চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২

স্মৃতিকথা- ২১ ।। এই আমি চরিত্র ।। নীলাঞ্জন কুমার ।। ( গত মাসের পর)

 স্মৃতিকথা- ২১

                              এই আমি চরিত্র


                              নীলাঞ্জন কুমার


                            ( গত মাসের পর)   



                                ।। ২১।।


সে সময় স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ চিন্তা করার মতো অবস্থান আমার ছিল না । নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারের মধ্যে জন্ম হওয়া এই আমি চরিত্রটি  তখন কল্পনার পাখা মেলে ভাসছে বলা যায় । মেদিনীপুর শহরে আবার আসার পর বলা যায় কিছু কিছু পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হয় । তাদের কেউ কেউ ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে অলিগন্ঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে ।যাহোক এবার শুরু হল পড়ার বাইরের বই পড়ার আনন্দ । বাড়িতে বাবা মা কখনো সখনো বাড়িতে শোভা বাড়ানোর জন্য কবিতার বই কিনে আনতো । নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ' উলঙ্গ রাজা' আমি বাবার কেনা বই থেকে পড়েছি । তাছাড়া আমার দাদার সে সময় সামান্য হলেও সাহিত্য স্পৃহা জন্মেছিল । দাদা বাড়িতে তার বন্ধুদের কাছ থেকে আনতো কৃত্তিবাস পত্রিকার তৎকালীন সংখ্যা ।দাদার সে সময়ের বিশেষ বন্ধু ছিল অচিন্ত্য নন্দী । যিনি এখন আমার বিশেষ কবি বন্ধু । দাদা তাঁর কাছ থেকেও আনতো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের,  অজিত বাইরী,  মতি মুখোপাধ্যায়,  বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের  কবিতার বই      ।আমি সেগুলো পড়তাম আর ভাবতাম কোনদিনও আমি এরকম লিখতে পারবো !
                 কর্ণেলগোলার ভাড়া বাড়িতে তখন আসতেন মায়ের ছোটমামা কেষ্ট চক্রবর্তী । তিনি থাকতেন শহরের বক্সি বাজারে । উনি ছিলেন মেদিনীপুরের তৎকালীন সময়ের নামকরা কবি ও  গীতিকার । রবীন্দ্রনাথের ধারায় তাঁর লেখা মেদিনীপুরে বেশ জনপ্রিয় ছিল । যদিও ওঁর কোন কাব্যগ্রন্থ কোনদিনও বেরোয়নি । তবু বহু পুরনো পত্রিকাতে  তাঁর অন্তমিলের কবিতা ছড়া ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেত মেদিনীপুর জেলায় ।সেই সময় মেদিনীপুরে একই স্তরের তিনজন কবিতা লেখক খ্যাতিলাভ করেন । তাঁরা হলেন কেষ্ট চক্রবর্তী,  বিভূতি বিদ্যাবিনোদ,  সু-মো-দে ( যাঁর পুরো নাম ছিল সুরেন্দ্র মোহন দে ) সকলেই এখন প্রয়াত । কিন্তু দুর্ভাগ্য এই,  তাঁরা মেদিনীপুর জেলার বাইরে নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন নি । কেষ্ট চক্রবর্তীকে আমি চশমা দাদুন বলে ডাকতাম । বড় বেলায় ছোট দাদু বলতাম । এছাড়া আমরা বিশেষ করে দিদিরা নাম দিয়েছিল 'এভারগ্রিন দাদু '। উনি রেডিওতে গান লিখতেন ।তাঁর বেশ কিছু গান রেডিওতে শুনেছি । দু-একটি ছায়াছবিতে  তাঁর লেখা গান রেকর্ড হয়েছিল ।
               ছোট দাদুন  মাঝে মধ্যে তাঁর কেনা সদ্য বেরোন টেপ রেকর্ডারটি আমাদের বাড়ি নিয়ে আসতেন । তখন আমাদের কি আনন্দ!  আমরা ওঁনার যন্ত্রটিতে আমাদের গান রেকর্ড  করতাম । আসলে তিনি ছিলেন আমাদের কাছে আনন্দের ঝলকানি । আমার ওঁর কাছে বায়না ছিল তাঁকে আমাদের বাসাতে এসে একটা করে ছড়া বা কবিতা লিখে যেতে হবে । তার জন্য আমি খাতাও কিনেছিলাম । উনি নিয়মিত সে দাবি মানতেন । তাছাড়া মাঝে মধ্যে আমাদের জন্য ছন্দের ছড়া বা কবিতা লিখে পোস্ট করতেন । বলতে হয় ছোট দাদুন আমার লেখার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রেরণা এনে দিয়েছিল । ওঁর দেখাদেখি আমি গান লিখতে শুরু করেছিলাম । তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি । প্রথম যে গান লিখেছিলাম সেটির প্রথম অংশ: ' মন আজ মেতেছে/ তবু যাই চলে/ কেন শুধু বাধা দাও/  দুয়ার দাও খুলে/  মন তবু মানে না/  তুমি ছাড়া জানে না ।' এই অযৌক্তিক গানটির সুরও দিয়েছিলাম । যা হয়েছিল  কিম্ভূতকিমাকার। এর পরের গান ছিল: 'দোল এসেছে দোল/ হৃদয় তুফান তোল/  প্রাণে আজ তুমুল লহর/  পর আজ খুশির ঝালর/  বাজাও মধুর বোল' ইত্যাদি ইত্যাদি । যার সুরও দিয়েছিলাম । যা মাঝে মধ্যে এখনও গুণ গুণ  করি । এর পরের গান সামান্য পরিণত হল । তার প্রথম অংশ  : ' এ হিয়ায় কাঁটার ব্যথা/  কত আর সইব বলো/  এ হিয়ার জ্বালা যত/  কত আর কইব বলো । ' এভাবে বেশ কিছু গান লেখা ও সুর দেওয়া শুরু হল । যেমন ময়মনসিংহের গীতিরূপ ' সোনাই মাধব ' -এর একটি গান অনুসারে লিখলাম ' বন্ধুরে হে, ঝএ বন্ধু কইবাম তোরে/ বউ আমার রাইগ্যা গিয়া বইস্যা আছে গোঁসাঘরে । ' অথবা শ্যামা সঙ্গীত ' তোকে যদি নাই পেলাম মা/  নামাবলী কি বা হবে/  অরূপ রতন যদি না পাই/  মানিক রতন কি বা হবে ।''ইত্যাদি ইত্যাদি।
                     তখন কার্যত গান আমায় পেয়ে বসেছে ।
গান গাইছি লিখছি সুর দিচ্ছি , ভাবছি আর মনে মনে কিশোর কুমার হওয়ার কথা চিন্তা করছি ।পাশাপাশি কবিতাও চলছে ঢিমেতালে । সে সময়ের কবিতাগুলো 
(অবশ্যই ছাপার অযোগ্য) তখন আমার কাছে যেন বুকের মধ্যে ধরে রাখার মতো ব্যাপার! তখন ভাবতেই
পারছি না কি করে আমি লিখে যাচ্ছি , গানে সুর দিচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি । সামনে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা  (তখন ক্লাস ইলেভেনের পর হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল হত) কিন্তু আমি মজে আছি গান কবিতাতে।বাড়িতে পড়াশোনা তথৈবচ । তবে নিয়মিত ক্লাস যত্ন করে করতাম । কেরিয়ার বিষয়ে ভাবনা ব্যাপারটা ছিল না। ।মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে কাটাচ্ছি সময় ।আমরা যা আনন্দ করেছি জীবনে তা এখনকার ছেলেপুলেরা কল্পনাতে আনতে পারবে না। সে কারণে আমাদের আর্থিক কেরিয়ার তেমন গড়ে ওঠেনি,  কিন্তু তাতে আমার কোনদুঃখ নেই । কারণ আমি যা হতে চেয়েছিলাম তা শত কেরিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখলে হয় না । অবশ্য কতখানি স্বপ্ন সফল করতে পারব তা জানি না । তবে হাজার বাঁক নিয়ে রসেবসে আছি ।
                                           ( চলবে)



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...