রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

রম্যরচনা || কবিকথা || কাশীনাথ সাহা

রম্যরচনা || কবিকথা
কাশীনাথ সাহা


আমাদের এই অভাগা দেশে অনেক কিছুরই অভাব আছে। চাকরি নেই, স্বাস্থ্য নেই, শিক্ষক নেই,ডাক্তার নেই। এমন অনেক নেই নিয়েই আমাদের দিনযাপনের রোজনামচা।কিন্তু এই পোড়া দেশে কবির আকাল হয়েছে এমন কথা কোনদিনই শোনা যায়নি। জন্মনিয়ন্ত্রণের সব বিধিনিষেধ কাটিয়ে কবিরা এখানে ছিল আছে এবং রমরমিয়ে থাকবে।
 কবিদের একটা নিজস্ব পোশাক আছে, বেশভূষাও আছে। হালকা  হালকা দাড়ি, শ্যাম্পু মারা চুল একটু উশকো খুশকো, হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুল পাঞ্জাবি, কাঁধে বাহারি ঝোলা। এটাই কবিদের সরকারি -বেসরকারি পোশাক। কিছু কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রমাণ করে। তাই তো!
এই এরকমই এক তরুণ কবি চলেছেন উদাস ভাবে মগজে কবিতা ভাঁজতে ভাঁজতে।সোজা পথে চলেছেন। পথে লেভেল ক্রসিং। ট্রেন আসছে তীব্র গতিতে। কিন্তু কবির ওসব সামান্য ব্যাপার দেখবার সময় নেই। বন্ধ গেটের তোয়াক্কা না করেই সে পৌঁছাতে চায় ওপারে!  পাবলিক চিৎকার করে ওঠে, থামুন থামুন...  ওরে ভাই দাঁড়াও।সকলেই সমবেত ভাবে কবিকে প্রায় টেনেই থামালেন। ট্রেন তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল। কবির চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি। প্রাণে বাঁচলেন সেটা কোন ব্যাপারই নয়। কবিতার লাইনটা বেলাইন হয়ে গেল,  ধুসস্...
সদ্য বিবাহিত বউকে নিয়ে কবি চলছেন শ্বশুরবাড়ী।বউকে পাশে বসিয়ে বের করলেন কবিতার খাতা।একটার পর একটা কবিতা পাঠ চললো। যথাসময়ে নির্দিষ্ট ষ্টেশনে ট্রেনও এসে গেল।বউ বললো, ওগো ষ্টেশন চলে এসেছে এবার নামো।কবির তখনও শ্রেষ্ঠ দুটো কবিতা পড়া বাকী। কবি বউকে আশ্বস্ত করলেন,আর দুটো কবিতা শুনে নাও, তারপর না হয় পরের ষ্টেশনে নামা যাবে!  নতুন বউ কি আর বলে, অগত্যা কবিতা শুরু হলো। ট্রেন ষ্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
শহরের কবি গ্রামের পরিবেশ দেখে কবিতা রচনা করছেন। বেশ মনোরম সবুজ স্নিগ্ধ পরিবেশ। কবিতার জন্য এক্কেবারে মারমার কাটকাট সকাল।কবি কবিতা আওড়াচ্ছেন - উপরে চাঁদ নিচে ঘাস চারিদিকে ছন্নছাড়া মানুষের বসবাস... আমি এই আলপথ ধরে যাই যদি তাঁর দেখা পাই...। পাশ দিয়ে মদনা মাতাল হাঁটছিল, থমকে দাঁড়িয়ে কবিকে আগাপাশতলা খুঁটিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করল, দাদা আমি তো শিবতলার কদমের ওখানে মাল খাই, বড্ড জল মেশায়। তিন চার গ্লাস খেলেও ঠিকমতো নেশা জমে না। পয়সাটাই জলে যায়। আপনার দেখছি জব্বর নেশা হয়েছে। কার কাছে খেলেন দাদা? ঠেকটা একটু বলে দিন দাদা আপনার গোলাম হয়ে থাকবো।
কবির পাড়ায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। একটি বেশ সুন্দরী মেয়ে আছে ওদের। সুন্দরী দেখলেই কবিদের বুকে প্রেম জন্মায়। এটা চরিত্রের দোষ নয়, কবি ধর্ম!  সেই মেয়ের নাম জানলেন কবি।  বড্ড মিষ্টি নাম, মল্লিকা। এক্কেবারে কবিতার মতো। মল্লিকাকে দেখে মল্লিকা বিষয়ক তেইশটা দীর্ঘ কবিতা নামালেন কবি।এক একটা কবিতা সাত আট পাতা।সেই কবিতা শেষ করে কবির কি উচ্ছ্বাস! আহা কি অসাধারণ কবিতা। কবিতা তো নয় যেন নায়াগ্রা জলপ্রপাত!  এই কবিতা শুনলে মল্লিকা তো কোন ছার মল্লিকার মা-ও কবির প্রেমে হাবুডুবু খাবে। পরদিন ভোরবেলায় মল্লিকাকে ঘুম থেকে তুলে কবি সেই কবিতা শোনাতে শুরু করলো। তেইশটা কবিতা যখন বেলা দশটায় শেষ হলো তখন মল্লিকা অজ্ঞান। ডাক্তারবাবু রোগী দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছিল?  মেয়ের হার্ট এতো দূর্বল কেন? নার্ভ ভীষণ উইক। মল্লিকার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আর বলবেন না ডাক্তারবাবু,  এক মুখপোড়া কবির ইয়া বড়ো বড়ো  তেইশটা কবিতা হজম করতে না পেরেই মেয়ের এই দূর্দশা। সেই কবিতা ঠিকঠাক হজম করাতে পাক্কা চারদিন নার্সিং হোমে থাকতে হলো মল্লিকাকে। ইতিমধ্যে সুযোগ পেয়ে নার্সিংহোম বিষয়ক গোটা কুড়ি কবিতা লিখে কবি হাজির নার্সিং হোমে। কিন্তু রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে সেই কবিতা মল্লিকাকে না শুনিয়ে নার্সকে শোনালেন কবি। নার্স তারপর পাশের বেডে শয্যাশায়ী। তাঁর এখনও জ্ঞান ফিরেনি। আর বিবেচক নার্সিংহোম কতৃপক্ষ গেটের বাইরে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে,  এখানে কবি ও কবিতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কবিরা একটু বাউণ্ডুলে হয়। কবির স্ত্রী কবির হাতে বাজারের ব্যগ ধরিয়ে  বাজার করতে পাঠালেন,ইলিশ মাছ কিনতে।  কবি বাজারের ব্যগ নিয়ে কলকাতা থেকে সোজা  বহরমপুর কবি সম্মেলনে। সেখান থেকে কবি বাড়িতে ফোন করলেন । মাছটা নিয়ে একটু বহরমপুর চলে এসেছি কবি সম্মেলনে। দু একদিন পরে ফিরছি।
কবিদের সাথে প্রেম করা যাবে কিন্তু বিবাহ নৈব নৈব চ! কবিতা দিয়ে প্রেম চলে সংসার চলে না। ঘরে চাল নেই কবিতা আছে, আলু নেই, তেল নেই কবিতা আছে। স্ত্রী-র কাপড় নেই কবিতা আছে। কবির স্ত্রী বললো হ্যাঁগো আমাদের তো চার বছর বিয়ে হলো এবার একটা ছেলেমেয়ে হলে হতো না। কবি স্বামী উদাস হয়ে বললো, মিনু আমি কবিতা ছাড়া আর কিছুই তোমাকে দিতে পারবো না। লক্ষীটি ভুল বোঝ না!
কবিরা একটু ভোলা মনের হয়। সব ভোলা মহেশ্বর! বউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে কবি। বউয়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বের হলো।কিন্তু বাড়ি ফিরে এলো অন্য বউয়ের হাত ধরে। ভিড়ে কবিতা ভাঁজতে ভাঁজতে বউয়ের হাত ছেড়ে অন্য মহিলাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে হাজির।সে বউ আলোয় কবিকে দেখে বললো, আপনি কে আপনি তো আমার স্বামী নয়! কবি চোখ কচলে বলে,দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। এখন কি হবে!  আপনি কে? মহিলা উত্তর দেয়, আমি কবি। আমিও তো কবি।  মহিলা সলজ্জ হেসে বলে ওমা তা-ই!  রতনে রতন চেনে।
কবির বাবা নার্সিংহোমে ভর্তি। এক্ষুনি রক্ত দিতে হবে। পেসেন্ট সিরিয়াস। কবি রক্ত শুনেই রক্ত বিষয়ে কবিতা লিখতে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন, রক্ত এনেছেন?  কবি আকাশ থেকে পড়লো, রক্ত? রক্ত কেন?
এ রক্ত কি নেবেন জননী প্রসন্ন দক্ষিণ হস্তে! ডাক্তারবাবু সব দেখে বললেন, আপনি তো মহামানব মশায়, আপনার একটু পায়ের ধুলো দিন মাদুলি করে পরবো।
কবি দীঘার সমুদ্রে স্নান করতে নেমেছেন। প্রবল ঢেউয়ে কবির গামছা ভেসে গেল। কবি অপেক্ষা করতে লাগলো পরবর্তী ঢেউয়েী জন্য। সমুদ্র কিছুই কেড়ে নেয় না, যা নেয় তা ফিরিয়েও দেয়। নগ্ন কবি কবিতায় মজে গেলেন... ঢেউয়ের চূড়ায় চূড়ায় ভেসে যায় শরীরের গ্লানি, কি হবে শরীর ঢেকে মিথ্যা আবরণে!!
রাঁচির পাগলা গারদ থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া ভদ্রলোক গঙ্গার পাড়ে বসে গঙ্গার ঢেউ গুনছে। ঢেউ গুলো গুনেই বাড়ি ফিরবে। কবি তক্কে তক্কে ছিল। গঙ্গার নির্জন পাড়ে এমন নিমগ্ন শ্রোতা পেয়ে তাকে পাকড়াও করে কবিতা শোনাতে লাগলো।দু চারটা কবিতা শোনার পরেই পাগলা দে ছুট।ওরে পালা পালা কবির পাল্লায় পড়বি না পাগলা করে ছাড়বে!  ছুটতে ছুটতে রাঁচির পাগলা গারদে আশ্রয় নিল। যাক বাবা বাঁচা গেল, এখানে পাগল আছে কিন্তু কবি নেই। দুদন্ড শান্তিতে থাকা যাবে।
কবি মৃত্যু শয্যায়। শিয়রে যমদূত মৃত্যু শমন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কবি শেষ নিঃশ্বাস কিছুতেই ছাড়ছে না। যা ছাড়ছে সবই কবিতা। অধৈর্য হয়ে যমদূত বললো, স্যর কবিতা রেখে এবার শেষ নিঃশ্বাসটা দয়া,করে ছাড়ুন। বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে কানাডার প্রেসিডেন্ট ওখানে অপেক্ষা করছে। কবিতার ভাবনায় ছেদ পড়তে কবি রুষ্ট হয়ে বললেন, তুমি তো বড্ড বেরসিক লোক হে, কবিতার কিসসু বোঝ না। তোমাদের যমলোকে কবিতা আছে  না নেই?
ভীরু চোখে যমদূত বললো, আজ্ঞে ওখানে এসব নেই স্যর, কোনদিন শুনিনি ।
কবির চোখে বিস্ময়। কবিতা নেই , আশ্চর্য!  একটু দাঁড়াও গোটা কয়েক কবিতার খাতা নিয়ে নিই। তোমাদের একটু কবিতা শোনানোর খুব দরকার। কবিতাহীন যমলোক ছিঃ! ততোক্ষণে যমদূত পগার পার। এই  যন্ত্রকে যমলোকে নিয়ে গিয়ে যন্ত্রণা বাড়িয়ে লাভ নেই। উঃ বাবা খুব বাঁচা বেঁচে গেছি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২১৪ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য  প্রভাত চৌধুরী ২১৪. কবিতাপাক্ষিক ৩০০ সংখ্যায় মোট ৪২১ জন কবির কবিতা ছাপা হয়েছিল । সংখ্যাটা কোনো পজিটিভ চিহ্ন বহন কর...