সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০

শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক


শিলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
 পর্ব~ ৮



মালবন্দি গ্রাম থেকে সোজা দক্ষিণে যে রাস্তাটি চলে গেছে আনন্দনগর ও ঘোড়ামারা গ্রামের দিকে তারই মাঝখানে পড়ে বিশাল এক পাথর চাটান। এই পাথর চাটানের দিকে একটুখানি চোখ রাখলেই দেখা যাবে কত সুন্দর করে নির্দিষ্ট মাপে মাপে সাইজ করে পাথর কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে। কী করে যে সেই পাথর তোলা হয়েছে মনে প্রশ্ন জাগবেই।
এবড়ো-খেবড়ো ভাব নেই কোথাও, সব সরল আকারে আয়তকার মাপে কাটা। পাথর কাটার এমন অদ্ভুত যন্ত্রপাতি কোথায় যে পেয়েছিল তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।
 
   ঠিক এরকমই দৃশ্য চোখে পড়ে এই পাথর চাটান থেকে আধ কিলোমিটার পশ্চিমে আরও এক পাথর চাটানে। এত পাথর কেটে কী কাজে লাগিয়েছিল তাতেও প্রশ্ন জাগে। মনে করা হচ্ছে সেই সময় যে সময় লায়কালি গড় নির্মিত হয়েছিল সেখানে এইসব পাথর যেত। কিংবা এমনও হতে পারে সেইসময় নানাস্থানে যে মন্দির নির্মিত হয়েছিল সেখানেও এই পাথরগুলি যেত।
 
   আবার মালবান্দির পাথর চাটান থেকে আরও খানিকটা দূরে বড়ডাঙা বরাশোল নামক স্থানে অন্য একটি নিদর্শন চোখে পড়ে। এখানে একটি জায়গায় প্রায় তিন হাত ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট একটি গোলাকার মতো জায়গা। যেমন মসৃণ- তেমনই সুন্দর করে কাটা। ঠিক চার-পাঁচ জন ঘুমোতে পারে সেরকম মাপে। একটি নয়। এরকম দু’তিনটি। পাশাপাশি। অনুমান করা হচ্ছে এখানেই রাত্রে ঘুমাতেন নায়েক বিদ্রোহীরা। বিছানার সংখ্যা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাদি দেখে মনে করা হচ্ছে – ছোটো ছোটো চার পাঁচজনের দলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করতেন তারা এবং এইভাবে সারা অঞ্চলটি করায়ত্ত করেছিলেন।
   কিন্তু দু:খের বিষয় উপযুক্ত সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে তথ্যসমৃদ্ধ এইসব অপূর্ব নিদর্শন ও চিহ্নগুলি ধীরে ধীরে লোপ লোপ পেতে চলেছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে মানব ইতিহাসের অন্তরালে। নির্বিচারে চলছে পাথর ভাঙার কাজ। সেই পাথর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে লায়কালি আমলের নিদর্শনগুলিও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরনো দিনের সে সব অমূল্য সম্পদ ও ঐতিহ্যের অনেকটাই ধ্বংস পেয়েছে ইতিমধ্যে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারের এখনই উচিত এর উপযুক্ত একটা সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেওয়া। অযথা দেরি করলে আর কিছুদিনের মধ্যেই মালবান্দির জঙ্গল থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে লায়কালি আমলের বহুমূল্য অপূর্ব-সুন্দর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি।


   মালবান্দি গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত বলদঘাটা গ্রাম। এই গ্রামের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহ্য হোল এখানকার দ্বাদশ শিবালয়। মালবান্দি হয়ে এই গ্রামে ঢোকার ঠিক আগেটায় বামদিকে শীলাবতী নদীর একেবারে পাড় ঘেঁষে এই দ্বাদশ শিবালয়ের অবস্থান। ১২ টি মন্দির নিয়ে এককালে গড়ে উঠেছিল এই দ্বাদশ শিবালয়। ছ’টি মন্দির ইতিমধ্যে শীলাবতী নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে। যে ছ’টি মন্দির অবশিষ্ট আছে তাও ভাঙাচোরা। বর্তমানে মানুষ এখানে ঢোকে না। যত সাপ, শিয়াল, বেজি আর চামচিকের বাস। কথিত এখানকার কালাচাঁদ সামন্ত নামে এক সামন্তরাজ এই দ্বাদশ শিবালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দ্বাদশ শিবালয়ে এককালে বারোমাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকতো। রাসমেলা, বারুণীমেলা, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো সব জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠিত হোত। কিন্তু আজ তা কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে। এখন এখানে পুজো হয় না, সন্ধ্যায় বাতি জ্বলে না। নি:সীম – নি:সাড়ে পড়ে থাকে এই ভগ্ন দেউল। এখন এটি বলদঘাটা গ্রামের সংরক্ষণহীন পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ।

 
   এবারে আসছি ‘নাককটি মেলা’র কথায়। বলদঘাটা গ্রামের ওপাশে শীলাবতী নদী পেরোলেই পড়ে গড়বেড়িয়া গ্রাম। এই গ্রামেই বসে নাককটি মেলা। আজ থেকে প্রায় ৭০/৭২ বছর আগে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা-১ ব্লকের গড়বেড়িয়া নিবাসী স্বর্গীয় যতীন্দ্রনাথ পাল তাঁর পুকুর খনন কালে একটি পাথরের মূর্তি পান। বর্তমানে মূর্তিটি যতীন্দ্রনাথ পাল মহাশয়ের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে।
   মূর্তিটি আসলে কিসের মূর্তি তা প্রত্নতাত্ত্বিকরা হয়তো বলতে পারবেন, কিন্তু এলাকাবাসী জানেন না কিসের মূর্তি। মূর্তিটির শরীরিক গঠন এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথেষ্ট অভিনবত্ব আছে। মূর্তিটি এখানে কিভাবে এল তা ইতিহাস বলবে কিন্তু পর্যবেক্ষন করে যা দেখা যাচ্ছে তাতে করে মূর্তিটি কোনো দেবী নয়, দেবমূর্তি। অন্তত তার চেহারা, সাজগোজ এবং পরণের পোশাক বলছে।

   কালো শিলাপাথর দিয়ে মূর্তিটি তৈরি। একটি কাঠামোর মধ্যে মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে। মনে করা হচ্ছে রথের উপরে চড়ে তিনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন। রাজকীয় একটা ভাবমূর্তি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে এই দেবমূর্তিটির মধ্যে। কাঠামোর দৈর্ঘ্য
৩ ফুট ২ ইঞ্চি, চওড়া ১ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং পুরু দেড় ইঞ্চি। মূল মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ২ ফুট ৮ ইঞ্চি, অবশ্যই মাথার মুকুটসহ।
   মূল মূর্তির গলায় হার আছে। দু’হাতে বাহুমূলে বাজুবন্ধ আছে। কোমরে আছে কোমরবন্ধ। কর্ণমূলেও আছে দুল। বক্ষপ্রদেশ এবং উদর খোলা। রাজপুত্ররা যেভাবে পোশাক পরিধান করে থাকে তিনি সজ্জিত। মাথায় রাজমুকুট। দু’পাশে কাঁধ পর্যন্ত চুল। হাতে কী ধরা ছিল বোঝার উপায় নেই কর হাতের তালু দু’টোই ভাঙা। মূর্তিটির হাত যেমন নেই তেমনি নাকটাও নেই। আদিবাসীরা যারা কোদাল দিয়ে পুকুর কাটছিল তাদের কোদালের আঘাতে নাকটা কত গিয়েছিল তাই তখন থেকেই জনশ্রুতি ‘নাককাটি’। এই মূর্তিকে সামনে রেখে যে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয় তার নাম নাককাটি মেলা।
   যাই হোক মূর্তিটির মধ্যে আরও যে বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল – মূর্তিটির পায়ে নাগরা জুতো আছে। মজা পরে আছেন। সবই কিন্তু পাথরের তৈরি। মূর্তিটির একেবারে পায়ের তলায় আর একটি মূর্তি। মনে করা হচ্ছে তিনি রথের সারথি। তার নিচে সাতটি ছুটন্ত ঘোড়া। লাগাম দিয়ে বাঁধা। মূর্তিটির ডানদিকে একটি মূর্তি ঠিক গণেশের মতো, বামদিকে একই মাপের আর একটি মূর্তি, গণেশ নয় তবে কার্তিক হতে পারে। ধনুর্বাণ নয়, গদা ধরে আছেন তিনি, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। এই কার্তিক এবং গণেশের নিচে দু’পাশে একটি করে নারী মূর্তি। হাতে করে ফুল না শঙ্খ ধরে আছেন পরিষ্কার নয়।
   আসল মূর্তির পিছনে একটি চক্র আছে। যার উপরে ‘৺’ চিহ্নটি আঁকা। তার দু’পাশে দু’টি মূর্তি ভাসমান অবস্থায়। যেন তারা পদ্মফুলের উপরে ভেসে আছেন, দেবমূর্তিকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এই মূল মূর্তির দু’দিকে যে মূর্তিগুলি আছে তাদের দৈর্ঘ্য ১ ফুট আড়াই ইঞ্চি করে। মূর্তিটির বামদিকের গলা থেক একটি মালার মতো অলঙ্কার জঙ্ঘা ছুঁয়ে ডানদিকের কোমরে শেষ হয়েছে। মালাও হতে পারে, নয়তো পৈতে।
   এই মূর্তিখানি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি অনুরূপ কাঠামোর মতো আর একটি মূর্তি বসানো। এটিও পাওয়া যায় গড়বেড়িয়া মৌজাতেই। তবে এটি গড়বেড়িয়ার পশ্চিম দিকের মৌজাতে পাওয়া যায়। ক্ষেত থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নাম ক্ষেত্রপাল। এটিও শিলাপাথরের তৈরি। মূর্তিটির বৈচিত্র্য কিছুটা আলাদা। মাথা, মাথার মুকুট থেকে বক্ষপ্রদেশের শেষ প্রান্ত পাওয়া গেছে। এটিও পুরুষ মূর্তি। যেটুকু পাওয়া গেছে তার দৈর্ঘ্য ১ ফুট ৮ ইঞ্চি। শুধুমাত্র মুকুটেরই দৈর্ঘ্য ১৫ ইঞ্চি। এই মূর্তির দু’পাশে দু’টো মূর্তি আছে। বাজুবন্ধ আছে। অনুমান করা হচ্ছে একই সময়কালে তৈরি।
   এই দেবমূর্তিটি পাওয়ার ইতিহাস জানতে গিয়ে গুরুদাস পাল মহাশয়ের মুখ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও বেশ চমকপ্রদ এবং বিস্ময়ের। শ্রীপাল কথপ্রসঙ্গে বলেন – তাঁদের বাড়ির মূর্তি পাওয়ার খবর শুনে তাঁর মাস্টারমশাই – নাম প্রফুল্লবাবু (পদবী বলতে পারেননি) কামারপুকুর থেকে এসেছিলেন। তিনি এখানে এসে পুকুরপাড়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি মূর্তি কুড়িয়ে পান। যার উচ্চতা এক ফুটের মতো। তিনি সেই মূর্তিটি নিয়ে চলে যান। কীসের মূর্তি তা গুরুদাসবাবু বলতে পারেননি।
   শ্রীপাল আরও যে কথা জানান – তাঁর স্বর্গত পিতা যতীন্দ্রনাথ পাল বলেছিলেন যে তাদের বাড়ির অনতিদূরে পূর্বদিকের পুকুরের পাড়ে মাটির নিচে একটি ৪ ফুট চওড়া দেওয়াল পাওয়া গিয়েছিল। সেটি এখনো আছে তবে মাটির নিচে কোথায় চাপা পড়ে আছে জানেন না। যতীন্দ্রনাথ পাল বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন।
   তবে এখানে যে একটি গড় ছিল তা সর্বব সত্য। এখানে গড়ের পুকুর বলে একটি পুকুর আছে। সম্প্রতি এটিকে স্থানীয় পঞ্চায়েত সংস্কার করেছে। এখানের গড়ে পাথরগুলি সুন্দর সাইজ করে কাটা। তার কিছু পাথর গুরুদাস পাল তাঁর বাড়ির কাজে লাগিয়েছেন এবং কিছু পাথর পার্শ্ববর্তী রাজবল্লভপুরবাসীরা নিয়ে যান। পাশাপাশি গ্রামের লোকেরা আটচালা বানানোর কাজে লাগিয়েছেন।
   যতীন্দ্রনাথ পাল দেবমূর্তিটি পাওয়ার পর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দক্ষিণ দিকে শীলাবতী নদীর ধারে গঙ্গারাম পালের বাড়ির কাছে একটি বেলগাছের তলায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে একটি মেলা বসান যার নাম ‘নাককাটির মেলা’। শীলাবতী নদী গর্ভে সে স্থান কবেই তলিয়ে গেছে। মূর্তিটি যাতে সংরক্ষিত থাকে তাই যতীন্দ্রনাথ পাল পরবর্তীকালে নিজের বাড়িতে
নিয়ে চলে আসেন। সেখানেই আছে মূর্তিটি। কিন্তু মেলাটি আজও চলে প্রতিবছর মাঘ মাসের ৩ এবং ৪ তারিখে সেই শীলাবতী নদীর ধারেই। পুরাতত্ত্ববিদরা এখানে এলে অনেক কিছুই পেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

একগুচ্ছ হাইকু || সুধাংশুরঞ্জন সাহা || কবিতা

একগুচ্ছ হাইকু সুধাংশুরঞ্জন সাহা (এক) আমার আছে নানা রঙের পাখি মায়াবী চোখে । (দুই) দুদিন ছিল একটু মনমরা ঘরে বাইরে । (তিন) আজ আবার মানুষ মেখেছ...