সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃৃষ্টি~ ৬ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার


শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃৃষ্টি~ ৬
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

এর পরের দিন ২ মাঘ গড়বেতা শহর থেকে পনেরো কিলোমিটার এবং পাথরা থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে ১২ নম্বর খড়কুশমা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন এই মালবান্দি গ্রামে বিখ্যাত এক মেলা তা হোল ‘ভৈরবী মেলা’। এই  গ্রামের বুকেই মণ্ডলপাড়া এবং নায়েকপাড়ার মাঝখানে বিরাজ করছেন দেবী ভৈরবী। এই অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভৈরবী একজন ব নদেবী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে পূজিতা হয়ে আসছেন। দেবী খুব জাগ্রত। বহুদূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে দেবীর মাহাত্ম্য। প্রতিদিনই এর নিত্যসেবা হয়ে থাকে। তবে পূজা সাধারণত কোনও কুলীন ব্রাহ্মণ বা ভট্টাচার্য করেন না। পূজা করেন এখানকার লায়েক বা নায়েক সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় দু’শো বছরেরও আগে
এই এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল ‘নায়েক’ বা ‘লায়কালি বিদ্রোহ’। অনুমান করা হচ্ছে এই নায়েক সম্প্রদায়ের মানুষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই বনদেবী ভৈরবীর আবাহন করেছিলেন। আর তখন থেকেই এই দেবীর আরাধনা ও পূজা হয়ে আসছে।
   দেবীর মাহাত্ম্য এতটাই বিখ্যাত যে স্থানীয় মানুষ তো বটেই আশ-পাশের বহু গ্রামের মানুষ দেবীকে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্য করে থাকেন। স্বামী-সংসার-সন্তানদের মঙ্গল কামনায় এলাকার মানুষ এখানে পূজা দিতে আসেন নৈবেদ্য সাজিয়ে। ছেলেমেয়েরা যাতে পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করে, ভালো ফল করে, গর্ভবতী মেয়ে-বৌমারা যাতে ভালোভাবে সন্তান প্রসব করতে পারে – তারই আশীর্বাদ প্রার্থনা করে পুজো দিয়ে যান পুণ্যার্থীরা। আবার কারও জিনিস চুরি বা খোয়া গেলেও তা ফিরে পাবার প্রত্যাশাতেও অনেকে পুজো দিয়ে যান। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় – আশেপাশের যত গ্রাম আছে – গাইগরুর বাছুর হলে একুশদিন বা একমাস পর এক ঘটি দুধ দেবীর নামে উত্সীর্গ করে যান প্রায় প্রতিটি পরিবারই। যার ফলে পরিবারের বয়স্ক বা বয়স্কাদের কেউ না কেউ এই দেবী ভৈরবীকে দুধ না খাওয়ানো পর্যন্ত নিজেও ততদিন খান না সেই গরুর দুধ।
   এখানে এই মালবান্দি গ্রামে দেবীর পূজা প্রতিদিনও হলেও বছরের যে দিনটিতে খুবই সাড়ম্বরে এবং জাঁকজমকভাবে পূজা দেওয়া হয় তা হোল ২ রা মাঘ। মকর সংক্রান্তির পর এই ২ রা মাঘ এলাকায় একটি বিশেষ দিন। কারণ এই দিনই দেবী ভৈরবীর পূজাকে কেন্দ্র করে বিরাট একটি মেলা বসে। যে মেলার নাম ‘ভৈরবী মেলা’। এই মেলার খ্যাতি বহু দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। মালবান্দি গ্রামের যে একটি বিশেষ পরিচিতি ঘটেছে তা এই ভৈরবী মেলাকে কেন্দ্র করেই।
   মেলাটি একদিনের। সকালে শুরু – সন্ধে দশটার মধ্যেই শেষ। এই সময়ের মধ্যে বহু মানুষের সমাগম ঘটে এদিন। বিকেলের দিকে ভিড় তো একেবারে উপচে পড়ে। অসংখ্য-অজস্র মানুষের সমাগমে সারা মেলা প্রাঙ্গণ সরগরম হয়ে উঠে। মেলাতে যারা আসে তারা মাটির কালো ঘোড়া এবং চিনি দিয়ে দেবীকে প্রণাম করে। বছরের পর বছর কালো ঘোড়া জমতে জমতে একেবারে স্তূপ হয়ে গেছে। দূ’পাশে লম্বালম্বিভাবে সে কালো ঘোড়ার পাহাড়। দেবীকে দেখতে তাই অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো জায়গা পেরিয়ে যেতে হয়। সারা বিকেল এবং সন্ধে যে মেলায় অজস্র লোকের উপস্থিতি – রাত দশটার দিকে তা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়।
   জনশ্রুতি – রাত্রে এখানে কারুরই থাকার নিয়ম নেই। কারণ বনদেবী ভৈরবী নাকি বাঘের রূপ পরিগ্রহ করে এখানে আসেন। কথাটার সত্যতা কতখানি তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে যেটা মনে করা হয় তা হোল এই মেলার দিন দেবীর সামনে অসংখ্য ছাগবলি হোত। আগে এই এলাকাটি গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল। চারদিক ছিল ঘন ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। স্বাভাবিকভাবেই পূর্বে এখানে ছাগবলির গন্ধে নেকড়ে-টেকড়ে বা ঐ জাতীয় কিছু আসতেই পারে। হয়তো সে কারণেই তখন থেকে এই নিয়ম চালু হয়ে গেছে। তা যাই হোক – মেলার দিন রাত্রে আর এখানে কেউ থাকে না।
   বর্তমানে এই মেলার ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান। তবু এই মেলাকে ঘিরে আজও যে উত্সাএহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় তা মালবান্দি গ্রামবাসীর কাছে গর্বের বিষয় বৈকি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমাগম ঘটে এই মেলায়। সম্প্রীতি ও সদ্ভাব রক্ষায় এই মেলা তাই এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেছে। তাছাড়া দিন যাপনের গ্লানি-প্রাণধারণের ক্লান্তিকর অবসাদ ভুলে দূ’দণ্ডের জন্য হলেও অসংখ্য মানুষ যে একটুখানি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলার সুযোগ পান – সেখানেও রয়েছে মেলাটির সার্থকতা।

   ভৈরবী মেলা ছাড়াও শীলাবতী অববাহিকায় অবস্থিত মালবান্দি গ্রামটি আরও যে কারণে বিখ্যাত তা হল তার নীলকুঠি। ইংরেজরা যে সত্যিই একদিন এদেশে তাদের শক্ত শিকড় প্রোথিত করেছিল, একেবারে প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিস্তার করেছিল তাদের সাম্রাজ্যের জাল – মালবান্দি গ্রামে এলেই তা বোঝা যায়। তাদের তৈরি নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আজও তার সাক্ষ্য, প্রমাণ দেয়। 
   আজ যেখানে তৈরি হয়েছে মালবান্দি আশুতোষ বিদ্যামন্দির অর্থাত্‍ মালবান্দি হাইস্কুল তা এককালে ছিল ইংরেজদের নীলকুঠি। নীলকুঠিরই একাংশের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তার ভিতের উপরই গড়ে তোলা হয়েছে এই হাইস্কুল। সত্তর দশকের শেষের দিকে আমি এই হাইস্কুলেরই একজন ছাত্র ছিলাম। সেই সুবাদে ইংরেজদের তৈরি এই নীলকুঠিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার বা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় দু’শো মিটার লম্বা এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায়
দেড়শো মিটার চওড়া – এই জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছিল এই নীলকুঠি। চারদিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের ভিতর ছিল বিশাল বিশাল বিল্ডিংগুলি। বিল্ডিং নির্মানের কৌশল এবং তার কারুকার্য দেখলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হবেই।
   দক্ষিণদিকে লম্বালম্বি বিরাট এক বিল্ডিং। চোখ রাখলেই দেখা যাবে এই বিল্ডিং-এ ছিল অসংখ্য কক্ষ। কক্ষগুলির সামনের হলটি দালান কোঠার অপরূপ কারুকার্য। পূর্বদিকে একটি বিল্ডিং – আর একটি বিল্ডিং ছিল পশ্চিম প্রান্তে। পশ্চিম প্রান্তের এই বিল্ডিংটিকে ভেঙে পরে পঠন-পাঠনের জন্য একটি বড়ো শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। পূর্বপ্রান্তের বিল্ডিংটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। তবে ভাঙাচোরা অবস্থায়। দেওয়ালের ভিতর শিকড় চালিয়েছে বেশ কিছু গাছ। ফলে বিশাল বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণদিকের বিল্ডিং-এর পিছন দিকে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল উঁচু গম্বুজ। যা এখন সাপ,পেঁচা আর চামচিকেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ভিতরের ধাপগুলি দেখে বোঝা যায় এই গম্বুজের ভিতর দিয়ে একদিন ওঠানামা করা যেত।
   পশ্চিমপ্রান্তের বিল্ডিংটির সামান্য উত্তরে ছিল বিরাট আকারের একটি কুয়ো। ছাত্রাবস্থায় ওয়ার্ক-এডুকেশনের কাজ করতে গিয়ে নীলকুঠিরই ভাঙা ইঁট, নুড়ি, পাথর, চুন-সুরকির টুকরো কুড়িয়ে কুড়িয়ে সেই গর্ত বুজিয়েছি। বড়োরা ভয় দেখিয়ে বলত- ওটা কুয়ো ছিল না, ওটা ছিল মানুষ মারার গর্ত। যেসব চাষিরা নীল এবং তুঁত চাষ করতে রাজি হোত না তাদের নীলকর সাহেবরা ধরে এনে অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন করত। অত্যাচার সইতে না পেরে যারা মারা যেত তাদের এই গর্তে ফেলে দেওয়া হোত। এর সত্যতা কতটুকু তা বলবে ইতিহাস। কিন্তু আমরা এইসব কাহিনি শুনতে শুনতে সত্যিই ভয়ে শিউরে উঠতাম। কী জানি, হয়তো হবেও বা – কারণ নীলকর সাহেবরা তো কম অত্যাচারী ছিল না। তাদের নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা তো ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়ানো। অনুরূপ নীলকুঠির সন্ধান মেলে মালবান্দি গ্রাম থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তরে শীলাবতী নদী ও খালের ওপাশে চমকাইতলায়। যেখানে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাদড়া আশুতোষ বিভাবরী বিদ্যামন্দির। চমকাইতলাতে নীলকুঠি ছাড়াও আছে চমত্কালরিনী দেবী। এই চমত্কা কারিনী দেবী থাকার জন্য এই জায়গার নাম হয়েছে চমকাইতলা। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যে চমকাইতলা নামটি একদিন সারা বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। তা যাই হোক শীলাবতী অববাহিকায় একসময় যে ব্যাপক নীল চাষ হোত, নীলকর সাহেবদের দমন-পীড়ন নীতি চরমে উঠেছিল, এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা নীলকুঠি ও  তার ধ্বংসাবশেষ এই প্রমাণ দেয়। আর যার ফলেই এই অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল ‘নায়েক বিদ্রোহ’ বা ‘লায়কালি বিদ্রোহ’।

1 টি মন্তব্য:

একগুচ্ছ হাইকু || সুধাংশুরঞ্জন সাহা || কবিতা

একগুচ্ছ হাইকু সুধাংশুরঞ্জন সাহা (এক) আমার আছে নানা রঙের পাখি মায়াবী চোখে । (দুই) দুদিন ছিল একটু মনমরা ঘরে বাইরে । (তিন) আজ আবার মানুষ মেখেছ...