Wednesday, July 8, 2020

খাঁড়িপথে ইচ্ছে পাড়ি || মধুছন্দা মিত্র ঘোষ || ভ্রমণকথা

খাঁড়িপথে ইচ্ছে পাড়ি
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

পর্ব – ৩

কুইলন 

        কত সফর যে লেগে থাকে ভ্রমণ মজলিসের পাতায় পাতায়। এই এখন যেমন চোখের নাগালে এক ঢাল লাবণ্য নিয়ে অপার জলরাশি। আমার সাবেকী বিস্ময়গুলো জোট বাঁধে। কেরালার বিখ্যাত বোট ক্রুজ বা হাউসবোট সফরের আরও একটি সুরম্য জলপথ হল, কুইলন বা কোল্লাম থেকে আলপুজ্জাহ্‌ বা আলেপ্পি পর্যন্ত খাঁড়ি পথ পরিক্রমা। কুইলন থেকে আট ঘন্টার জলপথে এই সফর, ভ্রমণ মানসিকতায় এক সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। পরিব্রাজকের ঝুলি তো এমনি করেই টইটুম্বুর হয়ে ওঠে। অদ্ভুত সুন্দর যাত্রাপথ। উন্মাদনায় দিশেহারা করছে এই পথের সারল্য। ভারি মনোরম সে সফরপথে, নীল-সবুজ নিসর্গ ও নিপাট নির্জনতা। দুই পাশে নিবিড় বনানী, আঁচলে তার সবুজ মায়ারঙের কারুকাজ। নিভৃত জলরাশির পাড়ে গ্রামীণ পথ, জেলে বস্তি, ঘরদুয়ার, বসতি। জলই যাদের জীবন-ভঙিমার অনেক কিছুই। একফালি গ্রামগুলির চোখের পাতায় যেন এখনও লেগে রয়েছে ঘুমের আদর। তাদের স্যাঁতস্যাঁতে শরীরে জল, জলগন্ধ।  
        স্থানীয় পরিবারগুলির প্রায় প্রত্যেকেরই নিজস্ব কাষ্ঠ নির্মিত ‘কেট্টুভালম’ রয়েছে। হাঊসবোটের সামনে সেই গ্রামের পণ্য বিক্রেতা কিছু কিছু নারীপুরুষ চলে আসেন। ফেরি করেন ডাবের জল ও শাঁস, কাজু, কলা, সব্জী। ওদিকে হাউসবোটে রান্নার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও প্রয়োজন মোতাবিক কিনে নেন পণ্যসামগ্রী। এইসব অঞ্চলের কাজুও খুব জনপ্রিয়। এখানকার কাজু কারখানাগুলিতে কাজু প্রক্রিয়াকরণ হয়ে প্যাকেটজাত হয়। হাঊসবোটের পর্যটকরাও ডেকে বসে হাত বাড়িয়ে কিনে নেন কাজু ও রকমারি মশলার প্যাকেট। কেরলের মশলার প্রশস্তি সারা বিশ্ব জুড়ে। খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকে দেশি বিদেশি বণিকেরা কেরল থেকে নিয়ে যেতেন মশলা, চা, রবার, কাজু, হাতির দাঁত, চন্দন কাঠ, কোকো ইত্যাদি। ‘অষ্টমুড়ি’ হ্রদের কোলে বানিজ্যশহর কুইলন নারকেল ছোবড়া, টাইলস, সিরামিক সামগ্রীর জন্যেও খ্যাত। চোখে পড়ছে ছোবড়া কারখানা। ছোবড়া প্রস্তুতকারক সংস্থাও রয়েছে অনেকগুলি। ব্যাকওয়াটারের প্রবেশদ্বার কুইলন থেকে নৌভ্রমণে দেখতে দেখতে চলা কেরলের নিপাট গ্রাম্যজীবন। কেনাকাটার ফাঁকফোকরে, জলযানের সহযাত্রীরা নিজেদের মধ্যে প্রীতি বিনিময় করে যান।  
         অতীতের কুইলন এখন ‘কোল্লাম’ নামে পরিচিত। সংস্কৃত শব্দ ‘কোল্লাম’ মানে ‘মরিচ’। যদিও আগে অঞ্চলটির কুইলন নাম ছিল। বর্তমানে নাম হয়েছে কোল্লাম। তবে এখনও কুইলন বলেই চেনেন অনেকে। কেরলের মালাবার উপকুলে কোল্লাম বা কুইলন একটি অতীতদিনের বানিজ্যশহর। এমনকি এখনও এটি কেরলের অতি ব্যাস্ত বানিজ্যিক শহর। সুদূর অতীতে জলপথেই কুইলন থেকে আলেপ্পি ও কোচিনে পণ্যবাহী জলযান চলাচল করত। ৭.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কোল্লাম খাঁড়ি পারাভুর হ্রদ এবং অষ্টমুড়ি হ্রদকেও জলের ভালোবাসায় জুড়েছে। কাল্লাদা নদী বাঁধা পড়েছে অষ্টমুড়ি হ্রদে। ইথিক্কারা নদী মিশেছে পারাভুর কয়াল হ্রদে। স্ফটিক স্বচ্ছ জলপথ, সবুজের সমারোহ। অসম্ভব সুন্দর কোল্লাম কেরলের অন্যান্য দ্রষ্টব্য পর্যটনপ্রিয় স্থলগুলি থেকে কোনও অংশে কম নয়। আদিগন্ত জলগাথার কাছে অবসর বিনোদনের নৌবিহারের উসকানিকে সামলানোই দায়।  
         আটটি খাঁড়িপথ মিলে সৃষ্টি হয়েছে ‘অষ্টমুড়ি’ হ্রদ। এই অষ্টমুড়ি লেক হল ‘গেট ওয়ে অফ কেরল ব্যাকওয়াটার’। এই হ্রদ ৭১ কিলোমিটার প্রসারিত তিরুবন্তপুরমের দিকে। হ্রদের ধারেই কেরল সরকারি পর্যটানাবাস। হাউসবোটে যেতে যেতেই দেখতে পাওয়া যায় কোথাও ধান জমি, কোথাও আবার একটুকরো জলা জমি। সেখানে ভিড় করে আছে নানান সামুদ্রিক পাখপাখালি। উৎসাহী পর্যটকের কাছে বেশ লোভনীয় দ্রষ্টব্য। ক্যামেরা সঙ্গে থাকলে তো কথাই নেই। এন্তার সাটার টেপার আওয়াজ তখন পর্যটকমহলে। অনেক পর্যটক ডিঙি নৌকাও ভেসে চলেছে। চলেছে সাজানো গোছানো মোটরবোট। সার দিয়ে বেতের চেয়ার পাতা মোটরবোটগুলিতে। জলের মধ্যে ঝোপঝাড়, কিছু নারকেল গাছ নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপের মত স্থলভূমি। কোথাও কোথাও জলরেখার ধার ঘেঁষে গাছপালা ঘরবাড়ি। মন্দির মসজিদ গির্জাও রয়েছে। কখনও একাকী পথ চলে গেছে গ্রামের পানে। কোনও গ্রামের সামনে টিনের পাতে ‘কথাকলি শিক্ষা কেন্দ্র’ বিজ্ঞাপন লেখা। কোচির বিখ্যাত ‘চায়না নেট’ এর মাধ্যমে মাছ ধরার তোড়জোড়ও নজর এড়াবেনা। ব্যাকওয়াটারের জলে রুপোলি শস্যই যাদের রুজিরুটি। 
       কেরল রাজ্য জলযান পরিবহন বিভাগ (KSWTC) এবং নানান বেসরকারি সংস্থারও ফেরি টার্মিনাল থেকে ডবল ডেকার লাক্সারি বোট, লাক্সারি বোটে আলপুঝাহ বা আলেপ্পি ছাড়াও অন্যান্য দ্বীপ ঘুরিয়ে আনে পর্যটক মরসুমে। অষ্টমুড়ি হ্রদ ও কাল্লদা নদীর সঙ্গমে রয়েছে মুনরো নামের এক দ্বীপ। ব্রিটিশ শাসক কর্নেল জন মুনরোর সম্মানে স্থানটির নামকরণ হয়েছে। তিনি কয়েকটি খাল খনন করে বেশ কয়েকটি ব্যাকওয়াটার অঞ্চল একীভূত করেছিলেন। বোট সাফারিতে বেরিয়ে আসা যায় এখানে। এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষন হল, ওনম মরসুমে নৌকা বাইচ। কাট্টাকয়াল নামের স্বচ্ছ হ্রদটির জল বয়ে গেছে ভাট্টাকয়াল জলায়। এইসব হরেক জলজ দৃশ্য ভুলিয়ে রাখে কদিনের জন্য ঘুরতে আসা ভ্রমণবিলাসী মনকে।  
        বশ্যতা না মানা সোঁদা গন্ধে মাতোয়ারা তাবৎ জলাভূম। কখনও শহরতলির কাছে আঁশটে গন্ধমাখা কোনও খালের ধারে কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের হাউসবোট ইন্দ্রপ্রস্থম। স্নানাগার ও রান্নাঘরে প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ, বাসনপত্র ধোওয়াধুয়ি, বাড়তি জল ছেঁচে পরিষ্কার করা ইত্যাদি নিত্য আবশ্যিক কাজকর্ম সারা হতে থাকে। রেলিং দেওয়া স্টিলের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় খাবারঘর। সেখানে থরে থরে রাখা পেল্লাই ক্যাসারলে সাজানো থাকে রুটি, ভাত, স্যালাড, দু’রকম তরকারি, মাছভাজা, ডাল, দই ইত্যাদি। রাতে মুরগি আর মালয়ালাম পদ্ধতিতে রান্না করা পোলাও বা বিরিয়ানি। সঙ্গে মিষ্টি। আর থাকে নানান ফল। আমরা দগ্ধ দিনে আকাশের কাছে জল চাই। এখানে অঢেল জল। ভেজা বাতাস, দূরে বিন্দু বিন্দু আলো, বিন্দু ছায়া। নাব্য এই কথামালায় জীবনের কী আশ্চর্য আনাগোনা। 
        গতে বাঁধা সফরসূচী থেকে জরা হট্‌ কে এই হাঊসবোট যাত্রা বয়ে আনে এক অন্য আনন্দ সন্দেহ নেই। হাউসবোটের ‘ভিজিটার লগ বুকে’ লিখে দিয়ে আসি ভালো লাগা মনের কয়েক ছত্র। অভিজ্ঞতার রসদ জমা হতে থাকে মনের কুঠুরিতে। পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া অন্য হাউসবোটের যাত্রীরা যখন অজানা বন্ধুত্ব আহ্বানে হাত নাড়েন, তখন বিনিময়ে আমাদেরও হাত নেড়ে জবাব দেওয়া --- কী যে মজার ছেলেমানুষি। প্রাপ্তির ঝুলি মায়ায় ভরে ওঠে কানায় কানায়জলবিহারের রমনীয় সৌন্দর্য, মুগ্ধতার অধিকারটুকু অচিরেই কেড়ে নেবে। বেশ টের পাই এই সফরনামায় ঋণী হয়ে পড়েছি  মালাবার উপকুলের রূপসী জলবিভাজিকাগুলির কাছে।

No comments:

Post a Comment

ভালো আছো প্রিয় জল ? || জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

ভালো আছো প্রিয় জল ?   ||    জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় লেলিহ শিখার মতো ঘিরেছে অন্ধকার আত্মীয় হাত অচেনা দস্তানায় ঢাকা কালো রক্তের বিষ মিশে যা...