর যাবে!'

'ওমা, আমার বুঝি শ্বশুর শাশুড়িকে দেখার ইচ্ছা হয় না। তাছাড়া, বিয়ের পরে শ্বশুর-শাশুড়ির পায়ের ধুলো না নিলে মেয়েদের অমঙ্গল হয়।'

প্রজ্ঞার ইচ্ছাটা আন্তরিক। লক্ষ্মীনাথও প্রজ্ঞাকে নিয়ে শিবসাগরে যেতে চায়। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের নৈষ্ঠিকতায় আস্থাবান বাবা কি ব্রাহ্মকুলে জন্ম নেওয়া প্রজ্ঞাকে বাড়ির বউ বলে স্বীকার করে নেবে? তার চেয়েও বড় কথা হল, প্রজ্ঞাকে নিয়ে গেলে বাবা কি নিজের বিশ্বাসের সংস্কারের বেড়া ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞাকে বাড়ির উঠোনে পা রাখতে দেবে? এইসব প্রশ্ন, আশঙ্কা জনিত প্রশ্ন। প্রজ্ঞাকে এসব বলা যাবে না। বলতে খারাপ লাগে।

' তুমি যাবে। আমি তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব।' লক্ষ্মীনাথ বলল, কিন্তু তার আগে বাইরে কোথাও একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিজেদের ঘর সংসারের একটা ব্যবস্থা করে নিই।'

'ঠিক আছে। প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ করে প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল,' আচ্ছা তোমার কাছে বাবার কোনো ফোটোগ্রাফ আছে?'

' ফোটোগ্রাফ!'

' ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। বাবাকে বড্ড মনে পড়ে। শ্বশুরমশাই বেঁচে আছেন। এখন তো তিনিই আমার বাবা। তাঁকে দেখতে ইচ্ছা করে। এখন যখন আসামে যাওয়াই হচ্ছে না, তুমি আমাকে ওঁর একটা ফোটোগ্রাফ দেখাও না গো।'

প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বরে ভালোবাসা। পত্নীর মমতা মাখানো মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' খুব সম্ভব মেসে বাবার একখানা ফোটোগ্রাফ আছে। সেটা পেলে তোমাকে এনে দেব।'


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...